Next
Previous
Showing posts with label ধারাবাহিক. Show all posts
0

ধারাবাহিক - মনোজ কর

Posted in






















১ম পর্ব - প্রতিকূলতাবিঘ্নিত প্রস্তুতি এবং যাত্রা




প্রস্তুতি

মিনি এখন ইটালির যে ছোট্ট শহরটাতে থাকে তার নাম রেজিও এমিলিয়া। শহরটার

সাইজ ২৩১ বর্গ কিলোমিটার। লোকসংখ্যা ১লক্ষ ৭২হাজার অর্থাৎ জনঘনত্ব

৭৫০জন প্রতি বর্গ কিলোমিটারে। তুলনামূলক ধারণা দেবার জন্য জানাই কলকাতা’র

(মেগাসিটি) আয়তন ২০৬ বর্গ কিমি এবং জনসংখ্যা ৬৫লক্ষ ৭৭হাজার। জনঘনত্বে

কলকাতা রেজিও এমিলিয়ার ৬০গুন!! মিনি যখন ইউনিভার্সিটি অফ মদেনা অ্যান্ড

রেজিও এমিলিয়াতে বৈজ্ঞানিকের কাজ নিয়ে প্রথম রেজিওতে আসে তখন আমরাও

এসেছিলাম ওর সাথে। গত দশবছরে ইউরোপের বিভিন্ন শহরে থেকেছে মিনি।সেই

সুবাদে যে যে শহরে ও থেকেছে সেই সব শহরে আমরাও গেছি প্রতিবছর। যার ফলে

ইউরোপের অনেকগুলো শহর ঘোরা হয়ে গেছে আমাদের। কিন্তু উত্তর ইটালির এই

ছোট্ট শহরটাতে গত বছর প্রথম পা রেখেই ভীষণ ভালো লেগেছিল আমার। শহরটাতে

বহুতল নেই বললেই চলে। সব বাড়িগুলোই পুরনো ধাঁচের। অনেকটা আমাদের উত্তর

কলকাতার পুরনো বড় বাড়িগুলোর মত। উঁচু উঁচু চওড়া পাথরের সিঁড়ি , নক্সাকরা

কাঠের রেলিং, কাঠের সার্সি দেওয়া কাচের জানলা, সিমেন্টের লাল মেঝে, উঁচু সিলিং।

মিনি যে বাড়িটাতে থাকে ওটা সিটি সেন্টারের পাশেই। তিনতলায় দুটো শোবার ঘর,

বসার ঘর, ডাইনিং স্পেস, কিচেন ,টয়লেট। ওর একা থাকার পক্ষে বেশ বড়। বাড়ির

জানলা দিয়ে সামনের রাস্তাটা দেখা যায়। সপ্তাহান্তে রাস্তাটায় লোকের আনাগোনা

বাড়ে। রাস্তার ধারের কফির দোকান, পিজেরিয়া (পিজার দোকান) আর

রেস্টুরেন্টগুলো ভর্তি হয়ে যায়। ইউরোপের অন্যান্য শহরের মতোই রাস্তার ওপরে

চেয়ার টেবিল পাতে কফি আর খাবার দোকানগুলো। আমার ভীষণ ভালো লেগেছিল

বাড়িটা। আগেরবার এই বাড়িটাতে শিফট করে, সব গোছগাছ করে, থাকতে শুরু করতে

না করতেই ফেরার সময় হয়ে গিয়েছিল। মাত্র তিনদিন ছিলাম এই বাড়িটায়। তখন

থেকেই ইচ্ছে ছিল ভিসার ভ্যালিডিটি থাকতে থাকতেই আর একবার এসে অন্তত

মাসখানেক থেকে যাব। বাড়ি ঠিক করে মিনি স্থিতু হতে না হতেই ফিরে এলাম।শুধু

সময় বের করে একদিন সকালে ফ্লোরেন্স গিয়ে রাত্রে ফিরে এসেছিলাম। আর

কোথাও যাওয়া হয়নি। মিনি বলেছিল পরের বার এলে সাত আট দিনের জন্য কোথাও

ঘুরে আসবো। আর সেজন্যই এইবার ইটালি আসা। ভিসার ভ্যালিডিটি শেষ ১৭ই মে।

তাই ঠিক হলো ১৩ই মার্চ রওনা দেব কলকাতা থেকে আর ফিরে যাব ১৮ই এপ্রিল।

মিনি এর মধ্যে স্পেন ভ্রমণের ব্যবস্থা করবে। সেই হিসাবে কলকাতা থেকে দুবাই




হয়ে বোলোনিয়া যাবার টিকিট কাটা হলো ১৩ই মার্চের জন্য। ১৩ই মার্চ রাত্রে

এমিরেটস এয়ারলাইন্সে কলকাতা থেকে দুবাই আর ১৪ই মার্চ সকালে দুবাই থেকে

বোলোনিয়া। সবই ঠিকঠাক চলছিল কিন্তু মার্চের গোড়ার দিকে শুরু হয়ে গেল

আমেরিকা –ইরান যুদ্ধ। যুদ্ধে জড়িয়ে গেল আমেরিকার মিত্রশক্তি সংযুক্ত আমির

আরবশাহি। আক্রান্ত হলো দুবাই। বন্ধ করে দেওয়া হলো দুবাই বিমানবন্দর ।

আমরা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেলাম। কিন্তু মনে ভাবলাম ১৩ তারিখ আসতে

প্রায় দু’সপ্তাহ দেরি। হয়ত এরমধ্যে অবস্থা স্বাভাবিক হয়ে আসবে। শুরু হলো

অস্থির অপেক্ষা। রোজ খবর নিচ্ছি ফ্লাইট ঠিকঠাক চালু হলো কিনা। আশার আলো

দেখিয়ে এমিরেটস জানাল কিছু সীমিত সংখ্যক ফ্লাইট ৮ তারিখ থেকে যাতায়াত শুরু

করবে। তার মধ্যে কলকাতা –দুবাই-বোলোনিয়া আছে। ভাবলাম যাক বাঁচা গেল।

দ্বিগুন উৎসাহে প্যাকিং শুরু করে দিলাম। ১১ তারিখ হঠাৎ এমিরেটস জানালো যে

১৪ তারিখের দুবাই –বোলোনিয়া ফ্লাইট একদিন পরে অর্থাৎ ১৫ তারিখ ছাড়বে।

তার মানে এই দাঁড়ালো যে ১৩ তারিখ রাত্রে কলকাতা থেকে দুবাই। তারপর দুবাইতে

প্রায় দেড় দিন অপেক্ষা । তারপর দুবাই থেকে বোলোনিয়া। এমিরেটস-এ ফোন করে

জানতে চাইলাম কলকাতা-দুবাই ফ্লাইট ১৩ তারিখের বদলে ১৪ তারিখে রি-সিডিউল

করা যাবে কিনা। ওরা রাজি হয়ে গেল। তার মানে আমাদের যাওয়া পিছিয়ে গেল

একদিন। চতুর্দিকে যা চলছে তাতে একদিন পিছিয়ে যাওয়াটা এমন কিছু ব্যাপার নয়।

মনকে সান্তনা দিলাম। ভাবলাম ঠিকই আছে। একদিনেরই তো ব্যাপার।কিন্তু যুদ্ধের

যা পরিস্থিতি তা দেখে খুব একটা নিশ্চিন্ত হতে পারছিলাম না। দুবাইতে পরিচিত

বন্ধুবান্ধবদের ফোন করলাম। এক-দু’জন বাঙালি তো যুদ্ধের ইঙ্গিত পেয়েই

সপরিবারে কলকাতা ফিরে এসেছে।কিছু দক্ষিণ ভারতীয় বন্ধু তখনও দুবাইতে আছে

কিন্তু তারাও খুব একটা আশার কথা শোনালো না। অনতিবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ হবারও

কোনও লক্ষণ নেই। যে কোনও সময়ে দুবাই বিমানবন্দরে ফ্লাইট ওঠানামা কমিয়ে

দেওয়া বা বন্ধ করে দেবার সম্ভাবনাও ওরা একেবারে উড়িয়ে দিল না। অনেক

বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়-পরিজন ইত্যাদি শুভাকাঙ্খীরা পরামর্শ দিল খুব জরুরি না

হলে এখন না যাওয়াই ভাল। কিন্তু কখন যে অবস্থা ভাল হতে পারে তার উত্তর কেউ

দিতে পারলো না। । এইসব অনিশ্চয়তার মধ্যেই ১২ তারিখে এমিরেটস থেকে খবর

এলো যে অনির্দিষ্টকালের জন্য দুবাই –বোলোনিয়া ফ্লাইট বন্ধ করে দেওয়া হলো।

মাথায় হাত! এতদিনের পরিকল্পনা ভেস্তে গেল! অন্য এয়ারলাইন্সে অন্য রুটে

টিকিটের দাম চেক করলাম। দ্বিগুন থেকে তিনগুন দাম। এদিকে হাতেও সময় কম।

ঠিক এইসময়েই এমিরেটস জানালো যে ৩০শে এপ্রিলের মধ্যে যাওয়ার জন্য যে

কোনও ফ্লাইটের দিন এবং রুট একাধিকবার সম্পূর্ণ বিনা অতিরিক্ত খরচায় বদল

করা যেতে পারে। কী মনে হলো এমিরেটস-এর ওয়েবসাইট চেক করে দেখলাম যারা

নতুন করে বোলোনিয়ার টিকিট কাটছে তাদের রোম অবধি প্লেনে এবং রোম থেকে




বোলোনিয়া ট্রেনের ব্যবস্থা করছে এমিরেটস। ভাবলাম আমার পুরনো টিকিট তো কী

আছে, চেষ্টা করে দেখতে দোষ কী? ফোন করলাম। ওরা সব শুনে বলল ট্রেনের

ব্যবস্থা করা যাবে না কিন্তু রোম থেকে একটা কানেক্টিং আই টি এ এয়ারলাইন্সের

ফ্লাইট ব্যবস্থা করে দিতে পারে। তবে ১৪ তারিখের বদলে ১৫ তারিখ রাত্রে ৮-২৫-

এ কলকাতা থেকে রওনা হতে হবে। ১৬ তারিখ রাত্রি ১২টায় (দুবাই সময়) দুবাই

এবং সকাল ৮ টায় (দুবাই সময়) দুবাই –রোম ফ্লাইট যেটা রোমে পৌঁছবে ১৬ তারিখ

১২-৪৫ (রোম সময়) এবং দুপুর ২-২৫ (রোম সময়) মিনিটে রোম-বোলোনিয়া ফ্লাইট।

রোমে লে-ওভার মাত্র ১ ঘন্টা ৪০ মিনিট। ইমিগ্রেশন এবং সিকিউরিটি করে ২৫

মিনিট আগে অর্থাৎ ১ ঘন্টা ১৫ মিনিটের মধ্যে গেটে পৌঁছতে হবে। যথেষ্ট ঝুঁকি

আছে তবুও রাজি হয়ে গেলাম। অন্য কোনও উপায় নেই। আবার অপেক্ষা শুরু ।

প্যাকিং মোটামুটি কমপ্লিট। কিন্তু বিপদ তো একা আসে না। ১৪ তারিখ রাত ১টা

থেকে মুনমুনের ডাইরিয়া শুরু হলো। রাতটুকু ম্যানেজ করার জন্য হাতের কাছে যা

ওষুধ ছিল তাই দিয়ে ভোর প্রায় ৫টার সময় পরিস্থিতি কিছুটা আয়ত্ত্বে এলেও

একেবারে বন্ধ হলো না। সকালে গৃহ চিকিৎসক ডঃ চৌধুরীকে ফোন করলাম।

রক্ষণশীল বয়স্ক ডাক্তার। ইংল্যান্ডে থাকতেন। বললেন,’ কোনও রিস্ক নেওয়া

যাবে না। আবার রি-সিডিউল করান। ওষুধ দিচ্ছি। মিনিমাম চার-পাঁচ দিন লাগবে।‘

আবার ফোন করলাম এমিরেটসে। ওরা সব কিছু দেখে বললো সিডিউল ছ’দিন পিছিয়ে

দেওয়া যেতে পারে। অর্থাৎ ১৫ তারিখের বদলে ২১ তারিখ কলকাতা থেকে রওনা।

বাকি টাইমিং একই রকম থাকবে। আমার অনুরোধে আমাদের ফেরার টিকিটও পিছিয়ে

১৭ই এপ্রিলের বদলে ২৩শে এপ্রিল করে দিতে রাজি হয়ে গেল এমিরেটস

এয়ারলাইন্স। মাঝখানে আর কিছু অঘটন ঘটেনি। অবশেষে ২১ তারিখ কলকাতা থেকে

রাত্রি ৮-২৫ মিনিটের কলকাতা-দুবাই ফ্লাইট ধরলাম। পরের গল্প শুরু ফ্লাইট

ছাড়ার পর।

এই গল্পের শেষে একটা কথা বলে রাখি। আমার এইবারের ইটালি যাত্রার সঙ্গে

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ইটালি ভ্রমণের বেশ কিছু সাদৃশ্য আছে। গুরুদেব তিনবার

ইটালি গেছেন। প্রথমবার ১৮৭৮ সালে ইংল্যান্ড যাবার পথে। দ্বিতীয় ও তৃতীয়বার

যথাক্রমে ১৯২৫ সালে এবং ১৯২৬ সালে। আমারও এটি তৃতীয় ইটালি ভ্রমণ।

প্রথমটি ২০১৬ সালে –রোম ও ভেনিস। আমার প্রথম ইটালি ভ্রমণ আমার কাছে

স্মরণীয় হয়ে আছে। সেবার ভেনিসে গন্ডোলার লাইনে আমার দু’শো ইউরো পকেট

কেটে তুলে নিয়েছিল এক ইটালিয়ান সুন্দরী। তারপর ২০২৫ এবং ২০২৬।

রবীন্দ্রনাথের দ্বিতীয় এবং তৃতীয় ইটালি ভ্রমণের ঠিক একশো বছর পরে।

মুসোলিনি এবং রবীন্দ্রনাথের ঐতিহাসিক সাক্ষাৎকারের শতবর্ষপূর্তি ঘটবে আর

পাঁচ সপ্তাহ পরেই -৩০শে মে। কাকতালীয় !!!




ধান ভাঙতে শিবের গীত এখানেই শেষ। এবার যাত্রা শুরু।

যাত্রা হলো শুরু।

কলকাতা থেকে ২১শে মার্চ রাত্রি ৮-২৫এর দুবাইগামী প্লেনে উঠে বসলাম। প্লেন

ছাড়লো সঠিক সময়। মুনমুনের উইন্ডো সিট, আমার মিডল আর প্যাসেজের পাশে

আইল সিটে এক বাংলাদেশি মাঝবয়সী ভদ্রলোক। প্লেন ছাড়ার খানিকক্ষণের

মধ্যেই চার-পাঁচ ক্যান বিয়র পান করে ঘুমিয়ে পড়লেন ভদ্রলোক। ঘন্টা চারেক পরে

মুনমুন টয়লেট যেতে চাইলে ভদ্রলোককে একটু উঠে দাঁড়াতে বললাম। কিন্তু কে শোনে

কার কথা! নেশাগ্রস্থ ভদ্রলোক তখন ঘুমে কাতর। আমি বারবার ডাকছি , গায়ে হাত

দিয়ে ঠেলা দিচ্ছি তবুও লোকটা নড়ছেনা চড়ছেনা দেখে একজন বিমানসেবিকা এসে

ভদ্রলোককে প্রায় ধাক্কা দিতে শুরু করলেন। অনেক চেষ্টার পর ভদ্রলোক

কোনওক্রমে সোজা হয়ে বসে নিজের পা দু’টো একটু টেনে নিয়ে আবার নিদ্রাদেবীর

কোলে ঢলে পড়লেন। অগত্যা ঐটুকু জায়গা দিয়ে অনেক কসরত করে আমি প্যাসেজে

এসে দাঁড়ালাম। এবার মুনমুনের পালা। অনেক চেষ্টা করে দুপায়ের হাঁটু যতদূর সম্ভব

ভাঁজ করে প্রচুর খেটেখুটে যখন প্যাসেজে এসে দাঁড়ালো তখন বোঝা গেল বাঁ পায়ের

হাঁটুটা আর ভাঁজ করা যাচ্ছেনা। পা সোজা হয়ে আছে কিন্তু হাঁটু মোড়া যাচ্ছে না। চাপ

দিয়ে মুড়তে গেলে প্রচন্ড ব্যাথা। ব্যাকরেস্ট ধরে ধরে কোনওক্রমে টয়লেট থেকে

ফিরে এসে সেই যে সিটে বসলো তারপর থেকে বাঁ পাটা একেবারে নট নড়ন চড়ন। সঙ্গে

রাখা পেন-কিলার খেয়ে ব্যথা একটু কমলেও পায়ের অবস্থার কোনও উন্নতি হলো

না। বিমানসেবিকা এসে বলে গেলেন ল্যান্ড করার পর সিটেই বসে থাকতে। পুরো প্লেন

খালি হয়ে গেলে হুইলচেয়ারে করে নিয়ে যাওয়া হবে। মুনমুনের এই প্রথমবার

হুইলচেয়ার আরোহণ। আইলে বসা ভদ্রলোককে বিশুদ্ধ বাংলায় অভিশাপ দিতে দিতে

হুইলচেয়ারে করে গড়িয়ে চলল মুনমুন আর পিছনে পিছনে আমি চললাম হেঁটে।

দুজনেরই মনেই গভীর উৎকণ্ঠা বাকি পথ কী করে পাড়ি দেব? মিনির বাড়িতো এখন

অনেকটা পথ। দুবাই থেকে রোম, রোম থেকে বোলোনিয়া , বোলোনিয়া থেকে রেজিও

এমিলিয়া-অনেক হাঁটা, ওঠা- নামা, অনেক ঝক্কি। যাইহোক হুইলচেয়ার মুনমুনকে

নামিয়ে দিয়ে গেল এমিরেটস-এর লাউঞ্জে। এখন দুবাই সময় রাত্রি ১২-৩০ , রোমের

ফ্লাইট সকাল ৮টায়। ৭ ঘন্টা ৩০ মিনিটের লে-ওভার। বলে গেল সকাল ৭টায় আবার

হুইলচেয়ার আসবে প্লেনে তুলে দেওয়ার জন্য। এয়ারপোর্ট অ্যাসিস্ট্যান্স

সার্ভিসের এক মহিলাকর্মী জানিয়ে গেলেন তিনি লাউঞ্জেই আছেন। টয়লেট যাবার

বা অন্য কোনও রকম দরকার হলে ওনাকে ডাকতে। এর আগে কোনওদিন

অ্যাসিস্টান্স সার্ভিসের দরকার পড়েনি তাই অভিজ্ঞতাও ছিলনা। ঐ মহিলাকর্মীর

আন্তরিক ব্যবহার এবং প্রতিটি প্রয়োজনে সযত্নে হাত বাড়িয়ে দেওয়া সত্যিই

ভোলবার নয়। কেবলমাত্র প্রশিক্ষণ এবং পেশাগত বাধ্যতার বাইরেও গভীর




আন্তরিকতা এবং পরম মমত্ববোধ ব্যতিরেকে এইধরনের সহায়তা প্রদান সম্ভব

নয়। কাঁটায় কাঁটায় ৭টার সময় হুইলচেয়ার নিয়ে এলেন আরেকজন সহায়তা কর্মী।

সমস্ত লাইন অতিক্রম করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে হুইলচেয়ার আরোহী যাত্রীদের

সকলের আগে প্লেনে ওঠানো হয়। এক্ষেত্রেও তার কোনও ব্যতিক্রম হলোনা।

সঠিক সময়ে আমরা উঠে বসলাম দুবাই থেকে রোম যাবার প্লেনে। দীর্ঘ উড়ান।

প্লেন যদি ঠিক সময়ে ছাড়ে তাহলে রোমে পৌঁছে পরের প্লেন ধরার জন্য সময় পাবো

১ ঘন্টা ১৫ মিনিট। তার মধ্যে সিকিউরিটি এবং ইমিগ্রেশনের গেরো। অনিশ্চয়তার

শুরু আবার। তারই মধ্যে যজ্ঞে ঘৃতাহুতি দিয়ে বিমানচালক জানালেন প্লেন ছাড়তে

৩০ মিনিট দেরি হবে। কারণ দুবাই বিমানবন্দরে রানওয়ের সংখ্যা নিরাপত্তার

কারণে কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমি তখন মনে মনে অঙ্ক করছি। যদি ৩০ মিনিট

দেরিতে ছাড়া মানে ৩০ মিনিট পৌঁছতে দেরি হয় তাহলে পরের প্লেন ধরা অসম্ভব।

সুতরাং হয় আজকের রাত্রি রোমে কাটিয়ে পরেরদিন সকালের বিমানে বোলোনিয়া

অথবা রোম এয়ারপোর্ট থেকে ট্রেন ধরে একটা ট্রেন বদল করে বোলোনিয়া স্টেশন।

কিন্তু এতো লাগেজ এবং প্রায় চলচ্ছক্তিহীন মুনমুনকে নিয়ে মাঝখানে ট্রেন বদল

করে বোলোনিয়া যাওয়া কিছুতেই সম্ভব নয়। প্লেন ছাড়লো ৮-৩০এ। বিমানচালক

ঘোষণা করলেন যে ছাড়তে দেরি করলেও তিনি চেষ্টা করবেন যতটা সম্ভব সময়

বাঁচাতে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পৌঁছে দিতে। আশা হতাশার দোলায় দুলতে

দুলতে চললাম রোমের উদ্দেশ্যে। রোমে যখন পৌঁছলাম তখন আমাদের হাতে আর

মাত্র একঘন্টা সময়। মুনমুনের যেহেতু হুইলচেয়ার লাগবে আমাদের অপেক্ষা করতে

হবে সব যাত্রীর নেমে যাওয়া অবধি। সেখানেই গেল দশ মিনিট। তারপর এলেন এক

মহিলা সহায়তা কর্মী। সঙ্গে হুইলচেয়ার। কিছু রেকর্ড চেক করে মুনমুনকে চেয়ারে

বসালেন। এই হুইলচেয়ারটি হাতে ঠেলা নয়, মোটরচালিত। বললেন,’ আমার নাম

বারবারা। আপনাদের আগেই বলে রাখি আমাদের হাতে যা সময় তাতে সিকিউরিটি,

ইমিগ্রেশন অতিক্রম করে চেক-ইন কাউন্টার থেকে বোর্ডিং পাস সংগ্রহ করে ঠিক

সময়ে গেটে পৌঁছনো প্রায় অসম্ভব।‘ আমাকে বললেন,’ দেখুন আমি হুইলচেয়ার একটু

জোরে ড্রাইভ করবো। আপনাকেও একটু জোরে আমাকে অনুসরণ করতে হবে।

মাঝখানে কোথাও দাঁড়াবেন না। অনেকটা পথ অতিক্রম করতে হবে।‘ হর্ন বাজাতে

বাজতে হুইলচেয়ার দৌড়চ্ছে ।পিছনে দৌড়চ্ছি আমি। ফার্স্ট স্টপ সিকিউরিটি।

বারবারা আমাদের দু’টো কেবিন ব্যাগ হাতে নিয়ে সিকিউরিটির লোকটাকে ওদের

ভাষায় কি একটা বলে বেল্টের ওপর রেখে দিল। সিকিউরিটি অফিসার আমাদের

লাইনের আগে আসতে বললেন। দ্রুতগতিতে সবকিছু চেক করে আমাদের সবার আগে

ছেড়ে দিলেন। শুরু হলো আবার দৌড়। সামনে হুইলচেয়ার, পিছনে আমি। সেকেন্ড স্টপ

–ইমিগ্রেশন। লাইন টপকে আমাদের নিয়ে গিয়ে দাঁড় করালেন ইমিগ্রেশন কাউন্টারে

একেবারে ইমিগ্রেশন অফিসারের সামনে। আমাদের হাত থেকে পাসপোর্টগুলো নিয়ে




ইমিগ্রেশন অফিসারের হাতে প্রায় গুঁজে দিয়ে ইতালিয়ন ভাষায় কি সব বোঝালেন

অফিসারকে। অফিসার মৃদু হেসে হাত চালিয়ে ফর্মালিটি কমপ্লিট করে পাসপোর্ট

দু’টো আমার হাতে দিয়ে হেসে বললেন -অল দি বেস্ট। ইউ আর ইন সেফ হ্যান্ডস।

আবার দৌড় । এবার হুইলচেয়ারের স্পিড আগের থেকে বেশি- লাস্ট ল্যাপ। আমিও

দৌড়চ্ছি প্রাণপণে। গেট নং –এ ৩২। গেটের উল্টোদিকে আই টি এ’র প্রায়রিটি

ট্রান্সফার সার্ভিস। আমাদের দাঁড় করিয়ে হাত থেকে পাসপোর্ট প্রায় ছিনিয়ে নিয়ে

সবাইকে ঠেলে কাউন্টারের সামনে গিয়ে হাত আর মাথা নেড়ে কাউন্টারের মহিলাকে

কি বোঝালেন কিছুই শোনা গেল না। কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখলাম হাতে পাসপোর্ট

আর বোর্ডিং পাস নিয়ে বিজয়ীর হাসি হাসতে হাসতে বারবারা এগিয়ে আসছেন

আমাদের দিকে। বোর্ডিং প্রায় চালু হয়ে গেছে ততক্ষণে। হুইলচেয়ার দেখে

কাউন্টারের মেয়েটি বারবারাকে তাড়াতাড়ি আসার ইঙ্গিত করে অন্যান্য যাত্রীদের

বোর্ডিং কিছুক্ষণের জন্য বন্ধ করে দিল। সকলের আগে হুইলচেয়ারের যাত্রীদের

ছাড়াই নিয়ম। বারবারা সকলের আগে আমাদের নিয়ে গিয়ে প্লেনে ওঠার দরজার কাছে

ছেড়ে দিলেন। বিমানসেবিকা হাত ধরে মুনমুনকে নির্দিষ্ট আসনে বসিয়ে দিলেন।

কিছুক্ষণ পরে বারবারা হুইলচেয়ার রেখে এসে প্লেনের মধ্যে ঢুকে আমাদের সঙ্গে

দেখা করে গেলেন। ওঁকে যে কী বলে ধন্যবাদ জানাবো তার ভাষা খুঁজে পেলাম না।

অনুভব করলাম কেবলমাত্র ধন্যবাদ জানালে বারবারাকে ছোট করা হয়। বললাম

ওঁকে কৃতজ্ঞতা জানানোর ভাষা আমাদের জানা নেই। হাসিমুখে বিদায় নিয়ে বারবারা

চলে গেল । ভেবে দেখলাম মুনমুনের পা যদি ঠিক থাকতো আর বারবারাকে যদি না

পেতাম তাহলে এই প্লেন ধরা আমাদের পক্ষে কোনওভাবেই সম্ভব হতোনা। এই

ঘটনা আমার চিরকাল মনে থাকবে। চরম অনিশ্চয়তা এবং বাধাবিপত্তির মধ্যে

কোথা থেকে হঠাৎ উনি এলেন আর কেনই বা আমাদের হাত ধরে ঝড়ের মতো সমস্ত

বাধাবিপত্তি দূর করে আমাদের লক্ষ্যে পৌঁছে দিলেন আর কী ভাবেই বা সবকিছু

সম্ভব হলো তা এখনও বুঝতে পারিনি।

মিনিকে ভিডিওতে ধরলাম। আমাদের প্লেনের মধ্যে দেখে ও তো একেবারে অবাক। ও

ভাবতেই পারেনি আমরা প্লেনটা ধরতে পারবো। ও নিশ্চিত আমরা কালকের আগে

পৌঁছব না। একমিনিট হাঁ করে তাকিয়ে থেকে বললো – বোলোনিয়াতে নেমে অপেক্ষা

কোরো। আমি লাঞ্চ করে এয়ারপোর্টে আসছি।

রেজিও এমিলিয়াতে মিনির বাড়ি এসে যখন পৌঁছোলাম তখন ইতালির ঘড়িতে সন্ধ্যা

৭টা বেজে ১৫ মিনিট। এখন তিন দিন কোনও কাজ নেই। ২৬শে মার্চ সকালে আমরা

রওনা দেবো উত্তর স্পেনের এক সুন্দর শহর বিলবাও-এর উদ্দেশ্যে।

বাংলাদেশি ভদ্রলোকটিকে বাছা বাছা শব্দে অভিসম্পাতের পর্ব কিন্তু এখনও শেষ

হয়নি। খুব তাড়াতাড়ি শেষ হবে বলেও মনে হচ্ছে না।



                  বোলোনিয়া এয়ারপোর্টে






রেজিও এমিলিয়াতে আমাদের বাড়ি

0

ধারাবাহিক - রঞ্জন রায়

Posted in




















২৮.১

শিবপালগঞ্জ গাঁয়ের এক দুঃখী ছেলে, নাম রুপ্পন বাবু। কিছু দিন আগে ওনার খুব দাপট ছিল আর লোকে বেশ সম্ভ্রমের চোখে দেখত। কারণ ওনার বাপের নাম বৈদ্যজী তবে ওনার নিজেরও কিছু নাম ছিল। উনি ক্লাস টেনে বেশ কয়েক বছর ধরে পড়ছেন এবং উনি ওখানকার ছাত্রনেতা। তহসীলদার ওনার ইয়ার, দারোগা ওনার চামচা এবং প্রিন্সিপাল ওনার অধীনস্থ কর্মচারী। উনি সারাক্ষণ কলেজের মাস্টারদের ব্যবহার চালচলন এসব নিয়ে অসন্তুষ্ট। আর মাস্টারের দল ওনাকে “ভয়ানাং ভয়ং ভীষণং” এবং পরমপিতা মেনে চলে।

ঘরের মধ্যে ওনার ছবি লাফালাফি করতে থাকা এঁড়ে বাছুরের মত। এটাও নিশ্চিত যে দেশের রাজনীতির খোলা মাঠে স্বচ্ছন্দে চরে বেড়ানো অনেক প্রতিভাশালী সন্তানের মত ইনিও একদিন চরে খাবার কৌশল শিখে নেবেন। এবং বাপ পটল তুললে কিছুদিন –বছর বা ছ’মাস—এদিক সেদিক ঘুরে একদিন বাপের ছেড়ে যাওয়া আসনে বসে খড় চিবুতে শুরু করবেন।

পাঁচ মাস আগে আরেকটি ছেলে এই গাঁয়ে এসেছিল। ওর নাম রঙ্গনাথ। লোকজন ওর বড়মানুষী চাল, উদার স্বভাব—সবই চিনতে পেরেছে। কারণ, ওর মামার নাম বৈদ্যজী। তবে ওর নিজেরও কিছু বড়মানুষী গুণ ছিল। ও ইতিহাসে এম এ করেছে। দেখতে সরল ভালমানুষটি, কিন্তু দরকারে বেশ বাঁকা কথা বলতে পারে। প্রতিটি লেখাপড়া জানা ভারতীয়ের মত ও নিজের সংগে সম্পর্ক নেই এমন সব ঘটনাকে ঘটনা হিসেবেই দেখত আর ভুলে যেত, --এ’নিয়ে কোন চাপ নিত না।

ইতিহাসের ছাত্র হওয়ায় ওর অনেক রাজনৈতিক এবং সামাজিক শোষণ ও উৎপীড়নের ঘটনার কথা জানা ছিল। কিন্তু কখনও ভাবে নি যে ও নিজেও ইতিহাসের অংশ, এবং চাইলে ইতিহাসের চেহারা বদলে দিতে পারে। ও দেশের সেই পঁচানব্বই প্রতিশত বুদ্ধিজীবীদের একজন যাদের বুদ্ধি দেয় আত্মসন্তোষ এবং তর্ক করার কৌশল। বুদ্ধির প্রেরণায় ওরা অন্যদের কী করা উচিত, বা কী করা উচিত নয় সে নিয়ে লম্বা লম্বা লেকচার দেয়, কিন্তু অন্যদের না করার পেছনে যে নিজেরও কিছু দায়িত্ব আছে—সেইসব বেহায়া যুক্তির থেকে কয়েক ক্রোশ সরে থাকে।

তবে যে ছেলেটার নাম রুপ্পন বাবু তার সমস্যা অন্য। কিছুদিন ধরে ও রাজনৈতিক পছন্দ-অপছন্দের মধ্যিখানে নিজের ব্যক্তিগত পছন্দ, রুচি এসব এনে ফেলেছে। ফলে আগে যেসব ভালোমন্দ, ন্যায়-অন্যায় ওর চোখে ধরা পড়ত না, সেগুল এখন ফুটবলের আকার নিয়ে যেন ওর চোখের পাতায় লটকে রয়েছে। আগে ও কলেজের প্রিন্সিপালকে নিজের বাবার চাকর ভাবত। এখন মনে হচ্ছে ব্যাটা গণ্ডমূর্খ এবং জেদি; আর অন্য মাস্টারদের দেখে জ্বলতে থাকে। সেই জ্বলুনির চোটে রূপ্পনের পিতাঠাকুরকে নিজের দলাদলির মধ্যে টেনে এনেছে। কয়েকজন মাস্টারকে আগে মনে হত মূর্খ এবং ছিটেল। এখন দেখা যাছে ওরা ছিটেল হলেও বদমাশ নয়—ওদের রক্ষা করা কর্তব্য। কিছুদিন আগেও বড়ভাই বদ্রী পালোয়ানকে মনে হত শক্তিচর্চার অন্তিম উদাহরণ, এবং বদ্রীকে নিয়ে রুপ্পনের গর্ববোধ হত। কিন্তু এখন ও দেখেছে আশপাশের জেলার কিছু গুণ্ডাকে—যারা মাঝে মাঝে শিবপালগঞ্জে এসে বদ্রীর সংগে কথা বলে চলে যায়।

অর্থাৎ এখন ছেলেটার মনে সেই ছটফটানি শুরু হয়েছে যার ঠেলায় কেউ বিভীষণ, ট্রটস্কি বা সুভাষচন্দ্র বোস হয়ে জগতকে কিছু করে দেখাতে চায়। কিন্তু যাত্রা শেষ হয় ফাঁসিকাঠে চড়ে, জেলে গিয়ে অথবা জয়প্রকাশ নারায়ণ বা অচ্যুত পটবর্ধনের মত সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর নিয়ে।

অন্য ছেলেটার অবস্থাও তথৈবচ। কারণ, পাঁচ মাস এখানে কাটিয়ে ও দেখেছে যে তামাশা খেলাচ্ছলে শুরু হয়েছিল এখন তার চোটে লোকের হাত-পা ভাঙা হচ্ছে। আর হাসতে হাসতে যে ধূলো অন্যের গায়ে ছিটিয়ে দেয়া হোল। তাতে লোকটার চোখ নষ্ট হল। যখন শনিচরকে পঞ্চায়েত প্রধান পদে দাঁড় করানোর কথা উঠল বা যখন ছোটে পালোয়ান জোগনাথের বিরুদ্ধে সাক্ষী দিতে গেল তখন ওর মনে হয়েছিল এসব ইয়ার্কি হচ্ছে। কিন্তু যখন শনিচর সত্যি সত্যি পঞ্চায়েতের প্রধান হল বা ছোটে পালোয়ান জোগনাথকে সত্যিই জেল থেকে ছাড়িয়ে আনল, তখন রঙ্গনাথের বুকে জোর ধাক্কা লাগল। শনিচরের ভোটে জেতার বিজয় উৎসবের দিন ও অনেক কিছু ভাবল। ও জ্ঞানচক্ষুতে দেখতে পেল—বিভিন্ন রাজ্যের রাজধানীতে কত কত বৈদ্যজী, মন্ত্রী এবং মুখ্যমন্ত্রীর লাইনে না জানি কত শনিচর ঢুকে গেছে!

যে ছেলেটার নাম রূপ্পন বাবু ওর মন অশান্ত হওয়ার দিন আরও একটা ঘটনা ঘটেছিল—যার সংগে মনের এই অশান্তির কোন সম্পর্ক নেই। অনেকদিন থেকে ছেলেটা টের পাচ্ছিল যে ওর দরকার একটা মেয়েমানুষের। এত বুঝেও ওর ভুল হচ্ছিল যে ওর স্রেফ বেলাকে চাই। তারপর, এই যে ইচ্ছে—যা কীটপতঙ্গ, পশুপাখির মধ্যে বিশেষ বিশেষ মরশুমে আর মানুষের মধ্যে সময়ে অসময়ে জেগে ওঠে-- সেটাকে ও ‘প্রেম’ নাম দিল। এটা অবশ্যি কবিতার জালিয়াতিতে আমাদের অভিধানে ঢুকে পড়েছে। ও ভাবতে লাগল যে ও বেলাকে ভালবাসে; আর পুরো খবর ওর কাছে না থাকায় ধরে নিল যে বেলাও ওকে ভালবাসে! ফের ও বেলাকে একটা প্রেমপত্র পাঠালো, যার জবাব বেলা দেয় নি। তবে সেটার ঠ্যালায় রুপ্পনকেই নানা জায়গায় অনেকবার কৈফিয়ত দিতে হল। এসব বলার সময় ও নিজের জিদ ও ঠ্যাঁটামি বজায় রাখল বটে, তবে মনে মনে ঝাড় খাচ্ছিল। শেষে যেদিন খান্না মাস্টারের মুখে শুনল যে বেলা ও বদ্রী পালোয়ানের ভেতরে ভেতরে ইন্টুমিন্টু চলছে এবং বদ্রী ওকে বিয়ে করবে সেদিন ওর মনের ছাটফটানি খুব বেড়ে গেল। আর কী করে যেন, সেই ছটফটানি ওকে প্রিন্সিপাল, বৈদ্যজী, বদ্রী পালোয়ান, শনিচর—সবার বিরুদ্ধে নানারকম উল্টো সিধে ভাবতে আতুর করে দিল।

এতদিন ও বাস্তবতা নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছিল, এবার ও নিজের জীবনের বাস্তবতা কী সেটা দেখতে পেল।

একই সময় অন্য ছেলেটারও জ্ঞানচক্ষু খুলে গেল। বুঝল খালি শোষণ ও অত্যাচারের ইতিহাস মুখস্থ করে কিছু হবে না। গাধার পিঠে সমস্ত বেদ, উপনিষদ, আর পুরাণের বোঝা চাপিয়ে দিলে সে বড়জোর আন্তর্জাতিক বিদ্বান পরিষদের সভাপতি হবে, তবুও মনুষ্য পদবাচ্য হবে না। তার জন্যে দরকার বিদ্যার ভার বহন না করে অন্য কিছু করা। খান্না মাস্টার রূপ্পনবাবুকে বদ্রী পালোয়ানের প্রেমকাণ্ড শোনানোর আগে আরও একটা কথা বলেছিল। এসব হয়েছিল হোলির তিন দিন পরে চাঁদ উঠলে এবং রাস্তার ধারের পুলিয়ায় বসে—সেই পুলিয়া, যেখানে বসে একদিন রঙ্গনাথ ওকে ছাতে একা শোনার বিশেষ অভিজ্ঞতার কথা বলেছিল।

সেদিন খান্না মাস্টারের সংগে মালবীয়ও ছিল। ওরা আগে থেকেই পুলিয়ায় বসে ছিল। রুপ্পন বাবু হোলি উৎসবের দিন থেকে সমানে ভাঙ খেয়ে ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত। তাই শরীরের ক্লান্তি দূর করতে আবার ভাঙ খেয়ে রঙ্গনাথের সংগে একটু পায়চারি করতে বেরিয়েছেন। পুলিয়ায় দুটো লোককে বসে থাকতে দেখে স্বাভাবিক অভ্যাসে হাঁক দিলেন—“কৌন হ্যায় বে”? কে রে ব্যাটাচ্ছেলে?

“কে রুপ্পন বাবু? নমস্কার রঙ্গনাথজী, আমি খান্না”।

“আরেকজন কে”?

“মালবীয়। নমস্কার রূপ্পন বাবু! আসুন, বসে পড়ুন”।

মাস্টারদের অভিবাদনের উত্তরে রূপ্পন একটা যেমন তেমন জবাব দিয়ে পুলিয়ার উপর বসে পড়লেন। ‘বিগ ফোর’ এর বৈঠক শুরু হল।

রাত ন’টা; কিন্তু কোথাও কোন শান্তি নেই। তহসীল অফিসের সামনের পান দোকানের রেডিও বেজেই চলেছে। আর ফিল্মি গানের নল থেকে ভর ভর করে বেরিয়ে আসছে ‘অরমান, সাজনা, হসীন, জাদুগর, মঞ্জিল, নজর, তু কঁহা, সীনা, গলে লগা লো, গলে লগ যা, মচল -মচলকর, আঁধিয়া, গুম, তমন্না, পরদেশী, শরাব, মুস্কান, আগ, জিন্দগী, মৌত, বেরহম, তসবির, চাঁদনী, আসমাঁ, সুহানা সপন, জোবন, মস্তি, উভার, ইন্তজার, বেজার, ইসরার, ইনকার, ইকরার”---- গোছের শব্দাবলী আর রাস্তায় ঝরে পড়ছে। এসব না খেতে পাওয়া দেশের নবজাগরণের খবর দেয়ার জন্যে সর্বথা উপযুক্ত। এই কলকল করে ঝরতে থাকা গানের আওয়াজ দিক দিগন্তে ছড়িয়ে পড়ছে। এদের পুলিয়াতেও হাওয়ার ঢেউয়ে কিছু ভেসে আসছে। আশপাশে শোনা যাছে শেয়ালের ডাক।

এটাই প্রমাণ হচ্ছে যে ওদের দলবেঁধে থাকার প্রবৃত্তি বেশ জোরদার। গ্রামের চারপাশের জঙ্গল কেটে সাফ করা হলেও—নিজের বাসভুমি থেকে বিতাড়িত ইহুদীদের মত—এরাও কোন একটা জায়গায় বসতি স্থাপনের জন্যে আন্দোলন গোছের কিছু করতে উৎসুক। কিন্তু এই সম্মিলিত শিবারব ছাপিয়ে শোনা যায় আরেকটা আওয়াজ-- হর্ন বাজাতে বাজাতে ঘন্টায় সত্তর মাইল বেগে শহরের দিকে ধাবমান ট্রাকের সারি।

রাত বাড়ছে। শহরের কোন শস্তা বারে রামের বোতল গড়াগড়ি যাচ্ছে, কোন ঢাবায় গোস্ত ও গরম তন্দুরী রুটি তৈরি হচ্ছে, আর কোথাও কোন ছুঁড়ি বিড়ি টানতে টানতে আমার অপেক্ষায় আছে---এইসব কল্পনা শ’ দু’শ মাইল দূর থেকে ট্রাক চালিয়ে আসা ড্রাইভারকে উত্তেজিত করতে এবং প্রাণপণে অ্যাকসিলেটরে পায়ের চাপ বাড়াতে যথেষ্ট। ফলে, প্রত্যেক পাঁচ মিনিটে কোন ট্রাক ঘরঘরিয়ে রাস্তা দিয়ে যায় আর সেই সময় পুলিয়ায় বসে থাকা আমাদের পরিচিত চার মহাপুরুষ নিঃশ্বাস নিতে ভুলে যান। ট্রাক চলে গেলে ‘জোর বাঁচা বেঁচেছি’ ভেবে নিশ্চিন্ত হয়ে ফের নিজেদের অসমাপ্ত আলোচনা চালিয়ে যান।

এতসব বাধাবিপত্তির মধ্যেও আলোচনা এগিয়ে যায়। খান্না মাস্টার দুখী স্বরে রুপ্পন ও রঙ্গনাথের কাছে সাহায্যের আবেদন করতে থাকেন। পকেট থেকে একটা চিরকুট বের করে রুপ্পন বাবুকে বলেন—‘এই দেখুন, আপনার প্রিন্সিপাল কীসব লিখেছে’।

রুপ্পন ,” আমি অন্ধকারে পড়তে পারি না। আপনি পারেন তো শুনিয়ে দিন”।

খান্না মাস্টার মুখে মুখে চিরকুটের সারাংশ শোনাতে লাগলেন। কথা উঠেছে মালবীয় স্যারের চালচলন নিয়ে। চিরকুটের কথা বিশ্বাস করলে মেনে নিতে হবে যে মালবীয় মাস্টার ছাত্রদের খুব ভালবাসেন। সেই ভালবাসা কোন কোন ছাত্রের সংগে একেবারে শারীরিক স্তরে প্রকাশ পায়। ওতে বেশ কিছু ঘটনার বর্ণনা আছে। যেমন, মালবীয় একটি ছাত্রকে শহরে নিয়ে সিনেমা দেখিয়ে ওর সংগে রাত কাটিয়ে ওকে আগামী পরীক্ষায় কেমন প্রশ্নপত্র হবে তার নমুনা দিয়ে তবে শিবপালগঞ্জে ফিরেছেন। চিরকুটের উদ্দেশ্য আদৌ সাহিত্যচর্চা নয়, বরং জনতাকে সত্যের সংগে পরিচয় করিয়ে দেয়া। তাই বর্ণনা শৈলী স্পষ্ট, সোজা সাপটা এবং কোথাও কোথাও একেবারে ক্যাওড়ামার্কা। এতে প্রিন্সিপাল এবং ম্যানেজারকে নিবেদন করা হয়েছে –যেন ওইরকম মাস্টারকে কান ধরে কলেজ থেকে বের করে দেয়া হোয়া

খান্না মাস্টার সংক্ষিপ্ত সংবাদ শুনিয়ে রূপ্পনকে বললেন—“এরপরেও বলবেন আমরা মুখ বন্ধ করে থাকব? প্রিন্সিপালের বিরুদ্ধে কিছু বলব না”?

রুপ্পন বাবু ভাঙের নেশায় বললেন, “কী করার ইচ্ছে”?

“আমাদের কাছে পাক্কা প্রমাণ আছে যে কাগজটা প্রিন্সিপালই ছাপিয়েছে। আমরা ওর বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করব”।

রঙ্গনাথ বলল, “কী লজ্জার কথা”!

রুপ্পনবাবু বেপরোয়া ভাবে বললেন, “দেখুন, সত্যি কথা হল মালবীয়ের সম্বন্ধে এরকম কিছু কথা আগেও শুনেছি। একটা ছেলে আমাকেই জানিয়েছিল যে মালবীয় স্যার আমাকে সিনেমা দেখাবেন বলছেন”---।

ওনার কথার মাঝে এক অদ্ভুত আওয়াজে বাধা পড়ল। মালবীয় জোরে জোরে নাক ঝাড়ছেন। এবার সবাই জানতে পারল যে উনি এতক্ষণ চুপটি করে মুখটি বুজে বসেছিলেন।

খান্না মাস্টার গরম হয়ে বললেন, “এই, এটাই! ক্যারেকটার অ্যাসেসিনেশন। একজন ভালমানুষকে এভাবে বদনাম করা। আপনার থেকে সহানুভুতি পাব ভেবেছিলাম। আর আপনিও এ’রকম উল্টোপালটা বলছেন”।

রূপ্পনবাবু নির্দয়, “আমি যা শুনেছি তাই বললাম। মাস্টাররা এসব করেই থাকেন। নালিশটা সত্যি হলেও বলব কোন নতুন কিছু নয়। তবে আমি এই নিয়ে চিরকুট ছাপানো পছন্দ করি না। আপনারা নিশ্চিন্ত হোন, আমি এর খোলাখুলি প্রতিবাদ করব”।

খান্না আরও উত্তেজিত হয়ে বললেন, “রুপ্পন বাবু, আপনি একই কথা বলে যাচ্ছেন—আমি এর প্রতিবাদ করি। এটা মালবীয়ের বিরুদ্ধে অপপ্রচার। চরিত্রহনন! কেউ কিছু একটা বললেই হল? এটা কোন কথা হল”?

উনি বলতে থাকেন, “লোকের কথা যদি ধরতেই হয়, সে তো বদ্রী পালোয়ানের বিষয়েও বলা হয়। কত কী আবোলতাবোল! কই, আমি তো বিশ্বাস করি নি”!

এবার রঙ্গনাথ প্রশ্ন করে, “বদ্রীদাদা! ওনার সম্বন্ধে কে কী ফালতু কথা বলছে”?

খান্না মাস্টার এবার এদিক সেদিক করে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বদ্রী পালোয়ানের প্রেমকান্ড শোনাতে থাকে। এসব ও কোন ছাত্রের থেকে শুনেছে। সেই ছাত্র আখড়ার কোন পালোয়ানের থেকে শুনেছে। আর সেই পালোয়ানো কারও না কারও মুখ থেকে শুনেছে---। খান্না মাস্টার যা বলল তাতে দুটো আরও লেজুড় যোগ করে দিল। যেমন, গয়াদীন মেয়ের বিয়ে না দিয়েও সাত আট মাস পরে দাদু হতে চলেছে এবং রুপ্পনবাবু উপহার হিসেবে এক ভাইপো পাবেন।

খবরের ঝটকা এমন জোরদার যে রুপ্পন পুলিয়া থেকে নালায় পড়ে যাচ্ছিলেন। রঙ্গনাথ চাপা দিতে গিয়ে বলল—এসব কিছু না। ভাঙের নেশা। কিন্তু সবার কাছে এটা স্পষ্ট –রুপ্পন বাবু হড়বড়িয়ে গেছেন। একেবারে হতভম্ব। একটু পরে সামলে উঠে মানস্ নেত্রে এমন অনেক কিছু দেখলেন যা আগে খেয়াল করেন নি। মনে পড়ল, বদ্রী পালোয়ান ইদানীং ছাতে গিয়ে ব্যায়াম করার নামে অনেকক্ষণ লাগায় এবং ছাতের দরজা বন্ধ করে রাখে। এবার ওনার কাছে স্পষ্ট হল কে সেই মেয়ে যে সেদিন রাতে রঙ্গনাথের খাটিয়ায় কে এসেছিল।

রুপ্পন বাবুর এবার ভাঙের গরম অসহ্য বোধ হল। অস্থির হয়ে এদিক ওদিক দেখতে লাগলেন। রঙ্গনাথ এবং খান্না মাস্টার প্রিন্সিপাল এবং তার চ্যালা-চামুন্ডার বিরুদ্ধে পেনাল কোডের ১০৭ ধারায় মামলা করার ব্যাপারে চর্চায় মগ্ন। খান্না আত্মকরুণার মহাকাব্যের এক নতুন অধ্যায় রচনা করতে শুরু করল। রুপ্পন বাবু খানিকক্ষণ চুপ করে সঙ্গীসাথীদের মন দিয়ে দেখছেন। চোখে পড়ল খান্না মাস্টার আগের চেয়ে রোগা হয়েছেন। আর মালবীয়, মনে হচ্ছিল চুপ করে বসে আছেন, আসলে চুপ নয়—ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন।

রুপ্পনের খুব রাগ হল, তবে কার উপরে সেটা স্পষ্ট নয়। তার সংগে এই মাস্টারদের উপর এবং নিজের উপরেও বড় দয়া হল। উনি এবার প্রিন্সিপালকে তেড়ে গাল দিতে শুরু করলেন। রঙ্গনাথ মাস্টারদের বোঝাতে চাইল যে –কিছু না, ভাঙের প্রভাব। কিন্তু রুপ্পন ওকে এক ধমকে থামিয়ে দিলেন।


শহরের এক কোণায় উঁচু পাঁচিলে ঘেরা একটি লম্বা-চওড়া বাংলো। ওর আকার প্রকার দেখে মনে হয় কোন তালুকদারকে ভাড়ায় থাকতে দেয়া হয়েছে। বাংলোর এক কোণায় একটি কামরায় জেলা বিদ্যালয়- পরিদর্শকের অফিস, বাকি অংশে ওনার আবাস। অফিসের পুরো ভাড়া আধিকারিক মহোদয় নিজের বাড়ির নামে দেখাতেন। এইরকম ‘মৈত্রীপূর্ণ-সমঝোতা’কে ইংরেজিতে বলে ‘অফিস-কাম-রেসিডেন্স’। হিন্দিতে বলে ‘ অফিস-কম-রেজিডেন্স-জ্যাদা’।

ওই দপ্তর থেকে, মানে কোণের কামরাটি থেকে বৈদ্যজী, প্রিন্সিপাল সাহেব এবং রুপ্পন বাবু বেরিয়ে এলেন। বাইরে থেকে দেখলে লোকে ভাববে তিনটে চোর বাংলোর ভেতর কিছু কম্মো সেরে বাথরুমের দরজা দিয়ে কেটে পড়ছে। পাঁচ দশ পা হাঁটার পর ওদের চলার গতি মন্থর হল। ওঁরা এদিক ওদিক তাকিয়ে লনের মাপজোক এবং বাগানের শোভা দেখতে লাগলেন। পোর্টিকো দেখে রুপ্পন বললেন, “মনে হচ্ছে ইন্সপেক্টর সাহেবের গাড়িটার একেবারে জর্জর অবস্থা”। প্রিন্সিপাল একনজর বুলিয়ে মন্তব্য করলেন,”হয়ত গাড়ি র ভাতা আটকে গেছে”।

“তাই”, রুপ্পন বললেন, “যাই হোক, খুব ঠাট। সবকিছু ফোকটে”।

ফটকের কাছে চাপরাশি দেখা দিল। প্রিন্সিপালকে দেখে ও এক বিশেষ কায়দায় মুখ বাঁকালো। প্রিন্সিপাল আর এক ধরণের ভেঙচি কেটে মাথা গোল গোল ঘোরালেন। চাপরাশি তৃতীয় কায়দায় মুখ বাঁকালো। প্রিন্সিপাল এবার পকেট হাতড়ে একটা আধুলি বের করে ওকে দেবার সময় বললেন, “ভাই, প্রত্যেক বার যদি এমনি করে—“।

চাপরাশি নরম গলায় বলল, “আপনাদের দয়াতেই করে খাচ্ছি”।

রুপ্পন বাবু বললেন, “এতে কোন সন্দেহ আছে”?

বৈদ্যজী এসব কড়া চোখে দেখলেন এবং রাস্তায় নামলেন। রুপ্পনবাবুর ফুর্তিতে কোন ফারাক হয় নি। বরং প্রিন্সিপালকে হালকা মেজাজে জ্ঞান দিলেন, “এসবের জন্যে দু’আনা দিলেই হয়। আট আনায় দুটো পান খাওয়া যেত”।

এটা শহরের সেই এলাকা যাকে ইংরেজ সিভিল লাইনস্‌ নাম দিয়ে উত্তরাধিকারী ও মানসপুত্রদের জন্যে ছেড়ে গেছে। রাস্তায় লোকের চলাফেরা খুব কম। কখনও সখনও দু’একটা ঝকঝকে মোটরগাড়ি—সে সরকারি হোক, ধারে পাওয়া হোক, অথবা ফোকটে—ঝাঁ করে চলে যায়। পথচারীরা ভাগ্য ও ভগবানের দয়ায় বেঁচে গেলে খুশি মনে একধারে সিঁটিয়ে যায়। কখনও কোন জর্জর চেহারার প্রাইভেট কার খড়খড়িয়ে ধীরে ধীরে চলতে থাকে। দেখলেই মনে হয় ভাতা-টাতা না পেয়ে রোগা, অসুস্থ, অ্যানিমিয়াগ্রস্ত।


বিকেল হয়েছে, চারটে বাজে। চতুর্থ শ্রেণীর সরকারি আদমি উঁচু পদের সরকারি অফিসারের বাচ্চাদের নিজের সাইকেলে বসিয়ে কির কির করে ঘন্টি বাজিয়ে চলছে। বাচ্চারা ইংরেজি স্কুল থেকে বাড়ি ফিরছে। সবারই তাড়া যে বাড়ি গিয়ে কোন মহান বার্তা পৌঁছাতে হবে। দুটো বাচ্চা তর্ক জুড়েছে, বিতর্কের বিষয় একটি বার্তা—“কাল যদি তোমার মাম্মি তোমায় দ্বিতীয় ড্রইংকপি কিনে না দেয় তাহলে তুমি পনিশ পাবে’। ওদের একজন সাইকেলের বসেছে সামনের ডান্ডাতে, অন্যজন পেছনের ক্যারিয়ারে। ওদের মাঝখানে সাইকেলের সীটের উপর একজন উর্দি পরা চাপরাশি।

প্রিন্সিপাল সাহেবের দুটো হাত ওনার পকেটে ঢুকে গেল। মানে উনি ছোট মুখে কোন বড় কথা বলার জন্যে তৈরি হচ্ছেন। বললেন, “ভাবছি আগামী জুলাই থেকেই আমাদের কলেজে ছেলেগুলোর জন্যে ইউনিফর্মের চলন শুরু করলে কেমন হয়”?

“উত্তম প্রস্তাব”, বৈদ্যজী সায় দিলেন।

একটু পেছনে চলতে চলতে রুপ্পন বাবু প্রিন্সিপালকে বললেন, “কোন ইউনিফর্ম চালাতে চাইছেন—চাপরাশির উর্দি? নাকি বাচ্চাগুলোর”?

‘রুপ্পনবাবু, আমি পুরোদস্তুর সোশ্যালিস্ট। আমার চোখে দু’য়ে কোন ভেদ নেই”।

“আমি তো আপনাকে জুড়ে দিচ্ছি। তিনেও কোন ভেদ নেই”।

ওরা খানিকক্ষণ চুপচাপ হাঁটছিলেন। হঠাৎ প্রিন্সিপাল বৈদ্যজীকে বললেন, “ইনস্পেক্টর সাহেবের ঘর থেকে ঘিয়ের খালি টিন ফেরত আসে নি”।

বৈদ্যজীর চলার ভঙ্গি বেশ গম্ভীর। কিছু ভেবে নিয়ে বললেন, “তা দশ সের ঘি হবে। যখন এতখানি ঘি দিয়েছ, খালি টিন নিয়ে কিসের দুঃখ”!

প্রিন্সিপাল হেসে ফেললেন, “যেতে দিন। যখন গরুটাই চলে গেছে তখন বাঁধার দড়ি নিয়ে কেন আফশোস”!

“সেটাই তো কথা”, বৈদ্যজী আরও গম্ভীর। এবার কথক ঠাকুর হয়ে কথা ফেনাতে লাগলেন। “ যখন হাতি দান হয়ে গেছে, অংকুশ নিয়ে কিসের চুলোচুলি! রাম যখন বিভীষণের রাজতিলক করলেন, তখন জাম্বুবান বললে—মহারাজ, গোটা রাজপাট দিয়ে দিলেন? নিজের জন্যে একটা ভবন তো রেখে দিতেন?

তাতে মর্যাদা পুরুষোত্তম শ্রীরামচন্দ্রজী মহারাজ বললেন—‘হে জাম্ববন্ত, বিক্রীতে করিণি কিমঁকুশে বিবাদঃ’? হাতি বেচার পর অংকুশ নিয়ে কেন ঝগড়া করা”?

প্রিন্সিপালের মন থেকে একটা কাঁটা বেরিয়ে গেল। কোন উঁচুদরের ভাগ্যবাদীর মত মাথা নাড়িয়ে বাহাদুরি দেখিয়ে বললেন, “তাহলে এটাই ঠিক। যেতে দিন। একটা খালি টিন পেয়ে হবেটা কী”?

রুপ্পন বাবু বললেন, “তবে কথাটা নীতি হিসেবে ভুল। ওনার উচিত ছিল খালি টিন ফেরত দেয়া। প্রত্যেকবার একটা করে নতুন টিন! আসবে কোত্থেকে”? উনি বেশ উৎসাহ দেখিয়ে প্রিন্সিপালকে বললেন, “দেখুন, আপনার যদি ফেরত চাইতে সংকোচ হচ্ছে, আমাকে হুকুম দিন। আমি গিয়ে ফেরত নিয়ে আসব”।

কিন্তু ওনাকে কেউ হুকুম দিল না।

(চলবে)
0

ধারাবাহিক - রঞ্জন রায়

Posted in




















পর্ব ২৭



সে এক সময় ছিল যখন দার্শনিকের দল পরমাত্মার অস্তিত্ব নিয়ে তর্কবিতর্কে

মেতে উঠতেন। তবে আজকাল তর্ক হচ্ছে গম উৎপাদন নিয়ে। দার্শনিকদের এক দল

বলছেন—দেশে যথেষ্ট গম উৎপন্ন হচ্ছে, শুধু শয়তান দোকানদারদের মজুত করে

গুদামে লুকিয়ে রাখার অভ্যাসের ফলে সমস্যা হচ্ছে।

দ্বিতীয় দলের অভিমত হল—গম বলে কিছুর অস্তিত্ব আছে কি? থাকলেও এদেশে

তো নেই। এই অন্তহীন তর্কবিতর্কের ঢেউ একসময় শিবপালগঞ্জে পৌঁছে গেল।

লোকজন শুধু গম নয়, দুধ -দই- ঘি নিয়েও ওইরকম নাস্তিকতা দেখাতে লাগল।

এইরকম খাদ্যসংকটে কুস্তির আখড়া কি হাওয়া খেয়ে বা খাইয়ে বেঁচে থাকবে? ক’বছর

আগে ছেলেছোকরার দল ব্যায়াম আর কুস্তির দাঁও প্যাঁচের অভ্যাস করে ক্লান্তিতে চুর

চুর হয়ে বাড়ি এলে অন্ততঃ ভিজিয়ে রাখা ছোলা এবং ঘোল খেতে পেত। এখন সেটাও

গেছে। এটা এবং আরও কিছু জিনিস মিলে এমন এক পরিবেশ তৈরি হল যে গ্রামের

নওজোয়ানদের নিষ্কর্মা ও কুঁড়ে হওয়া ছাড়া কোন কাজ রইল না। ওরা ছেঁড়াখোঁড়া

পোষাকের উপর রঙিন পাতলুন-পায়জামা পরে রোগা পাতলা পা ঢাকল এবং বুকে মাংস

লাগুক -না- লাগুক, বুকের মধ্যে সায়রা বানুর সংগে শোয়ার স্বপ্ন ভরে অলিগলিতে

পানের পিক পিচ করে ফেলে উদ্দেশ্যহীন ভাবে ঘুরে বেড়াতে লাগল।

ওদের মধ্যে বেশ ক’জন কখনও কখনও খেতখামার-কলকারখানা এবং জেলখানা ঘুরে

ফেরত এসে যেত। যারা ওদিকপানে যাবার সাহস জোটাতে পারে নি, তারা স্থানীয় কলেজে

মুখ্যু হওয়ার পাঠ নিতে ভর্তি হত। এই ধরণের কলেজ হামেশা কোন স্থানীয় জননায়কের

প্রেরণায় সাধারণ লোকের মধ্যে শিক্ষা প্রসারের নাম নিয়ে খোলা হত। এর আসল

উদ্দেশ্য ওই জননায়ক ভদ্রলোকের জন্যে আগামী বিধানসভা অথবা লোকসভা

নির্বাচন জেতার জমি তৈরি করা এবং আসল কাজ বলতে কয়েকজন মাস্টার ও সরকারি

অনুদানের শোষণ করা। এইসব কলেজ সাময়িক ফ্যাশনের হিসেবে বিনা আগুপাছু ভেবে

চালিয়ে যাওয়া হয়। আর এটাও পাক্কা যে ওখানকার ছাত্রের দল নিজেদের জন্মসূত্রে

প্রাপ্ত আর্থিক ও সামাজিক অবস্থায় সন্তুষ্ট থাকবে এবং কখনোই সেই জায়গা

ছাড়িয়ে উপরে ওঠার চেষ্টা করবে না। সরকারি উচ্চপদ এবং ব্যবসাপাতি যাঁদের হাতে,

তাঁদের মনোপলিতে ওই কলেজগুলোর থেকে কোন বাধা আসবে না।

সে যাই হোক, এইসব শোরগোলে আখড়া সংস্কৃতি খতম হওয়ার উপক্রম, আর গ্রামের

নবযুবকদের শারীরিক বিকাশ এখন ওদের মানসিক বিকাশের সংগে পাল্লা দিচ্ছে।

সেভাবে দেখলে শিবপালগঞ্জে একটা আখড়া থাকা এবং তাতে কিছু ছেলেছোকরার

নিয়মিত যাতায়াত এক মহত্বপূর্ণ তথ্য বটে।




বলার দরকার নেই যে এসব হচ্ছে বদ্রী পালোয়ানের সৌজন্যে। বেশ কয় বছর ধরে ও

নিয়মিত আখড়ায় গিয়ে ব্যায়াম করে, চ্যালাদের মধ্য কুস্তি প্রতিযোগিতা করায়। যখন

ওরা কাউকে তুলে আছাড় দেয়, বা শরীরের কোন অঙ্গে চোট লাগিয়ে দেয়, তখন সবাই

মেনে নেয় যে চ্যালাটি এখন পুরো পালোয়ান হয়ে গেছে।

আর বেশ ক’দিন কসরত করে এবং কুস্তি লড়ে কোন চ্যালা যদি উঃ আঃ করতে করতে

ঘরে ফেরে তো বুঝতে হবে ও আখড়ার কনভোকেশন থেকে ডিগ্রি নিয়ে বাড়ি এসেছে।

আজ আখড়া থেকে দুই পালোয়ান টলতে টলতে বেরোল। একজন বদ্রী, অন্যটি ছোটে।

দুজনেরই ন্যাড়া মাথা। তার উপর ঘাম আর মাটি মিশে যেন পলেস্তারা পড়েছে। ঘাড়ের

পেছনে গণ্ডারের মত বেশ ক’টা চামড়ার ভাঁজ। দুজনেই ল্যাঙগোটের এক প্রান্ত হাতির

শুঁড়ের মতন সামনে ঝুলিয়ে চলছে। ল্যাঙোটের সরু পট্টির পাশ থেকে অণ্ডকোষের

সংক্ষিপ্ত সংস্করণ বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের নজরে স্পষ্ট হচ্ছে। তবে যেমন শিল্পের

দোহাই দিয়ে হেনরি মিলার ও ডি এইচ লরেন্সকে অশ্লীলতার অভিযোগ থেকে ছাড়

দেওয়া হয়, তেমনই ভারতীয় ব্যায়ামের দোহাই দিয়ে ওই দুই পালোয়ানকেও ওসব

দেখানোর ছাড় দেওয়া হয়।

ছোটে পালোয়ানের সমাবর্তনের ডিগ্রি বেশ কয়েক বছর আগে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু

আজ বোধহয় পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ডিগ্রি পেয়েছে। তাই একটু পরে পরেই খুব ধীমে স্বরে

উঃ আঃ করছে। কিন্তু গুরুর সামনে আত্মসম্মান রক্ষা করতে আওয়াজ মুখ থেকে ‘হায়’

না হয়ে একটা দীর্ঘশ্বাসের সংগে মিশে ‘হাব্‌’ গোছের রূপ নিয়ে বেরোচ্ছে। বদ্রী চলছে

চুপচাপ, যেন ছোটের কষ্টের সংগে ওর কোন সম্পর্ক নেই।

আজ বদ্রী পালোয়ান ছোটে ব্যাটাকে ধোবী পাছাড় লাগিয়ে চিত করেছে।

এই প্যাঁচের প্রয়োগ করতে বদ্রী পালোয়ানকে এক অনেক উচ্চস্তরের কবির মত কাজ

করতে হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর “বিজয়িনী” কবিতায় এক নারীর কোন সরোবরের

স্নান করার সময় কামদেব আদি কিছু পাত্রের বিষয়ে অভূতপূর্ব কল্পনা করেছিলেন।

ধোবী পাছাড় প্যাঁচ কষার জন্যে বদ্রীকে তার চেয়ে বেশি অদ্ভূত কল্পনা করতে হয়েছে।

যেমন এটা আখড়া নয়, এক চমৎকার সরোবর--- “সমীরণ প্রলাপ বকিতেছিল

প্রচ্ছায়সঘন পল্লব-শয়নতলে---“।

ওই পরিবেশে ও নিজেকে এক ধোপা হিসেবে কল্পনা করল, আর প্রতিদ্বন্দ্বীকে কোন

নারীর পেটিকোট। ফের ও সেই ব্যাটার হাত টেনে নিজের পিঠের দিক থেকে কাঁধের উপর

উঁচুতে তুলে আখড়ার মাটিতে আছড়ে ফেলল। আছড়ে ফেলার সময় খেয়াল রাখতে হয় যাতে

মাটিতে পড়ার সময় পেটিকোটের সামনের ভাগ উপরের দিকে থাকে। অর্থাৎ

প্রতিদ্বন্দ্বীকে এমন ভাবে পটকাতে হবে যাতে সে মাটিতে চিৎ হয়ে পড়ে।




তারপর?

“বিজয়! বিজয়! মহান বিজয়! শত্রু জানু পাতি বসি , নির্বাক বিস্ময়ভরে নতশিরে---“।

বদ্রী পালোয়ান আজ ছোটেকে আছাড় মারার সময় একটু বেশি কল্পনা করে ফেলল। ওর

কল্পনায় এটা আখড়া নয় পুকুর। আর এটা আখড়ার মাটির আল নয়, পুকুরের ঘাটের

সিঁড়ির পাথর। ফলে ছোটে পালোয়ানের যখন আখড়ায় চিৎ হয়ে আখড়ার উপর বিছিয়ে

থাকা ‘প্রচ্ছায় সঘনপল্লব” দেখার কথা, ও দেখল চোখ থেকে আগুনের ফুলকি

বেরোচ্ছে, কোমরের নিচের অংশ আখড়ার জমির বাইরে , উপরের অংশ আখড়ার ভেতর।

আর ও নেহাত বেহায়া, নইলে কোমর ভেঙে যাওয়ার কথা।

কপালগুণে বদ্রী হল ছোটে পালোয়ানের ওস্তাদ, নইলে এতক্ষণে ওর চোখ থেকে জল

আর মুখ থেকে হাজার গালির ফোয়ারা ছুটত। কিন্তু ওস্তাদের প্রতি সম্ভ্রম দেখিয়ে ও

চুপচাপ হাঁটছে, বেশি কষ্ট হলে মুখ থেকে একটা ‘হাব্‌’ গোছের আওয়াজ বের করছে।

কিন্তু ওর বিপদ এখানেই শেষ হল না। চলতে চলতে বদ্রী পালোয়ান জিজ্ঞেস করল, “কী

হে, সেদিন জোগনাথের হয়ে সাক্ষী দিতে গিয়ে তুমি কীসব বলে এসেছ”?

“কোন শালা জোগনাথের সাক্ষী? আমি তো পুলিসের সাক্ষী ছিলাম”। ছোটে কোমরের

ব্যথা চেপে গিয়ে বেপরোয়া ভাব দেখিয়ে বলল।

বদ্রী বেশ শান্ত স্বরে বলল, “সোজা প্রশ্নের সোজা জবাব চাই। এর মধ্যে শালা-

ভগ্নীপতিকে নিয়ে টানাটানি কেন”?

“কে আবার ত্যাড়া চাল দিচ্ছে”? ছোটে বলল বটে, কিন্তু গলার জোর যেন কমে গেল।

বদ্রী পালোয়ান এসব নিরর্থক কথাবার্তা এড়িয়ে সোজা প্রশ্ন করল, “তুমি সেদিন

সাক্ষী দেবার সময় বেলাকে নিয়ে কী বলেছ”?

“আমার কী বলার ছিল? তখন যা মুখে এল বলে দিলাম”।

বদ্রী পালোয়ান বড় নরম গলায় কথা বলছিল। এবার ছোটের হাথ ধরে বলল, “ওর

জোগনাথের সংগে কোন ইন্টুমিন্টু ছিল”?

ছোটে নিজের হাতটা আস্তে করে ছাড়িয়ে নিল। আঙুল ধরে বাহু ধরা যায়। আবার বাহু

ধরলে ধোবীপাট প্যাঁচ লাগিয়ে কাউকে চিত করা যায়—এটা ও একটু আগেই দেখেছে। কথা

পালটানোর জন্যে বলল, “আমি কি জানি কার সংগে কার ইন্টুমিন্টু চলছে? গাঁয়ের

চারপাশে অড়হরের খেত। তার আড়ালে কে কার সংগে লাগাচ্ছে, আমি কোথায় কোথায়

উঁকি দেব”?




বদ্রী আগের মতই নরম আওয়াজে বলল, “কিন্তু তুমি নাকি বলেছ যে নিজের চোখে

বেলাকে জোগনাথের সংগে সটরপটর অবস্থায় দেখেছ”?

“বললে কী হয়”?

বদ্রী পালোয়ান হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল। কড়া আওয়াজে বলল, “কেন হয় না? তুমি বলেছ কি

বলনি”?

এবার ছোটে পালোয়ানের একটু ভয় ভয় করতে লাগল। ওর গলার স্বরে বেপরোয়া ভাব

গায়েব। শাশ্বত কালজয়ী সাহিত্যের লেখকও যেমন রেডিওর প্রশ্নকর্তার সামনে

হড়বড়িয়ে যায়, তো তো করে, তেমনই ছোটে বদ্রী পালোয়ানের সামনে হড়বড়িয়ে গেল।

মাফ চেয়ে বলল, “ গুরু, বলেছিলাম তো! বলতে গিয়ে অনেক কিছু বলেছিলাম। আদালতে

সাক্ষী দেওয়া বলে কথা! যা মুখে এল, বলতে থাকলাম। কে ওখানে সত্যি বলে”!

বদ্রী পালোয়ান অন্ধকারে খানিকক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। যে কাজটা কোন পালোয়ান

সহজে করতে পারে না, বদ্রী সেটাই করতে লাগল। অর্থাৎ কিছু একটা ভাব ছিল।

ছোটে এতে আরও ঘাবড়ে গেল। একটু তুতলে তুতলে বলল, “গুরু, কী নিয়ে এত চিন্তা-

ভাবনা? ভাবনাচিন্তা ছোটলোকের কাজ। আমাকে বল, হয়েছেটা কী”?

বদ্রী ধীরে ধীরে বলল, “ভাবছি, তোকে লাথি মেরে মেরে শায়েস্তা করি? নাকি জুতোপেটা

করি? শালা, তোর মুখে কুকুরের ছানা পেচ্ছাপ করে! থু ! থু !”

এই বলে ও বেশ ঘেন্নার সঙ্গে মাটিতে একদলা থুতু ফেলল।

ছোটে হক্কাবক্কা! থেমে থেমে অনুনয় করতে লাগল, “এমন কথা বল না গুরু! বলে দাও

কোথায় কী ভুল করেছি”।

“তুমি শালা বললেও বুঝতে পারবে কি? এক ভাল ঘরের মেয়ের সম্মান গোটা দুনিয়ার

সামনে ধূলোয় ছুঁড়ে ফেললে। তোমার চোখে এটা কিছুই নয়”?

ব্যস্‌ এইটুকু ব্যাপার! এবার ছোটে পালোয়ান শান্তিতে দম নিল। ফের বেপরোয়া ভাব

দেখিয়ে বলল, “গুরু, আমি যাই বলে থাকি, সেসব তো ভরা আদালতে ঈশ্বরের দিব্যি গেলে

বলেছি। সবাই জানে যে আদালতে যা বলা হয় তার কোন মাথামুণ্ডু নেই। এতে কার কী

ক্ষতি হোল”?

বদ্রীকে চুপ করতে দেখে ছোটের হিম্মত আরও বেড়ে গেল। অর্থাৎ নিজস্ব ঢঙে বাকি

দুনিয়াকে পোকামাকড় ভেবে ও নিজের কথাটা শেষ করল, “এই জন্যে আমাকে জুতো পেটা

করবে, গুরু? বাহ্‌ গুরু, তুমিও কখনও কখনও এমন সব কায়দা করে কথা বল যে আমিও

অবাক হয়ে ভাবতে থাকি—হয়েছেটা কী”?




বদ্রী পালোয়ান দুই হাতে নিজের গর্দান মালিশ করে তার উপর দু-চারটে তামাচা

লাগালো। এভাবে ও নিজের ঘাড়ে জমে প্লাস্টার হওয়া আখড়ার ধূলোমাটি ঝেড়ে ফেলল

এবং এতক্ষণ ধরে যা যা ভাবছিল সব এক ঝটকায় ছুঁড়ে ফেলল। তারপর আচমকা হেসে

উঠে বলল, “তুই শালা খানদানী খচ্চর। ডাইনে বাঁয়ে দেখে চলতে হয় না? বেলা মেয়েটি

এখন তোর আম্মা হতে যাচ্ছে। তাকে তুই ছেনাল বল বা অন্য কোন নোংরা শব্দ—গালি

তোরই গায়ে লাগবে”।

“এটা কী বললে গুরু”?

“বলার কী আছে? একমাসের ভেতর বেলার বিয়ে হবে। বদ্রী পালোয়ানের সংগে। আর তুই

সানাইয়ে পোঁ ধরবি। মাথায় কিছু ঢুকল”?

সার্কাসের জোকার ফালতু প্রলাপ বকে, বাঁদর-নাচ নাচে। রাস্তায় তামাশা করা ঢোল

বাজাতে বাজাতে হাতের কাঠের টুকরো বগলের তলা দিয়ে কায়দা করে ঘুরিয়ে তাল-ফেরতা

বাজায়। আখড়ায় দু’তিন পালোয়ান খামোখা হাতের উপর ভর করে পা শূন্যে তুলে বিচ্ছুর

মত চলে। গোধূলি বেলায় ঘরে ফেরার সময় বাছুর মাথা ঝুঁকিয়ে খানিক এলোমেলো দৌড়তে

থাকে। তারপর লাফালাফির আনন্দে ওপাশের ডোবায় ঝাঁপিয়ে পড়ে। শনিচর ব্যাটা

অকারণে হঠাৎ চেঁচায়—উর্‌ র্‌ র্‌!

বদ্রী পালোয়ানের কথা শুনে ছোটে পালোয়ানের মনে হল ওইরকম কিছু অর্থহীন

প্রলাপের বোঝা ওর সামনে ফেলে রাখা হয়েছে। আর কেউ ওকে ওই জঞ্জালের গাদায়

চিত করে পটকে দিয়েছে। ওর মুখ থেকে খালি একটা কথা শোনা গেল, “এসব কী বলছ

গুরু”?

“যা বললাম কানে ঢোকে নি”? বদ্রী হালকা ভাবে ঠাট্টা করার ছন্দে বলতে লাগল, “কী

ব্যাপার? কানে খুব ময়লা জমেছে? আবার শোন, আমি বেলাকে বিয়ে করছি। ওকে কথা

দিয়েছি। সেদিন তুমি যখন এজলাসে দাঁড়িয়ে ওর বদনাম করছিলে আমার এক এক রোঁয়া

আগুনে জ্বলছিল। মন চাইছিল --এক চাঁটিতে তোমার মাথা পেটে ঢুকিয়ে দি। কিন্তু তুমি

আমার চ্যালা। তাই পালক-বালক ভেবে মাফ করে দিলাম”।

একটা দীর্ঘশ্বাস! তারপর বদ্রী নিজের কথা শেষ করল এই বলে—“ যাক, যা হবার হয়ে

গেছে। এবার থেকে জিভে লাগাম দাও”।

ছোটের এখনও মনে হচ্ছে যে ও ফালতু কথার জঞ্জালের উপর চিত হয়ে শুয়ে আছে। আর

বদ্রী পালোয়ান যা বলছে সেসব কোন স্বপ্নলোকের কথা। ও বলল, “গুরু, তুমি হলে

বামুন। মেয়েটা বেনে। একটু ভেবে কথা বল। বৈদ্যজী মহারাজ যদি খেরে গিয়ে জিদ ধরেন

তাহলে তোমার পুরো ইস্কিম ভস্কে যাবে”।

বদ্রী বলল—“ হাথী চলে বাজার মেঁ, কুত্তা ভোঁকে হাজার মেঁ”।




ছোটে প্রায় হাতে পায়ে ধরতে লাগল, “গুরু, তুমি দেখছি প্রবাদ আউড়ে যাচ্ছ। এতে

বৈদ্যজী গলে যাবেন”?

মনে হচ্ছে মনের গোপন কথা বলে ফেলে বদ্রী একটু হালকা হয়েছে। ও জবাব না দিয়ে

সিটি বাজাতে লাগল।

আরও খানিকক্ষণ হাঁটার পর পুরো ব্যাপারটা আর তার গুরুত্ব ছোটে পালোয়ানের মগজে

ঢুকল। বেলার সম্বন্ধে উড়ো খবর ছিল যে রূপ্পন বাবু ওকে একটা চিঠি লিখেছেন।

এইভাবে উড়তে উড়তে ওর কানে এটাও পৌঁছেছিল যে কোন ছুঁড়ি রাত্তিরে বৈদ্যজীর ছাতে

এসেছিল। তবে রঙ্গনাথের সংগে ধাক্কা লাগায় পালিয়ে গেছল।

যে বাড়িগুলোর ছাত থেকে অনায়াসে বৈদ্যজীর ছাতে আসা যায় তার মধ্যে গয়াদীনের বাড়ি

একটি। রূপ্পনবাবু একদিন বলেছিলেন যে কোন মেয়ের লেখা চিঠি রঙ্গনাথের হাতে

এসেছে। কিন্তু রঙ্গনাথ সে নিয়ে খুলে বলছে না। ছোটে পালোয়ানের সন্দেহ হচ্ছিল যে

রূপ্পন বাবু কিছুদিন ধরে বেলার পেছনে লেগে আছেন আর প্রায় পটিয়ে ফেলেছেন। এই

পরিস্থিতির মধ্যে হঠাৎ একী! বেলার সাথে বদ্রী পালোয়ানের সম্বন্ধ আর মামলা

অনেকদূর গড়িয়েছে! ছোটে হড়বড়িয়ে গেল।

জিজ্ঞেস করল, “কিন্তু গুরু, শুনেছি রূপ্পনবাবু বেলাকে নিয়ে কিছু চিঠিচাপাটি

করেছিলেন”?

--“হ্যাঁ করেছিল। ছেলেমানুষ। বোকামি করেছে”।

-“শুনেছি, ওদিক থেকেও পালটা চিঠি এসেছিল”।

বদ্রী পালোয়ান কড়া সুরে বললে, “কে বলেছে”?

--“কেউ না, গুরু”।

-“তাহলে তুমি শুনলে কী করে”?

--“মন পড়ছে না গুরু। তবে কেউ না কেউ অমন হাওয়ায় উড়তে থাকা কথার পিঠে বলে

থাকবে”।

বদ্রী পালোয়ান চুপ। যখন কেউ কথাবার্তার সময় আদালতে ঈশ্বরের নামে দিব্যি গেলে

সাক্ষী দেয়ার পেশাদারি কায়দার নকল করে তখন আর কোন প্রশ্ন করা অর্থহীন হয়ে

যায়। বদ্রী খানিকক্ষণ চুপ করে থাকার পর খুলে বলল, “হ্যাঁ, চিঠি এসেছিল। তবে

আমার জন্যে। কিন্তু ওটা ঠিক চিঠি ছিল না। আজকালকার মেয়েদের ন্যাকামি—ফিল্মি

গানটানের কথায় ভর্তি”।




ছোটে এবার তোষামুদে স্বরে বলল, “ তো গুরু, ব্যপারটা কয়েক বছর ধরে চলছে, কী বল?

ছাতের উপরেই---“।

বদ্রী বলল, “ছোটে, এতবড় খবরটা সবার আগে শুধু তোমাকেই বললাম। যতটা শুনলে তাই

অনেক। বেশি খোঁচাখুঁচি করার দরকার নেই। আর দেখ, কাউকে বোল না যেন”।

ছোটে পালোয়ান অন্ধকারে কারও বারান্দার বাড়িয়ে রাখা একটা কোণায় হোঁচট খেল।

এগুলো গ্রামের লোক কোন জমির টুকরো হাতিয়ে নেবার উদ্দেশ্যে বানায়। মুখে এল কাঁচা

খিস্তি। তারপর কোমরের ব্যাথার প্রতি সম্মান দেখিয়ে একবার ‘হাব্‌’ গোছের আওয়াজ

বের করে বদ্রীকে বলল, “কাউকে বলব না গুরু”।

--“কিছুদিন পরে সবাই জানতে পারবে। কিন্তু এখন খবরটা চেপে রাখ”।

-“বললাম তো গুরু! কাউকে বলব না”।

একটু পরে বদ্রী পালোয়ান হেসে উঠল। বলল, “বাহ, রে ছোটে! কেমন যুগলের জোড়

বানিয়েছ! বেলা চক্কর চালাবে জোগনাথের সংগে? শালা ফুটো পয়সার গুড়! বেলা যদি ওর

হাত ধরে তো তোতলাতে থাকবে। তুমি বেলাকে ওর সংগে জোড় বানিয়ে দিলে? তুমি শালা

খড়ুসের খড়ুস! মাথামোটার হদ্দ”!

ছোটে পালোয়ানের কোমর থেকে একটা ব্যথা ঝিলিক দিয়ে উঠল। মনে হোল ধোবীপাছাড়

দিয়ে কেউ ওকে ফের পটকে দিয়েছে।

একজায়গায় এসে ওরা আলাদা হয়ে নিজের নিজের ঘরের পথ ধরল। কিন্তু তার আগে

বদ্রী ফের ছোটেকে মনে করিয়ে দিল—ওর আর বেলার সম্পর্কের কথা যেন পাঁচকান না

হয়। ছোটে বড় নিষ্ঠার সংগে গোপনীয়তার শপথ নিল। কিন্তু এই শপথ ওইসব তথাকথিত

শপথের মতই—যা রাজভবনে নেওয়া হয়। ফলে পরের দিনই বদ্রী পালোয়ানের সংগে

যাদের মোলাকাত হল, তাদের মধ্যে অনেকেই বদ্রীকে বদলে যাওয়া চোখে দেখতে লাগল।

(চলবে)
0

ধারাবাহিক - শৌনক দত্ত

Posted in




















২২. আবহমান বাঙালী জীবন তথা বাঙালিত্বের প্রতি





সুপ্রিয়বরেষু

বাসু

তোমার চিঠি যখন পেলাম ঠিক তার চার ঘন্টা পরেই আমার ফ্লাইট ছিল লন্ডন যাবার তাই চিঠিটা পড়া হয়নি, সঙ্গে নিয়ে গেলেও কাজের চাপে সেই চিঠি আবার বারদিন পরে আমার সাথে ফিরে এসেছে। বিস্তর সময় পরে গতকাল অফিস শেষে বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় তোমার চিঠি পড়েছি। তোমার চিঠি পড়তে পড়তে আমার বারবার মনে পড়ছিল পরিমল ভট্টাচার্যর‘সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা’ প্রসঙ্গ। 'সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা' কে শুধু একটি উপন্যাস বললে ভুল বলা হবে, পরিমল ভট্টাচার্যের লেখালেখির সঙ্গে যারা পরিচিত, তারা জানে তাঁর গদ্যের একটি নিজস্ব ভূগোল আছে। তিনি নিছক কাহিনি বলেন না, তিনি ইতিহাসের গায়ে কান পেতে, হারিয়ে যাওয়া জনপদের ধ্বনি শোনেন, নদীর ভাঙন ও মানুষের স্মৃতিকে একই সঙ্গে হৃদয়ে ধারণ করেন। পরিমল ভট্টাচার্যর ‘ফিল্ড নোটস ফ্রম আ ওয়াটারবোর্ন ল্যান্ড’ তো পড়েছো তাঁর সেই নদী চেতনার দেখা এখানেও মেলে এবং তা গুরুত্বপূর্ণ, আমরা তো জানি বাংলার ইতিহাস নদী ছাড়া অসম্পূর্ণ। সাতগাঁর পতনের পিছনেও নদীর ভূমিকা ছিল। লেখক নদীকে ইতিহাসের চরিত্রে পরিণত করেছেন। এই বইটি বড় ক্যানভাসে সময়, স্মৃতি, নদীসভ্যতা, উপনিবেশ, ইতিহাস, লোকবিশ্বাস, মিথ, পরিযান, ভাষা ও মানুষের অন্তর্গত বিষন্নতার এক বিশাল আর্কাইভ। ইতিহাস, মিথ এবং স্মৃতির এক জাদুময় আখ্যান। হুগলি ও সরস্বতী নদীর মধ্যবর্তী প্রাচীন বন্দর নগরী সাতগাঁর পটভূমিতে লেখা এই উপন্যাসটি ৭০০ বছরের পুরোনো এক বিপন্ন জনপদের ও বহুবর্ণ সংস্কৃতির মহাকাব্য। বইটা শেষ করেছি অনেকদিন হলো এখনো উপন্যাসের পটভূমি, চরিত্ররা ঘিরে আছে মনে হয় মাথার প্রতিটি কোষে মিশে গেছে চোখের তারায় ফুটে ওঠে ত্রিবেণীতে গঙ্গা, ভাগীরথী ও সরস্বতীতে বিভক্ত হয়ে যাওয়ায় এই দুই শাখার মধ্যবর্তী অঞ্চলে পলি জমে জমে সৃষ্টি হয় মাছের আকৃতির এক ভূমি, যার নাম মৎস্যভূমি যা প্রাক ইসলামিক পাল ও সেন যুগ থেকে ষোড়শ শতকের শেষভাগ পর্যন্ত ধারণ করে রেখেছে জমজমাট এক বাণিজ্যকেন্দ্র, সপ্তগ্রাম বন্দর। চলতি কথায় সাতগাঁ। সপ্তদশ শতকে সরস্বতী ক্রমশ: ক্ষীণকায়া হতে শুরু করলে সাতগাঁ বন্দর তার কৌলিন্য হারাতে শুরু করে। লেখক কোনো নির্দিষ্ট সন-তারিখ ধরে এগিয়ে যাননি। এখানে ইতিহাস নির্মিত হয়েছে স্মৃতি আর শ্রুতির পথ ধরে, যেখানে অতীত এবং বর্তমান ক্রমাগত একে অপরের পিঠে এসে ভর করে। উপন্যাসটির গভীরতম পরত লুকিয়ে আছে এর সমকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতায়। বাপ্পাদিত্যকে এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র বলা যায়। তার পিতা পূর্ববঙ্গের সন্তান। যাদের বলা হয় বাঙাল। সিলেটি। তারা এখনও সিদলের স্বাদ ভুলতে পারেননি। কিন্তু তার মা শিউলি কেবল ঘটী নয়, সাতগাঁর জয়রামবাটির অন্তত সাতশো বছরের নাড়ির যোগ তাদের। বাঙাল-ঘটী শব্দের পরিচয়সূচক ব্যবহার একশো বছরের অধিক নয়। আবার বাপ্পাদিত্যর মাতামহ বা শিউলির বাপের বাড়ির বংশলতিকার গোড়ায় দেখা যায় কোন সুদূর অতীতে উত্তর ভারতের কনৌজ থেকে এসে গঙ্গা-সরস্বতীর মধ্যকার মৎসভূমিতে বসবাস শুরু করেছিলেন তারা। মাঝে দরপ খান এই অঞ্চল জয় করলে এই বংশের রামাচার্য নতুন শাসককে বলেন --'আমরা পুরোহিত বংশ বটে, তবে মন্দিরে বিগ্রপূজাই আমাদের একমাত্র বৃত্তি নয় ---- আমরা শাস্ত্র পাঠ করি, শিক্ষাশ্রমে অধ্যাপনা করি। এর বাইরে কোনোরূপ জাগতিক বৃত্তি আমাদের বর্ণে নিষিদ্ধ। বারোটি নিষ্কর গ্রাম ও সংলগ্ন কৃষিজমি থেকে আমাদের অন্নসংস্থান হয়। শত শত বছর শাসকেরা এই ব্যবস্থাকে মান্যতা দিয়েছে। আপনি ব্যতিক্রম, আপনি সেই জমিতে কর চাপিয়েছেন। আমাদের সম্মিলিত আবেদন, আপনি সেই জমি আগের ব্যবস্থায় ফিরিয়ে দিন।' দরপ খান তাদের পূর্বব্যবস্থা কেবল বহাল রাখেননি, বরং এই অঞ্চলের প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন। পরবর্তীতে সাতগাঁর জমিনে পা পড়েছে পর্তুগীজদের, পা পড়েছে ইংরেজদের -- সংমিশ্রিত হয়েছে সাংস্কৃতিক রঙ। সেই নতুন রঙে তৈরি হয়েছে একটি জনপদের ক্যানভাস। কেন্দ্রীয় চরিত্র বাপ্পাদিত্য (যার বাবা দেশভাগের ছিন্নমূল প্রত্নতত্ত্ববিদ এবং মা সাতগাঁর স্মার্ত ব্রাহ্মণ পরিবারের মেয়ে) এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি, যেখানে রাষ্ট্র তার কাছে নাগরিকত্বের প্রমাণ বা সাবুদ চাইছে। এর প্রতিটি উপাখ্যান আসলে বাপ্পাদিত্যের সেই আইনি খাঁড়ার বিরুদ্ধে এক সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ। সে প্রমাণ করতে চায়, সাতশো বছর ধরে এই মাটির জল-হাওয়ায় তার পূর্বপুরুষদের অস্তিত্ব মিশে আছে। সেই বাপ্পাদিত্যই আমাদের নিয়ে যায় ক্যানভাসের কেন্দ্রে। আমরা পিছিয়ে যেতে থাকি ক্রমশ। আশপাশটা পাল্টে পাল্টে যেতে থাকে। গলা জড়িয়ে ধরে মিথ, ফ্যান্টাসি, পুরাণ। আমরা সাতশো বছর পিছিয়ে যাই। একটি কনৌজি ব্রাহ্মণ পরিবারের নয়টি প্রজন্ম এবং উনপঞ্চাশটি চরিত্র আমাদের ঘিরে জীবন্ত হয়ে ওঠে। লেখক আমাদের নিয়ে যান হুগলি আর সরস্বতী নদীর সংযোগস্থলে থাকা সেই অদ্ভুতুরে মায়াভূখণ্ডে, যার নাম সাতগাঁ। কত ঘটনাই সেখানে ঘটে! আমরা জানতে পারি আজকের বাপ্পাদিত্য ছেলেবেলা থেকে মায়ের সঙ্গে মার্টিন্স কোম্পানির ছোটো রেলগাড়ি চেপে এসেছে এই জাদুভূমিতে, যেখানে রেলের চাকায় বাজে কেরেস্তান-গোরস্তান ধ্বনি, হাওয়া দিলে গির্জার চালে বেড়ালের কান্নার মতো শব্দ হয়, যেখানে নারীরা নদীতে ডুব দিয়ে দূরবাসিনী আত্মীয়ার সঙ্গে জলে-জলে বার্তা বিনিময় করে, নৈয়ায়িকেরা কুয়োর পেতনির শাপে ব্যাঙ হয়ে যায়, প্যারিস থেকে তরুণ কবি এসে খুঁজে পায় তার ক্লেদজ কুসুম, সার্জেন-পাদরি নদীর খাত ঘুরিয়ে দেয়, দুর্দম তুর্কী যোদ্ধা এসে মায়াবী ভূমিতে বাঁধা পড়ে, সংস্কৃত শিখে গঙ্গাস্তোত্র লেখে, পুরুষেরা পুনর্জন্ম নিয়ে বংশে ফিরে আসে, এমনকি এক ফিরিঙ্গিও ফিরে আসে কাকাতুয়ারূপে... কী অসম্ভব নিপুণ এক নির্মিতি! এতটুকু বিচ্যুতি নেই বয়ানে। উপন্যাসের প্রথমেই দেখা যায় রাষ্ট্রের নতুন নাগরিকত্ব আইনের বেড়াজালে আটকে পড়েছে বাপ্পাদিত্য। বিচারকের কাছে তার জবানবন্দিই হল এই বৃহত্তর উপন্যাস। সাতশো বছরের প্রায় নয় প্রজন্ম ধরে চলে আসা কথকতা। ইতিবৃত্ত। অবিশ্বাস্য রকমভাবে অস্তিত্ব প্রমাণের চেষ্টা করে চলেছে বাপ্পাদিত্য। আইনের চোখে তা কতটা প্রামাণ্য হিসেবে বিবেচিত হবে সেটা বড় কথা নয়, পাঠকের কাছে তা বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠতে বাধ্য করেছেন লেখক। পাঠক অনায়াসে বিশ্বাস করবেন -- শিউলির নদীর জলে ডুব দিয়ে জলমাধ্যমে দূরের প্রিয়জনের সাথে কথোপকথন কতটা বাস্তব। দরপ খাঁ, যিনি দুর্ধর্ষ তুর্কী শাসক এই জনপদের প্রেমে পড়ে এই গঙ্গার সাথে আত্মিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন। সংস্কৃত ভাষায় রচনা করেন গঙ্গাস্তোত্র। তা পাঠ করে হিন্দু ব্রাহ্মণগণ। কিংবা পর্তুগীজ নাবিকের কাকাতুয়া হিসেবে ফিরে আসা -- সবই বাস্তব হয়ে ওঠে পাঠকের চোখে। রয়েছে ইতিহাসের সত্যতা। কিন্তু রাষ্ট্রকে কিভাবে বিশ্বাস করাবে বাপ্পাদিত্য যে এই ভূমির সাথে তার কত প্রজন্মের সম্পর্ক? তার যে জন্ম সার্টিফিকেট নেই! রথীন যখন তাকে জানায় -- 'কিন্তু তুমি তো ইন্ডিয়ায় জন্মেছ বাবা! দ্যাটস আ ফ্যাক্ট'। বাপ্পাদিত্য বলে -- 'সেটা তুই জানিস, আমি জানি রাষ্ট্র তো আর জানে না। রাষ্ট্র প্রমাণ চায়'।

মিথ নির্মাণ বা ইতিহাস প্রাজ্ঞতা দেখানোর মোটিভ নয়, বরং দর্শককে দ্রষ্টব্যের আরও কাছে নিয়ে গিয়ে অস্তিত্বের একেকটা চিহ্ন পুনরুদ্ধারই যেন তাঁর একমাত্র পরিকল্পনা। এ তো কেবল বাপ্পাদিত্যর ইতিহাস নয়, বরং গোটা একটি জাতির উৎসমুখে দাঁড়িয়ে লেখকের এই পরিবেশনা। লাতিন আমেরিকার ইতিহাস যেমন নিমজ্জিত থাকে মার্কেজের তৈরি বুয়েন্দিয়া পরিবারে, ঠিক তেমনি স্মার্ত ব্রাহ্মণ পরিবারটির সাতশো বছরের প্রাককথনে ডুবে আছে বাংলার বহুস্তরীয় সংস্কৃতি ও ইতিহাস। পড়তে পড়তে মনে হতে পারে উপন্যাসটির ম্যাজিক রিয়্যালিজ়ম লাতিন আমেরিকার অনুকরণ। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না ম্যাজিক রিয়্যালিজম লাতিন আমেরিকায় যুবক হলেও বাংলাসাহিত্যে তার শৈশবকাল বহু আগেই রচিত ঠাকুরমার ঝুলি রূপকথার গল্পে আর তাই বাংলার লোকবিশ্বাস, ভূতপ্রেত, নদীপুরাণ, স্বপ্ন, মঙ্গলকাব্য, গ্রামীণ কল্পনা ও স্মৃতির ভিতর থেকে উঠে এসেছে বহুবার। বাংলার গ্রামীণ জীবনে বাস্তব ও অলৌকিকের সীমানা কখনও খুব স্পষ্ট ছিল না। মৃতেরা ফিরে আসে, নদী কথা বলে, গাছের আত্মা থাকে, বাতাসে পূর্বপুরুষের ফিসফিসানি শোনা যায়। ‘হাওয়াতাঁতি’ শব্দটিই এই অলৌকিক বাস্তবতার জাদু।

পরিমল ভট্টাচার্যর ‘নাহুমের গ্রাম’-এ যেমন আমরা পড়েছিলাম ‘হেলেন’ নামের পুতুলটির এক জায়গা থেকে ভাসতে-ভাসতে আর-এক স্থানে পৌঁছে যাওয়ার ইতিবৃত্ত, সাতগাঁর কাহিনিও যেন তেমনই ভেসে বেড়ায় এক প্রজন্ম থেকে আর-এক প্রজন্মের জল-হাওয়ার বুননে। ‘হয়তো সেই কাহিনির বুননের ভেতর কোনো একটি বাঁকে’ আটকে পড়ে তারা। সেখান থেকে বেরোনোর পথ খুঁজে পাওয়া বড় সহজ নয়। তবে মুক্তির এক সহজ উপায় বের করে নেওয়া যেতে পারে। পরিমল ভট্টাচার্যর পাঠবিশ্ব সম্পর্কে অনেকটাই ধারণা করে নেওয়া যায় তাঁর লেখা অন্যান্য বইগুলি থেকে, এ ছাড়াও আমরা জেনেছি গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস, বোর্হেস, সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায় কিংবা সমরেশ বসুর প্রভাবের কথা। সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা পড়তে-পড়তে মনে আসে এমনই অনেক সৃষ্টির কথা। ইনসুলারিটি থেকে মুক্তি পাওয়ার, বাঁকে আটকে পড়া থেকে বেরিয়ে আসার এ-ই এক উপায়। সাতগাঁ–পর্তুগিজ়দের পোর্তো পেক্যেনো (‌ছোট বন্দর)–তার গির্জা, ক্রীতদাস, শাকম্ভরী দেবী, বনলতা, সরোজা, কলার ভেলায় ভেসে আসা মেয়ে মান্দাসী আর সেই জলজ মৎস্যভূমি জুড়ে ঘটে চলা হাজারও অবস্থান নির্মাণ করে চলে ভাষা আর ক্ষমতার সমীকরণের কাহিনি। যেখানে ভাষা ফুরিয়ে যায়, ইতিহাসও যেন থেমে থাকে স্থির, কেবল বুদ্‌বুদের মতো মৃত সময়ের মুখের ভিতর থেকে বেরোতে থাকে জলের ধারা। জে এম কুটসিয়ার লেখা উপন্যাস ফো-র শেষ পৃষ্ঠাটির কথা মনে আসে বারবার, ক্রুসো আর তার ফ্রাইডে যেন আদিরামবাটির কোনও বংশধর! কুটসিয়ার এই উপন্যাসের মূক ফ্রাইডে আর মান্দাসী দাঁড়িয়ে থাকে পাশাপাশি–কিন্তু তাদের ইতিহাস (মাইক্রোহিস্ট্রি, হিস্ট্রি ফ্রম বিলো–যা-ই বলি না কেন) শুনতে পাওয়া যায় কি আদৌ? আজও? ডুবোজাহাজের ভিতর জল স্থির, শান্ত–‘দ্য সেম ওয়াটার অ্যাজ় ইয়েস্টারডে, অ্যাজ় লাস্ট ইয়ার, অ্যাজ় থ্রি হান্ড্রেড ইয়ার্স আগো,’ লিখেছেন কুটসিয়া। এই জলের ছায়াও কি এসে পড়ে সাতগাঁয়ে? মৃত ফ্রাইডের মুখ খোলার চেষ্টা করা হয়। এ বার কি তার মুখ থেকে, নীচের মহল থেকে বেরিয়ে আসবে ভাষা? ‘His mouth opens. From inside him comes a slow stream, without breath, without interruption’। মিস্ট আর মিস্ট্রি বুনে চলে হাওয়াতাঁতিরা, অক্ষরপুঞ্জ দিয়ে গড়া হয় কল্পকাহিনি; বিরতিহীন, বিরামহীন। উপন্যাসটির আর একটি বড় গুরুত্ব তার বিষন্নতায়। কিন্তু এই বিষণ্ণতা নিছক নস্টালজিয়া নয়। এটি সভ্যতার ক্ষয় সম্পর্কে এক গভীর অনুভব। মানুষ প্রযুক্তিগত ভাবে যত উন্নত হচ্ছে, ততই একাকী, বিচ্ছিন্ন ও স্মৃতিহীন হয়ে পড়ছে। ‘সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা’ সেই শূন্যতার অনুভূতিকে ধারণ করে।

পড়তে পড়তে মনে হতে পারে এইভাষা সাম্প্রতিক সময়ের উপন্যাসের ভাষা নয় কিংবা দৃশ্যের পর দৃশ্য, কুয়াশা, নদী, ভাঙা বন্দর, পুরনো বাড়ি, বাতাসের শব্দ— সব মিলিয়ে তাঁর গদ্য অনেক সময় সিনেমাটিক। বিশেষত তারকোভস্কি-র মতো সময়কে তরল করে দেওয়ার প্রবণতা তাঁর লেখায় অনুভব করা যায়। চোখে পড়বে লেখকের বারংবার প্রসঙ্গান্তরে যাওয়া। লেখক হয়ত এভাবেই লিখতে চেয়েছেন। খানিকটা জার্নালের মতো। তাই অনেক পাঠকের কাছে এই ভঙ্গিতে চলা পছন্দসই মনে হয়ত হবেনা। তাই পাঠের তাল কেটে যেতে পারে বারবার। আজকের বাংলা সাহিত্যের একটি বড় অংশ দ্রুতপাঠ্য ও প্লটনির্ভর। সেখানে পরিমল ভট্টাচার্যের গদ্য ধীর, ধ্যানমগ্ন, বহুস্তরীয়। তিনি পাঠককে সহজ উপভোগের জায়গায় রাখেন না। বরং তাকে ইতিহাস, ভূগোল, ভাষা ও স্মৃতির স্তরগুলির মধ্যে প্রবেশ করতে বাধ্য করেন। এই ধীর গতি আজ রাজনৈতিক ভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বর্তমান সময়ের বাজার ও প্রযুক্তি মানুষকে ক্রমাগত দ্রুততার মধ্যে বন্দি করে রেখেছে। মানুষ আর থামতে জানে না, গভীর ভাবে পড়তে জানে না, মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না। ‘সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা’ সেই দ্রুততার বিরুদ্ধে এক সাহিত্যিক প্রতিরোধ। এটি পাঠককে ধীরে পড়তে শেখায়, শুনতে শেখায়, হারিয়ে যাওয়া সময়ের শব্দ শুনতে শেখায়। এই উপন্যাস উপকথায় ভরা। তার অনেকগুলোকেই অপ্রাসঙ্গিক মনে হতে পারে। মনে হতে পারে মূল উপন্যাসকে দুর্বল করেছে এবং গোলকধাঁধায় ফেলে কাহিনির অবয়ব বৃদ্ধি করা হয়েছে মাত্র। প্রথম আলো, সেইসময় পড়া বাঙালির কাছে মনে হতে পারে অজস্র তথ্য, ইতিহাস, চরিত্রের বিচিত্র সমাবেশ ঘটাতে গিয়ে পাতায় পাতায় বেশ জবরজঙ করে ফেলেছেন লেখক আরেকটু পরিমিতবোধ থাকতে পারতো কিংবা প্রশ্ন জাগতেই পারে শুরুতেই বিভিন্ন চরিত্র কাল্পনিক বলে ডিক্লারেশন দিয়ে কি লেখক একটা স্বাধীনতা নিয়েই রেখেছেন, খানিকটা আগাম জামিনের মতো আর তাই যে সব চরিত্রের ছায়া তিনি ব্যবহার করেছেন পাঠকের কাছে তাদের প্রকৃত স্বরূপ চেনানোর জন্য কোনও ফাঁক রাখেননি। যেমন কাঁঠালপাড়ার রাজমোহন চাটুজ্জেকে দিয়ে বন্দেমাতরম লিখিয়েছেন। কলকাতায় রাজেন্দ্রলাল সরকার অকাতরে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা করে গেছেন। প্রসাদ শাস্ত্রী প্রাচীন বাংলা বই-এর অনুসন্ধানে ঘুরেছে সাতগাঁ থেকে নেপাল অবধি। আরও অনেক। এইসব চরিত্রকে প্রকৃত চেহারায় লেখক কেন দেখালেন না তা বোধগম্য হয় না। চেনা চরিত্র নিয়েও কল্পনার সুযোগ তো লেখক নিতেই পারতেন। নাম বদল করে ব্যবহার ব্যাপারটাকে যেন সস্তা করে দিয়েছেন বলে মনে হতে পারে। এক যুগের বেশি সময় ধরে লিখছেন পরিমল ভট্টাচার্য তাঁর প্রিয় কালো জামা গায়ে চাপিয়ে খুঁজতে বেরোন স্মৃতিকে। গদ্যের নতুন ভাষার জন্ম দেন। বারবার প্রথা ভাঙেন। তিনি বলে থাকেন, ‘লেখায় কোন লাইনের প্রয়োজনীয়তা আছে আর কোনটা নেই, সেটা বুঝতে হবে। প্রয়োজনে খুব প্রিয় লাইন বাদ দিতে হবে।’ তাঁর লেখার একটা ধারা আছে। তিনি কোনও কিছুই কোনও বিশেষ খোপে ফেলতে চান না। ভ্রমণ, স্মৃতি, ইতিহাস এইসবের খোপে থাকতে চান না তিনি। তিনি শুধু লিখতে চান। পাঠকের কাঁধে হাত দিয়ে হেঁটে যেতে চান বহুদূর। এই বই পড়তে পড়তে মনে হয়— নদী শুধু জল বয়ে নিয়ে যায় না, সঙ্গে বয়ে নিয়ে যায় মানুষের জীবন, ভালোবাসা, বিচ্ছেদ, স্মৃতি ও বিস্মৃতি। আর সেই হারিয়ে যাওয়া সুরগুলোই যেন হাওয়ার তাঁতে বুনে চলেছে ‘সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা’। এ এক এমন পাঠ-অভিজ্ঞতা, যা শেষ পৃষ্ঠা উল্টে দেওয়ার পরও দীর্ঘদিন ধরে মনের ভেতর নদীর ঢেউয়ের মতো নিজের স্মৃতির সঙ্গে অনুরণিত হতে থাকে। লেখক জানেন তিনি সর্বজ্ঞ নন। ছায়াচ্ছন্ন অন্ধকার হাতড়েই তাঁকে কুড়োতে হয়েছে যাবতীয় মনিমুক্তো। বাপ্পাদিত্যের একক ইতিহাস মনে করিয়ে দেয় ইতালো কালভিনোর দ্য রোড টু সান জিওভান্নি, যেখানে উনি লিখছেন, ‘from the depth of the opaque I write..’ আলোচ্য উপন্যাসের লেখকও বহুমাত্রিক একটি ছায়া-অতীতকেই নির্বাচন করেছেন। ফিকশনের বহুরৈখিক গতি কখনোই পাঠককে বিভ্রান্ত করে না, বরং এই বহুস্বরীয় ইতিহাস স্বীকৃতি পায় পাঠকের ব্যক্তিগত উপলব্ধিতে। ফিকশনকে যদি একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ সমান্তরাল বাস্তব হিসেবে ধরে নেওয়া যায় তাহলে সেই বাস্তবের নির্মাণে প্রকরণগত ভাবে লেখক চূড়ান্ত সফল। ভুলে গেলে চলবে না আজকের বাপ্পাদিত্য, প্রৌঢ় বাপ্পাদিত্যের সামনে দাঁড়িয়ে আছে রাষ্ট্র। নাগরিকত্বের প্রমাণ চাইছে রাষ্ট্র। চাইছে এভিডেন্স। বাপ্পাদিত্যর সমস্ত মুখের কথা, স্মৃতির কথাকে উড়িয়ে দিয়ে রাষ্ট্র বলছে, ‘শো, ডোন্ট টেল’। বাপ্পাদিত্য বলছেন, ‘আমি ডিফেডেন্ট, আমিই ডিপোনেন্ট’। প্রত্যুত্তরে রাষ্ট্র বলছে এভিডেন্সে ইতিহাস থাকতে পারে, ভূগোল থাকতে পারে, কিন্তু সাহিত্য নয়। নো পোয়েট্রি! ঠিক এই বিপন্নতা থেকেই উপন্যাসের অবতারণা। রাষ্ট্রের সমস্ত অযৌক্তিক প্রশ্ন ও আগ্রাসী অবিশ্বাসের সামনে তাই এই আবহমানতার সচেতন প্রতিষ্ঠা। একটি জাতির ক্ষয় -জয়-দীনতা- গোঁড়ামো-বাণিজ্য, সর্বোপরি থেকে যাওয়ার বিস্তৃত ইতিহাসের প্রয়োজন এখানেই। এই বহুস্বরীয় আখ্যান এই প্রতিস্পর্ধীতার বক্তব্যেই প্রাসঙ্গিক। রাষ্ট্রের সমস্ত অযৌক্তিক প্রশ্ন ও আগ্রাসী অবিশ্বাসের সামনে তাই এই আবহমানতার সচেতন প্রতিষ্ঠা। লেখক পরিমল ভট্টাচার্যকে অভিনন্দন, কারণ তিনি রাষ্ট্রশক্তির ছুড়ে দেওয়া বিপন্নতার সামনে এভিডেন্স হাজির করাতে পেরেছেন। কালাকালের দলিল, চিরকালের এই প্রবহমান থেকে যাওয়ার অনিবার্যতাকে প্রকাশ করতেই এই বিপুল নির্মিতির দায়ভার লেখককে নিতে হয়েছে। এই আখ্যান কেবল বাপ্পাদিত্যকে নয়, আমাদেরকেও উৎসমুখে ঠেলে দেয়। সময়ের তাঁত বুনেছেন পরিমল ভট্টাচার্য। তিনিই স্বয়ং হাওয়াতাঁতি, এ নিয়ে আর সন্দেহ থাকে না।

ধান ভাঙ্গতে শিবের গাজন বলে একটা বাগধারা আছে বাংলায় আমি সম্ভবত সেটাই করে ফেললাম আজ তোমাকে লিখতে বসে, আসলে তোমার চিঠি পড়তে পড়তে বাংলার এই পরিক্রমার কথাই মনে পড়েছে বারবার। রাত এখন প্রায় একটা! সারা সোসাইটি ঘুমিয়ে গেছে দূর থেকে ভেসে আসছে জাহাজের ডাক, রাস্তার কুকুরগুলো সে সুরে সুর মিলিয়ে চিৎকার করছে, এমন সময় প্রশ্ন জাগে— সভ্যতা কি শুধুই নির্মাণের ইতিহাস, নাকি বিলুপ্তিরও ইতিহাস?



ভালবাসা সহ-

সুস্মি

২৬ জুন, ২০২৬