Next
Previous
Showing posts with label গল্প. Show all posts
0

গল্প - মনোজ কর

Posted in




















১৭ পর্ব

বিকালবেলায় সুন্দরী এসে খবর দিল যে ছোটকালী এসেছে দেখা করতে। পানু রায় জিজ্ঞাসা করলেন,’ রেগে আছে দেখলে?’

-রেগে আছে বৈকি। রাগে ফুঁসছে। মনে হচ্ছে একটা কিছু ঘটাবে।

-তাহলে আর দেরি না করে ওনাকে ভেতরে নিয়ে এস।

-জগাইকে বলি কিছু লোকজন নিয়ে কাছাকাছি অপেক্ষা করতে?

-না,না, ওসব কিছু দরকার নেই।

-দাদু, ছোটকালী কিন্তু বেশ ষন্ডামার্কা। গায়ে খুব জোর। তোমার বয়সের কথা মাথায় রেখো। যদি হাত চালিয়ে দেয় বিপদ হয়ে যাবে।

-সেটা ঠিক কিন্তু ও যদি দেখে আমি লোকজন জড়ো করছি তাহলে ভাববে আমি ভয় পেয়েছি। সেটা একদম ভালো হবে না। মুখোমুখি হলে অত রাগ থাকবে না। আমি আশা করি ওকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলতে পারব। অত ভয় করার কিছু নেই। দেখাই যাক না কী হয়। ওকে পাঠিয়ে দাও।

-ঠিক আছে। তুমি যখন বলছো আমি পাঠাচ্ছি কিন্তু ব্যাপারটা আমার মোটেই ভালো লাগছেনা।

কিছুক্ষণ পরে দড়াম করে দরজা খুলে ছোটকালী ঢুকল। মুখে চোখে রাগ ফেটে বেরোচ্ছে। পানু রায়ের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলল,’ আপনি এসব কী করছেন, মিঃ রায়?’

পানু রায় বললেন,’ আগে একটু বসুন শান্ত হয়ে। আমাকে বলুন আমার প্রতি আপনার এই রাগের কারণ কী? ‘

-আমি জানতে চাই আপনি এই সব খুনখারাপির মধ্যে আমার স্ত্রীকে কেন টেনে আনার চেষ্টা করছেন?

-আমি জানিনা আপনি একথা আমাকে কেন বলছেন? আমি বুঝতে পারছিনা আমি কী ভাবে আপনার স্ত্রীকে এই ব্যাপারে টেনে আনলাম।

-দুনিয়াশুদ্ধু লোক জানে আপনি এসব করেছেন শুধু আপনি নিজেই জানেননা।

-কিন্তু আগে বলুন আমি কী করেছি?

-আপনি ওকে শিবুলাল হত্যার মূল আসামি বলে প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করছেন।

-কিন্তু কী ভাবে?

-আপনি আমাকে রেবার কাছে বন্দুক নিয়ে যেতে বলেছিলেন। এই ব্যাপারে আমার জড়িয়ে পড়ার জন্য আপনিই দায়ী। আপনি যদি আমাকে এর সন্তোষজনক কোনও ব্যাখ্যা না দিতে পারেন তাহলে আমি আপনাকে ছাড়বোনা। মেরে চোয়াল ভেঙে দেব তারপরে এখান থেকে যাবো।

- তাতে আপনার কি কোনও লাভ হবে?

-অন্তত আমার মনের জ্বালা মিটবে।

-এমনও হতে পারে যে আপনি ফেরার সময় ভাঙা চোয়াল নিয়ে ফিরলেন। যাই হোক আমি বলতে চাইছি তাতে আপনার বা আপনার স্ত্রীর কোনও লাভ হবেনা। উল্টে কালকের কাগজের জন্য আপনি একটা গল্প তৈরি করবেন। আমার এবং আপনার এই মারপিটের খবর বাজারে ভালোই কাটবে।

-গল্পতো আপনি তৈরি করেই দিয়েছেন। গল্পের আর কী বাকি আছে?

-না, কোনও গল্প তৈরি হয়নি। কোনও গল্প তৈরি হবেনা যদিনা আপনি বোকার মত ওদের গল্পের জন্য কিছু মশলা ইতিমধ্যেই দিয়ে থাকেন। এখন চুপ করে বসুন এবং আমাকে বলুন কী হয়েছে। আর তা না হলে আপনি এখন আসতে পারেন। আমি ব্যাপারটা বুঝে নেব।

ছোটকালী পানু রায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে টেবিলের দিকে এগিয়ে গিয়ে কিছুটা বাঁদিকে সরে ধারে গিয়ে টেবিলের ওপর ভর দিয়ে আধবসা হয়ে বললো,’ হেনা কাঠমান্ডুতে কাজ করতো এবং শিবুলাল ওকে চিনতো।‘

-ধরে নিতে পারি হেনা আপনার স্ত্রীর নাম।

-হ্যাঁ। হেনা পান্ডে আমার স্ত্রীর নাম। হেনা যে ক্যাসিনোতে কাজ করতো সেখানে শিবুলালের যাতায়াত ছিল। ঐ ধরণের কাজে মেয়েদের সবাই অন্যভাবে দেখে। হেনার কোনও সত্যিকারের বন্ধু ছিলনা। সবাই আসত, আলাপ করত কিন্তু স্বার্থসিদ্ধি না হলে চলে যেত। শিবুলাল ছিল স্থানীয় লোক ওর বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহার হেনার ভালো লেগেছিল।

-এবং ওরা মাঝে মধ্যে কাজের বাইরে মেলামেশা করতো?

-হ্যাঁ। ওরা প্রায়ই নিজেদের মধ্যে দেখা করতো।

-হেনা জানতো যে শিবুলাল এখানে এসেছিল?

-কাগজে আমাদের বিয়ের খবরটা ছাপার পর শিবুলাল ওকে ফোন করে অভিনন্দন জানিয়েছিল।

-তাতে অন্যায়ের কিছু নেই।

-আলবত আছে। শিবুলালের অ্যাপার্টমেন্টে তল্লাসি চালানোর সময় পুলিশ একটা নোটবুকের সন্ধান পায় যাতে হেনার ফোন নম্বর লেখা ছিল। আর হেনার ফোনের ডিরেক্টরিতে পুলিশ শিবুলালের ব্যক্তিগত ফোন নম্বর পায়।

-আর কিছু বলবেন?

-সেদিন রাত্রে যেদিন শিবুলাল খুন হয় আমি ব্যবসার কাজে একজন ডিলারের কাছে যাই। ঐ ডিলারের গোটা কুড়ি গাড়ি বিক্রি হচ্ছিল না। বিক্রি না হলে নতুন মাল তুলতে পারবে না। আমি ভাবলাম এটা একটা ভালো সুযোগ। কমদামে যদি কিছু গাড়ি পাওয়া যায় তাহলে ভালোই হয়।

-আপনি ঐ ডিলারকে আগে জানিয়েছিলেন যে আপনি যাবেন?

-হ্যাঁ, আমি অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়েই গিয়েছিলাম।

-কটার সময় ছিল অ্যাপয়ন্টমেন্ট?

-ঐ নিয়ে চিন্তা করবেন না। আমি সেই সময় কোথায় ছিলাম তার প্রতিটি মিনিটের হিসাব এবং প্রমাণ আমি দিতে পারি।

-আপনি কি সঙ্গে করে বন্দুক নিয়ে গিয়েছিলেন?

-না, আমি বন্দুক টেবিলের ড্রয়ারে রেখে গিয়েছিলাম।

-আপনার স্ত্রী তখন কোথায় ছিলেন?

-কোথায় আবার থাকবে? বাড়িতেই ছিল। আমার জন্যই অপেক্ষা করছিল। আমার ওপর একটু রেগে ছিল কারণ হনিমুনের সময় ওকে রেখে আমি ব্যবসার কাজে বাইরে বেরিয়েছিলাম।

-আপনি যখন বাড়ি ফিরলেন তখন হেনাদেবী বাড়িতে ছিলেন?

-হ্যাঁ, অবশ্যই। থাকবে না তো কোথায় যাবে?

-আপনি ক’টার সময় ফিরেছিলেন?

-সাড়ে ন’টা-দশটা হবে।

- ততক্ষণ আপনার বন্দুকটা আপনার অফিসের ড্রয়ারেই ছিল?

- হ্যাঁ, ফিরে এসে আমি বন্দুকটা অফিস থেকে নিয়ে তারপর বাড়ি যাই।

-আপনার স্ত্রীর কাছে নিশ্চয়ই আপনার অফিসের চাবি ছিলনা?

-না, মানে হ্যাঁ ছিল। কিন্তু সেটা কোনওদিন হেনা ব্যবহার করেনি। মিঃ রায়, আমি বলছি হেনা সেই সময় বাড়ি ছিল।

-ঠিক আছে, ছিল।

-কিন্তু সমস্যা হচ্ছে যে এটা হেনা প্রমাণ করতে পারবে না। হেনা একা বাড়িতে ছিল এবং আমি ছিলাম ডিলারের অফিসে। হেনার কাছে প্রমাণ করার কোনও রাস্তা নেই যে সে বাড়িতেই ছিল।

-হেনার প্রমাণ করার কোনও দরকার নেই। যদি অন্য কেউ বলতে চায় যে ঐ সময় হেনা বাড়ি ছিলনা তবে প্রমাণের দায়িত্ব তার।

-কিন্তু একটা দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা ঘটেছিল।

-কী ঘটেছিল?

-আমি হেনাকে ফোন করার চেষ্টা করছিলাম কিন্তু ভুলবশত অন্য নাম্বার ডায়াল করায় হেনা ফোন ধরতে পারেনি।

-এ ব্যাপারে কাউকে কিছু বলার দরকার নেই।

-একটা ব্যবসাসংক্রান্ত ব্যাপারে আমি ঐ ডিলারের সঙ্গে কথা বলছিলাম এবং দেনা-পাওনা সংক্রান্ত কিছু তথ্য দেবার জন্য আমার ছোট নোটবুকটা পকেট থেকে বের করতে গিয়ে বুঝলাম ওটা আমি বাড়ির আলমারিতে ফেলে এসেছি।

-এবং আপনি আপনার স্ত্রীকে ফোন করলেন?

-ঠিক তাই

-কিন্তু ফোনটা বেজে গেল এবং কেউ ধরলো না। তাই তো?

-আমি সম্ভবত ভুল নাম্বার ডায়াল করেছিলাম।

-একবার ফোন করেই আপনি ছেড়ে দিলেন।

-না, আমি আবার ফোন করেছিলাম।

-দ্বিতীয়বারেও ফোন বেজে গেল।

-হ্যাঁ, দ্বিতীয়বারেও কেউ ধরলো না।

-দ্বিতীয় ফোনটা কতক্ষণ পরে করেছিলেন?

-পাঁচ-দশ মিনিট হবে। আমরা মাত্র দু’সপ্তাহ আগে ঐ অ্যাপার্টমেন্টে গিয়েছি। নাম্বারগুলো আমার লেখা হয়নি। আমি নিশ্চয়ই ভুল নাম্বার ডায়াল করেছিলাম। হেনা বাড়িতেই ছিল। হেনার সবচেয়ে বড় গুণ যে ও মিথ্যেকথা বলেনা। যা বলার সোজাসুজি বলে।

-যে ডিলারের সঙ্গে আপনি ছিলেন সে কি জানত যে আপনি ফোন করেছিলেন?

-সেটাই তো সমস্যা। ঐ ডিলারের পক্ষে বোঝা সম্ভব ছিলনা যে আমি ভুল নাম্বার ডায়াল করেছিলাম। আমি নিজেই জানতাম না যে আমি ভুল নাম্বার ডায়াল করছি।

-কিন্তু আপনি ফোন করেছিলেন এবং কোনও উত্তর পাননি?

-ঠিক

-কিন্তু আপনার সামনে যে বসেছিল সে বুঝেছিল যে আপনি ঠিক নাম্বারই ডায়াল করছিলেন কিন্তু কোনও উত্তর পাচ্ছিলেন না?

-ঠিক বলেছেন।

-কারণ আপনি আশা করছিলেন যে আপনার স্ত্রী বাড়িতেই আছেন তবুও ফোন ধরছেন না দেখে কিছু মন্তব্য করেছিলেন।

-হ্যাঁ, আমার মনে হয় আমি সেরকম কিছু বলেছিলাম।

-তখন সময় কত ছিল?

-ন’টা হবে খুব সম্ভবত।

-আপনি কটার সময় বাড়ির জন্য রওনা হলেন?

-আমার পক্ষে সেদিন সন্ধ্যেবেলা বাড়ি যাওয়া সম্ভব হয়নি। কাজের অসম্ভব চাপ ছিল। সেদিন ডিলারের কাছ থেকে ফেরার সময় একটা মাত্র স্যান্ডুইচ ছাড়া আর কিছু খাওয়া হয়নি। আমি ভেবেছিলাম তাড়াতাড়ি ফিরে হেনাকে নিয়ে ডিনারে যাব।

-কিন্তু আপনার ফিরতে অনেক দেরি হয়ে গেল?

-হ্যাঁ, খুব দেরি হয়ে গেল।

-একটা স্যান্ডুইচ ছাড়া আর কিছুই খাওয়া হলোনা?

-একেবারে ঠিক।

-আপনি আপনার স্ত্রীকে বললেন রেডি হয়ে বাইরে বেরোতে?

-হ্যাঁ, ওকে বললাম তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নিতে।

-তারপর কী হলো?

-হেনা খুব রেগে গেল কারণ আমি কথা দিয়ে কথা রাখতে পারিনি এবং বিয়ের এই ক’দিনের মধ্যেই এত কাজের চাপ যে আমাকে রাত করে বাড়ি ফিরতে হলো। আমাদের মধ্যে একটু কথা কাটাকাটি হয়েছিল।

-আপনার আর কিছু বলার আছে?

-না আমার এখন আর কিছু বলার নেই। শুধু একটা ব্যাপার আমার জানার আছে। সেটা হচ্ছে কেন আপনি আমার বন্দুক থেকে আমারই টেবিলে গুলি ছুঁড়ে একটা কেলেঙ্কারি ঘটালেন? এখন পুলিশ বলছে আমার বন্দুকটাই খুনী বন্দুক। এটা হাস্যকর এবং অসম্ভব! কিন্তু ওরা যদি এ ব্যাপারে হেনাকে জড়িয়ে দেয় এবং কাগজে হেনার নামে কিছু ছাপা হয় তখন কিন্তু আমি …

- এসব কিছুই হবেনা যদিনা আপনি কিছু উল্টোপাল্টা করেন। পুলিশ ভাবছে আমার কাছে খুনী বন্দুকটা ছিল। আমি সেটা নিয়ে আপনার অফিসে যাই। সেটা থেকে আপনার টেবিলে একটা গুলি ছুঁড়ি। তারপর গন্ডগোলের মধ্যে আমি আপনার বন্দুকের সঙ্গে আমার খুনী বন্দুকটা পাল্টে দিই। আমারটা আপনাকে দিয়ে দিই আর আপনারটা আমার কোটের পকেটে ঢুকিয়ে নিই।

-আপনি বলছেন পুলিশ একথা বলছে? কিন্তু কেন? তাহলে ওরা কেন বলছে যে হেনা অফিসে গিয়েছিল এবং সেখান থেকে বন্দুক নিয়ে শিবুলালের অ্যাপার্টমেন্টে গিয়ে ওকে মেরেছে কারণ সে নাকি হেনাকে ব্ল্যাকমেল করছিল? আপনি কী করে জানলেন পুলিশ কী ভাবছে?

-ওরা এখানে এসেছিল। আমাকে শাসিয়ে গেছে যে প্রমাণলোপের চেষ্টার অভিযোগে ওরা আমাকে অ্যারেস্ট করবে।

ছোটকালী আস্তে আস্তে টেবিল থেকে একটু দূরে সরে গিয়ে খুব শান্ত গলায় বললো,’ এটা কেন আমার মাথায় আসেনি? এটার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আমি যেন কিছুর গন্ধ পাচ্ছি মনে হচ্ছে। আপনি তো এতটা বোকা বা অসাবধাণী নন যে বিনা কারণে একটা বন্দুক থেকে গুলি ছুঁড়ে দেবেন।‘পানু রায় বললেন,’ যদি খুনী বন্দুকটা আমার কাছেই থাকত, যদি আমি আপনার কাছে গিয়ে আপনার বন্দুকটা আমাকে দিতে বলতাম, যদি আমি আপনার বন্দুক থেকে আপনার টেবিলে একটা গুলি ছুঁড়ে এমন একটা গন্ডগোলের সৃষ্টি করতাম যে সবার অজান্তে আপনার বন্দুকটার সঙ্গে আমার খুনী বন্দুকটা পাল্টে দিতাম…

-আপনি সেটাই করেছিলেন, মিঃ রায়।

-কোন বন্দুক থেকে গুলি ছুঁড়েছিলাম? আপনার বন্দুক থেকে না আমার কাছে যে খুনী বন্দুকটা ছিল সেটা থেকে?

-আমার বন্দুকটা থেকে।

-আপনি একেবারে নিশ্চিত যে আমি আপনার বন্দুকটা থেকেই গুলিটা ছুঁড়েছিলাম?

-একশোভাগ নিশ্চিত। আপনার প্রতিটি মুহূর্ত আমার মনে আছে। আপনি আমার হাত থেকে বন্দুকটা নিলেন। দু-তিনবার বন্দুকটাকে ওপর নীচ করে ব্যালান্স পরীক্ষা করলেন তারপর তৃতীয় বা চতুর্থবার বন্দুকটা টেবিলের দিকে নামিয়ে ট্রিগার টেনে দিলেন।

-যে বন্দুকটা আপনি আমার হাতে দিয়েছিলেন সেই বন্দুকটার কথাই বলছেন তো?

-হ্যাঁ, সেটাই। আপনি তারপর বন্দুক বদল করে দিয়েছিলেন। সবাই যখন ভয়ে এদিক ওদিক দৌড়াদৌড়ি করছে আপনি তখন এই কাণ্ডটা ঘটিয়েছেন। এটা কী করলেন আপনি?

-পুলিশও সেটাই মনে করছে।

ছোটকালী একগাল হেসে বললো,’ যাক বাঁচা গেল। এখন কেসটা পুরো অন্যদিকে ঘুরে গেল। যদি এই ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা থাকে তাহলে ওরা কী ভাবে হেনাকে দোষী সাব্যস্ত করবে? মিঃ রায়, যুদ্ধ এবং ভালোবাসায় সবই সম্ভব। আমি কিন্তু বন্দুক বদলের তত্ত্বে পুলিশের সঙ্গে আছি।‘ পানু রায় হেসে বললেন,’ আপনার কেন মনে হয় আমি আপনাকে পুলিশের এই বন্দুক বদলের তত্ত্ব জানালাম?’ ছোটকালী বেশ কিছুক্ষণ ভেবে পানু রায়ের দিকে এগিয়ে এসে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললো,’ আপনি একজন সত্যিকারের ভদ্রলোক। একটু অপেক্ষা করুন। আমি ততক্ষণে হেনাকে সমস্ত ব্যাপারটা জানাই।‘ পানু রায়ের সঙ্গে করমর্দন করে চলে যাবার সময় দরজা থেকে হঠাৎ ফিরে এসে ছোটকালী বললো,’ আপনার যদি কোনও গাড়ি লাগে বলবেন। আপনার জন্য স্পেশাল ডিসকাউণ্ট থাকবে সবসময়।‘

-আমার এখন কোনও গাড়ির দরকার নেই।

-এখন না হলেও যখনই লাগবে তখনই আপনার জন্য সবচেয়ে কম দামে সবচেয়ে ভালো গাড়ি।

-এক সেকেন্ড, আপনি আমায় বলতে পারবেন কার কার কাছে আপনার অফিসের চাবি থাকে?

-একটা সাফাইওয়ালার কাছে থাকে। আমার স্ত্রী এবং আমার সেক্রেটারির কাছেও একটা করে থাকে।

-আপনার বাবার কাছে?

-হ্যাঁ, বাবার অফিসের একটা চাবি আমার কাছে আর আমার অফিসের একটা চাবি বাবার কাছে থাকে। কিন্তু আমাদের ব্যবহার করার দরকার পড়েনি কখনও।

-এমনিই জিজ্ঞাসা করছিলাম। জানা রইল।

-তাহলে এখন গাড়ি কিনছেন না। ঠিক আছে যখন কিনবেন অবশ্যই বলবেন।

ছোটকালী অফিস থেকে বেরিয়ে গেল। সুন্দরী একগাল হেসে পানু রায়কে বললো,’ দাদু, তুমি পারও বটে। লোকটার সব রাগ গলে জল হয়ে গেল।

পানু রায় সুন্দরীর কথার উত্তর না দিয়ে বললেন,’ জগাই কে ডাক। হেনা পান্ডের সমস্ত খবর আমার চাই। ওকে বলো কাঠমান্ডুর সমস্ত পরিচিত লোককে কাজে লাগাতে। সময় খুব কম।

1

গল্প - রাহুল দাশগুপ্ত

Posted in






















ধীরে ধীরে বৃদ্ধ পার্কের ভিতর প্রবেশ করলেন। তাঁর পা দুটো যেন সিসের মতো ভারি হয়ে উঠেছে। তিনি যেন আর নিজের শরীরের ভার বহন করতে পারছেন না। নিজেকে টেনে নিয়ে যেতেও তাঁর কষ্ট হচ্ছে।

গাছের তলায় একটা ফাঁকা বেঞ্চ বেশ পছন্দ হল তাঁর। সেখানেই তিনি বসে পড়লেন। তাঁকে দেখে মনে হচ্ছিল, ভেতরে ভেতরে কোনো কারণে অস্থির হয়ে উঠেছেন। শ্বাস নিতেও তাঁর কষ্ট হচ্ছিল। বাতাসটা কেমন যেন ভারি আর ঘোলাটে হয়ে উঠেছে। একটু পরিষ্কার বাতাসের জন্য তাঁর ভেতরটা যেন আঁকুপাকু করে উঠল।

সন্ধ্যা হবো হবো করছে। গোটা আকাশে কেউ যেন মুঠো মুঠো আবির ছড়িয়ে দিয়েছে। নানা খরনের পাখির ডাকে ভরে উঠেছিল গোটা পার্ক। বিভিন্ন গাছে তারা এসে বসেছিল।

বৃদ্ধের পাশে দুটি অল্পবয়সি ছেলে–মেয়ে এসে বসেছিল। তারা নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে কথা বলছিল। তারা ভেবেছিল, বৃদ্ধ মানুষ, কোনো সমস্যা হবে না। কিন্তু সমস্যা হল।

বৃদ্ধ ছেলেটির পিঠে আঙুল দিয়ে দুবার টোকা মারলেন। ছেলেটি ঝুঁকে মেয়েটির সঙ্গে কথা বলছিল। সে ঈষৎ বিরক্ত হয়ে বৃদ্ধের দিকে তাকাল। তার কপালে ভাঁজ পড়েছে।

বৃদ্ধের মুখটা যেন এক অপার্থিব আনন্দে ভরে উঠেছে। অবশেষে তিনি একজন কথা বলার মানুষ পেয়েছেন। কেউ তাঁর পাশে এসে বসেছে। কারো সঙ্গে তাঁর কথা বলার সুযোগ হয়েছে!

বৃদ্ধের মুখের ভাব দেখে ছেলেটি আশ্চর্য হয়ে গেল। কিন্তু আশ্চর্য হওয়ার আরো অনেক বাকি ছিল। তাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই বৃদ্ধ বলে উঠলেন, একটা গল্প শুনবে? আমি অনেক গল্প জানি।

ছেলেটি এবার রুক্ষ স্বরে বলে উঠল, নিকুচি করেছে আপনার গল্পের! দেখছেন না, আমরা কথা বলছি! জরুরি কথা আছে আমাদের...

বৃদ্ধ যেন আমলই দিলেন না সেই কথার। তিনি যেন একটা ঘোরের মধ্যে আছেন। ওদের দিকে তাকিয়ে তিনি আবার বললেন, শুনেই দেখো না, বেশ মজার একটা গল্প। তোমাদের ভালো লাগবেই।

বৃদ্ধের আকুতি কিন্তু মেয়েটিকে স্পর্শ করেছিল। সে বৃদ্ধকে দেখে, তাঁর কথা শুনে যেন একটু কৌতুকই বোধ করছিল। এবার সে বলল, ঠিক বলছেন? আপনার গল্প শুনে আমরা মজা পাবো?

বৃদ্ধের সারা মুখ যেন খুশিতে ঝলমল করে উঠল। তিনি আর সময় নষ্ট করতে চাইলেন না। বললেন, শোনো তাহলে...

মেয়েটি কিন্তু দুম করে বলে বসল, আপনি খুব একা, তাই না?

বৃদ্ধের মুখটা হঠাৎ বিষন্ন হয়ে উঠল। তিনি প্রশ্নটাকে এড়িয়ে গিয়ে বললেন, গল্পটা খুব মজার।

মেয়েটি মিষ্টি গলায় বলল, আচ্ছা, বলুন।

বৃদ্ধ গল্প বলতে শুরু করলেন। যেন ঘোরের মধ্যেই কথা বলছেন। স্থান–কাল–পাত্র সম্পর্কে বোধ লোপ পেয়ে গিয়েছে তাঁর।

মেয়েটি তাকিয়ে দেখল, ছেলেটির মুখ অসম্ভব গম্ভীর হয়ে উঠেছে। আর বৃদ্ধ একা একাই নিজের মনে হেসে চলেছেন। গল্পটা যে খুবই মজার, তা নিয়ে বৃদ্ধের কোনও সন্দেহই নেই। তিনি নিজেই নিজের গল্প শুনে সবচেয়ে বেশি মজা পাচ্ছেন।

মেয়েটি কিন্তু সতর্ক হয়ে উঠল। বৃদ্ধের গল্প শুনে মজা পাওয়ার মতো সে কিছুই পায়নি। শুধু শুধুই সময় নষ্ট। সে বৃদ্ধকে দু–একবার থামানোর চেষ্টা করল। কিন্তু বৃদ্ধ থামার মানুষ নন। তিনি বলেই চলেছেন। গল্প বলা ছাড়া অন্য কোনো ব্যাপারে তাঁর কোনো হুঁশই নেই।

ছেলেটি যেন হিসহিসিয়ে উঠল, তুমি যাবে, না, এখানেই বসে থাকবে?

বৃদ্ধের জন্য মেয়েটির মায়া হল। কিন্তু সে যথেষ্ট করেছে। আর কেন? ছেলেটির কথাও তো ভাবতে হবে! সময় তো সত্যিই নষ্ট হচ্ছে!

মেয়েটি চুপ করে আছে দেখে ছেলেটি আবার হিসহিসিয়ে উঠল, তুমি তাহলে বসেই থাকো, আমি চললাম। লোকটা পাগল। স্থান–কাল–পাত্রের কোনো বোধই নেই। তুমি যদি একটা পাগলের সঙ্গে সময় কাটাতে চাও, কাটাও, আমার সময় নেই...

মেয়েটি বুঝতে পারল, সত্যিই আর দেরি করা ঠিক হবে না। ছেলেটা তাহলে ফসকে যাবে। সে ধৈর্যের শেষ সীমায় গিয়ে পৌঁছেছে। সে ছেলেটির হাত শক্ত করে ধরল। তারপর নিমেষের মধ্যে বৃদ্ধের চোখের আড়ালে চলে গেল।

গল্প শেষ করে গভীর তৃপ্তিতে বৃদ্ধ চোখ খুললেন। চোখ বুজেই তিনি এতক্ষণ গল্প বলে যাচ্ছিলেন। গল্পের ভেতরে, গল্পের মজায় যেন হারিয়ে গিয়েছিলেন। চোখ খুলে প্রথমেই তিনি জানতে চাইলেন, কেমন লাগল?

কিন্তু বেঞ্চটা ফাঁকা হয়ে গিয়েছে কখন। তিনি কাউকেই দেখতে পেলেন না। প্রথমটায় তিনি একটু অবাকই হলেন। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। গল্প শোনাতে পেরে তাঁর মনটা এখন বেশ হালকা লাগছে। এতক্ষণ বুকের মধ্যে যেন একটা পাথরের ভার টের পাচ্ছিলেন। গল্প শোনাতে শোনাতে সেই পাথরটা কখন যেন নেমে গিয়েছে। মাথাটাও হালকা হয়ে গিয়েছে। বেশ ঝরঝরে লাগছে এখন। বাতাসটাও হঠাৎ যেন পাতলা হয়ে গিয়েছে। শ্বাস–প্রশ্বাসও সহজ হয়ে উঠেছে।

হালকা চালে শিস দিতে দিতে, ফুরফুরে মেজাজে, তিনি দ্রুত পায়ে পার্ক থেকে বেরিয়ে এলেন।




পরদিন বিকেলে পার্কে এসে বৃদ্ধ আর এক কাণ্ড করলেন। ফাঁকা একটা জায়গায় সবুজ ঘাসের ওপর কয়েকটা ছেলে–মেয়ে নিজেদের ভেতর ব্যাডমিন্টন খেলছিল। বৃদ্ধ বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে তাদের দেখলেন। অসম্ভব অস্থির বোধ করছিলেন তিনি।

শেষ পর্যন্ত নিজেকে আর সামলাতে পারলেন না। প্রায় মরিয়া হয়ে সোজা তাদের কাছে গিয়ে বললেন, কিছুক্ষণের জন্য তোমরা খেলা থামাবে?

ছেলে–মেয়েরা অবাক হয়ে বৃদ্ধের দিকে তাকাল। বৃদ্ধের কিন্তু কোনো ভ্রূক্ষেপই নেই। তিনি যেন একটা ঘোরের মধ্যে আছেন। যেন খুব জরুরি কোনো কথা আছে, এইভাবে তিনি বললেন, তোমাদের আমি একটা মজার গল্প শোনাবো...

ছেলেমেয়েদের দেখেই বোঝা গেল, তারা দারুণ অবাক হয়ে গেছে। ওদের মধ্যে যে ছেলেটার চেহারা বেশ বড়োসড়ো, সে বলে উঠল, দেখছ না, আমরা খেলছি? এখন আমাদের বিরক্ত করতে এসেছো কেন?

বৃদ্ধ ছেলেটির দিকে তাকিয়ে মিনতি করে বললেন, ঠিক পাঁচ মিনিট নেবো। একটা দারুণ মজার গল্প শোনাবো। এরকম গল্প তোমরা আগে কখনও শোনোনি...

সবচেয়ে ছোটো মেয়েটি এবার বৃদ্ধের চোখে চোখ রেখে বলে উঠল, আমি শুনবো। হ্যাঁ, ওরা কেউ না শুনুক, আমি একাই শুনবো। আমি গল্প শুনতে খুব ভালোবাসি। তুমি আমায় বলবে?

বৃদ্ধ খুব খুশি হলেন। বললেন, আমি তো বলতেই চাই। এসো, ওই বেঞ্চের ওপর আমরা দুজনে বসি। তারপর তোমায় আমার গল্প শোনাবো...

ছোট্ট মেয়েটি মাঠের একধারে নিজের র‍্যাকেটটি রেখে এসে বৃদ্ধের কাছে গল্প শুনতে এল। আগেরদিনের সেই বেঞ্চে গিয়ে ওরা বসল। বাকিরা আগের মতোই খেলতে লাগল।

বৃদ্ধের গল্প শুনে মেয়েটি খিলখিল করে হাসতে লাগল। সেই হাসির শব্দ বৃদ্ধের কানে যেন মধুবর্ষণ করতে লাগল। তিনি খুব উৎসাহ নিয়েই গল্প বলতে লাগলেন।

একটু পরেই মেয়েটি দেখতে পেল, তার মা তাকে হাত নেড়ে ডাকছে। সে ছুটে গেল মায়ের কাছে। মা রেগে ছিল। ঝাঁঝিয়ে উঠে বলল, ওখানে কী করছিস? বন্ধুরা তো দিব্যি খেলছে। ওদের সঙ্গে খেলছিস না কেন?

আমি গল্প শুনছি মা। খুব মজার একটা গল্প। ছোট্টো মেয়েটি বলল।

মা বিরক্ত হয়ে বলল, তোকে কতদিন বলেছি না, কখনও কোনো অচেনা লোক ডাকলে যাবি না। তুই চিনিস ওই বুড়ো লোকটাকে?

মেয়েটি মাথা নেড়ে জানিয়ে দিল, সে চেনে না।

মা বলল, তাহলে? কার কী মতলব আছে, আমরা জানি?

মেয়েটি বলল, ঠিক আছে মা। শুধু আজ শুনতে দাও, গল্পটা শেষ করে আসি। তুমি একটু লক্ষ্য রেখো, তাহলেই হবে...

সে ছুটে গেল বৃদ্ধের কাছে। বৃদ্ধ তখনও গল্প বলেই চলেছিলেন। আর নিজের মনেই মিটিমিটি হাসছিলেন। মেয়েটি যে কখন তার পাশ থেকে উঠে গেছে, সে ব্যাপারে তাঁর কোনো হুঁশই নেই। গল্পটি শেষ করে মেয়েটিকে দেখে তিনি খুবই খুশি হলেন।

মেয়েটি গল্পটির চেয়েও গল্পকথককে দেখে বেশি মজা পাচ্ছিল। গল্পটির ব্যাপারে একটু পরেই সে উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছিল। কিন্তু এরকম আশ্চর্য গল্পকথক সে আগে কখনও দেখেনি। এই দাদু নিজেই নিজের গল্প শুনে হেসে গড়িয়ে পড়ে।

মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বৃদ্ধ হেসে জানতে চাইলেন, মজা লেগেছে?

মেয়েটি পুরো গল্পটা শোনেনি। তবু সে এই মজার লোকটির দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, খুব। কিন্তু কাল থেকে আর ডেকো না। মা বকবে...

বৃদ্ধের মুখটা করুণ হয়ে গেল। কিন্তু তিনি কিছুই বললেন না। মেয়েটি ছুটে চলে গেল। বৃদ্ধ সেদিকে বিষন্ন চোখে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর মনে হল, গল্প শোনানোর জন্য কাল থেকে আবার নতুন কাউকে খুঁজে নিতে হবে। গল্প না বলে তিনি থাকতে পারবেন না। তাঁর মাথা ফেটে যাবে। বুক ফেটে যাবে। গল্প তাঁকে বলতেই হবে!

তিনি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। তাঁকে খুব ক্লান্ত আর বিষন্ন দেখাচ্ছিল। তাঁর মুখের বলিরেখাগুলো আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। একটু পরে তাঁকে আর কেউ দেখতে পেল না।







গোটা পার্কে বৃদ্ধের ব্যাপারে যেন একটা ভীতি ছড়িয়ে গেছে। তাঁকে দেখলেই লোকে কৌতুক বোধ করে। কৌতূহলের চোখে তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকে। কারো দিকে তাক করে তিনি এগিয়ে আসছেন দেখলেই, সে পালিয়ে যায়। বৃদ্ধকে সবাই উপদ্রব বলেই মনে করে, তাঁকে এড়িয়ে চলতে চায়।

লোকে বলাবলি করতে শুরু করেছিল, লোকটা পাগল। সবাইকে ধরে ধরে গল্প শোনাতে চায়। গল্প শোনানোর জন্য জোর করে, পীড়াপীড়ি করে। কারো সুবিধা–অসুবিধা বোঝে না। আগ্রহী–অনাগ্রহী বিচার করে না।

পার্কে যারা আসে, বৃদ্ধকে দেখলেই তারা কেমন যেন সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে। একজন নিরীহ বৃদ্ধ লোক যে এতটা ত্রাস ছড়াতে পারে, তা যেন অবিশ্বাস্যই মনে হয়!

কেউ কেউ অবশ্য সহানুভূতির সুরে বলত, লোকটা বড়ো একা। তাই ওরকম করে।

কিন্তু এরকম লোক কমই ছিল। বৃদ্ধকে দেখলে বেশিরভাগ মানুষেরই অস্বস্তি হতো।

কারো কারো আবার খুবই বিশ্রী প্রতিক্রিয়া হতো। একদিন পার্কের সবুজ ঘাসে এক যুবক শুয়ে ছিল। বৃদ্ধের কেন জানি তাকে দেখে ভালো লেগে গেল। তিনি যুবকটির পাশে গিয়ে বসলেন। যুবকটি চোখ বুজে ঝিমোচ্ছিলো। বৃদ্ধকে দেখেই তার কপালে ভাঁজ পড়ল। কিছুটা রুক্ষভাবেই সে জানতে চাইল, কী চাই?

বৃদ্ধ তার রুক্ষতাকে আমলই দিলেন না। মিষ্টি করে জানতে চাইলেন, একটা গল্প শুনবে?

যুবকটি হঠাৎ উঠে বসল। তার মুখ–চোখ খুব হিংস্র দেখাচ্ছিল। তারপর সে চেঁচিয়ে উঠল, কেন আপনি এরকম করেন? এভাবে এসে সবাইকে বিরক্ত করেন? কাউকে আপনি শান্তি দেবেন না? নিজের মতো থাকতে দেবেন না? কেন আপনার এই গায়ে–পড়া ভাব?

বৃদ্ধ আহত চোখে যুবকটির দিকে তাকালেন। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। আস্তে আস্তে হেঁটে গিয়ে নিজের সেই প্রিয় বেঞ্চে বসলেন। ছেলেটির ব্যবহারে তিনি আঘাত পেয়েছিলেন ঠিকই। কিন্তু অন্য কারণটাই তাঁকে বেশি চিন্তায় ফেলে দিয়েছিল। কাউকে না কাউকে গল্প তাঁকে শোনাতেই হবে। তা নাহলে তাঁর মাথাটা ফেটে যাবে। বুকটা চৌচির হয়ে যাবে। তাঁর ভিতরে যেন তোলপাড় শুরু হয়েছিল।

সেই সময় হঠাৎ অল্পবয়সী কয়েকজন যুবক এসে তাঁকে ঘিরে দাঁড়াল। ছেলেগুলোকে দেখলেই বোঝা যায়, এরা সব লোকাল গুণ্ডা। এদের মধ্যে নেতা গোছের ছেলেটি পকেট থেকে ফস করে একটা ছুরি বার করে বৃদ্ধের সামনে উঁচিয়ে ধরল। তারপর তীক্ষ্ণ গলায় বলল, এক্ষুনি, এখান থেকে চলে যান। আপনার নামে অনেক কমপ্লেন। আর কখনও যেন আপনাকে এই পার্কে না দেখি...

বৃদ্ধের কানে কথাগুলো ঢুকল কিনা, ঠিক বোঝা গেল না। তিনি আদৌ কি বুঝলেন কে জানে, ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর পার্কের গেটের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলেন। যেখানে বাচ্চারা খেলে, তাঁকে দেখে খেলা থামিয়ে তারা হঠাৎ সচকিত হয়ে উঠল। কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাঁকে দেখতে লাগল।

বৃদ্ধ আজ কারো দিকে তাকালেন না। তাঁর ভেতরে অসম্ভব কষ্ট হচ্ছিল। কোনো অপমান–অসম্মানই তাঁর গায়ে লাগছে না। শুধু মনে হচ্ছে, কাউকে একটা তাঁকে পেতেই হবে। যে গল্পটা শোনাবেন বলে ঠিক করে এসেছেন, কাউকে না কাউকে তাঁকে শোনাতেই হবে।





ঠিক সেই সময় কে যেন বৃদ্ধের দিকে ছুটে এল। তারপর রীতিমতো উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে উঠল, দাদু, আজ গল্প শোনাবেন না?

বৃদ্ধ থমকে দাঁড়ালেন। এক ঝলমলে যুবতী। মেয়েটিকে তিনি চেনেন না। তাই ঈষৎ বিস্মিত হয়ে তার দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইলেন। তারপর মৃদু স্বরে জানতে চাইলেন, কে তুমি?

মেয়েটি দূরে বাচ্চা ছেলে–মেয়েদের ভিড়টার দিকে আঙুল দেখিয়ে বিশেষ একজনকে দেখানোর চেষ্টা করল। বৃদ্ধ দেখতে পেলেন, সেই ছোট্ট মেয়েটি, যাকে তিনি গল্প শুনিয়েছিলেন।

যুবতীটি সারা মুখে ঝলমলে হাসি ছড়িয়ে বলল, আমি পূজা। ওর টিচার। ওর মায়ের বন্ধুও বটে! ওর মুখে আপনার কথা অনেক শুনেছি। তাই আজ আপনার গল্প শুনতে এলাম।

বৃদ্ধ বিষন্ন হেসে বললেন, এখান থেকে ওরা আমাকে তাড়িয়ে দিয়েছে। আমি চলে যাচ্ছি...

পূজা যেন একটু ধাক্কাই খেল। তারপর মুহূর্তের মধ্যে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, বেশ তো, যাওয়ার অনেক জায়গা আছে। উল্টোদিকে একটা ক্যাফে আছে। ওখানে বসেই না হয় আপনার গল্প শুনবো...

বৃদ্ধ রাজি হলেন। একটু পরে দেখা গেল, গল্প জমে উঠেছে। বৃদ্ধ বলে চলেছেন, আর মেয়েটি গালে হাত দিয়ে দারুণ আগ্রহে গল্প শুনে চলেছে। ওদের দুজনের মধ্যে রাখা আছে কফি আর পাকোড়া। কিন্তু খাবার ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। গল্পের নেশায় খাবারের কথা দুজনের কারোরই মনে নেই।

গল্প বলতে বলতে বৃদ্ধ চোখ বুজে দিচ্ছেন মাঝেমধ্যে। তিনি যেন গল্পের রঙিন, মজাদার দুনিয়ায় হারিয়ে গেছেন। নিজের গল্পে নিজেই মশগুল হয়ে কখনও বা মিটিমিটি হাসছেন, যা তাঁর স্বভাব।

হঠাৎ বৃদ্ধ গল্প থামিয়ে দিলেন। অদ্ভুত চোখে তাকালেন মেয়েটির দিকে। তারপর সংশয়াচ্ছন্ন গলায় বললেন, তোমাকে কী আগে কোথাও দেখেছি? এত চেনা লাগছে কেন?

মেয়েটি বৃদ্ধের কথাকে গ্রাহ্যই করল না। বরং তাড়া দিয়ে বলল, গল্প থামিয়ে দিলেন কেন? আমি কিন্তু গল্প শুনতেই এসেছি। আগে ওটা শেষ করুন...

বৃদ্ধ যেন নিজের মধ্যে তলিয়ে গেছেন। হাবুডুবু খাচ্ছেন। শেষ পর্যন্ত আঁকড়ে ধরার মতো কিছু একটা পেলেন। তাঁর গলাতেও অনিশ্চয়তার ভাবটা কেটে গেছিল।

তিনি বললেন, হ্যাঁ, এবার বুঝেছি। তোমাকে দেখতে ঠিক আমার স্ত্রী–র মতো। হঠাৎ দেখে আমার চোখে যেন ধাধা লেগে গেছিল। মনে হয়েছিল, আমার সামনে যেন সে–ই বসে আছে! অল্প বয়সে আমার স্ত্রী ঠিক তোমার মতোই দেখতে ছিল...

পূজা বলল, বেশ কাকতালীয় ব্যাপার তো!

বৃদ্ধ বলে চললেন, আমার স্ত্রী খুব গল্প শুনতে চাইত। ওর জন্য রোজ আমাকে নতুন নতুন গল্প ভাবতে হতো। রাতে পাশে শুয়ে আমার মুখে গল্প না শুনলে ওর ঘুম আসতো না। আর ঠিক তোমার মতোই গল্প শেষ করার জন্য তাড়া দিত। কতদিন পর এত আগ্রহ নিয়ে কেউ আমার গল্প শুনছে! গল্প শেষ করার জন্য তাড়া দিচ্ছে!

পূজা জানতে চাইল, আপনার স্ত্রী এখন কোথায়?

কয়েক মাস আগে আমার স্ত্রী মারা গেছে। আমরা নিঃসন্তান। ওখানে আর থাকতে পারলাম না। সবসময় ওর কথা মনে পড়ত। তারপর একদিন ঝোঁকের বশেই সব ছেড়েছুড়ে এই শহরে চলে এলাম। কিন্তু এখানে আমি কাউকেই চিনি না। কাকে এখন আমার গল্পগুলো শোনাই? কেউ যে আমার গল্পগুলো শুনতেই চায় না!

বৃদ্ধ চোখ বুজে দিলেন।

পূজা করুণামাখা চোখে বৃদ্ধের দিকে তাকাল। তারপর বলল, গল্প শোনাতে না পারলে আপনার খুব কষ্ট হয় বুঝি?

বৃদ্ধ বললেন, খুব কষ্ট হয়। শ্বাস নিতে পারি না। গল্পগুলো বাইরে বেরোতে না পেরে ভেতরে চাপ দিতে থাকে। কেউ যেন আমার ফুসফুসটাকে নিজের মুঠোয় নিয়ে পিষতে থাকে।

পূজা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, বুঝেছি।

গল্পটা শেষ করার পর বৃদ্ধ দেখলেন, পূজা মিটিমিটি হাসছে। তার গালে টোল পড়েছে। সেদিকে তাকিয়ে বৃদ্ধ বললেন, তোমাকে গল্প শোনাতে এত ভালো লাগল কেন বলো তো?

বৃদ্ধ খুব আস্তে আস্তে নিজের মাথাটা নাড়ছিলেন। যেন তিনি বুঝতে পেরেছেন, কেন এতক্ষণ ধরে পূজাকে গল্প শোনাতে তাঁর এত ভালো লেগেছে! আসলে সে নেহাৎ উপলক্ষ্য মাত্র। পূজাকে সামনে দেখে তিনি নিজের মৃত স্ত্রী–কেই এতক্ষণ ধরে গল্প শুনিয়ে গিয়েছেন। বহুদিন পর।

পূজার দিকে তাকিয়ে তিনি জানতে চাইলেন, তুমি রোজ আসবে? আমার গল্প শুনবে?

পূজার যেন এতক্ষণে খেয়াল হল, কফি ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। সেই ঠাণ্ডা কফিতেই চুমুক দিয়ে সে বলল, তা কি হয়?

বৃদ্ধ জানতে চাইলেন, তাহলে আজ এলে কেন?

পূজার গালে আবার টোল পড়ল। সে হেসে বলল, আবার হারিয়ে যাবো বলে!

ঠিক আমার স্ত্রী–র মতো, তাই না? বৃদ্ধের গলার স্বর গম্ভীর শোনালো।

মেয়েটি একটু দ্বিধাগ্রস্তভাবে বলল, ঠাট্টা করছিলাম। স্যরি।

বৃদ্ধ ম্লান হাসলেন। তারপর বললেন, না, না, ঠিকই তো বলেছো। কার অত সময় আছে?

কিন্তু তারপরই তিনি বিপন্ন বোধ করলেন। সত্যিই তো। একটু পরেই তো পূজা চলে যাবে। কাল তিনি কাকে গল্প শোনাবেন? কীভাবে কাটবে তাঁর দিনগুলো? এই শহরে যে তাঁর কোনও শ্রোতাই নেই! কেউ–ই তাঁর গল্প শুনতে চায় না!






হঠাৎ পূজা উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল। তারপর বলল, দাদু, আপনার প্রবলেম আমি সলভ করে ফেলেছি।

বৃদ্ধ পূজার দিকে তাকালেন। সেই দৃষ্টিতে সারল্য আর বিস্ময় মিলেমিশে আছে। তিনি পূজার কথা বোঝার চেষ্টা করছেন। কিন্তু পুরোপুরি যেন বুঝে উঠতে পারছেন না।

আপনাকে আমি আমাদের ক্লাবে নিয়ে যাবো। সেখানে আপনি প্রচুর শ্রোতা পাবেন। যত খুশি গল্প বলবেন।

বৃদ্ধকে দেখে মনে হল, তাঁর নিজের যেন কোনো ইচ্ছাশক্তি নেই। তিনি পূজার ওপরই নিজেকে সম্পূর্ণ ছেড়ে দিয়েছেন।

হঠাৎ তিনি উঠে দাঁড়ালেন। তারপর ভাঙা গলায় বললেন, আজ বাড়ি যাই। খুব দুর্বল লাগছে।

পূজা হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, আমাকে ধরুন। আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছি। কাল কিন্তু ঠিক বিকেল পাঁচটায় আপনাকে নিতে আসব। তৈরি থাকবেন।

পরদিন বিকেল সাড়ে পাঁচটার মধ্যেই বৃদ্ধকে নিয়ে পূজা ওদের ক্লাবে পৌঁছে গেল। আধুনিক, সুসজ্জিত একটি ক্লাব। ভেতরে সবুজ লন। সেখানে ছড়ানো–ছিটানো চেয়ার। একটা ছাতার নিচে বৃদ্ধের বসার জায়গা হয়েছে।

ক্লাবে আজ বেশ ভিড়। অনেকেই এসেছে কৌতূহলী হয়ে। নির্দিষ্ট চেয়ারে বসে বৃদ্ধ জানতে চাইলেন, এরা কারা?

কারা? পূজার চোখে কৌতুক খেলা করছে।

এই, এত মানুষ?

এরা সবাই আপনার শ্রোতা।

এত শ্রোতা? বৃদ্ধ অবাক হলেন। আমার তো একজন হলেই চলে যেত!

দাদু, ভিড়ে আপনার অসুবিধে হয়?

বৃদ্ধ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপর বললেন, মনে হয়, যেন হারিয়ে গেছি। নিজেকে খুঁজে পাচ্ছি না।

প্রায় দশ মিনিট হয়ে গেছে। শ্রোতাদের মধ্যে কোলাহল বেড়ে চলেছে। তারা একটু একটু করে অধৈর্য হয়ে উঠছে। কিন্তু বৃদ্ধ চুপ করেই আছেন। তিনি বিষন্ন চোখে ভিড়ের দিকে তাকিয়ে আছেন। তাঁর বিহ্বল দুটো চোখ জলে ভরে গেছে। তাঁর মাথা হঠাৎ এমন ফাঁকা হয়ে গেছে কেন? তিনি কিছুই মনে করতে পারছেন না। তাঁর যেন কিছুই বলার নেই।

ভিড়ের মধ্যে থেকে কে যেন চেঁচিয়ে উঠল, উনি কিছু বলছেন না কেন?

আর একজন বলে উঠল, উনি কী বোবা?

কর্মকর্তাগোছের কে যেন বলে উঠল, এ কাকে ধরে আনলে পূজা?

পূজা বৃদ্ধের কাছে গিয়ে বলল, কিছু বলুন দাদু। সবাই আপনার গল্প শুনতে চাইছে...

বৃদ্ধ কিছুই বলতে পারলেন না। ফ্যালফ্যাল করে কয়েক মুহূর্ত পূজার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর গাল বেয়ে জলের ধারা গড়িয়ে নামতে লাগল।

পূজার সারা মুখ অস্বস্তিতে ভরে উঠেছে। ভিড়ের দিকে সে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল। তারপর চেঁচিয়ে উঠল, উনি অসুস্থ। আপনাদের সবাইকে এভাবে বিরক্ত করার জন্য আমি দুঃখিত।

ভিড়ের মধ্য থেকে আবার কে যেন চেঁচিয়ে উঠল, গল্প বলতে এসে উনি নিজেই যে গল্প হয়ে গেলেন...

একটা হাস্যরোল ছড়িয়ে পড়ল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই তারা নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। বৃদ্ধের কথা ভুলেই গেল সবাই। সবার অলক্ষ্যে, নিঃশব্দে বৃদ্ধ উঠে দাঁড়ালেন।

বৃদ্ধের দিকে তাকিয়ে পূজা ফিসফিস করে বলল, ভুল হয়ে গেছে দাদু। আমার বোঝা উচিত ছিল, ভিড় আপনার মতো মানুষের জন্য নয়। ওতে আপনার নিঃসঙ্গতা আরো বেড়ে যেতে পারে...

বৃদ্ধ আলতো করে পূজার হাত নিজের মুঠোয় নিয়ে চাপ দিলেন। অনেকক্ষণ পর তাঁর মুখে হাসি ফুটে উঠল। এই ক্লাবটা একটা নদীর ধারে। সেই নদীর দিকে একটা বারান্দা আছে। বৃদ্ধ ধীরে ধীরে সেই বারান্দার দিকে এগিয়ে গেলেন।

একটা বেতের চেয়ারে গিয়ে বসলেন তিনি। নদীর দিকে তাকালেন। এখন গোধূলির সময়। সারা আকাশে কেউ যেন আবির মাখিয়ে দিয়েছে। ক্লাবের সবাই তাঁকে ভুলে গেছে। শুধু উল্টোদিকের চেয়ারে বসে আছে পূজা। এই জায়গাটা নির্জন। দূরে হইচই হচ্ছে।

পূজা বলছিল, দাদু, যখনই কষ্ট হবে এই ক্লাবে চলে আসবেন। কেউ আপনাকে আটকাবে না। আমার বাবা এখানকার সেক্রেটারি। তাকে আপনার ব্যাপারে বলে রেখেছি। শ্রোতা হিসাবে ঠিক কাউকে পেয়ে যাবেন।

বৃদ্ধ কি কিছুই শুনতে পেলেন? নদীর দিক থেকে চোখ সরিয়ে তিনি পূজার দিকে তাকালেন। ফ্যালফ্যাল করে। কয়েক মুহূর্ত পরেই যেন আর কোনো হুঁশ রইলো না তাঁর। নদীর দিকে আবার মুখ ফিরিয়ে তিনি জলের ওপর পাখিদের ওড়াওড়ি দেখতে থাকলেন।

হঠাৎ সেই ছোট্ট মেয়েটি দৌড়ে এল। সে এক্ষুনি তার মায়ের সঙ্গে ক্লাবে এসেছে। তারপর সেই বৃদ্ধকে দেখেই ছুটে এল তাঁর কাছে। একগাল হেসে বলে উঠল, দাদু, তুমি এখানে?

বৃদ্ধের চোখ দুটো হঠাৎ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। শিশুটির দিকে তাকিয়ে তিনি বলে উঠলেন, একটা গল্প শুনবে?

মেয়েটি দারুণ উৎসাহে বলল, সেইজন্যই তো এলাম...

বৃদ্ধের আবার সব মনে পড়ে গেছে। তিনি গল্প বলে চলেছেন। যথারীতি একটা একঘেয়ে, বিরক্তিকর গল্প। বৃদ্ধ কিন্তু মাঝেমাঝেই হেসে গড়িয়ে পড়ছেন। নিজের গল্পে তিনি নিজেই মশগুল হয়ে গেছেন।

মেয়েটিও মজে গেছে। গল্প শুনে না গল্পকথককে দেখে, বোঝা মুশকিল। কিন্তু সে অবাক চোখে বৃদ্ধের দিকে তাকিয়ে আছে। তাঁর গলার স্বরকে, সেই স্বরের ওঠা–নামাকে অনুসরণ করে চলেছে। সেই স্বরের আকর্ষণকে এড়াতে পারছে না। তাঁর মুখের নানা কৌতুককর ভঙ্গিতে মোহাবিষ্ট হয়ে উঠেছে। তার দু–চোখে মুগ্ধতা।

মেয়েটির মা এগিয়ে আসছিল সেদিকে। তার কপালে ভাঁজ পড়েছে। অনেকক্ষণ হয়ে গেছে। মেয়ে আন্টিকে দেখে ছুটে গেল। তারপর আর ফিরছে না কেন? হঠাৎ বৃদ্ধকে এখানে, এই ক্লাবে দেখে সে রীতিমতো অবাকও হয়েছে।

পূ্জা এগিয়ে গেল তার দিকে। মেয়েটির মা কিছু বলার আগেই সে তার হাত ধরে বলল, এখন ওদের বিরক্ত করো না। ওদিকে চলো। কফি খাই...


0

গল্প - গান্ধর্বিকা

Posted in




















“ভাবছি এই উইকেণ্ডে শান্তিনিকেতন থেকে ঘুরে আসব।”

রিনির কথা শুনে অভিনব ল্যাপটপ থেকে চোখ আর ভুরু দুটোই তুলে তাকালো।

“হঠাৎ?” বলতে বলতেই ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়ে গেল। “ওঃ, বাসন্তীর কথাটা মাথায় ঘুরছে নাকি?”

রিনি ভয়ংকর ভ্রুকুটি করে উঠল। “বোকা বোকা কথা বোলো না তো! আমার যাওয়ার কথাই ছিল। মা বাবাকে পয়লা বৈশাখের জামাকাপড় দিতে হবে না? আরো দেরী করলে দর্জি কবে ব্লাউজ বানাবে?”

“বুঝলাম,” অভিনব আবার সলিটেয়ার খেলায় মন দিল। “আমি কিন্তু যেতে পারব না। এই শনিবার আমার ক্লায়েন্ট আসবে।”

“যেতে হবে না। এবারটা আমি একা গেলেই ভালো। নববর্ষে তো আমরা প্রণাম করতে যাবই।”

অভিনব অন্যমনস্ক ভাবে বলল “হুম।”

রিনি আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়ল। কিন্তু জাগরণে যায় বিভাবরী। অভিনবর কাছে স্বীকার করুক আর নাই করুক, বাসন্তীর ফোন আসার পর থেকেই সে বেশ ডিস্টার্বড হয়ে আছে।

“ছেলেটা সুবিধের নয় গো দিদি,” বাসন্তী নাটকীয় ভঙ্গিতে গলা নামিয়ে বলেছিল, “দিনরাত মাইমাকে কি মন্তর দিচ্ছে কে জানে! নির্ঘাত কোনো মতলবে আছে।”

বাবাকে জিজ্ঞেস করে যথারীতি কোনো সুরাহা হয়নি।

“কে, রজত? হ্যাঁ, আসে তো মাঝেমাঝে। তোর মাকে হেল্প করে। বেশ কাজের, ছেলেটা।”

আর মাকে তো ফোনে পাওয়াই অসম্ভব। গত দু'মাস ধরে যখনই রিনি ফোন করে হয় মা রজতের সঙ্গে বাগানে বসে আছে, নয় বাড়িতে ফোন রেখে রজতের সঙ্গে বাজারে কিংবা এটিএমে গেছে। সারাদিনে মেয়ের সঙ্গে একটা কথা বলারও সময় নেই। এতো কিসের ভাব এই রজতের সঙ্গে? নাঃ, একবার চর্মচক্ষে সমস্তটা না দেখে এলেই নয়।

শনিবার ভালো করে সকাল না হতেই রিনি গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেল। রাস্তা ফাঁকা, দেখতে দেখতে হাওড়া পেরিয়ে হাইওয়ে, তারপর হাইওয়ে ছাড়িয়ে বোলপুরের রাস্তায় ঢুকে পড়ল। ভাগ্য ভালো, লেভেল ক্রসিংটা খোলা আছে। এগারোটার মধ্যেই বাড়ির গেট দিয়ে ঢুকে গেল রিনি।

গাড়ি পার্ক করে ইঞ্জিন বন্ধ করার আগেই বাসন্তী হাসিমুখে এসে হাজির।

“এত সকাল সকাল এসে গেলে? রাস্তায় জাম পাওনি?”

“নাঃ, ফাঁকাই ছিল।”

গাড়ির পেছনের সীট থেকে ওভারনাইট ব্যাগটা তুলে “তোমার ঘরে রেখে দিলাম” বলে বাসন্তী দুলকি চালে ভেতরে ঢুকে গেল।

গাড়িটা গাছের তলায় রেখে রিনি লক করল। তারপর টাটকা হাওয়ায় বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে নিতে আড়মোড়া ভাঙল। গরমটা এখনো চরমে ওঠেনি। বসন্ত যদিও বিদায় নিয়েছে।

বাবা বারান্দায় বসে খবরের কাগজ পড়ছিল। রিনিকে দেখে হাত নাড়ল।

বাবা একা কেন?

রিনির মনে সন্দেহ জাগে।

“মা কোথায়?”

“রজতের সঙ্গে বাজার করতে গেছে।”

“রজত কেন?” রিনি বিরক্ত ভাবে একটা মোড়া টেনে বসতে বসতে বলল, “তুমি কি করছিলে?”

“আমি?” বাবা আঁতকে উঠল, “না না, এই গরমে বুড়ো বয়সে বেরলে আমি আর বাঁচব না!”

“এমন কি গরম পড়েছে?” ভুরু কুঁচকে রিনি জিজ্ঞেস করল।

“না গো, এখনো অত গরম হয়নি,” বাসন্তী রিনির হাতে এক গ্লাস সরবত ধরিয়ে বলল, “মামা এমনি এমনি ভয় পাচ্ছে।”

“হ্যাঁ, তুই তো সব জানিস! তোরা মাঠে ঘাটে কাজ করিস, তোরা বুঝবি না।” অভিমানে ঠোঁট ফুলিয়ে বাবা একটা সিগারেট ধরালো। “জার্মানিতে থাকতে আমি রোজ সকাল সাতটায় উঠে লোকাল মার্কেটে যেতাম।”

প্রাতর্যৌবনে বাবা মাস তিনেক জার্মানিতে ছিল। সেই থেকে আজও নাকি ভারতের গরম আর পল্যুশনে অভ্যস্ত হতে পারেনি।

“তা, বাড়িতে বুড়ো তো তুমি একা নও,” রিনি চুল তুলে বেঁধে নিল, “মা-রও তো বয়েস হয়েছে। মা-রই বা বেরোনোর কি দরকার ছিল?”

“আমি তো তাই বলি,” বাসন্তীর সব ব্যাপারে ওস্তাদি করা চাই, “তোমাদের বেরোতে হবে না, যা দরকার আমাকে বলবে। কিন্তু মাইমা শোনে কই?”

রিনি রুষ্টভাবে সরবতে চুমুক দিতে লাগল। অনতি বিলম্বেই গেট থেকে একটা রিক্সা থামার শব্দ ভেসে এল। তার সঙ্গে মায়ের খিলখিলিয়ে হাসির আওয়াজ। বাসন্তী রিনির দিকে ইঙ্গিতপূর্ণ দৃষ্টি দিল। রিনি চোখ ঘুরিয়ে নিল।

“যা দ্যাখ গিয়ে ব্যাগট্যাগ কিছু আনতে হবে কি না।”

বাসন্তীকে ধমক দিয়ে রিনি তারাতাড়ি বাড়িতে ঢুকে গেল। ও আসবে জেনেও মা যদি রজতের সঙ্গে বেড়াতে চলে যায় তাহলে ও-ই বা কেন হ্যাংলার মতো বারান্দায় বসে থাকবে? সবে সোফায় বসে তৈলচিত্রের মতো পোজ দিতে যাচ্ছে এমন সময়ে মায়ের গলা ভেসে এল।

“...আরেকটু হলেই ওজনে মেরে দিত। রজত একেবারে খপ্ করে ধরেছে, আমি তো দেখতেই পাইনি।”

আঁচল দিয়ে ঘাম মুছতে মুছতে মা বাড়ি ঢুকল। রিনি যতদূর হয় গলাটা ঠাণ্ডা করে বলল,

“ভালো আছ মা?”

“ওঃ, এসে গেছিস? দাঁড়া আমি হাতটা ধুয়ে আসছি। সারা হাতে আঁশটে গন্ধ হয়ে আছে।”

মায়ের পেছন পেছন একটা বছর পঁচিশের ছেলেও একেবারে বাড়ির ভেতরে ঢুকে এসেছে। ফর্সা, গোবেচারা মতো চেহারা। রান্নাঘরের সামনে দুটো বাজারের থলে নামিয়ে রাখল। এই বোধহয় সেই বিখ্যাত রজত।

“আমি তাহলে আসি কাকিমা?” ন্যাকা ন্যাকা গলায় প্রশ্ন করল ছেলেটা।

“না না এই রোদে এতগুলো থলে নিয়ে এলি, এক কাপ চা অন্তত খেয়ে যা।”

এক দৌড়ে রান্নাঘরে ঢুকে গেল মা।

“বাসন্তী, ওই মিষ্টিগুলো কোথায় আছে রে?”

“যেগুলো মামা কাল রিনিদির জন্যে আনাল? ফ্রিজে আছে তো।”

“ওঃ, ওগুলো রিনির জন্যে আনিয়েছে বুঝি? তাহলে এক কাজ কর্, ট্যাংরামাছ গুলোয় হলুদ মাখিয়ে রেখেছি, চট্ করে ভেজে দে তো। আর চা কর্। রিনি, চা খাবি?”

“নাঃ তোমরা খাও, আমি এই জাস্ট সরবত খেয়েছি।”

রজত একটু ইতস্তত করে রিনির দিকে এগিয়ে এল।

“চিনতে পারছ, দিদি?”

রিনি উত্তর দেওয়ার আগেই মা রান্নাঘর থেকে ঝড়ের গতিতে বেরিয়ে এল।

“একটু বোস, রজত, বাসন্তীকে মাছ ভাজতে বলেছি। ততক্ষণ তুই চা আর নিমকি খা। নাকি কেক খাবি? এক টুকরো কেক দিই? একটু চানাচুর খাবি?”

“না না, তুমি ব্যস্ত হয়ো না কাকিমা।”

“ওমা, তা বললে হয় নাকি? দাঁড়া, মাছ আসতে আসতে আমি তোকে দুটো পাঁউরুটি সেঁকে দিই! শুনছো, সকালে পাঁউরুটি খেয়ে মাখনটা কোথায় রেখেছ?”

বাবার মুখে কোনো উত্তর নেই। প্রয়োজনে কানে না শোনার অভিনয় বাবার মতো কেউ করতে পারে না।

মা আবার রান্নাঘরে অন্তর্হিত হল। বোধহয় একেবারে দুধ থেকে মাখন বানিয়ে পাঁউরুটিতে মাখাবে। অথচ রিনি যে এতদিন পরে বাড়ি এসেছে তাই নিয়ে কোনো ভ্রুক্ষেপই নেই।

এত আদিখ্যেতা আর চোখে দেখা যায় না। গজগজ করতে করতে রিনি ঘরের দিকে রওনা হল। দরজার কাছে গিয়ে শুনতে পেল বাবা বলছে “বাসন্তী, আমাকেও এক কাপ চা দিস তো।”

রজত যে ঠিক কি কি খেয়ে বাড়ি গেল তা আর রিনি জানতে পারেনি। স্নান সেরে বিছানায় লম্বা হয়েই ঘুমিয়ে পড়েছিল।

বাসন্তীর ডাকে ঘুম থেকে উঠে খাবার ঘরে গিয়ে দেখে মা বাবা অলরেডি খেতে বসে গেছে। এক জনপ্রিয় বাংলা সিরিয়ালের নায়িকা তার প্রতিপক্ষকে কি কি কথা শোনাতে পারত আর কেনই বা শোনাল না সেই নিয়ে একটা গুরুগম্ভীর আলোচনা জমে উঠেছে।

রিনি চেয়ার টেনে বসে পড়ল।

“এই সময়ে আবার কেন ট্রাভেল করতে গেলি?” ভাত বাড়তে বাড়তে মা রিনিকে জিজ্ঞেস করল।

“তুমিও তো বেরোচ্ছ রোজ,” রিনি বলল, “এই বয়েসে এত বেরোনো কি উচিৎ হচ্ছে?”

“না বেরোলে কি করে চলবে?” মা ঝাঁঝিয়ে উঠল, “বাড়ির কাজগুলো তো ভূতে করবে না। তোমার তো আমাদের জন্যে কোন সময় নেই, আর তোমার বাবাকে দিয়ে কোনো কম্ম হয় না।”

“আমাকে আবার টানছ কেন?” রিনির বাবা সরু গলায় প্রতিবাদ করে উঠল। “এই গরমে একজন বয়স্ক মানুষের পক্ষে বেরনো সম্ভব নয়। জার্মানিতে থাকতে-”

“তাহলে মা-ই বা বেরোচ্ছে কেন?” রিনি বাবার কথা শেষ করার সময় দিল না। “এই রজত না কে তাকে একা পাঠালেই তো হয়!”

“বোকা বোকা কথা বলিস না,” বলতে বলতে মা রিনির প্লেটে জলের চেয়েও পাতলা ‘বাসন্তী স্পেশাল' ডাল ঢেলে দিল। “রজত কি আমাদের চাকর নাকি?”

“পেলে কোথা থেকে মালটাকে?” রিনি তীর্যক সুরে প্রশ্ন করল।

“আরে আমাদের ইনশিওরেন্স করাতে আসত না, ধরবাবু?” বাবা ব্যাখ্যা শুরু করল, “ওই ধরবাবুর ছেলে। ও-ই এখন ধরবাবুর অফিসে বসে। খুব কাজের, ছেলেটা।”

“কতদিন হল ধরবাবুর অফিসে বসছে?”

মা বাবা চোখাচোখি করল।

“তা বছরখানেক তো হবেই,” মা হাসিমুখে জানালো। “ও-ই এখন আমার পলিসি টলিসি, ব্যাঙ্কের কাজটাজ সব দেখে। তোর বাবার এটিএম কার্ড আর পিনও ওকে দিয়ে রেখেছি। কাজ থেকে ফেরার সময়ে টাকা তুলে আনে।”

“তুমি কি পাগল হয়ে গেছ?” রিনি চেয়ার থেকে প্রায় লাফিয়ে উঠল। “এরকমভাবে যাকে তাকে কেউ নিজের এটিএম কার্ড দিয়ে দেয়? ও যদি তোমাদের সব টাকা চুরি করে নেয়?”

“ওমা কার্ড না দিলে ও টাকা তুলবে কি করে?” বাবা কঁকিয়ে ওঠে, “আমি কি এই গরমে বেরব নাকি?”

“কাউকে বেরোতে হবে না!” রিনির আর ধৈর্য থাকে না। “তোমাদের তো বলেছি কতবার আমার বাড়িতে এসে থাক কিছুদিন! আজকাল সব অনলাইন হয়, আমি তোমাদের শিখিয়ে দেব।”

“না, ওইভাবে মেয়ে জামাইয়ের বাড়ি থাকা যায় না,” মা প্রবল মাথা নেড়ে জানায়। “বাড়িতে একটা ছেলে থাকা খুব জরুরি। তুই তোর বর, সংসার নিয়ে নিজের মতো শহরে আছিস, থাক। আমাদের লাইফে নাক গলাতে আসিস না।”

“মোটে এক তো বছর চেনো এর মধ্যেই 'ছেলে' হয়ে গেল? প্যাথেটিক!”

“তুই কি চাস?” মা ঠাণ্ডা বাঁকা গলায় প্রশ্ন করে, “তোর বাবা আর আমি রজতকে দিয়ে কোনো কাজ করাব না, নিজেরাই সব কাজ করে হিট স্ট্রোক বা নিপা বাধিয়ে মরব, তাই তো? বেশ, তাই হবে। আমরা মরে গিয়ে আমাদের টাকাগুলো তোর জন্যে রেখে যাব। তাতেই তো তুই খুশি?”

রিনি বুঝতে পারে না এর উত্তরে কি বলবে। তার মা বাবার বুদ্ধিসুদ্ধি কি লোপ পেয়েছে?

“শোন, রিনি,” মায়ের অলক্ষ্যে আরেক পিস চিকেন পাতে নিতে নিতে বাবা শান্ত গলায় বলল, “তোরা শহরে থাকিস, পাশের বাড়ির লোককেও ভরসা করতে পারিস না। এটা অনেক ছোট জায়গা। এখানে সবাই সবাইকে বিশ্বাস করে। ধরবাবুর সঙ্গে আমার পরিচয় কি আজকের? সেই জার্মানি থেকে সবে ফিরেছি-”

“বেশ,” কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল রিনি, “যা খুশি কর। ওই ছেলে যখন তোমাদের গলা কেটে সারা বাড়ি লুট করে পালাবে তখন আমার কাছে কাটা মাথা নিয়ে কাঁদতে এস না।”

মা রিনির প্লেটে আরেক পিস মাংস দিতে দিতে পরিস্থিতি প্রাঞ্জল করে দিল,

“আসলে তোর রজতকে নিয়ে হিংসে হয়েছে। আমি সব বুঝতে পেরেছি।”

“খুব বুঝেছ।”

রাগ হলেও কথাটা যে নেহাৎ মিথ্যে নয় তা রিনিও মনের কোথাও বুঝতে পেরেছে। বেশ হাড়ে হাড়েই বুঝেছে। তা বলে একেবারে এটিএম কার্ড?

“আমি থাকতে ওই ছেলে যেন এ বাড়ির ত্রিসীমানা না মাড়ায়।”

রিনির কথার মান রেখে (অথবা প্রতিকূল আবহাওয়ার পূর্বাভাস পেয়ে) রজত সত্যিই সেই সপ্তাহান্তে রিনিদের বাড়ির চৌহদ্দি মাড়ায় নি। তা বলে তার গুণাবলীর কীর্তনে ছেদ পড়েনি। ওষুধ কেনা থেকে রিক্সা ধরা পর্যন্ত সব বিষয়ে তার অসাধারণ পটুতার কথা বারবার রিনিকে স্মরণ করানো হয়েছে। বাজারের অসৎ মাছ বিক্রেতাদের চেনানো আর টিভি খারাপ হয়ে গেলে বৃষ্টির মধ্যেও ভিজে ভিজে গিয়ে ইলেকট্রিশিয়ান যোগাড় করা তার উল্লেখযোগ্য কীর্তির মধ্যে পরিগনিত হয়েছে। তার করুণ চোখদুটোর দিকে তাকিয়ে মা একটা সন্দেহজনক বীমা কোম্পানিতে দশ হাজার আর স্বয়ং তাকে পাঁচ হাজার টাকা নগদ দিয়েছে, গল্পে গল্পে সে কথাও প্রকাশ পেয়েছে।

রিনির অনেক প্ররোচনা এবং সাবধানবানী সত্ত্বেও রজতের প্রতি তার বাবা মায়ের অন্ধবিশ্বাসকে টলানো যায়নি এক চুলও। শেষটায় বাসন্তীকেই “মালটাকে একটু চোখে চোখে রাখিস তো” বলে তাকে কোলকাতায় ফিরে আসতে হয়েছে।

তারপর ক'দিন নির্বিঘ্নেই কেটেছে। নববর্ষ আসন্ন। বহু অনুরোধ সত্ত্বেও মা বাবা কোলকাতায় একদিনের জন্যেও আসতে রাজি হয়নি। রজত নাকি ওখানে ওদের সব ব্যবস্থা করে দিচ্ছে। সে যে কত 'কাজের' সেকথা বাবা জার্মানির ফাঁকে ফাঁকে গুঁজে দিয়েছে। রিনি বাসন্তীর মারফত জেনেছে যে রজত প্রায়ই নাকি ওদের বাড়িতে দুপুরের খাওয়াও সারছে। মা নববর্ষ উপলক্ষে ওকে জামা জুতো সব কিনে দিয়েছে।

রিনির অস্বস্তি বেড়েই চলেছে। একটা উটকো ছেলেকে কেন যে তার বাবা মা এতো ভরসা করছে! বাড়িতে ডেকে খাওয়ানো দাওয়ানো – ও যদি ডাকাতির পার্পাসে এসে থাকে? আলমারি ভর্তি মায়ের সোনার গয়না... চাবিটাবি কোথায় আছে সব দেখে রেখেছে নিশ্চয়ই। একরাতে ঢুকে যদি সবার গলা কেটে রেখে যায়?

কিন্তু যাদের গলা তাদেরই টনক নেই। কাজেই দূরে বসে দাঁত কিড়মিড় করা ছাড়া রিনিরও কিছুই করার থাকে না। অভিনব সব শোনে আর শুধুই মিটিমিটি হাসে।

ফোনটা এল নতুন বছরের ঠিক আগের দিন। রিনি আর অভিনব শান্তিনিকেতনে যাবে বলে ব্যাগ গোছাচ্ছে এমন সময়ে।

“রিনি মা, একবারটি আসতে পারবি?”

বাবার গলা শুনেই রিনি বুঝে গেল নিশ্চয়ই গুরুতর কিছু একটা হয়েছে।

“কি-কি হয়েছে?” রিনি আতংকিত হয়ে জিজ্ঞেস করল। মনে মনে যদিও উত্তরটা সে জানে। ওই রজতই কিছু একটা করেছে।

“আর বলিস না...রক্তারক্তি কাণ্ড হয়েছে। এইমাত্র পুলিশ চলে গেল।”

রক্তারক্তি...খুনের চেষ্টা করেনি তো?

“মা...মা ঠিক আছে?” রিনির চোখে জল এসে গেছে।

“হ্যাঁ হ্যাঁ, এখন ঠিকই আছে।”

এখন...এখন মানেটা কি?

“তুমি কোনো চিন্তা কোর না বাবা, আমরা এক্ষুনি আসছি। বাড়িতেই আছ তো?”

আধ ঘন্টার মধ্যেই রিনি আর অভিনব গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। আভিনবই চালাল। কারণ রিনির হাত থরথর করে কাঁপছে। বাবা যদিও বলেছে সবাই বাড়িতে আছে, কিন্তু কি অবস্থায় আছে? বাবা মিথ্যে আশা দেয় নি তো? ওখানে গিয়ে মাকে সে কি অবস্থায় দেখবে? রক্তারক্তি! পুলিশ!

“আমি জানতাম!” রিনি কাঁদতে কাঁদতে অভিনবকে বলতে লাগল, “ওই ছেলেটাকে একবার দেখেই আমি বুঝে গেছিলাম ও সাংঘাতিক কিছু একটা ঘটাবে! নিশ্চয়ই ডাকাতি করতে এসেছিল! মা বাধা দেওয়ায় অ্যাটাক করেছে! মা কি অবস্থায় আছে কে জানে!”

“চিন্তা করছ কেন?” অভিনব ভরসা দেয়, “বাবা তো বললেন মা ভালো আছেন।”

“মা যে কেন এরকম একটা ক্রিমিনালকে বিশ্বাস করতে গেল! ছোট শহরে নাকি এসব কিছু হয়না, হুঁঃ!” জানলার কাঁচে রিনি মাথা ঠুকতে লাগল। কেন যে মা বাবাকে জোর করে কোলকাতায় নিয়ে এলো না!

শান্তিনিকেতনে পৌঁছেই গাড়ি থেকে প্রায় ছিটকে বেরিয়ে গেল রিনি। বাগান থেকেই দেখতে পেল বাইরের ঘরে আলো জ্বলছে, সামনের দরজাটা হাট করে খোলা। হাঁফাতে হাঁফাতে ঘরে ঢুকে দেখে বাবা একা সোফায় বসে আছে। সারা ঘরের লণ্ডভণ্ড অবস্থা।

“বলেছিলাম, একটা অচেনা ছেলেকে ভরসা না করতে!” রিনি কাঁপা কাঁপা গলায় চেঁচাতে শুরু করল। “এবার শিক্ষা হল তো?”

বাবা করুণ চোখে রিনির দিকে তাকালো।

“কি জানি কি করে সব হয়ে গেলো...সকাল থেকে তো সব ঠিকই ছিল।”

“সকাল থেকে কি বুঝবে? ও কি রঘু ডাকাত নাকি যে খবর দিয়ে আসবে?” রিনির বুক ধরফর করছে। মা কি বাড়িতেই আছে? আর বাসন্তীই বা কোথায়?

“কে ডাকাত? ওই মেয়েটার কথা বলছিস?”

“কিসের মেয়ে?” বাবার কি শকে মাথা খারাপ হয়ে গেছে নাকি?

বাবা মাথা নাড়ল।

“আগে দেখিনি কোনোদিন। এসে জিজ্ঞেস করল রজত আছে কি না। তোর মা বারান্দায় বসে ছিল। ও জানতে চাইল মেয়েটা কে। মেয়েটা বলল – ও নাকি রজতের বউ। রজতের টাকার ব্যাগটা নিতে এসেছে। অফিসে গিয়ে পায়নি তাই এখানে এসেছে।”

রিনি একটা সোফায় বসে পড়ল।

রজত ওর বউয়ের সঙ্গে মিলে ডাকাতি করে?

“মা কোথায়, মা?”

“আমরা জানতাম না রজতের বিয়ে হয়ে গেছে,” বাবা বিড়বিড় করে বলতেই থাকে। “তোর মা তো বিশ্বাসই করতে চায়নি। মেয়েটাকে বারান্দায় বসিয়ে রেখে দিয়েছিল, রজতের সামনে ধরিয়ে দেবে বলে। কিন্তু রজত এসে মেয়েটাকে দেখে ঘাবড়ে গেল। জানা গেল সত্যিই মেয়েটা ওর বউ। লুকিয়ে বিয়ে করেছে। আমাদের বললে পাছে ধরবাবুকে লাগিয়ে দিই সেই ভয়ে চেপে গেছে।”

“আরে তুমি আসল কথায় এসো না, ভণিতা ছেড়ে!”

“রজত বিয়ের কথা স্বীকার করতেই তোর মা কেমন যেন হয়ে গেল। বলল, তুই আমাকে এসব কিচ্ছু বললি না? শুধু আমার বীমার টাকায় কমিশন খাবি বলে ভালোমানুষির ভান করছিলি? মিথ্যেবাদী! এক্ষুনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে যা!”

“কেন? রজতের বউ আছে তো মায়ের কি?”

“জানিস তো, তোর মা মিথ্যে কথা সহ্য করতে পারে না। যাই হোক, রজত ওর ব্যাগটা নিতে এই ঘরে এল। তোর মাও ওর পেছন পেছন ছুটে এলো। বাসন্তী আটকাতে গেলে এলোপাতাড়ি জিনিসপত্র ছুঁড়তে লাগল। রজতের কপালে ফুলদানির কোণা লেগে একেবারে বিশ্রী রক্তারক্তি কাণ্ড।”

“মা-মানে?” রিনির মাথায় সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। “মা-র চোট লাগেনি?”

“না না, তোর মায়ের কেন চোট লাগবে?” বাবা এমনভাবে তাকায় যেন রিনি পাগল হয়ে গেছে। “বাসন্তী তোর মাকে ধরে শান্ত করছিল এর মধ্যে কখন দেখি রজতের বউ রজতকে নিয়ে থানায় ডায়রি করতে গেছে। একটু বাদে পুলিশ এসে হাজির। রজতের বউ তোর মায়ের নামে কেস করতে চায়। আমি কোনরকমে ওদের টাকা পয়সা দিয়ে ক্ষমা টমা চেয়ে ব্যপারটা মিটিয়েছি।”

“আর মা?”

“ডাক্তার ঘুমের ওষুধ দিয়েছে। পাশের ঘরে ঘুমচ্ছে। বাসন্তী ওর কাছে বসে আছে।”

রিনির হাত পা ক্রমশঃ অবসন্ন হয়ে আসে। কি বলবে, কি করবে কিছুই বুঝতে পারে না।

হঠাৎ বাবা সম্বিত ফিরে পায়। “আরে অভিনব, তুমি কখন এলে? এই দ্যাখো, তোমরা আজকের দিনে এলে অথচ বাড়িতে একটু মিষ্টিও নেই...আমি তো এর মধ্যে বেরোতেও পারব না, জার্মানিতে থাকলে অবিশ্যি আলাদা কথা ছিল...তোমার মা কি যে করেন না মাঝেমাঝে...”

“না না, আপনি ও নিয়ে ভাববেন না,” অভিনব রিনির বাবাকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করে, “আমরা আছি তো। আমি কাল বেরিয়ে মিষ্টি নিয়ে আসব।”

বাবার ম্লান মুখ একটু উজ্জ্বল হল।

“তাই ভালো, বাবা। তোমরাই তো এখন আমাদের ভরসা। রজতকে তো আর কাজে লাগাতে পারব না...আমার এটিএম কার্ড টার্ড সব ফেরত দিয়ে গেছে।”

“ওঃ, ফেরত দিয়ে দিয়েছে...” কার্ড ফিরলেও রিনি এখনো বাস্তবে ফিরতে পারেনি।

“হ্যাঁ,” বাবা বাসি দাড়িতে হাত বুলিয়ে নিল, “ও-ই তো ওর বউকে বুঝিয়ে শুনিয়ে কেস তুলে নিতে বলল। ছেলেটা সত্যিই বড় কাজের ছিল রে!”

বাবার হৃদয়মথিত হাহাকার বিদায়ী বছরের হাওয়ায় মিশে রাতের আকাশে ছড়িয়ে পড়ল।

রিনি স্বপ্নাবিষ্টর মতো মাথা নাড়ে।
0

গল্প - মনোজ কর

Posted in




















১৬ পর্ব

দুপুরের একটু আগে বড়কালীর ফোন এল।

- খুব ভালো করেছেন, মিঃ রায়।

-কী ভালো করলাম? কী ব্যাপারে বলছ?

-আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন।

-তুমি কোথায়?

-কাঠমান্ডুতে।

-তুমি বোধহয় জানোনা এর মধ্যে অনেক কান্ড হয়ে গেছে।

-আমি সব জানি, মিঃ রায়। আমি কাঠমান্ডুতে কিন্তু আমার কাছে সব খবর আছে।

-তুমি জানো পুলিশ তোমার পুত্র এবং পুত্রবধূকে আটকে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করছে? তুমি জান যে বন্দুকটা ঘটনাচক্রে আমি …

-সব জানি বললাম তো। আপনি যা করেছেন একেবারে ঠিক করেছেন। কিন্তু দয়া করে ভুলে যাবেন না যে রেবাকে পুলিশের হাত থেকে বাঁচাবার দায়িত্ব আপনার।

-তোমার পুত্র আর পুত্রবধূকে?

-যা ভালো বুঝবেন করুন। কিন্তু আমি আপনাকে বলে রাখছি পুলিশ ওদের বিরুদ্ধে কিছু করতে পারবে না। জিজ্ঞাসাবাদ শেষ হলে কপাল চাপড়াবে পুলিশ।

-আমি কী ওদের কেসটাও দেখবো? কী চাও তুমি?

-ওদেরটাও দেখুন। কিন্তু আপনার প্রথম এবং মূল দায়িত্ব রেবা।

-আর তোমার কী হবে?

- আমাকে নিয়ে চিন্তা করবেন না। আমার কয়েকটা জিনিস জানার ছিল। দেখুন আমি এখানে একটা হোটেলে আছি। নিজের নামেই আছি। আমি অন্য কোথাও পালানোর চেষতা করিনি। আমি প্রমাণ করতে পারি যে আমি ব্যবসার কাজে এখানে এসেছি। পুলিশ যে কোনও মুহূর্তে আমাকে খুঁজে পেতে পারে। আমি ঠিক করেছি পুলিশ যদি আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে আমি কোনও কথা বলবো না। আমি বলবো যে আমি আমার আইনি পরামর্শদাতার অনুপস্থিতিতে কোনও প্রশ্নের উত্তর দেবনা।

-সেটা কিন্তু তোমার পক্ষে ভালো হবে না। বিশেষ করে তোমার সম্বন্ধে সাধারণ মানুষের এবং পুলিশের সন্দেহ বেড়ে যাবে। তোমার সম্বন্ধে মানুষের এবং পুলিশের ভালো ধারণায় চিড় ধরবে। ওরা কিন্তু তোমাকে দোষী প্রমাণ করতে চাইবে।

-করুক। দেখা যাক না কী করে। চাইলে তো আর নির্দোষকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না।

-কিন্তু তুমি হয়ত জানোনা যে কিছু সাক্ষ্যপ্রমাণ আছে যা দিয়ে তোমাকে দোষী প্রমাণ করার চেষ্টা করা যেতে পারে।

- হয়ত আমার বিরুদ্ধে আরও কিছু যোগাড় করতে পারে। আপনি রেবার দিকটা দেখুন। আপনার সাহায্য ওর খুব দরকার।আমার ব্যাপারটা আমি সামলে নেব। আমি ওদের সঙ্গে কোনও কথা বলবো না। আমি বলতে বাধ্য নই বলে আমার বিশ্বাস। তাই নয় কি?

-না বাধ্য নও যদি তুমি বলো যে তুমি তোমার অ্যাটর্নির অনুপস্থিতিতে কিছু বলবে না। উনি এলে তারপর বলবে।

-ঠিক আছে। আমি বলবো যে আপনি আমার অ্যাটর্নি এবং আপনার পক্ষে এখন কাঠমান্ডু আসা অসম্ভব। আর আমারও অনেক ব্যবসাসংক্রান্ত জরুরি কাজ আছে। কিন্তু ওরা যদি বাড়াবাড়ি করে তাহলে আমি কী করবো?

-তুমি এখন বিদেশে। ওরা তোমার বিরুদ্ধে খুনে অভিযোগ এনে তোমাকে দেশে ফিরিয়ে নিয়ে আসার চেষ্টা করতে পারে।

-বুঝেছি। কিন্তু আমার মনে হয় আমার বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট কোনও অভিযোগ না থাকলে ওরা এত কান্ড করবে না।

-ওরা যদি নিশ্চিত না হয় যে তোমাকে নিয়ে এসে ওদের কোনও লাভ আছে তাহলে ওরা তোমার জন্য সময় নষ্ট করবে না। কিন্তু সমস্যা হলো এই যে ওরা মনে করে তোমাকে নিয়ে এসে ওদের অনেক লাভ আছে।

-সেক্ষেত্রে মুখ বন্ধ করে থাকবো। ওরা সন্দেহাতীত ভাবে প্রমাণ করুক যে আমি খুন করেছি।

- কিন্তু দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারটা উড়িয়ে দিও না।

-না, না। আমি কোনও সম্ভাবনাই উড়িয়ে দিচ্ছিনা।

-আমার ভয় হচ্ছে এতক্ষণে পুলিশ রেবাকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে দিয়েছে।

-আমারও তাই মনে হচ্ছে।ওরা আমার ছেলে এবং ছেলের বৌকেও জিজ্ঞাসাবাদ করছে। ওরা যত কেসটার ভিতরে ঢুকবে তত গুলিয়ে যাবে। আমি জানিনা কী ভাবে তবে আপনি যেটা করেছেন সত্যিই ভাবা যায় না। আমার কাছে প্রশংসার ভাষা নেই। আপনি তো এই হোটেলের নাম্বার জানেন এবং এও জানেন আমাকে পেতে গেলে কাকে ফোন করতে হবে।

-ঠিক আছে। আর আমাকে না পেলে সুন্দরীকে ফোন কোরো। আমি কিছু লোকজনকে গোয়েন্দাগিরির জন্য লাগাচ্ছি। ওদের বিলটা কিন্তু যোগ হবে।

-কোনও সমস্যা নেই। আমি বিনা পয়সায় কোনও কাজ করিনা এবং করাইনা। আপনার যেটা ভালো মনে হয় করুন। টাকা নিয়ে ভাববেন না। আপনার বিল নিয়ে আমি আগে কোনওদিন প্রশ্ন করিনি এবং ভবিষ্যতেও করবো না। কিন্তু আপনি আর যাই করুন রেবার দিকে নজর রাখুন। রাখলাম।

বড়কালীর সঙ্গে কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গেই দরজা ঠেলে সুন্দরীকে ঢুকতে দেখে অবাক হলেন পানু রায়। বললেন,’ কী হলো? আমি যে তোমাকে বললাম ভেতরে গিয়ে একটু বিশ্রাম নিতে।‘

-আমি পাশের দোকান থেকে মাথাধরার একটা ট্যাবলেট কিনে খেয়ে খানিকক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে দেখলাম এখন বেশ ঝরঝরে লাগছে। আমি ভাবছিলাম ছোটকালী সেদিন গাড়ি কেনার ব্যাপারে আমাদের কী বলছিল।

-কী বলছিল?

-বলছিল যে নতুন গাড়ি কিনে দু’বছর পরে বিক্রি করতে গেলে ভালো দাম পাওয়া যায় না। তাই চেনাশোনা কোনও পুরনো গাড়ির ডিলারের থেকে গাড়ি নেওয়া অনেক বেশি লাভজনক।

-তার মানে তুমি না ঘুমোতে গিয়ে ছোটকালীর অফিসে গিয়েছিলে?

-কিন্তু আমি ঠিক আছি। ট্যাবলেটটা খেয়ে আমি এখন পুরোপুরি ঠিক হয়ে গেছি।

-কেন গিয়েছিলে?

-আমার গাড়িটা ঠিক চলছিল না। তাই ভাবলাম আজ যখন একটু সময় পেলাম তাহলে একবার ঘুরে আসি। ছোটকালী ওখানে ছিলনা।একজন সেলসম্যানের সঙ্গে দেখা হলো। ছেলেটা জানতো তুমি ছোটকালীর বন্ধু। আমি যখন বললাম যে ছোটকালী আমাদের বিশেষ পরিচিত এবং বলেছিলেন যতটা সম্ভব কম দামে পারবেন উনি আমাদের একজনকে বা দু’জনকেই ভালো গাড়ি ব্যবস্থা করে দেবেন। সব শুনে ছেলেটা আমাকে একটা গাড়ি দেখালো। গাড়িটা দেখে ওটার প্রেমে পড়ে যাওয়া ছাড়া অন্য কোনও উপায় নেই।

-গাড়িটা কিনলে?

-কেনার কথা ভাবছি। তোমাকে ফোন করার চেষ্টা করলাম কিন্তু পেলাম না।

পানু রায় উত্তর দেবার আগেই দরজা ঠেলে জগাই ঢুকলো। বললো,’ এবার মনে হচ্ছে যাবতীয় কাগজপত্র হাতে নিয়েই কেলো দারোগা তোমার সঙ্গে দেখা করতে আসবে।‘

-কেন? কী হয়েছে?

-পুলিশ তো এখন নিজেদের নখ-চুল ছিঁড়ছে। কিছুতেই কিছু বুঝে উঠতে পারছে না। তোমাকে একটা খবর দিতে এলাম। তোমার কাজে লাগলেও লাগতে পারে। কেলো দারোগা ছোটকালীর দেয়ালে আটকে থাকা বুলেটটাকে নিয়ে সাক্ষ্যপ্রমাণ হিসাবে এতক্ষণ নিয়ে আসেনি। কিছুক্ষণ আগে কেলো দারোগা অস্ত্র বিশেষজ্ঞ সমাহারে বুলেট উদ্ধার করতে গিয়ে কী দেখলো জান?

-কী দেখলো?

-কোনও উৎসাহী ব্যক্তি ওটাকে ইতিপূর্বেই ওখান থেকে নিয়ে গেছে। গুলিটা ত্যারচাভাবে টেবিলে লেগে লাফিয়ে উঠে সামনের দেয়ালে গিঁথে গিয়েছিল।কেউ গিয়ে দেয়ালে একটা ছোট গর্ত করে সযত্নে গুলিটাকে নিয়ে চলে গেছে।

পানু রায় ভুরু কুঁচকে সুন্দরীর দিকে তাকালেন। সুন্দরী বলে উঠলো,’ ভাবা যায়? কিন্তু কে এমন কান্ড করতে পারে, জগাই?’

-কে জানে? কোনও উৎসাহী লোকের কাজ হবে। কিন্তু এখন পুরো কেসটা ঘেঁটে ঘ হয়ে গেছে।

-কিন্তু কী করে? কেন একথা বলছো?

-একটা ঘটনা পরম্পরাকে প্রমাণের জন্য খুব দরকারী সূত্র ছিল ঐ গুলিটা। কেলো দারোগা আঙ্গুল কামড়াচ্ছে এখন। সবাই বলবে পুলিশ এতদিন ঘুমিয়েছিল।

পানু রায় জিজ্ঞাসা করলেন,’ জগাই, তুই কোথা থেকে খবর পেলি?’

- অনেক ঘুরপথে খবরটা আমার কাছে এসেছে। সনাতনের লেখাটা কাগজে বেরোবার সঙ্গে সঙ্গে অনেক লোক ওখানে যেতে শুরু করে। ওখানে কী ঘটছে জানার জন্য সনাতন একজন সেলসম্যানের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে এবং মনে হয় কিছু পয়সা-কড়ি দিয়ে ওখানে কী হচ্ছে তার খবর জোগাড় করতে থাকে। কিছুক্ষণ আগে সনাতনের কাছে কেলো দারোগার এই বুলেট খুঁজে না পাবার খবরটা সনাতনের কাছে এসে পৌঁছোয়। সনাতনের অফিসের একটা লোক আমাকে চারদিকে কী ঘটছে সেই সংক্রান্ত খবর দেয় নিয়মিত। ঐ লোকটাই একটু আগে আমাকে ফোন করে ব্যাপারটা জানালো।

- জগাই, এতো অত্যন্ত জরুরি খবর। তোর কাছ থেকে আমি এতটা আশা করিনি। আমি খুব খুশি। এরকম খবর জোগাড় করতে থাক। এই ব্যাপারে সব খবর আমার চাই।

-কিন্তু দাদু, খরচের ব্যাপারটাও দেখতে হবে তো?

-খরচের ব্যাপারে কিছু ভাবার দরকার নেই। কোনও দরকারি খবর যেন বাদ না পড়ে।

-ঠিক আছে দাদু। আমি আসছি। দেখি আর কী খবর জোগাড় করতে পারি।

জগাই বেরিয়ে যায়। পানু রায় এবার সুন্দরীর দিকে সোজা তাকিয়ে বললেন,’ সুন্দরী, এবার আসল গল্পটা আমাকে বলো।‘ পানু রায়ের কথা শেষ হবার আগেই বাইরের দরজা ঠেলে কেলো দারোগা ঢুকলো। কেলো দারোগা বললো,’ কোনও ব্যক্তিগত আলোচনার মধ্যে এসে পড়লাম?’ পানু রায় বললেন,’ হ্যাঁ, একটা ছোট ব্যক্তিগত আলোচনা শেষ করার ছিল।‘

-কোনও ব্যাপার নয়। আপনারা শেষ করে নিন। বাইরে আমাদের লোকেরা আছে। আর কাউকে ভেতরে ঢুকতে দেবে না।

- আমার অফিসটাকে নিজের বাড়ির মত ভাবার জন্য ধন্যবাদ।

-দেখুন আমি আইনের প্রতিনিধি। আইন কারুর বাড়ির বাইরের ঘরে অপেক্ষা করে না। আমাদের যখন কারুর সঙ্গে দেখা করার দরকার হয় তখন আমরা সোজাসুজি তার কাছে পৌঁছে যাই।

-আপনি যে আসছেন সে কথা জানানোর প্রয়োজন বোধ করেন না?

-কিছু কিছু বোকা পুলিশ অফিসার করে। আমি করিনা। আমি কাউকে আগাম সাবধান করিনা। আমি হঠাত পৌঁছে গিয়ে প্রথম এক-দুই সেকেন্ডে তার মুখের পরিবর্তন লক্ষ্য করি।

-আমার মুখ দেখে কী বুঝলেন?

-অনেক কিছু। বুঝলাম যে আপনি আমার সঙ্গে কথা বলতে আগ্রহী নন।

-ঠিকই বুঝেছেন। যাই হোক, এসে যখন পড়েছেন বসুন। মাথার টুপি খুলুন এবং বলুন আপনার জন্য কী করতে পারি?

-ব্যস্ত হবেন না। আপনি নিশ্চয়ই জানেন আমি কী চাই।

-আমি তো গনৎকার নই।তাছাড়া আপনি কেন এসেছেন সেই নিয়ে আকাশপাতাল চিন্তা করে সময় নষ্ট করার সময় এবং ইচ্ছা কোনওটাই আমার নেই। আমার আগের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি আপনি আপনার কী চাই বা কী ভাবছেন বা কী পছন্দ করেন এবং করেন না তা বেশ গুছিয়েই বলতে পারেন। সময় নষ্ট না করে বলে ফেলুন।

-আপনাকেই আগে বলতে হবে। আপনি কালীকৃষ্ণের অফিসে গিয়েছিলেন এবং ওনার টেবিলে গুলি ছুঁড়েছিলেন।

-ওটা একটা অনিচ্ছাকৃত দুর্ঘটনা ছিল। কেউ হতাহত হয়নি। আমি কালীকৃষ্ণকে টেবিল বাবদ ক্ষতিপূরণ দেব বলেছি। এতে পুলিশের কী করার আছে? পুলিশের এই ব্যাপারে কোনও আগ্রহ থাকার কথা নয়।

- কোনও আগ্রহ থাকার কথা নয় বলছেন? ধরুন যদি জানা যায় যে ঐ বন্দুকটা দিয়েই শিবুলাল রেগমিকে তার অ্যাপার্টমেন্টে খুন করা হয়েছিল তাহলে?

-আপনি কি নিশ্চিত যে ঐ বন্দুকটা দিয়েই খুন করা হয়েছিল?

-একশোবার। এবার বলুন ঐ বন্দুকটা আপনি কোথা থেকে পেয়েছিলেন?

- কালীকৃষ্ণের কাছ থেকে। আমি জানতে চেয়েছিলাম যে ওর কাছে বন্দুক আছে কি না। ও বললো ও আত্মরক্ষার জন্য কাছে বন্দুক রাখে। অনেক সময় গুন্ডা বদমায়েশরা মালিকদের আটকে রেখে টাকা আদায় করে। এখানে এরকম ঘটনা আকছার ঘটে। তাছাড়া কালীকৃষ্ণের লাইসেন্স আছে। আপনি এ ব্যাপারে আমার চেয়ে বেশি জানবেন নিশ্চয়ই।

-তাহলে বলছেন কালীকৃষ্ণ আপনাকে বন্দুকটা দিয়েছিল।

-হ্যাঁ, ওর হাত থেকেই আমি বন্দুকটা নিয়েছিলাম। বলা যেতে পারে ও আমাকে বন্দুকটা দেখাচ্ছিল ।আমি বন্দুকটা ওর হাত থেকে নিয়ে বন্দুকটার ভারসাম্য পরীক্ষা করছিলাম আর তখনই অসাবধানতাবশত ট্রিগারে টান লেগে একটা গুলি ছিটকে যায়। কালীকৃষ্ণ আমাকে বলেনি যে বন্দুকটায় গুলি ভরা আছে।

- আপনি কি ভেবেছিলেন যে খালি বন্দুক নিয়ে উনি আত্মরক্ষা করেন?

-আমি অত কিছু ভাবিনি। বন্দুকের ট্রিগার আমি ইচ্ছাকৃতভাবে টানিনি। বলা যেতে পারে ওটার ভারসাম্য পরীক্ষা করার সময় কোনওভাবে ট্রিগারে টান পরে একটা গুলি বেরিয়ে যায়।

-বেশ, তারপর কী হলো?

-আমি রেবা কৈরালার আইনি পরামর্শদাতা। আমার মনে হয়েছিল রেবার জীবন বিপন্ন হতে পারে। আপনি জানেন ওর বাবা খুন হয়েছিল এবং আমি যতদূর জানি খুনি এখনও অধরা।আমি কালীকৃষ্ণকে বললাম যে বন্দুকটা কয়েকদিনের জন্য রেবাকে দিয়ে রাখলে ভালো হয়। আপনি জানেন কি না জানি না যে কালীকৃষ্ণের বিয়ের আগে পর্যন্ত রেবার সঙ্গে ওর ভালো বন্ধুত্ব ছিল।

-জানি, মিঃ রায়। আর এও জানি যে আপনি খুব ভালোভাবেই জানেন কালীকৃষ্ণের যে বন্দুকটার কথা আপনি বলছেন সেটা দিয়ে শিবুলালকে খুন করা হয়নি।

-শুনে আমার ভালো লাগছে। আমি সত্যিই তাই মনে করি। কিন্তু পুলিশ এত জোর দিয়ে বলতে আরম্ভ করল যে ওটা দিয়েই খুন করা হয়েছে আমার পক্ষে অন্যকিছু বলা সম্ভব হচ্ছিল না।

-আপনি এও জানেন আমি কী বলতে চাইছি। আপনি আসলে আসল খুনী বন্দুকটার সঙ্গে এই বন্দুকটা পাল্টে দিয়েছিলেন। আপনার কাছে খুনী বন্দুকটা ছিল। সেটা আপনি আপনার এক ক্লায়েন্টের কাছ থেকে পেয়েছিলেন। আপনি ঐ বন্দুকটা লুকিয়ে সঙ্গে করে নিয়ে কালীকৃষ্ণের সঙ্গে দেখা করতে আসেন। আপনি তারপর কালীকৃষ্ণকে জিজ্ঞাসা করেন তার কাছে কোনও বন্দুক আছে কি না। উনি বললেন আছে এবং ড্রয়ার থেকে বের করে টেবিলে রাখলেন। আপনি বন্দুকটা পরীক্ষা করার আছিলায় ট্রিগার টেনে দিলেন। ঐ গোলমালের মধ্যে সবার নজর এড়িয়ে আপনি আপনার বন্দুকটার সঙ্গে ঐ বন্দুকটা পাল্টে দিলেন।

-আপনি বলছেন কালীকৃষ্ণের বন্দুকটা খুনী বন্দুক নয়। খুনী বন্দুকটা আমার কাছে ছিল যেটা আমি পাল্টে দিয়েছি। আপনি একটা কাজ করতে পারেন। ঐ বন্দুকটা যেটা আপনারা পেয়েছেন সেটার নাম্বার নিয়ে ওটার রেজিস্ট্রেশন কার নামে দেখতে পারেন।

-সেটা আমরা ইতিমধ্যেই করেছি। ঐ বন্দুকটা কিনেছিলেন কালীকৃষ্ণের বাবা কৃষ্ণকালী।

-তাহলে ওটা কালীকৃষ্ণের কাছে কী করে গেল?

-কৃষ্ণকালীর অনেক দোকানের মধ্যে একটা খেলার সরঞ্জামের দোকান আছে। সেই দোকানের জন্য কৃষ্ণকালী তিনটে একই রকমের বন্দুক কেনে। তিনটেই হুবহু এক। তার মধ্যে একটা সে কালীকৃষ্ণকে দেয় আর দু’টো নিজের কাছে রাখে।

-নিজের কাছে দু’টো রাখে?

-ওনার ছেলে আমাদের তাই বলেছে, মিঃ রায়।

-তার মানে এটাই দাঁড়ায় যে বন্দুকটা আমি কালীকৃষ্ণের কাছ থেকে নিয়েছিলাম সেটা আসলে কৃষ্ণকালীর এবং কৃষ্ণকালী সেটা তার ছেলে কালীকৃষ্ণকে দিয়েছিল।

-খুনী বন্দুকটা কৃষ্ণকালীর একসঙ্গে কেনা তিনটে একইরকম বন্দুকের একটা। আমরা জানি যে বন্দুকটা আপনি কালীকৃষ্ণের কাছ থেকে নিয়েছিলেন সেটা দিয়ে খুন করা হয়নি।

-আপনি সেটা কী করে বুঝলেন, দারোগাবাবু?

-কারণ ঐ বন্দুকটা খুনের দিন সকাল থেকে রাত্রি পর্যন্ত কখন কোথায় ছিল তার পুরোপুরি হদিশ আমরা কালীকৃষ্ণের কাছ থেকে পেয়েছি।

-তাহলে আপনি নিশ্চিত যে ঐ বন্দুকটা দিয়ে খুন করা হয়নি।

-আশ্চর্য! সে কথাই তো আমি এসে পর্যন্ত বলে আসছি।

-আপনি একশভাগ নিশ্চিত তো? আগে আপনি বলেছিলেন যে ওটা দিয়েই খুন করা হয়েছিল এবং এখন আপনি বলছেন ওটা দিয়ে খুন করা হয়নি।

-মিঃ রায়, এখন আমি বলছি খুনী বন্দুকটা আপনার কাছে ছিল। ঐ বন্দুকটা কৃষ্ণকালীর বন্দুক যেটা সে কোনও কারণে রেবা কৈরালাকে দিয়েছিল। রেবা কৈরালা ঐ বন্দুকটা নিয়ে শিবুলালের কাছে যায় এবং তাকে খুন করে। রেবা কৈরালা আপনার সাহায্য চায়। আপনি খুনী বন্দুকটা নিয়ে কালীকৃষ্ণের কাছে যান এবং তার বন্দুকের সঙ্গে খুনী বন্দুকটা পাল্টে নেন। তারপর খুনী বন্দুকটা সঙ্গে নিয়ে আপনার সঙ্গে কালীকৃষ্ণ রেবার কাছে যায়।

-দারোগাবাবু, আপনার কেন মনে হচ্ছে যে খুনী বন্দুকটা আমি নিয়ে গিয়ে ওখানে রেখে আসব যাতে পুলিশ সেটা সহজে খুঁজে পায়? একটা কারণ তো দেখান।

- আমি জানিনা কেন।তবে আমি নিশ্চিত আপনি এটা করেছেন। আর একটা কথা বলে রাখি মিঃ রায়, এবার কিন্তু গল্প বলে আপনি পার পাবেন না। শিবুলালের মৃত্যুর সময় আর আপনার ওনার সঙ্গে দেখা করার সময় মিলে যাচ্ছে।

-তার মানে আমি শিবুলালকে খুন করেছি।

-না, আপনি করতেও পারেন। আমি বলছিনা যে আপনি শিবুলালের ফ্ল্যটে ঢুকে ঠান্ডা মাথায় তাকে খুন করেছেন। কিন্তু এমনও তো হতে পারে যে আপনার সঙ্গে কোনও বিষয়ে কথা কাটাকাটি হয়েছিল। শিবুলাল উত্তেজিত হয়ে বন্দুক বের করলো। তখন কোনও উপায় না দেখে আপনি বন্দুকটা ওর ওপর চেপে ধরে ট্রিগার টেনে দিলেন।

-আপনাকে আরও ভালো একটা গল্প তৈরি করতে হবে, দারোগাবাবু।আমি যখন বেরিয়ে আসি তখন শিবুলাল বেঁচে ছিল এবং ভালো ছিল। সে কোনও একজন আসার জন্য অপেক্ষা করছিল।

-ঠিক, রেবা কৈরালার জন্য।

-না, রেবা নয়। অন্য কেউ যে তাকে একটু আগেই ফোন করেছিল এবং বলেছিল যে সে এক্ষুনি আসছে।

-আপনি কী করে জানলেন?

-শিবুলাল আমাকে চলে যেতে বলেছিল । বলেছিল কেউ একজন এক্ষুনি তার কাছে আসবে এবং ব্যাপারটা বেশ জটিল। আমি যেন তক্ষুনি চলে যাই।

-তক্ষুনি আপনি চলে গেলেন এবং বাড়ির পিছনে অপেক্ষা করতে থাকলেন। কিছুক্ষণ পরে জনৈকা মহিলা পিছনের সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামলেন আর আপনি তাকে গাড়িতে তুলে নিয়ে চলে গেলেন। তাই তো?

-আমি তাই করেছিলাম?

-একদম তাই এবং ঐ জনৈকা মহিলা সে যেই হোক সেই খুনী। আপনি তাকে বাঁচাতে চাইছেন। আপনি জানতেন সে শিবুলালের কাছে যাবে। সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে সে আপনাকে বলে যে সে শিবুলালকে খুন করেছে। সে বন্দুকটা আপনার হাতে দিয়ে জিজ্ঞাসা করে সে এখন কী করবে। আপনি তাকে নিশ্চিন্ত করেন এবং বলেন যে আপনি বন্দুকটাকে কোথাও চালান করে দেবেন এবং কেসটাকে গুলিয়ে দেবেন।

-বাঃ, গল্পটা বেশ ভালো সাজিয়েছেন। কিন্তু মুস্কিল হলো এই যে এই গল্পটা প্রমাণ করা অসম্ভব কারণ গল্পটা ভুল।

-আমাদের কাছে প্রমাণ আছে।

-তাই নাকি?

-আমাদের কাছে প্রত্যক্ষদর্শী আছে যে সাক্ষ্য দেবে যে আপনি বাইরে অপেক্ষা করছিলেন এবং ঐ মহিলা সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলে আপনি তাকে গাড়িতে তুলে নিয়ে চলে যান। আমাদের কাছে আরও প্রত্যক্ষদর্শী আছে যে সাক্ষ্য দেবে যে আপনার কাছে খুনী বন্দুকটা ছিল এবং সেটা থেকে গুলি আপনি কালীকৃষ্ণের টেবিলে ছুঁড়েছিলেন।

-আপনি কী করে প্রমাণ করবেন যে ঐ বন্দুকটাই খুনী বন্দুক?

-ঐ গুলিটা থেকে। আমাদের অস্ত্র বিশারদ অনায়াসেই প্রমাণ করে দেবেন যে ঐ গুলিটা খুনী বন্দুক থেকে ছোঁড়া হয়েছিল। সেটা যদি হয় তাহলে প্রমাণ হবে যে আপনি ঐ মহিলা যিনি সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমেছিলেন তাঁর কাছ থেকে খুনী বন্দুকটা নিজের কাছে নিয়েছিলেন। আর তা যদি না হয় তাহলে প্রমাণ হবে আপনি কালীকৃষ্ণের অফিসে বন্দুক বদল করেছিলেন।

-বেশ, বেশ। তার মানে আপনার যুক্তি অনুযায়ী যাই ঘটুক আমি দোষী প্রমাণিত হবো।

-হ্যাঁ, তাতে অসুবিধের কী আছে?

- না এটা অন্যায় হবে। আমার মনে হয় গুলিটা খুনী বন্দুক থেকে ছোঁড়া হলে আমি দোষী আবার না ছোঁড়া হলে আমি বন্দুক বদলের জন্য দোষী এরকম একটা বিচার ন্যায়সঙ্গত নয়। আমার মনে হয় আপনার এই চিন্তাভাবনা পক্ষপাতদুষ্ট, দারোগাবাবু।

-সেই একই ঘেঁটে দেওয়ার চেষ্টা। যতবারই আমরা কোনও গুলি ছোঁড়ার তদন্তে নামি ততবারই আপনি অন্য একটা বন্দুক আমদানি করে সহজ ব্যাপারটা গুলিয়ে দেন।

-তাতে দোষের কী দেখলেন, দারোগাবাবু।

-এটা বেআইনি, ব্যস।

-তাহলে আমি অপরাধী –এটাই শেষ কথা, ব্যস?

-এবার আপনাকে আর ছাড়ছিনা। সেটা মন দিয়ে শুনে রাখুন।

-আপনি তাহলে আমার উদ্ভাবনীশক্তির প্রশংসা করবেন নিশ্চয়ই?

-আমি আপনার কায়দা ধরে ফেলেছি, মিঃ রায়। এবার কি আপনি বলবেন সেদিন ঠিক কী হয়েছিল? মানে আপনি কী করেছিলেন? যদি বলে দেন ভালো হয়। আমরা আপনাকে অযথা বিরক্ত করবো না। কিন্তু যদি না বলেন তাহলে আমরা অফিসের দেওয়াল থেকে যে গুলিটা উদ্ধার করেছি সেটা আপনার কাছে যে বন্দুকটা ছিল সেটার সঙ্গে মিলিয়ে দেখবো এবং তারপর কী হবে সেতো আপনার জানাই আছে।

সুন্দরী খুক খুক করে কেশে উঠলো। পানু রায় বললেন,’ এটাতো সোজাসুজি ভয় দেখানো হয়ে গেল’। কেলো দারোগা বলল,’ হ্যাঁ। এটাই ঘটবে। আপনাকে আগে থেকে বলে রাখলাম। এটাকে যদি ভয় দেখানো বলেন তবে তাই’।

-আপনি যখন মেনেই নিচ্ছেন আমার আর কিছু করার নেই। আমি আপনাকে বলতে পারি যে আমি কোনও বন্দুক বদল করিনি। আমি যে বন্দুকটা থেকে ভুলবশত গুলি ছুঁড়েছিলাম সেটা এবং কালীকৃষ্ণের ড্রয়ারে যে বন্দুকটা ছিল সে দুটো একই। ঐ বন্দুকটাই কালীকৃষ্ণ রেবার কাছে নিয়ে গিয়েছিল।

-তার মানে আপনি প্রমাণ লুকোনোর চেষ্টা করছেন এবং আততায়ী কে সাহায্য করার চেষ্টা করছেন।

-আমি আপনাকে যা সত্য তাই বলছি, দারোগাবাবু।

-আপনি পরে বলবেন না যে আমি আপনাকে সু্যোগ দিইনি। আজ আসি।

কেলো দারোগা অফিস থেকে বেরিয়ে গেল। পানু রায় বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে যখন নিশ্চিত হলেন যে কেলো দারোগা আশেপাশে নেই তখন সুন্দরীকে জিজ্ঞাসা করলেন,’ তুমি কি ছোটকালীর অফিসে গিয়েছিলে এবং গুলিটা দেয়াল থেকে তুলে নিয়ে এসেছিলে?

-কেন? তোমার কেন মনে হলো আমি এরকম একটা কিছু ঘটাতে পারি?

-তুমি করেছো কি না বলো? আমার ধারণা কেলো দারোগা আমাকে মিথ্যা বলে কথা বের করার চেষ্টা করছিল।

-আমি যদি গুলিটাকে স্মারক হিসাবে নিয়ে এসে থাকি তবে কি সেটা কোনও গুরতর অপরাধ বলে ধরা হবে?

-সেটা অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ হতে পারে।

-তাহলে আমি যদি বলি যে আমি ওটা নিয়ে এসেছি তাহলে সেটা তোমার পক্ষে অস্বস্তিকর হতে পারে তাই না? আমি বলছি –‘যদি আমি বলি’।

-ঠিক আছে। তুমি যা ভালো বুঝবে।

- তুমি আমাকে অপরাধবোধের হাত থেকে বাঁচালে দাদু।




চলবে