Next
Previous
Showing posts with label গল্প. Show all posts
0

গল্প - মনোজ কর

Posted in





















চতুর্দশ পর্ব

পানু রায়ের ফোন বেজে উঠলো। ফোনের ওপারে মনীষা।

-বলো মনীষা। সব ঠিকমত চলছে?

-হ্যাঁ, এখনও পর্যন্ত সব ঠিকই আছে।

-পুলিশের খোঁজাখুঁজি শেষ হলো? কিছু পেলো?

-না, কিছুই পায়নি। অনেক খোঁজাখুঁজি করলো। হতাশ হয়ে ফিরে গেল।

-এটা কোনও ফাঁদ হতে পারে। অফিসের অবস্থা কী রকম?

-অফিসের অবস্থা খুব খারাপ। সমস্ত কাগজপত্র, ফাইল এলোমেলো হয়ে আছে। এলিনা কী করে গেছে কে জানে? চিঠিপত্র, বিল সমস্ত ভুল জায়গায় ফাইল করে গেছে। টাকা পয়সাও খুব অসাবধানতার সঙ্গে দেয়া নেয়া করেছে।

-তার মানে? আমাকে আর একটু ডিটেলে বলো।

-ধরুন রাজেন্দ্র পার্কের নতুন ফ্ল্যাটটা যেটা উনি আমি ছুটিতে যাবার কয়েকদিন আগে কিনেছিলেন সেটাতে কিছু ইলেকট্রিক রিপেয়ারের কাজ হয়েছে যার জন্য বিল হয়েছে এক লক্ষ সত্তর হাজার টাকা। এটা কি সম্ভব?

-হতে পারে। হয়তো কোনও বড় টিভি লাগানো হয়েছে।

- আমি ডিটেলে দেখছি কিন্তু সবকিছু বেশ অগোছালো করে রেখে গেছে।

-মনীষা, যতটা পার ঠিক করার চেষ্টা করো। আমার সঙ্গে যোগাযোগ রেখো। কালীকৃষ্ণ ফোন করলে বোলো আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে।

-অবশ্যই। পুলিশের ব্যাপারটা উনি ফোন করলে জানাব?

-নিশ্চয়ই। ডিটেলে জানাবে।

-আমি ভাবছিলাম যদি পুলিশ ওনার ফোন ট্যাপ করে।

-কিছু করার নেই। ঝুঁকি তো নিতেই হবে।

-ঠিক আছে। আমি দেখি কতদূর কী গোছানো যায়।

পানু রায় ফোন রাখতেই দরজা ঠেলে জগাই ঢুকলো। পানু রায় জিজ্ঞাসা করলেন,’ কী হলো, কোনও খবর?’

-বেশ ভালোই গন্ডগোল শুরু হলো বলে মনে হচ্ছে।

-কী হয়েছে? এত উত্তেজিত হচ্ছিস কেন?

-তুমি ঐ সাংবাদিক সনাতনকে চেন তো? আরে যে ‘ঈগলের চোখে’ বলে খবরের কাগজে গল্প লেখে। খুব পপুলার ওর লেখা।

-হ্যাঁ, চিনি। আমিও ওর লেখার খুব ভক্ত। কিন্তু হয়েছেটা কী?

-কেউ একজন খবর জোগাড় করেছে যে তুমি নাকি ছোটকালীর অফিসে একটা বন্দুক থেকে গুলি চালিয়ে অফিসের ফার্নিচার নষ্ট করে দিয়েছো।

-তুই কী বলছিস জগাই? এটা ওরা খবরের কাগজে ছাপাবে?

-কেন আমার তো মনে হয় তুমি তাই চাইছিলে। প্রচারের জন্য এর চেয়ে ভালো খবর আর কী হতে পারে? আমি প্রথমে বিশ্বাস করিনি। কিন্তু এখন আমার মনে হচ্ছে হলেও হতে পারে।

-কিন্তু আমি অসাবধানতাবশত এটা করে ফেলেছিলাম।

-কিন্তু সনাতন এটা নিয়ে একটা মজার গল্প লিখতে চলেছে। একজন একশ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তি যিনি নাকি ব্যালিস্টিক বিশেষজ্ঞদের নাকানি চোবানি খাওয়াতে পারেন তিনি নাকি একটা বন্দুকের মধ্যে গুলি ভরা আছে কিনা না জেনেই ট্রিগার টেনে একটা বিপজ্জনক কান্ড ঘটিয়ে বসলেন।

-এটা সত্যিই খুব লজ্জার ব্যাপার হবে!

-আমারও প্রথমে তাই মনে হয়েছিল।

-এখন কি তোর অন্যকিছু মনে হচ্ছে?

-দাদু, তোমার কী করে মনে হলো যে এটা করে তুমি পার পেয়ে যাবে?

-আমার মনে হয়না আমি পার পেয়ে যাব। এটা ঐ সনাতনের মত সাংবাদিকদের জন্য লেখার একটা ভালো বিষয় হবে।আর সনাতন নিশ্চয়ই এমন ভালো একটা গল্প একদিনে শেষ করবে না।

-দাদু, আমার শুধু একটাই চিন্তা। তুমি এমন কিছু করনি তো যাতে ওরা তোমাকে আইনভঙ্গকারী বলতে পারে?

-জগাই, আমার মনে হয় তুই ঠিক। আসলে যে কারণে ওরা আমায় অভিযুক্ত করতে পারে তা হলো শহর এলাকায় গুলি চালানো।

পরের দিন পানু রায় যখন অফিসে ঢুকলেন দেখলেন টেবিলে খবরের কাগজটা রাখা। সনাতনের গল্পটা যে পাতায় আছে সেই পাতাটা খুলে সামনে রেখে গেছে সুন্দরী। পানু রায় কাগজটার দিকে তাকানোর সঙ্গে সঙ্গেই সুন্দরী ঘরে ঢুকলো। পানু রায় বললেন,’ সুন্দরী, আমি শেষ অবধি প্রচারের আলোয় এসে গেলাম।‘

-কাল থেকে তুমি এই শহরের সব আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। কী লিখেছে শোনো। - শতবর্ষীয় বিস্ময়বৃদ্ধ পানু রায় যাঁর অপরিসীম জ্ঞানের কথা সর্বজনবিদিত এবং যিনি এই শহরের সবচেয়ে মূল্যবান পরামর্শদাতা এবং যাঁর কারিগরী জ্ঞান বিশেষ করে অস্ত্রসম্বন্ধিত জ্ঞান যে কোনও অস্ত্রবিশেষজ্ঞের চেয়ে বেশি বইতো কম নয় সেই পানু রায় বন্দুক হাতে নিয়ে হাস্যকর ঘটনা ঘটালেন।

রেবা কৈরালার সঙ্গে ছোটকালীর সম্পর্ক এবং তারপর থেকে কী কী ঘটেছে এমনকি আচমকা গুলির আঘাতে ছোটকালীর মেহগিনি টেবিল যে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে সে কথা বলেই গল্প শেষ হয়নি। একথাও লেখা হয়েছে যে শিবুলালের খুনের তদন্ত করতে গিয়ে যে বন্দুকটি রেবা কৈরালার বাড়িতে পাওয়া গেছে সেটিতেও একটা গুলি কম ছিল এবং সেই বন্দুকটিই এই বন্দুক কি না সেবিষয়ে পুলিশ আরও খোঁজখবর চালাচ্ছে। ওদিকে কালীকৃষ্ণের অফিসে ঐ টেবিলটি দেখাবার জন্য সেলসম্যানেরা সম্ভাব্য ক্রেতাদের ভিড় করে ঐ ঘরে নিয়ে যাচ্ছে এবং গাড়ি কেনার কাগজে সই করাচ্ছে। সুতরাং টেবিল পাল্টানোর পরিকল্পনা এখন বাতিল করা হয়েছে। ঐ টেবিলটিকে বিশেষ দ্রষ্টব্য জিনিস বলে প্রচার চালানো হচ্ছে এবং ঐ টেবিলের নামকরণ করা হয়েছে ‘টেবিলের শবদেহ’ বলে।

এই পর্যন্ত পড়ে সুন্দরী থামল কারণ দরজা খুলে ততক্ষণে জগাই ঘরে ঢুকে পড়েছে। জগাই বললো,’ তোমাকে বলে রাখি কাগজ পড়ে যারা ঐ টেবিল দেখতে আসছে ছোটকালীর ছেলেরা তাদের সবাইকে গাড়ি বিক্রীর চেষ্টা করছে। একদিনে গোটা দশেক গাড়ি বিক্রী হয়ে গেছে যা এক সপ্তাহেও হয়না।‘ পানু রায় হেসে সুন্দরীকে ফোনটা দিয়ে বললেন,’ রেবা কৈরালাকে ধরার চেষ্টা করো। আমি ততক্ষণ জগাইএর সঙ্গে কাজের কথা সেরে নিই। বল জগাই কী কী খবর জোগাড় করলি।‘

-শিবুলালের অপরাধী হিসাবে পুলিশের খাতায় নাম আছে। বার দুয়েক জেল খেটেছে। একবার ঠকিয়ে টাকা আদায়ের জন্য আর অন্যবার ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়ের জন্য। লোকটা সেদিন সন্ধ্যেবেলা সাতটা থেকে সাড়ে আটটার মধ্যে ০.৩৮ ক্যালিবারের বুলেটের ঘায়ে মারা গেছে। ওর বুকে বন্দুকের নল ঠেকিয়ে গুলি করা হয়েছে।

-তাতে শরীরের মধ্যে শুধু গুলিই ঢোকে না সঙ্গে সঙ্গে বিষাক্ত গ্যাসও ঢুকে যায়। কেউ কি গুলির আওয়াজ শুনেছে?

-না। মনে হয়না। বুকে ঠেকিয়ে গুলি করলে আওয়াজ কম হয় বলেই মনে হয়।

-তার মানে কেউ কোনও আওয়াজ শোনেনি। আর কিছু খবর?

পানু রায়ের কথা শেষ হওয়ার আগেই জগাইএর ফোন বেজে উঠলো। জগাই ফোন ধরে ওদিকের কথা শুনে বললো,’ কী সর্বনাশ! তুমি ঠিক শুনেছো? ঠিক আছে এখন রাখছি। আর কিছু খবর পেলে আমাকে জানিও।‘ পানু রায় জিজ্ঞাসা করলেন,’ কী হয়েছে?’

-পুলিশ বলছে যে বন্দুকটা রেবা কৈরালার ঘরে পাওয়া গেছে সেটাই শিবুলালকে হত্যার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে।

-কোন বন্দুকটা?

-কেন? ওখানে তো একটাই বন্দুক ছিল যেটা ছোটকালী রেবা কৈরালাকে দিয়েছিল। তার মানে যে বন্দুকটা শিবুলালকে হত্যার ব্যাপারে ব্যবহার করা হয়েছিল বলে বলা হচ্ছে সেটা তোমার কাছে কিছুক্ষণের জন্য ছিল এবং তার থেকে একটা গুলি তুমি ব্যবহার করেছ এবং সবাই সেটা দেখেছে। পুলিশ প্রথমে ভেবেছিল তুমি কিছু একটা পরিকল্পনা করে ইচ্ছাকৃতভাবে ওদের বিপথে চালাতে চাইছিলে। ওরা ছোটকালীকে ঝাঁকাচ্ছে। ওদের ধারণা ছিল তুমি ইচ্ছে করে ঐ ঘাতক বন্দুকটা রেবার বাড়িতে রেখে এসেছিলে।

-ওদের এখন মত পরিবর্তন হয়েছে?

-হ্যাঁ, এখন ওদের মত বদলেছে। এখন ওদের সন্দেহ অন্য একজনকে। সে হচ্ছে ছোটকালীর স্ত্রী। ঐ মহিলা একসময় কাঠমান্ডুর কোনও এক হোটেলে হোস্টেস এবং গয়নার মডেল হিসাবে কাজ করত। শিবুলালের সঙ্গে ঐ মহিলার যোগাযোগ ছিল এবং ওনার ফোন ডায়েরিতে শিবুলালের ব্যক্তিগত ফোনের নম্বর পাওয়া গেছে। শিবুলাল ব্ল্যাকমেলার ছিল এবং ঐ মহিলা সদ্যবিবাহিতা। সুতরাং দুয়ে দুয়ে চার করতে কোনও অসুবিধে হওয়ার কথা নয়। পুলিশের কথা শুনে মনে হচ্ছে তোমার ঐ বোকা বোকা গুলি ছোঁড়ার ব্যাপারটা আর তোমার ঐ ‘আমি জানিনা ওতে গুলি ভরা ছিল’ তুমি বুলেট বিশেষজ্ঞদের বিপথে চালনা করার জন্য করেছ। পুলিশ ব্যাপারটা ভালো চোখে দেখছে না। ওরা সমস্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ তন্ন তন্ন করে পরীক্ষা করছে। কেলো দারোগা তোমাকে কেস দেবে বলে মুখিয়ে আছে। যদি প্রমাণ করতে পারে তুমি সাক্ষ্যপ্রমাণ নষ্ট করার চেষ্টা করেছ তাহলে তোমাকে জেলে ভরার জন্য যতদূর যেতে হয় যাবে।

পানু রায় চেয়ার থেকে উঠে একটু অস্থিরভাবে পায়চারি করতে করতে জগাইএর দিকে তাকিয়ে উত্তেজিতস্বরে বললেন,’ শোন, আমি জানতে চাই পুলিশ কী করছে? এ ব্যাপারে যত খবর পাওয়া সম্ভব সব আমার চাই। ওরা সম্ভবত রেবা এবং ছোটকালী দু’জনকেই জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে দিয়েছে। ভাগ্য আমাদের প্রতি সুপ্রসন্ন যে বড়কালী দেশের বাইরে। ওকে ধরা খুব একটা সহজ হবে না। কোথাও তো একটা গন্ডগোল লাগছে।‘

-কিন্তু দাদু পুলিশ জানতে চাইছে যে কেন তুমি ছোটকালীর অফিসে গেলে, ওর কাছ থেকে বন্দুক চাইলে, ওটা থেকে টেবিলের ওপর গুলি চালালে তারপর ওটা নিয়ে রেবা কৈরালার বাড়িতে গিয়ে এমন ভাবে রেখে এলে যাতে পুলিশের ওটা খুঁজে পেতে অসুবিধে না হয়।

-জগাই, তুই আমাকে নতুন কিছু বলছিস না। এর পিছনে কী আছে তার সম্বন্ধে তোর বিন্দুমাত্র ধারণা নেই। যেটা করতে বলছি সেটা কর।

জগাই মাথা নিচু করে অফিস থেকে বেরিয়ে গেল। পানু রায় আরও কিছুক্ষণ পায়চারি করে সুন্দরীর দিকে তাকিয়ে বললেন,’ এর উত্তর একটাই।‘ সুন্দরী কিছু বুঝতে না পেরে জিজ্ঞাসা করলো ,’ কী?’

-বড়কালীর কাছে নিশ্চয়ই ছোটকালীর অফিসের চাবি আছে। যে বন্দুকটা দিয়ে খুন করা হয়েছিল সেটা বড়কালীর কাছে ছিল। বড়কালী জানতো যে ছোটকালীর কাছে অবিকল একই রকম একটা বন্দুক আছে। সুতরাং বড়কালী খুনী বন্দুকটাতে একটা গুলি ভরে ছোটকালীর ড্রয়ারে রেখে ছোটকালীর বন্দুকটাকে নিয়ে চলে যায়। বড়কালী ভেবেছিল খুনী বন্দুকটা পুলিশ খুঁজে পাবে না। তারপর ছোটকালীর বন্দুক থেকে একটা গুলি খরচ করে সেটা রেবাকে দিয়ে আসে। ভেবেছিল পুলিশ ঐ বন্দুকটা রেবার বাড়িতে খুঁজে পাবে। একটা গুলি নেই দেখে ভাববে রেবা খুন করেছে, তারপর যখন বুঝবে যে ঐ বন্দুকটা থেকে খুন করা হয়নি তখন রেবার প্রতি আর সন্দেহ থাকবে না। আর সেজন্যই আমাকে বলেছিল যেভাবে হোক রেবার নিরাপত্তা যেন কোনও ভাবেই বিঘ্নিত না হয়। কিন্তু আমার ভুলের জন্য বড়কালীর সমস্ত পরিকল্পনা ভেস্তে গেল। আমি ভেবেছিলাম পুলিশ যখন রেবাকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে তখন জানতে পারবে যে বড়কালী তাকে একটা বন্দুক দিয়েছিল এবং সেটা তারা খুঁজে বের করবে অথবা তারা রেবার বাড়িতে খুনী বন্দুকের খোঁজে তল্লাশি চালাবে । আমি ভাবলাম আমি যদি কোনওভাবে ছোটকালীর বন্দুকটাও রেবার বাড়িতে রেখে দিতে পারি এবং পুলিশ যদি ঐ বন্দুকটা সহজেই হাতে পেয়ে যায় তাহলে নিশ্চয়ই দ্বিতীয় বন্দুকের খোঁজ করবে না। আর তার আগেই যদি ওরা জেনে যায় যে বড়কালী রেবাকে একটা বন্দুক দিয়ে গেছে এবং সেটা চায় তাহলে রেবা ছোটকালীর বন্দুকটা পুলিশকে দেবে এবং যখন বোঝা যাবে যে সেটা খুনী বন্দুক নয় তখন পুরো ব্যাপারটা গুলিয়ে যাবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে যে বন্দুকটা বড়কালী লুকিয়ে রেখে এলো আমি সেটা নিজের অজান্তে বের করে নিয়ে এসে পুলিশের হাতে তুলে দিলাম।

-এখন তোমার কী হবে?

-জানি না।তবে এটুকু বলতে পারি পুলিশ বলতে পারবে না আমি প্রমাণ লোপাট করেছি। উল্টে আমি যে প্রমাণের জন্য পুলিশ হন্যে হয়ে ঘুরছে সেই প্রমাণ উদ্ধার করে পুলিশের মূল সন্দেহ রেবা কৈরালার বাড়িতে রেখে এসেছি। সুতরাং এই মুহূর্তে আমি আমার কী হবে তাই নিয়ে চিন্তিত নই। আমার চিন্তা বড়কালীদের নিয়ে।

-দাদু, তোমার কি মনে হয়, কে খুন করেছে?

- সেটাই তো এখন মূল প্রশ্ন। এই মুহূর্তে পুলিশের ধারণা ছোটকালীর স্ত্রী অথবা ছোটকালী খুন করেছে এবং আমি ওদের বাঁচাবার জন্য রেবাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করছি। আমার মনে হয় ছোটকালী আর তার নববিবাহিতা স্ত্রীও আমার ওপর বেশ রেগে আছে। ওদের ধারণা আমি খুনী বন্দুকটা নিয়ে ছোটকালীর অফিসে গিয়েছিলাম। তারপর আমার ইচ্ছাকৃত হৈ হট্টগোলের মধ্যে কোনও ফাঁকে খুনী বন্দুকটাকে ছোটকালীর বন্দুকটার সঙ্গে বদলে দিই। আমার ফাঁদে পা দিয়ে ছোটকালী খুনী বন্দুকটা রেবাকে দিয়ে আসে। বড়কালী যখন কাগজে খবরটা পড়বে তখন আমাকে অভিশাপ দিতে শুরু করবে।

-আর পুলিশ তোমার সম্বন্ধে কী ভাবছে?

- পুলিশ ভাবছে আমি যা করেছি তা কেবলমাত্র পুলিশকে বিপথে চালনা করা জন্য। ওরা যে ভাবেই হোক প্রমাণ করার চেষ্টা করবে আমার কাছে ঐ খুনী বন্দুকটা ছিল। যদি একবার ওরা সেই জায়গায় পৌঁছোয় তাহলে ওরা আমাকে যতদূর পারে টেনে নামাবে।

-কিন্তু ওরা কী করে সেটা প্রমাণ করবে?

-ঐ গুলিটার থেকে যেটা আমি ছোটকালীর টেবিলে ছুঁড়েছিলাম। কিন্তু ঐ গুলিটা ছাড়া কিছুতেই প্রমাণ করতে পারবে না আমার কাছে ঐ বন্দুকটা ছিল। কিন্তু একবার যদি ঐ গুলিটা পুলিশ হাতে পায় এবং প্রত্যক্ষদর্শীরা যদি বলে ঐ গুলিটা আমি ছুঁড়েছিলাম পুলিশ প্রমাণ করবে যে ঐ গুলিটা খুনী বন্দুক থেকে ছোঁড়া হয়েছিল। মনে রেখো আমি শিবুলালের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম এবং কেলো দারোগা আপ্রাণ চেষ্টা করবে এটা প্রমাণ করতে যে আমিই খুন করেছিলাম।

-বেশ, ওরা যদি ঐ গুলিটা হাতে না পায় তাহলে ওরা নিশ্চয়ই প্রমাণ করতে পারবে না যে খুনী বন্দুকটা তোমার কাছে ছিল।

-পারতেও পারে তবে সোজাসুজি নয়।

-পুলিশের মাথায় এটা আসার আগে জগাইকে কি বলা যায় না ওখানে গিয়ে ঐ গুলিটা খুঁজে আনতে।

-না, না। সেটা সম্ভব নয়। আমি জগাইকে চিনি। এতবড় ঝুঁকির কাজ ও আগে করেনি। একবার ধরা পড়ে গেলে আমরা সবাই বিপদে পড়ে যাব।

-গুলিটা টেবিল থেকে ছিটকে কোথায় গিয়েছিল তোমার মনে আছে?

-আমি এমন একটা অ্যাঙ্গেল থেকে গুলিটা ছুঁড়েছিলাম যে গুলিটা যাতে ছিটকে দেয়ালে আটকে যায়, কাউকে যেন আঘাত না করে।

- এবার সত্যি বলতো গুলিটা তুমি কেন ছুঁড়েছিলে?

-যাতে কিনা পুলিশ সহজেই একটা গুলি ছোঁড়া হয়েছে এমন একটা বন্দুক রেবার বাড়িতে পেয়ে যায়। আমি ভেবেছিলাম যদি পুলিশ একরম একটা বন্দুকের খোঁজেই রেবার কাছে আসে তাহলে ছোটকালী এবং আমার রাখা বন্দুকটা নিয়েই পুলিশ চলে যাবে।

-তাহলে আমরা এখন কী করবো?

-আমাদের কাছে অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনও উপায় নেই।

-দাদু, সেটাই তো সবচেয়ে কঠিন কাজ । আমার অস্থির লাগছে। আমি একটু খোলা হাওয়ায় হেঁটে আসি। আমি এখনই আসছি।

-সুন্দরী, কী হয়েছে তোমার?

-আমি কাল রাত্রে ঘুমোতে পারিনি। আমি কাল সারারাত ছোটকালী আর রেবাকে নিয়ে ভেবেছি। আমি জানিনা কেন আমি ব্যাপারটা থেকে বেরোতে পারছিনা।

-তুমি আসলে অনেক বেশি সময় অফিসে দিচ্ছ এবং অনেক বেশু দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়ে নিয়েছ। এতকাজ একসাথে করার সঙ্গে সঙ্গে তুমি আমাকেও কেসের ব্যাপারে সাহায্য করছো।

- সে কথা ঠিক, কাজের চাপ হয়ত বেড়েছে কিন্তু আগে তো কখনও এরকম হয়নি। বিশেষ করে গতরাত্রে। আমি চোখের পাতা এক করতে পারিনি। আমার মনে হয় রেবার প্রেমে আঘাত পাবার ব্যাপারটা আমাকে বেশি ভাবাচ্ছে। একবার রেবার মনের অবস্থাটা ভেবে দেখ, দাদু। একদিন সকালবেলা খবরের কাগজ খুলে দেখল তার প্রেমিক অন্য একজনকে বিয়ে করেছে যে ব্যাপারে সে কিচ্ছু জানেনা। আর তার প্রেমিকের বাবা তাকে বাড়ি নিয়ে যেতে চায়। আমি কাঁদতে কাঁদতে ঘুম থেকে উঠে পড়েছিলাম। আর শুতে যেতে পারিনি। সারারাত অস্থিরভাবে পায়চারি করেছি।

-সুন্দরী, ভেতরে যাও। একটা ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়। আমি সবাইকে বলে দিচ্ছি কেউ যেন তোমাকে বিরক্ত না করে। যদি সেরকম কিছু ঘটে আমি তোমাকে ডেকে দেব।কালকের দিনটা ঘটনাবহুল হবে বলে মনে হয়। আজ সেরকম কিছু হবার সম্ভাবনা নেই। সবকিছু জট পাকিয়ে আছে। পুলিশকে কিছু করার আগে জট খুলতে হবে। সময় লাগবে।

-আর তারপর যখন পুলিশ সক্রিয় হয়ে উঠবে তখন তুমিই হবে তাদের প্রথম এবং প্রধান লক্ষ্য।

-একদম ঠিক। তবে যদি সে সুযোগ পুলিশ পায়। কেলো দারোগা আপ্রাণ চেষ্টা করবে আমি জানি। যাকগে, ছাড়ো ওসব। পরিস্থিতি কখনও কখনও মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে, কয়েকটা ঘটনা আকস্মিকভাবে একসঙ্গে ঘটে গেলে অনেকসময় জটিলতার সৃষ্টি করে। তুমি ভেতরে যাও সুন্দরী।

-দাদু, কিছু দরকার হলে আমাকে ডেকো কিন্তু।

-ঠিক আছে, বাবা।

-আমার শরীরটা ভীষণ ম্যাজম্যাজ করছে।

- কোনও অসুখ বাধাবে মনে হচ্ছে। একটা ডাক্তার দেখিয়ে নিতে পার।

-না, না। কোনও দরকার নেই।একটু ঘুমিয়ে নিতে পারলে সব ঠিক হয়ে যাবে।

- আমারও তাই মনে হয়। তবে জ্বর এলে আমাকে বোলো। ডাক্তার ডাকতে হবে।

-ঠিক আছে, আসি। দরকার পড়লে ডেকে নিও।

সুন্দরী ভেতরে চলে যায়। পানু রায় পায়চারি শুরু করেন। মাথায় নিশ্চয়ই কিছু ঘুরছে।
0

গল্প - রঞ্জন রায়

Posted in







শীতকাল এসে গেছে সুপর্ণা। তুমি টের পাওনি?

আমি খবর পেয়েছিলাম অনেকদিন আগে। নাঃ কোন পোস্টম্যান বা টেলিগ্রাফ পিওনের হাতে নয়, একটু একটু করে পাতার রঙ বদলানো দেখে , তারপর শুকনো পাতা ঝরতে দেখে। এটা কোলকাতায় ঠিক বোঝা যায় না। এখানে তিনটেই ঋতু—গ্রীষ্ম, বর্ষা আর শীত। বসন্ত আর হেমন্তের দিন টের পাওয়া যায়না। ওরা কখন আসে কখন যায়? আচ্ছা, তোমার ছেলেমেয়েরা কখন বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় আর কখন ফেরে?

টের পাও? আমি পাই না। একদিন জিজ্ঞেস করায় খেপে উঠে আমার চোদ্দপুরুষ উদ্ধার করেছিলে। বলেছিলে—মনটাকে একটু বড় কর। আদ্যিকালের বদ্যিবুড়ো হয়ে থেকো না। ওরা বড় হচ্ছে, ওরা জেঞ্জি।

--কী জি? গেঞ্জি না কী বললে? কোন ক্লাব বা প্রতিষ্ঠান? কোন ধর্মীয় সংঘ?

--ধ্যেৎ একটু খবর টবর দেখ, পেপার পড়। অন্ততঃ রোজ একবার গুগল করে নাও। খালি কবিতা কবিতা করলে হবে? কবতে করে অকম্মার ঢেঁকির দল। ওরা সোজা কথা সোজাভাবে বলতে পারে না। ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে এমন করে যেন শব্দ নিয়ে ক্যারাটে খেলছে।

আচ্ছা, শীতকালের খবর নিয়ে কী যেন বলছিলে? পাতার রঙ বদলানো দেখে শীতের আগমন? এমন কথা রবি ঠাকুর বা জীবনানন্দ লেখেননি তো? খালি পাতা ঝরা শিশির পড়া এইসব বলেছেন।

--ওটা বিদেশে গেলে দেখা যায়। ওদেশের ‘ফল সীজন’ আমাদের শরৎকাল। তখন সবুজ পাতাগুলো প্রথমে হলুদ হয়, তারপরে লাল এবং শেষে কালো। তারপর ঝরে পড়ে। তখন বিশাল বিশাল খাড়া খাড়া গাছগুলো—বার্চ, ওক, মেপলের দল—কংকালের মত, বা বধ্যভুমির মত বরফে ঢাকা প্রান্তরে শুকনো বিষণ্ণ ন্যাড়া ডালগুলো নিয়ে মনখারাপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। আমি ভাবি রোমে স্পার্টাকাসের বিদ্রোহ দমনের পর সারি সারি ক্রুশে বিদ্ধ গ্ল্যাডিয়েটর।

সুপর্ণা অবাক চোখে আমাকে দেখে।

হ্যাঁ, আমার বউয়ের নাম সুপর্ণা। কেন? আমার বউয়ের নাম সুপর্ণা হতে পারে না? কেন পারে না?

দেখুন আমার এক পিসেমশাইয়ের নাম ছিল সুন্দরীমোহন, আর পিসিমার নাম বঙ্গলক্ষ্মী; স্বদেশী যুগে তাঁর জন্ম হওয়ায় দাদু ওইরকম নাম রেখেছিলেন।

তাহলে বাংলা কবিতায় জীবনানন্দ-শক্তি-সুনীলের যুগের পর ভাস্কর চক্রবর্তীর যুগ শুরু হলে সবার প্রেমিকার নাম সুপর্ণা হতে বাধা কিসের! অ, বউয়ের নাম সুপর্ণা বলেছি! আমি যে বউকে ভালবাসি। কতটা?

আমার রোগাটে চুপসে যাওয়া পাঁজরগোণা বুকে যতটা ভালবাসা ধরে তার সবটা দিয়ে।

কাজেই সব প্রেমিকার নাম সুপর্ণা হতে কোন বাধা নেই। বউয়ের নাম? বউ যদি প্রেমিকা হয় তবে। সবার বউ হয় না। বেশিরভাগ অ্যাডজাস্টমেন্ট। আরেকটা কথা আজকাল বাজারে খুব চালু। কমফোর্ট জোন, কেউ তার অভ্যস্ত কমফোর্ট জোনের বাইরে যেতে চায় না।

কিন্তু আমি ভাবি এটা কোন নতুন কথা নয়। বঙ্কিমদা, থুড়ি বাবু বঙ্কিমচন্দ্র একশ’ বছর আগে রজনী উপন্যাসে এসব দেখিয়েছিলেন। “বিবাহিত লবঙ্গলতার স্বামী বুড়ো, সে তার প্রথম জীবনের প্রণয়ী অমরনাথের পিঠে গরম লোহা দিয়ে ‘চোর’ লিখলেও তার অমরনাথের প্রতি আসক্তি গোপন থাকে নি। বাঁশির ডাক সে শুনেছে কিন্তু সামাজিক বেড়ার আগল খুলে বাইরে আসতে ভয় পেয়েছে”।

অর্থাৎ কমফোর্ট জোনের বাইরে যাবে না। কেন যাবে? উচ্চবিত্ত পরিবার, খাওয়া পরার কষ্ট নেই। স্বামী, হোক গে বুড়ো, লবঙ্গকে চোখে হারায়। একেবারে ‘সুখী গৃহকোণ, শোভে গ্রামোফোন’ কেস।


হায়ার সেকেন্ডারির টেস্ট পরীক্ষায় বাংলা সেকেন্ড পেপারে ওইসব লেখার পর স্কুলের বুড়ো হেডমাস্টার আমার লোক্যাল গার্জেন কাকাকে ডেকে পাঠিয়ে ছিলেন। লবঙ্গলতা না যাক, আমি স্কুলের খাতায় কমফোর্ট জোনের বাইরে গেছলাম। ফল ভাল হয় নি। ওর জন্যেও ভাল হত না, সেটা বঙ্কিম বুঝেছিলেন। তখন মেয়েরা কমফোর্ট জোনের বাইরে গেলে হয় রোহিণী, নয় হীরা মালিনী হত।

এখন দুটো শতাব্দী পেরিয়ে গেছে।

তাই সুপর্ণা ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে—তুমি আবার কবে বিদেশ গেছলে? তাও ইউরোপে?

--না, মানে ছবি দেখেছি। ভিডিও দেখেছি। তাতে ফল সীজনের পাতার রঙ বদলানো—দারুণ একটা ব্যাপার। তারপরে শীত আসে, হিমশীতল শীত, বরফে আদিগন্ত ঢাকা শীত।

--তাই বল, তোমার মত ফোতো কবি আবার বিদেশ যাবে? হুঁঃ!


ব্যাপারটা হচ্ছে সুপর্ণা একটা স্কুলের ডাকসাইটে প্রিন্সিপাল ছিল, এবছর রিটায়ার করেছে। কিন্তু স্কুল ওকে সম্মান দিয়ে গভর্নিং বডির মেম্বার করেছে। সেখানে আমি মহা লুজার। ব্যাংকে চাকরি পেয়েছিলাম। তখন আমার বিয়ে হয়। কিন্তু দু’বছরের প্রবেশন শেষ হবার আগে আমাকে বাড়ি পাঠিয়ে দিল। আমার ‘ডিউ ডিলিজেন্সে’ ঘাটতির ফাঁক দিয়ে কিছু নেপো এসে দই খেয়ে যায়। এনকোয়ারি হয়। আমার গাফিলতি প্রমাণিত। হাতে হ্যারিকেন।

তারপরে কিছুদিন একটা স্কুলে কম বেতনে কাজ করেছি। গার্জেনরা কমপ্লেন করলেন। আমি পরীক্ষার জন্যে ছাত্রছাত্রীদের তৈরি করার বদলে রোজ দশ মিনিট কবিতা শোনাই। কোর্স কমপ্লিট করার ব্যাপারে নজর নেই।

এই সময়েই আমার পুরনো অসুখ ফের চাড়া দেয়।

আমি স্বপ্ন দেখি, রোজই দেখি। ঘুমুতে যাবার আগে আমার শরীরে রোমাঞ্চ জাগে এই কল্পনায় যে আজ কীরকম দেখব—ভয়ের, রোম্যান্টিক নাকি ঝাড়পিট? যেন স্বপ্ন আমার বিনে পয়সার নেটফ্লিক্স—দেদার সিনেমা।

কিন্তু ছোটবেলা থেকেই বিছানা ভেজানোর অভ্যাস হল। শোধরানোর অনেক চেষ্টা হয়। অপমানজনক তেতো কথা, ধোলাই, চাদর নিংড়ে জল মিশিয়ে খাওয়ানো, শীতের রাতে নিজের হাতে বাথরুমে গিয়ে চাদর ধুতে বাধ্য করা। কিন্তু ভবি ভোলে না।

বাড়ির লোকজনের ধারণা যে আমি আসলে অলস, কুঁড়ে। বিছানা ছেড়ে মাঝরাতে উঠতে চাই না, নইলে এমন হয়?

বোঝাতে পারি না যে সব দোষ স্বপ্নের, আমার নয়। ঘুমের মধ্যে টের পাই পেচ্ছাবের বেগ আসছে, আসছে। সাবধান! বিছানা ভেজানো নয়। আমি উঠে বাথরুমে গিয়ে কমোডে বসি ঘুমচোখে। প্যান্ট খুলে ফেলেছি। এইবার এইবার—কোন ভয় নেই, তুমি বিছানায় নেই, তুমি বাথরুমে। এত সব সাবধান বাণী নিজেকে শুনিয়ে মাভৈঃ মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ হয়ে শরীর ঢিলে করি।

‘বান এসেছে জোড়া গাঙে ঠেলতে হবে নাও,

তোমরা এখনও ঘুমাও? তোমরা এখনও ঘুমাও’।

এইবার সে আসছে—অতি ভৈরব হরষে! আঃ কী শান্তি। কিন্তু খানিকক্ষণ পরে টের পাই উষ্ণ স্রোত আমার দুই উরূ ভাসিয়ে দিয়ে বইছে। ধড়মড়িয়ে জেগে উঠি। একী। ফের ম্যাসাকার! তাহলে যে বাথরুম গেছলাম সেটা স্বপ্নে!

একটা বয়সের পর আলাদা বিছানা হোল, ভয় এবং দুর্ঘটনা অনেকটা কমে গেল। কিন্তু কোন মানসিক চাপ হলে মাঝে মাঝে, কিঞ্চিৎ, কদাচিৎ।

বিয়ের পর ফুলশয্যা। আমি ভয়ে কাঁটা। সেদিন খেল দেখালো বটে সুপর্ণা। যখন ফুলে সাজানো ঘরে শুতে যাব তখন দুই কাকিমা আর ঠাকুমা একটি ডাব আর একটা কানাউঁচু কাঁসার থালা নিয়ে এসে নাতবৌকে বললেন—আহা, একটা কথা আছে। আগে একটা অনুষ্ঠান করতে হবে যে! আমাদের বাড়ির নিয়ম।

আমাদের দুজনের চোখে জিজ্ঞাসা—কী নিয়ম?

--তুই এসে থালাটার উপর পা রেখে দাঁড়া। নাতবৌ ডাবের মাঙ্গলিক জল দিয়ে তোর পা ধুইয়ে দিয়ে নিজের খোলা চুল দিয়ে মুছিয়ে দেবে। তারপর বিছানায় উঠবি। নাকি তোর তর সইছে না?

হি-হি, হো-হো!

আমি চিন্তায় পড়লাম । আমাদের বাড়ির অন্য কোন বিয়েতে তো এরকম নিয়ম দেখিনি। হয়ত হয়েছিল, আমি ছোট বলে এন্ট্রি পাইনি। সুপর্ণার মুখের দিকে তাকাই, কী করব?

ওর মুখের চেহারা ধীরে ধীরে বদলে যায়। নতুন বৌ মুখ খুললোঃ

--শুনুন। রাত অনেক, আপনারা বয়স্ক মানুষ—এবার শুতে যান। আর এই থালা নারকোল সব উঠিয়ে নিয়ে যান।

ঘরের মধ্যে যেন বাজ পড়লো। সবাই আমাদের দুজনকে একবার করে দেখে কোন কথা না বলে বেরিয়ে গেলেন। ও ছিটকিনি তুলে দিল। আঃ কী শান্তি! আমাকে কিচ্ছু করতে হল না। কোন অপ্রিয় সীন ক্রিয়েট হল না। কঠিন থ্রি ভ্যারিয়েবলের ইকোয়েশনের সহজ সমাধান। আমার বুক কৃতজ্ঞতায় ভরে গেল। আমি ওর বাড়ির নাম সুচন্দ্রা বদলে সুপর্ণা করে দিলাম।

কিন্তু ও আমাকে বলল—তাড়াহুড়ো করবেন না। পাশ ফিরে শুয়ে পড়ুন। সব হবে, ধীরে ধীরে।

হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। যা ভয় ধরেছিল।

জানলায় আড়ি পাতা নানা বয়েসি মেয়েদের দল হতাশ হল।


বন্ধুবান্ধবেরা জোর দিয়ে বলেছিল—প্রথম রাত্তিরেই বেড়াল মারতে হয়।

কিন্তু আমি যে কাউকেই মারতে পারিনা। মারামারিতে নিতান্ত অনীহা, সেই ছোটবেলা থেকেই।

তারপর এল সেই রাত, যেদিন আমার ফাঁসি হল। বালজাকের লেখায় পড়েছিলাম---ফাঁসির দড়ি গলায় চেপে বসলে পুরুষের দৃঢ় হয়, উত্থান হয় এবং পতনও হয়। আমার হোল অধঃপতন। সেই স্বপ্নে যা হত, স্বপ্নসুন্দরীর আলিঙ্গনে চরম মুহুর্তে বজ্রপাত।

ওর চোখে ঝলসে উঠল একরাশ ঘেন্না, বিড়বিড় করে বলল-মানুষ না জানোয়ার! তারপর বাথরুমে গিয়ে স্নান করে এসে সোফায় শুয়ে বাকি রাত কাটালো। আমার লজ্জায় সারারাত ঘুম আসেনি। ভোরের দিকে চোখ লেগে এসেছিল। ওর হাতের ঠেলায় জেগে উঠলাম।

--যাও, ব্রাশ করে এস। চা হয়ে গেছে।

আমি ওর মুখের দিকে তাকাতে পারি নি।

চা খেতে খেতে বলল—শোন, এটা একটা অসুখ; শরীরের না মনের। তোমার ব্যক্তিত্বের। অসুখ হলে চিকিৎসা করাতে হয়। আমরা দু’জনে আজ সন্ধ্যেবেলা একজন সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে যাব। বাড়িতে সব খুলে বলার দরকার নেই। এখনও সবাই ভাবে শুধু পাগল বা মনোরোগীরাই ডাক্তার দেখায়।

আমি সেরে উঠলাম। আমি তখনই ওর প্রেমে পড়লাম, যার নেশা আজও কাটেনি। আমার জীবনে বসন্ত এল, ফুল ফুটল; বলা ভাল আমাদের মিলিত জীবনে।

এক ছেলে এক মেয়ে। তারপর যখন স্কুলের চাকরিটাও গেল বুঝলাম ফল সীজন আসছে। গাছের পাতা সবুজ থেকে হলুদ হচ্ছে। ও ভীষণ ব্যস্ত, নিজের লাইনে সফল। শহরে খুব নামডাক, স্থানীয় কাগজে ওর সাক্ষাৎকার বেরোয়, শহরের মেয়র ওর সংগে বোন পাতিয়েছেন। এফ এম ব্যান্ডের রেডিও ওকে টক শো’তে ডাকে।

আমি লুজার। নাম কা ওয়াস্তে কিছু টিউশনি করি, ওইটুকুই। সত্যি বলছি—আমার কোন ঈর্ষা হয় না। নো জেলাসি। আমাকে বাদ দিয়েই ওকে নানা জায়গায় যেতে হয়। আমি কেন ল্যাংবোট হব? আমি সফল হতে চাই না, খালি কবিতা লিখতে চাই।

পঞ্চাশ পেরিয়ে গেল সুপর্ণা। কিছু গাইনি সমস্যা হচ্ছে। আমরা নামজাদা ডাক্তারের কাছে গেলাম। উনি নাকি হার্ভার্ড ফেরত। বললেন একটা এম আর আই করিয়ে আনুন। আমি লিখে দিচ্ছি।

ছবি দেখে ডাক্তার উচ্ছসিত। --চিন্তা করবেন না, আপনি খুব ভালো আছেন। কোন মেজর ইস্যু নেই। আরও একটা কথা বলি, কিচ্ছু মনে করবেন না, প্লীজ। আপনার বয়স ফিফটি ফাইভ, কিন্তু ভাজিনার ছবি যেন পঁয়ত্রিশ বছরের। নিয়মিত যোগা করেন বুঝি?

সুপর্ণা স্মিত হেসে সায় দেয়।

ভাবি, আমাকে একবার ধন্যবাদ দিলে পারতো। আমি যদি অবুঝ স্বামী হতাম তাহলে ছবি অন্যরকম হত।


কিন্তু একদিন ঘটনা ঘটল।

কী একটা ব্যাপারে রেলওয়ে কালচারাল ইন্সটিউটে যাচ্ছিলাম। ও হ্যাঁ, আমার অ্যামেচার নাটকের দলের জন্য হল ভাড়ার দরখাস্ত জমা করতে। কিন্তু আমার মোবাইলটা ভুলে ওর হ্যান্ডব্যাগে চলে গেছল। সেটা নিয়ে তবে যাব। স্কুলে গিয়ে জানতে পারলাম—উনি এখন কালেক্টরের অফিসে আগামী বোর্ড পরীক্ষার মিটিং অ্যাটেন্ড করতে গেছেন।কালেক্টরের অফিসে আমাকে ঢুকতে দিল না। চাপরাশি বাইরে অপেক্ষা করতে বলল। প্রায় একঘন্টা। আমি মোবাইল নিয়ে ফের ইন্সটিটুটে দৌড় লাগালাম। ডি আর এম বেরিয়ে গেছেন।

সেদিন নাটকের দলেও কথা শুনতে হল।

--কেন মোবাইল সামনে রাখি নি? কেন ওদের কাউকে পাঠাইনি?

সবাই উত্তরটা জানে—লুজার!

বাড়ি ফিরে সুপর্ণাকে কিচ্ছু বলি নি। ঝগড়া করি নি। কিন্তু মাঝরাতে একযুগ পরে সেই জলসিঞ্চিত -ক্ষিতিসৌরভ- রভসে!

পরের দিন থেকে সুপর্ণা আলাদা ঘরে শুতে লাগল। হ্যাঁ, গাছের পাতা হলুদ লাল কালো হয়ে এখন ঝরে পড়ার দিন শুরু। বসন্তের দিনে আমরা খুব ভালো বন্ধু ছিলাম। নিজেদের ‘তুই’ করে বলতাম। সারাদিন কলকল করে গল্প করতাম, জোকস্‌ শোনাত। আমরা পছন্দের গান শুনতাম। ও একসময় কয়েকবছর কত্থক শিখেছিল। খালি ঘরে দরজা বন্ধ করে নেচে দেখাত—মোহে পানঘট পে নন্দলাল ছেড় গয়ো রে!

এখন শীত এসে গেছে। অনেকদিন ধরেই আমরা তুই ছেড়ে তুমি হয়ে গেছি। হাসির কথা, ঠাট্টা এসব বহুদিন বন্ধ হয়ে গেছে। একসঙ্গে নাটক দেখা, ক্লাসিক্যাল গান শোনা হয় না।

টের পাচ্ছিলাম শীত আসছে, পাতা ঝরছে। কিন্তু মন চাইছিল না বিশ্বাস করতে।

গত রোববার জলখাবারের পর বহুদিনের অভ্যাসে ওকে সুপর্ণা বলে ডেকেছি, ও বই থেকে চোখ তুলে তাকালো। তারপর কেটে কেটে বলল—আমাকে আমার বাবা মায়ের দেয়া নাম সুচন্দ্রা বলে ডাকবে।

হ্যাঁ, শীত এসে গেছে পাকাপাকি ভাবে।

নিজের ঘরে ঠান্ডা বিছানায় শুয়ে একা একা ভাবি—সুপর্ণা। শোন, আমার জন্যে তুমি সুপর্ণাই থাকবে। হ্যাঁ, আমি একজন ফালতু ফোতো কবি। যার কবিতা মফঃস্বলের কোন অজানা ম্যাগ মাগনায় ছাপে।

হ্যাঁ, আমি লুজার। কিন্তু আমার যে শীত করে সুপর্ণা, বড্ড শীত। ব্যর্থ কবির একটু উষ্ণতা চাওয়া কি অপরাধ? তুমিই বল সুপর্ণা?


*কবি ভাস্কর চক্রবর্তীর “শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা” পংক্তিটিকে সামান্য পরিবর্তিত করা হয়েছে।
0

গল্প - পাগলা গণেশ

Posted in




















সমরেশ চোখ খুলে দেখল, সিলিং ফ্যানটা ঘুরছে। ঘুরছে, ঘুরছে ক্রমাগত ঘুরেই চলেছে। সে বেশ

অনেকক্ষণ দেখল ফ্যানের ঘোরাটা। একই ছন্দে কতক্ষণ ধরে ঘুরছে, কোনো ক্লান্তি নেই,

নিঃসঙ্গতার বোধ নেই, ভালোবাসা বা মনোযোগ পাওয়ার ইচ্ছা নেই, কি সুন্দর! নেশা ধরে গেল।

কিছুক্ষণ এভাবে কাটার পর ও একটা নতুন খেলা আবিষ্কার করল। ফ্যানের ঘোরা গুনতে চেষ্টা করল,

একবার, দুবার, তিনবার.... হারিয়ে ফেলল। আবার চেষ্টা করল, একবার, দুবার, তিনবার, চারবার,

পাঁচবার..... আবার হারিয়ে ফেলল। এরকম করে বারবার হারিয়ে ফেলে ওকে একটা জেদ ধরল। আধঘন্টা

এতে কেটে গেল।

তারপর ওর মনে হল, ও যেন নিজেকেই দেখছে উপর থেকে। যেমন ও কাজে যেত, বাড়ি ফিরত, সন্ধ্যায়

চা খেয়ে আড্ডা দিতে যেত, বাড়ি ফিরে ছেলের পড়াশোনা দেখত, রাতের খাবার খেয়ে বউয়ের সাথে

সহবাস করে ঘুমিয়ে পড়ত। আবার সকালে উঠে কাজে যেত। কিন্তু ও ভাবত ও খুব খুশি আছে। উপর

থেকে নিজেকে দেখে ওর খুব করুণা হল।

ছোটবেলায় ভাবত, আমাজনের জঙ্গলে যাবে, সেই অ্যাডভেঞ্চার ছোট হতে হতে এখন মাসে একবার,

আরো ছোট হয়ে বছরে একবার বেলপাহাড়িতে যেতে ইচ্ছে করে খুব। কিন্তু তা বোধহয় আরো ছোট হয়ে

জীবনে একবার হতে চলল। ওর করুণা হল আবার নিজের উপর, একটা চাপা গ্লানি, নিজের সাথে

বেইমানি করার জন্য।

দেবযানীর কথা মনে পড়ল। ওর প্রথম প্রেম, প্রথম ওইরকম ভালো লাগা, ভালোবাসা। ঠোঁটের কোণে

একটা সূক্ষ্ম হাসি ফুটে উঠল। ওইরকম আর কাউকে ভালবাসতে পারল কই! ওইরকম মন খুলে বিশ্বাস

করা, ভরসা করা, আর কাউকে করতে পেরেছে কি!

সেও ওর জন্যই।

ওকে নিয়ে কত স্বপ্নই না দেখেছিল সেই সময়। ভাবতে অবাক লাগে কি বোকা ছিল, ঘর কোথায় হবে,

কত বড় হবে, কতগুলো কামরা হবে, কোন ঘরে কে থাকবে, ওদের বাচ্চা হলে কোন বাচ্চা কোন ঘরে

থাকবে, তাদের নাম কী হবে-ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু যারা এসব বলত, তাদের দুজনই তুচ্ছ কারণে

আলাদা হয়ে গেল। এখন ও ভাবে, নিজেদের অভিমান একটু যদি সরিয়ে রাখতে পারত, হয়তো দেবযানী

ওর পাশেই বসে থাকত।

সে আজ থেকে কম করেও পনের বছর আগেকার কথা। সেকেন্ড ইয়ারের প্রথম দিন। ওদের গ্রামের

বাড়ি থেকে কলেজ আসতে গেলে দুটো বাস পাল্টে আসতে হত। মাঝে যেখানে নামতে হত, সেখানটা একটা

হব হব শহর, নাম কেশবপুর। সেখানেই দেবযানীর সাথে প্রথম দেখা।

দেবযানী আসত উল্টো দিক থেকে। একটা মফস্বল শহর থেকে। মাঝখানে ওই হব হব শহরে বাস পাল্টে

ওরা একই বসে যেত। দেবযানীরা দল বেঁধে আসত, ওর তিনজন বান্ধবী, আর দুজন বন্ধু।




এদিকে সমরেশদের পুরো ছেলেদের দল। সাতজন ছেলে, সবাই সেকেন্ড ইয়ার। তবে সবাই আলাদা

আলাদা ডিপার্টমেন্টের। পড়াশোনায় যে ওরা খুব খারাপ তা নয়, তবে উচ্চ মাধ্যমিকে ফাঁকি মেরে ওই

সেভেন্টি পার্সেন্ট মতো নাম্বার পেয়েছে। খুব খারাপ রেজাল্ট নয়, কিন্তু ওদের বাবা-মা মাঠে খেটে

খায়, তাও লোকের জমিতে। পড়াশোনা বলতে নিজের নামটুকু সই করতে পারেন। জামা প্যান্ট পরা লোক

এসে ধমকে কথা বললে নিজেরাই থতমত খেয়ে যান, ছেলেদের আর কী পথ দেখাবেন? তাই ওরা কলেজে

জেনারেল ডিগ্রিতে ভর্তি হয়ে গেল।

সেরকমই একদিন, ওরা কেশবপুরে নেমে বাসের অপেক্ষা করছে, দেবযানীদের দল নামল। সমরেশ সেই

সিগারেটটা ধরিয়েছে;নতুন নতুন নেশা করছে, একটু সংকোচ আছে। তাই হাতের তালুর আড়ালে লুকিয়ে

খাচ্ছে একটু নিরিবিলিতে। এমন সময় একটা চেঁচামেচি শুনে সিগারেটটা হাতের তালুর মধ্যে লুকিয়ে ছুটে

এল।

এসে দেখে দুচারটে মস্তানমতো ছেলে একটা মেয়েকে খুব যাতা বলছে। তার সাথে আরো দুচারজন

ছেলেমেয়ে আছে, কিন্তু তারা চুপচাপ, কিচ্ছু বলছে না। এদিকে মেয়েটা কিছু না বলে চুপচাপ কথাগুলো

শুনে যাচ্ছে, আর নিঃশব্দে চোখ দিয়ে জলের ধারা বয়ে যাচ্ছে। সমরেশের একটু মায়া হল। যদিও ও জানে

এসব ছেলেরা ভয়ঙ্কর, এলাকার রাজনৈতিক নেতাদের পোষা, তবুও গিয়ে বলল, দাদা, কী হয়েছে?

এবারে ছেলেগুলোর দৃষ্টি গেল সমরেশের দিকে। তারা একটু ভ্রূ কুঁচকে রইল কিছুক্ষণ, তারপর তাদের

মধ্যে নেতাগোছের যে জন, সে বলে উঠল, তোর কী দরকার ভাই?

সমরেশ একটু ভড়কে গেল, ভাবল চলে যাবে কি?

তারপর একটু সাহস নিয়েই বলল, ও আমার বন্ধু। 

মেয়েটা হঠাৎ কান্না থামিয়ে অবাক চোখে ওর টিকে তাকাল।

ছেলেগুলোর এবার ওর দিকে ঘুরল। তারপর সেই নেতা আবার বলল, তাই? তা আপনার বন্ধু যে লোককে

ধাক্কা মারে বেড়াচ্ছে, আপনি জানেন?

মেয়েটা কিছু বলতে যাচ্ছিল, ও হাত তুলে তাকে থামতে বলল। তারপর একটু মিনতির সুরে বলল, দাদা,

ও একটু ছেলেমানুষ। কিছু মনে করবেন না। 

ছেলেগুলোর একটু হকচকিয়ে গেল যেন। এমনটা তারাও আশা করেনি। ভেবেছিল হয়তো একটু গরম গরম

কথা বিনিময় হবে, দুচার ঘা চালাচালি হবে। কিন্তু কিছুই না, এ তো দয়া ভিক্ষা করছে!

নেতা বলল, আচ্ছা ঠিক আছে, ঠিক আছে। 

বলে ওরা চলে গেল।

সমরেশ আর দাঁড়াল না। গিয়ে সিগারেটটায় টান মারতে হবে। একদিনের জন্য অনেক বেশি উত্তেজনা

হয়ে গেছে।

এরপর বাসে উঠে যাওয়ার সময় যতবার দেবযানীর দিকে চোখ পড়ল, প্রতিবার দেখল সে ওর দিকে

তাকিয়ে আছে। চোখাচোখি হতেই সে মুখ নামিয়ে নিল। সমরেশের বুকে কি একটা হালকা চিনচিনে

অনুভূতি হল? মনটা কি একটু খুশি খুশি লাগছে?

এরপর দুদিন কিছু হল না। তিনদিনের দিন দেবযানী ওকে ধরল। বোধহয় চোখে চোখে রাখছিল। ক্যান্টিন

থেকে খেয়ে বেরিয়ে করিডোর আবছা অন্ধকারে ঢুকতেই দেখল, দেবযানী সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ও




একমনে আসছিল, মুখ তুলতেই ওকে দেখে একটু চমকে উঠল। দেবযানীই প্রথমে কথা বলল, আপনাকে

আমার একটা ধন্যবাদ দেওয়া বাকি ছিল বোধহয়?

- কেন? কিসের ধন্যবাদ?

- সেদিন বাঁচানোর জন্য। 

- না, না, সে কী কথা?

- সে ছাড়ুন। শুকনো মুখে ধন্যবাদ দিচ্ছি বলে কিছু মনে করবেন না। কালকে যদি আপনাকে বিরিয়ানি

খাওয়াই, আশা করি কিছু মনে করবেন না?

সমরেশ একটু ইতস্তত করল, তারপর কোনমতে বলল, আচ্ছা। 

দেবযানী চলে গেল। সে সেখানেই দাঁড়িয়ে দেবযানীর চলে যাওয়ার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল।

মাসখানেক পর অমল ওকে ধরল, শালা, লুকিয়ে লুকিয়ে প্রেম চলছে? কী একখানা মাল তুলেছ মামু?

খাওয়াবে কবে বলো?

সমরেশ খুব শান্ত স্বরে বলল, ভাই, মাল বলিস না, খারাপ লাগে। 

অমল একটু চুপসে গেল। একটু পর সামলে নিয়ে তেড়ে কিছু বলতে গেল, কিন্তু সমরেশ বলল, ভাই, তুই

যেভাবেই নিজেকে সমর্থন করার চেষ্টা করিস না কেন, তুই ভুল বলেছিস। মেয়েরা মাল নয়, সম্মান

করতে শিখ।

অমলের মন খারাপ দেখে সমরেশের একটু মায়া হল। আচ্ছা তুই কী খাবি বল। 

অমল মুখ গোঁজ করে বলল, খাওয়াতে হবে না তোকে। 

সমরেশ তার মুখের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে বলল, ভাই রাগ করিস না। আমি তোকে আঘাত দেওয়ার জন্য

বলিনি। কিন্তু তুই বল, কথাটা ভুল কিনা?

অমল চুপ করে রইল। সমরেশ বলল, আমি ক্যান্টিনে যাচ্ছি, তুই আয়।  বলে চলে গেল।

কিছুক্ষণ পর অমল এল। এসেই সমরেশের পাশে বসে গলার পাশ দিয়ে কাঁধে হাত জড়িয়ে বলল,

ডিমটোস্ট বল, শালা।

একটা আওয়াজে ও বাস্তবে ফিরে এল। আওয়াজটার উৎস অনুসন্ধান করে ও ছাদের এক কোণে

তাকাল, একটা টিকটিকি। টিকটিকিটার গায়ের রং স্বাভাবিকের থেকে একটু বেশি গাঢ়। ওর মনে পড়ল,

ও কোথায় যেন পড়েছে, বাতাসে দূষণের মাত্রা বাড়লে টিকটিকিদের গায়ের রং গাঢ় হয়। ওর নিজের

জীবনের সাথে মিল পেল টিকটিকিটার। ওর অবস্থা হয়তো আরো খারাপ। তাই ও সহানুভূতি জানাতে

এসেছে। ওর হাসি পেল। তা শুধুমাত্র ওর চোখেই সীমাবদ্ধ রইল।

টিকটিকিটা একটা পোকা দেখতে পেয়েছে কাছেই। ধীরে ধীরে তার দিকে এগোচ্ছে, প্রতি পদে সে কী

মারাত্মক সাবধানতা! আচ্ছা, পতঙ্গদের কান কি খুব সংবেদনশীল? ওদের শ্রবণসীমা কতটা? মানে

মানুষের যেমন কুড়ি থেকে কুড়ি হাজার হার্টজ পর্যন্ত হয়, ওদের কত থেকে কত? ওরা কি টিকটিকির

পায়ের আওয়াজ শুনতে পায়?

টিকটিকিদের আচার - আচরণ নিয়ে কিন্তু খুব সহজেই গবেষণা করা যায়, খুব সহজ। কোনো বাড়তি

যন্ত্রপাতি বা ডিগ্রির দরকার নেই। দরকার শুধু অসীম ধৈর্য আর সময়। দ্বিতীয়টা ওর আছে, আর

প্রথমটা ওর হতেই হবে, কোনো উপায় নেই। শুধু ও যদি কথাটুকু বলতে পারত;কাউকে বললে লিখে দিত

নিশ্চয়!




টিকটিকিটা পোকাটার একেবারে কাছে চলে এসেছে। পোকাটা নাহয় শুনতে পাচ্ছে না, দেখতেও কি পাচ্ছে

না?উড়ে যা না বোকা, এই খেয়ে নিল!সমরেশ পারলে বিছানা থেকে উঠে গিয়ে পোকাটাকে তাড়িয়ে দেয়।

কিন্তু নাহ, গৃহগোধিকাটি পোকাটিকে ধরার জন্য জিভটা বাড়িয়েছে, ঠিক তখনই পোকাটা উড়ে চলে

গেল। সমরেশ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল একটা। যাক!

পোকাটা কিন্তু বেশিদূর যায় নি, হাতখানেক দূরেই বসেছে। টিকটিকিটা হতোদ্যম না হয়ে আবার অসীম

ধৈর্যের সাথে এগোতে লাগল। আবার একটা একটা করে পা ফেলে এগিয়ে যেতে লাগল। ধীরে ধীরে সে

পোকাটার প্রায় কাছে পৌঁছে গেছে, পোকাটা আবার উড়ে পালাল।

সমরেশের আনন্দ আর দুঃখ দুটোই একসাথে হল। ওর মনে হল, টিকটিকিটা বুঝতে পারছে না তো, যে ও

চাইছে পোকাটা উড়ে চলে যাক?এখন যদি ওটা রাগে ওর দিকে তেড়ে আসে?অমূলক ভয়, কিন্তু সমরেশ

ভয় পেল খুব। সত্যি যদি তেড়ে এসে ওর কিছুই করার নেই, হেঁটে দুপাও যেতে পারবে না ও।

নিজেকে একটু সামলে নিতে ওর খুব হাসি পেল। কী সব পাগলের মতো ভাবছে ও?

টিকটিকির সাথে একজনের মিল আছে। একসময় ওর খুব প্রিয় ছিল, কিন্তু অনেকদিন তার সাথে দেখা

হয়নি।

জুবায়েরের সাথে ওর পরিচয় ট্রেনের কামরায়। ও তখন মোটে একমাস অফিসে যোগ দিয়েছে। অনেক

খোঁজার পর, বন্ধুদের বলে একটা কাজ পেয়েছে। আহামরি কিছু নয়, কিন্তু অভাবের সংসারে ওটাই

স্বর্গ হাতে পাওয়ার চেয়ে কম নয়।

প্রতিদিন সকালে লোকাল ট্রেনে চেপে শহরে যেত সমরেশ। ট্রেনের কামরায় চেনা মুখদের সংখ্যা

বাড়ছিল ধীরে ধীরে। তার মধ্যেই একদিন, হালকা নীল শার্ট পরা, ব্যাগ কাঁধে ঝোলানো, একমাথা ঘন

চুলের লোকটা ওর ঠিক সামনে এসে দাঁড়াল। চোখে ফ্রেমহীন চশমা, মুখে স্থির একরকম নরম অথচ

কৌতূহলী হাসি।

জুবায়ের। খুব শান্ত স্বভাবের। সেই প্রথমে কথা বলেছিল। বলেছিল, “আপনি কি কালীঘাটে নামেন?”

সমরেশ হ্যাঁ বলেছিল। তারপর দু-একদিন কথাবার্তা, তারপর নাম-পরিচয়, একসময় বন্ধুত্ব।

জুবায়েরের সাথে কথা বলতে ভালো লাগত। ওর মধ্যে একটা ধৈর্য ছিল, প্রাচীন ঋষিদের মতো ধৈর্য,

যা সমরেশের মধ্যে ছিল না। সমরেশ যে খুব তাড়াহুড়ো করত তা নয়, কিন্তু খুব হঠকারী ছিল। বেশি না

ভেবে, না তলিয়ে দেখেই ঝাঁপিয়ে পড়ত। জুবায়ের যেন ওর বিপরীত সত্তা।

তবে ওদের একটা বড়ো মিল ছিল;দুজনেই বই পড়ত। দুপুরে অফিসের ক্যান্টিনে বসে বই নিয়ে আলাপ

হত। জীবনানন্দ, সার্ত্রে, কামু, হেমিংওয়ে, রবীন্দ্রনাথ, সুনীল — কিছুই বাদ যেত না।

তবে সমরেশ বুঝত, জুবায়েরের কিছু আছে যা সে বোঝে না।

একবার ও জুবায়েরকে জিজ্ঞেস করেছিল, “তুই এত চুপচাপ থাকিস কেন রে?”




জুবায়ের হেসে বলেছিল, “তুই তোর চোখের মণিটাকে কখনো জিজ্ঞেস করিস, সে এত ধৈর্য ধরে বসে

থাকে কেন?”

– “মানে?”

– “মানে, কিছু না। ”

তখন সমরেশ হেসে ফেলেছিল। এখন বিছানায় শুয়ে সেই কথাগুলো আবার মনে পড়ে যাচ্ছে। কী অদ্ভুত

মিল! টিকটিকিটাও তো কিছু বলে না, কেবল দেখে, এগোয়, ধরতে পারে না, তবু ফিরে আসে। আর

জুবায়ের? বহুদিন হলো কথা নেই, দেখা নেই। কোথায় যে আছে, কে জানে!

মাঝে মাঝে মনে হয়, জুবায়ের নিজেই একটা প্রতীক — যে জীবনের ভেতরে নেমে গিয়ে আবার নিঃশব্দে

হারিয়ে যায়, একটা দীর্ঘশ্বাসের মতো, একটা পোকা তাড়া করতে থাকা টিকটিকির মতো।

এমন সময় সুপ্রীতি এসে ওর পাশে বসল। ওর মাথায় হাত বোলাতে ও বাস্তবে ফিরে এল। সুপ্রীতি হেসে

জিজ্ঞেস করল, এখন কেমন লাগছে?

এই মেয়েটি এখনও যে কেন তার সাথে আছে সে বুঝতে পারে না। ও কী দিয়েছে তাকে? কিছু কি দিতে

পারবে কোনোদিন?

- ভালোই। বাবু ঘুমিয়েছে?

- হ্যাঁ। তোমার কথা জিজ্ঞেস করছিল।

- কী জিজ্ঞেস করছিল?

- কিছু না।

- আরে বলো না।

- আরে এমনি বলছিল, ওসব কিছু না।

- সুপ্রীতি তুমি জানো, আমি চাই না আমার উপর কেউ দয়া করুক।

সুপ্রীতি একটুক্ষণ চুপ থেকে ধরা গলায় বলল, "ও বলছিল, বাবা কেন আর ওঠে না, আমাকে বেড়াতে

নিয়ে যায় না?

সমরেশ আবার অন্যমনস্ক হয়ে যায়।

সুপ্রীতি বলল, এই জন্যই তো বলি না।

- তুমি জানো না, তোমাকে কোনোদিন বলা হয়নি। আমি কলেজে পড়তে একজনকে ভালোবাস তাম। বলে

চুপ থাকে।

সুপ্রীতি বলে, আমি জানি।

- কে বলল?

- একদিন তোমার ডায়েরি পড়েছিলাম আমি। 

- ও আচ্ছা, বলে সে আবার চুপ করে ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকে।

- তার নাম দেবযানী না?

- হ্যাঁ

খানিকক্ষণ পরে খুব ধীরগতিতে সুপ্রীতির দিকে অসহায়ের মতো তাকিয়ে বলল, আমি তোমাকে খুব

ভালোবাসি, খুব। কিন্তু তাকে এখনও মনে পড়ে। আজকেও মনে করছিলাম। আমি কি তোমাকে ঠকাচ্ছি?

- জানি না। তবে তুমি আমাকে ভালোবাসো, এটুকুই যথেষ্ট আমার জন্য। তুমি খাবে তো? আমি খাবার

নিয়ে আসছি, বলে সুপ্রীতি উঠে গেল।




কে কোথায় আছে কে জানে? যদি ওদের ফোন করা যায়? ওরা কথা বলবে? কেন বলবে? না থাক, ওরা

হয়তো ব্যস্ত।

যেদিন দুর্ঘটনাটা হয়, সেদিন আকাশটা খুব সুন্দর ছিল। ওর এখনও মনে আছে, ও বেশ কয়েকটা ছবি

তুলেছিল মুগ্ধ হয়ে। ভেবেছিল ফেসবুকে পোস্ট করবে।

ওর বাড়ি থেকে অফিস আধঘণ্টার রাস্তা। তাছাড়া ওর কলেজ ওই রাস্তা দিয়েই যেতে হতো। ওই

রাস্তায় সে এর আগে কম করেও কয়েক হাজারবার গেছে। কিন্তু সেদিন যে কী হল!

ও লরিটার পেছনে ছিল। ভাবল এগিয়ে যাই। যেই লরির পেছন থেকে বেরিয়েছে, ঠিক সেই সময় সামনে

একটা বাস। ও চেষ্টা করেছিল খুব, কিন্তু বাসটার গতি এত বেশি ছিল, আর তাছাড়া ও নিজেও বেশ

জোরেই চালাচ্ছিল, তাই শেষরক্ষা হয়নি। ওর শেষ যেটা মনে আছে তা হল, ও সোজা গিয়ে বাসের সামনে

গিয়ে ঝাপটে পড়ল, মাথাটা বাসের বনেটে ঠুকে গেল।

তারপর যখন জ্ঞান ফিরল, ও দেখল সুপ্রীতি ওর মুখের উপর ঝুঁকে আছে। ওকে জ্ঞান ফিরতে দেখেই

জোরে জোরে চেঁচিয়ে ডাকতে লাগল, ডাক্তারবাবু, ও ডাক্তারবাবু, জ্ঞান ফিরেছে, জ্ঞান ফিরেছে।

তাড়াতাড়ি আসুন।

ওরা ওকে কিছুই জানায় নি। তিনদিন পর অবশ্য জানাতেই হয়েছিল। ডাক্তারই জানালেন। আপনার

শরীরের নিচের অংশ কেটে ফেলতে হয়েছে। কিছু ছিল না সেখানে। তবে ভাগ্য ভালো আপনার

অর্গ্যানগুলোর তেমন বড়সড়ো কিছু ক্ষতি হয়নি। আমরা সেগুলো বাঁচিয়ে নিয়েছি। কিন্তু আপনার

স্পাইনাল কর্ডে খুব আঘাত লেগেছে, তাই আর কোনোদিন চলাফেরা করতে পারবেন না। এমনকি

হাতপাও নাড়াতে পারবেন না।

ওর মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছিল। এ কী হয়ে গেল ওর সাথে! ও এতদিন যে এত ব্যয়াম করল, ভেবেছিল

মরার আগের দিন পর্যন্ত সুস্থ থাকবে, ডন দিবে, উঠবস করবে? হা ঈশ্বর, এ কী করলে আমার

সাথে? কী অন্যায় করেছিলাম আমি, কোন পাপের শাস্তি দিলে?

সুপ্রীতি ওকে বুকে জড়িয়ে ধরেছিল, কানে কানে বলেছিল, কেঁদো না, কেঁদো না। আমি আছি তো, বাবু

আছে। আমরা সব সামলে নেব। 

সেও খুব পুরোনো কথা নয়। ওর তো মনে হয় কালকের কথা যেন। নিজেকে ওই দুঃস্বপ্ন থেকে সরিয়ে

আনতে চেষ্টা করে, কিন্তু স্মৃতি এঁটুলির মতো ওর মনে আঁকড়ে বসে থাকে, রক্ত তো নেই সেখানে, ওর

প্রাণবায়ু শুঁষে নিতে থাকে। ওকে প্রতিনিয়ত মনে করায়, তুই বোঝা, তোর বেঁচে থাকার কোনো

প্রয়োজন নেই।

তারপর ছয় মাস কেটে গেছে। ও নিজের মনকে অনেক বুঝিয়ে রাজি করেছে বাঁচার জন্য। আগে ইচ্ছা

করত যদি মরা যেত, আত্মহত্যা করা যেত? কিন্তু ওর তো হাতের আঙুলটুকু নাড়ানোর ক্ষমতাও নেই।

একটু জল খেতে গেলেও সুপ্রীতিকে ডাকতে হয়। তবে ভালো এই যে, ওর গলার স্বরটুকু আছে। ডাক্তার

বলেছিল, তাও যেতে পারত। ও শিউরে উঠেছিল, কী হত তাহলে?

সুপ্রীতি একদিনও একটুও বিরক্ত হয় নি। দেবযানী কি এমন করত, না ছেড়ে যেত? আচ্ছা, দেবযানী না

সুপ্রীতি কে বেশি ভালোবাসে বা বাসত?




দেবযানী ওর প্রথম প্রেম ছিল। কত স্মৃতি আছে ওদের!

দেবযানী ওকে প্রায়ই বলত, আমরা পালিয়ে বিয়ে করব। আমার বাবা যা গোঁড়া, কিছুতেই মানবেন না। 

সমরেশ বলত, আমি ঠিক মানিয়ে নেব। একটা কাজ দরকার শুধু। ঠিক মানিয়ে নেব। 

ওর হাসি পেল। প্রেমে পড়লে মানুষ কত অসম্ভব কল্পনা করে, কি বিরাট মিথ্যা আত্মবিশ্বাস ভর

করে!

একদিন ওরা কলেজ বাঙ্ক করে বেড়াতে গিয়েছিল। একটা মফস্বল শহরে, পার্কে। সেদিন ওরা প্রথম

চুমু খেয়েছিল। ও এখনও পরিষ্কার মনে করতে পারে, ও ভয়ে ভয়ে দেবযানীর ঠোঁটে নিজের ঠোঁটটা

ছোঁয়াল। শরীরে বিদ্যুৎ খেলে গেল একটা, শিহরিত হল। দুজনেই চমকে মুখ সরিয়ে নিল। তারপর লজ্জা

লজ্জা মুখ করে অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে বসে রইল কিছুক্ষণ। তারপর আবার একটু পরে, কথা বলতে

বলতে, যখন দুজনেই ঘনিষ্ঠ হয়ে বসেছে এক অপরের অজান্তে, মুখ ঘোরাতেই দেখল, ওদের ঠোঁটগুলো

একে অপরকে ছুঁতে চাইছে।

এবারে আর অতটা লজ্জা লাগেনি। দুজোড়া ঠোঁট একে অপরকে ছুঁল। আবার শিহরিত হল দুটি শরীর। সারা

পৃথিবী মুছে গেল, চরাচরে শুধু ওরা দুজন। নিজেদের ডুবিয়ে দিল এক অপরের মধ্যে। যখন ওরা সম্বিৎ

ফিরে পেল, দুজনেই সুখের সাগরে ভেসে চলেছে। ওরা চাইছিল একে অপরের দিকে তাকাতে, কিন্তু যেই

চোখে চোখ পড়ছিল, আবার মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছিল লজ্জায়। মুখে একটু মুচকি হাসি বুঝিয়ে দিচ্ছিল, ওদের

থেকে সুখী এখন আর কেউ নেই। মনে হচ্ছিল, যদি সারা পৃথিবীর মালিক হত ওরা, আর এই মুহূর্তে যদি

কেউ এসে তা চাইত, ওরা তাও দান করে দিত এক নিমেষে, বিনা বাক্যব্যয়ে।

নিজের অজান্তেই ও হাসতে লাগল। দেবযানীর সাথে আর কোনোদিন দেখা হবে কি?

প্রথম প্রথম যখন ও হাসপাতাল থেকে ফিরে এসেছিল বাড়িতে, অনেকে আসত দেখতে, ভালো লাগত

ওর। কিন্তু কিছুদিন পরে ওই দয়া দেখানো, উহ, চুক চুক  অসহ্য হয়ে উঠল। ভদ্রতাবশে কিছু বলতে

পারত না, কিন্তু মনে হতো, এরা কবে আসা বন্ধ করবে?

মাস দুয়েক যাওয়ার পর লোকের আসার পরিমাণ কমতে লাগল। দিনে তিরিশ-চল্লিশ জন থেকে জনা

দশেক, তারপর এক-দুজন, এখন তো সপ্তাহে একজনও আসে না। তাতে ও বেঁচেছে।

রোজের রোগীর প্রতি লোকে আর কত সহানুভূতি দেখাবে!

ওর ইদানিং একটা ইচ্ছা মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। সুপ্রীতিকে একবার বলেছিল, কিন্তু সে আধরাস্তাতেই

থামিয়ে দিয়েছিল মুখে হাত চাপা দিয়ে। ওর আরও মরতে ইচ্ছে করেছিল তখন। হাতগুলো যদি সক্ষম

থাকত তাহলে ও সুপ্রীতির হাতটা সরিয়ে নিজের কথাটা অন্তত শেষ করতে পারত। হা কপাল! ও যতই

নিজেকে বোঝাক ওকে বেঁচে থাকতে হবে, কিন্তু বেঁচে থাকার কোনো কারণ ও খুঁজে পায় না। ছোটবেলায়

বাবা ওকে অপদার্থ বলে গালাগালি করত, ওর খুব রাগ হতো, একবার এক সহপাঠী অপদার্থ বলাতে ও

মেরে তার নাক ফাটিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু এখন!ও তো একটা বস্তু বই আর কিছু নয়!বাস্তবিকই

অপদার্থ।

আহ্, আহ্ আওয়াজে সুপ্রীতি ছুটে এল রান্নাঘর থেকে।




কী হল? মহা উদ্বিগ্ন হয়ে সুপ্রীতি জিজ্ঞেস করল।

- কী জানি! পিঁপড়ে বোধহয়। 

সুপ্রীতি দেখল সমরেশের সারা গায়ে পিঁপড়ে ছেবে ধরেছে। অনেকক্ষণ থেকেই ধরেছে, কিন্তু এতক্ষণে

মুখে কামড়াতে ও বুঝতে পেরেছে। সুপ্রীতি তাড়াতাড়ি ওকে ধরে তোলে, তারপর সারা গা কাপড়ের

ঝাপটায় ঝাড়তে থাকে। কয়েকজায়গায় কামড়ে ক্ষত করে দিয়েছে। ওর খুব কান্না পেল হঠাৎ, কিন্তু

তাতে সমরেশ ভেঙে পড়বে, আর তাহলে সব শেষ।

ডাক্তার বারবার বলেছেন, সমরেশের মনের জোর বাড়াতে হবে, যেন বেঁচে থাকার ইচ্ছা থাকে। নইলে যত

চিকিৎসাই করো আর যত টাকাই খরচ করো, সমরেশ বাঁচবে না।

সুপ্রীতি কান্নাটা গিলে নিল। মানুষটা কি হালকা হয়ে গেছে! আগে কত গাঁট্টাগোঁট্টা ছিল। বিয়ের সময়

যখন দেখতে গিয়েছিল ওকে সমরেশ, ও তো যাকে বলে প্রেমেই পড়ে গিয়েছিল তার। সে কী সুন্দর মুখ,

একটু বাচ্চা বাচ্চা। তাতে অবশ্য ভালোই লাগছিল। ওর ইচ্ছে করেছিল একবার ওর গেল টিপে দিতে।

কিন্তু তা বলে শরীর বাচ্চা ছেলের মতো নয়। বেশ লম্বা, তদনুপাতে চওড়া, পেশীবহুল। যা চাই, সব ছিল।

ওর স্বপ্নের পুরুষ ছিল সমরেশ।

বিয়ের পর কটা বছর তো স্বপ্নের মতোই কেটেছিল ওদের। ওরা বড়লোক ছিল না, তবে স্বচ্ছল ছিল।

তারপর দুবছরের মাথায় বাবু হল, সে যেন সুখের সাগরে ভাসল ওরা দুজন। বাচ্চার নাম কী রাখবে তা

নিয়ে কত জল্পনা - কল্পনা করেছিল ওরা। তারপর শেষ পর্যন্ত দেবজ্যোতি নাম রেখেছিল।

দেবজ্যোতিই বটে। টুকটুকে এতটুকু মুখ, তাতে চোখ, কান, নাক, মুখ - সব এত টুকু টুকু। কি সুন্দর যে

লাগছিল! এতটুকু ছোট মানুষ, তাকে সারাদিন আদর করতে ইচ্ছে করত ওর। কিন্তু রান্না বান্না করতে

হবে, নইলে খাবে কী?তাই রান্না করতে যেত। কিন্তু সবসময় উদগ্রীব হয়ে থাকত, একটু শব্দেই ছুটে

আসত। বেশিরভাগ সময়েই কিছু হত না, কিন্তু ওই ছোট্ট পুতুলটাকে দেখে কি আনন্দ যে হতো!

তারপর সে আসতে আসতে চলতে শিখল, কথা বলতে শিখল। যখন প্রথমবার মা বলল খোকা, ওর মনে

হয়েছিল, ও আজকে মরে যেতে পারে, মনে কোনো আফসোস থাকবে না। খোকাকে জড়িয়ে ধরে চুমুতে

চুমুতে ভরিয়ে দিয়েছিল। সন্ধ্যায় সমরেশ বাড়ি ফিরতে ও ছুটে গিয়ে বলেছিল, জানো, খোকা আজকে মা

বলেছে আমাকে!

সমরেশ যেন আরো বাচ্চা হয়ে গিয়েছিল, কই দেখি, দেখি? আমার বাবাটা কোথায়?

কিন্তু খোকা সেদিন কিছুতেই বাবা বলেনি।

বলেছিল দিন কতক পর। অনেক শিখিয়ে পড়িয়ে। তখন সমরেশের মুখ দেখলে কে বলত, এই লোকটার

বয়স বারো নয় বত্রিশ!

কিন্তু দিন যায়, নতুন দিন আসে নতুন বিস্ময় নিয়ে। কখনও তা আনন্দদায়ক, কখনও বেদনা। কিন্তু

এমন চরম বেদনা, কোন পাপে?সে যতদূর মনে করতে পারে এমন কোনো পাপ বা অন্যায় সে তো করেনি,

কার জন্য তার এমন শাস্তি হতে পারে।

তবুও মানুষকে ভুগতে হয়। মানুষ ঈশ্বর বিশ্বাস করে। অন্যের হলে বলে পাপের শাস্তি, আর নিজের

হলে বলে পরীক্ষা। সামনে হাজার পরস্পরবিরোধী উদাহরণ থাকলেও চোখ বন্ধ করে থাকে

ইচ্ছাকৃতভাবে। যে শিশু জন্মের একমাসের মধ্যে ক্যান্সারে আক্রান্ত হল, সে কী পাপ করেছিল,

সুযোগটা পেল সে কোথায়?




আর যে রাজনৈতিক নেতাটা শয়ে শয়ে মানুষ খুন করে নিজের আত্মীয়স্বজনের মধ্যিখানে মরল, মরে

জাতীয় নায়কের সম্মান পেল, সে কী শাস্তি পেল?

কদিন পর সন্ধ্যাবেলায় দেবজ্যোতি সমরেশের বিছানার পাশে বসে গল্প করছিল। দেবজ্যোতির বয়স

এখন চার বছর, ঘরেই পড়াশোনা করে সুপ্রীতির কাছে। সমরেশের খুব ইচ্ছা ছিল ওকে একটা

দেবজ্যোতিকে একটা খুব ভালো স্কুলে পড়াবে, অনেক বড়ো হবে ও। কিন্তু এখন সুপ্রীতি কোনোমতে

সংসার টানছে। ও মরে গেলে ভালো হতো, তাহলে ওদের জীবন সহজ হতো। সুপ্রীতি তখন দুজনের খরচ

ভালো করে চালাতে পারত। মানুষ পরিশ্রম করে, নিজের শরীর পাত করে ফেলে। কিন্তু তা তো

ভবিষ্যতের কথা ভেবে! সুপ্রীতি যে ওকে টানছে কিছু পাবে কি ও?

ওর খুব ইচ্ছা করছে জুবায়েরকে ফোন করতে। একবার গলার আওয়াজটা শুনলেও ভালো লাগত, কিংবা

...... না থাক।

দেবজ্যোতির ডাকে ও বাস্তবে ফিরে এল।

- "বাবা, তুমি আমাকে বেড়াতে নিয়ে যাবে না আর? তোমার পাগুলো নেই কেন?"

একটা চাপা কান্নার দলা ওর গলা থেকে বেরিয়ে আসতে চায়, নিজেকে সামলে নেবার চেষ্টা করে খুব।

কিছুক্ষণ থেমে হাসার চেষ্টা করে বলে, নেই বাবা। স্ক্রু ঢিলে হয়ে গিয়েছিল তো, খুলে পড়ে গেছে। 

-  আমারও স্ক্রু ঢিলে হয়ে যাবে?খুলে পড়ে যাবে?

দুঃখের মধ্যেও সমরেশের হাসি পেল। সে হাসিমুখে বলল, না বাবা, তোমার তো খুব টাইট করে আঁটা

আছে খুলবে না। আর মা আছে না, কিছু হতে দেবে না তোমায়। 

সুপ্রীতি এসে ডাকল, খোকা এবারে খাবে এস, বাবাও খাবে। 

দেবজ্যোতি উঠে যায়। সুপ্রীতি বলে, আজকে মৌরলা মাছ রান্না করেছি। বিকেলে পলাশ দিয়ে গিয়েছিল,

ওদের পুকুরে খুব হয়েছে নাকি। 

মৌরলা মাছ সমরেশের খুব প্রিয় ছিল। এখন অবশ্য কিছুই ভালো লাগে না। কেমন পানসে লাগে,

স্বাদহীন।

ওর জীবনের সবকিছু আস্তে আস্তে ছোট হয়ে আসছে। ক্ষয়ে যাচ্ছে সব ধীরে ধীরে। ওর বাঁচার

ইচ্ছেটাও ধীরে ধীরে কমে আসছে। ও বুঝতে পারছে ও আর বেশিদিন বাঁচবে না। আচ্ছা নিজে দম বন্ধ

করে মরা যায় না? ও কোথায় পড়েছিল যেন, কোনো মানুষ নিজে নিজের নিঃশ্বাস বন্ধ করে মরতে পারে

না। ও চেষ্টা করে দেখবে কি?

হয়তো সফল হতেও পারে!

পরদিন সকালে ফ্যানের ক্যাঁচ ক্যাঁচ আওয়াজ ছাপিয়ে ঘর সুপ্রীতির বুকফাটা আর্তনাদে ভরে গেল।

পাড়ার লোক ছুটে এল। এসে সে এক অদ্ভূত, অসম্ভব দৃশ্য দেখল।

সমরেশ বালিশে মুখ গুঁজে পড়ে আছে। তার দেহ প্রাণহীন, নিথর। পাশে দেবজ্যোতি ঘুমজড়ানো চোখে

ফ্যালফ্যাল করে সমরেশের শরীরটার দিকে তাকিয়ে বসে আছে। সে বুঝতে পারছে না মা কেন কাঁদছে।

সমরেশের শরীরটা যখন মাচায় তোলা হচ্ছিল, প্রণব একাই তুলে নিল। অম্বরীশ হাত লাগাতে এসেছিল,

প্রণব বলল, থাক, কিছু নেই শরীরে, ক্ষয়ে শেষ হয়ে গেছে সব। ......

সে আরো কিছু বলতে যাচ্ছিল, অম্বরীশ তাকে ইশারায় মানা করল।




চিতা যখন সাজানো হল, এতটুকু চিতা হল, স্বাভাবিকের অর্ধেক। দেবজ্যোতি যখন মুখাগ্নি করল,

সুপ্রীতি ছুটে আসতে গেল, সঙ্গী মেয়েরা ধরে নিল তাকে। সে চেঁচিয়ে কাঁদতে লাগল, সাথে আছাড় খেতে

খেতে বলল, ওরে ওকে আর একটু রাখ। ওর মুখটা আর একবার দেখি। ওগো তোমরা আমায় একবার

ছাড়ো, আমি আর একবার দেখব ওকে। আমার সব শেষ হয়ে গেল, তোমরা আমায় একবার ছাড়ো। 

বলতে বলতেই অজ্ঞান হয়ে গেল। এই নিয়ে কবার হল আর কারো হিসেব নেই।

পাড়ার একজন প্রৌঢ় দেবজ্যোতির হাত ধরে মুখাগ্নি করিয়ে দিলেন।

দেবজ্যোতি সমরেশের দেহটা পুড়ে যেতে দেখে সেই প্রৌঢ়ের কাপড়ে মুখ লুকাল।
0

গল্প - মনোজ কর

Posted in









 ত্রয়োদশ পর্ব

ছোটকালীর অফিসের গেট পেরিয়ে একটু এগিয়ে পানু রায় দেখলেন যে সবকটা সেলসম্যানই খদ্দের সামলাতে ব্যস্ত। অফিসের সামনে গাড়ি রেখে প্রায় ছোটকালীর অফিসের দরজার কাছে পৌঁছোবার সঙ্গে সঙ্গেই একটা ছেলে এসে সামনে দাঁড়ালো। বললো,’ স্যার গাড়িটা পাল্টাবেন?’ পানু রায় বললেন,‘না, আমি কালীকৃষ্ণের সঙ্গে দেখা করতে চাই।‘ কিন্তু ছেলেটা ছাড়বার পাত্র নয়। বললো,’ আপনার গাড়িটা ভালো কন্ডিশনেই আছে। যদি ফার্স্ট- হ্যান্ড হয় তাহলে …’ পানু রায় ছেলেটার কথায় কান না দিয়ে এগিয়ে গিয়ে ছোটকালীর সেক্রেটারির দিকে না তাকিয়ে একেবারে দরজা ঠেলে ছোটকালীর ঘরে ঢুকে গেলেন। ছোটকালী মুখ তুলে পানু রায়কে দেখে অবাক হয়ে গেল। পানু রায় বললেন,’ হঠাৎ এভাবে ঢুকে পড়ার জন্য দুঃখিত,কালীকৃষ্ণ । কিন্তু ব্যাপারটা অত্যন্ত জরুরি। আমি তোমার সঙ্গে একান্তে কিছু জরুরি কথা বলতে চাই। এখানে আসি অবধি একটা ছেলে আমার মাথা খারপ করে দিচ্ছে। আমি কী করে এই ছেলেটার হাত থেকে রেহাই পাব?’ ছোটকালী বলল,’ একটাই রাস্তা আছে নিস্কৃতি পাবার। একটা গাড়ি কিনে নিন।‘ পানু রায় ছেলেটির দিকে তাকিয়ে বললেন,’ আমি ব্যক্তিগত দরকারে এখানে এসেছি। গাড়ি কেনা বা বিক্রীর জন্য নয়।‘ ছোটকালী বলল,’ আপনি নিজের গাড়িতে এসেছেন না ট্যাক্সিতে? ‘ পানু রায় বললেন,’নিজের গাড়িতে।‘ ছোটকালী ছেলেটিকে কাছে ডেকে বলল,’ গাড়িটাকে নিয়ে একটু চালিয়ে দেখ কী অবস্থায় আছে। সেইবুঝে মিঃ রায়কে একটা অফার দাও। মনে রেখ ওনার জন্য আমাদের তরফ থেকে যতটা বেশি সম্ভব ডিসকাউন্ট দেওয়া যায় ততটাই দিও।‘ পানু রায় বললেন,’ ঠিক আছে তাতে যদি কেউ উত্তেজনা কমে তাহলে তাই করো। কিন্তু আমাদের এক্ষুনি অনেকগুলো জায়গায় যেতে হবে। যদি গাড়িটা নিয়ে ওরা বেরোয় তাহলে তোমার ড্রাইভারকে বলো গাড়ি রেডি করতে।‘ ছেলেটি বেরিয়ে গেল। ছোটকালী বলল,’ঠিক আছে, বলুন কী ব্যাপার।‘

-তোমার কাছে বন্দুক আছে?

-কী ব্যাপার বলুন তো?

-আমি জানতে চাই তোমার কাছে বন্দুক আছে কি না। তুমি এখানে বড় অ্যামাউন্টের ক্যাশ রাখ এবং…

-হ্যাঁ, আছে।

-লাইসেন্স আছে?

-অবশ্যই। আপনি ভাববেন না আমি এখানে বেআইনি ব্যবসা চালাই আর কোনও লোক আচমকা ঢুকে পড়লে তাকে বন্দুক দেখিয়ে বের করে দিই।

-বন্দুকটা একবার আমাকে দেখাও।

ছোটকালী খানিকক্ষণ পানু রায়ের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। বোঝার চেষ্টা করল ব্যাপারটা কী ঘটতে চলেছে।কিছু আন্দাজ করতে না পেরে ডানদিকের ড্রয়ারের ওপরের তাক থেকে বন্দুকটা বের করে পানু রায়ের দিকে এগিয়ে দিল। পানু রায় বন্দুকটা হাতের তালুতে নিয়ে বারদুয়েক ওপর- নিচ করে বললেন,’ বেশ ভালো বন্দুক। এটা কি তোমার বাবার কাছে যেটা আছে অবিকল সেটার মতই?’ ছোটকালী বলল,’ আমি সেরা জিনিস ছাড়া ব্যবহার করি না। এটা বাবাই আমাকে দিয়েছে। একেবারে অবিকল…’ কথা শেষ হবার আগেই পানু রায় ট্রিগার টেনে দিলেন। প্রচন্ড শব্দ করে একটা বুলেট মেহিগিনির টেবিলের কোনে ধাক্কা খেয়ে পাশের দেয়ালের মধ্যে আধখানা ঢুকে আটকে গেল। ছোটকালী চিৎকার করে উঠলো,’ আরে আপনার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে ? আচ্ছা লোকতো আপনি। ওটা রাখুন।‘ পানু রায় স্তম্ভিত হয়ে বোকার মত বন্দুকটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। ততক্ষণে দরজা খুলে ছোটকালীর সেক্রেটারি আর তিন চারটে ছেলে ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। ওদের চোখে মুখে ভয় এবং উৎকণ্ঠা। একটা ষণ্ডামত ছেলে এগিয়ে এসে পানু রায়কে বলল,’ ওটা এক্ষুনি নিচে ফেলুন। এক্ষুনি ফেলুন না হলে এক ঘুষিতে আপনার চোয়াল ভেঙে দেব!’ পানু রায় অবাক হয়ে বললেন,’ হে ঈশ্বর! আমি জানতাম না ওতে গুলি ভরা আছে।‘ ছোটকালী ছেলেটিকে বলল,’ ঠিক আছে। ইনি মিঃ পানু রায়। আমাদের পারিবারিক বন্ধু এবং বাবার আইনি পরামর্শদাতা।‘ ছেলেটি জিজ্ঞাসা করল,’ ডাকাতি করতে আসেনি?’ ছোটকালী বলল,’না’। পানু রায় টেবিলের দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন তারপর বললেন,’ আমি ট্রিগারটা একটু পরীক্ষা করছিলাম। কিন্তু এটা এত মসৃণ যে আমি প্রায় চাপ দেবার আগেই ব্যাপারটা ঘটে গেল।‘

-সেই জন্যই আমি এটাকে এখানে রেখেছি। এটা রোজ তেল দিয়ে পরিষ্কার করা হয়। অত্যন্ত দামি এবং মসৃণ এটা। যেহেতু এটা আত্মরক্ষার জন্য ব্যবহৃত হয় সেজন্য এটাতে গুলি ভরা থাকে। কোনও বুদ্ধিমান লোক ডাকাত ঘরে ঢুকলে খালি বন্দুকের ট্রিগার টেপে না।‘

পানু রায় বন্দুকটা ছোটকালীকে ফিরিয়ে দিয়ে বললেন,’ আমার এটা নিয়ে নাড়াচাড়া করা ঠিক হয়নি।‘ ছোটকালী হেসে বললেন,’ আপনার মাথা এবং কথাই যথেষ্ঠ। আপনার বন্দুকের কোনও দরকার নেই।‘ পানু রায় ছোটকালীর সেক্রেটারি এবং লোকটার দিকে তাকিয়ে বললেন,’ আমি অত্যন্ত দুঃখিত যে আমার জন্য আপনাদের অনেক অসুবিধে হল। একটা মেহগিনির টেবিল আপনাদের পাওনা রইল।‘ ছোটকালী সেক্রটারি এবং ছেলেটিকে বলল,’ যাওয়ার সময় দরজাটা টেনে দিও।‘ ষণ্ডামত ছেলেটা অনিচ্ছাসত্ত্বেও বেরিয়ে গেল। সেক্রেটারি মেয়েটি পিছনে পিছনে বেরিয়ে গিয়ে বাইরে থেকে দরজাটা টেনে দিল। ছোটকালী বলল,’ এবার কী? আপনি যদি পানু রায় না হতেন তাহলে এই ঘটনাটা অনিচ্ছাকৃত বলে বিশ্বাস করতে পারতাম।‘ পানু রায় হাসি চাপতে পারলেন না। বললেন,’ বন্দুকটা পকেটে ঢোকাও এবং আমার সঙ্গে চল।‘

-বন্দুক নিয়ে?

-হ্যাঁ, বন্দুক নিয়ে। দরকার হতে পারে।

-ঠিক আছে। তাহলে আর একটা গুলি ভরে নিই?

-না,না। দরকার নেই। যেরকম আছে ওরকমই থাক।

-ঠিক আছে। কোথায় যাব?

-বেশি দূরে নয়।

-দাঁড়ান, একটা ফোন করে নিই।

ছোটকালী ফোনটা কানে নিয়ে বলল,’ পরেশ, আমি একটু বেরোচ্ছি। কালকে আমরা যে এক্স ৬০ কাজটা নিয়েছি ওটা এক্ষুনি বাইরে বের কর। এক্ষুনি মানে এক্ষুনি।‘ ছোটকালী টেবিলটার দিকে তাকিয়ে বলল,’ টেবিলের ওপরের পালিশটা মোটা মনে হত। এখন দেখছি পালিশটা খুব পাতলা। কিন্তু আসল উদ্দেশ্যটা কী ছিল? মিঃ রায়।‘ পানু রায় বললেন,’ সাধারণ উদ্দেশ্য হল ঐ এক্স ৬০ কাজটা কী আমার একটু বোঝা দরকার।‘

-আপনার দারুণ লাগবে। ভালো না বেসে পারবেন না। এটা স্পোর্টস সংক্রান্ত কাজ। আসলে গাড়ির সাইজের তুলনায় অনেক বেশি পাওয়ারের ইঞ্জিন লাগানো হয় বনেটের নিচে। সাধারণভাবে অত পাওয়ার কাজে লাগে না। কিন্তু যখন আপনি হাইওয়েতে উঠবেন এবং আপনি কাউকে অতিক্রম করতে চাইবেন আপনি মুহূর্তের মধ্যে তাকে অতিক্রম করে আবার নিজের লাইনে ফিরে আসতে পারবেন। এত দ্রুত আপনি ফিরে আসতে পারবেন যে কোনও গাড়ি কোনও বাঁক থেকে সহসা আবির্ভূত হয়ে আপনাকে ধাক্কা মারতে পারবে না।

-আমি সামনে কোনও বাঁক থাকলে ওভারটেক করি না।

-আপনার ওরকম মনে হচ্ছে বা আপনি হয়ত চেষ্টাও করতে পারেন কিন্তু যখন আপনি কোনও অচেনা রাস্তা দিয়ে যাচ্ছেন আপনার মনে হবে সামনের রাস্তা মসৃণ কিন্তু আসলে তা নয়…’

-পরে তোমার ভাষণ শুনবো। আপাতত দেখি জিনিসটা কী ।

সামনেই দাঁড়িয়ে থাকা একটা গাড়ির দরজাটা খুলে ছোটকালী বলল,’ আসুন, মিঃ রায়। স্টিয়ারিং এর সামনে বসুন। আগে চালিয়েছেন এই ধরণের স্পোর্টস কার?’ পানু রায় বললেন, না!’ ছোটকালী বলল,’ তাহলে চালান। ভুলে যান আপনার বয়স একশো বছরের বেশি। ভুলে যান আপনি কোনওদিন এরকম গাড়ি চালান নি।সামান্যই ব্যাপার। এমন গাড়ি আপনি কোনওদিন দেখেন নি এবং চাপেন নি সেকথা বাজি রেখে বলতে পারি। এরকম গাড়িই আপনার দরকার।‘

পানু রায় বললেন,’ কিন্তু সমস্যা একটাই। যেহেতু এটা সবার চেয়ে আলাদা লোকের চোখে এটা পড়বেই। এই ছোট্ট শহরে কিছুদিনের মধ্যেই সকলে জেনে যাবে যে এটা পানু রায়ের গাড়ি। যেখানেই যাই গাড়ি দেখলেই সবাই জানতে পারবে পানু রায় এসেছে।‘

-সেটা দারুণ ব্যাপার হবে না?

-আমার জন্য এর চেয়ে খারাপ আর কী হতে পারে?

-পেশাগত দিক থেকে গোপনীয়তা রক্ষা করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।বিশেষ করে আপনার ক্ষেত্রে। আপনাকে সামলাতে পুলিশ হিমসিম খেয়ে যায়। কিন্তু পানু রায় এই শহরের সবচেয়ে আলোচিত মানুষ সে কথাও তো ঠিক। এই গাড়ি পানু রায়কেই মানায়। আপনি গাড়ি স্টার্ট করুন। আপনি আমাকে যা বলেছেন তাই করেছি।একটা দামি মেহগিনি টেবিলও হারিয়েছি। এবার আমি যা বলছি করুন।যতক্ষণ আপনি না সন্তুষ্ট হচ্ছেন আপনাকে এক পয়সাও দিতে হবেনা। আপনি আগে যতদিন খুশি চালান তারপর যা সিদ্ধান্ত নেবেন তাই মেনে নেব। ইচ্ছে হলে কিনবেন না হলে ফেরৎ দিয়ে দেবেন।

পানু রায় গাড়িতে উঠে স্টার্ট দিলেন। গাড়িটা সামান্য কেঁপে একেবারে শান্ত হয়ে গেল। কোনও আওয়াজ নেই। শুধু ঘড়ির মত একটা টিক-টিক আওয়াজ হতে থাকলো। ছোটকালী বলল,’ গিয়ার দিন। আস্তে চাপুন।‘ পানু রায় চাপ দেবার সঙ্গে সঙ্গে তীব্র গতিতে গাড়িটা এগিয়ে গেল। ছোটকালী বলল,’ আস্তে, খুব আস্তে। শুধু ছুঁলেই হবে, চাপ দেওয়ার দরকার নেই।‘ পানু রায় হাইওয়েতে উঠলেন। ছোটকালী বলল,’ আপনি এখন ঘোড়ায় চেপেছেন। লাগামের সামান্য টানেই কাজ হয়ে যাবে। এই গাড়ি আপনার পছন্দ হতে বাধ্য।‘

-যদি আমি ততদিন বেঁচে থাকি।

-আমরা কোথায় যাচ্ছি? মি রায়।

-গাড়িটা চালিয়ে দেখতে।

-খুব ভালো। একটা দু’টো শার্প টার্ন নিন। স্টিয়ারিং টা ভালো করে বুঝুন। শুধু একটাই সাবধানবাণী শক্তি ব্যবহার করবেন না। স্পর্শেই কাজ হবে। একটু বেশিই সংবেদনশীল এই গাড়িটা।

-কিন্তু এই গাড়িটা আমার চেয়ে অন্তত চল্লিশ-পঞ্চাশ বছরের ছোটদের জন্যই ভালো।

-একেবারে উলটো। এই গাড়ি একমাত্র তাদেরই জন্য যাদের অভিজ্ঞতা আপনার মতোই দীর্ঘ।

-তোমার কী স্পোর্টস কার সম্বন্ধে এটাই ধারণা এবং বিশ্বাস?

-না, না। এসব নিছকই সেলসম্যানশিপ। কিন্তু আমরা যাচ্ছি কোথায়?

-কোথাও না।

-তাহলে গাড়িটাকে একটা ছোট রাস্তায় নিয়ে চলুন। অ্যাক্সিলারেটরটা পরীক্ষা করে দেখে নিন।

-না আমি ঠিক রাস্তাতেই আছি। আমি পরীক্ষা করছি।

-কী পরীক্ষা করছেন? গাড়ি?

-না, সেলসম্যানশিপ!

ছোটকালী হেসে উঠলো। পানু রায় আর একটু এগিয়ে বাঁ দিকে ঘুরে একটা ছোট রাস্তায় ঢুকে পড়লেন। ছোটকালী বলে উঠল,’ আরে আরে, কী করছেন মিঃ রায়?’ পানু রায় গাড়িটা ম্যান্ডেভিলা অ্যাপার্টমেন্টের সামনে দাঁড় করালেন। বললেন,’ আমাদের একটা কাজ আছে।‘

-আমি জানিনা আপনার মাথায় কী খেলছে, আমার উত্তর কিন্তু ‘না!’।

-চলে এসো। সময় কম।

-আমি বিবাহিত, মিঃ রায়।

-সেটা কীরকম অনুভূতি?

-এখনও ঠিক জানিনা।এখনও পর্যন্ত বেশ সুখকর। তবে বুঝতে পারছি সুবিধে এবং অসুবধে দুইই আছে। দেখুন এক অসাধারণ সুন্দরী মহিলার সঙ্গে আমার বিয়ে হয়েছে এবং কোনওভাবেই আমি এই সম্পর্কে চিড় ধরতে দেবনা।

-আমিও চাইনা তোমাদের সম্পর্কের কোনও ক্ষতি হোক। আমার সঙ্গে এসো।

-আপনি কী চাইছেন? আমাকে কী কোনও স্টেটমেন্ট দিতে হবে?

-না, আমি চাই তুমি একটাও কথা বলবে না। যদি মনে হয় মাথা নাড়তে পার।

-যদি না মনে হয়?

-তাহলে স্ট্যাচুর নাত দাঁড়িয়ে যা হচ্ছে শুনবে এবং দেখবে।

-আপনি নিশ্চয়ই জানেন আপনি কী বলছেন।

-আশা করি জানি। চল, এবার শুরু করা যাক। সময় নেই হাতে।

পানু রায় এবং ছোটকালী রেবার ফ্ল্যাটের সামনে এসে দরজায় টোকা দিলেন। রেবা কৈরালা ‘কে?’ বলে দরজা খুলে পানু রায়কে সামনে দেখে বলল,’ ও, মিঃ রায়, আসুন।‘ পরক্ষণেই রেবার চোখ পড়ল পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা ছোটকালীর দিকে।ভ্রু কুঁচকে অবাক হয়ে ছোটকালীর দিকে তাকিয়ে রইল রেবা। মুখে রাগ এবং বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট দেখতে পেল ছোটকালী। বলল,’ শোন, রেবা। এসব কিন্তু মিঃ রায়ের প্ল্যান। আমি এই ব্যাপারে কিছু জানিনা।‘ পানু রায় ধমকে উঠলেন,’ চুপ কর। একটাও কথা বলবে না।‘ রেবা ভেতরে ঢুকে গেল। পানু রায় হাত ধরে ছোটকালীকে ভেতরে টেনে নিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলেন। রেবা ভেতর থেকে এসে বলল,’ অভিনন্দন, কালীকৃষ্ণ।‘ পানু রায় আবার ধমকে উঠলেন,’ একদম চুপ, দু’জনেই! আমাদের ঝগড়া করার সময় নেই। রেবা, কালীকৃষ্ণ আপনার নিরাপত্তার ব্যাপারে চিন্তিত। যদিও আপনাদের বিবাহ হয়নি এবং কালীকৃষ্ণ অন্যত্র বিবাহ করেছে তবুও সে আপনাকে বন্ধু বলেই মনে করে। যেহেতু কালীকৃষ্ণ আপনার বাবার ব্যাপারটা জানে এবং আমার কাছে ঐ লোকগুলোর সঙ্গে আপনার দরকষাকষির ব্যাপারটা শুনেছে ওর মনে হয়েছে আপনার নিরাপত্তার জন্য আপনার কাছে কোনও অস্ত্র থাকা দরকার।‘

-রেবার নিরাপত্তার জন্য আমি কোথা থেকে অস্ত্র পাব?

-চুপ করো। বন্দুকটা ওনাকে দাও।

ছোটকালী পকেট থেকে বন্দুকটা বের করে। পানু রায় বললেন’ রেবা, আপনি বন্দুকটা রাখুন।‘ রেবা জিজ্ঞাসা করলো,’ আমি কী করব এটা নিয়ে?’ পানু রায় বললেন,’ বালিশের তলায় রাখবেন।‘ ছোটকালী মাঝখান থেকে বলে উঠলো,’এটাতে একটা গুলি ইতিমধ্যে ব্যবহার করা হয়েছে।‘ পানু রায় রেগে গিয়ে বললেন,’আচ্ছা মুসকিল তো! তুমি বললে তুমি কোনও কথা বলবে না। এখন তো দেখছি সব কথা তুমিই বলছো। এবার দয়া করে চুপ করো এবং আমায় বলতে দাও।‘

-রেবা, ছোটকালী আপনার নিরাপত্তার ব্যাপারে যারপরনাই উদ্বিগ্ন।ও চায় যে আপনি আত্মরক্ষার জন্য আপনার কাছে এই বন্দুকটা রাখুন।এ ব্যাপারে কোনও গোপনীয়তা রক্ষা করার দরকার নেই। কেউ যদি আপনাকে জিজ্ঞাসা করে যে এই বন্দুক আপনি কোথায় পেলেন আপনি স্বচ্ছন্দে বলতে পারেন যে কৃষ্ণকালী আপনাকে এটা দিয়েছে বা কেউ যদি আপনাকে বলে যে কৃষ্ণকালী আপনাকে যে বন্দুকটা দিয়েছে সেটা কোথায় তাহলে আপনি তাকে এই বন্দুকটা দেখাতে পারেন। মনে রাখবেন এই বন্দুকটার একটা গুলি ইতিমধ্যেই ব্যবহার করা হয়েছে এবং এইভাবেই বন্দুকটা আপনাকে দেওয়া হয়েছে।আপনি জানেন না এই গুলিটা কে কোথায় ব্যবহার করেছে।কেউ জিজ্ঞাসা করলে বলবেন যে কালীকৃষ্ণ আপনাকে এভাবেই বন্দুকটা দিয়েছে এবং আপনাকে না করে প্রশ্নটা কালীকৃষ্ণকে করতে। আপনার শিষ্টতার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ এবং আপনার নিরাপত্তার কালীকৃষ্ণর এই উদ্যোগ সত্যি প্রশংসাজনক। আমরা তাহলে আসি। এসো কালীকৃষ্ণ।‘ পানু রায় দরজা খুললেন। রেবা পানু রায়ের দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে রইলো। বন্দুকটা ঘরের মাঝখানে টেবিলটার ওপর পড়ে রইলো। কালীকৃষ্ণ হঠাৎ রেবার উদ্দেশ্যে বলে উঠলো,’ রেবা, কাগজে পড়ার আগেই আমি তোমাকে জানিয়েছিলাম।

-তোমাকে অত ব্যাখ্যা করে বলতে হবে না। তুমি আমাকে যতটা ভাব আমি তার থেকে একটু বেশিই বুঝতে পারি। আমি তোমার অস্থির আচরণ এবং পরিস্থিতি সামলানোর আপ্রাণ চেষ্টা দেখতে ও বুঝতে পারছি। যাই হোক আমাদের মধ্যে বন্ধুত্বের সম্পর্ক আমরা মেনে চলতেই পারি।‘

কালীকৃষ্ণ পানু রায়কে সরিয়ে একটু এগিয়ে গিয়ে রেবার হাতটা নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো। পানু রায় বললেন,’ তুমি যদি এখানে থাকতে চাও থাকতে পারো। আমি একটা ট্যাক্সি নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছি।‘ কালীকৃষ্ণ রেবাকে বললো,’আসি তাহলে। এই নিষ্ঠুর লোকটাকে আমি একটা গাড়ি বিক্রীর চেষ্টা করছি।‘

-বেশ। তাতে তোমার ক্ষমতা আরও বাড়বে। তোমার দরকারও আছে।

দু’জনে নিচে নেমে বাইরে যাবার দরজার দিকে একটু এগিয়েই হঠাৎ পানু রায় এক ঝটকায় ছোটকালীর হাতটা টেনে নিয়ে বললেন,’ চুপচাপ উল্টোদিকে চলো।‘ উল্টোদিকে খানিকটা এগিয়ে একটা সোফা দেখতে পেয়ে পানু রায় বসলেন এবং ছোটকালীকে পাশে বসিয়ে হাতে একটা বই ধরিয়ে দিলেন। ফিসফিস করে বললেন,’ একাগ্রমনে বইটা পড়তে থাকে ভান করো।‘ নিজে মুখের সামনে একটা খবরের কাগজ ধরে ফাঁক দিয়ে দেখলেন কেলো দারোগা বড় দরজাটা দিয়ে ঢুকে লিফটের দিকে এগোচ্ছে। সঙ্গে আর একজন অফিসার আর সেই ট্যাক্সি ড্রাইভারটা যাকে নিয়ে সেদিন বেরিয়েছিলেন। ওরা লিফটে ঢুকে যেতেই পানু রায় বললেন,’ চলো। আমরা যাই। আশা করি ওরা বাইরে দাঁড়ানো স্পোর্টস কারটা ওরা দেখেনি।‘

-কি যে বলেন মিঃ রায়। আপনি বলতে চান একজন ব্যাঙ্কার বোর্ড মিটিঙে বেসুরো কথাগুলো শুনতে পায়নি।

-শোন কৃষ্ণকালী, আমাকে যদি গাড়ি বিক্রী করতেই হয় তবে একটা পুরনো দিনের কালো সাধারণ গাড়ি জোগাড় করো।

-আমার কাছে আছে। চিন্তা করবেন না। আমি বুঝে গেছি আপনি এমন গাড়ি চাইছেন যা আলাদা করে যেন চিনতে না পারা যায়। বাইরে সাধারণ এবং শান্ত, ভিতরে অসাধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন।

পানু রায় হাসলেন।

তখন বেলা সওয়া দু’টো হবে। পানু রায়ের ফোন বেজে উঠলো।মনীষার ফোন। পানু রায় ফোন কানে দেবার সঙ্গে সঙ্গেই ওপার থেকে ভেসে এলো,’ পানু রায় বলছেন।‘

-মনীষা, বলো। কী ব্যাপার!

-ও, মিঃ রায়। আপনাকে ফোনে পেয়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।দু’জন পুলিশ অফিসার আমাদের অফিসে এসেছে। বাইরে অপেক্ষা করছে। বলছে ওদের কাছে সার্চ ওয়ারান্ট আছে। ওরা নাকি রক্তমাখা জামাকাপড় বা অন্য কোনও জিনিস অফিসে লুকোনো আছে কিনা দেখবে। কে একজন শিবুলালের খুনে তল্লাশির জন্য এই খোঁজ। আমি কী করব?

-দু’টো চেয়ারের ধুলো ঝেড়ে ওদের ভেতরে ডেকে বসতে বলো। চা কফি কিছু চাইলে দাও। তারপর বলো যতক্ষণ দরকার তল্লাশি চালাতে। আর বলো যে যাবার সময় অফিস থেকে যদি কিছু নিয়ে যায় তার একটা রসিদ দিয়ে যেতে।

-ঠিক আছে। বুঝে গেছি।

মনীষা ফোন কেটে দিল। পানু রায় সুন্দরীকে জিজ্ঞাসা করলেন,’ জগাই বাড়ি আছে? তুমি ভেতরে গিয়ে ওকে একটু পাঠিয়ে দাও তো।‘ সুন্দরী বললো,’ হ্যাঁ, বাড়িতেই আছে। কোথাও যেতে হবে?’

-আমার শিবুলাল সম্বন্ধে কিছু খবর দরকার। জগাই কাঠমান্ডুতে অনেককে চেনে। দেখি কিভহু জোগাড় করতে পারা যায় কি না। না হলে একবার কাঠমান্ডু যেতে হতে পারে, অবশ্য যদি দরকার হয়।

-নিশ্চয়ই হবে। আমিও সঙ্গে যাব কিন্তু আগে থেকে বলে রাখলাম।

-ঠিক আছে, যাবে। জগাইকে পাঠিয়ে দাও।

সুন্দরী বাড়ির ভিতরে চলে গেল। কিছুক্ষণ বাদে জগাই ভেতরের দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকে জিগ্যেস করলো,’ দাদু, আমাকে খুঁজছো? কোনও দরকার আছে?’

-হ্যাঁ , আছে তো বটেই। কিছু খবর জোগাড় করতে হবে।

-কী খবর দাদু?

-শিবুলাল রেগমির ব্যাপারে।

- শিবুলাল মানে কাল যে লোকটা খুন হয়েছে ?

-সুন্দরী সব বলেছে মনে হচ্ছে।

জগাই একটু হেসে বললো,’ ঐ আর কি! সুন্দরীর কাছে শুনে আমি একটু আধটু খোঁজ লাগিয়েছিলাম। লোকটা জুয়াড়ি ছিল।‘

- বড়সড় জুয়াড়ি?

-না, না, সেরকম বড়সড় কিছু নয়।

-দ্যাখ, আর কী খবর জোগাড় করতে পারিস। তোকে কয়েকটা কথা বলে রাখি তাতে তোর সুবিধে হবে। হয়ত সুন্দরীর কাছে শুনেছিস। তোর মনে আছে কিছুদিন আগে প্রসাদ কৈরালা বলে একজন খুন হয়েছিল।

-হ্যাঁ। বেশ মনে আছে। খুব হৈচৈ হয়েছিল। চোরাচালানকারী গুন্ডাদের হাতে খুন হয়েছিল।

-না তা নয়। মানে আমার মনে হয় তা নয় যদিও পুলিশ তাই বলেছিল এবং এ ব্যাপারে বিশেষ কিছু করেনি। যেহেতু শিবুলালের মত প্রসাদ কৈরালারও জুয়ার আড্ডায় যাতায়াত ছিল পুলিশ ওর মেয়ে রেবা কৈরালার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল।

-আমি জানি রেবা কৈরালার ব্যাপারটা তুমি দেখছো। আমি দেখছি কী কী খবর জোগাড় করা যায়। আমি বেশ কয়েকজনকে চিনি যারা এসব খবর জোগাড়ের ব্যাপারে আমাদের সাহায্য করতে পারবে।

-যা দরকার হয় কর। আমার শিবুলাল সম্বন্ধে সব খবর চাই, যা পাওয়া যায় তাড়াতাড়ি জোগাড় করে আমায় দিতে থাক। দিনে অন্তত দু’বার।

জগাই দরজা খুলে বেরিয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গেই সুন্দরী এসে জানালো বাইরে রেবা অপেক্ষা করছে। পানু রায় বললেন,’ আসতে বলো।‘ সুন্দরী রেবাকে নিয়ে এলো। পানু রায় জিজ্ঞাসা করলেন,’ নতুন কোনও সমস্যা?’

-আপনারা বেরিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গেই পুলিশের লোকেরা এসেছিল।বন্দুকটা তখন টেবিলের ওপরেই ছিল। ওটা বালিশের তলায় রাখতে আমি ভুলে গিয়েছিলাম। পুলিশের লোকেরা আসতে আমি ওটার ওপর একটা স্কার্ফ ছুঁড়ে দিই।

-তারপর কী হলো?

-ওরা বন্দুকটা হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখলো। নাকের কাছে নিয়ে গিয়ে গন্ধ শুঁকলো। ওটাকে খুলে ফেললো। তারপর জিজ্ঞাসা করলো আমি ওটা কোথা থেকে পেলাম।

-আপনি কী বললেন?

-আমি বললাম মিঃ কে কে চৌধুরী আমাকে ওটা দিয়েছেন এই ভেবে যে যে আমার জীবন বিপন্ন এবং হয়তো ওটা আমার কাজে আসতে পারে।

- আপনি কি বলেছেন কোন কে কে চৌধুরী আপনাকে ওটা দিয়েছে? ছোট না বড়?

-কেন আমার বলা উচিৎ ছিল?

-জানিনা।

-দেখুন যে ভাবে পুরো ঘটনাটা ঘটে গেল তাতে আমি সেই মুহুর্তে এর থেকে বেশি কিছু ওদের বলতে পারিনি। আমাকে প্রায় থামিয়ে ওরা জিজ্ঞাসা করলো যে আমি মিঃ কে কে চৌধুরীকে শেষবার কখন দেখেছি?

-আপনি কী বললেন?

-আমি বললাম সেদিন সকালে। এটা শুনে ওনারা উত্তেজিত হয়ে কাকে ফোন করতে শুরু করলেন এবং কিছু না বলে তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে গেলেন।

-ওনারা আর কিছু জিজ্ঞাসা করেনি?

-না, আর কিছু জিজ্ঞাসা করেনি।

-ওরা কিন্তু আবার আপনাকে প্রশ্ন করতে আসবে বা আপনাকে ডেকে পাঠাবে। আপনাকে তখন একটা কাজ করতে হবে।

-কী কাজ?

-আপনি বলবেন আপনি কোনও প্রশ্নের উত্তর দেবেন না যতক্ষণ না আমি সেখানে পৌঁছচ্ছি।

-তার মানে কী এই নয় যে আমি ওনারা যা বলছেন তা মেনে নিচ্ছি।

-ওরা মনে করতে পারে যে আপনি মেনে নিচ্ছেন। তাতে কিছু আসে যায় না এবং কিছু প্রমাণ হয় না। আপনি মুখ খুলবেন না। এমনকি কোনও সাধারণ প্রশ্ন যেমন আপনার জন্ম কোথায়, কোন স্কুলে পড়েছেন ইত্যাদি প্রশ্নেরও নয়। পারবেন?

-আপনি যদি আমায় বলেন তাহলে…

-আমি বলছি। কারণ কৃষ্ণকালী আমাকে বলেছে আপনার নিরাপত্তা নিশ্চিন্ত করতে।

-মিঃ রায়, গতকাল মিঃ চৌধুরী কাল রাত্রে আবার এসেছিলেন।

-ছোট না বড়?

-বাবা এসেছিলেন।

-এসে কী বললেন?

-বললেন উনি ঘুমোতে পারছেন না। উনি আমার সঙ্গে কথা বলতে চাইলেন। তারপর অনেকক্ষণ ধরে আমার সঙ্গে কথা বললেন।

-উনি কখন ফিরলেন?

-সেটাই তো। উনি যখন ফিরলেন তখন প্রায় মধ্যরাত্রি।

-ঠিক আছে আপনি কোনও প্রশ্নের উত্তর দেবেন না। নিজেকে একটু দূরে দূরে রাখুন।

-তার মানে?

-সুন্দরী, রেবা যে পোশাকটা পরে আছেন ওটা তোমার ঠিক লাগছে?

সুন্দরী বললো,’ খুব সুন্দর ওটা। আমি তো ওনাকে বলতেই যাচ্ছিলাম।‘

পানু রায় বললেন,’ আমার লাগছে না।আমার মনে হচ্ছে এই পোশাকটা পরে ছবি তুললে ভালো আসবে না। একটা সাদা-কালো পোশাক যেটায় ভালো ছবি ওঠে কিনতে কী রকম সময় লাগবে? সামনেটা ভি কাট, সাদা স্ট্রাইপ যাতে ফিগারটা বোঝা যায়? ‘ সুন্দরী বললো,’খুব একটা সময় লাগার কথা নয়।‘ তারপর পানু রায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বললো,’ তবে একটু সময় লাগতে পারে যদি একেবারে তুমি যেমন চাইছো তেমন পেতে হয়।‘ পানু রায় রেবাকে বললেন,’ আপনি এখন শপিংএ যাবেন। আপনার কাছে টাকা আছে?’ রেবা বললো,’হ্যাঁ, আছে। এখনই যেতে হবে?’

-হ্যাঁ, এখুনি। যখন শপিং করবেন তখন ভীষণ খুঁতখুঁতে ক্রেতার মত আচরণ করবেন। প্রচুর জিনিস নামাবেন। একটাও পছন্দ করবেন না। এত জ্বালাতন করবেন যে সেলসগার্ল যেন আপনাকে মনে রাখে। প্রচুর সময় নেবেন। দোকান বন্ধ হওয়ার আগে দোকান থেকে বেরোবেন না।

-তারপর?

-আমার সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ রাখবেন। আমাকে না পেলে সুন্দরীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখবেন। সুন্দরীর ফোন নম্বর আপনার কাছে না থাকলে নিয়ে নিন।

-আমি তাহলে পুলিশের সঙ্গে কথা বলবো না।

-না পুলিশের সঙ্গে নয়, কোনও রিপোর্টারের সঙ্গে নয় ,কারোর সঙ্গে নয়। আমার অনুপস্থিতিতে কাউকে কোনও প্রশ্নের উত্তর দেবেন না।

-ঠিক আছে, মিঃ রায়।

-আর একটা বন্দুক কোথায়?

-ওটা আমি লুকিয়ে রেখেছি। এমন জায়গায় লুকোনো আছে কেউ খুঁজে পাবে না।

-ঠিক আছে।আপনি শপিংএ ব্যস্ত হয়ে যান। এত ব্যস্ত হয়ে যান যে দোকান বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত আপনার কোনও সময় হবে না।

রেবা কৈরালা বেরিয়ে গেল। সুন্দরী জিজ্ঞাসা করলো,’ সাক্ষ্যপ্রমাণ গোপন করা অপরাধ নয়?’

-অবশ্যই অপরাধ। কিন্তু ক্লায়েন্টকে কথা না বলতে বলা কোনও অপরাধ নয়। জানো সুন্দরী, সবচেয়ে বড় অপরাধ হচ্ছে ক্লায়েন্টের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারা।

সুন্দরী পানু রায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে হাসিতে ফেটে পড়লো।