0

সম্পাদকীয়

Posted in



































সময়টা উৎসবের। যে শব্দটি উচ্চারণের মধ্যে এক হওয়ার একটি অভ্রান্ত বার্তা থাকে। থাকে এক স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দ উদ্‌যাপনের ইঙ্গিত। কিন্তু কোনও কারণে যদি পরিবেশ হয়ে ওঠে বিপদজনক, সম্পর্কগুলি আক্রান্ত হয় চোরা বিশ্বাসহীনতায়, উৎসবের বাতাবরণে কি অনুপ্রবেশ ঘটে না অবাঞ্ছিত উপাদানের?

গত কয়েকমাসে দেশের পরিস্থিতি যেমন, স্বাধীনতার পরবর্তী আশি বছরে এমন ঘটনাবলীর সম্মুখীন সম্ভবত এদেশের মানুষকে এর আগে হতে হয়নি। তরুণ সমাজের মধ্যে ক্ষোভের উদগীরণ মানুষ এর আগেও দেখেছে। একথাও অত্যুক্তি হবে না যে তারুণ্যই দুনিয়া কাঁপানো সব বিপ্লবের আঁতুর ঘর। তবুও সমস্ত সার্থক আন্দোলনের থাকে একটি কক্ষপথ। অনেক মূল্যের বিনিময়ে চিনে নিতে হয় সেটিকে। অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য যা নিতান্তই জরুরি। বাঁধনছেঁড়া উজ্জ্বল মুখগুলির কাছে আমাদের প্রত্যাশা এইটুকুই যে তাদের মেধার আলোয় আলোকিত হয়ে উঠবে সেই পথটি।

সুস্থ থাকুন। দায়বদ্ধ থাকুন।

শারদীয় শুভেচ্ছা ।

0 comments:

0

প্রচ্ছদ নিবন্ধ - রঞ্জন রায়

Posted in




















(সন্দর্ভঃ লেখক দেবোত্তম চক্রবর্তীর “বিদ্যাসাগরঃ নির্মাণ, বিনির্মাণ ও

পুনর্নিমাণ” গ্রন্থে বিদ্যাসাগরের মূল্যায়ন নিয়ে আমার চলমান বিতর্ক)

১.০ ইংরেজের কলোনিয়াল শিক্ষা সংস্কার ও বিদ্যাসাগর

১.১ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কেন প্রাচ্যভাষা শেখার মাথা ব্যথা?

আমরা ইতিমধ্যে দেখেছি যে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে উদ্ভুত নব্য জমিদার

ও নব্য ধনী মধ্যবিত্ত শ্রেণির গাঁটছাড়া বাঁধা রয়েছে কলোনিয়াল প্রভু ইংরেজের

কায়েমি স্বার্থের সঙ্গে। তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার একটি অভিমুখ হল ইংরেজি

শিক্ষালাভ।

কিন্তু এহ বাহ্য। আগে কোম্পানি যে ফোর্ট উইলিয়ম কলেজ শুরু করল তাতে

পড়ানো হত-আরবি, ফার্সি, হিন্দুস্তানি, সংস্কৃত, বাংলা ও অন্যান্য দেশিয় ভাষা।

কেন? উত্তরে লেখক সঠিক ভাবে দেখিয়েছেন ‘সওদাগরি ব্যবস্থা মসৃণভাবে

চালাতে গেলে সওদাগরদের সওদার ভাষা শিখে নেওয়া খুব জরুরি। দেওয়ানি ও

ফৌজদারি মামলার রায় যাতে শাসকস্বার্থকে অক্ষুণ্ণ রাখে, সেদিকে দৃষ্টি রেখে

আদালতে ভাষার ওপর দখলদারিও প্রয়োজনীয় বটে। তাই ইংল্যান্ড থেকে আগত

ছোকরা সাহেব কর্মচারীদের ভারতীয় ভাষা শেখানোর উদ্দেশ্য ১৮০০ সালে

কোলকাতায় স্থাপিত হয় ফোর্ট উইলিয়ম কলেজ’।

সেসময় দিল্লিতে মোগল বাদশা, গোটা দেশে রাজকাজ হয় ফার্সীতে।

লেখকের মতে গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস নব্যধনী আশরফ মুসলমান ও

হিন্দু দেওয়ান-বেনিয়াদের দেখাতে চাইলেন ‘আমি তোমাদেরই লোক’। তাই রাজধানী

কোলকাতায় ১৭৮১ সালে স্থাপিত হোল কোলকাতা মাদ্রাসা এবং ১৭৮৪ সালে

এশিয়াটিক সোসাইটি। লেখক এদের প্রাচ্যবিদ্যা চর্চার আগ্রহের চাবিকাঠি




দেখেছেন ওয়ারেন হেস্টিংসের স্বীকৃতিতে – ‘to graft Western notions and methods

on to the main stem of Eastern Institutions’.

বিদ্যাসাগর পরবর্তী কালে তাঁর অনুবাদগ্রন্থ বাঙ্গালার ইতিহাসে লেখেন যে

গভর্নর জেনারেল লর্ড ময়রার (হেস্টিংস অফ মার্কুইস) আগে (১৮১৩-২৩)

প্রজাদের বিদ্যাদান করা ‘রাজনীতির বিরুদ্ধ বলিয়া বিবেচিত হইত’। কিন্তু উনি

ওই আদেশ অগ্রাহ্য করে প্রজাদের শিক্ষার জন্যে স্থানে স্থানে বিদ্যালয়

স্থাপিত করালেন।

লেখক লিখলেন ‘ভারতবর্ষের শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁর অবদান সম্ভবত শূন্য’, কাজেই

তাঁর প্রশংসা করা বিদ্যাসাগরের মোসাহেবির পরিচয়। দেখা যাচ্ছে, লেখক

বিদ্যাসাগরকে এক ইঞ্চি জায়গা ছাড়তে রাজি নন। ভালো কথা, কিন্তু প্রমাণ

কোথায়?

আমার কথা হচ্ছে – দুশো বছর আগের বিদ্যাসাগরের ‘স্থানে স্থানে বিদ্যালয়

স্থাপিত’ মন্তব্যকে নস্যাৎ করতে হলে এ’রকম স্ট্রং স্টেটমেন্ট দেয়া যথেষ্ট

নয়, বরং পরিসংখ্যান দিয়ে দেখাতে হবে যে লর্ড ময়রার কার্যকালে

শিক্ষাক্ষত্রে বিশেষ কিছুই হয়নি। পরিসংখ্যান না পাওয়া গেলে ওই ঘটনার

সমসাময়িক বিদ্যাসাগরের বক্তব্যকেই প্রামাণ্য বলে মানতে হবে।

লেখক দেখিয়েছেন যে ‘বিস্তর টানাপোড়েনের পরে ১৮২৩ এর ১৭ জুলাই, বাংলায়

শিক্ষাবিভাগ পরিচালনার জন্যে’ দশ সদস্যবিশিষ্ট শিক্ষা সংসদ’ স্থাপিত

হয়।তাদের সিদ্ধান্ত হয় যে সংস্কৃত আরবি ইত্যাদি প্রাচ্যভাষা শেখানোর জন্যে

বছরে এক লক্ষ টাকা বরাদ্দ করা এবং কোলকাতাতে কাশীর মত সংস্কৃত কলেজ

স্থাপন করা; (নজরটান আমার)। এর ঠিক ছ’মাস আগে লর্ড ময়রার কার্যকাল

শেষ হয়। তাহলে কি এটাই স্বাভাবিক নয় যে ওই ‘বিস্তর টানাপোড়েন’ (অবশ্যই

কলকাতা এবং লন্ডনের মধ্যে) বাস্তবে লর্ড ময়রার দেশীয় শিক্ষার পক্ষে

দাঁড়ানোর ফল যার ইশারা বিদ্যাসাগরের ওই অনুচ্ছেদে রয়েছে?




শিক্ষা সংসদ ১৮২৪ সালে কোলকাতায় সংস্কৃত কলেজ প্রতিষ্ঠা করল, এবং ১০

বছরের মধ্যে ‘কলকাতা মাদ্রাসা ও কাশীর সংস্কৃত কলেজের পুনর্গঠন ও

উন্নতির ব্যবস্থা’; সংস্কৃত ও আরবি বই প্রকাশের ব্যবস্থা করল। এই কলেজে

পড়তে গেলে ফি নেয়া হত না, উলটে ছাত্রদের বৃত্তি দেয়া হত।

তাহলে ইংরেজি স্কুল কবে এবং কোত্থেকে এল?

এ ব্যাপারে লেখক গুরুত্বপূর্ণ আলোকপাত করেছেন। শিবনাথ শাস্ত্রীকে অনুসরণ

করে তিনি জানাচ্ছেন যে ১৮১৩ সালের সনদ অনুযায়ী পাদরিরা ভারতের সর্বত্র

অবাধ যাতায়াতের অধিকার পেলেন। তাঁদের ও বেসরকারি উদ্যোগে কলকাতা ও

তার আশেপাশে প্রতিষ্ঠিত হল বেশ কিছু ইংরেজি স্কুল ও কলেজ। ১৮১৭ সালে

খুলল হিন্দু কলেজ। এই সময় কলকাতাতে অনেক বাপ-মা তাঁর সন্তানদের ইংরেজি

শেখাতে ব্যগ্র হলেন। যদিও দেওয়ান কার্তিকেয়চন্দ্র ( ডিএল রায়ের পিতা?)

জানাচ্ছেন যে কোলকাতার বাইরে সবাই ফার্সি শিখতে চাইত কারণ ‘সমস্ত জেলার

রাজকার্য পারস্য ভাষায় নির্বাহ হইত’, কিন্তু কলকাতার মধ্যবিত্ত বুঝতে

পারছিলেন আগামী দিনে শুধু ফার্সিতে চাকরি পাওয়া যাবে না, ইংরেজি শিখতে হবে।

আজকাল যেমন অনেক বাঙালি বাপ-মা ইংরেজির সঙ্গে হিন্দি শেখাতে চান আর

কী!

১.২ ইংরেজি কবে থেকে সরকারি ভাষা হোল?

লেখক এইখানে তিনটে মূল্যবান পয়েন্ট তুলেছেন:

১) চার্লস গ্র্যান্টের ১৭৯২-এর পুস্তিকায় এশিয় প্রজাদের নৈতিক উন্নতির

জন্যে খ্রিস্টধর্মের প্রচার এবং ইংরেজি শিক্ষার প্রবর্তন এবং তার

ফলশ্রুতিতে বৃটিশ সংসদের ভারতের ‘শিক্ষা সমস্যা’কে রাষ্ট্রের অন্যতম

দায়িত্ব হিসেবে স্বীকার করে নেয়া। তাই ১৮১৩ সালের সনদে ৪৩ সংখ্যক ধারা

যুক্ত হয়ে ভারতে মিশনারি প্রচারের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহৃত হয়।

২) গভর্নর জেনারেল লর্ড বেন্টিংকের আমলে (১৮২৮-১৮৩৫), ‘অর্থাৎ




বাণিজ্যপুঁজি থেকে শিল্পপুঁজিতে উত্তরণের সময়কালে, প্রশাসনের প্রয়োজনে

এবং আর্থিক সম্পদকে ব্যবসা ও শিল্পের স্বার্থে শোষণের উদ্দেশ্যে, বেন্টিংক

ইংরেজি শিক্ষা প্রবর্তনের পক্ষপাতী হন’। (নজরটান আমার)।

৩) ‘এরপর ১৮৩০ সালে, সমস্ত সরকারি কাজকর্ম থেকে ফারসি ভাষাকে বিদায়

করা হয় এবং ১৮৩৩ সালে বেন্টিংক ইংরেজিকে সরকারি ভাষা হিসেবে ঘোষণা

করেন’।

তারপরে ১৮৩২-এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে, কলকাতা মাদ্রাসা ও সংস্কৃত কলেজের

সমস্ত ছাত্রকে বাধ্যতামূলক ভাবে ইংরেজি পড়তে হবে।

এই ধারায় শেষ খুঁটি নয়, লৌহস্তম্ভ দাঁড় করালেন মেকলে তাঁর ২রা ফেব্রুয়ারি,

১৯৩৫ তারিখের বিখ্যাত প্রস্তাবে, যাতে কলোনিয়াল ভারতে শিক্ষার নীতি,

মাধ্যম, পদ্ধতি ও লক্ষ্য নির্ধারিত হয়ে গেল। স্পষ্ট উদ্দেশ্য এমন একটি

দোভাষী শ্রেণির নির্মাণ ‘যার সদস্যরা রক্তে ও বর্ণে ভারতীয় হয়েও রুচি,

মতামত, নীতি এবং মননে হবে ইংরেজ’।

শিবনাথ শাস্ত্রীর মতে ইয়ং বেঙ্গলদের একই ধুয়ো: ‘প্রাচীতে যাহা কিছু আছে

তাহা হেয়, এবং প্রতীচীতে যাহা আছে তাহাই শ্রেয়ঃ’।

এখানে বিদ্যাসাগরের অপরাধ?

পূর্বপক্ষ:

লেখকের মতে ‘বাঙ্গালার ইতিহাস’ নামক অনুবাদকর্মটিতে বিদ্যাসাগর লিখেছেন

- শিক্ষা খাতে সরকারের অনুমোদিত বার্ষিক এক লক্ষ টাকা কেবল সংস্কৃত ও

আরবি ভাষা শিক্ষায় খরচ হত, বেন্টিংক ওই দুটো ভাষার ওপর ব্যয়সংকোচ করে

ইংরেজি ভাষা শিক্ষায় ‘অধিক উপকার বিবেচনা করিয়া’ বেশির ভাগ ‘স্থানে স্থানে

ইংরেজি বিদ্যালয় স্থাপন করিবার অনুমতি দিলেন। তদবধি, এতদ্দেশে ইংরেজি

ভাষার বিশিষ্টরূপ অনুশীলন হইতে আরম্ভ হইয়াছে’।




উত্তরপক্ষ:

এটা সায়েবের লেখা বইয়ের অনুবাদ, যাতে বেন্টিংক কী করলেন, কেন করলেন বলা

হয়েছে। উদ্দেশ্য বা পদ্ধতি সবই বেন্টিংকের, বিদ্যাসাগরের নয়। কোথাও

বিদ্যাসাগরের নিজস্ব ভ্যালু জাজমেন্ট দেখছি না তো।

লেখক বলতেই পারেন যে বিদ্যাসাগর নিজেই লিখেছেন যে এটা আক্ষরিক অনুবাদ

নয়, কোথাও কোথাও নিজস্ব সংযোজন আছে। কিন্তু এর মানে তো এটা নয় যে

গোটা বইটাই নিজস্ব মৌলিক রচনা। বরং উপরের লাইনে কোথাও কোন

ইন্টারপ্রিটেশন পাচ্ছিনে, যা পাচ্ছি তা’হল বক্তা নিরপেক্ষ স্টেটমেন্ট অফ

ফ্যাক্ট।

১.৩ প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা ও নবীন ইংরেজি শিক্ষা বিস্তার নীতি

গোটা বইয়ে এই ইস্যুটি বিশেষ মনোযোগের দাবি রাখে। কারণ, দেবোত্তমের মত

যাঁরা বঙ্গের কলোনিয়াল হিস্ট্রির পুনর্নির্মাণের আখ্যান তৈরি করছেন তাঁদের

একটি জরুরি প্রেমিস হোল পরম্পরাগত দেশিয় (ইন্ডেজেনাস) পদ্ধতিটি নষ্ট করে

কলোনিয়াল স্বার্থে যে ইংরেজিমুখী পদ্ধতিটি গড়ে উঠল তা এলিটিস্ট, এবং তার

ফলে দলিত, মুসলিম ও সমাজের প্রান্তিক অবস্থানের মানুষদের আরও পেছনে

ঠেলে দেয়া হোল।

তার থেকে এটা দাঁড়ায় যে তাঁদের মতে দেশিয় শিক্ষা ব্যবস্থা সাধারণ মানুষের

জন্যে বেশি কাছের এবং ভেদরহিত ছিল। এই থিসিসের পক্ষে দেবোত্তম যে যে

প্রমাণাদি পেশ করেছেন সেগুলো একটু খুঁটিয়ে দেখা যাক।

এর জন্যে উনি আশ্রয় করেছেন সে সময় কোম্পানির নির্দেশে মাদ্রাজ,

বোম্বাইয়ে কলেক্টরদের সার্ভের রিপোর্টএবং পরে বিহার ও বাংলার জন্যে লর্ড

বেন্টিংকের নির্দেশে উইলিয়াম অ্যাডামের করা তিনটি সার্ভের রিপোর্ট। এছাড়াও

সেই সময়ের তৃণমূল স্তরের বাস্তব ছবি তুলে ধরার জন্যে লেখক ব্যবহার

করেছেন শিবনাথ শাস্ত্রী ও বিপিনচন্দ্র পালের স্মৃতিচারণ।




এর থেকে যে ছবিটি উঠে আসে তা মোটামুটি এ’রকম -

১) তখন বাংলার প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা ব্রিটিশ শিক্ষাব্যবস্থার মত

প্রাতিষ্ঠানিক বা কেন্দ্রীভূত ছিল না।

২) সেখানেও উচ্চবর্ণ ও উচ্চশ্রেণির জন্যে ছিল সংস্কৃত ও আরবি-ফারসি

শিক্ষা। রাজানুগ্রহে প্রাপ্ত নিষ্কর জমির আয় থেকে এর ব্যয়নির্বাহ হত।

লোকে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সরকারি চাকরির জন্যেই রাজভাষা ফারসি

শিখত। পরে মোঘল শাসনের জায়গায় কলোনিয়াল শাসন এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের

জন্যে ফারসির বদলে ইংরেজি শেখার দাবি উঠল যার জন্যে রামমোহন রায় লর্ড

আমহার্স্টকে চিঠি লিখেছিলেন।

৩) দ্বিতীয় স্তরে ছিল গ্রামে পাঠশালা ও মক্তব পদ্ধতি যা রাজানুগ্রহের বদলে

‘সাধারণ মানুষের অর্থে পরিপুষ্ট ও তাঁদের প্রয়োজনের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা

সাধারণ মানুষের কথ্য ভাষায় লেখা, পড়া আর অংক শেখার শিক্ষাধারা’। লেখক

জানাচ্ছেন মক্তবের তুলনায় পাঠশালার শিক্ষা প্রায় ধর্মনিরপেক্ষ ছিল এবং তা’

ছিল ব্যবহারিক জ্ঞানে পূর্ণ। “পাঠশালা শিক্ষা ছিল এই কৃষিজীবী, কারিগর,

দোকানদার, জমিদারি সেরেস্তার কর্মচারি ইত্যাদি সাধারণ শ্রেণির মানুষের

জীবন ও জীবিকার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ এক সাধারণ শিক্ষাধারা।”

মীর মশারফ হোসেনের ও শিবনাথ শাস্ত্রীর লেখা থেকে পাচ্ছি গ্রামে আরবির

বিশেষ চল ছিল না। হিন্সু-মুসলমান নির্বিশেষে পাঠশালায় গিয়ে গুরুমশাইয়ের কাছে

প্রথমে মাটিতে, পরে তালপাতায়, তার পরে কলাপাতায় লিখে বাংলা ও অংক শিখত।

অ্যাডাম তাঁর রিপোর্টে বলেছেন স্কটল্যান্ডের গ্রামের স্কুলেও এত দৈনন্দিন

জীবনের সঙ্গে যুক্ত ব্যবহারিক শিক্ষা দেয়া হত না।

উনি এটাও লক্ষ্য করেছেন যে মুসলমান শিক্ষকের কাছেও হিন্দু-মুসলমান

নির্বিশেষে ছাত্র পড়তে যায়। তাঁর তৃতীয় রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে পাঠশালার




শিক্ষকদের মধ্যে অধিকাংশ কায়স্থ ও ব্রাহ্মণ, কিন্তু অন্য জাতের লোকও

ছিলেন ১৬ থেকে ২৪%।

তাই অ্যাডাম তৃতীয় রিপোর্টের শেষে প্রস্তাব দিলেন দেশজ ভাষায় দেশজ শিক্ষা

ব্যবস্থাকে মজবুত করার পক্ষে, কিন্তু কর্তৃপক্ষ ওই প্রস্তাব খারিজ করে

‘শহর ও জেলাসদরগুলোয় ইংরেজি মডেলের শিক্ষা’ প্রসারে জোর দেয়, যুক্তি

‘জনসাধারণের উচ্চ ও মধ্যশ্রেণির শিক্ষার মান উন্নয়নের মাধ্যমে

শিক্ষাসংক্রান্ত সংস্কার ক্রমশ নিচের দিকে গ্রামাঞ্চলের দেশজ

বিদ্যালয়গুলির কাছে দ্রুত পৌঁছবে’।

ট্রিকল ডাউন এফেক্ট!! নিও-ক্ল্যাসিক্যাল ইকনমির এই মন্ত্রটি শিক্ষার

ক্ষেত্রেও? এবং দেড়শ বছর আগে?

লেখক সঠিক ভাবেই বলছেন ‘ফলে শিক্ষা হয়ে ওঠে মুষ্টিমেয় উচ্চবর্ণ ও

উচ্চবিত্তের ক্রয়যোগ্য বস্তু’।

এঁর পরের সিদ্ধান্তের সঙ্গেও সহমত না হয়ে উপায় নেই।

‘এই নতুন শিক্ষাব্যবস্থা উচ্চশ্রেণির বিশেষত নব্য ভদ্রলোক শ্রেণির পক্ষে

যতটা প্রয়োজনীয় ছিল, নিম্নশ্রেণির পক্ষে ছিল ঠিক ততটাই অপ্রাসঙ্গিক’।

একদম ঠিক!

কিন্তু পরের লাইনগুলো?

“তাই ব্রিটিশ আমলের প্রাথমিক-মিডল-মাধ্যমিক স্কুল আর কলেজের

ক্রমসম্পর্কিত ব্যবস্থা স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশজ শিক্ষাব্যবস্থার গোড়া ধরে টান

মারে। উচ্চ ও নিম্নশ্রেণির জন্য একই কেন্দ্রীভূত শিক্ষাব্যবস্থায়, স্বভাবতই

শিক্ষার আঙিনার বাইরে চলে যায় অগণন দরিদ্র অন্ত্যজ হিন্দু ও নিম্নশ্রেণির

মুসলমান শিশু। সরকারি নিয়মের এক খোঁচায় তারা হয়ে ওঠে ব্রাত্য ও অবাঞ্ছিত।




আর সেই শূন্যস্থান ভরাট করতে চারিদিকে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ঊঠতে

থাকে অজস্র অ্যাংলো-বেঙ্গলি স্কুল”।

লেখকের এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে একেবারেই সহমত হতে পারলাম না।

এক, লেখকের আগের দেয়া তথ্য থেকে দেখা যাচ্ছে যে উচ্চবর্গের জন্যে যে

এলিট স্কুল ছিল সরকারি আনুকূল্যে মাত্র সেগুলোতে ফার্সির বদলে ইংরেজি চালু

করা হচ্ছে বা মাদ্রাসা ও সংস্কৃত কলেজে ইংরেজি একটি অতিরিক্ত বিষয়

হিসেবে পড়া বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে।

পাশাপাশি তৃণমূল স্তরে চলতে থাকা পাঠশালা-মক্তব ব্যবস্থা তো বন্ধ করার

নির্দেশ দেয়া হয়নি। আর সেগুলো, লেখক দেখিয়েছেন, চলত সাধারণ মানুষের

সহায়তায়; রাজানুগ্রহে নয়।

দুই, সরকারি খরচা স্পষ্টত রাজধানী ও জিলা সদরে হচ্ছিল। তাহলে এতদিনের

সমান্তরাল দেশিয় ব্যবস্থায় ছেদ পড়বে কেন? এরজন্যে লেখক কোন সাক্ষ্য,

কোন তথ্য দেন নি। এমনকি, পরের দু’পাতায়, ৭৮ ও ৭৯তে রবীন্দ্রনাথের যে

উদ্ধৃতি দিয়েছেন পাঠশালা শিক্ষা ব্যবস্থার পক্ষে, তাতেও দেখা যাচ্ছে যে তাঁর

সময়েও কোলকাতা মহানগরীতে পাঠশালা ব্যবস্থা সক্রিয় ছিল।

আমি নিজে ১৯৫৩-৫৪ সালে বাড়িতে ধারাপাতে কড়াকিয়া, গণ্ডাকিয়া, পণকিয়া,

বুড়িকিয়া, শতকিয়া এক বছর পড়েছিলাম যদিও সেটা তখন প্রায় অপ্রাসঙ্গিক হয়ে

গেছল।

তিন, ব্যাঙের ছাতার মত অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান স্কুল? গাঁয়েগঞ্জে? কোথায় এমন

সার্ভে বা তথ্য, অন্তত স্মৃতিকথা নির্ভর বর্ণনা? এমনকি কলকাতায়ও সে’সময়

ক’টি এমন স্কুল?

আমার ভুল হতে পারে, কিন্তু বইয়ে উদ্ধৃত তথ্যের ভূমিতে এই সিদ্ধান্ত

একেবারেই কপোলকল্পনা বলে মনে হচ্ছে। এখানে লেখক তাঁর অ্যান্টি-




কলোনিয়াল ইতিহাস লেখনের অ্যজেন্ডার ফলে বিশ্লেষণে কিছুটা একপেশে হয়ে

গেছেন মনে হচ্ছে।

এ যেন স্ট্যাটিসটিক্সের সম্ভাবনা তত্ত্বের অনুসিদ্ধান্ত: যেহেতু সরকারি নীতি

ও অর্থানুকূল্যে ইংরেজি বিদ্যালয়কে পুশ করা হচ্ছে তাহলে দেশি পদ্ধতি

কোণঠাসা হওয়ার সম্ভাবনা ৮০% বলে ধরে নিতে হবে।

আবার লেখকই এই পঞ্চম অধ্যায়ের শেষ প্যারায় পরমেশ আচার্যের দেশজ

শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর বইটি এবং হান্টারের রিপোর্ট উদ্ধৃত করে লিখছেন

‘১৮৮১-৮২ সালে, ততদিনে টিঁকে থাকা প্রায় ৫০ হাজার পাঠশালাকে পুনরায় শিক্ষা

বিস্তারের আওতায় নিয়ে আসা হবে’। তাহলে? ওঁর মূল প্রতিপাদ্য কোথায় দাঁড়াল?

লেখক রবীন্দ্রনাথের ১৯৩৬ সালের প্রবন্ধ উদ্ধৃত করে বলছেন “রাজার

অনাদরে আধমরা হয়ে এল সর্বসাধারণের নিরক্ষরতা দুর করবার স্বাদেশিক

ব্যবস্থা”।

কিন্তু আমরা কথা বলছি ওই বক্তব্যের ১০০ বছর আগের সময়ে। পাদ্রি

অ্যাডামের দ্বিতীয় ও তৃতীয় রিপোর্টটি পেশ হয়ে গেছে ১৮৩৫ ও ১৮৩৮ সালে।

যখন কোম্পানির আমল।

এই একশ’ বছরে ভারত তথা বঙ্গের আর্থসামাজিক পরিস্থিতিতে অনেক

গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হয়ে গেছে। তাই লেখকের ভাষায় ‘কেঁচে গণ্ডুষ করে’ ১৮৮২

সালে অ্যাডাম প্রদর্শিত পথে চলেও আগের মত সাফল্য পাওয়া যায়নি। পঞ্চাশ

বছর পরে রবীন্দ্রনাথের খেদোক্তিতে তার প্রকাশ।

কিন্তু অনেকগুলো সম্ভাব্য কারণের মধ্যে একটিকে ধরে ‘দেশি ধানক্ষেতে

বিদেশি ওক রোপণের’ দায়ে ধরা পড়বেন একা বিদ্যাসাগর? একটু এগিয়ে যাই।

১.৪ বিদ্যাসাগরের চাকুরিজীবন ও সাহেবদের কৃপাদৃষ্টি




ষষ্ঠ অধ্যায়ের শীর্ষক “বিদ্যাসাগরের কর্মজগতের শুরু - সাহেবসুবোর

সুধাসঙ্গ”। বা এর গোড়াতে লেখক তিনটে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের দিকে আমাদের

দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।

এক, ঈশ্বরকে পাশ করলে আদালতে জজপন্ডিতের চাকরি পাবার সম্ভাবনায়

সংস্কৃত কলেজে ভর্তি করা হয়েছিল। উনি প্রায় সাড়ে বারো বছর নাগাড়ে পড়ে

একুশ বছর বয়সে কোর্স শেষ করেন।

দুই, ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধি পাওয়ার জন্যে ল’ কমিটির পরীক্ষায় বসতে হত। সেটা

উনি প্রায় সতের বছর বয়সে পাশ করেন এবং উপাধিটি পান।‘উনি ছাড়া কলেজের

আরও অনেক পড়ুয়া এই উপাধিটি লাভ করেন’।

তিন, ফোর্ট উইলিয়ম কলেজ ছিল আজকের রাইটার্স বিল্ডিং ভবনে।

কিন্তু অধ্যায়টির প্রতিপাদ্য: ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের শিক্ষাবিভাগের

বিভিন্ন চাকরি পাওয়া এবং উন্নতির মূলে কলেজের পর গৃহশিক্ষক রেখে হিন্দি ও

ব্যবহারিক ইংরেজি শেখার চেয়েও সাহেবদের মোসাহেবি বেশি কাজে এসেছিল।

সূত্রবাক্য-বিদ্যাসাগরের ভাই শম্ভুচন্দ্রের ‘বিদ্যাসাগর জীবনচরিতে’র পৃঃ

১৪২এর একটি দীর্ঘ উক্তি, যাতে তিনি বলছেন শিক্ষাবিভাগের তিন হোমরাচোমরা

মার্শাল, মোয়াট ও বেথুনের কথা; ‘ইঁহারা তিনজনেই তাঁহার উন্নতি, প্রতিপত্তি ও

মানসম্ভ্রমের আদি কারণ’। বিদ্যাসাগর এই তিনজনের ছবি আঁকিয়ে

বাদুড়বাগানের বাড়িতে রেখেছিলেন এবং ‘প্রতিমূর্তিগুলি একবার না দেখিয়া

থাকিতে পারিতেন না’।

নিঃসংশয়ে এ’কথা বলা যায় ফোর্ট উইলিয়ম কলেজে চাকরি এবং সংস্কৃত

কলেজের প্রিন্সিপাল হওয়ার মধ্যে বিদ্যাসাগরের এঁদের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে

এসেছিলেন।




অনেক নিযুক্তিতে তাঁর হাত ছিল। এই সময়ে তাঁর চাকরিগুলো চোখ বুলিয়ে নিলে

দেখবঃ

সাল । সংস্থা । পদ

২৯ ডিসেম্বর, ১৮৪১ । ফোর্ট উইলিয়ম কলেজ । প্রধান পন্ডিত

৬ই এপ্রিল, ১৮৪৬ । সংস্কৃত কলেজ । সহকারী সম্পাদক

[*১৬ জুলাই, ১৮৪৭ পদত্যাগ (সম্পাদকের সঙ্গে মতভেদ)]

১লা মার্চ, ১৮৪৯ । ফোর্ট উইলিয়ম কলেজ । হেড রাইটার/ট্রেজারার

৫ই ডিসেম্বর, ১৮৫০ । সংস্কৃত কলেজ । সাহিত্যের অধ্যাপক

২২ জানুয়ারি, ১৮৫১ । সংস্কৃত কলেজ । প্রিন্সিপাল (নতুন পদ)

এই সময়ে বিভিন্ন সময়ে শূন্য পদে বিদ্যাসাগরের সুপারিশে নিযুক্তিঃ

নাম ও সম্পর্ক । সংস্থা । পদ

মদনমোহন তর্কালংকার(বন্ধু) । ফোর্ট উইলিয়ম কলেজ । পন্ডিত

মুক্তারাম বিদ্যাবাগীশ(সহপাঠী) । কোলকাতা মাদ্রাসা । পন্ডিত

তারানাথ তর্কবাচস্পতি । সংস্কৃত কলেজ । ব্যাকরণ পন্ডিত

এই সময়ে আমরা দেখেছি বিদ্যাসাগরের ঘনিষ্ঠতা এতটাই যে তিনি আবেদন

করলে বড়কর্তারা প্রায় সেদিনই সুপারিশপত্র লিখছেন, তাঁর নতুন চাকরি হয়ে

যাচ্ছে। খালি পদে কাউকে নিযুক্ত করার জন্য তাঁকে বলা হচ্ছে ভালো লোক খুঁজে

দিতে।

সংস্কৃত কলেজের উন্নতির জন্যে তাঁর থেকে লিখিত রিপোর্ট চাওয়া হচ্ছে। তাঁর

পরামর্শ মেনে সংস্কৃত কলেজের সেক্রেটারি ও অ্যাসিসট্যান্ট সেক্রেটারি

ইত্যাদি পদ তুলে দিয়ে শুধু প্রিন্সিপালের পদে ওই ক্ষমতাগুলো অর্পিত করে

তাঁকে নিযুক্ত করা হচ্ছে।




এসবের মধ্যে লেখক সাহেবের দাক্ষিণ্যের ফললাভ দেখছেন। আমি দেখছি যোগ্য

লোকের স্বীকৃতি। তখনও ভারত ভিক্টোরিয়ার সাম্রাজ্যের অধীন নয়। আজ থেকে

১৭০ বছর আগে কোম্পানির আমলের শেষ দশকে কতজন সংস্কৃত এবং ইংরেজিতে

কৃতবিদ্য ছিলেন? ফলে স্বাভাবিক চেনাজানার মধ্যে থেকেই নিযুক্তি হবে।

আজকের মত গেজেটে বা দৈনিক পত্রিকায় কর্মখালির বিজ্ঞাপন বেরোনোর বা

লিখিত পরীক্ষা ও ফর্মাল ইন্টারভিউয়ের সিস্টেমের কড়াকড়ি হবে না।

এখনও ভারতে বিভিন্ন উচ্চপদে, বিশেষ করে বেসরকারি সংস্থায়, চেনাজানা ও

রেকমেন্ডেশনের মাধ্যমে নিযুক্তি হয়। অনেক ক্ষেত্রে পদপ্রার্থী ও ইন্টারভিউ

বোর্ডের সদস্য দিল্লি ও কোলকাতার একই বিশিষ্ট কলেজের (ধরুন সেন্ট

স্টিফেন বা জেএনইউ, দিল্লি; প্রেসিডেন্সি বা যাদবপুর কোলকাতা) প্রাক্তনী

হলে নিযুক্তিতে প্রভাব পড়ে।

মোসাহেবি?

মোসাহেবের নিজস্ব মতামত বা সত্তা থাকে না। তার কাজ প্রভুর কথায় দিনকে

রাত করা, কখনও ‘না’ বলা নয়।

তাই মোসাহেব অযোগ্য হলেও নিযুক্তি পেয়ে যান।

বিদ্যাসাগর শিক্ষা বিভাগে অধ্যাপনা বা সম্পর্কিত অন্যান্য কাজে অযোগ্য

প্রার্থী ছিলেন না। এমনকি যাঁদের উনি রেকমেন্ড করেছেন বন্ধু অথবা ভাই —

সকলেই দেখা যাচ্ছে শিক্ষাগত যোগ্যতায় কোন কম ন’ন।

আর বিদ্যাসাগর, লেখকের দেয়া তথ্য অনুযায়ী সাহেবপ্রভুদের সঙ্গে আদৌ

‘উঠতে বললে ওঠ, বসতে বললে বোস’ গোছের ব্যবহার করেননি, বরং অনেক

ক্ষেত্রে নিজের শর্ত আরোপ করেছেন - নইলে চাকরিতে যোগ দেন নি।

আর চাকরিতে উচ্চাকাঙ্ক্ষা? প্রিন্সিপাল হতে চাওয়া? অস্বাভাবিক কী?




বিদ্যাসাগরের মূল্যায়ন হবে তিনি কেন আর্থিক লাভ, ভালো মাইনে - এসব

চেয়েছিলেন বলে নয়, বরং আর দশটা সাধারণ মানুষের মত ওসব চেয়েও উনি

শিক্ষা, সমাজ ও ভাষার সংস্কারের ক্ষেত্রে যা করেছিলেন তার নিরিখে।

১.৫ বিদ্যাসাগরের ব্যবসা ও সাহেবদের কৃপাদৃষ্টি

বিদ্যাসাগর পুস্তক প্রকাশনার ব্যবসা করতেন এবং বেশ সফল ব্যবসায়ী ছিলেন

এই তথ্য আমার জানা ছিল না। লেখক এই বিষয়টির পৃষ্ঠভূমি নিয়ে বেশ খুঁটিয়ে

দেখে যা লিখেছেন তার সার -

১) মার্শালের সঙ্গে আলোচনার পর সহকারী সম্পাদক বিদ্যাসাগর সংস্কৃত

কলেজের শিক্ষা সংস্কারের জন্যে একটি প্রস্তাব সম্পাদক রসময় দত্তের কাছে

পেশ করেন ১৮৪৬ সালের ১৯শে সেপ্টেম্বর। সম্পাদক মশায় “তাঁর অনুরোধ

সত্ত্বেও সম্পূর্ণ পরিকল্পনাটি না পাঠিয়ে রসময় দত্ত তার সামান্য অংশ

খন্ডিত আকারে শিক্ষা সংসদে পাঠান। পরিশেষে ১৮৪৭ এর ৭ এপ্রিল বিদ্যাসাগর

সরাসরি শিক্ষা সংসদের কাছে তাঁর ইস্তফাপত্র দাখিল করেন”।

- লেখকের প্রশ্ন কেন সাড়ে ছ’মাস বাদে? উনি নিজেই বলছেন এরমধ্যে কী কী

হয়েছে - যেমন মার্শাল-মোয়াট আলোচনা হয়েছে কিনা - তা’ জানা যায়নি।

- তাহলে যেটুকু তথ্য জানা গেছে তার ভিত্তিতে অনুমানের সাহায্য নেয়া ছাড়া

গত্যন্তর কী? লেখকের আপত্তি কেন অধিকাংশ গবেষক এরজন্যে রসময়

দত্তকে দায়ি করছেন?

- আমার কথা, আর কাকে দায়ী করা যায়? স্বাভাবিক ভাবে ওই প্রস্তাবে কোন

নির্ণয় না হয়ে ইস্যুটি লম্বিত থাকায় বা খারিজ হওয়ায় বিদ্যাসাগর রসময়

দত্তকে খন্ডিত অংশের বদলে পুরো প্রস্তাবটি পেশ করার জন্যে বারংবার

অনুরোধ করে থাকবেন। এই প্রক্রিয়ায় সাড়ে ছয়মাস লাগা কি অস্বাভাবিক? শেষে




হতাশ হয়ে পদত্যাগ - এটা ছাড়া অন্য কোন বিকল্প সম্ভাবনা লেখকের জানা

আছে কিনা তা’ স্পষ্ট নয়।

২) কিন্তু কলেজের সম্পাদককে ইস্তফা জমা দেওয়ার ডিউ প্রসিডিওর না মেনে

সরাসরি শিক্ষা সংসদের সম্পাদকের কাছে দেয়ায় শিক্ষা সংসদ ওই আবেদন

খারিজ করে। “অবশেষে ২০ এপ্রিল যথাবিহিত উপায়ে বিদ্যাসাগর ফের ইস্তফার

আবেদন জানালে তা’ ১৮৪৭ এর ১৬ই জুলাই গৃহীত হয়”।

- এর থেকে কি মনে হয় না যে সাহেবদের সঙ্গে ‘খাতিরদারি’ সত্ত্বেও তাঁদের

পদত্যাগ পত্র গ্রহণ করতে কোন আপত্তি নেই। কিন্তু ‘ডিউ প্রসিডিওর’ মানতে

বাধ্য করে তাঁরা বিদ্যাসাগরকে একটু রগড়ে দিলেন! এটা কি আগের অধ্যায়ের

বারবার বলা ‘মোসাহেব’ ছবির সঙ্গে আদৌ খাপ খায়?

৩) লেখকের দেয়া প্রামাণ্য তথ্য থেকে দেখা যাচ্ছে ইস্তফা দেবার অল্প আগে

বিদ্যাসাগর বাল্যবন্ধু মদনমোহন তর্কালঙ্কারের সঙ্গে ৫০:৫০ শেয়ারে

সংস্কৃতযন্ত্র নামে একটি ছাপাখানা খোলেন। টাকা না থাকায় আরেক বন্ধুর

থেকে প্রেস কেনার জন্যে ৬০০ টাকা ধার করতে হয়। এই টাকা শোধ করা সম্ভব

হয় মার্শাল অন্নদামঙ্গলের ১০০ কপি ৬০০ টাকায় কিনতে রাজি হওয়ায়। এর

জন্যে মদনমোহন মার্শালকে চিঠি লেখেন ১৮৪৭ সালের ৭ই জুন তারিখে।

লেখক বলছেন, ‘বিদ্যাসাগর তাঁর প্রকাশনার ব্যবসা শুরু করেন “অন্নদামঙ্গল”

ছেপে। এর থেকে এটা স্পষ্ট যে বিদ্যাসাগর যখন প্রেস কিনে ছাপাখানা খুলছেন

তার কয়েকমাস আগেই ওঁর দ্বিতীয়বার পদত্যাগপত্র জমা হয়ে গেছে।

টেকনিক্যালি প্রেস খোলার সময় উনি চাকরিতে রয়েছেন বটে, কিন্তু যে কোনো

সময় পদত্যাগপত্র অনুমোদিত হয়ে চাকরিটি চলে যেতে পারে। এইসময় যদি দুই

বন্ধু মিলে মার্শালকে অনুরোধ করে প্রথম বইটি ভাল কাগজে ভাল ভাবে ছাপার

গ্যারান্টি দিয়ে ১০০ কপি কলেজের জন্যে বুক করে থাকেন তার মধ্যে ‘অনৈতিক’

কী হল? ব্যবসাবুদ্ধি? অবশ্যই। আজ আমরা যে কেউ যদি ছাপাখানা খুলি তাহলে

চেনাজানা লোকজনের কাছে অনুরোধ করব না?




ভাই শম্ভুচন্দ্রের লেখা থেকে জানতে পারছি মার্শালের সঙ্গে সুসম্পর্কের

দৌলতে বিদ্যাসাগর ‘ইহার পর যে সকল সাহিত্য, ন্যায়, দর্শন, পুস্তক মুদ্রিত

ছিল না, তৎসমস্ত গ্রন্থ ক্রমশ মুদ্রিত করিতে লাগিলেন। ফোর্ট উইলিয়ম

কলেজের ও সংস্কৃত কলেজের লাইব্রেরীর জন্য যে পরিমাণ নূতন নূতন পুস্তক

লইতে লাগিল, তদ্বারা ছাপানর ব্যয় নির্বাহ হইয়াছিল। অন্যান্য লোকে যাহা ক্রয়

করিতে লাগিলেন, তাহা লাভ হইতে লাগিল’।

একবছর আটমাস পরে বিদ্যাসাগর ফোর্ট উইলিয়ম কলেজে মাসিক ৮০ টাকা

বেতনে ফের হেড রাইটার ও কোষাধ্যক্ষের পদে যোগ দিলেন। এর মধ্যে তিনি

প্রেস খোলার পাশাপাশি ‘সংস্কৃত প্রেস ডিপোজিটরি’ নামে বইয়ের দোকানও খুলে

ফেলেছিলেন। তাতে কমিশন বেসিসে অন্য প্রকাশনের বইও বিক্রি হত।

ফলে যখন আবার চাকরিতে যোগ দিলেন ততদিনে ব্যবসা দাঁড়িয়ে গেছে।

ভাল বুদ্ধি; আমরা কি বাঙালির চিরাচরিত ব্যবসাবিমুখতার মানসিক পূর্বাগ্রহে

আটকে থাকব?

ফের ১৮৫০ সালের ৫ ডিসেম্বর বিদ্যাসাগর মাসিক ৯০ টাকা বেতনে সংস্কৃত

কলেজে সাহিত্যের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। তারপর রসময় দত্ত কলেজের

প্রিন্সিপাল পদ ছেড়ে দিলে এবং কলেজের উন্নতি (আজকের হিসেবে ‘ইকনমিক

ভায়াবিলিটি’) এবং শিক্ষা ও ম্যানেজমেন্টের সংস্কারের জন্যে বিদ্যাসাগরের

পেশ করা রিপোর্টে সন্তুষ্ট হয়ে সেক্রেটারি ও অ্যাসিসট্যান্ট সেক্রেটারি পদ

তুলে দিয়ে বিদ্যাসাগরকে প্রিন্সিপাল করে পুরো ক্ষমতা সঁপে দেয়া হল। সময়টা

১৮৫১ সালের জানুয়ারি শেষ।

লেখকের ভাষায় এবার শুরু হল ‘তাঁর শিক্ষাসংস্কারের কর্মযজ্ঞ’।

২.০ বিদ্যাসাগরের ‘নিজস্ব শিক্ষাসংস্কার’




সপ্তম অধ্যায়ে লেখক বলছেন, সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ রূপে বিদ্যাসাগর ‘লাভ

করেন অসীম দাপট, অবাধ ক্ষমতা ও একক কর্তৃত্ব’।

তারপর বিদ্যাসাগর ওই কলেজে শিক্ষাসংস্কারের জন্যে যা করেছেন সেগুলোকে

লেখক ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের গবেষণাকে ভিত্তি করে আটটি বিন্দুতে

বেঁধেছেন। তারপর ওই সংস্কারগুলোর নিজস্ব মূল্যায়ন করতে গিয়ে বেশ কিছু

অজানা তথ্যের দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। আমরাও এ’ব্যাপারে

লেখককে অনুসরণ করব।

২.১ কলেজে বেতনপ্রথা চালু করা এবং মেধাবী ছাত্রদের জন্যে ‘মানি প্রাইজের’

বদলে ‘বুক প্রাইজ’ শুরু করা

এর পৃষ্ঠভূমি হিসেবে লেখক দেখিয়েছেন যে কলেজের জন্মলগ্ন থেকে ছাত্ররা

বিনা বেতনে পড়ত। কিন্তু ১৮৩৫ সালে এদেশে পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রচলনের পরে

সংস্কৃত কলেজের আর্থিক হাল ক্রমশ খারাপ হতে থাকে, কারণ সরকারি

আর্থিক সাহায্য কমাতে থাকে। মেকলে তাঁর বিখ্যাত প্রস্তাবে কোলকাতার

মাদ্রাসা ও সংস্কৃত কলেজ দুটোই তুলে দেয়ার পক্ষে বলেন। বেন্টিঙ্ক এইসব

প্রাচ্যবিদ্যা শিক্ষার প্রতিষ্ঠান বন্ধ হতে দেননি। কিন্তু নতুন ছাত্রদের জন্যে

বৃত্তিপ্রথা তুলে দেন।

কলেজে ছাত্রপিছু সরকারের ব্যয় ১৮৩৫ সালে ছিল প্রায় ১৬২ টাকা, যা ১৮৫১

সালে কমে গিয়ে হয় মাত্র ৬২ টাকা।

অধ্যক্ষের দায়িত্ব পেয়ে এর সমাধান হিসেবে বিদ্যাসাগর কী করলেন? দুটো

কাজ।

ক) মেধাবী ছাত্রদের জন্যে ‘মানি প্রাইজের’ বদলে ‘বুক প্রাইজ’ শুরু করলেন।

খ) কলেজের খরচা চালাতে বেতন প্রথা শুরু করলেন।

লেখকের আপত্তি কোথায়?




ক) ঈশ্বরচন্দ্র নিজে ১৮৩৮-৩৯ সালের বার্ষিক পরীক্ষায় দ্বিতীয় হয়ে নগদ

৮০ টাকা পুরস্কার পেয়েছিলেন।

‘তিনিই ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ১৮৫১ সালের ১৩

জানুয়ারি শিক্ষা সংসদের কার্যকরী সম্পাদককে চিঠি লিখে ‘মানি প্রাইজের’

বদলে ‘বুক প্রাইজ’ শুরু করার পরামর্শ দিলেন। (নজরটান আমার)।

আমার উত্তরপক্ষ -

কোম্পানির আমলে সরকার তাদের প্রাথমিকতা বদলে যাওয়ায় ব্যয় সংকোচের

নীতি নিল। মেকলে কলেজ বন্ধ করার পক্ষে বলেছেন। সেখানে অধ্যক্ষ হিসেবে

বিদ্যাসাগর যদি ‘ইকনমিক ভায়াবিলিটি’র খাতিরে নগদ টাকার বদলে পুরস্কার

হিসেবে বই দেয়ার প্রথা শুরু করে থাকেন তাতে ভুল কোথায়?

আজও স্বাধীন ভারতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রাইজ হিসেবে টাকার বদলে বই

দেওয়ারই প্রথা চলছে। বৃত্তি প্রদান আলাদা ব্যাপার। এর মধ্যে ঔপনিবেশিক

শাসনব্যবস্থার কথা আসছে কোত্থেকে? দেশজ শিক্ষাব্যবস্থায় কি আর্থিক

পুরস্কারের ব্যাপার ছিল? বরং ভাল ফল করলে ‘মানি প্রাইজ’ ব্যাপারটাই

ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থার দান।

আর ছাত্র ঈশ্বরচন্দ্র মানি প্রাইজ পেলেন এবং একই কলেজে বারো বছর পরে

প্রশাসকের ভূমিকায় এসে বিষম আর্থিক পরিস্থিতির মোকাবিলায় সেটা রদ

করলেন – এর মধ্যে আয়রনি অথবা নৈতিক প্রশ্ন কেন উঠবে?

খ) লেখকের প্রথম প্রেমিস সংস্কৃত কলেজ ইত্যাদি প্রতিষ্ঠার — যেখানে

ছাত্ররা বিনে পয়সায় পড়তে পেত, যার পিছনে সরকারের মূল লক্ষ্য ছিল

আদালতের কাজে সহায়তা করার জন্য কিছু সস্তা পন্ডিতের জোগান অব্যাহত

রাখা। --- কিন্তু দেশে পাশ্চাত্য শিক্ষা পুরোদমে চালু হওয়ার পরে, এই

প্রতিষ্ঠানগুলি তাদের বোঝাস্বরূপ হয়ে ওঠে। তখন তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য

হয়ে ওঠে, ‘যে কোন উপায়ে প্রতিষ্ঠানগুলির জন্য ব্যয়বরাদ্দ হ্রাস করা’।




-- একদম সঠিক। যথেষ্ট তথ্য দিয়ে এই প্রেক্ষিত লেখক স্থাপন করেছেন।

কিন্তু ওঁর আপত্তি অবৈতনিক ব্যবস্থা তুলে দিয়ে বেতন ব্যবস্থা চালু করায়।

লেখক অরবিন্দ গুহ সম্পাদিত ‘আনপাব্লিশড লেটার্স অফ বিদ্যাসাগর’ থেকে

দেখাচ্ছেন:

১) তিনি ১৯ অগস্ট ১৮৫২ তারিখে সম্পাদক মোয়াটকে চিঠি লিখে জানান যে বিনা

বেতনে পড়ার ব্যবস্থায় ছাত্রদের হাজিরা অনিয়মিত, ইংরেজি স্কুলে ভর্তির

সুযোগ পেলে ওরা এই কলেজ ছেড়ে দেয়। তাই শৃঙ্খলা রক্ষার খাতিরে নতুন নিয়ম

হোক: ভর্তি ফি ২ টাকা, হাজিরা খাতা থেকে একবার নাম কাটা গেলে ফের ভর্তি

হতে আবার ২ টাকা।

দেখা যাচ্ছে এই ব্যবস্থা শুরু হল সেপ্টেম্বর মাসে। তার ছ’মাস পরে বিদ্যাসাগর

চিঠি লিখে জানাচ্ছেন এ’বাবদ আদায় হয়েছিল মাত্র ৪০ টাকা!

আমার কথা: বিদ্যাসাগরের ঘোষিত উদ্দেশ্য তো জরিমানা বা ভর্তির ফি থেকে

আয় বৃদ্ধি করা নয়, বরং ক্লাস পালানো বা স্কুল পালানো বন্ধ করা। হতে পারে

জরিমানার ফলে স্কুলে অনিয়মিত হাজিরা কমে গিয়েছিল, তাই আদায় কম। যাই

হোক, শিক্ষাসত্রের শেষ কোয়ার্টারে চালু করা কোন নিয়মের মূল্যায়ন ছ’মাসে

হতে পারে না।

কিন্তু এরপর লেখক আরও গুরুতর অভিযোগ আনলেন।

“কলেজের জন্মলগ্ন থেকে ১৮৫১ সাল পর্য্যন্ত বিদ্যাসাগর যে ছাত্রতালিকা

উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে দেন, তাতে দেখা যায় দীর্ঘ ২৮ বছরে ভর্তি হওয়া একটি

ছাত্রও পড়া ছেড়ে দিয়ে অন্য কোথাও চলে যায় নি!!”

অভিযোগ মিথ্যাচারের?

আমার উত্তরপক্ষ:




এক, লেখক ৯৮ পৃষ্ঠায় বলেছেন - ‘১৮৩৫-এ দেশে শিক্ষা প্রচলনের পরে’।

অর্থাৎ, আমাদের বিবেচ্য বিষয়ে ২৮ বছর নয়, শেষ ১৬ বছর গুরুত্বপূর্ণ। এহ

বাহ্য। বিদ্যাসাগর ২৮ বছরের সূচি কেন পেশ করেছিলেন? তাঁর উদ্দেশ্য না জানলে

এই সূচির সাক্ষ্যটি যথেষ্ট নয়। আশা করব লেখক এই জায়গাটা স্পষ্ট করবেন।

প্রত্যেক তালিকা তৈরির বিশেষ অ্যাজেন্ডা থাকে। স্পষ্টত ২৮ বছরের

ছাত্রসংখ্যার সূচিটি কলেজে কত ছাত্র ছিল তার সূচি। আমাকে যদি পুরনো কোন

বছরের ছাত্রসংখ্যার তালিকা প্রস্তুত করতে বলা হয় আমি কী করব? প্রত্যেক

বছরে কত ছাত্র ভর্তি হয়েছিল? অথবা বছরের শেষের অন্তিম সূচি? আমার

অনুমান (অবশ্যই অনুমান) শেষ উপলব্ধ সূচি। ওই সূচিতে ক’জন ছেড়ে গিয়েছে তার

কলাম ছিল কি? তাহলে কীভাবে এই সিদ্ধান্ত টানা যায় যে এত বছরে কোন ছাত্র

কলেজ বদলায় নি?

কাজেই মিথ্যাচারের অভিযোগটির জন্যে লেখক যে প্রমাণ হাজির করেছেন তা এক

নজরে মেনে নেওয়ার মত নয় বলেই আমার মনে হয়।

পূর্বপক্ষ: লেখকের আসল বক্তব্য হল - শৃঙ্খলা ইত্যাদি ফালতু বাহানা, আসলে

উনি কলেজে মাইনে দিয়ে পড়ার ব্যবস্থা চালু করতে চাইতেন। এইটা ছিল তাঁর

আসল অ্যাজেন্ডা। তাই তিনি ভর্তি ফি শুরু করার চিঠিটির শেষ লাইনে লেখেন –

আশা করা যায়, এই ব্যবস্থা প্রবর্তিত হলে ক্রমশ মাসিক বেতন দিয়ে পড়ার

ব্যবস্থা চালু করা যাবে।

তারপর ১৮৫৪ সালের জুন মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে মাসিক এক টাকা বেতন

নেয়া শুরু হলে তিনি ২৪ জুন শিক্ষা সংসদের সম্পাদককে চিঠি লিখে ভর্তি ফি এবং

পুনর্ভর্তি ফি রদ করতে বলেন।

অতএব, ‘কলেজে বেতনপ্রথা চালু করার ক্ষেত্রে তাঁর প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল,

সরকারি ব্যয় সংকোচ নীতির সঙ্গে সাযুজ্য বজায় রাখা’।




-- নিঃসন্দেহে। একজন সরকারি কলেজের প্রিন্সিপাল আর্থিক ব্যাপারে

সরকারের নীতির বিরোধিতা করে চাকরি করবেন কি? স্বাধীন ভারতেও?

আমার উত্তরপক্ষ:

অধ্যক্ষ হিসেবে বিদ্যাসাগরের চ্যালেঞ্জ হল প্রতিষ্ঠানটিকে হয় বন্ধ করে

দেয়া, নয় আর্থিক ভাবে স্বাবলম্বী করে তোলা। উনি যদি প্রথম বিকল্পটিকে

বেছে নিতেন তাহলে ইতিহাসে ঔপনিবেশিক প্রভুদের বশংবদ মোসাহেব হিসেবে

অবশ্যই নিন্দিত হতেন। কিন্তু তিনি বেছে নিলেন দ্বিতীয় বিকল্পটি। শুধু তাই নয়,

মাসিক বেতন চালু হলে ভর্তি ফি রদ করার নমনীয়তাও দেখিয়েছেন। অর্থাৎ

তিনি কলেজ পরিচালনার আর্থিক পক্ষ নিয়ে যথেষ্ট সংবেদনশীল ছিলেন।

তৃতীয় কোন বিকল্প ছিল কি? আমার জানা নেই।

২.২ হিন্দু কলেজ ও কলকাতা মাদ্রাসার ছাত্রদের মতো সংস্কৃত কলেজের

ছাত্রদের জন্যও ডেপুটিগিরির সুযোগ করে দেওয়া

লেখক জানিয়েছেন যে হিন্দু কলেজ ও কলকাতা মাদ্রাসার ছাত্ররা প্রথমাবধি

ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের পদ পেত। সংস্কৃত কলেজের ছাত্ররা পেত না। এ’নিয়ে তাঁর

কলেজের ছাত্রদের জন্যেও এই সুযোগ পাওয়ার অনুরোধ করে বিদ্যাসাগর ১৮৫২

সালের ১৩ জানুয়ারি মোয়াট সাহেবকে চিঠি লেখেন এবং তাঁর অনুরোধ মঞ্জুর হলে

ছাত্ররা ডেপুটিগিরির পরীক্ষায় বসার সুযোগ পায়।

লেখকের সমালোচনা ও আমার মন্তব্য :

“এই কলেজ যে আর পাঁচটা কলেজের মতো ছাত্রদের ভবিষ্যতের পেশা বেছে

নেওয়ার ক্ষেত্রে আশাব্যঞ্জক ভূমিকা পালন করতে পারে, এই আশা দেখিয়ে

অধিক সংখ্যক ছাত্রভর্তি করাই ছিল এই তথাকথিত ‘সংস্কার’-এর মূল

উদ্দেশ্য”।




-- একদম ঠিক। এতে ব্যঙ্গের কারণ কী বুঝলাম না। আজকের দিনেও কোন

প্রতিষ্ঠান চালাতে গেলে, বিশেষ করে আর্থিক সংকটকালে, দেখতে হয় যে কোন

ব্যাপারে সেটি প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানের থেকে পিছিয়ে আছে।

এবং

“কলেজের ছাত্রদের চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে একটি নতুন পদে আবেদন করার

সুযোগ করে দেওয়ার বেশি এই ‘সংস্কার’-এর অতিরিক্ত কোন মূল্যই নেই”।

- নিঃসন্দেহে, কিন্তু অতিরিক্ত মূল্যের দাবি কেউ করেছে কি? লেখক বলছেন যে

‘এই সিদ্ধান্তের ফলে কতজন ছাত্র শেষ পর্য্যন্ত ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের চাকরি

পেয়েছিল, সে কথা জানা যায় না’।

- বেশ, কিন্তু বিদ্যাসাগরের দায়িত্ব সুযোগ করে দেয়া, আগে সেই সুযোগই ছিল না।

মাদ্রাসা ও হিন্দু কলেজের থেকে পাস হওয়া ছাত্রদের ছিল। বিধবাবিবাহ আইন

পাশ হওয়ার পর বহু বছর হাতে গোনা বিধবাবিবাহ হয়েছে। এখন হচ্ছে। তার জন্যে

কি দেড়শ বছর আগে ওই আইন পাশ হওয়ার ঐতিহাসিক গুরুত্ব কমে গেছে? তবে এ

নিয়ে যথাসময়ে কথা হবে।

২.৩ অষ্টমী ও প্রতিপদে ছুটির বদলে রবিবার ছুটি এবং দুমাস গরমের ছুটি চালু

করা

লেখক জানাচ্ছেন - সংস্কৃত কলেজ স্থাপিত হওয়ার পর থেকে অষ্টমী ও

প্রতিপদ তিথিতে কলেজ বন্ধ থাকত। বিদ্যাসাগর মোয়াট সাহেবকে চিঠি লিখে শুধু

রোববার করালেন। তাতে কার্যদিবস সমান থাকবে বলা হলেও আসলে কলেজ বন্ধ

হয় ৪৮ দিনের বদলে ৫২ দিন। দেখাই যাচ্ছে, বারোমাসের বারোটা রবিবার, কিন্তু

প্রতি তিনমাসে একটা করে রোববার বেড়ে যায়, তাই ৪৮+ ৪= ৫২। দুই পক্ষে ৩০

দিনে ২ অষ্টমী ও ২ প্রতিপদ, ফলে ৪৮ দিন ছুটি। তারপর বিদ্যাসাগর পরীক্ষা

(বার্ষিক?) অক্টোবর থেকে পিছিয়ে এপ্রিল করান এবং দু’মাস গরমের ছুটি করিয়ে




দিন। তাতে সবমিলিয়ে কর্ম দিবস প্রায় এক মাস কমে যায়। ছুটি ৬২ দিনের

জায়গায় ৮৫ দিন হয়। কর্তৃপক্ষ অরাজি হন নি।

এতে কী সমস্যা হল বুঝতে পারছি না। আজও বহুজায়গায় ছাত্রদের দু’মাস

গ্রীষ্মাবকাশ চলে এবং বার্ষিক অবকাশ আগের তুলনায় বেশি। মনে হয় আপত্তির

কারণ দুটো।

এক, ‘দীর্ঘদিনের প্রচলিত রীতি বন্ধ’ করা এবং দুই, ‘Her Majesty’s Birthday’ ছুটি

বন্ধ না করা।

এই আপত্তিগুলো আমার কিঞ্চিৎ ছেলেমানুষি মনে হয়েছে। ইংরেজের রাজত্ব,

ইংরেজের স্কুল — সেখানে মহারানির জনমদিনে ছুটি হবে না? সেই ছুটি রদ করার

চেষ্টা না করায় বিদ্যাসাগর কলোনিয়াল প্রভুর মোসাহেব! আজ স্বাধীন ভারতে

মহাত্মা গান্ধীর জন্মদিবসে ছুটি থাকে না? বা খ্রিস্টান স্কুলে ক্রিসমাসের সময়

টানা এক সপ্তাহ ছুটি হয় না? বিদ্যাসাগর ছাপাখানা খুলে ছিলেন বটে, কিন্তু নতুন

কলেজ খুলতে পারতেন কি?

৫.৪ সংস্কৃত কলেজে ইংরেজি পাঠক্রম চালু করা বা ইংরেজি বিভাগ খোলা

এখানে আমি লেখকের সঙ্গে একমত। বিদ্যাসাগরের উদ্দেশ্য ছিল ‘নতুন যুগের

চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের সংস্কৃত কলেজে

আকৃষ্ট করা’। এবং ‘প্রকৃতপক্ষে সরকারি ব্যয়সংকোচ নীতির সঙ্গে সাযুজ্য

বজায় রাখার জন্য তিনি যেমন কলেজে বেতন প্রথা চালু করেন, তেমনই

ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রাচ্যবিদ্যার প্রতিষ্ঠানেও চালু করার জন্য

তিনি ডেপুটিগিরির প্রলোভন দেখিয়ে কলেজে ইংরেজি বিভাগ চালু করেন’।

(নজরটান আমার)।

লেখকের আপত্তি: ইংরেজি নামক রাজভাষাকে ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থার

হাতিয়ার হিসেবে প্রাচ্যবিদ্যার অঙ্গনে উদ্যোগী হয়ে অনধিকার প্রবেশ দেওয়া।




ফল হল মারাত্মক। আগে অঙ্ক শেখানো হত সংস্কৃতে, ভাস্করাচার্যের বীজগণিত

ও লীলাবতী পড়ানো হত, এখন ইংরেজিতে পড়ানো হবে অ্যালজেব্রা। এছাড়া

বিদ্যাসাগর ইংরেজির নতুন অধ্যাপকদের ৫০ টাকা মাইনে বাড়ানোর সুপারিশ

করলেন কিন্তু সংস্কৃতের অধ্যাপক ও পন্ডিতদের বিগত বারো বছর ধরে মাইনে

না বাড়লেও এখন মাত্র ১০ টাকা বাড়ানোর কথা বলেন।

উত্তরপক্ষ:

আমি সংস্কৃত কলেজে কোর্স মডার্নাইজ করার মধ্যে কলোনিয়াল এজেন্ডার

মোসাহেবি আক্ষেপের তাৎপর্য বুঝতে পারছি না। লেখকের মতে কি সংস্কৃতে

অঙ্ক শেখানো চালু রাখা হত, সেটাই ঠিক ছিল? আর ঔপনিবেশিক ভারতে

ঔপনিবেশিক কলেজে চাকরি করার মধ্যে যতটুকু দাসত্বের আরোপ বর্তায়

ততটুকু বিদ্যাসাগরের জন্যেও প্রযোজ্য, ঠিক যে অর্থে ব্রিটিশ ভারতে যে

সমস্ত ভারতীয় নাগরিক ইংরেজ সরকারের অধীনে চাকরি করেছেন- রেলে,

আদালতে, সরকারি দপ্তরে বা পুলিশ ও মিলিটারিতে — সবাই কলোনিয়াল দাস

এবং তাঁরা কলোনিয়াল অ্যাজেন্ডায় কাজ করছেন। কিন্ত এর অতিরিক্ত কোনও

অভিযোগ, অর্থাৎ ব্যক্তি বিদ্যাসাগর অতিরিক্ত উদ্যোগ নিয়ে অনাবশ্যক ভাবে

কিছু করছেন – তেমনটা প্রমাণ করার জন্য এই তথ্য যথেষ্ট - এমন মনে হচ্ছে

না। তবে সংস্কৃত পণ্ডিতদের আর্থিক দুরবস্থার ব্যাপারে সৈয়দ মুজতবা আলীর

বলা পণ্ডিত মশায়ের নিজেকে সাহেবের পোষা কুকুরের চেয়েও নগণ্য মনে করার

গল্পটি অবশ্যই মনে পড়বে।

লেখকের ব্যঙ্গোক্তিটি - “ইংরেজি আমলে ইংরেজি জানা শিক্ষকদের বেতন যে

অন্যদের থেকে বেশি হবে, এ আর কী এমন নতুন কথা!” -- কিন্তু এটাই পরাধীন

ভারতের সত্য। শুধু শিক্ষাবিভাগ কেন, আদালত, সরকারি বিভাগ - সর্বত্রই একই

নিয়ম।

লেখক নিজেই দেখিয়েছেন যে বিদ্যাসাগরের জন্মের আগে প্রতিষ্ঠিত ফোর্ট

উইলিয়ম কলেজে (১৮০০ সাল) যে সায়েবরা আরবি, হিন্দুস্তানি ও সংস্কৃত




বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন তাঁদের মাইনে গড়পড়তা ১৫০০ টাকা, অথচ তাঁদের

সহায়ক বাঙালি পণ্ডিতদের সর্বোচ্চ মাইনে ২০০ টাকা মাত্র!

তাহলে শুধু বিদ্যাসাগরের থেকে আমরা কোন নীতিগত ব্যতিক্রম কেন আশা

করব?

কিন্তু লেখক দেখিয়েছেন যে মাত্র তিনবছরে বিদ্যাসাগরের মাইনে বেড়ে দ্বিগুণ

হল। আশ্চর্য! কিন্তু এটাও খেয়াল করতে হবে যে ওই সময় বিদ্যাসাগর

একইসঙ্গে সংস্কৃত কলেজের সহকারী সম্পাদক, সম্পাদক ও প্রিন্সিপালের কাজ

একাই সামলাচ্ছেন। ফলে ব্যয়সংকোচ করেও বিদ্যাসাগরের বেতন বাড়াতে কোন

অসুবিধে হবার কথা নয়।

অবশ্যই আজকে আমাদের চোখে এটি বিসদৃশ। কারণ বিদ্যাসাগর বলতে যে

ভাবমূর্তিকে আমরা পুজো করে থাকি তার বদলে একজন চতুর বিষয়বুদ্ধি সম্পন্ন

এবং নিজের আর্থিক লাভের প্রতি সচেতন একজন মানুষের চেহারা এবার উঁকি

মারছে।

লেখকের প্রশ্ন: এত সব করেও কলেজের ছাত্ররা কতটুকু ইংরেজি শিখেছিল?

বিদ্যাসাগরের কৃতি ছাত্র কৃষ্ণকমল লিখে গেছেন যে বিদ্যাসাগরের খেদোক্তি ‘না

ইংরাজিও তেমন লিখতে পারিস, না সংস্কৃতেও পণ্ডিত হলি’। তিনি চাইতেন যে

‘বিধবাবিবাহ’ বিষয়ক ওঁর যুক্তিগুলো কেউ ইংরেজিতে ভাল করে লিখুক। কিন্তু

‘সংস্কৃতও ভাল বুঝে, ইংরাজিও ভাল লিখিতে পারে এরূপ লোক না পাওয়ায় নিরস্ত

হইয়াছিলেন’।

১৯৫৩ সালের শেষের দিকে কলেজে ইংরেজি চালু হয়। কৃষ্ণকমল সাতবছর ওখানে

ইংরেজি পড়েছিলেন, পরে প্রেসিডেন্সিতে অধ্যাপনা করেন। কথা হচ্ছে, সেইসব

দিনে প্রেসিডেন্সিতে শিক্ষার মাধ্যম কী ছিল? অবশ্যই ইংরেজি। তাহলে আজকের

মানদণ্ডেও কৃতি ছাত্ররা যতটুকু ইংরেজি শিখেছিলেন তা যথেষ্ট নয় কি!




বিদ্যাসাগরের ‘সংস্কৃতও ভাল বুঝে, ইংরাজিও ভাল লিখিতে পারে এরূপ লোক না

পাওয়ায়’ খেদোক্তি দিয়ে ছাত্রদের ইংরেজি শিক্ষার মান বিচার করব, অথচ

প্রেসিডেন্সিতে অধ্যাপনার যোগ্যতা প্রসঙ্গে নজর দেব না?

আজকের কলকাতায় কতজন বাংলা মিডিয়াম স্কুলের পাশ করা ছাত্র ভাল

ইংরেজিতে বই অনুবাদের মত আত্মবিশ্বাস অর্জন করেন?

৫.৫ ব্যাকরণ শ্রেণিতে মুগ্ধবোধ পড়ানোর বিলুপ্তি

এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটা নিয়ে লেখক পূর্ববর্তী সমস্ত বিদ্যাসাগর-

গবেষকদের দিকে অভিযোগের আঙুল তুলে তিক্ত ভাষায় কিছু মন্তব্য করেছেন।

আমরা আগে অভিযোগটি বোঝার চেষ্টা করি।

লেখকের দেয়া তথ্য থেকে:

১) নভেম্বর ১৮৫৪ সাল পর্যন্ত কলেজে সংস্কৃত গ্রামার হিসেবে হিসেবে

ব্যোপদেবের মুগ্ধবোধ পড়ানো হত।

২) বিদ্যাসাগরের উপলব্ধি - সাধারণ বাঙালি ছেলের পক্ষে সংস্কৃত ভাষায়

সংস্কৃত গ্রামার আয়ত্ত করা আয়াসসাধ্য, প্রায় পাঁচ বছর লাগে। ছেলেরা অর্থ

না বুঝে মুখস্থ করে। বাংলায় সংস্কৃত গ্রামার পড়ালে সহজ হবে।

৩) তাই বিদ্যাসাগর বাংলায় লিখলেন ‘সংস্কৃত ব্যাকরণের উপক্রমণিকা’

(ইন্ট্রোডাক্টরি) এবং ‘ব্যাকরণ কৌমুদী’ (অ্যাডভান্সড)। এবং সংস্কৃত

সাহিত্যের বই থেকে নির্বাচিত গদ্য ও পদ্যাংশ নিয়ে ঋজুপাঠ (১ম, ২য় ও ৩য়)।

৪) বিদ্যাসাগর মশায় কলেজের ‘শিক্ষাসমাজ’ (যাতে মার্শাল, মোয়াট ইত্যাদি

বিদ্যাসাগরের গুণমুগ্ধ সায়েবরা রয়েছেন) থেকে প্রস্তাব পাশ করিয়ে ১৯৫৫

থেকে নিজের লেখা পাঁচটি উপরোক্ত বই কলেজে পাঠ্য করলেন।




এই পদক্ষেপকে বাংলার গবেষকরা এবং মধ্যবিত্ত সমাজ আজও গুরুত্বপূর্ণ

শিক্ষাসংস্কার মনে করে।

লেখকের পূর্বপক্ষ:

১) বিদ্যাসাগরের এই সংস্কার আসলে একটি ছল বা ধাপ্পাবাজি (শব্দটি আমার)।

বিদ্যাসাগর নিজে মুগ্ধবোধ তিনবছরে শেষ করেছিলেন, কৃতি ছাত্র রামকমল চার

বছরে। ফলে গড়পড়তা ছাত্রদের পাঁচ বছর লাগত - এটা বাজে কথা।

২) বিদ্যাসাগরের নতুন ব্যবস্থায় ছাত্রদের বোঝা বেড়ে গেল। এক মুগ্ধবোধের

বদলে খোদ বিদ্যাসাগরের লেখা পাঁচ-পাঁচটি বই পড়তে হল। তাতে যে সবাই

সংস্কৃতের পণ্ডিত হয়নি তার প্রমাণ বিদ্যাসাগরের পূর্বোক্ত খেদোক্তির

প্রথম অংশেঃ “না ইংরাজিও তেমন লিখতে পারিস, না সংস্কৃতেও পণ্ডিত হলি”।

৩) লেখকের কথায়: “একজন কলেজের অধ্যক্ষ তাঁর নিজের লেখা পাঁচটি বই তাঁরই

কলেজের পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করছেন, তৎকালীন সময়ে এমন ঘটনা সারা

ভারতবর্ষে ঘটেছিল কিনা সন্দেহ”।

৪) রামকমল ভটাচার্য ১৮৪৮ সালে ভর্তি হয়ে ১৮৬০ সালে ওখান থেকে গ্রাজুয়েট

হলেন। ভর্তি হয়েই মুগ্ধবোধ পড়া আরম্ভ করে চার বছরে মুগ্ধবোধ শেষ হোল।

কিন্তু বিদ্যাসাগরের মতে “না সংস্কৃতেও পণ্ডিত হলি”।

লেখকের মতে, “তার মানে মুগ্ধবোধের পাঁচ-পাঁচটা ‘সহায়িকা’য় না কমেছিল সময়, না

বেড়েছিল সংস্কৃতে ছাত্রদের দক্ষতা”।

আমার উত্তরপক্ষ:

নীচের থেকে শুরু করি।

৩) অধ্যক্ষের নিজের একগাদা বইপাঠক্রমে ঢোকানো, সে সময়ে গোটা ভারতে




আর কোথাও? সারা ভারতের কথা জানিনা, তবে কয়েক দশক পরে রবীন্দ্রনাথ

করেছিলেন - বিশ্বভারতীতে সহজ পাঠ (প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগ), বিশ্ব পরিচয়

এবং প্রাথমিক ইংরেজি শেখানোর পাঠ। কারণটা কিন্তু এক; মাতৃভাষার মাধ্যমে

বিদেশি ভাষা শেখানো। এনিয়ে ওঁর মাতৃদুগ্ধ যুক্তির সঙ্গে সবাই পরিচিত।

বিদ্যাসাগরেও একই যুক্তি। আর দুজনকে একই ‘অপরাধ’ করতে হয়েছিল। কারণ,

তখন বিকল্প ছিল না। আজকের চশমায় অতীতকে দেখলে এই ভুল হবে।

বরং বিদ্যাসাগরের সময়ে এই সমস্যাটি আরও প্রকট। তাই বিদ্যাসাগর ও

রবীন্দ্রনাথ দুজনেই ধন্যবাদার্হ সমস্যাটা বুঝে নিজেরাই সমাধানের ভার কাঁধে

তুলে নেয়ার জন্যে। এই বিন্দুতে বর্তমান লেখকের পূর্বসূরী বিদ্যাসাগর-

গবেষকরা বোধহয় বেশি ঠিক।

আমরা নিজের অভিজ্ঞতায় জানি গোড়াতেই নেসফিল্ডের গ্রামার না পড়ে বাংলার

মাধ্যমে লেখা গ্রামার পড়ে লাভ হয়েছে। নেসফিল্ডের গ্রামার ইংরেজদের জন্যে,

যারা ভাষাটা জানে। যেমন আমাদের বাংলার গ্রামারের জন্যে সুনীতিকুমার।

৪) উদাহরণটা ভুল। কৃষ্ণকমল (১৮৪৮+৪) মানে ১৮৫২ সালে মুগ্ধবোধ পড়া শেষ

করেন। ১৮৫৪ সালের নভেম্বর পর্যন্ত বিদ্যাসাগরের বই আসেনি। কৃষ্ণকমল

১৮৫৫ সালে সপ্তম বর্ষের ছাত্র; ব্যাকরণ শেষ করে দর্শন, স্মৃতি, সাহিত্য

এইসব পড়ছেন। তিনি কেন বিদ্যাসাগরের প্রাইমার সপ্তম বর্ষে পড়বেন?

২) উপক্রমণিকা আদৌ মুগ্ধবোধের সহায়িকা নয়, সাবস্টিটিউট। আর

উপক্রমণিকা এবং কৌমুদী আলাদা আলাদা স্ট্যান্ডার্ডের জন্য। যেমন ঋজুপাঠ

১, ২ ও ৩ মূল সংস্কৃত সাহিত্যের জায়গায় গ্রেডেড পাঠ সংকলন মাত্র। আদৌ

মুগ্ধবোধের সহায়িকা নয়। আমাদের বাংলায় স্কুলে পাঠ সংকলন বা কিশলয়ের

মত। এর মানে মোটেই নয় যে পাঁচটা বই একই ক্লাসে পড়ানো হচ্ছে। বিদ্যাসাগর

পুরো পাঠ্যসূচিকে ঢেলে সাজিয়েছেন। নতুনদের জন্যে মাতৃভাষায় সংস্কৃত গ্রামার

দুই লেভেলে এবং মূল সংস্কৃত সাহিত্যের টেক্সটের জায়গায় পাঠ সংকলন। এটা

সংস্কার নয়তো কী?




১) কাজেই বিদ্যাসাগর ও কৃষ্ণকমলের উদাহরণ দিয়ে গড়পড়তা ছাত্রদের সমস্যা

বোঝা যাবে না। বরং বিদ্যাসাগর যে সাধারণ ছাত্রদের সমস্যাটা বুঝে নিদান বের

করেছেন সেটাই বড় কথা। আমরাও ওই সংস্কারের একশ’ বছর পরে ওই

উপক্রমণিকাই পড়েছি। অর্থাৎ বইটি ফালতু হলে ১০০ বছর টিকে থাকত না।




(চলবে)

0 comments:

0

প্রবন্ধ - সব্যসাচী মজুমদার

Posted in









বিগত শতকের নব্বই দশকের বহু বর্ণিল পরিস্থিতি বাংলা কবিতাকে ঐশ্বর্যময় করে তুলেছিল— আমাদের সন্দেহ নেই। একটি ঘটমান সময় যত কূট ও কৌণিক হবে, সেই সময়ের কবিতা তত‌ই বহুস্তরিক হয়ে উঠবে— এ কথায় আমরা বিশেষ আপত্তি করব না যদি নব্বই দশকের বাংলা কবিতা প্রসঙ্গে আসে। এই নব্বই দশকের বাংলা কবিতা যখন আবহমান বাংলা কবিতার প্রেক্ষিতে আলোচিত হয়, যে গুটিকয়েক নাম আমাদের সম্মুখে প্রবল হয়ে ওঠে, তাঁদের মধ্যে নিঃসন্দেহে সব্যসাচী সরকার একজন অগ্রগণ্য। নব্বই দশকের প্রারম্ভ থেকে আমরা সব্যসাচীর কবিতা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। এবং আমরা এও জানি, বহুকৌণিক ও জাদু প্রবণতাময় সব্যসাচীর কবিতা আমাদের এমন একটি ভাষাগত ব্যঞ্জনার অভিজ্ঞতা দেয়, যা বাংলা কবিতায় ইতিপূর্বে বিশেষ সচরাচর নয়।

সম্প্রতি সব্যসাচী সরকারের শ্রেষ্ঠ কবিতা পাঠের সুযোগ হল। একসঙ্গে দুই মলাটের ভেতর কবিকে পড়তে পেরে একটি সময় ও তার প্রবণতা এবং কাব্যিক পরিশুদ্ধির একটি বিস্তারিত পাঠ পাওয়া গেল। বস্তুত, বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চিহ্নকে সব্যসাচী কিভাবে গড়ে তুলেছেন এবং বিনির্মাণের দিকে নিয়ে গিয়েছেন, তার একটি সম্যক ধারণা পাওয়া যায়। এ প্রসঙ্গে বিস্তারিত প্রবেশের আগে সব্যসাচী সরকারের কাব্যগুলিকে দেখে নেওয়া যাক— শুধু উইকেট বোঝে, সচিন ক্রিজে আয়, জোকার ও ডাইনির স্ক্রিনসেভার, ভাঙা খেলার পাসওয়ার্ড।

মাত্র চারটি কাব্যগ্রন্থেই সব্যসাচী সরকার একটি স্বতন্ত্র পরিবেশ গড়ে তুলতে পেরেছেন বলে যে বিশ্বাস জন্মায়— সে সম্পর্কে আলোচনার প্রয়োজন আছে। নব্বই দশকের মনস্তত্ত্বকে যে উদারীকরণের বিবিধ উপাদান প্রভাবিত করেছে। তারমধ্যে ক্রিকেট অবশ্যই। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হ‌ওয়ার পর আগ্রহটা অবশ্যই বেড়েছিল, কিন্তু বিস্তার ঘটল কেবল টিভি আসার পর। চাক্ষুষ দেখার অভিঘাত ক্রিকেটকে এতটাই ছড়িয়ে দিল প্রান্ত বাংলাতেও যে, ফুটবল একটি বিগত শিল্পক্ষেত্র হয়ে দাঁড়াল। টাকা, বিশ্বচ্যাম্পিয়নের সম্মান আর সচিন তেন্ডুলকর। ভারত হয়ে গেল ক্রিকেটের। কিন্তু, তার এই উত্থানের পেছনে যে সামাজিক কূট কাজ করেছেন, সব্যসাচী সম্যক বুঝেছিলেন। এবং হয়তো এ কারণেই ক্রিকেট ব্যবহৃত হল সব্যসাচীর কবিতায়। কিন্তু, রূপক হিসেবে। বহিরঙ্গ হিসেবে। একটা বক্র দৃষ্টির তাগিদে। কিন্তু, এ রূপক ভাঙলে মনে হয়, আমরা একটা ক্রান্তিকালের ছবিকে দেখতে পাই। একটা ভাঙতে ভাঙতে নতুন হতে থাকা সময়ের প্রতি কবির শ্লেষ এবং আশ্লেষকে স্পর্শ করতে পারি। এবং এই সূত্রে আমরা এ কথাও বলতে পারি, ক্রিকেটের চিহ্নকে মাধ্যম করে সব্যসাচী সরকার ম্যাজিক রিয়ালিটির ব্যবহার করেছেন। এ প্রসঙ্গে আমাদের একটি উদাহরণ প্রয়োজনীয়,


ক্রিকেট


কেউ ক্রিজে থাকতে দেবে না?


পায়ে লাগেইনি, অমুকদা এসে এল বি দিয়ে দিচ্ছে-ব্যাটে বলই লাগল না অমুকদা এসে বলে দিল কট বিহাইন্ড-কী চোট্টামি, কী চোট্টামি!


পরপর সাতদিন এক বলে আউট হওয়া লোকের দুঃখ শুধু উইকেট বোঝে। সশব্দে ভেঙে যায়, প্রতিবাদ করে।


তীর্যক ও বহু কৌণিক শ্লেষে সব্যসাচী আমাদের সমসময়কে দেখেন, ব্যখ্যা করেন এবং তারপর পৌঁছে এমন একটি পরিস্থিতিতে যেখানে আমরা একটি মানুষের ভেতর থেকে বিভিন্ন মানুষ বের হয়ে আসতে দেখি, " এখনও খোঁচা দাওনি? এখনও ক্রিজে?/ তাহলে চায়ের পরে আসতে চলেছে লুজ বল, / ছাদের ঘরে? সিঁড়ির কোণ ? শোবার ঘর ?/ হাতে হাত, তবু ব্যাটিং সাঁইত্রিশ?"( ইনিংস)। কেবল শ্লেষ এবং তীর্যক নেত্রপাতেই শেষ হয়ে যায় না সব্যসাচীর কবিতা। কেবল আত্মধিক্কারের ভেতরেই পরিশুদ্ধি পায় না সব্যসাচীর কবিতা। বরং সময়ের ভেতর থেকে আরেকটা সময়কে বের করে আনে ওঁর রচনা। এমন একটা সময় যা উদ্ভট, আপাত অসংলগ্ন এবং যাকে আমরা জাদু বাস্তবতা বলে চিনতে পছন্দ করব।

দেখুন, জাদু বাস্তবতা কাকে বলে? মোটামুটি আমরা জানি। একটি ঘটনা পরম্পরার অভ্যন্তরীণ কিছু পরম্পরাকে সরিয়ে দিয়ে একটা আকস্মিকতা নির্মাণ। যেমন আমরা টুপির ভেতর থেকে খরগোশ বের করে দেখালাম। কিন্তু মাঝখানে টুপির ভেতর ছেদ করা, গর্ত করা টেবিলে তাকে দাঁড় করানো। নীচ থেকে সহযোগির খরগোশ ঢুকিয়ে দেওয়া — এগুলো দর্শককে দেখালাম না। দর্শক কেবল টুপির ভেতর থেকে খরগোশ বের হয়ে আসতে দেখে অভিভূত হলেন। এরকম। আমাদের সাহিত্যে জাদু বাস্তবতার সঞ্চার সবসময় ছিল। কিন্তু বিচ্ছিন্ন ভাবে। সেই রূপকথার প্রহর থেকে তার যাত্রা। এখন, আমার মনে হয় বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে সচেতনভাবে জাদু বাস্তবতার চর্চা শুরু হয় নব্বই দশক থেকে। আমরা যদি লাতিন আমেরিকার জাদু বাস্তবতার কথা ভাবি, দেখব সেখানে জাদু বাস্তবতার উদ্ভব বিপ্লবের প্ররোচনায় বর্ম নির্মাণের তাগিদে। আমার মনে হয়, গত শতকের নব্বইয়ের বাঙালি কবিরা এরকম একটা বর্ম গড়ে তুলেছিলেন। এবং সেই জাদু বাস্তবতা বস্তুত মার্কেজ কথিত দেশ ও ভূগোল সাপেক্ষে গড়ে ওঠা জাদু বাস্তবতা বলেই ধারণা হয়। সব্যসাচী সরকার বাংলা কবিতার জাদু বাস্তবতা চর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ চিহ্ন বলেই এক‌ইসঙ্গে অনুমান করি, " জোকারের চাহনিতে কেঁপে যায় বুক। / তাসের দেশের ফাঁকে চোখ মারে সে। পিঠে রাখে হাত।/ খাদের ধারে দাঁড়িয়ে আমার চুলের মুঠিটা ধরে / কিছুটা নাড়ায়। কিন্তু ফেলে না। শূন্যে ঝুলিয়ে রাখে। ছটফট করতে করতে/ খুনখারাপি রঙের স্ক্রিনসেভারে ফিরতে চাই আমি ।/ কিন্তু পারি না।/ হাজার/ হাজার তাস গলা টিপে ধরে। "( লকডাউনে জোকারের সঙ্গে কথোপকথন)।
বস্তুত বহুগামী ও বহুস্তরিক মানব চরিত্র প্রতি মুহূর্তে নিজেকে প্রজ্ঞায় ও অপরাধে নিজেকে জারিত করছে বদলে ফেলছে। আর এই বদলের অভিঘাত আমাদের নিজেদের কাছে নিজেদের অপরিচিত, উদ্ভট করে তুলছে। বদলের দ্রুতি আমাদের হতচকিত করে দিচ্ছে। সব্যসাচী সেই হতচকিত, বিমূঢ় দৃষ্টিকে ব্যবহার করে কবিতার আবহাওয়ায় তৈরি করেছেন সেইসব ছবি যা আমরা আমাদের গূঢ় স্বপ্নে অথবা বহু বাসনার গুপ্ত কক্ষে লালন করি, লুকিয়ে রাখি,

"প্ল্যাটফর্মের ধারে বসে চায়ে ডুবিয়ে পাঁউরুটি খাচ্ছিল দুঃখ, একটু দূরে ট্রেন থেকে নামল বিচ্ছেদ, একটা বেঞ্চে এসে বসল। ধরাল সিগারেট।

বিকেলের মরা আলো এসে ওর গায়ে পড়ল টর্চের মতো।

অভিমান রেললাইনের পাশে সরু রাস্তা দিয়ে চলে যাচ্ছে সাইকেল চালিয়ে, কাঁকুরে পথ পেরিয়ে-এই তিনজনকেই আমি বসে বসে সন্তর্পণে লক্ষ করছিলাম, ভাবছিলাম, কোনো-না-কোনো দিন, এদের মধ্যে একজন-না-একজন, একটা উপন্যাস লিখবে, যার উৎসর্গে থাকবে, 'ট্রেন চলে গেলেও যে লোকটা প্ল্যাটফর্মেই ছিল...''

আমরা আর‌ও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষ করেছি সব্যসাচী সরকারের কবিতা প্রসঙ্গে। সময়ের প্রতিটি চিহ্নকে ধারণ করেন সব্যসাচী। এমন কিছু চিহ্ন যারা আমাদের মুক্ত পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ বিবর্তনগুলিকে সূচিত করে, দেখায় বিগত পৃথিবীর অনতি ইতিহাসের ঘটনাক্রমগুলিকে। এটি নব্বই দশকের অন্যতম বৈশিষ্ট বলেই মনে হয়। এবং এ কথাও বলতে আমাদের আপত্তি হবে না যে, নব্বইয়ের এই বৈশিষ্টের কারণেই বাংলা শব্দভাণ্ডারে এমন কিছু শব্দ প্রবেশ করেছে যারা ইতিপূর্বে আমাদের অপরিচিত ছিল। বাংলা ভাষার অঙ্গরাগ নির্মাণের ক্ষেত্রে এই সময়ের কবিতার ভূমিকা আমরা অস্বীকার করতে পারি না,

"বেরিয়েছে? ডাউনটাউন ছেড়ে শহরতলিতে? নাছোড়বান্দা কোনো নতুন প্রেমিক? তারপরে ডিনার শেষে আইসক্রিমের খোঁজে? কীভাবে ফিরতে পারে? উবার ধরবে? কিংবা হলুদ ট্যাক্সি?'( লকডাউনে জোকারের সঙ্গে কথোপকথন)

'ডাউনটাউন' থেকে 'হলুদ ট্যাক্সি' আমাদের জীবনে ছিল এতদিন, কিন্তু ভাষায় ছিল না। এই দুরূহ কাজটি সম্পন্ন করে আমাদের কৃতজ্ঞতা ভাজন হয়েছে এই সময় ও সব্যসাচীর কবিতা।

ছন্দের বিবিধ রূপে অনায়াস গতি সব্যসাচী সরকার অন্তর্ঘাত তৈরি করেছেন তাঁর কাব্যে। কখনও স্পর্শকারতাময়, সোচ্চার। কখনও নিভৃত, ইঙ্গিতময়। তীর্যক অথচ প্রসন্ন। বিমর্ষ কিন্তু বিষাদগ্রস্ত নন। সময়ের অন্তরাল থেকে উঠে আসা মানুষের এক বহুমাত্রিক রূপকে লিখেছেন সব্যসাচী। লিখেছেন এমন একটি ভাষায়, যে ভাষা বিবর্তনময় এবং জাদুর প্রস্তাবনা তৈরি করে। যে প্রস্তাবনার ভেতর আমাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চরিত্র স্পষ্ট হয়েছে। স্পষ্ট হয়েছে এমন একটা সময়ের চরিত্র যে যুগপৎ লড়ছে ও আত্মসমর্পণ করছে মুক্ত পৃথিবীতে। এই যুগল দ্বন্দ্বেই সিদ্ধি পায় সব্যসাচী সরকারের কবিতা।

বস্তুত 'শ্রেষ্ঠ কবিতা' সব্যসাচী সরকারের কেবল নয় বাংলা ভাষার কবিতার বিবর্তনের ধারাবাহিকতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ চিহ্ন বলেই ধারণা হয়। সন্দেহ নেই এই ব‌ই কৌতুহলী পাঠক, কবিতা কর্মী এবং এক‌ইসঙ্গে গবেষকের আগ্রহ ও সংগ্রহের বিষয় হয়ে উঠবে,
"ভালোবাসা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য/একটা দু'লাইনের টেক্সটই যথেষ্ট।/সেই দু'লাইনই টিউবের ভিতর থেকে বেরোনো টুথপেস্ট,/যা আর কখনও ফিরবে না।/ঠিক যেমন ফিরবে না মায়ের মৃত্যুদিন,/যেদিন মুখাগ্নির মুহূর্তে/ আমি শিখেছিলাম অনিশ্চয়তা,/যা কোনওদিন আমাকে সরলরেখার দিকে,/ এগিয়ে দিল না..."( মুখাগ্নি)


শ্রেষ্ঠ কবিতা : সব্যসাচী সরকার : বান্ধবনগর : প্রচ্ছদ— ধৃতিরূপা দাস : ২৫০ টাকা










0 comments:

0

প্রবন্ধ - সমরেন্দ্র বিশ্বাস

Posted in










কেমন আছে কাশ্মীরের মানুষ? সেখানেও তো কবিতা লেখা হয়? কেমন আছে কাশ্মীরের কবিতা?

বিভিন্ন সময়ে কবিদের কবিতাতে উঠে এসেছে কাশ্মীরের দৈনন্দিন জীবন, তাদের ভূখন্ড ও সমাজ। কবির কলম ও কাগজের পৃষ্ঠায় কাশ্মীরকে এক ঝলক বুঝে নেয়ার প্রচেষ্টা, তারই জন্যে এই লেখাটা।

ভূসর্গ কাশ্মীর। এখানকার কবি অগ্নিশেখর লেখেন –

‘দেবদারু গাছে বসে কাক কাঁদে

আর ছাদ বেয়ে এখনো গড়িয়ে পড়ে গ্লেশিয়ার …

প্রচুর মাত্রায় এখনো পড়ে বরফ

ঠিক ছোট্ট বেলার মতোই

শুধু আমরাই আর আগের মতো রইলাম না’ [ বরফ / অগ্নিশেখর।]

এই কবিতায় উঠে আসে ভূস্বর্গ কাশ্মীরের খন্ডচিত্র, সেই সাথে কোথাও যেন লুকিয়ে থাকে কবির একটা দীর্ঘশ্বাস। কেন এই দীর্ঘশ্বাস? সে কি জীবনের নিরাপত্তাহীনতা? প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, কবি অগ্নিশেখরে কাশ্মীরেরই কবি, সেখানেই তার জন্ম ১৯৫৬ সালে।

কবি অগ্নিশেখরের কবিতার পরবর্তী লাইনগুলোতে কিছুটা খুঁজে পাই এই নিরাপত্তাহীনতার কিছু ইঙ্গিত।

‘আমি হব্বা কদল সেতু থেকে দেখলাম

ঝিলম নদীকে …

ঝিলমকে দেখে আমার ঠিক মনে হয়

সে পাকিস্থানি গুপ্তচর

আমি আমার গলায় পরা পৈতে

জামার ভেতরে লুকিয়ে চটপট

ঘরে ফিরে এলাম

আর ঘুমন্ত অবস্থায় অনুভব করলাম

মাটি সরে যাচ্ছে।’ [ দেবদারুর একখানা চিঠি / অগ্নিশেখর।]

দেশের ভেতরকার ধর্মীয় অসংবেদনশীলতা! সীমান্তবর্তী পাকিস্থানের থেকে নেমে আসা আক্রমণ। এসব সত্ত্বেও হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে, আমার মনে হয়, কাশ্মীরের সাধারণ মানুষ শান্তির স্বপক্ষে, তারা পাশাপাশি মিলেমিশে ঘর বেঁধে থাকতে চায়।

২০২৫ এর এপ্রিলে সন্ত্রাসবাদীদের হামলায় প্রাণ হরালো কাশ্মীরের পহেলগাঁওতে ঘুরতে যাওয়া কিছু ট্যারিষ্ট মানুষ। ব্যাথায় আর্তনাদে রক্তাক্ত পড়ে রইলো ভূস্বর্গের মাটি। যারা সন্ত্রাসবাদী, তারা কি এ দেশের, না কি তারা পাকিস্থানের বর্ডার পেরিয়ে এসেছে?

অথচ এই ঘটনার পূর্ববর্তী সময়ে লেখা কাশ্মীরের কবিদের লেখা কিছু কবিতা আমার সামনে। যা কিনা বিভিন্ন কবির লেখা কাশ্মীরের কবিতার একটা বাংলা অনুবাদ সংকলন। [সূত্র – ১]

এই সংকলনে বসরত পীর-এর লেখা একটা কবিতার বিবরণ পড়ে যে কেউই থমকে যাবে - শ্রীনগর একটি বাঙ্কারের শহর। বিশ্বের শহরগুলির মধ্যে সর্বাধিক সামরিক উপস্থিতি রয়েছে এখানে। প্রায় দেড় দশক ধরে এই শহরের রাতগুলো কার্ফুতে হারিয়ে গিয়েছিল!

তারই লেখা Curfewed Night বই থেকে অনুদিত অংশের বিবরণে দেখি মধ্য-শ্রীনগরের হাব্বাকাদাল অঞ্চল সম্পর্কে কিছু উক্তি। এই অঞ্চল সম্পর্কে বলা হয়েছে – এখানে দেখার কিছুই নেই, এটি এখন একটি ধ্বংসাবশেষ। রাস্তা দিয়ে নেমে যান, আপনি কিছু পোড়া ঘর-বাড়ি দেখতে পাবেন। [সূত্র – ১]

সত্যিই কি ভূসর্গ কাশ্মীরের আজ এমনই একটা অবস্থা? কেন এমন অবস্থাটা হলো, কেন তিনি এমনটা লিখলেন?



পুরাণো ইতিহাসের দিকে একবার ফিরে দেখা যাক।

কাশ্মীরে একসময়ে ব্রাম্মণ্যবাদ ও বৌদ্ধবাদ প্রচলিত ছিল। ক্রমান্বয়ে কাশ্মীরে বৌদ্ধধর্মের প্রবেশ ঘটে। সম্রাট অশোকের মৃত্যুর পর শৈবধর্মের প্রচার শুরু হয়। কাশ্মীরে ইসলাম ধর্মের আগমণ বিভিন্ন সূফী ও পীরদের মাধ্যমে। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা যখন বিদায় নিচ্ছিল, তখন ভারতবর্ষের তিনটি দেশ (যথা - হায়দ্রাবাদ, জুনগর এবং জম্মু ও কাশ্মীর) স্বাধীন থাকতে চেয়েছিল – তখন কাশ্মীরের জনসংখ্যায় মুসলমানরা ছিল সংখ্যা গরিষ্ঠ, কিন্তু রাজা ছিল হিন্দু, হরি সিং। শুরুতে তিনিও স্বাধীন থাকতে চেয়েছিলেন এবং একই সঙ্গে নেহেরু ও জিন্নাহর সাহায্য চেয়ে দরবারও করেছিলেন। এদিকে দেশভাগের ফলে দুটি নতুন দেশের জন্ম হলে বিভিন্ন অঞ্চলে মুসলিম শিখ হিন্দুদের মধ্যে দাঙ্গার সৃষ্টি হলো। কাশ্মীরে একই পরিস্থিতি তৈরি হলে, মুসলিমরা পাকিস্থানে পলায়ন করতে থাকে। এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে পাকিস্থান কাশ্মীরে সেনাবাহিনীকে প্রেরণ করে। বাহিনীর আক্রমণে কাশ্মীরের অধিকাংশ অঞ্চল রাজার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। তারই প্রতিক্রিয়ায় মহারাজ হরি সিং ভারতের সাহায্য প্রার্থনা করলে, ভারত সরকার তাদের সঙ্গে কাশ্মীরের যুক্ত হবার শর্ত দেয় এবং রাজা হরি সিং তা মেনে নেয়। সেই থেকে কাশ্মীর নিয়ে ভারত-পাকিস্থান টেনশন অব্যহত। কাশ্মীরকে পাকিস্থানের অন্তর্ভূক্ত করার জন্যে জঙ্গী সংগঠনগুলো সচেষ্ট। এই পরিপ্রেক্ষিতে বিপর্যস্ত সেখানকার সমাজ ও সাহিত্য। কাশ্মীরের কবিতাতেও দেখি তার প্রতিফলন। [সূত্র - ৩ / পুস্তকের ভূমিকা – বিতস্তা ঘোষাল]

কবি আগা শাহিদ আলি ‘বিদায়বার্তা’ কবিতায় লেখেন – ‘আমি স্বর্গের মধ্য দিয়ে বয়ে চলেছি নরকের নদী বেয়ে …’ কিংবা ‘ওরা একটা করে বসতকে শ্মশান বানায় আর তার নাম দেয় শান্তি।’ এই লাইন দুটোই মনকে নাড়া দিয়ে যায়। এই কবিতাতেই তার লেখা আরও দুটো লাইন – ‘হ্রদের জলে মন্দির আর মসজিদের হাতগুলো একে অপরের / প্রতিবিম্বকে আঁকড়ে ধরে আছে’। মন্দির আর মসজিদের এই হাত ধরাধরি করে থাকার মধ্যে আমরা একটা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ইঙ্গিত পাই। এই সিদ্ধান্তে আমাদেরকে আসতে হয় – সব মানুষেরা সবসময়ে ধর্মান্ধ হয় না!

‘হিস্টিরিয়া’ কবিতায় মারিয়াম আলা আমজাদি যে ছবি আঁকেন, তা আতঙ্ক ও বিভীষিকার। এখানে জন্মগত প্রতিরোধের কথাও উঠে আসে।

‘জমিন আঁকড়ে পড়ে থাকো কাশ্মীর

আতঙ্ক আর বিভীষিকা

তোমার প্রতিদিনের দোস্ত

এমনকী মায়ের পেট থেকে পড়েই

নাদান শিশুরাও জেনে গেছে কীভাবে চিৎকার করতে হয়’

‘শব ও সরোবর’ কবিতায় কবি সাবির ‘আজার’ লেখেন -

‘সরোবরের আয়নায়

কী দেখা উচিত আমার ...?

জলের গভীর থেকে

অচেনার মতো এক শব

চেয়ে থাকে

অপলক ...’

মর্মান্তিক কাব্যময় কবিতা! সরোবরের আয়নায় আকাশ নয়, জলজ জীবন নয়, সেখানে দেখা যাচ্ছে ‘শবদেহ’! মর্মস্পর্শী ও করুণ এই দৃশ্য! সত্যিই কি এরকমটাই কবির কাশ্মীরের অবস্থা?

অর্জন দেব কাউল ‘মজবুর’ তাঁর কবিতা ‘কাশ্মীর’-এ লেখেন -

‘কত নদী-ছবি লাল হয়ে গেল বোবা মানুষের রক্তে!

আমার মায়ের কমনীয় মুখ কে পোড়াল এই রাজ্যে?’

আফ্রিন ফরিদি ‘চিনার তলায়’ কবিতাটিতে লেখেন, -

‘পোয়াতি মেয়েটি যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠল’। এই কবিতাটির পাদটিকা থেকে আমরা জানতে পারি, ১৯৯১ সালে সেনাবাহিনী ৩১ জন মহিলাকে গণধর্ষণ করেছিল। কবিতাটা তারই পটভূমিকায় লেখা। [ সূত্র -১ ]

অশান্ত কাশ্মীর তার দগ্ধ মুখ দেখায় ‘কাশ্মীরের কবিতা’ সংকলনটির [ সূত্র -১] পাতায় পাতায়। কারণ সেটাই হয়তো কোন এক সময়কার কাশ্মীরের প্রচলিত অবস্থা। ‘শাহজাদা’ রফিক তার ‘বিক্ষোভ জাগছে’ কবিতার সংক্ষিপ্ত পরিসরে তুলে ধরেন সেখানকার অবস্থা!

‘পাগল হাওয়া আর আগুন / বিক্ষোভ জাগছে / লাশ -বিবস্ত্র - কবর / বিক্ষোভ জাগছে’।

এম সি কাস ‘আমার প্রতিবাদ’ কবিতায় সোচ্চার হয়ে ওঠেন দমনপীড়নের বিরুদ্ধে, প্রচলিত রাজনীতির বিরুদ্ধে, ধর্ষণ ও হত্যার বিরুদ্ধে। তিনি তাই লেখেন – আমার প্রতিবাদ আমার ভাইয়ের জন্য / যে মৃত / আমার প্রতিবাদ সেই বুলেটের বিরুদ্ধে / যা তার মাথায় বিঁধে আছে’।

কিংবা

‘বিশ্বাসঘাতক পুতুল রাজনীতিক সব যাদের ভেতর কোনো আত্মা নেই / তারা ছল চাতুরীর সুতোয় আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে গনভোট নামের শব্দটিকে / আমার জান্নাত জ্বলছে সামরিক বাহিনীর হাতে।’

আগা শাহিদ আলি-র কবিতা –

‘আবার আমি সেই দেশে ফিরে এসেছি যেখানে একটা মসজিদের চূড়াকে কবরে পাঠানো হয়েছে।’ এ লাইনটা ভয়ঙ্কর! এটা পড়ে ধর্ম-নিরপেক্ষ দেশের বিবেকবান মানুষ অবশ্যই চমকে উঠবে! এই কবিতারই গদ্য ঢঙে লেখা কিছু লাইন আমাদেরকে দিয়ে প্রশ্ন করায়, এমনটাই কি কাশ্মীরের পরিস্থিতি?

“ ‘আগুনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আমরা অন্ধকার খুঁজি’ চেঁচিয়ে উঠলো রাস্তার খ্যাপাটে লোকটা, / আমি সেই লোকটা হতে চাই যে রক্ত ঢেলে দ্যায় তোমার হাতদুটো শুকানোর জন্যে।”

শ্রীময়ী নন্দিনী ঘোষের ‘কারফিউর শ্রীনগর’এ ধরা আছে দিনলিপির ঢঙে একাধিক কারফিউ দিনের বর্ণনা। গ্রন্থটির [সূত্র -১] পেছনে দেয়া পরিচয়লিপিতে শ্রীময়ীর পরিচিতি নেই; জানার ইচ্ছে রইলো, তিনি কাশ্মীরের মূল নিবাসী কি না? সে যাই হোক, অসাধারণ দক্ষতায় শ্রীময়ীর লেখনীতে উঠে এসেছে কাশ্মীরের দিনযাপন, সেখানকার উপদ্রুত সময়ের কথা! সে যাই হোক, অসাধারণ দক্ষতায় শ্রীময়ীর লেখনীতে উঠে এসেছে কাশ্মীরের দিনযাপন। সেখানকার উপদ্রুত সময়ের কথা।

‘শহরটা নির্বাক ছায়াছবি যেন

রাস্তাগুলো ফাঁকা

সমস্ত পৃথিবী যেন আড়ষ্ট গতিহীন স্থির।

খালি চুপিচুপি হাসপাতালে চলে যাচ্ছে

অসংখ্য শিশুর শরীর।’

কিংবা

‘কাশ্মীরে পৌঁছালো বিশ্বস্ত সূত্রের খবর।

ক্যামেরা লাগানো আর রিমোট চালিত একটি বোমা

ঘুরপাক খাচ্ছে নিচে কারফিউ স্তব্ধ শহরে।’

কিংবা

‘টিভি বন্ধ হয়ে গেছে।

খবরের কাগজের অফিসে ভাঙচুর

দূরভাষ বন্ধ আছে বহুদিন হল।

#

মসজিদ বাকরুদ্ধ শুক্রবার থেকে।

ইন্টারনেট খুঁড়িয়ে চলছে কোনোমতে

আমাদের সাথে গোটা পৃথিবীর

যোগাযোগ কোনোমতে রেখে।

শোনা যায় দুজন ট্রাকচালক

রাস্তায় খুন হয়েছে গতকাল রাতে

#

তাই হাইওয়ে বন্ধ করে দেওয়া হবে।’

কবিতাতে কারফিউর সময় চিত্রণে অনুমান করতে অসুবিধে হয় না, কেমন ভাবে কিছুকাল আগেও সময়ে সময়ে বরবাদ হয়ে যাচ্ছিল কাশ্মীরের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা!

পেয়ারে ‘হতাশ’ নামধারী কবি লেখেন ‘গজল ২’ কবিতা, যার সোজাসাপটা ক’টা লাইন তুলে দেওয়া যাক এখানে -

‘সে কে? যে মারা গেছে, সেই বা কে যে খুন হয়েছে!

সর্বত্র কাফনে মোড়া সেলাই করা মৃতদেহ দেখো

মরুবালুরা তোমরা সব দেখো!’

এ যেন মৃত্যু উপত্যকার এক নির্মম চিত্র!

পরবর্তী কবিতাটার সুর কিছুটা ভিন্ন! ছিনিয়ে নেয়া হল আমার নদী – কবিতায় অগ্নিশেখর লেখেন জীবনের অস্থিতি! নিরাপত্তাহীনতার কথা!

‘ছিনিয়ে নেয়া হল আমার নদী

বদলে দেয়া হল নদীর নাম

নিষিদ্ধ করে দেয়া হল নদীর জলে প্রদীপ ভাসানো

ছিনিয়ে নেয়া হল আমার দেবদারু গাছের ছায়াটুকুও

…… এই ভাবে শত বর্ষের শীতে

বরফ হয়ে গেল আমার কন্ঠ

ছিনিয়ে নেয়া হল আমার চেহারা

আর আমি এখন সব দিক থেকে চিনে ফেলার ভয়ে

পাল্টে ফেলেছি নিজেকে’ [ সূত্র – ৪]

কবি অগ্নিশেখরের ‘জবাহর টানেল’ দীর্ঘ কবিতাটার কিছু বিচ্ছিন্ন লাইনগুলো তুলে দিলাম –

‘এএত বছর

জবাহর লাল নেহেরু সুড়ঙ্গে

ঠেসে-ঠেসে অন্ধকার ভরা হয়েছে

আর পাঁচাল পর্বত ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে’

কিংবা

‘হাতগোলা ও বোমার অট্টহাস

জবাহর লাল নেহেরু সুড়ঙ্গ

ঠাঁয়-ঠাঁয় গুলির খেলা ও অলজেহাদ, অলজেহাদ,

অলজেহাদ।’

অথবা

‘সেঁকা হচ্ছিল লোকতন্ত্রের তাওয়ায় মিথ্যের রুটি

এটি মানব অধিকারের দিন

কিন্তু আমাদের মানব অধিকার বলে কিছু ছিল না।’

কিংবা

‘আমরা পাহাড় থেকে নেমে এলাম শরণার্থী ক্যাম্পে

ছড়িয়ে গেলাম সংবিধানের ফেঁপে ওঠা তাঁবুতে …’। [সূত্র -২]



বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে বাইরে রেখেই ছিন্ন বিচ্ছিন্ন ভাবে এখানে তুলে ধরা হলো কাশ্মীর ভূস্বর্গের কিছু কবিতা। আমরা দেখতে পাচ্ছি, এখানকার নানা কবিতার মধ্যে উঠে এসেছে মানুষজনের দীর্ঘশ্বাস, কান্না, বিক্ষোভ, চিৎকার, প্রতিবাদ। সব মিলিয়ে এটাই বুঝতে পারি কাশ্মীরের মানুষেরা ভয়ে ভয়ে আছে, সন্ত্রাসের মধ্যে আছে। তারা সুখে নেই, তারা ততো ভালো নেই।



[ সূত্র –

১) কাশ্মীরের কবিতা। প্রকাশক – মন্থন সাময়িকী, কোলকাতা – ১৮।

২) ভারতীয় কবিতার অঙ্গনে – অনুবাদ - মিতা দাস।

৩) সংগ্রহালয়ে কাটা পা – অগ্নিশেখর / অনুবাদ - মিতা দাস।

৪) শারদীয়া অনুবাদ পত্রিকা – ১৪২৬।

৫) আন্তর্জাল তথ্যপঞ্জি।]

0 comments: