Next
Previous
Showing posts with label ধারাবাহিক. Show all posts
0

ধারাবাহিক - নন্দিনী সেনগুপ্ত

Posted in




















২২

সেই ঘটনার পর থেকেই ক্রিস্টিনা জলির সঙ্গে মধুর ব্যবহার করত। আবার মাঝেমধ্যে বেশ আধিপত্য দেখাত। সঙ্গে নিয়ে বেড়াতে বেরোত। তরুণ সেই শিল্পী বন্ধু, আলফ্রেড, যার সঙ্গে ক্রিস্টিনা প্রায়ই দেখা করতে যেত, তার সঙ্গেও জলির আলাপ করিয়ে দিয়েছিল সে। সেই শিল্পী অদ্ভুত সব ছবি আঁকত। ক্যানভাসে যেন রঙের উচ্চকিত লড়াই। সাহস এবং নির্মমতার প্রকাশ ছিল তার শৈলীর মধ্যে। মনে হত এক পাষাণহৃদয় আত্মা নিজের সঙ্গেই ছলনা করতে ব্যস্ত। ক্রিস্টিনা আলফ্রেডকে বেশ পছন্দ করত। প্রেমের সীমানা ছাড়িয়ে তার প্রীতি ব্যক্তিপুজার স্তরে পৌঁছে গিয়েছিল। আলফ্রেড এই ব্যাপারটা বেশ উপভোগ করত, কারণ সেও ক্রিস্টিনার ব্যাপারে বেশ আগ্রহী ছিল। আলফ্রেড খুব বাকপটু, বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী, রসিক হলেও যথেষ্ট বন্ধুত্বপূর্ণ স্বভাবের ছিল। এবং বন্ধুত্বের প্রথম দিন থেকেই সে চেয়েছিল যাতে সে ক্রিস্টিনার কাছে ক্রমেই অপরিহার্য হয়ে উঠতে পারে।

ক্রিস্টিনার মতামতকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিত এবং ক্রিস্টিনার সুপ্ত প্রতিভার আবিষ্কারক ছিল আলফ্রেড। ক্রিস্টিনা অবশ্য শিল্পীর আঁকা ছবি দেখলেও সেসব নিয়ে বিশেষ আলোচনা করত না। কিন্তু যখন সে ছবি দেখত, তখন তার মধ্যে এক তীব্র আগ্রহ লক্ষ্য করেছিল আলফ্রেড। সাধারণত ক্রিস্টিনা উদাসীন স্বভাবের মানুষ। কিন্তু ছবি দেখবার সময়ে তার মধ্যে অদ্ভুত একটা মনঃসংযোগ দেখা যেত। তার বাহ্যচেতনা বিলুপ্ত হত। গোটা দুনিয়া তখন তার কাছে চলমান দৃশ্যাবলীর মত মনে হত।

আলফ্রেড তাকে জিজ্ঞেস করেছিল যে সে নিজে কখনো ছবি এঁকেছে কি না। ক্রিস্টিনা বলেছিল যে ছবি তাকে বিশেষ টানে না। কিন্তু সে নানা ধরনের আকার, শরীরী ভঙ্গিমা, হাত পায়ের গড়ন, মুখের অভিব্যক্তি এসব দেখতে ভালবাসে। সে অতীতে প্রচুর মুখোশ বানিয়েছে। হাত কিম্বা মুখের ভাস্কর্যও বানিয়েছে সে আগে। কিন্তু সেসব বানানো একেবারেই সহজ নয়। আলফ্রেড তার হাতের কাজ দেখতে চেয়েছিল। কিন্তু এখানে বোর্ডিং স্কুলে সে কিছুই নিয়ে আসেনি এবং এখানে আসবার পরে সে সেরকম কোনও কাজ করেনি।

‘আমার ভাই আমার চেয়ে অনেক বেশি প্রতিভার অধিকারী’ বলে ক্রিস্টিনা… ‘সে চিত্রকর হতে চায়। তার বয়স মোটে বাইশ। কিন্তু সে বয়সের তুলনায় অনেক পরিণত কাজ করে। আমি তার মত একেবারেই পারি না। ভাস্কর হয়ে ওঠাও আমার পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ, ভাই বলেছে যে ভাস্কর্য গড়তে গেলে সবার আগে আঁকতে জানতে হয়।’

আলফ্রেড ক্রিস্টিনাকে প্রস্তাব দিয়েছিল একসঙ্গে বসে কাজ করবার জন্য। ক্রিস্টিনা খুবই খুশি হয়েছিল এই প্রস্তাবে এবং তার কাজের ধরনধারণ দেখে আলফ্রেড চমকে গিয়েছিল। অবিশ্বাস্য দ্রুততায় ক্রিস্টিনা কাজ শিখছিল। যেখানে সে আটকে যেত, সেখানে আলফ্রেড তাকে বুঝিয়ে দিত অনেকখানি। ফলে যে কোনো কাজ করেই ক্রিস্টিনা আলফ্রেডের মতামতের অপেক্ষা করত। শিল্পচর্চার ক্ষেত্রে আলফ্রেডই ছিল তার একমাত্র শিক্ষক।

আলফ্রেড গভীরভাবে ক্রিস্টিনার প্রেমে পড়েছিল। ক্রিস্টিনার উপস্থিতি তার কাছে অভ্যেসে পরিণত হয়েছিল। সে ভাবতেও পারেনি যে ক্রিস্টিনা কোনওদিন তাকে ছেড়ে চলে যেতে পারে। কাজেই ক্রিস্টিনা যখন বলেছিল যে বোর্ডিং স্কুলে তার থাকবার মেয়াদ আর মাত্র দুই মাস, তখন সে কথা শুনে আলফ্রেড খুব বিমর্ষ হয়ে পড়েছিল। সে বলেছিল যে সে এমন কথা ভাবতেও পারছে না। ক্রিস্টিনা হাসিতে ফেটে পড়েছিল… ‘যাই হোক, তবে আমার কাছে আর এমন কী বা পাবে তুমি?’

আলফ্রেড ঘাড় বাঁকা করে তাকিয়েছিল তার দিকে। নিঃশব্দ এক রাগে ফেটে পড়ছিল সে… ‘বেশ…ভাল বলেছ… সে কথা যেন তুমি জানোই না।’ উত্তেজিত হয়ে বলেছিল সে… ‘দুনিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আমি তোমার বিষয়ে চিন্তা করি।’

ক্রিস্টিনা উঠে দাঁড়িয়েছিল। তারপর সেদিন যেভাবে বোর্ডিং স্কুলের প্রধানা শিক্ষিকার পাশে গিয়ে গা ঘেঁষে বসেছিল, ঠিক সেভাবে সে আলফ্রেডের পাশে গিয়ে বসল। আলফ্রেড আবেগপ্রবণ হয়ে তার হস্তচুম্বন করবার চেষ্টা করেছিল। ক্রিস্টিনা ফিরে তাকিয়েছিল তার দিকে এক অদ্ভুত ভোঁতা শীতলতা নিয়ে। তারপর তার ঠোঁটে দীর্ঘচুম্বন দিয়েছিল।

যখন জানাজানি হয়ে গেল যে আলফ্রেডের স্টুডিওতে ক্রিস্টিনা মাঝেমধ্যে জলিকে নিয়ে যায়, তখন একদিন জলিকে ডেকে পাঠানো হল প্রধান শিক্ষিকার ঘরে। সব শিক্ষিকা উপস্থিত ছিলেন। জলি ভয়ে কাঁপতে লাগল। দীর্ঘ সময় ধরে তাকে খুঁটিনাটি বিভিন্ন বিষয়ে কঠোর জেরা করা হতে লাগল।

“ক্রিস্টিনার সঙ্গে একদম মিশবে না।” বলা হল তাকে… “তার প্রভাব অত্যন্ত খারাপ এবং বিপজ্জনক।”

জানালার ফ্রেমের সামনে মেঝের দিকে তাকিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়েছিল জলি। তার ছোট জাপানি ধাঁচের মুখমণ্ডলে কোনও অভিব্যক্তি না থাকলেও বোঝা যাচ্ছিল যে সে শালীনতা বজায় রাখবার জন্য চুপ করে আছে। কোনও কথা বলবার সাহস যোগাচ্ছিল না তার মনে। কথা বলতে গেলে কণ্ঠস্বর কেঁপে যাবে, এরকম ভেবেছিল সে। শিক্ষিকারা বলে যেতে লাগলেন…

‘আজ থেকে অন্য ঘরে ঘুমাবে তুমি। ক্রিস্টিনার সঙ্গে পড়াশুনা কিম্বা অন্য কোনও বিষয়ে কোনও যোগাযোগ রাখবে না।’

জলি তীব্রভাবে কেঁপে চোখ বুজে ফেলল এই কথা শুনে। কিন্তু সে কিচ্ছুটি বলল না। চোখও খুলল না।

‘তোমাকে যা করতে বলা হয়েছে, তুমি সে ব্যাপারে সহমত পোষণ করো তো?’ পাশ থেকে বলে উঠলেন প্রধানা শিক্ষিকা। ‘পরিষ্কার জানাও যে তুমি এই নিয়মকানুন সঠিকভাবে মেনে নিতে রাজি কি না।’ জলি নীরবে মাথা নাড়ল। সেই মুহূর্তে তার মনে হচ্ছিল যে যদি সে ক্রিস্টিনাকে একটিবার দেখতে পায়! সে এত কথার মধ্য থেকে শুধু এইটুকুই বুঝতে পেরেছিল যে শিক্ষিকারা ক্রিস্টিনার কাছ থেকে তাকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে চাইছেন।

-‘কিন্তু জলি’ প্রধান শিক্ষিকা আবার বলে উঠলেন… ‘তুমি কি বুঝতে পারছ না যে তোমার ভুল সংশোধন করবার জন্য আমরা তোমাকে একটা সুযোগ দিতে চাই? তুমি খুব বিশ্রীভাবে নিয়মভঙ্গ করেছ এবং তোমার কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত এই কারণে যে এই কথাটা আমরা তোমার অভিভাবকদের জানাচ্ছি না।’

জলি একটু অবাক দৃষ্টিতে সবার দিকে তাকাল… ‘কিন্তু আমি ক্রিস্টিনাকে ভালবাসি’ সে বলল, ‘ওর সঙ্গে এক ঘরে থাকতে পারলে আমার ভাল লাগবে।’

শিক্ষিকাদের ধৈর্যের পরীক্ষা এখন। একজন শিক্ষিকা বিড়বিড় করে ক্রিস্টিনার কুপ্রভাবের ফলে জলি এমন উদ্ধত আচরণ করছে, এই স্বগতোক্তি করলেন। প্রধানা শিক্ষিকা বললেন যে এখনই জলিকে তার সিদ্ধান্তের কথা পরিষ্কারভাবে জানাতে হবে।

জলির জাপানি চোখ হঠাৎ বেশ বড় হয়ে উঠল। এত বড় আকারে যে তার চোখ কখনো খুলতে পারে, এরকম ঘটনা কেউই আগে লক্ষ্য করেনি। ভয়ে না রাগে এমন হল, সে কথা বলা মুস্কিল। জলি তার ছোট ছোট দুই হাতে জানালার পাল্লা চেপে ধরল। চিৎকার করে উঠল সে, ডুকরে ডুকরে কেঁদে বলতে লাগল… ‘কিন্তু আমি ক্রিস্টিনাকে ভালবাসি।’ বারে বারে হাহাকার করে বলতে লাগল সে… ‘কিন্তু আমি ক্রিস্টিনাকে ভালবাসি।’

ঠিক তখনই ক্রিস্টিনা প্রবেশ করল সে ঘরে। ভেজানো দরজায় আগাম টোকা না দিয়েই সে ঢুকে পড়ল। গটগট করে সে জলির দিকে এগিয়ে একটু ঝুঁকে তার কাঁধে হাত রাখল। তারপর দাঁড়াল তার পাশে। ক্রিস্টিনা জলির থেকে অনেকটা লম্বা এবং যুবতীসুলভ দেহ তার। তুলনায় জলির শরীর এখনো অপরিণত। যৌবনের লক্ষণ প্রকট হয়নি এখনো। জলিকে প্রায় বালকের মত দেখাচ্ছে ক্রিস্টিনার পাশে। ক্রিস্টিনার ভারি গড়ন বেশ টানটান দেখাচ্ছে। সে জলিকে সাহস দেবার জন্য এসেছে এখন। অদম্য আত্মবিশ্বাসে তার মুখচোখ উজ্জ্বল হয়ে আছে।

প্রধানা শিক্ষিকা ক্রোধে টকটকে লাল হয়ে গেলেন… ‘তুমি এখানে কী ভাবে এলে?’ কর্কশস্বরে চিবিয়ে চিবিয়ে শান্তভাবে বলে উঠলেন তিনি… ‘তুমি এখানে দরজায় দাঁড়িয়ে আড়ি পাতছিলে, তাই না?’

ক্রিস্টিনা জলির দিকে একটু ঝুঁকে দাঁড়িয়েছিল। একথা শুনে সে মাথা তুলল এক মুহূর্তের জন্য…

-‘হ্যাঁ, অবশ্যই। আড়ি পাতছিলাম আমি। কারণ আমার মনে হয়েছিল যে কিছু একটা ঘটতে চলেছে।’

তার কথা শুনে শিক্ষিকারা চেয়ার থেকে লাফ দিয়ে উঠতে যাচ্ছিলেন। বাক্যহারা হয়ে সবাই প্রধানা শিক্ষিকার দিকে তাকালেন, যিনি একটা টেবিলের সামনে টকটকে লাল, হতভম্ব মুখ নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। ক্রিস্টিনা একেবারে প্রধান শিক্ষিকার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়।

‘আপনি জলিকে শাস্তি দেবেন না!’ সে বলে… ‘আপনি খুব ভাল করেই জানেন যে তাহলে আপনারা নিজেরাই নিজেদের মূর্খ প্রমাণ করে ছাড়বেন।’ যদিও তার কণ্ঠস্বর উষ্ণ বন্ধুত্বপূর্ণ এবং কিছুটা উদাসী, কিন্তু তার চোখের দৃষ্টি প্রধানা শিক্ষিকার চোখ থেকে এক মুহূর্তের জন্য সরে যায় না। চোখের পলক ফেলে না ক্রিস্টিনা। তার চোখে কি একইসঙ্গে ব্যঙ্গ এবং নির্মমতা?

-‘আমি সব ঠিক করে দেব।’ জলির দিকে ফিরে ক্রিস্টিনা তার সঙ্গে চলে আসতে বলে। তারপর জলির ঘাড়ে হাত রেখে তাকে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।

এই ঘটনায় কোনো প্রতিক্রিয়া জানাতে পারেন না শিক্ষিকারা। তারা বেরিয়ে যাবার আগে দরজা বন্ধ হওয়া পর্যন্ত সবার চোখ ক্রিস্টিনার দিকে নিবদ্ধ থাকে। প্রধান শিক্ষিকার প্রতি করুণাবশত সম্ভবত সবাই চুপচাপ বসে থাকেন।

ক্রিস্টিনার বোর্ডিং স্কুলের কার্যক্রম শেষ হবার কিছু আগে ঘটেছিল এই ঘটনা। তারও বেশ কিছুদিন পর সেই বোর্ডিং স্কুলে এসেছিল ইনেস। তবে ইনেসের সঙ্গে ক্রিস্টিনার আলাপ বেশি জমে উঠতে পারেনি। কারণ ক্রিস্টিনা অনেকটা সময় আলফ্রেডের সঙ্গে কাটাত এবং স্কুলের পাঠক্রমের দিকে বিশেষ মনোযোগ ছিল না তার। স্বাভাবিক কারণেই, ক্রিস্টিনাকে নিয়ে যত কাণ্ডকারখানা ঘটেছিল বোর্ডিং স্কুলে, সেই সমস্ত কথা ইনেসের কানেও পৌঁছেছিল। জলির ঘটনাও জেনেছিল সে। যদিও ইতিমধ্যে জলিরও পাঠক্রম শেষ হয়ে গিয়েছিল। বোর্ডিং স্কুল থেকে যাবার সময়ে তার মা এসেছিলেন তাকে বাড়ি নিয়ে যাবার জন্য।

ক্রিস্টিনার সঙ্গে পরিচিত হবার জন্য ইনেসের বেশ আগ্রহ ছিল। যদিও সে শুনেছিল যে ক্রিস্টিনা খুব অহংকারী আর উদ্ভট স্বভাবের মেয়ে, তবে সামনাসামনি দেখে ইনেসের সেরকম কিছু মনে হয়নি। বরঞ্চ তার সঙ্গে আলাপ করে বন্ধু হবার ইচ্ছে জেগেছিল তার। ক্রিস্টিনার ঘরেও একবার গিয়েছিল সে। ক্রিস্টিনা তখন প্রস্তুত হচ্ছে বোর্ডিং ছেড়ে দেবার জন্য। অর্ধেক জিনিসপত্র গোছগাছ হয়ে গেছে। ঘরের বাইরে স্যুটকেস দাঁড় করিয়ে রাখা।

-‘তুমি কয়েক সপ্তাহ আগে এলে ভাল হত!’ ক্রিস্টিনা বলেছিল।

ইনেস বিষণ্ণ বোধ করছিল। বোর্ডিং স্কুলে এসে ইস্তক সেভাবে কোনও মেয়ের সঙ্গে এখনও তার বন্ধুত্ব হয়নি। কিন্তু এই লম্বা, বুদ্ধিমতী মেয়েটি, যে এক দুই দিনের মধ্যেই চলে যাবে, তাকে তার বেশ পছন্দ হয়েছে।

- ‘তুমি তো তাও একা ছিলে না।’ ইনেস বলে… ‘জলি ছিল তোমার সঙ্গে।’

ক্রিস্টিনা মাথা নাড়ে। ‘খুব ভাল, মিষ্টি মেয়েটা। কষ্ট পেল… কিন্তু, যাই হোক… তুমি আরেকটু আগে এলে… তোমার সঙ্গে কথা বলতে বেশ লাগে আমার!’

ইনেসের একটু অস্বস্তি হতে থাকে। ক্রিস্টিনার আপাত উদাসী কণ্ঠস্বরের মাঝে একটা আবেগী চোরাস্রোত আছে, যেটা বিপজ্জনক অথচ শান্ত, গভীর এক আবেদনে ভরপুর। ক্রিস্টিনার হাতদুটির মধ্যেও আছে সেই আবেদন। বড়সড়, সাদা, সুন্দর হাতদুটি স্থিরভাবে রেখেছে সে তার গাঢ় রঙের পোশাকের উপর। সুডৌল সেই বাহুদুটির উপর ঝুঁকে যে কারো ইচ্ছে হতে পারে হস্তচুম্বন করবার জন্য।

ইনেস সোজা হয়ে বসে। নিজের ভাবনার গতিপ্রকৃতি দেখে একটু অদ্ভুত দ্বিধাবোধ জাগে তার নিজের মনেই। সে লক্ষ্য করে ক্রিস্টিনা বিস্ময়ে তার চোখের পাতা, ভ্রু একটু উপরে তুলে তাকিয়ে আছে তার দিকে। সে কি পড়তে পেরেছে ইনেসের মনের ভাবনা?



(চলবে)
0

ধারাবাহিক - রঞ্জন রায়

Posted in




















পর্ব ২৬.১


কবি গিরিজাকুমার মাথুর বোধহয় শিবপালগঞ্জের প্রিন্সিপালকে দেখেই প্রেরণা পেয়ে
লিখেছিলেন —“হমনে বিতায়ী হ্যায় জিন্দগী কসালে কী, হমনে পরোয়া কভী কী ন কিসী
কী”।
অর্থাৎ “আমার জীবন ক্রমাগত সংঘর্ষের গাথা , লোকে কী বলল সে নিয়ে কখনও
ঘামাইনি মাথা”।
কেন বলছি, সব ব্যাপারে একগুঁয়েপনা, বৈদ্যজীকে ছেড়ে বাকি সবার সংগে তর্কে মেতে
কেবল নিজের মত আঁকড়ে ধরা এবং কথায় কথায় “কোই পরোয়া নহীঁ, সময় আসলে সব
ব্যাটাকে দেখে নেব” গোছের পংক্তি আউড়ে চলা – এসব ওনার জীবন-দর্শনের
অনিবার্য অঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
নিজের মতে অটল থাকার নীতি উনি নিজের বাবার থেকে পেয়েছিলেন।
ওনার বাবা এক অনারারি ম্যাজিস্ট্রেটের পেশকার ছিলেন-- অথচ অত্যন্ত সৎ।
ওনাকে বেশিরভাগ জীবন শহরে কাটাতে হত, কিন্তু সেখানেও পিতাশ্রী ওঁর গেঁয়োপনা
বেশ নিষ্ঠার সংগে চালিয়ে গেছেন। কিছু নিজস্ব নীতি নিয়ম ছিল, সেগুলো শত বাধাবিঘ্ন
সত্ত্বেও পাথরের মত নিরেট বুদ্ধির জোরে শক্ত হাতে পালন করতেন। সেগুলোর
কয়েকটি মণিমুক্তোঃ

এক, মলমূত্র ত্যাগের জন্যে কখনও বাথরুম পায়খানায় না যাওয়া। কারণ, ওসব
আমাদের প্রাচীন ঋষি-সংস্কৃতির প্রতিকূল।
দুই, কল থেকে জল না খাওয়া। কারণ, ওর মুখে চামড়ার ওয়াশার লাগানো থাকে।
তিন, রেলগাড়িতে যাত্রা করলে কিছু না খাওয়া। তাতে শূদ্রের ছোঁয়া আছে।
চার, খড়িবোলী হিন্দি এবং ইংরেজি ত্যাগ করে সদা অবধী ডায়লেক্টে কথা বলা। কারণ,
উনি এছাড়া অন্য কোন ভাষা শেখেন নি।
পাঁচ, চামড়ার নাগরা জুতো, ঝোলা গোঁফ এবং দু’ফেরতা টুপি পরা। কারণ, ওঁরা পিতৃদেবও
তাই পরতেন। ব্যস, এই পাঁচটি নীতিই ওর জীবনের মূল সিদ্ধান্ত, ওনার পঞ্চশীল।
একবার প্রিন্সিপাল সাহেব ওনার পিতাশ্রীর সংগে তর্কে মেতেছিলেন।

বিষয়ঃ “ বাড়ির ভেতরের পায়খানা ব্যবহার না করে সাত সকালে উঠে খালি রাস্তার
মাঝখানে নিত্যিকর্ম সারতে বসে পড়া নিতান্ত মূর্খতা”। উনি বোঝাতে চাইছিলেন যে
এরকম কাজ ঠিক নয়। কারণ, নাকায় বসে টোল ট্যাক্স আদায়ের দল আজকাল রাস্তায়
রাস্তায় সাফাই অভিযান চালাচ্ছে। ওদের চোখে পড়লে চালান হবার সম্ভাবনা।
এর জবাবে ওনার বাবা পেশকার সাহেব বললেন যে ব্যাপারটা আদর্শের বিষয়, বুদ্ধির
প্যাঁচ কষার নয়।
সেদিন প্রিন্সিপাল বুঝতে পারলেন – আমরা আদর্শের প্রশংসা করি তার অন্তর্নিহিত
মূল্যবোধের জন্যে নয়, বরং সেই আদর্শের পেছনে কত ত্যাগ, সহিষ্ণুতা, বলিদান আর
কষ্টভোগের ইতিহাস রয়েছে তার জন্যে।
উদাহরণঃ নমক কানুন ভঙ্গ করা হয়েছিল আমাদের দেশের দারিদ্র্য দূর করার
উদ্দেশ্যে নয়, বরং ওর পৃষ্ঠভূমিতে যে নিষ্ঠা এবং বিদ্রোহের ভাবনা ছিল সেটাই ওই
আন্দোলনকে নাটক হতে না দিয়ে ইতিহাসের পর্যায়ে নিয়ে গেছে।

প্রিন্সিপাল এই বিশ্লেষণ থেকে সিদ্ধান্তে পৌঁছলেন যে আদর্শের মহত্ব তার প্রতীক
হিসেবে, বাস্তব তথ্যের জন্যে নয়। তারপর এই যুক্তিকে উলটো করে উনি নতুন
সিদ্ধান্তে এলেন—ওঁর বাবা পঞ্চশীলে অটল ছিলেন, প্রতীক হিসেবে আদর্শ ব্যক্তি
বলা যায়। কিন্তু বাস্তব তথ্যের নিকষে দেখলে উনি একটি পাতি বাতেলাবাজ।
সে যাই হোক, প্রিন্সিপাল তাঁর বাবার নিষ্ঠা ও আদর্শ নিয়ে গল্পগুলো বেশ গর্বের
সংগে সবাইকে শোনাতেন। উনি স্বভাবে জেদি। যে কাজটায় যুক্তির নিতান্ত অভাব,
তাতেও জেতার জন্যে ছাতি ঠুকে বলতেন—ভেবেছটা কী! আমি সেই পেশকার সাহেবের
ব্যাটা!
উনি জানতেন যে নিজের এঁড়ে তর্কের স্বভাবটা উনি বাপের থেকে পেয়েছেন। কিন্তু এটা
জানতেন না যে অবধী বুলির প্রতি প্রেমও তাঁর পিতাঠাকুরের ঐতিহ্য থেকে পাওয়া।
রেগে গেলে বা উত্তেজিত হলে ওঁর মুখ থেকে ঝড়ের মত অবধী বুলি বেরিয়ে আসত, যেমন
অনেক হিন্দুস্তানির থেকে অনুরূপ পরিস্থিতিতে ইংরেজি বুলি।
এখন উনি বৈদ্যজীর সামনে কলেজের সমস্যাগুলো ব্যাখ্যা করছেন—অর্থাৎ খান্না
মাস্টারকে গাল দিচ্ছেন। একদিন আগে উনি পেনাল কোডের ধারা ১০৭ এর মামলায়
ম্যাজিস্ট্রেটের এজলাসে হাজির হয়েছিলেন। সেখানে ওনার চোখে মামলায় এক নতুন
প্যাঁচ চোখে পড়ল। কারণ, খান্না মাস্টারের উকিল নিজের বক্তব্যে কিছু এ’ধরণের কথা
বলছিলেনঃ
“ এই মামলা ‘হ্যাভ’ এবং ‘হ্যাভ নটস্‌’দের সংঘর্ষের ফল। একদিকে কলেজের
ম্যানেজার--যাকে সবাই ‘বৈদ্য মহারাজ’ বলে, যে ‘বৈদ্য’ কম ‘মহারাজ’ বেশি। ওনার
পেছনে শ’য়ে শ’য়ে চামচা ও গুন্ডার পাল। ওদের মধ্যেই রয়েছে প্রিন্সিপাল ও আট-
দশজন মাস্টার। এরা সবাই হয় ওঁর আত্মীয় অথবা আত্মীয়ের আত্মীয়। এদের সবার
আর্থিক অবস্থা খাসা, সংকটে পড়লে কলেজের ফান্ড থেকে উদ্ধার করা হয়।
শ্রীমন, অন্যদিকে রয়েছে খান্না এবং আরও আট দশজন মাস্টার—যাঁরা আর্থিক
দৃষ্টিতে গরীব। ওই ক্ষমতাবানের দল সবসময় কুটিল প্যাঁচ কষে এদের দমন করতে
থাকে। নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষের এটাই প্রধান কারণ”।
মাননীয় আদালত ইংরেজিতে বললেন, “অর্থাৎ, ঝগড়াটা মাছ ও রুটির ভাগাভাগির”।
উকিল নিজের কথাই খণ্ডন, মণ্ডন, সংশোধন, সংযোজন, পরিমার্জন করে ফের তার
পিণ্ডি চটকে দিয়ে বললেন-“ না, শ্রীমন। আমি ঠিক ওকথা বলতে চাইনি। বলছিলাম যে
ঝগড়াটা হল বিপরীত আদর্শের ফল”।
“একথা তো আগে বলেন নি”।
“বলতেই যাচ্ছিলাম শ্রীমন”, উকিল বলতে থাকল, “ জনগণের টাকা যেভাবে নয়ছয় করা
হচ্ছে সেটা খান্না মাস্টার এবং ওর চিন্তার শরিকদের কাছে অসহনীয় হয়ে উঠেছে।
শ্রীমন, এরা সব নবযুবক। বেইমান ও ভাঁড়ের সংগে মিলেমিশে থাকায় এখনও অভ্যস্ত
হয়নি”।
বিচারক মুচকি হেসে বললেন-“ এদের তো মামলা মোকদ্দমা এবং জেলে যাওয়ার ভয়
থাকা উচিত নয়”।
উকিল এই সুপরামর্শকে অগ্রাহ্য করে নিজের ব্যাখ্যা চালিয়ে গেল। “সেজন্যেই তো
ওরা কলেজে গণ্ডগোলের আশংকায় ওদের প্রতিবাদ সাংবিধানিক পদ্ধতিতে করে,
আওয়াজ তোলে। শ্রীমন, ক’দিন আগে কলেজে ম্যানেজারের নির্বাচন হল। তাতে স্রেফ
পিস্তলের জোরে বৈদ্য মহারাজ ফের ম্যানেজার নির্বাচিত হলেন। ডিপ্টি ডায়রেক্টর
অফ এডুকেশনের কাছে নালিশ করা হল। শুধু তাই নয়, খান্না এবং ওর সাথীরা ডিপ্টি
ডায়রেক্টরের সংগে দেখা করেছে। খুব শিগগির পুরো মামলার তদন্ত হবে। আবার বৈদ্য
মহারাজ যে কোঅপারেটিভ ইউনিয়নের ম্যানেজিং ডায়রেক্টর , সেখানেও টাকাপয়সা
তছরূপ ধরা পড়েছে। এই মামলাটা ছ’মাস চাপা পড়েছিল। খান্নার দল গিয়ে কোঅপারেটিভ
সোসাইটির রেজিস্ট্রারের সংগে দেখা করে ওর তদন্ত শুরু করিয়েছে। দরকার পড়লে
আমি ওই দু’জন সরকারি অফিসরকেও সাক্ষী দিতে এখানে পেশ করতে পারি।
“শ্রীমন, ওই তদন্তগুলো চলাকালীন খান্না ও সাথীদের ভয় দেখিয়ে চাপে রাখার জন্যেই
বর্তমান মামলা করা হয়েছে। বলতে গেলে এই মোকদ্দমাটাও একধরণের জালিয়াতি।
শ্রীমন---“।

প্রিন্সিপালের উকিল সেদিন এজলাসে কী বলেছিল সেটা তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। তবে
সেদিন প্রিন্সিপাল গ্রামে ফিরে এসে বৈদ্যজীকে বললেন যে কলেজের নির্বাচন এবং
কোঅপারেটিভের তহবিল তছরূপ—দুটো মামলারই তদন্ত হবে।


বৈদ্যজীর চেহারায় কোন পরিবর্তন দেখা গেল না। উনি শুধু ‘হরি ইচ্ছা’ বলে চুপ করে
রইলেন। কিন্তু প্রিন্সিপাল সাহেব কিছু একটা পাকাপাকি ভেবে এসেছিলেন এবং
উত্তেজিত হয়েছিলেন। তাই শুদ্ধ হিন্দির বদলে অবধী বোলিতে বলতে লাগলেনঃ
“মহারাজ, আমার মত হোল সমস্ত খান্না-টান্নাদের হাথ-পা ভেঙে কোন নালায় ফেলে
দেয়া হোক। এটা সম্ভব না হলে সবকটার কান ধরে কলেজ থেকে বের করে দেয়া হোক ।
ওদের পাছায় চার লাথ মেরে আর—“।
বৈদ্যজীর চেহারায় এসবের কোন প্রভাব পড়ল না। উনি বললেন, “ আমার হিংসক
কথাবার্তা পছন্দ নয়”। এবার উনি ঢেঁকুর তুললেন। প্রিন্সিপাল অপেক্ষা
করছিলেন—ফের ‘হরি ইচ্ছা’ শুনতে হবে। কিন্তু বৈদ্যজী কিচ্ছু বললেন না। বোধহয়
অহিংসা, পিস্তল দেখিয়ে চমকানো, তবিল তছরূপ, দেশের কল্যাণ – এইসব জটিল
সমস্যার জালে বাঁধা পড়ে উনি আপাতত চুপ করে রয়েছেন।
ভাটিখানা ছাড়িয়ে প্রায় একশ’ গজ এগিয়ে গেলে একটা অশত্থ গাছের দেখা পাওয়া যায়।
তাতে এক ভূতের বাসা। অনেক পুরনো ভূত। কত কী ঘটে গেল—দেশ স্বাধীন হোল,
জমিদারি প্রথা উঠে গেল, গ্রাম-সভা শুরু হল, কলেজ খুলে গেল—কিন্তু ভুত মরেনি।
যারা ভূতের ব্যাপারটা জানত তারা কেউ সূয্যি ডোবার পরে ওদিকটা মারাত না। কখনও
ওপাশ দিয়ে গেলে নানারকম শব্দ শোনা যায়। সেই সব আওয়াজ শোনার পর শ্রোতার
কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসত। জ্বর এলে বেশির ভাগ মরে যেত। যদি না মরে তো পণ্ডিত
রাধেলালের কাছে যেত। জনশ্রুতি উনি ভূতের ওঝা, ঝাড়ফুঁক পারদর্শী।


এক বিকেলে একজন সাইকেল আরোহী ওই অশত্থ গাছের নীচ দিয়ে যাচ্ছিল। ও ভূতের
কথাটা জানত। কিন্তু না গিয়ে উপায় নেই, গাছটা যে রাস্তার ধারে। তবে ওর আগে আগে
একটা ট্রাক ধীরে ধীরে যাচ্ছিল, ও পিছে পিছে। নইলে সাহস হত না। ট্রাকের পেছনের
লালবাতি এবং আকাশে সূর্য ডোবার পর যে দুয়েকটা লাল রেখা দেখা যাচ্ছে সেসবকেই ও
দিনের অন্ত হয় নি ধরে নিয়ে জায়গাটা পেরিয়ে গেল।
তারপর ও প্রাণভরে শ্বাস টানল। ফাগুনের হাওয়া বইছে, ওর গায়ে লাগছে—তার ছোঁয়ায়
ওর প্রাণ নেচে উঠল। ওর সাহস বেড়ে গেল। ও কোন কাল্পনিক জনতার উদ্দেশে
‘কটিলো কটিলো’ বলে তিতিরের ডাক ছাড়ল। তারপর অমর সিং রাঠোরের বীরগাথা নিয়ে
নামকরা যাত্রার গান—‘ নিকল গয়া জেইসে শের শিকারী কো মার’ – গুনগুন করতে
লাগল। গানের ভল্যুম ক্রমশঃ বেড়ে গেল।
হঠাৎ এক চমক। রাস্তার একদম ধার থেকে একটা আওয়াজ আসছে—‘গোঁ গোঁ গোঁ’!
এটা তো মানুষের নয়, নিঘঘাৎ ভূতের। সাইকেল আরোহীর উপরের শ্বাস বুকে আটকে
গেল। আর নিচের হাওয়া নিচের রাস্তা দিয়ে ফুস্‌। ওর মনে হল ভূত ব্যাটা কোন খবর
না দিয়ে এলাকা বদলে নিয়েছে। অশত্থ গাছের বাসা বদলে এখানকার পাকুড় গাছে
আস্তানা গেড়েছে।
আবার সেই ‘গোঁ গোঁ গোঁ’! এবার বেশ জোরে। সেই সঙ্গে দু’জন মানুষের গলার স্বর।
একজন জোরে জোরে হাসছিল। অন্যজন বলল, “বলছিলাম অত মাল খাস নে, কিন্তু কথা
শুনলে তো! আরও খা ব্যাটা”!
আর একদিন থেকে হেঁড়ে গলার গান ভেসে এল, ‘হামিদ ডাকু’ যাত্রার গানের দু’কলি। “ ন
কীজে শোরগুল চিকচিক, শীশ সবকো ঝুকাতে হ্যাঁয়”।
‘খামোখা কিচকিচ বন্ধ কর। দেখ, সবার মাথা নত হবে”।
তখনই ‘গোঁ গোঁ গোঁ’ আওয়াজে বেশ ক’বার আরোহ-অবরোহ শোনা গেল। প্রথমে কেউ গান
শুরু করার মত করে বলল- গোঁ গোঁ। তারপর কিছু ক্রিয়েটিভিটি দেখাবার ইচ্ছেয় চেঁচিয়ে
উঠল—‘বাঁচাও”! শেষে আবার সেই ‘গোঁ গোঁ গোঁ’। কিন্তু তাতে প্রাণ নেই, কেমন যেন
নিয়মরক্ষার মত শোনালো।
এবার ‘হামিদ ডাকু’ যাত্রার গায়ক তার গান থামিয়ে দিল। ফের ওর গলার স্বর—‘এত
করে বললাম বেশি খাস নে। ফোকটে পাওয়া দারু’! তারপর হেসে উঠে আবার ‘হামিদ
ডাকু’মার্কা গান গাইতে লাগল।
সাইকেল আরোহীর ভেতরে হাওয়া খারাপ হচ্ছিল বটে, কিন্তু সেসব ভূতের ভয়ে।
লোকজন দেখলে ওর ভয় করে না। মানুষের কথাবার্তা আর চিৎকার শুনে ওর মনে হোল
এখানে কিছু গণ্ডগোল কেস। ও সাইকেল থেকে নেমে গর্জে উঠল—“ ভয় পেয়ো না
পালোয়ান! আমি এসে গেছি। খবরদার! কেউ গায়ে হাত তুলবে না”!
পাকুড় গাছের পেছনে একটা ঝোপের মতন। তার পেছনে সন্ধ্যের আধো অন্ধকারে পাঁচ
ছ’জন লোকের চলাফেরা চোখে পড়ছে। নানারকম আওয়াজ আসছেঃ
‘গোঁ গোঁ গোঁ’!’
‘বাঁচাও’!
‘বেশি মাতলামি কোর না; বলেছিলাম এত খাস নে’!

‘ ন কীজে শোরগুল চিকচিক, শীশ সবকো ঝুকাতে হ্যাঁয়’।
সাইকেল আরোহী সতর্ক চোখে চারদিকে তাকাচ্ছিল এবং কোন অজানা ব্যক্তিকে
অজানা বিপদের হাত থেকে বাঁচাতে চেয়ে হুংকার ছাড়ছিল। এমন সময় ঝোপের পেছন
থেকে একজন বেরিয়ে এসে দুলকি চালে সাইকেলের কাছে এল। তার মুখ চোলাই মদের
গন্ধে ভুরভুর। ও সাইকেল আরোহীকে বেশ ডাঁট দেখিয়ে বলল, ‘কী ব্যাপার জোয়ান? কেন
চেঁচাচ্ছ? তোমার কিসে খুজলি হচ্ছে’?
আরোহী ঝোপের দিকে ইশারা করে বলল ,’ ওদিক থেকে বাঁচাও বাঁচাও চিৎকার শুনলাম
যে’!
‘এখানে সবকটা মাল টেনে বেহোঁশ। সব শালা মাতলামি করতে চায়! এখন তুমি কী করতে
চাও বলে ফেল’।
আরও দুই সাইকেল আরোহী রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল। এদের দেখে ওরাও সাইকেল থামিয়ে
নামবে না্মবে করছিল। ঝোপের পেছন থেকে আওয়াজ আরো জোরে জোরে আসছে, কিন্তু
কথা স্পষ্ট হচ্ছে না। ডাঁট দেখানো লোকটা গলার স্বর চড়িয়ে বলল, “ তোমার এখানে
থামার দরকার নেই। এসব গঁজহাদের মামলা। সব শালা মাল টেনে ভোম হয়ে আছে। তোমরা
নিজের নিজের রাস্তায় কেটে পড়”।
দুই সাইকেল আরোহী এমন উপদেশ শোনার পর সাইকেলের স্পীড বাড়িয়ে দিল। প্রথম
জন নাকটাক কুঁচকে যেতে যেতে বলল, “ সবক’টা লুচ্চা। এইসব মাতালের জন্যেই গোটা
এলাকা দুর্গন্ধে ভরে গেছে”।
মিলিটারি স্টাইলওলা জবাব দিল, “ঠিক বলছ জওয়ান, মদ খাওয়া ভাল নয়”।


(চলবে)
0

ধারাবাহিক - শৌনক দত্ত

Posted in




















২০. আলোর পথযাত্রী সলিল চৌধুরী





সুপ্রিয়বরেষু বাসু,

তোমাকে যখন লিখছি পশ্চিমবঙ্গে তখন নিশ্চয় বিজেপির বিজয় ঘোষণা হয়ে গেছে। বেশ কিছুদিন ধরেই চেনা পরিচিত সবার কাছে বিজেপির কথা খুব শুনছিলাম কিন্তু আমার মনে হচ্ছিল এইবারটাও কোন রকম কাটিয়ে দেবে তৃণমূল আর বাংলার দিদি। অনেকে ধর্ম ও সাম্প্রদায়িক দল হিসেবে বাংলায় বিজেপিকে প্রতিহত করতে চেয়েছে বারবার। বাংলায় বিজেপির এই বিজয় তুমি কিভাবে দেখছো? আমার মনে হচ্ছে বাংলার রাজনীতিতে এই বিজয় "প্যারাডাইম শিফট" বা কাঠামোগত পরিবর্তন। এটি কেবল একটি দলের পরিবর্তন নয়, বরং স্বাধীনতার পর থেকে বাংলার রাজনীতিতে যে বাম-উদারপন্থী বা সেক্যুলার ঘরানার একচ্ছত্র প্রভাব ছিল, তার ওপর এক বড় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আঘাত। এই বিশাল বিজয়ে একটা ব্যাপার নিশ্চিত কাজ করেছে বলেই আমার বিশ্বাস, বিজেপির দ্বারা তৈরি একটি 'কাউন্টার-হেজিমনি' বা পাল্টা-আধিপত্যের সফল রূপায়ণ। তৃণমূলের বিরুদ্ধে তোষণ রাজনীতির যে অভিযোগ দীর্ঘ বছর ধরে বিজেপি তুলেছিল, তা বাংলার হিন্দু মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের মনে এই ধারণা তৈরি করতে সফল হয়েছে যে—প্রচলিত 'সেক্যুলারিজম' আসলে সংখ্যাগুরুদের অধিকারকে খর্ব করছে। ফলে, মানুষ ঐতিহ্যগত সেক্যুলার কাঠামো ভেঙে বিজেপির 'সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ' বা 'হিন্দুত্ব'-এর ন্যারেটিভকে গ্রহণ করেছে। তোমারও কি তাই মনে হয় না?

বাংলার শিল্প সংস্কৃতিকে স্বাধীনতা পরবর্তীকালে যারা নেতৃত্ব দিয়েছেন তারা প্রায় সকলই বামপন্থায় বিশ্বাসী কিংবা কমিউনিষ্টকে চেতনায়, মননে ও আর্দশে লালন করতেন। বাংলার সাহিত্য, সঙ্গীত, সিনেমা, নাট্যকলা, চিত্রকলা সহ যেকোন শিল্প সংস্কৃতির ক্ষেত্রে চোখ মেললে যার কথা মনে আসবে তাদের প্রায় সবাই কমিউনিস্ট! ১৯৭৯ সালের এক সাক্ষাৎকারে সলিল চৌধুরীকে বলতে শুনি ‘‘রাজনীতিতে কেউ সিপিআই, কেউ সিপিএম, কেউ নকশাল— তা হোক না। আমার তো মনে হয় সাংস্কৃতিক ফ্রন্টে একটা জায়গায় আমরা সবাই মিলে কাজ করতে পারি।’’ তৃণমূলের শিল্প সংস্কৃতিকে যারা নেতৃত্ব দিয়েছে তারাও বামপন্থাতেই লালিত পালিত, পোষাক বদলে তৃণমূলের পারপাস সার্ভ করে গেছে। বিজেপির ক্ষেত্রে কি হবে জানি না তবে অনুমান করছি হিন্দুকরণের একটা চেষ্টা থাকবে!

বিজেপির বাংলা জয়ের সূচনা লগ্নে সলিল চৌধুরীকে মনে পড়ছে কেন বামপন্থী একজনকে মনে পড়ছে এটা প্রশ্ন হতেই পারে কিন্তু তুমি যদি পেছনে ফিরে তাকাও দেখতে পাবে সলিল চৌধুরী নিষিদ্ধ পার্টি থাকার সময়কালে কমিউনিস্ট আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিলেন। শুরু করেছিলেন কৃষক আন্দোলনে। কলেজে পড়ার সময় ছাত্র আন্দোলনেও যুক্ত ছিলেন। তবে সাংস্কৃতিক ফ্রন্টই তাঁর প্রধান জায়গা হয়ে ওঠে। ১৯৫১-’৫২ পর্যন্ত কমিউনিস্ট পার্টি, বামপন্থী আন্দোলনে প্রত্যক্ষ ভাবে যুক্ত থাকতে পেরেছিলেন। ওই সময়ে তাঁর বাবা প্রয়াত হন। সংসারের দায়িত্ব পালনে উপার্জন জরুরী হয়ে পড়ে। প্রথমে কয়েকটি বাংলা চলচ্চিত্রে সঙ্গীত সৃষ্টির কাজ করার পর মুম্বাই যান। সেখানে প্রতিষ্ঠিত হন। আবার সেখানেও কয়্যার সংগঠিত করেন। সেই কয়্যারে রুমা গুহঠাকুরতা যেমন ছিলেন, তেমন কিছুদিন যুক্ত ছিলেন লতা মঙ্গেশকরও। একটি বিষয় এখানে উল্লেখযোগ্য। ১৯৪২-’৪৩ এবং তারপর বেশ কয়েকবছর গণনাট্য, আইপিটিএ-তে আমরা সলিল চৌধুরীর মতোই দেখতে পাই সাহিব লুধিয়ানভি, বলরাজ সাহানি, পৃথ্বিরাজ কাপুর, কাইফি আজমি, জান নিসার আখতার(জাভেদ আখতারের বাবা)-র মতো ব্যক্তিত্বকে।সাম্রাজ্যবাদ বিরোধীতা, ফ্যাসিবাদ বিরোধীতা এবং কমিউনিজমের আদর্শের প্রতি ভালোবাসা তাঁদের উপস্থিত করেছিল বামপন্থী সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পরিসরে। সলিল চৌধুরীর কথাতে আছে সেই লেফট ইকোসিস্টেমের প্রমাণ। ১৯৯৩-র নভেম্বরে একটি ইংরাজী সংবাদপত্রের পক্ষ থেকে সাক্ষাতকারে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, আপনার প্রিয় স্বপ্ন কী? সলিল চৌধুরীর জবাব ছিল—‘সব মানুষ সমান হবে।’ আপনার দুঃস্বপ্ন কী? জবাব ছিল— ‘ফ্যাসিবাদ।’ ১৯৯৫-এর সেপ্টেম্বরে, মৃত্যুর কয়েকদিন আগে আর একটি সাক্ষাতকারে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের, এমনকী কলকাতারও কিছু শিল্পী বিজেপি’তে যোগ দিয়েছে। গণনাট্য থেকে উঠে এসে এটাকে কোন চোখে দেখছেন? সলিল চৌধুরীর জবাব ছিল সংক্ষিপ্ত কিন্তু প্রবল—‘কী জানি। মুর্খের দলে কী করে শিল্পীরা যোগ দেয়, বুঝি না।’

সলিল চৌধুরীর ভাবনা বাংলায় কতটা সঠিক তা সময় বলবে তবে গোটা ভারতবর্ষে বিজেপির শিল্প সংস্কৃতির মুখ দেখলে বুঝি সলিল চৌধুরীর বলা কথাটি এখনো পর্যন্ত সঠিক! আমার বিশ্বাস লড়াইয়ের ময়দান ছাড়া শিল্প হয় না। লেখা, গান, সিনেমা, নাটক— কিচ্ছু না। এই প্রসঙ্গেও সলিল চৌধুরীর একটা কথা মনে পড়ছে ১৯৮৮-র জুনে কেন্দ্রীয় নাট্য প্রশিক্ষণ শিবিরের কর্মশালায় ‘গণসঙ্গীত’ নিয়ে আলোচনার সময় সলিল চৌধুরীর বলছেন,‘‘কিন্তু একটা কথা বলব শুধু স্লোগান দিয়ে মানুষের মন জয় করা যাবে না। আপনাদের আজকের দিনের যারা গীতিকার ও সুরকার তাদেরও শিখতে হবে। আজকের বুর্জোয়ারা যে গানগুলো তৈরি করছে— টিভিতে বলুন, রেকর্ডে বলুন, ক্যাসেটে বলুন, যেসব অসাধারণ অর্কেস্ট্রেশন, অসাধারণ রেকর্ডিং, অসাধারণ পারফেকশন দিয়ে যেসব পচা জিনিস ওরা প্রচার করছে তার জৌলুসে, তার আঙ্গিকের চমৎকারিত্বে তা যুবমানসকে আপ্লুত করছে।...আমাদেরও ওই টেকনিক আয়ত্বে করতে হবে, তা নাহলে আমরা পারব না।...ওরা যদি মেশিনগান চালায় আমরা তলোয়ার নিয়ে লড়াই করতে পারব না। অস্ত্রাগার যেটা ওদের হাতে রয়েছে সেই অস্ত্রাগারের অধিকাংশ অস্ত্র আমারও দরকার।’’

সলিল চৌধুরী প্রথম দিকে কবি না হয়ে উঠলে পরে সফল সঙ্গীতকার হয়ে উঠতেন কি না, সন্দেহ প্রকাশ করেন তাঁর কবিতার অনুরাগী পাঠকেরা। সঙ্গীতকার, সুরকার ও সাহিত্যিক সলিল চৌধুরীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ছিল মার্কসীয় আদর্শ ও গণমানুষের চেতনায় ঋদ্ধ। শোষিত-বঞ্চিত মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে তিনি নিজের শিল্পসত্তাকে পরিণত করেছিলেন এক শক্তিশালী রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে। শিল্পীর স্বীকারোক্তি থেকেই স্পষ্ট, কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ গ্ৰহণ তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। তিনি জানিয়েছেন, শুধু গণনাট্য নয়, কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে শ্রমিক, কৃষক, মধ্যবিত্ত, ছাত্র— সব আন্দোলনের শরিক হতে পারাতেই তাঁর সঙ্গীতজীবনের ভিত্তি নিহিত। এতে সুরে নতুন মূর্ছনা যোগ হয়েছে। মার্ক্সবাদী চেতনা মানসিকতার নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। সমাজের ক্ষয়রোগটিকে চিহ্নিত করে নিরাময়ের নিদান দিয়েছেন লেখনীর মাধ্যমে। মতাদর্শগত সততা, শিল্প ও রাজনীতির মেলবন্ধন এবং প্রথাগত চিন্তার ঊর্ধ্বে ওঠা তাঁর প্রজ্ঞার মূল ভিত্তি ছিল। সলিল চৌধুরীকে চিনতে জানতে আমাদের ফিরে যেতে হবে সেই সময়ে যখন সকলে মিলে নতুন সমাজ গড়ার স্বপ্ন দেখছেন। লড়াইয়ের নতুন গান তৈরি হচ্ছে। গণনাট্যের সপ্তম সর্বভারতীয় সম্মেলনে হেমাঙ্গ বিশ্বাস বললেন, সলিলের গানে পাশ্চাত্য সঙ্গীতের প্রতি ঝোঁক। তার এই হারমনি আর অর্কেস্ট্রেশনের বাড়াবাড়ি সাধারণ শ্রমজীবী জনতার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। আমাদের গান তৈরি করতে হবে পরম্পরাগত লোকসুরের উপরে লড়াই আন্দোলনের কথা যোগ করেই। হেমাঙ্গ বিশ্বাসের কথা শোনার পরে সলিল চৌধুরীর তখন কি মনে হয়েছিল জানিনা তবে আমার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সোনার কাঠি’ প্রবন্ধের কথা মনে পড়ছে যেখানে তিনি লিখছেন, “আমাদের সাহিত্যে চিত্রে সমুদ্রপারের রাজপুত্র এসে পৌঁছেছে। কিন্তু সংগীতে পৌঁছায় নি। সেইজন্যেই আজও সংগীত জাগতে দেরি করছে। অথচ আমাদের জীবন জেগে উঠেছে।” সলিল চৌধুরীরও হয়ত এটাই মনে পড়েছিল তাই তিনি মেনে নিলেন না। বললেন, নতুন দিনের গান নতুন ভাষা দিয়েই তৈরি হবে। তাতে ঘটবে লোকায়ত ও শাস্ত্রীয়, পরম্পরাগত ও আধুনিক, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সঙ্গীতের মেলবন্ধন। এই সময়ের বহুমাত্রিকতা শুধু একরৈখিক মেলোডি দিয়ে ধরা সম্ভব নয়। হেমাঙ্গ বিশ্বাস কিন্তু শেষ জীবনে সলিল চৌধুরীর সঙ্গীতধারা কে মেনে নিয়েছিলেন আত্মজীবনীতে তিনি বলেছেন, “…বিষয়বস্তুর আলোচনাকে অগ্রাধিকার না দিয়ে এভাবে শুধু লোক আঙ্গিক নিয়ে বিতর্ক চালানো, ওটাও তো এক ধরনের ‘ফর্মালিজ়ম’। সলিলের ফর্মালিজ়ম-এর সমালোচনা করতে গিয়ে আমি নিজেও এক ধরনের ফর্মালিজ়ম-এর শিকার হয়েছিলাম। লড়াইটা হয়েছিল ফর্ম-এর।” পরে হেমাঙ্গ বিশ্বাসও রচনা করেন ‘শঙ্খচিল’-এর মতো গান, যা দেশি-বিদেশি নানা সুরের মিশ্রণে তৈরি। আসলে লড়াইটাও শুধুমাত্র লোকায়ত বনাম পাশ্চাত্য সুরের ছিল না। ছিল আরও গভীরে। সে দিনের বিতর্ক প্রসঙ্গে হেমাঙ্গ বিশ্বাস বলেছেন, “স্তালিনের সেই বক্তব্য: International in content, national in form— এই ছিল আমার তাত্ত্বিক ভিত্তি।”

একজন রাজনৈতিক সচেতন স্রষ্টা কেমন হয় তার দৃষ্টান্তও হতে পারেন সলিল চৌধুরী। একজন স্রষ্টার সৃষ্টি কি শুধু লড়াই সংগ্রামের তাৎক্ষণিক আবেদনের সাময়িক সৃষ্টির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে? সৃষ্টি কি তৈরি হবে শুধু মিছিল-হরতালের জন্য, আর গণসমাবেশকে উপলক্ষ করে? এখান থেকেই উঠে আসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি— সংস্কৃতি কি সংগ্রামের হাতিয়ারই শুধু? সর্বযুগেই তো সংস্কৃতি যতটা হাতিয়ার, তার চেয়ে অনেক বেশি যুদ্ধক্ষেত্র। তুলসীদাসের কাব্য থেকে কবীরের দোহা হয়ে মহাত্মা গান্ধীর ‘ঈশ্বর আল্লা তেরে নাম’-এ রামের রূপান্তর যে পথে ঘটে, সেটাও সংস্কৃতির ভিতরের দ্বন্দ্ব সংঘর্ষেরই ফল। ওই একই সাঙ্গীতিক দ্বন্দ্ব সংঘর্ষের আন্তঃপাঠ্যতার পথ ধরে মোহিনী চৌধুরীর ‘পৃথিবী আমারে চায়’ থেকে সলিল চৌধুরীর ‘আজ নয় গুনগুন গুঞ্জন প্রেমে’-র ‘পৃথিবী তোমারে যে চায়’-এর জন্ম হয়। এটাই সলিলের সঙ্গীতের বামপন্থা, যেখানে চিৎকৃত ডাক নেই, কিন্তু গভীরতর রাজনীতি রয়েছে। এ ভাবেই রবীন্দ্রনাথের ‘কৃষ্ণকলি’ তেভাগার ‘সেই মেয়ে’-তে রূপান্তরিত হয়, কিংবা রূপকথার সাত ভাই চম্পা আর একটি পারুল বোন সমকালের মাটিতে এসে দাঁড়ায়। এই সময়পর্বের তাঁর সৃষ্টি ‘গাঁয়ের বধূ’ বা ‘আয় বৃষ্টি ঝেঁপে’ নিয়ে গণনাট্যের অভ্যন্তরে তীব্র সমালোচিত হয়েছিলেন সলিল। বলা হয়েছিল, ‘আশা স্বপনের সমাধি’, ‘বিধি’, ‘কপালগুণে’— এই শব্দগুলি গণনাট্যের আদর্শের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এর পরই সলিল চৌধুরীর সঙ্গে গণনাট্যের প্রত্যক্ষ সংস্রব ছিন্ন হয়ে যায়। কিন্তু তাঁর শিল্পীসত্তা গণনাট্য ছেড়ে যায়নি কখনও। তাঁর সৃষ্টির গভীরে ডুব দিলেই বোঝা যায়, এক রাজনৈতিক সঙ্গীতকারই জেগে আছেন পরতে পরতে। ‘হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ’-এর সুর থেকে ‘ক্লান্তি নামে গো’ এবং এর পাশাপাশি তারও কিছু দিন আগে লেখা ‘ও আলোর পথযাত্রী’ শুনলে ভিতরের রাজনীতির সংযোগ বোঝা যায়। গণসঙ্গীত থেকে প্রেমের গানে বার বার ফিরে আসা নৌকা বা পথের প্রসঙ্গের মধ্যেও নিহিত রয়েছে তাঁর রাজনীতির আভাস। সলিল চৌধুরী বিশ্বাস করতেন, শিল্পের যথাযথ শিক্ষা ছাড়া সাংস্কৃতিক সংগ্রাম অসম্ভব। ওই একই সময়পর্বে পার্টির কাছে প্রদত্ত আ থিসিস অন কালচারাল মুভমেন্ট-এ ঋত্বিক ঘটক বলেছিলেন, সংস্কৃতি আন্দোলনের অগ্রসৈনিক হতে পারেন একমাত্র পূর্ণসময়ের শিল্পীরাই। শিল্প যাঁদের জীবনের অঙ্গ, শিল্পই যাঁদের জীবনধারণের মাধ্যম। সংস্কৃতির সংগ্রাম ও জীবনধারণের টানাপড়েন তিনি অনুভব করেছেন নিজের জীবনে।

‘নবান্ন’-র পর বিজন ভট্টাচার্য লিখলেন ‘জবানবন্দী’। তাঁর কাজকর্মে অনুপ্রাণিত হয়ে সলিলও লেখেন তিনটি নাটক— ‘জনান্তিকে’, ‘এই মাটিতে’ এবং লেডি গ্রগরির ‘The Rising of the Moon’ অবলম্বনে ‘অরুণোদয়ের পথে’। নাটকগুলি বেমালুম হারিয়ে গেল! প্রকাশ করার উদ্যোগ নেওয়া যায়নি, কারণ পার্টি নাটকগুলিকে নিষিদ্ধ করেছে। আর যখন তখন পুলিশের হামলা। কলকাতায় একবার নাটকের শো হচ্ছে। কালী বন্দ্যোপাধ্যায় পুলিশের চরিত্রে অভিনয় করছেন। আর সত্যিই পুলিশ রেইড করেছে। কালীবাবু বলে উঠছেন— ‘এ কী! এখন তো তোমাদের দৃশ্য নয়!’ ইতিমধ্যে আসল পুলিশের লাঠিচার্জ শুরু হয়ে গেছে। এই ঘটনাটা সারা জীবন তাঁর মনে থেকে গেছে। এরপরেও, গান গাইতে গিয়ে পুলিশের বেদম লাঠির বাড়ি জুটেছে কপালে। সলিল চৌধুরী মনে করেন, তৎকালীন জাতীয়তাবাদী রাজনীতির পথ থেকে অনেকটাই দূরে অবস্থান নিয়েছিলেন তাঁরা। কৃষক, শিল্পাঞ্চলের শ্রমিক, খেতমজুর, শহরের রিকশা চালক— সকলকেই কমিউনিস্ট পার্টির বৃত্তে আনার চেষ্টা হয়েছিল। সাফল্য কি আদৌ এসেছে? এ নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন ছিল তাঁর মনে। ফ্রান্স, ইতালি, ভিয়েতনাম, পূর্ব ইওরোপ, চিন, সোভিয়েত ইউনিয়ন নিয়ে সকলে ব্যতিব্যস্ত। সাংস্কৃতিক ফ্রন্টের দিকে নজর দেবে কে! নেতাদের মধ্যে যথেষ্ট রেষারেষি ছিল। পরবর্তীকালে সিপিআই, সিপিআই(এম), সিপিআই(এম)(এল)— পার্টি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। 'ভদ্রলোক' শ্রেণির শিক্ষিত লেখক-শিল্পীরা যেমন এসেছিলেন, তেমনই কৃষক-শ্রমিকেরও আগমনে ঘাটতি হয়নি। তাও পার্টি সাংস্কৃতিক ফ্রন্টে ব্যর্থ হলো। সলিল চৌধুরী বলেছেন— "আমি মনে করি, বাংলার রেনেসাঁসের পর সারস্বত চর্চার এত বড় সুযোগ এসেছে কি?" কাকদ্বীপ-সুন্দরবন অঞ্চলে এক সময় মুকুন্দ দাসের গান গেয়ে বেড়িয়েছেন। গণনাট্যে দেখলেন, নীতি নির্ধারকরা সকলেই মধ্যবিত্ত ভদ্রলোক। "গণনাট্য সংঘ ভেঙে যাওয়ার দায়ভার তাঁদেরই নিতে হবে," দ্বিধাহীনভাবে বলেছেন সলিল চৌধুরী। বিজন ভট্টাচার্যের ‘নবান্ন’-কেও তার প্রাপ্য গুরুত্ব দেয়নি কমিউনিস্ট পার্টি। পার্টিতে বলা হতো, সমসাময়িকতার উপর জোর দিয়ে, সমাজ পরিবর্তনের লক্ষ্যে কাজ করবেন সাংস্কৃতিক কর্মীরা। সলিল চৌধুরীর মতে, এভাবে শিল্পের পরিধি নির্ধারণ করে দিলে সমস্যার সৃষ্টি হয়। ‘পার্টি রবীন্দ্রনাথকে বুঝতে ভুল করেছে। এই ভুলের ক্ষমা হয় না’, বলেছেন সলিল চৌধুরী।

আজকের বাংলায় দাঁড়িয়ে যখন বাংলার শিল্প সংস্কৃতিকে ধসে পড়তে দেখছি, দলকানা বুদ্ধিজীবিকে অন্ধের মতন কথা বলতে শুনছি তখন সলিল চৌধুরীকে বুঝতে সুবিধা হয়। বুঝতে পারি সলিল চৌধুরী রাজনীতিতে প্রত্যক্ষভাবে সক্রিয় থাকলেও, তিনি শিল্পসত্তাকে দলীয় রাজনীতির সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে স্থান দিতে জানতেন। তিনি মনে করতেন, রাজনৈতিক মতাদর্শ ভিন্ন হলেও সাংস্কৃতিক ফ্রন্টে সকল প্রগতিশীল মানুষের একসঙ্গে কাজ করা উচিত। আর তাই হয়ত শতবর্ষ পরেও মনে হয় সলিল চৌধুরী অদৃশ্য হয়েও বাঙালির জনজীবনে জড়িয়ে আছে। বিশেষত, উদ্বাস্তু বাঙালি ও তাদের পরের প্রজন্মে। যারা কোনও দিন পূর্ববঙ্গে ফিরতে পারেনি, কিংবা যায়ওনি, কিন্তু বাঙাল ভাষা ও যাপনে একটা স্বয়ংসম্পূর্ণ সংস্কৃতিকে ধারণ করেছে, তাদের ‘স্বর’ হয়ে উঠেছিলেন সলিল চৌধুরী। আমাদের প্রজন্মের মধ্যবিত্ত বাড়িতে দারিদ্র ছিল। ছোটবেলায় অনেক সময় পুজো-পার্বণে একটা জামা হত বা হত না। আমাদের কেউ মনে রাখত না। কিন্তু ওই যে অন্তরা চৌধুরীর কণ্ঠ মাইকে বাজত– ‘কাঁদছ কেন আজ ময়না-পাড়ার মেয়ে/ নতুন জামা-ফ্রক পাওনি বুঝি চেয়ে/ আমার কাছে যা আছে সব তোমায় দেব দিয়ে/ আজ হাসি-খুশি মিথ্যে হবে তোমাকে বাদ দিয়ে…’– ওতে আমাদের অভাবী ছোটবেলায় স্নেহের প্রলেপ পড়ত। কিংবা, বাড়িতে-বাড়িতে লতা মঙ্গেশকরের মিঠে গলায় যখন ‘পা-পা-মা-গা-রে-সা তার চোখের জটিল ভাষা’, ‘না যেও না রজনী এখনও বাকি’, ‘অন্তবিহীন কাটে না আর কেন বিরহের এই দিন’ শোনা যেত– সেই সময় গোটা একটা গোষ্ঠী– জীবনযুদ্ধে ক্লান্ত, শীর্ণ যেন শুশ্রূষা পেত। আমাদের মতো পরিবারের কাছে রবীন্দ্রনাথ কিংবা তাঁর গান ততটা সুলভ ছিল না– ‘এলিট’ ছিল যেন বা। তার থেকে অনেক কাছাকাছি ছিলেন সলিল চৌধুরী। অথচ তাঁর সুর সহজ ছিল না। গানের গলা ভালো না হলে খালি গলায় সেসব গান গাওয়া মুশকিলই ছিল। অথচ, যথেষ্ট কঠিন হওয়া সত্ত্বেও এত কোমলভাবে ছিন্নমূল বাঙালি সমাজে কী করে তাঁর গান-সুর মিশে যেতে পারল, ভাবলে অবাক হতে হয়।

আসলে সলিল চৌধুরীর মতো বহুমুখী এক প্রতিভা সম্পর্কে কথা বলতে গেলে কথা শেষ করা কঠিন। তাঁর গানের ভাষাতেই বলা যায় ‘আজ তবে এইটুকু থাক, বাকি কথা পরে হবে।’ বাইরে ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে গত কয়েকদিনের ভ্যাপসা গরম হয়ত কিছুটা কাটবে, মাটির সোঁদা গন্ধ তোমাকে দিলাম নিরন্তর ভালো থেকো। তোমার চিঠির অপেক্ষায় থাকলাম…


ইতি-

সুস্মি

০৪ মে, ২০২৬
0

ধারাবাহিক - নন্দিনী সেনগুপ্ত

Posted in




















২১

আগেই বলেছি যে ক্রিস্টিনা সুন্দরী। যদিও তার কিশোরীবেলায় এই সৌন্দর্য, লাবণ্য সেরকম প্রস্ফুটিত ছিল না। ভারিক্কি চওড়া গড়নের চেহারায়, মুখে সেরকম ছিরিছাঁদ না থাকলেও এক অদ্ভুত পবিত্রতা ছিল। এবং তার মুখের বিচিত্র অভিব্যক্তির মধ্যে সবচেয়ে প্রকট ছিল বিরস বিষণ্ণতা। সবার মাঝখানে তাকে সেভাবে কেউ লক্ষ্য করত না। স্কুলে পড়াশুনা ভাল শিখছিল না সে। অবশেষে আঠেরো বছর বয়সে তাকে সুইজারল্যান্ডে এক ফরাসি-মাধ্যম বোর্ডিং স্কুলে পাঠানো হয়। কিন্তু সেখানেও সে তার শিক্ষিকাদের সন্তুষ্ট করবার মত সেরকম কোনও কাজ করতে পারেনি।

তার একজন চিত্রশিল্পীর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছিল। যদিও বোর্ডিং থেকে বেরিয়ে বাইরের লোকজনের সঙ্গে দেখা করবার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ ছিল। কিন্তু সে কোনোদিন এসব নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা করেনি এবং সেসব নিয়ে কোনও লুকোছাপাও করেনি। অদ্ভুত নিরুত্তাপ ভাব দেখাত সে। যখন এসবের জন্য তাকে তিরস্কার করা হত, সে শান্ত হয়ে শুনত; কিন্তু কোনও কিছুই রেখাপাত করত বা তার মাথায় ঢুকেছে বলে মনে হত না। ব্যাপারটা শেষে এমন দাঁড়াত যে, তাকে যেরকম নির্দেশই দেওয়া হোক না কেন, সে কোনওকিছুকে সেরকম পাত্তা দিত না।

ক্রিস্টিনার কাণ্ডকারখানায় তার শিক্ষিকারা মাঝেমধ্যে দিশেহারা বোধ করতেন। প্রথমে তারা ভেবেছিলেন যে ক্রিস্টিনার সেরকম মেধা বা প্রতিভা নেই, তারা ভেবেছিলেন যে সে হয়ত বা ফরাসি ভাষা ঠিকভাবে বুঝতে পারছে না। ফলে তার ক্ষেত্রে শিক্ষিকারা একটু বিশেষ ধৈর্য দেখাতেন। কিন্তু ক্রমেই দেখা গেল যে ক্রিস্টিনার বুঝবার কোনও ইচ্ছেই নেই। তারা অনেকবার নানাভাবে তাকে সামনাসামনি বোঝাবার চেষ্টা করেছেন, সেরকম ফল হয়নি। বরঞ্চ ক্রিস্টিনা অবাক হয়ে উত্তর দিয়েছিল যে সে যথাসম্ভব চেষ্টা করছে যাতে তার কোনও ভুল না হয় এবং সে বুঝতেই পারছে না যে শিক্ষিকারা তার কাছ থেকে ঠিক কী চান। পরদিন বিকেলে বোর্ডিংএর সবাই মিলে একসঙ্গে হাঁটতে যাবার কথা ছিল। এদিকে যথাসময়ে দেখা গেল যে ক্রিস্টিনার কোনও চিহ্ন নেই।

ক্রিস্টিনার রুমমেট জানাল যে দুপুরের খাবার খেয়েই সে কোথায় বেরিয়ে গেছে কেউ জানে না। শিক্ষিকা প্রচণ্ড ক্ষেপে গিয়ে বললেন যে এই কারণে ক্রিস্টিনাকে শাস্তিভোগ করতে হবে। তাছাড়া ভবিষ্যতে এইভাবে যদি সে বেরিয়ে যায়, তাহলে যেন তার সহপাঠীরা অতি অবশ্যই সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষকদের জানায়।

সময়টা ছিল বসন্তকাল, মনোরম আবহাওয়া। সবাই মিলে হাঁটতে শুরু করল লেকের দিকে। জেটির কাছাকাছি গিয়ে সবার সঙ্গে দেখা হল ক্রিস্টিনার। এক যুবকের সঙ্গে সেখানে দাঁড়িয়ে আছে সে। প্রচণ্ড উল্লাসে হাসতে হাসতে চ্যাপ্টা নুড়ি কুড়িয়ে লেকের জলে ছুঁড়ে ছুঁড়ে দেখছে যে সেগুলো কতবার করে জলের তলের উপরে লাফিয়ে উঠছে।

বোর্ডিংএর অন্যান্য সহপাঠীদের দেখে এক মুহূর্তের জন্য অপ্রস্তুত হল সে। কিন্তু পরমুহূর্তে একটু দ্বিধা ও জড়তার সঙ্গে হাসিমুখে সে শিক্ষিকাকে অভিবাদন জানাল। যুবকটিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে শিক্ষিকা প্রচণ্ড ক্ষোভে কাঁপতে কাঁপতে তাকে নির্দেশ দিলেন যে সে যেন এখনি তার বোর্ডিংএর সহপাঠীদের সঙ্গে যোগ দেয় এবং বোর্ডিংএ ফিরে আসে। ক্রিস্টিনাকে দৃশ্যত বেশ বিরক্ত দেখাল। মাথা নেড়ে জানাল যে সে এখন তার বন্ধুর সঙ্গে চা খেতে যেতে চায়। শিক্ষিকা রাগে ফ্যাকাসে হয়ে বললেন যে সে যদি এখনই সবার সঙ্গে যোগ না দেয়, তাহলে তার বাবা মাকে চিঠি লিখে বোর্ডিং স্কুল থেকে বের করে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হবে। একথা শুনে ক্রিস্টিনা একটু কাঁধ ঝাঁকাল উদাসীন ভঙ্গিতে। যুবকের সঙ্গে করমর্দন করল এবং বোর্ডিংএর শিক্ষার্থীদের মিছিলের সারিতে যোগ দিল। ‘তোমাদের দূর থেকে দেখে মনে হচ্ছিল হাঁসের ঝাঁক!’ পাশে হাঁটতে থাকা মেয়েটিকে বলে উঠল ক্রিস্টিনা।

প্রধানা শিক্ষিকা চিন্তায় ছিলেন যে ক্রিস্টিনাকে সত্যিই বাড়িতে পাঠিয়ে দেবেন কিনা। কিন্তু যেহেতু সমস্ত শিক্ষিকা চেয়েছিলেন যে ক্রিস্টিনাকে শৃঙ্খলাভঙ্গের কারণে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া উচিত, সেহেতু প্রধানা শিক্ষিকা সবার বিরুদ্ধে দাঁড়ালেন। এমনকি তিনি ক্রিস্টিনার সমর্থনেই কথা বললেন।

তারপর থেকেই, ক্রিস্টিনাকে প্রধানা শিক্ষিকার প্রিয়পাত্রী হিসেবে গণ্য করা হয় বোর্ডিং স্কুলে। সন্ধেবেলায় প্রায়ই প্রধানা শিক্ষিকার ব্যক্তিগত ঘরে ডাক পড়ত তার এবং এই কারণেই অন্যান্য শিক্ষিকারা বেশ ঈর্ষামিশ্রিত ঘৃণার চোখে তাকে দেখতে শুরু করলেন। মেয়েটির শান্ত এবং উদাসীন হাবভাব তাদের ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দিল এবং ক্লাসে ক্রিস্টিনার পঠনপাঠনও সেভাবে তার মর্যাদা বৃদ্ধিতে সহায়ক হল না।

প্রধানা শিক্ষিকা ছিলেন একজন ভারি উৎসাহী মহিলা। অন্যান্য শিক্ষিকাদের সঙ্গে সময় কাটানোর চেয়েও তার বেশি পছন্দ ছিল ছাত্রীদের সঙ্গ। ছাত্রীদের কী ভাবে শিক্ষাদান করা উচিত, সেই বিষয়ে তার কিছু নিজস্ব মতামত ছিল, যেগুলোকে কোনওভাবেই কঠোর বলা চলে না। আবার বেশি স্নেহ দেখাতে গিয়ে যাতে বাচ্চারা একেবারে বয়ে না যায়, সেই ব্যাপারেও তার যথেষ্ট চিন্তাভাবনা ছিল।

অনেক ছাত্রী তাকে বেশ পছন্দ করত। তিনিও খুব আহ্লাদ দেখাতেন তাদের। সন্ধেবেলায় ছাত্রীরা তার ঘরে যেত। তিনি তাদের চা খাওয়াতেন। তারপর সবার মাথার চুলে বিলি কেটে হালকা আদরে শুভরাত্রি জানাতেন।

ক্রিস্টিনা কখনই প্রধানা শিক্ষিকার ঘনিষ্ঠ ছাত্রীদের বৃত্তের মধ্যে ছিল না। বরঞ্চ সে এমন ভাব করত যে তার মন পাওয়া মোটেই সহজ ব্যাপার নয়। প্রধানা শিক্ষিকা নিজেই উঠেপড়ে লাগলেন ক্রিস্টিনাকে বশ করবার জন্য। সে যদি সন্ধ্যায় কখনো প্রধানা শিক্ষিকার ঘরে যেত, সবার সঙ্গে নয়, একলা ডাকা হত তাকে। সেটা ছিল বিশেষ সম্মান। তিনি ক্রিস্টিনাকে সবই জানিয়েছিলেন যে অন্যান্য শিক্ষিকারা কতখানি ক্ষেপে রয়েছেন তার উপরে। তাদের অভিযোগ, ক্লাসে ক্রিস্টিনার পড়াশুনার অমনোযোগ, খারাপ ফল, সর্বোপরি বিরাট সন্দেহের প্রশ্নচিহ্ন যে হয়তো ক্রিস্টিনা লুকিয়ে সেই যুবকটির সঙ্গে এখনও দেখা করে, যাকে তারা সেদিন লেকের ধারে ক্রিস্টিনার সঙ্গে দেখেছিলেন। অবশ্য তিনি তারপর আশ্বস্ত করলেন… ‘কিন্তু তোমায় সেই কারণে ভীত হবার প্রয়োজন নেই। আমি বিষয়টা দেখছি, যাতে তোমার কোনও ক্ষতি না হয়!’

ক্রিস্টিনা ভাবলেশহীন, স্থাণু বসে রইল। আলগা একটা হাসি ঝুলে রইল ঠোঁটে। প্রধানা শিক্ষিকা এবার দ্বিধায় পড়লেন…

‘ক্রিস্টিনা, তোমার কিন্তু কিছুটা হলেও কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত আমার প্রতি।’ শিক্ষিকা হালকা ভাবে তার হাত স্পর্শ করলেন। ক্রিস্টিনা আদরের কাঙাল, সে মুখে কিছু না বললেও উঠে গিয়ে প্রধানা শিক্ষিকার পাশে ডিভানে বসে। মুখের অভিব্যক্তির অদ্ভুত শীতলতা অবশ্য মুছে যায় না। ফলে শিক্ষিকা বেশ বিভ্রান্ত বোধ করতে থাকেন।

পাঠক, আপনার মনে এই প্রশ্ন আসতে পারে যে তাহলে ক্রিস্টিনা কি আসলে কাউকেই খুব একটা পছন্দ করে না? তার রুমমেট ছিল এক অষ্টাদশী, ছোট্টখাট্ট চেহারার মেয়ে। চালচলন শিশুসুলভ, জাপানিদের মত দেখতে। প্রথম প্রথম সে ক্রিস্টিনাকে বেশ ভয় পেত, এড়িয়ে চলত। বেশির ভাগ সময়ে চুপচাপ থাকত, স্নানে যাবার সময়ে কিম্বা পোশাক বদলানোর সময়ে খুবই অস্বস্তিতে থাকত। ক্রিস্টিনা আবার এসব ব্যাপার একেবারে পাত্তা দিত না। তবে একদিন সে বলে উঠল… ‘জলি, তুমি আমার সামনেই পোশাক বদলাতে পারো, তোমাকে দেখতে আমার খুব ভাল লাগে।’

জলি লাগোয়া চানঘরের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল; সে কোনও উত্তর দিল না। কিন্তু লজ্জায় লাল হয়ে উঠল। ক্রিস্টিনা উল্টোদিকের দেওয়ালে টাঙানো আয়নায় দেখতে পেল জলির অস্বস্তি। এই অস্বস্তি ক্রমে এতটাই বেড়ে চলেছে যে এক ঘরে থাকাটাই একটা সমস্যা হয়ে উঠতে পারে। জলি সর্বত্র ক্রিস্টিনাকে এড়িয়ে চলতে লাগল। ক্লাসরুমে বসে সে নিজের পড়া সারতো, তারপর ঘরে ফিরে সন্ধ্যায় তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ে ঘুমের ভান করত, যাতে কোনওভাবেই ক্রিস্টিনার সঙ্গে তাকে কথা বলতে না হয়। ক্রিস্টিনা আবার রাত জাগত। বিছানার পাশের নাইটল্যাম্পের আলোয় পড়াশুনা করবার জন্য মধ্যরাত অবধি জেগে থাকত সে। জলি শুয়ে শুয়ে দূর থেকে ক্রিস্টিনার প্রতিটি গতিবিধি লক্ষ্য করত। আলো নেভানোর সঙ্গে সঙ্গে ক্রিস্টিনা ঘুমিয়ে পড়ত। জলি তখনো শুনতে পেত তার দীর্ঘ হয়ে যাওয়া নিয়মিত শ্বাসের শব্দ। একদিন ওইভাবেই জলি মটকা মেরে পড়েছিল। আধখোলা চোখে লক্ষ্য করছিল ক্রিস্টিনার গতিবিধি। হঠাৎ সে দেখল যে ক্রিস্টিনা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকে লক্ষ্য করছে। জলি তখন আবার তাড়াতাড়ি তার চোখ বুজে ফেলল এবং একদম নড়াচড়া বন্ধ করে দিল।

- ‘জলি’ ক্রিস্টিনা বলে ওঠে… ‘কেন আমার প্রতি তোমার এত ক্ষোভ? কেন তুমি আমায় সহ্য করতে পারো না?’ জলি চোখ খোলে কিন্তু সরাসরি তার দিকে তাকায় না। মুখ ফিরিয়ে রাখে অন্যদিকে। … ‘আমাকে দেখে তোমার অস্বস্তি হয়?’ ক্রিস্টিনা বলে যায়… ‘তুমি কি জানো যে আমাকে যদি কেউ অপছন্দ করে, তাহলে আমি তার সঙ্গে একত্র থাকতে পারি না?’

জলি তাকে সম্পূর্ণ অবাক করে দিয়ে উঠে দাঁড়ায় এবং বলে যে একথা সত্য নয় যে সে তাকে সহ্য করতে পারে না। তার কণ্ঠস্বর শান্ত, কিন্তু তার অস্বস্তি স্পষ্ট।

ক্রিস্টিনা হালকা সুরে বলে… ‘তাহলে ব্যাপারটা কি এমন যে তুমি আমায় ভালবাস?’ বলে সে অনেকটা সময় চুপ করে বসে থাকে। জলি কোনও উত্তর দেয় না।

‘এসো’… আবার ক্রিস্টিনা তার দিকে তাকায়… ‘আমরা পরস্পর একটু আলোচনা করে দেখি।’

জলি তাড়াতাড়ি এসে বাধ্য মেয়ের মত ক্রিস্টিনার খাটের কিনারায় বসে। ক্রিস্টিনা আবার তাকে প্রশ্ন করে… ‘তুমি কি আমায় ভালবাস?’ এবার জলি ইতিবাচকভাবে মাথা নাড়ে।

ক্রিস্টিনা তাকে হালকা হাতে স্পর্শ করে… ‘সেকথা তো আগেই বলতে পারতে!’



(চলবে)
0

ধারাবাহিক - শৌনক দত্ত

Posted in




















১৯. বিজন ঘরে বিজন ভট্টাচার্য





হৃদীবরেষু সুস্মি,

তোমার চিঠি পেলাম। আমার চিঠি এতদিনে তোমার কাছে পৌঁচ্ছালো নিশ্চয়। খোয়া গেলো নাকি? তবে কি দেরীতে পৌচ্ছাবে? বুঝতে পারছিনা। দিনগুলো সোনার খাঁচায় নেই কবেই ফ্যাকাসে হয়ে গেছে সব। গান ছেড়েছি সেই কবে এখন আর সুর নেই সব বেসুরা বাজে! এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেলো এইমাত্র। বাতাসে সোঁদা গন্ধ। আলো অস্পষ্ট ধোয়াশার মতন। পৃথিবী যেন এইমাত্র স্নান সেরে শুভ্রতাকে আলিঙ্গন করেছে। ভেজা চওড়া রাস্তা, ডান পাশের গলি, রায়বাড়ির বাগান থেকে ঝুঁকে আসা নারকেল গাছ, একটি ছাদের প্যারাপেটে একঝাঁক শালিক, কিছু ব্যস্ত মানুষ রিকশায়, স্কুলযাত্রী বাচ্চাছেলে। বারান্দার দরজা খুলে দাঁড়িয়েছিলাম অনেকক্ষণ। সন্ধ্যা নেমেছে আমার বিজন ঘরে গানটা তোমার খুব প্রিয় ছিল এটা জানার পরেই গানটা নিজে নিজে গলায় তুলে ছিলাম। প্রথম যেদিন তোমাকে গানটা শুনিয়ে ছিলাম সেদিন সন্ধ্যায় বৃষ্টিতে ভেসে যাচ্ছিল চরাচর। লোডসেডিং মোমবাতির আলোয় মুখোমুখি বসেছিলাম দুজন মনে পড়ে? এখন অবশ্য বিজন ঘরে গানটির চেয়েও বেশি মনে পড়ছে শম্ভু মিত্র, তৃপ্তি মিত্র, ঋত্বিক ঘটকদের মতন আরেক নাট্যব্যক্তিত্ব বিজন ভট্টাচর্যকে। বাঙালির অদ্ভুত এক ধরনের গ্রহণ-বর্জনের ছাঁকনি আছে। বিজন ভট্টাচার্য-কে আমরা সে রকমই আমাদের পরিচিত বা চর্চিত বৃত্তের বাইরেই সসম্মানে সরিয়ে রেখেছি। খেয়াল করে দেখবে বাংলা থিয়েটার নাটক নিয়ে যত কথা হয় তাঁর কর্মীদের নিয়ে যত আলোচনা সমালোচনা হয় সেখানে বিজন ভট্টাচার্য কেমন যেন আড়ালের মানুষ! বাংলা নাট্যান্দোলন নিয়ে কথা হলেও দেখি তাঁর সহকর্মীদের নাম যেভাবে উল্লাসে উচ্চারিত হয় বিজন ভট্টাচার্য নামটি সেভাবে উচ্চারিত হয়না, একুশ শতকে পৌঁছেও বিজন ভট্টাচার্যের নাট্যদর্শন এবং সমাজভাবনা নিয়ে আলোচনা করতে ‘ভয়’ পায় বাংলা মঞ্চ। অথচ বাংলা সাহিত্য ও নাটকের ইতিহাসে তাঁর পরিচয় শুধুই ‘নবান্ন’!

বিজন ভট্টাচার্য-এর মনস্তাত্ত্বিক গঠন বুঝতে হলে খানিক ইতিহাস ঘাঁটতে হবে, সেখানে দেখবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরুর সময় বিজন বাবুর বয়স সাত আট বছর। ১৯১৮ সালের ১১ নভেম্বর প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলো তখন তার যা বয়স তিনি বোঝেন সবই। এরই মধ্যে ঘটে গিয়েছে বলশেভিক বিপ্লব ও সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত রাশিয়ার আবির্ভাব। বদলে গিয়েছিল বিশ্বের মানচিত্র। এদেশে তখন স্বাধীনতা আন্দোলন গতি পেয়েছে গান্ধিজি্র নেতৃত্বে। ১৯২০ সালের ৩০ অক্টোবর-২ নভেম্বর মুম্বাইয়ের এম্পায়র থিয়েটারে সম্মেলনের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠা লাভ করে অল ইন্ডিয়া ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস (এআইটিইউসি)। ১৯২২ সালে গঠিত হয় বেঙ্গল ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন। ১৯২২ সালে যে ১০টি ইউনিয়ন নিয়ে বেঙ্গল ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন গঠিত হয়েছিল তার কোনোটাতে শ্রমিক সদস্য ছিল না। অর্থাৎ শ্রমিক আন্দোলন ছিল অশ্রমিক পেশাজীবীদের হাতে। ১৯২৩-২৪ সাল থেকে প্রচেষ্টা শুরু হলেও ১৯২৬-২৭ সাল থেকে কমিউনিস্টরা জোরেশোরে ট্রেড ইউনিয়ন পরিচালনায় অংশ গ্রহণ করতে থাকে। সংস্কারবাদী নেতৃত্বের পরিবর্তে শ্রমিকরা নিজেরাই ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনে কমিউনিস্ট নেতৃত্বকে সাদরে গ্রহণ করছিল। চটকল, সুতাকল, ম্যাচ, ট্রাম কর্পোরেশনের সাফাইকর্মীদের বিদ্যমান সংগঠনগুলোতে সহজেই নেতৃত্বে আসীন হয়ে যান কমিউনিস্ট ট্রেড ইউনিয়ন কর্মীরা। ১৯২৮-২৯ সালে বাংলা প্রদেশে শ্রমিক আন্দোলন তুঙ্গে উঠে। এইসব যখন ঘটছে তিনি তখনো কলকাতা আসেননি। ১৯৩০এ ১৫বছরের তরুণ বিজন চলে এলেন কলকাতায়, ভর্তি হলেন আশুতোষ কলেজে। ছাত্র অবস্থাতেই সক্রিয়ভাবে অংশ নিলেন স্বাধীনতা আন্দোলনে। ফলে অসম্পূর্ণ থেকে গেলো কলেজ শিক্ষা। আনন্দবাজার পত্রিকার প্রখ্যাত সাংবাদিক সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার ছিলেন বিজনের মামা। বিজন চাকরি পেলেন আনন্দবাজারে ১৯৩৮-৩৯এ। ছোট ফিচার লেখা দিয়ে শুরু হল তাঁর লেখক জীবন। বাংলায় কমিউনিস্ট পার্টির প্রভাব বাড়ছে যখন তখন ১৯৩৪ সালের ২৩ জুলাই ব্রিটিশ রাজ ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ১৯৩৫ সালের মার্চ মাসে কলকাতার ১৩টি কমিউনিস্ট মনোভাবাপন্ন গণসংগঠনকে নিষিদ্ধ করা হয়। নিষিদ্ধ পার্টির কাজ থেমে থাকেনা। দ্বিতীয় বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলনও গোপনে অনুষ্ঠিত হয় চন্দননগরে ১৯৩৮ সালের নভেম্বর মাসে। ৫০ জন প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। সম্পাদক নির্বাচিত হন নৃপেন চক্রবর্তী। অন্যান্য সদস্যরা ছিলেন মুজফ্ফর আহমেদ, আব্দুল হালিম, সোমনাথ লাহিড়ী, রণেন সেন, পাঁচুগোপাল ভাদুড়ী ও গোপেন চক্রবর্তী। ১৯৩৯ সালে পাঁচুগোপাল ভাদুড়ীকে সম্পাদকের দায়িত্ব দেয়া হয়। বিজন ভট্টাচার্য ১৯৪০এ মুজফ্ফর আহমেদের সান্নিধ্যে আসেন ও আকর্ষিত হন কম্যুনিস্ট পার্টির প্রতি। ১৯৪২ সালের ২৩ জুলাই ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি এবং গণসংগঠনসমূহের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়। বিজন ভট্টাচার্য কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ পেলেন ১৯৪২এ। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পর ১৯৪৩ সালের ১৮-২১ মার্চ বঙ্গীয় প্রাদেশিক কমিটির তৃতীয় সম্মেলন কলকাতার ওয়ালিংটন স্কোয়ারে অনুষ্ঠিত হয়। ভবানী সেন সম্মেলনে রাজনৈতিক-সাংগঠনিক রিপোর্ট উত্থাপন করেন। সম্পাদক নির্বাচিত হন ভবানী সেন। ১৯৪৪এ আনন্দবাজারের চাকুরি ছেড়ে হলেন কমিউনিস্ট পার্টির সর্বক্ষণের কর্মী বা হোলটাইমার।

এই দৃশ্যপট আত্মস্থ করলে বিজন ভট্টাচার্য ও তাঁর সৃষ্টিকে বুঝতে সহজ হয় কেননা তাঁর নাট্যচিন্তা ও সৃজনের মূল উৎস ছিল শোষিত-নিপীড়িত-বঞ্চিত মানুষের প্রতি গভীর সহানুভূতি ও সমাজ পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা। বুঝতে শেখার কাল থেকে তিনি বিপ্লবই দেখেছেন তাই হয়ত দিনবদলের স্বপ্নে ছিলেন বিভোর। নাটককে তাই কেবল একটা ‘পারফর্ম্যান্স’ হিসেবে দেখতেন না। সমাজ বদলের হাতিয়ার বলতে তিনি বিশ্বাস রেখেছিলেন শিল্পে। থিয়েটারকে তিনি মনে করতেন সাধারণ মানুষের কথন। যা কেবল সাধারণ মানুষের ভাল-মন্দ-দ্বিধা-দ্বন্দ্বের কথা বলবে না। নাটকের মধ্য দিয়ে মানুষও হয়ে উঠবেন সেই গল্পের এক-একজন কুশীলব। দর্শক এবং রঙ্গকর্মী সকলে একত্রে ঢুকে পড়বেন থিয়েটারের অঙ্গনে। তার পরে বিপ্লব ঘটে যাবে। জীবন, রাজনীতি এবং থিয়েটার নিয়ে এ ভাবেই মিলেমিশে ছিলেন বিজন ভট্টাচার্য কোনও একটি সত্তাকে বাদ দিয়ে তাঁর অন্য সত্তাকে বোঝা মুশকিল। যাপন-অর্থনীতি-রাজনীতি-পরব— সব নিয়ে মাখামাখি যিনি, তিনি নিজেই আসলে একটা থিয়েটার! মোনোলগ। আমাদের চোখে দেখা বামপন্থা রাজনীতির সাথে সেইসময়ের রাজনীতিকে মেলানো যাবেনা কিছুতেই আর তাই সেই সময়কালে উঁকি দিলে দেখা যাবে একদিকে বিশ্বযুদ্ধের সর্বগ্রাসী প্রভাব অন‍্যদিকে আভ‍্যন্তরীণ রাষ্ট্রবিপ্লব – এই দুয়ে মিলে বাঙালির সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবন নিদারুণভাবে বিপর্যস্ত করেছিল। অসহায় অগণিত ছিন্নমূল মানুষ পুরানো শিকড় ছেড়ে পাড়ি দিল আরো অন্ধকার অনিশ্চয়তার পথে। যুদ্ধ, মন্বন্তর, দাঙ্গা সমবায়ে দেশভাগ বাঙালির জীবন করাল বিপর্যয়, কুৎসিত বিভীষিকার সামনে দাঁড় করিয়ে দিল। ভৌগলিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনে সামাজিক পারিবারিক পরিবর্তনকেও ত্বরান্বিত করল। বাঙালি পরিবারের আদর্শের বদল ঘটল, একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে গেল, শ্রম ও বিত্তের ভিত্তিতে সমাজ গড়ে উঠল, মেয়েদের গৃহপালিত লজ্জা খসে গেল, সর্বোপরি বেদনা ও বঞ্চনা তাদের নিত‍্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়াল। স্বাভাবিকভাবেই এর প্রভাব পড়ল সংস্কৃতি জগতেও। ছায়াসুনিবিড় গ্রামের পটভূমি বদলে গেল শ্রী হীন কোলাহলময় শহরতলিতে, নাট‍্যকার‌ও অভিনিবেশ করলেন জীবনের রূঢ় সত‍্য প্রতিষ্ঠায়। এবং এর সঙ্গে নাট‍্যকার বিষয়ের গুরুত্বকে অতিক্রম করে আঙ্গিকের অভিনবত্বের ব‍্যাপারে ঝুঁকলেন। পরিচিত রূঢ় বাস্তব ভরা কাহিনি নয়, তার উপযুক্ত সাধারণের জন‍্য বাহুল‍্য বর্জিত বাস্তব মঞ্চ‌ই দর্শককে আকর্ষণ করবে — এই ভাবনা থেকেই নাটকগুলিতে দর্শকের সঙ্গে সমন্বয় করার প্রয়াস দেখা দিল। এবং এই ভাবনা থেকেই নাট‍্যসাহিত‍্যের ইতিহাসে গণনাট‍্যের জন্ম দিল। অর্থাৎ গণনাট‍্যের উদ্ভব ঘটল সমাজমানসের এক রাজনৈতিক ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক কার্যকারণে।

'গন্ধর্ব', বিজন ভট্টাচার্য বিশেষ সংখ্যায় কেমন করে নাট্যের অন্দরে প্রবেশ করলেন বিজন ভট্টাচার্য, সে হদিশ পাওয়া যায় তাঁর নিজস্ব বয়ানে— "১৯৩০ থেকে আমি কলকাতায়, তার আগে গ্রামে ছিলাম। অনেকদিন ছিলাম বসিরহাট সাতক্ষীরায়। সেইজন্য পূর্ব ও পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত আঞ্চলিক ভাষা আমার জানা ছিল। আমার ভীষণ ভালো লাগত ঐ গ্রামের মানুষদের সঙ্গে থাকতে, ওদের সঙ্গে মিশতে। আমি লক্ষ করেছিলাম ওদের রিএ্যাকশন কী হয়, ওরা কেমন করে কথা বলে। অসুখে কেমন করে কষ্ট পায়। এই মাটিটাকে খুব চিনতাম, ভাষাটাও জানতাম। আমাকে যা ভীষণভাবে কষ্ট দিত, কোন্‌ আর্টফর্মে আমি এদের উপস্থিত করতে পারব। তারাশঙ্কর বা শরৎ চাটুজ্জের মত আমার কলম ছিল না, কিন্তু আমি দেখতাম তাঁরা তো কিছুই করছেন না। আমার জ্বালা ধরতো কারণ আমি বরাবরই জাতীয় আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলাম, কখনো 'ফ্রিন্‌জ'-এ কখনো ভেতরে ছিলাম।" সময়কাল মাথায় রাখলে দেখা যায় সেইসময় বাংলা রঙ্গমঞ্চে পেশাদারি বাণিজ্যিক নাট্যশালায় চলেছে সমাজজীবনের বিপর্যয় থেকে উটপাখির মত মুখ লুকিয়ে গতানুগতিক ঐতিহাসিক, পৌরাণিক এবং উচ্চবিত্ত-মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের সমাজজীবনের রঙিন ছবিসর্বস্ব নাটকের রমরমা। আবেগসর্বস্ব জাতীয়তাবাদ, ব্যক্তিকেন্দ্রিক ভাবপ্রবণতা, দেবলীলার ভক্তিভাষ্য, ধর্ম ও দেশাভিমান এবং সস্তা সেন্টিমেন্টের তরল আবেগসর্বস্বতার সীমাবদ্ধ গণ্ডিতেই চলছিলো বাংলা নাটকের চর্বিতচর্বণ। বিজন ভট্টাচার্য যখন বাংলা মঞ্চে কাজ শুরু করেছেন সেই সময় বাংলাদেশের সামাজিক অবস্থার দিকে তাকালে দেখবে শতাব্দীর বীভৎসতম মন্বন্তরে মৃত্যু হচ্ছে লক্ষ লক্ষ মানুষের, শহর কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় 'ফ্যান দাও মা'-র মর্মভেদী চীৎকারে চরম বীভৎসার মুখোমুখি বাংলার মানুষ, শিল্পী সাহিত্যিকরাও দলমত নির্বিশেষে পথে নেমে পড়েছেন সেই দুঃসময়ের দিনে, 'আমাদের নবজীবনের গান'-এর স্রষ্টা কালজয়ী সঙ্গীতস্রষ্টা জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রর এক লেখায় পাই সেই সময়ের ছবি— "১৯৪৩ সাল, বাংলায় ১৩৫০। গোটা বাংলাদেশ জুড়ে বিশেষ করে শহর কলকাতায়, মহামন্বন্তরের করাল ছায়া চারদিক অন্ধকার করে দিল। আর ঘরে থাকা যাচ্ছিল না। জমাট সাহিত্যিক আড্ডা ও রিহার্সাল ছেড়ে আমরা সবাই রাস্তায় নেমে পড়লাম, চরম বিপর্যয় ও বীভৎস মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়ালাম।" এমন একটা চরম দুঃসময়ের দিনে কি অবস্থান ছিল বিজন ভট্টাচার্যের? জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রর মতে ভারতীয় ভাষায় গণ নাটকের প্রথম স্রষ্টার আর এক জীবনসংবেদী শিল্পী প্রবাদপ্রতিম চিত্রপরিচালক ঋত্বিক ঘটকের বয়ানে শোনা যাক সেই ভূমিকার কথা— "বিজনবাবুই প্রথম দেখালেন কি করে জনতার প্রতি দায়িত্বশীল হতে হয়, কি করে সম্মিলিত অভিনয়-ধারার প্রবর্তন করা যায় এবং কি করে বাস্তবের একটা অংশের অখণ্ডরূপ মঞ্চের উপর তুলে ধরা যায়। আমরা যারা এমন চেষ্টা করেছিলাম, সেসব দিনের কথা ভুলব না। হঠাৎ একটা প্রচণ্ড আলোড়ন বাংলার একপ্রান্ত থেকে আর এক প্রান্তকে বিদ্যুৎস্পৃষ্ঠবৎ শিহরিত করে তুলল।" ঋত্বিক ঘটক বর্ণিত সেই বিদ্যুৎশিখার নাম 'নবান্ন', যে নাটককে শম্ভু মিত্রও অভিহিত করেছেন 'এপিক নাটক' হিসাবে, শম্ভু মিত্র বলেছিলেন ‘নবান্ন’-র আগে অবধি আমাদের সব ট্র্যাজেডিই পারিবারিক ট্র্যাজেডি; ‘নবান্ন’ এল এপিকের ব্যপ্তি নিয়ে। কী বলতে চেয়েছিলেন শম্ভুবাবু? যাকে বলা যায় নাট্য সংহতি ও নাট্য প্রবহমানতা, তা পুরোপুরি অস্বীকৃত হয়েছিল প্রবল সাহসী এই নাটকে। এই নাট্য আধুনিকতার মূল ভাষ্যের প্রতি নজর রেখে মুহূর্তনির্ভর। দৃশ্যের পর দৃশ্য জুড়ে আছে কান্নার একটি অদৃশ্য সুতো দিয়ে। তাই শম্ভু মিত্র বলেন— ‘একটা দৃশ্যে কুঞ্জকে কুকুরে কামড়েছে। শোভা কুকুরকে লক্ষ্য করে ওয়াইল্ডলি শাউট করে তারপরই সফটলি বলে: জল খাবে? জল তেষ্টা পেয়েছে?’ মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য এই দৃশ্য দেখে বলেছিলেন, এটা শাশ্বত। এই মুহূর্তের জয় আধুনিকতার জরায়ুতে নিহিত। বোদলেয়ার, মার্ক্স ও নিৎসে-তে এই মুহূর্ত-বন্দনা ছত্রে-ছত্রে। বিজনবাবুর প্রথমাঙ্ক আর দ্বিতীয়াঙ্কের মধ্যে যাঁরা মিল খুঁজে পান না, অথবা শেষ অংশটিকে যাঁদের প্রক্ষিপ্ত মনে হয়, তাঁরা বুঝতেই পারেন না, যে তিনি আত্ম-আখ্যান রচনা করেননি, তাঁর মেধা নিবেদিত হয়েছে নাট্যসন্দর্ভ প্রণয়নে। এই সন্দর্ভধর্মিতা উনিশ শতকের শিল্পচর্চার একটি মূল অন্বিষ্ট। ‘নবান্ন’ একটি প্রকল্প, কিন্তু তা বাস্তবের অনুলিখন নয়। যে নাটকে আঁকা রয়েছে মানুষের আত্মিক অপমৃত্যু, মনুষ্যত্বের চরম লাঞ্ছনার মর্মস্পর্শী ছবি, নবান্ন নাটক রচনার তাগিদ ও মানসিকতা বোঝাতে গিয়ে বিজন বলেছেন—"সেই সময় ডি. এন. মিত্র স্কোয়ারের পাশ দিয়ে রোজ আপিস যাই। রোজই দেখি গ্রামের বুভুক্ষু মানুষের সংসারযাত্রা, নারী-পুরুষ-শিশুর সংসার। এক একদিন এক একটা মৃতদেহ নোংরা কাপড়ে ঢাকা। মৃতদেহগুলো যেন জীবিত মানুষের চেয়ে অনেক ছোট দেখায়। বয়স্ক কি শিশু, আলাদা করা যায় না, ... আপিস থেকে ফিরবার পথে রোজই ভাবি, এইসব নিয়ে কিছু লিখতে হবে। কিন্তু কীভাবে লিখব? ভয় করে গল্প লিখতে, সে বড় সেন্টিমেন্টাল প্যানপেনে হয়ে যাবে। "একদিন ফেরবার পথে কানে এলো, পার্কের রেলিঙের ধারে বসে এক পুরুষ আর এক নারী তাদের ছেড়ে আসা গ্রামের গল্প করছে, নবান্নের গল্প, পুজো-পার্বণের গল্প। ভাববার চেষ্টা করছে তাদের অবর্তমানে গ্রামে এখন কী হচ্ছে। আমি আমার ফর্ম পেয়ে গেলাম। নাটকে ওরা নিজেরাই নিজেদের কথা বলবে।"

'নবান্ন'র পর একের পর এক নাটক লিখেছেন বিজন ভট্টাচার্য। 'জীয়নকন্যা', 'গোত্রান্তর', 'দেবীগর্জন', 'মরাচাঁদ', 'কৃষ্ণপক্ষ', 'আজ বসন্ত', 'লাশ ঘুইর‍্যা যাউক', 'সোনার বাংলা', 'চুল্লী', 'হাঁসখালির হাঁস'। নাট্যদলও তৈরি করেছেন একের পর এক—ক্যালকাটা থিয়েটার গ্রুপ, কবচকুণ্ডল। দুঃখজনক হলেও সত্যি কি জানো বিশ শতকের বাংলা নাট্যকলার ইতিহাসে ট্র্যাজিক নায়কের প্রথমজন যদি হন শিশিরকুমার ভাদুড়ি, তা হলে ইতিহাসের ট্র্যাজিক নায়কের দ্বিতীয় দাবিদার সম্ভবত বিজন ভট্টাচার্য। তাঁর প্রথম পূর্ণাঙ্গ নাটক ‘নবান্ন’ (১৯৪৪) বাংলা নাটকের ইতিহাসকে নতুন করে লিখেছিল, অথচ এখন তাঁর নাটক কদাচিৎ অভিনীত হয়। শুধু তা-ই নয়, তাঁর নিজের দল ক্যালকাটা থিয়েটারের (১৯৫১) বাইরে, যাকে এখন গ্রুপ থিয়েটার বলা হয় তার সবচেয়ে সফল প্রযোজনাগুলির মধ্যে বিজন ভট্টাচার্য-এর কোনও নাটকের নাম করা যাবে না, এমনকী গণনাট্য সঙ্ঘও ‘নবান্ন’-র পরে তাঁর অন্য নাটক নিয়ে বেশি উৎসাহ দেখায়নি। এ বিষয়ে শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের প্রধান নাটককারদের মধ্যে বিজন ভট্টাচার্যই সম্ভবত সবচেয়ে অবহেলিত। তাঁর অনুজ নাটককারদের রচনা অন্য অনেক দল গ্রহণ করেছে— উৎপল দত্ত, বাদল সরকার, মনোজ মিত্র, মোহিত চট্টোপাধ্যায়— তাঁরা অন্য বহু দলকে নাটক-রসদ জুগিয়েছেন, এখনও তাঁদের নাটক অনেক দলের দ্বারা অভিনীত হতে দেখা যায়। অথচ যাঁর নাটক নিয়ে বাংলা নাটকের ইতিহাস পেশাদার রঙ্গমঞ্চ থেকে নিজেকে উপড়ে নিয়েছিল, এবং পেশাদার রঙ্গমঞ্চকে তার পরবর্তী নির্মাণের ক্ষেত্রে এক রকম অপ্রাসঙ্গিক করে তুলেছিল, সেই বিজন ভট্টাচার্যের পরেকার সৃষ্টিগুলি মূলত তাঁরই একার প্রযোজনা হয়ে রইল। তাও সবগুলি নয়, নিজের কয়েকটি নির্বাচিত নাটকই তিনি নিজে ক্যালকাটা থিয়েটারের এবং পরে কবচকুণ্ডলের (১৯৭০) হয়ে প্রযোজনা করে যেতে পেরেছিলেন। তারও মধ্যে একটি-দুটির বেশি একাধিক বার প্রযোজনা করতে পারেননি। একাধিক নাটক— যেমন ‘জননেতা’, ‘জতুগৃহ’, ‘অবরোধ’ তো প্রযোজিতই হয়নি। বিস্ময়ের কথা এই যে, নাকি বাংলা নাট্য-সংগঠনের ইতিহাসে এটা খুব বিস্ময়ের কথা নয়ও যে, কোনও এক বিচিত্র বিচ্ছেদ-রসায়নে তাঁর নিজের হাতে তৈরি নাট্যদল ক্যালকাটা থিয়েটারও তাঁকে ছাড়তে হয়।

আমার মনে বারবার ঘুরে ফিরে এসেছে একটি কথা বিজন ভট্টাচার্য ব্রাত্য কেন? তোমার কি মনে হয় বাঙালি বা বাংলা থিয়েটার তাকে ভাঁজ করে গুছিয়ে রাখে কেন? আমার কি মনে হয় জানো বিজন ভট্টাচার্যকে ধারণ করার মতন বীজতলা বাংলা থিয়েটারে নেই। রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত তাঁকে বলছেন ‘অযত্নে রুক্ষ প্রতিভাবৃক্ষ’। প্রথমে গণনাট্য সংঘ, পরে তাঁর নিজের গ্রুপ, ক্যালকাটা থিয়েটার এবং কবচ কুণ্ডল। প্রথমটাতে অধিক সন্ন্যাসীর গাজন, গ্রুপ দুটির ব্যাপারে বলা যায় একটি নাট্যদল গড়ে তোলা এবং সক্রিয়ভাবে টিকিয়ে রাখার সংগঠনক্ষমতা বা কৌশলের অভাব ছিল তাঁর চরিত্রে। তার থেকেই শৃঙ্খলাহীনতার জন্ম। সংগঠন এলোমেলো হলে সৃজনকর্মেও তার ছাপ পড়ে। তাই, যতই দুর্ভাগ্যজনক এবং ক্ষতিকর হোক না কেন, ঐ সময়ের নাট্যকর্মীদের ভাবনার জগতে বা মননে তেমন কোনও ছাপ ফেলতে পারল না বিজনবাবুর প্রযোজনা, একক অভিনয় প্রতিভায় যেমন পেরেছেন ‘মেঘে ঢাকা তারা’, ‘সুবর্ণলতা’ বা ‘পদাতিক’ ছবিতে, কিংবা উৎপল দত্তর ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ মঞ্চ-প্রযোজনায়।

যে সময়ে বিজন ভট্টাচার্য দেখতে বুঝতে শিখছেন সেই সময়ে কলকাতায় পেশাদারি থিয়েটার যথেষ্টই জনপ্রিয়। ক্লাসিক্যাল থিয়েটার কখনওই টানেনি তাঁকে। আকর্ষণ করেনি পেশাদার ব্যবসায়িক থিয়েটার। বিজন ভট্টাচার্যের বিষয় ভাবনার সঙ্গে মেলে না তাঁর প্রয়োগ ভাবনা। জীর্ণ পুরাতন মঞ্চ ব্যবস্থায় ব্যতিক্রমী নতুন চিন্তার নাটক! তাই হয়ত দল গোছাতে চাননি কখনো, অভিনয়কে, থিয়েটারকে বোধহয় খুব গোছালো ভাবে দেখতে চাননি বিজন ভট্টাচার্য বরং সংগ্রামের পথটাই ধরে রাখতে চেয়েছিলেন। নাট্যদল গড়ে তোলা এবং সক্রিয়ভাবে টিকিয়ে রাখার সংগঠনক্ষমতা বা কৌশলের অভাব ছিল তাঁর চরিত্রে। তার থেকেই শৃঙ্খলাহীনতার জন্ম। সংগঠন এলোমেলো হলে সৃজনকর্মেও তার ছাপ পড়ে। তাই, যতই দুর্ভাগ্যজনক এবং ক্ষতিকর হোক না কেন, ঐ সময়ের নাট্যকর্মীদের ভাবনার জগতে বা মননে তেমন কোনও ছাপ ফেলতে পারল না বিজন ভট্টাচার্য-র প্রযোজনা, একক অভিনয় প্রতিভায় যেমন পেরেছেন ‘মেঘে ঢাকা তারা’, ‘সুবর্ণলতা’ বা ‘পদাতিক’ ছবিতে, কিংবা উৎপল দত্তর ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ মঞ্চ-প্রযোজনায়। মনে রাখা প্রয়োজন তিনি বারবার বলেছেন, ওই ধরনের থিয়েটারের রীতি, শৈলী কোনও কিছুই তাঁকে আকর্ষণ করেনি। নাটক রচনার ক্ষেত্রেও নয়, পরিচালনার ক্ষেত্রেও নয়। বরং তাঁকে নাটক লিখতে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে রেশনের লাইন। যেখানে তিনি দেখেছেন, ধর্ম-জাতি-সামাজিক স্তরের বেড়া ভেঙে সকলে একত্রে দাঁড়িয়েছেন। যোগাযোগ তৈরি হয়েছে একের সঙ্গে অপরের। কথোপকথন হয়েছে। শুধু তাই নয়, এই লাইনেই তিনি দেখেছেন, সংকীর্ণ স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে প্রশাসন, জোতদারের বিরুদ্ধে শ্রেণিস্বার্থ না ভেবে একত্রে প্রতিবাদ করছে জনসাধারণ। ওই জনসাধারণের মধ্যেই কমিউনিস্ট আস্ফালন দেখেছিলেন। বিজন ভট্টাচার্য বাংলা নাটকের ইতিহাসে এক বিপ্লবী ব্যক্তিত্ব হলেও, মূলধারার আলোচনায় তিনি যে উপেক্ষিত তার কারণ খুঁজতে গিয়ে পাই তাঁর আপসহীন, বোহেমিয়ান ব্যক্তিত্ব এবং দলীয় রাজনীতির অনুগত না থাকা, গণনাট্য আন্দোলনের (IPTA) প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হয়েও তিনি বাণিজ্যিকীকরণের বিরোধিতা করেছিলেন, যার ফলে তৎকালীন রাজনৈতিক গোষ্ঠী ও মূলধারার সাংস্কৃতিক চর্চা থেকে তিনি দূরত্বে থেকে গিয়েছেন। তাঁর নাটকগুলো ছিল চরমভাবে সময়-নির্দিষ্ট (Period-specific)। প্রচারধর্মিতা এবং উচ্চকিত সাম্যবাদী আদর্শের প্রভাব ছিল স্পষ্ট। বর্তমানের দর্শকরা 'বক্তৃতা'ধর্মী বা 'আদর্শবাদী' নাটকের চেয়ে সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা বা পরাবাস্তববাদী (Surrealist) নাটক বেশি পছন্দ করে। কবি মণীন্দ্র রায় একবার বিজনবাবুকে এইসব নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন। উত্তরে তিনি বলেন “এ দেশে এসব প্রত্যাশা থাকলে কবিতা লেখা বা নাটক করা বন্ধ করে দেওয়াই ভাল। তোমার উপায় নেই তাই তুমি কবিতা লেখো, আমারও উপায় নেই বলে নাটক করি। ঋত্বিক যে সিনেমা করে তাও একই কারণে। অন্য কোন উপায় থাকলে করত না। আমরা তো আর কিছু করতে জানি না, তাই করে যেতে হবে। কিন্তু করতে গিয়ে তো আর অন্য দলে নাম লেখাতে পারব না, কারণ এই রাজনীতিটা আমার বিশ্বাসের জায়গা।”আরেকটি বড় কারণ হতে পারে নাটকগুলোর ভাষা বিজন ভট্টাচার্য তাঁর নাটকে খাঁটি গ্রামীণ এবং আঞ্চলিক উপভাষা ব্যবহার করতেন। বর্তমানের নগরায়ণের যুগে এবং ভাষার বিবর্তনের ফলে সেই আদিম ও প্রাকৃত ভাষা অনেক সময় আজকের দর্শকদের কাছে দুর্বোধ্য বা কৃত্রিম মনে হতে পারে। ভুলে গেলে চলবেনা মঞ্চের ভাষা আর কথ্য ভাষা নিয়ে দীর্ঘ দিন কাজ করেছেন বিজন। কাজে লেগেছিল ’৪২-’৪৩ সাল জুড়ে সমগ্র বাংলা প্রদেশ পরিক্রমা। বিজন ভট্টাচার্য গবেষক শমীক বন্দ্যোপাধ্যায় মনে করেন, ‘টুনে, মালো, বেদে শোলার কারিগর, প্রতিমাশিল্পী, সাপুড়ে, আউল-বাউল, জেলে, এমন নানা সম্প্রদায়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ মেলামেশার মধ্য দিয়ে বিজনবাবু তাদের লোকাচার, জীবনদর্শন, লোকশ্রুতি, সংস্কার ও বিশ্বাস, ভাষা, কথার টান ও সুর আত্মস্থ করেছেন। ওই অভিজ্ঞতা ও শিক্ষাই তাঁর নাটকের ভাষা ও চাল নির্ধারণ করেছে।’নিখুঁতভাবে খেয়াল করলে দেখবে অঞ্চল ভেদে ডায়লেক্টের তফাতকেই নাটকে বারবার ব্যবহার করার চেষ্টা করেছেন বিজন ভট্টাচার্য। আইপিটিএ ছাড়ার পরে নিজের দলেও সেই ডায়লেক্ট ভিত্তিক সংলাপের উপরেই জোর দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর দলের অভিনেতারা অনেকেই পরে বলেছেন, উচ্চারণ নিয়ে কী ভয়ংকর খুঁতখুঁতে ছিলেন তিনি! ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঠিক উচ্চারণের জন্য লড়াই করে যেতেন। ব্যক্তিজীবনও তাকে বিস্মৃতির দিকে ঠেলে দিয়েছিল, মহাশ্বেতা দেবীর সাথে দাম্পত্য বিচ্ছেদ এবং জীবনযুদ্ধে টিকে থাকার ব্যক্তিগত সংগ্রামও তো কম নয় তাঁর! বিজন ভট্টাচার্য শুধু গল্পকার, নাট্যকার, গীতিকবি বা অভিনেতা নন, শুধু ঋত্বিকের সমধর্মী এক শিল্পী নন, নিজ-অধিকারী এক চিন্তাবিদ।এত বিচিত্র সম্বল নিয়েও মানুষটি ইতিহাসের শিকার হয়ে গেলেন, এই যা দুঃখ। তবে আমার বারবার মনে হয় বিজন ভট্টাচার্যের নাটকের আর্তি ও হাহাকার আজও প্রাসঙ্গিক। ক্ষুধার জ্বালা বা ভিটেমাটি হারানোর যন্ত্রণা আজও পৃথিবীর বহু প্রান্তে সত্য। বিজন ভট্টাচার্যের আর্তিগুলোকে যদি প্রতীকী (Symbolic) বা এক্সপ্রেশনিস্টিক ঢঙে উপস্থাপন করা যায়, নাটকের ভাষাকে কেবল মেদিনীপুর বা গ্রামীণ উপভাষার শিকলে না বেঁধে, তার ভেতরের সার্বজনীন মানবিক আর্তনাদকে গুরুত্ব দেয়া যায় কেননা 'ক্ষুধা'র কোনো ভৌগোলিক সীমানা বা ভাষা নেই। বর্তমান পৃথিবীতে জমিদারের লাঠিয়াল না থাকলেও সাম্রাজ্যবাদের মোড়কে করপোরেট আগ্রাসন আর অদৃশ্য পুঁজির শোষণ আছে। বিজন ভট্টাচার্যের শোষিত কৃষকের চরিত্ররা যদি আজকের দুনিয়ার 'প্রান্তিক শ্রমজীবী'র ছায়া হয়ে ওঠে আর সেই ভাবনাকে যদি নতুন করে মঞ্চস্থ করা যায় তবে সেই নাটক আগের চেয়েও বেশি বিস্ফোরক হয়ে উঠবে। এবং তা অবশ্যই আজকের আধুনিক দর্শকদের স্নায়ুকে নাড়া দিতে বাধ্য।

বিজন ভট্টাচার্য বিস্মৃত নন, বরং আমরা তাঁর সৃষ্টিকর্মকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে ভয় পাচ্ছি। তাঁর নাটকগুলোকে কেবল 'ঐতিহাসিক দলিল' হিসেবে মিউজিয়ামে না রেখে, আজকের সামাজিক অস্থিরতার আয়না হিসেবে ব্যবহার করা সময়ের দাবি। বিজন ভট্টাচার্যের নাট্যচর্চা আজ এক অদ্ভুত বৈপরীত্যে দাঁড়িয়ে। বিজন ভট্টাচার্য আসলে এমন এক শিল্পী, যিনি পচে যাওয়া সমাজকে ব্যবচ্ছেদ করতে শিখিয়েছিলেন। তাই যতক্ষণ পৃথিবীতে বৈষম্য আর হাহাকার থাকবে, ততক্ষণ বিজন ভট্টাচার্য ও তাঁর নাটককে 'অপ্রাসঙ্গিক' বলার সুযোগ নেই। যে 'নবান্ন' একদিন মেঠো পথ থেকে উঠে এসে কলকাতার মঞ্চ কাঁপিয়েছিল, আজ তা ক্রমশ মধ্যবিত্তের বিদগ্ধ 'বইয়ের তাকে' সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। শহরকেন্দ্রিক বামপন্থা বিজন ভট্টাচার্যকে একটি নির্দিষ্ট 'আইকন' বা 'নস্টালজিয়ায়' বন্দি করে ফেলেছে, যেখানে তাঁর প্রয়োগবাদী পরীক্ষা-নিরীক্ষার চেয়ে রাজনৈতিক আবেগই বেশি গুরুত্ব পায়। তাঁর ব্যবহৃত দেশজ ডায়লেক্ট বা আঞ্চলিক ভাষা আজ কেবল ভাষাতাত্ত্বিক কৌতূহল; আধুনিক মঞ্চে তার সেই আদিম, রুক্ষ ঘ্রাণ যেন নাগরিক মার্জিত উচ্চারণে হারিয়ে গেছে। থিয়েটার যখন দল থেকে দলে ঘোরে, তখন বিজনের সেই 'গণসংগ্রামের দর্শন' অনেক সময় কেবল উদযাপনের আনুষ্ঠানিকতায় রূপ নেয়। বর্তমানের ভোগবাদী সমাজে তাঁর সেই ক্ষুধার আর্তি আর ভিটেমাটি হারানোর যন্ত্রণা তাই যতটা না জীবন্ত দলিলে, তার চেয়ে বেশি মূর্ত হয় অ্যাকাডেমিক নস্টালজিয়ায়। বিজন কি তবে কেবল এক অতীতচারী স্মারক? নাকি আমাদের আধুনিক নাট্যভাবনা তাঁর সেই মাটির গভীরতাকে ধারণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে? আমি মনে করি বর্তমানের আধুনিক মঞ্চসজ্জা ও নাগরিক ভাষা বিজন ভট্টাচার্যর সেই আদিম ও রুক্ষ নাটকীয়তাকে ধারণ করার জন্য যথেষ্ট কিন্তু প্রশ্ন হলো, বর্তমানের নাট্যপরিচালকেরা কি রাজনৈতিক মেরুকরণের বাইরে গিয়ে বিজন ভট্টাচার্যর সেই 'আগুন'কে নতুন করে জ্বালানোর সাহস করবেন?

রাত অনেক হলো সারা পাড়া ঘুমিয়ে গেছে। ল্যাম্পপোস্টগুলো নিঃসঙ্গতায় দাঁড়িয়ে আছে নির্জন, পাড়ার কুকুরগুলো নানা সুরে ডাকছে দূরে কোথাও, আজ এখানেই শেষ করছি। সামনের সপ্তাহে পাহাড়ে যেতে পারি। ফিরে এসে তোমাকে লিখবো। নিরন্তর ভালো থেকো।

অন্তে প্রেম হোক

ঋষি

০৩ মার্চ, ২০২৬
0

ধারাবাহিক - রঞ্জন রায়

Posted in























পর্ব ২৬.১


কবি গিরিজাকুমার মাথুর বোধহয় শিবপালগঞ্জের প্রিন্সিপালকে দেখেই প্রেরণা পেয়ে
লিখেছিলেন —“হমনে বিতায়ী হ্যায় জিন্দগী কসালে কী, হমনে পরোয়া কভী কী ন কিসী
কী”।
অর্থাৎ “আমার জীবন ক্রমাগত সংঘর্ষের গাথা , লোকে কী বলল সে নিয়ে কখনও
ঘামাইনি মাথা”।
কেন বলছি, সব ব্যাপারে একগুঁয়েপনা, বৈদ্যজীকে ছেড়ে বাকি সবার সংগে তর্কে মেতে
কেবল নিজের মত আঁকড়ে ধরা এবং কথায় কথায় “কোই পরোয়া নহীঁ, সময় আসলে সব
ব্যাটাকে দেখে নেব” গোছের পংক্তি আউড়ে চলা – এসব ওনার জীবন-দর্শনের
অনিবার্য অঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
নিজের মতে অটল থাকার নীতি উনি নিজের বাবার থেকে পেয়েছিলেন।
ওনার বাবা এক অনারারি ম্যাজিস্ট্রেটের পেশকার ছিলেন-- অথচ অত্যন্ত সৎ।
ওনাকে বেশিরভাগ জীবন শহরে কাটাতে হত, কিন্তু সেখানেও পিতাশ্রী ওঁর গেঁয়োপনা
বেশ নিষ্ঠার সংগে চালিয়ে গেছেন। কিছু নিজস্ব নীতি নিয়ম ছিল, সেগুলো শত বাধাবিঘ্ন
সত্ত্বেও পাথরের মত নিরেট বুদ্ধির জোরে শক্ত হাতে পালন করতেন। সেগুলোর
কয়েকটি মণিমুক্তোঃ
এক, মলমূত্র ত্যাগের জন্যে কখনও বাথরুম পায়খানায় না যাওয়া। কারণ, ওসব
আমাদের প্রাচীন ঋষি-সংস্কৃতির প্রতিকূল।
দুই, কল থেকে জল না খাওয়া। কারণ, ওর মুখে চামড়ার ওয়াশার লাগানো থাকে।
তিন, রেলগাড়িতে যাত্রা করলে কিছু না খাওয়া। তাতে শূদ্রের ছোঁয়া আছে।
চার, খড়িবোলী হিন্দি এবং ইংরেজি ত্যাগ করে সদা অবধী ডায়লেক্টে কথা বলা। কারণ,
উনি এছাড়া অন্য কোন ভাষা শেখেন নি।
পাঁচ, চামড়ার নাগরা জুতো, ঝোলা গোঁফ এবং দু’ফেরতা টুপি পরা। কারণ, ওঁরা পিতৃদেবও
তাই পরতেন। ব্যস, এই পাঁচটি নীতিই ওর জীবনের মূল সিদ্ধান্ত, ওনার পঞ্চশীল।
একবার প্রিন্সিপাল সাহেব ওনার পিতাশ্রীর সংগে তর্কে মেতেছিলেন।
বিষয়ঃ “ বাড়ির ভেতরের পায়খানা ব্যবহার না করে সাত সকালে উঠে খালি রাস্তার
মাঝখানে নিত্যিকর্ম সারতে বসে পড়া নিতান্ত মূর্খতা”। উনি বোঝাতে চাইছিলেন যে


এরকম কাজ ঠিক নয়। কারণ, নাকায় বসে টোল ট্যাক্স আদায়ের দল আজকাল রাস্তায়
রাস্তায় সাফাই অভিযান চালাচ্ছে। ওদের চোখে পড়লে চালান হবার সম্ভাবনা।
এর জবাবে ওনার বাবা পেশকার সাহেব বললেন যে ব্যাপারটা আদর্শের বিষয়, বুদ্ধির
প্যাঁচ কষার নয়।
সেদিন প্রিন্সিপাল বুঝতে পারলেন – আমরা আদর্শের প্রশংসা করি তার অন্তর্নিহিত
মূল্যবোধের জন্যে নয়, বরং সেই আদর্শের পেছনে কত ত্যাগ, সহিষ্ণুতা, বলিদান আর
কষ্টভোগের ইতিহাস রয়েছে তার জন্যে।
উদাহরণঃ নমক কানুন ভঙ্গ করা হয়েছিল আমাদের দেশের দারিদ্র্য দূর করার
উদ্দেশ্যে নয়, বরং ওর পৃষ্ঠভূমিতে যে নিষ্ঠা এবং বিদ্রোহের ভাবনা ছিল সেটাই ওই
আন্দোলনকে নাটক হতে না দিয়ে ইতিহাসের পর্যায়ে নিয়ে গেছে।
প্রিন্সিপাল এই বিশ্লেষণ থেকে সিদ্ধান্তে পৌঁছলেন যে আদর্শের মহত্ব তার প্রতীক
হিসেবে, বাস্তব তথ্যের জন্যে নয়। তারপর এই যুক্তিকে উলটো করে উনি নতুন
সিদ্ধান্তে এলেন—ওঁর বাবা পঞ্চশীলে অটল ছিলেন, প্রতীক হিসেবে আদর্শ ব্যক্তি
বলা যায়। কিন্তু বাস্তব তথ্যের নিকষে দেখলে উনি একটি পাতি বাতেলাবাজ।
সে যাই হোক, প্রিন্সিপাল তাঁর বাবার নিষ্ঠা ও আদর্শ নিয়ে গল্পগুলো বেশ গর্বের
সংগে সবাইকে শোনাতেন। উনি স্বভাবে জেদি। যে কাজটায় যুক্তির নিতান্ত অভাব,
তাতেও জেতার জন্যে ছাতি ঠুকে বলতেন—ভেবেছটা কী! আমি সেই পেশকার সাহেবের
ব্যাটা!
উনি জানতেন যে নিজের এঁড়ে তর্কের স্বভাবটা উনি বাপের থেকে পেয়েছেন। কিন্তু এটা
জানতেন না যে অবধী বুলির প্রতি প্রেমও তাঁর পিতাঠাকুরের ঐতিহ্য থেকে পাওয়া।
রেগে গেলে বা উত্তেজিত হলে ওঁর মুখ থেকে ঝড়ের মত অবধী বুলি বেরিয়ে আসত, যেমন
অনেক হিন্দুস্তানির থেকে অনুরূপ পরিস্থিতিতে ইংরেজি বুলি।
এখন উনি বৈদ্যজীর সামনে কলেজের সমস্যাগুলো ব্যাখ্যা করছেন—অর্থাৎ খান্না
মাস্টারকে গাল দিচ্ছেন। একদিন আগে উনি পেনাল কোডের ধারা ১০৭ এর মামলায়
ম্যাজিস্ট্রেটের এজলাসে হাজির হয়েছিলেন। সেখানে ওনার চোখে মামলায় এক নতুন
প্যাঁচ চোখে পড়ল। কারণ, খান্না মাস্টারের উকিল নিজের বক্তব্যে কিছু এ’ধরণের কথা
বলছিলেনঃ
“ এই মামলা ‘হ্যাভ’ এবং ‘হ্যাভ নটস্‌’দের সংঘর্ষের ফল। একদিকে কলেজের
ম্যানেজার--যাকে সবাই ‘বৈদ্য মহারাজ’ বলে, যে ‘বৈদ্য’ কম ‘মহারাজ’ বেশি। ওনার
পেছনে শ’য়ে শ’য়ে চামচা ও গুন্ডার পাল। ওদের মধ্যেই রয়েছে প্রিন্সিপাল ও আট-


দশজন মাস্টার। এরা সবাই হয় ওঁর আত্মীয় অথবা আত্মীয়ের আত্মীয়। এদের সবার
আর্থিক অবস্থা খাসা, সংকটে পড়লে কলেজের ফান্ড থেকে উদ্ধার করা হয়।
শ্রীমন, অন্যদিকে রয়েছে খান্না এবং আরও আট দশজন মাস্টার—যাঁরা আর্থিক
দৃষ্টিতে গরীব। ওই ক্ষমতাবানের দল সবসময় কুটিল প্যাঁচ কষে এদের দমন করতে
থাকে। নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষের এটাই প্রধান কারণ”।
মাননীয় আদালত ইংরেজিতে বললেন, “অর্থাৎ, ঝগড়াটা মাছ ও রুটির ভাগাভাগির”।
উকিল নিজের কথাই খণ্ডন, মণ্ডন, সংশোধন, সংযোজন, পরিমার্জন করে ফের তার
পিণ্ডি চটকে দিয়ে বললেন-“ না, শ্রীমন। আমি ঠিক ওকথা বলতে চাইনি। বলছিলাম যে
ঝগড়াটা হল বিপরীত আদর্শের ফল”।
“একথা তো আগে বলেন নি”।
“বলতেই যাচ্ছিলাম শ্রীমন”, উকিল বলতে থাকল, “ জনগণের টাকা যেভাবে নয়ছয় করা
হচ্ছে সেটা খান্না মাস্টার এবং ওর চিন্তার শরিকদের কাছে অসহনীয় হয়ে উঠেছে।
শ্রীমন, এরা সব নবযুবক। বেইমান ও ভাঁড়ের সংগে মিলেমিশে থাকায় এখনও অভ্যস্ত
হয়নি”।
বিচারক মুচকি হেসে বললেন-“ এদের তো মামলা মোকদ্দমা এবং জেলে যাওয়ার ভয়
থাকা উচিত নয়”।
উকিল এই সুপরামর্শকে অগ্রাহ্য করে নিজের ব্যাখ্যা চালিয়ে গেল। “সেজন্যেই তো
ওরা কলেজে গণ্ডগোলের আশংকায় ওদের প্রতিবাদ সাংবিধানিক পদ্ধতিতে করে,
আওয়াজ তোলে। শ্রীমন, ক’দিন আগে কলেজে ম্যানেজারের নির্বাচন হল। তাতে স্রেফ
পিস্তলের জোরে বৈদ্য মহারাজ ফের ম্যানেজার নির্বাচিত হলেন। ডিপ্টি ডায়রেক্টর
অফ এডুকেশনের কাছে নালিশ করা হল। শুধু তাই নয়, খান্না এবং ওর সাথীরা ডিপ্টি
ডায়রেক্টরের সংগে দেখা করেছে। খুব শিগগির পুরো মামলার তদন্ত হবে। আবার বৈদ্য
মহারাজ যে কোঅপারেটিভ ইউনিয়নের ম্যানেজিং ডায়রেক্টর , সেখানেও টাকাপয়সা
তছরূপ ধরা পড়েছে। এই মামলাটা ছ’মাস চাপা পড়েছিল। খান্নার দল গিয়ে কোঅপারেটিভ
সোসাইটির রেজিস্ট্রারের সংগে দেখা করে ওর তদন্ত শুরু করিয়েছে। দরকার পড়লে
আমি ওই দু’জন সরকারি অফিসরকেও সাক্ষী দিতে এখানে পেশ করতে পারি।
“শ্রীমন, ওই তদন্তগুলো চলাকালীন খান্না ও সাথীদের ভয় দেখিয়ে চাপে রাখার জন্যেই
বর্তমান মামলা করা হয়েছে। বলতে গেলে এই মোকদ্দমাটাও একধরণের জালিয়াতি।
শ্রীমন---“।


প্রিন্সিপালের উকিল সেদিন এজলাসে কী বলেছিল সেটা তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। তবে
সেদিন প্রিন্সিপাল গ্রামে ফিরে এসে বৈদ্যজীকে বললেন যে কলেজের নির্বাচন এবং
কোঅপারেটিভের তহবিল তছরূপ—দুটো মামলারই তদন্ত হবে।
বৈদ্যজীর চেহারায় কোন পরিবর্তন দেখা গেল না। উনি শুধু ‘হরি ইচ্ছা’ বলে চুপ করে
রইলেন। কিন্তু প্রিন্সিপাল সাহেব কিছু একটা পাকাপাকি ভেবে এসেছিলেন এবং
উত্তেজিত হয়েছিলেন। তাই শুদ্ধ হিন্দির বদলে অবধী বোলিতে বলতে লাগলেনঃ
“মহারাজ, আমার মত হোল সমস্ত খান্না-টান্নাদের হাথ-পা ভেঙে কোন নালায় ফেলে
দেয়া হোক। এটা সম্ভব না হলে সবকটার কান ধরে কলেজ থেকে বের করে দেয়া হোক ।
ওদের পাছায় চার লাথ মেরে আর—“।
বৈদ্যজীর চেহারায় এসবের কোন প্রভাব পড়ল না। উনি বললেন, “ আমার হিংসক
কথাবার্তা পছন্দ নয়”। এবার উনি ঢেঁকুর তুললেন। প্রিন্সিপাল অপেক্ষা
করছিলেন—ফের ‘হরি ইচ্ছা’ শুনতে হবে। কিন্তু বৈদ্যজী কিচ্ছু বললেন না। বোধহয়
অহিংসা, পিস্তল দেখিয়ে চমকানো, তবিল তছরূপ, দেশের কল্যাণ – এইসব জটিল
সমস্যার জালে বাঁধা পড়ে উনি আপাতত চুপ করে রয়েছেন।


ভাটিখানা ছাড়িয়ে প্রায় একশ’ গজ এগিয়ে গেলে একটা অশত্থ গাছের দেখা পাওয়া যায়।
তাতে এক ভূতের বাসা। অনেক পুরনো ভূত। কত কী ঘটে গেল—দেশ স্বাধীন হোল,
জমিদারি প্রথা উঠে গেল, গ্রাম-সভা শুরু হল, কলেজ খুলে গেল—কিন্তু ভুত মরেনি।
যারা ভূতের ব্যাপারটা জানত তারা কেউ সূয্যি ডোবার পরে ওদিকটা মারাত না। কখনও
ওপাশ দিয়ে গেলে নানারকম শব্দ শোনা যায়। সেই সব আওয়াজ শোনার পর শ্রোতার
কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসত। জ্বর এলে বেশির ভাগ মরে যেত। যদি না মরে তো পণ্ডিত
রাধেলালের কাছে যেত। জনশ্রুতি উনি ভূতের ওঝা, ঝাড়ফুঁক পারদর্শী।
এক বিকেলে একজন সাইকেল আরোহী ওই অশত্থ গাছের নীচ দিয়ে যাচ্ছিল। ও ভূতের
কথাটা জানত। কিন্তু না গিয়ে উপায় নেই, গাছটা যে রাস্তার ধারে। তবে ওর আগে আগে
একটা ট্রাক ধীরে ধীরে যাচ্ছিল, ও পিছে পিছে। নইলে সাহস হত না। ট্রাকের পেছনের
লালবাতি এবং আকাশে সূর্য ডোবার পর যে দুয়েকটা লাল রেখা দেখা যাচ্ছে সেসবকেই ও
দিনের অন্ত হয় নি ধরে নিয়ে জায়গাটা পেরিয়ে গেল।
তারপর ও প্রাণভরে শ্বাস টানল। ফাগুনের হাওয়া বইছে, ওর গায়ে লাগছে—তার ছোঁয়ায়
ওর প্রাণ নেচে উঠল। ওর সাহস বেড়ে গেল। ও কোন কাল্পনিক জনতার উদ্দেশে
‘কটিলো কটিলো’ বলে তিতিরের ডাক ছাড়ল। তারপর অমর সিং রাঠোরের বীরগাথা নিয়ে


নামকরা যাত্রার গান—‘ নিকল গয়া জেইসে শের শিকারী কো মার’ – গুনগুন করতে
লাগল। গানের ভল্যুম ক্রমশঃ বেড়ে গেল।
হঠাৎ এক চমক। রাস্তার একদম ধার থেকে একটা আওয়াজ আসছে—‘গোঁ গোঁ গোঁ’!
এটা তো মানুষের নয়, নিঘঘাৎ ভূতের। সাইকেল আরোহীর উপরের শ্বাস বুকে আটকে
গেল। আর নিচের হাওয়া নিচের রাস্তা দিয়ে ফুস্‌। ওর মনে হল ভূত ব্যাটা কোন খবর
না দিয়ে এলাকা বদলে নিয়েছে। অশত্থ গাছের বাসা বদলে এখানকার পাকুড় গাছে
আস্তানা গেড়েছে।
আবার সেই ‘গোঁ গোঁ গোঁ’! এবার বেশ জোরে। সেই সঙ্গে দু’জন মানুষের গলার স্বর।
একজন জোরে জোরে হাসছিল। অন্যজন বলল, “বলছিলাম অত মাল খাস নে, কিন্তু কথা
শুনলে তো! আরও খা ব্যাটা”!
আর একদিন থেকে হেঁড়ে গলার গান ভেসে এল, ‘হামিদ ডাকু’ যাত্রার গানের দু’কলি। “ ন
কীজে শোরগুল চিকচিক, শীশ সবকো ঝুকাতে হ্যাঁয়”।
‘খামোখা কিচকিচ বন্ধ কর। দেখ, সবার মাথা নত হবে”।
তখনই ‘গোঁ গোঁ গোঁ’ আওয়াজে বেশ ক’বার আরোহ-অবরোহ শোনা গেল। প্রথমে কেউ গান
শুরু করার মত করে বলল- গোঁ গোঁ। তারপর কিছু ক্রিয়েটিভিটি দেখাবার ইচ্ছেয় চেঁচিয়ে
উঠল—‘বাঁচাও”! শেষে আবার সেই ‘গোঁ গোঁ গোঁ’। কিন্তু তাতে প্রাণ নেই, কেমন যেন
নিয়মরক্ষার মত শোনালো।
এবার ‘হামিদ ডাকু’ যাত্রার গায়ক তার গান থামিয়ে দিল। ফের ওর গলার স্বর—‘এত
করে বললাম বেশি খাস নে। ফোকটে পাওয়া দারু’! তারপর হেসে উঠে আবার ‘হামিদ
ডাকু’মার্কা গান গাইতে লাগল।
সাইকেল আরোহীর ভেতরে হাওয়া খারাপ হচ্ছিল বটে, কিন্তু সেসব ভূতের ভয়ে।
লোকজন দেখলে ওর ভয় করে না। মানুষের কথাবার্তা আর চিৎকার শুনে ওর মনে হোল
এখানে কিছু গণ্ডগোল কেস। ও সাইকেল থেকে নেমে গর্জে উঠল—“ ভয় পেয়ো না
পালোয়ান! আমি এসে গেছি। খবরদার! কেউ গায়ে হাত তুলবে না”!
পাকুড় গাছের পেছনে একটা ঝোপের মতন। তার পেছনে সন্ধ্যের আধো অন্ধকারে পাঁচ
ছ’জন লোকের চলাফেরা চোখে পড়ছে। নানারকম আওয়াজ আসছেঃ
‘গোঁ গোঁ গোঁ’!’
‘বাঁচাও’!
‘বেশি মাতলামি কোর না; বলেছিলাম এত খাস নে’!


‘ ন কীজে শোরগুল চিকচিক, শীশ সবকো ঝুকাতে হ্যাঁয়’।
সাইকেল আরোহী সতর্ক চোখে চারদিকে তাকাচ্ছিল এবং কোন অজানা ব্যক্তিকে
অজানা বিপদের হাত থেকে বাঁচাতে চেয়ে হুংকার ছাড়ছিল। এমন সময় ঝোপের পেছন
থেকে একজন বেরিয়ে এসে দুলকি চালে সাইকেলের কাছে এল। তার মুখ চোলাই মদের
গন্ধে ভুরভুর। ও সাইকেল আরোহীকে বেশ ডাঁট দেখিয়ে বলল, ‘কী ব্যাপার জোয়ান? কেন
চেঁচাচ্ছ? তোমার কিসে খুজলি হচ্ছে’?
আরোহী ঝোপের দিকে ইশারা করে বলল ,’ ওদিক থেকে বাঁচাও বাঁচাও চিৎকার শুনলাম
যে’!
‘এখানে সবকটা মাল টেনে বেহোঁশ। সব শালা মাতলামি করতে চায়! এখন তুমি কী করতে
চাও বলে ফেল’।
আরও দুই সাইকেল আরোহী রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল। এদের দেখে ওরাও সাইকেল থামিয়ে
নামবে না্মবে করছিল। ঝোপের পেছন থেকে আওয়াজ আরো জোরে জোরে আসছে, কিন্তু
কথা স্পষ্ট হচ্ছে না। ডাঁট দেখানো লোকটা গলার স্বর চড়িয়ে বলল, “ তোমার এখানে
থামার দরকার নেই। এসব গঁজহাদের মামলা। সব শালা মাল টেনে ভোম হয়ে আছে। তোমরা
নিজের নিজের রাস্তায় কেটে পড়”।
দুই সাইকেল আরোহী এমন উপদেশ শোনার পর সাইকেলের স্পীড বাড়িয়ে দিল। প্রথম
জন নাকটাক কুঁচকে যেতে যেতে বলল, “ সবক’টা লুচ্চা। এইসব মাতালের জন্যেই গোটা
এলাকা দুর্গন্ধে ভরে গেছে”।
মিলিটারি স্টাইলওলা জবাব দিল, “ঠিক বলছ জওয়ান, মদ খাওয়া ভাল নয়”।
(চলবে)
0

ধারাবাহিক - শৌনক দত্ত

Posted in




















১৮. মেঘে ঢাকা তারা ঋত্বিক ঘটক





প্রিয়বরেষু বাসু,



আজ ছুটিরদিন। শীত যাই যাই করছে, ব্যালকনিতে অলস দুপুর পা ছড়িয়ে বসে আছে। দুটি শালিক রোদ খুঁটে খাচ্ছে একমনে। ঘরে বাজছে রবীন্দ্রনাথ, এমন কর্মহীন দিনগুলোয় বড় একা লাগে কি করবো বুঝে ওঠতে পারি না। গতরাতে ঋত্বিক ঘটকের মেঘে ঢাকা তারা দেখলাম আবার! কতবার যে দেখেছি তাও মনে হয় নতুন দেখছি। আজ বেশ বেলা করে ঘুম ভেঙ্গেছে, সকালের চা নিয়ে অনেকটা সময় কেটেছে বইয়ের সাথে। তোমার চিঠি পাইনা বহুদিন। ঘুরে বেড়াচ্ছো নাকি কোচবিহারেই আছো বুঝতে পারছিনা। তোমারও কি এমন নির্জন সময় কাটে? নিঃসঙ্গ সময় কাটাতে তোমাকে লিখতে বসেছি। তোমার জীবনটাই ভালো, এতবছর পরে এই শান্ত দুপুরে বসে মনে হচ্ছে তুমিই সেরা যাপন বেছে নিয়েছ। বয়স বেড়ে যাচ্ছে, তাই প্রায়শ এই কর্মময় জীবন, ক্যারিয়ারের পেছনে দৌঁড় ঝাঁপ ছোটাছুটিকে মিথ্যে মনে হয়। তোমার লেখালেখির খবর কি বেনারস ভ্রমণের পরে তোমার লেখা তেমন চোখে পড়েনি। বইমেলায় নতুন কোন বই এসেছে কি তোমার?



ঋত্বিক ঘটক নিয়ে কদিন আগে তোমার একটা লেখা পড়ছিলাম, তোমার চোখে ঋত্বিক ঘটককে পড়তে পড়তে আমার বারবার মনে হচ্ছিল ঋত্বিক ঘটক নামটা উচ্চারণ করলেই সবাই সিনেমার কথা বলে কিন্তু ঋত্বিক ঘটকের চলচ্চিত্র জীবনের আড়ালে তাঁর নাট্যচর্চা এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে অনুচ্চারিত অধ্যায়। আত্মপ্রকাশ তথা বেশি মানুষের পৌঁছাবার সর্বোৎকৃষ্ট মাধ্যম হিসেবেই তিনি সিনেমা জগতে এসেছিলেন। এর চেয়ে জোরালো মাধ্যম পেলে তাকেই তিনি মান্য করতেন, এমন দৃপ্ত ঘোষণা তিনি করেছেন তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিমায়, ‘আমরা যখন মাঠে ময়দানে নাটক করতাম, তখন চার-পাঁচ হাজার লোক জমা হতো, নাটক করে তাঁদের একসঙ্গে rouse করা যেত। তখন মনে হলো সিনেমার কথা, সিনেমা লাখ লাখ লোককে একসঙ্গে একেবারে মোচড় দিতে পারে। এই ভাবেই আমি সিনেমাতে এসেছি, সিনেমা করব বলে আসিনি।’ ভবিষ্যতে সিনেমার চেয়ে শ্রেয়তর কোনো মাধ্যমের সন্ধান পেলে সিনেমাকে তিনি লাথি মেরে চলে যাবেন—এমন মন্তব্য তিনি করেছেন তাঁর লেখায়। না মশাই, সিনেমার প্রেমে আমি পড়িনি। সাফ বলে দিয়েছিলেন ঋত্বিক ঘটক। সেই সিনেমা, একসময় যাকে লাথি মেরে চলে যেতে চেয়েছিলেন তিনি। তাই বলে এটা বলছিনা ঋত্বিক ঘটকের সিনেমা ঋত্বিককে প্রতিনিধিত্ব করেনা বরং ঋত্বিকের সিনেমা আমাকে আজো মোহজালে আটকে রাখে। ‘আকাশ ভরা সূর্য তারা বিশ্ব ভরা প্রাণ’- এ বিখ্যাত গানটি ঋত্বিকের কোমলগান্ধার ছবিতে দেবব্রত বিশ্বাসের কন্ঠের সাথে যে পিকচারাইজেশন করেছেন তা দেখার পর থেকে অন্য রকম অনুভূতি হয়। যখনই এই গানটা শুনি তখন মনের পর্দায় ভেসে ওঠে কোমলগান্ধারের গানটির পিকচারাইজেশন- সুপ্রিয়া দেবী পাহাড়ের পাদদেশে বসে আছেন আর অনিল চ্যাটার্জি চোখে মুখে দুহাতে আনন্দের দারুণ অভিব্যক্তি ফুটিয়ে গানটির অন্তর্নিহিত মানব জনমের জয়গান গেয়ে হেলে দুলে হাঁটতে হাঁটতে গানটি গাইতে গাইতে তাঁকে অতিক্রম করে যাচ্ছেন। এ গানটির সাথে অনিল চ্যাটার্জির অভিব্যক্তি একই সাথে হাজির হয় আমার মানসপটে। প্রচণ্ড জীবনমুখী এ মহান শিল্পী, যিনি মানুষকে বলেছেন ‘মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও বাঁচতে চায়’, তাঁর পক্ষে এমন একটি অনুপম প্রাণবন্দনার রবীন্দ্রসঙ্গীত তাঁর সৃষ্টিতে প্রয়োগ দারুণ মানানসই। তাই বলে ঋত্বিক ঘটকের লেখা প্রথম নাটক জ্বালার কথা ভুলে গেলে চলবে কেন? সিনেমার ঋত্বিক ঘটক হয়ে ওঠার আগে তিনি নাটকের মঞ্চেই তাঁর সিনেমার চোখ তৈরি করেছিলেন। সুনীল দত্তের কোন এক লেখায় পড়ছিলাম ঋত্বিক কুমার ঘটক ডাকনাম ভবা’র একটি স্মৃতিকথা, ‘১৯৫০ সাল নাগাদ গণনাট্য সংঘে নতুন ভাবে সাংগঠনিক ও প্রয়োগরীতির কলাকৌশল নিয়ে বিতর্কের ঝড় উঠেছে। খোঁজা হচ্ছে নতুন ধরনের নাটক। সেই সময়ে ৪৬ ধর্মতলা স্ট্রিটে একটি যুবক এল, প্রায় ছ’ফুট লম্বা হবে। পায়জামা-পাঞ্জাবি পরা, চটি জুতো পায়ে, বগলে ছিল একটি পাণ্ডুলিপি, নাম ‘জ্বালা’। মৃণাল সেন গণনাট্য সংঘের সঙ্গে আগে থেকে ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তিনিই নিয়ে এসেছিলেন ঋত্বিক ঘটককে।’ ঋত্বিক তখন পি সি যোশির ‘ইন্ডিয়ান ওয়ে’ কাগজের বাংলার সংবাদদাতা। ‘জ্বালা’-র অঙ্কুর লুকানো ছিল এই সাংবাদিকতায়। কলকাতায় তখন পরপর আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে। সেই ঘটনার প্রতিবেদন থেকেই ‘জ্বালা’ নাটকের জন্ম। ঋত্বিক তাঁর প্রথম নাটক নিয়ে লিখেছেন, ‘সে সময় আমি একত্রিশটা সুইসাইড দেখে ‘সুইসাইড ওয়েভ ইন ক্যালকাটা’ লিখে পাঠালাম। এই ‘জ্বালা’ নাটকে তার থেকে সিলেক্ট করা ছ’টা চরিত্র ইচ ওয়ান ইজ় এ ট্রু ক্যারেক্টার। ‘জ্বালা’ ইজ় এ ডকুমেন্টারি।’ এ নাটক বহু বার অভিনীত হয়েছে। সম্ভবত ঋত্বিকের লেখা পাঁচটি নাটকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বার। রেডিওতে এক সময়ে নাটকটি ছদ্মনাম ভবেশ বাগচীর লেখা বলে অভিনীত হয়েছে। তুমি তো জানোই বাংলাদেশের পাবনার যে বংশে ঋত্বিকের জন্ম তার আদি পদবী ছিল বাগচী, পরে তাঁরা ঘটক উপাধি পেয়েছিল।



১৯৫১ সালে চলচ্চিত্র নির্মাণের যাত্রা শুরু হয় ঋত্বিক ঘটকের। প্রথম সিনেমা ‘বেদিনী’ মাঝপথেই অর্থাভাবে আটকে যায়। তবুও থেমে থাকেননি তিনি, নতুন গল্প ও চিত্রনাট্য নিয়ে শুরু করেন নতুন ছবি ‘অরূপ কথা’। সুবর্ণরেখা নদীর তীরে প্রায় ২০ দিন ধরে শুটিং হয় এই চলচ্চিত্রের। কিন্তু ক্যামেরায় ত্রুটির জন্য প্রকাশ পায়নি এটিও। এরপর শুরু করেন ‘নাগরিক’ ছবির কাজ। কিন্তু আর্থিক কারণে তখন মুক্তি পায়নি এই চলচ্চিত্রটিও। ১৯৭৭ সালে তাঁর মৃত্যুর এক বছর পরে মুক্তি পায় ‘নাগরিক’। পর পর তিনটি অপ্রকাশিত চলচ্চিত্রের যন্ত্রণা নিয়ে থেমে যাননি ঋত্বিক। ১৯৫৮ সালে প্রথম মুক্তি পায় মানুষ ও যন্ত্রের প্রেম নিয়ে তাঁর চলচ্চিত্র ‘অযান্ত্রিক’। ঋত্বিকের “নাগরিক”চলচ্চিত্রটিকে মনে করা হয় ভারতীয় চলচ্চিত্রের উত্তরণের এক নতুন যুগের সূচনা। যদিও অনেকেই হয়তো এ কথাও মেনে নেবেন, তাঁর বানানো যেকোনও ছবি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের বিজেতাদের কাজকে ম্লান করে দিতে পারলেও, তাঁর ছবিগুলো জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে বা আন্তর্জাতিক স্তরে যথাযথ প্রচারের উদ্দেশ্যে বিশেষ কিছুই করা হয় নি। তেমনি ঋত্বিকের জ্বালা নাটকের দিকে চোখ ফেরালে দেখবো শুধুই মৃত মানুষের যন্ত্রণা, আশাবাদের চিহ্ন কোথায়? অনেকে অবশ্য আপত্তি তুলেছিলেন নাটক অভিনয় নিয়ে। কিন্তু জ্বালা তো শুধু মৃত্যুর কথা বলে না। বলে এক সুন্দর দেশের কথা। যেখানে সব শান্তি, সব তৃপ্তি। কোথাও একটা আছে সেই দেশ। পথ খোঁজার শেষ হয়নি। খুঁজে পেতেই হবে সেই দেশটাকে। মানুষের উপরের খোলসটাকে বাদ দিলে যে অবিরাম আর্তনাদের মধ্যে সে চুপ করে বসে থাকে, ঋত্বিকের নাটক তন্ন তন্ন করে খুঁজে বেড়ায় তাকে। জ্বালা নাটকটি হৃদয়ের গভীরে উপলব্ধি করলে দেখা যাবে ‘যুক্তি, তক্কো আর গপ্পো’ সিনেমার শেষে নীলকণ্ঠ বাগচী বলেছিল, “সব পুড়ছে। ব্রহ্মাণ্ড পুড়ছে, আমি পুড়ছি।” কোথাও গিয়ে যেন মিলে যায় দুটি গল্প। নীলকণ্ঠের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন ঋত্বিক স্বয়ং। আবার শিল্পীজীবনের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে থাকা আগুনকে পান করে তিনি হয়ে উঠেছিলেন নীলকণ্ঠ। আকণ্ঠ মদ্যপান করে পুলিশের গুলিতে নীলকণ্ঠের তখন মৃতপ্রায়। দুগ্‌গাকে বলা এই অন্তিম সংলাপগুলিতে ঋত্বিক যেন এক নিঃশ্বাসে বলে যান নিজের জীবনের ক্লেদাক্ত বৃত্তান্ত। নীলকণ্ঠের পেটে বুলেটের ক্ষতের থেকেও বেশি যন্ত্রণাদায়ক হয়ে ওঠে ব্যর্থতা ও হতাশার গণ্ডি থেকে বেড়িয়ে আসার পণ্ডশ্রমের ক্লান্তি।



“আমি প্রতি মুহূর্তে আপনাকে ধাক্কা দিয়ে বোঝাব যে, It is not an imaginary story, বা আমি আপনাকে সস্তা আনন্দ দিতে আসি নি। …যা দেখছেন তা একটা কল্পিত ঘটনা, কিন্তু এর মধ্যে দিয়ে যেটা বোঝাতে চাইছি আমার সেই থিসিসটা বুঝুন, সেটা সম্পূর্ণ সত্যি। সেটার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্যই আমি আপনাকে এলিয়েনেট করব প্রতি মুহূর্তে। যদি আপনি সচেতন হয়ে ওঠেন, ছবি দেখে বাইরের সেই সামাজিক বাধা বা দুর্নীতি বদলের কাজে লিপ্ত হয়ে ওঠেন, আমার প্রোটেস্টকে যদি আপনার মাঝে চারিয়ে দিতে পারি তবেই শিল্পী হিসেবে আমার সার্থকতা।” চলচ্চিত্রকে প্রতিবাদ ছড়িয়ে দেওয়ার একটা মাধ্যম হিসেবে এভাবেই ভাবতেন ঋত্বিক ঘটক। সত্য বলার সেই দুরন্ত স্পর্ধা থেকে সারাটা জীবন যা ভেবেছেন তা নিয়েই নির্মাণ করেছেন চলচ্চিত্র। পুঁজিবাদী সমাজে মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্ত শ্রেণীর লড়াইয়ের গল্পগুলো তিনি খুব সচেতনভাবে ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন তাঁর চলচ্চিত্রগুলোতে। ১৯৬০ সালের ১৪ এপ্রিল মুক্তি পায় ঋত্বিক ঘটকের চতুর্থ এবং প্রথম ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র ‘মেঘে ঢাকা তারা’। দেশভাগ পরবর্তী কলকাতায় এক নিম্ন মধ্যবিত্ত শরণার্থী পরিবারের সংগ্রামমুখর জীবন নিয়ে নির্মিত হয় এই চলচ্চিত্রটি। শক্তিপদ রাজগুরুর উপন্যাস থেকে ঋত্বিক ঘটক এর কাহিনী নেন। পঞ্চাশের দশকে কলকাতা শহরের এক প্রান্তে রিফিউজি কলোনির একটি মধ্যবিত্ত পরিবারকে ঘিরেই এর গল্পটি আবর্তিত। ঋত্বিক ঘটকের সবচেয়ে আলোচিত সিনেমা মেঘে ঢাকা তারা আমাদের মনে দাগ কাটলেও দেখা যায় এই সিনেমার বীজ বহু আগেই রোপন করেছিলেন ঋত্বিক তাঁর নাটকে! যে কয়েকটি নাটকের জন্য ঋত্বিকের নাম নাট্য-আন্দোলনে চিরদিনের জায়গা করে নিয়েছে, তার একটি উদ্বাস্তু জীবন নিয়ে নাটক ‘দলিল।’একরাতের বেতার ঘোষণা চিরদিনের জন্য উদ্বাস্তু করে দিয়েছিল ঋত্বিককে। গণনাট্য ছাড়ার আগেই সেখানে প্রযোজনা করেছিলেন ‘দলিল’ নাটক। উদ্দেশ্য ছিল ‘ভাঙা বাংলার প্রতিরোধ’। নাটকে-সিনেমায় বারবার সন্ধান করেছিলেন ‘বাংলাদেশের মা’-এর। দেশভাগের যন্ত্রণা আজীবন ভুলতে পারেননি, চাননি বাঙালি সেই স্মৃতি ভুলে যাক। সুরমা ঘটকের লেখায় পাই, “কতকগুলো ঘরছাড়া সম্পূর্ণ মানুষ যে নাটকীয় ঘোরাফেরা করছে তারই নাম ‘দলিল’।” সেই দলে অর্জুন মালাকারদের সঙ্গে পাওয়া যাবে ঋত্বিককেও। দলিলের সন্ধানে অর্জুন খুঁজে বেড়াত দেশের রাজাকে। গুলি খেয়ে মরতে হয়েছিল তাঁকে, নীলকণ্ঠের মতোই। এ নাটক শেষ করতে পারেননি ঋত্বিক। তখনও আসেনি সেই পরিণতি। কিন্তু বিশ্বাস করতেন, আসবে একদিন। এই নাটকের শেষ পাতাটা লিখবে জনতা। তাদের জন্য ছেড়ে গেলেন শেষ পাতাটা। সেই মৃত্যুঞ্জয়ী আশা থেকে লিখেছিলেন, “বাংলারে কাটিছ কিন্তু দিলেরে কাটিবারে পার নাই।” আর সে বছরই সুরমাকে চিঠিতে তিনি লিখছেন, “-ও মেয়েকে আমি বহ্নিশিখার মত জ্বলে উঠতে দেখেছি। কিন্তু এই ছবিটিই আমার মনে থাকবে চিরটাকাল। আমার বাংলাদেশের মত শ্যামল বাংলার মেয়ে।” সমাপতন? নাকি এটাই দেখতে চেয়েছিলেন তিনি? এর সঙ্গে মিলিয়ে নিতে কষ্ট হয় পরবর্তী ঋত্বিককে। তার কারণের মধ্যে লুকিয়ে অসংখ্য পরত, অসংখ্য চরিত্র। ‘দলিল’-এ অর্জুন শেষ পর্যন্ত বুঝতে পেরেছিল রাজা আর শত্রু আসলে একই লোক। চিৎকার করে সে বলত, “দুশমন কনে?—তারে ধরতে আমি পারবই, তারে চিনতে আমি পারবই।” ১৯৫২ সালে নিজের লেখা সেই নাটকটি নিয়েই তিনি পাড়ি দিলেন গণনাট্যের কনফারেন্সে বোম্বে। কলকাতায় প্রথম অভিনয় হয় আমন্ত্রিত কয়েক জনের সামনে, ভূপতি নন্দীর বাড়ির ছাদে। পরিচালনা ও প্রধান অভিনেতা ছিলেন ঋত্বিক নিজেই। বোম্বে ছাড়া ভদ্রেশ্বর, উত্তরপাড়া, বালিতে অভিনয় হয়। তাঁর ‘সাঁকো’, ‘স্ত্রীর পত্র’ খুবই চর্চিত প্রযোজনা। ১৯৬৯ সালে, প্রান্তবেলায়, যখন অসুস্থ, গোবরা মানসিক হাসপাতালে রয়েছেন, লিখলেন ‘সেই মেয়ে।’ নিজের নির্দেশনায় হাসপাতালের রোগী ও কর্মী-চিকিৎসকদের দিয়ে অভিনয়ও করালেন। কবি বিনয় মজুমদারও তাতে অভিনয় করেছিলেন!



ঝুপ করে যেন সন্ধ্যা নেমে এসেছে কোলের কাছে। আজ আর লিখছি না। এমন সন্ধ্যায় তুমি পাশে থাকলে বেশ হতো, এখনো কি আগের মতন গাও-‘সন্ধ্যা নেমেছে আমার বিজন ঘরে, তব গৃহে জ্বলে বাতি। ফুরায় তোমারি উৎসব নিশি সুখে, পোহায় না মোর রাতি।। ’ সব গুলিয়ে যাচ্ছে স্মৃতির ভিড়ে। নিরন্তর ভালো থেকো।



ইতি-

সুস্মি

২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬