Next
Previous
Showing posts with label বিশেষ রচনা. Show all posts
0

বিশেষ রচনা - দীপারুণ ভট্টাচার্য

Posted in


বিশেষ রচনা


শঙ্খঘোষ
দীপারুণ ভট্টাচার্য


মাঝে মাঝে শুধু খসে পড়ে মাথা
কিছু-বা পুরোনো কিছু-বাতরুণ।
হাঁক দিয়ে বলে কনডাকটর :
পিছনের দিকে এগিয়ে চলুন।

কবি শঙ্খ ঘোষ, এই নামটির সঙ্গে আমার প্রথম কবে পরিচয় হয়েছিল, মনে নেই। তবে ওঁর প্রথম যে কাব্যগ্রন্থ আমি পড়েছিলাম তার নাম, "শবের উপরে শামিয়ানা"। সবে মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে তখন মাথায় চেপেছে কবিতার ভূত।

এরপর পড়েছি ওঁর বিভিন্ন কাব্যগ্রন্থ। যেমন ‘বাবরের প্রার্থনা’, ‘মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে’, ‘নিহিত পাতালছায়া’, ‘পাঁজরে দাঁড়ের শব্দ’ ইত্যাদি। কবিতা ছাড়াও পড়েছি তাঁর অন্য স্বাদের লেখা যেমন, ‘জার্নাল’ বা ‘কবিতার মুহূর্ত’। কবিতায় এক অদ্ভুত চিত্ররূপ সৃষ্টি করতে পারেন শঙ্খবাবু। সহজ ভাষা দিয়ে স্পর্শ করেন অতল গভীর। তাঁর, 'শূন্যের ভিতরে ঢেউ' কবিতাটির কয়েক লাইন উল্লেখ করার লোভ সামলাতে পারছি না ---

বলিনি কখনো?
আমি তো ভেবেছি বলা হয়ে গেছে কবে।
এভাবে নিথর এসে দাঁড়ানো তোমার সামনে
সেইএক বলা
কেননা নীরব এই শরীরের চেয়ে আরো বড়
কোনো ভাষানেই
কেননা শরীর তার দেহহীন উত্থানে জেগে
যত দূর মুছে দিতে জানে
দীর্ঘ চরাচর,
তার চেয়ে আর কোনো দীর্ঘতর যবনিকা নেই। (সংক্ষিপ্ত)

তিনি সামাজিক সমস্যাগুলোকে দেখতেন খুব সাধারণ চোখে, তাই লিখেছেন,

একলা হয়ে দাঁড়িয়ে আছি
তোমার জন্য গলির কোণে
ভাবি আমার মুখ দেখাব
মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে।

কবির জন্ম ৬ই ফেব্রুয়ারী ১৯৩২ সালে অধুনা বাংলাদেশের চাঁদপুর জেলায়। অঞ্চলটি পদ্মা ও মেঘনা নদীর মিলনস্থল। তিনি লিখেছেন, 'মেঘনার মতো তার শরীরে আদুল শুয়ে আছি'।

তাঁর কবিতার ভাষা অন্যদের চেয়ে আলাদা। ধরা যাক 'বোধ' কবিতাটি;

যে লেখে সে কিছুই বোঝেনা
যে বোঝে সে কিছুই লেখেনা
দু-জনের দেখা হয় মাঝে মাঝে ছাদের কিনারে
ঝাঁপ দেবে কিনা ভাবে অর্থহীনতার পরপারে!

শঙ্খবাবু সব সময় জীবনকে দেখেছেন খুব সাধারণ ভাবে এবং সেই ভাবেই প্রকাশ করেছেন। তাঁর এই চার লাইন কবিতার পর আর​ ব্যাখ্যা নিষ্প্রয়োজন-

লোকে বলে ভুল, আর আমিও কি জানিনা যে ভুল?
তবু তার মাঝখানে ডুবে আছি, যেভাবে মহিষ
নিজেকে নিহিত রাখে নিরুপায় জ্যৈষ্ঠের ডোবায়
বাতাস শুষেছে যার অবশ চোখের অলসতা।

মনে আছে তাঁর 'পাঁজরে দাঁড়ের শব্দ' কাব্যগ্রন্থটি যখন পড়েছিলাম তখন আমার ১৭ কি ১৮ বছর বয়স। শিখতে শুরু করি কিভাবে লিখতে হয় অক্ষর বৃত্তে বা মাত্রা বৃত্তে। শঙ্খবাবুর কবিতার ধারা অনুকরণ ও করেছি তখন।

এবছর, ২০১৬ সালে জ্ঞানপীঠ পুরস্কার পাচ্ছেন শঙ্খ ঘোষ। সাহিত্যে অবদানের জন্য ভারত সরকারের দেওয়া সবচেয়ে বড় সম্মান, জ্ঞানপীঠ। এবার একজন বাঙালী রাষ্ট্রপতি এই সম্মান তুলে দেবেন আর এক বাঙালী কবির হাতে। দৃশ্যটা চিন্তা করে বেশ ভালো লাগছে। এর আগে এই সম্মান পেয়েছেন ১৯৯৬ সালে মহাশ্বেতা দেবী, ১৯৯১ সালে সুভাষ মুখোপাধ্যায়, ১৯৭৬ সালে আশাপূর্ণা দেবী, ১৯৭১ সালে বিষ্ণু দে এবং ১৯৬৬ সালে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়।

শঙ্খ ঘোষ বাহান্নতম (৫২) মানুষ যিনি এই সম্মান নিয়ে আমাদের সম্মানিত করবেন। কারণ, আমার মনে হয় পুরস্কার কবিকে যতটা সম্মানিত করে তার চেয়ে অনেক বেশি সম্মানিত করে তাঁর পাঠকদের। জ্ঞানপীঠ ছাড়াও শঙ্খ বাবু পেয়েছেন ভারতীয় নাগরিক সম্মান পদ্ম-ভূষণ (১৯১১), রবীন্দ্র পুরস্কার (১৯৮৯) ইত্যাদি। তাঁকে ২০১৫ সালে Indian Institute of Engineering Science and Technology, শিবপুর, ডি.লিট উপাধি দেয়। একই সম্মান তাঁকে দিয়েছে বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ও।

কবিরা অভিমানী। তাই অভিমান স্বাভাবিক তাঁরও। তিনি লিখেছেন,

কে তোমার কথা শোনে? তুমি-ই বা শোন কার কথা?
তোমার আমার মধ্যে দু-মহাদেশের নীরবতা।

তাঁর গদ্য পড়তে গিয়ে জেনেছি তিনি কতটা সঙ্কোচ বোধ করেন নিজেকে প্রকাশ করতে। চিরকাল প্রচার বিমুখ থেকেছেন তিনি। যদিও প্রয়োজনে তাঁর উপযুক্ত ও সুনির্দিষ্ট প্রতিবাদ আমরা বারবার দেখেছি। তিনি লিখেছেন, 'ভোর এল ভয় নিয়ে, সেই স্বপ্ন ভুলিনি এখনও'। কিংবা আরো স্পষ্ট বলেছেন-


বাসের হাতল কেউ দ্রুত পায়ে ছুঁতে এলে আগে তাকে প্রশ্ন করো তুমি কোন দলে
ভুখা মুখে ভরা গ্রাস তুলে ধরবার আগে প্রশ্ন করো তুমি কোন দলে
পুলিশের গুলিতে যে পাথরে লুটোয় তা কেটেনে তুলবার আগে জেনে নাও দল
রাতে ঘুমোবার আগে ভালোবাস বার আগে প্রশ্ন করো কোন দল তুমি কোনদল
(সংক্ষিপ্ত)

আজ ৮৫ বছরের এই তরুণ কবিকে প্রণাম করতে চাই, বলতে চাই, ভালো থাকুন, আনন্দে থাকুন। তাঁর 'পাঁজরে দাঁড়ের শব্দ' কাব্যগ্রন্থটির দুটি কবিতায় সুর করেছিলাম একসময়, তখন আমার ১৮ বছর। ইচ্ছা ছিলো তাঁকে শোনাবার। সুযোগ হয়নি। ভাবছি you tube এ তুলে দিলে কেমন হয়। যদি ভক্তের কানের ভিতর দিয়ে এই গান পৌঁছে যায় ভগবানের কাছে!

তুমি কি কবিতা পড়ো? তুমি কি আমার কথা বোঝো?
ঘরের ভিতরে তুমি? বাইরে একা বসে আছো রকে?
কঠিন লেগেছে বড়ো? চেয়েছিলে আরো সোজাসুজি?
আমি যে তোমাকে পড়ি, আমি যে তোমার কথা বুঝি।

শঙ্খ বাবুকে প্রণাম।


0

বিশেষ রচনা - সাম্য দত্ত

Posted in


বিশেষ রচনা


তিন এক্কে তাতা 
সাম্য দত্ত



আপনি যদি মনে করেন, ভরপেট ভাত আর পাশে পাশবালিশ পেলেই একটি নিটোল ভাতঘুম সেরে নিতে পারবেন, তাহলে বলতে হয়, আপনি ঘুমিয়েই আছেন, এখনও ঘুমোতে শেখেননি। ঠিক যেরকম এবং যতখানি ঘুমলে তাকে তোফা ঘুম বলা চলে, সেরকম ঘুম এক তোফা- অর্থাৎ উপহার বিশেষ। ভাতের গরম আর পাশবালিশের নরম ছাড়াও আরেকটা জিনিস লাগে। এতক্ষণ যে বইটা পড়তে পড়তে চোখের পাতা বুজে আসছিল, সেইটা আড়াআড়ি বিছিয়ে দিন বুকের ওপর। এইবার চোখ বুজেই দিব্যি টের পাবেন, ঘুমপাড়ানি মাসি-পিসি আপনার মাথার কাছটিতে বসে ইকির-মিকির খেলছেন। আর পায়ে-পায়ে ঘুমপরী নেমে আসছেন আপনার চোখে। ব্যস! এরপর শুধু মনে মনে 'আয় ঘুম, যায় ঘুম, দত্তপাড়া দিয়ে' দু'কলি ভেঁজে নিন। ওই মনে মনে হলেই হবে। এই দেখুন, আপনি এক্কেবারে ঘুমিয়ে কাদা!

এত জোগাড়যন্ত্র করে যেই না একটা ফুরফুরে ঘুম এসেছে, নাকটাও হয়তো ফুরফুর করে বার দুই ডেকে উঠেছিল...বেমক্কা বারকতক হাঁচি হাঁচতে গিয়ে, হাঁউ-মাঁউ-কাঁউ মানুষের গন্ধ পাঁউ করে খাট থেকে প্রায় ছিটকেই পড়েছি। ধড়মড় করে উঠে বসে, চোখটোখ কচলে নিয়ে দেখি, একটা সাহেবসুবো গোছের লোক, পেন্সিলের মতো খাড়াই নাক আর সেই নাকে রসগোল্লার মতো চশমা, প্যাটপ্যাট করে আমার দিকে চেয়ে আছে। এইবার লোকটা তার পেন্সিলের মতো নাকটা কুঁচকে সিঙাড়ার মতো করে, ভয়ানক রকমের একটা ভেচকুরি কেটে বলল, "যাক বাবা, উঠেছ তাহলে!" 

আমি খুব চটেমটে বললাম, "কাঁচা ঘুমটা ভাঙিয়ে দিলে কেন শুনি?" লোকটা বলল, "ওমা, তোমার নাক ডাকছিল যে!"

-তা'তে কী হলো?

-তাও বুঝি জানো না? শোনো, সেই একজন লোক ছিল, সে মাঝেমাঝে এমন ভয়ঙ্কর নাক ডাকাত যে, সবাই তার উপর চটা ছিল। একদিন তাদের বাড়ি বাজ পড়েছে, আর অমনি সবাই দৌড়ে তাকে দমাদম মারতে লেগেছে। হোঃ হোঃ হোঃ..."

এইবার আমার বেজায় রাগ হলো, তেড়ে উঠে বললাম, "তুমি বাপু লোক ভালো নও!" 

লোকটা অমনি মাথা নেড়ে প্রতিবাদ করলে, "উঁহু.. লোক নয়, লোক নয়, আমার নাম হলো শ্রোডিঙ্গার। আমার নাম শ্রোডিঙ্গার, আমার ভাইয়ের নাম শ্রোডিঙ্গার, আমার পিসের নাম শ্রোডিঙ্গার।"

-তার চেয়ে বললেই হয়, তোমার গুষ্টিশুদ্ধু সবাই শ্রোডিঙ্গার।

লোকটা, থুড়ি, শ্রোডিঙ্গারটা একটু ভেবে বলল, "তা তো নয়। আমার মামার নাম কোয়ান্টাম। আমার মামার নাম কোয়ান্টাম, আমার খুড়োর নাম কোয়ান্টাম, আমার শ্বশুরের নাম কোয়ান্টাম।"

শ্বশুরের নাম কোয়ান্টাম শুনে কেমন যেন একটু সন্দেহ হলো। বললাম, "ঠিক বলছ?"

শ্রোডিঙ্গারটা আবার একটু ভেবে বলল, "না না, আমার শ্বশুরের নাম কোপেনহেগেন ইন্টারপ্রিটেশন।"

-যত্তসব বাজে কথা! তোমার নাম যাই হোক, আমার নাকে রুমাল ঢুকিয়ে সুড়সুড়ি দিচ্ছিলে কেন?

একথা শুনে শ্রোডিঙ্গারটা মনে হলো খুব দুঃখ পেল। মুখখানা বেগুনভাজার মতো বিষণ্ণ করে বলল, "না হে, রুমাল নয়, ওটা আদতে একটা বেড়াল।"

-বেড়াল কীরকম? 

-কীরকম শুনবে? তাহলে... অ্যায়! এই দেখ নোটবই, পেন্সিল এ'হাতে, এই দেখ ভরা সব কিলবিল লেখাতে। পড়ে দেখ দেখি, কিছু বোঝো কিনা!

পড়ে অবিশ্যি আমি কিছুই বুঝিনি, কিন্তু পাছে সেকথা বললে শ্রোডিঙ্গারটা আবার দুঃখ-টুঃখ পেয়ে বেগুনভাজার মতো বিষণ্ণ হয়ে যায়, তাই খুব খানিকটা ঘাড়-টাড় নেড়ে হুঁ হুঁ করে গেলাম।

শ্রোডিঙ্গার খুশি হয়ে বলল, "হ্যাঁ, বাক্সের মধ্যে বেড়ালটা যেই না ঢুকেছে, অমনি একখানা রেডিওঅ্যাক্টিভ এলিমেন্ট ছেড়ে দিয়েছি।"

-বেড়ালের তালব্য শ-এ আকার ল-এ আকার! তারপর?

-তারপর... হো হো হো... সেকথা বলতেও আমার বেজায় হাসি পাচ্ছে... রেডিওঅ্যাক্টিভ এলিমেন্টটা যেই অ্যাক্টিভ হবে, অমনি দিকে দিকে রেডিওবার্তা রটে যাবে... আর সঙ্গে সঙ্গে... হি হি হি...উফ্! গেল গেল, নাড়ি-ভুঁড়ি সব ফেটে গেল... ফ্লাস্কের বিষাক্ত গ্যাস বেরিয়ে এসে-

-পুসিক্যাট পপাত চ!

-এবং মমার চ! মার্জার মায়ের ভোগে! হা হা হা, ভাবো দেখি, কী মজার ব্যাপার! 

-কিন্তু...রুমাল তাহলে আসছে কোথ্থেকে?

শ্রোডিঙ্গার এবার হঠাৎ হাসি-টাসি থামিয়ে খুব গম্ভীর হয়ে বলল, "সেইখানেই তো হিসেবটা মিলছে না।"

-"মিলবে না কেন?" আমি তাকে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করলাম, "এ তো খুব সোজা হিসেব।"

-"না হে, তুমি ব্যাপারটা তলিয়ে ভাবছ না। অঙ্কটা এলসিএমও নয়, জিসিএমও নয়। সুতরাং হয় ত্রৈরাশিক, নাহয় ভগ্নাংশ।" বলেই শ্রোডিঙ্গারটা ছকাছক করে মাটিতে একটা ছক কেটে বলল, "মনে কর, এলিমেন্টটা অ্যাক্টিভই হলো না আদৌ। তখন?" 

-কোয়ায়েটলি ভেবে দেখলে, কোয়ায়েট পসিবল। তেজস্ক্রিয় আদপেও সক্রিয় হলো না, তার তেজ হয়তো আগাগোড়া নিষ্ক্রিয়ই থেকে গেল, নিষ্কৃতি পেলে না একটুও। এ তো হতেই পারে। পদার্থ অপদার্থের মতো আচরণ করতেই পারে।

-তাহলে তো বাতাসে বিষও মিশল না! ফলে বেড়ালটার কড়া জানও এযাত্রায় আর কড়কে গেল না।

-হুঁ! তাহলে বেড়ালটাকে এখন কী বলব? বেড়াল তো বেঁচে থাকতে পারে, আবার টেঁসেও যেতে পারে।

-পারেই তো! তাই, জীবিত বলতে পারো, মৃত বলতে পারো, আবার একসঙ্গে দুটোই বলতে পারো।

-দুটোই? কীরকম? 

শ্রোডিঙ্গার এবার একচোখ বুজে ফ্যাঁচফ্যাঁচ করে বিচ্ছিরি ভাবে হেসে বললে, "তাও বুঝলে না?"

আমি ভারি অপ্রস্তুত হয়ে পড়লাম। মনে হলো, 'একসঙ্গে দুটোই' ব্যাপারটা আমার বোঝা উচিত ছিল। তাই থতমত খেয়ে তাড়াতাড়ি বলে ফেললাম, "হ্যাঁ হ্যাঁ, এ তো বোঝাই যাচ্ছে।"

শ্রোডিঙ্গার মাথা নেড়ে বলল, "হ্যাঁ, বাক্স যতক্ষণ না খোলা হচ্ছে, দ্যা বেড়াল ইজ বোথ ডেড অ্যান্ড অ্যালাইভ।"

-তা তুমি বাস্ক খুলে কী দেখলে?

শ্রোডিঙ্গার খানিকক্ষণ চুপ করে আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, "ওইখানেই তো মুশকিল, হিসেবটা ওখানেই ঘেঁটে গেল। খুলে দেখলাম, বেড়াল-টেড়াল কিচ্ছুটি নেই। জীবিত, মৃত, জীবন্মৃত- কিস্যু লয়। তার বদলে, ওই রুমালটা পড়ে আছে।"

-ওইটে?

-হুঁ।

আমি অবাক হয়ে বললাম, "তা, এতে মুশকিলের কী আছে? ছিল বেড়াল, হয়ে গেল রুমাল। ছিল ডিম, হয়ে গেল দিব্যি একটা প্যাঁকপ্যাঁকে হাঁস। এ তো হামেশাই হচ্ছে।"

-ঠিক! ঠিক বলেছ। উত্তরটা মিলছিল না, তোমার ওই বইটা দেখতেই সব পরিষ্কার হয়ে গেল।

-আমার বই? ও, যেটা পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, ওইটে? 

-ইয়েস! ওই বইতেও ঠিক এই কথাটাই লিখেছে।

-কী লিখেছে?

-ওই তুমি যা বললে, "এ তো হামেশাই হচ্ছে।"

এইবার আমার বেজায় রাগ হয়ে গেল। বললাম, "তখন থেকে খালি আবোলতাবোল বকছ। দিলে তো মাথাটা গরম করিয়ে! আমার বাপু রাগ হলেই আবার খিদে-খিদে পায়। এখন কী খাই বল দেখি? দেখ না ফ্রিজিডেয়ারটা হাঁটকে, কিছু পাও কিনা।"

শ্রোডিঙ্গার আবার সেরকম ফ্যাঁচফ্যাঁচ করে হেসে উঠল। "উঁহু! সেটি হবার নয়, সে হবার যো নেই। ফ্রিজিডেয়ার বিলকুল ফাঁকা, কিস্যুটি নেই। তবে হ্যাঁ, এইটে মনে রেখো- নেই, তাই খাচ্ছ, থাকলে কোথায় পেতে?" বলেই আবার একটা ভেচকুরি কেটে জানলা গলে পালিয়ে গেল।

নেই বললেই হলো! শ্রোডিঙ্গারের কথায় প্রথমটা খুব রেগে গেসলাম। তারপর যেই মনে পড়ল, মামার আনা মিহিদানার হাঁড়িটা এখনও ফ্রিজেই আছে, অন্তত দুপ্পুর অবধি তাকে সেখানেই স্বমহিমায় বিরাজমান দেখেছি, অমনি রাগ-টাগ গলে জল হয়ে গেল। চুলোয় যাক শ্রোডিঙ্গার, হমারে পেটমে চুহা দৌড় রাহা হ্যায়।

ফ্রিজের একদম নীচের তাক থেকে মিহিদানার হাঁড়িটা যেন আমার দিকেই তাকিয়ে ছিল। তাক বুঝে, যেই না তাকে বগলদাবা করে তার ঢাকনা খুলেছি- আচমকা ফুটফাট দুমদাম ধুপধাপ শব্দে তাণ্ডব কোলাহলে সারা বাড়িটা একেবারে কাঁপিয়ে তুলল। মনে হলো যেন, যত রাজ্যের মিস্ত্রিমজুর সব একযোগে ছাদ পিটতে শুরু করেছে, দুনিয়ার যত কাঁসারি আর লাঠিয়াল যেন পাল্লা দিয়ে হাতুড়ি আর লাঠি ঠুকতে লেগেছে। আমি তো ভয়ের চোটে হাঁউমাঁউ করে হাত থেকে হাঁড়ি-টাঁড়ি ফেলে দিয়ে, পড়ার বইয়ে যাকে 'কিংকর্তব্যবিমূঢ়' বলে, তারও এককাঠি ওপরে উঠে একেবারে 'কিংকংকর্তব্যবিমূঢ়' হয়ে হাঁ করে বসে রইলাম।

কতক্ষণ ওভাবে বসে ছিলাম জানি না, হঠাৎ একটা বিটকেল গুরুগম্ভীর আওয়াজ পেয়ে চমকে উঠতে হলো। চেয়ে দেখি একটা দেড় হাত লম্বা বুড়ো, তার পা পর্যন্ত সবুজ দাড়ি, আর মাথাভরা টাক। সেই টাকে আবার খড়ি দিয়ে কবিতা লিখেছে। বুড়োটার হাতে একটা হুঁকো, তা'তে কল্কে-টল্কে কিচ্ছু নেই, সেটাকেই দূরবীনের মতো করে চোখের সামনে ধরে আমাকে দেখছে। তারপর পকেট থেকে কয়েকটা রঙিন কাঁচ বের করে সেগুলো দিয়ে আবার কিছুক্ষণ দেখল। দেখা-টেখা শেষ হলে, তেমনি ঘড়ঘড়ে গলায় বলল, "অন্তমিলটা মিলিয়ে দাও তো হে! চটপট!"

আমি দস্তুরমতো ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বললাম, "মিল? কিসের মিল?" 

-উঁহু উঁহু! 'কিসের'-এর সঙ্গে তো অনেক কিছুই মিল দেওয়া যায়। এই যেমন ধর- পিসের, সিসের ইত্যাদি প্রভৃতি। ও তো খুব সোজা, সবাই পারে। ওকথা বলছি না। ওই শ্রোডিঙ্গার যে লাইনটা বললে, তার সঙ্গে মিল দিয়ে একখানা লাইন ভেবে বের করো দেখি! তবে বুঝব, তুমি কেমন কবি!

ব্যাজার মুখ করে বললাম, "আমি ওসব পারি না।"

-"পারবে না? তুমিও পারবে না? ইস! তোমার ওপর যে বড্ড ভরসা ছিল হে!...নাহ্! তেত্রিশ বছর কাটলো, একটা মিল আর মিলল না।" বুড়োটা মনে হলো হতাশ হয়েছে, ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, "তবে আমারও তোমার মতোই দশা হয়েছিল। তাই না প্রথম লাইনটা লিখতে পারলুম।"

-কীরকম? 

-গল্পটা তোমায় বলিনি, না? আচ্ছা শোনো... আমার নাম কবি কালিদাস। আমি হলাম হাফটাইম কবি, বুঝলে?

-হাফটাইম কেন?

-আগে ফুলটাইম কাব্যচর্চা করতুম। তারপর আমার ব্রাহ্মণী সেনকো গোল্ডে খাতা খুললেন। তাই, এখন দিনের মিনিমাম একটা সময়, মিনি নামের মিনি সাইজের একটা মেয়েকে টিউশনি পড়াতে হয়। তা সেদিনও মিনিবাস থেকে নেমে মিনির বাড়ির দিকেই যাচ্ছি, এমন সময় চোখে ঝিলমিল লেগে গেল।

-কানা হয়ে গেলে নাকি?

-উঁহু! কানা নয়, মিহিদানা। মিষ্টির দোকানের পাশ দিয়ে যেতে গিয়ে তা'তেই চোখ আটকে গেসল। কিনেই ফেললুম, এক হাঁড়ি।

-তাপ্পর? 

-এমনিতে আমার ছাত্রীটিকে পড়ানোর বিশেষ ঝঞ্ঝাট নেই, বুঝলে? 'নদী শব্দের রূপ কর' বলে চেয়ারে বসে ঘুমিয়ে পড়লেই হলো। মিনিও স্লেট নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে লেগে যায়। তা সেদিনও মিহিদানার হাঁড়িটা চেয়ারের তলায় রেখে সবে চোখদুটো বুজেছি, মিহি স্বপ্নের দানায় চোখের পাতা ভারি হয়ে এসেছে, অমনি- ঠিক ওইরকম শব্দকল্পদ্রুম! বাসরে বাস! একলাফে চেয়ার-টেবিল ডিঙিয়ে ঘরের মধ্যিখানে গিয়ে পড়েছি।

-বলো কী!

-তবে আর বলছি কী! ঠাসঠাস দ্রুমদ্রাম শুনেই খটকা লেগেছিল। গোলমাল একটু কমলে পর, হাঁড়ি খুলে দেখি, ওমা! মিহিদানা কই, এ তো চীনেপটকা!

-অ্যাঁ! 

-হ্যাঁ। আর তাই দেখেই না ওই লাইনখানা ভেবে ফেললুম! ওই মিহিদানা নেই দেখেই তো! রাজা বিক্রমাদিত্যের সভাকবি আবার স্বভাবকবি কিনা-

'নেই, তাই খাচ্ছ, থাকলে কোথায় পেতে?'

কিন্তু ওই এক লাইনই। মনের মতো একপিস মিল, সে অমিলই থেকে গেল। অনেক মাথা চুলকেও আর কল্কে পেলাম না। তা বাপু, একটু দেখবে নাকি মাথা খাটিয়ে? 

এবার আমি বড় বাড়াবাড়ি রকমের বিরক্ত হয়ে গেলাম। "একে ওই শ্রোডিঙ্গার না কুলাঙ্গার কে একটা এসে কাঁচা ঘুমটা চটকে দিলে, তার ওপর হাঁড়ির মিহিদানা পটকা হয়ে ফাটতে লেগেছে, এত সব দেখেশুনে আমার আর কাব্যি-টাব্যি পাচ্ছে না। যাও তো বাপু, জ্বালিয়ো নাকো মোরে! বিদেয় হও, পথে যেতে যেতে ওসব ভাবার অনেক মওকা পাবে।"

এই অবধি যেই না বলেছি, বুড়োটা বেজায় উত্তেজিত হয়ে আট দশ পাক বনবন করে ঘুরে নিলে। "কী বললে, কী বললে? পথে যেতে যেতে? অ্যাঁ! তাই বললে তো? ওরে মা রে, মেশোমশাই রে, মিলেছে রে, মিলেছে! ও শ্রোডিঙ্গার, ভাই আমার, শুনে যা! মিল গয়া মিল !

'নেই, তাই খাচ্ছ, থাকলে কোথায় পেতে? 
কহেন কবি কালিদাস, পথে যেতে যেতে।'

কেয়াবাত! ওরে বুধো রে! বিভূষণ-বিভীষণ-বিভূতিভূষণ সব বাগিয়ে নিয়েছি রে! 'কহেন কবি কালিদাস...' হুঁ হুঁ বাবা, 'পথে যেতে যেতে।' কেয়াব্বাত!

"হঠাৎ কেন দুপুর রোদে চাদর দিয়ে মুড়ি
চোরের মতন নন্দগোপাল চলছে গুড়ি গুড়ি"

অত খপরে আপনের কী মশয়? তবে, ধরেই যখন ফেলেছেন, তখন বলি- যাচ্ছিলুম ওই গড়ের মাঠে। কী করব বলুন? যার চোখে ঘুম নেই, পেটে খিদে... না, তা অবিশ্যি আছে, কিন্তু খাবার মতো কিচ্ছুটি নেই, গোদের ওপর বিষফোঁড়া দুটো উমনো আর ঝুমনো এসে যার কানের কাছে হযবরল বকে গেল- জানবেন সে বেচারা নন্দগুপির জীবনে আনন্দও নেই। আর যার পকেট গড়ের মাঠ, সে বেচারা ওই গড়ের মাঠ ছাড়া আর যাবেই বা কোথা? খোলা হাওয়া খেতে অন্তত ট্যাক্সো লাগে না বলেই তো শুনিচি!

কিন্তু চৌকাঠও মাড়াতে হলো না, উঠোনের দিক থেকে একটা প্রলয়ঙ্কর ‘দাঁড়ে দাঁড়ে দ্রুম দেরে দেরে দেরে হায় হায় প্রাণ যায় হোক কলরব’ শুনে দৌড়ে গিয়ে দেখি- বাসরে! উঠোনময় যেন গাজনের মেলা বসেছে। একদল লোক, দেখে ভিনদেশী মনে হলেও কেমন যেন চেনা চেনা ঠেকল অথচ ঠিক চিনতে পারলুম না- তারা দিব্যি উঠোনখানা দখল করে বেজায় হৈচৈ জুড়ে দিয়েছে। ভাঁড়ার ঘরটা মেরামতির জন্য ইঁট আনিয়ে রাখা হয়েছিল, একটা গোলগাল রাজাগজার মতো দেখতে লোক সেই ইঁটের পাঁজার ওপর কেমন হুতুমথুম হয়ে গালে হাত দিয়ে বসে আছে। তার পাশেই একটা ঠোঙায় করে বাদামভাজা রাখা, রাজার মতো দেখতে লোকটা তার থেকে মাঝেমাঝে দু’চাট্টে করে মুখে ফেলছে, ফেলেই আবার গালে হাত দিয়ে আকাশপাতাল কী যেন ভাবতে লাগছে! আমার কেমন সন্দেহ হলো, লোকটা খাচ্ছে বটে, কিন্তু যেন গিলছে না! এদিকে একদল লোক, বোধহয় এই রাজাগজাটার প্রজাই হবে, কান্নার সুরে একটানা বিলাপ করে যাচ্ছে: 

হায় কী হলো
রাজা বুঝি ভেবেই মলো
ওগো রাজা মুখটি খোলো...

দেখেশুনে ব্যাপারস্যাপার তো কিছুই বোধগম্য হলো না! কাকে শুধোই ভাবছি, দেখি এককোণে দুটো লোক চুপটি করে বসে। তার মধ্যে যে লোকটা একটু বুড়োমতো, সে দেখি আমার সেই বইটা কোথ্থেকে কুড়িয়ে এনে ভারি মনযোগ দিয়ে পড়তে লেগেছে। ভাবলাম বলি, না জিজ্ঞেস করে আমার বইয়ে হাত দিয়েছে কেন? তা যেই না বুড়োটাকে ডাকতে গেছি, পাশের লোকটা চোখ বড়বড় করে আর মুখের সামনে আঙুল এনে ‘শশশশ’ গোছের আওয়াজ করল। কী আর করা? বাধ্য হয়ে তাকেই ফিসফিসিয়ে শুধোলাম, "বাপু হে, তোমরা কারা? আর এই যে উঠোনময় গাজনের মেলা বসিয়ে ফেলেছ, তোমাদের মতলবটা কী? 

লোকটা প্রায় আমার কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে বলল, "শোনো খোকা, আমরা সক্কলে আসছি সেই গলদেশ থেকে। গলের নাম শুনেছ?

-হুঁ, শুনেছি বইকি! জ্যাঠামশাই বলেছেন, গলদেশের পুরোটাই রোম সাম্রাজ্যের অধীনে। রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজার...

-"পুরোটা? উঁহু... ঠিক পুরোটা নয়। একটা গ্রাম এখনও রোমানরা দখল করতে পারেনি।" লোকটা খুব গর্ব গর্ব মুখ করে বুক বাজিয়ে বলল, "সেই গ্রামের অধিবাসীবৃন্দের তরফ থেকে অভিনন্দন গ্রহণ করো। আমরাই এখনও রোমানদের ঠেকিয়ে রেখেছি।" 

-ও, আর ওই লোকটা, ওই যে... রাজাগজার মতো দেখতে, উনি কিনি? 

-ওই ইঁটের উচ্চাসনে আসীন আমাদের দলপতি মহামান্য ভাইটালস্ট্যাটিস্টিক্স। তাঁর ঠিক সামনে...ওই যে দেখছ...ওই বামনাকৃতি বীর যোদ্ধাটি হলেন আমাদের গ্রামের গর্ব, অ্যাস্টেরিক্স। পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন তাঁর প্রাণের বন্ধু ওবেলিক্স... আর ইনি হচ্ছেন জেরিয়াট্রিক্স, ইনি ম্যাট্রিক্স... 

-তা ভালোমানুষের পো, তোমার নাম কী গো?

-অ্যাপেন্ডিক্স। আর আমার পাশে বসে আছেন, গ্রামের প্রধান পুরোহিত, শ্রদ্ধেয় শ্রী এটাসেটামিক্স। কিন্তু শশশশ... ওনাকে বিরক্ত করো না যেন, উনি এখন এই সঙ্কট থেকে আমাদের উদ্ধার করার উপায় খুঁজছেন।

-সঙ্কট? সঙ্কট কেন?

-সে অনেক কথা... আমাদের গ্রামের চারদিকে রোমানদের চারচাট্টে সৈন্যশিবির। তবু যে ওরা আমাদের সমঝে চলে, কেন জান? এই এটাসেটামিক্স এটার সাথে সেটা মিক্স করে এমন এক জাদু শরবত তৈরি করতেন, তাই খেয়েই আমাদের দেহের ওজন উনিশটি মন, শক্ত যেন লোহার মতন।

-কেমন? কেমন?

-আরে আমরা সবাই হাতি লুফি, খেলাচ্ছলে যখন-তখন। বাচ্চারা খুব কাঁদলে পরে, আনি দুটো রোমান ধরে। মনের সুখে মেরে - ধরে, ছেলেরা হাতের সুখ করে।

-বা রে! ভারি তো মজার ছেলেখেলা!

-"বললে বেশি ভাববে শেষে, এসব বুঝি ফেনিয়ে বলা।" বলেই অ্যাপেন্ডিক্স হঠাৎ যেন কেমন উদাস হয়ে গেল। "কিন্তু দারুণ দিনগুলো আচমকাই এভাবে নিদারুণ হয়ে যাবে, কে আর ভেবেছিল? একদিন সকালে উঠে...বয়স হয়েছে তো... এটাসেটামিক্স দেখলেন শরবতের ফর্মুলা কিছুতেই মনে পড়ছে না! ব্যস! গ্রামশুদ্ধু সক্কলে চোখে ধোঁয়া দেখতে লাগলাম।" 

বলতে বলতেই দেখলাম অ্যাপেন্ডিক্সের মুখটা কেমন করুণ হয়ে গেল। শেষটায় আর সামলাতে না পেরে ‘হায় হায় প্রাণ যায় হায় হুকু হায় হুকু হায় হায়’ বলে ভেউভেউ করে কেঁদেই ফেললে। তাকে এমন আকুল হয়ে কাঁদতে দেখে, আমারও চোখদুটো কেমন ভিজে ভিজে ঠেকছিল। ভাবছিলাম, শ্রোডিঙ্গারের সেই রুমালটা থাকলে এই সময় খুব কাজে দিত, এমন সময়-

বলা নেই কওয়া নেই, এটাসেটামিক্স যার নাম, সেই ভারিক্কি চালের বুড়োটা সুড়ুৎ করে উঠে দাঁড়ালো। তারপর দমাদ্দম করে নিজের বুকে গোটা দশ কিল মেরে হেঁড়ে গলায় চেঁচিয়ে উঠল, "পেয়েছি, আমি পেয়েছি! ও ছোটকা, ইউরেকা! ওরে, কে আছিস? দৌড়ে গিয়ে চারণকবিকে ডেকে আন।" 

-ও বাবা, তোমাদের মধ্যে আবার একজন চারণকবিও আছে নাকি?

-"আছে বইকি!" অ্যাপেন্ডিক্স জবাব দিলে, "সবুর করো না, এই এল বলে।" 

বলতে না বলতে, দুটো লোক মিলে একটা কোমর পর্যন্ত লম্বা চুল আর গোড়ালি অবধি লম্বা দাড়িওলা জন্তুকে ধরেবেঁধে হাজির করলে। জন্তু বলাই ভালো, কারণ একঝলক দেখে সে মানুষ না ভূত, বাঁদর না প্যাঁচা, সাম্প্রদায়িক না সেকুলার টের পাওয়া যায় না। এটাসেটামিক্স তাকে দেখেই তার কানেকানে কীসব কানাকানি করলে, তারপর সকলকে উদ্দেশ্য করে চিৎকার করে বলল, "ভদ্রমহিলা এবং ভদ্রমহোদয়গণ, এইবার চারণকবি মিঠেগলিক্স তার মিঠে গলায় আমাদের একটা গান শোনাবে। আশা করছি, এই গান আমাদের যোদ্ধাদের মধ্যে নতুন শক্তি সঞ্চার করবে।"

ওমা, এটাসেটামিক্সের কথা পড়তে পেল না, দেখি সবাই গুটিগুটি পালানোর মতলব করছে। কেউ বলে, "উনুনে শুয়োর রোস্ট করতে দিয়ে এসেছি, পুড়ে যাবে," তো কেউ বলে, "আমি যাই, এখনও অনেকগুলো মেনহির বিলি করা বাকি আছে।" হালচাল সুবিধার নয় বুঝেই বোধহয় এটাসেটামিক্স তড়িঘড়ি চারণকবির হাতে আমার বইটা গুঁজে দিলে আর মিঠেগলিক্সও গলা খাঁকারি দিয়ে বইয়ের একটা পাতা থেকে সুর করে পড়তে লাগলে:

"ওই আমাদের পাগলা জগাই নিত্যি হেথায় আসে
আপন মনে গুনগুনিয়ে মুচকি হাসি হাসে
চলতে গিয়ে হঠাৎ যেন ধাক্কা লেগে থামে
তড়াক করে লাফ দিয়ে যায় ডাইনে থেকে বামে।"

অবাক হয়ে দেখি, এতক্ষণ যারা পালাই পালাই করছিল, তারাই কেমন যেন থমকে দাঁড়িয়ে কান খাড়া করে শুনছে। ওদিকে, মিঠেগলিক্স কিন্তু থামেনি, একটানা গেয়েই চলেছে:

"ভীষণ রোখে হাত গুটিয়ে সামলে নিয়ে কোঁচা
'এইয়ো' বলে ক্ষ্যাপার মতো শূন্যে মারে খোঁচা।"

এই অবধি শুনেই অ্যাস্টেরিক্স, ওবেলিক্স, ভাইটালস্ট্যাটিস্টিক্স; যেখানে যত গল ছিল, কেউ আনন্দে তুড়িলাফ দিচ্ছে, কেউ বা ডন বৈঠক দিতে লেগেছে, কেউ আবার হুমহাম গুমগাম মুগুর ভাঁজতে ভাঁজতে দুমদাম পেশী ফোলাচ্ছে।

"উৎসাহেতে গরম হয়ে তিড়িংবিড়িং নাচে
কখনও যায় সামনে তেড়ে, কখনও যায় পাছে।
এলোপাথাড়ি ছাতার বাড়ি ধুপুসধাপুস কত
চক্ষু বুজে কায়দা খেলায় চর্কিবাজির মতো..."

গান থামামাত্র সবকটা গল, রাজা-প্রজা-বাচ্চা-বুড়ো-সেবাইত-পুরোহিত সবাই মিলে লম্ফঝম্প আর হইহল্লা জুড়ে দিলে:

"রোমান ধরে মারো, সবাই রোমান ধরে মারো
মাথায় ঢেলে ঘোল, ওদের উল্টো গাধায় তোল
কানের কাছে পিটতে থাকো চোদ্দ হাজার ঢোল।"

যেন রোমান ধরে ঠ্যাঙাবার জন্যে একযোগে সবার ঠ্যাং-এ সুড়সুড়ি, হাত নিশপিশ। কারো যেন আর তর সইছে না, 'নিঃশেষে প্রাণ' পরিস্থিতি পুরো। স্পষ্ট শুনতে পেলাম, যেতে যেতে ওই মোটা ওবেলিক্স আবার আব্দার জুড়েছে, "আমাকে কিন্তু দুটো রোমান বেশি দিতে হবে, হুঁ! আগেরবার আমার ভাগে কম পড়েছিল।"

তালগোল আর ডামাডোল থামলে পর খেয়াল হলো, গোলমালের সুযোগে গলগুলো আমার বইটা নিয়েই চম্পট দিয়েছে। তা যাকগে! বইয়ের নামটা মনে রেখেছি, মামাকে বললেই এনে দেবে'খন। 'সুকুমার সাহিত্য সমগ্র।'



0

বিশেষ রচনা - গুরু বলে তারেই প্রণাম করবি মন

Posted in










ছবি সৌজন্যে- দ্য টেলিগ্রাফ
বিশেষ রচনা                                      


গুরু বলে তারেই প্রণাম করবি মন
চয়ন



- সুনীলদা, চয়ন বলছি
- হ্যাঁ, বলুন 
- দাদা, এই সদ্য একটা বই বেরিয়েছে। বিদ্যাসাগরের লেখা সংস্কৃত ভূগোল বই এর প্রথম বাংলা অনুবাদ। নাম হ'ল..
- ভূগোলখগোলবর্ণনম। রেডি আছে। আর হ্যাঁ, ক্যালকাটা ইউনিভারসিটি থেকে বেরিয়েছে, রবীন্দ্রকুমার দাশগুপ্তের বিবিধ প্রবন্ধ। ওটাও এক কপি রাখছি। জানি তো, আপনি নেবেন...

যাঁর সঙ্গে এই কথোপকথন তাঁকে দেখতে চান? আসুন আমার সঙ্গে। কাঁকুড়্গাছি থেকে উল্টোডাঙা স্টেশনের দিকে যাওয়ার যে ফুটপাথ সেটা ধরে এগিয়ে চলুন। আপনার খিদে পেয়েছে কী? তাহলে ফুটব্রীজের তলার দোকান থেকে মোমো খেয়ে নেব। যদি না খান, তবে আরেকটু এগোই আসুন। সোনি ওয়র্ল্ড শো রুমের ঠিক মুখোমুখি বিশ্বাসদার রুমাল, জামাকাপড়ের স্টল আর অশোকদার মাটিতে ঢেলে রাখা পুরনো বইয়ের রাশির ঠিক মাঝখানে পেতে রাখা এই চৌকিটার সামনে দাঁড়াব আমরা। আলাপ করুন, এই ছোটখাটো চেহারার অমায়িক স্বভাবের মানুষটির সঙ্গে। ইনিই সুনীল কর। আমাদের সুনীলদা। উঁহু, নাকছাঁটা দেওয়ার ভুলটা করবেন না মোটে। কারণ, এখনই কারিগর থেকে সদ্য প্রকাশিত বইগুলি তাঁরা নিজেদের উদ্যোগে এখানে পৌঁছে দেবেন। আসবেন সূত্রধরের কর্ণধার। আসবেন কবি সুমন্ত মুখোপাধ্যায়। আসবেন নীহাররঞ্জন রায়ের ভারতেতিহাস জিজ্ঞাসার মত অসাধারণ বইয়ের সম্পাদক, শ্রী তরুণ পাইন। আসবেন বহু কলেজের অধ্যাপকের দল। আসবেন বহু শিক্ষক শিক্ষিকা। হয়তো, হাতে সময় থাকলে, এসে পৌঁছবেন শঙ্খ ঘোষ। 

সুনীলদা সবার বন্ধু। যাঁরা এসেছেন তাঁরাও পরস্পরের স্বজন। আজ্ঞে হ্যাঁ, আমার মত অভাজনও প্রচুর স্নেহ পায় এঁদের কাছ থেকে। 

সুনীলদা বিশেষ পরিচিত জনদের হাতে লাল চায়ের গেলাস তুলে দেবেন। সন্ধে ঘনাবে। আলোচনা চলবে সাহিত্যতত্ত্ব, দর্শনশাস্ত্র, ইতিহাস নিয়ে। রসিকতা বিনিময় হবে। "জানেন তো উদ্দালকদা আজ মন্ত্রী বললেন, 'ঐ উল্টোডাঙায় extremistদের আড্ডায় যাচ্ছেন?' তাহলে চয়নও extremist?" পিঠে হাত রেখেছেন পুস্তকপ্রেমী, সুলেখক, সমাজ বিজ্ঞানে অগাধ পণ্ডিত শ্রী সৌমিত্র সেনগুপ্ত। 

"অরূপদা খাওয়াচ্ছেন কবে? দাদা তো ফাণ্ডামেন্টাল ফিসিক্স প্রাইজ পেলেন।" বিশ্ববন্দিত পদার্থবিজ্ঞানী শ্রী অশোক সেনের অনুজ অধ্যাপক অরুণ সেন হাসবেন, "আশিসবাবুর Return from Exile টা নিলে চয়ন? কিছু লিখবে ভাবছ?" " আরে চয়ন তো কেবল একটা বিষয় নিয়েই ভাবে। জিজ্ঞেস করুন ওকে। বলুন ১৯৫৪ সালের শুকতারার বৈশাখ সংখ্যাটা কেমন ছিল? দেখবেন ও বলবে ওপরের কোণায় নীল দাগ ছিল একটা।" আবার সমবেত হাসি। লজ্জা করলেও একটা তৃপ্তিও আসবে। আমাকে গ্রহণ করেছেন এই বুধমণ্ডলী। আমি সেই চিন্তনবৃত্তের অংশ যাকে এঁরা নিজেরাই পরিহাস করে বলেন, "The Ultodanga School of Social Thoughts"। এবং আপনিও তা হতে পারেন। 

২০০৬ সালের কথা। একটা বই কলেজ স্ট্রীট তোলপাড় করে কোথাও পাই নি। মন মেজাজ বড্ড খারাপ। ফুটপাথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে ভাবছিলাম কলকাতার পুস্তকবিশ্ব একসময় অন্যরকম ছিল। শ্যামাচরণ দে স্ট্রীটে Calcuuta Old Book Stall বা কুমারস' এর কথা ছেড়েই দিলাম। সে তো আমার জন্মেরও দুইদশক আগে গত শতাব্দীর পঞ্চমার্ধের কথা। কিন্তু, এই সেদিনও ১৯৯৪-৯৫ সালে সীগ্যল সাহিত্যতত্ত্বের ওপর বই খুঁজতে গিয়ে দেখেছি যে আমায় আধুনিকতম বই এর পাশাপাশি কালজয়ী গ্রন্থের হদিশ দিয়েছেন তপনদা। আরামদায়ক গদি আঁটা মোড়ায় বসে অতি সুস্বাদু কফির পেয়ালায় চুমুক দিতে দিতে সারাদিন বইয়ের পাতা উলটেছি। আর আজ শপিং মল গুলোর কাউন্টারে গিয়ে কোনও বইয়ের নাম বললে কী বোর্ডে ঝড় তোলা আঙুলের মালিক মেকি হাসি হেসে যান্ত্রিক কন্ঠস্বরে বলেন সে বই স্টকে আছে না নেই। 

বাড়ী ফেরার পথে একবার ভাবলাম উলটোডাঙার সোনির সামনে ফুটপাথের দোকানটায় একবার খোঁজ করে যাই। গেলাম। পেলাম। আর আটকে রইলাম। ধীরে ধীরে হয়ে উঠলাম সুনীলদার স্বজন বৃত্তের অংশ। এর ঠিক দুবছর পরের কথা। সুনীলদার দোকান থেকে বিকাশ ভট্টাচার্যের ২০০০ টাকা দামের একটা বই চুরি হয়ে গেল। আমরা সবাই পালা করে পাহারা দিতাম দোকানটা তারপর থেকে। আজ্ঞে হ্যাঁ, সুনীলদার কাছে আপনি পাবেন Umberto Eco এর On Beayty, গৌতম ভদ্রের ন্যাড়া বেলতলায় যায় ক'বার, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অদ্ভুত রামায়ণ। এর সব কটাই অতি দামী বই। সুনীলদা আপনাকে দিতে পারেন Foucault এর Society Must Be Defended, গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকের Death of a Discipline, সুমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়ের The Parlour and the Street, সুকেতু মেহতার Maximum City, ডি.ডি. কোশাম্বীর Combined Methodology, প্রদ্যুম্ন ভট্টাচার্যের টীকা টীপ্পনী, পরিমল রায়ের ইদানীং, নারায়ণ দেবনাথের কমিক্স সমগ্র। এই খানে ২০০৬ এ পামুক নোবেল পাওয়ার অনেক আগে আমি পেয়েছিলাম My Name is Red আর ২০০৮ এ Le Clezio নোবেল পাওয়ার ঠিক পরের দিন তাঁর লেখা Desert। ২০০৯ এর এক বিকেলে একটা মোটাসোটা বই তুলে অলস ভাবে তার পাতা ওল্টাচ্ছি। হঠাৎ বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মত আমি কেঁপে উঠলাম। এ কি আরম্ভ! : "One hand limp by his side, the other to his brow, the young Aristotole languidly reads a scroll unfurled on his lap, sitting on a cushioned chair with his feet comfortably crossed. Holding a pair of clip glasses over his bony nose, a turbuned and bearded Virgil turns the pages of a rubricated volume in a portrait painted fifteen centuries after the poet's death......Pointing to the right hand page of a book open on his lap, the Child Jesus explains his reading to the elders in the Temple while they, astonished and unconvinced, vainly turn the pages of their respective tomes in search of refutation...
All these are readers, and their gestures, their craft, the pleasure, responsibility and power they derive from reading, are common with mine.
I am not alone." 

আমার মনে হ'ল এটা আমার বই। কেবল আমার জন্য লেখা। পকেটে যা ছিল সব দিয়ে বইটা কিনে আচ্ছন্নের মত হাঁটতে হাঁটতে বাড়ী ফিরেছিলাম। এর কিছুদিন পর আমি জানি যে এই বইটির নাম সারা পৃথিবী জানে। আলবের্তো মানগুয়েলের A History of Reading। 

২০০৮ এর ১৮ই ফেব্রুয়ারি আমরা সুনীলদার দোকানে তাঁকে চা খাওয়ালাম। মোমো কিনে এনে রাস্তায় দাঁড়িয়েই ছোট মতো পার্টি হয়ে গেল একটা। আমাদের এত উচ্ছ্বাসের কারণ ঠিক তার আগের দিন দ্য টেলিগ্রাফ এ Mall Print শীর্ষক এক রচনায় সুদেষ্ণা ব্যানার্জী সুনীলদার কথা লিখেছেন। তিনি লিখেছেন : "The biggest battle to the big-book-at-the-mall is perhaps being given by pavement shacks like the one near the Ultadanga crossing. Illuminated by the light from a Sony World showroom and sandwiched between hankerchiefs and stauettes, Sunil Kar sells Michel Foucault and Manik Bandyopadhyay, imported science journals and humble little magazines. 
" Sometimes people ask me if these are second hand -- as if one can't sell new books from the street," says the soft spoken but fiercely proud man who started his own enterprise after the book shop he worked in closed down. He thrives on personal relations and personalized service. Office goers on their। way back from Salt Lake and Baguiati stop to check out a stock chosen after scanning the review columns ( his brother runs a newspaper stall). He also offers 20 percent discount." আজ্ঞে হ্যাঁ, খুব বিশেষ কিছু প্রকাশনার বই ছাড়া ইংরিজি বা বাংলা যে কোনও বইতে সুনীলদা আপনাকে শতকরা ২০ শতাংশ ছাড় দেবেন। এই ভাবেই গত ত্রিশ বছর চলছে সুনীলদার দোকান, আর আমি খুব ঘনিষ্ঠ ভাবে তাঁকে দেখছি গত দশ বছর। আমার বলতে কোনও দ্বিধা নেই দানবাকৃতি শপিং মলগুলো যে ধনতান্ত্রিক বয়ানের প্রতিভূ, সুনীলদা তাঁর ফুটপাথের দোকানে একা হাতে গড়ছেন তার প্রতিবয়ান। সুদেষ্ণা তাই বড় সঠিক নামে ডেকেছেন একে : 'Foucault Corner'. 

দশ বছর আগে আমি যা ছিলাম আর এখন আমি যা তার মধ্যে বিপুল ব্যবধান। এ ক' বছরে আমার চিন্তনের ধরণ আমূল বদলে দিয়েছেন সুমিত সরকার, আশিস নন্দী, অরিন্দম চক্রবর্তী, রণজিৎ গুহ, পার্থ চট্টোপাধ্যায়, দীপেশ চক্রবর্তী, গৌতম ভদ্র। আর এঁদের সবার দেখা আমি পেয়েছি সুনীলদার মধ্যস্থতায়। তাই আজ সর্বসমক্ষে আমি তাঁকে গুরু বলে প্রণাম জানাই। প্রণাম সুনীলদা। পুনশ্চ ভূয়োপি নমোনমস্তে।



0

বিশেষ রচনা - হিমাদ্রি মুখোপাধ্যায়

Posted in


বিশেষ রচনা


মহাশ্বেতা
হিমাদ্রি মুখোপাধ্যায়



কোথাও কোনও ভূমিকম্প হয়নি সেদিন। যদিও বিগত ২৮ জুলাই, বিকেল তিনটেয় তিনি চলে গেলেন। অথবা, হয়েছে কোথাও, বিশাল এই দেশের সেই অন্ধকার অর্ধাংশে, যার তরঙ্গ সৌভাগ্যবশত, আমাদের আইনক্স জীবনে কখনও পৌঁছয় না, অন্তত এখনও পর্যন্ত পৌঁছয়নি কোনওদিন।

কোনও প্রতিষ্ঠানের দাক্ষিণ্য তিনি পাননি কখনও, অথবা চানওনি কোনওদিন। কমলকুমার, অমিয়ভূষণ কিংবা মহাশ্বেতাদের প্রাতিষ্ঠানিক আনুকূল্যের প্রয়োজনও হয় না কখনও। কখন যে তাঁকে সংবর্ধিত করে গেছে কোনও জ্ঞানপীঠ, কিংবা দেশিকোত্তম, হয়তো তা নিয়ে দুর্ভাবিত হওয়ার মতো সময়ও ছিলো না তাঁর। গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক নিজের গরজেই অনুবাদ করেন তাঁর ছোটগল্প আর উপন্যাস, লিখে যান তাঁকে নিয়ে পাতার পর পাতা, নিজের গরজেই, কেননা তাঁকে বাদ দিলে অসম্পূর্ণ থেকে যাবে এক সুবিশাল দেশের বিশালতর এক জনগোষ্ঠীর সামাজিক-অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাস। আক্ষরিক অর্থেই, মহাশ্বেতা ছিলেন "প্রতিযোগিতার পরপারে", কেননা জীবনে, সৃজনে ও কর্মে তাঁর নিঃসঙ্গ মহিমা এবং উত্তুঙ্গ দূরত্ব যেন তাঁকে জীবৎ কালেই করে তুলেছিলো আশ্রয়দায়িনী কোনও অতি দীর্ঘ মহীরুহ, যেন দীপ্যমান কোনও প্রতিষ্ঠান---স্বয়ংপ্রভ, অননুকরণীয় স্বাতন্ত্র্যে সমুজ্জ্বল।

১৯২৬ থেকে ২০১৬, দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এসেছেন তিনি। দেখেছেন মহাযুদ্ধ, মন্বন্তর, উত্তাল সেই মুক্তির দশক, কত সামাজিক, রাজনৈতিক উত্থান- পতন। অনুভব করেছেন বারেবারে, যে জীবনকে আমরা নিশ্চিন্ত জীবন বলে ভুল করে সানন্দে বেঁচে আছি প্রতিদিন, তার গভীরে আসলে দুশ্চিকিৎস্য ক্ষত তৈরী হয়েছে দিনে দিনে। কেননা তার বৃদ্ধি ও বিকাশের সঙ্গে প্রাচীন এই দেশের বৃহদাংশের মানুষের জীবনযাত্রার কোনও সম্পর্ক, কোনও সঙ্গতি নেই। আর তাই অবশ্যম্ভাবী এবং অনিবার্য সর্বনাশ সম্পর্কে সতর্কও করতে চেয়েছেন আমাদের, তাঁর রচনার প্রতিটি অক্ষরে। কতটা সতর্ক আমরা হলাম, অথবা আদৌ হলাম কী না, আগামীদিনের ইতিহাস হয়তো তার উত্তর দেবে। তবে এটুকু বলতে পারি নির্দ্বিধায়, আগামী সে ইতিহাস তাঁরই কলমে রচিত মানুষের ইতিহাস, প্রান্তিক মানুষের ইতিহাস, সাব-অল্টার্নের ইতিহাস।

ঘটনাবহুল কোনও উপন্যাসের মতো তাঁর জীবন অথবা বর্ণময় তাঁর বিপুল সাহিত্য কীর্তি কোনওটিই আজ আমি আলোচনা করতে আসি নি, আজ এই অতিসন্নিহিত শোকাচ্ছন্ন মুহূর্তগুলি সম্ভবত তার উপযুক্ত সময়ও নয়। তবে সেদিন কর্মস্থল থেকে ফেরার পথে আমার ইনবক্সে এক বন্ধুর প্রেরিত বার্তায় যখন ভেসে উঠলো তিনি আর নেই, অজান্তেই আমার চোখের পাতা বন্ধ হয়ে গেলো আচম্বিতে, আর আমি দেখতে পেলাম গভীর অন্ধকারে কোনও স্তনদায়িনীর ঠোঁটদুটো কেঁপে উঠলো হঠাৎ, মুষ্টিবদ্ধ হলো হাজার চুরাশির মায়ের হাত, বিস্তীর্ণ কোনও অরণ্যে কে যেন হাঁক দিয়ে উঠলো "উলগুলান" ...আর সেই মুহূর্তেই চোট্টি মুণ্ডার তীর উড়ে গেলো আকাশে।

যেতে তো হয়ই সবাইকে।আমরাও যাবো, যাই, তবে কী জানেন, সেই যে শক্তি চট্টোপাধ্যায় লিখে গিয়েছিলেন না---কোনো কোনো পদচিহ্ন রঙীন/চলে যাওয়ার পরেও থেকে যায় ছাপ।।



0

বিশেষ রচনা - রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য

Posted in


বিশেষ রচনা


কুসংস্কার বিরোধিতা: ছোটোদের গল্পে
রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য 



কলেজ স্ট্রীট পাড়ার এক প্রকাশক ২০০১-এ একটি বই বার করেন: বিশ শতকের কুসংস্কার-বিরোধী গল্প। সেই প্রকাশকই ২০০৩–এ বার করলেন ছোটদের কুসংস্কার-বিরোধী গল্প। ভাবতে ভালো লাগে, দু-খণ্ডে প্রকাশিত এই বইটি দু বছর অন্তর পুনর্মুদ্রণ হয়েছে, ২০১০-এ একটি পরিমার্জিত সংস্করণও বেরিয়েছে। চমৎকার কাজ; ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর থেকে একেবারে হালের শ্রেয়া রক্ষিত অবধি অনেকের গল্প এতে আছে।

সম্পাদকের পছন্দমতো গল্প বাছা হয়েছে, কিন্তু তার বাইরেও কিছু গল্প থাকে যেগুলি এই বইতে জায়গা পাওয়ার যোগ্য। তেমন একটি গল্প ক্ষিতীন্দ্রনারায়ণ ভট্টাচার্য-র ‘তাবিজ-মহিমা’। অমিয়কুমার চক্রবর্তী-সম্পাদিত একটি বইতে এটি আছে।

যেসব বিষয় নিয়ে বড়দের গল্প লেখা হয় তার প্রায় সবই ছোটোদের গল্পর বিষয় হতে পারে। তাই কুসংস্কার-বিরোধী গল্প বড়-ছোটো সবার জন্যেই লেখা হয়েছে। কিন্তু গল্পর চরিত্র ও ঘটনা ঠিক করার সময়ে একটু তফাতও হয়। ছোটোদের গল্পে চরিত্ররা, বা তাদের অন্তত কেউ কেউ, বয়সে ছোটো হলে কমবয়সী পাঠক-পাঠিকার সঙ্গে ভাবের সংযোগ আরও সহজে ঘটে। আর গল্পর ঘটনা যদি তাদের অভিজ্ঞতার জগতের হয়, তবে মূল কথাটি কিশোর পাঠকদের কাছে সহজেই পৌঁছয়। সব পাঠকের অভিজ্ঞতার জগৎ এক নয়। তবে স্কুল আর পরীক্ষা—এই দুটি ব্যাপার কিশোর পাঠকের অভিজ্ঞতায় থাকে। এইরকমই একটি বিষয় নিয়ে লেখা হয়েছিল ‘তাবিজ-মহিমা’।

গল্পটা সংক্ষেপে এই: সামনে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা কিন্তু সোমেশের কিছুই পড়া হয় নি। তার বন্ধু সিদ্ধেশ্বর খবর দিল: শিবপুরের হরিপদ জ্যোতিষালঙ্কার মন্ত্রপূত তাবিজ দিয়ে পরীক্ষা পাশের ব্যবস্থা করে দেন। সেই মতো দু জনেই জ্যোতিষালঙ্কারের কাছে গেল। জ্যোতিষী ঘরে ছিলেন না; ছিল তার খুকি বোনঝি। তাকে এক পয়সা ঘুষ দিয়ে জ্যোতিষীর দেখা মিলল। দু টাকা ফি আর পাঁচসিকে দাম দিয়ে তারা তাবিজ নিয়ে এল। জ্যোতিষালঙ্কার বলে দিলেন: ‘যি দিন পাশের সংবাদ বাইর হইবো সি দিনই এই তাবিজ খুইলা গঙ্গাজলে নিক্ষেপ করবেন—ভুল হয় না যিনি!’ শুধু ওই দুজনই নয়, সোমেশের আরো দশ-বারোজন বন্ধুও শিবপুরে গিয়ে সেই ‘তেজস্কর তাবিজ’ নিয়ে এল।

পরীক্ষার ফল বেরতে দেখা গেল: সিদ্ধেশ্বর, রমেশ আর হরেন ভালোভাবে পাশ করেছে, কিন্তু সোমেশ, ভুঁদো, ভোঁতা—একেবারে ফেল। সবাই মিলে তখন ছুটল শিবপুরে। সব শুনে জ্যোতিষীমশায় বললেন: ‘আমার তাবিজ ঠিকই আছে, কিন্তু মহামায়ার উপর তো আর মানুষের আত নাই, তেনি যদি পছন্দ করেন ফ্যালের আত কেডা বাচাইবো? তাবিজের ভিতর ঢুইকা তেনি হগ্‌গল বদলাইয়া দিবেন। কই, কেডা ফ্যাল্‌ হইছেন? আপনে? দেহি আপনের তাবিজ, খোলেন তো?’

সোমেশের তাবিজ খুলে ভেঙে ফেলা হলো। ভেতর থেকে ফুলের সঙ্গে বেরল পাকানো এক টুকরো কাগজ। তাতে লেখা: তুমি ফ্যাল হইবা। জ্যোতিষী সগর্বে বললেন: ‘আর কেডা কেডা ফ্যাল হইছেন? খোলেন তাবিজ।’ ভুঁদো আর ভোঁতার তাবিজ খুলে দেখা গেল: কাগজে একই কথা লেখা আছে।

এই অবধি গল্পর প্রথম পর্ব। ঘটনার গতি একমুখে চলেছে। এরপর শুরু হয় দ্বিতীয় পর্ব: 
"সোমেশের দলের মুখ চূন হইয়া গেল। জ্যোতিষালঙ্কার মহাশয় ঠোঁট দুটি শুয়োরের মত সরু করিয়া টিপিয়া টিপিয়া হাসি চাপিতে লাগিলেন; ভাবখানা–এবার কেমন জব্দ!

"হঠাৎ সিদ্ধেশ্বরের মাথায় কী খেয়াল চাপিল, সে কহিল—দেখি আমারটায় কী লেখা! আমি তো পাশ হয়েছি! জ্যোতিষালঙ্কার হাঁ হাঁ করিয়া উঠিলেন—কন্‌ কিঈ, পাশ করছেন তবু গঙ্গাজলে বিসর্জন দেন নাই! মহাপাতক করছেন—অখনই ছুইটা যান, মা গঙ্গার কাছে ক্ষমা চাইয়া তাবিজ ফেইলা দিয়া আসেন। ছি ছিছি! কিন্তু সিদ্দেশ্বর ততক্ষণে তাবিজ খুলিয়া ফেলিয়াছে। সকলে অবাক হইয়া দেখিল তার ভিতরেও পাকানো কাগজ এবং তাতেও গোটা গোটা অক্ষরে লেখা—তুমি ফ্যাল হইবা।

"যারা পাশ করেছিল তাদেরও তাবিজ খুলে দেখা গেল: প্রত্যেকটির মধ্যেই লেখা—তুমি ফ্যাল হইবা, তুমি ফ্যাল হইবা, তুমি ফ্যাল হইবা।"

গল্পটি এইখানেই শেষ হতে পারত, কিন্তু পাঠকের মন তাতে ভরত না। জ্যোতিষীকে কোনও শিক্ষা দেওয়া গেল কিনা সেটা জানার কৌতূহল তো থাকবেই। এই ব্যাপারটিতে ক্ষিতীন্দ্রনারায়ণ ভট্টাচার্য একটু যেন হতাশই করেন। সোমেশ ও তার বন্ধুরা যখন জ্যোতিষীর অন্য এক মক্কেলকে নিয়ে পড়েছে, সেই ফাঁকে জ্যোতিষীমশাই পা টিপে টিপে বাড়ির ভেতরে চলে গেছেন। ঝাড়া দুই ঘন্টা চিৎকার, চেঁচামেচি, ইত্যাদির পর ‘বোধহয় বাড়ির লোকদের মায়া হইল। উপরের বারান্দা হইতে সেদিনকার সেই খুকি দেখা দিল, কহিল—বাবুরা প্যাচাল পাড়বেন না! মাউসার প্যাটে ভঙ্কর ব্যাদনা হইছে, আইজ আর তেনি লামায় যাইবো না।‘

ক্ষিতীনবাবু কিন্তু জ্যোতিষের ছলনাকে শুধু পরীক্ষার্থীদের মধ্যেই আটকে রাখেন নি। জ্যোতিষীর লক্ষ্য ছিল আরও এক ধরণের লোক। তারা হলেন: বেকার। বাড়ির সাইনবোর্ডে বড় বড় অক্ষরে লেখা ছিল: উমেদারগণের মহা সুসময়

চাকুরির বাজারে নিষ্ফলভাবে ঘুরিয়া না বেড়াইয়া
এইখানে আসুন, জ্যোতিষালঙ্কারের
মন্ত্রপূত তাবিজে আপনার অবশ্য
চাকুরি লাভ ঘটিবে।

দ্বিতীয়দিন যখন সোমেশরা ঐ জ্যোতিষীর বাড়ি গেল, তখন তিনি বৈঠকখানাতেই ছিলেন, ‘তাঁর সামনে ছিল একটি অত্যন্ত গোবেচারা গোছের লোক। তারই হাতে তাবিজ বাঁধিতে বাঁধিতে তিনি বলিতেছেন—এই তাবিজে আপনের চাকরি না হইয়া পারে না, কিন্তু চাকরি পাইয়াই কইলাম তাবিজ গঙ্গাজলে নিক্ষেপ করতে ভুলবেন না। বোচ্ছেন নি!’ জ্যোতিষীর জোচ্চুরি ফাঁস হওয়ার পর সোমেশরা সেই গোবেচারা লোকটিকে কোনও কথা বলার ফুরসত না দিয়ে তার তাবিজটাও খুলে ফেলল। দেখা গেল, তার মধ্যে লেখা—তোমার চাকরি কস্মিনকালেও হইব না। সোমেশ বলল, ‘ওঃ, এই জন্যে আপনাকেও চাকরি পাওয়া মাত্র গঙ্গাজলে তাবিজ নিক্ষেপ করবার আদেশ দেওয়া হয়েছে।

পরীক্ষার্থীর পাশাপাশি কর্মপ্রার্থীকে এনে ক্ষিতীনবাবু একটি দারুণ কাজ করেছেন; জ্যোতিষীর কাজ শুধু ছাত্রদের ঠকানো—এই বার্তাটিও একই গল্পর ভেতর দিয়ে চমৎকার পৌঁছে দেওয়া হয়। জ্যোতিষীর কায়দাটি এক—চাকরি হলে ভালো, না-হলেও ক্ষতি নেই। মহামায়ার মায়া কে বুঝবে? তিনি যদি কাউকে চাকরি দিতে বা পরীক্ষায় পাশ করাতে না চান, তার ওপর তো আর জ্যোতিষীর ‘আত নাই’।

গল্পটা ঠিক কোন্‌ সালে লেখা তা জানা নেই! তবে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষার কথা যখন আছে তখন নিশ্চয়ই ১৯৫২-র আগের কথা। নববিন্দু বৃত্ত-র বদলে নাইন-পয়েন্টস্‌ সার্কল্‌ থেকে অনুমান হয়: গল্পর ঘটনাকাল ১৯৩০ বা ’৪০ এর দশকও হতে পারে। তখনও পরীক্ষায় পাশ ফেল আর চাকরি পাওয়া না-পাওয়ার দুর্ভাবনা ও অনিশ্চয়তা ভালোমতোই ছিল—এখনকার মতোই। আর এই অনিশ্চয়তার সুযোগে ছোটো-বড়ো-মাঝারি নানা মাপের জ্যোতিষী দিব্যি করে খেত—এখনো যেমন করে খায়। ক্ষিতীনবাবু নিশ্চয়ই জ্যোতিষীদের মুখোশ খোলার উদ্দেশ্য নিয়েই গল্পটি ফেঁদেছিলেন। কিন্তু শুধু উদ্দেশ্য দিয়েই তো গল্পর ভালোমন্দ বিচার হয় না। গল্পটিকেও তো ভালো গল্প হতে হবে। 

এ ব্যাপারে ক্ষিতীনবাবু শতকরা একশ পাঁচ ভাগ সফল। প্রথম হলো চরিত্রসৃষ্টি। খড়ম পরে ‘এক ঝলক বিশুদ্ধ নস্যের গন্ধ’র ‘পিছুপিছু জ্যোতিষালঙ্কার মহাশয়ও ঢুকিলেন।’ তার পরের অংশটিও অ-সাধারণ:
"জ্যোতিষীমহাশয় যে নেহাত হাতুড়ে জ্যোতিষী নন, তা তাঁর প্রথম কথা হইতেই বুঝা গেল—বাবুরা বুঝি এবার মেট্রিক দিবেন? সোমেশ ও সিদ্ধেশ্বর মুগ্ধ হইয়া গেল; লোকটি পণ্ডিত, আবার কেমন ভদ্র। এখনও তো তারা কলেজে উঠে নাই, তবু কেমন ‘বাবু’ ‘আপনি’ বলিয়া কথা বলিতেছেন। বাঃ, বেশ তো!"

সাধুভাষায় বিবরণের সঙ্গে পূর্ববঙ্গীয় ভাষার সংলাপ মেশানো—শুধু সংলাপে নয়, তাবিজের ভিতরকার ভবিষ্যদ্‌বাণীতেও—গল্পটিকে আরও সুখপাঠ্য করে তুলেছে। সবচেয়ে ওস্তাদি মার জ্যোতিষীর বোনঝি। তাকে এক পয়সা ঘুষ দিয়ে সোমেশ আর সিদ্ধেশ্বর প্রথম দিন জ্যোতিষীর দেখা পেয়েছিল। সে-ই আবার দেখা দেয় গল্পর শেষে। বারান্দা থেকে ঝুঁকে পড়ে, মেশোমশায়ের জবানিতে শেষ সংলাপ দিয়ে গল্পটি সে-ই শেষ করে। 



কৃতজ্ঞতা স্বীকার:
পার্থসারথি মিত্র, শ্যামল চট্টোপাধ্যায়, সিদ্ধার্থ দত্ত, সৌম্যেন পাল


তথ্যসূত্র:

অমিয়কুমার চক্রবর্তী সম্পা। হালকা হাসির গল্প। অভ্যুদয় প্রকাশ মন্দির, ১৯৫৬
সুতপা বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পা। ছোটোদের-কুসংস্কার-বিরোধী গল্প। খণ্ড ১ ও ২। র‍্যাডিক্যাল ইম্প্রেশন, ২০১০।
সৌমিত্র বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পা। বিশ শতকের কুসংস্কার-বিরোধী গল্প। র‍্যাডিক্যাল ইম্প্রেশন, ২০১২।
0

বিশেষ রচনা - শিবাংশু দে

Posted in


বিশেষ রচনা



তুমি নিজে ঝরে গেছো
শিবাংশু দে



.....এখন সকলে বোঝে, মেঘমালা ভিতরে জটিল
পুঞ্জীভূত বাষ্পময়, তবুও দৃশ্যত শান্ত, শ্বেত,
বৃষ্টির নিমিত্ত ছিলো, এখনও রয়েছে, চিরকাল.... (বিনয়)

পঁচিশে বৈশাখ এখন একা আসেনা। অথবা একজন মাত্র মানুষের স্মৃতি নয় তা। রাজেন্দ্র চোলের মন্দির বা রাগ য়মনকল্যাণের মতো তা বহুদিন ধরে গড়ে উঠেছে তিলে তিলে। যে সব মানুষগুলি রবীন্দ্রছায়ার আশ্রয়ে থেকে, একের পর এক ইঁট গেঁথে, বাঙালির তথাকথিত সাংস্কৃতিক সৌধটি নির্মাণ করেছিলেন, পঁচিশে বৈশাখে তাঁরাও ফিরে আসেন। মৌন, উজ্জ্বল, অশরীর, স্মৃতির মুখ হয়ে।

ধরা যাক কয়েকজনের কথা। তাঁরা সবাই ছিলেন কলকাতার মার্জিত, সম্পন্ন, বিত্তবান সংস্কৃতিধারকদের বৃত্ত থেকে বহুদূরে থাকা অস্বচ্ছল মধ্যবর্গের স্বপ্নদেখা তরুণ। কেউ লেখেন, কেউ গান করেন। পরবর্তীকালে এঁরা জনে জনে বাংলাসংস্কৃতির স্তম্ভ হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। তখন কেই বা জানতো? ভবানীপুরের ছেলেগুলির জন্য মহানগরের কিছু সেঁকতাপ তবু রাখা থাকতো। কিন্তু ময়মনসিঙের দলছুট বাঙালটি তো একেবারে একা।

ব্রাহ্ম হলেও, শান্তিনিকেতনের অন্দরমহলে তাঁর কোনও যোগাযোগ ছিলোনা। বন্ধুদের সঙ্গে বিভিন্ন উৎসবে বেড়াতে যেতেন সেখানে। কিন্তু সেখানে যে গান শুনতেন তার কোনও প্রভাব তাঁর উপর পড়তো না। ''.... এক নম্বর কারণ হতে পারে যে, ঐ গানগুলির রস গ্রহণ বা উপভোগ করার ব্যাপারে আমার নিজের অক্ষমতা কিংবা দু নম্বর কারণ হতে পারে এই যে, যাদের মুখে ও গলায় ঐ সব গান শুনতাম, গানের মধ্যে রস সঞ্চারণে তাদের অক্ষমতা। আবার এই কথাটিও সত্যি যে তখনকার দিনে সঙ্গীতরসিকরা এবং সাধারণ শ্রোতারাও রবীন্দ্রনাথের প্রেম পর্যায়ের গান এবং ঋতুসঙ্গীতগুলিকেও যথেষ্ট মর্যাদা দিতেন না। এই সব গানগুলির প্রতি তাদের রীতিমতো অশ্রদ্ধাই ছিল।'' জুড়াইতে চাই, কোথায় জুড়াই। জানেন না মহানগরের নির্লিপ্ত আবহে এক টুকরো ছায়া অঞ্চল কোথায় পাওয়া যাবে। গান গাইতে খুব ইচ্ছে করে যে।

ওদিকে কবিযশোপ্রার্থী কিশোর সুভাষ মুখুজ্যে হেমন্তের হাত ধরে নিয়ে যাচ্ছেন কালো'দার কাছে। কালো'দা অর্থাৎ অসিতবরণ আকাশবাণীতে তখন তবলা বাজাতেন। যদি তিনি হেমন্তকে রেডিও'তে একটা গানের চান্স করে দেন। তাঁদের আড্ডার আরেক সদস্য সন্তোষকুমার ঘোষ। সবাই লেখালিখি করেন। খুব বেশি স্বপ্ন দেখতেন না তাঁরা। তবু তাঁদের সাফল্য? স্বপ্নের গল্পের মতো'ই। 

ময়মনসিঙের তরুণটি ইন্দিরা দেবীর প্রশ্রয় পেলেও তখনও পর্যন্ত 'স্বরবিতান' নামের কোনও স্বরলিপি বইয়ের নাম শোনেননি। স্বরলিপি বুঝতেনও না। পরবর্তীকালে 'টাকা জমিয়ে' জর্জদা কিছু স্বরলিপির বই কিনে ফেলতে পেরেছিলেন এবং নিজে নিজে স্বরলিপি দেখে গান গাওয়ার অভ্যেসও হয়ে যায় তাঁর। একই গল্প ভবানীপুরের ছেলেটিরও, একই রকম। হেমন্ত বলতেন যে তাঁর রবীন্দ্রসঙ্গীত শিক্ষকের নাম 'স্বরবিতান'। তিনি দোকান থেকে স্বরবিতান কিনে আনতেন আর হারমোনিয়মে সুর টিপে গান বাঁধার মহলা চালিয়ে যেতেন। গুরুবাদী 'শুদ্ধতা'পন্থিদের পক্ষে রীতিমতো স্যাক্রিলেজ বলা যেতে পারে। 

অনেকদিন পরে, সন্তোষকুমার ঘোষ হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন অশোককুমার সরকারের 'ছেলে', যেমন ঘনশ্যামদাস বিড়লা ছিলেন গান্ধিজির মানসপুত্র। এই স্নেহের আতিশয্যে অমিতাভ চৌধুরীকে আবাপ ছাড়তে হয় এবং তাঁর জায়গায় বার্তা সম্পাদক হয়ে আসেন সন্তোষকুমার। সন্তোষকুমার নিজে কিন্তু যথেষ্ট সৃজনশীল মানুষ ছিলেন। কিন্তু অর্থহীন তীক্ষ্ণ অহমবোধ তাঁকে বহু মানুষের কাছে অপ্রিয় করে তুলেছিলো। এই ভাবেই জর্জদার সঙ্গে তাঁর প্রকটিত বিরোধে তিনি সর্বত্র একঘরে হয়ে পড়েছিলেন। ঠিক কী কারণে তাঁর সঙ্গে জর্জদার এই কলহটি শুরু হয়েছিলো তা নিয়ে নানা উপকথা আছে। একটা মত বঙ্গ সংস্কৃতি মেলায় জর্জদার অনুমতি না নিয়ে শিল্পী হিসেবে তিনি তাঁর নাম ঘোষণা করেছিলেন। অন্য একটি, সন্তোষকুমারের অতি পানাসক্তি দূরীকরণের জন্য সন্তোষঘরণীকে জর্জদা কিছু নিদান দিয়েছিলেন, যে'টা সন্তোষকুমারের পছন্দ হয়নি। তার পর আবাপ'তে (দেশ নয়) চতুর্থ পৃষ্ঠায় সকুঘ নামে সন্তোষকুমার যে কলমটি লিখতেন, সেখানে জর্জ'দার গায়ন ও অন্যান্য পদ্ধতি নিয়ে কিছু অকরুণ মন্তব্য করতে থাকেন। এই সুযোগে সঙ্গীতবোর্ডের কিছু প্রভাবশালী মানুষও জর্জ'দাকে একঘরে করতে আসরে নেমে পড়েন। আশ্চর্যের কথা, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, যিনি সম্ভবতঃ সঙ্গীতজগতে ও ব্যক্তিজীবনে জর্জদার নিকটতম সুহৃদ ছিলেন, তিনিও তাঁর প্রায় বাল্যবন্ধু সন্তোষকুমার'কে এই অকারণ বিতণ্ডা থেকে নিরস্ত করতে পারেননি। শান্তিদেব জর্জদার গায়ন নিয়ে খুব স্বস্তি'তে না থাকলেও প্রকাশ্যে বিরোধিতা কখনও করেননি, বরং সঙ্গীতবোর্ডের সেই 'কুখ্যাত' সার্কুলারের বিরুদ্ধে লিখিতভাবে মতামত জানিয়েছিলেন। 

একটা ছবি মনে পড়ে যায়। চাইবাসা থেকে আরো দক্ষিণে ঝিকপানি পেরিয়ে একটা জায়গায় চুনাপাথরের খনিঘেরা একটা দীঘি। গাছপালা, ছায়া, রোদ আর সুনীল আকাশের ব্যাকড্রপ। সেখানে সন্তোষকুমারের সঙ্গে আড্ডা জমেছিলো একটা হিমেল, উজ্জ্বল সকালে। সাতের দশকের শেষদিকে। সেখানে ছিলেন কৃত্তিবাস, কৌরবের কিছু প্রথম সারির নাম আর আমাদের মতো দু'চারজন চ্যাংড়া সদ্যোতরুণ। গুরুজনেরা যখন বারুণীদেবীর কৃপায় প্রমত্ত হয়ে বাংলা সাহিত্যসংস্কৃতির নো-হোল্ডস-বার আইকনসংহার করছিলেন, তখন এই অধম (তখন রক্তের গরমে জল ফুটে যেতো) সরাসরি চার্জ করে সন্তোষকুমার'কে। প্রসঙ্গ জর্জদা। থমকে যাওয়া সন্তোষকুমারের মুখে যে আতুরতা দেখেছিলুম সেদিন সেখানে কোনও প্রতিহিংসা দূরে থাক, আহত রক্তমাংসের খেদ ছাড়া কিছু দেখিনি। খুব নেভা স্বরে বললেন, "আমি কিন্তু তোমাদের থেকে অনেক বড়ো ভক্ত, জর্জদা'র।" আমি বলি, " এসব আপনার মত্ত প্রলাপ, আসলে কারণটা অন্য কোথাও।" তিনি মৌন হয়ে যা'ন। কিছুক্ষণ পরে যেন নিজেকেই শুনিয়ে বলেন, " নাহ, আমি সত্যি বলছি।" পরে ভেবেছি ঐ রোগকাতর, প্রবীণ, উজ্জ্বল মানুষটির (চ্যালেঞ্জ করে বলতেন, গোটা গীতবিতান কমা-দাঁড়ি-ফুলস্টপসহ স্মৃতিতে ধরে রেখেছেন এবং সত্যিকথা বলতে কি, তাঁর ভক্ত না হয়েও তাঁর থেকে বিভিন্ন রবীন্দ্রসঙ্গীতের যে ধরণের পাঠপ্রতিক্রিয়া শুনেছি, মুগ্ধ করেছিলো) প্রতি এত রূঢ় না হলেও চলতো বোধ হয়। এই ঘটনার কিছুদিন পরেই তিনি প্রয়াত হ'ন। দু'বার খুব বেশি করে মনে পড়েছিলো। প্রথমবার, যখন সন্তোষকুমারের প্রয়াণে আয়োজিত একটি স্মৃতিসভায় একটা মস্তো প্রতিকৃতির সামনে দাঁড়িয়ে তাঁকে নিয়ে আলোচনা করছিলুম। দ্বিতীয়বার জর্জদা'কে নিয়ে ব্রাত্য বসুর নাটক দেখতে দেখতে। সেখানে সন্তোষকুমারের চরিত্রটিকে পুরোপুরি কমিক'রিলিফ ভূমিকায় আঁকা হয়েছে। হি ডিজার্ভড বেটার....

এতদিন পরে পিছন ফিরে দেখলে আমার মনে হয় চিরকুমার জর্জ'দা জীবনের শেষদিন পর্যন্ত ছিলেন আগমার্কা ময়মনসিং। একটু উৎকেন্দ্রিকতার বীজও ছিলো তাঁর মধ্যে। মহানগরের পেশাদারি শিল্প জগতের পরিশীলিত, কিন্তু ঘাতক ঈর্ষার প্রবণতাগুলিকে কখনও সহজছন্দে গ্রহণ করতে পারেননি। গুরু'র থেকে এই শিক্ষাটি তাঁর শেষ পর্যন্ত নেওয়া হয়নি। আর সন্তোষকুমার অনেক লড়াই করে কলকাতার সংবাদসাহিত্যের হিংস্র জগতে একটা নিজস্ব স্থান করে নিয়েছিলেন, কিন্তু অকারণ অহমবোধ থেকে মুক্ত হতে পারেননি। জর্জদার নিজেকে 'হরিজন', 'ব্রাত্যজন' আখ্যা দেবার পিছনে নিঃসন্দেহে একটা ডিফেন্স মেক্যানিজম কাজ করেছে। তিনি তাঁর অপার জনপ্রিয়তা'কে অস্ত্র করে প্রাতিষ্ঠানিক বিরোধিতার সঙ্গে লড়ে গিয়েছিলেন। শিল্পী হিসেবে জর্জদার প্রতিভার সঙ্গে এই প্রতিষ্ঠানবিরোধী সত্ত্বাটি ওতপ্রোত হয়ে যাওয়ায় তিনি বাঙালিমানসে একটি কাল্ট ফিগার হয়ে গেছেন।

সব মিলিয়েই তো কবি, বৈশাখের পঁচিশ তারিখ।







0

বিশেষ রচনা - শৌনক দত্ত

Posted in


বিশেষ রচনা



উনিশ মে'র রোদ্দুবেলায়

শৌনক দত্ত



(২)

সুস্মির চোখে শীতল কফির সরলতা। দুই হাতে কফি মগ জড়িয়ে কেমন উদাস হয়ে সুস্মি বলে চলে ১৯৭০ সাল থেকে ভাষা আন্দোলন অন্য মোড় নেয়। ১৯৭০ সালের ১৯-৩০ এপ্রিলের ভিতর কাছাড়, ত্রিপুরা ও শিলং-এ ২৪ ঘন্টার গণঅনশণ করেন বিষ্ণুপ্রিয়া ভাষাবিদ্রোহীরা। ১৯৭২ সালের ১২ ডিসেম্বর কাছাড়ের সর্বত্র ৪৮ ঘন্টার গণঅনশণ, ১৯৭৪ সালের ৯ মার্চ কাছাড়ের সর্বত্র ৭২ ঘন্টার গণঅনশণ পালন করা হয়। ১৯৭৮ সালের ২ ডিসেম্বর করিমগঞ্জ ও কাছাড়ের সর্বত্র ‘সংখ্যালঘু বাঁচাও দিবস’ পালন করা হয়। একুশে ফেব্রুয়ারি যেদিন বাঙালির মাতৃভাষা দিবস, সেই তারিখে ১৯৭৯ সালে সমগ্র কাছাড়ে পালিত হয় অবস্থান ধর্মঘট।

এরপর? আমার প্রশ্ন সুস্মি চোখে নিয়ে উঠে যায়। জানালার ওপারে তখন আঁধার ঘিরে আছে। সুস্মির মুখ আবছা, যেন গহীন কোন অতল থেকে কথার পরে কথা ভেসে আসছে। আমি যেন দেখতে পাচ্ছি সেই সময় চোখের সামনে অনুবাদে। সুস্মি ডেকে ওঠে, বাসু! কি হলো? শুনছো না? -দেখছি তো। -কি? –না,মানে শুনছি তো। -কি বললাম বলো তো? খুব ইচ্ছে করছিলো বলি সুস্মি, ওই জানালার বাইরের ক্যানভাসে তোমার কথারা ছবি হয়ে ফুটছে, আমি দেখছিলাম। বলতে পারলাম না মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসছে একটু আগের ছবি কিংবা সুস্মির বলা কথারা.......

১৯৮২ সালের ২৫ জানুয়ারি আসামের শিল্প মন্ত্রণালয় ও ‘বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ছাত্র ইউনিয়নের’ ভেতর একটি বৈঠক হয়। ‘নিখিল বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী মহাসভা’ এবং ‘বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ছাত্র ইউনিয়ন’ যৌথভাবে অবিলম্বে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষাকে স্বীকৃতির দেয়ার বিষয়ে পদপে নেয়ার জন্য আসামের মূখ্যমন্ত্রী হিতেশ্বর শইকিয়ার কাছে মেমোরান্ডাম পেশ করেন। ১৯৮৩ সালের ২৫ অক্টোবর আসামের রাজ্য সরকারের কেবিনেট মিটিং-এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, কাছাড় ও করিমগঞ্জ জেলার স্কুলগুলোতে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষাকে প্রাথমিক পর্যায়ে অন্তর্ভূক্ত করা হবে। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত কেবলই সিদ্ধান্তই থেকে যায়। এর কোনও বাস্তবায়ন হয় না। ১৪ নভেম্বর ১৯৮৩ তারিখে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষা চালু করার বিষয়ে একটি নোটিফিকেশন হয়, কিন্তু দুঃখজনকভাবে ৮ ডিসেম্বর ১৯৮৩ তারিখে তা স্থগিত করা হয়।

১৯৮৪ সালে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী সাহিত্য পরিষদ ঠার ভাষা আন্দোলনের দীর্ঘ যাত্রা ও দাবীসমূহ নিয়ে প্রকাশিত দলিল (Let history and facts speak about Manipuri’s) আকারে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লীতে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সাথে সাক্ষাৎ করে। কিন্তু তারপরও রাষ্ট্র কোনও উদ্যোগ নেয় না। আবারও ‘বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ছাত্র ইউনিয়ন’ আন্দোলনের ডাক দেয়। ১৯৮৫ সালের ২ জুলাই ‘নিখিল বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ছাত্র ইউনিয়ন’ দাবীদিবস পালন করে। ১৯৮৯ সালের ১৯ জানুয়ারি পুনরায় জাপিরবন্দ-সোনাপুরে জনসভা ও রক্তস্বার কর্মসূচি পালন করে ছাএ ইউনিয়ন। আসামের রাজধানী গুয়াহাটিতে কেন্দ্রীয়ভাবে ছাত্র ইউনিয়ন প্রতিবাদ মিছিল করে ১৯৮৯ সালের ২৫ এপ্রিল। ১৯৮৯ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি নলিনী সিংহ, নির্মল সিংহ, কৃপাময় সিংহ, সুরচন্দ্র সিংহদের নেতৃত্বে ছাত্র সংগঠনের কর্মীরা ১২ ঘন্টা ‘রেল রোকো কর্মসূচি’ পালন করে। ১৯৮৯ সালের পয়লা ডিসেম্বর বিধান সভা চলাকালীন সময়ে দিসপুরে সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত রিলে অনশন পালিত হয়। ১৯৮৯ সালের ২৭ জুলাই তারিখে সরকার আবারও বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষা চালুর জন্য আরও একটি নোটিফিকেশন করে এবং ৬ আগস্ট ১৯৮৯ তারিখে তা স্থগিত করে। ১৯৯০ সালে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী অধ্যুষিত অঞ্চলে এল.পি স্কুলের ক্লাশ বয়কট করা হয়।

সুস্মির মুখে এখন রাতের নক্ষত্ররা ফুটছে। কোথাও বের হওয়া হলো না। ধ্রুবতারার মতন এক সময় যেন উড়ে এসে জ্বলজ্বল করছে সুস্মির দুচোখে। আমার কথা ফুরিয়ে এলে সুস্মি কথার রেশ টেনে নিয়ে বলতে থাকে- 

১৯৯১ সালের সালের ২৬ জানুয়ারি রাজকুমার অনিলকৃষ্ণ মণিপুরী ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি এবং সুরচন্দ্র সিংহ সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এদের নেতৃত্বেই ১৯৯২ সালের ৬,১০,১৯ আগস্ট শিলচর, হাইলাকান্দি, করিমগঞ্জ জেলার ডিআই অফিসে অনশন ধর্মঘট পালিত হয়। লড়াকু ছাত্ররা সম্মিলিতভাবে ১৯৯২ সালের ২১ সেপ্টেম্বর ১৫ দিনের ভেতর বিষ্ণুপ্রিয়া ভাষা চালু করার দাবী জানিয়ে চরমপত্র দেয়। ঐদিন শিলচর গান্ধিবাগ ময়দানে প্রায় দশহাজার মানুষের এক বিশাল জমায়েতের মাধ্যমে এই চরমপত্র দেয়া হয়। কিন্তু ঐ চরমপত্রকে কোনও গুরুত্ব না দেয়ায় ভাষা-আন্দোলন আরও দ্রোহী হয়ে উঠে এবং ১৯৯২ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর রবিশংকর সিংহ ও কুলচন্দ্র সিংহের নেতৃত্বে ‘বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী গণসংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়। ১৯৯২ সালের ২১ অক্টোবর বরাক উপত্যকার বারমুনি, কাটাখাল, কালানি, পাথাবরকান্দিতে ২৪ ঘন্টার জাতীয় সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করা হয়। ১৯৯২ সালের পয়লা নভেম্বর আন্দোলনকারীরা জাতীয় কনভেনশনের আয়োজন করে। ১৯৯২ সালের ১৬ নভেম্বর ৩৬ ঘন্টার সড়ক অবরোধ কর্মসূচি আহবান করা হয়। ১৯৯২ সালের ৩ ডিসেম্বর আসামের মূখ্যমন্ত্রী হিতেশ্বর শইকিয়া দিসপুরে এক বৈঠক আহবান করেন। বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে রাষ্ট্রের মূখ্যমন্ত্রী স্তরে এটিই ছিল কোনও প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক। রাষ্ট্রীয় বৈঠকে কোনও ইতিবাচক সিদ্ধান্ত না হওয়ায় আন্দোলনকারীরা পুনরায় ১৯৯৩ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৪৮ ঘন্টার সড়ক অবরোধ শুরু হয়। আসামে বিধানসভা চলাকালীন সময়ে দিসপুরে ১৯৯৩ সালের ২২ মার্চ ৩৬ ঘন্টার গণঅনশণ কর্মষূচি পালিত হয়। বিষ্ণুপ্রিয়া ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে ১০১ ঘন্টার রেল রোকো কর্মসূচি আরম্ভ হয় ১৯৯৩ সালের ২৭ এপ্রিল থেকে বুরুঙ্গা, কাটাখাল, পাথারকান্দি এলাকায়। এই কর্মসূচির ফলে বরাক উপত্যকায় রেল চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। এই রেল রোকো কর্মসূচির ফলে অনেক সত্যাগ্রহী আন্দোলনকারী গ্রেফতার হন। ১৯৯৩ সালের ১০ মে কাছাড়, করিমগঞ্জ, হাইলাকান্দির তিন জেলার ডিআই এবং ডিইইও অফিসে ১২ ঘন্টা পিকেটিং করা হয় এবং এর ফলে শিক্ষা বিভাগের অফিস পুরোপুরি অচল হয়ে পড়ে। ১৯৯৩ সালের ২০ ডিসেম্বরও বরাক উপত্যকার অনেক সড়কে ৭২ ঘন্টার অবরোধ কর্মসূচি পালিত হয়। আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৯৫ সালের ২৬ মে ত্রিপুরা রাজ্য সরকার ত্রিপুরা রাজ্যের প্রাথমিক স্কুলগুলোতে (মূলত: বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী অধ্যূষিত এলাকায়) বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষাকে অন্তর্ভূক্ত করে। কিন্তু আন্দোলনের কেন্দ্রীয় এলাকা আসাম রাজ্যে এই সিদ্ধান্ত নিতে সরকার তখনও গড়িমসি ভাবই বজায় রেখেছিল।

দুনিয়ার পয়লা আদিবাসী ভাষাশহীদ সুদেষ্ণা সিংহ ( ১৯৬৪-১৯৯৬)। আসামের বরাক উপত্যকায় বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীদের দীর্ঘ ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে ১৬ মার্চ একটি রক্তক্ষয়ী দিন। আন্দোরনের ধারাবাহিকতায় ভাষাবিপ্লবীরা বরাক উপত্যকায় ১৯৯৬ সালের মার্চ মাসে ৫০১ ঘন্টার রেল অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করেন। ১৯৯৬ সালের ১৬ মার্চ ভাষা আসামের পাথারকান্দির কলকলিঘাট রেলস্টেশনে আন্দোলনকারীদের একটি মিছিলে রাষ্ট্রের পুলিশ গুলি করে আন্দোলনকারীদের উপর। এই ঘটনায় অনেক ভাষা বিদ্রোহী আহত হন এবং ব্যাপক ধড়পাকড় হয় এবং মাতৃভাষার অধিকার চাইতে গিয়ে রাষ্ট্রের নৃশংস বন্দুকের গুলিতে প্রাণ দেন বিলবাড়ি গ্রামের বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী বিপ্লবী সুদেষ্ণা সিংহ। বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষা আন্দোলনের দীর্ঘ ইতিহাসকে আর উপক্ষা করতে পারে না আসাম রাজ্য সরকার। আসাম রাজ্যের ইলিমেন্টারি এডুকেশন এর ডেপুটি ডিরেক্টর ২০০১ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি বরাক উপত্যকার বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী অধ্যূষিত গ্রামের ৫২টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষার প্রথম পাঠ্য পুস্তক ‘কনাক পাঠ’ তৃতীয় শ্রেণীতে চালু করার সিদ্ধান্ত নেন। ২০০১ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি থেকে তা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ২০০৬ সালের ৮ মার্চ ভারতের সুপ্রিমকোর্ট ‘বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী’ শব্দটি লেখার রাষ্ট্রীয় অনুমোদন দেয়। ভাষা বিদ্রোহীদের দাবী ছিল বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষাকে কেবলমাত্র সংখ্যাগরিষ্ঠ বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী এলাকার জন্য সীমাবদ্ধ না রেখে সকল এলাকাতেই চালু করার। দীর্ঘদিন থেকে চলে আসা এই মৈতৈ মণিপুরী এবং বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী বিতর্কের একধরনের স্থিতি ঘটে।


0

বিশেষ রচনা - শৌনক দত্ত

Posted in


বিশেষ রচনা




উনিশ মে'র রোদ্দুবেলায় 
শৌনক দত্ত 



সুস্মি তখনো আছে। গোঁ ধরেছে শিলচর যাবে। অগত্য স্ত্রীর কন্নায় কর্ম। শিলচর কেন বিখ্যাত, কেন যাবে, আমি অত্তসব জানিনা। সুস্মিকে প্রশ্ন করতেই বলে, 

-গ্লাসে ডুবে মরো! 

কি বলবো না ভেবেই বললাম, 

-যা বাবা মরতে যাবো কেন? 

আগের চেয়েও রাগান্বিত কন্ঠে সুস্মি বললো, 

-তুমি কি বাঙালী? 

চোখ ছানাবড়া হলো আমার। তখন কি জানতাম, উনিশে মে শিলচরে ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছে এগারোজন। আমার কাছে ভাষা আন্দোলন বলতেই বাহান্নর একুশে ফেব্রুয়ারী। স্মুমি খুব রেগে গেছিলো। সেই রাগ ভাঙাতে ল্যাপিতে বসলাম। পড়ালেখা করলাম। আর তখন জানতে পারলাম, উনিশে মে’র আত্মত্যাগের বিনিময়ে পাওয়া ভাষা দিবসের কথা। বেশ কয়েকদিন অনেক কিছু রপ্ত করলাম। তারপর আমাদের শিলচর ভ্রমণ। 


শিলচর ঐতিহাসিক ষ্টেশনচত্বর ঘুরে যখন লজে ফিরেছি তখন আমার এই কয়েকদিনের জ্ঞান ফলাবার সাধকে আটকে রাখতে পারলাম না। তাছাড়া সুস্মির সেইদিনের রাগের মোক্ষম জবাব দিতে বললাম, 
-ভাষা শহিদ দিবসের ইতিহাস আমি জানতাম না ভাবছো, আমি গোটা ইতিহাসটা জানি। 

সুস্মির উত্তরের আশা না করেই আপনমনেই বলতে শুরু করেছি।

-বাঙালীর প্রাণের ভাষা বাংলা। মাতৃভাষার অধিকারের জন্য বাঙালী প্রাণকে তুচ্ছজ্ঞান করেছে। মাতৃভাষার জন্য কোন জাতির এতখানি দরদ থাকতে পারে, তা বাঙালীরা প্রাণের বিনিময়ে প্রমাণ করেছে। বাহান্নর ফেব্রুয়ারিতে বাংলা ভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে প্রাণ দিয়েছেন সালাম, রফিক, সফিয়ুর, বরকত ও জব্বার। বাহান্নর চেতনায় উদ্দীপ্ত হয়ে ১৯৬১ সালের মে মাসে বাংলা ভাষার ব্যবহার বন্ধ করার প্রতিবাদে ভারতের রাজ্য আসামের শিলচর শহরে পুলিশের গুলিতে প্রাণ দিয়েছিলেন এগারো জন ভাষাশহীদ। দুঃখের বিষয় ইতিহাস তাঁদের তেমন মনে রাখেনি। আসাম রাজ্যের প্রধান ভাষা অহমীয়া হলেও বরাক উপত্যকার করিমগঞ্জ,কাছাড় এবং শিলচর হলো বাঙালীদের ঘাঁটি। দেশবিভাগের একবছর পর ১৯৪৮ সালে রেফারেন্ডামের মাধ্যমে সুরমা ভ্যালী (বর্তমান সিলেট বিভাগ) পূর্বপাকিস্তানের অন্তর্ভূক্ত হয় । কিন্তু বৃহত্তর সিলেটের তিন চতুর্থাংশ নিয়ে বরাক ভ্যালী থেকে যায় আসামে । ১৯৬১ সালে আসাম প্রাদেশিক সরকার শুধু অহমীয়া ভাষাকে রাজ্যের একমাত্র সরকারী ভাষা ঘোষণা করলে ক্ষোভ দানা বাঁধে বাঙালীদের ভেতর । ক্রমশঃ তা রূপ নেয় আন্দোলনের। প্রথমে সত্যাগ্রহ, পরে সহিংস । ১৯৬১ সালের ১৯ মে । আন্দোলনের চুড়ান্ত পর্বে এদিন শিলচরে সকাল ৬টা-সন্ধ্যা ৬টা ধর্মঘট পালন করে। বেলা ৩টা ৩০ মিনিটে ভাষাবিপ্লবীরা যখন স্থানীয় রেলওয়ে ষ্টেশনে রেলপথ অবরোধ পালন করছিল, তখন নিরাপত্তারক্ষায় নিয়োজিত আসাম রাইফেলসের একটি ব্যাটালিয়ান তাদের বাধা দেয়। সংঘর্ষের এক পর্যায়ে আসাম রাইফেলস গুলিবর্ষণ করলে ঘটনাস্থনে প্রাণ হারান ১১ জন ভাষাবিপ্লবী। আহত হন অর্ধশতাধিক। রাজ্য সরকার শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত বাতিল করতে বাধ্য হয়। এরপর আসামে বাংলাকে ২য় রাজ্যভাষা হিসাবে ঘোষণা করা হয়। সেদিন মাতৃভাষার জন্য যে ১১ জন বীর শহীদ আত্মবলি দেন, তাদের মধ্যে ছিলেন পৃথিবীর প্রথম নারী ভাষাশহীদ, সতের বছরের তরুণী, কমলা ভট্টাচার্য। পৃথিবীর ইতিহাসে মাত্র দুজন নারী মাতৃভাষার জন্য প্রাণ উৎসর্গ করেছেন- একজন শহীদ কমলা ভট্টাচার্য, দ্বিতীয় জন শহীদ সুদেষ্ণা সিংহ, যিনি বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষার স্বীকৃতির আন্দোলনে শহীদ হন।

সুস্মি হেসে ফেটে পড়ে। 

-ভাল, খুব ভাল! নেট ঘেঁটে তো ভালই বললে। এবার তবে একটি বই করে ফেলো। 
বিদ্রুপটা ঠিক গায়ে লাগলো। 

-তুমি কি বলতে চাইছো এটা ঘটনা নয়? পৃথিবীর প্রথম নারী ভাষাশহীদ কমলা ভট্টাচার্য নয়? 

-আমি তা তো বলছি না! তবে তুমি কি বিষ্ণুপ্রিয়া মনিপুরী ভাষা আন্দোলনের কথা জানো? জানো কি আদিবাসী ভাষাশহীদ সুদেষ্ণা সিংহের কথা? 

পড়ুয়া আর জানুয়াদের সাথে এই এক সমস্যা তাদের সাথে কিছুতেই কিছু করে পেরে ওঠা যায় না। মনে মনে ভাবা কথাটা বলে ফেলতেই সুস্মি হেসে উঠলো। হাসির দমক থামিয়ে বললো, 

-শুনবে সেই ইতিহাস? 

বাইরে তখন গোধূলির আলো। পর্দার ফাঁকে মিঠে রোদ্দুর গলে পড়ছে সুস্মির মুখে। আমার আগ্রহ যে বেড়েছে তা স্পষ্ট বুঝতে পারছে সুস্মি। ঠক ঠক দরজার আওয়াজে কথা থেমে গেলো। কফি অর্ডার করা ছিলো। কেয়ারটেকার কফি মগ নিয়ে ঢুকলো। কফি মগে চুমুক দিয়ে সুস্মি বলতে শুরু করলো,

-বরাক-ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় শুরু হয়েছিল মাতৃভাষার দাবী … ভারতের উত্তর পূবাঞ্চলীয় রাজ্য আসামের দুটি প্রধান উপত্যকা- একটি ব্রহ্মপুত্র, অপরটি বরাক। পার্বত্য কাছাড়, কাছাড়, হাইলাকান্দি, করিমগঞ্জ এই চারটি জেলা নিয়েই আসামের বরাক উপত্যকা। আর এই বরাক উপত্যকার নীচেই বাংলাদেশের সুরমা উপত্যকা। উভয় উপত্যকার এক নির্ভীক প্রান্তিক জাতি বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী। ভারতে আসাম রাজ্যের কাছাড়, পাথারকান্দি, হাইলাকান্দি, করিমগঞ্জ , ত্রিপুরা রাজ্য এবং মণিপুরে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীদের সংখ্যাধিক্য। বাংলাদেশে মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জেই বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীদের অধিক বসতি দেখা যায়, মৌলভীবাজার, সিলেট, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ ছাড়াও দেশের অনেক জায়গাতেই নানান প্রয়োজনে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী জনগণ নিজেদের ঐতিহাসিক আবাস গড়ে তুলেছেন। বাংলাদেশে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী এবং মৈতৈ মণিপুরী (মৈতৈদের ভেতর যারা ইসলাম ধর্ম পালন করেন তাদেরকে পাঙন/পাঙান বলা হচ্ছে) এই দুই ভিন্ন জাতিকে বরাবর রাষ্ট্রীয় নথিপত্র ও দলিল দস্তাবেজে ‘মণিপুরী’ হিসেবে দেখানো হয়। ভারতের মণিপুরসহ উভয় উপত্যকায় বরাবর একটি আন্তঃজাতিগত দ্বন্দ্ব আছে - কে মণিপুরী আর কে মণিপুরী নয় - তা নিয়ে। উভয় রাষ্ট্রের উভয় উপত্যকার রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম বরাবর এই আন্তঃজাতিগত দ্বন্দ্ব থেকে নানান ফায়সালা নিতে চায়। আর তা হচ্ছে কৌশলে ভাষিক সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ভাষা ও জাতিগত অস্তিত্বকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও সমমর্যাদা না দেয়া। ভারতের মণিপুর অঞ্চলেই বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী জাতিদের ঠার বা ভাষার উদ্ভব। স্যার জর্জ গ্রিয়ারসন ‘লিংগুস্টিক সার্ভে অব ইণ্ডিয়া’ পুস্তকের ৫নং খণ্ডে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীদের ‘বিষ্ণুপুরীয়া মণিপুরী’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ভারতের সাংবিধানিক আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রের সকল ভাষিক সংখ্যালঘু জাতির সদস্যরা প্রাথমিক স্তরে শিক্ষা লাভের জন্য নিজের মাতৃভাষায় পড়ালেখা করার মৌলিক অধিকার রাখে। রাষ্ট্রে প্রান্তিক জাতিদের কোনও জনমিতি, পরিসংখ্যান, তথ্য উপাত্ত জনগণের দলিল হিসেবে রাখা হয় না। যাও থাকে তার প্রায় পুরোটাই লোকদেখানো ও বানোয়াট। বাংলাদেশে যেমন ১৯৯১ কি ২০০১ সালের সকল আদমশুমারীতেই দেশের বাঙালি বাদে অপরাপর জাতিদের জনসংখ্যা বাড়ে কমেনি, সেরকম ভারতেও। ১৯৬১ সনের ভারতীয় জনপরিসংখ্যানে আসাম রাজ্যের বরাক উপত্যকার করিমগঞ্জের পাথারকান্দিতে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীদের জনসংখ্যা মাত্র একজন নারী দেখানো হয়, অথচ সেখানে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীদের জনসংখ্যা ছিল ২২,০০০ এরও বেশী। অথচ ঐ একই জায়গার জনসংখ্যা ১৯৭১ সালে দেখানো হয়েছে ১০,১৬৪ জন। রাষ্ট্রের এই জনপরিসংখ্যানিক দলিল থেকে আমরা ধারণা করতে পারি প্রান্তিক জাতি বিষয়ে রাষ্ট্র কি ধরনের মনোযোগ ও উদ্যোগ বহাল রাখে। আর তা বরাক কিংবা সুরমা উপত্যকা যাই হোক না কেন। বরাক উপত্যকার বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীদের ভাষা আন্দোলন আমাদেরকে ভাষার লড়াই, জাতিগত অস্তিত্বের সংকট এবং রাষ্ট্রের আইনগত সিদ্ধান্তগ্রহণে কার্যকরী উৎসাহ ও ইশারা দিতে পারে। বরাক উপত্যকার বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষা আন্দোলনের ঘটনাপঞ্জী (১৯৫৫-১৯৯৬) অনুযায়ী ১৯৫৫ সন থেকেই বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীরা মাতৃভাষার অধিকারের আন্দোলনে ঐক্যবদ্ধ হতে শুরু করেন। বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষা আন্দোলন(১৯৫৫-১৯৯৬) শুরু হয় ‘নিখিল বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী মহাসভা’র ১৯৫৫ সালের দাবীর ভেতর দিয়েই, যেখানে তাদের দাবী ছিল আসাম ও ত্রিপুরা রাজ্যে বিষ্ণুপ্রিয়া শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষাদান। বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি এবং ভাষার অধিকারের দাবীতে ভাষা পরিষদের উদ্যোগে গড়ে উঠে ‘সত্যাগ্রহ আন্দোলন’। সত্যাগ্রহ আন্দোলনের সাতটি দাবীর ভেতর ছিল : আসাম ও ত্রিপুরা রাজ্যে প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষার স্বীকৃতি, আসামের রাজধানী গুয়াহাটি থেকে রাষ্ট্রীয় বেতার কার্যক্রমে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীদের সাংস্কৃতিক কার্যক্রম প্রচার, নিখিল বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী সাহিত্য পরিষদকে আর্থিক সহযোগিতা প্রদান, কেন্দ্র ও রাজ্য সভাতে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীদের আসন সংরক্ষণ, সরকারী ও বেসরকারী পর্যায়ে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীদের কোটা সংরক্ষণ, ভাষিক সংখ্যালঘু শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তা প্রদান এবং ১৯৬১ সালের আদমশুমারীর সংশোধন। সত্যাগ্রহ আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৬১ সালের ২ জুলাই ভাষা পরিষদ ভাষা দাবী দিবস পালন করে। ১৯৬১ সনের ২৫ জুলাই আসাম রাজ্যের শিক্ষা বিভাগের সাথে যোগাযোগ করা হয়। ১৯৬৩ সনের ২২ মার্চ শ্রী ডি এন বাজপেয়ি নিখিল বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী সাহিত্য পরিষদের সাথে দেখা করেন। ভাষা পরিষদ ১৯৬৪ সালের ৭ জুলাই আসামের মূখ্যমন্ত্রীর কাছে একটি মেমোরান্ডাম পেশ করেন। ১৯৬৪ সালেরই ২৮ জুলাই বিষয়টি নিয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য রাজনৈতিক বিভাগের কাছে পাঠানো হয়। ১৯৬৫ সালের ২ থেকে ৮ জুলাই ভাষা দাবী সপ্তাহ পালন করা হয়। ১৯৬৬ সালের ২৩ মার্চ নিখিল বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষা পরিষদ স্টেট বোর্ড অব ইলিমেন্টারি এড্যুকেশন এর সেক্রেটারি শ্রী কে কে শর্মার সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং তাঁকে আসামে প্রাথমিক শিক্ষাস্তরে দ্রুত বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষা চালুর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। ১৯৬৭ সালের ২ জুলাই দাবী সপ্তাহ ১২ দিন দীর্ঘায়িত করা হয় এবং কাছাড় জেলার সর্বত্র পাবলিক সভা সমাবেশ করা হয়, এইসব সভায় আদমশুমারী জালিয়াতির বিরুদ্ধে জোরদার বক্তব্য রাখা হয়। ১৯৬৭ সালের নভেম্বরে ভাষা পরিষদ নিজেরাই নিজস্ব উদ্যোগে জনপরিসংখ্যান উত্থাপন করেন এবং কাছাড়ে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীদের জনসংখ্যা দেখান ৬৬,৬২৩ জন। ১৯৬৮ সালের মে মাস থেকেই স্কুল, কলেজসহ রাস্তা ঘাটে পিকেটিং, ধর্মঘট, গণশ্লোগানের কার্যক্রম শুরু হয়। ১৯৬৮ সালের জুলাই মাসেই পাবলিক সভাগুলো আরো ব্যাপক বিস্তৃত হয় এবং ১৯৬১ সনের ঔপনিবেশিক আদমশুমারী প্রতিবেদন পোড়ানো হয়। ১৯৬৮ সনেরই ২৫ জুলাই আসামের শিক্ষামন্ত্রী জে বি হেগজার বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীদের দাবীর প্রেক্ষিতে ভারত সরকারের ভাবনা তুলে ধরেন। একই সনের ৩০ আগস্ট কাছাড়ের জনগণ আবারও আসামের মুখ্যমন্ত্রীর কাছে দাবী দাওয়া সংবলিত মেমোরান্ডাম পেশ করেন। ১৯৬৯ সালের ১৫ অক্টোবর কাছাড়ের বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী শিক্ষার্থী ও যুবসমাজ রক্ত দিয়ে রক্তস্বার কর্মসূচি পালন করে। এর পর পরই ভাষা আন্দোলন আরো চূড়ান্ত গণ রূপ নেয় এবং ব্যাপক ধর্মঘট, ধরপাকড়, বন্ধ কর্মসূচি চলতে থাকে। ১৯৬৯ সালের ২২ অক্টোবর কাতিগড়া বন্ধ কর্মসূচি থেকে ৭ জন ভাষাবিদ্রোহীকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৬৯ সনে পূর্ব পাকিস্থানে একদিকে যেমন চলতে থাকে গণঅভ্যুত্থান একই দিকে বরাক উপত্যকায় বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীদের ভাষা আন্দোলন বন্ধ-ধর্মঘট- ঘেরাও-গ্রেফতারের ভেতর দিয়ে জনরূপ নেয়। নরসিংহপুর, রাতাবাড়ি, শালচাপড়া বন্ধ (৫-২৯ অক্টোবর, ১৯৬৯)। জাপিরবন্দ বন্ধ(৩০ অক্টোবর ১৯৬৯) থেকে ২৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়, এই প্রথম কোন নারী ভাষাবিপ্লবীও গ্রেফতার হন। মেহেরপুর বন্ধ (৩১ অক্টোবর ১৯৬৯) থেকে ৫ জন নারী আন্দোলনকারীসহ ৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়। পয়লা নভেম্বর, ১৯৬৯ সালের পিকেটিং থেকে ২৯ জনকে গ্রেফতার করা হয়, ৩ নভেম্বর ১৯৬৯ গ্রেফতার হন ৩৮৫ জন, ১-৫ নভেম্বরের ভেতর তিন জেলার ডিসি অফিসে পিকেটিং করে চেয়ার দখল করে নেয়া হয়, ৪-৫ নভেম্বর ১৯৬৯ গ্রেফতার করা হন ১১১ জনকে। রাষ্ট্রের ধরপাকড় ও নির্যাতনমূলক শাসনের বিরুদ্ধে ১১-১৩ নভেম্বর, ১৯৬৯ তারিখে শিলচর শহরে বিশাল গণসমাবেশের আয়োজন হয়। শিলচর, নরসিংহপুর, হাইলাকান্দি ও পাথারকান্দিতে ১৪৪ ধারা ভেঙ্গে ফেলেন ভাষাবিপ্লবীরা, এই ঘটনায় সরকার ২৩৮ জনকে গ্রেফতার করে। ১৭ নভেম্বর ১৯৬৯ শিলচর বন্ধ থেকে ৩০০ জন সত্যাগ্রহীকে গ্রেফতার করা হয়। হাইলাকান্দির ও এস এ মাঠে বিশাল সমাবেশ ডাকা হয় একই সনের ২১ নভেম্বর, হাইলাকান্দি বন্ধ থেকে সবচে’ ব্যাপক ধরপাকড়টি হয় প্রায় ১৫০০ জন ভাষাবিদ্রোহীকে সরকার অন্যায়ভাবে গ্রেফতার করে। ১৯৬৯ সালের ১৪ ডিসেম্বর ‘ডিসি অব লিংগুস্টিক মাইনরিটিস ইন ইন্ডিয়া’ শিলচর আসেন এবং মহাসভার সাথে বৈঠক করেন।

কফি অনেকক্ষণ ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। সুস্মি চুপচাপ কফিমগটা নাড়ছে আমার আগ্রহ আরো চরমে - তারপর কি হলো বৈঠকের শেষে? 


চলবে...