Next
Previous
Showing posts with label ধারাবাহিক. Show all posts
0

ধারাবাহিক - রঞ্জন রায়

Posted in




















২৪.২

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে জোট-নিরপেক্ষ থাকার সমস্যাগুলো আমরা কোনরকমে রয়েসয়ে পার করেছি। কারণ এই কায়দায় আমরা অনেক সমস্যা এড়াতে পেরেছি। কিন্তু রামনগরওলাদের অহংকার ছিল যে ওরা নিজেদের ভাল-মন্দ নিজেরাই বুঝে নেবে। সমস্যা এড়াবে না। দেখতে দেখতে গোটা গ্রাম দুইদলে বিভক্ত হয়ে গেল। এক দল রিপুদমনের হাত দিয়ে জমির ভাগ -বাঁটোয়ারা করাতে চায়। অন্যদলের বিশ্বাস এ’বিষয়ে শত্রুঘ্ন সিং বেশি পটু।

ভোটের দিন এগিয়ে এসেছে, মাত্র দু’দিন বাকি। দু’দলের শিবিরে সাজ-সরঞ্জাম দেখা যাচ্ছে। লোকজন গলা ফাটিয়ে চেঁচাচ্ছে-‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’! আবার চলছে একে অন্যের মা-বোনের সঙ্গে সম্পর্ক পাতানোর কথা, নিজেদের লাঠিগুলোকে তেল চুকচুকে করা, বর্শা ও বল্লমের ফলা মেজে-ঘষে চকচকে করে হাতলে লাগিয়ে নেয়া, আর সেই হাতেই গাঁজার ছিলিম কষে ধরা।

এতসব হয়ে যাওয়ার পর রিপুদমন তার ভাই সর্বদমনকে ডেকে ভালমানষের গলায় বলল—দেখ ভাই, যদি এই লড়াইয়ে আমার জান চলে যায় আর তার সঙ্গে আমার সাথী আরও জনা পঁচিশের, তখন তুমি কী করবে?

সর্বদমন সিং ওকালতি পাশ করেছে বটে, তবে একসময় অনেক বড় বড় উকিল, বিলেত ফেরত ‘বালিস্টার’ ওকালত ছেড়ে রাজনীতিতে যোগ দিয়েছিলেন। সর্বদমন তাঁদের পদচিহ্নে চলে বছর চার আগে নিজের প্র্যাকটিস ছেড়ে স্থানীয় রাজনীতির আখড়ায় নেমে পড়েছে। তফাৎ একটাই।

স্বাধীনতা সংগ্রামের যুক্ত হওয়া অনেক উকিলের ভরণপোষণ কীভাবে চলত তার হদিস আম জনতা পেত না। কিন্তু সবার ভাল ভাবে জানা আছে যে সর্বদমনের আমদানি কোত্থেকে হয় । আর তাতে লোকের চোখে ওর সম্মান বেড়ে গেছল।

যেমন, ওর কাছে দশটা হ্যাজাক বাতি আছে যা বিয়েশাদিতে ভাড়া খাটে। এছাড়া ওর রয়েছে দুটো বন্দুক, যা ডাকাতির সীজনে ভাড়া খাটে। সব মিলিয়ে সর্বদমনের যা আমদানি হত তাতে খাওয়া-পরার কষ্ট ছিল না। তাই ও নিশ্চিন্ত হয়ে গ্রামীণ রাজনীতির কলকাঠি নাড়তে পারত। গ্যাসবাতি আর বন্দুক ভাড়ায় অনেক দূর অব্দি পাঠানো হত। এভাবে সর্বদমনের কত যে বিস্তৃত এবং গভীর সামাজিক সম্পর্কের জাল ছড়িয়ে গেছল—তা বলা মুশকিল। তার আত্মবিশ্বাসের ঝলক সর্বদমনের কথাবার্তায় চালচলনে ফুটে উঠত।

ভাইয়ের কথার উত্তরে সর্বদমন মেপেজুকে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলল—“ভাই, যদি লড়াইয়ে তুমি ও তোমার পঁচিশ জন মারা পড়ে, তবে ওদের শিবিরেও শত্রুঘ্ন সিং এবং তার জনা পঁচিশ মরবে, এটা নিশ্চিত জেনো। তারপরে তুমি যা বলবে তাই করব’খন।

একথা শোনার পর রিপুদমন সর্বদমনকে জড়িয়ে ধরে কাঁদার চেষ্টা করল। কিন্তু ইচ্ছে হলেই কেঁদে ফেলা—সেটা শুধু অভিনেতা বা নেতারা পারে। বলতে চাইছি—অভ্যাস নেই, তাই রিপুদমনের কান্নার চেষ্টা বিফল হল। সর্বদমন ধীরে ধীরে ভাইয়ের আলিঙ্গন-মুক্ত হয়ে বলল, -- এসব ছাড়ো; বলে দাও পঁচিশের বদলার হিসেব পুরো করে তারপর কী করা যায়?

রিপুদমন বলল—ধরে নাও দুদিকে লাশের সংখ্যা সমান সমান। তখন যদি ফের ভোট হয় আর তুমি গ্রামসভার প্রধান হতে চাও, তাহলে?

সর্বদমন কাগজ পেন্সিল নিয়ে বসে গেল। হিসেব টিসেব করে বলল—দাদা, তুমি আর শত্রুঘ্ন সিং যদি পঁচিশ পঁচিশজন সমেত মরে যাও, তো কিসের চিন্তা? আমার তরফের যেই দাঁড়াক, সে অন্য তরফের চেয়ে পঁচাশ ভোট বেশিই পাবে। কারণ, এতসব হওয়ার পরে গ্রাম থেকে ওদের হয়ে জানের বাজি লাগিয়ে ভোট দিতে আসা লোক খুব বেশি হলে পঁচিশ হবে। আর আমার পক্ষে ভোটার বেরোবে চল্লিশ বা তারও বেশি।

এখন ওদের পঁচিশজন মারা যাওয়ার মানে ওদের পুরো মহল্লা খালি। আর আমাদের পঁচিশ জনে চলে গেলেও বাকি খালি মাঠে আমার কম সে কম পনেরজন তো টিকে থাকবে।

ভোটের তিন দিন আগে রিপুদমন সাব -ডিভিসনাল ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে এক দরখাস্ত দিল, যার সারঃ

--শত্রুঘ্ন সিং ও তার পঁচিশজন লোকের থেকে রিপুদমনের নিজের জীবন ও সম্পত্তির উপর আক্রমণের আশংকা। এছাড়া ভোটের দিন শান্তিভঙ্গ হওয়ারও সম্ভাবনা। পুলিশ দরখাস্তকে নথিবদ্ধ করল। এবার শত্রুঘ্ন রিপুদমন এবং তার লোকজনের বিরুদ্ধে পালটা নালিশ করল। পুলিশ এই নালিশও নথিবদ্ধ করল।

ভোটের একদিন আগে দুই প্রার্থী এবং তাদের পঁচিশ জন করে সমর্থকের ম্যাজিস্ট্রেটের কোর্টে ডাক পড়ল।

ম্যাজিস্ট্রেট্‌, আইনের বই অনুযায়ী, শত্রুঘ্ন আর তার লোকজনের থেকে জামিন এবং মুচলেকা চাইল। ওরা এ বিষয়ে দেবে কিনা ভাবতে লাগল। তারপর উনি রিপুদমন আর তার দলের থেকেও ওইরকম জামিন ও মুচলেকা চাইলেন।

রিপুদমন বলল—“হুজুর, আমরা ওসব দেব না। আমার কথাটা মনে রাখবেন—কাল আমার গাঁয়ে পাইকারি হারে নরসংহার হবে। বড় বড় জমানতদাররাও শত্রুঘ্ন এবং তার গুণ্ডাদের দাঙ্গা করার থেকে আটকাতে পারবে না। আমরা হলাম সাধাসিধে চাষি। কেমন করে ওদের মোকাবিলা করব? তাই আমাদের জামিনের অভাবে কৃপা করে হাজতে আটকে রাখুন—প্রাণটা তো বাঁচবে! আর আমার বংশের যে দু’চারজন বাড়িতে থেকে যাবে ওদের রক্ষা করার বন্দোবস্ত করে দিন”।

পুলিস এই বক্তব্যও রেকর্ড করল।

শেষে ম্যাজিস্ট্রেট রায় দিলেন যে ভোটের দিন যখন রিপুদমন সিং ও সাথীরা হাজতে থাকবে, তখন শত্রুঘ্ন সিং পার্টিরও জামানত হবে না। ওরাও হাজতে থাকবে।

এই ভাবে দুই প্রার্থী ও তাদের পঁচিশ পঁচিশ জন লোক কিছুদিনের জন্য মরে গেল। আর নির্বাচন খুব শান্ত ও সভ্য বাতাবরণে অনুষ্ঠিত হল। তবে দুই দলের তুলনামূলক দক্ষতার হিসেব করে দেখা গেল শত্রুঘ্নের লোকজন কোন কাজের নয়। বোঝাই গেল না ওর সমর্থক বলতে কেউ গাঁয়ে টিকে আছে কিনা। ওদিকে রিপুদমনের পক্ষ থেকে সর্বদমন নির্বাচনে দাঁড়াল। কারণ পুলিশের খাতায় ওর নাম নেই অথচ, আইনের ডিগ্রি আছে, অতএব শান্তিপ্রিয় মানুষ। তাই ওকে হাজতে পোরা হয় নি। ও কোমর কষে ভোটে লড়ল এবং ফল ওটাই হোল যা ও কয়দিন আগে কাগজ পেন্সিলে আঁক কষে দেখিয়েছিল।

ভোটে জেতার এই কায়দা রামনগরের নামে পেটেন্ট হল।


নেবাদা কায়দাটা একটু আদর্শবাদী ধাঁচের।

ওখানে নানান জাতির লোক ভোটে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু মুখ্য প্রতিদ্বন্দ্বী দু’জন—যাদের ঋগ্বেদের পুরুষ সূক্তে ক্রমশঃ ব্রহ্মের মুখ এবং পাদদেশ বলা হয়েছে। আজকের ভাষায় বললে—এ হল ব্রাহ্মণ ও হরিজনের সংঘর্ষ। কিন্তু নেবাদায় এই মামলা বেশ সাংস্কৃতিক, প্রায় বৈদিক পদ্ধতিতে পেকে উঠল।

ব্রাহ্মণ ক্যান্ডিডেট সবর্ণদের মধ্যে ঋগ্বেদের পুরুষ-সূক্তটি কয়েক বার আউড়ে বুঝিয়ে দিল যে পুরুষ-ব্রহ্মের মুখ ব্রাহ্মণ ছাড়া কেউ নয়, আর শূদ্র হল পা। প্রধান পদের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে বলা হল এই কাজটির জন্য দরকার বুদ্ধি এবং বাণী যা মাথায় থাকে, পায়ে কদাপি নয়। আর মুখ হল সেই মাথারই অঙ্গ। অতএব, ব্রাহ্মণেরই প্রধান হওয়া উচিত, শূদ্রের নয়।

ব্রাহ্মণ প্রার্থী শূদ্রের নিন্দা করতে প্রচলিত গালিগালাজ না করে বেশ সাংস্কৃতিক কায়দায় প্রচার করতে লাগল। ও সমঝোতার ঢঙে এটাও মেনে নিল যে রোদেজলে দৌড়োদৌড়ি করতে মজবুত পায়ের দরকার। তাই পঞ্চায়েতের চাপরাশির পদ শূদ্রেরই প্রাপ্য। কিন্তু প্রধান বা মোড়লের পদের জন্য শূদ্র প্রার্থী? এটা বেদবিরুদ্ধ। কিন্তু যা হয় আর কি, এসব সাংস্কৃতিক কথাবার্তা সাধারণ গ্রামবাসী মেনে নিল না। বাধ্য হয়ে ব্রাহ্মণ প্রার্থীটি প্রচারের কায়দা বদলে নিলেন—মাথার চেয়ে মুখের ব্যবহার বেশি করতে লাগলেন। আর ওনার চ্যালারা মুখটা আরও খুলে প্রচার শুরু করল। অল্প দিনেই ব্যাপারটা সেই পুরনো কায়দায় ফিরে গেল। যেমন,-- বল বিক্রম সিং, তুমি কি আমাকে ছেড়ে ওই চামার ব্যাটাকে ভোট দেবে?

দেখতে দেখতে ব্রাহ্মণ প্রার্থীর মেহনতে গ্রামে গালিগালাজের উগ্র বাতাবরণ তৈরি হল এবং হঠাৎ একদিন উনি পুরুষ-সূক্তের ওই ঋচাটির সঠিক মানে বুঝতে পারলেন—যাতে শূদ্রকে পা বলা হয়েছে।

এক জায়গায় ওঁর দলের একজন শান বাঁধানো আঙিনায় বসে ভোটের প্রচার করছিল। মানে অন্য প্রার্থীর নাম করে খোলাখুলি গাল দিচ্ছিল। ওই ধারাবাহিক গালির ফোয়ারার মাঝখান থেকে একটি কেন্দ্রীয় প্রশ্ন বারবার উঠে আসছিলঃ “বল ঠাকুর কিসন সিং, তবে কি তুমি ওই---কে ভোট দেবে”?

ও তো ওখানে বসে লাগাতার বলেই যাচ্ছিল। হটাৎ ওর মুখে কথা আটকে গেল, পুরো হল না। ও কমরে এমন জোরে আঘাত পেল যে মুখ থেকে ‘তাত, লাত রাবণ মোহিঁ মারা’ (বাবা, রাবণ আমায় লাথি মেরেছে) বলার মত অবস্থাও রইল না। ও শান-বাঁধানো চবুতরা থেকে নীচে পড়ে গেল। তখনই আরও দশটা লাথি! যখন চোখ খুলল তখন ওর মনে হল—সংসার এক স্বপ্ন বটে, আর মোহ-নিদ্রা ভেঙে গেছে। এমন ঘটনা আরও কয়েকটি ঘটে যাবার পর ব্রাহ্মণ প্রার্থী বুঝতে পারলেন পুরুষ-ব্রহ্মের মুখ আর পায়ের দূরত্ব খুব বেশি নয়।

এর সার তত্ত্ব হলঃ যেখানে বেশি মুখ চালালে জবাবে লাথি চলতে থাকে, সেখানে মুখ না খুললেই মঙ্গল।

এই গবেষণার ফল ব্রাহ্মণ প্রার্থীকে মুশকিলে ফেলল। এমন সময় ওর বিপদতারণ কর্তায এক বাবাজীর আবির্ভাব হোল। ইনি সেই জাতের বাবাজি যাঁরা বিপদগ্রস্ত চাষি থেকে বড় থেকে বড় আধিকারিক, নেতা এবং ব্যবসায়ীর ভিড়ের মধ্যে সহজেই নিজের উপযুক্ত ভক্তটিকে চিনে নেন।

ঘটনা ঘটল ‘বত্রিশ সিংহাসন’ এবং ‘বেতাল পঞ্চবিংশতি’ স্টাইলে।

একদিন সেই ব্রাহ্মণ প্রার্থীটি, মুখের ভাষা সংযত হওয়া সত্ত্বেও, পুরুষ-ব্রহ্মের পায়ের লাথি খেয়ে মাটিতে গড়াগড়ি গেলেন। তারপর কী ভাবে গ্রামসভার মোড়লের পদটি চামার-ব্যাটার ছোঁয়া বাঁচিয়ে ব্রাহ্মণের অধীন করা যায় সে বিষয়ে ভাবছিলেন। এইসব ভাবনা চিন্তার স্থান হল গ্রামের বাইরে একটা শান বাঁধানো কুয়োর পাড়ে সাঝেঁর বেলায় ‘নীলাঞ্জনছায়া’ তলে এক বটগাছের কাছে । চোখে পড়ল গাছের নীচে আগুনের ফুলকি আর গম্ভীর আওয়াজে শোনা গেল মহাদেবের কিছু বিশেষণ।

উনি টের পেলেন নিঘঘাৎ গাছের নীচে কোন বাবাজি ধুনি জ্বালিয়ে বসেছেন।

ঠিকই বুঝেছিলেন। বাবাজী কৈলাসপতি ভোলে শংকরের নাম নিচ্ছিলেন আর গাঁজায় দম দিচ্ছিলেন। লোকে দুখী হোক না হোক, সামনে কোন বাবাজী দেখলে সোজা সাষ্টাংগ দণ্ডবৎ হয়ে যায়। এখানে তো ব্রাহ্মণ -প্রার্থীটি নিতান্ত দুঃখের সাগরে গোঁতা খাচ্ছিলেন আর সামনে এক বাবাজীর আবির্ভাব! ব্যস, উনি কিছু না ভেবেই সোজা বাবাজীর পায়ে পড়লেন আর কাকুতি মিনতি করতে লাগলেন।

বাবাজীর জীবনে এমন সুযোগ বহুবার এসেছে। উনি পুরনো অনুভবের জোরে প্রার্থীকে অভয়দান করে বললান যে বেটা, ঘাবড়িও না। যদি তোমার অসুখটি স্বপ্নদোষ বা শীঘ্রপতন অথবা ছোটবেলার উল্টোপাল্টা কাজের ফলে উৎপন্ন নপুংসকতা হয়ে থাকে, তাহলে ভরসা রাখো। আমার দেয়া টোটকার জাদুতে তুমি একহাজার নারীর মান-মর্দন করতে পারবে। কিন্তু ব্রাহ্মণ প্রার্থীটি দু’দিকে মাথা নেড়ে না করে দিলেন! তখন বাবাজী বললেন যে এটাএকটা গোপনীয় টোটকা। এর জোরে তুমি বাজীমাৎ করার ওস্তাদ তো হবেই, তাছাড়া এটাকে ওষুধ বানিয়ে বিক্রি শুরু করলে দেখতে দেখতে ক্রোড়পতি হয়ে যাবে।

কিন্তু কোন লাভ হোল না। প্রার্থীটি মাথা নাড়ছে আর হাপুস কান্না জুড়েছে। বাবাজি একটু অবাক হয়ে ওকে খোঁচাতে লাগলেন। তখন ও মুখ খুলল—আমি এক হাজার স্ত্রীলোকের মান-মর্দন করতে চাইনে। আমার কাজটা সহজ, শুধু এক ব্যাটা চামারের মানমর্দন করা।

বাবাজী ব্রাহ্মণ প্রার্থীটির সব কথা শুনলেন, ওকে আশ্বস্ত করলেন; তারপর গাঁজার কলকেটি ঝোলায় পুরে নকল জটায় খানিক ধুলো মাখিয়ে বসতির দিকে রওনা দিলেন। উনি গ্রামে গিয়ে এক মন্দিরের সামনে ডেরা জমিয়ে বসে গেলেন। তারপর কবীর, রামানন্দ থেকে শুরু করে গুরু গোরখনাথ থেকে এমন এমন কাহিনী শোনাতে লাগলেন যার শেষ কথা হল—লোকের জাতপাত জেনে কী হবে, হায়! যে হরিকে ভজনা করে সে হরির আপন হয়ে যায়।

এই ‘হরি’ যে কী জিনিস, সেটার পরিচয়ও লোকে সেদিন সন্ধ্যে থেকেই বুঝে ফেলল। একটা ছিলিমে গাঁজার টুকরো রাখা হোল, যার উপর আগুন ঠুঁসে দেয়া হল। ওটাকে মুখে নিয়ে গাল খিঁচে দম লাগিয়ে ক্রমাগত ফুঁয়ের জোরে আগুন জ্বলে উঠল এবং নিভল। এক নিঃশ্বাস থেকে পরের নিঃশ্বাস নেয়ার ফাঁকে ফাঁকে মহাদেবের নাম নানা ভাবে এবং নানা অর্থে নেয়ার পালা চলতে লাগল। ওই ছিলিমটি উপস্থিত ভক্তজনের মধ্যে এদিক থেকে ওদিক হাতে হাতে ঘুরতে লাগল। ভক্তগণ বুঝে গেল যে এই হল ‘হরি’!

বাবাজীর দরবারে আটচল্লিশ ঘন্টা অখন্ড নাম-সংকীর্তন চলে। যে গাঁজা খায় না, তার জন্যে ভাঙের বন্দোবস্ত আছে। যতক্ষণ কীর্তন চলে ততক্ষণ শিল নোড়াও চালু। হার্মোনিয়াম বাজতে থাকে এবং রাধাকৃষ্ণ ও সীতারামের খোসামোদ করতে এমন এমন গান গাওয়া হয়, যার সামন সিনেমার হিট গানও হার মেনে যায়।

উদাহরণঃ

“লেকে পহেলা পহেলা প্যার, ভরকে আখোঁ মেঁ খুমা র,

জাদু নগরী সে আয়া হ্যায় কোঈ জাদুগর”।

কথাগুলো বদলে নিয়ে গাওয়া হয়ঃ

“লেকে পহেলা পহেলা প্যার, ত্যাজকে গোয়ালোঁ কা সংসার,

মথুরা নগরী মেঁ আয়া হ্যায় কোঈ বংশীধর”।

এতেই বাজিমাত!


দুটো দিন কাটতেই সবার বিশ্বাস হোল যে বাবাজী হলেন কৃষ্ণের অবতার। তবে উনি যমুনার জল না খেয়ে খালি গাঁজা খেলেন আর এমন সব পিশাচ তাঁকে ঘিরে রইল যে ওনাকে কৃষ্ণ কম , শিবের অবতার বেশি মনে হল। কলকে ধকধক জ্বলছে আর প্রমাণ করছে যে—গাঁজা চুরির হোক, কি সরকারী দোকানের, গঙ্গাজল গঙ্গোত্রী থেকে আসুক, কি দুটো নোংরা নালার সঙ্গম থেকে --- দুটোরই প্রভাব সবসময় সমান।

বাবাজী মানুষটি বেশ মজার। কীর্তন খালি করান না, নিজেও করেন। যদি গাঁজা না খেতেন, তাহলে ওনার স্বর গলার বাইরে স্পষ্ট করে শোনা যেত। আর যদি হারমোনিয়ম না বাজত, তাহলে ওনার কীর্তনের সুরটাও খানিক বোঝা যেত। এইসব স্বাভাবিক বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও উনি দেখতে দেখতে গোটা গ্রামকে বশ করে ফেললেন। উনি কবীর, রুইদাস ও রামানন্দের এমন এমন ভজন শোনালেন যে লোকে মুগ্ধ হয়ে ওনাদের জয়-জয়কার করতে লাগল।

কবীর এবং অন্য সন্তেরা যদি এখানে হাজির হতেন এবং ওনাদের ভজন বলে যা সব মৌলিক কবিতা গাওয়া হচ্ছে সেসব শুনতেন, তাহলে তাঁরা বাবাজীর জয়ধ্বনি করতেন। এর ফলে বাবাজী গ্রাম থেকে জাতিবাদের নাম ভুলিতয়ে দিলেন। তারপর একদিন গাঁজা, সিদ্ধি ও কীর্তনের মাঝে ইশারা করলেন যে এই গ্রামের প্রধান বড় ধর্মাত্মা, তখন লোকজন হতভম্ব হয়ে গেল।

এক ব্যাটা সিদ্ধিখোর বলে উঠল—এখনও তো কেউ নির্বাচিত হয় নি। আর এই পদের জন্য প্রথমবার নির্বাচন হবে---। তখন বাবাজী ফের ইশারা করলেন যে আমার ভগবান তো ইতিমধ্যেই নির্বাচন সেরে ফেলেছেন।

সংক্ষেপে বললে, নেশা গায়েব হওয়ার আগেই জনতা জেনে গেল যে ব্রাহ্মণ প্রার্থীকেই ঈশ্বর প্রধান পদের জন্য নির্বাচিত করেছেন। নেশা নামার আগে প্রায় সবাই উক্ত জ্ঞানের জোয়ারে ভেসে গিয়ে মেনে নিল যে ওই আমাদের প্রধান। এইভাবে লাথির উপরে মুখের বিজয় হল।

নেবাদাওলা পদ্ধতি ভোটে যারা দাঁড়ায় তাদের খুব কাজে এল। অন্য গ্রামের লোকজনও এই পদ্ধতিকে আবশ্যক সংশোধন করে নিয়ে বড় বড় নির্বাচনে বিজয়ী হল। যেখানে গাঁজাখোর বাবাজী পাওয়া যায় নি বা অতখানি গাঁজা জোগাড় হয় নি, সেখানে লোকে কাউকে ধরে বাবা বানিয়ে কোন দেবীর পুজো শুরু করে দিত। ওখানে পাঁঠাবলি হত এবং কারণবারির ভোগ চড়ত। ফল একই—মুখের বিজয়, পদাঘাতের পরাজয়।

এইভাবে কৌশলটি পেটেন্ট হয়ে নির্বাচন সংহিতায় নেবাদাওলা পদ্ধতি নামে স্থান পেল।


মহিপালপুর পদ্ধতিটি নিঃসন্দেহে সবচেয়ে সরল এবং বিশুদ্ধ বৈজ্ঞানিক। এই পদ্ধতিটির উদ্ভব হয় এক নির্বাচন অধিকারীর ভুলের ফলে। পরে ওই ভুলটিকে মেনে নিয়ে অনেক জায়গায় সাফল্যের সঙ্গে রিপিট করা হয়। ভুলটা হয়েছিল একটি ঘড়ির চক্করে।

ভোট দেয়ার কথা বেলা বারোটা নাগাদ। হয়েছে কি, নির্বাচন অধিকারীর ঘড়ি শহরের ঘন্টাঘরের ঘড়ির সঙ্গে মেলানো ছিল। আর ঘন্টাঘরের ঘড়ি চুঙ্গী আদায়ের চেয়ারম্যানের ঘরের ঘড়ির সঙ্গে মিলিয়ে তাল রাখছিল। ফলে সওয়া ঘন্টা আগে চলছিল।

এবার হোল কি, নির্বাচন অধিকারী মহোদয়, বেশ কিছু প্রার্থীর আপত্তি সত্ত্বেও, পৌনে এগারটা নাগাদ যত প্রার্থী ও ভোটার এসে গেছে তাদের নিয়ে ভোট করিয়ে ফলাফল ঘোষণা করে দিলেন। যখন বাকি প্রার্থী এবং ভোটদাতারা ঘটনাস্থলে পৌঁছল, ততক্ষণে নির্বাচন অধিকারীটি নিজের বাড়িতে ওনার ঘড়ি অনুসারে সোয়া একটার খাবার খেতে ব্যস্ত।

এই নির্বাচন নিয়ে আদালতে মামলা হল। মামলা একেবারে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চলল। সেখানে সমস্ত তর্ক ও যুক্তি হল ঘড়ি নিয়ে। তাতে মহামান্য আদালতের নানারকম ঘড়ির বিষয়ে মেকানিক্যাল জ্ঞান হল। ফলে মামলা চলল তিন সাল, কিন্তু তাতে নির্বাচন অধিকারীর কোন দোষত্রুটি প্রমাণিত হল না—হওয়ার কথাও ছিল না। তাই উনি যাকে বিজয়ী ঘোষণা করলেন সে নিজের ঘড়িকে বরাবরের জন্য সোয়া ঘন্টা ফাস্ট করে দাপটে রাজত্ব করল। বাকি প্রার্থীরা, খোদ ছোটে পালোয়ানের ভাষায়, ঘড়ির জায়গায় হাতে ঘন্টা ধরে বসে রইল।


মহিপালপুরের ঘটনাটি আচমকা ঘটেছিল। কিন্তু নিউটনের সামনে গাছ থেকে আপেলও আচমকাই পড়েছিল। কিন্তু তার থেকে উনি মাধ্যাকর্ষণের সূত্র আবিষ্কার করলেন। পরে ভোট-টোট গুলে খাওয়া কিছু লোক মহিপালপুরের ঘটনা থেকে এক সূত্র বের করলঃ সব ঘড়ি একসাথে তাল মিলিয়ে চলে না আর সব ভোটার একসাথে এক জায়গায় ভোট দিতে হাজির হয় না।

এই তত্ত্ব আবিষ্কার হওয়ার পর গ্রাম-পঞ্চায়েতের নির্বাচনে এর প্রয়োগ বেশ কয়েকবার নানাভাবে হচ্ছিল। ইলেকশন অফিসারের ঘড়ি মহিপালপুরের উদাহরণ মনে রেখে কখনও ঘন্টা-আধ ঘন্টা লেট বা ফাস্ট হয়ে যেত। আর ঘড়ি এক মেশিন, তার জন্য কোন লোক কেন দোষের ভাগী হবে? ফলে যে প্রার্থীটির ঘড়ি ইলেকশন অফিসারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলত, সেই জিতে যেত। এটা দুটো মেশিনের খেলা, তাই এর জন্য কোন মানুষের ঘাড়ে দোষ চাপানো নেহাৎ অবৈজ্ঞানিক মানসিকতা!

ভুগোলের হিসেবে শিবপালগঞ্জ থেকে মহীপালপুর অনেকটা দূর, কিন্তু নেবাদা কাছে। তাই রামাধীন ভীখমখেড়ীর ভোটে জেতার নেবাদা ফর্মূলাটা ভাল করে জানতেন। নির্বাচনের প্রচারে সেটাই আঁকড়ে ধরেছিলেন। ওদিকে শনিচরের পক্ষে বৈদ্যজী ভূগোল ছেড়ে ইতিহাসকে আঁকড়ে ধরলেন। অতীত কাল থেকে জেতার যত পদ্ধতি আছে সব খুঁটিয়ে দেখে শনিচরকে বললেন মহীপালপুর পদ্ধতি প্রয়োগ করতে। ফলে ওনার পকেট থেকে খরচ বলতে সেরেফ একটা শস্তা হাতঘড়ির দাম যা হয়। সেই ঘড়িটা নির্বাচন অধিকারী ভুলে নিজের মণিবন্ধে বেঁধে বাড়ি নিয়ে গেছল। এদিকে নেবাদা ফর্মূলার লোকেরা হেরে গিয়ে এমন হতাশ হল যে এন্তার মদ গিলে মাঠে বেহুঁশ হয়ে পড়ে রইল। ওদের প্রাপ্তি বলতে নেশা করার গভীর জ্ঞান।
0

ধারাবাহিক - শৌনক দত্ত

Posted in




















১৫. লুইজ গ্লিক ও তাঁর কবিতা






প্রিয়বরেষু সুস্মি,

তোমাকে চিঠিটা লিখছি ব্যাঙ্গালোর থেকে। আমাকে লেখা তোমার চিঠি হয়ত বাড়ির পোষ্টবক্সে তালাবন্দি হয়ে পড়ে আছে। বেনারস থেকে ফিরেই ব্যাঙ্গালোর এসেছি। বহুবছর পরে ব্যাঙ্গালোর এলাম। আনুমানিক বিশ বছর তো হবেই নাকি? তুমি তখন ইলেকট্রনিক সিটিতে থাকতে, মনে পড়ে? সকালের ট্রেন লেট করে মধ্যরাতে যখন ব্যাঙ্গালোর পৌঁচ্ছালো তুমি তখনো আমার জন্য প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে। বাইরে অঝোর বৃষ্টি, আমরা বৃষ্টিতে ভিজেছিলাম একসাথে, পরেরদিন সকালে আমাদের দুজনেরই কি ভীষন জ্বর উঠেছিল। মনে আছে তোমার? এরপর আর কখনো ব্যাঙ্গালোর আসা হয়নি। তুমি নিশ্চয় পরে আরো বহুবার এসেছো। শহরটা আমূল বদলে গেছে, মেট্রোরেল হয়েছে। ইলেকট্রনিক শহরে এখন জ্যেঠু মানে অর্ক থাকে। মেট্রো ষ্টেশনের নীচে যখন ওর সাথে দেখা করেছি তোমার কথা খুব মনে পড়ছিল। ইনফোসিস, উইপ্রোর সেই চিরচেনা জায়গাগুলো বড্ড বদলে গেছে। পুরোনো জায়গাগুলোতে ঘুরতে ঘুরতে তোমাকে খুব মনে পড়ছিল মনে পড়ছিল ব্যাঙ্গালোরে প্রথম পড়া লুইজ গ্লিক নিয়ে তোমার সেই কথাগুলো। তখনো লুইজ গ্লিক নোবেল পাননি। তুমি কোন এক লাইব্রেরি থেকে কিনে এনেছিলে গ্লিকের বুনো আইরিস তাঁর পুলিৎজার পুরস্কারে ভূষিত কাব্যগ্রন্থ। আমার এখনো মনে পড়ে গ্লিকের বইটা শেষ করে তুমি বলেছিলে পড়ে দেখো আমেরিকার রাষ্ট্রীয় কবি ফুলের ভাষায় কথা বলেছেন গোটা কাব্যগ্রন্থে। ফুল বলতে হয়ত কাঁটাঝোপের ফুল, হয়ত গ্রীষ্মের সামান্য অবকাশে ফুটে ওঠা বর্ষজীবী বুনো আগাছার ফুল যারা কখনো স্রষ্টার কাছে প্রশ্ন রাখে কখনো বা ব্যঙ্গ করে তাঁকে। এবং অনিত্যতার মধ্য দিয়ে জীবনের এই যে উদযাপন তা বিষণ্ণতা বিবর্জিত নয়, কিন্তু যে পোয়েটিক এনার্জি এই বিষণ্ণতা নির্মাণে তিনি প্রতিটি পঙ্‌ক্তিতে সঞ্চারিত করতে পেরেছেন। তোমার মনে আছে? সেবার ব্যাঙ্গালোরে আমরা গ্লিকের কবিতাতেই ডুবেছিলাম, সম্ভবত ‘ফার্স্ট বর্ন’ বইটি আমরা পড়েছিলাম তার মাস দুয়েক পরে তারপর যখন আমেরিকা থেকে রাজীব নিয়ে এলো ‘দ্য ট্রায়াম্ফ অফ অ্যাকিলিস’তখন আমাদের নেশায় পেয়েছিল গ্লিকের কবিতা! তিনটি বই পড়ে আমরা একমত হয়েছিলাম গ্লিকের কবিতায় খ্রিষ্টীয় অনুষঙ্গ খুব বেশি করে থাকলেও তার সবটাই প্রায় বিষন্নতা থেকে উৎসারিত এবং সেখানেই তাঁর কবিতার আবেদন ভাষার সীমা অতিক্রম করে যায়। গ্লিকের ফেইথফুল অ্যান্ড ভার্চুয়াস নাইট যখন পড়ছি তুমি তখন দূরের মানুষ! তোমার সাথে আমার কোন যোগাযোগ নেই। বইটির মূল বক্তা একজন বয়স্ক চিত্রশিল্পী, যিনি তার মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন এবং জীবনকে এক নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছেন। এটি একটি কিংবদন্তি বা রূপকথার মতো করে লেখা, যেখানে একজন নাইট একটি রাজ্যে অ্যাডভেঞ্চার করতে যায়। কি অদ্ভুত আমাদের সম্পর্কটাও তখন মৃত! এই বই যখন পড়ছিলাম আমার বারবার তোমার কথা মনে হতো, আর মনে হতো লুইজ গ্লিক যেন তোমাকে বলতে না পারা আমার কথাগুলোই তার কবিতায় লিখছেন।

তুমিও কি সেই সময় গ্লিক পড়তে? তোমারও কি মনে হতো গ্লিক আমাদের মতই আত্মজৈবনিকতা ও বিষাদময়তা লিখছেন তাঁর কবিতায়। তোমারও কি মনে হয়েছিল গ্লিকের কবিতা মৃদুপ্রবহ, অধিকাংশ ক্ষেত্রে হ্রস্বকায় ও চকিত অন্তমিলযুক্ত। কবিতাগুলো আপাতসরল ভাষায়, কিন্তু তার মধ্যে লুকিয়ে থাকে জীবনের গভীর বোধ ও জটিলতা। সেখানে প্রগলভতা নেই, আছে পরিমিতিবোধ। শব্দকে তিনি ব্যবহার করেন অতি সাবধানে, অনেক চিন্তাভাবনা করে। তার কবিতার লিরিক্যাল কোয়ালিটিকে অনেকে এমিলি ডিকিনসন ও এলিজাবেথ বিশপের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তার নির্মেদ-সংবেদী কবিতায় অলংকারের ঘনঘটা নেই। আছে সহজ কথোপকথন ও শুভ-অশুভের বার্তা। তার কবিতা আবেগঘন, মিথ ও প্রাকৃতিক চিত্রকল্পে সমৃদ্ধ। আধুনিক জীবনের নানা অনুষঙ্গকে তিনি উপজীব্য করে তোলেন তার পঙক্তিমালায়। লুইজ গ্লিক নিয়ে তোমার সাথে কোন কথা হয়নি আমাদের এই দীর্ঘ বিরতির পরে। আজ ব্যাঙ্গালোরে বৃষ্টি দেখতে দেখতে মনে হচ্ছে ফেলে আসা সেইসব দিনরাত। তোমাকে লিখতে বসে মনে পড়ছে গ্লিকে ডুবে থাকা সেই সময়ের কথা। তোমার মনে আছে গ্লিকের দুটো বই পড়ে তুমি বলেছিলে- গ্লিকের কবিতা যেন ‘জীবন ঘষে শিল্প’ হয়ে উপস্থিত হয় আমাদের সামনে। আবেগ ও ভাবালুতাকে সঙ্গী করে বারবার যেন যাপিত জীবনের তটেই ফিরে আসেন তিনি। স্বভাবতই তাঁর কবিতায় ফিরে ফিরে আসে আমাদের নিত্যদিনের চাওয়া-পাওয়া, ছেলেবেলা, হারানো ভালোবাসা, যৌনতা, মৃত্যু, প্রকৃতি ও প্রেম। সমকালীন বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে নতুনভাবে উপস্থিত হয় পুরাণও। সব মিলিয়ে এই কবির কবিতার মধ্যে আছে সাধারণ—খুবই সাধারণ এক সুর। আর এই সুরটি একই সঙ্গে আমাদের চেনা আবার অচেনাও। বোধ করি এসব কারণেই গ্লিকের কবিতা সাধারণ হয়েও ‘অসাধারণ’। তোমার এই মূল্যায়ন কতটা সত্য তা পরে গ্লিক পড়তে গিয়ে বারবার অনুভব করেছি। আমি যখনই গ্লিককে পড়তে বসেছি আমার মনে হয়েছে সাধারণ হয়েও অসাধারণ হবার চেয়েও বড় হয়ত বিষাদময়তায় বিপরীতে জীবনের আকাঙ্ক্ষারও দেখা মেলে গ্লিকের কবিতায়। প্রেমের আকাঙ্ক্ষা, অন্তর্দৃষ্টির আকাঙ্ক্ষা। মাঝে মাঝে ইতি ও নেতির আকাঙ্ক্ষায় ঘটে উভয়প্রাপ্তি। এর মধ্যে হয়তো খুঁজলে বিরোধাভাসও পাওয়া যাবে। ভাষায় বিক্ষিপ্ত স্ট্যাটাস, পাওয়ার, মোরালিটি ও জেন্ডার তার সাম্পর্কিক জ্ঞানকে প্রভাবিত করে। সুইডিশ অ্যাকাডেমি লুইস গ্লিকের নোবেল সাইটেশনে উল্লেখ করেছে, গ্রিক পুরাণের ডিডো, পার্সিফোন কিংবা ইউরিডিস হয়ে তিনি যে ব্যক্তিগত উচ্চারণ করেন তার মূল্য বৈশ্বিক। আত্মকথা ও গ্রিক পুরাণ মিলেছে তাঁর কবিতায়। তাঁর কবিতা আত্মজীবনীমূলক মনে হলেও তা কনফেশনাল বা দোষ স্বীকারোক্তিমূলক মনে করা যাবে না। তাঁর কবিতা নিরাভরণ কিন্তু নিরাবরণ নয়; বর্ণনার আধিক্য নেই, ইঙ্গিতের গল্প অনেক কবিতায়। কবি ক্রেইগ মর্গান টিচার মনে করেন, তাঁর কবিতায় শব্দ দুর্লভ, শব্দের কোনো অপচয় নেই, পুনরাবৃত্তি নেই। আমার তো গ্লিক পড়তে বসলে মনে হয় তিনি নিজের সঙ্গে নিজে কথা বলেন, নিজেকে প্রশ্ন করেন। চিন্তা ও অনুভবের মাঝপথ দিয়ে তিনি হাঁটেন। তার পা মাটিতে কিন্তু দৃষ্টি আকাশে। তিনি আবেগরসে নিত্য ও অনিত্যের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করেন। তার কবিতা চলমানতা ও স্থিরতার এক আত্মিক সেতুবন্ধন। তার নিমগ্নতায় চেতন ও অবচেতনের মধ্যে পার্থক্য লুপ্ত হয়ে যায়। অপার অন্তর্মুখিনতার কারণে যদি তার কবিসত্তাকে ‘স্পিরিচুয়েল’ আখ্যা দেওয়া হয়, তাহলে ভুল হবে না। প্রাত্যহিক জীবনের রূপকল্পে নির্মিত গ্লিকের কাব্যসৌধ। তাই তার দৃষ্টি ব্যক্তিমানুষের জীবনের দিকে, নাগরিক জীবনের আটপৌরে ঘটনাবলিতেও। ছোট ছোট দৃশ্য চোখের সামনে আসে, ভাসে, চলে যায়। তাদের গুরুত্বও কম নয়। ‘শিকাগো ট্রেন’, ‘দ্য এগ’, ‘থ্যাঙ্কসগিভিং’, ‘হেজিটেট টু কল’, ‘মাই কাজিন ইন এপ্রিল’, ‘লেবার ডে’, ইত্যাদি কবিতায় জীবনের ছোটখাটো ঘটনাবলি অপূর্ব তাৎপর্য নিয়ে হাজির হয়। ‘রেডিয়াম’ কবিতায় তিনি সময়ের ও জীবনের সহজ চলমানতাকে তুলে ধরেন। তাঁর কবিতা পড়তে গিয়ে মনে হয় এমিলি ডিকিনসন, এলিজাবেথ বিশপ, সিলভিয়া প্লাথ, জন বেরিম্যান, রবার্ট লাওয়েল এবং রাইনার মারিয়া বিল কোন না কোনভাবে তাঁর কবিতা শৈলীতে মিশে আছে। লিওনিদ অ্যাডামস এবং স্ট্যানলি কুনিৎজের কথা তিনি নিজেই বলেছেন, দুজনই তাঁর শিক্ষক। খেয়াল করলে দেখা যাবে মার্কিন কবিতার মানচিত্র যারা গঠন করেছেন, তাদের কারো সঙ্গেই এ যাবৎ বাংলা কবি মহল ও পাঠকের ঘনিষ্ঠ পরিচয় গড়ে ওঠেনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পর্বের মার্কিন কবিতা সম্পর্কে সম্যক অবহিত হতে হলে কাদের কবিতা আবশ্যিকভাবে পাঠ করা দরকার নিজেকে প্রশ্ন করে দেখেছি উত্তর মিলেছে সচরাচর যে ক'জনের নাম পুরস্কারপ্রাপ্তি ও সমালোচকদের আলোচনার কারণে গুরুত্ববহ তাদের নামই মনে এসেছে, তারা হলেন জন অ্যাশবেরি, অ্যান্থনি হেকট, কে রেয়ান, ডব্লিউ এস মারভিন এবং লুইজ গ্লিক। তোমার তালিকায় কি আরো কেউ আছেন? বলা হয় জন অ্যাশবেরি উত্তরাধুনিক কবিতার প্রধানতম গুরু, তিনি কবিতায় আধুনিক শিল্পসুলভ বিমূর্ততা অনুপ্রবিষ্ট করেছেন, তথাপি তার কোনো অনুরাগী বাংলায় নেই। সত্য তো এই যে, এদের কারোর সঙ্গেই আমাদের কহতব্য কোনো পরিচয় গড়ে ওঠেনি, সৃষ্টি হয়নি আদান-প্রদানের কোনোরূপ সুড়ঙ্গপথ। বাঙালি কবিকুল ও পাঠকের জন্য এ কথা স্বীকার নেওয়া সুবিধাজনক যে, একুশ শতাব্দীর উষালগ্নে লুইস গ্লিক মার্কিন কবিতারসিকদের কাছে তাঁর দৃঢ়মূল অস্তিত্ব নিয়ে উপস্থিত একজন কবি। নিউ ইয়র্ক টাইমস বুক রিভিউয়ে কবি স্টিফেন্স ডোবিন্স লিখেছেন, 'সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন কবিদের মধ্যে লুইজ গ্লিকের চেয়ে ভালো আর কেউ লেখে না। আমাদের স্বভাবের এত গভীরে নিয়ে যেতে পারেন এ রকম আর কেউ নেই।' কবি রবার্ট হ্যাস লিখেছেন, 'এ রকম বিশুদ্ধ, এ রকম চৌকস গীতিকবি আমেরিকায় আর নেই।' আমেরিকান পোয়েট্রি রিভিউয়ে অ্যানা উটেনের পর্যবেক্ষণ এ রকম, 'গ্লিক তার পাঠককে ভাবতে বাধ্য করেন, পাঠককে অভিভূত করেন।' লুইজ গ্লিকের কবিতা দাবি করে পাঠকের মমতাপূর্ণ অভিনিবেশ। তার কবিতা পাঠে মনে হয় তিনি একজন ধ্যানস্থ মানুষ, যার মগ্নচৈতন্য থেকে উঠে এসেছে কিছু পর্যবেক্ষণ, কিছু দর্শনবাক্য, জীবনের অচিহ্নিতপূর্ব কিছু অভিজ্ঞান; যা তিনি সাজিয়ে দিয়েছেন কবিতার অবয়বে। বাইরে বৃষ্টি বেড়েছে। কোথাও যাবার নেই তাই তোমাকে লিখতে লিখতেই মনে পড়লো লুইজ গ্লিকের ফ্যান্টাসি কবিতাটি, ভাবছি এই অখন্ড অবসরে তোমার জন্য কবিতাটি অনুবাদ করে ফেলি। কতটুকু হবে কতটা পারবো জানিনা। চেষ্টা করছি যদি হয় চিঠির সঙ্গে দিয়ে দেবো। নিরন্তর ভালো থেকো।

অন্তে প্রেম হোক

বাসু



পুনশ্চ: পরশু ফিরবো দিল্লি, দশ পনেরদিন দিল্লিতে থাকবো। তুমি দিল্লির ঠিকানায় লিখতে পারো।



ফ্যান্টাসি

লুইজ গ্লিক


তোমাকে বলি: প্রতিদিন মরছে যে মানুষ তাদের কথা। এটা কেবল শুরু।
শ্মশানে রোজ জন্ম নিচ্ছে নতুন বিধবা, নতুন এতিম।
হাত ভাঁজ করে তারা বসে থাকে, আর ভাবে নতুন জীবনের কথা।
তারপর তারা হাঁটতে থাকে সমাধিক্ষেত্রের দিকে, অনেকেই প্রথম এসেছে:
কেউ কান্না করতে ভয় পায়; কারো ভয় কেঁদে ফেলার।
কেউ ঝুঁকে এসে বলে দেয় এখন কী তাদের করণীয়: হয়তো
বলতে হবে কিছু; হয়তো কবরে দিতে হবে মাটি
তারপর সবাই বাড়িতে ফিরে যায়: বাড়িটা সহসা মানুষে ভরে ওঠে
বিধবা রাজকীয়ভাবে বসে থাকে, তার কাছে যাওয়ার জন্য মানুষেরা সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়ায়
সে প্রত্যেককে কিছু বলে, আসবার জন্যে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে।
কিন্তু তার মন চায় সবাই চলে যাক:
সে ফিরে যেতে চায় সমাধিক্ষেত্রে অসুস্থদের ঘরে, হাসপাতালে
এটা সম্ভব নয় জেনেও এটাই তার একমাত্র আশা,
অতীতে ফেরার ইচ্ছে অতি সামান্য,
খুব দূরে নয় বিয়ে, প্রথম চুমুর কাছে।


১লা ডিসেম্বর,২০২৫
0

ধারাবাহিক - নন্দিনী সেনগুপ্ত

Posted in












১৭  

জেরাল্ডের এপার্টমেন্টের কথা আগেই উল্লেখ করেছি। যদিও খুঁটিনাটি বর্ণনা দেওয়া এখনও বাকি, তবে একথা আগেই বলা হয়েছে যে এপার্টমেন্টেরও জেরাল্ডের মতই দু’খানা আলাদা সত্তা আছে এবং এই দুই সত্তার মাঝে কোথাও কোনো বিরোধ নেই। বরঞ্চ জেরাল্ডের মতই সম্পূর্ণ স্বকীয় এবং ভিন্ন পরিসর নির্মিত হয়েছে সেখানে। জেরাল্ডের সম্পর্কেও আগেই বলা হয়েছে; তার অতীত সম্পর্কে জানানো হয়েছে যে তার বাবা ছিলেন এক কৃষক এবং তার মা ছিলেন এক ইহুদি বিদ্বান পণ্ডিতের কন্যা।  

 

সঙ্গীতশিক্ষকের বাড়িতে জেরাল্ডের সঙ্গে পিয়ানোবাদক কিশোর বের্নহার্ডের প্রথম সাক্ষাতের পরে বেশ কয়েকটা সপ্তাহ অতিবাহিত হয়ে গেছে। বের্নহার্ডের বাজনা এবং বাজনার মধ্যে প্রতিফলিত হওয়া ইয়োহান সেবাস্তিয়ান বাখ সম্বন্ধে পরিণত ভাবনাচিন্তা বিশেষভাবে জেরাল্ডকে স্পর্শ করেছিল। তবে জেরাল্ডের বাড়িতে যাবার আমন্ত্রণ বের্নহার্ড এখনো গ্রহণ করে উঠতে পারেনি, কারণ নানা ধরনের ঘটনাপ্রবাহে সে এই আমন্ত্রণের কথা একেবারে ভুলে গিয়েছিল।

 

বেটসির সঙ্গে সাক্ষাতের পর থেকে বের্নহার্ডের মনমেজাজ অনেকখানি ভাল হয়ে গিয়েছিল। বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবছিল সে যে এখানে এসেছে বলে সে বুঝতে পারছে যে কখনো কখনো বেশ সহজে পয়সা উপার্জন করা সম্ভব। ধূসর রঙের সিলিং, যেটা তার চোখে খুব বিশ্রী লাগতো, সেটা আজ হঠাৎ আর ততখানি মনখারাপ করবার মত রং বলে মনে হচ্ছে না তার। ওই রঙটা এখন তার অনেকখানি অভ্যেস হয়ে গেছে; তাছাড়া বড় শহরে বসবাস করতে হলে নিজের মেজাজমর্জির বশ্যতা স্বীকার করে গুমরে থাকার বিলাসিতা করা তার পক্ষে একেবারেই  সম্ভব নয়। প্রথম দিকে এই ব্যাপারটা সে ঠিকভাবে বুঝে উঠতে পারেনি বলে খুব ভুগেছে। বিশেষ করে যখন সে ক্লান্ত থাকতো, তখন একটা বিব্রত ভাব তাকে ঘিরে ধরত। মাঝে মাঝে সকালে সে একটা দমচাপা কষ্ট নিয়ে ঘুম থেকে জেগে উঠত। সারাদিনের কাজগুলোকে যেন মনে হত অজস্র কঠিন শাস্তি এবং সেগুলোর মধ্য দিয়ে তাকে যেতেই হবে। সে জানত যে সারাদিন যে মুখগুলোর সামনাসামনি তাকে হতে হবে, সেগুলোর অভিব্যক্তি কেমন হতে পারে… নির্বিকার, অপরিচিত, বিষণ্ণ। সারাদিন তাকে কী কী করতে হবে, সেটা ভাবলেই তার অসহ্য লাগত। এমনকি নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে করিডরের অপর প্রান্তে হেঁটে গিয়ে বিশেষ প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও মাদাম দুবোয়ার সঙ্গে কথা বলতেও ইচ্ছে করত না তার। অথচ মাদাম দুবোয়ার সঙ্গে কথা না বলার জন্য সেরকম যুতসই ছুতো খুঁজে বের করতে পারত না সে। বাদ্যযন্ত্রের দোকান অবধি হেঁটে যেতেও ইচ্ছে করত না তার। অতি অল্প আলোয়, শীতে ওই অপরিসর দোকানঘরের কুঠুরিতে বসে পিয়ানো অভ্যেস করতে গিয়ে তার হাতের আঙুলগুলি জমে শক্ত হয়ে যেত। এবং অবশেষে রু সান জাক অঞ্চলে একটা ছোট রেস্তরাঁয় চার্লসের সঙ্গে বসে একসঙ্গে খাবার অর্ডার করবার জন্য ওয়েটারকে ডাকা, পুরো ব্যাপারটাই ভীষণ বিরক্তিকর ছিল তার কাছে।  

সম্প্রতি বের্নহার্ড নিয়মিত অনেকখানি সময় কাটাচ্ছিল চার্লসের সঙ্গে। বেলা একটা নাগাদ তাদের দেখা হত। সঙ্গে চার্লসেরও কিছু বন্ধুবান্ধব থাকত। নিয়মমাফিক সবাই মিলে শিক্ষকদের মুণ্ডপাত করতো রোজ। সবাই একই ধরনের শব্দ ব্যবহার করত। গালাগালির বন্যায় রোজই একটা বিশেষ নির্দিষ্ট ধারা থাকত। তবে এই ছেলেগুলো বেশ মজার এবং প্রাণবন্ত ছিল। তাদের সঙ্গে মিশবার জন্য বিশেষ চেষ্টা করবার প্রয়োজন নেই। তারাও এই তরুণ ‘বশে’*কে নিজেদের মতো করে আপন করে নিয়েছিল… মুক্তকণ্ঠে তারা বের্নহার্ডের গুণাবলীর প্রশংসা করে যেত। আবার কখনো তাকে ডাকত ‘ব্লন্‌ড্‌ কমরেড’ বলে। বের্নহার্ডকে ঘিরে ইয়ার্কি ফাজলামি করতে করতে তারা নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতায় মেতে উঠত। যদিও বের্শেন অস্বস্তি বোধ করত এসবে, কিন্তু সে লক্ষ্য করত যে তাদের কথাবার্তার মধ্যে থাকত সুচতুর বাগ্মিতা এবং অবাক করে দেওয়া বুদ্ধিমত্তার ধার। তবে বিকেলের ক্লাস করতে স্কুলে ফিরে যাবার আগে তারা বের্নহার্ডের সুস্বাস্থ্যের কামনা করে জল মিশিয়ে রেড ওয়াইন পান করে যেত।

 অবশ্য এতকিছু সত্ত্বেও বের্নহার্ডের নিজেকে বহিরাগত বলে ভাবাটা বন্ধ হয়নি। যদিও চার্লস বেশির ভাগ সময়ে বিরক্ত এবং উত্তেজিত অবস্থায় থাকতো, তবুও একা চার্লসের সঙ্গ সে পছন্দ করত। স্কুলে চার্লসের অবস্থা ছিল শোচনীয়। শিক্ষকেরা তাকে একেবারেই পছন্দ করতেন না। তাছাড়া কী ভাবে যেন জানাজানি হয়ে গিয়েছিল যে চার্লস রবার্টের বাড়িতে যাতায়াত আছে। চার্লস জানে না যে এই কথাটা কে শিক্ষকদের কানে তুলেছে। সে রবার্টের বাড়িতে যাওয়া বন্ধ করেছে বহুদিন আগেই; এখন সে সন্ধ্যায় বাড়িতে বসে পড়াশুনা করে। কিন্তু এই গুজবের হাত থেকে সে রক্ষা পাচ্ছে না। সব মিলিয়ে চার্লস রেগে আগুন হয়ে আছে; তার পরিশ্রমের কোনও সুফল ফলছে না, কারণ শিক্ষকেরা তার প্রতি বিরূপ। ফলে চার্লস আবার সব ছেড়েছুঁড়ে একা একা পথেঘাটে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়াতে থাকে এবং মধ্যরাতে হা-ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফেরে।

 

বের্নহার্ড মাঝেমাঝে বেশ বুঝতে পারছিল যে চার্লসের বিষণ্ণতা এবং হতাশা তাকে প্রভাবিত করছে এবং এই ব্যাপারটাকে সে সবচেয়ে বেশি ভয় পায়। তার নিজস্ব বিষাদের সেরকম কোনও কারণ সে খুঁজে পাচ্ছিল না এবং সেই সময় চার্লসের থেকে যথাসম্ভব দুরত্ব বজায় রাখছিল সে। নিজের পরিস্থিতি নিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় যুক্তিসহ ভাববার চেষ্টা করছিল আত্মবিশ্লেষণ করে।  সে ভাবছিল যে বাড়ির জন্য মনখারাপ লাগছে কি না তার, নিজের কাজটা করতে ভাল লাগছে কি না… এই আবহাওয়া বা এই নতুন শহরের জল হাওয়ায় কোনও সমস্যা হচ্ছে কি না, কিম্বা এই বাড়ির অন্যান্য সদস্যদের মুখ দেখে বিরক্তি বোধ হচ্ছে কি না তার। কোনও সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারল না সে। মনের জোর দিয়ে যে তাকে এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে, সেটা সে বুঝেছিল। সে নিজেকে হাস্যকর কিম্বা অসহনীয় ব্যক্তিত্বের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চায় না, কিন্তু ক্রমাগত বিষাদ ও হতাশার সামনে সে অসহায়, দুর্বল ও অবশ বোধ করছিল।

এরকম একটা অদ্ভুত পরিস্থিতিতে বেটসির সঙ্গে দেখা হওয়াটা বের্নহার্ডের কাছে সৌভাগ্য বয়ে নিয়ে এসেছিল। সে নিজেই যে অর্থ উপার্জন করতে সক্ষম, শুধু এই ভাবনা থেকেই যে সে আরও শক্তিশালী এবং উদ্যমী বোধ করছিল, ব্যাপারটা এতখানি সরলসোজা নয়। এই দুই আমেরিকান এবং তাদের পোষা বাঁদর ক্ন্যাগি এবং তাদের মজার কাণ্ডকারখানা দেখে সে মানসিকভাবে অনেকটা হালকা বোধ করা শুরু করেছিল। প্রতিদিনের জীবনযাত্রার রুটিন আর বোঝার মত চেপে বসছিল না তার কাঁধে। সে প্রতিদিন ব্যস্ত থাকত। সন্ধে ছটা নাগাদ সে বেটসির কাছে যেত। সেখানে   চা আর কেক খেয়ে সে বেটসিকে জিজ্ঞেস করত যে আগের দিনের গানের লাইনগুলো তার মনে আছে কিনা। তারপর তার গানের কথার মধ্যে জার্মান শব্দগুলোর উচ্চারণ শুদ্ধ করে দিয়ে লক্ষ্য রাখত যে সেগুলো ভালভাবে অর্থ বুঝে বেটসি মুখস্ত করতে পারছে কিনা। অস্বস্তিকর সেই সূচনাপর্বের সময় প্রথম সেই পিয়ানোটার ঢাকনা খোলা হয়েছিল। বের্নহার্ডের ছাত্রী সেরকম প্রতিভাশালী নয়, কিন্তু পিয়ানোটা অপূর্ব সুন্দর। একটা মিষ্টি নরম সুরে বাঁধা যন্ত্রটা। বের্নহার্ড প্রতিদিন ওই যন্ত্রটার টানেও যেত এবং বাজিয়ে অভ্যেস করবার সুবর্ণসুযোগটা সে হারাতে চায়নি। বেটসি চুপ করে বসে তার বাজনা শুনতে পছন্দ করত। বিলি বেটসিকে ডিনারে যাবার জন্য কথা মনে করাবার পর, একেকদিন আটটা বেজে গেলেও সে ইশারায় তাকে চুপ করিয়ে দিত।

 

(চলবে) 

                 

* ‘বশে’ শব্দটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধপরবর্তী সময় থেকে জার্মান সৈন্যদের উদ্দেশ্যে একটা গালি হিসেবে ব্যবহার করত ফরাসি সৈনিকেরা। মাথামোটা, মূর্খ এই ধরনের গালি দেবার জন্য ব্যবহৃত হয়। 

0

ধারাবাহিক - শৌনক দত্ত

Posted in




















১৪. অ্যানি এরনো, যার লেখা নিজের স্মৃতিকেই অবিশ্বাসের মুখে দাঁড় করায়





প্রিয় বাসু,

গতকাল তোমার চিঠি পেয়েছি। বেনারস ভ্রমণ শেষ করে নিশ্চয় ফিরে গেছো। খুব ছোটবেলায় বেনারস গিয়েছিলাম বাবা মায়ের সাথে, সে স্মৃতি ফিকে হয়ে এসেছে। বেনারসও নিশ্চয় বদলে গেছে অনেক। কি অবাক কান্ড দেখো তুমি যখন রেলগাড়ির কামরায় বসে ভার্জিনিয়া উলফের আত্মহননের কথা লিখছো আমি তখন পড়ছি অ্যানি এরনোর দ্য ইয়ার্স। ষাটের দশকে, যখন অ্যানি এরনোর বয়স কুড়ি থেকে পঁচিশ, তখন ভার্জিনিয়া উলফ পড়ে পড়ে তার মধ্যে লেখালেখির তীব্র ইচ্ছা ঘনিয়ে উঠেছিল। কাছাকাছি সময়ে আঁদ্রে ব্রেটনের ‘ফার্স্ট ম্যানিফেস্টো অব সুররিয়ালিজম’ পড়ে জীবন এবং লেখালেখির ও জীবনযাপনের একটি পথরেখার সন্ধান পেয়েছিলেন। জারমেইন গ্রিয়ারের ‘দ্য ফিমেইল ইউনাক’ বইটি তার দার্শনিক চিন্তায় নারীর সামাজিক অবস্থানকে প্রবিষ্ট করে দিয়েছিল। ১৯৬৫-তে প্রকাশিত হয় জর্জ পেরেকের ‘ষাটের গল্প : বিষয় আশয়’। জর্জ পেরেকের রচনাকৌশল তাকে ভাবিয়েছিল। এই সবকিছু তাকে চেনা-পরিচিত জগৎকে নতুন করে উপলব্ধির দিকনির্দেশনা দিয়েছিল। ভার্জিনিয়া উলফের মতো তারও মনে হয়েছিল লিখতে হলে প্রথমে বর্ণনাতীত বাস্তবকে তীব্রভাবে অনুভব করে নিতে হবে। লেখালেখির লক্ষ্য হবে হৃদয়ের গভীরে অনুভূত বাস্তবকে সাহিত্যের নতুন কোনো ভাষায় উত্থাপন করা। তুমি অ্যানি এরনোর লেখা পড়েছো কিনা জানি না, আমি এর আগে এই লেখকের কিছুই পড়িনি, আর পড়িনি বলেই আফসোস হচ্ছে। মনে হচ্ছে কত কম জানি আমি! উনাকে যত পড়ছি আমি মুগ্ধ হচ্ছি। দ্য ইয়ার্স বইটি ফ্রান্সের অর্ধ-শতাব্দীর এবং পরিবর্তনের বিবরণ। এর সঙ্গে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলো যেমন বিটলস, ৯/১১, ইরাকের যুদ্ধ, ইত্যাদি বিষয়কে ফরাসী দৃষ্টিকোণ থেকে লেখক উপস্থাপন করেছেন। উত্তর-পশ্চিম ফ্রান্সের নরম্যান্ডির ছোট্ট শহর ইভতো-তে ১৯৪০ সালে জন্ম ও বেড়ে ওঠা অ্যানির। আধুনিক সাহিত্যে স্নাতকোত্তর হওয়ার পরে কিছু দিন স্কুল শিক্ষিকার কাজ করেন। তার পরে ১৯৭৭ সালে অধ্যাপিকা হিসেবে যোগ দেন ফ্রান্সের দূরশিক্ষা বিশ্ববিদ্যালয় ‘সিএনইডি’-তে। ২০০০ পর্যন্ত সেখানেই অধ্যাপনা করেছেন তিনি। লেখালিখি শুরু করেন যখন বয়স ত্রিশের কোঠায়। এক সাক্ষাৎকারে অ্যানি বলেছিলেন, ‘‘লেখক হয়ে ওঠার পথটা আদপেই সহজ ছিল না।’’ ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘লে আরমোয়ার ভিদ’। আদ্যন্ত আত্মজৈবনিক এই উপন্যাসটি প্রকাশিত হওয়ার পরেই তার ‘সাহসী’ কণ্ঠস্বরের জন্য সাড়া ফেলে দিয়েছিল। ‘দ্য ইয়ার্স’ গ্রন্থকে ফরাসি জীবনের স্মৃতিচারণার ‘মাস্টারপিস’ বলেন সাহিত্য সমালোচকেরা। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাময়িকী দ্য নিউইয়র্কার ২০২০ সালে লিখেছিল, অ্যানি এরনো তাঁর ২০টির বেশি বইয়ে শুধু একটি কাজ করেছেন: নিজের জীবনের খুঁটিনাটি তুলে আনা।

কয়েকমাস আগেই আমি অ্যানি এরনোর নাম শুনি, তখন থেকেই তাকে নিয়ে যেখানে যা পাচ্ছি তাই পড়ছি। তাঁর কাহিনি কখনও চলে ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণের পথ ধরে। কখনও সেই পথ থেকে দৌড়ে কিছুটা দূরে গিয়ে দাঁড়ান তিনি। ব্যক্তিগত স্মৃতিকেই দেখেন দূর থেকে। নিজের স্মৃতিকে নিজেই অবিশ্বাস করেন। নিজেকে নিজেই প্রশ্নের সামনে দাঁড় করান। ফরাসি ভাষার স্মৃতিচারণ মূলক সাহিত্য চর্চা তিনি করেন। তাই বার বার তাঁর সঙ্গে তুলনা চলে এসেছে প্রায় একই ঘরানার কিংবদন্তি সাহিত্যিক মার্সেল প্রুস্তের। তিনি কি প্রুস্ত দ্বারা অনুপ্রাণিত? যদিও অ্যানি বলেছেন, তাঁর উপর প্রুস্তের প্রভাব খুবই কম। বরং তাঁর উপর অনেক বেশি প্রভাব রয়েছে আমেরিকার সাহিত্যিক আর্নেস্ট হেমিংওয়ের। খুব সচেতনভাবেই তিনি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন ফরাসি সাহিত্যের সব ধরনের বৈশিষ্ট্য। ভাষাটুকু বাদ দিয়ে তিনি নিজেই হয়ে ওঠার চেষ্টা করেছেন একেবারে স্বতন্ত্র এক ঘরানা। ফরাসি ‘মিঠে বোল’, মেদুরতা, রোম্যান্টিসিজমকে বুড়ো আঙুল দেখাতেই ভালো লেগেছে তাঁর। নিজ ভাষ্যেই তিনি হয়ে উঠেছেন কর্কশ, কঠিন, এবং অবিশ্বাসী। আর সেটিই তাঁকে তাঁর নিজের দেশ, নিজের ভৌগলিক সীমারেখা, নিজের জাতিসত্ত্বার থেকে অনেক দূরে নিয়ে গিয়ে ফেলেছে। আশ্চর্য় বিষয় কি জানো ২০০৮ সালে প্রকাশিত এই বইটিকে ইংরেজি অনুবাদক এলিসন স্ট্রেয়ার এরনোর অন্যান্য রচনাগুলির নিরিখে এক বিচ্যুতি বলেছেন। আপাতভাবে কথাটি যথার্থ। রচনার দৈর্ঘ্যে, বা বহু স্বরের ব্যবহারে এমনকী এর বিশাল ব্যাপ্তিতেও এই বই এরনোর অন্যান্য বইয়ের থেকে আলাদা। কিন্তু নিহিত বিচারে এই বইয়ের মধ্যেও লক্ষ্য করা যায় তাঁর লেখার সাধারণ চিহ্নগুলি। এই বইয়ের মতোই একের পর এক বইতে নিজের অতীতে ফিরে গিয়েছেন এরনো, এটি সম্পূর্ণ অনুভূতিহীন গল্প। লেখক কমই প্রকাশ করেছেন নিজকে। অথচ পুরোটাই ব্যক্তিগত গল্প। পরিবার, সন্তান, লেখকের বিয়ের সমাপ্তি এসেছে, কিন্তু আসেনি প্রেম। অ্যানির মায়ের আলঝেইমার এসেছে, বেড়ালের চোখের দিকে তাকানোর সঙ্গে খেয়াল করা এবং প্রাক্তন প্রেমিকা যখন একজন কম বয়সী সঙ্গীকে খুঁজে পায় - এসব নিয়ে তাঁর ঈর্ষার কথা, কিন্তু অন্যগুলো একেবারেই আবেগহীন। আর সেখান থেকে খনন করে এনেছেন নানান স্মৃতিচিহ্ন, যেগুলিকে জড়ো করে পুনর্নির্মাণ করেছেন একেকটা অধ্যায়। নিজেকে বুঝবার জন্য তো বটেই, একইসঙ্গে নিজেকে ভেঙেচুরে নিজের মাধ্যমে জীবনকে বুঝবার এক বিরামহীন প্রয়াসে ব্রতী হয়েছেন। ভাষাকে ছুরির মতো ব্যবহার করেন তিনি, যা কল্পনার পর্দা ছিঁড়ে ফেলবে। সত্যান্বেষী ব্যোমকেশ বক্সী, ফেলুদা কিংবা হালের একেন বাবুর অপরাধ দৃশ্য পুনর্নির্মাণ করার মতো তাঁর লিখনপদ্ধতি। যেখানে কেউ সন্দেহের বাইরে নয়, নিজের স্মৃতিকেও বারংবার প্রশ্নচিহ্নের সামনে এনে দাঁড় করাচ্ছেন। সশরীরে ফিরে যাচ্ছেন স্মৃতিবিজড়িত জায়গাগুলিতে। কুড়িয়ে নিচ্ছেন কিছু বস্তুনিষ্ঠ সূত্র, কিছু ইঙ্গিত — কখনো নিজের ডায়েরির পাতা, কখনো কোনো সাদা কালো ছবি, কখনো কোনো বিজ্ঞাপনের সুর, কোনো গানের লাইন, কোনো বন্ধুর করা একটা আলগা মন্তব্য। স্মৃতির ফাঁকফোঁকর দিয়ে যাতে কোনোমতেই মিথ্যার অনুপ্রবেশ না ঘটে, তাই তাঁর এই নিরলস পরিশ্রম।

'ইন আ উওম্যানস্ স্টোরি'তে অ্যানি লেখেন, "আমি কেবল কুড়ুনি মাত্র"। তাই তাঁর লেখায় শুধু নিজের কথাই লেখেননি। সেখানে জড়ো হয়েছে তাঁর প্রজন্ম, তাঁর বাবা মায়ের প্রজন্ম এবং নানান শোষিতের কথকতা। এই বিশাল ব্যপ্তির স্তরে স্তরে গাঁথা যৌনতা ও অন্তরঙ্গতার থিম, সামাজিক বৈষম্য, যন্ত্রণা, লজ্জা— এই ইঁটেদের ফাঁকে ফাঁকে সময় আর স্মৃতির দ্বৈরথ। অথচ এমন থিমের বয়ান অত্যন্ত সাদামাটা গদ্যে। পাঠকের হাত ধরে সেই গদ্য করে তোলে নানান দ্বন্দ্বের মধ্যমণি। সে কারণেই এমন সরল গদ্য বেছে নেওয়া। অথচ এই সরলতার মধ্যেও এরনোঁর নিজস্ব বোধ কাজ করে ক্রমাগত। যে বোধ চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়, কোনও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাই বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। তা এক নির্দিষ্ট সমাজ-রাজনীতির অংশ। এই রাজনৈতিক বোধ অভিজ্ঞতাকে 'ব্যক্তিগত' বলে ঝেড়ে ফেলা যায় না। স্মৃতিও পিচ্ছিল। যার একদিক অস্বচ্ছ, অপরিষ্কার, সেদিকটা পক্ষপাতিত্বের ভার জমে জমে ক্রমশ ঝুঁকে গিয়েছে। কাজেই ভরসার অযোগ্য। তাতে ভরসা করলে আছাড় অনিবার্য। সেদিক থেকে তাঁর উক্তির সত্যটা খানিক খাটে বৈকি! কুড়ুনি হিসেবে তাঁর কাজ আদতে নৃতত্ত্ববিদের মতোই। খুঁড়ে খুঁড়ে ধ্বংসাবশেষ টুকু তোলা, ফসিল জমানো, সেই সব টুকরো জীবন তারপর এক তালে বাঁধার চেষ্টা। তাতে এই মহাকালের নিরিখে ব্যক্তির অবস্থান ফুটে ওঠে। যতটা ফোটানো যায় আর কী! তারই চেষ্টা মাত্র। অ্যানি এরনোকে যতটা পড়েছি আমার মনে হয়েছে শুধুমাত্র গল্প ও বিষয়বস্তু নয়, ফর্ম সম্পর্কে বেশি দৃষ্টি দিয়েছেন তিনি। তাঁর গদ্যশৈলীও এই কাজে তাঁর সহায়ক ও পরিপূরক। নির্মেদ, অনাড়ম্বর ঝরঝরে বাক্যগুলো যেন বিজ্ঞানের বস্তুনিষ্ঠা আর সাহিত্যের সত্যের মধ্যে এক আশ্চর্য্য মেলবন্ধন। তাঁকে পড়তে গিয়ে বারবার মনে হয় এই পাঠ ধ্রুব নয়। গতিহীন নয়। পড়ার প্রতিটি বাঁকে, প্রতিটি স্মৃতিচারণে, যতবার সে পাঠের দিকে নজর ফেরে পাঠ বদলে যেতে থাকে। অনবরত নিজের স্মৃতির প্রতি পাঠককে সন্দিগ্ধ করে তোলেন এরনো। নিজ অতীতের ময়নাতদন্তে লেখিকা খোদ পাঠকের ভিড়ে মিশে যান। থেকে থেকে উঠে আসে বিবিধ ধারাবিবরণী। নিজের সম্বন্ধে হোক বা দুনিয়ার, কোনো কিছুই লুকোচ্ছেন না এরনো। শরীরে আগত এই নতুন প্রাণটির প্রতি কোনো দয়ামায়া তার হয়নি, হয়নি অপত্যস্নেহের উন্মেষ। নিজের ডায়েরিতে নিজেকে ‘গর্ভবতী’ বলে উল্লেখ তো করেন নি, জরায়ুর অভ্যন্তরে থাকা প্রাণটিকেও শুধুমাত্র একটি বস্তু হিসেবে দেখেছেন, লিখেছেন ‘জিনিসটা’, ‘ওটা’। কলেজের এক পুরুষ সহপাঠী, সে তখন আন্দোলন করছে মেয়েদের নানা অধিকার নিয়ে, তাকে সবটা বলেছেন, কিন্তু সাহায্য পাওয়া তো দূরস্থান, বরং সেও সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করেছে। এরনো ক্ষোভ প্রকাশ করছেন না, বরং সহজভাবে লিখছেন, “আসলে, ঘটনাটা শুনে ওর মনে আমার সম্পর্কে ধারণাটা পাল্টে গিয়েছিলো, আমি তখন সেই ধরনের মেয়ে যে ‘হ্যাঁ’ বলবে, ‘না’ বলবে না। ছেলেরা তখন এই দুই ভাগেই মেয়েদের ভাগ করতো।” এইসব খোলামেলা স্বীকারোক্তির পাশাপাশি, তাঁর লেখায় অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে খুঁটিনাটি জিনিসের স্মৃতি। ঋতুস্রাবের রক্ত, একটা ছোপ লাগা অন্তর্বাস, একটা সরু লম্বা দণ্ড (যেটা যোনির মধ্যে ঢুকিয়ে গর্ভপাত করা হবে), একটা সাপ্তাহিক পত্রিকা, একটা ওষুধের শিশি — ছোট ছোট এই ছবিগুলি ছড়িয়েছিটিয়ে থাকে তাঁর লেখায়, অতীতকে জ্বলজ্যান্ত করে তোলে। মনে পড়ে যায় টি এস এলিয়টের নৈর্ব্যক্তিকতার তত্ত্ব — objective correlative : কবিতা হলো কবির ব্যক্তিগত আবেগ বা অনুভূতির প্রকাশ নয়, বরং আবেগ থেকে মুক্তি। এই তত্ত্ব অনুসারে, একজন কবিকে ঐতিহ্য ও ব্যক্তিগত প্রতিভার মধ্যে একটি ভারসাম্য রাখতে হয়, যেখানে কবি ঐতিহ্যকে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে অর্জন করেন এবং এর মাধ্যমে তিনি অতীত ও বর্তমানের মধ্যে একটি 'যুগপৎ ক্রম' তৈরি করেন। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কবি একটি 'নৈর্ব্যক্তিক' শৈল্পিক সত্তা তৈরি করেন, যা তাঁর ব্যক্তিগত অনুভূতিকে ছাপিয়ে যায়। কবি তাঁর ‘আমি’কে আনবেন না কাব্যে, তাঁর অনুভূতির, যন্ত্রণার বর্ণনা করবেন না; তিনি শুধু কিছু শব্দ, কিছু বস্তু, কিছু ছবি সাজিয়ে দেবেন, পাঠকের মনে দৃশ্যটি আপনিই ফুটে উঠবে, অনুভূতিগুলি জাগরুক হবে। নারীবাদীরা সঙ্গত কারণেই তাঁকে দলে টেনেছেন। তাঁর লেখায়, যাপনে, দৃষ্টিভঙ্গিতে বুভোয়ার, গ্রিয়ার, মিলেটদের ছাপ অনস্বীকার্য। কিন্তু কোলরিজ যেমনটা বলেছিলেন, প্রকৃত স্রষ্ঠার মন লিঙ্গভেদের ঊর্ধ্বে। এরনোর লেখায় তাই নারীজীবনের কথা মর্মে মর্মে অনুধাবন করতে পুরুষ পাঠকের সমস্যা হয় না। দেশকালের তফাতে অনেক ছোটখাটো রেফারেন্স হয়তো সবসময় ধরা যায় না, কিন্তু একটা জীবনের মধ্যে দিয়ে সময়ের বহমানতা, একজন ব্যক্তির মধ্যে দিয়ে সমাজের গতিপ্রকৃতি, আর সর্বোপরি একজনের স্মৃতির মধ্যে দিয়ে সর্বজনীন সত্যের প্রকাশ পাঠক সহজেই দেখতে পান। তাঁর অ্যাবর্শনের ট্রমা, খেটে খাওয়া পরিবারের মেয়ে হওয়ার লাঞ্ছনা, নিজেকে শিক্ষিত করার অবিরত চেষ্টা পুঙ্খানুপুঙ্খ ফুটে ওঠে কালের কাগজে। পুরুষশাসিত এই দুনিয়ায় নারীর স্বতন্ত্র অস্তিত্ব কতটুকু স্বীকৃত? হয় এক নিমেষে বাতিল করা, ছোট করা নয় নিজের আকাঙ্ক্ষার সামগ্রী হিসেবে আপন করা— এই দুই গত পুরুষের। এর বাইরে নারীকে একজন মানুষ হিসেবে কি আজও স্বীকৃতি দিয়েছেন পুরুষেরা? আত্মনির্ভরতার হিসেব নারীর এখনও বুঝে নেওয়া বাকি— এরনোর 'কুড়ুনিয়া' সাহিত্য আমাদের বারবার এই নগ্ন সত্যের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। প্রলেপের বিন্দুমাত্র চেষ্টা না করেই।

নিজের অতীতকে এতো শীতল, বস্তুনিষ্ঠ গদ্যে ফুটিয়ে তোলা, প্রায় আবেগহীন, বাহুল্যবর্জিতভাবে — এমন উদাহরণ বিশ্বসাহিত্যে বিরল বললেও অত্যুক্তি করা হবে না! আত্মজৈবনিক রচনায় তা আরোই অপ্রতুল। সর্বত্র নিজেকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখানোর যুগে, আত্মপ্রেমে ও আত্মগরিমায় হাবুডুবু খাওয়ার, আর অহরহ সত্যের সাথে মিথ্যেকে গুলিয়ে ফেলার এই সময়ে এমন একটি নৈর্ব্যক্তিক, ঋজু ও সত্যনিষ্ঠ স্বর তাই বিশ্বের পাঠককূলের কাছে এক আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবে, সন্দেহ নেই। ‘আমি’কে ছাপিয়ে যেতে পারা, নিজের অতীতকে এক নির্লিপ্ত দূরত্ব থেকে দেখতে ও দেখাতে পারা — এটাই বোধয় অ্যানি এরনোর সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব, যা তাঁর আত্মকথাগুলিকে সাহিত্যপদবাচ্য করে তুলেছে, এনে দিয়েছে সাহিত্যের সর্বোচ্চ পুরস্কার।

অ্যানি এরনো আমাকে মোহগ্রস্থ করে ফেলেছে। তোমার ভ্রমণ কেমন হলো? বেনারস ছাড়া আর কোথায় কোথায় গেলে? সব কিছু জানার অপেক্ষায় রইলাম। আমার চিঠি তোমার হাতে যাবার আগেই হয়ত তোমার চিঠি পাবো, নিরন্তর ভালো থেকো। মাঝে মাঝে মনে হয় আমাদের গেছে যে দিন সে কি একেবারই গেছে, কিছুই কি নেই বাকি? অ্যানি এরনো পড়তে পড়তে নিজেকে কোথায় খুঁজে পাচ্ছিলাম। আচ্ছা আমাদের ব্রেকাপটা কেন হয়েছিল বলতে পারো? তোমার কি আমাকে দায়ী মনে হয়? অনেক প্রশ্ন ঘিরে ধরছে, ঘড়ির কাটা চার ছুঁই ছুঁই করছে, কাল অফিস আছে তাই আর লিখছিনা।


অন্তে ভালো হোক

সুস্মি

০১.১০.২০২৫
0

ধারাবাহিক - নন্দিনী সেনগুপ্ত

Posted in




















১৬

ঈশ্বরকে ধন্যবাদ যে আমেরিকান ভদ্রমহিলা যেখানে থাকেন, সেই গেস্ট হাউসে পৌঁছাতে গেলে মেট্রোতে যাতায়াত করবার প্রয়োজন নেই। ইংলিশ চার্চের কাছেই জায়গাটা, এভেন্যু জর্জ ফাইভের মত শান্ত এবং অভিজাত এলাকাতে। বের্নহার্ড সেখানে পৌঁছে কেয়ারটেকারকে ঘরের নাম্বারটা জানালো। তারপর কেয়ারটেকার ভদ্রমহিলাকে টেলিফোনে জানাল বের্নহার্ডের কথা এবং একজন কিশোর, চাপরাশিদের মত বাদামী রঙের পোশাক পরা, সে তাঁকে সঙ্গে করে নিয়ে গেল লিফটের দিকে। লিফট থেকে নেমে কিশোরটি মাথায় সোনালি পাড় বসানো টুপির প্রান্ত কেতাদুরস্ত ভঙ্গিতে ধরে নিঃশব্দে হেঁটে যেতে লাগল কার্পেট মোড়া এক লম্বা করিডোর ধরে। হাতে সঙ্গীতের ফাইলটি নিয়ে বের্নহার্ড ওই কিশোরকে অনুসরণ করল।

আমেরিকান ভদ্রমহিলার ঘরে গ্রামোফোন বেজে যাচ্ছে। তারা বেশ জোরে জোরে টোকা দিল দরজায়; তারপর মাথা নুইয়ে দরজায় কান পেতে শুনবার চেষ্টা করল যে ভিতর থেকে আর কোনও শব্দ আসে কি না। তৃতীয়বার টোকা দেবার পরেও যখন কোনও উত্তর এল না, তখন সেই কিশোর দ্বিধাগ্রস্তভাবে বের্নহার্ডের দিকে একবার তাকিয়ে দরজার হাতল চেপে ধরে জোরে জোরে দরজার পাল্লার নিচের দিকে ধাক্কা দিল। ভেতর থেকে কেউ চেঁচিয়ে উঠল, ‘কাম ইন, প্লিজ!’ কিশোর তখন দরজাটা পুরোপুরি খুলে ধরে একটুখানি বাও করে পিছিয়ে দাঁড়াল।

বের্নহার্ড ঘরের মাঝখানে একটু বিস্মিত এবং অপ্রস্তুত ভাবে দাঁড়িয়ে চারদিকে দেখতে লাগল।

ঘরের দেওয়ালগুলো সবুজ সিল্কে ঢাকা। উজ্জ্বল রঙের অনেকগুলো কুশন রাখা আছে একটা বড় ডিভানের উপর। গৃহসজ্জায় উজ্জ্বল রঙের ব্যবহারে বেশ আধুনিকতার ছাপ। ডিভানের পাশে একটা টেবিল। টেবিলের উপরে রাখা গ্রামোফোন থেকে বীভৎস শব্দের হুল্লোড় ভেসে আসছে। সেই শব্দগুলোর একটাও বের্নহার্ডের পক্ষে উচ্চারণ করা সম্ভব নয়।

একজন যুবতী উঠে দাঁড়াল, যে গ্রামোফোনের পাশে একটা সোফার উপরে এলিয়ে বসেছিল। হাসিমুখে বের্নহার্ডের দিকে তাকাল সে। বের্নহার্ডের মনে পড়ল যে সে শুনেছিল যে এই যুবতী জার্মান ভাষা বুঝতে পারে; “গুটেন আবেন্‌ড!”১ বলে একটু ঝুঁকে বাও করল সে।

‘ওঃ, কোনও ব্যাপার নয়!’ বলে উঠল ভদ্রমহিলা। হাসিতে ঝলমলে চোখমুখের মত তাঁর কণ্ঠস্বরটিও বেশ মানানসই ধরনের খুশি ঝলমলে। তারপর সে ঘুরে দাঁড়িয়ে বিলি বলে একজন যুবককে ডাকল। বিলিকে বের্নহার্ড প্রথমে খেয়াল করেনি। বিলি জার্মান বলতে পারে না; কিন্তু সে যথেষ্ট উষ্ণভাবে বের্নহার্ডের সঙ্গে করমর্দন করল। হাত মেলানোর সময়ে বের্নহার্ড বুঝতে পারল যে বিলির গায়ে বেশ জোর এবং বিলিকে দেখতেও খুব বলশালী। তাঁকে দেখে ফ্যাশন ম্যাগাজিনের বিশাল কাঁধ আর সরু নিতম্বের যুবক মডেলদের কথা মনে পড়ল বের্নহার্ডের। বিলির পরনে চওড়া ঢিলা ট্রাউজার, সোয়েটারের উপরে মোটা জ্যাকেট, হালফ্যাশানের পোশাক মডেলের মত চেহারায় বেশ মানিয়েছে।

কিন্তু বিলির সঙ্গে সত্যিই সেরকম কোনও ব্যাপার নেই। সবার আগে এই যুবতী ভদ্রমহিলা, বেটসির সঙ্গেই বের্নহার্ডের কাজ। বেটসি আগ্রহভরে বের্নহার্ডের হাত থেকে ফাইলটা নিয়ে নিল এবং অমায়িকভাবে জিজ্ঞাসা করল যে সে তার গা থেকে গরম কোটটা খুলে রাখতে চায় কি না।… ‘হি ইজ কোয়াইট আ চাইল্ড!’ তার সম্বন্ধে হয়তো বলল, তারপর আবার জিজ্ঞেস করল যে সে ইংরেজি বোঝে কি না।

বের্নহার্ড নিঃশব্দে মাথা নাড়ল ইতিবাচকভাবে। ভদ্রমহিলার সোফা ও গ্রামোফোনের উল্টোদিকে রাখা একটা বড় আরামকেদারাতে বসল সে। বেটসি তার সামনে সিগারেট, চকলেট, পোর্ট ওয়াইন, ছোট কেক এসব সাজিয়ে গুছিয়ে রেখে দিল। বেটসি যখন এগুলো গোছাচ্ছিল, তখন সে আরেকটু সামনে থেকে এই যুবতী ভদ্রমহিলাকে নিরীক্ষণ করবার সময় পেয়েছিল। বেটসির বয়স একেবারেই বেশি নয় এবং সে খুবই সুন্দরী। তাঁর দাতগুলো এত ঝকঝকে সাদা যে বের্নহার্ডের টুথপেস্টের বিজ্ঞাপনের কথা মনে পড়ল। বিলিকে দেখে অবশ্য সঙ্গে সঙ্গেই তার ফ্যাশন ম্যাগাজিনগুলোর কথা মনে পড়েছিল।

যারা বিজ্ঞাপন বানায়, নির্ঘাত তারা শুধু আমেরিকান মডেলদের আদর্শ ভেবেই বানায়। বের্নহার্ড ভাবছিল… ভাবতে ভাবতে বেশ অপ্রতিভভাবে সে একটা সিগারেট ধরাল।

বেটসির চোখে মুখে সবসময় একটা খুশি ঝলমল করছে। খুশি ছাড়া আর বিশেষ কোনও সূক্ষ্ম অভিব্যক্তি বের্নহার্ডের নজরে এল না। যাই হোক, বেটসির লাল রঙে রাঙানো বাঁকা ঠোঁটের সঙ্গে এই খুশি খুশি ব্যাপারটা বেশ ভাল মানিয়েছে। মনে হচ্ছে যেন এক শিশু আনন্দে বিস্ময়ে মুখ অল্প খুলে হাঁ করে আছে। শুধু ঠোঁট নয়, বেটসির হাতের নখগুলোও লাল রঙে রাঙানো। মনে হচ্ছে সাদা সাদা হাতের আঙ্গুলের ডগায় লাল লাল ফোঁটা দেওয়া আছে। বের্নহার্ডের স্বভাবই হল মানুষের হাতের দিকে তাকিয়ে হাতের গড়ন, আঙুলের আকার এসব খুঁটিনাটি লক্ষ্য করা। ফলে মানুষের হাতের দিকে তাকিয়ে মানুষ সম্বন্ধে একটা ধারণা তৈরি করার ব্যাপারে সে বেশ আত্মবিশ্বাসী। এরই মধ্যে অবশ্য সে বিলির হাতগুলিও একঝলক দেখে নিয়েছে। বিলির হাত বেশ বড়সড়, শক্তিশালী। যদিও আঙুলগুলো সেরকম সুন্দর নয়, ডগার দিকটা একটু থ্যাবড়া ধরনের… তবে আঙুলগুলোর মধ্য দিয়ে বেশ ইতিবাচক লক্ষণ প্রকাশ পাচ্ছে। বিলির হাত দেখে মনে হয় যে মানুষটা ভাল, সরলসোজা। বেটসির হাতগুলো খুব সাদাটে এবং দেখে মনে হচ্ছে যে তার হাতের নিয়মিত পরিচর্যা করে সে। হাতের উপরের ভাগ সরু, সুগঠিত এবং দৃঢ় হলেও আঙুলগুলি ভারি কোমল। না চাইলেও ইনেসের হাতের কথা মনে পড়ে বের্নহার্ডের। ইনেসের হাতও ভারি সুন্দর আকারের এবং সুগঠিত। অবশ্য এভাবে তুলনা করা একেবারে অর্থহীন। তাই বের্নহার্ড নিজের পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যায় এবং এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে বেটসি একজন ভারি লাবণ্যময়ী, স্বাস্থ্যবতী, সুন্দরী যার পায়ের গড়ন বেশ দৃঢ় এবং সুগঠিত হলেও সে এক নরমশরম যুবতী। কাঁধের গঠন গোল ধরনের, বালিকার মত ভরাট গাল এবং গোল চিবুক।

বের্নহার্ডের মনে এই গায়িকা ভদ্রমহিলা সম্বন্ধে একটা অন্যরকম চিত্র আঁকা হয়েছিল। কারণ, আমেরিকান মহিলাদের সে আগে দেখেনি।

সঙ্গীতশিক্ষার সূচনা হিসেবে বের্নহার্ড সেদিন প্রস্তাব দিয়েছিল যে বেটসি একটা গান গাইবে এবং সে বাজাবে। দেখা গেল যে ওই ঘরের মধ্যেই একটা বিশাল পিয়ানো আছে। সবুজ সিল্কে ঢাকা দেওয়াল শোভিত ঘরটার মধ্যে ঠেসেঠুসে এক কোণে রাখা আছে বাদ্যযন্ত্রটা, যদিও সেটা এখন ফুলদানি রাখবার স্ট্যান্ড হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। নানা চেষ্টাচরিত্র করে ফুলদানি এবং ফুলের বোকেগুলি সরিয়ে পিয়ানোর ঢাকা খোলা হল।

বেটসি ‘ডি ফোরেল্লে’২ গাইতে চেয়েছিল। তবে বের্নহার্ড বারণ করেছিল। সে কোনও সহজ গান দিয়ে প্রথম দিন শুরু করতে চেয়েছিল। কিন্তু বেটসি সেসবে কর্ণপাত করল না। বেটসি ভয়াবহ ভুলভাল সুরে গাইল; একটা পর্যায়ে যে কারো মনে হতে পারে যে গানটা গায়িকার নিজেরই রচনা। তবে বেটসির কণ্ঠস্বর সুন্দর, পরিষ্কার এবং তাল, লয় ইত্যাদির জ্ঞান বেশ পাকা। কিছুক্ষণ অভ্যাস করবার পরে বেটসি ক্লান্ত হয়ে পড়ল এবং প্রস্তাব দিল বাইরে কোথাও গিয়ে কিছু খেয়ে আসবার জন্য। বিলি এবং বের্নহার্ড দু’ জনেই যেতে রাজি হল। রাত প্রায় ন’টা বাজে। অবশেষে বের্নহার্ড আর নিজের কৌতূহল সংবরণ করতে না পেরে বেটসিকে জিজ্ঞাসা করেই ফেলল যে তার কোনও পোষা বাঁদর আছে কি না। সে কথা শুনে বেটসি ভীষণ খুশি হল। চানঘরের দরজা খুলে সে ভারি নরম স্বরে ডাক দিল… ‘ক্ন্যাগিইই!’ সঙ্গে সঙ্গে শরীরে আটকানো একটি শিকলের ঝনঝন শব্দের প্রচণ্ড কোলাহলের মধ্য দিয়ে একটি ছোট, কুৎসিত প্রাণী ঘরে প্রবেশ করল। এক উড়ন্ত দানবের মত কুশনগুলির উপর দিয়ে, গ্রামোফোন মেশিনের উপর দিয়ে বেশ কয়েকটা ফুলদানি উল্টে ফেলে লাফিয়ে গেল সে। তারপর ভয়ে ভীত হয়ে একটা চেস্ট অফ ড্রয়ারের পেছনে গিয়ে লুকিয়ে পড়ে অবশেষে আবার চানঘরে ঢুকে গেল প্রাণীটি। মুহূর্তের মধ্যে সবুজ সিল্কে ঢাকা দেওয়ালে সজ্জিত ঘরটা একেবারে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল।

বেটসি আপ্লূত ভঙ্গিতে বারবার বলতে লাগল, … ‘কী মিষ্টি! কী সুন্দর না ও?’ তারপর আবেগের বশে এত হাসতে লাগল যে তার চোখ থেকে আনন্দাশ্রু গড়াতে শুরু করল। এসব কাণ্ডকারখানা দেখে বের্নহার্ড এতটাই বিস্মিত হয়েছিল যে অনেকক্ষণ পর্যন্ত কোনও কথা বলতে পারছিল না সে।

(চলবে)


১. জার্মান ভাষায় “গুটেন আবেন্ড!” শব্দবন্ধের অর্থ শুভ সন্ধ্যা।

২. ‘ডি ফোরেল্লে’… ঊনবিংশ শতকের শুরুর দিকে অস্ট্রিয়ান সঙ্গীতজ্ঞ ফ্রান্‌জ শুবার্ট রচিত একটি সঙ্গীত।
0

ধারাবাহিক - রঞ্জন রায়

Posted in























২৪.১

গাঁয়ের এক পাশে একটা ছোট পুকুর মত ছিল যা দেখলে মনে পড়বে “থাকিলে ডোবাখানা, হবে কচুরিপানা”। নোংরা পাঁক, দুর্গন্ধে বজবজ করছে। কিছু টাট্টু ঘোড়া, ধোপার গাধা, ঘেয়ো কুকুর আর শুয়োর ওটা দেখে খুশিতে ডগোমগো। পোকামাকড়, ডাঁশ, মশা মাছি ফ্যামিলি প্ল্যানিং এর জটিলতার থেকে সরে গিয়ে সমানে অযুত নিযুত হারে বংশবৃদ্ধি করে চলেছে। ওরা বোধহয় আমাদের শিক্ষা দিচ্ছে যে আমরাও যদি ওদের কায়দায় বাঁচতে শিখি তাহলে দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি বলে কোন সমস্যা থাকবে না।

নোংরামি কিছু কম পড়িয়াছে ভেবে গাঁয়ের দু’ডজন ছেলে পেটের স্বেচ্ছাচার থেকে নিস্তার পেতে নিয়মিত এখানে আসে-- সকাল সন্ধ্যে বা দিনের যে কোন সময়। এরা এসে এই ডোবার কিনারে --কঠিন, তরল ও বায়বীয়—তিনরকম পদার্থ ত্যাগ করে হালকা হয়ে ঘরে ফেরে।

কোন পিছিয়ে থাকা দেশেরও যেমন কোন- না- কোন আর্থিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব থাকে, তেমনই এই নোংরা ডোবাটারও বিশেষ গুরুত্ব ছিল। এর আর্থিক বিশেষত্ব হোল গায়ে লাগা ঢালু জমিতে খুব ভাল ঘাস জন্মায় আর গ্রামের এক্কাওলাদের ঘোড়াগুলোর খাদ্যসমস্যা এভাবেই দূর হয়। রাজনৈতিক গুরুত্ব হোল শনিচর এখানে এসে এক্কাওলাদের ভেতর ওর পঞ্চায়েতি নির্বাচনে মোড়ল হওয়ার জন্যে ভোট চাইতে এসেছে।

শনিচর যখন ডোবার কিনারে পৌঁছল তখন দু’জন ঘেসেড়ে ঘাস কাটছিল। ওরা পেশায় ঘেসেড়ে নয়, বরং এক্কাওলা। এমন যে এলাকায় সাইকেল রিকশার চলন হওয়ার পরও প্রাণে ধরে পেশা ছাড়েনি, ঘোড়াগুলোর সঙ্গে এখন অবধি টিকে আছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সাইকেল-রিকশা চালকদের হুজুম যে ভাবে দ্রুত বেড়ে উঠছে তার থেকে এটা প্রমাণিত হয় যে দেশের আর্থিক নীতি খুব ভাল আর দেশের ঘোড়াগুলো কোন কাজের নয়। আর এটাও বোঝা যাচ্ছে যে আমরা সমাজবাদ প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে এগিয়ে চলেছি। প্রথমে ঘোড়া ও মানুষের প্রভেদ দূর করেছি এখন মানুষে মানুষে ভাগাভাগি দূর করতে হবে।

এসব তো যুক্তি দিয়ে সিদ্ধ করা যায়, কিন্তু এই যে শিবপালগঞ্জ ও শহরের পথে এক ডজন সাইকেল-রিকশা চলছে, তারপরেও দুটো এক্কাগাড়িওলা আর ওদের ঘোড়া এখনও হাপিস হয় নি কেন —তার যুক্তি কী?

মানলাম, ঘোড়াগুলো এই ডোবার পাড়ে ঘাস খেয়ে বেঁচে আছে, কিন্তু এক্কাওলারা? ওরাও কি এদের কায়দাতেই পেট ভরাবে? উঁহু, খাদ্যবিজ্ঞানের সূত্র বলে মানুষের বুদ্ধি মাঝে মাঝে ঘাস খেয়ে পুষ্ট হতে পারে বটে, কিন্তু খোদ মানুষ এভাবে বাঁচতে পারে না।

শনিচর যখন এক্কাওলাদের কাছে গেল তখন ওর মনে এত সব গম্ভীর আর্থিক সামাজিক ভাবনা ছিল না। ওর মাথায় একটাই চিন্তা—ভোট চাই। সুতরাং ও কোন ভুমিকা ছাড়াই সোজাসুজি কাজের কথায় এল।

--দেখ, আমি এবার পঞ্চায়েত প্রধান হবার জন্যে কাগজ জমা করেছি। যদি নিজের ভাল চাও, তো আমাকে ভোট দাও।

একজন এক্কাওলা শনিচরকে উপর থেকে নীচ আর নীচ থেকে উপর অব্দি একনজর মেপে নিয়ে নিজের মনে বিড়বিড় করল—“ এ হবে প্রধান? পোঁদে নেই ইন্দি, ভজরে গোবিন্দি”!

ভোট ভিক্ষায় পথে নামলে অনেক বড় বড় নেতাও নম্র হয়ে যান। আর এ তো শনিচর! জবাব শুনে ওর তেজ গায়েব হোল, দাঁত বেরিয়ে এল। বলল, “আরে ভাই, আমি প্রধান হব নাম-কে-ওয়াস্তে। আসল প্রধান তো বৈদ্যজী মহারাজ। ব্যস, এটা মেনে নাও যে তুমি ভোটটা আমাকে নয় বৈদ্যজীকে দিচ্ছ। ধরে নাও, আমি নই স্বয়ং বৈদ্যজী তোমার কাছে ভোট চাইতে এসেছেন”।

ওরা একে অন্যকে দেখল, তারপর চুপ মেরে গেল। শনিচর বলল, “বল ভাই, কী ভাবছ”?

“বলার কী আছে”? অন্যজন মুখ খুলল, “বৈদ্যজী নিজে ভোট চাইছেন ! ওনাকে কে মানা করবে? আমরা কি ভোট নিয়ে আচার দেব? নিয়ে যান! বৈদ্যজীই নিয়ে যান”।

প্রথমজন উৎসাহিত। “ভোট সালা কোন একশ টাকার চিজ? যে কেউ নিয়ে যাক”।

অন্যজন প্রতিবাদ করল, “যে কেউ কেন নেবে? এই প্রথম বৈদ্যজী আমাদের কাছে কিছু চেয়েছেন। উনিই পাবেন, নিয়ে যান”।

শনিচর বলল, “তাহলে পাকা কথা ধরে নিই”?

দুজনে একসাথে যা বলল তার সার—মরদের কথার নড়চড় হয় না। আমাদের দেবার মত কিছু নেই, তবে বৈদ্যজী কিছু চাইছেন, ওনাকে ‘না’ বলা কঠিন। আশা করি তুমিও প্রধান হয়ে গেলে মাটিতে পা ফেলবে, আকাশে বাঁশ দিয়ে খোঁচাবে না”।

শনিচর চলে গেছে। ওরা দু’জন খানিকক্ষণ চুপচাপ ঘাস কাটতে লাগল। আর মাঝে মধ্যে আজকাল ঘাস কেন কমে যাচ্ছে সে নিয়ে তর্ক জুড়ে দিল। হঠাৎ চোখে পড়ল একজন লোক চলে যাচ্ছে। ওর আসল নাম কেউ জানে না, সেটা শুধু সরকারের কাগজে লেখা রয়েছে। সবাই ওকে বলে “রামাধীনের ভাইয়া”। ও হচ্ছে শিবপালগঞ্জের গ্রামসভার বর্তমান প্রধান। তবে গ্রামের সবাই মনে করত আসল প্রধান হলেন রামাধীন ভীখমখেড়িজী।

বিগত বছরগুলোয় গ্রামের দীঘিগুলোর মাছের নীলাম বেশ উঁচু দরে হয়েছিল। আর পড়তি রুক্ষ জমির পাট্টা জারি করেও সভার আয় বৃদ্ধি হয়েছিল। গ্রাম পঞ্চায়েত কখনও সখনও চিনি আর ময়দার কোটা বিতরণের কাজ করছিল। এইসব মিলে গ্রামসভা বড়লোক হচ্ছিল। তবে শিবপালগঞ্জে সবাই জানত যে গ্রামসভার বড়লোক হওয়া আর সভার প্রধানজীর বড়লোক হওয়া একই কথা। ফলে প্রধানের পদ বেশ লাভপ্রদ হয়ে গেল।

শুধু তাই নয়, প্রধানের পদ বেশ সম্মানেরও বটে। বছরে দু-একবার থানাদার ও তহশীলদার ওকে ডেকে এনে দু’চারটে গাল দেয় বটে, সে দিক গে। আলো-আঁধারিতে গাঁয়ের একাধ গুন্ডা ওকে পাঁচ দশটা ঢিল ছোঁড়ে , তা ছুঁড়ুক গে’। তাতে ওই পদের সম্মান বা মর্যাদায় কোন আঁচ লাগে না। কেননা আমাদের গোটা দেশে এবং শিবপালগঞ্জে সম্মান সেই পায় যে বড়লোক হয়েছে, সে যেভাবেই হোক না কেন! এছাড়া গোটা দেশের মত এখানেও কোন সংস্থার পয়সা ফোকটে হজম করে গেলে বড়লোকের সম্মান কমে যায় না।

এইসব কারণে রামাধীনের বড়দার ইচ্ছে এবারেও প্রধানের গদি আঁকড়ে থাকার।

এখন উনি ওনার ছোলার ক্ষেতের পাশে পড়শির ক্ষেত থেকে একগাদা চারা তুলে ফেলে বড় বোঝা বগলে পুরে ঘরে যাচ্ছিলেন এবং যেতে যেতে উঁচু গলায় গাল পাড়ছিলেন –যাতে লোকে জেনে যায় যে আসলে ওনার ক্ষেত থেকেই ছোলাগাছ চুরি হয়েছে।

উনি ডোবার পাশে এক্কাওলাদের সঙ্গে শনিচরের গুজগুজ দেখতে পেলেন। অমনি পথ বদলে পুকুরপাড়ে চলে এলেন। এক্কাওলারা দেখে নিল শনিচর দূরে চলে গেছে কিনা। তারপর ওনাকে সেলাম ঠুকে বলল, “ভাইয়া, তুমি এবারেও প্রধানগিরির জন্যে ভোটে দাঁড়াচ্ছ তো”?

রামাধীনের বড়দা প্রথমে ক্ষেত থেকে চানাচুরির গল্পটা শোনালেন। তারপর বললেন—দেখছ তো, আমার প্রধানগিরির সময় ফুরিয়ে আসছে, তাই চোর ব্যাটারা আবার সাহস করে পুরনো বদমায়েসি শুরু করেছে। যত্তক্ষণ আমার শাসন ছিল, এরা নিঃশ্বাস বন্ধ করে দিন গুনছিল।

ওনার যুক্তি হোল, এই গঞ্জহা ব্যাটারা (শিবপালগঞ্জের লোকজন) যদি নিজের ভাল বোঝে, সুখ-শান্তি চায় তাহলে শালারা নিজের থেকেই আমাকে ফের প্রধান বানাবে। আমায় কিছু করতে হবে না। শেষে উনি বেপরোয়া ভাব দেখিয়ে বললেন—আচ্ছা, শনিচর ব্যাটা কী বলছিল?

--ভোট চাইছিল।

--তোমরা কী বলেছ?

--বলেছি নিয়ে নিও, ভোট নিয়ে আচার পাতব নাকি?

-- ওকে ভোট দেবে? নিজের ভালমন্দ, উঁচুনীচু সব দেখেটেখে তবে দিও।

--সব দেখে নিয়েছি। তুমি ভোট চাইছ, আচ্ছা, তোমাকেই দেব’খন।

প্রথমজন ফের বলল—আমরা ভোট নিয়ে কি আচার পাতব?

রামাধীনের ভাইয়া বলল—তাহলে শনিচরকে ভোট দিচ্ছ না?

--তুমি বললে ওকেও দিতে পারি। যাকে বলবে তাকেই দিয়ে দেব। আমরা তোমার হুকুমের চাকর। ওই শালার ভোট নিয়ে কিসের আচার—

বড়দা ওর কথার মাঝখানে বলে উঠলেন—শোন, কোন শনিচর ফনিচরকে ভোট দেবে না, ব্যস।

--ঠিক আছে, দেব না।

--আমাকে দেবে।

--দিয়ে দেব। বললাম তো, নিয়ে যাও।


রামাধীনের বড়দা ফের ছোলাচোরের বাপান্ত করতে করতে ঘরের রাস্তা ধরলেন। চলার গতির সঙ্গে ওনার গালির রূপ ও আকার বদলে যেতে লাগল। কারণ, মহল্লা এসে গেছে। ওনার ইচ্ছে লোকজনকে বুঝিয়ে দেয়া যে উনিও একধরণের গুণ্ডা এবং আজ ওঁর মেজাজ খারাপ।




চামারটোলা ও উঁচুজাতের মহল্লার মাঝখানে তৈরি হয়েছে গান্ধী চবুতরা (মণ্ডপ)। অন্যদিন সেটার উপর কুকুর শুয়ে থাকে এবং চেঁচায়। কিন্তু আজ ওখানে মানুষের কন্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে। নির্বাচনের অল্প ক’দিন আগে রামাধীনের ভাইয়া ওটার মেরামত করিয়েছেন। কারণ, নির্বাচনের আইনে বোধহয় এমনটা করার নির্দেশ রয়েছে! অথবা নির্দেশ থাক বা না থাক, সব বড় বড় নেতা, না জানি কেন, নির্বাচনের দুয়েক মাস আগে নিজের নিজের নির্বাচনী এলাকায় মেরামত বা সংস্কার করাতে লেগে যান।

কেউ নতুন পুল বানিয়ে দেন, কেউ রাস্তা; অন্যেরা গরীবদের মধ্যে কম্বল এবং চাল-গম বিতরণ করেন। সেই হিসেবে রামাধীনের বড়দা ওই চবুতরার চেহারা বদলানোর চেষ্টা করেছিলেন।

ওখানে একটা লম্বা-চওড়া নিম গাছ দাঁড়িয়ে আছে। অনেক বুদ্ধিজীবীর মত গাছটাও অনেক শাখা প্রশাখা ছড়িয়েছে বটে, কিন্তু ভেতরটা ফোঁপরা। ভাইয়া ওর নীচে একটা কুয়ো বানিয়েছিলেন। আসলে ওখানে কুয়ো আগে থেকেই ছিল। উনি সেটা মেরামত করিয়ে সরকারি কাগজপত্তরে ‘নবীন কূপ নির্মাণ’ এন্ট্রি করিয়ে দিলেন। উদ্দেশ্য মোটা সরকারি ভর্তুকি হাতিয়ে ফেলা। কাগজাটা হয়ত ঠিক নৈতিক হল না, তবে একরকম রাজনৈতিক তো হল। আগে এই কুয়ো বর্ষার দিনে উঁচু জমি থেকে বয়ে আসা জল নিজের পেটে পুরে গ্রামকে বন্যার হাত থেকে রক্ষা করত। এখন ওর চারপাশে উঁচু বাঁধানো পাড়। বোঝাই যাচ্ছে এর সম্বন্ধ রয়েছে কোন পঞ্চবার্ষিক যোজনার সঙ্গে। এই কথাটা বড় গলায় বলার জন্যে ওই পাড়ের দু’পাশে দুটো উঁচু থাম তোলা হয়েছে। একটার গায়ে রয়েছে এক ‘শিলালেখ’ঃ

‘তৃতীয় পঞ্চবার্ষিক যোজনা। গাঁও-সভা শিবপালগঞ্জ। পশু-চিকিৎসক শ্রী ঝাউলাল এই কুয়োর ‘শিলান্যাস’ করেছেন। সভাপতি শ্রী জগদম্বা প্রসাদ’।

কুয়োর পাড় পাকা করে দেয়ায় বাইরের জল আর কুয়োতে আসে না। কিন্তু ভেতরের জল বাইরে আসে। মানে, ওর ভেতর থেকে শীতল-মন্দ-সুগন্ধ বা পচা জলের গন্ধ নাকে টের পাওয়া যায়। যেন ও গ্রামের লোকজনকে ডাক দিচ্ছে—পেটের কৃমির অভিজ্ঞতা তোমাদের হয়েছে বটে, এবার ওটা ছেড়ে ম্যালেরিয়া আর ফাইলেরিয়াকেও নিয়ে যাও।

কুয়োর মেরামতের সঙ্গে গান্ধী-চবুতরারও কপাল ফিরে গেল। ক’টা নতুন ইঁট জুড়ল আর তার গায়ে এমন সিমেন্ট যে ঠিকেদারের হাতে লাগানোর পনের দিন পরেও খসে পড়ে নি। এই আবহাওয়ায় চবুতরা বেশ আকর্ষণীয় হয়েছে। কলেজের যত ফালতু ছেলে কখনও সখনও এখানে বসে জুয়ো খেলতে লাগল। সন্ধ্যের সময় বদ্রী পালোয়ানের কুস্তির আখড়া থেকে কয়েকজন চ্যালা আসতে শুরু করল। ওদের হাবভাব দেখলে মনে হয় এখানে আসার একমাত্র উদ্দেশ্য বসে বসে গায়ে এঁটে থাকা মাটিকে চুলকে চুলকে তুলে ফেলা।

আজকে গ্রামসভার ভোট। কলেজের ছুটি। নির্বাচন তো অন্য জায়গায় হওয়ার কথা ছিল, নিঃসন্দেহে চামারটোলা থেকে দূরে। কিন্তু আজ গান্ধী-চবুতরায় ভারি ভীড়। আর সবরকম লোক একসাথে মিলেমিশে বসে আছে—যেমনটি গান্ধীজি চাইতেন। জুয়ো-খেলুড়েরা তাস পকেটে পুরেছে। আখড়ার চ্যালারা আজ কুস্তি করেনি, গায়ে মাটি মাখে নি, শুধু তেল মালিশ করে এসেছে। ফলে তার উগ্র গন্ধ দিগবিদিকে ছড়িয়ে যাচ্ছে।


রূপ্পনবাবু আজ যেন ক্লান্ত চরণে আসছেন। মুখের ভাবে রোজকার স্ফুর্তি আর চালাকির ঝলক দেখা যাচ্ছে না। ওনাকে গাব্ধী চবুতরার দিকে আসতে দেখে এক উঠতি পালোয়ান চোখ মেরে বলল, “কহো বাবু, ক্যা হাল”?

জবাবে রূপ্পন বাবু অন্যদিনের মত চোখ মারলেন না বা এটাও বললেন না যে তুমিই বল রাজা! তোমার কী হাল? উনি এমনভাবে মাথা নাড়লেন যার মানে—ঠাট্টা করছ! আমার ভাল লাগছে না। মুড খারাপ।

উনি চোখে কালো চশমা লাগিয়ে গলায় রেশমি রুমাল বেঁধে ধীরে ধীরে এসে চবুতরায় ধপ করে বসে পড়লেন। খানিকক্ষণ উপস্থিত ভদ্রজনের মধ্যে শান্তি বিরাজ করতে লাগল।

ছোকরা পালোয়ানটি অলস ভঙ্গিতে আড়মোড়া ভেঙে কনুই ভাঁজ করল। ওর কনুইয়ের উপরে নেংটি ইঁদুরের মত একটা ছোট্ট মাংসপেশি জেগে উঠল। ও বড় আদর করে ওটাকে বার বার হাত বুলিয়ে ফের রূপ্পন বাবুর কাছে গিয়ে বসল। ও আবার চোখ মারল, তারপর রূপ্পন বাবুর পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে বলল, “ কী ব্যাপার বাবু! আজকের রঙ যেন একটু বদরঙ লাগছে”!

শিবপালগঞ্জের বিখ্যাত প্রবাদ—“প্রেমিকের তিন নাম,

রাজা, বাবু, পালোয়ান”।

সে হিসেব ধরলে রাজার বদলে বাবু সম্বোধনে রূপ্পন বাবুর সম্মান কিছু কম হল মনে হতে পারে। তবে শিবপালগঞ্জ এটাও জানে যে এই ছোকরা পালোয়ানকে রূপ্পন বাবু অনেক ছাড় দিয়ে রেখেছেন। যেন গান্ধীজি সর্দার প্যাটেলকে কড়া কথা বলার ছাড় দিয়েছিলেন। সুতরাং দু’জনের নিজেদের মধ্যে এইসব কথাবার্তাকে আমরা ‘মহাপুরুষদের মহারঙ্গ’ বলে ধরে নেব।

কিন্তু রূপ্পন তো তাঁর চ্যালার গায়েপড়া ভাব ও ঠাট্টা খেয়াল করছেন না। একেবারে চুপটি করে মুখটি বুজে রয়েছেন। কলেজের একটি ছাত্র বলল,--গুরু, আমাদের কী করতে হবে? তুমি এখনও কিছু বলনি। এবার রামাধীনের দলে যেমন উত্তেজনা গরমাগর্মি ভাব, শনিচরের দলে তেমন কিছুই নেই’।

রূপ্পন বাবু পাতাল থেকে আসা আওয়াজে বললেন—‘এখন ঠান্ডাগরম নিয়ে কথা বলা বেকার। ভোটের ফলাফল একটু আগে বেরিয়ে গেছে। শনিচর জিতে গেছে’।

ছোকরা পালোয়ানের দল আর কলেজের ছাত্রদের মধ্যে হুলুস্থুল পড়ে গেল। চারদিকে একটাই প্রশ্ন ঘুরতে লাগল, “ আরে কী করে? কী ভাবে? শনিচর ব্যাটা জিতল কোন কায়দায়”?

রূপ্পন বাবুর চ্যালা ছোকরা পালোয়ান চোখ মেরে বলল, ‘ বলো পালোয়ান, শনিচর ব্যাটা জিতল কোন দাঁও লাগিয়ে”?

“মহীপালপুরওলা দাঁও”। রূপ্পন বাবুর গলার স্বরে অসীম ক্লান্তি।

************************************************************************

ভোটে জেতার তিনরকম দাঁও-প্যাঁচ আছেঃ রামনগরওয়ালা, নেবাদাওলা আর তিন নম্বর হোল মহীপালপুরওলা।

একবার গ্রানসভার নির্বাচনে রামনগর গ্রাম থেকে দু’জন ভোটে দাঁড়িয়েছিল—রিপুদমন সিং ও শত্রুঘ্ন সিং। দুজন একই জাতের, ফলে জাতের ভোট ভাগ হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিল। ঠাকুর সমাজের লোকজনের ভারি মুশকিল। ইনিও ঠাকুর, তিনিও ঠাকুর—ভোট দেব কাকে! আবার যারা ঠাকুর সমাজের নয় তারা ভাবল—এরা নিজের জাতের মধ্যেও রেষারেষি করছে, এমন প্রার্থীকে ভোট দিলেই কি, আর না দিলেই কি!

কিছুদিন পরে জানা গেল যে রিপুদমন আর শত্রুঘ্ন --দুটোর মানে একই; অর্থাৎ এমন এক সিংহ যে শত্রুকে গিলে খায়। এটা জানার পর গ্রামের লোকজন গণতন্ত্রের অনুকুল সিদ্ধান্তে পৌঁছল—ওরা একজন আর একজনকে গিলে খাক, অথবা গ্রামসভার প্রধান হোক—আমাদের কী আসে যায়!

নির্বাচনের পাঁচ দিন আগে পর্য্যন্ত ভোটের হাওয়া একদম গায়েব। প্রার্থীরা গাঁয়ে গিয়ে ভোট চাইলে লোকজন বলে দেয়—আমরা ভোট নিয়ে কি আচার দেব? যাকে দিতে বলবে তাকেই ভোট দেব।

ফলে দু’জনেই ভাবল—কেউ ওদের ভোট দেবে না। ওরা ঘাবড়ে গিয়ে গণতন্ত্রের দোহাই দিল, মানুষজনকে ভোটের মূল্য বোঝাতে লাগল। যেমন—তুমি যদি তোমার দামি ভোট ভুল লোককে দাও তাহলে প্রজাতন্ত্রের সমূহ বিপদ! বেশির ভাগ লোকে এসব বড় বড় কথা বুঝল না। যারা বুঝল, তারা বলল—ভুল লোককে ভোট দিলে গণতন্ত্রের কোন বিপদ হয় না। তুমি তোমার ভোট দিতে পারছ, সেটাই গণতন্ত্রের জন্যে যথেষ্ট। ভুল ঠিক তো চলতেই থাকে। দেখ না, আজকাল যা হচ্ছে----।

এধরণের কথা বলার লোক হাতে গোণা যায়। তবে গণতন্ত্রকে ফালতু প্রমাণিত করতে এরাই যথেষ্ট। তখন দুই ক্যান্ডিডেট প্রচারের কায়দা বদলে নিল। বলতে লাগল গ্রামসভার প্রধানের ক্ষমতার কথা। যেমন, প্রধান চাইলে গ্রামের সব পড়তি জমি অন্যদের বিলি করতে পারে এবং যারা বে-আইনি ভাবে পড়তি জমি দখল করে রেখেছে তাদের বেদখল করতে পারে।

যাঁরা প্রেমচন্দের ‘গোদান’ পড়েছেন বা ‘দো বিঘা জমিন’ ফিলিম দেখেছেন তাঁরা জানেন যে কৃষকের সবচেয়ে প্রিয় হল জমি। শুধু তাই নয়, ওদের নিজের জমির চাইতে অন্যের জমি বেশি প্রিয় এবং সুযোগ পেলেই ওদের পড়শির ক্ষেতের দিকে নোলা সকসক করে। এর পেছনে কোন সাম্রাজ্যবাদী উপনিবেশ গড়ার স্বপ্ন নয়, বরং সহজিয়া প্রেমের ভাবনা কাজ করে। সেই প্রেমের তাগিদে ও নিজের ক্ষেতের আলে বস পড়শির ক্ষেতে পশু চরতে দেয়। আখ খাবার জন্যে নিজের ক্ষেত ছেড়ে পাশের ক্ষেত থেকে আখ উপড়ে নেয়, আর সবাইকে দেখিয়ে দেখিয়ে বলে—দেখছ তো, আমার ক্ষেত থেকে কেমন চুরি হচ্ছে!

কথাটা ভুল নয়। কারণ, ওর পড়শিও একইভাবে তার পাশের লাগোয়া ক্ষেত থেকে আখ চুরি করে উপড়ে নেয়। অন্যের সম্পত্তিকে নিজের মনে করার পেছনে কাজ করে সহজিয়া প্রেমের তাড়না।

এই কথাগুলো গোদান উপন্যাসে স্পষ্ট করে বলা হয় নি। আর বোম্বাইয়া সিনেমাতেও—সম্ভবতঃ কৃষণ চন্দর এবং খাজা আহমদ আব্বাসের ভয়ে—অথবা প্রগ্রেসিভ হওয়ার ঝোঁকে অন্ধ হয়ে, কিংবা স্রেফ বদমাইশি করে—খোলাখুলি দেখানো হয় নি। এই জন্যে আমি খানিকটা পরিষ্কার করে বললাম। মানছি, দেশ থেকে জঞ্জাল দূর করার কাজ শিল্পী=সাহিত্যিকের নয়, তবুও---।

হল কি, যেই গাঁয়ের লোকজন বুঝে ফেলল পঞ্চায়েতের সম্বন্ধ জমির লেনদেনের সঙ্গে এবং পড়শির ক্ষেত হাতিয়ে নেয়া সম্ভব, অথবা অমুক কৃষক নিঃসন্তান মারা গেলে নিজেকে ওর উত্তরাধিকারী ঘোষণা করে রাজতিলক পরা যেতে পারে—ব্যস, চাষিদের সহজিয়া প্রেমভাবনা উথলে উঠল। তখন জমির প্রেম ভোটারদের গ্রাম পঞ্চায়েতের দিকে ঠেলা মারল, পঞ্চায়েতের প্রতি প্রেমে ওরা মোড়ল পদের প্রার্থীদের দিকে ধাক্কা দিল। ফলে ওদের মস্তিষ্ক একদম সক্রিয় হয়ে উঠল।

এরপর ওদের সামনে এল সেই সমস্যা যা চিনা হামলার সময় আচার্য কৃপলানী গোটা দেশের সামনে হাজির করেছিলেন। ওরা ভাবতে লাগল নিরপেক্ষ থাকা একদম ফালতু, এতে দুর্বলতা বাড়ে এবং লোকসান হয়। যদি তুমি শান্তিতে থাকতে চাও তাহলে রিপুদমন অথবা শত্রুঘ্নের মধ্যে কাউকে বেছে তার সঙ্গে ঝুলে পড়। আর বেশি নিরপেক্ষ ভাব দেখালে দু’দিক থেকেই মরবে।
0

ধারাবাহিক - শৌনক দত্ত

Posted in





















১৩. ভার্জিনিয়া উলফ ও কবি লেখকের আত্মহত্যা





সুপরিচিতাসু সুস্মি,


ষষ্ঠীর রাত। ঘন্টাখানেক আগেই নিউ জলপাইগুড়ি জংশন থেকে ট্র্রেনে চেপেছি। অনেকদিন হলো তোমার কোন চিঠি পাইনা। ভালো আছো নিশ্চয়? কাজের প্রেশারে চিঠি লিখতে পারছো না মনে হয়। বৈশুর হাতে তৈরি লুচি আার আলুর দম দিয়ে ডিনার সেরে জানালার পাশে বসে আছি বহুক্ষণ। রাতের ট্রেন ছুটছে, এসির জানালায় দূরের কোন আলো কাঁপছে। মনটা আজ খুব বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে, তোমাকে খুব মনে পড়ছে। কেন পড়ছে জানিনা। কিংবা এভাবে তোমাকে মনে করা উচিত হচ্ছে কিনা তাও বুঝতে পারছিনা। আমরা আজো যেহেতু মোবাইল নম্বর দেয়া নেয়া করিনি সেহেতু তোমাকে লেখা ছাড়া আর কোন উপায় নেই, পুরো কম্পার্টমেন্ট আধো ঘুমে আমি জেগে বসে তোমাকে লিখছি। আজ সন্ধ্যায় একটা সুইসাইড নোট পড়ছিলাম ১৯৪১ সালের ২৮ মার্চ শেষ বিদায়ের আগে প্রিয়তম স্বামীর উদ্দেশে লেখা এই চিঠিটি সম্ভবত সবচেয়ে বেশি পড়া সুইসাইড নোটগুলোর একটি। অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ওই চিঠিটি এখনও পড়েন বিশ্বের সাহিত্যপ্রেমীরা, আমিও আগে বহুবার পরেছি কিন্তু কেন জানিনা আজ পড়ার পর থেকেই খুব কষ্ট লাগছে, বয়স বেড়ে যাচ্ছে বুঝতে পারছি। এই চিঠি তোমারও নিশ্চয় পড়া। যেখানে আত্মহত্যাকারী লিখছেন—



প্রিয়তম,

আমি বুঝতে পারছি, আমি আবারও পাগল হয়ে যাচ্ছি। আমি বুঝতে পারছি এবার হয়তো আমাদের এই কঠিন সময় অতিক্রান্ত হবে না। আমি নানা রকম স্বর শুনতে পাচ্ছি, কিছুতেই মনঃসংযোগ করতে পারছি না। তাই যা সবচেয়ে ভালো মনে হচ্ছে তা-ই করতে যাচ্ছি আমি। তুমি আমাকে যতটুকু সম্ভব সুখী করেছ। তুমি সে সবই করেছ যা যা কোনও মানুষের তরফে করা সম্ভব। আমার মনে হয় না দুইজন মানুষ মিলে তোমার-আমার চেয়ে বেশি সুখী হতে পারতো, যতদিন না আমার এই ভয়ঙ্কর রোগটা দেখা দেয়। আমি আর এর সাথে যুদ্ধ করতে পারছি না। আমি জানি আমি তোমার জীবনটা নষ্ট করে ফেলছি, আমি না থাকলেই তুমি কাজ করতে পারবে। এবং তুমি করবেও, আমি জানি তা। এই দেখ, এই চিঠিটাও আমি ঠিকভাবে লিখতে পারছি না। আমি পড়তে পারি না। আমি সর্বার্থে বলতে চাই, আমার জীবনের সমস্ত সুখের জন্য আমি তোমার কাছে ঋণী। তুমি আমার সঙ্গে চরম সহিষ্ণুতা দেখিয়েছ, অসাধারণ সহৃদয় আচরণ করেছ। আমি বলতে চাই- এ সত্য সকলেই জানে। কেউ যদি আমাকে বাঁচাতে পারতো, সেটা হতে তুমিই। তুমি এত ভালো!- আমি তোমার জীবনটা এভাবে নষ্ট করতে পারি না। আমার মনে হয় না আমাদের দুজনের চেয়ে বেশি সুখী আর কেউ হতে পারবে।



এই কথাগুলো আমারও হতে পারে কিংবা যেকোন সংবেদনশীল মানুষের কথাও হতে পারে তাই না? নিশ্চয় বুঝে ফেলেছো এটা কার সুইসাইড নোট। তার মৃত্যুও কাব্যিক ব্যঞ্জনার। নিজের ওভারকোটের পকেটে নুড়ি পাথর বোঝাই করে হেঁটে নেমে গিয়েছিলেন খরস্রোতা পাথুরে নদীতে। আর কোনদিন ফিরে আসেননি। বিংশ শতাব্দীর আধুনিকতাবাদী সাহিত্যিকদের মধ্যে অন্যতম অ্যাডলিন ভার্জিনিয়া স্টিফেন উলফ নারীদের হয়ে লিখে গেছেন বহু চিঠি এবং ডায়রি। তাঁর ডায়রিতে বর্ণিত ঘটনাগুলি সেই সময়ের এক বিশ্বস্ত দলিল। পনের বছর বয়েসে তিনি প্রথম ডায়রি লেখেন। আর শেষ লেখাটি লিখেছিলেন মৃত্যুর ঠিক চারদিন আগে অর্থাৎ ২৪ মার্চ। তিনি তার লেখা খুব যত্ন করে রঙিন কাগজের মলাটের ভিতরে গুছিয়ে রাখতেন। অতীতচারণা করার সময়ে ডায়রির সাহায্য নিতেন, পরবর্তীতে এই বিষয়ের উপরে বেশ কিছু ছবি এঁকেছিলেন। তিনি লন্ডনের একটা কলেজে ইংরাজি ও ইতিহাস পড়ানোর পাশাপাশি দ্য গার্ডিয়ান, দ্য টাইমস লিটারারি সাপ্লিমেন্ট এবং বিভিন্ন প্রকাশনার জন্যে নিবন্ধ, রিভিউ লেখেন সমসাময়িক এবং ধ্রুপদী সাহিত্য বিষয়ে। এই সময়ে তিনি এবং তাঁর স্বামীর কয়েকজন বন্ধু মিলে একটা বৌদ্ধিক পরিমণ্ডল গড়ে তোলেন। লন্ডনের গর্ডন স্কোয়ারে ১৯০৬ সালে ‘থার্সডে ইভিনিং’ এবং পরে ‘ফ্রাইডে ক্লাব’-এ সাহিত্য, শিল্পকলা, বর্তমান সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা চলত। লেখার পাশাপাশি তিনি সাংবাদিকতাও করেছেন। নারী যখন ফিকশন লেখে তখন তার একটি কক্ষ আর কিছু অর্থ খুব প্রয়োজন”। এই উক্তি বিশ্ব সাহিত্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। ব্রিটিশ কথাসাহিত্যিক ভার্জিনিয়া নারী মুক্তির অগ্রদূত, নারীর ক্ষমতায়ন, নারীর অধিকার, লিঙ্গবৈষম্য, রাজনৈতিক দর্শন ও সমাজ বিশ্লেষক হিসেবে সর্বাধিক পরিচিত। নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্য উদ্দেশ্য করে ভার্জিনিয়ার ভাষ্য, যদি নিজস্ব একটা ঘর আর ৫০০ পাউন্ডের নিশ্চয়তা দেয়া হয়, নারীরাও অনেক উন্নতমানের সাহিত্য উপহার দিতে পারবে। জেইন অস্টেন থেকে ব্রন্টি ভগ্নিদ্বয়, জর্জ এলিয়ট ও মেরি কারমাইকেল পর্যন্ত সব লেখিকাই অনেক প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও শেকসপীয়রের স্তরে উন্নীত হতে পারছে না আর্থিকভাবে সামর্থ না থাকার কারনে। আর তাই নারীকে নির্ভর করতে হয় পুরুষের ওপর। আর নারীদের নিচে ফেলে না রাখলে পুরুষরা বড় হবে কি করে- এই মনোভাব বজায় রাখলে নারীদের মুক্তি মিলবে কিভাবে? তদানীন্তন সময়ে ঝাঁঝালো এই প্রশ্ন ব্রিটিশ পুরুষতান্ত্রিক সুশীল সমাজের বিবেককে নাড়িয়ে দেয়।



জীবনের পরিবর্তনশীলতা, সময়, স্মৃতি, সামাজিক সম্পর্ক, এবং মানুষের মনস্তত্ত্ব নিয়ে ভার্জিনিয়ার লেখা তার শেষ উপন্যাস বিটুইন দ্য এ্যাক্টস তোমার খুব প্রিয় আমি জানি। তুমি জানো নিশ্চয় ভার্জিনিয়া শিক্ষা, গির্জা, চিকিৎসা, আইন ইত্যাদি নানা জায়গায় কাজের জন্যে শিক্ষিত নারীদের প্রবেশাধিকারের সমস্যা নিয়ে কলম ধরেছিলেন। অক্সফোর্ড এবং কেমব্রিজ থেকে নারীদের বহিষ্কারের ফলে তাঁর কলম গর্জে ওঠে। নারী পুরুষের সমতা নিয়ে তাঁর লেখা উপন্যাস, ‘মিস্টার অ্যান্ড মিসেস রামসে’ পড়েছো কি? কিংবা তার বায়োগ্রাফি ‘ফ্লাস’? রোডলফ বেসিয়ারের একটি নাটক থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ফিকশনধর্মী এই উপন্যাসটি একটি কুকুরের চোখ দিয়ে পুরো থিমটি তুলে ধরা হয়েছে। ভার্জিনিয়া উলফ তার আন্টি ফটোগ্রাফার জুলিয়া মার্গারেট ক্যামেরুনের জীবনের নানা দিক নিয়ে ‘ফ্রেশওয়াটার’নামে একটি নাটক লিখেছিলেন। আমার অবশ্য ভালো লাগে ১৯৩৬ সালে প্রকাশিত হয় ‘এম আই এ স্নব’। বইটিতে মূলত সমাজের ধনাঢ্য শ্রেণী এবং সেই সাথে সুশীল সমাজের একজন প্রতিনিধি হওয়ার যে সংকট তা তুলে ধরা হয়েছে। এছাড়াও তাঁর জেকবস্ রুম, ওরলানডো, দ্য ওয়েভস্ উপন্যাসগুলোও আমার ভালো লাগে।



আমার মাথায় একটা প্রশ্ন সন্ধ্যা থেকে ঘুরছে, লেখকের মৃত্যু, বিশেষত আত্মহত্যা তাঁকে মহান করে কি? বিশ্বসাহিত্যে শতাধিক খ্যাতনামা কবি-লেখকের খোঁজ মিলবে, যাঁরা আত্মহত্যায় নিজেদের জীবনের ছেদ টেনেছেন। খোঁজ নিলে আরও দেখা যাবে, তাঁদের লেখালেখিতে নিজেদের মনোজগতের ছাপ পড়ুক বা না-ই পড়ুক, তাঁরা প্রত্যেকেই ব্যক্তিজীবনে প্রবল মানসিক চাপ বয়ে বেড়িয়েছেন, যা প্রায়ই তাঁদের এক দুঃসহ বিষণ্নতা ও মনোবৈকল্যের দিকে ঠেলে দিয়েছে। অতি বিখ্যাত আত্মহননকারী হিসেবে যাঁদের নাম প্রথমেই মনে আসে—প্রত্যেকেই মনোরোগের নানা লক্ষণে আক্রান্ত ছিলেন। ভার্জিনিয়া উলফের হৃদয়বিদারক সুইসাইডের কথা ভেবে উঠতে উঠতে তোমাকে আরও কয়েকটা নাম মনে করিয়ে দিই— সিলভিয়া প্লাথ, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা, ইয়ুকিও মিশিমা। প্রত্যেকে আত্মহন্তারক। মৃত্যুর আগের মুহূর্তেও বড় যত্নে ঘুমন্ত ছেলেমেয়ের বিছানার পাশে প্লাথ সাজিয়েছিলেন দু-গ্লাস গরম দুধ আর রুটি, তারপর মাথাটা গুঁজে দিয়েছিলেন জ্বলন্ত ওভেনের ভেতরে। হেমিংওয়ে তাঁর সেই আত্মঘাতী রাতে শুতে যাওয়ার ঠিক আগে খেয়েছিলেন নিউ ইয়র্ক স্ট্রিপ স্টেক, বেকড পোট্যাটো আর সিজার স্যালাড, সঙ্গে ছিল দুর্মূল্য বোরদো। কী এক অসহ্য তাড়না তাঁকে ডেকে নিল গহীন ঘুমের ভেতর থেকে, আর সুষুপ্তির অন্তরালে পার্শ্ববর্তিনীকে ফেলে রেখে নীচের বারান্দায় গিয়ে তিনি গুলি চালালেন নিজস্ব করোটি ফুঁড়ে। ‘আত্মহত্যা নিয়ে আমার না আছে কোনও শ্রদ্ধা, না আছে কোনও মায়ামমতা’— এমন পঙ্‌ক্তিমালা লেখার পরেও গ্যাসের নব নিজের হাতে খুলে দিয়ে নিজের শ্বাস রোধ করে মৃত্যু চেয়েছিলেন কাওয়াবাতা। আর মিশিমা? অনেক আশার বারুদ ঠাসা ছিল তাঁর বুকে, সেই সব স্বপ্নজাগরের অকালমৃত্যুসম্ভাবনায় আপন হাতে পেটের নাড়িভুঁড়ি চিরে বের করে বেছে নিলেন হারাকিরি মৃত্যু। সিলভিয়া প্লাথ ভেবে দেখবেন একবার, যেই মুহূর্তে আপনি জানলেন এঁদের প্রত্যেকের আত্মহননবৃত্তান্ত, এঁদের লেখার মোহের চাইতেও এঁদের আত্মহত্যার বয়ানটি জানার দুর্মর লোভ চেপে কি বসছে না আপনার মনে? ‘অন্তর্গত রক্তের ভিতরে খেলা’ করা সেই ‘বিপন্ন বিস্ময়’ সম্পর্কে অনন্ত কৌতূহল কি আপনাকে কি গ্রাস করছে না? উলফও জানতেন সে-কথা। জানতেন, হাজার আলোর রোশনাই এসে পড়বেই তাঁর জলে ভিজে হেজে-যাওয়া মৃত মুখে, শ্যাওলা-জড়ানো চুলে, পাথরের ভারে ছিঁড়তে বসা পকেটের খাঁজে। লেখকের ‘সুইসাইড নোট’ও সাহিত্যবিচারের আতসকাচের তলায় পড়তে পারে, এ-কথা ভাবতে পেরেছিলেন বলেই, স্বামীকে উদ্দেশ্য করে লেখা সেই শেষ চিঠিতে কৈফিয়তের জবানিতে লিখে গেলেন— ‘দ্যাখো, এ চিঠিটাও আমি ঠিকমতো লিখতেই পারছি না। পড়তেও পারি না আর।’ তবু রেহাই মেলেনি। তিন সপ্তাহ পর অর্ধগলিত সেই শবদেহ যখন শনাক্ত করছেন লিওনার্ড উলফ, ইতিমধ্যেই হাজার অভিযোগের তির ধেয়ে এসেছে তাঁর দিকে। ‘ঘোড়ার মতো মুখ আর হাত-কাঁপার জন্মগত রোগ’ওয়ালা এই কপর্দকশূন্য ইহুদিটাকে কেন এককালে বিয়ে করেছিলেন ভার্জিনিয়া স্টিফেন, নিশ্চয় এর অযত্ন আর অবহেলাতেই প্রাণ গেল সম্ভাবনাময়ীর! এমন চিত্রনাট্য তখন রোজ ছাপা হয় খবরের কাগজে। প্লটটা অবশ্য মুখ থুবড়ে পড়ল, কারণ কাগজে-কলমে লিওনার্ড প্রমাণ করলেন, ভার্জিনিয়া ভুগছিলেন বাইপোলার ডিজঅর্ডারে। ভয়াবহ ডিপ্রেশন আর ম্যানিয়াগ্রস্ত উত্তেজনা যে-রোগের অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী।



সৃজনশীলতার সঙ্গে মানসিক অসুস্থতার কি কোনো সংগোপন সম্পর্ক রয়েছে? কারও কারও ক্ষেত্রে লক্ষ করা যায়, ব্যাপারটা এমন একধরনের মানসিক বিকার (কখনো কখনো অসুস্থতার কাছাকাছি), যা সৃজনশীলতাকে উদ্দীপ্ত করতেও সাহায্য করে, আবার অন্যদের ক্ষেত্রে তা হয়তো একপর্যায়ে বিনাশী রূপ ধরেই আসে। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, লেখালেখি বা শিল্পচর্চা ছাড়াও সামগ্রিকভাবে সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে যাঁরা লিপ্ত, তাঁরা সমাজের অন্যদের থেকে কমপক্ষে ৮ শতিংশ বেশি বিষণ্নতা, মানসিক ভারসাম্যহীনতা ইত্যাদিতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন। তবে কবি-লেখকদের বেলায় এই ঝুঁকি আতঙ্কিত হওয়ার মতো বেশি। ভুক্তভোগীদের শতকরা ৫০ জনই আত্মহত্যায় জীবনের ছেদ টেনেছেন এমন তথ্য রয়েছে। মার্কিন ঔপন্যাসিক ই এল ডকটোরো এ বিষয়ে খোলাখুলি মতামত দিয়েছেন এই বলে যে লেখালেখি সামাজিকভাবে অনুমোদনপ্রাপ্ত একধরনের সিজোফ্রেনিয়া।



ভার্জিনিয়া উলফের বিষয়ে ধারণা করা হয়, তাঁর শেষ উপন্যাস বিটুইন দ্য এক্টস-এর (মৃত্যুর পর প্রকাশিত) পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করার পরপরই তাঁকে প্রচণ্ড বিষণ্নতা পেয়ে বসেছিল। ইতিপূর্বেও একাধিকবার এমন হয়েছিল—পরিবারের আপনজনের মৃত্যুতে এবং বই প্রকাশের পর অসন্তুষ্টিতে। তবে সে সময় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকবলিত পৃথিবীর নানা দুর্যোগও তাঁর বিষণ্নতাকে মনোবৈকল্যের এক চরম পর্যায়ে নিয়ে যায়। একার অন্ধকারে ডুবে মরা এই ভার্জিনিয়ার জন্য কোথাও ছিল না একফোঁটা চোখের জল। সবাই তাঁর মেধার দখলস্বত্ব বুঝে নিতে চায় শুধু। একের পর এক খবর তখন সিলমোহর দিয়ে জানান দিচ্ছে ভার্জিনিয়ার মৃত্যুজনিত বিষণ্নতা আসলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী পৃথিবীর শহুরে ক্লান্তি আর বিষণ্নতার দ্যোতক। তাদের নির্মম তাত্ত্বিক দর্শনের পুঁজি উপুড় করে এই মৃত্যুকে মুড়ে ফেলতে চাইছে গবেষণার শুখা কাগজে। বিষণ্নতায় আক্রান্ত হয়ে জীবন দুর্বহ হয়ে পড়ার ঘটনা খ্যাত-অখ্যাত বিস্তর কবি-সাহিত্যিকের বেলায় ঘটেছে। কেবল খ্যাতনামাদের তালিকাই কম দীর্ঘ নয়; তবে এই বিষণ্নতা সবার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত তা বলা যাবে না। ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কির আত্মহত্যার কারণ হিসেবে বিষণ্নতাসহ নানা বিতর্ক দাঁড় করালেও এর পেছনে বিপ্লবোত্তর সোভিয়েত রাশিয়ায় বিরাজমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে তাঁর বৈরিতাজনিত হতাশাকে মূলত দায়ী করা হয়ে থাকে। সৃজনশীলতা, বিষণ্নতা ও আত্মহত্যা—এই তিনের অন্তঃসম্পর্ক নিয়ে অনেকেই কথা বলেছেন। বইপত্রও লেখা হয়েছে। সুরাহা হওয়ার বিষয় নয়, তবু কোথাও যেন একই সুতার টান টের পান কেউ কেউ, বিশেষত মনোবিশ্লেষকেরা।



তোমাকে লিখতে লিখতে রাত পেরিয়ে পুবের আকাশ রাঙা হয়ে উঠছে। ব্রহ্ম মূহুর্ত পেরিয়ে গেছে অনেক আগেই। আকাশটা প্রথমে গভীর নীল, তারপর ধীরে ধীরে ফিকে হচ্ছে। দিগন্তে যেন কেউ হালকা হলুদ রঙের তুলির আঁচড় টেনে দিয়েছে। সেই আঁচড়ের ভেতর থেকে বেরোতে শুরু করেছে লালচে আভা। আর কয়েক ঘন্টা পরেই বেনারস নামবো। ভাবছি বহুবছর পরে আবার যখন এসেছি বাবু মায়ের পিন্ডটা দিয়ে যাবো। আবার কবে আসবো আদৌ আসবো কিনা জানিনা। ট্রেনের কামরা জেগে ওঠছে। চিঠিটা বেনারস নেমে পোষ্ট করবো। নিরন্তর ভালো থেকো।



অন্তে প্রীতি হোক

বাসু

২৮ সেপ্টেম্বর,২০২৫