1

সম্পাদকীয়

Posted in


সেদিন এক আড্ডায় (নিতান্তই হোয়াটসঅ্যাপ গ্রূপ চ্যাট... খামোকা আমাদের ‘Covidiot’ ভেবে বসবেন না) কথা হচ্ছিলো এই অতিমারীজনিত মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে। তাতে এক রসিক বন্ধু বললেন, করোনা নাকি দুই প্রকার। সেলিব্রিটি আর হাড়হাভাতে। প্রথমটায় অকুন্ঠ আরোগ্য কামনা। দ্বিতীয়টায় স্রেফ সংখ্যা গণনা। প্রতিক্রিয়ায় কেউ হাসলেন, কেউ একটু দুঃখ পেলেন এবং অবধারিতভাবে মানবতাবাদী সংবেদনশীল কয়েকজন শাসনব্যবস্থার পিতৃপুরুষ উদ্ধার করে দিলেন। সেই সব কিছু হয়ে যাওয়ার পর একটা অদ্ভুত প্রশ্ন করলেন সেই গ্রূপের সাধারণত সব থেকে মিতবাক সদস্যটি – মানুষের জীবনের যে এত দাম, সেটা মানুষ ঠিক কবে থেকে বুঝেছে?

সবাই আমরা virtually চোখ চাওয়াচাওয়ি করলাম। উত্তরটা কারোরই জানা আছে বলে মনে হলো না। প্রশ্নটা যিনি করেছিলেন, একটু পরে তিনিই উত্তরটা দিলেন – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলস্বরূপ রাষ্ট্রসঙ্ঘ তৈরি হওয়ার পর। Human rights বা amnesty জাতীয় ধারণাগুলি সব তৎপরবর্তী। অর্থাৎ, আজ থেকে মেরেকেটে সত্তর-পঁচাত্তর বছর আগে। আনন্দের কথা, নিঃসন্দেহে। Better late than never, অবশ্যই। রাষ্ট্রসঙ্ঘের জন্য একটা অভিনন্দনসূচক ইমোজি পোস্ট করবো কিনা ভাবছি... ঠিক তখনই এলো একটা রীতিমতন চমকে দেওয়া পরিসংখ্যান, যার সূত্র পৃথিবীর বিশ্বস্ততম তথ্য ও সংবাদ সরবরাহকারী সংস্থাগুলির একাধিক – রাষ্ট্রসঙ্ঘের জন্মের পর থেকে আজ পর্যন্ত মহামূল্যবান মানবজাতির প্রাণ রক্ষার্থে উৎসর্গীকৃত হয়েছে এই গ্রহের প্রায় ষাট শতাংশ বন্য প্রাণ! অর্থাৎ, যে কাণ্ডটি মানুষ তার সভ্যতার ইতিহাসের দশ হাজার বছরে (যার মধ্যে তার পেশাদার পশুশিকারীর প্রাচীন ও দীর্ঘ ভূমিকাটি অবশ্যগণ্য) করে উঠতে পারেনি, সেটা প্রায় হেলায় করে ফেলেছে তার নিজের জীবনের দামটি প্রায় অমূল্য হয়ে ওঠার অব্যবহিত পরেই।

কিন্তু যাক গে... এসব অসৈরণ কথাবার্তা বলে আপনাদের এমনিতেই খিঁচিয়ে থাকা lockdown mood আরও খিঁচড়ে দেওয়ার কোনও উদ্দেশ্য আমাদের নেই। আপনারা সপরিবারে, সবান্ধবে ও সপ্রতিবেশী করোনামুক্ত থাকুন, এই আমাদের ঐকান্তিক কাম্য। আমাদের অফিসটি যে ইতিমধ্যে স্থানান্তরিত হয়েছে, সে সংবাদও নিশ্চয়ই অনেকেই পেয়েছেন। সেখানে আপনাদের সবার স-মুখোশ ও স-দস্তানা অমন্ত্রণ রইলো। Sanitizer (Google বলছে sanity-র অর্থ নাকি মানসিক সুস্থতা! কি বিড়ম্বনা বলুন দেখি!) আমাদের তরফ থেকে সরবরাহ করা হবে।

সুস্থ থাকুন শরীরে ও মনে...
শুভেচ্ছা নিরন্তর

1 comments:

0

প্রচ্ছদ নিবন্ধ - রঞ্জন রায়

Posted in


ম্যাজিকের স্টেজ নির্মাণ

গত ২৮শে মে, ২০২০ তারিখে ইকনমিক টাইমসে একটি খবর প্রকাশিত হয়। তাতে বলা হয়েছিল যে মধ্যপ্রদেশের ইন্দোর জেলার কালেক্টর চুপচাপ বাবা রামদেবের পতঞ্জলি রিসার্চ ফাউন্ডেশন ট্রাস্টের তৈরি আয়ুর্বেদিক ওষুধ কোভিদ-১৯শের রোগীদের উপর পরীক্ষার অনুমতি দিয়েছিলেন, কিন্তু খবরটা চাউর হওয়ায় এবং এ নিয়ে কিছু এনজিও এবং প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী কংগ্রেসের দিগ্বিজয় সিং দেশের ড্রাগ কন্ট্রোলার জেনারেলের অনুমতি ছাড়া এবং নতুন কোন ওষুধ মানুষের উপর পরীক্ষার জন্যে নির্ধারিত আইনি প্রোটোকলের পালন ছাড়া এমন অনুমতি দেয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলায় (২২শে মে) সে অনুমতি বাতিল করা হয় । এ নিয়ে পতঞ্জলি ট্রাস্টের ৯৬% শেয়ারের মালিক আচার্য বালকৃষ্ণ বলেন – ভুল বোঝাবুঝি হচ্ছে। আমরা আয়ুর্বেদ নিয়ে কোন নতুন এক্সপেরিমেন্ট করছি না । যে ওষুধগুলো বহু লোক নিয়মিত ব্যবহার করছে তা করোনা রোগীদের দিলে কতটুকু লাভ হয় দেখতে চাইছি।

ম্যাজিক শো

২৩শে জুন সন্ধ্যেবেলা। করোনা প্যানডেমিকে ভারতে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৫ লক্ষ ছুঁতে চলেছে। গোটা দেশ উৎফুল্ল। সমস্ত চ্যানেলে দেখাচ্ছে বাবা রামদেব আচার্য বালকৃষ্ণকে পাশে নিয়ে প্রেস কনফারেন্স করছেন। সামনের টেবিলে রয়েছে করোনিল , শ্বাসারি এবং অনুতৈল নামে নাকে দেওয়ার জন্যে একটি তেল। বাবা রামদেব জানালেন যে উনি রাজস্থানের জয়পুরের ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অফ মেডিক্যাল ইন্সটিটিউট নামের একটি হাসপাতালে ১০০ জন রোগীর উপর রান্ডমাইজড কন্ট্রোল ট্রায়ালের নিয়ম মেনে পরীক্ষা চালিয়েছেন। তাতে ৩ দিনে ৬৬% এবং ৭ দিনে ১০০% রোগী সুস্থ হয়ে উঠেছে। অতএব—মা ভৈঃ !

সন্ধ্যেয় ইন্ডিয়া নামের হিন্দি চ্যানেলকে দেয়া একটি ইন্টারভিউয়ে উনি জানালেন যে কোভিদের চিকিৎসার জন্যে কোন এলোপ্যাথিক ওষুধ খাওয়ার দরকার নেই । প্রায় ৫৪৫ টাকার এই তিনটে ওষুধের কম্বিনেশনই যথেষ্ট । সাতদিনে একশ’ পার্সেন্ট সাকসেস! দুনিয়ায় কোন দেশ এখন অব্দি যা পারেনি—অক্সফোর্ড হোক বা আমেরিকা বা চীন বা জার্মানি—তা প্রাচীন আয়ুর্বেদ পারল। সমস্ত টিভি চ্যানেলে চ্যানেলে বাবাজির যোগ প্রজ্ঞা এবং রিসার্চের জয় জয়কার। যারা এ নিয়ে প্রশ্ন করার গুস্তাখি করছে সোশ্যাল মিডিয়ায় তারা দেশদ্রোহী এবং বিলিতি সাহেবদের পা-চাটা অভিধা পেল।

কেউ কেউ প্রশ্ন করল ওষুধটি বাজারে ছাড়ার বা বিজ্ঞাপিত করার আগে উনি আইসিএম আর (ইন্ডিয়ান যেন্টার ফর মেডিক্যাল রিসার্চ) থেকে অনুমতি নিয়েছেন তো? হেসে জবাব দিলেন—কোনও বে-আইনি কাজ করিনি। দরকারি অনুমতি এবং কাগজপত্র সবই আছে।

অ্যান্টি ক্লাইম্যাক্সঃ

কিন্তু সেদিন রাত্রে আয়ুষ মন্ত্রক পতঞ্জলি আয়ুর্বেদকে নোটিস ধরিয়ে জানাল যে এই দপ্তর সমস্ত কাগজপ্ত্র পরীক্ষা করে নিশ্চিন্ত হয়ে অনুমতি না দেয়া পর্য্যন্ত যেন করোনিলের বিক্রি এবং প্রচার বন্ধ রাখা হয়। কেন? 

কারণ ২১ ডিসেম্বর ২০১৮তে ভারত সরকারের গেজেটে ড্রাগস এন্ড কসমেটিক্স অ্যাক্টের কিঞ্চিৎ সংশোধন করে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল যে কোন আয়ুর্বেদিক, সিদ্ধ, ইউনানি বা হোমিওপ্যাথিক ওষুধের নামে কোন রোগ নিরাময়ের বা চিকিৎসার জন্যে বিজ্ঞাপন দেয়া বা প্রচার করা নিষিদ্ধ। 

মার্চ ২০২০ থেকে দেশে করোনার ভীতি ছড়িয়ে পড়ল। তার সঙ্গে শুরু হল গোমূত্র সেবন বা নাকে সরষের অথবা আয়ুর্বেদিক তেল লাগিয়ে করোনা ঠেকানোর বিপত্তারণ মন্ত্র। এমন সময়ে লক ডাউন শুরু হওয়ার পর ভারত সরকারের আয়ুষ মন্ত্রক থেকে গেজেটে ১ এপ্রিল নির্দেশ প্রকাশিত হল যে কেঁউ যদি আয়ুর্বেদ বা ইউনানি বা সিদ্ধ পদ্ধতিতে রোগ নিরাময়ের দাবি প্রিন্ট, টিভি বা ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে প্রচারিত করে তবে তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। 

এদিকে দেখা যাচ্ছে হরিদ্বারে এই ওষুধ উৎপাদনের জন্যে লাইসেন্সের আবেদনে কোথাও করোনার চিকিৎসার নামগন্ধ নেই। অনুমতি নেয়া হয়েছিল ‘ইমিউনিটি’ বা শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্যে।

রিসার্চের নামে যা দেখা গেলঃ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালস রেজিস্ট্রি অফ ইন্ডিয়ার রেকর্ডেও এই প্রয়োগে পতঞ্জলির নাম আছে কিন্তু করোনিল বা শ্বসারির নাম নেই। রিসার্চের স্থান এবং ফলফলের জায়গা খালি।

৯৫ জনকে নিয়ে ৪৫ জনকে (ট্রিটমেন্ট গ্রুপ) ওষুধ দেয়া হয় এবং বাকি পঞ্চাশ জন ‘প্লেসিবো’গ্রুপ, অর্থাৎ যাদের ওই ওষুধ দেয়া হয়নি। কিন্তু এতে শুধু ২০ থেকে ৪০ বছরের লোককে নেইয়া হয়েছিল। অনেকেই উপসর্গবিহীন, বা সামান্য কিছু উপসর্গ। পুরো রিসার্চ ঠিকমত করলে অর্থাৎ চিকিৎসার পর ফলো-আপ পিরিয়ডের উপসর্গ, সাইড এফেক্ট এসব দেখতে গেলে দু’মাস লাগে। অথচ এঁরা একমাস পুরো হতে না হতেই ওষুধ বানিয়ে ফেললেন। কোন মেডিক্যাল জার্নালে রিসার্চের ফল এবং রিপোর্ট প্রকাশ করা দরকার মনে করেননি। রোগীদের ক্লিনিক্যাল রিপোর্ট যেমন কো-মরবিডিটি আছে কিনা, চিকিৎসার সময় এবং ডোজ, নারী-পুরুষ –এসব কোন রেকর্ড নেই।

ফলে মহারাষ্ট্রের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওই রাজ্যে আয়ুষ মন্ত্রকের অনুমতি না পাওয়া পর্য্যন্ত করোনিলের বিক্রি নিষিদ্ধ করে দিলেন। মুজফরপুর এবং জয়পুরে বাবা রামদেব এবং আচার্য বালকৃষ্ণের বিরুদ্ধে এফ আই আর হল। রাজস্থানের স্বাস্থ্যমন্ত্রী হুংকার দিয়ে মানুষের স্বাস্থ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলার অপরাধে কড়া ব্যবস্থা নেবেন বলে জানালেন।


ফের ম্যাজিকঃ শীর্ষাসন

সাতদিন গেল না। এবার ৩০ জুন তারিখে রামদেব এবং আচার্য বালকৃষ্ণ আবার প্রেস কনফারেন্স করলেন। বললেন – উনি আয়ুর্বেদকে বদনাম করার ষড়যন্ত্রের শিকার। উনি নাকি কখনই দাবি করেননি যে পতঞ্জলির নতুন ‘ক্লিনিক্যালি ট্রায়ালড” বটিকা করোনিল করোনা সারাতে পারে বা এই অষুধ খেয়ে করোনার রোগী সেরে গেছে। 

ওনার ঘোষণা অনুসারে আয়ুষ মন্ত্রক ওদের তিনটি ওষুধের প্যাকেজ—দিব্য করোনিল, দিব্য শ্বাসারি বটি এবং দিব্য অনুতৈলকে ‘প্রতিরোধ ক্ষমতা’ বৃদ্ধির ওষূধ হিসেবে বিক্রি করার লাইসেন্স দিয়েছে।

কিন্তু অ্যাডভোকেট তুষার আনন্দ দিল্লি হাইকোর্টে আবেদন দিয়ে প্রার্থনা করেছেন যে উচ্চ আদালত মিথ্যা দাবি করে লোকের প্রাণ নিয়ে খেলা করার অপরাধে বাবা রামদেবের বিরুদ্ধে এফ আই আর করার নির্দেশ দিক।

বাবার নানান কঠিন রোগ সারানোর দাবিঃ

বাবা রামদেবের ওষুধ নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। এর আগে উনি ক্যান্সার, এইডস (এইচ আই ভি), এমনকি সমকাম(!) সারানোর দিব্য আরোগ্যের দাবি করে হইচই ফেলেছিলেন। এঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং পতঞ্জলি আয়ুর্বেদের ৯৪% শতাংশের মালিক আচার্য বালকৃষ্ণও বিতর্কিত চরিত্র। ওঁর হাইস্কুল এবং সম্পূর্ণানন্দ সংস্কৃত ইউনিভার্সিটি থেকে পাশ করার কোন রেকর্ড পাওয়া যায়নি বলেও বলা যায়।সিবিআইওঁর বিরুদ্ধে নকল ডিগ্রির ভিত্তিতে পাসপোর্ট নেওয়ার অভিযোগে কেস করে। পাসপোর্ট ২০১১ সালে বাজেয়াপ্ত হয়ে যায়। সাত বছর পরে হাইকোর্ট শর্ত সহ পাসপোর্ট ফেরত দেওয়ার আদেশ দেয় ।


যোগগুরু থেকে ব্যবসায়ী?

২৩ জুন সন্ধ্যেয় ইন্ডিয়া টুডে টিভির সাক্ষাৎকারে বাবা রামদেব বলেন যে উনি ব্যবসা করেন না , জনতার সেবা করেন। অ্যাঙ্কর রাজদীপ সরদেশাই হেসে বলেন—ব্যবসা করছেন তো! এখন তেল টুথপেস্ট ঘি চাল ম্যাগি কোল্ড ড্রিংক এবং জিন্স—সবই তো বিক্রি করছেন। 

ন্যাশনাল অ্যান্টি-প্রফিটিয়ারিং অথরিটি (এন এ এ) গত মার্চ ২০১২ তারিখে এক রায়ে বাবা ফরামদেবের পতঞ্জলি আয়ুর্বেদ লিমিটেডকে ৭৫.০৮ কোটি টাকা পেনাল্টি জমা করতে বলে। ওঁর অপরাধ? জিএসটি (পণ্য এবং সেবা কর) দর কম হওয়ায় নিয়ম অনুযায়ী ওঁর কোম্পানির ওয়াশিং পাউডার বিক্রির সময় দাম কমানো উচিত ছিল। উনি তা না করে প্রডাক্টের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। এটা কেব্দ্রীয় জিএস টি আইনের উল্লংঘন। এই পণ্যটির উপর জিএসটি আগে ২৮% ছিল । পরে কমে প্রথমে ১৮% তারপরে ১২% হয়ে যায় । তাহলে পতঞ্জলির উচিত ছিল সেই হিসেবে দাম কমিয়ে দেওয়া যাতে করহ্রাসের সুফল গ্রাহক পায়।

রায়ে বলা হয়েছে ওই রাশি এবং ১৮% জিএসটি যোগ করে আগামী তিনমাসের মধ্যে কেন্দ্র ও রাজ্যসরকারের গ্রাহক কল্যাণ ফান্ডে জমা করতে হবে। ডায়রেক্টর জেনারেল অ্যান্টি-প্রফিটিয়ারিংকে (ডিজিএপি) আগামী চারমাসের মধ্যে অনুপালন/ কমপ্লায়েন্স রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে।

বিগত ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ তারিখে ডায়রেক্টরেট অফ রেভিনিউ ইন্টেলিজেন্স বাবা রামদেবের চীনে রপ্তানি করার সময় ৫০ টন( ৫০,০০০ কিলোগ্রাম) রক্তচন্দনের কাঠ বাজেয়াপ্ত করে। এর বিরুদ্ধে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি্‌ ২০১৮ তারিখে বাবা দিল্লি হাইকোর্টে রিট পিটিশন দাখিল করে বলেন—ওঁর কাছে ডায়রেক্টরেট জেনারেল অফ ফরেন ট্রেডের বৈধ অনুমতি আছে। আর এই কাঠ অন্ধ্রপ্রদেশের বনবিভাগের থেকে নীলামের মাধ্যমে কেনা।

বাবার পারমিট ছিল সি গ্রেড রক্তচন্দনের কাঠ রপ্তানি করার। রেভিনিউ ইন্টেলিজেন্স ওনার কনসাইনমেন্ট এই সন্দেহে জব্দ করে যে এতে গ্রেড এ এবং গ্রেড বি’র কাঠ রয়েছে। ঐ দুটো গ্রেড রপ্তানি করা নিষিদ্ধ।

ইকনমিক টাইমসের অনুসারে ২০১৪তে বিশ্ববাজারে এ গ্রেড রক্তচন্দনের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় দাম প্রতি টন ৩০ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ২ কোটি পৌঁছে যায়। হাইকোর্ট আগামী শুনানির তারিখ ১৮ই এপ্রিল ঠিক করেছিলেন। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় সরকার ও ডি আর আইয়ের জবাবও চেয়ে পাঠিয়েছিলেন। 

ব্যাপারটা তক্ষুনি মেটেনি। ডায়রেক্টর অফ রেভিনিউ ইন্টেলিজেন্স (ডি আর আই) ১ অগাস্ট, ২০১৮ তারিখে পতঙজলি আয়ুর্বেদ, এবং তার চিফ ফিনানসিয়াল অফিসার সমেত আরও আটজনকে শোকজ নোটিস জারি করে বলে কাঠের গুঁড়িগুলোর সঙ্গে কাগজে বলা কোড মিলছে না – অর্থাৎ স্মাগলিংয়ের ইঙ্গিত ।

হরিদ্বার কোর্ট বাবা রামদেবের কোম্পানি পতঞ্জলি আয়ুর্বেদ লিমিটেডকে ‘মিসব্র্যান্ডিং’ এবং মিসলিডিং অ্যাড’ এর জন্যে১১ লক্ষ টাকা ফাইন করেছিল। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের মতে ‘অন্য কম্পানির তৈরি মাল নিজেদের লেবেল লাগিয়ে বিক্রি’ করা ফুড সেফটি অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ড (প্যাকেজিং অ্যান্ড এবং লেবেলিং রেগুলেশন্স ২০১১) আইনের ধারা ৫২ (মিসব্র্যান্ডিং) এবং ধারা ৫৩ (মিস্লিডিং অ্যাড) এর উল্লংঘন।

এছাড়া পতঞ্জলির মধু, নুন, সরষের তেল, জ্যাম এবং বেসনের মান নিয়েও অভিযোগ ছিল। তার ভিত্তিতে ১৬ অগাস্ট, ২০১২ তারিখে কিছু স্যাম্পল জব্দ করে পরীক্ষা করা হয় , যা নির্ধারিত মানের চেয়ে কম পাওয়া যায়। পরীক্ষাটি উত্তরাখন্ডের একমাত্র অনুমোদিত রুদ্রপুর ল্যাবে করা হয়।আলাদা আলাদা করে ফাইন করলে মোট ১৮ লাখ টাকা ফাইন হত। ম্যাজিস্ট্রেট একসাথে ১১ লাখ টাকা ফাইন করে একমাসের মধ্যে জমা দিতে আদেশ দিয়েছেন। বলেছেন আবার যদি কোয়ালিটিতে খামতি পাওয়া যায় তাহলে আরও কড়া শাস্তি হবে। 

সন ২০১৭তে একটি আর টি আই পিটিশনের উত্তরে জানা যায় যে পতঞ্জলির দিব্য আমলা জুস এবং শিবলিঙ্গি বীজ সরকারি ল্যাব পরীক্ষায় ফেল করেছে। শিবলিঙ্গি বীজে ৩১.৬৮% ‘ফরেন ম্যাটার’ (অন্য পদার্থ) পাওয়া গেছে। আর আমলার জুসের পি এইচ ভ্যালু নির্ধারিত মান ৭ এর চেয়ে কম পাওয়া গেছে। এর ফলে অ্যাসিডিটি হতে পারে।

এর একমাস আগে পশ্চিমবঙ্গের পাবলিক হেলথ ল্যাবরেটরির পরীক্ষায় পতঞ্জলির আমলা জুস গুণমানের বিচারে পাস না করায় সেনাবাহিনীর ক্যান্টিন স্টোর্স ডিপার্টমেন্ট (সি এস ডি) এক ব্যাচ আমলা জুস ওখানে বিক্রি স্থগিত করে।

বৃন্দা কারাত ৩ জানুয়ারি, ২০০৬ তারিখে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী শিব বসন্তের একটি চিঠি নিয়ে দাবি করেন যে বাবা রামদেবের হার্বাল আয়ুর্বেদিক দিব্য ফার্মেসিতে তৈরি ওষুধে জড়িবুটি ভেষজ ছাড়া মানুষের হাড়ের গুড়ো এবং পশুর শরীরের অংশও মেশানো রয়েছে। কারাতের ইউনিয়নের সদস্য শ্রমিকেরা মে মাসে হরিদ্বারে দিব্য ফার্মেসির প্রেসকৃপশন এবং ওদের কাউন্টার থেকে কেনা ওষুধের রসিদ সহ স্যাম্পল নিয়ে সরকারি পরীক্ষার জন্যে জমা করে। ওরা জানায় যে একটি মৃগী সারানোর ওষুধে মানুষের খুলির হাড়ের গুড়ো এবং যৌনশক্তিবর্ধক ওষুধে (দিব্য যৌবনামৃতবটি) ভোঁদড়ের অন্ডকোষের পাউডার মেশানো হয়।

তখন বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক নেতারা -- শরদ পাওয়ার, লালুপ্রসাদ, মুলায়ম সিং, প্রকাশ জাবড়েকর, রাম মাধব এবং সুভাষ চক্রবর্তী--বাবার পক্ষে দাঁড়িয়ে যান; বৃন্দা কারাতকে মাল্টিন্যাশনালের পয়সাখাওয়া দালাল বলে আক্রমণ করা হয় । ওঁর ইউনিয়ন অফিসে হামলা হয়। এদিকে বাবা বৃন্দার দেওয়া স্যম্পলের প্রতি সন্দেহ প্রকাশ করেন কেননা ওই স্যাম্পল কোন সরকারি কর্মচারি বাজেয়াপ্ত করেনি। উনি নিজে কিছু স্যাম্পল দেন তাতে ভেষজ ছাড়া অন্য কিছু পাওয়া যায়নি।

তখন কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী অম্বুমনি রামদাস সংসদে জানান যে হায়দ্রাবাদের সরকারি ল্যাবে মানব ডিএনএ পাওয়া গেছে, অন্যগুলিতে পাওয়া যায়নি। আরও অনুসন্ধান দরকার। একমাস বাদে উত্তরাঞ্চল সরকার বাবাকে সকল অভিযোগ থেকে মুক্তি দেয়।

উইকিপিডিয়া বলছে --পতঞ্জলি আয়ুর্বেদ লিমিটেডে একটি ভোগ্যপণ্য উৎপাদক এবং বিতরক সংস্থা। এর ২০১৬-১৭ সালে ঘোষিত টার্ন ওভার (বছরের ব্যবসা) ১০২১৬ কোটি টাকা এবং ২০১৯ সালের হিসেবে এর সম্পদের মূল্য ৩০০০ কোটি টাকা।

শেষকথাঃ

ভারতে আক্রান্তের সংখ্যা আট লক্ষ ছুঁতে চলেছে। তবু বর্তমানে সর্বত্র শান্তিকল্যাণ বিরাজ করছে, কারণ আই সি এম আর ঘোষণা করেছে যে হায়দ্রাবাদের ভারত বায়োটেকের তৈরি করোনা ভ্যাকসিন ১৫ই আগস্ট, ২০২০ নাগাদ বাজারে আসবে। এই ভ্যাকসিন ২৯শে জুন মানব ভলান্টিয়ারদের উপর পরীক্ষার অনুমতি পেয়েছে। কিন্তু ২ জুলাই তারিখে এদের এক কর্তাব্যক্তি বিজ্ঞানীদের চিঠি ধরিয়েছেন -- মানুষের উপর পরীক্ষার তিনটে স্টেজ ( যা প্রোটোকল হিসেবে ছ’মাস লেগে যায় ) টপাটপ ছ’ সপ্তাহের মধ্যে শেষ করে ফেলতে হবে। যাতে ঘোষণা অনুযায়ী ১৫ আগস্ট নাগাদ বাজারে ভ্যাকসিন ছাড়া যায়। যদিও ৫ জুলাই রবিবারে ইন্ডিয়ান অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্স এক বিবৃতি দিয়ে বলেছে—এই ভ্যাকসিনের ঘোষিত সময়সীমা অযৌক্তিক এবং অভুতপূর্ব।

0 comments:

0

প্রবন্ধ - চিত্তরঞ্জন হীরা

Posted in


আপামর বঙ্গীয় সমাজ যখন রবীন্দ্রনাথের দিকে ঝুঁকে তখন কখনও কখনও মনে হয় না কি বাঙালির জীবনে নজরুল একটু পেছনে পড়ে রইলেন! তিনিওতো বহু রূপে আমাদের সামনে হাজির হয়েছেন। কবিতায়, গানে, গল্প-উপন্যাস, প্রবন্ধে-নিবন্ধে, শিশুসাহিত্যে-নাটকে। তিনি আমাদের কাছে আরও আরও বেশি প্রাসঙ্গিক এই কারণে যে বাংলা কবিতা যখন ভীষণরকম রবীন্দ্রনাথে আচ্ছন্ন ঠিক সে সময়ে তিনি এলেন নিজস্ব মেজাজে একেবারে নতুনের জয়ধ্বজা উড়িয়ে। আমাদের ভেবে দেখতে হবে রবীন্দ্রপরবর্তী বাংলা কবিতায় জীবনানন্দ যে ধারার প্রবর্তন করেছিলেন সেখানে নজরুলকে বাদ দিয়ে ধারাবিবর্তনের ইতিহাস লেখা কখনও সম্ভব কীনা!

সময় যখন দাবি করছে পালাবদলের, বুদ্ধদেব বসু, সুধীন্দ্রনাথরা ভাবছেন প্রভাব থেকে মুক্ত হতে না পারলে বাংলা কবিতা একঘেয়ে হয়ে পড়ছে, রবীন্দ্র ঘেরাটোপে আটকা পড়ে যাচ্ছে, বৈচিত্র্যের সন্ধান অবশ্যম্ভাবী, সে সময়ে নজরুলের আবির্ভাব। অবশ্য অশ্রুকুমার সিকদার মহাশয় তাঁর "হাজার বছরের বাংলা কবিতা"য় বলছেন –"রবীন্দ্রনাথের মাছি-মারা অনুকরণের অর্থ হবে নিজেই মরা, একথা বুঝতে পেরেছিলেন রবীন্দ্রনাথের কনিষ্ঠ সমসাময়িক যতীন্দ্রনাথ, মোহিতলাল আর নজরুল" - (পৃ : ১২৪)। কিন্তু আজকের বিচারে বিষয়টা একটু ভাবায়, যতীন্দ্রনাথ এবং মোহিতলালের প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধা রেখেও আমরা বলতে চাই তাঁরা কি যথার্থই রবীন্দ্রনাথের প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পেরেছিলেন! একটু মতভেদ রয়েছে। তবে তাঁরা যে একটা নতুন পথ খুঁজছেন সেকথা অবশ্যই মাননীয়। সে আভাস আমরাও লক্ষ্য করে থাকি। তবে সেভাবে দেখলে নজরুল এতটাই স্বতন্ত্র, তাঁর স্বতঃস্ফূর্ততা যেন সব প্রভাবকেই অমান্য করে। তিনি ত্রিশের দশকের আধুনিকতাবাদীদের তাঁর স্বতন্ত্রতা দিয়েই মুগ্ধ করেছেন, আপ্লুত করেছেন এবং আক্রান্ত করেছিলেন। জীবনানন্দের প্রথম কাব্যগ্রন্থ "ঝরা পালক" (১৯২৮) প্রকাশের পর তৎকালীন সমালোচকরা জীবনানন্দের কবিতায় নজরুলের প্রভাব দেখতে পেলেন। কেউ কেউ সত্যেন্দ্রনাথের প্রভাবের কথাও বলতে চেয়েছেন। এ নিয়ে আজকের দিনে মতভেদ উঠতেই পারে।

আসলে জীবনানন্দের এই পর্বের কবিতায় যে প্রকৃতিচেতনা, মানবতা এবং দেশপ্রেমের স্পর্শ পাওয়া যায়, তা থেকেই হয়তো সত্যেন্দ্রনাথ এবং নজরুলের প্রসঙ্গ এসেছে। অবশ্য তারপরই তিনি অর্জন করে নিয়েছিলেন একেবারে নিজস্ব ভাষা, স্বকীয় কণ্ঠস্বর। এখানে নজরুলের ভূমিকা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। কারণ পথটা তিনি দেখান। তাঁর কবিতার দৃঢ়তা এবং বলিষ্ঠতাই তাঁর স্বাতন্ত্র্য। তাঁর অদম্য আবেগকে তিনি হয়তো সুবিন্যস্ত করতে পারেননি, তবে নতুন আলোর পথ দেখিয়েছেন, এই স্বভাব ও মেজাজটাই ক্রান্তিকালের মুহূর্তে সবার প্রেরণা হয়ে ওঠে।

জীবনানন্দ এবং নজরুল দুজনেরই জন্মসাল ১৮৯৯; দুজনের প্রথম প্রকাশও একই সময়ে। জীবনানন্দের প্রথম প্রকাশ 'ব্রক্ষ্মবাদী' পত্রিকায়, 'বর্ষ আবাহন' কবিতাটির মাধ্যমে, ১৩২৬ বঙ্গাব্দে (১৯১৯ সাল)। ওই একই সময়ে নজরুলের 'মুক্তি' কবিতাটি প্রকাশিত হয় 'বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য' পত্রিকায়। তার দুবছরের (১৯২১) মাথায় 'মোসলেম ভারত' পত্রিকায় তাঁর 'বিদ্রোহী' কবিতাটি প্রকাশের পরই সাহিত্যসমাজে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। এতটাই আলোড়ন ওঠে যে পরপর 'বিজলী', 'প্রবাসী', 'সাধনা' এবং 'ধূমকেতু'তেও উক্ত কবিতাটি প্রকাশিত হয়। আমাদের মনে রাখতে হবে 'ধূমকেতু' নজরুল সম্পাদিত পত্রিকা, তার ১ম বর্ষ ১ম সংখ্যায় ( আগষ্ট ১৯২২ ) তিনি আবার কবিতাটি পুনর্মুদ্রণ করেন।

বিষয়টি হল সমকালে দাঁড়িয়ে দুই সমবয়সী কবি একই সময়ে দুভাবে রবীন্দ্রছায়া থেকে নিজেদের এবং বাংলা কবিতাকে মুক্ত করতে চাইছেন। দুভাবে বলতে জীবনানন্দ ছিলেন শুরু থেকেই অনেকটাই অন্তর্মুখী এবং আবেগ সংযত। আর নজরুল ছিলেন উচ্চকণ্ঠী, অদম্য দুঃসাহসী। স্বভাবত তাঁর আবেগের কোনও বাঁধন ছিল না। তাঁর কবিতার চড়া সুরই তাঁকে লোকপ্রিয় করে তুলেছিল। প্রসঙ্গত আমরা জানি ওই 'বিদ্রোহী' কবিতাটির জন্যেই তাঁকে আখ্যা দেওয়া হয় 'বিদ্রোহী কবি' বলে। আবার কখনও তিনি 'সাম্যবাদী কবি',কখনও 'সর্বহারা'র কবি। কিন্তু তাঁর বিদ্রোহী রূপ আর প্রেমিক সত্তা নিয়ে আমাদের মনে একটা দ্বন্দ্ব থেকে যায়। কোন্ সত্তাটি বড়! যেখানে তিনি লিখছেন–

কারার ঐ লৌহ-কবাট ভেঙে ফেল্ কর্ রে লোপাট
রক্ত-জমাট শিকল-পুজোর পাষাণ-বেদী। …

পাশাপাশি তিনি লিখছেন গজল গানগুলি, যার মধ্যে ঝরে পড়ছে প্রেমের তৃষ্ণা, যা অতৃপ্ত হয়েও অপরূপ। সেই বিখ্যাত গানটি, আমরা মনে করি একবার –

পাষাণের ভাঙালে ঘুম কে তুমি সোনার ছোঁওয়ায়।
গলিয়া সুরের তুষার গীতি-নির্ঝর ব'য়ে যায়।। …

এসব ক্ষেত্রে বুদ্ধদেব বসু আমাদের কাছে আজও পথপ্রদর্শক। তিনি তাঁর 'কবিতা' পত্রিকার দশম বর্ষ প্রকাশ করেছিলেন "নজরুল সংখ্যা" (১৩৫২ বঙ্গাব্দ, ১৯৪৫ সাল) হিসাবে। বাংলা সাহিত্য পত্রিকার ইতিহাসে প্রথম নজরুল সংখ্যা। সেখানে একটি নিবন্ধে তিনি লিখছেন, –"নজরুল সম্বন্ধে বলার কথা এইটেই যে তিনি একই সঙ্গে লোকপ্রিয় কবি এবং ভালো কবি – তাঁর পরে একমাত্র সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের মধ্যে এই সমন্বয়ের সম্ভাবনা দেখা গেছে। বলা বাহুল্য এ-সমন্বয় দুর্লভ, কারণ সাধারণত দেখা যায় যে বাজে লেখাই সঙ্গে-সঙ্গে সর্বসাধারণের হাততালি পায়, ভালো লেখার ভালোত্ব উপলব্ধি করতে সময় লাগে।"

কী চমৎকার বিশ্লেষণ বুদ্ধদেববাবুর! নজরুলের অনন্যতাকে যেমন তিনি প্রাধান্য দিয়েছেন আবার এই গদ্যে তাঁর চোখে উঠে আসা নজরুলের দূর্বলতাগুলিও তুলে ধরতে কুণ্ঠাবোধ করেননি, এতটাই কর্তৃত্ব ছিল তাঁর। তবে এই প্রসঙ্গে জীবনানন্দের কথাও বলতে হয়। নজরুল সম্পর্কে সেই সংখ্যায় তিনি লিখেছিলেন, –"কোনো এক যুগে মহৎ কবিতা খুব বেশি লেখা হয় না। কিন্তু যে বিশেষ সময়ধর্ম, ব্যক্তিক আগ্রহ ও একান্ততার জন্যে নজরুলের অনেক কবিতা সার্থক হয়েছিল – জ্ঞানে ও অভিজ্ঞতায় মূল্য-ও-মাত্রা-চেতনায় খানিকটা সুস্থির হয়েও আজকের দিনের অনেক কবিতাই যে সে তুলনায় ব্যাহত হয়ে যাচ্ছে তা শুধু আধুনিক বিমুখ সময়রূপের জন্যেই নয় – আমাদের হৃদয়ও আমাদের বিরূপাচার করে, অনেক সময়ই আমাদের মনও আমাদের নিজেদের নয় ; এই সাময়িকতার নিয়মই হয়তো তাই। কিন্তু নজরুলের ব্যক্তিকতা ও সময় এই বুদ্ধিসর্বস্বতা হাত থেকে তাঁকে নিস্তার দিয়েছিল।" কারণ নজরুল তখন সাহিত্যের পথ ছেড়ে দিয়েছেন এবং অসুস্থ হয়ে সময়ের ডামাডোলের বাইরে নিরালায় জীবন যাপন করছেন। 

যাহোক, নজরুল তাঁর লেখালেখিতে ব্যক্তিগত আদর্শ মেনে সময় ও সমাজকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন ভীষণভাবে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরপরই বাংলায় যে অহিংস-অসহযোগ আন্দোলন সংঘটিত হয়েছিল, সেখানে তাঁর 'বিদ্রোহী' কবিতাটি হয়ে উঠেছিল অগ্নিদীক্ষার মতো। তাঁর এই তেজ, দূরন্ত অভিনবত্বই আকর্ষণ করেছিল তখনকার কবি লেখকদের, বিশেষ করে 'কল্লোল', 'প্রগতি'র লেখকগোষ্ঠীদের। তিনি বেপরোয়া, দিলখোলা, গান লেখেন, গান বাঁধেন, পথে পথে গান গেয়ে মানুষের মন জয় করেন। ব্যক্তিগতভাবে রবীন্দ্রগানের ভক্ত, শুরুতে বিভিন্ন আসরে-আড্ডায় রবীন্দ্রনাথের গানই করতেন। কিন্তু নিজে যখন গানরচনায় মেতে উঠলেন দেখা গেল রবীন্দ্রপ্রভাব থেকে সে গান হয়ে উঠলো মুক্ত ও নতুন সুরের সন্ধানী।

সত্যেন্দ্রনাথের কথা আমরা যা বলতে চেয়েছিলাম, তখন রবীন্দ্রনাথের পর সত্যেন্দ্রনাথের প্রভাবও বাংলা কবিতায় কম নয়। অনেকের মধ্যেই তাঁর ছায়া লক্ষ্য করা গেছে। কিন্তু নজরুল ফূর্তিবাজ, জাত-বোহেমিয়ান হয়েও নিজের স্বতন্ত্রতার প্রতি সচেতন ছিলেন আশ্চর্যজনকভাবে। কোথাও কোথাও তাঁর লেখা একটু এলিয়ে পড়েছে বলে মনে হয়, কিন্তু রবীন্দ্র ও সত্যেন্দ্রছায়া কাটাতে তাঁর বিশেষ অসুবিধা হয়নি।

তিনি একাধারে কবি, গদ্যকার, গীতিকার, গায়ক, শিল্পী, অভিনেতা – এতকিছু সত্ত্বেও তাঁর গানের ক্ষেত্রটি বোধ হয় সবচেয়ে বিস্তৃত এবং রবীন্দ্রনাথের পাশাপাশি আজও অম্লান। তিনি সাম্যবাদী গানের স্রষ্টা, যাকে আমরা বলে থাকি গণসঙ্গীত। আবার বাংলা গজল গানে তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়। 'কল্লোল' পত্রিকা তাঁর প্রথম পর্যায়ের গজলগুলি প্রকাশ করেছিল। তাঁর গান নিয়ে বুদ্ধদেববাবু বলেছিলেন, –"নজরুলের সমস্ত গানের মধ্যে যেগুলি ভালো সেগুলি সযত্নে বাছাই ক'রে নিয়ে একটি বই বের করলে সেটাই হবে নজরুল-প্রতিভার শ্রেষ্ঠ পরিচয় – সেখানে আমরা যাঁর দেখা পাবো তিনি সত্যিকার কবি, তাঁর মন সংবেদনশীল, সূক্ষ্ম-কোমল, আবেগপ্রবণ উদ্দীপনাপূর্ণ। সে-কবি শুধু বীররসের নন, আদিরসের পথে তাঁর স্বচ্ছন্দ আনাগোনা, এমন কি হাস্যরসের ক্ষেত্রেও প্রবেশ নিষিদ্ধ নয় তাঁর।"

রবীন্দ্রনাথও কিন্তু তাঁর গানের স্থায়িত্ব সম্পর্কে নিজেই আশাবাদী ছিলেন। আমরা তার প্রমাণও পাই কালে কালে। শোনা যায় নজরুলের রচিত গানের সংখ্যা রবীন্দ্রনাথের চেয়েও বেশি। পৃথিবীতে কোনও একজন কবি এত বেশি গান লেখেননি। সংখ্যাটা চারহাজারের কাছাকাছি হতে পারে। তিনি অসুস্থ হওয়ার আগে পর্যন্ত গ্রামোফোন কোম্পানির ফরমায়েশে অনবরত গান লিখেছেন – প্রেমের গান, শ্যামাসঙ্গীত, ইসলামী সঙ্গীত, হাসির গান – সব মিলিয়ে এত এত গান! কিন্তু দুঃখের বিষয় সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে তার অনেক গান গ্রন্থাকারে সংকলিত হয়নি, তেমনি অনেক গানের অস্তিত্বই হয়তো বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

তবে একথা তো মানতেই হবে তাঁর সঙ্গীতের বিষয়বৈচিত্র্য এবং সুরের মাধুর্য আজও বাংলার মাটিকে স্পর্শ করে আছে। আমরা মাঝেমাঝেই বলে থাকি রবীন্দ্রনাথের 'গীতবিতান' শুধু গাওয়ার নয়, তার পাঠও আমাদের শুশ্রূষা। তাহলে নজরুলের গানের ক্ষেত্রেও কি একথা খাটে না ! আমরা পড়েই দেখি না! এই তো তিনি যখন বলছেন –

রিম্ ঝিম্ রিম্ ঝিম্ ঝিম্ ঘন বরষে।
কাজরী গাহিয়া চল পুর নারী হরষে।।

নিতান্তই সাধারণ গানের কথা, কিন্তু পাঠের পর মনে হয় না যে কী অপূর্ব এই রিম ঝিমের দোলাটা! এক বৃষ্টির ছন্দে অন্তরে সেই তরঙ্গ প্রবাহিত হচ্ছে! গুনগুন করে উঠছে ভেতরটা। এতে বিষাদভোলা এক কাব্যিক মূর্ছনা রয়েছে। যেন ছবিটাও ভেসে উঠছে চোখের উপর। কদমের ডালে, তমালের ডালে কুহু-পাপিয়া-ময়ূর এসে বসছে, দোল খাচ্ছে। মেঘ উড়ে উড়ে আসছে। কবির মনে হচ্ছে যেন নট-শ্যাম-সুন্দর। মন-যমুনায় ঢেউ উঠছে, কূলহারা ঢেউ। ঘর ছাড়া বাঁশিটিও তখন বেজে উঠলো। মন তখন রাধা হয়ে ওঠে, ঘরে তার যেন আর বাঁধ মানছে না।

এই হল তার আবহ। এই যে সুর দিয়ে নিসর্গকে জাগানো, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন ভেঙে নতুন ভাবচৈতন্যে প্রেমের অবস্থান নির্ণয়, এখানেই তিনি রবীন্দ্রনাথ থেকে নিজের মতো করে আলাদা হতে চাইলেন। রবীন্দ্রনাথ হয়তো তাঁর গানের বাণী ও সুরে অন্তরকে জাগিয়ে তুলতে চান, আর সেখানে নজরুল আত্মার বাইরেকে বাজিয়ে তুলতে চান। এইতো আমরা আবার যেখানে পড়ছি–

তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয়, সে কি মোর অপরাধ?
চাঁদেরে হেরিয়া কাঁদে চকোরিনী, কিছু বলেনাত কিছু চাঁদ।। 

অতি সাধারণ কথায় এক অনন্য প্রেমানুভূতি। খুব চেনা গান। কিন্তু পাঠের সময় মনে হয় উপলব্ধিটুকুও সুরের সঙ্গে প্রাণের মাধুর্য নিয়ে বাতাসে ঘুরছে। কী চমৎকার বলেছেন–

মেঘ হেরি' ঝুরে চাতকিনী, মেঘ করেনাত' প্রতিবাদ।।
জানে সূর্য্যেরে পাবে না, তবু অবুঝ সূর্য্যমুখী
চেয়ে চেয়ে দেখে তার দেবতাকে, দেখিয়াই সে যে সুখী। 

এ প্রসঙ্গে আবার বুদ্ধদেব বসুর কথাই মনে পড়ে। কারণ তিনিই বলার সাহস জোগান। তিনি বলেছিলেন –“'বিদ্রোহী' কবি, 'সাম্যবাদী' কবি, কিংবা 'সর্বহারা'র কবি হিশেবে মহাকাল তাঁকে মনে রাখবে কিনা জানিনে, কিন্তু কালের কণ্ঠে গানের মালা তিনি পরিয়ে দিয়েছেন, সে-মালা ছোট কিন্তু অক্ষয়। আর কবিতাতেও তাঁর আসন নিঃসংশয়, কেননা কবিতায় তাঁর আছে শক্তি, আছে স্বাচ্ছন্দ্য, আছে সচ্ছলতা, আর এগুলিই কবিতার আদি গুণ।"

তাঁর ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ আমরা খুব বেশি নাইবা তুললাম। তাঁর দারিদ্র্য, তাঁর অভাব…। তিনি মাটির মানুষ, তাইতো সারাজীবন থেকেছেন মাটির কাছাকাছি। এখানেও রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর একটা বেসিক পার্থক্য আমরা লক্ষ্য করি। রবীন্দ্রনাথ অবস্থাসম্পন্নতার মধ্যে থেকে জীবনকে দেখেছেন নিজস্ব পঠন-পাঠন, শিক্ষা এবং উপলব্ধির মাধ্যমে, আর নজরুল জীবনকে দেখেছেন জীবনের কাছাকাছি থেকে, কঠিন বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে। বাবার অকালমৃত্যুতে বালক বয়সেই সংসার চালানোর জন্যে কাজ করেছেন কখনও রুটির দোকানে, কখনও মক্তবের শিক্ষকতা, কখনও লেটোর দলে গান বাঁধার কাজ। দশম শ্রেণীতে পড়তে পড়তেই যোগ দিয়েছিলেন ইংরেজ সেনাবাহিনীর বাঙালি পল্টনে। ১৯১৭ থেকে ১৯২০ অর্থাৎ বয়স তখন ১৮ থেকে ২০ ; লেখালেখি শুরু তখনই। তবে আমরা বলবো লেটোর দলের গান বাঁধতে বাঁধতেই সাহিত্যের সঙ্গে তাঁর আত্মার সংযোগ ঘটে যায়।

করাচির সেনানিবাসে থাকতে থাকতে তিনি একাধিক গল্প লিখেছিলেন – 'ব্যথার দান', 'হেনা', 'বাদল-বরিষণে', 'অতৃপ্ত কামনা' ইত্যাদি। সেই সব লেখায় উদ্ধৃতি হিসাবে রবীন্দ্রনাথের গান এসেছে, হাফিজের গজল, রুমির গজল–এসব তিনি ব্যবহার করেছেন। ছাত্রজীবন ব্যাহত হয়েছে কর্মজীবনের কারণে, কিন্তু যেভাবে তিনি তাঁর লেখালেখির মধ্যে বৈষ্ণব পদাবলী এনেছেন, রামায়ণ, মহাভারত, কোরআন, পুরান, ভাগবত তথা আরবি, ফারসি, উর্দু, সংস্কৃত ভাষার মিশ্রণ ঘটিয়েছেন তাতে সহজেই অনুমান করা যায় তাঁর জ্ঞানতৃষ্ণা কখনও থেমে থাকেনি। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় যাকে বলা হয় 'স্বাধীন পাঠ'। তাঁর গানের মধ্যে আমরা পাই শাস্ত্রীয় ও ধ্রুপদী সঙ্গীতের ছোঁয়া, রয়েছে যাত্রা, কথকতা, সুফি, বাউল, ফকির, সাধুসন্ন্যাসীদের জীবনচর্যার ছোঁয়া। এই স্বশিক্ষিত মানুষটিকে যেন সংস্কৃতির ভুবনে আমরা একটু খাটো করেই দেখলাম !

একটা কথা আমাদের বারবার মনে এসে পড়ে, যতবার তাঁর লেখা ইংরেজের রোষানলে পড়েছে ততই তাঁর কবিতার পাঠকপ্রিয়তা বেড়েছে, গ্রন্থের বাজার কাটতি হয়েছে, একাধিক সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। যদিও কালের বিচারে এসবের স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। কিন্তু ওই যে নজরুল "একই সঙ্গে লোকপ্রিয় এবং ভালো কবি" ( বুদ্ধদেব বসু )। আমরা আজও তাঁর কিছু কবিতার প্রতি আকৃষ্ট তো হই। এ সমন্বয় সত্যিই দুর্লভ। 

১৯২৮ থেকে ১৯৪২ পর্যন্ত তিনি গ্রামোফোন কোম্পানির হয়ে কাজ করেছেন। তাঁকে ঘিরে ওই সময়ে কোম্পানির গীতিকার সুরকারদের একটি সংগঠন 'সুরসভা' গড়ে উঠেছিল। আধুনিক বাংলা গানের উদ্ভব সেইসময়ে একে অন্যের ভাবনার আদানপ্রদান থেকেই। গীতিকার-কবি প্রণব রায়, সুরকার কমল দাশগুপ্তর কথা নিশ্চয়ই মনে পড়বে। টপ্পা, ঠুংরি, কীর্তন, ভজন, ভক্তিগীতির বাইরে তাঁরা প্রেম ও প্রকৃতি নিয়ে গানে কাব্যের সুষমা ও সুরের মেলোডির সমন্বয় গড়ে তোলার নানারকম কাজ করেছেন। কমল দাশগুপ্ত নজরুলের অনেক গানের সুর করেছেন। এভাবেই আধুনিক গানের একটি ধারা প্রবর্তিত হয়। এখানেই রয়েছে নজরুলের লোকপ্রিয়তার সঙ্গে সঙ্গে কালাতীতের ঐশ্বর্যদানের এক অপার মহিমা।

লেখালেখির শুরুতে তাঁর বেশিরভাগ কবিতা প্রকাশিত হত 'মোসলেম ভারত' পত্রিকায়। তাঁর একটা বিশেষ কারণ হয়তো তিনি যেখানে থাকতেন মেডিকেল কলেজের সামনে ৩২নং কলেজ স্ট্রিটে, তার পাশের ঘরেই ছিল ওই পত্রিকার দপ্তর। তাঁর রুমমেট ছিলেন তৎকালীন কমিউনিষ্ট নেতা শ্রদ্ধেয় মুজফ্ফর আহম্মদ। তাঁদের বন্ধুত্ব নিবিড় হওয়া সত্ত্বেও নজরুল সমাদৃত ছিলেন সব রাজনৈতিক মহলে। তিনি কার্যত কংগ্রেসের সদস্য ছিলেন। কিন্তু প্রথাসিদ্ধ কোনও রাজনৈতিক গণ্ডিতে আবদ্ধ হতে চাননি। তাঁর গান ও কবিতার জোরেই তিনি ছিলেন সব রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক দলের রসিকজনের একান্ত প্রিয়।

১৯২১-এ কুমিল্লার পথ-ঘাট তিনি উত্তাল করেছিলেন অহিংস-অসহযোগ আন্দোলনের মিছিলে গান গেয়ে। তাঁর 'বিদ্রোহী' কবিতার পরপরই লেখা "কারার ঐ লৌহ কপাট" অর্থাৎ 'ভাঙার গান'। তাঁর গানে উদ্বেলিত আপামর স্বদেশীর প্রাণ। তাঁর গানই পরাধীনতার বিরুদ্ধে, শোষণের বিরুদ্ধে, বঞ্চনার বিরুদ্ধে আপোষহীন সংগ্রামের এক হাতিয়ার হয়ে ওঠে। এটাই তাঁর প্রধান শক্তি, প্রধান জোরের জায়গা। তবে দেখা গেছে যেখানেই মনের মিল পাননি, সেখানেই তিনি স্থির থাকতে পারেননি। হয় প্রতিবাদী হয়েছেন, নাহলে সরে এসেছেন। এমন একটা অবস্থার মধ্যেই তিনি শুরু করেছিলেন 'ধূমকেতু' পত্রিকাটির প্রকাশ।

বিষয়টা হলো, ১৯২০ সাল থেকেই তিনি জড়িয়ে ছিলেন 'নবযুগ' পত্রিকার সঙ্গে। পত্রিকাটি প্রকাশিত হত তাঁর এবং মাননীয় মুজফ্ফর আহম্মদের যুগ্ম-সম্পাদনায়। এখানেই তাঁর সাংবাদিকতার হাতেখড়ি। এখানেই তিনি হাত পাকান সম্পাদকীয় হিসাবে ধারালো গদ্যরচনায়। খুবই পাঠকপ্রিয় হয়ে উঠেছিল সেইসব গদ্য। সেই নিবন্ধগুলির একটি নির্বাচিত সংকলন প্রকাশ পায় ১৯২২-এ। প্রকাশের পর সরকার সেটি বাজেয়াপ্ত করে। তখন 'নবযুগ'-এর প্রকাশও সাময়িক বন্ধ হয়ে যায়। তিনি তখন মহম্মদ আকরাম খাঁর 'সেবক' পত্রিকার সম্পাদকীয় বিভাগে যোগ দেন। কিছুদিনের মধ্যে কবি সত্যেন্দ্রনাথের মৃত্যু উপলক্ষে তিনি একটি সম্পাদকীয় গদ্য লেখেন। কিন্তু নিবন্ধটি তাঁর অজ্ঞাতে কিছুটা পরিবর্তিত হয়ে প্রকাশিত হওয়ায় তিনি অপমানিত বোধ করেন। পত্রিকার সঙ্গে সংযোগ ছিন্ন করেন এবং 'ধূমকেতু'র প্রকাশ শুরু করেন। এই পত্রিকা প্রকাশের সঙ্গেও বেশ কিছু ঘটনা জড়িয়ে রয়েছে, সে প্রসঙ্গে এখানে খুব বেশি প্রয়োজনীয় নয় বরং অন্য একটি প্রসঙ্গ এখানে মাথায় এলো।

অনেকেই বাঙালি মুসলমান সম্পাদিত পত্রিকার তালিকা বা ইতিহাস রচনায় আগ্রহী হয়েছেন, বিভিন্ন কালে, বিভিন্ন সময়ে। এখনও কারও কারও মধ্যে এই উদ্যোগ লক্ষ্য করা যায়। এর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নানা মত থাকতে পারে। মুসলিম জনমত গঠন বা তাঁদের উদ্বুদ্ধ করার ক্ষেত্রে এর ভূমিকার কথাও কেউ কেউ উল্লেখ করেছেন। অনেক ক্ষেত্রেই লক্ষ্য করা গেছে শুরু থেকেই পত্রিকাগুলোতে হিন্দু-মুসলমানদের মিলনের কথা বলা হচ্ছে। আমাদের প্রশ্ন হল মিলনের কথা যখন বলতেই হচ্ছে তার মানে বিভেদ সৃষ্টি হয়েছিল বলেই মিলনের ডাক দিতে হচ্ছে। এই ধরনের গবেষণার মধ্যে কোথাও যেন একদেশদর্শিতার একটা আভাস লুকিয়ে থাকে। আমাদের নানারকম সীমাবদ্ধতা থাকতেই পারে, কিন্তু আরেকটু উদার ও নিরপেক্ষ হওয়ার চেষ্টা থাকায় দোষ কোথায়!

যাহোক নজরুলের 'ধূমকেতু' প্রকাশে আমরা নিশ্চয়ই মুসলিম সমাজের বাণী বহন করার উদ্দেশ্য খুঁজতে বসবো না ! কারণ সে সুযোগ তিনি দেননি। আমরা যদি 'নবনূর', 'কোহিনুর', 'মোসলেম ভারত' (এই তিনটি পত্রিকারই জন্মসাল ১৯১১) বা 'নবযুগ' (১৯২০) প্রভৃতি পত্রিকা প্রকাশের দিকে তাকাই তাহলে দেখবো এই পত্রিকাগুলির মূলত লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশের বিরোধিতা। নজরুলও 'ধূমকেতু'র (১৯২২) প্রকাশ শুরু করেন এমন একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক আদর্শ নিয়ে। আর স্বাধীন সত্তায় আপোষহীন ভাবে নিজের মনের কথা বলার জন্যে স্বাধীন একটা মুখপত্র তিনি চেয়েছিলেন। তাঁর বিস্ফোরণের একটা আধার খুব জরুরি মনে হয়েছিল। 'ধূমকেতু' তাঁর সেই প্রয়োজন মিটিয়েছিল। খুব স্বল্প সময়ে মোট বত্রিশটি সংখ্যা প্রকাশিত হয় (১১আগষ্ট ১৯২২ থেকে ২৭ জানুয়ারি ১৯২৩)। এই সামান্য সময়ে তাঁর শাণিত বক্তব্য প্রকাশে কোনও অভিভাবকীয় শাসন আর রইলো না। কিন্তু তাঁর এই উদ্ধত ও দুঃসাহসিক কলমের দিকে পুলিশের ছিল কড়া নজর।

নজরুল 'ধূমকেতু'র প্রথম সংখ্যাতেই ঘোষণা দিয়েছিলেন, –"রাজভয়, লোকভয়, কোনো ভয়ই আমায় বিপথে নিয়ে যাবে না।" এই কারণে হয়তো প্রথম থেকেই সরকারের লোক 'ধূমকেতু'কে উগ্রপন্থী পত্রিকা বলে চিহ্নিত কর রেখেছিল। এর নেপথ্যে কোনও সন্ত্রাসবাদী বা উগ্রপন্থী দলের কোনও সংযোগ না পেলেও পুলিশের কড়া নজর তাঁকে কখনও তিষ্ঠোতে দেয়নি। পত্রিকার ২৬ সেপ্টেম্বর ১৯২২ (প্রসঙ্গত পত্রিকাটি সপ্তাহে দুদিন এই হিসাবে প্রকাশিত হতো) সংখ্যায় প্রকাশিত হল তাঁর 'আনন্দময়ীর আগমনে' কবিতাটি এবং এগারো বছরের এক সদ্য কিশোরী লীলা মিত্রর একটি ছোট গদ্য 'বিদ্রোহীর কৈফিয়ৎ'। রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে ৮ নভেম্বর ১৯২২ লেখাদুটিকে বাজেয়াপ্ত করা হয়। সম্পাদক নজরুল এবং প্রকাশক আফজালুল হকের নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়। ২৩ নভেম্বর কুমিল্লায় তিনি গ্রেফতার হন। ১৯২৩-এর ২৭ জানুয়ারি কলকাতার চীফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট সুইনহো রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধে তাঁকে একবছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেন। কারাগারে তিনি অনশনে ব্রতী হন, একটানা ৩৯ দিন অনশন করেন। তাঁর অনশনে উদ্বিগ্ন হয় সাহিত্যসমাজ। রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং প্রেসিডেন্সি জেলে তাঁর অনশন ভাঙার জন্যে টেলিগ্রাফ করেছিলেন এই বলে –"Give up hunger strike, our literature claims you." জেল কর্তৃপক্ষ "addressee not found" বলে সেই টেলিগ্রাফ ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছিল। আরও জানা যায় দৌলতপুরের জনৈকা বিরজাসুন্দরী দেবী, যাঁকে তিনি মা বলে ডাকতেন, তাঁর অনুরোধে শেষ পর্যন্ত তিনি অনশন ভঙ্গ করেন।

তাঁর সম্পর্কে বলার কোনও শেষ নেই। তাঁকে নিয়ে এত কম আলোচনা হয়, ভাবতে অবাক লাগে। আজ বলতে বসলে অনেক অনেক কথা উঠে আসবে, বিশেষ করে ইতিহাসের অহিংস-অসহযোগ আন্দোলন ও খেলাফৎ আন্দোলনের কথা। এসময়ে তাঁর কলম হয়ে ওঠে শাণিত তলোয়ারের মতো। আমরা যে তথ্য পাই সেখানে দেখা যাচ্ছে,–"অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের তত্ত্বগত চরিত্রের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা থাকলেও, নেতৃত্বের প্রতি ভক্তি তেমন ছিল না। লক্ষ্য করা যাবে, 'ধূমকেতু'র অজস্র লেখায় আন্দোলনকে নানান দিক থেকে বিশ্লেষণ করে কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে, কখনো কখনো সংশোধনের পথও নির্দেশিত হয়েছে।" (নজরুল ও ধূমকেতু /সাহারার জাহান, দেশ ১৩৯৭, সাহিত্য সংখ্যা)।

এই আন্দোলনের পাশাপাশি খেলাফৎ আন্দোলন সম্পর্কেও এই পত্রিকায় নিয়মিত বিভিন্ন খবর ও প্রবন্ধ প্রকাশ পেত। ঘটনা হল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষে তুরস্কের খেলাফৎ উচ্ছেদের চক্রান্ত ফাঁস হলে সারা বিশ্বে মূলত মুসলমান সমাজ প্রতিবাদে মুখর হয়ে ওঠে। ভারতীয় মুসলমানরাও স্বাভাবিকভাবে একে সমর্থন জানান। শুরু হয় খেলাফৎ আন্দোলন। এই প্রসঙ্গে 'ধূমকেতু'তে তুরস্ক সংকটের যাবতীয় সংবাদ এবং একাধিক সাহসী নিবন্ধ প্রকাশ পেতে থাকে। এই খেলাফৎ আন্দোলন নিয়েও অনেক কথা আছে। নজরুলের মতো উদার, অসাম্প্রদায়িক, প্রগতিশীল কবির মধ্যযুগীয় খলিফাতন্ত্র বা ধর্মভিত্তিক আন্দোলনকে কীভাবে সমর্থন করলেন তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। আসলে তাঁর খেলাফৎ আন্দোলনের সমর্থনের মূলে ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী চেতনা। এই আন্দোলনকে তিনি সমর্থন করলেও এর প্রতি যে ততটা আন্তরিক ছিলেন না সে প্রমাণ 'ধূমকেতু'র পাতায় রয়েছে। আমাদের কাছে লক্ষ্যণীয় হল তাঁর লেখনি। যেমন গদ্যে তিনি হয়ে উঠলেন কঠোর বিশ্লেষক, তেমনি এসময়ে তিনি কবিতা ও গানের অন্তরাত্মার জাগিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন মুক্তি সংগ্রামের প্রবল আওয়াজ। এই আন্দোলনের প্রভাবে তিনি হয়ে ওঠেন সাম্যবাদী ও স্বদেশী গানের স্রষ্টা, শিল্পী। তিনি তাঁর লেখনি দিয়ে জাগিয়ে তুলতে চেয়েছিলেন নৈরাশ্যতাড়িত যুবসমাজকে। তাঁর সৃষ্টির মধ্যে একদিকে প্রেম অন্যদিকে বৈপ্লবিক চেতনা।

আরেকটি বিষয় অবশ্যই লক্ষণীয় – তা হল নারী জাগরণ। তিনি বিশ্বাস করতেন নারীর মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠা না হলে সমাজের মুক্তি বা জাগরণ সম্ভব নয়। আমরা জানি রামমোহন, বিদ্যাসাগরের হাত ধরে যে আন্দোলনের শুরু হয়েছিল সমাজ কিন্তু সংস্কারের বেড়াজালে সেখানেই আবদ্ধ। নজরুলও বিষয়টি উপলব্ধি করেছিলেন। তিনি এও বিশ্বাস করতেন নারী-জাগরণে নারীকেই এগিয়ে আসতে হবে সবার আগে। তাঁর পত্রিকা 'ধূমকেতু'তে মহিলাদের জন্যে একটি বিভাগ ছিল 'সন্ধ্যা-প্রদীপ'। মেয়েদের স্বাধীন মতপ্রকাশের জন্যে বিভাগটি ছিল উন্মুক্ত। সেখানে নারীজাতির বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনা প্রবন্ধ প্রকাশিত হতো।

তিনি চেয়েছিলেন ভারতবর্ষের পূর্ণ স্বাধীনতা। এই স্বাধীনতার জন্যে চেয়েছিলেন আত্মার বিদ্রোহ। এই বিদ্রোহের জন্যে চেয়েছিলেন তারুণ্যের জাগরণ। আর সেই জাগরণের জন্যে চেয়েছিলেন সমাজের বলিষ্ঠ প্রত্যয়। বাইরের আবেগ ভেতরেও প্রবাহিত হয়েছে সমানভাবে, কারণ দেশের জন্যে তিনি ছিলেন দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। তিনি যেমন জাতির জন্যে উৎসর্গিত এক বাঙালি প্রাণ তেমনি একজন খাঁটি বাঙালি কবি। প্রতিভাদীপ্ত তাঁর বহুমুখী জীবনের প্রতিটি কর্মকাণ্ড আজও সমান উজ্জ্বল।

অসামান্য প্রতিভাসম্পন্ন না হলে এত এত কাজের মধ্যে এত এত গান, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নাটক, চিত্রনাট্য, শিশুসাহিত্য তিনি রচনা করে গেছেন। এছাড়া মৌলিক কবিতা তো রয়েছেই। দেখা যাচ্ছে তাঁর সৃষ্টিকাল মাত্র ২২ বছরের। এর মধ্যেই এত সৃষ্টি, যা অকল্পনীয়। তবে কিছু কিছু লেখার ক্ষেত্রে কোথাও কোথাও একটু পরিমার্জন হয়তো দাবি করেছিল। এমনটা অনেকেরই মনে হয়েছে। বুদ্ধদেববাবু তখন বলেছিলেন,–"কত গান সুন্দর আরম্ভ হয়েছে, সুন্দর চ'লে এসেছে, কিন্তু শেষ স্তবকে কোনো-একটা অমার্জিত শব্দ-প্রয়োগে সমস্ত জিনিশটাই গেছে নষ্ট হয়ে। তাঁর প্রেমের গান সরস, কমনীয়, চিত্রবহুল ; কিন্তু তার রস আমাদের মধ্যে ঘনীভূত হ'তে -হ'তে হঠাৎ কোনো স্থূল স্পর্শ এসে প্রায়ই মনকে বিমুখ করে দেয়।" আরও হয়তো কোথাও কোথাও মনে হয়েছে যৌবনের তারল্য থেকে তিনি মুক্ত হতে পারেননি কখনও‌। একজন কবির জীবনদর্শনের গভীরতা তাঁর কাব্যকে ক্রমশ রূপলোক থেকে ভাবলোকে উত্তীর্ণ করে। প্রতিভাকে যত্নে লালন করা, যাকে বলা হয় সাহিত্যের গৃহিনীপনা। নজরুলের ক্ষেত্রে যা অনেকটা অনুপস্থিত।

এতসব সত্ত্বেও আমরা বলবো কোনও মানুষ যেমন ত্রুটিহীন নয়, তেমনি কোনও স্রষ্টাও স্বয়ংসম্পূর্ণ নন। ভোলা কি যায়, তিনি যখন আমাদের শোনান –

আমায় নহে গো, ভালবাস শুধু, ভালবাস মোর গান।
বনের পাখিরে কে চিনে রাখে গান হলে অবসান।।

বা,

খেলিছ এ বিশ্ব ল'য়ে বিরাট শিশু আনমনে।
প্রলয়-সৃষ্টি তব পুতুল খেলা
নিরজনে প্রভু নিরজনে।।

এই অতুলনীয় কথা ও সুরের সমারোহ আমাদের আজও ভাসিয়ে নিয়ে যায়। রবীন্দ্র গান এবং নজরুলের সঙ্গীত দুটি ভিন্ন আবহ, আমরা সহজেই আলাদা করতে পারি। তাঁর অসামান্য গজল, ভজন, ধ্রূপদীয়ানা যেন সহজাত প্রতিভার স্ফূরণ। মূলধারা থেকে স্বতন্ত্র গতি ও মূর্ছনারই আভাস দেয়। একটা সময় রবীন্দ্র এবং নজরুল বিতর্ক দুই দেশের মধ্যে কিছুটা উত্তপ্ত হয়েছিল। এই যে আমি রবীন্দ্রগান আর নজরুলসঙ্গীত বললাম, বিতর্কটা এর মধ্যেও। আমরা রবীন্দ্রসঙ্গীত এবং নজরুলগীতি বলতেই অভ্যস্ত হয়েছি। এই বিতর্কটাও এখানে উহ্য থাক।

চল্লিশের দশকের সাম্যবাদী কবিরা প্রাণিত হয়েছিলেন তাঁর কবিতায়‌। সুকান্ত এবং নজরুল। আজও অনেকেই প্রত্যক্ষে বা পরোক্ষে তাঁর কাব্যাদর্শের প্রেরণা বহন করে চলেছেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাল্টেছে শুধু ভাষা ও প্রকরণ। এ প্রসঙ্গে অজস্র উদ্ধৃতি উল্লেখ করা যায়। সে বিষয় না হয় আমরা আবার কোনোদিন উত্থাপন করবো। এখানে কথা হল তিনি একজন আধ্যাত্মবাদী, কিন্তু ধর্ম থেকে মানুষকে গুরুত্ব দিয়েছেন বেশি। মানুষের কথাই বলে এসেছেন সমগ্র ক্রিয়াশীল জীবনে। কেউ যদি বলে থাকেন,– তিনি হলেন আগামীর কোলে গত শতকের বিদায়কালের এক প্রীতি-উপহার, সে কথা মনেহয় যথার্থ।

কেউ বলছেন তাঁর কবিতা চমৎকার কিন্তু মানোত্তীর্ণ নয়। একজন স্রষ্টার সব সৃষ্টিই যে মানের উত্তরণ ঘটাবে এমন কথা জোর দিয়ে বলা যায় না। কিন্তু প্রতিভা চিনতে কোনও অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। জীবনানন্দ অন্তর্মুখী কবি ছিলেন। নিজের লেখার প্রতি কখনও তৃপ্ত হতেন না, রূপলোক থেকে ভাবলোকে উত্তরণের চূড়ান্ত সাড়া না পাওয়ায় অধিকাংশ লেখাই অপ্রকাশিত রেখে চলে যান। আমাদের কাছে নজরুলের সফল সৃষ্টিগুলোই প্রাণের স্পন্দন। আমরা না হয় সেদিকেই ফিরে ফিরে তাকাবো বারবার।

যে কথা বলতে বলতে এতটা পথ চলে আসা, সেটি হল, নজরুল হলেন এমন এক স্রষ্টা, এমন এক শব্দশ্রমিক, যিনি শুরু থেকেই সহজাত প্রতিভাবলে স্বকীয়তায় উজ্জ্বল এবং থেমেও গেলেন সুদূর প্রসারী অপরিহার্যতা রেখে। পৃথিবীতে যতদিন বঞ্চনা থাকবে, শোষণ থাকবে, নিপীড়ন থাকবে, বাঙালি হিসাবে নজরুলকে ভোলা অসম্ভব। আমার ভাবতে ভালো লাগে সবার হৃদয়ে যদি রবীন্দ্রনাথ থাকেন, তাহলে চেতনায় রাখুন নজরুলকে। খুব কি ক্ষতি হয়ে যাবে তাতে! গানটা তো বাজছে…।

0 comments:

0

প্রবন্ধ - মলয় রায়চৌধুরী

Posted in


শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ‘কিন্নর কিন্নরী’ উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৭৬ সালে, ঘটনাগুলো ১৯৫৬ থেকে ১৯৬০ সালের, চাইবাসায় টানা যতদিন ছিলেন, সেসময়ের। তাঁর ‘কুয়োতলা’ উপন্যাস, যা তাঁর শৈশবের কাহিনি, সে উপন্যাসে তিনি নিজের নাম দিয়েছিলেন নিরুপম; পরে নিজের জীবনের ঘটনাবলী নিয়ে যে আখ্যানগুলো লিখলেন, প্রতিটি উপন্যাসে তিনি নিরুপম। ‘কিন্নর কিন্নরী’, যা তাঁর প্রথম প্রেম, কবি হয়ে ওঠা এবং কবিবন্ধুদের নিয়ে, এই আখ্যানে তিনি নিরুপম নামটা বাদ দিয়ে নিজেকে বললেন পার্থ। 

উপন্যাসটিতে সুনীল, সন্দীপন, দীপক, উৎপল আছেন, এবং আছেন সমীর রায়চৌধুরী আর আছে চাইবাসা, লুপুংগুটু ঝর্ণা, রোরো নদী, হেসাডির অরণ্য, মধুটোলা, সেনটোলা। উপন্যাসটিতে সমীর রায়চৌধুরীর অদ্ভুত প্রেম নিয়ে একটি সাবপ্লট আছে। কাকে কি নাম শক্তি দিয়েছেন তা যাঁরা চাইবাসার ঘটনাবলী জানেন তাঁরাই বলতে পারতেন। বইটি শক্তি উৎসর্গ করেছিলেন শান্তি লাহিড়ি আর তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী খুকুকে; শক্তির প্রেমিকার সবচেয়ে ছোটো বোন খুকু, যাঁকে শক্তি নাম দিয়েছেন বিন্তি। প্রেমিকা শীলা চট্টোপাধ্যায়ের নাম দিয়েছেন নয়ন, সবচেয়ে বড়ো বোন মন্টি, যার বিয়ে হয়ে গেছে, তার নাম দিয়েছেন চয়ন, অবিবাহিত বোনেদের নাম দিয়েছেন ময়ন, ইন্তি, বিন্তি, ভাই সন্তুর নাম শানু। সমীরের নাম শম্ভু, সুনীলের নাম হিরণ্ময়, সন্দীপনের নাম সনাতন, দীপকের নাম শর্বরী। পার্থ নামের মতোই, প্রতিটি নামই গোপন বার্তাবহ।


ষোলো পর্বের ‘কিন্নর কিন্নরী’র অষ্টম পর্বে চাইবাসায় মধুটোলার ছোটোঘরে শক্তি তাঁর প্রেমিকা নয়নকে নিজের লেখা কবিতা শোনাচ্ছেন, সেই সূত্রে লিখেছেন :

চোখ খুললো নয়ন। গভীর কালো চোখে তার খুশি উপচে পড়ছে। এত সামান্যে খুশি হয় নয়ন? ওর বিপদ অনেক।

বাষ্পাকুল চোখ দুটি তুলে বলে, ‘আর একটা বলবে? এই শেষ। আর বলতে বলবো না।’

‘কেন? আর বলবে না কেন?’ সপ্রশ্ন পার্থ।

‘তোমারও তো কষ্ট হয়, যেমন হচ্ছে আমার! হয় না?’

‘হয় নয়ন, হয় -- কষ্ট মেশানো সুখও হয় আবার। কিন্তু থাক, এতো কথা এখনই, তোমায় না বললেও হবে।’

‘কবিতাটির কোনো নাম দিইনি এখনও, নামটা তুমি দিয়ে নিও নয়ন। পারবে না?’

পার্থ আর উত্তরের জন্যে অপেক্ষা না করে আবৃত্তি শুরু করে :

যাবার সময় বোলো কেমন করে
এমন হলো, পালিয়ে যেতে চাও?
পেতেও পারো পথের পাশের নুড়ি
আমার কাছে ছিল না মুখপুড়ি
ভালোবাসার কম্পমান ফুল।
তোমায় দেবো? বাগান দ্যাখো ফাঁকা
তোমায় নিয়ে যাবো রোরোর ধার
তোমায় দেখে সবার অন্ধকার
মুছতে গেল সময়, আমার সময়।

ফিরে আবার আসবো না ককখনো
তোমার কাছে ভুলতে পরাজয়। 
সবাই বলতো, ইচ্ছেমতন এসো
অমুক মাসে, বছরে দশবার।
তুমি আমায় বললে, এসো নাকো
জীবনভর কাজের ক্ষতি করে।

‘মিথ্যুক, মিথ্যুক। আমি এমন কথা কবে তোমায় বলেছি? ছাই তোমার কবিতা -- বিচ্ছিরি --- ককখনো সত্যি নয়। ছিঃ’ --- নয়ন রাগে অভিমানে আকুল হয়ে পার্থর বুকের মধ্যে আত্মসমর্পণ করে। ‘তুমি আমায় ভাবো কী?’

‘আমার কেবলি ভয় করে, নয়ন, যদি এমন হয়! তুমি আমায় ভুল বুঝো না, এমন হতেও তো পারে?’


তৃতীয় পর্বে শম্ভুর চাইবাসার বাসায় পৌঁছোনো আর থেকে-যাওয়া নিয়ে শক্তি চট্টোপাধ্যায় লিখছেন :

পাকা বিহারী গেরস্হালির ছোঁয়াচ শম্ভুরা আবাল্য পেতে অভ্যস্ত। ওরা প্রবাসী বাঙালি। খাস বাড়ি কলকাতায় হলেও বাপ-পিতেমো ব্যবসাসূত্রে পাটনায় দীর্ঘদিন ছিলেন। সেখানে ওদের নিজেদের বাড়ি, নিজেদের ব্যবসা।

শম্ভু চিরকালই লেখাপড়া সাহিত্যশিল্পের অনুরক্ত। ট্রেনিং নিতে চলে গেলো সুদূর জাপানে একদিন। বাড়িতে আগে থেকে কিছুই জানায়নি। যখন জেনেছে তখন বাড়ি থেকে বাধা দিলেও শম্ভুকে ফেরানো শক্ত। তাই অকারণ বাধা দিতে এগিয়ে আসেনি কেউ। বিদেশে ট্রেনিং নিয়ে ঐ অল্প বয়সেই সে বিহার সরকারের বেশ উচ্চ কর্মচারী একজন। অবিবাহিত, রুচিবান, ভালো মনের বন্ধুবৎসল ছেলে। তাই ওর ওপর অত্যাচার অনেক সময়ে মাত্রা ছাড়িয়ে যায়।

পার্থ অল্প পরিচয় সত্বেও, শম্ভুর হৃদয়ের কাছাকাছি মানুষজনদের অন্যতম। যখনই কলকাতায় ছোটে কাজে-কর্মে ছুটিছাটায় -- খুঁজে পেতে পার্থর সঙ্গে দেখা করেছে। তাকে সঙ্গে নিয়ে যেতে চেষ্টা করেছে। পার্থ যথারীতি গেছে এড়িয়ে। বলেছে অনেক কাজ। অমুক মাসে নিশ্চয় যাবো। তারপর সেই পার্থ হঠাৎ এলো শম্ভুর কাছে। এলো আর কিছুতে তাকে ছেড়ে যেতে পারল না। দীর্ঘ দিন পার্থ তার কাছে ছিলো, একেবারে আপনার মতো হয়ে হয়ে ছিলো, তারপর হঠাৎ আবার একদিন পালালো। শুধু শম্ভুর থেকেই পালালো নয়। শম্ভুর যাবতীয় সংস্রব থেকে ছুটি নোলো। মিলিয়ে গেল -- কলকাতার জনসমুদ্রে। কিন্তু তা একেবারেই গল্প শেষের গল্প। আজকের কথা নয়। 


নবম পর্বে নয়ন সম্পর্কে শম্ভুর উক্তি নিয়ে শক্তি চট্টোপাধ্যায় লিখছেন :

শম্ভুর যেখানে বাসা সে-অঞ্চলটির নাম নিমডি। চাইবাসা শহরের একেবারে শেষপ্রান্তে, পূর্বাঞ্চলে। বাড়িটার নামও অদ্ভুত। পুরানা ভাট্টি। আগে এখানে ছিল এক ভাটিখানা। ভাটিখানা উঠে যাবার পর সরকার থেকে এটা নিয়ে নিয়েছে।

বাড়িটা একটা উঁচু টিলার মাথায়। খাপড়ার চাল। গা-গতর পাথরের। দরজা-জানলা সবগুলো দশাসই, তাদের গা-ভর্তি মুঠোর মতন বলটু মারা। খিল যেন ছোটোখাটো শালবল্লী।

জায়গাটা নির্জন। শহর বন্দরের শেষে এমন নির্জন একঘরে জায়গায় ভাটিখানাই সম্ভব। মানুষের পক্ষে বাস করা একটু শক্ত।

কিন্তু শম্ভু ওই বাড়িরই একটা অংশ বসবাসের জন্যে পেয়েছিল। বাকি অংশে থাকতেন আবগারি ইন্সপেক্টর। তাঁর অফিসও এখানে।

এক চাকর, শম্ভু এ আবগারি দুজনেরই খাবার তৈরি করে দিতো। ফাইফরমাস খাটতো। কোন অসুবিধে ছিল না। আজকাল শম্ভু অধিকাংশ দিনই চয়নদের বাড়িতে রাতে খায়। খেতে হয়, না খেলে ওঁরা ছাড়েন না। রাগ করেন। পার্থ যখন এলো তখন শম্ভু বাড়িতে খাওয়াই স্হির করে ফেলল। কেননা দুজনে মিলে কারুর বাড়ি খাওয়া খুবই দৃষ্টিকটু। সকালের দিকে হাতে হাতে উভয়ে তৈরি করে নিতো খাবার। সেই খাবারই থাকতো রাতের জন্যে। অসুবিধে হবার কথা নয়।

তাতেও ওঁরা রাগ করেন। একেকদিন রাতে শম্ভু-পার্থর নিজের হাতে তৈরি খাদ্য পড়ে-পড়ে পচতে থাকে। ওদের ওখানে চর্বাচূষ্য খেয়ে শম্ভু উদগার তোলে। আর শুধোয়, ‘কী রে কেমন বুঝছিস?’

‘কীসের আবার বোঝাবুঝি?’ পার্থ শম্ভুর প্রশ্নের বাঁকা ভাব সিধে করে দ্যায়।

তবু ছাড়ে না শম্ভু, ‘না, তাই বলছিলুম আর কি।’

নিশ্চিন্তে গা ছেড়ে দ্যায় বিছানায় শম্ভু। ‘তা কি পড়াচ্ছিস নয়নকে? এরকম বিনি পয়সার মাস্টারি আগে করেছিস নাকি কখনো?’

‘না’, পার্থ রাগ করে। শম্ভুর এভাবে কথা বলা তার মোটেই পছন্দ হচ্ছে না।

চলে আসার সময়কার নয়নের স্পষ্ট ও ফিসফাস কানে বাজে, ‘কালকে আসবেন তো? ঠিক?’

পার্থ মাথা নাড়ে।

শম্ভু বলে, ‘কী রে পাগল-ফাগল হয়ে গেলি নাকি শেষ পর্যন্ত? ওভাবে একা-একা মাথা নাড়ছিস কেন? এ্যাঁ?’

পার্থ এবার বাস্তবিক ফেটে পড়ে। আর সহ্য হয় না। শম্ভুর চিপটেনের একটা সীমা থাকা উচিত নিঃসন্দেহে।

‘তাই বলে একা-একা ছাড়া দুজনে কীভাবে মাথা নাড়ে -- আমার জানা নেই শম্ভু। তুই হয়তো জানতে পারিস। তা দেখিয়ে দে কেমন করে নাড়তে। দেখে শিখি।’

‘বাব্বাঃ তুই দেখি রেগেই টং। একটু রহস্য করছিলুম -- তাতে তুই যেমন চ্যাটাং চ্যাটাং বোল ছাড়ছিস, আজ উড়েই যাবো বোধ হচ্ছে। হয়েছে কি? নয়নের বুঝি লক্ষ্মীপুজো ছিল আজ? বেশিক্ষণ পড়াশুনো হয়নি, তাই...’

‘রাখ শম্ভু।’ পার্থ কী বলবে বুঝতে না পেরে হেসেই ফেললো।

‘এই তো, উঃ, কীরকম রামগরুড় হয়ে উঠেছিলি না? যদি আরশি থাকতো মুখের কাছে -- তা বল দিকি কতোদূর এগুলি, একটু শুনি।

‘তুই মহা ইয়ে...’ বলতে পারে না পার্থ। লজ্জায় অধোবদন হয়।

‘আচ্ছা। তাহলে অনেকখানিই পচ ধরেছে।’ শম্ভু উঠে বসে আর তখনি মন্ত্রোচ্চারণের মতো পার্থ বলে, ‘হ্যাঁরে, ও আমার কাছে অনেককিছু আশা করে।’

প্রথম পর্বে নয়ন কখন কলেজ থেকে ফিরবে তার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষারত পার্থ সম্পর্কে হিরণ্ময়ের (সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়) উক্তি বর্ণনা করেছেন শক্তি:

‘তুই ছোঁড়া কী রে? ঐভাবে ক্যাংলার মতো একটা মেয়েছেলের জন্যে বসে থাকিস হাপিত্যেশ করে। দিন নেই রাত নেই --- একি তোর বাপের পোঁতা ইস্টিশান পেলি নাকি?’

দশম পর্বের শুরু এইভাবে, এবং শক্তি চট্টোপাধ্যায় ও শীলা চট্টোপাধ্যায়ের প্রগাঢ় প্রণয়ের এবং অজস্র কবিতা রচনার সূত্রপাত; তাছাড়া শম্ভু সম্পর্কে চয়নের দুর্বলতার কথা: 

শম্ভুকে ট্যুরে যেতেই হলো। বহুভাবে ঠেকানোর চেষ্টা করেছিলো। পারল না।

যাবার আগে পার্থকে নয়নদের বাড়ি রেখে গেলো। বলল, ‘ভালোভাবে থাকিস। গাছের ডালে চড়িয়ে রেখে গেলাম। দেখিস অন্তত যে গাছের ডালে বসলি সেই ডালটাই মহান কবির মতো কেটে ফেলিস না।’

‘মানে?’ পার্থ শম্ভুর রহস্যালাপ বুঝেও না বোঝার ভান করে।

মানে যে কী -- শম্ভু বলার সময় পায় না। ইন্তিবিন্তিরা হৈ হৈ করে এসে পড়ে ওদের কাছাকাছি। ইন্তিবিন্তিরা নয়নের ছোটোখাটো বোনের দল। ছোটো মানে নিতান্ত ছোটো নয়, ক্লাসের উঁচুর দিকে পড়ে। ইন্তি সবচেয়ে ওপরের ক্লাসে, বিন্তি আর এক ক্লাস নিচুতে।

‘সর্বনাশ, দুই বন্ধু আবার কী যুক্তি করছে রে?’ ইন্তি বলে বিন্তিকে।

‘কী যুক্তি, কী যুক্তি’ -- বলে বিন্তি যেন নাচে-ভাসা, ওদের গায়ের কাছে সরে আসে। কান পেতে শোনার ভান করে। শম্ভুদা তো স্পিকটি নট। পার্থদা, বলুন না, কী গোপন আলোচনা হচ্ছিলো? নিশ্চই আমাদের নিয়ে, তাই না রে ইন্তি?’

আমাদের নিয়ে তো বটেই। তারপর পার্থদা! এখন তো আপনি আমাদের, শম্ভুদা টোটালি ফালতু। ধরুন আমরা ওঁকে চিনি না, কী বলুন?’

পার্থ মাথা নাড়ে, ‘বেশতো বেশতো। তা ধরা যায়।’

চয়ন এসে বলে, ‘শানু এলে পার্থবাবু তুমি ওর সঙ্গে গিয়ে তোমার টুকিটাকি জিনিসপত্র এনে নেবে শম্ভুর ওখান থেকে।’

তারপর অত্যন্ত সহজ করে জিজ্ঞেস করে, ‘ট্যুরে কোনদিকে যাবে শম্ভু এবার?’

‘জৈতগড়, আর সেখান থেকে ময়ূরভঞ্জের দুচারটে ব্লক।’

‘ফিরবে?’

‘দেখি। সাতদিনের প্রোগ্রাম -- আগে শেষ করতে পারলে, আগেই ফিরবো।’

‘গরম জামা-কাপড় সঙ্গে নিও।’

‘বাঃ, তা নেবো না কেন? আমি কি আর নতুন ট্যুরে বেরুচ্ছি?’

‘নতুন আমি বলছি না তো, তবে তুমি যেরকম উসোভুলো।’

‘আমি? তাহলে পার্থকে যে কী বলবে?’

‘উনি কবি মানুষ, ওঁর ভুল তো স্বাভাবিক।’

‘বাঃ, এরই মধ্যে পক্ষপাত শুরু হয়ে গেলো? দ্যাখ পার্থ, কেমন ভাগ্যবান ব্যাটা তুই -- দুদিনের জন্যে এসে আমার জায়গাটা দখল করে নিলি?’

পার্থ কিছু বলে না। ইন্তিবিন্তির সঙ্গে ঘরের ভেতর দিকে চলে যায়। এখন ওদের একটু সময় দেওয়া উচিত।

ময়ন নামটা হয় না। ময়না থেকে ভেঙে গায়ের জোরে ওরা ওদের নামধারার সঙ্গে মিলিয়ে নিয়েছে। চয়ন ময়ন নয়ন! তারপর আর মিলরাখা পায়নি বলেই ইন্তি বিন্তি শানু।

চয়ন নয়ন ওদের নামের সঙ্গে ময়নকে মিলিয়েছে বটে, কিন্তু ময়ন মেলেনি। সে ওদের স্বভাবের ঠিক বিপরীত ধাতুতে গড়া। অন্তরালবাসিনী। ওদের মায়ের হাতে ধরা। বড়ো একটা মজলিসে আসে না। সময় পায় না? তাও হতে পারে। আর সময় করে নিতেও চায় না। ও ভেতরে থাকে, ভেতর থেকেই ওদের ওপর মানসিক নজর রাখে। কার কখন কী দরকার ময়নের নখদর্পণে। গোটা সংসারের হাল ধরে আছে সে। মা তো রুগ্নাই। উনি ময়নের কাছে বসে থাকেন। ময়ন বলেছে, তোমায় কিছু করতে হবে না। তুমি শুধু কাছ থেকে বলে দিও।

তবুও মা এটা-ওটা টেনে নিয়ে করতে চান। ময়ন রাগ করে। 

মা বলেন, ‘যা না তুই ওদের সঙ্গে একটু গল্প-টল্প করে আয়। দেখা করে আয় শম্ভুর সঙ্গে। ও তো আবার ট্যুরে যাচ্ছে আজ।’

‘দিদিরা তো আছেই, আমার অনেক কাজ।’

এগারোতম পর্বে নয়নের সঙ্গে পার্থর প্রেমের কথা এইভাবে বলেছেন শক্তি :
কলেজে যাবার আগে নয়ন একবার পিছন ফিরে তাকায়। তারপর চোখের ইশারায় বলে, ভালো হয়ে থেকো।

তাই পার্থ ভালো হয়ে থাকে। একেকদিন নিজের সর্বনাশ করতে ইচ্ছা হয়। একেকদিন তাই বাইরে বেরিয়ে রোদে পুড়ে শরীর জখম করে নিয়ে আসে। চলে যায় নয়নের বাস যে পথ ধরে গেছে সেই পথে -- কোর্ট কাছারি বেড় দিয়ে গোশালার সেই পিচ-মসৃণ রাস্তায়। ওইদিকেই অপার চাইবাসা। নয়নের হলুদ কলেজ এতোদূর থেকেই দেখা যায়।

কেন যে এই বোকামিটুকু করে? সর্বক্ষণ নয়নের কাছাকাছি থেকেও এই যে অল্প সময়ের আড়াল --- এতেই পার্থ পাগলের মতন হয়ে যায়। নাকি এ-সমস্তই তার লোকদেখানো বাড়াবাড়ি আদিখ্যেতা। যেতে-যেতে প্রায়ই মনে হয়, আশপাশের পথচারীদের ডেকে বলবে, শোনো, নয়ন, যাকে আমি ভালোবাসি -- সে এই পথ ধরে গেছে বলেই আমি তার পিছু-পিছু পথ স্পর্শ করতে বেরিয়ে পড়েছি। আমার এ-পাগলামির নাম প্রেম। তোমরা একে প্রেমের উদাহরণও বলতে পারো। 

নয়নেরই ছোট্ট পড়ার ঘরটায় পার্থর বিছানা। এক কোণে বসে পড়তো নয়ন আর পার্থ চুপ করে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে শুয়ে থাকতো। চীনালন্ঠনের আলোয় গরবিনীর মুখ লাল।

‘কী দ্যাখো অমন করে?’

‘তোমায় -- তোমাকে দেখি।’

‘আমি আবার দেখার জিনিস নাকি কিছু?’

‘তেমন নয়, তবে--’

‘সর্বদাই তো দ্যাখো, দেখে-দেখে এতদিনে মুখস্হ হয়ে যাবার কথা।’


প্রথম পর্বে শক্তি চট্টোপাধ্যায় শম্ভু আর চয়ন-এর জটিল সম্পর্কের কথা লিখছেন:
‘হ্যাঁরে নয়ন, তোর হয়েছে কি? সর্বাদাই কী যেন ভাবিস। চুপচাপ, গম্ভীর। কই এমন তো ছিলি না তুই।’

‘কী আবার নতুন পেলে আমার মধ্যে’, পালটা প্রশ্ন করে নয়ন।

চয়ন হাসে। ‘তোর তো সবটাই নতুন রে আজকাল।’

‘তাই বুঝি’, হেসে পাশ কাটায়।

না, এভাবে চলবে না, চলতে পারে না। সে ধরা পড়ে যাচ্ছে। বিশেষ ভাবে দিদির চোখকে ফাঁকি দেওয়া যাচ্ছে না। দিদি নয়নের আদ্যোপান্ত জানে। আচ্ছা, জানেই যদি তবে অকারণ এটা-ওটা শুধোয় কেন? আসলে বোধহয় ও কথাবার্তায় সহজ হাওয়া চায়। নয়নকে ভালোবাসে বলেই নয়নের মনের ভাব ভাগ করে নিতে চায়। আশ্চর্য, দিদি ওকে মুখ ফুটে কিছু বলছে না কেন? দিদিকেও কেমন অদ্ভুত মনে হয়। মনে হয় দিদিও ধীর ও ক্রমাগত বদলে বদলে যাচ্ছে। সে-ও নয়নকে কিছু জানাতে চায় আপন অন্তর্বেদনার কথা। নয়ন বুঝতে পারে, দিদি এক অন্যায় আর অপ্রতিরোধ্য আবর্তে জড়িয়ে যাচ্ছে। ভুল, অত্যন্ত ভুল। নয়ন কী করবে কিছুই বুঝতে পারে না । সাবধান করবে দিদিকে? তাতে কি বাস্তবিক কোনো লাভ হবে? দিদি কি নিজেই যথেষ্ট সাবধান নয়? তবে? তবে ছেলেপুলে নিয়ে এখুনি রাউরকেলায় জ্যোতিদার কাছে যাওয়া উচিত। নয়নই চিঠি লিখবে জ্যোতিদাকে। তাড়াতাড়ি করুন, স্ত্রীপুত্রকে এভাবে ফেলে রাখবেন না আর। ভালোমানুষ জ্যোতিদার মুখটা মনে পড়ে নয়নের। দিদি কেমন করে ওঁকে ঠকাচ্ছে ভেবে শিউরে ওঠে সে। বাবাও টের পাচ্ছেন। অস্হির হয়ে ওঠেন তিনিও। এখনই বৈঠকখানা ঘরের দিকে তাকালে দেখা যাবে টেবিল আলোয় তাঁর মুখ অভিমানে জ্বলছে। ঠিক বিস্ফোরণের আগের অবস্হা। দিদি অন্ধ তাই টের পাচ্ছে না। নয়ন কিন্তু বুঝতে পারে যে সর্বনাশের আর বেশি দেরি নেই। 

নয়ন চোখ মুদে স্তব্ধ। অকস্মাৎ বিচিত্র কোলাহলে চোখ মেলে দ্যাখে, ‘তুমি? সত্যি তুমি? এত দেরি করলে যে!’

দ্বিত্বীয় পর্বে চয়ন-শম্ভু সম্পর্কের জট এই ভাবে খুলেছেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়: 
প্রথম দিন ওর দিদি চয়নের সঙ্গে দেখা। তিরিশের সামান্য ওপরে বয়স, স্বাস্হ্যোজ্বল চেহারা, হাস্যময় চোখ, তাছাড়া গলার স্বর মায়ায় ভরা। দেখা মাত্রই ভালো লেগে গেল পার্থর। তাছাড়া উনি বললেন যে পার্থর কবিতা পড়েছেন। ভালো লাগে। সব আধুনিক কবিদের মতন দুর্বোধ্য নয়। সুতরাং, পার্থরও ভালো লাগে।

পার্থ অবশ্য মুখে বলে, ‘আমার কবিতা? ওঃ শম্ভু দিয়েছে বুঝি আপনাকে? ছিঃ ছিঃ সে তো ছোটোবেলায় লেখা --- লেখা না বলে বরং তামাশা বলাই ভালো।’

চয়ন মৃদু হাসেন। বলেন, আপনারা দেখছি সবাই এক। নামেই তুলকালাম আধুনিক -- আসলে সেই ম্যাদামারা ভিতু বাঙালি -- কবিতা লেখেন তাতে এত কিন্তু-কিন্তু করেন কেন পার্থবাবু?’

শম্ভু অন্যমনস্ক। একটা চাপা অস্বস্তি তার মুখচোখ ছেয়ে ফেলেছে। তখন বে-আব্রু অবস্হার হাল ধরতে তড়োঘড়ি বলে ওঠে, ‘আচ্ছা মুশকিল, বন্ধুকে আনলাম কোথায় চা-টা খাওয়ানো হবে, না। একি কাণ্ড, হ্যাঁ? ভেবেছিল বেচারা কটা দিন এখানে থাকবে, তা এমন করলে...’

চয়ন অপ্রস্তুত হন। ‘সত্যিই তো, কী অন্যায়, কিছু মনে করবেন না পার্থবাবু, থাকবেন বৈকি, নিশ্চয় থাকবেন...তখন বুঝবেন আমি কিন্তু মানুষ খারাপ নই। আপনার বন্ধুকে...’

পার্থ তাঁর মুখের কথা লুফে নিয়ে বলে, ‘শম্ভুর কথা বলছেন? ও তো আপনার নামগান করছে বলতে পারেন।’

মহিলা আরক্ত হন। পার্থর নজর এড়ায় না। সে কিন্তু তার কথার ওজন সম্পর্কে একেবারেই অবহিত না। দোষক্ষালনের জন্যে সত্বর বলে, ‘মাপ করবেন, যদি ভুল করে আপনাকে আঘাত করে থাকি তো; আমি কিন্তু কিছু ভেবে বলিনি। এমনি হঠাৎ। ও আপনাকে ভীষণ ভালোবাসে’, বলেই চমকে ওঠে। এ কী কাণ্ড করছে সে পর পর? তার কি মাথা খারাপ? না হেসাডির অরণ্য, পরিবেশের বিধিবহির্ভূত অকপট, তাকে এহেন মুক্ত আর অসামাজিক কথা বলতে উদ্বুদ্ধ করেছে। ছিঃ ছিঃ!

তাই শুধরে নেবার জন্য শেষমেশ বলে বসে, ‘আপনি আমাকে ভুল বুঝবেন না কিন্তু, আমি সামাজিক কথাবার্তার বিশেষ একটা ধার ধারি নে। মুখে-মনে এক বলি। আমি বলতে চাই শম্ভু আপনাকে...’

‘অশেষ শ্রদ্ধা করে -- এই --তো? সে তো জানিই! আপনাকে আর ওর হয়ে সাউখুড়ি গাইতে হবে না। আপনি একটু বসুন ভাই, আমি এক্ষুনি আসছি। শোনো শম্ভু।’

পার্থ একাকী বসে নিজেকে ধিক্কার দিতে থাকলো। শম্ভু গেলো বাইরে, সম্ভবত দোকানেই গিয়ে থাকবে।

চয়ন এসে বসলেন, ‘তারপর কী ভাবছিলে পার্থবাবু? তোমাকে তুমিই বলি। তুমি আমার চেয়ে অনেক ছোটো। তর্ক কোরো না, যা বলছি মেনে নাও।’

‘নিলাম, মেনে নিলাম। শুধু বলুন, আপনি কিছু মনে করেননি তো? আমি এখনো পর্যন্ত ঠিক গুছিয়ে কথা বলতে শিখলুম না। আপনি যদি কিছু মনে করে থাকেন তো---’

‘যদি করেই থাকি। তবে তোমার কি ক্ষতিবৃদ্ধি পার্থবাবু? তুমিই বলো, মনে করা আমার উচিত কিনা।’

‘করতে পারেন। আমার সত্যিই কিছু বলার নেই। আমার মাথাটা---’

‘তোমার মাথাটা খারাপ নয় তেমন, তবে কি জানো ভাই, এক বিবাহিতা মহিলার নামগান যদি তাঁর অতিবড়ো ভক্তেও করে, ব্যাপারটা সত্যি হলে, নিছক ইয়ার্কির খাতিরেও বলা যায় না। আমি শম্ভুকে ভালোবাসি।’

এমন স্পষ্ট আর সদম্ভ উক্তি পার্থ জীবনে শোনেনি। বই-এ পড়েছে ক্বচিৎ-কখনো। রক্তমাংসের সাধারণ এক গৃহস্হবধু স্বল্পশিক্ষিত মনের মধ্যে, স্বামী ছাড়াও আরেকজনের জন্যে সযত্নে সিংহাসন পেতে রেখেছেন। পার্থর মহিলাকে প্রণাম করতে ইচ্ছা হয়েছিলো। ভাগ্যিস, এমন খেলো একটা কাজ সে তড়িঘড়ি করে বসেনি। সন্মান প্রদর্শনের বদলে ব্যাপারটা এমন কুৎসিত হয়ে দাঁড়াতো।

চয়ন বললেন, ‘পার্থবাবু আমার নাটক করার ইচ্ছে নেই, নতুবা গল্পে যেমন হয় আমি ছেলেমেয়ে স্বামী বিসর্জন দিয়ে শম্ভুর হাত ধরে বলতাম, চলো শম্ভু এবার নতুন রকমের জীবনে ঢুকি। এমন ঘটনা কি আর হয় না? আখছার হচ্ছে আজকাল। তবে আমি বলবো, এ সবই হচ্ছে মোহ থেকে -- ভালোবাসা থেকে নয়। আমি আমার স্বামী জ্যোতিকে অসম্ভব ভালোবাসি। তাঁর ছেলেমেয়েকেও। তিনিও আমাকে ছাড়া থাকতে পারবেন না, আমি জানি।’

‘শম্ভুর কথা --’

‘হ্যাঁ, এও তিনি জানেন। তাঁকে আমিই বলেছি। তিনিও শম্ভুকে ভালোবাসেন খুব। তিনি কারিগরি কাজের মোটা মানুষ, ভেবেছেন হয়তো স্ত্রীর মধ্যে যে সূক্ষ্ম আবেগ-অনুভূতিগুলো রয়েছে সেগুলোর সাহচর্য দিতে যদি কেউ এগিয়ে আসে, কেউ যদি স্ত্রীর মানসিক সহায় হয়, তাতে আপত্তির কী আছে? এর ফলেই না উভয়ত স্বাস্হ্য বজায় থাকবে। তাঁর কোনো আপত্তি নেই আমাদের এই আলাপচারিতায়, সহযোগে। তিনিও, এখানে এলে আমাদের মধ্যে বসে থাকেন।’

‘ভারি অদ্ভুত তো? আশ্চর্য!’

‘অদ্ভুত কিছুই নয় পার্থবাবু, এ হলো সাদামাটা বাঁচার বিলিব্যবস্থা। নয়ন কিন্তু আমার এ-ব্যাখ্যা মানে না...’


পঞ্চম পর্বে সনাতন (সন্দীপন) সম্পর্কে হেসাডির জঙ্গলের ঘটনা লিখছেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়:

সনাতন যে কাণ্ড করেছিলো তা সত্যিই অলৌকিক। অলৌকিক মানে, মানুষের অসাধ্য। এক কথায় বলতে হয়, সনাতন লেমসার মাকে তার অস্তমান যৌবন-স্মৃতির একটি টুকরো উপহার দেয়।

বারান্দায় বসে পার্থ লক্ষ্য করছিল সবই। শুধু এক শ্বাসরোধী আতঙ্কে কোনো কথা বলেনি। বাধাও দেয়নি। কথা বললে কী হতো বলা যায় না। হয়তো কিছুই হতো না। কারণ সনাতন জানতো পার্থ টের পাচ্ছে…

নানা প্রশ্নে ক্ষতবিক্ষত পার্থ, সনাতন কখন এসে তার সামনে দাঁড়িয়েছে খেয়াল করেনি। হঠাৎ চমকে ওঠে, ‘এত কী ভাবছিস পার্থ?’

পার্থ কিছু উত্তর করে না। মুখ নিচু করে বসে থাকে।

সনাতন বলে, জানি তুই কী ভাবছিস। কিন্তু ঘেন্নার কাজ আমি কখনো করিনি তুই জানিস। তাছাড়া, এক্ষেত্রে অহল্যার মতো এক পাষাণ প্রতিমাকে স্পর্শ করলুম। আমার পূণ্যই হলো। ঐ অশিক্ষিতা স্ত্রীলোক কি কথা বললো জানিস। তুমি তোমার বন্ধুর কাছে ছোটো হয়ে গেলে না তো ? আমার বড়ো উপকার করলে তুমি ---জেনানা লোকের এ যে কতো বড়ো উপকার --- সে তুমি বুঝবে না।

সনাতনই একটানা স্বপ্নে, ফিসফিসিয়ে বলে গেলো লেমসার মায়ের অতীত।

ওর স্বামীও ছিলো এমন চৌকিদার। সেসময়ে ওরা বুঝি থাকতো চাইবাসার সদর শহরে। বাংলোয় লোকজনের ভিড় লেগে থাকতো সদাসর্বদাই। ওর স্বামী, স্ত্রীর যৌবনের উপাসক একেবারেই ছিলো না। অহোরাত্র নেশায় চুর হয়ে থাকতো। সেই নেশার ঘোরে স্ত্রীকে তুলে দিয়ে আসতো বাংলোর ঘরে। প্রথম প্রথম অভিমান হতো ওর। হোক না আদিবাসী … তাই বলে কি রেণ্ডির মতন এর তার সঙ্গে শুতে হবে।

সুতরাং ব্যাপারটা শেষ পর্যন্ত দুই পৃথক নেশাতে গিয়েই দাঁড়ালো। স্ত্রীর এক, স্বামীর অন্য। …

ম্লান হাসে পার্থ। সেই হাসি দেখে সনাতন আরো উত্তপ্ত হয়ে পড়ে।

‘নিজেকে আর কত ভুল বোঝাবি সনাতন? তোর শরীর তোর ওপর প্রতিশোধ নিতে শুরু করেছে। যতই ব্যাপারটা অন্যভাবে নিস, আমি বলবো--’

কথাটা পার্থ শেষ করতে পারলো না, সনাতন মুষ্টি একত্র করে ঝাঁপিয়ে পড়ল ওর ওপর।


( চতুর্থ পর্বে সনাতনের চাকরি সম্পর্কে এই কথাগুলো লিখেছেন শক্তি : “ও মাসের প্রথম দিকটায় দু-এক দিনের জন্য অপিস যায়। তখন মাইনে পাবার সময় কিনা । কাজ করে কর্পোরেশানে। ঘুষের সুযোগ আছে বলে ওর সহকর্মীরাই হামলে পড়ে সনাতনের কাজটুকু করে। সনাতনের ঘুষ নিতে নীতিতে বাধে না, ও নিশ্চিত জানে ঘুষঘাস নিতে গেলেই কাজের দায়িত্ব এড়াতে পারবে না। তার বদলে ঘুষের খাতা সহকর্মীদের হাতে তুলে ও মাসমাইনে নিয়েই বিষম তৃপ্ত।)


তেরো আর চোদ্দো পর্বে শম্ভু ময়নকে বিয়ে করল; চয়ন সে বিয়েতে উপস্হিত থাকতে চায়নি। শক্তি চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন :
নয়ন বলছে পার্থকে, ‘তারপর আবার কী? হ্যাঁ-হ্যাঁ একটা সুখবর আছে। তোমাকে শম্ভুদা নিশ্চয় জানাবে। ময়ন, মানে মেজদি আর শম্ভুদার বিয়ে যে গো!’

‘অ্যাঁ? সত্যি বলছো?’

‘সত্যি সত্যি সত্যি তিন সত্যি। কার্ড পাঠাচ্ছি তোমার নামে। এই আসছে হপ্তায় পাবে। আর দিদিটা জানো কি কেলেঙ্কারি করেছে? ও তো একদম রাউরকেল্লা চলে গেছে, আবার লিখেছে ঐ সময়ে আসতে পারবে না। কী যেন একটা ঝঞ্ঝাটের কথাও লিখেছে বাপু। তা তুমি আসছ তো? এই? আমার অনেক বন্ধুকে বলেছি...তারা তোমাকে দেখতে চায়। কি অসভ্য দ্যাখো।’
…..

শম্ভুর বিয়ের চিঠি এসেছে। খুব আশ্চর্য, সে ময়নকে উদ্ধার করতে চলেছে। এই বাড়িতে সে নিজেকে পূর্ণ প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। ভালো কথা। পার্থর কাছে এ-চিঠির একদিন প্রচণ্ড মূল্য ছিল। আজ এর দাম কানাকড়িও না। সে নিজেকে সব কিছু থেকে সরিয়ে নিয়েছে।

শম্ভু লিখেছে, ময়নের প্রতি পার্থর যে মনোভাব সে কারুর অজানা নয়। না এলে ময়ন ভীষণ দুঃখ পাবে।

ইনিয়ে বিনিয়ে শম্ভু লেখে বেশ। মাছের খবরদারি না করে যদি উপন্যাস-টুপন্যাস লিখতো তাহলে বাজারে কাটতো ভালো। কিন্তু বাপু, পার্থর কাছে আজ আর কিছু কাটবে না। পার্থ অনেক সাবধান হয়ে গেছে আজ। কোনো কিছুই তাকে টলাতে পারবে না।


শেষ পর্যন্ত কেন তাহলে বিচ্ছেদ? শক্তি ইঙ্গিত দিয়েছেন, শম্ভু আর ময়নের ভূমিকার:

শম্ভু আর ময়ন দুজনেই মুকুট নামে একজনের কথা পার্থকে বলেছেন। তার মাধ্যমে চিড় ধরিয়েছেন পার্থ আর নয়নের সম্পর্কের মাঝে। পার্থর সেসময়ে চালচুলো ছিল না, চাকরি করতেন না, মদ খেতেন, এই সব কারণেই হয়ত শেষ পর্যন্ত নয়নের বাবা-মা সম্পর্কের অনুমোদন দেননি। প্রকৃত কী ঘটেছিল তা স্পষ্ট করে জানায়নি পার্থ, নয়নকেই হয়তো তাহলে দায়ি করতে হতো। 

ঘটনা হল যে স্নাতকোত্তর পড়াবার অজুহাতে নয়নকে পার্থর সংস্পর্শ থেকে দূরে পাটনায় পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল শম্ভুদের বাড়িতে। 

পার্থ আর কোনোদিন চাইবাসা ফেরেনি।

0 comments:

0

প্রবন্ধ - সোমব্রত সরকার

Posted in


বাউলের সাধনা সুটলের, আগেই বলেছি। টল হল স্বাভাবিক দেহ মিলনে যে শুক্র স্খলন হয় সেই দশা। গোদা বাংলায় বলা যায়, দেহ মিলনের সময় সঙ্গিনীর যোনিতে সঙ্গীর বীর্যপাত হয়ে যাওয়াই হল বাউলের টল। কামনার ধারা বাউলের হল নদীর বেগ। নদীকে কিছু আগেই সঙ্গিনীর শরীর হিসেবে বাউল সাধকের দেখবার কথা বলেছি— যখন নদী বোঝাই ছিল/ ঝড় তুফানের ভয় ছিল না গো—/ নদীর জল শুকাইল চর পড়িল/ তবু নদীর বেগ গেল না। বেগ হল গিয়ে কামনা যেমন, আবার বাঁকা নদীর উপমা যেন গানে এসেছে তা একেবারে সঙ্গিনীর শরীর নয় আর— আরও নির্দিষ্ট তাঁর জননাঙ্গ— নাইতে গেলে বাঁকার ঘাটে/ বিদ্যে বুদ্ধি রয় না ঘটে— কাম নামের কুমির জুটে/ চিবিয়ে চুষে খায় তাকে। 

লালশশী গানে পদকর্তা সর্বমোট ষোলো জনের কথা না ভোলার কথা বলেছেন দেহ-সাধককে। ছয় রিপু— কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাত্সর্য। একে অতিক্রমের কথা সমস্ত সাধনারই মূল কথা। বাউল, তাঁর গানে ছয়কে নানা রূপক-এও ব্যবহার করে থাকেন। যেমন তার একটি— তোর ঘরে ছয়টি ইঁদুর আছে, তুই বুদ্ধি নিলি তাদের কাছে, জ্ঞান হৈল না পর-আপন॥ ছয়কে দেহস্থ সাধনার ষট্-চক্র হিসেবেও দেখা যেতে পারে। যা সাধককে ভেদ করতে হয় বিবিধ শ্বাস-ক্রিয়ায়। এই ষট্-চক্র হল— মূলাধার, স্বাধিষ্ঠান, মণিপুর, অনাহত, বিশুদ্ধ ও আজ্ঞা চক্র। দেহ-সাধককে তা অতিক্রম করতে হয় কুণ্ডলিনী যোগে। আর এই ষট্-চক্র ভেদেই বীর্যের অভিমুখ উল্টোদিকে নিয়ে যেতে পারেন তন্ত্র-সাধক। বাউল-সাধক উল্টো স্রোতে নৌকো বেয়ে চলেন। কীভাবে তা হয়? মানব দেহের গুহ্যদেশ থেকে দু’-আঙুল ওপরে ও লিঙ্গমূল থেকে দু’-আঙুল নিচে চার-আঙুল বিস্তৃত যে যোনিমণ্ডল— তার ওপরে মূলাধার চক্র বা পদ্ম অবস্থিত। একানেই পঞ্চভূতের ক্ষিতির অবস্থানের কথাও বলেন সাধক। তন্ত্রে তার বীজ হল গিয়ে লং। মূলাধারস্থ এই শক্তিকে সাধক জাগরিত করে সহস্রারে গিয়ে লয় করেন। এর জোরেই বাউলের বীর্য-ধারণ হয়। পিতৃবস্তু রক্ষার কথাও তাঁরা বলেন— শুক্র ধাতু ভবেৎ পিতা/ রজ ধাতু ভবেৎ মাতা/ শূন্য ধাতু ভবেৎ প্রাণঃ। বাউলের মত, রজ-বীর্যে গঠিত মানবদেহে প্রাণ আসে শূন্য থেকে। আর তা আসতে পারে কেবল, যুগল সাধনাকেই পিতৃবস্তু রক্ষা করে— যে বস্তু জীবনের কারণ/ তাই বাউল করে সাধন। অর্থাৎ যা দিয়ে প্রাণস্পন্দন আসে পৃথিবীতে, বীর্য-রজের মিলনে সেই সন্তান উত্পাদন বাউল জীবনের উদ্দেশ্য নয়। তাঁদের প্রাণ তরঙ্গায়িত আনন্দ চেতনা। যা আসতে পারে নির্দিষ্ট পদ্ধতির দেহ-মিলনে। তার জন্যেই তাঁদের বস্তু-রক্ষা। বস্তু হল পিতৃবস্তু আর মাতৃবস্তু। বীর্জ-রজ। মূলাধারের শক্তিকে সাধক স্বাধিষ্ঠানে নিয়ে আসেন। লিঙ্গ-মূলে সংস্থিত দ্বিতীয় পদ্ম-চক্র হল স্বাধিষ্ঠান। এখানে রয়েছে পঞ্চভূতের অপ। বাউল সাধক আবার স্বাধিষ্ঠানের কথা বলেন না— চতুর্দল মূলাধারে/ মণিপুর তার ওপরে/ অনাহত বিশুদ্ধ পারে/ লক্ষ যোজন যাও না কেঁদে/ ইড়া আর পিঙ্গলার মাঝে। নাভিদেশ বরাবর মণিপুর চক্র। পঞ্চভূতের তেজ এখানে বিরাজ করছে। হৃদয়স্থিত অনাহত চক্রে বায়ুবীজ মরুৎ। কণ্ঠদেশের বিশুদ্ধ চক্রে আকাশতত্ত্ব বা ব্যোম। আর ভ্রূ-মধ্যে আজ্ঞা চক্র। আজ্ঞা চক্রের ওপরেই বিরাজ করছে করছে বাউলের ত্রিবেণী বা ত্রিকূট। ইড়া, পিঙ্গলা, সুষুম্না— এই তিন নাড়ির মিলন স্থল এটি। বাউল একে আরশিনগর হিসেবেও সম্বোধন করেন। 

ছয়ের ভাবগত ও অন্বয়গত ভাঙচুরের পর বাউলের ইন্দ্রিয় দশ-এ আসা যেতে পারে। এই দশ ইন্দ্রিয়ের দুটো ভাগ করেন তাঁরা। পাঁচ জ্ঞানেন্দ্রিয়— চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা, ত্বক আর পাঁচ কর্মেন্দ্রিয়— বাক্, পাণি, পাদ, পায়ু উপস্থ। নবদ্বারের কথাও বলেন তাঁরা— দুই নাক, দুই কান, দুই চোখ, মুখবিবর, পায়ু, উপস্থ। আর অষ্টসিদ্ধি তন্ত্রেরই ভাবজাত প্রতীক। যার কথা আগে আলোচনা করে ফেলেছি। এই ছয় আর দশের যোগফল ষোলো। এদে না ভোলার কাথীই কিনেতু বলেছেন বাউল পদকর্তারা। কারণ হল ছয় আর দশ যথেষ্টই শারীর-ক্রিয়া। যোগ-মিলন ক্রিয়ায় যেতে হলে এগুলোকে ভালোভাবে আয়ত্ত করা অতি প্রয়োজন। নামাশ্রয় আর মন্ত্রাশ্রয়য়ের কথাও বলেন তাঁরা। দুটোই বীজমন্ত্র। এরপর ভাবাশ্রয়ে কাম-বীজ ও কাম-গায়ত্রী জপে তাঁরা সেই যুগলে রাঙায়িত হয়ে যান বলেই বিশ্বাস। তারপরেই গুরুর উপদেশে রেচক-পূরক-কুম্ভকের কাজ— বাণ ক্রিয়া। আর এতেই তাঁরা তাঁদের কথিত বিশ্বাসে জেন্তে-মরা হয়ে ওঠেন। গানে লালশশী বলেছেন: এরা যখন হইবে শান্ত/ তখন দেখবে ভাই কোথায় আছে ঋতু-বসন্ত/ আর নীর-ক্ষীরে একযোগে/ নীর ফেলে ক্ষীর বেছে খাও। 

নীর বাউলের কাম। রজকেও তাঁরা নীর হিসেবে দেখে থাকেন। ক্ষীর হল তাঁদের প্রেম। কামে থেকে নিষ্কামী হওয়া তাঁদের সাধনগত অভিপ্রায়। অর্থাৎ কিনা কামকে প্রেম থেকে যোগাভ্যাসের দ্বারা বাদ দিয়ে দেন। কীভাবে দেন, সেই প্রক্রিয়াজাত অধ্যায়ের কথা বলা হয়েছে কিন্তু কথা হচ্ছে এতে, এইভাবে কাম বা যৌনতা কতখানি বাদ পড়ে? প্রশ্ন থেকে যায়। বরং যেটা মনে হয়, দেহকে নন্দন-নির্ভর সরলাঙ্কের চারুকলা, তাঁরা প্রতীক-সন্ধানী অমেয় শক্তিতে দিয়ে ওঠেন। দেহ সেখানে কামের বা যৌনতার অধিগত অধ্যায়কে মুছে ফেলে ঠিকই তাঁদের ধারিত বিশ্বাসে কিন্তু আমাদের মনে হয় তাঁদের এই সাধন-মার্গ, মিলনের জন্যে শরীরের কল-কব্জাকে নতুন রূপস্থ দশাতে উদ্ঘাটনে যথেষ্ট অর্থেই যৌনতা চিহ্নিত হয়ে পড়ে। যৌনতা তার ক্রিয়াগত ছদ্মবেশ ধারণ করে বেশ ভালোভাবেই নির্দিষ্ট হয়ে পড়ে বাউলের সাধন-মার্গের পদে। কীভাবে সেই সাধন-রহস্য শারীরিক নন্দন-নির্ভর হয়ে পড়ে আলোচ্য মর্ম-তৃপ্তিকে খুলে ধরে তাকেই এখন স্পষ্ট করব খ্যাপা বাবা বা মনোহর খ্যাপার একটা পদকে ঘিরে। 

শুনরে তোরা ক্ষ্যাপার কথা— 
ক্ষ্যাপার চোদ্দ ক্ষেপীর আট 
বল, এই নিয়ে কার মাথা ব্যথা, 
শুনরে তোরা, ক্ষ্যাপার কথা 
চব্বিশের ছয় ছেড়ে দিয়ে… 
এবার, যুক্তি কর যেথা সেথা॥ 

বাহান্নর চার বাদ দিয়ে দেখ 
(তোরা) পাবি নিজের মনের কথা 
শুনরে তোরা, ক্ষ্যাপার কথা ৷ 
ক্ষ্যাপার চোদ্দ ক্ষেপীর আট 
বল, এই নিয়ে কার মাথা ব্যথা॥ 

একশ আটের চব্বিশ বাদে 
গণনাতে হয় চুরাশি 
সাধক সিদ্ধ মাহপুরুষ 
কথায় বলে একাই আসি ৷ 
শুনরে তোরা ক্ষ্যাপার কথা— 
ক্ষ্যাপার চোদ্দ ক্ষেপীর আট 
বল, এই নিয়ে কার মাথা ব্যথা॥ 

বিশ্ব-জুড়ে দেখ না ঘুরে 
(আছে) চোদ্দ ব্রহ্মাণ্ডের কথা ৷ 
অষ্টাদশে শ্রীমদ্ ভাগবত 
(ক্ষ্যাপা) গুরু-শিষ্যের স্বার্থকতা— 
শুনরে তোরা, ক্ষ্যাপার কথা ৷ 
যায় বাহান্ন, তায় তিপান্ন 
ঐ দেখ আছে পঞ্চ-তত্ত্ব গাঁথা ৷
পাঁচে পাঁচে পঁচিশ হলে 
(ক্ষ্যাপা) সহস্র দল দেখবি হেথা— 
শুনরে তোরা ক্ষ্যাপার কথা 
ক্ষ্যাপার চোদ্দ ক্ষেপীর আট 
বল, এই নিয়ে কার মাথা ব্যথা॥ 

গানে খ্যাপার চোদ্দর দশ-কে কর্মেন্দ্রিয় ও জ্ঞানেন্দ্রিয়-র পাঁচ-পাঁচ করে সর্বমোট দশ হিসেবে ভাবতে পারি। যার কথা প্রসঙ্গত আগেও বলেছি। দশকে অনেক সাধক আবার মশম-দ্বার হিসেবেও চিহ্নিত করে থাকেন। এর রূপগত প্রত্যঙ্গের কথাও প্রসঙ্গত উল্লেখ করেছি আমরা। তবু বলি, পাঁচ কর্মেন্দ্রিয় (বাক্, পাণি, পাদ, পায়ু উপস্থ)। বাক্ হল কথার সংযম। তন্ত্রের পর্শ্বাচারের একটি। তার কথাও জায়গা বিশেষে বলা হয়ে গেছে। পাণিকে শুক্র-রস বা বীর্য হিসেবে ধরতে পারি। পাদ নিতম্ব। পায়ু হল মলদ্বার। উপস্থ হল গিয়ে জননেন্দ্রিয়, লিঙ্গ অথবা যোনি। পাঁচ জ্ঞানেন্দ্রিয় (চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা, ত্বক)। তবে দেহ-তত্ত্বের গানে স্ত্রী জননাঙ্গকেও দশমী দ্বার বলা হয়ে থাকে। বাকি রইল চার। যা প্রকৃত অর্থেই চার চন্দ্রের নামান্তর। বাউলের সাধনা হল গিয়ে চার চন্দ্রেরই সাধনা। চার চন্দ্র (মল, মূত্র, শুক্র, রজ)। সকাল-বেলাকার বিষ্ঠার প্রথম খানিকটা অংশ তুলে খেতে হয়। বাকিটা রেখে দিতে হয়। স্নানের সয়ম বুকে-মুখে-পেটে ভালো করে মালিশ করে কিছুক্ষণ রোদে দাঁড়িয়ে স্নান সেরে নিতে হবে। মলকে ফ্যাটাতে-ফ্যাটাতে এমন করে নিতে হবে, তা যখন তেলতেলে মাখনের মতো হয়ে যাবে তখনই খেতে ও মাখতে হবে। তাহলে তার আর দুর্গন্ধ থাকবে না একদম। মূত্র বা পেচ্ছাপ/প্রস্রাব যতবার হবে নারকেল মালাতে ধরে খেয়ে শরীরেই ফিরিয়ে নিতে হবে। শ্বাস ও দমের কাজের পর গুরু তাঁর শিষ্যের জন্যে যে কুমারীর রজ ধরে রাখেন পাত্রে, তাও খেতে হয়। দেব-যোগের পর সেটা মনে হবে সদ্য-দোয়া দুধ। বাউল আবার উলঙ্গ নৃত্যে একত্রে নারী-পুরুষ নাচানাচির পর বীর্য-স্খলন হলে পর তাকে তুলে ময়দাতে মেখে রুটি প্রস্তুত করে খান। এ হল তাঁদের প্রেমভাজা। আগেও বলেছি, মূত্র বাউলের রস বা রামরস। তাঁরা চার-চন্দ্র ভেদ করেন দেহ-নিঃসৃত এই চারটি বস্তুকে শরীরে বা দেহে ফিরিয়ে এনেই। ব্রহ্মচর্যেও তাঁরা তিন রস পালন করে থাকেন। মল-মূত্র খেয়ে-মেখে, রজ-বীর্য শরীরে ধারণ করে। পঞ্চভূতে দেহ গঠিত তাঁরা মনে করেন। মল তাঁদের ক্ষিতি। মূত্র হল অপ। তেজকে তাঁরা রজ ও শুক্রকে মরুৎ হিসেবেও ভেবে থাকেন। 

গানে বর্ণিত খেপীর আট হল, তাঁদের অষ্ট চন্দ্র বা অষ্ট ইন্দু। সঙ্গিনীর শরীরের আটটি প্রত্যঙ্গ। মুখ এক, দুটি স্তন, দুই হাত, বুক এক, নাভি এক, যোনি এক। বাউল সাধক এদেরও ভেদ করেন। তাঁরা বলেন, এই ভেদ প্রথম হয় দৃষ্টিস্পর্শে। কিন্তু বাস্তবিক নারী শরীরে উত্তেজনা কী পুরুষের দৃষ্টিস্পর্শে কেবল আসে? আর পুরুষ নারীর এইসব কাম জাগৃতির প্রত্যঙ্গ শুধু দেখে নিজের উত্তেজনা কি ধরে রাখতে পারেন? বাউলের এই মত তাই বিশ্বাসযোগ্য নয়। যদিও তাঁরা বলেন যোগের দ্বারা তা করা যায়। যেটা এখানে বাস্তবিকই বলার, তা হল, যোগ ঠিক। কিন্তু তা হল গিয়ে কামযোগ। যৌনাচার, যৌনতার কাব্যময় প্রকাশ আসলে এইসব। চোদ্দকে বাউল আবার ভুবন হিসেবেও দেখেন। চোদ্দ ভুবন (দুই চোখ, দুই কান, মুখ, মাজা, পায়ু, উপস্থ, বুক, দুই স্তন, নাভি, ব্রহ্মরন্ধ্র)। এগুলো সব দুই শরীরের প্রত্যঙ্গ। দেহকে তাঁরা চোদ্দ পোয়া বলেন। যা সাড়ে-তিন হাত। প্রচলিত এক কথা আছে। মৃত্যুর পর দাহ করতে বা গোর দিতে সাড়ে-তিন হাত জমি লাগবেই। এ কথার সঠিক অর্থ, এ হল দৈহিক পরিমাপ, শারীর-বিজ্ঞান। যাঁর-যাঁর নিজের হাতের মাপে তাঁর-তাঁর শরীর সেই সাড়ে-তিন হাতই। 

চব্বিশের ছয় পদে বাদ দেবার কথা বলেছেন পদকর্তা। ছয় তো ষড়রিপু। দেহস্থ ষট্-যন্ত্রও আবার। প্রথমটির সংযম আর দ্বিতীয়টির ক্রিয়া দেহ সাধনেতে অনিবার্যই। সেই ক্রিয়া-কলাপের কথা আগেই আলোচিত হয়েছে। এবার এখানে চব্বিশের কথা বলি। চব্বিশ হল তত্ত্বরূপ। কী ভাবে? পঞ্চভূত, পঞ্চগুণ, দশেন্দ্রিয়, ষড়রিপু আর অষ্টদ্বারের যোগফল। প্রতীক রূপগুলো আর উল্লেখ করলাম না। প্রসঙ্গত বলা হয়ে গেছে সবই। আবার মিলন যোগে সাড়ে-চব্বিশ চন্দ্র-স্পর্শের কথাও বলা হয়। এ হল সব বাউল মতের দৃষ্টি-চুম্বন। পায়ের নখে দশ বার, হাতের নখে দশ বার, দুই গলায় দুই বার, জিভে এক বার, নিচের ঠোঁটে এক বার আর কপালে অর্ধেক। এগুলো কেবল দৃষ্টিতে সঙ্গিনীর শরীরের কাম ভোঁতা করা হয় বলে বাউল মতকে সেইভাবে মানা যায় না। বাহান্নর চার বাদের কথা রয়েছে গানে। চার হল চার চন্দ্র। বাদের পর থাকা আট-চল্লিশ হল গিয়ে যুগল শরীরের চল্লিশ তত্ত্বরূপের গুণফল। একশ’ আটের আবার চব্বিশ বাদ। এই চব্বিশকে আরেকটু অন্যভাবেও দেখে থাকেন দেহ-সাধক। বৈষ্ণব সাধক বলেন, চব্বিশ অক্ষর কাম-গায়ত্রীর কথা— ক্লীং কামদেবায় বিদ্বহে পুষ্পবাণায় ধীমহি তন্নো কৃষ্ণ প্রচোদয়াৎ। বাউলও অবশ্য বলেন এক কথা। চব্বিশ হল গিয়ে আরেক প্রকার— ছয় রিপু, দশ ইন্দ্রিয়, আটটি পাশ— সর্বমোট চব্বিশ। ষড়রিপু ও ইন্দ্রিয়ের উল্লেখ আগেও হয়েছে। অষ্ট পাশ হল— ঘৃণা, লজ্জা, ভয়, শঙ্কা, জিগীষা, জাতি, কুল ও মান— দেহ সাধককে এই সব অনুভূতির ঊর্ধ্বে উঠতে হয়। একশো আট থেকে চব্বিশ যে বাদ পড়ল গণনাতে তা হল চুরাশি। বলা হয়, চুরাশি লক্ষ যোনি পার হয়ে এই মানব জীবন। চুরাশি তাই মানুষের প্রতিরূপ। যে মানুষকে বাউল মতেই সহজ শিরোপা অধিকার করে নিতে হবে। একশো আটকে পূর্ণ শরীর হিসেবে দেখা হচ্ছে। একশো পরম শূন্যতা আর আট অষ্টপাশ। একশো আট-কে আবার অষ্টদল পদ্ম ও নিজেকে যুক্ত করেও দেখা চলতে পারে। এ-ও সহজিয়া মত। এর একশত সাত ফুল— অষ্ট ক্রোশ গভীরের নিচে রূপের একটা গাছ রয়েছে/ একশত সাত ফুল ত্রি-জগৎ তার গন্ধে আকুল/ ফুল ফুটে তার মাসে মাসে মধু খায় ভ্রমর ডালে ডালে। এখানে রজঃবিকাশের কথা আসলে বলা হয়েছে। গানে পাঁচ-পাঁচে পঁচিশ হবার কথাও আছে। পঁচিশ হল চব্বিশ তত্ত্বের সঙ্গে অর্ধাংশ করে রজ-বীর্যের যোগফল। অর্থাৎ পূর্ণাঙ্গ দেহস্থ দশা। আর তা প্রাপ্ত হলেই সহস্র-দল পদ্ম দেখা যায়। বাউল মতে যুগল মিলনে স্থির-অচঞ্চল দশা এখানে স্থিত হয়। বীর্য ব্রহ্মরন্ধ্রে উঠে চলে যাবার পর সহস্রদলে সহস্রার পদ্মচক্রে এর বিকাশ অনুভূত হয়। বাহান্ন-তিপান্ন হল নারী শরীরের রস-বওয়া বিভিন্ন নাড়ি। 

যোগশাস্ত্রে কথিত সাতটি প্রাথমিক চক্র নিম্নরূপ: 

মূলাধার, (সংস্কৃত: मूलाधार, Mūlādhāra) ভূমি বা মূল চক্র (মেরুদণ্ডের অন্তিম হাড় *কোক্সিক্স*) স্বাধিষ্ঠান, (সংস্কৃত: स्वाधिष्ठान, Svādhiṣṭhāna) ত্রিক চক্র (অণ্ডাশয়/পুরস্থ গ্রন্থি) 

মণিপুর, (সংস্কৃত: मणिपुर, Maṇipūra) সৌর স্নায়ুজাল চক্র (নাভি ক্ষেত্র) 

অনাহত, (সংস্কৃত: अनाहत, Anāhata) হৃদয় চক্র (হৃদয় ক্ষেত্র) 

বিশুদ্ধ, (সংস্কৃত: विशुद्ध, Viśuddha) কণ্ঠ চক্র (কণ্ঠ ও গর্দান ক্ষেত্র) 

আজ্ঞা, (সংস্কৃত: आज्ञा, Ājñā) ললাট বা তৃতীয় নেত্র (তৃতীয় নেত্র) 

সহস্রার, (সংস্কৃত: सहस्रार, Sahasrāra) শীর্ষ চক্র (মাথার শীর্ষে; একটি নবজাত শিশুর মাথার 'কোমল স্থান') ।

তাহলে দেখা যাচ্ছে যুগল-তত্ত্বের এই সব গান বা পদ দুই শরীরের পূর্ণাত্মক মিলন বিকাশকে স্পষ্ট করে যাচ্ছে বারে বারে। যৌনতার চিন্তাস্রোতে তাই এই সব সাধন-আখরকে আমরা কোনওভাবেই বাদ রাখতে পারি না। কেন না যৌনতা এখানে স্পন্দিত সব রসাবয়ব।

সমাপ্ত 

0 comments: