Next
Previous
Showing posts with label ধারাবাহিক. Show all posts
0

ধারাবাহিক - রঞ্জন রায়

Posted in




















 ২৫(১)

“ ও সজনা! ওগো নিঠুর প্রিয়তম! তোমাকে আমার বড্ড মনে পড়ে। চাঁদ কি জানে - কোন চকোর ওকে

কামনা করে? তুমি কি জানো যে তুমিই আমার মন্দির, তুমিই আমার পূজা, তুমিই আমার দেবতা? হ্যাঁ,

তুমিই আমার দেবতা। তোমার কথা ভেবে আমার ঘুম আসে না, সারারাত জেগে এপাশ ওপাশ করতে থাকি।

এখন আমার অবস্থা দেখ—না সইতে পারি, না রইতে। দেখ আমার বুক কেমন ধকধক করছে, তোমাকে

দেখলেই হৃদয়ের গতি বদলে যায়। তুমি তো কখনও উড়ে যাও, কখনও মুখ ফিরিয়ে চলে যাও—আমার

হৃদয়ের গোপন কথা জানতে চাও না। তোমাকে নিয়ে আমার একটাই নালিশ—তুমি চাও ভালবাসা লুকিয়ে

রাখতে।

“কহীঁ দীপ জলে কহীঁ দিল, জরা দেখ তো আ কর পরোয়ানে”।

দেখা হলে অনেক কথা বলার আছে। বুকের এই জ্বালা কাকে বলি! মন চায় প্রেমে সব উজাড় করে দিতে

। কিন্তু আমার “নাদান বালমা না জানে জী কে বাত”। তাই তো সেদিন তোমার কাছে এসেছিলাম। “পিয়া

মিলন কো জানা”। আমার জ্যোৎস্না আমার সঙ্গে আড়ি করেছে। আমার শূন্য ঘরে আঁধার। আমি

তোমাকে দেখা করে বলতে চাইছিলাম যে আমার কিছু চাই না। শুধু আমায় তোমার “পলকো কী ছাঁও মেঁ

রহনে দো”। এটাই আমার অনেক পাওয়া। কিন্তু দুনিয়ার এটাই নিয়ম—‘কিসী কো গিরানা, কিসী কো

মিটানা’। আমি তোমার ছাতে পৌঁছে গেলাম। কিন্তু তোমার বিছানায় অন্য কোন পুরুষ শুয়ে ছিল। লজ্জায়

মরে গেলাম। নিরূপায় হয়ে ঘরে ফিরে এলাম। হে ঘূর্ণি ঝড় ! হাসো, খুব হেসে নাও। আমাকে নিয়ে হাসো,

আমার ভালবাসায় কটাক্ষ করে হাসো।

পাড়ায় আমার বদনাম হচ্ছে, আর তুমি চুপটি করে মুখ বুজে বসে রয়েছ? আর কত কষ্ট দেবে? আর

কত? দাও, যন্ত্রণা দাও। আমি ব্যাথায় ছটফট করেও তোমার গান গেয়ে যাব। শিগগির দেখা করা

দরকার। আজ আসতে পারবে? তোমা বিনা আমার মন্দির আজ শূন্য। “অকেলে হ্যাঁয়, চলে আও, জহাঁ

হো তুম”। “লগ জা গলে সে ফির ইয়ে হসীঁ রাত হো ন হো”। আমায় জড়িয়ে ধর, কে জানে, এমন সুন্দর রাত

আর আসবে কি? আমার এটাই ইচ্ছে যে তোমার দ্বারে যদি আমার প্রাণ যায় তো যাক! হায়, অনেক

আশায় বুক বেঁধে বসে আছি। দেখ গো, আমার মন যেন না ভাঙে!

তোমাকে ভেবে ভেবে

কোন এক উন্মাদিনী




ছাতের পাঁচিলের কাছে একটা নোংরা কাগজের পুরিয়া পড়ে আছে, সঙ্গে একটা ঢিল বাঁধা। দেখা গেল ওটা

একটা প্রেমপত্র! রঙ্গনাথ চিঠিটা একবার পড়ল, দ্বিতীয়বার পড়ল, আরও কয়েকবার পড়ল। বুঝতে

বাকি রইল না কে লিখেছে। সেই অজানা মেয়ে যার বুকের চাপ নিজের বুকে অনুভব করে রঙ্গনাথের সারা

রাত খাজুরাহো আর কোনারকের কথা মনে পড়ছিল। এটাও বোঝা গেল যে এই প্রেমপত্র লেখা হয়েছে

রঙ্গনাথ নয়, অন্য কারও কথা ভেবে।

কে সে?

রূপ্পন?




তাহলে এই চিঠিটি বেলা লিখেছে রূপ্পনের জন্যে? তবে কি সেই রাতে ছাদে চুপচাপ চলে আসা মেয়েটিই

বেলা?

যদি ভাবা হয় যে রঙ্গনাথ তর্কশাস্ত্রের বা নব্যন্যায়ের কোন মহান পণ্ডিতের মত অনেক

ভেবেচিন্তে, দুইয়ে দুইয়ে চার করে, এই সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পেরেছে তাহলে ভুল হবে।

আসলে ও এই প্রেমপত্রের লেখিকাকে বেলা ধরে নিয়ে রূপ্পনের লেখা চিঠির সঙ্গে মিলিয়ে ভাবছিল।

আবার আশ্চর্য হচ্ছিল যে শিবপালগঞ্জের মত অজ পাড়াগাঁয়ে কোন মেয়ে এত ফিল্মি গান জানে!

চিঠির প্রতিটি ছত্র কোন না কোন হিট বোম্বাইয়া সিনেমার গান থেকে টোকা। এমন জানলে

বিশ্ববিদ্যালয় এই লেখিকাকে বুকে জড়িয়ে না ধরলেও ‘ফিল্মি সাহিত্যের ডক্টরেট’ এর পদক ওর

গলায় ঝুলিয়ে দিত।

এইসব চিন্তার সঙ্গে সঙ্গে রঙ্গনাথের ভেতর থেকে এমন একটা আবেগ জেগে উঠছিল যাকে ফিল্মি

গানের ভাষায় বলা যায়—‘কী জানি কেন এই দুনিয়া আমায় জ্বালিয়ে মারে’! যে মেয়েটি সেই রাতে

রঙ্গনাথের গলার আওয়াজ শুনে “ হায় মাঈয়া’ (ওমা) গোছের পবিত্র মন্ত্র পড়ে পালিয়ে গেছল, সে

আজ অন্য কারও উদ্দেশে লিখছে “অকেলে হ্যায়, চলে আও, জহাঁ হো তুম”! আজ আমি একা, যেখানেই

থাকো চলে এস!

এ যেন অ্যাপিল ব্রডকাস্ট করছে। এটা অসহ্য।

চিঠিটা পকেটে পুরে রঙ্গনাথ বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল।

আজ শহরে জোগনাথের মামলার শুনানি হবে। শিবপালগঞ্জে যাদের গুণতির মধ্যে ধরা হয় তারা সবাই

আজ ওদিকে রওনা দিয়েছে। কখনও কোন গুণ্ডার মামলা এজলাসে ওঠে, ব্যস্‌ গ্রামবাসীদের

স্বাভাবিক ইচ্ছে জেগে ওঠে—চল, শহর ঘুরে আসি, কাছারি দেখে আসি।

গুণ্ডাকে সবার সামনে অপমানিত হতে দেখলে ওনাদের হৃদয়ে পুলক জাগে, আর গুণ্ডাও এই ভেবে খুশি

হয় যে আমার পক্ষে কতলোক হাজির! সেই রীতি রেয়াজ মেনে আজ অনেকে শহরে চলে গিয়েছে। আরও

অনেকে যাবে যাবে করছে।

রঙ্গনাথ দেখল বদ্রী পালোয়ান তার নিজস্ব ভুবনমোহন রূপ ধরে আসছেন। গায়ে মলমলের কুর্তা

ঝলমল করছে, নীচে গেঞ্জি নেই যদিও ফাল্গুন মাসের হিসেবে শীতের ভাব রয়েছে। কোমরে ল্যাঙোট

বাঁধা, কী আশ্চর্য, তার উপরে লুঙি! পায়ে পালিশ করা কালো বুটজুতো। ন্যাড়া মাথা সর্ষের তেলে

জবজবে, তার অনেক উঁচুতে নীল আকাশ।

রঙ্গনাথ প্রথমে ভেবেছিল যে প্রেমপত্রটি রূপ্পনবাবুর হাতে দিয়ে “সংস্কৃতির অবক্ষয়ে সিনেমার

ভূমিকা” গোছের বিষয় নিয়ে কিছু ডায়লগ ঝাড়বে, যাতে বেলার প্রেমে রূপ্পনের অধঃপতন ঠেকানো যায়।

কিন্তু ও জেনে গেছল যে এই বিষয়ে রূপ্পনের সঙ্গে কথা বলা মুশকিল। কিন্তু প্রেমপত্র পাওয়ার মতন

অসহ্য ঘটনাকে চুপচাপ হজম করাটাও ঠিক হবে না। কিন্তু বদ্রী পালোয়ানকে দেখে ও নিজের প্ল্যান

বদলে ফেলল। যেমন কোন আমেরিকান এক্সপার্ট এলে আমরা কখনও কখনও নিজেদের প্ল্যান বদলে

ফেলি।

বদ্রী পালোয়ান প্রেমপত্রটি দূর থেকে পড়তে লাগল। কাজটা সহজ করার জন্যে রঙ্গনাথ দেড় ফুট

দূরে দাঁড়িয়ে কাগজটাকে দু’হাতে মেলে ধরল। এক জায়গায় পালোয়ানকে চোখ ছোট করতে দেখে রঙ্গনাথ

সাহায্য করবে ভেবে পড়ে দিল—‘ ফির ইয়ে হসীঁ রাত হো ন হো”, মানে “হসীন, অর্থাৎ খুব সুন্দর”।




বদ্রী পালোয়ান ঢেঁকুর তুলল। হয়ত বলতে চাইল—বেশি বোঝাতে হবে না। এসব আমার জানা আছে। পুরো

চিঠিটা পরে পালোয়ান ওটা নিয়ে ভাঁজ করে জামার পকেটে পুরল।

রঙ্গনাথ বলল , “রূপ্পন বাবু খারাপ রাস্তায় চলছেন। আর ওই মেয়েটা! কে জানে চিঠিতে কত ফালতু

আবর্জনা ভরে দিয়েছে”।

উত্তরে বদ্রী পালোয়ান হো হো করে হেসে উঠল। “চিঠিটা তো শ্বশুড়ী ওই গ্রাম-সেবিকা লিখে দিয়েছে।

এ গাঁয়ে ও ছাড়া আর কেউ এসব জানে না”।

“ তার মানে –তার মানে রূপ্পন বাবু কোন গ্রামসেবিকার চক্করে ফেঁসেছেন”?

বদ্রী পালোয়ানের হাসি আর থামে না। কোনমতে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “না না। তুমি তো একেবারে

উলটা বুঝিলি রাম! ও বেচারি এসব করে না, শুধু অন্যদের হয়ে চিঠি লিখে দেয়”।

পালোয়ান নিজের রাস্তায় এগিয়ে গেল। যেতে যেতে রঙ্গনাথের হতভম্ব চেহারা দেখে বলে গেল, “এই

কাগজের টুকরো নিয়ে আর মাথা ঘামিও না। আমি সব ঠিক করে দেব”।




আদালত ভবন শহরে, কিন্তু আজ মনে হচ্ছে গোটা শিবপালগঞ্জ এজলাসে হাজির। জোগনাথের বিরুদ্ধে

চুরির মামলার শুনানি অলছে। আজ সাক্ষীদের বয়ান নেয়া হচ্ছে।

আদালতের পরিবেশ একেবারে জঘন্য এবং অশ্লীল। লোকজন বারান্দায় নেড়ি কুকুরের মত শুয়ে রয়েছে।

দোলের দিন প্রায় এসে গেছে। তাই লোকের মুখে ছ্যাবলা চুটকি এবং খিস্তিখেউড় লেগেই আছে। শরীরে

ময়লা কিন্তু নানারঙের কাপড় জামা। ময়লা কাপড় পরা বাদী-প্রতিবাদী-সাক্ষীর দল বিড়ি টানতে টানতে

অথবা নোংরা দাঁতের পেছনে খৈনির গুঁড়ো চেপে রেখে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে কথা বলছে। এক নারী বারান্দায়

শুয়ে বাচ্চার মুখে মাই ঠুঁসে দুধ খাওয়াচ্ছে আর কিছু নাগরিক তাই হাঁ করে দেখে দাঁত বের করছে।

এতোল বেতোল হাওয়ার দাপটে ধূলো ও শুকনো পাতা উড়ে বারান্দায় ছড়িয়ে পড়ছে। পুলিসের দুই সেপাই

ইউনিফর্ম পরে আদালতের বারান্দায় খালি পায়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তবে ওদের পায়ে খাকি রঙের পট্টি

জড়ানো। ওদের মধ্যে একজনের জুতো সর্বদা অন্য কাউকে মেরামত করতে মুখিয়ে থাকে; সে জুতো

জোড়া এখন বটগাছের নীচে এক মুচির হাতে মেরামত হচ্ছে। দ্বিতীয়জন তার জুতোজোড়া এজলাসের

দরজার সামনে খুলে রেখেছে। কারণ, ও সদ্য পুলিশ হয়েছে। এই জুতো ওর পায়ের বুড়ো আঙুলে কেটে

বসেছে। উকিলের দল, কাজ থাক বা না থাক, কাজের বোঝায় আতুর হয়ে সমানে এজলাসের ভেতর বার

করছে। এজলাসের পেশকারেরা হাই তুলে গয়ং গচ্ছ ঢঙে প্রতি পনের মিনিটে একবার করে পান

দোকানের দিকে ঘুরে আসছে আর মামলাবাজ লোকদের কাউকে পেছনে কাউকে বগলে চেপে মুখ ভর্তি

পান-খয়ের-দোক্তা-চূণ ঠেসে বোঝাতে বোঝাতে ফিরে আসছে যে আজ অনেক কাজ,এবার পরশুদিন

এসো। তারপর উটের মত ঘাড় তুলে এজলাসের নিরাপদ এলাকায় ঢুকে পড়ছে।

বারান্দার এক কোণে সেই ল্যাঙড়াটাও বিচারের আশায় বসে আছে।

শনিচর এখন গ্রামসভার প্রধান। তাই আমোদগেঁড়ে লোকজনের ভীড়ে ওর থাকা জরুরি। আরও কারণ যে

আজ ছোটে পালোয়ান জোগনাথের বিরুদ্ধে পুলিসের সাক্ষী হয়ে হাজির হয়েছে। এটা একটা ঐতিহাসিক

ঘটনা। ছোটে পালোয়ান এবং জোগনাথ দুজনেই বৈদ্যজীর লোক। তাহলে হঠাৎ কী হোল যে একজনেরই

দুই চ্যালা কাঠগড়ায় দুদিকে দাঁড়িয়ে—আসামী এবং সরকারী সাক্ষী!




কিছুদিন আগে এটা নিয়েই রূপ্পনবাবু রঙ্গ করে বলেছিলেন—একডালে ফুটল দুই ফুল, কিন্তু যার যা

কপাল!

শনিচর এবং গ্রামের আরও কয়েকজন একেবারে এজলাসের ভেতরে চলে গেছে। ল্যাংড়াকে শনিচর

সেরেফ ঘুরিয়ে আনার জন্যে রিকশায় চাপিয়ে নিয়ে এসেছিল। সে এখন বারান্দার এককোণে বসে নতুন

শ্রোতাদের নিজের জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা শোনাতে ব্যস্ত। ওর একটাই জীবন আর একটাই

অভিজ্ঞতা। সেটাই ও এবার ছড়িয়ে লম্বা করে শোনাচ্ছেঃ

“—তো বাপু, এতদিন পরে, মানে পুরো একবছর তিনমাস কেটে যাওয়ার পর, এখন মামলা লাইনে এসেছে।

নকল চেয়ে যে দরখাস্ত করেছিলাম তাতে আর কোন ভুলচুক নেই। ওটা এখন সদর থেকে তহসিল

অফিসে ফেরত চলে এসেছে। কাল তহসিল অফিসে গেছলাম। জানতে পেরেছি যে নকল জারি করার

কেরানী এখন আমার কাজটা নিজের হাতে নিয়েছেন। আজ সেটার জোগাড় চলছে, ফের ওর আসলের

সঙ্গে মিলান করে দেখা হবে। ব্যস, আর তিন চার দিনের মামলা”।

একজন উকিল থামের গায়ে হেলান দিয়ে সিগ্রেট ফুঁকছিল, সে ওখান থেকে গলা তুলে বলল—‘এতদিন

ধরে খামোখা ঘুরে মরছ, তারচেয়ে আমাকে বা অন্য কোন উকিলের কাছে এলে তিনচার দিনে কাজ হয়ে

যেত’।

ল্যাঙড়া এতদিনে সাধুসন্তদের মত ক্ষমাসুন্দর মধুর হাসি কাজে লাগাতে শিখে গেছে। যা দেখলে সবার

মনে হবে অন্য লোকটি বাচ্চাদের মত কথা বলছে। তেমনই এক মুচকি হাসির মুখোশ পরে ও জবাব দিল,

“ উকিলের দরকার ছিল না তো! এতো আমাদের দুজনেরই সত্যের পথে চলার লড়াই। পাঁচটাকা হাতে গুঁজে

দিলে তিন দিন কেন, তিন ঘন্টায় কাজ হয়ে যেত। কিন্তু ওভাবে না ও পয়সা নেবে, না আমি দেব”।

উকিল উবাচ, ‘কেন নিল না? তুমি টাকা বের করলে অথচ ও নেয় নি’?

ক্লান্ত ল্যাঙড়া বারান্দায় চাদর বিছিয়ে শোয়ার জোগাড় করছিল, বলল-- “ এটা সৎপথের লড়াই, তুমি

তো উকিল; তুমি বুঝবে না”।

লোকজন হেসে উঠল, কিন্তু ল্যাংড়া কোন কথা না বলে চোখ বুজে শুয়ে পড়ল। আচমকা ওর মুখ থেকে

কাতরানোর আওয়াজ! কেউ বলল, “কী হয়েছে ল্যাংড়া? ঠান্ডায় কাবু”?

ও চোখ বুঁজেই মাথা নেড়ে সায় দিল। ওর পাশে বসা লোকটি ওকে ছুঁয়ে বলল, ‘মনে হচ্ছে জ্বর হয়েছে’।

এক বুড়ি চুপচাপ বসে ঘোলাটে চোখে সংসারকে দার্শনিক চোখে দেখছিল। সে বলল, “বড় খারাপ সময়।

আমার দুই ছেলে, দুজনেই জ্বরে কাহিল। ফসল পেকেছে। কাটবে কে? ইঁদুরে ধান খেয়ে যাচ্ছে”।




অনারেরি ম্যাজিস্ট্রেটের এজলাস।

গয়াদীনের সাক্ষ্য নেয়া প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। হঠাৎ জোগনাথের উকিল প্রশ্ন করল, “ তোমার

একটি মেয়ে”?

“হ্যাঁ”।

“ওর নাম বেলা”?




“হ্যাঁ”।

“বয়েস প্রায় কুড়ি”?

“হ্যাঁ”।

মাননীয় আদালত গয়াদীনের দিকে কড়া চোখে তাকালো, মানে এক বিশ বছরের অবিবাহিতা মেয়ের বাপের

দিকে যেভাবে তাকানো উচিত আর কি!

--তোমার ঘরে কোন অন্য স্ত্রী থাকে?

--হ্যাঁ, আমার বিধবা বোন।

--কিন্তু ওতো সবসময় থাকে না।

--না, ও গোড়া থেকেই আমার ঘরে আছে।

-উকিল গর্জে উঠল,-- আদালতে শপথ নিয়ে সাক্ষ্য দিচ্ছ, মিথ্যে বললে তোমার বিরুদ্ধে মামলা হবে।

এটা কি সত্যি নয় যে বোনটি বেশিরভাগ সময় শ্বশুরবাড়িতে থাকে আর তখন মেয়ে একলা থাকে”?

গয়াদীন চুপচাপ দাঁড়িয়ে। উকিল ফের গর্জে উঠল, “চুপ করে আছ কেন? উত্তর দাও”।

--কী বলব? আপনি এত রেগেমেগে চেঁচাচ্ছেন যে কিছু বলা দুষ্কর।

উকিল সেভাবেই বলল—না, রাগ করি নি।

গয়াদীন চুপ।

উকিল এবার আওয়াজ নরম করে বলল, --উত্তর দাও।

--আমার বিধবা বোন সাবসময় আমার বাড়িতেই থাকে।

--মেয়ের বিয়ে হয়েছে?

-না।

--কবে বিয়ে দেবে?

-- বিয়ে দেওয়া তো ভগবানের কাজ।

ভগবানের নাম শোনামাত্র মহামান্য আদালত মুখ তুলে তাকালেন। এতক্ষণ উনি মন দিয়ে কিছু কাগজ

দেখছিলেন যার সঙ্গে এই মামলার কোন সম্পর্ক নেই। এবার উনি উকিলকে বললেন, “ এসব প্রশ্নের

বর্তমান মামলার সঙ্গে কোন সম্বন্ধ নেই”।

উকিল বলল—শ্রীমানজী, সম্বন্ধ আমি পরে সিদ্ধ করব।

আদালতের সমর্থন পেয়ে পাবলিক প্রসিকিউটর এবার নিজের সাক্ষীকে বাঁচাতে জেগে উঠলেন।

==শ্রীমান, এসব প্রশ্ন একদম অপ্রাসঙ্গিক।

কিন্তু আদালত কড়া চোখে পাবলিক প্রসিকিউটরকে দেখলেন।
0

ধারাবাহিক - নন্দিনী সেনগুপ্ত

Posted in




















১৮

বের্নহার্ডের বাজনার প্রভূত উন্নতি হচ্ছিল ক্রমেই। সে নিজেও উৎফুল্ল বোধ করছিল তার অগ্রগতিতে। তার সুর লাগানোর ক্ষমতা এবং চলন আরও স্বচ্ছন্দ এবং শক্তিশালী হয়ে উঠছিল। বাজনার প্রতিটি স্বর আরও ভরাট অথচ কোমল হয়ে উঠছিল। গানের কথার মতো স্পষ্ট এবং পরিশুদ্ধ হয়ে সুরের টুকরোগুলি বেজে উঠছিল তার হাতের ছোঁয়ায়। শপ্যাঁ রচিত একক সঙ্গীতের বিশেষ কঠিন সংবেদী বিন্যাসগুলিও সহজে মূর্ত হয়ে উঠছিল তার নিয়মিত অভ্যাসের ফলে। বাজনার নিরবচ্ছিন্ন সুরেলা অনুরণন বজায় রেখে সে ছড়িয়ে দিতো এক নির্ভার মাদকতা।

দুর্ভাগ্যবশত, বেটসিকে শেখাতে গিয়েও সে বাধাহীনভাবে বাজাতে পারত না। কারণ তাদের অন্যান্য আমেরিকান বন্ধুরা প্রায়ই এসে ডাকাডাকি করত। ওরা বলতো বন্ধু… আসলে বেশ কিছু নির্বিকার অল্পবয়েসি ছেলেমেয়ে, যাদের দেখতে, পোশাক পরিচ্ছদে, ভাষায়, চলনে বলনে আর নামেও প্রায় অনেকটাই ওদেরই মত। বেটসির খিদে পেয়ে যেত; তার গাড়ি পথে এসে অপেক্ষা করত। অবশেষে নিজেরই বিছিয়ে দেওয়া সুরের মায়াজালে আচ্ছন্ন থাকা বের্নহার্ডকে টেনেহিঁচড়ে পিয়ানো থেকে তুলে নিয়ে ডিনারে যেত ওরা।

প্রায় প্রতিদিন এই আমেরিকান তরুণ তরুণীর দলটার সঙ্গে ডিনার খেতে যেত বের্নহার্ড, যেটা অবশ্য তার পক্ষে মঙ্গলজনক হয়েছিল। তাছাড়া সে ভালই উপার্জন করছিল। বেটসি পরের দিনের বেতনটা ডলারে হিসেব করে তাকে দিয়ে দিত, কারণ সে বুঝতে পেরেছিল যে একা নতুন শহরে একজন ইউরোপিয়ান ছাত্রের আর্থিক প্রাচুর্য নাও থাকতে পারে।

এই হল বের্নহার্ডের বর্তমান পরিস্থিতি। সে আপাতত দুই হাত ঘাড়ের নিচে রেখে নিজের বিছানায় শুয়ে আছে। বিছানার পাশে টেবিলে ছাইদানে নিঃশব্দে একটা সিগারেট পুড়ে যাচ্ছে।

সে ভাগ্যবান। তার কপালের অস্বাভাবিক জোর আছে। চারপাশে সবাই তার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করে। তাকে ডিনারে নিমন্ত্রণ করে। তাকে "ছোট্ট বন্ধু” কিম্বা “বাচ্চা” এরকম সম্বোধনে ডাকে। পয়সা ভালই দিচ্ছে, চকলেট খাওয়াচ্ছে। বিশাল পিয়ানোটা, যেটার শব্দ অসাধারণ গমগমে অথচ নরম, সেই বাদ্যযন্ত্রে রোজ অভ্যেস করতে দিচ্ছে। এককালে গের্ট এবং ইনেস যেভাবে তাকে প্রশ্রয় দিত, সবসময় প্রচ্ছন্ন ভালবাসায় ঘিরে রাখতো, এরাও ঠিক সেভাবেই তাকে ঘিরে আছে। সে এখন বেটসির আভিজাত্যপূর্ণ কালো গাড়িটাতে চড়ে প্যারিস শহর চষে বেড়াচ্ছে এবং তার সঙ্গে ঘুরে ঘুরে সোয়েটার, সিগারেট, ক্ন্যাগির জন্য ছোট শক্ত কেক এসব কেনাকাটা করছে।

কিন্তু শুধুমাত্র বেটসি যে তাকে প্রশ্রয় দিচ্ছে, ব্যাপারটা এমন নয়। মাদাম দুবোয়া যে তাকে পছন্দ করেন বেশ, সেটাও বোঝা যায়। তিনি সবসময় যাতে তার জামাকাপড়, মোজা এগুলো পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকে, গুছিয়ে রাখা থাকে, এদিকে বিশেষ খেয়াল রাখেন। তার সঙ্গীতশিক্ষকও তার প্রতি অত্যন্ত সদয়। এমনকি চার্লস, তার বন্ধু যে সবসময় গোমড়ামুখে তিরিক্ষি মেজাজে অথবা অদ্ভুত উদাসীন ভঙ্গিতে ঘুরে বেড়ায়, সেও তাকে বিশেষভাবে পছন্দ করে। আজ তার সঙ্গেই সে জেরাল্ডের বাড়ি যাবে। এই জেরাল্ডের সঙ্গে দেখা করবার জন্য সে সাগ্রহে অপেক্ষা করছে।

চার্লস যথারীতি বিষণ্ণ এবং গম্ভীর মুখে বের্নহার্ডের ঘরে এসে উপস্থিত হল। সে আজই জেরাল্ডের সঙ্গে হেস্তনেস্ত করতে চায়। অনেকদিন অপেক্ষা করেছে সে। তাছাড়া ওই নেকুপুষু মিকাকে নিয়ে তার মনে এখন আর কোনও বিশেষ ভাবনা নেই। জেরাল্ড মিকার কথায় পাত্তা দিলে দেবে, সেসব নিয়ে এখন আর তার কোনও মাথাব্যথা নেই। মোট কথা, সেদিন যে জেরাল্ড তাকে সবার সামনে বিশ্রীভাবে অপমান করেছিল, সেই ব্যাপারে একটা মোকাবিলা সে আজই করতে চায়। উদার ভঙ্গিতে ঘুরিয়ে মাথাটা ঘুরিয়ে কাত করে এক অদ্ভুত বিনীত স্বরে বলে ওঠে সে… ‘তুমি আগ্রহী হলে আমার সঙ্গে অন্তত আসতে পারো!’

বের্নহার্ড জানায় যে সে খুবই আগ্রহী কারণ সে জেরাল্ডকে দেখতে চায়… “কেমন ব্যক্তি, যাকে তুমি এত ভয় পাও!” যদিও চার্লস মাথা নেড়ে উদ্ধত ভঙ্গিতে অস্বীকার করে তার ভীতির কথা, তবুও বের্নহার্ড লক্ষ্য করে যে যত তারা জেরাল্ডের বাড়ির দিকে এগোচ্ছে, তত মনে হচ্ছে যে চার্লস ভিতরে ভিতরে খুব ঘাবড়ে গিয়েছে। সব কথার সংক্ষিপ্ত উত্তর দিচ্ছে। খুব তাড়াহুড়ো করে একগুঁয়ে ভঙ্গিতে পথে হাঁটছে। বেশ কয়েকবার বাস চাপা পড়তে পড়তে বাঁচলো চার্লস।

যাই হোক, এখানে এই কথাটা উল্লেখ করা প্রয়োজন যে বের্নহার্ড এখনো আবিষ্কার করেনি যে এই দুই জেরাল্ড আসলে একই ব্যক্তি; তার সঙ্গীতশিক্ষকের বাড়িতে প্রথমদিন পিয়ানো বাজাতে বাজাতে শিক্ষকের যে ডাক্তার বন্ধুর সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়েছিল, সেই ব্যক্তি, এবং রবার্টের কাছে যাতায়াত করা ব্যক্তি যার বিষয়ে শহরে অজস্র গুজব ভেসে বেড়ায় এবং লোকে একথাও বলে যে তার এপার্টমেন্টে সুসজ্জিত মেক-আপ করা কচি কচি বার গার্লদের যাতায়াত আছে, এই দুজন যে একই ব্যক্তি, সেটা বের্নহার্ড এখনো জানে না।

চার্লস এবং বের্নহার্ড গিয়ে জেরাল্ডের দরজায় ডোরবেল বাজানোর পর এক তরুণ বাটলার বেরিয়ে আসে, সাদা আর নীল রঙের ডোরাকাটা জ্যাকেট পরা। তাদের প্রশ্নের উত্তরে বিনীত ভঙ্গিতে সে বলে যে মঁসিয়ে জেরাল্ড বাড়িতেই আছেন এবং শীঘ্র তাদের স্বাগত জানাবেন।

হে পাঠক, এই বিন্দুতে এসে আপনি অবশেষে জেরাল্ডের এপার্টমেন্টে প্রবেশ করলেন বের্নহার্ডের সঙ্গে। ঢুকেই সামনে প্যাসেজের দিকটা কার্পেট মোড়া, যথেষ্ট জায়গা জুড়ে একটা আভিজাত্যপূর্ণ গৃহসজ্জা। কোট ঝুলিয়ে রাখার চওড়া শেলফের উপরে দুটো ছোট হালকা রঙের ল্যাম্প জ্বলছে। একটা আলো সরাসরি রাখা আছে একটা বড় আয়নার মাথায়। আয়নার সামনে একটা ছোট টেবিলের উপরে চিরুনি, ব্রাশ, ছোট তোয়ালে রাখা। একটা পর্দার পেছনে হাত ধোবার বেসিন দেখা যাচ্ছে, সেটার উপরেও একটা আলো জ্বলছে।

এপার্টমেন্টের ভিতরের প্যাসেজের অংশটির চরিত্র একেবারে নিরপেক্ষ বলা যেতে পারে। আধুনিক গৃহসজ্জা যেমন হয়, তেমনি সব সুবিধে আছে। ছেলেরা নিজেদের কোট খুলে শেলফে ঝুলিয়ে রাখে। বের্নহার্ড আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চুলটা একবার ব্রাশ করে নেয়। এদিকে চার্লস অধৈর্য ভঙ্গিতে কার্পেটের উপরে এসে দাঁড়ায়। প্রস্থানোদ্যত বাটলারের দিকে ভীরু অথচ সন্ধানী দৃষ্টিতে তাকায় সে; তাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে সে ভিতরে ভিতরে অত্যন্ত উত্তেজিত। বের্নহার্ডের চুল ব্রাশ করা হয়ে গেলে বাটলার ছোকরাটি সামনের অংশ থেকে আরেকটু ভেতরে এগিয়ে আরেকটা ঘরের দরজা খুলে ধরে দাঁড়ায়। সেই ঘরের আলো অপেক্ষাকৃত উজ্জ্বল। এই ঘরটি বসার ঘর কিম্বা অপেক্ষা করবার ঘর। একটা টেবিলের উপরে প্রচুর বই, ম্যাগাজিন, খবরের কাগজ রাখা আছে। চারপাশে অজস্র চেয়ার।

হে পাঠক, আপনি এই আরামপ্রদ চেয়ারগুলির যে কোনও একটায় বসে, হাই তুলতে থাকা একঘেয়েমি কাটিয়ে উঠবার জন্য, টেবিলে রাখা ম্যাগাজিনগুলিতে চোখ বোলাতে পারেন।



(চলবে)
0

ধারাবাহিক - শৌনক দত্ত

Posted in




















১৬. তৃপ্তি মিত্র বিস্মৃত প্রতিভা





প্রিয় বাউন্ডুলেবরেষু

বাসু,

তুমি দিল্লিতেই আছো কিনা জানিনা। কদিন আগেই ব্যাঙ্গালোর থেকে লেখা তোমার চিঠি ও লুইজ গ্লিকের ফ্যান্টাসি কবিতার অনুবাদ পেলাম। অনুবাদ পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল লুইজ গ্লিককে বেশ গভীর থেকে আত্মস্থ করেছো। আজ রবিবার, ছুটির আমেজ মেখে ব্যালকনিতে বসে রোদ গায়ে লাগিয়ে তোমাকে লিখছি। এখানে ঠান্ডা পড়তে শুরু করেছে। গতরাতে অফিস থেকে ফেরার পথে খেয়ে এসেছিলাম তাই রান্না করতে হয়নি। ফ্রেশ হয়ে টিভির সামনে বসে রিমোট চাপতে চাপতে চোখ আটকে গেল একটা সিনেমায়, তৃপ্তি মিত্র অভিনীত এই সিনেমাটা আগেও বহুবার দেখেছি। ২০২৫ সালে তৃপ্তি মিত্রের জন্ম শতবর্ষ গেল অথচ গুণী এই নাট্যজন যেন জীবনে প্রাপ্য মর্যদা পেলেন না যতটুকু পাওয়া উচিত ছিল। মঞ্চে উনার অভিনয় দেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি কিন্তু ছোটকার মুখে বহুবার উনার অভিনয় নিয়ে বিস্তর কথা শুনেছি, ছোটকা দুটো নাটকের কথা সবসময় বলতেন একটা বাকী ইতিহাস অন্যটা অপরাজিতার কথা। নাটক নিয়ে কথা উঠলেই ছোটকা ঘুরে ফিরে এই দুই নাটক ও তাতে তৃপ্তি মিত্রের অভিনয় নিয়ে প্রশংসা জুড়তেন। শুনেছি বাকি ইতিহাস নাটকে তৃপ্তি মিত্র আর কুমার রায় তিনটে করে চরিত্রে অভিনয় করতেন। তৃপ্তি মিত্রের তিনটি চরিত্রের একজন বাসন্তী, মাঝবয়সি মহিলা, অন্য দু’জনের নাম কণা, কম বয়সি। এই দুই কণা আবার দু’ধরনের মেয়ে, একজন উচ্ছ্বল, ছটফটে, অন্যজন শান্ত, দুঃখী, যে কোনও কিছুকে মেনে নেওয়া স্বভাবের। প্রথম কণাকে দেখে ছোটকা নাকি ভেবেছিল উনি নিশ্চয়ই শাঁওলী মিত্র। তার নাকি দুটো কারণ। এক তো অস্বাভাবিক দ্রুততায়, সেকেন্ড তিরিশের মধ্যে তৃপ্তি মিত্র বাসন্তী থেকে কণায় রূপ বদলাতেন, সেই সঙ্গে বদলাতেন কথা বলার ধরন, হাঁটাচলার ধরন, এক কথায় পুরো ব্যক্তিত্বটাই অন্য রকম হয়ে যেত। এ একটা অসম্ভব ব্যাপার! ছোটকার কথায় যাঁরা অভিনয় করেন তাঁরা জানেন, এ খুব সহজ কাজ নয়। অত দ্রুত রূপ বদলের জন্যে দরকার হয় প্রায় যান্ত্রিক নিখুঁত তৎপরতা, আর ব্যক্তিত্ব পালটে দেওয়ার জন্য নিজের কণ্ঠ আর শরীরের ওপর অসামান্য দখল। বিস্ময়করভাবে তা ছিল তৃপ্তি মিত্রের। ছোটকার সাথে নাটক নিয়ে কথা বললেই এমন সব কথা শুনতে হতো আমি মনে করতাম হয়ত তৃপ্তি মিত্র নিয়ে ছোটকার দূর্বলতা কাজ করে। পরে যখন তাঁর অভিনয় দেখেছি পুরনো ছায়াছবিতে তাকে নিয়ে পড়েছি বিস্মিত হয়েছি আর ভেবেছি ছোটকার বলা কথাগুলি। ছোটকা তৃপ্তি মিত্রের একক নাটক অপরাজিতার কথা নিয়ে বলতে গেলেই বলতেন, তৃপ্তি মিত্রের অভিনয় ঘোর আমার আজ পর্যন্ত কাটেনি। কোনও লাভ নেই জানি, যাঁরা সেইসব অভিনয় দেখেননি তাঁদের তো কথা দিয়ে তাঁর অলৌকিকতা বোঝানো যাবে না, তবু ধর নিজেকে মনে করিয়ে দেওয়ার জন্যই বলি তাঁর আর-একটি নাটক, একক অভিনয়, ‘অপরাজিতা’র কথা।



পণ্ডিতেরা বলেন প্রাচীন গ্রীসে থিয়েটারের জন্ম। ওঁরা আবার এটাও বলেন, গণতন্ত্রের সূতিকাঘরও প্রাচীন গ্রীস। প্রথম দিকে ধর্মীয় অনুষ্ঠানের ঐন্দ্রজালিক ক্রিয়াকাণ্ডের সূত্রেই থিয়েটারের আত্মপ্রকাশ। পরে সেখান থেকে বিযুক্ত হয়। যে সমস্ত পরিসরে এথেন্সে প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের অনুষ্ঠানগুলি আয়োজিত হত, সেই পরিসরগুলি একই সাথে ছিল নাট্যানুষ্ঠানেরও স্থল। ফলে বলা যায়, শিশুকাল থেকেই থিয়েটার ও রাজনীতি এভাবে পরস্পর সম্পৃক্ত হয়ে আছে। এই সম্পর্ক তখন থেকেই দ্বিমুখী। কখনও থিয়েটারের মাধ্যমে রাজনৈতিক বিষয়ে বার্তাপ্রদান হয়েছে। আবার কখনও উল্টোদিক থেকে রাজনীতি চেয়েছে থিয়েটারকে নিয়ন্ত্রণ করতে বা তার মধ্য দিয়ে নিজের স্বার্থ পূরণ করতে। সংগঠিত ধর্মকে যদি রাজনৈতিক অভিব্যক্তিরই একটি অংশ বলে গণ্য করি, তবে থিয়েটার ও রাজনীতি ধর্মীয় পরিসরে আদি থিয়েটারের দিন থেকেই পরস্পর সম্পর্কিত হয়ে আছে। অন্য পণ্ডিতেরা বলবেন, সব কিছুর সূত্রপাত গ্রীসে খুঁজতে যাওয়া কেন? অন্য কোথাও সমান্তরালে বা তার আগেই এদের আত্মপ্রকাশ হয়ে থাকতেই পারে। তর্কের খাতিরে সেই বক্তব্যকে সত্য বলে মেনে নিলেও এটা অনস্বীকার্য যে থিয়েটার ও রাজনীতির পারস্পরিক সম্পর্ক এই একই পথরেখা ধরেই এগিয়েছে। ইংরেজীতে যাকে বলে লাভ এন্ড হেট রিলেশন, সেই যুগপৎ অনুরাগ ও বীতরাগের সম্পর্কেই থিয়েটার ও রাজনীতি সম্পর্কিত হয়ে আছে। কখনো দ্বন্দ্বে কখনো ছন্দে গাঁথা এই সম্পর্ক। সমাজে শ্রেণিশাসন আরো সংহত হওয়ার পর থিয়েটার ও রাজনীতির সম্পর্কটা বিচিত্রধর্মী হয়েছে। কখনো শাসকেরা চেয়েছে থিয়েটারকে রাজনৈতিক প্রয়োজনে নিয়ন্ত্রণে রাখতে বা ব্যবহার করতে, কখনো ভাষাহীন শোষিত থিয়েটারের মধ্য দিয়ে নিজের অবদমিত কথাকে ব্যক্ত করেছে। যারা সরাসরি রাজনৈতিক থিয়েটার না করে বিশুদ্ধ থিয়েটারের চর্চা করে বলে দাবি করে, তারাও জ্ঞাতে বা অজ্ঞাতে যে বিবৃতিটি রাখে সেটিও মর্মবস্তুর দিক থেকে রাজনৈতিকই। বাংলা নাটকে রাজনৈতিক প্রভাব প্রথম লক্ষ করা যায় ১৮৬০ সালে দীণবন্ধু মিত্র কর্তৃক প্রকাশিত "নীল দর্পন" নাটকে। পরবর্তীতে এটা আরও বেগবান হয় চল্লিশের দশকে গণনাট্য সংঘ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার মধ্যে দিয়ে এবং তারা বাংলা নাটকে এক বিপুল পরিবর্তনের নেতৃত্ব দেন অভিনয় থেকে আলোক সজ্জা সব ক্ষেত্রে এবং তার উজ্জল দৃষ্টান্ত নবান্ন, ছেড়া তার, দুঃখীর ইমান সহ আরও অনেক নাটক। বাংলা নাটকের যারা কুশী লব তথা বিজন ভট্টাচার্য, শম্ভু মিত্র, তৃপ্তি মিত্র, ঋত্বিক ঘটক, তুলসী লাহিড়ী এরা সবাই ছিলেন গণ নাট্য সংঘের কর্মী। ১৯৪২ সাল। কিছুদিন আগেই দিনাজপুরের ঠাকুরগাঁ গ্রাম থেকে কলকাতায় এসেছেন তৃপ্তি ভাদুড়ী। ম্যাট্রিকুলেশনের দরজা পার না করলেও নাটকে অভিনয় করা নিয়ে প্রবল আগ্রহ তাঁর। আশুতোষ কলেজে পড়ার সময় গার্লস স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভ্য হয়ে একাধিক নাটকে যুক্ত থাকার সুযোগও হয়েছে। কলকাতায় বড়োমামা সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদারেরও প্রচ্ছন্ন সমর্থন ছিল স্বভাবলাজুক মেয়েটির ভালোবাসার প্রতি। তখন অ্যাসোসিয়েশনের রিহার্সাল হত তাঁর দিদি শান্তিদেবী ও জামাইবাবু অরুণ মিত্রের সদানন্দ রোডের বাড়িতে। শিক্ষক হিসেবে আসতেন শম্ভু মিত্র, বিজন ভট্টাচার্য, শম্ভু ভট্টাচার্য প্রমুখ। কেউই তখন নিজস্ব ক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত নন ঠিকই, তবে ভবিষ্যতের আলোর নিশানা সুস্পষ্ট করে তুলছিল বাংলার সংস্কৃতিচেতনার নতুন পথ। তৃপ্তিও যুক্ত হয়ে পড়লেন তাঁদের সঙ্গে। কোনো এক অনুষ্ঠানে নামতে হল পুরুষের ভূমিকাতেও। অভিনয় চলাকালীন জোরে হাত নাড়তেই শার্টের হাতার ভিতর থেকে রিনিঝিনি করে বেজে উঠল একগোছা চুড়ি। অপ্রস্তুতের একশেষ! কোনোরকমে অভিনয় শেষ করে যেন ঠিক করলেন, আর কোনোদিন মঞ্চে না উঠতে পারলেই বাঁচেন। ঠিক তার পরের বছরেই তাঁকে দেখা যাবে ফ্যাসিবিরোধী লেখক শিল্পী সংঘের ‘আগুন’ নাটকে। নাটককার ও পরিচালক বিজন ভট্টাচার্য। ততদিনে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে পড়েছেন এ.আর.পি-র কাজে। সময়টাও ভারতের পক্ষে অনুকূল নয়। একদিকে স্বাধীনতা আন্দোলন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, অন্যদিকে ‘পঞ্চাশের মন্বন্তর’-এ ছারখার হয়ে যাচ্ছে গোটা বাংলা। পড়াশোনা বন্ধ রেখে ঝাঁপিয়ে পড়লেন দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধের লড়াইয়ে। গ্রাম ফেলে চলে আসা সহায় সম্বলহীন কৃষকদের জন্য জীবন উৎসর্গ তাঁর। আসলে কোথাও যেন একটা অস্পষ্ট মিল ছিল নিজের জীবনের সঙ্গেও। পিতা আশুতোষ ভাদুড়ি যখন যক্ষারোগগ্রস্ত, পরিবাবের মুখে খাবার জোটে না, সেই অনিশ্চিত দিনগুলিতেই এক কিশোরী বালিকা চলে এসেছিলেন কলকাতার অচেনা পরিবেশে। চুপ করে সম্পূর্ণ করতেন নিজের কাজটুকু। এতটাই নীরব হয়ে থাকতেন, যাতে সত্যেন্দ্রনাথের মনে হয়েছিল ‘মেয়েটি কি বোবা নাকি?’ এই আশঙ্কা আর নিরাপত্তাহীনতা যেন আজীবন সঙ্গী থেকেছে তাঁর, প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে অনেকে সিদ্ধান্তে। ১৯৪৪ সালে অভিনীত হল গণনাট্য সংঘ প্রযোজিত বিজন ভট্টাচার্যের নাটক ‘নবান্ন’। যুগ্ম পরিচালক বিজন ভট্টাচার্য ও শম্ভু মিত্র। বাংলা থিয়েটারের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া এই নাটকে বিনোদিনীর চরিত্রে অভিনয় করেন তৃপ্তি ভাদুড়ী। আমিনপুর গ্রাম থেকে খাদ্যের সন্ধানে কলকাতায় আসা এক পরিবারের সরল বালিকা বধূ সে। সন্তানসম মাখনকে কেড়ে নিয়েছে দুর্ভিক্ষ, নিজে ভুল পথে চলেছে জনৈকের ‘টাউট’-এর পাল্লায় পড়ে। এসব কি নিছকই অভিনয়? না, বরং জীবন থেকে, অভিজ্ঞতা থেকে খুঁজে পেয়েছিলেন অভিনয়ের প্রতিটি দৃষ্টিকোণ। মন্বন্তরের কলকাতার ‘ফ্যান দাও’ ধ্বনি ক্রমাগত বেজে চলত নাটকের মঞ্চে। প্রতিটি অবস্থাসম্পন্ন পরিবারের দরজার সামনে, বলা ভালো নর্দমার সামনে হাড় জিরজিরে মানুষের ভিড়। নর্দমা থেকে বেরিয়ে আসা উচ্ছিষ্ট ফ্যানের জন্য অশক্ত শরীরে নিজেদের মধ্যে লেগে যেত মারামারি। একদিন উপরের ঘরের জানলা থেকে প্রত্যক্ষ করলেন সেরকমই এক ঘটনা। সেদিন কাঁদতে পারেননি তিনি, কিন্তু পালটে গেছিল জীবনধারা। হয়তো কিছু করার নেই, সামর্থ্যই বা কতটুকু? তবু থিয়েটারকে সম্বল করে যে পথটুকু হাঁটা সম্ভব, সেই পথই বেছে নেন তিনি। থিয়েটারের মধ্যেই খুঁজে পান বাঁচার রসদ। গণনাট্যের উত্তাল দিনগুলি পার করে চলে আসেন ‘বহুরূপী’-তে। ১৯৪৫-এ শম্ভু মিত্রের সঙ্গে বিবাহসূত্রে হন তৃপ্তি মিত্র। রবীন্দ্রনাথের ‘চার অধায়’ উপন্যাসের এলা চরিত্র থেকে ‘রক্তকরবী’-র নন্দিনী হয়ে ‘পুতুল খেলা’-র বুলু—সর্বত্র সাক্ষ্য রেখেছেন অপরিসীম অভিনয় প্রতিভার। ‘বহুরূপী’ থেকে সরে এসে তৈরি করেন নিজস্ব ‘আরব্ধ নাট্যবিদ্যালয়’। আবার ‘অপরাজিতা’ নাটকে একা অভিনয় করেছিলেন আঠারোটি চরিত্রে। আসলে তৃপ্তি মিত্রের সঙ্গে হয়তো বহুভাবে জড়িয়ে যায় শম্ভু মিত্রের নাম। আশ্চর্যময়ী তৃপ্তি মিত্রের ওপরে বিশিষ্ট কবি অরুণ মিত্রের লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিল শ্রী মিত্রেরই লেখা 'পথের মোড়ে' (১৯৯৬) গ্রন্থে। অরুণ মিত্র ব্যক্তিগত আত্মীয়তার সম্পর্কের নিরিখে কিশোরীবেলা থেকে দেখেছেন তৃপ্তিকে — দেখেছেন তাঁর ক্রমশ উত্তরণ। দেখেছেন গণনাট্য সংঘের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ, অভিনয় জীবনে জড়িয়ে পড়া। এই অভিনয়কে কেন্দ্র করেই বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব শম্ভু মিত্রের সঙ্গে তাঁর পরিণয় — পরবর্তীকালে 'বহুরূপী'র এক অনন্যসাধারণ অভিনেত্রী হয়ে ওঠা। তবে তৃপ্তি মিত্রের নিজস্বতা, তাঁর বিশেষ বাচনভঙ্গি ও কণ্ঠস্বর তাঁর অভিনয়কে এক বিশেষ শৈলী দিয়েছিল। এই লেখার এক জায়গায় শ্রী মিত্র বলেছেন — "তার কণ্ঠের ও বাচনের তীব্রতা এবং শিথিলতা প্রায়ই আমার ভেতরটাকে একইভাবে দুমড়ে-মুচড়ে দিত এবং আমার পাষাণ চোখেও জল টেনে আনাত।" হ্যাঁ, শ্রী মিত্রের লেখাতে আমরা এই বিশিষ্ট অভিনেত্রীর ডাকনামটি জানতে পারি — "মণি"। নামটি সার্থক, সর্ব অর্থেই। ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণায় কবি অরুণ মিত্র আমাদের জানিয়েছেন — "অভিনয়ের অনুধ্যানে অমন সার্বিক আত্মনিয়োজন আমি আর দেখি নি।" বাস্তবিকই, নাটকের প্রতি তাঁর ভালবাসা ও নিষ্ঠা তৃপ্তি মিত্রকে তাঁর জীবনের অন্য এক সফলতার শীর্ষদেশের দিকে নিয়ে গেছে — যেখানে ব্যক্তিগত অভাববোধ বা সমস্যা তেমন ছায়া ফেলতে পারে নি। তবে জীবনের শেষ পর্যায়ে শারীরিক অসুস্থতা অভিনেত্রীকে টেনে নিয়ে গেছে যন্ত্রণা আর কষ্টের আবর্তে। স্বল্প পরিসরে সুলিখিত এই রচনা 'মণি'-আশ্চর্যময়ীদের অলঙ্কারে হীরকদ্যুতির মতো।



নবান্ন নাটকে ছোট বউ বিনোদিনী, ‘ছেঁড়া তার’এ ফুলজান বিবি, ‘বিসর্জন’এ গুণবতী, ‘ওয়াদিপাউস’এ ইয়োকান্তে,কাঞ্চনরঙ্গে তরলা, ‘বাকি ইতিহাস’এ কণা, ‘চোপ আদালত চলছে’তে বেনারে, পুতুল খেলায় বুলু ও ‘রাজা’ নাটকে রাণী সুদর্শনা প্রভৃতি স্মরণীয় চরিত্র সৃষ্টি করেছিলেন তৃপ্তি মিত্র। তবু তৃপ্তি মিত্র বাঙালি নাটকপ্রিয় দর্শকের কাছে নন্দিনী চরিত্রের জন্য কিংবদন্তী হয়ে আছেন। তিনি নন্দিনী চরিত্রে এতটাই আলোচিত ও প্রসংশনীয় যে পরবর্তীকালে অন্য কোনো অভিনেত্রীর পক্ষে সেই উচ্চতায় পৌঁছানো কঠিন ছিল। তাঁর অভিনয়ের মধ্যে ছিল স্নেহ, তেজ, এবং প্রাণোচ্ছল ভালোবাসা, যা দর্শকদের মুগ্ধ করে রাখতো। 'রক্তকরবী' নাটকের 'নন্দিনী' চরিত্রটি তৃপ্তি মিত্রের কিংবদন্তী অভিনয়ের প্রতীক হয়ে আছে। বহু লেখায় জেনেছি `রক্তকরবী` রচনার পর থেকে আজ পর্যন্ত যতবারই নাটকটি মঞ্চস্থ করার আয়োজন হয়েছে ততবারই বিপদে পড়তে হয়েছে। কারণ সব চরিত্রের জন্য উপযুক্ত কাউকে পাওয়া গেলেও নন্দিনী চরিত্রের জন্য খুঁজে পাওয়া ভার। কবিগুরু যেভাবে চরিত্রের বর্ণনা দিয়েছেন তার সঙ্গে মিলিয়ে শিল্পী খুঁজে পাওয়া মুশকিল। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ নিজেই এই সমস্যায় পড়েছিলেন। রচনার পর ``রক্তকরবী`` মঞ্চায়ন করতে গিয়েছিলেন তিনি। অভিনয়ের জন্য সব চরিত্র তিনি চূড়ান্ত করেছেন। শুধু বাকি নন্দিনী। নন্দিনী চরিত্রের মতো কাউকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। অনেক খোঁজাখুঁজির পর অবশেষে একটি মেয়ে পাওয়া গেল, যে নন্দিনী হতে পারে। মেয়েটি সিলেটের। রবীন্দ্রনাথ নিজেই তাকে নন্দিনী হিসেবে চূড়ান্ত করেছিলেন। নাম না জানা সেই মেয়েটিই আমাদের প্রথম নন্দিনী। কলকাতার বাঘা বাঘা অভিনেত্রী থাকতে সিলেটের সেই তরুণীই রবীন্দ্রনাথের চোখে প্রকৃত নন্দিনী হয়ে উঠেছিলেন। যদিও রবীন্দ্রনাথ তার জীবদ্দশায় রক্তকরবী মঞ্চস্থ করতে পারেননি। তাহলে একবার ভাবো সেই নন্দিনী হয়ে তৃপ্তি মিত্র কিংবদন্তী হয়ে গেছেন।



অভিনয়ের ক্ষেত্রে রক্তকরবী কেন অনন্যতার মর্যাদা পেয়েছিল, যদিও তার আগে রবীন্দ্রনাথের চার অধ্যায় অভিনীত হয়েছে, তবু তাতে স্বল্পসংখ্যক অভিনেতা কাজ করেছিলেন। রক্তকরবী নাটকে চরিত্রের সংখ্যা অনেক বেশি এবং প্রায় সব চরিত্রই উচ্চমানের অভিনয় দাবি করে। আর চার অধ্যায় নাটকের কাহিনির চেয়ে রক্তকরবীর কাহিনি আলাদা, তার সংলাপের ধরনও পৃথক। রক্তকরবীর মঞ্চ, আলো, আবহ, পোশাকভাবনা, অভিনয় এবং সর্বোপরি নাট্য-উপস্থাপনার অনন্যতা মানুষকে নিয়ে যেত শিল্প-অভিজ্ঞতার সেই স্তরে, যেখানে সচরাচর কেউ পৌঁছতে পারে না। রক্তকরবীর মঞ্চায়ন শুধু রবীন্দ্রনাটকেই নয়, বাংলা নাটকেও নবীন মাত্রা সঞ্চার করেছিল। বহুরূপীর প্রযোজনাটি কতটুকু বিন্যাসে রাবীন্দ্রিক আর অর্থযোজনার দিক থেকে কতটুকু রবীন্দ্রানুসারী, এ নিয়ে এক সাংস্কৃতিক ঝড়ই বয়ে গিয়েছিল, কত রকমের সমালোচনাই না হয়েছে পক্ষে আর বিপক্ষে। বিরোধিতা এতটাই তীব্র হয়ে উঠেছিল যে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ও তার সরকারের সমালোচনা করার উদ্দেশ্য নিয়েই এই প্রযোজনা – এ-কথা দৃঢ়তার সঙ্গে উচ্চারিত হয়েছিল। এতে বহুরূপী গোষ্ঠী বিমূঢ় বোধ করলেও এর মঞ্চায়ন থেকে সরে আসেনি। বরং দিল্লিতে মঞ্চায়নকালে জওহরলাল নেহরু সংসদ অধিবেশন থেকে ছুটে এসেছিলেন বহুরূপীর রক্তকরবী দেখতে। তিনি শুধু পছন্দই করেননি, রীতিমতো প্রীতিবোধ করেছেন। বহুরূপীর এই দিল্লি বিজয়ের পর অব্যাহত ধারায় ১৯৭৫ সালের ২৬ নভেম্বর পর্যন্ত এর অভিনয় হয়েছে। কলকাতা তো বটেই, দিল্লি, মুম্বাই, এলাহাবাদ এবং বিদেশ থেকে সুনাম কুড়িয়েছিল।



আমি ঠিক বুঝিনা কিন্তু প্রায়শ মনে হয় আজ তোমাকে লিখতে গিয়ে আরো বেশি করে মনে হচ্ছে তৃপ্তি মিত্র তাঁর প্রতিভা ও কাজের যথাযথ সম্মান পাননি, আলোকিত ও স্মরণীয় হবার সবরকম বিশেষত্ব থাকার পরেও তিনি বিস্মৃত কেননা তিনি প্রথমত নারী, দ্বিতীয়ত শম্ভু মিত্রের স্ত্রী, তৃতীয়ত শাঁওলি মিত্রের মা এবং সর্বোপরি তিনি নারী! শম্ভু মিত্রকে কোনভাবেই ছোট না করে আমি তৃপ্তি মিত্রকে দেখতে পাই শম্ভু মিত্রের পাশে কোন কোন ক্ষেত্রে শম্ভু মিত্রের আগেও। আমি কারো অভিনয়ই সরাসরি দেখিনি কিন্তু শম্ভু মিত্র যত ভালোই অভিনেতা হোন তিনি তৃপ্তি মিত্রকে অতিক্রম করতে পারেননি। এই প্রসংগে মনে করতে পারি দুজনের বিবাহ বিচ্ছেদ, প্রধান কারণ ছিল তাঁদের পেশাগত জীবনে সৃজনশীল মতপার্থক্য এবং মতাদর্শগত সংঘাত। তাঁদের বিচ্ছেদ ব্যক্তিগত জীবনের চেয়ে তাঁদের অভিনীত নাটক ও নাট্যদল 'বহুরূপী'-র অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের সঙ্গেই বেশি জড়িত ছিল। শিখরস্পর্শী স্ত্রী অভিনেত্রী তৃপ্তির সঙ্গে বিচ্ছিন্নতা। এ কি ছিল কেবল ব্যক্তিত্বের সংঘাত কিংবা পঠন-পাঠন অভিজ্ঞতা ও অভিনয়ে অনন্য দুই নাট্যব্যক্তিত্বের দ্বন্দ্ব? এই মুহূর্তে স্পষ্ট করে কিছু বলা সম্ভব নয়। বাংলা নাটকে অভিনয়কুশলতা ও নবনাট্যের বোধ ও আদর্শ সঞ্চারিত করার জন্য এই দম্পতি জীবনের প্রারম্ভে ও মধ্যপর্যায়ে যে-অবদান রেখেছিলেন সংসারের সকল দাবিকে অগ্রাহ্য ও তুচ্ছ করে, তার বিশাল মূল্য রয়েছে। দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতা সত্ত্বেও দেখা যায়, তৃপ্তি মিত্র যখন কর্কট রোগে ধ্বস্ত এবং মৃত্যুর অতল অন্ধকারের মুখোমুখি শম্ভু মিত্র কত না প্রেমে তাঁকে সঙ্গ দিয়েছেন, স্বপ্ন ও অতীতকাতরতায় প্রাণিত করতে চেয়েছেন। এই মানবিকতা প্রকাশ শম্ভু মিত্রের পক্ষে আগে সম্ভব ছিল না। কেননা তিনি তৃপ্তি মিত্রের খ্যাতি ও নাট্যজ্ঞানের কাছে হারিয়ে যাবার ভয় পেতেন এক পুরুষ হিসেবে। শম্ভু মিত্রের স্বেচ্ছানির্বাসনের যে-বিবরণ পাই তা খুবই কৌতুককর এবং নানা অনুষঙ্গভরা এক বিবরণ। তাঁর অন্তিম জীবনের খুঁটিনাটি এবং দাম্পত্য জীবনে তৃপ্তির সঙ্গে বিচ্ছিন্নতা বহুরূপীর নির্মাণ ও সৃষ্টির পথকে কণ্টকময় করে তুলেছিল – নির্দ্বিধায় এ-কথা তো বলাই যায়। বিনোদিনী দাসীর আত্মজীবনী 'আমার কথা'য় থিয়েটারের মালিক, পরিচালক এবং পৃষ্ঠপোষকরা প্রায়শই নারী শিল্পীদের ব্যক্তিগত জীবনে শোষণের এক নির্মম দলিল, যেখানে দেখা যায় পুরুষরা তাঁদের প্রতিভা ব্যবহার করলেও সামাজিক সম্মান বা স্থায়ী স্বীকৃতি দেননি। বিনোদিনী দাসী থেকে হালের নারী অভিনয় শিল্পীর জীবনে সেই অবস্থার কি খুব পরিবর্তন এসেছে? আমার তো মনে হয়না।



বেলা গড়িয়ে গেছে কখন বুঝতেই পারিনি। আজ আর লিখছিনা আচ্ছা ঋত্বিক ঘটককে তুমি কিভাবে দেখো তোমার চোখে মননে মানুষটি কেমন জানার ইচ্ছে রইলো। কখনো সময় সুযোগ হলেও জানিও।



নিরন্তর ভালো থেকো…

সুস্মি

১৪ ডিসেম্বর, ২০২৫
0

ধারাবাহিক - রঞ্জন রায়

Posted in




















২৪.২

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে জোট-নিরপেক্ষ থাকার সমস্যাগুলো আমরা কোনরকমে রয়েসয়ে পার করেছি। কারণ এই কায়দায় আমরা অনেক সমস্যা এড়াতে পেরেছি। কিন্তু রামনগরওলাদের অহংকার ছিল যে ওরা নিজেদের ভাল-মন্দ নিজেরাই বুঝে নেবে। সমস্যা এড়াবে না। দেখতে দেখতে গোটা গ্রাম দুইদলে বিভক্ত হয়ে গেল। এক দল রিপুদমনের হাত দিয়ে জমির ভাগ -বাঁটোয়ারা করাতে চায়। অন্যদলের বিশ্বাস এ’বিষয়ে শত্রুঘ্ন সিং বেশি পটু।

ভোটের দিন এগিয়ে এসেছে, মাত্র দু’দিন বাকি। দু’দলের শিবিরে সাজ-সরঞ্জাম দেখা যাচ্ছে। লোকজন গলা ফাটিয়ে চেঁচাচ্ছে-‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’! আবার চলছে একে অন্যের মা-বোনের সঙ্গে সম্পর্ক পাতানোর কথা, নিজেদের লাঠিগুলোকে তেল চুকচুকে করা, বর্শা ও বল্লমের ফলা মেজে-ঘষে চকচকে করে হাতলে লাগিয়ে নেয়া, আর সেই হাতেই গাঁজার ছিলিম কষে ধরা।

এতসব হয়ে যাওয়ার পর রিপুদমন তার ভাই সর্বদমনকে ডেকে ভালমানষের গলায় বলল—দেখ ভাই, যদি এই লড়াইয়ে আমার জান চলে যায় আর তার সঙ্গে আমার সাথী আরও জনা পঁচিশের, তখন তুমি কী করবে?

সর্বদমন সিং ওকালতি পাশ করেছে বটে, তবে একসময় অনেক বড় বড় উকিল, বিলেত ফেরত ‘বালিস্টার’ ওকালত ছেড়ে রাজনীতিতে যোগ দিয়েছিলেন। সর্বদমন তাঁদের পদচিহ্নে চলে বছর চার আগে নিজের প্র্যাকটিস ছেড়ে স্থানীয় রাজনীতির আখড়ায় নেমে পড়েছে। তফাৎ একটাই।

স্বাধীনতা সংগ্রামের যুক্ত হওয়া অনেক উকিলের ভরণপোষণ কীভাবে চলত তার হদিস আম জনতা পেত না। কিন্তু সবার ভাল ভাবে জানা আছে যে সর্বদমনের আমদানি কোত্থেকে হয় । আর তাতে লোকের চোখে ওর সম্মান বেড়ে গেছল।

যেমন, ওর কাছে দশটা হ্যাজাক বাতি আছে যা বিয়েশাদিতে ভাড়া খাটে। এছাড়া ওর রয়েছে দুটো বন্দুক, যা ডাকাতির সীজনে ভাড়া খাটে। সব মিলিয়ে সর্বদমনের যা আমদানি হত তাতে খাওয়া-পরার কষ্ট ছিল না। তাই ও নিশ্চিন্ত হয়ে গ্রামীণ রাজনীতির কলকাঠি নাড়তে পারত। গ্যাসবাতি আর বন্দুক ভাড়ায় অনেক দূর অব্দি পাঠানো হত। এভাবে সর্বদমনের কত যে বিস্তৃত এবং গভীর সামাজিক সম্পর্কের জাল ছড়িয়ে গেছল—তা বলা মুশকিল। তার আত্মবিশ্বাসের ঝলক সর্বদমনের কথাবার্তায় চালচলনে ফুটে উঠত।

ভাইয়ের কথার উত্তরে সর্বদমন মেপেজুকে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলল—“ভাই, যদি লড়াইয়ে তুমি ও তোমার পঁচিশ জন মারা পড়ে, তবে ওদের শিবিরেও শত্রুঘ্ন সিং এবং তার জনা পঁচিশ মরবে, এটা নিশ্চিত জেনো। তারপরে তুমি যা বলবে তাই করব’খন।

একথা শোনার পর রিপুদমন সর্বদমনকে জড়িয়ে ধরে কাঁদার চেষ্টা করল। কিন্তু ইচ্ছে হলেই কেঁদে ফেলা—সেটা শুধু অভিনেতা বা নেতারা পারে। বলতে চাইছি—অভ্যাস নেই, তাই রিপুদমনের কান্নার চেষ্টা বিফল হল। সর্বদমন ধীরে ধীরে ভাইয়ের আলিঙ্গন-মুক্ত হয়ে বলল, -- এসব ছাড়ো; বলে দাও পঁচিশের বদলার হিসেব পুরো করে তারপর কী করা যায়?

রিপুদমন বলল—ধরে নাও দুদিকে লাশের সংখ্যা সমান সমান। তখন যদি ফের ভোট হয় আর তুমি গ্রামসভার প্রধান হতে চাও, তাহলে?

সর্বদমন কাগজ পেন্সিল নিয়ে বসে গেল। হিসেব টিসেব করে বলল—দাদা, তুমি আর শত্রুঘ্ন সিং যদি পঁচিশ পঁচিশজন সমেত মরে যাও, তো কিসের চিন্তা? আমার তরফের যেই দাঁড়াক, সে অন্য তরফের চেয়ে পঁচাশ ভোট বেশিই পাবে। কারণ, এতসব হওয়ার পরে গ্রাম থেকে ওদের হয়ে জানের বাজি লাগিয়ে ভোট দিতে আসা লোক খুব বেশি হলে পঁচিশ হবে। আর আমার পক্ষে ভোটার বেরোবে চল্লিশ বা তারও বেশি।

এখন ওদের পঁচিশজন মারা যাওয়ার মানে ওদের পুরো মহল্লা খালি। আর আমাদের পঁচিশ জনে চলে গেলেও বাকি খালি মাঠে আমার কম সে কম পনেরজন তো টিকে থাকবে।

ভোটের তিন দিন আগে রিপুদমন সাব -ডিভিসনাল ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে এক দরখাস্ত দিল, যার সারঃ

--শত্রুঘ্ন সিং ও তার পঁচিশজন লোকের থেকে রিপুদমনের নিজের জীবন ও সম্পত্তির উপর আক্রমণের আশংকা। এছাড়া ভোটের দিন শান্তিভঙ্গ হওয়ারও সম্ভাবনা। পুলিশ দরখাস্তকে নথিবদ্ধ করল। এবার শত্রুঘ্ন রিপুদমন এবং তার লোকজনের বিরুদ্ধে পালটা নালিশ করল। পুলিশ এই নালিশও নথিবদ্ধ করল।

ভোটের একদিন আগে দুই প্রার্থী এবং তাদের পঁচিশ জন করে সমর্থকের ম্যাজিস্ট্রেটের কোর্টে ডাক পড়ল।

ম্যাজিস্ট্রেট্‌, আইনের বই অনুযায়ী, শত্রুঘ্ন আর তার লোকজনের থেকে জামিন এবং মুচলেকা চাইল। ওরা এ বিষয়ে দেবে কিনা ভাবতে লাগল। তারপর উনি রিপুদমন আর তার দলের থেকেও ওইরকম জামিন ও মুচলেকা চাইলেন।

রিপুদমন বলল—“হুজুর, আমরা ওসব দেব না। আমার কথাটা মনে রাখবেন—কাল আমার গাঁয়ে পাইকারি হারে নরসংহার হবে। বড় বড় জমানতদাররাও শত্রুঘ্ন এবং তার গুণ্ডাদের দাঙ্গা করার থেকে আটকাতে পারবে না। আমরা হলাম সাধাসিধে চাষি। কেমন করে ওদের মোকাবিলা করব? তাই আমাদের জামিনের অভাবে কৃপা করে হাজতে আটকে রাখুন—প্রাণটা তো বাঁচবে! আর আমার বংশের যে দু’চারজন বাড়িতে থেকে যাবে ওদের রক্ষা করার বন্দোবস্ত করে দিন”।

পুলিস এই বক্তব্যও রেকর্ড করল।

শেষে ম্যাজিস্ট্রেট রায় দিলেন যে ভোটের দিন যখন রিপুদমন সিং ও সাথীরা হাজতে থাকবে, তখন শত্রুঘ্ন সিং পার্টিরও জামানত হবে না। ওরাও হাজতে থাকবে।

এই ভাবে দুই প্রার্থী ও তাদের পঁচিশ পঁচিশ জন লোক কিছুদিনের জন্য মরে গেল। আর নির্বাচন খুব শান্ত ও সভ্য বাতাবরণে অনুষ্ঠিত হল। তবে দুই দলের তুলনামূলক দক্ষতার হিসেব করে দেখা গেল শত্রুঘ্নের লোকজন কোন কাজের নয়। বোঝাই গেল না ওর সমর্থক বলতে কেউ গাঁয়ে টিকে আছে কিনা। ওদিকে রিপুদমনের পক্ষ থেকে সর্বদমন নির্বাচনে দাঁড়াল। কারণ পুলিশের খাতায় ওর নাম নেই অথচ, আইনের ডিগ্রি আছে, অতএব শান্তিপ্রিয় মানুষ। তাই ওকে হাজতে পোরা হয় নি। ও কোমর কষে ভোটে লড়ল এবং ফল ওটাই হোল যা ও কয়দিন আগে কাগজ পেন্সিলে আঁক কষে দেখিয়েছিল।

ভোটে জেতার এই কায়দা রামনগরের নামে পেটেন্ট হল।


নেবাদা কায়দাটা একটু আদর্শবাদী ধাঁচের।

ওখানে নানান জাতির লোক ভোটে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু মুখ্য প্রতিদ্বন্দ্বী দু’জন—যাদের ঋগ্বেদের পুরুষ সূক্তে ক্রমশঃ ব্রহ্মের মুখ এবং পাদদেশ বলা হয়েছে। আজকের ভাষায় বললে—এ হল ব্রাহ্মণ ও হরিজনের সংঘর্ষ। কিন্তু নেবাদায় এই মামলা বেশ সাংস্কৃতিক, প্রায় বৈদিক পদ্ধতিতে পেকে উঠল।

ব্রাহ্মণ ক্যান্ডিডেট সবর্ণদের মধ্যে ঋগ্বেদের পুরুষ-সূক্তটি কয়েক বার আউড়ে বুঝিয়ে দিল যে পুরুষ-ব্রহ্মের মুখ ব্রাহ্মণ ছাড়া কেউ নয়, আর শূদ্র হল পা। প্রধান পদের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে বলা হল এই কাজটির জন্য দরকার বুদ্ধি এবং বাণী যা মাথায় থাকে, পায়ে কদাপি নয়। আর মুখ হল সেই মাথারই অঙ্গ। অতএব, ব্রাহ্মণেরই প্রধান হওয়া উচিত, শূদ্রের নয়।

ব্রাহ্মণ প্রার্থী শূদ্রের নিন্দা করতে প্রচলিত গালিগালাজ না করে বেশ সাংস্কৃতিক কায়দায় প্রচার করতে লাগল। ও সমঝোতার ঢঙে এটাও মেনে নিল যে রোদেজলে দৌড়োদৌড়ি করতে মজবুত পায়ের দরকার। তাই পঞ্চায়েতের চাপরাশির পদ শূদ্রেরই প্রাপ্য। কিন্তু প্রধান বা মোড়লের পদের জন্য শূদ্র প্রার্থী? এটা বেদবিরুদ্ধ। কিন্তু যা হয় আর কি, এসব সাংস্কৃতিক কথাবার্তা সাধারণ গ্রামবাসী মেনে নিল না। বাধ্য হয়ে ব্রাহ্মণ প্রার্থীটি প্রচারের কায়দা বদলে নিলেন—মাথার চেয়ে মুখের ব্যবহার বেশি করতে লাগলেন। আর ওনার চ্যালারা মুখটা আরও খুলে প্রচার শুরু করল। অল্প দিনেই ব্যাপারটা সেই পুরনো কায়দায় ফিরে গেল। যেমন,-- বল বিক্রম সিং, তুমি কি আমাকে ছেড়ে ওই চামার ব্যাটাকে ভোট দেবে?

দেখতে দেখতে ব্রাহ্মণ প্রার্থীর মেহনতে গ্রামে গালিগালাজের উগ্র বাতাবরণ তৈরি হল এবং হঠাৎ একদিন উনি পুরুষ-সূক্তের ওই ঋচাটির সঠিক মানে বুঝতে পারলেন—যাতে শূদ্রকে পা বলা হয়েছে।

এক জায়গায় ওঁর দলের একজন শান বাঁধানো আঙিনায় বসে ভোটের প্রচার করছিল। মানে অন্য প্রার্থীর নাম করে খোলাখুলি গাল দিচ্ছিল। ওই ধারাবাহিক গালির ফোয়ারার মাঝখান থেকে একটি কেন্দ্রীয় প্রশ্ন বারবার উঠে আসছিলঃ “বল ঠাকুর কিসন সিং, তবে কি তুমি ওই---কে ভোট দেবে”?

ও তো ওখানে বসে লাগাতার বলেই যাচ্ছিল। হটাৎ ওর মুখে কথা আটকে গেল, পুরো হল না। ও কমরে এমন জোরে আঘাত পেল যে মুখ থেকে ‘তাত, লাত রাবণ মোহিঁ মারা’ (বাবা, রাবণ আমায় লাথি মেরেছে) বলার মত অবস্থাও রইল না। ও শান-বাঁধানো চবুতরা থেকে নীচে পড়ে গেল। তখনই আরও দশটা লাথি! যখন চোখ খুলল তখন ওর মনে হল—সংসার এক স্বপ্ন বটে, আর মোহ-নিদ্রা ভেঙে গেছে। এমন ঘটনা আরও কয়েকটি ঘটে যাবার পর ব্রাহ্মণ প্রার্থী বুঝতে পারলেন পুরুষ-ব্রহ্মের মুখ আর পায়ের দূরত্ব খুব বেশি নয়।

এর সার তত্ত্ব হলঃ যেখানে বেশি মুখ চালালে জবাবে লাথি চলতে থাকে, সেখানে মুখ না খুললেই মঙ্গল।

এই গবেষণার ফল ব্রাহ্মণ প্রার্থীকে মুশকিলে ফেলল। এমন সময় ওর বিপদতারণ কর্তায এক বাবাজীর আবির্ভাব হোল। ইনি সেই জাতের বাবাজি যাঁরা বিপদগ্রস্ত চাষি থেকে বড় থেকে বড় আধিকারিক, নেতা এবং ব্যবসায়ীর ভিড়ের মধ্যে সহজেই নিজের উপযুক্ত ভক্তটিকে চিনে নেন।

ঘটনা ঘটল ‘বত্রিশ সিংহাসন’ এবং ‘বেতাল পঞ্চবিংশতি’ স্টাইলে।

একদিন সেই ব্রাহ্মণ প্রার্থীটি, মুখের ভাষা সংযত হওয়া সত্ত্বেও, পুরুষ-ব্রহ্মের পায়ের লাথি খেয়ে মাটিতে গড়াগড়ি গেলেন। তারপর কী ভাবে গ্রামসভার মোড়লের পদটি চামার-ব্যাটার ছোঁয়া বাঁচিয়ে ব্রাহ্মণের অধীন করা যায় সে বিষয়ে ভাবছিলেন। এইসব ভাবনা চিন্তার স্থান হল গ্রামের বাইরে একটা শান বাঁধানো কুয়োর পাড়ে সাঝেঁর বেলায় ‘নীলাঞ্জনছায়া’ তলে এক বটগাছের কাছে । চোখে পড়ল গাছের নীচে আগুনের ফুলকি আর গম্ভীর আওয়াজে শোনা গেল মহাদেবের কিছু বিশেষণ।

উনি টের পেলেন নিঘঘাৎ গাছের নীচে কোন বাবাজি ধুনি জ্বালিয়ে বসেছেন।

ঠিকই বুঝেছিলেন। বাবাজী কৈলাসপতি ভোলে শংকরের নাম নিচ্ছিলেন আর গাঁজায় দম দিচ্ছিলেন। লোকে দুখী হোক না হোক, সামনে কোন বাবাজী দেখলে সোজা সাষ্টাংগ দণ্ডবৎ হয়ে যায়। এখানে তো ব্রাহ্মণ -প্রার্থীটি নিতান্ত দুঃখের সাগরে গোঁতা খাচ্ছিলেন আর সামনে এক বাবাজীর আবির্ভাব! ব্যস, উনি কিছু না ভেবেই সোজা বাবাজীর পায়ে পড়লেন আর কাকুতি মিনতি করতে লাগলেন।

বাবাজীর জীবনে এমন সুযোগ বহুবার এসেছে। উনি পুরনো অনুভবের জোরে প্রার্থীকে অভয়দান করে বললান যে বেটা, ঘাবড়িও না। যদি তোমার অসুখটি স্বপ্নদোষ বা শীঘ্রপতন অথবা ছোটবেলার উল্টোপাল্টা কাজের ফলে উৎপন্ন নপুংসকতা হয়ে থাকে, তাহলে ভরসা রাখো। আমার দেয়া টোটকার জাদুতে তুমি একহাজার নারীর মান-মর্দন করতে পারবে। কিন্তু ব্রাহ্মণ প্রার্থীটি দু’দিকে মাথা নেড়ে না করে দিলেন! তখন বাবাজী বললেন যে এটাএকটা গোপনীয় টোটকা। এর জোরে তুমি বাজীমাৎ করার ওস্তাদ তো হবেই, তাছাড়া এটাকে ওষুধ বানিয়ে বিক্রি শুরু করলে দেখতে দেখতে ক্রোড়পতি হয়ে যাবে।

কিন্তু কোন লাভ হোল না। প্রার্থীটি মাথা নাড়ছে আর হাপুস কান্না জুড়েছে। বাবাজি একটু অবাক হয়ে ওকে খোঁচাতে লাগলেন। তখন ও মুখ খুলল—আমি এক হাজার স্ত্রীলোকের মান-মর্দন করতে চাইনে। আমার কাজটা সহজ, শুধু এক ব্যাটা চামারের মানমর্দন করা।

বাবাজী ব্রাহ্মণ প্রার্থীটির সব কথা শুনলেন, ওকে আশ্বস্ত করলেন; তারপর গাঁজার কলকেটি ঝোলায় পুরে নকল জটায় খানিক ধুলো মাখিয়ে বসতির দিকে রওনা দিলেন। উনি গ্রামে গিয়ে এক মন্দিরের সামনে ডেরা জমিয়ে বসে গেলেন। তারপর কবীর, রামানন্দ থেকে শুরু করে গুরু গোরখনাথ থেকে এমন এমন কাহিনী শোনাতে লাগলেন যার শেষ কথা হল—লোকের জাতপাত জেনে কী হবে, হায়! যে হরিকে ভজনা করে সে হরির আপন হয়ে যায়।

এই ‘হরি’ যে কী জিনিস, সেটার পরিচয়ও লোকে সেদিন সন্ধ্যে থেকেই বুঝে ফেলল। একটা ছিলিমে গাঁজার টুকরো রাখা হোল, যার উপর আগুন ঠুঁসে দেয়া হল। ওটাকে মুখে নিয়ে গাল খিঁচে দম লাগিয়ে ক্রমাগত ফুঁয়ের জোরে আগুন জ্বলে উঠল এবং নিভল। এক নিঃশ্বাস থেকে পরের নিঃশ্বাস নেয়ার ফাঁকে ফাঁকে মহাদেবের নাম নানা ভাবে এবং নানা অর্থে নেয়ার পালা চলতে লাগল। ওই ছিলিমটি উপস্থিত ভক্তজনের মধ্যে এদিক থেকে ওদিক হাতে হাতে ঘুরতে লাগল। ভক্তগণ বুঝে গেল যে এই হল ‘হরি’!

বাবাজীর দরবারে আটচল্লিশ ঘন্টা অখন্ড নাম-সংকীর্তন চলে। যে গাঁজা খায় না, তার জন্যে ভাঙের বন্দোবস্ত আছে। যতক্ষণ কীর্তন চলে ততক্ষণ শিল নোড়াও চালু। হার্মোনিয়াম বাজতে থাকে এবং রাধাকৃষ্ণ ও সীতারামের খোসামোদ করতে এমন এমন গান গাওয়া হয়, যার সামন সিনেমার হিট গানও হার মেনে যায়।

উদাহরণঃ

“লেকে পহেলা পহেলা প্যার, ভরকে আখোঁ মেঁ খুমা র,

জাদু নগরী সে আয়া হ্যায় কোঈ জাদুগর”।

কথাগুলো বদলে নিয়ে গাওয়া হয়ঃ

“লেকে পহেলা পহেলা প্যার, ত্যাজকে গোয়ালোঁ কা সংসার,

মথুরা নগরী মেঁ আয়া হ্যায় কোঈ বংশীধর”।

এতেই বাজিমাত!


দুটো দিন কাটতেই সবার বিশ্বাস হোল যে বাবাজী হলেন কৃষ্ণের অবতার। তবে উনি যমুনার জল না খেয়ে খালি গাঁজা খেলেন আর এমন সব পিশাচ তাঁকে ঘিরে রইল যে ওনাকে কৃষ্ণ কম , শিবের অবতার বেশি মনে হল। কলকে ধকধক জ্বলছে আর প্রমাণ করছে যে—গাঁজা চুরির হোক, কি সরকারী দোকানের, গঙ্গাজল গঙ্গোত্রী থেকে আসুক, কি দুটো নোংরা নালার সঙ্গম থেকে --- দুটোরই প্রভাব সবসময় সমান।

বাবাজী মানুষটি বেশ মজার। কীর্তন খালি করান না, নিজেও করেন। যদি গাঁজা না খেতেন, তাহলে ওনার স্বর গলার বাইরে স্পষ্ট করে শোনা যেত। আর যদি হারমোনিয়ম না বাজত, তাহলে ওনার কীর্তনের সুরটাও খানিক বোঝা যেত। এইসব স্বাভাবিক বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও উনি দেখতে দেখতে গোটা গ্রামকে বশ করে ফেললেন। উনি কবীর, রুইদাস ও রামানন্দের এমন এমন ভজন শোনালেন যে লোকে মুগ্ধ হয়ে ওনাদের জয়-জয়কার করতে লাগল।

কবীর এবং অন্য সন্তেরা যদি এখানে হাজির হতেন এবং ওনাদের ভজন বলে যা সব মৌলিক কবিতা গাওয়া হচ্ছে সেসব শুনতেন, তাহলে তাঁরা বাবাজীর জয়ধ্বনি করতেন। এর ফলে বাবাজী গ্রাম থেকে জাতিবাদের নাম ভুলিতয়ে দিলেন। তারপর একদিন গাঁজা, সিদ্ধি ও কীর্তনের মাঝে ইশারা করলেন যে এই গ্রামের প্রধান বড় ধর্মাত্মা, তখন লোকজন হতভম্ব হয়ে গেল।

এক ব্যাটা সিদ্ধিখোর বলে উঠল—এখনও তো কেউ নির্বাচিত হয় নি। আর এই পদের জন্য প্রথমবার নির্বাচন হবে---। তখন বাবাজী ফের ইশারা করলেন যে আমার ভগবান তো ইতিমধ্যেই নির্বাচন সেরে ফেলেছেন।

সংক্ষেপে বললে, নেশা গায়েব হওয়ার আগেই জনতা জেনে গেল যে ব্রাহ্মণ প্রার্থীকেই ঈশ্বর প্রধান পদের জন্য নির্বাচিত করেছেন। নেশা নামার আগে প্রায় সবাই উক্ত জ্ঞানের জোয়ারে ভেসে গিয়ে মেনে নিল যে ওই আমাদের প্রধান। এইভাবে লাথির উপরে মুখের বিজয় হল।

নেবাদাওলা পদ্ধতি ভোটে যারা দাঁড়ায় তাদের খুব কাজে এল। অন্য গ্রামের লোকজনও এই পদ্ধতিকে আবশ্যক সংশোধন করে নিয়ে বড় বড় নির্বাচনে বিজয়ী হল। যেখানে গাঁজাখোর বাবাজী পাওয়া যায় নি বা অতখানি গাঁজা জোগাড় হয় নি, সেখানে লোকে কাউকে ধরে বাবা বানিয়ে কোন দেবীর পুজো শুরু করে দিত। ওখানে পাঁঠাবলি হত এবং কারণবারির ভোগ চড়ত। ফল একই—মুখের বিজয়, পদাঘাতের পরাজয়।

এইভাবে কৌশলটি পেটেন্ট হয়ে নির্বাচন সংহিতায় নেবাদাওলা পদ্ধতি নামে স্থান পেল।


মহিপালপুর পদ্ধতিটি নিঃসন্দেহে সবচেয়ে সরল এবং বিশুদ্ধ বৈজ্ঞানিক। এই পদ্ধতিটির উদ্ভব হয় এক নির্বাচন অধিকারীর ভুলের ফলে। পরে ওই ভুলটিকে মেনে নিয়ে অনেক জায়গায় সাফল্যের সঙ্গে রিপিট করা হয়। ভুলটা হয়েছিল একটি ঘড়ির চক্করে।

ভোট দেয়ার কথা বেলা বারোটা নাগাদ। হয়েছে কি, নির্বাচন অধিকারীর ঘড়ি শহরের ঘন্টাঘরের ঘড়ির সঙ্গে মেলানো ছিল। আর ঘন্টাঘরের ঘড়ি চুঙ্গী আদায়ের চেয়ারম্যানের ঘরের ঘড়ির সঙ্গে মিলিয়ে তাল রাখছিল। ফলে সওয়া ঘন্টা আগে চলছিল।

এবার হোল কি, নির্বাচন অধিকারী মহোদয়, বেশ কিছু প্রার্থীর আপত্তি সত্ত্বেও, পৌনে এগারটা নাগাদ যত প্রার্থী ও ভোটার এসে গেছে তাদের নিয়ে ভোট করিয়ে ফলাফল ঘোষণা করে দিলেন। যখন বাকি প্রার্থী এবং ভোটদাতারা ঘটনাস্থলে পৌঁছল, ততক্ষণে নির্বাচন অধিকারীটি নিজের বাড়িতে ওনার ঘড়ি অনুসারে সোয়া একটার খাবার খেতে ব্যস্ত।

এই নির্বাচন নিয়ে আদালতে মামলা হল। মামলা একেবারে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চলল। সেখানে সমস্ত তর্ক ও যুক্তি হল ঘড়ি নিয়ে। তাতে মহামান্য আদালতের নানারকম ঘড়ির বিষয়ে মেকানিক্যাল জ্ঞান হল। ফলে মামলা চলল তিন সাল, কিন্তু তাতে নির্বাচন অধিকারীর কোন দোষত্রুটি প্রমাণিত হল না—হওয়ার কথাও ছিল না। তাই উনি যাকে বিজয়ী ঘোষণা করলেন সে নিজের ঘড়িকে বরাবরের জন্য সোয়া ঘন্টা ফাস্ট করে দাপটে রাজত্ব করল। বাকি প্রার্থীরা, খোদ ছোটে পালোয়ানের ভাষায়, ঘড়ির জায়গায় হাতে ঘন্টা ধরে বসে রইল।


মহিপালপুরের ঘটনাটি আচমকা ঘটেছিল। কিন্তু নিউটনের সামনে গাছ থেকে আপেলও আচমকাই পড়েছিল। কিন্তু তার থেকে উনি মাধ্যাকর্ষণের সূত্র আবিষ্কার করলেন। পরে ভোট-টোট গুলে খাওয়া কিছু লোক মহিপালপুরের ঘটনা থেকে এক সূত্র বের করলঃ সব ঘড়ি একসাথে তাল মিলিয়ে চলে না আর সব ভোটার একসাথে এক জায়গায় ভোট দিতে হাজির হয় না।

এই তত্ত্ব আবিষ্কার হওয়ার পর গ্রাম-পঞ্চায়েতের নির্বাচনে এর প্রয়োগ বেশ কয়েকবার নানাভাবে হচ্ছিল। ইলেকশন অফিসারের ঘড়ি মহিপালপুরের উদাহরণ মনে রেখে কখনও ঘন্টা-আধ ঘন্টা লেট বা ফাস্ট হয়ে যেত। আর ঘড়ি এক মেশিন, তার জন্য কোন লোক কেন দোষের ভাগী হবে? ফলে যে প্রার্থীটির ঘড়ি ইলেকশন অফিসারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলত, সেই জিতে যেত। এটা দুটো মেশিনের খেলা, তাই এর জন্য কোন মানুষের ঘাড়ে দোষ চাপানো নেহাৎ অবৈজ্ঞানিক মানসিকতা!

ভুগোলের হিসেবে শিবপালগঞ্জ থেকে মহীপালপুর অনেকটা দূর, কিন্তু নেবাদা কাছে। তাই রামাধীন ভীখমখেড়ীর ভোটে জেতার নেবাদা ফর্মূলাটা ভাল করে জানতেন। নির্বাচনের প্রচারে সেটাই আঁকড়ে ধরেছিলেন। ওদিকে শনিচরের পক্ষে বৈদ্যজী ভূগোল ছেড়ে ইতিহাসকে আঁকড়ে ধরলেন। অতীত কাল থেকে জেতার যত পদ্ধতি আছে সব খুঁটিয়ে দেখে শনিচরকে বললেন মহীপালপুর পদ্ধতি প্রয়োগ করতে। ফলে ওনার পকেট থেকে খরচ বলতে সেরেফ একটা শস্তা হাতঘড়ির দাম যা হয়। সেই ঘড়িটা নির্বাচন অধিকারী ভুলে নিজের মণিবন্ধে বেঁধে বাড়ি নিয়ে গেছল। এদিকে নেবাদা ফর্মূলার লোকেরা হেরে গিয়ে এমন হতাশ হল যে এন্তার মদ গিলে মাঠে বেহুঁশ হয়ে পড়ে রইল। ওদের প্রাপ্তি বলতে নেশা করার গভীর জ্ঞান।
0

ধারাবাহিক - শৌনক দত্ত

Posted in




















১৫. লুইজ গ্লিক ও তাঁর কবিতা






প্রিয়বরেষু সুস্মি,

তোমাকে চিঠিটা লিখছি ব্যাঙ্গালোর থেকে। আমাকে লেখা তোমার চিঠি হয়ত বাড়ির পোষ্টবক্সে তালাবন্দি হয়ে পড়ে আছে। বেনারস থেকে ফিরেই ব্যাঙ্গালোর এসেছি। বহুবছর পরে ব্যাঙ্গালোর এলাম। আনুমানিক বিশ বছর তো হবেই নাকি? তুমি তখন ইলেকট্রনিক সিটিতে থাকতে, মনে পড়ে? সকালের ট্রেন লেট করে মধ্যরাতে যখন ব্যাঙ্গালোর পৌঁচ্ছালো তুমি তখনো আমার জন্য প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে। বাইরে অঝোর বৃষ্টি, আমরা বৃষ্টিতে ভিজেছিলাম একসাথে, পরেরদিন সকালে আমাদের দুজনেরই কি ভীষন জ্বর উঠেছিল। মনে আছে তোমার? এরপর আর কখনো ব্যাঙ্গালোর আসা হয়নি। তুমি নিশ্চয় পরে আরো বহুবার এসেছো। শহরটা আমূল বদলে গেছে, মেট্রোরেল হয়েছে। ইলেকট্রনিক শহরে এখন জ্যেঠু মানে অর্ক থাকে। মেট্রো ষ্টেশনের নীচে যখন ওর সাথে দেখা করেছি তোমার কথা খুব মনে পড়ছিল। ইনফোসিস, উইপ্রোর সেই চিরচেনা জায়গাগুলো বড্ড বদলে গেছে। পুরোনো জায়গাগুলোতে ঘুরতে ঘুরতে তোমাকে খুব মনে পড়ছিল মনে পড়ছিল ব্যাঙ্গালোরে প্রথম পড়া লুইজ গ্লিক নিয়ে তোমার সেই কথাগুলো। তখনো লুইজ গ্লিক নোবেল পাননি। তুমি কোন এক লাইব্রেরি থেকে কিনে এনেছিলে গ্লিকের বুনো আইরিস তাঁর পুলিৎজার পুরস্কারে ভূষিত কাব্যগ্রন্থ। আমার এখনো মনে পড়ে গ্লিকের বইটা শেষ করে তুমি বলেছিলে পড়ে দেখো আমেরিকার রাষ্ট্রীয় কবি ফুলের ভাষায় কথা বলেছেন গোটা কাব্যগ্রন্থে। ফুল বলতে হয়ত কাঁটাঝোপের ফুল, হয়ত গ্রীষ্মের সামান্য অবকাশে ফুটে ওঠা বর্ষজীবী বুনো আগাছার ফুল যারা কখনো স্রষ্টার কাছে প্রশ্ন রাখে কখনো বা ব্যঙ্গ করে তাঁকে। এবং অনিত্যতার মধ্য দিয়ে জীবনের এই যে উদযাপন তা বিষণ্ণতা বিবর্জিত নয়, কিন্তু যে পোয়েটিক এনার্জি এই বিষণ্ণতা নির্মাণে তিনি প্রতিটি পঙ্‌ক্তিতে সঞ্চারিত করতে পেরেছেন। তোমার মনে আছে? সেবার ব্যাঙ্গালোরে আমরা গ্লিকের কবিতাতেই ডুবেছিলাম, সম্ভবত ‘ফার্স্ট বর্ন’ বইটি আমরা পড়েছিলাম তার মাস দুয়েক পরে তারপর যখন আমেরিকা থেকে রাজীব নিয়ে এলো ‘দ্য ট্রায়াম্ফ অফ অ্যাকিলিস’তখন আমাদের নেশায় পেয়েছিল গ্লিকের কবিতা! তিনটি বই পড়ে আমরা একমত হয়েছিলাম গ্লিকের কবিতায় খ্রিষ্টীয় অনুষঙ্গ খুব বেশি করে থাকলেও তার সবটাই প্রায় বিষন্নতা থেকে উৎসারিত এবং সেখানেই তাঁর কবিতার আবেদন ভাষার সীমা অতিক্রম করে যায়। গ্লিকের ফেইথফুল অ্যান্ড ভার্চুয়াস নাইট যখন পড়ছি তুমি তখন দূরের মানুষ! তোমার সাথে আমার কোন যোগাযোগ নেই। বইটির মূল বক্তা একজন বয়স্ক চিত্রশিল্পী, যিনি তার মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন এবং জীবনকে এক নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছেন। এটি একটি কিংবদন্তি বা রূপকথার মতো করে লেখা, যেখানে একজন নাইট একটি রাজ্যে অ্যাডভেঞ্চার করতে যায়। কি অদ্ভুত আমাদের সম্পর্কটাও তখন মৃত! এই বই যখন পড়ছিলাম আমার বারবার তোমার কথা মনে হতো, আর মনে হতো লুইজ গ্লিক যেন তোমাকে বলতে না পারা আমার কথাগুলোই তার কবিতায় লিখছেন।

তুমিও কি সেই সময় গ্লিক পড়তে? তোমারও কি মনে হতো গ্লিক আমাদের মতই আত্মজৈবনিকতা ও বিষাদময়তা লিখছেন তাঁর কবিতায়। তোমারও কি মনে হয়েছিল গ্লিকের কবিতা মৃদুপ্রবহ, অধিকাংশ ক্ষেত্রে হ্রস্বকায় ও চকিত অন্তমিলযুক্ত। কবিতাগুলো আপাতসরল ভাষায়, কিন্তু তার মধ্যে লুকিয়ে থাকে জীবনের গভীর বোধ ও জটিলতা। সেখানে প্রগলভতা নেই, আছে পরিমিতিবোধ। শব্দকে তিনি ব্যবহার করেন অতি সাবধানে, অনেক চিন্তাভাবনা করে। তার কবিতার লিরিক্যাল কোয়ালিটিকে অনেকে এমিলি ডিকিনসন ও এলিজাবেথ বিশপের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তার নির্মেদ-সংবেদী কবিতায় অলংকারের ঘনঘটা নেই। আছে সহজ কথোপকথন ও শুভ-অশুভের বার্তা। তার কবিতা আবেগঘন, মিথ ও প্রাকৃতিক চিত্রকল্পে সমৃদ্ধ। আধুনিক জীবনের নানা অনুষঙ্গকে তিনি উপজীব্য করে তোলেন তার পঙক্তিমালায়। লুইজ গ্লিক নিয়ে তোমার সাথে কোন কথা হয়নি আমাদের এই দীর্ঘ বিরতির পরে। আজ ব্যাঙ্গালোরে বৃষ্টি দেখতে দেখতে মনে হচ্ছে ফেলে আসা সেইসব দিনরাত। তোমাকে লিখতে বসে মনে পড়ছে গ্লিকে ডুবে থাকা সেই সময়ের কথা। তোমার মনে আছে গ্লিকের দুটো বই পড়ে তুমি বলেছিলে- গ্লিকের কবিতা যেন ‘জীবন ঘষে শিল্প’ হয়ে উপস্থিত হয় আমাদের সামনে। আবেগ ও ভাবালুতাকে সঙ্গী করে বারবার যেন যাপিত জীবনের তটেই ফিরে আসেন তিনি। স্বভাবতই তাঁর কবিতায় ফিরে ফিরে আসে আমাদের নিত্যদিনের চাওয়া-পাওয়া, ছেলেবেলা, হারানো ভালোবাসা, যৌনতা, মৃত্যু, প্রকৃতি ও প্রেম। সমকালীন বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে নতুনভাবে উপস্থিত হয় পুরাণও। সব মিলিয়ে এই কবির কবিতার মধ্যে আছে সাধারণ—খুবই সাধারণ এক সুর। আর এই সুরটি একই সঙ্গে আমাদের চেনা আবার অচেনাও। বোধ করি এসব কারণেই গ্লিকের কবিতা সাধারণ হয়েও ‘অসাধারণ’। তোমার এই মূল্যায়ন কতটা সত্য তা পরে গ্লিক পড়তে গিয়ে বারবার অনুভব করেছি। আমি যখনই গ্লিককে পড়তে বসেছি আমার মনে হয়েছে সাধারণ হয়েও অসাধারণ হবার চেয়েও বড় হয়ত বিষাদময়তায় বিপরীতে জীবনের আকাঙ্ক্ষারও দেখা মেলে গ্লিকের কবিতায়। প্রেমের আকাঙ্ক্ষা, অন্তর্দৃষ্টির আকাঙ্ক্ষা। মাঝে মাঝে ইতি ও নেতির আকাঙ্ক্ষায় ঘটে উভয়প্রাপ্তি। এর মধ্যে হয়তো খুঁজলে বিরোধাভাসও পাওয়া যাবে। ভাষায় বিক্ষিপ্ত স্ট্যাটাস, পাওয়ার, মোরালিটি ও জেন্ডার তার সাম্পর্কিক জ্ঞানকে প্রভাবিত করে। সুইডিশ অ্যাকাডেমি লুইস গ্লিকের নোবেল সাইটেশনে উল্লেখ করেছে, গ্রিক পুরাণের ডিডো, পার্সিফোন কিংবা ইউরিডিস হয়ে তিনি যে ব্যক্তিগত উচ্চারণ করেন তার মূল্য বৈশ্বিক। আত্মকথা ও গ্রিক পুরাণ মিলেছে তাঁর কবিতায়। তাঁর কবিতা আত্মজীবনীমূলক মনে হলেও তা কনফেশনাল বা দোষ স্বীকারোক্তিমূলক মনে করা যাবে না। তাঁর কবিতা নিরাভরণ কিন্তু নিরাবরণ নয়; বর্ণনার আধিক্য নেই, ইঙ্গিতের গল্প অনেক কবিতায়। কবি ক্রেইগ মর্গান টিচার মনে করেন, তাঁর কবিতায় শব্দ দুর্লভ, শব্দের কোনো অপচয় নেই, পুনরাবৃত্তি নেই। আমার তো গ্লিক পড়তে বসলে মনে হয় তিনি নিজের সঙ্গে নিজে কথা বলেন, নিজেকে প্রশ্ন করেন। চিন্তা ও অনুভবের মাঝপথ দিয়ে তিনি হাঁটেন। তার পা মাটিতে কিন্তু দৃষ্টি আকাশে। তিনি আবেগরসে নিত্য ও অনিত্যের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করেন। তার কবিতা চলমানতা ও স্থিরতার এক আত্মিক সেতুবন্ধন। তার নিমগ্নতায় চেতন ও অবচেতনের মধ্যে পার্থক্য লুপ্ত হয়ে যায়। অপার অন্তর্মুখিনতার কারণে যদি তার কবিসত্তাকে ‘স্পিরিচুয়েল’ আখ্যা দেওয়া হয়, তাহলে ভুল হবে না। প্রাত্যহিক জীবনের রূপকল্পে নির্মিত গ্লিকের কাব্যসৌধ। তাই তার দৃষ্টি ব্যক্তিমানুষের জীবনের দিকে, নাগরিক জীবনের আটপৌরে ঘটনাবলিতেও। ছোট ছোট দৃশ্য চোখের সামনে আসে, ভাসে, চলে যায়। তাদের গুরুত্বও কম নয়। ‘শিকাগো ট্রেন’, ‘দ্য এগ’, ‘থ্যাঙ্কসগিভিং’, ‘হেজিটেট টু কল’, ‘মাই কাজিন ইন এপ্রিল’, ‘লেবার ডে’, ইত্যাদি কবিতায় জীবনের ছোটখাটো ঘটনাবলি অপূর্ব তাৎপর্য নিয়ে হাজির হয়। ‘রেডিয়াম’ কবিতায় তিনি সময়ের ও জীবনের সহজ চলমানতাকে তুলে ধরেন। তাঁর কবিতা পড়তে গিয়ে মনে হয় এমিলি ডিকিনসন, এলিজাবেথ বিশপ, সিলভিয়া প্লাথ, জন বেরিম্যান, রবার্ট লাওয়েল এবং রাইনার মারিয়া বিল কোন না কোনভাবে তাঁর কবিতা শৈলীতে মিশে আছে। লিওনিদ অ্যাডামস এবং স্ট্যানলি কুনিৎজের কথা তিনি নিজেই বলেছেন, দুজনই তাঁর শিক্ষক। খেয়াল করলে দেখা যাবে মার্কিন কবিতার মানচিত্র যারা গঠন করেছেন, তাদের কারো সঙ্গেই এ যাবৎ বাংলা কবি মহল ও পাঠকের ঘনিষ্ঠ পরিচয় গড়ে ওঠেনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পর্বের মার্কিন কবিতা সম্পর্কে সম্যক অবহিত হতে হলে কাদের কবিতা আবশ্যিকভাবে পাঠ করা দরকার নিজেকে প্রশ্ন করে দেখেছি উত্তর মিলেছে সচরাচর যে ক'জনের নাম পুরস্কারপ্রাপ্তি ও সমালোচকদের আলোচনার কারণে গুরুত্ববহ তাদের নামই মনে এসেছে, তারা হলেন জন অ্যাশবেরি, অ্যান্থনি হেকট, কে রেয়ান, ডব্লিউ এস মারভিন এবং লুইজ গ্লিক। তোমার তালিকায় কি আরো কেউ আছেন? বলা হয় জন অ্যাশবেরি উত্তরাধুনিক কবিতার প্রধানতম গুরু, তিনি কবিতায় আধুনিক শিল্পসুলভ বিমূর্ততা অনুপ্রবিষ্ট করেছেন, তথাপি তার কোনো অনুরাগী বাংলায় নেই। সত্য তো এই যে, এদের কারোর সঙ্গেই আমাদের কহতব্য কোনো পরিচয় গড়ে ওঠেনি, সৃষ্টি হয়নি আদান-প্রদানের কোনোরূপ সুড়ঙ্গপথ। বাঙালি কবিকুল ও পাঠকের জন্য এ কথা স্বীকার নেওয়া সুবিধাজনক যে, একুশ শতাব্দীর উষালগ্নে লুইস গ্লিক মার্কিন কবিতারসিকদের কাছে তাঁর দৃঢ়মূল অস্তিত্ব নিয়ে উপস্থিত একজন কবি। নিউ ইয়র্ক টাইমস বুক রিভিউয়ে কবি স্টিফেন্স ডোবিন্স লিখেছেন, 'সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন কবিদের মধ্যে লুইজ গ্লিকের চেয়ে ভালো আর কেউ লেখে না। আমাদের স্বভাবের এত গভীরে নিয়ে যেতে পারেন এ রকম আর কেউ নেই।' কবি রবার্ট হ্যাস লিখেছেন, 'এ রকম বিশুদ্ধ, এ রকম চৌকস গীতিকবি আমেরিকায় আর নেই।' আমেরিকান পোয়েট্রি রিভিউয়ে অ্যানা উটেনের পর্যবেক্ষণ এ রকম, 'গ্লিক তার পাঠককে ভাবতে বাধ্য করেন, পাঠককে অভিভূত করেন।' লুইজ গ্লিকের কবিতা দাবি করে পাঠকের মমতাপূর্ণ অভিনিবেশ। তার কবিতা পাঠে মনে হয় তিনি একজন ধ্যানস্থ মানুষ, যার মগ্নচৈতন্য থেকে উঠে এসেছে কিছু পর্যবেক্ষণ, কিছু দর্শনবাক্য, জীবনের অচিহ্নিতপূর্ব কিছু অভিজ্ঞান; যা তিনি সাজিয়ে দিয়েছেন কবিতার অবয়বে। বাইরে বৃষ্টি বেড়েছে। কোথাও যাবার নেই তাই তোমাকে লিখতে লিখতেই মনে পড়লো লুইজ গ্লিকের ফ্যান্টাসি কবিতাটি, ভাবছি এই অখন্ড অবসরে তোমার জন্য কবিতাটি অনুবাদ করে ফেলি। কতটুকু হবে কতটা পারবো জানিনা। চেষ্টা করছি যদি হয় চিঠির সঙ্গে দিয়ে দেবো। নিরন্তর ভালো থেকো।

অন্তে প্রেম হোক

বাসু



পুনশ্চ: পরশু ফিরবো দিল্লি, দশ পনেরদিন দিল্লিতে থাকবো। তুমি দিল্লির ঠিকানায় লিখতে পারো।



ফ্যান্টাসি

লুইজ গ্লিক


তোমাকে বলি: প্রতিদিন মরছে যে মানুষ তাদের কথা। এটা কেবল শুরু।
শ্মশানে রোজ জন্ম নিচ্ছে নতুন বিধবা, নতুন এতিম।
হাত ভাঁজ করে তারা বসে থাকে, আর ভাবে নতুন জীবনের কথা।
তারপর তারা হাঁটতে থাকে সমাধিক্ষেত্রের দিকে, অনেকেই প্রথম এসেছে:
কেউ কান্না করতে ভয় পায়; কারো ভয় কেঁদে ফেলার।
কেউ ঝুঁকে এসে বলে দেয় এখন কী তাদের করণীয়: হয়তো
বলতে হবে কিছু; হয়তো কবরে দিতে হবে মাটি
তারপর সবাই বাড়িতে ফিরে যায়: বাড়িটা সহসা মানুষে ভরে ওঠে
বিধবা রাজকীয়ভাবে বসে থাকে, তার কাছে যাওয়ার জন্য মানুষেরা সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়ায়
সে প্রত্যেককে কিছু বলে, আসবার জন্যে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে।
কিন্তু তার মন চায় সবাই চলে যাক:
সে ফিরে যেতে চায় সমাধিক্ষেত্রে অসুস্থদের ঘরে, হাসপাতালে
এটা সম্ভব নয় জেনেও এটাই তার একমাত্র আশা,
অতীতে ফেরার ইচ্ছে অতি সামান্য,
খুব দূরে নয় বিয়ে, প্রথম চুমুর কাছে।


১লা ডিসেম্বর,২০২৫
0

ধারাবাহিক - নন্দিনী সেনগুপ্ত

Posted in












১৭  

জেরাল্ডের এপার্টমেন্টের কথা আগেই উল্লেখ করেছি। যদিও খুঁটিনাটি বর্ণনা দেওয়া এখনও বাকি, তবে একথা আগেই বলা হয়েছে যে এপার্টমেন্টেরও জেরাল্ডের মতই দু’খানা আলাদা সত্তা আছে এবং এই দুই সত্তার মাঝে কোথাও কোনো বিরোধ নেই। বরঞ্চ জেরাল্ডের মতই সম্পূর্ণ স্বকীয় এবং ভিন্ন পরিসর নির্মিত হয়েছে সেখানে। জেরাল্ডের সম্পর্কেও আগেই বলা হয়েছে; তার অতীত সম্পর্কে জানানো হয়েছে যে তার বাবা ছিলেন এক কৃষক এবং তার মা ছিলেন এক ইহুদি বিদ্বান পণ্ডিতের কন্যা।  

 

সঙ্গীতশিক্ষকের বাড়িতে জেরাল্ডের সঙ্গে পিয়ানোবাদক কিশোর বের্নহার্ডের প্রথম সাক্ষাতের পরে বেশ কয়েকটা সপ্তাহ অতিবাহিত হয়ে গেছে। বের্নহার্ডের বাজনা এবং বাজনার মধ্যে প্রতিফলিত হওয়া ইয়োহান সেবাস্তিয়ান বাখ সম্বন্ধে পরিণত ভাবনাচিন্তা বিশেষভাবে জেরাল্ডকে স্পর্শ করেছিল। তবে জেরাল্ডের বাড়িতে যাবার আমন্ত্রণ বের্নহার্ড এখনো গ্রহণ করে উঠতে পারেনি, কারণ নানা ধরনের ঘটনাপ্রবাহে সে এই আমন্ত্রণের কথা একেবারে ভুলে গিয়েছিল।

 

বেটসির সঙ্গে সাক্ষাতের পর থেকে বের্নহার্ডের মনমেজাজ অনেকখানি ভাল হয়ে গিয়েছিল। বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবছিল সে যে এখানে এসেছে বলে সে বুঝতে পারছে যে কখনো কখনো বেশ সহজে পয়সা উপার্জন করা সম্ভব। ধূসর রঙের সিলিং, যেটা তার চোখে খুব বিশ্রী লাগতো, সেটা আজ হঠাৎ আর ততখানি মনখারাপ করবার মত রং বলে মনে হচ্ছে না তার। ওই রঙটা এখন তার অনেকখানি অভ্যেস হয়ে গেছে; তাছাড়া বড় শহরে বসবাস করতে হলে নিজের মেজাজমর্জির বশ্যতা স্বীকার করে গুমরে থাকার বিলাসিতা করা তার পক্ষে একেবারেই  সম্ভব নয়। প্রথম দিকে এই ব্যাপারটা সে ঠিকভাবে বুঝে উঠতে পারেনি বলে খুব ভুগেছে। বিশেষ করে যখন সে ক্লান্ত থাকতো, তখন একটা বিব্রত ভাব তাকে ঘিরে ধরত। মাঝে মাঝে সকালে সে একটা দমচাপা কষ্ট নিয়ে ঘুম থেকে জেগে উঠত। সারাদিনের কাজগুলোকে যেন মনে হত অজস্র কঠিন শাস্তি এবং সেগুলোর মধ্য দিয়ে তাকে যেতেই হবে। সে জানত যে সারাদিন যে মুখগুলোর সামনাসামনি তাকে হতে হবে, সেগুলোর অভিব্যক্তি কেমন হতে পারে… নির্বিকার, অপরিচিত, বিষণ্ণ। সারাদিন তাকে কী কী করতে হবে, সেটা ভাবলেই তার অসহ্য লাগত। এমনকি নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে করিডরের অপর প্রান্তে হেঁটে গিয়ে বিশেষ প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও মাদাম দুবোয়ার সঙ্গে কথা বলতেও ইচ্ছে করত না তার। অথচ মাদাম দুবোয়ার সঙ্গে কথা না বলার জন্য সেরকম যুতসই ছুতো খুঁজে বের করতে পারত না সে। বাদ্যযন্ত্রের দোকান অবধি হেঁটে যেতেও ইচ্ছে করত না তার। অতি অল্প আলোয়, শীতে ওই অপরিসর দোকানঘরের কুঠুরিতে বসে পিয়ানো অভ্যেস করতে গিয়ে তার হাতের আঙুলগুলি জমে শক্ত হয়ে যেত। এবং অবশেষে রু সান জাক অঞ্চলে একটা ছোট রেস্তরাঁয় চার্লসের সঙ্গে বসে একসঙ্গে খাবার অর্ডার করবার জন্য ওয়েটারকে ডাকা, পুরো ব্যাপারটাই ভীষণ বিরক্তিকর ছিল তার কাছে।  

সম্প্রতি বের্নহার্ড নিয়মিত অনেকখানি সময় কাটাচ্ছিল চার্লসের সঙ্গে। বেলা একটা নাগাদ তাদের দেখা হত। সঙ্গে চার্লসেরও কিছু বন্ধুবান্ধব থাকত। নিয়মমাফিক সবাই মিলে শিক্ষকদের মুণ্ডপাত করতো রোজ। সবাই একই ধরনের শব্দ ব্যবহার করত। গালাগালির বন্যায় রোজই একটা বিশেষ নির্দিষ্ট ধারা থাকত। তবে এই ছেলেগুলো বেশ মজার এবং প্রাণবন্ত ছিল। তাদের সঙ্গে মিশবার জন্য বিশেষ চেষ্টা করবার প্রয়োজন নেই। তারাও এই তরুণ ‘বশে’*কে নিজেদের মতো করে আপন করে নিয়েছিল… মুক্তকণ্ঠে তারা বের্নহার্ডের গুণাবলীর প্রশংসা করে যেত। আবার কখনো তাকে ডাকত ‘ব্লন্‌ড্‌ কমরেড’ বলে। বের্নহার্ডকে ঘিরে ইয়ার্কি ফাজলামি করতে করতে তারা নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতায় মেতে উঠত। যদিও বের্শেন অস্বস্তি বোধ করত এসবে, কিন্তু সে লক্ষ্য করত যে তাদের কথাবার্তার মধ্যে থাকত সুচতুর বাগ্মিতা এবং অবাক করে দেওয়া বুদ্ধিমত্তার ধার। তবে বিকেলের ক্লাস করতে স্কুলে ফিরে যাবার আগে তারা বের্নহার্ডের সুস্বাস্থ্যের কামনা করে জল মিশিয়ে রেড ওয়াইন পান করে যেত।

 অবশ্য এতকিছু সত্ত্বেও বের্নহার্ডের নিজেকে বহিরাগত বলে ভাবাটা বন্ধ হয়নি। যদিও চার্লস বেশির ভাগ সময়ে বিরক্ত এবং উত্তেজিত অবস্থায় থাকতো, তবুও একা চার্লসের সঙ্গ সে পছন্দ করত। স্কুলে চার্লসের অবস্থা ছিল শোচনীয়। শিক্ষকেরা তাকে একেবারেই পছন্দ করতেন না। তাছাড়া কী ভাবে যেন জানাজানি হয়ে গিয়েছিল যে চার্লস রবার্টের বাড়িতে যাতায়াত আছে। চার্লস জানে না যে এই কথাটা কে শিক্ষকদের কানে তুলেছে। সে রবার্টের বাড়িতে যাওয়া বন্ধ করেছে বহুদিন আগেই; এখন সে সন্ধ্যায় বাড়িতে বসে পড়াশুনা করে। কিন্তু এই গুজবের হাত থেকে সে রক্ষা পাচ্ছে না। সব মিলিয়ে চার্লস রেগে আগুন হয়ে আছে; তার পরিশ্রমের কোনও সুফল ফলছে না, কারণ শিক্ষকেরা তার প্রতি বিরূপ। ফলে চার্লস আবার সব ছেড়েছুঁড়ে একা একা পথেঘাটে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়াতে থাকে এবং মধ্যরাতে হা-ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফেরে।

 

বের্নহার্ড মাঝেমাঝে বেশ বুঝতে পারছিল যে চার্লসের বিষণ্ণতা এবং হতাশা তাকে প্রভাবিত করছে এবং এই ব্যাপারটাকে সে সবচেয়ে বেশি ভয় পায়। তার নিজস্ব বিষাদের সেরকম কোনও কারণ সে খুঁজে পাচ্ছিল না এবং সেই সময় চার্লসের থেকে যথাসম্ভব দুরত্ব বজায় রাখছিল সে। নিজের পরিস্থিতি নিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় যুক্তিসহ ভাববার চেষ্টা করছিল আত্মবিশ্লেষণ করে।  সে ভাবছিল যে বাড়ির জন্য মনখারাপ লাগছে কি না তার, নিজের কাজটা করতে ভাল লাগছে কি না… এই আবহাওয়া বা এই নতুন শহরের জল হাওয়ায় কোনও সমস্যা হচ্ছে কি না, কিম্বা এই বাড়ির অন্যান্য সদস্যদের মুখ দেখে বিরক্তি বোধ হচ্ছে কি না তার। কোনও সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারল না সে। মনের জোর দিয়ে যে তাকে এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে, সেটা সে বুঝেছিল। সে নিজেকে হাস্যকর কিম্বা অসহনীয় ব্যক্তিত্বের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চায় না, কিন্তু ক্রমাগত বিষাদ ও হতাশার সামনে সে অসহায়, দুর্বল ও অবশ বোধ করছিল।

এরকম একটা অদ্ভুত পরিস্থিতিতে বেটসির সঙ্গে দেখা হওয়াটা বের্নহার্ডের কাছে সৌভাগ্য বয়ে নিয়ে এসেছিল। সে নিজেই যে অর্থ উপার্জন করতে সক্ষম, শুধু এই ভাবনা থেকেই যে সে আরও শক্তিশালী এবং উদ্যমী বোধ করছিল, ব্যাপারটা এতখানি সরলসোজা নয়। এই দুই আমেরিকান এবং তাদের পোষা বাঁদর ক্ন্যাগি এবং তাদের মজার কাণ্ডকারখানা দেখে সে মানসিকভাবে অনেকটা হালকা বোধ করা শুরু করেছিল। প্রতিদিনের জীবনযাত্রার রুটিন আর বোঝার মত চেপে বসছিল না তার কাঁধে। সে প্রতিদিন ব্যস্ত থাকত। সন্ধে ছটা নাগাদ সে বেটসির কাছে যেত। সেখানে   চা আর কেক খেয়ে সে বেটসিকে জিজ্ঞেস করত যে আগের দিনের গানের লাইনগুলো তার মনে আছে কিনা। তারপর তার গানের কথার মধ্যে জার্মান শব্দগুলোর উচ্চারণ শুদ্ধ করে দিয়ে লক্ষ্য রাখত যে সেগুলো ভালভাবে অর্থ বুঝে বেটসি মুখস্ত করতে পারছে কিনা। অস্বস্তিকর সেই সূচনাপর্বের সময় প্রথম সেই পিয়ানোটার ঢাকনা খোলা হয়েছিল। বের্নহার্ডের ছাত্রী সেরকম প্রতিভাশালী নয়, কিন্তু পিয়ানোটা অপূর্ব সুন্দর। একটা মিষ্টি নরম সুরে বাঁধা যন্ত্রটা। বের্নহার্ড প্রতিদিন ওই যন্ত্রটার টানেও যেত এবং বাজিয়ে অভ্যেস করবার সুবর্ণসুযোগটা সে হারাতে চায়নি। বেটসি চুপ করে বসে তার বাজনা শুনতে পছন্দ করত। বিলি বেটসিকে ডিনারে যাবার জন্য কথা মনে করাবার পর, একেকদিন আটটা বেজে গেলেও সে ইশারায় তাকে চুপ করিয়ে দিত।

 

(চলবে) 

                 

* ‘বশে’ শব্দটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধপরবর্তী সময় থেকে জার্মান সৈন্যদের উদ্দেশ্যে একটা গালি হিসেবে ব্যবহার করত ফরাসি সৈনিকেরা। মাথামোটা, মূর্খ এই ধরনের গালি দেবার জন্য ব্যবহৃত হয়। 

0

ধারাবাহিক - শৌনক দত্ত

Posted in




















১৪. অ্যানি এরনো, যার লেখা নিজের স্মৃতিকেই অবিশ্বাসের মুখে দাঁড় করায়





প্রিয় বাসু,

গতকাল তোমার চিঠি পেয়েছি। বেনারস ভ্রমণ শেষ করে নিশ্চয় ফিরে গেছো। খুব ছোটবেলায় বেনারস গিয়েছিলাম বাবা মায়ের সাথে, সে স্মৃতি ফিকে হয়ে এসেছে। বেনারসও নিশ্চয় বদলে গেছে অনেক। কি অবাক কান্ড দেখো তুমি যখন রেলগাড়ির কামরায় বসে ভার্জিনিয়া উলফের আত্মহননের কথা লিখছো আমি তখন পড়ছি অ্যানি এরনোর দ্য ইয়ার্স। ষাটের দশকে, যখন অ্যানি এরনোর বয়স কুড়ি থেকে পঁচিশ, তখন ভার্জিনিয়া উলফ পড়ে পড়ে তার মধ্যে লেখালেখির তীব্র ইচ্ছা ঘনিয়ে উঠেছিল। কাছাকাছি সময়ে আঁদ্রে ব্রেটনের ‘ফার্স্ট ম্যানিফেস্টো অব সুররিয়ালিজম’ পড়ে জীবন এবং লেখালেখির ও জীবনযাপনের একটি পথরেখার সন্ধান পেয়েছিলেন। জারমেইন গ্রিয়ারের ‘দ্য ফিমেইল ইউনাক’ বইটি তার দার্শনিক চিন্তায় নারীর সামাজিক অবস্থানকে প্রবিষ্ট করে দিয়েছিল। ১৯৬৫-তে প্রকাশিত হয় জর্জ পেরেকের ‘ষাটের গল্প : বিষয় আশয়’। জর্জ পেরেকের রচনাকৌশল তাকে ভাবিয়েছিল। এই সবকিছু তাকে চেনা-পরিচিত জগৎকে নতুন করে উপলব্ধির দিকনির্দেশনা দিয়েছিল। ভার্জিনিয়া উলফের মতো তারও মনে হয়েছিল লিখতে হলে প্রথমে বর্ণনাতীত বাস্তবকে তীব্রভাবে অনুভব করে নিতে হবে। লেখালেখির লক্ষ্য হবে হৃদয়ের গভীরে অনুভূত বাস্তবকে সাহিত্যের নতুন কোনো ভাষায় উত্থাপন করা। তুমি অ্যানি এরনোর লেখা পড়েছো কিনা জানি না, আমি এর আগে এই লেখকের কিছুই পড়িনি, আর পড়িনি বলেই আফসোস হচ্ছে। মনে হচ্ছে কত কম জানি আমি! উনাকে যত পড়ছি আমি মুগ্ধ হচ্ছি। দ্য ইয়ার্স বইটি ফ্রান্সের অর্ধ-শতাব্দীর এবং পরিবর্তনের বিবরণ। এর সঙ্গে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলো যেমন বিটলস, ৯/১১, ইরাকের যুদ্ধ, ইত্যাদি বিষয়কে ফরাসী দৃষ্টিকোণ থেকে লেখক উপস্থাপন করেছেন। উত্তর-পশ্চিম ফ্রান্সের নরম্যান্ডির ছোট্ট শহর ইভতো-তে ১৯৪০ সালে জন্ম ও বেড়ে ওঠা অ্যানির। আধুনিক সাহিত্যে স্নাতকোত্তর হওয়ার পরে কিছু দিন স্কুল শিক্ষিকার কাজ করেন। তার পরে ১৯৭৭ সালে অধ্যাপিকা হিসেবে যোগ দেন ফ্রান্সের দূরশিক্ষা বিশ্ববিদ্যালয় ‘সিএনইডি’-তে। ২০০০ পর্যন্ত সেখানেই অধ্যাপনা করেছেন তিনি। লেখালিখি শুরু করেন যখন বয়স ত্রিশের কোঠায়। এক সাক্ষাৎকারে অ্যানি বলেছিলেন, ‘‘লেখক হয়ে ওঠার পথটা আদপেই সহজ ছিল না।’’ ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘লে আরমোয়ার ভিদ’। আদ্যন্ত আত্মজৈবনিক এই উপন্যাসটি প্রকাশিত হওয়ার পরেই তার ‘সাহসী’ কণ্ঠস্বরের জন্য সাড়া ফেলে দিয়েছিল। ‘দ্য ইয়ার্স’ গ্রন্থকে ফরাসি জীবনের স্মৃতিচারণার ‘মাস্টারপিস’ বলেন সাহিত্য সমালোচকেরা। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাময়িকী দ্য নিউইয়র্কার ২০২০ সালে লিখেছিল, অ্যানি এরনো তাঁর ২০টির বেশি বইয়ে শুধু একটি কাজ করেছেন: নিজের জীবনের খুঁটিনাটি তুলে আনা।

কয়েকমাস আগেই আমি অ্যানি এরনোর নাম শুনি, তখন থেকেই তাকে নিয়ে যেখানে যা পাচ্ছি তাই পড়ছি। তাঁর কাহিনি কখনও চলে ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণের পথ ধরে। কখনও সেই পথ থেকে দৌড়ে কিছুটা দূরে গিয়ে দাঁড়ান তিনি। ব্যক্তিগত স্মৃতিকেই দেখেন দূর থেকে। নিজের স্মৃতিকে নিজেই অবিশ্বাস করেন। নিজেকে নিজেই প্রশ্নের সামনে দাঁড় করান। ফরাসি ভাষার স্মৃতিচারণ মূলক সাহিত্য চর্চা তিনি করেন। তাই বার বার তাঁর সঙ্গে তুলনা চলে এসেছে প্রায় একই ঘরানার কিংবদন্তি সাহিত্যিক মার্সেল প্রুস্তের। তিনি কি প্রুস্ত দ্বারা অনুপ্রাণিত? যদিও অ্যানি বলেছেন, তাঁর উপর প্রুস্তের প্রভাব খুবই কম। বরং তাঁর উপর অনেক বেশি প্রভাব রয়েছে আমেরিকার সাহিত্যিক আর্নেস্ট হেমিংওয়ের। খুব সচেতনভাবেই তিনি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন ফরাসি সাহিত্যের সব ধরনের বৈশিষ্ট্য। ভাষাটুকু বাদ দিয়ে তিনি নিজেই হয়ে ওঠার চেষ্টা করেছেন একেবারে স্বতন্ত্র এক ঘরানা। ফরাসি ‘মিঠে বোল’, মেদুরতা, রোম্যান্টিসিজমকে বুড়ো আঙুল দেখাতেই ভালো লেগেছে তাঁর। নিজ ভাষ্যেই তিনি হয়ে উঠেছেন কর্কশ, কঠিন, এবং অবিশ্বাসী। আর সেটিই তাঁকে তাঁর নিজের দেশ, নিজের ভৌগলিক সীমারেখা, নিজের জাতিসত্ত্বার থেকে অনেক দূরে নিয়ে গিয়ে ফেলেছে। আশ্চর্য় বিষয় কি জানো ২০০৮ সালে প্রকাশিত এই বইটিকে ইংরেজি অনুবাদক এলিসন স্ট্রেয়ার এরনোর অন্যান্য রচনাগুলির নিরিখে এক বিচ্যুতি বলেছেন। আপাতভাবে কথাটি যথার্থ। রচনার দৈর্ঘ্যে, বা বহু স্বরের ব্যবহারে এমনকী এর বিশাল ব্যাপ্তিতেও এই বই এরনোর অন্যান্য বইয়ের থেকে আলাদা। কিন্তু নিহিত বিচারে এই বইয়ের মধ্যেও লক্ষ্য করা যায় তাঁর লেখার সাধারণ চিহ্নগুলি। এই বইয়ের মতোই একের পর এক বইতে নিজের অতীতে ফিরে গিয়েছেন এরনো, এটি সম্পূর্ণ অনুভূতিহীন গল্প। লেখক কমই প্রকাশ করেছেন নিজকে। অথচ পুরোটাই ব্যক্তিগত গল্প। পরিবার, সন্তান, লেখকের বিয়ের সমাপ্তি এসেছে, কিন্তু আসেনি প্রেম। অ্যানির মায়ের আলঝেইমার এসেছে, বেড়ালের চোখের দিকে তাকানোর সঙ্গে খেয়াল করা এবং প্রাক্তন প্রেমিকা যখন একজন কম বয়সী সঙ্গীকে খুঁজে পায় - এসব নিয়ে তাঁর ঈর্ষার কথা, কিন্তু অন্যগুলো একেবারেই আবেগহীন। আর সেখান থেকে খনন করে এনেছেন নানান স্মৃতিচিহ্ন, যেগুলিকে জড়ো করে পুনর্নির্মাণ করেছেন একেকটা অধ্যায়। নিজেকে বুঝবার জন্য তো বটেই, একইসঙ্গে নিজেকে ভেঙেচুরে নিজের মাধ্যমে জীবনকে বুঝবার এক বিরামহীন প্রয়াসে ব্রতী হয়েছেন। ভাষাকে ছুরির মতো ব্যবহার করেন তিনি, যা কল্পনার পর্দা ছিঁড়ে ফেলবে। সত্যান্বেষী ব্যোমকেশ বক্সী, ফেলুদা কিংবা হালের একেন বাবুর অপরাধ দৃশ্য পুনর্নির্মাণ করার মতো তাঁর লিখনপদ্ধতি। যেখানে কেউ সন্দেহের বাইরে নয়, নিজের স্মৃতিকেও বারংবার প্রশ্নচিহ্নের সামনে এনে দাঁড় করাচ্ছেন। সশরীরে ফিরে যাচ্ছেন স্মৃতিবিজড়িত জায়গাগুলিতে। কুড়িয়ে নিচ্ছেন কিছু বস্তুনিষ্ঠ সূত্র, কিছু ইঙ্গিত — কখনো নিজের ডায়েরির পাতা, কখনো কোনো সাদা কালো ছবি, কখনো কোনো বিজ্ঞাপনের সুর, কোনো গানের লাইন, কোনো বন্ধুর করা একটা আলগা মন্তব্য। স্মৃতির ফাঁকফোঁকর দিয়ে যাতে কোনোমতেই মিথ্যার অনুপ্রবেশ না ঘটে, তাই তাঁর এই নিরলস পরিশ্রম।

'ইন আ উওম্যানস্ স্টোরি'তে অ্যানি লেখেন, "আমি কেবল কুড়ুনি মাত্র"। তাই তাঁর লেখায় শুধু নিজের কথাই লেখেননি। সেখানে জড়ো হয়েছে তাঁর প্রজন্ম, তাঁর বাবা মায়ের প্রজন্ম এবং নানান শোষিতের কথকতা। এই বিশাল ব্যপ্তির স্তরে স্তরে গাঁথা যৌনতা ও অন্তরঙ্গতার থিম, সামাজিক বৈষম্য, যন্ত্রণা, লজ্জা— এই ইঁটেদের ফাঁকে ফাঁকে সময় আর স্মৃতির দ্বৈরথ। অথচ এমন থিমের বয়ান অত্যন্ত সাদামাটা গদ্যে। পাঠকের হাত ধরে সেই গদ্য করে তোলে নানান দ্বন্দ্বের মধ্যমণি। সে কারণেই এমন সরল গদ্য বেছে নেওয়া। অথচ এই সরলতার মধ্যেও এরনোঁর নিজস্ব বোধ কাজ করে ক্রমাগত। যে বোধ চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়, কোনও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাই বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। তা এক নির্দিষ্ট সমাজ-রাজনীতির অংশ। এই রাজনৈতিক বোধ অভিজ্ঞতাকে 'ব্যক্তিগত' বলে ঝেড়ে ফেলা যায় না। স্মৃতিও পিচ্ছিল। যার একদিক অস্বচ্ছ, অপরিষ্কার, সেদিকটা পক্ষপাতিত্বের ভার জমে জমে ক্রমশ ঝুঁকে গিয়েছে। কাজেই ভরসার অযোগ্য। তাতে ভরসা করলে আছাড় অনিবার্য। সেদিক থেকে তাঁর উক্তির সত্যটা খানিক খাটে বৈকি! কুড়ুনি হিসেবে তাঁর কাজ আদতে নৃতত্ত্ববিদের মতোই। খুঁড়ে খুঁড়ে ধ্বংসাবশেষ টুকু তোলা, ফসিল জমানো, সেই সব টুকরো জীবন তারপর এক তালে বাঁধার চেষ্টা। তাতে এই মহাকালের নিরিখে ব্যক্তির অবস্থান ফুটে ওঠে। যতটা ফোটানো যায় আর কী! তারই চেষ্টা মাত্র। অ্যানি এরনোকে যতটা পড়েছি আমার মনে হয়েছে শুধুমাত্র গল্প ও বিষয়বস্তু নয়, ফর্ম সম্পর্কে বেশি দৃষ্টি দিয়েছেন তিনি। তাঁর গদ্যশৈলীও এই কাজে তাঁর সহায়ক ও পরিপূরক। নির্মেদ, অনাড়ম্বর ঝরঝরে বাক্যগুলো যেন বিজ্ঞানের বস্তুনিষ্ঠা আর সাহিত্যের সত্যের মধ্যে এক আশ্চর্য্য মেলবন্ধন। তাঁকে পড়তে গিয়ে বারবার মনে হয় এই পাঠ ধ্রুব নয়। গতিহীন নয়। পড়ার প্রতিটি বাঁকে, প্রতিটি স্মৃতিচারণে, যতবার সে পাঠের দিকে নজর ফেরে পাঠ বদলে যেতে থাকে। অনবরত নিজের স্মৃতির প্রতি পাঠককে সন্দিগ্ধ করে তোলেন এরনো। নিজ অতীতের ময়নাতদন্তে লেখিকা খোদ পাঠকের ভিড়ে মিশে যান। থেকে থেকে উঠে আসে বিবিধ ধারাবিবরণী। নিজের সম্বন্ধে হোক বা দুনিয়ার, কোনো কিছুই লুকোচ্ছেন না এরনো। শরীরে আগত এই নতুন প্রাণটির প্রতি কোনো দয়ামায়া তার হয়নি, হয়নি অপত্যস্নেহের উন্মেষ। নিজের ডায়েরিতে নিজেকে ‘গর্ভবতী’ বলে উল্লেখ তো করেন নি, জরায়ুর অভ্যন্তরে থাকা প্রাণটিকেও শুধুমাত্র একটি বস্তু হিসেবে দেখেছেন, লিখেছেন ‘জিনিসটা’, ‘ওটা’। কলেজের এক পুরুষ সহপাঠী, সে তখন আন্দোলন করছে মেয়েদের নানা অধিকার নিয়ে, তাকে সবটা বলেছেন, কিন্তু সাহায্য পাওয়া তো দূরস্থান, বরং সেও সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করেছে। এরনো ক্ষোভ প্রকাশ করছেন না, বরং সহজভাবে লিখছেন, “আসলে, ঘটনাটা শুনে ওর মনে আমার সম্পর্কে ধারণাটা পাল্টে গিয়েছিলো, আমি তখন সেই ধরনের মেয়ে যে ‘হ্যাঁ’ বলবে, ‘না’ বলবে না। ছেলেরা তখন এই দুই ভাগেই মেয়েদের ভাগ করতো।” এইসব খোলামেলা স্বীকারোক্তির পাশাপাশি, তাঁর লেখায় অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে খুঁটিনাটি জিনিসের স্মৃতি। ঋতুস্রাবের রক্ত, একটা ছোপ লাগা অন্তর্বাস, একটা সরু লম্বা দণ্ড (যেটা যোনির মধ্যে ঢুকিয়ে গর্ভপাত করা হবে), একটা সাপ্তাহিক পত্রিকা, একটা ওষুধের শিশি — ছোট ছোট এই ছবিগুলি ছড়িয়েছিটিয়ে থাকে তাঁর লেখায়, অতীতকে জ্বলজ্যান্ত করে তোলে। মনে পড়ে যায় টি এস এলিয়টের নৈর্ব্যক্তিকতার তত্ত্ব — objective correlative : কবিতা হলো কবির ব্যক্তিগত আবেগ বা অনুভূতির প্রকাশ নয়, বরং আবেগ থেকে মুক্তি। এই তত্ত্ব অনুসারে, একজন কবিকে ঐতিহ্য ও ব্যক্তিগত প্রতিভার মধ্যে একটি ভারসাম্য রাখতে হয়, যেখানে কবি ঐতিহ্যকে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে অর্জন করেন এবং এর মাধ্যমে তিনি অতীত ও বর্তমানের মধ্যে একটি 'যুগপৎ ক্রম' তৈরি করেন। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কবি একটি 'নৈর্ব্যক্তিক' শৈল্পিক সত্তা তৈরি করেন, যা তাঁর ব্যক্তিগত অনুভূতিকে ছাপিয়ে যায়। কবি তাঁর ‘আমি’কে আনবেন না কাব্যে, তাঁর অনুভূতির, যন্ত্রণার বর্ণনা করবেন না; তিনি শুধু কিছু শব্দ, কিছু বস্তু, কিছু ছবি সাজিয়ে দেবেন, পাঠকের মনে দৃশ্যটি আপনিই ফুটে উঠবে, অনুভূতিগুলি জাগরুক হবে। নারীবাদীরা সঙ্গত কারণেই তাঁকে দলে টেনেছেন। তাঁর লেখায়, যাপনে, দৃষ্টিভঙ্গিতে বুভোয়ার, গ্রিয়ার, মিলেটদের ছাপ অনস্বীকার্য। কিন্তু কোলরিজ যেমনটা বলেছিলেন, প্রকৃত স্রষ্ঠার মন লিঙ্গভেদের ঊর্ধ্বে। এরনোর লেখায় তাই নারীজীবনের কথা মর্মে মর্মে অনুধাবন করতে পুরুষ পাঠকের সমস্যা হয় না। দেশকালের তফাতে অনেক ছোটখাটো রেফারেন্স হয়তো সবসময় ধরা যায় না, কিন্তু একটা জীবনের মধ্যে দিয়ে সময়ের বহমানতা, একজন ব্যক্তির মধ্যে দিয়ে সমাজের গতিপ্রকৃতি, আর সর্বোপরি একজনের স্মৃতির মধ্যে দিয়ে সর্বজনীন সত্যের প্রকাশ পাঠক সহজেই দেখতে পান। তাঁর অ্যাবর্শনের ট্রমা, খেটে খাওয়া পরিবারের মেয়ে হওয়ার লাঞ্ছনা, নিজেকে শিক্ষিত করার অবিরত চেষ্টা পুঙ্খানুপুঙ্খ ফুটে ওঠে কালের কাগজে। পুরুষশাসিত এই দুনিয়ায় নারীর স্বতন্ত্র অস্তিত্ব কতটুকু স্বীকৃত? হয় এক নিমেষে বাতিল করা, ছোট করা নয় নিজের আকাঙ্ক্ষার সামগ্রী হিসেবে আপন করা— এই দুই গত পুরুষের। এর বাইরে নারীকে একজন মানুষ হিসেবে কি আজও স্বীকৃতি দিয়েছেন পুরুষেরা? আত্মনির্ভরতার হিসেব নারীর এখনও বুঝে নেওয়া বাকি— এরনোর 'কুড়ুনিয়া' সাহিত্য আমাদের বারবার এই নগ্ন সত্যের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। প্রলেপের বিন্দুমাত্র চেষ্টা না করেই।

নিজের অতীতকে এতো শীতল, বস্তুনিষ্ঠ গদ্যে ফুটিয়ে তোলা, প্রায় আবেগহীন, বাহুল্যবর্জিতভাবে — এমন উদাহরণ বিশ্বসাহিত্যে বিরল বললেও অত্যুক্তি করা হবে না! আত্মজৈবনিক রচনায় তা আরোই অপ্রতুল। সর্বত্র নিজেকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখানোর যুগে, আত্মপ্রেমে ও আত্মগরিমায় হাবুডুবু খাওয়ার, আর অহরহ সত্যের সাথে মিথ্যেকে গুলিয়ে ফেলার এই সময়ে এমন একটি নৈর্ব্যক্তিক, ঋজু ও সত্যনিষ্ঠ স্বর তাই বিশ্বের পাঠককূলের কাছে এক আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবে, সন্দেহ নেই। ‘আমি’কে ছাপিয়ে যেতে পারা, নিজের অতীতকে এক নির্লিপ্ত দূরত্ব থেকে দেখতে ও দেখাতে পারা — এটাই বোধয় অ্যানি এরনোর সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব, যা তাঁর আত্মকথাগুলিকে সাহিত্যপদবাচ্য করে তুলেছে, এনে দিয়েছে সাহিত্যের সর্বোচ্চ পুরস্কার।

অ্যানি এরনো আমাকে মোহগ্রস্থ করে ফেলেছে। তোমার ভ্রমণ কেমন হলো? বেনারস ছাড়া আর কোথায় কোথায় গেলে? সব কিছু জানার অপেক্ষায় রইলাম। আমার চিঠি তোমার হাতে যাবার আগেই হয়ত তোমার চিঠি পাবো, নিরন্তর ভালো থেকো। মাঝে মাঝে মনে হয় আমাদের গেছে যে দিন সে কি একেবারই গেছে, কিছুই কি নেই বাকি? অ্যানি এরনো পড়তে পড়তে নিজেকে কোথায় খুঁজে পাচ্ছিলাম। আচ্ছা আমাদের ব্রেকাপটা কেন হয়েছিল বলতে পারো? তোমার কি আমাকে দায়ী মনে হয়? অনেক প্রশ্ন ঘিরে ধরছে, ঘড়ির কাটা চার ছুঁই ছুঁই করছে, কাল অফিস আছে তাই আর লিখছিনা।


অন্তে ভালো হোক

সুস্মি

০১.১০.২০২৫