প্রবন্ধ - সব্যসাচী মজুমদার
Posted in প্রবন্ধবিগত শতকের নব্বই দশকের বহু বর্ণিল পরিস্থিতি বাংলা কবিতাকে ঐশ্বর্যময় করে তুলেছিল— আমাদের সন্দেহ নেই। একটি ঘটমান সময় যত কূট ও কৌণিক হবে, সেই সময়ের কবিতা ততই বহুস্তরিক হয়ে উঠবে— এ কথায় আমরা বিশেষ আপত্তি করব না যদি নব্বই দশকের বাংলা কবিতা প্রসঙ্গে আসে। এই নব্বই দশকের বাংলা কবিতা যখন আবহমান বাংলা কবিতার প্রেক্ষিতে আলোচিত হয়, যে গুটিকয়েক নাম আমাদের সম্মুখে প্রবল হয়ে ওঠে, তাঁদের মধ্যে নিঃসন্দেহে সব্যসাচী সরকার একজন অগ্রগণ্য। নব্বই দশকের প্রারম্ভ থেকে আমরা সব্যসাচীর কবিতা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। এবং আমরা এও জানি, বহুকৌণিক ও জাদু প্রবণতাময় সব্যসাচীর কবিতা আমাদের এমন একটি ভাষাগত ব্যঞ্জনার অভিজ্ঞতা দেয়, যা বাংলা কবিতায় ইতিপূর্বে বিশেষ সচরাচর নয়।
সম্প্রতি সব্যসাচী সরকারের শ্রেষ্ঠ কবিতা পাঠের সুযোগ হল। একসঙ্গে দুই মলাটের ভেতর কবিকে পড়তে পেরে একটি সময় ও তার প্রবণতা এবং কাব্যিক পরিশুদ্ধির একটি বিস্তারিত পাঠ পাওয়া গেল। বস্তুত, বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চিহ্নকে সব্যসাচী কিভাবে গড়ে তুলেছেন এবং বিনির্মাণের দিকে নিয়ে গিয়েছেন, তার একটি সম্যক ধারণা পাওয়া যায়। এ প্রসঙ্গে বিস্তারিত প্রবেশের আগে সব্যসাচী সরকারের কাব্যগুলিকে দেখে নেওয়া যাক— শুধু উইকেট বোঝে, সচিন ক্রিজে আয়, জোকার ও ডাইনির স্ক্রিনসেভার, ভাঙা খেলার পাসওয়ার্ড।
মাত্র চারটি কাব্যগ্রন্থেই সব্যসাচী সরকার একটি স্বতন্ত্র পরিবেশ গড়ে তুলতে পেরেছেন বলে যে বিশ্বাস জন্মায়— সে সম্পর্কে আলোচনার প্রয়োজন আছে। নব্বই দশকের মনস্তত্ত্বকে যে উদারীকরণের বিবিধ উপাদান প্রভাবিত করেছে। তারমধ্যে ক্রিকেট অবশ্যই। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর আগ্রহটা অবশ্যই বেড়েছিল, কিন্তু বিস্তার ঘটল কেবল টিভি আসার পর। চাক্ষুষ দেখার অভিঘাত ক্রিকেটকে এতটাই ছড়িয়ে দিল প্রান্ত বাংলাতেও যে, ফুটবল একটি বিগত শিল্পক্ষেত্র হয়ে দাঁড়াল। টাকা, বিশ্বচ্যাম্পিয়নের সম্মান আর সচিন তেন্ডুলকর। ভারত হয়ে গেল ক্রিকেটের। কিন্তু, তার এই উত্থানের পেছনে যে সামাজিক কূট কাজ করেছেন, সব্যসাচী সম্যক বুঝেছিলেন। এবং হয়তো এ কারণেই ক্রিকেট ব্যবহৃত হল সব্যসাচীর কবিতায়। কিন্তু, রূপক হিসেবে। বহিরঙ্গ হিসেবে। একটা বক্র দৃষ্টির তাগিদে। কিন্তু, এ রূপক ভাঙলে মনে হয়, আমরা একটা ক্রান্তিকালের ছবিকে দেখতে পাই। একটা ভাঙতে ভাঙতে নতুন হতে থাকা সময়ের প্রতি কবির শ্লেষ এবং আশ্লেষকে স্পর্শ করতে পারি। এবং এই সূত্রে আমরা এ কথাও বলতে পারি, ক্রিকেটের চিহ্নকে মাধ্যম করে সব্যসাচী সরকার ম্যাজিক রিয়ালিটির ব্যবহার করেছেন। এ প্রসঙ্গে আমাদের একটি উদাহরণ প্রয়োজনীয়,
ক্রিকেট
কেউ ক্রিজে থাকতে দেবে না?
পায়ে লাগেইনি, অমুকদা এসে এল বি দিয়ে দিচ্ছে-ব্যাটে বলই লাগল না অমুকদা এসে বলে দিল কট বিহাইন্ড-কী চোট্টামি, কী চোট্টামি!
পরপর সাতদিন এক বলে আউট হওয়া লোকের দুঃখ শুধু উইকেট বোঝে। সশব্দে ভেঙে যায়, প্রতিবাদ করে।
তীর্যক ও বহু কৌণিক শ্লেষে সব্যসাচী আমাদের সমসময়কে দেখেন, ব্যখ্যা করেন এবং তারপর পৌঁছে এমন একটি পরিস্থিতিতে যেখানে আমরা একটি মানুষের ভেতর থেকে বিভিন্ন মানুষ বের হয়ে আসতে দেখি, " এখনও খোঁচা দাওনি? এখনও ক্রিজে?/ তাহলে চায়ের পরে আসতে চলেছে লুজ বল, / ছাদের ঘরে? সিঁড়ির কোণ ? শোবার ঘর ?/ হাতে হাত, তবু ব্যাটিং সাঁইত্রিশ?"( ইনিংস)। কেবল শ্লেষ এবং তীর্যক নেত্রপাতেই শেষ হয়ে যায় না সব্যসাচীর কবিতা। কেবল আত্মধিক্কারের ভেতরেই পরিশুদ্ধি পায় না সব্যসাচীর কবিতা। বরং সময়ের ভেতর থেকে আরেকটা সময়কে বের করে আনে ওঁর রচনা। এমন একটা সময় যা উদ্ভট, আপাত অসংলগ্ন এবং যাকে আমরা জাদু বাস্তবতা বলে চিনতে পছন্দ করব।
দেখুন, জাদু বাস্তবতা কাকে বলে? মোটামুটি আমরা জানি। একটি ঘটনা পরম্পরার অভ্যন্তরীণ কিছু পরম্পরাকে সরিয়ে দিয়ে একটা আকস্মিকতা নির্মাণ। যেমন আমরা টুপির ভেতর থেকে খরগোশ বের করে দেখালাম। কিন্তু মাঝখানে টুপির ভেতর ছেদ করা, গর্ত করা টেবিলে তাকে দাঁড় করানো। নীচ থেকে সহযোগির খরগোশ ঢুকিয়ে দেওয়া — এগুলো দর্শককে দেখালাম না। দর্শক কেবল টুপির ভেতর থেকে খরগোশ বের হয়ে আসতে দেখে অভিভূত হলেন। এরকম। আমাদের সাহিত্যে জাদু বাস্তবতার সঞ্চার সবসময় ছিল। কিন্তু বিচ্ছিন্ন ভাবে। সেই রূপকথার প্রহর থেকে তার যাত্রা। এখন, আমার মনে হয় বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে সচেতনভাবে জাদু বাস্তবতার চর্চা শুরু হয় নব্বই দশক থেকে। আমরা যদি লাতিন আমেরিকার জাদু বাস্তবতার কথা ভাবি, দেখব সেখানে জাদু বাস্তবতার উদ্ভব বিপ্লবের প্ররোচনায় বর্ম নির্মাণের তাগিদে। আমার মনে হয়, গত শতকের নব্বইয়ের বাঙালি কবিরা এরকম একটা বর্ম গড়ে তুলেছিলেন। এবং সেই জাদু বাস্তবতা বস্তুত মার্কেজ কথিত দেশ ও ভূগোল সাপেক্ষে গড়ে ওঠা জাদু বাস্তবতা বলেই ধারণা হয়। সব্যসাচী সরকার বাংলা কবিতার জাদু বাস্তবতা চর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ চিহ্ন বলেই একইসঙ্গে অনুমান করি, " জোকারের চাহনিতে কেঁপে যায় বুক। / তাসের দেশের ফাঁকে চোখ মারে সে। পিঠে রাখে হাত।/ খাদের ধারে দাঁড়িয়ে আমার চুলের মুঠিটা ধরে / কিছুটা নাড়ায়। কিন্তু ফেলে না। শূন্যে ঝুলিয়ে রাখে। ছটফট করতে করতে/ খুনখারাপি রঙের স্ক্রিনসেভারে ফিরতে চাই আমি ।/ কিন্তু পারি না।/ হাজার/ হাজার তাস গলা টিপে ধরে। "( লকডাউনে জোকারের সঙ্গে কথোপকথন)।
বস্তুত বহুগামী ও বহুস্তরিক মানব চরিত্র প্রতি মুহূর্তে নিজেকে প্রজ্ঞায় ও অপরাধে নিজেকে জারিত করছে বদলে ফেলছে। আর এই বদলের অভিঘাত আমাদের নিজেদের কাছে নিজেদের অপরিচিত, উদ্ভট করে তুলছে। বদলের দ্রুতি আমাদের হতচকিত করে দিচ্ছে। সব্যসাচী সেই হতচকিত, বিমূঢ় দৃষ্টিকে ব্যবহার করে কবিতার আবহাওয়ায় তৈরি করেছেন সেইসব ছবি যা আমরা আমাদের গূঢ় স্বপ্নে অথবা বহু বাসনার গুপ্ত কক্ষে লালন করি, লুকিয়ে রাখি,
"প্ল্যাটফর্মের ধারে বসে চায়ে ডুবিয়ে পাঁউরুটি খাচ্ছিল দুঃখ, একটু দূরে ট্রেন থেকে নামল বিচ্ছেদ, একটা বেঞ্চে এসে বসল। ধরাল সিগারেট।
বিকেলের মরা আলো এসে ওর গায়ে পড়ল টর্চের মতো।
অভিমান রেললাইনের পাশে সরু রাস্তা দিয়ে চলে যাচ্ছে সাইকেল চালিয়ে, কাঁকুরে পথ পেরিয়ে-এই তিনজনকেই আমি বসে বসে সন্তর্পণে লক্ষ করছিলাম, ভাবছিলাম, কোনো-না-কোনো দিন, এদের মধ্যে একজন-না-একজন, একটা উপন্যাস লিখবে, যার উৎসর্গে থাকবে, 'ট্রেন চলে গেলেও যে লোকটা প্ল্যাটফর্মেই ছিল...''
আমরা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষ করেছি সব্যসাচী সরকারের কবিতা প্রসঙ্গে। সময়ের প্রতিটি চিহ্নকে ধারণ করেন সব্যসাচী। এমন কিছু চিহ্ন যারা আমাদের মুক্ত পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ বিবর্তনগুলিকে সূচিত করে, দেখায় বিগত পৃথিবীর অনতি ইতিহাসের ঘটনাক্রমগুলিকে। এটি নব্বই দশকের অন্যতম বৈশিষ্ট বলেই মনে হয়। এবং এ কথাও বলতে আমাদের আপত্তি হবে না যে, নব্বইয়ের এই বৈশিষ্টের কারণেই বাংলা শব্দভাণ্ডারে এমন কিছু শব্দ প্রবেশ করেছে যারা ইতিপূর্বে আমাদের অপরিচিত ছিল। বাংলা ভাষার অঙ্গরাগ নির্মাণের ক্ষেত্রে এই সময়ের কবিতার ভূমিকা আমরা অস্বীকার করতে পারি না,
"বেরিয়েছে? ডাউনটাউন ছেড়ে শহরতলিতে? নাছোড়বান্দা কোনো নতুন প্রেমিক? তারপরে ডিনার শেষে আইসক্রিমের খোঁজে? কীভাবে ফিরতে পারে? উবার ধরবে? কিংবা হলুদ ট্যাক্সি?'( লকডাউনে জোকারের সঙ্গে কথোপকথন)
'ডাউনটাউন' থেকে 'হলুদ ট্যাক্সি' আমাদের জীবনে ছিল এতদিন, কিন্তু ভাষায় ছিল না। এই দুরূহ কাজটি সম্পন্ন করে আমাদের কৃতজ্ঞতা ভাজন হয়েছে এই সময় ও সব্যসাচীর কবিতা।
ছন্দের বিবিধ রূপে অনায়াস গতি সব্যসাচী সরকার অন্তর্ঘাত তৈরি করেছেন তাঁর কাব্যে। কখনও স্পর্শকারতাময়, সোচ্চার। কখনও নিভৃত, ইঙ্গিতময়। তীর্যক অথচ প্রসন্ন। বিমর্ষ কিন্তু বিষাদগ্রস্ত নন। সময়ের অন্তরাল থেকে উঠে আসা মানুষের এক বহুমাত্রিক রূপকে লিখেছেন সব্যসাচী। লিখেছেন এমন একটি ভাষায়, যে ভাষা বিবর্তনময় এবং জাদুর প্রস্তাবনা তৈরি করে। যে প্রস্তাবনার ভেতর আমাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চরিত্র স্পষ্ট হয়েছে। স্পষ্ট হয়েছে এমন একটা সময়ের চরিত্র যে যুগপৎ লড়ছে ও আত্মসমর্পণ করছে মুক্ত পৃথিবীতে। এই যুগল দ্বন্দ্বেই সিদ্ধি পায় সব্যসাচী সরকারের কবিতা।
বস্তুত 'শ্রেষ্ঠ কবিতা' সব্যসাচী সরকারের কেবল নয় বাংলা ভাষার কবিতার বিবর্তনের ধারাবাহিকতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ চিহ্ন বলেই ধারণা হয়। সন্দেহ নেই এই বই কৌতুহলী পাঠক, কবিতা কর্মী এবং একইসঙ্গে গবেষকের আগ্রহ ও সংগ্রহের বিষয় হয়ে উঠবে,
"ভালোবাসা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য/একটা দু'লাইনের টেক্সটই যথেষ্ট।/সেই দু'লাইনই টিউবের ভিতর থেকে বেরোনো টুথপেস্ট,/যা আর কখনও ফিরবে না।/ঠিক যেমন ফিরবে না মায়ের মৃত্যুদিন,/যেদিন মুখাগ্নির মুহূর্তে/ আমি শিখেছিলাম অনিশ্চয়তা,/যা কোনওদিন আমাকে সরলরেখার দিকে,/ এগিয়ে দিল না..."( মুখাগ্নি)
শ্রেষ্ঠ কবিতা : সব্যসাচী সরকার : বান্ধবনগর : প্রচ্ছদ— ধৃতিরূপা দাস : ২৫০ টাকা








.jpeg)
.png)
.jpg)





