0

ধারাবাহিক - শ্যামাপ্রসাদ সরকার

Posted in






















(শেষপর্ব) 



ব্রিটিশ হংকং থেকে কানাডাগামী একদল ভারতীয় অভিবাসী যাত্রীকে জোর করে কলকাতায় নামিয়ে দেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ব্রিটিশ সরকার। এদের মধ্যে তিনশোজন শিখ, সাতাশজন মুসলিম আর বারোজন হিন্দু যাত্রী রয়েছে। লাহোরে গদর পার্টী বলে একটি শিখপ্রধান বিপ্লবীদের দল বড়লাট লর্ড হার্ডিঞ্জের মিছিলে কদিন আগেই বোমা ছুঁড়েছিল। তাই এখন ব্রিটিশ সরকারের বিষনজরে যেকোন শিখধর্মের মানুষজনই। কানাডায় এইসময়ে নতুন শিল্পায়ন আর কর্মসংস্থানের জোয়ার। কোনভাবেই হুট করে এত বাড়তি সংখ্যক ভারতীয় নেটিভদের ওদেশে ঢুকতে দেওয়া সমীচীন হবে না বলেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন স্বয়ং লর্ড হার্ডিঞ্জ। বরং 'কোমাগাতামারু' নামে একটি জাপানী জাহাজে করে পত্রপাঠ তাদের সকলকেই দেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। জাপান থেকে রেঙ্গুন হয়ে সেই জলযানের শেষগন্তব্য কলকাতাই। রাজধানী দিল্লীতে সদ্য স্থানান্তরিত হলেও প্রশাসনিক কাজের অনেকক্ষেত্রেই কলকাতা তার পূর্বতন গুরুত্ব হারায়নি। 

জাহাজঘাটায় সেজন্য অন্যদিনের চেয়ে ভীড় আর ব্যস্ততা যেন একটু বেশীই। 

দুপুরের দিকে শরৎ জাহাজঘাটায় এক পরিচিতজনের সাথে দেখা করতে এসেছিলেন। বিমল সেই নামের ছেলেটি ক্লিয়ারিং অফিসের একজন কেরাণী আর সম্পর্কে মনীন্দ্রের শ্যালক। গতমাসে তার কাছ থেকে বেশ কিছু টাকা ধার করেছিলেন। সেটি ফেরৎ দিতেই এ তল্লাটে আসা। চা সহযোগে বিমলের সাথে একটুক্ষণ গল্পগুজবে বেশ সময়টা কাটল। জাহাজঘাটায় আজ বড্ড ভীড়। ফিরতি পথে পাথরে হোঁচট খেয়ে শরৎের পায়ের চটিটি হঠাৎ ছিঁড়ে গেল। অসহায়ের মত এদিক ওদিক তাকাতেই সামনের গাছতলায় টোকা মাথায় একটা মুচিকে দৈবাৎ দেখতে পেয়ে সেদিকে সঙ্গে সঙ্গে এগোলেন। শরৎ বর্মীভাষায় কথা বলতে বেশ স্বচ্ছন্দ এখন, তাই লোকটিকে সে ভাষাতেই সম্বোধন করে চটিটি এগিয়ে দিলেন। গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে লোকটি চটি সেলাই করতে থাকে। পয়সা দিয়ে চলে আসছেন এমন সময় তাঁকে অবাক করে সেই টোকা মাথায় লোকটি মৃদুস্বরে খাঁটি বাঙলায় সম্বোধন করল 'শরৎদাদা'! শরৎের মুখটি আনন্দে চকচক করে উঠলো - 'মহিম! তুমি!' শরৎের বিস্ময় যেন কাটেনা আর! মহিম চাপাগলায় বলে "হ্যাঁ দাদা! ইংরেজের ভাত আর হজম হচ্ছিল না তাই পালাতেই হল। ভগবানের অসীম কৃপায়, আজ চলে যাওয়ার আগে শেষবারের মত আপনার পা'টি অন্ততঃ একবার ছুঁতে পেলাম।" 

সে জানায় মান্দালয়ের জেল থেকে সাতদিন আগেই সে পালিয়েছে। এদিক ওদিক ছদ্মবেশে ঘোরাঘুরি করে আপাততঃ জাহাজঘাটার কাছেই অস্থায়ী আস্তানা নিয়ে আছে। আবার আজ রাতেই খালাসীর ছদ্মবেশে সে কোমাগাতামারুতে চেপে ভারতবর্ষে চলে যাচ্ছে গোপনে আর এক বাক্স জার্মান মাউজার পিস্তলের বাক্স জোগাড় করে। সেগুলোর জন্য যতীন মুখোপাধ্যায় বলে একজন সহবিপ্লবী কলকাতায় ওর জন্য অপেক্ষা করার কথা। স্বাধীনতার মরণযযজ্ঞে অরবিন্দ ঘোষের নেতৃত্বে সহ বাকী সব বিপ্লবীদের এখন একজোট হওয়ার সময় হয়ে এসেছে। শরৎের দুচোখ গর্বে চিকচিক করে ওঠে। চলে আসার আগে ভীড়ের মধ্যে মহিমের হাতদুটি ধরে তিনি আবেগরুদ্ধ শরৎ বলে ওঠেন - 

" ভাই! তুমি বা তোমরা তো আমাদের মত সোজা মানুষ নও- তোমরা দেশের জন্য সমস্ত দিয়েছ, তাই ত দেশের খেয়া-তরীর তোমাদেরকে বইবার জো নেই, সাঁতার দিয়েই তোমাদের নদী বা সাগর পেরোতে হবে। দেশের রাজপথ তোমাদের মত সোনার টুকরো ছেলেদের কাছে চিররুদ্ধ। 

কোন বিস্মৃত অতীতে তোমাদেরই জন্য প্ৰথম শৃঙ্খল তৈরী করে আর তা দিয়ে বাঁধবে বলেই শাসকের দল অন্ধকার কারাগারের নির্মাণ করেছে। তোমাদের এই আত্মাহুতি আজকে সাধারণ লোকের অগোচরে থাকলেও স্বাধীন দেশের ভাবীকালের ইতিহাস তা কখনোই ভুলবেনা। সেই হবে তোমাদের আসল পুরস্কার! তোমাদের অবহেলা করে এ সাধ্য কার! এই যে অগণিত প্রহরী, এই যে বিপুল সৈন্যভার, সে ত কেবল তোমাদের জন্যই! দুঃখের দুঃসহ গুরুভার তোমরা বইতে পারো বলেই তা ভগবান এত বড় বোঝা তোমাদের নবীন স্কন্ধে অৰ্পণ করেছেন! মুক্তিপথের অগ্রদূত! পরাধীন দেশের ; হে রাজবিদ্রোহী! দেশের অগণিত মানুষের হয়ে তোমাকে আমার মত এক সাধারণ লেখকের শতকোটী নমস্কার! " 

এত লোকের ভীড়, এত লোকের আনাগোনা, এত লোকের চোখের দৃষ্টি কিছুতেই তাঁর খেয়াল ছিল না। নিজের মনের উচ্ছসিত আবেগে অবিচ্ছিন্ন চোখের জলে তাঁর গাল আর চিবুক, আবেগে ভাসতে লাগল। 

পোজুংডাং এর বাসা বাড়িটা শেষমেশ ছাড়তেই হল। নিভন্ত চুরুটের আগুন বইখাতায় ছড়িয়ে পড়ে একটা যাচ্ছেতাই কান্ড ঘটে গেল। ক্ষতি বেশ খানিকটাই হয়েছে। 'চরিত্রহীন' নামে একটি উপন্যাস সবে শুরু করেছিলেন তার পান্ডুলিপি সহ বিভিন্ন বইপত্র পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। এমনকি খোকাকে নিয়ে তাঁর আর শান্তির একমাত্র ফোটোগ্রাফটিও নষ্ট হয়ে গেছে। গৃহী শরৎচন্দ্রের যেন কোনও চিহ্নই আর রইলো না। কেমন যেন স্বপ্নের মত সব মিলিয়ে গেল হঠাৎ করে। কেবল ল্যান্সডাউন স্ট্রীটের বাসা বাড়িটায় রয়ে গেল কিছু সুখদুঃখের অপসৃয়মান স্মৃতিভার। 

মাঝেমধ্যেই বার্নার্ড ফ্রী লাইব্রেরীতে সন্ধেটা কাটান। আজকাল কান্ট, মিল, বেন্থামের পাশাপাশি মার্ক্স আর এঙ্গেলস্ এর সমাজতত্ত্বের কিছু বই ঘাঁটছেন। পড়াশোনা টায় মাঝখানে বেশ ছেদ পড়ে গেছিল বিরহ আর শোকের অবিচ্ছিন্ন প্রভাবে। 

এই নতুন পল্লীটি আর আগের মত ঘিঞ্জি নয়। বারান্দা থেকে দেখতে পান অদূরে ইরাবতীর রূপোলি জল ঝিকমিক করে। কাছেই একটা ধীবর পল্লী আর বাজার এলাকা। এখানে এসে কৃষ্ণদাস অধিকারী নামের এক ভাগ্যাণ্বেষী প্রৌঢ়ের সাথে ঘটনাচক্রে আলাপ হল। কোন এক মারোয়ারির গদীতে ভদ্রলোক খাতা লিখতেন। কদিন হল সে চাকরিটি গেছে তাই একটু অসুবিধায় আছেন। সঙ্গে আছে তার একমাত্র বালবিধবা মেয়ে মোক্ষদা। আলাপ হওয়ার কয়েকদিনের মধ্যেই ফস্ করে একদিন সে শরৎকে একটা অদ্ভূত প্রস্তাব দেয় তা হল শরৎ যদি তার মেয়েটিকে এ অবস্থায় বিবাহ করেন! আর নিতান্তই যদি শরৎ রাজী না থাকেন তো কিছু টাকা অন্ততঃ ধার দিতে যাতে অন্য কোথাও যদি তার বিয়ের ব্যবস্থা করতে পারেন। 

শরৎ এই আকস্মিক প্রস্তাবে হতচকিত হয়ে যান। বিবাহিত জীবনের বিগত স্মৃতি ও বিয়োগ যন্ত্রণা তিনি ভুলতে পারবেন না আজীবন সেটা তিনি নিজেও জানেন। কৃষ্ণদাসের এই বিয়ে জন্য অনৈতিক চাপ দেওয়ার একপ্রকার মানসিক নীচতায় শরৎ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। কিন্তু একই সাথে বালবিধবা মেয়েটির অসহায়তাও তাঁকে নতুন করে ভাবায়। নিজের দেশেও এই রকম মেয়েদের এতদিনেও বিয়ে হওয়া প্রায় অসম্ভব। তাই নিজেই আবার উদ্যম নিয়ে পরিচিতজনদের মধ্যে ব্যস্ত হয়ে সুপাত্র খুঁজতে লাগলেন। 

অবশেষে একদিন বিধ্বস্ত হয়ে মোক্ষদাকে সরাসরি তাঁর ব্যর্থতার কথা জানালেন। নিজের অসুস্থ শরীর, জীবনমৃত্যুর অনিশ্চয়তা, শরীর মনের অবসাদ সব অকপটে স্বীকার করে জিজ্ঞাসা করলেন সে কি তার বাবার কথামত তাঁর মত ছন্নছাড়া মানুষটিকে বিয়ে করে সুখী হতে পারবে? নতমস্তকে ঘাড় হেলিয়ে মোক্ষদা তার সম্মতি জানায়। 

শরৎ সত্যিই এই পুনর্বিবাহের জন্য মন থেকে প্রস্তুত ছিলেন না। মোক্ষদাকে স্নেহের চোখেই দেখতে অভ্যস্ত ছিলেন এতদিন। তাও কি দূর্বিপাকে সে তাঁর জীবনে কেমনভাবে এসে জড়িয়ে গেল। শরৎ আদর করে তার নাম রাখলেন 'হিরন্ময়ী'। 

বিরাট সমুদ্র যেন অসংখ্য ঢেউয়ের দোলায় ফুলে ফুলে উঠছে। দু একটা সাগর বলাকা ডেকের ওপর ডানা মেলে হঠাৎ হঠাৎ উড়ে যাচ্ছে। নোনা আঁশটে একটা জলজ গন্ধ যেটা একান্ত সমুদ্রেরই তা নাকে আসছে। দূরে পশ্চিম আকাশে একটা কমলারঙের সুগোল জ্যোতির্পুঞ্জ আস্তে আস্তে দিগন্তের দিকে ঢলে পড়ছে। সেই গোধূলি আলোয় বড় মায়াবী লাগছে চতুর্দিক। আর কিছুক্ষণ পরেই অন্ধকার নামবে এবার আসর জমাতে। সেই রাতটুকুর অবসানেই আসতে চলেছে আকাঙ্খিত একটি নতুন দিনের প্রারম্ভ। অনেক কটি শীত গ্রীষ্ম বর্ষার পর সেই সকালটিতে শরৎ এবার প্রাণভরে ভারতবর্ষের বাতাসে শ্বাস নেবেন আর প্রিয় বাংলাদেশের রোদ্দুর এবার থেকে লুটোপুটি খাবে তাঁর সর্বাঙ্গে। নিজের এই ক্ষুদ্র জীবনের অবশেষ থেকে তিনি তাঁর হিরন্ময়ীকে আর হারাতে দেবেন না কোথাও। বরং নিজেও সংসারী হতে শিখবেন নতুন করে। তার কাছে যে সব অনুভূতির মুক্তি ঘটিয়ে সহজেই অকপট হতে পারেন তিনি, এইখানেই সে যেন একেবারে জিতে গেছে। 

সেবারে দেশ ছাড়ার সময় এক অনিশ্চিত ভবিতব্যকে চ্যালেঞ্জ করেই জাহাজে উঠেছিলেন। আর আজকের জলযানটিতে যে শরৎ সপরিবারে যাত্রী হয়েছেন সেটি তাঁকে এক নতুন বন্দরে অবতীর্ণ করবে এবার তা নিয়ে আর কোন দ্বিধা নেই। নতুনকে যে নতুনভাবেই মেনে নিতে হয়, এটা আজ জীবন দিয়েই বুঝেছেন তিনি। শুধু কটি জীবনের বিনিময়মূল্যে তা অর্জন করতে হয়েছে এযাবৎকাল। 

হিরন্ময়ীর হাতে দুধ চিনি ছাড়া লেবু-চা এর পেয়ালাটা ধরিয়ে দিয়ে ডেকের উপর থেকে জলে হঠাৎ লাফিয়ে ওঠা শুশুকগুলি তাকে দেখাতে থাকেন সহাস্যে, ঠিক একদম এক মধ্যবয়স্ক শিশুর মতন। 


(সমাপ্ত) 



🗞তথ্যঋণ স্বীকার :: 

# শরৎচন্দ্রের বৈঠকী গল্প -গোপালচন্দ্র রায় 
# শরৎচন্দ্র ও মানবতাবাদ - আবদুল হালিম 
# সুলভ শরৎ সংগ্রহ (১,২)-আনন্দ পাবলিশার্স 
# শরৎচন্দ্র-অনুপম শৈলীতে ভাস্বর মনীষা - সারা বাংলা ১২৫তম শরৎচন্দ্র জন্মবার্ষিকী কমিটি সম্পাদিত 

**************************** 

লেখকের কথা - 

********************* 

শরৎচন্দ্রকে বাংলা সাহিত্যের নব্য বাস্তববাদের পথিকৃৎ বলাই যায়। বঙ্কিম পরবর্তী যুগে গদ্যসাহিত্য যখন রবীন্দ্রযুগে এসে সবে কৈশোর পার করছে ঠিক তখনই 'শরৎ'কাল এল বাংলা গদ্যে। আমার প্রচেষ্টা ছিল সেই প্রাক্ শরৎ যুগটিতে যাপন করে রেঙ্গুনের জলহাওয়ায় সেই শরৎচন্দ্রকে চিনতে বসা, যেখানে তিনি জীবনকে নানারকম দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছেন, কষ্ট পাচ্ছেন আবার সমৃদ্ধও হচ্ছেন। নিষ্ঠুর নিয়তির আগুনে একটু একটু করে আত্মদহনের পরেই সেই দরদী কলমের জন্ম তা তো আর ভোলা যায়না কখনোই। একজন লেখকের জীবনে এই দুনিয়াদারির রসদদার হওয়াটা যে জরুরী সেটা শরৎচন্দ্রের যে কোনও লেখা পড়লেই বোঝা যায়। জীবনকে দেখেই তিনি লিখেছেন বলে তাতে অতিরঞ্জন নেই। আপনাদের সাথে আমিও এক স্বপ্নের সাম্পানে সওয়ারী হয়েই অন্য শরৎকে খুঁজে পেলাম এক ঝলক খোলা হাওয়ার মতোই। 

এই উপন্যাসিকাটি কিন্তু কোনওভাবেই শরৎচন্দ্রের প্রামাণ্য জীবনী নয় বরং একে সত্যাশ্রয়ী শরৎজীবনের একটি স্বপ্নচারণ বলা যায়। 

সকল পাঠককে ধন্যবাদ জানাই এটিকে সপ্রশ্রয়ে পড়ে দেখার জন্য।গল্প বলিয়ের এটাই তো বড় পুরস্কার! 

তথ্যে অসংগতি যে যথাসম্ভব এড়িয়ে চলতেই চেয়েছি তাতে সাফল্যের হার কতটা তার মূল্যায়নের বিচারক আমার পাঠক পাঠিকারাই। 


উৎসর্গ: দরদী কথাশিল্পী শ্রীশরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় - শ্রীচরণকমলেষু।

0 comments: