প্রচ্ছদ নিবন্ধ - অমিতাভ বন্দ্যোপাধ্যায়
Posted in প্রচ্ছদ নিবন্ধপ্রবন্ধ - রঞ্জন রায়
Posted in প্রবন্ধ[ রনে দেকার্ত নিয়ে কথা কেন? দুটো কারণে।
এক, ষোড়শ শতাব্দীতে জন্মানো এই ফরাসি ভদ্রলোক ইউরোপিয় দর্শনে যুক্তিবাদী চিন্তার পথপ্রদর্শক। বার্ট্রাণ্ড রাসেলের মতে দেকার্ত থেকে দর্শন আধুনিক হল। মধ্যযুগের পাদ্রী ও যাজকদের একচেটিয়া খবরদারি থেকে মুক্ত হল, স্বাধীন হল। এক অর্থে লাইবনিজ, স্পিনোজা থেকে কান্ট এবং মার্ক্স—সবাই দেকার্তের উত্তরসূরী।
দুই, আমরা স্কুলে কো-অর্ডিনেট জিওমেট্রি পড়তে যে কার্টেসিয়ান অ্যাক্সিসের সংগে পরিচিত হই –ইনিই তার আবিষ্কর্তা। ইনি ঈশ্বরবিশ্বাসী ক্যাথলিক। কিন্তু পোপকে চিঠি লিখে বলেছিলেন—সবকিছুই যুক্তিসিদ্ধ হতে হবে, এমনকি ঈশ্বরের অস্তিত্বও। তাঁর প্রচেষ্টা যুক্তি দিয়ে ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণ করা।
এই ছোট নিবন্ধে আমরা তাঁর দুটো লেখার মাধ্যমে তাঁর চিন্তাকে, বিশেষ করে ‘সন্দেহবাদী পদ্ধতি’কে বোঝার চেষ্টা করব]
দর্শন চর্চার উদ্দেশ্যঃ
চারভাগে বিভক্ত ‘প্রিন্সিপলস অফ ফিলজফি’ বইটির ফ্রেঞ্চ অনুবাদের গোড়াতেই রয়েছে ভূমিকার বদলে অনুবাদকের উদ্দেশ্যে লেখা দীর্ঘ এক চিঠি। সেখানে উনি দর্শনের উদ্দেশ্য হিসেবে জোর দিচ্ছেন জ্ঞানের সাধনাকে। তার বিষয়ের পরিধি ব্যাপক, মানুষের দৈনন্দিন জীবন যাপনকে উন্নত করতে যা কাজে লাগে, মানে স্বাস্থ্য থেকে শুরু করে সমস্ত ব্যবহারিক জ্ঞান। তাহলে সপ্তদশ শতাব্দীর বিজ্ঞানচর্চার সঙ্গে দর্শনের তফাৎ রইল কোথায়?
এইখানে দার্শনিক দেকার্ত বলছেন—সমস্ত প্রকৃত জ্ঞানকে হতে হবে ‘আদি কারণ’ (ফার্স্ট কজ) থেকে উদ্ভূত। কাজেই দার্শনিক অনুসন্ধানের লক্ষ্য হচ্ছে সেই আদি কারণগুলোকে খুঁজে বের করা। এই কারণগুলোকেই উনি বলছেন ‘প্রিন্সিপলস অফ ফিলজফি’ বা দর্শনের মৌল নীতিসমূহ।
কিন্তু এই মৌল নীতিগুলোকে অবশ্যই দুটো শর্ত পূরণ করতে হবে।
প্রথম, এই নীতিগুলো এমন স্পষ্ট এমন স্বচ্ছ হবে যে অনুসন্ধিৎসু মানবমন এর সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন করবে না। অর্থাৎ, এরা স্বতঃস্পষ্ট স্বপ্রকাশ হবে।
আর দ্বিতীয়, বাকি সমস্ত জ্ঞানের সত্যতা এই নীতিগুলোর উপর নির্ভর করবে। কিন্তু এদের সত্যতা অন্য কারও মুখাপেক্ষী হবে না। এরা অস্তিত্বের জন্যে স্বনির্ভর। এদের আলাদা করে নিজের ধর্মেই চেনা যাবে। কিন্তু অন্য জ্ঞান এই নীতিগুলোর থেকে আলাদা করলে অস্তিত্বহীন।
প্রশ্ন হল—দেকার্তের আদিকারণ(ফার্স্ট কজ) একাধিক! এই আদিকারণগুলোর মধ্যে ঈশ্বর কোথায়?
[ভারতীয় ষড়দর্শনের উত্তরমীমাংসা বা বেদান্তশাখায় আদিকারণ একটিই--ব্রহ্ম বা ঈশ্বর। সাংখ্যের দ্বৈতবাদে( এবং যোগে) ঈশ্বর হলেন ক্লেশ-দুঃখ-বিকার রহিত এক পুরুষমাত্র। ন্যায়-বৈশেষিকে ঈশ্বর আদিকারণ ন’ন, নিমিত্তকারণ। পূর্বমীমাংসায় সমগ্র ব্রহ্মান্ড কখনই একসঙ্গে সৃষ্ট বা ধ্বংস হয় না। তাই এক আদিকারণের প্রশ্ন ওঠে না।]
কিন্তু কার্টেজিয়ান ফিলজফিতে ঈশ্বর আছেন; কীভাবে?
ওই চিঠিটির দ্বিতীয় প্যারাগ্রাফের শেষে উনি বলছেন যে একমাত্র ঈশ্বরই হলেন পরমজ্ঞানী, সমস্ত বিষয়ের সঠিক জ্ঞাতা। কিন্তু মানুষও কমবেশি সমস্ত মহত্বপূর্ণ ব্যাপারে সঠিক জ্ঞান অর্জন করতে সক্ষম।
সপ্তদশ শতাব্দীর দার্শনিকের মুখে মানুষের জয়গান! তাই তিনি রেনেসাঁর উত্তরসূরী, দর্শনে আধুনিকতার জনক।
প্রথম অধ্যায়ঃ যেসব বিষয়ে সন্দেহ করা যায়
দুটো বইই শুরু হয়েছে একটি আফশোস দিয়েঃ আমরা ছোটবেলা থেকেই প্রতারিত হয়েছি। অনেক মিথ্যাকে সত্যি বলে বিশ্বাস করতে বাধ্য হয়েছি। তাই সত্যের অনুসন্ধান শুরু করতে হবে সবকিছুকে সন্দেহ করে; যা কিছুর যথার্থ নিয়ে এতটুকু সন্দেহ বা অনিশ্চিয়তা রয়েছে এমন সবকিছু। আর সন্দেহযোগ্য সবকিছুকে মিথ্যা বলেই গণ্য করতে হবে। ( প্রিন্সিপলস, I & II)
কেন সবকিছুকে সন্দেহ করতে হবে?
কারণ, বাস্তব অভিজ্ঞতা আমাদের শিখিয়েছে যে ইন্দ্রিয়লব্ধ জ্ঞান অনেকবারই ধোঁকা দেয়। কোন জিনিস যদি একবারও ধোঁকা দেয় তাকে কি আদৌ নির্ভরযোগ্য বলা যায়? যেমন, স্বপ্নে আমরা অনেক জিনিস দেখি, কল্পনা করি যার বাস্তবে কোন অস্তিত্ব নেই। আবার যদি স্বপ্নকে সন্দেহের চোখে দেখি তারপর স্বপ্ন ও বাস্তবের মধ্যে তফাৎ কী ভাবে করব? এমন কোন মাপদন্ড এখনও নেই । (ibid, IV)
‘নিশার স্বপনসুখে সুখী যে কী সুখ তার, জাগে সে কাঁদিতে’
“আমি মানুষ; তাই ঘুমিয়ে পড়লে স্বপ্ন দেখি। স্বপ্নে কতবার দেখেছি যে পোষাক পরে আগুনের পাশে বসে তাপ পোয়াচ্ছি। বাস্তবে আমি তখন বিছানায় সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে শুয়ে আছি। ঘুমের মধ্যেও অনুরূপ ভ্রমপ্রত্যক্ষের দ্বারা আমি অনেকবার বিভ্রান্ত হয়েছি, এবং খুব স্পষ্ট করে বুঝতে পারছি যে এমন কোন চুড়ান্ত লক্ষণ নেই যার সাহায্যে আমরা জাগ্রত এবং নিদ্রিতাবস্থার মধ্যে প্রভেদ করতে পারি।
“কোন ক্রীতদাস যখন ঘুমের মধ্যে কল্পিত স্বাধীনতা উপভোগ করে, সে জেগে উঠতে ভয় পায় এই সন্দেহের বশে যে তার এই স্বাধীনতা কেবল একটি স্বপ্ন এবং সে এই ভ্রমের ছলনাকে প্রলম্বিত করার চেষ্টা করে। আমরাও একইভাবে প্রচলিত ভ্রমগুলোকে এড়িয়ে যাই কারণ জেগে উঠলে দিনের আলোর জায়গায় মুখোমুখি হতে হবে ভ্রান্তিজনিত সমস্যার ঘোর অন্ধকারের মধ্যে”। (মেডিটেশন্স, প্রথম অনুধ্যান)।
[ এখানে দেকার্ত বেকনের ভাবশিষ্যদের প্রয়োগবাদী দৃষ্টিভঙ্গি – লক , হিউম ইত্যাদি—থেকে সরে গিয়ে বুদ্ধিবাদী অবস্থান নিলেন। তুলনীয়, বেদান্তদর্শনে সুষুপ্তি ও জাগ্রত অবস্থা—এই বিষয়ে অনেকটা দেকার্তের কাছাকাছি। ]
তাই পদার্থবিদ্যা, জ্যোতির্বিদ্যা বা চিকিৎসাবিদ্যার মত বিজ্ঞান, যা বিভিন্ন যৌগিক বিষয়ের বিবেচনার উপর নির্ভরশীল, তা সংশয়জনক এবং অনিশ্চিত। কিন্তু পাটিগণিত, জ্যামিতি ইত্যাদি সরল অথচ সুনিশ্চিত এবং নিঃসন্দিগ্ধ। কারণ, আমার ঘুমন্ত বা জাগ্রত দুই অবস্থাতেই দুই আর দুইয়ে চার হবে, পাঁচ নয়। বর্গক্ষেত্রের মোট বাহুসংখ্যাও পাঁচ না হয়ে চার হবে। (মেডিটেশন্স, প্রথম অনুধ্যান)।
তবে গণিতশাস্ত্রের স্বতঃস্পষ্ট উপপাদ্যগুলোকে কেন সন্দেহের তালিকায় রাখব?
দুটো কারণে। এক, অনেকবার মানুষ স্বতঃস্পষ্ট বলে ভ্রমাত্মক উপপাদ্যকে সঠিক বলে মেনে নিয়ে গর্তে পড়েছে। আর দ্বিতীয় কারণটিই মুখ্য, তা হল সর্বশক্তিমান ঈশ্বর আমাদের সৃষ্টিকর্তা বটেন, কিন্তু মাঝে মাঝে আমরা যে ভুল করি, ধোঁকা খাই—এ ও কি তাঁর ইচ্ছা? আমরা জানি না। তবে কি আমাদের স্রষ্টা ঈশ্বর না হয়ে অন্য কোন তত্ত্ব, যার ক্ষমতা সীমিত? দুটো পরিস্থিতিতেই আমাদের ভুলের সম্ভাবনা খারিজ হয়ে যাচ্ছে না। তাই বিনা প্রশ্নে মেনে নেয়ার চাইতে সন্দেহ করে বাজিয়ে দেখাই সঠিক। (ibid, V)
অবশ্য, এমন কেউ কেউ থাকতে পারেন সব বিষয়ের অনিশ্চয়তায় বিশ্বাস করার চেয়ে সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের অস্তিত্ব অস্বীকার করাকেই শ্রেয় মনে করেন। কিন্তু এখন তাঁদের বিরোধিতা না করে তাঁদের পক্ষেই ধরে নেয়া যাক যে এখানে ঈশ্বর সম্পর্কে যা যা বলা হয়েছে তা একটি উপকথা।
(মেডিটেশন্স, প্রথম অনুধ্যান)।
আমরা তো স্বাধীন ইচ্ছার (ফ্রি উইল) অধিকারী। তাহলে সন্দেহজনক তথ্যকে স্বীকৃতি না দিয়ে ভুলের সম্ভাবনা এড়ানো যেতেই পারে।
অবশ্যই। আমাদের স্রষ্টা যিনিই হোন না কেন—যত শক্তিশালী বা জাদুকর—আমাদের মধ্যে এক স্বাধীন সত্তার অস্তিত্ব ঠিক টের পাওয়া যায়, যার ফলে আমরা বিভিন্ন পরিস্থিতিতে ধোঁকা খাওয়ার সম্ভাবনা থেকে সতর্ক থাকতে পারি। (প্রিন্সিপলস, VI)
এইভাবে দার্শনিক অনুসন্ধান করতে করতে আমরা যে নিঃসন্দিগ্ধ প্রথম জ্ঞানের সাক্ষাৎ পাই তা হল—আমরা সন্দেহ করার সময় আর যাই হোক নিজেদের অস্তিত্বকে সন্দেহ করতে পারি না।
হ্যাঁ, আমরা নেতি-নেতি করে সবকিছুকেই, যার অস্তিত্ব নিয়ে এতটুকু সন্দেহ রয়েছে, খারিজ করে দিতে পারি। বলতে পারি—ঈশ্বর, আকাশ, দেহ, এমনকি আমাদের হাত-পা শরীর সব মিথ্যে। কিন্তু একইভাবে আমরা আমাদের অস্তিত্বকে কীভাবে নস্যাৎ করে দিতে পারি? একজন যে সময়ে কোন কিছুকে সন্দেহ করছে, সে সেই সময়ে অস্তিত্বহীন কি করে হতে পারে? অতএব, যে শৃংখলাবদ্ধ ভাবে দার্শনিক চিন্তাভাবনা করে তার প্রথম যে নিশ্চিত জ্ঞানের উপলব্ধি হবে তা হল—কজিতো এরগো সুম বা আমি ভাবছি, তাই আমি আছি। (ibid, VII)
ফলে “ যে কেউ পারেন, আমাকে প্রতারিত করুন, কিন্তু তিনি আমাকে কখনও ‘অ-সত্তায়’ পর্যবসিত করতে পারবেন না যতক্ষণ পর্যন্ত আমি ভাবব যে আমি এক ধরণের সত্তা। তিনি কখনও এই বক্তব্যকে (স্টেটমেন্ট)—আমার কখনও অস্তিত্ব ছিল না-- সত্যি করে দিতে পারবেন না, কারণ এখন এটি সত্য যে আমি আছি।
“অথবা তিনি এও ঘটাতে পারবেন না যে দুই আর তিনের যোগফল পাঁচ”। (মেডিটেশন্স, তৃতীয় অনুধ্যান)।
সোজা কথায়, কোন ধূর্ত শয়তান যদি আমাকে ঠকিয়ে ভুল পথে নিয়ে যায় তাতেও আমার অস্তিত্ব ও খারিজ করতে পারেনা। আমি না থাকলে ও কাকে ঠকাচ্ছে বা ভুল পথে নিয়ে যাচ্ছে?
দেকার্তের ঈশ্বরকে কেন দরকারঃ
দেকার্তের মতে বাহ্যবস্তুর সঙ্গে ইন্দ্রিয়সম্পর্ক হলেও আসলে তাদের স্বরূপ আমাদের কাছে বুদ্ধির সাহায্যে ধরা দেয়, শুধু চিন্তাশক্তির মাধ্যমেই আমরা তাদের জানি। কিন্তু তবু ভুল হতে পারে, কারণ আমাদের সীমিত ধীশক্তি ও অপূর্ণতা। তখন সংশয় উপস্থিত হয়। তার দূর করার উপায় হল নিজের চেতনা সম্পর্কে নিঃসন্দেহ হওয়া । আর জন্ম থেকে জানি যে আমাদের চেতনার হেতু হলেন ঈশ্বর। কিন্তু এখনও পর্য্যন্ত আদৌ সুনিশ্চিত ভাবে জানি না যে তিনি আছেন কি না!
কাজেই সংশয়ের সম্পূর্ণ নিরসন করতে হলে আগে দেখতে হবে তিনি আদৌ আছেন কি না আর যদি থাকেন তাহলে তিনি প্রতারক হতে পারেন কি না! ( অর্থাৎ তিনি ইচ্ছে করে আমার চেতনাকে আবিল করে আমাকে ভুল জ্ঞানের পথে চালিত করতে পারেন কি না ?) কারণ এই দুটি বিষয়ের জ্ঞান ব্যতীত কোন বিষয় সম্বন্ধে সুনিশ্চিত হওয়া যাবে না । (মেডিটেশন, তৃতীয় অনুধ্যান)।
অনুসন্ধান করে দেকার্ত পেলেন যে উনি নিজে একটি দ্রব্য বা সত্তা যার চেতনা আছে। আর বাহ্যজগতের অস্তিত্ব সম্বন্ধে উনি সম্যক ধারণা পেয়ে যান ওই চেতনা থেকেই। তাহলে ওঁর মধ্যে সঞ্জাত যে এক অসীম, নিত্য, অপরিবর্তনশীল, স্বনির্ভর, সর্বজ্ঞ ও সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের ধারণা রয়েছে তার মূলে অবশ্যই এক ঈশ্বর নামক অস্তিত্ব রয়েছে।
ওঁর কথায়ঃ
‘আমি নিজে দ্রব্য (সাবস্ট্যান্স) বলে আমার মধ্যে দ্রব্যসংক্রান্ত ধারণা রয়েছে, তাই আমার মধ্যে যে অসীম দ্রব্যের ধারণা তা নিশ্চয় আমার চেতনায় কোন অসীম দ্রব্যের দ্বারা সঞ্চারিত’।
‘ যদি আমি অন্য সবকিছুর উপর নির্ভরশীল না হতাম, যদি আমিই আমার সত্তার স্রষ্টা হতাম, তাহলে আমি অবশ্যই কোন কিছুতে সন্দেহ করতাম না এবং শেষতঃ আমার মধ্যে পূর্ণতার অভাব থাকত না। -- এভাবে আমিই ঈশ্বর হতাম’। (মেডিটেশন, তৃতীয় অনুধ্যান)।
‘আমি নিজেকে অপূর্ণ খন্ডিত পরনির্ভরশীল সত্তা হিসেবে জানি আর আমি যার উপর নির্ভরশীল তিনি সেই সব মহৎ গুণের অধিকারী যেগুলো লাভ করার জন্যে আমি উদগ্রীব। তাঁর ধারণা আমার মধ্যে রয়েছে বাস্তবে প্রকট ভাবে এবং অসীমতার ব্যঞ্জনা নিয়ে। আর তাই তিনি ঈশ্বর’। (মেডিটেশন, তৃতীয় অনুধ্যান)।
[ঈশ্বরের অস্তিত্বের সপক্ষে যে দার্শনিক প্রমাণগুলো দেয়া হয় তাদের মোটামুটি তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়ঃ ১) সৃষ্টির আদিকারণজনিত প্রমাণ(কসমোলজিক্যাল প্রুফ), ২) সৃষ্টির উদ্দেশ্যজনিত প্রমাণ (টেলিওলজিক্যাল প্রুফ) এবং ৩) ধারণাগত প্রমাণ (অন্টোলজিক্যাল প্রুফ)। এই অধ্যায়ে আমরা উক্ত তিনটি প্রমাণকে ব্যাখ্যা করে দেখব যে দেকার্তের দেয়া ঈশ্বরের অস্তিত্ব বিষয়ক প্রমাণের এর কোনটির সঙ্গে সাদৃশ্য আছে কি না?]
১) সৃষ্টির আদিকারণজনিত প্রমাণ(কসমোলজিক্যাল প্রুফ)
জীবজগতের যেমন জন্ম-মৃত্যু, তেমনি বস্তুজগত বা ব্রহ্মান্ডেরও আছে সৃষ্টি ও লয়। জীবের যেমন কেউ জন্মদাতা, তেমনি ব্রহ্মান্ডেরও নিশ্চয় কোন সৃষ্টিকর্তা আছে । বস্তুতঃ কোন জিনিসই স্বয়ম্ভু নয়। সব কার্য এবং অস্তিত্বের কোন না কোন কারণ আছে। ঈশ্বর সেই আদি কারণ। সসীম জগৎও এক সময় সৃষ্ট হয়েছে। তার সৃষ্টিকর্তাকে অসীম এবং এমন এক সত্তা হতে হবে যে নিজেই সম্পূর্ণ; যাকে নিজের অস্তিত্বের জন্যে কারও উপর নির্ভর করতে হয় না। এভাবে ঈশ্বর হলেন আদি কারণ। এই যুক্তির প্রকারভেদ আমরা প্লেটো, আরিস্ততল ও লাইবনিজে পাই।
এবার দেকার্তের কন্ঠস্বর শোনা যাকঃ
আমরা নিজেরা আমাদের অস্তিত্বের কারণ হতে পারি না। আমাদের আদি কারণ হলেন ঈশ্বর এবং স্পষ্টতঃই তিনি আছেন। ‘নিজেই নিজের অস্তিত্বের কারণ হওয়া’ (causa sui) হল একমাত্র ঈশ্বরের বৈশিষ্ট্য, আর কারও নয়।
আমরা নিখুঁত নই, সম্পূর্ণ নই। কাজেই আমাদের সৃষ্টি হয়েছে কোন পূর্ণ এবং নিখুঁত অস্তিত্বের থেকে, তিনি ঈশ্বর ছাড়া অন্য কিছু হতে পারেন না।
আমাদের অস্তিত্বের আয়ুষ্কাল দেখলেই ঈশ্বরের অস্তিত্ব বোঝা যায়। যেমন, আমরা একের পর এক মুহূর্তগুলি জুড়ে আছি । কী করে? নিশ্চয়ই যিনি আমাদের স্রষ্টা তিনি প্রতিনিয়ত আমাদের অস্তিত্বকে সৃষ্ট বা রক্ষা করে চলেছেন। এইরকম এক স্রষ্টার অস্তিত্ব ছাড়া আমাদের জীবনের আয়ুষ্কালের ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না।
(প্রিন্সিপলস, XVII, XX, XI)
ভারতীয় ষড়দর্শনে অদ্বৈত বেদান্ত সৃষ্টিতত্ত্বে বিশ্বাসী নয়। ‘ব্রহ্ম সত্য, জগত মিথ্যা’ বলায় সৃষ্টির প্রশ্নই ওঠে না। এই মতে জগত এক ভ্রান্তি, মায়া--অবিদ্যাজনিত মালিন্যে রজ্জুতে সর্পভ্রমের মত ভুল দেখি।
কিন্তু বিশিষ্টাদ্বৈতবাদে জগত হল ব্রহ্মের অভিক্ষেপ (প্রজেকশন) বা বিশেষ প্রকাশ। পরমেশ্বর কল্পকালে বেদমন্ত্র উচ্চারণ করে জগত সৃষ্টি করেন। তাই ব্রহ্ম আদিকারণ।
দ্বৈতবাদী সাংখ্য ও যোগ মতে পুরুষ(চেতন বা ঈশ্বর) নিষ্ক্রিয়; প্রকৃতি সক্রিয়। সত্ত্ব-রজ-তম এই তিনগুণের অধিকারী প্রকৃতিই সৃষ্টিকর্ত্রী, কোন ঈশ্বর নয়।
নিরীশ্বরবাদী পূর্ব-মীমাংসার মতে সমগ্র ব্রহ্মান্ড কখনও একসঙ্গে ধ্বংস বা সৃষ্ট হয় না। সবসময় এর কোন অংশ ক্ষয় হচ্ছে, কোন অংশ সৃষ্ট হচ্ছে। কাজেই সৃষ্টি বা আদিকারণ হিসেবে সৃষ্টিকর্তার প্রশ্ন অবান্তর।
ন্যায়-বৈশেষিক মতে বিশ্ব-ব্রহ্মান্ড হল একটি যৌগিক কার্য (এফেক্ট)- মাটির কলসির মত। তাই কলসির নির্মাণকর্তা যেমন কুমোর, তেমনি বিশ্বজগতেরও কোন চেতন কারণ বা স্রষ্টা চাই, সেই কারণ হলেন ঈশ্বর। তবে তিনি আদিকারণ (মেটেরিয়াল কজ) ন’ন; বরং নিমিত্তকারণ (এফিসিয়েন্ট কজ)। তিনি আকাশ ও অণুর স্রষ্টা ন’ন; তারা আগে থেকেই ছিল—যেমন কুমোর মাটি ও চাকের নির্মাতা নয়।
বেদবিরোধী দর্শনের মধ্যে নিরীশ্বরবাদী জৈনদর্শন হল ঠিক মীমাংসকদের মত; ওরা বিশ্বের সৃষ্টি বা আদিকারণ অথবা নিমিত্তকারণ রূপে ঈশ্বর—দুই তত্ত্বকেই খারিজ করে।
বৌদ্ধদর্শন হল ক্ষণিকবাদী এবং অনাত্মবাদী। জগতের অস্তিত্ব ক্ষণিক, এবং কোন আদিকারণরূপী ঈশ্বর এর স্রষ্টা নয়।
২) সৃষ্টির উদ্দেশ্যজনিত প্রমাণ (টেলিওলজিক্যাল প্রুফ)
এই বিশ্বে কোন কিছুই উদ্দেশ্যবিহীন নয়, আকস্মিক নয়। এখানে বিনা উদ্দেশ্যে কিছু ঘটে না। আর উদ্দেশ্য মানেই কারও উদ্দেশ্য, অর্থাৎ, সব কার্যের পেছনে কোন উদ্দেশ্যদাতা আছে যার ইচ্ছেয় এবং প্রচেষ্টায় কার্যটি সাধিত হয়। তাহলে এই মহাজাগতিক বিশ্বের পেছনেও এক অতিজাগতিক সত্তা রয়েছে যার উদ্দেশ্য সাধন করার প্রয়াসেই এই বিশ্ব অস্তিত্ববান এবং বিলয়প্রাপ্ত হচ্ছে। তিনিই ঈশ্বর।
এই যুক্তিপরম্পরায় মানুষের স্বাধীন ইচ্ছে (ফ্রি উইল) থাকতে পারে না। সৃষ্টিকর্তা পরমেশ্বরের ইচ্ছে ছাড়া গাছের পাতাটিও নড়ে না। আর বেদান্তের লীলাবাদ অনুযায়ী পরমেশ্বেরের ইচ্ছা বা উদ্দেশ্য দুর্জ্ঞেয়। আমাদের মত সাধারণ জীবের পক্ষে বোঝা দুষ্কর। তাই সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয় হল ঈশ্বরের লীলা।
দেকার্ত টেলিওলজি বা সৃষ্টির উদ্দেশ্যকে ঈশ্বরের অস্তিত্বের প্রমাণ হিসেবে বিশেষ গুরুত্ব দেন নি বলেই মনে হয়।
উনি, ঈশ্বরের ক্ষমতা অসীম এবং আমাদের সীমিত বোধ-বুদ্ধিতে তাঁকে বোঝা অসম্ভব এসব (প্রিন্সিপলস, পার্ট III, II ও III) বলে্ও , মানুষের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি( ফ্রি উইল)কে ওঁর অধিবিদ্যায় বিশিষ্ট স্থান দিয়েছেন।
৩) ধারণাগত প্রমাণ (অন্টোলজিক্যাল প্রুফ)।
মানুষের মনে আদিকাল থেকে পরমকারুণিক সর্বশক্তিমান এক ঈশ্বরের ধারণা রয়েছে। এই ধারণা বাইরে থেকে না এসে মানবচেতনায় ওতপ্রোত। যার অস্তিত্ব নেই, তা চেতনায় আসে কী করে? কাজেই ঈশ্বরের ধারণা রয়েছে মানে ঈশ্বর আছে। আবার অপূর্ণ মানব সম্পূর্ণ এক সত্তার কথা ভাবে কী করে? আর মানবসত্তার বাইরে যদি কোন অস্তিত্ববান পূর্ণসত্তা না থাকে তাহলে মানুষ নিজের অপূর্ণতা টের পায় কী করে? অর্থাৎ সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের অস্তিত্ব এক আবশ্যিক(নেসাসারি) লজিক্যাল ক্যাটেগরি। এই হল দেকার্তের কথিত অন্টোলজিক্যাল প্রুফ।
ইউরোপীয় খ্রীস্টান পরম্পরায় অন্টোলজিক্যাল যুক্তি দিয়ে ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণ করার প্রথম নিদর্শন পাওয়া যায় ক্যান্টারবেরির যাজক আনসেল্ম এর প্রসলোগিয়ন (১০৭৮) বইটিতে। ওঁর মতে ঈশ্বর হলেন এমন একটি ধারণা যার চেয়ে বৃহত্তম কিছু ভাবা যায় না । উপনিষদের “মহতো মহীয়ান” আর কি! ওঁর হিসেবে মানবমনে, এমনকি অবিশ্বাসী নাস্তিকদের মনেও এই সত্তার অধিষ্ঠান। ওঁর যুক্তি ছিল যে যদি ঈশ্বর সম্ভাব্য বৃহত্তম সত্তা হিসেবে মানুষের মনে বা ধারণায় থাকেন, তাহলে তিনি নিশ্চিতভাবে বাস্তব জগতেও আছেন । কারণ বাস্তবে কোন কিছুর অস্তিত্ব না থাকলে তার ধারণা (কন্সেপ্ট) মানুষের মনে আসবে কী করে!
এবার দেকার্ত কী বলছেন দেখুনঃ মানবমন যখন নিজের অস্তিত্ব সম্বন্ধে নিঃসব্দেহ হয়ে বস্তুজগতের বা মনোজগতের অন্য ক্যাটেগরিগুলোর অস্তিত্ব নিয়ে নিঃসন্দেহ হতে চায় তখন নিজের মনের মধ্যেই কিছু ধারণাকে চিনতে পারে যার অস্তিত্ব নিয়ে আপাতঃ কোন প্রশ্ন উঠতে পারে না, যেমন দুটো সমান জিনিসের সঙ্গে সমান জিনিস যোগ করলে দুটো যোগফল সমান হবে। অথবা, ত্রিভূজের তিনটি কোণের যোগফল দুই সমকোণ হবে, কিন্তু যতক্ষণ এই স্বতঃসিদ্ধ গুলোর রচয়িতার খোঁজ না পাচ্ছি ততক্ষণ দ্বিধা থেকেই যায় – প্রতারিত হচ্ছি নয়া তো!
আবার ঈশ্বরের যতগুলি গুণ কল্পনা করা হয়েছে তার মধ্যে প্রধান হচ্ছে সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান এবং নিখুঁত হওয়া। তাই তিনি আছেন আবশ্যক তত্ত্ব বা ধারণা (কন্সেপ্ট) হিসেবে। ঠিক যেভাবে ত্রিভুজের সংজ্ঞা বা ধারণার মধ্যেই ‘তিনটি কোণের যোগফল দুই সমকোণ’ হওয়া নিহিত থাকে, তেমনি ঈশ্বরের বর্ণিত সংজ্ঞার মধ্যেই তাঁর অস্তিত্বের আবশ্যকতা এবং বাধ্যবাধকতা নিহিত রয়েছে। তাই তিনি আছেন, নিঃসংশয়ে। (প্রিন্সিপলস, XIV, XV, XVI)
যে লোকটি একটি উন্নতমানের যন্ত্র আবিষ্কার করেছে তাকে আমরা শুধোই যে কী করে এটা সম্ভব হল? ও কি আগে কোন এইধরণের মেশিন দেখেছে? কারও কাছে ভাল করে এর নির্মাণ প্রকৌশল শিখেছে? নাকি নিজের প্রতিভার জোরে করে ফেলেছে?
অবশ্যই একটি উন্নত মেশিনের অস্তিত্ব আগে থেকে ছিল, বস্তুগত ( অব্জেক্টিভলি) না হলেও ধারণার ও ভাবনার স্তরে নিশ্চিতরূপে।
ইচ্ছা হয়ে ছিলি মনের মাঝারে!
একই ভাবে সবচেয়ে নিখুঁত সত্তার ধারণা হিসেবে তিনি আছেন।
(প্রিন্সিপলস, XVII XVIII, XIX)
‘আমি আছি –আর আমার মধ্যে চূড়ান্ত পূর্ণতা বিশিষ্ট সত্তার অর্থাৎ ঈশ্বরের ধারণা আছে—শুধু এই তথ্য থেকে আমরা অনিবার্য ভাবে সিদ্ধান্ত করতে পারি যে, ঈশ্বরের অস্তিত্ব সংক্রান্ত প্রমাণ সর্বোচ্চ তথ্যের উপর প্রতিষ্ঠিত’। (মেডিটেশন, তৃতীয় অনুধ্যান)।
এর পরে বিখ্যাত জার্মান দার্শনিক লাইবনিজ দেকার্তের ‘নিখুঁত পরমসত্তা’ রূপে ঈশ্বরের অন্টোলজিক্যাল প্রমাণের পক্ষে আরও যুক্তিজাল রচনা করেছেন। গত শতাব্দীর ষাটের দশকে দার্শনিক গোদেল , নরম্যান ম্যালকম ও আরও অনেকে ঈশ্বরের অন্টোলজিক্যাল প্রমাণ নিয়ে একাদশ শতাব্দীর যাজক আনসেলম ও সপ্তদশ শতাব্দীর দেকার্তের অন্টোলজিক্যাল প্রুফ নিয়ে নতুন নতুন প্রমাণ ও ব্যাখ্যার মাধ্যমে বিতর্কটি জিইয়ে রেখেছেন।
দেকার্তের ঈশ্বরের বর্ণনাঃ
ঈশ্বর সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান, নিমিত্তকারণ; তাঁকে অপূর্ণ খন্ডিত মানসে ধারণা করা কঠিন। তবে তিনি বস্তুপুঞ্জ ন’ন; তিনি মানসে অধিষ্ঠিত। আমাদের মত ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে দেখেন না, শোনেন না । তিনি আমাদের কল্যাণকামী, তাই আমাদের শুভ-অশুভ ও সত্য-মিথ্যা নির্ণয়ের মত বুদ্ধি দিয়েছেন। তিনি আমাদের পাপ, অন্যায় বা ভ্রমের উৎস ন’ন।
(প্রিন্সিপলস, XXII, XXIII, XXIV, XXV, XXIX)
স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি ও ঈশ্বরের নির্দেশঃ
দেকার্ত বলছেনঃ
মানুষের পূর্ণতার প্রধান বৈশিষ্ট হল তার নিজের ইচ্ছে অনুযায়ী স্বাধীন ভাবে কাজ করার ক্ষমতা। এটাই তাকে পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রশংসা বা নিন্দার পাত্র করে তোলে। মানুষ সত্যের সন্ধানে গিয়ে যে সাফল্য পায় তাও তার স্বাধীন ইচ্ছে ও প্রয়াসের ফলে।
(প্রিন্সিপলস, XVII)
আমাদের ইচ্ছে যে স্বাধীন ও মুক্ত তা স্বপ্রকাশ। (প্রিন্সিপলস, XVIII)
কিন্তু এদিকে কার্টেজিয়ান মডেল তো ডিটারমিনিস্টিক, সবকিছুই যন্ত্রের মত পূর্বনির্ধারিত, পূর্বনিয়ন্ত্রিত। ঈশ্বরের মহিমা প্রকাশের উচ্ছাসে বলে ফেলেছেন – সবই সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের ইচ্ছা। নাস্তিকদের সমালোচনাকে উড়িয়ে দিয়েছেন ব্যঙ্গচ্ছলেঃ ওরা নিজেদের ভাবে কি! এতই বুদ্ধিমান যে ঈশ্বরের কী করা উচিত , কী উচিত নয়- তাও বাতলে দেবে!
তাহলে মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা ও ঈশ্বরের নিয়ন্ত্রণ—এই দুই বিপরীত মেরুকে মেলাবো কী করে?
প্রখর যুক্তিবাদী দেকার্তের চোখে এই স্ববিরোধিতা তৎক্ষণাৎ ধরা পড়েছে। (প্রিন্সিপলস, XL)
প্রশ্ন তুলেছেনঃ কী করে ঘটাবেন দৈব নির্দেশ ও স্বাধীন ইচ্ছার মেলবন্ধন? শেষে দাঁড় করালেন এক জোড়াতালি সমাধানঃ
এই অস্বস্তি থেকে পার পেতে হলে আমাদের মনে রাখতে হবে যে আমরা ঈশ্বরের দেয়া বুদ্ধিবৃত্তির থেকে জানি যে উনি অনাদি কাল থেকে অসীম শক্তির বলে সব কিছু নির্ধারিত (প্রি-অরডেইন্ড) করে রেখেছেন। কিন্তু আমাদের সসীম মন এটা বুঝতে অপারগ যে কীভাবে কেন এবং কতটুকু স্বাধীন ইচ্ছা উনি মানবমনকে দিয়েছেন। তাই যেসব ব্যাপারে আমরা পুরোপুরি সচেত এবং যা আমাদের কাছে স্পষ্ট তার সত্যতা নিয়ে সংশয়ের কোন কথা নেই । তবে কিছু ব্যাপার যা স্পষ্ট নয় তা আমাদের বোধবুদ্ধির বাইরে।
(প্রিন্সিপলস, XLI)
এই জোড়াতালি নিয়ে নিজেও সন্তুষ্ট ন’ন। তাই প্রশ্ন তোলেনঃ আমরা ইচ্ছে করে ভুল করি না ; তবু আমাদের ওই স্বাধীন ইচ্ছের প্রয়োগেই ভুল হয়ে যায়?
ঠিক কথা, আমরা কেউ ভুল করতে চাই না , তবু ভুল হয়ে যায়। কারণ আমরা অনেক সময় তাড়াহুড়ো করে যে ব্যাপারে স্পষ্ট ধারণা নেই তাতেও চটপট হ্যাঁ বলে ফেলি। যদি আমরা যা স্পষ্ট করে জানি বা জ্ঞানার্জনের সঠিক পদ্ধতি অনুযায়ী অনুসন্ধান করে যা জেনেছি শুধু সেই ব্যাপারেই ‘হ্যাঁ’ বলা অভ্যেস করি, তা হলে কখনও ভুল হবে না। ।(প্রিন্সিপলস, XLII, XLIII)
ওঁর এই ব্ক্তব্যটি আমাদের বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণ করেঃ
‘ভ্রম কোন পূর্ণ অভাবাত্মক বিষয় নয়, অর্থাৎ এটি শুধুমাত্র ত্রুটি বা কোন পূর্ণতার অভাব নয়, যে পূর্ণতা আমার থাকার কথা নয়। বরং এ হল কোন জ্ঞানের অভাব যা কোনভাবে আমার মধ্যেই থাকবে’। (মেডিটেশন, চতুর্থ অনুধ্যান)।
এরপর দেকার্ত ভ্রান্তির সম্ভাবনার জন্যে চারটি কারণ খুঁজে পেয়েছেন।
প্রথম বা মুখ্য কারণ হল ছোটবেলা থেকে মনের কোটরে জমে থাকা পূর্বাগ্রহ। অল্পবয়সে মন থাকে পুরোপুরি দেহনির্ভর, বা স্পষ্ট করে বললে ইন্দ্রিয়ানুভূতি নির্ভর। তখন সত্য-মিথ্যা যাচাই বা বিশ্লেষণের ক্ষমতা থাকে না । ফলে চোখ যা দেখে কান যা শোনে তাই সত্যি মনে হয়। তাই অল্পবয়সের স্মৃতি অনুযায়ী পৃথিবী স্থির ও চ্যাপ্টা এবং আকাশে মিটমিট করা তারা খুব ছোট—এই ভুল ধারণা বহুদিন মনের ভেতরে গেড়ে বসে থাকে। (LXXI)
দ্বিতীয় কারণ হল সেই পূর্বাগ্রহগুলো ভুলতে না পারা। বয়সের সঙ্গে আমাদের মন ক্রমশঃ দেহের অধীনতা থেকে মুক্ত হয়। ছোটবেলা থেকে গড়ে ওঠা কিছু ধারণা বড় হয়ে ভুল প্রমাণিত হলেও মন থেকে সহজে চলে যায় না। যেমন, ছোটবেলায় জানতাম আকাশের তারাগুলো খুব ছোট, আর বড় হয়ে জানলাম আসলে ওগুলো বিশাল আকারের। কিন্তু মন থেকে ওদের ছোট্ট করে দেখার অভ্যেস সহজে ঝেড়ে ফেলতে পারি না।
(LXXII)
তৃতীয়, যে সব ক্যাটেগরিগুলো আমাদের ইন্দ্রিয়সংবেদনায় ধরা পড়েনি, তাদের অনুসন্ধানে আমরা সহজে ক্লান্ত হয়ে পড়ি আর তাদের সম্বন্ধে আমরা প্রত্যক্ষ অনুভূতি থেকে পাওয়া তথ্যের (ডেটা) বদলে পূর্বানুমান বা পূর্বাগ্রহের উপর নির্ভর করে রায় দিতে অভ্যস্ত হই। (LXXIII)
চতুর্থ, আমরা আমাদের চিন্তাকে এমন সব শব্দ বা পদের মাধ্যমে বিনিময় করি যা সঠিক ভাবে ভাবনাটিকে প্রকাশ করে না। ক্রমশঃ চিন্তার খেই হারিয়ে যায়, লোকেরা আঁকড়ে ধরে সেই নির্দিষ্ট শব্দগুলোকে; ফলে একটি স্পষ্ট ও বিশিষ্ট চিন্তা ও ধারণা বদলে গিয়ে কিছু অস্পষ্ট ও ভ্রমাত্মক চিন্তার রূপ ধরে। (LXXIV)
দেকার্তের জ্ঞানতত্ত্বের সারকথাঃ
“ওরে যায় না কি জানা?”
না; দেকার্ত অজ্ঞেয়বাদী ন’ন। তাঁর মতে সত্যকে জানা যায়, দরকার সঠিক পথে দার্শনিক অনুসন্ধান। কী সেই পথ?
প্রথমে সব পূর্বাগ্রহ থেকে মনকে মুক্ত করতে হবে। অর্থাৎ, আগে যা কিছু সত্যি বলে মেনেছি সব কিছুকে সন্দেহ করতে হবে। কতদিন? বাজিয়ে দেখে সপক্ষে নতুন কোন মজবুত প্রমাণ বা সাক্ষ্য (এভিডেন্স) পাওয়া পর্যন্ত।
পরের পদক্ষেপ হল সমস্ত নিশ্চিত, সুস্পষ্ট ও নিঃসন্দিগ্ধ ধারণাগুলোকে একটি সুশৃংখল ক্রম এবং প্রকল্পে সাজিয়ে নেওয়া।
[তৃতীয় ভাগের প্রথম প্রশ্নের উত্তরে ঝুড়ি থেকে পচা আপেল আর তাজা আপেল আলাদা করার জন্যে আগে সবগুলোকে মাটিতে নামিয়ে একটা একটা করে তাজাগুলো বেছে ঝুড়িতে রাখার সেই দেকার্ত কথিত উপমাটি দেখুন। ]
এবার আমরা বুঝতে পারব যে আমরা আছি ; কতক্ষণ? না যতক্ষণ আমরা চিন্তা করতে পারছি। কারণ চিন্তা করাই মন বা আত্মার ধর্ম। এভাবে আমাদের চেতনায় আসবে যে এক ঈশ্বর আছেন যাঁর উপর আমরা নির্ভর করি এবং যাঁর গুণগুলোর সাহায্যে আমরা অন্য বস্তুদের সারও বুঝতে পারব, যেহেতু ঈশ্বর ওদের অস্তিত্বের কারণ। এরপরে আমরা খেয়াল করব যে আমাদের মনে এমন সব ধারণা রয়েছে যা মূলতঃ সত্যি। যেমন, ‘শূন্য থেকে কোন কিছুর উৎপত্তি হয় না’।
ঈশ্বরের বচন বা নির্দেশ বলে যা জানা যাচ্ছে তাকে মেনে নিতে হবে। যদি সেসব তথ্য, সাক্ষ্য ও যুক্তির আলোকে খারিজ করার যোগ্য বলে মনে হয়, তবুও।
কিন্তু ( এই ‘কিন্তু’টি বেশ লক্ষ্যণীয়) যেসব ব্যাপারে কোন দৈবীনির্দেশ নেই, সেসব বিষয়ে দার্শনিক অবশ্যই নিজের পদ্ধতি দিয়ে সত্যতা পরীক্ষা করে নেবেন। ছোটবেলা থেকে শুনে আসছেন বা মেনে নিয়েছেন বলে আজ মেনে নেবেন না ।
(LXXV) ও (LXXVI)
বস্তুজগত, মন ও ঈশ্বরঃ
কেমন করে নিশ্চিত হব যে জড়বস্তু আছে না নেই? (প্রিন্সিপলস, পার্ট II, I)
ছোটবেলা থেকে এর অস্তিত্ব বিশ্বাস করে এসেছি। কিন্তু এখন সবকিছু যাচাই করে দেখতে হবে, এমনকি এই বিশ্বাসের ভিত্তি কতদূর সত্যি, তাও।
প্রথমতঃ, এনিয়ে কোন ধন্দ নেই যে আমাদের সমস্ত সংবেদনা (পারসেপশন) আসে মনের বাইরে কোন স্বতন্ত্র অস্তিত্ব থেকে। আমাদের মনের সে শক্তি নেই যে ইচ্ছেমত এটা বা ওটাকে অনুভব করব, কারণ প্রত্যেকটি সংবেদনা নির্ভর করে সেই দ্রব্য বা বস্তুটির(অবজেক্ট) উপর যা আমাদের ইন্দ্রিয়কে প্রভাবিত করে। এখন সেই স্বতন্ত্র দ্রব্যটি ঈশ্বর না অন্য কিছু তা দেখতে হবে। কিন্তু এইসব ইন্দ্রিয়ানুভূতিতে আমরা পাই বিভিন্ন দ্রব্যের আভাস যার দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও বিস্তার আছে এবং যার সংস্পর্শে এসে আমাদের নানারকম রঙ, গন্ধ বা ব্যথার অনুভূতি হয়। এখন ঈশ্বর যদি নিজে এসে আমাদের মনে এইসব বিস্তৃত বস্তুর সংবেদনা পুরে দেন অথবা কোন স্থাবর, অপরিবর্তনশীল দ্রব্যের সাহায্যে আমাদের মনে এইসব ঘটিয়ে দেন, তাহলে তাঁকে নিঃসন্দেহে প্রতারক বলতে হবে।
কিন্তু আমরা ভাল করেই জানি—এক, উনি প্রতারক হতে পারেন না । দুই, আমরা স্পষ্ট টের পাই যে এই দ্রব্যগুলি আমাদের মন এবং ঈশ্বর থেকে স্বতন্ত্র। আর অনুভূতিগুলি যতক্ষণ ওদের নৈকট্যে থাকি ততক্ষণই থাকে। ফলে আমরা নিঃসন্দেহে এই সিদ্ধান্তে আসতে পারি যে আলাদা করে একটি দ্রব্য বা বস্তু আছে যার দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও বিস্তার আমরা ঠিকঠাক বুঝতে পারি। আর এই বিস্তৃত পরিবর্তনশীল দ্রব্য হল দেহ অথবা জড়জগত (ম্যাটার)।
মানবশরীর ও মনের ঘনিষ্ঠ সংযোগ কী করে বোঝা যায়? (প্রিন্সিপলস, পার্ট II, II)
শরীরে চোট লাগলে ব্যথার অনুভূতি হয়। এই অনুভূতি আলাদা করে মন থেকে আসে না। নইলে মন আগে থেকেই জানতে পারত; কিন্তু দেহের সংস্পর্শে এসেই ব্যথার সংবেদনা হয়।
[ ভারতীয় দর্শনের অন্তর্গত জৈন দর্শনের সঙ্গে এখানে অদ্ভূত মিল দেখতে পাচ্ছি। জৈন দর্শন চেতনা ও বস্তুজগতের বহুত্ব স্বীকার করে। এই দর্শনে দেহ ও আত্মার (মনের) সম্পর্ক দ্বান্দ্বিক,--এক অর্থে অভিন্ন আবার অন্য অর্থে ভিন্ন।
অভিন্ন, কারণ শরীরে ব্যথা লাগলে আত্মা (মন) কষ্ট পায়। আবার ভিন্ন, কারণ দেহের মৃত্যু বা নাশ হলেও আত্মা্র (মনের) নাশ হয় না। ]
শরীর স্বরূপতঃ সর্বদা বিভাজ্য ও মন সম্পূর্ণরূপে অবিভাজ্য। (মেডিটেশন্স, ষষ্ঠ অনুধ্যান)।
শরীরের বৈশিষ্ট্য শুধুমাত্র তার বিস্তারে--ওজন, কাঠিন্য বা রঙে নয় , (IV)।
দার্শনিক অর্থে যেখানে শরীর নেই , সেখানে স্থান (স্পেস) বা শূন্য (ভ্যাকুয়াম ) থাকা অসম্ভব। কারণ স্থান হল শরীরের প্রকাশের রূপ (মোড)।
(প্রিন্সিপলস, পার্ট II,XVI)।
অবিভাজ্য পরমাণুর অস্তিত্ব অসম্ভব এবং বিশ্বব্রহ্মান্ডের আকার ও বিস্তার অনির্দিষ্ট, অসীমিত। (প্রিন্সিপলস, পার্ট II,XXI)।
স্বর্গ ও মর্ত্যের উপাদান যে দ্রব্য (ম্যাটার) তা এক বা সমসত্ত্ব। দুইই একই বিশ্বব্রহ্মান্ডের অন্তর্গত। (প্রিন্সিপলস, পার্ট II,XXII)।
দ্রব্য বা বস্তুজগতের বিভিন্ন আকার ও রূপের কারণ হল ওর গতি (মোশন)। আর গতি হল চলমান দ্রব্যের প্রকাশের রূপ (মোড), ও নিজে কোন দ্রব্য (সাবস্ট্যান্স) নয়।
১ দেকার্তের সন্দেহ করার অনুসন্ধান পদ্ধতি নিয়ে আপত্তিঃ
প্রশ্নঃ
এই পদ্ধতিতে আপনি সুনিশ্চিত সত্যের সন্ধান করতে সন্দেহজনক বিষয়কে কাজে লাগিয়েছেন। আমাদের সত্যের আলোতে আনার জন্যে অন্ধকারে ডুব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন!
উত্তরঃ
আমার পদ্ধতিটি বুঝতে এই উদাহরণটি দেখুন। ধরুন আপনার কাছে এক ঝুড়ি আপেল আছে আর তার মধ্যে কিছু পচা, সেগুলোকে আলাদা করে ঝুড়ি থেকে বার নয়া করলে বাকিগুলোও নষ্ট হয়ে যাবে। এই কাজটি করার সবচেয়ে ভাল পন্থা হল সব আপেলগুলোকে ঝুড়ি থেকে ঢেলে দিয়ে একটি একটি করে পরীক্ষা করে ভাল গুলোকে আবার ঝুড়িতে ফেরত করে দেওয়া।
একইভাবে সমস্ত পুরোনো ধারণার মধ্যে কিছু ঠিক, কিছু ভুল। তাই প্রথমে সবগুলোকে বাতিল করে দিয়ে একটা একটা করে পরীক্ষা করে তাদের সত্যতা সম্বন্ধে নিঃসন্দেহ হয়ে আবার বহাল করা ভাল পদ্ধতি।
প্রশ্নঃ সন্দেহের থেকে সম্পূর্ণ রূপে মুক্ত কী থাকে?
উত্তরঃ ডাক্তাররা যখন রোগ নিরাময়ের জন্যে প্রথমে রোগের লক্ষণ গুলো ধরে ধরে রোগ নির্ণয় করেন। তাদের কি এই বলে দোষ দেওয়া হয় যে তারা আসলে মানুষকে অসুস্থ হয়ে পড়া শেখাচ্ছে? আমিও সন্দেহের পক্ষে যুক্তি না দিয়ে সেগুলো খন্ডন করার পক্ষেই যুক্তি দিয়েছি।
২ ইন্দ্রিয়সংক্রান্ত যুক্তি জনিত আপত্তিঃ
প্রশ্নঃ জলে ডোবা সোজা লাঠিটি আলোর প্রতিসরণের (রিফ্র্যাকশন) ফলে বাঁকা দেখায়। এই ভুল কিসের সাহায্যে শোধরানো হয়? বুদ্ধি? আদপেই নয়; হয় স্পর্শেন্দ্রিয়ের সাহায্যে।
উত্তরঃ মানতে পারলাম না। সত্যি কথা, লাঠিটি ছুঁলে পরে বুঝি যে ওটি বাঁকা নয় সোজা। তার মানে এই নয় যে মনের নির্ণায়ক ভূমিকা নেই শুধু স্পর্শেন্দ্রিয়ই নির্ধারক। দেখুন, আগে দর্শনেন্দ্রিয় প্রতারণা করে বাঁকা দেখাল, মন তার বিবেচনা দিয়ে স্পর্শনেন্দ্রিয়ের সাহায্য নেবার নির্দেশ পাঠাল, তবে না! সুতরাং এই উদাহরণে একান্তভাবে মনের বৌদ্ধিক ক্রিয়াই ভ্রান্তি থেকে সত্যে পৌঁছুতে সাহায্য করল।
প্রশ্নঃ যদি ছলনা বা মিথ্যা বলে কিছু থাকে, তাহলে তার জন্যে ইন্দ্রিয় দায়ী নয়, কারণ সে সাধারণতঃ নিষ্ক্রিয় থাকে। অবধারণা বা মনের মধ্যেই এই ভ্রান্তি বা ছলনা বা মিথ্যা বাসা বাঁধে কারণ মন যথেষ্ট সতর্কতার সঙ্গে ক্রিয়াশীল হয় না। উদাহরণস্বরূপ, সে খেয়াল করে না যে একই জিনিস দূরের থেকে একরকম দেখায় আর কাছের থেকে অন্যরকম। মুস্কিল হল যে ইন্দ্রিয়ের অনুভবের মাধ্যমে প্রাপ্ত জ্ঞানের ক্ষেত্রে কোন ভুল আছে কি না সেটা কখনই নিশ্চিত ভাবে বলা যায় না ।
ঊত্তরঃ এখানে আপনি স্পষ্টতঃ শুধু পূর্ব-সংস্কারের উপর নির্ভর করেছেন। যা একবার পর্যবেক্ষণ করেছেন তাকেই ধ্রুবসত্য বলে মেনে নিয়েছেন, বাজিয়ে নিতে চান নি। তাই মাঝেমধ্যেই ভ্রমের চক্করে পড়েছেন।
৩ স্বপ্নসংক্রান্ত যুক্তি নিয়ে আপত্তিঃ
প্রশ্নঃ এটা বাস্তবে হয় কিনা যে ব্যক্তিটি স্বপ্নের মধ্যেই সন্দেহ করছে যে সে জেগে আছে নাকি স্বপ্ন দেখছে? আর সে যদি তার পূর্ব অনুভবের বা স্মৃতির বিষয়ে স্বপ্ন দেখে তো তার মনে হবে সে জেগেই আছে, বা যা দেখছে তা সত্যি? কিন্তু মঁসিয়ে দেকার্ত বলেছেন যে জ্ঞানের ক্ষেত্রে সব সত্যতা ও নিশ্চয়তা একমাত্র ঈশ্বরকে জানার উপরই নির্ভর করে। তাহলে নাস্তিকেরা স্বপ্নের মধ্যে অতীতের অভিজ্ঞতা বিষয়ক কোন স্বপ্ন দেখলেও কোনদিন সত্যিটা জানতে পারবে না; অথবা, মঁসিয়কে মানতে হবে যে ঈশ্বরকে না জেনেও সত্যিটা জানা যায়।
উত্তরঃ স্বপ্নে কোন অতীত ঘটনা দেখলেও তার সঙ্গে কোন বাস্তবসম্পর্ক স্থাপন করা সম্ভব নয়। ঘুমের মধ্যেও মানুষ প্রতারিত হয়। জেগে উঠলেই ভুলটা ধরা পড়ে। কিন্তু একজন নাস্তিক স্বপ্নে অতীতের স্মৃতি দেখে মনে করতে পারে যে সে জেগে আছে, কিন্তু কোন ঘটনা সত্যি কি না জানার একটাই গ্যারান্টি যে সেটি ঈশ্বরের সৃষ্ট বলে নিশ্চিন্ত হওয়া গেল কি না!
৪ ‘কজিটো’ সংক্রান্ত ( আমি চিন্তা করছি , তাই আমি জানি যে আমি আছি) আপত্তিঃ
প্রশ্নঃ যেহেতু ঈশ্বরের পূর্বকথিত অস্তিত্ব সম্বন্ধে আপনি এখনও নিশ্চিত হন নি তাহলে কী করে জানলেন যে আপনি একটি চিন্তনশীল সত্তা? কারণ আপনার নিজের যুক্তি অনুসারে ঐ জ্ঞান ঈশ্বরের অস্তিত্বের স্পষ্ট জ্ঞানের উপর নির্ভরশীল। তাহলে ঈশ্বরের অস্তিত্ব সংক্রান্ত প্রমাণে না পৌঁছানো পর্য্যন্ত কী করে দাবি করছেন যে আপনি নিজেকে স্পষ্ট করে ও নিশ্চিত ভাবে জানেন?
উত্তরঃ আমরা যখন এই বলে সচেতন হই যে আমরা এক চিন্তনশীল সত্তা, তা কোন তার্কিক বা যুক্তিপরম্পরার মাধ্যমে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো নয়, বরং এটি হল জ্ঞানের এক মৌলিক ক্রিয়া। যখন কেউ বলে ‘আমি চিন্তা করছি, অতএব আমি আছি বা আমার অস্তিত্ব আছে’ তখন সে কেবল ‘মানস অবলোকন’ (ইন্টুইশন) নামক এক সরল মানসিক ক্রিয়ার সাহায্যে এই বিষয়টি উপলব্ধি করে। এটি এমন একটি বিষয় যাকে মন স্বাভাবিক ভাবেই জানে। ব্যক্তির অভিজ্ঞতা থেকেই জানতে হয় যে তার অস্তিত্ব না থাকলে সে চিন্তা করতে পারত না । কারণ বিশেষ বিশেষ দৃষ্টান্তের জ্ঞান থেকেই আমাদের মন ‘সামান্য বচন’ (জেনারালাইজেশন) নির্মাণ করে।
প্রশ্নঃ আমি আছি বা আমার অস্তিত্ব আছে—একথা তখনই সত্য প্রত্যেকবার যখন আপনি এটি ঘোষণা করেন বা মনে মনে ভাবেন। কিন্তু এতসব কৌশলের দরকার কি? কারণ, ভাবনা ছাড়াও অন্য যে কোন ক্রিয়া থেকে আপনি এই সিদ্ধান্তে (অর্থাৎ আপনার অস্তিত্ব আছে) পৌঁছুতে পারেন। কারণ আমরা স্বাভাবিক বুদ্ধিতেই জানি যে ক্রিয়া করে তার অস্তিত্বও থাকে।
উত্তরঃ একথা বলে আপনি সত্যের থেকে অনেক দূরে সরে গেলেন। কারণ চিন্তা ছাড়া এমন কোন ক্রিয়াই নেই যার সম্বন্ধে আমি সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিন্ত হতে পারি। এবং মেটাফিজিক্যাল নিশ্চয়তার অর্থে শুধু সেই বিষয়টিই এখানে বিবেচ্য।
ধরুন, আমি হাঁটছি; এটা দিয়ে কি আমি আমার অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারি ? স্বপ্নের মধ্যেও তো হাঁটার ভ্রম হতে পারে । কিন্ত যখন আমার মন চিন্তা করছে যে , আমি হাঁটছি তখন আমি আমার মন সম্বন্ধে নিঃসংশয় হতে পারি, আমার পা বা দেহের সম্বন্ধে নয়।
প্রশ্নঃ এটি সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিত মনে হয় না যে আমাদের অস্তিত্ব আছে তার কারণ আমরা চিন্তা করছি। কারণ আপনি যে চিন্তা করছেন সে ব্যাপারে নিশ্চিত হতে গেলে আপনাকে জানতে হবে যে আপনি ‘কী চিন্তা করছেন’ অথবা ‘চিন্তা করা’ বলতে কী বোঝায় এবং ‘অস্তিত্ব’ বলতে কী বোঝায়। কিন্তু যেহেতু আপনি এখনও পর্য্যন্ত জানেন না এগুলোর অর্থ কী, তাই কী করে জানবেন যে আপনি ‘চিন্তা’ করছেন অথবা আপনার ‘অস্তিত্ব’ আছে?
কারণ তা জানতে হলে এটা জানা প্রয়োজন যে আপনি জানেন আপনি কী বলছেন। আবার পুনরায় ‘আপনি যে জানেন আপনি কী বলছেন’ তাকেও (অর্থাৎ সেই জানাকেও) জানতে হবে। এইভাবে ‘অনবস্থা’ দোষের সৃষ্টি হবে। কাজেই আপনার অস্তিত্ব আছে কিনা অথবা আপনি চিন্তা করছেন কিনা—জানা সম্ভব নয়।
উত্তরঃ সত্যি কথা—‘চিন্তা’ এবং ‘অস্তিত্ব’ বলতে কী বোঝায় তা জানা না থাকলে এই লজিক্যাল স্ট্রাকচারে ভাবলে ‘অনবস্থা’ দোষ হবেই এবং কোন বিষয়ে নিশ্চিত জ্ঞান পাওয়া যাবে না। তবে কোন বিষয়কে স্বজ্ঞান (ইন্টুইশন) এর মাধ্যমে জানাই যথেষ্ট। এই ‘স্বজ্ঞান’ সবসময়েই চিন্তাভাবনার পূর্বগামী ( আ প্রায়রি) এবং এর জন্যে কোন পূর্ব-অভিজ্ঞতার দরকার নেই। আর কোন বিষয়ের চিন্তা বা চিন্তনকর্তা নিয়ে ধারণা ও অনুভব সব চিন্তনকর্তার মধ্যেই সহজাত ভাবে থাকে (ইননেট নলেজ)।
৫ মানবমনের প্রকৃতি সম্বন্ধীয় আপত্তিঃ
প্রশ্নঃ আপনি একটি চিন্তনশীল সত্তা—একথা বলে আপনি আমাদের জানা একটি বিধেয়কে নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন, এটা কোন নতুন কথা নয়। আপনার চিন্তাকে কে সন্দেহ করছে? যা আমাদের বিভ্রান্ত করে, যা আমরা জানতে চাই তা হল চিন্তনশীল সত্তা হিসেবে আপনার স্বরূপ কী? কাজেই আমাদের এটা জানানো যথেষ্ট নয় যে আপনি একটি সত্তা যে চিন্তা করে, অনুভব করে, সন্দেহ করে—ইত্যাদি। বরং দেহের রাসায়নিক পরীক্ষাদির মাধ্যমে যদি জানা যায় যে আপনি কীভাবে অন্য চিন্তনশীল মানুষদের থেকে স্বতন্ত্র, অর্থাৎ আপনার আভ্যন্তরীণ সারবস্তুর স্বরূপ তাহলে আমাদের জন্যে একটা কাজের কাজ হয় ।
উত্তরঃ আপনি স্বীকার করছেন যে মনের মধ্যে যেসব বিষয়কে আমি জানি সেগুলো বাস্তবিক একথা প্রমাণ করে যে আমি স্পষ্টভাবে জানি আমি আছি। অথচ আপনি বলছেন যে তাদের দ্বারা আমার স্বরূপ কী তা প্রমাণিত হয় না ! আপনি ব্যাপারটি থেকে আর কী অতিরিক্ত পাবার আশা করেন?
আমার বিশ্বাস, দ্রব্যের বিভিন্ন গুণাবলী ছাড়া তার স্বরূপকে প্রকাশ করার জন্যে অন্য কোন কিছুর দরকার হয় না । যার ফলে আমাদের দ্বারা উদ্ঘাটিত গুণের সংখ্যার অনুপাতে দ্রব্যের স্বরূপের অনুধাবনও যথার্থ হয়। আমাদের মনের মত অন্য কিছুই এত বেশি সংখ্যক গুণের প্রকাশ দেখাতে পারে না।
৬ ঈশ্বরের প্রতীক সংক্রান্ত ধারণা নিয়ে আপত্তিঃ
প্রশ্নঃ ঈশ্বরের অনুরূপ কোন প্রতিরূপ বা ধারণা আমাদের নেই । তাই প্রতিকৃতির মাধ্যমে ঈশ্বরের উপাসনা নিষিদ্ধ করা হয়েছে পাছে আমরা মনে করি যে যিনি ধারণাতীত তাঁকে আমরা ধারণায় বাঁধতে পারি।
উত্তরঃ এই নিষেধ শুধু ঈশ্বরের কোন ভৌত প্রতিরূপ বা বাস্তব চিত্রকল্পের বিরুদ্ধে। আমি ঈশ্বরের ধারণা বলতে মন যা ভাবে বাঃ মানসপ্রত্যক্ষ করে তার কথা বুঝিয়েছি। ঐশ্বরিক মনের প্রত্যক্ষকে বোঝাতে সাম্প্রতিক কালে দার্শনিকেরা এই শব্দটিই ব্যবহার করেছেন। আর এছাড়া আমার কাছে অন্য কোন উপযুক্ত শব্দও নেই ।
প্রশ্নঃ কী করে জানলেন যে আপনি যদি সভ্যসমাজের মধ্যে লালিতপালিত না হয়ে সারাজীবন মরুভূমির মধ্যে কাটাতেন তাহলেও আপনার মনে ঈশ্বরের ওই ধারণা জন্মাত? আপনি কি এই ধারণাকে আপনার বই পড়া থেকে, এই বিষয়ের আগের প্রচলিত চিন্তাভাবনা থেকে এবং বন্ধুদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা থেকে লাভ করেন নি? এমন নয়,যে এই ধারণা আপনি আপনার মন থেকে অথবা কোন অস্তিত্ববান পরমসত্তার থেকে লাভ করেছেন। কাজেই, আপনাকে আরও স্পষ্টভাবে প্রমাণ করতে হবে যে ঐ ধারণাটি আপনার মনে আসতে পারে না- যদি না কোন পরমসত্তার অস্তিত্ব না থাকে!
উত্তরঃ আপনার বক্তব্যে কোন সারবত্তা নেই । যদি মেনেও নিই যে আমি ঈশ্বরের ধারণা অন্যদের থেকে পেয়েছি তো প্রশ্ন হল তাঁরা কোত্থেকে পেয়েছেন? শেষে এই সিদ্ধান্তেই পৌঁছতে হবে যে ধারণাটি ঈশ্বরের থেকেই আদিতে এসেছে। এটি বস্তুজগতের প্রতিরূপের মত ধারণা নয়, বরং একটি বৌদ্ধিক ধারণা।
যেমন গণিতে ‘অসীম’ বলে সংখ্যাটি একটি বৌদ্ধিক ধারণা। বাস্তবে কোন সংখ্যাকেই ‘ অসীম’ বলে চিহ্নিত করা যায় না । আসলে সিদ্ধান্তটি হলঃ আমি সবচেয়ে বড় যে সংখ্যার কথা ভাবতে পারি তার চেয়েও বড় সংখ্যা হবে অসীম। আর এটি ভাবার ক্ষমতা আমি নিজের থেকে পাই নি, বরং আমার থেকে পূর্ণতর সত্তার কাছ থেকে পেয়েছি।
৭ সহজাত ধারণা সংক্রান্ত আপত্তিঃ
প্রশ্নঃ মঁসিয়ে দেকার্ত বলেন যে ঈশ্বর ও আত্মা সম্পর্কে ধারণা আমাদের সহজাত, তাহলে আমার প্রশ্ন যে গভীর স্বপ্নহীন ঘুমে আচ্ছন্ন মানুষ চিন্তা করতে পারে কি ? যদি তারা চিন্তা না করে তখন তাদের মনে কোন ধারণা থাকবে না । অতএব, কোন ধারণাই সহজাত নয়। কারণ সহজাত ধারণা তো সর্বদা উপস্থিত থাকবে।
উত্তরঃ আমি সহজাত ধারণা বলতে একথা বলি নি যে তারা সর্বদা বিদ্যমান থাকবে। আমি বলতে চাই যে ঐ ধারণাগুলো আমাদের মধ্যে সুষুপ্ত থাকে এবং তাদের জাগ্রত করার ক্ষমতা আমাদের আছে।
৮ ভ্রান্তি ও স্বাধীন ইচ্ছে নিয়ে আপত্তিঃ
প্রশ্নঃ এটা সত্যি যে ‘অজ্ঞতা’ হল একটি অভাবজনিত ত্রুটি, কিন্তু ভ্রান্তি তা নয় । পাথরের টুকরোর বিচারবুদ্ধির ও ইচ্ছাশক্তির অভাব আছে। কিন্তু তার জন্যে কেউ পাথরের টুকরোকে ভুল করার দোষ দেবে না । ভ্রান্তি তার হয় যার বিচারবুদ্ধি ও ইচ্ছাশক্তির মত সদর্থক গুণ আছে।
আর স্বাধীন ইচ্ছার ব্যাপারটি মঁসিয়ে কোন প্রমাণ ছাড়াই ধরে নিয়েছেন, ক্যালভিনীয়দের বিরোধিতা সত্ত্বেও।
উত্তরঃ যদিও ভুল করার জন্যে পূর্বশর্ত হল বিচারবিবেচনার ক্ষমতা থাকা এবং তার অপব্যবহার করা, কিন্তু তার থেকে এটা দাঁড়ায় না যে ‘ভুল’ হল কোন সদর্থক বস্তু। যেমন পাথরের দৃষ্টিশক্তি নেই , কিন্তু তার জন্যে অন্ধত্বকে কেউ সদর্থক শক্তি (পজিটিভ পাওয়ার) বলবে না ।
আর আমাদের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝি যে ইচ্ছা পোষণ করা ও স্বাধীন হওয়া একই কথা। যা ঐচ্ছিক আর যা স্বাধীন –এর মধ্যে কোন প্রভেদ নেই ।
৯ তত্ত্বাশ্রয়ী যুক্তি (অন্টলজিক্যাল প্রুফ) সংক্রান্ত আপত্তিঃ
প্রশ্নঃ যদি ধরে নেওয়া হয় যে পরমসত্তার সম্পর্কে আপনার সুস্পষ্ট জ্ঞান আছে আর পূর্ণসত্তার সারধর্মের (সাবস্ট্যান্স) মধ্যে তার অস্তিত্বও ধরা রয়েছে, তবু এটা প্রমাণ হয় না যে তাঁর অস্তিত্ব কোন বাস্তব সত্তাকে বোঝায়, যদি নয়া একথা ধরে নেওয়া হয় যে সর্বোচ্চ সত্তা অস্তিত্বশীল হবেই। কাজেই পরমসত্তার অস্তিত্বের প্রমাণ অন্য কোন উৎসে খুঁজতে হবে।
উত্তরঃ প্রথমতঃ যেসব বস্তু সম্পর্কে আমাদের সুস্পষ্ট ধারণা আছে, এমনকি যেগুলো আমাদের অলীক কল্পনা প্রসূত তাদের ‘সম্ভাব্য অস্তিত্ব’ আমরা স্বীকার করি। তাহলে ঈশ্বরের ‘সম্ভাব্য অস্তিত্ব’ স্বীকার করতে কোন বাধা নেই।
দ্বিতীয়তঃ যখন তাঁর অপরিমিত অসীম শক্তির কথা বিবেচনা করি তখন একথা স্বীকার না করেই পারি না যে সম্ভাব্য নয়, তিনি নিজের ক্ষমতার জোরেই অস্তিত্ববান। যা নিজের ক্ষমতার জোরে অস্তিত্ববান হয় তা সর্বদাই অস্তিত্বশীল। তাই আমরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছই যে তিনি সত্যি সত্যি আছেন এবং অনন্তকাল থেকে আছেন।
১০ কার্তেজীয় চক্রক যুক্তি(সাইক্লিক আর্গুমেন্ট) সংক্রান্ত আপত্তিঃ
প্রশ্নঃ ঈশ্বরের অস্তিত্বের এই তত্ত্ববিদ্যা (অন্টোলজিক্যাল) ভিত্তিক প্রমাণের মধ্যে স্পষ্টতঃ চক্রক যুক্তির দোষ দেখতে পাচ্ছি, অর্থাৎ যা প্রমেয় বা প্রমাণ করতে হবে তারই সাহায্য নেওয়া হচ্ছে প্রমাণটিকে দাঁড় করাতে। এই দোষের থেকে কী করে বেরিয়ে আসা যাবে?
যেমন,যা আমরা ‘স্পষ্ট ও নিশ্চিতরূপে’ প্রত্যক্ষ করি তা সত্য—এই বিশ্বাসের সপক্ষে একমাত্র দুর্ভেদ্য যুক্তি হল এই যে ঈশ্বরের অস্তিত্ব আছে। কিন্তু আমরা নিশ্চিত হতে পারি যে ঈশ্বর আছেন কারণ আমরা ‘স্পষ্ট ও নিশ্চিতরূপে’ ঐ বিষয়টি প্রত্যক্ষ করি। সুতরাং ঈশ্বরের অস্তিত্ব আছে এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার আগে আমাদের নিশ্চিত হওয়া উচিত যে যা কিছু আমরা স্পষ্ট ও প্রকটরূপে প্রত্যক্ষ করি তা সত্য।
উত্তরঃ “যা আমরা ‘স্পষ্ট ও নিশ্চিতরূপে’ প্রত্যক্ষ করি তা সত্য—এই বিশ্বাসের সপক্ষে একমাত্র দুর্ভেদ্য যুক্তি হল এই যে ঈশ্বরের অস্তিত্ব আছে। কিন্তু আমরা নিশ্চিত হতে পারি যে ঈশ্বর আছেন কারণ আমরা ‘স্পষ্ট ও নিশ্চিতরূপে’ ঐ বিষয়টি প্রত্যক্ষ করি”—এই বলে যে চক্রক যুক্তি দিইনি তার প্রমাণ হিসেবে এটাই বলতে পারি যে আমার উপস্থাপনায় আমি যা আমরা প্রকৃত বাস্তবে প্রত্যক্ষ করি তার সঙ্গে যা আমরা পূর্বে দেখেছি বলে স্মরণ করি – তার মধ্যে প্রভেদ টেনেছি। কারণ, আমরা প্রথমতঃ জানি যে ঈশ্বর আছেন, যেহেতু তাঁর অস্তিত্ব আমরা যুক্তি দিয়ে অনুধাবন করেছি; পরে এটা স্মরণ করাই যথেষ্ট যে কোন বিষয়কে স্পষ্ট ভাবে প্রত্যক্ষ করলে তা সত্য। তবে এটাও পর্যাপ্ত প্রমাণ হত না যদি না আমরা জানতাম যে ঈশ্বর আছেন এবং তিনি প্রতারক ন’ন।
১১ জড়বস্তুর অস্তিত্ব নিয়ে আপত্তিঃ
প্রশ্নঃ ডাক্তার যখন রোগীর নিরাময়ের জন্যে বা পিতামাতা যখন সন্তানের কল্যাণের জন্যে মিথ্যে বলেন তাতে দোষ হয় না—এটি প্রচলিত মত। অর্থাৎ বিভ্রান্তির খারাপ দিক হল যখন কেউ অসাধু উদ্দেশ্যে কাউকে ভুল পথে চালিত করেন। কাজেই মঁসিয় দেকার্ত খেয়াল করুন যে ঈশ্বর আমাদের কখনই প্রতারিত করতে পারেন না এই প্রকল্পটি সত্যের মর্যাদা পায় কিনা; নইলে, অর্থাৎ এটি অসত্য হলে, সার্বিক ভাবে জড় বস্তুর স্বতন্ত্র অস্তিত্ব আছে এই সিদ্ধান্ত মানা যায় না ।
উত্তরঃ এটি কুতর্ক। আমাদের সিদ্ধান্তের অকাট্যতার জন্য আমাদের একথা ধরে নেওয়ার কোন প্রয়োজন নেই যে আমরা কখনও প্রতারিত হই না ; আমি তো হই। আমরা প্রতারিত হই যখন আমাদের ভ্রান্তি ঈশ্বর আমাদের প্রতারিত করতে চেয়েছেন এরূপ সিদ্ধান্তের জন্ম দেয়।
চতুর্থ ভাগঃ উপসংহার
[ সমাপ্তি টানার অবসরে আমরা সংক্ষেপে কথা বলব কার্টেজিয়ান লজিক ও অধিবিদ্যার সেইসব বৈশিষ্ট্য নিয়ে যা পাশ্চাত্ত্য দর্শনের বিকাশের ধারাকে প্রভাবিত করেছে। এছাড়া উল্লেখ করব ভারতীয় দর্শনের চিন্তন-পরম্পরার সঙ্গে দেকার্তের কিছু মিল-অমিল, কিছু বিন্দু ।]
দেকার্তের বিরাট কৃতিত্ব হল মধ্যযুগীন স্কোলাস্টিক চিন্তাধারা ও চার্চের একাধিপত্য থেকে মুক্তি। চতুর্দশ থেকে সপ্তদশ শতক পর্য্যন্ত জ্ঞানচর্চার দুনিয়ায় প্রথম ও শেষকথা বলার অধিকার ছিল ভ্যাটিক্যান ও তার অনুমোদিত যাজকবৃন্দের। তাই ব্রহ্মান্ডের সৃষ্টি বা ঈশ্বর, আত্মা ও জড় জগতের অস্তিত্ব – সমস্ত বিষয়েই প্লেটো-আরিস্ততল ও টলেমিয় পৃথ্বীকেন্দ্রিক সৌরজগত এবং টমাস অ্যাকুইনাসের ফরমান দিয়ে আঁকা ছিল জ্ঞানচর্চার লক্ষ্মণরেখা।
দেকার্ত --সব কিছু নিয়েই প্রশ্ন করতে হবে এবং ঈশ্বরের অস্তিত্বকেও যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করতে হবে, আপ্তবাক্য দিয়ে নয় বলে—এক লাফে ওই রেখাটি টপকে গেলেন। এর পরে ইউরোপীয় মানসে কোন কিছুই আর আগের মত রইল না। পরবর্তী সমস্ত দার্শনিকদের পরিচর্চা শুধু অধিবিদ্যক প্রশ্নসমূহে সীমিত রইল না । জ্ঞানকান্ড বা এপিস্টেমোলজি দর্শনের একটি আবশ্যক অংগ হয়ে গেল। এর কৃতিত্ব অবশ্যই দেকার্তের।
দেকার্ত অভিজ্ঞতা-পূর্ব সহজাত জ্ঞানকে ( আ প্রায়োরি ইননেট নলেজ) বস্তুজগতের অনুভবের থেকে উঁচুতে স্থান দিলেন। গণিতকে পদার্থবিদ্যার চেয়ে পূর্ণাংগ বলা এর একটি উদাহরণ। বিতর্ক হল অভিজ্ঞতাবাদী বেকনধারার লক, বার্কলে, হিউম গোষ্ঠীর সঙ্গে। কিন্তু ওঁর ধারা,অর্থাৎ বুদ্ধিবাদী ধারায় পরবর্তীরা, যেমন স্পিনোজা ও লাইবনিজ, উল্লেখযোগ্য কাজ করে গেলেন।
শেষে এলেন ইম্মানুয়েল কান্ট; যিনি ওঁর বিখ্যাত ‘ আ ক্রিটিক অফ পিওর রীজন’ এ অভিজ্ঞতাবাদ ও বুদ্ধিবাদ দুইয়েরই সমালোচনা এবং সংশ্লেষণ করে দেখালেন যে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষণের পদ্ধতিতে দুইয়েরই প্রয়োগ ও সীমাবদ্ধতা আছে। জড় জগতের অনুভব থেকে প্রাপ্ত সংবেদনাকে বুদ্ধির আলোকে বিশ্লেষণ করে তবেই সত্যের উপলব্ধি ঘটে। কিন্তু অজ্ঞেয়বাদী কান্টের মতে বস্তুর ( থিং ইন ইটসেলফ) আভাস মাত্র আমরা পেতে পারি, আসল বস্তুর স্বরূপ কখনই জানা যাবে না । এরা হল অজ্ঞেয় (আননোয়েবল), যারে যায় না জানা। ঈশ্বর সম্বন্ধেও একই কথা।
দেকার্তের দ্বৈতবাদে মানস ও জড়জগত দুইয়ের অস্তিত্বই স্বীকৃত। এখানে ভারতীয় সাংখ্যদর্শনের সঙ্গে তুলনা হতে পারে। সাংখ্য ও কার্টেজিয়ান সিস্টেম দুইই দ্বৈতবাদী; সাংখ্য বেদকে এবং দেকার্ত বাইবেলকে অভ্রান্ত মানে। কিন্তু দুটি বিষয়ে দেকার্তের দর্শন ও সাংখ্যের মধ্যে মৌলিক তফাত রয়েছে।
এক, দেকার্তের মতে পরমসত্তা, পরমকারুণ্যময় ও সর্বশক্তিমান ঈশ্বর অস্তিত্ববান। তাঁর অস্তিত্ব প্রমাণ করা যায় । তিনি ধারণাভিত্তিক বা অন্টোলজিক্যাল প্রুফ ও দিয়েছেন। কিন্তু সাংখ্য হল নিরীশ্বরবাদী। বিখ্যাত সূত্রটি হল –‘ঈশ্বরাসিদ্ধেঃ’ বা প্রমাণের অভাবে ঈশ্বর অসিদ্ধ।
দুই, দেকার্তের মডেলে মন বা আত্মা হল সতত ক্রিয়াশীল। স্বতন্ত্র হলেও বস্তুর উপর পিনিয়াল গ্ল্যান্ডের মাধ্যমে প্রভাববিস্তার করে। আর জড়জগত হল অপরিবর্তনীয়, যান্ত্রিক নিয়মে চলে। সাংখ্যে পুরুষ বা চেতনার জগত হল নিষ্ক্রিয় দ্রষ্টা, নির্গুণ অপরিবর্তনীয়। প্রকৃতি বা জড়জগত হল সক্রিয় এবং সত্ত্বঃ, রজঃ এবং তমঃ এই তিনগুণ বিশিষ্ট। প্রকৃতির বিকার অথবা ওই ত্রিগুণের ভারসাম্যের বিপর্যয়ের ফলে বিশ্বজগত সৃষ্ট হয় ।
আবার ন্যায়দর্শনের সঙ্গে মিলও এড়িয়ে যাবার মত নয়। ন্যায়দর্শনেও জড় ও চেতনার জগত স্বীকৃত। ন্যায়দর্শনের ঈশ্বরও দেকার্তের মতই সৃষ্টির ‘নিমিত্তকারণ’ ( এফিশিয়েন্ট কজ) মাত্র। এই ঈশ্বর সচেতন ভাবে জড়জগতের বস্তুপুঞ্জকে সঠিক পথে চলতে সাহায্য করেন( দেকার্ত) । ন্যায়ের ঈশ্বর আকাশ (স্পেস), অণু (মলিকুল) সৃষ্টি করেন না , কিন্তু এগুলোর সমন্বয় ঘটিয়ে জগত সৃষ্টি করেন। আবার দেকার্ত ও ন্যায়দর্শন দুজনেই শাস্ত্র ও আপ্তবাক্য ( বেদ/ বাইবেল) মানেন। কিন্তু দুজনেই সত্যকে যুক্তিসিদ্ধ হওয়ার পক্ষে এবং দুজনেরই সুনির্দিষ্ট জ্ঞানতত্ত্ব আছে।
দেকার্তের বিখ্যাত প্রমাণ ‘আমি ভাবছি, তাই নিঃসন্দেহে আমি আছি’ নিঃসন্দেহে ইউরোপীয় চিন্তাজগতে বিপ্লব নিয়ে এল। এর মধ্যে থেকে দুটি বিপরীত ধারার চিন্তা এগিয়ে চলল-- ভাববাদ ও বস্তুবাদ।
একদিকে সবকিছুকে যুক্তিসিদ্ধ করার দাবী ও জ্ঞান সঠিক পদ্ধতি বিচারে যে কেউ প্রাপ্ত করতে পারে—এই দর্শন এগিয়ে দিল আধুনিক বস্তুবাদ। ফ্রান্সের দিদেরো (Diderot) বা পরবর্তী এন্সাক্লোপিডিক স্কুল’ এক অর্থে দেকার্তের কাছে ঋণী।
আবার মনের ইন্টুইশন বা স্বজ্ঞার শক্তি এবং অভিজ্ঞতা-পূর্ব জ্ঞান (আ প্রায়োরি নলেজ) কে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেয়ার ধারা নিয়ে গেল বিশপ বার্কলের বিষয়ীগত ভাববাদে( সাবজেক্টিভ আইডিয়ালিজম), যেখানে আমি শুধু নিজের চেতনা সম্বন্ধেই জানি। কোন বেড়াল আছে কিনা জানিনা, তবে ‘বেড়ালত্ব’ (ক্যাটনেস) বলে কিছু গুণের সমাহার দেখি, তার বেশি নয়। ‘ আমারই চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ’! ঈশ্বর বা বস্তুজগত কিছুই জানা সম্ভব নয়। এই অবস্থান থেকে দু’পা এগোলেই অজ্ঞেয়বাদী কান্ট, যিনি অধিবিদ্যার চর্চাকেই অবাস্তব, অপ্রয়োজনীয় ও কল্পনাবিলাস মনে করেন।
তবে এটাও দেখতে হবে যে যাঁরা প্রত্যক্ষভাবে কারটেজিয়ান লজিকের অনুগামী-- স্পিনোজা ও লাইবনিজ-- কিন্তু অব্জেক্টিভ আইডিয়ালিস্ট বা বিষয়গত ভাববাদী। তাঁদের ঈশ্বর বা পরমসত্তা কিন্তু বিষয়গত ভাবে অস্তিত্ববান—বিশ্বপ্রকৃতি তাঁরই প্রকাশ। বার্ট্রান্ড রাসেল লাইবনিজকে আঙ্কিক যুক্তিশাস্ত্রের ( ম্যাথমেটিক্যাল লজিক) প্রতিষ্ঠাতা মনে করেন।
পরবর্তী কালে হেগেল বিষয়গত ভাববাদ বা জগতকে এক মহাচেতনার অভিক্ষেপ হিসেবে দেখার দর্শনের এক উন্নত রূপ বিকসিত করেন যাতে প্রত্যেক বস্তু এক অর্থে হ্যাঁ ও আরেক অর্থে না । বস্তু ও চেতনার মধ্যে দ্বান্দ্বিক সম্পর্কযুক্ত নিরীশ্বরবাদী দর্শনের প্রণেতা কার্ল মার্ক্সও এক অর্থে দেকার্তের দ্বৈতবাদ ও বুদ্ধিবাদের কাছে ঋণী। সাধে কি দেকার্তের আপাতঃ ঈশ্বরবাদী বুদ্ধিবাদী দর্শনের লজিকে কয়েক শতাব্দী ধরে যাজকেরা নিরীশ্বরবাদের বীজ দেখতে পেয়েছিলেন!
বিধিসম্মত বিজ্ঞপ্তি
দর্শকসংখ্যা
ঋতবাক পরিচালনায়
উপদেষ্টামণ্ডলী – সুদিন চট্টোপাধ্যায়, বিশ্বনাথ রায়, চিন্ময় গুহ, ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়, শুভ্র ভট্টাচার্য, পল্লববরন পাল
সম্পাদনা – সুস্মিতা বসু সিংহ
কার্যনির্বাহী সম্পাদনা – শিশির রায়, সৌম্য ব্যানার্জী
কারিগরী সহায়তা – সুমিত রঞ্জন দাস
ব্লগ সংরক্ষণাগার
-
▼
2026
(82)
-
▼
June
(13)
- সম্পাদকীয়
- প্রচ্ছদ নিবন্ধ - অমিতাভ বন্দ্যোপাধ্যায়
- প্রবন্ধ - রঞ্জন রায়
- প্রবন্ধ - মনোজিৎকুমার দাস
- ধারাবাহিক - নন্দিনী সেনগুপ্ত
- ধারাবাহিক - রঞ্জন রায়
- ধারাবাহিক - শৌনক দত্ত
- গল্প - মনোজ কর
- গল্প - রঞ্জন রায়
- কবিতা - অমিতাভ মুখার্জী
- কবিতা - ইন্দ্রাণী সরকার
- কবিতা - কোহিনুর মিত্র
- ঋতু ম্যাডামের রান্নাঘর থেকে - মৈত্রেয়ী চক্রবর্তী
-
▼
June
(13)





0 comments: