Next
Previous
Showing posts with label গল্প. Show all posts
0

গল্প - মনোজ কর

Posted in




















১৬ পর্ব

দুপুরের একটু আগে বড়কালীর ফোন এল।

- খুব ভালো করেছেন, মিঃ রায়।

-কী ভালো করলাম? কী ব্যাপারে বলছ?

-আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন।

-তুমি কোথায়?

-কাঠমান্ডুতে।

-তুমি বোধহয় জানোনা এর মধ্যে অনেক কান্ড হয়ে গেছে।

-আমি সব জানি, মিঃ রায়। আমি কাঠমান্ডুতে কিন্তু আমার কাছে সব খবর আছে।

-তুমি জানো পুলিশ তোমার পুত্র এবং পুত্রবধূকে আটকে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করছে? তুমি জান যে বন্দুকটা ঘটনাচক্রে আমি …

-সব জানি বললাম তো। আপনি যা করেছেন একেবারে ঠিক করেছেন। কিন্তু দয়া করে ভুলে যাবেন না যে রেবাকে পুলিশের হাত থেকে বাঁচাবার দায়িত্ব আপনার।

-তোমার পুত্র আর পুত্রবধূকে?

-যা ভালো বুঝবেন করুন। কিন্তু আমি আপনাকে বলে রাখছি পুলিশ ওদের বিরুদ্ধে কিছু করতে পারবে না। জিজ্ঞাসাবাদ শেষ হলে কপাল চাপড়াবে পুলিশ।

-আমি কী ওদের কেসটাও দেখবো? কী চাও তুমি?

-ওদেরটাও দেখুন। কিন্তু আপনার প্রথম এবং মূল দায়িত্ব রেবা।

-আর তোমার কী হবে?

- আমাকে নিয়ে চিন্তা করবেন না। আমার কয়েকটা জিনিস জানার ছিল। দেখুন আমি এখানে একটা হোটেলে আছি। নিজের নামেই আছি। আমি অন্য কোথাও পালানোর চেষতা করিনি। আমি প্রমাণ করতে পারি যে আমি ব্যবসার কাজে এখানে এসেছি। পুলিশ যে কোনও মুহূর্তে আমাকে খুঁজে পেতে পারে। আমি ঠিক করেছি পুলিশ যদি আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে আমি কোনও কথা বলবো না। আমি বলবো যে আমি আমার আইনি পরামর্শদাতার অনুপস্থিতিতে কোনও প্রশ্নের উত্তর দেবনা।

-সেটা কিন্তু তোমার পক্ষে ভালো হবে না। বিশেষ করে তোমার সম্বন্ধে সাধারণ মানুষের এবং পুলিশের সন্দেহ বেড়ে যাবে। তোমার সম্বন্ধে মানুষের এবং পুলিশের ভালো ধারণায় চিড় ধরবে। ওরা কিন্তু তোমাকে দোষী প্রমাণ করতে চাইবে।

-করুক। দেখা যাক না কী করে। চাইলে তো আর নির্দোষকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না।

-কিন্তু তুমি হয়ত জানোনা যে কিছু সাক্ষ্যপ্রমাণ আছে যা দিয়ে তোমাকে দোষী প্রমাণ করার চেষ্টা করা যেতে পারে।

- হয়ত আমার বিরুদ্ধে আরও কিছু যোগাড় করতে পারে। আপনি রেবার দিকটা দেখুন। আপনার সাহায্য ওর খুব দরকার।আমার ব্যাপারটা আমি সামলে নেব। আমি ওদের সঙ্গে কোনও কথা বলবো না। আমি বলতে বাধ্য নই বলে আমার বিশ্বাস। তাই নয় কি?

-না বাধ্য নও যদি তুমি বলো যে তুমি তোমার অ্যাটর্নির অনুপস্থিতিতে কিছু বলবে না। উনি এলে তারপর বলবে।

-ঠিক আছে। আমি বলবো যে আপনি আমার অ্যাটর্নি এবং আপনার পক্ষে এখন কাঠমান্ডু আসা অসম্ভব। আর আমারও অনেক ব্যবসাসংক্রান্ত জরুরি কাজ আছে। কিন্তু ওরা যদি বাড়াবাড়ি করে তাহলে আমি কী করবো?

-তুমি এখন বিদেশে। ওরা তোমার বিরুদ্ধে খুনে অভিযোগ এনে তোমাকে দেশে ফিরিয়ে নিয়ে আসার চেষ্টা করতে পারে।

-বুঝেছি। কিন্তু আমার মনে হয় আমার বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট কোনও অভিযোগ না থাকলে ওরা এত কান্ড করবে না।

-ওরা যদি নিশ্চিত না হয় যে তোমাকে নিয়ে এসে ওদের কোনও লাভ আছে তাহলে ওরা তোমার জন্য সময় নষ্ট করবে না। কিন্তু সমস্যা হলো এই যে ওরা মনে করে তোমাকে নিয়ে এসে ওদের অনেক লাভ আছে।

-সেক্ষেত্রে মুখ বন্ধ করে থাকবো। ওরা সন্দেহাতীত ভাবে প্রমাণ করুক যে আমি খুন করেছি।

- কিন্তু দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারটা উড়িয়ে দিও না।

-না, না। আমি কোনও সম্ভাবনাই উড়িয়ে দিচ্ছিনা।

-আমার ভয় হচ্ছে এতক্ষণে পুলিশ রেবাকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে দিয়েছে।

-আমারও তাই মনে হচ্ছে।ওরা আমার ছেলে এবং ছেলের বৌকেও জিজ্ঞাসাবাদ করছে। ওরা যত কেসটার ভিতরে ঢুকবে তত গুলিয়ে যাবে। আমি জানিনা কী ভাবে তবে আপনি যেটা করেছেন সত্যিই ভাবা যায় না। আমার কাছে প্রশংসার ভাষা নেই। আপনি তো এই হোটেলের নাম্বার জানেন এবং এও জানেন আমাকে পেতে গেলে কাকে ফোন করতে হবে।

-ঠিক আছে। আর আমাকে না পেলে সুন্দরীকে ফোন কোরো। আমি কিছু লোকজনকে গোয়েন্দাগিরির জন্য লাগাচ্ছি। ওদের বিলটা কিন্তু যোগ হবে।

-কোনও সমস্যা নেই। আমি বিনা পয়সায় কোনও কাজ করিনা এবং করাইনা। আপনার যেটা ভালো মনে হয় করুন। টাকা নিয়ে ভাববেন না। আপনার বিল নিয়ে আমি আগে কোনওদিন প্রশ্ন করিনি এবং ভবিষ্যতেও করবো না। কিন্তু আপনি আর যাই করুন রেবার দিকে নজর রাখুন। রাখলাম।

বড়কালীর সঙ্গে কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গেই দরজা ঠেলে সুন্দরীকে ঢুকতে দেখে অবাক হলেন পানু রায়। বললেন,’ কী হলো? আমি যে তোমাকে বললাম ভেতরে গিয়ে একটু বিশ্রাম নিতে।‘

-আমি পাশের দোকান থেকে মাথাধরার একটা ট্যাবলেট কিনে খেয়ে খানিকক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে দেখলাম এখন বেশ ঝরঝরে লাগছে। আমি ভাবছিলাম ছোটকালী সেদিন গাড়ি কেনার ব্যাপারে আমাদের কী বলছিল।

-কী বলছিল?

-বলছিল যে নতুন গাড়ি কিনে দু’বছর পরে বিক্রি করতে গেলে ভালো দাম পাওয়া যায় না। তাই চেনাশোনা কোনও পুরনো গাড়ির ডিলারের থেকে গাড়ি নেওয়া অনেক বেশি লাভজনক।

-তার মানে তুমি না ঘুমোতে গিয়ে ছোটকালীর অফিসে গিয়েছিলে?

-কিন্তু আমি ঠিক আছি। ট্যাবলেটটা খেয়ে আমি এখন পুরোপুরি ঠিক হয়ে গেছি।

-কেন গিয়েছিলে?

-আমার গাড়িটা ঠিক চলছিল না। তাই ভাবলাম আজ যখন একটু সময় পেলাম তাহলে একবার ঘুরে আসি। ছোটকালী ওখানে ছিলনা।একজন সেলসম্যানের সঙ্গে দেখা হলো। ছেলেটা জানতো তুমি ছোটকালীর বন্ধু। আমি যখন বললাম যে ছোটকালী আমাদের বিশেষ পরিচিত এবং বলেছিলেন যতটা সম্ভব কম দামে পারবেন উনি আমাদের একজনকে বা দু’জনকেই ভালো গাড়ি ব্যবস্থা করে দেবেন। সব শুনে ছেলেটা আমাকে একটা গাড়ি দেখালো। গাড়িটা দেখে ওটার প্রেমে পড়ে যাওয়া ছাড়া অন্য কোনও উপায় নেই।

-গাড়িটা কিনলে?

-কেনার কথা ভাবছি। তোমাকে ফোন করার চেষ্টা করলাম কিন্তু পেলাম না।

পানু রায় উত্তর দেবার আগেই দরজা ঠেলে জগাই ঢুকলো। বললো,’ এবার মনে হচ্ছে যাবতীয় কাগজপত্র হাতে নিয়েই কেলো দারোগা তোমার সঙ্গে দেখা করতে আসবে।‘

-কেন? কী হয়েছে?

-পুলিশ তো এখন নিজেদের নখ-চুল ছিঁড়ছে। কিছুতেই কিছু বুঝে উঠতে পারছে না। তোমাকে একটা খবর দিতে এলাম। তোমার কাজে লাগলেও লাগতে পারে। কেলো দারোগা ছোটকালীর দেয়ালে আটকে থাকা বুলেটটাকে নিয়ে সাক্ষ্যপ্রমাণ হিসাবে এতক্ষণ নিয়ে আসেনি। কিছুক্ষণ আগে কেলো দারোগা অস্ত্র বিশেষজ্ঞ সমাহারে বুলেট উদ্ধার করতে গিয়ে কী দেখলো জান?

-কী দেখলো?

-কোনও উৎসাহী ব্যক্তি ওটাকে ইতিপূর্বেই ওখান থেকে নিয়ে গেছে। গুলিটা ত্যারচাভাবে টেবিলে লেগে লাফিয়ে উঠে সামনের দেয়ালে গিঁথে গিয়েছিল।কেউ গিয়ে দেয়ালে একটা ছোট গর্ত করে সযত্নে গুলিটাকে নিয়ে চলে গেছে।

পানু রায় ভুরু কুঁচকে সুন্দরীর দিকে তাকালেন। সুন্দরী বলে উঠলো,’ ভাবা যায়? কিন্তু কে এমন কান্ড করতে পারে, জগাই?’

-কে জানে? কোনও উৎসাহী লোকের কাজ হবে। কিন্তু এখন পুরো কেসটা ঘেঁটে ঘ হয়ে গেছে।

-কিন্তু কী করে? কেন একথা বলছো?

-একটা ঘটনা পরম্পরাকে প্রমাণের জন্য খুব দরকারী সূত্র ছিল ঐ গুলিটা। কেলো দারোগা আঙ্গুল কামড়াচ্ছে এখন। সবাই বলবে পুলিশ এতদিন ঘুমিয়েছিল।

পানু রায় জিজ্ঞাসা করলেন,’ জগাই, তুই কোথা থেকে খবর পেলি?’

- অনেক ঘুরপথে খবরটা আমার কাছে এসেছে। সনাতনের লেখাটা কাগজে বেরোবার সঙ্গে সঙ্গে অনেক লোক ওখানে যেতে শুরু করে। ওখানে কী ঘটছে জানার জন্য সনাতন একজন সেলসম্যানের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে এবং মনে হয় কিছু পয়সা-কড়ি দিয়ে ওখানে কী হচ্ছে তার খবর জোগাড় করতে থাকে। কিছুক্ষণ আগে সনাতনের কাছে কেলো দারোগার এই বুলেট খুঁজে না পাবার খবরটা সনাতনের কাছে এসে পৌঁছোয়। সনাতনের অফিসের একটা লোক আমাকে চারদিকে কী ঘটছে সেই সংক্রান্ত খবর দেয় নিয়মিত। ঐ লোকটাই একটু আগে আমাকে ফোন করে ব্যাপারটা জানালো।

- জগাই, এতো অত্যন্ত জরুরি খবর। তোর কাছ থেকে আমি এতটা আশা করিনি। আমি খুব খুশি। এরকম খবর জোগাড় করতে থাক। এই ব্যাপারে সব খবর আমার চাই।

-কিন্তু দাদু, খরচের ব্যাপারটাও দেখতে হবে তো?

-খরচের ব্যাপারে কিছু ভাবার দরকার নেই। কোনও দরকারি খবর যেন বাদ না পড়ে।

-ঠিক আছে দাদু। আমি আসছি। দেখি আর কী খবর জোগাড় করতে পারি।

জগাই বেরিয়ে যায়। পানু রায় এবার সুন্দরীর দিকে সোজা তাকিয়ে বললেন,’ সুন্দরী, এবার আসল গল্পটা আমাকে বলো।‘ পানু রায়ের কথা শেষ হবার আগেই বাইরের দরজা ঠেলে কেলো দারোগা ঢুকলো। কেলো দারোগা বললো,’ কোনও ব্যক্তিগত আলোচনার মধ্যে এসে পড়লাম?’ পানু রায় বললেন,’ হ্যাঁ, একটা ছোট ব্যক্তিগত আলোচনা শেষ করার ছিল।‘

-কোনও ব্যাপার নয়। আপনারা শেষ করে নিন। বাইরে আমাদের লোকেরা আছে। আর কাউকে ভেতরে ঢুকতে দেবে না।

- আমার অফিসটাকে নিজের বাড়ির মত ভাবার জন্য ধন্যবাদ।

-দেখুন আমি আইনের প্রতিনিধি। আইন কারুর বাড়ির বাইরের ঘরে অপেক্ষা করে না। আমাদের যখন কারুর সঙ্গে দেখা করার দরকার হয় তখন আমরা সোজাসুজি তার কাছে পৌঁছে যাই।

-আপনি যে আসছেন সে কথা জানানোর প্রয়োজন বোধ করেন না?

-কিছু কিছু বোকা পুলিশ অফিসার করে। আমি করিনা। আমি কাউকে আগাম সাবধান করিনা। আমি হঠাত পৌঁছে গিয়ে প্রথম এক-দুই সেকেন্ডে তার মুখের পরিবর্তন লক্ষ্য করি।

-আমার মুখ দেখে কী বুঝলেন?

-অনেক কিছু। বুঝলাম যে আপনি আমার সঙ্গে কথা বলতে আগ্রহী নন।

-ঠিকই বুঝেছেন। যাই হোক, এসে যখন পড়েছেন বসুন। মাথার টুপি খুলুন এবং বলুন আপনার জন্য কী করতে পারি?

-ব্যস্ত হবেন না। আপনি নিশ্চয়ই জানেন আমি কী চাই।

-আমি তো গনৎকার নই।তাছাড়া আপনি কেন এসেছেন সেই নিয়ে আকাশপাতাল চিন্তা করে সময় নষ্ট করার সময় এবং ইচ্ছা কোনওটাই আমার নেই। আমার আগের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি আপনি আপনার কী চাই বা কী ভাবছেন বা কী পছন্দ করেন এবং করেন না তা বেশ গুছিয়েই বলতে পারেন। সময় নষ্ট না করে বলে ফেলুন।

-আপনাকেই আগে বলতে হবে। আপনি কালীকৃষ্ণের অফিসে গিয়েছিলেন এবং ওনার টেবিলে গুলি ছুঁড়েছিলেন।

-ওটা একটা অনিচ্ছাকৃত দুর্ঘটনা ছিল। কেউ হতাহত হয়নি। আমি কালীকৃষ্ণকে টেবিল বাবদ ক্ষতিপূরণ দেব বলেছি। এতে পুলিশের কী করার আছে? পুলিশের এই ব্যাপারে কোনও আগ্রহ থাকার কথা নয়।

- কোনও আগ্রহ থাকার কথা নয় বলছেন? ধরুন যদি জানা যায় যে ঐ বন্দুকটা দিয়েই শিবুলাল রেগমিকে তার অ্যাপার্টমেন্টে খুন করা হয়েছিল তাহলে?

-আপনি কি নিশ্চিত যে ঐ বন্দুকটা দিয়েই খুন করা হয়েছিল?

-একশোবার। এবার বলুন ঐ বন্দুকটা আপনি কোথা থেকে পেয়েছিলেন?

- কালীকৃষ্ণের কাছ থেকে। আমি জানতে চেয়েছিলাম যে ওর কাছে বন্দুক আছে কি না। ও বললো ও আত্মরক্ষার জন্য কাছে বন্দুক রাখে। অনেক সময় গুন্ডা বদমায়েশরা মালিকদের আটকে রেখে টাকা আদায় করে। এখানে এরকম ঘটনা আকছার ঘটে। তাছাড়া কালীকৃষ্ণের লাইসেন্স আছে। আপনি এ ব্যাপারে আমার চেয়ে বেশি জানবেন নিশ্চয়ই।

-তাহলে বলছেন কালীকৃষ্ণ আপনাকে বন্দুকটা দিয়েছিল।

-হ্যাঁ, ওর হাত থেকেই আমি বন্দুকটা নিয়েছিলাম। বলা যেতে পারে ও আমাকে বন্দুকটা দেখাচ্ছিল ।আমি বন্দুকটা ওর হাত থেকে নিয়ে বন্দুকটার ভারসাম্য পরীক্ষা করছিলাম আর তখনই অসাবধানতাবশত ট্রিগারে টান লেগে একটা গুলি ছিটকে যায়। কালীকৃষ্ণ আমাকে বলেনি যে বন্দুকটায় গুলি ভরা আছে।

- আপনি কি ভেবেছিলেন যে খালি বন্দুক নিয়ে উনি আত্মরক্ষা করেন?

-আমি অত কিছু ভাবিনি। বন্দুকের ট্রিগার আমি ইচ্ছাকৃতভাবে টানিনি। বলা যেতে পারে ওটার ভারসাম্য পরীক্ষা করার সময় কোনওভাবে ট্রিগারে টান পরে একটা গুলি বেরিয়ে যায়।

-বেশ, তারপর কী হলো?

-আমি রেবা কৈরালার আইনি পরামর্শদাতা। আমার মনে হয়েছিল রেবার জীবন বিপন্ন হতে পারে। আপনি জানেন ওর বাবা খুন হয়েছিল এবং আমি যতদূর জানি খুনি এখনও অধরা।আমি কালীকৃষ্ণকে বললাম যে বন্দুকটা কয়েকদিনের জন্য রেবাকে দিয়ে রাখলে ভালো হয়। আপনি জানেন কি না জানি না যে কালীকৃষ্ণের বিয়ের আগে পর্যন্ত রেবার সঙ্গে ওর ভালো বন্ধুত্ব ছিল।

-জানি, মিঃ রায়। আর এও জানি যে আপনি খুব ভালোভাবেই জানেন কালীকৃষ্ণের যে বন্দুকটার কথা আপনি বলছেন সেটা দিয়ে শিবুলালকে খুন করা হয়নি।

-শুনে আমার ভালো লাগছে। আমি সত্যিই তাই মনে করি। কিন্তু পুলিশ এত জোর দিয়ে বলতে আরম্ভ করল যে ওটা দিয়েই খুন করা হয়েছে আমার পক্ষে অন্যকিছু বলা সম্ভব হচ্ছিল না।

-আপনি এও জানেন আমি কী বলতে চাইছি। আপনি আসলে আসল খুনী বন্দুকটার সঙ্গে এই বন্দুকটা পাল্টে দিয়েছিলেন। আপনার কাছে খুনী বন্দুকটা ছিল। সেটা আপনি আপনার এক ক্লায়েন্টের কাছ থেকে পেয়েছিলেন। আপনি ঐ বন্দুকটা লুকিয়ে সঙ্গে করে নিয়ে কালীকৃষ্ণের সঙ্গে দেখা করতে আসেন। আপনি তারপর কালীকৃষ্ণকে জিজ্ঞাসা করেন তার কাছে কোনও বন্দুক আছে কি না। উনি বললেন আছে এবং ড্রয়ার থেকে বের করে টেবিলে রাখলেন। আপনি বন্দুকটা পরীক্ষা করার আছিলায় ট্রিগার টেনে দিলেন। ঐ গোলমালের মধ্যে সবার নজর এড়িয়ে আপনি আপনার বন্দুকটার সঙ্গে ঐ বন্দুকটা পাল্টে দিলেন।

-আপনি বলছেন কালীকৃষ্ণের বন্দুকটা খুনী বন্দুক নয়। খুনী বন্দুকটা আমার কাছে ছিল যেটা আমি পাল্টে দিয়েছি। আপনি একটা কাজ করতে পারেন। ঐ বন্দুকটা যেটা আপনারা পেয়েছেন সেটার নাম্বার নিয়ে ওটার রেজিস্ট্রেশন কার নামে দেখতে পারেন।

-সেটা আমরা ইতিমধ্যেই করেছি। ঐ বন্দুকটা কিনেছিলেন কালীকৃষ্ণের বাবা কৃষ্ণকালী।

-তাহলে ওটা কালীকৃষ্ণের কাছে কী করে গেল?

-কৃষ্ণকালীর অনেক দোকানের মধ্যে একটা খেলার সরঞ্জামের দোকান আছে। সেই দোকানের জন্য কৃষ্ণকালী তিনটে একই রকমের বন্দুক কেনে। তিনটেই হুবহু এক। তার মধ্যে একটা সে কালীকৃষ্ণকে দেয় আর দু’টো নিজের কাছে রাখে।

-নিজের কাছে দু’টো রাখে?

-ওনার ছেলে আমাদের তাই বলেছে, মিঃ রায়।

-তার মানে এটাই দাঁড়ায় যে বন্দুকটা আমি কালীকৃষ্ণের কাছ থেকে নিয়েছিলাম সেটা আসলে কৃষ্ণকালীর এবং কৃষ্ণকালী সেটা তার ছেলে কালীকৃষ্ণকে দিয়েছিল।

-খুনী বন্দুকটা কৃষ্ণকালীর একসঙ্গে কেনা তিনটে একইরকম বন্দুকের একটা। আমরা জানি যে বন্দুকটা আপনি কালীকৃষ্ণের কাছ থেকে নিয়েছিলেন সেটা দিয়ে খুন করা হয়নি।

-আপনি সেটা কী করে বুঝলেন, দারোগাবাবু?

-কারণ ঐ বন্দুকটা খুনের দিন সকাল থেকে রাত্রি পর্যন্ত কখন কোথায় ছিল তার পুরোপুরি হদিশ আমরা কালীকৃষ্ণের কাছ থেকে পেয়েছি।

-তাহলে আপনি নিশ্চিত যে ঐ বন্দুকটা দিয়ে খুন করা হয়নি।

-আশ্চর্য! সে কথাই তো আমি এসে পর্যন্ত বলে আসছি।

-আপনি একশভাগ নিশ্চিত তো? আগে আপনি বলেছিলেন যে ওটা দিয়েই খুন করা হয়েছিল এবং এখন আপনি বলছেন ওটা দিয়ে খুন করা হয়নি।

-মিঃ রায়, এখন আমি বলছি খুনী বন্দুকটা আপনার কাছে ছিল। ঐ বন্দুকটা কৃষ্ণকালীর বন্দুক যেটা সে কোনও কারণে রেবা কৈরালাকে দিয়েছিল। রেবা কৈরালা ঐ বন্দুকটা নিয়ে শিবুলালের কাছে যায় এবং তাকে খুন করে। রেবা কৈরালা আপনার সাহায্য চায়। আপনি খুনী বন্দুকটা নিয়ে কালীকৃষ্ণের কাছে যান এবং তার বন্দুকের সঙ্গে খুনী বন্দুকটা পাল্টে নেন। তারপর খুনী বন্দুকটা সঙ্গে নিয়ে আপনার সঙ্গে কালীকৃষ্ণ রেবার কাছে যায়।

-দারোগাবাবু, আপনার কেন মনে হচ্ছে যে খুনী বন্দুকটা আমি নিয়ে গিয়ে ওখানে রেখে আসব যাতে পুলিশ সেটা সহজে খুঁজে পায়? একটা কারণ তো দেখান।

- আমি জানিনা কেন।তবে আমি নিশ্চিত আপনি এটা করেছেন। আর একটা কথা বলে রাখি মিঃ রায়, এবার কিন্তু গল্প বলে আপনি পার পাবেন না। শিবুলালের মৃত্যুর সময় আর আপনার ওনার সঙ্গে দেখা করার সময় মিলে যাচ্ছে।

-তার মানে আমি শিবুলালকে খুন করেছি।

-না, আপনি করতেও পারেন। আমি বলছিনা যে আপনি শিবুলালের ফ্ল্যটে ঢুকে ঠান্ডা মাথায় তাকে খুন করেছেন। কিন্তু এমনও তো হতে পারে যে আপনার সঙ্গে কোনও বিষয়ে কথা কাটাকাটি হয়েছিল। শিবুলাল উত্তেজিত হয়ে বন্দুক বের করলো। তখন কোনও উপায় না দেখে আপনি বন্দুকটা ওর ওপর চেপে ধরে ট্রিগার টেনে দিলেন।

-আপনাকে আরও ভালো একটা গল্প তৈরি করতে হবে, দারোগাবাবু।আমি যখন বেরিয়ে আসি তখন শিবুলাল বেঁচে ছিল এবং ভালো ছিল। সে কোনও একজন আসার জন্য অপেক্ষা করছিল।

-ঠিক, রেবা কৈরালার জন্য।

-না, রেবা নয়। অন্য কেউ যে তাকে একটু আগেই ফোন করেছিল এবং বলেছিল যে সে এক্ষুনি আসছে।

-আপনি কী করে জানলেন?

-শিবুলাল আমাকে চলে যেতে বলেছিল । বলেছিল কেউ একজন এক্ষুনি তার কাছে আসবে এবং ব্যাপারটা বেশ জটিল। আমি যেন তক্ষুনি চলে যাই।

-তক্ষুনি আপনি চলে গেলেন এবং বাড়ির পিছনে অপেক্ষা করতে থাকলেন। কিছুক্ষণ পরে জনৈকা মহিলা পিছনের সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামলেন আর আপনি তাকে গাড়িতে তুলে নিয়ে চলে গেলেন। তাই তো?

-আমি তাই করেছিলাম?

-একদম তাই এবং ঐ জনৈকা মহিলা সে যেই হোক সেই খুনী। আপনি তাকে বাঁচাতে চাইছেন। আপনি জানতেন সে শিবুলালের কাছে যাবে। সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে সে আপনাকে বলে যে সে শিবুলালকে খুন করেছে। সে বন্দুকটা আপনার হাতে দিয়ে জিজ্ঞাসা করে সে এখন কী করবে। আপনি তাকে নিশ্চিন্ত করেন এবং বলেন যে আপনি বন্দুকটাকে কোথাও চালান করে দেবেন এবং কেসটাকে গুলিয়ে দেবেন।

-বাঃ, গল্পটা বেশ ভালো সাজিয়েছেন। কিন্তু মুস্কিল হলো এই যে এই গল্পটা প্রমাণ করা অসম্ভব কারণ গল্পটা ভুল।

-আমাদের কাছে প্রমাণ আছে।

-তাই নাকি?

-আমাদের কাছে প্রত্যক্ষদর্শী আছে যে সাক্ষ্য দেবে যে আপনি বাইরে অপেক্ষা করছিলেন এবং ঐ মহিলা সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলে আপনি তাকে গাড়িতে তুলে নিয়ে চলে যান। আমাদের কাছে আরও প্রত্যক্ষদর্শী আছে যে সাক্ষ্য দেবে যে আপনার কাছে খুনী বন্দুকটা ছিল এবং সেটা থেকে গুলি আপনি কালীকৃষ্ণের টেবিলে ছুঁড়েছিলেন।

-আপনি কী করে প্রমাণ করবেন যে ঐ বন্দুকটাই খুনী বন্দুক?

-ঐ গুলিটা থেকে। আমাদের অস্ত্র বিশারদ অনায়াসেই প্রমাণ করে দেবেন যে ঐ গুলিটা খুনী বন্দুক থেকে ছোঁড়া হয়েছিল। সেটা যদি হয় তাহলে প্রমাণ হবে যে আপনি ঐ মহিলা যিনি সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমেছিলেন তাঁর কাছ থেকে খুনী বন্দুকটা নিজের কাছে নিয়েছিলেন। আর তা যদি না হয় তাহলে প্রমাণ হবে আপনি কালীকৃষ্ণের অফিসে বন্দুক বদল করেছিলেন।

-বেশ, বেশ। তার মানে আপনার যুক্তি অনুযায়ী যাই ঘটুক আমি দোষী প্রমাণিত হবো।

-হ্যাঁ, তাতে অসুবিধের কী আছে?

- না এটা অন্যায় হবে। আমার মনে হয় গুলিটা খুনী বন্দুক থেকে ছোঁড়া হলে আমি দোষী আবার না ছোঁড়া হলে আমি বন্দুক বদলের জন্য দোষী এরকম একটা বিচার ন্যায়সঙ্গত নয়। আমার মনে হয় আপনার এই চিন্তাভাবনা পক্ষপাতদুষ্ট, দারোগাবাবু।

-সেই একই ঘেঁটে দেওয়ার চেষ্টা। যতবারই আমরা কোনও গুলি ছোঁড়ার তদন্তে নামি ততবারই আপনি অন্য একটা বন্দুক আমদানি করে সহজ ব্যাপারটা গুলিয়ে দেন।

-তাতে দোষের কী দেখলেন, দারোগাবাবু।

-এটা বেআইনি, ব্যস।

-তাহলে আমি অপরাধী –এটাই শেষ কথা, ব্যস?

-এবার আপনাকে আর ছাড়ছিনা। সেটা মন দিয়ে শুনে রাখুন।

-আপনি তাহলে আমার উদ্ভাবনীশক্তির প্রশংসা করবেন নিশ্চয়ই?

-আমি আপনার কায়দা ধরে ফেলেছি, মিঃ রায়। এবার কি আপনি বলবেন সেদিন ঠিক কী হয়েছিল? মানে আপনি কী করেছিলেন? যদি বলে দেন ভালো হয়। আমরা আপনাকে অযথা বিরক্ত করবো না। কিন্তু যদি না বলেন তাহলে আমরা অফিসের দেওয়াল থেকে যে গুলিটা উদ্ধার করেছি সেটা আপনার কাছে যে বন্দুকটা ছিল সেটার সঙ্গে মিলিয়ে দেখবো এবং তারপর কী হবে সেতো আপনার জানাই আছে।

সুন্দরী খুক খুক করে কেশে উঠলো। পানু রায় বললেন,’ এটাতো সোজাসুজি ভয় দেখানো হয়ে গেল’। কেলো দারোগা বলল,’ হ্যাঁ। এটাই ঘটবে। আপনাকে আগে থেকে বলে রাখলাম। এটাকে যদি ভয় দেখানো বলেন তবে তাই’।

-আপনি যখন মেনেই নিচ্ছেন আমার আর কিছু করার নেই। আমি আপনাকে বলতে পারি যে আমি কোনও বন্দুক বদল করিনি। আমি যে বন্দুকটা থেকে ভুলবশত গুলি ছুঁড়েছিলাম সেটা এবং কালীকৃষ্ণের ড্রয়ারে যে বন্দুকটা ছিল সে দুটো একই। ঐ বন্দুকটাই কালীকৃষ্ণ রেবার কাছে নিয়ে গিয়েছিল।

-তার মানে আপনি প্রমাণ লুকোনোর চেষ্টা করছেন এবং আততায়ী কে সাহায্য করার চেষ্টা করছেন।

-আমি আপনাকে যা সত্য তাই বলছি, দারোগাবাবু।

-আপনি পরে বলবেন না যে আমি আপনাকে সু্যোগ দিইনি। আজ আসি।

কেলো দারোগা অফিস থেকে বেরিয়ে গেল। পানু রায় বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে যখন নিশ্চিত হলেন যে কেলো দারোগা আশেপাশে নেই তখন সুন্দরীকে জিজ্ঞাসা করলেন,’ তুমি কি ছোটকালীর অফিসে গিয়েছিলে এবং গুলিটা দেয়াল থেকে তুলে নিয়ে এসেছিলে?

-কেন? তোমার কেন মনে হলো আমি এরকম একটা কিছু ঘটাতে পারি?

-তুমি করেছো কি না বলো? আমার ধারণা কেলো দারোগা আমাকে মিথ্যা বলে কথা বের করার চেষ্টা করছিল।

-আমি যদি গুলিটাকে স্মারক হিসাবে নিয়ে এসে থাকি তবে কি সেটা কোনও গুরতর অপরাধ বলে ধরা হবে?

-সেটা অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ হতে পারে।

-তাহলে আমি যদি বলি যে আমি ওটা নিয়ে এসেছি তাহলে সেটা তোমার পক্ষে অস্বস্তিকর হতে পারে তাই না? আমি বলছি –‘যদি আমি বলি’।

-ঠিক আছে। তুমি যা ভালো বুঝবে।

- তুমি আমাকে অপরাধবোধের হাত থেকে বাঁচালে দাদু।




চলবে
0

গল্প - রঞ্জন রায়

Posted in





















আচ্ছা, যদি ছেলে জন্মালে জানতে পারেন যে ও বড় হয়ে হিটলার হবে, তখন কী করবেন?

মানে ওর মুখে নুন দিয়ে গঙ্গায় ভাসিয়ে দেবেন? নাকি আদরে বাঁদর পুষবেন?

না না, ভুল বুঝবেন না। আমার ছেলের নাম অ্যাডলফ হিটলার নয়। আর আমি কোন নর্ডিক আর্য নই, নেহাৎ ছাপোষা বাঙালি। একেবারে কালোকোলো। আমাকে দেখলে কেউ জার্মান বলে ভুল করবে না। কিন্তু দ্রাবিড় জাতি, মানে মদ্র বা মালয়ালি, ভাবতে পারে। একবার ছত্তিশগড়ের সায়েন্স কলেজে এক মালয়ালি ভদ্রলোক নিজের মেয়েকে ভর্তি করাতে এসে চেনাজানা লোক খুঁজছিলেন। আমাকে দেখে হাসিমুখে এগিয়ে এসে ঝড়ের মত কী কী সব বলে গেলেন।

আমি অবাক হয়ে ভাবলাম –গাল দিচ্ছেন নাকি? দু’একবার তাঁর সঙ্গের লবঙ্গলতার দিকে তাকিয়েছি বটে, কিন্তু সেটা এমনকি অপরাধ? মেয়েটা বরং লাজুক হেসে প্রতিদান দিয়েছে। নিরুপায় হয়ে ভাঙা ইংরেজিতে ‘এক্সকিউজ মী, এবং পার্ডন পার্ডন কয়েকবার আওড়ালাম। সত্যিই কিছু বুঝতে পারছিলাম না। শেষে ওঁর ভেতরের টিউবলাইট জ্বলে উঠল। চোখ বড় বড় করে বললেন—নট ফ্রম কেরালা?

--নো স্যার। ফ্রম ক্যালকাটা”।

উনি একগাল হেসে হাত বাড়িয়ে বললেন—আমি অ্যালেক্স রাজন। ঠিক আছে, আমার মেয়েকে ভর্তি করাতে এসেছি, বায়োলজি স্ট্রিম। একটুর জন্যে মেডিক্যালে চান্স পায় নি। ফের ট্রাই করবে। কিন্তু এ’বছর বিএসসি ফার্স্ট ইয়ারে পড়লে ওর ভালই হবে। আপনি কিছু সাহায্য করতে পারেন? মানে, কার সঙ্গে দেখা করতে হবে? কোন ডোনেশন লাগবে কিনা।

আমি তক্ষুণি মেয়েটির বড়দা হয়ে যাই এবং বলি—এটা সরকারি কলেজ এবং প্রিন্সিপাল সিনহা স্যার অত্যন্ত অনেস্ট, নো ডোনেশন! ওর ভাল রেজাল্ট, সহজেই হয়ে যাবে। চলুন, আমি হেড ক্লার্কের সঙ্গে কথা বলিয়ে দিচ্ছি যাতে ওর ফর্ম তাড়াতাড়ি প্রসেস করা হয়।

উনি বিগলিত হয়ে আমার হাত ঝাঁকাতে থাকেন এবং বলেন—বেঙ্গল এবং কেরল, দুটোর কমন ফ্যাক্টর আছে। দু’ রাজ্যেই বামপন্থী কালচার এবং ওই দুই রাজের মেয়েরা ভারতের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর।

আমি এবার খোলাখুলি ওঁর মেয়ের দিকে তাকাই—সে কথা আর বলতে!

জানিনা, আজ দেখা হলে উনি কী বলতেন।

কিন্তু এর মধ্যে হিটলার কোথায়?

দাঁড়ান, দাঁড়ান, --আসছে, হিটলার আসছে।


কালের নিয়মে কলেজের পাট চুকলো, চাকরি পেলাম, বিয়ে হল। এবার তো ছেলে হবার কথা! মানে, আমার তো মেয়ে হলেই ভাল। কিন্তু কিছু একটা হোক। দিন যায়, মাস যায়, বছর ঘোরে—তবু তোমার দেখা নাই রে তোমার দেখা নাই। ডাক্তার দেখানো হোল, আপাতদৃষ্টিতে শরীরের কলকব্জা, কেমিস্ট্রি সব ঠিক। তাহলে?

অর্ধাঙ্গিনী প্রতি শনিবারে উপোস রাখলেন। আমি শনি-মঙ্গল দু’দিন নিরামিষ খেতে লাগলাম।

কার আজ্ঞে? হাড়িপ বাবার আজ্ঞে। সেই বাবা আর কেউ নয়, গিন্নির বড়দা। উনি রেভিনিউ অফিসের বড়বাবু। মাইনে ছাড়া উপরি আছে। ভাল রোজগার। কিন্তু ভাল’র কোন শেষ নেই। বিদ্যার বিষয়ে ছোটবেলায় পড়েছিলাম—দানেন ন ক্ষয়ং যাতি বিদ্যারত্নং মহাধনম্‌!

‘যতই করিবে দান, তত যাবে বেড়ে’!

বড় হয়ে দেখলাম সব ফালতু কথা। নইলে যে স্যারেরা গাদাগুচ্ছের টিউশনি করেন বছর বছর—তারা সবাই এতদিনে বিদ্যাদিগগজ মহাধনুর্ধর হয়ে যেতেন। বরং “যতই খাইবে ঘুষ তত লোভ বাড়ে”—এটা একেবারে মোক্ষম। একবার খাওয়া শুরু করলে থামা যায় না—রোলার কোস্টার। কেউ বলতে পারে না যে অত টাকার ঘুষ হয়ে গেলে বা একটা গাড়ি এবং বাড়ি হয়ে গেলে খাওয়া বন্ধ করে দেব।

আমার বড়শালা শুরু করেছে ভাগ্যগণনা। স্থানীয় পত্রিকায় টাক মাথায় টুপি পড়ে দাড়ি রেখে একটা ছবি সহ বিজ্ঞাপন দেয়—সব জ্যোতিষ বার বার, চাঁদু শাস্ত্রী একবার। হ্যাঁ, চন্দ্রমোহন দাস এখন চাঁদু শাস্ত্রী। রোজ সন্ধ্যে সাতটা নাগাদ স্নান টান করে তিলক লাগিয়ে আমার বাড়ির গ্যারেজের পাশে অ্যাসবেসটস এর ছাতওলা একটা কামরায় টেবিল সাজিয়ে টেলিফোন নিয়ে বসে থাকে। দু’ঘন্টা। হাত দেখে, কোষ্ঠিবিচার করে, পাথর ধারণ করতে দেয়। তাঁর পরামর্শের আওতায় -- বিবাহ এবং বিচ্ছেদ, জন্ম ও মৃত্যু, চাকরি এবং সন্তান প্রাপ্তি, জমি কেনা, মারণ-উচাটন-বশীকরণ, সবই আছে। নিজের বোনকেও মাদুলি দিয়েছে, আমাকে দিয়েছে আংটিতে বসানো পাথর। দামটা আমিই দিয়েছি, নইলে ফলে না।

বুঝলাম ভাগ্যদেবীর দরবারেও নো ফ্রি লাঞ্চ।

তা শাস্ত্রী মশায়ের পরামর্শ মেনে চলার ফল হোক বা আমাদের কপাল—ছ’বছরের মাথায় আমাদের একটি সন্তান হল, এবং পুত্রসন্তান। ব্যস্‌ আমার স্ত্রীর হিস্টিরিয়া সেরে গেল। সংসারে সুখশান্তি ফিরে এল। আর বন্ধুদের সঙ্গে পুকুরে চান করতে গিয়ে আমার আঙটি হারিয়ে গেল। কোন মাছের পেটে গেছে কে জানে!

আঙটি হারানোর ফল হাতেনাতে পেলাম।

একমাসের মধ্যে আমার ট্রান্সফার হয়ে গেল অন্য জেলায়, ঘর থেকে অনেকটা দূর। গোড়ার দিকে প্রত্যেক শনিবারে বাড়ি আসতাম। কিছুদিন পরে সেটা মাসে একবার হয়ে গেল। বুঝে গেছি আমি যতই বিরহে জ্বলেপুড়ে ছাই হই না কেন, গিন্নির তাতে খুব একটা যায় আসে না। উনি তাঁর নতুন খেলনা আমাদের শিশু সন্তানকে নিয়ে ব্যস্ত। যখনই ফোনে কোন কথা বলি, সংসারের খোঁজখবর নিই ওনার মুখে খালি ছেলের কথা।

--জানো, আজ আমাকে মাম্মা বলেছে। আজ দুটো দাঁত উঠেছে, তাতে কী সুন্দর হাসে। আমায় দেখলে কোলে ঝাঁপিয়ে আসে।

গণ্ডগোল বাঁধল খোকার অন্নপ্রাশন দেবার সময়। মুখে ভাত দেবে কে? কেন মামা আছেন তো! সেটাই নিয়ম। সেসব হল। এবার বোনের আবদারে মামা বসলেন নবজাতকের কোষ্ঠী বিচার করতে, এতে সময় লাগে অনেক।

জন্মলগ্ন, গ্রহনক্ষত্র, সুতহিবুক যোগ, সাড়ে সাতি, বুধ কোথায় বক্রী, মঙ্গল কোন ঘরে বসেছে, সেই সময় শনি কী করছিলেন? কেতু দেবতার কতটুকু প্রভাব এই সব দেখে অনেক অংক কষে তবে না। বললে হবে? খর্চা আছে।

২ হিটলারের উদ্ভব

পরের মাসের গোড়ায় মাইনে পেয়ে সংসারের খরচা দিতে বাড়ি এলাম। হ্যাঁ, খোকাকে দেখব সেটাও একটা কারণ বটে। তাই দু’দিন সিএল নিয়ে এসেছি। রাত্তিরে খাওয়াদাওয়ার পর আমার খোকার ধর্মবাপ , মানে ওর মামু, ধোঁয়া গেলার অছিলায় আমায় ছাদে নিয়ে গেল। তারপর হাতের সিগ্রেট নিভিয়ে দু’বার আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল—শোন রাজীব, একটা সিরিয়াস কথা।

আমি ওনার মুখের দিকে তাকিয়ে। জানি, উনি সবসময় সিরিয়াস। কখনও হালকা কথা বলতে বা কোন চুটকি শোনাতে দেখি নি। হাসলে মুখটা একটু ফাঁক হয়, পুরো দাঁত দেখা যায় না।

--তোমার ঘরে এক অসাধারণ প্রতিভার জন্ম হয়েছে। খোকা বড় হয়ে এমন কিছু করবে যে ইতিহাসে ওর নাম থেকে যাবে।

আমার হাঁ-মুখ বন্ধ হয় না। আমার ঘরে কোন মহাপুরুষ! কী ভাবে? আমি তো খোকার জন্মের আগে আপনার বোনকে কাজু কিসমিস বা পুষ্টিকর কোন কিছু খাওয়াতে পারি নি। প্রোটিন বলতে ওই চারাপোনা আর তেলাপিয়া। পনের দিনে একবার পোলট্রির চিকেন, ফল বলতে কলা আর ডাঁসা পেয়ারা । নাঃ, আপেল, বেদানা, আঙুর, পেস্তাবাদাম ওসব আমার সিলেবাসের বাইরে ছিল। এরকম সাধারণ খাওয়া দাওয়ায় কি মহাপুরুষের জন্ম হয়?

--বাজে বোকো না। মহাপুরুষ নয়, ইতিহাসপুরুষ। ওর কপালে দুই ভুরুর মাঝখানে একটু উপরে একটা দাগ দেখেছ? ওটা রাজতিলকের চিহ্ন। ও হোল লীডার বাই বার্থ! ওর মধ্যে রয়েছে স্বাভাবিক নেতৃত্বের ক্ষমতা আর আর বীরত্ব।

--সে কী? ও কি আর একজন গান্ধীজি কি নেতাজি হবে? না না, আমি অমন চাইনে। এঁরা সবাই অপঘাতে মারা গেছেন—আততায়ীর পিস্তলের গুলিতে এবং প্লেন ক্র্যাশ হয়ে। আমি একজন ছাপোষা সাধারণ নিম্ন মধ্যবিত্ত। আমার ছেলে দীর্ঘদিন বেঁচে থাক। ভাল করে লেখাপড়া শিখে চাকরি করে খেয়ে পরে বাঁচুক এবং আমার বুড়ো বয়সে ওর বাবা মায়ের সহায় হোক। আর কিচ্ছু চাই না।

ও ভাল মানুষ হলেই যথেষ্ট। ইতিহাসের পাতায় নাম তোলার কোন দরকার নেই।

--শোন, সব পিতা চাইবেন যে তাঁর সন্তান তাঁকে ছাড়িয়ে যাক। গুরু চাইবেন—শিষ্যাদ্‌মিচ্ছেৎ পরাজয়ম্‌! শিষ্যের হাতে পরাজয়। এটাই সনাতন ভারতের পরম্পরা। আর ভারত কেন, গোটা বিশ্বেও তাই। দেখ, সক্রেটিসের শিষ্য প্লেটো, তাঁর শিষ্য অ্যারিস্টটল। আবার অ্যারিস্টটলের শিষ্য আলেকজান্ডার হলেন কর্মযোগী, বিশ্ববিজয়ী।

এভাবেই সভ্যতা এগিয়ে চলে। তোমার ছেলেকে তোমারই মত ভেতো বাঙালি করে বড় করতে চাও?


বুঝে ফেললাম আমার বিশ্ববিজয়ী পুত্রের গুরু অ্যারিস্টটলটি কিনি? খালি গুরুর দক্ষিণা কত সেটা ক’দিন পরে জানা যাবে। একদিকে ভালই হোল। আমার বদলির চাকরি। খোকাকে সময় দেয়া, ওকে অংক, ইংরেজি শেখানো এবং হোমটাস্ক করিয়ে দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়।

তা খোকাকে কি এনসিসি করাতে চান? গাড়ি ও বন্দুক চালানো?

--তোমার যত ছোট চিন্তা! ও কি পুলিশ হবে না সাধারণ সৈনিক? ও হবে কম্যান্ডার। ওকে নিজে হাতে বন্দুক চালাতে হবে না। ও স্ট্র্যাটেজি বানাবে, প্ল্যানিং করবে। তার জন্য দরকার উর্বর মস্তিষ্ক এবং চরিত্রনির্মাণ। ও তোমার যত বদ অভ্যেস সব এড়িয়ে চলবে। সিগ্রেট খাবে না, মদ ছোঁবে না, মেয়েদের পেছনে ঘুরঘুর করবে না। যাবনিক আদবকায়দার বদলে আমাদের সনাতন রীতিনীতি আত্মস্থ করবে।

যেমন, “মাতৃবৎ পরদারেষু পরদ্রব্যেষু লোষ্ট্রবৎ”। ও ছোটবেলা থেকেই মেয়েদের মাতৃবৎ ভাববে এবং নির্লোভ হবে।

--মরেছে! সব মেয়েদের মা ভাবলে ও বিয়ে করবে কী করে? আপনি কি চান ও আজীবন ব্রহ্মচারী থাকুক, আনন্দমঠের সন্ন্যাসীদের মতন? তাহলে আমার বাড়িঘর কার জন্যে? বুড়ো বয়সে আমাদের দেখবে কে?

--এখন থেকেই নাকে কান্না শুরু করলে? আরে বড় হয়ে নিশ্চয়ই বিয়ে করবে কোন মেয়েকে। কিন্তু বাকি সব মেয়ে ওর জন্যে মাতা অথবা ভগিনী হবে। কোন গার্লফ্রেন্ড-ট্রেন্ড নয়। একটা বয়সে ল্যাঙোট কষে বাঁধতে হয়। তোমার মতন ঢিলেঢালা হলে---।

এবার আমার রাগ হোল। উনি আমার মধ্যে বেচাল কী দেখলেন? ওনার বোনকে কখনও ঠকিয়েছি? বেপাড়ায় গেছি? হ্যাঁ, বিয়ের আগে একটু টুং টাং ফুং ফাং কার না থাকে?

যাক গে, সবাই জানে যে ম্যান প্রোপোজেস্‌ , ওম্যান ডিস্পোজেস্‌। কাজেই গিন্নির বড়দার অভিভাবকত্বে ‘নন্দের আলয়ে কৃষ্ণ দিনে দিনে বাড়ে’—এমনটাই হবে।

কিন্তু বড়দা, আপনার কল্পনা তো ঠিক আলেকজান্ডারের সঙ্গে মিলছে না। উনি তো নিজে যুদ্ধক্ষেত্রে যেতেন, হাতিয়ার চালনায় পারঙ্গম ছিলেন। তাহলে আপনার ভাগ্নের জন্যে রোল মডেল কাকে ভেবেছেন? অবশ্যি নরাণাং মাতুলঃ ক্রমঃ। আপনি থাকতে--।

বড়দা মিটিমিটি হাসেন। সবুরে মেওয়া ফলে।

হায়, তখন যদি একটু খতিয়ে দেখতাম। আমার কুলপ্রদীপ!

৩ হিটলারের বিকাশ

রাশি নক্ষত্র মিলিয়ে খোকার নাম রাখা হল রামচন্দ্র। ভর্তি করা হোল কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়ে—সোজা কথা! কোন প্রাদেশিকতার ছাপ ওর মামাবাবুর অপছন্দ।

-কিন্তু দুদিনে ও পাড়ার লোকের মুখে রামু হয়ে গেল, আর বন্ধুরা ডাকল রেমো বলে। স্কুলে কিছু হিন্দি অঞ্চলের ছেলে এসেছে। ওরা ওকে দেখলেই “রাম নাম সত্য হ্যায়” বলে আওয়াজ দিচ্ছিল। তখন খোকাকে ভর্তি করা হল গুরুকুলে, তার অন্যতম ট্রাস্টি হলেন ওর মামাবাবু। ওর স্কুলের খাতায় নাম হল বিজয়প্রতাপ।

আমি বললাম বাঙালিদের অমন নাম কখনও শুনিনি।

--অনেক কিছুই শোননি। এবার শুনবে, একদিন এই নাম ইতিহাসের পাতায় উঠবে। একদা বিজয় সিংহ হেলায় লংকা জয় করে পাঠ্যবইয়ের কবিতায় জায়গা পেয়েছেন।

মামাবাবু ভুল বলেন নি। ক্রমে ক্রমে খোকার মধ্যে শৌর্য বীর্য নেতৃত্বের ক্ষমতা সব প্রকট হোল। কয়েক বছর পরে এক শনিবারে বাড়ি ফিরে দেখি খোকা নেই। গিন্নি কাঁদছেন। কী হোল রে বাবা!

--ওকে পুলিশে ধরেছে। তুমি কিছু কর।

জানলাম, ওকে থানায় আটকে রেখেছে। তবে আমাকে কিছু করতে হয় নি। খানিকক্ষণ পরে ও ফিরে এল সঙ্গে ওর দ্রোণগুরু। মামাবাবু বন্ড ভরে ওকে ছাড়িয়ে এনেছেন। হাজার হোক ও জুভেনাইল, এখনও গোঁফ গজায় নি।

ছেলে ফিরল বীরদর্পে, যেন কিছুই হয় নি। একেবারে ‘হেলায় লংকা করিল জয়’ মোডে। মামাবাবুর মুখ গর্বে উদ্ভাসিত। শিষ্য একটা কাজ করেছে—কাজের মতন কাজ!

--বুঝলে! কাল রাত্তিরে বিজয়প্রতাপ পাঁচটা ছেলের সঙ্গে গিয়ে ঢিল ছুঁড়ে পাশের পাড়ায় যে মসজিদ রয়েছে তার কাঁচ ভেঙেছে, বারান্দায় নোংরা ফেলেছে।

আমি স্তম্ভিত, কেন করলি খোকা? এসব কী পাগলামি!

--খোকা নয়, ও বিজয়প্রতাপ। উচিত শিক্ষা দিয়েছে ম্লেচ্ছদের।

মানে? ওদের অপরাধ?

--বাঃ , ওরা বাংলাদেশে আমাদের মন্দির অপবিত্র করেনি? ভাঙচোর চালায় নি? এবার বুঝুক কত ধানে কত চাল!

--বেশ, ওরা গু খেলে তুই গু খাবি? ওরা কুয়োয় ঝাঁপ দিলে তুইও তাই করবি? এ বুদ্ধি তোদের কে দিল?

খোকা বিপন্ন মুখে গুরুর দিকে তাকায়।

--ছেলের সঙ্গে ভদ্রভাবে কথা বল। ও আর দশটা ছেলের মত নয়। লুকিয়ে ধোঁয়া গেলে না, পানু পড়ে না। বরং সবাইকে উদ্বুদ্ধ করে।

--কী করতে? ঢিল ছুঁড়ে মসজিদের কাঁচ ভাঙতে?

--আরে এটা সামান্য ব্যাপার। ও সবাইকে শেখাচ্ছে ধর্মযুদ্ধের জন্য তৈরি হতে।

ধর্মযুদ্ধ?

--হ্যাঁ বাবা। যুদ্ধ তো চলছে, কয়েক শতাব্দী ধরে। তোমার মত বাঙালীরা চোখ বুঁজে থাকলে কী হবে?

সেরেছে! তা তোর যুদ্ধ কাদের বিরুদ্ধে?

--যারা আমাদের মানে হিন্দুদের অসম্মান করে, আমাদের ধর্ম নিয়ে ইয়ার্কি করে তাদের সবার বিরুদ্ধে। হিন্দুস্থান দেশটা আমাদের, মানে হিন্দুদের—সেটা ভুলে যাচ্ছ কেন?

--ওরে বাবা! দেশটার নাম ভারত, ইংরেজিতে ইন্ডিয়া। সংবিধানের প্রথম লাইন, প্রথম আর্টিকল।

--ওসব আইনের কচকচি। দেশ চলে জনগণের আবেগে, ভালবাসায়। আমরা কি সাধারণ কথাবার্তায় দেশকে হিন্দুস্থান আর কালোয়াতি গানকে হিন্দুস্থানি সঙ্গীত বলি না? জ্যোতিবাবু কি হিন্দুস্থান পার্কে থাকতেন না? আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের বইয়ের নাম কি ‘হিন্দু কেমিস্ট্রি’ নয়?

এবার গুরু ময়দানে নেমেছেন। মামাভাগ্নের যুগলবন্দীতে আমি কুপোকাৎ। আমাকে চুপ করতে দেখে খোকার উৎসাহ বেড়ে যায়।

--আচ্ছা বাবা, তুমিই বল। সংবিধানে মন্ত্রীদের শপথ নেবার সময় ঈশ্বরের নামে শপথ নেবার নির্দেশ রয়েছে না? তাহলে। কোন আল্লা বা যীশুর নাম তো নেই?

--এবার তুই একটু শোন। ইংরেজিতে ‘গড’ বলা হয়েছে যার মানে ভগবান, আল্লাহ্‌ যীশু সবই হতে পারে, যার যেমন বিশ্বাস।

--ওসব তো নেহরুদের বিলিতি কায়দার ফল। কিন্তু কোন না কোন ভগবানের নাম তো নিতেই হবে। সেকুলার শব্দটা ইন্দিরা জরুরী অবস্থার সময় জোর করে ঢুকিয়েছিলেন।

--না বড়দা। শপথ নেবার আর্টিকলে একটা ‘অথবা’ রাখা হয়েছে। তাতে বলা আছে কেউ চাইলে “ঈশ্বরের নামে শপথ করছি” না বলে বলতে পারেন “ I solemnly affirm that”, মানে আমি দৃঢ় নিশ্চয় হয়ে বলছি।

তাই সুপ্রীম কোর্ট সেকুলার শব্দটা খারিজ না করে বলেছে আমাদের সংবিধান এবং রাষ্ট্র গোড়া থেকেই ভাবনায় ‘সেকুলার’।

এবার খোকা কেমন মিইয়ে গিয়ে মামাবাবুর দিকে তাকিয়ে চোখ নামালো। আমার ওর জন্য কষ্ট হল। কথা ঘোরাতে বললাম—ওসব কচকচি থাক। বল, তুই ছাড়া পেলি কীভাবে?

--পুলিশের তদন্তে বেরিয়েছে ও আসলে ইঁট ছোঁড়েনি, ভাঙচুর করেনি। ইন ফ্যাক্ট, ওতো মসজিদের আঙিনায় ঢোকেনি। ও তখন সামনের রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল।

--তাহলে ভাঙচুর করল কারা?

--কেন, বাকি চারজন। ওরা দোষ স্বীকার করেছে।

--বুঝলাম, ওদের নিয়ে গেল কে?

--কেউ নয়। ওরা নিজে থেকেই দল বেঁধে গেছে। ওরা স্টেটমেন্ট দিয়েছে তো, সাইন করে।

--খোকার নাম নেয়নি? একজনও না?

--কেন নেবে? ও হোল লীডার, ওকে ঝামেলা থেকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। ওকে পদাতিকদের সঙ্গে এক করে দেখলে চলবে? যুদ্ধ চলবে নিরন্তর।

--ওরা ছাড়া পেয়েছে?

---এখনও পায় নি। কাল জুভেনাইল কোর্ট বিচার করবে। বাবা মা জামিন হয়ে ছাড়িয়ে আনবে। ওদের জন্য চিন্তা করতে হবে না।

--আমি এখনও বুঝতে পারছি না। ওই বাচ্চাছেলেগুলো মুখ বুঁজে রইল? বিজয়প্রতাপ শব্দটা একবারও বলল না? এমন আনুগত্য?

--উফ, নাথুরাম গোড়সে, গোপাল গোড়সে, কারকারেরা কি সাভারকরের নাম নিয়েছিল? উনি যে কম্যান্ডার! আরও আগে লন্ডনে ছাত্র অবস্থায় সতেরো বছরের মদনলাল ধিংড়া যখন কার্জন-উইলি এবং একজন পার্শি ডাক্তারকে হত্যা করে ফাঁসিকাঠে চড়ল তখন কি একবারও সাভারকরের নাম উচ্চারণ করেচিল? উনি ওকে পিস্তল দিয়ে বলেছিলেন—মেরে এসো; ব্যর্থ হলে আর আমাকে মুখ দেখিও না।

এই হোল লীডারশিপ কোয়ালিটি—প্রশ্নহীন আনুগত্য সবাই পায় না। আমার ভাগ্নের মধ্যে রয়েছে।

--বড়দা, আপনি ওকে সাভারকর বানাতে চান? কী দরকার?

--শোন, এ’কথা যেন পাঁচ কান না হয়। ও আরও বড় কাজ করবে। সাভারকরের অসমাপ্ত মিশন সম্পূর্ণ করবে।

--কী সেই মিশন?

--হিটলারের জার্মানি ১৯৩৮ সালের মার্চ মাসে অস্ট্রিয়া দখল করায় সাভারকর হিটলারের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। এটা ওনার চোখে জার্মানির ঐক্যবদ্ধ হওয়ার উদাহরণ। মনে করলেন এই ভাবেই ‘হিন্দু ভারত’ ঐক্যবদ্ধ হতে পারে।

--খেয়েছে, আপনি ওকে মেইন ক্য্যাম্ফ ধরিয়েছেন। অত মোটা বই!

-- না না। প্রথম দু’শ পাতা পড়িয়েছি। এখন ওতেই চলবে। আচ্ছা, এখন খেতে বস। বিজয়প্রতাপের খিদে পেয়েছে।

৪ জয়-পরাজয়

রাতে খেতে বসে ফের লেগে গেল বড়দা, থুড়ি অ্যারিস্টটলের সঙ্গে। দোষের মধ্যে আমি বলেছিলাম ওকে নিজের মত বড় হতে দিন না! কেন নিজের পছন্দের ছাঁচে গড়ে তুলতে চাইছেন? এইসব ইতিহাসপুরুষ, সিদ্ধপুরুষ হ্যানো পুরুষ ত্যানো পুরুষ হওয়া অনেক চাপ। শেষে ওর ব্যক্তিত্ব দড়কচ্চা মেরে না যায়! এমন কি বীর হওয়ার চেষ্টায় কোন অপরাধ --!

আর হিটলারের আত্মজীবনী?

সবটা পড়ান। পাঁচশ পাতার পর দেখুন হিটলার কী অবজ্ঞার চোখে ভারতীয় জাতি এবং বিপ্লবীদের দেখতেন। ওদের বৃটিশ সাম্রাজ্যের অধীন হওয়াই ভবিতব্য বলেছেন এবং নেতাজির প্রতিবাদ ও অনুরোধ সত্ত্বেও ওই লাইনগুলো বাদ দেওয়া হয় নি।

ব্যস্‌ ফুটন্ত তেলে জলের ছিটে পড়ে চিড়বিড় শব্দ।

আমি খাওয়া ছেড়ে উঠে পড়লাম।

ঘুম আসছে না। ভাবতে লাগলাম এসব কী হচ্ছে? আমার খোকা হিটলারকে রোল মডেল ভাবছে? ও বড় হয়ে ভারতে হিটলারের ক্লোন হবে! আমার কী করা উচিত? আচ্ছা, ওই মামাবাবু যদি হঠাৎ টেঁসে যান!

হার্টের সমস্যা আছে। সুগার এবং প্রেসার দুটোর ওষুধ খান নিয়মিত। ভগবানের কোন ভুলে যদি এক দিন প্রেসারের ওষুধের ডোজ বেশি হয়ে যায়! অথবা ওনার ওষুধের শিশিতে ট্যাবলেটগুলো বদলে দেয়া হয়? অনেকটা একইরকম দেখতে অনেক ট্যাবলেট আছে। মেডিকোপিডিয়া ঘাঁটতে লাগলাম। দেখতে একইরকম, বিস্বাদ নয় অথচ হার্টফেল হতে পারে এমন ওষুধ?

আছে আছে। পাওয়া গেছে।

কিন্তু নেটফ্লিক্সের সিনেমা হয়ে যাচ্ছে না? তাতে তো শেষ মুহুর্তে অপরাধী ধরা পড়ে যায়। আমি জেলে গেলে গিন্নি ও খোকার কী হবে? সংসার ছারেখারে যাবে। তারচেয়ে বড় কথা হোল খোকার চোখে ওর গুরু শহীদ হয়ে যাবে, আর আমি ভিলেন।

নাঃ এ চলবে না।

ভোরের দিকে ঘুম এল এবং ঘুমের মধ্যে সমাধান। কেউ হিটলার হয়ে জন্মায় না। ওসব বাজে কথা। শিশু শিশুই থাকে। কাঁথায় শুয়ে হিসু করে, ওঁয়া ওঁয়া করে কাঁদে এবং ফোকলা মুখে খিলখিলিয়ে হাসে।

উপসংহার

সকালে রওনা হবার আগে স্ত্রী-পুত্রকে ডেকে পাশে বসালাম। বললাম—আমি আর হাত পুড়িয়ে খেতে পারছি না। বয়েস হচ্ছে। একটা দু’কামরার ভাড়াবাড়ি ঠিক করেছি। তোমাদের আগামী সপ্তাহে এসে নিয়ে যাব। খোকাকে ওখানকার ভালো সরকারি স্কুলে ভর্তি করে দেব। আমরা একসঙ্গে থাকব, আর আলাদা নয়। তোমরা গোছগাছ শুরু করে দাও। টিসি’র ব্যবস্থা বড়দা করে দেবেন। আমি নতুন ভর্তির ব্যাপারটা দেখছি।

সাতদিন পরে বাড়ি যাওয়া হয় নি, অফিসের চাপ। কিন্তু পরের মাসের মাইনে পেয়ে ভাড়াবাড়ি ঠিক করে ওদের আনতে গেলাম। গিয়ে দেখি কোথায় কী? কোন গোছগাছ হয় নি, সব আগের মত চলছে। খোকা বাড়িতে নেই।

গিন্নি চায়ের কাপ নিয়ে এসে বললেন—শোন, আমাদের খোকাকে এখন একডাকে সবাই চেনে। শুধু এ তল্লাটে নয়, পুরো মহকুমায়।

--কেন?

--ওদের স্কুলে একজন মাস্টারমশাই আছেন না? আরে তোমার বন্ধু, যিনি বিয়ে করেন নি। তাকে বেধড়ক ঠেঙিয়েছে। উনি নাকি চরিত্রহীন। মানে ওই হোমো না কীসব বলে। আর কেমিস্ট্রির সুধীনবাবু ও ইংরিজির ফিরদৌসি লাভ ম্যারেজ করেছিল। খোকা সমস্ত ছাত্রদের নিয়ে আন্দোলন করে ---এমন লুজ ক্যারেক্টার টিচারদের গুরুকুলে রাখা হলে ওরা পড়বে না। এসব সনাতন আদর্শের সঙ্গে বেমানান।

--সর্বনাশ! ফের পুলিশের খাতায় নাম? ওর ভবিষ্যৎ অন্ধকার। এইজন্যেই বলেছিলাম যে—

--আরে না না। ওসব কিছু হয় নি। পুলিশ ফুলিশের ঝামেলা নেই। কেউ নালিশ করেনি তো। সেই দু’জম টিচার গত সপ্তাহে গুরুকুল থেকে রিজাইন করে এখান থেকে চলে গেছে। আর খোকাকে এখন সবাই বিজয়প্রতাপ নামে চেনে।

--খোকা কোথায়? ওর সঙ্গে কথা বলব।

--কেন? ও তোমার সঙ্গে যাবে না। স্কুল বদলাবে না। ওদের প্রভাত ফেরি শুরু হয়েছে। ওরা জিতে গেছে তো! চল ছাদে গিয়ে দাঁড়াই। ওরা আসছে।

একশ’ জন ছেলে হেঁটে চলেছে। সামনে দু’জন ড্রাম বাজাচ্ছে। সমবেত কন্ঠে একটা গান বাতাসে ভেসে আসছে।

“ধাও ধাও সমরক্ষেত্রে, গাহ উচ্চে রণজয় গাথা,

রক্ষা করিতে পীড়িত ধর্মে ওই শোন ডাকে ভারতমাতা।

চল সমরে দিব জীবন ঢালি, জয় মা ভারত, জয় মা কালী”।


হ্যাঁ, হিটলারের মৃত্যু নেই।


 Savarkar, Whirlwind Propaganda, pp. 157-68
0

গল্প - দীপারুণ ভট্টাচার্য

Posted in








মেট্রো স্টেশন থেকে বেরিয়ে হাঁটছিল দিবাকর। কী যেন কিনতে হবে ভেবে দাঁড়িয়ে পড়ল। দোকানে রবি একা বসে হিসাব লিখছে। আগে বিকেল হলেই এখানে আড্ডা বসত। সন্ধ্যাবেলা রবির বাবা দোকানে আসতেই বন্ধুরা উঠে যেত। কাকু রেগে বলতেন, দোকান এবার লাটে উঠবে! না দোকান ওঠেনি। বন্ধুরা চাকরি পেতেই আড্ডা উঠে গেছে। ঘোর সংসারীদের আড্ডা জমে না।
সিগারেটে টান দিয়ে দিবাকর বলল, দুটো প্রোটিন বার দে। রবি ভ্রু কুঁচকে বলল, রোজ নিস কেন, এসব বেশি খাওয়া ভালো না! বিরক্ত মুখে দিবাকর বলল, তোকে দিতে বলেছি, দে। চোখে ফাজিল ইঙ্গিত করে রবি বলল, একটু আগেই তো তোর বউ নিয়ে গেল। ব্যাপার কী? দিবাকর ঘনঘন সিগারেট টানছে। রবির সঙ্গে তার কথা বাড়ানোর ইচ্ছা নেই। তাছাড়া কীভাবে বলবে, মা তার বউকে পেট ভরে খেতে দেয় না! মাঝরাতে সোনালির খিদে পায়। এসব বাইরে বলা যায় না।
জিনিসটা পকেটে রাখল সে। বিয়ের আগে পর্যন্ত মায়ের অনেক কিছুই তার জানা ছিল না। আচ্ছা, মা ছেলেকে ভালবাসতে পারে কিন্তু ছেলের বউকে পারে না কেন? অনেক ভেবেও উত্তর পায়নি। প্রেমের বিয়ে বলেই কি এমনটা হয়েছে? নাকি সোনালির চাকরি মায়ের পছন্দ নয়? কিংবা মা বহুদিন আগে নিজের শাশুড়ির থেকে পাওয়া খারাপ ব্যাবহারের ঝাল সোনালির উপর ঝাড়ছে! আগে চোখে পড়ত না। এখন দিবাকর সব বুঝতে পারে। সন্দেহ না করলে প্রিয়জনের খারাপ নজরে আসে না।
সকালে ছেলে-বউ পাশাপাশি বসে। মা তাড়াহুড়ো করে রান্না করে। ডাল, ভাত, তরকারি। সোনালি অনেক বলেও কাজের লোক রাখতে পারেনি। এটাও তাকে কষ্ট দেওয়ারই ফাঁদ, দিবাকর বোঝে। এক একদিন তার পাতে ভাজা মাছ পড়ে। প্রশ্ন করলে মা বলে, একটাই ভেজেছি! একটা কেন? উত্তর মেলে না। ভেঙে দিলে সোনালি খায় না। বলে, আমার খাওয়া হয়ে গেছে। প্রায় প্রতি রাতে ভাত কম পড়ে। মা বলে, আমার আর লাগবে না। সোনালি নিজের ভাত শাশুড়িকে তুলে দেয়। দিবাকর চিৎকার করে, বাজার দোকান কি কম করেছি? তাহলে রোজরোজ কম পড়বে কেন? উত্তর আসে না। সে আলাদা হওয়ার কথা ভেবেছে। তিন জনের দুটো সংসার! মন সায় দেয় না।
কিরে চুপ মেরে গেলি কেন? বাড়িতে সমস্যা হচ্ছে নাকি? সব সংসারেই শালা এক ব্যাপার। আমাকেই দেখ না! রবির কথার মাঝেই দিবাকর উঠে পড়ে। বলে, কাল তাড়াতাড়ি অফিস যেতে হবে। হাঁটতে হাঁটতে পকেটে হাত দিয়ে প্রোটিন বার দুটোকে ছুঁয়ে দেখে। সোনালিও একদিন মা হবে। তাদের সন্তানও কি কোনোদিন নতুন পরিচয়ে তার মা কে আবিষ্কার করবে! ঠাণ্ডা হাওয়া দিচ্ছে। মনে হচ্ছে আজ বৃষ্টি হবে।
0

গল্প - মনোজ কর

Posted in





















চতুর্দশ পর্ব

পানু রায়ের ফোন বেজে উঠলো। ফোনের ওপারে মনীষা।

-বলো মনীষা। সব ঠিকমত চলছে?

-হ্যাঁ, এখনও পর্যন্ত সব ঠিকই আছে।

-পুলিশের খোঁজাখুঁজি শেষ হলো? কিছু পেলো?

-না, কিছুই পায়নি। অনেক খোঁজাখুঁজি করলো। হতাশ হয়ে ফিরে গেল।

-এটা কোনও ফাঁদ হতে পারে। অফিসের অবস্থা কী রকম?

-অফিসের অবস্থা খুব খারাপ। সমস্ত কাগজপত্র, ফাইল এলোমেলো হয়ে আছে। এলিনা কী করে গেছে কে জানে? চিঠিপত্র, বিল সমস্ত ভুল জায়গায় ফাইল করে গেছে। টাকা পয়সাও খুব অসাবধানতার সঙ্গে দেয়া নেয়া করেছে।

-তার মানে? আমাকে আর একটু ডিটেলে বলো।

-ধরুন রাজেন্দ্র পার্কের নতুন ফ্ল্যাটটা যেটা উনি আমি ছুটিতে যাবার কয়েকদিন আগে কিনেছিলেন সেটাতে কিছু ইলেকট্রিক রিপেয়ারের কাজ হয়েছে যার জন্য বিল হয়েছে এক লক্ষ সত্তর হাজার টাকা। এটা কি সম্ভব?

-হতে পারে। হয়তো কোনও বড় টিভি লাগানো হয়েছে।

- আমি ডিটেলে দেখছি কিন্তু সবকিছু বেশ অগোছালো করে রেখে গেছে।

-মনীষা, যতটা পার ঠিক করার চেষ্টা করো। আমার সঙ্গে যোগাযোগ রেখো। কালীকৃষ্ণ ফোন করলে বোলো আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে।

-অবশ্যই। পুলিশের ব্যাপারটা উনি ফোন করলে জানাব?

-নিশ্চয়ই। ডিটেলে জানাবে।

-আমি ভাবছিলাম যদি পুলিশ ওনার ফোন ট্যাপ করে।

-কিছু করার নেই। ঝুঁকি তো নিতেই হবে।

-ঠিক আছে। আমি দেখি কতদূর কী গোছানো যায়।

পানু রায় ফোন রাখতেই দরজা ঠেলে জগাই ঢুকলো। পানু রায় জিজ্ঞাসা করলেন,’ কী হলো, কোনও খবর?’

-বেশ ভালোই গন্ডগোল শুরু হলো বলে মনে হচ্ছে।

-কী হয়েছে? এত উত্তেজিত হচ্ছিস কেন?

-তুমি ঐ সাংবাদিক সনাতনকে চেন তো? আরে যে ‘ঈগলের চোখে’ বলে খবরের কাগজে গল্প লেখে। খুব পপুলার ওর লেখা।

-হ্যাঁ, চিনি। আমিও ওর লেখার খুব ভক্ত। কিন্তু হয়েছেটা কী?

-কেউ একজন খবর জোগাড় করেছে যে তুমি নাকি ছোটকালীর অফিসে একটা বন্দুক থেকে গুলি চালিয়ে অফিসের ফার্নিচার নষ্ট করে দিয়েছো।

-তুই কী বলছিস জগাই? এটা ওরা খবরের কাগজে ছাপাবে?

-কেন আমার তো মনে হয় তুমি তাই চাইছিলে। প্রচারের জন্য এর চেয়ে ভালো খবর আর কী হতে পারে? আমি প্রথমে বিশ্বাস করিনি। কিন্তু এখন আমার মনে হচ্ছে হলেও হতে পারে।

-কিন্তু আমি অসাবধানতাবশত এটা করে ফেলেছিলাম।

-কিন্তু সনাতন এটা নিয়ে একটা মজার গল্প লিখতে চলেছে। একজন একশ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তি যিনি নাকি ব্যালিস্টিক বিশেষজ্ঞদের নাকানি চোবানি খাওয়াতে পারেন তিনি নাকি একটা বন্দুকের মধ্যে গুলি ভরা আছে কিনা না জেনেই ট্রিগার টেনে একটা বিপজ্জনক কান্ড ঘটিয়ে বসলেন।

-এটা সত্যিই খুব লজ্জার ব্যাপার হবে!

-আমারও প্রথমে তাই মনে হয়েছিল।

-এখন কি তোর অন্যকিছু মনে হচ্ছে?

-দাদু, তোমার কী করে মনে হলো যে এটা করে তুমি পার পেয়ে যাবে?

-আমার মনে হয়না আমি পার পেয়ে যাব। এটা ঐ সনাতনের মত সাংবাদিকদের জন্য লেখার একটা ভালো বিষয় হবে।আর সনাতন নিশ্চয়ই এমন ভালো একটা গল্প একদিনে শেষ করবে না।

-দাদু, আমার শুধু একটাই চিন্তা। তুমি এমন কিছু করনি তো যাতে ওরা তোমাকে আইনভঙ্গকারী বলতে পারে?

-জগাই, আমার মনে হয় তুই ঠিক। আসলে যে কারণে ওরা আমায় অভিযুক্ত করতে পারে তা হলো শহর এলাকায় গুলি চালানো।

পরের দিন পানু রায় যখন অফিসে ঢুকলেন দেখলেন টেবিলে খবরের কাগজটা রাখা। সনাতনের গল্পটা যে পাতায় আছে সেই পাতাটা খুলে সামনে রেখে গেছে সুন্দরী। পানু রায় কাগজটার দিকে তাকানোর সঙ্গে সঙ্গেই সুন্দরী ঘরে ঢুকলো। পানু রায় বললেন,’ সুন্দরী, আমি শেষ অবধি প্রচারের আলোয় এসে গেলাম।‘

-কাল থেকে তুমি এই শহরের সব আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। কী লিখেছে শোনো। - শতবর্ষীয় বিস্ময়বৃদ্ধ পানু রায় যাঁর অপরিসীম জ্ঞানের কথা সর্বজনবিদিত এবং যিনি এই শহরের সবচেয়ে মূল্যবান পরামর্শদাতা এবং যাঁর কারিগরী জ্ঞান বিশেষ করে অস্ত্রসম্বন্ধিত জ্ঞান যে কোনও অস্ত্রবিশেষজ্ঞের চেয়ে বেশি বইতো কম নয় সেই পানু রায় বন্দুক হাতে নিয়ে হাস্যকর ঘটনা ঘটালেন।

রেবা কৈরালার সঙ্গে ছোটকালীর সম্পর্ক এবং তারপর থেকে কী কী ঘটেছে এমনকি আচমকা গুলির আঘাতে ছোটকালীর মেহগিনি টেবিল যে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে সে কথা বলেই গল্প শেষ হয়নি। একথাও লেখা হয়েছে যে শিবুলালের খুনের তদন্ত করতে গিয়ে যে বন্দুকটি রেবা কৈরালার বাড়িতে পাওয়া গেছে সেটিতেও একটা গুলি কম ছিল এবং সেই বন্দুকটিই এই বন্দুক কি না সেবিষয়ে পুলিশ আরও খোঁজখবর চালাচ্ছে। ওদিকে কালীকৃষ্ণের অফিসে ঐ টেবিলটি দেখাবার জন্য সেলসম্যানেরা সম্ভাব্য ক্রেতাদের ভিড় করে ঐ ঘরে নিয়ে যাচ্ছে এবং গাড়ি কেনার কাগজে সই করাচ্ছে। সুতরাং টেবিল পাল্টানোর পরিকল্পনা এখন বাতিল করা হয়েছে। ঐ টেবিলটিকে বিশেষ দ্রষ্টব্য জিনিস বলে প্রচার চালানো হচ্ছে এবং ঐ টেবিলের নামকরণ করা হয়েছে ‘টেবিলের শবদেহ’ বলে।

এই পর্যন্ত পড়ে সুন্দরী থামল কারণ দরজা খুলে ততক্ষণে জগাই ঘরে ঢুকে পড়েছে। জগাই বললো,’ তোমাকে বলে রাখি কাগজ পড়ে যারা ঐ টেবিল দেখতে আসছে ছোটকালীর ছেলেরা তাদের সবাইকে গাড়ি বিক্রীর চেষ্টা করছে। একদিনে গোটা দশেক গাড়ি বিক্রী হয়ে গেছে যা এক সপ্তাহেও হয়না।‘ পানু রায় হেসে সুন্দরীকে ফোনটা দিয়ে বললেন,’ রেবা কৈরালাকে ধরার চেষ্টা করো। আমি ততক্ষণ জগাইএর সঙ্গে কাজের কথা সেরে নিই। বল জগাই কী কী খবর জোগাড় করলি।‘

-শিবুলালের অপরাধী হিসাবে পুলিশের খাতায় নাম আছে। বার দুয়েক জেল খেটেছে। একবার ঠকিয়ে টাকা আদায়ের জন্য আর অন্যবার ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়ের জন্য। লোকটা সেদিন সন্ধ্যেবেলা সাতটা থেকে সাড়ে আটটার মধ্যে ০.৩৮ ক্যালিবারের বুলেটের ঘায়ে মারা গেছে। ওর বুকে বন্দুকের নল ঠেকিয়ে গুলি করা হয়েছে।

-তাতে শরীরের মধ্যে শুধু গুলিই ঢোকে না সঙ্গে সঙ্গে বিষাক্ত গ্যাসও ঢুকে যায়। কেউ কি গুলির আওয়াজ শুনেছে?

-না। মনে হয়না। বুকে ঠেকিয়ে গুলি করলে আওয়াজ কম হয় বলেই মনে হয়।

-তার মানে কেউ কোনও আওয়াজ শোনেনি। আর কিছু খবর?

পানু রায়ের কথা শেষ হওয়ার আগেই জগাইএর ফোন বেজে উঠলো। জগাই ফোন ধরে ওদিকের কথা শুনে বললো,’ কী সর্বনাশ! তুমি ঠিক শুনেছো? ঠিক আছে এখন রাখছি। আর কিছু খবর পেলে আমাকে জানিও।‘ পানু রায় জিজ্ঞাসা করলেন,’ কী হয়েছে?’

-পুলিশ বলছে যে বন্দুকটা রেবা কৈরালার ঘরে পাওয়া গেছে সেটাই শিবুলালকে হত্যার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে।

-কোন বন্দুকটা?

-কেন? ওখানে তো একটাই বন্দুক ছিল যেটা ছোটকালী রেবা কৈরালাকে দিয়েছিল। তার মানে যে বন্দুকটা শিবুলালকে হত্যার ব্যাপারে ব্যবহার করা হয়েছিল বলে বলা হচ্ছে সেটা তোমার কাছে কিছুক্ষণের জন্য ছিল এবং তার থেকে একটা গুলি তুমি ব্যবহার করেছ এবং সবাই সেটা দেখেছে। পুলিশ প্রথমে ভেবেছিল তুমি কিছু একটা পরিকল্পনা করে ইচ্ছাকৃতভাবে ওদের বিপথে চালাতে চাইছিলে। ওরা ছোটকালীকে ঝাঁকাচ্ছে। ওদের ধারণা ছিল তুমি ইচ্ছে করে ঐ ঘাতক বন্দুকটা রেবার বাড়িতে রেখে এসেছিলে।

-ওদের এখন মত পরিবর্তন হয়েছে?

-হ্যাঁ, এখন ওদের মত বদলেছে। এখন ওদের সন্দেহ অন্য একজনকে। সে হচ্ছে ছোটকালীর স্ত্রী। ঐ মহিলা একসময় কাঠমান্ডুর কোনও এক হোটেলে হোস্টেস এবং গয়নার মডেল হিসাবে কাজ করত। শিবুলালের সঙ্গে ঐ মহিলার যোগাযোগ ছিল এবং ওনার ফোন ডায়েরিতে শিবুলালের ব্যক্তিগত ফোনের নম্বর পাওয়া গেছে। শিবুলাল ব্ল্যাকমেলার ছিল এবং ঐ মহিলা সদ্যবিবাহিতা। সুতরাং দুয়ে দুয়ে চার করতে কোনও অসুবিধে হওয়ার কথা নয়। পুলিশের কথা শুনে মনে হচ্ছে তোমার ঐ বোকা বোকা গুলি ছোঁড়ার ব্যাপারটা আর তোমার ঐ ‘আমি জানিনা ওতে গুলি ভরা ছিল’ তুমি বুলেট বিশেষজ্ঞদের বিপথে চালনা করার জন্য করেছ। পুলিশ ব্যাপারটা ভালো চোখে দেখছে না। ওরা সমস্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ তন্ন তন্ন করে পরীক্ষা করছে। কেলো দারোগা তোমাকে কেস দেবে বলে মুখিয়ে আছে। যদি প্রমাণ করতে পারে তুমি সাক্ষ্যপ্রমাণ নষ্ট করার চেষ্টা করেছ তাহলে তোমাকে জেলে ভরার জন্য যতদূর যেতে হয় যাবে।

পানু রায় চেয়ার থেকে উঠে একটু অস্থিরভাবে পায়চারি করতে করতে জগাইএর দিকে তাকিয়ে উত্তেজিতস্বরে বললেন,’ শোন, আমি জানতে চাই পুলিশ কী করছে? এ ব্যাপারে যত খবর পাওয়া সম্ভব সব আমার চাই। ওরা সম্ভবত রেবা এবং ছোটকালী দু’জনকেই জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে দিয়েছে। ভাগ্য আমাদের প্রতি সুপ্রসন্ন যে বড়কালী দেশের বাইরে। ওকে ধরা খুব একটা সহজ হবে না। কোথাও তো একটা গন্ডগোল লাগছে।‘

-কিন্তু দাদু পুলিশ জানতে চাইছে যে কেন তুমি ছোটকালীর অফিসে গেলে, ওর কাছ থেকে বন্দুক চাইলে, ওটা থেকে টেবিলের ওপর গুলি চালালে তারপর ওটা নিয়ে রেবা কৈরালার বাড়িতে গিয়ে এমন ভাবে রেখে এলে যাতে পুলিশের ওটা খুঁজে পেতে অসুবিধে না হয়।

-জগাই, তুই আমাকে নতুন কিছু বলছিস না। এর পিছনে কী আছে তার সম্বন্ধে তোর বিন্দুমাত্র ধারণা নেই। যেটা করতে বলছি সেটা কর।

জগাই মাথা নিচু করে অফিস থেকে বেরিয়ে গেল। পানু রায় আরও কিছুক্ষণ পায়চারি করে সুন্দরীর দিকে তাকিয়ে বললেন,’ এর উত্তর একটাই।‘ সুন্দরী কিছু বুঝতে না পেরে জিজ্ঞাসা করলো ,’ কী?’

-বড়কালীর কাছে নিশ্চয়ই ছোটকালীর অফিসের চাবি আছে। যে বন্দুকটা দিয়ে খুন করা হয়েছিল সেটা বড়কালীর কাছে ছিল। বড়কালী জানতো যে ছোটকালীর কাছে অবিকল একই রকম একটা বন্দুক আছে। সুতরাং বড়কালী খুনী বন্দুকটাতে একটা গুলি ভরে ছোটকালীর ড্রয়ারে রেখে ছোটকালীর বন্দুকটাকে নিয়ে চলে যায়। বড়কালী ভেবেছিল খুনী বন্দুকটা পুলিশ খুঁজে পাবে না। তারপর ছোটকালীর বন্দুক থেকে একটা গুলি খরচ করে সেটা রেবাকে দিয়ে আসে। ভেবেছিল পুলিশ ঐ বন্দুকটা রেবার বাড়িতে খুঁজে পাবে। একটা গুলি নেই দেখে ভাববে রেবা খুন করেছে, তারপর যখন বুঝবে যে ঐ বন্দুকটা থেকে খুন করা হয়নি তখন রেবার প্রতি আর সন্দেহ থাকবে না। আর সেজন্যই আমাকে বলেছিল যেভাবে হোক রেবার নিরাপত্তা যেন কোনও ভাবেই বিঘ্নিত না হয়। কিন্তু আমার ভুলের জন্য বড়কালীর সমস্ত পরিকল্পনা ভেস্তে গেল। আমি ভেবেছিলাম পুলিশ যখন রেবাকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে তখন জানতে পারবে যে বড়কালী তাকে একটা বন্দুক দিয়েছিল এবং সেটা তারা খুঁজে বের করবে অথবা তারা রেবার বাড়িতে খুনী বন্দুকের খোঁজে তল্লাশি চালাবে । আমি ভাবলাম আমি যদি কোনওভাবে ছোটকালীর বন্দুকটাও রেবার বাড়িতে রেখে দিতে পারি এবং পুলিশ যদি ঐ বন্দুকটা সহজেই হাতে পেয়ে যায় তাহলে নিশ্চয়ই দ্বিতীয় বন্দুকের খোঁজ করবে না। আর তার আগেই যদি ওরা জেনে যায় যে বড়কালী রেবাকে একটা বন্দুক দিয়ে গেছে এবং সেটা চায় তাহলে রেবা ছোটকালীর বন্দুকটা পুলিশকে দেবে এবং যখন বোঝা যাবে যে সেটা খুনী বন্দুক নয় তখন পুরো ব্যাপারটা গুলিয়ে যাবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে যে বন্দুকটা বড়কালী লুকিয়ে রেখে এলো আমি সেটা নিজের অজান্তে বের করে নিয়ে এসে পুলিশের হাতে তুলে দিলাম।

-এখন তোমার কী হবে?

-জানি না।তবে এটুকু বলতে পারি পুলিশ বলতে পারবে না আমি প্রমাণ লোপাট করেছি। উল্টে আমি যে প্রমাণের জন্য পুলিশ হন্যে হয়ে ঘুরছে সেই প্রমাণ উদ্ধার করে পুলিশের মূল সন্দেহ রেবা কৈরালার বাড়িতে রেখে এসেছি। সুতরাং এই মুহূর্তে আমি আমার কী হবে তাই নিয়ে চিন্তিত নই। আমার চিন্তা বড়কালীদের নিয়ে।

-দাদু, তোমার কি মনে হয়, কে খুন করেছে?

- সেটাই তো এখন মূল প্রশ্ন। এই মুহূর্তে পুলিশের ধারণা ছোটকালীর স্ত্রী অথবা ছোটকালী খুন করেছে এবং আমি ওদের বাঁচাবার জন্য রেবাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করছি। আমার মনে হয় ছোটকালী আর তার নববিবাহিতা স্ত্রীও আমার ওপর বেশ রেগে আছে। ওদের ধারণা আমি খুনী বন্দুকটা নিয়ে ছোটকালীর অফিসে গিয়েছিলাম। তারপর আমার ইচ্ছাকৃত হৈ হট্টগোলের মধ্যে কোনও ফাঁকে খুনী বন্দুকটাকে ছোটকালীর বন্দুকটার সঙ্গে বদলে দিই। আমার ফাঁদে পা দিয়ে ছোটকালী খুনী বন্দুকটা রেবাকে দিয়ে আসে। বড়কালী যখন কাগজে খবরটা পড়বে তখন আমাকে অভিশাপ দিতে শুরু করবে।

-আর পুলিশ তোমার সম্বন্ধে কী ভাবছে?

- পুলিশ ভাবছে আমি যা করেছি তা কেবলমাত্র পুলিশকে বিপথে চালনা করা জন্য। ওরা যে ভাবেই হোক প্রমাণ করার চেষ্টা করবে আমার কাছে ঐ খুনী বন্দুকটা ছিল। যদি একবার ওরা সেই জায়গায় পৌঁছোয় তাহলে ওরা আমাকে যতদূর পারে টেনে নামাবে।

-কিন্তু ওরা কী করে সেটা প্রমাণ করবে?

-ঐ গুলিটার থেকে যেটা আমি ছোটকালীর টেবিলে ছুঁড়েছিলাম। কিন্তু ঐ গুলিটা ছাড়া কিছুতেই প্রমাণ করতে পারবে না আমার কাছে ঐ বন্দুকটা ছিল। কিন্তু একবার যদি ঐ গুলিটা পুলিশ হাতে পায় এবং প্রত্যক্ষদর্শীরা যদি বলে ঐ গুলিটা আমি ছুঁড়েছিলাম পুলিশ প্রমাণ করবে যে ঐ গুলিটা খুনী বন্দুক থেকে ছোঁড়া হয়েছিল। মনে রেখো আমি শিবুলালের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম এবং কেলো দারোগা আপ্রাণ চেষ্টা করবে এটা প্রমাণ করতে যে আমিই খুন করেছিলাম।

-বেশ, ওরা যদি ঐ গুলিটা হাতে না পায় তাহলে ওরা নিশ্চয়ই প্রমাণ করতে পারবে না যে খুনী বন্দুকটা তোমার কাছে ছিল।

-পারতেও পারে তবে সোজাসুজি নয়।

-পুলিশের মাথায় এটা আসার আগে জগাইকে কি বলা যায় না ওখানে গিয়ে ঐ গুলিটা খুঁজে আনতে।

-না, না। সেটা সম্ভব নয়। আমি জগাইকে চিনি। এতবড় ঝুঁকির কাজ ও আগে করেনি। একবার ধরা পড়ে গেলে আমরা সবাই বিপদে পড়ে যাব।

-গুলিটা টেবিল থেকে ছিটকে কোথায় গিয়েছিল তোমার মনে আছে?

-আমি এমন একটা অ্যাঙ্গেল থেকে গুলিটা ছুঁড়েছিলাম যে গুলিটা যাতে ছিটকে দেয়ালে আটকে যায়, কাউকে যেন আঘাত না করে।

- এবার সত্যি বলতো গুলিটা তুমি কেন ছুঁড়েছিলে?

-যাতে কিনা পুলিশ সহজেই একটা গুলি ছোঁড়া হয়েছে এমন একটা বন্দুক রেবার বাড়িতে পেয়ে যায়। আমি ভেবেছিলাম যদি পুলিশ একরম একটা বন্দুকের খোঁজেই রেবার কাছে আসে তাহলে ছোটকালী এবং আমার রাখা বন্দুকটা নিয়েই পুলিশ চলে যাবে।

-তাহলে আমরা এখন কী করবো?

-আমাদের কাছে অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনও উপায় নেই।

-দাদু, সেটাই তো সবচেয়ে কঠিন কাজ । আমার অস্থির লাগছে। আমি একটু খোলা হাওয়ায় হেঁটে আসি। আমি এখনই আসছি।

-সুন্দরী, কী হয়েছে তোমার?

-আমি কাল রাত্রে ঘুমোতে পারিনি। আমি কাল সারারাত ছোটকালী আর রেবাকে নিয়ে ভেবেছি। আমি জানিনা কেন আমি ব্যাপারটা থেকে বেরোতে পারছিনা।

-তুমি আসলে অনেক বেশি সময় অফিসে দিচ্ছ এবং অনেক বেশু দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়ে নিয়েছ। এতকাজ একসাথে করার সঙ্গে সঙ্গে তুমি আমাকেও কেসের ব্যাপারে সাহায্য করছো।

- সে কথা ঠিক, কাজের চাপ হয়ত বেড়েছে কিন্তু আগে তো কখনও এরকম হয়নি। বিশেষ করে গতরাত্রে। আমি চোখের পাতা এক করতে পারিনি। আমার মনে হয় রেবার প্রেমে আঘাত পাবার ব্যাপারটা আমাকে বেশি ভাবাচ্ছে। একবার রেবার মনের অবস্থাটা ভেবে দেখ, দাদু। একদিন সকালবেলা খবরের কাগজ খুলে দেখল তার প্রেমিক অন্য একজনকে বিয়ে করেছে যে ব্যাপারে সে কিচ্ছু জানেনা। আর তার প্রেমিকের বাবা তাকে বাড়ি নিয়ে যেতে চায়। আমি কাঁদতে কাঁদতে ঘুম থেকে উঠে পড়েছিলাম। আর শুতে যেতে পারিনি। সারারাত অস্থিরভাবে পায়চারি করেছি।

-সুন্দরী, ভেতরে যাও। একটা ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়। আমি সবাইকে বলে দিচ্ছি কেউ যেন তোমাকে বিরক্ত না করে। যদি সেরকম কিছু ঘটে আমি তোমাকে ডেকে দেব।কালকের দিনটা ঘটনাবহুল হবে বলে মনে হয়। আজ সেরকম কিছু হবার সম্ভাবনা নেই। সবকিছু জট পাকিয়ে আছে। পুলিশকে কিছু করার আগে জট খুলতে হবে। সময় লাগবে।

-আর তারপর যখন পুলিশ সক্রিয় হয়ে উঠবে তখন তুমিই হবে তাদের প্রথম এবং প্রধান লক্ষ্য।

-একদম ঠিক। তবে যদি সে সুযোগ পুলিশ পায়। কেলো দারোগা আপ্রাণ চেষ্টা করবে আমি জানি। যাকগে, ছাড়ো ওসব। পরিস্থিতি কখনও কখনও মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে, কয়েকটা ঘটনা আকস্মিকভাবে একসঙ্গে ঘটে গেলে অনেকসময় জটিলতার সৃষ্টি করে। তুমি ভেতরে যাও সুন্দরী।

-দাদু, কিছু দরকার হলে আমাকে ডেকো কিন্তু।

-ঠিক আছে, বাবা।

-আমার শরীরটা ভীষণ ম্যাজম্যাজ করছে।

- কোনও অসুখ বাধাবে মনে হচ্ছে। একটা ডাক্তার দেখিয়ে নিতে পার।

-না, না। কোনও দরকার নেই।একটু ঘুমিয়ে নিতে পারলে সব ঠিক হয়ে যাবে।

- আমারও তাই মনে হয়। তবে জ্বর এলে আমাকে বোলো। ডাক্তার ডাকতে হবে।

-ঠিক আছে, আসি। দরকার পড়লে ডেকে নিও।

সুন্দরী ভেতরে চলে যায়। পানু রায় পায়চারি শুরু করেন। মাথায় নিশ্চয়ই কিছু ঘুরছে।
0

গল্প - রঞ্জন রায়

Posted in







শীতকাল এসে গেছে সুপর্ণা। তুমি টের পাওনি?

আমি খবর পেয়েছিলাম অনেকদিন আগে। নাঃ কোন পোস্টম্যান বা টেলিগ্রাফ পিওনের হাতে নয়, একটু একটু করে পাতার রঙ বদলানো দেখে , তারপর শুকনো পাতা ঝরতে দেখে। এটা কোলকাতায় ঠিক বোঝা যায় না। এখানে তিনটেই ঋতু—গ্রীষ্ম, বর্ষা আর শীত। বসন্ত আর হেমন্তের দিন টের পাওয়া যায়না। ওরা কখন আসে কখন যায়? আচ্ছা, তোমার ছেলেমেয়েরা কখন বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় আর কখন ফেরে?

টের পাও? আমি পাই না। একদিন জিজ্ঞেস করায় খেপে উঠে আমার চোদ্দপুরুষ উদ্ধার করেছিলে। বলেছিলে—মনটাকে একটু বড় কর। আদ্যিকালের বদ্যিবুড়ো হয়ে থেকো না। ওরা বড় হচ্ছে, ওরা জেঞ্জি।

--কী জি? গেঞ্জি না কী বললে? কোন ক্লাব বা প্রতিষ্ঠান? কোন ধর্মীয় সংঘ?

--ধ্যেৎ একটু খবর টবর দেখ, পেপার পড়। অন্ততঃ রোজ একবার গুগল করে নাও। খালি কবিতা কবিতা করলে হবে? কবতে করে অকম্মার ঢেঁকির দল। ওরা সোজা কথা সোজাভাবে বলতে পারে না। ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে এমন করে যেন শব্দ নিয়ে ক্যারাটে খেলছে।

আচ্ছা, শীতকালের খবর নিয়ে কী যেন বলছিলে? পাতার রঙ বদলানো দেখে শীতের আগমন? এমন কথা রবি ঠাকুর বা জীবনানন্দ লেখেননি তো? খালি পাতা ঝরা শিশির পড়া এইসব বলেছেন।

--ওটা বিদেশে গেলে দেখা যায়। ওদেশের ‘ফল সীজন’ আমাদের শরৎকাল। তখন সবুজ পাতাগুলো প্রথমে হলুদ হয়, তারপরে লাল এবং শেষে কালো। তারপর ঝরে পড়ে। তখন বিশাল বিশাল খাড়া খাড়া গাছগুলো—বার্চ, ওক, মেপলের দল—কংকালের মত, বা বধ্যভুমির মত বরফে ঢাকা প্রান্তরে শুকনো বিষণ্ণ ন্যাড়া ডালগুলো নিয়ে মনখারাপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। আমি ভাবি রোমে স্পার্টাকাসের বিদ্রোহ দমনের পর সারি সারি ক্রুশে বিদ্ধ গ্ল্যাডিয়েটর।

সুপর্ণা অবাক চোখে আমাকে দেখে।

হ্যাঁ, আমার বউয়ের নাম সুপর্ণা। কেন? আমার বউয়ের নাম সুপর্ণা হতে পারে না? কেন পারে না?

দেখুন আমার এক পিসেমশাইয়ের নাম ছিল সুন্দরীমোহন, আর পিসিমার নাম বঙ্গলক্ষ্মী; স্বদেশী যুগে তাঁর জন্ম হওয়ায় দাদু ওইরকম নাম রেখেছিলেন।

তাহলে বাংলা কবিতায় জীবনানন্দ-শক্তি-সুনীলের যুগের পর ভাস্কর চক্রবর্তীর যুগ শুরু হলে সবার প্রেমিকার নাম সুপর্ণা হতে বাধা কিসের! অ, বউয়ের নাম সুপর্ণা বলেছি! আমি যে বউকে ভালবাসি। কতটা?

আমার রোগাটে চুপসে যাওয়া পাঁজরগোণা বুকে যতটা ভালবাসা ধরে তার সবটা দিয়ে।

কাজেই সব প্রেমিকার নাম সুপর্ণা হতে কোন বাধা নেই। বউয়ের নাম? বউ যদি প্রেমিকা হয় তবে। সবার বউ হয় না। বেশিরভাগ অ্যাডজাস্টমেন্ট। আরেকটা কথা আজকাল বাজারে খুব চালু। কমফোর্ট জোন, কেউ তার অভ্যস্ত কমফোর্ট জোনের বাইরে যেতে চায় না।

কিন্তু আমি ভাবি এটা কোন নতুন কথা নয়। বঙ্কিমদা, থুড়ি বাবু বঙ্কিমচন্দ্র একশ’ বছর আগে রজনী উপন্যাসে এসব দেখিয়েছিলেন। “বিবাহিত লবঙ্গলতার স্বামী বুড়ো, সে তার প্রথম জীবনের প্রণয়ী অমরনাথের পিঠে গরম লোহা দিয়ে ‘চোর’ লিখলেও তার অমরনাথের প্রতি আসক্তি গোপন থাকে নি। বাঁশির ডাক সে শুনেছে কিন্তু সামাজিক বেড়ার আগল খুলে বাইরে আসতে ভয় পেয়েছে”।

অর্থাৎ কমফোর্ট জোনের বাইরে যাবে না। কেন যাবে? উচ্চবিত্ত পরিবার, খাওয়া পরার কষ্ট নেই। স্বামী, হোক গে বুড়ো, লবঙ্গকে চোখে হারায়। একেবারে ‘সুখী গৃহকোণ, শোভে গ্রামোফোন’ কেস।


হায়ার সেকেন্ডারির টেস্ট পরীক্ষায় বাংলা সেকেন্ড পেপারে ওইসব লেখার পর স্কুলের বুড়ো হেডমাস্টার আমার লোক্যাল গার্জেন কাকাকে ডেকে পাঠিয়ে ছিলেন। লবঙ্গলতা না যাক, আমি স্কুলের খাতায় কমফোর্ট জোনের বাইরে গেছলাম। ফল ভাল হয় নি। ওর জন্যেও ভাল হত না, সেটা বঙ্কিম বুঝেছিলেন। তখন মেয়েরা কমফোর্ট জোনের বাইরে গেলে হয় রোহিণী, নয় হীরা মালিনী হত।

এখন দুটো শতাব্দী পেরিয়ে গেছে।

তাই সুপর্ণা ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে—তুমি আবার কবে বিদেশ গেছলে? তাও ইউরোপে?

--না, মানে ছবি দেখেছি। ভিডিও দেখেছি। তাতে ফল সীজনের পাতার রঙ বদলানো—দারুণ একটা ব্যাপার। তারপরে শীত আসে, হিমশীতল শীত, বরফে আদিগন্ত ঢাকা শীত।

--তাই বল, তোমার মত ফোতো কবি আবার বিদেশ যাবে? হুঁঃ!


ব্যাপারটা হচ্ছে সুপর্ণা একটা স্কুলের ডাকসাইটে প্রিন্সিপাল ছিল, এবছর রিটায়ার করেছে। কিন্তু স্কুল ওকে সম্মান দিয়ে গভর্নিং বডির মেম্বার করেছে। সেখানে আমি মহা লুজার। ব্যাংকে চাকরি পেয়েছিলাম। তখন আমার বিয়ে হয়। কিন্তু দু’বছরের প্রবেশন শেষ হবার আগে আমাকে বাড়ি পাঠিয়ে দিল। আমার ‘ডিউ ডিলিজেন্সে’ ঘাটতির ফাঁক দিয়ে কিছু নেপো এসে দই খেয়ে যায়। এনকোয়ারি হয়। আমার গাফিলতি প্রমাণিত। হাতে হ্যারিকেন।

তারপরে কিছুদিন একটা স্কুলে কম বেতনে কাজ করেছি। গার্জেনরা কমপ্লেন করলেন। আমি পরীক্ষার জন্যে ছাত্রছাত্রীদের তৈরি করার বদলে রোজ দশ মিনিট কবিতা শোনাই। কোর্স কমপ্লিট করার ব্যাপারে নজর নেই।

এই সময়েই আমার পুরনো অসুখ ফের চাড়া দেয়।

আমি স্বপ্ন দেখি, রোজই দেখি। ঘুমুতে যাবার আগে আমার শরীরে রোমাঞ্চ জাগে এই কল্পনায় যে আজ কীরকম দেখব—ভয়ের, রোম্যান্টিক নাকি ঝাড়পিট? যেন স্বপ্ন আমার বিনে পয়সার নেটফ্লিক্স—দেদার সিনেমা।

কিন্তু ছোটবেলা থেকেই বিছানা ভেজানোর অভ্যাস হল। শোধরানোর অনেক চেষ্টা হয়। অপমানজনক তেতো কথা, ধোলাই, চাদর নিংড়ে জল মিশিয়ে খাওয়ানো, শীতের রাতে নিজের হাতে বাথরুমে গিয়ে চাদর ধুতে বাধ্য করা। কিন্তু ভবি ভোলে না।

বাড়ির লোকজনের ধারণা যে আমি আসলে অলস, কুঁড়ে। বিছানা ছেড়ে মাঝরাতে উঠতে চাই না, নইলে এমন হয়?

বোঝাতে পারি না যে সব দোষ স্বপ্নের, আমার নয়। ঘুমের মধ্যে টের পাই পেচ্ছাবের বেগ আসছে, আসছে। সাবধান! বিছানা ভেজানো নয়। আমি উঠে বাথরুমে গিয়ে কমোডে বসি ঘুমচোখে। প্যান্ট খুলে ফেলেছি। এইবার এইবার—কোন ভয় নেই, তুমি বিছানায় নেই, তুমি বাথরুমে। এত সব সাবধান বাণী নিজেকে শুনিয়ে মাভৈঃ মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ হয়ে শরীর ঢিলে করি।

‘বান এসেছে জোড়া গাঙে ঠেলতে হবে নাও,

তোমরা এখনও ঘুমাও? তোমরা এখনও ঘুমাও’।

এইবার সে আসছে—অতি ভৈরব হরষে! আঃ কী শান্তি। কিন্তু খানিকক্ষণ পরে টের পাই উষ্ণ স্রোত আমার দুই উরূ ভাসিয়ে দিয়ে বইছে। ধড়মড়িয়ে জেগে উঠি। একী। ফের ম্যাসাকার! তাহলে যে বাথরুম গেছলাম সেটা স্বপ্নে!

একটা বয়সের পর আলাদা বিছানা হোল, ভয় এবং দুর্ঘটনা অনেকটা কমে গেল। কিন্তু কোন মানসিক চাপ হলে মাঝে মাঝে, কিঞ্চিৎ, কদাচিৎ।

বিয়ের পর ফুলশয্যা। আমি ভয়ে কাঁটা। সেদিন খেল দেখালো বটে সুপর্ণা। যখন ফুলে সাজানো ঘরে শুতে যাব তখন দুই কাকিমা আর ঠাকুমা একটি ডাব আর একটা কানাউঁচু কাঁসার থালা নিয়ে এসে নাতবৌকে বললেন—আহা, একটা কথা আছে। আগে একটা অনুষ্ঠান করতে হবে যে! আমাদের বাড়ির নিয়ম।

আমাদের দুজনের চোখে জিজ্ঞাসা—কী নিয়ম?

--তুই এসে থালাটার উপর পা রেখে দাঁড়া। নাতবৌ ডাবের মাঙ্গলিক জল দিয়ে তোর পা ধুইয়ে দিয়ে নিজের খোলা চুল দিয়ে মুছিয়ে দেবে। তারপর বিছানায় উঠবি। নাকি তোর তর সইছে না?

হি-হি, হো-হো!

আমি চিন্তায় পড়লাম । আমাদের বাড়ির অন্য কোন বিয়েতে তো এরকম নিয়ম দেখিনি। হয়ত হয়েছিল, আমি ছোট বলে এন্ট্রি পাইনি। সুপর্ণার মুখের দিকে তাকাই, কী করব?

ওর মুখের চেহারা ধীরে ধীরে বদলে যায়। নতুন বৌ মুখ খুললোঃ

--শুনুন। রাত অনেক, আপনারা বয়স্ক মানুষ—এবার শুতে যান। আর এই থালা নারকোল সব উঠিয়ে নিয়ে যান।

ঘরের মধ্যে যেন বাজ পড়লো। সবাই আমাদের দুজনকে একবার করে দেখে কোন কথা না বলে বেরিয়ে গেলেন। ও ছিটকিনি তুলে দিল। আঃ কী শান্তি! আমাকে কিচ্ছু করতে হল না। কোন অপ্রিয় সীন ক্রিয়েট হল না। কঠিন থ্রি ভ্যারিয়েবলের ইকোয়েশনের সহজ সমাধান। আমার বুক কৃতজ্ঞতায় ভরে গেল। আমি ওর বাড়ির নাম সুচন্দ্রা বদলে সুপর্ণা করে দিলাম।

কিন্তু ও আমাকে বলল—তাড়াহুড়ো করবেন না। পাশ ফিরে শুয়ে পড়ুন। সব হবে, ধীরে ধীরে।

হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। যা ভয় ধরেছিল।

জানলায় আড়ি পাতা নানা বয়েসি মেয়েদের দল হতাশ হল।


বন্ধুবান্ধবেরা জোর দিয়ে বলেছিল—প্রথম রাত্তিরেই বেড়াল মারতে হয়।

কিন্তু আমি যে কাউকেই মারতে পারিনা। মারামারিতে নিতান্ত অনীহা, সেই ছোটবেলা থেকেই।

তারপর এল সেই রাত, যেদিন আমার ফাঁসি হল। বালজাকের লেখায় পড়েছিলাম---ফাঁসির দড়ি গলায় চেপে বসলে পুরুষের দৃঢ় হয়, উত্থান হয় এবং পতনও হয়। আমার হোল অধঃপতন। সেই স্বপ্নে যা হত, স্বপ্নসুন্দরীর আলিঙ্গনে চরম মুহুর্তে বজ্রপাত।

ওর চোখে ঝলসে উঠল একরাশ ঘেন্না, বিড়বিড় করে বলল-মানুষ না জানোয়ার! তারপর বাথরুমে গিয়ে স্নান করে এসে সোফায় শুয়ে বাকি রাত কাটালো। আমার লজ্জায় সারারাত ঘুম আসেনি। ভোরের দিকে চোখ লেগে এসেছিল। ওর হাতের ঠেলায় জেগে উঠলাম।

--যাও, ব্রাশ করে এস। চা হয়ে গেছে।

আমি ওর মুখের দিকে তাকাতে পারি নি।

চা খেতে খেতে বলল—শোন, এটা একটা অসুখ; শরীরের না মনের। তোমার ব্যক্তিত্বের। অসুখ হলে চিকিৎসা করাতে হয়। আমরা দু’জনে আজ সন্ধ্যেবেলা একজন সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে যাব। বাড়িতে সব খুলে বলার দরকার নেই। এখনও সবাই ভাবে শুধু পাগল বা মনোরোগীরাই ডাক্তার দেখায়।

আমি সেরে উঠলাম। আমি তখনই ওর প্রেমে পড়লাম, যার নেশা আজও কাটেনি। আমার জীবনে বসন্ত এল, ফুল ফুটল; বলা ভাল আমাদের মিলিত জীবনে।

এক ছেলে এক মেয়ে। তারপর যখন স্কুলের চাকরিটাও গেল বুঝলাম ফল সীজন আসছে। গাছের পাতা সবুজ থেকে হলুদ হচ্ছে। ও ভীষণ ব্যস্ত, নিজের লাইনে সফল। শহরে খুব নামডাক, স্থানীয় কাগজে ওর সাক্ষাৎকার বেরোয়, শহরের মেয়র ওর সংগে বোন পাতিয়েছেন। এফ এম ব্যান্ডের রেডিও ওকে টক শো’তে ডাকে।

আমি লুজার। নাম কা ওয়াস্তে কিছু টিউশনি করি, ওইটুকুই। সত্যি বলছি—আমার কোন ঈর্ষা হয় না। নো জেলাসি। আমাকে বাদ দিয়েই ওকে নানা জায়গায় যেতে হয়। আমি কেন ল্যাংবোট হব? আমি সফল হতে চাই না, খালি কবিতা লিখতে চাই।

পঞ্চাশ পেরিয়ে গেল সুপর্ণা। কিছু গাইনি সমস্যা হচ্ছে। আমরা নামজাদা ডাক্তারের কাছে গেলাম। উনি নাকি হার্ভার্ড ফেরত। বললেন একটা এম আর আই করিয়ে আনুন। আমি লিখে দিচ্ছি।

ছবি দেখে ডাক্তার উচ্ছসিত। --চিন্তা করবেন না, আপনি খুব ভালো আছেন। কোন মেজর ইস্যু নেই। আরও একটা কথা বলি, কিচ্ছু মনে করবেন না, প্লীজ। আপনার বয়স ফিফটি ফাইভ, কিন্তু ভাজিনার ছবি যেন পঁয়ত্রিশ বছরের। নিয়মিত যোগা করেন বুঝি?

সুপর্ণা স্মিত হেসে সায় দেয়।

ভাবি, আমাকে একবার ধন্যবাদ দিলে পারতো। আমি যদি অবুঝ স্বামী হতাম তাহলে ছবি অন্যরকম হত।


কিন্তু একদিন ঘটনা ঘটল।

কী একটা ব্যাপারে রেলওয়ে কালচারাল ইন্সটিউটে যাচ্ছিলাম। ও হ্যাঁ, আমার অ্যামেচার নাটকের দলের জন্য হল ভাড়ার দরখাস্ত জমা করতে। কিন্তু আমার মোবাইলটা ভুলে ওর হ্যান্ডব্যাগে চলে গেছল। সেটা নিয়ে তবে যাব। স্কুলে গিয়ে জানতে পারলাম—উনি এখন কালেক্টরের অফিসে আগামী বোর্ড পরীক্ষার মিটিং অ্যাটেন্ড করতে গেছেন।কালেক্টরের অফিসে আমাকে ঢুকতে দিল না। চাপরাশি বাইরে অপেক্ষা করতে বলল। প্রায় একঘন্টা। আমি মোবাইল নিয়ে ফের ইন্সটিটুটে দৌড় লাগালাম। ডি আর এম বেরিয়ে গেছেন।

সেদিন নাটকের দলেও কথা শুনতে হল।

--কেন মোবাইল সামনে রাখি নি? কেন ওদের কাউকে পাঠাইনি?

সবাই উত্তরটা জানে—লুজার!

বাড়ি ফিরে সুপর্ণাকে কিচ্ছু বলি নি। ঝগড়া করি নি। কিন্তু মাঝরাতে একযুগ পরে সেই জলসিঞ্চিত -ক্ষিতিসৌরভ- রভসে!

পরের দিন থেকে সুপর্ণা আলাদা ঘরে শুতে লাগল। হ্যাঁ, গাছের পাতা হলুদ লাল কালো হয়ে এখন ঝরে পড়ার দিন শুরু। বসন্তের দিনে আমরা খুব ভালো বন্ধু ছিলাম। নিজেদের ‘তুই’ করে বলতাম। সারাদিন কলকল করে গল্প করতাম, জোকস্‌ শোনাত। আমরা পছন্দের গান শুনতাম। ও একসময় কয়েকবছর কত্থক শিখেছিল। খালি ঘরে দরজা বন্ধ করে নেচে দেখাত—মোহে পানঘট পে নন্দলাল ছেড় গয়ো রে!

এখন শীত এসে গেছে। অনেকদিন ধরেই আমরা তুই ছেড়ে তুমি হয়ে গেছি। হাসির কথা, ঠাট্টা এসব বহুদিন বন্ধ হয়ে গেছে। একসঙ্গে নাটক দেখা, ক্লাসিক্যাল গান শোনা হয় না।

টের পাচ্ছিলাম শীত আসছে, পাতা ঝরছে। কিন্তু মন চাইছিল না বিশ্বাস করতে।

গত রোববার জলখাবারের পর বহুদিনের অভ্যাসে ওকে সুপর্ণা বলে ডেকেছি, ও বই থেকে চোখ তুলে তাকালো। তারপর কেটে কেটে বলল—আমাকে আমার বাবা মায়ের দেয়া নাম সুচন্দ্রা বলে ডাকবে।

হ্যাঁ, শীত এসে গেছে পাকাপাকি ভাবে।

নিজের ঘরে ঠান্ডা বিছানায় শুয়ে একা একা ভাবি—সুপর্ণা। শোন, আমার জন্যে তুমি সুপর্ণাই থাকবে। হ্যাঁ, আমি একজন ফালতু ফোতো কবি। যার কবিতা মফঃস্বলের কোন অজানা ম্যাগ মাগনায় ছাপে।

হ্যাঁ, আমি লুজার। কিন্তু আমার যে শীত করে সুপর্ণা, বড্ড শীত। ব্যর্থ কবির একটু উষ্ণতা চাওয়া কি অপরাধ? তুমিই বল সুপর্ণা?


*কবি ভাস্কর চক্রবর্তীর “শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা” পংক্তিটিকে সামান্য পরিবর্তিত করা হয়েছে।