Next
Previous
Showing posts with label গল্প. Show all posts
0

গল্প - মনোজ কর

Posted in




















১৯

পানু রায় বিদ্যুৎগতিতে চেয়ার থেকে উঠে দরজার দিকে হাঁটা দিলেন। সুন্দরী হাঁ

হাঁ করে উঠলো। বললো,’ খেয়ে যাও। আমি অর্ডার দিয়ে দিয়েছি।‘

-অর্ডার ক্যানসেল করে দাও। বড়কালী থানায়। সে বলেছে আমি না গেলে একটা

কথাও বলবেনা। পুলিশ অপেক্ষা করতে চাইছে না।

-কিন্তু আসলে অপেক্ষা করছে এবং চাইছে যে তুমি ওখানে পৌঁছে যাও। তার

মানে অন্য কোনও উপায় না দেখে ওরা তোমাকে ধরার জন্য ফাঁদ পেতেছে।

-আমি জানি। আমি ওই ফাঁদে পা দেব তাও ঠিক করেছি। তুমি অফিসে যাও।

আমি আর জগাই একটু পরেই ফিরবো। তারপর একসঙ্গে খেতে যাব।

পানু রায় একটা ট্যাক্সি ডেকে থানায় পৌঁছে দেখলেন অনেক লোক জড়ো হয়েছে।

সামনে দাঁড়িয়ে থাকে পুলিশ অফিসারটা পানু রায়কে দেখে এগিয়ে এসে বললো,’

স্যার, সবাই আপনার জন্যই অপেক্ষা করছে। আপনি ভেতরে যান।‘পানু রায়

ভিতরে ঢুকে দেখলেন কেলো দারোগার টেবিলের সামনে একটা চেয়ারে কৃষ্ণকালী

বসে আছে। পিছনের সারিতে আরও কয়েকজন সাব-ইনসপেক্টর বসে আছে। এরা

সম্ভবত কেলো দারোগাকে তদন্তের ব্যাপারে সাহায্য করছে। পানু রায়কে ঢুকতে

দেখে কেলো দারোগা বললেন,’মিঃ রায়, আপনি বসুন। আপনার জন্যই আমরা

অপেক্ষা করছি।কৃষ্ণকালীবাবু শহরের সম্মাননীয় মানুষ। উনি আপনার অনুপস্থিতিতে

কোনও কথা বলতে রাজি নন। আমরা অন্য সবায়ের সঙ্গে এক্ষেত্রে যা করে থাকি

ওনার সঙ্গে সেটা করা ভালো দেখায় না। সেইজন্য আপনার উপস্থিতি খুব দরকার

ছিল। জরুরি কাজ ফেলে রেখে আপনি যে এসেছেন তার জন্য ধন্যবাদ।‘ তারপর

বড়কালীর দিকে তাকিয়ে বললো,’ নিন, ওনাকে আপনার সামনে হাজির

করেছি।এবার আপনি আপনার রক্তমাখা জুতো এবং শিবুলালের অ্যাপার্টমেন্টে সেই

জুতোর ছাপের ব্যাপারে যদি একটু আলোকপাত করেন তাহলে খুব ভালো হয়।‘

পানু রায় বললে,’ দেখুন আপনাদের সঙ্গে কথা শুরুর আগে আমি একটু

কৃষ্ণকালীর সঙ্গে আলাদা করে কথা বলতে চাই।আপনাদের অসুবিধা নেই আশা

করি।‘ কেলো দারোগা বললো,’ আমরা কিন্তু অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেছি, মিঃ

রায়।‘

-দেখুন আপনারা যদি আমাকে আলাদা করে ওনার সঙ্গে কথা বলার সময় এবং

সুযোগ না দেন তাহলে ওনাকে বলবো আপনাদের কোনও প্রশ্নের কোনও উত্তর না

দিতে।




-সেক্ষেত্রে আমরা কাগজের অফিসে ওনার অসহযোগিতার কথা জানাতে বাধ্য হব।

উনি সমাজের একজন গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং ওনার সম্বন্ধে এই ধরণের প্রচার যে

ওনার প্রতি অবিচার সেটা আমি জানি। কিন্তু আর কোনও উপায় না থাকলে

আমাদের এ ছাড়া আর কিছু করার নেই।

-সেক্ষেত্রে আমিও কাগজের অফিসে জানাতে বাধ্য হব যে আমি কৃষ্ণকালীর সঙ্গে

একান্তে আলোচনার জন্য সময় চাইলে আমাদের ভয় দেখানো হয় যে আমাদের

নামে মিথ্যা অভিযোগ কাগজে প্রচার করার চেষ্টা করা হবে।

রাগে কাঁপতে কাঁপতে কেলো দারোগা চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে কিছু একটা বলতে

যাচ্ছিল। তখনই একজন সাব-ইনসপেক্টর উঠে এসে কেলো দারোগার কানের কাছে

মুখ নিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে কি যেন বললো। কেলো দারোগা পানু রায়ের দিকে

তাকিয়ে বললো,’ ঠিক আছে। পাশে একটা ছোট ঘর আছে। ওখানে যান। দশ

মিনিটের বেশি সময় দেওয়া সম্ভব নয়।কথা শেষ করে এখানে ফিরে আসবেন।‘

কেলো দারোগার কথা শেষ হতে না হতেই পানু রায় বড়কালীর হাত ধরে

একরকম টানতে টানতে পাশের ঘরের একটা কোণে নিয়ে গিয়ে ফিরে এসে দরজায়

ছিটকিনি লাগিয়ে গলা নামিয়ে বললো,’ খুব আস্তে কথা বলতে হবে। দেওয়ালেরও

কান আছে। তার ওপর এটা থানা।এবার তাড়াতাড়ি বলো কী হয়েছিল।‘

-আমার আগেই আপনাকে বলা উচিৎ ছিল। আমি আমার ছেলের প্রতি ভয়ঙ্কর

বিরক্ত ছিলাম।

-অনেক বাবাই ছেলের প্রতি অনেক কারণে বিরক্ত হয়। সময় নষ্ট না করে আসল

কথায় এসো।

-তবে এখন সব ঠিকঠাক। আমি প্রথমে ভেবেছিলাম এই বিয়েটা করে ও ভুল

করছে। পরে বুঝলাম না ও ঠিকই করেছে।

-তার মানে রেবা কৈরালা এই খুনের সঙ্গে জড়িত?

-না, তার মানে আমি রেবাকে ভালোবাসি। আমার মনে হয় ওকে যেদিন প্রথম

দেখেছি সেদিন থেকেই আমি ওর প্রেমে পড়েছি। আমি চেয়েছিলাম কালীকৃষ্ণ

রেবাকে বিয়ে করুক। তাহলে রেবা বাড়িতে আসবে। কিন্তু ও যখন অন্য একটা

মেয়েকে বিয়ে করলো আমার ভীষণ রাগ হওয়া উচিৎ ছিল কিন্তু কেন জানিনা

আমার ভীষণ ভালো লাগতে শুরু করলো। হয়তো অবচেতনে রেবার সঙ্গে ওর

বিয়েটা আমি চাইছিলাম না।




-তুমি রেবাকে সব খুলে বলেছ?

-না, আভাসে ইঙ্গিতে বোঝাবার চেষ্টা করেছি। আমার পক্ষে খোলাখুলি বলা সম্ভব

নয়। আমি ওর বাবার বয়সী।

-অনেক মহিলাই বাবার বয়সী লোকের সঙ্গে প্রেম করে আবার বিয়েও করে। এটা

এমন কিছু নতুন ব্যাপার নয়।

-ছাড়ুন। এটা হবে না। আমি আপনাকে একটা খবর দিলাম যেটা আপনাকে

অবস্থাটা বোঝার ব্যাপারে সাহায্য করবে।

-আমাদের হাতে আর মাত্র তিন মিনিট আছে। আমাকে সত্যি সত্যি কী ঘটেছিল

তাড়াতাড়ি বলো। তুমি খুনী বন্দুকটা নিয়ে তোমার ছেলের অফিসে গেলে এবং

তার টেবিলে রেখে এলে। আমি রেবার কাছে তুমি যে বন্দুকটা রেখে এসেছিলে

তার থেকে পুলিশের নজর সরাতে একটা কিছু করতে গিয়ে সব গন্ডগোল করে

ফেললাম।

-দাঁড়ান, দাঁড়ান, কী সব বলছেন? আমি কোনও বন্দুক আমার ছেলের টেবিলে

রেখে আসিনি।

-বাজে কথা বলবে না। তুমি অফিস যাবার আগে শিবুলালের অ্যাপার্টমেন্টে

গিয়েছিলে। তুমি শিবুলালকে খুন করেছ কি না?

-বোকার মত কথা বলবেন না। রেবা শিবুলালের কাছে গিয়েছিল আমি বেরিয়ে

আসার পর।

-বেশ, তুমি কী করেছিলে বলো।

-আমি অফিস যাবার পথে শিবুলালের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। আমি ওকে

জানতে দিতে চাইনি যে আমি যাব। আমি সোজা ওর অ্যাপার্টমেন্টে পৌঁছে কড়া

নাড়লাম।ও দরজা খুলে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। আমাকে ও চিনতো না।

আমি যখন নিজের পরিচয় দিলাম তখন ও বিরক্তি প্রকাশ করে বললো ঘরে

একজন রয়েছে। আমাকে বললো খুব দরকার থাকলে ঘন্টা দুয়েক পরে আসতে।

তারপর আমার মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিল। আমি সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে

রাস্তায় বেরোলাম। কিন্তু আমি যে ওখানে গিয়েছিলাম সে কথা কাকপক্ষীতেও

জানার নয় অথচ আপনি কী করে জানলেন?

-আমি কী করে জানলাম তা জানার কোনও দরকার নেই। তারপর তুমি সোজা

অফিস গেলে?




-না, সোজা নয়। পাম্পে দাঁড়িয়ে তেল নিলাম। তারপর কাঠমান্ডুতে একটা ফোন

করলাম। তারপর অফিস গেলাম। অফিসের লাগোয়া আমার একটা ছোট

অ্যাপার্টমেন্ট আছে। আমি এলিনাকে বলেছিলাম আমার জন্য অপেক্ষা করতে।

অফিসের ব্যাপারে কিছু কথা বলার এবং কিছু খবর নেওয়ার দরকার ছিল। আমি

এলিনাকে বলেছিলাম কিছু কাগজ ফাইল থেকে বের করে টেবিলে রাখতে। ততক্ষণে

আমি স্নান করে পোশাক পরিবর্তন করে এসে যাব।

-তারপর কী হলো, তাড়াতাড়ি বলো। সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে।

-আমি অফিসে এসে কাগজপত্র দেখার পর জিজ্ঞাসা করলাম যে ও আপনাকে কেন

বলেনি যে আমি কোথায় ছিলাম। সেই নিয়ে কথা কাটাকাটি শুরু হলো। ব্যাপারটা

এমন পর্যায়ে পৌঁছলো যে আমি বলতে বাধ্য হলাম যে পরেরদিন থেকে ওর আর

আসার দরকার নেই। তারপর কী হলো আপনি জানেন।

-না, জানিনা। আমাকে বলো।

-তারপর আমি আপনার কাছে গেলাম এবং ওখান থেকে আমরা রেবার কাছে

গেলাম।

-আমি রেবার কাছ থেকে চলে আসার সময় তুমি বললে তুমি আরও কিছুক্ষণ

ওখানে থাকবে।

-আপনি চলে আসার পর আমি খুব অল্পসময় ওখানে ছিলাম। আমি রেবাকে

বোঝাবার চেষ্টা করছিলাম আমি সত্যিই চেয়েছিলাম যে ও আমাদের পরিবারের

একজন হোক।

-কিন্তু বন্দুকের ব্যাপারটা সম্বন্ধে বলো।

-আমি সবসময়ে কাছে বন্দুক রাখি। আমার সমস্ত কোটের ভিতরে বন্দুক রাখার

একটা গোপন পকেট থাকে। সেখানে বন্দুক রাখলে বাইরে থেকে কিছু বোঝা যায়

না। আমি বন্দুকটা বের করে রেবাকে দিয়েছিলাম ওর কাছে রাখবার জন্য।

- যখন বন্দুকটা ওকে দিলে তখন কি বন্দুকে সবগুলো গুলি ভরা ছিল?

-অবশ্যই। আমি আপনাকে একটা কথা বলে রাখি যেটা আর কেউ জানেনা।

বন্দুকটা অনেকদিন ব্যবহার হয়নি। সেইজন্য কাঠমান্ডু যাবার আগে ঐ বন্দুকটার

পুরনো গুলিগুলো পাল্টে নতুন গুলি ভরে রেখেছিলাম। আমি জানতাম যে কোনও

সময় শিবুলালের সঙ্গে আমার সংঘাত হতে পারে। তাই তার প্রস্তুতি হিসাবে এই

ব্যবস্থা।




- তারপর কী হলো? সংক্ষেপে বলো।

-আমার অফিসে আলমারিতে আর একটা বন্দুক থাকে। আমার সেদিনই শিবুলালের

সঙ্গে দেখা করার কথা ছিল। কেউ জানতো না। আমি ওখান থেকে অফিসে ফিরে

এসে আলমারি থেকে অন্য বন্দুকটা নিয়ে শিবুলালের অ্যাপার্টমেন্টে যাই। গিয়ে দেখি

সামনের দরজাটা ভেজানো আছে, লক করা নেই। দরজাটা ঠেলতেই খুলে গেল।

ভিতরে গিয়ে দেখি মেঝেভর্তি রক্তের ওপর শিবুলাল পড়ে আছে। কাছে গিয়ে ভালো

করে দেখে বুঝলাম ওর শরীরে প্রাণ নেই। পাশেই রক্তের ওপর জুতোর ছাপ।

দেখলেই বোঝা যাচ্ছে কোনও মহিলার জুতো। জুতোর গোড়ালির ছাপ দেখে স্পষ্ট

বোঝা যাচ্ছে। আমি ভাবলাম এটা নির্ঘাত রেবার জুতোর ছাপ। আমি তাড়াতাড়ি

ওখান থেকে বেরিয়ে রেবার অ্যাপার্টমেন্টে গেলাম। দরজা খুলে আমাকে দেখে একটু

অবাক হলো। জিজ্ঞাসা করলো কিছু হয়েছে কি না। আমি বুঝলাম ও শুয়ে

পড়েছিল। আমার কড়া নাড়ার আওয়াজ শুনে উঠেছে। আমি বললাম আমার খুব

দুশ্চিন্তা হচ্ছিল তাই ভাবলাম ওর সঙ্গে দেখা করে একটু কথা বলে যাই। ও

আমাকে বসতে বলে ভিতরে গেল। বালিশের তলায় আমার বন্দুকটা দেখা যাচ্ছিল।

আমি সেই সুযোগে বন্দুকের সিলিন্ডার খুলে দেখি একটা গুলি নেই। ওর পরনে

একটা নাইট গাউন, পায়জামা আর পায়ে স্লিপার ছিল। পাশে একটা জুতো খোলা

ছিল। জুতোর গোড়ালিটা আমার দেখা ছাপের সঙ্গে মিলে গেল।

-তুমি রেবাকে এ ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞাসা করেছিলে?

-না, আমি মাঝরাত অবধি ওখানে ছিলাম। আমি ওকে বললাম কোনও দরকার

হলে যেন আমাকে জানাতে দ্বিধা না করে। আমাকে ও নিজের বন্ধু ভাবতে পারে।

তারপর আমি ওখান থেকে বেরিয়ে গেলাম।

-তুমি শিবুলালের অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে গেলে?

-হ্যাঁ, আমি শিবুলালের অ্যাপার্টমেন্টে গিয়ে অনেকক্ষণ ধরে রেবার বিরুদ্ধে যেতে

পারে এমন সব সম্ভাব্য সাক্ষ্যপ্রমাণ নষ্ট করে দিলাম।

-তুমি কী করলে?

-একটা অত্যন্ত সহজ উপায় ছিল। আমি সেটা না করার জন্য কিছুতেই নিজেকে

ক্ষমা করতে পারছি না। আমি যখন রেবার কাছে গেলাম তখন আমার কোটের

পকেটে আর একটা বন্দুক ছিল। আমি আগেরটার সঙ্গে এই বন্দুকটা পাল্টে দিতে

পারতাম। কিন্তু এই স্ফজ ব্যাপারটা আমার তখন মাথায় এলোনা।




-আমাকে মিথ্যা বলার চেষ্টা কোরোনা। তুমি বলছো তুমি বন্দুক পাল্টাওনি?

-আমাকে বিশ্বাস করো। আমি নিশ্চিত যে আমি রেবার কাছ থেকে চলে যাওয়া

এবং ফিরে আসার মধ্যে ঐ বন্দুক থেকে গুলি ছোঁড়া হয়েছিল।

-তাহলে তুমি শিবুলালের অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে গিয়ে কী করলে?

-আমি প্রথমে ভাবলাম জুতোর ছাপগুলো মুছে দেব। কিন্তু তারপর মনে হলো এতে

অনেক বেশি সময় লাগবে। সেইজন্য আমি আমার জুতোর সোলটাকে ভালো করে

রক্তের ওপর ঘষলাম। তারপর যেখানে যেখানে রেবার জুতোর ছাপ আছে সেখানে

সেখানে ঐ ছাপগুলোর ওপর চেপে চেপে আমার জুতোর ছাপ দিয়ে দিলাম। আমি

চাইছিলাম পুলিশের সন্দেহ যেন কোনওভাবেই রেবার ওপর না যায় এবং আমার

ওপর যায়। তারপর আমি পুলিশের হাত এড়ানোর জন্য কাঠমান্ডু পালালাম। কিন্তু

এরপর ঘটনাচক্রে কালীকৃষ্ণ আপনার ওপর চড়াও হয়ে ঝামেলা আরম্ভ করলো।

আমার মনে হলো ওর সঙ্গে দেখা করে ওকে একদম চুপচাপ থাকতে বলাটা খুব

দরকার। আমি ভাবলাম আমি বোধ হয় কাঠমান্ডুতে পুলিশকে বোকা বানিয়েছি।

কিন্তু আমিই শেষ অবধি পুলিশের কাছে বোকা বনে গেলাম। পুলিশ তক্কে তক্কে

ছিল। যেই আমি দেশে ঢুকেছি সঙ্গে সঙ্গে আমাকে ধরেছে। আমি উপায় নেই দেখে

মুখ বন্ধ করে আছি। বলেছি আপনি না এলে কোনও কথা বলবো না।

-ঠিক আছে। এবার চলো। দেখা যাক কী অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। আমি

হ্যাঁ না বললে কোনও কথা বলবে না। আমিই বেশিরভাগ কথার উত্তর দেব।

খবরের কাগজে সবকিছু বেরোবে। ওরা এভাবেই চাপ সৃষ্টি করবে। এটা মেনে

নিতে হবে। আমাদের পক্ষে খবরের কাগজের ব্যাপারে কিছু করা এখন সম্ভব নয়।

পানু রায় এবং বড়কালী কেলো দারোগার ঘরে ফিরে আসার পর পানু রায় কেলো

দারোগাকে জিজ্ঞাসা করলেন,’ বলুন, কী জানতে চান?’

কেলো দারোগা বললো,’ আমি আপনাকে একটা ফটোগ্রাফ দেখাচ্ছি। এটা আপনি

চিনতে পারবেন। খবরের কাগজে ইতিমধ্যে বেরিয়েছে। কিন্তু তফাৎ হচ্ছে যে এটা

আরও পরিষ্কার। আপনি এই ছবিটায় আরও ডিটেলে সব দেখতে পাবেন।‘ কেলো

দারোগা একটা ৮ বাই ১০ ছবি পানু রায়ের হাতে দিয়ে বললো,’ এই ছবিটা

রক্তের ওপর একটা জুতোর ছাপের ছবি।‘ পানু রায় বললেন,’ ঠিক আছে। কিন্তু

আপনি কী জানতে চান?’

-আমার পরের প্রশ্নটা কৃষ্ণকালীবাবুর জন্য। কৃষ্ণকালীবাবু, এটা কি আপনার

জুতোর ছাপ?




বড়কালী পানু রায়ের দিকে তাকালো। পানু রায় মাথা নেড়ে উত্তর না দিতে

বললেন। কেলো দারোগা রেগে গিয়ে বলে উঠলো,’ এক মিনিট। আমরা আপনাদের

বিশ্বাস করে এই প্রশ্নগুলো করতে চলেছি যে আপনারা আমাদের প্রশ্নের ঠিকঠিক

উত্তর দেবেন। আমরা কৃষ্ণকালীবাবুকে আপনার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ দিয়েছি।

আপনার কি ঠিক করেছেন? উত্তর দেবেন না দেবেন না? ‘ পানু রায় বললেন,’

যদি না দিই?’ কেলো দারোগা বললো,’ তাহলে আপনাদের পস্তাতে হবে।

কৃষ্ণকালীবাবু ,আমি আপনাকে জিজ্ঞাসা করছি আপনি কি তিন সপ্তাহ আগে

সদরের এক জুতোর দোকানে গিয়ে এক জোড়া নতুন জুতোতে রবারের হিল

লাগিয়েছিলেন?’ পানু রায় বললেন,’ উত্তর দাও, কৃষ্ণকালী ।‘ বড়কালী উত্তর

দিল,’ হ্যাঁ, গিয়েছিলাম।‘ কেলো দারোগা বললো,’ এবার আপনাকে আমি এক

জোড়া জুতো দেখাব। ভালো করে দেখে বলুন এই জুতোজোড়াই সেই জুতোজোড়া

কি না?’ টেবিলের নিচে থেকে জুতোজোড়া বের করে টেবিলের ওপর রাখলো

কেলো দারোগা। চমকে উঠে বড়কালী জিজ্ঞাসা করলো,’ এ’দুটো আপনি কোথা

থেকে পেলেন?’ কেলো দারোগা ঝাঁঝিয়ে উঠে বললো,’ সেটা আপনার জানার

দরকার নেই। এ’দুটো কি আপনার?’ জুতো দুটোর গায়ে কিছু অদ্ভুত ছোপছোপ

দাগ। বড়কালী ভালো করে দেখে বললো,’হ্যাঁ, এ’দুটো আমার।‘

-আপনার অবগতির জন্য জানাই এই জুতো দুটোতে রক্তের দাগ পরীক্ষার জন্য

কেমিক্যাল টেস্ট করা হয়েছিল।যেখানে যেখানে রক্তের দাগ ছিল সেখানে সেখানে

ঐ বেগুনি ছোপছোপ দাগগুলো গেখা যাচ্ছে। আপনি কি ঐ রক্তের দাগগুলো কী

ভাবে এল সে ব্যাপারে কিছু বলতে চান?’

-এই ব্যাপারে আমি এখন কিছু বলতে চাই না।

-ঠিক আছে। এবার আমি আপনাকে একটা রঙ্গিন ছবি দেখাব।

ছবিটা কেলো দারোগা পানু রায়ের হাতে দিয়ে বললো,’ মিঃ রায়, ভালো করে

দেখে বলুন আপনি কী দেখছেন?’ পানু রায় বললেন,’ একটা পায়ের ছাপ।‘কেলো

দারোগা বললো,’ ভালো করে দেখুন।‘ পানু রায় অনেকক্ষণ ছবিটার দিকে তাকিয়ে

রইলেন কিন্তু কিছু উত্তর দিলেন না। কেলো দারোগা বললো,’ আমি বলছি। আপনি

মিলিয়ে নিন। ছবিতে একটা জিনিস দেখা যাচ্ছে যেটা সাদা-কালো ছবিতে দেখা

সম্ভব ছিলনা। ভালো করে লক্ষ্য করে দেখুন কৃষ্ণকালীবাবুর জুতোর ছাপের নিচে

আরও একটা আবছা জুতোর ছাপ দেখা যাচ্ছে যেটা কোনও মহিলার জুতোর ছাপ।

কৃষ্ণকালীবাবু, তার মানে কি শিবুলাল খুন হয়েছে জানার পর শিবুলালের

অ্যাপার্টমেন্টে গিয়েছিলেন এবং ইচ্ছাকৃতভাবে যেখানে যেখানে খুনী মহিলার জুতোর




ছাপ ছিল তার ওপর আপনার জুতোর ছাপ ফেলে আসল সাক্ষ্যপ্রমাণ লোপ করার

চেষ্টা করেছিলেন?’

পানু রায় বললেন,’ দারোগাবাবু আপনি যা বলছেন তাই যদি হয় তাহলে সেটা

অপরাধ।‘

-আপনার আইনের জ্ঞান দেখে আমি মুগ্ধ, মিঃ রায়। কত কি জানেন আপনি।

অবশ্য আপনার বয়সটাও দেখতে হবে।

-ধন্যবাদ, দারোগাবাবু। সেক্ষেত্রে আমি কৃষ্ণকালীকে বলবো এই প্রশ্নের উত্তর না

দিতে।

-ঠিক আছে। কৃষকালীবাবু, আমি আপনাকে একটা আঙ্গুলের ছাপ দেখাবো যেটা

শিবুলালের অ্যাপার্টমেন্টের পিছনের দরজার হ্যান্ডেলে পাওয়া গেছে। এটা অত্যন্ত

পরিষ্কার যে কেউ একজন সযত্নে ঐ হ্যান্ডেলটা মুছে সম্ভাব্য সমস্ত আঙ্গুলের ছাপ

তুলে দিয়ে সযত্নে নিজের আঙ্গুলের ছাপ হ্যান্ডেলের মাঝখানে ভালো করে দিয়ে

এসেছে। পরীক্ষা করে দেখা গেছে ঐ আঙ্গুলের ছাপটা আপনার। এই ব্যাপারে

আপনার মন্তব্য কী?

পানু রায় বললেন,’যদি আপনার কথা সত্যি হয় যে উনি হ্যান্ডেলের সমস্ত দাগ

মুছে নিজের আঙ্গুলের ছাপ ইচ্ছাকৃতভাবে রেখে এসেছেন তাহলে কি উনি অপরাধী

হিসাবে সাব্যস্ত হবেন?’ কেলো দারোগা বললো,’ অবশ্যই।‘ পানু রায় বললেন,’

সেক্ষেত্রে আমি ওনাকে এই প্রশ্নের উত্তর না দেবার জন্য অনুরোধ করবো।‘

কেলো দারোগা পানু রায়ের দিকে তাকিয়ে বললো,’ আপনি নিজে খুনী বন্দুক পাল্টে

দিয়ে একটা গোলমাল ইতিমধ্যেই করেছেন। এখন আবার গন্ডগোল পাকানোর চেষ্টা

করছেন। আমি আপনাকে সত্যি কথা বলার একটা শেষ সুযোগ দিচ্ছি। কী করে

খুনী বন্দুকটা আপনার কাছে এল?’

-আমি যদি সত্যি কথা বলি তাহলে আপনি আমাকে অ্যারেস্ট করবেন না?

-দেখুন আমি আপনাকে কথা দিতে পারছিনা। তবে এটুকু বলতে পারি যে তদন্তের

কাজে সাহায্য করার জন্য আপনার শাস্তি একটু কম হতে পারে।

-বেশ, তাহলে শুনুন।আমি কালীকৃষ্ণ অর্থাৎ কৃষ্ণকালীর ছেলের অফিসে গিয়ে

জিজ্ঞাসা করেছিলাম তার কাছে কোনও বন্দুক আছে কি না? ও আমাকে একটা

বন্দুক দেখার জন্য দিল। আমি বন্দুক থেকে একটা গুলি ওর টেবিলের মাঝখান

লক্ষ্য করে ছুঁড়ি। আমি তারপর কালীকৃষ্ণকে সঙ্গে নিয়ে রেবা কৈরালার ফ্ল্যাটে




যাই। কালীকৃষ্ণ রেবাকে বন্দুকটা দেয়। এটাই সত্যি কথা। আপনি এবার কী

বলবেন?

-বাজে কথা। আপনি নিজে খুব ভালোভাবেই জানেন যে আপনি ওখানেই বন্দুক

পাল্টেছিলেন এবং কালীকৃষ্ণ আপনার কথামত খুনী বন্দুকটা নিয়ে রেবার কাছে

আসে।

পানু রায় বড়কালীকে উদ্দেশ্য করে বললেন,’দেখো কৃষ্ণকালী, ওনার কথার কত

দাম।তুমি যদি এমন কিছু বলো যেটা ওনার বানানো গল্পের সঙ্গে মেলে না তাহলে

উনি বলবেন সেটা বাজে কথা। উনি সেটাই মানবেন যেটা উনি শুনতে চান।

‘কেলো দারোগা রেগে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে তারপর কী যেন ভেবে আবার

ধুপ করে চেয়ারে বসে পড়ল। পানু রায় বললেন,’ দারোগাবাবু, আপনি যেটা

ভাবছেন এবং প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন ব্যাপারটা আসলে তা নয়। ব্যাপারটা

নিয়ে আপনাকে আরও গভীরভাবে চিন্তা করতে হবে। চিন্তা করা অভ্যাস করুন।

আপনার গল্পে অনেক ফাঁক আছে। প্রথম ফাঁক আমি বন্দুক পাল্টেছি এটা প্রমাণ

করার জন্য আপনাকে ভাবতে হবে আমার এই কাজ করার পিছনে সম্ভাব্য

কারণগুলো কী কী? আইনের ভাষায় যাকে মোটিভ বলে।

-ঠিক আছে। আপনি থামুন। আপনার কাছে জ্ঞান শোনার জন্য আমি আপনাকে

ডাকিনি।

-শুনলে ভালোই করতেন। আমি আপনার সমস্ত প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দিয়ে

আপনাকে তদন্তের কাজে সাহায্য করেছি। আমি কি ধরে নিতে পারি যে

জিজ্ঞাসাবাদ আজকের মত শেষ?

-আপনি এখন আসতে পারেন।

-আর কৃষ্ণকালী?

-ওনাকে আর একটু আমাদের আতিথ্য গ্রহণ করতে হবে।

-আপনাদের ধন্যবাদ। কৃষ্ণকালী, তোমার সন্ধ্যা উপভোগ্য হোক। আমার উপদেশ

যে তুমি কোনও প্রশ্নের উত্তর দেবে না এবং মুখ বন্ধ করে থাকবে।

কেলো দারোগা চেঁচিয়ে বললো,’ রিপোর্টারদের ভেতরে পাঠাও।‘

পানু রায় বেরিয়ে অফিসের দিকে রওনা দিলেন। অফিসে সুন্দরী অধীর আগ্রহে

অপেক্ষা করছিল। পানু রায় ঢুকতেই জিজ্ঞাসা করলো,’ কেমন হলো, দাদু। সব

ঠিক আছে?’




-আমি এই কেসটার কয়েকটা জিনিস এখনও বুঝতে পারিনি।

-আর পুলিশ?

-পুলিশ তো কিছুই বুঝতে পারেনি।

-আর বড়কালী?

-বড়কালীকে কেলো দারোগা এই খুনের সঙ্গে জড়িত হিসাবে প্রমাণ করার চেষ্টা

করবে।

-আর কাকে খুনী হিসাবে প্রমাণ করতে চাইছে?

-রেবা কৈরালাকে।

-আর তোমাকে?

-আমাকে বড়কালীকে প্রমাণলোপের চেষ্টায় সাহায্য করার জন্য অভিযুক্ত করবে

বলে মনে হচ্ছে।

-তাহলে এখন কী করবে?

-জানি না। তবে মাথা ঠান্ডা রেখে ভাবতে হবে। সবটা এখনও পরিষ্কার নয়।

ভাবতে হবে, আরও ভাবতে হবে। আমার মনে হয় কাল সকালেই ওরা রেবা

কৈরালাকে অ্যারেস্ট করবে। তারপরে বড়কালীর নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি

করবে রেবাকে সাহায্য করার জন্য। মনে হয় বড়কালীর জামিন হয়ে যাবে। তবে

ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করে বড়কালীকে বাধ্য করার চেষ্টা করবে পুলিশের পক্ষে

যাবার জন্য।

- কিন্তু আমরা এখন কী করব?

-আমরা যে খাবারগুলো অর্ডার করেছিলাম সেগুলো দিতে বলো। চলো ভালো করে

ডিনার করি। আমার কেন যেন মনে হচ্ছে এরপর বেশ কিছুদিন ভালো করে

ডিনার করা যাবে না।

-একথা কেন বলছো? ওরা কি তোমাকে অ্যারেস্ট করতে পারে?

-না তা নয়। তবে কেন জানি না আমার বারবার মনে হচ্ছে এর পর বেশ

কিছুদিন রাতের খাবার আর ঘুম দু’টোই বিঘ্নিত হতে পারে। চলো খেতে যাই।
0

গল্প - স্বর্ণদীপ চট্টোপাধ্যায়

Posted in





















দুপুর হতেই বৃষ্টি নামল। সমস্ত তোলপাড় করা বৃষ্টি নয়। বুক হু হু করা বৃষ্টি, মন ওলটপালট করা ঝিরঝিরে বৃষ্টি । এমন দিনে সিগারেট ধরাতে গেলেও আঙ্গুল অসাড় হয়ে যায়। বিছানা লেপটে থাকে পিঠের ওপর।

অথচ আজ শুভর আসার কথা। এভাবে থাকলে তো চলবেনা।

ঋদ্ধি এখন বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে। একটু একটু জলের ছাঁট এসে পড়ছে ওর জামায়, চুলে। তেল, শ্যাম্পু কিছুই দেওয়া হচ্ছেনা কদিন। কাল দিতে হবে। তবে শুভ এসেই প্রচুর গালি দেবে। কপালে কষ্ট আছে আজ। আগের সপ্তাহেই বলে গেছে, "শালা, মাইনে পাওনা? ঘরে পরার পাজামা আর টি-শার্টটা পরের সপ্তাহের মধ্যে চেঞ্জ না করলে এরপর তোর পাড়ার লোকের থেকে চাঁদা তুলে কিনে দেব, দেখিস!" আসলে কিছু করার ছিল না। কিছুই করার ছিল না। গত দু'বছরে নতুন শহরে একা থাকার একটা অভ্যাস হয়েছে বটে কিন্তু নিজের সাথে ঘর করার কায়দাকানুনগুলো এখনও ঋদ্ধি গুছিয়ে উঠতে পারল না। বাইরে খাবে না, রান্নার দায়িত্ব নিজে নেবে। এ পাড়ার আশেপাশে তিনটে বাজার বসে। দেখে নিতে হবে কোথায় পাওয়া যায় একটু সস্তায় পটল, ঢ্যাঁড়শ, আরও কিছু সবুজ সবজি। তারপর বাড়ি ফিরে রান্না বসাবে, নিজের যত্ন নেবে। হয় নি। শুভ্র অনেকবার বলেছে। হয় নি। প্রতিদিন মা ফোন করে বলেছে, "এবার একটু সুইগি, জম্যাটো থেকে খাওয়ার আনানো বন্ধ কর।" হয় নি। মাঝে মাঝে নিজের খাওয়ার টেবিল, বইয়ের তাক, বাথরুমের কোন, এসির ভেন্ট দেখলে ঋদ্ধির নিজেরই কান্না পায়। এতদিন সবকিছুই হয়ে যাচ্ছিল। হঠাত্‌ এই নেই-রাজ্যে এসে পরতে হল কেন?

এরকম বৃষ্টি হলে শ্রেয়ানের কথা মনে পড়ে খুব। ইউ জি ফার্স্ট ইয়ারে কলকাতায় আসার পর শ্রেয়ানই প্রথম বন্ধু। লাইব্রেরীতে একসাথে একই বই খুঁজতে খুঁজতে একদিন আলাপ হয়েছিল। আলাপ বলা যায়না, একটু ঝামেলাই হয়েছিল। তারপর ক্যান্টিনের সামনের দোকানে গিয়ে ঋদ্ধিকে কয়েকটা জরুরী পাতা ফটোকপি করে নিতে হয়েছিল কারণ বইটা শ্রেয়ানই নিয়ে যাবে। সেদিন ক্লাসের পর এরকম বৃষ্টি শুরু হল। তখন লর্ডসের মোড়ে খুব একটা তেমন ক্যাফে ছিলনা। কিন্তু ক্যাফেফাইলে একটা আশ্চর্য সুন্দর আইরিশ কফি বানাত। ওপরে একটু হোয়াইট চকলেট নিত ঋদ্ধি। সেখানেই শ্রেয়ানের সাথে ক্লাসের পর দেখা হয়েছিল, আলাপ জমেছিল আস্তে আস্তে। ইউনিভার্সিটি ছাড়ার ছয় বছর পরে আরেকদিন এই ক্যাফেতেই শ্রেয়ানের সাথে ঋদ্ধির দেখা হয়েছিল। তবে সেদিন ওদেরই ইউনিভার্সিটির পিজি ওয়ানের একটা মেয়ের সাথে এসেছিল শ্রেয়ান। তার বছর দেড়েক পরেই ক্যাফেফাইল বন্ধ হয়ে যায়। এখন এই ক্যাফেটা আর নেই।

শ্রেয়ানের সাথে তার পরে আর কোনদিন সামনা সামনি দেখা হয় নি। ফেসবুকে হয়েছে, ইন্সটাগ্রামে ছবি দেখেছে শ্রেয়ানের নতুন বন্ধুদের, কলিগদের। গত সপ্তাহে রোববার শ্রেয়ান কলিগদের সাথে লঙ ড্রাইভে কোলাঘাট গিয়েছিল শের-এ-পাঞ্জাবে খেতে। নতুন একটা SUV নিয়েছে - লাল রঙের একটা ক্রেটা। কলেজে পড়তে ব্ল্যাক ভারনা কিনবে বলে দুজনেই পাগল ছিল। তারপর শ্রেয়ান হায়দ্রাবাদ চলে গেল। তেমন কথা হত না আর পরের দিকে। ঋদ্ধি যখন কলেজের পার্টটাইম চাকরিটা ছেড়ে সাংবাদিকতা করবে কিনা ভাবছে, তার মাস দেড়েক পড় সম্ভবত ও কলকাতায় ফিরে এসেছিল নতুন একটা কাজ পেয়ে। জানায়ও নি একবার। একদিন সেক্টর ফাইভের দিকে একটা কাজ থেকে ফেরার সময়, বাস থেকে এক ঝলক, ওয়াটার সাইডের সামনে একটা দোকানে সিগারেট খেতে দেখেছিল শ্রেয়ানকে। ওইটুকুই, ব্যাস। ভুলেই তো গেছিল একরকম, তবুও মাঝে মাঝে সমস্ত ওলটপালট করে দেওয়ার মত এক একটা বিকেল আসে কেন?

এগারোটা বাজে। শুভ এখনও এল না। আধঘন্টা লেট। এরকম দেরি করে কেউ এসে পৌঁছেছে বলে কতগুলো ডেট ক্যান্সেল করেছে ঋদ্ধি। শ্রেয়সীর সাথে, অলিম্পিয়ার সাথে, আরও অনেকে আছে। মা অফিস থেকে দেরিতে ফিরলেও ঘণ্টা খানেক কথা বলত না ক্লাস এইট পর্যন্ত। সেসব না নয় ছেলেমানুষি, কিন্তু তারপরে যা যা হয়েছে সেটা অত সহজ ব্যাপার নয়। প্রথম প্রথম মনে হত, এ আর কী এমন ব্যাপার ! কারো জন্য রাস্তায় রোদে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হবে কেন, হ্যাঁ? সময়ে পৌঁছোতে পারেনি একজন, তাই আর অপেক্ষা করার কোন মানে হয় না। আবার কী! কিন্তু এরকম একবার হয় নি। বারবার হয়েছে। কলেজে শুভজিত একদিন বলেছিল, "দেখ, আমিতো পাস্ট লাইফ রিগ্রেশন, রেইকি, স্পিরিচুয়াল হিলিং এসব করছি এতদিন? তোকে একটা জিনিস বলি। এই যে তুই সময় ব্যপারটা এত মেনে চলিস, দেখবি এর জন্যে তুই তোর জীবনে সবকিছু ঠিক ঠিক সময়ে পেয়ে যাবি। দেখে নিস।" যাক, একজন তো বুঝেছে। ব্যাল্যান্স। নিজের মত একটা ব্যাল্যান্স তৈরি করার যথেষ্ট কারণ আছে ঋদ্ধির। সবকিছু এমনি এমনি নয়।

সময় সময় অনেক কিছু পেয়েছিল ঠিকই। শুধু, ধরে রাখতে পারে নি। অলিম্পিয়ার সাথে তিন মাস, শ্রেয়সীর সাথে বোধহয় তার থেকেও কম। শ্রেয়ান নেহাত বন্ধু বলে টিকে গিয়েছিল কলেজের কয়েকটা বছর। তিন বছর কি অনেকটা দীর্ঘ একটা সম্পর্কের জন্য? মনে তো হয় না। বরং একটা গোটা জীবনের জন্য এক একজনের সাথে থাকতে চেয়েছিল ঋদ্ধি- শ্রেয়ানের সাথে, শ্রেয়সীর সাথে, অলিম্পিয়ার সাথে, আর শুভজিত? শ্রেয়ানের খবরটুকু নিতে হয় তবু, নিজের তাগিদে। না হলে রাতে ঘুম আসবে না। স্বপ্ন দেখতে গেলেও একটু চোখ লেগে আসতে হয়। শ্রেয়ানের ইন্সটা পেজটা না দেখলে সেটুকুও হয় না আজকাল।


জোরে বৃষ্টি নামছে এবার। আচ্ছা, শুভজিত ঠিক বলেছিল? সব সময়ে সময়ে পাবে? আগের ওরা না হয় থাকে নি, ছেড়ে গেছে। ওরা বুঝতে পারেনি ঋদ্ধি কেন করছে এসব। কিন্তু শুভ ওদের মত নয়। শুভ বুঝবে। বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল ঋদ্ধি এবার। গ্রিলের গায়ে হেলান দিল। বাহ। একটু একটু বৃষ্টি এসে লাগছে গায়ে। সিগারেট ধরাবে একটা? অবশ্যই।

হাওয়া দিচ্ছে না আজ তেমন। না হলে এত যত্ন করে ধোঁয়া ছাড়া জলে যেত। কিছুটা নিকোটিন টেনে নিচ্ছে এখন গ্রিলরেলিং-এর মানি প্ল্যান্টগুলো, বাকিটা গ্রিলের গায়ে ধাক্কা খেতে খেতে দু'দিকে চলে যাচ্ছে, যেদিকে ইচ্ছে, যেমন ইচ্ছে। শুভ বুঝবেনা? নিশ্চয়ই বুঝবে। যে ছেলে মায়ের মত দুবেলা খাওয়া দাওয়ায়ার খোঁজ নিচ্ছে, জামা বদলাচ্ছে কিনা, কাচছে কিনা তার খবর রাখছে, সিগারেট কটা কমল এই সপ্তাহে তার দিকে নজর দিছছে, সে এটুকু বুঝবে না? দেরি করলে সেদিন ঋদ্ধি কারো সাথে আর দেখা করে না, আর সেটা কেন করে না, এসব বুঝতে পারবে না শুভ? যথেষ্ট বুদ্ধি আছে ওর। বাইরে দেখা করার ব্যাপার থাকলে না হয় সেখান থেকে চলে আসা যায়। শুভর তো আজ ওর বাড়ি আসার কথা।

তাতে কিছু এসে যায় না। সাড়ে এগারোটা বাজে। সীমা থাকা উচিত সব কিছুর। না হলে ওকেও 'টেকেন ফর গ্রান্টেড' ভাববে। হোয়াটসআপ খুলল ঋদ্ধি। আর এক মুহূর্ত না ভেবে সটান লিখে দিল, "আচ্ছা, সরি রে। তুই আজ আর আসিস না। অফিসের একটা হঠাৎ জরুরী কাজ পড়েছে। আমি বেরিয়ে যাচ্ছি। খুব সরি।"

বৃষ্টির জোর বাড়ছে আরও। এখন যদি শুভ চলে আসে তাহলে আবার একটা বাজে ব্যাপার হবে। নিশ্চয়ই বাড়ি থেকে বেরিয়ে পরেছে এতক্ষণে। তাহলে? এই বৃষ্টিতে বাড়ি বেরিয়ে যাবে? ছাতায় হবে না। একটা ক্যাব ডাকতে হবে। হয়তো কিছু সারচার্জ নেবে। কিন্তু, এছাড়া এখন আর কিছু করার নেই। শুভ যদি বাড়ী এসে দেখে তালাটা ভেতর দিয়ে বন্ধ তাহলে...

নাহ, ক্যাব বুক করতে হবে এবার শিগগির। সিগারেটটা শেষ হয়ে এসেছে। কাছাকাছিই কোথাও যাবে। বেশিদূরে নয়। শুভ্রর ধাতানিতে যে পাজামাটা কিনেছিল দিন দুয়েক আগে, ওটাই পরা যাক। বাথরুমে ঢুকেছে ঋদ্ধি এবার। একটু হাল্কা হতে হবে। অনেক হয়েছে সকাল থেকে। এরকম ঘোলাটে আকাশ, বৃষ্টিদিন খুব ভেতর থেকে ক্লান্ত করে দেয়। ভেঙ্গেচুরে দেয় অনেকখানি। যেটুকু আছে তারও কিছু কিছু গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে ছিটকে পরে এদিক ওদিক কোথায় যেন! সিগারেটের ছাইটা এবার কমোডে ফেলবে? না। দাঁড়িয়ে যাক। ইউনিভার্সিটিতে প্রথম ছাই না ফেলে ধোঁয়া টানতে শিখিয়েছিল শ্রেয়ান। দেখা যাক, আজ হাত কাঁপে কিনা।

সিগারেটের পেছনটুকু আস্তে আস্তে সিস্টার্নের ওপর সাবধানে ব্যালেন্স করতে থাকল ঋদ্ধি। পুরো ছাই হয়ে আছে সিগারেটটা। সাবধানে। ব্যালেন্স করতেই তো এতকিছু। নিজে করলে হবে না, অন্যকেও বোঝাতে হবে কেন এটা তোমার ন্যূনতম প্রয়োজন। সাবধানে। হ্যাঁ। এবার হয়েছে মনে হয়। হাত কাঁপলে হবে না এবার। নিখুঁতভাবে করতে হবে আজ অন্তত এটুকু। ফোনটা ট্রিং করে উঠেছে তিনবার। শুভ মনে হয়। এখন ওসব ভাবার আর সময় নেই। হাত কাঁপলে হবে না আর এবার। একটু ছাইও আজ পড়তে দেবে না ঋদ্ধি। পুড়েছে তো কি? এক কণা ছাইও আজ সিস্টার্নের ওপর থাকবে না। সোজা রাখতে হবে। সোজা...
0

গল্প - অচিন্ত্য দাস

Posted in




















উঁচুনিচু পাহাড়ি জমি, চারিদিকে গাছ, গাছ আর গাছ। এখানকার জাতীয় উদ্যান মানে ন্যাশনাল পার্কে ঢুকে ভারি ভালো লাগছিল। পাথরে বাঁধানো রাস্তা এঁকেবেঁকে অরণ্যের ভেতরে চলে গেছে, সে পথ ধরে হাঁটতে শুরু করলাম। মায়াকানন বলে একটা কথা আছে – এটা তাই। কোথাও পেল্লায় উঁচুউঁচু সেডার, পাইন, স্প্রুস গাছের ঘন বন, কোথাও ঝিরঝিরে ঝরনা নেমেছে আর তা পার হওয়ার জন্য কাঠের সাঁকো। কোথাও অদ্ভুত ধরনের কিছু ফুল ফুটেছে, কোথাও সবুজ জলের পুকুর। একটা জায়গায় এসে থমকে দাঁড়াতে হলো – বহু আগুনে পোড়া গাছ ভুলুন্ঠিত, তাদের পুড়ে যাওয়া গায়ে শ্যাওলা জমতে শুরু করেছে। কাছেই দেখলাম একটা বড় ফলকে ছবিটবি দিয়ে বুঝিয়ে দেওয়া আছে বনে আগুন লাগার পর কী কী হয়। ক্ষতি কী হয় তা তো মোটামুটি জানা – বায়ু-প্রদূষণ, পশুপাখির প্রাণনাশ ইত্যাদি। কিন্তু শেষের দিকে দেখলাম লেখা আছে আগুনের অনেক উপকারিতাও আছে। দাবানল জিনিসটা প্রকৃতির একটি রীতি বা নিয়ম। জমে থাকা ঝরাপাতার পুরু আস্তর পুড়ে গিয়ে মাটি অনেক কাল পরে পায় আলোর স্পর্শ। মরে যাওয়া পাতার ভেতর যা সার-পদার্থ ছিল তা মাটিতে আবার মিশে গিয়ে নতুন লতাপাতা গাছ-গাছালির পুষ্টি যোগায়। মোটকথা আগুন নতুন সৃষ্টির পথ খুলে দেয়।

এ দেশের সরকার প্রাকৃতিক ব্যাপার-স্যাপার খুব সুন্দর ভাবে সংরক্ষণ করে। এদের দেশে অঢেল প্রাকৃতিক সম্পদ, অবিশ্বাস্য রকমের প্রাকৃতিক শোভা। বিরাট বড়লোকের দেশ, তার মানে অবশ্য এই নয় যে সবার হাতে পয়সা আছে। বহু মানুষ গৃহহীন, রাস্তাঘাটে রেল-স্টেশনে আকছার তাদের দেখা যায়। আর এক শ্রেণী আছে যারা সারাদিন প্রচণ্ড পরিশ্রম করে বেঁচে আছে। হয়তো একটু একটু করে সঞ্চয় করে কোনো রকমে একটা পাকাপাকি আস্তানার ব্যবস্থা করতে পেরেছে। যেমন ফেডেরিক আর মারিয়া।

ফেডেরিকের বাবা ব্রাজিল থেকে ছেলেপিলে নিয়ে এসে এদেশে থিতু হয়েছিলেন। আর মারিয়ারা অনেক প্রজন্ম আগে মেক্সিকো থেকে এসেছিল। দুজনের স্প্যানিশ ভাষায় কথা বলে। বিধির বিধানে দুজনের কোথায় যেন দেখা হলো আর সঙ্গে সঙ্গে চার চোখের মিলন। কিছু দিনের মধ্যেই বিবাহ-বন্ধনে জড়িয়ে পড়ল দুজনে। প্রথম দু-চারমাস বেশ কাটলো, যেমন কাটে। কিন্তু তারপরেই মারিয়া বুঝল ফেডেরিকের পুরুষ-সুলভ গোঁ আছে ভালো রকম। চট করে ক্ষেপেও যায় লোকটা। এদিকে ফেডেরিক বুঝল মারিয়া যেমন অভিমানী তেমনি তার জিভের ধার। সামান্য কথা কাটাকাটি থেকে শুরু হয়ে রোজই তুমুল ঝগড়া লেগে যেত দুজনের। অবশ্য সকাল অবধি গড়াত না, কারণ কত আর ঝগড়া করবে! সকাল থেকে দুজনেরই তো হাড়ভাঙ্গা খাটনি শুরু হবে, চলবে সেই সন্ধে অবধি। আর দুজনের উপার্জন ছাড়া এ দেশে এ বাজারে কিছুতেই চলে না।

দিন কয়েক ধরে শোনা যাচ্ছিল শহরের পশ্চিম দিকটায় বাড়ির দর নাকি নেমে যাচ্ছে। কারণটা হলো আগুন। একটুই দূরেই বন, সেখানে গত পাঁচ বছরে ছোটবড় আগুন লেগেছে সতেরো বার। আগুনের ভয় লোকে বাড়ি বিক্রি করে চলে যাচ্ছে। ফেডেরিক বলল, “মাসে মাসে এতগুলো টাকা ভাড়া গুণছি – এই আমাদের সুযোগ। ব্যাঙ্ক থেকে লোন নিয়ে একটা বাড়ি কিনে ফেলি।”

“ওই আগুনের এলাকায়? না, একদম নয়”

ফাটাফাটি চলল টানা দুদিন কিন্তু তারপর বাড়ি কেনাই ঠিক হলো। পয়সা যে বাঁচবে তা তো মিথ্যে নয়, যতই ঝগড়া হোক পয়সার ব্যাপারটাতে এসে দুজনের মত মিলল।

লোন আংশিক পাওয়া যায়, বাকি টাকা তো দিতে হবে। আবার তুলকালাম। এ বলে তোমার অনেক জমানো আছে, ও বলে তুমি তো সংসারে কিছুই দাও না – এবার দাও। যাই হোক শেষমেষ বাড়ি কেনা হয়ে গেল। ছোট একতলা দু-কামরার বাড়ি। সামনে পেছনে খোলা জায়গা একটু। বাড়ি হিসেবে চলনসই, তবে জঙ্গলের বেশ কাছে।

প্রথমে কথা ছিল একটা তাদের শোবার ঘর হবে, আর একটা লিভিং রুম ধরনের। কিন্তু রোজই রাত্তিরে কথা-কাটাকাটির পর হয় ফেডেরিক নয় মারিয়া অন্য ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ত। সাধের ‘লিভিং রুম’ গোঁসা ঘর হয়েই রয়ে গেল।

সেদিন রাতে এত ঝগড়া হয়েছিল যে সকালে ফেডরিক ভাবলো আজ একটা কিছু এসপার-ওসপার করতেই হবে। এ ভাবে আর চলছে না। আরে বাবা, তার নিজেরও তো একটা জীবন আছে! রোজ অশান্তি, রোজ অশান্তি!! বাড়ি কেনার কাগজ বানাতে ক্লড বলে এক ছোকরা উকিলের সাহায্য নিয়েছিল সে। কী ভেবে ফেডরিক ক্লডের কাছে গেল।

“ভাই, ক্লড কী আর বলি তোমাকে – বড় অশান্তি, বড় সমস্যায় ভুগছি গো। রোজই মারিয়ার সঙ্গে ঝগড়া। মারিয়া তো আজকাল আমাকে মানুষ বলেই মনে করছে না…”

“এটা আবার কোনো সমস্যা হলো, বন্ধু! আজকাল ঘরেঘরে তো এই চলছে। দেখো ফেডেরিক, জীবন তোমার একটাই, নষ্ট হতে দিও না। ডিভোর্সের মামলা কর।”

যদিও ফেডেরিক এইরকমই কিছু ভাবতে ভাবতে এসেছিল, ডিভোর্স কথাটা শুনে সে যেন খানিকটা ঘাবড়েই গেল। আমতা আমতা করে বলল, “তা কী করতে হবে…”

ক্লড ছোট ছোট চিরকুটের মত কাগজে খসখস করে কীসব লিখলো, তারপর সাত-আটটা কাগজ একটা খামে ভরে ফেডেরিককে দিল। বললো, “কটা পয়েন্ট আলাদা আলাদা কাগজে লিখে দিলাম। অন্তত তিনটে কি চারটে তোমাকে বাছতে হবে, যেগুলো তুমি কোর্টে প্রমাণ করতে পারবে। আর এই নাও ফর্ম। ভেবেচিন্তে ভর্তি করবে – পয়েণ্টগুলো যেন থাকে। আবার এসো দশ দিন পরে। এখন পঞ্চাশ ডলার বাকসটায় রেখে যাও, আমার ফি। হ্যাঁ, পঞ্চাশ – ফাইভ জিরো…”

এই বাজারে পঞ্চাশটা ডলার গেলো। মনটা খারাপ হয়ে গিয়েছিলো ফেডেরিকের । সন্ধের মুখে বাড়ি ঢুকে ডিনার খেতে বসে ফেডেরিক দেখে স্যুপটা ঠাণ্ডা আর স্বাদটাও কেমন যেন। বলল, “মারিয়া, তুমি রান্নায় মন দিচ্ছো না, স্যুপটা নিজে চেখে দেখেছ? ছাগলেও খাবে না…”

“ছাগলে না খেলেও তুমি খাবে। আমি অত স্পেশাল রান্না করতে পারব না…কাল থেকে তুমি নিজের খাবার বানিয়ে নিও।”
“মানে, তুমি রান্নাটাও করবে না। তাহলে তোমাকে বিয়ে করলাম কেন?”

“সে তুমি জানো, আমি তো বলিনি…”

ফেডেরিকের মাথা গরম হয়ে গেল। বলেই ফেলল, “জানো আজকে আমি উকিলের কাছ থেকে কাগজপত্র সব নিয়ে এসেছি, তোমার থেকে আলাদা হয়ে যাব”

ফেডেরিক ভাবছিল পঞ্চাশ ডলার খরচা হয়েছে ঠিকই কিন্তু এ না হলে মারিয়াকে চাপে ফেলা যেত না। এইবার মারিয়া কেঁদেকেটে…

ও বাবা! কোথায় কী। মারিয়া তো শুনে হেসেই খুন। বলল, “যাও, তুমি কালকেই কেস ফাইল করো। আমার যাবার অনেক জায়গা আছে, অনেকেই আমাকে বিয়ে করতে রাজি হবে…”

ফেডেরিক ভ্যবাচ্যাকা খেয়ে গেল। পঞ্চাশ ডলার খরচা করে ভেবেছিল ভালো ওষুধ পাওয়া গেছে, তার তো উল্টো ফল হচ্ছে …দাঁড়াও না, এবার কেস ফাইল করেই ছাড়বে সে।

আর কী কী করবে ভেবে ওঠার আগেই দুজনের ফোনই তীব্র আওয়াজ করে বেজে উঠল। একসঙ্গে। এ তো ফোন আসা নয়। দুজনে ফোন নিয়ে দেখল লাল লাল বড় বড় অক্ষরে লেখা – বনে আগুন লেগেছে, আগুন শহরের দিকে আসতে পারে। সাবধান, সাবধান!!

ব্যাস, আবার তুলকালাম। মারিয়া বলল, “বললাম এখানে বাড়ি নিও না, সেই তোমার জেদ…”

“হ্যাঁ, শেষে তো বললে… নিয়েই নাও, এর থেকে কমে কি আর পাব...”

ঝগড়ার তাপ বাড়তে লাগল, তারপর যেমন হয়, দুজনে দুঘরে শুয়ে পড়ল।

মোরগ-ডাকা ভোরে মারিয়ার ঘুম ভেঙ্গে গেল। কালকের মতো তীক্ষ্ণ শব্দে ফোন বাজছে। লাল অক্ষরে লেখাটা পড়েই মারিয়া দৌড়ে গিয়ে ফেডেরিককে ঘুম থেকে তুলল। ওঠো, ওঠো …

বলতে না বলতেই ফেডেরিকের ফোনটাও বেজে উঠল। ভয়ঙ্কর সাবধানবাণী। হাওয়ার গতি শহরের দিকে হওয়ায় আগুন দ্রুত এদিকে এগিয়ে আসছে। এক ঘণ্টার ভেতর বাড়ি ছেড়ে চলে যাও, তার আগে যেতে পারলে ভালো হয়।

ফেডেরিক জানলা দিয়ে দেখল পাহাড়ের ওপারে লাল আগুনের আভা দেখা যাচ্ছে, আর কালো ধোঁয়া তো আছেই। দুজনে কোনোরকমে দরকারি জিনিসপত্র দুটো স্যুটকেস আর একটা ব্যাগে পড়ি-কি-মরি করে ভরতে লাগলো। যা যা মনে পড়ল তখন।

“এই ফেডেরিক, ওষুধের বাক্সটা আগে নাও...”

“নিচ্ছি। মারিয়া তুমি আলমারি থেকে দুজনের পাসপোর্ট আর কার্ডগুলো তাড়াতাড়ি ব্যাগে ভর ... আমি গাড়ি গেটের সামনে আনছি। দুজনের গরম কোট আর স্লিপিং ব্যাগদুটো নিও… কোথায় কোন শেলটারে ঢোকাবে কে জানে।”

দশ বছরের বৃদ্ধ এবং চারবার হাত বদল করা গাড়ি ওদের একটা ছিল বটে। এখন ওটাই ভরসা। দুজনে মিলে যা পারে, যতটা পারে ভরল। মারিয়া হঠাৎ বলল, “দাঁড়াও, আলমারির চাবি আর জুয়েলারি বাক্সটা নেওয়া হয়নি।” ফেডেরিক বলল, “তুমি অন্য জিনিস দেখ, আমি তাড়াতাড়ি নিয়ে আসছি…”

গাড়ি যখন চলল তখন লাল আভা আরও বেড়েছে, ধোঁয়ায় চোখ জ্বলছে।

***

টানা পাঁচদিন শেলটারে থাকতে হলো। দমকল, হেলিকপ্টার, এরোপ্লেন থেকে জল আর কেমিকাল ছড়িয়ে আগুন আয়ত্বে আনা হলো বটে কিন্তু ততদিনে ক্ষতি হয়ে গেছে অনেক।


ছ-দিনের দিন সকালে রাস্তা খুলল। বোঁচকা-বুঁচকি গাড়িতে তুলে দুজনে রওনা দিল শহরের দিকে। রাস্তায় যেতে যেতে দেখল আগুনের দাপটে সব তছনছ হয়ে গেছে। ভয় ভয় তারা বাড়ির দিকে এগোল, কী দেখবে কে জানে, কপালে কী যে আছে!

গাড়ি থেকে এক পলক দেখেই মারিয়া কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল। ফেডেরিক তাকে বুকে জড়িয়ে ধরল, মারিয়ার কান্না আর থামে না। কী আর সান্ত্বনা দেবে ফেডেরিক! বাড়ির একটা দিক পুড়ে গেছে। কাঠের কাঠামোটা কালো কাঠ-কয়লা হয়ে দাঁড়িয়ে – ফাঁকে ফাঁকে কটা অক্ষত সাদা টালি রাক্ষসের দাঁতের মতো বেরিয়ে রয়েছে।

মিন মিন করে ফেডেরিক বলল, “মারিয়া আমাদের শক্ত হতে হবে, একটা দিক তো ঠিক আছে। ইনশিওরেন্স থেকে কিছু তো পাবো। আবার আমরা গড়ে তুলব, মারিয়া। তুমি শুধু মনের জোর হারিও না।”

এরপরের দিনগুলো ছিল অসম্ভব পরিশ্রমের দিন। মিস্ত্রি লাগানোর খরচ অনেক – তাই বিকেলে কাজ থেকে ফিরে দুজনে হাতে হাতে বেশি-ক্ষতি-না-হওয়া দিকটা মেরামত করত সেই রাত অবধি। কাজের মধ্যেও দ্বিমত হতো ঠিকই কিন্তু এত খাটা-খাটনির পর ঝগড়া করার শক্তি আর অবশিষ্ট থাকত না। ঝগড়া করার আর একটা অসুবিধে ছিল – গোঁসা ঘর তো পুড়ে গেছে, শুতে তো হবে একটাই ঘরে! ভোরবেলা আবার দুজনের কাজে বেরিয়ে যাওয়া। এই করে মাস তিনেক কেটে গেল।

এদিকে বীমা কোম্পানী কিছু কিছু টাকা দিতে শুরু করেছে আর সরকারের পক্ষ থেকে কিছু ঠিকেদার বাড়ি সারাচ্ছে একটু কম খরচে। ঘর-দুয়ারের পোড়া ক্ষতে মলম আর ব্যাণ্ডেজের ব্যবস্থা হওয়াতে আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার বাড়িঘরগুলো অল্প অল্প করে আবার স্বাভাবিকের দিকে মোড় নিচ্ছে।

ক্ষতি হয়ে গেছে অনেক। বাড়ি কেনার পর সঞ্চয় তলানিতে ঠেকে গিয়েছিল আর এ কদিনে ব্যাঙ্কের খাতা প্রায় শূন্য। তবু এরই মধ্যে মারিয়া-ফেডেরিকের জীবনও স্বাভাবিক হয়ে আসছে। আর হপ্তা দুয়েকের ভেতর বাড়ির কাজ হয়ে গেলে দুটো ঘরই ব্যবহারযোগ্য হয়ে উঠবে। ওদের জীবন যে সত্যি স্বাভাবিক হয়ে আসছে সেটা বোঝা গেল সেদিন রাত্তিরে। মারিয়া বলল. “বীমা কোম্পানী কত টাকা দিয়েছে এখন পর্যন্ত?” ফেডেরিক অঙ্কটা জানাতেই মারিয়া সন্দেহের সুরে বলল, “তোমাকে বিশ্বাস নেই, ঠিক বলছ তো! ও টাকা বাড়ির জন্য, কায়দা করে আবার পকেটে পুরো না!”

ফেডেরিক গেল ক্ষেপে। “হ্যাঁ, আমাকে তো তোমার কোনদিনই বিশ্বাস হয় না। পড়তে অন্য লোকের হাতে, বুঝতে কত ধানে কত চাল …”

কলহের দেবতা দেবর্ষি নারদের অবাধ গতি সব দেশেই। তিনি ধর্মাধর্ম, দেশকাল কিছুই মানেন না। কখন যে তিনি অদৃশ্য হয়ে মারিয়া-ফেডেরিকের মাঝখানে এসে “হোক হোক আরও হোক” বলে চলে গিয়েছেন!! বাক-বিতণ্ডা বাড়তে বাড়তে একেবারে তার সপ্তকে চড়ে গেল! ‘জলসা’ চলল অনেক রাত্তির অবধি, সকালেও দেখা গেল তার রেশ ফেডেরিকের ভেতর র‌য়ে গেছে। ঘুম ভেঙ্গেই ফেডেরিক ঘরের জিনিস-পত্র টেনেটুনে ওলোট-পালট করে ক্লডের দেওয়া খামটা খুঁজতে লাগলো, যার ভেতরে ‘পয়েণ্ট’ লেখা চিরকুটগুলো ছিল। কিছুক্ষণ বৃথা জিনিসপত্র সরিয়ে টরিয়ে বুঝল বাড়ির ওপর এতো ধকল গেছে – ও আর পাওয়া যাবে না। কিন্তু তাতে আত্মবিশ্বাস হারালে চলবে না। ‘পয়েণ্টগুলো’ মনে করার চেষ্টা করতে লাগলো সে – দুএকটা মনে পড়াতে কাগজ পেনসিল নিয়ে লেখার যোগাড় করছিল এমন সময় মারিয়া এসে দাঁড়াল সামনে। “সকালে এসব কী শুরু করেছ, কাজে যাবে না…”

“না যাব না। যাচ্ছি ক্লডের কাছে, কেস ফাইল করব …”

মারিয়া একটুও না দমে ফুঁসে উঠল, “তোমার সব কিছুতেই দেরি। সেই কবে থেকে আস্তিন গুটিয়ে বলেই চলেছ কেস করব, কেস করব … কিছুই তো করলে না…”

“করিনি তো কী হয়েছে, এখন করব, আজই করব!”

“না, করবে না।”

“মানে?”

“খোকা আসছে, কিংবা খুকি।”

ধপ করে বিছানায় বসে পড়ল ফেডেরিক। পেনসিলটা হাত থেকে মেঝেতে পড়ে গড়িয়ে গড়িয়ে খাটের তলায় ঢুকে গেল।


*****


ভাবছিলাম ওই ন্যাশানাল পার্কের ফলকটাতে ঠিক কথাই লেখা ছিল। আগুনের সামনে যা থাকে তা পুড়েঝুড়ে ভস্ম হয়ে যায় বটে কিন্তু কী যেন কী এক যাদুতে তাণ্ডবলীলার মধ্যেও অগ্নিদেব নতুন কিছু শুরু করিয়েই দেন।
0

গল্প - মনোজ কর

Posted in


 







আঠারো পর্ব

ছোটকালী বেরিয়ে যাবার এক ঘন্টার মধ্যে মনীষার ফোন এল পানু রায়ের কাছে।

-মিঃ রায়, মনীষা বলছি।

-বলো। কী হয়েছে?

-আমি আপনাকে বিরক্ত করতে চাইনা। কিন্তু একটা বেশ বড় গন্ডগোল দেখে মনে হলো আপনাকে এক্ষুণি জানানো দরকার।

- কী গন্ডগোল?

- কয়েকটা বিল পেমেন্টের জন্য চেক কাটা হয়েছে কিন্তু চেকগুলো কাটা হয়েছে যে সব কোম্পানির নামে সেই কোম্পানিগুলো কেউ কোনও কাজ করেনি। আমি একটা বিলের কথা বললে হয়ত আপনার বুঝতে সুবিধে হবে। যেমন ধরুন বেশ কয়েকটা বিল এবং রসিদ দেখলাম তেওয়ারি ইলেকট্রিকের। সব মিলিয়ে প্রায় পাঁচ লক্ষ হবে। খাতায় চেক নম্বর, অ্যামাউন্ট,কাজের বিবরণ ইত্যাদি সব ঠিক লেখা আছে কিন্তু কোম্পানির নাম লেখা নেই।

-একটা কাজ করো। তুমি অ্যাকমে ইলেকট্রিককে ফোন করে বলো যে বিলগুলো একটু পাল্টাতে হবে এবং অর্ডারের কপিটা নিয়ে দেখা করতে।

- করেছি। কিন্তু কেউ ফোন ধরলো না।

-ওদের বিলে ঠিকানা লেখা নেই?

-আছে। কিন্তু খোঁজ নিয়ে জেনেছি ওখানে ঐ নামে কোনও অফিস নেই।

-বিলগুলো কি ছাপানো বিল?

-হ্যাঁ। বিলগুলো তো ঠিকই লাগছে। রাবার স্ট্যাম্প মেরে চেক-এর প্রাপ্তি স্বীকার করা আছে। তার চেয়েও বড় কথা খোঁজ নিয়ে দেখেছি এরকম কোনও কাজই হয়নি। এখন ব্যাঙ্ক বন্ধ। কাল সকালে ব্যাঙ্কে গিয়ে দেখবো আর কিছু জানা যায় কি না।

-ঠিক আছে। দেখ আর কিছু জানা যায় কি না। আরও কিছু ডিটেল না পেলে আগে কিছু করা যাবে না। তোমার কী মনে হয়? কী হতে পারে?

-আমার মনে হয় কেউ খবর পেয়েছিল যে নতুন সেক্রেটারি কাজে জয়েন করেছে। কিছু কাজ না করে একটা ভুয়ো বিল ছাপিয়ে এলিনাকে পাঠিয়ে দেখতে চেয়েছিল সে কী করে। প্রথম বিলটা ছিল ছোট অঙ্কের, কুড়িহাজার টাকার কাছাকাছি।

- বিলটা পেয়ে এলিনা কী করেছিল?

- কোনওরকম চেক না করে পেমেন্ট পাঠিয়ে দিয়েছিল।

- চেক পোস্টে পাঠিয়েছিল?

- হ্যাঁ, বিয়ারার চেক কেটে পোস্টে পাঠিয়ে দিয়েছিল।

-আচ্ছা, তারপর কী হলো?

-তারপর একমাস সব চুপচাপ। একমাস পরে আবার একটা ভুয়ো বিল এলো। এবার অঙ্কটা পঞ্চাশ হাজারের কাছাকাছি। একই ভাবে পেমেন্ট পাঠানো হলো। পরের বিলটা এলো তিনটে কাজের জন্য। আলাদা আলাদা তিনটে বিল। সব মিলিয়ে প্রায় দু লক্ষ টাকার কাছাকাছি।

-আর কিছু?

-অ্যাকমে ইলেকট্রিকের আর কোনও বিল আসেনি। তবে আমার সন্দেহ যে যদি অন্য কেউ এলিনার এইভাবে পেমেন্ট দেওয়ার কথা জানতে পারে তাহলে ব্যাপারটা এখানেই শেষ হয়নি।

-চেকগুলো কে সই করেছিল?

-কৃষ্ণকালী নিজেই। আপনি নিশ্চয়ই জানেন ওনার চেক সই করার পদ্ধতি। ওনার সেক্রেটারি সমস্ত চেক লিখে রেডি করে রাখে। উনি মাসের আট তারিখে সব চেক সই করে দেন যাতে ক্যাশ ডিসকাউন্ট পাওয়া যায়। সাধারণত সব বিলেই লেখা থাকে দশ তারিখের মধ্যে পেমেন্ট করলে দুই শতাংশ ডিসকাউন্ট দেওয়া হয়। কিন্তু এলিনা কোনও চেকেই ডিসকাউন্টের টাকা কাটেনি। পুরো বিলের অ্যামাউন্টই পেমেন্ট করেছে।

-আমাকে খবর দিয়ে ভালোই করলে। ব্যাপারটা খতিয়ে দেখে জানাব। আমাকে ঠিকানাটা বলো।

- ১৬, রাজেন্দ্রনগর।

-ঠিক আছে। আর সব কী খবর? কেমন আছো তুমি?

- খুবই অগোছালো সব কিছু। দেখি কতটা গোছাতে পারি।

-বেশি চাপ নিও না এখন। কালকে আসবে?

-হ্যাঁ, কাল আসবো।

-তাহলে আমি কাল আসবো একবার। নিজের চোখে কাগজপত্রগুলো দেখে আসবো।

- তাহলে তো খুবই ভালো হয়।

-ঠিক আছে রাখলাম এখন।

ফোন রেখে পানু রায় সুন্দরীর দিকে তাকিয়ে ভুরু কুঁচকে বললেন,’ কিছু তো একটা ঘটছে। জগাই কে বলো রাজেন্দ্রনগরের ঐ ঠিকানায় অ্যাকমে ইলেক্ট্রিকের ব্যাপারে একটু খোঁজখবর করতে। খুব অদ্ভুত ব্যাপার। কেউ না কেউ তো লাভবান হচ্ছে নিশ্চয়ই।‘ সুন্দরী বললো,’ অন্তত একজন তো হচ্ছেই।‘ সুন্দরীর কথা শেষ না হতেই কাঠমান্ডুর হোটেল থেকে সেই মেয়েটার ফোন যার সঙ্গে বড়কালী দরকার হলে যোগাযোগ করতে বলেছিল।

-আমি কে বলছি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, মিঃ রায়।

-হ্যাঁ, বলুন। কোনও জরুরি দরকার?

- কৃষ্ণকালী একটা জরুরি বিষয়ে এক্ষুণি ওনার ছেলের সঙ্গে কথা বলতে চান।

-বেশ, তাতে আমার কী করার আছে?

-না, ফোনে নয়। উনি ফ্লাইটে রওনা হয়ে গেছেন। উনি বলেছেন যে উনি যথেষ্ট সাবধানতা অবলম্বন করেছেন যাতে কেউ না জানতে পারে উনি কোথায় যাচ্ছেন এবং কখন যাচ্ছেন। উনি আমাকে বলেছিলেন উনি ঠিক তিনটের সময়, ছ’টার সময়, আটটার সময় এবং দশটার সময় আমাকে ফোন করবেন। যদি কোনও কারণে কোনও একটা ফোন না আসে শুধুমাত্র তাহলেই আপনাকে জানাতে।

-আপনি ফোন করেছেন কারণ তিনটের ফোন আসেনি?

-একদম ঠিক। সেজন্য ওনার নির্দেশমতো আপনাকে জানালাম।

-ধন্যবাদ। তার মানে ওনাকে অ্যারেস্ট করা হয়েছে। কেস লেখা না হলে আমাদের কিছু করার নেই। আমরা অবশ্যই খবর রাখবো।‘

পানু রায় ফোন রাখার সঙ্গে সঙ্গেই সুন্দরী সান্ধ্য দৈনিকের দু এর পাতাটা পানু রায়ের সামনে ধরে বললো,’ শিবুলালের অ্যাপার্টমেন্ট থেকে পুলিশ রক্তমাখা পায়ের ছাপ পেয়েছে। ছবিটাও ছেপেছে কাগজে।‘ পানু রায় কাগজটা সুন্দরীর হাত থেকে প্রায় ছিনিয়ে নিয়ে গভীরভাবে ছবিটা নিরীক্ষণ করে বললেন,’ এটা একটা লোকের পায়ের জুতোর ছাপ। জুতোটা নতুন। গোড়ালির লেখাটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে- ‘রাদু’। পানু রায় অস্থিরভাবে পায়চারি করতে করতে কী যেন ভাবতে লাগলেন। তারপর পায়চারি থামিয়ে সুন্দরীকে বললেন,’ আমার মনে হয়না আমি যদি কোনও সাক্ষীর সঙ্গে কেসটা অপব্যখ্যা সমেত কোর্টে ওঠার এবং জট পাকিয়ে যাওয়ার আগে কাজে নেমে পড়ি এবং কোনওরকম সাক্ষ্যপ্রমাণলোপের চেষ্টা না করি তাহলে অন্যায় করা হবে না। ওরা থানায় নিয়ে গিয়ে সাক্ষীকে গুলিয়ে দেবার আগেই আমাকে একটা কিছু করতে হবে।আরও একটা ব্যাপার তুমি লক্ষ্য করেছো কি না জানিনা। সাধারণত পুলিশ মূল অভিযুক্তকে চিহ্নিত করতে পারলেও খুনী অস্ত্রের সন্ধান সহজে পায়না। কিন্তু এক্ষেত্রে তার উল্টো। পুলিশ অস্ত্রের সন্ধান পেয়েছে কিন্তু কে খুন করেছে বুঝতে পারছেনা।

-দাদু, তাহলে তুমি পুলিশের থেকে এ ব্যাপারে একটু এগিয়ে রয়েছো। তুমি জানো যে তুমি বন্দুক বদল কর নি। আর তুমি এও জানো যে খুনী বন্দুকটা ছোটকালীর ড্রয়ারেই ছিল।

-সুন্দরী, আসল সমস্যাটা হচ্ছে আমি এখনও জানিনা যে বন্দুকটা ওখানে কে রেখেছিল? জানতেও পারবনা যতক্ষণ না আমি বড়কালীর সঙ্গে কথা বলতে পারছি।

-আর যদি বড়কালী না রেখে থাকে?

-তাহলে যে খুন করেছে সে রেখেছিল। আমাদের এখন অনেক কাজ। পুলিশ রেবা কৈরালাকে ধরে রেখেছে। এখন ওরা বড়কালীকে অ্যারেস্ট করবে। পুলিশকে পাত্তা না দিয়ে বড়কালী ঠিক করেনি। জগাইকে বলতে হবে বড়কালীর অফিসের ঐ নকল বিলগুলো কোথা থেকে ছাপা হয়েছিল খুঁজে বের করতে। দরকার হলে এই এলাকার সবকটা প্রেসে গিয়ে খবর নিতে হবে। তোমার মাথার যন্ত্রণা এখন কেমন?

-অনেক ভালো।

পানু রায় এবং সুন্দরী পাশেই একটা রেস্টুরেন্টে ঢুকে দুটো মোজিটো অর্ডার দিয়ে বসলো। পানু রায় বললেন,’ সুন্দরী, কী খাবে বলো? অনেকদিন গুছিয়ে খাওয়া হয়নি। চাপে না থাকলে আমার ক্ষিদে পায়না।‘

-আমার ক্ষিদে সে রকম নেই। কিন্তু জায়গাটা বেশ আরামদায়ক। কাজের ঝুটঝামেলা থেকে একটু ছুটি মন্দ নয়।

-আমার জন্য চিকেন রোস্ট আর স্ম্যাসড পোটাটো অর্ডার করো। তুমি দেখ কী খাবে। ততক্ষণে আমি জগাই কে ফোন করে বলি যে আমরা এখানে আছি। ও আসতে পারলে ভালোই হবে।

পানু রায় জগাইকে ফোন করে বললেন,’ তুমি কোথায়? শোন আমরা অফিসের পাশে যে রেস্টুরেন্টে আমরা মাঝে মাঝে বসি ওখানে আছি। সুন্দরীও আছে।তুমিও চলে এসো।‘ জগাই উত্তরে বললো,’ আমিও তোমাদের খুঁজে বেড়াচ্ছি। অফিসে তোমাদের দেখতে না পেয়ে ফোন করতে যাচ্ছিলাম। সময় নষ্ট করার মতো সময় নেই। ‘

-কী হয়েছে জগাই?

-কেলো দারোগা হন্যে হয়ে তোমাদের খুঁজছে। একটু আগে পুলিশের লোক তোমার খোঁজে অফিসে গিয়েছিল।

-কেন?

-বড়কালীকে পুলিশ ধরে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে। বড়কালী কোনও প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে না। বলেছে তুমি না আসা পর্যন্ত একটা কথাও উচ্চারণ করবে না। আমি খবর পেলাম কেলো দারোগা বড়কালীকে বলেছে ঠিকঠাক উত্তর না দিলে ওর গ্রেপ্তার হওয়ার খবর কাগজওয়ালাদের জানিয়ে দেবে।

-বড়কালী এখন কোথায়? তুমি কোথায়?

-আমি সব শুনে থানায় চলে এসেছি। বড়কালী কেলো দারোগার সামনে বসে আছে।

-ভেতরে গিয়ে বলে দাও আমি আসছি।
0

গল্প - প্রিয়দর্শিনী দেবাদ্রিতা

Posted in







-----প্রাক-কথন-----


বহুদিন আগেকার কথা।ঠিক এক শতাব্দী পূর্বে মোগল বাদশাহ আলমগীর গত হওয়ার পর থেকেই ভারতবর্ষের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলাতে শুরু করেছে।উত্তরে শিখরাজ্য। পূর্বে সুবিশাল বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি সম্পূর্ণ বাংলা বিহার আর উড়িষ্যার কিছুটা গ্রাস করে নেমে গেছে দক্ষিণে- সেই সিংহল অবধি। সেখানে রাজত্ব করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। সমস্ত মধ্যভারতখানাই মারাঠা শক্তির অধীন। সিন্ধিয়া, ভোঁসলে, হোলকার ও পেশোয়া; এই চতুস্তম্ভের ওপর নির্মিত শক্তিশালী মারাঠা কনফিডেরসি।সুপ্রাচীন কালের স্বাধীন রাজাদের মধ্যে রয়েছেন কেবল লখনৌ ও মহিশুরের নবাব, হায়দরাবাদের নিজাম আর রাজপুতানার গুটিকয়েক রাজ্য।

ঠিক এই সময়ে, যখন মোগল সূর্য অস্তমিতপ্রায় আর বাতাসে ভেসে আসছে যুগান্তরের পদধ্বনি,তখন এই ভারতবর্ষেরই একটি কোণে, মহাকালের কলমে একটি অদ্ভুত নাটক রচিত হয়েছিল ।বহু বড়ো বড়ো মহীরুহ মুখ থুবড়ে আছড়ে পড়েছিল ভূমিতে, প্রলয়ংকর উন্মাদনায় অন্ধ হয়ে গিয়েছিলো বহুদর্শী বহু নয়ন।

তারপর অকস্মাৎ, চিরকালীন নিয়মে, আবার সমস্ত শান্ত হয়ে গেলো। অপূর্ব সমস্যার পাওয়া গেল অভূতপূর্ব সমাধান।সেদিনকার রঙ্গমঞ্চের পাত্র-পাত্রীরা সকলেই আজ কালের গর্ভে বিলীন। কেবল ইতিহাস- তার বৃদ্ধ জরাজীর্ণ বুকে সযত্নে রেখে দিয়েছে কাহিনীর নির্যাসটুকু।।


-----১-----


“নীল সুকোমল,শরীর অমল,কমলে গঠিত অঙ্গ –

ভারের কারণ হীন আভরণ,সহজে মোহে অনঙ্গ

কমল বদন,কমল নয়ন,কমল-গঞ্জিত গণ্ড

দ্বিকর কমল,কমলাঙ্খিতল,ভুজ কমলের দণ্ড”


রাজকুমারীর প্রিয়তমা বয়স্যা সত্যভামা গান গাইছে।বঙ্গাল মুলুকের গান।সত্যভামার মা নিজেও বঙ্গাল দেশের মেয়ে।মার কাছ থেকে মেয়ে শিখেছে।কুমারী এ গানখানি শুনতে বড় ভালবাসেন।মনে হয়- যেন তাঁরই কথা ভেবে– অতীত কালের এক কবি লিখে রেখে গেছেন এ গান। একে তো কাব্যের নায়িকা আর কুমারী সমনাম্নী,তারপর কিশোরী রাজবালাকে দেখলে,তার রূপ বর্ণনা করতে গেলে- অন্য কোনও কথা মনে আসে না- কমলনয়না,কমলাননা কুমারী, সাক্ষাৎ কমলালয়ার মতনই রাজপুরী আলো করে আছেন।


সাল- ১৮০৭ খৃষ্টাব্দ।স্থান- উদয়পুর রাজপ্রাসাদ।মেবারের সিংহাসনে আসীন মহারাণা ভীমসিংহ।।তাঁরই কন্যা দশম বর্ষীয়া কৃষ্ণা।বাপের আদরের দুলালী, মায়ের নয়নমণি।মরুভূমির বালুকা সরোবরে প্রস্ফুটিত সহস্রদল কমল।

রাজ্যে আজ আনন্দের ধুম।সমস্ত রাজপথ সাজানো হয়েছে ফুলের মালায়।সরকারী খরচে দরজায় দরজায় বসেছে মঙ্গলঘট।মহারাণী অর্ষাজাবাদে স্বয়ং যাচ্ছেন কারুণী দেবীর মন্দিরে পুজো দিতে।মাত্র এক বছর আগে যে কালো ছায়া নেমে এসেছিল রাজদুহিতার জীবনে – যার থেকে উত্তরণের কোন আশাই ছিল না আর ,কেবল দেবীর আশীর্বাদেই তা সম্পূর্ণ রূপে দূরীভূত হয়েছে! মেবার আর সে মেবার নেই সত্য,তবে এতবড় আনন্দের দিনে উৎসব হবে না– এতটা অধঃপতন আজও ঘটেনি।

ব্যাপার কিন্তু সেরকম সাংঘাতিক কিছু নয়! কুমারী কৃষ্ণার বিয়ে ঠিক হয়েছে। রাজপরিবারে শত শত মেয়ে- প্রতি বছরই কারো না কারো সম্বন্ধ আসে। তাতে কোন নূতনত্ব নেই। প্রাত্যহিক জীবনের অন্য পাঁচটা বিষয়ের মতোই সহজ স্বাভাবিক ভাবে দেখা হয় সেসব ঘটনা!

তবে আজ যে কেন এরকম বিশেষ উৎসব হচ্ছে রাজ্যজুড়ে, সে কারণ অনুসন্ধান করতে গেলে আমাদের কিছুটা পিছিয়ে যেতে হবে। বুঝে নিতে হবে বর্তমানের সামগ্রিক অবস্থাটাও।

বস্তুতঃ সমস্ত রাজপুতানার মধ্যে মেবারের অবস্থাই এ সময় সবচেয়ে সঙ্গীন।মরুপ্রদেশের অন্যান্য রাজ্যগুলি– যথাক্রমে মারবার,অম্বর প্রভৃতি এতদিনে মোগল বাদশাহের বশম্বদ বা সম্রাট-পরিবারের সাথে বৈবাহিক সূত্রে আবদ্ধ,ফলে ভারতেশ্বরের কুটুম্বিতার সুবিধাও তারা পেয়েছে।কিন্তু মেবার তো তা পারে না।মহারানা বলেন-মেবারের সিংহাসনের অধিষ্ঠাতাদের মধ্যে এখনো শিশোদিয়া রক্ত প্রবহমান– সূর্যপুত্র শিলাদিত্য– বাপ্পাদিত্য থেকে শুরু করে সমর-সিংহ,লক্ষণ সিংহ,অরি সিংহ,হাম্বীর,চন্ডের মত বীরপুরুষ যে সিংহাসনের স্বার্থে জীবনব্যয় করেছেন;রাণা কুম্ভ,রাণা প্রতাপ,রাজ সিংহ,সংগ্রাম সিংহ যাদের পূর্বজ – বিধর্মীর হাতে তারা কি ভাবে কন্যা সম্প্রদান করবে?দেহে প্রাণ থাকতে কেমন ভাবে স্বীকার করবে অন্যের বশ্যতা ?

মেবারের অবস্থা তাই টালমাটাল।কোষাগার শূন্যপ্রায়।বেতন না পেয়ে মারাঠা সৈন্যেরা লুট করেছে চিতোর।জলাভাবে কৃষিকাজও ব্যাহত বেশ কয়বছর।দাদা দ্বিতীয় হাম্বীর সিংহ মাত্র ১৬ বছর বয়সে মারা গেলেন হাতে রাইফেল ফেটে গিয়ে।দশ বছরের ভীমের কাঁধে রাতারাতি উঠল মেবার শাসনের গুরুভার।তারপর বেশ কয়েকবছর পর,প্রায় বালকবয়স থেকে দায়িত্বের ভারে পিষ্ট হতে হতে রানা যখন অন্তরে-বাহিরে শুকিয়ে গেছিলেন, তখনি একঝলক টাটকা বাতাসের মতন জ্যেষ্ঠা রাজকুমারী কৃষ্ণার জন্ম।টালমাটাল রাজ্যে বহু দিন পর বেজে উঠল শঙ্খ।প্রথম সন্তান! কন্যা যদিও, পরগোত্র হয় যাবে, তবু সন্তান! ভীম সিংহ মেয়ের কোনো অভাব রাখলেন না। কুমারীকে রাজপরিবারের উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে নিযুক্ত হলো শিক্ষক।তিনি অসামান্যা সুন্দরী, দিনে দিনে বিকাশ ঘটতে লাগলো গুণের, কুমারী পারদর্শিনী হয়ে উঠতে লাগলেন নানা বিদ্যাতেও।কন্যার পঞ্চম বর্ষে মহারাণা তাঁর বিবাহ স্থির করলেন মারবার নৃপতির সঙ্গে।প্রসঙ্গত, এঁর নামও ভীম সিংহ।কন্যার উচিত ঘর-বর মিলেছে,কুলগুরু আশীর্বাদ করে বললেন- ‘রাজ-যোটক’।মাতাপিতার মনে সুখের অন্ত নেই।তারপর হঠাৎ বিনামেঘে বজ্রপাত!তিন বৎসর পরে এক সন্ধ্যায় সংবাদ এল– ইহলোক ত্যাগ করেছেন মারবাররাজ।লুনী নদীর তীরে ভস্মীভূত হয়ে গেছে তাঁর নশ্বর দেহ।সহমরণে গেছেন তাঁর স্ত্রীরা ।।

খবর যখন এল– নবম বর্ষীয়া কৃষ্ণা তখন সঙ্গিনীদের সাথে পুতুলের সংসার পেতেছে।‘পুতুলের সংসারই বটে!’মহারাণা কন্যার মুখের দিকে চাইতে পারেন না।নিঃশ্বাস ফেলে ভাবেন– ‘সত্য সংসারে আর প্রবেশাধিকার রইল না কুমারীর।‘ বাগদত্তা কন্যার পতিনাশ– লগ্নভ্রষ্টা হওয়ার সামিল।বৈধব্য যাতনার থেকে কোন অংশে কম নয় এই দাহ।সর্বোপরি– এই সর্বনাশের ফলে তাঁর তনয়া তথা মেবারের রাজদুহিতা অশুভ বলে চিণ্হিত হবে বিশ্বের দরবারে।মেবারের অদৃষ্টে এত বড় অসম্মান, শিশোদিয়া বংশের এতবড় অপমান আর কি কখনও ক্ষয় হবে?

ক্ষয় হল।।এত বড় দুষ্টগ্রহেরও ক্ষয় হল।এ যে কোন ঐশী শক্তির মহিমা,কুমারী কৃষ্ণা যে দেবীর আশীর্বাদধন্যা– এ ব্যাপারে আর সন্দেহ রইল না কারোর।নইলে কে কবে শুনেছে– এমন ঘটনার পরও যোগ্য পাত্র স্বয়ং কন্যার পাণি প্রার্থনা করে?এ ক্ষেত্রে তাই ঘটেছে,গত রাত্রে মহারাণার কাছে কৃষ্ণাকে বিবাহ করার অনুমতি চেয়ে পাঠিয়েছেন অম্বর-অধিপতি,তরুণ রাজা জগৎ সিংহ।

ভোর না হতেই তাই রাজ্যে জেগেছে উৎসবের হিল্লোল।মহারাজ নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সকাল থেকে করছেন সারাদিনব্যাপী দরিদ্র-নারায়ণ সেবা।মহারাণী চলেছেন মন্দিরে, অর্ঘ্য-থালা হাতে,আর সন্ধ্যার অবসরে,প্রদীপ জ্বালিয়ে রাজকুমারী বসেছেন বেণী-বয়ন করতে।ললাটে স্বেদবিন্দু,কপোলে রক্তিমাভা, পরনে রক্ত-চিনাংশুক– প্রদীপের আলোয় মনে হচ্ছে দর্পণের ভিতর থেকে যেন স্বয়ং দ্বাপরযুগের কৃষ্ণা,স্বয়ম্বরের পূর্ব্-রাত্রের সমস্ত লজ্জা অঙ্গে মেখে চেয়ে রয়েছেন অপলকে।কানের কাছে সত্যভামা চুপি চুপি গান করছে–

“ক্ষেত্রি কুলে আছে এ যতেক সভাজন

যে বিন্ধিব মোর ভগ্নী করিব বরণ

ভূপতি হউক নহু নাহিক বিচার

লভিবেক কৃষ্ণা লক্ষ্য বিন্ধে শক্তি যার-“


------------------- ২ -------------------

আকাশে চাঁদ উঠেছে।প্রাসাদের এই কক্ষ থেকে নীচের বাগিচা দেখা যায় না যদিও,তবু গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।গ্রীষ্মের ফুলের গন্ধ।যুবরাজের আজিকার শয্যাসঙ্গিনী শয্যাপার্শ্বে নিদ্রিতা- ষোড়শী,সুন্দরী,তন্বী।।

যুবরাজ নয়,মহারাজ!আপনমনেই হেসে ফেলেন বিংশতি-বর্ষীয় জগৎ সিংহ।পিতা,মহারাজা সোয়াই প্রতাপ সিংহ স্বর্গারোহণ করবার পর প্রায় ৩ বৎসর হতে চলল তিনি সিংহাসনে বসেছেন।তবু মাঝেমধ্যে ভুল হয়ে যায়।

শয্যা ত্যাগ করে তরুণ রাজা কক্ষ-সংলগ্ন বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালেন।জ্যোৎস্নায় চরাচর ভেসে যাচ্ছে।মৃদুগলায় গুনগুনিয়ে ওঠেন-"তুম ভায়ে চান্দা/মায় ভয়ে চকোরী যো/ তুম টোডো পিয়া..." জগৎ সিংহ স্বভাবতই ভাবপ্রবণ– সঙ্গীত –শিল্পকলা প্রভৃতির অনুরাগী।এ জিনিস তাঁর রক্তে আছে।প্রতাপ সিংহ স্বয়ং কবি ছিলেন; ব্রজনিধি ছদ্মনামে তিনি বহু কবিতা রচনা করেছেন একসময়।

আজ শুক্ল পক্ষের ত্রয়োদশী।সমস্ত চরাচর ভেসে যাচ্ছে জ্যোৎস্নায়। রাত্রির মৃদুমন্দ বাতাসে জুড়িয়ে যাচ্ছে দেহ। সুস্পষ্ট,ঈষৎ হলুদ চন্দ্রের দিকে চেয়ে কেমন যেন বিমনা হয়ে যান কুমার।শুক্লপক্ষেই তিনি ‘কৃষ্ণা’ কে আহ্বান জানিয়েছেন– বিবাহ প্রস্তাব পাঠিয়েছেন মেবার কুমারী কৃষ্ণাকে।।

লোকে বলে তার দু চোখ নাকি হরিণের মতো।তার মুখে নাকি আধফোটা পদ্মের সৌন্দর্‍্য।কিন্তু সৌন্দর্‍্যের অভাব তো নেই অম্বর রাজপুরীতে- এই বিশ বৎসরের জীবনেই কত কত নারী এসেছে তাঁর শয্যায়– লাস্যময়ী,সুন্দরী,যৌবনবতী নারীরা।এই দুহাতে কত, কত না শরীর ঘেঁটে ফিরেছেন কুমার, চুম্বন করেছেন কত সুন্দর,স্ফুরিত ওষ্ঠাধর।তবু যা খুঁজেছেন– পাননি।এখনো যে নারী তাঁর শয্যায় নিদ্রিতা– তার কটিদেশ ঈর্ষণীয় রকমের কৃশ,তার দীর্ঘ আয়ত চক্ষু, তিলফুল জিনি নাসা। কিন্তু এরা সবাই কেবল ক্ষণিক আনন্দ দিতে পারে– এরা শান্তি দিতে পারে না ।

বড় অশান্তি!বড় হানাহানি চারিদিকে!পিতার দেহাবসানের সঙ্গে সঙ্গেই মারবার আর অম্বরের সখ্য হয়েছে ধূলিসাৎ।তারপর মারাঠাদের লুঠতরাজ তো এখন প্রায় নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যপার হয়ে উঠেছে।তবে দুই বৎসর পূর্বে শীতকালে– ভারত ভূখণ্ডে নবাগত শক্তি যে বণিক সম্প্রদায়– ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, তাদের প্রতিনিধি লর্ড ওয়েলেস্লির সঙ্গে একখানা চুক্তি হয়েছে।সেই চুক্তি অনুযায়ী – মারাঠাদের উপদ্রব থেকে জয়পুরকে রক্ষা করবে কোম্পানি; কিন্তু সম্প্রতি আবার এক বিশ্বস্ত চর খবর পাঠিয়েছে– ওয়েলেস্লি নাকি শীঘ্রই অন্যত্র যাবেন– ইতিমধ্যে জনৈক জর্জ বারলো উপর মহলে বারবার বলে পাঠাচ্ছেন যে- দেশীয় রাজাদের আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করা কোম্পানির পক্ষে উচিত হবে না।

এত অশান্তি!এত রাজনৈতিক কূটচাল!বড় অসহায় লাগে জগতসিংহের!প্রয়োজন হলে জগৎ যুদ্ধের ময়দানে তরবারী হাতে দাঁড়াতে পারেন, রাজসভায় বসে বিচার করতে পারেন আপামর জনসাধারণের– কিন্তু এই রাজনীতির দাবাখেলাটা তাঁর আসে না।এই কয় বছরেই বড় ক্লান্ত,বড় বিদ্ধস্ত হয়ে পড়েছেন তিনি।জীবনটা বড্ডো ভারী লাগছে তাঁর– তাই তিনি আহ্বান জানিয়ে পাঠিয়েছেন সেই দুঃখী মেয়েটিকে– একদা জ্ঞান হবার আগেই যার বুকের উপরেও চেপেছিল পর্বতপ্রমাণ ভার– সমস্ত সমাজ যার ললাটে এঁকে দিয়েছিল কুলক্ষণার তিলক। সমস্ত রাজস্থান বলে– সেই মেয়েটির চোখ নাকি হরিণের মতন!তার মুখে নাকি আধফোটা পদ্মের মাধুর্য্য!

মাধুর্য্য! মায়াবী মাধুর্য্য! তাই কি তবে নারীর কাছে পুরুষের নিত্যকালের যাঞ্চা?হাজার সম্ভোগের অন্তরালে তবে কি চিরকাল ওই বস্তুটিরই কি খোঁজ করে ফেরে তৃষ্ণার্ত প্রেমিক পুরুষ?“কৃষ্ণা”- আনমনে নামটি উচ্চারণ করেন কুমার।“তোমার কাছে পৌঁছালেই কি ঘটবে এই সন্ধানের অন্ত?তোমার কোলে মাথা রাখলে কি আবার, সেই রাজা হওয়ার আগেকার দিনগুলোর মতন, শান্তিতে ঘুমোতে পারব আমি?”




-------------৩ ----------------

“বিশ্বাসঘাতক!” মধ্যরাত্রে ঘুম ভেঙ্গে চিৎকার করে ওঠেন মহারাজা।“বিশ্বাসঘাতক!সবাই বিশ্বাসঘাতকতা করেছে আমার সঙ্গে!”

মহারাজা মান সিংহ।।যোধপুরের বর্তমান মহারাজা। আজই সন্ধ্যায় ঠাকুর সোয়াই সিংহ চিঠি পাঠিয়েছে – সেই ঠাকুর সিংহ; পোখরানের সেই বিদ্রোহী সামন্ত রাজা- যাকে তিনি স্বয়ং এই কয়েকদিন আগে নির্বাসনদণ্ড দিয়েছিলেন,মারবারের সীমান্ত আজও যার কাছে বধ্যভূমি! সেই কৃমিকীট বিশ্বাসঘাতকটাও আজ তাঁকে নিয়ে মস্করা করার স্পর্ধা দেখায়!চিঠির অক্ষরগুলো বিষাক্ত তিরের ফলার মতন এখনও তাঁকে দংশন করে চলেছে।ধিক ধিক ধিক!ধিক বাহুবল!ধিক ক্ষত্রিয় জন্ম!ধিক এই রাজসিংহাসনে!

মান সিংহ সজোরে মুষ্ট্যাঘাত করেন দেওয়ালে।শিশুকাল থেকেই তাঁর মুখের গ্রাস কেড়ে নিয়েছে অন্যরা।এই যে ২১ বছর বয়সে তিনি মহারাজা হয়েছেন,এ রাজপদ তো বহু পূর্বেই তাঁর প্রাপ্য ছিল!প্রাক্তন মহারাজ বিজয় সিংহ– তাঁর নাতিদের মধ্যে মানকেই সিংহাসনের উত্তরাধিকারী ঘোষণা করে গিয়েছিলেন। কিন্তু কি হল?ঠাকুরদা চোখ বুজতেই ঝাঁপিয়ে পড়ল শেয়াল-শকুনের দল।পিতৃব্য-পুত্র ভীম অতর্কিত আক্রমণে,এতটুকু প্রস্তুতির অবকাশ না দিয়ে,অধিকার করে নিল সিংহাসন।হায় রে অদৃষ্ট!গতদিবসে যিনি ছিলেন যুবরাজ;পরদিন তাঁকেই সামান্য সামন্ত-রাজার মতন পালিয়ে আসতে হল জালোরে! সেখানে,প্রকৃতপক্ষে এ কবছর স্বেচ্ছা বন্দী জীবন যাপন করেছেন তিনি|প্রতি মুহূর্তে ভয়– এই বুঝি ভীম-নিযুক্ত গুপ্ত ঘাতক হত্যা করল তাঁকে!বিশ্বাস ঘাতক কৃমিকীটের দল সব!

মাড়বার রাজ্যের স্বাধীনতা নিয়েও নাকি ব্যবসা করেছে ওই পাষণ্ড।ম্লেচ্ছ বণিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে আপোষ করেছে! ছিঃ ছিঃ। রাজা হয়েই মান ও চুক্তি ভেঙে দিয়েছেন।মোগল অবধি তাও মানা যায় – তা বলে বিধর্মী বণিক সম্প্রদায়? ধিক ধিক ধিক!ধিক ক্ষাত্রতেজ!ধিক বাহুবল!


সকলে ষড়যন্ত্র করছে তাঁর বিরুদ্ধে।সব্বাই,সব্বাই চেষ্টা করছে তাঁকে হাস্যাস্পদ করবার| ঠিক লিখেছে ঠাকুর সিংহ– মেবারের রাজদুহিতা, ওই কি যেন নাম– কৃষ্ণা – হ্যাঁ-তার সঙ্গে যখন ভীমের বিবাহ স্থির হয়েছিল,তখন ভীমের অবর্তমানে সে কন্যার উপর তাঁরই প্রথম অধিকার বর্তায়।আর রাণা কি না মেয়ের বিয়ে ঠিক করেছে জয়পুরের ওই অপোগণ্ডের সঙ্গে!ওই ভণ্ড বিশ্বাসঘাতকটা!কদিন আগেই ভীমের ছেলে ঢোলকারকে নকল মহারাজা তৈরী করে যোধপুরের সিংহাসনে বসাতে চেয়েছিল।সমস্ত জয়পুর আর বিকানীরের সৈন্য একত্র করেও যোধপুরের এক্তা ইটও অধিকার করতে পারেনি|মোট ২ লক্ষ টাকা নজরানা দিয়ে কুকুরের মতন পালিয়েছিল শেষমেশ।মান সে উপলক্ষ্যে জয়পোল নামে একটা জয়স্তম্ভ ও নির্মাণ করিয়েছিলেন।তার রং এখনো ফিকে হয়নি!আর এরমধ্যেই এতো সাহস বেড়ে গেছে জয়সিংহের!আর রাণারও আক্কেল বলিহারি। তাকে কন্যা দেওয়া তো ইছছাপূর্বক মান সিংহ কে অপমান!এত বড় সাহস, ঠাকুর সিংহ তাঁকে লিখেছে– ঘুঙ্গুর পরে বৌদির বিবাহে নাচ দেখিয়ে আসতে।উফ!

না না না।আর সহ্য করবেন না তিনি।কালই তিনি মেবারে বিবাহ প্রস্তাব পাঠাবেন।রাণা মানে তো ভালো– নইলে তিনি মেবারে রক্তগঙ্গা বইয়ে দেবেন।ইন্দোররাজ হোলকার তাঁর বন্ধু-স্থানীয়,গোয়ালিয়রের মারাঠা সিন্ধিয়াদেরও দলে নেবেন তিনি . মেবার এখন বীরশূন্য– ফাঁপা বংশ মর্যাদার অহংকার আর ইতিহাসের চর্বিতচর্বণ মাত্র সম্বল ওদের।এ অসম্মানের প্রতিকার করতে দরকার হলে তিনি দ্বিতীয় আলাউদ্দীন হবেন, শিশোদিয়া বংশে বাতি দিতে আর একজনকে ও রাখবেন না।স্থান কাল পাত্র ভুলে যুদ্ধনিনাদ করে ওঠেন মান সিংহ– “জয় ভবানী!“

---------৪ ---------

“আমি ভবানীর নামে শপথ করে তাঁকে মনে মনে পতিত্বে বরন করেছি।আর আজ এসব কি প্রসঙ্গ উঠছে?একি ছেলেখেলা?”

“ছেলেখেলা বই কি কুমারী!আমাদের মেয়েদের জীবনটাই তো একটা ছেলেখেলা।তা ছাড়া তুমি তো এখনও তাঁকে চোখে দেখনি সখী।এর আগেও তো একবার আরেকজনের সঙ্গে তোমার বিয়ের কথা উঠেছিল-“

“থাম সত্যভামা,থাম।“ রাজকুমারী বলে ওঠেন, “তখন আমার জ্ঞান বুদ্ধি হয় নি,সে একরকম। আর এই ১৫ বছর বয়স হতে চলল, দু বছর ধরে যাঁকে মনে মনে স্বামী বলে জানি- আর তাছাড়া নেহাত এতসব ঝামেলা হল,না হলে কোন মেয়েটা এতদিন আইবুড়ো থাকে বল না?“

মরুভূমির দেশে যখন ঝড় ওঠে, তখন তার রূপ হয় ভয়ংকর ।। বালিতে আচ্ছন্ন হয়ে যায় চারিদিক, ঝাপসা চোখে আপন পর চেনা যায় না– হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে মানুষ ছুটতে থাকে উদ্দেশ্যহীনভাবে| বড় বড় বালি পাহাড় এক নিমেষে হাওয়ার তোড়ে অগণিত বালুকণায় রূপান্তরিত হয়ে পড়ে। ঝড় থামলে পরে তাদের অস্তিত্ব মাত্র থাকে না আর!

মেবারের ভাগ্যাকাশে এবার সেই ঝড় উঠেছে– কৃষ্ণার বিবাহ উপলক্ষ্যে । বহু শতাব্দী পূর্বে একবার এই ভারত ভূখণ্ডে আর্য্যাবর্তের সমস্ত রাজারা উন্মাদ হয়ে গেছিলেন– আরেকজন কৃষ্ণা রাজকুমারী দ্রুপদ-তনয়ার জন্য, আর এই এত শতাব্দী পরে পশ্চিম ভারতের সমস্ত প্রধান রাজারা অস্ত্রধারণের উপক্রম করেছেন ভীম-তনয়া কৃষ্ণাকে লাভের আশায়।

সেই হাহাকারটাই ঠিকরে ওঠে কুমারীর গলায় - “আমি কি দ্রৌপদী না কি ? আজ কেউ বলবেন ভীম সিংহ তোমার স্বামী;কাল ডেকে বলবেন – না না জগৎ সিংহ; পরদিন আবার বিবেচনা করতে বসবেন মান সিংহ কে নিয়ে।এখন আবার ওই দৌলত রাও সিন্ধিয়া;এত বড় আস্পর্ধা– নীচ মারাঠা হয়ে পদ্মিনীর বংশের রাজপুতানীকে অঙ্কশায়িনী করার স্বপ্ন দেখে!সেই ঘৃণ্য প্রস্তাব পাঠাবার আগে কেউ তার জিভটা কেটে নিতে পারল না? মেবার কি বীরশূন্য?এতদূর অধঃপতন ঘটেছে এ দেশের?সত্যভামা,এ কথা কানে শোনার চেয়ে আমার তো বিষ পানে আত্মহত্যা করা ভালো ছিল!”

“চুপ কর সখী। চুপ কর।“সত্যভামা কানে আঙ্গুল দেয়, “অমন কথা মুখেও এনো না।তা ছাড়া অন্যভাবে দেখলে সিন্ধিয়া কিন্তু শান্তি রক্ষা করবারই চেষ্টা করেছেন।।ভেবে দেখ, ওনার কথামত যদি তোমার এক বোনের সঙ্গে মাড়ওয়ার অধিপতি আর আরেক বোনের সঙ্গে অম্বর অধিপতির বিবাহ হয়,তবে ক্ষতিটা কোনখানে?”

“স্তব্ধ হও।।“ রাজকুমারীর গলা শুনে ভয় পেয়ে যায় সত্যভামা।এমন রূঢ় স্বর ইতিপূর্বে আর সে কখনও শোনেনি কুমারীর গলায়| “সত্যভামা!যা বোঝো না তা নিয়ে কথা বল না।তুমি বঙ্গালিনী।ও কথা তোমার মুখে মানায়| কিন্তু দেহে প্রাণ থাকতে রাজপুত কখনও শত্রুর সঙ্গে আপস করেনি,আর করবেও না।“

বস্তুতঃ গত তিন বছরে ব্যাপার ঘোরালো হয়ে উঠেছে। সিন্ধিয়া কে সঙ্গে করে জগৎ সিংহ যোধপুর যাত্রা করেছিলেন।কৃষ্ণা উপলক্ষ্য তো বটেই, তার উপর গত যুদ্ধে পরাজয়ের গ্লানিও অম্বরভূপের অন্তরে জাগ্রত ছিল। সিন্ধিয়ারও পাওনা বাকি ছিল যোধপুরের থেকে।অর্থমূল্যে স্বেচ্ছায় বিক্রীত হলেন মাড়ওয়ারের কয়েকজন বিদ্রোহী রাঠোড়। সবদিক থেকে কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন মান সিংহ।চর মুখে খবর এল – এক ভারী বিশ্বস্ত বন্ধু নাকি নিশ্চিত আত্মহত্যা থেকে বাঁচিয়েছেন মানকে। দুজন গোপনে পালিয়ে গেছেন।আশ্রয় নিয়েছেন মেহরানগড় দুর্গে।

জয়পুর রাজস্থানের অন্তর্গত হলেও ঠিক মরুপ্রদেশ নয়।বরং ঈষৎ পাহাড় সমৃদ্ধ সমভূমিই বলা চলে তাকে।তাই সেই দুর্গম মরুদুর্গে যুদ্ধ চালাতে পারল না তারা। ছয় মাস অবরোধের পর জগৎ সিংহ দেখলেন আর বেশী দিন এভাবে থাকলে– অন্নাভাবে আর ব্যাধিতেই শেষ হয়ে যাবে তাঁর বাহিনী।শুধু হাতেই ফিরতে হল তাঁকে|

এর কিছুদিন পরেই শিবির বদল করলো সিন্ধিয়া।মান সিংহের তরফে গোয়ালিঅরের সেনাপ্রধান সরজেরাও ঘটেগে মেবারের এক সামন্ত রাজা, শাহপুরার শাসনকর্তা অমর সিংহকে আক্রমণ করে বসলেন। সেসময় ,কিছু জয়পুরগামী মেবারের রাজপ্রতিনিধি ছিল এখানে,বল-পূর্বক তাদের ফেরত পাঠানো হল উদয়পুরে।

তারপরেই এই প্রস্তাব।জগৎ সিংহ ইতিমধ্যে সৈন্যদল পাঠিয়েছেন মহারাণার সাহায্যার্থে। ভীম সিংহ নাকচ করে দিলেন সিন্ধিয়ার প্রস্তাব। সিন্ধিয়া ঝাঁপিয়ে পড়ল উদয়পুরে।রক্তক্ষয়কারী সঙ্গ্রামের পর– পরাজিত হল মেবার। মহারাণা বাধ্য হলেন নাথওয়াড়ার চুক্তিপত্রে সই করে সিন্ধিয়ার সঙ্গে আপস করতে।

“যে কথা বললে সত্যভামা – আর দ্বিতীয়বার যেন না শুনি । মর্যাদা হানির পূর্বে বরং প্রাণত্যাগ করা শ্রেয় - বাঙ্গালিনী – তুমি ছোট জাত – এই বংশ মর্যাদার ব্যাপারটা হয় তো ঠিক অনুধাবন করতে পারবে না –“

সত্যভামা চুপ করে মেঝের দিকে চেয়ে বসে থাকে।। এসব কথা তার কাছে নতুন নয়।। তার মা বঙ্গাল দেশ ছেড়ে এদেশে এসেছিলেন কেন ,লোকমুখে তার আভাস ইঙ্গিত সে পেয়েছে। প্রকাশ্যে কেউ কিছু বলে না বটে, তবু রাজ্যের একজন গণ্যমান্য রাজপুরুষকে সে নিজেও ছেলেবেলায় কখনো সখনো তাদের বাড়ীতে আসতে দেখেছে।। মূলতঃ তাঁর অনুগ্রহেই তার রাজবাড়ীতে প্রবেশ– রাজদুহিতার সখী হিসাবে।।

কুমারী অতীতকালের গল্প বলে চলেছেন – ষোল হাজার রাজপুত মেয়ের পুড়ে মরার গল্প।।মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও –হলদীঘাটের যুদ্ধে সমগ্র মেবার সৈন্যের অসাধারণ বীরত্বের গল্প।। বহুবার – বহুজনের মুখে এসব কাহিনী অনুরণিত হয় রাজান্তঃপুরে।। সত্যভামা সেসব কথা শুনতে ভালোও বাসে।। তবে আজ কিছুতেই তার মন বসছিল না|সে অশিক্ষিতা নয়।। অত্যন্ত ছেলেবেলা থেকেই সে কুমারীর সঙ্গে থাকে – একই সঙ্গে তারা লালিত|তবু এদের ধরনধারণ সে বুঝতে পারে না। কি যে এদের এত মান আর কি যে মর্যাদা– যার জন্য কথায় কথায় সবাই প্রাণত্যাগ করছে! প্রাণ জিনিষটা বড় তুচ্ছ রাজা রাজড়াদের কাছে।ওটা দিতেও এদের বাধে না, নিতেও না।রাজকুমারী বলেন “কাপুরুষ বঙ্গালিনী”। কথাটা বোধ হয় সত্যি। এই প্রাণটুকুর জন্যই তারা মেয়ে মরদে খাটে– কেউ স্বৈরিণী হয়; কেউ দাসীবৃত্তি বা মোসাহেবী করে। এই যে সে, মুখে যতই সখী সখী বলুক- আসলে সেই মোসাহেব বই তো নয়।।সদা সর্বদা কুমারীর মন বুঝে কথা বলতে হয় তাকে। কোন সময় কোন মতের বিরোধিতা করলেই গর্বিতা রাজদুহিতার স্বর ভঙ্গিমা পালটে যায়।সে মেঝের দিকে তাকিয়ে অতি ক্ষুদ্র একটা নিঃশ্বাস ফেলে।।

হঠাৎ খেয়াল হয় – কুমারী অনেকক্ষণ কথা বলেন নি।একদৃষ্টে তার দিকেই চেয়ে আছেন।তাঁর সেই পদ্মের মত দুচোখ জলে টলটল করছে।

“বকেছি বলে রাগ করেছিস সত্য?” কুমারী এক আশ্চর্য রকম করুণ গলায় বলে ওঠেন। “কি করব বল।। মাথার ঠিক থাকে না। দেখছিস তো কি হচ্ছে চতুর্দিকে।। জ্ঞান হওয়ার পর থেকে একদিনও শান্তি পেলাম না।“

সত্যভামা নীরবে উঠে দাঁড়ায়।নীরবেই আলিঙ্গন করে কুমারীকে| কোন কথা বলে না।এটাও তার কাজের অঙ্গ। কুমারীর ভাব পরিবর্তনের গভীরতাটা না বুঝে কথা বলা ঠিক হবে না। কে জানে আবার কি কথায় তাঁর মানে লেগে যাবে! কুমারী কিন্তু এবার ঝরঝর করে কেঁদে ফেলেন,”হ্যাঁ রে সত্য, আমি জানি তুই কি ভাবছিস।। কিসের এত মান মর্যাদা?তাই নারে? না না, ঘাড় নাড়িস না।। আমি জানি। আমি তোকে সত্যি উত্তর দেব দেখ। আসলে ওটুকুই তো সম্বল আমাদের– মেবারের আজ কি আছে বল? অর্থ নেই – সৈন্য নেই – বীরত্ব নেই – ধর্ম নেই – সমস্ত দেশটা ধীরে ধীরে অবক্ষয়ের দিকে চলেছে। প্রতিবেশী রাজারা কেউ মানে না! প্রজাদের রক্ষা করতে পারি না! রাজপরিবারের মধ্যেই কত ব্যভিচারের প্রবেশ ঘটেছে! এর মধ্যে ওই গৌরব টুকুও যদি ছাড়ি, তবে কি নিয়ে থাকব আমরা?কি আশায় বেঁচে থাকব?”

“রাজকুমারী –“ সত্যভামা একটা মনমত জবাব দিতে চায়। রাজকুমারী শোনেন না।। আপন মনেই বলে চলেন “মর্যাদাই সব রে সত্য। এই দেখ না – এই যে এতগুলো রাজা; এতগুলো মস্ত মস্ত পুরুষমানুষ হঠাৎ আমার জন্য ক্ষেপে উঠেছে – যুদ্ধবিগ্রহ হচ্ছে ঠিকই , কিন্তু এই ব্যাপারটা , এই ব্যাপারটা কোন মেয়েটার না ভালো লাগবে বল? মিথ্যে বলব না ।। আমারও লাগত, জানিস।। এই আমিই সবার কামনার বস্তু ; এত শক্তি আমার আছে যে সমস্ত প্রতিবেশী রাজাদের ময়দানে নামিয়ে ছেড়েছি একেবারে; সবাই জান প্রাণ বাজি রেখেছে আমার জন্য – ভাবতেই কি নেশা লাগে| অহংকার হয় ! কিন্তু ভুল; নিদারুণ ভুল ! এখানেও সেই মান মর্যাদার গল্প – ওরা তো কেউ আমাকে চায় না ।। ওরা চায় মেবারদুহিতাকে, শিশোদিয়া বংশের রাজপুতানীকে । বুঝলি না – এই পরিচয়টা না থাকলে আমার দিকে কেউ ফিরেও চাইত না; পথের পাশে ফেলে যেত সবাই!এই পরিচয়টা ছাড়া যে আমি ভিখারিণী! এতবড় লোভ আমি কি করে সম্বরণ করব ?” মদগর্বিতা, উদ্ধত কুমারী কৃষ্ণা চোখে আঁচল চাপা দিয়ে প্রায় ছুটে বেরিয়ে যান ঘর থেকে। সত্যভামা নির্বাক হয়ে চেয়ে থাকে।।

-----------৫----------------

রাজকুমারী সেইদিন অমনভাবে উঠে যাওয়ার পর, আরও একবছর কেটে গেছে।। আজ শেষ রাত্রে প্রাসাদের খোলা ছাদে কুমারী কৃষ্ণা একলা দাঁড়িয়েছিলেন।। রাজস্থানের অধিকাংশ প্রাসাদের মতনই উদয়পুর দুর্গও পাহাড়ের উপর অবস্থিত।।ছাদে এসে দাঁড়ালে অনেকদূর পর্যন্ত দেখা যায় ।।

রাজদুহিতা তাঁর সুন্দর কোমল চক্ষুদুটি মেলে দেখছিলেন চারিধার| একদিকে পিছোলা দীঘি, অন্যদিকে জলমহল আর জগদীশ-মন্দির।।

ওই জলমহলে মেবারের মহারাণারা সূর্য-উপাসনা করতে যেতেন| ছেলেবেলায় কৃষ্ণাও গেছেন কখনো সখনো ভাই-বোনেদের সঙ্গে।। সূর্যের প্রথম আলো যখন প্রবেশ করে রাঙ্গিয়ে দিতে জল মহলের সাদা-কালো দেওয়ালগুলো – কি অদ্ভুত আনন্দ হত মনে। সে বয়সে ও আনন্দটা কিসের এবং কেন – এসব ভেবে দেখার ইচ্ছে করত না আদৌও। কেবল একটা নরম ভালোলাগার উত্তাপ ছড়িয়ে থাকত সারাটা দিনের সমস্ত কাজে।

কবে থেকে মেবারে আর সূর্য ওঠে না? যুদ্ধে যুদ্ধে দেশটা ছারখার হয়ে গেল।। জগৎসিংহ, মানসিংহ, সিন্ধিয়া, হোলকার – হ্যাঁ ইন্দোররাজ যশবন্ত রাও হোলকার ও নেমে পড়েছেন ময়দানে। তিনি রাণাকে চিঠি পাঠিয়েছিলেন যে মান বা জগৎ কারো সাথেই কৃষ্ণার বিবাহ না দিতে।। উপরন্তু মান সিংহের এক বোনকে বিবাহ করুন জগৎ।। জগৎ সে প্রস্তাবে রাজী হন নি।। আপাতঃ আত্মভোলা ছেলেমানুষ অম্বররাজ কিভাবে যেন হঠাৎ ভয়ানকরকম রাজনীতিজ্ঞ হয়ে উঠেছেন। মূলত তার কূটকৌশলেই, হোলকার চুক্তিপত্রে সই করেছিলেন যে তিনি এ বিবাহের ব্যাপারে কথা বলবেন না আর – জয়পুরকেও রক্ষা করবেন সিন্ধিয়া আঘাত হানলে।জগৎ সিংহ সিন্ধিয়াকেও ক্রয় করে ফেলেছেন এক কোটী তঙ্কায়।। বিকানীরের সুরাট সিংহ আর টোকের আমীর খানও তাঁর পক্ষে নাম লিখিয়েছেন।।

কৃষ্ণার বোনেদের সবার বিয়ে হয়ে গেছে।।ভাইরা এখন জোয়ান মরদ।।কৃষ্ণার বাবা সারাক্ষণ মন্ত্রীদের দ্বারা পরিবৃত হয়ে বসে থাকেন।।পরামর্শ চলে অহরহ। যুদ্ধের পরামর্শ।। কৃষ্ণার মায়ের ললাটে বলিরেখাগুলো বড় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে আজকাল।। মহারাণী সর্বক্ষণ দেবতার দয়া ভিক্ষা করেন।। তাঁর বয়স যেন দশ বছর বেড়ে গেছে ।। রাজবাড়ীর অন্য পুরন্ধ্রীরা , এমনকি পিসী চাঁদবাঈও কৃষ্ণাকে এড়িয়ে চলে আজকাল। যুবতী রাজদুহিতা একা একা প্রেতের মতন এ ঘর ও ঘর করেন। প্রতিমুহূর্তে মনে হয় এতদিনে তাঁর অন্য কোন সংসারে থাকবার কথা – এ গৃহে আর তাঁর অধিকার নেই ; এ স্থানটুকু তিনি জবরদখল করে বসে আছেন। সত্যভামার কথা মনে পড়ে – সে একবার কথাপ্রসঙ্গে বলেছিল বঙ্গালদেশে নাকি নিয়ম আছে যে বেলগাছ কাটতে নেই ।। তিনি যেন সেই গৃহস্থের শয়ন গৃহের দেওয়ালে জন্ম নেওয়া বেলগাছ – কাটাও চলে না – আবার রাখলেও বিপদ।। শিকড় ছড়িয়ে ছড়িয়ে ঘরের দেওয়ালটাই ভেঙ্গে ফেলে দেবে একদিন।।

প্রাকারের গায়ে সস্নেহে হাত বুলোন বোলান কুমারী।। জরাজীর্ণ অবস্থা। কতকাল মেরামত করা হয়নি। হবেই বা কি করে ? কোষাগারে অর্থ নেই।।কদিন আগেই সিন্ধিয়া দল পালটে ছারখার করে দিয়েছে জয়পুর আর উদয়পুর।হোলকার এখন নিঃস্পৃহ দর্শক। ভীম সিংহ শেষ অবধি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছেও সাহায্যের আবেদন করেছিলেন । তারা বলে পাঠিয়েছে কে এক নেপোলিয়নকে নিয়ে তারা এ মুহূর্তে বড়ই বিব্রত – তাদের পক্ষে কিছু করা এখন সম্ভব নয়।

ভোরের আলো ফুটছে ধীরে ধীরে।। ওই তো সোনারঙের রোদ ছড়িয়ে পড়ল পূর্ব দিকের গাঁ গুলোতে ।। ওসব গ্রাম এখন সুপ্ত।। কি নিশ্চিন্ত ওদের জীবন ! সত্যভামার মুখে ওদের কথা শুনেছেন কুমারী- ওখানকার মেয়েরা চারক্রোশ পথ হেঁটে কুয়ো থেকে জল আনে ঘড়ায় করে, ঘর নিকোয় , জ্বালানি সংগ্রহ করে , শিশুকে আগলায় , মরদের প্রহার সহ্য করে; আবার রাত্রে সেই অত্যাচারী স্বামীকেই পরম যত্নে বসে খাওয়ায় – মোটা মোটা বাজরার রুটি আর তেঁতুলের চাটনি।। কোন কোন দিন গৃহিণীর জন্য আর কিছুই পড়ে থাকে না।

একসময় এই অবমাননার কথা শুনলে ঘৃণায় রাগে গা রী রী করত কৃষ্ণার।। আজ তাঁর হিংসা হয় - মনে হয় আহা ওরা কেমন সুখে আছে! তিনিও যদি রাজদুহিতা না হয়ে,কৃষ্ণা না হয়ে, এক সামান্যা গ্রাম্য বধূ হতেন-

ওদের অন্ন নেই, বস্ত্র নেই , জল নেই , অর্থ নেই – তার উপর যুদ্ধের ব্যয়ভার বহন করতে কর চাপানো হয়েছে নতুন ।। কিন্তু কেন নেই? ভেবে দেখলে সেও তো তাঁর জন্যই ।। কার জন্য আজ মেবারের এই সর্বনাশ?

আমীর খান আবার শিবির বদল করেছে।। কর চেয়ে পাঠিয়েছে মেবার আর অম্বরে।। এর মধ্যে আবার উদয়পুরের সামন্ত রাজেদের মধ্যে বেধেছে অন্তর্দ্বন্দ্ব । রাণা সামলাতে পারছেন না এতদিক। সেই সুযোগে ক্ষমতালিপ্সু রাজপুরুষেরা ফণা তুলেছে। তাঁর জন্য কি মেবারের স্বাধীনতা সূর্য এবার অস্তমিত হবে ! এই এত বছরের বুক দিয়ে রক্ষা করা স্বাধীনতা! সহস্র বীরের প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা! গত কয়েক বছরের যুদ্ধে অধিকাংশ সৈন্য হত। উদয়পুর ও জয়পুরের কোষাগার শূন্যপ্রায় ।কার জন্য এই ক্ষয়, এই ধ্বংস? আচ্ছা, ওরা তাকে অভিশাপ দেবে না? ওই সব সৈনিকের পরিবার? ওই গ্রামবাসীরা? তাঁর নিজের পরিজনেরা?

কৃষ্ণা হেসে ফেলেন উন্মাদিনীর মত| নিজের নামটা বড় পছন্দ ছিল তাঁর। সেটা যে এমন অভ্রান্ত ভাবে ফলে যাবে কে জানত! মায়ের কাছে গল্প শুনেছিলেন – কুরুকুল ধ্বংসের জন্য জন্ম হয়েছিল যাজ্ঞসেনীর ।। কৃষ্ণাও তেমন মরুভূমির প্রেতিনীর মতন ভাবী শ্বশুরকুল ও পিতৃকুলের সমস্ত প্রাণ-রস পান করে চলেছেন অনবরত। রক্ত দিতে দিতে রক্ত নিঃশেষ হয়ে আসছে– তবু তৃষ্ণা মিটছে না। মর্যাদা মূল্যায়নের এই মহাযুদ্ধের শেষে তিনিও কি এক মহাশ্মশানের সম্রাজ্ঞী হবেন?

ঊষার আলো আজ বড় উজ্জ্বল। গ্রামগুলোর চালে সোনা রঙের সঙ্গে লালিমার আভাস। কিন্তু সহসা ও কি হল?ও কিসের শব্দ? অমন একটা সমবেত কোলাহল ভেসে আসছে কেন? এতদূর থেকে ঠিক বোঝা যাচ্ছেনা, তবু মনে হচ্ছে যেন অনেক মানুষ সমস্বরে আর্তনাদ করে চলেছে !

লালটাও ঠিক স্বাভাবিক নয়। ওই যে কালো ধোঁয়া আকাশটা ছেয়ে ফেলেছে! আগুন, আগুন লেগেছে! পুর্ব্ দিকের গ্রামগুলোতে আগুন লেগে গেছে কোনভাবে । এখুনি কাউকে খবর দেওয়া দরকার!

কৃষ্ণা নীচে নামতে যাবেন, এমন সময় সত্যভামা হাঁপাতে হাঁপাতে এসে প্রণাম করে – “রাজকুমারী,নীচে চল। মহারাজ তোমাকে এখুনি ডেকে পাঠিয়েছেন ।“

-----------৬----------------

ঘরে ঢুকতে গিয়ে থমকে দাঁড়ান কৃষ্ণা । কই, বাবা ত নেই ঘরে! বিশাল ঘরখানার একপ্রান্তে কেবল একলা বিষণ্ণ মুখে মেঝের দিকে চেয়ে বসে রয়েছেন মহারাজ দৌলত সিংহ, করজৌলির মহারাজা। কৃষ্ণা এগিয়ে গিয়ে প্রণাম করেন। দৌলত সম্পর্কে তাঁর পিতৃব্য; ৪ পুরুষ আগে মহারাণা ভীমের আর দৌলতের পূর্বজ ছিলেন একই ব্যক্তি। এই জ্ঞাতি কাকাটি্র সঙ্গে দেখা হয় না বড় একটা, তবু কৃষ্ণা তাঁকে বেশ ভালবাসেন ।।

দৌলত কৃষ্ণার মাথায় হাত রাখেন । কথা বলেন না কোন । কৃষ্ণা বিস্মিত হন ।। হেসে জিজ্ঞাসা করেন – “কই, আমায় আশীর্বাদ করলেন না কাকাজী? প্রতিবারের মত বললেন না তো, চিরায়ুষ্মতী হও?”

দৌলত সিংহ মুখ তুলে তাকান।। কৃষ্ণা এতক্ষণে দেখতে পায় – তাঁর দু চোখ আস্বাভাবিক রকমের রক্তাভ। মাথার চুল উসকোখুসকো। মুখে রাত্রি জাগরণের সুস্পষ্ট ছাপ। আরও একটা অস্বাভাবিক ব্যাপার – মহারাজের গা থেকে কিরকম হালকা একটা গন্ধ বেরোচ্ছে। মদ্যপ অবস্থায় কখনো তো রাজসকাশে আসেন না কাকামশাই!

“কি হয়েছে কাকাজী? আবার নতুন কোন অঘটন?” দৌলতের হাঁটু আঁকড়ে তাঁর পায়ের কাছে উপবেশন করেন কৃষ্ণা ।

সে স্পর্শে অকস্মাৎ থরথর করে কেঁপে ওঠেন দৌলত সিংহ।। কৃষ্ণা আজ ষোল বৎসরের যুবতী ।। সাক্ষাৎ দেবীপ্রতিমার মতন স্নিগ্ধ কমনীয় মূর্তি।তবে এ মেয়েকে তিনি জন্মাতেও দেখেছেন।। রাণার প্রথম সন্তানপ্রাপ্তির উৎসবে তিনিও ছিলেন আমন্ত্রিত।মোমের মতন নরম হাত পা ছিল শিশুটির।। ফোলা ফোলা গাল । থ্যাবড়া নাক।। তখনো তার চোখ ফোটেনি , ছোট্ট একখানা দোলনায় ঘুমোচ্ছিল সে। দৌলত নিজেও প্রায় কিশোর তখন। সদ্যোজাতর ছোট্ট নরম হাতখানা স্পর্শ করতে ঘুমন্ত অবস্থায়ই সে মুঠো করে ধরেছিল তাঁর তর্জনী।

“যে জিহ্বা এ আজ্ঞা দেয় – ধিক তাকে ।। এ কাজ না করলে যদি আমি বিশ্বাসের মূল্য না রাখতে পারি - তবে আমি বিশ্বাসঘাতক।। ভেঙ্গে যাক করজৌলির আনুগত্য।“ বিড়বিড় করে ওঠেন দৌলত।

“ কি বলছেন কাকাজী ? একটু জোরে বলুন, শুনতে পাচ্ছিনা।“ কৃষ্ণা জিজ্ঞাসা করে ।

“কিছু না, কিছু না।“ দৌলত সিংহ উঠে দাঁড়ান ।। কৃষ্ণার মাথায় আরেকবার হাত রেখে অস্ফুটে কি বলেন। তারপর দ্রুতপদে বেরিয়ে গিয়ে সোজা করজৌলির উদ্দেশে ঘোড়া ছুটিয়ে দেন|।

------------৭---------------

“পিতা, পিতা ।।“ বন্ধ দরজায় করাঘাত করে চলেছেন কৃষ্ণা ।। “একবার, কেবল একবার দরজা খুলুন।। নিজমুখে আমায় বলুন এ আদেশ আপনার। পিতা!” রুদ্ধ কপাটে মাথা ঠুকছেন মহারাণী আরশাজবদ ।। “দয়া কর । ওগো দয়া কর আমায় ।। দয়া কর তুমি! এ কথা – যে কথা শুনতেও পাপ – শুনলে গায়ের রক্ত জল হয়ে যায় – সে আদেশ, এ মহাপাপের আদেশ প্রত্যাহার কর তুমি!“ রুদ্ধ কপাট অটল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে , অন্তরাল থেকে ভেসে আসছে না কোন শব্দ ।।

“কেন পিতা, কেন ? কি অপরাধ করেছি আমি ?” ডাকতে ডাকতে কুমারীর গলা ভেঙ্গে যাচ্ছে, মহারাণীর কপালে রুধিরের রেখা। তবু দরজা খুলছে না।।

“কৃষ্ণা!” চমকে ফিরে তাকায় রাজকুমারী ।। পিসী চাঁদ বাঈ যেন কখন অতর্কিতে এসে দাঁড়িয়েছেন পিছনে। “কৃষ্ণা,মহারাজকে ছেড়ে দে। আমার সঙ্গে আয়। আমি তোকে বলছি কি হয়েছে ।“

কাকাজী অমন ভাবে বিদায় নেওয়ার পরই কৃষ্ণার মনটা খারাপ।। সে এসে বসেছিল মায়ের কাছে।।বহুদিন পরে মা-মেয়েতে কথা হচ্ছিল। এমন সময় ঘরে ঢুকল জয়ানদাস। কৃষ্ণার সহোদর ভাই। এগিয়ে এসে, কেউ কিছু বোঝবার আগেই, কৃষ্ণার বুকে ঠেকাল একখানা ছুরি। ছোট্ট অথচ ক্ষুরধার।। কৃষ্ণা চেয়ে রইল অবাক বিস্ময়ে ।। মহারাণীও স্তম্ভিতা ।। নড়াচড়া করতেও যেন ভুলে গেছেন সবাই।।

সে অবস্থায় কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল জয়ান। অতঃপর একসময় তার হাত থেকে স্খলিত হয়ে ছুরিখানা পড়ে গেল নীচে। অবরুদ্ধ স্বরে রাজপুত্র বলে উঠলেন – “পারব না । পারব না আমি।।“

কৃষ্ণা ব্যথাতুর হেসে জিজ্ঞাসা করেন – “তুই আমায় মারতে চাস ভাইয়া? কেন ভাই?” জয়ানদাস সবলে আলিঙ্গন করে ভগ্নীকে। দিদির চুলে মুখ লুকিয়ে ফিসফিস করে ওঠে – “পিতৃ আদেশ!”

তাঁর পরেই এই দৃশ্যের অবতারণা। এক দণ্ড কাল ধরে পিতার কক্ষের দরজা খোলাতে পারেনি কৃষ্ণা ।। পিতার কাছ থেকে উত্তর মেলেনি –“কি এই আদেশের তাৎপর্য্য ? কতদূর এর সত্যতা?”

মহারাণী এখনও রাণার দুয়ারে কড়া নেড়ে চলেছেন।। চাঁদ বাঈ কৃষ্ণাকে এনে বসান একখানি ঘরে।। দরজাটা আস্তে আস্তে বন্ধ করে দেন। ক্ষণকাল চুপ করে থেকে তারপর বলেন – “আজ সকালে গাঁয়ে আগুন লাগার ঘটনা তুইই প্রথম দেখেছিস না?” কৃষ্ণা ধীরে ধীরে মাথা নাড়ে । “ও আগুন কে লাগিয়েছিল জানিস ? আমীর খান পিণ্ডারী। টোঁকের নবাব । মেবারের সর্বত্রই আজ এই আগুন। আর এ আগুন নেভাতে পারে একমাত্র একজন। সে হচ্ছিস তুই। কৃষ্ণা, মেবার না তোর মাতৃভূমি ?“

“পিসী – আপনি আমাকে বলুন কি করতে হবে ! “ কৃষ্ণা ব্যাকুল স্বরে জিজ্ঞাসা করে। “মেবারের জন্য আমি প্রাণ অবধি দিতে পারি। কিন্তু তাঁর সাথে পিতার এ আদেশের …” বলতে বলতেই স্তব্ধ হয়ে যায় রসনা। সহসা বিদ্যুৎচমকের মতন এ ভীষণ আদেশের অর্থ বোধগম্য হয় কৃষ্ণার । স্পষ্ট হয়ে যায় সবটুকু। কণ্টকিত হয়ে ওঠে সারা দেহ । কাঁপতে কাঁপতে সে চাঁদ বাঈয়ের দিকে তাকায়।দেখে, তিনিও স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন তার দিকে।

“আমীর খান বলে পাঠিয়েছে মান সিংহের সঙ্গে তোর বিয়ে হয় তো ভালো, নইলে সে মেবার শ্মশান করে দেবে। রাঠোররা আমাদের চেয়ে বংশমর্যাদায় ছোট ।সবই তো জানিস। তুই- প্রতাপসিংহ, পদ্মিনীর বংশের মেয়ে । তোকে আর কি বলব!” চাঁদ বাঈ ফিসফিস করে ওঠেন –“তোর বেঁচে থাকার অর্থ এখন হয় কুলমর্যাদানাশ বা মেবারের স্বাধীনতানাশ।“

কৃষ্ণা ধীরে ধীরে মাটিতে বসে পড়ে– “কবে ? কখন?”। “এখুনি “ জলদগম্ভীর স্বরে ভেসে আসে উত্তর।

আজ? এখুনি?? এই তার ষোল বছর বয়স। আর সে প্রভাতের সূর্য দেখতে পাবে না ? খোঁপায় বেলফুলের মালা জড়াতে পারবে না? সন্ধ্যায় পিছোলা দীঘির পিছল ঘাটে পা ডোবাতে পারবে না ? রামায়ণ কথকতা শুনতে পাবে না? এখনো তো সে জানেনা ভালোবাসতে কেমন লাগে ঠিক! এখনও জানেনা কেমন হয় প্রিয়তম পুরুষের প্রথম স্পর্শ! আর কাল থেকে এ প্রাসাদে জলে-স্থলে-আকাশে-বাতাসে কোথাও সে নেই?

“একবার মা-বাবাকে প্রণাম করে আসি?” অস্ফুটে বলেন কুমারী।

“না । কারও সাথে দেখা করিস না আর।“ চাঁদ বাঈ অবিচলিতা।সস্নেহ স্বরে বলেন– “ এ সময়ে পৃথিবীকে বড় সুন্দর মনে হয়। কোন দুর্বলতাকে প্রশ্রয় দিস না।“ চাঁদ বাঈ বাড়িয়ে ধরেন একখানা সুদৃশ্য স্বর্ণ-ভৃঙ্গার।। তাতে পিছোলা দীঘির জলের মতন টলটলে নীল তরল ভরা! গরলাধার!

একমুহূর্ত ইতস্তত করে কৃষ্ণা তা গ্রহণ করে।তারপর একচুমুকে নিঃশেষ করে ফেলে পাত্রটা।

মহারাণী যখন খবর পেয়ে আলুথালু বেশে আর্তনাদ করতে করতে যখন এসে পৌঁছলেন, তখন কৃষ্ণার গাত্রবর্ণ নীল হয়ে গেছে। চোখের দৃষ্টি ঝাপসা ।তিন পেয়ালা হলাহল পান করেও সে এখনো অবধি জীবিতা। নবীন প্রাণ কিছুতেই পরিত্যাগ করতে চাইছে না স্ফুটনোন্মুখ তনুকে।।

এভাবে আরো দণ্ড কয়েক চলতে পারে ।প্রস্তুত হচ্ছে আরও কয়েক ভৃঙ্গার বিষ।। মহারাণী কন্যার অবস্থা দেখে আর কারও কাছে কিছু বললেন না। সকলকে সরিয়ে নিজে কন্যার মাথা তুলে নিলেন অঙ্কে, পিপাসার্ত ওষ্ঠাধরে ঢেলে দিলেন – কুসুম্বা !! রাজবাড়ীর সমস্ত আফিম সঞ্চিত করে প্রস্তুত করা সরবত!

মায়ের স্পর্শ পেয়ে কৃষ্ণা একবার মাত্র চোখ খোলবার চেষ্টা করেছিল। একবার কেবল বলে উঠেছিল –“মেবারের স্বাধীনতা অক্ষয় হোক ।।“ আরও কিছু বলতে চেয়েছিল সে – তবে জিভ তখন তার জড়িয়ে গিয়েছে।।

এরপরই,দেহের ধমনীতে প্রবাহিত রাজকীয় মর্যাদাপূর্ণ সমস্ত শিশোদিয়া রক্ত একবার ছুটে এল তার কপোলে; বিবাহ রাত্রির রক্তবাসের মতন – রাঙ্গিয়ে দিয়ে গেল তার আনন। মুদিত নেত্রে একখানা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন কৃষ্ণা। তারপরই ধীরে ধীরে সমস্ত মুখখানা হয়ে পড়ল ছাইয়ের মতন সাদা আর বরফের মতন শীতল।।

------------------৮-------------------


রাজকুমারী কৃষ্ণার গল্প এখানেই শেষ।।তবে উপসংহার আর একটু আছে ।।

কৃষ্ণা মৃত্যুর আট বছর পর, ১৮১৮ খৃষ্টাব্দে, মেবার কোম্পানীর বশ্যতা স্বীকার করে নেয়। সন্ধির শর্ত অনুযায়ী :-

১।) ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী রক্ষা করবে মেবারের সীমান্ত। তাদের অনুমতি ব্যতিরেকে অন্য কোন রাজ্যের সঙ্গে কোনরূপ সম্পর্কে আবদ্ধ হতে পারবেন না মহারাণা।

২।) মেবারের আয়ের এক চতুর্থাংশ কর ৫ বছর ধরে পাবেন কোম্পানী-বাহাদুর। তারপর বছর বছর তারা মেবারের আয়ের তিন–অষ্টমাংশ পেতে থাকবেন।।

৩) মেবার ব্রিটিশ কোম্পানীর সাম্রাজ্যের সার্বভৌমত্ব স্বীকার করবে সর্বতোভাবে। আর সেই আনুগত্য ও বিশ্স্বস্ততার পুরস্কার হিসেবে; সরকারের পক্ষে সুপ্রাচীন শিশোদিয়া বংশকে মর্যাদা দিতে মেবারপতির জন্য বরাদ্দ করা হল ১৯ খানা গান স্যালুট!

একটি দেশের স্বাতন্ত্র্য ও স্বাধীনতার মূল্য, একটি বংশের বিপুল মর্যাদা আর কুলগৌরবের মুল্য- মোট ১৯ খানা গান স্যালুট।

যোধপুরের মান সিংহ ও দৌলতরাও সিন্ধিয়া ১৮১৮ খৃষ্টাব্দে সন্ধি করেন কোম্পানীর সঙ্গে। সে বছরই, অর্থাৎ ১৮১৮ খৃষ্টাব্দের ২১শে নভেম্বর – ২১জন রাণী ও ২৪ জন রক্ষিতাকে বিষাদসাগরে ভাসিয়ে অম্বরের সোয়াই রাজা জগৎ সিংহ স্বর্গারোহণ করেন ।

x---------------------------x





কৈফিয়ত


১। কাহিনীটি ইতিহাস আশ্রিত। সজ্ঞানে ইতিহাসকে কোথাও অতিক্রম করিনি। তবে কাহিনীর স্বার্থে কিছু যুদ্ধের সময়কাল সামান্য অদলবদল করা হয়েছে।


২। কাহিনীতে বর্ণিত সকল চরিত্রই ঐতিহাসিক। কেবলমাত্র সত্যভামা লেখিকার কল্পনাপ্রসূত।


৩। ঐতিহাসিক সমস্ত দলিল ইংরিজিতে। সেখানে এই উপাখ্যানের নায়িকার নাম krishna kumari - যা কিনা বাংলায় কৃষ্ণা-কুমারী বা কৃষ্ণ-কুমারী উভয়ই হওয়া সম্ভব। গল্পের স্বার্থে এক্ষেত্রে কৃষ্ণা কুমারী নামটিই বহাল রেখেছি।



তথ্যসূত্র


Annals and antiquities of rajasthan- James Todd




The Three Moons- Elizabeth Bruce Elton Smith


The Making of the Indian Princess- Edward Thompson


মহাভারত- কাশীরাম দাস






Wikipedia