Next
Previous
Showing posts with label বিশেষ প্রতিবেদন. Show all posts
1

বিশেষ প্রতিবেদনঃ জয়িতা সরকার

Posted in

বিশেষ প্রতিবেদন 




সমাজের পট বদল ও আমরা
জয়িতা সরকার 




সারথি বৃহন্নলা:

একটু পেছনের দিকে হাঁটি আসুন। চলুন যাই বিরাট রাজসভায়। সেখানে গভীর চিন্তায় মগ্ন সকলে। বিষয় কি? কৌরবেরা বিরাট রাজার গোধন চুরির নিমিত্ত বিরাট রাজ্য আক্রমন করেছে। বয়োজ্যেষ্ঠ কেউই সেইসময় রাজ্যে নেই। রাজকুমার উত্তর, অস্থির ভাবে পদচালনা করছেন অন্ত:পুরে। উপস্থিত পুরনারী দের বলছেন....

' মম পরাক্রম মত পাইলে সারথি।
মুহূর্তেক জিনিবারে পারি কুরুপতি।।'

সেইসময় পাণ্ডবেরা অজ্ঞাতবাসে আছেন বিরাট রাজ্যে। যাজ্ঞসেনী সৈরিন্ধ্রী ছদ্মবেশে আছেন রানীর সহকারিনী হিসেবে, অন্ত:পুরে সব শুনে তিনি শীঘ্র অর্জুনরূপী বৃহন্নলা কে সব জানালেন। তারপর রাজপুত্র উত্তর কে এসে বললেন....

' নর্তকী যে বৃহন্নলা আছয়ে আমার।
সৈরিন্ধ্রী কহিল সব পরাক্রম তার।।
খান্ডব দহিয়া পার্থ তুষিল অনলে।
বৃহন্নলা সারথি যে ছিলো সেই কালে।। '

সৈরিন্ধ্রীর বাক্যে প্রীত হয়ে রাজকুমার উত্তর, বৃহন্নলারূপী অর্জুন কে বললেন.........

' সৈরিন্ধ্রীর বাক্য মিথ্যা নহে কদাচন।
উঠ শীঘ্র মোর রথে কর আরোহণ।।
অর্জুন বলেন মানি তোমার বচন।
সারথি নহি যে তবু করিব গমন।।
কেবল আমার এক আছয়ে নিয়ম।
যথা যাই শত্রু যদি হয় যম সম।।
না জিনিয়া বাহুড়ি না আসে মম রথ।
সর্বথা প্রতিজ্ঞা মম জানিবে এমত।।'

এরপরের ঘটনা সবার জানা। যুদ্ধক্ষেত্রে উত্তরের ভয়ে পলায়ন, বৃহন্নলার তাকে ফিরিয়ে আনা, যুদ্ধে জয়লাভ, কৌরব দের পলায়ন এবং যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জুনের নিজ আত্মপরিচয় দান সবটুকুই।(শ্লোক: কাশিরাম দাসের মহাভারত)।



বিশ্ব রজ:স্রাব স্বাস্থ্য দিবস :

" বিশ্ব রজ:স্রাব স্বাস্থ্য দিবসের" প্রাক্কালে 'Menstruation Matters' আন্দোলনে সারা দিয়েছেন অগণিত নারী-পুরুষ। তিলোত্তমা কলকাতার বুকে ঘটে গেছে নি:শব্দ বিপ্লব। ভেন্ডিং মেশিনে স্যানিটারি ন্যাপকিন বিক্রির ব্যবস্থা করে নারী স্বাস্থ্য সুরক্ষায় পথিকৃত হয়েছে ভবানীপুর এডুকেশন সোসাইটি কলেজ।

যেখানে আমরা আধুনিক নারীরাও প্রকাশ্যে স্যানিটারি ন্যাপকিন কিনতে কুন্ঠা বোধ করি, সেখানে এমন একটা উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসনীয়। এই মেশিনে সঠিক দাম দিয়ে নির্দিষ্ট বোতামে চাপ দিলেই প্রয়োজন অনুযায়ী ন্যাপকিন মিলবে। প্রকাশ্যে কেনার অস্বস্তি দূর করতে এই মেশিন অব্যর্থ।

২০১১ সালের একটি সমীক্ষায় দেখা গিয়েছিলো। মাত্র ১২% ভারতীয় মহিলা এটি ব্যবহার করেন। যেখানে এত সাঙ্ঘাতিক অচেতনতা, কুসংস্কারে আচ্ছন্ন যুক্তিবোধ, অশিক্ষা, হাইজিনের সম্পর্কে অজ্ঞতা বিদ্যমান। সেখানে নারী পুরুষ নির্বিশেষে এগিয়ে এসে এমন একটা পরিকল্পনা কে সার্থক রূপদান নিশ্চয়ই সাধুবাদের দাবী রাখে।(সূত্র : এইসময়)



কৃষ্ণনগর উইমেন্স কলেজ ও অধ্যক্ষা মানবী:

এই খবরে আন্তরিক খুশি কলেজের ছাত্র-ছাত্রী, অধ্যাপক, অধ্যাপিকা ও পরিচালন সমিতির সদস্য সহ বেশির ভাগ সাধারণ মানুষ। যুগ বদলেছে তাই আজ পুরুষ- মহিলা, রূপান্তরকামী বা বৃহন্নলা নয় তার শিক্ষা, ব্যক্তিত্ব, উন্নত শীর, সুগঠিত মেরুদন্ড, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর ক্ষমতা, মানুষের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করার ক্ষমতা হয়ে দাঁড়িয়েছে তার একান্ত পরিচয় বাহক। অন্য কিছু নয়।

মহাভারতে বৃহন্নলা সারথি কে সঙ্গে নিয়ে উত্তরের জয়লাভ ঘটেছিলো। মানবীর সুনিপুন পরিচালনায় হয়ত বদলাবে অনেককিছু, আমরা আশাবাদী। ভারতে মানবীই প্রথম তৃতীয় লিঙ্গের কোনো ব্যক্তি যিনি শিক্ষা ক্ষেত্রে এমন শীর্ষপদে আসীন হলেন। আমরা তাকিয়ে মানবীর মত আরো অনেকের দিকে। যাদের ঋজু ব্যক্তিত্ব, নেতৃত্ব দান বদলে দেবে অনেক কিছুকেই। বদলাবো আমরাও।

সেদিন আর এমন কোনো ঘটনা খবরের কাগজের পাতায় আলাদা বিশেষ স্থান করে নেবেনা। আমরা জানব এটাই স্বাভাবিক। যোগ্য ব্যক্তি যোগ্যতর স্থানে যাবে এটাই যেন নিয়ম হয় তার লিঙ্গভেদ নয়।

শেষ করার আগে একটাই কথা। এত বদলের মধ্যে একদিন যদি দেখি... ফর্ম ফিল আপ করতে গিয়ে - SEX, RELIGION, CAST - এগুলোর উল্লেখ কমতে কমতে মিলিয়ে যাচ্ছে। সেখানে অগ্রাধিকার পাচ্ছে মেধা, যোগ্যতা, মানবতা...

জানব, " জগত সভায় শ্রেষ্ঠ আসন" নিতে "ভারতের " আর বেশি দেরি নেই।



0

বিশেষ প্রতিবেদনঃ মনোজিৎকুমার দাস

Posted in





বিশেষ প্রতিবেদন



শ্রদ্ধাঞ্জলিঃ সুচিত্রা ভট্টাচার্য 
মধ্যবিত্ত বাঙালি জীবনের চালচিত্র অঙ্কনের নিপুন কথাশিল্পী 
মনোজিৎকুমার দাস 



সমকালীন মধ্যবিত্ত বাঙালি সমাজের নর নারীর ব্যক্তিগত সম্পর্কের টানাপোড়েন, বর্তমান যুগের নীতিবোধের ক্রমোবনতি, নৈতিক অবক্ষয়, নারীদের দুঃখ-যন্ত্রণার চালচিত্র বাংলা সাহিত্যে সুনিপুন ভাবে তুলে আনা কথাসাহিত্যিক সুচিত্রা ভট্টাচার্য ( ১০ জানুয়ারি ১৯৫০- ১২ মে ২০১৫) ৬৫ বছর বয়সে ২০১৫ সালের ১২ই মে স্থানীয় সময় রাত ১০ টা  ৪৫ মিনিটে কলকাতার ঢাকুরিয়ার নিজ বাসভবনে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে লোকান্তরিত হলেন। 

সুচিত্রা ভট্টাচার্য বিশ শতকের সত্তর দশক থেকে একুশ শতকের চলতি দশক পর্যন্ত নানা ক্ষেত্রে পরিবর্তনের বাস্তবচিত্র তাঁর ছোটগল্প ও উপন্যাসে তুলে ধরেছেন মেধা, মনন ও বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে। তিনি গত শতকের সত্তর দশক থেকে ছোটগল্প লিখতে শুরু করেন। আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে উপন্যাস রচনায় আত্মনিয়োগ করেন।

বাঙালি, বিশেষ করে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর নর নারীর আটপৌরে জীবনের কাহিনী তিনি তুলে ধরেছেন তাঁর লেখা ছোটগল্প ও উপন্যাসগুলিতে। তাঁর লেখা উল্লেখযোগ্য উপন্যাসগুলি হল: কাছের মানুষ, দহন, কাঁচের দেওয়াল, হেমন্তের পাখি, নীলঘূর্ণি, অলীক সুখ, গভীর অসুখ, উড়ো মেঘ, ছেঁড়া তার, আলোছায়া, অন্য বসন্ত, পরবাস, পালাবার পথ নেই, আমি রাইকিশোরী, রঙিন পৃথিবী, জলছবি, যখন যুদ্ধ ভাঙ্গন কাল, আয়নামহল ইত্যাদি।

সুচিত্রা ভট্টাচার্য এর ছোটগল্পের মধ্যে রয়েছে- মেঘপাহাড়, সুহেলি, ভালো মেয়ে খারাপ মেয়ে, দাগবসন্তি খেলা, আলোছায়া, তুতুল, ইত্যাদি।

অন্যদিকে, তাঁর শিশুতোষ গ্রন্থগুলি হল: তিন মিতিন, কেরালায় কিস্তিমাত, জনাথনের বাড়ির ভূত, জার্মান গনেশ, শুধু ভূত, ইত্যাদি।

তাছাড়া তাঁর অন্যান্য গ্রন্থগুলো হল: অচিন পাখি, অন্য বসন্ত, আঁধারবেলা, আছি, একা জীবন, এখন হৃদয়, গহীন হৃদয়, চেনামুখ অচেনা মুখ, জলছবি, দাবানলের দেশে, ধুসর বিষাদ, নীলঘূর্ণি, পরবাস, পালাবার পথ নেই, মন্থন, মাঝরাতের অতিথি, ময়নাতদন্ত, শুধু প্রেম, শূন্য থেকে শূন্য, শেষ বেলায়, শেষ শান্তিপুর লোকাল, সময় অসময়, সর্পরহস্য সুন্দরবনে, সুখ দুঃখ, হলুদগাঁদার বনে, ইত্যাদি। 

সাহিত্যে অনন্য অবদানের জন্য তিনি বেশকিছু পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। এর মধ্যে দহন উপন্যাসের জন্য কর্ণাটকের বেঙ্গালুরুর শাশ্বতী সংস্থা থেকে পেয়েছেন ননজনাগুড়ু থিরুমালাম্বা জাতীয় পুরস্কার (১৯৯৬)। এ ছাড়া উল্লেখযোগ্য পুরস্কারগুলি হলো- কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূবনমোহিনী মেডেল (২০০৪), কথা পুরস্কার (১৯৯৭), তারাশংকর পুরস্কার(২০০০), দ্বিজেন্দ্রলাল পুরস্কার (২০০১), শরৎ পুরস্কার (২০০২), ভারত নির্মাণ পুরস্কার, সাহিত্য সেতু পুরস্কার,শৈলজানন্দ স্মৃতি পুরস্কার। তার বহু উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। সুচিত্রা ভট্টাচার্যের সাহিত্যকর্ম নিয়ে আলোচনার আগে তাঁর ব্যক্তিজীবনের উপর স্বল্পপরিসরে তুলে ধরা যেতে পারে। সুচিত্রাভট্টাচার্য ১৯৫০ সালে ১০ই জানুয়ারি ভারতের বিহারের ভাগলপুরে মামারবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিত্রালয় মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুর শহরে। পড়াশোনা কলকাতার স্কুল ও কলেজে। তিনি কলকাতার যোগমায়া দেবী কলেজ থেকে স্নাতক হন।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষালাভের সময় তিনি বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হন। বিভিন্ন স্থানে চাকরি করার পর তিনি সরকারী চাকরিতে যোগদান করেন। লেখিকা হিসেবে সম্পূ্র্ণ রূপে সময় দেওয়ার জন্য তিনি ২০০৪ খ্রিস্টাব্দে তাঁর চাকরি থেকে ইস্তফা দেন। 

বিশ্বায়ন ও মুক্তবাজার অর্থনীতির পরিপ্রক্ষিতে বাঙালির সমাজ জীবনের নারী পুরুষদের মধ্যে যে টালমালা অবস্থার সৃষ্টিহয়ে নানা ক্ষেত্রে যে ধরনের নৈতিক অবক্ষয় সৃষ্টি হয়, পরিবারে বিশেষ করে যৌথ পরিবারে নানা নারীদের দুঃখ-যন্ত্রণাতাঁর রচনাগুলির মূল উপজীব্য ছিল। প্রায় সাড়ে তিন দশক ধরে তিনি বহু ছোট গল্প ছাড়াও চব্বিশটি উপন্যাস রচনা করেছেন। 

সুচিত্রা ভট্টাচার্য স্কুলে পড়াশোনা কাল থেকেই সাহিত্যে প্রতি অনুরক্ত হন। তিনি একবার বলেছিলেন যে ক্লাস সিক্সে পড়াকালে ‘ ফুলশয্যা ‘নামে একটি গল্প লিখে সকলকে বিস্মিত করেছিলেন। যদিও তিনি সত্তর দশকের শেষ দিক থেকে বাংলাসাহিত্য জগতে পুরোপুরি ভাবে সম্পৃক্ত হন। আগেই বলা হয়েছে তার লেখা গল্প ও উপন্যাসে আটপৌরে জীবনের কথা উঠেএসেছে। সুচিত্রা ভট্টাচার্য তাঁর নিজস্ব চিন্তাচেতার আলোকে শহুরে মধ্য বিত্ত নারী পুরুষের পোড় খাওয়া জীবনের কাহিনী অতি বাস্তবতার আলো চিত্রিত করেছেন বলেই গল্প ও উপন্যাস এতটা পাঠক প্রিয় হয়েছে।

সুচিত্রার লেখাতে বারবারই ঘুরে ফিরে এসেছে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের আত্মিক দিক ও নানা জটিলতা। নারীদের নিজস্ব জগতের যন্ত্রণা এবং সমস্যার কথাও ফুটে উঠেছে তার লেখায়। 

তার বৃহত্তম উপন্যাস ‘কাছের মানুষ’ ছিল অত্যন্ত জীবন ঘনিষ্ঠ। দারুণ চরিত্রায়নের কারণে যা প্রশংসিত হয়েছিল। ‘কাছের মানুষ’ উপন্যাসটিকে তাঁর মাস্টার পিস হিসাবে বিবেচিত করা হয়ে থাকে। তাঁর গল্প ও উপন্যাসগুলো নিয়মিত কলকাতার দেশপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।

মধ্যবিত্ত বাঙালি নর নারীর জীবনের চালচিত্র অঙ্কনের নিপুন শিল্পী সুচিত্রা ভট্টাচার্যের মহাপ্রয়াণে অনেক অনেক শ্রদ্ধাঞ্জলি। তিনি লোকান্তরিত হলেও তাঁর সাহিত্যকর্ম তাঁকে বাংলা সাহিত্যে চির ভাস্বর করে রাখবে।





0

বিশেষ প্রতিবেদনঃ সুধাংশু চক্রবর্ত্তী

Posted in


বিশেষ প্রতিবেদন




শুভ নববর্ষ 
সুধাংশু চক্রবর্ত্তী



১লা বৈশাখে বাঙালীদের শুভ নববর্ষের সূচনা । এই বৈশাখ মাসকে ধরেই বঙ্গাব্দের সূচনা । যদিও বঙ্গাব্দ কবে থেকে শুরু হয়েছিল এবং কোনটি গ্রহণযোগ্য এ নিয়ে দ্বিমত আছে । সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে ১৫৫৬ খ্রীঃ ১১ এপ্রিল সোমবার ছিল ১লা বৈশাখ । ইতিহাসের একদিক বলছেন এইদিন থেকে বঙ্গাব্দ শুরু । কিন্তু কেন, এই আলোচনা করতে গিয়ে ইতিহাসের নানান তথ্য উঠে আসছে । 

প্রাচীন কালে রাজা বাদশারা নিজ নিজ রাজ্য প্রতিষ্ঠার সময়কালকে এক একটি অব্দ বা সাল গণনা করেছেন । যেমন শকাব্দ, খ্রিষ্টাব্দ, বঙ্গাব্দ ইত্যাদি । সম্রাট আকবর যখন মোঘল সাম্রাজ্যের অধিপতি তখন এই উপ-মহাদেশে শকাব্দ, হর্ষাব্দ, বঙ্গাব্দ, পালাব্দ ইত্যাদি প্রচলিত ছিল । সম্রাট আকবর ১৫৫৬ খ্রীঃ ১৫ ফেব্রুয়ারি (হিজরি ৯৬৩) দিল্লীর সিংহাসনে বসেন । এই দিনটি স্মরণীয় করে রাখার জন্য আকবরের রাজসভার রাজজ্যোতিষী ও পণ্ডিত আমির সিরাজি ১৫৫৬ খ্রীঃ ১১ এপ্রিলকে নববর্ষ ধরে ৯৬৫ ফসলি সন গননা করার রীতি চালু করেন । আমির সিরাজির সিদ্ধান্ত মত সম্রাট আকবর তার রাজত্বকালে ১৫৫৬ খ্রীঃ থেকে রাজত্বের সর্বত্র এই ফসলি সনের প্রচলন করেন । পরবর্তীকালে এর নাম হয় বঙ্গাব্দ । 

সূর্য পরিক্রমার হিসাবে যে বর্ষ গণনা করা হয় তাকে বলে সৌর বর্ষ আর চন্দ্র পরিক্রমার হিসাবে যে বর্ষ গণনা করা হয় তাকে বলে চন্দ্র বর্ষ । এই দুই ধরণের মাসকে বলা হয়ে থাকে যথাক্রমে সৌর মাস এবং চন্দ্র মাস । বাংলা সন সৌর সন । খ্রীঃ ৭৮ সাল থেকে আর একটি সৌর সন গণনা করা হয় তার নাম শকাব্দ । এটি ভারতের জাতীয় সন । হিসাব অনুযায়ী ধরা যেতে পারে ২০১৫ সালে শকাব্দের বয়স ১৯৩৭ । শকাব্দের সঙ্গে ৭৮ যোগ করলে খ্রীষ্টাব্দ পাওয়া যাবে কিংবা খ্রিষ্টাব্দ থেকে ৭৮ বিয়োগ করলে শকাব্দ পাওয়া যাবে । শকাব্দ এবং বঙ্গাব্দ উভয়েই সৌর অব্দ তাই দুই অব্দের তেমন কোনো তারতম্য দেখা যায় না । এখন খ্রিষ্টাব্দ ২০১৫, শকাব্দ ১৯৩৭ বঙ্গাব্দ ১৪২১ । বঙ্গাব্দের সঙ্গে ৫১৬ যোগ করলে শকাব্দ পাওয়া যাবে । এটা আমরা সবাই জানি । সম্রাট আকবরের আমলে বঙ্গাব্দের যে বছর সৃষ্টি হয় দেখা যাচ্ছে সে বছরই তার বয়স ৯৬৩ বছর । সেই কারণে বলা যায় হিজরি সনের প্রথম থেকে ৯৬৩ বছর পর্যন্ত বঙ্গাব্দের প্রথম পর্যায় । কিন্তু বহু গবেষক এবং ইতিহাস বিদরা আবার ভিন্ন মত পোষণ করেছেন । কেউ কেউ মনে করেন সম্রাট আকবরের আমলে ৯৬৩ হিজরি ৯৬৩ বঙ্গাব্দ বলে যা শোনা যায় তা সম্ভবত ঠিক নয় । পাকিস্তানের বিশিষ্ট গবেষক ইতিহাসবিদ গোলাম মুরশিদ ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের এক পত্রিকায় লিখেছিলেন যার সারমর্ম ছিলো, “সম্রাট আকবরের সময় বাংলা সনের প্রবর্তন হয়নি । এমনকি কোনো মুসলমান কর্তৃক প্রবর্তিত হলে বাঙালি হিন্দুরা তা মেনে নিয়ে তাদের ধর্মকর্মের সংযোগ সাধন করবেন তা বিশ্বাসযোগ্য নয় ।” এই মন্তব্য বঙ্গাব্দ নিয়ে বিতর্ক উসকে দেয় । কারণ হিজরি চন্দ্র মাস অনুযায়ী গণনা করা হয় এবং বঙ্গাব্দ গণনা করা হয় সৌর মাস অনুযায়ী । 

সম্রাট আকবর ১৫৫৬ খ্রীঃ (৯৬৩ হিজরি) সিংহাসনে বসার পর পরই সারা দেশজুড়ে টানা দশবছর অবিরাম যুদ্ধ করেছিলেন । শোনা যায় যুদ্ধের জন্য সবসময় ঘোড়ায় চড়ে থাকার দরুন তার পা ধনুকের মত বেঁকে গিয়েছিল । যুদ্ধরত সম্রাটের পক্ষে সেসময় আশা করা যায় বঙ্গাব্দ নিয়ে ভাববার অবকাশ ছিল না । দেখা যায় ১৫৭৬ খ্রীঃ পাঠান দায়ুদের কাছ থেকে আকবর গৌড়বঙ্গের অধিকার কেড়ে নেন । তাই ২০ বছর আগে যে অখণ্ড বাংলাদেশ সম্রাটের অধিকারেই ছিল না সেই দেশে কিভাবে হিজরির পরিবর্তে বঙ্গাব্দের প্রবর্তন করলেন সেটিও ভেবে দেখার । কেউ কেউ মনে করেন সে যুগের রীতিনীতি অনুযায়ী হিন্দুদের ধর্ম সংস্কৃতি বিনষ্ট করে অন্য সম্প্রদায়ের বশীভূত করা অন্যতম কারণ হতে পারে ।

অধিকাংশ মানুষ মনে করেন রাজা শশাঙ্কের আমলেই বঙ্গাব্দের সুচনা হয় । খ্রীঃ সপ্তম শতাব্দীর প্রথমদিকে কিংবা তার কিছু পরে বাংলার স্বাধীন ও পরাক্রান্ত রাজা ছিলেন শশাঙ্ক । ৫৯৩ খ্রীঃ তিনি গৌড়ের সিংহাসনে বসেন । এই সময় রাজা শশাঙ্কের খ্যাতি সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে । বাংলাদেশের প্রথম সার্বভৌম বাঙ্গালী রাজা শশাঙ্কের রাজত্বের সূচনাকাল থেকেই বঙ্গাব্দের সূচনা বলেই অধিকাংশেরই অভিমত । দেখা যাচ্ছে, ১লা বঙ্গাব্দের ১লা বৈশাখ ছিল সোমবার । ক্যালেন্ডার অনুযায়ী তারিখটি হলো ৫৯৪ খ্রীঃ ১২ এপ্রিল । প্রথম মাস বৈশাখ । বঙ্গাব্দের সুচনা সোমবার । রাজা শশাঙ্ক শিবের উপাসক ছিলেন । সোমবারটি ছিল শসাঙ্কের কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ দিন । শুরু বৈশাখে । এদিকে গুপ্ত যুগ থেকে বৈশাখ মাস হিসাব বর্ষ গণনার যে শুরু হয়েছিল সেই ধারা আজও বিস্ময়কর ভাবে অব্যাহত । গুপ্ত রাজ বংশের বহমান আদর্শ, সংস্কৃতি কৃষ্টির ধারাকে অনুসরণ করেই বৈশাখ মাসকে বছরের প্রথম মাস হিসাবে চিহ্নিত করেছিলেন । তাই বঙ্গাব্দ নিয়ে দুটি মত ধারাবাহিক ভাবে উঠে আসছে । প্রথম মত ১৫৫৬ খ্রীঃ ৯৬৩ হিজরি । অর্থাৎ ৯৬৩ কে ভিত্তি করেই বঙ্গাব্দের সূচনা । বঙ্গাব্দের বর্তমান বয়স হয় ( ১৪২১ – ৯৬৩ ) ৪৫৮ বছর । বঙ্গাব্দের বর্তমান বয়স ৪৫৮ বছর ।

দ্বিতীয় মতানুযায়ী বঙ্গাব্দের সূচনা হয় রাজা শশাঙ্কের আমলে । বঙ্গাব্দের সূচনা কাল ১ ধরা গেলে ১৪১৯ বঙ্গাব্দের বয়স হবে ১৪১৮ । অর্থাৎ (১৪১৮ – ৪৫৮ ) ৯৬০ বছর । বাংলা পঞ্জিকা তৈরী হয় সুর্য সিদ্ধান্তের উপর ভিত্তি করে । সূর্য সিদ্ধান্ত মতে ১ বছর হল ৩৬৫.২৫৮৭ দিন । কিন্তু ইংরাজি ক্যালেন্ডারের হিসাব অনুযায়ী ১ বছর হল ৩৬৫.২৪২২ দিন । এই হিসাব অনুযায়ী বাংলা ক্যালেন্ডার ১ বছর ০.০১৬৫৫৬ দিন বা ২৩ মিনিট ৮৪ সেকেন্ড বেশী । তাই বঙ্গাব্দ ১৪ বা ১৫ এপ্রিল সূচিত হয়ে আসছে । 

অতি প্রাচীন কালে অগ্রহায়ণ ও পরে ফাল্গুন মাস থেকে নতুন বছর শুরু হতো । মুঘল সম্রাট আকবরের আমলে খাজনার হিসেবের সুবিধার জন্যই বঙ্গাব্দ শুরু হয় । অথচ ‘পয়লা বৈশাখ’ উৎসবের উৎপত্তি ইংরেজ আমলে । তখন বাঙালি গ্রামসমাজ ছিলো মুখ্যত কৃষিজীবী । সেখানে চড়ক, পৌষ-পার্বণ, নবান্ন ইত্যাদি ছিলো বড় উৎসব । ঔপনিবেশিক জমানায় দেখা গেল, ১ জানুয়ারি বছরের প্রথম দিনটি ছুটি । অগত্যা বাঙালি ভাবলো, সাহেবদের থাকলে আমাদেরই বা নয় কেন ? নগর কলকাতায় তৈরি হলো নতুন এক ‘সেকুলার উৎসব’ । পয়লা বৈশাখ প্রথম থেকেই গ্রামবাংলার নবান্ন বা পৌষ-পার্বণের মতো জনপ্রিয় ছিলো না । আবার ব্রিটিশ শাসকদের ‘বড়দিন’ বা ‘নিয় ইয়ার্স ইভ’-এর গ্ল্যামারও ছিলো না । আজও বাংলার কিছু গ্রামে পয়লা বৈশাখকে ‘বাসি চড়ক’ বলে । 

দেশের সকল প্রান্তের বাঙালিদের মতোই বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল এলাকার প্রধান তিনটি ক্ষুদ্র জাতিসত্তা একত্রে নববর্ষের উৎসব পালন করে । ত্রিপুরিদের বৈশুখ, মারমাদের সাংগ্রাই ও চাকমাদের বিজু উৎসবকে যৌথভাবে বলা হয় ‘বৈসাবি’ । এর মধ্যে রয়েছে ঐতিহ্যময় বেশ কিছু মজার বর্ষবরণ উৎসব । ‘বৈসাবি’ অহিংসার, বন্ধুত্বের প্রতীক আর মৈত্রীর সুদৃঢ় বন্ধন । পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মধ্যে চাকমাদের আধিক্য বেশি । তাঁদের প্রধান উৎসব হলো বিজু । চাকমাদের ধারনা, চৈত্র মাসের শুরুতেই একটি পাখি (বিজু পেইক) এসে বিজু বলে ডাক দিয়ে যায় । এই বিজু পেইক সুমধুর কলতানে বিজু উৎসবের আগমনী বার্তা নিয়ে আসে । বাংলা বর্ষপঞ্জী হিসেবে বছরের শেষ দুই দিন, অর্থাৎ ২৯ চৈত্র ফুল বিজু আর ৩০ চৈত্র মূল বিজু পালিত হয় । ফুল বিজুর দিন নদীতে ফুল ভাসিয়ে উৎসবের সূচনা করে চাকমারা দল বেঁধে শিকারে বের হন । মূল বিজুর দিন চাকমারা ভোর উঠে দল বেঁধে ফুল তুলতে বেরোন এবং নদীতে স্নান করেন । তারপর সারা দিন পাড়া বেড়ানো, পিঠে তৈরি করা, ১৫-২০ পদের বিভিন্ন রকম তরকারী রান্নার ধুম পড়ে যায় । মারমাদের বর্ষবরণ উৎসবের নাম সাংগ্রাই । ভালো খাবার খাওয়া, বাড়ি বাড়ি ঘুরতে যাওয়া, সুন্দর কাপড় পরে, নৃত্য-গীতের আয়োজন ছাড়াও ঐতিহ্যবাহী পানিখেলা বা জলকেলির উৎসব । মারমা যুবক-যুবতীরা দু’টি দলে বিভক্ত হয়ে একে অন্যের গায়ে জল ছুঁড়ে নববর্ষের শুভেচ্ছা বিনিময় করে । নববর্ষের দিন শুরু হয়ে তিন দিন ধরে চলে এই পানিখেলা । এছাড়াও পিঠে খাইয়ে অতিথি সদ্ব্যবহার, বৌদ্ধ মঠে গিয়ে বুদ্ধপ্রণাম, বিভিন্ন খেলাধুলার আয়োজন উৎসবের আনন্দকে বৃদ্ধি করে । ত্রিপুরিদের উৎসব হলো বৈশুখ । খাগড়াছড়িইয়ে এই জনগোষ্ঠীর আধিক্য দেখা যায় । চৈত্র মাসের শেষ দুই দিন ও বছরের প্রথম দিন এই উৎসব চলে । এই সময়ে সকলে নতুন কাপড় পড়েন এবং বড়রা ছোটদের আশীর্বাদ করেন । কিশোরীরা কলসি নিয়ে বড়দের খুঁজে খুঁজে স্নান করান । তরুণ – তরুণীরা একসঙ্গে রঙ খেলায় মেতে ওঠেন । রঙ খেলা শেষে সকলে একত্রে স্নান করতে যান । 

পয়লা বৈশাখ । নতুন বছরর প্রথম দিন । নতুন আনন্দ, নতুন সুখ, নতুন কিছু পাবার আশায় ভরা একটি দিন । দেশের সর্বত্র ধর্ষণকাণ্ডের ছড়াছড়ি, রাজনৈতিক হানাহানি, স্কুল-কলেজে ছাত্র রাজনীতির দাঙ্গা, ট্রেন দুর্ঘটনা, জ্বলন্ত ট্রেনে ঘুমন্ত যাত্রীর পুড়ে মরা । এমন আরও অনেক দুঃখ, কষ্টে ভরা যন্ত্রণাময় ঘটনার মোড়কে ঢাকা অভিশপ্ত ১৪২১ সালের বিদায় হয়েছে গত রাত্রে । এসেছে নতুন বছর ১৪২২ । পয়লা বৈশাখে নুতন কিছু অঙ্গীকার, ভালো হওয়ার-ভালো থাকার অঙ্গীকার । পৃথিবী আলোয় আলোময় হয়ে উঠবে খুশির উৎসারণে । দিকে দিকে সবাই সেজে উঠেছে নতুন বছরকে বরণ করে নিতে । নতুন সাজে-পোষাকে । নতুন রূপে, নতুন মনে । কলকাতায় হালখাতার পূজোর সামগ্রী নিয়ে ভোর রাত থেকেই বিশাল লাইন পড়ে যায় কালীঘাটে মায়ের মন্দিরের সামনে । গ্রামে ও শহরাঞ্চলের দোকানে দোকানে হয় গনেশ ও লক্ষ্মীর পূজো । খোলা হয় লাল সালুতে মোড়া নতুন খাতা । সবাই একাত্ম হয়ে ওঠে পয়লা বৈশাখ উদ্‌যাপনে । ক্রেতারা দোকানে দোকানে মিষ্টি মুখ করেন দলে দলে এসে । দেখা হলেই একমুখ হাসি নিয়ে ‘শুভ নববর্ষ’ বলে বুকে টেনে নেবার পালা চলে । সবাই যেন ভুলে যেতে চায় অতীতের সব মলিনতা । হয়ে উঠতে চায় প্রাণের বন্ধু, আত্মার আত্মীয় । মনে প্রাণে চায় মুছে যাক্‌ পারস্পরিক মতান্তর, বিভেদ, দ্বেষের আগুণ যাক্‌ নিভে । বয়ে যাক প্রেমভালোবাসার স্রোতস্বিনী নদী দেশ দেশান্তরে । মন চায় নববর্ষের এই দিনটিতে বাংলা গানে ভেসে যাই । বাংলা গানের স্বর্ণযুগের বিখ্যাত শিল্পীদের মন মাতানো গানগুলি আজও স্পর্শ করে – ছুঁয়ে যায় ।

অতএব আমরা বলতেই পারি – হে নববর্ষ, এবার এসো সুন্দরের পথ ধরে । শান্তি বিরাজ করুক প্রতি ঘরে ঘরে । হিংসা, দ্বেষ – যা কিছু সব মুছে ফেলে জন্ম নিক অন্য এক নতুন পৃথিবী ।





2

বিশেষ প্রতিবেদনঃ পিয়ালী বসু

Posted in













বিশেষ প্রতিবেদন


আইরিশ সমাজে নারীর অবস্থান 
পিয়ালী বসু 



আয়ারল্যান্ড (Ireland ) দেশটির অবস্থান ইউরোপের উত্তর পশ্চিম, এবং গ্রেট ব্রিটেনের একেবারে পশ্চিমে, তা এ হেন আয়ারল্যান্ড দেশটি কে প্রাচীনপন্থী আইরিশ রা মাদার আয়ারল্যান্ড ( Mother Ireland ) বলেও ডেকে থাকেন, শোনা যায় আয়ারল্যান্ড দেশটি নাকি মাতৃতান্ত্রিক, আর তাই মাদার শব্দের উল্লেখ । Eavan Boland এর উক্তিতে এও জানা যায়, “The heroine, ….. was utterly passive. She was Ireland or Hibernia. She was stamped, as a rubbed-away mark, on silver or gold; …... Or she was a nineteenth-century image of girlhood, …….. She was invoked, addressed, remembered, loved, regretted. And, most importantly, died for. She was a mother or a virgin ... Her identity was as an image. Or was it a fiction?” অর্থাৎ কুমারী মায়ের প্রসঙ্গ, ঠিক যেমন মাদার মেরী, তেমনই মাদার আয়ারল্যান্ড, এই মিথ কে যদি তেমন আমল নাও দেওয়া হয়, তাহলেও কিন্তু আয়ারল্যান্ড যে মাতৃতান্ত্রিক দেশ, এ তথ্যটি পাল্টায় না, এবং এর স্বপক্ষে হাজার হাজার উদাহরণও পেশ করা যায় । পুরুষ হল সংস্কৃতির প্রতীক, আর নারী হল প্রকৃতির ... এই উভয়ের মেলবন্ধনেই সুস্থু সমাজ প্রতিষ্ঠা। মা (Mother ) এমন একজন, যিনি তাঁর মৌনতাতেই মুখর করে তোলেন পারিপার্শ্বিক পরিবেশ, আর প্রকৃতিও এই মায়ের মতোই সহনশীল, মৌন ... তাই নারী কে প্রকৃতির সাথে তুলনা । 

১৯২২ সাল থেকে আয়ারল্যান্ড পূর্ণমাত্রায় একটি Free State এর মর্যাদা পায়, ১৯৩৭ সালেই রচিত হয় সংশোধিত নতুন সংবিধান, আর এই সংবিধানেই মেয়েদের অধিকার এর কথাও ঘোষিত হয়। সমাজে প্রতিষ্ঠা পেতে থাকে নারীর অবদান, Other হয়ে ওঠে Mother ...আর আস্তে আস্তে কমতে থাকে Father এর প্রতিপত্তি, এখনও পর্যন্ত আয়ারল্যান্ড মাতৃতান্ত্রিক দেশ, (যদিও নারী অর্থেই মা নন) ১৯২৭ সালে পাশ হয় এক নতুন আইন, যে আইন স্বীকৃতি দেয় অবিবাহিতা মায়েদের, bars and restrictions have been lifted and it is no longer socially unacceptable to have a child outside of marriage .. In a country where Mothers quite definitely have a place, they evidently do not have a position in the constitution...এই চিরাচরিত ধারণাটাই পাল্টাতে থাকে ক্রমে । 

আপাদমস্তক ক্যাথলিক খৃস্টান একটি দেশের (চার্চ, পাদ্রী এদের নিয়েই) এমন নজির কিন্তু বেশ নজর কাড়ে, কিন্তু প্রতিটি সিদ্ধান্তেরই একটি বিপ্রতীপ অপসিদ্ধান্ত থাকে, এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনা, সমাজ ও সংবিধানে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং অবিবাহিতা মায়েদেরও সমাজে মূল স্বীকৃতি দেওয়ায় গর্ভপাত বেআইনি বলে গন্য হয়, এবং সাম্প্রতিক কালের সারা বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা সবিতা হালাপান্নাভার এর মৃত্যু আমাদের আরও একবার এক বিরাট প্রশ্নের সামনে এনে উপস্থিত করে। ২৮ শে অক্টোবর ২০১২ ...আয়ারল্যান্ডের Galway City Hospital এ মৃত্যু হয় সবিতার। ১৭ সপ্তাহের গর্ভবতী সবিতা অপ্রতিরোধ্য ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশনে আক্রান্ত হয়ে Galway City Hospital ভর্তি হন, সেসময়তেই Miscarriage হয় তাঁর, নিজেও ডাক্তার সবিতা ডাক্তারদের কাছে Abortion এর আর্জি জানান ২১ শে অক্টোবর, তাঁর সেই আবেদন খারিজ হয় এই ভিত্তিতে যে, ক্যাথলিক দেশে গর্ভপাত বেআইনি ! সেপটিক শক, মাল্টি অরগ্যান ফেলিওর এবং কার্ডিয়াক ফেলিয়োরে শেষ পর্যন্ত মৃত্যু হয় সবিতার। 

আইন কি মানুষের জীবনের চেয়েও দামী ? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে তোলপাড় হয় গোটা আয়ারল্যান্ড, ১৪ ই নভেম্বর আয়ারল্যান্ডের সর্বপ্রচারিত দৈনিক সংবাদপত্র The Irish Times ৭০০,০০০ কপি বিক্রী করে। সোশাল মিডিয়া জুড়ে বিতর্কের ঝড় বয়ে যায়, অবস্থা হাতের বাইরে চলে যেতে দেখে United Nations Special Rapporteur হস্তক্ষেপ করে । প্রধানমন্ত্রী Enda Kenny তাঁর বয়ানে জানান, “"I don't think we should say anything about this until we are in possession of all the facts.” ...Health Service Executive সাবারাত্নাম আরুল্কুমারান সাতজন ডাক্তার সহ একটি মেডিক্যাল প্যানেল তৈরি করে এই বিষয়টির তদন্ত শুরু করেন। তাঁর রিপোর্টে আরুল্কুমারান স্পষ্টতই জানান, সবিতার মৃত্যু হয় শরীরে অতিমাত্রায় ইনফেকশন ছড়িয়ে যাওয়ায়, এবং সঠিক মেডিকেল সুযোগ সুবিধা না পাওয়ায় । আয়ারল্যান্ড, লন্ডন, জার্মানির Indian Embassy র সামনে শুরু হয় মিটিং, ...কর্পোরেট দুনিয়ার খ্যাতনামা ব্যক্তিত্ব Colm O Gorman জানান, “successive Irish Governments have failed in their duty to provide necessary clarity on how this right is protected and vindicated, leaving women in Ireland in a very vulnerable position” 

সমস্ত জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটে ৩০শে জুলাই ২০১৩ এ , রাষ্ট্রপতি Michael D Higgins নতুন আইনে স্বাক্ষর করেন Protection Of Life Pregnancy Act 2013 ... চূড়ান্ত ক্যাথলিক দেশ আয়ারল্যান্ড তার আইন পাল্টাতে বাধ্য হয়, জীবন যে আইনের চেয়েও বেশি মূল্যবান, এই সহজ সত্যটা আরও একবার প্রমানিত হয় । 

আয়ারল্যান্ডের সমাজ বিষয়ক ইতিহাস ঘাঁটলে মেয়েদের অবস্থানগত বিবর্তন স্পষ্টতই চোখে পড়ে, খ্যাতনামা রিলেশনশিপ এক্সপার্ট Brendan Madden জানান, “Over the past 50 years we've seen fundamental change in Irish society and Irish family life, however one constant has remained – the desire for people to form strong, sustaining relationships throughout their life” আর এই সুষ্ঠু সম্পর্ক ও পরিবার প্রতিষ্ঠায় নারীর অবদান অনস্বীকার্য, মেয়েদের কোমল স্পর্শ ছাড়া যে কোন পরিবারই অসম্পূর্ণ । Madden এও জানান যে, বিগত ৫০ বছরের আইরিশ সমাজতত্ব ঘাঁটলে দেখা যাবে মহিলারা এখন ঘরে আর বাইরে সমান স্বচ্ছন্দ, আর তাই শিক্ষাগত প্রতিষ্ঠান, অফিস এবং আরও অন্যান্য বিভাগেও মহিলাদের অবাধ বিচরণ, কাজের প্রতি নিষ্ঠা তাঁদের আলাদা করেছে পুরুষদের চেয়ে, আর এই আলাদা হওয়ার সুবাদেই তাঁরা ছিনিয়ে নিচ্ছেন পুরুষদের কাজ ।অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও পরিবর্তন হয়েছে আয়ারল্যান্ডের, ভাল ভাবে বাঁচতে গেলে এখন পরিবারের উভয়েরই উপার্জন প্রয়োজন, তাই স্বাভাবিক ভাবেই মেয়েদেরও এগিয়ে আসতে হচ্ছে, পরিবারের হাল ধরতে, The result is that women often has to juggle their careers while still handling the bulk of household duties . 

সময় এগোচ্ছে, এগোচ্ছে সমাজ, আর তার সাথে সাথে পারিপার্শ্বিক পটভূমি। traditional model Family র সংখ্যা কমছে, তার জায়গা নিচ্ছে Single Parent Family, আশাতীতভাবে হ্রাস পাচ্ছে বিবাহ এর সংখ্যাও । ১৯৬০ সালের পর থেকে গড় বিবাহ এর সংখ্যা বেশ নিম্নমুখী, আর তার কারণ হিসেবে এটাই বলা যায়, পুরুষ এর পরিচয়ে আর নিজেদের পরিচিত করতে চাইছেন না মেয়েরা, তাই বিবাহ নয়, Co Habiting, ...চিরকালীন Commitment নয়, বরং অস্থায়ী Commitment বেশ স্বচ্ছন্দ আজকের আধুনিক আইরিশ নারী, you might need me, but I don’t need you ..পুরুষের নর্মসহচরী নয়, আজকের আইরিশ নারী পুরুষের কর্মসহচরী, আর তাই

The perception 
of truth
is not dependent
nor is it failed to
be
logic
without us 



0

বিশেষ প্রতিবেদনঃ মমতা দাস (ভট্টাচার্য)

Posted in


বিশেষ প্রতিবেদন



বাংলা আমার ভাষা 
মমতা দাস (ভট্টাচার্য)


পর পর গুলির শব্দ ,লুটিয়ে পড়ল তরতাজা কটি প্রাণ, বয়ে গেল রক্তের নদী। বড় বেদনার, বড় প্রেরণার, বড় গর্বের সেই দিন, আজ শোনা যাক সে কাহিনী...

১৯৪৭ সালের ১৪/১৫ আগস্ট রাজনীতির পাশা খেলায় দু টুকরো হয়ে ভেঙ্গে গেল একটা দেশ ভারতবর্ষ । জন্ম হলো পাকিস্তানের। ভারতের প্রধান মন্ত্রী পন্ডিত জওহরলাল নেহেরু। পাকিস্তানের কায়েদ-এ আজম মহম্মদ আলী জিন্না গভর্নর জেনারেল । জিন্নার ঘোষণা পাকিস্তান-এর ধর্ম মুসলিম, আর রাষ্ট্র ভাষা উর্দু । আর কোনো ধর্ম বা ভাষার সরকারী স্বীকৃতি নেই। ধর্মের বিষয়টা ঠিক-ই ছিল। সংখ্যাগুরু সম্প্রদায় হল মুসলমান, সংখ্যা লঘু সম্প্রদায়ের সংখ্যা এত কম যে প্রশ্ন তোলা বা দাবি করার প্রশ্নই ওঠে না। কাজেই ধর্ম বিষয়ে কোনো অসুবিধার কারণ ঘটল না। গোল বাঁধলো ভাষার প্রশ্নে। পশ্চিম পাকিস্তানের জনগনের কোনো অসুবিধা বা আপত্তির কারণ ছিল না। তাদের বেশির ভাগের-ই ভাষা উর্দু। এবং অন্য যারা পাঞ্জাবি, সিন্ধি, জাঠ ছিল তারা প্রায় সকলেই উর্দু জানত। দৈনন্দিন ব্যবহারের ফলে সহজেই কথা বলতে পারত সেই ভাষায় ,তা ছাড়া তাদের সংখ্যা এত কম ছিল যে কোনরকম প্রতিবাদের কথা মাথায় আসা সম্ভব নয়, ফলে কোনরকম চিত্ত বৈকল্য ঘটল না তাদের। 

বৃহত্তর পাকিস্তানের জনসংখ্যার বেশির ভাগ-ই পূর্ব পাকিস্তানের (অধুনা বাংলাদেশ), তাদের মাতৃভাষা বাংলা । জিন্নার ঘোষণায় অসুবিধায় পড়ল তারা। উচ্চ শিক্ষিত বাঙালি মুসলমানরা অল্প-বিস্তর উর্দু জানলেও সাধারন বাঙালিরা নিজেদের মাতৃ ভাষাতেই অভ্যস্ত । সমস্ত সরকারী কাজ, কাগজপত্র, ব্যাঙ্ক ইত্যাদিতে বাধ্যতা মূলক ভাবে উর্দুর ব্যবহার তাদের বিরক্ত করে তুলল। তার উপরে শিক্ষার মাধ্যম-ও করা হলো উর্দু বা ইংরাজী কে। বাঙালির বিরক্তি বাড়লো। ১৯৪৭-এর ডিসেম্বর মাসেই পূর্ব বাংলার বাঙালিরা বাংলা ভাষায় শিক্ষা এবং কাজকর্মের অধিকার চেয়ে সমাবেশ করে। সেই হলো বাংলা ভাষার জন্য প্রথম সমাবেশ ,তবে তাতে সামিল হন কেবলমাত্র শিক্ষক ও ছাত্ররা। ঢাকা ইউনিভার্সিটি -তে একটি প্রতিবাদ সভা হয়। 'রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ 'গঠিত হয় । ইতিমধ্যে পাকিস্তান সরকার সমস্ত পোস্টাল স্ট্যাম্প, মুদ্রা, সমস্ত সরকারী কগজ-পত্র থেকে বাংলা ভাষা কে সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে দেয়। পরিষদ তার প্রতিবাদ করে। পাকিস্তান সরকার সে প্রতিবাদে কর্ণ পাত করে না। ১৯৪৮ সালে প্রথম শ্রী ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত একটি প্রস্তাবে বাংলাদেশ বিধানসভায় বাংলা ভাষা ব্যবহারের দাবি তোলেন। সেই সুর ধরে ঢাকা ইউনিভার্সিটি-র চত্ত্বরে ছাত্ররা জমায়েত হয় প্রতিবাদ কর্ম-সূচী নিয়ে। জারি হয় ১৪৪ ধারা, পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও লাঠি ব্যবহার করে। প্রচুর ছাত্র আহত ও বন্দী হয়। 

পাকিস্তানের তত্কালীন প্রধান মন্ত্রী লিয়াকত আলী এক কথায় সেই প্রস্তাব নাকচ করে দেয়। ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে পূর্ব পাকিস্তানে এসে জিন্না ঘোষণা করে বাঙালিদের এই অনুচিত দাবি কোনমতেই মানা হবে না , এবং পাকিস্তানকে ভেঙ্গে ফেলার এই অপচেষ্টা কঠোর হাতে দমন করা হবে। বাঙালিদের সম্মানে লাগে, এবং তারা রাগে ফুটতে থাকে। বাংলা ভাষার জন্য ছাত্রদের আন্দোলন চলতে থাকে। ইতিমধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের বিধানসভা একটি প্রস্তাব আনে , তার মূল বিষয় দুটি, 

১) বাংলা পূর্ব পাকিস্তানের মূল ভাষা হবে, তবে সেটা সময় সাপেক্ষ। সমস্ত সরকারী দপ্তর প্রস্তুত হলে তবেই ভাবা হবে সেই ব্যাপারে। 

২) স্কুল-কলেজে বাংলায় শিক্ষা দেওয়া হবে ,তবে মাধ্যমিক ও তার উপরের স্তরে উর্দু হবে Second Language .এই প্রস্তাবের পরে অবস্থা সঙ্গীন হয়ে ওঠে। Dr. শহীদুল্লাহ বললেন, "পূর্ব বঙ্গে বাংলা ভাষাকে পূর্ণ ক্ষমতা দিতে হবে। বাঙালি (মুসলমান,হিন্দু) একটা আলাদা জাত, তাদের ভাষা সম্পূর্ণ আলাদা। সেই ভাষাই বাংলার সর্বস্তরে (সরকারি-বেসরকারী কাজকর্ম, শিক্ষা ) ব্যবহৃত হতে হবে ",( ডিসেম্বর ১৯৪৮ ) . Dr .শহীদুল্লাহ'র কথা বাঙালির মনে ধরল, আপামর বাঙালির দ্বারা সাদরে গৃহিত হল। কিন্তু পাকিস্তানের শাসকরা বহু ভাষাভাষী রাষ্ট্রের বাস্তব সমস্যা না বুঝে, এই কথা সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে। তার বদলে সেখানে সংসদে প্রস্তাব গৃহিত হয় যে সংস্কৃত থেকে উদ্ভুত যত শব্দ মিশেছে বাংলা ভাষায়, সেই সমস্ত শব্দ পরিহার করা হবে। সেগুলি বাদ দিয়ে ,উর্দু,আরবী, ফার্সি শব্দ ঢোকানো হবে। সেটা একরকম অসম্ভব কাজ ! হাজার বছরের ব্যবহারে এত সংস্কৃত শব্দ ভারতে ব্যবহৃত ভাষা গুলিতে ঢুকেছে যে তাদের মুছে দেওয়া অতি দুরূহ কাজ, একরকম অসম্ভব। 

১৯৫১ সালে লিয়াকত আলী নিহত হয়, এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয় খাজা নাজিমুদ্দিন। ১৯৫২ সালে মুসলিম লীগের ঢাকা সম্মেলনে খাজা নাজিমুদ্দিন ঘোষণা করে যে, 'উর্দুই পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা, অন্য কোনো ভাষা সরকারী স্বীকৃতি পাবে না।' বাঙালি রাগে, অপমানে ফুলতে থাকে। আহত হয়। ১৯৫২ সালের জানুয়ারীতে একটি গোপন অধিবেশনে আওয়ামী লীগ এবং বামপন্থী দলগুলি মিলিত ভাবে ঠিক করে ভাষা আন্দোলন শুধু ছাত্র আন্দোলন হলে সফলতার আশা কম, একে রাজনৈতিক রূপ দিতে হবে। নেতৃত্ব দেবে রাজনৈতিক দলগুলি। কিন্তু মুখ্যত এটা থাকবে ছাত্র আন্দোলন রূপেই। সারা ফেব্রুয়ারী মাস জুড়ে নানারকম প্রতিবাদ সভা, ধর্না, সমাবেশ চলতে থাকে। ছাত্ররা ঢাকা ইউনিভার্সিটি-তে একটি সমাবেশের ডাক দেয়, ফেব্রুয়ারী-র ২০ তারিখ। ১৪৪ ধারা জারি করা হয় ইউনিভার্সিটি ও তার আশে-পাশে। 

ফেব্রুয়ারীর ২১ তারিখ ,১৯৫২ সাল, বিরাট প্রতিবাদ সভা ডাকা হয়। সকাল থেকে ছাত্ররা ১৪৪ ধারার পরোয়া না করে ইউনিভার্সিটি চত্ত্বরে জমা হতে থাকে । দুপুরে বিশাল জনসভায় সর্ব সম্মতি ক্রমে সিদ্ধান্ত হয়, বিধানসভার সামনে প্রতিবাদ সংঘটন করা হবে। প্রতিবাদ সভা শুরু হওয়া মাত্রই শুরু হয় পুলিশী অত্যাচার। ছাত্রদের দমানো যায় না। নামল আধা সামরিক বাহিনী। শুরু হলো কাঁদানে গ্যাস আর লাঠি চার্জ। ! ছাত্ররাও ইঁট-পাথর দিয়ে প্রত্যুত্তর দিতে শুরু করে। ক্রমে আন্দোলনের জোর বাড়ে, মেডিকেল কলেজ ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ছাত্ররাও এসে যোগ দেয়। মাতৃভাষার জন্য আবেগে উত্তাল হয়ে ওঠে ছাত্র সমাজ, কার সাধ্য তাকে রোধ করে ? "এই যৌবন জল তরঙ্গ রুধিবে কে ?" ক্রমেই দুর্বার হয়ে ওঠে ছাত্ররা। আন্দোলনের পরিধি বিস্তৃত হতে থাকে , অত্যাচার-ও সীমা ছাড়াতে থাকে। শত শত ছাত্র আহত হয়। কারাবরণ করে হাজারে হাজারে ছাত্র। নিরবচ্ছিন্ন আন্দোলন চলতেই থাকে। ঐদিন বিকেলে মেডিকেল কলেজের সামনে পুলিশ ছাত্রদের উপরে গুলি ছোঁড়ে। ঢাকা ইউনিভার্সিটি-র ৩ জন ছাত্র সমেত মোট ৫ জন ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারায়। বাহিনীর গুলিতে নিহত হয় আব্দুস সালাম,রফিকউদ্দিন আহমেদ, আবুল বরকত ,আব্দুল জব্বর, সফিক, শফিউর রহমান। বহু ছাত্র আহত হয়। বহু ছাত্র কারা বরণ করে। প্রতিবাদে বিধানসভার অধিবেশন মুলতুবি করার দাবী তোলে বিরোধীরা, মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিন সে প্রস্তাব নাকচ করে দেয় । বিরোধীরা প্রতিবাদ করে সভা ছেড়ে বেরিয়ে যায়। ছাত্রদের মৃত্যু স্থলে একটি 'শহিদ মিনার' গড়ে তোলা হয় রাতারাতি ! পাকিস্তানী সৈন্যরা সে শহিদ মিনার ভেঙ্গে দেয়। আবার সেই স্থানেই গড়ে তোলা হয় মিনার। সিমেন্ট, বালি ইঁট জোগাড় হয় ঢাকা ইউনিভার্সিটি তে নির্ণীয়মান ভবন থেকে। এবং ধারাবাহিক আন্দোলন চলতেই থাকে। 

লাগাতার আন্দোলনে জেরবার পাকিস্তান সরকার অবশেষে ১৯৫৪ সালের ৪ ঠা মে বাংলা ভাষাকে সরকারী মর্যাদা দিতে সম্মত হয়। ১৯৫৬ সালের ২৯ শে ফেব্রুয়ারী পাকিস্তানের সংবিধান সংশোধন করে, ঘোষণা করা হয় পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা দুটি, ...উর্দু এবং বাংলা। পূর্ব বাংলার বাঙালিদের 'ভাষা অন্দলন'-এর জয় হল অবশেষে। ঢাকায় জন্মলাভ করল বাংলা একাডেমি। এর পরে ভোট জিতে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানে প্রাদেশিক সরকার গঠন করে। নূতন মুখ্যমন্ত্রী তত্কালীন চিফ ইঞ্জিনিয়ার কে ঘটনাস্থলে একটি স্থায়ী শহিদ বেদী নির্মানের পরিকল্পনার দায়িত্ব দেন। তৎকালীন সুবিখ্যাত আর্কিটেক্ট (স্থপতি) হামিদুর রহমানের উপর দায়িত্ব বর্তায় বাঙালির সফল স্বপ্নের রূপকারদের স্মৃতি স্তম্ভ গড়ে তোলার। তৈরী হল কাঁচের তিনটি স্তম্ভ, মাঝখানের বড়টি মা এবং দুপাশের ছোট দুটি সন্তান, পিছনে লাল উদীয়মান সূর্য। সূর্যের আলোয় তারা জ্বলে ওঠে। শহিদ বেদির নীচে, মাটির তলায় হল বানিয়ে দেয়ালে ছবি এঁকে (ফ্রেস্কো), সমগ্র ভাষা আন্দোলনের ঘটনা অমর করে রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছিল, তবে সেই প্রস্তাব পরে পরিত্যক্ত হয়। বাঙালির আবেগ প্রবণ মনে ২১ সে ফেব্রুয়ারী-র আন্দোলন আবেগ এবং সম্মানের স্থান অধিগ্রহন অধিগ্রহণ নিল। বাঙালি কবি আব্দুল গফ্ফর চৌধুরী কবিতা রচনা করলেন, "আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো ২১ শে ফেব্রুয়ারী / আমি কি ভুলিতে পারি?" বাঙালির আবেগ ভালবাসার জোয়ারে পরিণত হল, সুর বসিয়ে গানে পরিণত করা হল। প্রত্যেক বৎসর এই গানটি দিয়ে 'ভাষা আন্দোলন' স্মরন অনুষ্ঠান শুরু করা হয়। প্রভাত ফেরি এবং পদযাত্রায় এই গানটা গাওয়া হয়। 

২১ শে ফেব্রুয়ারী বাংলা ভাষা এবং বাঙালিদের একটি স্মরনীয় দিন হিসাবে পরিগণিত হল। এবং এই বিশেষ দিন থেকেই বাঙালিদের মনে স্বাধীনতার ক্ষীন চেতনা জাগরিত হল। বলা যেতে পারে সম্ভাবনার বীজ বপন হল। বাঙালি বুঝলো সার্বিক আন্দোলন একদিন স্বাধীনতাও এনে দিতে পারে। কাজেই ভাষা আন্দোলনকেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের চেতনার সূচনা বলে ধরা যেতে পারে। পরে ইউনাইটেড নেশন (United Nations )-এর পক্ষ থেকে 'আন্তর্জাতিক মাতৃ ভাষা দিবস' (International Mother tongue day ) হিসাবে ২১ শে ফেব্রুয়ারী কে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ১৯৯৯ সালের সালের নভেম্বর মাসে ফ্রান্সের প্যারিস-এ তাদের হেড কোয়ার্টার থেকে এই ঘোষনা করা হয়। 

আজ বাংলা একটি স্বাধীন দেশ, বাংলাদেশ। তার সরকারী ভাষা বাংলা। বাংলা ভাষা এখন পূর্ণ সম্মানে, মর্যাদায় সেখানে প্রতিষ্ঠিত। বাংলা ভাষা আন্দোলনের সুন্দর, সফল স্বীকৃতি। নমস্য সেই ছাত্র দল যারা মাতৃভাষার জন্য শহিদ হয়ে বাংলার ভাষার পথ সহজ করেছিলেন ! আমার বিনম্র শ্রদ্ধা বাংলা ভাষার জন্য প্রাণ উৎসর্গকারী সেই ভাষা শহিদ দের প্রতি।
0

বিশেষ প্রতিবেদন: পিয়ালী বসু

Posted in


বিশেষ প্রতিবেদন

বইমেলা : একটি তথ্যসমৃদ্ধ আলোচনা 
পিয়ালী বসু



বইমেলা, Book Fair বইপ্রেমী মানুষের কাছে এই উদ্দীপনার নাম । কিছুদিনের মধ্যেই শুরু হতে চলেছে কলকাতা বইমেলা আর তার ঠিক প্রাক্কালে আমরা বরং একবার চোখ বুলিয়ে নিই বইমেলা র উৎস ও নানাবিধ বইমেলা র ওপর ।


ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা 

পৃথিবীর বৃহত্তম বইমেলা বলে খ্যাত এই বইমেলা। Frankfurt Trade Fair Ground এ মাত্র পাঁচ দিন ব্যাপী অনুষ্ঠিত হয় এই বইমেলা। ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা প্রায় ৫০০ বছর পুরনো , জানা যায় Johaness Gutenberg ফ্রাঙ্কফুর্ট এর কাছে Mainz একটি ছাপাখানা স্থাপন করেন , এবং স্থানীয় পুস্তক বিক্রেতাদের উদ্যোগে সেইসময়ে শুরু হয় ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা। ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা এখনও পর্যন্ত ইউরোপের শ্রেষ্ঠ বইমেলা!


লন্ডন বইমেলা 

London International Antiquarian Book Fair কে আমরা সবাই লন্ডন বইমেলা বলেই জানি। ১৯৫৭ সালে স্কুল কলেজে যখন গরমের ছুটি চলছে তখন বেশ আশ্চর্য ভাবেই উদ্ভাবিত হল এই বইমেলা। লন্ডনের Bond Street এ নামকরা এক Auction এর দোকান ছিল , সেখানেই এই বইমেলার প্রথম সূচনা। মাত্র ৫ পাউনডে বিক্রী হত সব বই , মুল উদ্দ্যেশ্য ছিল সাধারণ মানুষের মধ্যে বই এর নেশা ধরানোর এবং তাতে পূর্ণমাত্রায় সফল হয়েছিলো লন্ডন বইমেলা। ১৯৬৬-১৯৭০ সালে এই বইমেলা পরিচিত হয় The Book Collectors Fair নামে এবং চলতে থাকে টানা ১৬ দিন। ক্রমে বাড়তে থাকে এই বইমেলার পরিচিতি স্বাভাবিক ভাবে পরিধিও , ১৯৯৮ সাল থেকে ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা লন্ডন বইমেলা অনুষ্ঠিত হতে থাকে অলিম্পিয়া তে ।



মায়ামি বইমেলা 

১৯৮৪ সালে Books By The Bay দিয়ে সূচনা হয় মায়ামি বইমেলার। দুদিন ব্যাপী এই বইমেলার কোন ভেনু না থাকায় রাস্তাতেই শুরু হয় এই বইমেলা , দু বছরের মধ্যে পাল্টায় চিত্রকল্প , পাল্টায় ছবি ! ১৯৮৬ সাল থেকেই মায়ামি বইমেলার নতুন নামকরণ হয় Miami International Book Fair , দু দিন ব্যাপী অনুষ্ঠিত বইমেলা বাড়তে থাকে আট দিন, শেষে দশ দিনে। প্রতি বছরের নভেম্বর মাসে হাজার হাজার বইপ্রেমী মানুষ সমস্ত প্রতিকূলতা জয় করে এসে উপস্থিত হন Miami Downtown এ । এই বইমেলার অন্যতম বিশেষত্ব হল এখানে লেখক লেখিকাদের জন্য বিশেষ প্রদর্শনীর ব্যাবস্থা থাকে, Festivals of Authors নামে এই প্রদর্শনী টি শুরু হয় লেখালিখি সম্পর্কিত নানাবিধ বিতর্ক নিয়ে এবং শেষও হয় বই সম্পর্কিত তথ্যাবলী দিয়ে। রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে এবং পরে ব্যারাক ওবামা এই বইমেলার অন্যতম আকর্ষণ ।


আয়ারল্যান্ড বইমেলা 

Dublin Art Book Fair নামে খ্যাত আয়ারল্যান্ডের বইমেলা টি অপেক্ষাকৃত ভাবে নতুন , মাত্র পাঁচ বছর আগে জেমস জয়েসের শহর আয়ারল্যান্ডের রাজধানী ডাবলিনে শুরু হয় এই বইমেলা। ৬ই নভেম্বর – ১০ই নভেম্বর Temple Bar গ্যালারী তে অনুষ্ঠিত হয় এই বইমেলা। শিল্প সাহিত্যের দেশে এই বইমেলা একটা বিশেষ আকর্ষণ। মাত্র ৫ ইউরো তে বই পাওয়া যায় এই মেলায় যা বই প্রেমিক মানুষদের কাছে এক পরম পাওনা।


শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি সমৃদ্ধ দেশ আয়ারল্যান্ডে আরও অনেক ইতস্তত বইমেলা দেখা যায় , যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য Dublin City Book Fair , Dublin Book Festival, Westmeath town Of Books Festival, Delvin Book Fair ও Celtic Book Fair 


আবু ধাবি বইমেলা 

Abu Dhabi International Book Fair নামে খ্যাত এই বইমেলার সৌন্দর্য যে কোন পশ্চিমের দেশকেও হার মানায়, ৫০ টি দেশ থেকে প্রায় ১০২৫ জন প্রকাশক ও পাঠকের সমাবেশে সরগরম থাকে এই বইমেলা। 


শারজাহ বইমেলা 

Sharjah International Book Fair নামে খ্যাত এই বইমেলাটি প্রতিবছরের ৪ঠা -১৪ই নভেম্বর অনুষ্ঠিত হয় । বিশ্বের অন্যতম প্রধান বইমেলা হিসেবে এই বইমেলাটির নাম করা হয়। ১৯৮২ সালে স্থাপিত এই বইমেলার প্রধান বিশেষত্ব হল নব্য জেনেরেশন এর কাছে বই কে পৌঁছে দেওয়া , নানা রকম মেলা এবং সেমিনারের মাধ্যমে সমৃদ্ধ এই বইমেলা ।


কায়রো বইমেলা 

নতুন বছরের শুরুতে জানুয়ারি মাসেই অনুষ্ঠিত হয় এই বইমেলা যা শেষ হয় ফেব্রুয়ারির শেষদিকে। ১৯৬৯ সালে স্থাপিত এই বইমেলার অন্যতম বিশেষ আকর্ষণ ইজিপ্সিয় বইপত্র এবং ম্যাপ। 


কলকাতা বইমেলা

International Kolkata Book Fair বা আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলা নামে খ্যাত এই বইমেলা এশিয়ার বৃহত্তম বইমেলা হিসেবে আজও স্বীকৃত। প্রতি বছরের জানুয়ারি মাসে এই বইমেলা অনুষ্ঠিত হয় মিলন মেলা প্রাঙ্গনে। Publishers & Book Sellers Guild এর মেলার উদ্যোক্তা। ১৯৭৬ সালে স্থাপিত এই বইমেলা প্রথমে অনুষ্ঠিত হত কলকাতা ময়দানে , কিন্তু দুর্ভাগ্য জনক এই অগ্নি কাণ্ডে ক্ষতি হয় প্রচুর প্রকাশক ও পুস্তক বিক্রেতার , তার পরেই এই মেলা স্থানান্তরিত হয় সল্টলেকে এবং পরে মিলন মেলা প্রাঙ্গনে ।


সবশেষে এটুকুই বলার ... A Reader Lives A Thousand Times Before He/ She Dies.. তাই বই পড়ুন , ভালবাসুন বই কে আর প্রতিমুহূর্তে বেঁচে থাকুন আনন্দে।







0

বিশেষ প্রতিবেদন: সিয়ামুল হায়াত সৈকত

Posted in




বিশেষ প্রতিবেদন



ক্যান্সার হাসপাতাল, হুমায়ূন আহমেদের স্বপ্ন এবং …
সিয়ামুল হায়াত সৈকত



একটি স্বপ্ন। হ্যাঁ, পরিস্কার একটি স্বপ্ন দেখেছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। বাংলাদেশ হবে ক্যান্সার চিকিৎসার পীঠস্থান। স্বপ্নটি বোধহয় একটু বড়। কিন্তু স্বপ্ন দেখতে দোষ কি? যেখানে স্বপ্ন পূরণ হওয়াও দূরের কিছু নয় (!)

হুমায়ূন আহমেদ ২ নভেম্বর ২০১১-এ প্রথম আলোতে 'নো ফ্রি লাঞ্চ' শিরোনামে
একটি মর্মস্পর্শী লেখা লিখেছিলেন। লেখাটির শেষ দিকে তিনি বাংলাদেশে একটি বিশ্বমানের ক্যান্সার হাসপাতাল ও গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনের স্বপ্নের কথা জানিয়েছেন। লেখাটির শেষটুকু ছিল এরকম -

'সর্বাধুনিক, বিশ্বমানের একটি ক্যানসার হাসপাতাল ও গবেষণাকেন্দ্র কি বাংলাদেশে হওয়া সম্ভব না? অতি বিত্তবান মানুষের অভাব তো বাংলাদেশে নেই। তাঁদের মধ্যে কেউ কেন স্লোয়ান বা কেটারিং হবেন না? বিত্তবানদের মনে রাখা উচিত, কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ব্যাংকে জমা রেখে তাঁদের একদিন শূন্য হাতেই চলে যেতে হবে। বাংলাদেশের কেউ তাঁদের নামও উচ্চারণ করবে না। অন্যদিকে আমেরিকার দুই ইঞ্জিনিয়ার স্লোয়ান ও কেটারিংয়ের নাম তাঁদের মৃত্যুর অনেক পরেও আদর-ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার সঙ্গে সমস্ত পৃথিবীতে স্মরণ করা হয়। আমি কেন জানি আমেরিকায় আসার পর থেকেই স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছি, হতদরিদ্র বাংলাদেশ হবে এশিয়ায় ক্যানসার চিকিৎসার পীঠস্থান। যদি বেঁচে দেশে ফিরি, আমি এই চেষ্টা শুরু করব। আমি হাত পাতব সাধারণ মানুষের কাছে ।' 

-লেখাটিতে হুমায়ূন আহমেদের ইচ্ছে আর অভিব্যক্তি সম্পূর্ণ রূপে পরিস্ফুটন ঘটেছে। কেন সম্ভব নয়? প্রশ্ন জাগে আমারও। বাংলাদেশে ব্রাকের প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবিদ, ম্যান পাওয়ার এক্সপোর্ট ইন্ডাস্ট্রির প্রতিষ্ঠাতা মুসা বিন সামসুর, বসুন্ধরা গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা আহমেদ আকবর সোবাহান, সাচৌ এর প্রতিষ্ঠাতা আবুল হোসাইনের মতো উচ্চবিত্তশ্রেণীর লোকদের একটু সুন্দর দৃষ্টিভঙ্গিই গড়ে তুলতে পারেন সবচেয়ে চমৎকার আর প্রথম শ্রেণীর একটি ক্যান্সার হাসপাতাল। তাছাড়া বাংলাদেশ উন্নত নয়, উন্নয়নশীল। এদেশের বড় বড় হর্তাকর্তারা তা ভালো করেই জানেন। জানেন চিকিৎসার জন্য কতটুকু অসহায় চাহনি নিয়ে চিকিৎসকের দ্বারে ঘুরে মরতে হয় শ্রেণীবৈশম্যময় মানুষগুলোর। 

হুমায়ূন আহমেদ পথদৃষ্টা হিশেবে আছেন, কাজ আমাদের। হর্তাকর্তাদেরও। যে বীজ রোপণ করা হয়েছে একটু সাহায্যের হাত পেলেই তা বড় করা সম্ভব। জানা আছে মানুষের মন থেকে কখন এতখানি আকুতি বের হয়। ওনার জীবদ্দশায়; দুরারোগ্য ক্যান্সারের চাপে মস্তিষ্কের বিভুঁই কি সব কাজ করেছে, তা না হলে এমন একজন লেখক হাত পাতার কথা বলেন? 

হুমায়ূন আহমেদ একজন স্বপ্ন তৈরীর কারিগর। স্বপ্নের সাথে বুনে দিয়েছেন ইচ্ছেও। তার প্রত্যেকটি লেখায় আমরা ইচ্ছের প্রতিচ্ছবি পেয়েছি। ইচ্ছের মৃত্যু হয়না। ইচ্ছেরা বাঁচে। আমরাই পারি বাঁচাতে। হুমায়ূন আহমেদের স্বপ্নযাত্রা কখনই বিফল হবেনা একজন হুমায়ূন ভক্ত হিশেবে বলছি। হ্যাঁ, সাহায্যের খুব দরকার। আছেন কেউ পাশে ?
0

বিশেষ প্রতিবেদন : পিয়ালী বসু

Posted in


বিশেষ প্রতিবেদন 



প্রবাসের ডায়েরী থেকে 
পিয়ালী বসু 



ইতিহাসের পাতা ওলটালে জানা যায়, সম্ভবত পঞ্চদশ শতাব্দী তে প্রথম দুর্গাপূজার প্রচলন শুরু হয়, এও জানা যায় দিনাজপুর এবং মালদা জেলার জমিদার সম্প্রদায়ই প্রথম এই পূজার সূত্রপাত করেন, আবার কারোর কারোর মতে নদীয়া জেলার ভবানন্দ মজুমদারের উদ্যোগেই প্রথম দেবী দুর্গার আরাধনা শুরু হয় ১৬০৬ বঙ্গাব্দে। 

আমাদের বাঙালীদের প্রধান এই উৎসবের সঠিক উৎস নিয়ে নানাবিধ মতান্তর থাকলেও এটুকু আমরা সবাই জানি যে ১০৮ টি নীল পদ্ম এবং ১০৮ টি দীপ জ্বালিয়ে প্রথম এই পূজার সূচনা করেন বহুলকথিত রামচন্দ্র, দেবীর অকালবোধন এর মাধ্যমেই সম্ববত দুর্গা আমাদের জানান দিয়ে দেন যে অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করতে ধরাধামে আবির্ভূতা  হয়েছেন তিনি, আর আমরা মেরুদণ্ডহীন (ধর্মভীরু ) মানুষ তাঁকে আশ্রয় করেই বেঁচে আছি এই বিশ্বাস নিয়ে যে একদিন সব অন্যায়ের, সব অবিচারের প্রতিশোধ নেবেন তিনি। 

আসলে ১৭৯০ সালে সেই যে হুগলীর গুপ্তি পাড়ায় বারোয়ারী পূজার সূচনা হল, সেই থেকেই তো আমরা তাঁকে মানে দেবী দুর্গাকে আমাদের সবার মনে করে আমাদের যাবতীয় অন্যায় অবিচারের দায় তাঁর ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুম দিচ্ছি, আসলে দুর্গা আমাদের চোখে একটা Cult, একটা ধারণা, যিনি অন্যায়ের প্রতিশোধ নিতেই ধরাধামে এসেছেন, তাই আমরা, মানে গড়পড়তা হিন্দু বাঙালীরা দুর্গা পূজার Rational দিকটা নিয়ে কোনদিনই তেমন ভাবে ভাবিনি, যতক্ষণ না শ্রীযুক্ত সমেন্দ্রচন্দ্র নন্দী Statesman পত্রিকায় তাঁর “Durgapuja: A Rational Approach” প্রবন্ধটি প্রকাশ করলেন। 

আমাদের মধ্যে যারা ইতিহাস নিয়ে একটু আধটু চর্চা করি, তাঁরা নিশ্চয়ই এতক্ষণে জেনে গিয়েছি যে, যেসময়ে দুর্গাপূজার প্রবল উদ্দীপনায় সারা বাঙলা উদ্দীপিত ঠিক সেইসময়ে কিন্তু দেশ জুড়ে ব্রিটিশ রাজত্ব, এবং বিদেশীয় ব্রিটিশরা কিন্তু বেশ আনন্দের সঙ্গেই দুর্গাপূজার ঐ ১০ দিন ব্যাপী আনন্দ উৎসবে অংশগ্রহণ করতেন। 

চার ছেলেমেয়ে নিয়ে এই যে দুর্গার মর্ত ভ্রমণ এই ছবিটা কিন্তু বেশ টানে আমায়, আসলে আমাদের বাঙালীদের সেই একান্নবর্তী পরিবারের ছবিটা ভীষণ ভাবে স্পষ্ট হয় দুর্গার এই বাপের বাড়ি ভ্রমণ চিত্রে এবং সেই ছোটবেলা থেকে যখন বাবা মা র সঙ্গে প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঘুরতাম তখনও কিন্তু শোলার সাজের চেয়ে ডাকের সাজে সজ্জিত প্রতিমা ছিল আমার বেশী প্রিয়। 

আজ ১৫ বছর ধরে আমি আয়ারল্যান্ড নিবাসিনী এবং দীর্ঘ এই ১৫ বছর কলকাতার পূজার সাথে আমি সম্পর্কহীন, প্রতি বছর সেপ্টেম্বর, অক্টোবর মাসের মন খারাপ গুলি কিছুটা হলেও অন্তত কাটে এই ডাবলিনে আয়োজিত দুর্গাপূজা দেখে। 

আয়ারল্যান্ড দেশটি বেশ ছোট আর তার রাজধানী ডাবলিন শহরেই বাস আমার, এখানে বাঙালীর সংখ্যা হাতেগোনা রকমের কম, তাই পূজাটাও হয় মাত্র এক দিনেই, সবাই যেহেতু কর্মরত(রতা) এবং ধরেই নেওয়া যেতে পারে যে আইরিশরা বুঝতে পারবে না দুর্গাপূজা নিয়ে আমাদের এই উত্তেজনা, এবং কোনভাবেই কর্ম জগত থেকে ছুটি মিলবে না, কাজেই এখানকার বাঙালী সংগঠন “সুজন” (সেই যদি হও সুজন তেঁতুল পাতায় নজন এর অনুসঙ্গ) রবিবার দেখেই আয়োজন করেন একদিনের এই দুর্গাপূজার । মূল ডাবলিন শহর থেকে ৩০ মিনিট দুরত্বে Portmarnock এ প্রতিবছর ডাবলিনের দুর্গোৎসব আয়োজিত হয়। 
           
আমরা যারা কর্মসূত্রে দেশচ্যুত, এই একদিনের দুর্গাপূজা তাদের বছরআন্তের একমাত্র স্বস্তি এবং স্বান্তনার কারণ! এবারও তার ব্যতিক্রম নয়... দিন গুনছি প্রতি মুহূর্তে।