Next
Previous
Showing posts with label গল্প. Show all posts
0
undefined undefined undefined

গল্প - মনোজ কর

Posted in




















প্রথম পর্ব – বারৌনি প্রত্যাবর্তন

হিন্দোশিয়ার বিদেশসচিব আমান্ডা আইনস্টাইনের আতিথ্যে প্রায় ছ’মাস কাটানোর পর একদিন সকালে সমুদ্রতীরে তাদের প্রাসাদোপম বাড়ির ব্যালকনি থেকে সূর্যোদয় দেখতে দেখতে মাধাই পানু রায়ের কাছ ঘেঁসে এসে বসলো। পানু রায় জিজ্ঞাসা করলেন,’ মাধাই, কিছু বলবি?’ মাধাই বলল,’ না তেমন কিছু নয়। ভাবছি আপনি এখন সূর্যোদয়ের আনন্দ উপভোগ করছেন , আপনাকে বিরক্ত করাটা ঠিক হবে কি না?’ পানু রায় বললেন,’ তোর গলায় উৎকণ্ঠার সুর শুনছি। সূর্যোদয়ের আনন্দ তো প্রাত্যহিক ব্যাপার। তুই নির্দ্বিধায় বলতে পারিস।‘ মাধাই হাত কচলাতে কচলাতে বলল,’ এমনি করে আরও কিছুদিন কাটালে আমার কাজকর্মের সূর্যাস্ত হতে আর দেরি হবে না। দেশে ফিরে যাবার কথা কিছু ভাবছেন?’ পানু রায় বললেন,’ দেখ মাধাই, আমি চাইলে আমার বাকি জীবন এখানে বসে বসে কাটিয়ে দিতে পারি। আমান্ডা যে আমায় যেতে দিতে চায় না সে কথা তোরা জানিস। তোর কথা শুনে মনে হচ্ছে সত্যি এভাবে সময় কাটাতে থাকলে আমি আর বেশিদিন বাঁচব না।‘ পাশ থেকে পচা বলল,’ তোমার বয়স তো ১০৫ হল। আরও বেশিদিন বাঁচা মানে কী? আরও কত বছর?’ পানু রায় বললেন,’ ঠিক বলেছিস ,পচা। বেশিদিন আর নেই । বাকি জীবনটা বসে না থেকে নতুন কিছু একটা করতে চাই। এখানে থাকলে তা হবে না। তার চেয়ে চল সবাই মিলে বারৌনি ফিরে যাই। জগাই আর সুন্দরীর মধুচন্দ্রিমা তো অনন্তকাল চলতে পারে না। কেষ্ট, জগাই, সুন্দরীদেরও একটা গোটা জীবন পড়ে আছে। তুই বোকাসোকা মানুষ , তুই না হয় মাধাই এর কাছেই কাজ করবি সারাজীবন।‘ পচা গম্ভীর হয়ে বলল,’ দাদু, তুমি ভুলে যেও না সে দিন আমি দরজা না খুললে আজকের দিন তোমরা কেউ দেখতে পেতে না।‘ পানু রায় বললেন।‘ তুই রাগ করলি পচা। আমি মজা করছিলাম। তোকে আমি সকলের চেয়ে বেশি ভালোবাসি আর তার জন্যে আমায় কম কথা শুনতে হয় না।‘ পচা পানু রায়ের একেবারে কাছে এসে বসে। পানু রায় পচার কাঁধে হাত দিয়ে কাছে টেনে নেয়। ততক্ষণে জগাই আর সুন্দরীকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলেছে মাধাই। আরও কিছুদিন এখানে কাটানোর ইচ্ছে থাকলেও মাধাইএর কথায় রাজি হয়ে গেল ওরা। কেষ্টদার কথা অবশ্য আলাদা। কেষ্টদা এখনও শয্যাত্যাগ করেনি।সুস্বাদু খাদ্য এবং সুনিদ্রার ব্যবস্থা থাকলে হিন্দোশিয়ার সমুদ্রসৈকত আর বারৌনির পুকুরপারের মধ্যে কোনও তফাৎ নেই কেষ্টদার। ব্রেকফাস্টের টেবিলে ঠিক হল যে পানু রায় আজ কালের মধ্যেই প্রসঙ্গটা উত্থাপন করবেন আমান্ডার কাছে। তারপর আমান্ডাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বারৌনি ফেরার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। ব্যবস্থা করা হয়ত অসুবিধে হবে না। বিনা পাসপোর্টে যখন আসা গেছে যাওয়াও যাবে নিশ্চয়ই। তাছাড়া আমান্ডা এখনও হিন্দোশিয়ার বিদেশ সচিব। সুতরাং ব্যবস্থা একটা হয়ে যাবে। জগাই বলল,’ কিন্তু চিন্তার কথা হচ্ছে যে সোনিয়ার ওজন এখন বেড়ে ৫৫০০ কেজি হয়েছে।‘ সুন্দরী এতক্ষণ চুপ করে ছিল। এখন আর চুপ করে থাকতে পারলো না। বলল,’ তোমরা নিজেরা বসে বসে কী হয়েছ চোখে দেখতে পাচ্ছ? সোনিয়ার একটুখানি ওজন বেড়েছে তাই নিয়ে তোমাদের চিন্তার শেষ নেই।‘জগাই বলল,’ আহা, রাগ করছো কেন? আসার সময় কী হয়েছিল মনে নেই তোমার? প্লেনে তুলতে জীবন বেরিয়ে গিয়েছিল আমাদের।‘ সুন্দরীর রাগ কমল না। বলল,’ শোন, ওকে যদি প্লেনে তোলা না যায় নিতে হবে না সোনিয়াকে। তোমরা চলে যাও। আমি আর সোনিয়া থেকে যাব এখানে।‘ পানু রায় এতক্ষণ ওদের কথোপকথন শুনে বেশ মজা পাচ্ছিলেন। এবার দেখলেন তিনি না থামালে ঝগড়া বন্ধ হবে না। বললেন,’ সুন্দরী, সোনিয়াকে যখন আমরা এনেছি , নিয়ে যাবার দায়িত্ব আমাদের। আমরা তো আছি। ৫৫ কেজির মা আর ৫৫০০ কেজির মেয়েকে ছেড়ে দিয়ে চলে যাব আমরা। তুমি কি আমাদের এতটা স্বার্থপর মনে কর?’ পানু রায়ের আশ্বাস শুনে রাগ কমল সুন্দরীর। বলল,’ দাদু, ১০৫ বছর বয়সে যে দায়িত্ব তুমি নিতে পারলে, ৩০ বছর বয়সে সে দায়িত্ব জগাই নিতে পারছে না। হাজার হলেও সোনিয়া তো ওর মেয়েই হল, না কি? হস্তিনী বলে কি মানুষ নয় ও? ‘বাস্টার সঙ্গে সঙ্গে চেঁচামেচি করে বুঝিয়ে দিল যে কথাটা ওর জন্যেও সত্যি। সুন্দরী তাড়াতাড়ি উঠে গিয়ে বাস্টারকে কোলে তুলে আদর করতে করতে সোনিয়ার দিকে এগিয়ে চলল। হাঁ করে জগাই তাকিয়ে রইল সুন্দরী আর তার ছেলেমেয়েদের দিকে। সুন্দরীর এই অপত্যস্নেহ মাঝে মাঝে অবাক করে জগাইকে। ভয় হয় বাস্টারকে কোলে নিয়ে কোথাও যাবার সময় যদি সোনিয়াকে কোলে নেবার জন্য ওকে বলে তাহলে কী করবে ও? পানু রায় জগাই এর পিঠে হাত রাখেন। বলেন,’ কী দেখছিস জগাই? ভয় করিস না। আমি তো আছি। সংসার সমরাঙ্গনে যুদ্ধ করো দৃঢ়পণে, ভয়ে ভীত হয়ো না কাতর।‘পরম ভরসায় ৩০ বছরের জগাই ১০৫ বছরের পানু রায়ের কাঁধে মাথা রাখে। জগাই এর মাথায় আস্তে আস্তে হাত বুলিয়ে দেন পানু রায়। পানু রায়ের বড় আদরের এই জগাই।

মধ্যাহ্নভোজের সময় আমান্ডার কাছে আস্তে আস্তে কথাটা পাড়লেন পানু রায়। বললেন,’ আমান্ডা, অনেকদিন তো হল হিন্দোশিয়ায়। আর কিছুদিন এমনি করে কাটালে চলচ্ছক্তিরহিত হয়ে যাব আমি। তাছাড়া, আমার নাতি-নাতনিদেরও তো কিছু একটা করতে হবে। তোমার আদরে থেকে থেকে বাঁদর হয়ে উঠলে ওদের ভবিষ্যৎ রসাতলে যাবে যে।‘কথাটা শুনে আমান্ডা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল,’ সত্যি করে বল তো তোমাদের কোনও অসুবিধে হচ্ছে না তো? ‘সকলে হাঁ হাঁ করে বলে উঠল,’ কী যে বলেন ম্যাম! একথা বললে নরকেও জায়গা হবে না আমাদের।‘কেষ্টদা কথাটা ঠিকঠাক না শুনেই বলে উঠল,’ জায়গা না হলে হিন্দোশিয়ায় ফিরে আসব সবাই মিলে।‘সবাই হো হো করে হেসে উঠল। কেষ্টদা বোকার মত তাকিয়ে রইল। মনে মনে ভাবতে থাকল কী এমন হাসির কথা বলেছে সে? কিছু বুঝতে না পেরে পাশে রাখা মিষ্টির প্লেটের দিকে হাত বাড়াল কেষ্টদা। তার বড় ভালবাসার এই জলভরা সন্দেশ। অতি কষ্টে হাসি থামিয়ে আমান্ডা বলল,’ ঠিক আছে আমি যদি সকলের কাজের ব্যবস্থা করে দিতে পারি এখানে তাহলে তো কোনও অসুবিধে হবার কথা নয়। ইন্ডিয়া থেকে কত লোক কত কাঠখড় পুড়িয়ে এখানে কাজের জন্য আসে। আমি একসপ্তাহের মধ্যে তোমাদের কাজের ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। আর তোমাদের মনে হবে না তোমরা বসে বসে খাচ্ছ।‘পচা আনন্দে একেবারে চেয়ার থেকে লাফিয়ে উঠে বলল,’এ তো দারুন ব্যাপার! কি কাজ করতে হবে ম্যাম?’ পাশ থেকে সুন্দরী উত্তর দিল,’ সৈনিকের। ম্যাম যুদ্ধে পাঠানোর জন্য তোকে বেছে রেখেছেন। দাদুর সঙ্গে ম্যামের কথা হয়ে গেছে। কাল থেকে তোর থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা মিলিটারি ক্যাম্পে। খুশি তো? ‘পচার মুখের হাসি মুহূর্তের মধ্যে মিলিয়ে গেল। পানু রায়ের কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে কাঁদোকাঁদো গলায় জিগ্যেস করলো,’ দাদু, সত্যি?’ পচার কষ্ট পানু রায় একদম সহ্য করতে পারেন না। পচাকে সকলের চেয়ে বেশি স্নেহ করেন পানু রায়। পানু রায় হেসে বললেন,’ দুর বোকা, তাই কখনও হয়? ওরা তোকে নিয়ে মজা করছে। তোকে ছেড়ে আমরা কি কেউ থাকতে পারি?‘ হাসিতে মুখটা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে পচার।

একটু ইতস্তত করে পানু রায় বললেন, ’আমান্ডা, দেশে ফেরাটা আমাদের খুব দরকার। তোমার আতিথ্যে আমরা মুগ্ধ। তোমাদের ছেড়ে যাবার কোনওরকম ইচ্ছে আমাদের নেই সে কথা বলা বাহুল্য। দেশে ফিরে হয়ত এত আদর যত্ন আরাম আমাদের জুটবে না। তবুও ঘরের টান! বুঝতে তো পারছোই। তুমি মন খারাপ করো না, আমান্ডা। আমি তোমার সঙ্গে সন্ধ্যাবেলা দেখা করব। তোমাকে এখন আর বিরক্ত করব না।‘ আমান্ডা উঠে এসে পানু রায়ের হাত দু’টো নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে বলল, ’তুমি আমার সবচেয়ে পুরনো বন্ধু। তোমাকে ছেড়ে দিতে আমার মন চাইছে না। কিন্তু তোমার কথাও ফেলা যায় না। তুমি আজীবন মুক্ত বিহঙ্গ। কী সাধ্য আমার যে তোমাকে সোনার খাঁচায় বেঁধে রাখি।‘ আমান্ডার চোখ জলে ভরে যায়। পানু রায় বললেন, ’তোমার মত বন্ধু পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। এতবছর ধরে কত শত জায়গায় আমি ঘুরেছি। কত যে মানুষের সঙ্গে দেখা হয়েছে, বন্ধুত্ব হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। কিন্তু তোমার মত কাউকে পাইনি। যখন সারাজীবনের জন্য তোমাকে চেয়েছিলাম তখন পাইনি। আজ আর জীবনের শেষপ্রান্তে এসে মায়ায় জড়াতে চাইনা। আমান্ডা বলল,’ আমি সে কথা জানি। অন্তর দিয়ে তোমার ভালোবাসা উপলব্ধি করি। তুমি যেখানে ভালো থাকবে সেখানেই থাকো। আমার হৃদয়ে তোমার জায়গা সবসময়। যেদিন ইচ্ছে হবে চলে এসো। সবাইকে নিয়ে এসো। তোমরা আমার পরিবারের চেয়ে কম কিছু নয়।‘ সবাই কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। আমান্ডা সকলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে যাওয়ার আগে পানু রায়কে বলে গেল,’ সন্ধ্যাবেলা এস। কথা আছে।‘

আমান্ডা চলে যাবার পর সুন্দরী পানু রায়ের কাছে এসে দাঁড়ায়। চোখ বড় বড় করে এক গাল ঝকঝকে হাসি মুখে নিয়ে বলে,’ দাদু, তোমার পেটে পেটে এত! আগে গিয়ে আরও কত কী যে দেখব কে জানে?’ ঘরশুদ্ধু সবাই পানু রায়কে ঘিরে দাঁড়ায়। সকলের হাসি মস্করায় মুখরিত হয়ে ওঠে চারদিক।

সেদিন সন্ধ্যাবেলা আমান্ডার সঙ্গে দেখা করে ফিরতে বেশ দেরি হয়ে গেল পানু রায়ের। যখন ফিরলেন তখন নৈশভোজের আয়োজন সম্পূর্ণ। সকলে ডাইনিং হলে পানু রায়ের জন্য অপেক্ষা করছে। সুন্দরী স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিমায় এক গাল হেসে বলল,’ দাদু, এত দেরি হল? ছাড়তে চাইছিল না নিশ্চয়ই। পুরনো প্রেম বলে কথা। কত কথা যে জমে আছে!’ পানু রায় হেসে বললেন,’ সে কথা তো শেষ হবার নয়। কিন্তু যাবার ব্যাপারে যা কথা হল তা এই যে আমাদের উড়োজাহাজের ব্যবস্থা আমান্ডা করবে যাতে সোনিয়াসহ আমরা সকলে একসঙ্গেই যেতে পারি। আগামী রবিবার মধ্যাহ্নভোজের পর আমরা বেরিয়ে পড়ব। হিন্দোশিয়ার প্রথাগত পদ্ধতি মেনে আমাদের বিদায়ী মধ্যাহ্নভোজে হিন্দোশিয়ার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত থাকবেন। অতএব এবার আমাদের গোটাবার পালা। সুতরাং চলো বারৌনি!! মাধাই, তোমার লোকজনদের খবর দিয়ে দাও আমরা সদলবলে রবিবার বারৌনি পৌঁছচ্ছি। এবার খাওয়া শুরু করা যাক।‘


দ্বিতীয় পর্ব - আমান্ডা আর পানু রায়ের কথা

ওরা সবাই বারৌনি এসে পৌঁছেছে প্রায় ছ’মাস হয়ে গেল। অনেকদিন না থাকার জন্য বেশ কিছু কাজ জমে গিয়েছিল সবার। তার ওপর হিন্দোশিয়াতে অতিরিক্ত অনেকটা সময় কাটিয়েছে সবাই। সমুদ্রের ধারে প্রাসাদোপম বাংলোতে আমান্ডার অভাবনীয় আতিথ্য উপেক্ষা করে ফিরে আসা সম্ভব ছিল না ওদের পক্ষে। অবশেষে মাধাইএর মাথাতেই এই মাত্রাতিরিক্ত অবসর যাপনের অপকারিতার কথা এসেছিল। তা না হলে আরও কতদিন যে ওখানে কেটে যেত কে জানে। যাই হোক সবকিছু ঠিকঠাক করে এখন মোটামুটি সবাই বেশ স্থিতু। আজ ব্রেকফাস্ট টেবিলে আমান্ডার কথাটা উত্থাপন করল সুন্দরী। আমান্ডার সঙ্গে পানু রায়ের সম্পর্কটা ঠিক কী ছিল সেটা কিছুতেই স্পষ্ট করে বুঝতে পারছিল না সুন্দরী। দেখে মনে হয় আমান্ডা খুব বেশি হলে পনের বছরের ছোট পানু রায়ের থেকে। একটা মিষ্টি মধুর সম্পর্ক যে এককালে ছিল দু’জনের কথাবার্তায় বেশ বোঝা যায়। একটা রোমান্টিকতার আভাস দু’জনের আচরণে সুন্দরী যে মাঝেমাঝে লক্ষ করেনি তা নয়। ব্যাপারটা আরও বিস্তারিত ভাবে জানার ঔৎসুক্যে ভালো করে ঘুম হচ্ছিল না সুন্দরীর। জগাইএর সঙ্গে কয়েকবার আলোচনাও হয়েছে সুন্দরীর এ নিয়ে। আজ আর নিজেকে সামলাতে না পেরে জিগ্যেস করে বসল,’ দাদু, আমান্ডার সঙ্গে তোমার সম্পর্ক কি শুধুই বন্ধুত্বের না আরও কিছু? অনেকদিন ধরে তোমাকে জিগ্যেস করব করব করে সাহস করে উঠতে পারিনি। তারপর মনে হল তুমি তো আমাদের একেবারে নিজের মানুষ। তোমার কাছে আমরা গল্প শোনার আবদার তো করতেই পারি।‘ সুন্দরীর কথা শুনে সবাই হৈ হৈ করে পানু রায়কে ঘিরে বসল। পানু রায় বললেন,’ হ্যাঁ, গল্পই বলা যেতে পারে। খাওয়া শুরু কর সবাই। খেতে খেতে বলছি।‘ পানু রায় যা বললেন তা এইরকম।

আজ থেকে প্রায় ৭০ বছর আগের কথা। পৃথিবীর নানা দেশ ঘুরে পানু রায় তখন রাশিয়ায়। পানু রায়ের কাজ ছিল ওখানকার জেলবন্দিদের কম্যুনিজমের প্রাথমিক পাঠ দেওয়ার। যাতে জেলবন্দিরা এই তত্ত্বে বিশ্বাস করতে শুরু করে এবং রাশিয়ার প্রতি তাদের ভালোবাসা জন্মায়। সেইসময় নানান জেলে ঘুরতে ঘুরতে পানু রায়ের সঙ্গে দেখা হয় রবার্ট আইনস্টাইনের । রবার্ট জার্মানির লোক। প্রায় তার সমবয়সী। রবার্ট নিজের বয়স কত নিজেও ঠিকমত জানত না। রবার্টের কথা অনুযায়ী অ্যালবার্ট আইনস্টাইন নাকি ওর দূর সম্পর্কের আত্মীয় ছিল। হিটলারের অত্যাচারে অনেকেই তখন দেশ ছেড়ে পালাচ্ছে। সেই সময় আরও অনেকের সঙ্গে জার্মানি ছেড়ে পালায় রবার্ট। পালাতে পালাতে এসে পৌঁছয় রাশিয়ার সীমান্তে। বিনা পাসপোর্টে সীমানা পেরোনোর সময় মিলিটারি পুলিশের হাতে ধরা পড়ে রবার্ট। তারপর প্রায় দশ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে কিন্তু বিনা বিচারে রাশিয়ার জেলে বন্দি হয়ে আছে জার্মানিরা। ইতিমধ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে। হিটলারের ভয়ে যারা পালিয়ে গিয়েছিল তারা জার্মানিতে ফিরে আসছে কিন্তু তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়নি। রবার্টের কাহিনী শুনে তার হয়ে জেল কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানান পানু রায়। এক বছর ধরে অনেক তদ্বির তদারকি করে রবার্টকে জেলের বাইরে নিয়ে আসার অনুমতি আদায় করেন পানু রায়। পানু রায়ের কাছে থেকে জার্মানিতে যোগাযোগ করে রবার্ট জানতে পারে ইতিমধ্যে তার বাবা এবং কাকা দু’জনেই মারা গেছেন। রবার্টের মা রবার্ট দেশ ছাড়ার অনেক আগে মারা গেছেন। কাকা বিয়ে করেননি এবং তাদের সঙ্গেই থাকতেন। যেহেতু রবার্ট তার বাব-মার একমাত্র সন্তান সুতরাং উত্তরাধিকারসূত্রে পরিবারের স্থাবর এবং অস্থাবর সমস্ত সম্পত্তির মালিক এখন রবার্টই। রাশিয়ার বিদেশ দপ্তরে আবেদন নিবেদন করে রবার্ট পানু রায়কে সঙ্গে নিয়ে জার্মানি যাবার অনুমতি সংগ্রহ করল। শর্ত রইল ছ’মাসের মধ্যে ফিরে আসতে হবে। দেশে গিয়ে জায়গা-জমি-ঘর-বাড়ি সব বিক্রি করে , ব্যাঙ্কের কাজ মিটিয়ে রাশিয়া ফিরে এল দু’জনেই। তারপর রাশিয়ায় বেশ কিছুদিন কাটল দু’জনের। একসঙ্গে থাকতে থাকতে বন্ধুত্ব গাঢ় হয়ে উঠল পানু রায় আর রবার্টের। বয়সের ব্যবধান কোনও বাধার সৃষ্টি করল না। রবার্ট ছিল প্রায় দশ বছরের বড়। থাকতে থাকতে পানু রায়ের চাকরির মেয়াদ ফুরিয়ে গেল। পানু রায়ের কাজে সন্তুষ্ট হয়ে রাশিয়া সরকার চুক্তির মেয়াদ এবং অর্থের পরিমাণ দুই-ই বৃদ্ধি করতে রাজি হল। কিন্তু বাধ সাধল রবার্ট । রবার্ট বলল ,’ তোমার জন্য আমার জীবনটা পালটে গেল। আজ যে আমি এত অর্থের মালিক তা তুমি না হলে সম্ভব হত না। তোমাকে আর চাকরি করতে হবে না। চল ক’টা বছর অন্য কোথাও ঘুরে আসি। সব খরচ আমার। তুমি আপত্তি কোরো না।‘ রবার্টের আবদারে অনুরোধে রাজি হয়ে গেল পানু রায়। ফিরে এসে দপ্তরে আবার কাজে যোগদান করবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বেরিয়ে পড়ল পানু রায় আর রবার্ট। এখান ওখান ঘুরে অবশেষে হিন্দোশিয়া পৌঁছে মনে হল এখানে সমুদ্রসৈকতে বেশ কিছুদিন কাটানো যেতে পারে। সমুদ্রের ধারে একটা ছোট কিন্তু সুন্দর হোটেল ভাড়া করে থাকতে আরম্ভ করল দুই বন্ধুতে। সেই হোটেলে পরিবেশিকার কাজ করত আমান্ডা। আমান্ডার মাথা আর মন যে কোথায় থাকত কে জানে। তাকে ভদকা আনতে বললে নিয়ে এসে হাজির করত কলার শরবৎ। অমলেট আনতে বললে চিকেন কাবাব নিয়ে এসে হাজির হত। এককথা একশ’বার বললেও মাথায় ঢুকতোনা আমান্ডার। একদিন ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে গেল পানু রায়ের। প্রচন্ড রাগারাগি করল আমান্ডার ওপর। আমান্ডা মুখ ভার করে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। কিছুক্ষণ পরে আবার যে কে সেই। রেগেমেগে পানু রায় চলল ম্যানেজারের কাছে অভিযোগ জানাতে। এই মেয়েকে দিয়ে আর চলবে না তাদের। পানু রায় চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াবার সঙ্গে সঙ্গে তার হাত চেপে ধরল রবার্ট। বলল,’ থাক না। আমান্ডার মাথাটা একটু মোটা ঠিকই কিন্তু মুখটা ভারি সুন্দর। একটু মানিয়ে গুছিয়ে নিলে কোনও অসুবিধে হবেনা।‘ অবাক হয়ে রবার্টের মুখের দিকে তাকিয়ে পানু রায়ের মনে হল রবার্টের চোখ অন্য কিছু বলছে। পানু রায় জিজ্ঞাসা করলেন,’ তোমার কী হয়েছে, রবার্ট? সত্যি করে বলতো। তোমার চোখ মুখ তো অন্য কিছু বলছে। তুমি কি শেষ অবধি হাঁটুর বয়সী মেয়েটার…?’ লজ্জায় রবার্টের মুখ লাল হয়ে উঠল। চেয়ারে আবার বসে পড়লেন পানু রায়। ভালোবাসার গতি কি বিচিত্র!

এতটা শুনে সুন্দরী জিগ্যেস করল,’ তারপর? ‘পানু রায় বুঝতে পারলেন সবাই যেটা শুনতে চাইছিল সেটার সঙ্গে গল্পটার কোনও মিল পাওয়া যাচ্ছে না। স্বাভাবিকভাবেই হতাশ ওরা সবাই। বিশেষ করে সুন্দরী। পানু রায় মুচকি হেসে বললেন,-তারপর আর কী? সারারাত নিজেদের মধ্যে আলোচনা সেরে পরের দিন সকালে আমি আর রবার্ট খুঁজে খুঁজে আমান্ডার বাড়ি পৌঁছে গেলাম। আমান্ডা ততক্ষণে হোটেলের জন্য বেরিয়ে গেছে। ওর বাবার সঙ্গে দেখা করে সবকথা বললাম। রবার্ট মাথা নিচু করে বসে রইল সারাক্ষণ। সব শুনে আমান্ডার বাবা বলল,’ আপনারা ঠিক বাড়িতে এসেছেন তো? মানে আমি জানতে চাইছি আপনারা আমার বড় মেয়ের কথা বলছেন? ওর নামও আমান্ডা। সাত আটটা জায়গায় কাজ খুইয়ে ক’মাস হল একটা হোটেলে কাজ করছে এখন। কতদিন করতে পারবে কে জানে?’ আমরা ভদ্রলোককে আশ্বস্ত করে বললাম,’ হ্যাঁ,আমরা ওনার মেয়ে আমন্ডের জন্যই এসেছি। রবার্ট ওকে বিয়ে করতে চায়।‘ ভদ্রলোক ধাতস্থ হয়ে একগ্লাস জল ঢকঢক করে গলায় ঢেলে তাড়াতাড়ি ভিতরে গিয়ে স্ত্রীকে ডেকে নিয়ে এলেন। সব জেনেশুনে আমান্ডার বাবা-মা রাজি হয়ে গেল। বাড়ি ফেরার পথে মনের আনন্দে রবার্ট আমাদের দু’জনের জন্য একজোড়া স্যুট আর জুতো কিনে ফেলল। হোটেলে ফিরে সারাদিন ধরে খাদ্য আর পানীয়ের অর্ডার যোগান দিতে গিয়ে হিমশিম খেয়ে কেঁদে ফেলল আমান্ডা। আমিও অবাক হয়ে দেখছি ভুলভাল যা এনে দিচ্ছে আমান্ডা তাই মহানন্দে উদরস্থ করে নিচ্ছে রবার্ট। আজকে একটাও ভুল হয়নি ভেবে নিজেই কেমন যেন ঘাবড়ে গেল আমান্ডা। চোখগুলো বড় বড় করে বোকার মত তাকিয়ে রইল আমার দিকে। বোধ হয় জিগ্যেস করতে চাইছে,’ সত্যিই কি আমি একটাও ভুল করিনি?’ কিন্তু কী করে আমি বলি,’ ভুল, সবই ভুল’? কোনটা যে ঠিক আর কোনটা যে ভুল সব হিসেব গুলিয়ে গেল আমার। মদে বেহুঁশ হয়ে ওখানেই ঘুমিয়ে পড়ল রবার্ট। আমি আর আমান্ডা দু’জনে মিলে ধরাধরি করে কোনওক্রমে ওকে ঘরে নিয়ে গিয়ে শুইয়ে দিলাম।

বিস্ময়ের পালা তখনও শেষ হয়নি।আরও সব গোলমাল হয়ে গেল যখন পরের দিন সকালে আমান্ডা এসে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল,’ এত বড় সাহস ঐ বুড়ো মাতালটার যে কাল আমি বেরোবার পর বাবাকে বুঝিয়ে এসেছে যে ও আমাকে বিয়ে করতে চায়। কোনও লাজলজ্জা নেই। ঠিকসময় বিয়ে হলে আমার বয়সী একটা মেয়ে হত ওর। তাই ভাবছি যা দিচ্ছি কোনও কথা না বলে কেন গিলে নিচ্ছে বুড়োটা? এমনতো হবার কথা নয়। আর এই যে তুমি শুঁড়ির সাক্ষী মাতাল। তুমিও গিয়েছিলে ওটার সঙ্গে সঙ্গে আমার সর্বনাশ করতে।‘কথা শেষ করতে না করতেই হাউ হাউ করে কেঁদে উঠল আমান্ডা। ওর কান্না দেখে চিৎকার করে কান্না শুরু করে দিল রবার্ট। হোটেলের আর আশেপাশের সমস্ত মানুষ হাঁ করে দেখতে থাকল এই দৃশ্য, শুনতে থাকল রবার্ট আর আমান্ডার যুগলবন্দী। কান্না থামলে আস্তে আস্তে নিজের ঘরে চলে গেল রবার্ট। সারাদিন ঘর থেকে বেরোলো না। একটা দানাও মুখে কাটলো না।‘বাড়ি যাবার আগে আমান্ডা আমার কাছে এল। বলল,’ আমার খুব খারাপ লাগছে। আমার এতটা উত্তেজিত হওয়া ঠিক হয়নি। উনি আমার বাবার কাছে গিয়ে আমাকে বিবাহের প্রস্তাব দিয়েছেন। সে উনি দিতেই পারেন। রাজি হওয়া না হওয়া আমার ব্যাপার। কিন্তু আমার ওনার প্রতি এই আচরণ ঠিক হয়নি।‘ আমি তো অবাক। যে মেয়ের মাথায় কিছু নেই বলেই আমি জানি আর আজ সকালে যার এমন রণচন্ডী রূপ আমি দেখেছি সেই মেয়ে এত গুছিয়ে শান্তস্বরে কথা বলছে? কে জানে মেয়েরা বোধ হয় এরকমই হয়। বাইরে যতই কঠিন হোকনা কেন ভেতরে তারা সত্যিই কোমল। আমি বললাম,’ এসব কথা আমাকে বলে লাভ কী? তুমি রবার্টের কাছে তোমার অনুতাপের কথা জানিও।‘আমান্ডা বলল,’ সকালের ঘটনার আমি ওনার মুখোমুখি হতে পারবো না। আপনি অনুগ্রহ করে ওনাকে জানিয়ে দেবেন যে আমি আমার আচরণের জন্য সত্যিই দুঃখিত।‘আমি চুপ করে রইলাম। তারপর জিজ্ঞাসা করলাম,’ আচ্ছা,একটা কথা বলবে? আজ সকালে তুমি এরকম অস্বাভাবিক আচরণ করলে কেন? ওনাকে কেন এভাবে আক্রমণ করলে? সামান্য কারণে হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে যাওয়া কি তোমার স্বভাবজাত?’ আমান্ডা বলল,’ একেবারেই না। আসলে আশাভঙ্গই আমার উত্তেজনার কারণ। আমি যা চেয়েছিলাম তা না পাবার জ্বালা থেকেই আমি এসব করে ফেলেছি। মনের দুঃখ, অপমান চেপে রাখতে পারিনি।‘ আমি বললাম,’ আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না। রবার্ট তোমার আশাভঙ্গের কারণ হলো কী করে? তা ছাড়া সে তো তোমাকে কোনও কষ্ট, যন্ত্রণা, আঘাত দেয়নি। তাহলে?’ আমান্ডা বলল,’ না না ওনার কোনও দোষ নেই। কেউ কোনও দোষ করেনি। সবই আমার চাওয়া আর তা না পাওয়ার দোষ। আমি আপনাকে বোঝাতে পারবো না।‘আমার মাথায় জেদ চেপে গেল। আমান্ডার বাবার কাছে রবার্টের প্রস্তাবে কী এমন ঘটল আমান্ডার জীবনে যে সে স্থান কাল পাত্র ভুলে রবার্টকে হেনস্থার চূড়ান্ত করল? আমান্ডার বাবা তো এই প্রস্তাবে খুশিই হয়েছিল। আশাভঙ্গ যদি কারও হয়ে থাকে তবে তা রবার্টের। এ তো দেখি উলটো কথা বলে। আমি বললাম,’ কী আশা করেছিলে তুমি যা ঘটলো না? কী চেয়েছিলে তুমি যা পেলে না? তোমাকে স্পষ্ট করে বলতেই হবে।‘ আমান্ডার মুখ লজ্জায় লাল হয়ে উঠল। বলল,’ সে আমি আপনাকে বলতে পারবো না।‘ আমি বললাম,’ না তা হয়না । জানতে আমাকে হবেই।রবার্ট আমার বন্ধু। তার অপমান আমারও অপমান। সেই অপমানের কারণ না জানলে আমার মন কিছুতেই শান্ত হবে না।‘ আমান্ডা মুখ নামিয়ে নিজের পা-এর দিকে বলল,’ আপনি যখন জানতেই চাইছেন তাহলে শুনুন। অনেকদিন ধরে আমি আপনাকে লক্ষ করছিলাম। আপনার চোখের ভাষা দেখে আমি আশা করেছিলাম আপনি হয়ত আমাকে প্রস্তাব দেবেন। মনে মনে আমি আপনাকে চেয়েছিলাম। ওনাকে নয়।‘ আমান্ডার কথা শুনে আমার তো প্রায় চেয়ার থেকে পড়ে যাবার মত অবস্থা। জীবনে এই প্রথম কোনও মেয়ে আমাকে বলল যে সে আমাকে পছন্দ করে। আমি হাঁ করে আমান্ডার দিকে তাকিয়ে কতক্ষণ বসেছিলাম কে জানে? সম্বিৎ ফিরল আমান্ডার গলার আওয়াজে। বলল,’ আপনি অবাক হলেন? আপনি জানতে চাইলেন তাই বললাম। আপনি কিছু মনে করবেন না।‘আমি বললাম,’ আমি তো কিছুই বুঝতে পারিনি। তুমি আমাকে সরাসরি বললে না কেন? নিজের ইচ্ছের কথা নিজের মনে গোপন করে রাখতে গেলে কেন? রবার্টকে দেখ। সে তার মনের কথা তোমার বাবার কাছে সোজাসুজি স্পষ্ট ভাবে জানিয়ে এসেছে। ওর ভালোবাসায় কোনও দ্বিধা নেই, একেবারে নিখাদ। তোমার প্রত্যাখানে ভয়ঙ্কর আঘাত পেয়েছে ও।‘আমান্ডার চোখ দু’টো জলে ভরে উঠলো। আমি বললাম,’ আমান্ডা, রবার্ট আমার বন্ধু। সে তোমাকে সত্যিই ভালোবাসে। তুমি তাকে প্রত্যাখ্যান করতেই পারো। সে তোমার স্বাধীনতা। কিন্তু তোমার ডাকে আমি কী করে সাড়া দিই বল? আমার প্রাণের বন্ধুর সঙ্গে এত বড় বিশ্বাসঘাতকতা আমি কী করে করব? আর তুমি হয়ত জাননা তোমার বারবার ভুলের জন্য তোমার নামে আমি তোমার ম্যানেজারের কাছে নালিশ করতে যাচ্ছিলাম। রবার্ট আমাকে নিরস্ত করেছিল। বলেছিল সে তোমাকে ভালোবাসে। এখন আমি বুঝতে পারছি তুমি কেন বারবার ভুল করছিলে? দুঃখ পেয়োনা আমান্ডা। রবার্টের কথাটা ভেবে দেখো। আমি কয়েকদিনের মধ্যেই হিন্দোশিয়া ছেড়ে চলে যাব। রবার্টকে বিয়ে কর। সে তোমাকে খুব ভালো রাখবে।‘আমার কথা শেষ হবার আগেই আমান্ডা এক দৌড়ে হোটেলের ভিতরে ঢুকে গেল।

সেদিন রাত্রে রবার্ট কিছু খেল না। একবারের জন্যও ঘরের বাইরে এল না। আমি অনেকবার ডাকলাম। শরীর খারাপের অজুহাত দিয়ে নিজেকে ঘরের মধ্যে বন্দি করে রাখল। পরেরদিন সকালে আমি যখন লনে গিয়ে বসলাম দেখলাম রবার্ট দূরে একটা পাথরের ওপর বসে একমনে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে আছে। আমি আস্তে আস্তে গিয়ে ওর পাশে বসলাম। ওর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। আমাকে দেখে একেবারে হাউ হাউ করে কেঁদে উঠল। বুঝলাম প্রত্যাখ্যান আর অপমানের জ্বালা অশ্রু হয়ে ঝরে পড়ছে ওর দুই চোখ দিয়ে। অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে ওকে শান্ত করে ব্রেকফাস্ট টেবিলে নিয়ে এলাম।যা ঘটে গেছে তা অনাবশ্যক জিইয়ে রেখে কোনও লাভ নেই। অস্বস্তির আবহাওয়াটা কেটে গিয়ে যত তাড়াতাড়ি সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যায় ততই মঙ্গল। ভাবলাম আমান্ডাকে বুঝিয়ে তার ব্যবহারের জন্য রবার্টের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিতে বলব। কিন্তু ব্রেকফাস্ট টেবিলে গিয়ে শুনলাম আমান্ডা আজ আসেনি। ভাবলাম ঠিক আছে কাল বা পরশু যেদিন আসবে সেদিনই ব্যাপারটা মিটমাট করে নেওয়া যাবে। এই মূহূর্তে আমান্ডা হয়ত রবার্টের মুখোমুখি হতে চাইছে না। একটু সময় গেলে আমান্ডা এবং রবার্ট দু’ জনেরই উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত হবে । তখন সামনাসামনি কথা বলাটা অনেক সহজ হয়ে যাবে হয়ত। কিন্তু যা ভাবলাম তা হল না। দেখতে দু’ সপ্তাহ কেটে গেল আমান্ডার দেখা নেই। ম্যানেজারের কাছে খোঁজ নিলাম। সে বলল আমান্ডা কোনও খবর দেয়নি। আর ক’টা দিন দেখে হোটেল আইনমাফিক ব্যবস্থা নেবে। আমার ব্যাপারটা খুব সুবিধের মনে হল না। আমারও যে আমান্ডার প্রতি একটা দুর্বলতা আস্তে আস্তে তৈরি হচ্ছে বেশ বুঝতে পারছিলাম। কিছুটা কৌতূহল কিছুটা আমান্ডাকে দেখার ইচ্ছে সব মিলিয়ে ভাবলাম যদি পরেরদিন সকালেও আমান্ডা না আসে তাহলে বেলার দিকে ওর বাড়িতে একবার যাব। আমি একাই যাব স্থির করলাম। রবার্টকে কিছু বললাম না। কিন্তু তার আর দরকার হলো না। সকালবেলা নিচে নেমে দেখি লনের চেয়ারে আমান্ডা আর ওর বাবা বসে আছে। রবার্ট তখনও নামেনি। আমাকে দেখতে পেয়ে ওরা দু’জনেই আমার দিকে এগিয়ে এলো। আমান্ডা আমাকে বলল,’ ওদিকে আসুন, জরুরি কথা আছে।‘ আমি আমান্ডার বাবার দিকে তাকালাম। উনি চোখের ইঙ্গিতে সম্মতি দিলেন। একটু দূরে গিয়ে আমান্ডা আমাকে বলল,’ গত পনেরদিন অনেক ভেবে বাবার সঙ্গে কথা বলে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমি রবার্টকে বিয়ে করব। কিন্তু একটা শর্তে। তুমি আমাদের ছেড়ে যেতে পারবে না। তোমাকে আমাদের সঙ্গেই থাকতে হবে। তুমি যদি রাজি হও তাহলে বাবা আজই রবার্টের সঙ্গে কথা বলবে। তার আগে আমি আমার অন্যায় আচরণের জন্য রবার্টের কাছে ক্ষমা চেয়ে নেব।‘ আমি কী বলব বুঝে উঠতে পারলাম না। কিন্তু আমান্ডার যা জেদ তাতে আমি কথা না দিলে হয়ত আবার ফিরে যাবে। আমার এই প্রস্তাবে রাজি না হওয়ার জন্য যদি ওদের বিয়েটা আটকে যায় তাহলে আমি নিজের কাছে এবং ওদের কাছে অপরাধী হয়ে থাকব সারাজীবন। বিশেষ করে যখন আমান্ডা রবার্টকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছে। আমি আমান্ডার প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেলাম। আমান্ডার বাবা আমাদের কাছে সব শুনে বললেন,’ আমি রবার্টকে গিয়ে খবরটা দিই। রবার্টের প্রস্তাবে আমি সম্মত ছিলাম গোড়া থেকেই। মাঝখান থেকে আমার মেয়েটাই পাকালো যত গন্ডগোল। যাক সবকিছু ভালোভাবেই মিটে যাবে মনে হচ্ছে। ‘ আমি আমান্ডাকে বললাম ,’ তুমিও যাও বাবার সঙ্গে। বাবা কথাটা বলার আগেই তুমি ক্ষমা চেয়ে নিও।‘ আমান্ডা শান্ত মেয়ের মত বাবার পিছু পিছু রবার্টের ঘরের দিকে হাঁটা দিল। কত পাল্টে গেছে মেয়েটা গত পনেরদিনে।

এই পর্যন্ত শুনে সুন্দরী বলল,’ আমান্ডার গল্প তো শুনলাম। কিন্তু তুমি কী করলে?’

পানু রায় বললেন- তারপর ধুমধাম করে আমান্ডা আর রবার্ট এর বিয়ে হয়ে গেল। আমি আর কী করি? কাবাব মে হাড্ডি হয়ে থেকে গেলাম ওদের সঙ্গে। রবার্ট এবং আমান্ডা দু’জনেই আমাকে কিছুতেই ছাড়তে চাইল না। যাবার কথা উঠলেই দু’জনে এত ছেলেমানুষি করত যে যাওয়া হয়ে উঠত না। সত্যি কথা বলতে কী ওদের বন্ধন ছেড়ে যেতে আমারও মন চাইত না। দেখতে দেখতে দু’বছর কেটে গেল। হোটেলের চাকরি ছেড়ে আমান্ডা সরকারি দপ্তরে চাকরিতে ঢুকে গেল। হিন্দোশিয়ায় টাকা খরচ করলে বা বলা ভাল ঠিক জায়গায় টাকা দিতে পারলে ডিগ্রি সার্টিফিকেট আর সরকারি চাকরি জোগাড় করা এমন কোনও বড় ব্যাপার নয়। বলা যেতে পারে সরকারি চাকরি পাবার এটাই একমাত্র রাস্তা ছিল। রবার্টের টাকার কোনও অভাব ছিল না। ঠিকঠাক জায়গায় টাকাকড়ি দিয়ে আমান্ডাকে বিদেশ দপ্তরে ঢুকিয়ে দিল। আমান্ডার বাবার অনেক জানাশোনা ছিল কিন্তু টাকার জন্য কিছু করতে পারছিল না। রবার্ট প্রভূত পরিমাণে টাকা খরচ করে নিজে রাজনীতিতে যোগ দিল। হিন্দোশিয়াতে ভোট হয় ঠিকসময় কিন্তু সরকার পাল্টায় না কোনওবার। গত চল্লিশ বছর ধরে একই দল সরকার চালাচ্ছে। পয়সা খরচ করে কর্পোরেশন ভোটে একটা টিকিট জোগাড় করে ফেলল রবার্ট। হিন্দোশিয়ায় টিকিট পাওয়াটাই আসল। বিরোধীপক্ষ বলে কিছু নেই সুতরাং ভোটে হারার কোনও ব্যাপার নেই। টিকিট পাওয়া মানেই কাউন্সিলর হওয়া। ওপর মহলে আমান্ডার বাবার যোগাযোগ আর রবার্টের টাকা এই দুই এর মিলিত শক্তিতে জনপ্রতিনিধিত্বের প্রথম ধাপ অতিক্রম করল রবার্ট। বাকিটা টাকার খেলা। টাকার অঙ্কের ওপর নির্ভর করবে বিধানসভার সদস্যপদ, মন্ত্রীত্ব, লোকসভার সদস্যপদ ইত্যাদি ইত্যাদি। রবার্ট যেদিন কাউন্সিলর হল আমান্ডা জানাল সে মা হতে চলেছে। আমান্ডা যারপরনাই ব্যস্ত হয়ে পড়ল। রবার্টেরও সময় নেই। মনে ইচ্ছে থাকলেও রবার্ট এবং আমান্ডা কেউই সময় দিতে পারছিল না আমাকে। বুঝতে পারতাম একটা অপরাধবোধ কাজ করছে ওদের মধ্যে। ওদের অস্বস্তি না বাড়িয়ে আমি সুইডেনে একটা চাকরি জোগাড় করে ওদের কাছে বিদায় চাইলাম। রবার্ট প্রস্তাব দিল চাকরির জন্য সুইডেনে যাবার দরকার নেই। হিন্দোশিয়াতেই আমার একটা উচ্চপদস্থ সরকারি চাকরির ব্যবস্থা করে দেবে সে। আমি রাজি হলাম না। বেশ কিছুদিন টানহ্যাঁচড়ার পর ওরা আমাকে যেতে দিতে রাজি হল কিন্তু শর্ত রইল সময় পেলেই আমি যেন হিন্দোশিয়ায় যাই। তারপর যা হয়। প্রথম প্রথম কয়েকবার গিয়েছিলাম। এর মধ্যে রবার্ট মন্ত্রী হল। আমান্ডার বছর বছর পদোন্নতি হতে থাকল। আমান্ডার কোলে দ্বিতীয় সন্তান এল। তারপর যোগাযোগ ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে গেল। ফোনে যোগাযোগ করাও খুব একটা সহজ ছিল না তখন। বেশ কিছুদিন পরে একদিন খবর পেলাম রবার্ট খুব অসুস্থ। গেলাম হিন্দোশিয়া। বেশ কিছুদিন যমে মানুষে টানাটানির পর রবার্ট চলে গেল। কিছুদিন রইলাম হিন্দোশিয়াতে। ধাক্কা সামলিয়ে আমান্ডা অফিস জয়েন করার পর ফিরে এলাম সুইডেনে। তারপর অনেকদিন আর যাওয়া হয়নি হিন্দোশিয়ায়। বারৌনি আসার পর তোরা সবাই যেতে চাইলি বলে আবার যাওয়া হল হিন্দোশিয়া।
11
undefined undefined undefined

গল্প - অচিন্ত্য দাস

Posted in






কলেজ পাশ করে চাকরি খুঁজতে খুঁজতে হয়রান হয়ে চায়ের দোকানে যখন একদিন বসে ভাবছি ‘পরবর্তী পদক্ষেপ’ কী নেওয়া যায়, পকেটে রাখা ফোন বেজে উঠল। উফ, একেই বলে ভাগ্য! চাকরির ফোন। তাও আবার স্বয়ং এম ডি ফোন করেছেন। ঢুকেই ম্যানেজারের পদ, কোলকাতার বাইরে এক প্রাইভেট ফার্মে।

ফোন করেছিলেন সত্যেন কাকা, আমার খুড়তুতো কাকা হন, বারাসাতে থাকেন। বললেন, “মধুপুরে আমার যে যাত্রীনিবাস মানে হোটেলটা আছে তার ম্যানেজার কাজ ছেড়ে দিয়েছে। তুই করবি? মাইনে বেশি দিতে পারব না কিন্তু অভিজ্ঞতা তো হবে …”


দেরি না করে তিন দিনের মধ্যে মধুপুর গিয়ে ‘কার্যভার গ্রহণ’ করলাম। ছোট হোটেল, দোতলা বাড়িতে গোটা আটেক ঘর আছে। দোতলার সামনেটা জুড়ে বেশ চওড়া বারান্দা। সামনে একটু ঘাস, আগাছা আর দু-চারটে কলাবতী ফুলের গাছ নিয়ে একখানা বাগানও আছে। এই অঞ্চলের মোটামুটি চালু হোটেল, সস্তা আর রাস্তার কাছে বলে বোধ হয়।

ওরে বাবা! হোটেল চালাতে তো দেখছি মেলা হ্যাপা! খাটনি আছে তাছাড়া সবকিছু চোখে চোখে রাখতে হয়। মাস খানেক লেগে গেল কাজটা ঠিক করে বুঝতে।

তারপর একদিন সত্যেন কাকার ফোন এলো। ভূমিকা ছাড়াই বললেন, “যা খবর পেলাম তাতে মনে হচ্ছে তুই কাজটা ধরে নিয়েছিস। ভালো। এ মাস থেকে তোর মাইনে একটু বাড়িয়ে দিলাম।”

আমি তো আল্হাদে আটখানা। এক মাসেই এম ডি মাইনে বাড়িয়ে দিলেন!!

সত্যেন কাকা তখনো ফোন কাটেননি। বললেন, “আর শোন, এই ধরনের কাজে ‘সফ্ট স্কিল’ খুব দরকার। সেটা তোর কম, তোকে শিখতে হবে।”

“কী স্কিল বললে?”

“সফ্ট। মানে অতিথিদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করবি যেন ওদেরই হোটেল। যা চাইবে তাতে কখনো না বলবি না কিন্তু তার মানে এই নয় যে সব করতে হবে। হ্যাঁ, যতটা সম্ভব ততটা করিস।এতে অতিথিরা বারবার ফিরে আসে। বুঝলি তো ব্যাপারটা।”

কথাটা বুঝলাম। এও বুঝলাম হোটেল চালাতে গেলে এ না হলেই নয়। নিজেকে ‘তরু হতে যে বা হয় সহিষ্ণু’ ধরনের হতে হবে। নিজেকে এই দিকে যতটা পারি পাল্টে নেবার চেষ্টা করলাম, খানিকটা পারলাম বলেই মনে হয়। যেমন সেদিন দুপুরের দিকে এক বয়স্ক স্বামী-স্ত্রী এলেন। ভদ্রলোক আমাকে দেখে যেন একটু অবাক হলেন। স্ত্রীকে বললেন, “নতুন লোক।”

বললাম. “হ্যাঁ স্যার। আমি এই মাস দুয়েক জয়েন করেছি। কতদিন থাকবেন স্যার … ডবল বেড …”

“ভাড়া আমি জানি, বাড়াওনি তো আবার? তাহলে অন্য হোটেল দেখবো। এই নিয়ে তিনবার এলাম।”

ভদ্রলোক আধার কার্ড বাড়িয়ে দিলেন। নাম দেখলাম সুশীতল বসু। একতলার একটা ঘর দিচ্ছি বলতে উনি আপত্তি করে উঠলেন। “না রে বাবা, আমার দোতলার ঘর চাই। তোমাদের হোটেলের ওই দোতলার বারান্দাটাই তো আসল, বসে বসেই সময় কেটে যায়।”

কাকার কথা মনে পড়ে গেল। খুব বিনীত ভাবে বললাম, “আজ তো খালি নেই স্যার, কিন্তু কাল খালি হচ্ছে। তখন আপনারা ওটা নেবেন। আর বারান্দা? আজকে বিকেলের চা টা স্যার নয় দোতলার বারান্দায় বসেই খাবেন, ব্যবস্থা করে দেবো।”

রাজি হয়ে গেলেন।

মার্কামারা পাতি বাঙ্গালি মধ্যবিত্ত পরিবার। অন্য জায়গায় কি এত খাতির পেতেন এনারা? এই যে খাতির করছি এটা আমার সদ্য শেখা ‘সফ্ট স্কিল’!

বিকেলে একবার দোতলায় দেখে আসতে গেলাম। বেতের চেয়ারে বসেছেন দুজনে। মহিলার গলা সিঁড়ি থেকেই কানে আসছিল। “বিস্কুটগুলো বড় মিষ্টি, একটাই খাবে। আর এবার থেকে চায়ে চিনি কম করো নয় বাদ দাও। সুগার তো বেশ বেড়েছে।”

“আরে ছাড়ো তোমার সুগার। এখন বাইরেটা দেখ কী সুন্দর। চল, চা-টা খেয়ে বেরোই।”

“ঠাণ্ডা পড়ছে। দুপুরের দিক ছাড়া বেরোনো যাবে না।”

“দুপুরে কি সূর্যাস্ত দেখা যায়!”

“ঠাণ্ডার মধ্যে সূর্যাস্ত দেখবে তো মাফলারটা আনলে না কেন? আলমারি থেকে বারও করে দিলাম, তাও ছেড়ে এলে। এত ভুলোমন...”

“এক কাজ করি, কাল সকালে একটা মাফলার কিনে নিই।”

“আবার নতুন মাফলার! এবার এর মধ্যেই কত খরচ হয়ে গেছে জানো? কুলিই তো নিল দেড়শ।”

আমি এসে দাঁড়িয়েছি দেখে সুশীতলবাবু বললেন, “সময় আছে? একটু বোস না এখানে…”

বসলাম। উনি বললেন, “ভাই, এখানে জমির কীরকম দাম চলছে জানো কি? জায়গাটা এত ভালো লাগে, মনে হয় একটা ছোট্ট বাড়ি করে …”

“আজ্ঞে স্যার, আমি তো এখানে নতুন। খোঁজ নিয়ে বলতে পারি … রাস্তার ধারে দাম শুনেছি খুব বেড়ে গেছে…”

“তবু?”

“ঠিক জানি না তবে চল্লিশ-পঞ্চাশ হাজার কাঠা …”

“ওরে বাবা, অত! না, না রাস্তার ধারে নয় আমার ওই পাহাড়ের দিকটায় হলেই হবে …”

উঠে আসতে আসতে শুনলাম মহিলা একচোট নিচ্ছেন স্বামীর ওপরে। “ভীমরতি ধরেছে, এইখানে জমি কিনবে! মুরোদ তো পেনসনের ওই টাকা কটা। শুভার বিয়েতে তো পভিডেন শেষই হয়ে গেল! এসব একদম মাথায় আনবে না …”

দিন দুয়েক পর সন্ধেবেলায় আপিসে বসে আছি। উনি, মানে সুশীতলবাবু ঢুকলেন। “বসব এখানে?”

কদিন দেখছি এই ভদ্রলোক আমকে বন্ধুর মতো ভাবতে শুরু করেছেন। বললাম, “হ্যাঁ হ্যাঁ, বসুন না”

“ওই সেদিনের কথাটাই বলতে এলাম। আসলে উর্মি আপত্তি করে কারণ আমাদের তো তেমন পয়সা কড়ি নেই। তবু কি জান ভাই, কোলকাতায় আর থাকতে ভালো লাগে না, তাই খরচাপাতি হলেও এখানে বারবার চলে আসি। ছোট দোতলা বাড়ি আমাদের। ছেলে থাকে পরিবার নিয়ে নিচের তলায়, ওপরের ঘরটায় আমরা। একে ঘিঞ্জি এলাকা তার ওপর বাড়ির পেছনে একটা ক্লাব হয়েছে। ওদের তো বারো মাসে ছত্রিশ পার্বণ। এই পুজো সেই পুজো এই দিবস সেই দিবস - টানা মাইক চলতে থাকে। যেদিন ওসব থাকে না সেদিন হয় রক্তদান শিবির নয় ছোটদের যোগ-ব্যায়াম প্রতিযোগিতা। মাইকে ‘ঘোষণা’শুরু হয়ে যায় সকাল থেকে। আর সামনের রাস্তায় আজকাল অটোর রুট হয়েছে। অটোওলারা খুচরো ফেরৎ দিতে চায় না, তার ওপর ডাকাডাকি ছোটাছুটি - সারাদিন হৈহৈ চেঁচামিচি।

এই জায়গাটা এত ভালো লাগে … ওই পাহাড়ের গা দিয়ে একটা জঙ্গুলে পায়ে চলা রাস্তা উঠে গেছে। সকালে গিয়েছিলাম ... কী যে সুন্দর।“

“হ্যাঁ, ওই গ্রামের লোকেরা আসা-যাওয়া করে। আদিবাসী মেয়েরা কাঠ কুড়োতে যায়।”

“হে হে এই হল ‘বনপথ’। কি হে, সময় নিচ্ছি বলে রাগ করছ না তো! তোমাদের সময়কার নয়, সে আমদের সময় একটা গান ছিল ‘দূর বনপথে ছায়াতে আলোতে/ ঝরানো পাতার ছন্দ বাজে কার পায়ে পায়ে….’ খুব সুন্দর গানটা। সেই রকমই বনপথ এটা। ওর কাছাকাছি যদি ছোট একটা বাড়ি করে থাকতে পারতাম! হ্যাঁ, তোমাদের হোটেলের বারান্দাটা বড় ভালো, বসে বসে কত দূর অবধি দেখতে পাই...”

“আপনার ভালো লাগে সেটা তো আমাদের গর্ব। আপনারা খুশি হলেই আমরাও খুশি।” নিজের ‘সফ্ট স্কিল’ এর প্রয়োগ দেখে আমি নিজেই খুশি!

“তোমাকে বলি ভাই। আমার একটা ইচ্ছে আছে। স্বপ্নও বলতে পারো – ওই দূরের দিকটায়, এই ধর দেড়-দু কাঠার ওপর হলেই চলে, একটা ঘর যদি বানাতে পারতাম! ছাদ ঢালাই না করে টালির ও করা যায়, খরচা কম। সামনে বাগানের জন্য একটু জায়গা ছেড়ে দিতাম। দিনভর পাহাড় আর বন চোখের সামনে থাকত! কখনো সখনো হয়তো মেঠো বনপথ দিয়ে হেঁটে চলে যেতাম অনেকটা …”

আমি কিছু না বলে মানুষটিকে দেখতে লাগলাম। এনার যা সংগতি তাতে এসব আকাশকুসুম স্বপ্নের কোনো মানে হয় নাকি। ইনি কি তা বোঝেন না? বোঝেন ঠিকই তবু স্বপ্নটুকু নিয়ে নাড়াচাড়া করতে ভালবাসেন।

“তুমি যদি একটু খোঁজ-খবর নিয়ে রাখো। ভাবছি এ বছরই আর একবার আসব।”


বেশ কিছু দিন হয়ে গেছে, বছরও ঘুরে গেল, ওনারা আসেননি। আমিও প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম আর ওসব জমির খোঁজ-খবর, বলাই বাহুল্য, নিইনি।


একদিন সকালের দিকে আমদের হোটেলের সামনের ডেস্কে যে বসে সে এসে বলল কে যেন আমার খোঁজ করছেন। গেলাম। বছর চল্লিশের একজন, আমি চিনতে পারলাম না।

“আমার বাবা-মা অনেকবার আপনাদের হোটেলে এসে থেকেছেন। আমি সুশীতলবাবুর ছেলে।”

“সুশীতল বসু?” আমার মনে পড়ে গেল, চাকরির প্রথম দিকের ব্যাপার তো।

“হ্যাঁ। উনি গত মাসে মারা গেছেন। মা আমাকে আপনার কাছে পাঠালেন।”

“ওহ, দুঃখিত। বলুন আমি কী করতে পারি।”

“আসলে ওনারা এই জায়গাটা খুব ভালোবাসতেন, বিশেষ করে বাবা। শুনেছি আপনাদের এখানে দোতলার বারান্দায় বাবা বসে থাকতে খুব পছন্দ করতেন। সকাল বিকেল নাকি বারান্দায় বসে কাটিয়ে দিতেন। ওই মা বলছিলেন আর কি।”

“ঠিকই বলেছেন, আমার বেশ মনে আছে।”

“মা আপনাকে একটা অনুরোধ করেছেন, যদি আপনি রাজি থাকেন …”

আমি একটু সতর্ক হয়ে গেলাম। কাকার কথা মনে পড়ল। অনুরোধ রাখলে অতিথি আবার ফিরে আসেন। কিন্তু উনি তো মার গেছেন, তাহলে?। যাক গে শুনি তো ব্যাপারটা কী।

যে অনুরোধটা এলো সেটা কিন্তু আমি আন্দাজ করিনি।

“মা বলছিলেন, বারান্দাটা বাবার কতখানি প্রিয় ছিল আর উনি ওখানে বসে দূরে পাহাড় জঙ্গলের দিকে দেখতেন। ওনার আবার একটা ছোট বাড়ি করে থাকারও ইচ্ছে হয়েছিল – ওই স্বপ্ন আর কি। তা অবশ্য হয়ে ওঠার কোনো প্রশ্নই ছিল না। তাই মা বললেন ওনার একটা ছবি যদি ওই দোতলার বারন্দায় টাঙিয়ে রাখা যেত… বড় ছবি নয়…”

একফুট বাই দেড়ফুট মতো কাচে ফ্রেম করা ছবি ব্যাগ থেকে বার হলো। হ্যাঁ, চিনতে পারলাম। সুশীতলবাবু।

কি করা উচিত? হোটেলে কি এরকম ছবি রাখা যায়? তবে কেন জানি না ছবিটা দেখে আমার মনটা যেন একটু নরম হয়ে গিয়েছিল। ভাবলাম একটা তো পেরেকের ব্যাপার, ওনার স্ত্রী যখন বলে পাঠিয়েছেন তখন থাক না বারান্দার দেয়ালে।

বললাম, “ঠিক আছে, রেখে যান। আমি সুবিধে মত দেয়ালে লাগিয়ে দেবো”


বিকেলে ছবিটা টাঙিয়ে চলে যাচ্ছিলাম কিন্তু কাচের ভেতর থেকে সুশীতলবাবুর দৃষ্টিটা যেন আমাকে আটকে রাখল। সেই ‘দূর বনপথের’ দিকে তাকিয়ে আছেন অপলক। এ জীবনে যা হলো না তাই হয়তো দেখছেন সেখানে। একটা লাল টালির ছাদওলা ঘর, সামনে একটু বাগান আর সেখানে দুটো বেতের চেয়ার।

একটা কথা মনে হচ্ছিল। শুনেছি গীতায় আছে আত্মা অবিনশ্বর। শরীর শেষ হয়ে গেলেও আত্মার বিনাশ নেই। আচ্ছা, স্বপ্নের কথা কিছু কি লেখা আছে সেখানে? শরীর বিলীন হবার পর এনার মত সাধারণ মানুষের স্বপ্নটুকুর কী হয়। তা কি জীবনাবসানের সঙ্গে সঙ্গে দূরের বনপথে মিলিয়ে যায় নাকি সবার অলক্ষ্যে পড়ন্ত বিকেলের আলোছায়াতে বাতাসে বাতাসে ভেসে বেড়ায়।
1
undefined undefined undefined

গল্প - সুমন্ত চ্যাটার্জী

Posted in




















-"ও দাদা, উঠুন না"!

-"আরে আমাদের বসতে দিন"!

-"ও দাদা, উঠুন উঠুন"!

-"এটা জেনারেল কামরা, আপনার বাড়ির বিছানা নয়"!

একের পর এক চিৎকার আছড়ে পড়তে থাকে ভোরের নীরব কামরায়! কিন্তু এতকিছু সত্ত্বেও লম্বা সীটে দুর্গন্ধের কাঁথা-কম্বল মুড়ি দিয়ে নির্বিকার শুয়ে থাকে অসাড় দেহটা! শেষমেশ বারকয়েক ঠেলাঠেলির পর কোনওমতে বিরক্তির সাথে কাঁচাপাকা চুলদাড়ি আর হতবাক বলিরেখার আঁকিবুকি মুখে নিয়ে উঠে বসেন বছর পঞ্চাশের এক রোদে পোড়া মানুষ!

উঠে বসে চারিদিকে অবাক হয়ে তাকান, আর কিসব বলতে থাকেন কেউ বুঝতে পারে না! আমার পাশের ব্যাঙ্ককর্মী ভদ্রলোক বলেন, "আরে, কেয়া বোলতা হ্যায়? হিন্দি মে বোলিয়ে"! সবাই যখন বিভ্রান্ত হয়ে নিজেদের মধ্যে তাকাতাকি করে, রোদে পোড়া মানুষটি বলেন,"বিজয়ওয়াড়া, বিজয়ওয়াড়া"! এক ঘুগনিওয়ালা বিরক্ত হয়ে বলে,"ইয়ে বিজয়ওয়াড়া নেহি হ্যায় ভাই"! জানালার সীট থেকে আরেকজন জানতে চায়, "ইংলিশ আতা হ্যায় আপকো?" রোদে পোড়া মানুষটি শূন্যদৃষ্টিতে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন কিছুক্ষণ, তারপর বলেন "বিজয়ওয়াড়া, তেলুগু"! আরও কয়েকজন প্রশ্ন করতে থাকলে রোদে পোড়া মানুষটি নিজের নোংরা পুঁটলি থেকে একটা আইডি কার্ড বের করে দেখান, বলেন, "জোসেফ, বিজয়ওয়াড়া, ইন্ডিয়া"!

আইডি কার্ডটা কয়েক হাত ঘুরে এসে পড়ে আমার হাতে। ভোরের ট্রেনে শেষমেশ নিজের ঘুমঘোর বিসর্জন দিতেই হয়। একবার চোখ বুলিয়ে আইডি কার্ডটা ওনার হাতে ফিরিয়ে দিতেই কাচুমাচু মুখে বলেন, "বিজয়ওয়াড়া, তেলুগু"। এবার পকেট থেকে মোবাইলটাকে বার করি, গুগল ট্রান্সলেটর খুলে বাংলাতে টাইপ করি, "আপনি ভুল ট্রেনে উঠেছেন, এই ট্রেন বিজয়ওয়াড়া যাবে না", তারপর সেটাকে তেলুগু'তে ট্রান্সলেট করতে দিয়ে অডিও'টা শোনায় ওনাকে। জোসেফের চোখদুটোয় আলো খেলে যায়! সে মাথা নাড়িয়ে বুঝিয়ে দেয়, বুঝতে পেরেছে! আমি আবার একই পদ্ধতিতে টাইপ করি, "আপনাকে এখান থেকে উলটো পথের ট্রেন ধরে হাওড়া যেতে হবে, তারপর সেখান থেকে বিজয়ওয়াড়া যাওয়ার ট্রেন ধরতে হবে"। তেলুগু অনুবাদ'টা আবার ওকে শোনাতেই যন্ত্রণাক্লিষ্ট মুখে কৃতজ্ঞতার হাসি খেলে যায়! আশেপাশের যাত্রীরা তখন অবাক চোখে দেখছে কিভাবে ভাষার প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে পৌঁছে যাওয়া যায় মানুষের ভিতরে। এবার ট্রান্সলেটরের সাহায্য নিয়েই ভোরবেলায় ভাঙা ভাঙা তেলুগু'তে জানতে চাই ও পরিযায়ী শ্রমিক কিনা। জোসেফ বলতে চায় অনেককিছু, কিন্তু কেন জানি না চুপ করে যায়, হাত তুলে বুঝিয়ে দেয় যে ও সন্তুষ্ট হয়েছে। আমিও আর কথা বাড়াই না। পরের স্টেশনে ট্রেন থামলে চুপচাপ তল্পিতল্পা গুটিয়ে নেমে পড়ে, তারপর চারিদিকে একবার তাকিয়ে জানালার বাইরে থেকে আমাকে হাত তুলে আশীর্বাদ করে। ট্রেনটা আস্তে আস্তে স্টেশন ছেড়ে কুয়াশার দিকে এগোতে থাকলে আশেপাশের যাত্রীরা রোদে পোড়া মানুষটির মানসিক সুস্থতা নিয়ে আলোচনা শুরু করে।

আমি আবার একটু ঘুমোনোর চেষ্টা করি, কিন্তু চোখে ভেসে ওঠে জোসেফের চোখে দেখতে পাওয়া সেই একচিলতে আলোর রেখাটুকু, যা আমাকে নিয়ে যায় এক ঠিকানাহীন মানুষের সুদূর, শান্ত বাড়ির ভেতর, খালি পায়ে, ভিজে পায়ে ...
0
undefined undefined undefined

গল্প - রণজয় দে

Posted in




















প্রথম পরিচ্ছেদ:

হাঁটছে সাওন। আদিগন্ত হিমাচল পেরিয়ে য্যানো হাঁটছে, আসলে কলকাতায়। টালিগঞ্জ বস্তির ভেতরের এই রাস্তাগুলো একটু অচেনা ওর কাছে। ও যাচ্ছে কাউকে একটা ডাকতে। গায়ে য্যানো বল নেই। খুবই ক্লান্ত চলন। দাঁড়ালো ও। হঠাৎ কিছু মনে পড়েছে না রাস্তা চিনতে পারছে না বোঝা যাচ্ছেনা। আবার শুরু। একটা মৃত গলির শেষ বাড়িটায় ঢুকে পড়ল। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে পকেট হাতড়ে কিছু একটা বের করলো। তারপর দোতলায় এসে কড়া নাড়তেই একজন বৃদ্ধা দরজা খুললেন। সাওন হাতের মুঠো খুলে ওনাকে কিছু একটা দেখাতেই উনি দরজা ছেড়ে সড়ে দাঁড়ালেন। বৃদ্ধাকে জিনিসটা দিয়ে ভেতরে একটা ভাঙা চেয়ারের পাশ কাটিয়ে তুলো ওঠা একটা সোফার ওপরে গিয়ে বসলো ও। বৃদ্ধা দরজা বন্ধ করে ভেতরের দিকে অদৃশ্য হয়ে গ্যালেন। পকেট থেকে মোবাইল ফোনটা বের করে পাশে রাখলো সাওন। সঙ্গে সঙ্গেই ওটা জ্বলে উঠলো নিজে থেকে। ফোন ধরলো সাওন। ওপাশ থেকে একটা মহিলা কণ্ঠস্বর, 'আর কতক্ষণ লাগবে তোমার পৌঁছতে?' সাওন-- 'আর আধঘণ্টা।' ওপার থেকে একটা অস্ফুট আওয়াজ হয়ে ফোনটা কেটে গ্যালো। ফোনটা আবার পকেটে ভরে ছোট, খালি, ঠান্ডা এবং সোঁদা গন্ধওয়ালা ঘরটার দিকে একবার তাকালো। পরক্ষণেই উঠে দাঁড়িয়ে ও-ও ভেতরের দিকে অদৃশ্য হয়ে গ্যালো।

ভেতরের ঘরটা মানুষ এবং টুকটাক কিছু জিনিসে তুলনায় ভরা। চারজন বিভিন্ন বয়সী মহিলাদের মধ্যে একজন কিশোরীও ছিলো। সাওন 'টাকা দাও, বেরোবো, তাড়া আছে' বলতেই কিশোরী বাদে বাকি তিনজন পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলো। চল্লিশ-পয়তাল্লিশের দিকে যার বয়স, খুবই রঙীন এবং খুবই পুরনো একটি শাড়ি পরিহিত মহিলা বললেন, 'জিনিসটা আমার পছন্দ হয়নি।' বাকি তিনজনের মুখটা এখন একটু ফ্যাকাসে দ্যাখাচ্ছে। সাওন মুখে কিছু না বলে হাত পাতলো। মহিলা জিনিসটা দিয়ে দিলেন। একটা চৌকো কালো রঙের ছোট বাক্স। সাওন হাত মুঠো করে বাক্সটা পকেটে চালান করে দিলো। 'বেরোলাম' বলে বেরিয়ে দ্রুত পায়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগলো।

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ:

বহরমপুর শহরের ওপর একটা বড় চারতলা অ্যাপার্টমেন্টের তিনতলায় একটা ফ্ল্যাটের বড়ো ঘর। আসবাব ও বই দিয়ে খুবই সৌখিন মতে সাজানো। ঘরের মাঝে একটা গোল টেবিলের চারদিকে চারটে চেয়ার। টেবিলের ওপর কিছু কাগজ, বইপত্র, দুটো কফিমগের তলায় শেষ হয়ে যাওয়া কফির কালো দাগ ও একটা ছাইদানি। আর একটু পাশে মেঝেতে একটা লাল রঙের ম্যাট্রেসের ওপর খোল, দোতারা, ডুবকী জাতীয় দুয়েকটা লোকসঙ্গীতের যন্ত্র অবিন্যস্ত পড়ে আছে। ম্যাট্রেসের ওপর একজন যুবকও বসে আছে, ফোন ঘাঁটছে। ঘরের দেওয়ালগুলো ছৌ-এর মুখোশ এবং কিছু ছবি দিয়ে সাজানো। ষাটোর্দ্ধ প্রৌঢ় একজন ঘরে ঢুকলেন। চুল-দাড়ি বেশ বড়ো, যার বেশিরভাগটাই সাদা, চুলগুলো পেছনে জড়ো করে বাঁধা, ঢোলা জিন্স এবং পাঞ্জাবী পরিহীত। ঢুকেই যুবককে উদ্দেশ্য করে, 'একি নীচে ক্যানো, চেয়ারে এসে বোসো' বলে নিজে একটা চেয়ারে বসলেন। যুবক উঠে আসলো ধীরে ধীরে। পকেট থেকে সিগারেট আর লাইটার বের করে 'কফি চলবেতো?' বলে যুবকের দিকে তাকালেন। যুবক মুখে আলতো হাসি নিয়ে না-সূচক ঘাড় নাড়লো। প্রৌঢ় সিগারেট জ্বালিয়ে একগাল ধোঁয়া ছেড়ে 'বেশ, বলো তবে' বলে টেবিল থেকে একটা কাগজ তুলে নিয়ে তার ওপর তাকিয়ে রইলেন। 'দেখুন, প্রথমেশ বাবু' বলে মাথা নিচু করে মেঝের দিকে তাকিয়ে যুবক একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। 'আমার কিছু বলার নেই কিন্তু আমি আর পারছিনা' বলে এক ঝটকায় উঠে দাঁড়িয়ে আবার মুহূর্তের মধ্যে চেয়ারে বসে পড়লো ছেলেটি। 'কিছু করার নেই, মন্মথ, পারতে তোমাকে হবেই-' বলে লোকটা আবার কাগজে ভাবলেশহীন মুখটা গুঁজে দিলেন। নিঃশব্দে মূর্তির মতো করে চার সেকেন্ড কেটে গেলে প্রথমেশ বাবু একটু গলা খাঁকাড়ি দিয়ে আবার বললেন,'যদিও উপায় একটা যে আছে, তা তো তুমি জানো।' ছেলেটার চোখদুটো একটু য্যানো জ্বলে আবার নিভে গ্যালো। একটু থতমত খেয়ে খানিক তুতলে নিয়ে মন্মথ বললো 'না, সেটা তো আমি পারবো না আপনি জানেন।' 'তাহলে যা করছো করে যাও, হপ্তায় হপ্তায় বিরক্ত করতে এসো না তো' বলে উঠে দাঁড়িয়ে ভদ্রলোক পায়চারি করতে লাগলেন। 'এভাবে কটা দিন মুখ বুজে এখানে থাকো না' বলে দাঁড়িয়ে নিচু হয়ে যুবকের দিকে মুখ ঝুঁকিয়ে কৃত্রিম হাসিমুখে বললেন, 'তারপরই তো তোমাকে দুবাই পাঠিয়ে দেবো।' বলে আবার হাঁটা শুরু করলেন। ছেলেটা মাথা নিচু অবস্থাতেই খানিক আচ্ছন্নের মতো বললো,' না আমি পরে পালাতে চাই না। হয় আমাকে এখুনি পাঠিয়ে দিন। রোজ রোজ পাশবিক অত্যাচার দ্যাখা একটা নেশার মতো। অভ্যেস হয়ে গেলে এখান থেকে যাওয়া আর সম্ভব হবে না।' 'কিছু করার নেই, মন্মথ, পারতে তোমাকে হবেই' বলে লোকটা আবার কাগজে ভাবলেশহীন মুখটা গুঁজে দিলেন। নিঃশব্দে মূর্তির মতো করে চার সেকেন্ড কেটে গেলে প্রথমেশ বাবু একটু গলা খাঁকাড়ি দিয়ে আবার বললেন,'যদিও উপায় একটা যে আছে, তা তো তুমি জানো।' ছেলেটার চোখদুটো একটু য্যানো জ্বলে আবার নিভে গ্যালো। একটু থতমত খেয়ে খানিক তুতলে নিয়ে মন্মথ বললো 'না, সেটা তো আমি পারবো না আপনি জানেন।' 'তাহলে যা করছো করে যাও, হপ্তায় হপ্তায় বিরক্ত করতে এসো না তো' বলে উঠে দাঁড়িয়ে ভদ্রলোক পায়চারি করতে লাগলেন। 'এভাবে কটা দিন মুখ বুজে এখানে থাকো না' বলে দাঁড়িয়ে নিচু হয়ে যুবকের দিকে মুখ ঝুঁকিয়ে কৃত্রিম হাসিমুখে বললেন, 'তারপরই তো তোমাকে দুবাই পাঠিয়ে দেবো।' বলে আবার হাঁটা শুরু করলেন। ছেলেটা মাথা নিচু অবস্থাতেই খানিক আচ্ছন্নের মতো বললো, 'না আমি পরে পালাতে চাই না। হয় আমাকে এখুনি পাঠিয়ে দিন। রোজ রোজ পাশবিক অত্যাচার দ্যাখা একটা নেশার মতো। অভ্যেস হয়ে গেলে এখান থেকে যাওয়া আর সম্ভব হবে না।' বলে উঠে দাঁড়িয়ে 'আচ্ছা আমি আসি।' বলে লোকটার দিকে আর না তাকিয়ে দ্রুত পায়ে দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল মন্মথ। দরজার দিকে তাকিয়ে খানিকক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন প্রথমেশ বাবু। তারপর আবার চেয়ারে বসে একটু জোরে 'আমাকে এককাপ কফি দিও তো' বলে ভেতরের দিকে তাকালেন। ভেতর থেকে কোনো আওয়াজ এলো না। উনি আরেকটা সিগারেট জ্বালিয়ে দেওয়ালে কোনো একটা ছবির দিকে তাকিয়ে বসে রইলেন। তার দশ মিনিট পর বছর পঞ্চাশের অভিজাত শাড়ি পরা মহিলা একটি ট্রেতে দুটি কফিমগ এনে ওনার হাতে একটা মগ দেওয়া পর্যন্ত ছাই এবং পোড়া সিগারেট ফ্যালা বাদে উনি একফোঁটাও নড়াচড়া করলেন না। মহিলা একটি চেয়ারে বসে কফিতে নিঃশব্দ চুমুক দিয়ে প্রথমেশ বাবুর দিকে তাকালেন।ভদ্রলোক 'মন্মথ' বলে মুখে একটা অদ্ভুত শব্দ করে কফিতে মন দিলেন। মহিলা বিরক্ত সুরে একটু গলা নামিয়ে বললেন, 'ওকে এখান থেকে পাঠিয়ে দাও না, তাহলেই তো ঝামেলা মিটে যায়।' ভদ্রলোক 'ধুস। তা বললে হয় নাকি' বলে আরেকটা সিগারেট ধরালেন। 'ওকে এতো সহজে মুক্তি দিলে যে আমার জীবনটা আবার আগের মতো জটিল হয়ে যাবে মাধবী।' বলে প্রচণ্ড গম্ভীর হয়ে গেলেন। মহিলা কিছু বললেন না। 'মানুষের মৃত্যু দেখতে দেখতে অর্ধ-শতাব্দী জীবন কাটিয়ে দেওয়ার পরও আমার কষ্ট হয় মাধবী, খুব কষ্ট হয়। মাঝে মাঝে মনে হত, দি একটানে সব শেষ করে। পারিনি। আজ এতোদিন পর মন্মথকে পেয়ে... ' আর বলতে পারলেন না। গলা য্যানো জড়িয়ে এলো প্রথমেশ বাবুর। মাধবী দেবী উঠে দুটি খালি কফিমগ ট্রেতে নিয়ে ধীর পায়ে ভেতরের দিকে চলে গেলেন।

তৃতীয় পরিচ্ছেদ :

সকাল এগারোটার সময় কলকাতার রাস্তাঘাট পুরো মহাদেবের জটার মতো হয়ে থাকে। এরকম একটা ব্যস্ত সময়ে বড়োবাজারের মুখে একটা ক্রসিং-এর সামনে অপেক্ষা করছে উপল। হাতে একটা বাজারের থলে মতো ঝোলা আর পরনে গেঞ্জি-জিন্স। আঠাশ থেকে তিরিশের মধ্যে বয়স হবে ওর। উঠে দাঁড়িয়ে কাকে য্যানো দেখতে পেয়ে হাত নাড়লো। মাঝবয়সী লোকটা এগিয়ে এসে হাত উল্টে গোপনীয়তার সাথে উপলের হাতে একটা প্যাকেট চালান করলো। উপল হাতটা আলতো মুঠো করে একইরকম গোপনীয়তার সাথে প্যাকেটটা দেখে নিলো একঝলক। 'ঠিকাছে' বলে পকেটে রেখে দিলো। গাঁজা। 'সপ্তাহখানেকের মধ্যে আবার ফোন করছি' - কথাটা উপলের মুখ থেকে বেরোতে না বেরোতেই ঢোলা জামা তুলনায় কম ঢোলা ফ্যাকাসে বাদামী প্যান্ট পরা লোকটা ভিড়ের মধ্যে উধাও হয়ে গ্যালো। উপল চারদিকটা একবার দেখে নিয়ে রাস্তাটা পার হয়ে একটা বাসে উঠে পড়লো। শেয়ালদা আসতে যদিও বেশি সময় লাগার কথা নয় তবুও মিনিট পয়তাল্লিশের বেশি সময় লাগিয়ে দিলো বাসটা। নেমে গ্যালো উপল। সাত-আট পা হেঁটে একটা গলির ভেতর বেশ খানিকটা চলে যাওয়ার পরে হঠাৎ কি মনে হতে আবার পেছন ফিরে উল্টো দিকে আসতে লাগলো।

চতুর্থ পরিচ্ছেদ :

অন্ধকারের মতো তাকিয়ে আছে মুন্নি। নিঃশ্বাস পড়ছে অথবা পড়ছে না। খুব রঙীন একটা ঘরে বসে আছে ও। ওদের ঘরটাই। পলেস্তারা খসা ভিজে গন্ধযুক্ত খুবই ছোটো, ওই ঘরটাই। রঙটুকু ফিরেছে শুধু। মুন্নির জীবনের সমস্ত রঙ য্যানো নিজের গায়ে মেখে নিয়েছে ঘরটা। মুন্নি, অসাড়, জড়, মৃতদৃষ্টি এবং পেটে পাঁচ মাসের বাচ্চা নিয়ে বসে আছে। ভূতের মতো দ্যাখাচ্ছে ওকে। একমনে একটা জিনিসের কথা ভাবছে, মানুষ সেলায়ের সুতোটা। বাইরের ঝোড়ো হাওয়ায় জানলাটা একটু নড়তেই মুন্নিও ক্যামন য্যানো কেঁপে উঠলো। বৃষ্টি নামবে বাইরে। খুব জোরে।

পঞ্চম পরিচ্ছেদ :

সালমা আপা - টালিগঞ্জ বস্তিতে এই নামেই খ্যাত বছর পয়তাল্লিশ কি আরেকটু হবে, ডাকাবুকো চরিত্রের মহিলা। একজন বড় ও দুই ছোটবোনকে নিয়ে থাকেন। বস্তিটা আসলে ওদের পৈতৃক ভিটে। তাছাড়া কলকাতায় দুটো বিলাসবহুল ফ্ল্যাট আছে ওর নিজের। একটা আন্তর্জাতিক অবৈধ ব্যবসা চক্রের সাথে যুক্ত এই সালমা আপা। যুবতী মেয়েদের স্তনবৃন্তের ব্যবসার এক কুৎসিত বিরাট চক্র। উনি এখন বসে ছিলেন পার্কস্ট্রীটের জাঁকালো কোনো রেস্তোরাঁর দোতলায়। ওর ব্যক্তিগত গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে বাইরে, যেটা নিয়ে উনি বস্তিতে ঢোকেননা। সাদা ধুতি পাঞ্জাবি পরা, অনেক সোনার হার ও আঙটিওয়ালা বছর ষাটেকের এক ভদ্রলোক ও স্যুটেড-বুটেড একজন যুবকের সঙ্গে হাত মিলিয়ে উঠে দাঁড়ালেন আপা। সিঁড়ি দিয়ে নেমে বেরিয়ে গাড়ির দিকে যাচ্ছিলেন, দুজন আরোহীসহ একটি বাইকের পেছনের জনের হাত থেকে দুটি সশব্দ গুলি এসে লাগে আপার কপালের একেবারে মাঝখানে।

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ :

সাওন ডাকতে যাচ্ছিলো ওর প্রেমিকার ভাইকে, যাদবপুরে। ডাকতে যাচ্ছিলো বলা ভুল, সঙ্গে করে নিয়ে আসারই হুকুম ছিলো ওপরতলার তরফ থেকে। কিন্তু দেবজ্যোতি আসতে রাজি না হওয়ায় ওকে একাই ফিরে যেতে হচ্ছে। দমদমে মানে বাড়িতে যদিও এখন যাবেনা সাওন। তিস্তাকে ফোনে জানিয়ে দিয়েছে যে ওর ভাই পড়াশোনার চাপের জন্য ফোন ধরছে না আর সে কারণেই আজকেও আসতে রাজি হয়নি। উত্তরে অনেককিছু বললো তিস্তা। সেগুলো খুব একটা মন দিয়ে শোনেনি সাওন। ফোন রেখে দিয়ে ধর্মতলার একটা টিকিট কেটে মেট্রোতে উঠে গেলো ও। নেমে কয়েকপা হেঁটে কাছেই একটা বারে ঢুকে পড়লো। হুইস্কির পেগে চুমুক দিয়ে ওর মাথাটা একটু ঠান্ডা হলো। ধীরে ধীরে ভাবনার জটগুলো স্থান বদলাতে শুরু করলো। যেদিকে এগোচ্ছে ও, ঠিক হচ্ছে কিনা বুঝতে পারছে না। শর্মাজিকে এর আগে কখনও ঠকায়নি ও। আট বছর হয়ে গেছে, ও শর্মাজির এখানে আছে। জীবনে অনেক অপরাধ করেছে ও, মানে সেভাবে বলতে গেলে অপরাধ করাটাই ওর পেশা। কিন্তু যার নুনে পেট ভরে, তার পেটে লাথি মারতে কেমন বিবেক অথবা ওরকমই কিছুতে একটা খচখচ করছে। প্রচুর মেয়ের জীবন নষ্ট করেছে ও জীবনে। মানে খুন ধর্ষণ নয়। স্তনবৃন্ত কেটে সেলাই করে বাবা অথবা স্বামীকে টাকা দিয়ে দেওয়া, এটুকুই। তারপর ধুয়ে বাক্সতে ভরে শর্মাজির লোককে জিনিসটা দিয়ে দেওয়া। এই শেষেরটুকু এবারে আর করেনি ও। সালমা আপা নাকচ করে দিলেও ওর হাতে আরও দুজন রয়েছে। তবুও ক্যামন যেন খুব ভয় করছে সাওনের। তলপেটটা গুলোচ্ছে, বমি পাচ্ছে খুব। মৃত্যুভয়ের মতো কিছু একটা ব্যাপার। আসলে ওটাই। এ লাইনে গোলাগুলিটা টাকাপয়সার মতো। সব সময় ব্যবহার হয়। আট বছরের এই অদ্ভুত জীবনে প্রচুর মেয়ের কান্না শুনেছে সাওন। এসব নিয়ে এর আগে কখনো ভাবেনি ও। কিন্তু আজকে যেনো ওই সবকটা কান্না এক এক করে এসে ওর কানের কাছে ফিসফিস করে কথা বলছে। এসব কি ভাবছে সাওন। পাগলের মতো লাগছে। ভাবছে শর্মাজির কাছে যাবে। গিয়ে বলবে ও আর কাজ করবে না। কিন্তু পকেটের জিনিসটা? ওটা দিয়ে কি সব সত্যি কথা বলে দেবে? নাকি ওটাই শেষবারের মতো বিক্রি করে এসবের থেকে পাততাড়ি গুটোবে?

তিন নম্বর পেগটা শেষ করে গ্লাস রেখে টাকা দিয়ে বেরিয়ে গ্যালো সাওন। না, এসব কিছুই ও করবে না। কিন্তু ও এখন ঘুমোবে। বাড়ি গিয়ে স্নান করে গভীর একটা ঘুমের প্রস্তুতি নেবে। দ্যাখা যাক তারপর কি হয়।

সপ্তম পরিচ্ছেদ :

দুঘন্টার বেশি সময় হয়ে গ্যাছে রায়ান এখানে অপেক্ষা করছে। শেয়ালদা স্টেশন থেকে অল্প দূরে একটা গলির ভেতর ওয়োর একটা ঘরে। সকাল থেকেই ও এখানে আছে উপল বলে একজনের সাথে। এখন দুপুর গড়াচ্ছে, সাড়ে তিনটে বাজে। গ্রাইন্ডার বলে একটা ডেটিং অ্যাপের মাধ্যমে উপলের সঙ্গে মাসখানেক আগেই ওর পরিচয় হয়েছে। কথা হতো অনিয়মিত, দুদিন আগেই উপল ওকে প্রস্তাবটা দেয়। খানিক সময় নিয়ে ওও রাজি হয় বিষয়টাতে। ভালোই লাগছিলো উপলকে কাছ থেকে। কিন্তু সেই যে গাঁজা কিনতে বেরোলো তো বেরোলো। একটু আগে ফোনে বললো বড়বাজার থেকে ফেরার বাসে উঠে গ্যাছে। তারপর থেকে একঘন্টা হতে যায় প্রায়। উপল আর ফোন ধরছেনা। শুয়ে শুয়ে সিগারেট খাচ্ছে আর বিরক্ত চোখে… ফোন বাজলো। উপল।

অষ্টম পরিচ্ছেদ :

আরে ওয়োর টাকাটা পাঠিয়ে দেওয়ার পরেও এরম করছে ক্যানো ছেলেটা। হ্যাঁ, বলেছিলো আসছে, কিন্তু এখন আর সম্ভব হচ্ছে না। হলো তো এতক্ষন সকাল থেকে, এখন একটু মন্মথকে চোখে চোখে রাখার কাজটা শুরু করতে হবে। 'বলো তো তোমাকেও কিছু পাঠিয়ে দিতে পারি' বলাতে প্রচন্ড জোরে একটা খিস্তি করে ফোনটা কেটে দিলো রায়ান। যাক্, ভালো হয়েছে। সকালে এই ওয়োটাতে ঢোকার আধঘণ্টার মাথায় প্রথমেশবাবু ওকে ফোন করে এই কাজটার কথা জানায়। ও করবে বলাতে ফোন কাটার পরেই প্রথমেশবাবু বেশ কিছু টাকা পাঠিয়েছেন ওকে। এই মুহূর্তে মন্মথ কোথায় থাকতে পারে ভাবতে ভাবতে হাঁটতে লাগলো উপল।

নবম পরিচ্ছেদ :

সালমা আপার মারা যাওয়ার খবরটা পেয়েছেন প্রথমেশবাবু। নিজের ঘরে শুয়ে শুয়ে আকাশ-কুসুম ভেবে চলেছেন এসব নিয়ে। যদিও এলাইনে এসব জলভাত, উনি ভাবছেন উনি ক্যানো এখানে? উনি ভাবছেন এসব থেকে মুক্তির উপায়। না, প্রথমদিকে অবশ্য এমন ছিলেন না ভদ্রলোক। নার্সিংহোমটা চালু হওয়ার পাঁচ বছরের মাথায় এক গুরুজী গোছের লোকের সঙ্গে আলাপ হয় ওর। সত্যানন্দ মহারাজ। তখন থেকেই চলছে এসব। গভীর অভ্যন্তরের বিভিন্ন গ্রাম থেকে মেয়েদের নিয়ে আসে মহারাজের লোকেরা, বেশিরভাগই নিচু জাতের মেয়েদের। প্রথমেশের হাসপাতালেই চলে নারকীয় যজ্ঞটা। পরিবর্তে প্রচুর পরিমাণে টাকা আসে ওর পকেটে। ভালই লাগে ওর বিষয়টা, মানে লেগেছিলো। ততদিনই, যতদিন না কোনো গর্ভবতী মহিলার স্বামী টাকার লোভে নিজের স্ত্রীয়ের সাথে - মেয়েটার পাথরের চোখদুটো এখনও চোখ বুজলেই দেখতে পান প্রথমেশবাবু। মুন্নি। আর ওই সময়েই কপাল জোরে মাধবীর ছোটোপিসি মাধবীকে ফোন করে ওর ছেলের একটু কাজকর্মের - তখন থেকেই মন্মথকে নার্সিংহোমের দায়িত্ব দিয়ে কোলকাতা ছেড়ে উনি মুর্শিদাবাদের বাড়িতে থাকতে শুরু করলেন। ভেবেছিলেন একেবারে পুরোনো দিনের মতো বাউল গান গাইবেন আর সরল জীবন কাটাবেন। তা আর হচ্ছে কই? বিভিন্ন ফোনাফুনি আর মন্মথকে বাদ দিলেও মুন্নির চোখদুটো যে অবিরাম জ্বলছে ওর মাথার মধ্যিখানে। তাড়া করছে কোনো অনির্দিষ্ট গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। একবার ঠিক করলেন যাবেন, দঃ চব্বিশ পরগনার জয়নগরের দিকে, মুন্নিদের বাড়ি। এতদিন এত মেয়ের জীবন শেষ হয়ে গ্যাছে, কখনো তো কারো নামও মনে রাখেননি প্রথমেশ। তাহলে এখন?

অনেকখানি বয়স হয়ে গ্যাছে। মানুষ হয়ে জন্মানোর জ্বালাস্বরূপ সূঁচগুলো খুব ধারালো হয়ে বিঁধছে। নিঃসন্তান থাকার ভাগ্যকে অভিশাপ মনে হচ্ছে এতদিনে প্রথমবার। উঠে বাথরুমের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করলেন প্রথমেশ। চোখদুটো ভীষণ ঝাপসা লাগছে। কোনোক্রমে বাথরুমে পৌঁছে জলের তলায় দাঁড়িয়ে শরীরের সব ব্যাথা মনে আর মনের সব ব্যাথা শরীরে চালান করবার সাধনায় নৈরাশ্যের দেবীকে আহ্বান করতে লাগলেন।
0
undefined undefined undefined

গল্প - মনোজ কর

Posted in

পর্ব-২২

বণিকের মানদন্ড দেখ দিল রাজদণ্ডরূপে

(সময়ানুক্রমিক সংক্ষিপ্ত বিবরণী)-তৃতীয় অংশ

মারাঠা রাজ্যে তখন পাঁচ সর্দারের মধ্যে তীব্র অন্তর্কলহ। এই পাঁচ সর্দাররা যথাক্রমে পুনার পেশোয়া, নাগপুরের ভোঁসলে, গোয়ালিয়রের সিন্ধিয়া ,ইন্দোরের হোলকার এবং বরোদার গায়কোয়াড়। সর্দারদের অভ্যন্তরীণ কলহে দীর্ণ মারাঠা রাজ্যের অবস্থা তখন শোচনীয় বলা যেতে পারে। নানা ফড়নবীশ পেশোয়াকে কার্যত ক্ষমতাহীন করে রেখেছে তখন।১৭৯৫ সালে তৎকালীন পেশোয়া মাধবরাও নারায়ণ মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত হয়ে মাত্র ২১ বছর বয়সে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। উত্তরাধিকার সংক্রান্ত সমস্যায় সমগ্র মারাঠা রাজনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। নতুন পেশোয়া দ্বিতীয় বাজি রাও নানা ফড়নবীশের হাত থেকে বাঁচার জন্য বিভিন্ন রাজ্যের সঙ্গে জোট বাঁধার চেষ্টা করতে থাকে। এইসময় ১৮০০ সালে নানা ফড়নবীশ পুনাতে দেহত্যাগ করে এবং মারাঠা রাজ্যে রাজনৈতিক অস্থিরতা চরমে পৌঁছয়।দৌলত রাও সিন্ধিয়া তখন পেশোয়াকে সমর্থন করলেও হোলকারের সৈন্যসামন্ত মালওয়া অঞ্চলে ব্যাপক লুঠতরাজ চালাতে শুরু করে দিল।নিরুপায় পেশোয়া দ্বিতীয় বাজি রাও অগত্যা ইংরেজদের শরণাপন্ন হলো। ওয়েলেসলি ইতিমধ্যে ভারতে এসে গেছে এবং ভারতীয় রাজ্যগুলির প্রতি ব্রিটিশদের মনোভাব অনেকটাই পাল্টে গেছে। হায়দ্রাবাদের নিজাম ইংরেজদের সঙ্গে অধীনতামূলক মিত্রতার শর্তাবলী মেনে নিয়েছে। সাবসিডিয়ারি অ্যালায়েন্স বা অধীনতামূলক মিত্রতা নীতির মূল কথা হল যে— কোন দেশীয় রাজ্যের রাজা ইংরেজদের সঙ্গে মিত্রতা চুক্তিতে আবদ্ধ হতে পারবেন । দেশীয় রাজাদের অভ্যন্তরীণ অধিকার ক্ষুন্ন না করে তাঁদের নিজেদের অধীনে রাখাই হল অধীনতামূলক মিত্রতা নীতির মূল কথা । কোনো দেশীয় রাজা এই নীতি গ্রহণ করলে তাঁকে কতকগুলি শর্ত পালন করতে হত, যেমন—

১) অধীনতামূলক মিত্রতায় আবদ্ধ দেশীয় রাজাগুলিকে কোম্পানির বশ্যতা স্বীকার করতে হত ।

২) সংশ্লিষ্ট দেশীয় রাজ্যগুলিতে একদল ইংরেজ সৈন্য এবং একজন ইংরেজ রেসিডেন্ট রাখতে হত ।

৩) সৈন্যবাহিনীর ব্যয়নির্বাহের জন্য মিত্রতাবদ্ধ রাজ্যকে নগদ টাকা বা রাজ্যের একাংশ ছেড়ে দিতে হত।

৪) কোম্পানির বিনা অনুমতিতে অপর কোনো শক্তির সঙ্গে মিত্রতা বা যুদ্ধবিগ্রহ করা যেত না । অর্থাৎ মিত্র রাজ্যগুলির বৈদেশিক নীতি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নির্ধারণ করত ।

৫) চুক্তিবদ্ধ রাজ্যে ইংরেজ ছাড়া অন্যান্য সমস্ত ইউরোপীয়কে তাড়িয়ে দিতে হত ।

৬) এই সব বশ্যতার বিনিময়ে কোম্পানি সেই রাজ্যকে অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ, বৈদেশিক আক্রমণ এবং অন্যান্য বিপদ থেকে রক্ষা করত ।

হায়দ্রাবাদ এবং মাইসোরের পর মারাঠাদের মুখোমুখি হবার সুযোগ পেয়ে গেল ব্রিটিশ। ১৮০২ সালে হোলকাররা যখন পেশোয়াকে পর্যুদস্ত করে এবং পুনাতে ব্যাপক লুন্ঠন শুরু করলো তখন পেশোয়া ভাসাই পালিয়ে গিয়ে ব্রিটিশদের সঙ্গে অধীনতামূলক মিত্রতা চুক্তি স্বাক্ষর করে কার্যত ব্রিটিশদের অধীনতা স্বীকার করে নিল। সুরাত দিয়ে দেওয়া হল কোম্পানিকে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী পেশোয়া দ্বিতীয় বাজি রাওকে পুনার সিংহাসনে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করলো ব্রিটিশ সেনাবাহিনী। কিন্তু মারাঠাদের স্বাধীনতা খর্ব করা গেল না। আসলে এখান থেকেই শুরু হলো দ্বিতীয় ব্রিটিশ-মারাঠা যুদ্ধের। মারাঠা রাজত্ব কুক্ষিগত করার জন্য হোলকার অন্য সর্দারদের সঙ্গে জোট বাঁধার চেষ্টা শুরু করে দিল। অন্যদিকে ওয়েলেসলি এবং লেক বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে যুদ্ধে নেমে পড়লো। প্রায় দু’বছর যুদ্ধের পর ১৮০৫ সালে মারাঠা রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলকে এবং মারাঠা অধিকৃত অন্যান্য অঞ্চলকেও নিজেদের নিয়ন্ত্রনে নিয়ে আসতে সক্ষম হলো ওয়েলেসলি। রাজপুত, জাঠ, রোহিল্লা এবং উত্তর মালওয়ার বুন্দেলারাও ব্রিটিশদের নিয়ন্ত্রনে এসে গেল। সিন্ধিয়ারাও দিল্লি, আগ্রা, গুজরাট এবং অন্যান্য মারাঠা অঞ্চলকে অধীনতামূলক মিত্রতার আওতায় নিয়ে আসতে রাজি হয়ে গেল। কিন্তু এতসব কিছু করার পরেও মারাঠা শক্তিকে সম্পূর্ণ বিনষ্ট করা গেল না। বিদ্রোহের আগুন জ্বলতেই থাকলো সর্দারদের মধ্যে।

অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান যুদ্ধসংক্রান্ত ব্যয়ভার বহন করতে সক্ষম না হয়ে ব্রিটিশ সরকার ওয়েলেসলিকে ১৮০৫ সালে দেশে ফিরিয়ে নিয়ে গেল। নতুন গভর্নর জেনারেল হয়ে আবার এলো কর্নওয়ালিশ। তাকে পরিষ্কার নির্দেশ দেওয়া হলো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকার জন্য। এই সুযোগে হোলকার এবং সিন্ধিয়ারা মালওয়া এবং রাজস্থানের গ্রামাঞ্চলে ব্যাপক লুন্ঠন চালু করে দিল। এভাবেই চলতে থাকলো যতক্ষণ না ১৮১৩ সালে হেস্টিংস ভারতবর্ষে এল নতুন গভর্নর জেনারেল হয়ে। হেস্টিংস এসেই সর্বপ্রধানত্বের নীতি চালু করে। প্যারামাউন্টসি বা সর্বপ্রধানত্বের নীতি অনুযায়ী কোম্পানিই হচ্ছে সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী এবং এই ক্ষমতাকে রক্ষা করার জন্য কোম্পানি যে কোনও রাজ্যের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে পারে এবং প্রয়োজনে সেই রাজ্যকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করে দিতে পারে। এইসময় পেশোয়া দ্বিতীয় বাজি রাও আর একবার সর্দারদের সংগঠিত করে স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের শেষ চেষ্টা করে। শুরু হয় তৃতীয় ব্রিটিশ মারাঠা যুদ্ধ (১৮১৭-১৯)। এই যুদ্ধে হোলকার এবং পিন্ডারিরা সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। ব্রিটিশরা পেশোয়া দ্বিতীয় বাজি রাও এর অধীনস্থ সমস্ত অঞ্চল নিজেদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রনে নিয়ে আসে এবং পেশোয়া প্রথা চিরতরে বিলুপ্ত করে দেয়। ভোঁসলে এবং হোলকারদের নিয়ন্ত্রনে থাকা বিস্তীর্ণ অঞ্চল অধীনতামূলক মিত্রতার আওতায় নিয়ে এসে মারাঠা রাজ্যজয় সম্পূর্ণ করে ব্রিটিশরা।

ইতিমধ্যে উত্তর ভারতেও বিভিন্ন অঞ্চল দখলের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। বক্সারের যুদ্ধ এবং এলাহাবাদ চুক্তির পরবর্তী পর্যায়ে অবধ একটি নিরপেক্ষ রাজ্য হিসাবে ব্রিটিশ অধ্যুষিত বাংলা এবং রাজনৈতিক ভাবে বিপর্যস্ত উত্তর ভারতের মধ্যে অবস্থান করছিল। মারাঠাদের হাত থেকে অবধকে রক্ষা করার অছিলায় ব্রিটিশেরা ১৭৭৩ সালে অবধের দরবারে নিজেদের প্রতিনিধি এবং পাকাপাকি ভাবে ব্রিটিশ সেনাবাহিনী নিয়োগ করে। এই প্রতিনিধি এবং সেনাবাহিনীর ব্যয়ভার বহন করার দায়িত্ব নিতে হয় নবাব সুজাউদ্দৌল্লাকে। এই ব্যয়ের পরিমাণ ক্রমশ বাড়াতে থাকে ব্রিটিশেরা। ব্রিটিশদের এই ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটানোর জন্য করবৃদ্ধি করতে বাধ্য হয় নবাব সুজাউদ্দৌল্লা। করবৃদ্ধির ফলস্বরূপ তালুকদারদের সঙ্গে সংঘাত বাঁধে নবাবের এবং অবধে সৃষ্টি হয় রাজনৈতিক অস্থিরতা। এই অস্থিরতার অজুহাতেই পরবর্তীকালে অবধ দখল করে নেয় ব্রিটিশ। ওয়ারেন হেস্টিংস ১৭৭৪ সালে গভর্নর জেনারেল হওয়ার পর সিদ্ধান্ত নেয় যে খরচের সমপরিমাণ রাজস্ব ব্রিটিশরা নিজেরাই আদায় করে নেবে এবং তার জন্য অবধ রাজ্যের কিছু কিছু অঞ্চল তারা অধিগ্রহণ করবে। মাইসোরের যুদ্ধ এবং ফরাসিদের মোকাবিলায় বিপুল অর্থব্যয়ের কারণে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন হয়ে পড়ে ব্রিটিশদের। সেইসময় অবধের নবাব বেনারসের উপর আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা চালাচ্ছিল। অবধের হাত থেকে বাঁচানোর নামে এই টাকা আদায়ের জন্য বেনারসের রাজা চৈত সিং এর উপর চাপ সৃষ্টি করতে থাকে ব্রিটিশেরা। ব্রিটিশদের চাপের কাছে নতিস্বীকার করে অবশেষে ১৭৮১ সালে ব্রিটিশদের কাছে বেনারসকে গচ্ছিত রাখতে বাধ্য হয় চৈত সিং। ১৭৭৫ সালে নবাব সুজাউদ্দৌল্লার মৃত্যু হয়। সুজাউদ্দৌল্লার বিশাল সম্পদের অধিকারী হয় তার স্ত্রী বেগম উম্মত উজ জাহারা। হেস্টিংসের নির্দেশে ব্রিটিশদের কাছে প্রয়াত সুজাউদ্দৌল্লার ধার মেটানোর জন্য তার কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ মাসোহারা আদায় করতে শুরু করে ব্রিটিশরা। অবধ অধিগ্রহণের পরিকল্পনা ব্রিটিশদের দীর্ঘদিন ধরেই ছিল। ১৮০১ সালে ওয়েলেসলি এই পরিকল্পনাকে বাস্তবায়িত করে যখন নবাব ওয়াজির আলি খান ব্রিটিশদের চাহিদা মেটোনোর অক্ষমতার কথা সর্বসমক্ষে জানায়। অবশ্য এই অধিগ্রহণের পিছনে অন্যান্য কারণও ছিল। এলাহাবাদ চুক্তির পর নবাব সুজাউদ্দৌল্লা বারবার কোম্পানির কাছে অভিযোগ জানিয়েছিল যে কোম্পানিকে দেওয়া করমুক্ত বাণিজ্যের অধিকারের ব্যাপক অপপ্রয়োগ ঘটাচ্ছে ইউরোপীয় ব্যবসায়ীরা এবং তাদের ভারতীয় গোমস্তারা তাদের নিজেদের ব্যবসার জন্য। কোম্পানির অধিকর্তারা এব্যাপারে কিছু পদক্ষেপ নিতে পারেনি।এছাড়াও সমুদ্রপথে বাণিজ্যের জন্য তখন অবধ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। অষ্টাদশ শতাব্দির শেষদিকে লন্ডনে নীলের চাহিদা বৃদ্ধি পেতে থাকে। এই চাহিদার শতকরা ষাট ভাগ আসত অবধ থেকে। অবধের তুলো চিনা বাজারে বিক্রি করা হতো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ভারসাম্য ব্রিটিশদের অনুকূলে রাখার জন্য। সুতরাং ১৭৮৮ সালে কর্নওয়ালিশের সঙ্গে অবাধ এবং মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়া সত্ত্বেও রপ্তানির উপর নবাবের কর চাপানোর সিদ্ধান্ত নিশ্চিতভাবেই অনভিপ্রেত এবং যথেষ্ঠ বিরক্তির কারণ ছিল। সুতরাং অধিগ্রহণ অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠলো যখন ওয়েলেসলি রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের অভিপ্রায় সঙ্গে নিয়ে ভারতবর্ষে এসে পৌঁছলো।

অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে প্রথম হস্তক্ষেপ করার সুযোগ এল ১৭৯৭ সালে সুজাউদ্দিন এর উত্তরসূরী নবাব আসাফুদ্দৌল্লার দেহান্তের পর। ব্রিটিশরা তার ছেলের নবাবের আসনের দাবি না মেনে আসাফুদ্দৌল্লার ভাই সাদাত আলি খানকে সিংহাসনে বসাল। মূল্যবাবদ সাদাত আলি খান ব্রিটিশদের বেশকিছু অঞ্চলের রাজস্ব আদায়ের অধিকার এবং কয়েক কিস্তিতে বছরে ৭৬ লক্ষ টাকা ভর্তুকি দেবার প্রতিশ্রুতি দিল। নতুন নবাব বছর বছর টাকা দিতে রাজি হলেও তার শাসনব্যবস্থায় ব্রিটিশদের হস্তক্ষেপ করার ক্ষেত্রে তীব্র আপত্তি জানালো। ব্রিটিশদের আসল উদ্দেশ্য সাধিত হল না। ১৮০১ সালে ওয়েলেসলি নিজের ভাই হেনরিকে পাঠালো সাদাত আলি খানের সঙ্গে ভর্তুকির প্রসঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হতে। চুক্তির ফলস্বরূপ অর্ধেক অবধ ব্রিটিশদের হাতে চলে গেল। চুক্তি অনুযায়ী এটা ঠিক হলো যে ভর্তুকির টাকা ব্রিটিশরা সরাসরি রাজস্ব হিসাবে রোহিলখন্ড, গোরখপুর এবং দোয়াব থেকে আদায় করে নেবে। বাস্তবে এই তিনটি অঞ্চল থেকে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ছিল প্রায় এক কোটি চল্লিশ লক্ষ টাকা যা ছিল নির্দ্ধারিত ভর্তুকির প্রায় দ্বিগুন। যদিও যুক্তি হিসাবে দেখানো হল যে সাদাত আলি খানের অপশাসন থেকে অবধকে বাঁচাবার জন্য ব্রিটিশরা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে আসলে এই পদক্ষেপ রাজস্ব এবং ব্যবসার ক্ষেত্রে ঔপনিবেশিক চাহিদা ছাড়া আর কিছু নয়। যদিও এই চুক্তি ভর্তুকি আদায় সংক্রান্ত সমস্যার সম্ভাবনা সম্পূর্ণভাবে বিনষ্ট করেছিল তবুও ব্রিটিশদের জুলুমের কোনও অন্ত ছিল না। লক্ষ্ণৌ এর ব্রিটিশ রেসিডেন্সি ধীরে ধীরে অবধের ক্ষমতার কেন্দ্র হয়ে উঠতে থাকলো। অর্থ, সামরিক সহযোগিতা এবং নানারকম সুবিধার বিনিময়ে ব্রিটিশরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন দরবার, প্রশাসক এবং জমিদারশ্রেণী তৈরি করে নিল। ক্রমে ক্রমে পরিকল্পিত ভাবে এই ব্যবস্থার মাধ্যমে নবাবকে কার্যত ক্ষমতাশূণ্য করে দিল ব্রিটিশ রেসিডেন্সি। অবশেষে ১৮৫৬ সালে অপশাসনের অজুহাতে লর্ড ডালহৌসি অবধের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রন নিজেদের করায়ত্ত করে নিল। উত্তর ভারত দখল প্রায় শেষ। বাকি রইল কেবল শিখ অধ্যুষিত পাঞ্জাব। অষ্টাদশ শতকের শেষ ভাগে ১৭৯৫ থেকে ১৭৯৮ সালের মধ্যবর্তী সময়ে রঞ্জিত সিং এর নেতৃত্বে শিখ সম্প্রদায় সংঘবদ্ধ হয়েছিল । রঞ্জিত সিং এর জীবদ্দশায় ব্রিটিশরা পাঞ্জাবের ধারে কাছে আসতে সাহস করেনি। রঞ্জিত সিং এর মৃত্যুর পর পাঞ্জাবে রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু হয়। উত্তরাধিকার নিয়ে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সংঘাত এবং যুদ্ধের শুরু হয়। রঞ্জিত সিং দীর্ঘ প্রচেষ্টায় বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে যে ভারসাম্য সৃষ্টি করে এক পতাকার তলায় সকলকে সমবেত করেছিলেন সেই ভারসাম্য ধীরে ধীরে ভেঙে পড়তে থাকে। এই সুযোগে প্রশাসনের অভ্যন্তরে দুর্নীতি বাসা বাঁধতে থাকে। পাঞ্জাবি এবং ডোগরাদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং কারদারদের অবাধ লুন্ঠন পাঞ্জাবের অর্থনীতিকে প্রায় ধ্বংস করে দিল। পাঞ্জাবের বিভিন্ন সম্প্রদায় ক্রমাগত একে অপরের থেকে দূরে সরে যেতে লাগলো। ব্যবসায়ী সম্প্রদায় বিরক্ত হয়ে উঠতে লাগলো এবং পরিস্থিতি ক্রমশ ব্রিটিশ হস্তক্ষেপের অনুকূল হয়ে উঠতে শুরু করলো। সংক্ষেপে বলতে গেলে ১৮৩৯ সালে রঞ্জিত সিং মারা যাওয়ার আগে তার ছেলে খড়ক সিংকে উত্তরাধিকার অর্পণ করে যান। খড়ক সিং নিজে দক্ষ প্রশাসক ছিল না এবং বহুলাংশেই তার ডোগরা উজির রাজা ধ্যান সিং এর উপর নির্ভরশীল ছিল। সম্পর্ক প্রথমে ভালো থাকলেও পরবর্তী কালে খড়ক সিং এর ক্ষমতা হ্রাস করার জন্য ধ্যান সিং রাজদরবারে ডোগরা বিরোধীদের পৃষ্ঠপোষকতা করতে থাকে। ধ্যান সিং তখন যুবরাজ নাও নিহাল সিং এর সঙ্গে জোট বেঁধে ডোগরা বিরোধীদের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে। কিন্তু এই লড়াই বেড়ে ওঠার আগেই ১৮৪০ সালে খড়ক সিং এর মৃত্যু হয়। তার কিছুদিনের মধ্যেই এক আকস্মিক দুর্ঘটনায় নাও নিহাল সিং এর মৃত্যু হয়। এমতাবস্থায় সিংহাসনের অধিকার নিয়ে পরিবারের মধ্যে সংঘাত শুরু হয়। একদিকে ছয় জীবিত যুবরাজের একজন যুবরাজ শের সিং অন্যদিকে খড়ক সিং এর পত্নী মহারাণী চাঁদ কাউর। তিনি সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হিসাবে নিহাল সিং এর বিধবা পত্নীর গর্ভস্থ সন্তানের অধিকার দাবি করেন। ডোগরা সম্প্রদায় শের সিং এর প্রতি তাদের সমর্থন জ্ঞাপন করে। অন্যদিকে সিন্ধনওয়ালিয়া সর্দারেরা মহারাণীর পক্ষ নেয়। দু পক্ষই সমর্থন চেয়ে ব্রিটিশদের দ্বারস্থ হয়। ব্রিটিশরা নিরপেক্ষ থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। অবশেষে ডোগরাদের চক্রান্তে শের সিং সিংহাসনে বসে এবং উজির ধ্যান সিং এর সাহায্য প্রার্থনা করে। কিন্তু ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে। কিছুদিনের মধ্যেই ধ্যান সিং এর ক্রমবর্ধমান ক্ষমতা হ্রাসের অভিপ্রায়ে শের সিং তার বিরোধীপক্ষের সিন্ধনওয়ালিয়া সর্দারদের সাহায্য প্রার্থনা করে। সিন্ধনওয়ালিয়া সর্দারেরা বৃহত্তর রাজপরিবারের অংশ ছিল।তারা সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। সিন্ধনওয়ালিয়া সর্দারেরা ১৮৪৩ সালে শের সিং , শের সিং এর পুত্র এবং রাজা ধ্যান সিংকে হত্যা করে নিজেদের প্রতিহিংসা চরিতার্থ করে। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়। ধ্যান সিং এর ছেলে রাজা হীরা সিং ডোগরা সেনাবাহিনীর একাংশের সাহায্যে সিন্ধনওয়ালিয়া নেতাদের হত্যা করে রঞ্জিত সিং এর কনিষ্ঠ সন্তান পঞ্চবর্ষীয় দলীপ সিং কে সিংহাসনে বসিয়ে নিজে উজিরের পদে বসে। রাজপ্রাসাদের অভ্যন্তরীণ বিবাদ এবং সর্দারদের পারষ্পরিক শত্রুতা বাড়তেই থাকে। ইতিমধ্যে খালসা সেনাবাহিনী নিজেরা ক্ষমতার কেন্দ্রে এসে পাঞ্জাবের রাজনীতি নিয়ন্ত্রন করতে শুরু করে। শের সিং এর রাজত্বে সেনাবাহিনীর সদস্যেরা ছোট ছোট দল বা পঞ্চায়েত গঠন করে সরাসরি মহারাজের সঙ্গে যোগসূত্র স্থাপন করে। এইসমস্ত পঞ্চায়েতগুলি এখন রাজদরবারে তাদের চাহিদা বাড়াতে থাকে দিনের পর দিন। তাদের চাহিদা না মিটিয়ে হীরা সিং এর পক্ষে টিকে থাকা সম্ভব ছিল না। কিন্তু এইভাবে বেশিদিন চলা সম্ভব নয়। সেনাবাহিনীর মধ্যে ডোগরা বিরোধী মনোভাব বাড়তে থাকে এবং ১৮৪৪ সালে হীরা সিং সেনাবাহিনীর বিক্ষুব্ধ অংশের হাতে নিহত হয়। দলীপ সিং এর মা অর্থাৎ রঞ্জিত সিং এর কনিষ্ঠা স্ত্রী মহারাণী জিন্দন রিজেন্ট নিযুক্ত হয় এবং তার ভাই সর্দার জওয়াহির সিং উজিরের পদে বসে। কার্যত এই দুজনেই সেনাবাহিনীর হাতের পুতুল ছিল। একদিকে খালসা সেনাবাহিনীর রাজনৈতিক উত্থান এবং গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র নিয়ে তাদের পরিকল্পনা এবং অন্যদিকে লাহোরে কোনও স্থায়ী সরকার না থাকায় ব্রিটিশরা পাঞ্জাব নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলো। ঊনবিংশ শতকের প্রথম দিকে ব্রিটিশরা পাঞ্জাবকে একদিকে অধিকৃত উত্তর ভারত এবং অন্যদিকে পার্সিয়া এবং আফগানিস্তানের মুসলমান শাসকদের মধ্যে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করছিল। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পাবার সঙ্গে সঙ্গে ব্রিটিশরা বুঝতে পারল এই নীতি আর কাজে লাগবে না। ১৮৪০ সাল থেকেই ব্রিটিশরা শিখদের সঙ্গে যুদ্ধের ব্যাপারে চিন্তাভাবনা শুরু করেছিল। ১৮৪৩ সাল থেকে ব্রিটিশরা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। ১৮৪৫ সালের সেপ্টেম্বর সেনাবাহিনীর হাতে জওয়াহির সিং এর হত্যার সঙ্গে সঙ্গে লর্ড হার্ডিঞ্জ পাকাপাকি ভাবে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেয় এবং ১৩ই ডিসেম্বর ১৮৪৫ শুরু হয় ব্রিটিশদের সঙ্গে শিখদের যুদ্ধ। অসফল যুদ্ধ পরিচালনা এবং কিছু সর্দারদের বিশ্বাসঘাতকার জন্য শিখরা এই যুদ্ধে ব্রিটিশদের কাছে পরাজিত হয়। ১৮৪৬ সালে স্বাক্ষরিত হয় অপমানজনক লাহোর চুক্তি। এই চুক্তি অনুযায়ী জলন্ধর দোয়াবের বিলুপ্তি ঘটে, কাশ্মির দিয়ে দেওয়া হয় ব্রিটিশ তাঁবেদার জম্মুর রাজা গুলাব সিংকে। লাহোর সেনাবিহিনীর সৈন্যসংখ্যা কমিয়ে সেখানে ব্রিটিশ সেনাবাহিনী বসানো হয়। দলীপ সিংকে সিংহাসনে রাখা হলো কিন্তু অভিবাবকের আসনে বসানো হলো ব্রিটিশ প্রতিনিধিকে।মহারাণী জিন্দানকে সরানো হল রিজেন্ট পদ থেকে এবং ব্রিটিশ প্রতিনিধির হাতে সমস্ত বিভাগের সমস্ত সিদ্ধান্ত নেবার একচ্ছত্র অধিকার দেওয়া হলো। রাজা এবং রাজমাতার ভূমিকা কেবলমাত্র প্রতীকী হয়ে রইল। যেহেতু ব্রিটিশদের উদ্দেশ্য ছিল পাঞ্জাবকে সামগ্রিক ভাবে নিজেদের করায়ত্ত করা সেইজন্য ১৮৪৯ সালে দ্বিতীয় ব্রিটিশ- পাঞ্জাব যুদ্ধের অব্যবহিত পরেই বিদ্রোহী মুলতানের গভর্নর দিওয়ান মুল রাজ, আটারিওয়ালার গভর্নর সর্দার ছত্তর সিং এবং তার পুত্র হরিপুরের রাজা শের সিংকে দমন করার অজুহাতে সমগ্র পাঞ্জাব নিজেদের অধিকারে নিয়ে নিল ব্রিটিশরা। ১৮৪৯ সালের ২৯শে মার্চ মহারাজা দলীপ সিং পাঞ্জাবের স্বাধীনতা ব্রিটিশদের হাতে তুলে দিয়ে পাঞ্জাবকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাম্রাজ্যের একটি প্রদেশে পরিণত করার চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করতে বাধ্য হলো। বিদ্রোহী সর্দারদের একে একে ব্রিটিশদের কাছে আত্মসমর্পণ করা ছাড়া আর কোনও উপায় রইলো না।

উনবিংশ শতকের প্রথমার্ধে ভারতবর্ষের অন্যান্য অঞ্চলগুলিও ক্রমে ক্রমে ব্রিটিশদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ নিয়ন্ত্রনে আসতে থাকল। কোম্পানি অধিকৃত এই সাম্রাজ্যের নিরাপত্তাজনিত কারণে ব্রিটিশ আগ্রাসন আরও তীব্র আকার ধারণ করলো। ভারতবর্ষের ব্রিটিশ সামরিক আধিকারিকেরা দেশের বাইরে এবং ভিতর থেকে আক্রমণের আশঙ্কায় বিচলিত হয়ে যত্রতত্র সামরিক ক্ষমতাপ্রদর্শনের নেশায় মেতে উঠলো। এই নিরাপত্তাজনিত আশঙ্কার কারণেই আগ্রাসন সংক্রান্ত ব্রিটিশ সরকারের এবং লন্ডনের কোম্পানি কর্তাদের সমস্ত বিধিনিষেধ ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। ১৮২৩ সালে আমহার্স্ট যখন ভারতের গভর্নর জেনারেল হয়ে আসে তখন তার প্রতি নির্দেশ ছিল যে ভারতবর্ষে ব্যয়সাপেক্ষ রাজকীয় যুদ্ধ এবং আগ্রাসনের প্রক্রিয়া বন্ধ করে যেন শান্তির পরিবেশ ফিরিয়ে আনা হয়। কিন্তু ভারতে পৌঁছোনোর সঙ্গে সঙ্গেই বাঙলার উত্তর-পূর্ব সীমান্তে বর্মা থেকে আক্রমণের সম্ভাবনা প্রবল হয়ে উঠলো। বর্মার রাজশক্তি অষ্টাদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে রাজ্যবিস্তারের উদ্দেশ্যে ক্রমে ক্রমে পেগু, তেনাসেরিম এবং আরাকানের বিস্তীর্ণ অঞ্চল দখল করে নেয়। উনবিংশ শতকের প্রথম দিকে মণিপুর, কাছার এবং আসামে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করে। এতদিন বর্মার এইসমস্ত কাজকর্মকে কোম্পানির কর্তারা খুব একটা আমল দেয়নি। কিন্তু এখন ব্রিটিশ সামরিকবাহিনী এলাকাদখলের নেশায় উন্মত্ত। তারা যুক্তি খাড়া করলো যে বর্মার এই আগ্রাসন থেকে অভ্যন্তরীণ শত্রুরা সাহস সঞ্চয় করছে। বিপদের সম্ভাবনা সমূলে বিনষ্ট করার জন্য বর্মাকে উপযুক্ত শিক্ষা দেওয়া খুব দরকার। ১৮২৪ সালে শুরু হলো প্রথম বর্মা যুদ্ধ। আসাম, নাগাল্যান্ড এবং বর্মা অধিকৃত আরাকান এবং তেনাসেরিম ব্রিটিশরা দখল করে নিল। ১৮৩০ সালে কাছার এবং ১৮৩৪ সালে বেন্টিঙ্কের আমলে কুর্গও ব্রিটিশদের দখলে এসে গেল। বর্মা যেমন উত্তর-পূর্ব ভারতে তেমনই রাশিয়া ছিল উত্তর-পশ্চিমে ভয়ের কারণ। সুতরাং উত্তর-পশ্চিমেও আগ্রাসনের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেল। অকল্যান্ডের নেতৃত্বে ১৮৩৮ থেকে ১৮৪২ অবধি চলে আফগান যুদ্ধ। ১৮৪২ সালে ব্রিটিশরা নিজেদের অনুগত রাজাকে সিংহাসনে বসিয়ে আফগানিস্থানকে পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণের অধীনে নিয়ে আসে। এলেনবরো ১৮৪৩ সালে সিন্ধ দখল করে। কিন্তু ঔপনিবেশিক আগ্রাসন চূড়ান্ত রূপ নেয় ডালহৌসির সময় (১৮৪৮ থেকে ১৮৫৬ সাল পর্যন্ত)। ব্রিটিশ প্রবর্তিত স্বত্ববিলোপ নীতির আশ্রয় নিয়ে অনেক রাজ্যকেই সরাসরি নিজেদের আওতায় নিয়ে আসে ডালহৌসি। এই নীতি অনুযায়ী যদি কোনও রাজা কোনও পুরুষ উত্তরাধিকারী না রেখে দেহত্যাগ করে তাহলে সেই সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ ব্রিটিশদের হাতে সরাসরি চলে আসবে। এই নীতি ব্যবহার করে ১৮৪৮ সালে সাতারা, ১৮৫০ সালে সম্বলপুর এবং বাঘাট, ১৮৫২ সালে উদয়পুর, ১৮৫৩ সালে নাগপুর এবং ১৮৫৪ সালে ঝাঁসি দখল করে নেয় ব্রিটিশেরা। ১৮৫২-৫৩ সালে দ্বিতীয় বর্মা যুদ্ধ জয় করে পেগু দখল করে ব্রিটিশবাহিনী। সেনাবাহিনীর খরচ আদায়ের জন্য ১৮৫৩ সালে হায়দ্রাবাদ থেকে বেরার বিচ্ছিন্ন করে অধিগ্রহণ করে নেয় ব্রিটিশেরা। ১৮৫৭ সালের মধ্যে ভারতবর্ষের ৬৩ শতাংশ অঞ্চল এবং ৭৮ শতাংশ জনগণ সরাসরি ব্রিটিশদের অধীনে চলে আসে। বাকি অঞ্চলগুলি ইংরেজদের অনুগত রাজাদের অনুশাসনেই থাকে। ব্রিটিশরা এইসময়ে সরাসরি অধিগ্রহণের পথ ছেড়ে পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণের পথ বেছে নেয়। খাতায় কলমে স্বশাসিত হলেও আসলে এইসমস্ত রাজারা ছিল ব্রিটিশদের তাঁবেদার এবং প্রতি পদক্ষেপে ব্রিটিশদের হস্তক্ষেপ তাদের একরকম পুতুল করে রেখেছিল।

অবাধ এবং মুক্ত বাণিজ্যের প্রয়োজনে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং অধিগ্রহণ শুরু হলেও শেষ অবধি ভারতবর্ষকে ব্রিটিশ উপনিবেশে পরিণত করে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলই হয়ে ওঠে তাদের মূল লক্ষ্য। কিন্তু ভারতবর্ষের মত এক বিশাল দেশকে সম্পূর্ণ নিজেদের অধীনে নিয়ে আসা সহজসাধ্য ছিলনা। সেই সময় নানা কারণে মোগলেরা দূর্বল হয়ে পড়েছিল কিন্তু যে সমস্ত অন্য রাজ্যেরা সেই সুযোগে সিংহাসন দখলের চেষ্টা করছিল তারা কিন্তু খুব একটা দূর্বল ছিল না। প্রচুর সংখ্যক সৈন্য এবং অস্ত্রশস্ত্র ছিল এই সব রাজ্যের কাছে যদিও আধুনিকতার নিরিখে এই সব অস্ত্রশস্ত্র ব্রিটিশদের চাইতে অনেক নিম্নমানের ছিল। পৃথিবী জুড়ে ব্রিটিশ এবং ফরাসিদের মধ্যে দ্বন্দ্ব তখন বেড়েই চলেছে। সেই কারণে ভারতে অভূতপূর্ব মাত্রায় ব্রিটিশ সৈন্যের সংখ্যা বাড়তে থাকলো। তবে উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হলো এই সময় ব্রিটিশরা ভারতবর্ষে ভারতীয়দের ব্রিটিশ সৈন্যবাহিনীতে নিযুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু করে দিল। ব্রিটিশ অফিসারদের দ্বারা প্রশিক্ষিত নতুন সেনাবাহিনী ব্রিটিশদের প্রতিপক্ষ রাজ্যগুলিকে শায়েস্তা করার কাজে নিযুক্ত করা হলো। এই বিশাল সেনাবাহিনীর সাহায্যে ব্রিটিশরা অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠলো এবং অধীনতামূলক মিত্রতার অধীন রাজ্যগুলির থেকে আর্থিক চাহিদা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে লাগলো। বাণিজ্য বৃদ্ধির জন্য সীমান্ত সুরক্ষিত রাখা ব্রিটিশদের কাছে আবশ্যিক হয়ে উঠেছিল। সীমান্ত সুরক্ষিত রাখার জন্য সরাসরি রাজ্য দখল করা ছাড়া আর কোনও উপায় ছিল না। চলতে থাকলো একের পর এক রাজ্য দখলের যুদ্ধ। রাজস্বের বেশিরভাগ অংশই খরচ হয়ে যেত যুদ্ধে এবং সেনাবাহিনীর ভরণপোষণে। পরিকল্পিত ভাবে অভ্যন্তরীণ এবং বহিঃশত্রুর থেকে আক্রমণের আশঙ্কা সৃষ্টি করে এই বিপুল সেনাবাহিনীকে সবসময়ে যুদ্ধে নিযুক্ত রাখা হতো।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাফল্যের অন্যতম কারণ ছিল অর্থ এবং রসদ সংগ্রহের ক্ষেত্রে তাদের প্রতিপক্ষ রাজ্যগুলির থেকে এগিয়ে থাকা। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সৈন্যদের খাওয়া, থাকা এবং নিয়মিত বেতন প্রদানের ক্ষেত্রে ব্রিটিশরা কোনও কার্পণ্য করতো না। এছাড়াও ভারতীয় ব্যাঙ্কগুলি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দেশীয় রাজাদের চাইতে ব্রিটিশদের বেশি বিশ্বাস করতো। প্রয়োজনে ব্যাঙ্কগুলির থেকে টাকা ধার পেতে ব্রিটিশদের কোনও অসুবিধে হতো না। যেহেতু রাজ্যগুলিকে সরাসরি দখল করে রাজস্ব আদায় ব্রিটিশরা নিজেরাই করতে থাকল সেইজন্য ব্যাঙ্কের উপর নির্ভরতাও ক্রমাগত কমে যেতে থাকলো। পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণের অধীনে থাকা রাজ্যগুলি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্রিটিশদের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে চলে আসতে থাকলো। সমস্ত দেশজুড়ে কায়েম হতে থাকলো ব্রিটিশরাজ। রাজ্যশাসন এবং রাজস্ব আদায় দুইই এখন সরাসরি কোম্পানির হাতে । রাজস্ব আদায়, বাণিজ্য এবং সামরিক অভিযান ভারতবর্ষে ব্রিটিশ উপনিবেশ স্থাপনের জন্য একইসূত্রে গ্রথিত ছিল।

অষ্টাদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ইংল্যান্ড ছিল বিশ্বের ধনী দেশগুলির অন্যতম। অন্য ধনী দেশগুলি যখন সাম্রাজ্যবিস্তারে ব্যস্ত ব্রিটিশ শাসকেরা যুদ্ধের পথে সাম্রাজ্যবিস্তারের পথে না গিয়ে বিশ্বব্যাপী মুক্ত এবং অবাধ বাণিজ্যের পথ অবলম্বন করে। ব্রিটিশ সরকার দেশের বড় কোম্পানিগুলিকে অন্যদেশে বাণিজ্যবৃদ্ধির অনুমতি দেয়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতবর্ষে বাণিজ্যবৃদ্ধির অনুমতি পায়। বিনিয়োগ এবং বাজার দখলই ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রাথমিক উদ্দেশ্য। এই সম্পদবৃদ্ধির প্রক্রিয়ায় সরকার ছিল কোম্পানির অন্যতম সহযোগী। কোম্পানি এবং সরকারের যুগলবন্দী সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাণিজ্যবৃদ্ধি এবং সম্প্রসারণের প্রয়োজনে ভারতবর্ষের অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করে ধীরে ধীরে ভারতবর্ষকে ব্রিটিশ উপনিবেশে পরিণত করে। বাজার দখল দিয়ে শুরু করে গোটা দেশকেই দখল করে নেয় ব্রিটিশ।
0
undefined undefined undefined

গল্প - রূপশ্রী ঘোষ

Posted in




















‘লড়াই লড়াই লড়াই চাই’। ‘লড়াই করে বাঁচতে চাই’। ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’। ‘সর্বক্ষয়ী দলের কালো হাত ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও’। ‘এই লড়াই লড়াই লড়াই চাই’। ‘লড়াই করে বাঁচতে চাই’। পাটুলির ফুটপাত দিয়ে একজন মধ্যবয়সী লোক হেঁটে যাচ্ছে আর নিজের মনে একাই এভাবে স্লোগান আওড়ে চলেছে। মধ্যবয়সী লোক, কিন্তু দেখে এক ঝটকায় কুড়ি পঁচিশ বছরের ছেলেও মনে হতে পারে। খুব শান্তশিষ্ট, ভদ্রসভ্য দেখতে। চোখেমুখে লেখাপড়ার ছাপ স্পষ্ট, কিন্তু দৃষ্টিতে একটা কুটিল কুটিল ভাব আছে। রুহিও ওইপথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল। সে বারবার একই স্লোগান শুনতে শুনতেই হাঁটছিল। তারপর আর তার কৌতূহল চেপে থাকতে না পেরে একটু এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করেই ফেলল –

এই? আপনি কে? এমন এভাবে একাই মিছিলের মতো স্লোগান দিচ্ছেন? মিছিলে তো প্রথমে একজন বলে, তারপর পিছনের বহুলোক সমস্বরে ওই কথাটাই বলে বা প্রশ্ন হলে তার জবাব দিয়ে একটা গণগর্জন তুলতে তুলতে হাঁটে। আপনি এমন একাই এসব করছ, কী ব্যাপার?


আমার দল সর্বহারা।


মানে? আপনাকে দেখে একটু চেনা চেনা লাগছে। নাম কী?


আমার নাম এক্স।


এক্স? বললেই হল?


কেন? হবে না কেন? এত এক্স ওয়াই ধরে অঙ্ক করলেন আর আমার নাম এক্স শুনেই চিৎকার করছেন? ওইতো আমার এক মেয়ে বন্ধুর নাম ওয়াই। সেও ওই প্রোলেতারিয়েতদের দল করে।


প্রোলেতারিয়েতদের দল? মানেটা কী?


আরে প্রোলেতারিয়েত, প্রোলেতারিয়েত। যাকে বলে সর্বহারা। ম্যাক্সিম গোর্কির ‘মা’ পড়েছেন? পড়লে ওখানে ওই শব্দটা পেতে্ন। আপনারা তো কিছুই পড়েন না। আমরা যারা সর্বহারাদের দল করি, তারা অনেক লেখাপড়া করি।


ও! তা আপনাদের ওই সর্বহারা দলটা সম্পর্কে একটু বুঝিয়ে দেবেন? কী কাজ করেন শুনি।


আরে ওই তো, আমাদের একটা ম্যা-ম্যা-ম্যানুফেস্টো আছে। সেটা পড়ে নেবেন। সব জেনে যাবেন।


অ। তা একটু গুছিয়ে বলতে কী হয়? একা একাই যখন মিছিলের স্লোগান দিতে দিতে হাঁটছেন তখন তো আপনার ... ওই কী বললেন, ম্যানুফেস্টো সম্পর্কে জ্ঞান দিতেও ভালো লাগা উচিত…


হ্যাঁ তা লাগে, তো আমার অত সময় নেই, সংক্ষেপে যা দাঁড়ায় তা হল আমরা প্রতিবাদ করি। খেটে খাওয়া মানুষদের সমান কাজ, সমান অধিকার চাই। দারিদ্র ঘোচাতে চাই।


ও, তাই নাকি? তা সর্বহারাদের দল যখন, তখন কি সব হারিয়েছেন? নাকি আপনাদের দলটাই হারিয়ে গেছে? চেহারা সাজ পোশাক দেখে তো কিছুই হারিয়েছেন বলে মনে হচ্ছে না।


আরে আমার কথা বলছি নাকি? আমি তো সর্বহারা জনগণের কথা বলছি।


ও, তো আপনি কে? প্রতিনিধি?


হ্যাঁ, বলতে পা্রেন।


আর আপনার ওই বন্ধু ওয়াই, সেও?


হ্যাঁ সেও। তার ইনফ্লুয়েন্সেই আমি এই দলটা করি। নাহলে আমি কোনো দলকেই ভোট দিতাম না।


তাই বলুন। কারণ আমি স্কুল কলেজ থেকেই আপনার মুখ চিনি। আপনি ওই ক্লাসের সবচেয়ে ভালো ছেলেটার মতো স্যুটকেশ হাতে নিয়ে, চুলের বাঁদিকে সিঁথি কেটে, ফার্স্ট বেঞ্চে ভালো ছেলেটার মতোই বসে থাকা বলে জানি। কলেজ টলেজেও ওই একইভাবে দেখেছি। কোনোদিন কোনো ইউনিয়নে টিউনিয়নে হাঁটতেও তো দেখিনি। আর এখন একাই হেঁটে হেঁটে একটা মিছিল বানিয়ে ফেলছেন?


আপনি আমায় চেনেন নাকি?


আমি আপনাকে চিনি। কিন্তু আপনারা আমাদের মতো লোককে চেনেন না। কেন বলুন তো?


এটা মগজ ধোলাই। এটা ওয়াই আমাকে শিখিয়েছে।


তা আপনার ওয়াই কি সর্বহারা?


না, সেও সর্বহারা নয়। তার অনেক টাকা পয়সা সম্পত্তি। বিদেশেও থাকে মাঝে। দেশেও অনেক বাড়ি গাড়ি।


ও বাব্বা! অবাক কাণ্ড তো মশাই। এতকিছু সম্পত্তি বাগিয়ে সে কিনা সর্বহারাদের প্রতিনিধি? আপনার কালটিভেট করতে ইচ্ছে হয়নি মশাই? আপনার সম্পর্কে তো অনেক অনেক ভালো ভালো কথা বলত সবাই। আপনি নাকি গোয়েন্দা গল্প সব গুলে খেতেন। তা আমাদের ফেলু মিত্তির আপনার মাথায় ধাক্কা মারেননি? আপনিও ওই দলে ভিড়ে গেলেন? আমি আসলে আপনারই পাড়ার মেয়ে, আর আপনার স্কুল কলেজেই পড়াশুনো। তাই আপনার সম্পর্কে অনেককিছু জানি।


ও তাই নাকি? তা কী কী জানেন?


সেসব পরে হবে। আপনি এখন আপনার ওই সর্বহারা দল নিয়ে বলুন কী কী জানেন। আমি বরং শুনি।


আরে সর্বহারা দল নিয়ে আর শোনার কী আছে, ও তো সবাই জানে। ওরা দুর্নীতি শুরু করেছিল বলে সব হারিয়েছে। আমি বরং শাসক দল নিয়ে বলি। ওদের সম্পর্কে আমার এখন শুনে শুনে অনেক ধারণা হয়েছে।


তা কী ধারণা হয়েছে শুনি…


আরে ওই যে রেলইয়ার্ডে কী সব ঘটল না, সেটার পিছনে কার হাত, কত বড়ো হাত সব ওয়াই আমাকে বলেছে। আর বলেছে ওই দলের প্রধান যিনি তিনি নাকি কোনো নারীকেই সম্মান করেন না।


ও তাই নাকি? তা আমিও শুনেছি বটে। কিন্তু আপনার সম্পর্কেও নাকি ওই একই কথা শোনা যায়…


মানে? আমার সম্পর্কে কেন শোনা যাবে? আমি কি কোনো বড়ো নেতা বা নেত্রী?


না, আপনি নেত্রী নন তো বটেই। আপনি পুরুষ। আপনার নামও এক্স।


তো? তাহলে কী শুনেছেন? আমি বিখ্যাত কেউ নই।


না, মানে খুব বিখ্যাত কেউ নন। কিন্তু আপনি যতটুকু বিখ্যাত হয়েছেন তা ওই কু কেলেঙ্কারি দিয়েই।


মানে? আপনি আমার সম্পর্কে এসব কোথায় শুনেছেন? কী শুনেছেন? এইজন্য আপনি এগিয়ে এসে আমার সঙ্গে আলাপ করলেন? এসব বলবেন বলে?

এক্স গজগজ করতেই থাকলেন। রুহি আর কোনো কথা না বাড়িয়ে এক্সকে উস্কিয়ে দিয়ে হনহন করে হেঁটে গেল। আসলে রুহি আর ভূতের মুখে রামনাম সহ্য করতে পারছিল না। একই পাড়ায় থাকার দৌলতে সে তার সম্পর্কে কিছু কেমন কথা জানে। আর বাঙালির স্বভাবেই তো তা আছে। পরচর্চা পরনিন্দা। কিছু ঘটালে কেউ তা শুনবে না এটা হতে পারে না। খবর হাওয়ার থেকে, আলোর থেকে আগে দৌড়োয়। মুখরোচক খবর হলে তো কথাই নেই। রুহি ভাবছে, লোকটাকে ভালো জবাব দেওয়া গেছে। আবার দেবে একদিন। ও খেয়াল রেখেছে ওখান দিয়ে নাকি ওই ভদ্রলোক দুবেলা হেঁটে যায়। কোনো কোনোদিন দুবেলা না হলেও একবেলা তো মাস্ট। অতএব চিন্তা নেই, আবার ধরা যাবে। ভাবতে ভাবতে রুহি নিজের মনে হাঁটতে লাগল। রুহিও কাজ থেকে ফেরার সময় বা যাওয়ার সময় হাতে টাইম থাকলে একটু হেঁটে নেয়। ওভাবে যাওয়া আসার পথেই তার চোখে পড়ে ওই ভদ্রলোকের মিছিল। কিন্তু কোনোকিছুতেই তার কৌতূহল মেটে না। এই যেমন রান্নাঘরে সে যখন কাজ করে জানলা দিয়ে দেখতে পায়, উপরের তলা থেকে নিচের দিকে কী যেন একটা উড়ে গেল। কী উড়ে যায় সে কোনোদিন দেখতে পায় না। তাই সে ভাবে কালো পাখি বা কালো প্লাসটিক প্যাকেট বা কালো কোনো কাপড়ের টুকরো। কিন্তু কালো যে, সেটা সে স্পষ্ট বুঝতে পারে। অন্য কোনো রঙ নয়। কালোই দেখে সে। এই কালো নিয়ে তার ভয় সারা জীবনেও যায় না। ছোটো থেকেই ভাবত, চা খেলে কালো হয়ে যায়, শাক খেলে কালো হয়ে যায়, কালো লোক দেখে ভয় পায়, কালো ছেলে সে কিছুতেই বিয়ে করবে না, আর অন্ধকারের কালো দেখলে তো কথাই নেই। সে অন্ধকারকে ভয় পায় কালো বলেই। একবার তো শিয়ালদা থেকে রাজাবাজার যাওয়ার সময় বাসে কন্ডাক্টরকে বলেছিল, ‘কালোটাকা আমি নেব না’। গোটা বাস হো হো করে হেসেছিল কিন্তু সে তার ‘কালো আর ময়লা’র ক্যাবলামির তফাৎ করতে পারেনি। রুহি এসব ভাবতে ভাবতেই আবার এক্সের চিন্তা নিয়ে পড়ল। তার মনে হল, ‘আচ্ছা এক্স যে সর্বহারা দলের প্রতিনিধি বলল, কিন্তু সে তো কই সাদা ফতুয়া আর সায়ার মতো বা তার থেকেও বেশি ঢোলা পাজামা পরে হাঁটতে দেখেনি। মনে মনে ভাবল, ‘ছোটোবেলায় তো পুকুর পাড় দিয়ে যে মিছিল হেঁটে যেত তার নেতাদের বেশিরভাগ লোকই ওইরকম সাদা পোশাক পরে হাঁটত। তাহলে কি যুগের সঙ্গে পোশাক বদলে গেল আর দলটার নাম আর এজেন্ডা এক রয়ে গেল’? রুহির এ আর এক সমস্যা। খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে যেন নিজেই নিজের পেটের ভিতর থেকে টপিক বের করে আর ভাবতে থাকে। এমন ভাবতে ভাবতে সে কতবার ভাত তরকারি পুড়িয়ে ফেলেছে। তবুও তার ভাবা চাই। যা বলা সত্যিই তাই। ভাতের ফ্যান উপচে পড়ে গোটা রান্নাঘর, গ্যাস ওভেন সব নোংরা হয়ে গেল। আবার সবকিছু ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করতে হবে। এই নোংরা ব্যাপারটাও তার পছন্দ নয়। নোংরা ঘটনা, নোংরা দৃশ্য, নোংরা ছবি…। অবশ্য ও যেগুলো নোংরা ছবি বা ভিডিও ভাবে সেগুলো আসলে অন্যদের কাছে রোম্যান্টিক। ও নিজেই একটু কেমন খুঁতখুঁতে পুরোনো পন্থী। এই নিয়ে সে ঝাড়ও খায় বন্ধুবান্ধবদের কাছে। এই দ্যাখো পুরোনো কথাটা মাথায় আসতেই সে আবার ভাবতে বসল, ‘এক্স কেন সবুজের কালো হাত বলল? সবুজ তো নিজেই পুরোনো। সেই কবে ক্ষমতা থেকে ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেছে। ওরাই তো সাফ করে দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল। এখন সে দলও তো সর্বহারা। ইনফ্যাক্ট সর্বহারাদের সঙ্গে তারা জোটও তো বেঁধেছিল দু একবার’। এবার রুহি ঠিক করেই নিল, যেভাবে হোক ওই ভদ্রলোককে রাস্তায় পেতেই হবে। নাহলে চলবে না। যা ভাবা তাই করা। যাওয়া আসার পথে রুহিও যেন ওত পেতে বসেছিল, শিকারীর মত। এক্সকে দেখতে পেয়েই সে খপ করে ধরল –

আরে মশাই দাঁড়ান দাঁড়ান। আপনি ওভাবে সেদিন মিছিলে সবুজের কালো হাত ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও বললেন কেন? ও তো অনেক পুরোনো দল, সে তো আপনারাই সাফ করেছিলেন…


না, মানে ইয়ে (প্রথমে রুহিকে এড়িয়ে পালাবে কিনা ভাবছিলেন) মানে, মানে আমরা তো প্রথম থেকে ওই দলটাকেই ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে শিখেছি, পুরোনো অভ্যেস আর কী। আর তাছাড়া ঘাস পাতা জুড়ে বর্তমান দল ক্ষমতায় এলেও আসলে তো শিকড় ওখানেই পোঁতা ছিল। তাই আমরা ওটা থেকে আর বেরোতে পারছি না…


হ্যাঁ তা বুঝলাম মশাই। কিন্তু ওই দল তো এখন আপনাদের মতোই সর্বহারা। আর আপনাদের সঙ্গেই জোট বেঁধে শক্ত পোক্ত একটা দল গড়তে চাইছে। তা আপনারা যে, এই স্লোগান দিচ্ছেন তাতে তাঁদের নেতা নেত্রীরা রাগ করছেন না?


না, মানে আমাদের এখন একটাই লক্ষ্য। এই ক্ষমতাটাকে সরাতে হবে আর ওই হিন্দু দলটাকে আসতে দেওয়া যাবে না। তাই আমরা যা খুশি তাই বললেও ওরা গায়ে মাখছে না। কারণ লক্ষ্য তো এক। তাই লক্ষ্যবস্তুর দিকে স্থির দৃষ্টি রেখে যেটা ভালো বা যেমনভাবে এগোলে লক্ষ্যে পৌঁছোনো যাবে আমরা সেভাবেই এগোচ্ছি।


ওরা মেনে নিল? এতবড়ো একটা অপবাদ…?


মানবে না কেন? কালো হাত কী ছিল না? কালোই তো ছিল। তাই মানতে বাধ্য। বলুন তো সেই চালে কাঁকর মেশানো থেকে শুরু করে জরুরি অবস্থা হেনতেন আর কী কী শোনেননি বলুন? ওরাও কি অস্বীকার করতে পারবে? পারলে তো ট্যাঁ ফোঁ করত এই স্লোগান নিয়ে …। কেন করছে না তাহলে... এবার আপনিই বুঝুন। আর শুনুন আপনি এমন মাঝে মাঝেই শিকারীর মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে আমাকে অ্যাটাক করবেন না তো? আমার ভয় করে আপনাকে দেখলেই?


কেন? ভয়ের কী হল? আমি কি কামড়ে দেব আপনাকে?


না তা নয়, কিন্তু আপনি বড্ড প্রশ্ন করেন। এই এত প্রশ্ন আমার ভালো লাগে না। এত কৈফিয়ত আপনাকে দিতে যাবই বা কেন?


আরে, এ আপনার দোষ নয়। এটা গোটা পুরুষ জাতির দোষ। তারা প্রশ্নে ভয় পায়। বিশেষ করে ব্যক্তিগত প্রশ্নে। আপনিও তো পুরুষ, তাই আপনার ভয় পাওয়াতে আমি অস্বাভাবিক কিছু দেখছি না


একি? আপনি আবার জাত তুলে কথা বলছেন? আমি তো কই জাত তুলিনি, আমিও যদি নারী জাতি বলে গালাগাল দিই? আপনার ভালো লাগবে?


ভালো লাগা না লাগার কিছু নেই মশাই। আপনারা এখনো গালাগালি, শাপ শাপান্ত, আধিপত্যবাদ চালিয়েই যাচ্ছেন মেয়েদের উপর। আপনারা তো মেয়েজাত বলেই আর রাত হলেই ধরা বাঁধা কোনো নারী না থাকলে সোনাগাছি ছোটেন। আপনাদের কথা ছাড়ুন মশাই। ও না না সোনাগাছি না, আজকাল কী যেন নতুন নাম শুনি, এসকর্ট গার্ল। তা মশাই আপনিও যান নাকি?

এই শুনে তো এক্স আবার রাগে খাপ্পা। আবার গজগজ করতে করতে চলে গেল। নেহাত শান্তশিষ্ট লোক বলে তাই রুহির রেহাই। নাহলে হয়তো কোনোদিন বলে বসত বাড়িতে গুণ্ডা পাঠাব…। যতই হোক রাজনীতি বলে কথা। রুহি মনে মনে ভাবে, এক্স যতই সর্বহারা দলের হয়ে এখন গুণগান করুক না কেন, ওর নিজস্ব কিছু বুদ্ধি সুদ্ধি আছে বলেই মনে হয়। কারণ কখনো সখনো ওদের দলের খারাপ কাজ নিয়ে সমালোচনা করতেও সে শুনেছে। তাদে।।সর্বক্ষয়ী দলের মতোই বহু খারাপ কাজ, বহু দুর্নীতিকে এক্স সাপোর্ট করে না। এইসব ভাবতে ভাবতেই রুহি সর্বহারা দলের খারাপ কাজ এবং দুর্নীতিগুলোর একটা তালিকা তৈরি করে ফেলল। নেক্সট দিন এক্সকে দেখতে পেলেই সে সরাসরি তার মতামত জানবে বলে। দু একদিন সেই তালিকা নিয়ে আসা যাওয়ার পথে এক্সের খোঁজ করল আপন মনে। কোথাও খুঁজে পেল না তাকে। একটু হতাশ হল রুহি। কী ব্যাপার, আর দেখা যাচ্ছে না কেন এক্সকে। সে কি চাকরি ছেড়ে দিল? এ পাড়া থেকে অন্য পাড়া চলে গেল? নাকি অন্য দেশ? সুস্থ হল না তো? নানান উদ্ভট প্রশ্ন রুহির মাথায় ঘুরতে লাগল। লাগারই কথা। সে তো ভেবে রেখেছে দেখা হলেই সর্বহারা দলের দুর্নীতি বিষয়ে তার মতামত জানতে চাইবে। যতক্ষণ না পাচ্ছে উত্তর ততক্ষণ শান্তি নেই। এইসব ভাবনার মধ্যে ঘুরপাক খেতে খেতেই রুহি অফিস গেল। ফেরার পথে সিমেন্ট ব্রিজের নিচে ভিড় হট্টগোল থেকে সেও থমকে গেল। সে দেখল বিভিন্ন দিক থেকে গাড়ির লম্বা জ্যাম। সে এঁটুলি মোড় থেকে হেঁটে ফেরে বলে তার অসুবিধা হয়নি, মোড়ে জটলার কাছে পৌঁছে সেও হতবাক হয়ে গেল। ওখানে একটা বড়সড়ো অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে। গোটা রাস্তা রক্তে ভেসে যাচ্ছে। কারোর মুখে কোনো কথা নেই। ওখানে মাঝখানে হাত পা ছড়িয়ে বসে এক্স হাউহাউ করে কেঁদে চলেছে। কিছুতেই তাকে কেউ থামাতে পারছে না। কেন কাঁদছে তাও কেউ তার কাছ থেকে বের করতে পারছে না। রুহি ভিড় ঠেলে এগিয়ে গেল। গিয়েই এক্সের কাছে জানতে চাইল,

কী হয়েছে? কাঁদছেন কেন এমন করে?


(কেঁদেই চলেছে এক্স, কোনো উত্তর নেই)


আরে বলুন কী হয়েছে? গোটা রাস্তা জ্যাম হয়ে গেছে তো। চারদিক পুরো ব্লকড। কী হয়েছে আপনার ? এমন কী হল যে, পুলিশও তোমাকে তুলতে পারছে না? কলকাতার রাস্তায় এমন অ্যাকসিডেন্ট, রক্ত, এমনকি প্রকাশ্যে দিনের আলোয় শুট আউট করে খুনও তো ঘটে থাকে। আপনি কি সবসময় এমন অ্যাক্সিডেন্ট দেখে শোরগোল বাঁধিয়ে দাও নাকি?

রাস্তার এমন বেহাল অবস্থা দেখেই রুহি জোরে জোরে ধমক দিচ্ছিল এক্সকে। তারপর একটা সময় এক্স নিজেকে সামলে নিয়ে বলতে শুরু করল, ‘এই রক্তই তো সেই রক্ত, যে রক্ত দিয়ে আমার দল, দলের নেতারা বৃদ্ধা মাকে ভাত মেখে দিয়েছিল। এ তো সেই রক্ত। আমি তো এই রক্তের মধ্যে সেই বৃদ্ধা মায়ের যন্ত্রণা দেখছি। আপনারা তো সাধারণ অ্যাকসিডেন্টের রক্ত বলে উড়িয়ে দিচ্ছেন, ঘটনাটা তাচ্ছিল করছেন, লঘু করে দিচ্ছেন, কিন্তু আমি তো তা পারছি না। যতই আমার দল হোক, আমি যতই সেই দলের প্রতিনিধি হই না কেন, রক্ত দেখলে আমার সেই বৃদ্ধা মায়ের যন্ত্রণা ছাড়া কিচ্ছু আসে না চোখের সামনে। আমি দেখতে পাই দুয়ার ভেসে যাওয়া সেই রক্ত, উঠোন ভেসে যাওয়া সেই রক্ত, মায়ের বুক ভেসে যাওয়া সেই রক্ত… লাল, চারিদিক লাল, কেবল লাল, টুকটুকে লাল রঙ ছাড়া আমি আর কিচ্ছু দেখতে পাই না, লাল, চারিদিক লাল, সূর্যোদয়, সূর্যাস্ত সব লাল…। দুহাত রাঙিয়ে নিয়ে আমরা সর্বহারা…। আমরা রক্তপতাকা, আমরা লড়াই চাই। লড়াই লড়াই লড়াই চাই। লড়াই করে বাঁচতে চাই…’। এক্সের কান্নার তীব্রতা আরও বেড়ে গেল। রুহি রীতিমতো স্তব্ধ হয়ে গেল। তার মুখে আর কোনো কথা নেই, ধীরে ধীরে ব্যাগ থেকে প্রশ্নের তালিকাটা বের করে ছিঁড়ে কুচিয়ে রাস্তায় ছড়িয়ে দিল…। ধীর, ক্লান্ত পায়ে রুহি আবার হাঁটতে শুরু করল বাড়ির দিকে…। এক্সের মতামত নিয়ে রুহির আর কোনো বক্তব্য নেই!

মোড়ের মাথায় লাল সিগন্যাল। সব গাড়ি দাঁড়িয়ে। মানুষ কিন্তু চলেছে। পায়ে, পায়ে এগিয়ে চলেছে ক্লান্ত, বিষণ্ণ মানুষ। লড়াই করতে করতে তারা আর লড়াই করতে চায় না। বাইপাসে লম্বা যানজটে গাড়ির পর গাড়ির ভিতর, অ্যাম্বুলেন্সের পর অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেনের ভিতর দিয়ে একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস পাক খাচ্ছে চারিদিকে।

সিগন্যালের রঙের বদল হচ্ছে না। সব থমকে আছে।