0

সম্পাদকীয়

Posted in

সম্পাদকীয়



শূন্য করে ভরে দেওয়া যাহার খেলা
তারি লাগি রইনু বসে সকল বেলা...


হেমন্তের মাঠে মাঠে কবিতার পংক্তিগুলি গেয়ে ফেরে নবান্নের গান। আমার সব খোয়াবার সময় বুঝি হলো এবার...

দেখতে দেখতে পাঁচ বছর পেরিয়ে চার মাস। অর্থাৎ ষষ্ঠ বর্ষ, চতুর্থ সংখ্যা বা চৌষট্টিটা সংখ্যা। অনেক লেখা, অনেক লেখক। গুচ্ছ গুচ্ছ লেখা আসে প্রতিনিয়ত। তবে তার চেয়েও বড়ো কথা হলো গুচ্ছ গুচ্ছ লেখা বাদ পড়ে প্রতিনিয়ত। কিন্তু কেন? লেখার মান বা অন্য কারণ বাদ দিলে মূলত যে কারণটা পড়ে থাকে, তা হলো 'বানান'। বলতে খারাপই লাগছে... প্রতি মাসে বেশ কিছু লেখা বাদ পড়ে শুধু ওই কারণেই। আর, সবচেয়ে বড়ো কথা হলো, এই বাদ-পড়া লেখাগুলোর মধ্যে অনেকগুলো বেশ ভালোই লেখা। আফসোস হয়, কিন্তু নিরুপায়। এত বানান এডিট করা অসম্ভব।   

এমনিতে, বাংলা ভাষায় লেখার হার সর্বাত্মকভাবে যেমন বেড়েছে, তেমনই বাংলা বানানের মান হতাশাজনকভাবে নিম্নগামী হয়েছে, একথা অনস্বীকার্য। কিন্তু তাই বলে হাল ছেড়ে দিলে চলবে না। বাংলা বানানের মানোন্নয়নের দায় গ্রহণ করতে হবে সর্ব্বস্তরেই। এবিষয়ে সামান্য ক'দিনের অভিজ্ঞতার ফলপ্রসূ কিছু সাজেশন রাখতে পারি এখানে, যদি কারোর কাজে লাগে, এই ভেবে --

প্রথমেই বলি, একটা অভিধান হাতের নাগালে রাখুন সবসময়। ণত্ববিধি - ষত্ববিধিটা একবার ঝালিয়ে নিলে বানান ভুল অনেকটা কমে - বাংলা বানানের এটা খুব গোলমেলে একটা অধ্যায়। এছাড়া, আমরা ঋতবাকে কিছু বানান বিধি মেনে চলি, যেগুলো একবার বুঝে নিলে বানান ভুল হওয়ার সম্ভাবনা কমানো যায়। যেমন, হল - লাঙ্গল অর্থে, হলো - হইলো অর্থে; হত - নিহত অর্থে, হতো - হইতো অর্থে; ভাল - ললাট অর্থে, ভালো - উত্তম অর্থে। এ তো (এতো নয়) - এই তো অর্থে, এত - অনেক অর্থে। তেমনই ছোটো (ছোট-এর ব্যবহার -  হেঁটে গেলে ধরতে পারবি না, ছোট), বড়ো (বড়ো দাদা, কিন্তু সম্বোধনে - বড়দা), ইত্যাদি প্রভৃতি। আসলে এগুলো আমরা সবাই জানি, লেখার সময় খেয়াল থাকে না কেবল। কিন্তু খেয়ালটা এবার থেকে রাখতে হবে সচেতনভাবেই। 

লেখার সময় আরও একটা বিষয়ে সচেতন হতে হবে, সেটা হলো পাংচুয়েশন বা যতিচিহ্ন। আমরা সবাই জানি, পাংচুয়েশন ছাড়া লেখা অর্থহীন। একটা কথা মাথায় রাখতে হবে - কোনও পাংচুয়েশনের আগেই স্পেস হয় না। একই নিয়ম খাটে ওপেন ইনভার্টেড কমার পরে এবং ক্লোজ ইনভার্টেড কমার আগে; দু'ক্ষেত্রেই স্পেস হয় না। 

গদ্য এবং পদ্য লেখার ক্ষেত্রেও একই শব্দের ভিন্নরূপে প্রয়োগ প্রচলিত। যেমন,

পদ্যে - সাথে, গদ্যে - সঙ্গে 
পদ্যে - আজি, গদ্যে - আজই
পদ্যে - তেমনি, গদ্যে - তেমনই
ইত্যাদি এবং ইত্যাদি...

এবারের ঋতবাক সংখ্যায় অনেক বানান ভুল। এবার থেকে আমি আর বানান ভুল ঠিক করবো না। এখন থেকে আপনাদের নিজেদের পত্রিকার মান রক্ষার দায়িত্ব আপনাদের নিজেদেরই। নিজেরাই এডিট করে পাঠান আপনাদের লেখা। একমাত্র সচেতনতাই পারে সুঅভ্যাস গড়ে তুলতে। 

আমি আশাবাদী।

সুস্থ থাকুন, সৃষ্টিতে থাকুন, আনন্দে থাকুন

শুভেচ্ছা নিরন্তর 

0 comments:

0

প্রবন্ধ - নিলয় সরকার

Posted in

প্রবন্ধ


নদীয়া জেলার পুতুলনাচের ইতিকথা 
নিলয় সরকার 


নদীয়া জেলার আপাত উপেক্ষিত পুতুলনাচ-ই একেবারে খাঁটি লোকশিল্প। নদীয়া জেলার পুতুলনাচ পাড়া বা গ্রাম বলতে বোঝায়, শিয়ালদা থেকে একশো কি.মি দূরে নদীয়া জেলার হাঁসখালি থানার --মূড়াগাছা, মিলননগর, ভবানীপুর, বগুলা বা তার আশেপাশের গ্রামগুলো। পূর্ব রেলে শিয়ালদা থেকে বগুলার দূরত্ব ৯৮ কিলো মিটার। অর্থাৎ লোকাল ট্রেনে প্রায় দু-ঘন্টার পথ, সেখান থেকে দু মাইলের মধ্যেই মুড়াগাছা গ্রাম, এই গ্রাম ঘিরেই আশেপাশে গড়ে উঠেছে নানান নয়াবসতি। বগুলার অ-পৌর অঞ্চলের এই বসতি ঘিরেই গড়ে উঠেছে বাংলার পুতুলনাচের লোকশিল্প একমাত্র এই এলাকাতেই বিচিত্র সুন্দর সুন্দর নামে রয়েছে কম বেশী বাষট্টি-টা পুতুল নাচের দল। এ ছাড়া রানাঘাট থানার বড়ো বেরিয়া,নবদ্বীপ, কৃষ্ণনগর, কৃষ্ণগঞ্জ, তেহট্ট থানার আরও পঞ্চাশটি দল মিলে প্রায় দেড়শতাধিক পুতুলনাচের দল রয়েছে এই জেলায়। এই দলগুলি প্রায় ষাটটা রকমারি পালাগান বিবিধ উৎসবে তারা নিয়মিত দেখিয়ে বেড়ায়। পুতুলনাচের আঙ্গিক অনুসারে লোকশিল্পীরা নিজেরাই পালারূপ তৈরী করেন এবং পাণ্ডুলিপি আকারে সেগুলো-ই সমস্থ দল তা সংরক্ষণ করেন। এ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ পালারূপ ছাপা আকারে প্রকাশ পেয়েছে বলে জানা নেই। এই সব পালার আখ্যানবস্তু মূলতঃ পুরান। রামায়ণ ও মহাভারত থেকে সংগৃহীত হলেও গ্রাম বাংলার চিরপরিচিত অমর গাথাগুলিও এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান জুড়ে রয়েছে। এছাড়াও দেখা যায় কোনও হালফিল রাজনৈতিক ও সামাজিক ঘটনাও পুতুলনাচ পালার উপজীব্য বিষয় হয়ে উঠেছে। পৌরাণিক পালার মধ্যে রয়েছে রাম সীতার বিবাহ, সীতাহরণ, রাবণবধ, অশ্বমেধ যজ্ঞ, ভক্ত-প্রহ্লাদ, দাতাকর্ণ, রাজা-হরিশচন্দ্র, সাবিত্রী-সত্যবান, সতী-বেহুলা, শকুন্তলা-দুষমন্ত প্রভৃতি। গাথামূলক পালার মধ্যেও রয়েছে সতী-রূপবান, সোনাই দীঘি, মলয়ার প্রেম, রাখালবন্ধু জামাল-জরিনা, লায়লা-মজনু, এই লোকপালাগুলির ও যথেষ্ঠ চাহিদা রয়েছে পুতুলনাচের মাঠ ময়দানে। এদেশীয় প্রথায় কিছু সামাজিক পালা ও রচনা হয়েছে যেমন সরলার সংসার, কপালকুণ্ডলা, নটী-বিনোদিণী, দেবদাস, বিন্দুরছেলে, ইত্যাদি। এছাড়াও ঐতিহাসিক পালা রয়েছে, সিরাজদ্দৌলা, প্রতাপাদিত্য, সাজাহান, নিমাইসন্যাস, চণ্ডীদাস, সাধক রামপ্রসাদ, সন্তোষী-মা, প্রমুখ। 

এইসব পুতুলনাচ পালার দের ঘন্টা থেকে দু-ঘণ্টার অভিনয় থাকে। নেপথ্যে গাওয়া হয় পদ্য ও গদ্যের সংলাপ, ও কথায় কথায় কণ্ঠসঙ্গীত যা এই পালার মূল লোকগান, ব্যাপারটার সাথে গীতিনাট্য-র বেশ মিল আছে। সঙ্গে থাকে বিবিধ যন্ত্রশিল্পী ও যন্ত্রসঙ্গীত, পালার মধ্যে স্বছন্দ লোকগীতির সরল প্রয়োগ যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে লোকগীতির ঢঙে নানান ধরণের পল্লীগীতির চলন। হাল আমলের চটুল হিন্দি ছায়াছবির গানের কথাসুর ও শোনা যায়। পালার নাটকীয় বিন্যাসের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বাণী চয়ন ও সঙ্গীত নির্বাচন করা হয়ে থাকে। পুতুলনাচের এই সব অখ্যাত অবজ্ঞাত গ্রামীণ গীতিকার, সুরকার, পালাকার--দের নীরব সাধনা আর প্রতিভা এই অবক্ষয়ী সমাজে আজও যথাযথ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত হননি। ফলতঃ কালক্রমে হয়তো হারিয়েই যাবে লোকসংস্কৃতির এই ক্ষয়িষ্ণু ধারা। চলচিত্রের হয়ত জাতীয় সংরক্ষণ সম্ভব, কিন্তু লোকনাট্য-সংস্কৃতির সংরক্ষণ কিভাবে সম্ভব, সেটাই আজ ভাববার বিষয় হয়ে উঠেছে। 

এক একটি দলে নানান ধরণের কাজের জন্য ১৮--২০ জন কর্মী নিয়োজিত হন। এই শিল্প আগাগোড়াই একটা টোটাল টিম ওয়ার্ক বা যৌথ-সমন্বিত শিল্প। এর মধ্যে একজন 'মাস্টার'--ইনি মূল পালার ও সঙ্গীতাংশগুলির পরিচালক ও সুরকার গীতিকার ও হারমোনিয়াম বাদক। কখনো কখনো পালার রূপ-রচয়িতা ও সর্বপোরি একমাত্র নেপথ্য অভিনেতা। এই 'মাস্টার' মশাইরা সব সময় ২৫-৩০ টি পালা মুখস্থ রাখেন, নাট্য প্রয়োগে এঁর দামই সবচেয়ে বেশী। আর একজন থাকেন তাদের বলাহয় দোয়ারকি ---অর্থাত্ তিনি গানের ধুয়ো ধরেন বা গাওয়া প্রতিটি কলির পুনরুক্তি করেন। এই সঙ্গে থাকেন একজন সঙ্গতকার তবলা, ঢোলক, নাল, এসবের জন্য আর একজন জুরিদার। এরপরে দলের সামর্থ অনুসারে থাকে ক্লারিয়নেট, বেহালা, দোতারা, আড়বাঁশি, থেকে আধুনিক কালের সিনথেসাইজার পর্যন্ত। 

'মাস্টার'-এর পরেই মুখ্য ভূমিকায় থাকেন সূত্রধর অর্থাত্ নানান কৌশলে পুতুলগুলিকে সাজিয়ে,নাচিয়ে, জনসাধারণের মনোরঞ্জন করেন। কাজটা কিন্তু একার নয় মঞ্চের নীচে থেকে কখনো বাখারির চটা, তার, বা কখনো সুতোর সাহায্যে মনোরঞ্জনের কাজটি করে থাকেন। বিবিধ ব্যবস্থার জন্য থাকেন এরেঞ্জর, ম্যানেজার, সহ আরও কিছু সহকর্মী। এসব সুষ্ঠ ভাবে করার জন্য মঞ্চ হয় সাধারণতঃ একটু উঁচুতে, মঞ্চের নীচের কাজগুলি সাধারণের দৃষ্টির অন্তরালে করার জন্য অনেক ঘেরাটোপ থাকে। জনসাধারণ অনুষ্ঠানটি দেখার সময় একটু মাথা উঁচু করেই দেখতে অভ্যস্থ হয়ে ওঠেন। এই ভাবেই লোকনাট্য এগিয়ে চলে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। 

পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, বিহার, উত্তরপ্রদেশ, উড়িষ্যা, ত্রিপুরার গ্রাম গঞ্জে ও শহরে ঘুরে বেড়ায় দল এক এক রকম লোকনাট্য পালা নিয়ে। বাংলার তথা নদীয়ার পুতুলনাচ আর ভিনদেশীয় পুতুলনাচের আঙ্গিক কিন্তু একদমই আলাদা। বছরে আট মাস কাজ থাকে এই দল গুলির বাঁকি চারমাস ঘরে বসে থাকতে হয়। কারণ দেশ দেশান্তরে তখন বর্ষা। যে বছর আগে বর্ষা নামে তখন আগেই তাদের ছুটি। মাস মাইনের চুক্তিতে সবাই কাজ করেন, কাজের গুরুত্ব ও দায়িত্বের ভিত্তিতে তাদের মাইনে নির্ধারিত হয়। চার মাস কাজ না থাকলে মাইনেও নেই, তবে একটা বোনাস দিয়ে তাদের সেবারের মতো বিদায় দিতে হয়। বর্ষা অতিক্রান্ত হয় তারপর সবাই একেএকে ফিরে আসেন পালা দলে ...একটু শহর অঞ্চলে অবশ্য আজকাল রথযাত্রার মেলাতেও পুতুলনাচের দল বসছে ছোটো করে। এই সব স্বভাব শিল্পীদের পারিবারিক অবস্থা মোটেই স্বচ্ছল নয়। কারো কারো সামান্য জমি আছে, অধিকাংশ জন-ই ভূমিহীন। ফলতঃ এই পুরষানুক্রমিক পেশা বা বৃত্তি কেউই আর অন্তর থেকে গ্রহণ করেন না। যদিও এই জেলায় এই পেশায় নির্ভরশীল প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ, দক্ষ ও অদক্ষ কর্মীর সংখ্যা প্রায় কুড়ি হাজার। প্রসঙ্গতঃ একটা বৈশিষ্টের কথা না বললেই নয়, তা হলো এইসব দলের প্রযোজক, পালাকার, শিল্পী ও কর্মচারীদের প্রায় সবাই তপশীল জাতিভুক্ত। দেশ ভাগের পর বাংলাদেশ ও ভারতে এই পেশা দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছে। ফরিদপুর, যশোর, বরিশাল ছেড়ে এই গোষ্ঠি নদীয়া জেলায় বসতি গেঁড়ে নদীয়ার প্রাচীন পুতুলনাচের সম্প্রদায়গুলোর সাথে মিশেগিয়ে এক বৃহত্তর শিল্পী সম্প্রদায় গড়ে তুলেছে। জনান্তিকে বলা ভালো এই পেশায় আছে দল ভাঙানোর খেলা। শিল্পীর দক্ষতা অনুসারে চলে দরকষাকষির খেলা, তাই দল ভাঙাভাঙি, দল ছাড়াছাড়ি নিত্ত-নৈমিত্তিক ঘটনা। গ্রামীণ প্রান্তিক মানুষের জীবনে এ এক জীর্ণ অর্থনৈতিক উন্নয়ন। 

নদীয়ার পুতুলনাচ ইংরেজি ম্যারিয়নেট ( Marionette) গোত্রের, অর্থাত্ ওপর থেকে বিশেষভাবে নির্মিত নিজস্ব আঙ্গিকের পুতুলগুলো সুতোর নিয়ন্ত্রণে নাচানোর এক প্রথা। দেশের বিভিন্ন স্থানে 'পাপেট শো '--যেমন হয়, তাদের থেকে এই বাংলা প্রথার পুতুলনাচ সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরণের। নদীয়ার পুতুলনাচ এই জন্যই লোকনাট্যের অন্তর্ভুক্ত অর্থাত্ লোকশিল্প। এই লোকনাট্য গাঁ-ঘরের সাধারণ মানুষের একান্তই আদরের ধন, আবার লোকশিক্ষার ও বাহন। 

এ প্রসঙ্গে বলি দীর্ঘ কাহিনী নির্ভর পুতুলনাচের গীতিনাট্য সংগ্রহকরা সম্ভব হয়নি। পুতুলনাচের ছোটো ছোটো মনোরঞ্জনের যে লোকশিল্প রয়েছে এবার সেখান থেকে কিছু বর্ণনা দিই। পুতুলনাচের প্রকৃতি ও বিষয় অনুসারে পটভূমিও বিবিধ প্রকার হয়, সুতরাং সঙ্গীত ও পুতুলের আঙ্গিক ও হয় বিবিধ। নানারকমের পুতুল হলে গান গুলোও হয় খণ্ড খণ্ড, সাধারণতঃ আসর বন্দনা দিয়েই শুরুহয়, এক্ষেত্রে প্রথমেই একটা কৃষ্ণের পুতুল দেখানো হয়। এবার গান :-- 

" আমার এই বাসনা পুরাও, সাঁই 
একবার হয়ে বাঁকা, দাও হে দেখা, গুণধাম, 
কোথায় আছো, দয়াময়, তরাও গো আমায়, 
জ্ঞান চোক্ষে হেরে, আমার পূর্ণ করো, মনস্কাম, 
আমার এই বাসনা পুরাও, সাঁই। " 

[এবার একটা বন-মানুষের পুতুল দেখিয়ে, সূত্রধর বলছেন মনে হচ্ছে এখানে একটা বনমানুষ পুতুল হয়ে এসেছে ] 

" আমাদের বুন মানুষের হাড়ে কত গুণ, 
জলে লাগায় আগুন ; 
ডিঙ্গলাকে কাঁচকলা বলে, পটল কা বেগুন, 
জলে লাগায় আগুন। 
উসতাজের গুণ জাহির করি, 
নূন কে করি চুন, জলে লাগায় আগুন। 
আমাদের বুন মানুষের হাড়ে কত গুণ, 
জলে লাগায় আগুন। " 

[এবার ঝোলা থেকে বেরোয় একটা পেত্নীর পুতুল ..এরপর গাওয়া হয় ...] 

"এবার মোরে হবই এক প্রাণ পিপেশী, 
শাওড়া তলায় করবো বাসা রাশি রাশি। 
কালোরে কালো বরণী, কালো রূপে করবো আলোনী, 
কালো মেঘের কোলে দেখি, অতি কালো, 
ছুঁ'লে পরেই রঙ, হবে কালো।" 

[পুতুলনাচের মধ্যে দিয়েই দাম্পত্য জীবনের একটা সরল চিত্রও দেখা যায়,যেমন :-- ] 

"ও লো সুন্দরী। কার কথায় করাছো তুমি মন ভারি, 
আমি যেখানে, সেখানে থাকি অনুগত তোমারই, 
কার কথায় করাছো তুমি মুন ভারি। 
তুমি আমার বালাম চাল, যেমন অড়হরের ডাল, 
গোলআলু, চিংড়িভাজা, আলু পটল চচ্চড়ি, 
কার কথায় করাচ্ছ তুমি মুন ভারি 
তুমি আমার রৌদ্রের ছাতা, শীতের কাঁথা, মশার মশারি, 
তুমি আমার রসে ভরা রসগোল্লা,তুমি আমার ডালপুরী, 
কার কথায় করাছো তুমি মন ভারি।" 

[...এই দেখো ...ঝাড়ুদারের ...পুতুল ...নাসতেছে ...] 

"ঝাড়ুদারী কর্ম করি, করিবো না আর এ চাকুরী 
খিদের জ্বালায় জ্বলে মরি, রাজা হলো মোদের খুবই বুরি।  
ঝাড়ুদারী কর্ম করে, খেতে পায় না পেটটা ভরে, 
ক্ষিদের জ্বালায় জ্বলে মরি, করিবো না আর এ চাকুরী।" 

[ঝাড়ুদার-রা সাধারণতঃ পশ্চিম দেশীয় লোক ...সেই জন্য লোকচিত্রে যথাযথ রূপ দেবার জন্য ...হিন্দী শব্দের পদও রয়েছে পুতুলনাচের লোকনাট্যে ] 

"ম্যায় তু ঝাড়ু দে, চুকা ফজর মে হো, 
কাহে বুলাবে আদমি 
না মিলে ছুটি, গম কা রোটি 
লেড়কা বালা, ভূখ মে মারা হো, 
কাহে বুলাবে আদমি " 

[এইবার ফরাসদারের পুতুল, আসছে ...] 

"বারেবারে ফরাসদারে, ডেকো না হে আর, 
যাচ্ছি ফিরে রাজদরবারে, আমি ফরাসদার। 
আমি ফরাসদার কি হে, তুমি ফরাসদার, 
বারেবারে ফরাসদারে, ডেকোনা হে আর।" 

[এবার ভিস্তিওয়ালার পুতুলনাচ দেখা যাবে ...] 

"ক'হে ভিস্তীবালা, একেলা ভবানীপুর কা মেলা 
রাজার হুজুরেতে যায় মোরে পানি দিতে, 
আসতে হইলো মোর, দু'দণ্ড বেলা, ভবানীপুর কা মেলা, 
মিঠা পানি আনতে বাবু বলেন আমারে l 
মিঠা পানি মিলিলো না এ ত্রি-সংসারে। 
মৌর, দারকা, দামুদর নদী, কানা, কুয়া, গঙ্গা, বাঁকি 
লাগাত পদ্মার ধার অবধি, 
গেলছিলাম, মোরে মিঠা পানি মিলিলো না, মোর এ ত্রি-সংসারে " 

[এবার বেদের পুতুলের নাচ হবে ...কেউ যাবেন নি ...] 

"মহারাজের বেদে আমি, আমি বেদে বড়ো গুণী, 
সাপ ধরি গো, জোড়া জোড়া, হলহোলা, ঢ্যামনা, ঢোঁড়া, 
আরো দেখি পানি বুরা, বেছে বেছে ধরি ইনি। 
মহারাজের বেদে আমি, আমি বেদে বড়ো গুণী। 

[এবার কোনো নায়িকা পুতুল এ অবসরে নেচে নেবে ...] 

"ডুব মারি ভাই, ডুব মারি, 
ঝপ ঝপাঝপ প্রেম-সরোবরে, 
আর কিছু নয়, আর কিছু নয়, 
দুনিয়া আকুল, যাক তরে যাক তরে। 
ফুলের মালোয় আয়, ফুলের মালোয় বায় 
ডাকছে কত রঙ বিলাসে, 
আয়, আয়, আয়। 
আয় কে নিবি আয়, হৃদয় নিয়ে মাখামাখি, 
আয় কে যাবি আয়।" 

এইভাবেই বিবিধ লোকরঞ্জনে পুতুলনাচের আঙ্গিক পালা শেষ হয়। কিন্তু আগেই বলেছি পুতুলনাচের মঞ্চপালা একটু দীর্ঘ আঙ্গিকের। পটভূমিকায় থাকে সাধারণতঃ পাঁচালী, কীর্তন, মালসী, ও ঝুমুর আঙ্গিকের গান। মাঝে মাঝে থাকে পাদপূরক দীর্ঘ সংলাপ, লোকনাট্য এগিয়ে চলে মফঃস্বল থেকে গ্রাম গ্রামান্তর। সারা বছর ধরে বিবিধ নির্ম্মাণ ও নির্ম্মিতির উন্মুক্ত তেপান্তর। 

0 comments:

0

প্রবন্ধ - ঝর্ণা চট্টোপাধ্যায়

Posted in


প্রবন্ধ


সুহারির 'কালু রায়' ও তার মন্ত্র
ঝর্ণা চট্টোপাধ্যায়


বর্ধমান থেকে অনতিদূরে গ্রাম-সুহারি। মূলতঃ উগ্রক্ষত্রিয়দের বসবাস, অন্যান্য জাতিও যে নেই তা নয়, তবে মূল অধিবাসী উগ্রক্ষত্রিয় বা বর্ধমানের ভাষায় ‘আগুরী’ দের বাস। কয়েকটি টেরাকোটার মন্দির আছে। টেরাকোটার ফলকগুলি খুবই সুন্দর তবে অনেকাংশেই বিনষ্ট হতে চলেছে। নিজের অতীত গৌরব ও ঐতিহ্তয সম্ববন্ধে অজ্ঞতার ফল। গ্রামের লোকেদের এবং পরিবারগুলির ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় কিছু প্রতিরোধ করার চেষ্টা চলছে।
দুর্গাপূজা,কালিপূজা ইত্যাদি বড় পূজার প্রচলন থাকলেও গ্রামের অন্যতম প্রধান উৎসব হল ধর্মরাজের পুজো। এই গ্রামে ধর্মরাজের পুজো একটি আলাদা মাত্রা পেয়েছে। ধর্মরাজ মূলতঃ অন্ত্যজ শ্রেণীর দেবতা।

‘অমলেন্দু চক্রবর্তীর ‘রাঢের সংষ্কৃতি ও ধর্মঠাকুর’ বইতে দেখছি, ধর্মঠাকুর বা ধর্মরাজ হলেন রূপান্তরিত বুদ্ধদেব। বাহন সাদা ঘোড়া। সুতরাং অনেকের মতে তিনি সূর্যদেব। তিনিই আদি দেবতা, নিরঞ্জন। আদিম জনজাতির সঙ্গে যুক্ত। কোন পাকা ঘরে তিনি থাকেন না। বাগদী, বাউরি, ডোম, কোটাল জাতীয় জনজাতিদের সঙ্গে এই পূজা জড়িত। ধর্মরাজের পূজায় ভাঁড়াল নাচানো হয়। ভাঁড়াল-ভাণ্ড-ভাঁড়। পচাই মদ থাকত ভাঁড়ে, সেটা সারা গ্রাম ঘুরিয়ে বেড়ানো হত, তাকেই বলে ভাঁড়াল নাচানো।

ধর্মঠাকুর নানা নামে পূজিত। কালু রায়, বসন্ত রায়, দক্ষিণ রায় ইত্যাদি নানা নাম দেবতাটির। যদিও সুন্দরবনের দক্ষিণ রায় ও রাঢের দক্ষিণ রায় এক নন। ধর্মঠাকুর কেবলমাত্র রাঢের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। প্রশ্ন জাগে, সে কি তবে রাঢ অঞ্চল আদিবাসী ও নিম্নবর্গ জাতি অধ্যূষিত অঞ্চল বলে?

সুহারি গ্রামের ধর্মঠাকুর কালাচাঁদ বা কালু রায় নামে পরিচিত। পারিবারিক এক বন্ধুর বাড়ি সুহারিতে। সেই সুবাদেই ঐ গ্রামের ধর্মরাজের পুজো দেখার সুযোগ হয়েছিল।

মূর্তি কূর্মের। বাহন-সাদা ঘোড়া। জনসাধারণের পূজার পর দুটি পালকিতে সারা গ্রাম এবং আশেপাশের গ্রামে ঘোরানো হয়। কিন্তু কূর্ম মূর্তি যেহেতু গ্রামের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয় না, তাই প্রতীকি কালাচাঁদকে পালকি করে অন্যান্য গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়। নিয়ম হল, যেখানে যেখানে কালাচাঁদের পালকি বাহকরা গ্রামের বাইরে পালকি নামান, সেখানে সেই পালকিকে আটকানো হয়। সেই সব গ্রামের লোকেরা নানারকম প্রশ্ন করেন। এ যেন সেই আদিকালের অশ্বমেধ যজ্ঞের ঘোড়া আটকানো। তখন যুদ্ধ হত, যুদ্ধে পরাস্ত করতে পারলে ঘোড়া মুক্তি পেত। এখানে হয় প্রশ্নোত্তরের খেলা। যারা দেবতার পালকিকে আটকে দেন তারা প্রশ্ন করেন। আর সন্ন্যাসীরা, যারা সঙ্গে থাকেন তাদের এর উত্তর দিতে হয়। গ্রাম্য জীবনের এও এক আনন্দের উৎস। প্রথাগতভাবে সেগুলি যে খুব উচ্চমানের, তা হয়ত নয়। কিন্তু মন্দ লাগে না। গ্রাম্য জীবন, পুরাণ, ইতিহাস, মহাকাব্য অনেক কিছু মিশে আছে এগুলির সঙ্গে। ধর্মরাজের পূজার অনুষ্ঠানের অঙ্গ হিসাবে গ্রামের মানুষের গীত কয়েকটি প্রশ্নোত্তর এখানে উল্লেখ করা যেতেই পারে।

প্রশ্ন—

ফুল সপাটে খেলিরে ভাই ফুলের কর নাম
কোন ফুলেতে তুষ্ট তোমাদের ভোলা মহেশ্বর
কোন ফুলেতে তুষ্ট তোমাদের কৃষ্ণ বলরাম
কোন ফুলেতে তুষ্ট তোমাদের ধর্ম নিরঞ্জন

উত্তর—

ফুল সপাটে খেলি আমরা ফুলের করি নাম
ধুতরো ফুলে তুষ্ট মহেশ্বর
আর কদম ফুলে তুষ্ট কৃষ্ণ বলরাম
আর আকন্দ ফুলে তুষ্ট ধর্ম নিরঞ্জন

প্রশ্ন---

ঢাকি ভাই ঢাক বাজাও ঘন ঘন নাড়ো মাথা
সত্যি করে বলতো ভাই
ঢাকের জন্ম কোথা?
যদি না বলিতে পারো ঢাক রাখো হেথা
সকলে মিলে চলে যাও নিজ নিজ স্থানে

উত্তর---

নমঃ নমঃ নমঃ চন্ডী নম নারায়ণ
অযোধ্যাতে জন্মেছিলেন রাম নারায়ণ
পিতৃসত্য পালনের জন্য
গেলেন পঞ্চবটী বনে
পঞ্চবটী বনে সীতায় ধরিল রাবণে
সীতা অণ্বেষণে যখন পবন নন্দন
অশোক বনেতে পবন আম্রবৃক্ষে চড়ে
সেই আম্র খেয়ে পবন পৃথিবীতে ফেলে
সেথায় হইল আম্রগাছ পরে কামারে কাটিল
ছুতারে গড়িল ঢাক নয়টি লোহারি
রুইদাস ছাইল ঢাক হইল হইল শুদ্ধ
বাজাও রে ঢাকি ভাই মনের আনন্দিত।।

প্রশ্ন---

ঢাক বাজে ঢোল বাজে আর বাজে কাঁসি
অকস্মাৎ পথমধ্যে এক সন্ন্যাসী ত্যজিল পরাণি
অশৌচ হইল দেখো সন্ন্যাসী ভকতা
আগে মরার জীবদাস পরে অন্যকথা

উত্তর---

শিব শিব বলি ভকতা ডাকিতে লাগিল
কৈলাসেতে মহাদেবের আসন টলিল
আইলেন মহাদেব পবনে করি ভর
ভকতা একজন পড়ে আছে পথের উপর
অমৃত কুম্ভের জল ছড়াইল মড়ায়
মড়া জীবিত হইল দেখো বিদ্যমান
গাজন সহিত হইল এখন শুদ্ধমান।

আপাততঃ এই কয়খানি প্রশ্নোত্তর দেওয়া গেল। একটা কথা অনায়াসেই বলা যায়, এই গান কিংবা প্রশ্ন-উত্তর যাই বলি না কেন, এগুলি মিশ্র আকার ধারণ করেছে। ভাষার মিশ্রণ, শব্দের মিশ্রণ, সাধু ও চলিতের প্রয়োগ এমন কি ছড়াগুলিতে ঠিকমত বাক্য ব্যবহারও কোথাও কোথাও অসংলগ্ন...কিন্তু একটি গ্রাম্য দেবতার পূজা উপলক্ষে প্রাচীন একটি ধারণার আমরা সম্মুখীন হতে পারি যেখানে অনায়াসেই বলা যায় এই পূজার গান বা ছড়াগুলিতে প্রাচীন যুগের পাশাপাশি আশ্চর্যরকমভাবে আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। আধুনিকতার ছোঁয়া আছে তাদের মন্ত্রগুলিতেও। আমাদের আলোচ্য বিষয়ও সেটিই। কিভাবে সংষ্কৃত মন্ত্রের সঙ্গে একেবারে ঘরোয়া কথাবার্তা মিশে এই দেবতার পূজায় মন্ত্রপাঠ করা হয়, না দেখলে বা শুনলে তা বিশ্বাস করা করা যায় না। আরো অবাক করা ঘটনা, অন্ত্যজ জাতি, নিম্নবর্গ মানুষগুলির ব্যবহৃত যে ছড়া আমরা এখানে পাই, তাতেও আছে রামায়ণের উল্লেখ। রামায়ণ যে কিভাবে সমগ্র জাতিকে প্রভাবিত করেছে,এও তার একটি বড় প্রমাণ। আপামর ভারতবাসী রামায়ণে মুগ্ধ।

কিন্তু যাইই ঘটুক না কেন, অভাব হয় না, বিশ্বাসের,ভক্তির আর উৎসবের আনন্দের।

একটা কথা মনে রাখা দরকার, এই পূজা ছড়িয়ে আছে অন্ত্যজ জাতিগুলির মধ্যে এবং এই পূজার অধিকারীও তারাই। সুহারি গ্রামের যিনি পুরোহিত, তাঁর নাম নন্দ পন্ডিত। জাতিতে নমঃশূদ্র। তিনিই নিত্যসেবার অধিকারী। পূজা করার জন্য পন্ডিত উপাধি পেয়েছেন। তাঁর কাছে গল্প যা শুনেছি, এ গল্প চলে আসছে বহু বছর ধরে আরো আরো অনেক দেবতার পূজার কাহিনিতে। এখানেও সেই এক গল্প---এক বাগদী মেয়ে পুকুরে চান করতে গিয়ে গুগুলি ভাঙ্গার সময়ে পায়ে ঠেকে এক পাথর। যা নিয়ে আসা হয় এবং সেটিকে পুজো করা হয়। সেই থেকে চলে আসছে এই পূজা।

সুহারি গ্রামের নন্দ পণ্ডিত এই পূজার নিত্যসেবার অধিকারী। তিনি সেবাইতও বটে। সেবাইতকে গুরুকরণ, দেহশুদ্ধির জন্য কুলগুরুর কাছে গুরুকরণ করতে হয় বলে জানিয়েছেন। তা নইলে সেবাইত হওয়া যায় না। যেহেতু কচ্ছপ বা কূর্ম দেবতার রূপ, তাই কচ্ছপ, মুরগী (বলি দেওয়া হয়)র মাংস খাওয়া যায় না পূজার কদিন।

পূজাপদ্ধতি এবং তার মন্ত্রগুলি ঠিক কেমন? জেনে নেওয়া যাক...

সকালে মন্দির পরিষ্কার করা হয়। স্নান করে মন্দিরে শুদ্ধ কাপড় ( পাটের অথবা তসরের, গ্রাম্য কোথায় ছালের কাপড়) পরে মন্দিরে দেবতাকে ঘুম থেকে তোলা হয়( শয়ান থেকে)। সেটি করারা জন্য আগে দেহশুদ্ধি। তার মন্ত্র শুধু একবার ‘ নম বিষ্ণু,নম বিষ্ণু’ই যথেষ্ট।

দেহশুদ্ধির পর জাগরণ। তার মন্ত্র---

'যোগনিদ্রা করুন এবার ভঙ্গ, শিব করছে দেখুন রঙ্গ
হরিহর আপনার চরণে বাহন সহিত নিদ্রা যাচ্ছে

নিদ্রা যাচ্ছেন সব দেবদেবীরা
প্রণাম জানাই কেমনে?

উঠুন সব দেবদেবীরা এবার...'

এরপর সিংহাসন থেকে পুরনো বাসী পুষ্প সব সরিয়ে ফেলে দেওয়া হয়। তারপর সিঁদুর মাখানো হয় মূর্তিকে। সিঁদুর মাখানো হয়ে গেলে গঙ্গাজল দিয়ে স্নান করানো হয়। প্রথমে পুষ্পশুদ্ধি---

'নম পুষ্পে নম পুষ্পে মহাপুষ্পে
সপুষ্পে পুষ্পসম্ভবে
পুষ্পচৈব কীটনাশকে, কীট নাশ করলেন...

এরপর স্নানের মন্ত্র---

'নমঃ গঙ্গা চ যমুনে চৈব গোদাবরী সিন্ধু সর্ব দেব নর্মদা
জমতোস্মনিন সন্নিধং কুরু

ঠাকুর এবার চান করেছেন
ঠাকুর চান করলেন...নম ধর্মরাজ ঠাকুর কালু রায় নমঃ'

এরপর ঠাকুরকে গামছায় মোছানো হবে। মুছিয়ে চন্দনের টিকা পরানো হবে। টিকা পরানোর মন্ত্র আছে---

'নম টিকায়, টীকার ফোঁটা রূপার ভাঁড়
জয়যাত্রী মালাকার
সব সন্ন্যাসীরা শুনুন শাত্রের বচন কি বলেছেন

চতুর্বেদে গাইলেন রমাই পণ্ডিত

কি বলেছেন নম নমঃ

সখা পরন্তায় টিকার ফোঁটা পরিলেন কালু রায়

তিনি দেবতায় নমঃ।'

এরপর আছে তুলসীপাতা দেবার মন্ত্র—

'নমঃ তুলস্ববিতরং মাসি মাসি
সদাতাং কেশবপ্রিয়া
কেশবার্থে তৃণমি ত্বং বরদাভব শোভনে

ঠাকুর মালাটিকা পরিছেন, দেখো সবাই। কালুরায় সচন্দন পুষ্প পরিলেন।
ওঁ সন্নিধাং কুরু।

সচন্দন ধর্মরাজ কালু রায় নমঃ। এইবারে দেবতা সিংহাসনে চড়িবেন। ও নমঃ সচন্দন দেবতায় নমঃ। কালু রায় দেবতায় নমঃ।'

এরপর ঠাকুরকে থালা থেকে তুলে সিংহাসনে রাখা হয়। রাখার আগে ফুল দিয়ে সিংহাসন সাজান হয়। পাশে কালাচাঁদ, মহাদেব, দুর্গা ইত্যদিও থাকেন। এরপর নৈবেদ্য সাজিয়ে ধূপ-ধুনো দিয়ে পূজো শুরু। পুজোর মন্ত্র (হাতে আতপচাল নিয়ে)......

'নমঃ কর্তব্য অস্মিন গণপত্রাদি সর্বদেবতা, দেবী গণের পূজা পূর্বকো কালু রায়ের পূজা কর্বানি। ওঁ পূজা করিষ্যামি। নমঃ পূণ্যাহং...নমঃ পূণ্যাহং... নমঃ পূণ্যাহং
নমঃ পূণ্যাহং স্বস্তি স্বস্তি স্বস্তি
নমঃ পূণ্যাহং ঋদ্ধিং ভবন্তি ধি ভবন্তু ভবন্তু...'

উপরোক্ত মন্ত্রগুলি যদি আমরা পড়ি, তাহলে দেখতে পাবো কিভাবে সংষ্কৃত মন্ত্রের সঙ্গে সাধারণ কথোপকথন, দৈনন্দিন যাপনের কথাবার্তা,স্বগতোক্তির মত ব্যবহৃত হয়েছে । সবকিছু মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে পূজার মন্ত্রে।

দুটি কথা মনে হয় এখানে। প্রথমতঃ, নিম্নবর্গ পরিবারের মানুষগুলি দেবতার পূজা,পৌরহিত্য ইত্যাদি থেকে দূরে ছিল বহুদিন, বহুযুগ ধরে। ব্রাহ্মণ্য সংষ্কৃতির চাপে সমাজে তাদের নিজেদের অস্তিত্ব একরকম ঢাকা ছিল। যখন তারা সেই আস্তরণ সরিয়ে সেই অধিকার আবার ফিরে পেতে শুরু করল, ব্রাহ্মণ্য পূজার রীতিগুলিকে নিজেদের করায়ত্ত করার চেষ্টা করল। কিংবা বলা ভালো, এই রীতিগুলির প্রতি তাদেরও লোভ জন্মাল। কিন্তু দীর্ঘদিনের অশিক্ষা, ভাষাজ্ঞানের অভাব ইত্যাদি নানাকারণে তা রপ্ত করতে পারল না। ফলও হল মারাত্মক! এগুলি শুনতে, পড়তে আনন্দদায়ক মনে হলেও অজস্র ভুলভ্রান্তিতে ভরা, অনুকরণের অক্ষম প্রচেষ্টা। ভাষা এবং উচ্চারণ দুয়েরই ভুল। মাঝে মাঝেই মন্ত্র ভুলেগিয়ে দৈনন্দিন যাপনের কথা কখনও বা স্বগতোক্তির মত মন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। আবার কোথাও কোথাও জনগনকে বোঝানোর জন্য কথ্যভাষার ব্যবহারও করতে হয়েছে পূজার ক্রম ও রীতিগুলি বোঝানোর জন্য। এর পরিণাম হল এই মন্ত্রগুলি।

দ্বিতীয় যে কথাটি মাঝে মাঝে মনে হয় সেটি হল-- এই অন্ত্যজ, নিম্নবর্গ মানুষগুলি যার মধ্যে মিশে আছে কিছু জনগোষ্ঠী সমাজের মানুষও যাদের আমরা বলি আদিম অধিবাসী, হয়তো এই পূজাগুলি একদিন ছিল তাদেরই অধিকারে। বহুযুগ পরে তাদের ফিরে পেয়ে আর মনে করতে পারেন না সেই মন্ত্রগুলিকে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ভুলে থাকা সেই অতীতকে মনে করতে পারে না। কারণ ঘটে গেছে অনেক সংযুক্তি, অনেক বিযুক্তি। ফলে তাদের বোঝানো জন্য যা স্মরণে আসে, সেগুলির সঙ্গে তাই জোড়াতালি দিয়ে, গোঁজামিল দিয়ে নিজেদের উন্নত, উচ্চ পর্যায়ে উঠবার অভিপ্রায়। কে বলে দেবে কোনটা সত্য!

কিন্তু পূজার মন্ত্র যেমনই হোক, ঠিক অথবা ভুলে ভরা, মানুষগুলির বিশ্বাস, ভালবাসা আর ভক্তির কোন অভাব ঘটে না তাতে। খোলামেলা অন্তরে তারা আরাধনা করে দেবতার, আনন্দে মেতে ওঠে, আনন্দ ছড়িয়ে দেয়।
সুহারির কালু রায়কে আমারও প্রণাম...।

0 comments:

1

প্রবন্ধ - ধ্রুবজ্যোতি চক্রবর্তী

Posted in

প্রবন্ধ


কমলাকান্ত উবাচ – গব্যশক্তি 
ধ্রুবজ্যোতি চক্রবর্তী


কমলাকান্তর সাথে মধ্যরাতে আমার আলাপ-আলোচনা’র বিষয় নিয়ে পরে অনেক চিন্তা-ভাবনা করে দেখেছি যে এই পুরো আলোচনার পরিচালনটা কমলাকান্ত’র হাতেই থাকে। 

মাঝে মধ্যে আমার প্রশ্নের উত্তর সে দেয় বটে তবে সেটা আলোচনাটা এগিয়ে নিয়ে যাবার খাতিরেই, এর মধ্যে আমার তরফ থেকে কোনো বিশেষ উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ ছিল না। তারপর ধীরে ধীরে আমি নিজেকে দুজনের কথপোকথন থেকে আস্তে আস্তে আরও সরিয়ে নিয়ে তার কথা বলার সময়টা বাড়িয়ে দেবার প্রচেষ্টাটা চালিয়ে যেতে থাকি। 

আমার এই প্রচেষ্টার ফলে কমলাকান্ত আমার কাছে নিজেকে উজাড় করে দিতে পিছপা হয় না। বর্তমান কালে তার সমস্ত বক্তব্যের এরকম প্রায় নির্বাক মনোযোগী শ্রোতা খুঁজে পাওয়া মুশকিল। সেটা সে জানে বলেই আমার কাছে কমলাকান্ত খুব নিশ্চিন্ত অবস্থায় থাকে বলে আমার মনেহয়। আর তার ফলে কমলাকান্তের স্মৃতির অফুরন্ত ভান্ডার থেকে আমি একের পর এক আনমোল রতনের সন্ধান পেয়ে চলেছি। 

তবে যেটা সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা সেটা হচ্ছে কমলাকান্তের ধারাবাহিকতা। তাকে নিয়ম মতো কোনো বাঁধাধরা ছকে বেঁধে রাখা খুবই মুশকিল। 

তাই আমার তরফ থেকে কমলাকান্তের ব্যাপারে কোনোরকম আগাম ভবিষ্যৎবাণী করা খুবই মুশকিল এবং আমি তা কখনই চেষ্টা করে দেখতে চাই না। 

পুজোর আগে আশা করেছিলাম একবার অন্তত কমলাকান্তের দেখা পাব। কিন্তু সে আশায় ছাই ঢেলে দিয়েছিল কমলাকান্ত। 

সেদিন বৈকালিক ভ্রমণ সাঙ্গ করে বাড়ি ফেরার সময় নজর পড়ল আমার লেটার বক্সের দিকে। একটা হলুদ রঙের খাম উঁকি দিচ্ছে দেখলাম। এযুগে কে আবার খামে চিঠি লিখেছে, এই কৌতুহল নিয়ে লেটার বক্স থেকে চিঠিটা উদ্ধার করে বাড়িতে ঢুকলাম। 

বাইরের ঘরের সোফাতে বসে হাতে ধরা হলুদ খামটার দিকে নজর দিলাম। ঠিক পরিচিত সাদামাটা খাম নয়। হ্লুদ তুলোট কাগজে তৈরি খাম। আমার বাড়ির ঠিকানাটা ভিক্টোরিয়ান যুগের ইংরেজি স্টাইলে লেখা। প্রেরকের নাম লেখা আছে দেখলাম – শ্রীকমলাকান্ত, নিবাস – নসীধাম। 

প্রেরকের নাম ঠিকানাটা দেখেই শিড়দাঁড়া দিয়ে একটা হিমবাহের ধারা বয়ে গেল। কমলাকান্তের চিঠি! মুহূর্তকাল আমার এক্কেবারে কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা!!

আড়চোখে টিভিতে মগ্নমৈণাক গিন্নীর দিকে তাকিয়ে বুঝলাম উনি আমার এই সহসা শারিরীক এবং মানসিক পরিবর্তণ লক্ষ্য করেননি। তাঁর প্রিয় সিরিয়াল কন্যা তখন সালঙ্কারা, মাস্কারারূপ ধারন করে সুসজ্জিতা অবস্থায় নেকি-নেকি কান্নায় স্ক্রীন জুড়ে উপস্থিত। বুঝলাম বেশ একটা রগরগে সেন্টিমেন্টের একটা হড়হড়ে সিন চলছে। 

ভগবান মঙ্গলময়। তাই আমি গিন্নীর রাডারের বাইরে আছি আর তাই তৎকালিক কোনো বিপদের আশঙ্কা নেই। তাঁর কাছ থেকে “কার চিঠি?”-এই আপাত নিরীহ প্রশ্নটা আমাকে বাধ্য করত ঝুড়ি ঝড়ি মিথ্যের ডালি সাজিয়ে বসবার জন্য। 

যাইহোক মনের উত্তেজনা মনেই চেপে রেখে ঠিক করলাম যে এখন নয়, যথাকালে রাতের খাওয়া-দাওয়া সম্পন্ন করে আমার লেখার টেবিলে গুছিয়ে বসে কমলাকান্তের চিঠিটা মনযোগ সহকারে পড়তে হবে। 

তারপর আলোকের গতিতে সেই রাতের নিজের প্রয়োজনীয় কর্মকাণ্ড  সম্পন্ন  করে আজ একটু তাড়াতাড়িই লেখার টেবিলে এসে বসলাম। ঠাকুর্দাদার ঘড়িতে দেখলাম কমলাকান্ত’র আগমন কালের বেশ দেরি আছে। উত্তেজনায় নিজের হৃদয়ের শব্দ নিজের কানেই যেন শুনতে পাচ্ছিলাম। 

আর বেশী চিন্তা ভাবনা না করে সন্তর্পনে হলুদ রঙের তুলোট কাগজের খামটা আমার লেখার টেবিলের দেরাজ থেকে বের করলাম। তারপর কাগজ কাটার ছুরিটা দিয়ে থেকে খুব সাবধানে খামের কোনাটা একটু ছিঁড়ে নিয়ে ছুরিটা দিয়ে খামটা খুলে ফেললাম। 

খোলা খামের ভেতর থেকে টেনে বের করে আনলাম হাতে তৈরি কাগজে জ্বলজ্বলে মুক্তোর মতো হস্তাক্ষরে লেখা একটা চিঠি। নিচের সাক্ষরের জায়গায় দেখলাম কমলাকান্তের দস্তখত। 

এক লহমায় মনে হলো যেন সারা পৃথিবী আমার হাতের মুঠোয়।

একটু সময় নিয়ে মনটাকে একটু শান্ত করে আমার প্রিয় রাত্রিকালীন পাণীয়তে একটা লম্বা চুমক সহযোগে চিঠিটা পড়া শুরু করলামঃ


“পূজ্যপাদ শ্রীযুক্ত বাবু লেখক মহাশয় 

শ্রীচরণকমলেষু, 

(কমলাকান্ত আমাকে “লেখক” বলে সম্বোধন করেছে দেখে যারপরনাই আহ্লাদিত হলাম) 


মহাশয়! আপনাকে পত্র লিখিব কি – লিখিবার অনেক অনেক শত্রু। আমি এখন যে কুঁড়ে ঘরে বাস করি তাহাতে কাল রাত্রে কেহ বা কাহারা আসিয়া তাহার বিস্তর ক্ষতি সাধন করিয়া গিয়াছে। 

গত সন্ধ্যায় আমার বাড়ির দাওয়ায় প্রসন্ন গোয়ালিনী তাহার মঙ্গলা গাভীকে খোঁটা বাঁধিয়া রাখিয়া পাগলা চন্ডী নদী তীরবর্তী তাহার গ্রামে অসুস্থা মায়ের পরিদর্শনে যাইবার প্রাক্কালে বলিয়া গিয়াছিল,”ঠাকুর, একরাত মঙ্গলার খেয়াল রাখিও। আমি তাহার রাতের খোল বিচালির ব্যবস্থা করিয়া যাইতেছি। তুমি কেবল খেয়াল রাখিও। আমি কাল সকালেই ফিরিয়া আসিব।“

সকালে প্রাতঃকৃত্য যাইবার প্রাক্কালে দেখি মঙ্গলা নাই আর আমার গৃহের দালানটি কেহ বা কাহারা যেন কোদাল চালাইয়া এমন ক্ষতি করিয়া গিয়াছে যে গৃহের দরোজা খুলিয়া বাহিরে আসিতে পদযুগল দাওয়াতে রাখিতে গিয়া আমি ধরণী চুম্বন করিয়াছি। 

আমার অপরাধ আমার জানা নাই। 

অপরাধের বিরুদ্ধে নালিশ জানাইতে কোতোয়ালিতে হাজির হইলে কোতোয়াল আমার নালিশ লিপিবদ্ধ করেন নাই। তাহার কারণ হিসেবে তিনি আমায় জানাইয়াছেন যে বর্তমানে তাঁহার সান্ত্রী, পেয়াদা সকল রাজনৈতিক নেতাদের জিলা সফরে ব্যস্ত আছে। আমি যেন কয়েকদিবস পরে তাঁহার শরণাপন্ন হই।

আমি জীবনে কখনও এই প্রকার আশ্চর্য হই নাই।

কি করিব ভাবিতে ভাবিতে গৃহে প্রত্যাবর্তন করিয়া ভগ্নদূতের ন্যায় মস্তকে হস্ত রাখিয়া নিজ ভাগ্যকে অভিসম্পাত করিতে ছিলাম। কিছুক্ষন পর প্রসন্ন আসিয়া উপস্থিত হইল। তাহাকে আমার অবস্থার কথা জানাইলাম। 

প্রসন্ন কপালে করাঘাত রোদন করিতে করিতে মঙ্গলার সন্ধানে বাহির হইয়া গেল। প্রসন্ন’র লাগি আমার প্রাণ কাঁদিয়া উঠিল। কিন্তু কি করিব! আমি গরীব ব্রাহ্মণ, আমার কথা কেহ শুনিবে না। আমার নসীবাবুও নাই যে তাঁহার শরণ লইব। অতএব, ভগ্নস্তুপ সদৃশ দাওয়ায় বসিয়া আকাশ পাতাল ভাবিতে লাগিলাম। 

প্রসন্ন’র সঙ্গে আমার একটু প্রণয় ছিল বটে, কিন্তু সে প্রণয়টা গব্যরসাত্মক। এই কারণে আমি নিজের জন্য যত না দুঃখিত, প্রসন্নের জন্য আমি গভীর দুঃখিত। তবে প্রসন্নের প্রতি আমার যেরূপ অনুরাগ, তাহার মঙ্গলা নামে গাইয়ের প্রতিও তদ্রূপ। একজন ক্ষীর সর, নবনীতের আকর, দ্বিতীয়, তাহার দানকর্ত্রী। গঙ্গা বিষ্ণুপদ হইতে জন্মগ্রহণ করিয়াছেন বটে, কিন্তু ভগীরথ তাঁহাকে আনিয়াছেন,; মঙ্গলা আমার বিষ্ণুপদ; প্রসন্ন আমার ভগীরথ; আমি দু-জনকেই সমান ভালবাসি। 

কিন্তু মন্দলোকের ধারণা যে আমি প্রসন্ন’র প্রতি আসক্ত। 

এই সকল মন প্রাণের কথা লেখক তোমায় জানাইতেছি এই আশা করিয়া যে তুমি খোসনবীসের ন্যায় ইহা লইয়া ব্যবসা ফাঁদিবে না। আজকাল দিনকাল ভাল নয়। প্রসন্ন’র প্রতি আমার হৃদয় দৌর্বল্যতা অকারণ মানুষের রসনাকে তৃপ্ত করিতে পারে। ইহার পর হয়ত দেখিতে পাইতে পার যে আমি আদালতের কাঠগড়ায় গরু চুরি মামলার সাক্ষীরূপে নহে “আম্মো” মামলায় আসামী রূপে বিরাজমান।

তৎকালে “আম্মো” ঘটনা যে ঘটে নাই তাহা বলিলে ভুল হইবে কিন্তু তাহা আদালত পর্যন্ত গড়াইবার পূর্বেই বলবান ব্যক্তিসকল তাহার কন্ঠ রোধ করিয়া দিত। তাহার ফলে সমাজের বাহুবলীদের প্রবল প্রতাপে অসহায় নারীদিগের ক্রন্দন চাপা পড়িয়া যাইত। সেইকালে সমাজের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিই এই সকল আম্মো কেসে যে নাসিকা অবধি নিমজ্জিত ছিল তাহা বলিলে মোটেই অত্যুক্তি করা হইবে না বলিয়াই আমার ধারনা। 

প্রসন্ন আর তাহার গাভী মঙ্গলার প্রতি যে আমার মাত্রাতিরিক্ত প্রীতি তাহা আমার এলাকার কর্তাব্যক্তিগনের চক্ষুশূলের কারন হিসাবে দেখা দিতে লাগিল। শুকনো কথায় চিড়া ভিজিতেছে না দেখিয়া তাহার আমায় শিক্ষা দিবার নামে মঙ্গলাকে লইয়া গিয়াছে আর আমার বাসস্থানটিতে লাঙ্গল চালাইয়া দিয়া গিয়াছে বলিয়া আমার বোধ হইল। 

বর্তমানে কিছু করনীয় নাই দেখিয়া শেষমেস কোতোয়ালিতে নালিশ লিখাইবার জন্য অপেক্ষা করিতে মনস্থ করিলাম বটে।

দিনের প্রায় দ্বিপ্রহর কালে সূর্যদেব মস্তকের উপর আরোহণ করিলে এক পাত্র জল আর এক থালা মড়ি-মুরকি লইয়া ক্ষুৎপিপাসা নিবারণার্থে ভগ্ন দাওয়ায় বসিতে না বসিতে ভগ্নদূতের ন্যায় প্রসন্ন ঝড়ের বেগে আসিয়া উপস্থিত হইল। 

অগ্নিপূর্ণ দৃষ্টিতে সে আমাকে নিরীক্ষণ করিয়া কহিল,”নির্লজ্জ পেটুক ব্রাহ্মণ! যে মঙ্গলার দুধ হইতে নির্মিত দই, ননী, ঘী সেবন করিয়া এই নধর কান্তি দেহটি তৈয়ার করিয়াছ, সেই মঙ্গলার উদ্ধার কার্য সম্পন্ন না করিয়া তুমি কিনা ঘরে নিশ্চিন্তে বসিয়া আহার করিতেছ! তুমি প্রকৃতই অকৃতজ্ঞ বটে।“ 

এই সকল অনৈতিক কথা বলিয়া প্রসন্ন কপালে করাঘাত করিয়া তাতস্বরে ক্রন্দন করিতে লাগিল। 

আমি পড়িলাম মহা মুশকিলে।

হাঁ, আমি মঙ্গলা নামক গাভীর দুধ এবং সেই দুধ দ্বারা নির্মিত দই, ননী, ছানা, ক্ষীর ইত্যাদির স্বাদ হামেশাই লইয়া থাকি বটে তবে গাভী তো আমার নয়। আবার প্রসন্ন তাহার পরিচর্যা করে বলিয়া গাভী তাহার হইবে এমন কোন কথা নাই। তাহার পরিচর্যা প্রসন্ন নিজের স্বার্থের জন্যই করিয়া থাকে। সে গাভীর দুধ এবং দুগ্ধজাত দ্রব্য বিক্রয় করিয়া পয়সা উপার্জন করিয়া থাকে। অতএব মঙ্গলা এবং প্রসন্নের ভিতর একটি লেনা-দেনার সম্পর্ক আছে যাহা একে অন্যের পরিপূরক রূপে বিবেচিত হইবে। এই বিবেচনায় কেহই কাহারো সম্পত্তি বলিয়া নির্দেশিত হইতে পারে না। 

অতএব মঙ্গলা কাহার?

ইতিপূর্বে গরু চুরি মামলায় হাকিম সাহেবের সামনে ঈশ্বরকে প্রত্যক্ষ জানিয়া হলফনামা পাঠ করিয়া বলিয়াছিলাম যে ব্যক্তি দুধ পান করিয়া থাকে, গরু তাহার বলিয়া বিবেচিত হইবে। কিন্তু এখন দেখিতেছি তাহা পূর্ণ সত্য নহে। কারণ হিসাবে বলা যাইতে পারে যে সুরাসেবী ব্যক্তিগণ সুরা সেবন করেন বলিয়া যে স্কচ প্রস্তুত কারক কোম্পানীর উপর তাঁহাদের মালিকানা বর্তাইবে তাহা হইতে পারে না। 

এইসকল চিন্তায় আর ভুখা পেটের জ্বালায় মাথা গরম হইয়া উঠিল। 

প্রসন্নকে কহিলাম যে যদ্যপি “গরু কার?” এই প্রশ্নের তর্কাতীতভাবে মিমাংসা না হইতেছে তদ্যপি মঙ্গলার সন্ধান করিয়া কোনো লাভ নাই। কারন মঙ্গলার অন্বষনে বাহির হইয়া যদি প্রমাণিত হয় যে মঙ্গলার আসল মালিকই তাহাকে লইয়া গিয়াছে তবে সেই ব্যাপারে আমাদের তো কোনো কথা থাকে না। 

ইহা শুনিয়া প্রসন্ন পুনরায় অগ্নিমূর্তি ধারণ করিয়া কহিল,”নষ্টবুদ্ধি তরল মস্তিস্ক ব্রাহ্মণ! তোমার জাহান্নামে যাওয়া উচিৎ।“

অতএব আমি পুনরায় কোতোয়ালিতে হাজির হইয়া কোতোয়ালকে আমার সমস্যার কথা জানাইলাম। 

কোতোয়াল সাহেব হাতের তালুতে গুঠকা লইয়া তাহার গুণ বিচারে নিমগ্ন ছিলেন। সারা দেশে গুঠকা সেবন, বিক্রয় এবং সঞ্চয় নিষিদ্ধ হইলেও কোতোয়ালিতে তাহার অবাধ ব্যবহার দেখিলাম। 

গুঠকার প্রতি নিমগ্ন অবস্থায় কোতোয়াল মহাশয় প্রশ্ন করিলেন,”কি সমস্যা?”

“আজ্ঞে, গরু কার?”কিন্তু কিন্তু করিয়া আমার প্রশ্নটি পেশ করিলাম। 

একটুও অবাক না হইয়া কোতোয়াল সাহেব বলিলেন,এক্ষণে তাঁহার অবস্থান কোথায়?”

আমি আমতা আমতা করিয়া কহিলাম,বর্তমানে নিখোঁজ।”

“নিখোঁজ হইবার পূর্বে তিনি কাহার জিম্মায় ছিলেন?”

“আঁজ্ঞে, এই অধ্ম ব্রাহ্মণের।“

“তা তুমি কি সেইকালে তাঁহার অন্নজল সংস্থানের দায়িত্বে ছিলে?”

“না, আঁজ্ঞে মানে ঠিক তা নয়”- এই বলিয়া আমি কোতোয়াল সাহেবকে যথাসম্ভব বিস্তারিত ভাবে প্রসন্ন-মঙ্গলা কাহিনী বর্ণণা করিলাম। 

কোতোয়াল সাহেব দক্ষিণ হস্তের তালুবন্দি গুটখা সকল তাঁর মুখ গহ্বরে চালান করিয়া চক্ষু মুদিয়া অমৃতের স্বাদ আহরণ করিবার কালে প্রায় দুই মিনিটকাল নীরবতা পালন করিবার পর চক্ষু খুলিয়া কহিলেন,”তোমার গৃহে যদি কোনো পারিবারিক সম্পর্কহীন স্ত্রীলোক কোন গাভীমাতাকে খোঁটাবন্দি করিয়া যায় এবং তাহার পরবর্তীকালে সেই গাভীমাতাকে কেহ মুক্তিদান করিয়া সঙ্গে লইয়া গেলে তাহার বিপরীতে কোনো ফৌজদারি মামলা রুজু করা নিরর্থক।“ 

আমি কহিলাম,”কিন্তু সেই স্ত্রীলোকটি যে এই গাভীটির লালন পালন তাহার জন্মকাল হইতে করিয়া আসিতেছে। অতএব গাভীটির মালিকানা তাহার উপরেই বর্তায়।“ 

আমার যুক্তি শুনিয়া কোতোয়াল সাহেব মুচকি হাসিলেন। কহিলেন,”শুন হে ব্রাহ্মণ, গাভী আমাদের দেশে সত্য যুগ হইতেই মাতৃরূপে পূজিতা। আমাদের শাস্ত্রে গাভী উচ্চস্থানে প্রতিষ্ঠিত এবং অন্যায়ের বিরূদ্ধাচারী। বিশ্বামিত্র মুনি যখন বাহুবলে স্বত্ত্বগুণী ঋষি বশিষ্ঠের আশ্রম হইতে কামধেনু অপহরণ করিবার মতলব করিয়াছিলেন, তখন সদাশিব বশিষ্ঠমুনি মাতা কামধেনুরই শরণাপন্ন হইলে কামধেনু হইতে শত সহস্র বীর যোদ্ধা উৎপন্ন হইয়া বিশ্বামিত্রের সৈন্যবাহিনীকে পগার পার করিয়া দেয়। অবশেষে বিশ্বামিত্রমুনি নিরুপায় হইয়া ঋষি বশিষ্ঠের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করিলে মামলার মীমাংসা হয়। অতএব গাভীমাতার শক্তিকে অস্বীকার করা কখনই উচিৎ নহে।“

এই পর্যন্ত বলিয়া কোতোয়াল সাহেব দম নেবার জন্য একটু অবকাশ সৃষ্টি করিলে আমি বলিয়া উঠি,”কিন্তু বর্তমান কালে গাভী তো দুগ্ধ, দধি, ক্ষীর, ননী ইত্যাদিই সৃষ্টি করিয়া থাকে, কমান্ডো বাহিনী সৃষ্টি করিয়াছে বলিয়া তো কখনও তো শুনি নাই।“

“আমাদের দেশের এইটাই তো সমস্যা। আমরা আত্মবিস্মৃত জাতি বলিয়া আজি পৃথিবী বিখ্যাত। আমাদের হৃত গৌরব পুন্রুত্থানের জন্যেই তো বর্তমানে দেশের রাজনীতির মঞ্চে গাভীমাতা আজি সদর্পে বিরাজমান। এতদিনে তিনি তাঁহার ভুলুন্ঠিত স্থান পুনরুদ্ধার করিয়া লইতে বদ্ধপরিকর হইয়াছেন।“ গাভীমাতা বিষয়ক আলোচনা কালে কোতোয়াল সাহেবের মুখ যেন সহস্র সূর্যের কিরণে আলোকিত হইয়া উঠিয়াছে। 

আমি দেখি আরে এতো ভ্যালা মজা। এখন আমি কি করি। একদিকে প্রগলভা প্রসন্ন গোয়ালিনী আর অপরদিকে গাভীমাতার সম্মান উদ্ধারকারী গুঠখা প্রিয় কোতোয়াল। এই দুই শক্তিশালী চরিত্রের মাঝে আমার প্রাণ তো ওষ্টাগতপ্রায়। কি করিয়া এই অকুস্থল হইতে ছাড়া পাই তাহাই ভাবিতেছি। কাজ নাই আমার আর মঙ্গলার মালিকানার ইতিহাস অবগত হইবার। আমি এখন এই উন্মাদ সদৃশ কোতোয়ালের হাত হইতে নিস্তার পাইবার রাস্তার সন্ধান পাইতে ইষ্টদেবতার নাম জপিতে লাগিলাম। 

কোতোয়াল সাহেবকে একটি নমস্কার করিয়া পালাইবার তাল করিতেই কোতোয়াল সাহেব আমার ঊর্ণি ধরিয়া এক হেঁচকা টানে আমাকে আবার আমার জায়গায় বসাইয়া দিলেন। আমার তখন ন যযৌ ন স্তথৌ অবস্থা। 

আমার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া কোতোয়াল সাহেব আবার শুরু করিলেন,”আপুনি যে প্রশ্ন লইয়া আসিয়াছিলেন তাহার উত্তর না লইয়া তো আপনার প্রস্থান উচিৎ হইবে না বলিয়া আমার মনে হয়। অতএব আলোচনাটায় আবার প্রত্যাবর্তন করা যাক। বর্তমানে দেশে রামরাজত্ব প্রতিষ্ঠা প্রকল্পে সর্বপ্রথমে গাভীমাতৃকার নায্য অধিকার সর্বাগ্রে সুপ্রতিষ্ঠিত করিতে হইবে। এবং সেই কার্যে সর্বপ্রথমে তাঁহার মালিকানা আইনের ব্যাপক সংস্কার করিতে হইবে। এই নব্য আইনের বলে সরকার দেশের সমস্ত গাভীকুলের অভিভাবক রূপে বিবেচিত হইবেন। তবে তাঁহার ভরন পোষনের দায়িত্ব দেশের জনগণের উপর অর্পিত থকিবে। জনগণ আপন খরচে দেশের সমস্ত গাভীকূলকে লালন পালন করিবেন। তবে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কর্মকান্ডে গাভীর প্রয়োজন হইলে যে কোনো সময়ে সরকার যে কোনো গাভী অধিগ্রহণ করিতে পারিবেন। অতএব, গাভী বাছুর বয়সে গাভীমাতার, যৌবনে ষণ্ডের, দুগ্ধদান কালে রাজনৈতিক নেতাদিগের এবং দুগ্ধদানে বিরত হইলে গরুপাচার মাফিয়াগোষ্ঠীর সম্পত্তি বলিয়া বিবেচিত হইবে। তবে এই সকল পর্যায়েই দেশের আপামর জনগন আপন আপন রৌপ্যমুদ্রা ব্যয় করিয়া সমস্ত গাভীকুলের উদরপূর্তি নামক এক অতি সামান্য কাজে জাতীয় সরকারকে সাহয্য করিবেন। তবে জনগণের সরকার মোটেই অবিবেচক নহেন। যে সকল দেশবাসী আনন্দের সহিত এই সরকারি কার্যে অংশ গ্রহন করিবেন তাঁহাদের জন্য আয়কর দপ্তর শীঘ্রই বিশেষ ছাড় ঘোষনা করিবেন। আর যে সকল জনগণ নিরানন্দের সহিত এই কার্যে লিপ্ত থাকিবেন তাঁহাদের তলিকা প্রস্তুত করিবার জন্য সমস্ত কোতোয়ালীকে নির্দেশ দেওয়া হইবে। এই প্রকল্প সর্বাঙ্গসুন্দর করিয়া তুলিবার জন্য বাছুরকালেই তাহাদের জন্য এবং তাহাদের ভরনপোষনের দায়িত্বে নিয়োজিত দেশবাসীর জন্য ডিজিটাল সামাজিক রক্ষণাবেক্ষণ পত্র বিতরণ করা হইবে।“

আমার কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা দেখিয়া কোতোয়াল সাহেব একটু বিরতি ঘোষণা করিয়া তাঁহার জলের গেলাসটি আমার দিকে এগিয়ে দিলেন। 

আমি এক নিঃশ্বাসে সেই জল গলাধঃকরন করিয়া একটু ধাতস্থ হইলে কোতোয়াল সাহেব আবার শুরু করিলেন,”এটি একটি বৃহৎ প্রকল্প। বর্তমান সরকার দ্বারা পরবর্তী সরকার গঠিত হইলে এই প্রকল্প আলোকের গতিবেগ পাইবে বলিয়া দেশের বহু বিদদ্ধ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারনা। এই কারনে উদাহরণ স্বরূপ প্রসন্ন গোয়ালিনীর গাভী মঙ্গলাকে লইয়া গাভী মুদ্দার এক রাজনৈতিক নেতা এলাকার ভোটদাতাদের ঘরে ঘরে ঘুরিয়া ফিরিতেছেন তাঁহার দলের হাইকমান্ডের নির্দেশে। অতএব মঙ্গলা এখন জাতীয় সম্পত্তি। ব্রাহ্মণ আশা করি তুমি তোমার “গরু কার?” প্রশ্নের উত্তর জলবৎ তরলং রূপে অবগত হইয়াছ। যাও, ঘরে প্রত্যাবর্তন করিয়া প্রসন্ন গোয়ালিনীকে দুশ্চিন্তা করিতে মানা কর। রাজনৈতিক প্রচার সম্পন্ন হইলেই সে সময় মতো মঙ্গলাকে ফেরত পাইবে। তাহার পর সে যেন অতি অবশ্যই মঙ্গলাকে যত্নআত্তি করিয়া পর্যাপ্ত ভোজন করাইয়া প্রস্তুত রাখে। কিছুদিনের মধ্যেই হাইকমাণ্ডের প্রতিনিধি এই অঞ্চলে আসিলে আবার মঙ্গলার প্রয়োজন হইবে।“

কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থাতেও আমি প্রশ্ন করিলাম,”আচ্ছা, বকনা বাছুর তো বড় হইয়া গাভী হইয়া দুগ্ধ প্রদান করিবে, কিন্তু এঁড়ে বাছুরগুলির ভবিষ্যৎ কি?”

কোতোয়াল সাহেব আমাকে পূর্ণদৃষ্টিতে দেখিয়া কহিলেন,”গুড কোশ্চেন। বর্তমানে এঁড়ে বাছুর গুলির সিংহ ভাগ সিংহ-ব্যাঘ্র এবং আরও সকল মাংশাসী প্রাণীদের খাদ্যরূপে বিবেচিত হয়। আর অবশিষ্ট এঁড়ে বাছুরসকল ষণ্ডরূপে কাশীর শহরের ন্যায় অপর সকল শহরের মন্দিরের অলিগলি এবং গ্রামগঞ্জ-শহরের বাজার অলোকিত করিয়া থাকে। তবে অতি শীঘ্রই সিংহ, ব্যাঘ্র এবং আর সকল মাংশাসী প্রাণীদের নিরামিষাশী প্রাণীতে পরিণত করিবার জন্য এক ব্যায়ামবীর মহারাজকে হিমালয়ের জরিবুটি সহযোগে এক বটিকা আবিস্কার করিবার গবেসনা কার্যে নিযুক্ত করা হইয়াছে। তবে মহারাজ এক সাংবাদিক সম্মেলনে বলিয়াছেন যে সিংহ-ব্যাঘ্র ইত্যাদি মাংশাসী প্রাণীদের নিরামিষভোজী করিতে শুধু আয়ুর্বেদিক বটিকার ওপর নির্ভর করিলেই চলিবে না, সেই সঙ্গে তাহাদের কিছু পাওয়ার যোগাও করাইতে হইবে।“

একটু দম লইয়া কোতোয়াল সাহেব আমার দিকে একবার ক্রুণাঘন দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া আবার তাঁহার বক্তৃতা শুরু করেন,”এই প্রকল্প সফল হইলে দেশের সমস্ত এঁড়ে বাছুর ষণ্ডরূপে আমাদের দেশের সর্বত্র বিচরন করিতে করিতে দেশের সমগ্র ষন্ডশক্তির অবিরাম প্রদর্শন করিয়া সমস্ত বিশ্বকে স্তম্ভিত করিয়া দিবে। আমাদের পড়শী দেশগুলি আমাদের ষণ্ডশক্তির প্রদর্শনে যারপরনাই ভীত সন্ত্রস্ত হইয়া আমাদের বশ্যতা স্বীকার করিয়া লইবে।“ 

কোতোয়ালের কবল হইতে নিস্তার পাইবার ইহাই সুবর্ণ সুযোগ বুঝিয়া আমি বলিয়া উঠি,”এই অতীব লোমহর্ষক সংবাদটি এই মূহুর্তে প্রসন্ন’র অবগত হওয়া অত্যন্ত জরুরি। তাহার মঙ্গলা এখন দেশের এক বৃহত্তম কর্মকাণ্ডে নিযুক্ত আছে। অতএব তাহার দুশ্চিন্তা করিবার কোন কারন নাই।“ 

এই বলিয়া আমি আর পশ্চাতে না তাকাইয়া একপ্রকার দৌড়াইয়া কোতোয়ালী ত্যাগ করিয়া গৃহাভিমুখী হইলাম। 

পথ চলিতে চলিতে হেঁটমুন্ড আমি ভাবিতে লাগিলাম “গরু কার?” প্রশ্নের উত্তর তো আমি তো অষ্টরম্ভা স্বরূপ অনেক কিছু বুঝিলাম, এক্ষণে প্রসন্নকে বুঝাইব কিরূপ! 

এই চিন্তায় গৃহে প্রত্যাবর্তন করিয়াই কাগজ আর কলমদানির সাহায্য লইয়া লেখক, তোমায় এই পত্রাঘাত। অতি সত্বর এই পত্রের উত্তরের আশা রাখি।

নমস্কারান্তে,

ভবদীয় 

শ্রীকমলাকান্ত চক্রবর্ত্তী 

1 comments:

0

ঝরনাতলার নির্জনে - শিবাংশু দে

Posted in

ঝরনাতলার নির্জনে

জোড়াসাঁকো জংশন ও জেনএক্স রকেটপ্যাড -৭
শিবাংশু দে


'... তখন এমনি করেই বাজবে বাঁশি এই নাটে' 


১৯২৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পঙ্কজকুমারের যখন বছর বাইশ বয়স, তখন কেউ তাঁকে গার্স্টিন প্লেসে রেডিও কোম্পানির দফতরে নিয়ে যান। বৃহত্তর জনতার কাছে পৌঁছোনোর জন্য ইন্ডিয়ান ব্রডকাস্টিং কোম্পানির এই মাধ্যমটিই ছিলো একমাত্র উপায়। যদিও পঙ্কজকুমারের নাড়াবাঁধা গুরু ছিলেন দুর্গাদাস বন্দোপাধ্যায়, কিন্তু দিনু ঠাকুরের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিলো। দিনু ঠাকুর ছিলেন সদাশিব প্রকৃতির মানুষ। কেউ ভালোবেসে রবিবাবুর গান শিখতে চাইলে তিনি সাগ্রহে এগিয়ে আসতেন। এইসূত্রেই পঙ্কজকুমারের সঙ্গে তাঁর একটা বিনিময় সম্পর্ক গড়ে উঠেছিলো। পঙ্কজকুমারের বিধিবদ্ধ সঙ্গীতশিক্ষা ছিলো অন্য গুরুর কাছে, কিন্তু দিনু ঠাকুর তাঁকে রবীন্দ্রসঙ্গীতের স্বরূপ ও সাধনার বিষয়ে দিকনির্দেশ করতেন। এই নতুন পাওয়া 'ভালোবাসার ধন'টি তরুণ পঙ্কজকুমারকে এমন আচ্ছন্ন করে রাখতো যে অন্য সব গান ছেড়ে তাঁর রেডিও স্টেশনের প্রথম অনুষ্ঠানে তিনি গাইলেন দু'টি রবীন্দ্রসঙ্গীত, ' এমনদিনে তারে বলা যায়' এবং 'একদা তুমি প্রিয়ে' । রেডিও কোম্পানির সঙ্গে তাঁর সুদীর্ঘ আটচল্লিশ বছরের সম্পর্ক এভাবেই তৈরি হলো।


১৯২৯ সালে কর্তৃপক্ষের অনুরোধে তিনি আরম্ভ করলেন পরবর্তীকালের প্রবাদপ্রতিম 'সঙ্গীত শিক্ষার আসর। বাংলাগানের প্রথম 'গণসঙ্গীতশিক্ষণ প্রকল্প'। এই 'গণসঙ্গীত' শব্দটি যেভাবে আজকাল একটি নির্দিষ্ট জঁরের গীতধারা হিসেবে ব্যবহার হয়, এটি তা নয়। এ ছিলো আমাদের দেশের জনমাধ্যমে প্রথম আপামর জনসাধারণকে শর্তবিহীন গান শেখানোর আয়োজন। যদিও এই আসরে সবরকম বাংলাগানই শেখানো হতো, কিন্তু সিংহভাগ ছিলো রবীন্দ্রসঙ্গীত। আমাদের শৈশবে দেখতুম, যদিও সময় তখন অনেক বদলে গেছে, সারা বাংলাদেশে রবিবারের সকালে সাধারণ গৃহলক্ষ্মী থেকে শুরু করে ছাত্রছাত্রী, চাকুরে কিম্বা প্রবীণ গুরুজনেরা নিয়ম করে এই অনুষ্ঠানটি শুনতেন । শুধু তাই নয়, কেউ গুনগুন করে বা উচ্চস্বরে পঙ্কজকুমারের সঙ্গে গানের মহলাও দিতেন। এই আয়োজনে যোগ দেবার একমাত্র শর্ত ছিলো যোগদানকারীকে বাংলা জানতে, বুঝতে হবে এবং গান'কে ভালোবাসতে হবে। আমরা প্রবাসী বাঙালিরা দেশের নানা প্রান্তে অনেক অবাংলাভাষীকেও এই অনুষ্ঠানটি নিয়মিত শুনতে দেখতুম। কারণ, ভাষা নির্বিশেষে, এক বিশেষ প্রজন্মের ভারতীয় শ্রোতাদের কাছে পঙ্কজকুমার একজন স্বীকৃত আইকন ছিলেন। এই অনুষ্ঠানটি হয়তো কোনও 'বড়ো' গায়কগায়িকা আমাদের দিতে পারেনি, কিন্তু রবীন্দ্রসঙ্গীতকে মূলস্রোতের মানুষজনের ধরাছোঁয়ার মধ্যে নিয়ে এসে শিল্পহিসেবে তার ভাবমূর্তিটি তৈরি করে দিয়েছিলো। রবীন্দ্রসঙ্গীতকে কেন্দ্র করে জনরুচির উৎকর্ষের যে মান ও স্বাভাবিক মূল্যবোধের বিকাশ আমরা চল্লিশ দশক থেকে লক্ষ্য করি, তার প্রেক্ষিতে পঙ্কজকুমারের এই প্রয়াসটির বৃহৎ ভূমিকা ছিলো। মনে রাখতে হবে ১৯২৯ সালে পঙ্কজকুমারের বয়স ছিলো মাত্র ২৪ বছর এবং সেই সময় রবীন্দ্রসঙ্গীতের 'মালিকানা' ছিলো অত্যন্ত সীমিত সংখ্যক অভিজাত মানুষের অধিকারে, যাঁদের সঙ্গে ইতরযানী মানুষের কোনও প্রত্যক্ষ সম্পর্ক ছিলোনা। ১৯৩১ সালে কবির সত্তরতম জন্মবর্ষ পূর্তির অনুষ্ঠানে মূল রবীন্দ্রবলয়ের বাইরের মানুষ হয়েও গান গাইবার জন্য পঙ্কজকুমার ডাক পেয়েছিলেন সসম্মানে। হয়তো দিনু ঠাকুরেরও এর মধ্যে কিছু ভূমিকা ছিলো। কারণ সমগ্র অনুষ্ঠানটির সঙ্গীত শিক্ষা ও নির্দেশনার দায়িত্ব ছিলো দু'জনের হাতে, দিনু ঠাকুর ও ইন্দিরা দেবী। 


এর পর থেকে পঙ্কজকুমার পিছনে ফিরে তাকাননি। তাঁর সম্বল ছিলো অনুপম কণ্ঠসম্পদ ও আশিরনখর রবীন্দ্রভক্তি। তাঁর কণ্ঠে রবীন্দ্রসঙ্গীত সাধারণ শ্রোতার কাছে এক সম্পূর্ণ নতুন রূপ নিয়ে আসে। বস্তুতঃ তাঁর ব্যারিটোন কণ্ঠের গায়নশৈলি পরবর্তীকালে রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পীদের জন্য লোকপ্রিয় হবার সব থেকে জরুরি শর্ত হয়ে দাঁড়ায়। যদিও তাঁর শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে কিছু তালিম ছিলো, কিন্তু গাইবার সময় তিনি সচেতনভাবে শাস্ত্রীয়সঙ্গীতের ঢঙে সুর লাগানোর পক্ষপাতী ছিলেন না। দিনু ঠাকুর রবীন্দ্রসঙ্গীতে নিজস্ব ধরনে খোলা গলায় সোজা স্বরস্থান নির্ভর যেভাবে সুর লাগাতেন, তাঁর দুই শিষ্য শান্তিদেব ও পঙ্কজকুমারকেও সেই শিক্ষাই দিয়েছিলেন। পঙ্কজকুমারের জন্য এই শিক্ষা অভূতপূর্ব সাফল্যের স্বাদ নিয়ে এলো। ব্যারিটোন কণ্ঠ ও সোজা সুর লাগানোর গায়নভঙ্গিটি তাঁর টার্গেট শ্রোতৃদল, অর্থাৎ বৃহত্তর ইতর জনতার কাছে বিশেষ সমাদৃত হয়ে ছিলো। তিনি কিন্তু সে অর্থে ন্যাচরল গায়ক ছিলেন না, ছিলেন না কুন্দনলাল সহগলও । কিন্তু তাঁদের গাওয়া রবীন্দ্রসঙ্গীতে শাস্ত্রীয়সঙ্গীতের উপজিত স্বেদবিন্দু টের পাওয়া যেতোনা। 'গুরু' ও 'শিষ্যে'র পরিবেশিত এই গায়নকৌশলের জাদু সংখ্যাগুরু শ্রোতাদের জন্য ছিলো মাঠঘাট, গলি-রাজপথে রবীন্দ্রসঙ্গীতের নতুন পরিপ্রেক্ষিত ও প্রাসঙ্গিকতার আবিষ্কার। স্বতই রবীন্দ্রসঙ্গীতে 'ন্যাচরল' গায়ন ও লোকপ্রিয়তা পেয়ে গেলো এক মুদ্রার দুই দিক হিসেবে সহজ স্বীকৃতি। শ্রোতাদের রসগ্রাহিতায় রবীন্দ্রসঙ্গীতের একটি নির্দিষ্ট ছাঁচ এই সূত্রে গড়ে উঠেছিলো। 


পঙ্কজকুমারই প্রথম রবীন্দ্রসঙ্গীতে তালবাদ্য হিসেবে তবলার প্রয়োগ শুরু করেছিলেন। ভারতীয় চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক গায়নেরও তিনি ছিলেন ভগীরথ। এর থেকেও বড়ো কথা তিনিই প্রথম একজন সুরকার যিনি রবীন্দ্রনাথের রচনায় সুর করার শুধু 'দুঃসাহস'ই করেননি, কবির অনুমতিও লাভ করেছিলেন। ১৯৩৭ সালে 'মুক্তি' ছবি করার সময় প্রমথেশ বড়ুয়া পঙ্কজকুমারকে নিয়ে গিয়েছিলেন জোড়াসাঁকোয়। কবির সামনে অর্গ্যান বাজিয়ে নার্ভাস পঙ্কজকুমার খেয়া কাব্যের কবিতাটি নিজের সুরে পরিবেশন করেছিলেন। কবি তৎক্ষণাৎ কিছু বলেননি, কিন্তু পরে তাঁর স্বীকৃতি জানিয়ে দিয়েছিলেন। 

কবি স্বীকার করেছিলেন গায়কে গায়কে এক্সপ্রেশনের ভেদ থাকবেই, থাকবে ইন্টারপ্রেশনের স্বাধীনতা। এই স্বাধীনতার বিভিন্ন রূপ তো আমরা দেখতে পাই দেবব্রত বিশ্বাস ও সুবিনয় রায়ের গানে অথবা সুচিত্রা মিত্র বা কণিকা বন্দোপাধ্যায়ের পরিবেশনে। কবির মনে এই স্বাধীনতার ব্যাখ্যা ছিলো, ' স্বরোচ্চারণে, গায়নভঙ্গিমায় গায়কের নিজস্ব উপলব্ধির মধ্য দিয়ে বাণীর অন্তর্গত বোধের উন্মোচন'। 


(ক্রমশ)

0 comments:

0

বইপোকার বইঘর - অনিন্দিতা মণ্ডল

Posted in

বইপোকার বইঘর
অনিন্দিতা মণ্ডল


এবারের সংখ্যায় একটি পত্রিকার আলোচনা রাখলাম। পত্রিকাটির বিষয় ইসমত চূঘতাই। যাঁরা একটু খতিয়ে পড়েন এবং পাঠক হিসেবে একটু ভিন্ন রুচির, তাঁদের কাছে চূঘতাই একটি স্মরণযোগ্য নাম। তিনি উর্দু সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য নাম। পত্রিকাতে ইসমতের লিহাফ নামের অতি বিতর্কিত ও প্রসিদ্ধ গল্পটি বাদে আরো কটি গল্প আছে। আছে তাঁকে নিয়ে লেখা উর্দু ও ইংরিজি থেকে অনূদিত প্রবন্ধ স্মৃতিচারণা ও পত্র। এছাড়া সমসময়ের প্রাবন্ধিকদের লেখা। শীর্ষেন্দু দত্ত ঊর্বী থেকে প্রকাশিত চূঘতাইয়ের বইটির আলোচনাও রেখেছেন। 

পত্রিকাটি একটি সংগ্রহযোগ্য সংকলন। যাঁরা ইসমত চূঘতাই সম্পর্কে আগ্রহী তারা এটি সংগ্রহ করুন। যেহেতু সবুজপত্র সুতরাং ধ্যানবিন্দু পাতিরাম ইত্যাদি দোকানে পেতে পারেন।
বইটির মূল্য ১২০/- 




0 comments:

0

স্মৃতির সরণী - বিপুল দাস

Posted in

স্মৃতির সরণী 


কথামালা
বিপুল দাস


শোষণহীন সমাজের স্বপ্ন দেখেছিল একটা ঝকঝকে প্রজন্ম। জীবনমৃত্যু পায়ের ভৃত্য করে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সংগঠিত রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে। পুঁজি বলতে ছিল কিছু দেশি বন্দুক, পেট, রেডবুক, চোখে স্বপ্ন আর বুকে আদর্শের আগুন। কিন্তু একটা সুসংগঠিত, নিষ্ঠুর, পেশাদার ঘাতক বাহিনীর সঙ্গে দীর্ঘদিন গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মত রণকৌশল, রসদ, এবং অস্ত্র তাদের ছিল না। অন্তর্দ্বন্দ্ব ছিল, গ্রামেগঞ্জের আমাশা-ম্যালেরিয়া ছিল। সুসংহত বাহিনী না গড়ে, উপযুক্ত রাজনৈতিক এবং সামরিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই যুদ্ধ শুরু করার ডাক শুনে এরা স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে, ঘর ছেড়ে পথে নেমে এসেছিল। এদের ঝাড় শেষ করে দিয়েছিল সিদ্ধার্থ রায়, কিন্তু বংশ লোপ করতে পারেনি।

মাঝে মাঝে পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হয়। অ্যাকশন স্কোয়াডের শঙ্কর পূজারি বামুন হয়ে গেছে। কী করব বল, চাকরি পাব না জানি, ভেরিফিকেশনে আটকে যাবে। সংসার তো চালাতে হবে – বলেছিল শঙ্কর। শঙ্কর জানে না কত হার্ড-কোর নকশালপন্থী, কত আগুনখেকো বিপ্লবী কী সব ভুজুংভাজুং দিয়ে পুলিশ ভেরিফিকেশন ক্লিয়ার করে নিয়েছে। মিহির হাত দেখে আর পাথর বেচে বেশ কাঁচা পহা আমদানি করেছিল। লাং ক্যান্সারে মারা যায় মিহির। কত বন্ধু ঠিকাদারি-প্রোমোটারিতে চকচকে হয়ে উঠল। কত বন্ধু লাইন করে সরকারি চাকরি পেল। বন্দীমুক্তি পর্বে ছাড়া পাওয়ার পর বেসীর ভাগ কেমন নির্জীব হয়ে পড়েছিল। চোখে আর সেই দ্যুতি ছিল না। অনেকেই ফিজিক্যালি হান্ডিক্যাপড্‌ হয়ে পড়েছিল। খড়দার হোগলাদা পরে চেষ্টা করেছিল মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে আবার উঠে দাঁড়াতে। হয়নি। চারুদার বড় মেয়ে অনীতার বর সেন্ট পলস্‌-এর মেধাবী ছাত্র সুগত সেনগুপ্ত আবার পার্টির কাজ শুরু করেছিল। অসম থেকে ফিরে এল জ্বর নিয়ে। পরে যখন ধরা পড়ল মেনেজাইটিস ম্যালেরিয়া, তখন আর কিছু করার ছিল না।

সেই ছাতিমগাছটা সব জানত। কিন্তু এখন আর গাছটা খুঁজেই পাই না। এক রকম গাছ আছে, বনে আগুন লাগলে সেই গাছ নিজের ধ্বংস বুঝতে পেরে খুব দ্রুত নিজের বীজ ঝরিয়ে দেয় মাটিতে। আমি পুড়ে যাচ্ছি, তোরা থাক। আমাদের ছাই-এর ওপর তোদের নবাঙ্কুর জেগে উঠুক নতুন ধারাপাতে। কে জানে, আবার নতুন সপ্তপর্ণী জেগে উঠবে কিনা।

সত্তরের দশকের মাঝামাঝি থেকে আমি আমার মত করে নিজেকে বিশ্লেষণ করতে শুরু করেছিলাম। কতটুকু বুঝেছিলাম মার্ক্সবাদ, লেনিনবাদ। নির্বাচিত লেনিন রচনাবলির ক’পৃষ্ঠা পড়েছি আমি। বিশ্ব-রাজনীতির প্রেক্ষাপটে এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ভারতবর্ষের মানুষের সনাতন সাংস্কৃতিক কাঠামো, ভারতের পরিবর্তিত সামাজিক পরিস্থিতি ও মানুষের মানসিক কাঠামো – এ সবের প্রেক্ষিতে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ডাক দেওয়ার সময় কি হয়েছিল। বিপ্লবের জন্য মাটি কি প্রস্তুত ছিল। এ যেন আগুনটুকু শুধু আছে, রান্নাবান্নার জিনিস নেই, হাতাখুন্তি নেই, অথচ দেশসুদ্ধ লোকের নেমন্তন্ন হয়ে গেছে।

যত বিশ্লেষণ করি, মোহমুক্তি ঘটতে থাকে আমার। আমার মত করে লেখালেখি আর সঙ্গীতের জগতে নিজেকে সমর্পণ করি। ক্রমশ এই উপলব্ধি হয়, ‘ বাহির হইতে প্রযুক্ত বল দ্বারা অবস্থার পরিবর্তন না হইলে’ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করে সেই পরিবর্তন হয়তো সম্ভব।

এখনকার আশাবাদী সি পি এম –এর কমরেডরা বলেন – পার্টি আবার ঘুরে দাঁড়াবে। কিন্তু কেমন করে ঘুরে দাঁড়াবে, সে কথা কোথাও শুনি না। তেভাগা বা তারও আগে শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি ঐক্যে যে শক্তি জেগে উঠতে শুরু করেছিল, যে ভাবে গানে-নাটকে-চলচ্চিত্রে-সাহিত্যে প্রগতিশীল মানুষ নিপীড়িত, লাঞ্ছিত, বঞ্চিত মানুষের কথা প্রচার করেছেন, যে ভাবে দিনের পর দিন চিড়েমুড়ি খেয়ে আদর্শে নিবেদিত কম্যুনিস্ট গ্রামে গ্রামে সংগঠন গড়ে তুলেছে, যে ভাবে কম্যুনিস্ট পার্টি শ্রমিকের স্বার্থে শহরে তীব্র গণ-আন্দোলন গড়ে তুলেছে, তৎকালীন প্রশাসনকে ব্যতিব্যস্ত করে রেখেছে – আর এক দল চৌত্রিশ বছর ধরে তার ফল ভোগ করেছে। যে গাছকে রোদজলঝড়বৃষ্টি থেকে রক্ষা করে, আগাছা নিংড়ে, পোকা মেরে, জল ও সার দিয়ে মহাবৃক্ষে পরিণত করা হয়েছিল, সেই বৃক্ষ ফলবতী হতেই সেই গাছের ছায়ায় এসে বসল চালাক মানুষের দল, ফড়ের দল। তারা যথেচ্ছ ফল খেল, ফুল তুলল, পাতা ছিঁড়ল, ডাল ভাঙল। গাছকে বাঁচানোর কথা আর কেউ ভাবল না। ভেবেছিল আরও পঞ্চাশ বছর এই গাছ আমাদের ছায়া দেবে, ফলপাকুড় দেবে। পেটে গামছা বেঁধে, ঝড়জলরোদে গ্রামে গ্রামে কম্যুনিস্ট পার্টির সংগঠন গড়ে তোলা এবং ধরে রাখার লোক তখন আর নেই। প্রতিটি সিদ্ধান্ত দ্বিধাগ্রস্ত। দক্ষিণ মুখাপেক্ষিতা। ভুলের ওপর ভুল। পরে আবার ভুল স্বীকার। গ্রামেগঞ্জে গিয়ে মাটি কামড়ে পড়ে থেকে সংগঠন করার লোক আর রইল না। নতুন কোনও প্রজন্ম এগিয়ে এল না সেই আরব্ধ কাজের দায়িত্ব নিতে। ভাগ্যিস পুব-পাকিস্তান থেকে বিশাল সংখ্যায় বামপন্থী মনোভাবের লোক, তেভাগায় অংশগ্রহণ করা কিছু লোক পশ্চিমবঙ্গজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। এরা ছিল বামপন্থীদের একটা অন্যতম শক্তি। পার্টি ভাগ হওয়ার পর মগজ কমে গিয়েছিল সি পি এমের। সেটি সি পি আই নিয়ে আলাদা হয়ে যায়। আর মগজবিহীন ক্রমবর্ধমান ধড় নিয়ে সি পি এম ভেবেছে – দ্যাখো আমি বাড়ছি মাম্মি।

আশির দশকের মাঝামাঝি থেকেই অনিয়ন্ত্রিত কোষ-বিভাজনের ফলে উদ্ভুত মারণ রোগের লক্ষণ টের পাওয়া যাচ্ছিল।ক্রমে জনসংযোগের বদলে জনবিচ্ছিন্নতা শুরু হ’ল। স্থানীয় নেতারা সবাই প্রায় ছোটখাটো সামন্তপ্রভু হয়ে বসেছিল। প্রোমোটারি-রাজ দৃঢ় ভাবে কায়েম হয়ে বসল। আস্তে আস্তে পায়ের তলার মাটি নরম এবং সরে যাচ্ছে – এটা না বোঝার কথা নয়। কিন্তু হিটলার যেমন ভাবতে পারেনি রাশিয়ার তুষারাবৃত প্রান্তর থেকে তার অজেয় বাহিনী মার খেয়ে পালিয়ে আসবে, তেমনই বামফ্রন্টের ছোটবড় নেতারা বিশ্বাস করতে পারেনি এই সরকারের পতন হতে পারে। মার্ক্সবাদ বিজ্ঞান, তাই সে অজর, অমর, অক্ষয়, অব্যয়। তাকেও যে স্থানকালপাত্রের প্রেক্ষিতে প্রয়োগের উপযুক্ত করার জন্য সামান্য ঘষামাজা করে নিলে মহাভারত অশুদ্ধ হবে না, এই শুচিবাই থেকে বেরোতে না পারা ভয়ানক ক্ষতি করে ছিল। শহরে, গ্রামে, গঞ্জের অফিসে-স্কুলকলেজ-আদালতে ছোট দরের একপো-আধপো নেতাদের দেখেছি কথায় কথায় বিরোধীদের, সরকার বা পার্টির সামান্য সমালোচনা করলে আস্তিন গুটিয়ে তেড়ে আসতে। এরা কেউ সংগ্রামের ভেতর দিয়ে, ত্যাগতিতিক্ষার ভেতর দিয়ে, আদর্শের জন্য সি পি এম করতে আসেনি। যাঁরা এসেছিল, তারা অনেকেই বীতশ্রদ্ধ হয়ে বসে গেছে। শহরে ছাত্র আন্দোলনের নেতারা, শ্রমিক বেল্টের নেতারা অনেকেই তখন বড় নেতা মন্ত্রী। মুড়ি, রুটিগুড় তখন ইতিহাস। গ্রামেগঞ্জে সামন্তপ্রভুদের কড়া হাতে রাশ টানা, আত্ম-সমালোচনা, আত্মশুদ্ধি –এ সব কথা মাঝে মাঝে প্রকাশ্যে এবং রুদ্ধদ্বার বৈঠকে উচ্চারিত হ’ত বটে, কিন্তু কঠোর হাতে পরিমার্জনা করতে সে রকম উৎসাহ কারও ভেতরেই ছিল না। যেমন-আছে-থাক, স্ট্যাটাস কো-এর এই সুখপ্রদ অবস্থাকে কেউ আর টালমাটাল করতে চায়নি। যদি এই মসৃণ জীবনযাপন পালটে যায়।

সেই মহাবৃক্ষের নীচে তখন ফল কুড়িয়ে খাওয়ার লোক বেশি। গাছ মরে গেলে তাদের কিছু আসে যায় না। আবার অন্য গাছের ছায়া খুঁজে নেবে। এরা বাংলার মাটিতে কম্যুনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাস কিছুই জানে না। এরা সলিল চৌধুরী, শম্ভু মিত্র, বিজন ভট্টাচার্যের নাম শোনেনি। তেভাগা আন্দোলনের কথা জানে না। একমাত্র বামপন্থার শক্তিই পারে জাতিধর্ম, শ্রেণিগতস্থান নির্বিশেষে সম্প্রীতি ও ঐক্যের বন্ধনে সমাজকে সুস্থ ও সংহত রাখতে – এসব কিছু তারা বুঝতে চায়নি। পরগাছার মত সেই বৃক্ষ থেকেই ক্রমাগত রস টেনে স্ফীত হয়েছে। এদের নির্মূল করার অভিযান কোনও দিন হয়নি। প্রবল আত্মবিশ্বাস, গরিমা, দম্ভ, স্বচ্ছল জীবনযাপনে অভ্যস্ত কমরেডরা টের পায়নি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে, ঘরের বাইরে অসংখ্য সুযোগ-প্রত্যাশী ও স্তাবকদের ভীড়েসংগ্রাম হারিয়ে যাচ্ছে। ভিটেতে ঘুঘুর ডাক অস্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল। শোনা যাচ্ছিল ভিতের নীচে উইপোকার শব্দ। তখন আর সময় নেই। বস্তু যখন খুব ভারি হয়ে যায়, তখন তার আপন ভারেই গতিজাড্য নিয়ে সামনে গড়ায়। তাই হয়েছিল। বিশাল পার্টি তার নিজস্ব ভরেই গড়িয়ে চলছিল। সবাই ভাবত – এই তো দিব্যি চলছে।

পশ্চিমবঙ্গের কম্যুনিস্ট আন্দোলন, কম্যুনিস্ট-শাসিত সরকার – দীর্ঘদিন ধরেই অনেকের মাথাব্যথার কারণ হয়ে ছিল। এর পতন তারা চেয়েছিল। ভূমিসংস্কারের সুফল এই সরকার দীর্ঘদিন ভোগ করেছে। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত দেশীয় ভূস্বামীদের একটা বড় অংশ, অ-কম্যুনিস্ট দলগুলো, বিদেশি পুঁজিপতিদের দালালশ্রেণি – নানা ভাবে চেষ্টা করেছে এই সরকারকে উৎখাত করতে। কিছু জাতীয়তাবাদী সংবাদপত্র, ইলেক্ট্রনিক প্রচারমাধ্যম, কেন্দ্রের সরকার – এই কম্যুনিস্ট পার্টি এবং তার সরকারকে কোনও দিনই পছন্দ করেনি। কম্যুনিস্টদের প্রতি ঘৃণা ছিল অনেক বিখ্যাত লোকেরও। সেটা আমরা পরবর্তী পর্যায়ে লালগড়, নন্দীগ্রাম আন্দোলনে দেখেছি। শুনেছি লাল রং তারা কেমন ঘৃণার চোখে দেখেন। কম্যুনিস্ট নেতাদের শহিদ বেদিতে পদাঘাত করতেও তাদের বাধেনি। লালগড়, নন্দীগ্রাম, সিঙ্গুর, নেতাই – তারও আগে সাঁইবাড়ি, মরিচঝাঁপি, অনীতা দেওয়ান, নেতাদের বক্রোক্তি-দম্ভোক্তি ইত্যাদি ঘটনা মানুষ ভালো ভাবে নেয়নি। অনেকগুলো ক্ষত তৈরি হয়েই ছিল। সুতরাং যাঁরা সেদিন বা আজও কম্যুনিজম্‌কে ঘৃণা করছে, নিশ্চয় তাদের কাছেও অজস্র যুক্তি আছে। আবার এমনও বহু মানুষ আছেন, যাঁরা কম্যুনিজম্‌কে নয়, ঘৃণা করেছেন তথাকথিত সরকারি বামপন্থীদের।

চৌত্রিশ বছরের বাম জমানার অবসান ঘটানোর জন্য তখনকার বিরোধী নেত্রীর কৃতিত্ব অস্বীকার করার কোনও প্রশ্নই নেই। ছল-বল-কৌশল, মিথ্যাচার, ক্রমাগত মিথ্যা-প্রচার –এ সব রাজনীতির অঙ্গ। দোষারোপ অর্থহীন। ক্ষমতার গন্ধ পেয়ে তিনি বাম-বিরোধী সমস্ত শক্তিকে সং গঠিত করতে পেরেছিলেন। এমন কী, কিছু বামাদর্শের রাজনৈতিক দলও আর একটি বাম সরকারকে উৎখাত করার জন্য তার সমর্থনে জোট বেঁধেছিল। কৃতিত্ব অবশ্যই বিরোধী নেত্রীর। ক্ষমতায় আসার পর দক্ষ কূটনীতির চালে অদরকারী এবং ভবিষ্যতে ক্ষতিকারক হতে পারে, এমন শক্তিকে নিকেশ করলেন, বর্জন করলেন। দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত সঙ্গীদের নিয়েই নিজস্ব বৃত্ত তৈরি করলেন। এটি ছিল অন্তর্বলয়। আর একটি বহির্বলয়ে স্থান দিলেন সহযোগী শক্তিগুলিকে। বাংলার সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলের এবং অন্যান্য জগতের বিশিষ্টজন, যাঁরা এই লড়াই-এ তাকে সমর্থন করেছিল এবং পরবর্তীতে ক্ষমতার পদলেহী কিছু মানুষ এই বহির্বলয়ে স্থান পায়।

কিন্তু প্রশ্ন হ’ল, পরিস্থিতির এই অবস্থায় পৌঁছনোর জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রণনীতিই কি সর্বাংশে কাজ করেছে ? সেটাই কি একমাত্র কারণ ছিল ? বাম-ঐক্য কেন রুখতে পারল না এই ভাঙন। এ কথা ঠিক, সমস্ত বিরোধী শক্তি একজোটে এই সরকারের পতন চেয়েছিল। যে জনশক্তি ছিল বামেদের দাঁড়িয়ে থাকার মূল স্তম্ভ, পার্টি সেই সাধারণ মানুষের থেকে অনেক দূরে চলে যাচ্ছিল। মানুষও তাদের ‘চোখের মনির মত’ সরকার এবং পার্টি থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছিল। ছোটখাটো নেতাদের উদ্ধত আচরণ, চাপা একটা সন্ত্রাসের আবহ, সীমাহীন স্বজনপোষণ, গ্রামেগঞ্জের নেতাদের অনৈতিকতা, নেতামন্ত্রীদের সংগ্রাম-বিমুখতা, শিক্ষা-স্বাস্থ্যের হাল ফেরাতে না পারা – মানুষ সত্যি বদল চেয়েছিল। এই বদল ঘটানোর জন্য যতটা না মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে সমগ্র বিরোধী জোত দায়ী, তার চেয়ে অনেক বেশি দায়ী বাম-সরকার নিজে এবং বামদলগুলি। মানুষ যতটা না মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্যারিশমা দেখে ভোট দিয়েছে, তার চেয়ে বেশি ভোট দিয়েছে যে ভাবে হোক এই সরকারের বদল চেয়ে।

তবু, অবস্থা বোধহয় এর চেয়ে কিছুটা ভালো ছিল। মোটামুটি একটা গণতান্ত্রিক আবহ ছিল। যে রাজ্যে মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসে গেছেন বিধান রায়, প্রফুল্ল সেন, অজয় মুখোপাধ্যায়, সেখানে জ্যোতি বসু, এমন কী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য পর্যন্ত বেমানান মনে হয়নি। যে রাজ্যে রাজনীতি করে গেছেন চিত্তরঞ্জন দাশ, সুভাষচন্দ্র বসু, উমেশ ব্যানার্জী, বিধানচন্দ্র রায়, মুজাফ্‌ফর আহ্‌মেদ, প্রমোদ দাশগুপ্তের মত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব – সেখানে অশোক মিত্র, বিনয় কোঙার, সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়, অরুণাভ ঘোষ, তথাগত রায় পর্যন্ত তবু চলে যায় – কিন্তু তারপর যা পড়ে রইল, এই বাংলার বরাবরের রাজনীতির সভ্য, মার্জিত, সংস্কৃত রূপের আবহমান ধারাটি তারা তছনছ করে দিলেন।

এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই দক্ষ দাবাড়ুর মত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মরণ-পণ চালের কাছে, কূতনীতির কাছে, রাজনীতির কাছে চালবাজির কাছে বামদলের পোড়খাওয়া দক্ষ রাজনীতিক বাহিনী হেরে গেছে। কিন্তু আবারও বলছি, নেত্রীকে তার কাজের জন্য কৃতিত্ব দিলেও, ক্ষেত্র বামসরকার এবং পার্টিই তৈরি করে দিয়েছিল তাদের অবিমৃষ্যকারিতা দিয়ে। বোঝেনি, এক একটা দাম্ভিক উক্তি জনমানসে কেমন বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। বুমেরাং হয়ে ফিরে আসতে পারে একদিন দু’শো পঁয়ত্রিশ আর পয়ঁত্রিশের তুল্যমূল্য অহংকারী ঘোষণা। 

বাম-সরকার আর পার্টি সমার্থক হয়ে গিয়েছিল। সরকারি আমলাদের অপদার্থতা, নৈতিক স্খলন, জমি অধিগ্রহণের নীতি, অন্যান্য কিছু ভুল সরকারকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার কথা ছিল পার্টির। ভুল সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করার কথা ছিল পার্টির। ছোট শরিকরা দু’একবার মিঁউ মিঁউ করেছে, তাতে কোনও কাজ হয়নি। মার্ক্সবাদী কম্যুনিস্ট পার্টি কেন তখন সরকারের সমালোচনা করল না। তারাও কি চেয়েছিল ভুলটা ধামাচাপা দেওয়া যাক। কেন সরকারের সব সিদ্ধান্তকেই অন্ধের মত সমর্থন করে গেল। কেন সরকারকে সাবধান করেনি অসাধু আমলা, ধান্দাবাজ ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে। “ওরা আমাদের সমর্থক”—এই যুক্তির কাছে মাথা নুইয়েছে পার্টি। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে চাপ দেয়নি কেন। বিশেষত শিক্ষার ক্ষেত্রে অনেক জনসমর্থন বিরোধী সরকারি ফরমানকেই সমালোচনা না করে স্বাগত জানিয়েছে। ক্ষেত্র সরকার এবং পার্টি, উভয় মিলেই তৈরি করে দিয়েছিল কোনও এক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য। ‘কোনও এক’ বললাম এই জন্য যে, তিনি যে কেউ হতে পারতেন। মমতা, প্রমিতা, অমল, বিমল বা ইন্দ্রজিৎ। পড়ে-পাওয়া ঘুঁটিগুলো চমৎকার সাজিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কুড়িয়ে-পাওয়া সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে তার মত কূটবুদ্ধিসম্পন্না রাজনীতিকের অসুবিধা হয়নি। সমস্ত পরিবেশ কার্যকারণযোগে দশচক্রে ভগবান ভূত হওয়ার মত তার অনুকূলে এসে গিয়েছিল। প্রবল একটা হাওয়া উঠেছিল পরিবর্তনের। ঝড়ের মুখে খড়কুটোর মত উড়ে গেল কয়েকটা দীর্ঘযুগ। লক্ষ মানুষের কান্নাঘামরক্ত দিয়ে তৈরি একটা দল। আবার যদি এই পার্টিকে উঠে দাঁড়াতে হয়, তবে মুখ থেকে কোকের বোতল সরিয়ে, আমেরিকা-আলবেনিয়া-কিউবার কথা ভুলে রংপুর থেকে আসা লুঙি পরে অবিরত সাইকেল চালিয়ে গ্রামে-গ্রামান্তরে ঘুরে সংগঠন গড়ে তোলা আরও অনেক বলরাম সাহা, কেষ্ট দাস, অমৃত মুখার্জী, স্বদেশ পাল, ভোলা মুখার্জীর দরকার। আবার যদি গ্রামে গ্রামে ঘুরে জনসংযোগের মাধ্যমে গণসংগঠন গড়ে তোলা যায়, যদি তাঁদের মত জাগতিক সুখদুঃখের বিলাসিতা ভুলে শুধুমাত্র আদর্শের জন্য এগিয়ে আসতে পারে নতুন একটা প্রজন্ম, তবেই হয়তো পার্টি আবার উঠে দাঁড়াতে পারবে।

কিন্তু মুশকিল আছে। সেই সময় পক্ষে কতগুলো সমীকরণ কাজ করেছিল। তেভাগা আন্দোলনের টাটকা স্মৃতি, তার অভিজ্ঞতা, দেশ ছেড়ে এসে নতুন ইহুদি হওয়ার মানসিক যন্ত্রণা, ফলে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ক্ষোভ – সহজেই দানা বেঁধেছিল কৃষক আন্দোলন, শ্রমিক আন্দোলন, খাদ্য আন্দোলন। শহর জনজোয়ারে উত্তাল হয়ে উঠেছে সরকারবিরোধী আন্দোলনে। তাকে যোগ্য সহযোগিতা করে গেছে বামপন্থী, প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক কার্যক্রম। গানে, নাটকে, চলচ্চিত্রে, সাহিত্যে মুখর হয়ে উঠেছিল মানুষের প্রতিবাদের ভাষা।

বাম আমলের ‘ধীরে খাও, দিয়ে খাও’ নীতি রাতারাতি পালটে গেল। শুরু হ’ল অন্য কায়দায় শাসন। প্রতিবাদের মুখগুলোকে চুপ করিয়ে রাখার জন্য সরাসরি শাসানি। কেউ সরকারের সমালোচনা করবে না, কেউ কোনও সামাজিক অন্যায়ের প্রতিবাদ করবে না, কেউ নারী নিগ্রহের প্রতিবাদে পথে নামবে না, চাষিরা ন্যায্যমূল্যে সার পাচ্ছে না কেন – কেউ সে প্রশ্ন করবে না, কেউ কোনও অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুলবে না।করলেই তুমি মাওবাদী, করলেই তোর বাপ সিপিএম ছিল, করলেই সরকারকে হেয় করার চক্রান্ত, করলেই নাশকতার ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব খাড়া করা হতে লাগল। এমন কী – রাশিয়া, স্পেন, ইটালির কথা মনে পড়ে – নির্দোষ রসিকতার মূল্য চোকাতে হ’ল অধ্যাপককে।

বাম শাসনের অবসান চেয়ে, পরিবর্তনের ডাক দিয়েছিলেন রাজ্যের শিল্পীসাহিত্যিক, কলাকুশলীদের এক বৃহদংশ। খুব প্রভাবিত হয়েছিল শহুরে নাগরিক। নন্দীগ্রামে গুলিচালনার প্রতিবাদে পথে নেমেছিল সহস্র সাধারণ মানুষ। আমিও হেঁটেছিলাম। কিন্তু খুব আশ্চর্যের বিষয়, পরবর্তীতে সরকারের কোনও অন্যায় সিদ্ধান্ত, নেতামন্ত্রীদের অনৈতিক কার্যকলাপ, পথেঘাটে নেতামন্ত্রীদের ঔদ্ধত্য, সিন্ডিকেট-প্রোমোটাররাজ –এসব দেখাও এরা কাঠপুতুলের মত নির্বাক রইলেন। প্রতিবাদে পথে নামলেন না। অথচ, পূর্ববর্তী সরকারের এই ধরণের অনৈতিক ক্রিয়াকলাপ নিয়ে এরা চ্যানেলে চ্যানেলে মুখর হয়ে ছিলেন। এদের কারও গলা দিয়েই প্রতিবাদের কথা উচ্চারিত হ’ল না। কোন এক অদৃশ্য বন্ধনীতে এদের ঠোঁট বন্ধ রইল। কে জানে, কোথায় বন্ধক দিয়ে রেখেছেন নৈতিক শক্তিটুকু। অন্যায়কে অন্যায় বলার সৎসাহসটুকু।

প্রসঙ্গত বলা ভালো, দিনবদলের ডাক-দেওয়া সেই সব বুদ্ধিজীবীদের অনেকেই পরে বিভিন্ন ভাবে রাজানুগ্রহ লাভ করেছেন। সাংসদ, মন্ত্রী, বিভিন্ন কমিটির চেয়ারম্যান, প্রেসিডেন্ট, উপদেষ্টামণ্ডলীর সভ্য। অনুগত লেখক-শিল্পীরা পেয়েছেন সরকারি খেতাব। বিভিন্ন ভূষণে ভূষিত হয়েছেন তারা।

২০১১-এর পালাবদলের পর সরকারের কাজকর্মের খতিয়ান নিলে দেখা যাবে কাজ কিছু হয়নি, তা নয়। অনেক কাজ হয়েছে। সেটাই তো স্বাভাবিক। রাজ্যের উন্নয়নই তো সরকারের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। কিন্তু অনেক কেন্দ্রীয় সরকারের প্রোজেক্ট তাদের টাকায় সম্পন্ন হলেও গ্রামেগঞ্জের সাধারণ মানুষের ধারণা এটা এই সরকার করে দিয়েছে। গ্রামগঞ্জের সাধারণ অশিক্ষিত মানুষ তো দূরের কথা, শহুরে শিক্ষিত মানুষের ক’জন খবর রাখেন কোন কাজ কোন সরকারের। বিরোধী দলগুলোর এমন ছন্নছাড়া অবস্থা, সত্যিমিথ্যেটুকুও তারা সঠিক ভাবে প্রচার করতে পারে না। মাঝে নেপোয় দই মেরে চলে যায়। কাজ হয়েছে। গ্রামেগঞ্জে যোগাযোগের ব্যবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে। দু’টাকার চাল, কন্যাশ্রী, সাইকেল – যে কথা ভেবে এসব প্রকল্প চালু করা হয়েছিল, সেটা সম্পূর্ণ সফল। প্রতিটি প্রকল্পের পেছনে সুদূরপ্রসারী ভাবনা কাজ করেছে। প্রগতির ফলের কথা ভেবেই উন্নয়নের কাজ হয়েছে, অন্তত কিছু ক্ষেত্রে তো বটেই। তবু বলব, চুরিচামারির ভেতরেও কিছু কাজ হয়েছে।

এ রাজ্যে রাজনীতির একটা সুষ্ঠু পরিমণ্ডল ছিল। যার যে রাজনৈতিক আদর্শ পছন্দ, সে সেই রাজনীতি করেছে। রাজনৈতিক ভাবেই চাপান-উতোর চলেছে। আমার এই প্রায় সত্তর বছর বয়সে এসে এই প্রথম দেখলাম নোংরা, কুৎসিত ভাষায় বিরোধী পক্ষকে আক্রমণ। তবে এ ব্যাপারে প্রগতিশীল বামেরাও পিছিয়ে নেই। তাদেরও অতীত এবং বর্তমান রেকর্ড ভালো নয়। ভাবতে অবাক লাগে একদিন এ রাজ্যের ইন্দ্রজিৎ গুপ্ত, সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ের মত বাগ্মী সাংসদের ভাষণ শুনে মুগ্ধ হয়েছে বিরোধী নেতারাও, হাততালি দিয়ে অভিনন্দন জানিয়েছে, আজ সেই পার্লামেন্টে পশ্চিমবঙ্গের সাংসদরা মাথায় কলসি, হাতে কুলো, কাঁখে কয়লায় ঝুড়ি নিয়ে ধরণা দিচ্ছে। সাংসদ বলছে – ঘরে ছেলে ঢুকিয়ে রেপ করিয়ে দেব। এ কোথায় নেমেছে রাজনীতি। এমন দেউলেপনা, এমন রুচিহীন, বিকারগ্রস্তের মত রাজনীতি করছে সুস্থ সংস্কৃতির পীঠস্থান পশ্চিমবঙ্গ। সরকারি বুদ্ধিজীবীর দল নিশ্চুপ। মুখে কুলুপ। অনেকে আবার কুযুক্তি দেখিয়ে দোষ খণ্ডানোর চেষ্টা করে। চৌত্রিশ বছরের কথা বলে। যেন ‘ব’ চুরি করেছে, সুতরাং ‘ত’-এর চুরি আইনত সিদ্ধ হয়ে গেছে। একটা অন্যায়কে আর একটা অন্যায় দিয়ে জাস্টিফাই করার চেষ্টা।

এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গের অবস্থা ভালো নয়। খুব দ্রুত মেরুকরণ ঘটে যাচ্ছে। এই সরকারের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতি অতিরিক্ত নমনীয়তা, তোষণ-নীতি সাধারণ হিন্দু বাঙালি ভালো ভাবে নেয়নি। বিশেষত যাদের এখনও আপশোষ রয়েছে “ ওই পারে দালান, পুষ্কর্ণী, নাইহলের বাগান শ্যাখেরা ভোগ করতাসে”, যারা ঘরবাড়ি, ইজ্জৎ, সব হারিয়ে এখানে আবার শিকড় বসাতে চেয়েছেন এটাই তাদের প্রকৃত স্বদেশ – এই ভাবনায়, বুকে এখনও দগদগে স্মৃতির ক্ষত, তারা ব্যাপারটা একেবারেই পছন্দ করেনি। এই প্রথম বোধহয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একটা ভুল হিসেব করে ফেললেন।

সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় নেতাদের উদ্ধত জবান, দু’একটি জায়গায় উৎসব নিয়ে অশান্তি – কড়াহাতে দমন করার ব্যাপারে দ্বিধাগ্রস্ত হয়েছেন তিনি। পূর্ববর্তী একজন মুখ্যমন্ত্রীর মত বলতে পারেননি – এ রাজ্যে দাঙ্গা করতে এলে মাথা গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে। সাম্প্রতিক কালে দু’ সম্প্রদায়ের ভেতরে এ রকম অবিশ্বাসের আবহ এর আগে আমি দেখিনি। কাজচালানো গোছের যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানটুকু ছিল, সেটাও বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এ বড় সুখের সময় নয়। এখন যা দেখা যাচ্ছে, তা সত্যি উদ্বেগের কথা। সাধারণ, মধ্যবিত্ত বাঙালি ভয় পেয়েছে। এবং আরও ভয়ের কথা এই ভয় থেকে উত্তরণের জন্য যার অভয়বাণী দেবার কথা, তিনি আশ্চর্যজনক ভাবে নীরব রইলেন। সমস্ত পৃথিবীতে যখন ইসলাম জগতে নারীমুক্তি আন্দোলন ক্রমশ জোরদার হয়ে উঠছে, আধুনিক প্ররথিবীর দিকে তাকাবে বলে তারা বোরখা ছেড়ে মুক্ত অক্সিজেন নিতে চাইছে, তিন তালাকের মত একটি নিষ্ঠুর ও পুরুষতান্ত্রিক নিয়মের শৃঙ্খল থেকে বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইছে, তখন আমাদের সরকারের প্রতিনিধি সেই তিন তালাকের সমর্থনে বলছেন – কে কার সঙ্গে থাকবে, সেটা তারাই ঠিক করুক। এ যেন শাহবানু মামলায় রাজীব গান্ধীর ভূমিকারই নব্য-সংস্করণ। আলমদুলিল্লাহ্‌।

এ সব ধর্মীয় নেতারা সাধারণ আতরাফ শ্রেণির নিম্নবর্গীয় মুসলমান নয়। এরা বহিরাগত আশরাফ শ্রেণির। সাধারণ খেটে-খাওয়া মুসলমানদের ওপর হয়তো এদের বিরাট প্রভাব আছে, সরকারি পলিসি বোধহয় সে রকমই ভেবেছিল। তাই এদের বেয়াড়াপনা দেখেও প্রশাসন আশ্চর্যজনক ভাবে নীরব থেকেছে। আর সেখানেই ভুল বার্তা গেছে। এখন দেখা যাচ্ছে প্রচুর সাধারণ মুসলমান এ সব ফতোয়া অস্বীকার করছে। বলছে, এ সবের সঙ্গে তাদের কোনও সম্পর্ক নেই। বলছে – বরকতি হুজুরের কথা আমাদের কথা নয়। উনি এ রাজ্যের সবশ্রেণির মুসলমানের প্রতিনিধি নন। আর এখানেই বর্তমান সরকার একটু থমকে গেছে। তা হলে কি কিছু ভুল হ’ল। একে তো এক রকম হিসেব কষে ধর্মগুরুদের প্রতি নমনীয়তা দেখানো হয়েছে, তাদের নানারকম সুবিধা পাইয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন দেখা যাচ্ছে এই ধর্মগুরুদের কথাই শেষ কথা নয়। মুসলিম সমাজে মুক্তচিন্তার মানুষও প্রচুর রয়েছে। আবার, এদের প্রতি নমনীয় থাকতে গিয়ে খুব দ্রুত একটা ভাঙন ধরে গিয়েছে। খুবই ভয়ের এবং আশঙ্কার কথা দ্রুত মেরুকরণ ঘটছে পশ্চিমবঙ্গে। নিরপেক্ষ বাঙালি রামনবমীর মিছিল দেখে খুশি হচ্ছে। হাটেমাঠে, চায়ের দোকানে কথা বলে বুঝেছি যত লোক মিছিলে ছিল, তার অন্তত একশ গুণ লোক এই মিছিলকে সমর্থন করেছে। এ কী অশনিসংকেত নয়।

ইদানীং শুরু হয়েছে এ রাজ্যে বসে কিছু ধর্মীয় নেতার ‘ফতোয়া’ দেওয়ার আস্ফালন। আমরা, যারা বাংলার আবহমান ভাষা-সংস্কৃতির সঙ্গে আবাল্য পরিচিত, তারা 'ফতোয়া' শব্দটি ক্বচিৎ শুনেছি। পির, ফকির,ইমাম, মহরম, আজান, কোরান,ইদ, ইফতার, সালাম অনেকটাই হিন্দু বাঙালির গ্রহণীয় হয়ে উঠেছে। কিন্তু 'ফতোয়া' কখনওই হয়নি। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই হিন্দু সমাজেও ফতোয়া ছিল, অন্য নামে। ব্রাহ্মণ্য ধর্মের বাড়বাড়ন্তের সময় উচ্চবর্ণের মানুষ তুচ্ছ অপরাধেই নিম্ন বর্ণের মানুষকে বিধান দিয়ে জাতিচ্যুত করেছে, সমাজ থেকে তাড়িয়ে দেবার ফরমান জারি করেছে। রামমোহন, বিদ্যাসাগর, আরও অনেক সমাজ সংস্কারকদের যুদ্ধের ফলে এবং, অবশ্যই ডিরজিওপন্থী নব্যযুবাদের আধুনিকতা, ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণে হিন্দুদের এগিয়ে আসা ইত্যাদি কারণে উচ্চবর্ণের মানুষদের সেই বিধান দেবার প্রবণতা ক্রমশ কমে যায়। ধর্মের কড়া কানুনের শৃঙ্খলা অনেকটাই শিথিল হয়ে যায়। মুক্ত চিন্তার প্রসার ঘটে হিন্দু বাঙালিদের ভেতরে। 
" ফতোয়া" ইসলাম শাস্ত্রসম্মত রায় বা নির্দেশ। ফতোয়ার প্রয়োজন পড়ে তখনই, যখন কোনও ব্যক্তি বা কোনও বিচারক কোরান বা হাদিস থেকে প্রাপ্ত শরিয়ত বা ফিকাহ্‌ গ্রন্থগুলিতে উদ্ভূত সমস্যার সন্তোষজনক সমাধানে পৌঁছতে পারেন না। ইসলামের আদি পর্ব থেকে ইমাম ও মুফ্‌তিদের দেওয়া বহু ফতোয়া সংগৃহীত হয়েছে। সেগুলিই ফিকাহ্‌ নামে পরিচিত। সাধারণ ভাবে একজন মুফ্‌তি ফতোয়া দেওয়ার অধিকারী।এই বিংশ শতাব্দীতেও কোনও কোনও মুসলিম রাষ্ট্রে ইসলামি ধর্মশাস্ত্রের পণ্ডিতদের নিয়ে ফতোয়া কমিটি গঠন করা হয়। ওই সব দেশে প্রচলিত আইনের পাশাপাশি ফতোয়াও কার্যকর হয়। কিন্তু গণতান্ত্রিক দেশে ফতোয়াকে নিছক ধর্মীয় অভিমত হিসেবে দেখা হয়। স্বাভাবিক ভাবেই তার কোনও আইনি বা সাংবিধানিক গুরুত্ব নেই। ভারতে তো নয়ই, বাংলাদেশের মত মুসলমান-প্রধান দেশেও ফতোয়াকে অসংবিধানিক বলে ঘোষণা করা হয়েছে। তা সত্ত্বেও দুই দেশেই ফতোয়া দেওয়ার প্রবণতা বন্ধ করা যায়নি। এ দেশে বেশির ভাগ ফতোয়া দিয়ে থাকেন দারুল উলুম দেওবন্দের মুফ্‌তিরা। সেই ফতোয়া ে দেশের মুসলমানেরা কতটা গ্রহণযোগ্য মনে করেন, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। ২০০৭ সালের জুলাই মাসে দেওবন্দের এক মুফতি ছেলেমেয়েদের একই স্কুলে পড়া নিষিদ্ধ করে ফতোয়া দেন। তার কয়েক মাস আগেই মুসলমানদের জন্য জীবন বীমা বে-আইনি ঘোষণা করে ফতোয়া জারি হয়। তারও আগে উত্তরপ্রদেশের একটি গ্রামে ইমরানা নামের এক মহিলাকে তাঁর শ্বশুর ধর্ষণ করলে ওই মাদ্রাসা থেকে ফতোয়া দেওয়া হয় ইমরানা আর তার স্বামীর সঙ্গে বাস করতে পারবে না। নারীদের বিরুদ্ধে ফতোয়া জারির প্রবণতা বেশি। নারী নিজের অধিকারের জন্য যত সচেতন হচ্ছে, এই ধরণের ফতোয়া তত বাড়ছে। ধর্মের সঙ্গে নারী-প্রগতির সঙ্ঘাতের ফলেই ফতোয়ার প্রবণতা বাড়ছে। (চলতি ইসলামি শব্দকোষ, মিলন দত্ত)
সাত আট'শ বছর ভারত শাসন করেছে বাঙালি মুসলমান নয়, বিদেশি মুসলমান। তাঁদের উত্তরপুরুষদের রক্তে এখনও সেই অহংকার রয়েছে। ক্ষোভ রয়েছে এখন পরাধীন হয়ে থাকার। বিদেশাগত উচ্চবর্ণের আশরাফ এরা। সৈয়দ, শেখ, মুঘল, পাঠান। ভারতের সঙ্গে বার বার যুদ্ধে এরাই জয়ী হয়েছেন, বিজিতের ভূমিতে বসবাস করেছেন যাঁরা ফিরে যাননি। এদের অর্থের জোর ছিল। বড় বড় শহরে এরা স্থায়ী ভাবে কায়েম হ'ন। তা ছাড়া উচ্চবিত্ত আমির-ওমরাহ্‌, নবাববংশের উত্তরাধিকারীরাও নগরেই থিতু হ'ন। কলকাতার কথাই যদি ধরা যায়, এদের ভেতরে অনেক রকম মানসিকতা কাজ করেছে। শহরে সংখ্যালঘু হওয়ার জন্য জোট বেঁধে থাকার প্রবণতা (প্রাণীমাত্ররই এই প্রবণতা থাকে), অপ্রয়োজনেও আস্ফালন করে পায়ের তলার মাটি শক্ত করা, ধর্মের কড়া অনুশাসনে নিজের কৌমকে সংগঠিত করা রাখা, ভোটার হিসেবে যতটা পারা যায় সুবিধা উসুল করে নেওয়া। এবং পূর্বপুরুষের সংস্কৃতিকে হারিয়ে যেতে না দেওয়া। 
এরা বাদেও এক বিশাল সংখ্যক মুসলমান রয়েছে পশ্চিম বাংলায়। রয়েছে শিক্ষিত এবং প্রকৃত অর্থেও আলোকপ্রাপ্ত, আধুনিক-মনস্ক মুসলমান। এরা আজ এই সব মৌলবি, মুফতি, বরকতিদের সামাজিক সর্দারি সরাসরি অস্বীকার করছেন। হয়তো একদিন সত্যি আমাদের দেশের মুসলমান সমাজ পরিপূর্ণ ভাবে আধুনিক হয়ে উঠবে। মনুষ্যত্বের পক্ষে, ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে ওরাই স্বর তুলবে। ইমামভাতা নয়, চাই আরও আধুনিক শিক্ষা, চাই আরও স্বাস্থ্য নিকেতন। কয়েক জন ধর্মগুরুর নির্দেশ এই বাংলার সমগ্র মুসলিম সমাজের কণ্ঠ নয়। ("ধর্মীয় মেরুকরনের সঙ্গে সঙ্গে সাংস্কৃতিক মেরুকরণও হচ্ছে। পশ্চিম বাংলাতে মুসলমান সমাজের অধিকাংশ বাঙালি। কিন্তু যে ইসলামিক আচার আমরা দেখি তা কিন্তু বাঙালি মুসলমানেরা পালন করেননা। বাঙালি হারিয়ে না যায়।" -- আরিফ আহমেদ।)

এক ক্রান্তিকারী সময়ে বসে আছি। আগের সরকারের অবিমৃষ্যকারিতার ফল ভালোমন্দ মিশিয়ে ভোগ করছি, কিন্তু এই সরকারের অবিমৃষ্যকারিতার ফল আরও খারাপ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। কী করতে পারি আমরা ?

মনুষ্যত্ববোধের অহংকার মানুষকে প্ররোচিত করে যে কোনও রকমের ভাঙন, যা তার এবং তার প্রজাতির অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তুলতে পারে – তার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে। বিভিন্ন জনের ক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়া বিভিন্ন হয়। কেউ ওয়ার অ্যান্ড পিস লেখেন, কেউ কমোডে বসে মেঝেয়ে থুথু ফেলেন, কেউ গেয়ে ওঠে উই শ্যাল ওভারকাম, কেউ রিকশাওয়ালা পেটায়, কেউ ডেপুটেশন দেয়, কেউ পুলিশকে খিস্তি দেয়, আবার কোনও কবি বন্দুক হাতে গ্রানাডা পাহাড়ে চলে যান তবে সব কিছু এত সহজে হয় না। রক্তে বিরুদ্ধগতির প্রবাহও থাকে। অনেক প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীও পাকিস্তানের সঙ্গে খেলা থাকলে এক্সট্রা উত্তেজনায় জারিত হ’ন। কোথা থেকে আসে এই এক্সট্রা ? এও কভারেজ। রাষ্ট্র বা তার নিজের অস্তিত্বের সংকটের বিরুদ্ধে এক রকম ডিফেন্স মেকানিজম্‌। এক ধরণের পোকা আছে, বিপদ দেখলে দুর্গন্ধময় রস ছড়ায়।

মানুষ নামক জটিল প্রাণী অসীম অনন্ত এক রহস্যে মোড়া। আপাতভাবে মনে হয় শান্ত নদীর জল। কিন্তু অনেক চোরাপাথর, মগ্নমৈনাক থাকে জীবনের গভীরে। রহস্যের গোপন কন্দরে ডুবে থাকে সেই সব ডুবোপাহাড়। অসীম বিশ্বাস ও কোটি টাকার অহংকারী টাইটনিকও ডুবে যায় কত সহজে।

বয়স যখন সত্তরের দিকে ঢলে পড়েছে, যখন ভবিষ্যৎ বলে আর কোনও উজ্জ্বল আকাশ নেই, তখন বারে বারে পেছন ফিরে দেখা ছাড়া আর কিছু থাকে না। তবু বর্তমানও নাছোড়বান্দা নীল ডুমো মাছির মত বিনবিন করতে থাকে। লিখি, পুরনো দিনের কথা। আমার বাল্যের মহানন্দা, কৈশোরের শিলিগুড়ি, যৌবনের টালমাটাল সময়ের কথা। প্রথম প্রেমিকার অকাল-মৃত্যু ও এখনও তার স্বপ্নে আমার অশ্রুপাত।

“শিকড়ের ডানা হোক, ডানার শিকড়” --- হুয়ান রামোন হিমেনেথ।

(শেষ)

0 comments: