Next
Previous
Showing posts with label গল্প. Show all posts
0

গল্প - মনোজ কর

Posted in


 







আঠারো পর্ব

ছোটকালী বেরিয়ে যাবার এক ঘন্টার মধ্যে মনীষার ফোন এল পানু রায়ের কাছে।

-মিঃ রায়, মনীষা বলছি।

-বলো। কী হয়েছে?

-আমি আপনাকে বিরক্ত করতে চাইনা। কিন্তু একটা বেশ বড় গন্ডগোল দেখে মনে হলো আপনাকে এক্ষুণি জানানো দরকার।

- কী গন্ডগোল?

- কয়েকটা বিল পেমেন্টের জন্য চেক কাটা হয়েছে কিন্তু চেকগুলো কাটা হয়েছে যে সব কোম্পানির নামে সেই কোম্পানিগুলো কেউ কোনও কাজ করেনি। আমি একটা বিলের কথা বললে হয়ত আপনার বুঝতে সুবিধে হবে। যেমন ধরুন বেশ কয়েকটা বিল এবং রসিদ দেখলাম তেওয়ারি ইলেকট্রিকের। সব মিলিয়ে প্রায় পাঁচ লক্ষ হবে। খাতায় চেক নম্বর, অ্যামাউন্ট,কাজের বিবরণ ইত্যাদি সব ঠিক লেখা আছে কিন্তু কোম্পানির নাম লেখা নেই।

-একটা কাজ করো। তুমি অ্যাকমে ইলেকট্রিককে ফোন করে বলো যে বিলগুলো একটু পাল্টাতে হবে এবং অর্ডারের কপিটা নিয়ে দেখা করতে।

- করেছি। কিন্তু কেউ ফোন ধরলো না।

-ওদের বিলে ঠিকানা লেখা নেই?

-আছে। কিন্তু খোঁজ নিয়ে জেনেছি ওখানে ঐ নামে কোনও অফিস নেই।

-বিলগুলো কি ছাপানো বিল?

-হ্যাঁ। বিলগুলো তো ঠিকই লাগছে। রাবার স্ট্যাম্প মেরে চেক-এর প্রাপ্তি স্বীকার করা আছে। তার চেয়েও বড় কথা খোঁজ নিয়ে দেখেছি এরকম কোনও কাজই হয়নি। এখন ব্যাঙ্ক বন্ধ। কাল সকালে ব্যাঙ্কে গিয়ে দেখবো আর কিছু জানা যায় কি না।

-ঠিক আছে। দেখ আর কিছু জানা যায় কি না। আরও কিছু ডিটেল না পেলে আগে কিছু করা যাবে না। তোমার কী মনে হয়? কী হতে পারে?

-আমার মনে হয় কেউ খবর পেয়েছিল যে নতুন সেক্রেটারি কাজে জয়েন করেছে। কিছু কাজ না করে একটা ভুয়ো বিল ছাপিয়ে এলিনাকে পাঠিয়ে দেখতে চেয়েছিল সে কী করে। প্রথম বিলটা ছিল ছোট অঙ্কের, কুড়িহাজার টাকার কাছাকাছি।

- বিলটা পেয়ে এলিনা কী করেছিল?

- কোনওরকম চেক না করে পেমেন্ট পাঠিয়ে দিয়েছিল।

- চেক পোস্টে পাঠিয়েছিল?

- হ্যাঁ, বিয়ারার চেক কেটে পোস্টে পাঠিয়ে দিয়েছিল।

-আচ্ছা, তারপর কী হলো?

-তারপর একমাস সব চুপচাপ। একমাস পরে আবার একটা ভুয়ো বিল এলো। এবার অঙ্কটা পঞ্চাশ হাজারের কাছাকাছি। একই ভাবে পেমেন্ট পাঠানো হলো। পরের বিলটা এলো তিনটে কাজের জন্য। আলাদা আলাদা তিনটে বিল। সব মিলিয়ে প্রায় দু লক্ষ টাকার কাছাকাছি।

-আর কিছু?

-অ্যাকমে ইলেকট্রিকের আর কোনও বিল আসেনি। তবে আমার সন্দেহ যে যদি অন্য কেউ এলিনার এইভাবে পেমেন্ট দেওয়ার কথা জানতে পারে তাহলে ব্যাপারটা এখানেই শেষ হয়নি।

-চেকগুলো কে সই করেছিল?

-কৃষ্ণকালী নিজেই। আপনি নিশ্চয়ই জানেন ওনার চেক সই করার পদ্ধতি। ওনার সেক্রেটারি সমস্ত চেক লিখে রেডি করে রাখে। উনি মাসের আট তারিখে সব চেক সই করে দেন যাতে ক্যাশ ডিসকাউন্ট পাওয়া যায়। সাধারণত সব বিলেই লেখা থাকে দশ তারিখের মধ্যে পেমেন্ট করলে দুই শতাংশ ডিসকাউন্ট দেওয়া হয়। কিন্তু এলিনা কোনও চেকেই ডিসকাউন্টের টাকা কাটেনি। পুরো বিলের অ্যামাউন্টই পেমেন্ট করেছে।

-আমাকে খবর দিয়ে ভালোই করলে। ব্যাপারটা খতিয়ে দেখে জানাব। আমাকে ঠিকানাটা বলো।

- ১৬, রাজেন্দ্রনগর।

-ঠিক আছে। আর সব কী খবর? কেমন আছো তুমি?

- খুবই অগোছালো সব কিছু। দেখি কতটা গোছাতে পারি।

-বেশি চাপ নিও না এখন। কালকে আসবে?

-হ্যাঁ, কাল আসবো।

-তাহলে আমি কাল আসবো একবার। নিজের চোখে কাগজপত্রগুলো দেখে আসবো।

- তাহলে তো খুবই ভালো হয়।

-ঠিক আছে রাখলাম এখন।

ফোন রেখে পানু রায় সুন্দরীর দিকে তাকিয়ে ভুরু কুঁচকে বললেন,’ কিছু তো একটা ঘটছে। জগাই কে বলো রাজেন্দ্রনগরের ঐ ঠিকানায় অ্যাকমে ইলেক্ট্রিকের ব্যাপারে একটু খোঁজখবর করতে। খুব অদ্ভুত ব্যাপার। কেউ না কেউ তো লাভবান হচ্ছে নিশ্চয়ই।‘ সুন্দরী বললো,’ অন্তত একজন তো হচ্ছেই।‘ সুন্দরীর কথা শেষ না হতেই কাঠমান্ডুর হোটেল থেকে সেই মেয়েটার ফোন যার সঙ্গে বড়কালী দরকার হলে যোগাযোগ করতে বলেছিল।

-আমি কে বলছি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, মিঃ রায়।

-হ্যাঁ, বলুন। কোনও জরুরি দরকার?

- কৃষ্ণকালী একটা জরুরি বিষয়ে এক্ষুণি ওনার ছেলের সঙ্গে কথা বলতে চান।

-বেশ, তাতে আমার কী করার আছে?

-না, ফোনে নয়। উনি ফ্লাইটে রওনা হয়ে গেছেন। উনি বলেছেন যে উনি যথেষ্ট সাবধানতা অবলম্বন করেছেন যাতে কেউ না জানতে পারে উনি কোথায় যাচ্ছেন এবং কখন যাচ্ছেন। উনি আমাকে বলেছিলেন উনি ঠিক তিনটের সময়, ছ’টার সময়, আটটার সময় এবং দশটার সময় আমাকে ফোন করবেন। যদি কোনও কারণে কোনও একটা ফোন না আসে শুধুমাত্র তাহলেই আপনাকে জানাতে।

-আপনি ফোন করেছেন কারণ তিনটের ফোন আসেনি?

-একদম ঠিক। সেজন্য ওনার নির্দেশমতো আপনাকে জানালাম।

-ধন্যবাদ। তার মানে ওনাকে অ্যারেস্ট করা হয়েছে। কেস লেখা না হলে আমাদের কিছু করার নেই। আমরা অবশ্যই খবর রাখবো।‘

পানু রায় ফোন রাখার সঙ্গে সঙ্গেই সুন্দরী সান্ধ্য দৈনিকের দু এর পাতাটা পানু রায়ের সামনে ধরে বললো,’ শিবুলালের অ্যাপার্টমেন্ট থেকে পুলিশ রক্তমাখা পায়ের ছাপ পেয়েছে। ছবিটাও ছেপেছে কাগজে।‘ পানু রায় কাগজটা সুন্দরীর হাত থেকে প্রায় ছিনিয়ে নিয়ে গভীরভাবে ছবিটা নিরীক্ষণ করে বললেন,’ এটা একটা লোকের পায়ের জুতোর ছাপ। জুতোটা নতুন। গোড়ালির লেখাটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে- ‘রাদু’। পানু রায় অস্থিরভাবে পায়চারি করতে করতে কী যেন ভাবতে লাগলেন। তারপর পায়চারি থামিয়ে সুন্দরীকে বললেন,’ আমার মনে হয়না আমি যদি কোনও সাক্ষীর সঙ্গে কেসটা অপব্যখ্যা সমেত কোর্টে ওঠার এবং জট পাকিয়ে যাওয়ার আগে কাজে নেমে পড়ি এবং কোনওরকম সাক্ষ্যপ্রমাণলোপের চেষ্টা না করি তাহলে অন্যায় করা হবে না। ওরা থানায় নিয়ে গিয়ে সাক্ষীকে গুলিয়ে দেবার আগেই আমাকে একটা কিছু করতে হবে।আরও একটা ব্যাপার তুমি লক্ষ্য করেছো কি না জানিনা। সাধারণত পুলিশ মূল অভিযুক্তকে চিহ্নিত করতে পারলেও খুনী অস্ত্রের সন্ধান সহজে পায়না। কিন্তু এক্ষেত্রে তার উল্টো। পুলিশ অস্ত্রের সন্ধান পেয়েছে কিন্তু কে খুন করেছে বুঝতে পারছেনা।

-দাদু, তাহলে তুমি পুলিশের থেকে এ ব্যাপারে একটু এগিয়ে রয়েছো। তুমি জানো যে তুমি বন্দুক বদল কর নি। আর তুমি এও জানো যে খুনী বন্দুকটা ছোটকালীর ড্রয়ারেই ছিল।

-সুন্দরী, আসল সমস্যাটা হচ্ছে আমি এখনও জানিনা যে বন্দুকটা ওখানে কে রেখেছিল? জানতেও পারবনা যতক্ষণ না আমি বড়কালীর সঙ্গে কথা বলতে পারছি।

-আর যদি বড়কালী না রেখে থাকে?

-তাহলে যে খুন করেছে সে রেখেছিল। আমাদের এখন অনেক কাজ। পুলিশ রেবা কৈরালাকে ধরে রেখেছে। এখন ওরা বড়কালীকে অ্যারেস্ট করবে। পুলিশকে পাত্তা না দিয়ে বড়কালী ঠিক করেনি। জগাইকে বলতে হবে বড়কালীর অফিসের ঐ নকল বিলগুলো কোথা থেকে ছাপা হয়েছিল খুঁজে বের করতে। দরকার হলে এই এলাকার সবকটা প্রেসে গিয়ে খবর নিতে হবে। তোমার মাথার যন্ত্রণা এখন কেমন?

-অনেক ভালো।

পানু রায় এবং সুন্দরী পাশেই একটা রেস্টুরেন্টে ঢুকে দুটো মোজিটো অর্ডার দিয়ে বসলো। পানু রায় বললেন,’ সুন্দরী, কী খাবে বলো? অনেকদিন গুছিয়ে খাওয়া হয়নি। চাপে না থাকলে আমার ক্ষিদে পায়না।‘

-আমার ক্ষিদে সে রকম নেই। কিন্তু জায়গাটা বেশ আরামদায়ক। কাজের ঝুটঝামেলা থেকে একটু ছুটি মন্দ নয়।

-আমার জন্য চিকেন রোস্ট আর স্ম্যাসড পোটাটো অর্ডার করো। তুমি দেখ কী খাবে। ততক্ষণে আমি জগাই কে ফোন করে বলি যে আমরা এখানে আছি। ও আসতে পারলে ভালোই হবে।

পানু রায় জগাইকে ফোন করে বললেন,’ তুমি কোথায়? শোন আমরা অফিসের পাশে যে রেস্টুরেন্টে আমরা মাঝে মাঝে বসি ওখানে আছি। সুন্দরীও আছে।তুমিও চলে এসো।‘ জগাই উত্তরে বললো,’ আমিও তোমাদের খুঁজে বেড়াচ্ছি। অফিসে তোমাদের দেখতে না পেয়ে ফোন করতে যাচ্ছিলাম। সময় নষ্ট করার মতো সময় নেই। ‘

-কী হয়েছে জগাই?

-কেলো দারোগা হন্যে হয়ে তোমাদের খুঁজছে। একটু আগে পুলিশের লোক তোমার খোঁজে অফিসে গিয়েছিল।

-কেন?

-বড়কালীকে পুলিশ ধরে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে। বড়কালী কোনও প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে না। বলেছে তুমি না আসা পর্যন্ত একটা কথাও উচ্চারণ করবে না। আমি খবর পেলাম কেলো দারোগা বড়কালীকে বলেছে ঠিকঠাক উত্তর না দিলে ওর গ্রেপ্তার হওয়ার খবর কাগজওয়ালাদের জানিয়ে দেবে।

-বড়কালী এখন কোথায়? তুমি কোথায়?

-আমি সব শুনে থানায় চলে এসেছি। বড়কালী কেলো দারোগার সামনে বসে আছে।

-ভেতরে গিয়ে বলে দাও আমি আসছি।
0

গল্প - প্রিয়দর্শিনী দেবাদ্রিতা

Posted in







-----প্রাক-কথন-----


বহুদিন আগেকার কথা।ঠিক এক শতাব্দী পূর্বে মোগল বাদশাহ আলমগীর গত হওয়ার পর থেকেই ভারতবর্ষের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলাতে শুরু করেছে।উত্তরে শিখরাজ্য। পূর্বে সুবিশাল বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি সম্পূর্ণ বাংলা বিহার আর উড়িষ্যার কিছুটা গ্রাস করে নেমে গেছে দক্ষিণে- সেই সিংহল অবধি। সেখানে রাজত্ব করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। সমস্ত মধ্যভারতখানাই মারাঠা শক্তির অধীন। সিন্ধিয়া, ভোঁসলে, হোলকার ও পেশোয়া; এই চতুস্তম্ভের ওপর নির্মিত শক্তিশালী মারাঠা কনফিডেরসি।সুপ্রাচীন কালের স্বাধীন রাজাদের মধ্যে রয়েছেন কেবল লখনৌ ও মহিশুরের নবাব, হায়দরাবাদের নিজাম আর রাজপুতানার গুটিকয়েক রাজ্য।

ঠিক এই সময়ে, যখন মোগল সূর্য অস্তমিতপ্রায় আর বাতাসে ভেসে আসছে যুগান্তরের পদধ্বনি,তখন এই ভারতবর্ষেরই একটি কোণে, মহাকালের কলমে একটি অদ্ভুত নাটক রচিত হয়েছিল ।বহু বড়ো বড়ো মহীরুহ মুখ থুবড়ে আছড়ে পড়েছিল ভূমিতে, প্রলয়ংকর উন্মাদনায় অন্ধ হয়ে গিয়েছিলো বহুদর্শী বহু নয়ন।

তারপর অকস্মাৎ, চিরকালীন নিয়মে, আবার সমস্ত শান্ত হয়ে গেলো। অপূর্ব সমস্যার পাওয়া গেল অভূতপূর্ব সমাধান।সেদিনকার রঙ্গমঞ্চের পাত্র-পাত্রীরা সকলেই আজ কালের গর্ভে বিলীন। কেবল ইতিহাস- তার বৃদ্ধ জরাজীর্ণ বুকে সযত্নে রেখে দিয়েছে কাহিনীর নির্যাসটুকু।।


-----১-----


“নীল সুকোমল,শরীর অমল,কমলে গঠিত অঙ্গ –

ভারের কারণ হীন আভরণ,সহজে মোহে অনঙ্গ

কমল বদন,কমল নয়ন,কমল-গঞ্জিত গণ্ড

দ্বিকর কমল,কমলাঙ্খিতল,ভুজ কমলের দণ্ড”


রাজকুমারীর প্রিয়তমা বয়স্যা সত্যভামা গান গাইছে।বঙ্গাল মুলুকের গান।সত্যভামার মা নিজেও বঙ্গাল দেশের মেয়ে।মার কাছ থেকে মেয়ে শিখেছে।কুমারী এ গানখানি শুনতে বড় ভালবাসেন।মনে হয়- যেন তাঁরই কথা ভেবে– অতীত কালের এক কবি লিখে রেখে গেছেন এ গান। একে তো কাব্যের নায়িকা আর কুমারী সমনাম্নী,তারপর কিশোরী রাজবালাকে দেখলে,তার রূপ বর্ণনা করতে গেলে- অন্য কোনও কথা মনে আসে না- কমলনয়না,কমলাননা কুমারী, সাক্ষাৎ কমলালয়ার মতনই রাজপুরী আলো করে আছেন।


সাল- ১৮০৭ খৃষ্টাব্দ।স্থান- উদয়পুর রাজপ্রাসাদ।মেবারের সিংহাসনে আসীন মহারাণা ভীমসিংহ।।তাঁরই কন্যা দশম বর্ষীয়া কৃষ্ণা।বাপের আদরের দুলালী, মায়ের নয়নমণি।মরুভূমির বালুকা সরোবরে প্রস্ফুটিত সহস্রদল কমল।

রাজ্যে আজ আনন্দের ধুম।সমস্ত রাজপথ সাজানো হয়েছে ফুলের মালায়।সরকারী খরচে দরজায় দরজায় বসেছে মঙ্গলঘট।মহারাণী অর্ষাজাবাদে স্বয়ং যাচ্ছেন কারুণী দেবীর মন্দিরে পুজো দিতে।মাত্র এক বছর আগে যে কালো ছায়া নেমে এসেছিল রাজদুহিতার জীবনে – যার থেকে উত্তরণের কোন আশাই ছিল না আর ,কেবল দেবীর আশীর্বাদেই তা সম্পূর্ণ রূপে দূরীভূত হয়েছে! মেবার আর সে মেবার নেই সত্য,তবে এতবড় আনন্দের দিনে উৎসব হবে না– এতটা অধঃপতন আজও ঘটেনি।

ব্যাপার কিন্তু সেরকম সাংঘাতিক কিছু নয়! কুমারী কৃষ্ণার বিয়ে ঠিক হয়েছে। রাজপরিবারে শত শত মেয়ে- প্রতি বছরই কারো না কারো সম্বন্ধ আসে। তাতে কোন নূতনত্ব নেই। প্রাত্যহিক জীবনের অন্য পাঁচটা বিষয়ের মতোই সহজ স্বাভাবিক ভাবে দেখা হয় সেসব ঘটনা!

তবে আজ যে কেন এরকম বিশেষ উৎসব হচ্ছে রাজ্যজুড়ে, সে কারণ অনুসন্ধান করতে গেলে আমাদের কিছুটা পিছিয়ে যেতে হবে। বুঝে নিতে হবে বর্তমানের সামগ্রিক অবস্থাটাও।

বস্তুতঃ সমস্ত রাজপুতানার মধ্যে মেবারের অবস্থাই এ সময় সবচেয়ে সঙ্গীন।মরুপ্রদেশের অন্যান্য রাজ্যগুলি– যথাক্রমে মারবার,অম্বর প্রভৃতি এতদিনে মোগল বাদশাহের বশম্বদ বা সম্রাট-পরিবারের সাথে বৈবাহিক সূত্রে আবদ্ধ,ফলে ভারতেশ্বরের কুটুম্বিতার সুবিধাও তারা পেয়েছে।কিন্তু মেবার তো তা পারে না।মহারানা বলেন-মেবারের সিংহাসনের অধিষ্ঠাতাদের মধ্যে এখনো শিশোদিয়া রক্ত প্রবহমান– সূর্যপুত্র শিলাদিত্য– বাপ্পাদিত্য থেকে শুরু করে সমর-সিংহ,লক্ষণ সিংহ,অরি সিংহ,হাম্বীর,চন্ডের মত বীরপুরুষ যে সিংহাসনের স্বার্থে জীবনব্যয় করেছেন;রাণা কুম্ভ,রাণা প্রতাপ,রাজ সিংহ,সংগ্রাম সিংহ যাদের পূর্বজ – বিধর্মীর হাতে তারা কি ভাবে কন্যা সম্প্রদান করবে?দেহে প্রাণ থাকতে কেমন ভাবে স্বীকার করবে অন্যের বশ্যতা ?

মেবারের অবস্থা তাই টালমাটাল।কোষাগার শূন্যপ্রায়।বেতন না পেয়ে মারাঠা সৈন্যেরা লুট করেছে চিতোর।জলাভাবে কৃষিকাজও ব্যাহত বেশ কয়বছর।দাদা দ্বিতীয় হাম্বীর সিংহ মাত্র ১৬ বছর বয়সে মারা গেলেন হাতে রাইফেল ফেটে গিয়ে।দশ বছরের ভীমের কাঁধে রাতারাতি উঠল মেবার শাসনের গুরুভার।তারপর বেশ কয়েকবছর পর,প্রায় বালকবয়স থেকে দায়িত্বের ভারে পিষ্ট হতে হতে রানা যখন অন্তরে-বাহিরে শুকিয়ে গেছিলেন, তখনি একঝলক টাটকা বাতাসের মতন জ্যেষ্ঠা রাজকুমারী কৃষ্ণার জন্ম।টালমাটাল রাজ্যে বহু দিন পর বেজে উঠল শঙ্খ।প্রথম সন্তান! কন্যা যদিও, পরগোত্র হয় যাবে, তবু সন্তান! ভীম সিংহ মেয়ের কোনো অভাব রাখলেন না। কুমারীকে রাজপরিবারের উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে নিযুক্ত হলো শিক্ষক।তিনি অসামান্যা সুন্দরী, দিনে দিনে বিকাশ ঘটতে লাগলো গুণের, কুমারী পারদর্শিনী হয়ে উঠতে লাগলেন নানা বিদ্যাতেও।কন্যার পঞ্চম বর্ষে মহারাণা তাঁর বিবাহ স্থির করলেন মারবার নৃপতির সঙ্গে।প্রসঙ্গত, এঁর নামও ভীম সিংহ।কন্যার উচিত ঘর-বর মিলেছে,কুলগুরু আশীর্বাদ করে বললেন- ‘রাজ-যোটক’।মাতাপিতার মনে সুখের অন্ত নেই।তারপর হঠাৎ বিনামেঘে বজ্রপাত!তিন বৎসর পরে এক সন্ধ্যায় সংবাদ এল– ইহলোক ত্যাগ করেছেন মারবাররাজ।লুনী নদীর তীরে ভস্মীভূত হয়ে গেছে তাঁর নশ্বর দেহ।সহমরণে গেছেন তাঁর স্ত্রীরা ।।

খবর যখন এল– নবম বর্ষীয়া কৃষ্ণা তখন সঙ্গিনীদের সাথে পুতুলের সংসার পেতেছে।‘পুতুলের সংসারই বটে!’মহারাণা কন্যার মুখের দিকে চাইতে পারেন না।নিঃশ্বাস ফেলে ভাবেন– ‘সত্য সংসারে আর প্রবেশাধিকার রইল না কুমারীর।‘ বাগদত্তা কন্যার পতিনাশ– লগ্নভ্রষ্টা হওয়ার সামিল।বৈধব্য যাতনার থেকে কোন অংশে কম নয় এই দাহ।সর্বোপরি– এই সর্বনাশের ফলে তাঁর তনয়া তথা মেবারের রাজদুহিতা অশুভ বলে চিণ্হিত হবে বিশ্বের দরবারে।মেবারের অদৃষ্টে এত বড় অসম্মান, শিশোদিয়া বংশের এতবড় অপমান আর কি কখনও ক্ষয় হবে?

ক্ষয় হল।।এত বড় দুষ্টগ্রহেরও ক্ষয় হল।এ যে কোন ঐশী শক্তির মহিমা,কুমারী কৃষ্ণা যে দেবীর আশীর্বাদধন্যা– এ ব্যাপারে আর সন্দেহ রইল না কারোর।নইলে কে কবে শুনেছে– এমন ঘটনার পরও যোগ্য পাত্র স্বয়ং কন্যার পাণি প্রার্থনা করে?এ ক্ষেত্রে তাই ঘটেছে,গত রাত্রে মহারাণার কাছে কৃষ্ণাকে বিবাহ করার অনুমতি চেয়ে পাঠিয়েছেন অম্বর-অধিপতি,তরুণ রাজা জগৎ সিংহ।

ভোর না হতেই তাই রাজ্যে জেগেছে উৎসবের হিল্লোল।মহারাজ নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সকাল থেকে করছেন সারাদিনব্যাপী দরিদ্র-নারায়ণ সেবা।মহারাণী চলেছেন মন্দিরে, অর্ঘ্য-থালা হাতে,আর সন্ধ্যার অবসরে,প্রদীপ জ্বালিয়ে রাজকুমারী বসেছেন বেণী-বয়ন করতে।ললাটে স্বেদবিন্দু,কপোলে রক্তিমাভা, পরনে রক্ত-চিনাংশুক– প্রদীপের আলোয় মনে হচ্ছে দর্পণের ভিতর থেকে যেন স্বয়ং দ্বাপরযুগের কৃষ্ণা,স্বয়ম্বরের পূর্ব্-রাত্রের সমস্ত লজ্জা অঙ্গে মেখে চেয়ে রয়েছেন অপলকে।কানের কাছে সত্যভামা চুপি চুপি গান করছে–

“ক্ষেত্রি কুলে আছে এ যতেক সভাজন

যে বিন্ধিব মোর ভগ্নী করিব বরণ

ভূপতি হউক নহু নাহিক বিচার

লভিবেক কৃষ্ণা লক্ষ্য বিন্ধে শক্তি যার-“


------------------- ২ -------------------

আকাশে চাঁদ উঠেছে।প্রাসাদের এই কক্ষ থেকে নীচের বাগিচা দেখা যায় না যদিও,তবু গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।গ্রীষ্মের ফুলের গন্ধ।যুবরাজের আজিকার শয্যাসঙ্গিনী শয্যাপার্শ্বে নিদ্রিতা- ষোড়শী,সুন্দরী,তন্বী।।

যুবরাজ নয়,মহারাজ!আপনমনেই হেসে ফেলেন বিংশতি-বর্ষীয় জগৎ সিংহ।পিতা,মহারাজা সোয়াই প্রতাপ সিংহ স্বর্গারোহণ করবার পর প্রায় ৩ বৎসর হতে চলল তিনি সিংহাসনে বসেছেন।তবু মাঝেমধ্যে ভুল হয়ে যায়।

শয্যা ত্যাগ করে তরুণ রাজা কক্ষ-সংলগ্ন বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালেন।জ্যোৎস্নায় চরাচর ভেসে যাচ্ছে।মৃদুগলায় গুনগুনিয়ে ওঠেন-"তুম ভায়ে চান্দা/মায় ভয়ে চকোরী যো/ তুম টোডো পিয়া..." জগৎ সিংহ স্বভাবতই ভাবপ্রবণ– সঙ্গীত –শিল্পকলা প্রভৃতির অনুরাগী।এ জিনিস তাঁর রক্তে আছে।প্রতাপ সিংহ স্বয়ং কবি ছিলেন; ব্রজনিধি ছদ্মনামে তিনি বহু কবিতা রচনা করেছেন একসময়।

আজ শুক্ল পক্ষের ত্রয়োদশী।সমস্ত চরাচর ভেসে যাচ্ছে জ্যোৎস্নায়। রাত্রির মৃদুমন্দ বাতাসে জুড়িয়ে যাচ্ছে দেহ। সুস্পষ্ট,ঈষৎ হলুদ চন্দ্রের দিকে চেয়ে কেমন যেন বিমনা হয়ে যান কুমার।শুক্লপক্ষেই তিনি ‘কৃষ্ণা’ কে আহ্বান জানিয়েছেন– বিবাহ প্রস্তাব পাঠিয়েছেন মেবার কুমারী কৃষ্ণাকে।।

লোকে বলে তার দু চোখ নাকি হরিণের মতো।তার মুখে নাকি আধফোটা পদ্মের সৌন্দর্‍্য।কিন্তু সৌন্দর্‍্যের অভাব তো নেই অম্বর রাজপুরীতে- এই বিশ বৎসরের জীবনেই কত কত নারী এসেছে তাঁর শয্যায়– লাস্যময়ী,সুন্দরী,যৌবনবতী নারীরা।এই দুহাতে কত, কত না শরীর ঘেঁটে ফিরেছেন কুমার, চুম্বন করেছেন কত সুন্দর,স্ফুরিত ওষ্ঠাধর।তবু যা খুঁজেছেন– পাননি।এখনো যে নারী তাঁর শয্যায় নিদ্রিতা– তার কটিদেশ ঈর্ষণীয় রকমের কৃশ,তার দীর্ঘ আয়ত চক্ষু, তিলফুল জিনি নাসা। কিন্তু এরা সবাই কেবল ক্ষণিক আনন্দ দিতে পারে– এরা শান্তি দিতে পারে না ।

বড় অশান্তি!বড় হানাহানি চারিদিকে!পিতার দেহাবসানের সঙ্গে সঙ্গেই মারবার আর অম্বরের সখ্য হয়েছে ধূলিসাৎ।তারপর মারাঠাদের লুঠতরাজ তো এখন প্রায় নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যপার হয়ে উঠেছে।তবে দুই বৎসর পূর্বে শীতকালে– ভারত ভূখণ্ডে নবাগত শক্তি যে বণিক সম্প্রদায়– ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, তাদের প্রতিনিধি লর্ড ওয়েলেস্লির সঙ্গে একখানা চুক্তি হয়েছে।সেই চুক্তি অনুযায়ী – মারাঠাদের উপদ্রব থেকে জয়পুরকে রক্ষা করবে কোম্পানি; কিন্তু সম্প্রতি আবার এক বিশ্বস্ত চর খবর পাঠিয়েছে– ওয়েলেস্লি নাকি শীঘ্রই অন্যত্র যাবেন– ইতিমধ্যে জনৈক জর্জ বারলো উপর মহলে বারবার বলে পাঠাচ্ছেন যে- দেশীয় রাজাদের আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করা কোম্পানির পক্ষে উচিত হবে না।

এত অশান্তি!এত রাজনৈতিক কূটচাল!বড় অসহায় লাগে জগতসিংহের!প্রয়োজন হলে জগৎ যুদ্ধের ময়দানে তরবারী হাতে দাঁড়াতে পারেন, রাজসভায় বসে বিচার করতে পারেন আপামর জনসাধারণের– কিন্তু এই রাজনীতির দাবাখেলাটা তাঁর আসে না।এই কয় বছরেই বড় ক্লান্ত,বড় বিদ্ধস্ত হয়ে পড়েছেন তিনি।জীবনটা বড্ডো ভারী লাগছে তাঁর– তাই তিনি আহ্বান জানিয়ে পাঠিয়েছেন সেই দুঃখী মেয়েটিকে– একদা জ্ঞান হবার আগেই যার বুকের উপরেও চেপেছিল পর্বতপ্রমাণ ভার– সমস্ত সমাজ যার ললাটে এঁকে দিয়েছিল কুলক্ষণার তিলক। সমস্ত রাজস্থান বলে– সেই মেয়েটির চোখ নাকি হরিণের মতন!তার মুখে নাকি আধফোটা পদ্মের মাধুর্য্য!

মাধুর্য্য! মায়াবী মাধুর্য্য! তাই কি তবে নারীর কাছে পুরুষের নিত্যকালের যাঞ্চা?হাজার সম্ভোগের অন্তরালে তবে কি চিরকাল ওই বস্তুটিরই কি খোঁজ করে ফেরে তৃষ্ণার্ত প্রেমিক পুরুষ?“কৃষ্ণা”- আনমনে নামটি উচ্চারণ করেন কুমার।“তোমার কাছে পৌঁছালেই কি ঘটবে এই সন্ধানের অন্ত?তোমার কোলে মাথা রাখলে কি আবার, সেই রাজা হওয়ার আগেকার দিনগুলোর মতন, শান্তিতে ঘুমোতে পারব আমি?”




-------------৩ ----------------

“বিশ্বাসঘাতক!” মধ্যরাত্রে ঘুম ভেঙ্গে চিৎকার করে ওঠেন মহারাজা।“বিশ্বাসঘাতক!সবাই বিশ্বাসঘাতকতা করেছে আমার সঙ্গে!”

মহারাজা মান সিংহ।।যোধপুরের বর্তমান মহারাজা। আজই সন্ধ্যায় ঠাকুর সোয়াই সিংহ চিঠি পাঠিয়েছে – সেই ঠাকুর সিংহ; পোখরানের সেই বিদ্রোহী সামন্ত রাজা- যাকে তিনি স্বয়ং এই কয়েকদিন আগে নির্বাসনদণ্ড দিয়েছিলেন,মারবারের সীমান্ত আজও যার কাছে বধ্যভূমি! সেই কৃমিকীট বিশ্বাসঘাতকটাও আজ তাঁকে নিয়ে মস্করা করার স্পর্ধা দেখায়!চিঠির অক্ষরগুলো বিষাক্ত তিরের ফলার মতন এখনও তাঁকে দংশন করে চলেছে।ধিক ধিক ধিক!ধিক বাহুবল!ধিক ক্ষত্রিয় জন্ম!ধিক এই রাজসিংহাসনে!

মান সিংহ সজোরে মুষ্ট্যাঘাত করেন দেওয়ালে।শিশুকাল থেকেই তাঁর মুখের গ্রাস কেড়ে নিয়েছে অন্যরা।এই যে ২১ বছর বয়সে তিনি মহারাজা হয়েছেন,এ রাজপদ তো বহু পূর্বেই তাঁর প্রাপ্য ছিল!প্রাক্তন মহারাজ বিজয় সিংহ– তাঁর নাতিদের মধ্যে মানকেই সিংহাসনের উত্তরাধিকারী ঘোষণা করে গিয়েছিলেন। কিন্তু কি হল?ঠাকুরদা চোখ বুজতেই ঝাঁপিয়ে পড়ল শেয়াল-শকুনের দল।পিতৃব্য-পুত্র ভীম অতর্কিত আক্রমণে,এতটুকু প্রস্তুতির অবকাশ না দিয়ে,অধিকার করে নিল সিংহাসন।হায় রে অদৃষ্ট!গতদিবসে যিনি ছিলেন যুবরাজ;পরদিন তাঁকেই সামান্য সামন্ত-রাজার মতন পালিয়ে আসতে হল জালোরে! সেখানে,প্রকৃতপক্ষে এ কবছর স্বেচ্ছা বন্দী জীবন যাপন করেছেন তিনি|প্রতি মুহূর্তে ভয়– এই বুঝি ভীম-নিযুক্ত গুপ্ত ঘাতক হত্যা করল তাঁকে!বিশ্বাস ঘাতক কৃমিকীটের দল সব!

মাড়বার রাজ্যের স্বাধীনতা নিয়েও নাকি ব্যবসা করেছে ওই পাষণ্ড।ম্লেচ্ছ বণিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে আপোষ করেছে! ছিঃ ছিঃ। রাজা হয়েই মান ও চুক্তি ভেঙে দিয়েছেন।মোগল অবধি তাও মানা যায় – তা বলে বিধর্মী বণিক সম্প্রদায়? ধিক ধিক ধিক!ধিক ক্ষাত্রতেজ!ধিক বাহুবল!


সকলে ষড়যন্ত্র করছে তাঁর বিরুদ্ধে।সব্বাই,সব্বাই চেষ্টা করছে তাঁকে হাস্যাস্পদ করবার| ঠিক লিখেছে ঠাকুর সিংহ– মেবারের রাজদুহিতা, ওই কি যেন নাম– কৃষ্ণা – হ্যাঁ-তার সঙ্গে যখন ভীমের বিবাহ স্থির হয়েছিল,তখন ভীমের অবর্তমানে সে কন্যার উপর তাঁরই প্রথম অধিকার বর্তায়।আর রাণা কি না মেয়ের বিয়ে ঠিক করেছে জয়পুরের ওই অপোগণ্ডের সঙ্গে!ওই ভণ্ড বিশ্বাসঘাতকটা!কদিন আগেই ভীমের ছেলে ঢোলকারকে নকল মহারাজা তৈরী করে যোধপুরের সিংহাসনে বসাতে চেয়েছিল।সমস্ত জয়পুর আর বিকানীরের সৈন্য একত্র করেও যোধপুরের এক্তা ইটও অধিকার করতে পারেনি|মোট ২ লক্ষ টাকা নজরানা দিয়ে কুকুরের মতন পালিয়েছিল শেষমেশ।মান সে উপলক্ষ্যে জয়পোল নামে একটা জয়স্তম্ভ ও নির্মাণ করিয়েছিলেন।তার রং এখনো ফিকে হয়নি!আর এরমধ্যেই এতো সাহস বেড়ে গেছে জয়সিংহের!আর রাণারও আক্কেল বলিহারি। তাকে কন্যা দেওয়া তো ইছছাপূর্বক মান সিংহ কে অপমান!এত বড় সাহস, ঠাকুর সিংহ তাঁকে লিখেছে– ঘুঙ্গুর পরে বৌদির বিবাহে নাচ দেখিয়ে আসতে।উফ!

না না না।আর সহ্য করবেন না তিনি।কালই তিনি মেবারে বিবাহ প্রস্তাব পাঠাবেন।রাণা মানে তো ভালো– নইলে তিনি মেবারে রক্তগঙ্গা বইয়ে দেবেন।ইন্দোররাজ হোলকার তাঁর বন্ধু-স্থানীয়,গোয়ালিয়রের মারাঠা সিন্ধিয়াদেরও দলে নেবেন তিনি . মেবার এখন বীরশূন্য– ফাঁপা বংশ মর্যাদার অহংকার আর ইতিহাসের চর্বিতচর্বণ মাত্র সম্বল ওদের।এ অসম্মানের প্রতিকার করতে দরকার হলে তিনি দ্বিতীয় আলাউদ্দীন হবেন, শিশোদিয়া বংশে বাতি দিতে আর একজনকে ও রাখবেন না।স্থান কাল পাত্র ভুলে যুদ্ধনিনাদ করে ওঠেন মান সিংহ– “জয় ভবানী!“

---------৪ ---------

“আমি ভবানীর নামে শপথ করে তাঁকে মনে মনে পতিত্বে বরন করেছি।আর আজ এসব কি প্রসঙ্গ উঠছে?একি ছেলেখেলা?”

“ছেলেখেলা বই কি কুমারী!আমাদের মেয়েদের জীবনটাই তো একটা ছেলেখেলা।তা ছাড়া তুমি তো এখনও তাঁকে চোখে দেখনি সখী।এর আগেও তো একবার আরেকজনের সঙ্গে তোমার বিয়ের কথা উঠেছিল-“

“থাম সত্যভামা,থাম।“ রাজকুমারী বলে ওঠেন, “তখন আমার জ্ঞান বুদ্ধি হয় নি,সে একরকম। আর এই ১৫ বছর বয়স হতে চলল, দু বছর ধরে যাঁকে মনে মনে স্বামী বলে জানি- আর তাছাড়া নেহাত এতসব ঝামেলা হল,না হলে কোন মেয়েটা এতদিন আইবুড়ো থাকে বল না?“

মরুভূমির দেশে যখন ঝড় ওঠে, তখন তার রূপ হয় ভয়ংকর ।। বালিতে আচ্ছন্ন হয়ে যায় চারিদিক, ঝাপসা চোখে আপন পর চেনা যায় না– হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে মানুষ ছুটতে থাকে উদ্দেশ্যহীনভাবে| বড় বড় বালি পাহাড় এক নিমেষে হাওয়ার তোড়ে অগণিত বালুকণায় রূপান্তরিত হয়ে পড়ে। ঝড় থামলে পরে তাদের অস্তিত্ব মাত্র থাকে না আর!

মেবারের ভাগ্যাকাশে এবার সেই ঝড় উঠেছে– কৃষ্ণার বিবাহ উপলক্ষ্যে । বহু শতাব্দী পূর্বে একবার এই ভারত ভূখণ্ডে আর্য্যাবর্তের সমস্ত রাজারা উন্মাদ হয়ে গেছিলেন– আরেকজন কৃষ্ণা রাজকুমারী দ্রুপদ-তনয়ার জন্য, আর এই এত শতাব্দী পরে পশ্চিম ভারতের সমস্ত প্রধান রাজারা অস্ত্রধারণের উপক্রম করেছেন ভীম-তনয়া কৃষ্ণাকে লাভের আশায়।

সেই হাহাকারটাই ঠিকরে ওঠে কুমারীর গলায় - “আমি কি দ্রৌপদী না কি ? আজ কেউ বলবেন ভীম সিংহ তোমার স্বামী;কাল ডেকে বলবেন – না না জগৎ সিংহ; পরদিন আবার বিবেচনা করতে বসবেন মান সিংহ কে নিয়ে।এখন আবার ওই দৌলত রাও সিন্ধিয়া;এত বড় আস্পর্ধা– নীচ মারাঠা হয়ে পদ্মিনীর বংশের রাজপুতানীকে অঙ্কশায়িনী করার স্বপ্ন দেখে!সেই ঘৃণ্য প্রস্তাব পাঠাবার আগে কেউ তার জিভটা কেটে নিতে পারল না? মেবার কি বীরশূন্য?এতদূর অধঃপতন ঘটেছে এ দেশের?সত্যভামা,এ কথা কানে শোনার চেয়ে আমার তো বিষ পানে আত্মহত্যা করা ভালো ছিল!”

“চুপ কর সখী। চুপ কর।“সত্যভামা কানে আঙ্গুল দেয়, “অমন কথা মুখেও এনো না।তা ছাড়া অন্যভাবে দেখলে সিন্ধিয়া কিন্তু শান্তি রক্ষা করবারই চেষ্টা করেছেন।।ভেবে দেখ, ওনার কথামত যদি তোমার এক বোনের সঙ্গে মাড়ওয়ার অধিপতি আর আরেক বোনের সঙ্গে অম্বর অধিপতির বিবাহ হয়,তবে ক্ষতিটা কোনখানে?”

“স্তব্ধ হও।।“ রাজকুমারীর গলা শুনে ভয় পেয়ে যায় সত্যভামা।এমন রূঢ় স্বর ইতিপূর্বে আর সে কখনও শোনেনি কুমারীর গলায়| “সত্যভামা!যা বোঝো না তা নিয়ে কথা বল না।তুমি বঙ্গালিনী।ও কথা তোমার মুখে মানায়| কিন্তু দেহে প্রাণ থাকতে রাজপুত কখনও শত্রুর সঙ্গে আপস করেনি,আর করবেও না।“

বস্তুতঃ গত তিন বছরে ব্যাপার ঘোরালো হয়ে উঠেছে। সিন্ধিয়া কে সঙ্গে করে জগৎ সিংহ যোধপুর যাত্রা করেছিলেন।কৃষ্ণা উপলক্ষ্য তো বটেই, তার উপর গত যুদ্ধে পরাজয়ের গ্লানিও অম্বরভূপের অন্তরে জাগ্রত ছিল। সিন্ধিয়ারও পাওনা বাকি ছিল যোধপুরের থেকে।অর্থমূল্যে স্বেচ্ছায় বিক্রীত হলেন মাড়ওয়ারের কয়েকজন বিদ্রোহী রাঠোড়। সবদিক থেকে কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন মান সিংহ।চর মুখে খবর এল – এক ভারী বিশ্বস্ত বন্ধু নাকি নিশ্চিত আত্মহত্যা থেকে বাঁচিয়েছেন মানকে। দুজন গোপনে পালিয়ে গেছেন।আশ্রয় নিয়েছেন মেহরানগড় দুর্গে।

জয়পুর রাজস্থানের অন্তর্গত হলেও ঠিক মরুপ্রদেশ নয়।বরং ঈষৎ পাহাড় সমৃদ্ধ সমভূমিই বলা চলে তাকে।তাই সেই দুর্গম মরুদুর্গে যুদ্ধ চালাতে পারল না তারা। ছয় মাস অবরোধের পর জগৎ সিংহ দেখলেন আর বেশী দিন এভাবে থাকলে– অন্নাভাবে আর ব্যাধিতেই শেষ হয়ে যাবে তাঁর বাহিনী।শুধু হাতেই ফিরতে হল তাঁকে|

এর কিছুদিন পরেই শিবির বদল করলো সিন্ধিয়া।মান সিংহের তরফে গোয়ালিঅরের সেনাপ্রধান সরজেরাও ঘটেগে মেবারের এক সামন্ত রাজা, শাহপুরার শাসনকর্তা অমর সিংহকে আক্রমণ করে বসলেন। সেসময় ,কিছু জয়পুরগামী মেবারের রাজপ্রতিনিধি ছিল এখানে,বল-পূর্বক তাদের ফেরত পাঠানো হল উদয়পুরে।

তারপরেই এই প্রস্তাব।জগৎ সিংহ ইতিমধ্যে সৈন্যদল পাঠিয়েছেন মহারাণার সাহায্যার্থে। ভীম সিংহ নাকচ করে দিলেন সিন্ধিয়ার প্রস্তাব। সিন্ধিয়া ঝাঁপিয়ে পড়ল উদয়পুরে।রক্তক্ষয়কারী সঙ্গ্রামের পর– পরাজিত হল মেবার। মহারাণা বাধ্য হলেন নাথওয়াড়ার চুক্তিপত্রে সই করে সিন্ধিয়ার সঙ্গে আপস করতে।

“যে কথা বললে সত্যভামা – আর দ্বিতীয়বার যেন না শুনি । মর্যাদা হানির পূর্বে বরং প্রাণত্যাগ করা শ্রেয় - বাঙ্গালিনী – তুমি ছোট জাত – এই বংশ মর্যাদার ব্যাপারটা হয় তো ঠিক অনুধাবন করতে পারবে না –“

সত্যভামা চুপ করে মেঝের দিকে চেয়ে বসে থাকে।। এসব কথা তার কাছে নতুন নয়।। তার মা বঙ্গাল দেশ ছেড়ে এদেশে এসেছিলেন কেন ,লোকমুখে তার আভাস ইঙ্গিত সে পেয়েছে। প্রকাশ্যে কেউ কিছু বলে না বটে, তবু রাজ্যের একজন গণ্যমান্য রাজপুরুষকে সে নিজেও ছেলেবেলায় কখনো সখনো তাদের বাড়ীতে আসতে দেখেছে।। মূলতঃ তাঁর অনুগ্রহেই তার রাজবাড়ীতে প্রবেশ– রাজদুহিতার সখী হিসাবে।।

কুমারী অতীতকালের গল্প বলে চলেছেন – ষোল হাজার রাজপুত মেয়ের পুড়ে মরার গল্প।।মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও –হলদীঘাটের যুদ্ধে সমগ্র মেবার সৈন্যের অসাধারণ বীরত্বের গল্প।। বহুবার – বহুজনের মুখে এসব কাহিনী অনুরণিত হয় রাজান্তঃপুরে।। সত্যভামা সেসব কথা শুনতে ভালোও বাসে।। তবে আজ কিছুতেই তার মন বসছিল না|সে অশিক্ষিতা নয়।। অত্যন্ত ছেলেবেলা থেকেই সে কুমারীর সঙ্গে থাকে – একই সঙ্গে তারা লালিত|তবু এদের ধরনধারণ সে বুঝতে পারে না। কি যে এদের এত মান আর কি যে মর্যাদা– যার জন্য কথায় কথায় সবাই প্রাণত্যাগ করছে! প্রাণ জিনিষটা বড় তুচ্ছ রাজা রাজড়াদের কাছে।ওটা দিতেও এদের বাধে না, নিতেও না।রাজকুমারী বলেন “কাপুরুষ বঙ্গালিনী”। কথাটা বোধ হয় সত্যি। এই প্রাণটুকুর জন্যই তারা মেয়ে মরদে খাটে– কেউ স্বৈরিণী হয়; কেউ দাসীবৃত্তি বা মোসাহেবী করে। এই যে সে, মুখে যতই সখী সখী বলুক- আসলে সেই মোসাহেব বই তো নয়।।সদা সর্বদা কুমারীর মন বুঝে কথা বলতে হয় তাকে। কোন সময় কোন মতের বিরোধিতা করলেই গর্বিতা রাজদুহিতার স্বর ভঙ্গিমা পালটে যায়।সে মেঝের দিকে তাকিয়ে অতি ক্ষুদ্র একটা নিঃশ্বাস ফেলে।।

হঠাৎ খেয়াল হয় – কুমারী অনেকক্ষণ কথা বলেন নি।একদৃষ্টে তার দিকেই চেয়ে আছেন।তাঁর সেই পদ্মের মত দুচোখ জলে টলটল করছে।

“বকেছি বলে রাগ করেছিস সত্য?” কুমারী এক আশ্চর্য রকম করুণ গলায় বলে ওঠেন। “কি করব বল।। মাথার ঠিক থাকে না। দেখছিস তো কি হচ্ছে চতুর্দিকে।। জ্ঞান হওয়ার পর থেকে একদিনও শান্তি পেলাম না।“

সত্যভামা নীরবে উঠে দাঁড়ায়।নীরবেই আলিঙ্গন করে কুমারীকে| কোন কথা বলে না।এটাও তার কাজের অঙ্গ। কুমারীর ভাব পরিবর্তনের গভীরতাটা না বুঝে কথা বলা ঠিক হবে না। কে জানে আবার কি কথায় তাঁর মানে লেগে যাবে! কুমারী কিন্তু এবার ঝরঝর করে কেঁদে ফেলেন,”হ্যাঁ রে সত্য, আমি জানি তুই কি ভাবছিস।। কিসের এত মান মর্যাদা?তাই নারে? না না, ঘাড় নাড়িস না।। আমি জানি। আমি তোকে সত্যি উত্তর দেব দেখ। আসলে ওটুকুই তো সম্বল আমাদের– মেবারের আজ কি আছে বল? অর্থ নেই – সৈন্য নেই – বীরত্ব নেই – ধর্ম নেই – সমস্ত দেশটা ধীরে ধীরে অবক্ষয়ের দিকে চলেছে। প্রতিবেশী রাজারা কেউ মানে না! প্রজাদের রক্ষা করতে পারি না! রাজপরিবারের মধ্যেই কত ব্যভিচারের প্রবেশ ঘটেছে! এর মধ্যে ওই গৌরব টুকুও যদি ছাড়ি, তবে কি নিয়ে থাকব আমরা?কি আশায় বেঁচে থাকব?”

“রাজকুমারী –“ সত্যভামা একটা মনমত জবাব দিতে চায়। রাজকুমারী শোনেন না।। আপন মনেই বলে চলেন “মর্যাদাই সব রে সত্য। এই দেখ না – এই যে এতগুলো রাজা; এতগুলো মস্ত মস্ত পুরুষমানুষ হঠাৎ আমার জন্য ক্ষেপে উঠেছে – যুদ্ধবিগ্রহ হচ্ছে ঠিকই , কিন্তু এই ব্যাপারটা , এই ব্যাপারটা কোন মেয়েটার না ভালো লাগবে বল? মিথ্যে বলব না ।। আমারও লাগত, জানিস।। এই আমিই সবার কামনার বস্তু ; এত শক্তি আমার আছে যে সমস্ত প্রতিবেশী রাজাদের ময়দানে নামিয়ে ছেড়েছি একেবারে; সবাই জান প্রাণ বাজি রেখেছে আমার জন্য – ভাবতেই কি নেশা লাগে| অহংকার হয় ! কিন্তু ভুল; নিদারুণ ভুল ! এখানেও সেই মান মর্যাদার গল্প – ওরা তো কেউ আমাকে চায় না ।। ওরা চায় মেবারদুহিতাকে, শিশোদিয়া বংশের রাজপুতানীকে । বুঝলি না – এই পরিচয়টা না থাকলে আমার দিকে কেউ ফিরেও চাইত না; পথের পাশে ফেলে যেত সবাই!এই পরিচয়টা ছাড়া যে আমি ভিখারিণী! এতবড় লোভ আমি কি করে সম্বরণ করব ?” মদগর্বিতা, উদ্ধত কুমারী কৃষ্ণা চোখে আঁচল চাপা দিয়ে প্রায় ছুটে বেরিয়ে যান ঘর থেকে। সত্যভামা নির্বাক হয়ে চেয়ে থাকে।।

-----------৫----------------

রাজকুমারী সেইদিন অমনভাবে উঠে যাওয়ার পর, আরও একবছর কেটে গেছে।। আজ শেষ রাত্রে প্রাসাদের খোলা ছাদে কুমারী কৃষ্ণা একলা দাঁড়িয়েছিলেন।। রাজস্থানের অধিকাংশ প্রাসাদের মতনই উদয়পুর দুর্গও পাহাড়ের উপর অবস্থিত।।ছাদে এসে দাঁড়ালে অনেকদূর পর্যন্ত দেখা যায় ।।

রাজদুহিতা তাঁর সুন্দর কোমল চক্ষুদুটি মেলে দেখছিলেন চারিধার| একদিকে পিছোলা দীঘি, অন্যদিকে জলমহল আর জগদীশ-মন্দির।।

ওই জলমহলে মেবারের মহারাণারা সূর্য-উপাসনা করতে যেতেন| ছেলেবেলায় কৃষ্ণাও গেছেন কখনো সখনো ভাই-বোনেদের সঙ্গে।। সূর্যের প্রথম আলো যখন প্রবেশ করে রাঙ্গিয়ে দিতে জল মহলের সাদা-কালো দেওয়ালগুলো – কি অদ্ভুত আনন্দ হত মনে। সে বয়সে ও আনন্দটা কিসের এবং কেন – এসব ভেবে দেখার ইচ্ছে করত না আদৌও। কেবল একটা নরম ভালোলাগার উত্তাপ ছড়িয়ে থাকত সারাটা দিনের সমস্ত কাজে।

কবে থেকে মেবারে আর সূর্য ওঠে না? যুদ্ধে যুদ্ধে দেশটা ছারখার হয়ে গেল।। জগৎসিংহ, মানসিংহ, সিন্ধিয়া, হোলকার – হ্যাঁ ইন্দোররাজ যশবন্ত রাও হোলকার ও নেমে পড়েছেন ময়দানে। তিনি রাণাকে চিঠি পাঠিয়েছিলেন যে মান বা জগৎ কারো সাথেই কৃষ্ণার বিবাহ না দিতে।। উপরন্তু মান সিংহের এক বোনকে বিবাহ করুন জগৎ।। জগৎ সে প্রস্তাবে রাজী হন নি।। আপাতঃ আত্মভোলা ছেলেমানুষ অম্বররাজ কিভাবে যেন হঠাৎ ভয়ানকরকম রাজনীতিজ্ঞ হয়ে উঠেছেন। মূলত তার কূটকৌশলেই, হোলকার চুক্তিপত্রে সই করেছিলেন যে তিনি এ বিবাহের ব্যাপারে কথা বলবেন না আর – জয়পুরকেও রক্ষা করবেন সিন্ধিয়া আঘাত হানলে।জগৎ সিংহ সিন্ধিয়াকেও ক্রয় করে ফেলেছেন এক কোটী তঙ্কায়।। বিকানীরের সুরাট সিংহ আর টোকের আমীর খানও তাঁর পক্ষে নাম লিখিয়েছেন।।

কৃষ্ণার বোনেদের সবার বিয়ে হয়ে গেছে।।ভাইরা এখন জোয়ান মরদ।।কৃষ্ণার বাবা সারাক্ষণ মন্ত্রীদের দ্বারা পরিবৃত হয়ে বসে থাকেন।।পরামর্শ চলে অহরহ। যুদ্ধের পরামর্শ।। কৃষ্ণার মায়ের ললাটে বলিরেখাগুলো বড় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে আজকাল।। মহারাণী সর্বক্ষণ দেবতার দয়া ভিক্ষা করেন।। তাঁর বয়স যেন দশ বছর বেড়ে গেছে ।। রাজবাড়ীর অন্য পুরন্ধ্রীরা , এমনকি পিসী চাঁদবাঈও কৃষ্ণাকে এড়িয়ে চলে আজকাল। যুবতী রাজদুহিতা একা একা প্রেতের মতন এ ঘর ও ঘর করেন। প্রতিমুহূর্তে মনে হয় এতদিনে তাঁর অন্য কোন সংসারে থাকবার কথা – এ গৃহে আর তাঁর অধিকার নেই ; এ স্থানটুকু তিনি জবরদখল করে বসে আছেন। সত্যভামার কথা মনে পড়ে – সে একবার কথাপ্রসঙ্গে বলেছিল বঙ্গালদেশে নাকি নিয়ম আছে যে বেলগাছ কাটতে নেই ।। তিনি যেন সেই গৃহস্থের শয়ন গৃহের দেওয়ালে জন্ম নেওয়া বেলগাছ – কাটাও চলে না – আবার রাখলেও বিপদ।। শিকড় ছড়িয়ে ছড়িয়ে ঘরের দেওয়ালটাই ভেঙ্গে ফেলে দেবে একদিন।।

প্রাকারের গায়ে সস্নেহে হাত বুলোন বোলান কুমারী।। জরাজীর্ণ অবস্থা। কতকাল মেরামত করা হয়নি। হবেই বা কি করে ? কোষাগারে অর্থ নেই।।কদিন আগেই সিন্ধিয়া দল পালটে ছারখার করে দিয়েছে জয়পুর আর উদয়পুর।হোলকার এখন নিঃস্পৃহ দর্শক। ভীম সিংহ শেষ অবধি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছেও সাহায্যের আবেদন করেছিলেন । তারা বলে পাঠিয়েছে কে এক নেপোলিয়নকে নিয়ে তারা এ মুহূর্তে বড়ই বিব্রত – তাদের পক্ষে কিছু করা এখন সম্ভব নয়।

ভোরের আলো ফুটছে ধীরে ধীরে।। ওই তো সোনারঙের রোদ ছড়িয়ে পড়ল পূর্ব দিকের গাঁ গুলোতে ।। ওসব গ্রাম এখন সুপ্ত।। কি নিশ্চিন্ত ওদের জীবন ! সত্যভামার মুখে ওদের কথা শুনেছেন কুমারী- ওখানকার মেয়েরা চারক্রোশ পথ হেঁটে কুয়ো থেকে জল আনে ঘড়ায় করে, ঘর নিকোয় , জ্বালানি সংগ্রহ করে , শিশুকে আগলায় , মরদের প্রহার সহ্য করে; আবার রাত্রে সেই অত্যাচারী স্বামীকেই পরম যত্নে বসে খাওয়ায় – মোটা মোটা বাজরার রুটি আর তেঁতুলের চাটনি।। কোন কোন দিন গৃহিণীর জন্য আর কিছুই পড়ে থাকে না।

একসময় এই অবমাননার কথা শুনলে ঘৃণায় রাগে গা রী রী করত কৃষ্ণার।। আজ তাঁর হিংসা হয় - মনে হয় আহা ওরা কেমন সুখে আছে! তিনিও যদি রাজদুহিতা না হয়ে,কৃষ্ণা না হয়ে, এক সামান্যা গ্রাম্য বধূ হতেন-

ওদের অন্ন নেই, বস্ত্র নেই , জল নেই , অর্থ নেই – তার উপর যুদ্ধের ব্যয়ভার বহন করতে কর চাপানো হয়েছে নতুন ।। কিন্তু কেন নেই? ভেবে দেখলে সেও তো তাঁর জন্যই ।। কার জন্য আজ মেবারের এই সর্বনাশ?

আমীর খান আবার শিবির বদল করেছে।। কর চেয়ে পাঠিয়েছে মেবার আর অম্বরে।। এর মধ্যে আবার উদয়পুরের সামন্ত রাজেদের মধ্যে বেধেছে অন্তর্দ্বন্দ্ব । রাণা সামলাতে পারছেন না এতদিক। সেই সুযোগে ক্ষমতালিপ্সু রাজপুরুষেরা ফণা তুলেছে। তাঁর জন্য কি মেবারের স্বাধীনতা সূর্য এবার অস্তমিত হবে ! এই এত বছরের বুক দিয়ে রক্ষা করা স্বাধীনতা! সহস্র বীরের প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা! গত কয়েক বছরের যুদ্ধে অধিকাংশ সৈন্য হত। উদয়পুর ও জয়পুরের কোষাগার শূন্যপ্রায় ।কার জন্য এই ক্ষয়, এই ধ্বংস? আচ্ছা, ওরা তাকে অভিশাপ দেবে না? ওই সব সৈনিকের পরিবার? ওই গ্রামবাসীরা? তাঁর নিজের পরিজনেরা?

কৃষ্ণা হেসে ফেলেন উন্মাদিনীর মত| নিজের নামটা বড় পছন্দ ছিল তাঁর। সেটা যে এমন অভ্রান্ত ভাবে ফলে যাবে কে জানত! মায়ের কাছে গল্প শুনেছিলেন – কুরুকুল ধ্বংসের জন্য জন্ম হয়েছিল যাজ্ঞসেনীর ।। কৃষ্ণাও তেমন মরুভূমির প্রেতিনীর মতন ভাবী শ্বশুরকুল ও পিতৃকুলের সমস্ত প্রাণ-রস পান করে চলেছেন অনবরত। রক্ত দিতে দিতে রক্ত নিঃশেষ হয়ে আসছে– তবু তৃষ্ণা মিটছে না। মর্যাদা মূল্যায়নের এই মহাযুদ্ধের শেষে তিনিও কি এক মহাশ্মশানের সম্রাজ্ঞী হবেন?

ঊষার আলো আজ বড় উজ্জ্বল। গ্রামগুলোর চালে সোনা রঙের সঙ্গে লালিমার আভাস। কিন্তু সহসা ও কি হল?ও কিসের শব্দ? অমন একটা সমবেত কোলাহল ভেসে আসছে কেন? এতদূর থেকে ঠিক বোঝা যাচ্ছেনা, তবু মনে হচ্ছে যেন অনেক মানুষ সমস্বরে আর্তনাদ করে চলেছে !

লালটাও ঠিক স্বাভাবিক নয়। ওই যে কালো ধোঁয়া আকাশটা ছেয়ে ফেলেছে! আগুন, আগুন লেগেছে! পুর্ব্ দিকের গ্রামগুলোতে আগুন লেগে গেছে কোনভাবে । এখুনি কাউকে খবর দেওয়া দরকার!

কৃষ্ণা নীচে নামতে যাবেন, এমন সময় সত্যভামা হাঁপাতে হাঁপাতে এসে প্রণাম করে – “রাজকুমারী,নীচে চল। মহারাজ তোমাকে এখুনি ডেকে পাঠিয়েছেন ।“

-----------৬----------------

ঘরে ঢুকতে গিয়ে থমকে দাঁড়ান কৃষ্ণা । কই, বাবা ত নেই ঘরে! বিশাল ঘরখানার একপ্রান্তে কেবল একলা বিষণ্ণ মুখে মেঝের দিকে চেয়ে বসে রয়েছেন মহারাজ দৌলত সিংহ, করজৌলির মহারাজা। কৃষ্ণা এগিয়ে গিয়ে প্রণাম করেন। দৌলত সম্পর্কে তাঁর পিতৃব্য; ৪ পুরুষ আগে মহারাণা ভীমের আর দৌলতের পূর্বজ ছিলেন একই ব্যক্তি। এই জ্ঞাতি কাকাটি্র সঙ্গে দেখা হয় না বড় একটা, তবু কৃষ্ণা তাঁকে বেশ ভালবাসেন ।।

দৌলত কৃষ্ণার মাথায় হাত রাখেন । কথা বলেন না কোন । কৃষ্ণা বিস্মিত হন ।। হেসে জিজ্ঞাসা করেন – “কই, আমায় আশীর্বাদ করলেন না কাকাজী? প্রতিবারের মত বললেন না তো, চিরায়ুষ্মতী হও?”

দৌলত সিংহ মুখ তুলে তাকান।। কৃষ্ণা এতক্ষণে দেখতে পায় – তাঁর দু চোখ আস্বাভাবিক রকমের রক্তাভ। মাথার চুল উসকোখুসকো। মুখে রাত্রি জাগরণের সুস্পষ্ট ছাপ। আরও একটা অস্বাভাবিক ব্যাপার – মহারাজের গা থেকে কিরকম হালকা একটা গন্ধ বেরোচ্ছে। মদ্যপ অবস্থায় কখনো তো রাজসকাশে আসেন না কাকামশাই!

“কি হয়েছে কাকাজী? আবার নতুন কোন অঘটন?” দৌলতের হাঁটু আঁকড়ে তাঁর পায়ের কাছে উপবেশন করেন কৃষ্ণা ।

সে স্পর্শে অকস্মাৎ থরথর করে কেঁপে ওঠেন দৌলত সিংহ।। কৃষ্ণা আজ ষোল বৎসরের যুবতী ।। সাক্ষাৎ দেবীপ্রতিমার মতন স্নিগ্ধ কমনীয় মূর্তি।তবে এ মেয়েকে তিনি জন্মাতেও দেখেছেন।। রাণার প্রথম সন্তানপ্রাপ্তির উৎসবে তিনিও ছিলেন আমন্ত্রিত।মোমের মতন নরম হাত পা ছিল শিশুটির।। ফোলা ফোলা গাল । থ্যাবড়া নাক।। তখনো তার চোখ ফোটেনি , ছোট্ট একখানা দোলনায় ঘুমোচ্ছিল সে। দৌলত নিজেও প্রায় কিশোর তখন। সদ্যোজাতর ছোট্ট নরম হাতখানা স্পর্শ করতে ঘুমন্ত অবস্থায়ই সে মুঠো করে ধরেছিল তাঁর তর্জনী।

“যে জিহ্বা এ আজ্ঞা দেয় – ধিক তাকে ।। এ কাজ না করলে যদি আমি বিশ্বাসের মূল্য না রাখতে পারি - তবে আমি বিশ্বাসঘাতক।। ভেঙ্গে যাক করজৌলির আনুগত্য।“ বিড়বিড় করে ওঠেন দৌলত।

“ কি বলছেন কাকাজী ? একটু জোরে বলুন, শুনতে পাচ্ছিনা।“ কৃষ্ণা জিজ্ঞাসা করে ।

“কিছু না, কিছু না।“ দৌলত সিংহ উঠে দাঁড়ান ।। কৃষ্ণার মাথায় আরেকবার হাত রেখে অস্ফুটে কি বলেন। তারপর দ্রুতপদে বেরিয়ে গিয়ে সোজা করজৌলির উদ্দেশে ঘোড়া ছুটিয়ে দেন|।

------------৭---------------

“পিতা, পিতা ।।“ বন্ধ দরজায় করাঘাত করে চলেছেন কৃষ্ণা ।। “একবার, কেবল একবার দরজা খুলুন।। নিজমুখে আমায় বলুন এ আদেশ আপনার। পিতা!” রুদ্ধ কপাটে মাথা ঠুকছেন মহারাণী আরশাজবদ ।। “দয়া কর । ওগো দয়া কর আমায় ।। দয়া কর তুমি! এ কথা – যে কথা শুনতেও পাপ – শুনলে গায়ের রক্ত জল হয়ে যায় – সে আদেশ, এ মহাপাপের আদেশ প্রত্যাহার কর তুমি!“ রুদ্ধ কপাট অটল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে , অন্তরাল থেকে ভেসে আসছে না কোন শব্দ ।।

“কেন পিতা, কেন ? কি অপরাধ করেছি আমি ?” ডাকতে ডাকতে কুমারীর গলা ভেঙ্গে যাচ্ছে, মহারাণীর কপালে রুধিরের রেখা। তবু দরজা খুলছে না।।

“কৃষ্ণা!” চমকে ফিরে তাকায় রাজকুমারী ।। পিসী চাঁদ বাঈ যেন কখন অতর্কিতে এসে দাঁড়িয়েছেন পিছনে। “কৃষ্ণা,মহারাজকে ছেড়ে দে। আমার সঙ্গে আয়। আমি তোকে বলছি কি হয়েছে ।“

কাকাজী অমন ভাবে বিদায় নেওয়ার পরই কৃষ্ণার মনটা খারাপ।। সে এসে বসেছিল মায়ের কাছে।।বহুদিন পরে মা-মেয়েতে কথা হচ্ছিল। এমন সময় ঘরে ঢুকল জয়ানদাস। কৃষ্ণার সহোদর ভাই। এগিয়ে এসে, কেউ কিছু বোঝবার আগেই, কৃষ্ণার বুকে ঠেকাল একখানা ছুরি। ছোট্ট অথচ ক্ষুরধার।। কৃষ্ণা চেয়ে রইল অবাক বিস্ময়ে ।। মহারাণীও স্তম্ভিতা ।। নড়াচড়া করতেও যেন ভুলে গেছেন সবাই।।

সে অবস্থায় কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল জয়ান। অতঃপর একসময় তার হাত থেকে স্খলিত হয়ে ছুরিখানা পড়ে গেল নীচে। অবরুদ্ধ স্বরে রাজপুত্র বলে উঠলেন – “পারব না । পারব না আমি।।“

কৃষ্ণা ব্যথাতুর হেসে জিজ্ঞাসা করেন – “তুই আমায় মারতে চাস ভাইয়া? কেন ভাই?” জয়ানদাস সবলে আলিঙ্গন করে ভগ্নীকে। দিদির চুলে মুখ লুকিয়ে ফিসফিস করে ওঠে – “পিতৃ আদেশ!”

তাঁর পরেই এই দৃশ্যের অবতারণা। এক দণ্ড কাল ধরে পিতার কক্ষের দরজা খোলাতে পারেনি কৃষ্ণা ।। পিতার কাছ থেকে উত্তর মেলেনি –“কি এই আদেশের তাৎপর্য্য ? কতদূর এর সত্যতা?”

মহারাণী এখনও রাণার দুয়ারে কড়া নেড়ে চলেছেন।। চাঁদ বাঈ কৃষ্ণাকে এনে বসান একখানি ঘরে।। দরজাটা আস্তে আস্তে বন্ধ করে দেন। ক্ষণকাল চুপ করে থেকে তারপর বলেন – “আজ সকালে গাঁয়ে আগুন লাগার ঘটনা তুইই প্রথম দেখেছিস না?” কৃষ্ণা ধীরে ধীরে মাথা নাড়ে । “ও আগুন কে লাগিয়েছিল জানিস ? আমীর খান পিণ্ডারী। টোঁকের নবাব । মেবারের সর্বত্রই আজ এই আগুন। আর এ আগুন নেভাতে পারে একমাত্র একজন। সে হচ্ছিস তুই। কৃষ্ণা, মেবার না তোর মাতৃভূমি ?“

“পিসী – আপনি আমাকে বলুন কি করতে হবে ! “ কৃষ্ণা ব্যাকুল স্বরে জিজ্ঞাসা করে। “মেবারের জন্য আমি প্রাণ অবধি দিতে পারি। কিন্তু তাঁর সাথে পিতার এ আদেশের …” বলতে বলতেই স্তব্ধ হয়ে যায় রসনা। সহসা বিদ্যুৎচমকের মতন এ ভীষণ আদেশের অর্থ বোধগম্য হয় কৃষ্ণার । স্পষ্ট হয়ে যায় সবটুকু। কণ্টকিত হয়ে ওঠে সারা দেহ । কাঁপতে কাঁপতে সে চাঁদ বাঈয়ের দিকে তাকায়।দেখে, তিনিও স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন তার দিকে।

“আমীর খান বলে পাঠিয়েছে মান সিংহের সঙ্গে তোর বিয়ে হয় তো ভালো, নইলে সে মেবার শ্মশান করে দেবে। রাঠোররা আমাদের চেয়ে বংশমর্যাদায় ছোট ।সবই তো জানিস। তুই- প্রতাপসিংহ, পদ্মিনীর বংশের মেয়ে । তোকে আর কি বলব!” চাঁদ বাঈ ফিসফিস করে ওঠেন –“তোর বেঁচে থাকার অর্থ এখন হয় কুলমর্যাদানাশ বা মেবারের স্বাধীনতানাশ।“

কৃষ্ণা ধীরে ধীরে মাটিতে বসে পড়ে– “কবে ? কখন?”। “এখুনি “ জলদগম্ভীর স্বরে ভেসে আসে উত্তর।

আজ? এখুনি?? এই তার ষোল বছর বয়স। আর সে প্রভাতের সূর্য দেখতে পাবে না ? খোঁপায় বেলফুলের মালা জড়াতে পারবে না? সন্ধ্যায় পিছোলা দীঘির পিছল ঘাটে পা ডোবাতে পারবে না ? রামায়ণ কথকতা শুনতে পাবে না? এখনো তো সে জানেনা ভালোবাসতে কেমন লাগে ঠিক! এখনও জানেনা কেমন হয় প্রিয়তম পুরুষের প্রথম স্পর্শ! আর কাল থেকে এ প্রাসাদে জলে-স্থলে-আকাশে-বাতাসে কোথাও সে নেই?

“একবার মা-বাবাকে প্রণাম করে আসি?” অস্ফুটে বলেন কুমারী।

“না । কারও সাথে দেখা করিস না আর।“ চাঁদ বাঈ অবিচলিতা।সস্নেহ স্বরে বলেন– “ এ সময়ে পৃথিবীকে বড় সুন্দর মনে হয়। কোন দুর্বলতাকে প্রশ্রয় দিস না।“ চাঁদ বাঈ বাড়িয়ে ধরেন একখানা সুদৃশ্য স্বর্ণ-ভৃঙ্গার।। তাতে পিছোলা দীঘির জলের মতন টলটলে নীল তরল ভরা! গরলাধার!

একমুহূর্ত ইতস্তত করে কৃষ্ণা তা গ্রহণ করে।তারপর একচুমুকে নিঃশেষ করে ফেলে পাত্রটা।

মহারাণী যখন খবর পেয়ে আলুথালু বেশে আর্তনাদ করতে করতে যখন এসে পৌঁছলেন, তখন কৃষ্ণার গাত্রবর্ণ নীল হয়ে গেছে। চোখের দৃষ্টি ঝাপসা ।তিন পেয়ালা হলাহল পান করেও সে এখনো অবধি জীবিতা। নবীন প্রাণ কিছুতেই পরিত্যাগ করতে চাইছে না স্ফুটনোন্মুখ তনুকে।।

এভাবে আরো দণ্ড কয়েক চলতে পারে ।প্রস্তুত হচ্ছে আরও কয়েক ভৃঙ্গার বিষ।। মহারাণী কন্যার অবস্থা দেখে আর কারও কাছে কিছু বললেন না। সকলকে সরিয়ে নিজে কন্যার মাথা তুলে নিলেন অঙ্কে, পিপাসার্ত ওষ্ঠাধরে ঢেলে দিলেন – কুসুম্বা !! রাজবাড়ীর সমস্ত আফিম সঞ্চিত করে প্রস্তুত করা সরবত!

মায়ের স্পর্শ পেয়ে কৃষ্ণা একবার মাত্র চোখ খোলবার চেষ্টা করেছিল। একবার কেবল বলে উঠেছিল –“মেবারের স্বাধীনতা অক্ষয় হোক ।।“ আরও কিছু বলতে চেয়েছিল সে – তবে জিভ তখন তার জড়িয়ে গিয়েছে।।

এরপরই,দেহের ধমনীতে প্রবাহিত রাজকীয় মর্যাদাপূর্ণ সমস্ত শিশোদিয়া রক্ত একবার ছুটে এল তার কপোলে; বিবাহ রাত্রির রক্তবাসের মতন – রাঙ্গিয়ে দিয়ে গেল তার আনন। মুদিত নেত্রে একখানা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন কৃষ্ণা। তারপরই ধীরে ধীরে সমস্ত মুখখানা হয়ে পড়ল ছাইয়ের মতন সাদা আর বরফের মতন শীতল।।

------------------৮-------------------


রাজকুমারী কৃষ্ণার গল্প এখানেই শেষ।।তবে উপসংহার আর একটু আছে ।।

কৃষ্ণা মৃত্যুর আট বছর পর, ১৮১৮ খৃষ্টাব্দে, মেবার কোম্পানীর বশ্যতা স্বীকার করে নেয়। সন্ধির শর্ত অনুযায়ী :-

১।) ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী রক্ষা করবে মেবারের সীমান্ত। তাদের অনুমতি ব্যতিরেকে অন্য কোন রাজ্যের সঙ্গে কোনরূপ সম্পর্কে আবদ্ধ হতে পারবেন না মহারাণা।

২।) মেবারের আয়ের এক চতুর্থাংশ কর ৫ বছর ধরে পাবেন কোম্পানী-বাহাদুর। তারপর বছর বছর তারা মেবারের আয়ের তিন–অষ্টমাংশ পেতে থাকবেন।।

৩) মেবার ব্রিটিশ কোম্পানীর সাম্রাজ্যের সার্বভৌমত্ব স্বীকার করবে সর্বতোভাবে। আর সেই আনুগত্য ও বিশ্স্বস্ততার পুরস্কার হিসেবে; সরকারের পক্ষে সুপ্রাচীন শিশোদিয়া বংশকে মর্যাদা দিতে মেবারপতির জন্য বরাদ্দ করা হল ১৯ খানা গান স্যালুট!

একটি দেশের স্বাতন্ত্র্য ও স্বাধীনতার মূল্য, একটি বংশের বিপুল মর্যাদা আর কুলগৌরবের মুল্য- মোট ১৯ খানা গান স্যালুট।

যোধপুরের মান সিংহ ও দৌলতরাও সিন্ধিয়া ১৮১৮ খৃষ্টাব্দে সন্ধি করেন কোম্পানীর সঙ্গে। সে বছরই, অর্থাৎ ১৮১৮ খৃষ্টাব্দের ২১শে নভেম্বর – ২১জন রাণী ও ২৪ জন রক্ষিতাকে বিষাদসাগরে ভাসিয়ে অম্বরের সোয়াই রাজা জগৎ সিংহ স্বর্গারোহণ করেন ।

x---------------------------x





কৈফিয়ত


১। কাহিনীটি ইতিহাস আশ্রিত। সজ্ঞানে ইতিহাসকে কোথাও অতিক্রম করিনি। তবে কাহিনীর স্বার্থে কিছু যুদ্ধের সময়কাল সামান্য অদলবদল করা হয়েছে।


২। কাহিনীতে বর্ণিত সকল চরিত্রই ঐতিহাসিক। কেবলমাত্র সত্যভামা লেখিকার কল্পনাপ্রসূত।


৩। ঐতিহাসিক সমস্ত দলিল ইংরিজিতে। সেখানে এই উপাখ্যানের নায়িকার নাম krishna kumari - যা কিনা বাংলায় কৃষ্ণা-কুমারী বা কৃষ্ণ-কুমারী উভয়ই হওয়া সম্ভব। গল্পের স্বার্থে এক্ষেত্রে কৃষ্ণা কুমারী নামটিই বহাল রেখেছি।



তথ্যসূত্র


Annals and antiquities of rajasthan- James Todd




The Three Moons- Elizabeth Bruce Elton Smith


The Making of the Indian Princess- Edward Thompson


মহাভারত- কাশীরাম দাস






Wikipedia
0

গল্প - মনোজিৎকুমার দাস

Posted in





















হবু বর ও বরের ভগ্নিপতিরা শিবানীকে পাকা দেখা দেখতে এলে ইন্দুবালা প্রথম হবু নাতজামাই ব্রজগোপালকে দেখে কেন যেন অস্বস্তি বোধ করে। সাত ক্লাসে উঠার আগ থেকেই প্রভাত ও তার বউ মিনতি তাদের বড় মেয়ে শিবানীর বিয়ের কথা ভাবতে শুরু করে । ইন্দুবালা ভাবে- এহনকার দিনি এতটুহু মিয়্যার কেউ বিয়ে দেয়! আমাগেরে কালে না হয় এটা ছ্যাল। মুইর বিয়ে তো হইছেলো ১১ বছর বয়সে। কার্তিক মন্ডলের বাবা মুইকে পণ দিয়ে বেটার বউ করে ঘরে তুলিছিল।
পরক্ষণেই সে আবার ভাবে- এতটুহু বয়সে বিয়ে না দিয়েই বা করবি কী পিরভাতে। ছাওয়াল হবি হবি করে পিরভাতের বউ চারডা মিয়্যা বিয়োইছে। পিরভাতে এডা ওডা করে যা কামাই করে তাতে ওদের সংসারই তো চলে না। একটুহু বয়সে বিয়ে না দিয়ে কীবা করবি পিরভাতে।
তার সোয়মী কার্তিক মন্ডল তার বউ ইন্দুবালাকে বলল- এখন আইন হইছে মাইয়্যার বয়স ১৮ আর ছাওয়ালে বয়স ২১ এর কম হলিপারে বিয়ে দিয়া বেআইনী।
- পিরভাতের মাইয়্যা শিবানী তো মাঘ মাসে ১২ থিকে ১৩ বছরে পরিছে।
-ঠিকই কইছো পিরভাতের বাপ। হবু নাত জামাই ব্রজগোপালের বয়স তো শিবানী হতি তিন গুণ বেশি হবেনে। তার মানে ওর বয়স ৩৭ থেকে ৩৯ বছরের মত হবি মনে হয়।
- তুমার লগে মুইর বিয়ে ৯ বছর বয়সে হলিপারেও তুমি কিন্তুক ছিলে ২১ বছরের জোয়ান ছাওয়াল। পিরভাতের মাসি শাশুড়ি কদমবালা আর তার মাইয়্যা পরেশের বউ সোন্দরী আধ বুড়ো ছাওয়ালের লগে ফুলির কুঁড়ির নাহাল মুইর নাতনিডার সব্বোনাশ করার জন্যি লাগিছে। সে সময় ইন্দুবালা আধা বয়সী ছাওয়ালে সঙ্গে শিবানী বিয়েতে অমত করলে পরেশের বউ সোন্দরী তাকে বলেছিল- চাওয়াল হল সুনার মতো। মাওইমা জানেন না সোনার আংটি বাঁকাও ভাল ! তার কথায় ইন্দুবালাই প্রতিবাদ করেছিল।
নাতজামাইয়ের মতিগতি আর নাতজামাইয়ের মা ও বোনের দুর্ব্যবহারে ইন্দুবালা সুন্দোরী বলেছিল- দেখলি তো সোন্দরী আমার কথাই ঠিক হল কিনা । কটা ছামড়া থাকলি সোন্দরী হয় আর ছাওয়াল হলিপারেই সোনার আংটি হয় না যদি না তার গুণ না থাকে।


ইন্দুবালার বড় ছেলে প্রভাতের মেয়ে শিবানী বিয়ে ! এক কথা ভাবতে তার অনেক কথাই মনের কোণে ভেসে উঠে।
তারপর দিনের পর দিন গড়িয়ে যায়। ইন্দুবালার তারপর আরো দুটো ছেলে একটা মেয়ে হল। তার জাদেরও ছেলে মেয়ে হল। এক সময় হানুগঞ্জের মন্ডলবাড়ির একান্নবর্তী পরিবারে ভাঙন দেখা দিল। একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে মন্ডলবাড়ি ছেলেরা যার যার মত হয়ে গেল। জমিজমা ভাগ হওয়ার পর কার্তিক মন্ডল যা পেল তার আয় থেকে তার পরিবারের ছয় ছয়টা মুখকে খাওয়ানো পরানো কার্তিক মন্ডলের পক্ষে কষ্টকর হয়ে পড়ল। মেয়েটার বয়স কয়েক মাস মাত্র। কার্তিক মন্ডলের ইচ্ছে ছিল তিনটি ছেলেকে লেখা পড়া শেখানোর। শেষ পর্যন্ত হল না। পিঠেপিঠে জন্মানো তিনটি ছেলে দিনে দিনে বড় হয়ে উঠল। ওরা প্রাইমারী স্কুলের লেখা পড়াও শেষ করতে পারল না। ওদের বাবার শরীরটাও ভাল না।
ইন্দুবালা মনে মনে ভাবে- পিরভাতে ছাড়াও তার আর দুই ছাওয়াল গনসা ও মঙলারও লেহাপড়া হল না। দেখতি দেখতি ছাওয়ালগুলো বড় হয়ে উঠল। তখন ছাওয়ালগুলো এটাওটা করে দুএক টাহা রোজগার করতি লাগল। পিরভাতের এতটকু বয়সে বিয়ে দিবার দরকার ছ্যাল না। কিন্তুক ইন্দুবালার শাশুড়িঠাকরোনের ইচ্ছেতে পেত্থমে পিরভাতের বিয়ে দিতি হেলো।


প্রভাতের বিয়ের আড়াই বছর পরে প্রভাতের বউ শিবানীকে জন্ম দিল। ইন্দুবালা আর দুটো ছেলের নাম গনসা ও মঙলা। তারা সব সময়ই কামারপাড়ায় বসে থাকে। কামারপাড়ায় বিয়ে যোগ্য মেয়ের অভাব নেই। এদিকে গনসা ও মঙলা এই দুজন কামারপাড়ায় রমেশ আর পরেশের কামারশালায় কাজ করতে থাকায় ইন্দুবালা ও তার স্বামী কার্তিক মন্ডল তো অবাক! কার্তিক মন্ডল তার বউ ইন্দুবালা একদিন বলল- গনসা ও মঙলার মতিগতি ভাল লাগতিছে না, কুথায় কী করে বসবিনি তার তা কী তুমি ভ্যাবি দেহিছো, বউ! ওগেরে বিয়ে আমি বোশেখ মাসের মধ্যিই দ্যাবো, মুই মনে মনে প্রিতিজ্ঞে করতিছি। কার্তিক মন্ডল সত্যি সত্যি তার কথা রাখল।


বিয়ের পর তিন ভাই এক সঙ্গেই থাকলেও কয়েক বছর যেতেই বউদের যুক্তি শুনে তিন ছেলেই যার যার মত আলাদা হলে গেল। ছোট মেয়েটাকে নিয়ে ইন্দুবালা ও কার্তিক মন্ডল এখন ছেলেদের থেকে আলাদা। কার্তিকের বয়স হয়েছে, ইন্দুবালার বয়সও আগের মত নেই। তিনটি প্রাণীর সংসার চালাতে গিয়ে তাদেরকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।


প্রভাতের মেয়েটা এবার সাত ক্লাসে উঠেছে। সামনের পরীক্ষার পর আট ক্লাসে উঠবে। গনসা ও মঙলা দুটো করে মেয়ে, তার সবে প্রাইমারী স্কুলে যাচ্ছে। ইন্দুবালা ভাবলো- তিনটে ছাওয়ালের একটাও ছাওয়াল না হলিপারেও ওরা যদি মাইয়্যাগুলিকে লেহাপড়া শেখায় তা হলি ভালই হবি। দিনকাল বদলাছে। মাইয়্যা পেলারাও এহন লেহা পড়া শিখতিছে।


ইন্দুবালার ইচ্ছেটা পূরণ হবে না সে কয়েকদিন পরেই বুঝতে পারলো । মদন ঘটক মাঝে মধ্যেই তাদের বাড়িতে আসছে দেখে ইন্দুবালার মনে খটকা লাগল।
একদিন ইন্দুবালা বড়বৌমাকে বলল- মদন ঘটক পিরভাতে, আর তুমার সাথে কী বলতি একদিন পর পরই আসতিছে। ইন্দুবালা প্রভাতের বউয়ের কাছ থেকে জানতে পারল ওদের বড় মেয়ে শিবানীর জন্যে একটা ছেলের খোঁজ নিয়ে এসেছে। বড়বৌমার মুখ থেকে কথাটা শুনে ইন্দুবালা অবাক হয়ে বলল- এতটুকু মাইয়্যার বিয়ে! তুমরা কি পাগল হইছো? শ্বাশুড়ির কথা শুনে শিবানীর মা একটা কথাও বলল না।
কয়েকদিন পরে মদনগোপাল শিবানীর বাবা প্রভাত ও তার ভাইরা ভাই পরেশকে নিয়ে শিবানীর বিয়ের জন্যে ছেলে দেখতে যাবে এমন কানা ঘুষা ইন্দুবালার কানে গেল। প্রভাত তার মাসতোত শালিকা সোন্দরীকে নিজের পাড়ার পরেশের লগে বিয়ে দিয়ে গ্রামে একজন কুটুম করেছে নিজের শক্তি পাকাপোক্ত করার জন্যে।
ফটকি নদীর ওপারে গোসাইগাঁও এ শিবানীর বিয়ের জন্যে ছেলে দেখতে যাওয়ার আগে প্রভাত মাকে প্রণাম করে বলল- শিবানীর জন্যি ছাওয়াল দেখতি যাতিছি।
প্রভাতের কথা শুনে প্রতিবাদ করার ইচ্ছে ইন্দুবালার মনে জাগলেও শুভকাজে যাত্রার সময় ব্যাগড়া দিতে তার মন সায় দিল না। সে শুধু বলল- আচ্চা , ভালয় ভালয় আসগে।


ছেলে দেখে ফিরে এসে প্রভাত যতটা ছেলের বাড়ি, ছেলের মা ও বোনের প্রশংসা করল তার চেয়ে বেশি গুণগান করল প্রভাতের ভায়রা পরেশ আর মনদা ঘটক। প্রভাত তার মাকে শুধু বলল- ছাওয়ালের বয়স একডু বেশি, তাহলি পারে কিন্তুক জমিজিরেত আর ব্যবসাপাতি অঢেল। বোনডার বিয়ে হয়ে গেলিপারে সব কিচুরই মালেক জামাইবাবাজি।
সেখানে প্রভাতের ভায়রা পরেশ ও পরেশের বউ সোন্দরী ছিল। প্রভাতের কথা শুনে সোন্দরী তার ভগ্নিপতি প্রভাতকে বলল- ছাওয়ালের আবার বয়স বোলে কিছু আছে নাকি, সোনার আংটি বাঁকাও ভাল।


এবার ছেলে পক্ষের মেয়ে দেখতে আসার পালা হলেও তার কিন্তু প্রথমে এলো না। ইন্দুবালার বাড়ির বউরা প্রভাতের শালি পরেশের বউ সোন্দরীরা এবার দলবল সহ গোসাইগাঁও গেলেও তাদের শ্বশুরশাশুড়ি কার্তিক ও ইন্দুবালাকে যাওয়ার কথা কিন্তু বলল না। এতে কার্তিক মন্ডল মনে কিছু না নিলেও ইন্দুবালা মনে মনে গোসা করলো । কিন্তু কিছুই কাউকে বলল না। বউরা ফিরে এসে হবু জামাই ব্রজগোপাল, তার মা ও বোনের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। প্রভাতের ভায়রা পরেশের বউ মানে প্রভাতের শালি সোন্দরী সারা গ্রাম ঘুরে ঘুরে হবু জামাই ব্রজগোপালদের কত যে প্রশংসা করল ! সোন্দরীকে গ্রামের লোকেরা বিশেষ করে মহিলারা গেজেট বলে ডাকে , সে তার মাজা ব্যাঁকা শাশুড়ি বুড়ির দিয়ে রান্নাবান্না থেকে যাবতীয় কাজকর্ম করিয়ে নিজে পাড়ায় পাড়ায় গল্প করে বেড়ানোই তার কাজ।
সোন্দরীর শাশুড়ি কমলাসুন্দরী তাকে বলল- পরেশরা বলতিছিল ছাওয়ালের বয়স নাহি বেশি, শ্বশুর জামাই এক জায়গায় দাঁড়ালে জামাইকে শ্বশুর আর শ্বশুরকে জামাই মনে হবি। শাশুড়ির কথা শুনে কথা শুনে পরেশের বউ সোন্দরীর আবারও বলল- সোনার আংটি বাঁকাও ভাল, পুরুষ মানুষের আবার বয়স!


হবু জামাইয়ের প্রশংসায় সবাই পঞ্চমুখ। তারপর ব্রজগোপাল বন্ধুবান্ধব নিয়ে শিবানীকে দেখতে এল। শিবানী স্কুলের ইউনিফরম আর জামা পাজামা ছাড়া পরেনি। ওই দিন তাকে শাড়ি পরে ছেলে পক্ষের সামনে বসতে হল। ছেলের মামা শ্যামসুন্দর ব্রজগোপালের গার্জিয়ান। শ্যামসুন্দর মনে মনে ভাবল- ভাগনের বিয়ে দেওয়ার জন্য কম চেষ্টা করেনি। এত বয়সী ছেলে সাথে বিয়ে দিতে কোন বাবা মাই মাইয়্যা দিতি রাজি হয় না।


সে এবার ভাবল - মেয়েটি বাচ্চা হলেও বিয়ের জল গায়ে পড়লে বড় হতে কয়দিন। দুই পক্ষ রাজি হওয়ায় শিবানীর বিয়ে দিন ক্ষণ স্থির হল। ছেলেকে আশীর্বাদ করতে প্রভাত ভায়েরা পরেশ , পরেশের বউ সোন্দরী এবং শিবানীর মা ও তার জাদের গোসাইগাঁও গেল ।গ্রামের দুএকজন মাতবরকেও সাথে নিল। শুধু সঙ্গে নিল না তার বাবা ও মাকে।


কয়েক মাস পরে শিবানীর বিয়ে। ছেলে পক্ষ এর মাঝে দশ বার আত্মীয়স্বজন ও মাতবর সঙ্গে করে এসে শিবানীকে আর্শীবাদ করে গেল। বিয়ের আগ থেকেই বর ও কণে না পক্ষের মধ্যে আত্মীয়ের সম্পর্ক গড়ে উঠল। তারপর একদিন ঘটা করে শিবানীর বিয়ে ভাল ভাবেই হয়ে গেল। কিন্তু শিবানীর বিয়ের পর কয়েকদিন যেতে না যেতেই থলের বিড়াল বেড়িয়ে পড়ল।


ইন্দুবালার মনে সংশয় লেগে ছিল তার নাতনি শিবানীর হবু বরকে দেখার পর থেকেই। তার একটাই ভাবনা এত বছর বয়সী নাতি জামাই তার নাতনি শিবানীকে মানিয়ে নিতে পারবে তো! সে মনে মনে ভাবল যে শিবানী সুখী হলেই তাদের সুখ।

প্রভাত এক মাইক্রোবাস ভর্তি করে আত্মীয়স্বজনদের কে নিয়ে শিবানীর বউভাতে গেল। এবারও ইন্দুবালা ও কার্তিক মন্ডলকে শিবানীর বাড়িতে নিয়ে গেল না প্রভাত। কিন্তু প্রভাত এবারও পরেশের বউ সোন্দরী, শিবানীর মা, তার জাদের সাথে গ্রামের মাতবরদের নিয়ে গেল বউভাতে। প্রভাতের ছোট ভাইয়েরা, মদন গোপাল ঘটকও তাদের সাথে গেল। আশীর্বাদের সময় না যাওয়া সোন্দরীর মাসি কদমবালা মানে প্রভাতের মাসি শাশুড়ি মহিলাদের মধ্যে এবারই প্রথম শিবানীর শ্বশুড়বাড়ি গোসাইগাঁও এসেছে।


আসলে প্রভাত তার কর্তা নয়, কর্তা তার বউ মানে শিবানীর মা। শিবানীর মায়ের ইচ্ছে ছিল বউভাতের পর শিবানী ও ব্রজগোপাল জামাইবাবাজীকে নিয়ে আসবে তাদের ওখানে ফিরানি ভাঙতে। শিবানী বুঝল ব্রজগোপালের বাড়ির আসল কর্তা তার বোন হেমাঙ্গী। হেমাঙ্গীর হাবভাব দেখে মনে সোন্দরীর মাসি কদমবালা মোটেই ভাল ঠেকল না। হেমাঙ্গী ব্রজগোপালকে বলল- দাদা,ফিরানি ভাঙার পরে দিনই বউকে নিয়ে বাড়ি ফিরে আসবি কিন্তুক। সে সময় কদম মাসি হেমাঙ্গীর কথায় প্রতিবাদ করে বলল- নতুন জামাই আবার ফিরানি ভাঙতে য্যায়ে শ্বশুর বাড়ি একদিন থ্যাকে নোতুন বউ নিয়ে বাড়ি ফেরে তাতো বাপের জম্মে কহন শুনিনি।
-এবারে জামাইয়ের দৌলতে শুনে রাখুন ।শিবানীর কলেজে পড়া ননদ হেমাঙ্গী কদম মাসিকে বলল। কথার পৃষ্ঠে কথা বলতে কদম মাসিও কিন্তু কম যায় না। নতুন কুটুম বাড়ি ভেবে সে আর কথা না বাড়াতে চাইলেও তবুও সে হেমাঙ্গী বলল- এ বাড়ির হত্তাকর্তা কি তুমি। ব্রজগোপালের কলেজে পড়া একডা অবিয়েত্তো বোন আছ বিয়ের আগে জানতি পারলি এত বছর বয়সী ছাওয়ালের সঙ্গে শিবানী দিদিভাইয়ের বিয়ে দিতে দিতাম না। কদমবালার কথা শুনে হেমাঙ্গী ও তার মা তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল। কদমবালাকে যাচ্ছেতাই বলে গালিগালাজ করতে দ্বিধা করল মা ও মেয়ে।


ব্রজগোপাল ফিরানি ভাঙতে এসে তার বোন হেমাঙ্গীর কথা মত ফিরানি ভাঙার পর দিনই শিবানীকে নিয়ে বাড়ি ফিরে গেল। কদম মাসি সোন্দরীকে বলল- এত বয়সী ছাওয়ালের সাথে নাবালিকা শিবানীর বিয়ে দিতে আমার মন সায় দ্যায়নি। তুই গেয়ে বেড়াতে লাগলি ছাওয়ালের বয়স হইছে তাতে কী ! সোনার আংটি বাঁকাও ভাল !


শিবানী ফিরানি ভেঙে শ্বশুর বাড়ি ফিরে যাওয়ার পর থেকেই শিবানীর উপর আসল খেল শুরু করল। শাশুড়ির চোখে বেটার বউ মন:পুত নয় শিবানী শাশুড়ির কথাবার্তায় দু’চার দিন গেলেই বুঝতে পারল। ব্রজগোপালে মা ও বোন হেমাঙ্গীকে গুজুরফুসুর করতে দেখে শিবানী কিছুই বুঝতে পারল না। তার নিজের বাবার বয়সের চাইতে বড় স্বামীকে আসলে শিবানী ভয় পায়।


পরদিন থেকে বাড়িতে হুলুস্থুল কান্ড শুরু হল। হেমাঙ্গী এর গলার সোনার হার খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বেটি ও মা সব জায়গায় হারটা খুঁজে খুঁজে হয়রান। তারা শিবানীর বাক্স পেটরা খুঁজে পেতে দেখতেও তারা কসুর করল না। হেমাঙ্গী প্রথমে কথাটা বলল- কালুখালীর গদাগুণীনের কাছে গেলে কে আমার সোনার হার নিয়েছে জানতে পারা যাবে, মা। মা বেটি ছাড়াও অনেকেই জানে গদাগুণীর একজন ধাপ্পাবাজ।


শিবানী দিদিমা কদমবালার ওপর হেমাঙ্গীর রাগ তখনো পড়েনি। সে ও তার মা যুক্তি করে ঠিক করল শিবানীর কদম দিদিমাকে জব্দ করতেই হবে। কালুখালীর গদাগুণীনকে কাজে লাগিয়ে কদমবালাকে নাকানী চুবানী খাওয়াতে আর শিবানীর বাবার কাছ থেকে একটা সোনার হারের টাকা আদায় করতে হবে।


পরদিন কলেজ থেকে ফেরার পথে হেমাঙ্গী গদাগুণীনের বাড়ি যেয়ে তার সহকারী বঙ্কাজী সাথে দেখা করে তার সোনার হার চোরের হদিস দেওয়ার কথা বললে বঙ্কাজী বলল- আপনি কাহাকে সন্দেহ করিতেছেন তাহার তাহার নাম আমাকে লিখিয়া দিন । কে আপনার হার চুরি করিয়াছে তাহা আপনি প্রকাশ করিতে পারিতেছেন না সেই নামটি গুণীনবাবাজী জনসমক্ষে প্রকাশ করিয়া দিবেন।
বঙ্কাজী সাধু ভাষায় কথা বলেন আর সবাইকে আপনি বলে সম্বোধন করেন। । গলায় জবাফুলের মালা। কপালে সিঁদুরের লম্বা টান। ছেলেটির বয়স একুশ থেকে পঁচিশের মধ্যে হবে। ফর্সা আর সুঠামদেহী খুব সুন্দর বলে ছেলেটিকে হেমাঙ্গীর মনে হল। এমন সুন্দর চেহারা ছেলেটি ধাপ্পাবাজি কাজের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়েছে তা হেমাঙ্গী ভেবে পেলে না। কলহপ্রিয় হলেও হেমাঙ্গী নিজেও কিন্তু সুন্দরী কম নয়।
ছেলেটি ভেবে অবাক হল -গুণীনজীর আখড়ায় এমন সুন্দরী মেয়ে তো কখনোই আসে না, আসে যত বদখত বুড়োথাড়া মহিলা কিংবা পুরুষেরা। সে উৎসুক দৃষ্টিতে হাসি হাসি মুখে হেমাঙ্গীর পানে তাকে বলল- - আগামীকাল মঙ্গলবার , ভাল দিন। আপনাদের বাড়িতে যাওয়া আসা করিয়া থাকে কিংবা দুই একদিন অবস্থান করিয়াছে এমন জনা কয়েক লোকের নামের একটি তালিকা এবং তাহার সাথে একান্নটি টাকা আপনি আগামীকাল দ্বিপ্রহরের আগে আমার মাধ্যমে গুণীনজীর কাছে জমা দিবেন। তবে একটি কথা হইতেছে যে এখানে আসিবার সময় গ্রামের অথবা পাড়ার মোড়লমাতুব্বর ,মেম্বার ও পণ্যমান্য লোকজনদেরকে সাথে নিয়া আনিবেন।
গদাগুণীজীর সহকারী বঙ্গাজীর হাতে কদমবালার নামটা জমা দিয়ে হেমাঙ্গী বাড়ি দিকে পা বাড়ালে ছেলেটি পেছন থেকে ডাক দিয়ে বললেন- ওই তালিকায় কিন্তু এই নামটি অবশ্যই থাকে।
- ঠিক আছে ।
- এতক্ষণ আপনার সঙ্গে কথা হইল , কিন্তু আপনার নামটি আমার শোনাই হইল না। হেমাঙ্গী তার নামটি তাকে বলে ওখান থেকে বাড়ির পথ ধরল।
এর মাঝে শিবানী ফোন করে তার মাকে জানাল আমারে ননদের সোনার হার হারিয়ে গেছে। তা দিয়ে এখানে গোন্ডগোল পাকিয়ে উঠেছে। পরদিন হেমাঙ্গী, তার মা এবং ব্রজগোপাল মোড়ল মেম্বার ও গ্রায়ের লোকজনদের কে নিয়ে গদাগুণীনের বাড়ি যেয়ে হাজির হলো। হেমাঙ্গী গদাগুণীনজী সহকারী বঙ্কাজীর হাতে সন্দেহভাজন চোরদের নামের তালিকার সঙ্গে একান্ন টাকা জমা দেবার সময় হেমাঙ্গীর মনে হল ছেলেটি যেন একটু বেশিই সাজগোজ করেছে। হেমাঙ্গী তার গা থেকে চন্দনের গন্ধ পেল।
- গুণীনজী ভেতরে পুজো করতিছেন। এখনই তিনি বাইরে আসবেন।


একটু পরেই গদাগুণীনজী বাইরে এলেন, হাতে পুজোর ফুল। ঘরের বারান্দায় আসন পেতে রেখেছে। গদাগুণীজী সেই আসনে বসে বঙ্কা নামের ছেলেটির কাছ থেকে সন্দেহভাজন চোরদের নামের তালিকার হাতে নিয়ে ধ্যানস্থ হলেন। ঘন্টা খানেক পরে তার ধ্যান ভাঙাল। এক সময় তিনি হেমাঙ্গীর দেওয়া তালিকার উপর চোখ রেখে বলে উঠলেন। কদমবালা।


হেমাঙ্গীদের সঙ্গে আসা ইউনুস মেম্বার সহ গ্রামের লোকেরা এক সঙ্গে বলে উঠল- ব্রজগোপাল , কদমবালা আবার কে? ব্রজগোপাল জবাব দেওয়ার আগেই হেমাঙ্গী কদমবালার পরিচয় দিল।
ইউনুস মেম্বার এলাকার খুব প্রভাবশালী,গুণীনজীর বুজুর্কী জানতে তার বাকি নেই। সামনে ইলেকশন তাই এ সব বুজুর্কীর কথা জেনেও ইউনুস নিশ্চুপ!


বাড়ি ফিরে হেমাঙ্গী ও তার মা প্রচার করে দিল নতুন বউয়ের দিদিমা কদমবালাই হেমাঙ্গীর সোনার হার চুরি করেছে। শিবানীর বিশ্বাস হল না তার কদম দিদিমা এটা করতে পারে। শিবানীর শাশুড়ি তার মা ও বাবাকে ফোন করে জানাল হেমাঙ্গীর সোনার হার তাদের কদম মাসি চুরি করেছে। ভাল ভালয় যেন ওটা ফেরত দিয়ে যায়। খবরটা শুনে কদমবালা তো হতবাক!
তারপর থেকে ঘন্টায় ঘন্টায় ফোন আসতে লাগল। শিবানীর মা তার জামাই ব্রজগোপালকে ফোন করে আসল বিষয়টা জানতে চাইলে জামাইবাবাজী ফোনটা রিসিভ করে আমতা আমতা করে কী যেন বলে ফোনটা তার বোন হেমাঙ্গীর কাছে দিল। হেমাঙ্গী যে ভাষায় যা বলল তা ভাষায় ব্যক্ত করার নয়।
শিবানী বাবা মা ও পরেশ অনেক চেষ্ট করেও জামাই ব্রজগোপালের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করতে না পেরে শিবানীর সঙ্গে কথা বললে সে বলল- তোমরা এসে এর ফয়সালা করে যাও নইলে আমাকে নির্যাতন ----
এইটুকু বলে সে ফোন কেটে দিল। ওখানকার ইউনুস মেম্বার প্রভাতের পরিচিত, তাই আসল ঘটনা জানার জন্যে তাকে ফোন করে জানতে পারল যে এ সব ধাপ্পাবাজী, সামনে ইলেকশন সে নিজে কিছু বলতে পারছে না।
তিনি শেষে বললেন- আপনার আসেন, আমি থেকে একটা ফয়সালা করে দেব। এবার শিবানীর বাবা হেমাঙ্গীর কাছে ফোন করে জানিয়ে দিল তারা কয়েকজন তাদের ওখানে যে কোনদিন যাবে বিষয়টার ব্যাপারে। প্রভাত ভাবল- জামাই বাড়ির আসল কর্তা জামাই নয় , আসল কর্তা জামাইয়ের সুন্দরী বোন হেমাঙ্গী ও তার মা। সে ইউনুস মেম্বারকে শুধু ওখানে যাওয়ার তারিখটা জানিয়ে রাখল।


কলেজ থেকে ফেরার পথে গদাগুণীনের বাড়ি কাছাকাছি এলে হেমাঙ্গী শিবানীর বাবার ফোন পেয়ে একটু অস্বস্তিবোধ করে এগিয়ে যেতেই গদাগুণীনের সাকরেদ বঙ্কা নামের ছেলেটিকে দেখতে পেল বকুল গাছটার নিচে প্যান্ট পরে বসে আছে। হেমাঙ্গী ভাবল- হার চুরির বিষয়ে যে ভাবে ঘোট পাকিয়ে উঠছে তাতে ওর পরামর্শ নেওয়াও দরকার। সে তাকে সব কথা খুলে বললে ছেলেটি হেমাঙ্গীকে বলল -নাজেহাল হতে না চাইলে তুমি তোমার চুরি না যাওয়া হারটা আর লুকিয়ে রেখ না।
ছেলেটার কথা হেমাঙ্গী মনে ধরল। হারটা লুকিয়ে রেখে কদমবালাকে জব্দ করা যাবে না।


সেদিন সন্ধ্যায় কালুখালী বাজারে ইউনুস মেম্বার ব্রজগোপাল বলল যে তার শ্বশুররা আগামীকাল আসছে। - তোরা সবাই কিন্তু বাড়ি থাকিস। ব্রজগোপাল বাড়ি ফিরে ইউনুস মেম্বারের বলা কথাটা মা ও বোনকে বলল। সে তার বউ শিবানীকেও তার বাপমাদের আসার কথাও বলল। হেমাঙ্গী ও তার মা ঘুজুরঘুজুর ফুসুর ফুসুর করার পর তারা দুজনেই শিবানীকে গালমন্দ করতে শুরু করল। শিবানী গালমন্দ খেয়ে কাঁদতে শুরু করল।


ব্রজগোপাল ইয়ারবন্ধুদের সাথে তাস খেলতে গেছে বটতলায়। শিবানী রাতে ভাবল – বাপমা এলে এবার সে এখান থেকে তাদের সঙ্গে চলে যাবে। পরদিন প্রভাত শিবানীর মা, তার মাসি কদমবালা , পরেশ, পরেশের বউ সোন্দরীকে নিয়ে শিবানীর শ্বশুর বাড়ির উদ্দেশ্যে টেম্পুতে ওঠবার সময় শিবানী শাশুড়ির ফোন পেয়ে প্রভাত তো অবাক! শিবানীর শাশুড়ি বলল যে হেমাঙ্গীর সোনার হার পাওয়া গেছে তার নিজের আলমারীতে, ও ভুল করে ওটা রেখেছিল। আপনারা আসেছেন ------
প্রভাত রাগের চোটে ফোন কেটে দিয়ে ইউনুসকে মেম্বারকে ফোন করে সব কথা খুলে প্রভাত। শিবানীর দিদিমা কদমবালাকে চোর অপবাদ দিয়ে জব্দ করতে না পারায় হেমাঙ্গী ও তার মা শিবানীর ওপর অকথ্য নির্যাতন চালাতে থাকে। আর তাকে বলে, তোকে আমরা জীবন থাকতে বাপের বাড়ি পাঠাবো না।


কয়েকদিন যেতে না যেতেই শিবানীদের পাড়া প্রতিবেশিরা কানাঘুষা শুনতে পায় শিবানীর শ্বশুর বাড়ি থেকে মেম্বার মাতুব্বর আসছে শিবানীর বাপের বাড়িতে কাদের দোষ আর কাদের গুণ যাচাই করার জন্যে তাদের সঙ্গে প্রভাতের জামাই মেয়েও আসবে। প্রভাতের ভায়রা ভাই পরেশ বলে বেড়াতে থাকে যে ব্রজগোপালের মা ও হেমাঙ্গীও আসছে। এবার বিচার কাকে বলে দেখতে পাবে বাছাধনরা।


সত্যি সত্যি ইউনুস মেম্বার ব্রজগোপাল, শিবানী ও গ্রামের মাতুব্বর মোড়লদের নিয়ে এক টেম্পু ভরে প্রভাতদের বাড়িতে আসে, তারা কিন্তু শিবানীর শাশুড়ি ও হেমাঙ্গীকে সঙ্গে আনতে পারে না। খাওয়া দাওয়ার পরে বিচার বসলে প্রথমে শিবানীর জবানবন্দী নিলে প্রকাশ পায় ব্রজগোপালের আসকারার তার মা বোন নাবালিকা শিবানীর ওপর যারপর নেই অত্যাচার চালিয়েছে। এমনকি প্রায় রাতেই শিবানীকে তার স্বামী বজ্রগোপালের সাথে শুতে দেয়নি। শিবানীর কথা শোনার পর ইউনুস মেম্বার ব্রজগোপালকে জিজ্ঞেস করে এ সব কথা সত্যি কিনা। ব্রজগোপাল কোন জবাব না দেওয়ায় ব্রজগোপালের সম্পর্কে মামা গোলক মোড়ল ব্রজগোপালকে একটা চড় কশে দেয়। ওখান থেকে আসা সবাই ব্রজগোপালকে গালমন্দ করে রায় দিয়ে যায় যে ব্রজগোপালকে শ্বশুর বাড়িতে সাতদিন থেকে তার বউ শিবানীর সঙ্গে ঠিকঠাক মত মেলামেশা করতে হবে এবং শ্বশুরশাশুড়ির সেবাযত্ন করার পর তারা খুশি হলে তার সঙ্গে শিবানীকে শ্বশুর বাড়িতে পাঠাবে।
ব্রজগোপাল সালিশের রায় মেনে নিয়ে শ্বশুর বাড়িতে থেকে যায়। কিন্তু ভোর রাতের দিকে ব্রজগোপাল কাউকে এমনকি তার বউ শিবানীকে কিছু না বলেই পালিয়ে যায়, শিবানীর কাছ থেকে খবর জেনে বাসস্ট্যান্ড থেকে ব্রজগোপলকে প্রভাত ও পরেশ গিয়ে পাকড়াও করে আনে। কিন্তু ব্রজগোপাল তার মা ও বোনের সঙ্গে ফোনে কথা বলে পরদিন আবার চম্পট দেয় । শিবানী ও শিবানী মার কান্নার শব্দ শুনে এগিয়ে আসে ইন্দুবালা , কদমবালা, সোন্দরী ও পাড়াপ্রতিবেশিরা। সব কথা শুনে ইন্দুবালা বলল- সোন্দরী তার ভগ্নিপতি প্রভাতকে কইছ্যাল- ছাওয়ালের আবার বয়স বোলে কিছু আছে নাকি, ছাওয়াল হলো সোনার আংটি , আর সোনার আংটি বাঁকাও ভাল।
0

গল্প - মনোজ কর

Posted in




















১৭ পর্ব

বিকালবেলায় সুন্দরী এসে খবর দিল যে ছোটকালী এসেছে দেখা করতে। পানু রায় জিজ্ঞাসা করলেন,’ রেগে আছে দেখলে?’

-রেগে আছে বৈকি। রাগে ফুঁসছে। মনে হচ্ছে একটা কিছু ঘটাবে।

-তাহলে আর দেরি না করে ওনাকে ভেতরে নিয়ে এস।

-জগাইকে বলি কিছু লোকজন নিয়ে কাছাকাছি অপেক্ষা করতে?

-না,না, ওসব কিছু দরকার নেই।

-দাদু, ছোটকালী কিন্তু বেশ ষন্ডামার্কা। গায়ে খুব জোর। তোমার বয়সের কথা মাথায় রেখো। যদি হাত চালিয়ে দেয় বিপদ হয়ে যাবে।

-সেটা ঠিক কিন্তু ও যদি দেখে আমি লোকজন জড়ো করছি তাহলে ভাববে আমি ভয় পেয়েছি। সেটা একদম ভালো হবে না। মুখোমুখি হলে অত রাগ থাকবে না। আমি আশা করি ওকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলতে পারব। অত ভয় করার কিছু নেই। দেখাই যাক না কী হয়। ওকে পাঠিয়ে দাও।

-ঠিক আছে। তুমি যখন বলছো আমি পাঠাচ্ছি কিন্তু ব্যাপারটা আমার মোটেই ভালো লাগছেনা।

কিছুক্ষণ পরে দড়াম করে দরজা খুলে ছোটকালী ঢুকল। মুখে চোখে রাগ ফেটে বেরোচ্ছে। পানু রায়ের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলল,’ আপনি এসব কী করছেন, মিঃ রায়?’

পানু রায় বললেন,’ আগে একটু বসুন শান্ত হয়ে। আমাকে বলুন আমার প্রতি আপনার এই রাগের কারণ কী? ‘

-আমি জানতে চাই আপনি এই সব খুনখারাপির মধ্যে আমার স্ত্রীকে কেন টেনে আনার চেষ্টা করছেন?

-আমি জানিনা আপনি একথা আমাকে কেন বলছেন? আমি বুঝতে পারছিনা আমি কী ভাবে আপনার স্ত্রীকে এই ব্যাপারে টেনে আনলাম।

-দুনিয়াশুদ্ধু লোক জানে আপনি এসব করেছেন শুধু আপনি নিজেই জানেননা।

-কিন্তু আগে বলুন আমি কী করেছি?

-আপনি ওকে শিবুলাল হত্যার মূল আসামি বলে প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করছেন।

-কিন্তু কী ভাবে?

-আপনি আমাকে রেবার কাছে বন্দুক নিয়ে যেতে বলেছিলেন। এই ব্যাপারে আমার জড়িয়ে পড়ার জন্য আপনিই দায়ী। আপনি যদি আমাকে এর সন্তোষজনক কোনও ব্যাখ্যা না দিতে পারেন তাহলে আমি আপনাকে ছাড়বোনা। মেরে চোয়াল ভেঙে দেব তারপরে এখান থেকে যাবো।

- তাতে আপনার কি কোনও লাভ হবে?

-অন্তত আমার মনের জ্বালা মিটবে।

-এমনও হতে পারে যে আপনি ফেরার সময় ভাঙা চোয়াল নিয়ে ফিরলেন। যাই হোক আমি বলতে চাইছি তাতে আপনার বা আপনার স্ত্রীর কোনও লাভ হবেনা। উল্টে কালকের কাগজের জন্য আপনি একটা গল্প তৈরি করবেন। আমার এবং আপনার এই মারপিটের খবর বাজারে ভালোই কাটবে।

-গল্পতো আপনি তৈরি করেই দিয়েছেন। গল্পের আর কী বাকি আছে?

-না, কোনও গল্প তৈরি হয়নি। কোনও গল্প তৈরি হবেনা যদিনা আপনি বোকার মত ওদের গল্পের জন্য কিছু মশলা ইতিমধ্যেই দিয়ে থাকেন। এখন চুপ করে বসুন এবং আমাকে বলুন কী হয়েছে। আর তা না হলে আপনি এখন আসতে পারেন। আমি ব্যাপারটা বুঝে নেব।

ছোটকালী পানু রায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে টেবিলের দিকে এগিয়ে গিয়ে কিছুটা বাঁদিকে সরে ধারে গিয়ে টেবিলের ওপর ভর দিয়ে আধবসা হয়ে বললো,’ হেনা কাঠমান্ডুতে কাজ করতো এবং শিবুলাল ওকে চিনতো।‘

-ধরে নিতে পারি হেনা আপনার স্ত্রীর নাম।

-হ্যাঁ। হেনা পান্ডে আমার স্ত্রীর নাম। হেনা যে ক্যাসিনোতে কাজ করতো সেখানে শিবুলালের যাতায়াত ছিল। ঐ ধরণের কাজে মেয়েদের সবাই অন্যভাবে দেখে। হেনার কোনও সত্যিকারের বন্ধু ছিলনা। সবাই আসত, আলাপ করত কিন্তু স্বার্থসিদ্ধি না হলে চলে যেত। শিবুলাল ছিল স্থানীয় লোক ওর বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহার হেনার ভালো লেগেছিল।

-এবং ওরা মাঝে মধ্যে কাজের বাইরে মেলামেশা করতো?

-হ্যাঁ। ওরা প্রায়ই নিজেদের মধ্যে দেখা করতো।

-হেনা জানতো যে শিবুলাল এখানে এসেছিল?

-কাগজে আমাদের বিয়ের খবরটা ছাপার পর শিবুলাল ওকে ফোন করে অভিনন্দন জানিয়েছিল।

-তাতে অন্যায়ের কিছু নেই।

-আলবত আছে। শিবুলালের অ্যাপার্টমেন্টে তল্লাসি চালানোর সময় পুলিশ একটা নোটবুকের সন্ধান পায় যাতে হেনার ফোন নম্বর লেখা ছিল। আর হেনার ফোনের ডিরেক্টরিতে পুলিশ শিবুলালের ব্যক্তিগত ফোন নম্বর পায়।

-আর কিছু বলবেন?

-সেদিন রাত্রে যেদিন শিবুলাল খুন হয় আমি ব্যবসার কাজে একজন ডিলারের কাছে যাই। ঐ ডিলারের গোটা কুড়ি গাড়ি বিক্রি হচ্ছিল না। বিক্রি না হলে নতুন মাল তুলতে পারবে না। আমি ভাবলাম এটা একটা ভালো সুযোগ। কমদামে যদি কিছু গাড়ি পাওয়া যায় তাহলে ভালোই হয়।

-আপনি ঐ ডিলারকে আগে জানিয়েছিলেন যে আপনি যাবেন?

-হ্যাঁ, আমি অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়েই গিয়েছিলাম।

-কটার সময় ছিল অ্যাপয়ন্টমেন্ট?

-ঐ নিয়ে চিন্তা করবেন না। আমি সেই সময় কোথায় ছিলাম তার প্রতিটি মিনিটের হিসাব এবং প্রমাণ আমি দিতে পারি।

-আপনি কি সঙ্গে করে বন্দুক নিয়ে গিয়েছিলেন?

-না, আমি বন্দুক টেবিলের ড্রয়ারে রেখে গিয়েছিলাম।

-আপনার স্ত্রী তখন কোথায় ছিলেন?

-কোথায় আবার থাকবে? বাড়িতেই ছিল। আমার জন্যই অপেক্ষা করছিল। আমার ওপর একটু রেগে ছিল কারণ হনিমুনের সময় ওকে রেখে আমি ব্যবসার কাজে বাইরে বেরিয়েছিলাম।

-আপনি যখন বাড়ি ফিরলেন তখন হেনাদেবী বাড়িতে ছিলেন?

-হ্যাঁ, অবশ্যই। থাকবে না তো কোথায় যাবে?

-আপনি ক’টার সময় ফিরেছিলেন?

-সাড়ে ন’টা-দশটা হবে।

- ততক্ষণ আপনার বন্দুকটা আপনার অফিসের ড্রয়ারেই ছিল?

- হ্যাঁ, ফিরে এসে আমি বন্দুকটা অফিস থেকে নিয়ে তারপর বাড়ি যাই।

-আপনার স্ত্রীর কাছে নিশ্চয়ই আপনার অফিসের চাবি ছিলনা?

-না, মানে হ্যাঁ ছিল। কিন্তু সেটা কোনওদিন হেনা ব্যবহার করেনি। মিঃ রায়, আমি বলছি হেনা সেই সময় বাড়ি ছিল।

-ঠিক আছে, ছিল।

-কিন্তু সমস্যা হচ্ছে যে এটা হেনা প্রমাণ করতে পারবে না। হেনা একা বাড়িতে ছিল এবং আমি ছিলাম ডিলারের অফিসে। হেনার কাছে প্রমাণ করার কোনও রাস্তা নেই যে সে বাড়িতেই ছিল।

-হেনার প্রমাণ করার কোনও দরকার নেই। যদি অন্য কেউ বলতে চায় যে ঐ সময় হেনা বাড়ি ছিলনা তবে প্রমাণের দায়িত্ব তার।

-কিন্তু একটা দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা ঘটেছিল।

-কী ঘটেছিল?

-আমি হেনাকে ফোন করার চেষ্টা করছিলাম কিন্তু ভুলবশত অন্য নাম্বার ডায়াল করায় হেনা ফোন ধরতে পারেনি।

-এ ব্যাপারে কাউকে কিছু বলার দরকার নেই।

-একটা ব্যবসাসংক্রান্ত ব্যাপারে আমি ঐ ডিলারের সঙ্গে কথা বলছিলাম এবং দেনা-পাওনা সংক্রান্ত কিছু তথ্য দেবার জন্য আমার ছোট নোটবুকটা পকেট থেকে বের করতে গিয়ে বুঝলাম ওটা আমি বাড়ির আলমারিতে ফেলে এসেছি।

-এবং আপনি আপনার স্ত্রীকে ফোন করলেন?

-ঠিক তাই

-কিন্তু ফোনটা বেজে গেল এবং কেউ ধরলো না। তাই তো?

-আমি সম্ভবত ভুল নাম্বার ডায়াল করেছিলাম।

-একবার ফোন করেই আপনি ছেড়ে দিলেন।

-না, আমি আবার ফোন করেছিলাম।

-দ্বিতীয়বারেও ফোন বেজে গেল।

-হ্যাঁ, দ্বিতীয়বারেও কেউ ধরলো না।

-দ্বিতীয় ফোনটা কতক্ষণ পরে করেছিলেন?

-পাঁচ-দশ মিনিট হবে। আমরা মাত্র দু’সপ্তাহ আগে ঐ অ্যাপার্টমেন্টে গিয়েছি। নাম্বারগুলো আমার লেখা হয়নি। আমি নিশ্চয়ই ভুল নাম্বার ডায়াল করেছিলাম। হেনা বাড়িতেই ছিল। হেনার সবচেয়ে বড় গুণ যে ও মিথ্যেকথা বলেনা। যা বলার সোজাসুজি বলে।

-যে ডিলারের সঙ্গে আপনি ছিলেন সে কি জানত যে আপনি ফোন করেছিলেন?

-সেটাই তো সমস্যা। ঐ ডিলারের পক্ষে বোঝা সম্ভব ছিলনা যে আমি ভুল নাম্বার ডায়াল করেছিলাম। আমি নিজেই জানতাম না যে আমি ভুল নাম্বার ডায়াল করছি।

-কিন্তু আপনি ফোন করেছিলেন এবং কোনও উত্তর পাননি?

-ঠিক

-কিন্তু আপনার সামনে যে বসেছিল সে বুঝেছিল যে আপনি ঠিক নাম্বারই ডায়াল করছিলেন কিন্তু কোনও উত্তর পাচ্ছিলেন না?

-ঠিক বলেছেন।

-কারণ আপনি আশা করছিলেন যে আপনার স্ত্রী বাড়িতেই আছেন তবুও ফোন ধরছেন না দেখে কিছু মন্তব্য করেছিলেন।

-হ্যাঁ, আমার মনে হয় আমি সেরকম কিছু বলেছিলাম।

-তখন সময় কত ছিল?

-ন’টা হবে খুব সম্ভবত।

-আপনি কটার সময় বাড়ির জন্য রওনা হলেন?

-আমার পক্ষে সেদিন সন্ধ্যেবেলা বাড়ি যাওয়া সম্ভব হয়নি। কাজের অসম্ভব চাপ ছিল। সেদিন ডিলারের কাছ থেকে ফেরার সময় একটা মাত্র স্যান্ডুইচ ছাড়া আর কিছু খাওয়া হয়নি। আমি ভেবেছিলাম তাড়াতাড়ি ফিরে হেনাকে নিয়ে ডিনারে যাব।

-কিন্তু আপনার ফিরতে অনেক দেরি হয়ে গেল?

-হ্যাঁ, খুব দেরি হয়ে গেল।

-একটা স্যান্ডুইচ ছাড়া আর কিছুই খাওয়া হলোনা?

-একেবারে ঠিক।

-আপনি আপনার স্ত্রীকে বললেন রেডি হয়ে বাইরে বেরোতে?

-হ্যাঁ, ওকে বললাম তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নিতে।

-তারপর কী হলো?

-হেনা খুব রেগে গেল কারণ আমি কথা দিয়ে কথা রাখতে পারিনি এবং বিয়ের এই ক’দিনের মধ্যেই এত কাজের চাপ যে আমাকে রাত করে বাড়ি ফিরতে হলো। আমাদের মধ্যে একটু কথা কাটাকাটি হয়েছিল।

-আপনার আর কিছু বলার আছে?

-না আমার এখন আর কিছু বলার নেই। শুধু একটা ব্যাপার আমার জানার আছে। সেটা হচ্ছে কেন আপনি আমার বন্দুক থেকে আমারই টেবিলে গুলি ছুঁড়ে একটা কেলেঙ্কারি ঘটালেন? এখন পুলিশ বলছে আমার বন্দুকটাই খুনী বন্দুক। এটা হাস্যকর এবং অসম্ভব! কিন্তু ওরা যদি এ ব্যাপারে হেনাকে জড়িয়ে দেয় এবং কাগজে হেনার নামে কিছু ছাপা হয় তখন কিন্তু আমি …

- এসব কিছুই হবেনা যদিনা আপনি কিছু উল্টোপাল্টা করেন। পুলিশ ভাবছে আমার কাছে খুনী বন্দুকটা ছিল। আমি সেটা নিয়ে আপনার অফিসে যাই। সেটা থেকে আপনার টেবিলে একটা গুলি ছুঁড়ি। তারপর গন্ডগোলের মধ্যে আমি আপনার বন্দুকের সঙ্গে আমার খুনী বন্দুকটা পাল্টে দিই। আমারটা আপনাকে দিয়ে দিই আর আপনারটা আমার কোটের পকেটে ঢুকিয়ে নিই।

-আপনি বলছেন পুলিশ একথা বলছে? কিন্তু কেন? তাহলে ওরা কেন বলছে যে হেনা অফিসে গিয়েছিল এবং সেখান থেকে বন্দুক নিয়ে শিবুলালের অ্যাপার্টমেন্টে গিয়ে ওকে মেরেছে কারণ সে নাকি হেনাকে ব্ল্যাকমেল করছিল? আপনি কী করে জানলেন পুলিশ কী ভাবছে?

-ওরা এখানে এসেছিল। আমাকে শাসিয়ে গেছে যে প্রমাণলোপের চেষ্টার অভিযোগে ওরা আমাকে অ্যারেস্ট করবে।

ছোটকালী আস্তে আস্তে টেবিল থেকে একটু দূরে সরে গিয়ে খুব শান্ত গলায় বললো,’ এটা কেন আমার মাথায় আসেনি? এটার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আমি যেন কিছুর গন্ধ পাচ্ছি মনে হচ্ছে। আপনি তো এতটা বোকা বা অসাবধাণী নন যে বিনা কারণে একটা বন্দুক থেকে গুলি ছুঁড়ে দেবেন।‘পানু রায় বললেন,’ যদি খুনী বন্দুকটা আমার কাছেই থাকত, যদি আমি আপনার কাছে গিয়ে আপনার বন্দুকটা আমাকে দিতে বলতাম, যদি আমি আপনার বন্দুক থেকে আপনার টেবিলে একটা গুলি ছুঁড়ে এমন একটা গন্ডগোলের সৃষ্টি করতাম যে সবার অজান্তে আপনার বন্দুকটার সঙ্গে আমার খুনী বন্দুকটা পাল্টে দিতাম…

-আপনি সেটাই করেছিলেন, মিঃ রায়।

-কোন বন্দুক থেকে গুলি ছুঁড়েছিলাম? আপনার বন্দুক থেকে না আমার কাছে যে খুনী বন্দুকটা ছিল সেটা থেকে?

-আমার বন্দুকটা থেকে।

-আপনি একেবারে নিশ্চিত যে আমি আপনার বন্দুকটা থেকেই গুলিটা ছুঁড়েছিলাম?

-একশোভাগ নিশ্চিত। আপনার প্রতিটি মুহূর্ত আমার মনে আছে। আপনি আমার হাত থেকে বন্দুকটা নিলেন। দু-তিনবার বন্দুকটাকে ওপর নীচ করে ব্যালান্স পরীক্ষা করলেন তারপর তৃতীয় বা চতুর্থবার বন্দুকটা টেবিলের দিকে নামিয়ে ট্রিগার টেনে দিলেন।

-যে বন্দুকটা আপনি আমার হাতে দিয়েছিলেন সেই বন্দুকটার কথাই বলছেন তো?

-হ্যাঁ, সেটাই। আপনি তারপর বন্দুক বদল করে দিয়েছিলেন। সবাই যখন ভয়ে এদিক ওদিক দৌড়াদৌড়ি করছে আপনি তখন এই কাণ্ডটা ঘটিয়েছেন। এটা কী করলেন আপনি?

-পুলিশও সেটাই মনে করছে।

ছোটকালী একগাল হেসে বললো,’ যাক বাঁচা গেল। এখন কেসটা পুরো অন্যদিকে ঘুরে গেল। যদি এই ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা থাকে তাহলে ওরা কী ভাবে হেনাকে দোষী সাব্যস্ত করবে? মিঃ রায়, যুদ্ধ এবং ভালোবাসায় সবই সম্ভব। আমি কিন্তু বন্দুক বদলের তত্ত্বে পুলিশের সঙ্গে আছি।‘ পানু রায় হেসে বললেন,’ আপনার কেন মনে হয় আমি আপনাকে পুলিশের এই বন্দুক বদলের তত্ত্ব জানালাম?’ ছোটকালী বেশ কিছুক্ষণ ভেবে পানু রায়ের দিকে এগিয়ে এসে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললো,’ আপনি একজন সত্যিকারের ভদ্রলোক। একটু অপেক্ষা করুন। আমি ততক্ষণে হেনাকে সমস্ত ব্যাপারটা জানাই।‘ পানু রায়ের সঙ্গে করমর্দন করে চলে যাবার সময় দরজা থেকে হঠাৎ ফিরে এসে ছোটকালী বললো,’ আপনার যদি কোনও গাড়ি লাগে বলবেন। আপনার জন্য স্পেশাল ডিসকাউণ্ট থাকবে সবসময়।‘

-আমার এখন কোনও গাড়ির দরকার নেই।

-এখন না হলেও যখনই লাগবে তখনই আপনার জন্য সবচেয়ে কম দামে সবচেয়ে ভালো গাড়ি।

-এক সেকেন্ড, আপনি আমায় বলতে পারবেন কার কার কাছে আপনার অফিসের চাবি থাকে?

-একটা সাফাইওয়ালার কাছে থাকে। আমার স্ত্রী এবং আমার সেক্রেটারির কাছেও একটা করে থাকে।

-আপনার বাবার কাছে?

-হ্যাঁ, বাবার অফিসের একটা চাবি আমার কাছে আর আমার অফিসের একটা চাবি বাবার কাছে থাকে। কিন্তু আমাদের ব্যবহার করার দরকার পড়েনি কখনও।

-এমনিই জিজ্ঞাসা করছিলাম। জানা রইল।

-তাহলে এখন গাড়ি কিনছেন না। ঠিক আছে যখন কিনবেন অবশ্যই বলবেন।

ছোটকালী অফিস থেকে বেরিয়ে গেল। সুন্দরী একগাল হেসে পানু রায়কে বললো,’ দাদু, তুমি পারও বটে। লোকটার সব রাগ গলে জল হয়ে গেল।

পানু রায় সুন্দরীর কথার উত্তর না দিয়ে বললেন,’ জগাই কে ডাক। হেনা পান্ডের সমস্ত খবর আমার চাই। ওকে বলো কাঠমান্ডুর সমস্ত পরিচিত লোককে কাজে লাগাতে। সময় খুব কম।