ধারাবাহিক - শৌনক দত্ত
Posted in ধারাবাহিক১৯. বিজন ঘরে বিজন ভট্টাচার্য
হৃদীবরেষু সুস্মি,
তোমার চিঠি পেলাম। আমার চিঠি এতদিনে তোমার কাছে পৌঁচ্ছালো নিশ্চয়। খোয়া গেলো নাকি? তবে কি দেরীতে পৌচ্ছাবে? বুঝতে পারছিনা। দিনগুলো সোনার খাঁচায় নেই কবেই ফ্যাকাসে হয়ে গেছে সব। গান ছেড়েছি সেই কবে এখন আর সুর নেই সব বেসুরা বাজে! এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেলো এইমাত্র। বাতাসে সোঁদা গন্ধ। আলো অস্পষ্ট ধোয়াশার মতন। পৃথিবী যেন এইমাত্র স্নান সেরে শুভ্রতাকে আলিঙ্গন করেছে। ভেজা চওড়া রাস্তা, ডান পাশের গলি, রায়বাড়ির বাগান থেকে ঝুঁকে আসা নারকেল গাছ, একটি ছাদের প্যারাপেটে একঝাঁক শালিক, কিছু ব্যস্ত মানুষ রিকশায়, স্কুলযাত্রী বাচ্চাছেলে। বারান্দার দরজা খুলে দাঁড়িয়েছিলাম অনেকক্ষণ। সন্ধ্যা নেমেছে আমার বিজন ঘরে গানটা তোমার খুব প্রিয় ছিল এটা জানার পরেই গানটা নিজে নিজে গলায় তুলে ছিলাম। প্রথম যেদিন তোমাকে গানটা শুনিয়ে ছিলাম সেদিন সন্ধ্যায় বৃষ্টিতে ভেসে যাচ্ছিল চরাচর। লোডসেডিং মোমবাতির আলোয় মুখোমুখি বসেছিলাম দুজন মনে পড়ে? এখন অবশ্য বিজন ঘরে গানটির চেয়েও বেশি মনে পড়ছে শম্ভু মিত্র, তৃপ্তি মিত্র, ঋত্বিক ঘটকদের মতন আরেক নাট্যব্যক্তিত্ব বিজন ভট্টাচর্যকে। বাঙালির অদ্ভুত এক ধরনের গ্রহণ-বর্জনের ছাঁকনি আছে। বিজন ভট্টাচার্য-কে আমরা সে রকমই আমাদের পরিচিত বা চর্চিত বৃত্তের বাইরেই সসম্মানে সরিয়ে রেখেছি। খেয়াল করে দেখবে বাংলা থিয়েটার নাটক নিয়ে যত কথা হয় তাঁর কর্মীদের নিয়ে যত আলোচনা সমালোচনা হয় সেখানে বিজন ভট্টাচার্য কেমন যেন আড়ালের মানুষ! বাংলা নাট্যান্দোলন নিয়ে কথা হলেও দেখি তাঁর সহকর্মীদের নাম যেভাবে উল্লাসে উচ্চারিত হয় বিজন ভট্টাচার্য নামটি সেভাবে উচ্চারিত হয়না, একুশ শতকে পৌঁছেও বিজন ভট্টাচার্যের নাট্যদর্শন এবং সমাজভাবনা নিয়ে আলোচনা করতে ‘ভয়’ পায় বাংলা মঞ্চ। অথচ বাংলা সাহিত্য ও নাটকের ইতিহাসে তাঁর পরিচয় শুধুই ‘নবান্ন’!
বিজন ভট্টাচার্য-এর মনস্তাত্ত্বিক গঠন বুঝতে হলে খানিক ইতিহাস ঘাঁটতে হবে, সেখানে দেখবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরুর সময় বিজন বাবুর বয়স সাত আট বছর। ১৯১৮ সালের ১১ নভেম্বর প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলো তখন তার যা বয়স তিনি বোঝেন সবই। এরই মধ্যে ঘটে গিয়েছে বলশেভিক বিপ্লব ও সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত রাশিয়ার আবির্ভাব। বদলে গিয়েছিল বিশ্বের মানচিত্র। এদেশে তখন স্বাধীনতা আন্দোলন গতি পেয়েছে গান্ধিজি্র নেতৃত্বে। ১৯২০ সালের ৩০ অক্টোবর-২ নভেম্বর মুম্বাইয়ের এম্পায়র থিয়েটারে সম্মেলনের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠা লাভ করে অল ইন্ডিয়া ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস (এআইটিইউসি)। ১৯২২ সালে গঠিত হয় বেঙ্গল ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন। ১৯২২ সালে যে ১০টি ইউনিয়ন নিয়ে বেঙ্গল ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন গঠিত হয়েছিল তার কোনোটাতে শ্রমিক সদস্য ছিল না। অর্থাৎ শ্রমিক আন্দোলন ছিল অশ্রমিক পেশাজীবীদের হাতে। ১৯২৩-২৪ সাল থেকে প্রচেষ্টা শুরু হলেও ১৯২৬-২৭ সাল থেকে কমিউনিস্টরা জোরেশোরে ট্রেড ইউনিয়ন পরিচালনায় অংশ গ্রহণ করতে থাকে। সংস্কারবাদী নেতৃত্বের পরিবর্তে শ্রমিকরা নিজেরাই ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনে কমিউনিস্ট নেতৃত্বকে সাদরে গ্রহণ করছিল। চটকল, সুতাকল, ম্যাচ, ট্রাম কর্পোরেশনের সাফাইকর্মীদের বিদ্যমান সংগঠনগুলোতে সহজেই নেতৃত্বে আসীন হয়ে যান কমিউনিস্ট ট্রেড ইউনিয়ন কর্মীরা। ১৯২৮-২৯ সালে বাংলা প্রদেশে শ্রমিক আন্দোলন তুঙ্গে উঠে। এইসব যখন ঘটছে তিনি তখনো কলকাতা আসেননি। ১৯৩০এ ১৫বছরের তরুণ বিজন চলে এলেন কলকাতায়, ভর্তি হলেন আশুতোষ কলেজে। ছাত্র অবস্থাতেই সক্রিয়ভাবে অংশ নিলেন স্বাধীনতা আন্দোলনে। ফলে অসম্পূর্ণ থেকে গেলো কলেজ শিক্ষা। আনন্দবাজার পত্রিকার প্রখ্যাত সাংবাদিক সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার ছিলেন বিজনের মামা। বিজন চাকরি পেলেন আনন্দবাজারে ১৯৩৮-৩৯এ। ছোট ফিচার লেখা দিয়ে শুরু হল তাঁর লেখক জীবন। বাংলায় কমিউনিস্ট পার্টির প্রভাব বাড়ছে যখন তখন ১৯৩৪ সালের ২৩ জুলাই ব্রিটিশ রাজ ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ১৯৩৫ সালের মার্চ মাসে কলকাতার ১৩টি কমিউনিস্ট মনোভাবাপন্ন গণসংগঠনকে নিষিদ্ধ করা হয়। নিষিদ্ধ পার্টির কাজ থেমে থাকেনা। দ্বিতীয় বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলনও গোপনে অনুষ্ঠিত হয় চন্দননগরে ১৯৩৮ সালের নভেম্বর মাসে। ৫০ জন প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। সম্পাদক নির্বাচিত হন নৃপেন চক্রবর্তী। অন্যান্য সদস্যরা ছিলেন মুজফ্ফর আহমেদ, আব্দুল হালিম, সোমনাথ লাহিড়ী, রণেন সেন, পাঁচুগোপাল ভাদুড়ী ও গোপেন চক্রবর্তী। ১৯৩৯ সালে পাঁচুগোপাল ভাদুড়ীকে সম্পাদকের দায়িত্ব দেয়া হয়। বিজন ভট্টাচার্য ১৯৪০এ মুজফ্ফর আহমেদের সান্নিধ্যে আসেন ও আকর্ষিত হন কম্যুনিস্ট পার্টির প্রতি। ১৯৪২ সালের ২৩ জুলাই ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি এবং গণসংগঠনসমূহের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়। বিজন ভট্টাচার্য কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ পেলেন ১৯৪২এ। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পর ১৯৪৩ সালের ১৮-২১ মার্চ বঙ্গীয় প্রাদেশিক কমিটির তৃতীয় সম্মেলন কলকাতার ওয়ালিংটন স্কোয়ারে অনুষ্ঠিত হয়। ভবানী সেন সম্মেলনে রাজনৈতিক-সাংগঠনিক রিপোর্ট উত্থাপন করেন। সম্পাদক নির্বাচিত হন ভবানী সেন। ১৯৪৪এ আনন্দবাজারের চাকুরি ছেড়ে হলেন কমিউনিস্ট পার্টির সর্বক্ষণের কর্মী বা হোলটাইমার।
এই দৃশ্যপট আত্মস্থ করলে বিজন ভট্টাচার্য ও তাঁর সৃষ্টিকে বুঝতে সহজ হয় কেননা তাঁর নাট্যচিন্তা ও সৃজনের মূল উৎস ছিল শোষিত-নিপীড়িত-বঞ্চিত মানুষের প্রতি গভীর সহানুভূতি ও সমাজ পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা। বুঝতে শেখার কাল থেকে তিনি বিপ্লবই দেখেছেন তাই হয়ত দিনবদলের স্বপ্নে ছিলেন বিভোর। নাটককে তাই কেবল একটা ‘পারফর্ম্যান্স’ হিসেবে দেখতেন না। সমাজ বদলের হাতিয়ার বলতে তিনি বিশ্বাস রেখেছিলেন শিল্পে। থিয়েটারকে তিনি মনে করতেন সাধারণ মানুষের কথন। যা কেবল সাধারণ মানুষের ভাল-মন্দ-দ্বিধা-দ্বন্দ্বের কথা বলবে না। নাটকের মধ্য দিয়ে মানুষও হয়ে উঠবেন সেই গল্পের এক-একজন কুশীলব। দর্শক এবং রঙ্গকর্মী সকলে একত্রে ঢুকে পড়বেন থিয়েটারের অঙ্গনে। তার পরে বিপ্লব ঘটে যাবে। জীবন, রাজনীতি এবং থিয়েটার নিয়ে এ ভাবেই মিলেমিশে ছিলেন বিজন ভট্টাচার্য কোনও একটি সত্তাকে বাদ দিয়ে তাঁর অন্য সত্তাকে বোঝা মুশকিল। যাপন-অর্থনীতি-রাজনীতি-পরব— সব নিয়ে মাখামাখি যিনি, তিনি নিজেই আসলে একটা থিয়েটার! মোনোলগ। আমাদের চোখে দেখা বামপন্থা রাজনীতির সাথে সেইসময়ের রাজনীতিকে মেলানো যাবেনা কিছুতেই আর তাই সেই সময়কালে উঁকি দিলে দেখা যাবে একদিকে বিশ্বযুদ্ধের সর্বগ্রাসী প্রভাব অন্যদিকে আভ্যন্তরীণ রাষ্ট্রবিপ্লব – এই দুয়ে মিলে বাঙালির সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবন নিদারুণভাবে বিপর্যস্ত করেছিল। অসহায় অগণিত ছিন্নমূল মানুষ পুরানো শিকড় ছেড়ে পাড়ি দিল আরো অন্ধকার অনিশ্চয়তার পথে। যুদ্ধ, মন্বন্তর, দাঙ্গা সমবায়ে দেশভাগ বাঙালির জীবন করাল বিপর্যয়, কুৎসিত বিভীষিকার সামনে দাঁড় করিয়ে দিল। ভৌগলিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনে সামাজিক পারিবারিক পরিবর্তনকেও ত্বরান্বিত করল। বাঙালি পরিবারের আদর্শের বদল ঘটল, একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে গেল, শ্রম ও বিত্তের ভিত্তিতে সমাজ গড়ে উঠল, মেয়েদের গৃহপালিত লজ্জা খসে গেল, সর্বোপরি বেদনা ও বঞ্চনা তাদের নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়াল। স্বাভাবিকভাবেই এর প্রভাব পড়ল সংস্কৃতি জগতেও। ছায়াসুনিবিড় গ্রামের পটভূমি বদলে গেল শ্রী হীন কোলাহলময় শহরতলিতে, নাট্যকারও অভিনিবেশ করলেন জীবনের রূঢ় সত্য প্রতিষ্ঠায়। এবং এর সঙ্গে নাট্যকার বিষয়ের গুরুত্বকে অতিক্রম করে আঙ্গিকের অভিনবত্বের ব্যাপারে ঝুঁকলেন। পরিচিত রূঢ় বাস্তব ভরা কাহিনি নয়, তার উপযুক্ত সাধারণের জন্য বাহুল্য বর্জিত বাস্তব মঞ্চই দর্শককে আকর্ষণ করবে — এই ভাবনা থেকেই নাটকগুলিতে দর্শকের সঙ্গে সমন্বয় করার প্রয়াস দেখা দিল। এবং এই ভাবনা থেকেই নাট্যসাহিত্যের ইতিহাসে গণনাট্যের জন্ম দিল। অর্থাৎ গণনাট্যের উদ্ভব ঘটল সমাজমানসের এক রাজনৈতিক ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক কার্যকারণে।
'গন্ধর্ব', বিজন ভট্টাচার্য বিশেষ সংখ্যায় কেমন করে নাট্যের অন্দরে প্রবেশ করলেন বিজন ভট্টাচার্য, সে হদিশ পাওয়া যায় তাঁর নিজস্ব বয়ানে— "১৯৩০ থেকে আমি কলকাতায়, তার আগে গ্রামে ছিলাম। অনেকদিন ছিলাম বসিরহাট সাতক্ষীরায়। সেইজন্য পূর্ব ও পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত আঞ্চলিক ভাষা আমার জানা ছিল। আমার ভীষণ ভালো লাগত ঐ গ্রামের মানুষদের সঙ্গে থাকতে, ওদের সঙ্গে মিশতে। আমি লক্ষ করেছিলাম ওদের রিএ্যাকশন কী হয়, ওরা কেমন করে কথা বলে। অসুখে কেমন করে কষ্ট পায়। এই মাটিটাকে খুব চিনতাম, ভাষাটাও জানতাম। আমাকে যা ভীষণভাবে কষ্ট দিত, কোন্ আর্টফর্মে আমি এদের উপস্থিত করতে পারব। তারাশঙ্কর বা শরৎ চাটুজ্জের মত আমার কলম ছিল না, কিন্তু আমি দেখতাম তাঁরা তো কিছুই করছেন না। আমার জ্বালা ধরতো কারণ আমি বরাবরই জাতীয় আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলাম, কখনো 'ফ্রিন্জ'-এ কখনো ভেতরে ছিলাম।" সময়কাল মাথায় রাখলে দেখা যায় সেইসময় বাংলা রঙ্গমঞ্চে পেশাদারি বাণিজ্যিক নাট্যশালায় চলেছে সমাজজীবনের বিপর্যয় থেকে উটপাখির মত মুখ লুকিয়ে গতানুগতিক ঐতিহাসিক, পৌরাণিক এবং উচ্চবিত্ত-মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের সমাজজীবনের রঙিন ছবিসর্বস্ব নাটকের রমরমা। আবেগসর্বস্ব জাতীয়তাবাদ, ব্যক্তিকেন্দ্রিক ভাবপ্রবণতা, দেবলীলার ভক্তিভাষ্য, ধর্ম ও দেশাভিমান এবং সস্তা সেন্টিমেন্টের তরল আবেগসর্বস্বতার সীমাবদ্ধ গণ্ডিতেই চলছিলো বাংলা নাটকের চর্বিতচর্বণ। বিজন ভট্টাচার্য যখন বাংলা মঞ্চে কাজ শুরু করেছেন সেই সময় বাংলাদেশের সামাজিক অবস্থার দিকে তাকালে দেখবে শতাব্দীর বীভৎসতম মন্বন্তরে মৃত্যু হচ্ছে লক্ষ লক্ষ মানুষের, শহর কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় 'ফ্যান দাও মা'-র মর্মভেদী চীৎকারে চরম বীভৎসার মুখোমুখি বাংলার মানুষ, শিল্পী সাহিত্যিকরাও দলমত নির্বিশেষে পথে নেমে পড়েছেন সেই দুঃসময়ের দিনে, 'আমাদের নবজীবনের গান'-এর স্রষ্টা কালজয়ী সঙ্গীতস্রষ্টা জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রর এক লেখায় পাই সেই সময়ের ছবি— "১৯৪৩ সাল, বাংলায় ১৩৫০। গোটা বাংলাদেশ জুড়ে বিশেষ করে শহর কলকাতায়, মহামন্বন্তরের করাল ছায়া চারদিক অন্ধকার করে দিল। আর ঘরে থাকা যাচ্ছিল না। জমাট সাহিত্যিক আড্ডা ও রিহার্সাল ছেড়ে আমরা সবাই রাস্তায় নেমে পড়লাম, চরম বিপর্যয় ও বীভৎস মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়ালাম।" এমন একটা চরম দুঃসময়ের দিনে কি অবস্থান ছিল বিজন ভট্টাচার্যের? জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রর মতে ভারতীয় ভাষায় গণ নাটকের প্রথম স্রষ্টার আর এক জীবনসংবেদী শিল্পী প্রবাদপ্রতিম চিত্রপরিচালক ঋত্বিক ঘটকের বয়ানে শোনা যাক সেই ভূমিকার কথা— "বিজনবাবুই প্রথম দেখালেন কি করে জনতার প্রতি দায়িত্বশীল হতে হয়, কি করে সম্মিলিত অভিনয়-ধারার প্রবর্তন করা যায় এবং কি করে বাস্তবের একটা অংশের অখণ্ডরূপ মঞ্চের উপর তুলে ধরা যায়। আমরা যারা এমন চেষ্টা করেছিলাম, সেসব দিনের কথা ভুলব না। হঠাৎ একটা প্রচণ্ড আলোড়ন বাংলার একপ্রান্ত থেকে আর এক প্রান্তকে বিদ্যুৎস্পৃষ্ঠবৎ শিহরিত করে তুলল।" ঋত্বিক ঘটক বর্ণিত সেই বিদ্যুৎশিখার নাম 'নবান্ন', যে নাটককে শম্ভু মিত্রও অভিহিত করেছেন 'এপিক নাটক' হিসাবে, শম্ভু মিত্র বলেছিলেন ‘নবান্ন’-র আগে অবধি আমাদের সব ট্র্যাজেডিই পারিবারিক ট্র্যাজেডি; ‘নবান্ন’ এল এপিকের ব্যপ্তি নিয়ে। কী বলতে চেয়েছিলেন শম্ভুবাবু? যাকে বলা যায় নাট্য সংহতি ও নাট্য প্রবহমানতা, তা পুরোপুরি অস্বীকৃত হয়েছিল প্রবল সাহসী এই নাটকে। এই নাট্য আধুনিকতার মূল ভাষ্যের প্রতি নজর রেখে মুহূর্তনির্ভর। দৃশ্যের পর দৃশ্য জুড়ে আছে কান্নার একটি অদৃশ্য সুতো দিয়ে। তাই শম্ভু মিত্র বলেন— ‘একটা দৃশ্যে কুঞ্জকে কুকুরে কামড়েছে। শোভা কুকুরকে লক্ষ্য করে ওয়াইল্ডলি শাউট করে তারপরই সফটলি বলে: জল খাবে? জল তেষ্টা পেয়েছে?’ মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য এই দৃশ্য দেখে বলেছিলেন, এটা শাশ্বত। এই মুহূর্তের জয় আধুনিকতার জরায়ুতে নিহিত। বোদলেয়ার, মার্ক্স ও নিৎসে-তে এই মুহূর্ত-বন্দনা ছত্রে-ছত্রে। বিজনবাবুর প্রথমাঙ্ক আর দ্বিতীয়াঙ্কের মধ্যে যাঁরা মিল খুঁজে পান না, অথবা শেষ অংশটিকে যাঁদের প্রক্ষিপ্ত মনে হয়, তাঁরা বুঝতেই পারেন না, যে তিনি আত্ম-আখ্যান রচনা করেননি, তাঁর মেধা নিবেদিত হয়েছে নাট্যসন্দর্ভ প্রণয়নে। এই সন্দর্ভধর্মিতা উনিশ শতকের শিল্পচর্চার একটি মূল অন্বিষ্ট। ‘নবান্ন’ একটি প্রকল্প, কিন্তু তা বাস্তবের অনুলিখন নয়। যে নাটকে আঁকা রয়েছে মানুষের আত্মিক অপমৃত্যু, মনুষ্যত্বের চরম লাঞ্ছনার মর্মস্পর্শী ছবি, নবান্ন নাটক রচনার তাগিদ ও মানসিকতা বোঝাতে গিয়ে বিজন বলেছেন—"সেই সময় ডি. এন. মিত্র স্কোয়ারের পাশ দিয়ে রোজ আপিস যাই। রোজই দেখি গ্রামের বুভুক্ষু মানুষের সংসারযাত্রা, নারী-পুরুষ-শিশুর সংসার। এক একদিন এক একটা মৃতদেহ নোংরা কাপড়ে ঢাকা। মৃতদেহগুলো যেন জীবিত মানুষের চেয়ে অনেক ছোট দেখায়। বয়স্ক কি শিশু, আলাদা করা যায় না, ... আপিস থেকে ফিরবার পথে রোজই ভাবি, এইসব নিয়ে কিছু লিখতে হবে। কিন্তু কীভাবে লিখব? ভয় করে গল্প লিখতে, সে বড় সেন্টিমেন্টাল প্যানপেনে হয়ে যাবে। "একদিন ফেরবার পথে কানে এলো, পার্কের রেলিঙের ধারে বসে এক পুরুষ আর এক নারী তাদের ছেড়ে আসা গ্রামের গল্প করছে, নবান্নের গল্প, পুজো-পার্বণের গল্প। ভাববার চেষ্টা করছে তাদের অবর্তমানে গ্রামে এখন কী হচ্ছে। আমি আমার ফর্ম পেয়ে গেলাম। নাটকে ওরা নিজেরাই নিজেদের কথা বলবে।"
'নবান্ন'র পর একের পর এক নাটক লিখেছেন বিজন ভট্টাচার্য। 'জীয়নকন্যা', 'গোত্রান্তর', 'দেবীগর্জন', 'মরাচাঁদ', 'কৃষ্ণপক্ষ', 'আজ বসন্ত', 'লাশ ঘুইর্যা যাউক', 'সোনার বাংলা', 'চুল্লী', 'হাঁসখালির হাঁস'। নাট্যদলও তৈরি করেছেন একের পর এক—ক্যালকাটা থিয়েটার গ্রুপ, কবচকুণ্ডল। দুঃখজনক হলেও সত্যি কি জানো বিশ শতকের বাংলা নাট্যকলার ইতিহাসে ট্র্যাজিক নায়কের প্রথমজন যদি হন শিশিরকুমার ভাদুড়ি, তা হলে ইতিহাসের ট্র্যাজিক নায়কের দ্বিতীয় দাবিদার সম্ভবত বিজন ভট্টাচার্য। তাঁর প্রথম পূর্ণাঙ্গ নাটক ‘নবান্ন’ (১৯৪৪) বাংলা নাটকের ইতিহাসকে নতুন করে লিখেছিল, অথচ এখন তাঁর নাটক কদাচিৎ অভিনীত হয়। শুধু তা-ই নয়, তাঁর নিজের দল ক্যালকাটা থিয়েটারের (১৯৫১) বাইরে, যাকে এখন গ্রুপ থিয়েটার বলা হয় তার সবচেয়ে সফল প্রযোজনাগুলির মধ্যে বিজন ভট্টাচার্য-এর কোনও নাটকের নাম করা যাবে না, এমনকী গণনাট্য সঙ্ঘও ‘নবান্ন’-র পরে তাঁর অন্য নাটক নিয়ে বেশি উৎসাহ দেখায়নি। এ বিষয়ে শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের প্রধান নাটককারদের মধ্যে বিজন ভট্টাচার্যই সম্ভবত সবচেয়ে অবহেলিত। তাঁর অনুজ নাটককারদের রচনা অন্য অনেক দল গ্রহণ করেছে— উৎপল দত্ত, বাদল সরকার, মনোজ মিত্র, মোহিত চট্টোপাধ্যায়— তাঁরা অন্য বহু দলকে নাটক-রসদ জুগিয়েছেন, এখনও তাঁদের নাটক অনেক দলের দ্বারা অভিনীত হতে দেখা যায়। অথচ যাঁর নাটক নিয়ে বাংলা নাটকের ইতিহাস পেশাদার রঙ্গমঞ্চ থেকে নিজেকে উপড়ে নিয়েছিল, এবং পেশাদার রঙ্গমঞ্চকে তার পরবর্তী নির্মাণের ক্ষেত্রে এক রকম অপ্রাসঙ্গিক করে তুলেছিল, সেই বিজন ভট্টাচার্যের পরেকার সৃষ্টিগুলি মূলত তাঁরই একার প্রযোজনা হয়ে রইল। তাও সবগুলি নয়, নিজের কয়েকটি নির্বাচিত নাটকই তিনি নিজে ক্যালকাটা থিয়েটারের এবং পরে কবচকুণ্ডলের (১৯৭০) হয়ে প্রযোজনা করে যেতে পেরেছিলেন। তারও মধ্যে একটি-দুটির বেশি একাধিক বার প্রযোজনা করতে পারেননি। একাধিক নাটক— যেমন ‘জননেতা’, ‘জতুগৃহ’, ‘অবরোধ’ তো প্রযোজিতই হয়নি। বিস্ময়ের কথা এই যে, নাকি বাংলা নাট্য-সংগঠনের ইতিহাসে এটা খুব বিস্ময়ের কথা নয়ও যে, কোনও এক বিচিত্র বিচ্ছেদ-রসায়নে তাঁর নিজের হাতে তৈরি নাট্যদল ক্যালকাটা থিয়েটারও তাঁকে ছাড়তে হয়।
আমার মনে বারবার ঘুরে ফিরে এসেছে একটি কথা বিজন ভট্টাচার্য ব্রাত্য কেন? তোমার কি মনে হয় বাঙালি বা বাংলা থিয়েটার তাকে ভাঁজ করে গুছিয়ে রাখে কেন? আমার কি মনে হয় জানো বিজন ভট্টাচার্যকে ধারণ করার মতন বীজতলা বাংলা থিয়েটারে নেই। রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত তাঁকে বলছেন ‘অযত্নে রুক্ষ প্রতিভাবৃক্ষ’। প্রথমে গণনাট্য সংঘ, পরে তাঁর নিজের গ্রুপ, ক্যালকাটা থিয়েটার এবং কবচ কুণ্ডল। প্রথমটাতে অধিক সন্ন্যাসীর গাজন, গ্রুপ দুটির ব্যাপারে বলা যায় একটি নাট্যদল গড়ে তোলা এবং সক্রিয়ভাবে টিকিয়ে রাখার সংগঠনক্ষমতা বা কৌশলের অভাব ছিল তাঁর চরিত্রে। তার থেকেই শৃঙ্খলাহীনতার জন্ম। সংগঠন এলোমেলো হলে সৃজনকর্মেও তার ছাপ পড়ে। তাই, যতই দুর্ভাগ্যজনক এবং ক্ষতিকর হোক না কেন, ঐ সময়ের নাট্যকর্মীদের ভাবনার জগতে বা মননে তেমন কোনও ছাপ ফেলতে পারল না বিজনবাবুর প্রযোজনা, একক অভিনয় প্রতিভায় যেমন পেরেছেন ‘মেঘে ঢাকা তারা’, ‘সুবর্ণলতা’ বা ‘পদাতিক’ ছবিতে, কিংবা উৎপল দত্তর ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ মঞ্চ-প্রযোজনায়।
যে সময়ে বিজন ভট্টাচার্য দেখতে বুঝতে শিখছেন সেই সময়ে কলকাতায় পেশাদারি থিয়েটার যথেষ্টই জনপ্রিয়। ক্লাসিক্যাল থিয়েটার কখনওই টানেনি তাঁকে। আকর্ষণ করেনি পেশাদার ব্যবসায়িক থিয়েটার। বিজন ভট্টাচার্যের বিষয় ভাবনার সঙ্গে মেলে না তাঁর প্রয়োগ ভাবনা। জীর্ণ পুরাতন মঞ্চ ব্যবস্থায় ব্যতিক্রমী নতুন চিন্তার নাটক! তাই হয়ত দল গোছাতে চাননি কখনো, অভিনয়কে, থিয়েটারকে বোধহয় খুব গোছালো ভাবে দেখতে চাননি বিজন ভট্টাচার্য বরং সংগ্রামের পথটাই ধরে রাখতে চেয়েছিলেন। নাট্যদল গড়ে তোলা এবং সক্রিয়ভাবে টিকিয়ে রাখার সংগঠনক্ষমতা বা কৌশলের অভাব ছিল তাঁর চরিত্রে। তার থেকেই শৃঙ্খলাহীনতার জন্ম। সংগঠন এলোমেলো হলে সৃজনকর্মেও তার ছাপ পড়ে। তাই, যতই দুর্ভাগ্যজনক এবং ক্ষতিকর হোক না কেন, ঐ সময়ের নাট্যকর্মীদের ভাবনার জগতে বা মননে তেমন কোনও ছাপ ফেলতে পারল না বিজন ভট্টাচার্য-র প্রযোজনা, একক অভিনয় প্রতিভায় যেমন পেরেছেন ‘মেঘে ঢাকা তারা’, ‘সুবর্ণলতা’ বা ‘পদাতিক’ ছবিতে, কিংবা উৎপল দত্তর ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ মঞ্চ-প্রযোজনায়। মনে রাখা প্রয়োজন তিনি বারবার বলেছেন, ওই ধরনের থিয়েটারের রীতি, শৈলী কোনও কিছুই তাঁকে আকর্ষণ করেনি। নাটক রচনার ক্ষেত্রেও নয়, পরিচালনার ক্ষেত্রেও নয়। বরং তাঁকে নাটক লিখতে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে রেশনের লাইন। যেখানে তিনি দেখেছেন, ধর্ম-জাতি-সামাজিক স্তরের বেড়া ভেঙে সকলে একত্রে দাঁড়িয়েছেন। যোগাযোগ তৈরি হয়েছে একের সঙ্গে অপরের। কথোপকথন হয়েছে। শুধু তাই নয়, এই লাইনেই তিনি দেখেছেন, সংকীর্ণ স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে প্রশাসন, জোতদারের বিরুদ্ধে শ্রেণিস্বার্থ না ভেবে একত্রে প্রতিবাদ করছে জনসাধারণ। ওই জনসাধারণের মধ্যেই কমিউনিস্ট আস্ফালন দেখেছিলেন। বিজন ভট্টাচার্য বাংলা নাটকের ইতিহাসে এক বিপ্লবী ব্যক্তিত্ব হলেও, মূলধারার আলোচনায় তিনি যে উপেক্ষিত তার কারণ খুঁজতে গিয়ে পাই তাঁর আপসহীন, বোহেমিয়ান ব্যক্তিত্ব এবং দলীয় রাজনীতির অনুগত না থাকা, গণনাট্য আন্দোলনের (IPTA) প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হয়েও তিনি বাণিজ্যিকীকরণের বিরোধিতা করেছিলেন, যার ফলে তৎকালীন রাজনৈতিক গোষ্ঠী ও মূলধারার সাংস্কৃতিক চর্চা থেকে তিনি দূরত্বে থেকে গিয়েছেন। তাঁর নাটকগুলো ছিল চরমভাবে সময়-নির্দিষ্ট (Period-specific)। প্রচারধর্মিতা এবং উচ্চকিত সাম্যবাদী আদর্শের প্রভাব ছিল স্পষ্ট। বর্তমানের দর্শকরা 'বক্তৃতা'ধর্মী বা 'আদর্শবাদী' নাটকের চেয়ে সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা বা পরাবাস্তববাদী (Surrealist) নাটক বেশি পছন্দ করে। কবি মণীন্দ্র রায় একবার বিজনবাবুকে এইসব নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন। উত্তরে তিনি বলেন “এ দেশে এসব প্রত্যাশা থাকলে কবিতা লেখা বা নাটক করা বন্ধ করে দেওয়াই ভাল। তোমার উপায় নেই তাই তুমি কবিতা লেখো, আমারও উপায় নেই বলে নাটক করি। ঋত্বিক যে সিনেমা করে তাও একই কারণে। অন্য কোন উপায় থাকলে করত না। আমরা তো আর কিছু করতে জানি না, তাই করে যেতে হবে। কিন্তু করতে গিয়ে তো আর অন্য দলে নাম লেখাতে পারব না, কারণ এই রাজনীতিটা আমার বিশ্বাসের জায়গা।”আরেকটি বড় কারণ হতে পারে নাটকগুলোর ভাষা বিজন ভট্টাচার্য তাঁর নাটকে খাঁটি গ্রামীণ এবং আঞ্চলিক উপভাষা ব্যবহার করতেন। বর্তমানের নগরায়ণের যুগে এবং ভাষার বিবর্তনের ফলে সেই আদিম ও প্রাকৃত ভাষা অনেক সময় আজকের দর্শকদের কাছে দুর্বোধ্য বা কৃত্রিম মনে হতে পারে। ভুলে গেলে চলবেনা মঞ্চের ভাষা আর কথ্য ভাষা নিয়ে দীর্ঘ দিন কাজ করেছেন বিজন। কাজে লেগেছিল ’৪২-’৪৩ সাল জুড়ে সমগ্র বাংলা প্রদেশ পরিক্রমা। বিজন ভট্টাচার্য গবেষক শমীক বন্দ্যোপাধ্যায় মনে করেন, ‘টুনে, মালো, বেদে শোলার কারিগর, প্রতিমাশিল্পী, সাপুড়ে, আউল-বাউল, জেলে, এমন নানা সম্প্রদায়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ মেলামেশার মধ্য দিয়ে বিজনবাবু তাদের লোকাচার, জীবনদর্শন, লোকশ্রুতি, সংস্কার ও বিশ্বাস, ভাষা, কথার টান ও সুর আত্মস্থ করেছেন। ওই অভিজ্ঞতা ও শিক্ষাই তাঁর নাটকের ভাষা ও চাল নির্ধারণ করেছে।’নিখুঁতভাবে খেয়াল করলে দেখবে অঞ্চল ভেদে ডায়লেক্টের তফাতকেই নাটকে বারবার ব্যবহার করার চেষ্টা করেছেন বিজন ভট্টাচার্য। আইপিটিএ ছাড়ার পরে নিজের দলেও সেই ডায়লেক্ট ভিত্তিক সংলাপের উপরেই জোর দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর দলের অভিনেতারা অনেকেই পরে বলেছেন, উচ্চারণ নিয়ে কী ভয়ংকর খুঁতখুঁতে ছিলেন তিনি! ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঠিক উচ্চারণের জন্য লড়াই করে যেতেন। ব্যক্তিজীবনও তাকে বিস্মৃতির দিকে ঠেলে দিয়েছিল, মহাশ্বেতা দেবীর সাথে দাম্পত্য বিচ্ছেদ এবং জীবনযুদ্ধে টিকে থাকার ব্যক্তিগত সংগ্রামও তো কম নয় তাঁর! বিজন ভট্টাচার্য শুধু গল্পকার, নাট্যকার, গীতিকবি বা অভিনেতা নন, শুধু ঋত্বিকের সমধর্মী এক শিল্পী নন, নিজ-অধিকারী এক চিন্তাবিদ।এত বিচিত্র সম্বল নিয়েও মানুষটি ইতিহাসের শিকার হয়ে গেলেন, এই যা দুঃখ। তবে আমার বারবার মনে হয় বিজন ভট্টাচার্যের নাটকের আর্তি ও হাহাকার আজও প্রাসঙ্গিক। ক্ষুধার জ্বালা বা ভিটেমাটি হারানোর যন্ত্রণা আজও পৃথিবীর বহু প্রান্তে সত্য। বিজন ভট্টাচার্যের আর্তিগুলোকে যদি প্রতীকী (Symbolic) বা এক্সপ্রেশনিস্টিক ঢঙে উপস্থাপন করা যায়, নাটকের ভাষাকে কেবল মেদিনীপুর বা গ্রামীণ উপভাষার শিকলে না বেঁধে, তার ভেতরের সার্বজনীন মানবিক আর্তনাদকে গুরুত্ব দেয়া যায় কেননা 'ক্ষুধা'র কোনো ভৌগোলিক সীমানা বা ভাষা নেই। বর্তমান পৃথিবীতে জমিদারের লাঠিয়াল না থাকলেও সাম্রাজ্যবাদের মোড়কে করপোরেট আগ্রাসন আর অদৃশ্য পুঁজির শোষণ আছে। বিজন ভট্টাচার্যের শোষিত কৃষকের চরিত্ররা যদি আজকের দুনিয়ার 'প্রান্তিক শ্রমজীবী'র ছায়া হয়ে ওঠে আর সেই ভাবনাকে যদি নতুন করে মঞ্চস্থ করা যায় তবে সেই নাটক আগের চেয়েও বেশি বিস্ফোরক হয়ে উঠবে। এবং তা অবশ্যই আজকের আধুনিক দর্শকদের স্নায়ুকে নাড়া দিতে বাধ্য।
বিজন ভট্টাচার্য বিস্মৃত নন, বরং আমরা তাঁর সৃষ্টিকর্মকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে ভয় পাচ্ছি। তাঁর নাটকগুলোকে কেবল 'ঐতিহাসিক দলিল' হিসেবে মিউজিয়ামে না রেখে, আজকের সামাজিক অস্থিরতার আয়না হিসেবে ব্যবহার করা সময়ের দাবি। বিজন ভট্টাচার্যের নাট্যচর্চা আজ এক অদ্ভুত বৈপরীত্যে দাঁড়িয়ে। বিজন ভট্টাচার্য আসলে এমন এক শিল্পী, যিনি পচে যাওয়া সমাজকে ব্যবচ্ছেদ করতে শিখিয়েছিলেন। তাই যতক্ষণ পৃথিবীতে বৈষম্য আর হাহাকার থাকবে, ততক্ষণ বিজন ভট্টাচার্য ও তাঁর নাটককে 'অপ্রাসঙ্গিক' বলার সুযোগ নেই। যে 'নবান্ন' একদিন মেঠো পথ থেকে উঠে এসে কলকাতার মঞ্চ কাঁপিয়েছিল, আজ তা ক্রমশ মধ্যবিত্তের বিদগ্ধ 'বইয়ের তাকে' সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। শহরকেন্দ্রিক বামপন্থা বিজন ভট্টাচার্যকে একটি নির্দিষ্ট 'আইকন' বা 'নস্টালজিয়ায়' বন্দি করে ফেলেছে, যেখানে তাঁর প্রয়োগবাদী পরীক্ষা-নিরীক্ষার চেয়ে রাজনৈতিক আবেগই বেশি গুরুত্ব পায়। তাঁর ব্যবহৃত দেশজ ডায়লেক্ট বা আঞ্চলিক ভাষা আজ কেবল ভাষাতাত্ত্বিক কৌতূহল; আধুনিক মঞ্চে তার সেই আদিম, রুক্ষ ঘ্রাণ যেন নাগরিক মার্জিত উচ্চারণে হারিয়ে গেছে। থিয়েটার যখন দল থেকে দলে ঘোরে, তখন বিজনের সেই 'গণসংগ্রামের দর্শন' অনেক সময় কেবল উদযাপনের আনুষ্ঠানিকতায় রূপ নেয়। বর্তমানের ভোগবাদী সমাজে তাঁর সেই ক্ষুধার আর্তি আর ভিটেমাটি হারানোর যন্ত্রণা তাই যতটা না জীবন্ত দলিলে, তার চেয়ে বেশি মূর্ত হয় অ্যাকাডেমিক নস্টালজিয়ায়। বিজন কি তবে কেবল এক অতীতচারী স্মারক? নাকি আমাদের আধুনিক নাট্যভাবনা তাঁর সেই মাটির গভীরতাকে ধারণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে? আমি মনে করি বর্তমানের আধুনিক মঞ্চসজ্জা ও নাগরিক ভাষা বিজন ভট্টাচার্যর সেই আদিম ও রুক্ষ নাটকীয়তাকে ধারণ করার জন্য যথেষ্ট কিন্তু প্রশ্ন হলো, বর্তমানের নাট্যপরিচালকেরা কি রাজনৈতিক মেরুকরণের বাইরে গিয়ে বিজন ভট্টাচার্যর সেই 'আগুন'কে নতুন করে জ্বালানোর সাহস করবেন?
রাত অনেক হলো সারা পাড়া ঘুমিয়ে গেছে। ল্যাম্পপোস্টগুলো নিঃসঙ্গতায় দাঁড়িয়ে আছে নির্জন, পাড়ার কুকুরগুলো নানা সুরে ডাকছে দূরে কোথাও, আজ এখানেই শেষ করছি। সামনের সপ্তাহে পাহাড়ে যেতে পারি। ফিরে এসে তোমাকে লিখবো। নিরন্তর ভালো থেকো।
অন্তে প্রেম হোক
ঋষি
০৩ মার্চ, ২০২৬



0 comments: