0

সম্পাদকীয়

Posted in



































সব মিলিয়ে এমন বিপজ্জনক সময়ের মুখোমুখি কি আমরা এর আগে কখনও হয়েছি। যাঁরা বিশ্বযুদ্ধ দেখেছেন, দেখেছেন দেশভাগ আর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ভয়াল রূপ, তাঁরা অনেকে এখনও আছেন। একটু ফ্যানের জন্য ক্ষুধার্ত মানুষের হাহাকার হয়তো তাঁদের কারও কারও স্মৃতিতে ফিকে হয়ে এলেও তার রেশ সম্পূর্ণ চলে যায়নি।

আজকের সংকট সেই তুলনায় ভিন্ন। কতিপয় স্বার্থান্ধ এবং কুটিল রাজনীতিক এই গ্রহের শেষ ক্ষণটি রচনা করতে যেন বদ্ধপরিকর।

বৃত্তটি আরও ছোট করে এনেও রেহাই নেই। ক্ষমতাশালী আর দুর্বৃত্ত - দু'টি আপাত-দূরবর্তী শব্দের মধ্যে এমন সখ্য আগে কখনও দেখা গিয়েছিল কি? 'ক্ষমতার দুর্বৃত্তায়ন' আর 'দুর্বৃত্তের ক্ষমতা'এখন সমার্থক। এমন নিম্নগামী পরিবেশে জীবনধারণের ন্যূনতম মর্যাদাটুকুও এখন লুটেরার করায়ত্ত। অসহায় ক্রোধ পুষে রাখা ছাড়া সাধারণ মানুষের করণীয় আর কিছুই নেই। উৎকর্ষের চর্চার স্বীকৃতি দূরে থাক, সেই অভ্যাস বজায় রাখাই এক দুরূহ কাজ হয়ে উঠেছে।

এমন অবস্থাতেও আরেকটি নববর্ষ উদ্‌যাপিত হল। বইপাড়া গল্পগুজব আর খাওয়া-দাওয়ায় হয়ে উঠল মজলিশি!

১৪৩৩ সনের শুভকামনা সকলকে!

দায়বদ্ধ থাকুন!

আশপাশের মানুষজনের সঙ্গে সংযোগ হয়ে উঠুক আরও নিবিড়!

0 comments:

0

প্রচ্ছদ নিবন্ধ - হিন্দোল ভট্টাচার্য

Posted in

আমি রাজনীতি নিয়ে লিখতে বসিনি কোনোদিনই এইভাবে—অন্তত এমন এক তীব্র ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার জায়গা থেকে নয়। আমার কাছে রাজনীতি ছিল দূরের এক মঞ্চ, যেখানে বক্তৃতা হয়, বিতর্ক হয়, মতভেদ হয়—কিন্তু সেইসব যেন আমার দৈনন্দিন জীবনের ভেতরে ঢুকে পড়ে না। আমি আমার মতো করে লিখি, পড়ি, মানুষের সঙ্গে মিশি, কবিতার শব্দে, গল্পের শরীরে মানবিকতার ছোট ছোট আলো খুঁজি। কিন্তু আজ বুঝতে পারছি, সেই আলোটুকু কেবল ম্লানই হয়নি—তার উপর যেন ইচ্ছাকৃতভাবে ধুলো চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

আমি এখন খুব স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছি—এই যে ভোটের ঢক্কানিনাদ, এই যে গণতন্ত্রের উৎসব বলে প্রচারিত এক বিশাল আয়োজন—এর ভেতরে কোথাও একটা গভীর, লজ্জাজনক দরদাম চলছে। মানুষের সম্মানকে এখানে মুদ্রা বানানো হয়েছে। প্রতিশ্রুতিগুলো আর স্বপ্ন নয়, সেগুলো হয়ে উঠেছে লেনদেনের ভাষা। যেন আমার জীবন, আমার দুঃখ, আমার অভাব—সবকিছুই একটা দর কষাকষির টেবিলে তুলে রাখা।

আমি শুনি—“রাস্তা করে দেব”, “চাকরি দেব”, “বাড়ি করে দেব”—এইসব প্রতিশ্রুতির শব্দগুলো এখন আমার কানে আর আশ্বাসের মতো শোনায় না। বরং মনে হয়, যেন কেউ আমাকে কিনতে চাইছে। আমার ভোট, আমার বিশ্বাস, আমার অস্তিত্ব—সবকিছুর একটা দাম নির্ধারণ করা হচ্ছে।

আমি দাঁড়িয়ে থাকি সেই লাইনে—গরমে, ধুলোয়, অস্বস্তিতে—আর ভাবি, এই যে আমি, একজন মানুষ হিসেবে আমার যে সম্মান, তা কি সত্যিই এত সস্তা? আমার পাঁচ বছরের জীবন কি একটি বোতামের চাপে মাপা যায়? আমি কি কেবল একটি আঙুলে কালি লাগানোর মুহূর্ত?

আর সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হল, এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে আমরা “উৎসব” বলে উদ্‌যাপন করি। কী ভয়ঙ্কর শ্লেষ লুকিয়ে আছে এই শব্দটার মধ্যে! উৎসব—যেখানে আনন্দ থাকে, সমতা থাকে, সম্মান থাকে। অথচ এই তথাকথিত উৎসবের ভেতরে আমি দেখি অসমতা, দেখি প্রলোভন, দেখি অপমানের সূক্ষ্ম বিনিময়।

আমি দেখেছি, কীভাবে মানুষকে আলাদা আলাদা দলে ভাগ করা হয়—ধর্মের ভিত্তিতে, ভাষার ভিত্তিতে, পরিচয়ের ভিত্তিতে। তারপর প্রতিটি দলকে আলাদা আলাদা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। যেন আমরা সবাই মানুষ নই—আমরা সবাই আলাদা আলাদা ‘টার্গেট গ্রুপ’। আমাদের দুঃখ, আমাদের চাহিদা—সবকিছু বিশ্লেষণ করা হচ্ছে, মাপা হচ্ছে, তারপর তার উপর ভিত্তি করে তৈরি হচ্ছে রাজনৈতিক কৌশল।

এই পুরো প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি যে জিনিসটা হারিয়ে যাচ্ছে, তা হল মানুষের প্রতি সম্মান। আমি আর একজন নাগরিক নই—আমি একজন ভোটার। আর এই “ভোটার” পরিচয়ের ভেতরে আমার সমস্ত মানবিক পরিচয় যেন মুছে যাচ্ছে।

আমি বুঝতে পারি, আমাকে বোঝানো হচ্ছে—এই ব্যবস্থাটাই আমার স্বাধীনতা। আমাকে বলা হচ্ছে—“আপনি আপনার প্রতিনিধি বেছে নিচ্ছেন।” কিন্তু আমি যখন দেখি, সেই প্রতিনিধি নির্বাচনের পর আমাকে আর মনে রাখে না, তখন আমার মনে হয়, আমি কি সত্যিই কাউকে বেছে নিচ্ছি, না কি আমি নিজেই বেছে নেওয়া হচ্ছি—একটি ব্যবস্থার দ্বারা, যা আমাকে ব্যবহার করতে চায়?

আর এই ব্যবহারটাই সবচেয়ে অমানবিক। কারণ এটি খুব সূক্ষ্ম, খুব পরিকল্পিত। এটি সরাসরি আঘাত করে না—এটি ধীরে ধীরে ক্ষয় করে। আমার আত্মসম্মানকে, আমার ভাবনাকে, আমার বিশ্বাসকে।

আমি মাঝে মাঝে খুব তীক্ষ্ণ এক রকমের শ্লেষ অনুভব করি—যখন দেখি, ভোটের আগে আমাকে সম্মান করা হচ্ছে, আর ভোটের পরে আমাকে ভুলে যাওয়া হচ্ছে। তখন মনে হয়, এই সম্মানটা আসলে সম্মান নয়—এটি একটি অভিনয়। একটি প্রয়োজনীয় অভিনয়, যা আমাকে সন্তুষ্ট রাখার জন্য করা হয়।

আমি নিজেকেই প্রশ্ন করি—আমি কি এই অভিনয়ের অংশ? আমি কি এই ভণ্ডামিকে মেনে নিচ্ছি? আমার নীরবতা কি এই ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করে তুলছে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর সহজ নয়। কারণ আমি জানি, আমি একা নই। আমার মতো আরও অসংখ্য মানুষ আছে, যারা এইসব অনুভব করে, কিন্তু হয়তো প্রকাশ করতে পারে না। অথবা করে না—কারণ ভয় আছে, ক্লান্তি আছে, অথবা হয়তো এক ধরনের অভ্যেস তৈরি হয়ে গেছে।

এই অভ্যেসটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক। যখন আমরা অমানবিকতাকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে শুরু করি, তখন আমরা আর তার বিরুদ্ধে দাঁড়াই না। তখন আমরা কেবল বেঁচে থাকি—কিন্তু মানুষ হিসেবে নয়, একটি ব্যবস্থার অংশ হিসেবে।

আমি এই অবস্থাকে মেনে নিতে পারি না। আমি চাই, আমার কণ্ঠস্বর থাকুক—যত ক্ষুদ্রই হোক। আমি চাই, আমি বলতে পারি—এই যে ভোটের নামে, গণতন্ত্রের নামে, যে দরদাম চলছে, তা আমি মেনে নিচ্ছি না।

আমি চাই, আমি মনে রাখতে পারি—আমি কেবল একজন ভোটার নই, আমি একজন মানুষ। আমার সম্মান আছে, আমার ভাবনা আছে, আমার অনুভূতি আছে।

আর এই স্মৃতিটুকুই হয়তো আমার সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ।

কারণ যতদিন আমি নিজেকে মানুষ হিসেবে ভাবতে পারব, ততদিন এই অমানবিক ব্যবস্থার সম্পূর্ণ দখল সম্ভব নয়।

আমি জানি, এই লড়াই খুব ছোট—প্রায় অদৃশ্য। কিন্তু তবুও, এই ছোট ছোট প্রতিরোধই হয়তো একদিন বড় হয়ে উঠবে।

হয়তো একদিন, এই ঢক্কানিনাদের শব্দের ভেতর থেকে সত্যিকারের মানুষের কণ্ঠস্বর শোনা যাবে—যেখানে প্রতিশ্রুতি নয়, সম্মান থাকবে; যেখানে ভয় নয়, বিশ্বাস থাকবে; যেখানে রাজনীতি নয়, মানুষ প্রধান হয়ে উঠবে।

সেই দিনের অপেক্ষাতেই আমি লিখে যাই—নিজের মতো করে, নিজের ভাষায়, নিজের ক্ষুদ্র অথচ অদম্য মানবিকতার পক্ষে।

0 comments:

0

প্রবন্ধ - সেবিকা ধর

Posted in










চৈত্রমাসে চৈত্রের বিদায়বেলার ব্যঞ্জনা প্রকৃতিই আমাদের দিয়ে দেয়।তার অবিনাশী প্রভাব, চৈত্রের গাজন, শিবগোত্র পাওয়া ভক্ত্যারা, চৈত্রের পরব,চৈত্রের সবকিছু মিটে যায়, ধীরে ধীরে পয়লা বৈশাখ বা নববর্ষের কিঞ্চিৎ ছোঁয়ায়।পয়লা বৈশাখের দিন প্রত্যেক বাড়িতে বা ব্যবসা ক্ষেত্রে দেখা যায় নতুন নতুন পোড়ামাটির ঘট, আমপাতা, আমপাতায় তেল সিঁদুরের ছোঁয়া, দেওয়াল জুড়ে 'শ্রী শ্রী কালিমাতার কৃপায় এই ব্যবসা করিতেছি',খাতা নিয়ে ত্রিপুরেশ্বরী কালি মন্দিরে বা নিজেদের গৃহদেবতা বা ঠাকুরের কাছে নিজের তথা সার্বিক কল্যাণ কামনা- মিনতি করা- সবই কিন্তু হিন্দু বাঙালি জীবনের পয়লা বৈশাখ নিয়ে আসে।
পয়লা বৈশাখ এমন একটা দিন, যেদিন বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনার ব্যাপার জেগে থাকে। হিন্দু বাঙালি এবং মুসলমান বাঙালি ,তারা তাঁদের পারস্পরিক বিনিময় ও যোগাযোগ করেন, যা তাঁদের কাছে প্রেম ও প্রীতির বন্ধন।

পয়লা বৈশাখ মানেই নতুন কাপড়, নতুন বসন,অনেকে যাদের পয়সা আছে তারা নতুন গহনা,নতুন বাসনপত্র, মানুষকে নতুন কাপড় দেওয়া, দেবতার মাথায় জলসত্র দেওয়া, জলের ব্যবস্থা, শিবলিঙ্গের মাথায় জল দেওয়া বা গৃহদেবতার মস্তকে জলের ঝাড়ি দেওয়া,ব্রাহ্মণকে বৈশাখের প্রত্যেকদিন একটি করে মাটির কলসি ও তার সঙ্গে দক্ষিণা দান করা এবং যাদের সামর্থ্য আছে তারা ধাতব কলসি,সেই সঙ্গে দক্ষিণা, চাল এই সবই দান করেন যা পয়লা বৈশাখের অনুষঙ্গ।

আমরা লক্ষ্য করি, পুরাতন ক্যালেন্ডারের পাতা বদলে যায়,চৈত্রের ধূলি-ধূসরিত দেওয়াল তাকে ঝাড়পোঁছ করে একটা নতুন চেহারা দেওয়ার চেষ্টা করা হয় হিন্দু বাঙালি পরিবারে। অনেকে ঘরদোর রঙ করান,অনেকে আসবাবপত্র ঝাড়পোঁছ করেন,ঘর মোছেন,পরিষ্কার করেন, দেবতাদের পুজো করেন,ব্যবসায়ীরাও তা করেন।
গোটা পয়লা বৈশাখ হচ্ছে আমাদের অন্তরের প্রক্ষালন ব্যবস্থাকে সজাগ করা।

ইদানীং পয়লা বৈশাখ নিয়ে অনেক বিতর্ক তৈরি হয়েছে,পয়লা বৈশাখ অর্থাৎ এই যে বাংলা সালের সূত্রপাত, এইটা কে শুরু করেছেন? দ্বিতীয় লক্ষ্মণ সেন? শশাঙ্ক ? নাকি মহামতি আকবর। এই নিয়ে প্রচুর বিতর্ক চলছে।তবে একটা কথা ঠিক, মহামতি আকবর যদি বাংলা বর্ষ শুরুর হিসেব করে থাকেন, তাহলে কোথাও না কোথাও এর একটা দলিল থাকবেই।সম্রাট আকবর এবং তাঁর নবরত্ন সভার রত্নরা ছিলেন অত্যন্ত পারদর্শী এবং পারঙ্গম। কিন্তু কোথাও এর উল্লেখ নেই আকবর এই বাংলা নববর্ষ শুরু করেছেন।এমনকি 'আইন-ই - আকবরি'-তেও উল্লেখ নেই। ফলে আমরা অনেকটা ধাঁধার মধ্যেই আছি। এই যে পয়লা বৈশাখ তা কোথা থেকে শুরু হয়েছে। অনেকে বিক্রম সংবতের কথা বলছেন, অনেকে বৈদিক নববর্ষের কথা বলছেন। অনেকে রাজনৈতিক ভাবে বলছেন বৈদিক নববর্ষের কথা।হিন্দু বাঙালির চৈত্র মাসই বছরের শেষ মাস।সেখানে কিন্তু বৈদিক নববর্ষের কথার উল্লেখ নেই।আমরা এইসব বিতর্কে যাচ্ছি না।

আমরা ভাবছি পয়লা বৈশাখের নতুন ভোর আসে জীবনের নতুন নতুন রূপকল্পনা নিয়ে। পয়লা বৈশাখ মানেই নতুন জামাকাপড়,গুরুজনদের প্রণাম, মিষ্টিমুখ, মাছ-মাংস, মিষ্টি, দই,লুচি,পায়েস,ফলমূল এককথায় সুখাদ্য যা যা আছে সবই।সকালে উঠেই স্নান সেরে গৃহদেবতার পুজো দেওয়া,অঞ্জলি দেওয়া,মিষ্টি, ফল,দই দেবতাকে নিবেদন করা কিংবা মন্দিরে গিয়ে পুজো দেওয়া- এইসবই কিন্তু পয়লা বৈশাখের জীবনাচরণের মধ্যে রয়ে গেছে।হিন্দু বাঙালি জীবনে ত্রিপুরাতে যেমন আছে তেমনি রয়েছে পশ্চিমবাংলা ও বাংলাদেশেও।বিভিন্ন মন্দিরে পুজোর ভীড় লেগে থাকে।তারা উপবাস করে পয়লা বৈশাখের শুভ দিনটি পালন করেন।আবার বাংলাদেশে চৈত্র মাসের শেষ দিনে নববর্ষের উদ্ভোধন হয়। সেই নিয়ে বিরাট শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়।এখন মঙ্গল শোভাযাত্রা বলে একটি বর্ণিল শুভাযাত্রা হয়।সেখানে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলকে শোভাযাত্রায় যোগদানের জন্যে আহবান করা হয়। কিন্তু মুশকিল হল মৌলবাদী শক্তি, যারা এই মঙ্গল শব্দটির মধ্যে হিঁদুয়ানির সুর দেখে, তারা এই মঙ্গল শোভাযাত্রার বিপক্ষে।কিন্তু মানুষের এই মিলন মেলায় সমস্ত অপশক্তি পরাজিত হয়। ফলে শুভ কাজ এগিয়ে যেতে থাকে।ইদানীং বাংলাদেশের দেখাদেখি কলকাতার যাদবপুর অঞ্চলে পয়লা বৈশাখকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের ট্যাবলো অর্থাৎ বাঙালি সংস্কৃতির যে প্রতীক তাকে সবার সম্মুখে তুলে ধরা হয় বিভিন্ন সাজ-সজ্জার মাধ্যমে। যা কলকাতা শহরের মানুষকে উদ্বেলিত করে।ত্রিপুরার বিভিন্ন জেলায়ও এই মিলন মেলা পরিলক্ষিত হয়।

মানুষের মনের ভেতর যে সাম্প্রদায়িক হানাহানির বীজ, ঘৃণার বীজ লুকিয়ে থাকে, তাকে এই ধরনের শোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে,মেলামেশার মধ্য দিয়ে খানিকটা হলেও একটা সামগ্রিক সমন্বয়বাদী চেহারা দেওয়ার চেষ্টা করা যেতে পারে।

পয়লা বৈশাখ হিন্দু বাঙালির জীবনে এবং ইসলাম ধর্মাবলম্বী বাঙালির জীবনে- উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে এই খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা আগেও এই কথা বলেছি এখনও বলছি,একটা অসাম্প্রদায়িক চেহারার যে নিরিখ, যেখানে কোনো দেবমূর্তি নেই,যদিও হিন্দু বাঙালি গণেশ, লক্ষ্মী পুজো করেন।কিন্তু সার্বিকভাবে যে মনের কথা, আনন্দের কথা,এই যে নতুন বছর এল পুরনো জীর্ণ বছর চলে গেল, তার পরিপ্রেক্ষিতে একটা সম্পূর্ণ বিষয় আমাদের সামনে ফুটে ওঠে। এই সামগ্রিকতা বাঙালি জাতিসত্তার বৈশিষ্ট্য। এই সামগ্রিকতা বাঙালি যে মানস, তার বৈশিষ্ট্য। পয়লা বৈশাখে বহু জায়গায় গান বাজনার আসর,খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা হয়।

কলকাতায় নববর্ষকে কেন্দ্র করে কলেজ স্ট্রীটের বই পাড়ায় বই উৎসব শুরু হয়।প্রকাশকরা লেখকদের আমন্ত্রণ করেন।লেখকরা সেখানে যান।সারাদিন ধরে প্রবল দাবদাহের মধ্যে এই বৈশাখী উত্তাপ নিয়েও লেখকরা হাজির হন।কারণ সার্বিকভাবে হৃদয়ে হৃদয় মেলানর যে আবেদন সে আবেদন কিন্তু ক্রমশ ক্রমশ আরও নিবিড় হয়ে উঠে।

পয়লা বৈশাখ হিন্দু বাঙালির মেনুতে ইস্পেশাল ডে।এখানে মাংস অবধারিত।মূলত খাসির মাংস রান্না হয়।আত্মীয়-পরিজন, প্রিয় মানুষ, বন্ধুবান্ধবদের নিমন্ত্রণ করে খাওয়ানর রীতি আছে।ভালো চালের ভাত,খাসির তেলের বড়া, অনেক রকমের তরকারি, কয়েক রকমের মাছ,মাংস, মিষ্টি, দই সহযোগে আহার সারা হয়।অনেকেই বিজয়া দশমী ও পয়লা বৈশাখে পুঁটি মাছ খাওয়ার রেওয়াজ বহু পরিবারে।
আবার এটাও বলা হয় পয়লা বৈশাখ আমরা যা করব অর্থাৎ যে ধরনের আচরণ করব, আমরা মানুষের সঙ্গে সারা বছর ধরে এই আচরণটুকু করে যাব।ফলে সেদিন ছোটোরা খানিকটা দুষ্টুমি করলেও বড়রা সেদিন তাদের চোখ রাঙান না।মারধর তো করেনই না।কারণ বলা হয় নববর্ষের দিন, 'পুজো কাঁঠাল'-এর দিন মারধর করতে নেই।এই যে খাওয়া-দাওয়া, নব বস্ত্র পরিধান করা, ভালো আতর মাখা, আগেকার দিনে নববর্ষের দিন সিনেমা দেখার প্রচলনও ছিল।যদিও এখন সেই রেওয়াজ অনেকটা কমে গেছে। যাই হোক, সবাই মিলে সমবেত হওয়া এবং আজকে শুভ পয়লা বৈশাখ, আজকে শুভ নববর্ষ, শুভ বাংলা নববর্ষ এবং মোবাইলের ভাষায় হ্যাপি পয়লা বৈশাখ, হ্যাপি বাংলা নিউইয়ার এই সবই চলতে থাকে। আগেকার দিনে চিঠি লেখার রেওয়াজ ছিল, বাড়ির যাঁরা গুরুজনেরা ছিলেন তাঁরা চিঠি লিখতেন,চিঠি পেতেন।দোকান থেকে লাল রঙের গণেশ মার্কা চিঠি আসত। এবং ধার বাকি যা থাকত দোকানে, সোনার দোকানে হোক আর মুদির দোকানেই হোক, আর কাপড়ের দোকানেই হোক,অন্যান্য যেখানেই ধার বাকি থাকত তা মিটিয়ে দেওয়া হত এবং নতুন করে খাতা চালু হত। যারা ধার বাকিতে জিনিস নিতেন না।তারা সামান্য দুটাকা পাঁচ টাকা দিয়ে আসতেন সেই মুদির দোকানে, বা কাপড়ের দোকানে বা সোনার দোকানে বা দর্জির দোকানে যেখানে তাদের নিমন্ত্রণ থাকত সেখানে।সেখানে মিষ্টি ও শরবত খাওয়ান হত।কোথাও লস্যি,কোথাও কোল্ড ড্রিংকস এর ব্যবস্থা থাকত। কোথাও কোথাও ডাবের ব্যবস্থা থাকত। সব মিলিয়ে একটা আনন্দের দিন।
দেবদারু পাতা,শোলার ফুল,আম্রপল্লব,সিঁদুরের ফোঁটা, দ্বারঘট, কলা গাছ সব মিলিয়ে বাঙালির একটা আনন্দ সেতু হল এই পয়লা বৈশাখ।

0 comments:

0

ধারাবাহিক - শৌনক দত্ত

Posted in




















১৮. মেঘে ঢাকা তারা ঋত্বিক ঘটক





প্রিয়বরেষু বাসু,



আজ ছুটিরদিন। শীত যাই যাই করছে, ব্যালকনিতে অলস দুপুর পা ছড়িয়ে বসে আছে। দুটি শালিক রোদ খুঁটে খাচ্ছে একমনে। ঘরে বাজছে রবীন্দ্রনাথ, এমন কর্মহীন দিনগুলোয় বড় একা লাগে কি করবো বুঝে ওঠতে পারি না। গতরাতে ঋত্বিক ঘটকের মেঘে ঢাকা তারা দেখলাম আবার! কতবার যে দেখেছি তাও মনে হয় নতুন দেখছি। আজ বেশ বেলা করে ঘুম ভেঙ্গেছে, সকালের চা নিয়ে অনেকটা সময় কেটেছে বইয়ের সাথে। তোমার চিঠি পাইনা বহুদিন। ঘুরে বেড়াচ্ছো নাকি কোচবিহারেই আছো বুঝতে পারছিনা। তোমারও কি এমন নির্জন সময় কাটে? নিঃসঙ্গ সময় কাটাতে তোমাকে লিখতে বসেছি। তোমার জীবনটাই ভালো, এতবছর পরে এই শান্ত দুপুরে বসে মনে হচ্ছে তুমিই সেরা যাপন বেছে নিয়েছ। বয়স বেড়ে যাচ্ছে, তাই প্রায়শ এই কর্মময় জীবন, ক্যারিয়ারের পেছনে দৌঁড় ঝাঁপ ছোটাছুটিকে মিথ্যে মনে হয়। তোমার লেখালেখির খবর কি বেনারস ভ্রমণের পরে তোমার লেখা তেমন চোখে পড়েনি। বইমেলায় নতুন কোন বই এসেছে কি তোমার?



ঋত্বিক ঘটক নিয়ে কদিন আগে তোমার একটা লেখা পড়ছিলাম, তোমার চোখে ঋত্বিক ঘটককে পড়তে পড়তে আমার বারবার মনে হচ্ছিল ঋত্বিক ঘটক নামটা উচ্চারণ করলেই সবাই সিনেমার কথা বলে কিন্তু ঋত্বিক ঘটকের চলচ্চিত্র জীবনের আড়ালে তাঁর নাট্যচর্চা এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে অনুচ্চারিত অধ্যায়। আত্মপ্রকাশ তথা বেশি মানুষের পৌঁছাবার সর্বোৎকৃষ্ট মাধ্যম হিসেবেই তিনি সিনেমা জগতে এসেছিলেন। এর চেয়ে জোরালো মাধ্যম পেলে তাকেই তিনি মান্য করতেন, এমন দৃপ্ত ঘোষণা তিনি করেছেন তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিমায়, ‘আমরা যখন মাঠে ময়দানে নাটক করতাম, তখন চার-পাঁচ হাজার লোক জমা হতো, নাটক করে তাঁদের একসঙ্গে rouse করা যেত। তখন মনে হলো সিনেমার কথা, সিনেমা লাখ লাখ লোককে একসঙ্গে একেবারে মোচড় দিতে পারে। এই ভাবেই আমি সিনেমাতে এসেছি, সিনেমা করব বলে আসিনি।’ ভবিষ্যতে সিনেমার চেয়ে শ্রেয়তর কোনো মাধ্যমের সন্ধান পেলে সিনেমাকে তিনি লাথি মেরে চলে যাবেন—এমন মন্তব্য তিনি করেছেন তাঁর লেখায়। না মশাই, সিনেমার প্রেমে আমি পড়িনি। সাফ বলে দিয়েছিলেন ঋত্বিক ঘটক। সেই সিনেমা, একসময় যাকে লাথি মেরে চলে যেতে চেয়েছিলেন তিনি। তাই বলে এটা বলছিনা ঋত্বিক ঘটকের সিনেমা ঋত্বিককে প্রতিনিধিত্ব করেনা বরং ঋত্বিকের সিনেমা আমাকে আজো মোহজালে আটকে রাখে। ‘আকাশ ভরা সূর্য তারা বিশ্ব ভরা প্রাণ’- এ বিখ্যাত গানটি ঋত্বিকের কোমলগান্ধার ছবিতে দেবব্রত বিশ্বাসের কন্ঠের সাথে যে পিকচারাইজেশন করেছেন তা দেখার পর থেকে অন্য রকম অনুভূতি হয়। যখনই এই গানটা শুনি তখন মনের পর্দায় ভেসে ওঠে কোমলগান্ধারের গানটির পিকচারাইজেশন- সুপ্রিয়া দেবী পাহাড়ের পাদদেশে বসে আছেন আর অনিল চ্যাটার্জি চোখে মুখে দুহাতে আনন্দের দারুণ অভিব্যক্তি ফুটিয়ে গানটির অন্তর্নিহিত মানব জনমের জয়গান গেয়ে হেলে দুলে হাঁটতে হাঁটতে গানটি গাইতে গাইতে তাঁকে অতিক্রম করে যাচ্ছেন। এ গানটির সাথে অনিল চ্যাটার্জির অভিব্যক্তি একই সাথে হাজির হয় আমার মানসপটে। প্রচণ্ড জীবনমুখী এ মহান শিল্পী, যিনি মানুষকে বলেছেন ‘মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও বাঁচতে চায়’, তাঁর পক্ষে এমন একটি অনুপম প্রাণবন্দনার রবীন্দ্রসঙ্গীত তাঁর সৃষ্টিতে প্রয়োগ দারুণ মানানসই। তাই বলে ঋত্বিক ঘটকের লেখা প্রথম নাটক জ্বালার কথা ভুলে গেলে চলবে কেন? সিনেমার ঋত্বিক ঘটক হয়ে ওঠার আগে তিনি নাটকের মঞ্চেই তাঁর সিনেমার চোখ তৈরি করেছিলেন। সুনীল দত্তের কোন এক লেখায় পড়ছিলাম ঋত্বিক কুমার ঘটক ডাকনাম ভবা’র একটি স্মৃতিকথা, ‘১৯৫০ সাল নাগাদ গণনাট্য সংঘে নতুন ভাবে সাংগঠনিক ও প্রয়োগরীতির কলাকৌশল নিয়ে বিতর্কের ঝড় উঠেছে। খোঁজা হচ্ছে নতুন ধরনের নাটক। সেই সময়ে ৪৬ ধর্মতলা স্ট্রিটে একটি যুবক এল, প্রায় ছ’ফুট লম্বা হবে। পায়জামা-পাঞ্জাবি পরা, চটি জুতো পায়ে, বগলে ছিল একটি পাণ্ডুলিপি, নাম ‘জ্বালা’। মৃণাল সেন গণনাট্য সংঘের সঙ্গে আগে থেকে ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তিনিই নিয়ে এসেছিলেন ঋত্বিক ঘটককে।’ ঋত্বিক তখন পি সি যোশির ‘ইন্ডিয়ান ওয়ে’ কাগজের বাংলার সংবাদদাতা। ‘জ্বালা’-র অঙ্কুর লুকানো ছিল এই সাংবাদিকতায়। কলকাতায় তখন পরপর আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে। সেই ঘটনার প্রতিবেদন থেকেই ‘জ্বালা’ নাটকের জন্ম। ঋত্বিক তাঁর প্রথম নাটক নিয়ে লিখেছেন, ‘সে সময় আমি একত্রিশটা সুইসাইড দেখে ‘সুইসাইড ওয়েভ ইন ক্যালকাটা’ লিখে পাঠালাম। এই ‘জ্বালা’ নাটকে তার থেকে সিলেক্ট করা ছ’টা চরিত্র ইচ ওয়ান ইজ় এ ট্রু ক্যারেক্টার। ‘জ্বালা’ ইজ় এ ডকুমেন্টারি।’ এ নাটক বহু বার অভিনীত হয়েছে। সম্ভবত ঋত্বিকের লেখা পাঁচটি নাটকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বার। রেডিওতে এক সময়ে নাটকটি ছদ্মনাম ভবেশ বাগচীর লেখা বলে অভিনীত হয়েছে। তুমি তো জানোই বাংলাদেশের পাবনার যে বংশে ঋত্বিকের জন্ম তার আদি পদবী ছিল বাগচী, পরে তাঁরা ঘটক উপাধি পেয়েছিল।



১৯৫১ সালে চলচ্চিত্র নির্মাণের যাত্রা শুরু হয় ঋত্বিক ঘটকের। প্রথম সিনেমা ‘বেদিনী’ মাঝপথেই অর্থাভাবে আটকে যায়। তবুও থেমে থাকেননি তিনি, নতুন গল্প ও চিত্রনাট্য নিয়ে শুরু করেন নতুন ছবি ‘অরূপ কথা’। সুবর্ণরেখা নদীর তীরে প্রায় ২০ দিন ধরে শুটিং হয় এই চলচ্চিত্রের। কিন্তু ক্যামেরায় ত্রুটির জন্য প্রকাশ পায়নি এটিও। এরপর শুরু করেন ‘নাগরিক’ ছবির কাজ। কিন্তু আর্থিক কারণে তখন মুক্তি পায়নি এই চলচ্চিত্রটিও। ১৯৭৭ সালে তাঁর মৃত্যুর এক বছর পরে মুক্তি পায় ‘নাগরিক’। পর পর তিনটি অপ্রকাশিত চলচ্চিত্রের যন্ত্রণা নিয়ে থেমে যাননি ঋত্বিক। ১৯৫৮ সালে প্রথম মুক্তি পায় মানুষ ও যন্ত্রের প্রেম নিয়ে তাঁর চলচ্চিত্র ‘অযান্ত্রিক’। ঋত্বিকের “নাগরিক”চলচ্চিত্রটিকে মনে করা হয় ভারতীয় চলচ্চিত্রের উত্তরণের এক নতুন যুগের সূচনা। যদিও অনেকেই হয়তো এ কথাও মেনে নেবেন, তাঁর বানানো যেকোনও ছবি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের বিজেতাদের কাজকে ম্লান করে দিতে পারলেও, তাঁর ছবিগুলো জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে বা আন্তর্জাতিক স্তরে যথাযথ প্রচারের উদ্দেশ্যে বিশেষ কিছুই করা হয় নি। তেমনি ঋত্বিকের জ্বালা নাটকের দিকে চোখ ফেরালে দেখবো শুধুই মৃত মানুষের যন্ত্রণা, আশাবাদের চিহ্ন কোথায়? অনেকে অবশ্য আপত্তি তুলেছিলেন নাটক অভিনয় নিয়ে। কিন্তু জ্বালা তো শুধু মৃত্যুর কথা বলে না। বলে এক সুন্দর দেশের কথা। যেখানে সব শান্তি, সব তৃপ্তি। কোথাও একটা আছে সেই দেশ। পথ খোঁজার শেষ হয়নি। খুঁজে পেতেই হবে সেই দেশটাকে। মানুষের উপরের খোলসটাকে বাদ দিলে যে অবিরাম আর্তনাদের মধ্যে সে চুপ করে বসে থাকে, ঋত্বিকের নাটক তন্ন তন্ন করে খুঁজে বেড়ায় তাকে। জ্বালা নাটকটি হৃদয়ের গভীরে উপলব্ধি করলে দেখা যাবে ‘যুক্তি, তক্কো আর গপ্পো’ সিনেমার শেষে নীলকণ্ঠ বাগচী বলেছিল, “সব পুড়ছে। ব্রহ্মাণ্ড পুড়ছে, আমি পুড়ছি।” কোথাও গিয়ে যেন মিলে যায় দুটি গল্প। নীলকণ্ঠের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন ঋত্বিক স্বয়ং। আবার শিল্পীজীবনের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে থাকা আগুনকে পান করে তিনি হয়ে উঠেছিলেন নীলকণ্ঠ। আকণ্ঠ মদ্যপান করে পুলিশের গুলিতে নীলকণ্ঠের তখন মৃতপ্রায়। দুগ্‌গাকে বলা এই অন্তিম সংলাপগুলিতে ঋত্বিক যেন এক নিঃশ্বাসে বলে যান নিজের জীবনের ক্লেদাক্ত বৃত্তান্ত। নীলকণ্ঠের পেটে বুলেটের ক্ষতের থেকেও বেশি যন্ত্রণাদায়ক হয়ে ওঠে ব্যর্থতা ও হতাশার গণ্ডি থেকে বেড়িয়ে আসার পণ্ডশ্রমের ক্লান্তি।



“আমি প্রতি মুহূর্তে আপনাকে ধাক্কা দিয়ে বোঝাব যে, It is not an imaginary story, বা আমি আপনাকে সস্তা আনন্দ দিতে আসি নি। …যা দেখছেন তা একটা কল্পিত ঘটনা, কিন্তু এর মধ্যে দিয়ে যেটা বোঝাতে চাইছি আমার সেই থিসিসটা বুঝুন, সেটা সম্পূর্ণ সত্যি। সেটার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্যই আমি আপনাকে এলিয়েনেট করব প্রতি মুহূর্তে। যদি আপনি সচেতন হয়ে ওঠেন, ছবি দেখে বাইরের সেই সামাজিক বাধা বা দুর্নীতি বদলের কাজে লিপ্ত হয়ে ওঠেন, আমার প্রোটেস্টকে যদি আপনার মাঝে চারিয়ে দিতে পারি তবেই শিল্পী হিসেবে আমার সার্থকতা।” চলচ্চিত্রকে প্রতিবাদ ছড়িয়ে দেওয়ার একটা মাধ্যম হিসেবে এভাবেই ভাবতেন ঋত্বিক ঘটক। সত্য বলার সেই দুরন্ত স্পর্ধা থেকে সারাটা জীবন যা ভেবেছেন তা নিয়েই নির্মাণ করেছেন চলচ্চিত্র। পুঁজিবাদী সমাজে মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্ত শ্রেণীর লড়াইয়ের গল্পগুলো তিনি খুব সচেতনভাবে ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন তাঁর চলচ্চিত্রগুলোতে। ১৯৬০ সালের ১৪ এপ্রিল মুক্তি পায় ঋত্বিক ঘটকের চতুর্থ এবং প্রথম ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র ‘মেঘে ঢাকা তারা’। দেশভাগ পরবর্তী কলকাতায় এক নিম্ন মধ্যবিত্ত শরণার্থী পরিবারের সংগ্রামমুখর জীবন নিয়ে নির্মিত হয় এই চলচ্চিত্রটি। শক্তিপদ রাজগুরুর উপন্যাস থেকে ঋত্বিক ঘটক এর কাহিনী নেন। পঞ্চাশের দশকে কলকাতা শহরের এক প্রান্তে রিফিউজি কলোনির একটি মধ্যবিত্ত পরিবারকে ঘিরেই এর গল্পটি আবর্তিত। ঋত্বিক ঘটকের সবচেয়ে আলোচিত সিনেমা মেঘে ঢাকা তারা আমাদের মনে দাগ কাটলেও দেখা যায় এই সিনেমার বীজ বহু আগেই রোপন করেছিলেন ঋত্বিক তাঁর নাটকে! যে কয়েকটি নাটকের জন্য ঋত্বিকের নাম নাট্য-আন্দোলনে চিরদিনের জায়গা করে নিয়েছে, তার একটি উদ্বাস্তু জীবন নিয়ে নাটক ‘দলিল।’একরাতের বেতার ঘোষণা চিরদিনের জন্য উদ্বাস্তু করে দিয়েছিল ঋত্বিককে। গণনাট্য ছাড়ার আগেই সেখানে প্রযোজনা করেছিলেন ‘দলিল’ নাটক। উদ্দেশ্য ছিল ‘ভাঙা বাংলার প্রতিরোধ’। নাটকে-সিনেমায় বারবার সন্ধান করেছিলেন ‘বাংলাদেশের মা’-এর। দেশভাগের যন্ত্রণা আজীবন ভুলতে পারেননি, চাননি বাঙালি সেই স্মৃতি ভুলে যাক। সুরমা ঘটকের লেখায় পাই, “কতকগুলো ঘরছাড়া সম্পূর্ণ মানুষ যে নাটকীয় ঘোরাফেরা করছে তারই নাম ‘দলিল’।” সেই দলে অর্জুন মালাকারদের সঙ্গে পাওয়া যাবে ঋত্বিককেও। দলিলের সন্ধানে অর্জুন খুঁজে বেড়াত দেশের রাজাকে। গুলি খেয়ে মরতে হয়েছিল তাঁকে, নীলকণ্ঠের মতোই। এ নাটক শেষ করতে পারেননি ঋত্বিক। তখনও আসেনি সেই পরিণতি। কিন্তু বিশ্বাস করতেন, আসবে একদিন। এই নাটকের শেষ পাতাটা লিখবে জনতা। তাদের জন্য ছেড়ে গেলেন শেষ পাতাটা। সেই মৃত্যুঞ্জয়ী আশা থেকে লিখেছিলেন, “বাংলারে কাটিছ কিন্তু দিলেরে কাটিবারে পার নাই।” আর সে বছরই সুরমাকে চিঠিতে তিনি লিখছেন, “-ও মেয়েকে আমি বহ্নিশিখার মত জ্বলে উঠতে দেখেছি। কিন্তু এই ছবিটিই আমার মনে থাকবে চিরটাকাল। আমার বাংলাদেশের মত শ্যামল বাংলার মেয়ে।” সমাপতন? নাকি এটাই দেখতে চেয়েছিলেন তিনি? এর সঙ্গে মিলিয়ে নিতে কষ্ট হয় পরবর্তী ঋত্বিককে। তার কারণের মধ্যে লুকিয়ে অসংখ্য পরত, অসংখ্য চরিত্র। ‘দলিল’-এ অর্জুন শেষ পর্যন্ত বুঝতে পেরেছিল রাজা আর শত্রু আসলে একই লোক। চিৎকার করে সে বলত, “দুশমন কনে?—তারে ধরতে আমি পারবই, তারে চিনতে আমি পারবই।” ১৯৫২ সালে নিজের লেখা সেই নাটকটি নিয়েই তিনি পাড়ি দিলেন গণনাট্যের কনফারেন্সে বোম্বে। কলকাতায় প্রথম অভিনয় হয় আমন্ত্রিত কয়েক জনের সামনে, ভূপতি নন্দীর বাড়ির ছাদে। পরিচালনা ও প্রধান অভিনেতা ছিলেন ঋত্বিক নিজেই। বোম্বে ছাড়া ভদ্রেশ্বর, উত্তরপাড়া, বালিতে অভিনয় হয়। তাঁর ‘সাঁকো’, ‘স্ত্রীর পত্র’ খুবই চর্চিত প্রযোজনা। ১৯৬৯ সালে, প্রান্তবেলায়, যখন অসুস্থ, গোবরা মানসিক হাসপাতালে রয়েছেন, লিখলেন ‘সেই মেয়ে।’ নিজের নির্দেশনায় হাসপাতালের রোগী ও কর্মী-চিকিৎসকদের দিয়ে অভিনয়ও করালেন। কবি বিনয় মজুমদারও তাতে অভিনয় করেছিলেন!



ঝুপ করে যেন সন্ধ্যা নেমে এসেছে কোলের কাছে। আজ আর লিখছি না। এমন সন্ধ্যায় তুমি পাশে থাকলে বেশ হতো, এখনো কি আগের মতন গাও-‘সন্ধ্যা নেমেছে আমার বিজন ঘরে, তব গৃহে জ্বলে বাতি। ফুরায় তোমারি উৎসব নিশি সুখে, পোহায় না মোর রাতি।। ’ সব গুলিয়ে যাচ্ছে স্মৃতির ভিড়ে। নিরন্তর ভালো থেকো।



ইতি-

সুস্মি

২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

0 comments:

0

ধারাবাহিক - রঞ্জন রায়

Posted in




















২৫ (৩)

--তোমার নাম?

--ছোটে পালোয়ান।

পাব্লিক প্রসিকিউটর একটু শুধরে দিলেন। পেশকার বলল- লিখুন, ছোটেলাল।

ছোটে পালোয়ান ওর দিকে এমনভাবে তাকালো যেন সত্যিই ওকে ছোট বানিয়ে দেয়া

হয়েছে। চটে গিয়ে ও নাল গিলে ফেলল। পরের প্রশ্ন—বাবার নাম?

--কুসেহর।

পাব্লিক প্রসিকিউটর ফের শুধরে দিলেন, --কুসেহরপ্রসাদ।

ওর দিকে পালোয়ান এবার যেভাবে দেখল যেন ওর বাবাকে গাল দেয়া হয়েছে।

--জাত?

--বাহমন।

--মোকাম?

--আমরা গঁজহা।

--বুঝলাম, কিন্তু তোমার গ্রামের নাম কী?

--গঞ্জ।

--আরে কোন গঞ্জ?

ছোটে পালোয়ান চোয়াড়ে ভঙ্গিতে বলল-এদিকে কি শ’ দুশো গঞ্জ আছে? ফের সামলে

নিয়ে বলল—শিবপালগঞ্জ।

--এবার বল, ভগবানের কসম, যা বলব, সব সত্যি বলব।

--বলে দিলাম।

--বলে দিলাম নয়, নিজের মুখে বলো—ভগবানের দিব্যি, সব সত্যি বলব।

--নিজের মুখেই তো বললাম।

আর্দালি মহামহিমের দিকে দেখতে লাগল। কথাবার্তায় ‘ডেডলক’!




মহামহিম ছোটে পালোয়ানকে বেশ খুঁটিয়ে দেখলেন। -- চওড়া চোয়াল, বলদের মত ঘাড়,

গয়াদীনের ভাষায়—শুঁড়হীন হাতি! আবার মহামহিমের ব্যক্তিত্ব বুদ্ধিজীবী ধাঁচের। উনি

আর্দালিকে বললেন—সাক্ষীকে বল বাইরে গিয়ে মুখ ধুয়ে আসতে।

--বাইরে যাও, মুখ পরিষ্কার করে ফের হাজির হও।

ছোটে পালোয়ান কাঁধের গামছা দিয়ে মুখের অদৃশ্য ঘাম মুছে নিয়ে কাঠঘড়ার ফ্রেমে হাত

রেখে বেপরোয়া ভঙ্গিতে চারদিকে তাকাল, যেন জাহাজের ডেকে রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে

সমুদ্রে জলজন্তুদের দেখছে। আদালত ফের হুকুম দিলেনঃ

-সাক্ষীর মুখ পরিষ্কার করাও!

এবার পাব্লিক প্রসিকিউটর ছোটেকে বললেন—বাইরে গিয়ে মুখের পান ফেলে এস।

ছোটে পালোয়ান এতক্ষণ বেশ ডাঁট দেখিয়ে পান চিবুচ্ছিল। ওর মনে হোল যেন ওকে ওর

আত্মসম্মান থুঃ করে ফেলে আসতে বলা হচ্ছে। ও এমন ভাব করল যেন শোনেনি,

তারপর চিবোনো পান গিলে ফেলে ফের গামছা দিয়ে ভাল করে মুখ মুছল।

মহামহিম আর্দালিকে বললেন—সাক্ষীকে শপথ করিয়ে নাও।

আর্দালি এই শর্টকাটকে মুখ ভেঙেচে দেখতে দেখতে ছোটে পালোয়ানকে বলল- বল,

ভগবানের কসম, যা বলব সব সত্যি বলব।

--সত্যি বলব।

--ভগবানের কসম।

--ভগবানের কসম।

ছোটে পালোয়ান এদিক ওদিক দেখতে দেখয়ে যন্ত্রের মত বলে দিল। উ

পাব্লিক প্রসিকিউটর প্রথমে পালোয়ানকে জোগনাথের ঘরে তল্লাসি নিয়ে প্রশ্ন করল।

ও স্বীকার করল যে দারোগাজী জোগনাথকে সঙ্গে নিয়ে ওর ঘরে তল্লাসি করতে

গিয়েছিলেন।

--তারপর ঘরের তল্লাসি হল?

--হ্যাঁ।

--কী পাওয়া গেল?

- কিস্যু না।




--পাব্লিক প্রসিকিউটরের চোখ কপালে উঠল। উনি দাবড়ে দিয়ে বললেন—আমি জানতে

চাইছি তল্লাসিতে কী পাওয়া গেল?

---কী আর পাওয়া যাবে? ঘন্টা?

জোগনাথ আর ওর উকিল—দুজনের মুখে হাসির ঝিলিক। পেছন থেকে শনিচর বলে

উঠল—শাবাশ! লড়ে যাও ব্যাটা!

“কে বলল? এখানে কে কথা বলছে? এ কী রকম অভদ্রতা”? মহামহিমের মুখ গম্ভীর।

কিন্তু শনিচর তার আগেই এজলাস থেকে কেটে পড়েছে।

পাব্লিক প্রসিকিউটর—তল্লাসি করে তিনটে গয়না উদ্ধার হয়েছে। সেগুলো এখন

তোমার সামনে রাখা হয়েছে।

অমনই জোগনাথের উকিল লাফিয়ে সামনে এসে দাঁড়াল।

--হুজুর, এ তো জেরা হচ্ছে! ক্রস এগজামিনেশন!

পাব্লিক প্রসিকিউটর— হুজুর, সাক্ষী হোস্টাইল হয়ে গেহে। আমি একে ক্রস

এগজামিনেশন করার অনুমতি চাইছি।

মহামহিম গম্ভীর মুখে বললেন—শুরু করুন।

জোগনাথের উকিল আপত্তি করল,--শ্রীমানজী আগে উনি লিখে দিন যে এই সাক্ষী

হোস্টাইল।

পাব্লিক প্রসিকিউটর ফাইল থেকে একটা আবেদন পত্র বের করে আদালতে পেশ

করলেন। বোঝা যাচ্ছে যে ওটা আগে থেকে লিখে রাখা।

ফের আপত্তি, --হুজুর ওটা আগে থেকে লিখে রাখা ছিল।

আদালত গম্ভীর—তাতে কী আসে যায়!

পাব্লিক প্রসিকিউটর নিজের সাফাই দিলেন।

--হুজুর, এ সমস্ত তো রোজকার কারবার, আদালতী দাঁও প্যাঁচ। সমস্ত সম্ভাবনার কথা

ভেবে আগে থেকে তৈরি হয়ে আসি।

--ঠিক আছে, ঠিক আছে। আপনি জেরা শুরু করুন।

পাব্লিক প্রসিকিউটর ঘুরে দাঁড়িয়ে ছোটে পালোয়ানকে সেই একই প্রশ্ন করলেন—এই

যে তিনটে গয়না দেখছ, এগুলো তল্লাসির সময় জোগনাথের ঘর থেকে বাজেয়াপ্ত হয়েছে?




ছোটে এমন ভাব দেখাল যেন ফালতু কথা নিয়ে বারবার কথা কাটাকাটিতে ওর কোন

উৎসাহ নেই। বলল—আমার বয়ান একবার হয়ে গেছে। তল্লাসিতে কিছুই পাওয়া যায় নি।

পাব্লিক প্রসিকিউটর ফাইল থেকে একটা কাগজ বের করে দেখালেন—এই ফর্দ মাল

বাজেয়াপ্ত করার সময় তোমার সামনে লেখা হয়েছিল?

--আমার সামনে খালি গালাগালি হচ্ছিল, তাই কোন লেখা-টেখার সুযোগই হয় নি।

--এই ফর্দতে এটা তো তোমারই দস্তখত? একবার ভাল করে দেখ।

পালোয়ান কাগজের দিকে না তাকিয়েই গোঁয়ার ভাব দেখিয়ে বলল—না।

পাব্লিক প্রসিকিউটর কাগজের এক জায়গায় ছোটে পালোয়ানের দস্তখত দেখিয়ে

বললেন—এই দেখ, ভালো করে দেখে নাও। এটা তো তোমারই দস্তখত।

ছোটে পালোয়ান এবার মহামান্য আদালতের দিকে তাকিয়ে বলল—আমার বয়ান নেয়া

হয়ে গেছে। তাহলে এ কেন বারবার একটাই প্রশ্ন করে যাচ্ছে?

কিন্তু মহামহিম এবার কোন সহানুভূতি না দেখিয়ে কড়াসুরে বললেন—কাগজ দেখে তবে

জবাব দাও। মিথ্যে বললে জেল হবে।

ছোটে এতটুকু বিচলিত হোল না। বুক চিতিয়ে বলল, -- জেলের কারবার নতুন কিছু নয়।

যখন এজলাসে এসেছি তখন এক পা জেলের মধ্যে, অন্য পা জেলের বাইরে। কিন্তু কাগজ

টাগজ কেন দেখব? লেখাপড়া আমার জন্য ক’অক্ষর গোমাংস।

পাব্লিক প্রসিকিউটর ফের উঁচু স্বরে বললেন—তাহলে দস্তখত কী করে কর? এই

দস্তখত তুমি করনি বলছ?

এতক্ষণ পরে জোগনাথের উকিল মুখ খুললেন। বললেন—ধীরে ধীরে একটা একটা করে

প্রশ্ন করুন। সাক্ষী কি পালিয়ে যাচ্ছে?

পাব্লিক প্রসিকিউটর পাত্তা না দিয়ে ফের জিজ্ঞেস করলেন—তাহলে দস্তখত কী

করে কর?

--কোন হতভাগা দস্তখত করে? আমার সাত পুরুষে কেউ কখনও দস্তখত করেনি আর

আমি করব! যাও, ভাল করে চোখ খুলে দেখ। পাঁচশো কাগজ রাখা আছে, সবকটায় আমার

বুড়ো আঙুলের টিপছাপ। হোল তো?

ছোটে পালোয়ান গর্বের সঙ্গে এজলাসের চারদিকে চোখ ঘুরিয়ে দেখল।

পাব্লিক প্রসিকিউটর ফের বললেন—আমি বলছি, এই কাগজে তুমিই দস্তখত করেছ।

--সে তুমি সারাক্ষণ চড়াইয়ের মত কিচিরমিচির করতে থাক, কে মানা করছে?




আদালত হস্তক্ষেপ করলেন,--ভদ্রভাবে কথা বল।

ছোটে পালোয়ানের মেজাজ চড়ে গেছে। বলল, --যার যার ভদ্রতা তার তার কাছে হুজুর!

এনার ধমক খেয়ে মিথ্যে সাক্ষী কেন দেব?

পাব্লিক প্রসিকিউটর নিজের ফাইল গুটিয়ে নিয়ে বললেন—আমার আর কিছু জিজ্ঞেস

করার নেই।

ছোটে পালোয়ান লুঙি কষে কেটে পড়ছিল। কিন্তু জোগনাথের উকিল বাধা দিলেন।

--আমি কিছু প্রশ্ন করতে চাই।

আদালতের আপত্তি নেই।

উকিল বললেন—গয়াদীনের মেয়ে বেলাকে চেন?

--কে না চেনে!

--এলোমেলো কথা ছেড়ে নিজের কথা বল। তুমি ওকে চেন, কি চেন না?

--চিনব না কেন!

--মেয়েটি কেমন?

--বাজে মেয়ে, চালচলন ঠিক নয়।

মহামহিম বাধা দিলেন; --এসব কথার কী মানে? বর্তমান কেসের সঙ্গে কিসের

সম্পর্ক?

--সম্পর্ক থাকবে না কেন? এখনই মামলা সাফ হয়ে যাবে।

এবার উকিল কটু স্বরে ছোটে পালোয়ানকে বললেন—কী করে বলছ যে মেয়েটার চালচলন

ঠিক নয়?

--নিজের চোখে দেখেছি যে!

--কী দেখেছ?

--দেখেছি ও জোগনাথের সঙ্গে খারাপ কাজ করছিল। গয়াদীন এজন্যই জোগনাথকে

মিথ্যে মামলায় ফাঁসিয়েছে।

ব্যস, এরপর জেরা শুরু হোল সেই পুরনো বহু প্রচলিত কায়দায়—যাতে আদালতে বহুবার

প্রমাণ করা হয়েছে যে সংসারে কেউ চোর নয়, বরং যাকে চোর ভাবা হয়েছে সে আসলে

গেরস্তের বৌ, বোন বা মেয়ের প্রেমিক। যাকে তারা রাত্তিরে নির্জন শয্যায় শোয়ার




নেমন্তন্ন করেছিল। কিন্তু গেরস্ত তাকে নিজের ভাই, ভগ্নিপতি বা জামাই না বলে চোর

বলে ডেকেছে। যার পরিণামে আজ-----।




সেই দারোগাজী আজকাল শিবপালগঞ্জে নেই, বদলি হয়ে গেছেন। নিজের ভাঙাচোরা খাট,

দুধেল গাই, এবং কনভন্টগামিনী কন্যাকে নিয়ে শহরবাসী হয়েছেন। বড় মুশকিলে একটা

গলির মধ্যে একটা ছোটখাটো ভাড়ার বাড়ি পেয়ে তাতে সাধারণ নাগরিকের মত বাস

করছেন। যেহেতু সরকারি আধিকারিককে সামান্য নাগরিকের দশায় দেখলে খারাপ লাগে,

তাই ওনাকে দেখেও খারাপ লাগল।

কিন্তু উনিই তো জোগনাথের চুরির মামলার তদন্ত করেছিলেন তাই ওনাকে আজ ফের

এজলাসে হাজির হয়ে গঞ্জহাদের সঙ্গে গা ঘেষাঘেষি করতে হচ্ছে। ছোটে পালোয়ানের

বয়ান শোনামাত্র উনি ছিঃ ছিঃ করে উঠলেন। মহামহিমের নজর ওনার উপর পড়ার আগেই

উনি গয়াদীনের হাত ধরে বাইরে চলে এলেন। খানিকক্ষণ দুজনেই চুপ।

শেষে দারোগাজী বললেন— হতচ্ছাড়া গঞ্জহার দল! বেইমানীর সীমা ছাড়িয়ে গেছে। এমন

একটি মেয়ের জন্যে এরকম নোংরা কথা বলার আগে ওদের জিভ খসে যায় না কেন!

গয়াদীন মাথা নীচু করে মেজের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। দুটো ইঁটের ফাঁকে একটা আলপিন

পড়ে আছে। ওনাকে দেখে মনে হচ্ছে-- যেন ভাবছেন, ওটা তুলে নেবেন কিনা।

দারোগাজী ঘৃণার স্বরে বললেন—এখানে দেখছি-- যে কেউ কারও নামে কিছু বলতে পারে।

ভালমানুষের কোন কদর নেই।

গয়াদীন মুখ খুললেন, সেই চিরপরিচিত ক্লান্ত স্বরে—এতো হবারই কথা। যেদিন

আপনি জোগনাথকে ধরে নিয়ে গেলেন, সেদিনই বুঝেছিলাম—এবার আমার ঘরে কারও

ইজ্জত বাঁচানো কঠিন হবে।

--আমার বড্ড আফশোস হচ্ছে।

--আফশোস কেন? আপনার কী দোষ? কাউকে চোর সাজিয়ে জেলে ভরতে চাইলে সে কি

ছেড়ে কথা বলবে?

--আমার তো সারা শরীর জ্বলছে।

--আমার জন্য শরীর পোড়াতে হবে না দারোগাজী! এসবই আমাদের দেশের রীতিরেয়াজ।

কাছারির মুখ দেখেছি যখন সবই সহ্য করতে হবে। যাকে এখানে আসতে হয়, ধরে নাও

তার কপাল পুড়েছে। তুমি নিজের শরীর পুড়িয়ে কী আর করবে?




জোগনাথের উকিল তিরবেগে বেরিয়ে এসে অন্য কোন এজলাসের দিকে দৌড়ল। ওর পেছন

পেছন দৌড়ুতে থাকা মক্কেলদের বলল—তাড়াহুড়ো কোর না। আগে জোগনাথকে ছাড়া

পেয়ে বাইরে আসতে দাও। তারপর এক এক জনের হিসেব করব। হ্যাঁ হ্যাঁ, পুলিসেরও।

দারোগাজী চমকে উঠে তাকালেন। কিন্তু ওনার দেখার জন্য কিছু বাকি ছিল না।

(চলবে)

0 comments:

0

ধারাবাহিক - নন্দিনী সেনগুপ্ত

Posted in





















২০


-“আপনি নিজেকে সামলে নিন!” বলে ওঠে জেরাল্ড। চার্লস চুপ করে যায়। স্থাণু হয়ে থাকে জানালার সামনে অদ্ভুত বিষণ্ণ ভঙ্গিমায়। একটুও নড়ে না।

-“এখানে এসে বসুন!” জেরাল্ড বলে যায়… “এবং আমার কথা ভালভাবে শুনুন।” একটা চেয়ার যেটা ল্যাম্পশেড থেকে একটু দূরে, সেখানে চার্লসকে বসতে ইঙ্গিত করে সে। চার্লস জানালার পাল্লার হাতলটা ছেড়ে ধীরে ধীরে এসে চেয়ারে বসে। মুখ তুলে তাকায় না সে। তার দুই হাত এখনো মুষ্টিবদ্ধ।

জেরাল্ড খুব খুঁটিয়ে লক্ষ্য করে চার্লসকে, তারপর শীতল এবং নিঃস্পৃহ স্বরে বলে যায়…

-“আমি ব্যাপারটা একটু বুঝিয়ে বলতে চাই যে কেন সেদিন রবার্টকে আমি বলেছিলাম আপনাকে বাড়ি পাঠিয়ে দেবার জন্য। আপনি ছাত্র হিসেবে সাধারণ মানের এবং আপনার স্নায়ূ সব সময় চঞ্চল হয়ে থাকে। এদিকে আপনার অভ্যেস আছে সব সময় কোনও না কোনও অ্যাডভেঞ্চারে জড়িয়ে পড়ার। আমি সচেতনভাবেই ‘অভ্যেস’ শব্দটা ব্যবহার করছি, কারণ বার বার এই ধরনের কাজ করাটা আপনার কাছে স্বাভাবিক বলেই মনে হচ্ছে। কিন্তু আপনার জন্য সবচেয়ে ভাল হবে শান্তিতে নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকা, শান্ত হয়ে পড়াশুনা করা এবং শান্তিতে জীবন কাটানো। আপনি সহজে উত্তেজিত হয়ে যান, অদ্ভুত কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলেন এবং মনে করেন যে আপনার এই অভিজ্ঞতা একটা দারুণ ব্যাপার আপনার জীবনে। যেমন রবার্টের ওখানে যেতে যেতে, আপনি হঠাৎ মিকার প্রেমে পড়লেন। দয়া করে বসুন, দয়া করে… আমার পুরো কথা শুনে যাবেন। আপনি মিকার প্রেমে পড়লেন। মেয়েটি বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ, সবার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে জানে, কিন্তু আচার আচরণ অত্যন্ত শিশুসুলভ এবং সে নিজেই খুব বিভ্রান্তিতে ভোগে। ফলে আপনার পক্ষে তার সঙ্গে মেলামেশা করা একেবারে অর্থহীন। তাছাড়া এই ধরনের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার মত পরিপক্কতা আপনার একেবারেই নেই এবং আপনি অকারণে কষ্ট পাবেন। কষ্ট পেতে বাধ্য আপনি, চার্লস এবং এই পরিস্থিতি আপনি নিজে ডেকে আনছেন। আমি বহুবার রবার্টকে আপনাকে তার বাড়িতে আমন্ত্রণ জানাতে বারণ করেছি। সে আমার কথায় কর্ণপাত করেনি, সেই কারণে আমি আপনাকে সেদিন বলেছিলাম বাড়ি চলে যেতে।”

চার্লস অস্পষ্ট স্বরে কিছু একটা বলবার চেষ্টা করল। তবে এখন তার ভাবভঙ্গি বেশ নম্র। সে বুঝতে পেরেছে যে কোথাও একটা ভুল হয়েছে তার। জেরাল্ড তাকে অপমান করবার জন্য এসব বলেনি। এক সাধারণ মানের ছাত্র এবং অল্পবয়সী কিশোর যে সব ব্যাপারে অপ্রয়োজনে নাক গলিয়ে বেড়ায়, এরকম এক মানুষ হিসেবেই জেরাল্ড তাকে দেখে। পুরো ব্যাপারটা সত্যি এবং লজ্জাজনক হলেও সেদিন চার্লসকে অপমান করবার উদ্দেশ্য জেরাল্ডের কোনওমতেই ছিল না, এটা পরিষ্কার। বাড়ি পাঠিয়ে দেবার ব্যাপারটা একটা সাধারণ বাক্য হিসেবেই ধরা উচিত এক্ষেত্রে।

এখন জেরাল্ডের দিকে মুখ তুলে তাকানো কিম্বা তার ব্যাপারে অভিযোগ করবার মত কোনও সাহস চার্লসের আর অবশিষ্ট নেই। সে বলে যে জেরাল্ড যেহেতু চার্লসের দোষের ব্যাপারগুলো খোলাখুলি বলে দিয়েছে, সেহেতু তার আর বিশেষ কিছু বলবার সুযোগ নেই এই মুহূর্তে। তবে এখন চার্লসের বক্তব্য একটু ক্ষমাসূচক সুরে বাঁধা। জেরাল্ডও অনেকটা নরম সুরে কথা বলে এখন…

-“রবার্টের ওখানে যাবার আপনার কোনও প্রয়োজন নেই।” জেরাল্ড বলে যায়… “তাছাড়া ওখানে যাওয়া এমন কিছু বড় ব্যাপার নয়। আপনি এইসব মানুষদের বিশাল কিছু ভেবে বসে আছেন। আমার ব্যাপারেও আপনি ভেবেছেন আমি একজন কেউকেটা। আসলে আপনি হীনমন্যতায় ভুগে এইসব ফাঁকা আওয়াজে, মূল্যবোধের নকল মানকে আসল বলে ভেবে বসে আছেন। কারো সঙ্গে মতের অমিল হওয়া মানে হেরে যাওয়া নয়। এইসব বার গার্ল যারা, তারা নিরীহ বার গার্ল মাত্র। কিন্তু তাদের সঙ্গে আমার মিলমিশ হওয়া অসম্ভব। কারণ এরা চটপটে, চতুর আর বেশ বলিয়েকইয়ে ধরনের এবং তারা কখন কোথায় কার সঙ্গে ঝামেলা পাকাবে, কেউ জানে না।”

চার্লস আবার একগুঁয়ে ভঙ্গিতে বলে ওঠে… “কিন্তু আপনি আমায় অতি সাধারণ বলে দাগিয়ে দিয়েছেন এবং ঠিক এই কারণেই মিকা আমায় অবজ্ঞা করে।”

“মিকার অবজ্ঞার সঙ্গে এসবের কী সম্পর্ক! চার্লস, আমি আপনাকে যতখানি বোকা ভেবেছিলাম, আপনি তার চেয়েও অনেক বেশি বোকা। যান, আপনার যদি অতই ইচ্ছে থাকে, তো রবার্টের কাছে যান। অন্তত নিজেকে দুঃখী, বিষণ্ণ, অবমানিত আত্মা ভাবা বন্ধ করুন। পারলে সঙ্গে বের্নহার্ডকেও নিয়ে যান। আমি আপনার কোনও ব্যাপারে থাকতে চাই না।”

বের্নহার্ড পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারে না জেরাল্ডকে। কেন সে আবার রবার্টের কাছেই যেতে বলল যদি সেখানে যাওয়াটা চার্লসের জন্য এতটাই ক্ষতিকর হয়? সে নিজেই বা কেন যায় সেখানে? সে কি রবার্টের ওখানে যারা আসে, তাদের পছন্দ করে? হঠাৎ বের্নহার্ডের সেই বাচ্চাদের ছবির কথা মনে পড়ল। সেই মহৎ, অথচ বিষণ্ণ মুখচোখ এবং তাদের হাতে এক অদ্ভুত পেলব আর্তি। সে মনে মনে বাচ্চাগুলোর সঙ্গে একাত্মতা অনুভব করল, তার মনে হল যেন তারা ভাইবোনের মত আপন।

…………………

হে পাঠক, এখন আমরা একটু ক্রিস্টিনার ব্যাপারে জেনে নেব। ভাস্কর্যশিল্পী ক্রিস্টিনা, সুদর্শনা এবং কল্পনাপ্রবণ এক নারী। তার প্রতিভা, তার চরিত্রের বহুমুখী গুণাবলী সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা শুধু কঠিন নয়, বিভ্রান্তিকর হয়ে উঠতে পারে। প্যারিসে সে বহুদিন ধরে কাজ করছে। রদ্যাঁ মিউজিয়ামে তাকে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায়। কখনো সে একটা মূর্তির সামনেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকে গালে হাত দিয়ে… সম্ভবত বুঝবার চেষ্টা করে যে মহান শিল্পীর শৈলীর গোপন রহস্য কী ছিল! তার কোনও শিক্ষক নেই, সে অতীতে কোনও স্টুডিওতে কাজ করেনি। “কে আমায় শেখাবে কী ভাবে দেখতে হয়”… সে বলেছিল… “কারণ ঠিকভাবে দেখতে পারাটাই আসল তফাৎ গড়ে দেয়।”

নিয়মিত কাজ করে না সে। দিনের পর দিন, সপ্তাহের পর সপ্তাহ হয়তো সে কোনও কাজই করল না। এদিক ওদিক উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়াতে লাগল, দেখতে লাগল অনেক কিছু। কারণ সে সারা পৃথিবীটাকেই বিশেষ ভাবে দর্শন করতে চায়। সেই সময় সচেতনভাবে নিজের মনের ভাবনাগুলো বিশ্লেষণ করে না, অনুভবগুলো নিয়মমাফিক সাজিয়ে গুছিয়ে রাখতে চায় না সে। এই সময়গুলো সে একটা ঘোরের মধ্যে বাস করে। বহির্জগতে ভাবনাগুলো প্রকাশ করে না সে। অবচেতনে পাওয়া আকার, রূপ এবং রেখার মধ্যে আধোজাগা অবস্থায় বিচরণ করে ক্রিস্টিনা।

কিন্তু এই সমস্ত আকার তার মনে অদ্ভুত তীব্রতা নিয়ে স্পষ্টভাবে জেগে থাকে। তার ইন্দ্রিয়ানুভূতি একত্রিত করে সে বাস্তবে দেখা বাড়িঘরদোর, জন্তুজানোয়ার এসবের মধ্য থেকেই নতুন আকার নির্মাণের সাধনা করে। মানুষজনের মুখ বিষণ্ণ কিম্বা আনন্দিত, যেরকমই হোক না কেন, তার স্মৃতিতে ধরা থাকে একেকটা মুখোশের মত। প্রাথমিকভাবে সে ওই মুখগুলোর অভিব্যক্তি বোঝবার চেষ্টা করে না। কিন্তু দ্বিতীয়বার যখন ওই মুখগুলি হানা দেয় তার মনে, তখন যেন পাথর কুঁদে কুঁদে তৈরি করা নিষ্প্রাণ মূর্তির মত সে দেখতে পায় ওই মানুষদের। পুরো প্রক্রিয়া সে কখনোই সজ্ঞানে চালনা করে না। আপনা থেকেই, তার মনের অবচেতনে ঘটে এমন রূপান্তর। ক্রিস্টিনা একথা একেবারেই সচেতনভাবে লক্ষ্য করে না যে তার স্মৃতির প্রকোষ্ঠের ভেতরেই ঘটে গিয়েছে এই প্রক্রিয়া। নিজেরই অজান্তে মুখাবয়বগুলির ভাস্কর্যের মধ্যে সঞ্চার করে সে নতুন আত্মার স্পর্শ।

অতএব, অনেক সময় এমন হত যে ওই মুখাবয়বগুলির মধ্যে একটা বিশেষ সাদৃশ্য দেখা যেত; অবশ্য যদি কেউ খুব খুঁটিয়ে দেখে তাহলে সেটা অনুভব করবে। কিন্তু যদি সেই দর্শককে প্রশ্ন করা হয় যে সাদৃশ্য ঠিক কোন জায়গায়, তাহলে সে সেটা সঠিকভাবে বুঝিয়ে বলতে পারবে না। তবে এই সাদৃশ্যের ব্যাপারটা ক্রিস্টিনা গঠনমূলক সমালোচনা হিসেবেই গ্রহণ করে। কারণ সে কিছুতেই নিজের কাজে একঘেয়েমি দ্বারা আক্রান্ত হতে চায় না। ফলে সে বিশেষ নজর রাখে যাতে একটা কাজ আরেকটা দ্বারা প্রভাবিত না হয়। প্রতিটি কাজই তার কাছে প্রথম। সে অবশ্য নিজের প্রতিভার ব্যাপারে সচেতন, এবং তার অনেক কারণ আছে। তরুণ প্রজন্মের অতি প্রতিভাবান ভাস্করদের মধ্যে ক্রিস্টিনা অন্যতম।



(চলবে)

0 comments:

0

গল্প - মনোজ কর

Posted in


 







আঠারো পর্ব

ছোটকালী বেরিয়ে যাবার এক ঘন্টার মধ্যে মনীষার ফোন এল পানু রায়ের কাছে।

-মিঃ রায়, মনীষা বলছি।

-বলো। কী হয়েছে?

-আমি আপনাকে বিরক্ত করতে চাইনা। কিন্তু একটা বেশ বড় গন্ডগোল দেখে মনে হলো আপনাকে এক্ষুণি জানানো দরকার।

- কী গন্ডগোল?

- কয়েকটা বিল পেমেন্টের জন্য চেক কাটা হয়েছে কিন্তু চেকগুলো কাটা হয়েছে যে সব কোম্পানির নামে সেই কোম্পানিগুলো কেউ কোনও কাজ করেনি। আমি একটা বিলের কথা বললে হয়ত আপনার বুঝতে সুবিধে হবে। যেমন ধরুন বেশ কয়েকটা বিল এবং রসিদ দেখলাম তেওয়ারি ইলেকট্রিকের। সব মিলিয়ে প্রায় পাঁচ লক্ষ হবে। খাতায় চেক নম্বর, অ্যামাউন্ট,কাজের বিবরণ ইত্যাদি সব ঠিক লেখা আছে কিন্তু কোম্পানির নাম লেখা নেই।

-একটা কাজ করো। তুমি অ্যাকমে ইলেকট্রিককে ফোন করে বলো যে বিলগুলো একটু পাল্টাতে হবে এবং অর্ডারের কপিটা নিয়ে দেখা করতে।

- করেছি। কিন্তু কেউ ফোন ধরলো না।

-ওদের বিলে ঠিকানা লেখা নেই?

-আছে। কিন্তু খোঁজ নিয়ে জেনেছি ওখানে ঐ নামে কোনও অফিস নেই।

-বিলগুলো কি ছাপানো বিল?

-হ্যাঁ। বিলগুলো তো ঠিকই লাগছে। রাবার স্ট্যাম্প মেরে চেক-এর প্রাপ্তি স্বীকার করা আছে। তার চেয়েও বড় কথা খোঁজ নিয়ে দেখেছি এরকম কোনও কাজই হয়নি। এখন ব্যাঙ্ক বন্ধ। কাল সকালে ব্যাঙ্কে গিয়ে দেখবো আর কিছু জানা যায় কি না।

-ঠিক আছে। দেখ আর কিছু জানা যায় কি না। আরও কিছু ডিটেল না পেলে আগে কিছু করা যাবে না। তোমার কী মনে হয়? কী হতে পারে?

-আমার মনে হয় কেউ খবর পেয়েছিল যে নতুন সেক্রেটারি কাজে জয়েন করেছে। কিছু কাজ না করে একটা ভুয়ো বিল ছাপিয়ে এলিনাকে পাঠিয়ে দেখতে চেয়েছিল সে কী করে। প্রথম বিলটা ছিল ছোট অঙ্কের, কুড়িহাজার টাকার কাছাকাছি।

- বিলটা পেয়ে এলিনা কী করেছিল?

- কোনওরকম চেক না করে পেমেন্ট পাঠিয়ে দিয়েছিল।

- চেক পোস্টে পাঠিয়েছিল?

- হ্যাঁ, বিয়ারার চেক কেটে পোস্টে পাঠিয়ে দিয়েছিল।

-আচ্ছা, তারপর কী হলো?

-তারপর একমাস সব চুপচাপ। একমাস পরে আবার একটা ভুয়ো বিল এলো। এবার অঙ্কটা পঞ্চাশ হাজারের কাছাকাছি। একই ভাবে পেমেন্ট পাঠানো হলো। পরের বিলটা এলো তিনটে কাজের জন্য। আলাদা আলাদা তিনটে বিল। সব মিলিয়ে প্রায় দু লক্ষ টাকার কাছাকাছি।

-আর কিছু?

-অ্যাকমে ইলেকট্রিকের আর কোনও বিল আসেনি। তবে আমার সন্দেহ যে যদি অন্য কেউ এলিনার এইভাবে পেমেন্ট দেওয়ার কথা জানতে পারে তাহলে ব্যাপারটা এখানেই শেষ হয়নি।

-চেকগুলো কে সই করেছিল?

-কৃষ্ণকালী নিজেই। আপনি নিশ্চয়ই জানেন ওনার চেক সই করার পদ্ধতি। ওনার সেক্রেটারি সমস্ত চেক লিখে রেডি করে রাখে। উনি মাসের আট তারিখে সব চেক সই করে দেন যাতে ক্যাশ ডিসকাউন্ট পাওয়া যায়। সাধারণত সব বিলেই লেখা থাকে দশ তারিখের মধ্যে পেমেন্ট করলে দুই শতাংশ ডিসকাউন্ট দেওয়া হয়। কিন্তু এলিনা কোনও চেকেই ডিসকাউন্টের টাকা কাটেনি। পুরো বিলের অ্যামাউন্টই পেমেন্ট করেছে।

-আমাকে খবর দিয়ে ভালোই করলে। ব্যাপারটা খতিয়ে দেখে জানাব। আমাকে ঠিকানাটা বলো।

- ১৬, রাজেন্দ্রনগর।

-ঠিক আছে। আর সব কী খবর? কেমন আছো তুমি?

- খুবই অগোছালো সব কিছু। দেখি কতটা গোছাতে পারি।

-বেশি চাপ নিও না এখন। কালকে আসবে?

-হ্যাঁ, কাল আসবো।

-তাহলে আমি কাল আসবো একবার। নিজের চোখে কাগজপত্রগুলো দেখে আসবো।

- তাহলে তো খুবই ভালো হয়।

-ঠিক আছে রাখলাম এখন।

ফোন রেখে পানু রায় সুন্দরীর দিকে তাকিয়ে ভুরু কুঁচকে বললেন,’ কিছু তো একটা ঘটছে। জগাই কে বলো রাজেন্দ্রনগরের ঐ ঠিকানায় অ্যাকমে ইলেক্ট্রিকের ব্যাপারে একটু খোঁজখবর করতে। খুব অদ্ভুত ব্যাপার। কেউ না কেউ তো লাভবান হচ্ছে নিশ্চয়ই।‘ সুন্দরী বললো,’ অন্তত একজন তো হচ্ছেই।‘ সুন্দরীর কথা শেষ না হতেই কাঠমান্ডুর হোটেল থেকে সেই মেয়েটার ফোন যার সঙ্গে বড়কালী দরকার হলে যোগাযোগ করতে বলেছিল।

-আমি কে বলছি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, মিঃ রায়।

-হ্যাঁ, বলুন। কোনও জরুরি দরকার?

- কৃষ্ণকালী একটা জরুরি বিষয়ে এক্ষুণি ওনার ছেলের সঙ্গে কথা বলতে চান।

-বেশ, তাতে আমার কী করার আছে?

-না, ফোনে নয়। উনি ফ্লাইটে রওনা হয়ে গেছেন। উনি বলেছেন যে উনি যথেষ্ট সাবধানতা অবলম্বন করেছেন যাতে কেউ না জানতে পারে উনি কোথায় যাচ্ছেন এবং কখন যাচ্ছেন। উনি আমাকে বলেছিলেন উনি ঠিক তিনটের সময়, ছ’টার সময়, আটটার সময় এবং দশটার সময় আমাকে ফোন করবেন। যদি কোনও কারণে কোনও একটা ফোন না আসে শুধুমাত্র তাহলেই আপনাকে জানাতে।

-আপনি ফোন করেছেন কারণ তিনটের ফোন আসেনি?

-একদম ঠিক। সেজন্য ওনার নির্দেশমতো আপনাকে জানালাম।

-ধন্যবাদ। তার মানে ওনাকে অ্যারেস্ট করা হয়েছে। কেস লেখা না হলে আমাদের কিছু করার নেই। আমরা অবশ্যই খবর রাখবো।‘

পানু রায় ফোন রাখার সঙ্গে সঙ্গেই সুন্দরী সান্ধ্য দৈনিকের দু এর পাতাটা পানু রায়ের সামনে ধরে বললো,’ শিবুলালের অ্যাপার্টমেন্ট থেকে পুলিশ রক্তমাখা পায়ের ছাপ পেয়েছে। ছবিটাও ছেপেছে কাগজে।‘ পানু রায় কাগজটা সুন্দরীর হাত থেকে প্রায় ছিনিয়ে নিয়ে গভীরভাবে ছবিটা নিরীক্ষণ করে বললেন,’ এটা একটা লোকের পায়ের জুতোর ছাপ। জুতোটা নতুন। গোড়ালির লেখাটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে- ‘রাদু’। পানু রায় অস্থিরভাবে পায়চারি করতে করতে কী যেন ভাবতে লাগলেন। তারপর পায়চারি থামিয়ে সুন্দরীকে বললেন,’ আমার মনে হয়না আমি যদি কোনও সাক্ষীর সঙ্গে কেসটা অপব্যখ্যা সমেত কোর্টে ওঠার এবং জট পাকিয়ে যাওয়ার আগে কাজে নেমে পড়ি এবং কোনওরকম সাক্ষ্যপ্রমাণলোপের চেষ্টা না করি তাহলে অন্যায় করা হবে না। ওরা থানায় নিয়ে গিয়ে সাক্ষীকে গুলিয়ে দেবার আগেই আমাকে একটা কিছু করতে হবে।আরও একটা ব্যাপার তুমি লক্ষ্য করেছো কি না জানিনা। সাধারণত পুলিশ মূল অভিযুক্তকে চিহ্নিত করতে পারলেও খুনী অস্ত্রের সন্ধান সহজে পায়না। কিন্তু এক্ষেত্রে তার উল্টো। পুলিশ অস্ত্রের সন্ধান পেয়েছে কিন্তু কে খুন করেছে বুঝতে পারছেনা।

-দাদু, তাহলে তুমি পুলিশের থেকে এ ব্যাপারে একটু এগিয়ে রয়েছো। তুমি জানো যে তুমি বন্দুক বদল কর নি। আর তুমি এও জানো যে খুনী বন্দুকটা ছোটকালীর ড্রয়ারেই ছিল।

-সুন্দরী, আসল সমস্যাটা হচ্ছে আমি এখনও জানিনা যে বন্দুকটা ওখানে কে রেখেছিল? জানতেও পারবনা যতক্ষণ না আমি বড়কালীর সঙ্গে কথা বলতে পারছি।

-আর যদি বড়কালী না রেখে থাকে?

-তাহলে যে খুন করেছে সে রেখেছিল। আমাদের এখন অনেক কাজ। পুলিশ রেবা কৈরালাকে ধরে রেখেছে। এখন ওরা বড়কালীকে অ্যারেস্ট করবে। পুলিশকে পাত্তা না দিয়ে বড়কালী ঠিক করেনি। জগাইকে বলতে হবে বড়কালীর অফিসের ঐ নকল বিলগুলো কোথা থেকে ছাপা হয়েছিল খুঁজে বের করতে। দরকার হলে এই এলাকার সবকটা প্রেসে গিয়ে খবর নিতে হবে। তোমার মাথার যন্ত্রণা এখন কেমন?

-অনেক ভালো।

পানু রায় এবং সুন্দরী পাশেই একটা রেস্টুরেন্টে ঢুকে দুটো মোজিটো অর্ডার দিয়ে বসলো। পানু রায় বললেন,’ সুন্দরী, কী খাবে বলো? অনেকদিন গুছিয়ে খাওয়া হয়নি। চাপে না থাকলে আমার ক্ষিদে পায়না।‘

-আমার ক্ষিদে সে রকম নেই। কিন্তু জায়গাটা বেশ আরামদায়ক। কাজের ঝুটঝামেলা থেকে একটু ছুটি মন্দ নয়।

-আমার জন্য চিকেন রোস্ট আর স্ম্যাসড পোটাটো অর্ডার করো। তুমি দেখ কী খাবে। ততক্ষণে আমি জগাই কে ফোন করে বলি যে আমরা এখানে আছি। ও আসতে পারলে ভালোই হবে।

পানু রায় জগাইকে ফোন করে বললেন,’ তুমি কোথায়? শোন আমরা অফিসের পাশে যে রেস্টুরেন্টে আমরা মাঝে মাঝে বসি ওখানে আছি। সুন্দরীও আছে।তুমিও চলে এসো।‘ জগাই উত্তরে বললো,’ আমিও তোমাদের খুঁজে বেড়াচ্ছি। অফিসে তোমাদের দেখতে না পেয়ে ফোন করতে যাচ্ছিলাম। সময় নষ্ট করার মতো সময় নেই। ‘

-কী হয়েছে জগাই?

-কেলো দারোগা হন্যে হয়ে তোমাদের খুঁজছে। একটু আগে পুলিশের লোক তোমার খোঁজে অফিসে গিয়েছিল।

-কেন?

-বড়কালীকে পুলিশ ধরে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে। বড়কালী কোনও প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে না। বলেছে তুমি না আসা পর্যন্ত একটা কথাও উচ্চারণ করবে না। আমি খবর পেলাম কেলো দারোগা বড়কালীকে বলেছে ঠিকঠাক উত্তর না দিলে ওর গ্রেপ্তার হওয়ার খবর কাগজওয়ালাদের জানিয়ে দেবে।

-বড়কালী এখন কোথায়? তুমি কোথায়?

-আমি সব শুনে থানায় চলে এসেছি। বড়কালী কেলো দারোগার সামনে বসে আছে।

-ভেতরে গিয়ে বলে দাও আমি আসছি।

0 comments: