Next
Previous
Showing posts with label ধারাবাহিক. Show all posts
0

ধারাবাহিক - শৌনক দত্ত

Posted in




















১৪. অ্যানি এরনো, যার লেখা নিজের স্মৃতিকেই অবিশ্বাসের মুখে দাঁড় করায়





প্রিয় বাসু,

গতকাল তোমার চিঠি পেয়েছি। বেনারস ভ্রমণ শেষ করে নিশ্চয় ফিরে গেছো। খুব ছোটবেলায় বেনারস গিয়েছিলাম বাবা মায়ের সাথে, সে স্মৃতি ফিকে হয়ে এসেছে। বেনারসও নিশ্চয় বদলে গেছে অনেক। কি অবাক কান্ড দেখো তুমি যখন রেলগাড়ির কামরায় বসে ভার্জিনিয়া উলফের আত্মহননের কথা লিখছো আমি তখন পড়ছি অ্যানি এরনোর দ্য ইয়ার্স। ষাটের দশকে, যখন অ্যানি এরনোর বয়স কুড়ি থেকে পঁচিশ, তখন ভার্জিনিয়া উলফ পড়ে পড়ে তার মধ্যে লেখালেখির তীব্র ইচ্ছা ঘনিয়ে উঠেছিল। কাছাকাছি সময়ে আঁদ্রে ব্রেটনের ‘ফার্স্ট ম্যানিফেস্টো অব সুররিয়ালিজম’ পড়ে জীবন এবং লেখালেখির ও জীবনযাপনের একটি পথরেখার সন্ধান পেয়েছিলেন। জারমেইন গ্রিয়ারের ‘দ্য ফিমেইল ইউনাক’ বইটি তার দার্শনিক চিন্তায় নারীর সামাজিক অবস্থানকে প্রবিষ্ট করে দিয়েছিল। ১৯৬৫-তে প্রকাশিত হয় জর্জ পেরেকের ‘ষাটের গল্প : বিষয় আশয়’। জর্জ পেরেকের রচনাকৌশল তাকে ভাবিয়েছিল। এই সবকিছু তাকে চেনা-পরিচিত জগৎকে নতুন করে উপলব্ধির দিকনির্দেশনা দিয়েছিল। ভার্জিনিয়া উলফের মতো তারও মনে হয়েছিল লিখতে হলে প্রথমে বর্ণনাতীত বাস্তবকে তীব্রভাবে অনুভব করে নিতে হবে। লেখালেখির লক্ষ্য হবে হৃদয়ের গভীরে অনুভূত বাস্তবকে সাহিত্যের নতুন কোনো ভাষায় উত্থাপন করা। তুমি অ্যানি এরনোর লেখা পড়েছো কিনা জানি না, আমি এর আগে এই লেখকের কিছুই পড়িনি, আর পড়িনি বলেই আফসোস হচ্ছে। মনে হচ্ছে কত কম জানি আমি! উনাকে যত পড়ছি আমি মুগ্ধ হচ্ছি। দ্য ইয়ার্স বইটি ফ্রান্সের অর্ধ-শতাব্দীর এবং পরিবর্তনের বিবরণ। এর সঙ্গে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলো যেমন বিটলস, ৯/১১, ইরাকের যুদ্ধ, ইত্যাদি বিষয়কে ফরাসী দৃষ্টিকোণ থেকে লেখক উপস্থাপন করেছেন। উত্তর-পশ্চিম ফ্রান্সের নরম্যান্ডির ছোট্ট শহর ইভতো-তে ১৯৪০ সালে জন্ম ও বেড়ে ওঠা অ্যানির। আধুনিক সাহিত্যে স্নাতকোত্তর হওয়ার পরে কিছু দিন স্কুল শিক্ষিকার কাজ করেন। তার পরে ১৯৭৭ সালে অধ্যাপিকা হিসেবে যোগ দেন ফ্রান্সের দূরশিক্ষা বিশ্ববিদ্যালয় ‘সিএনইডি’-তে। ২০০০ পর্যন্ত সেখানেই অধ্যাপনা করেছেন তিনি। লেখালিখি শুরু করেন যখন বয়স ত্রিশের কোঠায়। এক সাক্ষাৎকারে অ্যানি বলেছিলেন, ‘‘লেখক হয়ে ওঠার পথটা আদপেই সহজ ছিল না।’’ ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘লে আরমোয়ার ভিদ’। আদ্যন্ত আত্মজৈবনিক এই উপন্যাসটি প্রকাশিত হওয়ার পরেই তার ‘সাহসী’ কণ্ঠস্বরের জন্য সাড়া ফেলে দিয়েছিল। ‘দ্য ইয়ার্স’ গ্রন্থকে ফরাসি জীবনের স্মৃতিচারণার ‘মাস্টারপিস’ বলেন সাহিত্য সমালোচকেরা। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাময়িকী দ্য নিউইয়র্কার ২০২০ সালে লিখেছিল, অ্যানি এরনো তাঁর ২০টির বেশি বইয়ে শুধু একটি কাজ করেছেন: নিজের জীবনের খুঁটিনাটি তুলে আনা।

কয়েকমাস আগেই আমি অ্যানি এরনোর নাম শুনি, তখন থেকেই তাকে নিয়ে যেখানে যা পাচ্ছি তাই পড়ছি। তাঁর কাহিনি কখনও চলে ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণের পথ ধরে। কখনও সেই পথ থেকে দৌড়ে কিছুটা দূরে গিয়ে দাঁড়ান তিনি। ব্যক্তিগত স্মৃতিকেই দেখেন দূর থেকে। নিজের স্মৃতিকে নিজেই অবিশ্বাস করেন। নিজেকে নিজেই প্রশ্নের সামনে দাঁড় করান। ফরাসি ভাষার স্মৃতিচারণ মূলক সাহিত্য চর্চা তিনি করেন। তাই বার বার তাঁর সঙ্গে তুলনা চলে এসেছে প্রায় একই ঘরানার কিংবদন্তি সাহিত্যিক মার্সেল প্রুস্তের। তিনি কি প্রুস্ত দ্বারা অনুপ্রাণিত? যদিও অ্যানি বলেছেন, তাঁর উপর প্রুস্তের প্রভাব খুবই কম। বরং তাঁর উপর অনেক বেশি প্রভাব রয়েছে আমেরিকার সাহিত্যিক আর্নেস্ট হেমিংওয়ের। খুব সচেতনভাবেই তিনি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন ফরাসি সাহিত্যের সব ধরনের বৈশিষ্ট্য। ভাষাটুকু বাদ দিয়ে তিনি নিজেই হয়ে ওঠার চেষ্টা করেছেন একেবারে স্বতন্ত্র এক ঘরানা। ফরাসি ‘মিঠে বোল’, মেদুরতা, রোম্যান্টিসিজমকে বুড়ো আঙুল দেখাতেই ভালো লেগেছে তাঁর। নিজ ভাষ্যেই তিনি হয়ে উঠেছেন কর্কশ, কঠিন, এবং অবিশ্বাসী। আর সেটিই তাঁকে তাঁর নিজের দেশ, নিজের ভৌগলিক সীমারেখা, নিজের জাতিসত্ত্বার থেকে অনেক দূরে নিয়ে গিয়ে ফেলেছে। আশ্চর্য় বিষয় কি জানো ২০০৮ সালে প্রকাশিত এই বইটিকে ইংরেজি অনুবাদক এলিসন স্ট্রেয়ার এরনোর অন্যান্য রচনাগুলির নিরিখে এক বিচ্যুতি বলেছেন। আপাতভাবে কথাটি যথার্থ। রচনার দৈর্ঘ্যে, বা বহু স্বরের ব্যবহারে এমনকী এর বিশাল ব্যাপ্তিতেও এই বই এরনোর অন্যান্য বইয়ের থেকে আলাদা। কিন্তু নিহিত বিচারে এই বইয়ের মধ্যেও লক্ষ্য করা যায় তাঁর লেখার সাধারণ চিহ্নগুলি। এই বইয়ের মতোই একের পর এক বইতে নিজের অতীতে ফিরে গিয়েছেন এরনো, এটি সম্পূর্ণ অনুভূতিহীন গল্প। লেখক কমই প্রকাশ করেছেন নিজকে। অথচ পুরোটাই ব্যক্তিগত গল্প। পরিবার, সন্তান, লেখকের বিয়ের সমাপ্তি এসেছে, কিন্তু আসেনি প্রেম। অ্যানির মায়ের আলঝেইমার এসেছে, বেড়ালের চোখের দিকে তাকানোর সঙ্গে খেয়াল করা এবং প্রাক্তন প্রেমিকা যখন একজন কম বয়সী সঙ্গীকে খুঁজে পায় - এসব নিয়ে তাঁর ঈর্ষার কথা, কিন্তু অন্যগুলো একেবারেই আবেগহীন। আর সেখান থেকে খনন করে এনেছেন নানান স্মৃতিচিহ্ন, যেগুলিকে জড়ো করে পুনর্নির্মাণ করেছেন একেকটা অধ্যায়। নিজেকে বুঝবার জন্য তো বটেই, একইসঙ্গে নিজেকে ভেঙেচুরে নিজের মাধ্যমে জীবনকে বুঝবার এক বিরামহীন প্রয়াসে ব্রতী হয়েছেন। ভাষাকে ছুরির মতো ব্যবহার করেন তিনি, যা কল্পনার পর্দা ছিঁড়ে ফেলবে। সত্যান্বেষী ব্যোমকেশ বক্সী, ফেলুদা কিংবা হালের একেন বাবুর অপরাধ দৃশ্য পুনর্নির্মাণ করার মতো তাঁর লিখনপদ্ধতি। যেখানে কেউ সন্দেহের বাইরে নয়, নিজের স্মৃতিকেও বারংবার প্রশ্নচিহ্নের সামনে এনে দাঁড় করাচ্ছেন। সশরীরে ফিরে যাচ্ছেন স্মৃতিবিজড়িত জায়গাগুলিতে। কুড়িয়ে নিচ্ছেন কিছু বস্তুনিষ্ঠ সূত্র, কিছু ইঙ্গিত — কখনো নিজের ডায়েরির পাতা, কখনো কোনো সাদা কালো ছবি, কখনো কোনো বিজ্ঞাপনের সুর, কোনো গানের লাইন, কোনো বন্ধুর করা একটা আলগা মন্তব্য। স্মৃতির ফাঁকফোঁকর দিয়ে যাতে কোনোমতেই মিথ্যার অনুপ্রবেশ না ঘটে, তাই তাঁর এই নিরলস পরিশ্রম।

'ইন আ উওম্যানস্ স্টোরি'তে অ্যানি লেখেন, "আমি কেবল কুড়ুনি মাত্র"। তাই তাঁর লেখায় শুধু নিজের কথাই লেখেননি। সেখানে জড়ো হয়েছে তাঁর প্রজন্ম, তাঁর বাবা মায়ের প্রজন্ম এবং নানান শোষিতের কথকতা। এই বিশাল ব্যপ্তির স্তরে স্তরে গাঁথা যৌনতা ও অন্তরঙ্গতার থিম, সামাজিক বৈষম্য, যন্ত্রণা, লজ্জা— এই ইঁটেদের ফাঁকে ফাঁকে সময় আর স্মৃতির দ্বৈরথ। অথচ এমন থিমের বয়ান অত্যন্ত সাদামাটা গদ্যে। পাঠকের হাত ধরে সেই গদ্য করে তোলে নানান দ্বন্দ্বের মধ্যমণি। সে কারণেই এমন সরল গদ্য বেছে নেওয়া। অথচ এই সরলতার মধ্যেও এরনোঁর নিজস্ব বোধ কাজ করে ক্রমাগত। যে বোধ চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়, কোনও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাই বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। তা এক নির্দিষ্ট সমাজ-রাজনীতির অংশ। এই রাজনৈতিক বোধ অভিজ্ঞতাকে 'ব্যক্তিগত' বলে ঝেড়ে ফেলা যায় না। স্মৃতিও পিচ্ছিল। যার একদিক অস্বচ্ছ, অপরিষ্কার, সেদিকটা পক্ষপাতিত্বের ভার জমে জমে ক্রমশ ঝুঁকে গিয়েছে। কাজেই ভরসার অযোগ্য। তাতে ভরসা করলে আছাড় অনিবার্য। সেদিক থেকে তাঁর উক্তির সত্যটা খানিক খাটে বৈকি! কুড়ুনি হিসেবে তাঁর কাজ আদতে নৃতত্ত্ববিদের মতোই। খুঁড়ে খুঁড়ে ধ্বংসাবশেষ টুকু তোলা, ফসিল জমানো, সেই সব টুকরো জীবন তারপর এক তালে বাঁধার চেষ্টা। তাতে এই মহাকালের নিরিখে ব্যক্তির অবস্থান ফুটে ওঠে। যতটা ফোটানো যায় আর কী! তারই চেষ্টা মাত্র। অ্যানি এরনোকে যতটা পড়েছি আমার মনে হয়েছে শুধুমাত্র গল্প ও বিষয়বস্তু নয়, ফর্ম সম্পর্কে বেশি দৃষ্টি দিয়েছেন তিনি। তাঁর গদ্যশৈলীও এই কাজে তাঁর সহায়ক ও পরিপূরক। নির্মেদ, অনাড়ম্বর ঝরঝরে বাক্যগুলো যেন বিজ্ঞানের বস্তুনিষ্ঠা আর সাহিত্যের সত্যের মধ্যে এক আশ্চর্য্য মেলবন্ধন। তাঁকে পড়তে গিয়ে বারবার মনে হয় এই পাঠ ধ্রুব নয়। গতিহীন নয়। পড়ার প্রতিটি বাঁকে, প্রতিটি স্মৃতিচারণে, যতবার সে পাঠের দিকে নজর ফেরে পাঠ বদলে যেতে থাকে। অনবরত নিজের স্মৃতির প্রতি পাঠককে সন্দিগ্ধ করে তোলেন এরনো। নিজ অতীতের ময়নাতদন্তে লেখিকা খোদ পাঠকের ভিড়ে মিশে যান। থেকে থেকে উঠে আসে বিবিধ ধারাবিবরণী। নিজের সম্বন্ধে হোক বা দুনিয়ার, কোনো কিছুই লুকোচ্ছেন না এরনো। শরীরে আগত এই নতুন প্রাণটির প্রতি কোনো দয়ামায়া তার হয়নি, হয়নি অপত্যস্নেহের উন্মেষ। নিজের ডায়েরিতে নিজেকে ‘গর্ভবতী’ বলে উল্লেখ তো করেন নি, জরায়ুর অভ্যন্তরে থাকা প্রাণটিকেও শুধুমাত্র একটি বস্তু হিসেবে দেখেছেন, লিখেছেন ‘জিনিসটা’, ‘ওটা’। কলেজের এক পুরুষ সহপাঠী, সে তখন আন্দোলন করছে মেয়েদের নানা অধিকার নিয়ে, তাকে সবটা বলেছেন, কিন্তু সাহায্য পাওয়া তো দূরস্থান, বরং সেও সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করেছে। এরনো ক্ষোভ প্রকাশ করছেন না, বরং সহজভাবে লিখছেন, “আসলে, ঘটনাটা শুনে ওর মনে আমার সম্পর্কে ধারণাটা পাল্টে গিয়েছিলো, আমি তখন সেই ধরনের মেয়ে যে ‘হ্যাঁ’ বলবে, ‘না’ বলবে না। ছেলেরা তখন এই দুই ভাগেই মেয়েদের ভাগ করতো।” এইসব খোলামেলা স্বীকারোক্তির পাশাপাশি, তাঁর লেখায় অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে খুঁটিনাটি জিনিসের স্মৃতি। ঋতুস্রাবের রক্ত, একটা ছোপ লাগা অন্তর্বাস, একটা সরু লম্বা দণ্ড (যেটা যোনির মধ্যে ঢুকিয়ে গর্ভপাত করা হবে), একটা সাপ্তাহিক পত্রিকা, একটা ওষুধের শিশি — ছোট ছোট এই ছবিগুলি ছড়িয়েছিটিয়ে থাকে তাঁর লেখায়, অতীতকে জ্বলজ্যান্ত করে তোলে। মনে পড়ে যায় টি এস এলিয়টের নৈর্ব্যক্তিকতার তত্ত্ব — objective correlative : কবিতা হলো কবির ব্যক্তিগত আবেগ বা অনুভূতির প্রকাশ নয়, বরং আবেগ থেকে মুক্তি। এই তত্ত্ব অনুসারে, একজন কবিকে ঐতিহ্য ও ব্যক্তিগত প্রতিভার মধ্যে একটি ভারসাম্য রাখতে হয়, যেখানে কবি ঐতিহ্যকে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে অর্জন করেন এবং এর মাধ্যমে তিনি অতীত ও বর্তমানের মধ্যে একটি 'যুগপৎ ক্রম' তৈরি করেন। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কবি একটি 'নৈর্ব্যক্তিক' শৈল্পিক সত্তা তৈরি করেন, যা তাঁর ব্যক্তিগত অনুভূতিকে ছাপিয়ে যায়। কবি তাঁর ‘আমি’কে আনবেন না কাব্যে, তাঁর অনুভূতির, যন্ত্রণার বর্ণনা করবেন না; তিনি শুধু কিছু শব্দ, কিছু বস্তু, কিছু ছবি সাজিয়ে দেবেন, পাঠকের মনে দৃশ্যটি আপনিই ফুটে উঠবে, অনুভূতিগুলি জাগরুক হবে। নারীবাদীরা সঙ্গত কারণেই তাঁকে দলে টেনেছেন। তাঁর লেখায়, যাপনে, দৃষ্টিভঙ্গিতে বুভোয়ার, গ্রিয়ার, মিলেটদের ছাপ অনস্বীকার্য। কিন্তু কোলরিজ যেমনটা বলেছিলেন, প্রকৃত স্রষ্ঠার মন লিঙ্গভেদের ঊর্ধ্বে। এরনোর লেখায় তাই নারীজীবনের কথা মর্মে মর্মে অনুধাবন করতে পুরুষ পাঠকের সমস্যা হয় না। দেশকালের তফাতে অনেক ছোটখাটো রেফারেন্স হয়তো সবসময় ধরা যায় না, কিন্তু একটা জীবনের মধ্যে দিয়ে সময়ের বহমানতা, একজন ব্যক্তির মধ্যে দিয়ে সমাজের গতিপ্রকৃতি, আর সর্বোপরি একজনের স্মৃতির মধ্যে দিয়ে সর্বজনীন সত্যের প্রকাশ পাঠক সহজেই দেখতে পান। তাঁর অ্যাবর্শনের ট্রমা, খেটে খাওয়া পরিবারের মেয়ে হওয়ার লাঞ্ছনা, নিজেকে শিক্ষিত করার অবিরত চেষ্টা পুঙ্খানুপুঙ্খ ফুটে ওঠে কালের কাগজে। পুরুষশাসিত এই দুনিয়ায় নারীর স্বতন্ত্র অস্তিত্ব কতটুকু স্বীকৃত? হয় এক নিমেষে বাতিল করা, ছোট করা নয় নিজের আকাঙ্ক্ষার সামগ্রী হিসেবে আপন করা— এই দুই গত পুরুষের। এর বাইরে নারীকে একজন মানুষ হিসেবে কি আজও স্বীকৃতি দিয়েছেন পুরুষেরা? আত্মনির্ভরতার হিসেব নারীর এখনও বুঝে নেওয়া বাকি— এরনোর 'কুড়ুনিয়া' সাহিত্য আমাদের বারবার এই নগ্ন সত্যের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। প্রলেপের বিন্দুমাত্র চেষ্টা না করেই।

নিজের অতীতকে এতো শীতল, বস্তুনিষ্ঠ গদ্যে ফুটিয়ে তোলা, প্রায় আবেগহীন, বাহুল্যবর্জিতভাবে — এমন উদাহরণ বিশ্বসাহিত্যে বিরল বললেও অত্যুক্তি করা হবে না! আত্মজৈবনিক রচনায় তা আরোই অপ্রতুল। সর্বত্র নিজেকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখানোর যুগে, আত্মপ্রেমে ও আত্মগরিমায় হাবুডুবু খাওয়ার, আর অহরহ সত্যের সাথে মিথ্যেকে গুলিয়ে ফেলার এই সময়ে এমন একটি নৈর্ব্যক্তিক, ঋজু ও সত্যনিষ্ঠ স্বর তাই বিশ্বের পাঠককূলের কাছে এক আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবে, সন্দেহ নেই। ‘আমি’কে ছাপিয়ে যেতে পারা, নিজের অতীতকে এক নির্লিপ্ত দূরত্ব থেকে দেখতে ও দেখাতে পারা — এটাই বোধয় অ্যানি এরনোর সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব, যা তাঁর আত্মকথাগুলিকে সাহিত্যপদবাচ্য করে তুলেছে, এনে দিয়েছে সাহিত্যের সর্বোচ্চ পুরস্কার।

অ্যানি এরনো আমাকে মোহগ্রস্থ করে ফেলেছে। তোমার ভ্রমণ কেমন হলো? বেনারস ছাড়া আর কোথায় কোথায় গেলে? সব কিছু জানার অপেক্ষায় রইলাম। আমার চিঠি তোমার হাতে যাবার আগেই হয়ত তোমার চিঠি পাবো, নিরন্তর ভালো থেকো। মাঝে মাঝে মনে হয় আমাদের গেছে যে দিন সে কি একেবারই গেছে, কিছুই কি নেই বাকি? অ্যানি এরনো পড়তে পড়তে নিজেকে কোথায় খুঁজে পাচ্ছিলাম। আচ্ছা আমাদের ব্রেকাপটা কেন হয়েছিল বলতে পারো? তোমার কি আমাকে দায়ী মনে হয়? অনেক প্রশ্ন ঘিরে ধরছে, ঘড়ির কাটা চার ছুঁই ছুঁই করছে, কাল অফিস আছে তাই আর লিখছিনা।


অন্তে ভালো হোক

সুস্মি

০১.১০.২০২৫
0

ধারাবাহিক - নন্দিনী সেনগুপ্ত

Posted in




















১৬

ঈশ্বরকে ধন্যবাদ যে আমেরিকান ভদ্রমহিলা যেখানে থাকেন, সেই গেস্ট হাউসে পৌঁছাতে গেলে মেট্রোতে যাতায়াত করবার প্রয়োজন নেই। ইংলিশ চার্চের কাছেই জায়গাটা, এভেন্যু জর্জ ফাইভের মত শান্ত এবং অভিজাত এলাকাতে। বের্নহার্ড সেখানে পৌঁছে কেয়ারটেকারকে ঘরের নাম্বারটা জানালো। তারপর কেয়ারটেকার ভদ্রমহিলাকে টেলিফোনে জানাল বের্নহার্ডের কথা এবং একজন কিশোর, চাপরাশিদের মত বাদামী রঙের পোশাক পরা, সে তাঁকে সঙ্গে করে নিয়ে গেল লিফটের দিকে। লিফট থেকে নেমে কিশোরটি মাথায় সোনালি পাড় বসানো টুপির প্রান্ত কেতাদুরস্ত ভঙ্গিতে ধরে নিঃশব্দে হেঁটে যেতে লাগল কার্পেট মোড়া এক লম্বা করিডোর ধরে। হাতে সঙ্গীতের ফাইলটি নিয়ে বের্নহার্ড ওই কিশোরকে অনুসরণ করল।

আমেরিকান ভদ্রমহিলার ঘরে গ্রামোফোন বেজে যাচ্ছে। তারা বেশ জোরে জোরে টোকা দিল দরজায়; তারপর মাথা নুইয়ে দরজায় কান পেতে শুনবার চেষ্টা করল যে ভিতর থেকে আর কোনও শব্দ আসে কি না। তৃতীয়বার টোকা দেবার পরেও যখন কোনও উত্তর এল না, তখন সেই কিশোর দ্বিধাগ্রস্তভাবে বের্নহার্ডের দিকে একবার তাকিয়ে দরজার হাতল চেপে ধরে জোরে জোরে দরজার পাল্লার নিচের দিকে ধাক্কা দিল। ভেতর থেকে কেউ চেঁচিয়ে উঠল, ‘কাম ইন, প্লিজ!’ কিশোর তখন দরজাটা পুরোপুরি খুলে ধরে একটুখানি বাও করে পিছিয়ে দাঁড়াল।

বের্নহার্ড ঘরের মাঝখানে একটু বিস্মিত এবং অপ্রস্তুত ভাবে দাঁড়িয়ে চারদিকে দেখতে লাগল।

ঘরের দেওয়ালগুলো সবুজ সিল্কে ঢাকা। উজ্জ্বল রঙের অনেকগুলো কুশন রাখা আছে একটা বড় ডিভানের উপর। গৃহসজ্জায় উজ্জ্বল রঙের ব্যবহারে বেশ আধুনিকতার ছাপ। ডিভানের পাশে একটা টেবিল। টেবিলের উপরে রাখা গ্রামোফোন থেকে বীভৎস শব্দের হুল্লোড় ভেসে আসছে। সেই শব্দগুলোর একটাও বের্নহার্ডের পক্ষে উচ্চারণ করা সম্ভব নয়।

একজন যুবতী উঠে দাঁড়াল, যে গ্রামোফোনের পাশে একটা সোফার উপরে এলিয়ে বসেছিল। হাসিমুখে বের্নহার্ডের দিকে তাকাল সে। বের্নহার্ডের মনে পড়ল যে সে শুনেছিল যে এই যুবতী জার্মান ভাষা বুঝতে পারে; “গুটেন আবেন্‌ড!”১ বলে একটু ঝুঁকে বাও করল সে।

‘ওঃ, কোনও ব্যাপার নয়!’ বলে উঠল ভদ্রমহিলা। হাসিতে ঝলমলে চোখমুখের মত তাঁর কণ্ঠস্বরটিও বেশ মানানসই ধরনের খুশি ঝলমলে। তারপর সে ঘুরে দাঁড়িয়ে বিলি বলে একজন যুবককে ডাকল। বিলিকে বের্নহার্ড প্রথমে খেয়াল করেনি। বিলি জার্মান বলতে পারে না; কিন্তু সে যথেষ্ট উষ্ণভাবে বের্নহার্ডের সঙ্গে করমর্দন করল। হাত মেলানোর সময়ে বের্নহার্ড বুঝতে পারল যে বিলির গায়ে বেশ জোর এবং বিলিকে দেখতেও খুব বলশালী। তাঁকে দেখে ফ্যাশন ম্যাগাজিনের বিশাল কাঁধ আর সরু নিতম্বের যুবক মডেলদের কথা মনে পড়ল বের্নহার্ডের। বিলির পরনে চওড়া ঢিলা ট্রাউজার, সোয়েটারের উপরে মোটা জ্যাকেট, হালফ্যাশানের পোশাক মডেলের মত চেহারায় বেশ মানিয়েছে।

কিন্তু বিলির সঙ্গে সত্যিই সেরকম কোনও ব্যাপার নেই। সবার আগে এই যুবতী ভদ্রমহিলা, বেটসির সঙ্গেই বের্নহার্ডের কাজ। বেটসি আগ্রহভরে বের্নহার্ডের হাত থেকে ফাইলটা নিয়ে নিল এবং অমায়িকভাবে জিজ্ঞাসা করল যে সে তার গা থেকে গরম কোটটা খুলে রাখতে চায় কি না।… ‘হি ইজ কোয়াইট আ চাইল্ড!’ তার সম্বন্ধে হয়তো বলল, তারপর আবার জিজ্ঞেস করল যে সে ইংরেজি বোঝে কি না।

বের্নহার্ড নিঃশব্দে মাথা নাড়ল ইতিবাচকভাবে। ভদ্রমহিলার সোফা ও গ্রামোফোনের উল্টোদিকে রাখা একটা বড় আরামকেদারাতে বসল সে। বেটসি তার সামনে সিগারেট, চকলেট, পোর্ট ওয়াইন, ছোট কেক এসব সাজিয়ে গুছিয়ে রেখে দিল। বেটসি যখন এগুলো গোছাচ্ছিল, তখন সে আরেকটু সামনে থেকে এই যুবতী ভদ্রমহিলাকে নিরীক্ষণ করবার সময় পেয়েছিল। বেটসির বয়স একেবারেই বেশি নয় এবং সে খুবই সুন্দরী। তাঁর দাতগুলো এত ঝকঝকে সাদা যে বের্নহার্ডের টুথপেস্টের বিজ্ঞাপনের কথা মনে পড়ল। বিলিকে দেখে অবশ্য সঙ্গে সঙ্গেই তার ফ্যাশন ম্যাগাজিনগুলোর কথা মনে পড়েছিল।

যারা বিজ্ঞাপন বানায়, নির্ঘাত তারা শুধু আমেরিকান মডেলদের আদর্শ ভেবেই বানায়। বের্নহার্ড ভাবছিল… ভাবতে ভাবতে বেশ অপ্রতিভভাবে সে একটা সিগারেট ধরাল।

বেটসির চোখে মুখে সবসময় একটা খুশি ঝলমল করছে। খুশি ছাড়া আর বিশেষ কোনও সূক্ষ্ম অভিব্যক্তি বের্নহার্ডের নজরে এল না। যাই হোক, বেটসির লাল রঙে রাঙানো বাঁকা ঠোঁটের সঙ্গে এই খুশি খুশি ব্যাপারটা বেশ ভাল মানিয়েছে। মনে হচ্ছে যেন এক শিশু আনন্দে বিস্ময়ে মুখ অল্প খুলে হাঁ করে আছে। শুধু ঠোঁট নয়, বেটসির হাতের নখগুলোও লাল রঙে রাঙানো। মনে হচ্ছে সাদা সাদা হাতের আঙ্গুলের ডগায় লাল লাল ফোঁটা দেওয়া আছে। বের্নহার্ডের স্বভাবই হল মানুষের হাতের দিকে তাকিয়ে হাতের গড়ন, আঙুলের আকার এসব খুঁটিনাটি লক্ষ্য করা। ফলে মানুষের হাতের দিকে তাকিয়ে মানুষ সম্বন্ধে একটা ধারণা তৈরি করার ব্যাপারে সে বেশ আত্মবিশ্বাসী। এরই মধ্যে অবশ্য সে বিলির হাতগুলিও একঝলক দেখে নিয়েছে। বিলির হাত বেশ বড়সড়, শক্তিশালী। যদিও আঙুলগুলো সেরকম সুন্দর নয়, ডগার দিকটা একটু থ্যাবড়া ধরনের… তবে আঙুলগুলোর মধ্য দিয়ে বেশ ইতিবাচক লক্ষণ প্রকাশ পাচ্ছে। বিলির হাত দেখে মনে হয় যে মানুষটা ভাল, সরলসোজা। বেটসির হাতগুলো খুব সাদাটে এবং দেখে মনে হচ্ছে যে তার হাতের নিয়মিত পরিচর্যা করে সে। হাতের উপরের ভাগ সরু, সুগঠিত এবং দৃঢ় হলেও আঙুলগুলি ভারি কোমল। না চাইলেও ইনেসের হাতের কথা মনে পড়ে বের্নহার্ডের। ইনেসের হাতও ভারি সুন্দর আকারের এবং সুগঠিত। অবশ্য এভাবে তুলনা করা একেবারে অর্থহীন। তাই বের্নহার্ড নিজের পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যায় এবং এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে বেটসি একজন ভারি লাবণ্যময়ী, স্বাস্থ্যবতী, সুন্দরী যার পায়ের গড়ন বেশ দৃঢ় এবং সুগঠিত হলেও সে এক নরমশরম যুবতী। কাঁধের গঠন গোল ধরনের, বালিকার মত ভরাট গাল এবং গোল চিবুক।

বের্নহার্ডের মনে এই গায়িকা ভদ্রমহিলা সম্বন্ধে একটা অন্যরকম চিত্র আঁকা হয়েছিল। কারণ, আমেরিকান মহিলাদের সে আগে দেখেনি।

সঙ্গীতশিক্ষার সূচনা হিসেবে বের্নহার্ড সেদিন প্রস্তাব দিয়েছিল যে বেটসি একটা গান গাইবে এবং সে বাজাবে। দেখা গেল যে ওই ঘরের মধ্যেই একটা বিশাল পিয়ানো আছে। সবুজ সিল্কে ঢাকা দেওয়াল শোভিত ঘরটার মধ্যে ঠেসেঠুসে এক কোণে রাখা আছে বাদ্যযন্ত্রটা, যদিও সেটা এখন ফুলদানি রাখবার স্ট্যান্ড হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। নানা চেষ্টাচরিত্র করে ফুলদানি এবং ফুলের বোকেগুলি সরিয়ে পিয়ানোর ঢাকা খোলা হল।

বেটসি ‘ডি ফোরেল্লে’২ গাইতে চেয়েছিল। তবে বের্নহার্ড বারণ করেছিল। সে কোনও সহজ গান দিয়ে প্রথম দিন শুরু করতে চেয়েছিল। কিন্তু বেটসি সেসবে কর্ণপাত করল না। বেটসি ভয়াবহ ভুলভাল সুরে গাইল; একটা পর্যায়ে যে কারো মনে হতে পারে যে গানটা গায়িকার নিজেরই রচনা। তবে বেটসির কণ্ঠস্বর সুন্দর, পরিষ্কার এবং তাল, লয় ইত্যাদির জ্ঞান বেশ পাকা। কিছুক্ষণ অভ্যাস করবার পরে বেটসি ক্লান্ত হয়ে পড়ল এবং প্রস্তাব দিল বাইরে কোথাও গিয়ে কিছু খেয়ে আসবার জন্য। বিলি এবং বের্নহার্ড দু’ জনেই যেতে রাজি হল। রাত প্রায় ন’টা বাজে। অবশেষে বের্নহার্ড আর নিজের কৌতূহল সংবরণ করতে না পেরে বেটসিকে জিজ্ঞাসা করেই ফেলল যে তার কোনও পোষা বাঁদর আছে কি না। সে কথা শুনে বেটসি ভীষণ খুশি হল। চানঘরের দরজা খুলে সে ভারি নরম স্বরে ডাক দিল… ‘ক্ন্যাগিইই!’ সঙ্গে সঙ্গে শরীরে আটকানো একটি শিকলের ঝনঝন শব্দের প্রচণ্ড কোলাহলের মধ্য দিয়ে একটি ছোট, কুৎসিত প্রাণী ঘরে প্রবেশ করল। এক উড়ন্ত দানবের মত কুশনগুলির উপর দিয়ে, গ্রামোফোন মেশিনের উপর দিয়ে বেশ কয়েকটা ফুলদানি উল্টে ফেলে লাফিয়ে গেল সে। তারপর ভয়ে ভীত হয়ে একটা চেস্ট অফ ড্রয়ারের পেছনে গিয়ে লুকিয়ে পড়ে অবশেষে আবার চানঘরে ঢুকে গেল প্রাণীটি। মুহূর্তের মধ্যে সবুজ সিল্কে ঢাকা দেওয়ালে সজ্জিত ঘরটা একেবারে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল।

বেটসি আপ্লূত ভঙ্গিতে বারবার বলতে লাগল, … ‘কী মিষ্টি! কী সুন্দর না ও?’ তারপর আবেগের বশে এত হাসতে লাগল যে তার চোখ থেকে আনন্দাশ্রু গড়াতে শুরু করল। এসব কাণ্ডকারখানা দেখে বের্নহার্ড এতটাই বিস্মিত হয়েছিল যে অনেকক্ষণ পর্যন্ত কোনও কথা বলতে পারছিল না সে।

(চলবে)


১. জার্মান ভাষায় “গুটেন আবেন্ড!” শব্দবন্ধের অর্থ শুভ সন্ধ্যা।

২. ‘ডি ফোরেল্লে’… ঊনবিংশ শতকের শুরুর দিকে অস্ট্রিয়ান সঙ্গীতজ্ঞ ফ্রান্‌জ শুবার্ট রচিত একটি সঙ্গীত।
0

ধারাবাহিক - রঞ্জন রায়

Posted in























২৪.১

গাঁয়ের এক পাশে একটা ছোট পুকুর মত ছিল যা দেখলে মনে পড়বে “থাকিলে ডোবাখানা, হবে কচুরিপানা”। নোংরা পাঁক, দুর্গন্ধে বজবজ করছে। কিছু টাট্টু ঘোড়া, ধোপার গাধা, ঘেয়ো কুকুর আর শুয়োর ওটা দেখে খুশিতে ডগোমগো। পোকামাকড়, ডাঁশ, মশা মাছি ফ্যামিলি প্ল্যানিং এর জটিলতার থেকে সরে গিয়ে সমানে অযুত নিযুত হারে বংশবৃদ্ধি করে চলেছে। ওরা বোধহয় আমাদের শিক্ষা দিচ্ছে যে আমরাও যদি ওদের কায়দায় বাঁচতে শিখি তাহলে দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি বলে কোন সমস্যা থাকবে না।

নোংরামি কিছু কম পড়িয়াছে ভেবে গাঁয়ের দু’ডজন ছেলে পেটের স্বেচ্ছাচার থেকে নিস্তার পেতে নিয়মিত এখানে আসে-- সকাল সন্ধ্যে বা দিনের যে কোন সময়। এরা এসে এই ডোবার কিনারে --কঠিন, তরল ও বায়বীয়—তিনরকম পদার্থ ত্যাগ করে হালকা হয়ে ঘরে ফেরে।

কোন পিছিয়ে থাকা দেশেরও যেমন কোন- না- কোন আর্থিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব থাকে, তেমনই এই নোংরা ডোবাটারও বিশেষ গুরুত্ব ছিল। এর আর্থিক বিশেষত্ব হোল গায়ে লাগা ঢালু জমিতে খুব ভাল ঘাস জন্মায় আর গ্রামের এক্কাওলাদের ঘোড়াগুলোর খাদ্যসমস্যা এভাবেই দূর হয়। রাজনৈতিক গুরুত্ব হোল শনিচর এখানে এসে এক্কাওলাদের ভেতর ওর পঞ্চায়েতি নির্বাচনে মোড়ল হওয়ার জন্যে ভোট চাইতে এসেছে।

শনিচর যখন ডোবার কিনারে পৌঁছল তখন দু’জন ঘেসেড়ে ঘাস কাটছিল। ওরা পেশায় ঘেসেড়ে নয়, বরং এক্কাওলা। এমন যে এলাকায় সাইকেল রিকশার চলন হওয়ার পরও প্রাণে ধরে পেশা ছাড়েনি, ঘোড়াগুলোর সঙ্গে এখন অবধি টিকে আছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সাইকেল-রিকশা চালকদের হুজুম যে ভাবে দ্রুত বেড়ে উঠছে তার থেকে এটা প্রমাণিত হয় যে দেশের আর্থিক নীতি খুব ভাল আর দেশের ঘোড়াগুলো কোন কাজের নয়। আর এটাও বোঝা যাচ্ছে যে আমরা সমাজবাদ প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে এগিয়ে চলেছি। প্রথমে ঘোড়া ও মানুষের প্রভেদ দূর করেছি এখন মানুষে মানুষে ভাগাভাগি দূর করতে হবে।

এসব তো যুক্তি দিয়ে সিদ্ধ করা যায়, কিন্তু এই যে শিবপালগঞ্জ ও শহরের পথে এক ডজন সাইকেল-রিকশা চলছে, তারপরেও দুটো এক্কাগাড়িওলা আর ওদের ঘোড়া এখনও হাপিস হয় নি কেন —তার যুক্তি কী?

মানলাম, ঘোড়াগুলো এই ডোবার পাড়ে ঘাস খেয়ে বেঁচে আছে, কিন্তু এক্কাওলারা? ওরাও কি এদের কায়দাতেই পেট ভরাবে? উঁহু, খাদ্যবিজ্ঞানের সূত্র বলে মানুষের বুদ্ধি মাঝে মাঝে ঘাস খেয়ে পুষ্ট হতে পারে বটে, কিন্তু খোদ মানুষ এভাবে বাঁচতে পারে না।

শনিচর যখন এক্কাওলাদের কাছে গেল তখন ওর মনে এত সব গম্ভীর আর্থিক সামাজিক ভাবনা ছিল না। ওর মাথায় একটাই চিন্তা—ভোট চাই। সুতরাং ও কোন ভুমিকা ছাড়াই সোজাসুজি কাজের কথায় এল।

--দেখ, আমি এবার পঞ্চায়েত প্রধান হবার জন্যে কাগজ জমা করেছি। যদি নিজের ভাল চাও, তো আমাকে ভোট দাও।

একজন এক্কাওলা শনিচরকে উপর থেকে নীচ আর নীচ থেকে উপর অব্দি একনজর মেপে নিয়ে নিজের মনে বিড়বিড় করল—“ এ হবে প্রধান? পোঁদে নেই ইন্দি, ভজরে গোবিন্দি”!

ভোট ভিক্ষায় পথে নামলে অনেক বড় বড় নেতাও নম্র হয়ে যান। আর এ তো শনিচর! জবাব শুনে ওর তেজ গায়েব হোল, দাঁত বেরিয়ে এল। বলল, “আরে ভাই, আমি প্রধান হব নাম-কে-ওয়াস্তে। আসল প্রধান তো বৈদ্যজী মহারাজ। ব্যস, এটা মেনে নাও যে তুমি ভোটটা আমাকে নয় বৈদ্যজীকে দিচ্ছ। ধরে নাও, আমি নই স্বয়ং বৈদ্যজী তোমার কাছে ভোট চাইতে এসেছেন”।

ওরা একে অন্যকে দেখল, তারপর চুপ মেরে গেল। শনিচর বলল, “বল ভাই, কী ভাবছ”?

“বলার কী আছে”? অন্যজন মুখ খুলল, “বৈদ্যজী নিজে ভোট চাইছেন ! ওনাকে কে মানা করবে? আমরা কি ভোট নিয়ে আচার দেব? নিয়ে যান! বৈদ্যজীই নিয়ে যান”।

প্রথমজন উৎসাহিত। “ভোট সালা কোন একশ টাকার চিজ? যে কেউ নিয়ে যাক”।

অন্যজন প্রতিবাদ করল, “যে কেউ কেন নেবে? এই প্রথম বৈদ্যজী আমাদের কাছে কিছু চেয়েছেন। উনিই পাবেন, নিয়ে যান”।

শনিচর বলল, “তাহলে পাকা কথা ধরে নিই”?

দুজনে একসাথে যা বলল তার সার—মরদের কথার নড়চড় হয় না। আমাদের দেবার মত কিছু নেই, তবে বৈদ্যজী কিছু চাইছেন, ওনাকে ‘না’ বলা কঠিন। আশা করি তুমিও প্রধান হয়ে গেলে মাটিতে পা ফেলবে, আকাশে বাঁশ দিয়ে খোঁচাবে না”।

শনিচর চলে গেছে। ওরা দু’জন খানিকক্ষণ চুপচাপ ঘাস কাটতে লাগল। আর মাঝে মধ্যে আজকাল ঘাস কেন কমে যাচ্ছে সে নিয়ে তর্ক জুড়ে দিল। হঠাৎ চোখে পড়ল একজন লোক চলে যাচ্ছে। ওর আসল নাম কেউ জানে না, সেটা শুধু সরকারের কাগজে লেখা রয়েছে। সবাই ওকে বলে “রামাধীনের ভাইয়া”। ও হচ্ছে শিবপালগঞ্জের গ্রামসভার বর্তমান প্রধান। তবে গ্রামের সবাই মনে করত আসল প্রধান হলেন রামাধীন ভীখমখেড়িজী।

বিগত বছরগুলোয় গ্রামের দীঘিগুলোর মাছের নীলাম বেশ উঁচু দরে হয়েছিল। আর পড়তি রুক্ষ জমির পাট্টা জারি করেও সভার আয় বৃদ্ধি হয়েছিল। গ্রাম পঞ্চায়েত কখনও সখনও চিনি আর ময়দার কোটা বিতরণের কাজ করছিল। এইসব মিলে গ্রামসভা বড়লোক হচ্ছিল। তবে শিবপালগঞ্জে সবাই জানত যে গ্রামসভার বড়লোক হওয়া আর সভার প্রধানজীর বড়লোক হওয়া একই কথা। ফলে প্রধানের পদ বেশ লাভপ্রদ হয়ে গেল।

শুধু তাই নয়, প্রধানের পদ বেশ সম্মানেরও বটে। বছরে দু-একবার থানাদার ও তহশীলদার ওকে ডেকে এনে দু’চারটে গাল দেয় বটে, সে দিক গে। আলো-আঁধারিতে গাঁয়ের একাধ গুন্ডা ওকে পাঁচ দশটা ঢিল ছোঁড়ে , তা ছুঁড়ুক গে’। তাতে ওই পদের সম্মান বা মর্যাদায় কোন আঁচ লাগে না। কেননা আমাদের গোটা দেশে এবং শিবপালগঞ্জে সম্মান সেই পায় যে বড়লোক হয়েছে, সে যেভাবেই হোক না কেন! এছাড়া গোটা দেশের মত এখানেও কোন সংস্থার পয়সা ফোকটে হজম করে গেলে বড়লোকের সম্মান কমে যায় না।

এইসব কারণে রামাধীনের বড়দার ইচ্ছে এবারেও প্রধানের গদি আঁকড়ে থাকার।

এখন উনি ওনার ছোলার ক্ষেতের পাশে পড়শির ক্ষেত থেকে একগাদা চারা তুলে ফেলে বড় বোঝা বগলে পুরে ঘরে যাচ্ছিলেন এবং যেতে যেতে উঁচু গলায় গাল পাড়ছিলেন –যাতে লোকে জেনে যায় যে আসলে ওনার ক্ষেত থেকেই ছোলাগাছ চুরি হয়েছে।

উনি ডোবার পাশে এক্কাওলাদের সঙ্গে শনিচরের গুজগুজ দেখতে পেলেন। অমনি পথ বদলে পুকুরপাড়ে চলে এলেন। এক্কাওলারা দেখে নিল শনিচর দূরে চলে গেছে কিনা। তারপর ওনাকে সেলাম ঠুকে বলল, “ভাইয়া, তুমি এবারেও প্রধানগিরির জন্যে ভোটে দাঁড়াচ্ছ তো”?

রামাধীনের বড়দা প্রথমে ক্ষেত থেকে চানাচুরির গল্পটা শোনালেন। তারপর বললেন—দেখছ তো, আমার প্রধানগিরির সময় ফুরিয়ে আসছে, তাই চোর ব্যাটারা আবার সাহস করে পুরনো বদমায়েসি শুরু করেছে। যত্তক্ষণ আমার শাসন ছিল, এরা নিঃশ্বাস বন্ধ করে দিন গুনছিল।

ওনার যুক্তি হোল, এই গঞ্জহা ব্যাটারা (শিবপালগঞ্জের লোকজন) যদি নিজের ভাল বোঝে, সুখ-শান্তি চায় তাহলে শালারা নিজের থেকেই আমাকে ফের প্রধান বানাবে। আমায় কিছু করতে হবে না। শেষে উনি বেপরোয়া ভাব দেখিয়ে বললেন—আচ্ছা, শনিচর ব্যাটা কী বলছিল?

--ভোট চাইছিল।

--তোমরা কী বলেছ?

--বলেছি নিয়ে নিও, ভোট নিয়ে আচার পাতব নাকি?

-- ওকে ভোট দেবে? নিজের ভালমন্দ, উঁচুনীচু সব দেখেটেখে তবে দিও।

--সব দেখে নিয়েছি। তুমি ভোট চাইছ, আচ্ছা, তোমাকেই দেব’খন।

প্রথমজন ফের বলল—আমরা ভোট নিয়ে কি আচার পাতব?

রামাধীনের ভাইয়া বলল—তাহলে শনিচরকে ভোট দিচ্ছ না?

--তুমি বললে ওকেও দিতে পারি। যাকে বলবে তাকেই দিয়ে দেব। আমরা তোমার হুকুমের চাকর। ওই শালার ভোট নিয়ে কিসের আচার—

বড়দা ওর কথার মাঝখানে বলে উঠলেন—শোন, কোন শনিচর ফনিচরকে ভোট দেবে না, ব্যস।

--ঠিক আছে, দেব না।

--আমাকে দেবে।

--দিয়ে দেব। বললাম তো, নিয়ে যাও।


রামাধীনের বড়দা ফের ছোলাচোরের বাপান্ত করতে করতে ঘরের রাস্তা ধরলেন। চলার গতির সঙ্গে ওনার গালির রূপ ও আকার বদলে যেতে লাগল। কারণ, মহল্লা এসে গেছে। ওনার ইচ্ছে লোকজনকে বুঝিয়ে দেয়া যে উনিও একধরণের গুণ্ডা এবং আজ ওঁর মেজাজ খারাপ।




চামারটোলা ও উঁচুজাতের মহল্লার মাঝখানে তৈরি হয়েছে গান্ধী চবুতরা (মণ্ডপ)। অন্যদিন সেটার উপর কুকুর শুয়ে থাকে এবং চেঁচায়। কিন্তু আজ ওখানে মানুষের কন্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে। নির্বাচনের অল্প ক’দিন আগে রামাধীনের ভাইয়া ওটার মেরামত করিয়েছেন। কারণ, নির্বাচনের আইনে বোধহয় এমনটা করার নির্দেশ রয়েছে! অথবা নির্দেশ থাক বা না থাক, সব বড় বড় নেতা, না জানি কেন, নির্বাচনের দুয়েক মাস আগে নিজের নিজের নির্বাচনী এলাকায় মেরামত বা সংস্কার করাতে লেগে যান।

কেউ নতুন পুল বানিয়ে দেন, কেউ রাস্তা; অন্যেরা গরীবদের মধ্যে কম্বল এবং চাল-গম বিতরণ করেন। সেই হিসেবে রামাধীনের বড়দা ওই চবুতরার চেহারা বদলানোর চেষ্টা করেছিলেন।

ওখানে একটা লম্বা-চওড়া নিম গাছ দাঁড়িয়ে আছে। অনেক বুদ্ধিজীবীর মত গাছটাও অনেক শাখা প্রশাখা ছড়িয়েছে বটে, কিন্তু ভেতরটা ফোঁপরা। ভাইয়া ওর নীচে একটা কুয়ো বানিয়েছিলেন। আসলে ওখানে কুয়ো আগে থেকেই ছিল। উনি সেটা মেরামত করিয়ে সরকারি কাগজপত্তরে ‘নবীন কূপ নির্মাণ’ এন্ট্রি করিয়ে দিলেন। উদ্দেশ্য মোটা সরকারি ভর্তুকি হাতিয়ে ফেলা। কাগজাটা হয়ত ঠিক নৈতিক হল না, তবে একরকম রাজনৈতিক তো হল। আগে এই কুয়ো বর্ষার দিনে উঁচু জমি থেকে বয়ে আসা জল নিজের পেটে পুরে গ্রামকে বন্যার হাত থেকে রক্ষা করত। এখন ওর চারপাশে উঁচু বাঁধানো পাড়। বোঝাই যাচ্ছে এর সম্বন্ধ রয়েছে কোন পঞ্চবার্ষিক যোজনার সঙ্গে। এই কথাটা বড় গলায় বলার জন্যে ওই পাড়ের দু’পাশে দুটো উঁচু থাম তোলা হয়েছে। একটার গায়ে রয়েছে এক ‘শিলালেখ’ঃ

‘তৃতীয় পঞ্চবার্ষিক যোজনা। গাঁও-সভা শিবপালগঞ্জ। পশু-চিকিৎসক শ্রী ঝাউলাল এই কুয়োর ‘শিলান্যাস’ করেছেন। সভাপতি শ্রী জগদম্বা প্রসাদ’।

কুয়োর পাড় পাকা করে দেয়ায় বাইরের জল আর কুয়োতে আসে না। কিন্তু ভেতরের জল বাইরে আসে। মানে, ওর ভেতর থেকে শীতল-মন্দ-সুগন্ধ বা পচা জলের গন্ধ নাকে টের পাওয়া যায়। যেন ও গ্রামের লোকজনকে ডাক দিচ্ছে—পেটের কৃমির অভিজ্ঞতা তোমাদের হয়েছে বটে, এবার ওটা ছেড়ে ম্যালেরিয়া আর ফাইলেরিয়াকেও নিয়ে যাও।

কুয়োর মেরামতের সঙ্গে গান্ধী-চবুতরারও কপাল ফিরে গেল। ক’টা নতুন ইঁট জুড়ল আর তার গায়ে এমন সিমেন্ট যে ঠিকেদারের হাতে লাগানোর পনের দিন পরেও খসে পড়ে নি। এই আবহাওয়ায় চবুতরা বেশ আকর্ষণীয় হয়েছে। কলেজের যত ফালতু ছেলে কখনও সখনও এখানে বসে জুয়ো খেলতে লাগল। সন্ধ্যের সময় বদ্রী পালোয়ানের কুস্তির আখড়া থেকে কয়েকজন চ্যালা আসতে শুরু করল। ওদের হাবভাব দেখলে মনে হয় এখানে আসার একমাত্র উদ্দেশ্য বসে বসে গায়ে এঁটে থাকা মাটিকে চুলকে চুলকে তুলে ফেলা।

আজকে গ্রামসভার ভোট। কলেজের ছুটি। নির্বাচন তো অন্য জায়গায় হওয়ার কথা ছিল, নিঃসন্দেহে চামারটোলা থেকে দূরে। কিন্তু আজ গান্ধী-চবুতরায় ভারি ভীড়। আর সবরকম লোক একসাথে মিলেমিশে বসে আছে—যেমনটি গান্ধীজি চাইতেন। জুয়ো-খেলুড়েরা তাস পকেটে পুরেছে। আখড়ার চ্যালারা আজ কুস্তি করেনি, গায়ে মাটি মাখে নি, শুধু তেল মালিশ করে এসেছে। ফলে তার উগ্র গন্ধ দিগবিদিকে ছড়িয়ে যাচ্ছে।


রূপ্পনবাবু আজ যেন ক্লান্ত চরণে আসছেন। মুখের ভাবে রোজকার স্ফুর্তি আর চালাকির ঝলক দেখা যাচ্ছে না। ওনাকে গাব্ধী চবুতরার দিকে আসতে দেখে এক উঠতি পালোয়ান চোখ মেরে বলল, “কহো বাবু, ক্যা হাল”?

জবাবে রূপ্পন বাবু অন্যদিনের মত চোখ মারলেন না বা এটাও বললেন না যে তুমিই বল রাজা! তোমার কী হাল? উনি এমনভাবে মাথা নাড়লেন যার মানে—ঠাট্টা করছ! আমার ভাল লাগছে না। মুড খারাপ।

উনি চোখে কালো চশমা লাগিয়ে গলায় রেশমি রুমাল বেঁধে ধীরে ধীরে এসে চবুতরায় ধপ করে বসে পড়লেন। খানিকক্ষণ উপস্থিত ভদ্রজনের মধ্যে শান্তি বিরাজ করতে লাগল।

ছোকরা পালোয়ানটি অলস ভঙ্গিতে আড়মোড়া ভেঙে কনুই ভাঁজ করল। ওর কনুইয়ের উপরে নেংটি ইঁদুরের মত একটা ছোট্ট মাংসপেশি জেগে উঠল। ও বড় আদর করে ওটাকে বার বার হাত বুলিয়ে ফের রূপ্পন বাবুর কাছে গিয়ে বসল। ও আবার চোখ মারল, তারপর রূপ্পন বাবুর পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে বলল, “ কী ব্যাপার বাবু! আজকের রঙ যেন একটু বদরঙ লাগছে”!

শিবপালগঞ্জের বিখ্যাত প্রবাদ—“প্রেমিকের তিন নাম,

রাজা, বাবু, পালোয়ান”।

সে হিসেব ধরলে রাজার বদলে বাবু সম্বোধনে রূপ্পন বাবুর সম্মান কিছু কম হল মনে হতে পারে। তবে শিবপালগঞ্জ এটাও জানে যে এই ছোকরা পালোয়ানকে রূপ্পন বাবু অনেক ছাড় দিয়ে রেখেছেন। যেন গান্ধীজি সর্দার প্যাটেলকে কড়া কথা বলার ছাড় দিয়েছিলেন। সুতরাং দু’জনের নিজেদের মধ্যে এইসব কথাবার্তাকে আমরা ‘মহাপুরুষদের মহারঙ্গ’ বলে ধরে নেব।

কিন্তু রূপ্পন তো তাঁর চ্যালার গায়েপড়া ভাব ও ঠাট্টা খেয়াল করছেন না। একেবারে চুপটি করে মুখটি বুজে রয়েছেন। কলেজের একটি ছাত্র বলল,--গুরু, আমাদের কী করতে হবে? তুমি এখনও কিছু বলনি। এবার রামাধীনের দলে যেমন উত্তেজনা গরমাগর্মি ভাব, শনিচরের দলে তেমন কিছুই নেই’।

রূপ্পন বাবু পাতাল থেকে আসা আওয়াজে বললেন—‘এখন ঠান্ডাগরম নিয়ে কথা বলা বেকার। ভোটের ফলাফল একটু আগে বেরিয়ে গেছে। শনিচর জিতে গেছে’।

ছোকরা পালোয়ানের দল আর কলেজের ছাত্রদের মধ্যে হুলুস্থুল পড়ে গেল। চারদিকে একটাই প্রশ্ন ঘুরতে লাগল, “ আরে কী করে? কী ভাবে? শনিচর ব্যাটা জিতল কোন কায়দায়”?

রূপ্পন বাবুর চ্যালা ছোকরা পালোয়ান চোখ মেরে বলল, ‘ বলো পালোয়ান, শনিচর ব্যাটা জিতল কোন দাঁও লাগিয়ে”?

“মহীপালপুরওলা দাঁও”। রূপ্পন বাবুর গলার স্বরে অসীম ক্লান্তি।

************************************************************************

ভোটে জেতার তিনরকম দাঁও-প্যাঁচ আছেঃ রামনগরওয়ালা, নেবাদাওলা আর তিন নম্বর হোল মহীপালপুরওলা।

একবার গ্রানসভার নির্বাচনে রামনগর গ্রাম থেকে দু’জন ভোটে দাঁড়িয়েছিল—রিপুদমন সিং ও শত্রুঘ্ন সিং। দুজন একই জাতের, ফলে জাতের ভোট ভাগ হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিল। ঠাকুর সমাজের লোকজনের ভারি মুশকিল। ইনিও ঠাকুর, তিনিও ঠাকুর—ভোট দেব কাকে! আবার যারা ঠাকুর সমাজের নয় তারা ভাবল—এরা নিজের জাতের মধ্যেও রেষারেষি করছে, এমন প্রার্থীকে ভোট দিলেই কি, আর না দিলেই কি!

কিছুদিন পরে জানা গেল যে রিপুদমন আর শত্রুঘ্ন --দুটোর মানে একই; অর্থাৎ এমন এক সিংহ যে শত্রুকে গিলে খায়। এটা জানার পর গ্রামের লোকজন গণতন্ত্রের অনুকুল সিদ্ধান্তে পৌঁছল—ওরা একজন আর একজনকে গিলে খাক, অথবা গ্রামসভার প্রধান হোক—আমাদের কী আসে যায়!

নির্বাচনের পাঁচ দিন আগে পর্য্যন্ত ভোটের হাওয়া একদম গায়েব। প্রার্থীরা গাঁয়ে গিয়ে ভোট চাইলে লোকজন বলে দেয়—আমরা ভোট নিয়ে কি আচার দেব? যাকে দিতে বলবে তাকেই ভোট দেব।

ফলে দু’জনেই ভাবল—কেউ ওদের ভোট দেবে না। ওরা ঘাবড়ে গিয়ে গণতন্ত্রের দোহাই দিল, মানুষজনকে ভোটের মূল্য বোঝাতে লাগল। যেমন—তুমি যদি তোমার দামি ভোট ভুল লোককে দাও তাহলে প্রজাতন্ত্রের সমূহ বিপদ! বেশির ভাগ লোকে এসব বড় বড় কথা বুঝল না। যারা বুঝল, তারা বলল—ভুল লোককে ভোট দিলে গণতন্ত্রের কোন বিপদ হয় না। তুমি তোমার ভোট দিতে পারছ, সেটাই গণতন্ত্রের জন্যে যথেষ্ট। ভুল ঠিক তো চলতেই থাকে। দেখ না, আজকাল যা হচ্ছে----।

এধরণের কথা বলার লোক হাতে গোণা যায়। তবে গণতন্ত্রকে ফালতু প্রমাণিত করতে এরাই যথেষ্ট। তখন দুই ক্যান্ডিডেট প্রচারের কায়দা বদলে নিল। বলতে লাগল গ্রামসভার প্রধানের ক্ষমতার কথা। যেমন, প্রধান চাইলে গ্রামের সব পড়তি জমি অন্যদের বিলি করতে পারে এবং যারা বে-আইনি ভাবে পড়তি জমি দখল করে রেখেছে তাদের বেদখল করতে পারে।

যাঁরা প্রেমচন্দের ‘গোদান’ পড়েছেন বা ‘দো বিঘা জমিন’ ফিলিম দেখেছেন তাঁরা জানেন যে কৃষকের সবচেয়ে প্রিয় হল জমি। শুধু তাই নয়, ওদের নিজের জমির চাইতে অন্যের জমি বেশি প্রিয় এবং সুযোগ পেলেই ওদের পড়শির ক্ষেতের দিকে নোলা সকসক করে। এর পেছনে কোন সাম্রাজ্যবাদী উপনিবেশ গড়ার স্বপ্ন নয়, বরং সহজিয়া প্রেমের ভাবনা কাজ করে। সেই প্রেমের তাগিদে ও নিজের ক্ষেতের আলে বস পড়শির ক্ষেতে পশু চরতে দেয়। আখ খাবার জন্যে নিজের ক্ষেত ছেড়ে পাশের ক্ষেত থেকে আখ উপড়ে নেয়, আর সবাইকে দেখিয়ে দেখিয়ে বলে—দেখছ তো, আমার ক্ষেত থেকে কেমন চুরি হচ্ছে!

কথাটা ভুল নয়। কারণ, ওর পড়শিও একইভাবে তার পাশের লাগোয়া ক্ষেত থেকে আখ চুরি করে উপড়ে নেয়। অন্যের সম্পত্তিকে নিজের মনে করার পেছনে কাজ করে সহজিয়া প্রেমের তাড়না।

এই কথাগুলো গোদান উপন্যাসে স্পষ্ট করে বলা হয় নি। আর বোম্বাইয়া সিনেমাতেও—সম্ভবতঃ কৃষণ চন্দর এবং খাজা আহমদ আব্বাসের ভয়ে—অথবা প্রগ্রেসিভ হওয়ার ঝোঁকে অন্ধ হয়ে, কিংবা স্রেফ বদমাইশি করে—খোলাখুলি দেখানো হয় নি। এই জন্যে আমি খানিকটা পরিষ্কার করে বললাম। মানছি, দেশ থেকে জঞ্জাল দূর করার কাজ শিল্পী=সাহিত্যিকের নয়, তবুও---।

হল কি, যেই গাঁয়ের লোকজন বুঝে ফেলল পঞ্চায়েতের সম্বন্ধ জমির লেনদেনের সঙ্গে এবং পড়শির ক্ষেত হাতিয়ে নেয়া সম্ভব, অথবা অমুক কৃষক নিঃসন্তান মারা গেলে নিজেকে ওর উত্তরাধিকারী ঘোষণা করে রাজতিলক পরা যেতে পারে—ব্যস, চাষিদের সহজিয়া প্রেমভাবনা উথলে উঠল। তখন জমির প্রেম ভোটারদের গ্রাম পঞ্চায়েতের দিকে ঠেলা মারল, পঞ্চায়েতের প্রতি প্রেমে ওরা মোড়ল পদের প্রার্থীদের দিকে ধাক্কা দিল। ফলে ওদের মস্তিষ্ক একদম সক্রিয় হয়ে উঠল।

এরপর ওদের সামনে এল সেই সমস্যা যা চিনা হামলার সময় আচার্য কৃপলানী গোটা দেশের সামনে হাজির করেছিলেন। ওরা ভাবতে লাগল নিরপেক্ষ থাকা একদম ফালতু, এতে দুর্বলতা বাড়ে এবং লোকসান হয়। যদি তুমি শান্তিতে থাকতে চাও তাহলে রিপুদমন অথবা শত্রুঘ্নের মধ্যে কাউকে বেছে তার সঙ্গে ঝুলে পড়। আর বেশি নিরপেক্ষ ভাব দেখালে দু’দিক থেকেই মরবে।
0

ধারাবাহিক - শৌনক দত্ত

Posted in





















১৩. ভার্জিনিয়া উলফ ও কবি লেখকের আত্মহত্যা





সুপরিচিতাসু সুস্মি,


ষষ্ঠীর রাত। ঘন্টাখানেক আগেই নিউ জলপাইগুড়ি জংশন থেকে ট্র্রেনে চেপেছি। অনেকদিন হলো তোমার কোন চিঠি পাইনা। ভালো আছো নিশ্চয়? কাজের প্রেশারে চিঠি লিখতে পারছো না মনে হয়। বৈশুর হাতে তৈরি লুচি আার আলুর দম দিয়ে ডিনার সেরে জানালার পাশে বসে আছি বহুক্ষণ। রাতের ট্রেন ছুটছে, এসির জানালায় দূরের কোন আলো কাঁপছে। মনটা আজ খুব বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে, তোমাকে খুব মনে পড়ছে। কেন পড়ছে জানিনা। কিংবা এভাবে তোমাকে মনে করা উচিত হচ্ছে কিনা তাও বুঝতে পারছিনা। আমরা আজো যেহেতু মোবাইল নম্বর দেয়া নেয়া করিনি সেহেতু তোমাকে লেখা ছাড়া আর কোন উপায় নেই, পুরো কম্পার্টমেন্ট আধো ঘুমে আমি জেগে বসে তোমাকে লিখছি। আজ সন্ধ্যায় একটা সুইসাইড নোট পড়ছিলাম ১৯৪১ সালের ২৮ মার্চ শেষ বিদায়ের আগে প্রিয়তম স্বামীর উদ্দেশে লেখা এই চিঠিটি সম্ভবত সবচেয়ে বেশি পড়া সুইসাইড নোটগুলোর একটি। অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ওই চিঠিটি এখনও পড়েন বিশ্বের সাহিত্যপ্রেমীরা, আমিও আগে বহুবার পরেছি কিন্তু কেন জানিনা আজ পড়ার পর থেকেই খুব কষ্ট লাগছে, বয়স বেড়ে যাচ্ছে বুঝতে পারছি। এই চিঠি তোমারও নিশ্চয় পড়া। যেখানে আত্মহত্যাকারী লিখছেন—



প্রিয়তম,

আমি বুঝতে পারছি, আমি আবারও পাগল হয়ে যাচ্ছি। আমি বুঝতে পারছি এবার হয়তো আমাদের এই কঠিন সময় অতিক্রান্ত হবে না। আমি নানা রকম স্বর শুনতে পাচ্ছি, কিছুতেই মনঃসংযোগ করতে পারছি না। তাই যা সবচেয়ে ভালো মনে হচ্ছে তা-ই করতে যাচ্ছি আমি। তুমি আমাকে যতটুকু সম্ভব সুখী করেছ। তুমি সে সবই করেছ যা যা কোনও মানুষের তরফে করা সম্ভব। আমার মনে হয় না দুইজন মানুষ মিলে তোমার-আমার চেয়ে বেশি সুখী হতে পারতো, যতদিন না আমার এই ভয়ঙ্কর রোগটা দেখা দেয়। আমি আর এর সাথে যুদ্ধ করতে পারছি না। আমি জানি আমি তোমার জীবনটা নষ্ট করে ফেলছি, আমি না থাকলেই তুমি কাজ করতে পারবে। এবং তুমি করবেও, আমি জানি তা। এই দেখ, এই চিঠিটাও আমি ঠিকভাবে লিখতে পারছি না। আমি পড়তে পারি না। আমি সর্বার্থে বলতে চাই, আমার জীবনের সমস্ত সুখের জন্য আমি তোমার কাছে ঋণী। তুমি আমার সঙ্গে চরম সহিষ্ণুতা দেখিয়েছ, অসাধারণ সহৃদয় আচরণ করেছ। আমি বলতে চাই- এ সত্য সকলেই জানে। কেউ যদি আমাকে বাঁচাতে পারতো, সেটা হতে তুমিই। তুমি এত ভালো!- আমি তোমার জীবনটা এভাবে নষ্ট করতে পারি না। আমার মনে হয় না আমাদের দুজনের চেয়ে বেশি সুখী আর কেউ হতে পারবে।



এই কথাগুলো আমারও হতে পারে কিংবা যেকোন সংবেদনশীল মানুষের কথাও হতে পারে তাই না? নিশ্চয় বুঝে ফেলেছো এটা কার সুইসাইড নোট। তার মৃত্যুও কাব্যিক ব্যঞ্জনার। নিজের ওভারকোটের পকেটে নুড়ি পাথর বোঝাই করে হেঁটে নেমে গিয়েছিলেন খরস্রোতা পাথুরে নদীতে। আর কোনদিন ফিরে আসেননি। বিংশ শতাব্দীর আধুনিকতাবাদী সাহিত্যিকদের মধ্যে অন্যতম অ্যাডলিন ভার্জিনিয়া স্টিফেন উলফ নারীদের হয়ে লিখে গেছেন বহু চিঠি এবং ডায়রি। তাঁর ডায়রিতে বর্ণিত ঘটনাগুলি সেই সময়ের এক বিশ্বস্ত দলিল। পনের বছর বয়েসে তিনি প্রথম ডায়রি লেখেন। আর শেষ লেখাটি লিখেছিলেন মৃত্যুর ঠিক চারদিন আগে অর্থাৎ ২৪ মার্চ। তিনি তার লেখা খুব যত্ন করে রঙিন কাগজের মলাটের ভিতরে গুছিয়ে রাখতেন। অতীতচারণা করার সময়ে ডায়রির সাহায্য নিতেন, পরবর্তীতে এই বিষয়ের উপরে বেশ কিছু ছবি এঁকেছিলেন। তিনি লন্ডনের একটা কলেজে ইংরাজি ও ইতিহাস পড়ানোর পাশাপাশি দ্য গার্ডিয়ান, দ্য টাইমস লিটারারি সাপ্লিমেন্ট এবং বিভিন্ন প্রকাশনার জন্যে নিবন্ধ, রিভিউ লেখেন সমসাময়িক এবং ধ্রুপদী সাহিত্য বিষয়ে। এই সময়ে তিনি এবং তাঁর স্বামীর কয়েকজন বন্ধু মিলে একটা বৌদ্ধিক পরিমণ্ডল গড়ে তোলেন। লন্ডনের গর্ডন স্কোয়ারে ১৯০৬ সালে ‘থার্সডে ইভিনিং’ এবং পরে ‘ফ্রাইডে ক্লাব’-এ সাহিত্য, শিল্পকলা, বর্তমান সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা চলত। লেখার পাশাপাশি তিনি সাংবাদিকতাও করেছেন। নারী যখন ফিকশন লেখে তখন তার একটি কক্ষ আর কিছু অর্থ খুব প্রয়োজন”। এই উক্তি বিশ্ব সাহিত্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। ব্রিটিশ কথাসাহিত্যিক ভার্জিনিয়া নারী মুক্তির অগ্রদূত, নারীর ক্ষমতায়ন, নারীর অধিকার, লিঙ্গবৈষম্য, রাজনৈতিক দর্শন ও সমাজ বিশ্লেষক হিসেবে সর্বাধিক পরিচিত। নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্য উদ্দেশ্য করে ভার্জিনিয়ার ভাষ্য, যদি নিজস্ব একটা ঘর আর ৫০০ পাউন্ডের নিশ্চয়তা দেয়া হয়, নারীরাও অনেক উন্নতমানের সাহিত্য উপহার দিতে পারবে। জেইন অস্টেন থেকে ব্রন্টি ভগ্নিদ্বয়, জর্জ এলিয়ট ও মেরি কারমাইকেল পর্যন্ত সব লেখিকাই অনেক প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও শেকসপীয়রের স্তরে উন্নীত হতে পারছে না আর্থিকভাবে সামর্থ না থাকার কারনে। আর তাই নারীকে নির্ভর করতে হয় পুরুষের ওপর। আর নারীদের নিচে ফেলে না রাখলে পুরুষরা বড় হবে কি করে- এই মনোভাব বজায় রাখলে নারীদের মুক্তি মিলবে কিভাবে? তদানীন্তন সময়ে ঝাঁঝালো এই প্রশ্ন ব্রিটিশ পুরুষতান্ত্রিক সুশীল সমাজের বিবেককে নাড়িয়ে দেয়।



জীবনের পরিবর্তনশীলতা, সময়, স্মৃতি, সামাজিক সম্পর্ক, এবং মানুষের মনস্তত্ত্ব নিয়ে ভার্জিনিয়ার লেখা তার শেষ উপন্যাস বিটুইন দ্য এ্যাক্টস তোমার খুব প্রিয় আমি জানি। তুমি জানো নিশ্চয় ভার্জিনিয়া শিক্ষা, গির্জা, চিকিৎসা, আইন ইত্যাদি নানা জায়গায় কাজের জন্যে শিক্ষিত নারীদের প্রবেশাধিকারের সমস্যা নিয়ে কলম ধরেছিলেন। অক্সফোর্ড এবং কেমব্রিজ থেকে নারীদের বহিষ্কারের ফলে তাঁর কলম গর্জে ওঠে। নারী পুরুষের সমতা নিয়ে তাঁর লেখা উপন্যাস, ‘মিস্টার অ্যান্ড মিসেস রামসে’ পড়েছো কি? কিংবা তার বায়োগ্রাফি ‘ফ্লাস’? রোডলফ বেসিয়ারের একটি নাটক থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ফিকশনধর্মী এই উপন্যাসটি একটি কুকুরের চোখ দিয়ে পুরো থিমটি তুলে ধরা হয়েছে। ভার্জিনিয়া উলফ তার আন্টি ফটোগ্রাফার জুলিয়া মার্গারেট ক্যামেরুনের জীবনের নানা দিক নিয়ে ‘ফ্রেশওয়াটার’নামে একটি নাটক লিখেছিলেন। আমার অবশ্য ভালো লাগে ১৯৩৬ সালে প্রকাশিত হয় ‘এম আই এ স্নব’। বইটিতে মূলত সমাজের ধনাঢ্য শ্রেণী এবং সেই সাথে সুশীল সমাজের একজন প্রতিনিধি হওয়ার যে সংকট তা তুলে ধরা হয়েছে। এছাড়াও তাঁর জেকবস্ রুম, ওরলানডো, দ্য ওয়েভস্ উপন্যাসগুলোও আমার ভালো লাগে।



আমার মাথায় একটা প্রশ্ন সন্ধ্যা থেকে ঘুরছে, লেখকের মৃত্যু, বিশেষত আত্মহত্যা তাঁকে মহান করে কি? বিশ্বসাহিত্যে শতাধিক খ্যাতনামা কবি-লেখকের খোঁজ মিলবে, যাঁরা আত্মহত্যায় নিজেদের জীবনের ছেদ টেনেছেন। খোঁজ নিলে আরও দেখা যাবে, তাঁদের লেখালেখিতে নিজেদের মনোজগতের ছাপ পড়ুক বা না-ই পড়ুক, তাঁরা প্রত্যেকেই ব্যক্তিজীবনে প্রবল মানসিক চাপ বয়ে বেড়িয়েছেন, যা প্রায়ই তাঁদের এক দুঃসহ বিষণ্নতা ও মনোবৈকল্যের দিকে ঠেলে দিয়েছে। অতি বিখ্যাত আত্মহননকারী হিসেবে যাঁদের নাম প্রথমেই মনে আসে—প্রত্যেকেই মনোরোগের নানা লক্ষণে আক্রান্ত ছিলেন। ভার্জিনিয়া উলফের হৃদয়বিদারক সুইসাইডের কথা ভেবে উঠতে উঠতে তোমাকে আরও কয়েকটা নাম মনে করিয়ে দিই— সিলভিয়া প্লাথ, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা, ইয়ুকিও মিশিমা। প্রত্যেকে আত্মহন্তারক। মৃত্যুর আগের মুহূর্তেও বড় যত্নে ঘুমন্ত ছেলেমেয়ের বিছানার পাশে প্লাথ সাজিয়েছিলেন দু-গ্লাস গরম দুধ আর রুটি, তারপর মাথাটা গুঁজে দিয়েছিলেন জ্বলন্ত ওভেনের ভেতরে। হেমিংওয়ে তাঁর সেই আত্মঘাতী রাতে শুতে যাওয়ার ঠিক আগে খেয়েছিলেন নিউ ইয়র্ক স্ট্রিপ স্টেক, বেকড পোট্যাটো আর সিজার স্যালাড, সঙ্গে ছিল দুর্মূল্য বোরদো। কী এক অসহ্য তাড়না তাঁকে ডেকে নিল গহীন ঘুমের ভেতর থেকে, আর সুষুপ্তির অন্তরালে পার্শ্ববর্তিনীকে ফেলে রেখে নীচের বারান্দায় গিয়ে তিনি গুলি চালালেন নিজস্ব করোটি ফুঁড়ে। ‘আত্মহত্যা নিয়ে আমার না আছে কোনও শ্রদ্ধা, না আছে কোনও মায়ামমতা’— এমন পঙ্‌ক্তিমালা লেখার পরেও গ্যাসের নব নিজের হাতে খুলে দিয়ে নিজের শ্বাস রোধ করে মৃত্যু চেয়েছিলেন কাওয়াবাতা। আর মিশিমা? অনেক আশার বারুদ ঠাসা ছিল তাঁর বুকে, সেই সব স্বপ্নজাগরের অকালমৃত্যুসম্ভাবনায় আপন হাতে পেটের নাড়িভুঁড়ি চিরে বের করে বেছে নিলেন হারাকিরি মৃত্যু। সিলভিয়া প্লাথ ভেবে দেখবেন একবার, যেই মুহূর্তে আপনি জানলেন এঁদের প্রত্যেকের আত্মহননবৃত্তান্ত, এঁদের লেখার মোহের চাইতেও এঁদের আত্মহত্যার বয়ানটি জানার দুর্মর লোভ চেপে কি বসছে না আপনার মনে? ‘অন্তর্গত রক্তের ভিতরে খেলা’ করা সেই ‘বিপন্ন বিস্ময়’ সম্পর্কে অনন্ত কৌতূহল কি আপনাকে কি গ্রাস করছে না? উলফও জানতেন সে-কথা। জানতেন, হাজার আলোর রোশনাই এসে পড়বেই তাঁর জলে ভিজে হেজে-যাওয়া মৃত মুখে, শ্যাওলা-জড়ানো চুলে, পাথরের ভারে ছিঁড়তে বসা পকেটের খাঁজে। লেখকের ‘সুইসাইড নোট’ও সাহিত্যবিচারের আতসকাচের তলায় পড়তে পারে, এ-কথা ভাবতে পেরেছিলেন বলেই, স্বামীকে উদ্দেশ্য করে লেখা সেই শেষ চিঠিতে কৈফিয়তের জবানিতে লিখে গেলেন— ‘দ্যাখো, এ চিঠিটাও আমি ঠিকমতো লিখতেই পারছি না। পড়তেও পারি না আর।’ তবু রেহাই মেলেনি। তিন সপ্তাহ পর অর্ধগলিত সেই শবদেহ যখন শনাক্ত করছেন লিওনার্ড উলফ, ইতিমধ্যেই হাজার অভিযোগের তির ধেয়ে এসেছে তাঁর দিকে। ‘ঘোড়ার মতো মুখ আর হাত-কাঁপার জন্মগত রোগ’ওয়ালা এই কপর্দকশূন্য ইহুদিটাকে কেন এককালে বিয়ে করেছিলেন ভার্জিনিয়া স্টিফেন, নিশ্চয় এর অযত্ন আর অবহেলাতেই প্রাণ গেল সম্ভাবনাময়ীর! এমন চিত্রনাট্য তখন রোজ ছাপা হয় খবরের কাগজে। প্লটটা অবশ্য মুখ থুবড়ে পড়ল, কারণ কাগজে-কলমে লিওনার্ড প্রমাণ করলেন, ভার্জিনিয়া ভুগছিলেন বাইপোলার ডিজঅর্ডারে। ভয়াবহ ডিপ্রেশন আর ম্যানিয়াগ্রস্ত উত্তেজনা যে-রোগের অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী।



সৃজনশীলতার সঙ্গে মানসিক অসুস্থতার কি কোনো সংগোপন সম্পর্ক রয়েছে? কারও কারও ক্ষেত্রে লক্ষ করা যায়, ব্যাপারটা এমন একধরনের মানসিক বিকার (কখনো কখনো অসুস্থতার কাছাকাছি), যা সৃজনশীলতাকে উদ্দীপ্ত করতেও সাহায্য করে, আবার অন্যদের ক্ষেত্রে তা হয়তো একপর্যায়ে বিনাশী রূপ ধরেই আসে। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, লেখালেখি বা শিল্পচর্চা ছাড়াও সামগ্রিকভাবে সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে যাঁরা লিপ্ত, তাঁরা সমাজের অন্যদের থেকে কমপক্ষে ৮ শতিংশ বেশি বিষণ্নতা, মানসিক ভারসাম্যহীনতা ইত্যাদিতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন। তবে কবি-লেখকদের বেলায় এই ঝুঁকি আতঙ্কিত হওয়ার মতো বেশি। ভুক্তভোগীদের শতকরা ৫০ জনই আত্মহত্যায় জীবনের ছেদ টেনেছেন এমন তথ্য রয়েছে। মার্কিন ঔপন্যাসিক ই এল ডকটোরো এ বিষয়ে খোলাখুলি মতামত দিয়েছেন এই বলে যে লেখালেখি সামাজিকভাবে অনুমোদনপ্রাপ্ত একধরনের সিজোফ্রেনিয়া।



ভার্জিনিয়া উলফের বিষয়ে ধারণা করা হয়, তাঁর শেষ উপন্যাস বিটুইন দ্য এক্টস-এর (মৃত্যুর পর প্রকাশিত) পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করার পরপরই তাঁকে প্রচণ্ড বিষণ্নতা পেয়ে বসেছিল। ইতিপূর্বেও একাধিকবার এমন হয়েছিল—পরিবারের আপনজনের মৃত্যুতে এবং বই প্রকাশের পর অসন্তুষ্টিতে। তবে সে সময় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকবলিত পৃথিবীর নানা দুর্যোগও তাঁর বিষণ্নতাকে মনোবৈকল্যের এক চরম পর্যায়ে নিয়ে যায়। একার অন্ধকারে ডুবে মরা এই ভার্জিনিয়ার জন্য কোথাও ছিল না একফোঁটা চোখের জল। সবাই তাঁর মেধার দখলস্বত্ব বুঝে নিতে চায় শুধু। একের পর এক খবর তখন সিলমোহর দিয়ে জানান দিচ্ছে ভার্জিনিয়ার মৃত্যুজনিত বিষণ্নতা আসলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী পৃথিবীর শহুরে ক্লান্তি আর বিষণ্নতার দ্যোতক। তাদের নির্মম তাত্ত্বিক দর্শনের পুঁজি উপুড় করে এই মৃত্যুকে মুড়ে ফেলতে চাইছে গবেষণার শুখা কাগজে। বিষণ্নতায় আক্রান্ত হয়ে জীবন দুর্বহ হয়ে পড়ার ঘটনা খ্যাত-অখ্যাত বিস্তর কবি-সাহিত্যিকের বেলায় ঘটেছে। কেবল খ্যাতনামাদের তালিকাই কম দীর্ঘ নয়; তবে এই বিষণ্নতা সবার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত তা বলা যাবে না। ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কির আত্মহত্যার কারণ হিসেবে বিষণ্নতাসহ নানা বিতর্ক দাঁড় করালেও এর পেছনে বিপ্লবোত্তর সোভিয়েত রাশিয়ায় বিরাজমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে তাঁর বৈরিতাজনিত হতাশাকে মূলত দায়ী করা হয়ে থাকে। সৃজনশীলতা, বিষণ্নতা ও আত্মহত্যা—এই তিনের অন্তঃসম্পর্ক নিয়ে অনেকেই কথা বলেছেন। বইপত্রও লেখা হয়েছে। সুরাহা হওয়ার বিষয় নয়, তবু কোথাও যেন একই সুতার টান টের পান কেউ কেউ, বিশেষত মনোবিশ্লেষকেরা।



তোমাকে লিখতে লিখতে রাত পেরিয়ে পুবের আকাশ রাঙা হয়ে উঠছে। ব্রহ্ম মূহুর্ত পেরিয়ে গেছে অনেক আগেই। আকাশটা প্রথমে গভীর নীল, তারপর ধীরে ধীরে ফিকে হচ্ছে। দিগন্তে যেন কেউ হালকা হলুদ রঙের তুলির আঁচড় টেনে দিয়েছে। সেই আঁচড়ের ভেতর থেকে বেরোতে শুরু করেছে লালচে আভা। আর কয়েক ঘন্টা পরেই বেনারস নামবো। ভাবছি বহুবছর পরে আবার যখন এসেছি বাবু মায়ের পিন্ডটা দিয়ে যাবো। আবার কবে আসবো আদৌ আসবো কিনা জানিনা। ট্রেনের কামরা জেগে ওঠছে। চিঠিটা বেনারস নেমে পোষ্ট করবো। নিরন্তর ভালো থেকো।



অন্তে প্রীতি হোক

বাসু

২৮ সেপ্টেম্বর,২০২৫
0

ধারাবাহিক - নন্দিনী সেনগুপ্ত

Posted in





















১৫

গের্ট হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ ইনেসের দিকে।

-‘উকিল হয়ে পাশ করলে… কিন্তু সেটা তো আলাদা ব্যাপার। সেটা তো পেশা!’

-‘পেশা হোক বা ব্যক্তিগত জীবন… আসল ব্যাপারটা তো তোমাকে নিয়েই। যাই হোক, আমার মতে তোমার মনের জোর যে কম শুধু তাই নয়, তুমি অদ্ভুত কাপুরুষের মত আচরণ করছ।’

-‘কাপুরুষের মত?’

-‘হ্যাঁ। কারণ বের্শেন চলে গেছে বলে তুমি কষ্ট পাচ্ছ এবং কষ্ট পেয়ে নিষ্কর্মার মত বসে আছ। কোনও কাজ না করার ফলে তোমার কষ্ট আরও বেড়ে যাচ্ছে। তুমি নিজেও জান যে তোমার মনের জোর নেই এবং সেই কারণেই তুমি পড়াশুনায় ফিরতে চাইছ।’

-‘সেই কথাটা তোমার আমাকে না বললেও চলবে। ও হ্যাঁ, ভাল কথা… ঠিক কী কারণে বের্শেনকে আমার ভালবাসা উচিত নয়?’

-‘এটা তো আমারও প্রশ্ন! শোনো গের্ট, তুমি তো আর কচি খোকা নও। নিজের প্রতি সৎ থাকো। আসল কথাটা কী?’

-‘আমার ভীষণ একা লাগছে ইনেস। সহ্য করতে পারছি না আমি।’

-‘পড়াশুনা শুরু করলে অবশ্য একদিকে ভালই হবে। তুমি তো আগে কখনও সেভাবে খাটবার চেষ্টা করনি।’

-‘এইরকম একাকিত্ব আমি সহ্য করতে পারছি না!’

-‘অনেকেই তো একা। তাছাড়া তোমার সঙ্গে তো আমি আছি, ফ্লক আছে। তুমি যদি চাও, বের্শেনের সঙ্গে দেখা করে আসতে পারো। সে হতভাগা নিশ্চয়ই খুব খুশি হবে।’

-‘ভুল করছ… আমি তো বের্শেনের কাছে কিছু চাইনি। বরঞ্চ সে চলে যাবার পরে হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছিলাম। ওর সুন্দর মাথার গড়ন, মিষ্টি শিশুসুলভ মুখ… এসব দেখেই আমার অসহ্য লাগতো। ও সব সময় আমাদের সঙ্গে চিপকে থাকতো… সব সময়! পুরো ব্যাপারটাই বিরক্তিকর!

- ‘থামো! তুমি নিজেও জানো যে যা বলছ সেটা তুমি বিশ্বাস কর না।’

কিন্তু গের্ট থামে না। থামতে চায় না সে। ইনেসের দুটো হাত শক্ত করে ধরে আছে সে। মুখটা অন্যদিকে ফিরিয়ে প্রচণ্ড আবেগমথিত স্বরে সে বলে যায়…

‘ইনেস, ও আমাদের বিরক্ত করত। আমি একদম নিশ্চিতভাবে, ঠিকভাবে ভেবেই বলছি তোমায় যে ও আমাদের জ্বালিয়ে খেত। তুমি ওকে কত প্রীতি ভালবাসা দিয়েছ, আমিও দিয়েছি। তুমি সব সময় ওকে আগলে দেখে রাখতে, যখন আমরা সন্ধ্যায় একসঙ্গে বেরতাম লং ড্রাইভে। আমরা ওকে ভালবাসায় ভরিয়ে রাখতে চেয়েছিলাম।’

‘এবং সে শান্ত হয়ে ফ্লককে কোলে নিয়ে তার কলারটা চেপে আমাদের মাঝে বসে থাকত; সেও সব সময় আমাদের বন্ধুত্বপূর্ণ উষ্ণ প্রীতি দেখিয়েছে।’

‘কিন্তু তুমি তাকে আমার চেয়েও বেশি ভালবাসা দিয়েছ। আমার ব্যাপারে তুমি সেভাবে পরোয়া কর না।’

‘ছেলেমানুষি কোর না গের্ট!’

‘ওহ… ইনেস, আমি চাই যে তুমি আমায় ভালোবাসো!’ গের্ট আরও শক্ত করে চেপে ধরে ইনেসের দুই হাত। এতটাই শক্ত করে ধরে যে তার কব্জি ফ্যাকাসে হয়ে যায়; ইনেসের হাতের পাতায় সে নিজের মুখ চেপে ধরে। এক অদ্ভুত সমর্পণে কম্পিত হয়ে আনত হয় তার শরীর। মুখমণ্ডল উত্তেজনায় সাদা হয়ে যায়। ইনেস গের্টের গলা জড়িয়ে ধরে তার দুই হাতে। কিছুক্ষণ পিছনদিকে হেলিয়ে রাখে তার মাথা। তারপর হঠাৎ চুম্বনে আবদ্ধ হয়ে কেঁদে ওঠে তীব্রভাবে।

-------------------









প্রথমে বের্নহার্ড চার্লসকে জেরাল্ডের বাড়িতে নিয়ে যেতে পারেনি। তবে যাবার কথা উঠতো মাঝে মাঝেই। বিকেলের দিকে সময়টা ফাঁকা থাকত। ইচ্ছে হলে পরদিনই যেতে পারত তারা। এরকম একটা অদ্ভুত ব্যাপার বেশিদিন ফেলে রাখা ঠিক নয়। কিন্তু চার্লসের এক গোঁ; সে যেতে একেবারেই রাজি নয়। সে বলল যে তার ভয় করছে। এখন এই ভয়ের ব্যাপারে বের্নহার্ড আর কী বা করতে পারে? চার্লস উল্লেখ না করলে জেরাল্ডের বাড়ি যাবার ব্যপারে বের্নহার্ড আর স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে কিছুই বলবে না ঠিক করল।



অবশ্য বের্নহার্ড নানা ব্যাপারে খুব ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। অচেনা জায়গা, সবকিছুই অজানা অচেনা তার কাছে। ফলে অনেক সময় তাকে বেশ বেগ পেতে হচ্ছিল। তাছাড়া আসল কথা হল যে তার আরও অর্থ প্রয়োজন। মাসের প্রথমে বাবা যে টাকাটা পাঠিয়ে দেন, তাতে ঘর ভাড়া আর দুই বেলার খাওয়া হিসেব করে চললে কুলিয়ে যায়। কিন্তু লন্ড্রির খরচ, স্বরলিপি কিনবার খরচ, পিয়ানোর ভাড়ার খরচ ছাড়াও শীতের জন্য বেশ কিছু পোশাক কেনা প্রয়োজন, যেগুলো সে এখনও কিনে উঠতে পারেনি। এছাড়া বাসভাড়া থেকে শুরু করে চার্লসকে সিগারেট কিনতে ধার দেওয়া পয়সা… খরচের কি শেষ আছে? মোট কথা হল যে তার টাকা দরকার।

আশ্চর্য হয়ে সে লক্ষ্য করল যে চার্লস এবং অন্যান্য বন্ধুদের কাছে সে যেরকম পরিস্থিতির কথা অতীতে শুনেছে, সে নিজেই এখন সেরকম পরিস্থিতিতে পড়েছে। কিন্তু এই পরিস্থিতি সামলে নেবার জন্য সে একেবারেই প্রস্তুত নয়। তার টাকার দরকার এবং সে জানে না যে কী ভাবে সেই টাকা যোগাড় হবে। চার্লস সে কথা শুনে শুধুই কান এঁটো করা হাসি দিল। বের্নহার্ডের একেবারেই ভাল লাগল না তার এই অদ্ভুত ব্যবহার। কারণ বের্নহার্ড তাকে গত বেশ কয়েকটা সপ্তাহে বারেবারে সাহায্য করেছে। তাছাড়া পরের কিস্তির টাকা মাদাম দুবোয়ার কাছ থেকে পেতে আরও আটদিন বাকি আছে এবং সে কথা শুনে কী ভাবে কারো হাসি পায়, সেটাও বের্নহার্ড ভেবে পেল না।

বের্নহার্ড তার সঙ্গীতশিক্ষকের কাছে জানালো তার সমস্যার কথা। সঙ্গীতশিক্ষকের কাছে একটা নয়, একাধিক উপায় জানা আছে এই সমস্যার সমাধান বের করবার। এখন বের্নহার্ডকে বেছে নিতে হবে সে ঠিক কোন কাজটা করতে চায়।

‘আপনি তো নিজেও সঙ্গীত শিক্ষা দিতে পারেন, আপনার অগ্রগতি প্রশংসনীয়!’

প্রশংসা শুনে বের্নহার্ড লজ্জায় লাল হয়ে যায়।

‘কিন্তু আপনাকে দেখতে খুবই তরুণ… আসলে দেখে মনে হয় স্কুলের শিক্ষার্থী!’

বের্নহার্ড এই কথাটা হাসিমুখে একেবারে অগ্রাহ্য করে। কারণ, যে উপায়গুলি তার সামনে এসেছে, সেগুলো বেশ আকর্ষণীয়। যেমন, একজন ভদ্রমহিলা এসেছেন আমেরিকা থেকে, মাতৃভাষা জার্মান, পোষা একটা বাঁদর আছে বাসায় এবং তিনি কণ্ঠসঙ্গীত শিখতে চান। বের্নহার্ডের শিক্ষকের নামডাক শুনে তাঁর শরণাপন্ন হয়েছেন। এই ভদ্রমহিলা খুব ধনী এবং গায়িকা হতে চান; অথচ তিনি কিছুতেই বুঝতে চান না যে কেন শিক্ষক প্রতিদিন তাঁকে সঙ্গীতশিক্ষা দিতে রাজি হন না।

এছাড়া আছে একটা রাশিয়ান কয়ার, যারা একজন বাজিয়ে খুঁজছে, যে স্বরলিপি দেখে চট করে বাজিয়ে দিতে পারবে এবং অন্যান্য যন্ত্রসঙ্গীতশিল্পী এবং কণ্ঠসঙ্গীতশিল্পীদের সঙ্গে রিহার্সাল দেবার সময় বের করতে পারবে।

আর আছে একটা জ্যাজ ব্যান্ড, যারা একজন প্রতিভাবান পিয়ানোবাদকের সন্ধানে আছে। এরা সিন নদীর উত্তরে শহরের কেন্দ্রস্থলে একটা ছোট বারে নিয়মিত কনসার্ট করে। দিনে চার ঘণ্টা এদের সঙ্গে বাজাতে হবে। অনুষ্ঠানের সময় শিল্পীরা লাল স্যুট আর সাদা লাল চেক টাই পরে এবং বের্নহার্ড এদের সঙ্গে বাজালে দিনে ১৫০ ফ্রাঁ রোজগার করতে পারবে, কারণ এই ব্যান্ডটার বেশ নামডাক আছে।

কিন্তু এই তরুণ পিয়ানোবাদককে সব বিষয়গত খুঁটিনাটি ভালভাবে জানতে হবে এবং সেই ব্যান্ডে অন্তর্ভুক্ত হবার আগে একটা অডিশন পরীক্ষায় উপস্থিত হতে হবে। কিন্তু বের্নহার্ডের মনে একটু সন্দেহ ছিল যে এই কাজটা সে ঠিকভাবে সামলাতে পারবে কি না। ফলে সে ওই আমেরিকান ভদ্রমহিলা, যার পোষা বাঁদর আছে, তাঁকে সঙ্গীতশিক্ষা দেবার কাজটা বেছে নিল। তার শিক্ষক তার যোগ্যতা বিষয়ে সুপারিশ করে খুব সুন্দর একটা চিঠি লিখে দিলেন। চিঠিটা নিয়ে দিনের শেষে বের্নহার্ড খুব ক্লান্ত হয়ে নিজের বাসায় ফিরল।

(চলবে)
0

ধারাবাহিক - রঞ্জন রায়

Posted in




















২৩.২

রঙ্গনাথের প্রিন্সিপালের কথায় বাধা দিয়ে কিছু বলার সাহস হল না। তাই বলল, “হ্যাঁ, প্রিন্সিপাল

সাহেব, ঠিকই আছে’।


হঠাৎ প্রিন্সিপাল খেপে গেলেন। “ঠিক তো বটেই রঙ্গনাথ বাবু, আমায় চার চার বোনের বিয়ে দেয়া

বাকি। পকেটে একটা ফুটো কড়িও নেই। কাল বৈদ্যজী যদি আমায় কান ধরে কলেজ থেকে বের করে দেন

তো কেউ ভিক্ষাও দেবে না।

“তাহলে আমি ওই খান্না-বান্নাকে বাপ বলে ডাকব, নাকি বৈদ্যজীকে? তুমিই বলে দাও”।

গোড়ার কথাবার্তায় প্রিন্সিপালের একটা মানবিক এবং সংবেদনশীল চেহারা দেখা যাচ্ছিল, কিন্তু

এখন উনি যা করছেন তাতে সেই চেনা বাংগড়ুপনা বা ক্যাওড়ামিই প্রকট হচ্ছে। এভাবে ওঁর তৈরি

সাময়িক আবেগঘন মায়ার প্রভাব গায়েব হয়ে গেল।

রঙ্গনাথ আগের মত হালকা মেজাজে। বলল, “না না; আপনি যা করছেন- সব ঠিক। আর যেখানে যা আছে,

সব ঠিকই আছে। ইউনিভার্সিটির প্রফেসর হলে বেশি কি হত? এখানে আপনি কোন ভাইস চ্যান্সেলরের

চেয়ে কম নাকি”?

এতক্ষণে প্রিন্সিপাল একটু হাসলেন। বললেন। “ হ্যাঁ, সে তো বটেই। আমি তো নিজেকে ভাইস

চ্যান্সেলরের থেকেও সেরা ভাবি। আজকাল ভাইস চ্যান্সেলরের জীবনও নরক সমান। সকাল থেকেই

নিজের মোটরগাড়ি চড়ে সমস্ত আমলাদের সেলাম ঠুকতে বেরোয়। কখনও চ্যান্সেলরের সামনে হাজির

হও, কখনও কোন মন্ত্রীর, কখনও সেক্রেটারির। গভর্নর বছরে অন্ততঃ চারবার বকুনি লাগান।

দিনরাত ক্যাঁও -ক্যাঁও, চ্যাঁও -চ্যাঁও! ছাত্রের দল মুখের উপর মা-বোন তুলে গালি দিতে দিতে মিছিল

বের করে। সবসময় মার খাওয়ার ভয়! পুলিস ডাকো তো এসপি হাসে। বলে -দেখ এই ভাইস

চ্যান্সেলরকে! ছেলেদের উপর বছরে দশ- বিশবার লাঠি তলোয়ার না চালিয়ে এনার শান্তি নেই। এই তো

অবস্থা, বাবু রঙ্গনাথ”!

গলা খাঁকারি দিয়ে ফের বললন,”এখনও প্রিন্সিপালগিরিতে এসব ঝামেলা শুরু হয় নি। আর যেখানে

বৈদ্যজীর মত ম্যানেজার, সেখানে প্রিন্সিপাল, ধরে নাও, কোন বব্বর সিংহের চেয়ে কম নয়। আমি

কাউকে খোশামোদ করতে চাই না। বৈদ্যজীর খুঁটি ছুঁয়ে রেখে সবাইকে জুতোর আগায় ঠিক রাখি। তুমি কী

বল, বাবু রঙ্গনাথ”?

“যা বলছেন, একদম ঠিক”।

“আর সত্যি কথা জানতে চাও তো বলি—ইউনিভার্সিটিতে লেকচারার না হওয়াতে আমার কোন দুঃখ

নেই। ওখানে আরো বড় নরক, একেবারে কুম্ভীপাক! রাতদিন খোসামুদি। কোন সরকারি বোর্ড দশ

টাকার গ্রান্ট দেয়, তো কান ধরে যেমন ইচ্ছে থিসিস লিখিয়ে নেয়। যাকেই দেখ, একটা না একটা

রিসার্চ প্রোজেক্ট বগলদাবা করে বসে আছে। জিজ্ঞেস করলে বলে—রিসার্চ করছি। কেমন রিসার্চ?

যার খাচ্ছ, তার গুণ গাইতে থাক, ব্যস। এদের কী যেন বলে? একটা বিশেষ শব্দ? হ্যাঁ হ্যাঁ, মনে পড়ল-

-বুদ্ধিজীবী। অবস্থা এমন যে এইসব বুদ্ধিজীবীরা বিলেত যাওয়ার সুযোগ পাওয়ার জন্য নিজের বাপের

নাম বদলে দিতে পারে। এদের চৌরাস্তার মোড়ে দাঁড় করিয়ে দশবার জুতোপেটা কর, কিন্তু একবার তো

আমেরিকা ঘুরে আসতে দাও! এই হল তোমার বুদ্ধিজীবী”।

এবার উনি নিজের মাতৃভাষা অবধী থেকে একটি প্রবাদ আউড়ে দিলেন।

“গু খেতে হলে হাতির গু খাব। আমি তো এটাই ভেবেছি যে বৈদ্যজীর খোসামোদ করলে আর কাউকে তেল

দেবার দরকার নেই। লেকচারার হওয়া আমার পোষাবে না”।




প্রিন্সিপাল মাথা নেড়ে লেকচারার হবেন না জানিয়ে দিলেন। ওনার মুখের ভাবে মনে হল যেন সংসারের

সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে শোকের ছায়া নেমেছে।

“এটা একদম ঠিক বলেছেন”, রঙ্গনাথ সায় দিল।

প্রিন্সিপাল তীক্ষ্ণ চোখে রঙ্গনাথকে দেখতে লাগলেন। তারপর ফিকে হেসে ধীমে স্বরে বললেন, “কী

ব্যাপার বাবু রঙ্গনাথ? আজ আমি যাই বলি সবতাতেই হ্যাঁ বলছ যে”?

রঙ্গনাথ বলল, ‘ভাবছি, আপনার অভিজ্ঞতা থেকে শিখব। কী দরকার কারও কথার ভুল বের করার? যে

যাই বলুক, আমি বলব –ঠিক বলেছেন”।

প্রিন্সিপাল সাহেব হা-হা করে হেসে উঠলেন, “তুমিও ঠিক বলেছিলে, রঙ্গনাথ বাবু। যখন পিকাসোর নাম

নিলাম, তোমার নিশ্চয়ই বমি পাচ্ছিল, এটা বুঝি—।

“এতে অবাক হবার কী হয়েছে? এসব কথার প্রভাব মেশিনের উপরেও পড়ে। তোমায় একটা ঘটনার কথা

বলি।

“একটা হাওয়াই জাহাজ ইন্ডিয়া থেকে ইংল্যাণ্ড যাচ্ছিল। যাত্রীদের মধ্যে একজন তামাক ব্যবসায়ী

ছিল। শালার সারা জীবন কাটল বিড়ি-সিগ্রেটের কারবার করে। হঠাৎ ওর কী যে হল, ব্যাটা লিটারেচার

আর ফিলজফির তত্ত্ব আওড়াতে লাগল। ব্যস, তক্ষুণি হাওয়াই জাহাজের ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেল।

বিমান একহাজার ফুট নীচে নেমে এল। আতংক ছড়িয়ে পড়ল। সবাই ভাবল কোন দুর্ঘটনা হয়েছে, কিন্তু

একটু পরে আবার ইঞ্জিন চালু হয়ে গেল। বিমান উড়তে লাগল।

“হাওয়াই জাহাজের ইঞ্জিনিয়ার কারণ খুঁজে কী পেল জান? ওই তামাকের ব্যবসায়ী হঠাৎ কার্ল

জেসপার্সের নাম নিয়েছিল। আর সেই ঝটকায় বিমানের ইঞ্জিনের হার্ট ত্থেমে গেল।তখন সব যাত্রী

ওই লোকটাকে মিনতি করতে লাগল—মশাই, হয় চুপ করে থাকুন, নয় শুধু তামাক নিয়ে কথা বলুন। নইলে

অ্যাকসিডেন্ট হবে”।

রঙ্গনাথ হেসে উঠল,”আজ আপনি ভারি মজার কিসসা শোনাচ্ছেন”।

প্রিন্সিপালের চেহারায় উদাস ভাব। “আপনার জন্য রোজ এমন সব কিসসা শোনাতে পারি। কিন্তু আপনি

আমাকে কোথায় পাত্তা দিচ্ছেন? আপনি তো আজকাল খান্না মাস্টারের কথায় নাচছেন”।




ওরা এখন ফেরার পথ ধরেছেন। আঁধার নেমেছে। বাতাসে শীতের আমেজ। রাস্তার ধারে কয়েকজন

যাযাবর শ্রেণীর লোক বসে আগুন পোহাচ্ছিল আর অভিজাতকুলের অবোধ্য কোন ভাষায় নিজেদের

মধ্যে গল্প করছিল। যেভাবে লোকে পথের ধারে পড়ে থাকা গরু -মোষকে অগ্রাহ্য করে এগিয়ে যায়,

প্রিন্সিপাল তেমনই করে ওদের এড়িয়ে চলতে লাগলেন। রঙ্গনাথ একবার পেছন ফিরে ওদের দেখে

মন্তব্য করল—“বেশ ঠান্ডা পড়েছে”।

প্রিন্সিপাল সাহেব আবহাওয়া নিয়ে কোন কথা বলার মুডে ছিলেন না। উনি আগের কথার খেই ধরে

বললেন,”তোমরা এখনও লোক চিনতে শেখ নি। রূপ্পন তো শুনলাম খান্না মাস্টার চক্করে পড়েছে।

কিন্তু, বাবু রঙ্গনাথ! এই খান্না মাস্টারটি কেমন চিজ সে তো তোমার বোঝা উচিত।




“খান্না বড় চালু মাল। দেখ, সেদিন কলেজে মারপিটের পরিস্থিতি হল কিনা? ওর তো কিছু এসে যায় না।

কিন্তু কলেজের ইজ্জত গেল”।

রঙ্গনাথ, “আমি তো শুনেছি ঝগড়ায় দু’পক্ষেরই দোষ ছিল”।

প্রিন্সিপাল সাধু-সন্তের মত বললেন, “তোমার শোনা -না -শোনায় কি হয় বাবু রঙ্গনাথ? মামলা তো

এখন কাছারিতে পৌঁছে গেছে। ম্যাজিস্ট্রেট যেমন বুঝবেন, ফয়সালা করবেন”।

--“এ তো বড় খারাপ কথা”!

--‘খারাপ মানে? এক ঘটি জলে ডুবে মরার সমান, রঙ্গনাথ বাবু! কিন্তু খান্না মাস্টারের লজ্জা-শরম

বলতে কিছুই নেই। আমাকেই ওর গলায় পাথর বাঁধতে হবে, তবে না ডুববে”!

উনি এখন সরকারের প্রচার বিভাগের মত নিস্পৃহভাবে—অর্থাৎ কেউ শুনুক, না শুনুক, আমি তো

বলবই—বলতে লাগলেন।

“ পুলিস জবরদস্তি দু’পক্ষেরই নামে ধারা ১০৭ এর মামলা শুরু করেছে। এটা পুলিসের হারামিপনা। খান্না

করল বদমাইসি। ওর সঙ্গীসাথীরা মারামারির জন্যে উসকে দিল। আর পুলিস চালান কাটল দুপক্ষের

নামে! এ তো একদম ‘অন্ধের নগরী চৌপট রাজা’ 1 কেস।

“কালকেই শুনানি ছিল। আমাকে বলল মিটমাট করে নাও। আমি বললাম—তার কি দরকার? আমাকে

সোজা ফাঁসিকাঠে চড়িয়ে দিন—ঝামেলা খতম। শিবপালগঞ্জে শুধু খান্না মাস্টার থাকবে, আর থাকবে

ওর গুণ্ডার পাল। ফের কিসের ঝগড়া, কিসের বিবাদ?

“আমি তো চুপচাপ চলে এলাম। কিন্তু ওদের দেখ—সত্তরটা ছেলে নিয়ে ‘প্রিন্সিপাল মুর্দাবাদ’ মিছিল

বের করেছে। শহরের আদালত। অনেক ভালো লোকের নিবাস। ওরা জিজ্ঞেস করছিল—এইসব ছেলেপুলে

কোথাকার? খান্না মাস্টার আগ বাড়িয়ে বলে দিল –ওরা ছঙ্গামল কলেজের ছাত্র।

“বেশরম হতে হয় তো ওর মত”।

ফের উনি অবধী বুলিতে তিন নম্বর প্রবাদ আউড়ে দিলেন—'ন্যাংটোর পোঁদে জুটেছে ইজের, তো নেচে

নেচে বলছে-এই তো ছায়া পেয়েছি’।

“ বুঝেছ বাবু রঙ্গনাথ! এই হচ্ছে তোমাদের খান্না মাস্টার। রূপ্পন বাবুকে বলে দিও—ওর সঙ্গে বেশি

গা ঘষাঘষি না করতে। নইলে একদিন কাঁদতে হবে”।




এবার ওরা থানার সামনে দিয়ে যাচ্ছেন। লণ্ঠন হাতে ক’টা সেপাই এদিক করছে। ভারি শোরগোল।

কয়েকটা ছোঁড়া রাস্তায় দাঁড়িয়ে কোরাস গাইছে। থানার পাশে দারোগাজির কোয়ার্টারের সামনে তিনটে

ট্রাক দাঁড়িয়ে, তাতে মালপত্র তোলা হচ্ছে। হো-হল্লার আসল কারণ ওটাই।

প্রিন্সিপাল সাহেব বললেন, “মনে হচ্ছে দারোগাজীর হয়ে গেছে”! বলতে বলতে উনি রঙ্গনাথের কাঁধ

ধরে ঝাঁকাতে লাগলেন, “এই ব্যাপার! পুরো এলাকা নোংরা ময়লায় ভরে গেছল। এবার সাফ হচ্ছে”।

1 হিন্দি কথা সাহিত্যের প্রখ্যাত ভারতেন্দু হরিশ্চন্দ্রের লেখা ‘অন্ধের নগরী চৌপট রাজা”।

প্রবাদের অর্থ যে দেশে নিয়ম কানুন নেই, রাজা গায়েব।




রঙ্গনাথ,”বুঝতে পারছি না, এত তাড়াতাড়ি অর্ডার এসে গেল! কী ভাবে? দুপুর বেলাতেও কোন খবর

শুনিনি তো”।

প্রিন্সিপাল সাহেবের খুশির কোন সীমা নেই। দেখে মনে হচ্ছে এবার উনি ডানা মেলে আকাশে উড়ে

সামনের গাছের ডালে গিয়ে বসবেন আর বুলবুলির মত সুরেলা শিস দেবেন। বললেন, “বাবু রঙ্গনাথ,

এতদিন মামার সঙ্গে থেকেও ওনাকে চিনতে পারোনি? আগের দারোগাকে উনি বারো ঘণ্টার মধ্যে

শিবপালগঞ্জ থেকে ভাগিয়ে দিয়েছিলেন। এই দাওগা তো তবু চব্বিশ ঘন্টা টাইম পেয়ে গেল”।

এরপর ফিসফিসিয়ে, “বৈদ্যজীর মহিমা কেউ বুঝতে পারে? যেদিন উনি জোগনাথকে জামিনে ছাড়লেন না,

সেদিনই বুঝেছিলাম যে এনার দিন ঘনিয়ে এসেছে। তার সাথে আমার ১০৭ ধারার মামলা। তুমিই বল বাবু

রঙ্গনাথ, এর কোন দরকার ছিল? কিন্তু এনাকে বোঝাবে কে? ইনি রামাধীনকে বাপ ডেকেছেন। ও যেমন

ইচ্ছে, তেমনই নাচিয়েছে—সে তো তুমি দেখেছ। এখন এটাও দেখলে যে দশটা দিন গেল না, ওর শমন

এসে গেল”।

ছোকরার দলের কোরাস জারি—“দারোগাজী, ট্রাকে চড়লেন, দারোগাজী, ট্রাকে চড়লেন”।

ওরা দলবেঁধে ট্রাকে দারোগাজীর মালপত্র তোলা দেখছে।

একটা ট্রাকে শিশু কাঠের কিছু বড় বড় পালংক উঠে গেছে আর খালি জায়গাটুকুতে একটা চমৎকার

ভাল জাতের গরু আর তার বাছুর। প্রিন্সিপাল সাহেব দেখে টেখে প্রশ্ন করলেন, “মোষ দেখছি না যে!

মুররা জাতের দুধেল মোষ”?

রঙ্গনাথ বোঝাতে লাগল, “ এই গরুটা টিকৈতগঞ্জের ঠাকুর পরিবার দিয়েছিল। বিধবা ছেলে বৌয়ের পেট

খসানোর মামলা। গোদান করে পাপমুক্ত”!

উনি বিশেষ কাউকে লক্ষ্য না করে উঁচু আওয়াজে বললেন, “মোষটা কোথায় গেল? দেখছি না যে”!

অন্ধকারে কারও স্বর ভেসে এল—“বিক্রি হয়ে গেছে”।

“কোথায়”?

“শহর থেকে এক গোয়ালা এসেছিল”।

“কততে গেল”?

“একশ’তে আর কত? তুমি কি ভেবেছিলে-- হাজার”?

“আমি তো এখনও তাই ভাবছি”, প্রিন্সিপাল মজা করে বললেন।

তারপর রঙ্গনাথের কাঁধ ধরে ঝাঁকুনি দিলেন। ভাবটা—তুমিও কথাবার্তার মজাটা উপভোগ কর।

এখন ট্রাকের পাশে সেরেফ কিছু পালংক পড়ে আছে। রঙ্গনাথ শুনেছিল যে দারোগাবাবুর শখ নানারকম

পালংক জোগাড় করা। এখন নিজের চোখে দেখল। খুব হৈচৈ আর চেঁচামেচির মধ্যে ট্রাকে পালংক তোলা

হচ্ছে। কিছু উঠে গেছে, কিছু উঠছে, কিছু উঠবে। রাস্তায় কোরাস গাওয়া ছেলের দল এখন অন্ধকারের

মধ্যেও ট্রাকের কাছে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে ভারি উৎসাহের সঙ্গে ট্রাকে পালংক তোলা দেখছে।

এক সেপাই ট্রাকে রাখা পালংকের উপর চড়ে হাতে লণ্ঠন ঝুলিয়ে নীচের লোকজনকে পালংক তুলতে

নির্দেশ দিচ্ছে। “আবে ও! কব্জাটা ভেঙে ফেললি তো! জানতাম, এ ব্যাটা না ভেঙে ছাড়বে না”।




ওর হুঙ্কার শুনলে সবাই মানবে যে পালংকের কব্জা ভেঙে ফেলাটা আজ ভারতীয় গণতন্ত্রের সবচেয়ে

বড় দুর্ঘটনা বটে! রঙ্গনাথও পালংক যারা ট্রাকে তুলছিল তাদের সান্ত্বনা দেবার জন্যে শীতল স্বরে

বলল, “হাঁ ভাই, কব্জা-টব্জা ভেঙো না। সামলে সুমলে ট্রাকে তোলো”।

প্রিন্সিপাল সাহেব রঙ্গনাথের কথা শুনে জোরে হেসে উঠলেন। এক সেপাই পালংক তোলার কাজ

করতে করতে নিজের জায়গা থেকে বলল, “কে বটে? প্রিন্সিপাল সাহেব নাকি? জয়হিন্দ্‌ সাহেব”।

“কী হয়েছে ভাই? জয়হিন্দ! বদলি হয়েছে কি”?

“হ্যাঁ, প্রিন্সিপাল সাহেব। দারোগাজী এসপি সাহেবকে দরখাস্ত দিয়েছিলেন। মেয়ের পড়াশুনোর জন্যে

শহরে বদলি চেয়েছিলেন”।

“আমার কলেজে ভর্তি করাতেন। শিবপালগঞ্জ কোন শহর থেকে কম নাকি”?

“আপনার কলেজ তো একটা হিন্দুস্থানী স্কুল। উনি ইংরেজিতে পড়াতে চান। ভগতিন স্কুলে। বেবির

উর্দি তৈরি হয়ে গেছে। নীল নীল উর্দি। গায়ে চড়ালে একদম ইংরেজ মেয়ের মত দেখায়”।

“তাহলে শহরে বদলি হয়েছে। বেশ, ভাল কথা। কিন্তু গরু কোথায় রাখবেন? খড় ভুষি কোথায় পাবেন?

গরুটা বেচবেন কি”?

সেপাই এবার একটা বড় পালংক হেঁইয়ো করে সর্বশক্তি দিয়ে ট্রাকে তুলছিল। কোঁকাতে কোঁকাতে

বলল, “না। গরু থাকবে সৈনিক ফার্মে। দারোগার ভাইসাহেব ওখানেই চাকরি করেন। এখানে গাই বেচারার

ঠিক মত খাওয়া জুটত না। এখন ওর খাওয়ার দিন আসছে”।

ট্রাকের উপরে সওয়ার সেপাইয়ের পুরো নজর পালংকের কবজায় আটকে ছিল। ও দাঁতে দাঁত পিষে

বলছিল, “ ঠিক সে। আবে ঠিক সে। আরে, আরে, এবার অন্য পালংকটাকেও ভাঙবি নাকি! যদি ভাঙে তো

সালা ---“।

কেউ বলল যে বৈদ্যজী এক্ষুণি দারোগাজীর সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। বলছিলেন—উনি থাকতে ওনার

বদলি কী করে হতে পারে? আদেশ বদলে দেবেন।

প্রিন্সিপাল রঙ্গনাথকে বললেন, “যদি চোখের চামড়া থাকে, তাহলে দারোগাজী ভোরের মোরগ ডাকার

আগে শিবপালগঞ্জ ছেড়ে চলে যাবেন”।

খানিকক্ষণ ট্রাকে চড়া মালপত্তর খুঁটিয়ে দেখা হল। রঙ্গনাথ বলল, “ দারোগাজীর শখ ছিল নানারকম

পালংক”।

“ওনার শখ যা কিছু মিনি মাগনা পাওয়া যায় তা হাতিয়ে নেয়া”। হঠাৎ উনি ট্রাকের উপড় চড়ে থাকা

সেপাইকে ডাক দিয়ে বললেন, “ আরে ভাই সেপাইজি! ওই কব্জা ভাঙা খাটিয়াটা ছেড়ে দাও না! যদি

টাকাখানেক দামে নীলামে ওঠে তো আমিই কিনে নেব”।

সেপাই বলল, “আপনি এত বড় মানুষ হয়ে কেন ছোটলোকের মত কথা বলছেন? নেবেন তো পুরো ট্রাক

নিয়ে নিন। বলুন, আপনার ঘরে পুরো ট্রাক পাঠিয়ে দিই”?

“হেঁ-হেঁ-হেঁ! একটা গোটা ট্রাক নিয়ে আমি কি করব? আমি তো মামুলি এক মাস্টার”। ফের গলার স্বর

বদলে মোটা আওয়াজে বললেন, “দারোগাজী ঘরেই আছেন তো? বৈদ্যজীও রয়েছেন? তো চলুন বাবু




রঙ্গনাথ, দারোগাজীকে সেলাম করে আসি। বেচারি বড্ড ভালমানুষ ছিলেন। কখনও কাউকে কষ্ট দেন

নি। কারও থেকে কিছু চাইতেন না। ভগবান যা দিতেন তাই চোখ বুঁজে নিয়ে নিতেন”।

হ্যাঁ, সত্যিই ভালোমানুষ ছিলেন, তাই চলে যেতে হল—রঙ্গনাথ ভাবছিল।

(চলবে)
0

ধারাবাহিক - নন্দিনী সেনগুপ্ত

Posted in




















১৪


ইনেস তাঁর বন্ধু গের্টকে নিয়েও বিশেষ চিন্তিত। গের্ট অবশেষে আইনশাস্ত্র নিয়ে পড়বার ব্যাপারে মনস্থির করেছে। আগামী হেমন্ত থেকেই ক্লাস শুরু হবে। সে হিসেব করে দেখেছে যে পাশ করে বেরতে আরও তিন বছর লাগবে; কারণ কিছু সেমিস্টারের ক্লাস সে এর মধ্যেই করা হয়ে গিয়েছে তাঁর। গের্ট এই বিষয়ে ইনেসের সঙ্গে বেশ গুরুগম্ভীর ভঙ্গিতে আলোচনা শুরু করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের থেকে নেওয়া সরু, হলদে সিলেবাসের বইটা নিজের পকেট থেকে বের করে যে যে ক্লাসের লেকচারগুলো শুনতে সে ইচ্ছুক, সেগুলোর পাশে একটা সোনালি রঙের পেন্সিল দিয়ে দাগ টানে।


ইনেস গের্টের পরিকল্পনা মনোযোগ দিয়ে শোনে। মনে মনে আগামী শীতের সময়টা কল্পনা করে সে। ফ্লকের সঙ্গে সে মাঝে মাঝে গের্টের এপার্টমেন্টে যাবে দেখা করতে। তবে খুব ঘনঘন যাবে না, কারণ গের্ট কাজে এবং পড়াশুনায় ব্যস্ত থাকবে। বের্নহার্ডের সুন্দর পোর্ট্রেটের পেন্সিল স্কেচগুলোর বদলে কালো রঙের কলেজ খাতায় আর ‘করপাস ইউরিস সিভিলিস’ এর অনেক খণ্ডে ভরে থাকবে গের্টের টেবিল। একজন উকিলের ঘরে আর কী কী থাকতে পারে, সেই বিষয়ে ইনেসের পরিষ্কার ধারণা নেই। ফলে সে আর বেশি কল্পনা করতে পারে না; তবে তাঁর মনে হতে থাকে যে গের্টের চেহারা ক্রমেই একঘেয়ে ক্লান্ত, বিরক্ত ধরনের হয়ে যাবে এবং সে সবসময় তিরিক্ষি মেজাজে থাকবে।

কিন্তু তাঁর অন্যান্য বন্ধুরা? ফার্দিনান্দ আর বের্নহার্ড চলে যাবার পর থেকে সন্ধের আড্ডাগুলোর সেরকম কোনো আকর্ষণ আর নেই। হতে পারে যে তুমি আইনের ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে নতুন করে বন্ধুত্ব করলে… ভবিষ্যতের উকিল অথবা বিচারক কিম্বা কৌঁসুলি যারা। এরা খুব গুরুগম্ভীর প্রকৃতির, সব সময় নিজের মর্যাদা বিষয়ে অত্যধিক সচেতন। তরুণ সঙ্গীতশিক্ষার্থীরা এমন নয়, উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে সবসময় সব ব্যাপারে চরম মতামত পোষণ করে না তারা। তবে গের্টকে ভবিষ্যতে স্থির করতে হবে যে সে হিটলারের পক্ষে না বিপক্ষে…


-‘গের্ট!’ ইনেস শুরু করে, … ‘তুমি কি হিটলারপন্থী?’


-‘তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে?’


-‘না, এমনিই… জিজ্ঞেস করলাম আর কি!’


ইনেসের হঠাৎ গের্টকে আইনের ক্লাসের ছাত্র হিসেবে কল্পনা করে হাসি পায়। সাধারণত ছাত্র মানেই মানুষ তাদের স্নেহের চোখে দেখে। কিন্তু গের্ট ছাত্র হিসেবে নিঃসন্দেহে হাস্যকর… একটা অসম্ভব কাণ্ড ঘটতে চলেছে বলে মনে হয় ইনেসের। কারণ গের্ট খুবই সংবেদনশীল এবং সহজেই মন খারাপ হয়ে যায় তাঁর। তাছাড়া যে কাজটা তাঁর পছন্দ হয় না, সেটা শেষ করা তো দূর, সে কিছুতেই বেশিক্ষণ টেনে নিয়ে যেতে পারে না। গের্ট নিজেও হয়তো নিশ্চিতভাবে এখনো বুঝতে পারছে না যে ভবিষ্যতে সে কী ভাবে ব্যাপারটা সামলাবে। তবে সে সমাজে ‘একজন’ হয়ে উঠতে চায়। সেটাই এই মুহূর্তে তাঁর একমাত্র ইচ্ছা। ‘একজন’ হয়ে ওঠা মানে সমাজে একটা ভাল জায়গা, একটা ভাল ডিগ্রি, উপাধি ইত্যাদি।

গের্ট এখনো অনিশ্চয়তায় ভুগছে। তবে নিজের সম্বন্ধে যথেষ্ট গর্ববোধ আছে তাঁর এবং এই বোধটাই তাঁর দুর্বলতা হয়ে উঠছে। কারণ সেটাই বদলে যাবার পথে তাঁকে ভিতরে ভিতরে বাধা দিচ্ছে। এই বিরক্তিকর এবং একঘেয়ে পরিস্থিতি থেকে বেরতে পারছে না সে। তাঁর দ্বিধা এখনো কাটেনি এবং সে বিষণ্ণ তিক্ত মেজাজে সিলেবাসের হলুদ বইটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে থাকে।

ইনেস শান্তভাবে তাঁকে নিরীক্ষণ করে। তাঁর সুন্দর মুখমণ্ডলের রেখাগুলি, তামাটে হয়ে পুড়ে যাওয়া কপালের অর্ধেকটা কালো চুলের গুচ্ছে ঢাকা। তাঁর চোখদুটো গাঢ় রঙের, তীব্র এবং অস্থির। ঠোঁট এবং চোয়াল ক্রুদ্ধ, কঠিন, মাঝে মধ্যে সে মুখটা অল্প খুলছে যেন এখনই কোনও খেদ, অভিযোগ কিম্বা প্রতিবাদী সমালোচনার শব্দ বেরিয়ে আসবে।

কিন্তু গের্ট কখনই অভিযোগ করে না। তাঁর গর্ববোধ তাঁকে সেটা করতে বাধা দেয়। কিন্তু মাঝেমধ্যে যখন সে অনেক কথা একসঙ্গে বলতে থাকে, সেসব কথাবার্তা উদ্ধত এবং বিদ্বেষপূর্ণ। যদি কোনও কারণে সে আহত হয়, তখন অবুঝের মত অনেক কথা আন্দাজে ঢিল ছুঁড়ে বলে দেয়। অনেক মানুষ এই কারণে গের্টকে একেবারেই পছন্দ করে না। তাঁকে উগ্র এবং বিশ্বাসের অযোগ্য বলে মনে করে। অনেকেই ইনেসকে সতর্ক করে গের্টের সঙ্গে মিশবার কারণে। আবার অনেকে অবাক হয় ইনেসের সাহসের কথা চিন্তা করে, কারণ সাধারণভাবে মানুষ মনে করে যে গের্টের মত ব্যক্তির কাছাকাছি থাকতে হলে অনেক সাহসের প্রয়োজন। কিন্তু পুরো ব্যাপারটা হাস্যকর। কারণ ইনেস গের্টের থেকে অনেক বেশি সপ্রতিভ এবং মানসিক শক্তির অধিকারিণী। তাছাড়া সে বের্নহার্ড এবং অন্যান্য বন্ধুদের যেভাবে সবসময় সাধ্যমত সাহায্য করতে প্রস্তুত, সেভাবেই সে গের্টকেও সাহায্য করে থাকে।

তবে এইমুহূর্তে গের্টের জন্য ইনেসের বেশ চিন্তা হচ্ছে। এতদিন গের্ট ভবিষ্যতে কী করতে চায়, সে বিষয়ে ইনেস একেবারেই মাথা ঘামায়নি। কারণ গের্ট সপ্রতিভ উজ্জ্বল তরুণ, যদিও বিশেষ উচ্চাশা নেই জীবনে। এদিকে আবার গর্ববোধ আছে যথেষ্ট পরিমাণে। জীবনে কিছু একটা করতে চায় সে সাফল্যের সঙ্গে, নিজের কাজের জন্য একটা স্বীকৃতিলাভ করতে চায় সে। কিন্তু সম্প্রতি সে সব ব্যাপারে সম্পূর্ণ উদাসীন হয়ে গিয়েছিল। নিজের ঘরে সিগারেট খেতে খেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কখনো একা বসে থাকছিল, আবার কখনও বন্ধুদের সঙ্গে এখানে সেখানে মাতাল হয়ে বেড়াচ্ছিল; এতকিছু করে কোনও উপকার অবশ্য হয়নি। এসব কাণ্ড ঘটিয়ে সে আবার লজ্জিত হয়ে শাস্তি পাওয়া স্কুলের ছাত্রের মত মুখ নিচু করে ঘুরে বেড়াচ্ছিল এদিক সেদিক। সবকিছুই ইনেসের কানে এসেছিল। ইনেস তাঁকে একসঙ্গে ঘুরতে কিম্বা হাঁটতে যাবার কথা বলেছিল; সে একেবারেই রাজি হয়নি এবং হাজারটা বাহানা দেখিয়েছিল। ইনেসের যে একটু খারাপ লাগেনি তা নয়, তবে সে মাঝে মাঝেই ফোন করে গের্টের খবরাখবর নিত। কারণ তার মনে হয়েছিল যে এসব বদমায়েশি আর ছেলেমানুষি কাণ্ড ঘটিয়ে গের্ট হয়তো তার সঙ্গে দেখা করতে লজ্জা পাচ্ছে। এর মধ্যে একদিন হঠাৎ গের্ট নিজে থেকেই ইনেসকে ফোন করে দেখা করতে চায়; বলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দেখা করতে, কারণ সে নাকি বহুদিন ধরে অপেক্ষা করছে ইনেসকে একটা জরুরি কথা বলবার জন্য। এখন সে বলছে যে সে এখন সত্যিই ভালভাবে পড়াশুনা শুরু করতে চায়।


… ‘গের্ট, আসলে তুমি ঠিক কোন কারণে পড়াশুনা শুরু করতে চাও?’


-‘আমার বাবা মা সেটাই চান।’


-‘সেটা কি তুমি এতদিন জানতে না? জানা সত্ত্বেও তুমি সেই ব্যাপারে কোনও গুরুত্ব দাওনি।’


-‘কারণ আমি বিশ্বাস করতাম যে আমি ভাল আঁকতে পারি। আমি একজন শিল্পী।’


-‘কবে থেকে তোমার বিশ্বাসে চিড় ধরল?’


-‘বের্নহার্ড চলে যাবার পর থেকে।’


-‘তুমি এখন আর ছবি আঁকতে ভালবাস না?’


গের্ট যন্ত্রণাকাতর মুখে তাকায় ইনেসের দিকে… ‘তুমি তো সবই জানো।’ বলে সে… ‘কেন শুধুশুধু এই প্রশ্ন করছ?’ মুখটা অন্যদিকে ফেরায় সে… ‘আমি ভেবেছিলাম আমি আঁকতে পারব। কিন্তু আমি শুধু বের্নহার্ডকেই আঁকতে পারতাম। সে ছাড়া আর কাউকে, আর কোনওকিছু আমি আঁকতে পারি না। সে চলে যাবার পর আমি একটা রেখাও টানতে পারিনি কাগজে। আমার কোনও প্রতিভা নেই, ইনেস। ছবি আঁকতে নয়, আমি বের্নহার্ডকে ভালবাসি।’

অবশেষে গের্ট মুখ খুলেছে। আবেগমথিত খেদ আর অভিযোগের বন্যা বেরিয়ে আসছে এখন তার খোলা মুখ দিয়ে।

ইনেস স্তব্ধ হয়ে যায়। বিষণ্ণভাবে একদৃষ্টে গের্টের মুখের দিকে চেয়ে থাকে। যদিও এই বিষণ্ণতা চট করে বাইরে থেকে কেউ বুঝতে পারবে না। মানুষের মনে হবে যে ইনেসের মুখমণ্ডলে অদ্ভুত প্রশান্তি বিরাজ করছে।

‘তুমি যদি পাশ করে উকিল হয়ে বেরোও, তাহলে কি তুমি আর বের্নহার্ডকে ভালবাসবে না?’ বলে ওঠে ইনেস, ‘তুমি কি তখন বদলে যাবে?’


(চলবে)