Next
Previous
Showing posts with label ধারাবাহিক. Show all posts
0

ধারাবাহিক - মনোজ কর

Posted in




















২য় পর্ব- মোহনাশহর বিলবাও এবং গুগেলহাইম মিউজিয়ম।




যে রকম আগের থেকে ঠিক করা হয়েছিল এবং মিনি প্লেনের টিকিট আর হোটেল

ব্যবস্থা করে রেখেছিল সেইমত ২৬শে মার্চ সকালবেলা রওনা দিলাম বিলবাও এর

উদ্দেশ্যে। মুনমুনের পায়ের সমস্যাটা তখনও মেটেনি। সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা এবং

হাঁটতে বেশ কষ্ট হচ্ছিল তখনও। তা সত্ত্বেও ক্যান্সেলেশন এবং রি-বুকিং এর

ঝামেলা এড়াতে ও কিছুটা জোর করেই বেরিয়ে পড়ল। বোলোনিয়া থেকে মিউনিখ,

মিউনিখ থেকে প্লেন চেঞ্জ করে বিলবাও পৌঁছতে বিকাল হয়ে গেল। আগে থেকে বলে

পুরোটাই হুইল চেয়ারের ব্যবস্থা করা হয়েছিল তাই অসুবিধে খুব একটা হয়নি।

বিলবাও স্পেনের একটি আধুনিক বাণিজ্য শহর। এই শহরের মধ্যে দিয়ে বয়ে চলেছে

নারভিয়ন নদী। লন্ডনে যেমন টেমস, প্যারিসে যেমন সেইন, কলকাতায় যেমন হুগলী

তেমনই বিলবাওতে নারভিয়ন। নদীর দু’পাশে গড়ে উঠেছিল জনপদ যা ক্রমে ক্রমে

এখন এক আধুনিক দর্শনীয় শহরের চেহারা নিয়েছে। আমরা যে হোটেলে উঠলাম সেটা

নদীর ধারেই। জায়গাটার নাম ক্যাম্পো ভোলান্টিন। হোটেলের জানলা দিয়ে নদী আর

নদীর পাশের রাস্তা দেখতে দেখতে সময় কাটিয়ে দেওয়া যায় অনায়াসে। হোটেল থেকে

বেরিয়ে রাস্তা পার হয়ে ওপারে যাবার জন্য ফুটব্রিজ। এই ফুটব্রিজের নাম

জুবিজুরি। জুবিজুরি অর্থ সাদা ব্রিজ। জুবিজুরি টায়েড আর্চ ব্রিজ অর্থাৎ এপারে

ক্যাম্পো ভোলান্টিন থেকে ওপারে উরিবিতার্তে অবধি বিস্তৃত দুটো স্টিল আর্চের

থেকে স্টিলের মোটা পাকানো দড়ি দিয়ে ঝোলানো এই ব্রিজ। ব্রিজের রঙ সাদা এবং

রাস্তা কাচের ইট দিয়ে তৈরি। ১৯৯৭ সালে নির্মিত এই ব্রিজের রূপকার বিশিষ্ট

স্থপতি স্যান্টিয়াগো কালাভাত্রা। সিঁড়ি দিয়ে উঠে ব্রিজ পেরিয়ে ওপারে যাওয়া

যায়। ওপারে বিলবাও-এর পুরনো সিটি সেন্টার। গাড়ি নিয়ে পুরনো সিটি সেন্টারে

ঢোকা যায়না। সরু সরু রাস্তার দুপাশে রকমারি দোকান পাট, রেস্টুরেন্ট। সরু

রাস্তাগুলো এসে মিলেছে একটা স্কোয়ারে। স্কোয়ারে পাতা আছে অনেক চেয়ার,

বেঞ্চি। বাজার দোকান ঘুরে এককাপ কফি বা একগ্লাস বিয়র নিয়ে একটু জিরিয়ে

নেয় পর্যটকেরা। নতুন সিটি সেন্টারের চেয়ে পুরনো সিটি সেন্টারে জিনিসপত্র একটু

সস্তা। জায়গাটাও নতুন সিটি সেন্টারের থেকে বেশ শান্ত। উরিবিতার্তের থেকে নদীর

ধার দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে যাওয়া যায় বিশ্ববিখ্যাত আর্ট মিউজিয়ম গুগেনহাইম

মিউজিয়মে। হাঁটতে কষ্ট হলে অথবা বৃষ্টি এসে গেলে রাস্তার পাশ দিয়ে যাওয়া

ট্রামে উঠে পড়া যায়। বিলবাও শহরের প্রান্তদেশ ছাড়িয়ে একটু এগোলেই চোখে

পড়বে তিন নদীর মিলনস্থল। নারভিয়ন,ইবাইজাবাল আর কাডাগুয়া। ক্যাম্পো

ভোলান্টিন থেকে নদীর ধার দিয়ে হাঁটা পথ শেষ হয়েছে নতুন অত্যাধুনিক সিটি

সেন্টারে। বিশাল বিশাল মল, হোটেল ,ব্যাঙ্ক আর নামী দামী ব্র্যান্ডের শো-রুম




ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে চারিদিকে। ভূগর্ভস্থ মেট্রো রেলে চেপে পৌঁছে যাওয়া যায়

শহরের সর্বত্র।


২৭শে মার্চ বিলবাও শহরটা ঘুরে দেখে ফিরে এলাম হোটেলে। পরেরদিন গুগেনহাইম

মিউজিয়ম দর্শন। মিনি আগে থেকে টিকিট কেটে রেখেছিল। দেশ বিদেশের অসংখ্য

পর্যটক এবং শিল্পরসিক বিলবাও আসে এই মিউজিয়মের আকর্ষণে। এই

মিউজিয়মের মূলত সংরক্ষিত আছে বিংশ শতাব্দীর কয়েকজন বিশিষ্ট শিল্পীর

আধুনিক শিল্পসম্ভার। এদের মধ্যে একজন হলেন রুথ আইকো আসাওয়া।

আসাওয়ার জন্ম আমেরিকার নরওয়াকে ১৯২৬ সালের জানুয়ারিতে। আসাওয়ার বাবা

মা ছিলেন জাপানি উদ্বাস্তু। সাত ভাইবোনের চতুর্থ আসাওয়ার বড় হয়ে ওঠা

নরওয়াকের এক ছোট্ট খামারবাড়ির এক চিলতে ঘরে।১৯৪৫ সালে দ্বিতীয়

বিশ্বযুদ্ধের সময় প্রায় ১,২০,০০০ জাপানি উদ্বাস্তুকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় ১০টি

কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে। এই ক্যাম্পে থাকার সময় আসাওয়া কয়েকজন জাপানি

শিল্পীর সান্নিধ্যে আসেন যাঁরা ক্যাম্পে আসার আগে কাজ করতেন ওয়াল্ট ডিসনি

স্টুডিওতে। তাঁদের কাছে অঙ্কনবিদ্যায় পারদর্শী হয়ে স্কলারশিপ অর্জন করে

আসাওয়া উচ্চতর শিল্প শিক্ষার জন্য যোগ দেন উইস্কন্সিন কলেজ অফ




মিলওয়াউকিতে। কলেজ থেকে ডিগ্রি অর্জনের পর ঐ কলেজেই শিক্ষকতার যোগ্যতা

অর্জন করেন আসাওয়া। কিন্তু সরকারি নির্দেশে জাপানি উদ্বাস্তুর সন্তান হওয়ার

জন্য সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয় আসাওয়াকে। হতোদ্যম না হয়ে ১৯৪৫ সালে

বড় বোনকে সঙ্গে নিয়ে মেক্সিকো পাড়ি দেন আসাওয়া। সেখানে গিয়ে এক

মেক্সিকান শিল্পীর কাছে তার বোনার কাজ শিখে শিল্পের ঐ বিশেষ বিভাগে পারদর্শী

হয়ে ওঠেন আসাওয়া এবং পরবর্তীকালে তার বোনার এই বিশেষ শিল্পে বিশ্ববিখ্যাত

হয়ে ওঠেন আসাওয়া। ১৯৪৬ সালে আসাওয়া নর্থ ক্যারোলিনার ব্ল্যাক মাউন্টেন

আর্ট কলেজে চিত্রশিল্পী জোসেফ আলবার এবং বিখ্যাত আমেরিকান স্থপতি

বাকমিনস্টার ফুলারের অধীনে শিল্পশিক্ষা শুরু করেন। যে পদ্ধতিতে তার বুনে ঝুড়ি

তৈরি করা হয় সেই পদ্ধতিতে তার বুনে নানান অসাধারণ শিল্পকর্ম সৃষ্টি করে ধীরে

ধীরে খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছে যান আসাওয়া। ১৯৫৫ সালে তাঁর শিল্পকর্মের প্রথম

প্রদর্শনী হয় নিউ ইয়র্কে। তারপর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি আসাওয়াকে।

‘সকলের জন্য শিল্প’ এই মন্ত্র বুকে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন সান ফ্রান্সিস্কো স্কুল

অফ আর্টস। ২০১১ সালে আসাওয়ার ৭৫তম জন্মবার্ষিকীতে এই আর্ট কলেজের

নাম পরিবর্তন করে ‘রুথ আসাওয়া সান ফ্রান্সিস্কো স্কুল অফ আর্টস’ রাখা হয়।




আসাওয়ার শিল্পকর্ম আমেরিকা এবং বিলবাও-এর গুগেনহাইম মিউজিয়ম ছাড়াও

নিউ ইয়র্কের হুইটনি মিউজিয়ম অফ আমেরিকান আর্টস এবং সান ফ্রান্সিস্কোর

ডি ইয়ং মিউজিয়মে সসম্মানে রক্ষিত আছে। ইউ এস পোস্টাল বিভাগ আসাওয়ার

সম্মানে তাঁর ছবি সম্বলিত কুড়িটি ডাকটিকিট প্রকাশ করেছে।

সেইসময় আমেরিকায় অসবর্ণ বিবাহ নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও আসাওয়া ব্ল্যাক

মাউন্টেন কলেজের সতীর্থ স্থপতিশিল্পী অ্যালবার্ট লেনিয়রের সঙ্গে ১৯৪৯ সালে

বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ছয় সন্তানের মাতা আসাওয়া ২০১৩ সালে শেষ নিঃশ্বাস

ত্যাগ করেন।




আসাওয়া নিজের অতীত সম্বন্ধে বলেছেন,’ আমি যে অপরিসীম দুঃখ কষ্টের মধ্যে

দিয়ে বড় হয়েছি তার জন্য আমার কোনও ক্ষোভ নেই। আমি তার জন্য কাউকে দায়ী

করতেও চাইনা। আমি বিশ্বাস করি প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করেই মানুষ বিকশিত

হয়। আমার ছোটবেলা কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে না কাটলে হয়ত আমি আমি এই

উচ্চতায় পৌঁছতে পারতাম না। আমার নিজের জন্য আমি গর্ব অনুভব করি।‘

আজও হাজার হাজার শিল্পপ্রেমী আসাওয়ার সান ফ্রান্সিস্কোর বাসগৃহ দর্শন

করতে আসেন। ‘আমার বাসগৃহই আমার স্টুডিও’ –বলেছিলেন আসাওয়া।

রুথ আসাওয়া ছাড়াও এই প্রজন্মের আর এক বিশ্ববিখ্যাত শিল্পী মার্ক লেকে ও

তাঁর অপূর্ব সৃষ্টি ‘ অ্যান্ড দি সিটি স্টুড ইন ইটস ব্রাইটনেস’ সম্বন্ধে কিছু কথা

বলে এই পর্ব শেষ করব।

লিভারপুলের কাছে উইরাল নামে এক ছোট্ট দ্বীপে মার্ক লেকের জন্ম ১৯৬৪ সালে।

মার্ক দি গার্ডিয়ান পত্রিকার এক ইন্টারভিউতে নিজের শ্রমজীবি বাবা-মা সম্বন্ধে

বলার সময় বলেন তিনি ছোটবেলায় বখাটে হয়ে গিয়েছিলেন। বাবা-মা লিভারপুলে

লিটলউড নামে একটি দোকানে কাজ করতেন। স্কুলের লেখাপড়া বেশিদূর এগোয়নি

মার্কের। মাত্র পনের বছর বয়সে স্কুল ছেড়ে দেন মার্ক। ১৯ বছর বয়সে প্রাচীন

সভ্যতার বিষয়ে আগ্রহী হয়ে নিজেই পড়াশুনা শুরু করে দেন মার্ক এবং নিজেকে

স্বশিক্ষিত বলতেই ভালোবাসেন মার্ক। ১৯৯৫ সালে আমেরিকা পাড়ি দেন মার্ক

কিন্তু ১৯৯৭ সালে আবার লন্ডনে ফিরে আসেন। লন্ডনে ওয়েব ডিজাইন এজেন্সি

অনলাইন ম্যাজিক কোম্পানিতে কাজ করতে শুরু করেন মার্ক। ওখানে থাকাকালীন

১৯৯৯ সালে তিনি তৈরি করেন তাঁর বিখ্যাত মিউজিক ভিডিও ‘ফিরৌসি মেড মি

হার্ডকোর’ । ফিটসরোভিয়ার, উইন্ডমিল স্ট্রিটের একচিলতে ফ্ল্যাটে তখন

থাকতেন মার্ক। সেইসময়ই এড লাইকের সঙ্গে শুরু করেন তাঁর মিউজিক ব্যান্ড

ডেনঅ্যাটেল। এই ব্যান্ডের প্রথম মিউজিকাল শো হয় ব্রিক্সটনের ৪১৪ ক্লাবে।

পরবর্তীকালে বিখ্যাত শিল্পী এনরিকো ডেভিড এবং বনি ক্যাম্পলিন যোগ দেন এই

ব্যান্ডে। ২০০৫ সাল থেকে ২০০৯ পর্যন্ত তিনি স্ট্যাডেলশুল, ফ্রাঙ্কফুর্ট-এ

সিনেমা বিষয়ে অধ্যাপনা করেন। বর্তমানে মার্ক নর্থ লন্ডনে স্ত্রী লিজি কারে-

টমাস এবং কন্যার সঙ্গে বাস করেন। মার্কের স্ত্রী লিজা সার্পেনটাইন গ্যালারিতে

সমকালীন শিল্পের কিউরেটর হিসাবে কাজ করেন। মার্ক নিজেকে পপ আর্টিস্ট

হিসাবেই পরিচয় দিতে ভালোবাসেন।

‘ অ্যান্ড দি সিটি স্টুড ইন ইটস ব্রাইটনেস’ ভাস্কর্য, সঙ্গীত এবং আলোর এক

অদ্ভুত সংমিশ্রণ। গুগেনহাইমের প্রদর্শশালায় অন্ধকার ঘরে এই শিল্পকর্ম দেখা,

শোনা এবং অনুভব করা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। একটি কাল্পনিক মধ্যযুগীয়




দুর্গশহরের ভাস্কর্যকে কেন্দ্র করে সঙ্গীত এবং আলোর মায়াময় ছন্দোময়তা

এই শিল্পকর্মের মূল উপজীব্য। বাস্তব এবং কল্পনার সীমানাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে

এক অদ্ভুত অনুভূতি আমাদের আচ্ছন্ন করে রেখেছিল দীর্ঘক্ষণ। ঘোর কাটতে

শিল্পপ্রেমী আরও অনেক মানুষের এক নির্বাক মিছিলের সঙ্গে সঙ্গে আস্তে

আস্তে বেরিয়ে এলাম গুগেনহাইম মিউজিয়মের বাইরে।
















0

ধারাবাহিক - রঞ্জন রায়

Posted in





















২৮.২

ওনারা বাজার পৌঁছে গেছেন। আজও যে কোন হিন্দুস্তানী শহরে দু’রকম বাজার বসে। একটা স্থানীয়

লোকজনের, অন্যটি গোরা সাহেবসুবোদের। এই বাজারটা দ্বিতীয় জাতের। এখানে ইংরেজি সিনেমার হল,

মদের দোকান আর ঝকমকে দোকানের সারি। আছে বিজলির আলোয় ঝলমলে সাইনবোর্ড—বিশেষ

করে সিগারেট আর মদের বিজ্ঞাপনের।

এখানে আসলে মনে হবে দেশে রুটির আকাল হলেও কেক সহজে পাওয়া যায়। জলের তেষ্টায় গলা শুকোলে

বিয়ার খেয়ে চনমনে হওয়া যায়, এমনকি দরকার পড়লে মদ নিষিদ্ধ করা নিয়ে লম্বা লেকচার ঝাড়তে

পারা যায়।

সংক্ষেপে, এখানে এলে উপলব্ধি হয় যে তুমি যতদিন ‘জনগণ’ হয়ে বাঁচবে, ততদিন তোমার ‘রোটি কাপড়া

অউর মকান’ নিয়ে সমস্যা থাকবে। যদি এসব সমস্যা থেকে রেহাই পেতে চাও, তবে জনতাগিরি ছেড়ে

বড়মানুষির গ্রুপে ঢুকে পড়ার কোন শর্টকাট খুঁজে নাও।

ফুটপাথের উপর এক জায়গায় ধুতি-পাঞ্জাবী-টুপি পরা কয়েকজন ভদ্রলোক পায়চারি করতে করতে

আড্ডা দিচ্ছিলেন। এদের চেহারায় বেশ খুশি খুশি ভাব। কখনও কখনও খুশির আবেগে এঁরা বন্ধুদের

পায়ের কাছে পিচ করে পানের পিক ফেলছিলেন। রুপ্পন বাবুর জন্ম ‘ইংরেজ ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের

পরে। উনি বেশ আত্মবিশ্বাসের সংগে বললেন, “খোদা নিজের প্রিয় গাধাদের জিলিপি খাওয়াচ্ছেন।

কাকে কী বলা যায়! গাছের ডালে ডালে পেঁচা বসে আছে”।

এই কাব্য বা প্রবাদ জনসাধারণের মধ্যে বহুপ্রচলিত, এটা আউড়ে রুপ্পন কোন মৌলিকতার নমুনা

দেখান নি। কিন্তু ওনার বলার ভাবভঙ্গি এমন যেন বেশ গভীর কোন বাণী দিচ্ছেন। প্রিন্সিপাল ওনাকে

তোল্লাই দিয়ে বৈদ্যজীকে বললেন, “চলুন মহারাজ। কিছু খেয়ে নেয়া যাক। ছেলেটার শরীর খারাপ

লাগছে”।

প্রথমে উনি পান দোকান খুঁজতে শুরু করলেন। হিন্দুস্তানিদের জন্যে এটা কঠিন কিছু নয়। যদি নির্জন

দ্বীপে রবিনসন ক্রুসোর বদলে কোন হিন্দুস্তানি আটকে পড়ে, তাহলে ‘ম্যান ফ্রাইডে’ নয়, কোন

পানওয়ালাকে খুঁজে বার করবে। বাস্তবে, সাচ্চা হিন্দুস্তানির বৈশিষ্ট্য হল লোকটা যেখানেই যাক দুটো

জিনিস খুঁজে নেবে—পানের দোকান আর পেচ্ছাপ করার জায়গা। তবে এখানে পান দোকান খোঁজার

দরকার পড়ে না। ওরাই খদ্দেরকে খুঁজে নেয়। একটু আগে সামনের দিকে পানের দোকান, পেছনের দিকে

পান দোকান, ডাইনে বাঁয়ে সবদিকেই পান দোকান। এই তিন মূর্তি সামনে যে পান দোকান দেখলেন

সেখানেই দাঁড়িয়ে পড়লেন। দোকানের বড় আয়নায় চেহারা দেখে বৈদ্যজী পাগড়ির কোণা ঠিক করলেন,




রুপ্পন বাবু চোখ টিপে মুচকি হাসির চেষ্টা করলেন, আর প্রিন্সিপাল সাহেব পানওয়ালার সংগে আলাপ

করতে ব্যস্ত হলেন।

নীচু গলায় বললেন, “তিন গেলাস, একটু গাঢ় দেখে”।

বৈদ্যজী অবুঝ বাচ্চার মত বললেন, “কী ব্যাপার? কী জিনিস”?

প্রিন্সিপাল ,” কিছু না। পান খাওয়ার আগে একটু জল খাবার ব্যবস্থা”।

পানওয়ালা ভাঙ গুলে তিনটে গেলাসে ঢেলে দিল। প্রিন্সিপাল সাহেব বললেন, “একটু গোলমরিচ আর

বাদামের দানা দিলে ভালো হয়”।

পান দোকানে একটি সুন্দর স্বাস্থ্যবান নওজোয়ানের ফটো টাঙানো ছিল। দেখে অনুমান করা যায় যে

ওটা এই থলথলে ভোঁদা লোকটার দশ-পনেরো বছর আগের ছবি। রুপ্পন বাবু প্রিন্সিপালকে কনুইয়ের

গুঁতো মেরে বললেন, “এখানে কোন ভগ্নস্তুপও নেই যা দেখে বলা যাবে—হ্যাঁ, বাড়িটা একসময় দমদার

ছিল”।

প্রিন্সিপাল সাহেব বললেন, “উঁহু, মনে হচ্ছে আর কারও ফটো”।

পানওয়ালা এরকম অপমানের কোন প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে ভাঙ ঘোঁটার গতি বাড়িয়ে দিল, বেশ

পালোয়ানি ঢঙে। রুপ্পন বাবু এদিক ওদিক দেখছেন –পুলিস না এসে পড়ে এবং বেআইনি ভাবে লুকিয়ে

ভাঙ বেচার অপরাধে পানওয়ালাকে চালান না করে দেয়!

চারদিকে খুব ইংরেজির বোলবোলাও। ইংরেজিতে বিজ্ঞাপন। সাইনবোর্ডে দোকানের নাম ইংরেজিতে।

চারপাশে সবাই ইংরেজি ঝাড়ছে—ময়লা কলারওলা ক্লার্ক, ঝলমলে পোশাকে ব্যবসায়ীর ছেলেপুলে,

রাজনীতির ভাঙাচোরা মালের ভবঘুরে মার্কা বেচুবাবু, চোখের চাউনিতে দুনিয়াকে ভস্ম করে দেয়া থুতনি

উঁচু করে চলা হেরে যাওয়া/হারিয়ে দেয়া অফিসার, কে নয়। ইংরেজি পোশাক পরে সব আসছে আর

যাচ্ছে। একটা ইংরেজি সিনেমার পোস্টারে একটি অর্ধনগ্ন বিলেতি মেয়ে একটা বিছানার উপর

অর্ধশায়িত। আর তাকে সবাই চুমো খাচ্ছে। দু-চারটে কালোকোলো নোংরা বাচ্চা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে।

পাশের কোন গ্রামোফোনের দোকানে কোন পপ-মিউজিকের রেকর্ড বাজছে। কিছু ছোকরা ভুলে গেছে

বাড়িতে যে রুটি খাচ্ছে তার গম বিদেশ থেকে গরীব বলে কান্নাকাটি করে আনা হয়েছে। তাই গানের সংগে

এলোমেলো হাত পা নাড়িয়ে ভারি খুশি। এখানে রুডিয়ার্ড কিপলিং এর মাথা নীচে ধড় উপরে করে উলটো

টাঙিয়ে পূর্ব ও পশ্চিমের সংস্কৃতির বিরাট মিলন হচ্ছে।

দুটো মেয়ে, মাথায় কাগের বাসা কোঁকড়ানো চুল, পরনে চুড়িদার পায়জামা আর পালোয়ানি ঢঙে শরীর

ফুটিয়ে তোলা কুর্তা, ইংরেজিতে আলাপ করতে করতে চলে যাচ্ছে। রুপ্পনবাবুর ইচ্ছে হল মেয়েদুটোকে

জাপটে ধরে কোথাও পালিয়ে যায়। কিন্তু নিজের এরকম বর্বর বুনো ইচ্ছাকে চাপা দিতে উনি

প্রিন্সিপাল সাহেবকে বললেন, “দেখেছেন? মনে হয়, সব ক’টা বিলেত থেকে এসেছে। ওদের পেচ্ছাপ

থেকে জন্মেছে”।




প্রিন্সিপাল সাহেব এই মানবশাস্ত্রীয় তর্কাতর্কিতে না গিয়ে বৈদ্যজীকে শুনিয়ে বললেন, “আরও

খান্না মাস্টারের সংগে দোস্তি করুন! দেখছি আপনার উপর ভালই প্রভাব পড়ছে। আপনিও অশ্লীল

চুটকি শোনাচ্ছেন”। রুপ্পন বাবু ভাঙের গেলাস ঠন্‌ করে পানওয়ালার দোকানে নামিয়ে রেখে বললেন,

“পেচ্ছাপ অশ্লীল হল”?

‘কথাটা পেচ্ছাপ নিয়ে নয়, খান্না মাস্টারের সংগে ওঠাবসা নিয়ে”।

রুপ্পন বাবু এবার নিজের পিতার দিকে তাকালেন। “আপনি এই প্রিন্সিপাল সাহেবকে একটু বকে দিন

তো! এখানে যেন খান্না মাস্টারের নাম টেনে না আনা হয়। নইলে, আমি যদি একবার মুখ খুলে সোজা

সুজি বলতে শুরু করি তাহলে ইনি পালাবার পথ পাবেন না”।

বৈদ্যজী যেন শান্তি ও ক্ষমার দেবদূত। তাই তাঁর দুই পাখা ফরফর করে নাড়িয়ে, অর্থাৎ গোঁফের

দুপাশে লেগে থাকা ভাঙের সরবতের চিহ্ন মুছে বললেন, “আমাকে এর মধ্যে টেনো না রুপ্পন!

প্রিন্সিপাল সাহেবের দুঃখ তুমি আজকাল খান্নার পক্ষ নিচ্ছ। তোমরা নিজেদের মধ্যে কথা বলে এর

ফয়সালা করে নাও”।

ওঁরা রিকশা স্ট্যান্ডের দিকে যাচ্ছিলেন। কিন্তু এই কথা শোনামাত্র রুপ্পন দাঁড়িয়ে পড়লেন। কাঁধের

ঝোলা ফুটপাথে নামিয়ে রেখে বললেন, “তাহলে আ জাও প্রিন্সিপাল সাহেব। প্রথমে খান্নার ব্যাপারটার

ফয়সালা করা যাক”।

প্রিন্সিপাল সাহেব চলতে চলতে অন্যদিকে তাকিয়ে বললেন, “আজ থাক, আরেকদিন হবে ‘খন”।

রুপ্পন বাবু উত্তেজিত হয়ে বললেন, “আজকের কাজ কাল করব বলে ফেলে রাখার বান্দা আমি নই। এই

ব্যাপারটার ফয়সালা এখনই হয়ে যাক। কালকের ভরসায় ছাড়লে আর কখনও হবে না”।

বৈদ্যজীর চোখে পড়ল একটা অশত্থ গাছের তলায় শিবলিঙ্গ, তার উপর একটা ছোট মডেলের মন্দির!

শিবলিঙ্গ দেখামাত্র বৈদ্যজী ভক্তিস্রোতে ভেসে গেলেন। উনি ভুলে গেলেন—এটা সাহেবি কায়দার

বাজার, এখানে ভগবানের নাম লুকিয়ে জপতে হয়। উনি অশত্থ গাছের নীচে গিয়ে ধরা গলায় শংকরের

স্তোত্র আওড়াতে লাগলেন।

এদিকে প্রিন্সিপাল সাহেব এবং রুপ্পন বাবু ফুটপাথে দাঁড়িয়ে কালকের ফয়সালা আজ করতে উদ্যত।

বৈদ্যজী চোখ বন্ধ করলেন। পেছনে রাস্তায় মোটরগাড়ি যাচ্ছে আসছে, মেয়েদের ইংরেজি মাখা গলার

স্বর হাওয়ায় কাঁপুনি ধরাচ্ছে। খেলনাওলারা কোন সিনেমায় দেখা খেলনাওলার নকল করে কানফাটানো

সঙ্গীত সৃষ্টি করছে। যেভাবে বিরোধীদের আপত্তি ও চেঁচামেচিকে অগ্রাহ্য করে মন্ত্রীরা শুধু নিজের

দলের কথা শুনে এগিয়ে চলেন, সেভাবেই বৈদ্যজী এইসব শব্দতরঙ্গকে অগ্রাহ্য করে শংকর বন্দনায়

লীন হলেন।

নানা জায়গা থেকে সংগ্রহ করা জড়িবুটিকে থেঁতো করে পিষে কাপড়ে ছেনে উনি শংকর বন্দনার যে চুরন

তৈরি করলেন সেটা এইরকমঃ




“হে শংকর! শত্রুদের মারো!

“তুমি রুদ্র, তুমি মধুময়, অখিল-সৃষ্টির সংহারকর্তা। আমাদের গাঁয়ে কলেজের ম্যানেজারগিরির

নির্বাচনে ভীখমখেড়ী হেরে গেছে। ও ব্যাটা ডায়রেক্টর অফ এজুকেশনের কাছে পিটিশন

করেছে—নির্বাচন নাকি বন্দুকের জোরে হয়েছে। ও পুলিশ কাপ্তানের কাছেও নালিশ করেছে। তুমি তো

ভাঙ খাও, ধুতরো খাও। এই হাকিমগুলোর ভ্রষ্টবুদ্ধিতে তুমি ভাঙ ও ধুতরো মিশিয়ে আরও ভ্রষ্ট করে

দাও। ওনাদের আমার পক্ষে রায় দিতে প্রেরণা দাও। হে ভূতনাথ! রামাধীন ভীখমখেড়ীকে মারো!

“হে ত্রম্ব্যক, সুগন্ধিময়, পুষ্টিবর্ধন! আমার মৃত্যুর আশংকাকে বোঁটা থেকে শসা ছিড়ে নেওয়ার মত

দূর করো! কিন্তু অমৃতত্ব যেন আমায় ছেড়ে না যায়! আর হে শিব! শত্রুদের অমৃতত্বের বোঁটা থেকে

ছিঁড়ে মৃত্যুর অন্ধকূপে ঠেলে দাও। তুমি তোমার সেবকের বাধাকে নিজের বাধা মনে করেছ। তুমি আমার

সেবকের সেবক, দাসের দাস, শনিচরের বাধা দূর কর। পঞ্চায়েত প্রধানের নির্বাচন নিয়ে শত্রুর দল

ওর বিরুদ্ধে পিটিশন দিয়েছে। তাতে শনিচরকে জিতিয়ে দাও। শত্রু পিটিশন ফেরত না নিলে ওকেও মারো!

“হে উমাপতি, জগতকারণ, পন্নগভূষণ শিব! শত্রুরা কোঅপারেটিভ সুপারভাইজার রামস্বরূপের প্রশ্ন

তুলে ইউনিয়নে তবিল তছরূপের কথা তুলেছে। ওরা চেঁচাচ্ছে--ওতে নাকি আমারও হাত আছে।

কোঅপারেটিভ নীচ, ধূর্ত এবং সৎ। একদম বাগে আসছে না। গতবার আমাকে একলা ডেকে ভয় দেখিয়ে

গেছে। তুমি ওই ইনস্পেক্টরকেও মারো!

“হে রুদ্র! দিবিলোকে তোমার অস্ত্র বর্ষা, অন্তরিক্ষে তোমার অস্ত্র বায়ু, ভূলোকে তোমার অস্ত্র

অন্ন। শত্রুকে মারতে তোমার যে অস্ত্রে ইচ্ছে তাই দিয়ে মারো! সে বাজ পড়ে মরুক, বা তুফানে উড়ে

যাক, অথবা কলেরা কিংবা গ্যাস্ট্রোইনট্রাইটিস হয়ে মরুক! যেটায় তোমার সুবিধে।

“হে শিব, হে মহেশ, আমি তোমার ধ্যান করি। তুমি পরানন্দময়, আপন তেজে নভোবকাশে ব্যাপ্ত, তুমি

অতীন্দ্রিয়, সূক্ষ্ম, অনন্ত, আদ্য, নিসসংগ, নির্লিপ্ত।

“তাই বলছি, হে শিব! শত্রুকে মারো”!

বৈদ্যজী অত্যন্ত দীনহীন ভাবে শংকরের বন্দনা করলেন। এত বড় শহরে চাকরিতে উন্নতি এবং খুব

মাল কামানোর ইচ্ছেয় শয়ে শয়ে অফিসার সাতসকালে পূজাঘরে পাঁচ ঘন্টা বসে থেকে সম্মিলিত ভাবে

যত না দীন ভাবের সৃষ্টি করেন, তার চেয়ে বেশি দীনতা একা বৈদ্যজী রাস্তায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই হৃদয়

থেকে পাঁচ মিনিটে বের করে শংকর ভগবানের সামনে নিবেদন করলেন। কিন্তু এত বেশি পরিমাণে

হওয়াতেই বোধহয় ’দীনতা’র বাজার মূল্য নীচে নেমে গেল। হয়ত এ’জন্যেই দীনভাবের উত্তম

কোয়ালিটি এবং কোয়ান্টিটি সত্ত্বেও শংকর ভগবানের উপর কোন প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ল না।

শিবলিংগ আগে যেমন ছিল এখনও তাই—অচল, অটল। একটা ছোট আগুনের ফুলকিও বেরোয় নি। গলার

মালা স্থানচ্যুত হয়ে নীচে পড়ে যায় নি।

বৈদ্যজী চোখ খুললেন। দেখলেন বাইরের দুনিয়া আগের মতই রয়েছে। একটাই তফাত—দশ গজ দূরে

রুপ্পন বাবু প্রিন্সিপালের উপর চেঁচাচ্ছেন।




“তুমি বড় তীসমার খাঁ (তিরিশজনকে বধ করা যোদ্ধা )হয়েছ। আমাকে খান্না মাস্টারের লৌন্ডা

(ছোকরা) বলছ? আমি কোন শালার দলে নেই, কেবল সত্যের সাথী। কী বুঝলে হে প্রিন্সিপাল সাহেব”?

প্রিন্সিপাল-- বড়রা যেভাবে ছোটদের বলে—সেই ভঙ্গীতে হেসে বললেন, “ব্যাস, রুপ্পন, অনেক হয়েছে।

এবার চুপ কর”।

“এখনও কিছুই হয় নি প্রিন্সিপাল সাহেব! শুনে নাও-- তুমি যে ১০৭ ধারার মোকদ্দমা শুরু করেছ, সেটা

কালকের মধ্যে মিটিয়ে নিতে হবে। কালকের যদি আর একটা শুনানির তারিখ পড়ে, তাহলে দেখে নিও,

সমস্ত ইস্টুডেন্ট ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ শুরু করে দেবে। তোমার যত দলবাজি সব ভেতরে ভরে দেবে”।

“রুপ্পন”! বৈদ্যজী এগিয়ে আসত আসতে ধমক দিলেন। কিন্তু রুপ্পনের তাতে কোন হেলদোল নেই। উনি

বললেন, ‘দেখুন পিতাজি, আমি সেদিনও কিছু বলি নি। খান্না মাস্টার আর প্রিন্সিপালের ঝগড়ার সময়

আমি হাজির ছিলাম। আমিই তো মিটমাট করিয়েছিলাম। ওই ১০৭ ধারার মোকদ্দমা পুরো মিথ্যে। খান্না

মাস্টারকে ফাঁসিয়ে দেয়ার ষড়যন্ত্র। ইস্টুডেন্ট সমাজ এর বিলকুল সাপোর্ট করবে না”।

বৈদ্যজী ঠান্ডা স্বরে বললেন, “ঠিক আছে, ঠিক আছে। এসব ঘরে গিয়ে আলোচনা করা যাবে”।

হঠাৎ প্রিন্সিপালের কী যে হল! উনি চেঁচিয়ে উঠলেন, “আলোচনা তো পরে করে নেবেন মহারাজ! কিন্তু

রুপ্পন যে ভরা বাজারে আমার অপমান করল তার কী? খান্নাকে নিয়ে আমাকে কী না কী বলল!

আপনাকে কী আর বলব, মিসেজ খান্না এর মাথাটা খেয়েছে। জানি পর্দার আড়ালে যা সব হচ্ছে,

আপনাকে বলার মত নয়”!

বৈদ্যজী গম্ভীর হলেন। “বলার দরকার নেই। সবই জানি”।

ওরা চলতে শুরু করলেন। কিন্তু রুপ্পন বাবু ওদের থামিয়ে দিয়ে বললেন, “এবার তো পিতাজী, এই কথার

ফয়সালা এখানেই করতে হবে। বলুন, আপনি কী জানেন? হ্যাঁ, বলুন! বলুন! এইসব কথাবার্তার মাঝে

মিসেজ খান্নাকে কেন নিয়ে এলেন”?

বৈদ্যজী থেমে গেলেন। নাটকীয় ভাবে প্রিন্সিপালকে দেখলেন। সেই দৃষ্টির সামনে প্রিন্সিপাল হার

মেনে নিলেন। এবার উনি একই ভাবে রুপ্পনের দিকে তাকালেন। কোন সিলির-পিলির গ্যাদগেদে লোক

হলে ওই দৃষ্টির সামনে ওখানেই মাটিতে পড়ে যেত। কিন্তু রুপ্পন বাবু এসব বিষয়ে নিজের বাপেরও

বাপ! লপলপিয়ে বললেন, “বলুন না , থেমে গেলেন কেন”?

বৈদ্যজী বড় করে শ্বাস টেনে বললেন, “আমি জানি রূপ্পন, তুমি হঠাৎ করে নিজের গুরুর প্রতি কেন

দ্রোহ করছ আর খান্না মাস্টার কেন তোমার নতুন সাথী। খোলাখুলি বলি—তোমার ওখানে যাতায়াত

আমার আর উচিত মনে হচ্ছে না”।

রুপ্পন বাবু খানিকক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলেন। ফের উনি গলায় বাঁধা রুমালটিকে আরও টাইট করলেন

এবং ঝোলা হাতে তুলে নিয়ে বললেন, “এবার বুঝেছি। আপনি আমার ক্যারেক্টার নিয়ে সন্দেহ করছেন।




সব বুঝতে পেরেছি”। তারপর আঙুল তুলে ভবিষ্যবাণী করার পোজ মেরে বললেন, “এই প্রিন্সিপাল

সাহেবই আপনার কান ভাঙিয়েছে। জানি। কিন্তু এর ফল ভাল হবে না বলে দিলাম”।

হটাৎ বৈদ্যজীর দিকে ঘুরে বললেন, “আর বদ্রী দাদা? ওনার নামে পুরো গাঁ যে ছি-ছি করছে ! উনি

বেলাকে নিজের ঘরে বসাতে চান। ওনাকে কিছু বলার হিম্মত নেই? ওনার ক্যারেক্টার নিয়ে---“

প্রিন্সিপাল বুঝে গেলেন এইবার বাজ পড়ল বলে! বড়ছেলের চরিত্র নিয়ে কেচ্ছা শুনে বৈদ্যজীর

ফুটপাথে বেহুঁশ হয়ে পড়ে যাওয়ার আশংকায় প্রিন্সিপাল রুপ্পন বাবুকে মাঝপথে থামিয়ে ধমকে

উঠলেন, “কী আজেবাজে বকবক করছ রুপ্পন বাবু? মুখ সামলে কথা বল”।

উনি বৈদ্যজীকে বললেন, “যেতে দিন মহারাজ, রুপ্পন বাবু এখনও ছেলেমানুষ। কোথায় কি ফালতু কথা

শুনেছেন, সেটাই চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে পাড়া মাথায় করছেন”।

তবে বৈদ্যজীর প্রিন্সিপালের ধামাচাপা দেয়া সান্ত্বনার দরকার ছিল না। উনি রুপ্পনের আবেগের

ঝোঁকে চিৎকারকে শান্ত ভাবে গম্ভীর হয়ে সামলাচ্ছিলেন। ওনার চেহারায়, গোঁফের দুই প্রান্ত

কয়েকবার কেঁপে ওঠা ছাড়া, কোন পরিবর্তন চোখে পড়ছে না। রুপ্পন বাবু উত্তেজনার চোটে বদ্রী

পালোয়ানের প্রেমকাণ্ডের তিরস্কার করছিলেন। প্রথমে উনি পেছনের ইতিহাসে প্রবেশ করলেন।

তারপর ব্যাপারটার বর্তমান পরিস্থিতির বিষয়ে কিছু তথ্য এবং ডেটা পেশ করলেন। শেষে উনি

বৈদ্যজীর সব-কিছু-দেখেও-না-দেখার ভানকে কাপুরুষতা আখ্যা দিলেন এবং দুই ছেলের সংগে দু’রকম

ব্যবহারের নিন্দা করলেন। প্রমাণিত করতে চাইলেন যে বৈদ্যজীর বদ্রী এবং রুপ্পনের মধ্যে

পক্ষপাত গণতন্ত্রের মৌলিক সিদ্ধান্তের বিরোধী। কথা শেষ করতে করতে ওনার চেহারা গরম হল,

ঠোঁট ফেনা উঠে ভিজে গেল এবং চোখ মিটমিট করতে লাগল।

প্রিন্সিপাল সাহেব গোড়াতেই বুঝে গেছিলেন যে সান্ত্বনা টান্তনা দেয়া বেকার। তাই বিক্রি ভাল না

হওয়ায় বিরক্ত মিঠাইওলার দোকান গুটিয়ে ফেলার মত নিজের জিনিসপত্তর ঝোলায় ভরে ফেলেছেন।

বৈদ্যজীর কোন প্রতিক্রিয়া না দেখে রুপ্পন বাবুও চুপ মেরে গেলেন এবং এখান থেকে কী করে কেটে

পড়বেন তাই ভাবতে লাগলেন। বৈদ্যজী পুরো ব্যাপারটা এমন শান্তভাবে শুনলেন যেন ওটা রুপ্পনের

উত্তেজিত প্রলাপ নয়, বরং গীতার সমত্বযোগের সার যা ওনাকে ফুটপাথে দাঁড় করিয়ে বড় ভালবেসে

শোনানো হচ্ছে। রুপ্পন চুপ করলে উনি প্রিন্সিপাল সাহেবকে বললেন, “চলুন, স্টেশনে ফিরে যাই। মনে

হয় গাড়ি আসার সময় হচ্ছে”।

রুপ্পন বাবু ওনার পিতার অমন শান্তিপূর্ণ ভাবভঙ্গী দেখে হড়বড়িয়ে গেলেন। থতমত খেয়ে বললেন,

“আমি থাকছি। রাতের গাড়িতে ফিরব”। ওর কথা কেউ কানে নিল না। উত্তেজনা কম করার চেষ্টায়

প্রিন্সিপাল ওই বিষয়ে ঠান্ডা স্বরে কিছু বলতে চাইলেন, “ বদ্রীপালোয়ানের বিষয়ে---“।

বৈদ্যজী হাতের ইশারায় ওনাকে নিরস্ত করে বললেন, “কিছু বলার দরকার নেই। আমি কী করব ঠিক

করে ফেলেছি”।




রুপ্পন বাবুর কৌতুহল বাধা মানছিল না। কিন্তু উনি নিরুৎসাহ ভাব দেখিয়ে একটু দূরে দাঁড়িয়ে রাস্তায়

লোকজনের যাওয়া আসা দেখতে লাগলেন। বৈদ্যজী এমন একটা উঁচু স্বরে বলতে শুরু করলেন যে যার

শোনার ইচ্ছে নেই সেও শুনে ফেলবে। “আমি এতটা পুরাতনপন্থী নই। গান্ধীজি ভিন্ন জাতের মধ্যে

বিবাহের পক্ষে ছিলেন, আমিও তাই। বদ্রী আর বেলার বিয়ে সব্দিক থেকেই একটা আদর্শ হবে। তবে

গয়াদীন আমার প্রস্তাব কীভাবে নেবে সেটা বুঝতে পারছি না। দেখব’ খন”।

কথাটা বলে উনি রুপ্পন বাবুকে দেখলেন। রুপ্পনের হিম্মত হল না যে চোখে চোখ রাখে। বিড়বিড় করে

বললেন, “আমি চললাম”।

প্রিন্সিপাল সাহেবও এই প্রেম প্রসংগের এমন সরল সমাধান দেখতে তৈরি ছিলেন না। ঘাবড়ে গিয়ে মুখ

থেকে অবধী বুলি বেরোতে লাগল। বললেন, “আরে মহারাজ, আমি তো প্রথম থেকেই বুঝে গেছলাম।

আপনার মত সমাজ-সংস্কারক---“ বলতে বলতে উনি একটা রিকশাকে ডাক দিলেন।

বৈদ্যজী বললেন, “এসব কী? জানেন না আমি রিকশায় চড়ি না? টাঙ্গা ডাকুন”।

প্রিন্সিপাল ভুলের জন্যে ক্ষমা চাইলেন। বৈদ্যজী বললেন, “রিকশার প্রচলন এদেশের কলংক! মানুষ

মানুষের কাঁধে চাপবে”?

একটু পরে ওরা দু’জন টাঙ্গায় চড়ে স্টেশনের জন্যে রওনা হলেন। রিকশাকে বয়কট করা মাত্র

রিকশাওলাদের কলংক ভরা সমস্যা নিজে থেকেই মিটে গেল।

(চলবে)
0

ধারাবাহিক - মনোজ কর

Posted in






















১ম পর্ব - প্রতিকূলতাবিঘ্নিত প্রস্তুতি এবং যাত্রা




প্রস্তুতি

মিনি এখন ইটালির যে ছোট্ট শহরটাতে থাকে তার নাম রেজিও এমিলিয়া। শহরটার

সাইজ ২৩১ বর্গ কিলোমিটার। লোকসংখ্যা ১লক্ষ ৭২হাজার অর্থাৎ জনঘনত্ব

৭৫০জন প্রতি বর্গ কিলোমিটারে। তুলনামূলক ধারণা দেবার জন্য জানাই কলকাতা’র

(মেগাসিটি) আয়তন ২০৬ বর্গ কিমি এবং জনসংখ্যা ৬৫লক্ষ ৭৭হাজার। জনঘনত্বে

কলকাতা রেজিও এমিলিয়ার ৬০গুন!! মিনি যখন ইউনিভার্সিটি অফ মদেনা অ্যান্ড

রেজিও এমিলিয়াতে বৈজ্ঞানিকের কাজ নিয়ে প্রথম রেজিওতে আসে তখন আমরাও

এসেছিলাম ওর সাথে। গত দশবছরে ইউরোপের বিভিন্ন শহরে থেকেছে মিনি।সেই

সুবাদে যে যে শহরে ও থেকেছে সেই সব শহরে আমরাও গেছি প্রতিবছর। যার ফলে

ইউরোপের অনেকগুলো শহর ঘোরা হয়ে গেছে আমাদের। কিন্তু উত্তর ইটালির এই

ছোট্ট শহরটাতে গত বছর প্রথম পা রেখেই ভীষণ ভালো লেগেছিল আমার। শহরটাতে

বহুতল নেই বললেই চলে। সব বাড়িগুলোই পুরনো ধাঁচের। অনেকটা আমাদের উত্তর

কলকাতার পুরনো বড় বাড়িগুলোর মত। উঁচু উঁচু চওড়া পাথরের সিঁড়ি , নক্সাকরা

কাঠের রেলিং, কাঠের সার্সি দেওয়া কাচের জানলা, সিমেন্টের লাল মেঝে, উঁচু সিলিং।

মিনি যে বাড়িটাতে থাকে ওটা সিটি সেন্টারের পাশেই। তিনতলায় দুটো শোবার ঘর,

বসার ঘর, ডাইনিং স্পেস, কিচেন ,টয়লেট। ওর একা থাকার পক্ষে বেশ বড়। বাড়ির

জানলা দিয়ে সামনের রাস্তাটা দেখা যায়। সপ্তাহান্তে রাস্তাটায় লোকের আনাগোনা

বাড়ে। রাস্তার ধারের কফির দোকান, পিজেরিয়া (পিজার দোকান) আর

রেস্টুরেন্টগুলো ভর্তি হয়ে যায়। ইউরোপের অন্যান্য শহরের মতোই রাস্তার ওপরে

চেয়ার টেবিল পাতে কফি আর খাবার দোকানগুলো। আমার ভীষণ ভালো লেগেছিল

বাড়িটা। আগেরবার এই বাড়িটাতে শিফট করে, সব গোছগাছ করে, থাকতে শুরু করতে

না করতেই ফেরার সময় হয়ে গিয়েছিল। মাত্র তিনদিন ছিলাম এই বাড়িটায়। তখন

থেকেই ইচ্ছে ছিল ভিসার ভ্যালিডিটি থাকতে থাকতেই আর একবার এসে অন্তত

মাসখানেক থেকে যাব। বাড়ি ঠিক করে মিনি স্থিতু হতে না হতেই ফিরে এলাম।শুধু

সময় বের করে একদিন সকালে ফ্লোরেন্স গিয়ে রাত্রে ফিরে এসেছিলাম। আর

কোথাও যাওয়া হয়নি। মিনি বলেছিল পরের বার এলে সাত আট দিনের জন্য কোথাও

ঘুরে আসবো। আর সেজন্যই এইবার ইটালি আসা। ভিসার ভ্যালিডিটি শেষ ১৭ই মে।

তাই ঠিক হলো ১৩ই মার্চ রওনা দেব কলকাতা থেকে আর ফিরে যাব ১৮ই এপ্রিল।

মিনি এর মধ্যে স্পেন ভ্রমণের ব্যবস্থা করবে। সেই হিসাবে কলকাতা থেকে দুবাই




হয়ে বোলোনিয়া যাবার টিকিট কাটা হলো ১৩ই মার্চের জন্য। ১৩ই মার্চ রাত্রে

এমিরেটস এয়ারলাইন্সে কলকাতা থেকে দুবাই আর ১৪ই মার্চ সকালে দুবাই থেকে

বোলোনিয়া। সবই ঠিকঠাক চলছিল কিন্তু মার্চের গোড়ার দিকে শুরু হয়ে গেল

আমেরিকা –ইরান যুদ্ধ। যুদ্ধে জড়িয়ে গেল আমেরিকার মিত্রশক্তি সংযুক্ত আমির

আরবশাহি। আক্রান্ত হলো দুবাই। বন্ধ করে দেওয়া হলো দুবাই বিমানবন্দর ।

আমরা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেলাম। কিন্তু মনে ভাবলাম ১৩ তারিখ আসতে

প্রায় দু’সপ্তাহ দেরি। হয়ত এরমধ্যে অবস্থা স্বাভাবিক হয়ে আসবে। শুরু হলো

অস্থির অপেক্ষা। রোজ খবর নিচ্ছি ফ্লাইট ঠিকঠাক চালু হলো কিনা। আশার আলো

দেখিয়ে এমিরেটস জানাল কিছু সীমিত সংখ্যক ফ্লাইট ৮ তারিখ থেকে যাতায়াত শুরু

করবে। তার মধ্যে কলকাতা –দুবাই-বোলোনিয়া আছে। ভাবলাম যাক বাঁচা গেল।

দ্বিগুন উৎসাহে প্যাকিং শুরু করে দিলাম। ১১ তারিখ হঠাৎ এমিরেটস জানালো যে

১৪ তারিখের দুবাই –বোলোনিয়া ফ্লাইট একদিন পরে অর্থাৎ ১৫ তারিখ ছাড়বে।

তার মানে এই দাঁড়ালো যে ১৩ তারিখ রাত্রে কলকাতা থেকে দুবাই। তারপর দুবাইতে

প্রায় দেড় দিন অপেক্ষা । তারপর দুবাই থেকে বোলোনিয়া। এমিরেটস-এ ফোন করে

জানতে চাইলাম কলকাতা-দুবাই ফ্লাইট ১৩ তারিখের বদলে ১৪ তারিখে রি-সিডিউল

করা যাবে কিনা। ওরা রাজি হয়ে গেল। তার মানে আমাদের যাওয়া পিছিয়ে গেল

একদিন। চতুর্দিকে যা চলছে তাতে একদিন পিছিয়ে যাওয়াটা এমন কিছু ব্যাপার নয়।

মনকে সান্তনা দিলাম। ভাবলাম ঠিকই আছে। একদিনেরই তো ব্যাপার।কিন্তু যুদ্ধের

যা পরিস্থিতি তা দেখে খুব একটা নিশ্চিন্ত হতে পারছিলাম না। দুবাইতে পরিচিত

বন্ধুবান্ধবদের ফোন করলাম। এক-দু’জন বাঙালি তো যুদ্ধের ইঙ্গিত পেয়েই

সপরিবারে কলকাতা ফিরে এসেছে।কিছু দক্ষিণ ভারতীয় বন্ধু তখনও দুবাইতে আছে

কিন্তু তারাও খুব একটা আশার কথা শোনালো না। অনতিবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ হবারও

কোনও লক্ষণ নেই। যে কোনও সময়ে দুবাই বিমানবন্দরে ফ্লাইট ওঠানামা কমিয়ে

দেওয়া বা বন্ধ করে দেবার সম্ভাবনাও ওরা একেবারে উড়িয়ে দিল না। অনেক

বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়-পরিজন ইত্যাদি শুভাকাঙ্খীরা পরামর্শ দিল খুব জরুরি না

হলে এখন না যাওয়াই ভাল। কিন্তু কখন যে অবস্থা ভাল হতে পারে তার উত্তর কেউ

দিতে পারলো না। । এইসব অনিশ্চয়তার মধ্যেই ১২ তারিখে এমিরেটস থেকে খবর

এলো যে অনির্দিষ্টকালের জন্য দুবাই –বোলোনিয়া ফ্লাইট বন্ধ করে দেওয়া হলো।

মাথায় হাত! এতদিনের পরিকল্পনা ভেস্তে গেল! অন্য এয়ারলাইন্সে অন্য রুটে

টিকিটের দাম চেক করলাম। দ্বিগুন থেকে তিনগুন দাম। এদিকে হাতেও সময় কম।

ঠিক এইসময়েই এমিরেটস জানালো যে ৩০শে এপ্রিলের মধ্যে যাওয়ার জন্য যে

কোনও ফ্লাইটের দিন এবং রুট একাধিকবার সম্পূর্ণ বিনা অতিরিক্ত খরচায় বদল

করা যেতে পারে। কী মনে হলো এমিরেটস-এর ওয়েবসাইট চেক করে দেখলাম যারা

নতুন করে বোলোনিয়ার টিকিট কাটছে তাদের রোম অবধি প্লেনে এবং রোম থেকে




বোলোনিয়া ট্রেনের ব্যবস্থা করছে এমিরেটস। ভাবলাম আমার পুরনো টিকিট তো কী

আছে, চেষ্টা করে দেখতে দোষ কী? ফোন করলাম। ওরা সব শুনে বলল ট্রেনের

ব্যবস্থা করা যাবে না কিন্তু রোম থেকে একটা কানেক্টিং আই টি এ এয়ারলাইন্সের

ফ্লাইট ব্যবস্থা করে দিতে পারে। তবে ১৪ তারিখের বদলে ১৫ তারিখ রাত্রে ৮-২৫-

এ কলকাতা থেকে রওনা হতে হবে। ১৬ তারিখ রাত্রি ১২টায় (দুবাই সময়) দুবাই

এবং সকাল ৮ টায় (দুবাই সময়) দুবাই –রোম ফ্লাইট যেটা রোমে পৌঁছবে ১৬ তারিখ

১২-৪৫ (রোম সময়) এবং দুপুর ২-২৫ (রোম সময়) মিনিটে রোম-বোলোনিয়া ফ্লাইট।

রোমে লে-ওভার মাত্র ১ ঘন্টা ৪০ মিনিট। ইমিগ্রেশন এবং সিকিউরিটি করে ২৫

মিনিট আগে অর্থাৎ ১ ঘন্টা ১৫ মিনিটের মধ্যে গেটে পৌঁছতে হবে। যথেষ্ট ঝুঁকি

আছে তবুও রাজি হয়ে গেলাম। অন্য কোনও উপায় নেই। আবার অপেক্ষা শুরু ।

প্যাকিং মোটামুটি কমপ্লিট। কিন্তু বিপদ তো একা আসে না। ১৪ তারিখ রাত ১টা

থেকে মুনমুনের ডাইরিয়া শুরু হলো। রাতটুকু ম্যানেজ করার জন্য হাতের কাছে যা

ওষুধ ছিল তাই দিয়ে ভোর প্রায় ৫টার সময় পরিস্থিতি কিছুটা আয়ত্ত্বে এলেও

একেবারে বন্ধ হলো না। সকালে গৃহ চিকিৎসক ডঃ চৌধুরীকে ফোন করলাম।

রক্ষণশীল বয়স্ক ডাক্তার। ইংল্যান্ডে থাকতেন। বললেন,’ কোনও রিস্ক নেওয়া

যাবে না। আবার রি-সিডিউল করান। ওষুধ দিচ্ছি। মিনিমাম চার-পাঁচ দিন লাগবে।‘

আবার ফোন করলাম এমিরেটসে। ওরা সব কিছু দেখে বললো সিডিউল ছ’দিন পিছিয়ে

দেওয়া যেতে পারে। অর্থাৎ ১৫ তারিখের বদলে ২১ তারিখ কলকাতা থেকে রওনা।

বাকি টাইমিং একই রকম থাকবে। আমার অনুরোধে আমাদের ফেরার টিকিটও পিছিয়ে

১৭ই এপ্রিলের বদলে ২৩শে এপ্রিল করে দিতে রাজি হয়ে গেল এমিরেটস

এয়ারলাইন্স। মাঝখানে আর কিছু অঘটন ঘটেনি। অবশেষে ২১ তারিখ কলকাতা থেকে

রাত্রি ৮-২৫ মিনিটের কলকাতা-দুবাই ফ্লাইট ধরলাম। পরের গল্প শুরু ফ্লাইট

ছাড়ার পর।

এই গল্পের শেষে একটা কথা বলে রাখি। আমার এইবারের ইটালি যাত্রার সঙ্গে

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ইটালি ভ্রমণের বেশ কিছু সাদৃশ্য আছে। গুরুদেব তিনবার

ইটালি গেছেন। প্রথমবার ১৮৭৮ সালে ইংল্যান্ড যাবার পথে। দ্বিতীয় ও তৃতীয়বার

যথাক্রমে ১৯২৫ সালে এবং ১৯২৬ সালে। আমারও এটি তৃতীয় ইটালি ভ্রমণ।

প্রথমটি ২০১৬ সালে –রোম ও ভেনিস। আমার প্রথম ইটালি ভ্রমণ আমার কাছে

স্মরণীয় হয়ে আছে। সেবার ভেনিসে গন্ডোলার লাইনে আমার দু’শো ইউরো পকেট

কেটে তুলে নিয়েছিল এক ইটালিয়ান সুন্দরী। তারপর ২০২৫ এবং ২০২৬।

রবীন্দ্রনাথের দ্বিতীয় এবং তৃতীয় ইটালি ভ্রমণের ঠিক একশো বছর পরে।

মুসোলিনি এবং রবীন্দ্রনাথের ঐতিহাসিক সাক্ষাৎকারের শতবর্ষপূর্তি ঘটবে আর

পাঁচ সপ্তাহ পরেই -৩০শে মে। কাকতালীয় !!!




ধান ভাঙতে শিবের গীত এখানেই শেষ। এবার যাত্রা শুরু।

যাত্রা হলো শুরু।

কলকাতা থেকে ২১শে মার্চ রাত্রি ৮-২৫এর দুবাইগামী প্লেনে উঠে বসলাম। প্লেন

ছাড়লো সঠিক সময়। মুনমুনের উইন্ডো সিট, আমার মিডল আর প্যাসেজের পাশে

আইল সিটে এক বাংলাদেশি মাঝবয়সী ভদ্রলোক। প্লেন ছাড়ার খানিকক্ষণের

মধ্যেই চার-পাঁচ ক্যান বিয়র পান করে ঘুমিয়ে পড়লেন ভদ্রলোক। ঘন্টা চারেক পরে

মুনমুন টয়লেট যেতে চাইলে ভদ্রলোককে একটু উঠে দাঁড়াতে বললাম। কিন্তু কে শোনে

কার কথা! নেশাগ্রস্থ ভদ্রলোক তখন ঘুমে কাতর। আমি বারবার ডাকছি , গায়ে হাত

দিয়ে ঠেলা দিচ্ছি তবুও লোকটা নড়ছেনা চড়ছেনা দেখে একজন বিমানসেবিকা এসে

ভদ্রলোককে প্রায় ধাক্কা দিতে শুরু করলেন। অনেক চেষ্টার পর ভদ্রলোক

কোনওক্রমে সোজা হয়ে বসে নিজের পা দু’টো একটু টেনে নিয়ে আবার নিদ্রাদেবীর

কোলে ঢলে পড়লেন। অগত্যা ঐটুকু জায়গা দিয়ে অনেক কসরত করে আমি প্যাসেজে

এসে দাঁড়ালাম। এবার মুনমুনের পালা। অনেক চেষ্টা করে দুপায়ের হাঁটু যতদূর সম্ভব

ভাঁজ করে প্রচুর খেটেখুটে যখন প্যাসেজে এসে দাঁড়ালো তখন বোঝা গেল বাঁ পায়ের

হাঁটুটা আর ভাঁজ করা যাচ্ছেনা। পা সোজা হয়ে আছে কিন্তু হাঁটু মোড়া যাচ্ছে না। চাপ

দিয়ে মুড়তে গেলে প্রচন্ড ব্যাথা। ব্যাকরেস্ট ধরে ধরে কোনওক্রমে টয়লেট থেকে

ফিরে এসে সেই যে সিটে বসলো তারপর থেকে বাঁ পাটা একেবারে নট নড়ন চড়ন। সঙ্গে

রাখা পেন-কিলার খেয়ে ব্যথা একটু কমলেও পায়ের অবস্থার কোনও উন্নতি হলো

না। বিমানসেবিকা এসে বলে গেলেন ল্যান্ড করার পর সিটেই বসে থাকতে। পুরো প্লেন

খালি হয়ে গেলে হুইলচেয়ারে করে নিয়ে যাওয়া হবে। মুনমুনের এই প্রথমবার

হুইলচেয়ার আরোহণ। আইলে বসা ভদ্রলোককে বিশুদ্ধ বাংলায় অভিশাপ দিতে দিতে

হুইলচেয়ারে করে গড়িয়ে চলল মুনমুন আর পিছনে পিছনে আমি চললাম হেঁটে।

দুজনেরই মনেই গভীর উৎকণ্ঠা বাকি পথ কী করে পাড়ি দেব? মিনির বাড়িতো এখন

অনেকটা পথ। দুবাই থেকে রোম, রোম থেকে বোলোনিয়া , বোলোনিয়া থেকে রেজিও

এমিলিয়া-অনেক হাঁটা, ওঠা- নামা, অনেক ঝক্কি। যাইহোক হুইলচেয়ার মুনমুনকে

নামিয়ে দিয়ে গেল এমিরেটস-এর লাউঞ্জে। এখন দুবাই সময় রাত্রি ১২-৩০ , রোমের

ফ্লাইট সকাল ৮টায়। ৭ ঘন্টা ৩০ মিনিটের লে-ওভার। বলে গেল সকাল ৭টায় আবার

হুইলচেয়ার আসবে প্লেনে তুলে দেওয়ার জন্য। এয়ারপোর্ট অ্যাসিস্ট্যান্স

সার্ভিসের এক মহিলাকর্মী জানিয়ে গেলেন তিনি লাউঞ্জেই আছেন। টয়লেট যাবার

বা অন্য কোনও রকম দরকার হলে ওনাকে ডাকতে। এর আগে কোনওদিন

অ্যাসিস্টান্স সার্ভিসের দরকার পড়েনি তাই অভিজ্ঞতাও ছিলনা। ঐ মহিলাকর্মীর

আন্তরিক ব্যবহার এবং প্রতিটি প্রয়োজনে সযত্নে হাত বাড়িয়ে দেওয়া সত্যিই

ভোলবার নয়। কেবলমাত্র প্রশিক্ষণ এবং পেশাগত বাধ্যতার বাইরেও গভীর




আন্তরিকতা এবং পরম মমত্ববোধ ব্যতিরেকে এইধরনের সহায়তা প্রদান সম্ভব

নয়। কাঁটায় কাঁটায় ৭টার সময় হুইলচেয়ার নিয়ে এলেন আরেকজন সহায়তা কর্মী।

সমস্ত লাইন অতিক্রম করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে হুইলচেয়ার আরোহী যাত্রীদের

সকলের আগে প্লেনে ওঠানো হয়। এক্ষেত্রেও তার কোনও ব্যতিক্রম হলোনা।

সঠিক সময়ে আমরা উঠে বসলাম দুবাই থেকে রোম যাবার প্লেনে। দীর্ঘ উড়ান।

প্লেন যদি ঠিক সময়ে ছাড়ে তাহলে রোমে পৌঁছে পরের প্লেন ধরার জন্য সময় পাবো

১ ঘন্টা ১৫ মিনিট। তার মধ্যে সিকিউরিটি এবং ইমিগ্রেশনের গেরো। অনিশ্চয়তার

শুরু আবার। তারই মধ্যে যজ্ঞে ঘৃতাহুতি দিয়ে বিমানচালক জানালেন প্লেন ছাড়তে

৩০ মিনিট দেরি হবে। কারণ দুবাই বিমানবন্দরে রানওয়ের সংখ্যা নিরাপত্তার

কারণে কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমি তখন মনে মনে অঙ্ক করছি। যদি ৩০ মিনিট

দেরিতে ছাড়া মানে ৩০ মিনিট পৌঁছতে দেরি হয় তাহলে পরের প্লেন ধরা অসম্ভব।

সুতরাং হয় আজকের রাত্রি রোমে কাটিয়ে পরেরদিন সকালের বিমানে বোলোনিয়া

অথবা রোম এয়ারপোর্ট থেকে ট্রেন ধরে একটা ট্রেন বদল করে বোলোনিয়া স্টেশন।

কিন্তু এতো লাগেজ এবং প্রায় চলচ্ছক্তিহীন মুনমুনকে নিয়ে মাঝখানে ট্রেন বদল

করে বোলোনিয়া যাওয়া কিছুতেই সম্ভব নয়। প্লেন ছাড়লো ৮-৩০এ। বিমানচালক

ঘোষণা করলেন যে ছাড়তে দেরি করলেও তিনি চেষ্টা করবেন যতটা সম্ভব সময়

বাঁচাতে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পৌঁছে দিতে। আশা হতাশার দোলায় দুলতে

দুলতে চললাম রোমের উদ্দেশ্যে। রোমে যখন পৌঁছলাম তখন আমাদের হাতে আর

মাত্র একঘন্টা সময়। মুনমুনের যেহেতু হুইলচেয়ার লাগবে আমাদের অপেক্ষা করতে

হবে সব যাত্রীর নেমে যাওয়া অবধি। সেখানেই গেল দশ মিনিট। তারপর এলেন এক

মহিলা সহায়তা কর্মী। সঙ্গে হুইলচেয়ার। কিছু রেকর্ড চেক করে মুনমুনকে চেয়ারে

বসালেন। এই হুইলচেয়ারটি হাতে ঠেলা নয়, মোটরচালিত। বললেন,’ আমার নাম

বারবারা। আপনাদের আগেই বলে রাখি আমাদের হাতে যা সময় তাতে সিকিউরিটি,

ইমিগ্রেশন অতিক্রম করে চেক-ইন কাউন্টার থেকে বোর্ডিং পাস সংগ্রহ করে ঠিক

সময়ে গেটে পৌঁছনো প্রায় অসম্ভব।‘ আমাকে বললেন,’ দেখুন আমি হুইলচেয়ার একটু

জোরে ড্রাইভ করবো। আপনাকেও একটু জোরে আমাকে অনুসরণ করতে হবে।

মাঝখানে কোথাও দাঁড়াবেন না। অনেকটা পথ অতিক্রম করতে হবে।‘ হর্ন বাজাতে

বাজতে হুইলচেয়ার দৌড়চ্ছে ।পিছনে দৌড়চ্ছি আমি। ফার্স্ট স্টপ সিকিউরিটি।

বারবারা আমাদের দু’টো কেবিন ব্যাগ হাতে নিয়ে সিকিউরিটির লোকটাকে ওদের

ভাষায় কি একটা বলে বেল্টের ওপর রেখে দিল। সিকিউরিটি অফিসার আমাদের

লাইনের আগে আসতে বললেন। দ্রুতগতিতে সবকিছু চেক করে আমাদের সবার আগে

ছেড়ে দিলেন। শুরু হলো আবার দৌড়। সামনে হুইলচেয়ার, পিছনে আমি। সেকেন্ড স্টপ

–ইমিগ্রেশন। লাইন টপকে আমাদের নিয়ে গিয়ে দাঁড় করালেন ইমিগ্রেশন কাউন্টারে

একেবারে ইমিগ্রেশন অফিসারের সামনে। আমাদের হাত থেকে পাসপোর্টগুলো নিয়ে




ইমিগ্রেশন অফিসারের হাতে প্রায় গুঁজে দিয়ে ইতালিয়ন ভাষায় কি সব বোঝালেন

অফিসারকে। অফিসার মৃদু হেসে হাত চালিয়ে ফর্মালিটি কমপ্লিট করে পাসপোর্ট

দু’টো আমার হাতে দিয়ে হেসে বললেন -অল দি বেস্ট। ইউ আর ইন সেফ হ্যান্ডস।

আবার দৌড় । এবার হুইলচেয়ারের স্পিড আগের থেকে বেশি- লাস্ট ল্যাপ। আমিও

দৌড়চ্ছি প্রাণপণে। গেট নং –এ ৩২। গেটের উল্টোদিকে আই টি এ’র প্রায়রিটি

ট্রান্সফার সার্ভিস। আমাদের দাঁড় করিয়ে হাত থেকে পাসপোর্ট প্রায় ছিনিয়ে নিয়ে

সবাইকে ঠেলে কাউন্টারের সামনে গিয়ে হাত আর মাথা নেড়ে কাউন্টারের মহিলাকে

কি বোঝালেন কিছুই শোনা গেল না। কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখলাম হাতে পাসপোর্ট

আর বোর্ডিং পাস নিয়ে বিজয়ীর হাসি হাসতে হাসতে বারবারা এগিয়ে আসছেন

আমাদের দিকে। বোর্ডিং প্রায় চালু হয়ে গেছে ততক্ষণে। হুইলচেয়ার দেখে

কাউন্টারের মেয়েটি বারবারাকে তাড়াতাড়ি আসার ইঙ্গিত করে অন্যান্য যাত্রীদের

বোর্ডিং কিছুক্ষণের জন্য বন্ধ করে দিল। সকলের আগে হুইলচেয়ারের যাত্রীদের

ছাড়াই নিয়ম। বারবারা সকলের আগে আমাদের নিয়ে গিয়ে প্লেনে ওঠার দরজার কাছে

ছেড়ে দিলেন। বিমানসেবিকা হাত ধরে মুনমুনকে নির্দিষ্ট আসনে বসিয়ে দিলেন।

কিছুক্ষণ পরে বারবারা হুইলচেয়ার রেখে এসে প্লেনের মধ্যে ঢুকে আমাদের সঙ্গে

দেখা করে গেলেন। ওঁকে যে কী বলে ধন্যবাদ জানাবো তার ভাষা খুঁজে পেলাম না।

অনুভব করলাম কেবলমাত্র ধন্যবাদ জানালে বারবারাকে ছোট করা হয়। বললাম

ওঁকে কৃতজ্ঞতা জানানোর ভাষা আমাদের জানা নেই। হাসিমুখে বিদায় নিয়ে বারবারা

চলে গেল । ভেবে দেখলাম মুনমুনের পা যদি ঠিক থাকতো আর বারবারাকে যদি না

পেতাম তাহলে এই প্লেন ধরা আমাদের পক্ষে কোনওভাবেই সম্ভব হতোনা। এই

ঘটনা আমার চিরকাল মনে থাকবে। চরম অনিশ্চয়তা এবং বাধাবিপত্তির মধ্যে

কোথা থেকে হঠাৎ উনি এলেন আর কেনই বা আমাদের হাত ধরে ঝড়ের মতো সমস্ত

বাধাবিপত্তি দূর করে আমাদের লক্ষ্যে পৌঁছে দিলেন আর কী ভাবেই বা সবকিছু

সম্ভব হলো তা এখনও বুঝতে পারিনি।

মিনিকে ভিডিওতে ধরলাম। আমাদের প্লেনের মধ্যে দেখে ও তো একেবারে অবাক। ও

ভাবতেই পারেনি আমরা প্লেনটা ধরতে পারবো। ও নিশ্চিত আমরা কালকের আগে

পৌঁছব না। একমিনিট হাঁ করে তাকিয়ে থেকে বললো – বোলোনিয়াতে নেমে অপেক্ষা

কোরো। আমি লাঞ্চ করে এয়ারপোর্টে আসছি।

রেজিও এমিলিয়াতে মিনির বাড়ি এসে যখন পৌঁছোলাম তখন ইতালির ঘড়িতে সন্ধ্যা

৭টা বেজে ১৫ মিনিট। এখন তিন দিন কোনও কাজ নেই। ২৬শে মার্চ সকালে আমরা

রওনা দেবো উত্তর স্পেনের এক সুন্দর শহর বিলবাও-এর উদ্দেশ্যে।

বাংলাদেশি ভদ্রলোকটিকে বাছা বাছা শব্দে অভিসম্পাতের পর্ব কিন্তু এখনও শেষ

হয়নি। খুব তাড়াতাড়ি শেষ হবে বলেও মনে হচ্ছে না।



                  বোলোনিয়া এয়ারপোর্টে






রেজিও এমিলিয়াতে আমাদের বাড়ি

0

ধারাবাহিক - রঞ্জন রায়

Posted in




















২৮.১

শিবপালগঞ্জ গাঁয়ের এক দুঃখী ছেলে, নাম রুপ্পন বাবু। কিছু দিন আগে ওনার খুব দাপট ছিল আর লোকে বেশ সম্ভ্রমের চোখে দেখত। কারণ ওনার বাপের নাম বৈদ্যজী তবে ওনার নিজেরও কিছু নাম ছিল। উনি ক্লাস টেনে বেশ কয়েক বছর ধরে পড়ছেন এবং উনি ওখানকার ছাত্রনেতা। তহসীলদার ওনার ইয়ার, দারোগা ওনার চামচা এবং প্রিন্সিপাল ওনার অধীনস্থ কর্মচারী। উনি সারাক্ষণ কলেজের মাস্টারদের ব্যবহার চালচলন এসব নিয়ে অসন্তুষ্ট। আর মাস্টারের দল ওনাকে “ভয়ানাং ভয়ং ভীষণং” এবং পরমপিতা মেনে চলে।

ঘরের মধ্যে ওনার ছবি লাফালাফি করতে থাকা এঁড়ে বাছুরের মত। এটাও নিশ্চিত যে দেশের রাজনীতির খোলা মাঠে স্বচ্ছন্দে চরে বেড়ানো অনেক প্রতিভাশালী সন্তানের মত ইনিও একদিন চরে খাবার কৌশল শিখে নেবেন। এবং বাপ পটল তুললে কিছুদিন –বছর বা ছ’মাস—এদিক সেদিক ঘুরে একদিন বাপের ছেড়ে যাওয়া আসনে বসে খড় চিবুতে শুরু করবেন।

পাঁচ মাস আগে আরেকটি ছেলে এই গাঁয়ে এসেছিল। ওর নাম রঙ্গনাথ। লোকজন ওর বড়মানুষী চাল, উদার স্বভাব—সবই চিনতে পেরেছে। কারণ, ওর মামার নাম বৈদ্যজী। তবে ওর নিজেরও কিছু বড়মানুষী গুণ ছিল। ও ইতিহাসে এম এ করেছে। দেখতে সরল ভালমানুষটি, কিন্তু দরকারে বেশ বাঁকা কথা বলতে পারে। প্রতিটি লেখাপড়া জানা ভারতীয়ের মত ও নিজের সংগে সম্পর্ক নেই এমন সব ঘটনাকে ঘটনা হিসেবেই দেখত আর ভুলে যেত, --এ’নিয়ে কোন চাপ নিত না।

ইতিহাসের ছাত্র হওয়ায় ওর অনেক রাজনৈতিক এবং সামাজিক শোষণ ও উৎপীড়নের ঘটনার কথা জানা ছিল। কিন্তু কখনও ভাবে নি যে ও নিজেও ইতিহাসের অংশ, এবং চাইলে ইতিহাসের চেহারা বদলে দিতে পারে। ও দেশের সেই পঁচানব্বই প্রতিশত বুদ্ধিজীবীদের একজন যাদের বুদ্ধি দেয় আত্মসন্তোষ এবং তর্ক করার কৌশল। বুদ্ধির প্রেরণায় ওরা অন্যদের কী করা উচিত, বা কী করা উচিত নয় সে নিয়ে লম্বা লম্বা লেকচার দেয়, কিন্তু অন্যদের না করার পেছনে যে নিজেরও কিছু দায়িত্ব আছে—সেইসব বেহায়া যুক্তির থেকে কয়েক ক্রোশ সরে থাকে।

তবে যে ছেলেটার নাম রুপ্পন বাবু তার সমস্যা অন্য। কিছুদিন ধরে ও রাজনৈতিক পছন্দ-অপছন্দের মধ্যিখানে নিজের ব্যক্তিগত পছন্দ, রুচি এসব এনে ফেলেছে। ফলে আগে যেসব ভালোমন্দ, ন্যায়-অন্যায় ওর চোখে ধরা পড়ত না, সেগুল এখন ফুটবলের আকার নিয়ে যেন ওর চোখের পাতায় লটকে রয়েছে। আগে ও কলেজের প্রিন্সিপালকে নিজের বাবার চাকর ভাবত। এখন মনে হচ্ছে ব্যাটা গণ্ডমূর্খ এবং জেদি; আর অন্য মাস্টারদের দেখে জ্বলতে থাকে। সেই জ্বলুনির চোটে রূপ্পনের পিতাঠাকুরকে নিজের দলাদলির মধ্যে টেনে এনেছে। কয়েকজন মাস্টারকে আগে মনে হত মূর্খ এবং ছিটেল। এখন দেখা যাছে ওরা ছিটেল হলেও বদমাশ নয়—ওদের রক্ষা করা কর্তব্য। কিছুদিন আগেও বড়ভাই বদ্রী পালোয়ানকে মনে হত শক্তিচর্চার অন্তিম উদাহরণ, এবং বদ্রীকে নিয়ে রুপ্পনের গর্ববোধ হত। কিন্তু এখন ও দেখেছে আশপাশের জেলার কিছু গুণ্ডাকে—যারা মাঝে মাঝে শিবপালগঞ্জে এসে বদ্রীর সংগে কথা বলে চলে যায়।

অর্থাৎ এখন ছেলেটার মনে সেই ছটফটানি শুরু হয়েছে যার ঠেলায় কেউ বিভীষণ, ট্রটস্কি বা সুভাষচন্দ্র বোস হয়ে জগতকে কিছু করে দেখাতে চায়। কিন্তু যাত্রা শেষ হয় ফাঁসিকাঠে চড়ে, জেলে গিয়ে অথবা জয়প্রকাশ নারায়ণ বা অচ্যুত পটবর্ধনের মত সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর নিয়ে।

অন্য ছেলেটার অবস্থাও তথৈবচ। কারণ, পাঁচ মাস এখানে কাটিয়ে ও দেখেছে যে তামাশা খেলাচ্ছলে শুরু হয়েছিল এখন তার চোটে লোকের হাত-পা ভাঙা হচ্ছে। আর হাসতে হাসতে যে ধূলো অন্যের গায়ে ছিটিয়ে দেয়া হোল। তাতে লোকটার চোখ নষ্ট হল। যখন শনিচরকে পঞ্চায়েত প্রধান পদে দাঁড় করানোর কথা উঠল বা যখন ছোটে পালোয়ান জোগনাথের বিরুদ্ধে সাক্ষী দিতে গেল তখন ওর মনে হয়েছিল এসব ইয়ার্কি হচ্ছে। কিন্তু যখন শনিচর সত্যি সত্যি পঞ্চায়েতের প্রধান হল বা ছোটে পালোয়ান জোগনাথকে সত্যিই জেল থেকে ছাড়িয়ে আনল, তখন রঙ্গনাথের বুকে জোর ধাক্কা লাগল। শনিচরের ভোটে জেতার বিজয় উৎসবের দিন ও অনেক কিছু ভাবল। ও জ্ঞানচক্ষুতে দেখতে পেল—বিভিন্ন রাজ্যের রাজধানীতে কত কত বৈদ্যজী, মন্ত্রী এবং মুখ্যমন্ত্রীর লাইনে না জানি কত শনিচর ঢুকে গেছে!

যে ছেলেটার নাম রূপ্পন বাবু ওর মন অশান্ত হওয়ার দিন আরও একটা ঘটনা ঘটেছিল—যার সংগে মনের এই অশান্তির কোন সম্পর্ক নেই। অনেকদিন থেকে ছেলেটা টের পাচ্ছিল যে ওর দরকার একটা মেয়েমানুষের। এত বুঝেও ওর ভুল হচ্ছিল যে ওর স্রেফ বেলাকে চাই। তারপর, এই যে ইচ্ছে—যা কীটপতঙ্গ, পশুপাখির মধ্যে বিশেষ বিশেষ মরশুমে আর মানুষের মধ্যে সময়ে অসময়ে জেগে ওঠে-- সেটাকে ও ‘প্রেম’ নাম দিল। এটা অবশ্যি কবিতার জালিয়াতিতে আমাদের অভিধানে ঢুকে পড়েছে। ও ভাবতে লাগল যে ও বেলাকে ভালবাসে; আর পুরো খবর ওর কাছে না থাকায় ধরে নিল যে বেলাও ওকে ভালবাসে! ফের ও বেলাকে একটা প্রেমপত্র পাঠালো, যার জবাব বেলা দেয় নি। তবে সেটার ঠ্যালায় রুপ্পনকেই নানা জায়গায় অনেকবার কৈফিয়ত দিতে হল। এসব বলার সময় ও নিজের জিদ ও ঠ্যাঁটামি বজায় রাখল বটে, তবে মনে মনে ঝাড় খাচ্ছিল। শেষে যেদিন খান্না মাস্টারের মুখে শুনল যে বেলা ও বদ্রী পালোয়ানের ভেতরে ভেতরে ইন্টুমিন্টু চলছে এবং বদ্রী ওকে বিয়ে করবে সেদিন ওর মনের ছাটফটানি খুব বেড়ে গেল। আর কী করে যেন, সেই ছটফটানি ওকে প্রিন্সিপাল, বৈদ্যজী, বদ্রী পালোয়ান, শনিচর—সবার বিরুদ্ধে নানারকম উল্টো সিধে ভাবতে আতুর করে দিল।

এতদিন ও বাস্তবতা নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছিল, এবার ও নিজের জীবনের বাস্তবতা কী সেটা দেখতে পেল।

একই সময় অন্য ছেলেটারও জ্ঞানচক্ষু খুলে গেল। বুঝল খালি শোষণ ও অত্যাচারের ইতিহাস মুখস্থ করে কিছু হবে না। গাধার পিঠে সমস্ত বেদ, উপনিষদ, আর পুরাণের বোঝা চাপিয়ে দিলে সে বড়জোর আন্তর্জাতিক বিদ্বান পরিষদের সভাপতি হবে, তবুও মনুষ্য পদবাচ্য হবে না। তার জন্যে দরকার বিদ্যার ভার বহন না করে অন্য কিছু করা। খান্না মাস্টার রূপ্পনবাবুকে বদ্রী পালোয়ানের প্রেমকাণ্ড শোনানোর আগে আরও একটা কথা বলেছিল। এসব হয়েছিল হোলির তিন দিন পরে চাঁদ উঠলে এবং রাস্তার ধারের পুলিয়ায় বসে—সেই পুলিয়া, যেখানে বসে একদিন রঙ্গনাথ ওকে ছাতে একা শোনার বিশেষ অভিজ্ঞতার কথা বলেছিল।

সেদিন খান্না মাস্টারের সংগে মালবীয়ও ছিল। ওরা আগে থেকেই পুলিয়ায় বসে ছিল। রুপ্পন বাবু হোলি উৎসবের দিন থেকে সমানে ভাঙ খেয়ে ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত। তাই শরীরের ক্লান্তি দূর করতে আবার ভাঙ খেয়ে রঙ্গনাথের সংগে একটু পায়চারি করতে বেরিয়েছেন। পুলিয়ায় দুটো লোককে বসে থাকতে দেখে স্বাভাবিক অভ্যাসে হাঁক দিলেন—“কৌন হ্যায় বে”? কে রে ব্যাটাচ্ছেলে?

“কে রুপ্পন বাবু? নমস্কার রঙ্গনাথজী, আমি খান্না”।

“আরেকজন কে”?

“মালবীয়। নমস্কার রূপ্পন বাবু! আসুন, বসে পড়ুন”।

মাস্টারদের অভিবাদনের উত্তরে রূপ্পন একটা যেমন তেমন জবাব দিয়ে পুলিয়ার উপর বসে পড়লেন। ‘বিগ ফোর’ এর বৈঠক শুরু হল।

রাত ন’টা; কিন্তু কোথাও কোন শান্তি নেই। তহসীল অফিসের সামনের পান দোকানের রেডিও বেজেই চলেছে। আর ফিল্মি গানের নল থেকে ভর ভর করে বেরিয়ে আসছে ‘অরমান, সাজনা, হসীন, জাদুগর, মঞ্জিল, নজর, তু কঁহা, সীনা, গলে লগা লো, গলে লগ যা, মচল -মচলকর, আঁধিয়া, গুম, তমন্না, পরদেশী, শরাব, মুস্কান, আগ, জিন্দগী, মৌত, বেরহম, তসবির, চাঁদনী, আসমাঁ, সুহানা সপন, জোবন, মস্তি, উভার, ইন্তজার, বেজার, ইসরার, ইনকার, ইকরার”---- গোছের শব্দাবলী আর রাস্তায় ঝরে পড়ছে। এসব না খেতে পাওয়া দেশের নবজাগরণের খবর দেয়ার জন্যে সর্বথা উপযুক্ত। এই কলকল করে ঝরতে থাকা গানের আওয়াজ দিক দিগন্তে ছড়িয়ে পড়ছে। এদের পুলিয়াতেও হাওয়ার ঢেউয়ে কিছু ভেসে আসছে। আশপাশে শোনা যাছে শেয়ালের ডাক।

এটাই প্রমাণ হচ্ছে যে ওদের দলবেঁধে থাকার প্রবৃত্তি বেশ জোরদার। গ্রামের চারপাশের জঙ্গল কেটে সাফ করা হলেও—নিজের বাসভুমি থেকে বিতাড়িত ইহুদীদের মত—এরাও কোন একটা জায়গায় বসতি স্থাপনের জন্যে আন্দোলন গোছের কিছু করতে উৎসুক। কিন্তু এই সম্মিলিত শিবারব ছাপিয়ে শোনা যায় আরেকটা আওয়াজ-- হর্ন বাজাতে বাজাতে ঘন্টায় সত্তর মাইল বেগে শহরের দিকে ধাবমান ট্রাকের সারি।

রাত বাড়ছে। শহরের কোন শস্তা বারে রামের বোতল গড়াগড়ি যাচ্ছে, কোন ঢাবায় গোস্ত ও গরম তন্দুরী রুটি তৈরি হচ্ছে, আর কোথাও কোন ছুঁড়ি বিড়ি টানতে টানতে আমার অপেক্ষায় আছে---এইসব কল্পনা শ’ দু’শ মাইল দূর থেকে ট্রাক চালিয়ে আসা ড্রাইভারকে উত্তেজিত করতে এবং প্রাণপণে অ্যাকসিলেটরে পায়ের চাপ বাড়াতে যথেষ্ট। ফলে, প্রত্যেক পাঁচ মিনিটে কোন ট্রাক ঘরঘরিয়ে রাস্তা দিয়ে যায় আর সেই সময় পুলিয়ায় বসে থাকা আমাদের পরিচিত চার মহাপুরুষ নিঃশ্বাস নিতে ভুলে যান। ট্রাক চলে গেলে ‘জোর বাঁচা বেঁচেছি’ ভেবে নিশ্চিন্ত হয়ে ফের নিজেদের অসমাপ্ত আলোচনা চালিয়ে যান।

এতসব বাধাবিপত্তির মধ্যেও আলোচনা এগিয়ে যায়। খান্না মাস্টার দুখী স্বরে রুপ্পন ও রঙ্গনাথের কাছে সাহায্যের আবেদন করতে থাকেন। পকেট থেকে একটা চিরকুট বের করে রুপ্পন বাবুকে বলেন—‘এই দেখুন, আপনার প্রিন্সিপাল কীসব লিখেছে’।

রুপ্পন ,” আমি অন্ধকারে পড়তে পারি না। আপনি পারেন তো শুনিয়ে দিন”।

খান্না মাস্টার মুখে মুখে চিরকুটের সারাংশ শোনাতে লাগলেন। কথা উঠেছে মালবীয় স্যারের চালচলন নিয়ে। চিরকুটের কথা বিশ্বাস করলে মেনে নিতে হবে যে মালবীয় মাস্টার ছাত্রদের খুব ভালবাসেন। সেই ভালবাসা কোন কোন ছাত্রের সংগে একেবারে শারীরিক স্তরে প্রকাশ পায়। ওতে বেশ কিছু ঘটনার বর্ণনা আছে। যেমন, মালবীয় একটি ছাত্রকে শহরে নিয়ে সিনেমা দেখিয়ে ওর সংগে রাত কাটিয়ে ওকে আগামী পরীক্ষায় কেমন প্রশ্নপত্র হবে তার নমুনা দিয়ে তবে শিবপালগঞ্জে ফিরেছেন। চিরকুটের উদ্দেশ্য আদৌ সাহিত্যচর্চা নয়, বরং জনতাকে সত্যের সংগে পরিচয় করিয়ে দেয়া। তাই বর্ণনা শৈলী স্পষ্ট, সোজা সাপটা এবং কোথাও কোথাও একেবারে ক্যাওড়ামার্কা। এতে প্রিন্সিপাল এবং ম্যানেজারকে নিবেদন করা হয়েছে –যেন ওইরকম মাস্টারকে কান ধরে কলেজ থেকে বের করে দেয়া হোয়া

খান্না মাস্টার সংক্ষিপ্ত সংবাদ শুনিয়ে রূপ্পনকে বললেন—“এরপরেও বলবেন আমরা মুখ বন্ধ করে থাকব? প্রিন্সিপালের বিরুদ্ধে কিছু বলব না”?

রুপ্পন বাবু ভাঙের নেশায় বললেন, “কী করার ইচ্ছে”?

“আমাদের কাছে পাক্কা প্রমাণ আছে যে কাগজটা প্রিন্সিপালই ছাপিয়েছে। আমরা ওর বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করব”।

রঙ্গনাথ বলল, “কী লজ্জার কথা”!

রুপ্পনবাবু বেপরোয়া ভাবে বললেন, “দেখুন, সত্যি কথা হল মালবীয়ের সম্বন্ধে এরকম কিছু কথা আগেও শুনেছি। একটা ছেলে আমাকেই জানিয়েছিল যে মালবীয় স্যার আমাকে সিনেমা দেখাবেন বলছেন”---।

ওনার কথার মাঝে এক অদ্ভুত আওয়াজে বাধা পড়ল। মালবীয় জোরে জোরে নাক ঝাড়ছেন। এবার সবাই জানতে পারল যে উনি এতক্ষণ চুপটি করে মুখটি বুজে বসেছিলেন।

খান্না মাস্টার গরম হয়ে বললেন, “এই, এটাই! ক্যারেকটার অ্যাসেসিনেশন। একজন ভালমানুষকে এভাবে বদনাম করা। আপনার থেকে সহানুভুতি পাব ভেবেছিলাম। আর আপনিও এ’রকম উল্টোপালটা বলছেন”।

রূপ্পনবাবু নির্দয়, “আমি যা শুনেছি তাই বললাম। মাস্টাররা এসব করেই থাকেন। নালিশটা সত্যি হলেও বলব কোন নতুন কিছু নয়। তবে আমি এই নিয়ে চিরকুট ছাপানো পছন্দ করি না। আপনারা নিশ্চিন্ত হোন, আমি এর খোলাখুলি প্রতিবাদ করব”।

খান্না আরও উত্তেজিত হয়ে বললেন, “রুপ্পন বাবু, আপনি একই কথা বলে যাচ্ছেন—আমি এর প্রতিবাদ করি। এটা মালবীয়ের বিরুদ্ধে অপপ্রচার। চরিত্রহনন! কেউ কিছু একটা বললেই হল? এটা কোন কথা হল”?

উনি বলতে থাকেন, “লোকের কথা যদি ধরতেই হয়, সে তো বদ্রী পালোয়ানের বিষয়েও বলা হয়। কত কী আবোলতাবোল! কই, আমি তো বিশ্বাস করি নি”!

এবার রঙ্গনাথ প্রশ্ন করে, “বদ্রীদাদা! ওনার সম্বন্ধে কে কী ফালতু কথা বলছে”?

খান্না মাস্টার এবার এদিক সেদিক করে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বদ্রী পালোয়ানের প্রেমকান্ড শোনাতে থাকে। এসব ও কোন ছাত্রের থেকে শুনেছে। সেই ছাত্র আখড়ার কোন পালোয়ানের থেকে শুনেছে। আর সেই পালোয়ানো কারও না কারও মুখ থেকে শুনেছে---। খান্না মাস্টার যা বলল তাতে দুটো আরও লেজুড় যোগ করে দিল। যেমন, গয়াদীন মেয়ের বিয়ে না দিয়েও সাত আট মাস পরে দাদু হতে চলেছে এবং রুপ্পনবাবু উপহার হিসেবে এক ভাইপো পাবেন।

খবরের ঝটকা এমন জোরদার যে রুপ্পন পুলিয়া থেকে নালায় পড়ে যাচ্ছিলেন। রঙ্গনাথ চাপা দিতে গিয়ে বলল—এসব কিছু না। ভাঙের নেশা। কিন্তু সবার কাছে এটা স্পষ্ট –রুপ্পন বাবু হড়বড়িয়ে গেছেন। একেবারে হতভম্ব। একটু পরে সামলে উঠে মানস্ নেত্রে এমন অনেক কিছু দেখলেন যা আগে খেয়াল করেন নি। মনে পড়ল, বদ্রী পালোয়ান ইদানীং ছাতে গিয়ে ব্যায়াম করার নামে অনেকক্ষণ লাগায় এবং ছাতের দরজা বন্ধ করে রাখে। এবার ওনার কাছে স্পষ্ট হল কে সেই মেয়ে যে সেদিন রাতে রঙ্গনাথের খাটিয়ায় কে এসেছিল।

রুপ্পন বাবুর এবার ভাঙের গরম অসহ্য বোধ হল। অস্থির হয়ে এদিক ওদিক দেখতে লাগলেন। রঙ্গনাথ এবং খান্না মাস্টার প্রিন্সিপাল এবং তার চ্যালা-চামুন্ডার বিরুদ্ধে পেনাল কোডের ১০৭ ধারায় মামলা করার ব্যাপারে চর্চায় মগ্ন। খান্না আত্মকরুণার মহাকাব্যের এক নতুন অধ্যায় রচনা করতে শুরু করল। রুপ্পন বাবু খানিকক্ষণ চুপ করে সঙ্গীসাথীদের মন দিয়ে দেখছেন। চোখে পড়ল খান্না মাস্টার আগের চেয়ে রোগা হয়েছেন। আর মালবীয়, মনে হচ্ছিল চুপ করে বসে আছেন, আসলে চুপ নয়—ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন।

রুপ্পনের খুব রাগ হল, তবে কার উপরে সেটা স্পষ্ট নয়। তার সংগে এই মাস্টারদের উপর এবং নিজের উপরেও বড় দয়া হল। উনি এবার প্রিন্সিপালকে তেড়ে গাল দিতে শুরু করলেন। রঙ্গনাথ মাস্টারদের বোঝাতে চাইল যে –কিছু না, ভাঙের প্রভাব। কিন্তু রুপ্পন ওকে এক ধমকে থামিয়ে দিলেন।


শহরের এক কোণায় উঁচু পাঁচিলে ঘেরা একটি লম্বা-চওড়া বাংলো। ওর আকার প্রকার দেখে মনে হয় কোন তালুকদারকে ভাড়ায় থাকতে দেয়া হয়েছে। বাংলোর এক কোণায় একটি কামরায় জেলা বিদ্যালয়- পরিদর্শকের অফিস, বাকি অংশে ওনার আবাস। অফিসের পুরো ভাড়া আধিকারিক মহোদয় নিজের বাড়ির নামে দেখাতেন। এইরকম ‘মৈত্রীপূর্ণ-সমঝোতা’কে ইংরেজিতে বলে ‘অফিস-কাম-রেসিডেন্স’। হিন্দিতে বলে ‘ অফিস-কম-রেজিডেন্স-জ্যাদা’।

ওই দপ্তর থেকে, মানে কোণের কামরাটি থেকে বৈদ্যজী, প্রিন্সিপাল সাহেব এবং রুপ্পন বাবু বেরিয়ে এলেন। বাইরে থেকে দেখলে লোকে ভাববে তিনটে চোর বাংলোর ভেতর কিছু কম্মো সেরে বাথরুমের দরজা দিয়ে কেটে পড়ছে। পাঁচ দশ পা হাঁটার পর ওদের চলার গতি মন্থর হল। ওঁরা এদিক ওদিক তাকিয়ে লনের মাপজোক এবং বাগানের শোভা দেখতে লাগলেন। পোর্টিকো দেখে রুপ্পন বললেন, “মনে হচ্ছে ইন্সপেক্টর সাহেবের গাড়িটার একেবারে জর্জর অবস্থা”। প্রিন্সিপাল একনজর বুলিয়ে মন্তব্য করলেন,”হয়ত গাড়ি র ভাতা আটকে গেছে”।

“তাই”, রুপ্পন বললেন, “যাই হোক, খুব ঠাট। সবকিছু ফোকটে”।

ফটকের কাছে চাপরাশি দেখা দিল। প্রিন্সিপালকে দেখে ও এক বিশেষ কায়দায় মুখ বাঁকালো। প্রিন্সিপাল আর এক ধরণের ভেঙচি কেটে মাথা গোল গোল ঘোরালেন। চাপরাশি তৃতীয় কায়দায় মুখ বাঁকালো। প্রিন্সিপাল এবার পকেট হাতড়ে একটা আধুলি বের করে ওকে দেবার সময় বললেন, “ভাই, প্রত্যেক বার যদি এমনি করে—“।

চাপরাশি নরম গলায় বলল, “আপনাদের দয়াতেই করে খাচ্ছি”।

রুপ্পন বাবু বললেন, “এতে কোন সন্দেহ আছে”?

বৈদ্যজী এসব কড়া চোখে দেখলেন এবং রাস্তায় নামলেন। রুপ্পনবাবুর ফুর্তিতে কোন ফারাক হয় নি। বরং প্রিন্সিপালকে হালকা মেজাজে জ্ঞান দিলেন, “এসবের জন্যে দু’আনা দিলেই হয়। আট আনায় দুটো পান খাওয়া যেত”।

এটা শহরের সেই এলাকা যাকে ইংরেজ সিভিল লাইনস্‌ নাম দিয়ে উত্তরাধিকারী ও মানসপুত্রদের জন্যে ছেড়ে গেছে। রাস্তায় লোকের চলাফেরা খুব কম। কখনও সখনও দু’একটা ঝকঝকে মোটরগাড়ি—সে সরকারি হোক, ধারে পাওয়া হোক, অথবা ফোকটে—ঝাঁ করে চলে যায়। পথচারীরা ভাগ্য ও ভগবানের দয়ায় বেঁচে গেলে খুশি মনে একধারে সিঁটিয়ে যায়। কখনও কোন জর্জর চেহারার প্রাইভেট কার খড়খড়িয়ে ধীরে ধীরে চলতে থাকে। দেখলেই মনে হয় ভাতা-টাতা না পেয়ে রোগা, অসুস্থ, অ্যানিমিয়াগ্রস্ত।


বিকেল হয়েছে, চারটে বাজে। চতুর্থ শ্রেণীর সরকারি আদমি উঁচু পদের সরকারি অফিসারের বাচ্চাদের নিজের সাইকেলে বসিয়ে কির কির করে ঘন্টি বাজিয়ে চলছে। বাচ্চারা ইংরেজি স্কুল থেকে বাড়ি ফিরছে। সবারই তাড়া যে বাড়ি গিয়ে কোন মহান বার্তা পৌঁছাতে হবে। দুটো বাচ্চা তর্ক জুড়েছে, বিতর্কের বিষয় একটি বার্তা—“কাল যদি তোমার মাম্মি তোমায় দ্বিতীয় ড্রইংকপি কিনে না দেয় তাহলে তুমি পনিশ পাবে’। ওদের একজন সাইকেলের বসেছে সামনের ডান্ডাতে, অন্যজন পেছনের ক্যারিয়ারে। ওদের মাঝখানে সাইকেলের সীটের উপর একজন উর্দি পরা চাপরাশি।

প্রিন্সিপাল সাহেবের দুটো হাত ওনার পকেটে ঢুকে গেল। মানে উনি ছোট মুখে কোন বড় কথা বলার জন্যে তৈরি হচ্ছেন। বললেন, “ভাবছি আগামী জুলাই থেকেই আমাদের কলেজে ছেলেগুলোর জন্যে ইউনিফর্মের চলন শুরু করলে কেমন হয়”?

“উত্তম প্রস্তাব”, বৈদ্যজী সায় দিলেন।

একটু পেছনে চলতে চলতে রুপ্পন বাবু প্রিন্সিপালকে বললেন, “কোন ইউনিফর্ম চালাতে চাইছেন—চাপরাশির উর্দি? নাকি বাচ্চাগুলোর”?

‘রুপ্পনবাবু, আমি পুরোদস্তুর সোশ্যালিস্ট। আমার চোখে দু’য়ে কোন ভেদ নেই”।

“আমি তো আপনাকে জুড়ে দিচ্ছি। তিনেও কোন ভেদ নেই”।

ওরা খানিকক্ষণ চুপচাপ হাঁটছিলেন। হঠাৎ প্রিন্সিপাল বৈদ্যজীকে বললেন, “ইনস্পেক্টর সাহেবের ঘর থেকে ঘিয়ের খালি টিন ফেরত আসে নি”।

বৈদ্যজীর চলার ভঙ্গি বেশ গম্ভীর। কিছু ভেবে নিয়ে বললেন, “তা দশ সের ঘি হবে। যখন এতখানি ঘি দিয়েছ, খালি টিন নিয়ে কিসের দুঃখ”!

প্রিন্সিপাল হেসে ফেললেন, “যেতে দিন। যখন গরুটাই চলে গেছে তখন বাঁধার দড়ি নিয়ে কেন আফশোস”!

“সেটাই তো কথা”, বৈদ্যজী আরও গম্ভীর। এবার কথক ঠাকুর হয়ে কথা ফেনাতে লাগলেন। “ যখন হাতি দান হয়ে গেছে, অংকুশ নিয়ে কিসের চুলোচুলি! রাম যখন বিভীষণের রাজতিলক করলেন, তখন জাম্বুবান বললে—মহারাজ, গোটা রাজপাট দিয়ে দিলেন? নিজের জন্যে একটা ভবন তো রেখে দিতেন?

তাতে মর্যাদা পুরুষোত্তম শ্রীরামচন্দ্রজী মহারাজ বললেন—‘হে জাম্ববন্ত, বিক্রীতে করিণি কিমঁকুশে বিবাদঃ’? হাতি বেচার পর অংকুশ নিয়ে কেন ঝগড়া করা”?

প্রিন্সিপালের মন থেকে একটা কাঁটা বেরিয়ে গেল। কোন উঁচুদরের ভাগ্যবাদীর মত মাথা নাড়িয়ে বাহাদুরি দেখিয়ে বললেন, “তাহলে এটাই ঠিক। যেতে দিন। একটা খালি টিন পেয়ে হবেটা কী”?

রুপ্পন বাবু বললেন, “তবে কথাটা নীতি হিসেবে ভুল। ওনার উচিত ছিল খালি টিন ফেরত দেয়া। প্রত্যেকবার একটা করে নতুন টিন! আসবে কোত্থেকে”? উনি বেশ উৎসাহ দেখিয়ে প্রিন্সিপালকে বললেন, “দেখুন, আপনার যদি ফেরত চাইতে সংকোচ হচ্ছে, আমাকে হুকুম দিন। আমি গিয়ে ফেরত নিয়ে আসব”।

কিন্তু ওনাকে কেউ হুকুম দিল না।

(চলবে)