Next
Previous
Showing posts with label প্রচ্ছদ নিবন্ধ. Show all posts
0

প্রচ্ছদ নিবন্ধ - হিন্দোল ভট্টাচার্য

Posted in

আমি রাজনীতি নিয়ে লিখতে বসিনি কোনোদিনই এইভাবে—অন্তত এমন এক তীব্র ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার জায়গা থেকে নয়। আমার কাছে রাজনীতি ছিল দূরের এক মঞ্চ, যেখানে বক্তৃতা হয়, বিতর্ক হয়, মতভেদ হয়—কিন্তু সেইসব যেন আমার দৈনন্দিন জীবনের ভেতরে ঢুকে পড়ে না। আমি আমার মতো করে লিখি, পড়ি, মানুষের সঙ্গে মিশি, কবিতার শব্দে, গল্পের শরীরে মানবিকতার ছোট ছোট আলো খুঁজি। কিন্তু আজ বুঝতে পারছি, সেই আলোটুকু কেবল ম্লানই হয়নি—তার উপর যেন ইচ্ছাকৃতভাবে ধুলো চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

আমি এখন খুব স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছি—এই যে ভোটের ঢক্কানিনাদ, এই যে গণতন্ত্রের উৎসব বলে প্রচারিত এক বিশাল আয়োজন—এর ভেতরে কোথাও একটা গভীর, লজ্জাজনক দরদাম চলছে। মানুষের সম্মানকে এখানে মুদ্রা বানানো হয়েছে। প্রতিশ্রুতিগুলো আর স্বপ্ন নয়, সেগুলো হয়ে উঠেছে লেনদেনের ভাষা। যেন আমার জীবন, আমার দুঃখ, আমার অভাব—সবকিছুই একটা দর কষাকষির টেবিলে তুলে রাখা।

আমি শুনি—“রাস্তা করে দেব”, “চাকরি দেব”, “বাড়ি করে দেব”—এইসব প্রতিশ্রুতির শব্দগুলো এখন আমার কানে আর আশ্বাসের মতো শোনায় না। বরং মনে হয়, যেন কেউ আমাকে কিনতে চাইছে। আমার ভোট, আমার বিশ্বাস, আমার অস্তিত্ব—সবকিছুর একটা দাম নির্ধারণ করা হচ্ছে।

আমি দাঁড়িয়ে থাকি সেই লাইনে—গরমে, ধুলোয়, অস্বস্তিতে—আর ভাবি, এই যে আমি, একজন মানুষ হিসেবে আমার যে সম্মান, তা কি সত্যিই এত সস্তা? আমার পাঁচ বছরের জীবন কি একটি বোতামের চাপে মাপা যায়? আমি কি কেবল একটি আঙুলে কালি লাগানোর মুহূর্ত?

আর সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হল, এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে আমরা “উৎসব” বলে উদ্‌যাপন করি। কী ভয়ঙ্কর শ্লেষ লুকিয়ে আছে এই শব্দটার মধ্যে! উৎসব—যেখানে আনন্দ থাকে, সমতা থাকে, সম্মান থাকে। অথচ এই তথাকথিত উৎসবের ভেতরে আমি দেখি অসমতা, দেখি প্রলোভন, দেখি অপমানের সূক্ষ্ম বিনিময়।

আমি দেখেছি, কীভাবে মানুষকে আলাদা আলাদা দলে ভাগ করা হয়—ধর্মের ভিত্তিতে, ভাষার ভিত্তিতে, পরিচয়ের ভিত্তিতে। তারপর প্রতিটি দলকে আলাদা আলাদা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। যেন আমরা সবাই মানুষ নই—আমরা সবাই আলাদা আলাদা ‘টার্গেট গ্রুপ’। আমাদের দুঃখ, আমাদের চাহিদা—সবকিছু বিশ্লেষণ করা হচ্ছে, মাপা হচ্ছে, তারপর তার উপর ভিত্তি করে তৈরি হচ্ছে রাজনৈতিক কৌশল।

এই পুরো প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি যে জিনিসটা হারিয়ে যাচ্ছে, তা হল মানুষের প্রতি সম্মান। আমি আর একজন নাগরিক নই—আমি একজন ভোটার। আর এই “ভোটার” পরিচয়ের ভেতরে আমার সমস্ত মানবিক পরিচয় যেন মুছে যাচ্ছে।

আমি বুঝতে পারি, আমাকে বোঝানো হচ্ছে—এই ব্যবস্থাটাই আমার স্বাধীনতা। আমাকে বলা হচ্ছে—“আপনি আপনার প্রতিনিধি বেছে নিচ্ছেন।” কিন্তু আমি যখন দেখি, সেই প্রতিনিধি নির্বাচনের পর আমাকে আর মনে রাখে না, তখন আমার মনে হয়, আমি কি সত্যিই কাউকে বেছে নিচ্ছি, না কি আমি নিজেই বেছে নেওয়া হচ্ছি—একটি ব্যবস্থার দ্বারা, যা আমাকে ব্যবহার করতে চায়?

আর এই ব্যবহারটাই সবচেয়ে অমানবিক। কারণ এটি খুব সূক্ষ্ম, খুব পরিকল্পিত। এটি সরাসরি আঘাত করে না—এটি ধীরে ধীরে ক্ষয় করে। আমার আত্মসম্মানকে, আমার ভাবনাকে, আমার বিশ্বাসকে।

আমি মাঝে মাঝে খুব তীক্ষ্ণ এক রকমের শ্লেষ অনুভব করি—যখন দেখি, ভোটের আগে আমাকে সম্মান করা হচ্ছে, আর ভোটের পরে আমাকে ভুলে যাওয়া হচ্ছে। তখন মনে হয়, এই সম্মানটা আসলে সম্মান নয়—এটি একটি অভিনয়। একটি প্রয়োজনীয় অভিনয়, যা আমাকে সন্তুষ্ট রাখার জন্য করা হয়।

আমি নিজেকেই প্রশ্ন করি—আমি কি এই অভিনয়ের অংশ? আমি কি এই ভণ্ডামিকে মেনে নিচ্ছি? আমার নীরবতা কি এই ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করে তুলছে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর সহজ নয়। কারণ আমি জানি, আমি একা নই। আমার মতো আরও অসংখ্য মানুষ আছে, যারা এইসব অনুভব করে, কিন্তু হয়তো প্রকাশ করতে পারে না। অথবা করে না—কারণ ভয় আছে, ক্লান্তি আছে, অথবা হয়তো এক ধরনের অভ্যেস তৈরি হয়ে গেছে।

এই অভ্যেসটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক। যখন আমরা অমানবিকতাকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে শুরু করি, তখন আমরা আর তার বিরুদ্ধে দাঁড়াই না। তখন আমরা কেবল বেঁচে থাকি—কিন্তু মানুষ হিসেবে নয়, একটি ব্যবস্থার অংশ হিসেবে।

আমি এই অবস্থাকে মেনে নিতে পারি না। আমি চাই, আমার কণ্ঠস্বর থাকুক—যত ক্ষুদ্রই হোক। আমি চাই, আমি বলতে পারি—এই যে ভোটের নামে, গণতন্ত্রের নামে, যে দরদাম চলছে, তা আমি মেনে নিচ্ছি না।

আমি চাই, আমি মনে রাখতে পারি—আমি কেবল একজন ভোটার নই, আমি একজন মানুষ। আমার সম্মান আছে, আমার ভাবনা আছে, আমার অনুভূতি আছে।

আর এই স্মৃতিটুকুই হয়তো আমার সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ।

কারণ যতদিন আমি নিজেকে মানুষ হিসেবে ভাবতে পারব, ততদিন এই অমানবিক ব্যবস্থার সম্পূর্ণ দখল সম্ভব নয়।

আমি জানি, এই লড়াই খুব ছোট—প্রায় অদৃশ্য। কিন্তু তবুও, এই ছোট ছোট প্রতিরোধই হয়তো একদিন বড় হয়ে উঠবে।

হয়তো একদিন, এই ঢক্কানিনাদের শব্দের ভেতর থেকে সত্যিকারের মানুষের কণ্ঠস্বর শোনা যাবে—যেখানে প্রতিশ্রুতি নয়, সম্মান থাকবে; যেখানে ভয় নয়, বিশ্বাস থাকবে; যেখানে রাজনীতি নয়, মানুষ প্রধান হয়ে উঠবে।

সেই দিনের অপেক্ষাতেই আমি লিখে যাই—নিজের মতো করে, নিজের ভাষায়, নিজের ক্ষুদ্র অথচ অদম্য মানবিকতার পক্ষে।

0

প্রচ্ছদ নিবন্ধ - সব্যসাচী মজুমদার

Posted in







আমরা নিশ্চিত ছিলাম এ আই, চ্যাট জিপিটি, হোয়াটসঅ্যাপ, ঘিবলি ইত্যাদি দেখে আমাদের ধারণা হয়েছিল এ আই অন্তত মানুষের শিল্পের ওপর ইতর বিশেষ প্রভাব ফেলতে পারবে না। বিশেষত আমরা পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা আর‌ও নিশ্চিত ছিলাম যেই, এই প্রান্তিক ভাষার দিকে কতটাই বা আগ্রহ দেখাবে এ আই ! অন্তত যা নমুনা দেখছিলাম আমরা চতুর্দিকে। তাতে, আমাদের ধারণা দৃঢ় বদ্ধ হচ্ছিল যে, এ আই নিখুঁত হতে চায় বলেই সে শিল্পিত নয়। কিন্তু, আমাদের ধারণা ছিল না যে, এ আই বিবিধ রূপেই আমাদের চতুর্মাত্রিক পৃথিবীকে ঘিরে ধরছে। 

আমরা প্রতিনিয়ত আমাদের ফোনে বা অনলাইন সংক্রান্ত যা কিছু করে চলেছি , বস্তুত এ আইয়ের নজরদারিতে। আর নজরদারিটা এমন‌ই যে আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপ, আমাদের প্রতিটি কথা ও চিন্তা পরিণত হচ্ছে প্রাইম নম্বরের বিবিধ অ্যালগোরিদমে। ব্যাখ্যাত হচ্ছে, আবিস্কৃত হচ্ছে এবং তথ্য হিসেবে ধরা থাকছে এ আইয়ের বিশাল পরিসরে। কেবল ধরাই থাকছে না, ব্যবহৃত হচ্ছে আমাদের পূনর্নির্মাণের প্রকল্পে অথবা আমাদের‌ই বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে। কিরকম অস্ত্র! সেই অস্ত্রের স্বরূপ বোঝা যাবে যদি আমরা কবিতার দিকে তাকাই। 

কবিতা সবসময় প্রযুক্তির সঙ্গে দ্বিরালাপ করেছে। প্রযুক্তি মানুষের জীবনযাপনে যখনই অবকাশ, নিশ্চিন্ত অবকাশ তৈরি করেছে, মানুষ উদ্ভাবক হয়ে উঠেছে। উদ্ভাবনায় যোগ করেছে বিবিধ মাত্রা। এতো সরলীকরণ। কিন্তু, আমরা অস্বীকার করতে পারি না, যে, বিজ্ঞান কিংবা প্রযুক্তিগত জ্ঞান মানুষের যাপন ও যাপন সংক্রান্ত মনস্তত্ত্বকে নিয়ন্ত্রণ ও প্ররোচিত করেছে। এবং এই প্ররোচনার অন্যতম উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে আমরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে যদি সাব্যস্ত করি, তবে দেখব দৃষ্টি ভঙ্গির মাত্রা বদলের জন্য‌ও এই বৈজ্ঞানিক দর্শন কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে তা আমরা তো বুঝতে পারি জীবনানন্দের কবিতা অনুসরণ করলে। 

আমরা যখন তাঁর সুররিয়ালিজমের ওপর আলো ফেলি, দেখি, উদ্ভট - অতিলৌকিক অনতিক্রম্য জগৎ অতিক্রম করে খুব বেশি করে প্রতিভাত হয় ডারুইনের জগৎ। পশু সেখানে মনুষ্যেতর নয়, মানুষেরই সমান্তরাল একটি সত্তা, একটি সমান্তরাল জগতের অধিবাসী হিসেবে উপস্থাপিত হয় ( এ বিষয়ে 'শতবছরে সুররিয়ালিজম' সংকলনে 'জীবনানন্দের সুররিয়ালিজম : মানুষের সমান্তরাল জগতের এক স্বতঃবিনির্মাণ' শীর্ষক নিবন্ধে বিশদ আলোচনা করা গেছে)। 'আটবছর আগের একদিন', 'বিড়াল', 'ঘোড়া' বিবিধ কবিতা যার সাক্ষ্য বহন করে। যখন,

'রক্ত ক্লেদ বসা থেকে ফের রৌদ্রে উড়ে যায় মাছি ' 

আমরা জীবনের দ্বিবিধ উৎসের প্রয়োগের এই মাত্রাভেদ দেখে যেমন বিমূঢ় হ‌ই, তেমন‌ই মাছি আমাদের এই 'ক্লান্ত… ক্লান্ত' মানব জীবনের কাছে একটি শাশ্বত সূর্যোদয় হয়ে থেকে যায়। বিস্মিত হ‌ই যখন জীবনানন্দ মাছির জীবনের বিস্তার রক্ত-ক্লেদের উৎস থেকে পৌঁছে দেন সূর্যোদয়ের ইতিবৃত্তে। একটি রূপ বিনির্মিত হয় আলোর সংজ্ঞায়। 

জীবনানন্দের পরবর্তী সময়ে আমরা এই বিজ্ঞান চেতনার ব্যাপ্তি লক্ষ করি বিনয় মজুমদারের কবিতায়। এ কথা বলাই বাহুল্য। কিন্তু বিনয় মজুমদার অবধি আসতে আসতে বাংলা কবিতার শরীরে বড়সড় একটা পরিবর্তন ঘটে গেছে। ইতিমধ্যে মহাকাব্যের যুগ অবসৃত হয়েছে। কাব্যনাট্য, নাট্যকাব্য এবং দীর্ঘ কবিতা মূলত লিরিক ধর্মীতার ভেতরেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রেখেছে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা অনধিক কুড়ির আওতায় ঢুকে পড়েছে। কেননা, পত্রিকার দাবি মেটানোর একটা তাগিদ শুরু হয়েছিল উত্তর রৈবিক যুগ থেকেই।

বিনয় মজুমদারের কবিতায় বিজ্ঞান চেতনা সম্পর্কে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। এবং এই প্রেক্ষিতটিও বিরাট। এই অবকাশে আলোচনা করা দুস্কর। তবে এ বিষয়ে তো আমরা সকলেই সহমত যে বিনয় মজুমদারের কবিতায় বিজ্ঞান কেবল প্রত্যক্ষ চিহ্ন হিসেবেই ব্যবহৃত হল না, বরং বিজ্ঞান দর্শন হয়ে উঠল,


"আর যদি নাই আসো,ফুটন্ত জলের নভোচারী
বাষ্পের সহিত যদি বাতাসের মতো না-ই মেশো,
সেও এক অভিজ্ঞতা ; অগণন কুসুমের দেশে
নীল বা নীলাভবর্ণ গোলাপের অভাবের মতো
তোমার অভাব বুঝি ; কে জানে হয়তো অবশেষে
বিগলিত হতে পারো ; আশ্চর্য দর্শনবহু আছে
নিজের চুলের মৃদু ঘ্রাণের মতন তোমাকেও
হয়তো পাইনা আমি, পূর্ণিমার তিথিতেও দেখি
অস্ফুট লজ্জায় ম্লান ক্ষীণ চন্দ্রকলা উঠে থাকে,
গ্রহণ হবার ফলে, এরূপ দর্শন বহু আছে ।"(আর যদি নাই আসো)


বিনয় মজুমদারের কবিতা একটি ফটোগ্রাফি তৈরি করে, কেবল তাঁর বাস্তবিক অবস্থান নয়, কেবল তাঁর গ্রাম, পরিবেশ, পরিস্থিতি নয়, বিনয় মজুমদারের কবিতায় উপস্থাপিত হয় এমন একটি টপোগ্রাফি, যার অস্তিত্ব আমাদের চারপাশেই, অথচ, যাকে আমরা আবিস্কার করতে পারিনি কখনও। 

এই আবিস্কারের প্রবণতাই তো একটি কবিতাকে বিনির্মাণ আর পূণর্বিনির্মাণের দিকে ঠেলে দেয়। যে দ্বন্দ্বের অভিযোজনে‌ই কবিতা একটি কালিক পরিস্থিতি থেকে স্পর্শ করতে পারে আরেকটি কালিক পরিস্থিতিকে। ঠিক এই কথার সূত্রেই আমাদের মনে পড়ে মণীন্দ্র গুপ্তের কবিতার কথা। বস্তুত শতবর্ষী মণীন্দ্র বোধহয় তাঁর দৃষ্টিক্ষেত্রকে বিস্তার করতে পেরেছিলেন মানুষের নিজস্ব গণ্ডি পেরিয়ে। যেমন আমরা যদি 'গণ্ডার' কবিতাটির কথা মনে করি কিংবা 'এখন ওসব কথা থাক' কবিতাটির কথা মনে করি, অনায়াসে দেখতে পাচ্ছি আমাদের পরিবেশের, পরিস্থিতির, ঘটমানতার গঠনতন্ত্র বদলে যাচ্ছে। আমরা এ কবিতার ওপর সুররিয়ালিজমের বা যে কোন‌ও রকম আলো ফেলে দেখতেই পারি। দেখব এ কবিতা প্রতিটি আলোকেই গ্রহণ করছে। কিন্তু, সবকিছু অতিক্রম করে পরিস্ফুট হয়ে ওঠে একটি আবহমান সময়ের বহমান ও বিবর্তমান মনস্তত্ত্বের ধারাভাষ্য। কেবল তাই নয় সময়ের তার সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের মূল সূত্রটি বলে রাখেন মণীন্দ্র এ কবিতায়,

"এক লক্ষ বছর সঙ্গে থাকার পর সাব্যস্ত হবে, তুমি আমার কিনা।
ওসব কথা এখন থাক।
এখন চলো মিকির পাহাড়ে বুনো কুল পেকেছে, চলো খেয়ে আসি।

লাল রুখু চুল
        সূর্যাস্তের মধ্যে...
          অর্কিডের উজ্জ্বল শিকড়ের মতো উড়ছে।
          —দেখি দেখি, তোমার তামাটে মুখখানা দেখি!

সূর্য এখনি অস্ত যাবে। পশুর মতো ক্ষীণ শরীরে আমরা হাঁটু পর্যন্ত জলস্রোত পেরিয়ে চলেছি—
                   জলস্রোত ক্রমশ তীর... কনকনে..."
 ( এখন ওসব কথা থাক )


বস্তুত পক্ষে এতক্ষণ আমরা কথা বলছিলাম, বিজ্ঞান কিভাবে বাংলা কবিতায় দর্শন হিসেবে উপস্থিত হয় — এ বিষয়ে। এ সম্পর্কে আর‌ও কথা বলা যাবে নির্দিষ্ট সূত্রে। এখন চলে যেতে চাইছি আরেক প্রসঙ্গে। বিশেষত যে সময়টি চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের পর সোসাইটি ৫.০-র দিকে ঝুঁকতে চাইছে। যে সময়টি তার নিজের গঠন ও গঠনের মনস্তত্ত্বকে বদলাতে চাইছে। অর্থাৎ দু'হাজার পনের সনের পরবর্তী সময়ে। 

আমরা যদি বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে ভাবতে শুরু করি, তবে একটা বিষয় লক্ষ করতে পারব যে দু'হাজার দশ থেকে কুড়ি সময়টি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, সময়টিকে সাহিত্যের প্রেক্ষিতে বিচার করলে দেখতে পাচ্ছি, দু'হাজার পনের পর্যন্ত প্রাধান্য পেত প্রিন্ট মাধ্যম। অরকুট, ফেসবুক কিংবা ওয়েবম্যাগ বা ওয়েবজিন তখন‌ও গুরুত্বহীন। দু'হাজার পনের'র পর কিন্তু অবস্থাটা দ্রুত বদলে যেতে শুরু করল। আন্তর্জাল মাধ্যম বেশি সক্রিয় হয়ে উঠল। প্রিন্ট মাধ্যম কিছুটা হলেও পিছনে সরল। এরসঙ্গে সঙ্গে আমরা যে ঘটনাটি লক্ষ করলাম তা হল অ্যালগোরিদমের দাবিতে কবিতার আকার বদলাতে শুরু হল। আমরা জানি ইতোমধ্যে মহাকাব্যের যুগ অবসৃত, নাট্যকাব্য-কাব্যনাট্য — অতিবিরল শিল্পে পরিণত। দীর্ঘ কবিতার চর্চা ক্রমশ প্রচ্ছন্ন, কবিতা মোটামুটি কুড়ি পঙক্তির হয়ে এসেছে। কেবল যে গঠনতান্ত্রিক প্রভাব লক্ষ করলাম — তার নয়। এক‌ইসঙ্গে আমাদের মনে রাখার দরকার — আমরা যখনই সমাজ মাধ্যমে বা ওয়েবজিনে আমার কবিতাটি প্রকাশ করছি, আসলে করছি একটি অফুরন্ত এবং বিস্তীর্ণ প্রচার মাধ্যমে। বিচিত্র ধরনের, বিচিত্র রসের প্রেমিক, বিবিধ অবস্থানের মানুষ কবিতাটির পাঠক হয়ে উঠছেন। এমন মানুষ পাঠক হয়ে উঠছেন, যাঁরা কবিতার প্রাথমিক পাঠক। কবিতার প্রতি আগ্রহ আছে কিন্তু খুব বেশি কবিতা পড়া হয়নি। তাঁরাও কেবল পাঠক নন, স্বাধীন মতামত দাতা ও রচনাটির বিচারক হয়ে উঠলেন। এবং মতামত অনেক সময় ও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রচনাকারের চিন্তার অবস্থান থেকে বহু দূরের। ফলে এই ক্ষেত্রে জনপ্রিয়তা বা পাঠক প্রিয়তা কিংবা সম্ভ্রম অর্জনের জন্য কবিতা বদলাতে শুরু করল। সহজ দর্শন, সরল ভাষা এবং অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত আকারের প্রচ্ছন্ন বা উচ্চাবচতাময় ছন্দ সম্পন্ন কবিতা উপস্থাপিত হতে শুরু করল। পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করল। আমরা এক্ষেত্রে রুপি ক‌উরের কবিতাকে উদাহরণ হিসেবে ভাবতে পারি। এক‌ইসঙ্গে এও দেখা গেল কবিতার কূট, গহন, ইঙ্গিতবাহী রূপটি অবহেলিত চর্চায় পরিণত হল। 

এ আই ক্রমাগত শিখছে। বাংলার মতো জটিল ভাষা অর্জন করতে তার বেশ কিছু সময় লাগবে সন্দেহ নেই। কিন্তু, সেই সময় অনন্ত নয়। ছবি কিংবা ভাস্কর্যকে হুবহু অনুকরণ করতে শিখে গেছে। সম্প্রতি নেচার পত্রিকাও একটি সমীক্ষা করে দেখেছে, কবিতা রচনার ক্ষেত্রে এ আই খুব বেশি অমানবিক নয়।
"Study 1 showed that human-out-of-the-loop AI-generated poetry is judged to be human-written more often than poetry written by actual human poets, and that experience with poetry does not improve discrimination performance. Our results contrast with those of previous studies, in which participants were able to distinguish the poems of professional poets from human-out-of-the-loop AI-generated poetry16, or that participants are at chance in distinguishing human poetry from human-out-of-the-loop AI-generated poetry17. Past research has suggested that AI-generated poetry needs human intervention to seem human-written to non-expert participants, but recent advances in LLMs have achieved a new state-of-the-art in human-out-of-the-loop AI poetry that now, to our participants, seems “more human than human.”…"
( Brian Porter and Eduard Machery : article number - 26133: published - november 2024 : Nature)

আমরা আমাদের লক্ষ্য রাখতে চাইছি দ্বিতীয় উদ্ধৃত অংশের দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে। মোট দুটো স্টাডির প্রথমটিতেই আমরা এই বিষয়ে অবগত হতে পারছি যে, মানুষের আবেগ, ভালোবাসা, জেদ,ঈর্ষা, কাতরতা, স্বপ্নকে স্পর্শ করতে পারছে এ আই। অনুবাদ করতে পারছে সে। ক্রমশ নিজেকে মানুষের অস্তিত্ব, অস্তিত্বের ইতিবৃত্তকে জেনে ফেলছে সে। হারারির ধারণাকে মান্যতা দিয়ে যদি আমরা নেচার কৃত দ্বিতীয় স্টাডির ফলাফল দেখি, 

Study 2 finds that participants consistently rate AI-generated poetry more highly than the poetry of well-known human poets across a variety of factors. Regardless of a poem’s actual authorship, participants consistently rate poems more highly when told that a poem is written by a human poet, as compared to being told that a poem was generated by AI.
 ( Brian Porter and Eduard Machery : article number - 26133: published - november 2024 : Nature)

খুব স্বস্তিদায়ক নয়। মানুষের শিল্পকে রচিত এই আই দখল করবে বটে, কিন্তু টিঁকিয়ে রাখবে কি ! 

এই প্রসঙ্গে প্রবেশের আগে বলে নেওয়া ভাল যে, পূর্বোল্লিখিত কবিতার নতুন গঠন ও প্রবণতা কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকেই উৎসাহিত করবে। কেননা, তারপক্ষে জটিল -কূট বিন্যাসের বদলে তাৎক্ষণিকভাবে স্পর্শকাতর কবিতাগুলিকে নকল করাই তার পক্ষে সহজ। এবং আমরা চমৎকৃত হয়ে দেখছি যে, অ্যালগোরিদম কিন্তু বাংলা কবিতাকে ঠেলে দিতে চাইছে সেদিকেই।

এখন প্রশ্ন হল—বিজ্ঞানের সঙ্গে কথোপকথনে সদা নিয়োজিত কবিতাকে, বাংলা কবিতাকেও কিন্তু শংকিত হয়ে থাকতে হচ্ছে একটা প্রশ্নে — মানুষের শিল্পকে কতদিন জায়গা ছেড়ে দেবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা? কেননা, এই আই এখন নতুন স্বরূপ ধারণ করেছে। সে এখন আর নকল করতে সক্ষম মাত্র নয়, সে এখন সিন্থেটিক এ আইয়ে পরিণত। এমন এ আই যে মানুষের সমান্তরাল বাস্তবতার জন্ম দিতে সক্ষম। সে কবিতা লিখতেও পারদর্শী হয়ে উঠবে না — আমরা কি করে বলছি ? অন্তত এলিয়েন শক্তি হিসেবে সে ইতিমধ্যেই মানুষের প্রতি যে কৌতুহল দেখিয়েছে — তা যথেষ্ট এবং উদ্বেগজনক। 

তবে, সঙ্গে সঙ্গে একথাও ভরসা জোগায় যে মানুষের কৌতুহল ও কৌতুহলজাত উদ্ভাবনা তাকে স্বতঃবিবর্তনের দিকে এগিয়ে দিয়েছে। এই বিবর্তন তাকে প্রতি মুহূর্তে নিজের কাছে অচেনা করে তুলেছে নিজেকে। একারণেই আমরা হয়তো আমাদের শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে পারব। এই কৌতুহল জাত স্বতঃবিবর্তনের মাধ্যমে। কেননা সেই বিবর্তিত মানুষ যেমন নিজের কাছে অচেনা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাছেও। আমাদের কাছে ভরসার জায়গা এটাই তৈরি হয়। তবে, আমাদের একটা মনে রাখার দরকার— কৌতুহলহীন অথবা ক্র্যাক রাইটিং বা জনপ্রিয় লেখার এখন যে প্রবণতা, সেই প্রবণতা কিন্তু কতদূর জারি থাকবে, তা কিন্তু চিন্তার অবকাশ তৈরি করতে পারে, আশংকার‌ও। মানুষের তালা চাবি যত মজবুত হবে, বিজ্ঞানের সঙ্গে তার যত কথোপকথন হবে, সে নিজের উদবর্তন তৈরি করতে পারবে। অন্যথায় কিন্তু, একদিন হোমো সেপিয়েন্স আক্ষরিক অর্থেই সংকটের মুখে পড়বে। বিজ্ঞান‌ই হবে তার সংকটের কারণ।

0

প্রচ্ছদ নিবন্ধ - রঞ্জন রায়

Posted in




















১ ভূমিকা

যারা দেশের অর্থব্যবস্থাকে ভেতর থেকে ধ্বসিয়ে দেবার চেষ্টা করে তাদের দেশদ্রোহী বলবেন কি বলবেন না ভেবে নিন। ধরুণ, যারা দেশের সাধারণ মানুষের কষ্টসঞ্চিত টাকাপয়সা সরকারী ব্যাংককে বোকা বানিয়ে বা সোজাসুজি ঠকিয়ে কয়েক হাজার কোটি টাকা নিয়ে বিদেশে পালিয়ে গিয়ে মৌজমস্তি করছে, বিলাসে ডুবে আছে, খেলার মাঠে দুই পরীকে বগলদাবা করে হাজির হয়ে আমাদের দেশের অর্থব্যবস্থাকে বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছে তাদের কী ক্রিমিনাল মনে করবেন না? তাদের মনে মনে শাপ দেবেন না—‘হেঁটোয় কণ্টক দাও, উপরে কণ্টক” !

তবে আগে তো তার টিকির নাগাল পান, তাদের হাতকড়ি পড়িয়ে এদেশে নিয়ে আসুন, যেমনটি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বে-আইনি ভাবে আমেরিকায় ঢোকা ভারতীয় “অনুপ্রবেশকারী”দের এদেশে ফেরত পাঠিয়ে ছিলেন। কিন্তু তারা যদি অনুতপ্ত হয়, ক্ষমা চায়? তখন কী করবেন? অনুতাপে মানুষ শুদ্ধ হয়, পবিত্র হয়।

শ্যামার জন্যে বজ্রসেন ক্ষমা চেয়েছিল। মানুষশিকারী অঙ্গুলিমালকে ভগবান বুদ্ধ ক্ষমা করেছিলেন। আর এরা তো খুনটুন করেনি, কেবল আর্থিক ফ্রড করেছিল। আমাদের ট্র্যাডিশন আমাদের সংস্কৃতি কী বলে?

—“-- ভালবাসো, অন্তর হতে বিদ্বেষবিষ নাশো” ।

এমনই একটি ক্ষমা চাওয়া এবং পাওয়ার কেস হল সন্দেসরা ভাইদের। নীতিন ও চেতন সন্দেসরা হলেন ‘স্টারলিং বায়োটেক লোন ফ্রডের নায়ক। ওদের পুরো পরিবার মিলেমিশে আমাদের দেশের কিছু ব্যাংককে ঠকিয়েছে। কত টাকা? ১৬০০০ কোটি!

২ পলাতক সন্দেসরা পরিবারঃ এককালীন কিছু টাকা দিয়ে সমঝোতা ও সুপ্রীম কোর্ট

গত ১৯ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে সুপ্রীম কোর্টের একটি রায়ে ব্যাংক ফ্রড করে বিদেশে পলাতক দুই ভাই, নীতিন ও চেতন সন্দেসরা বড় রকম সুবিধে পেয়েছে। এককালীন কিছু টাকা জমা করার কড়ারে ওদের ক্ষমা করে সমস্ত এফ আই আর তুলে নেয়ার নির্দেশ জারি করেছে মহামান্য আদালত। সরকার পক্ষও সহমত।

ওরা কোথায়? ২০১৭ সালে দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছে। তারপর নাইজেরিয়াতে গেড়ে বসেছে। তদন্ত কে করেছে? ভারত সরকারের সিবি আই ও ইডি। সরকার মনে করে এগুলো ক্রিমিনাল কৃত্য। তাই অনেকগুলো এফ আই আর করা হয়েছিল। ওদের বিরুদ্ধে অভিযোগ -- মানি লন্ডারিং (বে-আইনি ভাবে বিদেশে টাকা পাচার), বিদেশে ‘শেল কোম্পানি’ (নকল কোম্পানি) খোলা, বেনামি ফার্মের মাধ্যমে জালি লেনদেন দেখিয়ে টাকা ব্যাঙ্কের টাকার অপব্যয় করা। সেপ্টেম্বর ২০২০ নাগাদ ভারত সরকার ওদের আইনি ব্যবস্থার সংগে সহযোগিতা না করার অপরাধে “ পলাতক আর্থিক অপরাধী” (Fugitive Economic Offender) ঘোষণা করে।

লক্ষণীয় যে ২০১৮ সালের Fugitive Economic Offender আইন অনুসারে -- যাদের অমন দাগিয়ে দেয়া হয়, তারা বা তাদের সঙ্গে যুক্ত সমস্ত কোম্পানি কোন সিভিল আদালত বা ট্রাইব্যুনালে কোন দেওয়ানি মামলা করতে পারবে না এবং তাদের বিরুদ্ধে হলে আদালতে আইনের সাহায্যে ডিফেন্ড করতে পারবে না। সন্দেসরা ভাইদের বিরুদ্ধে অনেকগুলো দেওয়ানি এবং ফৌজদারি মামলা করা হয়। যেমন, PMLA, Fugitive Economic Offender Act, SFIO, Black Money Act, Income Tax আইনের বিভিন্ন ধারায়।

কিন্তু তারা অনেকটা বকায়া ঋণ শোধ করার প্রতিশ্রুতি দিলে তাদের সুপ্রীম কোর্ট নির্দিষ্ট শর্তে ক্ষমা করার এবং সব মামলা (দেওয়ানি এবং ফৌজদারি সি বি আইকোর্ট বা ইডি) তুলে নেয়ার আদেশ জারি করে।

গত ১৯ নিভেম্বর, ২০২৫ এর রায়ে দেশের সর্বোচ্চ আদালত বলে—যদি অপরাধীরা এক থোকে ৫১০০ কোটি টাকা জমা করে তবেই; নচেৎ নয়।

মাননীয় আদালতের যুক্তিঃ ওরা দুই দশক আগে ব্যাংকগুলোর থেকে লোন নিয়ে মেরে দিয়েছিল ৫৩৮৩ কোটি টাকা। যা ইডির মতে সুদে আসলে দাঁড়িয়েছে ১৬০০০ কোটি টাকা। ইডি এরমধ্যে ওদের ১৪৫২১ কোটি টাকার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেছে। (সমঝোতা হয়ে ওদের বিরুদ্ধে কেস উঠে গেলে এই সম্পত্তি ওদের ফেরত করে দেয়া হবে)।

ইতিমধ্যে সন্দেসরা ভাইয়েরা ব্যাংকগুলোর সঙ্গে দরদাম করে চুক্তি করেছে যে ভারতীয় কোম্পানিগুলোকে এককালীন ৩৮২৫ কোটি টাকা এবং বিদেশি জামিন থাকা কোম্পানিগুলোকে ২৯৩৫ কোটি টাকা দিয়ে One Time Settlement করে ঝামেলা চুকিয়ে দেবে। মানে, ১৬০০০ কোটি টাকা লোন ফ্রডের ফয়সালা হবে মোট ৬৭৬১ কোটি টাকা দিয়ে। অর্থাৎ ব্যাড লোন মাফ করা হোল ৯২৩৯ কোটি (=১৬০০০-৬৭৬১) টাকায়। তাহলে অত টাকা ডুবল কার? সরকারের, মানে নাগরিকদের।

ঠিক আছে। তবে ওই ৬৭৬১ কোটি টাকার মধ্যে কত টাকা আদায় হয়েছে? আদালতের হিসেবে ৩৫০৭.৬৩ কোটি টাকা। এছাড়া ওদের দেউলিয়া ঘোষণা করে ন্যাশনাল কোম্পানি ল ট্রাইব্যুনাল এর আদালতি পদক্ষেপে স্টারলিং বায়োটেক, স্টারলিং এস ই জেড এবং পিএম টি মেশিন কোম্পানিগুলো থেকে মোট আদায় হয়েছে ১১৯২ কোটি টাকা। অতএব, আদালতের হিসেবে সমঝোতা রাশির বকায়া রয়েছে ২০৬১.৩৭ কোটি টাকা। সুপ্রীম কোর্টে সরকারের সলিসিটর জেনারেল বলেন -সব মিলিয়ে অন্ততঃ ৫১০০ কোটি টাকা জমা করলে তবে ঠিক হবে। (এতে আনুষঙ্গিক খরচা যোগ করা হয়ে থাকে)।

সরকার মনে করে সন্দেসরা পরিবার বহু বছর ধরে নাইজেরিয়া এবং আলবেনিয়ায় বসবাস করছে। ওদের বিষয়ে দেশে ফিরিয়ে আনার (এক্সট্রাডিশন) আবেদন লটকে রয়েছে। ওদের বিদেশে গ্রেফতারের জন্যে জারি রেড কর্নার নোটিসও ঠান্ডা হয়ে যায় নি।

তবে সুপ্রীম কোর্ট তার রায়ে বলেছে দুটো কথাঃ

এক, অনাদায়ী পাবলিক মানি’র একটা বড় অংশ উদ্ধার হয়ে গেলে সরকারের কেস চালানোর কোন মানে হয় না। তাই সমস্ত এফ আই আর বাতিল করা হোক। সরকার আপত্তি করে নি।

দুই, তবে এই রায় একটি বিশেষ কেসে ব্যতিক্রম হিসেবে গণ্য হবে। একে উদ্ধৃত করে পরে কেউ অনুরূপ সুবিধে পাবে না।

কিন্তু , একজন অভিজ্ঞ সিনিয়র ইডি অফিসার বলেছেন যে সুপ্রীম কোর্ট বলেছেন বটে, কিন্তু আর যারা পালিয়েছে তাদের উকিলেরা ঠিক রাস্তা বের করে নেবে।


৩ অন্য পলাতকেরাঃ বর্তমান হাল-হকিকত

চারজন রাঘব বোয়ালের কথা বলা যাক।

৩.১ বিজয় মালিয়া

স্টেট ব্যাংক সমেত ১৭টি ব্যাংকের কনসর্টিয়াম বিজয় মালিয়ার বিরুদ্ধে কিং ফিশার এয়ারলাইনসের নামে ঠকিয়ে লোন নেয়ার এবং মানি লণ্ডারিং করার অভিযোগ করল । সি বি আই ও ইডি তদন্ত করে কেস দিল। মালিয়া ২ মার্চ, ২০১৬ সালে ইউ কে তে পালিয়ে গেল। ডেট রিকভারি ট্রাইব্যুনালের হিসেবে ২০১৩ সালে মূল ফ্রড লোন ছিল ৬০৯৭ কোটি টাকা। সুদে আসলে এখন সেটা হয়েছে ১৭৭৮১ কোটি টাকা।

আদায় হয়েছে কত? বিত্ত মন্ত্রকে ২০২৫ এর বার্ষিক রিপোর্ট অনুযায়ী ইডি ১৪০০০ কোটি টাকার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে ব্যাংকদের হস্তান্তর করেছে।

মালিয়াকে ভারত সরকার পলাতক আর্থিক অপরাধী” (Fugitive Economic Offender) ঘোষণা করেছে। যুক্তরাজ্যের একটি আদালত ওকে ভারতে বন্দী হিসেবে ফেরত পাঠানোর আদেশ দিয়েছে। তবে ব্রিটিশ সরকারের অন্তিম কদমের অপেক্ষায় সবাই। ততদিন মালিয়া ওদেশেই থাকবে।




৩.২ নীরব মোদীঃ

পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাংকের ১৩০০০ কোটি টাকা জালিয়াতির মুখ্য অভিযুক্ত। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ হল --ওই ব্যাংকের ব্র্যাডি হাউস শাখা মুম্বাই থেকে জাল লেটার অফ আন্ডারটেকিং ইস্যু করানো, এবং সিবিআইয়ের কথায়—ব্যাংক আধিকারিকদের সঙ্গে যোগসাজশে বিদেশে টাকা পাচার ইত্যাদি।

ব্যাংককে কত টাকা ঠকানো হয়েছে? ৬৪৯৮ কোটি টাকা।

টাকা আদায়ঃ ইডি নীরব মোদীর জুয়েলারি এবং ফার্ম হাউস মিলিয়ে মোট ২৬২৬ কোটি টাকার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে ব্যাংককে ১০৫২ কোটি টাকার সম্পত্তির দখল দিয়েছে।

বর্তমান অবস্থা

নীরব মোদীকে পলাতক আর্থিক অপরাধী ঘোষণা করে যুক্তরাজ্যে ২০১৯ সালে গ্রেফতার করানো হয়েছিল। ও যাতে ফিরে আসতে না হয় তার জন্যে বিলেতের আদালতে আইনি লড়াই করছে। তবে ভারতের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের ‘প্রত্যর্পণ চুক্তি’ (extradition pact) আছে। তাই ভারত ওকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্যে আইনি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

৩.৩ মেহুল চোকসি

ইনি উপরোক্ত পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাংক ফ্রড কেসে নীরব মোদীর সংগে সহ-অভিযুক্ত। ইনিই মাস্টারমাইন্ড। এঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ-- শেল ফার্মের মাধ্যমে জালিয়াতির সাপ্লাই চেন তৈরি করার পরিকল্পনা, বিদেশে টাকা পাচার এবং নকল হীরে বিক্রি করা।

কত টাকা আদায় করতে হবে?

এঁর সমস্ত ফার্ম মিলিয়ে ব্যাংককে দেয় টাকা ৬০৯৭ কোটি।

আদায় হয়েছেঃ

ইডি চোকসির প্রায় ২৫৬৫ কোটি টাকার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেছে। বিত্ত মন্ত্রকের দেয়া তথ্য অনুযায়ী এর পাওনাদারদের ৩১০ কোটি টাকার সম্পত্তি দেয়া হয়েছে। অন্য সম্পত্তিগুলো ব্যাংককে দেয়ার আইনি কাজ এগিয়ে চলেছে।

বর্তমানেঃ ইনি ২০১৮ সালে দেশ ছেড়ে পালিয়েছিলেন। আন্টিগুয়া এবং বারবুডা নামের দুটো ক্যারিবিয়ান দ্বীপের নাগরিকত্ব পেয়ে গেছেন। এঁকে ডোমিনিকায় মে ২০২১ সালে গ্রেফতার করা হয়েছিল। কিন্তু আইনের ফাঁকে পালিয়ে যায়। এইবছরের গোড়ায় বেলজিয়াম পুলিশ গ্রেফতার করে ওকে জেলে পোরে। বেলজিয়াম কোর্ট ভারতের প্রত্যর্পণের আবেদন মঞ্জুর করে। কিন্তু ও এখন ওখানকার সুপ্রীম কোর্টে আপিল করেছে।

৩.৪ যতীন মেহতা

রাঘববোয়াল ঠগ। ভারতে হীরের ব্যবসায়ে সবচেয়ে বড় ব্যাংক জালিয়াতির নায়ক। সার্কুলার ট্রেডিং (এর টুপি ওর মাথায়) এবং বুলিয়ন সিকিউরিটির ভিত্তিতে পাওয়া ব্যাংক লোনের পয়সা নয়ছয় করার দায়ে অভিযুক্ত। সবটা এখনও টের পাওয়া যায় নি। ইডি, সিবিআই এবং ব্যাংকের তদন্ত চলছে। ওর দুটো ফার্ম—দ্য উইনসাম ডায়মন্ডস এবং ফরএভার প্রেশাস জুয়েলারি-- ২০১৩ সালে ব্যাংককে ৬৮০০ কোটি পাওনা টাকা দেয় নি যা এখন ১০০০০ কোটি টাকার অংকও ছাড়িয়ে গেছে।

আদায়

ইডি ১০০০ কোটি টাকার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেছে। যুক্তরাজ্যের আদালতে ব্যাংক মাত্র ১৫৭ কোটি টাকা উদ্ধার করতে পেরেছে।

বর্তমান অবস্থাঃ

২০১৩ সালে মেহতা ভারত থেকে পালিয়ে ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের সেন্ট কিটস্‌ অ্যান্ড নেভিস রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছে। ভারতের বিভিন্ন এজেন্সি ওকে ফেরত আনার অনুরোধ করে যাচ্ছে। ব্যাংকগুলো ওকে উইলফুল ডিফল্টার ঘোষণা করেছে। এখনও তদন্ত চলছে।

৪ যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু!

সুপ্রীম কোর্টের পরিবেশ আইন নিয়ে আরেকটি সাম্প্রতিক রায়ঃ পোস্ট ফ্যাক্টো ক্লিয়ারেন্স!

কারও মাথা কেটে ফের জোড়া লাগিয়ে দেয়া যায়? যায় না। যার মাথা কাটা গেছে তার আত্মীয়-পরিজনকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিলে হারিয়ে যাওয়া মানুষটার অভাব পূরণ হয়? হয় না। বনভূমি এবং পরিবেশ সুরক্ষা আইন ভেঙে বিনা অনুমতিতে ঘন অরণ্য কেটে সাফ করে কারখানা বানিয়ে তারপর পেনাল্টি দিলে কি রাতারাতি বনভূমি গজিয়ে ওঠে? পরিবেশের যা ক্ষতি হয়েছে তা পূরণ হয়?

তাহলে সুপ্রীম কোর্ট গত ১৮ নভেম্বর তারিখে সুপ্রীম কোর্টের সাংবিধানিক বেঞ্চ এটা কী রায় দিলেন? বিশেষ করে যখন দিল্লির পরিবেশ দূষণের মাত্রা বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছে গেছে?

মনে রাখা দরকার, ইন্ডাস্ট্রি বা কোন বাণিজ্যিক প্রোজেক্ট শুরু করতে হলে যে environmental clearance নিতে হয় সেটা কোন কাগুজে নিয়মপালন নয়—বরং এটি নাগরিকদের সুস্থ জীবনের জন্য একটি সাংবিধানিক সুরক্ষা। আর্টিকল ২১ আমাদের যে জীবনের অধিকার দেয়, তার আবশ্যিক অঙ্গ হল বিশুদ্ধ বায়ু, বিশুদ্ধ হাওয়া এবং বিশুদ্ধ পরিবেশ।

বনশক্তি বনাম ভারত সরকার কেস

পরিবেশ মন্ত্রক বিগত ২০১৭ সালে একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে এবং পরে ২০২১ সালে আর একটি মেমোরান্ডাম জারি করে। সেগুলোর মাধ্যমে কোন প্রোজেক্টের পরিবেশের উপর ক্ষতিকর প্রভাবের মূল্যায়নের (ETA Rules) নিয়মগুলোকে ঢিলে করে দেয়। তাতে সোজাসুজি “ডেভেলপার” দের প্রোজেক্ট শুরু করার পরে পরিবেশ সম্বন্ধিত গ্রীন ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট পাওয়ার রাস্তা খুলে দেয়া হয়।

ওই আদেশের বিরুদ্ধে মূম্বাইয়ের এনজিও বনশক্তি সুপ্রীম কোর্টে আবেদন করে। এই কেসে সুপ্রীম কোর্টের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি গবইয়ের নেতৃত্বে দুই সদস্যের বেঞ্চ ১৬ মে তারিখে রায় দিয়ে বলল—পোস্ট ফাক্টো ক্লিয়ারেন্স বা পরিবেশ আইন ভেঙে তারপর সেটার অনুমতি পাওয়া – পুরোপুরি বে-আইনি।

তারপর কনফেডারেশন অফ রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার্স অফ ইন্ডিয়া রিভিউ চেয়ে আবেদন করল। ওদের চিন্তা, এই রায়ের রিভিউ না হলে ২০০০০ কোটি টাকার পাবলিক প্রোজেক্ট ভেঙে দিতে হবে। তাই তিন সদস্যের সাংবিধানিক বেঞ্চকে দায়িত্ব দেয়া হল।

কিন্তু সেই বেঞ্চ গত ১৮ নভেম্বরে ২-১ বিভক্ত রায়ে আগের রায় পুরোপুরি পালটে দিয়ে বিনা অনুমতি প্রোজেক্ট শুরু করে পরে গ্রীন ক্লিয়ারেন্স প্রমাণপত্র নেয়াকে বৈধ করে দিল!

জাস্টিস উজ্জ্বল ভুঁইয়া অসহমতি জাহির করে কারণ দেখালেনঃ

সুপ্রীম কোর্ট নিয়মিত পরিবেশ রক্ষার প্রাথমিক নীতিগুলোর পক্ষে দাঁড়িয়েছে। ২০১৭ সালে কমন কজ বনাম ভারত সরকার কেসে বলেছে—পরিবেশ রক্ষার সার্টিফিকেট কোন যান্ত্রিক কাজ চালিয়ে যাওয়ার জন্যে নয়। আর পোস্ট ফ্যাক্টো ক্লিয়ারেন্স পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি করবে।

তিন বছর পরে অ্যালেম্বিক ফার্মাসিউটিক্যাল কেসেও জোর দিয়ে বলেছে -- পরিবেশের উপর ক্ষতিকর প্রভাবের মূল্যায়নের (ETA Rules) নিয়মগুলোকে কড়াভাবে পালন করা উচিত।

বনভূমি এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের গুরুত্বের কথা তৎকালীন প্রধান বিচারপতি গবই বলেছিলেন।

দিল্লি এখন বিশ্বের ১০০টি দূষিত পরিবেশযুক্ত শহরের তালিকায় সবার উপরে। বর্তমান প্রধান বিচারপতি জাস্টিস সূর্যকান্ত সেদিন দিল্লিতে প্রাতোভ্রমণে গিয়ে দূষিত আবহাওয়ায় অসুস্থ হয়েছেন।


আমরা কি আর একবার ওই রায় পুনর্বিবেচনার আশা করতে পারি?


 *ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ২ ডিসেম্বর, ২০২৫
0

প্রচ্ছদ নিবন্ধ - সেবিকা ধর

Posted in







অদ্বৈত মল্ল বর্মন নামটি শুনলেই আমাদের সামনে ভেসে ওঠে মালো পাড়া একেবারে তথাকথিত প্রান্তিক জেলে পরিবারের মানুষজন,নৌকো, মাছের আঁশ গন্ধ তিতাসের কল্লোল এবং তিতাসের স্রোত। মালো পাড়ার এই যে জীবন, জাওরা পুলার জীবন সবটা নিয়ে অদ্বৈত কলকাতার যে তথাকথিত বুদ্ধিজীবী আবহ তার মধ্যে খানিকটা হয়তোবা প্রান্তিক নয়তো ব্রাত্য ছিলেন।তিনি তাঁর নিজের লেখার যোগ্যতায় লেখনীর ঐতিহ্যে এবং ধারাবাহিকতায় তৈরি করেছেন এক মহান উপন্যাস, এক মহা আখ্যান। তার নাম তিতাস একটি নদীর নাম।বাংলা ভারত তথা বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চলচিত্রকার ঋত্বিক কুমার ঘটক তাঁর এই আখ্যানটি নিয়ে একটি মহৎ চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন।আমরা সেই সব প্রসঙ্গেও যাচ্ছি না।কিন্তু অদ্বৈতের স্বল্পায়ু কলকাতার সাংস্কৃতিক জীবনে তাঁকে খুটে খাওয়া খবরের কাগজের চাকরি, তিতাস একটি নদীর নামের পাণ্ডুলিপি দেশ পত্রিকার অফিস থেকে হারিয়ে যাওয়ার পর যে প্রতিকূলতা সব ধরনের যে বাঁধা তাকে অগ্রাহ্য করে তিনি এগিয়েছেন নিজের খেয়ালে।নিজের মেজাজে,নিজস্ব ভঙ্গিতে। এই নিজস্ব ভঙ্গিমা স্থির হয়েছে ভারতীয় তথা বাংলার যে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য যে লোকগান,মাঝি মাল্লাদের সঙ্গীত সেই সঙ্গে সঙ্গে মানুষের আকাঙ্খা, বিবাহ,যৌনতা মৃত্যু সবই অদ্বৈতকে তিতাসের কোলে বারবার নিয়ে এসেছে। এই তিতাস তরঙ্গ তার জীবনে এক আশ্চর্য অভিঘাত হয়ে দাঁড়ায়।




বাংলাভাষা বা শুধুমাত্র বাংলা ভাষায় কেন পৃথিবীর অন্যান্য ভাষায় যে নদীকেন্দ্রিক উপন্যাস লেখা হয়েছে তার মধ্যে অদ্বৈত মল্লবর্মণের 'তিতাস একটি নদীর নাম' অবশ্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আখ্যান।অদ্বৈত মল্লবর্মনের পূর্বপুরুষ মৎস শিকারী বা মৎসজীবী ছিলেন।সেই জীবনের অভিজ্ঞতা তিনি প্রতি পদে,প্রতি পাতায় বিবৃত করেছেন এই আখ্যানে। কিন্তু শুধুমাত্র তো অভিজ্ঞতা থাকলেই হয় না,তার সঙ্গে মিশে স্বপ্ন কল্পনা। লেখকের অন্যান্য অনুভব তাই।ফলে 'তিতাস একটি নদীর নাম' আখ্যান হিসাবে ভারতীয় বাংলা তথা পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ নদীকেন্দ্রিক আখ্যান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।আমরা জানি বাংলা ভাষায় রবীন্দ্রনাথের কাছে 'পদ্মা', বিভূতিভূষণের 'ইছামতী', তারাশঙ্করের 'ময়ূরাক্ষী', 'অজয়', মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'পদ্মা নদীর মাঝি', নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছে 'মহানন্দা', সমরেশ বসুর 'গঙ্গা' দেবেশ রায়ের 'তিস্তা' ঐশ্বর্যময় রূপে আত্মপ্রকাশ করেছে। কিন্তু তিতাসের চরিত্রে ঔপন্যাসিক যে ধারাবাহিকতা দেখিয়েছেন সেটা সম্পূর্ণ অর্থে এদের থেকে আলাদা,স্বতন্ত্র। এছাড়াও আরও অনেকে চেষ্টা করেছেন নদীকে নিয়ে বাংলা ভাষায় উপন্যাস লিখতে।যেমন প্রবোধ বন্ধু অধিকারী লিখেছেন 'আবার কর্ণফুলী আবার সমুদ্র' অমরেন্দ্র ঘোষ 'চর কাশেম' লিখেছেন নদী নিয়ে উপন্যাস।এছাড়া আরও অনেকে রয়েছেন। কিন্তু তিতাস সর্ব অর্থে একটি আলাদা পরিকল্পক হিসাবে আমাদের সামনে আসে। আমরা জানি তিতাসের যে মূল পাণ্ডুলিপি তা হারিয়ে গিয়েছিল প্রথম বার এবং দ্বিতীয়বার তিনি অদ্বৈত তাঁর স্মৃতি থেকে সেই লেখাটি লিখেন এবং তা প্রকাশিত হয়।


তিতাস একটি নদীর নাম'-একটি মহৎ আখ্যান।এই লেখাটির আখ্যান কল্পনাকার অদ্বৈত মল্ল বর্মন। সাধারণভাবে কোনো চরিত্রকে ধরে এই আখ্যান এগোয় নি।চরিত্ররা এসছে, পাশে থেকেছে, হেঁটেছে কিন্তু আসল চরিত্র হচ্ছে তিতাস।যে তিতাস জলে, বৃষ্টিতে, রোদে ষড়ঋতুর কাঁপন এবং প্রবহমানতায় গ্রীষ্ম, বর্ষা,শরৎ, হেমন্ত, শীত, বসন্তে নতুন নতুন রূপ পরিগ্রহ করে এবং আমরা দেখতে পাই যেতে সেই রূপের আন্ধার মধ্যে, আমরা 'রূপের আন্ধার' কথাটি খুব স্পষ্ট করেই বললাম কারণ নারীর রূপেও কখনো কখনো আন্ধার থাকে যখন নারী নিজেকে অন্য কোনো ভাবে মেলে ধরতে চায় পুরুষের কাছে।আন্ধার থেকেই আসে আলো।তিতাসের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা একই রকম। অর্থাৎ তিতাসের যে আন্ধারিমা, তার যে অন্ধকার, জীবনের নানা টানাপোড়েন এবং কষ্ট, সেখানকার মানুষদের এই যে ভয়ানক দুর্দশা এবং বাঁচার জন্য যে ইতস্তত সংগ্রাম এই সবটা নিয়ে তিতাস আমাদের বুকের গভীরে হৃদয় রেখার সংলগ্ন হয়ে গভীরে এগোয়।


অদ্বৈত সম্পূর্ণ দেশজ সংস্কৃতির উপর নির্ভর করে এই উপন্যাস নির্মাণ করেছেন।আমাদের সাংস্কৃতিক জীবনের আঙ্গিক এবং পরা আঙ্গিকের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।এখানে পরা আঙ্গিক বিষয়টি আমাদের একটু বলে দেওয়া দরকার তার কারণ আঙ্গিক তো সবাই তৈরি করে।কিন্তু আঙ্গিক ভাঙার কথা, আঙ্গিকের মধ্য থেকে নতুন আঙ্গিককে বের করে আনা যেমন নদীর স্রোতের ভেতর থেকে আরেকটি স্রোত আবিষ্কার করেন একজন মহৎ শিল্পী। ঠিক তেমনি অদ্বৈত মল্ল বর্মন তিতাস নদীর সঙ্গে, তিতাসের নৌকোর পালের সঙ্গে এগিয়ে গেছেন জীবন এবং জিজ্ঞাসার উত্তর দিতে দিতে। তিনি নাইয়রের গান, বিয়ের গান,ছড়া,ধাঁধা, প্রবাদ- প্রবচন, নৌকা, কাঁথা, হুকো,জাল,আলপনা, লোকবাদ্য, লোকদেবতা, লোকক্রীড়া, লোকঔষধ, লোকগণিত,বারোমাসি গান,আম্রতত্ত্ব ইত্যাদি এইসমস্ত কিছুর কথা তিনি বলে গেছেন। আমরা জানি যে আমাদের লোকজীবনের সঙ্গে মৎসচাষ,মৎস শিকার মৎসের পেছনে ঘুরে বেড়ান একটা বড় ব্যাপার ছিল একসময়।আজকে আধুনিক পৃথিবীতে ট্রলার ইত্যাদি আবিষ্কার হওয়ার পর সেই মহিমা হয়ত খানিকটা পরিবর্তিত হয়েছে,যখন পৃথিবীতে পাল তোলা নৌকো এবং দাঁড় ও আবহাওয়া নির্ভর মাঝিরা তারা এগিয়েছেন সেই সূত্রধরে।


আমরা দেখেছি যে এক অন্যতর ভুবনের কথা অদ্বৈত যেমন বলছেন। ফলে প্রতিটি পদে এই যে বাংলার ছড়ানো প্রতিটি লোকজীবন ও সংস্কৃতি, লোকব্যবহার, লোকাচার, লোককথা,লোক যে সম্ভাষণ পরম্পরা সবটাই এসেছে শুধুমাত্র তাঁর নাগরিক ভাবনাচিন্তা থেকেই। তিতাসের যে অনুষঙ্গগুলি প্রতিটি পদক্ষেপে, প্রতিটি পাতায় অদ্বৈত দেখিয়েছেন, অদ্বৈত নাগরিক মনন থেকে শুধুমাত্র অনুসরণ বা অনুশীলন করেন নি
তিনি একজন প্রকৃত প্রস্তাবে একজন ছাত্রের মতো পাঠ নিচ্ছেন লোকজীবনের আবার একইসঙ্গে ব্যাখ্যা, এবং তাঁর যে মেধা, তাঁর যে ধী শক্তি সেদিকেও তিনি প্রয়োগ করেছেন নিজস্ব মুন্সিয়ানায়। এই মুন্সিয়ানাকে আমাদের শ্রদ্ধা না জানিয়ে কোনও উপায় থাকে না।আখ্যানের গভীরে ঢুকতে ঢুকতে তিনি মালো পাড়া,মালো জীবন জাওলা জীবন ইত্যাদি প্রভৃতি যে চলন সেগুলোর যে ধারাবাহিক ছন্দ এবং পতন তাঁকে আবিষ্কার করেছেন। আমরা জানি 'ওল্ড ম্যান এন্ড দ্য সী' আর্ণেষ্ট হেমিংওয়ের বিখ্যাত একটি আখ্যান। সেই আখ্যান নিয়ে অনেক ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ ইত্যাদি করা হয়েছে।'ওল্ড ম্যান এণ্ড দ্য সী' আয়তনে অত্যন্ত কৃষ মানে বেশি পাতার উপন্যাস সেটি নয়। কিন্তু তার আলোচনা এবং ব্যাখ্যা হয়েছে নানাভাবে। জীবন, মৃত্যু,মৃত্যুবোধ সবটাই উঠে এসেছে সেই ব্যাখ্যাকারদের কলমে বা টাইপ রাইটারে।রুশ সাহিত্যিক মিখাইল শলোকভের 'অ্যাণ্ড কুয়াইট ফ্লোওস দ্য ডন' উপন্যাসে ডন নদী এক সুবিশাল জাতিগোষ্ঠীর প্রাণ প্রবাহ সঞ্চারিত করে ছিল।আমরা যদি অদ্বৈত মল্ল বর্মণের সৃষ্টির দিকে তাকাই তাহলে দেখব যে ভারতীয় বা বাংলা উপন্যাসের যে চলন সেই চলনকে অদ্বৈত অস্বীকার করে নিজের মত করে এগিয়েছেন।অর্থাৎ অস্বীকার করা মানে ইংরেজদের একটি চাপিয়ে দেওয়া মডেল, সেই মডেলকে অস্বীকার করে,সেই মডেলকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্রভাবে বিচার করে তিনি এগিয়েছেন তার নিজস্ব মুন্সিয়ানায়। ফলে তিতাস হয়ে উঠেছে চরিত্র তিতাস হয়ে উঠেছে মানুষের ক্রন্দন,বারোমেসে জীবন জেলে যারা মৎসজীবী,তাদের কষ্টের কথা তাঁদের আবহমানের দুঃখ, নির্যাতন বেঁচে থাকা, বিবাহ, আনন্দ, মৃত্যু,আহ্লাদ, যৌনতা, সার্বিকভাবে একটা গোটা নদীর ভূগোল যেন ঢুকে পড়েছে এই আখ্যান পর্বে।


নদীর যে চলন এবং ইতিহাস তা পৃথিবীর সব দেশে আপাতভাবে এক মনে হলেও মোটেই এক নয়।নদী এশিয়াতে বা ভারত উপমহাদেশে যে ব্যাপ্তি গ্রহণ করে যে রূপ পরিগ্রহ করে ইউরোপের নদী একেবারেই সেরকম নয়।ফলে মিশর চীন ভারত এবং ইরাক ইরানের যে নদী মাত্রিক জীবন তার সঙ্গে ইউরোপের নদী মাত্রিক জীবনের ফারাক রয়ে গেছে, আছে, থাকবেও। অদ্বৈত মল্ল বর্মণ কোনও তত্ত্ব লিখতে বসেন নি। তিনি তাঁর মতো করে নদীকেন্দ্রিকতার এক আশ্চর্য চেহারা অন্য রূপ তুলে এনেছেন আমাদের সামনে।লেখক যেভাবে একজন প্রকৃত প্রস্তাবের ভাস্কর, তিনি যেভাবে পাথর কেটে কেটে একটি বড় মূর্তি বা স্থাপত্য তৈরি করেন সেভাবেই অদ্বৈত মল্ল বর্মণের লেখার গভীর থেকে সত্যটিকে খুঁজে বের করেছেন। লেখার এই আত্মা বা সত্য প্রকাশ করে অতীব কঠিন কর্ম।
আমরা আগেই বলেছি অদ্বৈত মল্লবর্মণের তিতাস একটি নদীর নাম বাংলা তথা ভারতীয় ভাষার একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ নদীকেন্দ্রিক আখ্যান।অদ্বৈত জলকে যেমন নিয়ে এসেছেন মানুষের জীবন ধারার অন্যতম স্রোত হিসেবে।তিতাসের স্রোত তিতাসের নদী বহতা,বহমান তিতাস, জলে ভেসে থাকা নৌকো,জেলেদের নিদারুণ জীবন যন্ত্রণা সবটাই অদ্বৈত মল্লবর্মণ চমৎকারভাবে ফুটিয়েছেন আমাদের সামনে। এখন কথা হল যে অদ্বৈত মল্লবর্মণের তিতাস একটি নদীর নামের মধ্যে যে লোকায়ত এবং লোকায়তিক জীবন এবং পারিপার্শ্বিকতার কথা বলা হয়েছে অত্যন্ত সুনিপূনভাবে সেই সমস্ত বিষয়গুলি আমাদের সামনে তোলে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে নিজস্ব আঙ্গিক এবং নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গী থেকে।






গান মানুষের জীবনের এক অনন্ত সম্পদ।দুঃখের সুখে আনন্দে বিষাদে হর্ষে সবেতেই গান বা সংগীত মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত হয়। গান এবং লোকগান এই দুয়ের পার্থক্য যেমন ছিল তেমনই থাকবে।আমরা জানি যে সমুদ্রের কল্লোর নদীর বহতা ধারা, পর্বতের দৃঢ় ভাবে দাঁড়িয়ে থাকা, অরণ্যের পত্রমর্মর,পাখির গান সব কিছুই মানুষের জীবনে সংগীতের মূর্ছনা হিসেবে হাজির হয়েছে।মানুষ যখন প্রকৃতির সঙ্গে সংলগ্ন ছিল তখন সে সমুদ্রের উচ্ছ্বাস থেকে বাণ-বণ্যার ভয়াবহতা থেকে, নদীর কল্লোল এবং কলতান থেকে,পাখির কূজন থেকে কোনও হিংস্র জন্তুর হিশহিশানি থেকে বা গর্জন থেকে আবিষ্কার করেছে সংগীতের নতুন নতুন আঙ্গিক। এইভাবেই উঠে এসেছে লোকগান, লোকসংগীত বা লোকগীতি।যুগ- যুগান্তরে সেটি আস্তে আস্তে অন্যরকম হয়েছে। ধীরে ধীরে তার সংস্কার হয়েছে কিন্তু লোকগান বা লোকগীতি অনেকটাই প্রকৃতির সংলগ্ন হয়ে আছে।যেমন মাঝিদের গান তার সঙ্গে মিশে আছে ভাটিয়ালি, জারি-সারি ইত্যাদি, তারপর আছে ফসল রোপনের গান,ফসল কাটার গান, আছে বিবাহের গান,নবজাতক বা নবজাতিকা হলে তার গান, বিবাহোত্তর জীবনের যে পরিণতি সবই কিন্তু গান হয়ে আমাদের জীবনে এসেছে।এই গান এক অনাস্বাদিত অধ্যায়ের কথা,আমাদের লৌকিক জীবনের আঙ্গিক হিসাবে এসে উপস্থিত হয় আমাদের সামনে।আমরা নগর সভ্যতা বা নাগরিক চাতুরালি দিয়ে এই গানকে বুঝতে চেষ্টা করি কিন্তু বুঝতে পারি না।আসলে লোকমানসের গান হচ্ছে মানুষের বুকের ভাষা এবং মুখের ভাষা।সে বুকের ভাষা এবং মুখের ভাষা যখন সুর হয়ে এক হয়ে যায় তখন তা পরিণত হয় লোকগানে।ভাওয়াইয়া, চটকা,আলকাপ,গম্ভীরা মুর্শিদি, বাউল সবই নানাধরণের লোকগান। ফলে এই যে লোকগানের বিশাল ভুবন অদ্বৈত মল্ল বর্মণ তাঁর মহাকাব্য প্রতীম আখ্যান তিতাস একটি নদীর নাম- এ যে গানের কথা যেমন নাইয়রের গানের কথা,বিবাহের গানের কথা অন্য অন্য লোকগানের কথা অনুষঙ্গ হিসেবে সুন্দর করে তুলে এনেছেন আমাদের সামনে।


ধরা যাক লোকসঙ্গীতের ব্যবহার। অদ্বৈতের উপন্যাস মাটির রূপ-রস গ্রহণ করে জীবনকে সুর ও ছন্দে এক আশ্চর্য কথকথায় বেঁধে রাখে।তবুও এই জীবন সংগ্রাম সংস্কৃতি চর্চায় বিমুখ হয় নি। তিতাস পাড়ের অপামর মানুষের জীবন স্রোতের সুর সাঙ্গীতিকময় হয়ে উঠেছে বিচিত্র সঙ্গীত ধারায়।সেই সঙ্গীতের সুর তিতাসের বুকে মাঝি-মাল্লা,মা বোনদের কন্ঠে ভেসে বেড়ায়।এই সঙ্গীত হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ, ভালোবাসা-বেদনার গান।তারা গায় দেহতত্ত্ব,বিচ্ছেদ,হরিবংশ,ভোরগান, গোষ্ঠগান,বিবাহের গান,বারমাসি গান,মিলনের গান।প্রথাগত সঙ্গীত শিক্ষার জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন লোকবৃত্তের মানুষেরা গায় সারি গান,গদ্যভাবের গান,গায় হোলির গান।লেখক দেখিয়েছেন কিশোর- সুবল প্রবীন তিলকচাঁদকে সঙ্গে নিয়ে প্রবাসে পাড়ি জমিয়েছে, নতুন জায়গায় মাছ ধরার জন্য।নৌকায় ভেসে ভেসে কিশোর গাইছে-
"উত্তরের জমিনরে,সোনাবন্ধু হাল চষে,
লাঙ্গলে বাজিয়া উঠে খুয়া।
দক্ষিণা মলয়ার বায়,
চান্দমুখ শুকাইয়া যায়
কার ঠাঁই পাঠাইব পান গুয়া।।"
গ্রামের একটি কীর্তনের আসরে তিলক গায়,
"উঠান মাটি ঠন ঠন, পিড়া নিল সোতে, গঙ্গা মইল জল-তিরাসে,ব্রহ্মা মইল শীতে।।"
তিতাস পাড়ের লোকেদের প্রিয় বারোমাসি গান। তিতাস পাড়েএ বারোমাসির দুটি লাইন এরকম-
"জল ভর শান্তি কন্যা,জল ভর তুমি
যে ঘটে ভরিবা জল গো চৌকিদার আমি।।"




লোকক্রীড়া লোক খেলা বলতে আমরা বুঝি হাডু- ডুডু, দাঁড়িয়াবান্ধা, ছু কিৎ কিৎ,কাবাডি, ইত্যাদি প্রভৃতি। এইগুলো কোনও রকম উপাদান ছাড়াই খেলা হয় আমরা আমাদের লেখার শুরুতে যে অনুশীলনের কথা লোকক্রীড়ায় বলেছি তার কথা অদ্বৈত মল্ল বর্মণ তাঁর এই মহাআখ্যানের মধ্যে নিয়ে এসেছেন এবং তুলে ধরেছেন অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে। কেননা মানুষ খেলা করে ক্রীড়া পদ্ধতির মধ্য দিয়ে যায়,তার আদিম যে জীবনের তরঙ্গ তাকে স্মরণ করার জন্যে।মানুষ আগে মৃগিয়ায় নামত। আত্মরক্ষার জন্য তারা পশু শিকার করতেন কিন্তু পরবর্তী সময় যখন তথাকথিত সভ্যতার রথ আরও অনেকটাই অগ্রসর হল তখন শিকারের ব্যাপারটা হয়ে দাঁড়াল অনেকটা মাংস খাওয়ার থেকে বা আত্মরক্ষার থেকে যত না তার চেয়েও অনেকবেশি মানুষের ভেতরকার যে আদিম রিপু ক্রোধ এবং হিংসা তাকে পরিপুষ্ট করার জন্য।ফলে শিকার রয়ে গেল।পরবর্তী সময় মানুষের এই অমানবিক কাজের ফলে পশুকূলের বা জন্তু জানোয়ারের মধ্যে অনেক প্রজাতি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল বা প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল মানুষের এই ভয়ানক আচরণে। পরবর্তী সময়ে আমরা দেখলাম আইন করে শিকার নিষিদ্ধ করা হল এবং সংরক্ষিত জঙ্গল তৈরি করা হল এবং সেখানে অভয়ারণ্য হিসেবে বলা হয় যাকে সেখানে পশুকূলকে যাতে তারা ঠিকঠাক করে তারা নিজেদের বংশ বৃদ্ধি করতে পারে তার ব্যবস্থা করে দেওয়া হল।যদি আমরা ভারতের ইতিহাস আলোচনা করি তাহলে দেখব বৌদ্ধ যুগে মৃগদাব ছিল।তার আগের যুগে ছিল ব্যাপক শিকার এবং হিংসা।ময়ূর,হরিণ, কৃষ্ণসার,বাঘ,বনুশূকর সমস্ত কিছুই মানুষ নির্বিচারে হত্যা করত নেহাতই খাওয়ার জন্য বা নিজের হিংসার যে বহিঃপ্রকাশ তাকে চরিতার্থ করার জন্য।পরবর্তী সময় মৃগদাব তৈরি করা হল বুদ্ধের সময় এবং ভারত ভূমিতে অভয়ারণ্যের যে ধারণা তা কিন্তু বুদ্ধদেব এবং তার অনুগামীদের রচিত। তাঁর অনুশাসনেও শিকার প্রায় নিষিদ্ধ হয়ে গেল আবার শিকার ফিরে এল মুঘল যুগে,পাঠান যুগে। এবং পরবর্তী সময়ে যিখন ইংরেজরা ভারত দখল করল তখন নতুন করে এই শিকারকে আমাদের জীবনের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়।এই শিকারের যে অবশেষ সেটাই হল লোকক্রীড়ার অঙ্গ।আমরা যদি কাবাডি,হাডুডু বা অন্য খেলাগুলোকে লক্ষ্য করি তাহলে দেখব সেখানে কোনও উপাদান নেই।ব্যাট বল কিছুই নেই। যা আছে তা হল মানুষের শক্তি, মানুষের শক্তির কৌশল, পায়ের জোর,হাতের জোর,দৌড় ইত্যাদি প্রভৃতি।


তিতাস একটি নদীর নামে যে মহতি আখ্যান তাতে লেখক এই লোকক্রীড়াকে যে মালো পাড়া বা মালো জীবন বা মৎসজীবীদের যে বেঁচে থাকা তার মধ্যেই মিশিয়েছেন। সুখ-দুঃখ,আনন্দ-আহ্লাদ,বিষাদ এবং কষ্ট তার মধ্যেও মানুষ যে আনন্দের প্রদীপকে জাগ্রত করেন তার একটা অন্যতম উদাহরণ হচ্ছে এই লোকক্রীড়া। এই লোকক্রীড়ার মধ্য দিয়ে শরীর এবং মন যেমন মজবুত শক্তিশালী ও দৃঢ় হয় তেমনই মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে যেহেতু খেলার আর অন্য কোনও উপাদান নেই,বল নেই,ব্যাট নেই তাই, স্টিক নেই,কিচ্ছু নেই সেইগুলো মানুষের একটা প্রকৃতির সঙ্গে সংলগ্নতার একটা উপাদান তৈরি করে যা যোগাযোগ তৈরি করে।এবং এর মধ্য দিয়েই লোকক্রীড়া আমাদের দেখিয়েছেন অদ্বৈত মল্ল বর্মণ।






ছড়া ও ছিকুলি আসলে আমাদের সভ্যতার গণগাঁথা।এই যে চার লাইন ছয় লাইন বা আট লাইনের যে কথাবার্তা যা অনেকটাঅ ছন্দবদ্ধ হয়ে আসে আমাদের সামনে।তার মধ্যে লুকিয়ে থাকে মনুষ্য জীবনের নানা রহস্য। অদ্বৈত মল্ল বর্মণ খুব স্বাভাবিকতায় তিতাস পাড়ের যে ছড়া এবং ছিকুলি ধাঁধা এবং পরণ কথা তাকে তুলে এনেছেন উপন্যাসের মধ্যে। ছড়া,ধাঁধা, ছড়া, ছিকুলি,পরণ কথা ইত্যাদি সবই হয়ে উঠেছে আমাদের যাপিত জীবনের বাইরে থেকে দেখা এক অনন্য সৌন্দর্য। যা আমরা বারবার পাঠ করলে আমাদের গভীরে নিয়ে আসতে পারি।








এবার আসা যাক ছড়া, ধাঁধা ও প্রবাদ-প্রবচনে।ছড়া হল মানুষের আদিমতম প্রয়াস।তাই সময়ের সঙ্গে সঙ্গতি রক্ষা করেই ছড়া মানুষের ধর্মবিশ্বাসের সঙ্গে আদিম মন্ত্র হিসাবে রূপান্তরিত হতে থাকে।তিতাস একটি নদীর নাম উপন্যাসে ব্রতের অঙ্গ হিসাবে ছড়া ব্যবহৃত হয়েছে।যেমন-
"লও লও সুরজ ঠাকুর লও ঝুটার জল
মাপিয়া জুখিয়া দিব সপ্ত আঁজল।"
গ্রামের মানুষ অনন্তবালাকে নিয়ে ছড়া কাটে-
"অনন্তবালা, সোনার বালা
যখনই পরি তখনি ভালা।"
অনন্তবালা যখন বড়ো হয়ে গেল,তখন তাকে নিয়ে ছোট মেয়েরা বিভিন্ন ছড়া কাটত,যা তার জন্য কগুব একটা স্বস্তির কারণ ছিল না।তারা বলত-
"অনন্তবালা ঘরের পালা।তারে নিয়া বিষম জ্বালা"।


লোকসাহিত্যে ধাঁধা একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ।যার মধ্যে রয়েছে একটি সাহিত্যিক গুণ। তিতাস মল্লবর্মণের তিতাস একটি নদীর নাম উপন্যাসে রয়েছে লোকসংস্কৃতির এক বিশাল জগৎ। যা তিতাস পারের মানুষেরা যুগ যুগ ধরে লালন পালন করে বাঁচিয়ে রাখে নিজেদের সংস্কৃতিকে। সবই তাদের জীবনের অঙ্গ।যেমন উদয়তারা একটি ছড়া বলে -
"সুফল ছিট্যা রইছে, তুলবার লোক নাই,
সু-শয্যা পইরা রইছে,শুইবার লোক নাই,
ক দেখি অনন্ত এ-কথার মানতি কি?"
আকাশের বুকে অগুনতি তারার সঙ্গে মাটির পৃথিবীর ফুলের,মানুষের তৈরি শয্যার সঙ্গে এই বিশাল নদী বক্ষকে তুলনা করেছেন শিলক রচয়িতা।অনন্তের উত্তর দেওয়ার আগেই উদয়তারা উত্তর দিল।এর উত্তর হবে আকাশের তারা।
উদয়তারা আবার বলে
"হিজল গাছে বিজল ধরে
সন্ধ্যা হইলে ভাইঙ্গা পড়ে।"
এর উত্তর হাটকেই বুঝিয়েছে আসমান তারা। উদয়তারার পরের ধাঁধা-
'পানির তলের বিন্দাজী গাছ ঝিকিমিকি করে,
ইলসা মাছে ঠোকর দিলে ঝরঝরাইয়া পড়ে।'
এর উত্তর হবে কুয়াশা।
এরপর আসা যাক প্রবাদ-প্রবচনে।আমরা তিতাস পাড়ের কয়েকটি প্রবাদ প্রবচনের কথা উল্লেখ করছি।সুবলের বউ প্রবাদ বলে- 'জিভে কামড় শিরে হাত,কেমনে আইল জগন্নাথ।'
'দশ জনের কথা যেখানে,মরণ ভাল সেখানে।'
'জন্ম- মৃত্যু- বিয়ে,তিন বিধাতা নিয়ে।'
'নতুন বউ নথলী,শেওরা গেছের পেত্নী'।
'মানুষের কুটুম দিলে থুইলে,গরুর কুটুম চাটলে চুটলে'।
'পরের পাগল হাততালি, আপন পাগল বাইন্ধা রাখি।'
'তীর্থের মধ্যে কাশী,ইষ্টির মধ্যে মাসি,
ধানের মধ্যে খামা,কুটুমের মধ্যে মামা।'
'গাঙে গাঙে দেখা হয় তবু ভইনে ভইনে দেখা হয় না'।
অপমানের বাঁচন থাইক্যা সম্মানের মরণও ভালা।




বাংলা লোকসংস্কৃতিতে আজও কাঁথার শৈল্পিক ও নান্দনিক মূল্য রয়েছে। এই কাঁথা নির্মিত হয় একক বা যৌথ প্রচেষ্টায়।আর সেটা যদি নকশি কাঁথা হয় তাহলে তা লোককলার অন্যতম নিদর্শন। অদ্বৈত মল্লবর্মণ সুনিপুণভাবে 'নকশি কাঁথা'র উল্লেখ করেছেন।করমালীর স্ত্রী লোকের বাড়ির কাঁথা সেলাই করিয়া দেয় কাঁথা সেলাইয়ের ধূম পড়িয়াছে। ডান হাতের সূঁঁচের ফোঁড় বাঁ হাতের আঙ্গুলের ডগায় তুলিতে তুলিতে আঙ্গুলে হাজার কাটাকুটি দাগ পড়িয়াছে।কিন্তু নিজেদের ভাগ্যে ভালো কাঁথা জোটে না করমালী জানায়- "ছিঁড়া খাঁতায় গাও এলাইয়া" দেয় সে। নকশি কাঁথার শৈল্পিক সৌন্দর্যের কথা গবেষক ও লেখক জ্ঞাত বলেই এই কাঁথার কথা আমরা পাই।




গ্রামীন তথা ভারতীয় জীবনে এবং বঙ্গভূমি তো বটেই ঠ্যালো হুঁকো একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নেশা মাধ্যম হিসাবে প্রচলিত।তার ব্যবহার সময়ের ধুপে খানিকটা ফিকে হয়ে গেলেও তার প্রচলন আমরা দেখি গ্রাম বাংলার ঘরে।নারকেলের খোল দিয়ে ঘষে মেজে মসৃণ করে তৈরি হয় ঠ্যালো হুঁকো। হুঁকোর ওপর যে কলকে থাকে তাতে তামাক এবং জ্বলন্ত টিকে বসিয়ে তা থেকে ধুম্রপানের উপকরণ তৈরি করেন গ্রাম বাংলার মানুষ। শুধু গ্রাম বাংলা কেন,একসময় কলকাতাতেও ঠ্যালো হুঁকোর প্রচলন ছিল যথেষ্ট। বিবেকানন্দের জীবনে একটি কাহিনিতে আমরা দেখি তাঁর পিতার বৈঠকখানায় নানা ধরনের যাঁরা নানা ধর্মের এবং নানা বর্ণের মানুষ আছে,তাদের জন্য আলাদা আলাদা হুঁকো।তো বিবেকানন্দ সেখান থেকে একটি অন্য ধর্মের ব্যবহার করা হুঁকো টেনে দেখেছিলেন তাতে তাঁর জাত যায় কি না।অর্থাৎ বাড়ির লোকেরা যখন তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন- 'তুমি হুঁকো টানছ কেন?' না আমি টান দিয়ে দেখলুম আমার জাত যায় কি না'। এটা একটা খুবই প্রচলিত গল্প বিবেকানন্দের জীবনে।কিন্তু শহর কলকাতায় বা নাগরিক অভ্যাসে হুক্কাবার থাকলেও ঠ্যালা হুঁকো কিন্তু ক্রমশ আস্তে আস্তে পিছিয়ে গেছে।তিতাস একটি নদীর নামে এই ঠ্যালো হুঁকোর ব্যবহার যথেষ্ট পরিমাণে আমরা দেখি। কারণ মাছোয়ারা,মাল্লারা তাদের নৌকো,তাদের জলের অভিযান,নদীর ভেতর যে মাছ ধরা তার সঙ্গে নিজের জীবনকে উদ্দীপনাময় করার জন্য এই ঠ্যালো হুঁকোর ব্যবহার করেছেন এবং সেটিকে অত্যন্ত সুচারুভাবে তুলে নিয়ে এসেছেন।


তিতাস একটি নদীর নাম উপন্যাসে ঔপন্যাসিক হুঁকোতে ধূমপানের কথা বলেছেন। হুঁঁকো এবং টিকে নির্মাণ ও তামাকের ব্যবহার লোকপ্রযুক্তির সঙ্গে মিশে থাকে শৈল্পক ভাবনা।কিশোর- সুবল-তিলক মাছ ধরতে বেরিয়েছে।তাদের নৌকা এসে ভিরেছে নয়াকান্দা গ্রামে।একজন কৌতুহলী 'মালো' কিশোরদের সঙ্গে কথাবার্তা শুরু করল।কিশোর মুগ্ধ হইয়া শুনিতে শুনিতে হাতের হুক্কা তার দিকে বাড়াইয়া দিল।আমারও হুক্কা আইতাছে।দেও আগে তোমারটা খাই।এই সময়ে একটি ছোট দিগম্বরী হৃষ্টপুষ্ট মেয়ে আসিতেছে দেখা গেল।বাড়ি থেকে হুক্কা লইয়া আসিয়াছে।শরীরের দিলানির সঙ্গে সঙ্গে হুকাটা ডাইনে বাঁয়ে দুলিতেছে- মেয়ের হাত হইতে হুক্কা লইয়া কিশোরের দিকে বাড়াইয়া লোকটি বলিল,'আমি খাই তোমার হুক্কা,তুমি খাও আমা ঝিয়ের হুক্কা।'এখানে দুজনেরই পারস্পরিক সম্পর্কের কথা রয়েছে।


মালোদের ঘরে ঘরে রয়েছে জাল বোনার সরঞ্জাম,সুতো বানানর চরকা মজুত থাকে।তাই আমরা দেখতে পাই- ঘাটে বাঁধা নৌকা,মাটিতে ছড়ানো জাল,উঠোনের কোণে গাবের মটকি,ঘরে ঘরে চরকি,টেকো,তকলি- সুতা কাটার,জাল বোনার সাজ-সরঞ্জাম। এই নিয়েই মালোদের সংসার।অনন্তর মা সুতা কাটা শিখছে।"সাতদিনে চৌদ্দ নিড়ি সুতা হইল।সাতটা মোটা সুতার,সাতটা সরু সুতার"- জাল তৈরি করতে সুতো লাগে।লেখক এখানে বিভিন্ন রকমের জালের বিবরণও দিয়েছেন।তবসী ভেসাল,মালাইয়া ভেসাল,গরমা ভেসাল, নলা, ছান্দিজাল, ফাঁস ছান্দি,ডোরা ছান্দি,কাইচ্চাল ছান্দি,জগৎ বেড়।জেলে জীবনে জাল অপরিহার্য। জাল নির্মাণের কৃতকৌশল প্রত্যেক জেলেরই জানতে হয়।বিভিন্ন জাল বিভিন্ন ঋতুতে,বিভিন্ন মাছের জন্য ব্যবহৃত হয়। তাই প্রয়োজন অনুসারে জেলে- বাড়ির বউ- ঝিরা জাল নির্মাণের কাজে হাত দেয়।তাই জাল লোক ঐতিহ্যের অন্যতম শিল্প।


উপন্যাসে গোকর্ণহাট গ্রামের কিশোরীদের মাঘমণ্ডল ব্রত উদযাপনের কথা রয়েছে।দীননাথ মালোর মেয়ে বাসন্তী মাঘমণ্ডলের ব্রতী।তার মা,মেয়েকে আলপনা আঁকার কাজে সাহায্য করতে চায়।কিন্তু ঘোড়া,পাখি ইত্যাদি আঁকা তার কাছে সহজ কাজ নয়।তাই সে সুবল ও কিশোরের সাহায্য চাইছে।বাসন্তীর মা বলছে," উঠানজোড়া আলিপনা আকুম,অ বাবা কিশোর,বাবা সুবল,একটা ঘোড়া আর কয়টা পক্ষী আইক্যা দেও।"বাংলার মেয়েরা যেকোনও উৎসবকে কেন্দ্র করে মাটির উঠোনে বা মাটির মেঝেতে আলপনা এঁকে থাকেন।আলপনায় আঙুলের কাজই মুখ্য।হাতের মুঠোয় ধরা থাকে রঙে ভেজান নেংড়া।হাতের চাপে ভেঁজা ন্যাকড়া থেকে পিটুলি গোলা জল নিয়ে আলপনা আঁকা হয়।


লোকজীবনে লোকবাদ্যের ব্যবহার যে 'তিতাস একটি নদীর নাম' উপন্যাসে রয়েছে তা এড়িয়ে যান নি।গানের সঙ্গে তাল রাখতে গিয়ে লোকবাদ্যের প্রচলন হয়েছিল।উপন্যাসে আমরা যেসমস্ত লোকবাদ্যের উল্লেখ পাই সেগুলো হল- করতাল,গোপীযন্ত্র, ঘুঙুরা,খঞ্জনি, রসমাধুরী, সারিন্দা, কাঠের তৈরি ঢোলক, তবলা, হারমোনিয়াম, বাঁশি, বেহালা ইত্যাদি।


নদী তীরে বসবাসকারী মানুষের জীবনে লৌকিক দেব- দেবীর স্থান থাকবে সে তো স্বাভাবিক। তাই গবেষণা এই দিকটিও সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।উপন্যাসের নয়াবসত অংশে রয়েছে দেবী চণ্ডীর কথা।আবার রয়েছে বাও চণ্ডী নামে লৌকিক দেবতা যনি বাতাসের সঙ্গে আসেন।তিনি অশুভ বার্তা বহন করেন।বিশেষ করে শিশুদের।সুতরাং এর জন্য ঝাড়ফুঁক, তূকতাক,জলপড়া চিকিৎসায় বাওচণ্ডীর প্রভাব কেটে যায়। আবার অন্য এক জায়গায় বাসন্তীর মা অনন্তকে লক্ষ্য করে বলছে-" শত্তুর শত্তুর, ইটা আমার শত্তুর।অখনই মরুক।সুবচনীর পূজা করুম"।সাধারণত শুভ কাজ করার জন্য 'সুবচনীর ব্রত' পালন করা হয়।এই সুবচনী হলেন লৌকিক দেবতা।




লোকক্রীড়া লোক খেলা বলতে আমরা বুঝি হাডু- ডুডু, দাঁড়িয়াবান্ধা, ছু কিৎ কিৎ,কাবাডি, ইত্যাদি প্রভৃতি। এইগুলো কোনও রকম উপাদান ছাড়াই খেলা হয় আমরা আমাদের লেখার শুরুতে যে অনুশীলনের কথা লোকক্রীড়ায় বলেছি তার কথা অদ্বৈত মল্ল বর্মণ তাঁর এই মহাআখ্যানের মধ্যে নিয়ে এসেছেন এবং তুলে ধরেছেন অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে। কেননা মানুষ খেলা করে ক্রীড়া পদ্ধতির মধ্য দিয়ে যায়,তার আদিম যে জীবনের তরঙ্গ তাকে স্মরণ করার জন্যে।মানুষ আগে মৃগিয়ায় নামত। আত্মরক্ষার জন্য তারা পশু শিকার করতেন কিন্তু পরবর্তী সময় যখন তথাকথিত সভ্যতার রথ আরও অনেকটাই অগ্রসর হল তখন শিকারের ব্যাপারটা হয়ে দাঁড়াল অনেকটা মাংস খাওয়ার থেকে বা আত্মরক্ষার থেকে যত না তার চেয়েও অনেকবেশি মানুষের ভেতরকার যে আদিম রিপু ক্রোধ এবং হিংসা তাকে পরিপুষ্ট করার জন্য।ফলে শিকার রয়ে গেল।পরবর্তী সময় মানুষের এই অমানবিক কাজের ফলে পশুকূলের বা জন্তু জানোয়ারের মধ্যে অনেক প্রজাতি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল বা প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল মানুষের এই ভয়ানক আচরণে। পরবর্তী সময়ে আমরা দেখলাম আইন করে শিকার নিষিদ্ধ করা হল এবং সংরক্ষিত জঙ্গল তৈরি করা হল এবং সেখানে অভয়ারণ্য হিসেবে বলা হয় যাকে সেখানে পশুকূলকে যাতে তারা ঠিকঠাক করে তারা নিজেদের বংশ বৃদ্ধি করতে পারে তার ব্যবস্থা করে দেওয়া হল।যদি আমরা ভারতের ইতিহাস আলোচনা করি তাহলে দেখব বৌদ্ধ যুগে মৃগদাব ছিল।তার আগের যুগে ছিল ব্যাপক শিকার এবং হিংসা।ময়ূর,হরিণ, কৃষ্ণসার,বাঘ,বনুশূকর সমস্ত কিছুই মানুষ নির্বিচারে হত্যা করত নেহাতই খাওয়ার জন্য বা নিজের হিংসার যে বহিঃপ্রকাশ তাকে চরিতার্থ করার জন্য।পরবর্তী সময় মৃগদাব তৈরি করা হল বুদ্ধের সময় এবং ভারত ভূমিতে অভয়ারণ্যের যে ধারণা তা কিন্তু বুদ্ধদেব এবং তার অনুগামীদের রচিত। তাঁর অনুশাসনেও শিকার প্রায় নিষিদ্ধ হয়ে গেল আবার শিকার ফিরে এল মুঘল যুগে,পাঠান যুগে। এবং পরবর্তী সময়ে যিখন ইংরেজরা ভারত দখল করল তখন নতুন করে এই শিকারকে আমাদের জীবনের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়।এই শিকারের যে অবশেষ সেটাই হল লোকক্রীড়ার অঙ্গ।আমরা যদি কাবাডি,হাডুডু বা অন্য খেলাগুলোকে লক্ষ্য করি তাহলে দেখব সেখানে কোনও উপাদান নেই।ব্যাট বল কিছুই নেই। যা আছে তা হল মানুষের শক্তি, মানুষের শক্তির কৌশল, পায়ের জোর,হাতের জোর,দৌড় ইত্যাদি প্রভৃতি।


তিতাস একটি নদীর নামে যে মহতি আখ্যান তাতে লেখক এই লোকক্রীড়াকে যে মালো পাড়া বা মালো জীবন বা মৎসজীবীদের যে বেঁচে থাকা তার মধ্যেই মিশিয়েছেন। সুখ-দুঃখ,আনন্দ-আহ্লাদ,বিষাদ এবং কষ্ট তার মধ্যেও মানুষ যে আনন্দের প্রদীপকে জাগ্রত করেন তার একটা অন্যতম উদাহরণ হচ্ছে এই লোকক্রীড়া। এই লোকক্রীড়ার মধ্য দিয়ে শরীর এবং মন যেমন মজবুত শক্তিশালী ও দৃঢ় হয় তেমনই মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে যেহেতু খেলার আর অন্য কোনও উপাদান নেই,বল নেই,ব্যাট নেই তাই, স্টিক নেই,কিচ্ছু নেই সেইগুলো মানুষের একটা প্রকৃতির সঙ্গে সংলগ্নতার একটা উপাদান তৈরি করে যা যোগাযোগ তৈরি করে।এবং এর মধ্য দিয়েই লোকক্রীড়া আমাদের দেখিয়েছেন অদ্বৈত মল্ল বর্মণ।






লোকক্রিড়া হল লোকজীবনের অন্যতম অঙ্গ। 'রামধনু' অংশে লোকক্রিড়াগুলোর মধ্যে রয়েছে গোল্লাছুট,পুতুলের ঘরকান্নার খেলা।ছোটবেলা উদয়তারা নদীর পারে গাছের তলায় ছেলেদের 'গোল্লাছুট' খেলতে দেখেছে।আর উদয়তারা নিজে নয়নতারা ও উসমানতারার সঙ্গে 'পুতুলখেলা' ও 'লাইখেলা' খেলেছে।লাইখেলা হল জলকেন্দ্রিক খেলা।এই খেলায় জল ভরা নদী,পুকুর চাই। আর খেলোয়ারকে ভালো করে ডুব সাঁতার জানতে হবে।জলের মধ্যে দুই বা ততোধিক খেলোয়ার থাকে। একজন ছড়া কাটে।" লাই- ফটিক নিয়ে যাই।" এখানে মহার্ঘ বস্তুটি হল ফটিক বা স্ফটিক। ছড়া কেটেই স্ফটিকের মালিক ডুব দেয় এবার বিপক্ষ খেলোয়ারদেরও ডুব সাঁতারে স্ফটিকের অধিকারীকে স্পর্শ করতে হবে।স্পর্শ করলে স্ফটিক হস্তান্তরিত হয়।এইভাবেই খেলার প্রক্রিয়া চলতে থাকে।


লোকগণিতের ব্যবহার করেছে কাদির।সে বাজারে আলু নিয়ে এসেছে।আলুগুলো একজন পাইকারের কাছে বিক্রি করেছে সে।'কাদির বড় এক পাইকার পাইয়াছে।খুচরো বিক্রিতে ঝামেলা।অবশ্য দুই চারি পয়সা করিয়া মণেতে বেশি পাওয়া যায়। কিন্তু মণামণি হিসাবের বিক্রি তার চাইতে অনেক ভালো।" মণ শব্দটি লৌকিক শব্দ এবং হিসাবের একক।মণের বহুবচনে মণামণি শব্দটির ব্যবহার ঘটান হয়েছে।


নদী বা নদ আপন সুরে বয়। তার দুপাশে গড়ে উঠে জনপদ,খেলাঘর, মন্দির,মসজিদ, গীর্জা,সমাধিক্ষেত্র, শ্মশানভূমি।নদী আপন খেয়ালে বইতে থাকে। নদীর স্রোতের সঙ্গে সঙ্গেই হয়তবা তৈরি হতে থাকে লোকজীবনের নতুন নতুন তরঙ্গ।নদী তরঙ্গের সঙ্গে তা মিশে যায় এক হয়ে।নদী তরঙ্গের যে প্রভাব তার সবটুকু এসে পড়ে লোকতরঙ্গের ওপর।এবং তার গান,তার নাচ,তার খেলা, তার পুতুল খেলা,তার পূজাআর্চা,তার নায়রী বিদায় বা নায়রী সম্ভাষণ, তার আকাশ বাতাস চর্চা সবটাই হয়ে উঠে নদী কেন্দ্রিক। অদ্বৈত মল্ল বর্মণ পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ আখ্যানকার,বাংলা সাহিত্যে তো বটেই।তিনি তিতাস একটি নদীর নাম উপন্যাসের মধ্যে এই লোকচর্চার যে নানা দিগন্ত তোরণ,তার দরজা জানলা খুলে দিয়েছেন, সেটাকেই অদ্বৈত মল্ল বর্মন নিজের মতো করে গবেষণা যুক্ত নিরীক্ষা ও নিরিখ দিয়ে তুলে এনেছেন আমাদের সামনে।আমরা নতুন করে দীপ্ত হয়েছি।আমরা নতুন করে আবিষ্কার করেছি অদ্বৈত মল্ল বর্মণ- এর এই ভুবন ও ভুবন কেন্দ্রিক যাত্রাপথ।





0

প্রচ্ছদ নিবন্ধ - রঞ্জন রায়

Posted in





















১.০ প্রস্তাবনা

গত এক শতাব্দী ধরে প্রাচীন ভারতের প্রাক-ইতিহাস (pre-history) চর্চায় দুটো পরস্পর বিরোধী থিওরি একে অন্যকে টক্কর দিচ্ছে। একটা হোল আর্যদের মধ্য এশিয়া থেকে হিন্দুকুশ পেরিয়ে ভারতে আগমনের তত্ত্ব। আরেকটি হল আর্যরা ভারতে বহিরাগত নয়, এখানেই উদ্ভূত ভারতের আদি জনগোষ্ঠী। এই বিতর্কে রাজনৈতিক রঙ লাগায় শুরু হয়ে গেছে ঠান্ডা মাথায় পরস্পরবিরোধী সাক্ষ্যের যুক্তিযুক্ত বিবেচনার বদলে চেরি পিকিং করে আংশিক তথ্য নিয়ে গলাবাজি। ইদানীং কালে হরপ্পা সভ্যতার বেশ কিছু নিদর্শন পুরাতাত্ত্বিক খননের ফলে আবিষ্কার হয়েছে। যেমন গুজরাতের ধোলাবিরা ও লোথাল এবং হরিয়ানার রাখীগড়ী।

যা পাওয়া গেছে তার থেকে কী সিদ্ধান্তে আসা যুক্তিসংগত হবে সে কথায় পরে আসছি।

বলে রাখা ভাল, বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে এ নিয়ে কোন বিতর্ক ছিল না। সবাই মেনে নিয়েছিলেন যে ভারতের সবচেয়ে প্রাচীন সভ্যতা হল হরপ্পা সভ্যতা (মহেঞ্জোদারো এবং হরপ্পা)। এদের বিশিষ্ট পরিচিতি ছিল নগরায়ণ। অন্যদিকে বহিরাগত আর্যরা ছিলেন যাযাবর শিকারী জনগোষ্ঠী। তাঁদের ছিল অশ্ব এবং ব্রোঞ্জের হাতিয়ার, লোহার অস্ত্র পরের দিকে এসেছে। যজ্ঞ ছিল দৈনন্দিন জীবনযাত্রার গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। যুদ্ধ এবং প্রাকৃতিক শক্তির আরাধনা তাঁদের সাংস্কৃতিক পরিচয়।

সৃষ্টির উৎস খোঁজা, আধ্যাত্মিক বিমূর্ত চিন্তা অনেক পরে বিকসিত হয়।

এই হাইপোথেসিসের উৎস হল বৈদিক সাহিত্য , বিশেষ করে ঋগবেদের বিভিন্ন বর্ণনা।

এছাড়া দক্ষিণ ভারতের দ্রাবিড় জনগোষ্ঠীও বৈদিক আর্যদের আগমনের আগে থেকে ভারতে রয়েছে। রামায়ণের কাহিনীকে অনেক ইতিহাসবিদ উত্তর ভারতের আর্যদের দাক্ষিণাত্য এলাকা বিস্তারের গাথা মনে করেন।

সেই সময় হিন্দুত্ব ধারণার প্রবক্তা সাভারকরও বহিরাগত আর্যদের থিওরির সমর্থক ছিলেন। তাঁর “হিন্দুত্ব” বইয়ে তিনি এটাকে বৈদিক আর্যের উপনিবেশ নির্মাণের প্রমাণ হিসেবে দেখে গর্বিত হয়েছিলেন। বইয়ের উপসংহারে আশা প্রকাশ করেছেন যে আজকের হিন্দু একদিন ফের সমগ্র বিশ্বে উপনিবেশ স্থাপনের অভিযান শুরু করবে।

“হিন্দুস্থানের এবং হিন্দু সংস্কৃতির প্রতি ভালবাসা নিয়ে তারা ছড়িয়ে পড়ুক উত্তর মেরু থেকে দক্ষিণ মেরু, গড়ে তুলুক হিন্দু উপনিবেশ; সমগ্র বিশ্বই তাদের ভৌগলিক সীমা”।

কিন্তু গত শতাব্দীর শেষ পাদে বাবরি মসজিদ ধ্বংস ও খোলাখুলি ভারতকে ধর্মনিরপেক্ষ দেশের বদলে হিন্দুরাষ্ট্র বানানোর আহ্বানের সঙ্গে প্রচার শুরু হয়েছে যে হিন্দুধর্ম হচ্ছে ‘সনাতন’—যার কালসীমা নির্ধারণ করা কঠিন। এবং হিন্দু ছিল বিশ্বগুরু এবং ঈশ্বরের নির্বাচিত ধার্মিক জনগোষ্ঠী। কাজেই ভারতের প্রাচীন সভ্যতা মানেই হিন্দু সভ্যতা যা ভারতে আবহমান কাল থেকে অস্তিত্ববান। অতএব, ‘বহিরাগত’ আর্যদের ভারতে আসার তত্ত্ব খারিজ।

কিন্তু এই হাইপোথেসিসকে শক্ত ভিতের উপর দাঁড় করাতে হলে আগে দেখাতে হবে যে হরপ্পা সভ্যতার নগরায়ণের আগে থেকে ভারতে আর্য বা ইন্দো-ইউরোপীয় সভ্যতার অস্তিত্ব ছিল এবং তা হরপ্পার চেয়ে উন্নত ছিল।

২.০ প্রাক-ইতিহাসের খোঁজঃ তিনটি পদ্ধতি

ক) পুঁথি ও পুরাণভিত্তিক

শুরু হয়েছিল প্রাচীন পুঁথি, সাহিত্য, লোককথা, পুরাণকে সাক্ষ্য এবং উৎস মেনে। কিন্তু দেখা গেল তার সীমা আছে। অনেকগুলিই লেখা হয়েছে ঘটনার অনেক পরে, একটি জনগোষ্ঠীর স্মৃতি , কল্পকথা ও বিশ্বাসকে ভিত্তি করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাতে পড়েছে অনেকের হাত, মিশেছে লিপিকারের মনের মাধুরী। ফলে কালনির্ণয় কঠিন।

খ) পুরাতত্বভিত্তিক

এবার এল পুরাতত্ব বা পাথুরে প্রমাণ। যা সময়ের দলিল হিসেবে বেশি টেঁকসই। গত শতাব্দীর দ্বিতীয় ভাগ থেকে পুরাতত্ব বিজ্ঞান তার আধুনিক খনন পদ্ধতি, তার থেকে প্রাপ্ত মৃৎপাত্র, হাতিয়ার, জনপদের বাড়িঘরের ধ্বংসাবশেষ এবং ফসিল তথা পুঁথির থেকে কালনির্ণয়ের আধুনিক পদ্ধতির (রেডিও কার্বন ১৪ টেস্ট) মাধ্যমে অনেক ভাল ফল দিচ্ছে। অর্থাৎ প্রাক-ইতিহাসের আলোচনায় পুঁথির চেয়ে পাথুরে সাক্ষ্য বেশি নির্ভরযোগ্য।

রেডিও কার্বন ১৪ টেস্ট

সমস্ত জীবিত উদ্ভিদ এবং প্রাণী বাতাবরণ থেকে কার্বন -১৪ সংগ্রহ করে, কিন্তু মৃত হলে সেটা বন্ধ হয়ে যায় এবং আগে থেকে সংগৃহীত কার্বন ১৪ ক্ষয় হতে হতে নাইট্রোজেন ১৪ হয়ে যায়। প্রতি ৫৭৩০ বছরে একটি স্যাম্পলে জমে থাকা কার্বন ১৪ এর অর্ধেক নষ্ট হয়ে যায়।

বৈজ্ঞানিকেরা স্যাম্পল থেকে কার্বন ১৪ ( নষ্ট এবং বাকি) তুলনামূলক অধ্যয়ন থেকে বের করতে পারেন যে কত বছর আগে এটি মারা গেছে।

এই পদ্ধতিতে ৫০০০০ বছর পুরনো স্যাম্পল অবধি সঠিক ফলাফল দেয়।

আজ পর্যন্ত হরপ্পা-মহেঞ্জোদারো সভ্যতার লিপির সঠিক পাঠোদ্ধার সম্ভব না হলেও এই পদ্ধতির মাধ্যমে শিলালিপি, মূর্তি ও বাস্তুকলার কালনির্ণয় সম্ভব হয়েছে।

সিন্ধু সভ্যতার নিদর্শনগুলো্র মধ্যে হরপ্পা-মহেঞ্জোদারো সমেত অধিকাংশই সিন্ধু অববাহিকার পাকিস্তান অংশে পাওয়া গেছে। কিন্তু এই শতাব্দীর গোড়ায় ভারতের কয়েকটি জায়গায় – লোথাল ও ধোলাভিরা (গুজরাত), কালিবঙ্গান (রাজস্থান) এবং সাম্প্রতিক যে খনন নিয়ে হৈচৈ হচ্ছে, রাখীগড়ি (হরিয়ানা) তা থেকে বেশ কয়েক হাজার বছর আগে এখানে বন্দর , নৌবাণিজ্য, উন্নত জল নিকাশি ও সংরক্ষণ ইত্যাদির প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে।

আর রাখীগড়ি হচ্ছে ভারত-পাক উপমহাদেশে সিন্ধু সভ্যতার সবচেয়ে বড় সাইট।

গ) ডি এন এ বিশ্লেষণ বা জেনেটিক বিজ্ঞানের সাক্ষ্য

প্রাক ইতিহাসের চর্চায় এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি—জিনতত্ত্ব বা ডি এন এ বিশ্লেষণের মাধ্যমে কালনির্ণয়। আজ কয়েক লক্ষ বছর পুরনো ফসিলেরও ডি এন এ বিশ্লেষণ সম্ভব হচ্ছে। ফলে পুরাতত্ব ও জিনতত্ত্ব হাত ধরাধরি করে অনেক অমীমাংসিত প্রশ্নের স্থায়ী সমাধান এনে দিচ্ছে।

কিন্তু এই পদ্ধতিটি বিকসিত এবং উন্নত হয়েছে মাত্র কয়েক দশক আগে। তাই বেশির ভাগ সাধারণ মানুষ এর গুরুত্ব বিষয়ে তেমন অবহিত নন।

এই লেখার সীমিত পরিসরে বোঝার চেষ্টা হয়েছে যে এই অত্যাধুনিক পদ্ধতিটি ভারতে মধ্য এশিয়া থেকে আর্যদের আগমনের তত্ত্ব নিয়ে কী সাক্ষ্য বা প্রমাণ পেশ করছে।

গোড়াতে দরকার বিতর্কটি স্পষ্ট করে বোঝা।


৩.০ কেন বাইরের থেকে কাউকে আসতেই হবে?

আমরা কেন ধরে নিচ্ছি যে ভারতের মাটিতে প্রথম পা রাখা আধুনিক মানুষটি বাইরে থেকে এসেছিল? ভারতের মূল জনগোষ্ঠী এদেশের মাটিতেই উদ্ভূত হয়েছিল—এটা মেনে নিতে বাধা কোথায়? এতদিন তো এটাই ধরে নেয়া হয়েছিল যে আধুনিক মানব বিশ্বের বিভিন্ন অংশে স্বতন্ত্র ভাবে উদ্ভুত এবং বিবর্তিত হয়েছে। তাহলে ভারতের ক্ষেত্রে কেন ব্যতিক্রম হবে? চিনের নৃতত্ববিদেরাও মনে করতেন চিনের মানব বিশ্বের অন্য নরগোষ্ঠীর থেকে আলাদা, উদ্ভূত হয়েছে চিনেরই ভৌগলিক অঞ্চলে।

তবে চার্লস ডারউইন সেই ১৮৭১ সালেই বলেছিলেন যে সমগ্র মানবজাতির একটিই উৎস--আফ্রিকায় এক বিশেষ প্রজাতির শিম্পাঞ্জি।

গত শতাব্দীর শেষ কয়েক দশক থেকে এই প্রশ্নটি শুরু হয়েছে এবং কিছুদিন আগেও মনে করা হত --এটি একটি সংগত প্রশ্ন বটে। কিন্তু আজকে মুষ্টিমেয় কিছু নৃতত্ববিদ ছাড়া সবাই মনে করছেন আফ্রিকা থেকে প্রাপ্ত ফসিলের ডি এন এ বিশ্লেষণ নিশ্চিত ভাবে মানব জনমের উৎস নিয়ে ‘বহুত্ববাদী’ তত্ত্বকে খারিজ করছে।

কীভাবে?

৪.০ শেষ হাসি কি ডারউইনের?

বিবর্তনের ধাপে আধুনিক মানুষের নিকটতম পূর্বপুরুষদের সবরকম বৈচিত্র্যময় ফসিল পাওয়া গেছে শুধু আফ্রিকা মহাদেশে।

যেমন Sahelanthropus tchadensis (৭ মিলিয়ন বছর আগে), Ardipithecus ramidus (৪ মিলিয়ন বছর), Kenyanthropus playtyops (৩.৫ মিলিয়ন), Homo habilis (২.৪ মিলিয়ন) এবং Homo beidelbergensis ( ৭ লক্ষ থেকে ২ লক্ষ বছর আগের)।

আর এসবের ডি এন এ বিশ্লেষণ থেকে চূড়ান্ত প্রমাণ পাওয়া গেছে যে আফ্রিকার বাইরে বিভিন্ন মহাদেশে যে আধুনিক মানব তারা সবাই আফ্রিকা মহাদেশের একটি একক জনগোষ্ঠীর বংশধর (descendants) বা উত্তর পুরুষ। সেই জনগোষ্ঠীর একটা বড় অংশ প্রায় ৭০০০০ বছর আগে অভিবাসী (migrants) হয়ে এশিয়ায় প্রবেশ করে। তারপর সেখান থেকে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।

সমস্ত আধুনিক আবিষ্কার ও প্রমাণ আমাদের, অর্থাৎ সমগ্র মানবজাতির, আফ্রিকান শেকড়ের ধারণাকে পোক্ত করছে।

দুটো উদাহরণঃ

ইথিওপিয়ায় ওমো কিবিশে খননে প্রাপ্ত দুই মানব করোটির অংশের ফসিল যার বয়স ১,৯৫,০০০, আর ২০১৭ সালে মরক্কোর সাফি শহরের কাছে জেবেল ইরহুদ গুহায় প্রাপ্ত করোটির ফসিল যার ডি এন এ বিশ্লেষণ বলছে বয়স ৩,০০,০০০ বছর। কীভাবে জেনোম সিকোয়েন্সিং (genome sequencing) পদ্ধতির মাধ্যমে দুই আপাত বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠীর মূল সম্পর্ক খুঁজে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো হয়—তার বর্ণনা এই লেখার সীমার বাইরে। কিন্তু ফসিলের ডি এন এ বিশ্লেষণের উন্নত প্রযুক্তি আবিষ্কার আজ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে স্বতন্ত্র জনগোষ্ঠীর উদ্ভবের তত্ত্বকে পুরোপুরি বাতিল করে দিয়েছে।

৫.০ ভারতে বাইরে থেকে মানুষের আগমন কখন?

পুরাতত্ত্ববিদ বলবেন প্রায় ১,২০,০০০ বছর আগে। কিন্তু জনসংখ্যা নিয়ে কাজ করা জিনতত্ত্ববিদ বলবেন প্রায় ৬৫০০০ বছর আগে।

কে ভুল, কে ঠিক?

দুজনেই ঠিক।

পুরাতত্ত্ববিদ ভারতে মানুষের পদার্পণ বলতে সেই মানুষের কথা বলেন যাদের আগমনের পাথুরে প্রমাণ আছে, কিন্তু তারা এখানে বংশবৃদ্ধি করেছিল এমন প্রমাণ নেই।

আবার জিনতত্ত্ববিদ বলবেন শুধু সেই মানব গোষ্ঠীর কথা যারা এখানে এসে রয়ে গেল এবং বংশবৃদ্ধির জেনেটিক প্রমাণ রেখে গেল।

২০০৯ সালে হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুলের সঙ্গে যুক্ত বিশ্বের প্রায় ৯০ জন ইতিহাস, পুরাতত্ত্ব এবং জিনতত্ত্বের পণ্ডিতেরা মিলে নেচার পত্রিকায় একটি রিসার্চ পেপার প্রকাশ করলেন –বিষয় ভারতের জনগোষ্ঠী নিয়ে নতুন ভাবনা।

২০১০ সালে জানা গেল আধুনিক মানব ও নিয়েন্ডারথালদের মধ্যে প্রজননের কাহিনী এবং ২০১৪ সালে সামনে এল ডেনিসোভান এবং আমাদের পূর্ব পুরুষদের মধ্যে আন্তরিক সম্পর্কের কথা।

তারপর ২০১৭ সালে যুক্তরাজ্যের অধ্যাপক মার্টিন বি রিচার্ডস এবং তাঁর সহযোগীদের রিসার্চ পেপার বেরোল। বিষয় ভারতীয় উপমহাদেশে জনগোষ্ঠীর ছড়িয়ে পড়ার ক্রমাবলোকনের ইতিহাস।

৬.০

ভারতে আর্যদের আগমন নিয়ে দুই বিরোধী তত্ত্বঃ আজকে কী অবস্থা

আজকে হরপ্পার পরে আর্যদের আগমনকে অস্বীকার করতে গিয়ে নতুন কথা বলা হচ্ছেঃ

এক, বিগত ৪০,০০০ বছরে ভারতে বাইরে থেকে কোন অনুপ্রবেশ ঘটেনি।

দুই, আসলে আমাদের দেশে মূলতঃ দুটি আদি জনগোষ্ঠী প্রাচীন কাল থেকেই রয়েছে। তাদের টেকনিক্যাল নাম দেয়া হয়েছে—উত্তর ভারতীয় পূর্বপুরুষ ( Ancestral North Indian or ANI) এবং দক্ষিণ ভারতীয় পূর্বপুরুষ (Ancestral South Indian or ASI)। এদের মধ্যে মেলামেশা থেকেই আমাদের ভারতীয় জনগোষ্ঠী। আর্যদের মধ্যপ্রাচ্য থেকে আগমনের তত্ত্ব ভুল।

মজার ব্যাপার, এই তত্ত্বের দুই প্রবক্তা, ভারতের দুই উচ্চপদে আসীন অধ্যাপক, ২০০৯ সালের নেচার পত্রিকায় হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুলের সৌজন্যে প্রকাশিত গবেষক দলের অংশ এবং স্বাক্ষরকারী। সেখানে তাঁরা এসব না বলে উলটো কথাই বলেছিলেন।

কী বলা হয়েছে নেচার পত্রিকায় প্রকাশিত পেপারে?

ওই পেপারে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে দক্ষিণ ভারতে (ASI) নয়, উত্তর ভারতের জনগোষ্ঠী (ANI) ডি এন এ’র বিচারে পশ্চিম এশিয়া, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য এবং ককেশাস অঞ্চল থেকে আগত অভিবাসীদের মিশ্রণজাত। অর্থাৎ এই গবেষণা আর্য আগমনের তত্ত্বে শীলমোহর লাগিয়েছে।

এ বিষয়ে জুন ২০১৭ সালে দি হিন্দু পত্রিকায় প্রকাশিত টনি জোসেফের প্রবন্ধ --‘আর্য আগমন’ তত্ত্বের পুরো বিতর্কের উপর কী ভাবে জিনতত্ত্বের প্রমাণ দিয়ে যবনিকা পতন হোল-- তার চমৎকার সারসংক্ষেপ। এই সিদ্ধান্তের আরও পোক্ত প্রমাণ হিসেবে ২০১৮ সালে বিশ্বের ৯২জন বৈজ্ঞানিকের সম্মিলিত রিসার্চের পেপার প্রকাশিত হোল। তার অন্তিম এবং পরিমার্জিত রূপ সেপ্টেম্বর ২০১৯ সালে সায়েন্স পত্রিকায় বেরোল। এতে প্রাচীন ফসিলের ডি এন এ বিশ্লেষণের ভিত্তিতে মধ্যপ্রাচ্যের স্তেপ অঞ্চল থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় আগমনের মজবুত প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। যার ফলে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষার ছড়িয়ে পড়ার ব্যাপারটা বোঝা গেল।

রাখীগড়ি খননের তাৎপর্য

হরপ্পা সভ্যতার অন্যতম খনন স্থল রাখীগড়িতে একটি ৪৬০০ বছরের পুরনো মহিলার করোটি পাওয়া গেছে। সেটা নিয়ে ওই একই তারিখে (১৬/৯/২০১৯) ‘Cell’ পত্রিকায় একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হল। দুই পেপারের অধিকাংশ লেখক এক। কাজেই স্বাভাবিক যে ওঁদের নিষ্কর্ষ একই হবে।

তাতে বলা হোল হরপ্পা অঞ্চলের প্রাপ্ত ওই মহিলার ফসিলের জিন বিশ্লেষণে স্তেপের পশুপালক জনগোষ্ঠী এবং ইরাণীয় কৃষক জনগোষ্ঠীর কোন সম্পর্ক পাওয়া যায় নি।

ব্যস, আর্য আগমন তত্ত্বের বিরোধীরা বললেন—এই তো পেয়েছি! ভারতে স্বয়ম্ভু মানব অস্তিত্বের প্রমাণ! অনেক পত্রপত্রিকা হেডলাইন করল—রাখীগড়ি খনন আর্য আগমনের তত্ত্বকে খারিজ করেছে!

আসলে না বুঝে প্রেক্ষিত বাদ দিয়ে একটা লাইন চেরি পিকিং করলে যা হয়!

পেপারের বক্তব্য এ নয় যে রাখীগড়ী মহিলার ইরাণের জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কোন সম্পর্ক ছিল না। বরং এটি ইরাণের ‘কৃষক’ জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। অর্থাৎ এটি এত প্রাচীন যে তখন ইরাণে বা হরপ্পায় কৃষি শুরু হয় নি। এর জেনোম ইরাণ থেকে আগত শিকারী ও খাদ্য সংগ্রাহক গোষ্ঠীর।

ওই পেপারেই পরে স্পষ্ট বলা হয়েছে প্রাচীন কালের ডি এন এ অধ্যয়নের ফলে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠীর পূর্ব ইউরোপ থেকে মধ্যপ্রাচ্য হয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় দ্বিতীয় সহস্রাব্দের প্রথম ভাগে ছড়িয়ে পড়ার বিস্তারিত খুঁটিনাটির দস্তাবেজ তৈরি সম্ভব হয়েছে।

উত্তর প্রদেশের সিনৌলিতে রথের ভগ্ন অংশ!

দিল্লির কাছে বাগপত জেলার সিনৌলির এক প্রাচীন সমাধিস্থলে তিনটে ভাঙা গাড়ি, সম্ভবতঃ ১৯০০ বি সি ই (before common era) পাওয়া গেছে। কেউ বলছেন ওগুলো আসলে রথের চাকা। স্তেপ মাইগ্রেশনের সময়কাল হল ২০০০ থেকে ১৫০০ বি সি ই। কাজেই এটা মনে হয় ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষার লোকজনের প্রথম দলের আগমন চিহ্ন।

কিন্তু ডিসকভারি প্লাস চ্যানেলে ২০২১ সালের গোড়ায় একটি ডকুমেন্টারি ফিল্ম দেখানো হোল—Secrets of Sinauli. তাতে দাবি করা হোল ভারত সরকারের পুরাতাত্ত্বিক বিভাগ সেই মৃতদের কবর দেয়ার প্রাচীন স্থল থেকে একটি কংকালের ডি এন এ রিপোর্ট পেয়েছে। তাতে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের জেনেটিক সম্পর্কের কোন প্রমাণ পাওয়া যায় নি।

কিন্তু ওই ডকুমেন্টারি দেখানোর সময় থেকে আজ অব্দি এমন কোন ডি এন এ রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসে নি!

উপসংহার

ইহুদী, ক্রিশ্চান, আরব সবাই দাবি করে যে তারাই নাকি ঈশ্বরের ‘বেছে নেয়া’ (chosen) জনগোষ্ঠী। এটা বোঝা মুশকিল যে পরম করুণাময় ঈশ্বর কেন তাঁর সন্তানদের প্রতি পক্ষপাত করবেন! তবে এই বিশ্বাস লক্ষ লক্ষ নিরীহ ইহুদীদের হিটলারের গ্যাস চেম্বার থেকে বাঁচাতে পারে নি। জার্মানি-ফ্রান্স-পোল্যান্ডের অধিবাসীদের বিশ্বযুদ্ধের আগুন থেকে রক্ষা করে নি। আজ গাজা ও প্যালেস্তাইনের আরবদেরও গণহত্যা থেকে বাঁচাতে পারছে না।

এখন আমরা ভারতবাসীরা নাকি সেই ঈশ্বরের বিশেষ পছন্দের লোক। তাই আমরা স্বয়ম্ভু, আমাদের দেশে কোন বিদেশীর অনুপ্রবেশ হতে পারে না। আমাদের ভাষা দেবভাষা। তাই ইতিহাস চর্চার সমস্ত মান্য পদ্ধতিকে এক ফুঁয়ে উড়িয়ে দিয়ে আমরা রক্তের বিশুদ্ধতার দাবি করি। তাই গোঁজামিল অবশ্যম্ভাবী।

কিন্তু সাভারকর তাঁর ‘হিন্দুত্ব’ বইয়ের শেষভাগে এটা কী বললেন?

“আসলে সমগ্র বিশ্বে একটিই জাতি—মানব জাতি। একই শোণিত বহমান –মানব রক্ত। বাকি সব রক্তের বন্ধন কাজ চালানোর জন্যে--provisional, a make shift and only relatively true. Nature is constantly trying to overthrow the artificial barriers between race and race. To try to prevent the co-mingling of blood is to build on sand. Sexual attraction has proved more powerful than all the commands of all the prophets put together”
0

প্রচ্ছদ নিবন্ধ - সোমা দত্ত

Posted in




আমার এক বোন ছিল যে খুব ছোটবেলায় অকারণে মিথ্যা কথা বলত। সেইসব মিথ্যার মধ্যে অধিকাংশই ছিল খুব দুঃখজনক কোনো একটি বর্ণনা যেমন মা ছেড়ে চলে গেছে বা বাবা-মা সেপারেটেড এইরকম ধরনের। অনেক পরে আমরা তার এই মিথ্যা বলার প্রবৃত্তি টের পাই। আবার আমার এক বন্ধু ছিল যে খামোকাই আকাশ কুসুম মিথ্যা বলত যেটা আমরা উপভোগ করতাম। যেমন সে হয়তো বলল তার বাবা আমেরিকার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে মিটিং এ ব্যস্ত আজ তাই তাকে নিতে আসবে না স্কুলে। আমরা খুব হাসলাম শুনে হয়তো। কোনো কোনো বন্ধু আবার পরীক্ষায় পাওয়া নম্বর মিথ্যেই বাড়িয়ে বলত। বন্ধু শুধু কেন বন্ধুর মা-ও হয়তো বলল। এমনকি আমি নিজেও মফসসলের নিম্নবিত্ত পরিবারে জন্মে একটু দামী ইস্কুলে পড়ার জন্য আমাদের বাড়িতে টেপ রেকর্ডার না থাকাকালীন সময়ে বন্ধুদের মিথ্যে বলতাম যে আছে। একটু বড় হয়ে বাড়িতে মিথ্যে বলে বন্ধুদের সঙ্গে এদিক ওদিক যাওয়া ইত্যাদি তো আছেই। এইসব ছোটখাটো মিথ্যের সঙ্গে বড় হওয়ার অনেক পরে আমরা জানলাম মিথ্যে বলা একটি অসুখ। আর খুব ছোটবেলায় ‘কদাপি মিথ্যা বলিবে না’ পড়ার সময় আমরা জেনেই গেছিলাম যে ওটি অতি পুরাতন বিদ্যাসাগরীয় রীতি যার কিছুই আর ভ্যালিড নয়। তো যখন জানলাম মিথ্যা বলা একটি অসুখ তখন পাশাপাশি এটিও জানলাম যে সেইসব অসুখ হওয়া মিথ্যাগুলো অন্য, আমাদেরগুলো নয়। এবার এটি একটি অত্যন্ত সাধারণ বিষয় কিন্তু মিথ্যা প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য কারণ অপরাধ যেমন ছোট থেকেই বড় হয় এবং অন্যান্য অনেক অভ্যাস এবং পরিবেশের মাধ্যমে জিনগত ভাবে রেপ্লিকেট করে তেমনি মিথ্যা বলার প্রবণতাও একইরকমভাবে এগোতেই পারে। অর্ধেকের উপর মিথ্যেকে আমরা আগে থেকেই বৈধতা দিয়ে রাখি জীবনে। এখানেই একটা দ্বন্দ্ব তৈরি হয় যে কোন কোন মিথ্যা তাহলে বৈধ? যেমন হোয়াইট লাইস বলে একটা প্রচলিত কথা আছে। যে মিথ্যায় কারো ক্ষতি হয় না বিশেষ করে হয়তো মঙ্গলই সাধন হয় তাকে বলা হয় ধরে নেওয়া যেতে পারে। এবার এইসব সফেদ শুদ্ধ মিথ্যা একজনের জন্য মঙ্গলদায়ক হলে যে আরেকজনের জন্য হবে সেটা জোর দিয়ে বলা যায় না। অশ্বত্থামা হত ইতি গজ এক পক্ষের জন্য মঙ্গলদায়ক হলেও অন্যপক্ষের জন্য ক্ষতি। বৃহত্তর স্বার্থের জন্য কোন ক্ষতিকে স্বীকার করা হবে তার কি কোনো প্রামাণ্য তালিকা আছে না থাকতে পারে। কতগুলো সাধারণ ঘটনা নিয়েই যদি ভাবি তাহলে কিছু উদাহরণ লাগবে। যেমন-

ঘটনা ১- এক উচ্চপদস্থ প্রাইভেট কোম্পানির বিপণন বিভাগের প্রোডাক্ট ম্যানেজার একজন ক্লায়েন্টকে নিজেদের প্রোডাক্ট সম্পর্কে ধারণা দিচ্ছেন। উপস্থিত রয়েছেন কোম্পানির বিপণন বিভাগের কিছু শিক্ষানবিশ এবং বিপণন বিভাগের দায়িত্বে থাকা অন্যান্য জুনিয়র কয়েকজন। স্বাভাবিকভাবেই নিজেদের প্রস্তুতকারক ফর্মুলায় তৈরি বস্তুর গুণমান সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত ব্যাখা করছিলেন। কিন্তু বলার সময় অনেক অতিরিক্ত গুণের উল্লেখ করছিলেন যা আদপেই সত্য নয়। ক্লায়েন্ট চলে যাওয়ার পর একজন শিক্ষানবিশ সাহস সঞ্চয় করে এই ভুল ব্যাখার কারণ জানতে চাইলে ম্যানেজার বললেন ওটুকু বলতে হয়। এভাবেই বলবে।

ঘটনা ২- মেয়ের বিয়ের সম্বন্ধ এসেছে। ছেলের বাবা ছেলের রোজগার এবং পড়াশুনা সম্পর্কে কথা বলছেন ভাবি বেয়াই এর সঙ্গে। যা বলছেন বেশ খানিক বাড়িয়ে বলছেন। কথা সম্পূর্ণ হওয়ার পর ছেলেটির বোন এসে তার বাবার কাছে জানতে চাইল ওই অতিরঞ্জিত গুণগ্রাহিতার কারণ। বাবা বললেন, ওরকম বলতে হয়।

ঘটনা ৩ – বায়োডেটা তৈরি করার সময় সিনিয়র দাদা জুনিয়র বোনকে বলল কয়েক টেকনিকাল নলেজ এক্সট্রা লিখে দিলাম। বোন বলল আমি বিষয়গুলো জানিনা। দাদা বলল, না জানলেও চলবে কিন্তু এগুলো না লিখলে চাকরি হবে না। ওরকম একটু লিখতে হয়।

ঘটনা ৪ – অমিয়বাবু নিজের এপার্টমেন্টের সিকিউরিটি গার্ডকে প্রায়ই ব্যক্তিগত কাজে দোকানে পাঠান। বিনিময়ে তাকে বকসিস দেন দশ কুড়ি টাকা। একজন বাসিন্দা খবর পেয়ে সরাসরি অমিয়বাবুকে জিগ্যাসা করলে তিনি সত্য অস্বীকার করলেন। তার নাতি তাকে বলল, দাদু কেন মিথ্যে বললে? অমিয়বাবু বললেন প্রয়োজনে ওরকম একটু বলতে হয়।

ঘটনা ৫ – নতুন রান্নার লোক রাখছেন অমৃতা। বললেন পরিবারে তিনজন লোকের দুবেলার রান্না করতে হবে। একটা সবজি আর মাছ। কাজের লোক দ্বিগুণ মাইনে চাইল। দোনামনা করে হলেও রাজি হলেন অমৃতা। লোক চলে যাওয়ার পর শাশুড়ি বললেন তুমি এত কমিয়ে রান্নার কথা বললে কেন? আমাদের তো তিন চাররকম পদ হয়। এছাড়া সকালের খাবার তৈরি করতে হয়। অমৃতা বললেন ওসব ওরকমই বলতে হয়। পরে বুঝিয়ে সুঝিয়ে কাজ করিয়ে নেবক্ষণে।

এই যে ঘটনাগুলোর উদাহরণ এলো সেগুলো খুব নির্বিষ ধরনের বা খুবই নিরীহ ধরনের উদাহরণ। এই যে ছোট একটি কথা ওরকম বলতে হয় এর উপর নির্ভর করে আসলে ছোট থেকে শুরু করে যেকোনো বড় অপরাধও সংঘটিত হয়ে যায়। আমরা ভাবি আমরা তো অপরাধ করি না। আমরা সুশিক্ষিত, মার্জিত। আমরা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে সঠিক পথ দেখাই। কিন্তু আমরা জানিনা আমরা আসলে তা করি না। খুব সূক্ষ্মভাবে ভাবলেই দেখা যাবে অপঘাতে মৃত্যু হয় সত্যের কী অবলীলায়। সহজ করমর্দন করি আমরা বন্ধুর সঙ্গে মিথ্যা দিয়েই। নিজেকে কৈফয়ত দিই এমনই বলতে হয়। মিথ্যার সঙ্গে সহবাস করি অথচ কী অদ্ভুতভাবে তাকে বৈধতা প্রদান করি। মানুষ সাধারণভাবে নিজের রোজগার নিয়ে মিথ্যা বলে তাকে স্বাভাবিক মনে করে। নিজের অর্থনৈতিক উদারতার অভাবকে ঢাকতে মিথ্যা হিসেব নিকেশ নিয়ে মিথ্যা বলে। তারাই আবার অর্থনৈতিক সাম্যের কথা বলে। বড় হোটেলে খাওয়ার পরে টিপস দেয় দেড়শো টাকা কিন্তু বাইরে যে দারোয়ান মাথায় ছাতা ধরে গাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দেয় তাকে দেয় দশটাকা। আইনক্সে সিনেমা দেখে পপকর্ণ খেয়ে নষ্ট করে দু’হাজার টাকা বাজারে পেঁপে কিনতে গিয়ে দরদস্তুর করে। এ এক বিচিত্র সভ্যতা যা আসলে অসভ্যতাকেই কোয়ালিফাই করে এগোয় প্রতিমুহূর্তে। ভালোমানুষেরা মিথ্যে বলার সময় তাকে সত্য বলে প্রতীয়মান করতে যৌক্তিকতার আশ্রয় নেন। মিথ্যেকে সত্যি করে তোলার অস্বস্তি তাকে আরও বেশি মিথ্যাবাদী করে তোলে। তবু কেন যে সত্যবাদী হওয়ার দাবি করি। আমরা কেন যে বুঝিনা আমরা খেলাঘরের পুতুলের মতো। ভিডিও গেমের প্রোগামের মতো। আমাদের চলাচল, আমাদের রীতি, অভ্যাস, সত্য মিথ্যা সব জড়িয়ে পেঁচিয়ে এক করে ফেললেও সে-সবই পূর্ব নির্দিষ্ট। আমাদের এরকম আর ওরকমের মাঝে একটা মস্ত বড় বাঁচার লড়াই থাকে। সেই লড়াই স্তরে স্তরে সভ্যতার সেই আদিম যুগ থেকে বাড়ছে। যত বাড়ছে তত জটিল হচ্ছে। যত জটিল হচ্ছে তত মিশিয়ে ফেলছে সত্য অসত্য। আমরা জেনেটিক্যালি পরিবর্তিত হয়ে চলেছি। আমাদের নিউরোট্রান্সমিটার ভাষা পরিবর্তন করছে। একজন ব্যক্তির অবিচ্ছিন্নভাবে মিথ্যা বলার অনিয়ন্ত্রিত প্রবণতাকে মিথোম্যানিয়া বলে। এটা এক ধরনের প্যাথোলজিক্যাল ডিসঅর্ডার। মিথোম্যানিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা নিজেকে নায়কের মতো দেখানোর জন্য এবং তাদের আশেপাশের লোকেদের কাছ থেকে গ্রহণযোগ্যতা বা সহানুভূতি অর্জনের জন্য মিথ্যা বলে। মিথোম্যানিয়াকরা হয়তো বুঝতে পারে না যে তারা মিথ্যা বলছে এবং বিশ্বাস করে যে তারা তাদের কল্পনা দিয়ে যে চিন্তাভাবনা তৈরি করে তা বাস্তব। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এইরকম মিথ্যা কথা বলা মানুষগুলো নিজেকেও মিথ্যাটা বলে। অর্থাৎ মিথ্যার প্রতি একটা বিশ্বাস তৈরি করে তাকে সত্য বানানোর প্রচেষ্টা চলে তাদের মধ্যে। পরিস্থিতির প্রভাবে যে মিথ্যেগুলো আমরা সাধারণত বলে থাকি সেগুলিকে সাদা মিথ্যে বলা যেতে পারে। মিথোম্যানিয়াকদের এইসব মিথ্যা হোয়াইট লাইজ বা সাদা মিথ্যার অন্তর্গত নয়। মনোবিজ্ঞানিদের মতে প্রত্যেক মানুষই দিনে একটি কি দুটো সাদা মিথ্যে বলে থাকে। যা মূলত প্রয়োজনে বলা হয় অর্থাৎ যার কোনো সদর্থক ভূমিকা থাকতে পারে। এই সদর্থক ভূমিকা কথাটিও বেশ গোলমেলে। কারণ যেকোনো বিষয়ে সদর্থক ভূমিকা ব্যক্তিসাপেক্ষে বদলে যেতে পারে। অর্থাৎ যাকে হোয়াইট লাইজ বলা হচ্ছে তা সর্বজনস্বীকৃতভাবে হোয়াইট নাও হতে পারে। যেমন যদি মনের রোগের কথাই ভাবি তাহলে বলা হয়, মিথোম্যানিয়ার মতো প্রায় একই রকম একটি মানসিক সমস্যা কনফ্যাবুলেশন। এতে দেখা যায় ব্যক্তি বাস্তব ঘটনার পরিবর্তে কিছু কাল্পনিক বা বিকৃত গল্প তৈরি করে যার প্রভাব খারাপ ভালো দুই-ই হতে পারে। ব্যক্তি সেই খারাপ বা ভালো সম্পর্কে কোনো সচেতনতা বহন করে না। মনোবিজ্ঞানিরা বলছেন যে এই ধরনের সমস্যাগুলো অন্য অনেক মানসিক রোগের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত যেমন ডিমেনশিয়া বা কোরসাকফ সিন্ড্রোম। এইরকম তথ্য খুঁজে যদি মিথ্যাকে প্যাথোলজিক্যালি কাঁটা ছেঁড়া করা হয় তাহলে অনেক ব্যাধি, অনেক উপসর্গ এবং সে-সবের অগুনতি উদাহরণ বেরোবে। কিন্তু যা সামনে আসবে না তা হলো সাদা মিথ্যের সঙ্গে মিশে থাকা ধূসরতা। এই ধূসরতা একটি অস্পষ্ট অবস্থার দিকে আঙুল তোলে যা সত্য এবং মিথ্যে দুটিকেই একাধারে ঘোলাটে করে তুলছে যুগের চলনের সঙ্গে সঙ্গে। এমন নয় যে এর উদ্ভব খুব সম্প্রতি হয়েছে। এই ধূসরতা রয়েছে পৌরাণিক কাল থেকেই। মিথ থেকেই এসেছে মিথ্যা। দেব দেবীর ম্যাজিক, তাদের তুষ্ট করে পাওয়া অলৌকিক ক্ষমতা কী মিথ্যা নয়? গল্প উপন্যাসের মিথ্যা সর্বজনস্বীকৃত মিথ্যা। কিন্তু তার মধ্যেও ভাগ রয়েছে। কল্পনাকে রূপায়িত করে লেখা উপন্যাস আর কাল্পনিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে গড়ে তোলা বিশ্বাস এক নয়। উপন্যাস ঘোষণাপূর্বক কাল্পনিক। কিন্তু পুরান বা পৌরাণিক বিশ্বাস, ভগবানের লীলাখেলার কাল্পনিক গল্প ঘোষণাপূর্বক কাল্পনিক নয়। এখানে বিশ্বাস নিয়ন্ত্রণ করে মানুষকে এবং মিথ থেকে আসা সেইসব মিথ্যাকে সত্য প্রমাণ করবার জন্য অজস্র মিথ্যা বলে। মনোবিজ্ঞান এই মিথ্যাকে কীভাবে ব্যাখা করে? মেসিয়াহ কমপ্লেক্স বা নিজেকে শ্রেষ্ঠ মনে করে দেবত্ব আরোপ করাও একধরনের বাইপোলার ডিসঅর্ডার বা সিজোফ্রেনিয়ার লক্ষণ। কিন্তু সাধারণভাবে এই অন্ধত্ব দেখা যাওয়ার আগে পর্যন্ত সেটিকে স্বাভাবিক মনে করা হয়। তাহলে এরপর স্বাভাবিক এবং অস্বাভাবিকের দ্বন্দ্ব উপস্থিত হয়। অর্থাৎ কোন কোন প্যারামিটারের উপর ভিত্তি করে আপনি কাউকে স্বাভাবিক বা অস্বাভাবিক বলবেন? ধর্মন্মোত্ত মানুষ কি স্বাভাবিক? ধর্মন্মোত্ততার চূড়ান্ত নিদর্শন পাওয়ার আগে পর্যন্ত কি তাকে আপনি অস্বাভাবিক বলবেন? যুক্তি তর্কের বাইরে গিয়ে কাল্পনিক হয়ে ওঠার পরেও তার গ্রহণযোগ্যতা বৈধ থাকে কেন? ছোটবেলা থেকে শিশুকে বিশ্বাস অর্থে ঈশ্বর সম্পর্কিত অবাস্তব কাল্পনিক কাহিনি শোনানো হয় কেন? প্রফেসর শঙ্কু যদি কাল্পনিক চরিত্র হন তবে দুর্বাশা কেন কাল্পনিক নন? পাগলা দাশুর মিথ্যা যদি মিথ্যা হয় তবে হনুমানের পাহাড় তুলে নিয়ে আসার কাহিনি কেন কাল্পনিক নয়? এবং পৌরাণিক দেবতাদের এইসব কীর্তিকলাপকে নাল অ্যান্ড ভয়েড করে তুললে বিশেষ সম্প্রদায়ের মানুষদের ধর্মন্মোত্ত ব্যবহার কেন মানসিক সমস্যা নয়? সত্যজিত ‘দেবী’ চলচ্চিত্রে এর অনেকখানি চর্চা রয়েছে। চর্চা হয়তো আরও অনেক রয়েছে এই বিষয়ে কিন্তু মিথ্যে অলক্ষ্যে সত্যিতে পরিণত হচ্ছে আধুনিক সভ্যতাতে। যদি এইসমস্ত অলৌকিক বিশ্বাসকে বহন করে নিয়ে চলা হোয়াইট লাইজ হয় তাহলে জনৈক মিথোম্যানিয়াকের মিথ্যাই বা সাদা নয় কেন? এরপরে আসে রাজনৈতিক মিথ্যা। তারপরে রয়েছে সামাজিক মিথ্যা যার মধ্যে খানিকটা ওই বিশ্বাসের বিষয়টাও মিশে আছে। প্রতি মুহূর্তে মিথ্যা বলা হয় এবং তাকে বৈধতা দেওয়া হয়। সে মিথ্যে নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তাকে যুক্তি দিয়ে স্বাভাবিক ঘোষণা করা হয় এমনকি যদি মিথ্যা প্রমাণিত হয় তাহলেও তাকে মানসিক ব্যাধির সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয় না। কেন অকারণ মিথ্যাকে প্রশ্রয় দিতে বলা হয় ‘ওরকম বলতে হয়।’ কেন সাদা মিথ্যার মধ্যে থাকা ধূসর অংশকে ব্যাখা করা হয় না? হুমায়ূন আহমেদ বলেছেন ‘কারণে মিথ্যা বলার চেয়ে অকারণে মিথ্যা বলতে মানুষ বেশি পছন্দ করে’। সে তো করেই কিন্তু সেই মিথ্যাকে প্রতিষ্ঠিত করতে যত মিথ্যা বলা হয় সে আরও জটিল প্রক্রিয়া। আসলে আমরা একটি প্যাথোলজিক্যাল মিথ্যার অভ্যাসকে নিজেদের জীবনে প্রতিষ্ঠা করে চলেছি প্রতিমুহূর্তে একথা বলতে বাধা কই? জিনগতভাবে আমরা প্রজন্মকে শিক্ষিত করে তুলছি স্বাভাবিক মিথ্যা বলার অভ্যাসে।