Next
Previous
Showing posts with label প্রচ্ছদ নিবন্ধ. Show all posts
0

প্রচ্ছদ নিবন্ধ - রঞ্জন রায়

Posted in

(১.১) মহাপুরুষদের জীবনী

আমাদের ছোটবেলায় একজাতের বই বাড়িতে এবং স্কুলে অবশ্য পাঠ্য ছিল –

মহাপুরুষদের জীবনী। তাতে ক্ষুদিরাম, নেতাজি ও সূর্য সেনের মত স্বাধীনতা

সংগ্রামী, রামমোহন, বিদ্যাসাগর ও আম্বেদকরের মত সমাজসংস্কারক,

রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিমচন্দ্র, শরৎচন্দ্রের মত সাহিত্যিক এবং চৈতন্য, রামকৃষ্ণ

ও বিবেকানন্দের মত ধর্ম সংস্কারক সকলেই একসারিতে জায়গা পেতেন।

এঁদের জীবনীর একটি ছাঁচ আছে। এঁরা কোন বিশেষ ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনে

প্রেরিত। এঁদের জন্মসূত্রেই প্রতিভার স্ফুরণ দেখা যায়। এঁরা কখনও ভুল করেন

না। কাজেই ভুল স্বীকার করার প্রশ্ন ওঠে না।

এঁরা মহাপুরুষ কেন? দুটো কারণে।

এক, এঁদের রাস্তা কখনোই মসৃণ নয়, বরং কাঁটায় ভরা। কিন্তু সব প্রতিকূলতা সব

বাধা দু’হাতে সরিয়ে এঁরা এগিয়ে চলেন।

দুই, এঁরা কখনও ক্ষুদ্র স্বার্থে আদর্শের সঙ্গে আপস করেন না। তাই আর্থিক

কষ্ট এঁদের নিত্যসঙ্গী আর পরিবার, আত্মীয়, বন্ধুবান্ধব সবাই এঁদের ভুল

বোঝে। ফলে অধিকাংশ সময় এঁরা বড় নিঃসঙ্গ।

আমরা এঁদের আদর্শ জীবনী পড়তে পড়তে বড় হই। এবং বড় হতে হতে বুঝে যাই

ওই আদর্শ চরিত্র ঠিক আমাদের মত অকিঞ্চনের মডেল নয়। ওঁরা অনেক উঁচুতে

বসে আছেন। হাত বাড়িয়ে নাগাল পাওয়া দুষ্কর। তাঁদের আমরা পুজো করি, কিন্তু

তাঁদের মত হওয়া? সে বড় কঠিন। আমরা আমাদের ছেলেমেয়েদেরও অমন আদর্শ

মানব বা মহামানব হতে বলি না। জানি, ওঁরা ক্ষণজন্মা, সবাই চাইলেও অমন হতে

পারবে না। আমরা পদে পদে আপস করি। আমাদের জীবন বৈপরীত্যে ভরা। ওঁদের

জীবন সোজা সপাট, কোন ধূসর এলাকা নেই।




আজও অধিকাংশ হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-সুকান্ত জয়ন্তীতে

তাঁদের প্রণাম জানিয়ে ইতিকর্তব্য সারে। তাঁদের কর্মজীবন বা লেখাপত্রকে

অনুধাবন করার বিন্দুমাত্র চেষ্টা করে না। তাই ওঁদের মাথার পাশের

জ্যোতির্মণ্ডল অপরিবর্তিত থাকে। তাঁরা পূজনীয়, তাই তাঁদের যাপিত জীবন বা

তাঁদের উত্তরসূরীদের জন্যে বাতলে দেয়া পথ নিয়ে ঠিক বা ভুল কোন প্রশ্ন

তুললেই ভক্তকুল রে রে করে ওঠেন। কার সম্বন্ধে কথা বলছে, জান? সাহস তো

কম নয়! এ তো মহাপুরুষদের স্ট্যাচুতে কালি লেপে দেয়া!

সে গান্ধীজির নোয়াখালি যাত্রায় যৌনশক্তি নিয়ে অসংবেদনশীল পরীক্ষা-

নিরীক্ষাই হোক, বা নেতাজির প্রেমপত্র। খেয়াল করি না প্রথমটির উৎস

যাত্রাসঙ্গী নির্মল কুমার বসুর দিনলিপি যা তিনি লিখেছিলেন গান্ধীজিকে

জানিয়েই। দ্বিতীয়টির সমর্থন মেলে সুভাষের জার্মান স্ত্রীর কন্যা অনীতা বসুর

থেকে।

এতসব সাতকাহনের একটাই কারণ। সদ্য পড়ে শেষ করেছি একটি বই যা আমাকে

বিচলিত করেছে। বইটির নাম “বিদ্যাসাগর: নির্মাণ-বিনির্মাণ-পুনর্নির্মাণের

আখ্যান”। লেখক দেবোত্তম চক্রবর্তী, এটি সম্ভবত তাঁর প্রথম পূর্ণাঙ্গ

প্রকাশিত বই। চারশ ছত্রিশ পাতার রুচিসম্মত অলংকরণ করা হার্ডকভার

বইটির দাম ৬২০/- টাকা, প্রকাশক - কলাবতী মুদ্রা।

(১.২) আমি কেন বিচলিত?

আমি বড় হয়েছি বিদ্যাসাগরকে প্রায় বীরপুজো করে। উনি বীরসিংহের সিংহশিশু;

মার সঙ্গে দেখা করতে ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ দামোদর সাঁতরে পার হয়েছেন।স্কুলের

পাঠ্যবইয়ে পড়েছি তিনি নারীজাতির প্রতি বিশেষ পক্ষপাতিত্ব করেন। তাই

বহুবিবাহ বন্ধ করানো, বিধবার বিয়ে দেয়ার জন্যে গোঁড়াদের সঙ্গে লড়ে আইন

পাশ করানো -সব করেছেন। এঁর জন্যে তাঁর উপর শারীরিক হামলাও হয়েছে। তারপর

জেনেছি বাংলাভাষাকে দাঁড় করানোর জন্যে উনি প্রাইমার লিখেছেন। তাতে ‘জল

পড়ে, পাতা নড়ে’র সহজ চিত্রময়তা ও সংগীতে রবীন্দ্রনাথও মুগ্ধ। শুধু এটুকুই

নয়, কলেজ স্তরে বাংলা শেখানোর যে পাঠ্যবই লিখেছেন তাতে ইতিহাস,

মহাপুরুষদের লাইফ স্কেচ, সীতার বনবাস বা অভিজ্ঞান শকুন্তলম থেকে অনুবাদ

সবই আছে। এবং তাঁর হাত ধরে বাংলা ভাষাও ক্রমশ ‘এই সেই জনস্থানমধ্যবর্তী




প্রস্রবণ গিরি। ইহার শিখরদেশ সততসঞ্চরমাণ জলধরপটলসংযোগে’ থেকে সরল

এবং প্রসাদগুণ সম্পন্ন হয়েছে, বিশেষ করে ‘প্রভাবতী সম্ভাষণে’।

তারপর জেনেছি উনি ব্যালান্টাইন সায়েবকে চিঠি লিখে সাংখ্য ও বেদান্তকে ভুল

দর্শন বলে তার অ্যান্টিডোট হিসেবে মিলের লজিক পড়াতে রেকমেন্ড করেছেন।

আমার যৌবনের বামপন্থী মন উড়ুনি গায়ে দেয়া তালতলার চটি পরা ব্রাহ্মণ

পণ্ডিতের মধ্যে এক ব্যতিক্রমী প্রায় অজ্ঞেয়বাদী বা সংশয়বাদী আধুনিক

মানসকে দেখতে পেল।

এখানেই শেষ নয়। অবধারিত ভাবে আসবে তাঁর চরিত্রের দার্ঢ্য ও ধারাবাহিকতার

প্রসঙ্গ। সেই ঔপনিবেশিক সমাজে ইংরেজি শিক্ষায় দীক্ষিত মানুষজন যখন

শাসক ইংরেজের সায়েবদের মোসায়েবি করতে ব্যস্ত, তখন এই ইংরেজি জানা

মানুষটি কখনই বুট-হ্যাট-কোটে সায়েব হওয়ার চেষ্টা করেননি। বরং এক সায়েবের

বুটজুতো ট্রেনের জানলা গলিয়ে ফেলে দিয়েছিলেন! দরকার পড়লে সদর্পে দেশের

রাজন্যদের নাকে চটিজুতো পরে টক করে লাথি মারতে পারেন!

ফলে আমার কৈশোরপরবর্তী মানসে উনি একাধারে কলোনিয়াল প্রভু এবং দেশি

সামন্তপ্রভুদের বিরুদ্ধে এক আপসহীন প্রতিবাদী চরিত্র। আর প্রথম বিধবা

বিবাহ দিলেন ছেলে নারায়ণচন্দ্রের সঙ্গে। একেবারে আপনি আচরি ধর্ম!

তারপরে শেষ জীবনে পরিবারের সঙ্গে বিচ্ছেদ। ‘আপনজনে ছাড়বে তোরে তা বলে

ভাবনা করা চলবে না’। কলকাতা ছেড় কার্মাটারে সাঁওতালদের মধ্যে জীবন

কাটানো! একাকী বিচ্ছিন্ন নিঃসঙ্গ ট্র্যাজিক নায়ক। আমার পছন্দের মহাপুরুষ।

যাঁর কথায় কাজে ফাঁক নেই, ফাঁকি নেই। কিন্তু উপরের বইটি আমার সযত্নে

লালিত এতদিনের বিশ্বাসের গোড়া ধরে টান দিয়েছে। বিভিন্ন তথ্য ও বিশ্লেষণ

দিয়ে দেখাতে চাইছে যে উপরের অনেকগুলো আখ্যান ভক্তজনের তৈরি মিথ,

অতিকথন বা প্রেক্ষিত থেকে আলাদা করে টেনে মানে করা, চটজলদি সিদ্ধান্ত

নেয়া। আমার প্রাথমিক মনস্থিতি হোল বিরক্তি। বিদ্যাসাগরকে নিয়ে টানাটানি

কেন? লোক কি কিছু কম পড়িয়াছে?

(১.৩) ‘তুমহারা পলিটিক্স ক্যা হ্যায় পার্টনার’?

কিন্তু ইদানীং ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে খোদ

আমেরিকাতেও যখন অনেক মহাপুরুষের মূর্তি ধরা টানা হচ্ছে তাহলে পরাধীন




ভারতের মহাপুরুষরা কেন বাদ যাবেন? বিদ্যাসাগর, রামমোহন, বঙ্কিমচন্দ্র ও

রবীন্দ্রনাথ? নতুন তথ্যের আলোকে ইতিহাসের পুনর্মূল্যায়ন অবশ্যই কাম্য।

ইতিহাস সব সময়েই ক্ষমতার ইতিহাস, বিজয়ীরা লেখে। অন্য স্বর চাপা পড়ে যায়।

তাহলে সব ইতিহাস লেখনেরই অ্যাজেন্ডা থাকে। ভিন্সেন্ট স্মিথ আর রমেশচন্দ্র

দত্ত, যদুনাথ সরকার বা রমেশচন্দ্র মজুমদারের লেখা একরকম হতে পারেনা।

দু’দলেরই নিজস্ব অ্যাজেন্ডা (কলোনিয়াল বনাম অতীত গৌরবগাথা) অনুযায়ী

নিজস্ব অতিকথনের ঝোঁক থাকে। তাহলে চক্রবর্তী মশায়ের অ্যাজেন্ডাটি কী?

আধুনিক হিন্দি কবিতার সবচেয়ে উঁচু আসনে যাকে অকাদমিক দুনিয়া বসিয়ে

রেখেছে তিনি হলেন ছত্তিশগড়ের গজানন মাধব মুক্তিবোধ। রাজনৈতিক বিশ্বাসে

সাম্যবাদী কিন্তু কবিতার আঙ্গিকে সুকান্ত-সুভাষ নয়, বরং বিষ্ণু দে-অরুণ মিত্র

ঘরানার।

বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে আলাপচারিতায় তাঁর বহু উচ্চারিত একটি বাক্য হল -

‘তুমহারা পলিটিক্স ক্যা হ্যায় পার্টনার’? একই প্রশ্ন ছিল আমারও, তবে গোটা

বইটি বার দুই পড়ার পর আমি সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি যে ইনি বাংলার কলোনিয়াল

হিস্ট্রির অপর স্বরের নির্মাণে ব্যস্ত। এঁদের প্রেমিসগুলো মোটামুটি এইরকম:

১) বৃটিশ কলোনিপ্রভুরা বাণিজ্যিক লুঠের স্বার্থে যেমন ভারত তথা বাংলাদেশের

কৃষি ও হস্তশিল্পের বারোটা বাজিয়েছে, তেমনই পরম্পরাগত শিক্ষা, সমাজনীতি

ইত্যাদিকেও নিজেদের স্বার্থে ঢেলে সাজিয়েছে।

২) আমরা, মানে কলোনিয়াল রুলের বাইপ্রোডাক্ট মধ্যবিত্ত শিক্ষিত বাঙালিরা,

ওদের প্রবর্তিত রেল, ডাক, যাতায়াত, আধুনিক শিক্ষার ফল পেয়েছি ভেবে ধরে

নিই, ওদের হাত না পড়লে আমাদের উন্নতি হত না, আমরা অন্ধকার যুগে পড়ে

থাকতাম। ফলে উন্নতির বিকল্প সম্ভাবনা নিয়ে চিন্তাই করি নি।

৩) তাই আমরা সতীদাহ ও বহুবিবাহ রদ, হিন্দু কোড এসব নিয়ে খুব খুশি। কিন্তু

একবারও ভেবে দেখি না এরা মাথাব্যথা সারাতে মাথাই কেটে ফেলল কিনা।

৪) কলোনিয়াল অ্যাজেন্ডায় যেমন হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক বিভাজন বেড়ে

গেল, তেমনই ওদের ভাষা সংস্কারে বাংলা থেকে আরবি, ফার্সি ও অন্যান্য

প্রাকৃত শব্দ ছেঁটে দিয়ে এক কৃত্রিম উচ্চবর্গীয় সংস্কৃত ঘেঁষা বাংলা ভাষা তৈরি

হল তার ফলে শিক্ষার ক্ষেত্রে নিম্নবর্ণ ও মুসলমানেরা অবহেলিত হয়ে রইল।




আমাদের কবিতা ও গল্পে এরা হয় অনুপস্থিত, নয় প্রান্তিক চরিত্র। এরা

আমাদের ‘অপর’ হয়েই রইল। আর সেই বিষবৃক্ষের ফল আজ পেকেছে।

বেশ, এতে বিদ্যাসাগর, রামমোহন আদি চরিত্রের কী দোষ? সেটা হল এঁরা এই

গ্র্যান্ড ডিজাইনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এঁরা সমাজসংস্কার, শিক্ষাসংস্কারের

নামে যা করেছেন তা কলোনিয়াল প্রভুদের তালে তাল দিতে। সুফল বলতে আমরা যা

পেয়েছি কুফলগুলো পাল্লায় তুললে ওজনে ভারি।

এই হল আমার পূর্বপক্ষ বা লেখকের বক্তব্যের সার - আমি যেমন বুঝেছি।

(২.০) আমার উত্তরপক্ষ

(২.১) লেখকের পদ্ধতি

প্রথমেই বলতে চাই লেখক চিরাচরিত মহাপুরুষের জীবনীর নামে একরৈখিক

মাহাত্ম্য বা কুৎসা রটনার শৈলীটি পরিত্যাগ করে এঁদের একটি নির্দিষ্ট

ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত ও কালখণ্ডের উপজ হিসেবে দেখেছেন। তাই প্রথমে যত্ন

করে কোম্পানির রাজত্বে খাজনা আদায়ের পদ্ধতি , চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ও তার

ফল এবং কীভাবে নব্য জমিদার ও মুৎসুদ্দি বানিয়া শ্রেণির জন্ম ও বিকাশ হল

তা পর্যাপ্ত দস্তাবেজ ও দলিলের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছেন। এই প্রারম্ভিক

পরিচ্ছেদগুলি বইটির সম্পদ।

লেখক এই বইটিতে গোপাল হালদারের সম্পাদিত “বিদ্যাসাগর রচনাসংগ্রহ”কে

প্রামাণ্য ধরে তাঁরই অনুসরণে বইটিকে তিনটি ভাগে ভাগ করেছেন -

শিক্ষাসংস্কার, সমাজসংস্কার ও বাংলা ভাষা সংস্কার।

আমরাও পাঠ-প্রতিক্রিয়ায় ওই ছকটিই অনুসরণ করব।

(২.২) আমার পদ্ধতি

তথ্য -

এই বইয়ে তথ্য এবং তথ্যসূত্র বিস্তারিত ভাবে দেয়া হয়েছে এবং লেখক পরস্পর

বিরোধী তথ্যের মুখোমুখি হলে যা গ্রহণ বা বর্জন করেছেন তার ভিত্তিটুকুও

স্পষ্ট করেছেন। এখানে তথ্যের স্বল্পতা নয় বরং বহু আয়াসে সংগৃহীত তথ্য এত




বেশি রয়েছে যে খেই হারিয়ে যাবার যোগাড়। এর থেকে ছেনে তথ্যের তুল্যমূল্য

বিচার অনেক পরিশ্রম সাপেক্ষ। তাই আমার সীমিত সাধ্যে তথ্য নিয়ে কথা বলা

উচিত হবে না। অতএব, আমি আমার লেখায় উদ্ধৃতি দিলে আলোচ্য লেখকের

বইটিরই পৃষ্ঠা সংখ্যার উল্লেখ করব। এর দুটো দিক। পাঠপ্রতিক্রিয়ায়

বিশ্লেষণ বা যুক্তির ভুল হলে তার দায় নির্দ্বিধায় আমার। কিন্তু তথ্যসূত্রে বা

উদ্ধৃতিতে কোন ভুল থাকলে তার দায়িত্ব লেখক চক্রবর্তী মশায়ের।

আমার কাজ -

আমি দেখব তথ্যের ভিত্তিতে লেখক যে হাইপোথেসিস দাঁড় করাচ্ছেন তার

বিশ্লেষণ, যুক্তিপ্রয়োগ এবং অন্য বিপরীত ব্যাখ্যার সম্ভাবনাগুলো। দেখব

লেখক নিজের অ্যান্টি-কলোনিয়াল অ্যাজেন্ডার জোরে কোথাও কোথাও এমন

সিদ্ধান্ত টানছেন কিনা যাকে স্ট্যাটিসটিক্সের লোকেরা বলেন ‘প্রসিকিউটর’স

বায়াস’।

আমরা দামোদর সাঁতরে পার হওয়ার গল্প নিয়ে মাথা ঘামাব না। বিদ্যাসাগরের

আপন ভাই শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্নের সাক্ষ্যই এসব গালগল্পকে খারিজ করার

জন্যে যথেষ্ট। কিন্তু দেখব নারীশিক্ষার জন্যে বেথুন ও বিদ্যাসাগরের মডেলের

সাফল্য ও বিফলতা নিয়ে তুলনা। দেখব সেই সময়ে ইংরেজ প্রভুদের আনুকূল্যেই

সই, উত্তরভারতে এবং মহারাষ্ট্রে নারীশিক্ষার জন্যে কী কাজ হচ্ছিল এবং

ব্যালান্টাইন-বিদ্যাসাগর বিবাদে সত্যিই বিদ্যাসাগর বেদান্তের বিরুদ্ধে

পাশ্চাত্যের এনলাইটেনমেন্টের প্রতীক মিলের লজিক পড়াতে চাইতেন কিনা।

দেখব শুধু উচ্চবর্ণের ছাত্রদের জন্যে শিক্ষার দ্বার খুলে দেয়া বিদ্যাসাগরের

জাতিঘৃণার লক্ষণ, নাকি নতুন কোন উদ্যোগ শুরু করার জন্যে আবশ্যক

সমঝোতা।

মধুকবিকে বিদ্যাসাগর জেলে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে টাকা ধার দিয়েছেন।

অমিত্রাক্ষর ছন্দ নিয়ে বিদ্রূপ করলেও একটা স্নেহের টান ছিলই। পরেও

অনেকবার টাকা দিয়েছেন - মধুকবির কবিতায় যার স্বীকৃতি রয়েছে। কখনও

কখনও প্রশ্ন জাগত - কত টাকা ছিল বিদ্যাসাগরের? এবং এই অগাধ আয়ের

উৎস কী?

এ নিয়ে অনেক অজানা তথ্য দিয়েছেন লেখক। তাতে এক ব্যবসাবুদ্ধি সম্পন্ন




সুচতুর ব্যক্তির ছবি ফুটে উঠেছে যা আপাত বিভিন্ন সংস্কার আন্দোলন এবং

শিক্ষার মশাল জ্বালিয়ে এগিয়ে চলা বাঙালির ছবির সঙ্গে একেকবারেই খাপ খায়

না। আমরা জানি যে বাঙালি ব্যবসাবিমুখ এবং ব্যবসায়ীদের সততাকে সন্দেহের

চোখে দেখে। অতএব এই নির্মাণটিকেও দেখা দরকার যে বিদ্যাসাগর ব্যবসার

ডুবজলে নেমে নিজের কোন সযত্নলালিত মূল্যবোধ ও নীতির সঙ্গে আপস

করেছেন কিনা।

সমাজসংস্কারের ক্ষেত্রে দেখতে হবে নিজের ছেলেকে দিয়ে বিধবাবিবাহ

আন্দোলনের শুরু করেও কী কারণে পিছিয়ে এলেন? এছাড়া লেখক ইংরেজদের

মনুকে কেটে ছেঁটে হিন্দু কোড বিল বানানোয় নারীদের আগের চেয়ে ক্ষতি হয়েছে

বলে অভিযোগ করেছেন — এটা গুরুত্বপূর্ণ, কাজেই নেড়েচেড়ে দেখতে হবে এতে

বিদ্যাসাগরের দায়িত্ব কতটুকু।

সাহিত্য পর্যায়ে দেখব সমসাময়িক মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালংকার, মদনমোহন

তর্কালংকারের তুলনায় বিদ্যাসাগরের সাহিত্যকর্ম ও ভাষার সৌকর্য

নিম্নমানের ছিল কিনা। রচনায় নারীচরিত্র ও প্রান্তিক মানুষেরা কেন অনুপস্থিত

ইত্যাদি।

তাহলে এবার বিসমিল্লা বলে শুরু করা যাক।

(৩.০) কোম্পানিরাজ, চিরস্থায়ী বন্ডোবস্ত এবং শিক্ষা সংস্কার

(৩.১) চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত

মোঘল আমল থেকে কোম্পানির আমলে, মানে ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে’র আগে,

জমির খাজনার ব্যাপারটা কেমন ছিল?

লেখক সঠিকভাবে বলছেন - কৃষক এবং রাজা বা রাষ্ট্রের মাঝখানে কোন জমিদার

বা মধ্যস্বত্বভোগী ছিল না। সমগ্র গ্রামের উপর রাজস্ব ধার্য হত, এবং

গ্রামসমাজগুলি রাজস্ব আদায়কারী ‘জমিদারে’র মারফত সমবেতভাবে রাজস্ব

প্রদান করত। ‘রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জমিদার নির্দিষ্ট দিনে গ্রামে উপস্থিত

হয়ে রাজস্ব হিসেবে সমগ্র ফসলের এক-তৃতীয়াংশ আদায় করত এবং এই

আদায়ীকৃত ফসলের এক-দশমাংশ নিজের কাছে পারিশ্রমিক হিসেবে রেখে বাকি

ফসল রাষ্ট্রকে দিতে বাধ্য থাকত’। [1] এর মানে তো দাঁড়াল যে আদায়ীকৃত




ফসলের বাকি নয়/দশমাংশ রাষ্ট্রকে দিতে হবে। উনি ব্যাখ্যা করে বলছেন যে

তখন জমিদাররা জমির মালিক ছিল না, তারা ছিল নিছক সরকারের রাজস্ব

আদায়ের প্রতিনিধি। তাদের নবাব ইত্যাদিরা নিযুক্ত করতেন। এ যেন ডাকু গব্বর

সিংহের প্রতিনিধি এসে গোটা গাঁয়ের থেকে নির্ধারিত আনাজ আদায় করছে!

কিন্তু এরপরেই লেখক বলছেন, ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে ঠিক হয় যে,

জমিদারেরা আদায়ীকৃত রাজস্বের নয়-দশমাংশ কোম্পানির কাছে হস্তান্তরিত

করবে। বছরের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এই নির্দিষ্ট রাজস্ব কোম্পানির ঘরে

জমা দিলে, জমিদাররা বংশানুক্রমে জমির স্বত্বাধিকারী থাকবে, ভবিষ্যতে জমির

মূল্য যাই হোক না কেন, তাতে তাদের সঙ্গে কোম্পানির রাজস্ব বন্দোবস্তের

কোনও পরিবর্তন হবে না’। [2]

তাহলে কী দাঁড়াল? আগের ও পরের দুটো নিয়মেই জমিদারেরা ‘আদায়ীকৃত ফসলে’র

এক/দশমাংশ নিজের কাছে রেখে বাকি নয়/দশমাংশ রাষ্ট্রকে দেবেন?

তফাৎ কোথায়? চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে জমিদাররা স্থায়ী ভাবে জমির মালিক

হলেন। আগে গ্রামে উৎপন্ন ফসলের এক-তৃতীয়াংশ খাজনা হিসেবে আদায় করে

তার ভাগাভাগি হত। এখন জমির মূল্য হিসেব করে তার (ফসলের নয়, জমির

মালিকানা স্বত্বের) স্থায়ী খাজনা নির্ধারিত হলে জমিদারেরা প্রতিবছর

নির্দিষ্ট সময়ে তা কোষাগারে জমা দেবেন, নাহলে মালিকানা হাতছাড়া হয়ে যাবে।

অর্থাৎ আগে রাষ্ট্র আদায় করত ফসলের ভাগ, এখন আদায় করছে জমির

মালিকানার খাজনা জমিদারদের থেকে। সেই খাজনা আবার জমিদারেরা আগেই উশুল

করছে চাষিদের থেকে, তাতে যুক্ত করছে নিজের একটা অংশ।

এটা একভাবে দেখলে এশিয়াটিক সোসাইটির গ্রামীণ সমাজের উপর ইউরোপিয়

সামন্ততান্ত্রিক কাঠামো চাপিয়ে দেয়া।

আমরা কী ভাবে দেখছি? কোনটা ভাল, কোনটা মন্দ? কৃষকদের দিক থেকে দেখলে

দুটোই খারাপ। তাহলে মন্দের ভাল কোনটা? লেখকের মতে আগের ব্যবস্থা-তাতে

যে গাঁয়ে থেকে চাষ করে তারই জমির মালিকানা স্বত্ব ছিল। কী চাষ করবে নাকি

করবে না সেটা সেই ঠিক করত। কিন্তু নতুন নিয়মে জমির মালিক জমিদার, সে

উলটে চাষির থেকে খাজনা আদায় করবে।




আমার মতে দুটো খারাপের মধ্যে ১৭৯৩ সালের ২২শে মার্চে প্রবর্তিত চিরস্থায়ী

বন্দোবস্ত কম খারাপ। কেন?

এক, এতে ফসলের হিসেবে প্রতি বছর নতুন নতুন খাজনা ধার্য করার বদলে একটা

ফিক্সড খাজনা। জমিদার ও কৃষক উভয়েই জানে কত দিতে হবে, তাতে অ্যানার্কির

বদলে শৃংখলা আসে, অ্যানার্কির দিনে গরিবের ভোগান্তি বেশি হয়।

দুই, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে জমিদারের খানিকটা দায়িত্ব বা ইনভল্ভমেন্ট থাকে

যাতে চাষটা ভাল ভাবে হয়। ফলে হাল-বলদ-বীজধান ইত্যাদির যোগান এবং

দরকারমত আর্থিক সাহায্য (অবশ্যই চড়া সুদে) দিতে একরকম বাধ্য থাকে।

আগের ব্যবস্থায় এসবই অনিশ্চিত।

লেখক সহমত নন। উনি দেখাচ্ছেন যে ‘কোম্পানি চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে

নতুন জমিদার ও মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণির সৃষ্টি করে, তেমনই তাদের অত্যাচার

ও শোষণ থেকে পরিত্রাণের জন্য অসংখ্য কৃষক সংগ্রামের সৃষ্টি হয়’(নজরটান

আমার)। উদাহরণ হিসেবে লেখক উল্লেখ করেছেন সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহ

(১৭৬৩-৭৮), মেদিনীপুরের বিদ্রোহ (১৭৬৬-৮৩), ত্রিপুরায় সমশের গাজির

বিদ্রোহ ( ১৭৬৭-৬৮), সন্দ্বীপের কৃষক বিদ্রোহ (১৭৬৯), কৃষক-তন্তুবায়দের

লড়াই (১৭৭০-৮০), চাকমা বিদ্রোহ (১৭৭৬-৮৭), এবং রংপুর বিদ্রোহ (১৭৮৩)।

[3]

দেখুন, সবক’টি কৃষক বিদ্রোহ হয়েছে ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত

প্রবর্তনের অনেক আগে। বরং এই নতুন ব্যবস্থা শুরু হওয়ার পরে কোন বড়

কৃষক বিদ্রোহের নজির দেখছি না।তাহলে লেখকের যুক্তি পরম্পরা অনুসরণ

করলে কোন সিস্টেমকে মন্দের ভাল বলব?

(৩.২) নতুন মধ্যস্বত্বভোগী জমিদার ও মুৎসুদ্দিদের উদ্ভব

কেন নতুন করে বড় বিদ্রোহ হল না? এখানে লেখক সঠিক ভাবে আঙুল তুলেছেন

চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে সৃষ্ট নতুন মধ্যস্বত্বভোগী জমিদার ও

মুৎসুদ্দিদের দিকে।

১৭৯৩ সালের ২২শে মার্চ তারিখে লর্ড কর্নওয়ালিশ ‘চিরস্থায়ী বদোবস্তে’র

প্রবর্তন করেন। ঠিক তার আগে ৬ই মার্চ কোম্পানির ডিরেক্টরদের একটি




চিঠিতে লেখেন- ‘ভূমিস্বত্বকে নিরাপদ ঘোষণা করার সঙ্গে সঙ্গেই এদেশীয়দের

হাতে যে বিরাট বিত্ত আছে, তা তারা অন্য কোনও ভাবে নিয়োগ করার উপায় না

পেয়ে ভূসম্পত্তি ক্রয়ের উদ্দেশ্যেই ব্যয় করবে’। [4]

লেখক চমৎকার ভাবে দেখিয়েছেন যে ৪০ বছর পরে লর্ড বেন্টিংক মন্তব্য

করছেন -

‘আমি মানতে বাধ্য যে ব্যাপক গণবিক্ষোভ বা বিপ্লব থেকে নিরাপত্তার প্রশ্নে

চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের একটা বিরাট সুবিধে আছে। অন্ততপক্ষে এর বদান্যতায়

এমন এক বিপুলসংখ্যক ধনী জমিদারশ্রেণী উদ্ভূত হয়েছে যারা বৃটিশ শাসনকে

টিকিয়ে রাখতে প্রচণ্ড আগ্রহী, জনসাধারণের ওপরও তাদের সম্পূর্ণ আধিপত্য

আছে’। [5]

এই সমর্থকদের শ্রেণিবিন্যাসের বিশ্লেষণ করেছেন বিনয় ঘোষ -

‘গ্রাম্যসমাজে নতুন জমিদারশ্রেণী, বৃহৎ একটি জমিদারি-নির্ভর মধ্যসত্বভোগী

ও গ্রাম্য মধ্যশ্রেণী, এবং নাগরিক সমাজে নতুন অর্বাচীন অভিজাত-ধনিকশ্রেণী,

খুদে-ব্যবসায়ী দোকানদার চাকরিজীবী প্রভৃতিদের নিয়ে বড় একটি নাগরিক

মধ্যশ্রেণী এবং তার মধ্যে সোনার চাঁদের মতো একদল ইংরেজিশিক্ষিত ‘elite’।

[6]

(৩.৩) কৃষি, চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত, বঙ্কিম ও বিদ্যাসাগর

মন্বন্তর: ১৭৭০ সালের দুর্ভিক্ষ(বাংলায় ছিয়াত্তরের মন্বন্তর) হয়েছিল

চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত্রের প্রায় আড়াই দশক আগে, যার ভয়াবহ বর্ণনা

বঙ্কিমের দেবী চৌধুরাণী ও আনন্দমঠে রয়েছে। এরপরে বাঙালি পেল সোজা

পঞ্চাশের মন্বন্তর যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে, ১৯৪২-৪৩ সালে ঘটেছিল।

এর মধ্যে কোন বড় দুর্ভিক্ষ উনবিংশ শতাব্দীতে ঘটেনি। কাজেই আমার মনে হয়

কর্নওয়ালিশ স্থায়ী বৃটিশ স্বার্থে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে বংগের

কৃষিতে যে স্ট্রাকচারাল পরিবর্তন আনেন, কিন্তু তার আপাত সুফল বাংলার

কৃষক পেয়েছে। তাই বড় দুর্ভিক্ষ বা বিদ্রোহ কোনটাই হয়নি।

এই আলোচনাটা জরুরি কেন? এইজন্যে যে এখানে লেখক আঙুল তুলেছেন বঙ্কিম

ও বিদ্যাসাগরের দিকে, তাঁদের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের গুণকীর্তন করার দোষে।

তার প্রেক্ষাপটে লেখক বলছেন -




‘উনিশ শতকের প্রথম থেকে এদেশে যে ইংরেজি শিক্ষার প্রচলন শুরু হয়, তার

সুযোগ প্রধানত গ্রহণ করে এই জমিদার ও মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণির

প্রতিনিধিরাই। ভুমিরাজস্ব থেকে প্রাপ্ত বিপুল আর্থিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে

পরবর্তীকালে তারা শিক্ষাদীক্ষা, সরকারি চাকরি এবং ডাক্তার-ওকালতি ইত্যাদি

কাজে নিযুক্ত থেকে এক নতুন বুদ্ধিজীবী শ্রেণির সৃষ্টি করে। চাকরি-নির্ভর এই

শিক্ষিত সম্প্রদায়ও স্বাভাবিকভাবেই ব্রিটিশ অনুরাগী হিসেবে গড়ে ওঠে। তারা

এমন একটি সামাজিক শ্রেণির রূপ গ্রহণ করে, যাদের শ্রেণিস্বার্থ বাঁধা থাকে

ভুমিব্যবস্থার স্রষ্টা, পালক ও রক্ষক ব্রিটিশদের সঙ্গে’। [7]

এইটাই আসল কথা। গোটা গবেষণার ধ্রুবপদ হোল যে বঙ্কিম, বিদ্যাসাগর,

রামমোহন এবং রবীন্দ্রনাথের ঊর্ধ্বতন দুই পুরুষ হয় চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের

উপজ নব্য জমিদার বা নব্য মুৎসুদ্দি ধনিক অথবা ইংরেজের চাকরিনির্ভর নব্য

মধ্যবিত্ত শ্রেণি। ইতিহাসের সাক্ষ্য কী বলে?

অভিযোগ অনেকটাই সত্যি। জোড়াসাঁকো ঠাকুর পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা

রবীন্দ্রনাথের পিতামহ পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত দ্বারকানাথ ইউনিয়ন ব্যাংক

স্থাপন করেছিলেন, রানিগঞ্জের কয়লাখনি, জুটমিল,আসামের চা বাগান

কিনেছিলেন, বিমা কোম্পানি, জাহাজ কোম্পানি খুলেছিলেন। এসব আমরা জানি,

কিন্তু সবই ব্রিটিশদের হাত ধরে, তাদের ছোট তরফ হয়ে। ওড়িশা ও পূর্ব বাংলার

জমিদারি ওঁর পালকপিতা রামলোচন পেয়েছিলেন ওই চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের

আইনের সুবিধেয়। তথ্য ঘাঁটলে পাওয়া যায় খাজনা আদায়ে দ্বারকানাথ ‘রুথলেস’

ছিলেন।

আবার প্রিন্স দ্বারকানাথের তৈরি দেশের প্রথম অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান ম্যানেজিং

এজেন্সির নাম ‘কার, টেগোর অ্যান্ড কোম্পানি’। কিন্তু যেটা বলা হয় না সেটা

হোল এঁদের প্রধান কাজ ছিল আফিমের ব্যবসা। বঙ্গে তৈরি আফিম লুকিয়ে চিনে

জোগান দেওয়া। আর বঙ্কিমচন্দ্র ও বিদ্যাসাগর ছিলেন অবশ্যই ইংরেজ

সরকারের চাকুরিজীবা - একজন ম্যাজিস্ট্রেট, অন্য জন শিক্ষাবিভাগে বিভিন্ন

পদে।

এরপর লেখক বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বঙ্গদেশের কৃষক’ থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে দেখাচ্ছেন

বঙ্কিমচন্দ্র তৎকালীন কৃষিব্যবস্থায় কৃষকদের দুর্দশা সম্বন্ধে সম্যক

অবহিত, লেখনীতে ফুটে উঠেছে হাসিম শেখ-রামা কৈবর্ত-পরাণ মণ্ডলদের দুর্দশা।




কিন্তু লেখকের চোখে এ’সবই কুম্ভীরাশ্রু; কেননা এরপর বঙ্কিম দুটো বক্তব্য

রেখেছেন।

এক, ভাল জমিদার ও মন্দ জমিদারের মধ্যে ফারাক করেছেন, ‘সিস্টেম -অ্যাজ এ

হোল’কে কাঠগড়ায় দাঁড় করান নি।

দুই, চাষির দুঃখকষ্ট দেখেও চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পক্ষে কথা বলেছেন।

“চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ধ্বংসে বঙ্গসমাজে ঘোরতর বিশৃংখলা উপস্থিত হইবার

সম্ভাবনা। আমরা সামাজিক বিপ্লবের অনুমোদক নহি”।

আরও,

“যে দিন ইংরাজের অমঙ্গলাকাঙ্ক্ষী হইব, সেদিন সমাজের অমঙ্গলাকাঙ্ক্ষী

হইব, সেইদিন সে পরামর্শ দিব। --- আমরা কেবল ইহাই চাহি যে সেই

বন্দোবস্তের ফলে যে সকল অনিষ্ট ঘটিতেছে, এখন সুনিয়ম করিলে তাহার যত

দুর প্রতীকার হইতে পারে, তাহাই হউক”। [8]

লেখক এবার দেখাচ্ছেন বিদ্যাসাগর কীভাবে দেখেছিলেন চিরস্থায়ী

বন্দোবস্তকে। “চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত হওয়াতে, বাঙ্গালা দেশের যে সবিশেষ

উপকার দর্শিয়াছে, ইহাতে কোন সন্দেহ নাই। এরূপ না হইয়া যদি পূর্বের ন্যায়,

রাজস্ব বিষয়ে নিত্যনতুন পরিবর্তের প্রথা থাকিত, তাহা হইলে, এদেশের কখনই

মঙ্গল হইত না”। [9]

গ্রন্থটির প্রথম ভাগের এই দ্বিতীয় অধ্যায়টির শীর্ষক ছিল “হেস্টিংস থেকে

কর্নওয়ালিস, সাহেব ও মোসাহেবদের লুঠ কিসসা”। বিদ্যাসাগরের উপরোক্ত

উদ্ধৃতিটি দিয়ে লেখক ধরে নিয়েছেন তাঁর উপপাদ্যটি প্রমাণিত। তাই শেষ করেছেন

এই বলে - ‘বুঝ লোক যে জান সন্ধান’!

অর্থাৎ,

চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ভারতে ইংরাজদের লুঠের ভিত্তি।

বঙ্কিম ও বিদ্যাসাগর চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সমর্থক।

অতএব, ওঁরা দু’জন ইংরেজের মোসাহেব এবং ওদের লুঠের ভাগীদার।

একেবারে অবরোহ তর্কপদ্ধতির হদ্দমুদ্দ।




আমার উত্তরপক্ষ:

চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত মোঘল আমল থেকে চলে আসা কৃষি রাজস্বের পদ্ধতির

চেয়ে মন্দের ভাল। লেখকের বর্ণনা থেকেই দেখা গেছে পুরনো ব্যবস্থায়

কোম্পানির রাজস্ব আদায়কারী প্রতিনিধিরা (পড়ুন জমিদারেরা) একেকবছর

একেক রকম দাবি নিয়ে সোজা মাৎসন্যায় শুরু করেছিল। ফলে ছিয়াত্তরের

মন্বন্তর ও একগাদা কৃষক বিদ্রোহ। নতুন ব্যবস্থায় একবার যা খাজনা ধার্য

হয়েছে তাই প্রতি বছর কোম্পানিকে দিতে হবে। ফলে একধরনের অরাজকতা বন্ধ

হোল। মন্বন্তর ও কৃষক বিদ্রোহ হল না। বিদ্যাসাগর সঠিক বলেছেন - ‘যদি

পূর্বের ন্যায়, রাজস্ব বিষয়ে নিত্যনতুন পরিবর্তের প্রথা থাকিত, তাহা হইলে,

এদেশের কখনই মঙ্গল হইত না”।

কিন্তু যে কোন ব্যবস্থারই অন্ধকার দিক থাকে। দেখাই যাচ্ছে বঙ্কিম সে বিষয়ে

যথেষ্ট ওয়াকিবহাল ছিলেন যা তাঁর ‘বঙ্গদেশের কৃষক’ লেখাটির ছত্রে ছত্রে

আছে। তাই সংস্কারের দাবি রেখেছেন। নইলে ইংরেজ সরকারের ডেপুটি

ম্যাজিস্ট্রেটের কী দায় পড়েছিল ওই অন্ধকার দিকের প্রতি আঙুল তোলার?

‘মোসাহেব’ হলে শুধু গুণ গাইতেন, অন্ধকার দিকের কথা তুলতেন না।

লেখকের আপত্তি যে ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের’ আইন বানিয়েছে বঙ্কিম কেন তার

কাছেই কিছু সংস্কারের আবেদন করছেন?

আমার প্রতিপ্রশ্ন - তা নইলে আর কার কাছে করতেন? অন্য কোন বিকল্প ছিল

কি? থাকলে সেটা কী?

একটা তিনঠেঙে তুলনা টানছি। আজ যে বামপন্থীরা ‘নো ভোট টু বিজেপি’ বলেছেন,

তাঁরাই মমতা সরকারকে বলছেন নিজেদের ক্যাডারদের নিয়ন্ত্রণ করতে, ভোট

পরবর্তী হিংসা বন্ধ করতে। এটাই তো স্বাভাবিক। আর কার কাছে এই দাবি করা

যায়?

আজকে ২১ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে যেসব বিকল্প ভাবনা আমরা ভাবতে পারি দুশো

বছর আগের কলোনিয়াল ভারতে, তখনও হয়ত দিল্লির তখতে মোগল সম্রাট বা

মাত্র ভিক্টোরিয়া হাতে ক্ষমতা নিয়েছেন — কতদূর সম্ভব ছিল?




বিদ্যাসাগরের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সমর্থনের কোন বিষময় প্রভাব তাঁর

শিক্ষা সংস্কারে পড়েছিল কিনা তা আমরা দেখব পরের অধ্যায়ে।

(৩.৪) ইতিহাসের আয়রনি

আমার কথা হল সমাজ বা রাষ্ট্র পরিবর্তন খাপে খাপে আপনার আমার কেতাবি

ফরমুলা মেনে হয় না। বিকাশ ও উত্তরণের সর্পিল গতি অনেক ছোট ছোট

সমঝোতার মধ্যে দিয়ে এগোয়। আমাদের ফর্মূলা তার approximation মাত্র।

তাই আয়রনির ছড়াছড়ি। কয়েকটি উদাহরণ দিচ্ছি।

এক, মজদুরের মুক্তির তত্ত্ব কোন মজদুরের মস্তিষ্কপ্রসূত নয়, বরং এসেছে

মার্ক্স নামের এক প্রুশিয়ান উচ্চবর্গীয় অভিজাত শিক্ষিত পরিবারের ব্যক্তির

থেকে।

দুই, স্বাধীনতা আন্দোলনের ‘বন্দে মাতরম' নামের ব্যাটল ক্রাই এল ইংরেজের

চাকর এক ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের থেকে, যিনি নিজেকে ওপরের প্রবন্ধে বলেছেন

‘ইংরেজের মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী’ বলে।

তিন, যিনি জীবনভর পরিশ্রম করলেন শ্রমিকের শোষণের ‘উদ্বৃত্ত মূল্যের’

তত্ত্বকে দাঁড় করাতে, তাঁকেই ওই ক্যাপিটাল বইটি লেখার সময় খাওয়াপরার

জন্যে বন্ধু এংগেলসের কাপড়ের কলের শেয়ারের ডিভিডেন্ড হিসেবে শ্রমিকের

শ্রমের উদ্বৃত্ত মূল্যের উপর নির্ভর করতে হল।

চার, যে মোহনদাস গান্ধী বিংশ শতাব্দীর গোড়ায় নিজেকে ব্রিটিশ এম্পায়ারের

মোস্ট ওবিডিয়েন্ট সাবজেক্ট বলে লিখছেন তিনিই আর দুটো দশক পরে তাকে

বলছেন ‘দ্য ডেভিল’স এম্পায়ার’ এবং ‘কুইট ইন্ডিয়া’র ডাক দিচ্ছেন।

পাঁচ, রাশিয়ায় পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা লেনিনের ‘ইস্ক্রা’ পত্রিকা

প্রকাশের খরচাটি সম্ভব হত প্রধানত সাশা মরোজভ বলে এক পুঁজিপতির

দাক্ষিণ্যে।

এ নিয়ে আমরা আবার কথা বলব লেখাটির সমাপ্তির সময়। আপাতত লেখকের

সমস্ত মূল্যবান পরিশ্রমী সাক্ষ্যের অকুণ্ঠ প্রশংসা করেও তাঁর সিদ্ধান্তের




সঙ্গে — চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রশংসা করা বঙ্কিম বিদ্যাসাগরেরা ইংরেজের

মোসাহেব - এ নিয়ে একমত হতে পারছি না।
0

প্রচ্ছদ নিবন্ধ - সুকান্ত ঘোষ

Posted in








তারা আপনাকে দেখেই ঠিক করে ফেলেছে

১৯৯০ সালের কথা - স্যান্ড্রা ফরসাইথ নামে মায়ামি ইউনিভার্সিটির এক গবেষক একটা বেশ সাধারণ কিন্তু আবার চালাকি মেশানো পরীক্ষা করলেন। তিনি চারজন মহিলাকে ভিডিওতে রেকর্ড করলেন, যাঁরা একটা ম্যানেজমেন্ট পোষ্টের জন্য ইন্টারভিউ দিচ্ছেন। চারজনের প্রত্যেককে চার রকমের পোশাকে, যে পোশাকগুলো সাজানো হয়েছিল ‘পুরুষালি’ হবার মাত্রা অনুযায়ী। এক নম্বর পোশাক সবচেয়ে নরম, মেয়েলি; চার নম্বর সবচেয়ে কড়া, কাটা-কাটা, প্রায় পুরুষের স্যুটের মত। তারপর ব্যাঙ্কিং আর মার্কেটিং জগতের ১০৯ জন লোককে সেই ভিডিও দেখানো হল আওয়াজ বন্ধ করে। মানে, কে কী বলছেন তা শোনার উপায় নেই, শুধু দেখা যাচ্ছে। বলা হল যে মহিলারা ইন্টারভিউ দিয়েছেন তাঁদের সবার যোগ্যতা, ডিগ্রী, অভিজ্ঞতা সমান – এবার আপনারা নম্বর দিন।

ফলাফল কি হল অনুমান করতে পারছেন? যাঁরা বেশী ‘পুরুষালি’ পোশাক পরেছিলেন, তাঁদের অনেক বেশী মাত্রায় দৃঢ়চেতা, আত্মনির্ভর, ক্ষিপ্র, আক্রমণাত্মক এবং সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম বলে মনে করা হল। এবং তাঁদের চাকরী দেবার সুপারিশও বেশী এল। মজার ব্যাপার, ইন্টারভিউ যিনি নিচ্ছেন তিনি পুরুষ না মহিলা, ব্যাঙ্কার না মার্কেটিং-এর লোক, তাতে বিশেষ কিছু হেরফের হল না। মানে, সবাই একই ছাঁচে ভাবছে।

এবার আপনি বলতেই পারেন, ভাই বড়ই সরলীকরণ করে ফেললে কেসটা। এমন ব্যাপার স্যাপার হলে তো সব কোম্পানীর বড় পোষ্টের লোকজনকে ব্র্যাড পিট হতে হবে! কিন্তু আমরা জানি তা তো হয় না। তার মানে ভিতরে থাকলে বা বাকিদের থেকে লক্ষণীয় ভাবে ভালো হলে এই সব পোষাক ইত্যাদি নিয়ে ভাবতে হয় না। আর যদি গড়পড়তা লোক হয়ে বাকিদের সাথে ফাইট দিতে হয়, তাহলে একটা চান্স থেকে যায় পোষাক দিয়ে প্রভাব ফেলার বা প্রভাবিত হবার।

ফরসাইথ-ও সেটা জানতেন না এমন নয়! তিনি নিজেও কিন্তু সৎ ভাবে লিখেছিলেন যে পোশাকের প্রভাব ব্যক্তির নিজের প্রভাবের তুলনায় ছোট – মুখ, ভঙ্গী, হাসি, হাত নাড়ার ধরণ, এ সবের ওজন বেশী। কিন্তু তারপরেই তিনি এমন একটা কথা লিখেছেন যা বেশ জোরালোঃ পোশাক জিনিসটা সহজে বদলানো যায়, মুখ বদলানো যায় না! এবং এই ‘সহজে বদলানো যায়’ বলেই গোটা একটা শিল্প গড়ে উঠেছে আমাদের ঘাড়ে চেপে। সেই পোষাক এবং ফ্যাশন ইন্ডাষ্ট্রি নিয়ে কথা পরে হবেক্ষণ।

তবে কিনা এই নিয়ে গবেষণার লিষ্ট লম্বা, এবং প্রায় সবই এক দিকে ঝুঁকে আছে। ফর্ম্যাল জামা পরা টিচিং অ্যাসিষ্ট্যান্টদের ছাত্ররা বেশী বুদ্ধিমান ভাবে, কিন্তু কম ইন্টারেষ্টিং। ফর্ম্যাল পোশাক পরা থেরাপিষ্টের কাছে ক্লায়েন্ট দ্বিতীয়বার ফিরে আসে বেশী। হাই স্কুলের ছেলেমেয়েদের জামাকাপড়ের ধরণ দেখে বন্ধু এবং শিক্ষক – দু’পক্ষই ঠিক করে ফেলে ছেলেটি বা মেয়েটি পড়াশুনায় কেমন। আর সবচেয়ে বাজে তৈরী হওয়া ধারণাটি হল - উঁচু পদের চাকরীতে কোন মহিলা যদি একটু বেশী আকর্ষণীয় করে সাজেন, তাঁকে কম যোগ্য বলে মনে হয়। মানে মেয়েদের জন্য দড়িটা এত সরু যে হাঁটাই মুশকিল, বেশী মেয়েলি হলে অযোগ্য, বেশী পুরুষালি হলে ‘অ্যাগ্রেসিভ’, আর সুন্দরী হলে তো কথাই নেই! খুবই গুণী এবং তার সাথে প্রচন্ড সুন্দরী একজনাকে খুবই কাছাকাছি একছাদের তলায় দীর্ঘদিন দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। আমরা এই বিষয়গুলি নিয়ে আলোচনা করতাম, এমনকি নিজেদের মধ্যে ছোটখাট পরীক্ষাও, সেই সব নিয়েও দীর্ঘ লেখা লিখে ফেলা যাক। তবে সে সবই কিন্তু বাকি প্রকাশিত স্টাডিগুলির সমর্থনসূচকই ছিল বেশীর ভাগ সময়।


সুন্দর দেখতে বলেই আপনি ঠিক কথা বলছেন না

ওদিকে চেহারার বাজারদর মাপার কাজটা করেছেন অর্থনীতিবিদরা। ড্যানিয়েল হ্যামারমেশ প্রায় গোটা কেরিয়ার এই নিয়ে খরচ করেছেন – ‘পালক্রোনমিক্স’ বলে ইয়ার্কি করে ডাকা হয় জিনিসটাকে, সৌন্দর্যের অর্থনীতি। তাঁর হিসেব অনুযায়ী আমেরিকায় এক জন সুশ্রী মানুষ গোটা কর্মজীবনে গড়ে প্রায় দুই লক্ষ তিরিশ হাজার ডলার বেশী রোজগার করেন গড়পড়তা-থেকে-কম-দেখতে সহকর্মীর তুলনায়। শতাংশের হিসেবটা ছোট – দু-তিন-চার শতাংশ – কিন্তু তিরিশ বছর ধরে জমলে আর ছোট থাকে না। সুন্দর লোকেরা চাকরী বেশী পান, প্রোমোশন বেশী পান, ব্যাঙ্কে লোন পান সহজে, সুদটাও তাঁদের দিতে হয় একটু কম। এ জিনিসও আমি নিজে সামনা সামনি দেখেছি – পৃথিবীর নানা দেশে ঘুরতে গিয়ে কত জিনিসের ডিসকাউন্ট পেয়েছি কেনার সময়, অনেক সময় না চাইতেই, কেবল সাথে সুন্দরী একজন ছিল বলে!

এবার একটা ইনটারেষ্টিং পরীক্ষার কথা বলি, যেটা আমাদের নিজেদের রাজনৈতিক পক্ষপাত নিয়েও একটু খোঁচা দিয়ে যায়! আগে থেকে জানা ছিল যে ডানপন্থী রাজনীতিবিদদের ভোটাররা বেশী সুশ্রী বলে মনে করেন – অষ্ট্রেলিয়া, ফিনল্যান্ড, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আমেরিকা – চার জায়গার নির্বাচনের ডাটাতেই এইরকম ফলের ইঙ্গিত দিয়েছিল একসময়। এখন প্রশ্ন হল, কেন? দুটো ব্যাখ্যা সম্ভব। এক, ডানপন্থী লোকজন এমনিতেই দেখতে ভালো – কারণ সুন্দর লোকেরা বেশী রোজগার করেন, আর বেশী রোজগেরে লোকেরা সম্পদের পুনর্বন্টন কম পছন্দ করেন। একটা নিখুঁত গোল বৃত্ত। দুই, ডানপন্থী দলে প্রার্থী বাছাই করার সময়েই চেহারার উপর বেশী জোর দেওয়া হয়।

হেলসিঙ্কি ইউনিভার্সিটির জান-এরিক লনভিষ্ট এই দুটোকে আলাদা করার জন্য এক দারুণ ভাবনা বেছে নিলেন। তিনি রাজনীতিবিদদের ছেড়ে ধরলেন বুদ্ধিজীবীদের – ডানপন্থী ও বামপন্থী পত্রিকায় যাঁরা লেখেন, সেই সব অধ্যাপক-লেখকদের ছবি। যুক্তিটা সহজ: বুদ্ধিজীবী হবার জন্য কেউ কাউকে সুন্দর হতে বলে না। ওই লাইনে সুশ্রী মুখের কোন বাজারদর নেই।

ফল বেরুলো - বিচারকরা ছবি দেখে দিব্যি আন্দাজ করতে পারলেন কে বামপন্থী আর কে ডানপন্থী (মুখ দেখে রাজনীতি চেনা যায়, এ এক আলাদা অস্বস্তিকর গল্প)। কিন্তু সৌন্দর্য? ডানপন্থী বুদ্ধিজীবীরা মোটেই বেশী সুশ্রী নন। উল্টে, ছবির কোয়ালিটি আর ‘গ্রুমিং’-এর হিসেব বাদ দিয়ে দেখা গেল বেশী সুশ্রী মানুষরা বরং বামপন্থী পত্রিকাতেই বেশী লিখছেন। ডানপন্থীরা যেখানে এগিয়ে, সেটা সৌন্দর্য নয় – সেটা হল পরিপাট্য। চুল আঁচড়ানো, দাড়ি কামানো, জামার ভাঁজ। মানে, ঈশ্বরপ্রদত্ত মুখ নয়, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে খরচ করা সময়।

লনভিষ্টের পেপারটার নাম, যার থেকে ভালো নাম হতে পারত না, ‘Just because you look good, doesn’t mean you’re right’। দেখতে ভালো বলেই আপনার কথাটা ঠিক, তা নয়। ইংরেজীতে ‘right’ শব্দটার দুটো মানে – ‘ঠিক’ এবং ‘ডান’। লনভিষ্ট ভাষার সাথে একটু খেলা করেছেন আর কি!

নোবেলজয়ী লেখক আইজ্যাক বাশেভিস সিঙ্গার এক জায়গায় লিখেছিলেন, পোশাকের ভিতরে এক অদ্ভুত ক্ষমতা লুকিয়ে থাকে। কথাটা কেবল কথার কথা নয়, ওটা মাপা যায় বা মাপার চেষ্টা অন্তত অনেকেই করেছেন দীর্ঘদিন ধরে। তাই সেই নিয়ে গবেষণাও কম নেই।

এখন এটা একটু কমেছে গত কিছু বছর হল, বিজনেস ক্লাসের লাইনে দাঁড়ালে (বিশেষ করে ভারতে), গেট খুলে বোর্ডিং-এর আগে একবার করে এসে টিকিট চেক করে যায়। এমন নয় যে আগে করত না, কিন্তু আগে মাঝে মাঝে ফট করে হয়ত লাইনে দাঁড়ানো কাউকে বলেই দিত, “আপনার লাইন এটা নয়, ওটা ওদিকে”। আমার সাথে অনেকবার হয়েছে এটা। টিকিট চেক না করে কি দেখে তারা বিজনেস ক্লাস বা ইকনমি ক্লাসের পার্থক্য করত তারা বলে আপনার মনে করেন? যেহেতু ট্রাভেল একটু বেশিই করতে হয় – তাই পরীক্ষাও চালিয়ে ছিলাম আগে কখন এরা আর জিজ্ঞেস করবে না আমি ইকনমি ক্লাসে কিনা। দেখেছিলাম হাতে ইংরাজি বই থাকলে প্রশ্ন কম করে।

বহু আগে এই সব নিয়ে বেশ বিরক্ত হতাম। সুধা ম্যাডাম এই নিয়ে ফুটেজ দেবার বহু আগে থেকেই এই জিনিস চলে আসছে। তো এই ব্যাপারটা নিয়ে ভাবতে ভাবতেই একদিন আবিষ্কার করলাম, আমি যা নিয়ে বিরক্ত হচ্ছি, গত পঞ্চাশ বছর ধরে দুনিয়ার সাইকোলজিষ্ট, সমাজতত্ত্ববিদ, আর ইকনমিষ্টরা তা নিয়ে রীতিমতন ল্যাবরেটরীতে পরীক্ষা চালিয়ে গেছেন। এবং তাঁদের ফলাফল আমার বিরক্তিকে সমর্থনই করে, আরো খানিকটা অস্বস্তি বাড়িয়ে দিয়ে।


এবার উল্টো দিক – জামাকাপড় আপনাকে কী করে?

এতক্ষণ যা বললাম তা হল, অন্যরা আপনাকে জামা দেখে বিচার করে। সেটা তো জানা কথাই, শুধু মাপজোখ হয়েছে। আসল চমকটা এল ২০১২ সালে।

নর্থওয়েষ্টার্ন ইউনিভার্সিটির দুই গবেষক, হাইয়ো অ্যাডাম আর অ্যাডাম গ্যালিনস্কি একটা শব্দ বানালেন: ‘এনক্লোদ্‌ড কগনিশন’। বাংলায় বলা যেতে পারে ‘পরিহিত মনন’, যদিও তাতে জিনিসটার মজাটা মরে যায়। তাঁদের বক্তব্য এই যে জামাকাপড় শুধু অন্যের চোখে আপনাকে বদলায় না, জামাকাপড় আপনার নিজের মাথার ভিতরের ধারণাটাও বদলে দেয়।

তাঁরা বেছে নিলেন সাদা ল্যাব কোট। প্রথমে ৩৮ জনকে জিজ্ঞেস করে নিশ্চিত হলেন যে হ্যাঁ, লোকে সাদা ল্যাব কোট দেখলে মনে করে – মনোযোগী, সতর্ক, দায়িত্বশীল, বৈজ্ঞানিক। তাহলে যদি আপনি সেই কোটটা গায়ে চড়ান, আপনার মনোযোগ কি বাড়বে?

প্রথম পরীক্ষা করা হল স্ট্রুপ টেস্ট। যাঁরা জানেন না, ব্যাপারটা এই: স্ক্রীনে একটা শব্দ ভেসে উঠবে, ধরুন ‘লাল’ – কিন্তু লেখাটা নীল কালিতে। আপনাকে বলতে হবে কালির রঙ, শব্দটা নয়। শুনতে সহজ, করতে গিয়ে মাথা ঘুরে যায়, কারণ মস্তিষ্ক পড়া বন্ধ করতে পারে না। ১৯৩৫ সাল থেকে এই টেস্টকে মনোযোগ মাপার সোনার কাঠি বলা হয়। দেখা গেল, যাঁরা ল্যাব কোট পরে বসেছেন, তাঁরা কঠিন প্রশ্নগুলোতে প্রায় অর্ধেক কম ভুল করছেন সেই তুলনায় যাঁরা নিজের জামাতেই আছেন।

এখানেই থামলে গল্পটা বিশ্বাসযোগ্য হবে না হয়ত। প্রশ্ন উঠতেই পারে, সাদা কোটটা তো নিছক ‘ডাক্তার’ কথাটা মনে করিয়ে দিচ্ছে, তাতেই কাজ হচ্ছে না তো? গায়ে চড়ানোর দরকার কী?
তাই দ্বিতীয় পরীক্ষা। ৭৪ জন ছাত্রছাত্রীকে তিন ভাগে ভাগ করা হল। এক দলকে একই ডিসপোজেব্‌ল সাদা কোট পরানো হল, বলা হল এটা ডাক্তারের কোট। আর এক দলকে একদম হুবহু সেই একই কোট পরানো হল, শুধু বলা হল এটা শিল্পীর কোট, ছবি আঁকার সময় পরে। তৃতীয় দলকে কোটটা পরানো হল না, শুধু টেবিলে সাজিয়ে রাখা হল সামনে, বলে দেওয়া হল ওটা ডাক্তারের কোট। তারপর সবাইকে ‘দুটো ছবির মধ্যে চারটে তফাৎ খুঁজে বার করুন’ ধরণের কাজ দেওয়া হল – মনোযোগ ধরে রাখার পরীক্ষা।

ফল: ডাক্তারের কোট গায়ে থাকা দলটা বাকি দুই দলকে হারিয়ে দিল। আর বাকি দুই দলের মধ্যে, শিল্পীর কোট পরা দল আর ডাক্তারের কোট দেখা দল, কোন তফাৎই নেই!
অর্থাৎ কাপড়টা এক, সুতোটা এক, ওজন এক। বদলেছে শুধু নামটা। কোটের গায়ে যে অদৃশ্য লেবেলটা সাঁটা আছে – ‘ডাক্তার’ না ‘শিল্পী’ – সেটাই আপনার মনোযোগ ঠিক করে দিচ্ছে। এবং শুধু লেবেল যথেষ্ট নয়, গায়ে চড়াতেই হবে। দেখলে হবে না।

অ্যাডাম আর গ্যালিনস্কি লিখলেন, এনক্লোদ্‌ড কগনিশনের দুটো শর্ত: এক, জামার প্রতীকী অর্থ; দুই, জামাটা সত্যি সত্যি গায়ে দেওয়ার শারীরিক অভিজ্ঞতা। দুটো একসাথে না হলে কিছু হয় না।


এবং তারপর সেই পরীক্ষা ভেঙে পড়ল

অ্যাডাম-গ্যালিনস্কির পেপারটা হইহই করে বিখ্যাত হয়ে গেল। ছ’বছরে দুশোর বেশী উদ্ধৃতি, খবরের কাগজে লেখালিখি, টেড টক-এর মালমশলা। এবং তারপর, ২০১৯ সালে, ডেভিন বার্নস আর তাঁর সহকর্মীরা কাজটা আবার করলেন। এবারে আগে থেকে সব কিছু ঘোষণা করে – কী মাপব, কতজনের উপর, কীভাবে হিসেব কষব, সব রেজিষ্টার করা, যাতে ফল দেখে পরে অঙ্ক পাল্টানো না যায়। অনেক বেশী লোক, অনেক বেশী ট্রায়াল।


ভাবছেন কি পাওয়া গেল পরীক্ষায়? ল্যাব কোটের কোন প্রভাবই পাওয়া গেল না!

বার্নস দেখালেন, তাঁদের যন্ত্রপাতি এতই সূক্ষ্ম যে সাত মিলিসেকেন্ডের তফাৎও ধরা পড়ছে। কাজেই ‘ভুলটা আমাদের যন্ত্রের’ – এ ওজর চলবে না। ল্যাব কোটের এফেক্ট যদি থেকেও থাকে, সেটা এত ছোট যে মূল পরীক্ষায় ওটা ধরা পড়ারই কথা নয়।

এবার এই সময়েই বিজ্ঞানীদের সঠিক চরিত্র বোঝা যায়। অ্যাডাম আর গ্যালিনস্কি একই জার্নালে একটা উত্তর লিখলেন যা পড়ে উনাদের প্রতি সম্মান বেড়ে যেতে বাধ্য। তাঁরা লিখলেন, রিপ্লিকেশনের কাজটা যোগ্য হাতে হয়েছে, এবং তার ফল তাঁদের নিজেদের স্ট্রুপ-ফলাফল নিয়ে সত্যিকারের সন্দেহ তৈরী করছে। ঝগড়া নয়, গোঁজামিল নয়, ‘আমাদের বোঝোনি’ নয়। তারপর তাঁরা বললেন – কিন্তু মূল ধারণাটা, যে আমরা যা পরি তা আমাদের ভাবা-অনুভব-করা-আচরণকে প্রভাবিত করে, সেটা অন্য অনেক পরীক্ষাতেই দাঁড়িয়ে আছে।

এবং সেটা মিথ্যে নয়। যেমন ধরুন মাইকেল স্লেপিয়ানের কাজ, পাঁচটা পরীক্ষায় তিনি দেখিয়েছেন, ফর্ম্যাল পোশাক পরলে মানুষ বেশী বিমূর্ত ভাবে ভাবতে শুরু করে। গাছের দিকে না তাকিয়ে জঙ্গলটা দেখে, ছোট ছোট বিশদের বদলে বড় ছবিটা ধরে। মাঝখানে যে জিনিসটা কাজ করছে তা হল ‘ক্ষমতার অনুভূতি’ – টাই বাঁধলে যেমন নিজেকে খানিকটা তফাতের, খানিকটা উপরের মানুষ মনে হয়, আর দূর থেকে দেখলে সব কিছুই বড়-বড় দাগে দেখা যায়।

তার মানে, সাদা কোট পরে বসে থাকলেই আপনি খুঁটিয়ে দেখতে শুরু করবেন - এই সহজ, লোভনীয়, ইনস্টাগ্রামে-ছড়ানোর-মত সিদ্ধান্তটা টেকে না। কিন্তু জামার সাথে মনের একটা যোগ আছে – সেটা একটা ঘটনা।


সাঁতারের পোশাক এবং একটা অঙ্ক পরীক্ষা

জামা যে কেবল আত্মবিশ্বাস বাড়ায় তা নয়। কখনো কখনো সে কেস কেলো-ও করে দেয়।

১৯৯৮ সালে বারবারা ফ্রেডরিকসন এবং তাঁর সহকর্মীরা একটা পরীক্ষা করেছিলেন যেটার কথা আমি প্রথমবার পড়ে বেশ ভেবেছিলাম। ছাত্রছাত্রীদের বলা হল, এটা ‘আবেগ এবং ক্রেতা-আচরণ’ নিয়ে একটা গবেষণা – তাদের কিছু জিনিসপত্র পরে দেখে মতামত দিতে হবে। তারপর প্রত্যেককে একা একা একটা ট্রায়াল রুমে ঢুকিয়ে দেওয়া হল, সামনে আয়না। অর্ধেককে দেওয়া হল একটা সোয়েটার। বাকি অর্ধেককে সাঁতারের পোশাক। সেই পোশাক পরে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থাতেই তাদের কিছু প্রশ্নপত্র ভরতে দেওয়া হল, তারপর কিছু খাবার চাখতে দেওয়া হল, এবং শেষে একটা অঙ্ক পরীক্ষা।


ঘরে আর কেউ নেই, কেউ দেখছে না। তবুও -

মেয়েদের ক্ষেত্রে সাঁতারের পোশাক জন্ম দিল লজ্জা এবং একটা তীব্র আত্ম-বিতৃষ্ণার। তারা খাবার কম খেলো, নিজেকে সংযত করলো এবং অঙ্ক পরীক্ষায় খারাপ করলো সোয়েটার-পরা মেয়েদের তুলনায়। গবেষকদের ব্যাখ্যা: শরীরটাকে যখন বাইরের একজোড়া চোখ দিয়ে দেখতে শুরু করি, তখন মাথার একটা বড় অংশ ওই পাহারা দেওয়ার কাজেই খরচ হয়ে যায়। অঙ্ক করার জন্য যা পড়ে থাকে, তা কম।

ছেলেদের ক্ষেত্রে? সাঁতারের পোশাক পরে তারা লজ্জা তো পায়নি বটেই বরং পেয়েছে তাদের হাসি। তারা লিখেছে নিজেদের ‘বোকা-বোকা’, ‘অস্বস্তিকর’, ‘হাস্যকর’ লাগছে। গবেষকরা রিপোর্টে লিখেছেন, ট্রায়াল রুমের বন্ধ দরজার ওপাশ থেকে কয়েকজনের হাসির আওয়াজ পাওয়া গিয়েছিল। তাঁদের খাওয়ায় কোন হেরফের হয়নি। অঙ্কেও না, বরং সামান্য ভালোই করেছিলেন।
একই ঘর, একই আয়না, একই কম কাপড়। একদলের কাছে সেটা ঠাট্টা, আর একদলের কাছে বিচারসভা।

এটা আমাদের বাড়ির ভিতরেও রোজ ঘটে, শুধু আমরা নাম দিই না। মেয়েটির ‘এই জামায় আমাকে মোটা লাগছে না তো?’ আর ছেলেটির ‘যা হোক একটা গলিয়ে নিয়েছি’ – এই দুটো বাক্যের মধ্যে যে অসমান দূরত্ব, তার একটা মাপ আছে, এবং সেই মাপটা কারো তৈরী করা।


বাজার এই পেপারগুলো পড়ে ফেলেছে

ভাবছেন এই যে সব গবেষণাপত্রের কথা লিখলাম, তারা শুধু জার্নালের পাতায় ধুলো খাচ্ছে? মোটেই না – মার্কেটিং ডিপার্টমেন্টগুলো এগুলো আমাদের অনেক আগে পড়েছে।
‘অ্যাথলেজার’ শব্দটা শুনেছেন? অ্যাথলেটিক আর লেজার মিলিয়ে বানানো – ব্যায়ামের পোশাক, যা ব্যায়ামের বাইরেও পরা হয়। লেগিংস, জগার, হুডি, ইয়ো গা প্যান্ট। যে জিনিসটা জিমে পরার কথা ছিল, সেটা এখন অফিসে, ব্রাঞ্চে, মুদির দোকানে, বিমানবন্দরে। বাজারের মাপ? সমীক্ষা-সংস্থাগুলোর হিসেব একেক রকম, কিন্তু সবাই একমত যে ২০২৫ সালে এটা চারশো বিলিয়ন ডলারের [১ বিলিয়ন ডলার মানে মোটামুটি ১০০ কোটি টাকা] আশেপাশে দাঁড়িয়ে এবং আগামী দশ বছরে দ্বিগুণেরও বেশী হবে। একটা প্যান্টের ব্যবসা, যেটা কার্যত পঁচিশ বছর আগেও ছিল না।

২০১৯ সালে সারা লিপসন এবং তাঁর সহকর্মীরা প্রথমবার এই ট্রেন্ডটাকে শরীর-ভাবনার আয়নায় ফেললেন – কুড়িজন নিয়মিত অ্যাথলেজার-পরা মহিলার সাথে দীর্ঘ কথাবার্তা। যা বেরিয়ে এল, তা প্রায় নিখুঁত এক ফাঁদের নকশা।

এক, লেগিংস পরলে তাঁদের মনে হয় তাঁরা ফিট, স্বাস্থ্যসচেতন, আত্মবিশ্বাসী – পোশাকটা যেন একটা লাইফস্টাইলের সদস্যপত্র। এনক্লোদ্‌ড কগনিশন হাতেনাতে।

দুই, একই পোশাক শরীরটাকে এমন ভাবে ধরে রাখে যে যেখানে যেখানে ‘সমস্যা’, সেগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। একজন বলেছেন, আঁটোসাঁটো জিনিস পরলে আমি ঠিক বুঝতে পারি কোথায় কোথায় কাজ করতে হবে। আর একজন আরো এগিয়ে গিয়ে বলেছেন, এই কারণেই তাঁর মাথায় প্লাষ্টিক সার্জারির কথা আসতে শুরু করেছে।

তিন, তাই তাঁরা জিমে যান। জিমে গিয়ে শরীর বদলায়, বদলটা লেগিংসে দেখা যায়, দেখে ভালো লাগে, আরো জিমে যান।

চার, এবং এটাই সবচেয়ে মনে হয় ইন্টারেষ্টিং – কুড়ি জনের মধ্যে উনিশ জনই স্পষ্ট বলেছেন যে এই গোটা ব্যাপারটা অবাস্তব, অসম্ভব, বিজ্ঞাপনের দুনিয়া বাস্তবের সাথে সম্পর্কহীন। তাঁরা জানেন, কিন্তু তবুও -

এটাকে গবেষকরা বলেছেন ‘কগনিটিভ ডিসোন্যান্স’। আমি বলব, এটাকে বলে ভালো ব্যবসা। আমার পিসতুতো দাদা অরবিন্দ যেটা ভালো বোঝে খুব! যে পণ্যটা আপনার অভাববোধ তৈরী করে এবং সেই অভাব মেটানোর পথও দেখায়, এবং যার দাম আশি ডলার – সেই পণ্যের চেয়ে নিখুঁত জিনিস বাজারে খুব বেশী নেই। জিমের সদস্যপদটা পর্যন্ত এত ভালো কাজ করে না, কারণ জিমে না গেলে অন্তত ব্যাপারটা চোখে পড়ে না। লেগিংস রোজ সকালে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হিসেব চায়!


ইউনিফর্ম – ক্ষমতার সবচেয়ে সস্তা রূপ

এবার একটু অন্য দিকে তাকানো যাক। আমাদের হাউসিং সোসাইটির সিকিউরিটি গার্ডরা অনেকেই যেভাবে ডেলিভারী বয়-গুলোকে হ্যাটা করে সেটা দিনের পর দিন দেখার পর এই দিকটা নিয়ে না কিছু লিখলে আমার নিজেরই খারাপ লাগবে।

১৯৯৬ সালে আমেরিকার শিক্ষা দপ্তর হিসেব করে দেখল, মাত্র ৩ শতাংশ সরকারী স্কুলে ইউনিফর্ম বাধ্যতামূলক। প্রেসিডেন্ট ক্লিন্টন বললেন, ইউনিফর্ম ক্লাসঘরকে বেশী শৃঙ্খলাবদ্ধ, বেশী সুশৃঙ্খল করে তোলে – স্কুলগুলোর উচিত এটা চালু করা। ২০০৫ সালের মধ্যে সংখ্যাটা দাঁড়াল ১৪ শতাংশে। চারগুণেরও বেশী।


কিন্তু সত্যিই কি এত পজিটিভ এফেক্ট পাওয়া যায় ?

এলিসাবেতা জেন্টিলে আর স্কট ইমবারম্যান দক্ষিণ-পশ্চিম আমেরিকার এক বিশাল শহুরে স্কুল ডিষ্ট্রিক্টের তথ্য নিয়ে বসলেন। সুবিধেটা এই যে সেখানে প্রতিটা স্কুল নিজে ঠিক করে ইউনিফর্ম চালু করবে কিনা, এবং আলাদা আলাদা বছরে করে। ফলে একই ছাত্রকে ইউনিফর্মের আগে আর পরে দু’ভাবেই দেখা যায়।

ফল? উঁচু ক্লাসে হাজিরা সামান্য বাড়ে, বছরে বাড়তি আধখানা দিন মত। শৃঙ্খলাভঙ্গের ঘটনায় কোন উল্লেখযোগ্য হেরফের নেই। পরীক্ষার নম্বরে কার্যত কিছুই না।

তবে একটা জায়গায় বেশ বড় প্রভাব পাওয়া গেল, এবং সেটা প্রায় কেউ ভাবেইনি: প্রাথমিক স্কুলে ইউনিফর্ম চালু হবার পর শিক্ষকরা চাকরী ছেড়ে যাওয়া অনেক কমে গেল। গড়ে যেখানে পঁচিশ শতাংশ শিক্ষক প্রতি বছর চলে যেতেন, সেখানে পাঁচ শতাংশ কমে গেল।

অর্থাৎ ইউনিফর্মে ছেলেমেয়েদের কিছু বিশেষ হল না। যা হল, তা হল শিক্ষকদের। একটা শৃঙ্খলাবদ্ধ ক্লাসঘরের চেহারা দেখলে শিক্ষকের নিজের মনে হয় জায়গাটা চালানোর মত। মজাটা এখানেই – ইউনিফর্ম শিশুদের বদলায় না, বদলায় শিশুদের দিকে তাকিয়ে থাকা লোকটাকে।

এই বিভ্রম কতদূর যেতে পারে, তার একটা মোক্ষম উদাহরণ পাওয়া যায় বেসরকারী নিরাপত্তারক্ষীদের ইউনিফর্ম নিয়ে লেখাপত্রে। আমেরিকার প্রাইভেট সিকিউরিটি কোম্পানীরা দীর্ঘদিন ধরে তাঁদের লোকেদের প্রায়-পুলিশ পোশাক পরিয়ে এসেছেন – গাঢ় নীল শার্ট, ব্যাজ, বেল্টে ঝোলানো সরঞ্জাম। কারণ? লোকে ভয় পাবে, কথা শুনবে। ক্যালিফোর্নিয়ার আইনে এটা রীতিমতন নিষিদ্ধ – পোশাক এমন হতে পারবে না যাতে মনে হয় লোকটি সরকারী আইনরক্ষী।

আর যাঁরা এই নিয়ে কাজ করেছেন, তাঁরা বলছেন, আইন বাদ দিলেও ব্যাপারটা ব্যবসার দিক থেকেই বোকামি। কারণ পুলিশের পোশাক পরলে মানুষ পুলিশের মত সেবা আশা করে – যা এঁরা দিতে পারেন না, দেবার অধিকারও নেই। আবার পুলিশের প্রতি মানুষের যত রাগ, বিরক্তি, তিক্ত অভিজ্ঞতা – সে সবও ছিটকে এসে এঁদের গায়ে লাগে। ঠকানোর চেষ্টা ধরা পড়লে মানুষ ক্ষমা করে না। লেখকদের যুক্তিটা চমৎকার: কর্তৃত্ব আসে আইন থেকে, আর ব্যক্তিগত গুণ থেকে। পোশাকের রঙ থেকে নয়। পৃথিবীর নানা দেশে পুলিশের পোশাক সাদা, খাকি, বাদামী, সবুজ, কালো – সব রকমই আছে। তাহলে কর্তৃত্ব কোন রঙে?


লাল স্নিকার এবং যাঁরা নিয়ম ভাঙার লাইসেন্স পান

এতক্ষণ পড়ে যদি ভাবেন তাহলে সবাই স্যুট পরাই ভালো, তাঁদের বলি একটু সবুর করুন। আমি নিজে যেহেতু কোট, স্যুট ইত্যাদি পরি না, তাই সেগুলো না পরলেও তেমন কিছু পার্থক্য হয় না এমন কিছু স্টাডির প্রতি দুর্বলতা আছে।

সিলভিয়া বেলেৎসা, ফ্রান্সেসকা জিনো আর অ্যানাট কেইনান, হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের এই তিনজন এক অদ্ভুত জিনিস দেখালেন, যার নাম দিয়েছেন ‘লাল স্নিকার এফেক্ট’। ধরুন এক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, ফর্ম্যাল মিটিং-এ ঢুকলেন লাল স্নিকার পায়ে। বা ধরুন এক ভদ্রলোক দামী বুটিকে ঢুকলেন জিমের পোশাকে। ছাত্র বা দোকানের বিক্রেতা কী ভাবে?
গবেষণা বলছে – তাঁরা লোকটিকে বেশী উঁচু জাতের, বেশী ক্ষমতাশালী, বেশী যোগ্য বলে ধরে নেন। কারণ যুক্তিটা মাথার ভিতরে এই রকম চলে: এই লোকটা তো জানে নিয়মটা কী। তবুও ভাঙছে। মানে ভাঙার সামর্থ্য আছে। মানে ভয় পাবার কিছু নেই। মানে বড় লোক।

এই যুক্তিটা দিয়েই সিলিকন ভ্যালির হুডি, স্টিভ জবসের কালো টার্টলনেক, বিলিয়নেয়ারের ছেঁড়া জিন্স।

কিন্তু – এবং এই ‘কিন্তু’-টা বেশ জটিল - গবেষকরা খুব যত্ন করে দেখিয়েছেন কখন এই ম্যাজিক কাজ করে না। এক, যদি দর্শক জায়গাটাকে না চেনে (মানে নিয়মটাই যদি না জানে, তাহলে নিয়ম ভাঙাটা দেখবে কী করে?)। দুই, যদি মনে হয় লোকটা ইচ্ছে করে নয়, বেখেয়ালে ভুল করেছে। তিন, যদি সেখানে ফর্ম্যাল হবার কোন প্রত্যাশাই না থাকে।

অর্থাৎ, নিয়ম ভাঙার লাইসেন্স পাওয়া যায় কেবল তখনই, যখন সবাই জানে যে আপনার নিয়ম মানার আর দরকার নেই। আমার মত লোক টি-শার্ট পরে গেলে কোন ফ্যাক্টরির গেটে হয়ত দাঁড় করিয়ে দেবে – আর মার্ক জুকারবার্গ হুডি পরে গেলে সেটা দর্শন।

এ ব্যাপারটা আমাদের গ্রামের দিকে অন্য চেহারায় বহুদিন ধরে আছে। বড়লোক বড়ির কর্তা ময়লা ধুতি পরে বাজার করতে বেরুতে পারেন, তাতে কারো ভুল হয় না। ভুল হয় না কারণ সবাই জানে ধুতিটা কার। দারিদ্র্য আর সাদাসিধেপনার মধ্যে যে তফাৎ, সেটা কাপড়ে নয় – সেটা দর্শকের মাথায়।


লিফটের পাশের আয়না

সমাজতত্ত্বে এই গোটা ব্যাপারটার একটা সুন্দর ব্যাখ্যা আছে, যেটা দিয়েছিলেন গ্রেগরি স্টোন, ১৯৬২ সালে। তাঁর মতে পোশাক দিয়ে পরিচয় তৈরী হয় দুটো ধাপে। প্রথম ধাপ – যাকে তিনি বলেছেন ‘প্রোগ্রাম’ – আমি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখি এবং ঠিক করি আমি কী বলতে চাইছি। দ্বিতীয় ধাপ – ‘রিভিউ’ – অন্যরা আমাকে দেখে এবং প্রতিক্রিয়া জানায়। দুটো যদি মিলে যায়, আমার ‘আমি’-টা প্রতিষ্ঠিত হয়। আর যদি না মেলে? তাহলে, স্টোন বলছেন, মানুষ নিজেকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করতে শুরু করে। ভাবলে বেশ ভজকট মনে হয়! মানে আমার নিজের সম্পর্কে ধারণাটা পুরোপুরি আমার নিজের হাতে নেই। ওটা একটা যৌথ প্রকল্প, যেখানে ভোট দেয় বাসের সহযাত্রী, অফিসের রিসেপশনিষ্ট, আর গেটের সিকিউরিটি ছেলেটি।

সাংগঠনিক পোশাক নিয়ে কাজ করা এক গবেষকদলের একটা কথা মাথায় গেঁথে গেছে। তাঁরা বলছেন, অফিসের সবচেয়ে অবহেলিত অথচ সবচেয়ে ক্ষমতাশালী যন্ত্রটি হল আয়না এবং লক্ষ্য করুন, আয়নাগুলো সাধারণত বসানো থাকে লিফটের পাশে। কেন? কারণ ঠিক ওইখানেই দুটো জগতের সীমানা - ঘর আর অফিস, ব্যক্তিগত আর সরকারী। কলার ঠিক করে নেওয়া, চুলে হাত বুলিয়ে নেওয়া, শাড়ির আঁচলটা টেনে দেওয়া – ওটা প্রসাধন নয়। ওটা সীমান্তে পাসপোর্ট দেখানো।


এবং একটা নতুন জামার গন্ধ

তাহলে কি দাঁড়ালো মোটের উপর? এত পরীক্ষা, এত পরিসংখ্যান, এত ব্যাখ্যা! কিন্তু আমাদের অনেকের মনে যে ছবিটা বা ছবিগুলো আসল হিসেবে গেঁথে থাকে, সেটা কোন জার্নালে ছাপা নেই।

ছোটবেলায় বছরে জামা হত কটা? গোটা কয়েক এবং তাদের প্রায় সব কটাই কেনা হত দুর্গা পুজোয়। কেনা হত মাসখানেক আগে, তারপর আলমারীতে তোলা থাকত, প্লাষ্টিকের প্যাকেট সমেত। মাঝে মাঝে খুলে দেখা হত বাড়িতে কেউ এলে। শুঁকে দেখা হত। নতুন কাপড়ের সেই গন্ধ – একটু কড়া, একটু মিষ্টি, খানিকটা রঙ আর খানিকটা মাড় – ওটা আসলে গন্ধ ছিল না, ওটা ছিল একটা প্রতিশ্রুতি। পুজোর সকালে ওটা গায়ে চড়ালে আমি একটু অন্য মানুষ হয়ে যাব।

এবং হতাম না কি আমরা? আমার তো মনে হয় সত্যিই হতাম এবং এখনো অনেকেই হয়। বুক চিতিয়ে হাঁটতাম, পাড়ার যে ছেলেটার সাথে ঝগড়া তার সামনে দিয়ে বার তিনেক ঘুরে আসতাম, আর মন্ডপে যে মেয়েটি প্রতি বছর আসত তার দিকে খানিকটা বেশী সাহস নিয়ে তাকাতাম। অ্যাডাম আর গ্যালিনস্কি এটার নাম দিয়েছেন এনক্লোদ্‌ড কগনিশন। আমরা নামটা জানতাম না, কিন্তু জিনিসটা জানতাম।

তফাৎ শুধু এই যে তখন জামাটা ছিল একটা ঘটনা – বছরে একবার। আর এখন জামা একটা অবিরাম ব্যবস্থা। এখন কেউ আপনাকে প্রতিশ্রুতি বিক্রী করে না; বিক্রী করে একটা অভাববোধের সাবস্ক্রিপশন। লেগিংস কিনবেন যাতে ফিট মনে হয়, ফিট নন বলে জিমে যাবেন, জিমের জন্য আরো লেগিংস কিনবেন। স্যুট কিনবেন যাতে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়, তারপর দেখবেন সহকর্মীর স্যুটটা আরো ভালো।

গবেষণাগুলো পড়ে আমি এই সিদ্ধান্তে আসিনি যে কাল থেকে টি-শার্ট পরে অফিস যাব – সেটাতে নতুন কিছু নেই, কারণ আমি ট-শার্ট আর জিন্স পরেই অফিস যাই। তাহলে এই বিষয়ের পেপারগুলো পড়ি কেন? আসলে ব্যাপারটা বুঝতে চাই – বুঝতে চাই মানুষের মনস্তত্ত্ব। তো যা বুঝলুম তার একটা দিক হল, সরল ভাবে বললে - সকালে একটা জামা বাছি যেটা পরে অফিসে যাব, আর সারাদিন ধরে অন্যের জামা দেখে তাদের বিচার করি। প্রথম কাজটা নিয়ে আমরা অনেক ভাবি, অনেক খরচ করি, অনেক দুশ্চিন্তা করি।

দ্বিতীয় কাজটা নিয়ে আমরা কার্যত কিছুই ভাবি না। ওটা হয়ে যায়, আপনা আপনি, নিঃশব্দে, চোখের পলক পড়ার আগেই। ফরসাইথের ভিডিওতে আওয়াজ ছিল না – তবুও ১০৯ জন লোক দিব্যি বলে দিলেন কে চাকরীটা পাবার যোগ্য।

আমার মনে হয়, বদলানোর জায়গাটা ওইখানে। নিজের জামাকাপড় নিয়ে যত মাথা ঘামাই, তার এক শতাংশও যদি অন্যের জামাকাপড় নিয়ে নিজের জাজমেন্ট-টাকে চ্যালেঞ্জ করার কাজে খরচ করতাম, তাহলে হয়ত সামগ্রিক পরিস্থিতি উন্নতি হবার ব্যাপারে আমার নিজের একটু অবদান থাকত!

এখন প্রশ্ন হল, আজ সকালে আপনি যে পোষাকটা পরে বেরিয়েছেন – সেটা কে বেছেছে? আপনি? না কি আজ যাদের সাথে দেখা হবে, তারা?




তথ্যসূত্র


1) Adam, H., & Galinsky, A. D. (2012). Enclothed cognition. Journal of Experimental Social Psychology, 48(4), 918–925.
2) Burns, D. M., Fox, E. L., Greenstein, M., Olbright, G., & Montgomery, D. (2019). An old task in new clothes: A preregistered direct replication attempt of enclothed cognition effects on Stroop performance. Journal of Experimental Social Psychology, 83, 150–156.
3) Adam, H., & Galinsky, A. D. (2019). Reflections on enclothed cognition: Commentary on Burns et al. Journal of Experimental Social Psychology, 83, 157–159.
4) Slepian, M. L., Ferber, S. N., Gold, J. M., & Rutchick, A. M. (2015). The cognitive consequences of formal clothing. Social Psychological and Personality Science, 6(6), 661–668.
5) Forsythe, S. M. (1990). Effect of applicant's clothing on interviewer's decision to hire. Journal of Applied Social Psychology, 20(19), 1579–1595.
6) Fredrickson, B. L., Roberts, T.-A., Noll, S. M., Quinn, D. M., & Twenge, J. M. (1998). That swimsuit becomes you: Sex differences in self-objectification, restrained eating, and math performance. Journal of Personality and Social Psychology, 75(1), 269–284.
7) Lönnqvist, J.-E. (2017). Just because you look good, doesn't mean you're right. Personality and Individual Differences, 108, 133–135.
8) Berggren, N., Jordahl, H., & Poutvaara, P. (2017). The right look: Conservative politicians look better and voters reward it. Journal of Public Economics, 146, 79–86.
9) Hamermesh, D. S. (2011). Beauty Pays: Why Attractive People Are More Successful. Princeton University Press.
10) Lipson, S. M., Stewart, S., & Griffiths, S. (2020). Athleisure: A qualitative investigation of a multi-billion-dollar clothing trend. Body Image, 32, 5–13.
11) Gentile, E., & Imberman, S. A. (2012). Dressed for success? The effect of school uniforms on student achievement and behavior. Journal of Urban Economics, 71(1), 1–17.
12) Bellezza, S., Gino, F., & Keinan, A. (2014). The red sneakers effect: Inferring status and competence from signals of nonconformity. Journal of Consumer Research, 41(1), 35–54.
13) Johnson, K., Lennon, S. J., & Rudd, N. (2014). Dress, body and self: Research in the social psychology of dress. Fashion and Textiles, 1:20.
14) Johnson, K. K. P., Yoo, J.-J., Kim, M., & Lennon, S. J. (2008). Dress and human behavior: A review and critique. Clothing and Textiles Research Journal, 26(1), 3–22.
15) Lennon, S. J. (2012). Clothing and adornment: Social psychology perspectives. In Encyclopedia of Body Image and Human Appearance (pp. 321–327). Elsevier.
16) Fredrickson, B. L., & Roberts, T.-A. (1997). Objectification theory: Toward understanding women's lived experiences and mental health risks. Psychology of Women Quarterly, 21(2), 173–206.
17) Stone, G. P. (1962). Appearance and the self. In A. M. Rose (Ed.), Human Behavior and Social Processes. Houghton Mifflin.
18) Sena, J. F. (2015). Presenting a professional image. In Conflict Management for Security Professionals (Ch. 4). Elsevier/Butterworth-Heinemann.
19) Harding, N., & Tomkins, L. (2012/2013). 'Do I look right?' De-familiarizing the organizational fashioning of the body. European Management Journal (organizational dress and the mirror).
20) Glick, P., Larsen, S., Johnson, C., & Branstiter, H. (2005). Evaluations of sexy women in low- and high-status jobs. Psychology of Women Quarterly, 29(4), 389–395.
21) Morris, T. L., Gorham, J., Cohen, S. H., & Huffman, D. (1996). Fashion in the classroom: Effects of attire on student perceptions of instructors in college classes. Communication Education, 45(2), 135–148.
22) Fortune Business Insights / Grand View Research (2026). Athleisure Market Size, Share & Growth Reports (global market estimates, 2025–2026).




 ***গুরুচন্ডালী প্ল্যাটফর্মে সুকান্ত ঘোষের নিজস্ব ব্লগ থেকে নেওয়া। 

0

প্রচ্ছদ নিবন্ধ - রঞ্জন রায়

Posted in




















দু’মাস আগে কবি নজরুলের জন্মদিন পালন হয়ে গেছে। কিন্তু তাঁকে নিয়ে বিতর্ক এবং টানাটানি এখনও চলছে। জন্মেছিলেন রাঢ় বাংলার চুরুলিয়া গ্রামে। কিন্তু হয়ে উঠেছেন পড়শি বাংলাদেশের জাতীয় কবি। আহা, তাতে কি এমন মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে গেল? কোলকাতার জোড়াসাঁকোর রবীন্দ্রনাথের লেখা গান “আমার সোনার বাংলা” কি পদ্মাপারের জাতীয় সংগীত নয়? তাহলে নজরুল কী দোষ করলেন? বাংলাদেশ ওনার শ্বশুরবাড়ি বটে!

কিন্তু নজরুলের মত নেওয়া হয়েছিল কি? কী মুশকিল, রবীন্দ্রনাথেরও নেয়া হয় নি। তাতে কী?


কেউ ভোলে না কেউ ভোলে

পঞ্চাশের দশক। প্রাইমারি ক্লাসে পড়ছি। নজরুলের নাম শুনেছি শুধু, কবিতা টবিতা পড়া হয় নি। গান? নাঃ। একটা চূণের ডাব্বামার্কা রেডিও। তাতে ভক্তিমূলক গান, পল্লীগীতি, রবীন্দ্রসঙ্গীত এই সব শোনা হয়। বেশিরভাগ সময় ওটা দাদু ঠাকুমার দখলে। আমরা শুনতাম শনি-রোববারে অনুরোধের আসর। ওই গানগুলো বিভিন্ন উৎসবের সময় চারদিকে ঝমঝমিয়ে বাজে। লাইনগুলো মুখস্থ হয়ে যায়। নজরুলগীতিকে ভীড়ের মধ্যে আলাদা করে চেনার মত সুযোগ ও কান তৈরি হয় নি।

তবে কাকাদের ব্যাচেলর্স ডেনের দেয়ালে অনেক ফটো টাঙানো। প্রথমে চুলদাড়িওলা কজন—দেখলে কীরকম সাধুবাবা সাধুবাবা ফীলিং হয়। এঁদের মধ্যে শুধু রবি ঠাকুরকে চিনি। দেখলেই গড় হয়ে ‘ঠাকুর নম’ বলতে ইচ্ছে হয়। তারপরে লেনিন দাদু, স্তালিন দাদু, পাগড়ি মাথায় ঋষি বঙ্কিমের পর আলাদা করে দু’জন।

একজন গালে হাত দিয়ে ঘুম ঘুম চোখে কিছু ভাবছেন। ঠিক করে গোঁফ ওঠেনি। দেখলে একডাকে কবি বলে চেনা যায়। উনি রানার বলে হেমন্তের গাওয়া হিট গানটার পদ্য লিখেছেন। পাশে আরেকজনের গোঁফদাড়ি নেই, কিন্তু মাথায় বাবরি চুল। বড় বড় টানা টানা চোখ, কেমন গল্পের রঘু ডাকাতের মত।

কাকাদের ধমক খাই। উনিও বড় কবি। ছোটকা একটা সুন্দরমত বই ধরিয়ে দেয়—গাঢ় সবুজ ডাঁটি ও পাতার উপর রক্তলাল পপি ফুল। বইটির নাম সঞ্চিতা। মায়ের বিয়েতে পাওয়া কালো রঙে বাঁধানো ‘সঞ্চয়িতা’ থেকে দাদু অনেক কবিতা পড়ে শোনায়। ওটা রবি ঠাকুরের বই। তা ইনি সঞ্চিতা নাম রাখলেন কেন? রবি ঠাকুরের নকল করে কবিতা লেখেন? ফের কানমলা।

--বোকার মত কথা না বলে পড়ে দেখ।

হুঁ, পাতা ওল্টালাম—“বাতায়ন পথে গুবাক তরুর সারি”! বাতায়ন মানে জানি, কিন্তু গুবাক? শব্দটা বিচ্ছিরি। বইটা রেখে দিলাম। দেখি ছোটকা কড়া চোখে তাকিয়ে আছে। ফের তুলে নিলাম।

“সেদিন দেখিনু রেলে

কুলি বলে এক বাবুসাব তারে ঠেলে দিল নীচে ফেলে।

চোখ ফেটে এল জল।

এমনি করে কি জগত জুড়িয়া মার খাবে দুর্বল”?


আরে, এ তো সত্যি কথা! আরো ছোট বয়সে কাকাদের কোলে উঠে হাওড়া স্টেশনে গিয়েছিলাম। ঠিক এমন ঘটনা দেখেছি। লাল কুর্তা ও ময়লা ধুতি পরা, হাতে নম্বর লেখা পেতলের চাকতি বাঁধা হিন্দি বলা কুলিকে ধাক্কা দিয়ে নামিয়ে দেওয়া হোল। যা কানে এল—চার আনায় রফা হয়েছিল। কিন্তু মাল তোলার পর বাবুসাহেব একটা হলদেটে দু’আনি ছুঁড়ে দিলেন। কুলি নেবে না।

প্ল্যাটফর্মে উঠে দাঁড়িয়ে মানুষটা গায়ের ধূলো ঝেড়ে প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে কু--ঝিক ঝিক করে এগোতে থাকা রেলগাড়ির দিকে তাকিয়ে ছিল। ওর চোখে জল ছিল না, আগুনও না। কেমন যেন গরুর মত বোবা দৃষ্টি।

নজরুল যেন আমার মনের কথা, ওর বোবা চোখের ভাষা নিয়ে লাইনটি লিখেছেন-- এমনি করে কি জগত জুড়িয়া মার খাবে দুর্বল? কিন্তু তারপরে ঘ্যান ঘ্যান করেন নি।

গর্জে উঠেছেন—“বেতন দিয়াছ? চোপরও যত মিথ্যাবাদীর দল!

                            কত পাই দিয়ে কুলিদের তুই কত ক্রোড় পেলি বল”!

আহা, বুকের মধ্যে দুর্গাপূজোর ঢাক বেজে উঠল। আকাশে গুর গুর করে মেঘ ডাকল।

খোলাখুলি বাবুসাহেবদের মিথ্যেবাদী বলা! চোপরও বলে ধমক দেয়া! এমন তো দেখিনি শুনিনি।

আর “এমনি করে কি জগত জুড়িয়া মার খাবে দুর্বল”? এই লাইনটা উনি লিখেছেন আমার জন্যে। আমি একা নই, আমার মত দুর্বলদের জন্যে। মানে যারা গায়ে গতরে রোগা প্যাংলা, খ্যাংরাকাঠি আলুর দম গোছের। যারা হাতাহাতিতে কখনই পেরে ওঠে না। শুধু মার খায়।

মার খায় স্কুলে, মার খায় খেলার মাঠে। আমাদের দেখলেই অন্যেরা চিনতে পারে—সহজ শিকার। এদের পেটানো যায়। এরা মাস্টারমশাইয়ের কাছে নালিশ করবে না। বাড়ি গিয়ে কেঁদে কেটে বাবা কাকাদের ডেকে আনবে না। মুখ বুজে মার খাবে।

কোন কোন টিম যেমনি ওপেনিং জুড়ি আউট হলেই দান ছেড়ে দেয়। ব্যাট বগলে প্যাভিলিয়ন থেকে এক এক করে আসে আর ফিরে যায়। তেমনই এরা মারামারি শুরু হলেই অপেক্ষা করে কখন মার খেয়ে মাটিতে পড়ে যাবে।

কিন্তু ভগবান আছেন। উনি কি একদিন এইসব অন্যায়ের বিচার করবেন না? নজরুল কিছু বলেন নি? ‘সঞ্চিতা’ ‘সঞ্চয়িতা’র কবিতার বৈচিত্র্যের ঢেউয়ে কয়েক বছর চাপা পড়ে গেল।

কিন্তু কয়েক বছর পরে ক্লাসের পাঠ্য বইয়ের সংকলনে পেলাম মনের মত উত্তর—“ফরিয়াদ”। শব্দটা আগে কখনও শুনিনি। উকিল দাদু বললেন—আসামী ও ফরিয়াদী। এখানে ফরিয়াদ মানে নালিশ। কার কাছে? ভগবানের কাছে।

বুকের পাটা আছে নজরুলের। সোজা ভগবানের কাছে নালিশ! কোন “ও অনাথের নাথ, ও অগতির গতি” বলে কান্নাকাটি, ভালভাবে বললে করুণ আর্তি, করা নয়। সোজা নালিশ।

“মাগে প্রতিকার, উত্তর দাও, আদিপিতা ভগবান”।

দারুণ লাগল। এই হোল কবিতা। হ্যাঁ, আগে রবি ঠাকুরের ‘প্রশ্ন’ কবিতা পড়েছি। সেটা অসাধারণ। কিন্তু উনি ভগবানকে প্রশ্ন করেছেন –তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো”?

কিন্তু নজরুল করেছেন নালিশ।

সে নালিশের বিশাল ফিরিস্তি, পাতার পর পাতা জুড়ে। ভগবানের রাজ্যে কত অবিচার, কত অন্যায়। তো ভগবান করেন কি! নিজের ডিউটি ঠিকমত করেন না?

পড়তে লাগলামঃ

“শ্বেত-পীত-কালো করিয়া সৃজিলে মানবে সে তব সাধ,

আমরা যে কালো তুমি ভালো জান নহে তাহা অপরাধ”।

আরে! এটাও আমার কথা। হরদম কালো বলে ব্যঙ্গবিদ্রূপ শুনি, --কালোভূত! কেলটে। জন্মেছি কালো হয়ে যদিও মা ফরসা—কিন্তু সেটা কি আমার দোষ! কিন্তু নজরুল কী করে টের পেলেন আমার কষ্ট? উনিও কি কালো?

কিন্তু শেষের দিকে এসে থমকে যাই। খানিক ভাবি, তারপর উল্লাসে ফেটে পড়ি।
“ওই দিকে দিকে বেজেছে ডংকা, শংকা নাহিক আর,

মরিয়ার মুখে মরণের বাণী উঠিতেছে মার! মার!”

নজরুল খোলাখুলি মারতে বলেছেন। উদোম ক্যালাতে বলছেন, কাদের? ওই যারা এতদিন ধরে তোমাদের মারছে তাদের। শুনতে বেশ ভাল লাগে। মারের পালটা মার!

তারপর ঘাবড়ে যাই। না, আমি কাউকে মারতে পারব না। তাহলে কী করব? পালিয়ে যাব, টেনে দৌড়? ওসব কিছু নয়। দলবেঁধে মার মার করে পকেটমারকে ক্যালাও? না, ওর মধ্যে আমি নেই। ভগবান ফরিয়াদ শুনছেন। একদিন তাঁর ন্যায়ের দণ্ড নেমে আসবে। সব ধর্মই এই আশ্বাস দেয়। আপাত আশ্বস্ত হওয়া যাক।

আচ্ছা, নজরুল নিজে কখনও কাউকে মেরেছেন? মারামারি করেছেন?

মনে পড়ল দেশ পত্রিকায় শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় ধারাবাহিক লিখতেন “কেউ ভোলে না কেউ ভোলে”।

বর্ধমানের চুরুলিয়া গ্রামের ছেলেবেলার স্মৃতি, বিশেষ করে বাল্যবন্ধু কোন এক দুখু মিঞার কথা।

--ছোটকা উনি কে?

-- উনি কল্লোল যুগের তিন মহারথী। কল্লোল পত্রিকার থ্রি মাস্কেটিয়ার্সের অন্যতম—শৈলজানন্দ, প্রেমেন্দ্র মিত্র ও অচিন্ত্যকুমার।

--মানে ঘনাদা ও পরমপুরুষ শ্রীরামকৃষ্ণ?

--দূর গাধা! তোর কথাটা ভুল নয়, আদ্দেক সত্যি।

--আর দুখু মিঞা?

--আরে উনিই তো বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলাম।

--বিদ্রোহী কবি কেন?

--উনি একটা কান্ড করেছিলেন। সারারাত জেগে লিখলেন একটা অন্যরকম কবিতা –বিদ্রোহী। তারপর সাত সকালে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির সামনে গিয়ে রাস্তা থেকে পাড়াজাগানো চিৎকার।

রবি ঠাকুর অবাক হয়ে দোতলার বারান্দা থেকে জিজ্ঞেস করলেন—কী ব্যাপার কাজী?

“গুরুদেব! আমি তোমায় হত্যা করব”!

সে কী! উনি পুলিশ ডাকেন নি?

--আরে বোকারাম! এ হত্যা সে হত্যা নয়। উনি চেয়েছিলেন বাংলা কবিতার ধারা বদলে দিতে। ‘বিদ্রোহী’ কবিতা সেই কাজটা করেছিল। ছন্দে, মাত্রা বদলে, শব্দ চয়নে ও পুরাণকথার রূপক মিলে সে এক কাণ্ড। বাংলা কবিতায় বাঁধা পথের বাইরে পা ফেলা। প্রথম লাইনেই চমকঃ

“বল বীর

চির উন্নত মম শির।

শির নেহারি আমারি নতশির ওই

শিখর হিমাদ্রীর”।

আরও শোনঃ

আমি পিণাকপাণির ডমরুত্রিশূল ধর্মরাজের দণ্ড

আমি চক্র, মহাশংখ, প্রলয়নাদ প্রচণ্ড।

আমি বেদুঈন, আমি চেঙ্গিস,

আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্ণিশ।

আমি বজ্র, আমি ঈশান-বিষাণে ওঙ্কার,

আমি ইস্রাফিলের শিঙ্গার মহা হুংকার”।

ছোটকার আবৃত্তি চলতে থাকে। আমি ভেসে যাই অনুপ্রাসের ঝংকার আর নতুন ধরণের শব্দের ছবির সারি দেখতে দেখতে। সাইক্লোন, ধ্বংস, পেরিয়ে সমস্ত নিয়মের শৃংখল ভেঙে টর্পেডো ভাসমান মাইন সব হয়ে বিদ্রোহী হঠাৎ মহর্ষি ভৃগু হয়ে ভগবান বুকে পদচিহ্ন এঁকে দিচ্ছেন। কিন্তু আচমকা একি?

“আমি চিত-চুম্বন-চোর কম্পন

আমি থর-থর-থর প্রথম পরশ কুমারীর!

আমি যৌবন-ভীতু পল্লীবালার আঁচর কাঁচলি নিচোর”!

এবার কেমন কেমন লাগছে। উনি কোন কুমারী মেয়েকে স্পর্শ করেছেন! মরেছে! আর গ্রামের মেয়ের কাঁচলি নিয়ে চিন্তা করা, কল্পনা করা! এই কবি নির্ঘাৎ--

ছোটকাকে কবিতার নেশায় পেয়েছে। আবৃত্তি চলছেঃ

--“একি উন্মাদ ! আমি উন্মাদ! আমি সহসা আমারে চিনেছি আমার খুলিয়া গিয়াছে সব বাঁধ”।

বুঝেছি, এমন অকপট সত্যি বলতে উনিই পারেন। কিন্তু দুর্বলের পক্ষ নিয়ে কথা বলা সেই কবি কোথায় গেলেন? না, না। এই তো উনি পরশুরামের কুঠার হতে চাইছেন। কেন রে বাবা!

“যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না-

অত্যাচারীর খড়গকৃপাণ ভীম রণভূমে রণিবে না,

বিদ্রোহী রণক্লান্ত

আমি সেই দিন হব শান্ত”।

ভাল লাগে। একটা অন্যরকম অনুভূতি। যেমন শরতের ভোরে মহালয়ার পাঠে মহিষাসুর বধের পর বুকের ভেতরে হয়।

‘আমি সেইদিন হব শান্ত’।

বাঃ, কিন্তু উনিই কি শৈলজানন্দের বাল্যবন্ধু দুখু মিঞা। অবাক লাগে। আরে ছোটবেলায় কিছু না কিছু টের পাওয়া যায়। যেমন সাভারকর ছোটবেলায় তাঁর জন্মভূমি ভাগুর গাঁয়ে বাচ্চাদের দলবল জুটিয়ে রাতের অন্ধকারে ঢিল ছুঁড়ে একটা পুরনো মসজিদের কাঁচ ভেঙে ছিলেন।

কিন্তু দুখু মিঞার বিদ্রোহ কোথায়? বরং বেশ কোমল কবি কবি ভাব। একটা চড়াই পাখির ছানা ওড়ার চেষ্টা করে পড়ে যাওয়ায় মা-চড়াইয়ের কষ্ট নিয়ে কবিতা লিখলেন। ওদিকে রবি ঠাকুরকে ছোটবেলায় দেখুন।

“আমসত্ত্ব দুধে ফেলি তাহাতে কদলী দলি

সন্দেশ মাখিয়া দিয়া তাতে।

হাপুস হুপুস শব্দ, চারিদিক নিস্তব্ধ

পিঁপড়া কাঁদিয়া যায় পাতে”।

বেশ, বামুন বাড়ির ফলার খাওয়া পেটুক ছেলের ছবি।


ভুল ভেঙে গেল। দুখু মিঞা কোন ব্যতিক্রম নন। ছোটবেলা থেকেই রোমান্টিক। বন্ধু শৈলজানন্দের সংগে পাল্লা দিয়ে লিখে ফেললেন কোন রাণীমার গড় নিয়ে আবেগঘন কবিতাঃ



“ওই ঝাউয়ের পাহাড়ে নীরব চিতাটি রাণীমার,

ও যে দপদপ জ্বলে লোকে বলে আলো আঁধিয়ার।

এই নিভে যায়, ওই জ্বলে ওঠে

থমকি চমকি পছি দিকে ছোটে

মিশে যায় শেষে রাজগড়ে উঠে

আবার তেমনই আঁধিয়ার।

বাচ্চা দুখু মিঞার শব্দচয়নে রবি ঠাকুরের প্রভাব স্পষ্ট। আহা, তাতে কী? বড় কবি অচিন্ত্য কুমারের রচনায় নেই? করুণানিধান বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতায়? কিন্তু আবেগ ও ছন্দের হাত? ওটা সবার হয় না, যার হয় তার হয়।

যেমন গলায় সুর ও কানে তালের বোধ--সবার থাকে না, যার আছে তার আছে।

দুখু মিঞা বড় হয়ে যখন নজরুল হলেন, তাঁর ছন্দ, অন্ত্যমিল এবং অনুপ্রাস অলংকার নিয়ে মারকাটারি নৈপুণ্যে ঘায়েল হয়ে কবিশেখর কালিদাস রায় লিখলেন –“নজরুল আমাদের কবিতা লিখতে দেবে না দেখছি। ও ‘অলস বৈশাখে’র সংগে ‘কলস কই কাঁখে’ মিলিয়েছে”।

বটেই তো।

“জল আনতে চললি যে তুই অলস বৈশাখে,

-----কলস কই কাঁখে”।

কিন্তু দুখু মিঞা যে মহা আড্ডাবাজ, ইয়ার্কিদেনেওয়ালা। এক বন্ধুর পাঠশালা পেরোনো হয় নি, কিন্তু বিয়ে হয়ে গেছে। বাবা সফল ব্যবসায়ী। কনেবৌ বাপের বাড়ি থেকে স্বামীকে চিঠি লিখেছে।

ভাষাটা এইরকমঃ

“তুমি ভাল আছ। আমি কেমন আছি। ইতি-“।

সেই চিঠি পড়ে বন্ধুটি প্রেমে উলুত পুলুত। চিঠির জবাব লিখলেন শৈলজানন্দ। গোলাপি রঙের দামি কাগজের উপর বাঁদিকে ছোট করে ঠোঁটে চিঠি বয়ে নিয়ে যাওয়া পাখির মনোগ্রাম ছাপা।

দুখু মিঞা খুব হাসল। দেখল পাখির ছবির নীচে ছাপা রয়েছেঃ

“যাও পাখি, বোল তারে

সে যেন ভোলে না মোরে”।

বলল—“আর বোল এ চিঠিটি

লিখে দেছে শৈল।

বোল না বোল না যেন,

এ দিব্যি রইল”।

তো দুখু যে নজরুল হয়ে ঢাকায় আশু সোমের বাড়িতে কিশোরী রাণু সোমের (প্রতিভা বসু) পরিবেশন করা চা দেখে গেয়ে উঠবে “এত চা ওইটুকু কাপে, পাষাণী আনলে বল কে”—সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু দুখু যে নজরুল হয়ে গেছে। তাই দু’লাইনের চটজলদি ছড়ার রূপান্তর ঘটল চমৎকার এক গানে—“ এত জল ওই কালো চোখে, পাষাণী আনলে বল কে”।

আর ফক্কুড়ি? হো হো করে হাসির সংগে “দে গরুর গা ধুইয়ে”!

কিন্তু দুখু বিদ্রোহী নজরুল হলেন কী করে? বা ঠিক করে বললে কবে? সেই যে পেটের দায়ে ঘরবাড়ি ছেড়ে ব্রিটিশ ইন্ডিয়া ফৌজে যোগ দিয়ে আফগানিস্তান ঘুরে এলেন, তখন উনি হাবিলদার দুখু মিঞা।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যে অটোমান সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ছে। অটোমানের সুলতানের বা খলিফার উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত শাসন তথা ধার্মিক নিদানের অধিকার টলটলায়মান। কারণ, ব্রিটিশ সরকারের হুকুম এবং তুরস্কে মুস্তাফা কামাল আতাতুর্কের ধর্মীয় নিয়ন্ত্রণ থেকে বেরিয়ে আধুনিকতার জয়গান। উনি আইন করে খলিফাগিরি বন্ধ করে দিলেন।

কিন্তু সহজে কেউ ক্ষমতা ছাড়ে? তার আগে ভারতে মুসলমানদের মধ্যে শুরু হোল খিলাফত আন্দোলন, যার উদ্দেশ্য অটোমান সুলতানের খলিফাগিরি বহাল রাখা।

গান্ধীজি ভাবলেন—ইংরেজের বিরুদ্ধে হিন্দুদের সংগে মুসলিমদের একসাথে আনার সুবর্ণ সুযোগ। উনি খিলাফতের সমর্থন করলেন। কিন্তু ভারতীয় মুসলিম, কাজী পরিবারের নজরুল ইসলাম, উলটোপথে হাঁটলেন।

সংস্কারের সমর্থনে লিখে ফেললেন—“কামাল তুনে কামাল কিয়া ভাই”!

তাহলে কি উনি মুসলিম নন? কে বলল নন? তাহলে “মোহম্মদী” পত্রিকায় কেন প্রবন্ধ লিখতেন? কী করে লিখলেন ঈদের গান, আর এই গানটাঃ

“সাহারাতে ফুটল যে ফুল,

সেই ফুলেরই জ্বালা।

কেউ বলে হজরত মোহম্মদ

কেউ বা কমলিওয়ালা”।

আর কী প্রমাণ চাই?

বেশ, কিন্তু এদিকে মালকোষে এইরকম গান লিখেছেন যে!

“গরজে গম্ভীর গগনে কম্বু

নাচে শংকর নাচে স্বয়ম্ভু”।

আবার “মহাকালের কোলে এসে গৌরী হল মহাকালী”।

থামো, থামো; আরও আছে।

কতগুলো আগমনী গান আর দেবী দুর্গাকে নিয়ে বন্দনা গান বল দিকি?

গুনতে শুরু করঃ

“এলো রে শ্রীদুর্গা শ্রী আদ্যাশক্তি”, “জয় দুর্গা দুর্গতিনাশিনী”, “আয় মা উমা রাখো এবার”---

ব্যস্‌ ব্যস, এতেই হবে। তাহলে নজরুল কী? হিন্দু না মুসলমান? প্রতিমা পূজা বা ‘বুত-পরস্তি’ ইসলামে নিষিদ্ধ নয়?

নজরুল নিজেই উত্তর দিয়ে গেছেনঃ

“হিন্দু না ওরা মুসলিম ওই জিজ্ঞাসে কোন জন?

কাণ্ডারী বল ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মার”।

তবু লোকের জিভ নড়ে, আজও নড়ে।

তাই লিখতে হয়ঃ

“সব ছেড়ে দিয়ে করিলাম বিয়ে, হিন্দুরা ক’ন ‘আড়ি চাচা’!

যবন না আমি কাফের ভাবিয়া খুঁজি টিকি দাড়ি, নাড়ি কাছা”।



খেয়াল করি, নজরুলের কবিতা ও গানে দুর্গা আনন্দময়ী দেশমাতৃকা হয়ে যান। যুদ্ধ থেকে ফিরে ইংরেজ তাড়ানোর ইচ্ছে ওর মনে প্রবল। ওঁর আগুন ঝরানো সম্পাদকীয়ের চোটে একের পর এক পত্রিকা নিষিদ্ধ হচ্ছে। আর নামগুলো কী—লাঙল, ধূমকেতু, নবযুগ আরও অনেক।

মিনার্ভা থিয়েটারে মহাষষ্ঠীর দিন অভিনীত “দেবী দুর্গা” নাটকের জন্যে গান লিখলেন নজরুল। মন্মথ রায়ের “কারাগার” নাটকের জন্যেও। “আগমনী” কবিতায় উনি দুর্গার বন্দনা করলেন ‘রণরঙ্গিনী’ রূপে। “দশদিকে তাঁর দশ হাতে বাজে

বাজে দশ প্রহরণ”।

দুর্গাকে ‘বেটি’ বলে আদর করে ডেকে আহ্বান করছেন লড়াইয়ের ময়দানে নামতে-- ‘ঢাল-তরবার’ নিয়ে ধ্বংস করতে ‘অত্যাচারী শক্ত চাঁড়াল’—স্পষ্টতই ইংরেজদের। এরপর কারাগারে যেতেই হয়।

তাতে কি! গেয়ে উঠলেনঃ

“কারারই লৌহকপাট ভেঙে ফেল কররে লোপাট”।

আর একটি লাইনে ধরা পড়ল শুধু বঙ্গ বা ভারত নয় , গোটা বিশ্বের মুক্তি আন্দোলনে ছাত্রদের ভূমিকা—“ আমরা ধরি মৃত্যুরাজার যজ্ঞ ঘোড়ার রাশ”।

উনি কোন একটি দলের সমর্থনে বদ্ধ ছিলেন না। দেশ স্বাধীন করতে হবে—যিনিই করুন, নেতাজি বা গান্ধীজি—সবাই তাঁর শ্রদ্ধেয়।

“আনকোরা যত নন-ভায়োলেন্ট নন্‌-কো’র দলও নন খুশি,

‘ভায়োলেন্সের ভায়োলিন’ নাকি আমি বিপ্লবী -মন-তুষি।

‘এটা অহিংস’ বিপ্লবী ভাবে

নয় চরকার গান কেন গাবে?

গোঁড়া-রাম ভাবে নাস্তিক আমি, পাতিরাম ভাবে কন্‌ফুসি”।

কিন্তু হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতি কখনই আমাদের বঙ্গে স্থায়ী হয় নি। আপাত শান্তির তলায় বিদ্বেষের তুষের আগুন ধিকিধিকি জ্বলছে , আজও নেভেনি। তাতে ধুনো দেয়ার লোকের অভাব কোন কালেই ছিল না।

দাঙ্গার আগুনে মানবিক বোধ পুড়তে দেখে ব্যথিত নজরুল লেখেন—“খালেদ আবার ধরিয়াছে অসি, অর্জুন ছোঁড়ে বাণ”। জাতের নামে বজ্জাতি সব তাঁর কাছে গোপন ছিল না।

তবে মুজফফর আহমেদের সংগে ৩২ নং কলেজ স্ট্রিটে থাকা ও বন্ধুত্ব তাঁকে আগ্রহী করে সাম্যবাদী আন্দোলনে। (এখন সেই বাড়ির সামনে একগাদা দোকানপাট, পেছনে সরকার পরিবারের পুরনো বাড়ি)।

‘গাহি সাম্যের গান” শুধু একটি বিচ্ছিন্ন কবিতা নয়, শুধু কুলি-মজুরের কথা নয়—তিনি চেয়েছিলেন সার্বিক সাম্য। বিশেষ করে পুরুষ ও নারীর সাম্য। বলেছেন সৃষ্টির যা কিছু তার অর্ধেক নারীর সৃষ্টি। নজরুল বললে কী হবে? আমরা সংসদে নারীর জন্যে অর্ধেক আসন বরাদ্দ করার কথা এখনও ভাবতে পারিনি। এক-তৃতীয়াংশ দেব কিনা, কবে দেব—সেই নিয়ে কামড়াকামড়ি চলছে।

“মিথ্যে শুনিনি ভাই,

এই হৃদয়ের থেকে বড় কোন মন্দির-কাবা নাই”।

তারপরেও নজরুল কতখানি হিন্দু বা কতখানি মুসলিম—আদৌ কোনটা কিনা, সে নিয়ে আজও তরজা চলে। আজ জীবিত থাকলে লাভ-জিহাদের অপবাদ শুনতে হত হিন্দু মেয়ে বিয়ে করার অপরাধে।

এক ফাঁকে টুক করে বলে দিই—বিশ্বে সাম্যবাদী আন্দোলনের বিখ্যাত গান, পারি কমিউনের শ্রমিকের লেখা দ্য ইন্টারন্যাশনালের লিরিক রাশিয়া থেকে গোপনে ভারতে এনেছিলেন সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর। বাংলা অনুবাদ নজরুলের-‘অন্তর-ন্যাশনাল সঙ্গীত’ নামে। একজন সত্যিকারের কবির কলমে ধরা পড়েছে গানটির আত্মা।

“যত অত্যাচারের শিরে বজ্র হানি, হাঁকে লাঞ্ছিত-জনমন-মথিত বাণীঃ

নব জনম লভি অভিনব ধরণী ওরে ওই আগত”।

কিন্তু এতসব বিদ্রোহ-বিপ্লবের ভীড়ে হারিয়ে যায় নি দুখু মিঞা নামের নটখট ছেলেটা। ছোটদের জন্যে লিখেছে একগাদা কবিতা!

দেখুন, বর্ণপরিচয়ে কোন রস নেই। খালি এটা করিও না। ওটা করিও না। খালি পড়তে বস, নো খেলাধূলো, নো হৈ -হুল্লোড়।

রবি ঠাকুরের সহজ পাঠ? শিশু? শিশু ভোলানাথ? দারুণ সব কবিতা। আমাদের অন্য জগতে নিয়ে যায়। কিন্তু “ আমি আজ কানাই মাস্টার” বা “খুকি তোমার কিচ্ছু বোঝে না মা” গোছের তিন চারটে ব্যতিক্রম বাদ দিলে সবগুলো আসলে বড়দের জন্য। বাচ্চার বাবা-মায়ের জন্য।

সবচেয়ে ভাল মদনমোহন তর্কালংকারের “রাত পোহালো ফর্সা হোলো, ফুটলো কত ফুল”। কিন্তু যাকে বলে মজা বা Fun, তার দেখা পাওয়া গেল নজরুলের লিচুচোর, খাঁদুদাদু, কাঠবেড়ালিতে।

“ওমা তোমার বাবার নাকে কে মেরেছে ল্যাং” দুখু মিঞা ছাড়া কে লিখতে পারতেন?

রবি ঠাকুরের প্রেমের গান ধূপের ধোঁয়ার মত, পূজা ও প্রেম মিশে যায়। নজরুল অনেক মাটির কাছাকাছি, অগুরু নয় দেহের গন্ধ পাই তাঁর প্রেমের গানে। পসন্দ আপনি আপনি!

তবে মিনমিনে গলায় রবীন্দ্রসঙ্গীত যদি বা বান্ধবীকে শোনাতে পারেন, নজরুলের গান গাইতে একটু গলার চর্চা দরকার।

এটা আমার মত হরিদাস পালের ব্যক্তিগত মত; রে রে করে উঠবেন না প্লীজ!


রবি ঠাকুর লিখলেন—“আজি হতে শতবর্ষ পরে,

                                        কে তুমি পড়িছ আজি আমার কবিতাখানি

                                            কৌতুহল ভরে”?

নজরুল অন্য ধাতুর। কোন কালজয়ী কবি হবার অমর হবার লোভ নেই।

“পরোয়া করিনা বাঁচি বা না বাঁচি যুগের হুজুগ কেটে গেলে,

মাথার উপর জ্বলিছেন রবি, রয়েছে সোনার শত ছেলে।

প্রার্থনা কর যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটি মুখের গ্রাস,

যেন লেখা হয় মোর রক্তলেখায় তাদের সর্বনাশ”।।


উনি বললে কী হবে? একশ সাতাশ বছর হয়ে গেল। তবু নজরুলের গান কবিতা কিছুই আমরা ভুলি নি। কারণ, অনেক কিছু এখনও সেইরকম রয়ে গেছে। যেমনটি ছিল নজরুল বেঁচে থাকতে।