0

ধারাবাহিক - শৌনক দত্ত

Posted in




















২০. আলোর পথযাত্রী সলিল চৌধুরী





সুপ্রিয়বরেষু বাসু,

তোমাকে যখন লিখছি পশ্চিমবঙ্গে তখন নিশ্চয় বিজেপির বিজয় ঘোষণা হয়ে গেছে। বেশ কিছুদিন ধরেই চেনা পরিচিত সবার কাছে বিজেপির কথা খুব শুনছিলাম কিন্তু আমার মনে হচ্ছিল এইবারটাও কোন রকম কাটিয়ে দেবে তৃণমূল আর বাংলার দিদি। অনেকে ধর্ম ও সাম্প্রদায়িক দল হিসেবে বাংলায় বিজেপিকে প্রতিহত করতে চেয়েছে বারবার। বাংলায় বিজেপির এই বিজয় তুমি কিভাবে দেখছো? আমার মনে হচ্ছে বাংলার রাজনীতিতে এই বিজয় "প্যারাডাইম শিফট" বা কাঠামোগত পরিবর্তন। এটি কেবল একটি দলের পরিবর্তন নয়, বরং স্বাধীনতার পর থেকে বাংলার রাজনীতিতে যে বাম-উদারপন্থী বা সেক্যুলার ঘরানার একচ্ছত্র প্রভাব ছিল, তার ওপর এক বড় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আঘাত। এই বিশাল বিজয়ে একটা ব্যাপার নিশ্চিত কাজ করেছে বলেই আমার বিশ্বাস, বিজেপির দ্বারা তৈরি একটি 'কাউন্টার-হেজিমনি' বা পাল্টা-আধিপত্যের সফল রূপায়ণ। তৃণমূলের বিরুদ্ধে তোষণ রাজনীতির যে অভিযোগ দীর্ঘ বছর ধরে বিজেপি তুলেছিল, তা বাংলার হিন্দু মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের মনে এই ধারণা তৈরি করতে সফল হয়েছে যে—প্রচলিত 'সেক্যুলারিজম' আসলে সংখ্যাগুরুদের অধিকারকে খর্ব করছে। ফলে, মানুষ ঐতিহ্যগত সেক্যুলার কাঠামো ভেঙে বিজেপির 'সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ' বা 'হিন্দুত্ব'-এর ন্যারেটিভকে গ্রহণ করেছে। তোমারও কি তাই মনে হয় না?

বাংলার শিল্প সংস্কৃতিকে স্বাধীনতা পরবর্তীকালে যারা নেতৃত্ব দিয়েছেন তারা প্রায় সকলই বামপন্থায় বিশ্বাসী কিংবা কমিউনিষ্টকে চেতনায়, মননে ও আর্দশে লালন করতেন। বাংলার সাহিত্য, সঙ্গীত, সিনেমা, নাট্যকলা, চিত্রকলা সহ যেকোন শিল্প সংস্কৃতির ক্ষেত্রে চোখ মেললে যার কথা মনে আসবে তাদের প্রায় সবাই কমিউনিস্ট! ১৯৭৯ সালের এক সাক্ষাৎকারে সলিল চৌধুরীকে বলতে শুনি ‘‘রাজনীতিতে কেউ সিপিআই, কেউ সিপিএম, কেউ নকশাল— তা হোক না। আমার তো মনে হয় সাংস্কৃতিক ফ্রন্টে একটা জায়গায় আমরা সবাই মিলে কাজ করতে পারি।’’ তৃণমূলের শিল্প সংস্কৃতিকে যারা নেতৃত্ব দিয়েছে তারাও বামপন্থাতেই লালিত পালিত, পোষাক বদলে তৃণমূলের পারপাস সার্ভ করে গেছে। বিজেপির ক্ষেত্রে কি হবে জানি না তবে অনুমান করছি হিন্দুকরণের একটা চেষ্টা থাকবে!

বিজেপির বাংলা জয়ের সূচনা লগ্নে সলিল চৌধুরীকে মনে পড়ছে কেন বামপন্থী একজনকে মনে পড়ছে এটা প্রশ্ন হতেই পারে কিন্তু তুমি যদি পেছনে ফিরে তাকাও দেখতে পাবে সলিল চৌধুরী নিষিদ্ধ পার্টি থাকার সময়কালে কমিউনিস্ট আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিলেন। শুরু করেছিলেন কৃষক আন্দোলনে। কলেজে পড়ার সময় ছাত্র আন্দোলনেও যুক্ত ছিলেন। তবে সাংস্কৃতিক ফ্রন্টই তাঁর প্রধান জায়গা হয়ে ওঠে। ১৯৫১-’৫২ পর্যন্ত কমিউনিস্ট পার্টি, বামপন্থী আন্দোলনে প্রত্যক্ষ ভাবে যুক্ত থাকতে পেরেছিলেন। ওই সময়ে তাঁর বাবা প্রয়াত হন। সংসারের দায়িত্ব পালনে উপার্জন জরুরী হয়ে পড়ে। প্রথমে কয়েকটি বাংলা চলচ্চিত্রে সঙ্গীত সৃষ্টির কাজ করার পর মুম্বাই যান। সেখানে প্রতিষ্ঠিত হন। আবার সেখানেও কয়্যার সংগঠিত করেন। সেই কয়্যারে রুমা গুহঠাকুরতা যেমন ছিলেন, তেমন কিছুদিন যুক্ত ছিলেন লতা মঙ্গেশকরও। একটি বিষয় এখানে উল্লেখযোগ্য। ১৯৪২-’৪৩ এবং তারপর বেশ কয়েকবছর গণনাট্য, আইপিটিএ-তে আমরা সলিল চৌধুরীর মতোই দেখতে পাই সাহিব লুধিয়ানভি, বলরাজ সাহানি, পৃথ্বিরাজ কাপুর, কাইফি আজমি, জান নিসার আখতার(জাভেদ আখতারের বাবা)-র মতো ব্যক্তিত্বকে।সাম্রাজ্যবাদ বিরোধীতা, ফ্যাসিবাদ বিরোধীতা এবং কমিউনিজমের আদর্শের প্রতি ভালোবাসা তাঁদের উপস্থিত করেছিল বামপন্থী সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পরিসরে। সলিল চৌধুরীর কথাতে আছে সেই লেফট ইকোসিস্টেমের প্রমাণ। ১৯৯৩-র নভেম্বরে একটি ইংরাজী সংবাদপত্রের পক্ষ থেকে সাক্ষাতকারে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, আপনার প্রিয় স্বপ্ন কী? সলিল চৌধুরীর জবাব ছিল—‘সব মানুষ সমান হবে।’ আপনার দুঃস্বপ্ন কী? জবাব ছিল— ‘ফ্যাসিবাদ।’ ১৯৯৫-এর সেপ্টেম্বরে, মৃত্যুর কয়েকদিন আগে আর একটি সাক্ষাতকারে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের, এমনকী কলকাতারও কিছু শিল্পী বিজেপি’তে যোগ দিয়েছে। গণনাট্য থেকে উঠে এসে এটাকে কোন চোখে দেখছেন? সলিল চৌধুরীর জবাব ছিল সংক্ষিপ্ত কিন্তু প্রবল—‘কী জানি। মুর্খের দলে কী করে শিল্পীরা যোগ দেয়, বুঝি না।’

সলিল চৌধুরীর ভাবনা বাংলায় কতটা সঠিক তা সময় বলবে তবে গোটা ভারতবর্ষে বিজেপির শিল্প সংস্কৃতির মুখ দেখলে বুঝি সলিল চৌধুরীর বলা কথাটি এখনো পর্যন্ত সঠিক! আমার বিশ্বাস লড়াইয়ের ময়দান ছাড়া শিল্প হয় না। লেখা, গান, সিনেমা, নাটক— কিচ্ছু না। এই প্রসঙ্গেও সলিল চৌধুরীর একটা কথা মনে পড়ছে ১৯৮৮-র জুনে কেন্দ্রীয় নাট্য প্রশিক্ষণ শিবিরের কর্মশালায় ‘গণসঙ্গীত’ নিয়ে আলোচনার সময় সলিল চৌধুরীর বলছেন,‘‘কিন্তু একটা কথা বলব শুধু স্লোগান দিয়ে মানুষের মন জয় করা যাবে না। আপনাদের আজকের দিনের যারা গীতিকার ও সুরকার তাদেরও শিখতে হবে। আজকের বুর্জোয়ারা যে গানগুলো তৈরি করছে— টিভিতে বলুন, রেকর্ডে বলুন, ক্যাসেটে বলুন, যেসব অসাধারণ অর্কেস্ট্রেশন, অসাধারণ রেকর্ডিং, অসাধারণ পারফেকশন দিয়ে যেসব পচা জিনিস ওরা প্রচার করছে তার জৌলুসে, তার আঙ্গিকের চমৎকারিত্বে তা যুবমানসকে আপ্লুত করছে।...আমাদেরও ওই টেকনিক আয়ত্বে করতে হবে, তা নাহলে আমরা পারব না।...ওরা যদি মেশিনগান চালায় আমরা তলোয়ার নিয়ে লড়াই করতে পারব না। অস্ত্রাগার যেটা ওদের হাতে রয়েছে সেই অস্ত্রাগারের অধিকাংশ অস্ত্র আমারও দরকার।’’

সলিল চৌধুরী প্রথম দিকে কবি না হয়ে উঠলে পরে সফল সঙ্গীতকার হয়ে উঠতেন কি না, সন্দেহ প্রকাশ করেন তাঁর কবিতার অনুরাগী পাঠকেরা। সঙ্গীতকার, সুরকার ও সাহিত্যিক সলিল চৌধুরীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ছিল মার্কসীয় আদর্শ ও গণমানুষের চেতনায় ঋদ্ধ। শোষিত-বঞ্চিত মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে তিনি নিজের শিল্পসত্তাকে পরিণত করেছিলেন এক শক্তিশালী রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে। শিল্পীর স্বীকারোক্তি থেকেই স্পষ্ট, কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ গ্ৰহণ তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। তিনি জানিয়েছেন, শুধু গণনাট্য নয়, কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে শ্রমিক, কৃষক, মধ্যবিত্ত, ছাত্র— সব আন্দোলনের শরিক হতে পারাতেই তাঁর সঙ্গীতজীবনের ভিত্তি নিহিত। এতে সুরে নতুন মূর্ছনা যোগ হয়েছে। মার্ক্সবাদী চেতনা মানসিকতার নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। সমাজের ক্ষয়রোগটিকে চিহ্নিত করে নিরাময়ের নিদান দিয়েছেন লেখনীর মাধ্যমে। মতাদর্শগত সততা, শিল্প ও রাজনীতির মেলবন্ধন এবং প্রথাগত চিন্তার ঊর্ধ্বে ওঠা তাঁর প্রজ্ঞার মূল ভিত্তি ছিল। সলিল চৌধুরীকে চিনতে জানতে আমাদের ফিরে যেতে হবে সেই সময়ে যখন সকলে মিলে নতুন সমাজ গড়ার স্বপ্ন দেখছেন। লড়াইয়ের নতুন গান তৈরি হচ্ছে। গণনাট্যের সপ্তম সর্বভারতীয় সম্মেলনে হেমাঙ্গ বিশ্বাস বললেন, সলিলের গানে পাশ্চাত্য সঙ্গীতের প্রতি ঝোঁক। তার এই হারমনি আর অর্কেস্ট্রেশনের বাড়াবাড়ি সাধারণ শ্রমজীবী জনতার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। আমাদের গান তৈরি করতে হবে পরম্পরাগত লোকসুরের উপরে লড়াই আন্দোলনের কথা যোগ করেই। হেমাঙ্গ বিশ্বাসের কথা শোনার পরে সলিল চৌধুরীর তখন কি মনে হয়েছিল জানিনা তবে আমার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সোনার কাঠি’ প্রবন্ধের কথা মনে পড়ছে যেখানে তিনি লিখছেন, “আমাদের সাহিত্যে চিত্রে সমুদ্রপারের রাজপুত্র এসে পৌঁছেছে। কিন্তু সংগীতে পৌঁছায় নি। সেইজন্যেই আজও সংগীত জাগতে দেরি করছে। অথচ আমাদের জীবন জেগে উঠেছে।” সলিল চৌধুরীরও হয়ত এটাই মনে পড়েছিল তাই তিনি মেনে নিলেন না। বললেন, নতুন দিনের গান নতুন ভাষা দিয়েই তৈরি হবে। তাতে ঘটবে লোকায়ত ও শাস্ত্রীয়, পরম্পরাগত ও আধুনিক, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সঙ্গীতের মেলবন্ধন। এই সময়ের বহুমাত্রিকতা শুধু একরৈখিক মেলোডি দিয়ে ধরা সম্ভব নয়। হেমাঙ্গ বিশ্বাস কিন্তু শেষ জীবনে সলিল চৌধুরীর সঙ্গীতধারা কে মেনে নিয়েছিলেন আত্মজীবনীতে তিনি বলেছেন, “…বিষয়বস্তুর আলোচনাকে অগ্রাধিকার না দিয়ে এভাবে শুধু লোক আঙ্গিক নিয়ে বিতর্ক চালানো, ওটাও তো এক ধরনের ‘ফর্মালিজ়ম’। সলিলের ফর্মালিজ়ম-এর সমালোচনা করতে গিয়ে আমি নিজেও এক ধরনের ফর্মালিজ়ম-এর শিকার হয়েছিলাম। লড়াইটা হয়েছিল ফর্ম-এর।” পরে হেমাঙ্গ বিশ্বাসও রচনা করেন ‘শঙ্খচিল’-এর মতো গান, যা দেশি-বিদেশি নানা সুরের মিশ্রণে তৈরি। আসলে লড়াইটাও শুধুমাত্র লোকায়ত বনাম পাশ্চাত্য সুরের ছিল না। ছিল আরও গভীরে। সে দিনের বিতর্ক প্রসঙ্গে হেমাঙ্গ বিশ্বাস বলেছেন, “স্তালিনের সেই বক্তব্য: International in content, national in form— এই ছিল আমার তাত্ত্বিক ভিত্তি।”

একজন রাজনৈতিক সচেতন স্রষ্টা কেমন হয় তার দৃষ্টান্তও হতে পারেন সলিল চৌধুরী। একজন স্রষ্টার সৃষ্টি কি শুধু লড়াই সংগ্রামের তাৎক্ষণিক আবেদনের সাময়িক সৃষ্টির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে? সৃষ্টি কি তৈরি হবে শুধু মিছিল-হরতালের জন্য, আর গণসমাবেশকে উপলক্ষ করে? এখান থেকেই উঠে আসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি— সংস্কৃতি কি সংগ্রামের হাতিয়ারই শুধু? সর্বযুগেই তো সংস্কৃতি যতটা হাতিয়ার, তার চেয়ে অনেক বেশি যুদ্ধক্ষেত্র। তুলসীদাসের কাব্য থেকে কবীরের দোহা হয়ে মহাত্মা গান্ধীর ‘ঈশ্বর আল্লা তেরে নাম’-এ রামের রূপান্তর যে পথে ঘটে, সেটাও সংস্কৃতির ভিতরের দ্বন্দ্ব সংঘর্ষেরই ফল। ওই একই সাঙ্গীতিক দ্বন্দ্ব সংঘর্ষের আন্তঃপাঠ্যতার পথ ধরে মোহিনী চৌধুরীর ‘পৃথিবী আমারে চায়’ থেকে সলিল চৌধুরীর ‘আজ নয় গুনগুন গুঞ্জন প্রেমে’-র ‘পৃথিবী তোমারে যে চায়’-এর জন্ম হয়। এটাই সলিলের সঙ্গীতের বামপন্থা, যেখানে চিৎকৃত ডাক নেই, কিন্তু গভীরতর রাজনীতি রয়েছে। এ ভাবেই রবীন্দ্রনাথের ‘কৃষ্ণকলি’ তেভাগার ‘সেই মেয়ে’-তে রূপান্তরিত হয়, কিংবা রূপকথার সাত ভাই চম্পা আর একটি পারুল বোন সমকালের মাটিতে এসে দাঁড়ায়। এই সময়পর্বের তাঁর সৃষ্টি ‘গাঁয়ের বধূ’ বা ‘আয় বৃষ্টি ঝেঁপে’ নিয়ে গণনাট্যের অভ্যন্তরে তীব্র সমালোচিত হয়েছিলেন সলিল। বলা হয়েছিল, ‘আশা স্বপনের সমাধি’, ‘বিধি’, ‘কপালগুণে’— এই শব্দগুলি গণনাট্যের আদর্শের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এর পরই সলিল চৌধুরীর সঙ্গে গণনাট্যের প্রত্যক্ষ সংস্রব ছিন্ন হয়ে যায়। কিন্তু তাঁর শিল্পীসত্তা গণনাট্য ছেড়ে যায়নি কখনও। তাঁর সৃষ্টির গভীরে ডুব দিলেই বোঝা যায়, এক রাজনৈতিক সঙ্গীতকারই জেগে আছেন পরতে পরতে। ‘হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ’-এর সুর থেকে ‘ক্লান্তি নামে গো’ এবং এর পাশাপাশি তারও কিছু দিন আগে লেখা ‘ও আলোর পথযাত্রী’ শুনলে ভিতরের রাজনীতির সংযোগ বোঝা যায়। গণসঙ্গীত থেকে প্রেমের গানে বার বার ফিরে আসা নৌকা বা পথের প্রসঙ্গের মধ্যেও নিহিত রয়েছে তাঁর রাজনীতির আভাস। সলিল চৌধুরী বিশ্বাস করতেন, শিল্পের যথাযথ শিক্ষা ছাড়া সাংস্কৃতিক সংগ্রাম অসম্ভব। ওই একই সময়পর্বে পার্টির কাছে প্রদত্ত আ থিসিস অন কালচারাল মুভমেন্ট-এ ঋত্বিক ঘটক বলেছিলেন, সংস্কৃতি আন্দোলনের অগ্রসৈনিক হতে পারেন একমাত্র পূর্ণসময়ের শিল্পীরাই। শিল্প যাঁদের জীবনের অঙ্গ, শিল্পই যাঁদের জীবনধারণের মাধ্যম। সংস্কৃতির সংগ্রাম ও জীবনধারণের টানাপড়েন তিনি অনুভব করেছেন নিজের জীবনে।

‘নবান্ন’-র পর বিজন ভট্টাচার্য লিখলেন ‘জবানবন্দী’। তাঁর কাজকর্মে অনুপ্রাণিত হয়ে সলিলও লেখেন তিনটি নাটক— ‘জনান্তিকে’, ‘এই মাটিতে’ এবং লেডি গ্রগরির ‘The Rising of the Moon’ অবলম্বনে ‘অরুণোদয়ের পথে’। নাটকগুলি বেমালুম হারিয়ে গেল! প্রকাশ করার উদ্যোগ নেওয়া যায়নি, কারণ পার্টি নাটকগুলিকে নিষিদ্ধ করেছে। আর যখন তখন পুলিশের হামলা। কলকাতায় একবার নাটকের শো হচ্ছে। কালী বন্দ্যোপাধ্যায় পুলিশের চরিত্রে অভিনয় করছেন। আর সত্যিই পুলিশ রেইড করেছে। কালীবাবু বলে উঠছেন— ‘এ কী! এখন তো তোমাদের দৃশ্য নয়!’ ইতিমধ্যে আসল পুলিশের লাঠিচার্জ শুরু হয়ে গেছে। এই ঘটনাটা সারা জীবন তাঁর মনে থেকে গেছে। এরপরেও, গান গাইতে গিয়ে পুলিশের বেদম লাঠির বাড়ি জুটেছে কপালে। সলিল চৌধুরী মনে করেন, তৎকালীন জাতীয়তাবাদী রাজনীতির পথ থেকে অনেকটাই দূরে অবস্থান নিয়েছিলেন তাঁরা। কৃষক, শিল্পাঞ্চলের শ্রমিক, খেতমজুর, শহরের রিকশা চালক— সকলকেই কমিউনিস্ট পার্টির বৃত্তে আনার চেষ্টা হয়েছিল। সাফল্য কি আদৌ এসেছে? এ নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন ছিল তাঁর মনে। ফ্রান্স, ইতালি, ভিয়েতনাম, পূর্ব ইওরোপ, চিন, সোভিয়েত ইউনিয়ন নিয়ে সকলে ব্যতিব্যস্ত। সাংস্কৃতিক ফ্রন্টের দিকে নজর দেবে কে! নেতাদের মধ্যে যথেষ্ট রেষারেষি ছিল। পরবর্তীকালে সিপিআই, সিপিআই(এম), সিপিআই(এম)(এল)— পার্টি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। 'ভদ্রলোক' শ্রেণির শিক্ষিত লেখক-শিল্পীরা যেমন এসেছিলেন, তেমনই কৃষক-শ্রমিকেরও আগমনে ঘাটতি হয়নি। তাও পার্টি সাংস্কৃতিক ফ্রন্টে ব্যর্থ হলো। সলিল চৌধুরী বলেছেন— "আমি মনে করি, বাংলার রেনেসাঁসের পর সারস্বত চর্চার এত বড় সুযোগ এসেছে কি?" কাকদ্বীপ-সুন্দরবন অঞ্চলে এক সময় মুকুন্দ দাসের গান গেয়ে বেড়িয়েছেন। গণনাট্যে দেখলেন, নীতি নির্ধারকরা সকলেই মধ্যবিত্ত ভদ্রলোক। "গণনাট্য সংঘ ভেঙে যাওয়ার দায়ভার তাঁদেরই নিতে হবে," দ্বিধাহীনভাবে বলেছেন সলিল চৌধুরী। বিজন ভট্টাচার্যের ‘নবান্ন’-কেও তার প্রাপ্য গুরুত্ব দেয়নি কমিউনিস্ট পার্টি। পার্টিতে বলা হতো, সমসাময়িকতার উপর জোর দিয়ে, সমাজ পরিবর্তনের লক্ষ্যে কাজ করবেন সাংস্কৃতিক কর্মীরা। সলিল চৌধুরীর মতে, এভাবে শিল্পের পরিধি নির্ধারণ করে দিলে সমস্যার সৃষ্টি হয়। ‘পার্টি রবীন্দ্রনাথকে বুঝতে ভুল করেছে। এই ভুলের ক্ষমা হয় না’, বলেছেন সলিল চৌধুরী।

আজকের বাংলায় দাঁড়িয়ে যখন বাংলার শিল্প সংস্কৃতিকে ধসে পড়তে দেখছি, দলকানা বুদ্ধিজীবিকে অন্ধের মতন কথা বলতে শুনছি তখন সলিল চৌধুরীকে বুঝতে সুবিধা হয়। বুঝতে পারি সলিল চৌধুরী রাজনীতিতে প্রত্যক্ষভাবে সক্রিয় থাকলেও, তিনি শিল্পসত্তাকে দলীয় রাজনীতির সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে স্থান দিতে জানতেন। তিনি মনে করতেন, রাজনৈতিক মতাদর্শ ভিন্ন হলেও সাংস্কৃতিক ফ্রন্টে সকল প্রগতিশীল মানুষের একসঙ্গে কাজ করা উচিত। আর তাই হয়ত শতবর্ষ পরেও মনে হয় সলিল চৌধুরী অদৃশ্য হয়েও বাঙালির জনজীবনে জড়িয়ে আছে। বিশেষত, উদ্বাস্তু বাঙালি ও তাদের পরের প্রজন্মে। যারা কোনও দিন পূর্ববঙ্গে ফিরতে পারেনি, কিংবা যায়ওনি, কিন্তু বাঙাল ভাষা ও যাপনে একটা স্বয়ংসম্পূর্ণ সংস্কৃতিকে ধারণ করেছে, তাদের ‘স্বর’ হয়ে উঠেছিলেন সলিল চৌধুরী। আমাদের প্রজন্মের মধ্যবিত্ত বাড়িতে দারিদ্র ছিল। ছোটবেলায় অনেক সময় পুজো-পার্বণে একটা জামা হত বা হত না। আমাদের কেউ মনে রাখত না। কিন্তু ওই যে অন্তরা চৌধুরীর কণ্ঠ মাইকে বাজত– ‘কাঁদছ কেন আজ ময়না-পাড়ার মেয়ে/ নতুন জামা-ফ্রক পাওনি বুঝি চেয়ে/ আমার কাছে যা আছে সব তোমায় দেব দিয়ে/ আজ হাসি-খুশি মিথ্যে হবে তোমাকে বাদ দিয়ে…’– ওতে আমাদের অভাবী ছোটবেলায় স্নেহের প্রলেপ পড়ত। কিংবা, বাড়িতে-বাড়িতে লতা মঙ্গেশকরের মিঠে গলায় যখন ‘পা-পা-মা-গা-রে-সা তার চোখের জটিল ভাষা’, ‘না যেও না রজনী এখনও বাকি’, ‘অন্তবিহীন কাটে না আর কেন বিরহের এই দিন’ শোনা যেত– সেই সময় গোটা একটা গোষ্ঠী– জীবনযুদ্ধে ক্লান্ত, শীর্ণ যেন শুশ্রূষা পেত। আমাদের মতো পরিবারের কাছে রবীন্দ্রনাথ কিংবা তাঁর গান ততটা সুলভ ছিল না– ‘এলিট’ ছিল যেন বা। তার থেকে অনেক কাছাকাছি ছিলেন সলিল চৌধুরী। অথচ তাঁর সুর সহজ ছিল না। গানের গলা ভালো না হলে খালি গলায় সেসব গান গাওয়া মুশকিলই ছিল। অথচ, যথেষ্ট কঠিন হওয়া সত্ত্বেও এত কোমলভাবে ছিন্নমূল বাঙালি সমাজে কী করে তাঁর গান-সুর মিশে যেতে পারল, ভাবলে অবাক হতে হয়।

আসলে সলিল চৌধুরীর মতো বহুমুখী এক প্রতিভা সম্পর্কে কথা বলতে গেলে কথা শেষ করা কঠিন। তাঁর গানের ভাষাতেই বলা যায় ‘আজ তবে এইটুকু থাক, বাকি কথা পরে হবে।’ বাইরে ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে গত কয়েকদিনের ভ্যাপসা গরম হয়ত কিছুটা কাটবে, মাটির সোঁদা গন্ধ তোমাকে দিলাম নিরন্তর ভালো থেকো। তোমার চিঠির অপেক্ষায় থাকলাম…


ইতি-

সুস্মি

০৪ মে, ২০২৬

0 comments: