0

সম্পাদকীয়

Posted in

 




































এই মাসটি বাঙালির জীবনে অতি গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৬১ সালে, এই মে মাসের ১৯ তারিখে আসামের বরাক উপত্যকায় 'বাংলা ভাষা আন্দোলনে'র শহীদ হয়েছিলেন এগারোজন বাঙালি আর তার ঠিক একশ বছর আগে কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন এমন একজন যুগপুরুষ, যিনি পরবর্তীকালে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অবিসংবাদী সম্রাটরূপে প্রতিষ্ঠা পাওয়া ছাড়াও তাঁর সমগ্র বেঁচে থাকা জুড়ে লড়াই করেছিলেন বাঙালির জাতিসত্তার দীপটি সদা-প্রজ্জ্বলিত রাখার জন্য।

পৃথিবীর ইতিহাসে এমন তুলনা বিরল নয়, যেখানে একজন সাহিত্যিক শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠেন সাংস্কৃতিক পথদ্রষ্টা। রবীন্দ্রনাথের পরিসরটি সম্ভবত অনন্য এবং তাঁর যাত্রাপথে তিনি প্রায় একাকী। সাহিত্যকৃতির ক্ষেত্রে তাঁর নিজস্ব রাজসিংহাসন থেকে তিনি নেমে এসেছেন বারংবার। কোনও কিছুর বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা না করেই আর এই কারণেই বাঙালির সবচেয়ে ভালোবাসার পাত্র মনে হয় তিনিই। আজও।

১৯০৫ সালে লর্ড কার্জন প্রনয়ণ করেন বঙ্গভঙ্গ নীতি। প্রশাসনিক সুবিধার মোড়কে আসলে তিনি যা করতে চেয়েছিলেন, তা হল ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিক বিভাজন। রবীন্দ্রনাথ এর তীব্র বিরোধিতা করে পথে নামেন। যে দিনটি থেকে এই বিশেষ আইন কার্যকর হওয়ার কথা ছিল, সেই ১৬ অক্টোবর সারা বাংলা জুড়ে তিনি ডাক দেন অরন্ধনের। উদ্‌যাপন করেন 'রাখিবন্ধন' উৎসবের। হিন্দু এবং মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ একে অপরকে রাখি পরিয়ে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন সৌহার্দ্যের বার্তা। শেষ পর্যন্ত এই আন্দোলন এমন এক গণ প্রতিরোধের চেহারা নেয় যে ১৯১১ সালে তৎকালীন ভারত সরকার এই সম্পূর্ণ অনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করতে বাধ্য হন।

এই বিশেষ সময়টিতে যখন তাঁর ১৬৫ তম জন্মদিনটি নানারূপে পালিত হয়ে চলেছে মাসব্যাপী, ঠিক একই মুহূর্তে বাংলা এবং বাঙালি জাতিসত্তা একাধিক কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি।

আবারও কি আমরা তাঁর সামনে নতজানু হয়ে বসব, তাঁর অঙ্গুলি কোন ভবিষ্যত নির্দেশ করে দেখার জন্য?

সুস্থ থাকুন। সচেতন থাকুন।
শুভেচ্ছা নিরন্তর।

0 comments:

0

প্রচ্ছদ নিবন্ধ - সব্যসাচী মজুমদার

Posted in






















এই জগতে, জগত বলতে যতদূর মানুষ আন্দাজ করতে পেরেছে যতটা পদার্থ আছে, তার থেকেও বেশি অপদার্থ রয়ে গেছে। এন্টিম্যাটারের কথা বলতে চাইছি। এই যা কিছু আমরা চোখে দেখি, তার অনেক অংশ শূন্য। নিরাকার, নির্বাঁধ, অসীম। তাকে আমরা শূন্য বলি। কিন্তু,‌শূন্য মানে কি ? এর উত্তর দেওয়ার অধিকারী কি আমি ? তবুও মনে প্রশ্ন জাগে। সেই প্রশ্নের কারণে ভাবতে ইচ্ছে করে। এরকম একটা ভাবনা থেকে মনে হচ্ছিল শূন্য তো আসলে নিরাকার, নির্জন,রিক্ত নয়। সে রীতিমতো একটা অস্তিত্ব। একটা অবস্থা। অংকের ক্ষেত্রে শূন্য তৈরি হয় অসংখ্য, অনিঃশেষ নেগেটিভ সংখ্যার সংকলনে। কেবল অশেষ সেই সংখ্যার কল্পনা। আমাদের সমকালীন গবেষণাগুলিও জানিয়ে দিয়েছে, যাকে এই মহাবিশ্বে আমরা শূন্য বলে মনে করি; গ্রহ থেকে আরেকটি গ্রহের মাঝখানের দূরত্ব কেই ধরা যাক না, যেখানে মাঝেমাঝে উল্কা, বিচ্ছিন্ন গ্রহাণু চলাচল করে, যেখানে বাতাস নেই কেবল আলো আছে — শূন্য বলে মনে করি। কিন্তু, তবুও সেখানে আলো আছে। মানে অসংখ্য কণা রয়েছে, যাদেরকে আমরা চোখে দেখতে পাই। কিন্তু, যেখানে আলোও নেই ! বিজ্ঞানী বলছেন সেখানে রয়েছে এন্টিম্যাটার। এবং এই জগতে ( যতটা অনুমান করা গেছে ) যতটা পদার্থ আছে, তার চেয়েও বেশি এন্টিম্যাটার আছে। এবং তারাই বজায় রেখেছে ক্রমবর্ধমান মহাবিশ্বের ভারসাম্য।


আমাদের অনুভব প্রধানত এই দৃশ্যমান বস্তু সমূহকে নির্ভর করেই আবর্তিত হয়। কবিই কেবল বলতে পারেন, ' শূন্যের ভেতর এত ঢেউ '। শূন্যের স্তর, শূন্যের বহুমাত্রিকতা, অনুপস্থিতির তীব্র অভিঘাত একমাত্র কবিই ( কবিতা যিনি লেখেন তিনিই কবি — এরকম ধারণায় আটকে থাকতে চাইছি না ) অনুভব করতে পারেন সম্ভবত। আর এই সূত্রে যদি আন্দ্রেই আর্সেনেভিচ তারকোভস্কি'র ছবির প্রসঙ্গ ওঠে, তবে, কথা আমাদের স্বীকার করে নেওয়ার পর্ব চুকে গিয়েছে যে তারকোভস্কি কবি। সিনেমার কবি। ক্যামেরায় কবিতা লিখেছেন। অনুভব করতে চেয়েছেন আমাদের চারপাশের দৃশ্য জগৎ - অদৃশ্য জগতের। অদৃশ্যের অন্তরালে থাকা আরেক সমান্তরাল দৃশ্যগুচ্ছকে। আমাদের দেখিয়েছেন তারকোভস্কি, আমাদের অনুভব করিয়েছেন তারকোভস্কি। মানুষের মুক্তি চেয়েছেন, ব্যক্তি মানুষকে নির্ণয় করতে চেয়ে পার্টির- রাষ্ট্রের বিরাগভাজন হয়েছেন, কিন্তু তার পরেও তারকোভস্কি তাঁর বেদনার দিকে, বিস্ময়ের দিকে, শূন্যতার দিকে যাত্রা অব্যহত রেখেছেন। ঠিক এ কারণেই আমার, একান্তই নিজের অনুভবে তারকোভস্কি'কে একজন বিশুদ্ধ কবি মনে হয়।


কেন বিশুদ্ধ কবি ?


সঙ্গত কারণেই এ প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। সেক্ষেত্রে একটি উত্তর নির্মাণের চেষ্টা করা যাক।
আমরা সকলেই জানি তারকোভস্কির সৃষ্টি সম্ভার ও স্বীকৃতি সম্পর্কে। ফলে সেসব তথ্য তুলে ধরে এই আলোচনাকে ভারাক্রান্ত করতে চাইছি না। বরং একবার জানা সত্ত্বেও মনে করে নিই কাকে বলে বিশুদ্ধ কবিতা। আলোচনায় সুবিধা হবে,




"message-free verse that is concerned with exploring the essential musical nature of the language rather than with conveying a narrative or having didactic purpose. The term has been associated particularly with the poems of Edgar Allan Poe. Pure poetry was also written by George Moore (who published An Anthology of Pure Poetry in 1924), "


এই কারণকে মনে রাখলে আমরা বিশুদ্ধ কবিতার কয়েকটি স্বভাবলক্ষণ পেতে পারি,


১.এ কবিতা কোনও বার্তা, উপদেশ,নির্দেশ,নির্ণয় কিছুই দিতে চায় না।


২.লিরিক্যালিটি থাকবে এবং অবশ্যই দৃশ্যের বর্ণনার সঙ্গে ওতোপ্রোতো জড়িয়ে থাকবে।


৩. ঘটনা বলতে,এমন ঘটমানতা যা তীব্রভাবে সম্ভাব্যকে আক্রমণ করে না।যা সম্ভাব্যের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে চায়।


৪. সাংগীতিক ধর্ম বজায় থাকতেও পারে।যদিও এই সাংগীতিক ধর্ম বিষয়ের সাপেক্ষে নির্মীত হয়।




তারকোভস্কি কোন উদ্দেশ্য পূরণের জন্য ছবি তৈরি করেছিলেন? কোন প্রোপাগান্ডা ছিল তাঁর ! আমরা জানি, মানুষের শিল্পী সত্তার সঙ্গে সবসময় পার্টি কালচারের বিরোধ ঘটেছে। ফ্যাসিস্টদের সঙ্গে ঘটেছে, কমিউনিস্টদের সঙ্গে ঘটেছে, লিবারালদের সঙ্গেও ঘটেছে। আমরা এও জানি, পার্টি কালচার বা প্রোপাগান্ডা একজন শিল্পীর বহুস্তরিক বিন্যাসকে বাধা দেয়। একজন মানুষ হিসেবে, মানুষের শিল্প হিসেবে বিকাশের ঘাটতি সঙ্গত কারণেই প্রোপাগান্ডার আইসোটোপ তৈরি করে। এ কথা আমরা জানি বলেই আমাদের মনে পড়ছে মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে সলঝেনেৎসিনিন পর্যায় এপিসোড। আমাদের এক‌ই সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ছে এই কথা যে, তারকোভস্কি 'ইডিয়ট' -এর চিত্রনাট্য করার পর সেটি নাকোচ করেছিল সর্বশক্তিমান রাষ্ট্র। যৌথ খামারের রাষ্ট্র রাশিয়া। এই প্রসঙ্গে একটা অদ্ভুত ধাঁধা তৈরি হয়। যদিও এই লেখার সঙ্গে ধাঁধাঁটির একটি সুদূরপ্রসারী সম্পর্ক রয়েছে।


কি সেই ধাঁধা ?


সাঁর্ত্র মনে করতেন ইতিহাসের চলন অনুভবের ক্ষেত্রে বার্গম্যান বা আন্তোনিওর থেকেও উৎকৃষ্ট তারকোভস্কি। সাঁর্ত্র স্টালিনের শাসন পদ্ধতির সমর্থক ছিলেন। সাঁর্ত্র অস্তিত্ববাদী। এই অস্তিত্ববাদের অন্যতম প্রবক্তা ডস্টয়ভস্কি। এবার তারকোভস্কি যখন ইডিয়ট অবলম্বনে সিনেমা করার কথা ভাবছেন, নাকোচ করছে রাষ্ট্র। যদিও সাঁর্ত্র তাঁর অবস্থান বদল করেছেন অনেকক্ষেত্রেই। তবে এ ক্ষেত্রে এই জটিল বিন্যাসটি আমাদের এই তথ্য দিচ্ছে, কোন‌ও নির্দিষ্ট মতামতকে প্রাধান্য দিয়ে বা নির্দিষ্টিকৃত করে বিষয়কে ব্যখ্যা করতে গেলে জটিলতা সৃষ্টি হবেই। যেমন এক্ষেত্রে হয়েছিল সাঁর্ত্রর। যদিও আমরা পরবর্তী সময়ে এই জটিলতাটি অনেকটা‌ই স্পষ্ট রূপ ধারণ করতে পেরেছিল।


যা হোক, মূল আলোচনায় ঢুকলে আমাদের যে সামনে যে নির্ণয়টি ফুটে উঠছে, তা হল, বিশুদ্ধ কবি হিসেবে তারকোভস্কিকে অনুমান। আমরা বিশুদ্ধ কবিতার যে লক্ষণ গুলিকে একবার দেখে নিয়েছি সেই অবস্থান থেকে যদি তারকোভস্কির সিনেমার দিকে তাকাই, তবে, ইভানস চাইল্ডহুড ( ১৯৬২ ) থেকে দ্য স্যাক্রিফাইস ( ১৯৮৬) পর্যন্ত প্রলম্বিত তারকোভস্কির সিনেমায় খুঁজে পাই এমন কিছু চিহ্ন ও চিন্তা ও চিন্তার বিনির্মাণ, আমাদের প্ররোচিত করে বাস্তবতার সমান্তরাল আরেকটি জায়মান মনোজগতের নির্মাণে। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ছে শ্রীসঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের একটি চমৎকার মন্তব্য,
"যদিও বোদল্যেরের সেই সমুদ্রবিহঙ্গ আলবাট্রসের মতোই তারকোভস্কি নিজেকে 'সমাজতান্ত্রিক' ব্যবস্থায় নির্যাতিত, রুদ্ধগতি ও অসহায় ভাবেন, কিন্তু একই সঙ্গে কখনওই মনে করেন না যে, শিল্পীর সঙ্গে সমাজের বিচ্ছেদ সম্পূর্ণ ও চূড়ান্ত। এক নিবিড় ইতিবচন থেকে তিনি মনে করেন, সিনেমায় যত প্রকট বাস্তবের অন্তর্গত থেকেই অনাহত বাস্তব তাঁকে রচনা করতে হবে।" ( সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়, তারকোভস্কির ডায়েরি : অনশ্বর রোজ নামচা )


সময় পর্বে তারকোভস্কি সক্রিয় ছিলেন আন্তর্জাতিক রাজনীতির মনোভাবের ক্ষেত্রে ভীষণ জরুরি ছিল সময়টি। কেন ? যে সময় তাঁর কাজের সূচনা, কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব তার সোনালী অতীত অতিক্রম করেছে। কিছু মিথ, কিছু রূপকথা, অনেকটা রিয়েলিটির দ্বন্দ্ব তখন অবশিষ্ট। ক্রমশ লিবারেলদের সামনে প্রচ্ছন্ন হতে শুরু করেছে। আর যখন শেষ করছেন তারকোভস্কি, তার তিন বছর পর ঘটবে চেচেস্কুর বক্তৃতা পর্ব। আসতে চলেছে বিখ্যাত নব্বই দশক। অর্থাৎ প্রার্থিত যৌথ খামারের অবলুপ্তি আপাতত ঘটতে চলেছে তারকোভস্কি জেনে গেছিলেন কেবল তো নয়, তাঁর জীবনের বিশ্বাস, চিন্তা এবং অবস্থানের‌ও একটি বিবর্তন ঘটে গেছে। তা কেবল স্বপ্ন বয়নের বিবর্তন নয়, স্বপ্ন ভঙ্গের‌ও।


আমরা তো এটুকু সকলেই বুঝতে পারি তারকোভস্কি যেমন সামাজিক মানুষের জন্য আশা খুঁজতে চেয়েছিলেন, তেমন‌ই চেয়েছিলেন ব্যক্তি মানুষের মুক্তি। এই মুক্তি কামনাকে যদি অস্তিত্ববাদ বলে মনে করি কিংবা তরজমায় নির্ভর না করে যদি সরাসরি এক্সিসটেনসিয়ালিজম বলে ভাবতে চাই, তবে কমিউনিস্ট পার্টি সরাসরি তত্ত্বটিকে নাকোচ করেছিল। এমনকি বুর্জোয়াদের শেষ চেষ্টা গোছের তকমা লাগিয়ে দিয়েওছিল। ( একটি সূত্র আবার মনে পড়ছে এই প্রসঙ্গে, অর্থাৎ কমিউনিস্ট পার্টি সাঁর্ত্রকে নাকোচ করছে। অথচ সাঁর্ত্র ছিলেন অন্যতম মার্ক্স ব্যখ্যাকার )। প্রসঙ্গে ফিরলে দেখা যাচ্ছে, তারকোভস্কির এই ব্যক্তি মানুষের আত্ম উন্মোচনের কাঙ্খার সঙ্গে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত, পলিটব্যুরো নিয়ন্ত্রিত একটি ব্যবস্থার সংঘাত তৈরি হবে এতো বলাই বাহুল্য। ওয়াল্টার হুইটম্যান কথিত 'I contain multitude ' যেন অনেকাংশে, অনেক স্তরন্যাসে ধরা পড়ে তারকোভস্কির ছবিতে। ছবির বয়ানে।


রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্ব পালন করা ছাড়াও ব্যক্তি মানুষের আত্ম সন্ধানের, আত্ম নিমগ্নতার অধিকার আছে, এই ধারণা তো আমলা তান্ত্রিক ব্যবস্থার পক্ষে বিরক্তির, অস্বস্তির, বিবমিষার কারণ হয়ে উঠবে— স্বাভাবিক। তারকোভস্কি আপোস করেননি। নিজের কথা বলেছেন। তাঁর প্রত্যেকটি লং শট যেন সে কথা বলতে চায়। এবং এই প্রসঙ্গে আমরা আবার এই আলোচনায় ফিরে আসতে পারি কেন তারকোভস্কি বিশুদ্ধ কবি?


প্রথমত তারকোভস্কির সিনেমা মানুষের পরিশুদ্ধি, মানুষের প্রসন্ন বোধ, মানুষের কবিত্বের প্রমা বহন করেছে মাত্র। এর চেয়ে বেশি কোন‌ও নির্দিষ্ট দার্শনিক বোধ কিংবা রাজনৈতিক চিন্তাকে অনুসরণ করেনি।


দ্বিতীয়ত তারকোভস্কির লং শট। একটা দৃশ্যকে অনেক্ষণ ধরে একটি অবস্থান থেকে বহু মাত্রায় ও বিনির্মাণে দেখে নেওয়ার আয়োজন যেন। প্রতিটি লং শট একটি কাব্যের একটি অংশকে পুনঃ পুনঃ পাঠের ও পুনরাবিস্কারের প্রক্রিয়া যেন। নাটকীয় মুহূর্ত গুলিও অবলীলায় অনুচ্চকিত হয়ে ওঠে গ্রন্থনা ও উপস্থাপনায়। তৈরি করে একটা অনিবার্য মূর্ছনার। আমাদের এখন‌ই মনে পড়ছে স্টকারে যেখানে 'জোন'-এর কাছে এসে রেল কোম্পানি থেকে চোরাই গাড়িটিকে ছেড়ে দিয়ে একলা হয়ে যাচ্ছে তিনজন। কুয়াশা ঘন জলাভূমির ভেতরে তিনটি ল্যাম্পপোস্ট। একটি গীতিকাব্য তৈরি করে মাত্র।


তৃতীয়ত তারকোভস্কির ছবিতে কেবল মানুষ নয়, অন্যান্য প্রাণী গুরুত্বপূর্ণ চিহ্ন হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন ঘোড়া, যেমন কুকুর। মাত্র কয়েকটা দৃশ্যেই মাত্র শহরকে দেখেছেন তারকোভস্কি। এবং যতবার দেখেছেন ততবার তাকে প্রেক্ষাপটের তুলনায় বিসদৃশ, কৃত্রিম করে দেখান‌ই যেন উদ্দেশ্য। মূলত মানুষের গড়ে তোলা শহর ব্যতিরেকে পরিবেশের সঙ্গে সম্পর্ক নির্মাণ করাও ছিল তারকোভস্কির অন্যতম উদ্দেশ্য। এই উদ্দেশ্যে তিনি সফল। এবং সফল বলেই তিনি অনেকটাই মেটাফিজিক্যাল বলেও মনে হয়।


এক্ষেত্রে আরেকটি কৌতুহলেও আক্রান্ত হতে হয় যে, কেন তথাকথিত পশুরা তাঁর শিল্পের অন্যতম চিহ্ন হয়ে উঠছে ? এ কারণেই বলে মনে হয়, তারকোভস্কি তাঁর পরিবেশের, অস্তিত্বের প্রতিটি অবস্থান, কৌণিক বিন্দু থেকে দেখতে চান তাঁর সঙ্গে অস্তিত্বের, জায়মানতার কি সম্পর্ক ? জানতে চেয়েছেন বলেই হয়তো দৃশ্যের প্রতিটি বিন্দু, প্রতিটি সরণ, প্রতিটি চলনকে অনুভব করতে, অনুবাদ করতে চেয়েছিলেন ক্যামেরায়। হয়তো চেয়েছিলেন স্বাধীন দৃশ্যের উদারতা।


এখন, সেই স্বাধীনতার ওপর, ব্যক্তি মুক্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ নামিয়ে এনেছিল রাষ্ট্র। অস্তিত্ববাদের বিকাশ মেনে নেয়নি — এই তথ্য আমরা ইতিপূর্বে এই আলোচনায় এনেছি। এখন এই প্রসঙ্গে আবার ফিরে আসতে চাই। কেননা, এই কথাটি নির্ণয় করা খুবই জরুরি যে, তবে কি তারকোভস্কির প্রসঙ্গের অন্তরালে এই কথাটি বলতে চাইছি যে, অস্তিত্ববাদের সপক্ষে ?


বলাটা অপরাধ নয় যদিও। তবুও, একথা তো ঠিক, যে, ব্যক্তি স্বাতন্ত্রের ধারণাটি এখন অনেকটাই প্রচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে। বরং তার বদলে এই তথ্য মানুষ জেনে নিয়েছে যে, তার সাফল্যের পেছনে, তার অস্তিত্বের বিকাশে সবচেয়ে বড় ভূমিকা নিয়েছে গোষ্ঠী চেতনা। অর্থাৎ একসঙ্গে ভাবার এবং ভাবানর ক্ষমতা। এবং আজকের মানুষের পক্ষে একা বেঁচে থাকাটা কার্যত অসম্ভব। এ কারণেই গোষ্ঠী নির্ভর জীবন ব্যক্তি স্বাতন্ত্রের ধারণাকে হয়তো খুব গুরুত্ব দিতে চায়নি। আমি নির্ণায়ক কেউ ন‌ই। অধিকারীও ন‌ই। তবে এক্ষেত্রে এই বিষয়টিই আমার কাছে বড় হয়ে উঠছে যে, কোন‌ও মতকে, মতের বিকাশকে, যতক্ষণ না পর্যন্ত সে মানুষের বেঁচে থাকার জন্য হানিকর হয়ে উঠছে, রাষ্ট তাকে বাধা দিলে সেটি বোধহয় রাষ্ট্রের পক্ষে ভাল বিজ্ঞাপন হয় না বা আদর্শ রাষ্ট্রের উদাহরণ‌ও হয় না।


কিন্তু, এই যে ব্যক্তি মুক্তির চিন্তাকে ধারণ করেছিলেন তারকোভস্কি, সেই কাঙ্খিত মুক্তি কি পেলেন তিনি? এই প্রশ্নের সমাধানের জন্য আমাদের দারস্থ হতে হয় তিনটি ছবির — ভয়েজ ইন টাইম ( ১৯৮২), স্টকার ( ১৯৮৩), দ্য স্যাক্রিফাইস ( ১৯৮৬)। মনে রাখতে হবে, এই সময়ের ইতালিতে কমিউনিস্ট পার্টির শাসন চলছে।


বিশেষ করে ক্যান্সার আক্রান্ত তারকোভস্কি যেভাবে স্যাক্রিফাইস শেষ করেছেন, পারমাণবিক বিপর্যয় থেকে মানুষকে বাঁচাতে শেষ পর্যন্ত যেভাবে নিজেকে এবং পরিবারকে ঈশ্বরের কাছে সমর্পণ করেন, তাতে এ ছবি কাব্য হয়ে ওঠে শেষ পর্যন্ত এবং তারকোভস্কি'কে পৌঁছে দেয় অনেকটাই মেটাফিজিক্যালিটির কাছাকাছি। তারকোভস্কির সিনেমা হয়ে ওঠে সামাজিক মানুষের পুনর্বিন্যাস। 'ইডিয়ট'কে কেন্দ্র করে যে অভিমান গড়ে উঠেছিল, তা অবস্থানেই যেন স্যাক্রিফাইস বুঝিয়ে দেয় রাষ্ট্রিয় দখলদারিত্বের সমান্তরালে একটি প্রত্যাহারের প্রবণতাও থেকে যায়। তাকে স্বীকার করতে হয়। তার ধারণাকে আত্তিকরণ। ন‌ইলে একটি রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত জড় মানচিত্রে পরিণত হয়। তাকে তখন নস্যাৎ করা সহজ। তারকোভস্কি রাষ্ট্রের স্থিতিস্থাপকতায় বিশ্বাস করেছিলেন।


মানুষের সিনেমার এক শীর্ষ বিন্দু তারকোভস্কি, মানবিক মহাকাব্যের একটি অধ্যায় তারকোভস্কি।

0 comments:

0

প্রবন্ধ - রাধাবল্লভ চক্রবর্ত্তী

Posted in









বাংলা ভাষার সর্বকালের অন্যতম প্রভাবশালী ও উল্লেখযোগ্য কবি হলেন শক্তি, শক্তি চট্টোপাধ্যায়। কথাটি নেহাতই গৌরবান্বিত করে দেখানোর জন্য নয়, বরং জীবনব্যাপী রচনায়, মূলত কবিতায় তাঁর যে প্রকাশ, ও তাঁর বক্তব্য এবং একইসাথে সেই বক্তব্যের প্রাসঙ্গিকতা ও প্রয়োজনীয়তা, তা-ই তাঁর কবিতাকে বাঁচিয়ে রেখেছে এবং বছরের পর বছর ধরে তাঁকে কবি হিসেবে বাঁচিয়ে রেখেছে ও জনপ্রিয় করে রেখেছে। শক্তি জীবদ্দশায় কবিতা লিখেছেন, অনুবাদ করেছেন এবং গদ্যও লিখেছেন বিস্তর। কিন্তু, তাঁর মূল প্রকাশের জায়গা মৌলিক কবিতা; যাঁকে তিনি ‘পদ্য’ বলেই ডেকেছেন সারাজীবন। কবিতাই হোক বা ‘পদ্য’, আমরা পাঠকরা কবিতা বলেই বলব, তার সংকলন নেহাত কম নয়, সংখ্যায় ৫১টি। যার মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং সার্থক কাব্যগ্রন্থ ‘ভাত নেই, পাথর রয়েছে’। ‘শ্রেষ্ঠ’ এবং একইসাথে এই যে ‘সার্থক’ কথা দুটি ব্যবহার করা হল, তার ভিত্তি পেতে গেলে, আমাদের কাব্যগ্রন্থটির কবিতাগুলির প্রতি মনোনিবেশ করে যদি অনুসন্ধিৎসু পাঠ করা যায়, তাহলে একটি ধারণা ও শব্দদুটি ব্যবহারের উদ্দেশ্য সম্পর্কে অবগত হওয়া যাবে।

এবার এইসব ক্লান্তিকর কথা ছেড়ে কবির কবিতা ও তার বিশ্লেষণের দিকেই নজর দেওয়া যাক বরং –

কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতাটিই যদি ধরা যায়, যার নামেই কাব্যগ্রন্থটি, তাহলেই আমরা দেখতে পাবো যে, এটি একটি বিবৃতি এবং একইসাথে ঘোষণাও। এই যে সাধারণ ইপ্সিত ও নিত্য প্রয়োজনীয় কিছুর অতিক্রমণ এবং তার বদলে পাওয়া যাচ্ছে এমন কিছু, যা ধারণাতীত, তার একটি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত উভয় বিশেষ্য ‘ভাত’ ও ‘পাথর’-এর ক্ষেত্রে আমরা কিন্তু পাচ্ছি। বলে রাখা দরকার, এর মধ্যে শ্লেষ বিষয়টির আগে রয়েছে মূলত বৈপরীত্য। কীভাবে? খানিক আলোচনা করে বোঝার চেষ্টা করা যাক – আমাদের এই দেশ, এই বঙ্গভূমি উভয়ই কৃষিপ্রধান, কিন্তু কখনও মনুষ্য দ্বারা সৃষ্ট অসমতার কারণে (এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে চার্চিলের শয়তানি ও বর্বরতার কারণে বাংলার যে দুর্ভিক্ষ, হাহাকার অর্থাৎ, মন্বন্তর হয়েছিল, তা আমরা সবাই কমবেশি জানি।), অন্যদিকে, এই বাংলা ভৌগোলিকভাবে এমন একটি স্থানে রয়েছে, যেখানে বন্যা, ঘূর্ণিঝড় দ্বারা বিধ্বস্ত হওয়া অনিবার্য এবং তা হয়ও। ফলে, এই বৈপরীত্য, অর্থাৎ, কৃষিপ্রধান, সুজলাসুফলা ভূমি হলেও মানুষের দু’মুঠো অন্নের খোঁজ চলে, যা আসলে এক নির্ধারিত জীবনসংগ্রামে পরিণত হয়েছে।

উপরোক্ত প্রসঙ্গে আরও দুটি বিষয় চিন্তার জানালায় উঁকি দিচ্ছে। প্রথমত, আমাদের মাথায় রাখতে হবে যে, এই রাজ্যের ১৯৬৬-র খাদ্য আন্দোলন এবং তার পূর্ববর্তী ও পরবর্তী অধ্যায়, যা এক সুগভীর প্রভাব ফেলেছিল বঙ্গের যাবতীয় বাস্তবতায়। দ্বিতীয়ত, যদিও এটি কতটা ফ্যাক্ট হিসেবে সলিড তা বলা যায় না, হয়তো সম্পূর্ণটি একটি অপসারী চিন্তন বা ভাবনা, তা সত্বেও বলা বা নেহাত প্রকাশ করা, তা হল – কোথাও গিয়ে যেন এই ‘ভাত’ ও ‘পাথর’-এর অবতারণা কেবলমাত্র ক্ষুধার নিমিত্তে নয়, বরং একটি প্রজন্মের নতুন আশা, উদ্দীপনা এবং ইংরেজি শব্দ hunger এর বাংলা প্রতিশব্দ যে ‘ক্ষুধা’, তা-ই। যে hunger শব্দটি থেকে hungry কথাটা এসেছে – শব্দটি একটি adjective বা বিশেষণ যা কিনা noun বা বিশেষ্য পদ এই কবিকে হতে পারে, দেশ-কাল-সমাজের কোনও পরিস্থিতিকে বা একটি নবীন, উঠতি, প্রাণোচ্ছ্বলময় প্রজন্মকে বোঝাতে পারে, অর্থাৎ কিনা সেই ছকভাঙা ‘হাংরি জেনারেশন’-কে হতে পারে – যার চিরতরতাজা, উৎফুল্লিত কিন্তু জাগতিক বিষাদে চুর অথচ নতুন দিশা খুঁজে এনে দিতে সদা বদ্ধপরিকর অগ্নিস্ফুলিঙ্গ এবং বহ্নিপতঙ্গ সেই ‘স্ফুলিঙ্গ সমাদ্দার’, অর্থাৎ কিনা ‘হেতোলবেতোল’ অন্ধকারে ঘুরে বেড়ানো শক্তি চট্টোপাধ্যায় নিজেই। কিন্তু এসবের মাঝে মূল কথা, বাস্তবিক রূঢ়তা এবং তার সাঙ্কেতিক বর্ণনা এবং এসবের মাঝে নিজের বা নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য যে জীবনসংগ্রাম এবং প্রাণশক্তির একপ্রকার সংরক্ষণ, ব্যবহার এবং উপযোগিতার সার্থকতা, এবং হাতে হাত মিলিয়ে এসবের সাথে বা বলা ভালো মধ্যবর্তী ব্যাপক দর্শন, তা কিন্তু কোথাও লোপ পাচ্ছে না। তা আছেই; তা রয়েছে এই বইয়ের প্রায় প্রতিটি কবিতায় প্রায় সার্থকভাবেই। উদাহরণ হিসেবে বলতে গেলে প্রথমেই এই বইয়ের দ্বিতীয় কবিতা, যা কিনা মুখে-বুকে-ফেসবুকে সবেতেই প্রায় কিংবদন্তী হয়ে রয়েছে, সেই ‘ছেলেটা’ কবিতাকে বলতে পারি। এখানেও একজন, সেটি সমাজের প্রৌঢ় হতে পারে বা বৃদ্ধ, সহজ কথায় যে কিনা আগের প্রজন্ম, সেক্ষেত্রে কবি স্বয়ংও যদি হন তাতেও বিরাট একটা আপত্তির কিছু থাকে না বলাই যায়; বলছেন: ‘ছেলেটা খুব ভুল করেছে শক্ত পাথর ভেঙে/ মানুষ ছিলো নরম, কেটে, ছড়িয়ে দিলে পারতো।/ অন্ধ ছেলে, বন্ধ ছেলে, জীবন আছে জানলায়!/ - পাথর কেটে পথ বানানো, তাই হয়েছে ব্যর্থ।’ বা, মাত্র ১০ লাইনের ক্ষুদ্র, স্বল্পায়তন কিন্তু চূড়ান্ত তীব্র ও শ্লেষাত্মক উক্ত কবিতার প্রথম লাইনের ৬ নং লাইনে গিয়ে পুনরাবৃত্তি করা বা শেষের সেই মোক্ষম লাইন ‘মানুষ বড় শস্তা, কেটে, ছড়িয়ে দিলে পারতো’ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে সম্ভবত যে কয়েকটি কথা উঠে আসে, সেগুলি খানিকটা এরকম – উচিত-অনুচিত কর্ম এবং ইংরেজি একটি ইডিওমেটিক ফ্রেজ ‘need of the hour’ – উচিত-অনুচিত বা need of the hour কোন প্রসঙ্গে বা কীসের ভিত্তিতে? এই যে সময়, যখন ‘পাথর কেটে’ সভ্যতার আলো পৌঁছে দেওয়া ও গতিপথ বিস্তৃত করা বা যাত্রা অব্যাহত ও অক্ষুণ্ণ রাখার বদলে বিবর্তিত হয়ে সবচেয়ে উন্নত ও প্রগতিশীল প্রাণী হিসেবে পরিগণিত মানুষকে ‘কেটে ছড়িয়ে’ দেওয়া উচিত ছিল, অন্ততপক্ষে তা করতে ‘পারতো’ বা চেষ্টাটুকু করতে ‘পারতো’, সেক্ষেত্রে ছেলেটি যে সঠিক কাজটি করেনি, তা-ই বলছে ব্যাক্তিটি। কী করা উচিত ছিল, কী করা উচিত ছিল না এবং কী করা হয়েছে। এই। মাথায় রাখতে হবে, এই কবিতায় আসা পুনরাবৃত্তিগুলি কবিতার লাইন হিসেবে বিবেচিত ও পঠিতই হোক বা বক্তব্যই হোক, তাকে কেবল reinforce-ই করছে না, বরং intensify করে তুলছে, স্বভাবে blazing ও fierce করে তুলছে এবং সর্বাপেক্ষা যে দিকটি ফুটিয়ে তুলছে, যাকে এড়িয়ে গেলে বা উপেক্ষা করলে আসল মেজাজটাকেই অধরা রেখে দেওয়া হয়, সেটি হল বর্তমান সমাজ, জীবনের ভয়াবহতা, অপরাধপ্রবণতা, হিংসাত্মক কার্যের মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকা। এ যেন পরম কবি জীবনানন্দের সেই অক্ষয় শব্দবন্ধগুলিকে মনে করায় – ‘যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই-প্রীতি নেই-করুণার আলোড়ন নেই’। এই যে পরিবর্তন, এই যে বিবর্তন, যার মধ্য দিয়ে সমাজ এবং তার মধ্য দিয়ে আমরা এগিয়ে চলেছি, তাতে মানবিক মহৎ গুণগুলি বিলুপ্ত হচ্ছে বা বলা ভালো অনেক অনেক এমন গুণ লুপ্ত ইতোমধ্যেই হয়েছে, ফলে, জীবনানন্দের কথা ধরেই পুনরায় বলতে হয় – ‘অদ্ভুত আঁধার এক’ আমাদের এই গ্রহকে ঘিরে ফেলে ফেলে ‘অন্ধ’ করে দিয়েছে তার প্রাণীদের, মূলত আমাদেরই। ফলে, কোনও পথের হদিশ আমরা আর জানতে পারি না, বরং তা ‘পথই জানে’ আর মত্ত যারা, তারা নানান মতের কথা বললেও, বক্তা জানেন, এই মুহূর্তে, এই সময়ে হিংসাই মূল কাজ, মূল ধর্ম, বা আরও স্পষ্ট করে বললে এটাই বলা যায় যে, হিংসার জগতে আশ্রয় পেতে যেন হিংসা প্রয়োজন। যেন এটা struggle for the existence ছাড়া অন্য কিছু নয়। এই কথার অন্য একটি দিক খুলে যায় ফলত। এই চেনা স্থান, চেনা মানুষের রক্তলোলুপ হয়ে ওঠার কারণে যে স্থিতাবস্থার মৃত্যু, তা মানুষের অজান্তেই ঘটে যায়, যা কবিকে দিয়ে উচ্চারণ করায় ‘মানুষ কীভাবে মৃত হয়ে আছে, নিজেও জানে না!’। কবির সত্ত্বা যা হওয়া উচিৎ,

তা-ই যেন কবি করে চলেছেন সম্পূর্ণ কাব্যগ্রন্থটি জুড়ে। তিনি যেন পৃথিবীর পথে, জীবনের পথে হেঁটে যেতে যেতে ক্রমশ এবং খুব দ্রুতভাবে বদলে যেতে থাকা এবং অচেনা হতে থাকা পৃথিবী, মানুষ এবং তার সাথে মনস্তত্ত্ব, ভূ-রাজনীতি এবং যাবতীয় অবস্থানকে দেখছেন। তবে শক্তির এই ব্যাখ্যান যে খুব তীব্র তা কিন্তু কখনওই নয়, বরং সাঙ্কেতিক, কথার ছলে এবং বড়ই সহজ ও স্বাভাবিক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পর্বে সমগ্র বিশ্বের যে মানবতার স্থায়ী অবনমন এবং ক্ষমতার চোখরাঙানি, তার মধ্যে বেঁচে থাকা, তার আভাস পাওয়া যাচ্ছে ‘পুড়ন্ত সিংহাসন’ কবিতায়। কী চমৎকারভাবে শেষ দুটি লাইনে উনি লিখেছেন ‘বছরে কয়েকবার, না জানি ভিক্ষে করে আনে!/ বিশ্বের জাঙ্গাল থেকে, পরমাণু জ্বালানি, বোধ করি?’ – অর্থাৎ, পৃথিবী এখন যেন মানবিক থেকে পারমাণবিক হয়ে উঠেছে। স্নিগ্ধ সবুজাভা থেকে এখন তেজস্ক্রিয়তার দিকে এগিয়ে যাওয়া এক পৃথিবী। এখানে ‘পরমাণু’ শব্দটি জ্বালানির কথা বললেও, আমাদের মনে কিন্তু পরমাণু শুনলে বা পড়লে তার যে শক্তি বিকিরণ ও ধ্বংসক্ষমতা, তা-ই মনে আসে। এখানে এই জ্বালানি যেন কোনওভাবেই শুধু নিজের দহনের দিকে ইঙ্গিত করছে না, বরং বাকি সবাইকে, সভ্যতাকে পুড়িয়ে দেওয়ার বার্তাও দিচ্ছে। এই পারমাণবিক জ্বালানির কারণে যে দূষণ, তা শুধু প্রাকৃতিক পরিবেশের ক্ষেত্রকেই নয়, বরং মানুষের অভ্যন্তরীণ পরিবেশকেও ভয়াবহভাবে দূষিত করেছে।

তবে, এই কাব্যগ্রন্থ নিয়ে কথা বলতে গেলে শুধু ঋণাত্মক দিকগুলো বলে চলে গেলেই হয় না, কেননা, শক্তি চিরকাল প্রেম, সবুজ, প্রাণের উদযাপনের কবি। আর তার যথার্থ ও যথেষ্ট প্রতিফলন এখানেও রয়েছে কিন্তু। সেক্ষেত্রে দুটি কাব্যধারা বয়ে যেতে দেখব এখানে। আমরা একে mental fluctuation বলেও বলতে পারি কি? একজায়গায় যেভাবে উনি বাধাহীনতাকে দেখাচ্ছেন, তেমনই, অন্য জায়গায় নিয়ন্ত্রণ, সঙ্কেত দেখতে পাবো পাঠক হিসেবে আমরা। শক্তির কবিতায় এই যে ভ্রমণ, এই যে স্বাদ তা তাঁর কবিতাকে অনন্যসাধারণ করে রাখে। তার কিছু উদাহরণ কবিতা থেকেই দেখা যাক বরং –

‘গাছের নিচে’ কবিতায় উনি এক মানুষের কথাই বলছেন, যে কিনা অপেক্ষায় থেকে নিজেই গাছ হয়ে উঠেছে তার মতন বৈশিষ্ট্য নিয়ে। শক্তি সার্থক কবির সাক্ষর রাখেন সেই attribution-এ – যেখানে গাছ এবং মানুষ উভয়কে একই আসনে বসিয়েও, মুহূর্তে আলাদা করে দিচ্ছেন আচ্ছন্ন করে দেওয়ার মতো শব্দজাদুতে।

‘গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছে গাছের মতন/ ফুল ফুটেছে সেই মানুষের বুকের ধারে/ পাতার শাখায় হারিয়ে গেছে মুখটি তাহার/ গাছের কাছে পারলে হারে…’

এরপর আরেকটু এগোলে আমরা ‘কথা বলছে না’ কবিতায় দেখতে পাবো কেমন যেন এক নিয়ন্ত্রিত ও অস্বাভাবিক পৃথিবীর চলন। কবিতাটি আমাদের জানাচ্ছে

‘কেউ কথা ছড়িয়ে বলছে না/ কেউ কথা ছাড়িয়ে বলছে না … / কেউ হেঁটে যাচ্ছে কোনোমতে/ দাঁড়িয়ে পড়েছে স্থির ছবি/ কেউ পথে সহজে চলছে না’ এবং কবিতাটি শেষ হচ্ছে এক জিজ্ঞাসা দিয়ে, বা কবিতাটির দিকে তাকালে বা কবিতাটির প্রেক্ষিত ও পরিবেশের দিকে তাকালে বুঝবো যে প্রশ্ন নয়, ওটাই উত্তর। লাইনটি হচ্ছে ‘মানুষের সত্যি কী হয়েছে?’।

এই লাইনটি পড়লেই আমরা বুঝব যে এ তো বোধহয় আমাদের সবার জিজ্ঞাস্য, আমাদের সবার জানতে চাওয়ার ইচ্ছে এই প্রশ্নের উত্তর। এবং সবাই একমত হব যে মানুষের সত্যিই কিছু হয়েছে, ফলে, আমাদের এই জীবনের বিপরীত চলা ও বিপরীত অবস্থা। যা কিছু সহজ, তা-ই কঠিন, যা কিছু সুন্দর, তারই বিচ্ছিন্নতা এই জীবন থেকে; যার ফলে কবির কাব্যস্বত্ত্বা লিখিয়ে দেয় কবিকে দিয়ে এমন লাইন – ‘- সততা ও সুন্দরের বড়ো কষ্ট! বড়ো অধীনতা!’। সুন্দরের খোঁজ এবং কখনও পেলেও, তার কষ্টময় চেহারা কবিকে আজীবন ব্যথা দিয়েছে। এখানেও তার ইঙ্গিত স্পষ্ট। এই ক্ষয় কবি যেমন বাইরের দিকে তাকিয়ে দেখতে পান, ঠিক তেমনভাবেই নিজের মধ্যেও তার উপলব্ধি করতে পারেন। তিনি নিজেই নিজের কাছে সুন্দর হয়ে ওঠেন। এটিকে আমরা self-love বা self-conciousness বা self-determination বলে ভাবতে চাইলে ভাবাই যায় একপ্রকার। উনি সুন্দরের খোঁজে বেরিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েন আবার, সেটাও আবার কার মতো? সেই সুন্দরের মতই। এ এক অপূর্ব ব্যঞ্জনা এবং বর্ণনা, যা শক্তির জাদুতে মনোমুগ্ধকর হয়ে উঠেছে। ‘শুধু তাকে পেলে’ নাম্নী কবিতায় তার স্পষ্টতা পাওয়া যাচ্ছে।

‘সুন্দর যেমন ক্লান্ত, আমি তার মতো হই রোজ/ কলকাতার পথে ঘুরে/ অবিমৃশ্যকারী শুধু মেঘ, …’ বা ‘অভিমান শব্দভার আর দূর গন্ধের কুন্তলে/ আপাদমস্তক ডুব্‌/ ডুবে যাওয়া/ শুধু তাকে পেলে/ কলকাতা সমস্ত কিছু দেয়, তবু দেয় না সেকেলে/ বৃষ্টি!’

এই ক্ষয় বা কান্না স্থায়ী শক্তির মাঝে, শক্তির কবিতায়। অন্য একটি কবিতার উল্লেখও করা যাক – কবিতার নাম ‘জামা কতদিনে ছেঁড়ে’, সেখানে লিখছেন ‘মানুষ যখন কাঁদে, মানুষের সাধ্য কি, থামায়?/ নদীর নিকটে গিয়ে কাঁদে, কাঁদে পাথরের পাশে/ মাঠের ভিতরে গিয়ে কাঁদে একা, চোখ তুলে আকাশে - / সাধ্য কি, থামায় তাকে? একা কাঁদে, সংঘে কি কাঁদে না/ মানুষ যখন কাঁদে, মানুষের সাধ্য কি, থামায়?/ চোখ ফেটে রক্ত পড়ে, সে রক্ত উজ্জ্বল জামায়/ লেগে থাকে, বৃষ্টিজল ধুলো থেকে মুক্ত করে পাতা/ রক্তের উপরে তার জারিজুরি খাটে না কিছুই/ জামায় রক্তের দাগ পিছু-ফেরা বিপ্লবের মতো/ থাকে, জামা কতদিনে ছেঁড়ে?’

এই কান্নার মাঝে আশ্রয় খোঁজা এবং তার সাথে কান্নার আঁচড় থেকে অন্তরাত্মাকে বা অন্তরতর প্রিয় মানুষকে বাঁচানোর চেষ্টা বা বাঁচিয়ে রাখা, এই তো ধর্ম হওয়া উচিত মানুষের, একজন প্রেমিকের। যা আজীবন পালন করে গেছেন শক্তি। তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘ইচ্ছে করে’ কবিতা তো তারই উদ্‌যাপন করেছে।

‘ইচ্ছে করে বাঁচাই এবং বাঁচি/ গৌরীবরণ চারদিকে মৌমাছির/ মধ্যে তাকে বাঁচাই এবং বাঁচি/ ইচ্ছে করে সারা জীবন কাছে/ রাখতে তাকে, বড়ো যে সাধ আছে/ ভালোবাসার পুঞ্জিত মৌমাছি/ ইচ্ছে করে তার মধু কালবিষে/ নষ্ট করি সাধ্য আমার কি সে/ স্বয়ংবরাসত্য না সন্ন্যাসী/ ইচ্ছে করে বাঁচাই এবং বাঁচি/ গৌরীবরণ চারদিকে মৌমাছির/ মধ্যে তাকে বাঁচাই এবং বাঁচি।’

এই হলেন কবি শক্তি, এই হলেন মানুষ শক্তি। যিনি ধ্বংসের মধ্যেও ভালবাসতে ভোলেন না। নিজের স্বাচ্ছন্দ্যটুকু খুঁজে নিয়ে ক্ষান্ত থাকেন না, বরং ‘গৌরীবরণ চারদিকে মৌমাছির’ হুল থেকে, তার কামড় থেকে অপরজনটিকেও বাঁচানোর ‘ইচ্ছে করে’ সৎভাবে। আবার এই কামড়, এই ভালবাসা, যন্ত্রণা যখন ভালোবাসার হয়ে ওঠে, তখন তিনি তাকে আজীবন কাছে রেখে পেতে চান, রেখে দিতে চান। কেননা, শক্তি যতখানি কবিতার সাধক, তার চেয়েও বেশি ভালোবাসার কাঙাল। তবু জীবন কি আর পূর্ণ করে দেয়? অসম্পূর্ণতা, না-পাওয়া থাকেই। ফলে, কবির ‘ইচ্ছে করে’ এসবের, কিন্তু সেটা বাস্তবায়িত না-হয়েই থেকে যায়। তাই কবি লিখছেন – ‘রাখতে তাকে, বড়ো যে সাধ আছে’। অর্থাৎ, ‘সাধ আছে’, কিন্তু সাধ্য বা সে উপায় নেই। এই আশা, ইচ্ছে এবং একইসাথে আশাভঙ্গ হওয়াকেও কবি যেভাবে সমাদরে অভ্যর্থনা জানান ও স্থায়ী আসন দেন, তা শিক্ষণীয়, তা প্রশংসনীয়ও।

আরও অসংখ্য এমন মণিমানিক্য দিয়ে খচিত এই কাব্যগ্রন্থ। মানুষ এবং তার পারিপার্শ্বিকের বিধৃতি এবং তার মধ্য দিয়ে আত্মবিশ্লেষণের কারণে বইটিকে বলতে পারা যায় যে it’s a gem – এখানে প্রায় প্রতিটি মানবিক গুণের অস্তিত্ব স্বীকার করা হয়েছে। এখানে যেমন ক্ষুধা আছে, সহনীয়তার বার্তা আছে, পরিশ্রম আছে, পরিচিত পরিবেশের সাথে অপরিচিত হয়ে ভয়ের বাতাবরণ সৃষ্টি আছে, তেমনই মহত্ত্ব ও উদারতার দ্বারা এইসবকিছুকে replace করে আবার একটা স্বপ্নের জীবন, স্বপ্নের পৃথিবী তৈরি করা বা খুঁজে পাওয়া, যেখানে প্রেম থাকবে, ভালোবাসা থাকবে, হয়তো সেই ভালোবাসার ‘মধু কালবিষ’ থাকবে, কিন্তু কবি তা সয়ে নেবেন, মানুষ তা সয়ে নেবে, কেননা, ‘কত কী যে সয়ে যেতে হয় ভালোবাসা হলে’ তার ঠিক নেই। আর সবচেয়ে বড় কথা, মানুষ তা সয়ে নিতে চায়ও, মানুষ তা সয়ে নিতে পারেও।

0 comments:

0

ধারাবাহিক - নন্দিনী সেনগুপ্ত

Posted in




















২১

আগেই বলেছি যে ক্রিস্টিনা সুন্দরী। যদিও তার কিশোরীবেলায় এই সৌন্দর্য, লাবণ্য সেরকম প্রস্ফুটিত ছিল না। ভারিক্কি চওড়া গড়নের চেহারায়, মুখে সেরকম ছিরিছাঁদ না থাকলেও এক অদ্ভুত পবিত্রতা ছিল। এবং তার মুখের বিচিত্র অভিব্যক্তির মধ্যে সবচেয়ে প্রকট ছিল বিরস বিষণ্ণতা। সবার মাঝখানে তাকে সেভাবে কেউ লক্ষ্য করত না। স্কুলে পড়াশুনা ভাল শিখছিল না সে। অবশেষে আঠেরো বছর বয়সে তাকে সুইজারল্যান্ডে এক ফরাসি-মাধ্যম বোর্ডিং স্কুলে পাঠানো হয়। কিন্তু সেখানেও সে তার শিক্ষিকাদের সন্তুষ্ট করবার মত সেরকম কোনও কাজ করতে পারেনি।

তার একজন চিত্রশিল্পীর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছিল। যদিও বোর্ডিং থেকে বেরিয়ে বাইরের লোকজনের সঙ্গে দেখা করবার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ ছিল। কিন্তু সে কোনোদিন এসব নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা করেনি এবং সেসব নিয়ে কোনও লুকোছাপাও করেনি। অদ্ভুত নিরুত্তাপ ভাব দেখাত সে। যখন এসবের জন্য তাকে তিরস্কার করা হত, সে শান্ত হয়ে শুনত; কিন্তু কোনও কিছুই রেখাপাত করত বা তার মাথায় ঢুকেছে বলে মনে হত না। ব্যাপারটা শেষে এমন দাঁড়াত যে, তাকে যেরকম নির্দেশই দেওয়া হোক না কেন, সে কোনওকিছুকে সেরকম পাত্তা দিত না।

ক্রিস্টিনার কাণ্ডকারখানায় তার শিক্ষিকারা মাঝেমধ্যে দিশেহারা বোধ করতেন। প্রথমে তারা ভেবেছিলেন যে ক্রিস্টিনার সেরকম মেধা বা প্রতিভা নেই, তারা ভেবেছিলেন যে সে হয়ত বা ফরাসি ভাষা ঠিকভাবে বুঝতে পারছে না। ফলে তার ক্ষেত্রে শিক্ষিকারা একটু বিশেষ ধৈর্য দেখাতেন। কিন্তু ক্রমেই দেখা গেল যে ক্রিস্টিনার বুঝবার কোনও ইচ্ছেই নেই। তারা অনেকবার নানাভাবে তাকে সামনাসামনি বোঝাবার চেষ্টা করেছেন, সেরকম ফল হয়নি। বরঞ্চ ক্রিস্টিনা অবাক হয়ে উত্তর দিয়েছিল যে সে যথাসম্ভব চেষ্টা করছে যাতে তার কোনও ভুল না হয় এবং সে বুঝতেই পারছে না যে শিক্ষিকারা তার কাছ থেকে ঠিক কী চান। পরদিন বিকেলে বোর্ডিংএর সবাই মিলে একসঙ্গে হাঁটতে যাবার কথা ছিল। এদিকে যথাসময়ে দেখা গেল যে ক্রিস্টিনার কোনও চিহ্ন নেই।

ক্রিস্টিনার রুমমেট জানাল যে দুপুরের খাবার খেয়েই সে কোথায় বেরিয়ে গেছে কেউ জানে না। শিক্ষিকা প্রচণ্ড ক্ষেপে গিয়ে বললেন যে এই কারণে ক্রিস্টিনাকে শাস্তিভোগ করতে হবে। তাছাড়া ভবিষ্যতে এইভাবে যদি সে বেরিয়ে যায়, তাহলে যেন তার সহপাঠীরা অতি অবশ্যই সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষকদের জানায়।

সময়টা ছিল বসন্তকাল, মনোরম আবহাওয়া। সবাই মিলে হাঁটতে শুরু করল লেকের দিকে। জেটির কাছাকাছি গিয়ে সবার সঙ্গে দেখা হল ক্রিস্টিনার। এক যুবকের সঙ্গে সেখানে দাঁড়িয়ে আছে সে। প্রচণ্ড উল্লাসে হাসতে হাসতে চ্যাপ্টা নুড়ি কুড়িয়ে লেকের জলে ছুঁড়ে ছুঁড়ে দেখছে যে সেগুলো কতবার করে জলের তলের উপরে লাফিয়ে উঠছে।

বোর্ডিংএর অন্যান্য সহপাঠীদের দেখে এক মুহূর্তের জন্য অপ্রস্তুত হল সে। কিন্তু পরমুহূর্তে একটু দ্বিধা ও জড়তার সঙ্গে হাসিমুখে সে শিক্ষিকাকে অভিবাদন জানাল। যুবকটিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে শিক্ষিকা প্রচণ্ড ক্ষোভে কাঁপতে কাঁপতে তাকে নির্দেশ দিলেন যে সে যেন এখনি তার বোর্ডিংএর সহপাঠীদের সঙ্গে যোগ দেয় এবং বোর্ডিংএ ফিরে আসে। ক্রিস্টিনাকে দৃশ্যত বেশ বিরক্ত দেখাল। মাথা নেড়ে জানাল যে সে এখন তার বন্ধুর সঙ্গে চা খেতে যেতে চায়। শিক্ষিকা রাগে ফ্যাকাসে হয়ে বললেন যে সে যদি এখনই সবার সঙ্গে যোগ না দেয়, তাহলে তার বাবা মাকে চিঠি লিখে বোর্ডিং স্কুল থেকে বের করে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হবে। একথা শুনে ক্রিস্টিনা একটু কাঁধ ঝাঁকাল উদাসীন ভঙ্গিতে। যুবকের সঙ্গে করমর্দন করল এবং বোর্ডিংএর শিক্ষার্থীদের মিছিলের সারিতে যোগ দিল। ‘তোমাদের দূর থেকে দেখে মনে হচ্ছিল হাঁসের ঝাঁক!’ পাশে হাঁটতে থাকা মেয়েটিকে বলে উঠল ক্রিস্টিনা।

প্রধানা শিক্ষিকা চিন্তায় ছিলেন যে ক্রিস্টিনাকে সত্যিই বাড়িতে পাঠিয়ে দেবেন কিনা। কিন্তু যেহেতু সমস্ত শিক্ষিকা চেয়েছিলেন যে ক্রিস্টিনাকে শৃঙ্খলাভঙ্গের কারণে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া উচিত, সেহেতু প্রধানা শিক্ষিকা সবার বিরুদ্ধে দাঁড়ালেন। এমনকি তিনি ক্রিস্টিনার সমর্থনেই কথা বললেন।

তারপর থেকেই, ক্রিস্টিনাকে প্রধানা শিক্ষিকার প্রিয়পাত্রী হিসেবে গণ্য করা হয় বোর্ডিং স্কুলে। সন্ধেবেলায় প্রায়ই প্রধানা শিক্ষিকার ব্যক্তিগত ঘরে ডাক পড়ত তার এবং এই কারণেই অন্যান্য শিক্ষিকারা বেশ ঈর্ষামিশ্রিত ঘৃণার চোখে তাকে দেখতে শুরু করলেন। মেয়েটির শান্ত এবং উদাসীন হাবভাব তাদের ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দিল এবং ক্লাসে ক্রিস্টিনার পঠনপাঠনও সেভাবে তার মর্যাদা বৃদ্ধিতে সহায়ক হল না।

প্রধানা শিক্ষিকা ছিলেন একজন ভারি উৎসাহী মহিলা। অন্যান্য শিক্ষিকাদের সঙ্গে সময় কাটানোর চেয়েও তার বেশি পছন্দ ছিল ছাত্রীদের সঙ্গ। ছাত্রীদের কী ভাবে শিক্ষাদান করা উচিত, সেই বিষয়ে তার কিছু নিজস্ব মতামত ছিল, যেগুলোকে কোনওভাবেই কঠোর বলা চলে না। আবার বেশি স্নেহ দেখাতে গিয়ে যাতে বাচ্চারা একেবারে বয়ে না যায়, সেই ব্যাপারেও তার যথেষ্ট চিন্তাভাবনা ছিল।

অনেক ছাত্রী তাকে বেশ পছন্দ করত। তিনিও খুব আহ্লাদ দেখাতেন তাদের। সন্ধেবেলায় ছাত্রীরা তার ঘরে যেত। তিনি তাদের চা খাওয়াতেন। তারপর সবার মাথার চুলে বিলি কেটে হালকা আদরে শুভরাত্রি জানাতেন।

ক্রিস্টিনা কখনই প্রধানা শিক্ষিকার ঘনিষ্ঠ ছাত্রীদের বৃত্তের মধ্যে ছিল না। বরঞ্চ সে এমন ভাব করত যে তার মন পাওয়া মোটেই সহজ ব্যাপার নয়। প্রধানা শিক্ষিকা নিজেই উঠেপড়ে লাগলেন ক্রিস্টিনাকে বশ করবার জন্য। সে যদি সন্ধ্যায় কখনো প্রধানা শিক্ষিকার ঘরে যেত, সবার সঙ্গে নয়, একলা ডাকা হত তাকে। সেটা ছিল বিশেষ সম্মান। তিনি ক্রিস্টিনাকে সবই জানিয়েছিলেন যে অন্যান্য শিক্ষিকারা কতখানি ক্ষেপে রয়েছেন তার উপরে। তাদের অভিযোগ, ক্লাসে ক্রিস্টিনার পড়াশুনার অমনোযোগ, খারাপ ফল, সর্বোপরি বিরাট সন্দেহের প্রশ্নচিহ্ন যে হয়তো ক্রিস্টিনা লুকিয়ে সেই যুবকটির সঙ্গে এখনও দেখা করে, যাকে তারা সেদিন লেকের ধারে ক্রিস্টিনার সঙ্গে দেখেছিলেন। অবশ্য তিনি তারপর আশ্বস্ত করলেন… ‘কিন্তু তোমায় সেই কারণে ভীত হবার প্রয়োজন নেই। আমি বিষয়টা দেখছি, যাতে তোমার কোনও ক্ষতি না হয়!’

ক্রিস্টিনা ভাবলেশহীন, স্থাণু বসে রইল। আলগা একটা হাসি ঝুলে রইল ঠোঁটে। প্রধানা শিক্ষিকা এবার দ্বিধায় পড়লেন…

‘ক্রিস্টিনা, তোমার কিন্তু কিছুটা হলেও কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত আমার প্রতি।’ শিক্ষিকা হালকা ভাবে তার হাত স্পর্শ করলেন। ক্রিস্টিনা আদরের কাঙাল, সে মুখে কিছু না বললেও উঠে গিয়ে প্রধানা শিক্ষিকার পাশে ডিভানে বসে। মুখের অভিব্যক্তির অদ্ভুত শীতলতা অবশ্য মুছে যায় না। ফলে শিক্ষিকা বেশ বিভ্রান্ত বোধ করতে থাকেন।

পাঠক, আপনার মনে এই প্রশ্ন আসতে পারে যে তাহলে ক্রিস্টিনা কি আসলে কাউকেই খুব একটা পছন্দ করে না? তার রুমমেট ছিল এক অষ্টাদশী, ছোট্টখাট্ট চেহারার মেয়ে। চালচলন শিশুসুলভ, জাপানিদের মত দেখতে। প্রথম প্রথম সে ক্রিস্টিনাকে বেশ ভয় পেত, এড়িয়ে চলত। বেশির ভাগ সময়ে চুপচাপ থাকত, স্নানে যাবার সময়ে কিম্বা পোশাক বদলানোর সময়ে খুবই অস্বস্তিতে থাকত। ক্রিস্টিনা আবার এসব ব্যাপার একেবারে পাত্তা দিত না। তবে একদিন সে বলে উঠল… ‘জলি, তুমি আমার সামনেই পোশাক বদলাতে পারো, তোমাকে দেখতে আমার খুব ভাল লাগে।’

জলি লাগোয়া চানঘরের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল; সে কোনও উত্তর দিল না। কিন্তু লজ্জায় লাল হয়ে উঠল। ক্রিস্টিনা উল্টোদিকের দেওয়ালে টাঙানো আয়নায় দেখতে পেল জলির অস্বস্তি। এই অস্বস্তি ক্রমে এতটাই বেড়ে চলেছে যে এক ঘরে থাকাটাই একটা সমস্যা হয়ে উঠতে পারে। জলি সর্বত্র ক্রিস্টিনাকে এড়িয়ে চলতে লাগল। ক্লাসরুমে বসে সে নিজের পড়া সারতো, তারপর ঘরে ফিরে সন্ধ্যায় তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ে ঘুমের ভান করত, যাতে কোনওভাবেই ক্রিস্টিনার সঙ্গে তাকে কথা বলতে না হয়। ক্রিস্টিনা আবার রাত জাগত। বিছানার পাশের নাইটল্যাম্পের আলোয় পড়াশুনা করবার জন্য মধ্যরাত অবধি জেগে থাকত সে। জলি শুয়ে শুয়ে দূর থেকে ক্রিস্টিনার প্রতিটি গতিবিধি লক্ষ্য করত। আলো নেভানোর সঙ্গে সঙ্গে ক্রিস্টিনা ঘুমিয়ে পড়ত। জলি তখনো শুনতে পেত তার দীর্ঘ হয়ে যাওয়া নিয়মিত শ্বাসের শব্দ। একদিন ওইভাবেই জলি মটকা মেরে পড়েছিল। আধখোলা চোখে লক্ষ্য করছিল ক্রিস্টিনার গতিবিধি। হঠাৎ সে দেখল যে ক্রিস্টিনা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকে লক্ষ্য করছে। জলি তখন আবার তাড়াতাড়ি তার চোখ বুজে ফেলল এবং একদম নড়াচড়া বন্ধ করে দিল।

- ‘জলি’ ক্রিস্টিনা বলে ওঠে… ‘কেন আমার প্রতি তোমার এত ক্ষোভ? কেন তুমি আমায় সহ্য করতে পারো না?’ জলি চোখ খোলে কিন্তু সরাসরি তার দিকে তাকায় না। মুখ ফিরিয়ে রাখে অন্যদিকে। … ‘আমাকে দেখে তোমার অস্বস্তি হয়?’ ক্রিস্টিনা বলে যায়… ‘তুমি কি জানো যে আমাকে যদি কেউ অপছন্দ করে, তাহলে আমি তার সঙ্গে একত্র থাকতে পারি না?’

জলি তাকে সম্পূর্ণ অবাক করে দিয়ে উঠে দাঁড়ায় এবং বলে যে একথা সত্য নয় যে সে তাকে সহ্য করতে পারে না। তার কণ্ঠস্বর শান্ত, কিন্তু তার অস্বস্তি স্পষ্ট।

ক্রিস্টিনা হালকা সুরে বলে… ‘তাহলে ব্যাপারটা কি এমন যে তুমি আমায় ভালবাস?’ বলে সে অনেকটা সময় চুপ করে বসে থাকে। জলি কোনও উত্তর দেয় না।

‘এসো’… আবার ক্রিস্টিনা তার দিকে তাকায়… ‘আমরা পরস্পর একটু আলোচনা করে দেখি।’

জলি তাড়াতাড়ি এসে বাধ্য মেয়ের মত ক্রিস্টিনার খাটের কিনারায় বসে। ক্রিস্টিনা আবার তাকে প্রশ্ন করে… ‘তুমি কি আমায় ভালবাস?’ এবার জলি ইতিবাচকভাবে মাথা নাড়ে।

ক্রিস্টিনা তাকে হালকা হাতে স্পর্শ করে… ‘সেকথা তো আগেই বলতে পারতে!’



(চলবে)

0 comments:

0

ধারাবাহিক - শৌনক দত্ত

Posted in




















১৯. বিজন ঘরে বিজন ভট্টাচার্য





হৃদীবরেষু সুস্মি,

তোমার চিঠি পেলাম। আমার চিঠি এতদিনে তোমার কাছে পৌঁচ্ছালো নিশ্চয়। খোয়া গেলো নাকি? তবে কি দেরীতে পৌচ্ছাবে? বুঝতে পারছিনা। দিনগুলো সোনার খাঁচায় নেই কবেই ফ্যাকাসে হয়ে গেছে সব। গান ছেড়েছি সেই কবে এখন আর সুর নেই সব বেসুরা বাজে! এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেলো এইমাত্র। বাতাসে সোঁদা গন্ধ। আলো অস্পষ্ট ধোয়াশার মতন। পৃথিবী যেন এইমাত্র স্নান সেরে শুভ্রতাকে আলিঙ্গন করেছে। ভেজা চওড়া রাস্তা, ডান পাশের গলি, রায়বাড়ির বাগান থেকে ঝুঁকে আসা নারকেল গাছ, একটি ছাদের প্যারাপেটে একঝাঁক শালিক, কিছু ব্যস্ত মানুষ রিকশায়, স্কুলযাত্রী বাচ্চাছেলে। বারান্দার দরজা খুলে দাঁড়িয়েছিলাম অনেকক্ষণ। সন্ধ্যা নেমেছে আমার বিজন ঘরে গানটা তোমার খুব প্রিয় ছিল এটা জানার পরেই গানটা নিজে নিজে গলায় তুলে ছিলাম। প্রথম যেদিন তোমাকে গানটা শুনিয়ে ছিলাম সেদিন সন্ধ্যায় বৃষ্টিতে ভেসে যাচ্ছিল চরাচর। লোডসেডিং মোমবাতির আলোয় মুখোমুখি বসেছিলাম দুজন মনে পড়ে? এখন অবশ্য বিজন ঘরে গানটির চেয়েও বেশি মনে পড়ছে শম্ভু মিত্র, তৃপ্তি মিত্র, ঋত্বিক ঘটকদের মতন আরেক নাট্যব্যক্তিত্ব বিজন ভট্টাচর্যকে। বাঙালির অদ্ভুত এক ধরনের গ্রহণ-বর্জনের ছাঁকনি আছে। বিজন ভট্টাচার্য-কে আমরা সে রকমই আমাদের পরিচিত বা চর্চিত বৃত্তের বাইরেই সসম্মানে সরিয়ে রেখেছি। খেয়াল করে দেখবে বাংলা থিয়েটার নাটক নিয়ে যত কথা হয় তাঁর কর্মীদের নিয়ে যত আলোচনা সমালোচনা হয় সেখানে বিজন ভট্টাচার্য কেমন যেন আড়ালের মানুষ! বাংলা নাট্যান্দোলন নিয়ে কথা হলেও দেখি তাঁর সহকর্মীদের নাম যেভাবে উল্লাসে উচ্চারিত হয় বিজন ভট্টাচার্য নামটি সেভাবে উচ্চারিত হয়না, একুশ শতকে পৌঁছেও বিজন ভট্টাচার্যের নাট্যদর্শন এবং সমাজভাবনা নিয়ে আলোচনা করতে ‘ভয়’ পায় বাংলা মঞ্চ। অথচ বাংলা সাহিত্য ও নাটকের ইতিহাসে তাঁর পরিচয় শুধুই ‘নবান্ন’!

বিজন ভট্টাচার্য-এর মনস্তাত্ত্বিক গঠন বুঝতে হলে খানিক ইতিহাস ঘাঁটতে হবে, সেখানে দেখবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরুর সময় বিজন বাবুর বয়স সাত আট বছর। ১৯১৮ সালের ১১ নভেম্বর প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলো তখন তার যা বয়স তিনি বোঝেন সবই। এরই মধ্যে ঘটে গিয়েছে বলশেভিক বিপ্লব ও সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত রাশিয়ার আবির্ভাব। বদলে গিয়েছিল বিশ্বের মানচিত্র। এদেশে তখন স্বাধীনতা আন্দোলন গতি পেয়েছে গান্ধিজি্র নেতৃত্বে। ১৯২০ সালের ৩০ অক্টোবর-২ নভেম্বর মুম্বাইয়ের এম্পায়র থিয়েটারে সম্মেলনের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠা লাভ করে অল ইন্ডিয়া ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস (এআইটিইউসি)। ১৯২২ সালে গঠিত হয় বেঙ্গল ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন। ১৯২২ সালে যে ১০টি ইউনিয়ন নিয়ে বেঙ্গল ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন গঠিত হয়েছিল তার কোনোটাতে শ্রমিক সদস্য ছিল না। অর্থাৎ শ্রমিক আন্দোলন ছিল অশ্রমিক পেশাজীবীদের হাতে। ১৯২৩-২৪ সাল থেকে প্রচেষ্টা শুরু হলেও ১৯২৬-২৭ সাল থেকে কমিউনিস্টরা জোরেশোরে ট্রেড ইউনিয়ন পরিচালনায় অংশ গ্রহণ করতে থাকে। সংস্কারবাদী নেতৃত্বের পরিবর্তে শ্রমিকরা নিজেরাই ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনে কমিউনিস্ট নেতৃত্বকে সাদরে গ্রহণ করছিল। চটকল, সুতাকল, ম্যাচ, ট্রাম কর্পোরেশনের সাফাইকর্মীদের বিদ্যমান সংগঠনগুলোতে সহজেই নেতৃত্বে আসীন হয়ে যান কমিউনিস্ট ট্রেড ইউনিয়ন কর্মীরা। ১৯২৮-২৯ সালে বাংলা প্রদেশে শ্রমিক আন্দোলন তুঙ্গে উঠে। এইসব যখন ঘটছে তিনি তখনো কলকাতা আসেননি। ১৯৩০এ ১৫বছরের তরুণ বিজন চলে এলেন কলকাতায়, ভর্তি হলেন আশুতোষ কলেজে। ছাত্র অবস্থাতেই সক্রিয়ভাবে অংশ নিলেন স্বাধীনতা আন্দোলনে। ফলে অসম্পূর্ণ থেকে গেলো কলেজ শিক্ষা। আনন্দবাজার পত্রিকার প্রখ্যাত সাংবাদিক সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার ছিলেন বিজনের মামা। বিজন চাকরি পেলেন আনন্দবাজারে ১৯৩৮-৩৯এ। ছোট ফিচার লেখা দিয়ে শুরু হল তাঁর লেখক জীবন। বাংলায় কমিউনিস্ট পার্টির প্রভাব বাড়ছে যখন তখন ১৯৩৪ সালের ২৩ জুলাই ব্রিটিশ রাজ ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ১৯৩৫ সালের মার্চ মাসে কলকাতার ১৩টি কমিউনিস্ট মনোভাবাপন্ন গণসংগঠনকে নিষিদ্ধ করা হয়। নিষিদ্ধ পার্টির কাজ থেমে থাকেনা। দ্বিতীয় বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলনও গোপনে অনুষ্ঠিত হয় চন্দননগরে ১৯৩৮ সালের নভেম্বর মাসে। ৫০ জন প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। সম্পাদক নির্বাচিত হন নৃপেন চক্রবর্তী। অন্যান্য সদস্যরা ছিলেন মুজফ্ফর আহমেদ, আব্দুল হালিম, সোমনাথ লাহিড়ী, রণেন সেন, পাঁচুগোপাল ভাদুড়ী ও গোপেন চক্রবর্তী। ১৯৩৯ সালে পাঁচুগোপাল ভাদুড়ীকে সম্পাদকের দায়িত্ব দেয়া হয়। বিজন ভট্টাচার্য ১৯৪০এ মুজফ্ফর আহমেদের সান্নিধ্যে আসেন ও আকর্ষিত হন কম্যুনিস্ট পার্টির প্রতি। ১৯৪২ সালের ২৩ জুলাই ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি এবং গণসংগঠনসমূহের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়। বিজন ভট্টাচার্য কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ পেলেন ১৯৪২এ। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পর ১৯৪৩ সালের ১৮-২১ মার্চ বঙ্গীয় প্রাদেশিক কমিটির তৃতীয় সম্মেলন কলকাতার ওয়ালিংটন স্কোয়ারে অনুষ্ঠিত হয়। ভবানী সেন সম্মেলনে রাজনৈতিক-সাংগঠনিক রিপোর্ট উত্থাপন করেন। সম্পাদক নির্বাচিত হন ভবানী সেন। ১৯৪৪এ আনন্দবাজারের চাকুরি ছেড়ে হলেন কমিউনিস্ট পার্টির সর্বক্ষণের কর্মী বা হোলটাইমার।

এই দৃশ্যপট আত্মস্থ করলে বিজন ভট্টাচার্য ও তাঁর সৃষ্টিকে বুঝতে সহজ হয় কেননা তাঁর নাট্যচিন্তা ও সৃজনের মূল উৎস ছিল শোষিত-নিপীড়িত-বঞ্চিত মানুষের প্রতি গভীর সহানুভূতি ও সমাজ পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা। বুঝতে শেখার কাল থেকে তিনি বিপ্লবই দেখেছেন তাই হয়ত দিনবদলের স্বপ্নে ছিলেন বিভোর। নাটককে তাই কেবল একটা ‘পারফর্ম্যান্স’ হিসেবে দেখতেন না। সমাজ বদলের হাতিয়ার বলতে তিনি বিশ্বাস রেখেছিলেন শিল্পে। থিয়েটারকে তিনি মনে করতেন সাধারণ মানুষের কথন। যা কেবল সাধারণ মানুষের ভাল-মন্দ-দ্বিধা-দ্বন্দ্বের কথা বলবে না। নাটকের মধ্য দিয়ে মানুষও হয়ে উঠবেন সেই গল্পের এক-একজন কুশীলব। দর্শক এবং রঙ্গকর্মী সকলে একত্রে ঢুকে পড়বেন থিয়েটারের অঙ্গনে। তার পরে বিপ্লব ঘটে যাবে। জীবন, রাজনীতি এবং থিয়েটার নিয়ে এ ভাবেই মিলেমিশে ছিলেন বিজন ভট্টাচার্য কোনও একটি সত্তাকে বাদ দিয়ে তাঁর অন্য সত্তাকে বোঝা মুশকিল। যাপন-অর্থনীতি-রাজনীতি-পরব— সব নিয়ে মাখামাখি যিনি, তিনি নিজেই আসলে একটা থিয়েটার! মোনোলগ। আমাদের চোখে দেখা বামপন্থা রাজনীতির সাথে সেইসময়ের রাজনীতিকে মেলানো যাবেনা কিছুতেই আর তাই সেই সময়কালে উঁকি দিলে দেখা যাবে একদিকে বিশ্বযুদ্ধের সর্বগ্রাসী প্রভাব অন‍্যদিকে আভ‍্যন্তরীণ রাষ্ট্রবিপ্লব – এই দুয়ে মিলে বাঙালির সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবন নিদারুণভাবে বিপর্যস্ত করেছিল। অসহায় অগণিত ছিন্নমূল মানুষ পুরানো শিকড় ছেড়ে পাড়ি দিল আরো অন্ধকার অনিশ্চয়তার পথে। যুদ্ধ, মন্বন্তর, দাঙ্গা সমবায়ে দেশভাগ বাঙালির জীবন করাল বিপর্যয়, কুৎসিত বিভীষিকার সামনে দাঁড় করিয়ে দিল। ভৌগলিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনে সামাজিক পারিবারিক পরিবর্তনকেও ত্বরান্বিত করল। বাঙালি পরিবারের আদর্শের বদল ঘটল, একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে গেল, শ্রম ও বিত্তের ভিত্তিতে সমাজ গড়ে উঠল, মেয়েদের গৃহপালিত লজ্জা খসে গেল, সর্বোপরি বেদনা ও বঞ্চনা তাদের নিত‍্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়াল। স্বাভাবিকভাবেই এর প্রভাব পড়ল সংস্কৃতি জগতেও। ছায়াসুনিবিড় গ্রামের পটভূমি বদলে গেল শ্রী হীন কোলাহলময় শহরতলিতে, নাট‍্যকার‌ও অভিনিবেশ করলেন জীবনের রূঢ় সত‍্য প্রতিষ্ঠায়। এবং এর সঙ্গে নাট‍্যকার বিষয়ের গুরুত্বকে অতিক্রম করে আঙ্গিকের অভিনবত্বের ব‍্যাপারে ঝুঁকলেন। পরিচিত রূঢ় বাস্তব ভরা কাহিনি নয়, তার উপযুক্ত সাধারণের জন‍্য বাহুল‍্য বর্জিত বাস্তব মঞ্চ‌ই দর্শককে আকর্ষণ করবে — এই ভাবনা থেকেই নাটকগুলিতে দর্শকের সঙ্গে সমন্বয় করার প্রয়াস দেখা দিল। এবং এই ভাবনা থেকেই নাট‍্যসাহিত‍্যের ইতিহাসে গণনাট‍্যের জন্ম দিল। অর্থাৎ গণনাট‍্যের উদ্ভব ঘটল সমাজমানসের এক রাজনৈতিক ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক কার্যকারণে।

'গন্ধর্ব', বিজন ভট্টাচার্য বিশেষ সংখ্যায় কেমন করে নাট্যের অন্দরে প্রবেশ করলেন বিজন ভট্টাচার্য, সে হদিশ পাওয়া যায় তাঁর নিজস্ব বয়ানে— "১৯৩০ থেকে আমি কলকাতায়, তার আগে গ্রামে ছিলাম। অনেকদিন ছিলাম বসিরহাট সাতক্ষীরায়। সেইজন্য পূর্ব ও পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত আঞ্চলিক ভাষা আমার জানা ছিল। আমার ভীষণ ভালো লাগত ঐ গ্রামের মানুষদের সঙ্গে থাকতে, ওদের সঙ্গে মিশতে। আমি লক্ষ করেছিলাম ওদের রিএ্যাকশন কী হয়, ওরা কেমন করে কথা বলে। অসুখে কেমন করে কষ্ট পায়। এই মাটিটাকে খুব চিনতাম, ভাষাটাও জানতাম। আমাকে যা ভীষণভাবে কষ্ট দিত, কোন্‌ আর্টফর্মে আমি এদের উপস্থিত করতে পারব। তারাশঙ্কর বা শরৎ চাটুজ্জের মত আমার কলম ছিল না, কিন্তু আমি দেখতাম তাঁরা তো কিছুই করছেন না। আমার জ্বালা ধরতো কারণ আমি বরাবরই জাতীয় আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলাম, কখনো 'ফ্রিন্‌জ'-এ কখনো ভেতরে ছিলাম।" সময়কাল মাথায় রাখলে দেখা যায় সেইসময় বাংলা রঙ্গমঞ্চে পেশাদারি বাণিজ্যিক নাট্যশালায় চলেছে সমাজজীবনের বিপর্যয় থেকে উটপাখির মত মুখ লুকিয়ে গতানুগতিক ঐতিহাসিক, পৌরাণিক এবং উচ্চবিত্ত-মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের সমাজজীবনের রঙিন ছবিসর্বস্ব নাটকের রমরমা। আবেগসর্বস্ব জাতীয়তাবাদ, ব্যক্তিকেন্দ্রিক ভাবপ্রবণতা, দেবলীলার ভক্তিভাষ্য, ধর্ম ও দেশাভিমান এবং সস্তা সেন্টিমেন্টের তরল আবেগসর্বস্বতার সীমাবদ্ধ গণ্ডিতেই চলছিলো বাংলা নাটকের চর্বিতচর্বণ। বিজন ভট্টাচার্য যখন বাংলা মঞ্চে কাজ শুরু করেছেন সেই সময় বাংলাদেশের সামাজিক অবস্থার দিকে তাকালে দেখবে শতাব্দীর বীভৎসতম মন্বন্তরে মৃত্যু হচ্ছে লক্ষ লক্ষ মানুষের, শহর কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় 'ফ্যান দাও মা'-র মর্মভেদী চীৎকারে চরম বীভৎসার মুখোমুখি বাংলার মানুষ, শিল্পী সাহিত্যিকরাও দলমত নির্বিশেষে পথে নেমে পড়েছেন সেই দুঃসময়ের দিনে, 'আমাদের নবজীবনের গান'-এর স্রষ্টা কালজয়ী সঙ্গীতস্রষ্টা জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রর এক লেখায় পাই সেই সময়ের ছবি— "১৯৪৩ সাল, বাংলায় ১৩৫০। গোটা বাংলাদেশ জুড়ে বিশেষ করে শহর কলকাতায়, মহামন্বন্তরের করাল ছায়া চারদিক অন্ধকার করে দিল। আর ঘরে থাকা যাচ্ছিল না। জমাট সাহিত্যিক আড্ডা ও রিহার্সাল ছেড়ে আমরা সবাই রাস্তায় নেমে পড়লাম, চরম বিপর্যয় ও বীভৎস মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়ালাম।" এমন একটা চরম দুঃসময়ের দিনে কি অবস্থান ছিল বিজন ভট্টাচার্যের? জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রর মতে ভারতীয় ভাষায় গণ নাটকের প্রথম স্রষ্টার আর এক জীবনসংবেদী শিল্পী প্রবাদপ্রতিম চিত্রপরিচালক ঋত্বিক ঘটকের বয়ানে শোনা যাক সেই ভূমিকার কথা— "বিজনবাবুই প্রথম দেখালেন কি করে জনতার প্রতি দায়িত্বশীল হতে হয়, কি করে সম্মিলিত অভিনয়-ধারার প্রবর্তন করা যায় এবং কি করে বাস্তবের একটা অংশের অখণ্ডরূপ মঞ্চের উপর তুলে ধরা যায়। আমরা যারা এমন চেষ্টা করেছিলাম, সেসব দিনের কথা ভুলব না। হঠাৎ একটা প্রচণ্ড আলোড়ন বাংলার একপ্রান্ত থেকে আর এক প্রান্তকে বিদ্যুৎস্পৃষ্ঠবৎ শিহরিত করে তুলল।" ঋত্বিক ঘটক বর্ণিত সেই বিদ্যুৎশিখার নাম 'নবান্ন', যে নাটককে শম্ভু মিত্রও অভিহিত করেছেন 'এপিক নাটক' হিসাবে, শম্ভু মিত্র বলেছিলেন ‘নবান্ন’-র আগে অবধি আমাদের সব ট্র্যাজেডিই পারিবারিক ট্র্যাজেডি; ‘নবান্ন’ এল এপিকের ব্যপ্তি নিয়ে। কী বলতে চেয়েছিলেন শম্ভুবাবু? যাকে বলা যায় নাট্য সংহতি ও নাট্য প্রবহমানতা, তা পুরোপুরি অস্বীকৃত হয়েছিল প্রবল সাহসী এই নাটকে। এই নাট্য আধুনিকতার মূল ভাষ্যের প্রতি নজর রেখে মুহূর্তনির্ভর। দৃশ্যের পর দৃশ্য জুড়ে আছে কান্নার একটি অদৃশ্য সুতো দিয়ে। তাই শম্ভু মিত্র বলেন— ‘একটা দৃশ্যে কুঞ্জকে কুকুরে কামড়েছে। শোভা কুকুরকে লক্ষ্য করে ওয়াইল্ডলি শাউট করে তারপরই সফটলি বলে: জল খাবে? জল তেষ্টা পেয়েছে?’ মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য এই দৃশ্য দেখে বলেছিলেন, এটা শাশ্বত। এই মুহূর্তের জয় আধুনিকতার জরায়ুতে নিহিত। বোদলেয়ার, মার্ক্স ও নিৎসে-তে এই মুহূর্ত-বন্দনা ছত্রে-ছত্রে। বিজনবাবুর প্রথমাঙ্ক আর দ্বিতীয়াঙ্কের মধ্যে যাঁরা মিল খুঁজে পান না, অথবা শেষ অংশটিকে যাঁদের প্রক্ষিপ্ত মনে হয়, তাঁরা বুঝতেই পারেন না, যে তিনি আত্ম-আখ্যান রচনা করেননি, তাঁর মেধা নিবেদিত হয়েছে নাট্যসন্দর্ভ প্রণয়নে। এই সন্দর্ভধর্মিতা উনিশ শতকের শিল্পচর্চার একটি মূল অন্বিষ্ট। ‘নবান্ন’ একটি প্রকল্প, কিন্তু তা বাস্তবের অনুলিখন নয়। যে নাটকে আঁকা রয়েছে মানুষের আত্মিক অপমৃত্যু, মনুষ্যত্বের চরম লাঞ্ছনার মর্মস্পর্শী ছবি, নবান্ন নাটক রচনার তাগিদ ও মানসিকতা বোঝাতে গিয়ে বিজন বলেছেন—"সেই সময় ডি. এন. মিত্র স্কোয়ারের পাশ দিয়ে রোজ আপিস যাই। রোজই দেখি গ্রামের বুভুক্ষু মানুষের সংসারযাত্রা, নারী-পুরুষ-শিশুর সংসার। এক একদিন এক একটা মৃতদেহ নোংরা কাপড়ে ঢাকা। মৃতদেহগুলো যেন জীবিত মানুষের চেয়ে অনেক ছোট দেখায়। বয়স্ক কি শিশু, আলাদা করা যায় না, ... আপিস থেকে ফিরবার পথে রোজই ভাবি, এইসব নিয়ে কিছু লিখতে হবে। কিন্তু কীভাবে লিখব? ভয় করে গল্প লিখতে, সে বড় সেন্টিমেন্টাল প্যানপেনে হয়ে যাবে। "একদিন ফেরবার পথে কানে এলো, পার্কের রেলিঙের ধারে বসে এক পুরুষ আর এক নারী তাদের ছেড়ে আসা গ্রামের গল্প করছে, নবান্নের গল্প, পুজো-পার্বণের গল্প। ভাববার চেষ্টা করছে তাদের অবর্তমানে গ্রামে এখন কী হচ্ছে। আমি আমার ফর্ম পেয়ে গেলাম। নাটকে ওরা নিজেরাই নিজেদের কথা বলবে।"

'নবান্ন'র পর একের পর এক নাটক লিখেছেন বিজন ভট্টাচার্য। 'জীয়নকন্যা', 'গোত্রান্তর', 'দেবীগর্জন', 'মরাচাঁদ', 'কৃষ্ণপক্ষ', 'আজ বসন্ত', 'লাশ ঘুইর‍্যা যাউক', 'সোনার বাংলা', 'চুল্লী', 'হাঁসখালির হাঁস'। নাট্যদলও তৈরি করেছেন একের পর এক—ক্যালকাটা থিয়েটার গ্রুপ, কবচকুণ্ডল। দুঃখজনক হলেও সত্যি কি জানো বিশ শতকের বাংলা নাট্যকলার ইতিহাসে ট্র্যাজিক নায়কের প্রথমজন যদি হন শিশিরকুমার ভাদুড়ি, তা হলে ইতিহাসের ট্র্যাজিক নায়কের দ্বিতীয় দাবিদার সম্ভবত বিজন ভট্টাচার্য। তাঁর প্রথম পূর্ণাঙ্গ নাটক ‘নবান্ন’ (১৯৪৪) বাংলা নাটকের ইতিহাসকে নতুন করে লিখেছিল, অথচ এখন তাঁর নাটক কদাচিৎ অভিনীত হয়। শুধু তা-ই নয়, তাঁর নিজের দল ক্যালকাটা থিয়েটারের (১৯৫১) বাইরে, যাকে এখন গ্রুপ থিয়েটার বলা হয় তার সবচেয়ে সফল প্রযোজনাগুলির মধ্যে বিজন ভট্টাচার্য-এর কোনও নাটকের নাম করা যাবে না, এমনকী গণনাট্য সঙ্ঘও ‘নবান্ন’-র পরে তাঁর অন্য নাটক নিয়ে বেশি উৎসাহ দেখায়নি। এ বিষয়ে শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের প্রধান নাটককারদের মধ্যে বিজন ভট্টাচার্যই সম্ভবত সবচেয়ে অবহেলিত। তাঁর অনুজ নাটককারদের রচনা অন্য অনেক দল গ্রহণ করেছে— উৎপল দত্ত, বাদল সরকার, মনোজ মিত্র, মোহিত চট্টোপাধ্যায়— তাঁরা অন্য বহু দলকে নাটক-রসদ জুগিয়েছেন, এখনও তাঁদের নাটক অনেক দলের দ্বারা অভিনীত হতে দেখা যায়। অথচ যাঁর নাটক নিয়ে বাংলা নাটকের ইতিহাস পেশাদার রঙ্গমঞ্চ থেকে নিজেকে উপড়ে নিয়েছিল, এবং পেশাদার রঙ্গমঞ্চকে তার পরবর্তী নির্মাণের ক্ষেত্রে এক রকম অপ্রাসঙ্গিক করে তুলেছিল, সেই বিজন ভট্টাচার্যের পরেকার সৃষ্টিগুলি মূলত তাঁরই একার প্রযোজনা হয়ে রইল। তাও সবগুলি নয়, নিজের কয়েকটি নির্বাচিত নাটকই তিনি নিজে ক্যালকাটা থিয়েটারের এবং পরে কবচকুণ্ডলের (১৯৭০) হয়ে প্রযোজনা করে যেতে পেরেছিলেন। তারও মধ্যে একটি-দুটির বেশি একাধিক বার প্রযোজনা করতে পারেননি। একাধিক নাটক— যেমন ‘জননেতা’, ‘জতুগৃহ’, ‘অবরোধ’ তো প্রযোজিতই হয়নি। বিস্ময়ের কথা এই যে, নাকি বাংলা নাট্য-সংগঠনের ইতিহাসে এটা খুব বিস্ময়ের কথা নয়ও যে, কোনও এক বিচিত্র বিচ্ছেদ-রসায়নে তাঁর নিজের হাতে তৈরি নাট্যদল ক্যালকাটা থিয়েটারও তাঁকে ছাড়তে হয়।

আমার মনে বারবার ঘুরে ফিরে এসেছে একটি কথা বিজন ভট্টাচার্য ব্রাত্য কেন? তোমার কি মনে হয় বাঙালি বা বাংলা থিয়েটার তাকে ভাঁজ করে গুছিয়ে রাখে কেন? আমার কি মনে হয় জানো বিজন ভট্টাচার্যকে ধারণ করার মতন বীজতলা বাংলা থিয়েটারে নেই। রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত তাঁকে বলছেন ‘অযত্নে রুক্ষ প্রতিভাবৃক্ষ’। প্রথমে গণনাট্য সংঘ, পরে তাঁর নিজের গ্রুপ, ক্যালকাটা থিয়েটার এবং কবচ কুণ্ডল। প্রথমটাতে অধিক সন্ন্যাসীর গাজন, গ্রুপ দুটির ব্যাপারে বলা যায় একটি নাট্যদল গড়ে তোলা এবং সক্রিয়ভাবে টিকিয়ে রাখার সংগঠনক্ষমতা বা কৌশলের অভাব ছিল তাঁর চরিত্রে। তার থেকেই শৃঙ্খলাহীনতার জন্ম। সংগঠন এলোমেলো হলে সৃজনকর্মেও তার ছাপ পড়ে। তাই, যতই দুর্ভাগ্যজনক এবং ক্ষতিকর হোক না কেন, ঐ সময়ের নাট্যকর্মীদের ভাবনার জগতে বা মননে তেমন কোনও ছাপ ফেলতে পারল না বিজনবাবুর প্রযোজনা, একক অভিনয় প্রতিভায় যেমন পেরেছেন ‘মেঘে ঢাকা তারা’, ‘সুবর্ণলতা’ বা ‘পদাতিক’ ছবিতে, কিংবা উৎপল দত্তর ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ মঞ্চ-প্রযোজনায়।

যে সময়ে বিজন ভট্টাচার্য দেখতে বুঝতে শিখছেন সেই সময়ে কলকাতায় পেশাদারি থিয়েটার যথেষ্টই জনপ্রিয়। ক্লাসিক্যাল থিয়েটার কখনওই টানেনি তাঁকে। আকর্ষণ করেনি পেশাদার ব্যবসায়িক থিয়েটার। বিজন ভট্টাচার্যের বিষয় ভাবনার সঙ্গে মেলে না তাঁর প্রয়োগ ভাবনা। জীর্ণ পুরাতন মঞ্চ ব্যবস্থায় ব্যতিক্রমী নতুন চিন্তার নাটক! তাই হয়ত দল গোছাতে চাননি কখনো, অভিনয়কে, থিয়েটারকে বোধহয় খুব গোছালো ভাবে দেখতে চাননি বিজন ভট্টাচার্য বরং সংগ্রামের পথটাই ধরে রাখতে চেয়েছিলেন। নাট্যদল গড়ে তোলা এবং সক্রিয়ভাবে টিকিয়ে রাখার সংগঠনক্ষমতা বা কৌশলের অভাব ছিল তাঁর চরিত্রে। তার থেকেই শৃঙ্খলাহীনতার জন্ম। সংগঠন এলোমেলো হলে সৃজনকর্মেও তার ছাপ পড়ে। তাই, যতই দুর্ভাগ্যজনক এবং ক্ষতিকর হোক না কেন, ঐ সময়ের নাট্যকর্মীদের ভাবনার জগতে বা মননে তেমন কোনও ছাপ ফেলতে পারল না বিজন ভট্টাচার্য-র প্রযোজনা, একক অভিনয় প্রতিভায় যেমন পেরেছেন ‘মেঘে ঢাকা তারা’, ‘সুবর্ণলতা’ বা ‘পদাতিক’ ছবিতে, কিংবা উৎপল দত্তর ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ মঞ্চ-প্রযোজনায়। মনে রাখা প্রয়োজন তিনি বারবার বলেছেন, ওই ধরনের থিয়েটারের রীতি, শৈলী কোনও কিছুই তাঁকে আকর্ষণ করেনি। নাটক রচনার ক্ষেত্রেও নয়, পরিচালনার ক্ষেত্রেও নয়। বরং তাঁকে নাটক লিখতে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে রেশনের লাইন। যেখানে তিনি দেখেছেন, ধর্ম-জাতি-সামাজিক স্তরের বেড়া ভেঙে সকলে একত্রে দাঁড়িয়েছেন। যোগাযোগ তৈরি হয়েছে একের সঙ্গে অপরের। কথোপকথন হয়েছে। শুধু তাই নয়, এই লাইনেই তিনি দেখেছেন, সংকীর্ণ স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে প্রশাসন, জোতদারের বিরুদ্ধে শ্রেণিস্বার্থ না ভেবে একত্রে প্রতিবাদ করছে জনসাধারণ। ওই জনসাধারণের মধ্যেই কমিউনিস্ট আস্ফালন দেখেছিলেন। বিজন ভট্টাচার্য বাংলা নাটকের ইতিহাসে এক বিপ্লবী ব্যক্তিত্ব হলেও, মূলধারার আলোচনায় তিনি যে উপেক্ষিত তার কারণ খুঁজতে গিয়ে পাই তাঁর আপসহীন, বোহেমিয়ান ব্যক্তিত্ব এবং দলীয় রাজনীতির অনুগত না থাকা, গণনাট্য আন্দোলনের (IPTA) প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হয়েও তিনি বাণিজ্যিকীকরণের বিরোধিতা করেছিলেন, যার ফলে তৎকালীন রাজনৈতিক গোষ্ঠী ও মূলধারার সাংস্কৃতিক চর্চা থেকে তিনি দূরত্বে থেকে গিয়েছেন। তাঁর নাটকগুলো ছিল চরমভাবে সময়-নির্দিষ্ট (Period-specific)। প্রচারধর্মিতা এবং উচ্চকিত সাম্যবাদী আদর্শের প্রভাব ছিল স্পষ্ট। বর্তমানের দর্শকরা 'বক্তৃতা'ধর্মী বা 'আদর্শবাদী' নাটকের চেয়ে সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা বা পরাবাস্তববাদী (Surrealist) নাটক বেশি পছন্দ করে। কবি মণীন্দ্র রায় একবার বিজনবাবুকে এইসব নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন। উত্তরে তিনি বলেন “এ দেশে এসব প্রত্যাশা থাকলে কবিতা লেখা বা নাটক করা বন্ধ করে দেওয়াই ভাল। তোমার উপায় নেই তাই তুমি কবিতা লেখো, আমারও উপায় নেই বলে নাটক করি। ঋত্বিক যে সিনেমা করে তাও একই কারণে। অন্য কোন উপায় থাকলে করত না। আমরা তো আর কিছু করতে জানি না, তাই করে যেতে হবে। কিন্তু করতে গিয়ে তো আর অন্য দলে নাম লেখাতে পারব না, কারণ এই রাজনীতিটা আমার বিশ্বাসের জায়গা।”আরেকটি বড় কারণ হতে পারে নাটকগুলোর ভাষা বিজন ভট্টাচার্য তাঁর নাটকে খাঁটি গ্রামীণ এবং আঞ্চলিক উপভাষা ব্যবহার করতেন। বর্তমানের নগরায়ণের যুগে এবং ভাষার বিবর্তনের ফলে সেই আদিম ও প্রাকৃত ভাষা অনেক সময় আজকের দর্শকদের কাছে দুর্বোধ্য বা কৃত্রিম মনে হতে পারে। ভুলে গেলে চলবেনা মঞ্চের ভাষা আর কথ্য ভাষা নিয়ে দীর্ঘ দিন কাজ করেছেন বিজন। কাজে লেগেছিল ’৪২-’৪৩ সাল জুড়ে সমগ্র বাংলা প্রদেশ পরিক্রমা। বিজন ভট্টাচার্য গবেষক শমীক বন্দ্যোপাধ্যায় মনে করেন, ‘টুনে, মালো, বেদে শোলার কারিগর, প্রতিমাশিল্পী, সাপুড়ে, আউল-বাউল, জেলে, এমন নানা সম্প্রদায়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ মেলামেশার মধ্য দিয়ে বিজনবাবু তাদের লোকাচার, জীবনদর্শন, লোকশ্রুতি, সংস্কার ও বিশ্বাস, ভাষা, কথার টান ও সুর আত্মস্থ করেছেন। ওই অভিজ্ঞতা ও শিক্ষাই তাঁর নাটকের ভাষা ও চাল নির্ধারণ করেছে।’নিখুঁতভাবে খেয়াল করলে দেখবে অঞ্চল ভেদে ডায়লেক্টের তফাতকেই নাটকে বারবার ব্যবহার করার চেষ্টা করেছেন বিজন ভট্টাচার্য। আইপিটিএ ছাড়ার পরে নিজের দলেও সেই ডায়লেক্ট ভিত্তিক সংলাপের উপরেই জোর দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর দলের অভিনেতারা অনেকেই পরে বলেছেন, উচ্চারণ নিয়ে কী ভয়ংকর খুঁতখুঁতে ছিলেন তিনি! ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঠিক উচ্চারণের জন্য লড়াই করে যেতেন। ব্যক্তিজীবনও তাকে বিস্মৃতির দিকে ঠেলে দিয়েছিল, মহাশ্বেতা দেবীর সাথে দাম্পত্য বিচ্ছেদ এবং জীবনযুদ্ধে টিকে থাকার ব্যক্তিগত সংগ্রামও তো কম নয় তাঁর! বিজন ভট্টাচার্য শুধু গল্পকার, নাট্যকার, গীতিকবি বা অভিনেতা নন, শুধু ঋত্বিকের সমধর্মী এক শিল্পী নন, নিজ-অধিকারী এক চিন্তাবিদ।এত বিচিত্র সম্বল নিয়েও মানুষটি ইতিহাসের শিকার হয়ে গেলেন, এই যা দুঃখ। তবে আমার বারবার মনে হয় বিজন ভট্টাচার্যের নাটকের আর্তি ও হাহাকার আজও প্রাসঙ্গিক। ক্ষুধার জ্বালা বা ভিটেমাটি হারানোর যন্ত্রণা আজও পৃথিবীর বহু প্রান্তে সত্য। বিজন ভট্টাচার্যের আর্তিগুলোকে যদি প্রতীকী (Symbolic) বা এক্সপ্রেশনিস্টিক ঢঙে উপস্থাপন করা যায়, নাটকের ভাষাকে কেবল মেদিনীপুর বা গ্রামীণ উপভাষার শিকলে না বেঁধে, তার ভেতরের সার্বজনীন মানবিক আর্তনাদকে গুরুত্ব দেয়া যায় কেননা 'ক্ষুধা'র কোনো ভৌগোলিক সীমানা বা ভাষা নেই। বর্তমান পৃথিবীতে জমিদারের লাঠিয়াল না থাকলেও সাম্রাজ্যবাদের মোড়কে করপোরেট আগ্রাসন আর অদৃশ্য পুঁজির শোষণ আছে। বিজন ভট্টাচার্যের শোষিত কৃষকের চরিত্ররা যদি আজকের দুনিয়ার 'প্রান্তিক শ্রমজীবী'র ছায়া হয়ে ওঠে আর সেই ভাবনাকে যদি নতুন করে মঞ্চস্থ করা যায় তবে সেই নাটক আগের চেয়েও বেশি বিস্ফোরক হয়ে উঠবে। এবং তা অবশ্যই আজকের আধুনিক দর্শকদের স্নায়ুকে নাড়া দিতে বাধ্য।

বিজন ভট্টাচার্য বিস্মৃত নন, বরং আমরা তাঁর সৃষ্টিকর্মকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে ভয় পাচ্ছি। তাঁর নাটকগুলোকে কেবল 'ঐতিহাসিক দলিল' হিসেবে মিউজিয়ামে না রেখে, আজকের সামাজিক অস্থিরতার আয়না হিসেবে ব্যবহার করা সময়ের দাবি। বিজন ভট্টাচার্যের নাট্যচর্চা আজ এক অদ্ভুত বৈপরীত্যে দাঁড়িয়ে। বিজন ভট্টাচার্য আসলে এমন এক শিল্পী, যিনি পচে যাওয়া সমাজকে ব্যবচ্ছেদ করতে শিখিয়েছিলেন। তাই যতক্ষণ পৃথিবীতে বৈষম্য আর হাহাকার থাকবে, ততক্ষণ বিজন ভট্টাচার্য ও তাঁর নাটককে 'অপ্রাসঙ্গিক' বলার সুযোগ নেই। যে 'নবান্ন' একদিন মেঠো পথ থেকে উঠে এসে কলকাতার মঞ্চ কাঁপিয়েছিল, আজ তা ক্রমশ মধ্যবিত্তের বিদগ্ধ 'বইয়ের তাকে' সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। শহরকেন্দ্রিক বামপন্থা বিজন ভট্টাচার্যকে একটি নির্দিষ্ট 'আইকন' বা 'নস্টালজিয়ায়' বন্দি করে ফেলেছে, যেখানে তাঁর প্রয়োগবাদী পরীক্ষা-নিরীক্ষার চেয়ে রাজনৈতিক আবেগই বেশি গুরুত্ব পায়। তাঁর ব্যবহৃত দেশজ ডায়লেক্ট বা আঞ্চলিক ভাষা আজ কেবল ভাষাতাত্ত্বিক কৌতূহল; আধুনিক মঞ্চে তার সেই আদিম, রুক্ষ ঘ্রাণ যেন নাগরিক মার্জিত উচ্চারণে হারিয়ে গেছে। থিয়েটার যখন দল থেকে দলে ঘোরে, তখন বিজনের সেই 'গণসংগ্রামের দর্শন' অনেক সময় কেবল উদযাপনের আনুষ্ঠানিকতায় রূপ নেয়। বর্তমানের ভোগবাদী সমাজে তাঁর সেই ক্ষুধার আর্তি আর ভিটেমাটি হারানোর যন্ত্রণা তাই যতটা না জীবন্ত দলিলে, তার চেয়ে বেশি মূর্ত হয় অ্যাকাডেমিক নস্টালজিয়ায়। বিজন কি তবে কেবল এক অতীতচারী স্মারক? নাকি আমাদের আধুনিক নাট্যভাবনা তাঁর সেই মাটির গভীরতাকে ধারণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে? আমি মনে করি বর্তমানের আধুনিক মঞ্চসজ্জা ও নাগরিক ভাষা বিজন ভট্টাচার্যর সেই আদিম ও রুক্ষ নাটকীয়তাকে ধারণ করার জন্য যথেষ্ট কিন্তু প্রশ্ন হলো, বর্তমানের নাট্যপরিচালকেরা কি রাজনৈতিক মেরুকরণের বাইরে গিয়ে বিজন ভট্টাচার্যর সেই 'আগুন'কে নতুন করে জ্বালানোর সাহস করবেন?

রাত অনেক হলো সারা পাড়া ঘুমিয়ে গেছে। ল্যাম্পপোস্টগুলো নিঃসঙ্গতায় দাঁড়িয়ে আছে নির্জন, পাড়ার কুকুরগুলো নানা সুরে ডাকছে দূরে কোথাও, আজ এখানেই শেষ করছি। সামনের সপ্তাহে পাহাড়ে যেতে পারি। ফিরে এসে তোমাকে লিখবো। নিরন্তর ভালো থেকো।

অন্তে প্রেম হোক

ঋষি

০৩ মার্চ, ২০২৬

0 comments:

0

ধারাবাহিক - রঞ্জন রায়

Posted in























পর্ব ২৬.১


কবি গিরিজাকুমার মাথুর বোধহয় শিবপালগঞ্জের প্রিন্সিপালকে দেখেই প্রেরণা পেয়ে
লিখেছিলেন —“হমনে বিতায়ী হ্যায় জিন্দগী কসালে কী, হমনে পরোয়া কভী কী ন কিসী
কী”।
অর্থাৎ “আমার জীবন ক্রমাগত সংঘর্ষের গাথা , লোকে কী বলল সে নিয়ে কখনও
ঘামাইনি মাথা”।
কেন বলছি, সব ব্যাপারে একগুঁয়েপনা, বৈদ্যজীকে ছেড়ে বাকি সবার সংগে তর্কে মেতে
কেবল নিজের মত আঁকড়ে ধরা এবং কথায় কথায় “কোই পরোয়া নহীঁ, সময় আসলে সব
ব্যাটাকে দেখে নেব” গোছের পংক্তি আউড়ে চলা – এসব ওনার জীবন-দর্শনের
অনিবার্য অঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
নিজের মতে অটল থাকার নীতি উনি নিজের বাবার থেকে পেয়েছিলেন।
ওনার বাবা এক অনারারি ম্যাজিস্ট্রেটের পেশকার ছিলেন-- অথচ অত্যন্ত সৎ।
ওনাকে বেশিরভাগ জীবন শহরে কাটাতে হত, কিন্তু সেখানেও পিতাশ্রী ওঁর গেঁয়োপনা
বেশ নিষ্ঠার সংগে চালিয়ে গেছেন। কিছু নিজস্ব নীতি নিয়ম ছিল, সেগুলো শত বাধাবিঘ্ন
সত্ত্বেও পাথরের মত নিরেট বুদ্ধির জোরে শক্ত হাতে পালন করতেন। সেগুলোর
কয়েকটি মণিমুক্তোঃ
এক, মলমূত্র ত্যাগের জন্যে কখনও বাথরুম পায়খানায় না যাওয়া। কারণ, ওসব
আমাদের প্রাচীন ঋষি-সংস্কৃতির প্রতিকূল।
দুই, কল থেকে জল না খাওয়া। কারণ, ওর মুখে চামড়ার ওয়াশার লাগানো থাকে।
তিন, রেলগাড়িতে যাত্রা করলে কিছু না খাওয়া। তাতে শূদ্রের ছোঁয়া আছে।
চার, খড়িবোলী হিন্দি এবং ইংরেজি ত্যাগ করে সদা অবধী ডায়লেক্টে কথা বলা। কারণ,
উনি এছাড়া অন্য কোন ভাষা শেখেন নি।
পাঁচ, চামড়ার নাগরা জুতো, ঝোলা গোঁফ এবং দু’ফেরতা টুপি পরা। কারণ, ওঁরা পিতৃদেবও
তাই পরতেন। ব্যস, এই পাঁচটি নীতিই ওর জীবনের মূল সিদ্ধান্ত, ওনার পঞ্চশীল।
একবার প্রিন্সিপাল সাহেব ওনার পিতাশ্রীর সংগে তর্কে মেতেছিলেন।
বিষয়ঃ “ বাড়ির ভেতরের পায়খানা ব্যবহার না করে সাত সকালে উঠে খালি রাস্তার
মাঝখানে নিত্যিকর্ম সারতে বসে পড়া নিতান্ত মূর্খতা”। উনি বোঝাতে চাইছিলেন যে


এরকম কাজ ঠিক নয়। কারণ, নাকায় বসে টোল ট্যাক্স আদায়ের দল আজকাল রাস্তায়
রাস্তায় সাফাই অভিযান চালাচ্ছে। ওদের চোখে পড়লে চালান হবার সম্ভাবনা।
এর জবাবে ওনার বাবা পেশকার সাহেব বললেন যে ব্যাপারটা আদর্শের বিষয়, বুদ্ধির
প্যাঁচ কষার নয়।
সেদিন প্রিন্সিপাল বুঝতে পারলেন – আমরা আদর্শের প্রশংসা করি তার অন্তর্নিহিত
মূল্যবোধের জন্যে নয়, বরং সেই আদর্শের পেছনে কত ত্যাগ, সহিষ্ণুতা, বলিদান আর
কষ্টভোগের ইতিহাস রয়েছে তার জন্যে।
উদাহরণঃ নমক কানুন ভঙ্গ করা হয়েছিল আমাদের দেশের দারিদ্র্য দূর করার
উদ্দেশ্যে নয়, বরং ওর পৃষ্ঠভূমিতে যে নিষ্ঠা এবং বিদ্রোহের ভাবনা ছিল সেটাই ওই
আন্দোলনকে নাটক হতে না দিয়ে ইতিহাসের পর্যায়ে নিয়ে গেছে।
প্রিন্সিপাল এই বিশ্লেষণ থেকে সিদ্ধান্তে পৌঁছলেন যে আদর্শের মহত্ব তার প্রতীক
হিসেবে, বাস্তব তথ্যের জন্যে নয়। তারপর এই যুক্তিকে উলটো করে উনি নতুন
সিদ্ধান্তে এলেন—ওঁর বাবা পঞ্চশীলে অটল ছিলেন, প্রতীক হিসেবে আদর্শ ব্যক্তি
বলা যায়। কিন্তু বাস্তব তথ্যের নিকষে দেখলে উনি একটি পাতি বাতেলাবাজ।
সে যাই হোক, প্রিন্সিপাল তাঁর বাবার নিষ্ঠা ও আদর্শ নিয়ে গল্পগুলো বেশ গর্বের
সংগে সবাইকে শোনাতেন। উনি স্বভাবে জেদি। যে কাজটায় যুক্তির নিতান্ত অভাব,
তাতেও জেতার জন্যে ছাতি ঠুকে বলতেন—ভেবেছটা কী! আমি সেই পেশকার সাহেবের
ব্যাটা!
উনি জানতেন যে নিজের এঁড়ে তর্কের স্বভাবটা উনি বাপের থেকে পেয়েছেন। কিন্তু এটা
জানতেন না যে অবধী বুলির প্রতি প্রেমও তাঁর পিতাঠাকুরের ঐতিহ্য থেকে পাওয়া।
রেগে গেলে বা উত্তেজিত হলে ওঁর মুখ থেকে ঝড়ের মত অবধী বুলি বেরিয়ে আসত, যেমন
অনেক হিন্দুস্তানির থেকে অনুরূপ পরিস্থিতিতে ইংরেজি বুলি।
এখন উনি বৈদ্যজীর সামনে কলেজের সমস্যাগুলো ব্যাখ্যা করছেন—অর্থাৎ খান্না
মাস্টারকে গাল দিচ্ছেন। একদিন আগে উনি পেনাল কোডের ধারা ১০৭ এর মামলায়
ম্যাজিস্ট্রেটের এজলাসে হাজির হয়েছিলেন। সেখানে ওনার চোখে মামলায় এক নতুন
প্যাঁচ চোখে পড়ল। কারণ, খান্না মাস্টারের উকিল নিজের বক্তব্যে কিছু এ’ধরণের কথা
বলছিলেনঃ
“ এই মামলা ‘হ্যাভ’ এবং ‘হ্যাভ নটস্‌’দের সংঘর্ষের ফল। একদিকে কলেজের
ম্যানেজার--যাকে সবাই ‘বৈদ্য মহারাজ’ বলে, যে ‘বৈদ্য’ কম ‘মহারাজ’ বেশি। ওনার
পেছনে শ’য়ে শ’য়ে চামচা ও গুন্ডার পাল। ওদের মধ্যেই রয়েছে প্রিন্সিপাল ও আট-


দশজন মাস্টার। এরা সবাই হয় ওঁর আত্মীয় অথবা আত্মীয়ের আত্মীয়। এদের সবার
আর্থিক অবস্থা খাসা, সংকটে পড়লে কলেজের ফান্ড থেকে উদ্ধার করা হয়।
শ্রীমন, অন্যদিকে রয়েছে খান্না এবং আরও আট দশজন মাস্টার—যাঁরা আর্থিক
দৃষ্টিতে গরীব। ওই ক্ষমতাবানের দল সবসময় কুটিল প্যাঁচ কষে এদের দমন করতে
থাকে। নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষের এটাই প্রধান কারণ”।
মাননীয় আদালত ইংরেজিতে বললেন, “অর্থাৎ, ঝগড়াটা মাছ ও রুটির ভাগাভাগির”।
উকিল নিজের কথাই খণ্ডন, মণ্ডন, সংশোধন, সংযোজন, পরিমার্জন করে ফের তার
পিণ্ডি চটকে দিয়ে বললেন-“ না, শ্রীমন। আমি ঠিক ওকথা বলতে চাইনি। বলছিলাম যে
ঝগড়াটা হল বিপরীত আদর্শের ফল”।
“একথা তো আগে বলেন নি”।
“বলতেই যাচ্ছিলাম শ্রীমন”, উকিল বলতে থাকল, “ জনগণের টাকা যেভাবে নয়ছয় করা
হচ্ছে সেটা খান্না মাস্টার এবং ওর চিন্তার শরিকদের কাছে অসহনীয় হয়ে উঠেছে।
শ্রীমন, এরা সব নবযুবক। বেইমান ও ভাঁড়ের সংগে মিলেমিশে থাকায় এখনও অভ্যস্ত
হয়নি”।
বিচারক মুচকি হেসে বললেন-“ এদের তো মামলা মোকদ্দমা এবং জেলে যাওয়ার ভয়
থাকা উচিত নয়”।
উকিল এই সুপরামর্শকে অগ্রাহ্য করে নিজের ব্যাখ্যা চালিয়ে গেল। “সেজন্যেই তো
ওরা কলেজে গণ্ডগোলের আশংকায় ওদের প্রতিবাদ সাংবিধানিক পদ্ধতিতে করে,
আওয়াজ তোলে। শ্রীমন, ক’দিন আগে কলেজে ম্যানেজারের নির্বাচন হল। তাতে স্রেফ
পিস্তলের জোরে বৈদ্য মহারাজ ফের ম্যানেজার নির্বাচিত হলেন। ডিপ্টি ডায়রেক্টর
অফ এডুকেশনের কাছে নালিশ করা হল। শুধু তাই নয়, খান্না এবং ওর সাথীরা ডিপ্টি
ডায়রেক্টরের সংগে দেখা করেছে। খুব শিগগির পুরো মামলার তদন্ত হবে। আবার বৈদ্য
মহারাজ যে কোঅপারেটিভ ইউনিয়নের ম্যানেজিং ডায়রেক্টর , সেখানেও টাকাপয়সা
তছরূপ ধরা পড়েছে। এই মামলাটা ছ’মাস চাপা পড়েছিল। খান্নার দল গিয়ে কোঅপারেটিভ
সোসাইটির রেজিস্ট্রারের সংগে দেখা করে ওর তদন্ত শুরু করিয়েছে। দরকার পড়লে
আমি ওই দু’জন সরকারি অফিসরকেও সাক্ষী দিতে এখানে পেশ করতে পারি।
“শ্রীমন, ওই তদন্তগুলো চলাকালীন খান্না ও সাথীদের ভয় দেখিয়ে চাপে রাখার জন্যেই
বর্তমান মামলা করা হয়েছে। বলতে গেলে এই মোকদ্দমাটাও একধরণের জালিয়াতি।
শ্রীমন---“।


প্রিন্সিপালের উকিল সেদিন এজলাসে কী বলেছিল সেটা তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। তবে
সেদিন প্রিন্সিপাল গ্রামে ফিরে এসে বৈদ্যজীকে বললেন যে কলেজের নির্বাচন এবং
কোঅপারেটিভের তহবিল তছরূপ—দুটো মামলারই তদন্ত হবে।
বৈদ্যজীর চেহারায় কোন পরিবর্তন দেখা গেল না। উনি শুধু ‘হরি ইচ্ছা’ বলে চুপ করে
রইলেন। কিন্তু প্রিন্সিপাল সাহেব কিছু একটা পাকাপাকি ভেবে এসেছিলেন এবং
উত্তেজিত হয়েছিলেন। তাই শুদ্ধ হিন্দির বদলে অবধী বোলিতে বলতে লাগলেনঃ
“মহারাজ, আমার মত হোল সমস্ত খান্না-টান্নাদের হাথ-পা ভেঙে কোন নালায় ফেলে
দেয়া হোক। এটা সম্ভব না হলে সবকটার কান ধরে কলেজ থেকে বের করে দেয়া হোক ।
ওদের পাছায় চার লাথ মেরে আর—“।
বৈদ্যজীর চেহারায় এসবের কোন প্রভাব পড়ল না। উনি বললেন, “ আমার হিংসক
কথাবার্তা পছন্দ নয়”। এবার উনি ঢেঁকুর তুললেন। প্রিন্সিপাল অপেক্ষা
করছিলেন—ফের ‘হরি ইচ্ছা’ শুনতে হবে। কিন্তু বৈদ্যজী কিচ্ছু বললেন না। বোধহয়
অহিংসা, পিস্তল দেখিয়ে চমকানো, তবিল তছরূপ, দেশের কল্যাণ – এইসব জটিল
সমস্যার জালে বাঁধা পড়ে উনি আপাতত চুপ করে রয়েছেন।


ভাটিখানা ছাড়িয়ে প্রায় একশ’ গজ এগিয়ে গেলে একটা অশত্থ গাছের দেখা পাওয়া যায়।
তাতে এক ভূতের বাসা। অনেক পুরনো ভূত। কত কী ঘটে গেল—দেশ স্বাধীন হোল,
জমিদারি প্রথা উঠে গেল, গ্রাম-সভা শুরু হল, কলেজ খুলে গেল—কিন্তু ভুত মরেনি।
যারা ভূতের ব্যাপারটা জানত তারা কেউ সূয্যি ডোবার পরে ওদিকটা মারাত না। কখনও
ওপাশ দিয়ে গেলে নানারকম শব্দ শোনা যায়। সেই সব আওয়াজ শোনার পর শ্রোতার
কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসত। জ্বর এলে বেশির ভাগ মরে যেত। যদি না মরে তো পণ্ডিত
রাধেলালের কাছে যেত। জনশ্রুতি উনি ভূতের ওঝা, ঝাড়ফুঁক পারদর্শী।
এক বিকেলে একজন সাইকেল আরোহী ওই অশত্থ গাছের নীচ দিয়ে যাচ্ছিল। ও ভূতের
কথাটা জানত। কিন্তু না গিয়ে উপায় নেই, গাছটা যে রাস্তার ধারে। তবে ওর আগে আগে
একটা ট্রাক ধীরে ধীরে যাচ্ছিল, ও পিছে পিছে। নইলে সাহস হত না। ট্রাকের পেছনের
লালবাতি এবং আকাশে সূর্য ডোবার পর যে দুয়েকটা লাল রেখা দেখা যাচ্ছে সেসবকেই ও
দিনের অন্ত হয় নি ধরে নিয়ে জায়গাটা পেরিয়ে গেল।
তারপর ও প্রাণভরে শ্বাস টানল। ফাগুনের হাওয়া বইছে, ওর গায়ে লাগছে—তার ছোঁয়ায়
ওর প্রাণ নেচে উঠল। ওর সাহস বেড়ে গেল। ও কোন কাল্পনিক জনতার উদ্দেশে
‘কটিলো কটিলো’ বলে তিতিরের ডাক ছাড়ল। তারপর অমর সিং রাঠোরের বীরগাথা নিয়ে


নামকরা যাত্রার গান—‘ নিকল গয়া জেইসে শের শিকারী কো মার’ – গুনগুন করতে
লাগল। গানের ভল্যুম ক্রমশঃ বেড়ে গেল।
হঠাৎ এক চমক। রাস্তার একদম ধার থেকে একটা আওয়াজ আসছে—‘গোঁ গোঁ গোঁ’!
এটা তো মানুষের নয়, নিঘঘাৎ ভূতের। সাইকেল আরোহীর উপরের শ্বাস বুকে আটকে
গেল। আর নিচের হাওয়া নিচের রাস্তা দিয়ে ফুস্‌। ওর মনে হল ভূত ব্যাটা কোন খবর
না দিয়ে এলাকা বদলে নিয়েছে। অশত্থ গাছের বাসা বদলে এখানকার পাকুড় গাছে
আস্তানা গেড়েছে।
আবার সেই ‘গোঁ গোঁ গোঁ’! এবার বেশ জোরে। সেই সঙ্গে দু’জন মানুষের গলার স্বর।
একজন জোরে জোরে হাসছিল। অন্যজন বলল, “বলছিলাম অত মাল খাস নে, কিন্তু কথা
শুনলে তো! আরও খা ব্যাটা”!
আর একদিন থেকে হেঁড়ে গলার গান ভেসে এল, ‘হামিদ ডাকু’ যাত্রার গানের দু’কলি। “ ন
কীজে শোরগুল চিকচিক, শীশ সবকো ঝুকাতে হ্যাঁয়”।
‘খামোখা কিচকিচ বন্ধ কর। দেখ, সবার মাথা নত হবে”।
তখনই ‘গোঁ গোঁ গোঁ’ আওয়াজে বেশ ক’বার আরোহ-অবরোহ শোনা গেল। প্রথমে কেউ গান
শুরু করার মত করে বলল- গোঁ গোঁ। তারপর কিছু ক্রিয়েটিভিটি দেখাবার ইচ্ছেয় চেঁচিয়ে
উঠল—‘বাঁচাও”! শেষে আবার সেই ‘গোঁ গোঁ গোঁ’। কিন্তু তাতে প্রাণ নেই, কেমন যেন
নিয়মরক্ষার মত শোনালো।
এবার ‘হামিদ ডাকু’ যাত্রার গায়ক তার গান থামিয়ে দিল। ফের ওর গলার স্বর—‘এত
করে বললাম বেশি খাস নে। ফোকটে পাওয়া দারু’! তারপর হেসে উঠে আবার ‘হামিদ
ডাকু’মার্কা গান গাইতে লাগল।
সাইকেল আরোহীর ভেতরে হাওয়া খারাপ হচ্ছিল বটে, কিন্তু সেসব ভূতের ভয়ে।
লোকজন দেখলে ওর ভয় করে না। মানুষের কথাবার্তা আর চিৎকার শুনে ওর মনে হোল
এখানে কিছু গণ্ডগোল কেস। ও সাইকেল থেকে নেমে গর্জে উঠল—“ ভয় পেয়ো না
পালোয়ান! আমি এসে গেছি। খবরদার! কেউ গায়ে হাত তুলবে না”!
পাকুড় গাছের পেছনে একটা ঝোপের মতন। তার পেছনে সন্ধ্যের আধো অন্ধকারে পাঁচ
ছ’জন লোকের চলাফেরা চোখে পড়ছে। নানারকম আওয়াজ আসছেঃ
‘গোঁ গোঁ গোঁ’!’
‘বাঁচাও’!
‘বেশি মাতলামি কোর না; বলেছিলাম এত খাস নে’!


‘ ন কীজে শোরগুল চিকচিক, শীশ সবকো ঝুকাতে হ্যাঁয়’।
সাইকেল আরোহী সতর্ক চোখে চারদিকে তাকাচ্ছিল এবং কোন অজানা ব্যক্তিকে
অজানা বিপদের হাত থেকে বাঁচাতে চেয়ে হুংকার ছাড়ছিল। এমন সময় ঝোপের পেছন
থেকে একজন বেরিয়ে এসে দুলকি চালে সাইকেলের কাছে এল। তার মুখ চোলাই মদের
গন্ধে ভুরভুর। ও সাইকেল আরোহীকে বেশ ডাঁট দেখিয়ে বলল, ‘কী ব্যাপার জোয়ান? কেন
চেঁচাচ্ছ? তোমার কিসে খুজলি হচ্ছে’?
আরোহী ঝোপের দিকে ইশারা করে বলল ,’ ওদিক থেকে বাঁচাও বাঁচাও চিৎকার শুনলাম
যে’!
‘এখানে সবকটা মাল টেনে বেহোঁশ। সব শালা মাতলামি করতে চায়! এখন তুমি কী করতে
চাও বলে ফেল’।
আরও দুই সাইকেল আরোহী রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল। এদের দেখে ওরাও সাইকেল থামিয়ে
নামবে না্মবে করছিল। ঝোপের পেছন থেকে আওয়াজ আরো জোরে জোরে আসছে, কিন্তু
কথা স্পষ্ট হচ্ছে না। ডাঁট দেখানো লোকটা গলার স্বর চড়িয়ে বলল, “ তোমার এখানে
থামার দরকার নেই। এসব গঁজহাদের মামলা। সব শালা মাল টেনে ভোম হয়ে আছে। তোমরা
নিজের নিজের রাস্তায় কেটে পড়”।
দুই সাইকেল আরোহী এমন উপদেশ শোনার পর সাইকেলের স্পীড বাড়িয়ে দিল। প্রথম
জন নাকটাক কুঁচকে যেতে যেতে বলল, “ সবক’টা লুচ্চা। এইসব মাতালের জন্যেই গোটা
এলাকা দুর্গন্ধে ভরে গেছে”।
মিলিটারি স্টাইলওলা জবাব দিল, “ঠিক বলছ জওয়ান, মদ খাওয়া ভাল নয়”।
(চলবে)

0 comments:

0

অনুবাদ সাহিত্য - মনোজিৎকুমার দাস

Posted in







বোমাটি কিছুটা দূরে পড়েছিল কিন্তু তাহলেও বাড়ির দেয়াল বোমার বিস্ফোরণের ধাক্কা সহ্য করতে পারেনি। দেয়াল ছিল মাটির তৈরি। কিছুক্ষণের মধ্যেই তা ভেঙে পড়ে। তার ছোট বোন ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে মারা যায়। বড় বোন তাকে তুলে নিয়ে দৌড়ে যায়। বাবা মায়ের হাত ধরে কিছু জিনিসপত্রের একটি বান্ডিল, একটি ট্রাঙ্ক ও বস্তায় কিছু নিয়ে তারা সবাই পালিয়ে গেল। তখন তার বয়স চার বছর।

“আব্বু…এই যে…গোরারা ওই দিকে!”

আর সে তার আপার পাশ থেকে লাফিয়ে চলে গেল। তার দৃষ্টিশক্তি ছিল প্রখর। সামনের রাস্তা থেকে একটা জীপ গুলি বর্ষণ করে চলে গেল।

“নাসির আমাদের বাঁচিয়েছে!”

তার বোন তাকে চুম্বন দিল। তার মা তাকে ভালবাসা ও দোয়া করল।

নাসিরের চোখে অদ্ভুত এক ঝলক। চিতার চোখে ঝলকের মতো। সে এখন জঙ্গলের জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল। এখন একটা বাড়ির স্মৃতিও ম্লান হতে শুরু করেছে। তারা দু-তিন মাইল দূরে থাকত, তারপর সংক্ষেপে ফিরে আসত। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা হাঁড়ি-পাতিল, বাক্স ও বান্ডিল সংগ্রহ করে আবার পালিয়ে যাওয়া। দাদি একাই রয়ে গেল… খড়ের বান্ডিলের মতো এক জায়গায় পড়ে আছে।

সে যখন প্রথম বিমান ও বোমার গর্জন শুনতে পায় তখন তার বয়স দুই বছর। মায়ের বুক জড়িয়ে ধরলে তারা কেঁপে কেঁপে উঠল। তার মা তাকে এক প্রশস্ত কাপড় দিয়ে তাকে বুকে বেঁধে রেখেছিল।

সে এক হাতে একটি বান্ডিল ধরল আর অন্য হাতে তার ছোট বোন বানোকে। তার বাবার হাতে একটি ছোট ট্রাঙ্ক ছিল। সে বিড়বিড় করছিল। যখন সে তার মাকে দরজা পর্যন্ত টেনে নিয়ে গিয়ে বলল : “আম্মা! চেষ্টা করো, একটু চেষ্টা করো! আল্লাহকে ভরসা করে মসজিদ পর্যন্ত এসো।”

দাদিও বিড়বিড় করছিল আর অভিশাপ দিচ্ছিল। নাসিরের চোখ তখন চকচক করছিল। তখন তার মনে একটা নির্দোষ চিন্তা এসেছিল।” কেন ঈশ্বর আমাদের এত কষ্ট দেন?”

দুই বছর বয়স অনেক ছোট কিন্তু চোখ… এই কোমল বয়সে চোখ গিলে ফেলতে পারে এবং অনেক কিছু গিলতে পারে। তারা যা দেখে তা মজুদ করে রাখে।

রক্তের দুর্গন্ধে মসজিদ ভরে গেছে। হাত, হাঁটু, কাঁধ, ঘাড়ে রক্ত পড়ছে! খুব কম লোক ছিল যারা সম্পূর্ণ অক্ষত ছিল। নাসিরের কাছে এটি ছিল বিশ্বের “স্বাভাবিক” দৃশ্য। যেদিন সে চোখ খুলেছিল সেদিন থেকেই এই পৃথিবীটা সে দেখেছিল। এই পৃথিবীতেই সে বড় হয়েছে। মাটিতে রক্ত দেখতে পা দিয়ে তা ছিটিয়ে দিতে চাওয়াটা তার কাছে বৃষ্টির পানিতে পা ছিটিয়ে দেওয়ার মতোই ছিল।

মসজিদের অনেক নতুন নাম শুনেছে। সে তাঁর বংশের অধিকাংশের নাম জানত। কিন্তু রুশ, আমেরিকান, বুশ, তুরগেনভ, ফিরাঙ্গি, কপ্টার, হেলিকপ্টার… এগুলো অন্য কোনো গোত্রের নাম বলে মনে হয়। তাদের জঙ্গল অবশ্যই সেই পাহাড়ের ওপারে হতে হবে — যেখান থেকে এই হেলিকপ্টারগুলো উড়েছিল, যেখান থেকে আগুনের গোলাগুলো তাদের ঘরবাড়ি ধ্বংস করতে এসেছিল। সে এখনও তার ছোট বোনের মৃত্যুর কথা ভোলেননি।

সে সময় তার বয়স ছিল তিন বছর। তখন তারা পাকা বাড়ি করে শহরে থাকতে এসেছিল।

তার বাবা বলেছিল, “বাইরে আগুনের বৃষ্টি হচ্ছে, বোমা পড়ছে”।

“কে বোমা ফেলে দেয়?”

“তারা… সেই সব সাদা মানুষ যারা হেলিকপ্টারে আসে।”

“কেন তারা বোমা ফেলে?”

“কারণ তারা আমাদের শত্রু!”

“আমরাও কি তাদের শত্রু?”

“অবশ্যই, আর কি?”

দেড় বছর পরে, সে জিজ্ঞাসা করেছিল, —

“তাহলে, আমরাও কি তাদের পাহাড়ে বোমা ফেলতে পারি?”

“আমাদের হেলিকপ্টার নেই, বাবা।”

“তাহলে আমরা কিভাবে তাদের ছেড়ে দেব?”

“আমাদের কাছে ফিদায়ীন আছে; তাই আমরা আমাদের শহীদদের পাঠিয়েছি।”

সে বুঝতে পারেনি। কথাগুলো কঠিন হয়ে যাচ্ছিল… ফিদায়ীন!

প্রায়ই তার দাদির কথা মনে পড়ে। কান্দাহারের “কালো” মসজিদে তারা যে কয়েক মাস কাটিয়েছে তার অনেক গল্প সে তাকে বলেছিল।

“একটি ভয়ানক লম্বা আর্টিফুল ইম্পোস্টার পরীকে নিয়ে গিয়েছিল এবং তাকে একটি আকাশ-উচ্চ টাওয়ারে আটকে রেখেছিল। পরী থাকত এক টাওয়ারে আর আর্টিফুল একটা টাওয়ারে। সে পরীর ডানা ছেঁটে দিয়েছিল যাতে সে উড়ে যেতেও পারেনি। টাওয়ারগুলো এত উঁচু ছিল যে কেউ তাদের চূড়ায় পৌঁছাতে পারত না। যখন লোকেরা টাওয়ারের গোড়ায় জড়ো হত, তখন সে তার থেকে একটি পালক ছিঁড়ে ফেলে দিত। মাটিতে ঝাঁঝরা মানুষরা এটা ধরতে হাজার হাজার মাইল দৌড়াবে।”

এতক্ষণে সে ফিদায়ীনের অর্থ বুঝে ফেলেছে। দাদি এখানে থাকলে ওকে বলত। সে তার বাবাকে জিজ্ঞেস করল সে কোথায় আছে।

তিনি উত্তর দিলেন, “সে এখন আল্লাহর কাছে আছে… তিনি তাকে নিয়ে গেছেন।”

“দাদিও?” ও আবার চুপ হয়ে গেল।

মসজিদের মিনারগুলো ছোট হচ্ছে নাকি সে লম্বা হচ্ছে তা বলা মুশকিল। সে দাদির কাছ থেকে উঠে মিনারের সিঁড়ি বেয়ে উঠত। সেখান থেকে সে পুরো শহর দেখতে পেত। সেই সুবিধার জায়গা থেকে, শহরটিকে একটি বড় ইটের ভাটা মনে হয়েছিল। অনেক জায়গা থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছিল। তারা অবশ্যই বেকারের দোকান হবে। মাংস সেখানে রান্না করা আবশ্যক. কাবাব তৈরি হচ্ছে।

নাসির খুব দ্রুত বড় হচ্ছিল। তার পোশাক তার জন্য ছোট হতে থাকে। দাদি তার জন্য জামাকাপড় খুঁজতে থাকে, কোথা থেকে কার কাছ থেকে আল্লাহই জানে। সে সেই মিনার থেকে ট্যাঙ্কের গর্জন শুনতে পেয়েছিল। তারা বাজারের মধ্য দিয়ে হেঁটে গেলে মাটি কাঁপবে বলে মনে হয়। তারা দাদির জাদুকথার সেই লোহার গন্ডারের মতো লাগছিল, তাদের স্নাউটগুলো উঁচিয়ে, আগুন ছড়িয়ে দিয়ে এগিয়ে চলেছে।

আরেকটি হামলা হয়েছে। গন্ডাররা মসজিদটিকে ঘিরে ফেলে এবং অবরোধ করে যা কয়েকদিন ধরে চলে। রাতের আঁধারে মসজিদের বেসমেন্ট থেকে কিছু লোককে গবাদি পশুর মতো বের করে দেওয়া হত। তাদের হাঁটু এবং কনুইতে হামাগুড়ি দিয়ে তারা গলি পেরিয়ে পরিষ্কার মাটিতে চলে যেত। নাসিরও তার আম্মি ও আপাসহ এভাবেই পালিয়ে যায়। আব্বা ও দাদি পেছনে পড়ে থাকল।

পাহাড়ের পেছনে আরেকটি গ্রাম ছিল। কিছু পরিবার একটি আস্তাবলে আশ্রয় পেয়েছিল। এখানে সামান্য শব্দ ছিল. আব্বা কয়েকদিন পর পর দেখা করতেন। একবার, আব্বা অনেক দিন আসেনি। আম্মি সেজদায় পড়ে দোয়া করতেন। তিনি সবসময় মোনাজাত করতেব, তার চোখ সবসময় অশ্রুতে ভিজে থাকত। একবার, নাসির মাটিতে শুয়ে থাকা অবস্থায় তাকে জিজ্ঞেস করেছিল : ‘আম্মি, তুমি কিসের জন্য মোনাজাত করছ?’

‘আমি আল্লাহর কাছে চেয়েছিলাম, তোমাকে ও তোমার বাবাকে নিরাপদে রাখুক।

নাসির মাটিতে শুয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর মৃদুস্বরে জিজ্ঞেস করল, ‘আম্মি, আল্লাহ কার পক্ষে? আমাদের পক্ষে, নাকি তাদের?’

সে ঘুরে দাঁড়াল। কিন্তু আম্মি চলে গেছে।

এক রাতে, নাসির তার সালোয়ারের ভাঁজে তার গুলতি গুঁজে এবং অন্ধকারে তার পথ শুঁকে মসজিদের একই বেসমেন্টে পৌঁছে যায়। যে দৃশ্যটি তার চোখ দেখেছিল তা তাকে অসাড় করে দিয়েছে। মসজিদটি ভিতর থেকে সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। সর্বত্র ধ্বংসস্তূপ এবং দুর্গন্ধও ছিল। তার চোখ অন্ধকারে অভ্যস্ত হওয়ার সাথে সাথে সে দেখতে পেল ধ্বংসস্তূপের নীচ থেকে লাশের হাত-পা বের হয়ে আসছে। ধ্বংসস্তূপে মিনারে যাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যায়। সকাল হলে সে প্রধান ফটকের দিকে এগোতেই কিছু লোককে দেখতে পেল। তাদের নাক-মুখ কাপড়ে বাঁধা, হাতে বেলচা। সম্ভবত তারা ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করতে এসেছিল। তাদের কাছ থেকে যতটা সম্ভব লুকিয়ে নাসির মসজিদ থেকে বেরিয়ে এলো। বাইরে লোকজনের ভিড় দেখে সে দ্রুত দেয়ালের পাশে রাখা একটি ট্রাকে উঠে গেল।

মৃতদেহের একটি স্তূপ, তাদের হাত-পা অনুপস্থিত এবং খারাপভাবে বিকৃত মৃতদেহ ট্রাকে স্তূপ করা।

নাসির এক কোণে কুঁকড়ে বসে আছে, প্রায় লাশের স্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে। সে দেখেছিল এক ধরনের অর্ধ-কাটা, আংশিক চামড়ার ছাগলের গাদা, গাড়িতে বোঝাই করে কসাইয়ের দোকানে আনা হচ্ছে।

সে যেখানে ছিল সেখানেই শুয়েছিল। ট্রাক সরে গেল। কোন কসাইয়ের দোকানে তাকে ফেলে দেওয়া হবে কে জানত! কয়েক ঘণ্টা ধরে চলা এই যাত্রায় সে ঘুমিয়ে গেছে নাকি ঘুমিয়ে পড়েছে তা বলা মুশকিল। কিন্তু যখন ট্রাকটি তার বিষয়বস্তু একটি পাহাড়ের মাথায় খালি করে তখন সে বাইরে পড়ে যায়, তারপর ট্রাক স্টার্ট দিলে তার জ্ঞান ফিরে আসে। ট্রাকটি ধ্বংসাবশেষ একটি বড় গর্তে ফেলে চলে যায়। মৃত মানুষের সেই ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে নাসির হামাগুড়ি দিয়েছিল। একটি নগ্ন পাথুরে পর্বত তার উপরে উঠেছিল; এটিকে গুহার মুখ দিকে মার্ক করা ছিল ছোট করে, ইঁদুরের গর্তের মতো। চারদিকে আরোহণ করে, তিনি ভীত শেয়ালের মতো পাহাড়ের মুখে ছুড়ে ফেলে এবং একটি গুহার মতো ফাটলে আশ্রয় পায়।

সে ওখান থেকে ধ্বংসস্তূপ দেখতে পায়। সন্ধ্যা নাগাদ গর্তটি ভরাট হয়ে বন্ধ হয়ে যায়। নাসির সারারাত সেখানেই থাকে। রাতের আঁধারে সে কিছু মানুষের কণ্ঠ শুনতে পেল। সম্ভবত কিছু লোক তার কাছের গুহায় অবস্থান করছিল। সে দেখতে পেল কিছু চোখ ছটফট করছে; হয়তো তারা বন্য খরগোশের ছিল। তার চারপাশে হাত দিয়ে খুঁজতে খুঁজতে নাসির কিছু ছোট পাথর ও নুড়ি সংগ্রহ করে। গুলতিটা তখনও তার সালোয়ারের ভাঁজে আটকে ছিল। ওটা বের করে নিল। সে একটি ছোট, সূক্ষ্ম পাথর খুঁজে পেলে যা সে একটি বড় পাথরের সাথে ঘষতে শুরু করল। তার দাদির কথা মনে পড়ল।

“আদিকালে মানুষ পাথর দিয়ে অস্ত্র তৈরি করত। তারা খাবারের জন্য শিকার করত এবং গুহায় বাস করত। যে গোষ্ঠীগুলিতে আগুন ছিল তারা অন্যদের থেকে শ্রেষ্ঠ বলে বিবেচিত হত। তারা খোলা মাঠে চলে যেত, ভ্রমণ করত এবং নতুন অঞ্চল জয় করত…”

নাসির একটি বড় পাথরের সাথে একটি ছোট ধারালো পাথর ঘষে একটি পাথরের অস্ত্র তৈরি করতে লাগল।

লেখক পরিচিতি : ভারতের প্রথিতযশা গীতিকার, চিত্রনাট্যকার, চলচ্চিত্র পরিচালক, কবি, ছোটগল্প লেখক এবং ঔপন্যাসিক গুলজার। তাঁর আসল নাম সাম্পুরাণ সিং কারলা (Sampooran Singh Kalra)। তৎকালীন অখণ্ড ভারতের পাঞ্জাব (বর্তমানে পাকিস্তানে) প্রদেশের ঝিলাম জেলার দিনা শহরে তিনি ১৯৩৪ সালের ১৮ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন। মূলত হিন্দি, উর্দু এবং পাঞ্জাবি ভাষায় সাহিত্য রচনা করলেও ভারতের বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষায় লেখালেখি করেন। ‘টু’ (Two) তাঁর একমাত্র উপন্যাস, যা ভারত-পাকিস্তান বিভক্তির পরে শরণার্থীদের করুণ কাহিনী নিয়ে রচিত। তিনি তিনটি কাব্যগ্রন্থ এবং দুটি ছোটগল্প সংকলন রচনা করেন। ‘রাভি পার অ্যান্ড আদার স্টোরিজ’ (Raavi Paar and other Stories) (১৯৯৭) এবং ‘হাফ এ রুপি স্টোরিজ’ (Half a Rupee Stories) (২০১৩) ইংরেজিতে প্রকাশিত ছোটগল্প সংকলন। তবে ‘রাভি পার অ্যান্ড আদার স্টোরিজ’ থেকে চারটি গল্প নিয়ে ২০০২ সালে প্রকাশিত হয়েছে ‘সীমা অ্যান্ড আদার স্টোরিজ’ (Seema and other stories)। কাব্যিক ভাষায় চরিত্র চিত্রণের, বিশেষ করে শব্দ প্রয়োগের, জন্য তাঁকে ‘মাস্টার ওয়ার্ডস্মীথ’ (Master wordsmith) বা ‘শব্দ কারিগর’ হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়।

গুলজারের কর্মজীবন শুরু হয়েছে সঙ্গীত পরিচালক হিসাবে। পরবর্তীতে তিনি গীতিকার, চিত্রনাট্যকার এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসাবে সুপরিচিতি হন। গীতিকার হিসাবে তিনি ২০০৪ সালে ‘পদ্মভূষণ’ (মর্যাদা এবং সম্মানের দিক থেকে ভারতের তৃতীয় অসামরিক পুরস্কার) এবং ২০০২ সালে ‘সাহিত্য অ্যাকাডেমি’ পুরস্কার অর্জণ করেন। এছাড়া তিনি ‘দাদাসাহেব ফালকে’ পুরস্কার-সহ একাধিক জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন। হলিউডের বিখ্যাত ‘স্লামডগ মিলিনিয়র’ চলচ্চিত্রের গান ‘জয় হো’ সঙ্গীত রচনার জন্য তিনি অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড এবং গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড অর্জণ করেন। তিনি ১৯৭৩ সালে বলিউডের বিখ্যাত নায়িকা রাখীর সঙ্গে ‘সাত পাকে বাঁধা’ পড়েন।

মূল উর্দু থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন Rakhshanda Jalil.। তার ইংরেজি অনুবাদ থেকে বঙ্গানুবাদ করা হলো প্রস্তর যুগ নামে।

0 comments: