ধারাবাহিক - রঞ্জন রায়
Posted in ধারাবাহিক২৮.২
ওনারা বাজার পৌঁছে গেছেন। আজও যে কোন হিন্দুস্তানী শহরে দু’রকম বাজার বসে। একটা স্থানীয়
লোকজনের, অন্যটি গোরা সাহেবসুবোদের। এই বাজারটা দ্বিতীয় জাতের। এখানে ইংরেজি সিনেমার হল,
মদের দোকান আর ঝকমকে দোকানের সারি। আছে বিজলির আলোয় ঝলমলে সাইনবোর্ড—বিশেষ
করে সিগারেট আর মদের বিজ্ঞাপনের।
এখানে আসলে মনে হবে দেশে রুটির আকাল হলেও কেক সহজে পাওয়া যায়। জলের তেষ্টায় গলা শুকোলে
বিয়ার খেয়ে চনমনে হওয়া যায়, এমনকি দরকার পড়লে মদ নিষিদ্ধ করা নিয়ে লম্বা লেকচার ঝাড়তে
পারা যায়।
সংক্ষেপে, এখানে এলে উপলব্ধি হয় যে তুমি যতদিন ‘জনগণ’ হয়ে বাঁচবে, ততদিন তোমার ‘রোটি কাপড়া
অউর মকান’ নিয়ে সমস্যা থাকবে। যদি এসব সমস্যা থেকে রেহাই পেতে চাও, তবে জনতাগিরি ছেড়ে
বড়মানুষির গ্রুপে ঢুকে পড়ার কোন শর্টকাট খুঁজে নাও।
ফুটপাথের উপর এক জায়গায় ধুতি-পাঞ্জাবী-টুপি পরা কয়েকজন ভদ্রলোক পায়চারি করতে করতে
আড্ডা দিচ্ছিলেন। এদের চেহারায় বেশ খুশি খুশি ভাব। কখনও কখনও খুশির আবেগে এঁরা বন্ধুদের
পায়ের কাছে পিচ করে পানের পিক ফেলছিলেন। রুপ্পন বাবুর জন্ম ‘ইংরেজ ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের
পরে। উনি বেশ আত্মবিশ্বাসের সংগে বললেন, “খোদা নিজের প্রিয় গাধাদের জিলিপি খাওয়াচ্ছেন।
কাকে কী বলা যায়! গাছের ডালে ডালে পেঁচা বসে আছে”।
এই কাব্য বা প্রবাদ জনসাধারণের মধ্যে বহুপ্রচলিত, এটা আউড়ে রুপ্পন কোন মৌলিকতার নমুনা
দেখান নি। কিন্তু ওনার বলার ভাবভঙ্গি এমন যেন বেশ গভীর কোন বাণী দিচ্ছেন। প্রিন্সিপাল ওনাকে
তোল্লাই দিয়ে বৈদ্যজীকে বললেন, “চলুন মহারাজ। কিছু খেয়ে নেয়া যাক। ছেলেটার শরীর খারাপ
লাগছে”।
প্রথমে উনি পান দোকান খুঁজতে শুরু করলেন। হিন্দুস্তানিদের জন্যে এটা কঠিন কিছু নয়। যদি নির্জন
দ্বীপে রবিনসন ক্রুসোর বদলে কোন হিন্দুস্তানি আটকে পড়ে, তাহলে ‘ম্যান ফ্রাইডে’ নয়, কোন
পানওয়ালাকে খুঁজে বার করবে। বাস্তবে, সাচ্চা হিন্দুস্তানির বৈশিষ্ট্য হল লোকটা যেখানেই যাক দুটো
জিনিস খুঁজে নেবে—পানের দোকান আর পেচ্ছাপ করার জায়গা। তবে এখানে পান দোকান খোঁজার
দরকার পড়ে না। ওরাই খদ্দেরকে খুঁজে নেয়। একটু আগে সামনের দিকে পানের দোকান, পেছনের দিকে
পান দোকান, ডাইনে বাঁয়ে সবদিকেই পান দোকান। এই তিন মূর্তি সামনে যে পান দোকান দেখলেন
সেখানেই দাঁড়িয়ে পড়লেন। দোকানের বড় আয়নায় চেহারা দেখে বৈদ্যজী পাগড়ির কোণা ঠিক করলেন,
রুপ্পন বাবু চোখ টিপে মুচকি হাসির চেষ্টা করলেন, আর প্রিন্সিপাল সাহেব পানওয়ালার সংগে আলাপ
করতে ব্যস্ত হলেন।
নীচু গলায় বললেন, “তিন গেলাস, একটু গাঢ় দেখে”।
বৈদ্যজী অবুঝ বাচ্চার মত বললেন, “কী ব্যাপার? কী জিনিস”?
প্রিন্সিপাল ,” কিছু না। পান খাওয়ার আগে একটু জল খাবার ব্যবস্থা”।
পানওয়ালা ভাঙ গুলে তিনটে গেলাসে ঢেলে দিল। প্রিন্সিপাল সাহেব বললেন, “একটু গোলমরিচ আর
বাদামের দানা দিলে ভালো হয়”।
পান দোকানে একটি সুন্দর স্বাস্থ্যবান নওজোয়ানের ফটো টাঙানো ছিল। দেখে অনুমান করা যায় যে
ওটা এই থলথলে ভোঁদা লোকটার দশ-পনেরো বছর আগের ছবি। রুপ্পন বাবু প্রিন্সিপালকে কনুইয়ের
গুঁতো মেরে বললেন, “এখানে কোন ভগ্নস্তুপও নেই যা দেখে বলা যাবে—হ্যাঁ, বাড়িটা একসময় দমদার
ছিল”।
প্রিন্সিপাল সাহেব বললেন, “উঁহু, মনে হচ্ছে আর কারও ফটো”।
পানওয়ালা এরকম অপমানের কোন প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে ভাঙ ঘোঁটার গতি বাড়িয়ে দিল, বেশ
পালোয়ানি ঢঙে। রুপ্পন বাবু এদিক ওদিক দেখছেন –পুলিস না এসে পড়ে এবং বেআইনি ভাবে লুকিয়ে
ভাঙ বেচার অপরাধে পানওয়ালাকে চালান না করে দেয়!
চারদিকে খুব ইংরেজির বোলবোলাও। ইংরেজিতে বিজ্ঞাপন। সাইনবোর্ডে দোকানের নাম ইংরেজিতে।
চারপাশে সবাই ইংরেজি ঝাড়ছে—ময়লা কলারওলা ক্লার্ক, ঝলমলে পোশাকে ব্যবসায়ীর ছেলেপুলে,
রাজনীতির ভাঙাচোরা মালের ভবঘুরে মার্কা বেচুবাবু, চোখের চাউনিতে দুনিয়াকে ভস্ম করে দেয়া থুতনি
উঁচু করে চলা হেরে যাওয়া/হারিয়ে দেয়া অফিসার, কে নয়। ইংরেজি পোশাক পরে সব আসছে আর
যাচ্ছে। একটা ইংরেজি সিনেমার পোস্টারে একটি অর্ধনগ্ন বিলেতি মেয়ে একটা বিছানার উপর
অর্ধশায়িত। আর তাকে সবাই চুমো খাচ্ছে। দু-চারটে কালোকোলো নোংরা বাচ্চা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে।
পাশের কোন গ্রামোফোনের দোকানে কোন পপ-মিউজিকের রেকর্ড বাজছে। কিছু ছোকরা ভুলে গেছে
বাড়িতে যে রুটি খাচ্ছে তার গম বিদেশ থেকে গরীব বলে কান্নাকাটি করে আনা হয়েছে। তাই গানের সংগে
এলোমেলো হাত পা নাড়িয়ে ভারি খুশি। এখানে রুডিয়ার্ড কিপলিং এর মাথা নীচে ধড় উপরে করে উলটো
টাঙিয়ে পূর্ব ও পশ্চিমের সংস্কৃতির বিরাট মিলন হচ্ছে।
দুটো মেয়ে, মাথায় কাগের বাসা কোঁকড়ানো চুল, পরনে চুড়িদার পায়জামা আর পালোয়ানি ঢঙে শরীর
ফুটিয়ে তোলা কুর্তা, ইংরেজিতে আলাপ করতে করতে চলে যাচ্ছে। রুপ্পনবাবুর ইচ্ছে হল মেয়েদুটোকে
জাপটে ধরে কোথাও পালিয়ে যায়। কিন্তু নিজের এরকম বর্বর বুনো ইচ্ছাকে চাপা দিতে উনি
প্রিন্সিপাল সাহেবকে বললেন, “দেখেছেন? মনে হয়, সব ক’টা বিলেত থেকে এসেছে। ওদের পেচ্ছাপ
থেকে জন্মেছে”।
প্রিন্সিপাল সাহেব এই মানবশাস্ত্রীয় তর্কাতর্কিতে না গিয়ে বৈদ্যজীকে শুনিয়ে বললেন, “আরও
খান্না মাস্টারের সংগে দোস্তি করুন! দেখছি আপনার উপর ভালই প্রভাব পড়ছে। আপনিও অশ্লীল
চুটকি শোনাচ্ছেন”। রুপ্পন বাবু ভাঙের গেলাস ঠন্ করে পানওয়ালার দোকানে নামিয়ে রেখে বললেন,
“পেচ্ছাপ অশ্লীল হল”?
‘কথাটা পেচ্ছাপ নিয়ে নয়, খান্না মাস্টারের সংগে ওঠাবসা নিয়ে”।
রুপ্পন বাবু এবার নিজের পিতার দিকে তাকালেন। “আপনি এই প্রিন্সিপাল সাহেবকে একটু বকে দিন
তো! এখানে যেন খান্না মাস্টারের নাম টেনে না আনা হয়। নইলে, আমি যদি একবার মুখ খুলে সোজা
সুজি বলতে শুরু করি তাহলে ইনি পালাবার পথ পাবেন না”।
বৈদ্যজী যেন শান্তি ও ক্ষমার দেবদূত। তাই তাঁর দুই পাখা ফরফর করে নাড়িয়ে, অর্থাৎ গোঁফের
দুপাশে লেগে থাকা ভাঙের সরবতের চিহ্ন মুছে বললেন, “আমাকে এর মধ্যে টেনো না রুপ্পন!
প্রিন্সিপাল সাহেবের দুঃখ তুমি আজকাল খান্নার পক্ষ নিচ্ছ। তোমরা নিজেদের মধ্যে কথা বলে এর
ফয়সালা করে নাও”।
ওঁরা রিকশা স্ট্যান্ডের দিকে যাচ্ছিলেন। কিন্তু এই কথা শোনামাত্র রুপ্পন দাঁড়িয়ে পড়লেন। কাঁধের
ঝোলা ফুটপাথে নামিয়ে রেখে বললেন, “তাহলে আ জাও প্রিন্সিপাল সাহেব। প্রথমে খান্নার ব্যাপারটার
ফয়সালা করা যাক”।
প্রিন্সিপাল সাহেব চলতে চলতে অন্যদিকে তাকিয়ে বললেন, “আজ থাক, আরেকদিন হবে ‘খন”।
রুপ্পন বাবু উত্তেজিত হয়ে বললেন, “আজকের কাজ কাল করব বলে ফেলে রাখার বান্দা আমি নই। এই
ব্যাপারটার ফয়সালা এখনই হয়ে যাক। কালকের ভরসায় ছাড়লে আর কখনও হবে না”।
বৈদ্যজীর চোখে পড়ল একটা অশত্থ গাছের তলায় শিবলিঙ্গ, তার উপর একটা ছোট মডেলের মন্দির!
শিবলিঙ্গ দেখামাত্র বৈদ্যজী ভক্তিস্রোতে ভেসে গেলেন। উনি ভুলে গেলেন—এটা সাহেবি কায়দার
বাজার, এখানে ভগবানের নাম লুকিয়ে জপতে হয়। উনি অশত্থ গাছের নীচে গিয়ে ধরা গলায় শংকরের
স্তোত্র আওড়াতে লাগলেন।
এদিকে প্রিন্সিপাল সাহেব এবং রুপ্পন বাবু ফুটপাথে দাঁড়িয়ে কালকের ফয়সালা আজ করতে উদ্যত।
বৈদ্যজী চোখ বন্ধ করলেন। পেছনে রাস্তায় মোটরগাড়ি যাচ্ছে আসছে, মেয়েদের ইংরেজি মাখা গলার
স্বর হাওয়ায় কাঁপুনি ধরাচ্ছে। খেলনাওলারা কোন সিনেমায় দেখা খেলনাওলার নকল করে কানফাটানো
সঙ্গীত সৃষ্টি করছে। যেভাবে বিরোধীদের আপত্তি ও চেঁচামেচিকে অগ্রাহ্য করে মন্ত্রীরা শুধু নিজের
দলের কথা শুনে এগিয়ে চলেন, সেভাবেই বৈদ্যজী এইসব শব্দতরঙ্গকে অগ্রাহ্য করে শংকর বন্দনায়
লীন হলেন।
নানা জায়গা থেকে সংগ্রহ করা জড়িবুটিকে থেঁতো করে পিষে কাপড়ে ছেনে উনি শংকর বন্দনার যে চুরন
তৈরি করলেন সেটা এইরকমঃ
“হে শংকর! শত্রুদের মারো!
“তুমি রুদ্র, তুমি মধুময়, অখিল-সৃষ্টির সংহারকর্তা। আমাদের গাঁয়ে কলেজের ম্যানেজারগিরির
নির্বাচনে ভীখমখেড়ী হেরে গেছে। ও ব্যাটা ডায়রেক্টর অফ এজুকেশনের কাছে পিটিশন
করেছে—নির্বাচন নাকি বন্দুকের জোরে হয়েছে। ও পুলিশ কাপ্তানের কাছেও নালিশ করেছে। তুমি তো
ভাঙ খাও, ধুতরো খাও। এই হাকিমগুলোর ভ্রষ্টবুদ্ধিতে তুমি ভাঙ ও ধুতরো মিশিয়ে আরও ভ্রষ্ট করে
দাও। ওনাদের আমার পক্ষে রায় দিতে প্রেরণা দাও। হে ভূতনাথ! রামাধীন ভীখমখেড়ীকে মারো!
“হে ত্রম্ব্যক, সুগন্ধিময়, পুষ্টিবর্ধন! আমার মৃত্যুর আশংকাকে বোঁটা থেকে শসা ছিড়ে নেওয়ার মত
দূর করো! কিন্তু অমৃতত্ব যেন আমায় ছেড়ে না যায়! আর হে শিব! শত্রুদের অমৃতত্বের বোঁটা থেকে
ছিঁড়ে মৃত্যুর অন্ধকূপে ঠেলে দাও। তুমি তোমার সেবকের বাধাকে নিজের বাধা মনে করেছ। তুমি আমার
সেবকের সেবক, দাসের দাস, শনিচরের বাধা দূর কর। পঞ্চায়েত প্রধানের নির্বাচন নিয়ে শত্রুর দল
ওর বিরুদ্ধে পিটিশন দিয়েছে। তাতে শনিচরকে জিতিয়ে দাও। শত্রু পিটিশন ফেরত না নিলে ওকেও মারো!
“হে উমাপতি, জগতকারণ, পন্নগভূষণ শিব! শত্রুরা কোঅপারেটিভ সুপারভাইজার রামস্বরূপের প্রশ্ন
তুলে ইউনিয়নে তবিল তছরূপের কথা তুলেছে। ওরা চেঁচাচ্ছে--ওতে নাকি আমারও হাত আছে।
কোঅপারেটিভ নীচ, ধূর্ত এবং সৎ। একদম বাগে আসছে না। গতবার আমাকে একলা ডেকে ভয় দেখিয়ে
গেছে। তুমি ওই ইনস্পেক্টরকেও মারো!
“হে রুদ্র! দিবিলোকে তোমার অস্ত্র বর্ষা, অন্তরিক্ষে তোমার অস্ত্র বায়ু, ভূলোকে তোমার অস্ত্র
অন্ন। শত্রুকে মারতে তোমার যে অস্ত্রে ইচ্ছে তাই দিয়ে মারো! সে বাজ পড়ে মরুক, বা তুফানে উড়ে
যাক, অথবা কলেরা কিংবা গ্যাস্ট্রোইনট্রাইটিস হয়ে মরুক! যেটায় তোমার সুবিধে।
“হে শিব, হে মহেশ, আমি তোমার ধ্যান করি। তুমি পরানন্দময়, আপন তেজে নভোবকাশে ব্যাপ্ত, তুমি
অতীন্দ্রিয়, সূক্ষ্ম, অনন্ত, আদ্য, নিসসংগ, নির্লিপ্ত।
“তাই বলছি, হে শিব! শত্রুকে মারো”!
বৈদ্যজী অত্যন্ত দীনহীন ভাবে শংকরের বন্দনা করলেন। এত বড় শহরে চাকরিতে উন্নতি এবং খুব
মাল কামানোর ইচ্ছেয় শয়ে শয়ে অফিসার সাতসকালে পূজাঘরে পাঁচ ঘন্টা বসে থেকে সম্মিলিত ভাবে
যত না দীন ভাবের সৃষ্টি করেন, তার চেয়ে বেশি দীনতা একা বৈদ্যজী রাস্তায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই হৃদয়
থেকে পাঁচ মিনিটে বের করে শংকর ভগবানের সামনে নিবেদন করলেন। কিন্তু এত বেশি পরিমাণে
হওয়াতেই বোধহয় ’দীনতা’র বাজার মূল্য নীচে নেমে গেল। হয়ত এ’জন্যেই দীনভাবের উত্তম
কোয়ালিটি এবং কোয়ান্টিটি সত্ত্বেও শংকর ভগবানের উপর কোন প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ল না।
শিবলিংগ আগে যেমন ছিল এখনও তাই—অচল, অটল। একটা ছোট আগুনের ফুলকিও বেরোয় নি। গলার
মালা স্থানচ্যুত হয়ে নীচে পড়ে যায় নি।
বৈদ্যজী চোখ খুললেন। দেখলেন বাইরের দুনিয়া আগের মতই রয়েছে। একটাই তফাত—দশ গজ দূরে
রুপ্পন বাবু প্রিন্সিপালের উপর চেঁচাচ্ছেন।
“তুমি বড় তীসমার খাঁ (তিরিশজনকে বধ করা যোদ্ধা )হয়েছ। আমাকে খান্না মাস্টারের লৌন্ডা
(ছোকরা) বলছ? আমি কোন শালার দলে নেই, কেবল সত্যের সাথী। কী বুঝলে হে প্রিন্সিপাল সাহেব”?
প্রিন্সিপাল-- বড়রা যেভাবে ছোটদের বলে—সেই ভঙ্গীতে হেসে বললেন, “ব্যাস, রুপ্পন, অনেক হয়েছে।
এবার চুপ কর”।
“এখনও কিছুই হয় নি প্রিন্সিপাল সাহেব! শুনে নাও-- তুমি যে ১০৭ ধারার মোকদ্দমা শুরু করেছ, সেটা
কালকের মধ্যে মিটিয়ে নিতে হবে। কালকের যদি আর একটা শুনানির তারিখ পড়ে, তাহলে দেখে নিও,
সমস্ত ইস্টুডেন্ট ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ শুরু করে দেবে। তোমার যত দলবাজি সব ভেতরে ভরে দেবে”।
“রুপ্পন”! বৈদ্যজী এগিয়ে আসত আসতে ধমক দিলেন। কিন্তু রুপ্পনের তাতে কোন হেলদোল নেই। উনি
বললেন, ‘দেখুন পিতাজি, আমি সেদিনও কিছু বলি নি। খান্না মাস্টার আর প্রিন্সিপালের ঝগড়ার সময়
আমি হাজির ছিলাম। আমিই তো মিটমাট করিয়েছিলাম। ওই ১০৭ ধারার মোকদ্দমা পুরো মিথ্যে। খান্না
মাস্টারকে ফাঁসিয়ে দেয়ার ষড়যন্ত্র। ইস্টুডেন্ট সমাজ এর বিলকুল সাপোর্ট করবে না”।
বৈদ্যজী ঠান্ডা স্বরে বললেন, “ঠিক আছে, ঠিক আছে। এসব ঘরে গিয়ে আলোচনা করা যাবে”।
হঠাৎ প্রিন্সিপালের কী যে হল! উনি চেঁচিয়ে উঠলেন, “আলোচনা তো পরে করে নেবেন মহারাজ! কিন্তু
রুপ্পন যে ভরা বাজারে আমার অপমান করল তার কী? খান্নাকে নিয়ে আমাকে কী না কী বলল!
আপনাকে কী আর বলব, মিসেজ খান্না এর মাথাটা খেয়েছে। জানি পর্দার আড়ালে যা সব হচ্ছে,
আপনাকে বলার মত নয়”!
বৈদ্যজী গম্ভীর হলেন। “বলার দরকার নেই। সবই জানি”।
ওরা চলতে শুরু করলেন। কিন্তু রুপ্পন বাবু ওদের থামিয়ে দিয়ে বললেন, “এবার তো পিতাজী, এই কথার
ফয়সালা এখানেই করতে হবে। বলুন, আপনি কী জানেন? হ্যাঁ, বলুন! বলুন! এইসব কথাবার্তার মাঝে
মিসেজ খান্নাকে কেন নিয়ে এলেন”?
বৈদ্যজী থেমে গেলেন। নাটকীয় ভাবে প্রিন্সিপালকে দেখলেন। সেই দৃষ্টির সামনে প্রিন্সিপাল হার
মেনে নিলেন। এবার উনি একই ভাবে রুপ্পনের দিকে তাকালেন। কোন সিলির-পিলির গ্যাদগেদে লোক
হলে ওই দৃষ্টির সামনে ওখানেই মাটিতে পড়ে যেত। কিন্তু রুপ্পন বাবু এসব বিষয়ে নিজের বাপেরও
বাপ! লপলপিয়ে বললেন, “বলুন না , থেমে গেলেন কেন”?
বৈদ্যজী বড় করে শ্বাস টেনে বললেন, “আমি জানি রূপ্পন, তুমি হঠাৎ করে নিজের গুরুর প্রতি কেন
দ্রোহ করছ আর খান্না মাস্টার কেন তোমার নতুন সাথী। খোলাখুলি বলি—তোমার ওখানে যাতায়াত
আমার আর উচিত মনে হচ্ছে না”।
রুপ্পন বাবু খানিকক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলেন। ফের উনি গলায় বাঁধা রুমালটিকে আরও টাইট করলেন
এবং ঝোলা হাতে তুলে নিয়ে বললেন, “এবার বুঝেছি। আপনি আমার ক্যারেক্টার নিয়ে সন্দেহ করছেন।
সব বুঝতে পেরেছি”। তারপর আঙুল তুলে ভবিষ্যবাণী করার পোজ মেরে বললেন, “এই প্রিন্সিপাল
সাহেবই আপনার কান ভাঙিয়েছে। জানি। কিন্তু এর ফল ভাল হবে না বলে দিলাম”।
হটাৎ বৈদ্যজীর দিকে ঘুরে বললেন, “আর বদ্রী দাদা? ওনার নামে পুরো গাঁ যে ছি-ছি করছে ! উনি
বেলাকে নিজের ঘরে বসাতে চান। ওনাকে কিছু বলার হিম্মত নেই? ওনার ক্যারেক্টার নিয়ে---“
প্রিন্সিপাল বুঝে গেলেন এইবার বাজ পড়ল বলে! বড়ছেলের চরিত্র নিয়ে কেচ্ছা শুনে বৈদ্যজীর
ফুটপাথে বেহুঁশ হয়ে পড়ে যাওয়ার আশংকায় প্রিন্সিপাল রুপ্পন বাবুকে মাঝপথে থামিয়ে ধমকে
উঠলেন, “কী আজেবাজে বকবক করছ রুপ্পন বাবু? মুখ সামলে কথা বল”।
উনি বৈদ্যজীকে বললেন, “যেতে দিন মহারাজ, রুপ্পন বাবু এখনও ছেলেমানুষ। কোথায় কি ফালতু কথা
শুনেছেন, সেটাই চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে পাড়া মাথায় করছেন”।
তবে বৈদ্যজীর প্রিন্সিপালের ধামাচাপা দেয়া সান্ত্বনার দরকার ছিল না। উনি রুপ্পনের আবেগের
ঝোঁকে চিৎকারকে শান্ত ভাবে গম্ভীর হয়ে সামলাচ্ছিলেন। ওনার চেহারায়, গোঁফের দুই প্রান্ত
কয়েকবার কেঁপে ওঠা ছাড়া, কোন পরিবর্তন চোখে পড়ছে না। রুপ্পন বাবু উত্তেজনার চোটে বদ্রী
পালোয়ানের প্রেমকাণ্ডের তিরস্কার করছিলেন। প্রথমে উনি পেছনের ইতিহাসে প্রবেশ করলেন।
তারপর ব্যাপারটার বর্তমান পরিস্থিতির বিষয়ে কিছু তথ্য এবং ডেটা পেশ করলেন। শেষে উনি
বৈদ্যজীর সব-কিছু-দেখেও-না-দেখার ভানকে কাপুরুষতা আখ্যা দিলেন এবং দুই ছেলের সংগে দু’রকম
ব্যবহারের নিন্দা করলেন। প্রমাণিত করতে চাইলেন যে বৈদ্যজীর বদ্রী এবং রুপ্পনের মধ্যে
পক্ষপাত গণতন্ত্রের মৌলিক সিদ্ধান্তের বিরোধী। কথা শেষ করতে করতে ওনার চেহারা গরম হল,
ঠোঁট ফেনা উঠে ভিজে গেল এবং চোখ মিটমিট করতে লাগল।
প্রিন্সিপাল সাহেব গোড়াতেই বুঝে গেছিলেন যে সান্ত্বনা টান্তনা দেয়া বেকার। তাই বিক্রি ভাল না
হওয়ায় বিরক্ত মিঠাইওলার দোকান গুটিয়ে ফেলার মত নিজের জিনিসপত্তর ঝোলায় ভরে ফেলেছেন।
বৈদ্যজীর কোন প্রতিক্রিয়া না দেখে রুপ্পন বাবুও চুপ মেরে গেলেন এবং এখান থেকে কী করে কেটে
পড়বেন তাই ভাবতে লাগলেন। বৈদ্যজী পুরো ব্যাপারটা এমন শান্তভাবে শুনলেন যেন ওটা রুপ্পনের
উত্তেজিত প্রলাপ নয়, বরং গীতার সমত্বযোগের সার যা ওনাকে ফুটপাথে দাঁড় করিয়ে বড় ভালবেসে
শোনানো হচ্ছে। রুপ্পন চুপ করলে উনি প্রিন্সিপাল সাহেবকে বললেন, “চলুন, স্টেশনে ফিরে যাই। মনে
হয় গাড়ি আসার সময় হচ্ছে”।
রুপ্পন বাবু ওনার পিতার অমন শান্তিপূর্ণ ভাবভঙ্গী দেখে হড়বড়িয়ে গেলেন। থতমত খেয়ে বললেন,
“আমি থাকছি। রাতের গাড়িতে ফিরব”। ওর কথা কেউ কানে নিল না। উত্তেজনা কম করার চেষ্টায়
প্রিন্সিপাল ওই বিষয়ে ঠান্ডা স্বরে কিছু বলতে চাইলেন, “ বদ্রীপালোয়ানের বিষয়ে---“।
বৈদ্যজী হাতের ইশারায় ওনাকে নিরস্ত করে বললেন, “কিছু বলার দরকার নেই। আমি কী করব ঠিক
করে ফেলেছি”।
রুপ্পন বাবুর কৌতুহল বাধা মানছিল না। কিন্তু উনি নিরুৎসাহ ভাব দেখিয়ে একটু দূরে দাঁড়িয়ে রাস্তায়
লোকজনের যাওয়া আসা দেখতে লাগলেন। বৈদ্যজী এমন একটা উঁচু স্বরে বলতে শুরু করলেন যে যার
শোনার ইচ্ছে নেই সেও শুনে ফেলবে। “আমি এতটা পুরাতনপন্থী নই। গান্ধীজি ভিন্ন জাতের মধ্যে
বিবাহের পক্ষে ছিলেন, আমিও তাই। বদ্রী আর বেলার বিয়ে সব্দিক থেকেই একটা আদর্শ হবে। তবে
গয়াদীন আমার প্রস্তাব কীভাবে নেবে সেটা বুঝতে পারছি না। দেখব’ খন”।
কথাটা বলে উনি রুপ্পন বাবুকে দেখলেন। রুপ্পনের হিম্মত হল না যে চোখে চোখ রাখে। বিড়বিড় করে
বললেন, “আমি চললাম”।
প্রিন্সিপাল সাহেবও এই প্রেম প্রসংগের এমন সরল সমাধান দেখতে তৈরি ছিলেন না। ঘাবড়ে গিয়ে মুখ
থেকে অবধী বুলি বেরোতে লাগল। বললেন, “আরে মহারাজ, আমি তো প্রথম থেকেই বুঝে গেছলাম।
আপনার মত সমাজ-সংস্কারক---“ বলতে বলতে উনি একটা রিকশাকে ডাক দিলেন।
বৈদ্যজী বললেন, “এসব কী? জানেন না আমি রিকশায় চড়ি না? টাঙ্গা ডাকুন”।
প্রিন্সিপাল ভুলের জন্যে ক্ষমা চাইলেন। বৈদ্যজী বললেন, “রিকশার প্রচলন এদেশের কলংক! মানুষ
মানুষের কাঁধে চাপবে”?
একটু পরে ওরা দু’জন টাঙ্গায় চড়ে স্টেশনের জন্যে রওনা হলেন। রিকশাকে বয়কট করা মাত্র
রিকশাওলাদের কলংক ভরা সমস্যা নিজে থেকেই মিটে গেল।
(চলবে)



0 comments: