গল্প - মনোজ কর
Posted in গল্প২০
জগাই ঘরে ঢুকে বললো,’ দাদু, মনে হচ্ছে আমাদের একদিকে বাঘ আর অন্যদিকে ভাল্লুক। বড়কালীকে শিবুলালের খুনের সহযোগী হিসাবে পুলিশ সাব্যস্ত করেছে। এক লক্ষ টাকা জামিনে তাকে ঘন্টাখানেকের মধ্যে ছেড়ে দেওয়া হবে। রেবা কৈরালাকে পুলিশ খুনের দায়ে কালকেই কোর্টে তুলতে চাইছে। প্রেসের লোকেদের ডেকে কেলো দারোগা পুলিশের পরবর্তী পদক্ষেপের কথা জানিয়ে দিয়েছে।‘
-হেনার কোনও খবর পেলে, জগাই?
-হেনার খবর জোগাড় করায় অনেক বাধা আছে। বিশেষ করে বড়কালীর পরিবারে ওর বিবাহের জন্য। কোনও কথা বাইরে বেরোচ্ছে না। বাইরের লোক এমনকি কাজের লোকদেরও ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। এই মডেলদের একটা সমস্যা আছে। আসলে কিন্তু বেশিরভাগ মডেলই সাধারণ জীবন যাপন করে। স্বামী, পুত্র, কন্যা নিয়ে তাদের সুখের সংসার। কিন্তু জনগনের মডেলদের সম্বন্ধে একটা পক্ষপাতদুষ্ট ধারণা আছে। যেহেতু মডেলদের তোয়ালে বা বিকিনি পরা ছবি কাগজে বা টিভিতে দেখা যায় তাই লোকে তাদের অন্যরকম ভাবে। হেনাকে নিয়ে কাঠমান্ডুতে গল্পের অভাব নেই। সে নিজের ফ্ল্যাটে একলা থাকত। সে পার্ট টাইম মডেলের কাজ করতো। বাকি সময় ছোট ছোট জামা পরে নৃত্যের ভঙ্গিমায় ক্যাসিনোর টেবিলে টেবিলে ঘুরে বেড়াত যাতে জুয়াড়ীরা আর একটু বেশি সময় সেখানে কাটায় , আর একটু বেশি টাকা জুয়ার পিছনে খরচা করে। অনেক সময় বিকিনি পরে হোটেলের সুইমিং পুলে সাঁতার কাটতো। তারপর ভিজে গায়ে, ভিজে চুলে সুইমিং পুলের ধারে আধশোয়া হয়ে আবাসিকদের মনোরঞ্জন করতো।
-হেনা কি কমিশনে কাজ করতো?
-না, মাসিক মাইনেতে। এটা তার কাজ ছিল। তুমি এতদিন এত জায়গায় গেছো। কত ক্যাসিনো দেখেছ কে জানে? একজন সুন্দরী যখন তোমার পাশে এসে দাঁড়ায় আর তোমার হয়ে চাল দিতে থাকে আর তুমি জিততে থাক তখন টেবিল ছেড়ে উঠে যাওয়া কি সহজ?
- সত্যি, আমি অনেকবার এই দৃশ্য নিজের চোখে দেখেছি। এমনকি বেশ কয়েকবার এই অভিজ্ঞতা ব্যক্তিগতভাবে আমারও হয়েছে। নিজেকে এই নেশার হাত থেকে সামলানো খুব কঠিন। কিন্তু আমি বুঝতে পারিনা ওরা তোমার পিঠে হাত রেখে তোমার জন্য চাল দিলে তুমি জেত কী করে? সবাই অপেক্ষা করে থাকে কখন সে এসে তার পাশে দাঁড়াবে আর তার জন্য চাল দেবে। জুয়া জেতা তো আছেই আর উপরি পাওনা তার শরীরের আলতো স্পর্শ। তবে এই মডেলরা অত্যন্ত সতর্ক এবং সচেতন। এরা ততটাই করবে যতটা আইনানুগ। আইনের বাইরে গিয়ে এরা কিছুই করবে না তা তুমি তাকে যতই প্রলুব্ধ করো।
-ঠিকই বলেছ। তোমার অভিজ্ঞতা থেকে আমরা প্রতিদিন শিখি। এবার হেনার কথায় ফিরি। ও শিবুলালকে চিনতো। মাঝে মাঝে শিবুলালের সঙ্গে ডেটিংএও যেত। হয়তো ওদের মধ্যে ভালোবাসা ছিল। অথবা কোনও ব্যবসায়িক কারণও থাকতে পারে। তবে শিবুলাল ব্ল্যাকমেলার ছিল যদিও সেটা প্রমাণ করা যাবে না । কেউ জানেনা শিবুলাল কী করতো? কিন্তু দক্ষ শিকারি ছিল। কাঠমান্ডুর রেড লাইট এরিয়া, ক্যাসিনো আর পাঁচতারা হোটেলের আশেপাশে ঘুরে বেড়িয়ে প্রচুর পয়সা রোজগার করেছে। শিবুলালের কোনও ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ছিল না, ট্যাক্স দিত না। দেখে মনে হত লোকটা কোনওক্রমে দিন গুজরান করে। অনেক লোক কাঠমান্ডুতে আসে , ফূর্তি করে চলে যায়। অনেকে এদেশ থেকে কাঠমান্ডুতে লজ বা ছোট হোটেল চালায়। সেখানে অনেকে আসে সঙ্গিনী নিয়ে রাত কাটাতে। কারুর স্মৃতিশক্তি যদি প্রখর হয় এবং দিনক্ষণসমেত এইসব লোকেদের মুখ এবং কাজকর্মের কথা মনে রাখতে পারে তাহলে পয়সা রোজগার করা কোনও ব্যাপার নয়। তার ওপর যদি হেনার মত মেয়েরা যদি নিয়মিতভাবে তাকে টাকার বিনিময়ে খবর দেয় তাহলে তো কথাই নেই। এই সমস্ত খবর হেনার মত মেয়েদের কাছে প্রচুর থাকে। কয়েকটা কাজে লাগাতে পারলেই যথেষ্ট।
-জগাই, ঠিকই বলেছ। তবে এসব প্রমাণ করা খুব কঠিন, অসম্ভবই বলা যেতে পারে।
-দাদু, আর একটা খবর তোমাকে দিই। শিবুলালের মানিব্যাগে ১৫০০০টাকা পাওয়া গেছে। তদন্তে যতদূর উদ্ধার করা গেছে এই ১৫০০০ টাকা ছাড়া আর শিবুলালের আর কোনও টাকা কোথাও পাওয়া যায়নি। কিন্তু এটা হতেই পারেনা। তার মানে শিবুলালের টাকা কোথাও রাখা আছে যেখান থেকে সে দরকার পড়লে টাকা নিয়ে আসতো। শিবুলাল যে ব্যবসায় ছিল সেখানে দশ-পনের হাজার টাকা যখন তখন বের করতে হয়।
-কিন্তু ইনকাম ট্যাক্স ডিপার্টমেন্টের নজর তার দিকে পড়লো না? এরা রাস্তার ধারের চা-ওয়ালার রোজগারের খবর রাখে অথচ যে লোকটা প্রপার্টি ডিল করে তার খবর রাখে না। আশ্চর্য নয়?
-যতদূর খবর পেয়েছি ইনকাম ট্যাক্সের নোটিস ও কোনওদিন পায়নি। লোকটা ধুরন্ধর ছিল। লোকটা ভুল করে জীবনের প্রথম দিকেও কোনওদিন ট্যাক্স দেয়নি। ওদের খাতায় ওর অস্তিত্বই নেই। শিবুলালের সঙ্গে হেনা অর্থাৎ ছোটকালীর স্ত্রীর বেশ ভালোই যোগাযোগ ছিল। যে কোনও কারণেই হোক হেনা চাইছে তাদের এই সম্পর্কের কথা এবং তার বিবাহ পূর্ববর্তী জীবনের কথা যেন কেউ না জানতে পারে। কাগজে যেন এসব খবর ছাপা না হয়। বিশেষত এই কারণে যে সমাজের উচুঁতলায় সে এখন ছোটকালীর স্ত্রী হিসাবে স্বীকৃতি পেতে চলেছে।
-ছোটকালী সম্বন্ধে লোকজনের কী ধারণা?
-সাধারণভাবে বলা যায় লোকটা একটু বন্য প্রকৃতির। আদব কায়দা খুব একটা জানে না। বাবার ব্যবসা চালানোর অযোগ্য। বাবার একেবারে বিপরীত। বাবাকে মানুষ মোটামুটি সম্ভ্রম করে। সামাজিক আচার অনুষ্ঠানে বড়কালীকে খুব একটা দেখা যায় না কিন্তু ছেলেকে সর্বত্র দেখা যায়। ছেলে সেকেন্ড হ্যান্ড গাড়ির ব্যবসায় ঢুকে ভালোই রোজগার করছে। ছোটকালীর একমাত্র লক্ষ্য তাড়াতাড়ি পয়সা রোজগার করা। যেভাবেই হোক পয়সা কামানো এবং চটজলদি পয়সা কামানো ওর একমাত্র লক্ষ্য। সম্মান, সুনাম এসবের প্রতি ওর কোনও আগ্রহ নেই। এখন তো গাড়ির সঙ্গে জমি-ফ্ল্যাট কেনা বেচার ব্যবসাও করছে শুনলাম।
-অ্যাকমে ইলেকট্রিকের কিছু খবর পেলে?
-ওদের চিঠিপত্র একটা ঘরের ঠিকানায় পৌঁছোয়। সেই ঘরটা একটা লোক ভাড়া নিয়েছে কিন্তু সেখানে থাকে না। মাঝে মাঝে এসে চিঠিগুলো নিয়ে যায়।
-লোকটাকে দেখতে কী রকম?
-একেবারে সাধারণ। ভিড়ের মধ্যে কেউ চিনতে পারবে বলে মনে হয়না। আশেপাশের কেউ সেভাবে নজর করেনি। এসে পাঁচ-দশ মিনিটের মধ্যে চলে যায়। দাদু, তোমাকে আর একটা খবর দিই। কেলো দারোগা কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে হেনাকে সন্দেহের তালিকায় রাখতে চাইছে না। কেসটা এমনভাবে সাজাতে চাইছে যাতে প্রমাণ করা যায় তুমি বন্দুক পাল্টেছ আর রেবা খুন করেছে। তুমি যদি হেনার বিরুদ্ধে সাক্ষ্যপ্রমাণ জোগাড় করে বলতে যাও যে হেনারও খুন করার মোটিভ আছে তাহলে কেলো দারোগা বলতে শুরু করবে তুমি যে ছোটকালীর অফিসে গিয়ে একটা কান্ড ঘটিয়ে বন্দুক বদল করেছ সেটার থেকে পুলিশের দৃষ্টি ঘোরানোর জন্য তুমি এখন হেনাকে কেসটার মধ্যে ঢোকাচ্ছ।
-আমার মনে হয় জগাই আমরা কেলো দারোগাকে ওর দাবি প্রমাণ করার যতই সুযোগ দিই না কেন ও কিছুতেই প্রমাণ করতে পারবেনা যে আমি বন্দুক পাল্টেছি।
-আমিও জানি দাদু যে ওরা তোমাকে দোষী প্রমাণ করতে পারবে না। আর সেই জ্বালায় কেলো দারোগা জ্বলে পুড়ে মরছে। আচ্ছা, তুমি কি রেবা কৈরালাকে বাঁচাবার চেষ্টা করবে?
-নিশ্চয়ই। আমার মনে হয় পুলিশ যেটা বলছে সেটা ঠিক নয়।
-দাদু, রেবা কৈরালা কী বলেছে? আসলে কী হয়েছে?
-সেটাই তো মুস্কিল। রেবা কৈরালা কিছু বলছে না। শুধু এটাই বলছে যে সে খুন করেনি। যদি আমার জেরার মুখে ওকে কিছু বলতে হয় তাহলে এমন সব কথা বেরিয়ে আসবে যা রেবার পক্ষে খুব একটা স্বস্তিদায়ক হবে না। সেইজন্য আমিও জোর করছি না।
-তার পুরোনো জীবনের কিছু কথা?
-আমারও তাই মনে হয়। তবে আজ না হোক কাল আমাকে সব কথা বলতেই হবে সেটাও হয়ত ও জানে। কিন্তু এই মুহূর্তে ও মুখ বন্ধ রাখতে চায়। ওর কথা অনুযায়ী ওকে দোষী হিসাবে সাব্যস্ত করার জন্য প্রাথমিকভাবে যে তথ্যপ্রমাণ দরকার পুলিশের কাছে তা নেই। কিছু আন্দাজের ওপর নির্ভর করে পুলিশ এগোচ্ছে যেটা কোনও কাজে লাগবে না।
-আমি সবসময় তোমার সঙ্গে আছি। কিছু দরকার হলে বোলো।
-জগাই, ঐ ভুয়ো বিলগুলো কোথায় ছাপা হয়েছিল আমার জানা একান্ত দরকার।
-আমার চেষ্টার কোনও খামতি হবে না। খবর আমি আনবোই দাদু।
জগাই আর সুন্দরী বেরিয়ে যায়। পানু রায় চোখ বুজে গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে গেলেন।
চলবে



0 comments: