Next
Previous
Showing posts with label গল্প. Show all posts
0

গল্প - মনোজ কর

Posted in





















২১



পরের দিন কেলো দারোগা থানায় সবাইকে ডেকে পাঠালো। এই ব্যাপারটা মেটাতে না পারলে তার ঘুম হচ্ছে না। সবাইকে উদ্দেশ্য করে কেলো দারোগা বললো,’ আমি গতকাল সারারাত ধরে একটা ছবি আঁকার চেষ্টা করেছি যা থেকে অত্যন্ত পরিষ্কার হয়ে যাবে যে সেদিন আসলে কী ঘটেছিল।‘সকলে নড়েচড়ে বসলো। কেলো দারোগা বলতে শুরু করলো,’ মেডিক্যাল পরীক্ষা থেকে বোঝা গেছে যে বন্দুকের নল শিবুলালের বুকে ঠেকিয়ে গুলি করা হয়েছিল। যার ফলে গুলি এবং গ্যাস দু’টোই সরাসরি শিবুলালের হৃদপিন্ড ভেদ করে শরীরের ভিতর ঢুকে যায়। রেবা কৈরালার সেদিন ঐ সময়ে শিবুলালের সঙ্গে দেখা করার কথা ছিল। রেবা সেদিন ঐ সময় অ্যাপার্টমেন্টের সামনের দরজা দিয়ে শিবুলালের সঙ্গে দেখা করার জন্য প্রবেশ করে কিন্তু অ্যাপার্টমেন্ট থেকে পিছনের দরজা দিয়ে বেরোয়। আমার কাছে প্রমাণ আছে যে সে খুন করার পর শিবুলালের দেহ থেকে নির্গত রক্তের ওপর অসাবধানতাবশত পা ফেলে তারপর সেই রক্তের দাগ ধোওয়ার জন্য বাথরুমে যায়। কিন্তু রক্তের ওপর তার জুতোর ছাপ এবং বাথরুমের তোয়ালেতে রক্তের এবং জুতোর ময়লার দাগ থেকে যায়। রেবার বন্ধু কৃষ্ণকালীবাবু ঐ প্রমাণ লোপের জন্য অনেক চেষ্টা করেছিলেন। সে সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণে আমি পরে আসছি। আমার কাছে প্রমাণ আছে যে যে বন্দুক দিয়ে শিবুলালকে গুলি করা হয়েছিল তা আগে থেকেই রেবার কাছে ছিল। রেবার এবং কৃষ্ণকালীবাবুর পরম শুভাকাঙ্খী আমাদের সকলের পরিচিত এবং শ্রদ্ধেয় পানু রায় মহাশয় ব্যাপারটাকে গুলিয়ে দেবার জন্য এক অভিনব পদ্ধতির আশ্রয় নেন। কিন্তু খুনী বন্দুকটা শেষ অবধি রেবা কৈরালার কাছ থেকেই পাওয়া যায়। রেবাদেবী যদি এব্যাপারে আলোকপাত করেন তাহলে সুবিধা হয়। পানু রায় কেন এই খুনীকে বাঁচাবার চেষ্টা করছেন সে ব্যাপারে আমি পরে আসছি। কিন্তু আপাতত রেবা কৈরালাই যে খুন করেছে সে ব্যাপারে আমার কোনও সন্দেহ নেই। মিঃ রায়, আপনার কিছু বলার আছে?’

-আপনার যদি বলা শেষ হয়ে থাকে তাহলে আমি বলতে পারি। নাহলে আমি আর একটু অপেক্ষা করতে পারি। আপনি ভেবে নিয়ে আমায় বলুন।

-আচ্ছা, আমি একটা ছবি দেখাচ্ছি। ছবিটা আমার তোলা। আমি যখন রেবা কৈরালার বাড়িতে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গিয়েছিলাম তখন আমি তার টেবিলে খুনী বন্দুকটা দেখেছিলাম। আমি সেটার একটা ছবি তুলে নিয়ে আসি পরে প্রমাণ হিসাবে দরকার হবে বলে।

ছবিটা পানু রায়ের হাতে দিয়ে কেলো দারোগা বললো,’ এবার আপনি বলুন।‘

-এই ছবির বন্দুকটাকেই কি আপনারা খুনী বন্দুক বলে নির্ধারিত করেছেন?

-অবশ্যই। না হলে এই ছবিটা আপনাকে দেখাচ্ছি কেন?

-বন্দুকটা যখন প্রথম দেখেন আর ছবিটা যখন তোলা হয় বন্দুকটা কি একই জায়গায় ছিল?

-হ্যাঁ, একই পোজিশনে।

-তাহলে বন্দুকটা পরীক্ষা করার আগেই ছবিটা তোলা হয়েছিল?

-হ্যাঁ, মানে ঠিক তা নয়। বন্দুকটা পরীক্ষা করার পর যেমন ছিল ঠিক তেমন করে রেখে ছবিটা তোলা হয়েছিল।

-বেশ, কী পরীক্ষা করেছিলেন?

-আমি সিলিন্ডারটা খুলে দেখেছিলাম একটা গুলি নেই। তারপর শুঁকে দেখেছিলাম কোনও গন্ধ পাওয়া যায় কি না।

-ফিঙ্গারপ্রিন্ট নেবার জন্য কোনও পাউডার ছড়িয়েছিলেন?

-হ্যাঁ। তারপর বন্দুকটা যে পোজিশনে ছিল সেই পোজিশনে রেখে ছবি তোলা হয়েছিল।

-যে গুলিটা শিবুলালের শরীর থেকে পাওয়া গেছে সেটা যে এই বন্দুক থেকে ছোঁড়া হয়েছিল সেটা কী করে জানা গেল? আমি জানতে চাইছি কোনও পরীক্ষা করা হয়েছিল না আন্দাজে বলছেন?

-একদম করা হয়েছিল।

-কখন করা হয়েছিল?

-কয়েক ঘন্টার মধ্যে করা হয়েছিল।

-কয়েকঘন্টা মানে কী?

-খুব একটা বেশি সময় নয়।

-কতক্ষণ? চব্বিশ ঘন্টা? আটচল্লিশ ঘন্টা?

-না, আটচল্লিশ ঘন্টা নয়।

-তাহলে চব্বিশ ঘন্টা?

-হয়তো তাই। কমও হতে পারে।

-কে বন্দুকটা আবার যে জায়গায় ছিল সেই জায়গায় রেখে দিল?

-আমিই রেখেছিলাম।

-আপনি কী করে বলছেন আপনি ঠিক সেই জায়গায় সেই অবস্থায় রেখেছিলেন?

-আমার মনে আছে।

-আপনি কি দাগ দিয়ে রেখেছিলেন?

-না, কোনও দাগ দেওয়ার দরকার ছিল না।

-যখন আপনি ঘরে ঢুকলেন এবং বন্দুকটা দেখতে পেলেন তখন বন্দুকের নলটা কোনদিকে মুখ করে রাখা ছিল? দরজার দিকে না অন্য কোনও দিকে?

-ছবিতে যেরকম দেখা যাচ্ছে সেরকম।

- ছবিটা না দেখে বলুন কোনদিকে মুখ করে রাখা ছিল? দরজার দিকে না অন্য কোনও দিকে?

- আমার এখন মনে পড়ছে না। তবে আমি পাঁচ মিনিটের মধ্যে বন্দুকটা রেখেছিলাম তাই তখন আমার মনে ছিল। এখন মনে পড়ছে না।

-আচ্ছা। আর একটা কথা বলুন। রেবা কৈরালা কি আপনাকে কার কাছ থেকে বন্দুকটা পেয়েছিল তার নাম বলেছিল?

- নিশ্চয়ই। সে বলেছিল মিঃ কে কে চৌধুরীর কাছ থেকে পেয়েছিল।

-ওটা নামের আদ্যক্ষর এবং পদবি। আমি জানতে চাইছি নাম বলেছিল কিনা? কেননা আপনি জানেন কৃষ্ণকালী এবং কালীকৃষ্ণ উভয়েই কে কে চৌধুরী।

- এবার বলুন রেবা কি বলেছিল যে কখন সে বন্দুকটা পেয়েছিল?

-না বলে নি। মানে ওনাকে জিজ্ঞাসা করা হয়নি।

-আপনি রেবার অ্যাপার্টমেন্টে কখন গিয়েছিলেন?

-এগারোটা পয়ঁতাল্লিশ।

-দারোগা বাবু, আমার মনে হয় রেবার বিরুদ্ধে কেস কোর্টে পাঠানোর আগে আমরা যদি যারা এই বন্দুক, রক্তের দাগ, আঙ্গুলের ছাপ এইসব পরীক্ষা করেছিল তাদের সঙ্গে কথা বলে নিলে ভালো হয়। আমার তাই মনে হয়। আমি এবং আপনি দু’জনেই নিশ্চিত হতে পারলে কোর্টে সময় নষ্ট করার কোনও মানে হয়না। তা না হলে আপনি জানেন আমাদের কোর্টগুলোতে কেসের যে পরিমাণ পাহাড় জমে আছে তাতে তারিখ পেতে অনেক দেরি হয়ে যাবে। তারপর দু’দিকের উকিলকে সবকিছু বোঝাতে আবার সময় লাগবে। দেখুন এটা আমার প্রস্তাব। সিদ্ধান্ত আপনার।

-আমাকে একটু সময় দিন। আপনারা বসুন। আমি একটু পরে এসে জানাচ্ছি।

কেলো দারোগা বেরিয়ে গেল। পানু রায় ফোনে কার সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলেন ঠিক বোঝা গেল না। মিনিট দশেক বাদে কেলো দারোগা এসে বলে গেলেন যে উনি যারা বিভিন্ন পরীক্ষার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তাদের জানিয়েছেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই সবাই এসে যাবে। একজন এলেই আবার কথাবার্তা শুরু করা যাবে। তারপর ঘুরে পানু রায়ের দিকে তাকিয়ে বললো,’ আপনি সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট না হওয়া পর্যন্ত কাউকেই জেলে পাঠাবো না। নিশ্চিন্তে থাকুন। তবে এবার ছাড় পাবেন না।‘পানু রায় হেসে বললেন,’ সত্যের জয় হবে। আমি বা আপনি কেউ নয়। সত্যের সন্ধানই আমাদের কাজ। কাউকে সন্দেহের বশে কোর্টে পাঠানো ঠিক নয়। তাতে যদি একটু সময় যায় সে আর কী এমন বড় ব্যাপার? ‘

কিছুক্ষণের মধ্যেই কেলো দারোগা একজন কমবয়সী সুদর্শন ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে ঢুকলেন। পানু রায়কে বললেন,’ ইনি সাইন্টিফিক ইনভেস্টিগেটর এবং ফিঙ্গারপ্রিন্ট এক্সপার্ট। শিবুলালের অ্যাপার্টমেন্টে ইনিই গিয়েছিলেন তদন্তের জন্য। যা যা পরীক্ষা হয়েছিল ইনিই সেগুলি করেছেন এবং আমাদের জানিয়েছেন। আপনি ওনাকে আপনার যা যা জিজ্ঞাসা আছে করতে পারেন।‘

পানু রায় জিজ্ঞাসা করলেন,’ আপনি কি কোনও পরণের জিনিস সেদিন ওখানে পেয়েছিলেন? ‘

-হ্যাঁ, আমি একটা বাঁ পায়ের জুতো পেয়েছিলাম।যার সোল এবং হিলে রক্তের দাগ ছিল।

-আপনি কি নিশ্চিত যে ঐ দাগগুলো মানুষের রক্তের দাগ ছিল?

-না, সেটা নিশ্চিত করে বলা যায় না। জুতোটা ধুয়ে ফেলা হয়েছিল। অল্প যেটুকু দাগ লেগেছিল সেটা পরীক্ষা করে বোঝা গেছে ওটা রক্তের দাগ ছিল।

-জুতোটার কোনও বৈশিষ্ট ছিল?

-ঐ জুতোর সোলটা একধরণের বিশেষ রাবার দিয়ে তৈরি। খুব দামি জুতো ছাড়া ঐ ধরণের রাবার ব্যবহার করা হয় না।

-বেশ। আপনি কি ওখানে কোনও ময়লা তোয়ালে পেয়েছিলেন?

-হ্যাঁ, আমি বলতেই যাচ্ছিলাম। ওখানে একটা তোয়ালে পেয়েছিলাম তাতে রক্তের ছাপ ছিল। বোঝা যাচ্ছিল কোনও রক্তমাখা জিনিসকে মোছার জন্য ওটা ব্যবহার করা হয়েছিল। তবে খুব ভালো করে পরীক্ষা করে দেখা গেছে ঐ তোয়ালেতে জুতোর সোলে যে রাবার ছিল তার গুঁড়োও লেগেছিল।

কেলো দারোগা বললো,’ আপনি জুতোর ছাপের একটা রঙ্গীন ছবি দেখে কিছু সিদ্ধান্তে এসেছিলেন। সেটা যদি আপনি একবার মিঃ রায়কে বলেন তাহলে উনি আপনার কাছে হয়ত আরও কিছু জানতে চাইতে পারেন। ওনাকে সবদিক দিয়ে সন্তুষ্ট করার পরেই আমরা কোর্টে যাব।‘

-আমি ঐ ছবিতে দু’টো জুতোর ছাপ দেখেছি। একটা জুতোর হিল বেশ উঁচু এবং ধাতুনির্মিত। ঐ হিলের নিচে ইংরেজিতে ৩৩ লেখা আছে এবং যার ছাপ অস্পষ্ট হলেও ছবিতে দেখা যাচ্ছে। আতশ কাঁচের নিচে ধরলে লেখাটা আরও স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। ঐ জুতোটার ছাপের ওপর একটা বড় সাইজের ছেলেদের জুতোর ছাপ দেখা যাচ্ছে। এটাও বোঝা যাচ্ছে যে মেয়েদের জুতোর ছাপটার ওপরে বেশ কিছুক্ষন পরে ধরা যেতে পারে দুই থেকে তিনঘন্টা পরে। ছেলেদের জুতোর ছাপটা পড়েছে।

-আমি ধরে নিলাম আপনি দায়িত্ব নিয়েই সময়ের হিসাবটা দিচ্ছেন। আমি বলতে চাইছি কোনও এক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে যে ব্যাপারে আপনি একজন বিশেষজ্ঞ অর্থাৎ কেবলমাত্র অনুমানের ভিত্তিতে নয়।

-অবশ্যই। এটাই আমার পেশা। আমি প্রায় প্রতিদিন এই পরীক্ষা নিরীক্ষাই করে থাকি।

-বেশ, ঐ জুতোটা আপনি কোথায় পেয়েছিলেন?

-কৃষ্ণকালীবাবুর অফিসে একটা স্যুটকেসের ভিতর থেকে।

-ঠিক আছে।এবার আঙ্গুলের ছাপের প্রসঙ্গে আসা যাক। আপনি কি দেখেছিলেন এবং কোথায় দেখেছিলেন?

-শিবুলালের অ্যাপার্টমেন্টের সবকটা দরজার হাতলের সব ছাপ যত্নসহকারে মুছে ফেলা হয়েছিল।কেবলমাত্র একটা ছাড়া।

-কোথায় আঙ্গুলের ছাপ মোছা হয়নি? সেখানে কী দেখা গেল?

-পিছনের দরজায়। কেউ একজন সযত্নে হাতলটা মুছে তার ওপর একটা বাঁ হাতের বুড়ো আঙ্গুলের ছাপ বসিয়ে দিয়েছে।

-ওটা কার আঙ্গুলের ছাপ ছিল?

-কৃষ্ণকালী চৌধুরীর।

-আঙ্গুলের ছাপটা কোন সময়ের বলা যেতে পারে? খুনের আগের না পরের?

- সেটা বলতে পারবো না। তবে এটা বলতে পারি যে ঐ ছাপটা বসানো হয়েছিল সমস্ত দরজার হাতল থেকে ছাপ মুছে দেওয়ার পর। যেহেতু ঐ একটি মাত্র ছাপই পাওয়া গেছে সুতরাং বলা যেতে পারে ঐ ছাপগুলো মোছা হয়েছিল উনি যখন ভিতরে ছিলেন।

-এমনও তো হতে পারে কেউ একজন সব দাগগুলো মুছে পিছনের দরজার কাছে এসে বুঝতে পারলো যে কৃষ্ণকালীবাবু পিছনের দরজা দিয়ে আসছেন তখন দরজাটা অল্প খুলে রেখে অপেক্ষা করতে থাকলো। কৃষ্ণকালীবাবু পিছনের দরজা দিয়ে ভিতরে এসে ভিতরের হাতলটা বাঁ হাতের বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে ঠেলে দরজাটা বন্ধ করে দিয়েছিলেন।

-না, কেননা ছাপটা ভালো করে দেখলে বোঝা যাবে ওটা যত্ন করে বসানো হয়েছে। সাধারণভাবে হাতলে আঙ্গুল দিয়ে ঠেললে ঐ রকম স্পষ্ট দাগ হয় না।

-আচ্ছা, কেউতো বাইরের হাতলটা ভিতরে এবং ভিতরের হাতলটা বাইরে করে দিতে পারে?

-আপনি ঠিক বুঝিয়ে বলুন কী বলতে চাইছেন আপনি।

-দেখুন যে হাতলটা কথা আপনি বলছেন সেটা গোলাকার এবং একটা চৌকো পিনের ওপর স্ক্রু দিয়ে আটকানো। যে হাতলটা আপনি দরজার ভিতরের দিকে দেখেছেন সেটা কিছুক্ষণ আগে হয়ত বাইরের দিকে ছিল। কৃষ্ণকালীর আঙ্গুলের ছাপ হয়ত বাইরের হাতলে ছিল। কেউ পরে হাতে গ্লাভস পরে বাইরেরটা ভিতরে আর ভিতরেরটা বাইরে করে দিতে পারে। এমন সম্ভাবনা অযৌক্তিক বলে উড়িয়ে দিয়ে যায় কি?

-না, উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কিন্তু আপনার কল্পনাশক্তি অসাধারণ।

-কল্পনাশক্তি না সত্যকে দেখতে পাওয়ার শক্তি তা বলা মুস্কিল।

কেলো দারোগা এতক্ষণ শুনছিল। ব্যাপারটা গুলিয়ে গেল দেখে কথাটা ঘুরিয়ে বড়কালীকে জিজ্ঞাসা করলো,’ আচ্ছা, স্যুটকেসে পাওয়া জুতোজোড়া আপনার? ‘ বড়কালী বললো,’হ্যাঁ, আমার’।

-ঐ জুতোটা কি শিবুলালের মৃত্যুর দিন আপনার পায়ে ছিল?

-হ্যাঁ, ছিল।

-আপনি কি ঐ জুতোটা শিবুলালের বাড়িতে রক্তের ওপর রেখে তারপর জুতোটার রক্তমাখা সোল আর একটা মহিলার জুতোর ছাপের ওপর রেখেছিলেন?

-আমি এই প্রশ্নের উত্তর দেবো না।

-কেন দেবেন না?

- আমাকে ফাঁসানোর জন্য এই প্রশ্নটা করা হচ্ছে। আমি এই প্রশ্নের উত্তর দেবো না।

-বেশ, আপনি কি ঐ দিন শিবুলালের অ্যাপার্টমেন্টে গিয়েছিলেন?

-হ্যাঁ, গিয়েছিলাম।

-কখন গিয়েছিলেন?

-রাত্রি ১১টা বা ১১-৩০।

-আপনি কি ওখানে পৌঁছে একটা কাপড় বা ঐ জাতীয় কিছু দিয়ে দরজার হাতলগুলো থেকে আঙ্গুলের ছাপ মুছেছিলেন?

-এই প্রশ্নটাও আমাকে ফাঁসানোর জন্য করা হচ্ছে। আমি এই প্রশ্নের উত্তর দেবো না।

-আচ্ছা, ঐ দিন আপনি কি রেবা কৈরালাকে একটা বন্দুক দিয়ে বলেছিলেন যে আত্মরক্ষার জন্য বন্দুকটা তার কাজে লাগতে পারে?

-হ্যাঁ, দিয়েছিলাম এবং বলেছিলাম।

কেলো দারোগা একটা বন্দুক বড়কালীর হাতে দিয়ে বললো,’ দেখুন তো এটাই সেই বন্দুকটা কি না?’ বড়কালী বললো,’ মনে হচ্ছে এটাই।‘

-এবার বলুন সেদিন আপনি কোথায় কোথায় গিয়েছিলেন এবং কখন?

-আমি কাঠমান্ডু থেকে ফিরে অফিসে যাই। অফিসে গিয়ে স্নান করে, পোশাক পরিবর্তন করি।‘

পানু রায় বড়কালীকে ইঙ্গিতে চুপ করতে বলে বললেন,’ কৃষ্ণকালী আপনার আর কিছু বলার দরকার নেই।‘ তারপর কেলো দারোগার দিকে তাকিয়ে বললেন,’ আপনি এত কথা জানতে চাইছেন কেন? এটা তো ওনার ব্যক্তিগত ব্যাপার। আপনি যা জানতে চেয়েছিলেন উনি তো বলেছেন। উনি বলেছেন সেদিন ১১টা বা ১১-৩০এর সময় উনি শিবুলালের অ্যাপার্টমেন্টে গিয়েছিলেন। আর বলেছেন উনি সেদিন রেবা কৈরালাকে বন্দুক দিয়েছিলেন। আর কী জানতে চান?’

-ঐ বন্দুকটা আপনি কোথা থেকে পেয়েছিলেন বা কিনেছিলেন?

-আমার একটা খেলার এবং নিরাপত্তার সরঞ্জামের দোকান আছে। ঐ দোকানের স্টক থেকে আমি তিনটে একই রকমের বন্দুক নিজের কাছে রেখেছিলাম।

-কোথায় রেখেছিলেন?

-একটা আমার ছেলেকে দিয়েছিলাম। বাকি দুটোর একটা আমার কাছে সবসময় থাকে।আর একটা থাকে আমার অফিসের লকারে।

-বেশ। যে বন্দুকটা আপনি আপনার ছেলেকে দিয়েছিলেন সেটাকে আমরা বলবো ‘ছোট বন্দুক’, যেটা আপনি নিজের কাছে রাখেন সেটাকে আমরা বলব ‘বড় বন্দুক’ আর যেটা লকারে থাকে সেটা ‘লকার বন্দুক’। এবার আমি একটা নির্দিষ্ট প্রশ্ন করতে চাই। আপনি রেবাকে বড় বন্দুকটা দিয়ে অফিসে এসে লকার বন্দুকটা নিজের কাছে রেখেছিলেন? আপনার এই প্রশ্নের ব্যাপারে কোনও আপত্তি আছে , মিঃ রায়?

পানু রায় বললেন,’ না, আমার কোনও আপত্তি নেই।‘ বড়কালী বললো,’ হ্যাঁ, আপনি ঠিক বলছেন।‘

-সেদিন সন্ধ্যাতেই? কটার সময়?

-হ্যাঁ, সেদিন সন্ধ্যাতেই। ১১টা বাজার মিনিট পাঁচেক আগে।

-তারপর আপনি রেবার অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে যান?

-হ্যাঁ, আমি আবার রেবার অ্যাপার্টমেন্টে গিয়েছিলাম।

-আপনি কি রেবার অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে গিয়ে বড় বন্দুকটা দেখতে পেয়েছিলেন?

-হ্যাঁ, দেখতে পেয়েছিলাম।

-কোথায় দেখতে পেয়েছিলেন?

-বিছানায়, বালিশের নিচে।

-আপনি কি বন্দুকটা পরীক্ষা করেছিলেন?

-হ্যাঁ, আমি নিজের হাতে পরীক্ষা করেছিলাম।

-পরীক্ষা করে কী দেখলেন?

-আমি বন্দুকটা দিয়েছিলাম গুলিভর্তি অবস্থায় কিন্তু তখন দেখলাম এর ভিতরে একটা গুলি ব্যবহার করা হয়েছে।

-আপনি কি নিশ্চিত যে বন্দুকটা আপনি গুলিভর্তি অবস্থায় দিয়েছিলেন।

-হ্যাঁ, আমি কাঠমান্ডু থেকে আসার আগে বন্দুকটায় গুলি ভরেছিলাম কারণ আমি জানতাম যে আমি আক্রান্ত হতে পারি।

-আর সেদিন আপনি শিবুলালের ফ্ল্যাটে গিয়েছিলেন কারণ আপনি ভেবেছিলেন যে আপনি যে বন্দুকটা রেবাকে দিয়েছিলেন সেটা শিবুলালের জন্য ব্যবহার করা হতে পারে।

এবার পানু রায় উঠে দাঁড়ালেন, বললেন,’ দারোগাবাবু, এই মামলাটা রেবা কৈরালার বিরুদ্ধে। কৃষ্ণকালী মনে মনে কী ভেবেছিল তার সঙ্গে এই হত্যাকান্ড এবং রেবার কোনও যোগ নেই। আপনি এধরণের প্রশ্ন কী করে করতে পারেন? আপনি অন্য কোনও প্রশ্ন করুন।‘ কেলো দারোগা বিরক্তি দেখিয়ে বললো,’ আমার কিছু জিজ্ঞাসা করার নেই।‘ পানু রায় বললেন,’ বেশ । তাহলে আমি একটা প্রশ্ন করি? ‘ উত্তরের অপেক্ষা না করে পানু রায় বড়কালীকে জজ্ঞাসা করলেন,’ আপনি বড় বন্দুকটা রেবাকে কেন দিয়েছিলেন?’

-কারণ রেবা একসময় আমার ছেলে কালীকৃষ্ণের প্রেমিকা ছিল। আমি চেয়েছিলাম রেবা আমার পুত্রবধূ হিসাবে আমাদের বাড়ি আসুক। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে সেটা হলো না। আমি হঠাৎ বুঝতে পারলাম যে আমি রেবাকে ভালোবেসে ফেলেছি।

-আমি আপনাকে আর একটা প্রশ্ন করতে চাই।এই হত্যাকান্ড যেদিন ঘটে তার আগের দিন বা আরও আগে আপনি কি কিছু খবর পেয়েছিলেন যার থেকে আপনার মনে হয়েছিল যে এই শিবুলালই রেবার বাবাকে হত্যা করেছিল?

-হ্যাঁ। আমার তাই মনে হয়েছিল এবং আমি রেবাকে বলেছিলাম যে আমার ধারণা শিবুলালই রেবার বাবার হত্যাকারী এবং শিবুলাল সুযোগ পেলে রেবাকেও হত্যা করতে পারে। সেইজন্যই আমি সবসময়ে কাছে রাখার জন্য বড় বন্দুকটা রেবাকে দিই। আমি নিশ্চিত ছিলাম যে আমি প্রমাণ করতে পারবো যে শিবুলালই খুনী এবং কয়েকদিনের মধ্যেই পুলিশ ওকে অ্যারেস্ট করবে।

পানু রায় বললেন,’দারোগা বাবু, এর থেকে কী প্রমাণ হলো? ধরা যাক কোনও অজ্ঞাতকারণে কৃষ্ণকালীর মনে হলো আমি শিবুলালকে হত্যা করেছি। আমাকে বাঁচাবার জন্য সে শিবুলালের ফ্ল্যাটে গেল। গিয়ে দেখলো এমন কোনও তথ্য প্রমাণ সেখানে নেই যার থেকে বলা যেতে পারে আমি খুন করেছি। আমি নিজে সে কথা তাকে বলিনি। আমি তাকে সেখানে যেতেও বলিনি। তা সত্ত্বেও সে আমাকে বাঁচাবার জন্য কিছু সাক্ষ্যপ্রমাণ নষ্ট করে ফেললো। এই পুরো ব্যাপারটা কী ভাবে প্রমাণ করতে পারে যে কে খুনী।

-তাহলে আপনি বলতে চাইছেন যে এতক্ষণ যে কথাবার্তা হলো সেগুলো অর্থহীন? আমরা মিছিমিছি সময় নষ্ট করলাম?

-দেখুন দারোগাবাবু, আমি বলছি এই দীর্ঘ আলোচনা থেকে মাত্র দুটি সত্য এই খুনের তদন্তে সাহায্য করতে পারে। প্রথমটি হলো কৃষ্ণকালী গুলিভর্তি বন্দুকটা রেবাকে দিয়েছিল এবং সেদিনই পরে এসে দেখেছিল যে সিলিন্ডারে একটা গুলি কম। দ্বিতীয়টি হলো ঐ জুতোর ছাপটি যেটি মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল সেই জুতোটি রেবার।

-বেশ, এবার আমি কালীকৃষ্ণ অর্থাৎ কৃষ্ণকালীবাবুর ছেলেকে কিছু জিগ্যেস করতে পারি?

-অবশ্যই। আমি আপনার সঙ্গে সর্বতোভাবে সহযোগিতা করবো।

ছোটকালী পিছনের সারির চেয়ার থেকে উঠে এসে সামনে বসলো। কেলো দারোগা এবার ছোটকালীকে জিজ্ঞাসা করলো,’ আপনি বলুন যে যেদিন হত্যাকান্ড ঘটে সেদিন আপনি আপনার বন্দুকটি অর্থাৎ যেটিকে আমরা ছোট বন্দুক বলছি সেটি মিঃ রায়কে দিয়েছিলেন?’

-হ্যাঁ, দিয়েছিলাম।

-মিঃ রায় বন্দুকটি নিয়ে কী করেছিলেন?

পানু রায় বললেন,’ এই প্রশ্নের কোনও সম্বন্ধ নেই এই কেসের সঙ্গে। যেহেতু বড় বন্দুকটি খুনী বন্দুক হিসাবে প্রমাণ করার চেষ্টা চলছে সেখানে অন্য বন্দুক নিয়ে কে কী করেছিল এই কেসের সঙ্গে তার কী সম্বন্ধ? ‘ কেলো দারোগা ছোটকালীকে বড় বন্দুকটা দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করলো,’ এই বন্দুকটা আপনি আগে দেখেছেন?’

-হ্যাঁ, এটা আমি আগে দেখেছি।

-কখন দেখেছেন?

-যেদিন খুনের ঘটনাটি ঘটে সেদিন পানু রায় এই বন্দুকটি আমার হাতে দিয়েছিল।

পানু রায় বললেন,’ আমি কী করেছি না করেছি তার সঙ্গে এই হত্যার সম্পর্ক কী?’ কেলো দারোগা বললো,’ আপনি চুপ করুন। আমাকে কথা বলতে দিন। কালীকৃষ্ণবাবু আপনি বলুন মিঃ রায়ের থেকে বন্দুকটা নিয়ে আপনি কী করলেন?’

-আমি এটা নিয়ে রেবা কৈরালার অ্যাপার্টমেন্টে গেলাম।তারপর পানু রায় কী সব বলে গেলেন যার মানে হচ্ছে রেবা খব বিপদের মধ্যে আছে এবং আমি তাকে একটা বন্দুক দেবার জন্য এসেছি যেটা তার কাজে লাগবে। আমি স্ট্যাচুর মত দাঁড়িয়ে রইলাম।

-যাই হোক, বন্দুকটা মিঃ রায় আপনাকে কোথায় দিয়েছিলেন?

-আমার অফিসে।

-এই বন্দুকটা ওনার কাছ থেকে নেবার আগে আপনি কি ওনাকে একটা বন্দুক দিয়েছিলেন?

-হ্যাঁ,দিয়েছিলাম আর সেই বন্দুকটা হাতে নিয়ে সবাইকে চমকে দিয়ে পানু রায় আমার টেবিলের দিকে তাক করে ট্রিগার টিপে দিলেন।টেবিলটা ফেটে চৌচির হয়ে গেল। ঘরটা ধোঁয়ায় ধোঁয়ায় ভরে গেল। এই গন্ডগোলের মাঝখানে সবার নজর এড়িয়ে ছোট বন্দুকটা নিজের কাছে রেখে বড় বন্দুকটা আমার হাতে ফিরিয়ে দিলেন পানু রায়।আমি সেটা বুঝতে পারিনি। আমি ভাবলাম আমি ছোট বন্দুকটাই রেবাকে দিয়ে এলাম।

-আর এইভাবেই মিঃ রায় প্রমাণ তৈরি করলেন যে খুনী বন্দুকটা হত্যাকান্ডের সময় আপনার কাছেই ছিল। ঘটনাচক্রে দু’টি বন্দুকেই একটা করে গুলি কম ছিল।একেবারে জলের মত পরিষ্কার হয়ে গেল। মিঃ রায়, আপনার কিছু বলার আছে?

পানু রায় বললেন,’ কালীকৃষ্ণ , তুমি কি আমাকে বন্দুকটা পাল্টাতে দেখেছ?

-অবশ্যই না।আপনি যা কান্ড করলেন তাতে কারুর পক্ষেই কিছু দেখা সম্ভব ছিলনা। আপনি ইচ্ছে করেই এই কান্ড ঘটিয়েছিলেন যাতে আপনার আসল কাজটা কেউ দেখতে না পায়।এতো দুয়ে দুয়ে চার।

-তার মানে এটা তোমার অনুমান। তুমি নিজের চোখে এটা ঘটতে দেখোনি। তুমি আন্দাজে বলছো।

- হ্যাঁ তাই। আপনি যে এই কাজ করেছেন তা তো সহজেই অনুমান করা যায়।

-বেশ, দারোগাবাবু যদি মনে করেন এতে প্রমাণিত হলো যে আমি এই কাজ করেছি তাহলে আমার কিছু বলার নেই। বাকি কথা আদালতে হবে।

কেলো দারোগা বললো ,’ আপনি অযথা উত্তেজিত হচ্ছেন, মিঃ রায়। আপনাকে অন্যায়ভাবে দোষারোপ করার কোনও ইচ্ছে আমার নেই। আমাকে একটু কথা বলতে দিন। আচ্ছা কালীকৃষ্ণবাবু আপনি বলছেন যে আপনি একটা বন্দুক মিঃ রায়কে দিয়েছিলেন।তাই তো?’

-হ্যাঁ, যেটাকে ছোট বন্দুক বলা হচ্ছে সেই বন্দুকটা আমি ওনাকে দিয়েছিলাম।

-বন্দুকটা কোথায় ছিল?

-আমার টেবিলের ড্রয়ারে।

-আপনি বন্দুকটা কোথা থেকে পেয়েছিলেন?

-আমার বাবা আমাকে বন্দুকটি দিয়েছিলেন।

-যেদিন খুনের ঘটনাটি ঘটে সেদিন বন্দুকটা কোথায় ছিল?

-আমার কাছেই ছিল।

-সারাদিনই আপনার কাছে ছিল?

হ্যাঁ, সারাদিনই আমার কাছে ছিল।

-আপনি কবে বন্দুকটা মিঃ রায়ের হাতে দিয়েছিলেন?

-পরের দিন বেলার দিকে।

-তারপর কী হলো?

-পানু রায় বন্দুকটা থেকে একটা গুলি টেবিলের উপর ছুঁড়লেন।

-তারপর?

-তারপর উনি বন্দুকটা আমার হাতে দিয়ে বললেন ওটা নিয়ে ওনার সঙ্গে রেবার কাছে যেতে।

-ঐ বন্দুকটা যেটা আপনি রেবার কাছে নিয়ে গেলেন আর যেটা আপনি মিঃ রায়কে দিয়েছিলেন সে’দুটি কি একই বন্দুক?

-না।

এবার পানু রায় বিরক্ত হয়ে বললেন,’ দারোগাবাবু, আপনি কোনও প্রমাণ ছাড়াই এই একই কথা বারবার কেন ওকে দিয়ে বলাচ্ছেন? এটা ওর ব্যক্তিগত মত। এটা কোনও প্রমাণের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত সত্য নয়।‘কেলো দারোগা বললো,’ ঠিক আছে বন্দুকদু’টো একই না আলাদা সেটা প্রমাণসাপেক্ষ। কালীকৃষ্ণবাবু, আপনি বলুন রেবাদেবী বন্দুকটা নিয়ে কী করলেন? ‘

-রেবা ওটা টেবিলের ওপর রেখে দিল। তারপর কী হলো জানিনা। আমি এবং পানু রায় তারপর ওখান থেকে চলে গেলাম। যাওয়ার সময় দেখলাম আপনি এবং আর একজন পুলিশ অফিসার ওপরে যাওয়ার লিফটের দিকে যাচ্ছেন।

-আপনার কিছু বলার আছে মিঃ রায়?

পানু রায় বললেন,’কালীকৃষ্ণ, তুমি বললে যে ছোট বন্দুকটা যেদিন খুনের ঘটনাটা ঘটে সেদিন সারাক্ষণ তোমার কাছেই ছিল। তুমি যখন লাঞ্চ করতে গিয়েছিলে তখন কি বন্দুকটা সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলে?

-না, তখন ওটা ড্রয়ারে ছিল।

-ড্রয়ারে চাবি দেওয়া ছিল?

-না, আমি ঐ ড্রয়ারটায় চাবি দিইনা। কারণ তাহলে দরকারের সময় চাবি খুলে বন্দুকটা বের করতে দেরি হয়ে যাবে।

-বেশ, তা সত্ত্বেও তুমি মনে করো যে বন্দুকটা সারাক্ষণ তোমার কাছেই ছিল। সেদিন সন্ধ্যাবেলা তুমি কোথায় ছিলে?

-আমি এক ডিলারের সঙ্গে মিটিং এর জন্য গিয়েছিলাম।

-বন্দুকটা সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলে?

-না, ওটা ড্রয়ারেই ছিল। আমি অফিসে ফিরে ওটা পকেটে নিয়ে বাড়ি যাই।

-তারপর বাড়ি গিয়ে বন্দুকটা কোথায় রাখলে?

-আমার বেডরুমের কাবার্ডে।

-রাত্রে কি তোমার অফিস তালাবন্ধ থাকে?

-হ্যাঁ, অফিস তালাবন্ধ থাকে। তবে গেটে দারোয়ান থাকে। গাড়ি পাহারা দেবার জন্য।

-অফিসের চাবি কার কার কাছে থাকে?

-আমার বাবার কাছে, আমার সেক্রেটারির কাছে আর আমার স্ত্রীর কাছে।

-পরেরদিন অফিস যাবার সময় বন্দুকটা সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলে?

-না, আমি নিয়ে যেতে ভুলে গিয়েছিলাম। পরে আমার স্ত্রী ওটা কাবার্ডে দেখতে পেয়ে আমায় ফোন করে জানায়। আমি ওকে বন্দুকটা নিয়ে অফিসে আসতে বলি। ও বন্দুকটা নিয়ে অফিসে এসে আমাকে দেয়। আমি সেটা ড্রয়ারে রাখি।

-তুমি কী করে নিশ্চিত হচ্ছো যে তোমার স্ত্রী তোমাকে যে বন্দুকটা দিয়েছিল সেটাই খুনী বন্দুকটা নয় যেটা তুমি আমাকে দিয়েছিলে? কী? হতেও পারে তাই না?

-না, না, তা কী করে হবে? এরকম হতেই পারে না।

-আমি বলছিনা যে এরকমই হয়েছিল। আমি বলছি যে এরকম হতেই পারে। তুমি কিছুতেই অনুমানের ওপর ভিত্তি করে বলতে পারোনা যে আমি বন্দুকটা পাল্টে দিয়েছিলাম। কি দারোগাবাবু, আমি ঠিক বলছি তো?

কেলো দারোগা বললো,’ এটাই তো মুস্কিল, মিঃ রায়। আপনি এমন একটা গল্পের ফাঁদে জড়িয়ে দেন যা কেটে বেরিয়ে আসা যায় না।‘পানু রায় বললেন,’ গল্প কেবন সম্ভাবনার কথা বলে। প্রমাণ সত্য প্রতিষ্ঠা করে। প্রমাণহীন গল্প অর্থহীন। প্রমাণের কথা যখন উঠলো তখন আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করি। যে গুলিটা আমি সেদিন ছুঁড়েছিলাম সেটা পরীক্ষা করলেই তো পরিষ্কার হয়ে যাবে সেটা কোন বন্দুকটা থেকে ছোঁড়া হয়েছিল। ঐ গুলিটা কি পরীক্ষা করা হয়েছিল?

-না, মানে ঐ গুলিটা খুঁজে পাওয়া যায়নি। কেউ ঐ গুলিটা ওখান থেকে সরিয়ে নিয়েছে।

-সেকি? পুলিশ গুলিটা খুঁজে পায়নি। পুলিশের অকর্মন্যতার জন্য একজন নির্দোষ মহিলাকে আটকে রাখা হয়েছে? দারোগাবাবু, কোর্টে আপনার কী অবস্থা হতে চলেছে বুঝছেন?’

কেলো দারোগা বেগতিক দেখে চুপ করে থাকে। ছোটকালী উঠে এসে পানু রায়ের কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে কিছু একটা বলার সঙ্গে সঙ্গে চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠলেন পানু রায়। গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে বললেন,’ কী বলছো তুমি? আবার বলো। সবার সামনে বলো। জোরে বলো যাতে সবাই শুনতে পায়।‘ ছোটকালী চুপ করে থাকে। পানু রায় ঝাঁঝিয়ে ওঠেন,’ সাহস থাকে সবার সামনে বলো। চুপ করে আছো কেন?’ কেলো দারোগা ছোটকালীর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করে,’ কী বলেছেন আপনি? বলুন। সময় নষ্ট করবেন না।‘ ছোটকালী ঘাবড়ে গিয়ে বলে,’ আমি বলেছি আমি ওনাকে থানার বাইরে বেরোলে গুলি করে দেব।‘ পানু রায় চেঁচিয়ে বলে ওঠেন,’ তুমি আমাকে ভয় দেখাচ্ছো ? তাও আবার থানার মধ্যে? তুমি জানো আমি চাইলে আমি তোমাকে হাতকড়া পরিয়ে লকআপে ঢোকাতে পারি।‘ কেলো দারোগা ছোটকালীকে বলে,’শুনুন, থানাটা গুন্ডাগিরির জায়গা নয়। বেরিয়ে যান। না হলে সোজা লকআপে চালান করে দেব।‘ ছোটকালী মাথা নিচু করে চুপচাপ বেরিয়ে যায়।

মিনিট পাঁচেক পরেই থানায় ঢুকলো এলিনা। পানু রায়ের দিকে তাকিয়ে কেলো দারোগা বললো ,’ আমি ওনাকে ডেকে পাঠিয়েছিলাম। আপনি নিশ্চয়ই চেনেন ওনাকে।‘ পানু রায় বললেন,’ বিলক্ষণ। আমি ভেবেছিলাম আপনাকে বলবো ওনাকে ডাকতে। যাই হোক, আপনি যখন নিজেই ডেকেছেন শোনা যাক উনি কী বলেন?’

কেলো দারোগা বললো,’ এলিনাদেবী, আপনি এখন কী করেন?’

-আমি একজন মডেল এবং অভিনেত্রী।

-যেদিন খুনের ঘটনাটা ঘটে সেদিন আপনি কী করছিলেন মানে আপনি কি সেদিনও কোনও মডেলিং বা অভিনয়ের কাজে ব্যস্ত ছিলেন?

-না, না, আমি তখন দুর্ভাগ্যবশত কৃষ্ণকালীবাবুর অফিসে ওনার সেক্রেটারির কাজ করতাম।

-যেদিন খুনের ঘটনাটা ঘটে সেদিন আপনার অফিসে কি অস্বাভাবিক কিছু ঘটেছিল?

-অস্বাভাবিক বলা যাবে কি না জানিনা। তবে সেদিন কৃষ্ণকালীবাবু আমাকে কাঠমান্ডু থেকে ফোন করে বলেছিলেন উনি না আসা পর্যন্ত আমি যেন অফিসে অপেক্ষা করি। ওনার আসতে সাড়ে ন’টা বা দশটা হতে পারে।

-উনি কখন এলেন?

-উনি তার অনেক আগেই এসে যান। পৌনে ন’টা নাগাদ।ওনাকে খুব নার্ভাস লাগছিল।

-উনি কি আপনাকে শিবুলালের ব্যাপারে কিছু বলেছিলেন?

-হ্যাঁ, উনি বললেন যে যে রেবা কৈরালার বাবাকে খুন করেছিল তার সঙ্গে আজ আমার কথা হয়েছে। আমি এগারোটা নাগাদ লোকটার সঙ্গে দেখা করবো।‘

-তারপর কী হলো?

-উনি কোটটা খুলে স্ট্যান্ডে রাখলেন। ভেতরের পকেট থেকে বন্দুকটা বের করে টেবিলের ওপর রেখে বাথরুমে চলে গেলেন।

কেলো দারোগা একটা বন্দুক দেখিয়ে বললো,’আপনি কি বলতে পারবেন এইটাই সেই বন্দুকটা কি না?’

-না,আমি ভীষণ ভয় পাই। বন্দুকের ধারে কাছে যাইনা। তবে অনেকটা একই রকম দেখতে বলে মনে হচ্ছে।

কেলো দারোগা পানু রায়ের দিকে তাকিয়ে বললো,’ আপনি কিছু জানতে চান?’

পানু রায় বললেন,’ উনি আপনাকে বলেছিলেন যে ওনার সঙ্গে শিবুলালের কথা হয়েছে? ‘

-না, উনি বলেছিলেন ‘যে রেবা কৈরালার বাবাকে খুন করেছিল তার সঙ্গে আজ আমার কথা হয়েছে। আমি এগারোটা নাগাদ লোকটার সঙ্গে দেখা করবো।‘

- উনি শিবুলালের নাম বলেন নি?

-না শিবুলালের নাম বলেন নি। তবে আমার মনে হয় উনি শিবুলালের কথাই বলছিলেন।

-আপনার মনে হওয়া না হওয়ায় কিছু এসে যায় না। আমার আর কিছু জানার নেই।

কেলো দারোগা এলিনাকে একটু অপেক্ষা করতে বলে বেরিয়ে গেলেন। একটু পরে এক সুন্দরী মহিলাকে সঙ্গে নিয়ে ঢুকলেন। বললেন, ‘ ইনি কালীকৃষ্ণবাবুর সদ্যবিবাহিতা স্ত্রী। আমরা এনার সঙ্গেও কথা বলবো।‘ ওনাকে বসতে বলে কেলো দারোগা বড় বন্দুকটা দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করলো,’ আপনি এই বন্দুকটা আগে দেখেছেন? ‘

- জানিনা এটাই দেখেছি কি না। তবে এরকমই দেখতে একটা বন্দুক আমি কাবার্ডে দেখেছিলাম যেটা কালীকৃষ্ণ ভুল করে ফেলে রেখে অফিসে চলে গিয়েছিল।

-কবে এবং কখন উনি ঐ বন্দুকটা কাবার্ডে রেখেছিলেন।

-যেদিন শিবুলাল খুন হয় সেদিন রাত সাড়ে দশটা হবে।

- আপনি বন্দুকটা পরের দিন দেখেছিলেন?

-হ্যাঁ, দেখেছিলাম।

-তারপর কী করলেন?

-আমি কালীকৃষ্ণকে ফোন করে জানালাম যে সে বন্দুকটা ফেলে রেখে গেছে।

-কখন ফোন করেছিলেন? কালীকৃষ্ণবাবু অফিস পৌঁছনোর পর?

-আমি সদ্যবিবাহিতা। আমি এখন আমার স্বামী অর্থাৎ কালীকৃষ্ণকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছি কী ভাবে নিজের ব্রেকফাস্ট নিজে তৈরি করতে হয়। আমি সেজন্য সকাল সাড়ে ন’টা পর্যন্ত ঘুমোই।হ্যাঁ, আমার চোখে যখন পড়লো যে বন্দুকটা কাবার্ডে পড়ে আছে ততক্ষণে কালীকৃষ্ণ অফিস পৌঁছে গেছে।

-তারপর কী হলো?

- কালীকৃষ্ণ আমাকে বললো বন্দুকটা নিয়ে অফিসে পৌঁছে যেতে। আমি সকাল সাড়ে দশটা নাগাদ অফিসে গিয়ে ওকে বন্দুকটা দিয়ে দিই।

-কালীকৃষ্ণ যখন বাড়ি ফিরেছিল আর পরের দিন যখন আপনি বন্দুকটা ওনাকে ফেরত দিয়েছিলেন সেই সময়ের মধ্যে বন্দুকটা থেকে কি কোনও গুলি ছোঁড়া হয়েছিল?

-অসম্ভব। বন্দুকটা যখন রাখা হয় আর আমি যখন ওটা ফেরত দেবার জন্য নিই তারমধ্যে আমার বেডরুমে কেউ ঢোকেনি। বন্দুকটা একই অবস্থায় ছিল।

-আমার আর কিছু জানার নেই। মিঃ রায় আপনি কিছু জানতে চান?

পানু রায় মহিলার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন,’ আপনি কি ঐদিন সারাসন্ধ্যে বাড়িতে ছিলেন?’

-হ্যাঁ, অবশ্যই।

-আপনি জানেন কালীকৃষ্ণ আপনাকে দু’বার ফোন করেছিল সেদিন সন্ধ্যায় কিন্তু আপনি ফোন ধরেননি?

-কালীকৃষ্ণ আমাকে একই কথা বলেছে।

-আপনি কি ইচ্ছা করে ধরেননি?

-না, না। আসলে আমি মাঝখানে একঘন্টা ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।

-আপনি কি কালীকৃষ্ণকে সেকথা বলেছেন?

-না,এটা কখনও বলা যায়? আপনি সিচুয়েশনটা বুঝুন। আমরা মধুচন্দ্রিমা যাপন করছি। আমার স্বামী ব্যবসার কাজে সারাসন্ধ্যে বাড়ির বাইরে এমনকি ডিনারেও আসেনি। আমি ওকে বোঝাতে চাই যে এটা ঠিক নয়, আমি রাগান্বিত এবং মর্মাহত। আমি যদি ওকে বলি যে আমি ওর জন্যে অপেক্ষা করিনি, ঘুমিয়ে পড়েছিলাম তাহলে ও ব্যাপারটার গুরুত্বটাকে লঘু করে দেখতে পারে। সেইজন্য আমি ওকে বলেছিলাম ও হয়তো ভুল নাম্বারে ডায়াল করেছিল।

-আপনি বলছেন আপনি ওকে বুঝিয়েছিলেন যে ও দু-দুবার ভুল নাম্বার ডায়াল করেছিল। এতো বড় শক্ত কাজ করলেন কী করে?

-বিবাহের অব্যবহিত পরেই একজন স্ত্রী অনেক সহজে তার স্বামীকে অনেক কিছু বোঝাতে পারে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কাজটা কঠিনতর হয়ে ওঠে।

-তার মানে আপনি ওনাকে মিথ্যা কথা বলেছিলেন?

-মিথ্যা কোথায় বললাম। আমি বলেছিলাম অনেক সম্ভাবনার মধ্যে ভুল নাম্বার ডাইয়াল করাও একটা সম্ভাবনা। তাছাড়া ও আমাকে জিজ্ঞাসা করেনি যে আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম কি না? তাই আমিও কিছু বলিনি।

-বেশ। এবার বলুন যখন বন্দুকটা নিয়ে আপনি কালীকৃষ্ণের কাছে যান আপনি কি তখন জানতেন যে বন্দুকটায় একটা গুলি কম আছে।

-তাহলে আপনি টেবিলে গুলি ছোঁড়ার পর বন্দুকে দুটি গুলি কম থাকতো। তাই না?

-হ্যাঁ, সেটা যদি যে বন্দুকটা আপনি কালীকৃষ্ণকে দিয়েছিলেন সেই বন্দুকটাই কালীকৃষ্ণ আমাকে দিয়ে থাকে।

-একজন স্ত্রীর উচিৎ তার স্বামীকে বিশ্বাস করা। তাই নয় কি, মিঃ রায়?

-ঠিক আছে, আমার আর কিছু জানার নেই।

-তাহলে আমি আসতে পারি, দারোগাবাবু?

কেলো দারোগা বললেন,’ চলুন আপনাকে এগিয়ে দিই।‘ কেলো দারোগা সকলকে বিশেষ করে পানু রায়কে বলে গেল,’ একটু অপেক্ষা করুন। আর একজনকে আমি ডেকেছিলাম। উনি এসেছেন।আমি ওনাকে নিয়ে আসছি।‘ একটু পরেই কেলো দারোগা এক বয়স্কা, স্থূলকায়া মহিলাকে সঙ্গে নিয়ে ফিরে এল। বললো,’ ইনি গীতাদেবী। শিবুলালের অ্যাপার্টমেন্টের নিচের তলায় ইনি থাকেন। হত্যার দিন সন্ধ্যাবেলা উনি কিছু দেখেছিলেন যা আমাদের এই হত্যার কিনারা করতে সাহায্য করবে বলে আমার বিশ্বাস অর্থাৎ যা থেকে পরিষ্কার হয়ে যাবে যে রেবা কৈরালাই খুনী। এবার গীতাদেবী, আপনি বলুন। বসে বসেই বলুন।‘ গীতাদেবী বলতে শুরু করলো,’ সেদিন সন্ধ্যে পৌনে ন’টা নাগাদ আমি একজন মহিলাকে পিছনের সিঁড়ি দিয়ে নামতে দেখি।আমি ভাবলাম চোর-ছ্যাঁচোর হবে তাই একটা কাছাকাছি দূরত্ব রেখে পিছু নিলাম যাতে বুঝতে না পারে আমি ওকেই অনুসরণ করছি।‘ কেলো দারোগা জিজ্ঞাসা করলো,’ আপনি কি মহিলাকে স্পষ্ট দেখতে পেয়েছিলেন?’ গীতাদেবী উত্তর দিল,’ হ্যাঁ, আমি তাকে এই ঘরেও দেখতে পাচ্ছি।‘ গীতাদেবী আঙ্গুল দিয়ে রেবা কৈরালাকে দেখালো।

-উনি তারপর কী করলেন?

-উনি রাস্তায় বেরিয়ে ফুটপাথ ধরে হাঁটতে শুরু করলেন । তার কিছুক্ষণ পরে এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক গাড়ি নিয়ে এসে ওনার পাশে দাঁড়ালেন। ঐ মহিলা গাড়িতে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই গাড়ি চালিয়ে বেরিয়ে গেলেন।

-আপনি ঐ বৃদ্ধ ভদ্রলোককে কাছ থেকে দেখেছিলেন?

গীতাদেবী পানু রায়ের দিকে দেখিয়ে বললো,’ইনিই সেই ভদ্রলোক।‘ পানু রায় বললেন,’ আপনি পিছনের সেদিন পিছনের সিঁড়িতে নজর রেখেছিলেন?’

-হ্যাঁ, প্রায়ই আমি পিছনের সিঁড়ি দিয়ে কমবয়সী অপরিচিত মেয়েদের উঠতে নামতে দেখি। সেদিন ঠিক করেছিলাম আজ হাতেনাতে ধরবো এবং জানতে চাইবো তারা কার কাছে আসে এবং কেন আসে?

-তার মানে আপনি বলছেন ঐ মহিলাকে অর্থাৎ রেবাকে আপনি আগে ওখানে যেতে দেখেছেন?

-মানে ওনাকেই দেখেছি কিনা সেটা হলফ করে বলতে পারছিনা।

-আপনি বলছেন ঐ দিনের আগে আপনি ওনাকে দেখেছেন কি না জানেন না। সেদিন আর কোনও অপরিচিত কমবয়সী মহিলাকে দেখেছিলেন?

-না, শুধু ওনাকেই দেখেছিলাম।

-ওনাকে অনুসরণ করলেন কেন?

-আমি দেখতে চাইছিলাম ঐ মহিলা কে?

- শুধু সেইজন্যই অনুসরণ করছিলেন?

-হ্যাঁ, আসলে ওকে ভালো করে দেখার জন্য পিছন পিছন যাচ্ছিলাম।

-ভালো করে দেখা হয়ে গেলেই ফিরে যাবেন ভেবেছিলেন?

-হ্যাঁ, ভেবেছিলাম ভালো করে মুখটা দেখেই ফিরে যাব।

-যখন উনি গাড়িতে উঠছিলেন তখনও আপনি ওনাকে দেখবার চেষ্টা করছিলেন?

-হ্যাঁ আমি তখনও ওনাকে দেখার চেষ্টা করছিলাম।

-তাহলে আপনার নিজের কথা অনুযায়ী আপনি তখনও ওনাকে ভালো করে দেখতে পাননি। তাই না?

-না মানে হ্যাঁ, আমি ওনাকে ভালো করেই দেখতে পেয়েছিলাম। আরও ভালো করে দেখতে চাইছিলাম। কিন্তু আমার মনে হয় আমি ওনাকেই দেখেছিলাম।

-বেশ, উনি যদি গাড়িতে না উঠে আরও খানিকটা হেঁটে যেতেন তাহলে কি আপনি তখনও ওনাকে অনুসরণ করতেন?

-অবশ্যই করতাম। যতক্ষণ না পর্যন্ত ভালো করে মানে আরও ভালো করে ওনাকে না দেখতে পেতাম ততক্ষণ অনুসরণ করতাম।

-ঠিক আছে। আমার আর কিছু জানার নেই। দারোগাবাবু, আমরা কিন্তু যেখানে ছিলাম সেখানেই আছি। এখনও পর্যন্ত নির্দিষ্ট কোনও প্রমাণ পাওয়া গেল না। রেবাকে কেবলমাত্র সন্দেহের বশে আটকে রাখার কোনও মানে হয়না।

-আপনার ভরসায় আমি ওনাকে ছেড়ে দিচ্ছি। উনি বাড়ি যেতে পারেন কিন্তু নজরবন্দি থাকবেন আজ। ওনার দরজার সামনে দু’জন কনস্টেবল থাকবে সর্বক্ষণের পাহারায়। কালকে সকালে আবার আমরা এখানে বসবো। আগামি পরশুর মধ্যে আমি চার্জশিট জমা করতে চাই।

-দারোগাবাবু, আমার মনে হয় আপনার তৈরি হয়ে নামাই ভালো। কোর্টে সবার সামনে হেনস্তা হওয়ার চেয়ে নিজেদের মধ্যে একটা ঐক্যমত্যে এলে আপনি জোর গলায় বলতে পারবেন এটা ওপেন অ্যান্ড শাট কেস।

-সেটা আমাকে ভাবতে দিন, মিঃ রায়। কাল দেখা হবে।

পানু রায়, সুন্দরী এবং জগাই থানা থেকে বেরিয়ে বাড়ির দিকে রওনা দিল।
0

গল্প - সমরেন্দ্র বিশ্বাস

Posted in








স্মৃতিসৌধটা রাতের অন্ধকারে ঝিমোচ্ছে, ল্যাম্পপোষ্ট থেকে সামান্য আলো ছিটকে পড়ছে নতুন লাগানো নাম-ফলকটাতে, সৌধটার গায়ে। চারপাশে হাওয়া নেই। স্মৃতিসৌধটার মাথায় পতাকাটা। তার নড়াচড়া ঠিক ঠাহর করা যাচ্ছে না। জনাদুয়েক ভিখারী গোছের মানুষ, কাছেই চাতালে গভীর ঘুমে ডুবে আছে। কাল সকালেই জায়গার চেহারাটা বদলে যাবে। ট্যুরিষ্ট আর লোকাল লোকেদের আনাগোনায়।

এই ঝিম ধরা নির্জন রাতে থমকে থাকা বাতাসকে একটা ধারালো ছুরিতে চিড়ে ফেলে নিঃশব্দে দুটো মূর্তি এসে শহীদবেদীটার সামনে দাঁড়ালো! একজন পক্ককেশ অতি অতি বৃদ্ধ পুরুষ। আরেকজন এলোমেলো পক্ককেশী বৃদ্ধা। দুজনেরই বয়েস একশোর বেশী। পাশাপাশি দাঁড়িয়ে স্মৃতিসৌধটাকে স্যালুট জানিয়ে ওরা একসঙ্গে বলে উঠলো – জয় হিন্দ! ওরা দুজনেই স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহনকারী। কার্তিক শবর ও তারই মেয়ে দেমাতি দেই শালিহান!

মনুমেন্টটার দেয়ালে লাগানো নামফলকটাকে দেখে শালিহান বললো – ‘এই নামফলকটা তো আগে ছিলো না! মনে হচ্ছে, অল্প কিছুদিন হলো লাগানো হয়েছে।’ আধা আলো অন্ধকার। মেয়েটা কাছে ঝুঁকে সৌধফলকে লেখা নামের তালিকাটা দেখলো। এক দুই তিন করে সাতেরো জন লোকের নাম! এরা সবাই স্বাধীনতা সংগ্রামী। একে একে পরিচিত নামগুলো পড়ে নিয়ে শালিহান তার বাবাকে বললো – ‘বাপো! এই সাতেরো জন স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মধ্যে তোর নামটা, মানে কার্তিক শবরের নামটাই নেই!’

বুড়ো মানুষটা বললো - ‘এতে আশ্চর্য হবার কি আছে! সৌধফলকে আমার নাম থাকবে তার জন্যে তো আমরা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়ি নি! আমরা লড়াই করেছি দেশটাকে স্বাধীন করার জন্যে। সত্যিকারের ইতিহাস লেখা হলে, মনুমেন্টের এই ফলকটাতে স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসেবে তোর নামটাও থাকতো। আমি জানি, দেমাতি দেই শালিহান-এর নামটা ওরা সৌধফলকে লিখতে ভুলে গেছে!’

তখনো ভোর হতে অনেক বাকী। মেয়ে বাপকে বললো – ‘চলো তো, স্বাধীন দেশটাকে এই রাতের অন্ধকারে আরো কিছুক্ষণ উড়ে উড়ে ঘুরে ঘুরে দেখি।’

তখনই সেই অশরীরী আত্মাদুটো আকাশে উড়াল দিলো। নীচে আলো অন্ধকারে দাঁড়িয়ে শালিহা গ্রামের স্মৃতিসৌধটা। সেটা ম্লান রাতের অন্ধকারে লজ্জায় ম্রিয়মান!



(২)



‘এ কেমন কতা রে বাপো! জঙ্গল থেকে লকড়ি লাবু, তার জন্যে খাজনা দিতে হবু। জঙ্গলে বকরি গাই চড়াবু, তার জন্যে ধলা সাহেবদের খাজনা দিতে হবু। বাপোর জম্মেও এমন কানুন ছিলুক নাই!’ লকড়ু শবরের চোখে মুখে হতাশা!

‘আমরা মানবু ক্যানে? বিটিশ কানুন আমরা মানবুক নাই!’ – লোদা শবরের দুচোখে ধারালো আগুন জ্বলছে!

ব্রিটিশ শাসিত দেশ, উড়িষ্যার নুয়াপাড়া অঞ্চল। আদিবাসী শবর অধ্যুষিত এলাকা। সময়টা ১৯২৯-১৯৩০ খ্রীষ্টাব্দ। ভারতবর্ষের দিকে দিকে গান্ধীজির সত্যাগ্রহ চলছে। পিছিয়ে পড়া শালিহা গ্রামেও তার আঁচ!

সেদিনটাতে বট শাল গাছের ছায়ায় গ্রামীন মানুষ, আদমি আওরতদের জটলা। তাদের এই নিস্তরঙ্গ ভিটে মাটি গ্রামেও ব্রিটিশ হানাদাররা থাবা মারছে। স্বভাবতই এলাকার সরল মতি মানুষজনেরা অসন্তুষ্ট। কানু শবর কাজ করতে গিয়েছিল ভিন প্রদেশে। সে জটলাতে জানালো, গান্ধীজি তার দলবল নিয়ে মিছিল করে শীঘ্রই এদিকেই আসছে। তবে ঠিক কবে এসে পৌঁছাবে, তা সে জানে না।

কার্তিক শবর ঠান্ডা মাথায় জবাব দিলো, ‘গান্ধীজি দেশের নেতা। আমরা তার নির্দেশের অপেক্ষায় থাকবো। কিন্তু তিনি যতদিন না এসে পৌঁছান আমরা আমাদের উলগুলান চালিয়ে যাবো। এই মাটি আমাদের, এই জঙ্গল আমাদের! আমাদের বাপ ঠাকুদ্দাদের গাঁও! তোরা কোন বিলাইতী মানুষ? মোদের উপর খবদ্দারি কত্তে এয়েছিস? যত্তো সব জবরদস্তি! জঙ্গল থেকে কাঠ-লকড়ি কুড়াবার খাজনা আমরা বিটিশদের দেবো না, জঙ্গলে জানোয়ার চড়াবার খাজনাও আমরা দেবো না!’

জমায়েতে বেশ কিছু শবর নারী ও পুরুষ। তারা তাদের হাতের লাঠি আর কাস্তে উপরে তুলে ধরে একসঙ্গে চেঁচিয়ে বলে উঠলো – ‘উলগুলান! উলগুলান! লড়াই! লড়াই! বিটিশ কানুন আমরা মানবুক নাই!’

কার্তিক শবর এই জমায়েতকে জানালো, ‘তোমরা তৈরী থাকো। লাঠি আর মশাল নিয়ে আমরা শান্তিপূর্ণ মিছিল করবো! আর কয়েক দিনের মধ্যেই সবাই দল বেঁধে থানায় যাবো! আমরা ব্রিটিশ-শাসন মানি না। গান্ধীজি আমাদের নেতা। সত্যাগ্রহ আন্দোলন আমাদের চালিয়ে যেতেই হবে। খাজনা আমরা দেবো না!’

ওই জমায়েতে কতগুলো নারী-পুরুষ কন্ঠ একসাথে আওয়াজ তুললো – ‘বিটিশ-রাজ মানছি না, মানবো না। খাজনা আমরা দেবো না, দেবো না! বিটিশ, তু এঠারো ছাড়ি পলাই যা! পলাই যা!’

কার্তিক শবরের মেয়ে দেমাতি দেই শালিহান ওই জমায়েতে দাঁড়িয়ে বাপের কথা শুনছিল। সেও জনতার সাথে গলা মেলালো – ‘বিটিশ, তু এঠারো ছাড়ি পলাই যা! পলাই যা! ….’

সবার অলক্ষে শবরদের ওই জমায়েতে ঘাপটি মেরে দাঁড়িয়েছিল একজন উচ্চ বর্ণের মানুষ। স্থানীয় জমিদারের চর! সেদিন বিকেলেই জমিদারের কাছে খবর চলে গেলো, শীঘ্রই থানা ঘেরাও হবে। এই খবরটা থানাতেও শীঘ্রিই পৌঁছে গেলো। ব্রিটিশ শাসন অভিজ্ঞ। তারা জানে, জনজাগরণকে প্রথমেই ঠান্ডা করে দেয়া ভালো! তার রাস্তা হচ্ছে নেতা মানুষটাকে প্রথমেই টাইট করে দেয়া!



(৩)



দেমাতি-র বাপ কার্তিক শবর সেদিন জঙ্গলে আসে নি। কটক থেকে একজন সত্যাগ্রহী আসছে, কার্তিক শবরের কুটিরে তার পদার্পণ করার কথা। গান্ধীজির সত্যাগ্রহ আন্দোলনকে কি করে প্রত্যন্ত নুয়াপাড়া অঞ্চলে, আসপাশের গ্রামে গ্রামে আরো ছড়িয়ে দেয়া যায়?

অন্যদিকে মেয়ে পুরুষেরা জঙ্গলে বেরিয়েছে সেই কোন সকালে। কার্তিক শবরের মেয়ে দেমাতি দেই-ও ওদের দলে। এখানে শবর ছেলেমেয়েরা সবাই জঙ্গলে যায়। প্রত্যেকের হতে এক একটা বাঁশের বড়ো আকারের লাঠি। নিজেদের নিরাপত্তার জন্যে। ওরা জঙ্গল থেকে সংগ্রহ করে মহুয়া বীজ, বুনো ফল, নানা ধরণের প্রাকৃতিক শস্য। পাথরের টুকরো দিয়ে মাটি খুঁড়ে ওরা সংগ্রহ করে গাছের মূল। গাভিন গরুছাগলের জন্যে জঙ্গল থেকে উঠিয়ে নিয়ে আসে ঘাস লতা পাতা। সব সময়েই ওদের সতর্ক থাকতে হয়, যে কোন সময়ে বুনো শিয়াল, দাঁত বের করা কোনো হিংস্র জন্তু ওদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে।

সূর্য তখনো মাঝ আকাশ ছোঁয় নি। যেটা ভাবা, সেদিন সেটাই হলো। কতগুলো বাঁদর হঠাৎ লাফালাফি শুরু করলো। পাখিগুলো হঠাতই অশান্ত হয়ে কিচির মিচির শুরু করে দিলো। একটা নেকড়ে দূরে ওৎ পেতে ছিল; মতলব করছিল বাছুরটার উপরে ঝাঁপিয়ে পড়বে! তক্ষুনি নজরে এলো বিধু শবরের। চিৎকার – ‘জানোয়ায়! জানোয়ার!’ শবর দলের পুরুষদের দলটা তেড়ে গেলো হিংস্র নেকড়েটার দিকে। এতোগুলো লোককে একসাথে তেড়ে আসতে দেখে নেকড়েটা ভয়ে পেছনে ছুটছে। বিধু শবর আর পুরুষদের ছোট্ট দলটাও ছুটছে নেকড়েটার পেছন পেছন। ওটাকে এলাকা ছাড়া করতে হবে। এরকম ঘটনা ওদের জীবনে নতুন কিছু না!

ওদিকে কার্তিক শবরের মেয়ে দেমাতি দেই। সে জঙ্গলে দেখছিল একটা গাছ, তার নীচে কুরমা জাতীয় কন্দ আছে। ভাবছিল, কন্দটা মাটির নীচ থেকে খুঁড়ে বের করবে কিনা? তখনই ব্যাপারটা নজরে এলো। চেঁচাতে চেঁচাতে দেমাতির দিকে ছুটে আসছে তাদেরই গাঁওএর মেয়েটা! – ‘তোর বাপাকো পুলিশ পিটুছে! তু জলদি করি ঘরকে যা! জলদি, জলদি!’

যুবতী শবরকন্যা দেমাতি দেই-এর মাথাটা ঘুরে গেলো। তার বাপকে পুলিশ মারছে! সঙ্গিনীরা দেখলো, কাঁধে লাঠিটা উঠিয়ে দেমাতি দেই জঙ্গলের মধ্য দিয়ে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে তাদের গ্রামের দিকে ছুটছে। সে দিকবিদিক জ্ঞানশূণ্য!

সঙ্গিনী শবর মেয়েগুলি চেঁচিয়ে জানালো – দাঁড়া দাঁড়া। তুই একা যাস না। আমরাও আসছি। কিন্তু দেমাতির হাতে অপেক্ষা করার মতো সময় নেই। তার বাপ কার্তিক শবর আক্রান্ত!



(৪)



দেমাতি ছুটতে ছুটতে তার গাঁওএর কাছে গিয়ে দেখলো, বট শাল গাছের ঘন ছায়ার নীচে অল্প কিছু গ্রামীন মানুষদের জটলা। সেখানে মাটিতে পড়ে আছে কার্তিক শবরের আহত শরীর। তার পায়ের মাংসল পেশী খানিকটা জখম করে বেরিয়ে গেছে গুলিটা। বেরিয়ে আসছে রক্ত। আর সেখানে উর্দিধারী তিনজন ব্রিটিশ পুলিশ হা হা করে হাসছে! এই দৃশ্য দেখে ষোলো বছরের যুবতী দেমাতির মাথায় রক্ত চড়ে গেছে!

ততক্ষণে অকুস্থলে প্রায় ত্রিশ চল্লিশ জনের একটা মেয়েদের দল এসে পড়েছে, যারা দেমাতির সাথে জঙ্গলে খাবার ফলমূল কাঠকুঠো এসব সংগ্রহ করছিল। মেয়েদের সবার কাঁধে এক একটা লাঠি! শবরদের গ্রামের সেই জায়গাটা মুহূর্তেই পরিণত হলো একটা রণক্ষেত্রে।

দেমাতি তেমন কিছু কথা না খরচ করে মুহুর্তেই ঝাঁপিয়ে পড়লো কোমরে বন্দুকধারী ব্রিটিশ পুলিশটার উপরে! তার কানে এসেছিলো, এই বদমাশ বন্দুকয়ালা পুলিশটা তার বাপকে গুলি চালিয়েছে! দেমাতি তার নিজের লম্বা লাঠিটা দিয়ে নিমেষেই পুলিশটার ডান হাত আর বাম হাতে জবরদস্ত কয়েকটা মোক্ষম আঘাত মারলো! ঘটনাটা খুবই আকস্মিক, স্বতঃস্ফুর্ত! অদম্য সাহসে দেমাতি এলোপাথারি পেটাতে লাগলো তার বাপকে যে মেরেছে, সেই উর্দিয়ালা ব্রিটিশ দালালটাকে। পুলিশটা জবরদস্ত আক্রান্ত। সাধ্য কি, তার আহত হাত দুটোয় বন্দুকটা দিয়ে সে কি করে নিশানা বাঁধবে।

প্রায় ত্রিশ চল্লিশ জনের সেই মেয়েদের দলটা যারা লাঠি হাতে দেমাতির পেছন পেছন ছুটতে ছুটতে এসেছিল। ততক্ষণে তারাও ঝাঁপিয়ে পড়েছে। দেমাতির দেখাদেখি তারাও ঘিরে ফেলেছে পুলিশদের বাকি দুজনকে। এলোপাথারি আক্রমণ।

মূল ভূমিকায় মাত্র ষোল বছর বয়েসী শবর যুবতী দেমাতি! তার সঙ্গী ত্রিশ-চল্লিশ জন শবর মেয়ে। বিপরীতে তিনজন অর্ধ সশস্ত্র পুলিশ।

সমস্ত ব্যাপারটা এমনই আচমকা ছিল, যে পুলিশেরা কিছু করার মতো অবস্থায় ছিল না! ওরা তিনজন দুটো সাইকেলে এসেছিল। কোনোক্রমে তারা বেশী আহত পুলিশ সঙ্গীটাকে একটা সাইকেলের পেছনে বসালো। দুটো সাইকেলে তারা তিনজন আত্মরক্ষার তাগিদে পগার পার! ফিরে গেলো নিজেদের ঠেকে!

এদিকে পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা লাঠি হাতে শবরদের বিশাল প্রমিলা বাহিনী আর উপস্থিত গ্রামের লোকজন তাদের ভাষায় চিৎকার দিতে লাগলো – ‘বিটিশরাজ মানছি না। মানবো না। জঙ্গলের খাজনা দিচ্ছি না দেবো না! বিটিশ, তু এঠারো ছাড়ি পলাই যা! তু এ দেশ ছাড়ি পলাই যা!’

সমবেত শ্লোগান শুনে মাটিতে পড়ে থাকা কার্তিক শবরের রক্তাক্ত শরীরটা উজ্জীবিত হলো। ডান পায়ের থাই জখম। গড়িয়ে নামছে রক্ত। সে পা দু’টো টান টান করে জমিতে এক হাতে ভর দিয়ে পেছনে ঝুঁকে বসলো। কার্তিক শবরের গলার থেকেও ক্ষীণ স্বরে বেরিয়ে এলো বেদনার্ত আওয়াজ – ‘বিটিশ, তু এঠারো ছাড়ি পলাই যা!’

দেমাতি তার হাতের লাঠিটা মাটিতে রেখে বাপের শরীরটাতে ঠিক মতো বসালো। কেউ একজন মাটির পাত্রে তার দিকে জল এগিয়ে দিলো। সবাই মিলে শলা পরামর্শ করে ঠিক করা হলো, কার্তিক শবরকে কবিরাজের কাছে নিয়ে যাওয়া হবে। ডাক্তার তো এখানে অমিল। অগত্যা সবাই মিলে ধরাধরি করে কার্তিক শবরকে নিয়ে গেলো স্থানীয় কবিরাজের কাছে। যদিও থাইএর ক্ষতস্থান থেকে মাংস বেরিয়ে পড়েছে, তবুও ভেতরে বুলেট আটকে নেই। কবিরাজ ক্ষতটা পরিস্কার করে, জড়ি বুটি লাগিয়ে সেখানে কাপড়ের ব্যান্ডেজ করে দিল। সে যাত্রা কার্তিক শবর বেঁচে গেলো। তার আত্মজা দেমাতি আর লাঠি হাতে মেয়েদের দল সেদিন গড়ে তুললো শবর বিদ্রোহের এক নতুন ইতিহাস! সেটা ১৯২৯-৩০ সাল!

নানা সক্রিয়তায়। বহু মানুষের আত্মত্যাগে পরাধীন দেশটার ইতিহাস এগিয়ে চললো। দেশটাও স্বাধীন হলো। সময়ের নদীতে গড়িয়ে গেলো অনেক জল!



(৫)



স্বাধীনতার পরেও কিন্তু দেমাতি দেই শালিহানের অবস্থা তেমন কিছু পালটায় নি। সে থাকে গ্রামেরই একটা ঝুপড়ি ঘরে। কোনো ক্রমে চলে দিন আনা দিন খাওয়া। যে স্বাধীনতার জন্যে তার বাপ জেলে গেছে, যে স্বাধীনতার জন্যে সে উড়িষ্যার একটা গ্রামে একদল মেয়ে নিয়ে ব্রিটিশ পুলিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে, তারপর অনেক অনেক কিছু ঘটনা ঘটে গেছে। স্বাধীনতা সংগ্রামীদের অনেকে নেতা মন্ত্রী হয়েছে, অনেকে মাসিক পেনশন পেয়েছে, কিন্তু দেমাতি দেইর কপালে সেসব কিছুই জোটে নি। কারণ সে জেল খাটে নি, তার নামে কারাগার-যাপনের কোনো সার্টিফিকেট বা নথিপত্র পাওয়া যায় নি। তাই তার জীবনের দুঃরবস্থা ঘোচে নি। অথচ ১৯২৯-১৯৩০ খ্রীষ্টাব্দে একটা গ্রামে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যে উল্লেখযোগ্য স্বাধীনতার আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তাতে দেমাতি দেই শালিহানের অবদান কি কিছু কম ছিল?

দেমাতি এখনো চোখ বুঝলে দেখতে পায় ব্রিটিশদের সাথে লড়াইএর সে সব দিনগুলোকে। তার বাপ কার্তিক শবরের সেই দীর্ঘস্থায়ী লড়াই।

১৯৯৭তে দেশের স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর। ১৯৩০ এর শালিহা সত্যাগ্রহ, তখন দেমাতি দেই-র বয়েস ছিল ষোলো। এখন তার বয়েস ৯৭ বছর, আন্দোলনের ৬৭বছর অতিক্রান্ত!

সেদিনটাতে গ্রামের প্রধান একটা চিঠি নিয়ে এলো। শালিহা বিদ্রোহের স্মরণে একটা স্মৃতিসৌধর উন্মোচন করা হবে। তাতে দেমাতি দেই-ও আমন্ত্রিত। প্রথমে একটা অনিচ্ছা সুলভ মনোভাব দেখালেও খবরটা পেয়ে সে খুশি হলো।

মঞ্চে আসীন বৃদ্ধা দেমাতি দেই শালিহান। কিছুটা ভাব প্রবণ হয়ে পড়েছিল সে। অনেক লোকজন সেখানে জড়ো হয়েছে। দেশের একজন বড় নেতা স্মৃতিসৌধটির উন্মোচন করলেন। সেই বিশাল অনুষ্ঠানে দেমাতি দেই শালিহানকে সরকারী তরফে একটা সুসজ্জিত রঙিন প্রশংসাপত্র দিয়ে সম্মানিত করা হলো। একজন স্থানীয় নেতা তার ভাষণে জানালো, - নুয়াপাড়ার এই গ্রামের নাম ‘শালিহা’ রাখা হয়েছে তাদেরই বীর কন্যা দেমাতি দেই শালিহান-এর নামে! তিনি এই গ্রামেরই সেই মেয়ে, যিনি মাত্র ১৬ বছর বয়সে অসীম সাহসে ব্রিটিশ পুলিশদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল, এমন ঘটনা ইতিহাসে বিরল! তিনি এই সভায় আজ উপস্থিত, তাকে সম্বর্ধনা দিতে পেরে আমরা গ্রামবাসীরা গর্বিত!

শালিহা গ্রামে সুসজ্জিত স্মৃতিসৌধটার উন্মোচন দেমাতি-র জীবনের একটা উল্লেখযোগ্য ঘটনা। তারই উপস্থিতিতে, তাকে সম্বর্ধিত করে একটা অনুষ্ঠান! জেল খাটা স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসেবে তার মৃত বাপ কার্তিক শবরের নামটাও সেই অনুষ্ঠানে বারবার উচ্চারিত হয়েছিল।

সেদিন খুশী মনে দেমাতি ঘরে ফিরে এলো। মনে মনে বিশ্বাস করেছিল, সে আর তার বাপ কার্তিক শবর, এই স্মৃতিসৌধটার মধ্য দিয়ে ভারতবর্ষের দুজন স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসেবে ইতিহাসে বেঁচে থাকবে। কিন্তু সে কতটা ঠিক জানতো?



(৬)



দশ এগারো বছর কেটে গেছে। ২০০৮ এর পরবর্তী কোন একটা সময়।

শালিহার এই স্মৃতিসৌধটার উপরে একটা সুদৃশ্য নাম ফলক লাগানো হয়েছে! সেখানে স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসেবে খোঁদাই রয়েছে পরপর ১৭ জনের নাম। না! তাদের নাম নেই! সেখানে দেমাতি দেই শালিহানের নাম নাই থাকতে পারে, তার বাপ কার্তিক শবরের নামটাও নেই। যদিও তারা দুজন তখন আর বেঁচেও নেই। মৃত! কিন্তু স্মৃতিরও কি মৃত্যু হতে পারে? হায়! স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস!

তাই মাঝে মাঝেই ওদের দুজনের আত্মা মাঝরাতে এসে শহীদবেদীটার সামনে দাঁড়ায়! পাশাপাশি দাঁড়িয়ে স্মৃতিসৌধটাকে স্যালুট জানিয়ে দুজনেই একসঙ্গে বলে উঠলো – জয় হিন্দ!

মেয়েটি বুড়ো মানুষটাকে বললো – ‘বাবা! এই সাতেরো জন স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মধ্যে কার্তিক শবরের নামটাই নেই!’

বুড়ো মানুষটার বুকে সেই পুরোনো কথা, ‘এতে অবাক হবার কি আছে! সৌধের ফলকে নাম থাকবে, তার জন্যে তো সেই যুগে আমরা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করি নি! আজকাল দেশের নেতারা তো ধান্ধায় ঘোরে। দেশের ফয়দা? নাকি নিজের নিজের ফয়দা? কি করে ভোটে জেতা যাবে। কি করে গদী দখল করা যাবে! যাক সে সব কথা!’

রাতের অন্ধকারে দাঁড়িয়ে শালিহার স্মৃতিসৌধটা মাঝে মাঝে জীবন্ত হয়ে ওঠে। ওটা দেখতে পায় শালিহা গ্রামে ঘটে যাওয়া অতীত দিনের ছবি। দেমাতি দেই শালিহানের এর সেই তান্ডব মূর্তি! স্মৃতিসৌধটা শুনতে পায় ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে ১৯৩০ সালের শবর-মানুষজনের গন উত্থান – উলগুলান! উলগুলান! অথচ মাত্র সাতেরোজন, বাছাই-করা! কে বেছেছে? বাদবাকী সব নাম বাদ! মাত্র সাতেরোজন স্বাধীনতা সংগ্রামীর বিজ্ঞাপন বুকে সেঁটে এই স্মৃতিসৌধটার ভয়ে লজ্জায় দুঃখে মাথা হেঁট করে থাকে! তখনই আকাশে শবর বংশীয় বাপ-মেয়ের জোড়া আত্মাদুটো শহীদবেদীটার মাথার উপরে চক্কর লাগায় – তারা দেখে দেশের মানচিত্র, দেখে অঞ্চলের হালচাল, নেতাদের কার্যকলাপ! ওরা আকাশে ওড়ে, ওদের কোন দায় নেই, কারণ ওরা এখন মৃত!

[তথ্য ঋণ – পি সাইনাথ রচিত গ্রন্থ “আননোন হিরোস অফ ইন্ডিয়া’স ফ্রীডম স্ট্রাগল”।]
0

গল্প - বিশ্বজিৎ দত্ত

Posted in






সিএ হওয়াটা আমার ভবিতব্য ছিল। আমি ছোটবেলা থেকেই একটি খাতায় খালি বিয়োগের হিসাব রাখি। দুঃখ হতো না কোনো, এখনো হয় না। বিয়োগ মানে তো দান করা, দিদু বলেছিল। যা নিজের নয় তা রেখে কী লাভ বলো। যত দান করবে ততই তুমি হালকা হয়ে যাবে। একদিন মুক্ত বিহঙ্গের মতো উড়বে। আমি দিদুর কথার মানে বুঝতে পারিনি। কিন্তু পাখি হয়ে উড়ব নীল আকাশে। এত দারুণ ব্যাপার।

তখন আমার বারো বছর বয়স। সুপ্রিয়র খুব মন খারাপ। সদ্য পিতৃবিয়োগ এবং তার ফলে বাবার সাথে ঘুমও হারিয়ে গিয়েছে তার জীবন থেকে। আমি নিয়ে গেলাম তাঁকে গ্রামের শেষপ্রান্তে। যেখানে আছে একটি ভাঙা মন্দির, একটি টিউবকল ও একটি বহু পুরাতন নিম গাছ। আর আছে সে। তার কথায় পরে আসছি। সেই নিম গাছের নিচে মেরুদণ্ড সোজা করে বসলাম। ঠিক যেমন টিভিতে রামায়ণ সিরিয়াল দেখেছিলাম। সুপ্রিয়র মাথায় হাত দিয়ে বললাম, ভগবান ওকে ঘুম দাও। কিশোর বয়সের একটি কাতরতা থাকে। সেই কাতরতা থেকে মনে হয় সমস্ত সমস্যাই খুব একান্ত। সেই রাতে আমি দু চোখের পাতা এক করতে পারিনি।

সুপ্রিয় পেরেছিল। ও অনেকদিন পর বারো ঘণ্টা ঘুমোয়। সেই শুরু আমার বিয়োগের। এবং তার সাথে খাতায় হিসেব তুলে রাখার। জিভের স্বাদ দিয়ে দিই রানু পিসিকে। রানু পিসির ছোটবেলায় আন্ত্রিক হয়েছিল। এর ফলে জিভের সমস্ত কোষ খারাপ হয়ে যায়। আর তার সাথে শেষ হয়ে যায় মাস্টার শেফ হবার স্বপ্ন। শেফ যদি ফারাক না করতে পারে লবণে ও চিনিতে তাহলে ভালো রান্না আর তৈরি করবে কী করে? আবার বসলাম নিম গাছের নিচে আর দিয়ে দিলাম রানু পিসিকে আমার স্বাদ। প্রতি বছর কলকাতার ফাইভ স্টার হোটেলের রান্নাঘর থেকে আমার জন্মদিনে একটা ৫ কেজির কেক আসে। আমি গ্রামের বাচ্চাদের দিয়ে দিই। আমার কাছে কেকও যা, বার্লিও তাই।


দিদু আমার পনেরো বছর বয়সে একটা গল্প শুনিয়েছিলেন। দধীচি মুনির গল্প। উনি একদিন একটি নিম গাছের নিচে বসে ধ্যান করছিলেন, বিশ্বকর্মা ওনার কাছে এসে উপস্থিত হন। অসুরদের কাছে দেবতারা খালি পরাজিত হচ্ছে, এর প্রতিকার একটাই, যদি দধীচি মুনি তার হাড় দান করে দেন, তবে বিশ্বকর্মা একটা বজ্র তৈরি করবেন ওই হাড় দিয়ে এবং অসুরদের যুদ্ধে পরাজিত করবেন ইন্দ্র বজ্রাঘাত করে। দধীচি মুনি হাসিমুখে নিজের হাড় দান করেন। আমি দিদুকে জিজ্ঞেস করেছিলাম দধীচি মুনি কি উড়তে চাইতেন? তিনি নিশ্চয়ই পাখি হয়ে গেছিলেন। দিদু বললেন তা তো জানি না। তবে তুমি ওই দধীচি মুনির বংশধর। তুমি বর পেয়েছ দান করার। আমার দিদুর গল্প শুনে মনে হলো দধীচি মুনিও নিশ্চয়ই মানুষ হবার থেকে পাখি হতেই চাইতেন।


আপনারা নিশ্চয় বুঝেছেন যে গ্রামের লোকজন আমাকে আমার সিএ গুণের থেকেও বেশি দানের জন্য মনে রেখেছে। আমার খাতা অনুসারে ৫০ বছর বয়স অব্দি আমি দান করেছি

১) ঘুম (সাপ্তাহিক কিস্তিতে, সাময়িক),

২) স্বাদ, (চিরজীবনের জন্য)

৩)গানের গলা (ট্রেনে বাউল গান গাইতেন রাহুলদা, পুলিশ মাঝখানে অ্যারেস্ট করে কারণ সরকার নিষিদ্ধ করে দিয়েছিল ট্রেনে গান গাওয়া, এখন বাংলা সিনেমায় প্লেব্যাক করে),

৪) কাঁদার ক্ষমতা (এক বিধবা স্বামীর মৃত্যুতে কাঁদছিলেন না, আত্মীয়স্বজন তাঁকে মেরে সম্পত্তি নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল, নারীর চোখের জলের অসীম ক্ষমতা দেখেছিলাম সেদিন)

৫) জীবনের তিনটি বছর (সমীরের ভাইঝির হার্টে ফুটো ছিল)


আরও অনেক বিয়োগ লেখা আছে কিন্তু যোগ নেই একটাও। কেউ যদি আমায় জিজ্ঞেস করত আমি কি একা, আমি উত্তর দিতাম আমি ব্যস্ত। আমি আসলে গ্রামের পাতকুয়ো। সবাই প্রয়োজনে একটি করে বালতি কুয়োতে ডুবিয়ে জল ভরে নিয়ে যায়। কিন্তু ওই বালতি ডুবোনোর ফলে কুয়োর ভেতরে যে একটি অস্থিরতা তৈরি হয় তার খোঁজ কেউ নেয় না।


তবে আমার একটি খ্যাতি তৈরি হয়েছে এই গ্রামে। কেউ কেউ আমায় সাধক হিসেবে ভাবতে লাগল এবং প্রণামী হিসেবে দশ বিশ টাকা করে দিতে থাকল। ভালোই হলো, আজকাল বিড়ি সিগারেটের যা দাম বেড়েছে, আমার একটু সুবিধা হয়। তবে প্রণামী দিয়ে লাভ হয় না দানের ক্ষেত্রে। আমি একবার টাকার বিনিময়ে সুদীপকে আমার সুন্দর হাতের লেখা দিতে চেয়েছিলাম। সুদীপ UPSC পরীক্ষার জন্য প্রিপারেশন নিচ্ছিল। কিন্তু কিছুই হলো না। ওর হাতের লেখা অপরিষ্কার থেকে গেল। তবে আজকাল ও প্রোমোটার হয়েছে। বড় গাড়ি, বড় বাড়ি নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। আমাকে দেখে বলে কি সাধু ভালো আছেন? কিছু অসুবিধা হলে বলবেন। আমি হাসি।


গ্রামের ওই শেষ প্রান্তরে আমার বাড়ি তৈরি করে নিয়েছি। ভাঙা মন্দির, পুরাতন নিম গাছ এবং একটি টিউবকল। আর সাথে সে।


নিকষ কালো মার্বেলের তৈরি পাষাণী। হাত জোড় করে নতমস্তকে হাঁটু মুড়ে চেয়ে আছে মন্দির প্রাণে। জনশ্রুতি এই পাষাণীর নাম অহল্যা। স্বামী ছিলেন ব্রাহ্মণ। পুজো করতে বেরিয়েছিলেন এবং সেই সময় উনি ব্যভিচারে লিপ্ত হন দেবরাজ ইন্দ্রের সাথে। সেই ইন্দ্র যার জন্য মুনি প্রাণ ত্যাগ করেন। অহল্যার স্বামী ফিরে এসে অভিশাপ দেন এবং তার ফলে পাথরের মূর্তি হয়ে যান। গ্রামের প্রান্তে রাখা হয়েছে এই মূর্তিটিকে একটি সতর্কীকরণ হিসেবে। পাষাণীর পুজো হয় না ।খালি আমি প্রতি সন্ধ্যায় ওর করজোড় প্রস্তর হাতে একটি তেলের প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখি। ছোটো ছেলেরা ওর হাতের প্রদীপটি কেড়ে নিয়ে খেলা করে। সবাই তাঁকে স্পর্শ করে, কিন্তু দেখে না কেউ।


আর পাষাণী অভিশাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে থাকে হাত জোড় করে।


আমি দুবেলা তার সাথে কথা বলি। সকালে বাজার থেকে খবরের কাগজ নিয়ে এসে ওকে পড়ে শোনাই। দুপুরে স্বাদহীন বার্লি খেতে খেতে সমস্ত পৃথিবীর দুঃখ সুখ জানাই। পাষাণী চেয়ে থাকে মন্দির প্রান্তে। অপেক্ষায় আছে কবে অভিশাপ থেকে মুক্তি দেবে এই কঠোর পৃথিবী।


লোকে প্রথমে ঠাট্টা করতে থাকে আমাকে নিয়ে, তারপর অকথা কুকথা চলে, এবং তারপর আবার ঠাট্টা করাতে ফিরে যায়। ঠাট্টা করা সহজ, কুকথা বলতে পরিশ্রম করতে হয়। আমি আমার কথা চালিয়ে যাই। পাষাণীকে আমার খাতার সব বিয়োগ বলি। সে আর পাষাণী নয় আমার সহধর্মিণী হয়ে উঠেছে। সেই সহধর্মিণী যে স্বামীর সমস্ত কথা জানে এবং শুনে বিরক্ত হয়।


পাথরকে পড়ে শোনানোর অভ্যাসের ফল হলো যে একসময় নিজেই নানা রকমের গল্পের ভাণ্ডার হয়ে যায় পাঠক। আমিও গল্পের এনসাইক্লোপিডিয়া হয়ে গেছি। অহল্যার সমস্ত গল্প ওর প্রতি অবিচারের দিকে ইঙ্গিত করে। প্রতি রাত্রে আমি স্বপ্নে পাষাণীকে দেখি। সে বলে আমায় মুক্ত করো। আমি দোষী নই। আমি ঘুম থেকে উঠে পড়ি। ঘর্মাক্ত। বিভ্রান্ত। সকালে পাষাণীর কাছে যাই। ওর নতমস্তক যেন আরেকটু নত হয়েছে। পাথরের গণ্ডে অশ্রুধারা দেখা যাচ্ছে।


আমি ঠিক করি পাষাণে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করব। অহল্যা কেন শাস্তি ভোগ করবে কারুর কপটতার। আজকে ওকে মুক্তি দিয়ে আমার বিয়োগের খাতা এখানেই বন্ধ করব। আমি নিম গাছের নিচে হাঁটু মুড়ে বসলাম, এবং পাষাণী, না আর পাষাণী নয়, অহল্যার মাথায় হাত ঠেকালাম। ভগবান ওকে প্রাণ দাও আমার প্রাণের বিনিময়ে। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করলাম। কিছুই হলো না।


ফিরে গেলাম আবার গল্পের ভাণ্ডারে। কোথাও তো লেখা থাকবে ওর মুক্তির উপায়। প্রতি বছর চড়কের মেলা হয় এই গ্রামেই। সেখানে অহল্যার কথা লাউডস্পিকারে বাউলরা গেয়ে শোনায়। ওর ব্যভিচারের গল্প পুরো মেলায় গমগম করে ওঠে। কিন্তু ওর সাথে তো কপটতা করা হয়েছিল। সেটা তো কেউ বলে না। অহল্যার মুক্তি কী করে হবে? আর আমার দানও কেন কাজ করছে না?


চড়কের মেলায় ঘুরছি আর শুনছি কথকদের গল্পকথা। এই মাঝেই ঝগড়া শুরু হয়েছে মঞ্চের মাঝখানে। এক কথক মেলার কর্মকর্তাকে বলছে পয়সা কেন কম দেওয়া হবে? কর্মকর্তা জবাব দিলেন আপনি তো সাধক মানুষ, আর এত কামিনীকাঞ্চনের লোভ? কথক বললেন লোভ নয়, সম্মান। কপটতা করা কারুর সাথে মানে তাকে অসম্মান করা। অসম্মান মানুষের হৃদয়কে পাষাণ করে তোলে। বাকি কথা আর আমার কানে ঢোকেনি। কারণ আমি ওর মুক্তির সন্ধান পেয়ে গেছি।


………..


আজ শুক্লপক্ষ। প্রচুর সমাগম হয়েছে মন্দিরে। দেবী অহল্যার মন্দিরটি নাকি খুব জাগ্রত। উনি সবার মনস্কামনা নাকি পূর্ণ করেন। তাই প্রচুর লোক এসেছে আজকে পুজো দিতে এই কালো পাষাণের মূর্তির কাছে। ভিড়ে রয়েছে রাহুলদা, প্লেব্যাক সিঙ্গার, সমীরের ভাইঝি যার নাকি হৃদয়ের ফুটো সেরে গেছে এখানে পুজো দিয়ে এবং আরো অনেকে। কলকাতা থেকে বিশাল নামী একজন শেফ এসেছেন। উনি নাকি অহল্যা মায়ের দয়ায় খ্যাতি পেয়েছেন। নাহলে তো আন্ত্রিকের ফলে ওনার জিভের স্বাদই নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল। নষ্ট জিভে কি আর রাঁধুনি হওয়া যায়। সব এই মায়ের কৃপা। এখানে নাকি একটা পাগল থাকত আগে এই মন্দিরে। তাকে আর দেখা যায় না।


এটাই আমার খাতায় শেষ বিয়োগ,আমার সিএ কর্মজীবনের ইতি এই পৃথিবীতে। অহল্যাকে আমার খ্যাতি দান করলাম। তাতে মূর্তি প্রাণ পায়নি। সে মূর্তি থেকে বিগ্রহে পরিণত হয়েছে। রাজ্যের সব থেকে বড় মন্দির তৈরি হয়েছে ওর পুজোর জন্য। অহল্যার শাপমোচন ঘটেছে। আমিও আছি। বহু দূরে, নীল নভোচরে,মুক্ত বিহঙ্গ হয়ে। আমি যাচ্ছি ইন্দ্রের কাছে, ওনার কাছে আমার একটি দেবোত্তর সম্পত্তি গচ্ছিত আছে।
0

গল্প - মনোজ কর

Posted in





















২০

জগাই ঘরে ঢুকে বললো,’ দাদু, মনে হচ্ছে আমাদের একদিকে বাঘ আর অন্যদিকে ভাল্লুক। বড়কালীকে শিবুলালের খুনের সহযোগী হিসাবে পুলিশ সাব্যস্ত করেছে। এক লক্ষ টাকা জামিনে তাকে ঘন্টাখানেকের মধ্যে ছেড়ে দেওয়া হবে। রেবা কৈরালাকে পুলিশ খুনের দায়ে কালকেই কোর্টে তুলতে চাইছে। প্রেসের লোকেদের ডেকে কেলো দারোগা পুলিশের পরবর্তী পদক্ষেপের কথা জানিয়ে দিয়েছে।‘

-হেনার কোনও খবর পেলে, জগাই?

-হেনার খবর জোগাড় করায় অনেক বাধা আছে। বিশেষ করে বড়কালীর পরিবারে ওর বিবাহের জন্য। কোনও কথা বাইরে বেরোচ্ছে না। বাইরের লোক এমনকি কাজের লোকদেরও ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। এই মডেলদের একটা সমস্যা আছে। আসলে কিন্তু বেশিরভাগ মডেলই সাধারণ জীবন যাপন করে। স্বামী, পুত্র, কন্যা নিয়ে তাদের সুখের সংসার। কিন্তু জনগনের মডেলদের সম্বন্ধে একটা পক্ষপাতদুষ্ট ধারণা আছে। যেহেতু মডেলদের তোয়ালে বা বিকিনি পরা ছবি কাগজে বা টিভিতে দেখা যায় তাই লোকে তাদের অন্যরকম ভাবে। হেনাকে নিয়ে কাঠমান্ডুতে গল্পের অভাব নেই। সে নিজের ফ্ল্যাটে একলা থাকত। সে পার্ট টাইম মডেলের কাজ করতো। বাকি সময় ছোট ছোট জামা পরে নৃত্যের ভঙ্গিমায় ক্যাসিনোর টেবিলে টেবিলে ঘুরে বেড়াত যাতে জুয়াড়ীরা আর একটু বেশি সময় সেখানে কাটায় , আর একটু বেশি টাকা জুয়ার পিছনে খরচা করে। অনেক সময় বিকিনি পরে হোটেলের সুইমিং পুলে সাঁতার কাটতো। তারপর ভিজে গায়ে, ভিজে চুলে সুইমিং পুলের ধারে আধশোয়া হয়ে আবাসিকদের মনোরঞ্জন করতো।

-হেনা কি কমিশনে কাজ করতো?

-না, মাসিক মাইনেতে। এটা তার কাজ ছিল। তুমি এতদিন এত জায়গায় গেছো। কত ক্যাসিনো দেখেছ কে জানে? একজন সুন্দরী যখন তোমার পাশে এসে দাঁড়ায় আর তোমার হয়ে চাল দিতে থাকে আর তুমি জিততে থাক তখন টেবিল ছেড়ে উঠে যাওয়া কি সহজ?

- সত্যি, আমি অনেকবার এই দৃশ্য নিজের চোখে দেখেছি। এমনকি বেশ কয়েকবার এই অভিজ্ঞতা ব্যক্তিগতভাবে আমারও হয়েছে। নিজেকে এই নেশার হাত থেকে সামলানো খুব কঠিন। কিন্তু আমি বুঝতে পারিনা ওরা তোমার পিঠে হাত রেখে তোমার জন্য চাল দিলে তুমি জেত কী করে? সবাই অপেক্ষা করে থাকে কখন সে এসে তার পাশে দাঁড়াবে আর তার জন্য চাল দেবে। জুয়া জেতা তো আছেই আর উপরি পাওনা তার শরীরের আলতো স্পর্শ। তবে এই মডেলরা অত্যন্ত সতর্ক এবং সচেতন। এরা ততটাই করবে যতটা আইনানুগ। আইনের বাইরে গিয়ে এরা কিছুই করবে না তা তুমি তাকে যতই প্রলুব্ধ করো।

-ঠিকই বলেছ। তোমার অভিজ্ঞতা থেকে আমরা প্রতিদিন শিখি। এবার হেনার কথায় ফিরি। ও শিবুলালকে চিনতো। মাঝে মাঝে শিবুলালের সঙ্গে ডেটিংএও যেত। হয়তো ওদের মধ্যে ভালোবাসা ছিল। অথবা কোনও ব্যবসায়িক কারণও থাকতে পারে। তবে শিবুলাল ব্ল্যাকমেলার ছিল যদিও সেটা প্রমাণ করা যাবে না । কেউ জানেনা শিবুলাল কী করতো? কিন্তু দক্ষ শিকারি ছিল। কাঠমান্ডুর রেড লাইট এরিয়া, ক্যাসিনো আর পাঁচতারা হোটেলের আশেপাশে ঘুরে বেড়িয়ে প্রচুর পয়সা রোজগার করেছে। শিবুলালের কোনও ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ছিল না, ট্যাক্স দিত না। দেখে মনে হত লোকটা কোনওক্রমে দিন গুজরান করে। অনেক লোক কাঠমান্ডুতে আসে , ফূর্তি করে চলে যায়। অনেকে এদেশ থেকে কাঠমান্ডুতে লজ বা ছোট হোটেল চালায়। সেখানে অনেকে আসে সঙ্গিনী নিয়ে রাত কাটাতে। কারুর স্মৃতিশক্তি যদি প্রখর হয় এবং দিনক্ষণসমেত এইসব লোকেদের মুখ এবং কাজকর্মের কথা মনে রাখতে পারে তাহলে পয়সা রোজগার করা কোনও ব্যাপার নয়। তার ওপর যদি হেনার মত মেয়েরা যদি নিয়মিতভাবে তাকে টাকার বিনিময়ে খবর দেয় তাহলে তো কথাই নেই। এই সমস্ত খবর হেনার মত মেয়েদের কাছে প্রচুর থাকে। কয়েকটা কাজে লাগাতে পারলেই যথেষ্ট।

-জগাই, ঠিকই বলেছ। তবে এসব প্রমাণ করা খুব কঠিন, অসম্ভবই বলা যেতে পারে।

-দাদু, আর একটা খবর তোমাকে দিই। শিবুলালের মানিব্যাগে ১৫০০০টাকা পাওয়া গেছে। তদন্তে যতদূর উদ্ধার করা গেছে এই ১৫০০০ টাকা ছাড়া আর শিবুলালের আর কোনও টাকা কোথাও পাওয়া যায়নি। কিন্তু এটা হতেই পারেনা। তার মানে শিবুলালের টাকা কোথাও রাখা আছে যেখান থেকে সে দরকার পড়লে টাকা নিয়ে আসতো। শিবুলাল যে ব্যবসায় ছিল সেখানে দশ-পনের হাজার টাকা যখন তখন বের করতে হয়।

-কিন্তু ইনকাম ট্যাক্স ডিপার্টমেন্টের নজর তার দিকে পড়লো না? এরা রাস্তার ধারের চা-ওয়ালার রোজগারের খবর রাখে অথচ যে লোকটা প্রপার্টি ডিল করে তার খবর রাখে না। আশ্চর্য নয়?

-যতদূর খবর পেয়েছি ইনকাম ট্যাক্সের নোটিস ও কোনওদিন পায়নি। লোকটা ধুরন্ধর ছিল। লোকটা ভুল করে জীবনের প্রথম দিকেও কোনওদিন ট্যাক্স দেয়নি। ওদের খাতায় ওর অস্তিত্বই নেই। শিবুলালের সঙ্গে হেনা অর্থাৎ ছোটকালীর স্ত্রীর বেশ ভালোই যোগাযোগ ছিল। যে কোনও কারণেই হোক হেনা চাইছে তাদের এই সম্পর্কের কথা এবং তার বিবাহ পূর্ববর্তী জীবনের কথা যেন কেউ না জানতে পারে। কাগজে যেন এসব খবর ছাপা না হয়। বিশেষত এই কারণে যে সমাজের উচুঁতলায় সে এখন ছোটকালীর স্ত্রী হিসাবে স্বীকৃতি পেতে চলেছে।

-ছোটকালী সম্বন্ধে লোকজনের কী ধারণা?

-সাধারণভাবে বলা যায় লোকটা একটু বন্য প্রকৃতির। আদব কায়দা খুব একটা জানে না। বাবার ব্যবসা চালানোর অযোগ্য। বাবার একেবারে বিপরীত। বাবাকে মানুষ মোটামুটি সম্ভ্রম করে। সামাজিক আচার অনুষ্ঠানে বড়কালীকে খুব একটা দেখা যায় না কিন্তু ছেলেকে সর্বত্র দেখা যায়। ছেলে সেকেন্ড হ্যান্ড গাড়ির ব্যবসায় ঢুকে ভালোই রোজগার করছে। ছোটকালীর একমাত্র লক্ষ্য তাড়াতাড়ি পয়সা রোজগার করা। যেভাবেই হোক পয়সা কামানো এবং চটজলদি পয়সা কামানো ওর একমাত্র লক্ষ্য। সম্মান, সুনাম এসবের প্রতি ওর কোনও আগ্রহ নেই। এখন তো গাড়ির সঙ্গে জমি-ফ্ল্যাট কেনা বেচার ব্যবসাও করছে শুনলাম।

-অ্যাকমে ইলেকট্রিকের কিছু খবর পেলে?

-ওদের চিঠিপত্র একটা ঘরের ঠিকানায় পৌঁছোয়। সেই ঘরটা একটা লোক ভাড়া নিয়েছে কিন্তু সেখানে থাকে না। মাঝে মাঝে এসে চিঠিগুলো নিয়ে যায়।

-লোকটাকে দেখতে কী রকম?

-একেবারে সাধারণ। ভিড়ের মধ্যে কেউ চিনতে পারবে বলে মনে হয়না। আশেপাশের কেউ সেভাবে নজর করেনি। এসে পাঁচ-দশ মিনিটের মধ্যে চলে যায়। দাদু, তোমাকে আর একটা খবর দিই। কেলো দারোগা কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে হেনাকে সন্দেহের তালিকায় রাখতে চাইছে না। কেসটা এমনভাবে সাজাতে চাইছে যাতে প্রমাণ করা যায় তুমি বন্দুক পাল্টেছ আর রেবা খুন করেছে। তুমি যদি হেনার বিরুদ্ধে সাক্ষ্যপ্রমাণ জোগাড় করে বলতে যাও যে হেনারও খুন করার মোটিভ আছে তাহলে কেলো দারোগা বলতে শুরু করবে তুমি যে ছোটকালীর অফিসে গিয়ে একটা কান্ড ঘটিয়ে বন্দুক বদল করেছ সেটার থেকে পুলিশের দৃষ্টি ঘোরানোর জন্য তুমি এখন হেনাকে কেসটার মধ্যে ঢোকাচ্ছ।

-আমার মনে হয় জগাই আমরা কেলো দারোগাকে ওর দাবি প্রমাণ করার যতই সুযোগ দিই না কেন ও কিছুতেই প্রমাণ করতে পারবেনা যে আমি বন্দুক পাল্টেছি।

-আমিও জানি দাদু যে ওরা তোমাকে দোষী প্রমাণ করতে পারবে না। আর সেই জ্বালায় কেলো দারোগা জ্বলে পুড়ে মরছে। আচ্ছা, তুমি কি রেবা কৈরালাকে বাঁচাবার চেষ্টা করবে?

-নিশ্চয়ই। আমার মনে হয় পুলিশ যেটা বলছে সেটা ঠিক নয়।

-দাদু, রেবা কৈরালা কী বলেছে? আসলে কী হয়েছে?

-সেটাই তো মুস্কিল। রেবা কৈরালা কিছু বলছে না। শুধু এটাই বলছে যে সে খুন করেনি। যদি আমার জেরার মুখে ওকে কিছু বলতে হয় তাহলে এমন সব কথা বেরিয়ে আসবে যা রেবার পক্ষে খুব একটা স্বস্তিদায়ক হবে না। সেইজন্য আমিও জোর করছি না।

-তার পুরোনো জীবনের কিছু কথা?

-আমারও তাই মনে হয়। তবে আজ না হোক কাল আমাকে সব কথা বলতেই হবে সেটাও হয়ত ও জানে। কিন্তু এই মুহূর্তে ও মুখ বন্ধ রাখতে চায়। ওর কথা অনুযায়ী ওকে দোষী হিসাবে সাব্যস্ত করার জন্য প্রাথমিকভাবে যে তথ্যপ্রমাণ দরকার পুলিশের কাছে তা নেই। কিছু আন্দাজের ওপর নির্ভর করে পুলিশ এগোচ্ছে যেটা কোনও কাজে লাগবে না।

-আমি সবসময় তোমার সঙ্গে আছি। কিছু দরকার হলে বোলো।

-জগাই, ঐ ভুয়ো বিলগুলো কোথায় ছাপা হয়েছিল আমার জানা একান্ত দরকার।

-আমার চেষ্টার কোনও খামতি হবে না। খবর আমি আনবোই দাদু।

জগাই আর সুন্দরী বেরিয়ে যায়। পানু রায় চোখ বুজে গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে গেলেন।



চলবে
0

গল্প - রঞ্জন রায়

Posted in







কাল রাত্তিরে আমাকে পুলিশে ধরেছিল। আমার অপরাধ? রাত বারোটায় ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের বাইরে পিচের রাস্তার ওপারে ঘাসের মধ্যে শাল মুড়ি দিয়ে বসে থাকা। আমার চেহারাটাও সরেস। চারদিনের না কামানো খোঁচা খোঁচা দাড়ি, দু’পাশের দুটো দাঁত পড়ে যাওয়ায় তোবড়ানো গাল, আধময়লা জীন্সের প্যান্ট ও রঙওঠা পাঞ্জাবি। পায়ে একটা বেল্ট লাগানো শস্তা জুতো চার সবদিকে হাওয়া লাগার বন্দোবস্ত।

ওদের দোষ নেই। এত রাতে কুয়াশাঘেরা ফাঁকা মাঠে একটা খেঁকুরে লোক বসে আছে—ওদের হিসেব মিলছিল না। ভাবল মেয়ের দালাল বা চোরাই ড্রাগসের সাপ্লায়ার। কিন্তু মেয়ের দালাল হলে মেয়ে ও খদ্দের? তারা কোথায়? সন্ধ্যেবেলা এখানে দুষ্টুমিষ্টুদের দেখা যায়, তখন ওদের সময়। এখন তো সবাই বড় রাস্তার ওপারে নিরাপদ ডেরায়। ঠান্ডা বেড়ে গেছে যে! আর ড্রাগস সাপ্লাইয়ের জন্যে ছোটেলালের পান গুমটি আর বৃন্দা মাসির তেলেভাজার দোকান তো রয়েছে। এই খোলা মাঠে লোকটা বুদ্ধদেবের মত ধ্যানস্থ হয়ে বসে আছে কেন?

উঁহু এটা অন্য কেস, বড় কোন কেস। এত মাথা না ঘামিয়ে ব্যাটাকে তুলে নিলেই হয়। থানায় বড় অফিসাররা এর ঠিকুজি কুষ্ঠি বিচার করবেন’খন।

এইসব কথাবার্তার পর ওরা বেশি সময় নষ্ট করেনি। ময়দানের খোলা হাওয়ায় শীতের কাঁপন। আমাকে একজন ওপর ওপর থাবড়ে, পকেট হাতড়ে কালো গাড়িতে তুলে নিল। গাড়ির মধ্যে মাত্র একজন মহিলা, মাঝবয়েসি। প্যাট প্যাট করে আমাকে দেখছে আর পিচ করে থুতু ফেলছে প্রায় পায়ের কাছেই। আমার গা গুলিয়ে উঠল।

মহিলাটি আমার অস্বস্তি দেখে মুচকি হেসে বলল—কী কেস?

--মানে?

--কোন ধারা লাগিয়েছে? ২০ নম্বর নাকি ২৭? গাঁজা, চরসের পুরিয়া রাখা? নাকি মাগীর দালালি?

আমি চুপ করে থাকি। ও আমাকে শুনিয়ে বলে—চিন্তা কোর না বাবু। আমার চেনা উকিল আছে, কাল জামিন পেয়ে বেরিয়ে যাবে, মাক্কালী। একটা বড় পাত্তি খরচা হবে, ব্যস।

আমি কথা না বাড়িয়ে জালের ফাঁক দিয়ে রাত্তিরের কুয়াশা ঘেরা অন্ধকার কোলকাতাকে দেখতে থাকি। থানা এসে গেল। বেশ আলো ঝলমল। তিন ধাপ সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয়। আমাকে খানিকক্ষণ বারান্দায় একটা লম্বা বেঞ্চিতে বসিয়ে রাখল। আমি স্কুলে পড়ার সময় একবার থানায় গেছলাম। কড়েয়া থানা। আমরা দশজন। অপরাধ --রাস্তায় ক্রিকেট খেলতে গিয়ে পাশের দোতলা বাড়ি জানলার কাঁচ ভাঙা। আরও ছিল –ওই বাড়ির মেয়েদের বিরক্ত করা। কথাগুলো ঠিক। কিন্তু যারা করেছিল তারা পুলিশের গাড়ি গলিতে ঢোকামাত্র হাওয়া হয়ে গেছল। কয়েকজন নিজেদের হাওয়াই চটি ফেলে। ওরা বড় ছেলের দল, ক্লাস নাইন টেন। তখন আমি ফাইভে পড়ি; দুধভাত। খেলতে নিত না, চক দিয়ে ফুটপাতে স্কোর লিখতে লাগিয়ে দিত। তাই গাড়িটা দেখেও পালাই নি। বুঝতেই পারি নি কেন পালাতে হবে। থানায় অফিসার আমাদের বকুনি দিলেন। আর জানলার কাঁচ কার হিটে ভেঙেছে? পালের গোদা কে? কারা মেয়েদের বিরক্ত করে জিজ্ঞেস করলেন। আমার কপাল ভাল, আগে আমার থেকে বড় কয়েকজনকে জেরা করতেই ওরা এক এক করে সবার নাম বদলে দিল। তখন সবাইকে চুপচাপ বাড়ি যেতে বলা হল।

আমি খুব ভয় পেয়েছিলাম। আমাকে বললে নাম বলে দিতাম, কিন্তু খুব খারাপ লাগত। আমি যে দুধভাত হলেও অপেক্ষায় আছি --একবার আমাকে বল করতে দিক। খালি এক ওভার। রবারের বলে খুব ভাল অফ ব্রেক করাতে পারি। পার্কসার্কাস বাড়ির ছাদে খুব প্র্যাকটিস করি, বাচ্চুদার সঙ্গে। এখন পুলিশের কাছে নাম বলে দিলে কোন মুখে ফের ওদের খেলার সময় হাজির হতাম!

কিন্তু এই থানা আর পুরনো কড়েয়া থানার মধ্যে আকাশপাতাল তফাৎ। কোথায় টালির ছাদ আর ধীরে ধীরে ঘুরতে থাকা মান্ধাতার আমলের পাখা আর কোথায় এই আধুনিক থানা, যেখানে টেবিলে টেবিলে কম্পিউটার, কেবিনে এসি লাগানো, শীতকাল বলে বন্ধ রয়েছে। দেয়ালে একটা বড় টিভি। একটা জল খাবার কুলার, বাঃ!

দেখামাত্র আমার এই শীতের রাতেও তেষ্টা পেল। আসলে খুব ভয় পেয়েছি। থানায় নাকি খুব মারে! আমাকেও মারবে নাকি? কড়েয়া থানায় গিয়েছিলাম বাচ্চা বয়সে, কিন্তু এখন তো আমি সিনিয়র সিটিজেন! থানায় এজন্য কোন রেহাই পাওয়া যায়? কী জানি!

আমার ডাক এল।

ভেতরে গিয়ে একটা টেবিলের সামনে দাঁড়াতে বলল। ওই মহিলা এবং আরও কয়েকজনের আগে জেরা চলছিল। ওদের এবার টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গিয়ে একটা লোহার বড় বড় রড লাগানো ঘুপচি ঘরে বন্ধ করে দিল, মহিলাকে আলাদা একটা রুমে। সে যাবার আগে আমাকে চোখ টিপল। সেটা পুলিসের চোখ এড়ায়নি।

আমাকে পেশ করার পর জিজ্ঞেস করা হোল আমার কাছে কী কী পাওয়া গেছে। সঙ্গের পুলিশ বলল—কিচ্ছু না। চুপচাপ আলোয়ান মুড়ি দিয়ে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের পাঁচিলের বাইরে খোলা মাঠে বসেছিল। স্যার, মনে হচ্ছে বাঞ্চোৎ বুড়ো বড় খেলুড়ে। চুতিয়া সেজে কেটে পড়ার ফিকির। কিন্তু রহিমন বিবি লক আপে ঢোকার আগে ওকে চোখ মারল—আমি নিজে দেখেছি। আজ রাতের মত লক আপে ঢুকিয়ে দিই?

ওসি সাহেবের চোখ ছোট হল। আমাকে খানিক দেখে বলল—নাম? সাকিন?

--বঙ্কিম সান্যাল। পার্কসার্কাস বাজারের সামনে।

--সেকী? হিন্দু বামুনের ঘরের! তায় বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ। কিন্তু রহিমন বিবিকে কবে থেকে চেন?

--আজ কালো গাড়িতে চড়ে আসার সময় থেকে।

--আগে কখনও দেখ নি?

--না।

--তাহলে তোমাকে চোখ মারল কেন?

--আমি কী করে বলব স্যার? ওই বিবিকেই জিজ্ঞেস করুন।

পাশের সেপাই গালে আচমকা একটা চড় কষাল। ব্যথার চেয়েও অবাক হলাম বেশি।

--অ্যাই খানকির ছেলে! সাহেবের সঙ্গে ভাল করে কথা বল।

আচমকা অমন ঝন্নাটেদার চড় খেয়ে মাথা ঝিমঝিম করছিল, তায় মা তুলে গালি! আমার একটাই দুর্বল জায়গা। কোত্থেকে একটা বিচ্ছিরি বেয়াড়া রাগ শিরদাঁড়া পাকিয়ে মাথায় উঠতে লাগল।

ওসিকে বললাম—অফিসার! অ্যাম স্পীকিং টু ইউ, স্যার; নট টু দিস সিলি পার্সন। কাউন্ডলি টেল ইয়োর সিপয় টু বিহেভ। আরেকবার যদি আমার মা তুলে কিছু বলে--।

এটুকু বলে আমি হাঁফাতে লাগলাম।

অন্য সেপাইরা মজা দেখতে চলে এল। একজন বলল—মা তুললে তুই কি করবি রে বুড়ো? মারবি? ওর সঙ্গে বক্সিং লড়বি?

সবাই হেসে উঠল। রাতদুপুরে থানার ভেতরে রঙ্গ জমেছে মন্দ নয়!

--আমি আ—মি ওর গায়ে থুতু ছিটিয়ে দেব। যে অন্যের মাকে অসম্মান করে সে নিজের মাকেও সম্মান দিতে জানে না।

কিন্তু ইংরেজি বলার সুফল ফলল, স্বাধীনতার এতদিন পরেও। মেকলেকে ধন্যবাদ।

অফিসার একটা চেয়ার দেখিয়ে আমাকে বসতে বললেন। অন্য সেপাইগুলোকে একটু সরে দাঁড়াতে বলে রাইটার বা মুন্সীজিকে ডাকলেন। সে একটা প্যাড আর পেন নিয়ে আমার পাশের চেয়ারে বসল।

এবার আমার জেরা শুরু।

--পার্কসার্কাস বাজারের সামনে? ওটা তো পুরো মুসলিম এলাকা। আপনি ওখানে থাকেন? কেন?

--আমি ওখানেই জন্মেছি, বড় হয়েছি। স্কুলে গেছি।

--নাম ঠিকানা ঠিক বলছেন? বঙ্কিম সান্যাল? বাকাউল্লা বা সুলেমান না? মিথ্যে বললে নিজেই ভুগবেন।

--বাবার নাম?

--স্বর্গীয় শশাংকশেখর সান্যাল।

--শশাংকশেখর মানে কি?

--ওটা শিবের আর একটা নাম। মানে যার মাথার জটায় শশাংক বা চাঁদ রয়েছে। চন্দ্রচুড় মানেও তাই। বহুব্রীহি সমাস।

--হুম্‌ তা সান্যাল মশায়, চাঁদ-তারা মসজিদ বা দরগার মাথাতেও থাকে। সবুজ রঙা রেশমি পতাকায়।

--তা থাকে স্যার। চন্দামামা সবার মামা।

--বেশ। আবার জিজ্ঞেস করছি। ওই পাড়াটা হিন্দু বামুনের থাকার মত নয়। রাস্তাঘাট বড্ড নোংরা। তবু আপনি ওখানে পড়ে আছেন, কেন?

--আমার আর কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই তাই।

--মানে? হেঁয়ালি না করে সোজাসুজি বলুন।

--বলছি স্যার। আমার তিনকুলে কেউ নেই। বাবা মা’র একমাত্র সন্তান। দু’জনেই গত হয়েছেন। আমি বিএ পাশ করে প্রাইভেট স্কুলে মাস্টারি করতাম। পঞ্চান্ন বছরে রিটায়ার। জমাপুঁজি নেই। বাবা সামান্য রেখে গেছেন। তা দিয়ে খাওয়া পরা এবং ডাক্তারের খরচ নমো নমো করে হয়ে যায়। এই বাড়িটার ভাড়া এখনও ষাট টাকা, এত বার বাড়িওলা বদলে গেছে যে কেউ জানে না মালিক কে। ভাড়া দিতে হয় না। কারণ কর্পোরেশন সবাইকে এই ভাঙাচোরা বাড়িটা ছেড়ে দিতে বলছে।

আমি ছাড়ি নি। যতদিন আছি এখানেই মাথাগুঁজে থেকে যাব।

--আপনার বাবা কী করতেন?

আমার হাসি পায়। সেটা লুকিয়ে গলার স্বর বদলে নিয়ে বলি—বাবা ল্যান্স নায়েক এস এস স্যানিয়েল ভারতীয় সেনাবাহিনীতে চাকরি করেছেন। আটচল্লিশে কাশ্মীর ফ্রন্টে লড়েছেন।

নিস্তব্ধতা ।

--কাগজ আছে? রিটায়ারমেন্টের?

--ফোর্ট উইলিয়ামে সব আছে। আমার কাছে নেই। কোনদিন দরকার হবে ভাবি নি।

--আপনি কী করেন?

--কিছু না। এই বয়সে কোন কিছু করার উৎসাহ পাইনে।

--সে কী! তাহলে এই শীতের রাতে ভিক্টোরিয়ার কাছে খোলা মাঠে বসেছিলেন কী করে? এর এনার্জি এল কোত্থেকে?

--সেটা একটা ব্যক্তিগত ব্যাপার স্যার।

--এটা কোন ব্যক্তিগত ব্যাপার নয়। আপনি নিজের ঘরের ছাদে নয়, পাবলিক প্লেসে বসেছিলেন।

আমি কিছু বলার আগে আরেক জন একটা ফাইল নিয়ে আসে। সেটায় চোখ বুলিয়ে সাইন করতে করতে অফিসার জিজ্ঞেস করেন—কিছু পেলে?

--না স্যার। কোলকাতা পুলিসের রেকর্ডে এই লোকটার বা বঙ্কিম সান্যাল নামে কারও কোন কেস পেলাম না।



-ওকে। শুনুন সান্যাল। সত্যি কথা বলুন। রাত অনেক হয়েছে। উত্তর স্যাটিসফ্যাক্টরি হলে আপনাকে আটকাব না। বাড়ি যেতে পারেন। না হলে আজকের রাতটা এখানেই লক আপে থাকতে হবে। এবার বলুন, খোলা মাঠে আলোয়ান মুড়ি দিয়ে কেন বসেছিলেন?

খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলে ফেলি—পরীর জন্যে অপেক্ষা করছিলাম।

--পরী? কোন পরী? বেন্টিংক স্ট্রিটের পরীবানু?

-স্যার, ওরকম কাউকে চিনি না।

--বেশ, যাকে চেনেন তার কথা বলুন। এই বয়সে কোন পরীর সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন? এত রাতে? তার নাম ঠিকানা?

--আপনারা চেনেন তাকে। সে আমার কাছে বিজয়া, ইতিহাসের পাতায় তার নাম অ্যাঞ্জেল অফ ভিক্টরি। জন্ম ১৯২১ সালে ইংল্যান্ডের চেল্টেনহ্যামে। বাবার নাম লিন্ডসে ক্লার্ক, একজন ইংরেজ ভাস্কর। মা রোমের যুদ্ধ ও শান্তির দেবী ভিক্টোরিয়া। ও বাবার সংগে জাহাজে চড়ে কোলকাতায় আসে। ওর হাইট ১৬ ফুট, ওজন সাড়ে তিন টন। ঘাবড়াবেন না, সত্যি বলছি ওর সারা শরীর ব্রোঞ্জের, ডান হাতে বিউগল, বাঁ হাতে পুষ্পহার। ওর রয়েছে উড়ে যাবার জন্যে একজোড়া ডানা। ও যে পরী। ইচ্ছেমত রাত্তিরে উড়ে বেড়ায় ও গোটা কোলকাতাকে রক্ষা করে, বলা ভাল দেখাশোনা করে। হাওয়ার গতি যদি ঘন্টায় ১৫ কিলোমিটারের বেশি হয়, অমনি ও নড়ে ওঠে। হাওয়ার দিকবদল দেখিয়ে দেয়।

---ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের পরী?

----ঠিক ধরেছেন।

--বলছেন সে ডানায় ভর দিয়ে উড়ে মাঝরাতে খোসগল্প করতে আসে?

আমি মাথা নাড়ি।

--অ্যাই, এই পাগলাচোদাকে পাশের ঘরটায় নিয়ে গিয়ে ভাল করে বানা, কম্বলে মুড়ে। আমার সঙ্গে রাতদুপুরে দিল্লাগি!

ভয়ে আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যায়। কী করব? কিছুই মাথায় আসছে না। দুই যমদূত আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।

--স্যার ! স্যার! ভুল করছেন। ভুল করছেন। আরেকটু শুনে যান। স্যার, আমি বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ, পৈতে আছে। আজ যদি আপনার যমদূতগুলো আমার গায়ে হাত তোলে তাহলে কাল রাত্তির নাগাদ মুখ দিয়ে রক্ত উঠবে। একবার গায়ে হাত দেয়া হয়ে গেছে তো, কোটা শেষ। আর আপনিও রেহাই পাবেন না। কাস্টডিয়াল ডেথ! অনেক ধারা লাগবে, এমনকি সাসপেন্ড হতে পারেন।

আপনার বাবা মায়ের বয়েস নিশ্চয়ই আমার কাছাকাছি হবে, স্যার।

সেপাইদের কড়া হাত নরম হয়। ওদের চোখে ভয়। ওরা ইতস্ততঃ করে।

অফিসার বিরক্ত। কী হোল?

একজন মাঝবয়েসি সেপাই বলে—স্যার, আমি নমশূদ্র, পদবি বিশ্বাস। বাবা শিবভক্ত, চাঁদসী ডাক্তার। আমি বারেন্দ্র ব্রাহ্মণের গায়ে হাত তুলতে পারব না। ঘরে বৌ-বাচ্চা আছে, যদি কিছু হয়ে যায়। আপনিও একটু ভাবুন স্যার।

অফিসারের কপালে অনেকগুলো ভাঁজ, কিন্তু মুখের ভাব তেমনই কড়া। সম্বোধন আপনি থেকে তুমি হয়ে গেছে।

--এদিকে এস। আরেকটা চান্স দিচ্ছি। গাঁজাখুরি গপ্পো না ফেঁদে সত্যি কথা বল। পরীর সাথে কথা হয়? কী কথা? পরী তোমার কাছে কী শুনতে চায়?

--কবিতা স্যার।

--ক-বি-তা?

--হ্যাঁ স্যার। আমি ওকে কবিতা শোনাই। সপ্তাহে এক দিন।

--ঢপ দিচ্ছ? টের পেলে তোমার চামড়া গুটিয়ে নেব।

--না স্যার।

--তুমি কবিতা লেখ?

-না স্যার। অন্য কবিদের কবিতা শোনাই। বাংলা কবিতা। আর ও কখনও সখনও মুডে থাকলে আমাকে ইংরেজি কবিতা শোনায়।

--আচ্ছা! একটা শোনাও দেখি? কীরকম কবিতা শুনিয়ে পরী নামিয়ে আন তার নমুনা? ধর প্রথম দিন কী কবিতা শুনিয়েছিলে?

--কাউকে এক গেলাস জল দিতে বলবেন স্যার? গলা শুকিয়ে গেছে।



জল খেয়ে আমি ধীরে ধীরে বলতে শুরু করি।

“অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ-পৃথিবীতে আজ,

যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দ্যাখে তারা;

যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই – প্রীতি নেই – করুণার আলোড়ন নেই

পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া।

যাদের গভীর আস্থা আছে আজো মানুষের প্রতি

এখনো যাদের কাছে স্বাভাবিক ব’লে মনে হয়

মহত্‍‌ সত্য বা রীতি, কিংবা শিল্প অথবা সাধনা

শকুন ও শেয়ালের খাদ্য আজ তাদের হৃদয়”।



শেষ করে আরও একঢোঁক জল খাই। তারপর পড়া মুখস্থ বলা সুবোধ ছাত্রের মত অফিসারের দিকে তাকাই। চোখে একটু আশা-- নীল ডাউন করবে নাকি বেঞ্চিতে বসতে বলবে?

--এ কবিতাটা কে লিখেছে? তুমি?

--না স্যার, ওটা জীবনানন্দ দাশ বলে একজনের লেখা।

--কিন্তু “যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দেখে তারা” লাইনটার মানে কী? অন্ধ হলে আবার চোখে দেখে কী করে? এর মধ্যে কোন পলিটিক্যাল ইয়ার্কি নেই তো?

--আমি কী করে বলব স্যার! লাইনটা কবি লিখেছিলেন গত শতাব্দীতে, কোলকাতায় বসে। উনি কী ভেবে লিখেছিলেন তা উনিই জানেন। কী জানেন স্যার, ভাল কবিতা, মানে যেটা সময় পেরিয়েও টিকে যায় তার অর্থ একেক জন পাঠকের কাছে একেক রকম। কবিতা হোল বীজ, পাঠকের মনের মাটিতে তার অংকুর বেরোয়, পাতা বেরোয়।

--ব্যস ব্যস্‌ তুমি কি বাংলার টিচার? মাথা ধরিয়ে দিলে। কবির নামটা কী যেন? জীবন দাশ?

--না স্যার, জীবনানন্দ দাশ।

--দাশ মানে নমশূদ্র?

--না স্যার, উনি বরিশালের বদ্যি—আসলে দাশগুপ্ত। বদ্যিদের নিয়েও অন্যরা কবিতা লেখে, শুনবেন?

আমি মরিয়া; আড়ংধোলাই খাবার ভয়ে মাথা কাজ করছে না। যা মুখে আসছে বলে যাচ্ছি—উদ্দেশ্য এদের ভোঁতা করে দেয়া, ক্লান্ত করে দেয়া। আমাকে থামলে চলবে না। খেলাটা শেষ অব্দি খেলতে হবে। তাই ওনার অনুমতির অপেক্ষা না করে শুরু করিঃ

“কহ ভাই কহরে, অ্যাঁকাচোরা শহরে,

বদ্যিরা কেন কেউ আলুভাতে খায় না?

লেখা আছে কাগজে, আলু খেলে মগজে

ঘিলু যায় ভসকিয়ে বুদ্ধি গজায় না”।

আমার রণকৌশল সফল! সেপাই থেকে সাহেব—সবার মুখে হাসি ফুটেছে, নানারকম মাপের হাসি।

কিন্তু অফিসার আমায় ছাড়েন না।

--এটা কোন কবিতা? যা খুশি কিছু একটা বলে দিলেই হল?

-না স্যার, যা খুশি নয়। এটা ছড়া, আবোল তাবোলে আছে।

--সুকুমার রায়ের ‘আবোল তাবোল’?

--হ্যাঁ স্যার।

--বুড়ো বাঞ্চৎ, এবার ক্যালানি খাবে। আবোলতাবোল আমি পড়েছি, বাড়িতে আছে। এরকম কোন ছড়া ওতে নেই।

--আছে স্যার, সত্যি বলছি।

---আমি মোবাইলে পিডিএফ ডাউনলোড করছি। এই দেখ আবোলতাবোলের সূচীপত্র। কোথায় তোমার ছড়া?

--সূচীপত্র না, সূচীপত্র না। আপনি পাতাগুলো উলটে দেখুন। এরকম কয়েকটা ছড়া মার্জিনের উপরের খালি জায়গায় ছোট হরফে আছে। একটু দেখুন স্যার।

অফিসার মোবাইলটা রাইটারের হাতে দিয়ে চেক করতে বললেন।

--কিন্তু আগে বল তুমি কী মানে ভেবে ওই কবিতাটা তোমার পরীকে শোনাচ্ছিলে। অন্ধ কে? সে আবার অন্যদের থেকে চোখে বেশি দেখে?

--বদ্যি কবি কী ভেবেছিলেন তা বলতে পারব না। তবে কী জানেন স্যার, নানারকম দেখা আছে। একজন নামকরা গায়ক ছিলেন না কে সি দে? মান্না দে’র কাকা? কায়স্থ সন্তান। উনি অন্ধ গায়ক, লোকে বলত কানাকেষ্ট। আমার ঠাকুমা তাঁর ফ্যান ছিলেন, তাঁর ভজন কীর্তন সব গাইতেন। এটা শুনুন, “ও তাঁরে দেখবি যদি নয়ন ভরে এ দুটো চোখ কর রে কানা”!

দেখছেন তো, দেখতে পাওয়াও নানারকম। সবটা চোখ দিয়ে হয় না। বাইরের দেখা, ভেতরের দেখা—আলাদা আলাদা। রবীন্দ্রনাথের একটা নাটকে শাপগ্রস্ত যক্ষ কুরূপ হোল। রাণী তাকে বাইরের থেকে দেখল—কুরূপ, বেতালা। যেদিন ভেতরের চোখ ফুটল সেদিন দেখল ও কত সুন্দর।

অফিসার হাত তুলে আমাকে চুপ করতে বললেন। কারণ, রাইটার বাবু ওনার কানে ফিসফিস করছে। উনি মাথা নাড়লেন। বললেন—ওকে, ছড়াটা বইয়ে আছে। আপনি বাড়ি যান। আচ্ছা, কীভাবে যাবেন?

--কেন স্যার, হেঁটে। এইটুকু তো পথ। আমি হেঁটেই মেরে দেব।

--এই ঠান্ডায় মাঝরাতে হেঁটে? দাঁড়ান, একটা পি সি আর ভ্যান যাচ্ছে, কড়েয়া থানার দিকে। আপনাকে থানার সামনে নামিয়ে দিলে চলবে?

পুত্রসম ওসি’র বিচার বিবেচনায় আমি গলে জল।

শুনতে পেলাম উনি একজন পুলিশকে বলছেন আমাকে আগে কড়েয়া থানায় নিয়ে গিয়ে ওখানকার অফিসারকে চেহারাটা দেখিয়ে দিতে এবং এই উনি যেন ওনার এলাকায় এই পাগলাটে বুড়োর চলাফেরার প্রতি একটু নজর রাখেন।