0

প্রবন্ধ - রাধাবল্লভ চক্রবর্ত্তী

Posted in









বাংলা ভাষার সর্বকালের অন্যতম প্রভাবশালী ও উল্লেখযোগ্য কবি হলেন শক্তি, শক্তি চট্টোপাধ্যায়। কথাটি নেহাতই গৌরবান্বিত করে দেখানোর জন্য নয়, বরং জীবনব্যাপী রচনায়, মূলত কবিতায় তাঁর যে প্রকাশ, ও তাঁর বক্তব্য এবং একইসাথে সেই বক্তব্যের প্রাসঙ্গিকতা ও প্রয়োজনীয়তা, তা-ই তাঁর কবিতাকে বাঁচিয়ে রেখেছে এবং বছরের পর বছর ধরে তাঁকে কবি হিসেবে বাঁচিয়ে রেখেছে ও জনপ্রিয় করে রেখেছে। শক্তি জীবদ্দশায় কবিতা লিখেছেন, অনুবাদ করেছেন এবং গদ্যও লিখেছেন বিস্তর। কিন্তু, তাঁর মূল প্রকাশের জায়গা মৌলিক কবিতা; যাঁকে তিনি ‘পদ্য’ বলেই ডেকেছেন সারাজীবন। কবিতাই হোক বা ‘পদ্য’, আমরা পাঠকরা কবিতা বলেই বলব, তার সংকলন নেহাত কম নয়, সংখ্যায় ৫১টি। যার মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং সার্থক কাব্যগ্রন্থ ‘ভাত নেই, পাথর রয়েছে’। ‘শ্রেষ্ঠ’ এবং একইসাথে এই যে ‘সার্থক’ কথা দুটি ব্যবহার করা হল, তার ভিত্তি পেতে গেলে, আমাদের কাব্যগ্রন্থটির কবিতাগুলির প্রতি মনোনিবেশ করে যদি অনুসন্ধিৎসু পাঠ করা যায়, তাহলে একটি ধারণা ও শব্দদুটি ব্যবহারের উদ্দেশ্য সম্পর্কে অবগত হওয়া যাবে।

এবার এইসব ক্লান্তিকর কথা ছেড়ে কবির কবিতা ও তার বিশ্লেষণের দিকেই নজর দেওয়া যাক বরং –

কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতাটিই যদি ধরা যায়, যার নামেই কাব্যগ্রন্থটি, তাহলেই আমরা দেখতে পাবো যে, এটি একটি বিবৃতি এবং একইসাথে ঘোষণাও। এই যে সাধারণ ইপ্সিত ও নিত্য প্রয়োজনীয় কিছুর অতিক্রমণ এবং তার বদলে পাওয়া যাচ্ছে এমন কিছু, যা ধারণাতীত, তার একটি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত উভয় বিশেষ্য ‘ভাত’ ও ‘পাথর’-এর ক্ষেত্রে আমরা কিন্তু পাচ্ছি। বলে রাখা দরকার, এর মধ্যে শ্লেষ বিষয়টির আগে রয়েছে মূলত বৈপরীত্য। কীভাবে? খানিক আলোচনা করে বোঝার চেষ্টা করা যাক – আমাদের এই দেশ, এই বঙ্গভূমি উভয়ই কৃষিপ্রধান, কিন্তু কখনও মনুষ্য দ্বারা সৃষ্ট অসমতার কারণে (এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে চার্চিলের শয়তানি ও বর্বরতার কারণে বাংলার যে দুর্ভিক্ষ, হাহাকার অর্থাৎ, মন্বন্তর হয়েছিল, তা আমরা সবাই কমবেশি জানি।), অন্যদিকে, এই বাংলা ভৌগোলিকভাবে এমন একটি স্থানে রয়েছে, যেখানে বন্যা, ঘূর্ণিঝড় দ্বারা বিধ্বস্ত হওয়া অনিবার্য এবং তা হয়ও। ফলে, এই বৈপরীত্য, অর্থাৎ, কৃষিপ্রধান, সুজলাসুফলা ভূমি হলেও মানুষের দু’মুঠো অন্নের খোঁজ চলে, যা আসলে এক নির্ধারিত জীবনসংগ্রামে পরিণত হয়েছে।

উপরোক্ত প্রসঙ্গে আরও দুটি বিষয় চিন্তার জানালায় উঁকি দিচ্ছে। প্রথমত, আমাদের মাথায় রাখতে হবে যে, এই রাজ্যের ১৯৬৬-র খাদ্য আন্দোলন এবং তার পূর্ববর্তী ও পরবর্তী অধ্যায়, যা এক সুগভীর প্রভাব ফেলেছিল বঙ্গের যাবতীয় বাস্তবতায়। দ্বিতীয়ত, যদিও এটি কতটা ফ্যাক্ট হিসেবে সলিড তা বলা যায় না, হয়তো সম্পূর্ণটি একটি অপসারী চিন্তন বা ভাবনা, তা সত্বেও বলা বা নেহাত প্রকাশ করা, তা হল – কোথাও গিয়ে যেন এই ‘ভাত’ ও ‘পাথর’-এর অবতারণা কেবলমাত্র ক্ষুধার নিমিত্তে নয়, বরং একটি প্রজন্মের নতুন আশা, উদ্দীপনা এবং ইংরেজি শব্দ hunger এর বাংলা প্রতিশব্দ যে ‘ক্ষুধা’, তা-ই। যে hunger শব্দটি থেকে hungry কথাটা এসেছে – শব্দটি একটি adjective বা বিশেষণ যা কিনা noun বা বিশেষ্য পদ এই কবিকে হতে পারে, দেশ-কাল-সমাজের কোনও পরিস্থিতিকে বা একটি নবীন, উঠতি, প্রাণোচ্ছ্বলময় প্রজন্মকে বোঝাতে পারে, অর্থাৎ কিনা সেই ছকভাঙা ‘হাংরি জেনারেশন’-কে হতে পারে – যার চিরতরতাজা, উৎফুল্লিত কিন্তু জাগতিক বিষাদে চুর অথচ নতুন দিশা খুঁজে এনে দিতে সদা বদ্ধপরিকর অগ্নিস্ফুলিঙ্গ এবং বহ্নিপতঙ্গ সেই ‘স্ফুলিঙ্গ সমাদ্দার’, অর্থাৎ কিনা ‘হেতোলবেতোল’ অন্ধকারে ঘুরে বেড়ানো শক্তি চট্টোপাধ্যায় নিজেই। কিন্তু এসবের মাঝে মূল কথা, বাস্তবিক রূঢ়তা এবং তার সাঙ্কেতিক বর্ণনা এবং এসবের মাঝে নিজের বা নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য যে জীবনসংগ্রাম এবং প্রাণশক্তির একপ্রকার সংরক্ষণ, ব্যবহার এবং উপযোগিতার সার্থকতা, এবং হাতে হাত মিলিয়ে এসবের সাথে বা বলা ভালো মধ্যবর্তী ব্যাপক দর্শন, তা কিন্তু কোথাও লোপ পাচ্ছে না। তা আছেই; তা রয়েছে এই বইয়ের প্রায় প্রতিটি কবিতায় প্রায় সার্থকভাবেই। উদাহরণ হিসেবে বলতে গেলে প্রথমেই এই বইয়ের দ্বিতীয় কবিতা, যা কিনা মুখে-বুকে-ফেসবুকে সবেতেই প্রায় কিংবদন্তী হয়ে রয়েছে, সেই ‘ছেলেটা’ কবিতাকে বলতে পারি। এখানেও একজন, সেটি সমাজের প্রৌঢ় হতে পারে বা বৃদ্ধ, সহজ কথায় যে কিনা আগের প্রজন্ম, সেক্ষেত্রে কবি স্বয়ংও যদি হন তাতেও বিরাট একটা আপত্তির কিছু থাকে না বলাই যায়; বলছেন: ‘ছেলেটা খুব ভুল করেছে শক্ত পাথর ভেঙে/ মানুষ ছিলো নরম, কেটে, ছড়িয়ে দিলে পারতো।/ অন্ধ ছেলে, বন্ধ ছেলে, জীবন আছে জানলায়!/ - পাথর কেটে পথ বানানো, তাই হয়েছে ব্যর্থ।’ বা, মাত্র ১০ লাইনের ক্ষুদ্র, স্বল্পায়তন কিন্তু চূড়ান্ত তীব্র ও শ্লেষাত্মক উক্ত কবিতার প্রথম লাইনের ৬ নং লাইনে গিয়ে পুনরাবৃত্তি করা বা শেষের সেই মোক্ষম লাইন ‘মানুষ বড় শস্তা, কেটে, ছড়িয়ে দিলে পারতো’ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে সম্ভবত যে কয়েকটি কথা উঠে আসে, সেগুলি খানিকটা এরকম – উচিত-অনুচিত কর্ম এবং ইংরেজি একটি ইডিওমেটিক ফ্রেজ ‘need of the hour’ – উচিত-অনুচিত বা need of the hour কোন প্রসঙ্গে বা কীসের ভিত্তিতে? এই যে সময়, যখন ‘পাথর কেটে’ সভ্যতার আলো পৌঁছে দেওয়া ও গতিপথ বিস্তৃত করা বা যাত্রা অব্যাহত ও অক্ষুণ্ণ রাখার বদলে বিবর্তিত হয়ে সবচেয়ে উন্নত ও প্রগতিশীল প্রাণী হিসেবে পরিগণিত মানুষকে ‘কেটে ছড়িয়ে’ দেওয়া উচিত ছিল, অন্ততপক্ষে তা করতে ‘পারতো’ বা চেষ্টাটুকু করতে ‘পারতো’, সেক্ষেত্রে ছেলেটি যে সঠিক কাজটি করেনি, তা-ই বলছে ব্যাক্তিটি। কী করা উচিত ছিল, কী করা উচিত ছিল না এবং কী করা হয়েছে। এই। মাথায় রাখতে হবে, এই কবিতায় আসা পুনরাবৃত্তিগুলি কবিতার লাইন হিসেবে বিবেচিত ও পঠিতই হোক বা বক্তব্যই হোক, তাকে কেবল reinforce-ই করছে না, বরং intensify করে তুলছে, স্বভাবে blazing ও fierce করে তুলছে এবং সর্বাপেক্ষা যে দিকটি ফুটিয়ে তুলছে, যাকে এড়িয়ে গেলে বা উপেক্ষা করলে আসল মেজাজটাকেই অধরা রেখে দেওয়া হয়, সেটি হল বর্তমান সমাজ, জীবনের ভয়াবহতা, অপরাধপ্রবণতা, হিংসাত্মক কার্যের মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকা। এ যেন পরম কবি জীবনানন্দের সেই অক্ষয় শব্দবন্ধগুলিকে মনে করায় – ‘যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই-প্রীতি নেই-করুণার আলোড়ন নেই’। এই যে পরিবর্তন, এই যে বিবর্তন, যার মধ্য দিয়ে সমাজ এবং তার মধ্য দিয়ে আমরা এগিয়ে চলেছি, তাতে মানবিক মহৎ গুণগুলি বিলুপ্ত হচ্ছে বা বলা ভালো অনেক অনেক এমন গুণ লুপ্ত ইতোমধ্যেই হয়েছে, ফলে, জীবনানন্দের কথা ধরেই পুনরায় বলতে হয় – ‘অদ্ভুত আঁধার এক’ আমাদের এই গ্রহকে ঘিরে ফেলে ফেলে ‘অন্ধ’ করে দিয়েছে তার প্রাণীদের, মূলত আমাদেরই। ফলে, কোনও পথের হদিশ আমরা আর জানতে পারি না, বরং তা ‘পথই জানে’ আর মত্ত যারা, তারা নানান মতের কথা বললেও, বক্তা জানেন, এই মুহূর্তে, এই সময়ে হিংসাই মূল কাজ, মূল ধর্ম, বা আরও স্পষ্ট করে বললে এটাই বলা যায় যে, হিংসার জগতে আশ্রয় পেতে যেন হিংসা প্রয়োজন। যেন এটা struggle for the existence ছাড়া অন্য কিছু নয়। এই কথার অন্য একটি দিক খুলে যায় ফলত। এই চেনা স্থান, চেনা মানুষের রক্তলোলুপ হয়ে ওঠার কারণে যে স্থিতাবস্থার মৃত্যু, তা মানুষের অজান্তেই ঘটে যায়, যা কবিকে দিয়ে উচ্চারণ করায় ‘মানুষ কীভাবে মৃত হয়ে আছে, নিজেও জানে না!’। কবির সত্ত্বা যা হওয়া উচিৎ,

তা-ই যেন কবি করে চলেছেন সম্পূর্ণ কাব্যগ্রন্থটি জুড়ে। তিনি যেন পৃথিবীর পথে, জীবনের পথে হেঁটে যেতে যেতে ক্রমশ এবং খুব দ্রুতভাবে বদলে যেতে থাকা এবং অচেনা হতে থাকা পৃথিবী, মানুষ এবং তার সাথে মনস্তত্ত্ব, ভূ-রাজনীতি এবং যাবতীয় অবস্থানকে দেখছেন। তবে শক্তির এই ব্যাখ্যান যে খুব তীব্র তা কিন্তু কখনওই নয়, বরং সাঙ্কেতিক, কথার ছলে এবং বড়ই সহজ ও স্বাভাবিক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পর্বে সমগ্র বিশ্বের যে মানবতার স্থায়ী অবনমন এবং ক্ষমতার চোখরাঙানি, তার মধ্যে বেঁচে থাকা, তার আভাস পাওয়া যাচ্ছে ‘পুড়ন্ত সিংহাসন’ কবিতায়। কী চমৎকারভাবে শেষ দুটি লাইনে উনি লিখেছেন ‘বছরে কয়েকবার, না জানি ভিক্ষে করে আনে!/ বিশ্বের জাঙ্গাল থেকে, পরমাণু জ্বালানি, বোধ করি?’ – অর্থাৎ, পৃথিবী এখন যেন মানবিক থেকে পারমাণবিক হয়ে উঠেছে। স্নিগ্ধ সবুজাভা থেকে এখন তেজস্ক্রিয়তার দিকে এগিয়ে যাওয়া এক পৃথিবী। এখানে ‘পরমাণু’ শব্দটি জ্বালানির কথা বললেও, আমাদের মনে কিন্তু পরমাণু শুনলে বা পড়লে তার যে শক্তি বিকিরণ ও ধ্বংসক্ষমতা, তা-ই মনে আসে। এখানে এই জ্বালানি যেন কোনওভাবেই শুধু নিজের দহনের দিকে ইঙ্গিত করছে না, বরং বাকি সবাইকে, সভ্যতাকে পুড়িয়ে দেওয়ার বার্তাও দিচ্ছে। এই পারমাণবিক জ্বালানির কারণে যে দূষণ, তা শুধু প্রাকৃতিক পরিবেশের ক্ষেত্রকেই নয়, বরং মানুষের অভ্যন্তরীণ পরিবেশকেও ভয়াবহভাবে দূষিত করেছে।

তবে, এই কাব্যগ্রন্থ নিয়ে কথা বলতে গেলে শুধু ঋণাত্মক দিকগুলো বলে চলে গেলেই হয় না, কেননা, শক্তি চিরকাল প্রেম, সবুজ, প্রাণের উদযাপনের কবি। আর তার যথার্থ ও যথেষ্ট প্রতিফলন এখানেও রয়েছে কিন্তু। সেক্ষেত্রে দুটি কাব্যধারা বয়ে যেতে দেখব এখানে। আমরা একে mental fluctuation বলেও বলতে পারি কি? একজায়গায় যেভাবে উনি বাধাহীনতাকে দেখাচ্ছেন, তেমনই, অন্য জায়গায় নিয়ন্ত্রণ, সঙ্কেত দেখতে পাবো পাঠক হিসেবে আমরা। শক্তির কবিতায় এই যে ভ্রমণ, এই যে স্বাদ তা তাঁর কবিতাকে অনন্যসাধারণ করে রাখে। তার কিছু উদাহরণ কবিতা থেকেই দেখা যাক বরং –

‘গাছের নিচে’ কবিতায় উনি এক মানুষের কথাই বলছেন, যে কিনা অপেক্ষায় থেকে নিজেই গাছ হয়ে উঠেছে তার মতন বৈশিষ্ট্য নিয়ে। শক্তি সার্থক কবির সাক্ষর রাখেন সেই attribution-এ – যেখানে গাছ এবং মানুষ উভয়কে একই আসনে বসিয়েও, মুহূর্তে আলাদা করে দিচ্ছেন আচ্ছন্ন করে দেওয়ার মতো শব্দজাদুতে।

‘গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছে গাছের মতন/ ফুল ফুটেছে সেই মানুষের বুকের ধারে/ পাতার শাখায় হারিয়ে গেছে মুখটি তাহার/ গাছের কাছে পারলে হারে…’

এরপর আরেকটু এগোলে আমরা ‘কথা বলছে না’ কবিতায় দেখতে পাবো কেমন যেন এক নিয়ন্ত্রিত ও অস্বাভাবিক পৃথিবীর চলন। কবিতাটি আমাদের জানাচ্ছে

‘কেউ কথা ছড়িয়ে বলছে না/ কেউ কথা ছাড়িয়ে বলছে না … / কেউ হেঁটে যাচ্ছে কোনোমতে/ দাঁড়িয়ে পড়েছে স্থির ছবি/ কেউ পথে সহজে চলছে না’ এবং কবিতাটি শেষ হচ্ছে এক জিজ্ঞাসা দিয়ে, বা কবিতাটির দিকে তাকালে বা কবিতাটির প্রেক্ষিত ও পরিবেশের দিকে তাকালে বুঝবো যে প্রশ্ন নয়, ওটাই উত্তর। লাইনটি হচ্ছে ‘মানুষের সত্যি কী হয়েছে?’।

এই লাইনটি পড়লেই আমরা বুঝব যে এ তো বোধহয় আমাদের সবার জিজ্ঞাস্য, আমাদের সবার জানতে চাওয়ার ইচ্ছে এই প্রশ্নের উত্তর। এবং সবাই একমত হব যে মানুষের সত্যিই কিছু হয়েছে, ফলে, আমাদের এই জীবনের বিপরীত চলা ও বিপরীত অবস্থা। যা কিছু সহজ, তা-ই কঠিন, যা কিছু সুন্দর, তারই বিচ্ছিন্নতা এই জীবন থেকে; যার ফলে কবির কাব্যস্বত্ত্বা লিখিয়ে দেয় কবিকে দিয়ে এমন লাইন – ‘- সততা ও সুন্দরের বড়ো কষ্ট! বড়ো অধীনতা!’। সুন্দরের খোঁজ এবং কখনও পেলেও, তার কষ্টময় চেহারা কবিকে আজীবন ব্যথা দিয়েছে। এখানেও তার ইঙ্গিত স্পষ্ট। এই ক্ষয় কবি যেমন বাইরের দিকে তাকিয়ে দেখতে পান, ঠিক তেমনভাবেই নিজের মধ্যেও তার উপলব্ধি করতে পারেন। তিনি নিজেই নিজের কাছে সুন্দর হয়ে ওঠেন। এটিকে আমরা self-love বা self-conciousness বা self-determination বলে ভাবতে চাইলে ভাবাই যায় একপ্রকার। উনি সুন্দরের খোঁজে বেরিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েন আবার, সেটাও আবার কার মতো? সেই সুন্দরের মতই। এ এক অপূর্ব ব্যঞ্জনা এবং বর্ণনা, যা শক্তির জাদুতে মনোমুগ্ধকর হয়ে উঠেছে। ‘শুধু তাকে পেলে’ নাম্নী কবিতায় তার স্পষ্টতা পাওয়া যাচ্ছে।

‘সুন্দর যেমন ক্লান্ত, আমি তার মতো হই রোজ/ কলকাতার পথে ঘুরে/ অবিমৃশ্যকারী শুধু মেঘ, …’ বা ‘অভিমান শব্দভার আর দূর গন্ধের কুন্তলে/ আপাদমস্তক ডুব্‌/ ডুবে যাওয়া/ শুধু তাকে পেলে/ কলকাতা সমস্ত কিছু দেয়, তবু দেয় না সেকেলে/ বৃষ্টি!’

এই ক্ষয় বা কান্না স্থায়ী শক্তির মাঝে, শক্তির কবিতায়। অন্য একটি কবিতার উল্লেখও করা যাক – কবিতার নাম ‘জামা কতদিনে ছেঁড়ে’, সেখানে লিখছেন ‘মানুষ যখন কাঁদে, মানুষের সাধ্য কি, থামায়?/ নদীর নিকটে গিয়ে কাঁদে, কাঁদে পাথরের পাশে/ মাঠের ভিতরে গিয়ে কাঁদে একা, চোখ তুলে আকাশে - / সাধ্য কি, থামায় তাকে? একা কাঁদে, সংঘে কি কাঁদে না/ মানুষ যখন কাঁদে, মানুষের সাধ্য কি, থামায়?/ চোখ ফেটে রক্ত পড়ে, সে রক্ত উজ্জ্বল জামায়/ লেগে থাকে, বৃষ্টিজল ধুলো থেকে মুক্ত করে পাতা/ রক্তের উপরে তার জারিজুরি খাটে না কিছুই/ জামায় রক্তের দাগ পিছু-ফেরা বিপ্লবের মতো/ থাকে, জামা কতদিনে ছেঁড়ে?’

এই কান্নার মাঝে আশ্রয় খোঁজা এবং তার সাথে কান্নার আঁচড় থেকে অন্তরাত্মাকে বা অন্তরতর প্রিয় মানুষকে বাঁচানোর চেষ্টা বা বাঁচিয়ে রাখা, এই তো ধর্ম হওয়া উচিত মানুষের, একজন প্রেমিকের। যা আজীবন পালন করে গেছেন শক্তি। তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘ইচ্ছে করে’ কবিতা তো তারই উদ্‌যাপন করেছে।

‘ইচ্ছে করে বাঁচাই এবং বাঁচি/ গৌরীবরণ চারদিকে মৌমাছির/ মধ্যে তাকে বাঁচাই এবং বাঁচি/ ইচ্ছে করে সারা জীবন কাছে/ রাখতে তাকে, বড়ো যে সাধ আছে/ ভালোবাসার পুঞ্জিত মৌমাছি/ ইচ্ছে করে তার মধু কালবিষে/ নষ্ট করি সাধ্য আমার কি সে/ স্বয়ংবরাসত্য না সন্ন্যাসী/ ইচ্ছে করে বাঁচাই এবং বাঁচি/ গৌরীবরণ চারদিকে মৌমাছির/ মধ্যে তাকে বাঁচাই এবং বাঁচি।’

এই হলেন কবি শক্তি, এই হলেন মানুষ শক্তি। যিনি ধ্বংসের মধ্যেও ভালবাসতে ভোলেন না। নিজের স্বাচ্ছন্দ্যটুকু খুঁজে নিয়ে ক্ষান্ত থাকেন না, বরং ‘গৌরীবরণ চারদিকে মৌমাছির’ হুল থেকে, তার কামড় থেকে অপরজনটিকেও বাঁচানোর ‘ইচ্ছে করে’ সৎভাবে। আবার এই কামড়, এই ভালবাসা, যন্ত্রণা যখন ভালোবাসার হয়ে ওঠে, তখন তিনি তাকে আজীবন কাছে রেখে পেতে চান, রেখে দিতে চান। কেননা, শক্তি যতখানি কবিতার সাধক, তার চেয়েও বেশি ভালোবাসার কাঙাল। তবু জীবন কি আর পূর্ণ করে দেয়? অসম্পূর্ণতা, না-পাওয়া থাকেই। ফলে, কবির ‘ইচ্ছে করে’ এসবের, কিন্তু সেটা বাস্তবায়িত না-হয়েই থেকে যায়। তাই কবি লিখছেন – ‘রাখতে তাকে, বড়ো যে সাধ আছে’। অর্থাৎ, ‘সাধ আছে’, কিন্তু সাধ্য বা সে উপায় নেই। এই আশা, ইচ্ছে এবং একইসাথে আশাভঙ্গ হওয়াকেও কবি যেভাবে সমাদরে অভ্যর্থনা জানান ও স্থায়ী আসন দেন, তা শিক্ষণীয়, তা প্রশংসনীয়ও।

আরও অসংখ্য এমন মণিমানিক্য দিয়ে খচিত এই কাব্যগ্রন্থ। মানুষ এবং তার পারিপার্শ্বিকের বিধৃতি এবং তার মধ্য দিয়ে আত্মবিশ্লেষণের কারণে বইটিকে বলতে পারা যায় যে it’s a gem – এখানে প্রায় প্রতিটি মানবিক গুণের অস্তিত্ব স্বীকার করা হয়েছে। এখানে যেমন ক্ষুধা আছে, সহনীয়তার বার্তা আছে, পরিশ্রম আছে, পরিচিত পরিবেশের সাথে অপরিচিত হয়ে ভয়ের বাতাবরণ সৃষ্টি আছে, তেমনই মহত্ত্ব ও উদারতার দ্বারা এইসবকিছুকে replace করে আবার একটা স্বপ্নের জীবন, স্বপ্নের পৃথিবী তৈরি করা বা খুঁজে পাওয়া, যেখানে প্রেম থাকবে, ভালোবাসা থাকবে, হয়তো সেই ভালোবাসার ‘মধু কালবিষ’ থাকবে, কিন্তু কবি তা সয়ে নেবেন, মানুষ তা সয়ে নেবে, কেননা, ‘কত কী যে সয়ে যেতে হয় ভালোবাসা হলে’ তার ঠিক নেই। আর সবচেয়ে বড় কথা, মানুষ তা সয়ে নিতে চায়ও, মানুষ তা সয়ে নিতে পারেও।

0 comments: