Next
Previous
Showing posts with label প্রবন্ধ. Show all posts
0

প্রবন্ধ - সব্যসাচী মজুমদার

Posted in









বিগত শতকের নব্বই দশকের বহু বর্ণিল পরিস্থিতি বাংলা কবিতাকে ঐশ্বর্যময় করে তুলেছিল— আমাদের সন্দেহ নেই। একটি ঘটমান সময় যত কূট ও কৌণিক হবে, সেই সময়ের কবিতা তত‌ই বহুস্তরিক হয়ে উঠবে— এ কথায় আমরা বিশেষ আপত্তি করব না যদি নব্বই দশকের বাংলা কবিতা প্রসঙ্গে আসে। এই নব্বই দশকের বাংলা কবিতা যখন আবহমান বাংলা কবিতার প্রেক্ষিতে আলোচিত হয়, যে গুটিকয়েক নাম আমাদের সম্মুখে প্রবল হয়ে ওঠে, তাঁদের মধ্যে নিঃসন্দেহে সব্যসাচী সরকার একজন অগ্রগণ্য। নব্বই দশকের প্রারম্ভ থেকে আমরা সব্যসাচীর কবিতা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। এবং আমরা এও জানি, বহুকৌণিক ও জাদু প্রবণতাময় সব্যসাচীর কবিতা আমাদের এমন একটি ভাষাগত ব্যঞ্জনার অভিজ্ঞতা দেয়, যা বাংলা কবিতায় ইতিপূর্বে বিশেষ সচরাচর নয়।

সম্প্রতি সব্যসাচী সরকারের শ্রেষ্ঠ কবিতা পাঠের সুযোগ হল। একসঙ্গে দুই মলাটের ভেতর কবিকে পড়তে পেরে একটি সময় ও তার প্রবণতা এবং কাব্যিক পরিশুদ্ধির একটি বিস্তারিত পাঠ পাওয়া গেল। বস্তুত, বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চিহ্নকে সব্যসাচী কিভাবে গড়ে তুলেছেন এবং বিনির্মাণের দিকে নিয়ে গিয়েছেন, তার একটি সম্যক ধারণা পাওয়া যায়। এ প্রসঙ্গে বিস্তারিত প্রবেশের আগে সব্যসাচী সরকারের কাব্যগুলিকে দেখে নেওয়া যাক— শুধু উইকেট বোঝে, সচিন ক্রিজে আয়, জোকার ও ডাইনির স্ক্রিনসেভার, ভাঙা খেলার পাসওয়ার্ড।

মাত্র চারটি কাব্যগ্রন্থেই সব্যসাচী সরকার একটি স্বতন্ত্র পরিবেশ গড়ে তুলতে পেরেছেন বলে যে বিশ্বাস জন্মায়— সে সম্পর্কে আলোচনার প্রয়োজন আছে। নব্বই দশকের মনস্তত্ত্বকে যে উদারীকরণের বিবিধ উপাদান প্রভাবিত করেছে। তারমধ্যে ক্রিকেট অবশ্যই। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হ‌ওয়ার পর আগ্রহটা অবশ্যই বেড়েছিল, কিন্তু বিস্তার ঘটল কেবল টিভি আসার পর। চাক্ষুষ দেখার অভিঘাত ক্রিকেটকে এতটাই ছড়িয়ে দিল প্রান্ত বাংলাতেও যে, ফুটবল একটি বিগত শিল্পক্ষেত্র হয়ে দাঁড়াল। টাকা, বিশ্বচ্যাম্পিয়নের সম্মান আর সচিন তেন্ডুলকর। ভারত হয়ে গেল ক্রিকেটের। কিন্তু, তার এই উত্থানের পেছনে যে সামাজিক কূট কাজ করেছেন, সব্যসাচী সম্যক বুঝেছিলেন। এবং হয়তো এ কারণেই ক্রিকেট ব্যবহৃত হল সব্যসাচীর কবিতায়। কিন্তু, রূপক হিসেবে। বহিরঙ্গ হিসেবে। একটা বক্র দৃষ্টির তাগিদে। কিন্তু, এ রূপক ভাঙলে মনে হয়, আমরা একটা ক্রান্তিকালের ছবিকে দেখতে পাই। একটা ভাঙতে ভাঙতে নতুন হতে থাকা সময়ের প্রতি কবির শ্লেষ এবং আশ্লেষকে স্পর্শ করতে পারি। এবং এই সূত্রে আমরা এ কথাও বলতে পারি, ক্রিকেটের চিহ্নকে মাধ্যম করে সব্যসাচী সরকার ম্যাজিক রিয়ালিটির ব্যবহার করেছেন। এ প্রসঙ্গে আমাদের একটি উদাহরণ প্রয়োজনীয়,


ক্রিকেট


কেউ ক্রিজে থাকতে দেবে না?


পায়ে লাগেইনি, অমুকদা এসে এল বি দিয়ে দিচ্ছে-ব্যাটে বলই লাগল না অমুকদা এসে বলে দিল কট বিহাইন্ড-কী চোট্টামি, কী চোট্টামি!


পরপর সাতদিন এক বলে আউট হওয়া লোকের দুঃখ শুধু উইকেট বোঝে। সশব্দে ভেঙে যায়, প্রতিবাদ করে।


তীর্যক ও বহু কৌণিক শ্লেষে সব্যসাচী আমাদের সমসময়কে দেখেন, ব্যখ্যা করেন এবং তারপর পৌঁছে এমন একটি পরিস্থিতিতে যেখানে আমরা একটি মানুষের ভেতর থেকে বিভিন্ন মানুষ বের হয়ে আসতে দেখি, " এখনও খোঁচা দাওনি? এখনও ক্রিজে?/ তাহলে চায়ের পরে আসতে চলেছে লুজ বল, / ছাদের ঘরে? সিঁড়ির কোণ ? শোবার ঘর ?/ হাতে হাত, তবু ব্যাটিং সাঁইত্রিশ?"( ইনিংস)। কেবল শ্লেষ এবং তীর্যক নেত্রপাতেই শেষ হয়ে যায় না সব্যসাচীর কবিতা। কেবল আত্মধিক্কারের ভেতরেই পরিশুদ্ধি পায় না সব্যসাচীর কবিতা। বরং সময়ের ভেতর থেকে আরেকটা সময়কে বের করে আনে ওঁর রচনা। এমন একটা সময় যা উদ্ভট, আপাত অসংলগ্ন এবং যাকে আমরা জাদু বাস্তবতা বলে চিনতে পছন্দ করব।

দেখুন, জাদু বাস্তবতা কাকে বলে? মোটামুটি আমরা জানি। একটি ঘটনা পরম্পরার অভ্যন্তরীণ কিছু পরম্পরাকে সরিয়ে দিয়ে একটা আকস্মিকতা নির্মাণ। যেমন আমরা টুপির ভেতর থেকে খরগোশ বের করে দেখালাম। কিন্তু মাঝখানে টুপির ভেতর ছেদ করা, গর্ত করা টেবিলে তাকে দাঁড় করানো। নীচ থেকে সহযোগির খরগোশ ঢুকিয়ে দেওয়া — এগুলো দর্শককে দেখালাম না। দর্শক কেবল টুপির ভেতর থেকে খরগোশ বের হয়ে আসতে দেখে অভিভূত হলেন। এরকম। আমাদের সাহিত্যে জাদু বাস্তবতার সঞ্চার সবসময় ছিল। কিন্তু বিচ্ছিন্ন ভাবে। সেই রূপকথার প্রহর থেকে তার যাত্রা। এখন, আমার মনে হয় বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে সচেতনভাবে জাদু বাস্তবতার চর্চা শুরু হয় নব্বই দশক থেকে। আমরা যদি লাতিন আমেরিকার জাদু বাস্তবতার কথা ভাবি, দেখব সেখানে জাদু বাস্তবতার উদ্ভব বিপ্লবের প্ররোচনায় বর্ম নির্মাণের তাগিদে। আমার মনে হয়, গত শতকের নব্বইয়ের বাঙালি কবিরা এরকম একটা বর্ম গড়ে তুলেছিলেন। এবং সেই জাদু বাস্তবতা বস্তুত মার্কেজ কথিত দেশ ও ভূগোল সাপেক্ষে গড়ে ওঠা জাদু বাস্তবতা বলেই ধারণা হয়। সব্যসাচী সরকার বাংলা কবিতার জাদু বাস্তবতা চর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ চিহ্ন বলেই এক‌ইসঙ্গে অনুমান করি, " জোকারের চাহনিতে কেঁপে যায় বুক। / তাসের দেশের ফাঁকে চোখ মারে সে। পিঠে রাখে হাত।/ খাদের ধারে দাঁড়িয়ে আমার চুলের মুঠিটা ধরে / কিছুটা নাড়ায়। কিন্তু ফেলে না। শূন্যে ঝুলিয়ে রাখে। ছটফট করতে করতে/ খুনখারাপি রঙের স্ক্রিনসেভারে ফিরতে চাই আমি ।/ কিন্তু পারি না।/ হাজার/ হাজার তাস গলা টিপে ধরে। "( লকডাউনে জোকারের সঙ্গে কথোপকথন)।
বস্তুত বহুগামী ও বহুস্তরিক মানব চরিত্র প্রতি মুহূর্তে নিজেকে প্রজ্ঞায় ও অপরাধে নিজেকে জারিত করছে বদলে ফেলছে। আর এই বদলের অভিঘাত আমাদের নিজেদের কাছে নিজেদের অপরিচিত, উদ্ভট করে তুলছে। বদলের দ্রুতি আমাদের হতচকিত করে দিচ্ছে। সব্যসাচী সেই হতচকিত, বিমূঢ় দৃষ্টিকে ব্যবহার করে কবিতার আবহাওয়ায় তৈরি করেছেন সেইসব ছবি যা আমরা আমাদের গূঢ় স্বপ্নে অথবা বহু বাসনার গুপ্ত কক্ষে লালন করি, লুকিয়ে রাখি,

"প্ল্যাটফর্মের ধারে বসে চায়ে ডুবিয়ে পাঁউরুটি খাচ্ছিল দুঃখ, একটু দূরে ট্রেন থেকে নামল বিচ্ছেদ, একটা বেঞ্চে এসে বসল। ধরাল সিগারেট।

বিকেলের মরা আলো এসে ওর গায়ে পড়ল টর্চের মতো।

অভিমান রেললাইনের পাশে সরু রাস্তা দিয়ে চলে যাচ্ছে সাইকেল চালিয়ে, কাঁকুরে পথ পেরিয়ে-এই তিনজনকেই আমি বসে বসে সন্তর্পণে লক্ষ করছিলাম, ভাবছিলাম, কোনো-না-কোনো দিন, এদের মধ্যে একজন-না-একজন, একটা উপন্যাস লিখবে, যার উৎসর্গে থাকবে, 'ট্রেন চলে গেলেও যে লোকটা প্ল্যাটফর্মেই ছিল...''

আমরা আর‌ও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষ করেছি সব্যসাচী সরকারের কবিতা প্রসঙ্গে। সময়ের প্রতিটি চিহ্নকে ধারণ করেন সব্যসাচী। এমন কিছু চিহ্ন যারা আমাদের মুক্ত পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ বিবর্তনগুলিকে সূচিত করে, দেখায় বিগত পৃথিবীর অনতি ইতিহাসের ঘটনাক্রমগুলিকে। এটি নব্বই দশকের অন্যতম বৈশিষ্ট বলেই মনে হয়। এবং এ কথাও বলতে আমাদের আপত্তি হবে না যে, নব্বইয়ের এই বৈশিষ্টের কারণেই বাংলা শব্দভাণ্ডারে এমন কিছু শব্দ প্রবেশ করেছে যারা ইতিপূর্বে আমাদের অপরিচিত ছিল। বাংলা ভাষার অঙ্গরাগ নির্মাণের ক্ষেত্রে এই সময়ের কবিতার ভূমিকা আমরা অস্বীকার করতে পারি না,

"বেরিয়েছে? ডাউনটাউন ছেড়ে শহরতলিতে? নাছোড়বান্দা কোনো নতুন প্রেমিক? তারপরে ডিনার শেষে আইসক্রিমের খোঁজে? কীভাবে ফিরতে পারে? উবার ধরবে? কিংবা হলুদ ট্যাক্সি?'( লকডাউনে জোকারের সঙ্গে কথোপকথন)

'ডাউনটাউন' থেকে 'হলুদ ট্যাক্সি' আমাদের জীবনে ছিল এতদিন, কিন্তু ভাষায় ছিল না। এই দুরূহ কাজটি সম্পন্ন করে আমাদের কৃতজ্ঞতা ভাজন হয়েছে এই সময় ও সব্যসাচীর কবিতা।

ছন্দের বিবিধ রূপে অনায়াস গতি সব্যসাচী সরকার অন্তর্ঘাত তৈরি করেছেন তাঁর কাব্যে। কখনও স্পর্শকারতাময়, সোচ্চার। কখনও নিভৃত, ইঙ্গিতময়। তীর্যক অথচ প্রসন্ন। বিমর্ষ কিন্তু বিষাদগ্রস্ত নন। সময়ের অন্তরাল থেকে উঠে আসা মানুষের এক বহুমাত্রিক রূপকে লিখেছেন সব্যসাচী। লিখেছেন এমন একটি ভাষায়, যে ভাষা বিবর্তনময় এবং জাদুর প্রস্তাবনা তৈরি করে। যে প্রস্তাবনার ভেতর আমাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চরিত্র স্পষ্ট হয়েছে। স্পষ্ট হয়েছে এমন একটা সময়ের চরিত্র যে যুগপৎ লড়ছে ও আত্মসমর্পণ করছে মুক্ত পৃথিবীতে। এই যুগল দ্বন্দ্বেই সিদ্ধি পায় সব্যসাচী সরকারের কবিতা।

বস্তুত 'শ্রেষ্ঠ কবিতা' সব্যসাচী সরকারের কেবল নয় বাংলা ভাষার কবিতার বিবর্তনের ধারাবাহিকতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ চিহ্ন বলেই ধারণা হয়। সন্দেহ নেই এই ব‌ই কৌতুহলী পাঠক, কবিতা কর্মী এবং এক‌ইসঙ্গে গবেষকের আগ্রহ ও সংগ্রহের বিষয় হয়ে উঠবে,
"ভালোবাসা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য/একটা দু'লাইনের টেক্সটই যথেষ্ট।/সেই দু'লাইনই টিউবের ভিতর থেকে বেরোনো টুথপেস্ট,/যা আর কখনও ফিরবে না।/ঠিক যেমন ফিরবে না মায়ের মৃত্যুদিন,/যেদিন মুখাগ্নির মুহূর্তে/ আমি শিখেছিলাম অনিশ্চয়তা,/যা কোনওদিন আমাকে সরলরেখার দিকে,/ এগিয়ে দিল না..."( মুখাগ্নি)


শ্রেষ্ঠ কবিতা : সব্যসাচী সরকার : বান্ধবনগর : প্রচ্ছদ— ধৃতিরূপা দাস : ২৫০ টাকা










0

প্রবন্ধ - সমরেন্দ্র বিশ্বাস

Posted in










কেমন আছে কাশ্মীরের মানুষ? সেখানেও তো কবিতা লেখা হয়? কেমন আছে কাশ্মীরের কবিতা?

বিভিন্ন সময়ে কবিদের কবিতাতে উঠে এসেছে কাশ্মীরের দৈনন্দিন জীবন, তাদের ভূখন্ড ও সমাজ। কবির কলম ও কাগজের পৃষ্ঠায় কাশ্মীরকে এক ঝলক বুঝে নেয়ার প্রচেষ্টা, তারই জন্যে এই লেখাটা।

ভূসর্গ কাশ্মীর। এখানকার কবি অগ্নিশেখর লেখেন –

‘দেবদারু গাছে বসে কাক কাঁদে

আর ছাদ বেয়ে এখনো গড়িয়ে পড়ে গ্লেশিয়ার …

প্রচুর মাত্রায় এখনো পড়ে বরফ

ঠিক ছোট্ট বেলার মতোই

শুধু আমরাই আর আগের মতো রইলাম না’ [ বরফ / অগ্নিশেখর।]

এই কবিতায় উঠে আসে ভূস্বর্গ কাশ্মীরের খন্ডচিত্র, সেই সাথে কোথাও যেন লুকিয়ে থাকে কবির একটা দীর্ঘশ্বাস। কেন এই দীর্ঘশ্বাস? সে কি জীবনের নিরাপত্তাহীনতা? প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, কবি অগ্নিশেখরে কাশ্মীরেরই কবি, সেখানেই তার জন্ম ১৯৫৬ সালে।

কবি অগ্নিশেখরের কবিতার পরবর্তী লাইনগুলোতে কিছুটা খুঁজে পাই এই নিরাপত্তাহীনতার কিছু ইঙ্গিত।

‘আমি হব্বা কদল সেতু থেকে দেখলাম

ঝিলম নদীকে …

ঝিলমকে দেখে আমার ঠিক মনে হয়

সে পাকিস্থানি গুপ্তচর

আমি আমার গলায় পরা পৈতে

জামার ভেতরে লুকিয়ে চটপট

ঘরে ফিরে এলাম

আর ঘুমন্ত অবস্থায় অনুভব করলাম

মাটি সরে যাচ্ছে।’ [ দেবদারুর একখানা চিঠি / অগ্নিশেখর।]

দেশের ভেতরকার ধর্মীয় অসংবেদনশীলতা! সীমান্তবর্তী পাকিস্থানের থেকে নেমে আসা আক্রমণ। এসব সত্ত্বেও হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে, আমার মনে হয়, কাশ্মীরের সাধারণ মানুষ শান্তির স্বপক্ষে, তারা পাশাপাশি মিলেমিশে ঘর বেঁধে থাকতে চায়।

২০২৫ এর এপ্রিলে সন্ত্রাসবাদীদের হামলায় প্রাণ হরালো কাশ্মীরের পহেলগাঁওতে ঘুরতে যাওয়া কিছু ট্যারিষ্ট মানুষ। ব্যাথায় আর্তনাদে রক্তাক্ত পড়ে রইলো ভূস্বর্গের মাটি। যারা সন্ত্রাসবাদী, তারা কি এ দেশের, না কি তারা পাকিস্থানের বর্ডার পেরিয়ে এসেছে?

অথচ এই ঘটনার পূর্ববর্তী সময়ে লেখা কাশ্মীরের কবিদের লেখা কিছু কবিতা আমার সামনে। যা কিনা বিভিন্ন কবির লেখা কাশ্মীরের কবিতার একটা বাংলা অনুবাদ সংকলন। [সূত্র – ১]

এই সংকলনে বসরত পীর-এর লেখা একটা কবিতার বিবরণ পড়ে যে কেউই থমকে যাবে - শ্রীনগর একটি বাঙ্কারের শহর। বিশ্বের শহরগুলির মধ্যে সর্বাধিক সামরিক উপস্থিতি রয়েছে এখানে। প্রায় দেড় দশক ধরে এই শহরের রাতগুলো কার্ফুতে হারিয়ে গিয়েছিল!

তারই লেখা Curfewed Night বই থেকে অনুদিত অংশের বিবরণে দেখি মধ্য-শ্রীনগরের হাব্বাকাদাল অঞ্চল সম্পর্কে কিছু উক্তি। এই অঞ্চল সম্পর্কে বলা হয়েছে – এখানে দেখার কিছুই নেই, এটি এখন একটি ধ্বংসাবশেষ। রাস্তা দিয়ে নেমে যান, আপনি কিছু পোড়া ঘর-বাড়ি দেখতে পাবেন। [সূত্র – ১]

সত্যিই কি ভূসর্গ কাশ্মীরের আজ এমনই একটা অবস্থা? কেন এমন অবস্থাটা হলো, কেন তিনি এমনটা লিখলেন?



পুরাণো ইতিহাসের দিকে একবার ফিরে দেখা যাক।

কাশ্মীরে একসময়ে ব্রাম্মণ্যবাদ ও বৌদ্ধবাদ প্রচলিত ছিল। ক্রমান্বয়ে কাশ্মীরে বৌদ্ধধর্মের প্রবেশ ঘটে। সম্রাট অশোকের মৃত্যুর পর শৈবধর্মের প্রচার শুরু হয়। কাশ্মীরে ইসলাম ধর্মের আগমণ বিভিন্ন সূফী ও পীরদের মাধ্যমে। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা যখন বিদায় নিচ্ছিল, তখন ভারতবর্ষের তিনটি দেশ (যথা - হায়দ্রাবাদ, জুনগর এবং জম্মু ও কাশ্মীর) স্বাধীন থাকতে চেয়েছিল – তখন কাশ্মীরের জনসংখ্যায় মুসলমানরা ছিল সংখ্যা গরিষ্ঠ, কিন্তু রাজা ছিল হিন্দু, হরি সিং। শুরুতে তিনিও স্বাধীন থাকতে চেয়েছিলেন এবং একই সঙ্গে নেহেরু ও জিন্নাহর সাহায্য চেয়ে দরবারও করেছিলেন। এদিকে দেশভাগের ফলে দুটি নতুন দেশের জন্ম হলে বিভিন্ন অঞ্চলে মুসলিম শিখ হিন্দুদের মধ্যে দাঙ্গার সৃষ্টি হলো। কাশ্মীরে একই পরিস্থিতি তৈরি হলে, মুসলিমরা পাকিস্থানে পলায়ন করতে থাকে। এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে পাকিস্থান কাশ্মীরে সেনাবাহিনীকে প্রেরণ করে। বাহিনীর আক্রমণে কাশ্মীরের অধিকাংশ অঞ্চল রাজার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। তারই প্রতিক্রিয়ায় মহারাজ হরি সিং ভারতের সাহায্য প্রার্থনা করলে, ভারত সরকার তাদের সঙ্গে কাশ্মীরের যুক্ত হবার শর্ত দেয় এবং রাজা হরি সিং তা মেনে নেয়। সেই থেকে কাশ্মীর নিয়ে ভারত-পাকিস্থান টেনশন অব্যহত। কাশ্মীরকে পাকিস্থানের অন্তর্ভূক্ত করার জন্যে জঙ্গী সংগঠনগুলো সচেষ্ট। এই পরিপ্রেক্ষিতে বিপর্যস্ত সেখানকার সমাজ ও সাহিত্য। কাশ্মীরের কবিতাতেও দেখি তার প্রতিফলন। [সূত্র - ৩ / পুস্তকের ভূমিকা – বিতস্তা ঘোষাল]

কবি আগা শাহিদ আলি ‘বিদায়বার্তা’ কবিতায় লেখেন – ‘আমি স্বর্গের মধ্য দিয়ে বয়ে চলেছি নরকের নদী বেয়ে …’ কিংবা ‘ওরা একটা করে বসতকে শ্মশান বানায় আর তার নাম দেয় শান্তি।’ এই লাইন দুটোই মনকে নাড়া দিয়ে যায়। এই কবিতাতেই তার লেখা আরও দুটো লাইন – ‘হ্রদের জলে মন্দির আর মসজিদের হাতগুলো একে অপরের / প্রতিবিম্বকে আঁকড়ে ধরে আছে’। মন্দির আর মসজিদের এই হাত ধরাধরি করে থাকার মধ্যে আমরা একটা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ইঙ্গিত পাই। এই সিদ্ধান্তে আমাদেরকে আসতে হয় – সব মানুষেরা সবসময়ে ধর্মান্ধ হয় না!

‘হিস্টিরিয়া’ কবিতায় মারিয়াম আলা আমজাদি যে ছবি আঁকেন, তা আতঙ্ক ও বিভীষিকার। এখানে জন্মগত প্রতিরোধের কথাও উঠে আসে।

‘জমিন আঁকড়ে পড়ে থাকো কাশ্মীর

আতঙ্ক আর বিভীষিকা

তোমার প্রতিদিনের দোস্ত

এমনকী মায়ের পেট থেকে পড়েই

নাদান শিশুরাও জেনে গেছে কীভাবে চিৎকার করতে হয়’

‘শব ও সরোবর’ কবিতায় কবি সাবির ‘আজার’ লেখেন -

‘সরোবরের আয়নায়

কী দেখা উচিত আমার ...?

জলের গভীর থেকে

অচেনার মতো এক শব

চেয়ে থাকে

অপলক ...’

মর্মান্তিক কাব্যময় কবিতা! সরোবরের আয়নায় আকাশ নয়, জলজ জীবন নয়, সেখানে দেখা যাচ্ছে ‘শবদেহ’! মর্মস্পর্শী ও করুণ এই দৃশ্য! সত্যিই কি এরকমটাই কবির কাশ্মীরের অবস্থা?

অর্জন দেব কাউল ‘মজবুর’ তাঁর কবিতা ‘কাশ্মীর’-এ লেখেন -

‘কত নদী-ছবি লাল হয়ে গেল বোবা মানুষের রক্তে!

আমার মায়ের কমনীয় মুখ কে পোড়াল এই রাজ্যে?’

আফ্রিন ফরিদি ‘চিনার তলায়’ কবিতাটিতে লেখেন, -

‘পোয়াতি মেয়েটি যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠল’। এই কবিতাটির পাদটিকা থেকে আমরা জানতে পারি, ১৯৯১ সালে সেনাবাহিনী ৩১ জন মহিলাকে গণধর্ষণ করেছিল। কবিতাটা তারই পটভূমিকায় লেখা। [ সূত্র -১ ]

অশান্ত কাশ্মীর তার দগ্ধ মুখ দেখায় ‘কাশ্মীরের কবিতা’ সংকলনটির [ সূত্র -১] পাতায় পাতায়। কারণ সেটাই হয়তো কোন এক সময়কার কাশ্মীরের প্রচলিত অবস্থা। ‘শাহজাদা’ রফিক তার ‘বিক্ষোভ জাগছে’ কবিতার সংক্ষিপ্ত পরিসরে তুলে ধরেন সেখানকার অবস্থা!

‘পাগল হাওয়া আর আগুন / বিক্ষোভ জাগছে / লাশ -বিবস্ত্র - কবর / বিক্ষোভ জাগছে’।

এম সি কাস ‘আমার প্রতিবাদ’ কবিতায় সোচ্চার হয়ে ওঠেন দমনপীড়নের বিরুদ্ধে, প্রচলিত রাজনীতির বিরুদ্ধে, ধর্ষণ ও হত্যার বিরুদ্ধে। তিনি তাই লেখেন – আমার প্রতিবাদ আমার ভাইয়ের জন্য / যে মৃত / আমার প্রতিবাদ সেই বুলেটের বিরুদ্ধে / যা তার মাথায় বিঁধে আছে’।

কিংবা

‘বিশ্বাসঘাতক পুতুল রাজনীতিক সব যাদের ভেতর কোনো আত্মা নেই / তারা ছল চাতুরীর সুতোয় আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে গনভোট নামের শব্দটিকে / আমার জান্নাত জ্বলছে সামরিক বাহিনীর হাতে।’

আগা শাহিদ আলি-র কবিতা –

‘আবার আমি সেই দেশে ফিরে এসেছি যেখানে একটা মসজিদের চূড়াকে কবরে পাঠানো হয়েছে।’ এ লাইনটা ভয়ঙ্কর! এটা পড়ে ধর্ম-নিরপেক্ষ দেশের বিবেকবান মানুষ অবশ্যই চমকে উঠবে! এই কবিতারই গদ্য ঢঙে লেখা কিছু লাইন আমাদেরকে দিয়ে প্রশ্ন করায়, এমনটাই কি কাশ্মীরের পরিস্থিতি?

“ ‘আগুনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আমরা অন্ধকার খুঁজি’ চেঁচিয়ে উঠলো রাস্তার খ্যাপাটে লোকটা, / আমি সেই লোকটা হতে চাই যে রক্ত ঢেলে দ্যায় তোমার হাতদুটো শুকানোর জন্যে।”

শ্রীময়ী নন্দিনী ঘোষের ‘কারফিউর শ্রীনগর’এ ধরা আছে দিনলিপির ঢঙে একাধিক কারফিউ দিনের বর্ণনা। গ্রন্থটির [সূত্র -১] পেছনে দেয়া পরিচয়লিপিতে শ্রীময়ীর পরিচিতি নেই; জানার ইচ্ছে রইলো, তিনি কাশ্মীরের মূল নিবাসী কি না? সে যাই হোক, অসাধারণ দক্ষতায় শ্রীময়ীর লেখনীতে উঠে এসেছে কাশ্মীরের দিনযাপন, সেখানকার উপদ্রুত সময়ের কথা! সে যাই হোক, অসাধারণ দক্ষতায় শ্রীময়ীর লেখনীতে উঠে এসেছে কাশ্মীরের দিনযাপন। সেখানকার উপদ্রুত সময়ের কথা।

‘শহরটা নির্বাক ছায়াছবি যেন

রাস্তাগুলো ফাঁকা

সমস্ত পৃথিবী যেন আড়ষ্ট গতিহীন স্থির।

খালি চুপিচুপি হাসপাতালে চলে যাচ্ছে

অসংখ্য শিশুর শরীর।’

কিংবা

‘কাশ্মীরে পৌঁছালো বিশ্বস্ত সূত্রের খবর।

ক্যামেরা লাগানো আর রিমোট চালিত একটি বোমা

ঘুরপাক খাচ্ছে নিচে কারফিউ স্তব্ধ শহরে।’

কিংবা

‘টিভি বন্ধ হয়ে গেছে।

খবরের কাগজের অফিসে ভাঙচুর

দূরভাষ বন্ধ আছে বহুদিন হল।

#

মসজিদ বাকরুদ্ধ শুক্রবার থেকে।

ইন্টারনেট খুঁড়িয়ে চলছে কোনোমতে

আমাদের সাথে গোটা পৃথিবীর

যোগাযোগ কোনোমতে রেখে।

শোনা যায় দুজন ট্রাকচালক

রাস্তায় খুন হয়েছে গতকাল রাতে

#

তাই হাইওয়ে বন্ধ করে দেওয়া হবে।’

কবিতাতে কারফিউর সময় চিত্রণে অনুমান করতে অসুবিধে হয় না, কেমন ভাবে কিছুকাল আগেও সময়ে সময়ে বরবাদ হয়ে যাচ্ছিল কাশ্মীরের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা!

পেয়ারে ‘হতাশ’ নামধারী কবি লেখেন ‘গজল ২’ কবিতা, যার সোজাসাপটা ক’টা লাইন তুলে দেওয়া যাক এখানে -

‘সে কে? যে মারা গেছে, সেই বা কে যে খুন হয়েছে!

সর্বত্র কাফনে মোড়া সেলাই করা মৃতদেহ দেখো

মরুবালুরা তোমরা সব দেখো!’

এ যেন মৃত্যু উপত্যকার এক নির্মম চিত্র!

পরবর্তী কবিতাটার সুর কিছুটা ভিন্ন! ছিনিয়ে নেয়া হল আমার নদী – কবিতায় অগ্নিশেখর লেখেন জীবনের অস্থিতি! নিরাপত্তাহীনতার কথা!

‘ছিনিয়ে নেয়া হল আমার নদী

বদলে দেয়া হল নদীর নাম

নিষিদ্ধ করে দেয়া হল নদীর জলে প্রদীপ ভাসানো

ছিনিয়ে নেয়া হল আমার দেবদারু গাছের ছায়াটুকুও

…… এই ভাবে শত বর্ষের শীতে

বরফ হয়ে গেল আমার কন্ঠ

ছিনিয়ে নেয়া হল আমার চেহারা

আর আমি এখন সব দিক থেকে চিনে ফেলার ভয়ে

পাল্টে ফেলেছি নিজেকে’ [ সূত্র – ৪]

কবি অগ্নিশেখরের ‘জবাহর টানেল’ দীর্ঘ কবিতাটার কিছু বিচ্ছিন্ন লাইনগুলো তুলে দিলাম –

‘এএত বছর

জবাহর লাল নেহেরু সুড়ঙ্গে

ঠেসে-ঠেসে অন্ধকার ভরা হয়েছে

আর পাঁচাল পর্বত ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে’

কিংবা

‘হাতগোলা ও বোমার অট্টহাস

জবাহর লাল নেহেরু সুড়ঙ্গ

ঠাঁয়-ঠাঁয় গুলির খেলা ও অলজেহাদ, অলজেহাদ,

অলজেহাদ।’

অথবা

‘সেঁকা হচ্ছিল লোকতন্ত্রের তাওয়ায় মিথ্যের রুটি

এটি মানব অধিকারের দিন

কিন্তু আমাদের মানব অধিকার বলে কিছু ছিল না।’

কিংবা

‘আমরা পাহাড় থেকে নেমে এলাম শরণার্থী ক্যাম্পে

ছড়িয়ে গেলাম সংবিধানের ফেঁপে ওঠা তাঁবুতে …’। [সূত্র -২]



বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে বাইরে রেখেই ছিন্ন বিচ্ছিন্ন ভাবে এখানে তুলে ধরা হলো কাশ্মীর ভূস্বর্গের কিছু কবিতা। আমরা দেখতে পাচ্ছি, এখানকার নানা কবিতার মধ্যে উঠে এসেছে মানুষজনের দীর্ঘশ্বাস, কান্না, বিক্ষোভ, চিৎকার, প্রতিবাদ। সব মিলিয়ে এটাই বুঝতে পারি কাশ্মীরের মানুষেরা ভয়ে ভয়ে আছে, সন্ত্রাসের মধ্যে আছে। তারা সুখে নেই, তারা ততো ভালো নেই।



[ সূত্র –

১) কাশ্মীরের কবিতা। প্রকাশক – মন্থন সাময়িকী, কোলকাতা – ১৮।

২) ভারতীয় কবিতার অঙ্গনে – অনুবাদ - মিতা দাস।

৩) সংগ্রহালয়ে কাটা পা – অগ্নিশেখর / অনুবাদ - মিতা দাস।

৪) শারদীয়া অনুবাদ পত্রিকা – ১৪২৬।

৫) আন্তর্জাল তথ্যপঞ্জি।]
0

প্রবন্ধ - সেবিকা ধর

Posted in

























যজ্ঞবেদীর ওপর যেটুকু আলো আছে, তাতে খানিকটা দেখা যায়, অনেকটাই দেখা যায় না।সেই যজ্ঞস্থলে তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন নিজের কেশপাশ উন্মুক্ত করে। এই কৃষ্ণবর্ণ কেশপাশের দিকে কুরু যোদ্ধাদের লোভী চোখ ছিল।রজঃস্বলা অবস্থায় তারা আমাকে টানতে টানতে নিয়ে এসেছিল কুরুসভাতে।আমি এক কালো মেয়ে।পঞ্চস্বামীর অতি আদরের দ্রৌপদী, পাঞ্চালী, কৃষ্ণা,যাজ্ঞসেনী। এছাড়া আরও কত নাম আমার।আমাকে এই পঞ্চস্বামী-যুধিষ্ঠির, ভীম,অর্জুন, নকুল,সহদেব ছাড়াও কর্ণ নামে এক বীর, তিনিও পছন্দ করতেন আমাকে।আমিও পছন্দ করতাম বীর, শূরবীর কর্ণকে।সূর্যপুত্র কর্ণকে, সূতপুত্র কর্ণকে,সে এক অন্য ইতিহাস।


যজ্ঞবেদীর আলোর চূর্ণমালা পৌঁছে গেছে আমার গালে।আর গালের যেটুকু কালোর আভাস, তা আরও উজ্জ্বলতর হয়ে উঠছে আলোর স্পর্শে। আমি দ্রৌপদী,আমি কালো মেয়ে।


লাইট,ক্যামেরা, অ্যাকশন- না না না আলোটা ঠিক মতো রিফ্লেক্টার দিয়ে ফেলা যাচ্ছে না ওর গালে।আপনি একটু-একটু - স্যরি তুমি একটু সাইড ফেস করতো।হ্যাঁ, হ্যাঁ - এবার ঠিক আছে। সে দাঁড়িয়ে আছে অনেক অনেক আলোর নীচে।বিজ্ঞাপনের মডেল হবে বলে।সে উজ্জ্বল আলোয় ধাঁধিয়ে যাওয়া তার স্বল্পবাসময় শরীর, নিজেই নিজেকে দেখতে দেখতে সে ভাবল- আমি এতো উজ্জ্বল? আমি এতো কালো? তা সত্ত্বেও তো ওরা আমাকে নিয়েছে মডেল হিসেবে।তার চোখের সামনে 'লিরিল' সাবানএর গুঞ্জন ধ্বনি।যা সে চোখে দেখেনি,শুনেছে তার পূর্বজদের কাছে।সেই 'লিরিল' সাবানের ফেনাময় বিজ্ঞাপন আবছা করে ভেসে উঠল।কারণ এই বিজ্ঞাপন সে দেখেছে, এই এড সে দেখেছে ইউটিউবে। চমৎকার শরীরের এক নারী,চারদিকে সাবান, ফেনা,সাবান-ঝরনা,ফেনায় জীবন বহে যাচ্ছে।


না, না, এভাবে হবে না।এটা কিন্তু আন্ডার গার্মেন্টসের বিজ্ঞাপন।তোমাকে বলা হয়েছে কী পজিশন, কী পোজ তোমাকে নিতে হবে। সেইভাবে তুমি তোমার পোজ নাও।ঔদ্ধত্য দেখাও, শরীরী আবেদনের কথা, লাস্যের কথা বলো।


আমি এক কালো মেয়ে।আমি আজ বিজ্ঞাপন- সুন্দরীও। আমাকে ব্যবহার করছে বিজ্ঞাপন কোম্পানি। তারা আমার শরীর যা লক্ষ লক্ষ টাকায় বিক্রি করবে অন্য অন্য পার্টি- বিজ্ঞাপনদাতাদের প্রচার- ক্যামপেনে।
ঠিক আছে, ঠিক আছে, একটু পেছনে, একটু নামাও,বুবস দুটো ভালো করে দেখা যাচ্ছে না। একটু খাঁজ দাও,একটু খাঁজ দাও। হ্যাঁ হ্যাঁ ব্যাক পোর্শান।ঠিক ঠিক।আচ্ছা অন্তর্বাসের বিজ্ঞাপনে এতো এতো ব্যাকপোর্শান, বুবস দেখান!তারপরই ভাবল সেই বিজ্ঞাপনের কালো মেয়ে-এ সব তো করতেই হবে।এই ব্যাক পোর্শান,বোটক্স,বুবস- এতো এই প্রফেশনের অঙ্গ।করতেই হবে।ওরা চাইছেন।


কাট- লাইট,ক্যামেরা, এ্যাকশন - হ্যাঁ, হ্যাঁ এবার শট ঠিক হয়েছে।


কালো মেয়ে, ধরা যাক তার নাম অর্ণবা।কিংবা জুলিয়া অথবা নাসিমা- যে কোনো নাম হতে পারে তার-এক্স, ওয়াই, কিংবা জেড - সেই মেয়েটি এখন বিজ্ঞাপনের মেয়ে। গায়ে তার কালো চামড়ার রঙ উপচে পড়েছে ক্যামেরার লেন্সের ওপর।আর কয়েকদিনের মধ্যে যে প্রোডাক্ট বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে মেয়েদের আন্ডার গার্মেন্টসের পোশাক-বিজ্ঞাপন হিসেবে ছড়িয়ে যাবে টিভিতে। খবরের কাগজে,অন্য অন্য মাধ্যমে।


আমি এক কালো মেয়ে। আমার স্টেপকাট চুলে আশ্চর্য আলো টুকটুক করে এসে বসছে।আবার উড়েও যাচ্ছে।যেমন চড়াই পাখি উড়ে যায়, নীল দিগন্তে অসীম আকাশে।আমি কি ঈগলদের সামনে দাঁড়িয়ে আছি? এতো আলো, এতো কম পোশাক, এতো পা,এতো হাঁটু,এতো বুক, এতো ব্যাক পোর্শন। আমার তো লজ্জা পাওয়া উচিত ছিল।না, না, না - টাকা রোজগার করতে করতে গেলে ওসব ভাবলে হবে না ।বিজ্ঞাপন-মডেল হতে গেলে ওসব ভাবলে চলবে না।আমার কালো রঙ আমাকে আটকাতে পারেনি। তার কারণ আমার আবেদনময়ী শরীর। এই শরীর দিয়ে,শরীরকে প্রদর্শন করে আমি বিজ্ঞাপনের একটা বড় অংশ,একটা বড় জগৎ দখল করতে চাইছি।


কিছু বলল, বলল কিছু, ওদের বাড়ির লোকেরা? শান্তার মুখের দিকে তাকিয়ে প্রবীর মাথা নীচু করে রইল।চৌষট্টি বছরের প্রবীর,ষাট বছরের শান্তা।প্রবীর একজন ব্যাঙ্কের রিটায়ার্ড কেরানি। প্রবীর ও শান্তার দুই মেয়ে।শান্তা কৃষ্ণবর্ণা।কন্যারাও রঙ পেয়েছে মায়ের। প্রবীর এবং শান্তার এই নিয়ে দুশ্চিন্তার শেষ নেই।এই বঙ্গভূমে যতই লেখা হোক, 'কালো মেয়ের পায়ের তলায় দেখে যা আলোর নাচন' কিংবা 'কালো জগতের আলো'- প্রবীর কোনো খেই পাচ্ছে না কৃষ্ণবর্ণা কন্যাদের জন্য।মধুরিমা ও মাধুরী- দুই মেয়ে।দুজনেই গ্র‍্যাজুয়েশন শেষ করে এম এ করে ফেলেছে।বয়স বেড়ে যাচ্ছে ক্রমে, কিন্তু প্রবীর তাদের পাত্রস্থ করতে পারছে না কিছুতেই। কন্যারা যদি কোনো প্রেমঘটিত সম্পর্কে বিষয়ে জড়িয়ে যেত,আর সেই ছেলে যদি ভালো হত।প্রবীর ও শান্তার সেখানে আপত্তি থাকার কথা নয়, থাকতও না।কিন্তু এই দুই কালো মেয়ে প্রেমের বিবাহে বা প্রেম- বিবাহের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়তে পারেনি। খুচরো দু-একটা ঘটনা হয়ত তাদের জীবনে ঘটেছে যা শান্তা খানিকটা জানে,প্রবীর জানে অনেক কম।এবং সেখানেও একটু এগোনর পরই দুই কন্যেই বাতিল হয়ে গেছে তাদের গায়ের রঙের জন্য।


আজকের এই পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে কেউ হয়ত এই সত্য বিশ্বাস করবে না।কিন্তু রবিবার আগরতলা বলুন আর রবিবার কলকাতাই বলুন, সেখানকার বহুল প্রচারিত পত্রিকাতে বা খবরের কাগজে যে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয় সেখানে লেখা হয় 'সুশ্রী গৌর বর্ণা, চাকুরিরতা.... ইত্যাদি ইত্যাদি। অর্থাৎ মেয়েকে সব হতে হবে।সে ভালো রান্না করবে,সে দেখতে খুব সুন্দর হবে, তার গায়ের রঙ হবে ধবধবে ফর্সা, অর্থ উপার্জন করবে,সন্তান মানুষ করবে,সমস্ত দায় সেই মেয়ের।কিন্তু সেখানে কালো মেয়ে হলেই যত আপত্তি-ঘোর এসে যায়।বিশেষ করে যাঁরা পুরনোপন্থী শ্বশুরমশাই এবং শাশুড়িমা, তাঁদের কাছে গায়ের রঙটা খুব বড় ব্যাপার। ফলে প্রবীর এবং শান্তা দুজনেই খুব অকুলেই আছে দুই মেয়েকে নিয়ে।যদিও দুই মেয়ের বিয়ের বিজ্ঞাপনও করেছে তারা,অর্থ ব্যয় করেছেন তাঁরা।মেয়েদের বিবাহের বিজ্ঞাপন দিয়েছে টিভিতে, ম্যাট্রিমনি সাইটে।কিন্তু কোথাও সেই মেয়েদের জন্য উপযুক্ত পাত্র পাওয়া যাচ্ছে না।


এক ঘন অন্ধকারের ভেতর বসে রয়েছে তাঁরা।মেয়েরা ক্রমশ বুড়ি হয়ে যাচ্ছে।মনের ওপর মেঘলা ছায়া ফেলছে তাঁদের।কোন নেলপালিশ লাগাব নখে,কোন ওষ্ঠরঞ্জনী বা লিপস্টিক লাগাবে ঠোঁটে, এই নিয়ে তাদের মধ্যে দোলাচল তৈরি হয়।কালো মেয়েকে কী সব মানায়? কোন শাড়িটা পরবে,কোন কালারের সালোয়ার-কামিজ পরব,কোন পালাজো পরব,এই সব দ্বন্দ্ব- দ্বিধা -এই রঙ কী আমাদের মানাবে? উজ্জ্বল হলুদ রঙের যে আভা, তা কী ফুটে উঠবে আমাদের গায়ে? না কী অসুন্দর দেখাবে? কিংবা কালো শাড়ি নয়তো সাদা সালোয়ার কামিজ? কিংবা টকটকে লাল জিন্স এবং কুর্তি? কোনোটাই সঠিকভাবে মানিয়ে তোলা যাচ্ছে না।ফলে দুই মেয়ে ক্রমশ বিষণ্ণ,বিপর্যস্ত হয়ে যাচ্ছে।চাকরির চেষ্টা করছে তারা।চাকরিও যে খুব ভালো পাওয়া যাচ্ছে, এমন নয়।চাকরির ক্ষেত্রেও অনেক বাছবিচার আছে।অনেক বাঁধাধরা নিয়ম আছে।


সব জায়গা থেকে হতমান হয়ে এই দুই মেয়ে ক্রমশ ভাবছে, তারা আর বিয়ে করবে না।কোনো পুরুষের গলায় তারা আর ঝুলিয়ে দেবে না বরমালা।তারা বাঁচবে নিজেদের মতো করে, নিজেদের রাস্তায়।নিজেদের মতো করে, জীবন তাদের গুছিয়ে নেবে। কিন্তু তারজন্য তো আর্থিক স্বাবলম্বন দরকার।প্রবীর অবসর নিয়েছে, কিছু টাকা সে নিশ্চয়ই পেয়েছে।পাচ্ছে পেনশন। কিন্তু তাতে কী তাদের চারজনের সংসার চলবে?ফলে দুই মেয়ে ঠিক করেছে তারা স্বাধীন ভাবে বাঁচবে।নয়ত স্বাধীনভাবে ব্যবসা করবে তারা।এম এ পাশ করে কম্পিউটার নিয়ে নানারকম চাকরির চেষ্টা করে, তারা ভাবছে এবার একটা ছোটোখাটো ব্যবসা দিয়ে তারা শুরু করবে তাদের নিজেদের জীবন। কালো মেয়ের আলোর জীবন।


অন্ধকারে স্তনবৃন্ত দেখে চমকে উঠল শমীক।এই মেয়ের স্তন এতো কালো! সে জানত না।ফলে কালো স্তন এবং তার নিপল শমীককে শারীরিক ভাবে উত্থানে অসমর্থ করল।শমীক করবীর দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি এতো কালো? আমি তো জানতাম না?জানলে পরে এগিয়ে আসতাম না তোমার দিকে।তোমার বুবস এতো কালো? করবী ভেতরে ভেতরে কষ্ট পাচ্ছিল। সে সবে রাগানুরঞ্জিত হচ্ছিল অভ্যন্তরে।কিন্তু শমীকের এই কথা, শমীকের এই বাক্যবাণ, তাকে অস্থির করে তুলল।করবী ডিভোর্সি।শমীক ডিভোর্স মেনে নিয়েছে।বিবাহবিচ্ছিন্ন অবস্থায় তাদের দুজনের দুটি পরিবারই আলাদা আলাদা।
শমীকের একটি ছেলে, একটি মেয়ে।করবীর একটি মেয়ে।তারা চেষ্টা করছিল নতুন করে একটা যৌথ জীবনের দিকে তারা যাবে।কিন্তু যেতে গেলে কিছু কিছু শারীরিক চাহিদা থেকে যায়।সেই শারীরিক চাহিদার সূত্র ধরে করবীর ফ্ল্যাটে একদিন শমীক এসেছিল।বাইরে তখন ঝমঝমে বৃষ্টি। বৃষ্টিতে ভিজে যাচ্ছে চরাচর।কাঁচের জানলা দিয়ে আচমকা ভেসে আসা বিদ্যুতের আলোয় শমীক আবার করবীর স্তন দেখতে পেল।তার হাতের যে নিবিড় স্পর্শ করবী অনুভব করতে চেয়েছিল তার শরীর ছুঁয়ে, শমীকের এই কথায় তা সম্পূর্ণ ডুবে গেল।বুকের আড়াল সামলে নিয়ে নিজেকে গোছাতে গোছাতে করবী বলল- ঠিক আছে, থাক..


ডিম ডিম ডিম ডিম করে মাদল বাজছে। বাঁধনা পরব- শীত- অন্ধকার,মাটির জালা ভর্তি মহুয়ার আসবের নাচছে মেঝেনরা।সাঁওতাল রমণীরা।এই নারীরা সকলেই, কৃষ্ণবর্ণা,কালো এবং আলো।মেঝেনদের সঙ্গে নাচছে মাঝিরা-মর্দরা।তারা সবাই নিজেদের বাঁশিতে তান তুলছে, যে তান ছড়িয়ে যাচ্ছে দূর থেকে দূরান্তরে।এক আশ্চর্য লোকগাথা তৈরি হচ্ছে ভেতরে ভেতরে। সেই লোকগাথার মধ্যে হয়ত লুকিয়ে আছে সাঁওতাল বিদ্রোহের দীর্ঘ ইতিহাস।চাঁদ,ভৈরব, শালগিরার ডাক, সিধু, কানু -সমস্ত কিছু যেন সামনে দিয়ে দৌড়ে যাচ্ছে তাদের।একদল কৃষ্ণবর্ণ মানুষ তারা দৌড়চ্ছে, হাতে তীর-ধনুক, বল্লম,কাঁড়-বাঁশ নিয়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে, দখলদার দিখুদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য।


কোথায় যেন সেই আলো গিয়ে পড়ল আফ্রিকা মহাদেশে।সেখানকার কৃষ্ণবর্ণ মানুষ, কৃষ্ণাবর্ণা নারীরা সকলেই-নিজেদের বাজনা, গান, উৎসব, নিয়ে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী লড়াইয়ে সামিল করেছেন নিজেদের।তাহলে কী দাঁড়াল? কালো সত্যি সত্যিই জগতের আলো কী? না কী নয়, সত্যি সত্যিই জগতের আলো।তাকে বুঝবার জন্য চোখ, হৃদয়, মন প্রয়োজন।


তিনি বসেছিলেন রাজসভায়।সামনে তাঁর অসংখ্য দাস-দাসী।এবার তাঁরা যাবেন প্রসাধন-কক্ষে।সেখানে নিজের রূপ-চর্চা-রূপটান করবেন রানী ক্লিওপাত্রা। মিশরের নীলনদের হাওয়া ঝিনুকের গভীরে জমে থাকা জল সব- মিলেমিশে এক হয়ে যাচ্ছে ক্লিওপাত্রার রূপ চর্চায়।এন্টনি ক্লিওপাত্রার কালো রূপে মুগ্ধ।তাঁর কৃষ্ণরূপে বিমোহিত।তিনি জানতে চান এই সৌন্দর্যের আকর উৎস কী? কোন জগতের মধ্যে।ক্লিওপাত্রা তার কালো গালের অতি বিখ্যাত টোলে তরঙ্গ তুলে হাসলেন।সেই হাসিতে গাল- টোলের মাধুরী আরও বিস্তৃত হল।আবারও ক্লিওপাত্রা তার কালো গালের টোল- সৌন্দর্য নিয়ে হাসেন।


যজ্ঞবেদীর সামনে দাঁড়িয়ে আছেন যাজ্ঞসেনী। তাঁর পঞ্চস্বামী দাঁড়িয়ে রয়েছেন একটু দূরে। যাজ্ঞসেনীর উন্মুক্ত পিঠ, পিঠের ওপর খোলা দীর্ঘ কেশমালা, অর্জুন এবং ভীম দুজনকে অনুরক্ত করছে যাজ্ঞসেনীর প্রতি।আমি তোমাকে জয় করে এনেছিলাম পাঞ্চালী।উচ্চারণ করলেন অর্জুন।আমি তোমাকে রক্ষা করেছি পাঞ্চালী। আমি তোমাকে রক্ষা করেছি যাজ্ঞসেনী,উচ্চারণ করলেন বৃকোদর- ভীম। আমি তোমাকে রক্ষা করেছি কুরুসভায়।বললেন শ্রীকৃষ্ণ,তোমার লজ্জা নিবারণ করেছি।দূরে দাঁড়িয়েছিলেন শ্রীকৃষ্ণ। তিনি বললেন আসলে এই কালো মেয়েই আমার সখী।একে নিয়ে আমি সারাজীবন চলে যেতে পারি দূর থেকে দূরান্তে কোনো নিবিড় জীবনের আশায়,ভালোবাসায়,প্রেমে-প্রীতিতে।সব কিছুতেই আমার সখী পাঞ্চালী। আমার যাঁরা গোপিনী, আমার বিবাহিত দুই স্ত্রী - রুকমিণী ও সত্যভামা আর সেই সঙ্গে প্রক্ষিপ্ত বা যাই বলা হোক না কেন, শ্রীরাধিকা তো আছেনই।কবি কল্পনায়, কাব্যে,কিন্তু পাঞ্চালী তো একেবারেই স্বতন্ত্র। ঠিক করে বললে পাঞ্চালীও তাদের থেকে স্বতন্ত্র আমার কাছে। আমি তার সখা।আমার সে কৃষ্ণা।কৃষ্ণের কৃষ্ণা।অর্জুন আবারও বললেন আমি জয় করেছি তোমাকে। দ্রৌপদী, তুমি আমার হও।ভীম বললেন, আমি তোমায় রক্ষা করেছি যাজ্ঞসেনী। তুমি আমার হও।যুধিষ্ঠির, নকুল সহদেব- কেউ কোনো কথা বলতে পারছিলেন না।


আরও অনেক দূরে দাঁড়িয়ে আছেন, মহাবীর সূর্যপুত্র, সূতপুত্র কর্ণ।তার মুখেও কোনো কথা নেই।কর্ণ তার দীপ্তমান শরীর দিয়ে আলো ফুটিয়ে তুলতে তুলতে যাজ্ঞসেনীর দিকে তাকিয়েরছিলেন।সেই কালো মেয়ে অর্জুনকে বললেন, আপনি আমায় জয় করেন নি।সেই কালো মেয়ে বৃকোদরকে বললেন, আপনি আমায় রক্ষা করেন নি।আমি নিজেকে নিজে রক্ষা করেছি।আমার স্বভাব ধর্ম, আমার প্রেম, আমার শরীর, আমার মন, আমার সব মিলিয়ে আপনাদের ভালোবাসা।আপনাদের ভালোবেসে থাকা,বাঁচা। ভেবে নেওয়া আপনারাও আমাকে ভালোবাসছেন। এই সূত্র ধরে আমি নিজেকে জয় করেছি, রক্ষা করেছি।


দুই কন্যা দাঁড়িয়ে ছিল রাস্তার ধারে।একটু পরেই তাদের গাড়িটি এসে যাবে।কসমেটিকস- এর ব্যবসা করতে করতে বেশ খানিকটা টাকা ইনভেস্ট করে,ধারে ইনস্টলমেন্টে জিনিসপত্র কিনে, বেচে এখন তারা নিজেরাই নখরঞ্জনী,ওষ্ঠরঞ্জনী,বডিলোশন, সানস্ক্রিনলোশন আরও যা যা লোশন ইত্যাদি সমস্ত কিছু বিক্রি করে যাচ্ছে ক্রমান্বয়ে। এবং তাদের ব্যবসা-কসমেটিকস-এর ব্যবসা ক্রমশ ক্রমশ ফুলে-ফেঁপে উঠছে।তারা বিবাহের কথা বলে না, কিন্তু তারা যৌনতার কথা ভাবে।যৌনতা তাদের জীবনে আছে।সেই যৌনতার গল্প আরও কোনোদিন বলা যাবে।কোনো পছন্দের পুরুষ তাদের সঙ্গে সঙ্গত করলে জীবন মধুময় হয়ে ওঠে।সেই পুরুষ তাদের দেখে বলে না তোমরা বড্ড কালো।কী কালো গো তোমরা! এই কথা উচ্চারণ করেনা পুরুষেরা।ফলে দুই মেয়ে বেশ আছে।প্রবীর এবং শান্তার একটু চিন্তা এই মেয়েদের বিয়ে হল না।বিয়ে হলে ভালো হত।নাতি-নাতনি হত।কিন্তু দুই মেয়ের কোনো চিন্তা নেই। তারা দিব্যি ফুরফুরে আনন্দে, নিজস্ব ভাবনায় ব্যবসা-বাণিজ্য করে, চমৎকার আছে তারা।


সাঁওতাল পল্লীর বাঁধনা পরবের আশ্চর্য মাদল- ধ্বনি ছড়িয়ে যাচ্ছে সমস্ত চরাচরে। কৃষ্ণ বর্ণের মেয়েরা নাচতে নাচতে আসবের উল্লাসে জড়িয়ে ধরছে অন্য অন্য কৃষ্ণ বর্ণের পুরুষদের। সমস্ত আকাশ মথিত হয়ে আছে তারকা সৌন্দর্যে। কালো আকাশের ভেতর অজস্র তারা।মেয়েরা-সাঁওতাল রমণীরা, সাঁওতাল পুরুষেরা নাচতে নাচতে তারা হয়ে যাচ্ছে।


এই সমস্যা মধ্যবিত্তের। প্রবীর একদিন মনে মনে বলেছিল খবরের কাগজ পড়তে পড়তে।এই কালো মেয়ে ফর্সা মেয়ে...শান্তা বলল, না না সবটা তা নয়।আমাদের মধ্যে একটা ঔপনিবেশিক শৃঙ্খল আছে। প্রবীর একদা রাজনীতি করা তার বউয়ের দিকে তাকাল।আমরা আসলে কালোকে নিয়ে চিন্তা করি।বারবার ঘৃণা করি।বিশেষ করে বিয়ের পাত্রী হিসেবে কালো মেয়েদের অজস্র কাঞ্চনমূল্যের বিনিময়ে বিক্রি করতে হয়। ভালোই হয়েছে।দুই মেয়ের বিয়ে হয় নি।


প্রবীর বিড়বিড় করে বলল- তাহলে কালীকে যে আমরা পুজো করি? এখানে অন্য অনেক কথা আছে।কালী কালো,কৃষ্ণ কালো, গোপাল কালো,আরও কোনো কোনো দেবদেবী হয়ত কালো।কিন্তু মানবজীবনের সঙ্গে দেবজীবনের তরঙ্গ একসঙ্গে মেলেনা।ফলে কালো দূরে থাকে। সংসারে কালো মেয়েকে অনেক টাকা পণ নিয়ে মুখ ব্যাজার করে বউ হিসেবে আনতে হয় এবং শ্বশুর-শাশুড়ি ভাবেন যে কালো মেয়ে এল।এবার এদের যে সন্তানাদি হবে নাতি- নাতনি সবাই কালো হবে।পুরো কালোর বংশ হয়ে যাবে আমাদের।এই অন্ধ ভাবনার গভীরতা এখন রয়ে গেছে আমাদের জীবনে।প্রবীর আর শান্তা নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে একসময় চুপ করে গেল।দুই মেয়ে এসি গাড়ির মধ্যে চোখে সানগ্লাস দিয়ে নতুন কোনো বড় ব্যবসার কথা ভাবছিল মনে মনে।
0

প্রবন্ধ - মনোজিৎকুমার দাস

Posted in







আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস ন হন্যতে যাকে বিশেষ খ্যাতি এনে দেয় তিনি হলেন মৈত্রেয়ী দেবী।

মৈত্রেয়ী দেবী( সেপ্টেম্বর, ১৯১৪ - ৪ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯০) ছিলেন একজন বাঙালি কবি, লেখক ও ঔপন্যাসিক। তার বিখ্যাত উপন্যাসের ' ন হন্যতে' জন্য তিনি ১৯৭৬ সালে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন। সাহিত্য ছাড়াও সমাজসেবায় অনন্য অবদান রেখেছেন। ১৯৭৭ সালে তিনি ভারতের সর্বোচ্চ সম্মাননা পদ্মশ্রী পুরস্কারে ভূষিত হন।

মৈত্রেয়ী ১৯১৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর তার বাবার কর্মস্থল তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির (বর্তমান বাংলাদেশ) চট্টগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম সুরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত ও মাতা ভারতের প্রথম ডক্টরেট সুরমা দেবী। তার বাবা ছিলেন একজন দার্শনিক ও প্রাবন্ধিক। তার শৈশব কাটে বাবার বাড়ি বরিশাল জেলার আগৈলঝারার গৈলা গ্রামে। ১৯৩৬ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগমায়া দেবী কলেজ থেকে দর্শনে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন।

মির্চা এলিয়াদ নামক এক বিদেশীর সাথে মৈত্রেয়ী সম্পর্ক তার পরিবারকে বিশেষ ভাবে যখন নাড়া দেয় তখনি তারা তার বিয়ে ঠিক করেন।

১৯৩৪ সালে তিনি ড. মনোমোহন সেনের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। মনোমোহন সেন ছিলেন একজন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী। তিনি মংপুতে সিনকোনা ফ্যাক্টরির ম্যানেজার ছিলেন ও ম্যালেরিয়া প্রতিরোধী ভেষজ সিনকোনা চাষ নিয়ে গবেষণা করেন। মৈত্রেয়ী দেবী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্নেহভাজন হওয়ায় তারা মংপুতে থাকাকালীন রবীন্দ্রনাথ মৈত্রেয়ীর আমন্ত্রণে ১৯৩৮ সাল থেকে ১৯৪০ সালে চারবার সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন।

১৯৩২ সালে ইনি কবি অতুলপ্রসাদ সেনের কথায় ও সুরে "মধুকালে এল হোলি" গানটি এইচ এম ভি থেকে রেকর্ড করেন (রেকর্ড # এইচএমভি এন ৪০১৯).

তার সাহিত্যজীবন শুরু ষোল বছর বয়সে। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ উদিত ১৯৩০ সালে প্রকাশিত হয়। এই বইয়ের ভূমিকা লিখেছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ চিত্তছায়া। ১৯৪২ সালে রবীন্দ্রনাথের মংপুতে কাঠানো দিনগুলোর স্মৃতি ও তার সাথে আলাপচারিতা নিয়ে লিখেন স্মৃতিকথা মংপুতে রবীন্দ্রনাথ। বইটি টেগোর বাই ফায়ারসাইড নামে ইংরেজিতে অনূদিত হয়। রবীন্দ্র বিষয়ক তার অন্যান্য বইগুলো হল স্বর্গের কাছাকাছি, কবি সার্বভৌম, রবীন্দ্রনাথ গৃহে ও বিশ্বে, রবীন্দ্রনাথ : দি ম্যান বিহাইন্ড হিজ পোয়েট্রি। তার আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস ন হন্যতে পাঠক মহলে তাকে খ্যাতির শীর্ষে নিয়ে আসে।১৯৭৫ সালে ভারতীয় লেখিকা সংঘ "ন হন্যতে" ( ইংরেজি, It Does Not Die: A Romance) উপন্যাসের জন্য তাকে সম্মানসূচক পদক দেয়। 'ন হন্যতে' মানে 'যাকে বিনাশ করা যায় না'। এই বইতে তিনি তার দৃষ্টিভঙ্গি, জীবন বোধ, ইংরেজ শাসনামলে ভারতের সমাজ ব্যবস্থা এবং জীবনযাপনের চিত্র তুলে ধরেন। এই বইটির জন্য তিনি ১৯৭৬ সালে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন। বইটি ইংরেজি ভাষায় ইট ডাজ নট ডাই নামে অনূদিত ও প্রকাশিত হয়।

মৈত্রেয়ী দেবীর উপন্যাস ‘ন হন্যতে’ আর "লা নুই বেঙ্গলি" মির্চা ইউক্লিড (ইলিয়াদ)এর পড়েছেন অথচ মনে দাগ কাটেনি এমন বাঙালি প্রায় বিরল।
"ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে" অর্থাৎ "শরীরকে হনন করা গেলেও একে হত্যা করা যায় না" সে ঠিকই রয়ে যায়। পারিপার্শ্বিকতা হয়ত ক্ষণিকের জন্য তার উপর প্রভাব ফেলতে পারে কিন্তু দেহস্থিত সেই সত্য অমর।

১৯২৮/ ২৯ খ্রীস্টাব্দে মির্চা ইউক্লিড(ইলিয়াদ) নামের এক রোমানিয়ান যুবক অতিথি হিসেবে আসেন তাদের পরিবারে ভারতীয় ভাষা-সংস্কৃতি তথা প্রাচ্যের দর্শন সম্বন্ধে জ্ঞানলাভ করার জন্য।
মির্চার শিক্ষক গৃহকর্তা সুরেন্দ্রনাথ কন্যা "রু" যা (মৈত্রেয়ী দেবীর অন্য একটি নাম) দায়িত্ব দেন রোমানিয়ান এই তরুনকে বাংলা শেখানোর জন্য, এবং মির্চাকে ভার দেন রু-কে ফরাসী ভাষা শেখানোর জন্য।

গল্পে মির্চা নামক যুবক, সে তার ইউরোপিয় আভিজাত্য ভূলে গিয়ে বাঙ্গালি-হিন্দু মেয়ে মৈত্রেয়ী এর প্রেমে পড়ে যায়।এমন কি একপর্যায়ে খ্রিষ্টান ধর্ম ত্যাগ করার জন্য ও সংকল্পবদ্ধ হয়।
অপরদিকে মৈত্রেয়ী তার ইউরোপিয়ান কালচারের প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়ে। তারা একে অপরকে গভীরভাবে ভালোবাসে। কিন্তু ক্রীশ্চান মির্চা ও হিন্দু মৈত্রেয়ী দেবীর সেই প্রেম পূর্নতা পায় নি। মির্চাকে আতিথ্যের আসন ত্যাগ করে বাড়ি ছেড়ে নিজের দেশে ফিরে যেতে হয়।
জীবনের প্রথম প্রেম ভুলতে মৈত্রেয়ী ও মির্চা, দুজনকেই প্রচুর বেগ পেতে হয়েছিল। অনেকদিন স্বাভাবিক হতে পারেনি মৈত্রেয়ী।

১৯৩৩ এ ফরাসী ভাষায় তার লেখা "লা নুই বেঙ্গলি"তে মৈত্রেয়ী দেবীর সাথে তার প্রেমকাহিনী লিখে তিনি বিখ্যাত হন।

“লা নুই বেঙ্গলীর” অর্থ হচ্ছে বাঙ্গালীর রাত। লেখক এই বইটিতে আত্মজীবনী পাশাপাশি সত্যের সাথে মিশিয়েছেন ফ্যান্টাসি।

সেই ফ্যান্টাসিতে লেখক তার অপ্রাপ্তি গুলোকে পূর্ণতা দিয়েছেন। সে সময়ের রোমানিয়ান ভাষায় লেখা বেস্ট সেলার বই এটি। মির্চা ও মৈত্রেয়ীর ভালোবাসার গল্প পড়ে কেঁদেছিল সে দেশের মানুষগুলো। ধর্ম, বর্ণ, ভাষা ও জাতীয়তার কিভাবে মানুষের হৃদয়ের পথ আলাদা করে দেয়, তা বইটি পরলে জানা যায়। বই শুধুমাত্র আত্মজীবনী ছিল না তার সাথে ছিলো কল্পনার মিশ্রণ। আর সেই কল্পনার অনেকটা জুড়েই ছিল যৌনতা, শারীরিক ভালোবাসা। পশ্চিমা সংস্কৃতিতে শরীর একটা প্রেমের অংশ হিসেবে দেখা যায় সহজেই কিন্তু ভারতীয় সংস্কৃতিতে এগুলো তখন ‘স্ক্যান্ডাল’ ছাড়া কিছুই নয়।

আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে,মির্চা যে মৈত্রেয়ীকে তার উপন্যাসে স্বপ্নের নায়িকা বানিয়েছে, সেটা স্বয়ং মৈত্রেয়ী জানতেন না। মধ্যবয়েসে এসে মৈত্রেয়ী যখন এই বইয়ের কথা জানতে পারেন, তখন তার ছেলে মেয়েরও বিয়ে হয়ে গিয়েছে।

মৈত্রেয়ী জানতে পারলেন, উপন্যাসে মির্চা লেখেন কিশোরী মৈত্রেয়ী তার ঘরে রোজ রাতে আসতো এবং তাদের মধ্যে শারীরিক প্রেমও হতো। এই সমস্ত ঘটনাকে মৈত্রেয়ী ‘মিথ্যে অভিযোগ’ হিসেবে অবিহিত করেন।

পুরনো প্রেম তাকে নতুন করে কষ্ট দিতে থাকে। এরই মধ্যে মৈত্রেয়ীর দেবীকে শিকাগো থেকে আমন্ত্রণ জানানো হয় রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বক্তৃতা দেওয়ার জন্য। মির্চা এলিয়াদ তখন শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনের অধ্যাপক। লোকলজ্জার ভয় তুচ্ছ করে মৈত্রেয়ী তার স্বামীর অনুমতি নিয়েই দেখা করতে যান তার সাথে। তাদের এই দেখা হয়তো ‘পূনর্মিলন’ ছিল না, কিন্তু এই দেখার ভেতর তারা একে অপরের হৃদয় দেখতে পেয়েছিল। বুঝতে পেরেছিল, এ জীবনে না হলেও অন্য কোনো জীবনে, অন্য কোনো জন্মে তারা এক হবেই।

শিকাগো থেকে ফিরে লা নুই বেঙ্গলির সমস্ত অসত্য ঘটনার উত্তরে ও একইসাথে নিজের মনের গভীরে এত বছর ধরে গোপন করে রাখা এই ব্যথা থেকে মুক্তি পেতে মৈত্রেয়ী লেখেন ন হন্যতে।
১৯৭৪ সালে প্রকাশিত ন হন্যতে, মৈত্রেয়ী দেবীর এতদিনের সাজানো গোছানো জীবনে তীব্র বিতর্ক ও সমালোচনার সঞ্চার করে। এই বইটির জন্য "সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার" পান তিনি। শিকাগোতে মির্চার সাথে দেখা হওয়ার পর মৈত্রেয়ী তার কাছে জানতে চেয়েছিলেন, কেন ওরকম মিথ্যে লিখেছিলেন তার ব্যাপারে। উত্তরে মির্চা বলেছিলেন, ভেতর কষ্টগুলোকে দমন করার জন্য তিনি; কল্পনার আশ্রয় নিয়েছিলেন।

তিনি মৈত্রেয়ী দেবীকে কথাও দিয়েছিলেন, মৈত্রেয়ীর জীবনকালে এই বই কোনোদিন ইংরেজিতে প্রকাশ করা হবে না। ১৯৯০ সালে মৈত্রেয়ী দেবী মারা গেলে তার ৪ বছর পর ১৯৯৪ সালে ন হন্যতে ও লা নুই বেঙ্গলি দুটো বই ই একসাথে শিকাগো প্রেস থেকে ইংরেজিতে প্রকাশ করা হয়।
এই কাহিনী নিয়ে প্রেম ১৯৮৮ সালে" দ্য বেঙ্গলী নাইট "নামের চলচ্চিত্র তৈরি করেন নিকোলাস ক্লতজ।
এছাড়া বলিউডে সঞ্জয় লীলা ভনসালির "হাম দিল দে চুকে সানাম" চলচ্চিত্রের সাথে তাদের কাহিনীর খানিকটা মিল রেখে তৈরি করা হয় চলচ্চিত্রটি।

ইতিহাস আর সাহিত্যে অসমাপ্ত প্রেমের গল্প বরাবরই মানুষের মনে সবচেয়ে বেশি দাগ কেটেছে। এমনকি যেসব প্রেমের পরিণতিতে মধুর মিলন হয়েছে, সেসবের চাইতেও বেশি আবেদন যেন ব্যর্থ প্রেমেই লুকিয়ে থাকে। বিরহে কাতর দুটো মনুষ্য-হৃদয়ের ব্যাকুলতা মানু্ষের অন্তরকে সবসময় ছুঁয়ে যায়।

তাদের প্রেম পূর্ণতা লাভ না করলে তাদের উভয়ের মনজগতে গভীর পূর্ণতায় উন্নীত হয়েছিল,যা চিরদিনের জন্য অমর হয়ে থাকবে।
0

প্রবন্ধ - অমিতাভ বন্দ্যোপাধ্যায়

Posted in






শ্রাবণ তার চরিত্র এতটুকু বদলায়নি। এক অদ্ভূত মাস এই শ্রাবণ। সারা গ্রীষ্মের তাপে বাষ্পীভূত মেঘ আষাঢ়ে ঘন শ্যামলচ্ছায়া থেকে বিশুদ্ধ পরিস্রুত জল ঝরিয়ে দেয় এক বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে। মেঘের ভার যখন কমে আসে আষাঢ় তার কাজ শেষ করে শ্রাবণকে পাঠায়। এই শ্রাবণ জলভরা মেঘের ঘনত্ব ও আয়তন কমাতে থাকে ধীরে ধীরে। কমতে থাকে বৃষ্টির তেজ ঝাঁঝ। মেঘ টুকরো হতে থাকে নানা আকারে ফলে আর অনেকটা এলাকা জুড়ে আর বর্ষণ নয়, বরং এলাকাভিত্তিক মেঘের চোরপুলিশ খেলা রোদ্দুরের সাথে। এই শ্রাবণের চরিত্রের কথাই বলতে ইচ্ছে করছে। ছোটবেলা থেকেই আকাশ দেখার শখ আর তা থেকে প্রকৃতির চক্র বোঝা যা ঋতুচক্রও বটে। সেই ছোটবেলায় যেমনটি দেখেছিলাম শ্রাবণ আজও তেমনই চঞ্চল। আকাশের কোনও একটা দিগন্ত থেকে উঠে আসে কাজল মেঘ, ছেয়ে যায় মাথার ওপর দিয়ে অন্য প্রান্তের দিকে আর যাবার সময় ঝাঁপিয়ে ঝরিয়ে দেয় সঞ্চিত জল। অল্পসময় ভারি বর্ষণে যা হবার তাই হয়, প্লাবিত রাস্তা আর মন্থর চলাচলের যান, ফলত, যানজট। বৃষ্টি থেমে যাবার পর কিছুটা সময় জলীয় বাষ্প মাখা শীতল আমেজ আর তারপরেই কুলকুল বহে নদ-নদী শরীর বেয়ে। আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি, দুপুরে পশ্চিম থেকে ভেসে এল ঘন কালো মেঘ আর তুমুল বর্ষণ। এলোমেলো হাওয়ায় জলকণার ওড়াউড়ি যেমন চলছে তার সাথে ভারী মোটা দানার পতন। কোনরকম পূর্বঘোষিত বার্তা ছাড়াই এলোমেলো বাতাসে দক্ষিণের বারান্দা আর জানালা দিয়ে বৃষ্টির ছিটে এসে ঘরদোর ভাসিয়ে দেয়। ভাল লাগে বাহাত্তুরে বুড়োর দুষ্টু নাতনির সাথে এই খেলা খেলতে। সারাটা সকাল ঘেমে-নেয়ে অস্থির হবার পর স্বাভাবিকভাবেই দেখতে ভাল লাগছিল, জলকণায় ভিজিয়ে নিচ্ছিলাম শরীর। একঘন্টা মত এরকম চলার পর আকাশ ফর্সা। যেন কিছুই হয়নি, শুধু রাস্তা জলমগ্ন।

অন্যসময় এই শ্রাবণ ভালোই লাগে কিন্তু জবরদস্তি অন্তরালে একা থাকা আর থেকে থেকে বৃষ্টি আরও যেন বন্দিদশায় একাকীত্ব বাড়িয়ে দেয়। মন চায় ছুটে দূরে কোথাও চলে যেতে। মনে পড়ে গেল চার বছর আগের এমন এক শ্রাবণ। সত্যি বলতে কি, সেবার প্রায় মাসখানেক ধরেই মনটা উড়ুউড়ু করছিল। নানা গ্রুপের বন্ধুদের উস্কানোর চেষ্টা চালাচ্ছিলাম, শেষে পঞ্চাশ বছর আগের কলেজের বন্ধুরাই একমত হলাম। কাছাকাছি কোথাও একরাত কাটানো, নিজের বাড়ির ঘরের সেই একঘেয়ে চার দেয়ালের বাইরে থাকা একটা রাত, কিছুটা সময়, আর অফুরন্ত আড্ডা। আহামরি কিছু না হলেও সেটা সম্ভব হল আর চার বন্ধুর অফুরন্ত জীবনীশক্তির জন্যে। সেটা ছাড়াও বেরিয়ে একটা অন্য উপলব্ধি হয়েছে, সেটা বলার জন্যে একটা চাপ আসছে ভেতর থেকে।

এই যে আমরা স্থানান্তরে ভ্রমণে যাই সেটা তো পৃথিবীর ঘাড়ে চেপেই রোজ হচ্ছে। সৌরমণ্ডলের যে অবস্থানে আমরা আছি তা তো অনবরত বদলে যাচ্ছে। ঠিক এই মুহূর্তে আমার যেখানে অবস্থান পৃথিবীই তো ঠেলে বদলে দিচ্ছে তার ঠিকানা প্রতিনিয়ত। আপন অক্ষের চারিদিকে ঘুরতে ঘুরতে রোজ কত ঘুরিয়ে দিচ্ছে। উত্তর গোলার্ধে যারা আছে তারা যেমন আবর্তিত হচ্ছে তেমনই দক্ষিণ গোলার্ধের লোকেরাও। আর শুধু কি তাই? ভেবে দেখলে এটাও সত্যি আমাদের এই গ্যালাক্সির সূর্য সমেত সব নক্ষত্রই ঘূর্ণায়মান, তার অবস্থান পালটে যাচ্ছে অনবরত। তার মানে আমরা এক অর্থে মহাকাশচারীও বটে। এটা সত্যি, বিজ্ঞানভিত্তিক সত্যি। কিন্তু বিজ্ঞান জ্ঞানের সন্ধান দিলেও মনটা মানবে কি করে। তার বিজ্ঞান তো অন্য। তার পরিচালনার ভার প্রত্যেক মানুষের ক্ষেত্রে ভিন্ন, বিচিত্র। আমাদের মন কি চায়? তার ভ্রমণের অর্থ ইন্দ্রিয় দ্বারা চেনা পরিচিত জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়া। তার মূল্য আবর্তনের হিসেবে নয়, ভৌগোলিক দূরত্ব হওয়া চাই, বস্তু হিসেবে ইংরেজিতে যাকে বলে মেটিরিয়ালিস্টিক। ভাবের নদীতে তরী বেয়ে আমরা কত জায়গায় ভ্রমণ করি, তাতে মনের একটা আবেগ যাকে ভাবাবেগ বলে সন্তুষ্ট হলেও হতে পারে কিন্তু বস্তুবাদী আবেগ কান্নাকাটি করে, সে চায় নির্দিষ্ট ভাবে আক্ষরিক স্থানান্তর, পৃথিবীর ঘাড়ে চেপে নয়, রীতিমতো গাড়িঘোড়া চেপে অন্যকোথাও অন্যকোনোখানে। আর তাতেই মজা। প্রকৃতির অন্য রূপ, প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য অথবা মনুষ্যকৃত স্থাপত্যের আরেক প্রদর্শনী এসবই আমাদের মনকে আপ্লুত করে, সাময়িক বিশ্রাম পায় একঘেয়ে জীবনের দিনলিপি। এটাই ভ্রমণের আনন্দ বলে আহ্লাদিত হই।

চার বছর আগে যেখানে গেছিলাম সেটা বিস্তীর্ণ ধানখেতের মধ্যে একটা আলের ওপর কৃত্রিম গড়ে তোলা গ্রামের আবছায়া, রিসর্ট। নাম সুন্দরগ্রাম। বলে রাখি, কৃত্রিমে আমার একটা অ্যালার্জি আছে। যাই হোক, বর্ষার শেষের দিকে এখন সেখানে ধানগাছের চারা রোপণ করা হচ্ছে। সেটা মন্দ নয়। নীরবতা ছেয়ে চারিদিক। কিছু দোয়েল, ফিঙে, বুলবুল নিশ্চিন্তে ওড়াউড়ি করছে, মাঝেমধ্যে কেউ একটা শিস দিয়ে সাথীকে ডাকছে অথবা আপন খেয়ালে আকাশের দিকে মুখ তুলে আনন্দ প্রকাশ করছে। কাছেই ইটভাটা, সেখানে কিছু কর্মচারী রয়েছে পরিবার নিয়ে। আর রিসর্টে আমাদের মত কিছু পর্যটক, কর্মচারী। এছাড়া জনমনিষ্যি চারপাশে নেই। আড়াই কিলোমিটার দূরে অন্য গ্রাম।

এরকম বাইরে যাবার দুটো উদ্দেশ্য, পরিবার নিয়ে দু-এক দিন চেনা জগৎ থেকে পালিয়ে মুক্তির স্বাদ চেটেপুটে নেওয়া, আনন্দ ভাগ করা আর নয়তো বন্ধুদের সাথে চূড়ান্ত আড্ডা মারা, ফিরে যাওয়া স্মৃতির তরণী বেয়ে ছাত্র জীবনে। আমরা শেষেরটায় পরিপূর্ণ হয়েছি। কিছুটা হলেও বাড়তি অক্সিজেন সঞ্চয় হয়েছে। এটাও শ্রাবণের দান।

এবার বলি এবছর আষাঢ়-শ্রাবণকে সাক্ষী রেখে গেছিলাম দক্ষিণ গোলার্ধে দক্ষিণ আফ্রিকা। সেখানে শীতকাল চলছে। একটা কথা বলতেই হয়, আসলে আমাদের পৃথিবীতে সাকুল্যে দুটো ঋতু যা সূর্যের আছড়ে পড়া তাপে ভূপৃষ্ঠের এবং তার ফলে আবহাওয়ার তাপমাত্রায় হেরফের করে গরম আর শীত। এই গরম আর শীতের মধ্যে কোনও স্পষ্ট বিভেদরেখা নেই বরং গড়ানে। গরমের তাপ গড়াতে গড়াতে ঠান্ডার দিকে চলতে চলতে যে তাপমাত্রায় পরিবর্তন তার থেকেই আমরা শরত আর হেমন্ত করে নিয়েছি আর শীত থেকে গরমের মাঝের সময়ে বসন্ত। এই ভেদ কিন্তু খুব কম জায়গায়, বলা যায় নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে তাও সর্বত্র নহে সে প্রস্ফুটিত। তবে এই বাংলায় তার রূপখানি অতি চমৎকার। এটি রবীন্দ্রনাথ নানাভাবে আমাদের দেখিয়ে দিয়েছেন। আমরাও প্রজাপতির মত আনন্দে নাচি নাচি। তবে বর্ষা কিন্ত দুটো, গ্রীষ্মকালীন ও শীতকালীন। বাংলায় গ্রীষ্মের বর্ষা প্রকট আর দক্ষিণভারতে শীতের বৃষ্টি। অক্ষরেখা মিলিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা অনেকটা আমাদের প্রকৃতির রীতি মেনে চলে। সেখানে এখন বৃষ্টি নেই। তাবলে কি বৃষ্টির স্বাদ নেব না? চলে গেলাম জিম্বাবুয়ের ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাত এলাকায়। বিশাল জলরাশি একশো মিটার মত পাহাড় থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ছে নিচে আর তার প্রতিঘাতে বাতাসে ভেসে উঠছে জলকণা। সেই জলকণা কিছুটা উপরে উঠে বৃষ্টি হয়ে নেমে আসছে মাথায়। আকাশে নেই একফোঁটা মেঘ আর এদিকে ভিজে একসা। এও এক প্রকৃতির ম্যাজিক ম্যাজিক খেলা।

তবু, আকাশের দিকে চেয়ে বলতে ইচ্ছে হয়, শ্যামল ছায়া নাই বা গেলে।




0

প্রবন্ধ - ইন্দ্রনীল মজুমদার

Posted in








আগেকার দিনে বিধবাদের দুঃখ ও কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করা খুব দুঃসাধ্যের কাজ। সমাজের কড়া নিয়মের জাঁতাকলে পিষে যেত বিধবাদের জীবন ও ইচ্ছে। আজ থেকে প্রায় দুশো বছর আগে, খুব কমবয়সে মেয়েদের বিয়ে হয়ে যেত। আর বিয়ে হত কোনো বয়স্ক মানুষের সাথে যাঁর মৃত্যু হলে বিধবা মেয়েটির জীবনে নেমে আসত এক ঘোর অন্ধকার। এই বিধবাদের কষ্ট দূর করতে সমাজ সংস্কারক ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় এবং তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের সহায়তায় লর্ড ক্যানিংয়ের আমলে ১৮৫৬ সালের ২৬শে জুলাই হিন্দু বিধবা পুনর্বিবাহ আইন (The Hindu Widows' Remarriage Act, 1856) আইনটি প্রণয়ন করা হয়। উক্ত আইনের অধীনেই ঐ বছরের ৭ই ডিসেম্বর উত্তর কলকাতায় প্রথম বৈধ বিধবা বিবাহ সম্পন্ন হয়। আচ্ছা, এখন যদি জিজ্ঞেস করা হয় যে, প্রথম বিধবা বিবাহ কে করেছিলেন? যিনি করেছিলেন তাঁকে হয়তো আমরা অনেকেই ভুলে গিয়েছি। আজ এই লেখার মধ্যে তাঁকে আমরা আমাদের বিস্মৃতির অতল সাগর থেকে তুলে এনে স্মরণ করব। তিনি হলেন শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন।

শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন ছিলেন ঊনবিংশ শতাব্দীর একজন বাঙালি সমাজ সংস্কারক। তিনি ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সহযোগী। তিনি ছিলেন অবিভক্ত চব্বিশ পরগনা জেলার প্রাচীন কুশদহ পরগনার গোবরডাঙ্গা খাঁটুরার বাসিন্দা। তাঁর পিতা ছিলেন খ্যাতনামা কথক রামধন তর্কবাগীশ এবং দাদা গণেশচন্দ্র। শ্রীশচন্দ্র কলকাতার সংস্কৃত কলেজে অধ্যয়ন করে 'বিদ্যারত্ন' উপাধি পেয়েছিলেন এবং সংস্কৃত কলেজে প্রথমে অ্যাসিস্টেন্ট সেক্রেটারির পদে নিযুক্ত ছিলেন এবং পরে সাহিত্যশাস্ত্রের অধ্যাপনাও করেছিলেন।

আজ থেকে প্রায় ১৭০ বছর আগে ১৮৫৬ সালে যখন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের উদ্যোগে বিধবা বিবাহ আইন সরকারি অনুমোদন লাভ করে তখন কেউ বিধবা বিবাহ করতে তেমন এগিয়ে আসেনি। কিন্তু, প্রচলিত সমস্ত সামাজিক প্রথা ও সংস্কার অগ্রাহ্য করে সর্বপ্রথম বিধবা বিবাহ করতে এগিয়ে আসেন তৎকালীন মুর্শিদাবাদের জজ পণ্ডিত শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন। ৭ই ডিসেম্বর ১৮৫৬ সালে উত্তর কলকাতায় অবস্থিত রাজকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সুকিয়া স্ট্রীটের বাড়িতে বিদ্যাসাগর মহাশয় তো বটেই এমনকি রমাপ্রসাদ রায়, নীলকমল মুখোপাধ্যায়, কালীপ্রসন্ন সিংহ, প্যারীচাঁদ মিত্র, রামগোপাল ঘোষ প্রমুখ সে যুগের উল্লেখযোগ্য বিশিষ্ট পণ্ডিতবর্গ তথা বুদ্ধিজীবীদের উপস্থিতিতে শ্রীশচন্দ্র বিবাহ করেছিলেন বর্ধমানের পলাশডাঙার প্রয়াত ব্রক্ষানন্দ মুখ্যোপাধ্যায়ের দশ বছরের বাল‍্য‍-বিধবা মেয়ে কালীমতী দেবীকে। কালীমতী দেবীর প্রথম বিবাহ হয়েছিল মাত্র চার বছর বয়সে। আর তিনি বিধবা হন ছয় বছর বয়সে। সকলের উপস্থিতিতে বিদ্যাসাগর মহাশয় নিজে দাঁড়িয়ে থেকে কনের মা লক্ষ্মীদেবীকে দিয়ে কন্যা সম্প্রদান করিয়েছিলেন।

প্রায় আটশো জনকে কার্ড দিয়ে নিমন্ত্রণ করা হয়েছিল। বোঝাই যাচ্ছে যে, প্রথম বিধবা বিবাহ বাড়িতে নিমন্ত্রিতদের বেশ ভালোই ভিড় ছিল। রক্ষণশীল হিন্দু সমাজ সেদিন এই বিবাহ পণ্ড করার চেষ্টা করলেও, রাস্তায় ব্রিটিশ পুলিশ প্রহরা থাকায় তারা কোনোরকম বিঘ্ন ঘটাতে পারেনি। রাস্তায় এই ব্রিটিশ পুলিশের পাহারার মাঝে রাতের দ্বিতীয় প্রহর পালকি চেপে বিয়ে করতে এসেছিলেন শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন।

বিধবা বিবাহ আইন পাশের পর এই প্রথম বিধবা বিবাহের অধিকাংশ ব্যয়ভার বিদ্যাসাগর মহাশয় স্বয়ং বহন করেছিলেন। যদিও পরবর্তীতে এই বিধবা বিবাহ নিয়ে তুমুল সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল বিদ্যাসাগর মহাশয়কে।

বঙ্গের তথা দেশের এই প্রথম ‘বিধবা বিবাহ’ করে শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের প্রচেষ্টায় প্রবর্তিত ‘বিধবা বিবাহ আইন’-কে সামাজিক ক্ষেত্রে প্রচলন করেন। তবে, বিধবা বিবাহ করার পর শ্রীশচন্দ্রকে অনেক সামাজিক প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছিল। প্রথম বিধবা বিবাহ করার ফলে তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজের চক্ষুশূল হয়ে উঠেছিলেন তিনি। গোবরডাঙার বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ পবিত্র মুখ্যোপাধ্যায়ের মতে, “সমাজ সংস্কারক শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্নকে শুধুমাত্র বিধবা বিবাহ করার জন্য গোবরডাঙায় তাঁর পৈত্রিক ভিটেতে আসতে নিরুতসাহিত করেন তৎকালীন ব্রাক্ষণ সমাজের মাথারা।”

এদেশের তৎকালীন গোঁড়া রক্ষণশীল সমাজ না দিলেও বিধবা বিবাহের মতো কাজ করার জন্য ইংরেজ সরকার এই সমাজ সংস্কারককে বিশেষ মর্যাদা ও সম্মান দিয়েছিল। শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন একসময় বঁনগার ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের পদেও উন্নিত হয়েছিলেন। ১৮৭০ সালে গোবরডাঙা পৌরসভা স্থাপিত হলে তিনিই প্রথম পৌরপিতা হন। স্ত্রী কালীমতী দেবীর মৃত্যুর পর সমাজ ব্যবস্থার চাপে প্রায়শ্চিত্ব করে শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্নকে গোবরডাঙায় তাঁর পৈত্রিক ভিটেতে আসতে হয়। প্রথম পৌরপিতা হিসেবে তিনি গোবরডাঙার বিপুল উন্নয়ন ঘটিয়েছিলেন। গোবরডাঙা পৌরসভা স্থাপন তো বটেই এমনকি তিনি রেললাইন স্থাপন করেছিলেন। তাঁর পৌর এলাকার রাস্তাঘাট সংস্কার করে পাল্টে দিয়েছিলেন গোবরডাঙ্গা শহরকে। জানা যায় যে, শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন প্রতিষ্ঠিত খাঁটুরার বাওড়-তীরের ঘাট ও ১৮৬৮ সালে তাঁর মায়ের নামে গোবরডাঙার কঙ্কনা বাওড়ের ধারে পোড়ামাটির ভাস্কর্যের দুটি শিবমন্দির এখনো বিদ্যমান রয়েছে।

দুঃখের বিষয় এই যে, আজ শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্নের মতো একজন সমাজ সংস্কারক ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদের স্মৃতি সংরক্ষণের ব্যবস্থা সেরকম দেখা যায়নি। তাঁর বসত ভিটে আজ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। তবে, শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন যেহেতু প্রথম নির্বাচিত পৌরপ্রধান তাই সেই স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে পৌরসভার পক্ষ থেকে খাঁটুরায় তাঁর বাড়ির সামনের রাস্তাটির নামকরণ করা হয়েছে ‘শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন সরনী’। তবে তাঁর স্মৃতির উদ্দেশ্যে গোবরডাঙ্গা পৌরসভায় ‘শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন ভবন’ নামটি সংরক্ষিত রয়েছে। গোবরডাঙা তথা বাংলার সমাজসংস্কার আন্দোলনের ইতিহাসে শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন এক উজ্জ্বল নাম। অথচ আজ তিনি অনেকটাই বিস্মৃতপ্রায়। তাঁর স্মৃতিকে সংরক্ষণ এবং আগামী প্রজন্মের কাছে তাঁর অবদান তুলে ধরার ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত উদ্যোগের অভাব লক্ষ করা যায়। তবু সময়ের ধুলো তাঁর কীর্তিকে মুছে দিতে পারেনি; গোবরডাঙা তথা বাংলার শিক্ষিত ও সংস্কৃতিমনস্ক সমাজ আজও গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে এই মহান সমাজসংস্কারক, শিক্ষাবিদ ও জনহিতৈষী মানুষটিকে।

এই ছিল এই বঙ্গের তথা ভারতের মাটিতে ঊনবিংশ শতাব্দীতে প্রথম বিধবা বিবাহের মাধ্যমে ঘটা এক বাঙালির সাহস, দৃঢ়তা ও সমাজ-সংস্কারের প্রতি অঙ্গীকারের ইতিহাস। ৭ই ডিসেম্বর, ১৮৫৬ তারিখটি এদেশে প্রথম বিধবা বিবাহ উপলক্ষ্যে এক উল্লেখযোগ্য ইতিহাস রচনা করেছে যা বাংলা তথা ভারতের ইতিহাসের পাতায় স্বর্নাক্ষরে লেখা থাকবে।



তথ্যসূত্রঃ-
সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান
বাংলা উইকিপিডিয়া