গল্প - স্বর্ণদীপ চট্টোপাধ্যায়
Posted in গল্পদুপুর হতেই বৃষ্টি নামল। সমস্ত তোলপাড় করা বৃষ্টি নয়। বুক হু হু করা বৃষ্টি, মন ওলটপালট করা ঝিরঝিরে বৃষ্টি । এমন দিনে সিগারেট ধরাতে গেলেও আঙ্গুল অসাড় হয়ে যায়। বিছানা লেপটে থাকে পিঠের ওপর।
অথচ আজ শুভর আসার কথা। এভাবে থাকলে তো চলবেনা।
ঋদ্ধি এখন বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে। একটু একটু জলের ছাঁট এসে পড়ছে ওর জামায়, চুলে। তেল, শ্যাম্পু কিছুই দেওয়া হচ্ছেনা কদিন। কাল দিতে হবে। তবে শুভ এসেই প্রচুর গালি দেবে। কপালে কষ্ট আছে আজ। আগের সপ্তাহেই বলে গেছে, "শালা, মাইনে পাওনা? ঘরে পরার পাজামা আর টি-শার্টটা পরের সপ্তাহের মধ্যে চেঞ্জ না করলে এরপর তোর পাড়ার লোকের থেকে চাঁদা তুলে কিনে দেব, দেখিস!" আসলে কিছু করার ছিল না। কিছুই করার ছিল না। গত দু'বছরে নতুন শহরে একা থাকার একটা অভ্যাস হয়েছে বটে কিন্তু নিজের সাথে ঘর করার কায়দাকানুনগুলো এখনও ঋদ্ধি গুছিয়ে উঠতে পারল না। বাইরে খাবে না, রান্নার দায়িত্ব নিজে নেবে। এ পাড়ার আশেপাশে তিনটে বাজার বসে। দেখে নিতে হবে কোথায় পাওয়া যায় একটু সস্তায় পটল, ঢ্যাঁড়শ, আরও কিছু সবুজ সবজি। তারপর বাড়ি ফিরে রান্না বসাবে, নিজের যত্ন নেবে। হয় নি। শুভ্র অনেকবার বলেছে। হয় নি। প্রতিদিন মা ফোন করে বলেছে, "এবার একটু সুইগি, জম্যাটো থেকে খাওয়ার আনানো বন্ধ কর।" হয় নি। মাঝে মাঝে নিজের খাওয়ার টেবিল, বইয়ের তাক, বাথরুমের কোন, এসির ভেন্ট দেখলে ঋদ্ধির নিজেরই কান্না পায়। এতদিন সবকিছুই হয়ে যাচ্ছিল। হঠাত্ এই নেই-রাজ্যে এসে পরতে হল কেন?
এরকম বৃষ্টি হলে শ্রেয়ানের কথা মনে পড়ে খুব। ইউ জি ফার্স্ট ইয়ারে কলকাতায় আসার পর শ্রেয়ানই প্রথম বন্ধু। লাইব্রেরীতে একসাথে একই বই খুঁজতে খুঁজতে একদিন আলাপ হয়েছিল। আলাপ বলা যায়না, একটু ঝামেলাই হয়েছিল। তারপর ক্যান্টিনের সামনের দোকানে গিয়ে ঋদ্ধিকে কয়েকটা জরুরী পাতা ফটোকপি করে নিতে হয়েছিল কারণ বইটা শ্রেয়ানই নিয়ে যাবে। সেদিন ক্লাসের পর এরকম বৃষ্টি শুরু হল। তখন লর্ডসের মোড়ে খুব একটা তেমন ক্যাফে ছিলনা। কিন্তু ক্যাফেফাইলে একটা আশ্চর্য সুন্দর আইরিশ কফি বানাত। ওপরে একটু হোয়াইট চকলেট নিত ঋদ্ধি। সেখানেই শ্রেয়ানের সাথে ক্লাসের পর দেখা হয়েছিল, আলাপ জমেছিল আস্তে আস্তে। ইউনিভার্সিটি ছাড়ার ছয় বছর পরে আরেকদিন এই ক্যাফেতেই শ্রেয়ানের সাথে ঋদ্ধির দেখা হয়েছিল। তবে সেদিন ওদেরই ইউনিভার্সিটির পিজি ওয়ানের একটা মেয়ের সাথে এসেছিল শ্রেয়ান। তার বছর দেড়েক পরেই ক্যাফেফাইল বন্ধ হয়ে যায়। এখন এই ক্যাফেটা আর নেই।
শ্রেয়ানের সাথে তার পরে আর কোনদিন সামনা সামনি দেখা হয় নি। ফেসবুকে হয়েছে, ইন্সটাগ্রামে ছবি দেখেছে শ্রেয়ানের নতুন বন্ধুদের, কলিগদের। গত সপ্তাহে রোববার শ্রেয়ান কলিগদের সাথে লঙ ড্রাইভে কোলাঘাট গিয়েছিল শের-এ-পাঞ্জাবে খেতে। নতুন একটা SUV নিয়েছে - লাল রঙের একটা ক্রেটা। কলেজে পড়তে ব্ল্যাক ভারনা কিনবে বলে দুজনেই পাগল ছিল। তারপর শ্রেয়ান হায়দ্রাবাদ চলে গেল। তেমন কথা হত না আর পরের দিকে। ঋদ্ধি যখন কলেজের পার্টটাইম চাকরিটা ছেড়ে সাংবাদিকতা করবে কিনা ভাবছে, তার মাস দেড়েক পড় সম্ভবত ও কলকাতায় ফিরে এসেছিল নতুন একটা কাজ পেয়ে। জানায়ও নি একবার। একদিন সেক্টর ফাইভের দিকে একটা কাজ থেকে ফেরার সময়, বাস থেকে এক ঝলক, ওয়াটার সাইডের সামনে একটা দোকানে সিগারেট খেতে দেখেছিল শ্রেয়ানকে। ওইটুকুই, ব্যাস। ভুলেই তো গেছিল একরকম, তবুও মাঝে মাঝে সমস্ত ওলটপালট করে দেওয়ার মত এক একটা বিকেল আসে কেন?
এগারোটা বাজে। শুভ এখনও এল না। আধঘন্টা লেট। এরকম দেরি করে কেউ এসে পৌঁছেছে বলে কতগুলো ডেট ক্যান্সেল করেছে ঋদ্ধি। শ্রেয়সীর সাথে, অলিম্পিয়ার সাথে, আরও অনেকে আছে। মা অফিস থেকে দেরিতে ফিরলেও ঘণ্টা খানেক কথা বলত না ক্লাস এইট পর্যন্ত। সেসব না নয় ছেলেমানুষি, কিন্তু তারপরে যা যা হয়েছে সেটা অত সহজ ব্যাপার নয়। প্রথম প্রথম মনে হত, এ আর কী এমন ব্যাপার ! কারো জন্য রাস্তায় রোদে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হবে কেন, হ্যাঁ? সময়ে পৌঁছোতে পারেনি একজন, তাই আর অপেক্ষা করার কোন মানে হয় না। আবার কী! কিন্তু এরকম একবার হয় নি। বারবার হয়েছে। কলেজে শুভজিত একদিন বলেছিল, "দেখ, আমিতো পাস্ট লাইফ রিগ্রেশন, রেইকি, স্পিরিচুয়াল হিলিং এসব করছি এতদিন? তোকে একটা জিনিস বলি। এই যে তুই সময় ব্যপারটা এত মেনে চলিস, দেখবি এর জন্যে তুই তোর জীবনে সবকিছু ঠিক ঠিক সময়ে পেয়ে যাবি। দেখে নিস।" যাক, একজন তো বুঝেছে। ব্যাল্যান্স। নিজের মত একটা ব্যাল্যান্স তৈরি করার যথেষ্ট কারণ আছে ঋদ্ধির। সবকিছু এমনি এমনি নয়।
সময় সময় অনেক কিছু পেয়েছিল ঠিকই। শুধু, ধরে রাখতে পারে নি। অলিম্পিয়ার সাথে তিন মাস, শ্রেয়সীর সাথে বোধহয় তার থেকেও কম। শ্রেয়ান নেহাত বন্ধু বলে টিকে গিয়েছিল কলেজের কয়েকটা বছর। তিন বছর কি অনেকটা দীর্ঘ একটা সম্পর্কের জন্য? মনে তো হয় না। বরং একটা গোটা জীবনের জন্য এক একজনের সাথে থাকতে চেয়েছিল ঋদ্ধি- শ্রেয়ানের সাথে, শ্রেয়সীর সাথে, অলিম্পিয়ার সাথে, আর শুভজিত? শ্রেয়ানের খবরটুকু নিতে হয় তবু, নিজের তাগিদে। না হলে রাতে ঘুম আসবে না। স্বপ্ন দেখতে গেলেও একটু চোখ লেগে আসতে হয়। শ্রেয়ানের ইন্সটা পেজটা না দেখলে সেটুকুও হয় না আজকাল।
জোরে বৃষ্টি নামছে এবার। আচ্ছা, শুভজিত ঠিক বলেছিল? সব সময়ে সময়ে পাবে? আগের ওরা না হয় থাকে নি, ছেড়ে গেছে। ওরা বুঝতে পারেনি ঋদ্ধি কেন করছে এসব। কিন্তু শুভ ওদের মত নয়। শুভ বুঝবে। বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল ঋদ্ধি এবার। গ্রিলের গায়ে হেলান দিল। বাহ। একটু একটু বৃষ্টি এসে লাগছে গায়ে। সিগারেট ধরাবে একটা? অবশ্যই।
হাওয়া দিচ্ছে না আজ তেমন। না হলে এত যত্ন করে ধোঁয়া ছাড়া জলে যেত। কিছুটা নিকোটিন টেনে নিচ্ছে এখন গ্রিলরেলিং-এর মানি প্ল্যান্টগুলো, বাকিটা গ্রিলের গায়ে ধাক্কা খেতে খেতে দু'দিকে চলে যাচ্ছে, যেদিকে ইচ্ছে, যেমন ইচ্ছে। শুভ বুঝবেনা? নিশ্চয়ই বুঝবে। যে ছেলে মায়ের মত দুবেলা খাওয়া দাওয়ায়ার খোঁজ নিচ্ছে, জামা বদলাচ্ছে কিনা, কাচছে কিনা তার খবর রাখছে, সিগারেট কটা কমল এই সপ্তাহে তার দিকে নজর দিছছে, সে এটুকু বুঝবে না? দেরি করলে সেদিন ঋদ্ধি কারো সাথে আর দেখা করে না, আর সেটা কেন করে না, এসব বুঝতে পারবে না শুভ? যথেষ্ট বুদ্ধি আছে ওর। বাইরে দেখা করার ব্যাপার থাকলে না হয় সেখান থেকে চলে আসা যায়। শুভর তো আজ ওর বাড়ি আসার কথা।
তাতে কিছু এসে যায় না। সাড়ে এগারোটা বাজে। সীমা থাকা উচিত সব কিছুর। না হলে ওকেও 'টেকেন ফর গ্রান্টেড' ভাববে। হোয়াটসআপ খুলল ঋদ্ধি। আর এক মুহূর্ত না ভেবে সটান লিখে দিল, "আচ্ছা, সরি রে। তুই আজ আর আসিস না। অফিসের একটা হঠাৎ জরুরী কাজ পড়েছে। আমি বেরিয়ে যাচ্ছি। খুব সরি।"
বৃষ্টির জোর বাড়ছে আরও। এখন যদি শুভ চলে আসে তাহলে আবার একটা বাজে ব্যাপার হবে। নিশ্চয়ই বাড়ি থেকে বেরিয়ে পরেছে এতক্ষণে। তাহলে? এই বৃষ্টিতে বাড়ি বেরিয়ে যাবে? ছাতায় হবে না। একটা ক্যাব ডাকতে হবে। হয়তো কিছু সারচার্জ নেবে। কিন্তু, এছাড়া এখন আর কিছু করার নেই। শুভ যদি বাড়ী এসে দেখে তালাটা ভেতর দিয়ে বন্ধ তাহলে...
নাহ, ক্যাব বুক করতে হবে এবার শিগগির। সিগারেটটা শেষ হয়ে এসেছে। কাছাকাছিই কোথাও যাবে। বেশিদূরে নয়। শুভ্রর ধাতানিতে যে পাজামাটা কিনেছিল দিন দুয়েক আগে, ওটাই পরা যাক। বাথরুমে ঢুকেছে ঋদ্ধি এবার। একটু হাল্কা হতে হবে। অনেক হয়েছে সকাল থেকে। এরকম ঘোলাটে আকাশ, বৃষ্টিদিন খুব ভেতর থেকে ক্লান্ত করে দেয়। ভেঙ্গেচুরে দেয় অনেকখানি। যেটুকু আছে তারও কিছু কিছু গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে ছিটকে পরে এদিক ওদিক কোথায় যেন! সিগারেটের ছাইটা এবার কমোডে ফেলবে? না। দাঁড়িয়ে যাক। ইউনিভার্সিটিতে প্রথম ছাই না ফেলে ধোঁয়া টানতে শিখিয়েছিল শ্রেয়ান। দেখা যাক, আজ হাত কাঁপে কিনা।
সিগারেটের পেছনটুকু আস্তে আস্তে সিস্টার্নের ওপর সাবধানে ব্যালেন্স করতে থাকল ঋদ্ধি। পুরো ছাই হয়ে আছে সিগারেটটা। সাবধানে। ব্যালেন্স করতেই তো এতকিছু। নিজে করলে হবে না, অন্যকেও বোঝাতে হবে কেন এটা তোমার ন্যূনতম প্রয়োজন। সাবধানে। হ্যাঁ। এবার হয়েছে মনে হয়। হাত কাঁপলে হবে না এবার। নিখুঁতভাবে করতে হবে আজ অন্তত এটুকু। ফোনটা ট্রিং করে উঠেছে তিনবার। শুভ মনে হয়। এখন ওসব ভাবার আর সময় নেই। হাত কাঁপলে হবে না আর এবার। একটু ছাইও আজ পড়তে দেবে না ঋদ্ধি। পুড়েছে তো কি? এক কণা ছাইও আজ সিস্টার্নের ওপর থাকবে না। সোজা রাখতে হবে। সোজা...



0 comments: