Next
Previous
Showing posts with label ধারাবাহিক. Show all posts
0

ধারাবাহিক - শৌনক দত্ত

Posted in




















১৮. মেঘে ঢাকা তারা ঋত্বিক ঘটক





প্রিয়বরেষু বাসু,



আজ ছুটিরদিন। শীত যাই যাই করছে, ব্যালকনিতে অলস দুপুর পা ছড়িয়ে বসে আছে। দুটি শালিক রোদ খুঁটে খাচ্ছে একমনে। ঘরে বাজছে রবীন্দ্রনাথ, এমন কর্মহীন দিনগুলোয় বড় একা লাগে কি করবো বুঝে ওঠতে পারি না। গতরাতে ঋত্বিক ঘটকের মেঘে ঢাকা তারা দেখলাম আবার! কতবার যে দেখেছি তাও মনে হয় নতুন দেখছি। আজ বেশ বেলা করে ঘুম ভেঙ্গেছে, সকালের চা নিয়ে অনেকটা সময় কেটেছে বইয়ের সাথে। তোমার চিঠি পাইনা বহুদিন। ঘুরে বেড়াচ্ছো নাকি কোচবিহারেই আছো বুঝতে পারছিনা। তোমারও কি এমন নির্জন সময় কাটে? নিঃসঙ্গ সময় কাটাতে তোমাকে লিখতে বসেছি। তোমার জীবনটাই ভালো, এতবছর পরে এই শান্ত দুপুরে বসে মনে হচ্ছে তুমিই সেরা যাপন বেছে নিয়েছ। বয়স বেড়ে যাচ্ছে, তাই প্রায়শ এই কর্মময় জীবন, ক্যারিয়ারের পেছনে দৌঁড় ঝাঁপ ছোটাছুটিকে মিথ্যে মনে হয়। তোমার লেখালেখির খবর কি বেনারস ভ্রমণের পরে তোমার লেখা তেমন চোখে পড়েনি। বইমেলায় নতুন কোন বই এসেছে কি তোমার?



ঋত্বিক ঘটক নিয়ে কদিন আগে তোমার একটা লেখা পড়ছিলাম, তোমার চোখে ঋত্বিক ঘটককে পড়তে পড়তে আমার বারবার মনে হচ্ছিল ঋত্বিক ঘটক নামটা উচ্চারণ করলেই সবাই সিনেমার কথা বলে কিন্তু ঋত্বিক ঘটকের চলচ্চিত্র জীবনের আড়ালে তাঁর নাট্যচর্চা এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে অনুচ্চারিত অধ্যায়। আত্মপ্রকাশ তথা বেশি মানুষের পৌঁছাবার সর্বোৎকৃষ্ট মাধ্যম হিসেবেই তিনি সিনেমা জগতে এসেছিলেন। এর চেয়ে জোরালো মাধ্যম পেলে তাকেই তিনি মান্য করতেন, এমন দৃপ্ত ঘোষণা তিনি করেছেন তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিমায়, ‘আমরা যখন মাঠে ময়দানে নাটক করতাম, তখন চার-পাঁচ হাজার লোক জমা হতো, নাটক করে তাঁদের একসঙ্গে rouse করা যেত। তখন মনে হলো সিনেমার কথা, সিনেমা লাখ লাখ লোককে একসঙ্গে একেবারে মোচড় দিতে পারে। এই ভাবেই আমি সিনেমাতে এসেছি, সিনেমা করব বলে আসিনি।’ ভবিষ্যতে সিনেমার চেয়ে শ্রেয়তর কোনো মাধ্যমের সন্ধান পেলে সিনেমাকে তিনি লাথি মেরে চলে যাবেন—এমন মন্তব্য তিনি করেছেন তাঁর লেখায়। না মশাই, সিনেমার প্রেমে আমি পড়িনি। সাফ বলে দিয়েছিলেন ঋত্বিক ঘটক। সেই সিনেমা, একসময় যাকে লাথি মেরে চলে যেতে চেয়েছিলেন তিনি। তাই বলে এটা বলছিনা ঋত্বিক ঘটকের সিনেমা ঋত্বিককে প্রতিনিধিত্ব করেনা বরং ঋত্বিকের সিনেমা আমাকে আজো মোহজালে আটকে রাখে। ‘আকাশ ভরা সূর্য তারা বিশ্ব ভরা প্রাণ’- এ বিখ্যাত গানটি ঋত্বিকের কোমলগান্ধার ছবিতে দেবব্রত বিশ্বাসের কন্ঠের সাথে যে পিকচারাইজেশন করেছেন তা দেখার পর থেকে অন্য রকম অনুভূতি হয়। যখনই এই গানটা শুনি তখন মনের পর্দায় ভেসে ওঠে কোমলগান্ধারের গানটির পিকচারাইজেশন- সুপ্রিয়া দেবী পাহাড়ের পাদদেশে বসে আছেন আর অনিল চ্যাটার্জি চোখে মুখে দুহাতে আনন্দের দারুণ অভিব্যক্তি ফুটিয়ে গানটির অন্তর্নিহিত মানব জনমের জয়গান গেয়ে হেলে দুলে হাঁটতে হাঁটতে গানটি গাইতে গাইতে তাঁকে অতিক্রম করে যাচ্ছেন। এ গানটির সাথে অনিল চ্যাটার্জির অভিব্যক্তি একই সাথে হাজির হয় আমার মানসপটে। প্রচণ্ড জীবনমুখী এ মহান শিল্পী, যিনি মানুষকে বলেছেন ‘মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও বাঁচতে চায়’, তাঁর পক্ষে এমন একটি অনুপম প্রাণবন্দনার রবীন্দ্রসঙ্গীত তাঁর সৃষ্টিতে প্রয়োগ দারুণ মানানসই। তাই বলে ঋত্বিক ঘটকের লেখা প্রথম নাটক জ্বালার কথা ভুলে গেলে চলবে কেন? সিনেমার ঋত্বিক ঘটক হয়ে ওঠার আগে তিনি নাটকের মঞ্চেই তাঁর সিনেমার চোখ তৈরি করেছিলেন। সুনীল দত্তের কোন এক লেখায় পড়ছিলাম ঋত্বিক কুমার ঘটক ডাকনাম ভবা’র একটি স্মৃতিকথা, ‘১৯৫০ সাল নাগাদ গণনাট্য সংঘে নতুন ভাবে সাংগঠনিক ও প্রয়োগরীতির কলাকৌশল নিয়ে বিতর্কের ঝড় উঠেছে। খোঁজা হচ্ছে নতুন ধরনের নাটক। সেই সময়ে ৪৬ ধর্মতলা স্ট্রিটে একটি যুবক এল, প্রায় ছ’ফুট লম্বা হবে। পায়জামা-পাঞ্জাবি পরা, চটি জুতো পায়ে, বগলে ছিল একটি পাণ্ডুলিপি, নাম ‘জ্বালা’। মৃণাল সেন গণনাট্য সংঘের সঙ্গে আগে থেকে ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তিনিই নিয়ে এসেছিলেন ঋত্বিক ঘটককে।’ ঋত্বিক তখন পি সি যোশির ‘ইন্ডিয়ান ওয়ে’ কাগজের বাংলার সংবাদদাতা। ‘জ্বালা’-র অঙ্কুর লুকানো ছিল এই সাংবাদিকতায়। কলকাতায় তখন পরপর আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে। সেই ঘটনার প্রতিবেদন থেকেই ‘জ্বালা’ নাটকের জন্ম। ঋত্বিক তাঁর প্রথম নাটক নিয়ে লিখেছেন, ‘সে সময় আমি একত্রিশটা সুইসাইড দেখে ‘সুইসাইড ওয়েভ ইন ক্যালকাটা’ লিখে পাঠালাম। এই ‘জ্বালা’ নাটকে তার থেকে সিলেক্ট করা ছ’টা চরিত্র ইচ ওয়ান ইজ় এ ট্রু ক্যারেক্টার। ‘জ্বালা’ ইজ় এ ডকুমেন্টারি।’ এ নাটক বহু বার অভিনীত হয়েছে। সম্ভবত ঋত্বিকের লেখা পাঁচটি নাটকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বার। রেডিওতে এক সময়ে নাটকটি ছদ্মনাম ভবেশ বাগচীর লেখা বলে অভিনীত হয়েছে। তুমি তো জানোই বাংলাদেশের পাবনার যে বংশে ঋত্বিকের জন্ম তার আদি পদবী ছিল বাগচী, পরে তাঁরা ঘটক উপাধি পেয়েছিল।



১৯৫১ সালে চলচ্চিত্র নির্মাণের যাত্রা শুরু হয় ঋত্বিক ঘটকের। প্রথম সিনেমা ‘বেদিনী’ মাঝপথেই অর্থাভাবে আটকে যায়। তবুও থেমে থাকেননি তিনি, নতুন গল্প ও চিত্রনাট্য নিয়ে শুরু করেন নতুন ছবি ‘অরূপ কথা’। সুবর্ণরেখা নদীর তীরে প্রায় ২০ দিন ধরে শুটিং হয় এই চলচ্চিত্রের। কিন্তু ক্যামেরায় ত্রুটির জন্য প্রকাশ পায়নি এটিও। এরপর শুরু করেন ‘নাগরিক’ ছবির কাজ। কিন্তু আর্থিক কারণে তখন মুক্তি পায়নি এই চলচ্চিত্রটিও। ১৯৭৭ সালে তাঁর মৃত্যুর এক বছর পরে মুক্তি পায় ‘নাগরিক’। পর পর তিনটি অপ্রকাশিত চলচ্চিত্রের যন্ত্রণা নিয়ে থেমে যাননি ঋত্বিক। ১৯৫৮ সালে প্রথম মুক্তি পায় মানুষ ও যন্ত্রের প্রেম নিয়ে তাঁর চলচ্চিত্র ‘অযান্ত্রিক’। ঋত্বিকের “নাগরিক”চলচ্চিত্রটিকে মনে করা হয় ভারতীয় চলচ্চিত্রের উত্তরণের এক নতুন যুগের সূচনা। যদিও অনেকেই হয়তো এ কথাও মেনে নেবেন, তাঁর বানানো যেকোনও ছবি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের বিজেতাদের কাজকে ম্লান করে দিতে পারলেও, তাঁর ছবিগুলো জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে বা আন্তর্জাতিক স্তরে যথাযথ প্রচারের উদ্দেশ্যে বিশেষ কিছুই করা হয় নি। তেমনি ঋত্বিকের জ্বালা নাটকের দিকে চোখ ফেরালে দেখবো শুধুই মৃত মানুষের যন্ত্রণা, আশাবাদের চিহ্ন কোথায়? অনেকে অবশ্য আপত্তি তুলেছিলেন নাটক অভিনয় নিয়ে। কিন্তু জ্বালা তো শুধু মৃত্যুর কথা বলে না। বলে এক সুন্দর দেশের কথা। যেখানে সব শান্তি, সব তৃপ্তি। কোথাও একটা আছে সেই দেশ। পথ খোঁজার শেষ হয়নি। খুঁজে পেতেই হবে সেই দেশটাকে। মানুষের উপরের খোলসটাকে বাদ দিলে যে অবিরাম আর্তনাদের মধ্যে সে চুপ করে বসে থাকে, ঋত্বিকের নাটক তন্ন তন্ন করে খুঁজে বেড়ায় তাকে। জ্বালা নাটকটি হৃদয়ের গভীরে উপলব্ধি করলে দেখা যাবে ‘যুক্তি, তক্কো আর গপ্পো’ সিনেমার শেষে নীলকণ্ঠ বাগচী বলেছিল, “সব পুড়ছে। ব্রহ্মাণ্ড পুড়ছে, আমি পুড়ছি।” কোথাও গিয়ে যেন মিলে যায় দুটি গল্প। নীলকণ্ঠের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন ঋত্বিক স্বয়ং। আবার শিল্পীজীবনের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে থাকা আগুনকে পান করে তিনি হয়ে উঠেছিলেন নীলকণ্ঠ। আকণ্ঠ মদ্যপান করে পুলিশের গুলিতে নীলকণ্ঠের তখন মৃতপ্রায়। দুগ্‌গাকে বলা এই অন্তিম সংলাপগুলিতে ঋত্বিক যেন এক নিঃশ্বাসে বলে যান নিজের জীবনের ক্লেদাক্ত বৃত্তান্ত। নীলকণ্ঠের পেটে বুলেটের ক্ষতের থেকেও বেশি যন্ত্রণাদায়ক হয়ে ওঠে ব্যর্থতা ও হতাশার গণ্ডি থেকে বেড়িয়ে আসার পণ্ডশ্রমের ক্লান্তি।



“আমি প্রতি মুহূর্তে আপনাকে ধাক্কা দিয়ে বোঝাব যে, It is not an imaginary story, বা আমি আপনাকে সস্তা আনন্দ দিতে আসি নি। …যা দেখছেন তা একটা কল্পিত ঘটনা, কিন্তু এর মধ্যে দিয়ে যেটা বোঝাতে চাইছি আমার সেই থিসিসটা বুঝুন, সেটা সম্পূর্ণ সত্যি। সেটার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্যই আমি আপনাকে এলিয়েনেট করব প্রতি মুহূর্তে। যদি আপনি সচেতন হয়ে ওঠেন, ছবি দেখে বাইরের সেই সামাজিক বাধা বা দুর্নীতি বদলের কাজে লিপ্ত হয়ে ওঠেন, আমার প্রোটেস্টকে যদি আপনার মাঝে চারিয়ে দিতে পারি তবেই শিল্পী হিসেবে আমার সার্থকতা।” চলচ্চিত্রকে প্রতিবাদ ছড়িয়ে দেওয়ার একটা মাধ্যম হিসেবে এভাবেই ভাবতেন ঋত্বিক ঘটক। সত্য বলার সেই দুরন্ত স্পর্ধা থেকে সারাটা জীবন যা ভেবেছেন তা নিয়েই নির্মাণ করেছেন চলচ্চিত্র। পুঁজিবাদী সমাজে মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্ত শ্রেণীর লড়াইয়ের গল্পগুলো তিনি খুব সচেতনভাবে ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন তাঁর চলচ্চিত্রগুলোতে। ১৯৬০ সালের ১৪ এপ্রিল মুক্তি পায় ঋত্বিক ঘটকের চতুর্থ এবং প্রথম ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র ‘মেঘে ঢাকা তারা’। দেশভাগ পরবর্তী কলকাতায় এক নিম্ন মধ্যবিত্ত শরণার্থী পরিবারের সংগ্রামমুখর জীবন নিয়ে নির্মিত হয় এই চলচ্চিত্রটি। শক্তিপদ রাজগুরুর উপন্যাস থেকে ঋত্বিক ঘটক এর কাহিনী নেন। পঞ্চাশের দশকে কলকাতা শহরের এক প্রান্তে রিফিউজি কলোনির একটি মধ্যবিত্ত পরিবারকে ঘিরেই এর গল্পটি আবর্তিত। ঋত্বিক ঘটকের সবচেয়ে আলোচিত সিনেমা মেঘে ঢাকা তারা আমাদের মনে দাগ কাটলেও দেখা যায় এই সিনেমার বীজ বহু আগেই রোপন করেছিলেন ঋত্বিক তাঁর নাটকে! যে কয়েকটি নাটকের জন্য ঋত্বিকের নাম নাট্য-আন্দোলনে চিরদিনের জায়গা করে নিয়েছে, তার একটি উদ্বাস্তু জীবন নিয়ে নাটক ‘দলিল।’একরাতের বেতার ঘোষণা চিরদিনের জন্য উদ্বাস্তু করে দিয়েছিল ঋত্বিককে। গণনাট্য ছাড়ার আগেই সেখানে প্রযোজনা করেছিলেন ‘দলিল’ নাটক। উদ্দেশ্য ছিল ‘ভাঙা বাংলার প্রতিরোধ’। নাটকে-সিনেমায় বারবার সন্ধান করেছিলেন ‘বাংলাদেশের মা’-এর। দেশভাগের যন্ত্রণা আজীবন ভুলতে পারেননি, চাননি বাঙালি সেই স্মৃতি ভুলে যাক। সুরমা ঘটকের লেখায় পাই, “কতকগুলো ঘরছাড়া সম্পূর্ণ মানুষ যে নাটকীয় ঘোরাফেরা করছে তারই নাম ‘দলিল’।” সেই দলে অর্জুন মালাকারদের সঙ্গে পাওয়া যাবে ঋত্বিককেও। দলিলের সন্ধানে অর্জুন খুঁজে বেড়াত দেশের রাজাকে। গুলি খেয়ে মরতে হয়েছিল তাঁকে, নীলকণ্ঠের মতোই। এ নাটক শেষ করতে পারেননি ঋত্বিক। তখনও আসেনি সেই পরিণতি। কিন্তু বিশ্বাস করতেন, আসবে একদিন। এই নাটকের শেষ পাতাটা লিখবে জনতা। তাদের জন্য ছেড়ে গেলেন শেষ পাতাটা। সেই মৃত্যুঞ্জয়ী আশা থেকে লিখেছিলেন, “বাংলারে কাটিছ কিন্তু দিলেরে কাটিবারে পার নাই।” আর সে বছরই সুরমাকে চিঠিতে তিনি লিখছেন, “-ও মেয়েকে আমি বহ্নিশিখার মত জ্বলে উঠতে দেখেছি। কিন্তু এই ছবিটিই আমার মনে থাকবে চিরটাকাল। আমার বাংলাদেশের মত শ্যামল বাংলার মেয়ে।” সমাপতন? নাকি এটাই দেখতে চেয়েছিলেন তিনি? এর সঙ্গে মিলিয়ে নিতে কষ্ট হয় পরবর্তী ঋত্বিককে। তার কারণের মধ্যে লুকিয়ে অসংখ্য পরত, অসংখ্য চরিত্র। ‘দলিল’-এ অর্জুন শেষ পর্যন্ত বুঝতে পেরেছিল রাজা আর শত্রু আসলে একই লোক। চিৎকার করে সে বলত, “দুশমন কনে?—তারে ধরতে আমি পারবই, তারে চিনতে আমি পারবই।” ১৯৫২ সালে নিজের লেখা সেই নাটকটি নিয়েই তিনি পাড়ি দিলেন গণনাট্যের কনফারেন্সে বোম্বে। কলকাতায় প্রথম অভিনয় হয় আমন্ত্রিত কয়েক জনের সামনে, ভূপতি নন্দীর বাড়ির ছাদে। পরিচালনা ও প্রধান অভিনেতা ছিলেন ঋত্বিক নিজেই। বোম্বে ছাড়া ভদ্রেশ্বর, উত্তরপাড়া, বালিতে অভিনয় হয়। তাঁর ‘সাঁকো’, ‘স্ত্রীর পত্র’ খুবই চর্চিত প্রযোজনা। ১৯৬৯ সালে, প্রান্তবেলায়, যখন অসুস্থ, গোবরা মানসিক হাসপাতালে রয়েছেন, লিখলেন ‘সেই মেয়ে।’ নিজের নির্দেশনায় হাসপাতালের রোগী ও কর্মী-চিকিৎসকদের দিয়ে অভিনয়ও করালেন। কবি বিনয় মজুমদারও তাতে অভিনয় করেছিলেন!



ঝুপ করে যেন সন্ধ্যা নেমে এসেছে কোলের কাছে। আজ আর লিখছি না। এমন সন্ধ্যায় তুমি পাশে থাকলে বেশ হতো, এখনো কি আগের মতন গাও-‘সন্ধ্যা নেমেছে আমার বিজন ঘরে, তব গৃহে জ্বলে বাতি। ফুরায় তোমারি উৎসব নিশি সুখে, পোহায় না মোর রাতি।। ’ সব গুলিয়ে যাচ্ছে স্মৃতির ভিড়ে। নিরন্তর ভালো থেকো।



ইতি-

সুস্মি

২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
0

ধারাবাহিক - রঞ্জন রায়

Posted in




















২৫ (৩)

--তোমার নাম?

--ছোটে পালোয়ান।

পাব্লিক প্রসিকিউটর একটু শুধরে দিলেন। পেশকার বলল- লিখুন, ছোটেলাল।

ছোটে পালোয়ান ওর দিকে এমনভাবে তাকালো যেন সত্যিই ওকে ছোট বানিয়ে দেয়া

হয়েছে। চটে গিয়ে ও নাল গিলে ফেলল। পরের প্রশ্ন—বাবার নাম?

--কুসেহর।

পাব্লিক প্রসিকিউটর ফের শুধরে দিলেন, --কুসেহরপ্রসাদ।

ওর দিকে পালোয়ান এবার যেভাবে দেখল যেন ওর বাবাকে গাল দেয়া হয়েছে।

--জাত?

--বাহমন।

--মোকাম?

--আমরা গঁজহা।

--বুঝলাম, কিন্তু তোমার গ্রামের নাম কী?

--গঞ্জ।

--আরে কোন গঞ্জ?

ছোটে পালোয়ান চোয়াড়ে ভঙ্গিতে বলল-এদিকে কি শ’ দুশো গঞ্জ আছে? ফের সামলে

নিয়ে বলল—শিবপালগঞ্জ।

--এবার বল, ভগবানের কসম, যা বলব, সব সত্যি বলব।

--বলে দিলাম।

--বলে দিলাম নয়, নিজের মুখে বলো—ভগবানের দিব্যি, সব সত্যি বলব।

--নিজের মুখেই তো বললাম।

আর্দালি মহামহিমের দিকে দেখতে লাগল। কথাবার্তায় ‘ডেডলক’!




মহামহিম ছোটে পালোয়ানকে বেশ খুঁটিয়ে দেখলেন। -- চওড়া চোয়াল, বলদের মত ঘাড়,

গয়াদীনের ভাষায়—শুঁড়হীন হাতি! আবার মহামহিমের ব্যক্তিত্ব বুদ্ধিজীবী ধাঁচের। উনি

আর্দালিকে বললেন—সাক্ষীকে বল বাইরে গিয়ে মুখ ধুয়ে আসতে।

--বাইরে যাও, মুখ পরিষ্কার করে ফের হাজির হও।

ছোটে পালোয়ান কাঁধের গামছা দিয়ে মুখের অদৃশ্য ঘাম মুছে নিয়ে কাঠঘড়ার ফ্রেমে হাত

রেখে বেপরোয়া ভঙ্গিতে চারদিকে তাকাল, যেন জাহাজের ডেকে রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে

সমুদ্রে জলজন্তুদের দেখছে। আদালত ফের হুকুম দিলেনঃ

-সাক্ষীর মুখ পরিষ্কার করাও!

এবার পাব্লিক প্রসিকিউটর ছোটেকে বললেন—বাইরে গিয়ে মুখের পান ফেলে এস।

ছোটে পালোয়ান এতক্ষণ বেশ ডাঁট দেখিয়ে পান চিবুচ্ছিল। ওর মনে হোল যেন ওকে ওর

আত্মসম্মান থুঃ করে ফেলে আসতে বলা হচ্ছে। ও এমন ভাব করল যেন শোনেনি,

তারপর চিবোনো পান গিলে ফেলে ফের গামছা দিয়ে ভাল করে মুখ মুছল।

মহামহিম আর্দালিকে বললেন—সাক্ষীকে শপথ করিয়ে নাও।

আর্দালি এই শর্টকাটকে মুখ ভেঙেচে দেখতে দেখতে ছোটে পালোয়ানকে বলল- বল,

ভগবানের কসম, যা বলব সব সত্যি বলব।

--সত্যি বলব।

--ভগবানের কসম।

--ভগবানের কসম।

ছোটে পালোয়ান এদিক ওদিক দেখতে দেখয়ে যন্ত্রের মত বলে দিল। উ

পাব্লিক প্রসিকিউটর প্রথমে পালোয়ানকে জোগনাথের ঘরে তল্লাসি নিয়ে প্রশ্ন করল।

ও স্বীকার করল যে দারোগাজী জোগনাথকে সঙ্গে নিয়ে ওর ঘরে তল্লাসি করতে

গিয়েছিলেন।

--তারপর ঘরের তল্লাসি হল?

--হ্যাঁ।

--কী পাওয়া গেল?

- কিস্যু না।




--পাব্লিক প্রসিকিউটরের চোখ কপালে উঠল। উনি দাবড়ে দিয়ে বললেন—আমি জানতে

চাইছি তল্লাসিতে কী পাওয়া গেল?

---কী আর পাওয়া যাবে? ঘন্টা?

জোগনাথ আর ওর উকিল—দুজনের মুখে হাসির ঝিলিক। পেছন থেকে শনিচর বলে

উঠল—শাবাশ! লড়ে যাও ব্যাটা!

“কে বলল? এখানে কে কথা বলছে? এ কী রকম অভদ্রতা”? মহামহিমের মুখ গম্ভীর।

কিন্তু শনিচর তার আগেই এজলাস থেকে কেটে পড়েছে।

পাব্লিক প্রসিকিউটর—তল্লাসি করে তিনটে গয়না উদ্ধার হয়েছে। সেগুলো এখন

তোমার সামনে রাখা হয়েছে।

অমনই জোগনাথের উকিল লাফিয়ে সামনে এসে দাঁড়াল।

--হুজুর, এ তো জেরা হচ্ছে! ক্রস এগজামিনেশন!

পাব্লিক প্রসিকিউটর— হুজুর, সাক্ষী হোস্টাইল হয়ে গেহে। আমি একে ক্রস

এগজামিনেশন করার অনুমতি চাইছি।

মহামহিম গম্ভীর মুখে বললেন—শুরু করুন।

জোগনাথের উকিল আপত্তি করল,--শ্রীমানজী আগে উনি লিখে দিন যে এই সাক্ষী

হোস্টাইল।

পাব্লিক প্রসিকিউটর ফাইল থেকে একটা আবেদন পত্র বের করে আদালতে পেশ

করলেন। বোঝা যাচ্ছে যে ওটা আগে থেকে লিখে রাখা।

ফের আপত্তি, --হুজুর ওটা আগে থেকে লিখে রাখা ছিল।

আদালত গম্ভীর—তাতে কী আসে যায়!

পাব্লিক প্রসিকিউটর নিজের সাফাই দিলেন।

--হুজুর, এ সমস্ত তো রোজকার কারবার, আদালতী দাঁও প্যাঁচ। সমস্ত সম্ভাবনার কথা

ভেবে আগে থেকে তৈরি হয়ে আসি।

--ঠিক আছে, ঠিক আছে। আপনি জেরা শুরু করুন।

পাব্লিক প্রসিকিউটর ঘুরে দাঁড়িয়ে ছোটে পালোয়ানকে সেই একই প্রশ্ন করলেন—এই

যে তিনটে গয়না দেখছ, এগুলো তল্লাসির সময় জোগনাথের ঘর থেকে বাজেয়াপ্ত হয়েছে?




ছোটে এমন ভাব দেখাল যেন ফালতু কথা নিয়ে বারবার কথা কাটাকাটিতে ওর কোন

উৎসাহ নেই। বলল—আমার বয়ান একবার হয়ে গেছে। তল্লাসিতে কিছুই পাওয়া যায় নি।

পাব্লিক প্রসিকিউটর ফাইল থেকে একটা কাগজ বের করে দেখালেন—এই ফর্দ মাল

বাজেয়াপ্ত করার সময় তোমার সামনে লেখা হয়েছিল?

--আমার সামনে খালি গালাগালি হচ্ছিল, তাই কোন লেখা-টেখার সুযোগই হয় নি।

--এই ফর্দতে এটা তো তোমারই দস্তখত? একবার ভাল করে দেখ।

পালোয়ান কাগজের দিকে না তাকিয়েই গোঁয়ার ভাব দেখিয়ে বলল—না।

পাব্লিক প্রসিকিউটর কাগজের এক জায়গায় ছোটে পালোয়ানের দস্তখত দেখিয়ে

বললেন—এই দেখ, ভালো করে দেখে নাও। এটা তো তোমারই দস্তখত।

ছোটে পালোয়ান এবার মহামান্য আদালতের দিকে তাকিয়ে বলল—আমার বয়ান নেয়া

হয়ে গেছে। তাহলে এ কেন বারবার একটাই প্রশ্ন করে যাচ্ছে?

কিন্তু মহামহিম এবার কোন সহানুভূতি না দেখিয়ে কড়াসুরে বললেন—কাগজ দেখে তবে

জবাব দাও। মিথ্যে বললে জেল হবে।

ছোটে এতটুকু বিচলিত হোল না। বুক চিতিয়ে বলল, -- জেলের কারবার নতুন কিছু নয়।

যখন এজলাসে এসেছি তখন এক পা জেলের মধ্যে, অন্য পা জেলের বাইরে। কিন্তু কাগজ

টাগজ কেন দেখব? লেখাপড়া আমার জন্য ক’অক্ষর গোমাংস।

পাব্লিক প্রসিকিউটর ফের উঁচু স্বরে বললেন—তাহলে দস্তখত কী করে কর? এই

দস্তখত তুমি করনি বলছ?

এতক্ষণ পরে জোগনাথের উকিল মুখ খুললেন। বললেন—ধীরে ধীরে একটা একটা করে

প্রশ্ন করুন। সাক্ষী কি পালিয়ে যাচ্ছে?

পাব্লিক প্রসিকিউটর পাত্তা না দিয়ে ফের জিজ্ঞেস করলেন—তাহলে দস্তখত কী

করে কর?

--কোন হতভাগা দস্তখত করে? আমার সাত পুরুষে কেউ কখনও দস্তখত করেনি আর

আমি করব! যাও, ভাল করে চোখ খুলে দেখ। পাঁচশো কাগজ রাখা আছে, সবকটায় আমার

বুড়ো আঙুলের টিপছাপ। হোল তো?

ছোটে পালোয়ান গর্বের সঙ্গে এজলাসের চারদিকে চোখ ঘুরিয়ে দেখল।

পাব্লিক প্রসিকিউটর ফের বললেন—আমি বলছি, এই কাগজে তুমিই দস্তখত করেছ।

--সে তুমি সারাক্ষণ চড়াইয়ের মত কিচিরমিচির করতে থাক, কে মানা করছে?




আদালত হস্তক্ষেপ করলেন,--ভদ্রভাবে কথা বল।

ছোটে পালোয়ানের মেজাজ চড়ে গেছে। বলল, --যার যার ভদ্রতা তার তার কাছে হুজুর!

এনার ধমক খেয়ে মিথ্যে সাক্ষী কেন দেব?

পাব্লিক প্রসিকিউটর নিজের ফাইল গুটিয়ে নিয়ে বললেন—আমার আর কিছু জিজ্ঞেস

করার নেই।

ছোটে পালোয়ান লুঙি কষে কেটে পড়ছিল। কিন্তু জোগনাথের উকিল বাধা দিলেন।

--আমি কিছু প্রশ্ন করতে চাই।

আদালতের আপত্তি নেই।

উকিল বললেন—গয়াদীনের মেয়ে বেলাকে চেন?

--কে না চেনে!

--এলোমেলো কথা ছেড়ে নিজের কথা বল। তুমি ওকে চেন, কি চেন না?

--চিনব না কেন!

--মেয়েটি কেমন?

--বাজে মেয়ে, চালচলন ঠিক নয়।

মহামহিম বাধা দিলেন; --এসব কথার কী মানে? বর্তমান কেসের সঙ্গে কিসের

সম্পর্ক?

--সম্পর্ক থাকবে না কেন? এখনই মামলা সাফ হয়ে যাবে।

এবার উকিল কটু স্বরে ছোটে পালোয়ানকে বললেন—কী করে বলছ যে মেয়েটার চালচলন

ঠিক নয়?

--নিজের চোখে দেখেছি যে!

--কী দেখেছ?

--দেখেছি ও জোগনাথের সঙ্গে খারাপ কাজ করছিল। গয়াদীন এজন্যই জোগনাথকে

মিথ্যে মামলায় ফাঁসিয়েছে।

ব্যস, এরপর জেরা শুরু হোল সেই পুরনো বহু প্রচলিত কায়দায়—যাতে আদালতে বহুবার

প্রমাণ করা হয়েছে যে সংসারে কেউ চোর নয়, বরং যাকে চোর ভাবা হয়েছে সে আসলে

গেরস্তের বৌ, বোন বা মেয়ের প্রেমিক। যাকে তারা রাত্তিরে নির্জন শয্যায় শোয়ার




নেমন্তন্ন করেছিল। কিন্তু গেরস্ত তাকে নিজের ভাই, ভগ্নিপতি বা জামাই না বলে চোর

বলে ডেকেছে। যার পরিণামে আজ-----।




সেই দারোগাজী আজকাল শিবপালগঞ্জে নেই, বদলি হয়ে গেছেন। নিজের ভাঙাচোরা খাট,

দুধেল গাই, এবং কনভন্টগামিনী কন্যাকে নিয়ে শহরবাসী হয়েছেন। বড় মুশকিলে একটা

গলির মধ্যে একটা ছোটখাটো ভাড়ার বাড়ি পেয়ে তাতে সাধারণ নাগরিকের মত বাস

করছেন। যেহেতু সরকারি আধিকারিককে সামান্য নাগরিকের দশায় দেখলে খারাপ লাগে,

তাই ওনাকে দেখেও খারাপ লাগল।

কিন্তু উনিই তো জোগনাথের চুরির মামলার তদন্ত করেছিলেন তাই ওনাকে আজ ফের

এজলাসে হাজির হয়ে গঞ্জহাদের সঙ্গে গা ঘেষাঘেষি করতে হচ্ছে। ছোটে পালোয়ানের

বয়ান শোনামাত্র উনি ছিঃ ছিঃ করে উঠলেন। মহামহিমের নজর ওনার উপর পড়ার আগেই

উনি গয়াদীনের হাত ধরে বাইরে চলে এলেন। খানিকক্ষণ দুজনেই চুপ।

শেষে দারোগাজী বললেন— হতচ্ছাড়া গঞ্জহার দল! বেইমানীর সীমা ছাড়িয়ে গেছে। এমন

একটি মেয়ের জন্যে এরকম নোংরা কথা বলার আগে ওদের জিভ খসে যায় না কেন!

গয়াদীন মাথা নীচু করে মেজের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। দুটো ইঁটের ফাঁকে একটা আলপিন

পড়ে আছে। ওনাকে দেখে মনে হচ্ছে-- যেন ভাবছেন, ওটা তুলে নেবেন কিনা।

দারোগাজী ঘৃণার স্বরে বললেন—এখানে দেখছি-- যে কেউ কারও নামে কিছু বলতে পারে।

ভালমানুষের কোন কদর নেই।

গয়াদীন মুখ খুললেন, সেই চিরপরিচিত ক্লান্ত স্বরে—এতো হবারই কথা। যেদিন

আপনি জোগনাথকে ধরে নিয়ে গেলেন, সেদিনই বুঝেছিলাম—এবার আমার ঘরে কারও

ইজ্জত বাঁচানো কঠিন হবে।

--আমার বড্ড আফশোস হচ্ছে।

--আফশোস কেন? আপনার কী দোষ? কাউকে চোর সাজিয়ে জেলে ভরতে চাইলে সে কি

ছেড়ে কথা বলবে?

--আমার তো সারা শরীর জ্বলছে।

--আমার জন্য শরীর পোড়াতে হবে না দারোগাজী! এসবই আমাদের দেশের রীতিরেয়াজ।

কাছারির মুখ দেখেছি যখন সবই সহ্য করতে হবে। যাকে এখানে আসতে হয়, ধরে নাও

তার কপাল পুড়েছে। তুমি নিজের শরীর পুড়িয়ে কী আর করবে?




জোগনাথের উকিল তিরবেগে বেরিয়ে এসে অন্য কোন এজলাসের দিকে দৌড়ল। ওর পেছন

পেছন দৌড়ুতে থাকা মক্কেলদের বলল—তাড়াহুড়ো কোর না। আগে জোগনাথকে ছাড়া

পেয়ে বাইরে আসতে দাও। তারপর এক এক জনের হিসেব করব। হ্যাঁ হ্যাঁ, পুলিসেরও।

দারোগাজী চমকে উঠে তাকালেন। কিন্তু ওনার দেখার জন্য কিছু বাকি ছিল না।

(চলবে)
0

ধারাবাহিক - নন্দিনী সেনগুপ্ত

Posted in





















২০


-“আপনি নিজেকে সামলে নিন!” বলে ওঠে জেরাল্ড। চার্লস চুপ করে যায়। স্থাণু হয়ে থাকে জানালার সামনে অদ্ভুত বিষণ্ণ ভঙ্গিমায়। একটুও নড়ে না।

-“এখানে এসে বসুন!” জেরাল্ড বলে যায়… “এবং আমার কথা ভালভাবে শুনুন।” একটা চেয়ার যেটা ল্যাম্পশেড থেকে একটু দূরে, সেখানে চার্লসকে বসতে ইঙ্গিত করে সে। চার্লস জানালার পাল্লার হাতলটা ছেড়ে ধীরে ধীরে এসে চেয়ারে বসে। মুখ তুলে তাকায় না সে। তার দুই হাত এখনো মুষ্টিবদ্ধ।

জেরাল্ড খুব খুঁটিয়ে লক্ষ্য করে চার্লসকে, তারপর শীতল এবং নিঃস্পৃহ স্বরে বলে যায়…

-“আমি ব্যাপারটা একটু বুঝিয়ে বলতে চাই যে কেন সেদিন রবার্টকে আমি বলেছিলাম আপনাকে বাড়ি পাঠিয়ে দেবার জন্য। আপনি ছাত্র হিসেবে সাধারণ মানের এবং আপনার স্নায়ূ সব সময় চঞ্চল হয়ে থাকে। এদিকে আপনার অভ্যেস আছে সব সময় কোনও না কোনও অ্যাডভেঞ্চারে জড়িয়ে পড়ার। আমি সচেতনভাবেই ‘অভ্যেস’ শব্দটা ব্যবহার করছি, কারণ বার বার এই ধরনের কাজ করাটা আপনার কাছে স্বাভাবিক বলেই মনে হচ্ছে। কিন্তু আপনার জন্য সবচেয়ে ভাল হবে শান্তিতে নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকা, শান্ত হয়ে পড়াশুনা করা এবং শান্তিতে জীবন কাটানো। আপনি সহজে উত্তেজিত হয়ে যান, অদ্ভুত কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলেন এবং মনে করেন যে আপনার এই অভিজ্ঞতা একটা দারুণ ব্যাপার আপনার জীবনে। যেমন রবার্টের ওখানে যেতে যেতে, আপনি হঠাৎ মিকার প্রেমে পড়লেন। দয়া করে বসুন, দয়া করে… আমার পুরো কথা শুনে যাবেন। আপনি মিকার প্রেমে পড়লেন। মেয়েটি বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ, সবার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে জানে, কিন্তু আচার আচরণ অত্যন্ত শিশুসুলভ এবং সে নিজেই খুব বিভ্রান্তিতে ভোগে। ফলে আপনার পক্ষে তার সঙ্গে মেলামেশা করা একেবারে অর্থহীন। তাছাড়া এই ধরনের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার মত পরিপক্কতা আপনার একেবারেই নেই এবং আপনি অকারণে কষ্ট পাবেন। কষ্ট পেতে বাধ্য আপনি, চার্লস এবং এই পরিস্থিতি আপনি নিজে ডেকে আনছেন। আমি বহুবার রবার্টকে আপনাকে তার বাড়িতে আমন্ত্রণ জানাতে বারণ করেছি। সে আমার কথায় কর্ণপাত করেনি, সেই কারণে আমি আপনাকে সেদিন বলেছিলাম বাড়ি চলে যেতে।”

চার্লস অস্পষ্ট স্বরে কিছু একটা বলবার চেষ্টা করল। তবে এখন তার ভাবভঙ্গি বেশ নম্র। সে বুঝতে পেরেছে যে কোথাও একটা ভুল হয়েছে তার। জেরাল্ড তাকে অপমান করবার জন্য এসব বলেনি। এক সাধারণ মানের ছাত্র এবং অল্পবয়সী কিশোর যে সব ব্যাপারে অপ্রয়োজনে নাক গলিয়ে বেড়ায়, এরকম এক মানুষ হিসেবেই জেরাল্ড তাকে দেখে। পুরো ব্যাপারটা সত্যি এবং লজ্জাজনক হলেও সেদিন চার্লসকে অপমান করবার উদ্দেশ্য জেরাল্ডের কোনওমতেই ছিল না, এটা পরিষ্কার। বাড়ি পাঠিয়ে দেবার ব্যাপারটা একটা সাধারণ বাক্য হিসেবেই ধরা উচিত এক্ষেত্রে।

এখন জেরাল্ডের দিকে মুখ তুলে তাকানো কিম্বা তার ব্যাপারে অভিযোগ করবার মত কোনও সাহস চার্লসের আর অবশিষ্ট নেই। সে বলে যে জেরাল্ড যেহেতু চার্লসের দোষের ব্যাপারগুলো খোলাখুলি বলে দিয়েছে, সেহেতু তার আর বিশেষ কিছু বলবার সুযোগ নেই এই মুহূর্তে। তবে এখন চার্লসের বক্তব্য একটু ক্ষমাসূচক সুরে বাঁধা। জেরাল্ডও অনেকটা নরম সুরে কথা বলে এখন…

-“রবার্টের ওখানে যাবার আপনার কোনও প্রয়োজন নেই।” জেরাল্ড বলে যায়… “তাছাড়া ওখানে যাওয়া এমন কিছু বড় ব্যাপার নয়। আপনি এইসব মানুষদের বিশাল কিছু ভেবে বসে আছেন। আমার ব্যাপারেও আপনি ভেবেছেন আমি একজন কেউকেটা। আসলে আপনি হীনমন্যতায় ভুগে এইসব ফাঁকা আওয়াজে, মূল্যবোধের নকল মানকে আসল বলে ভেবে বসে আছেন। কারো সঙ্গে মতের অমিল হওয়া মানে হেরে যাওয়া নয়। এইসব বার গার্ল যারা, তারা নিরীহ বার গার্ল মাত্র। কিন্তু তাদের সঙ্গে আমার মিলমিশ হওয়া অসম্ভব। কারণ এরা চটপটে, চতুর আর বেশ বলিয়েকইয়ে ধরনের এবং তারা কখন কোথায় কার সঙ্গে ঝামেলা পাকাবে, কেউ জানে না।”

চার্লস আবার একগুঁয়ে ভঙ্গিতে বলে ওঠে… “কিন্তু আপনি আমায় অতি সাধারণ বলে দাগিয়ে দিয়েছেন এবং ঠিক এই কারণেই মিকা আমায় অবজ্ঞা করে।”

“মিকার অবজ্ঞার সঙ্গে এসবের কী সম্পর্ক! চার্লস, আমি আপনাকে যতখানি বোকা ভেবেছিলাম, আপনি তার চেয়েও অনেক বেশি বোকা। যান, আপনার যদি অতই ইচ্ছে থাকে, তো রবার্টের কাছে যান। অন্তত নিজেকে দুঃখী, বিষণ্ণ, অবমানিত আত্মা ভাবা বন্ধ করুন। পারলে সঙ্গে বের্নহার্ডকেও নিয়ে যান। আমি আপনার কোনও ব্যাপারে থাকতে চাই না।”

বের্নহার্ড পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারে না জেরাল্ডকে। কেন সে আবার রবার্টের কাছেই যেতে বলল যদি সেখানে যাওয়াটা চার্লসের জন্য এতটাই ক্ষতিকর হয়? সে নিজেই বা কেন যায় সেখানে? সে কি রবার্টের ওখানে যারা আসে, তাদের পছন্দ করে? হঠাৎ বের্নহার্ডের সেই বাচ্চাদের ছবির কথা মনে পড়ল। সেই মহৎ, অথচ বিষণ্ণ মুখচোখ এবং তাদের হাতে এক অদ্ভুত পেলব আর্তি। সে মনে মনে বাচ্চাগুলোর সঙ্গে একাত্মতা অনুভব করল, তার মনে হল যেন তারা ভাইবোনের মত আপন।

…………………

হে পাঠক, এখন আমরা একটু ক্রিস্টিনার ব্যাপারে জেনে নেব। ভাস্কর্যশিল্পী ক্রিস্টিনা, সুদর্শনা এবং কল্পনাপ্রবণ এক নারী। তার প্রতিভা, তার চরিত্রের বহুমুখী গুণাবলী সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা শুধু কঠিন নয়, বিভ্রান্তিকর হয়ে উঠতে পারে। প্যারিসে সে বহুদিন ধরে কাজ করছে। রদ্যাঁ মিউজিয়ামে তাকে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায়। কখনো সে একটা মূর্তির সামনেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকে গালে হাত দিয়ে… সম্ভবত বুঝবার চেষ্টা করে যে মহান শিল্পীর শৈলীর গোপন রহস্য কী ছিল! তার কোনও শিক্ষক নেই, সে অতীতে কোনও স্টুডিওতে কাজ করেনি। “কে আমায় শেখাবে কী ভাবে দেখতে হয়”… সে বলেছিল… “কারণ ঠিকভাবে দেখতে পারাটাই আসল তফাৎ গড়ে দেয়।”

নিয়মিত কাজ করে না সে। দিনের পর দিন, সপ্তাহের পর সপ্তাহ হয়তো সে কোনও কাজই করল না। এদিক ওদিক উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়াতে লাগল, দেখতে লাগল অনেক কিছু। কারণ সে সারা পৃথিবীটাকেই বিশেষ ভাবে দর্শন করতে চায়। সেই সময় সচেতনভাবে নিজের মনের ভাবনাগুলো বিশ্লেষণ করে না, অনুভবগুলো নিয়মমাফিক সাজিয়ে গুছিয়ে রাখতে চায় না সে। এই সময়গুলো সে একটা ঘোরের মধ্যে বাস করে। বহির্জগতে ভাবনাগুলো প্রকাশ করে না সে। অবচেতনে পাওয়া আকার, রূপ এবং রেখার মধ্যে আধোজাগা অবস্থায় বিচরণ করে ক্রিস্টিনা।

কিন্তু এই সমস্ত আকার তার মনে অদ্ভুত তীব্রতা নিয়ে স্পষ্টভাবে জেগে থাকে। তার ইন্দ্রিয়ানুভূতি একত্রিত করে সে বাস্তবে দেখা বাড়িঘরদোর, জন্তুজানোয়ার এসবের মধ্য থেকেই নতুন আকার নির্মাণের সাধনা করে। মানুষজনের মুখ বিষণ্ণ কিম্বা আনন্দিত, যেরকমই হোক না কেন, তার স্মৃতিতে ধরা থাকে একেকটা মুখোশের মত। প্রাথমিকভাবে সে ওই মুখগুলোর অভিব্যক্তি বোঝবার চেষ্টা করে না। কিন্তু দ্বিতীয়বার যখন ওই মুখগুলি হানা দেয় তার মনে, তখন যেন পাথর কুঁদে কুঁদে তৈরি করা নিষ্প্রাণ মূর্তির মত সে দেখতে পায় ওই মানুষদের। পুরো প্রক্রিয়া সে কখনোই সজ্ঞানে চালনা করে না। আপনা থেকেই, তার মনের অবচেতনে ঘটে এমন রূপান্তর। ক্রিস্টিনা একথা একেবারেই সচেতনভাবে লক্ষ্য করে না যে তার স্মৃতির প্রকোষ্ঠের ভেতরেই ঘটে গিয়েছে এই প্রক্রিয়া। নিজেরই অজান্তে মুখাবয়বগুলির ভাস্কর্যের মধ্যে সঞ্চার করে সে নতুন আত্মার স্পর্শ।

অতএব, অনেক সময় এমন হত যে ওই মুখাবয়বগুলির মধ্যে একটা বিশেষ সাদৃশ্য দেখা যেত; অবশ্য যদি কেউ খুব খুঁটিয়ে দেখে তাহলে সেটা অনুভব করবে। কিন্তু যদি সেই দর্শককে প্রশ্ন করা হয় যে সাদৃশ্য ঠিক কোন জায়গায়, তাহলে সে সেটা সঠিকভাবে বুঝিয়ে বলতে পারবে না। তবে এই সাদৃশ্যের ব্যাপারটা ক্রিস্টিনা গঠনমূলক সমালোচনা হিসেবেই গ্রহণ করে। কারণ সে কিছুতেই নিজের কাজে একঘেয়েমি দ্বারা আক্রান্ত হতে চায় না। ফলে সে বিশেষ নজর রাখে যাতে একটা কাজ আরেকটা দ্বারা প্রভাবিত না হয়। প্রতিটি কাজই তার কাছে প্রথম। সে অবশ্য নিজের প্রতিভার ব্যাপারে সচেতন, এবং তার অনেক কারণ আছে। তরুণ প্রজন্মের অতি প্রতিভাবান ভাস্করদের মধ্যে ক্রিস্টিনা অন্যতম।



(চলবে)
0

ধারাবাহিক - নন্দিনী সেনগুপ্ত

Posted in





















১৯

বের্নহার্ড ঘড়ির দিকে একঝলক তাকায়… ‘লোকে ভাবতে পারে যে আমরা রুগি… মানে ডাক্তার দেখাতে এসেছি।’ চার্লসের দিকে তাকিয়ে সে বলে উঠল।

বিষণ্ণ, গম্ভীরমুখে চার্লস গভীর মনোযোগ সহকারে আদর্শ পিতামাতার করণীয় বিষয়ে শিক্ষামূলক চার্টগুলো ঝুঁকে পড়ে দেখছিল।

ঠিক তখনই দরজাটা খুলে গেল এবং জেরাল্ড ঘরে প্রবেশ করল। দ্রুত ছেলেদের দিকে এগিয়ে দু’হাত বাড়িয়ে দিয়ে বিশেষ উষ্ণতার সঙ্গে তাদের স্বাগত জানাল। বিস্ময়ে বের্নহার্ড একটু অপ্রস্তুত বোধ করতে লাগল। লাল হয়ে উঠল তার মুখমণ্ডল। পাস্‌সিতে প্রথম দিনে সঙ্গীতশিক্ষকের বাড়িতে এই ব্যক্তির সঙ্গে আলাপ হয়েছিল তার। এখনও পরিষ্কারভাবে সেদিন বিকেলের সব খুঁটিনাটি কথা তার মনে আছে। সে সবে বাজাতে শুরু করেছিল। বাজাতে বাজাতে আবেশে চোখ বন্ধ করেছিল সে। হঠাৎ এক ফাঁকে চোখ খুলতেই সে দেখেছিল এক অপরিচিত আগন্তুক নিবিষ্টমনে তাকে নিরীক্ষণ করে চলেছে। সেই মানুষটিই জেরাল্ড। জেরাল্ডের চোখের দৃষ্টিটা অদ্ভুত মনে হয়েছিল বের্নহার্ডের। তার মনে হয়েছিল কী যেন এক গভীর অনুভব আছে সেই দৃষ্টিতে, যে অনুভব উঠে এসেছে এক মহান বিষাদের অতল থেকে।

কিন্তু জেরাল্ড কি তাকে চিনতে পেরেছে? জেরাল্ড প্রথমে চার্লসকে অভিবাদন জানায়, তারপর এই ছোট্ট চেহারার ব্লন্‌ড ছেলেটির দিকে তাকায়। তার চাহনিতে কোনও বিস্ময় নেই, বরঞ্চ এক বন্ধুত্বপূর্ণ অনাবিল হাসিতে সে বুঝিয়ে দেয় যে সে বের্নহার্ডকে বিলক্ষণ চিনতে পেরেছে…

-“আমি কবে থেকে আপনার জন্য অপেক্ষা করছি” জেরাল্ড বলে যায়… “যদিও আপনার শিক্ষকের কাছ থেকে আপনার বিষয়ে সব খবরাখবর আমি পেয়ে যাই। আপনি দ্রুত উন্নতি করছেন শুনেছি। আমি অত্যন্ত প্রীত হয়েছি এ কথা শুনে।”

চার্লস সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে দু’জনের দিকেই। জেরাল্ড সেটা লক্ষ্য করে ছেলেদের ডেকে নেয় তার এপার্টমেন্টের ভিতরের দিকে। ইথানল আর কার্বলিকের গন্ধে ভারি একটা আধো-অন্ধকার ঘরের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায় তারা। ঘরটা একেবারে ফাঁকা, কিছু সাদা রঙের আসবাব আর ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য একটা চওড়া উঁচু বেড রাখা আছে। ঘরটার মেঝে ঠাণ্ডা, মসৃণ, পা ফেললে কোনও শব্দ হয় না। ঘরটার জানালাগুলোর পাল্লা অর্ধেকটা টানা।

“এটা আমার রুগি পরীক্ষার ঘর”… জেরাল্ড বলে যায়… “আপনাদের কোনও প্রয়োজনে আমার কাছে আসতে পারেন।”

হে পাঠক, এখন আপনি বের্নহার্ডের সঙ্গে জেরাল্ডের এপার্টমেন্টের একদম ভিতরে প্রবেশ করছেন। ডাক্তারের এই আলোআঁধারি ঘরের দুই পাল্লার স্লাইডিং দরজা ঠেলে আপনি এসে দাঁড়িয়েছেন একটা অপেক্ষাকৃত ছোট ঘরের মধ্যে, যেটার দেওয়ালে ম্যাট ফিনিশ করা অপূর্ব নীল রং। অথচ দেওয়ালে কোথাও কোনও ছবি ঝুলছে না। বের্নহার্ডের মনে পড়ল যে বাইরের যে ঘরে বসে তারা অপেক্ষা করছিল, সেই ঘরের দেওয়ালে অনেক সুন্দর অয়েলপেইন্টিং ফ্রেম করা আছে। তাছাড়া বেশ কিছু স্কেচ এবং উডকাটের কাজও আছে সেই ঘরে। কিন্তু এই ঘরে সেরকম কিছুই নেই। দেওয়াল একেবারে ফাঁকা। ঘরের মাঝখানের অংশটাও একদম ফাঁকা। ফলে ঘরটা বেশ বড় দেখাচ্ছে। ঘরের একদিকের দেওয়ালে একটা ডিভান রাখা আছে, ডিভানের উপরে ফক্স ফারের ঢাকনা। আরেক দিকের দেওয়ালে লাগোয়া একটা টেবিল, সেটাও ম্যাটপালিশ করা। সেটার উপরে একটা ব্রোঞ্জের ভাস্কর্য, এক কিশোরী কন্যার মূর্তি, দু হাত ছড়ানো, হাঁটুদুটি খুব সরু, শিশুর মত। মাথাটা একদিকে কাত করা, এক অদ্ভুত বিষাদের অভিব্যক্তি মুখমণ্ডলে।

মনে হচ্ছে যে এই ঘরে কেউ বাস করে না। হয়তো এটা একটা প্রদর্শনীকক্ষ। কিন্তু যে কেউ ভাবতে পারে যে ঘরের আসবাবসজ্জা এখনও অসম্পূর্ণ। জেরাল্ড এই ঘরে দাঁড়ায় না। একঝলক তাকায় ব্রোঞ্জ ভাস্কর্যটার দিকে, তারপর বলে ওঠে… “এখানে অপেক্ষা থেকে যায়।” ছেলেরা এই কথাটার অর্থ বুঝতে পারে না। এর পর আপনি জেরাল্ডের নিজের ঘরটা দেখতে পাবেন। মৃদু আলোয় আলোকিত বড় ঘরটির মেঝে ধূসর কার্পেটে ঢাকা। দেওয়ালগুলিতেও একই রং এবং সরু কাঠের ফালি দিয়ে দেওয়ালের বর্ডার করা। এই ঘরেও খুব বেশি আসবাব নেই। একটা বিশাল পিয়ানোর উল্টোদিকে একটা টেবিল ভর্তি কাগজপত্র, একটা চওড়া ডিভান। তবে এই ঘরের ডিভানে ফক্স-ফার নয়, হালকা ধূসর রঙের কম্বল আর বালিশ রাখা। ডিভানের পাশে একটা নিচু গোলটেবিলে ফুল সাজানো আছে ফুলদানিতে। ফুলদানির পাশে সিগারেট। গোলটেবিলের পাশে একই রকম নিচু নিচু কিছু চেয়ার আছে ধূসর ভেলভেটে ঢাকা। সরু কাঠের ফ্রেমে বাঁধানো বেশ কিছু ছবি এলোমেলো ভাবে দেওয়ালে টাঙানো, সেগুলো দেখে বের্নহার্ডের একটু অদ্ভুত মনে হল।

ছবিগুলো শুধুমাত্র অল্পবয়সী বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েদের, সাদা কলারওয়ালা জামা সবার পরনে। একঝলক দেখে যে কারো মনে হতে পারে যে তারা সবাই ভাই- বোন, মুখের যথেষ্ট সাদৃশ্য আছে। সবারই চোখ বড় বড় এবং চোখ বিশেষ বড় করে খুলে ছবিগুলো তোলানো, যাতে চোখের মণিগুলো স্পষ্ট দেখা যায়। কিন্তু সবার মুখেই একটা অদ্ভুত বেদনাদায়ক উদ্বেগের অভিব্যক্তি।

কিন্তু খুঁটিয়ে দেখলে বোঝা যায় যায় যে এই সাদৃশ্যটা মুখের আদলে নয়, সম্ভবত সবারই কাছাকাছি বয়স, একই প্রকৃতির প্রাণশক্তির উচ্ছ্বাসের মধ্যে লুকিয়ে আছে। প্রায় একই ধরনের ভঙ্গিমায় ছবিগুলি তোলা। কিছু মেয়ে খুবই সুন্দরী। ম্যাডোনার মত একটু পাংশু গাত্রবর্ণ এবং হাসির মধ্যে বিষণ্ণ গাম্ভীর্য মিশে আছে সবারই। হাতগুলো অনেকেরই পূর্ণযৌবনা নারীদের মত সমান এবং সুন্দর। একমুহূর্তের জন্য বের্নহার্ডের তার পুরনো বন্ধু হান্সের মায়ের কথা মনে পড়ল। হান্সের মায়েরও এমন সুন্দর, সাদা, মখমলের মত মসৃণ হাত।

এছাড়াও আরও কিছু মুখমণ্ডলের ছবি আছেঃ সপ্রতিভ ভঙ্গিতে চেয়ে থাকা কিছু মুখ। চোখগুলো বড় বড়, উজ্জ্বলভাবে পুরোটা খোলা, ঝকঝকে মুখ, সাহসী কপাল, যেন অচিরেই তাদের ভবিষ্যতের অভীষ্ট লক্ষ্য পূরণ হতে চলেছে, সত্যি হতে চলেছে তাদের স্বপ্নগুলো।

বের্নহার্ড ঠিক বুঝতে পারছে না এই মুখগুলো ছেলেদের নাকি মেয়েদের। সবগুলো মুখ একইরকম দেখাচ্ছে, কারণ সবারই মুখে একই ধরনের ধার্মিক স্থৈর্য এবং বীরত্বের দীপ্তি। তাদের কাঁধগুলো সরু ধরনের এবং সবাই সামনের দিকে ঘাড় উঁচু করে আছে। মনে হচ্ছে তারা যেন অনেক আশা নিয়ে বিশেষ কোনও প্রতিশ্রুতির কথা শুনছে। তাদের সরু কাঁধ, আশাবাদী ভঙ্গিমা বের্নহার্ডকে স্পর্শ করছে। সে জানে না কেন তার মনে কষ্ট হচ্ছে এদের ছবি দেখে। হঠাৎ তার গের্টের কথা মনে পড়ল। যদিও তার মুখে কখনোই ধার্মিক স্থৈর্যের লেশমাত্র ছিল না, কিন্তু হঠাৎ গের্টের কথা মনে পড়াতে এক অদ্ভুত বিষাদ তার মনকে আচ্ছন্ন করল।

কিছু বাচ্চার হাত অদ্ভুত ধরনের। শান্ত ম্যাডোনাসুলভ মেয়েদের যেরকম নরম সাদা হাত, সেরকম নয় একেবারেই। বড়, চওড়া পরিণত ধরনের হাত। দেখে মনে হয় বলিষ্ঠ, তরুণ ক্রুসেডারেরা যে ধরনের হাত দিয়ে তরোয়াল ঘোরাতে সক্ষম ছিল, ঠিক সেই ধরনের হাত কিছু বাচ্চার। তবে তাদের হাতের মধ্যেও একই রকম প্রাণচঞ্চল মসৃণতা রয়েছে। যদিও ভঙ্গিমার মধ্যে এটা পরিষ্কার যে হয়তো অনেক কষ্ট এবং বেদনার অভিজ্ঞতা আছে এদেরও। সম্ভবত অল্প বয়সেই এরা জেনে গিয়েছে জীবনের অনিশ্চয়তা।

একটা ছবির সামনে বের্নহার্ড একটু বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। কী পেলব, নমনীয়, মিষ্টি মুখ! তবে এই মুখটাও ছেলে না মেয়ের মুখ, সেটা বোঝা যাচ্ছে না। তার মনে হচ্ছে যে ছেলের মুখ, যদিও মুখের রেখাগুলি খুব কোমল; কোনও কৌণিক কঠোরতা নেই সেরকম। পাংশু কপাল ঘিরে খেলা করা সোনালি চুলের গুচ্ছ ঝিকমিক করছে। যেন তুলি দিয়ে আঁকা ভ্রুযুগল সুন্দর আয়ত, ঘনবর্ণ চোখের অনেকখানি উপরে অবস্থান করছে। একটা অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে বের্নহার্ডের এই ছবিটার সামনে। বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলে হয়তো মনে মনে আপনিও ছবির মানুষটির সঙ্গে বাক্যালাপ করতে আরম্ভ করে দেবেন। একটু হেসে একটা বন্ধুত্বপূর্ণ বাক্যের জন্য অপেক্ষা করবেন ছবির মানুষটির জন্য এবং কেমন যেন বিভ্রান্ত বোধ করবেন শৈশবের নিষ্কলুষ বায়নাক্কা এবং দাবিদাওয়ার সামনে।

বের্নহার্ডকে এই অদ্ভুত সুন্দর শিশুটির ছবির সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জেরাল্ড আলতোভাবে তার কাঁধ স্পর্শ করে প্রশ্ন রাখে ফরাসি ভাষায়… “আপনার এই ছবিটা পছন্দ?” খুব নরমভাবে প্রায় ফিসফিস করে বলে সে “ভোয়েজেলমেই?” (Vous l'aimez?) বের্নহার্ড নজর সরায় না ছবিটার দিক থেকে। ইতিবাচক ভঙ্গিতে মাথা নাড়ে। জেরাল্ড বের্নহার্ডের কাঁধের থেকে হাত সরায় না, ফিসফিস করে বলে… “হয়তো আপনি এই মেয়েটির ভাই হতে পারতেন, কে জানে! শিশুটি গত শীতে আমাদের ছেড়ে চলে গেছে। মাত্র তেরো বছর বয়স ছিল তার।”

সবাই নীরব থাকে বেশ কিছুক্ষণ। তারপর জেরাল্ড ছেলেদের নিয়ে সেই নিচু গোলটেবিলের সামনে চেয়ারে বসিয়ে দেয়। বাটলার তাদের কাপে এখনই চা ঢেলে দেবে।

অবশেষে তারা চার্লসের বিষয়ে আলোচনা আরম্ভ করে। প্রথমদিকে তাদের মধ্যে একটা দ্বিধাবোধ, জড়তা ছিল। ধীরে ধীরে সেটা কাটিয়ে তারা সাহসীভাবে তাদের বক্তব্য পেশ করে, কারণ জেরাল্ড যথেষ্ট মনোযোগ দিয়ে তাদের সব কথা শুনছিল। কিন্তু চার্লস এখনো বেশ উত্তেজিত। তার মতে যে মানুষটি তাকে কুৎসিতভাবে সবার সামনে অপমান করেছিল, তার সামনে সে নিজের ভাবনা কী ভাবে সঠিক ভাষায় প্রকাশ করবে? তার পরিষ্কার মনে আছে মিকার সামনে তাকে বলা হয়েছিল সিগারেট না খেতে এবং সেই অদ্ভুত মেকআপ করা বার-গার্লদের কথাও তার মনে আছে। বের্নহার্ড যখন শান্তভাবে আর্থিক সমস্যার ব্যাপারে বলতে শুরু করেছিল, তখন চার্লস অত্যন্ত ক্রুদ্ধভাবে বলেছিল যে পয়সা রোজগার করবার বিষয়ে অত লজ্জা করা একদম অর্থহীন এবং এই প্রসঙ্গ এখানে উত্থাপন করাটাই অপ্রাসঙ্গিক। তারপর সে একতরফা নিজের বিষয়েই বলে যেতে থাকে; কিন্তু যত সে মূল বক্তব্যের দিকে এগোতে থাকে, তত তার উত্তেজনা বাড়তে থাকে। জেরাল্ড তাকে অপমান করেছিল, এই কথাটা বোঝাতে গিয়ে তার কণ্ঠস্বর অদ্ভুত বিকৃত হয়ে যায়। চোখ যেন জ্বলতে থাকে, মুখ, ঠোঁট শুকিয়ে যায়, হাত মুঠো করে সে নিজের হাঁটুদুটো আঁকড়ে ধরে।

বের্নহার্ডের কাছে পুরো ব্যাপারটা অসহনীয়, কষ্টকর বলে মনে হচ্ছিল। তার মনে হচ্ছিল যে চার্লস পরিস্থিতি বোঝাতে গিয়ে নিজেকে অতিরিক্ত কষ্ট দিচ্ছে। সে একটু আকস্মিকভাবে এবং দয়ালুস্বরে বলে ওঠে… ‘চার্লস খুবই অপমানিত বোধ করেছিল সেদিন। তার মনে হয়েছিল যে আপনি তাকে একেবারে অপদার্থ ছেলে বলে ভাবেন এবং সেই কারণেই আপনি তাকে বাড়ি চলে যেতে বলেছিলেন।’

শুনেই প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে চার্লস। প্রবল উত্তেজনা এবং ক্রোধে হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে সে বের্নহার্ডের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে ওঠে… “তুমি আমাকে এভাবে অপমান করতে পারো না। আপনাদের কেউই আমাকে এভাবে অপমান করতে পারেন না। আমি খুব ভালভাবেই জানি যে জেরাল্ড আমাকে একেবারেই পছন্দ করেন না।”

চার্লস চেয়ার থেকে উঠে লাফ দিয়ে জানালার কাছে যায়। জানালার পাল্লার হাতল দু’হাত দিয়ে সজোরে চেপে ধরে সে। তারপর চিৎকার করে কেঁদে ওঠে সে। তার অশ্রুমাখা গাল সে জানালার ঠাণ্ডা ধাতব ফ্রেমের উপর চেপে ধরে।



(চলবে)
0

ধারাবাহিক - শৌনক দত্ত

Posted in




















১৭. শম্ভু মিত্র বাংলা থিয়েটারের নতুন দিশারী





হৃদীবরেষু সুস্মি,

অনেকদিন হলো তোমার চিঠি পেয়েছি। নানা ব্যস্ততায় তোমাকে লেখা হয়নি। তোমার শেষ চিঠিতে তৃপ্তি মিত্রর কথা পড়তে পড়তে বাবু (বাবা)-র কথা খুব মনে পড়ছিল। বাবু কেমন নাটক পাগল ছিলেন তুমি জানো। আমি যদিও বাবুর কোন নাটক দেখিনি। লোক মুখে আজো শুনি বাবুর অভিনয় নিয়ে মানুষের প্রশংসা। বাবুর প্রিয় নাট্যাভিনেতা ছিলেন শম্ভু মিত্র। শম্ভু মিত্রকে সরাসরি দেখলেও তাঁর নাটক দেখার সৌভাগ্যও আমার হয়নি। তবে ছোটবেলায় তাঁর আবৃত্তি ও ফিতা ক্যাসেটে তাঁর নাটক 'ছোঁড়া তার', 'রক্তকরবী', 'বিভাব', 'রাজা অয়দিপাউস', 'দশচক্র' ও 'চাঁদ বণিকের পালা' (যা শ্রুতি-সংস্করণ হিসেবেও পরিচিত) শুনেছি বহুবার।

১৯ মে ১৯৯৭ সাল সোমবার খবর রটে গেলো হৃদস্পন্দন বন্ধ হয়ে গেছে বাংলার নবনাট্যের প্রবাদপুরুষের। কিন্তু কেউ জানতেও পারল না। কোনো সম্মান, গান স্যালুট, স্মারক স্মৃতি— সুযোগই দিলেন না শম্ভু মিত্র। তিনি চলে গেছেন কাউকে কিছু না জানিয়ে। নিঃশব্দে, রাতের অন্ধকারে। তেমনই ইচ্ছে ছিল তাঁর। কন্যা শাঁওলীকে লিখেছিলেন তাঁর ‘ইচ্ছাপত্র’। এক বার নয়, বেশ কয়েক বার। ১৯৯৭ সালের ১৮ মে রাত দুটো বেজে ১৫ মিনিটে শম্ভু মিত্র শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তারপর তাঁরই ইচ্ছে অনুযায়ী শাঁওলী গভীর রাতে সিরিটির শ্মশানে বৈদ্যুতিক চুল্লিতে তাঁর নশ্বর দেহটি দাহ করে ফিরে এসে বাবার মৃত্যুসংবাদ জানিয়েছিলেন। শ্মশানের ভারপ্রাপ্ত কর্মচারীটি মধ্যরাতের শ্মশানযাত্রীদের দেখে ও মৃত মানুষটির নাম জেনে প্রশ্ন করেছিলেন, “ইনি কি সেই শম্ভু মিত্র? যিনি নাটক করেন?” উত্তর পাননি। পাওয়ার কথা নয়। কারণ, তিনি ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন, “আমি সামান্য মানুষ, জীবনে অনেক জিনিষ এড়িয়ে চলেছি। তাই মরবার পরেও আমার দেহটা যেন তেমনি নীরবে, একটু ভদ্রতার সঙ্গে, সামান্য বেশে, বেশ একটু নির্লিপ্তির সঙ্গে পুড়ে যেতে পারে।” শাঁওলী মিত্র তাঁর তর্পণ বইয়ে শম্ভু মিত্রকে নিয়ে লিখেছেন, “জীবনভর অনেক মন্দ কথা শুনেও, নাট্যমঞ্চ নির্মাণের ক্ষেত্রে বারংবার অসফল হয়ে এবং বারংবার বিশ্বাসঘাতকতার আঘাত সহ্য করেও, নিজের শিষ্যদের কাছে চরম অপমানিত হয়েও যিনি হতাশা বা নৈরাশ্যে ভোগেননি, জীবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছেও যিনি বলেছেন, ‘স্বপ্ন তো দেখতেই হবে। স্বপ্নগুলো সব কাঁচের মতো ভেঙে গুঁড়িয়ে গেছে। আবার সেগুলো তো জড়ো করতে হবে।’’ তাই অসফলতা, বিশ্বাসঘাতকতা, নৈরাশ্যের কালো ছায়া সরিয়ে ফের উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা তাঁর সত্ত্বায়। বাস্তব আর অভিনেতার রঙ্গমঞ্চকে আলাদা করে না দেখার এক অনবদ্য উপাখ্যান তাঁর জীবন।

আমার এখনো হুবুহু মনে আছে, ১৯মে অফিস থেকে ফিরে বাবু এক অন্য মানুষ এমন কখনো দেখিনি বাবুকে। আমি এতবছর পরেও চোখের সামনে স্পষ্ট দেখতে পারছি, বাবু সন্ধ্যার অনেক আগে বাড়ি ফিরে বিমর্ষ মুখে পড়ার ঘরে ঢুকে পড়েছে। অন্য দিন বাবু অফিস থেকে ফিরে ড্রেস চেঞ্জ করে টিভির ঘরে দুধ খৈ খেতে খেতে পত্রিকা খুলে মায়ের সাথে গল্প করে এমনটাই দেখে এসেছি চিরদিন। বাবুর এমন অস্বাভাবিক আচরণে মা অবাক হয়ে গেলো সঙ্গে আমি ও, সেদিন বাবা কিচ্ছু খায়নি, পড়ার ঘরেই ছিল সারারাত। বন্ধ দরজা পেরিয়ে ভেসে আসছিল শম্ভু মিত্রের কন্ঠে "এই মোর শেষ নিবেদন", "জীবনদেবতা"—এবং জীবনানন্দ দাশের "আট বছর আগের একদিন" ও "বোধ" কবিতা। আমরা কিছুই বুঝতে পারছিনা। মার কয়েকবার ডাকের পরে বাবু ভেতর থেকে উত্তর দেয়- শম্ভু মিত্র মারা গেছে জানো,একটু একা থাকতে দাও, আমি ঠিক আছি!

শম্ভু মিত্রকে আমি যতটা জানি তার বেশিরভাগ আমি আমার বাবুর চোখেই তাঁকে চিনি। আমার এখনো মনে আছে বাড়ির ডালিম গাছের নীচে দাঁড়িয়ে বাবু বলেছিল বাংলা নাটকে আধুনিকতার পথ নির্মাণ ও সৃজনে বহুমাত্রিকতা এবং ঐতিহ্যভাবনার কথা যখনই ওঠবে তখনই শম্ভু মিত্রকে স্মরণ করতে হবে শ্রদ্ধা ভরে। মঞ্চে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে তিনি যখন শিখরস্পর্শ করেছিলেন এবং পেশাদারি থিয়েটারের বৃত্ত ভেঙে নবনাট্য আন্দোলনে নতুন ধারার সূচনা করেছিলেন, তখন কেউ ভাবেনি এই মানুষটি বাংলা নাট্যমঞ্চকে দীর্ঘদিনের ভাবনায়, পরিশ্রমে, প্রজ্ঞায়, মননে, জিজ্ঞাসায় ও অনুজদের দীক্ষাদানে নব রীতি-কৌশলে কত উচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাবেন। কত ভাবেই না তিনি বাংলা নাট্যমঞ্চকে করে তুলেছিলেন ঐতিহ্যিক প্রবাহের সঙ্গে ঐশ্বর্যবান ও আধুনিক। মঞ্চে প্রাণশক্তিসঞ্চারে নবধারার প্রবর্তক তিনি। বহুরূপী ও তাঁর নির্দেশিত নাটক বোধে নবীন ও দীপ্তিতে উজ্জ্বল; বাংলা মঞ্চধারায় নতুন প্রতিশ্রুতির প্রবর্তক। শুধু রবীন্দ্র-নাটকের প্রয়োগরীতি ও মঞ্চকুশলতার জন্যই নয়, নাটককে উৎকর্ষের উচ্চতায় পৌঁছোনোর সাধনায় তাঁর তুল্য ব্যক্তি নেই। সামগ্রিকভাবে তাঁর বোধ, বুদ্ধি, সাধনা ও সিদ্ধি উপলব্ধির জন্য পূর্বকালীন মঞ্চধারার রীতি ও শম্ভু মিত্র-প্রবর্তিত নাট্যধারা সম্পর্কে জ্ঞান থাকা জরুরি। বহুবছর পরেও বাবুর কথাগুলো আমার হুবুহু আজ মনে পড়ছে, এতবছর পরে যখন নিজের জানার সাথে বাবুর কথাগুলো মেলাতে চাইছি দেখছি সত্যিই তো শম্ভু মিত্র বাংলা নাট্যমঞ্চে আধুনিকতার পথ-প্রদর্শক। অপরিসীম সৃজন-প্রতিভার জোরে এবং নাটক ও নাট্যভাবনায় প্রতিদিন নিজেকে প্রস্ত্তত করে তিনি যে অভিনয়রীতি ও মঞ্চশৈলী নির্মাণ করে গেছেন তা উৎকর্ষে ও উচ্চতায় বাংলা আধুনিক নাটককে শম্ভু অধ্যায় বলে চিহ্নিত করা যায় অবলীলায়।

শম্ভু মিত্রকে নিজের মতন করে জানতে চিনতে শেখার সময় আমার বারবার মনে হয়েছে শৈশবে মা হারানোর পরই মানুষটি নিজের ভেতরে ডুব দিয়েছিলেন। তাই হয়ত অনেকের চোখেই তিনি দাম্ভিক, তার্কিক, একগুঁয়ে। কিন্তু শম্ভু মিত্রের মধ্যে আমি একজন অবুঝ শিশুকেও দেখি। শৈশবে মা হারানো সন্তানরা যেমন একাকীত্বে ভোগে তেমনি তার মনে বহু প্রশ্নের উদয় হয়, বহু প্রশ্নের একটি প্রশ্ন বোধ করি সবার মনেই জাগে মা নেই কেন? মৃত্যু কি? এমন প্রশ্ন সবাইকে হয়ত ভাবনার স্তরে ভাসিয়ে দেয়না। কেউ কেউ ভেসে যায় শম্ভু মিত্র তেমনই একজন কেননা যদুনাথ মিত্রর পুত্র শরৎকুমারের মেজো ছেলে শম্ভু মিত্র অনায়াসে জমিদারি করে জীবন কাটাতে পারতেন। হুগলির কলাছড়া গ্রামে ছিল ওঁর পূর্বপুরুষের জমিজিরেত। শরৎকুমার যেমন সে-পথ মাড়াননি, তাঁর পুত্র শম্ভুও না। বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাই স্কুলে পড়ার সময় থেকেই অভিনয় ও আবৃত্তিতে শম্ভু মিত্রের আগ্রহ জন্মায়। তাঁর ভাগ্নে, সহপাঠী দুর্গার সঙ্গেই কখনও স্কুলে আবার কখনও বকুলবাগানের ‘গোল মাঠে’ চলত চেনা অচেনা নাটকে ঘরোয়া অভিনয়। পাশাপাশি চলত মুখস্থ করে কবিতা আবৃত্তি। আর এভাবে ছোট থেকেই শম্ভু মিত্র বই না খুলেও অবলীলায় বলে দিতে পারতেন কোথায় কোন পৃষ্ঠায় কোন কবিতা আছে। যেন এটা পৃথিবীর সবচেয়ে সহজ কাজ। স্কুল পেরিয়ে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন শম্ভু মিত্র। কিন্তু অল্প কিছুদিনের মধ্যেই প্রথাগত পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে স্বশিক্ষিত হওয়ার প্রয়াসে বাবার সঙ্গে চলে যান উত্তরপ্রদেশে। সেখান থেকে লখনউ, তারও পরে এলাহাবাদে। এলাহাবাদের পাবলিক লাইব্রেরিতে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পড়াশোনায় নীরবে নিজেকে তৈরি করেছিলেন শম্ভু মিত্র। সেইসময়েই একদিন শুনলেন, পাশের কোন এক বাড়িতে ‘আলমগীর’ নাটকের রেকর্ড বাজছে। নিজেই বলেছেন সে কথা, “মনে হল শ্যামের বাঁশি বাজল। নাটক ছাড়া আমার গত্যন্তর নেই”। ১৯৩৬-৩৭ সালে কলকাতায় ফিরে নানা জায়গায় থেকেছেন। জ্যোতিনাথ ঘোষের বাড়িতে থাকার সময় তার ছেলেমেয়েদের পড়াতেনও। এই জ্যোতিনাথই তাঁকে ‘শম্ভু মিত্র’ হয়ে ওঠায় দিশা দেখালেন প্রথম। তাঁকে সঙ্গে করে সিনেমা, থিয়েটার দেখানো, বিদেশি বই জোগাড় করে তাঁকে পড়ানো, এইসবই জ্যোতিনাথের কৃতিত্ব। এরপর প্রথাগত থিয়েটারে এলেন শম্ভু মিত্র ১৯৩৯-এ। যুক্ত হলেন ‘রঙমহলে’, এখানেই তিনি পেলেন তাঁর ‘গুরু’, ‘মহর্ষি’ মনোরঞ্জন ভট্টাচার্যকে। তাঁর স্নেহ, ভালবাসার আশ্রয়ে অভিনেতা, নাট্যকার শম্ভু মিত্র জীবনভর তাঁর ডালপালা বিস্তার করে গেছেন।

একজন শম্ভু মিত্র বাংলা নাটকের কেন নতুন দিশারী তা নিয়ে বহু কথা লেখা যাবে, তর্ক বিতর্ক ও হবে প্রচুর কিন্তু শম্ভু মিত্রকে অতিক্রম করা যাবে কি? মনসা মঙ্গল খ্যাত চাঁদ বনিকের সঙ্গে আমরা সকলেই পরিচিত। শম্ভু মিত্রের লেখা চাঁদ বণিকের পালা নাটকটি কখনই মঞ্চস্থ হয়নি, কিন্তু বেশ কয়েকবার শ্রুতিনাটকের আশ্রয়ে পরিবেশন করেছেন। শেষবার পরিবেশিত শ্রুতিনাটকটির একটি রেকর্ডিং আছে। নাটকের শেষে শম্ভু মিত্র শ্রোতাদের জানাচ্ছেন যে যদিও তিনি কোনোদিনও সাবেকি থিয়েটারের সাহায্যে নাটকটি উপস্থাপিত করেননি, তবুও শ্রুতিনাটকের আকারে উনি ভবিষ্যতের মানুষের জন্য নাটকটি রেখে গেলেন। যদি কারও ভাল লাগে, যদি নাটকটি মঞ্চস্থ করার ইচ্ছা জাগে, তবে হয়তো বা রেকর্ডিংটি কাজে লাগতেও পারে। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী হতাশাজনক পরিস্থিতিতে মানুষের জীবনের অসহায়ত্ব, বিচ্ছিন্নতা এবং যোগাযোগের অকার্যকারিতা কে উপজীব্য করে একটি নাট্যধারার সূচনা হয় যাকে বলে অ্যাবসার্ড নাটক, যা প্রথাগত কাহিনী, চরিত্র ও যৌক্তিক সংলাপ বর্জন করে জীবনের অর্থহীনতা ও অস্তিত্বের সংকট ফুটিয়ে তোলে। ১৯৫৩-তে একইসঙ্গে প্যারিসে মঞ্চস্থ হয় এমন দুটি অ্যাবসার্ড নাটক। স্যামুয়েল বেকেট-এর ‘ওয়েটিং ফর গোডো’ এবং ইউজিন ইউনেস্কোর ‘দ্য চেয়ারস’। চাঁদ বণিকের পালা তেমনি একটি এবসার্ড নাটকের ধার ঘেঁষে চলে গিয়েছে। অস্তিত্ববাদ দর্শনের পথ ধরে নাটকটি যেন জিজ্ঞাসা করছে মনুষ্য জীবনের আদৌ কোনও অর্থ আছে কি? আবার এমনও হতে পারে যে তিনি অন্য একটি বার্তা আমাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। আর তা হল আদর্শে বিশ্বাস রাখার জন্য জাগতিক অর্থে কোনও প্রতিদান নেই। বিশ্বাসের প্রতিদান বিশ্বাস নিজেই। নির্দেশনা এবং অভিনয়ের গুণে তিনি দর্শক-হৃদয়ের নানা স্তরে পরিশীলিতভাবে জীবন সম্পর্কে এমনভাবে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন যা ছিল শুধু শম্ভু মিত্রের একক অবদান। বাবু বলতো রাজা অয়দিপাউসে তাঁর অভিনয়ের গুণে দর্শক-হৃদয়ে যে টানটান উত্তেজনা অভিনয়ে যে গ্রিক আবহের সৃষ্টি অয়দিপাউসের আর্ত হাহাকার কিংবা রাজা নাটকে স্বরের ওঠানামা, অন্ধকারের মধ্যে শুধু গলার ভেতর দিয়ে উচ্চারণ, যা বুকের ভেতর দিয়ে বেরিয়ে এসেছে। এ-উচ্চারণ কখনো কখনো মৃদু, তীব্র ও সূক্ষ্ম অভিনয়গুণের দিক থেকে সেখানে তিনি নিঃসঙ্গ, একক ব্যক্তিত্ব, তুলনারহিত। সমকালীনদের মধ্যে সেখানেই তিনি ছিলেন ভিন্ন। যদিও আমরা জানি যে, তাঁর সমকালীন উৎপল দত্ত কিংবা অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় অভিনয়গুণে ও নির্দেশনায় বহুদিক থেকে মান্য এবং তাঁরা দুজন সত্তরের ও আশির দশকে বাংলা নাট্যমঞ্চে অভিনয় ও নির্দেশনায় যে-সমৃদ্ধি এনেছিলেন তা মঞ্চ-ইতিহাসের অন্তর্গত হয়ে আছে। পূর্বজ নাট্যাচার্যদের মহান কীর্তি বাংলা মঞ্চের স্তম্ভকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করিয়েছে এবং লোকপ্রিয় করেছে বটে, তবু কথা থেকে যায়। বিনোদন, বীররস, ঐতিহাসিক বিষয় এবং জীবনের দুঃখ-বেদনাকে ধারণ করে যে-পেশাদারি মঞ্চ দর্শক-আনুকূল্য অর্জন করেছিল তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব আছে। সেই সময়ের রঙ্গালয় ও নাট্যসাধনা পরবর্তীকালের নাট্যচর্চায় গতিবেগ সঞ্চারিত করেছে কিন্তু তা কোনোভাবেই সমকালীন জীবনচর্যা ও সংকটকে প্রতিফলিত করেনি। দেশি-বিদেশি কত নাটকই তো অভিনীত হয়েছে নাট্যাচার্যদের প্রযত্নে ও পরিশীলনে। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ পর্যায়ে এবং বিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্নে পেশাদারি রঙ্গালয় দর্শক তৈরি করেছে, নাটক ও বিনোদনে ভূমিকা রেখেছে – এ-তথ্য খুবই জরুরি আমাদের কাছে। তবু এই নাট্যচর্চাকে জীবনের সচল ধারার প্রতিচ্ছবি হয়তো বলা যায় না। সমকালীন জীবন-চেতনা এবং ঐতিহ্যিক ধারার সমন্বয়ে সেক্ষেত্রে শম্ভু মিত্র বহুরূপী নিয়ে যে-নাট্যধারার সূচনা করেছিলেন তার গুরুত্ব ও তাৎপর্য অসীম। শম্ভু মিত্র তিরিশ বছর বহুরূপীর প্রাণপুরুষ হিসেবে যে-নাট্যধারা প্রতিষ্ঠিত করেছেন, তা হয়ে উঠল বাংলা নাট্যমঞ্চের অভূতপূর্ব এক ইতিহাস। পঞ্চাশের ও ষাটের দশকের সাংস্কৃতিক কর্মপ্রবাহেও এর প্রভাব পড়েছিল।

ইতিহাস ধরে হেঁটে গেলে দেখা যাবে প্রকৃতপক্ষে বাংলা থিয়েটারের সূত্রপাত গিরিশচন্দ্র ঘোষ ও অর্ধেন্দুশেখর মুস্তাফির হাতে। সেটা উনিশ শতকের সত্তরের দশক। তার পর পিতৃমুখী প্রতিভা দানীবাবুকে (সুরেন্দ্রমোহন ঘোষ) পেরিয়ে আরও বছর পঞ্চাশেক পরে আমাদের থিয়েটার যথার্থ নতুন ও আধুনিক রূপ নিল আর এক যুগন্ধর নাট্যপুরুষ শিশিরকুমার ভাদুড়ীর হাতে। অধ্যাপনার কাজ ছেড়ে থিয়েটারে এসে, কিছু দিনের মধ্যে যোগেশ চৌধুরীর ‘সীতা’ প্রযোজনা করে তিনি আমাদের নাট্য-ইতিহাসে প্রথম সক্ষম ও সার্থক প্রযোজনার স্বীকৃতি ও আপামর জনসাধারণের আদর পেয়েছেন। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও ছিলেন শিশিরকুমারের গুণমুগ্ধ; নিজের দু-একটি নাটক তাঁকে প্রযোজনার্থে দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। ১৩৩১ বঙ্গাব্দের ১৩ ভাদ্র ‘নাচঘর’ পত্রিকা লিখছে: ‘‘রসিক সমাজকে আজ আমরা আর একটি আনন্দ সংবাদ দিতে চাই। রবীন্দ্রনাথের বিশেষ অনুগ্রহে তাঁর নূতন ও অপূর্ব নাটক ‘রক্তকরবী’ অভিনয় করবার অধিকার (শিশিরকুমার) পেয়েছেন।... এ শ্রেণীর নাটক বাংলা রঙ্গালয়ে আর কখনো অভিনীত হয়নি এবং শীঘ্র হ’তও কিনা সন্দেহ, কারণ প্রকাশ্য রঙ্গালয়ে এখন এরকম নাটক অভিনয় করে সফল হবার শক্তি, সাহস ও প্রতিভা আছে, একমাত্র শিশিরকুমারেরই। পরন্তু ‘রক্তকরবী’র অভিনয়েও শিশিরকুমার যদি তাঁর অসাধারণ যোগ্যতার পরিচয় দিতে পারেন, তবে বাংলার নাট্যজগতে যথার্থই নবযুগের প্রবর্তন হবে। আমরা সাগ্রহে সেই মাহেন্দ্রক্ষণের প্রতীক্ষায় রইলুম।’’সেই মাহেন্দ্রক্ষণ তখন আসেনি, এসেছিল তিরিশ বছর পরে আর এক জন মানুষের হাতে। তিনি শম্ভু মিত্র, ‘বহুরূপী’র স্রষ্টা। ‘বহুরূপী’র প্রথম তিরিশ বছর শম্ভু মিত্রের প্রযোজনাধন্য, এবং শুরুর প্রথম বারো বছর সব কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু ছিল ১১এ নাসিরুদ্দিন রোডে তাঁর নিজস্ব ফ্ল্যাট। বহুরূপীর জন্মক্ষণে ফিরে গেলে জানা যায় আইপিটিএ থেকে বেরিয়ে এসে মনোরঞ্জন ভট্টাচার্যকে সঙ্গে নিয়ে শম্ভু মিত্ররা গোষ্ঠীচেতনা ও নবনাট্য আন্দোলনকে সঞ্জীবিত করার জন্য নাটক শুরু করলেন ১৯৪৮ সালে। তখনো দলের কোনো নামকরণ হয়নি। এ প্রসঙ্গে শম্ভু-কন্যা শাঁওলী মিত্র বলেন, ‘কমিউনিস্ট পার্টির সংসর্গচ্যুত এই যুবকেরা যখন বুঝে উঠতে পারছেন না কী তাঁদের করণীয়, তখন মহর্ষি [মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য] সাহস দিয়ে বলেছিলেন, Why are we eating our hearts out? আমরা কিছু করি। আমাদের সঙ্গে তো ঝগড়া নেই কারও-র। আমরা যেমন করে পারি, যেটা ভালো মনে করি, করতে শুরু করে দিই।’ এই অনুপ্রেরণা থেকেই ১৯৪৮ সালে বহুরূপীর জন্ম। কাজ শুরু হয়ে যায়। যদিও নামকরণ হয়েছিল বছর দুই পরে, ১৯৫০ সালে। দেশের এবং ব্যক্তিগত জীবনের চরম বিপর্যয়ের মধ্যেই বহুরূপীর জন্ম। বলা যেতে পারে বহুরূপী শম্ভু মিত্রের প্রথম সন্তান। যে-সন্তানটির প্রতি তাঁর একাগ্র মনোযোগ, সমস্ত যৌবন দিয়ে তাকে গড়ে তোলবার সাধনা। আর তা এতই স্বাভাবিক ছিল, সে যেন নিঃশ্বাসের মতোই। নবান্ন শম্ভু মিত্রের নাট্য-পথপরিক্রমায় নিঃসন্দেহে এক মাইলফলক। তাঁর প্রকৃত নাট্যদীক্ষা হয়েছে এ-নাটকের মাধ্যমে; দীর্ঘ প্রায় দুবছর একাদিক্রমে এ-নাটকটিতে সংলগ্ন ছিলেন তিনি। অতঃপর তাঁর অগ্রযাত্রা আমরা লক্ষ করব।’বাংলা নাটকের ইতিহাসে ১৯৫৪ সালটি বিশেষভাবে চিহ্নিত হয়ে আছে বহুরূপী নাট্যসংস্থা-প্রযোজিত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রক্তকরবী মঞ্চায়নের জন্য। রক্তকরবী শিক্ষিত মধ্যবিত্তের জীবনচেতনায় এবং বিশেষত নাট্যপ্রয়াসের সঙ্গে যুক্ত সকলকে জিজ্ঞাসা-উন্মুখ ও নবীন পথপ্রবাহ-সৃষ্টির জন্য প্রণোদিত করেছিল। বহুগুণান্বিত শম্ভু মিত্রকেই আধুনিকতার পথিকৃৎ বলে মনে পড়ে। তাঁর ধ্যান, জ্ঞান, কল্পনা, স্বপ্ন ছিল নাটক। সেই নাটক যা দর্শককে করবে জীবন সম্পর্কে আকুল কিংবা ভাবনা ও জিজ্ঞাসাকে উন্মুখ করে তুলবে। নির্দেশনা কেবল নির্দেশনা ছিল না তাঁর কাছে। কত পরিশ্রমে, কতভাবে চরিত্রের অন্তর্নিহিত মাধুর্য, সৌন্দর্য ও বোধ তাঁকে বলীয়ান করেছিল নাট্যচর্চায় তা নানাজনের স্মৃতিকথায় উল্লিখিত হয়েছে। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য নাটক সম্পর্কে ব্যাপক ও গভীর জ্ঞান, পঠন-পাঠনের মধ্য দিয়ে শম্ভু মিত্র এ কৃতি অর্জন করেছিলেন। বহুরূপীর পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন শম্ভু মিত্রের। বাংলা নাটকের ক্ষেত্রে শিশিরকুমার ভাদুড়ীর যে-যুগ – তারপরে নবনাট্যের মধ্য দিয়ে তিনিই আরেক অধ্যায়ের সূচনা করেন। তিনটি দশক তিনি সক্রিয় ছিলেন বহুরূপীতে। ঐতিহ্যকে অস্বীকার করেননি। তাঁরই প্রবর্তনায় রবীন্দ্রনাটক পুনরাবিষ্কৃত হয়েছে।

বাঙালি নাট্যদর্শক ও নাট্যশিক্ষার্থীরা তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ কেবল রবীন্দ্রনাটক-মঞ্চায়নের পরিপ্রেক্ষিত নির্মাণের জন্যই নয়, তিনিই রবীন্দ্রনাটকের সফল নির্দেশক। রবীন্দ্রনাটকের বিন্যাসে এবং অর্থ উপলব্ধির বোধগম্যতায় তিনি এমন মাত্রা সঞ্চার করেছিলেন যা হয়ে ওঠে বাস্তবানুগ। সেজন্য রক্তকরবী প্রযোজনার কিছুদিনের মধ্যে এই নাটকের বক্তব্য এবং মঞ্চায়ন নিয়ে বহুরূপী ও শম্ভু মিত্রকে কত না তর্ক করতে হয়েছে। প্রতীক থেকে যখন বাস্তবভিত্তিক জনচেতনায় এ হয়ে উঠল অনন্য একটি মঞ্চনাটক, বুদ্ধিবাদী মহলকে প্রবলভাবে তা আলোড়িত করেছিল। এ-নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে মত দিতে হয়েছিল অনেককেই। বিশ্বভারতীর আমন্ত্রণে শম্ভু মিত্র ১৯৭৭ সালে ভিজিটিং ফেলো হিসেবে এক বছর শান্তিনিকেতনে ছিলেন। এই সময়ে তিনি নাট্য-সম্পর্কিত যে-বক্তৃতা দেন তার মধ্যে বিশিষ্ট ছিল ‘রক্তকরবী ও রবীন্দ্রনাথ : উপলব্ধি ও আবিষ্কার’। এই বক্তৃতায় তিনি উল্লেখ করেছেন কীভাবে নানা পথ পরিক্রমার মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রসাহিত্যের স্বাদ আস্বাদন করে তিনি পৌঁছে যান রবীন্দ্রনাথকে মঞ্চে উপস্থাপনায়। এই উপস্থাপনায় কত না স্তর এবং অভিজ্ঞতায় নদীর মতো বাঁক রয়েছে। চার অধ্যায়, বিসর্জন আর রক্তকরবী এক ধরনের প্রযোজনা নয়। মঞ্চে বক্তব্য ও বিন্যাসে কত না পৃথক এ-তিনটি নাটক। পরিশেষে শান্তিনিকেতন ও শ্রীনিকেতনে নাট্যকেন্দ্র স্থাপন, মঞ্চ-নির্মাণ ও ভারতবর্ষের নানা অঞ্চলের নাট্যচর্চাকে অনুধাবন ও সম্যক পরিচয়লাভের জন্য অনুবাদ সেল গঠনেরও প্রস্তাব দেন তিনি। এটি বাস্তবায়িত হলে বাংলা নাট্যসংস্কৃতির গৌরবময় কেন্দ্র হয়ে উঠবে শান্তিনিকেতন – এ-আশাবাদও ব্যক্ত করেন তিনি। বিশ্বভারতীর উপাচার্যকে লেখা চিঠিটি পাঠ করার পর আমাদের মনে হয়, শম্ভু মিত্র নাট্যমঞ্চ ও নাট্যকেন্দ্র নির্মাণের জন্য যে-সুপারিশ করেছিলেন তা বাস্তবায়িত হলে সত্যিকার অর্থে ভারতবর্ষের ও দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলের নাট্যচর্চায় নবীন মাত্রা অর্জন করত। এ ব্যাপারে সন্দেহ নেই, কলাভবন প্রতিষ্ঠার পর চিত্রকলার ক্ষেত্রে যে বিকল্প রীতি ও শান্তিনিকেতন স্কুল চিত্রকলার প্রয়াসে যে অবদান রেখেছে তা ভারতবর্ষের চিত্রকলা আন্দোলনে নবধারার প্রবর্তক বলে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। শান্তিনিকেতনে শম্ভু মিত্র-প্রস্তাবিত এই দুটি কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হলে নাট্য চর্চা, গবেষণা ও পঠন-পাঠনের ক্ষেত্রে আরো একটি দিগন্ত উন্মোচিত হতো, আমাদের দুর্ভাগ্য তা হলো না।

শম্ভু মিত্র মৃত্যুর মুহূর্ত পর্যন্ত নাটককেই লালন করেছেন। অবমানিত হয়েছেন, বহুরূপীতে। তাঁকে সত্তরের দশকের অন্তিম পর্যায়ে এড়িয়ে চলেছে বহুরূপী গোষ্ঠী। কতভাবেই না তাঁর কর্মপ্রবাহ ও প্রবর্তিত ধ্যান-ধারণাকে, শিক্ষাপদ্ধতিকে অবহেলা করা হয়েছে। দাম্পত্য জীবনের বিচ্ছিন্নতাকে ভিন্ন রং দিয়ে তিনি যাতে গোষ্ঠী থেকে বেরিয়ে পড়েন সেদিকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দলের ভেতর যখন অন্তর্কলহ ও বিরোধ তীব্র হয়ে উঠেছে এবং তাঁর অপরিহার্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, কিংবা গোষ্ঠীর প্রাণপুরুষকে অবহিত না করে নানা কর্মপ্রবাহ পরিচালিত হয়েছে তখনো শম্ভু মিত্রের ভেতর রক্তক্ষরণ হয়েছে, কিন্তু তিনি থেমে যাননি। এই সময়েও দেখি তাঁকে সৎ নাটক নিয়ে ভাবতে। পরবর্তীকালে গ্যালিলিউ প্রযোজনাকালে তাঁকে যখন প্রয়োজন হলো তিনি সেই আহবানে সাড়া না দিয়ে পারেননি। সমসাময়িক সময়ে দাঁড়িয়েও বলাই যায় শম্ভু মিত্র বাংলা নাট্যমঞ্চে সাধণায়, চর্চায় ও নাট্য প্রয়াসের কর্মে যে কত প্রাসঙ্গিক এবং তাঁর নাট্যমননচেতনার আবেদন এখনো ফুরিয়ে যায়নি। শম্ভু মিত্র অন্তিম জীবনে সমাজ, রাষ্ট্র, সহযাত্রী ও আত্মজনকে কোন দৃষ্টিভঙ্গি এবং পরিপ্রেক্ষিত জ্ঞানে বুঝতে চাইতেন, এ-ইচ্ছাপত্র যেন তারই নিদর্শন হয়ে থাকলো। এ শুধু প্রামাণিক দলিল নয়, এ-ইচ্ছাপত্রে আমরা পর্যবেক্ষণ করি তাঁর জীবনদর্শনেরও অনুষঙ্গ। শিক্ষিত মধ্যবিত্তের ভন্ডামি ও ক্ষুদ্রতার বিরুদ্ধেও তীব্র প্রতিবাদ এ-ইচ্ছাপত্র।

মনটা কেন জানিনা ফাঁকা হয়ে গেলো, আজ আর লিখছি না। তোমার চিঠির অশায় রইলাম। নিরন্তর ভালো থেকো।

ভালোবাসান্তে-

বাসু

১১ জানুয়ারী, ২০২৬