ধারাবাহিক - রঞ্জন রায়
Posted in ধারাবাহিকপর্ব ২৬.১
কবি গিরিজাকুমার মাথুর বোধহয় শিবপালগঞ্জের প্রিন্সিপালকে দেখেই প্রেরণা পেয়ে
লিখেছিলেন —“হমনে বিতায়ী হ্যায় জিন্দগী কসালে কী, হমনে পরোয়া কভী কী ন কিসী
কী”।
অর্থাৎ “আমার জীবন ক্রমাগত সংঘর্ষের গাথা , লোকে কী বলল সে নিয়ে কখনও
ঘামাইনি মাথা”।
কেন বলছি, সব ব্যাপারে একগুঁয়েপনা, বৈদ্যজীকে ছেড়ে বাকি সবার সংগে তর্কে মেতে
কেবল নিজের মত আঁকড়ে ধরা এবং কথায় কথায় “কোই পরোয়া নহীঁ, সময় আসলে সব
ব্যাটাকে দেখে নেব” গোছের পংক্তি আউড়ে চলা – এসব ওনার জীবন-দর্শনের
অনিবার্য অঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
নিজের মতে অটল থাকার নীতি উনি নিজের বাবার থেকে পেয়েছিলেন।
ওনার বাবা এক অনারারি ম্যাজিস্ট্রেটের পেশকার ছিলেন-- অথচ অত্যন্ত সৎ।
ওনাকে বেশিরভাগ জীবন শহরে কাটাতে হত, কিন্তু সেখানেও পিতাশ্রী ওঁর গেঁয়োপনা
বেশ নিষ্ঠার সংগে চালিয়ে গেছেন। কিছু নিজস্ব নীতি নিয়ম ছিল, সেগুলো শত বাধাবিঘ্ন
সত্ত্বেও পাথরের মত নিরেট বুদ্ধির জোরে শক্ত হাতে পালন করতেন। সেগুলোর
কয়েকটি মণিমুক্তোঃ
এক, মলমূত্র ত্যাগের জন্যে কখনও বাথরুম পায়খানায় না যাওয়া। কারণ, ওসব
আমাদের প্রাচীন ঋষি-সংস্কৃতির প্রতিকূল।
দুই, কল থেকে জল না খাওয়া। কারণ, ওর মুখে চামড়ার ওয়াশার লাগানো থাকে।
তিন, রেলগাড়িতে যাত্রা করলে কিছু না খাওয়া। তাতে শূদ্রের ছোঁয়া আছে।
চার, খড়িবোলী হিন্দি এবং ইংরেজি ত্যাগ করে সদা অবধী ডায়লেক্টে কথা বলা। কারণ,
উনি এছাড়া অন্য কোন ভাষা শেখেন নি।
পাঁচ, চামড়ার নাগরা জুতো, ঝোলা গোঁফ এবং দু’ফেরতা টুপি পরা। কারণ, ওঁরা পিতৃদেবও
তাই পরতেন। ব্যস, এই পাঁচটি নীতিই ওর জীবনের মূল সিদ্ধান্ত, ওনার পঞ্চশীল।
একবার প্রিন্সিপাল সাহেব ওনার পিতাশ্রীর সংগে তর্কে মেতেছিলেন।
বিষয়ঃ “ বাড়ির ভেতরের পায়খানা ব্যবহার না করে সাত সকালে উঠে খালি রাস্তার
মাঝখানে নিত্যিকর্ম সারতে বসে পড়া নিতান্ত মূর্খতা”। উনি বোঝাতে চাইছিলেন যে
এরকম কাজ ঠিক নয়। কারণ, নাকায় বসে টোল ট্যাক্স আদায়ের দল আজকাল রাস্তায়
রাস্তায় সাফাই অভিযান চালাচ্ছে। ওদের চোখে পড়লে চালান হবার সম্ভাবনা।
এর জবাবে ওনার বাবা পেশকার সাহেব বললেন যে ব্যাপারটা আদর্শের বিষয়, বুদ্ধির
প্যাঁচ কষার নয়।
সেদিন প্রিন্সিপাল বুঝতে পারলেন – আমরা আদর্শের প্রশংসা করি তার অন্তর্নিহিত
মূল্যবোধের জন্যে নয়, বরং সেই আদর্শের পেছনে কত ত্যাগ, সহিষ্ণুতা, বলিদান আর
কষ্টভোগের ইতিহাস রয়েছে তার জন্যে।
উদাহরণঃ নমক কানুন ভঙ্গ করা হয়েছিল আমাদের দেশের দারিদ্র্য দূর করার
উদ্দেশ্যে নয়, বরং ওর পৃষ্ঠভূমিতে যে নিষ্ঠা এবং বিদ্রোহের ভাবনা ছিল সেটাই ওই
আন্দোলনকে নাটক হতে না দিয়ে ইতিহাসের পর্যায়ে নিয়ে গেছে।
প্রিন্সিপাল এই বিশ্লেষণ থেকে সিদ্ধান্তে পৌঁছলেন যে আদর্শের মহত্ব তার প্রতীক
হিসেবে, বাস্তব তথ্যের জন্যে নয়। তারপর এই যুক্তিকে উলটো করে উনি নতুন
সিদ্ধান্তে এলেন—ওঁর বাবা পঞ্চশীলে অটল ছিলেন, প্রতীক হিসেবে আদর্শ ব্যক্তি
বলা যায়। কিন্তু বাস্তব তথ্যের নিকষে দেখলে উনি একটি পাতি বাতেলাবাজ।
সে যাই হোক, প্রিন্সিপাল তাঁর বাবার নিষ্ঠা ও আদর্শ নিয়ে গল্পগুলো বেশ গর্বের
সংগে সবাইকে শোনাতেন। উনি স্বভাবে জেদি। যে কাজটায় যুক্তির নিতান্ত অভাব,
তাতেও জেতার জন্যে ছাতি ঠুকে বলতেন—ভেবেছটা কী! আমি সেই পেশকার সাহেবের
ব্যাটা!
উনি জানতেন যে নিজের এঁড়ে তর্কের স্বভাবটা উনি বাপের থেকে পেয়েছেন। কিন্তু এটা
জানতেন না যে অবধী বুলির প্রতি প্রেমও তাঁর পিতাঠাকুরের ঐতিহ্য থেকে পাওয়া।
রেগে গেলে বা উত্তেজিত হলে ওঁর মুখ থেকে ঝড়ের মত অবধী বুলি বেরিয়ে আসত, যেমন
অনেক হিন্দুস্তানির থেকে অনুরূপ পরিস্থিতিতে ইংরেজি বুলি।
এখন উনি বৈদ্যজীর সামনে কলেজের সমস্যাগুলো ব্যাখ্যা করছেন—অর্থাৎ খান্না
মাস্টারকে গাল দিচ্ছেন। একদিন আগে উনি পেনাল কোডের ধারা ১০৭ এর মামলায়
ম্যাজিস্ট্রেটের এজলাসে হাজির হয়েছিলেন। সেখানে ওনার চোখে মামলায় এক নতুন
প্যাঁচ চোখে পড়ল। কারণ, খান্না মাস্টারের উকিল নিজের বক্তব্যে কিছু এ’ধরণের কথা
বলছিলেনঃ
“ এই মামলা ‘হ্যাভ’ এবং ‘হ্যাভ নটস্’দের সংঘর্ষের ফল। একদিকে কলেজের
ম্যানেজার--যাকে সবাই ‘বৈদ্য মহারাজ’ বলে, যে ‘বৈদ্য’ কম ‘মহারাজ’ বেশি। ওনার
পেছনে শ’য়ে শ’য়ে চামচা ও গুন্ডার পাল। ওদের মধ্যেই রয়েছে প্রিন্সিপাল ও আট-
দশজন মাস্টার। এরা সবাই হয় ওঁর আত্মীয় অথবা আত্মীয়ের আত্মীয়। এদের সবার
আর্থিক অবস্থা খাসা, সংকটে পড়লে কলেজের ফান্ড থেকে উদ্ধার করা হয়।
শ্রীমন, অন্যদিকে রয়েছে খান্না এবং আরও আট দশজন মাস্টার—যাঁরা আর্থিক
দৃষ্টিতে গরীব। ওই ক্ষমতাবানের দল সবসময় কুটিল প্যাঁচ কষে এদের দমন করতে
থাকে। নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষের এটাই প্রধান কারণ”।
মাননীয় আদালত ইংরেজিতে বললেন, “অর্থাৎ, ঝগড়াটা মাছ ও রুটির ভাগাভাগির”।
উকিল নিজের কথাই খণ্ডন, মণ্ডন, সংশোধন, সংযোজন, পরিমার্জন করে ফের তার
পিণ্ডি চটকে দিয়ে বললেন-“ না, শ্রীমন। আমি ঠিক ওকথা বলতে চাইনি। বলছিলাম যে
ঝগড়াটা হল বিপরীত আদর্শের ফল”।
“একথা তো আগে বলেন নি”।
“বলতেই যাচ্ছিলাম শ্রীমন”, উকিল বলতে থাকল, “ জনগণের টাকা যেভাবে নয়ছয় করা
হচ্ছে সেটা খান্না মাস্টার এবং ওর চিন্তার শরিকদের কাছে অসহনীয় হয়ে উঠেছে।
শ্রীমন, এরা সব নবযুবক। বেইমান ও ভাঁড়ের সংগে মিলেমিশে থাকায় এখনও অভ্যস্ত
হয়নি”।
বিচারক মুচকি হেসে বললেন-“ এদের তো মামলা মোকদ্দমা এবং জেলে যাওয়ার ভয়
থাকা উচিত নয়”।
উকিল এই সুপরামর্শকে অগ্রাহ্য করে নিজের ব্যাখ্যা চালিয়ে গেল। “সেজন্যেই তো
ওরা কলেজে গণ্ডগোলের আশংকায় ওদের প্রতিবাদ সাংবিধানিক পদ্ধতিতে করে,
আওয়াজ তোলে। শ্রীমন, ক’দিন আগে কলেজে ম্যানেজারের নির্বাচন হল। তাতে স্রেফ
পিস্তলের জোরে বৈদ্য মহারাজ ফের ম্যানেজার নির্বাচিত হলেন। ডিপ্টি ডায়রেক্টর
অফ এডুকেশনের কাছে নালিশ করা হল। শুধু তাই নয়, খান্না এবং ওর সাথীরা ডিপ্টি
ডায়রেক্টরের সংগে দেখা করেছে। খুব শিগগির পুরো মামলার তদন্ত হবে। আবার বৈদ্য
মহারাজ যে কোঅপারেটিভ ইউনিয়নের ম্যানেজিং ডায়রেক্টর , সেখানেও টাকাপয়সা
তছরূপ ধরা পড়েছে। এই মামলাটা ছ’মাস চাপা পড়েছিল। খান্নার দল গিয়ে কোঅপারেটিভ
সোসাইটির রেজিস্ট্রারের সংগে দেখা করে ওর তদন্ত শুরু করিয়েছে। দরকার পড়লে
আমি ওই দু’জন সরকারি অফিসরকেও সাক্ষী দিতে এখানে পেশ করতে পারি।
“শ্রীমন, ওই তদন্তগুলো চলাকালীন খান্না ও সাথীদের ভয় দেখিয়ে চাপে রাখার জন্যেই
বর্তমান মামলা করা হয়েছে। বলতে গেলে এই মোকদ্দমাটাও একধরণের জালিয়াতি।
শ্রীমন---“।
প্রিন্সিপালের উকিল সেদিন এজলাসে কী বলেছিল সেটা তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। তবে
সেদিন প্রিন্সিপাল গ্রামে ফিরে এসে বৈদ্যজীকে বললেন যে কলেজের নির্বাচন এবং
কোঅপারেটিভের তহবিল তছরূপ—দুটো মামলারই তদন্ত হবে।
বৈদ্যজীর চেহারায় কোন পরিবর্তন দেখা গেল না। উনি শুধু ‘হরি ইচ্ছা’ বলে চুপ করে
রইলেন। কিন্তু প্রিন্সিপাল সাহেব কিছু একটা পাকাপাকি ভেবে এসেছিলেন এবং
উত্তেজিত হয়েছিলেন। তাই শুদ্ধ হিন্দির বদলে অবধী বোলিতে বলতে লাগলেনঃ
“মহারাজ, আমার মত হোল সমস্ত খান্না-টান্নাদের হাথ-পা ভেঙে কোন নালায় ফেলে
দেয়া হোক। এটা সম্ভব না হলে সবকটার কান ধরে কলেজ থেকে বের করে দেয়া হোক ।
ওদের পাছায় চার লাথ মেরে আর—“।
বৈদ্যজীর চেহারায় এসবের কোন প্রভাব পড়ল না। উনি বললেন, “ আমার হিংসক
কথাবার্তা পছন্দ নয়”। এবার উনি ঢেঁকুর তুললেন। প্রিন্সিপাল অপেক্ষা
করছিলেন—ফের ‘হরি ইচ্ছা’ শুনতে হবে। কিন্তু বৈদ্যজী কিচ্ছু বললেন না। বোধহয়
অহিংসা, পিস্তল দেখিয়ে চমকানো, তবিল তছরূপ, দেশের কল্যাণ – এইসব জটিল
সমস্যার জালে বাঁধা পড়ে উনি আপাতত চুপ করে রয়েছেন।
ভাটিখানা ছাড়িয়ে প্রায় একশ’ গজ এগিয়ে গেলে একটা অশত্থ গাছের দেখা পাওয়া যায়।
তাতে এক ভূতের বাসা। অনেক পুরনো ভূত। কত কী ঘটে গেল—দেশ স্বাধীন হোল,
জমিদারি প্রথা উঠে গেল, গ্রাম-সভা শুরু হল, কলেজ খুলে গেল—কিন্তু ভুত মরেনি।
যারা ভূতের ব্যাপারটা জানত তারা কেউ সূয্যি ডোবার পরে ওদিকটা মারাত না। কখনও
ওপাশ দিয়ে গেলে নানারকম শব্দ শোনা যায়। সেই সব আওয়াজ শোনার পর শ্রোতার
কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসত। জ্বর এলে বেশির ভাগ মরে যেত। যদি না মরে তো পণ্ডিত
রাধেলালের কাছে যেত। জনশ্রুতি উনি ভূতের ওঝা, ঝাড়ফুঁক পারদর্শী।
এক বিকেলে একজন সাইকেল আরোহী ওই অশত্থ গাছের নীচ দিয়ে যাচ্ছিল। ও ভূতের
কথাটা জানত। কিন্তু না গিয়ে উপায় নেই, গাছটা যে রাস্তার ধারে। তবে ওর আগে আগে
একটা ট্রাক ধীরে ধীরে যাচ্ছিল, ও পিছে পিছে। নইলে সাহস হত না। ট্রাকের পেছনের
লালবাতি এবং আকাশে সূর্য ডোবার পর যে দুয়েকটা লাল রেখা দেখা যাচ্ছে সেসবকেই ও
দিনের অন্ত হয় নি ধরে নিয়ে জায়গাটা পেরিয়ে গেল।
তারপর ও প্রাণভরে শ্বাস টানল। ফাগুনের হাওয়া বইছে, ওর গায়ে লাগছে—তার ছোঁয়ায়
ওর প্রাণ নেচে উঠল। ওর সাহস বেড়ে গেল। ও কোন কাল্পনিক জনতার উদ্দেশে
‘কটিলো কটিলো’ বলে তিতিরের ডাক ছাড়ল। তারপর অমর সিং রাঠোরের বীরগাথা নিয়ে
নামকরা যাত্রার গান—‘ নিকল গয়া জেইসে শের শিকারী কো মার’ – গুনগুন করতে
লাগল। গানের ভল্যুম ক্রমশঃ বেড়ে গেল।
হঠাৎ এক চমক। রাস্তার একদম ধার থেকে একটা আওয়াজ আসছে—‘গোঁ গোঁ গোঁ’!
এটা তো মানুষের নয়, নিঘঘাৎ ভূতের। সাইকেল আরোহীর উপরের শ্বাস বুকে আটকে
গেল। আর নিচের হাওয়া নিচের রাস্তা দিয়ে ফুস্। ওর মনে হল ভূত ব্যাটা কোন খবর
না দিয়ে এলাকা বদলে নিয়েছে। অশত্থ গাছের বাসা বদলে এখানকার পাকুড় গাছে
আস্তানা গেড়েছে।
আবার সেই ‘গোঁ গোঁ গোঁ’! এবার বেশ জোরে। সেই সঙ্গে দু’জন মানুষের গলার স্বর।
একজন জোরে জোরে হাসছিল। অন্যজন বলল, “বলছিলাম অত মাল খাস নে, কিন্তু কথা
শুনলে তো! আরও খা ব্যাটা”!
আর একদিন থেকে হেঁড়ে গলার গান ভেসে এল, ‘হামিদ ডাকু’ যাত্রার গানের দু’কলি। “ ন
কীজে শোরগুল চিকচিক, শীশ সবকো ঝুকাতে হ্যাঁয়”।
‘খামোখা কিচকিচ বন্ধ কর। দেখ, সবার মাথা নত হবে”।
তখনই ‘গোঁ গোঁ গোঁ’ আওয়াজে বেশ ক’বার আরোহ-অবরোহ শোনা গেল। প্রথমে কেউ গান
শুরু করার মত করে বলল- গোঁ গোঁ। তারপর কিছু ক্রিয়েটিভিটি দেখাবার ইচ্ছেয় চেঁচিয়ে
উঠল—‘বাঁচাও”! শেষে আবার সেই ‘গোঁ গোঁ গোঁ’। কিন্তু তাতে প্রাণ নেই, কেমন যেন
নিয়মরক্ষার মত শোনালো।
এবার ‘হামিদ ডাকু’ যাত্রার গায়ক তার গান থামিয়ে দিল। ফের ওর গলার স্বর—‘এত
করে বললাম বেশি খাস নে। ফোকটে পাওয়া দারু’! তারপর হেসে উঠে আবার ‘হামিদ
ডাকু’মার্কা গান গাইতে লাগল।
সাইকেল আরোহীর ভেতরে হাওয়া খারাপ হচ্ছিল বটে, কিন্তু সেসব ভূতের ভয়ে।
লোকজন দেখলে ওর ভয় করে না। মানুষের কথাবার্তা আর চিৎকার শুনে ওর মনে হোল
এখানে কিছু গণ্ডগোল কেস। ও সাইকেল থেকে নেমে গর্জে উঠল—“ ভয় পেয়ো না
পালোয়ান! আমি এসে গেছি। খবরদার! কেউ গায়ে হাত তুলবে না”!
পাকুড় গাছের পেছনে একটা ঝোপের মতন। তার পেছনে সন্ধ্যের আধো অন্ধকারে পাঁচ
ছ’জন লোকের চলাফেরা চোখে পড়ছে। নানারকম আওয়াজ আসছেঃ
‘গোঁ গোঁ গোঁ’!’
‘বাঁচাও’!
‘বেশি মাতলামি কোর না; বলেছিলাম এত খাস নে’!
‘ ন কীজে শোরগুল চিকচিক, শীশ সবকো ঝুকাতে হ্যাঁয়’।
সাইকেল আরোহী সতর্ক চোখে চারদিকে তাকাচ্ছিল এবং কোন অজানা ব্যক্তিকে
অজানা বিপদের হাত থেকে বাঁচাতে চেয়ে হুংকার ছাড়ছিল। এমন সময় ঝোপের পেছন
থেকে একজন বেরিয়ে এসে দুলকি চালে সাইকেলের কাছে এল। তার মুখ চোলাই মদের
গন্ধে ভুরভুর। ও সাইকেল আরোহীকে বেশ ডাঁট দেখিয়ে বলল, ‘কী ব্যাপার জোয়ান? কেন
চেঁচাচ্ছ? তোমার কিসে খুজলি হচ্ছে’?
আরোহী ঝোপের দিকে ইশারা করে বলল ,’ ওদিক থেকে বাঁচাও বাঁচাও চিৎকার শুনলাম
যে’!
‘এখানে সবকটা মাল টেনে বেহোঁশ। সব শালা মাতলামি করতে চায়! এখন তুমি কী করতে
চাও বলে ফেল’।
আরও দুই সাইকেল আরোহী রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল। এদের দেখে ওরাও সাইকেল থামিয়ে
নামবে না্মবে করছিল। ঝোপের পেছন থেকে আওয়াজ আরো জোরে জোরে আসছে, কিন্তু
কথা স্পষ্ট হচ্ছে না। ডাঁট দেখানো লোকটা গলার স্বর চড়িয়ে বলল, “ তোমার এখানে
থামার দরকার নেই। এসব গঁজহাদের মামলা। সব শালা মাল টেনে ভোম হয়ে আছে। তোমরা
নিজের নিজের রাস্তায় কেটে পড়”।
দুই সাইকেল আরোহী এমন উপদেশ শোনার পর সাইকেলের স্পীড বাড়িয়ে দিল। প্রথম
জন নাকটাক কুঁচকে যেতে যেতে বলল, “ সবক’টা লুচ্চা। এইসব মাতালের জন্যেই গোটা
এলাকা দুর্গন্ধে ভরে গেছে”।
মিলিটারি স্টাইলওলা জবাব দিল, “ঠিক বলছ জওয়ান, মদ খাওয়া ভাল নয়”।
(চলবে)



0 comments: