0

প্রবন্ধঃ শ্রীশুভ্র

Posted in


প্রবন্ধ



মাতৃভাষা দিবসের ছটায় ঝাপসা একুশ
শ্রীশুভ্র



একুশ এখন মাতৃভাষাদিবস! ২১শে ফেব্রুয়ারীর পূণ্যলগ্ন এখন আর শুধুমাত্র বাংলাদেশের জাতীয় তিথি নয়। আবিশ্ব সকল দেশেরই নিজস্ব মাতৃভাষা দিবস। ঐতিহাসিক যে ঘটনাটি কেবলমাত্র বাংলাদেশের অস্তিত্বের সঙ্গেই সম্পৃক্ত ছিলো এতদিন, আজ সেই ঘটনার সূত্র ধরে আবিশ্ব প্রতিটি দেশেরই অস্তিত্বের সাথে জরিত মাতৃভাষাকে কেন্দ্র করে ২১শে ফেব্রুয়ারীর বিশ্বায়ন ঘটে গেছে। বিশ্বায়নের এই শতাব্দীতে বিশ্বের দরবারে বাঙালি জাতির এই এক অনন্য কীর্তিগাঁথা। এই যে ২১শে ফেব্রুয়ারী আবিশ্ব মাতৃভাষা দিবস পালন, এই ঘটনা বাঙালি হিসেবে আমাদের শ্লাঘার বিষয় সন্দেহ নাই।

কিন্তু সকল প্রদীপের তলাতেই যে অন্ধকার লুকিয়ে থাকে, সেকথাও শাশ্বত সত্য। বাহান্নর ভাষা আন্দোলনের পর ইতিহাসের পাতায় অনেক জল গড়িয়ে গিয়েছে, কেটে গিয়েছে অর্দ্ধশতাবদীরও বেশী সময়। ওলোট পালোট হয়ে গিয়েছে বাংলাদেশের মানুষের রোজকার জীবন যাপনের ছন্দ। লেখা হয়েছে নতুন ইতিহাস নতুন দিনের পাতায়। বাহান্নোর ভাষা আন্দোলন বাংলাদেশের ভাষা সহিত্য সংস্কৃতিকে পরিপুষ্ট করেছে বিপুল পরিমাণে। জেগে উঠেছে একটি ঘুমিয়ে থাকা জাতি। ছিনিয়ে নিয়েছে তার প্রাপ্য স্বাধীনতা; তবু এই আলোর তলায় জমে উঠছে কি না কোন অন্ধকার, সেদিকেও খেয়ল রখা দরকার কিন্তু।

সবচেয়ে মজার বিষয়টি ঘটেছে আজকের আবিশ্ব এই মাতৃভাষা দিবস পালনকে কেন্দ্র করেই। আমরা যারা ২১শে ফেব্রুয়ারীর মাতৃভাষা দিবসে উত্তরণে আনন্দে আত্মহারা, গর্বে উদ্বেলিত তারা কি একবারও ভেবে দেখেছি ২১ ফেব্রুয়ারীর এই উত্তরণে বাংলা ও বাংলাভাষার কতটা সমৃদ্ধি হল? কিংবা কতটুকু ঘটলো আ মরি বাংলাভাষার বিশ্বায়ন। কিংবা আদৌ তা ঘটলো কিনা? তার থেকেও বড়ো প্রশ্ন, বাংলাভাষার বিশ্বায়ণ নিয়ে আমরা কি আদৌ চিন্তিত? আমাদের আবেগের সিংহ ভাগ জুড়ে কতটুকু ব্যাপ্ত বাংলাভাষার বিশ্বায়ন নিয়ে স্বপ্ন সাধ সাধনা- আশা আকাঙ্খা আনন্দ?

অনেকেই হয়তো ভ্রু কুঁচকাবেন, বাংলাভাষার বিশ্বায়ন! সে আবার কি জিনিস? বিশ্বজুড়ে ভাষা তো একটাই, আবার বাংলা নিয়ে টানাটানি কেন? আমাদের প্রতিবেশী দেশ ও প্রদেশগুলিতেই তো বাংলা অচল। আর কেনই বা অবাঙালিরা বাংলা নিয়ে মাতামাতি করতে যাবে। বাংলা থাক বাংলাতেই! 

বাংলা থাক বাংলাতেই! অথচ ইংরেজী থাক ইংল্যান্ডেই, সেকথা যদি ভাবত ইংরেজরা! কেউই সে কথা ভাবে না। প্রতিটি সমৃদ্ধ জাতিরই বাসনা থাকে তার ভাষা ও সংস্কৃতিকে আবিশ্ব ছড়িয়ে দিতে, পারুক আর না পারুক। নিজ মাতৃভাষার সেই বিকাশের অভিমুখেই উন্মুখ থাকে অধিকাংশ জাতির মন মনন মানসিকতা। 

আমাদের বাঙালি জাতির কথা একটু ভিন্ন সন্দেহ নাই। কারণ অনেকেই গর্ব অনুভব করেন আধুনিক বাংলাভাষার উৎপত্তি ইংরেজী ভাষার সাহচর্যে মনে করেই। কাউকে কাউকে এমন কথাও বলতে শোনা যায়, বাংলা ভাষায় বুৎপত্তি অর্জন করতে হলে ভালো করে ইংরেজীটাও শেখা দরকার। এবং আধুনিক যুগে আমরা প্রায় স্মরণেই রাখি না, বাংলাভাষার উদ্ভবে সংস্কৃত ভাষার গুরুত্বের কথা। আর আমাদের এই মানসিকতার কারণেই বর্তমানে বাংলা ব্যকরণ ও বানান বিধির তোয়াক্কা না করেই চর্চিত হয় বাংলা! যার সুদূর প্রসারী ফল ভাষার পক্ষে কখনোই সুখকর হতে পারে না! এই যে নিজের মাতৃভাষা সম্বন্ধেও আত্মনির্ভরতার একন্ত অভাব এইটি যে কোনো জাতির মাতৃভাষার পক্ষেই চিন্তার বিষয়। আর এই আত্মনির্ভরতার অভাব থেকেই বাধাগ্রস্ত হয় ভাষার সমৃদ্ধি ও প্রসার। তাই বাঙালি মাত্রেই আমরা ভাবতেই পারি না বাংলা ভাষার বিশ্বায়নের কথা। ভাষার বিশ্বায়ন বলতে আমরা ধরেই নিই একটি মাত্র ভাষার কথা। ভাষার বিশ্বায়ন প্রাথমিক ভাবে মূলত নির্ভর করে সাম্রাজ্যবাদের উপর। যেভাবে ইংরেজী ও স্প্যানিশ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদ ছাড়াও সাংস্কৃতিক আদান প্রদান ব্যাবসা বাণিজ্যের মাধ্যমেও ভাষার বিশ্বায়ন ঘটতে পারে। বর্তমানে যার কিছুটা নমুনা দেখা যাচ্ছে হিন্দী ভাষার ক্ষেত্রে। বোম্বাই সিনেমা, ও টিভির দৌলতে হিন্দীর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিই তার অন্যতম প্রমাণ। কিন্তু দুঃখের কথা বাংলার বাইরে বাংলাভষার জনপ্রিয়তা শূন্য। পরিতাপের কথা বাংলার অভ্যন্তরেই বাংলার জনপ্রিয়তা বিশেষ কিছু নয়। কারণ আমরা সবাই জানি, জীবনে সুখে সমৃদ্ধিতে থাকতে গেলে বাংলা ভাষার উপর নির্ভর করা যায় না কোনো ভাবেই। দুই একজন জনপ্রিয় কথাসাহিত্যক কি সঙ্গীতশিল্পীর দৃষ্টান্ত তো বড়ো কথা নয়! ফলে সাধারণ ভাবে আমরা ধরেই নিয়ে থাকি বাংলা ভাষার কোনো ভবিষ্যত নেই। নেই কোনো কার্যকারিতা। তাই বাঙালির কাছে মাতৃভাষা চর্চা আজ আর খুব একটা প্রাসঙ্গিক বিষয় নয়। 

নয় বলেই কাঁটাতারের দুই দিকেই ইংরেজী স্কুলগুলির এত জনপ্রিয়তা। সব বাবা মায়েরাই চান তার সন্তানকে ইংরেজী মাধ্যমে শিক্ষিত করে তুলতে। ভবিষ্যত জীবনের সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তার কথা ভেবে। আর ঠিক এইখানে এসেই উপলব্ধি ঘটে আমাদের, বাহান্নোর ভাষা আন্দোলনের বাষট্টি বছর পরেও মাতৃভাষা রূপে বাংলাভাষা বাঙালির জীবন ও জীবিকায় সদর্থক ভূমিকা রাখতে সফল হয়নি আজও। হয়ত অনেকেই প্রতিবাদ করবেন, বিশেষ করে স্বাধীন বাংলাদেশের কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চাইবেন। যেখানে বাংলা রাষ্ট্রভাষা হিসাবেই প্রচলিত। এমনকি বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গেও রাজ্যের সরকারী কাজকর্মে বাংলার ব্যবহার ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে তাঁরা য়ুক্তি সাজাবেন। ঠিক, কিন্তু দেখতে হবে একটি জাতির উন্নতির পিছনে যে মেধাসম্পদের চর্চা ও বৃদ্ধির প্রয়োজন; সেই কাজটিতে সেই জাতির মাতৃভাষা কতখানি সদর্থক ভূমিকা রাখতে পারছে! এইটিই সবচাইতে মূল্যবান প্রশ্ন! আর এইখানে এসেই ঠেকে যাচ্ছে আ মরি বাংলা ভাষা। আবহমান কালব্যাপি এইটিই বাংলাভাষার দুঃখজনক হলেও সত্য ইতিহাস। আমরা স্বীকার করি আর না করি।

আমাদের বুঝতে হবে কোনো জাতিই কোনো বিদেশী ভাষাকে মাধ্যম করে তার মেধাসম্পদের সার্বিক চর্চা ও সমৃদ্ধি ঘটাতে পারে না, ইতিহাসে কোনদিন কোথাও পারেনি। আমরাও পরবো না। আর, একটি দেশের মেধাসম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার ছাড়া সেই দেশ সেই জাতি কখনো উন্নতি করতে পারে না! কাঁটাতারের দুই দিকেই আমরা যে যে বিষয়গুলিকে দৃষ্টান্ত হিসেবে খাড়া করে উন্নয়নের জয়ঢাক পেটাতে যাই, একটু ভালো করে তলিয়ে দেখলেই বোঝা যাবে- সেগুলি সার্বিক উন্নয়নের প্রমাণ্য কোনো ছবি নয়। হলে আমরা প্রায় সকল রকমের আন্তর্জাতিক পরিমিতিতে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিশ্বের উন্নত দেশগুলি থেকে বহূ বছর করে পিছিয়ে থাকতাম না। আর এই ব্যাপারে কাঁটাতারের উভয় প্রান্তেই আমাদের অবস্থা ঊনিশ বিশ সমান।

তাই একুশ নিয়ে আমাদের আবেগ যতটা- মাতৃভাষা বাংলা নিয়ে দায়বদ্ধতা ততটা নয় আদৌ। একুশের পূণ্যলগ্নে শহীদবেদীতে মালা দেওয়ার লাইন যত দীর্ঘই হোক না কেন, সাধের ইংরেজী মাধ্যমের স্কুলে সন্তানকে ভর্ত্তির করার লাইন তার তুলনায় দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে উঠছে প্রতিদিন! এটাই দুই বাংলার বাস্তব চিত্র। আর এই চিত্র একটি জাতির ভবিষ্যতের পক্ষে ভালো নয়, বর্তমানের পক্ষে সুস্থ নয়। দুঃখের কথা এই সত্য উপলব্ধি করার মতোন প্রজ্ঞা বাঙালি হিসেবে আমাদের অস্থিমজ্জায় আজ আর অবশিষ্ট নেই। আজ আমরা সবাই একটি দুটি বিশেষ ভাষা ও সংস্কৃতির বিশ্বায়নে গা ভাসাতে পারলেই নিশ্চিন্ত বোধ করি। তাই আজ দুই বাংলাতেই ইংরাজী ও হিন্দী এত জনপ্রিয়। সেই ভাষাদুটির চর্চায় আমরা যতটা যত্নবান হতে স্বচেষ্ট হই, মাতৃভাষা বাংলার সম্বন্ধে ঠিক ততটাই উদাসীন থাকাটাই পছন্দ করি। এইটিই হল সেই অন্ধকার, ২১শে ফেব্রুয়ারীর বিশ্বমাতৃভাষা দিবস হয়ে ওঠার আলোর তলায় যা জমাট বাঁধছে কেবলই।

এবং আরও মজার কথা হল, ২১শে ফেব্রুয়ারী বিশ্বমাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হওয়াতে আবিশ্ব প্রতিটি দেশেই মাতৃভাষা সচেতনাতা বৃদ্ধি পাবে, সকলেই নিজ নিজ ভাষার শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে গর্ব অনুভব করবে সন্দেহ নাই। কিন্তু সকল জাতির নিজ নিজ মাতৃভাষার উৎসবের এই দিনে বাঙালির একুশ আটকে থাকবে সেই বাংলাতেই। কজন আর জানবে ২১শের ইতিহাস ও বাঙালাদেশের ইতিহাসে তার যথার্থ ভূমিকা? তাই বিশ্বমাতৃভাষা দিবসের রোশনাইতে একুশ আটকে থাকল বাংলাদেশেরই অভ্যন্তরীন ইতিহাস হয়ে। একুশেরও ঘটল না যথার্থ বিশ্বায়ন আর আমরাও একুশের চেতনাকে ক্রমেই ঝাপসা থেকে ঝাপসা করে দিয়ে নিজ মাতৃভাষাকেই জাতির জীবনে করে তুলছি অপ্রাসঙ্গিক! রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী জীবিত থাকলে বলতেন কী, ইহাই বাঙালিত্ব?

0 comments: