0

গল্প - মনোজ কর

Posted in








শেষ পর্ব



পরের দিন সকালে অফিসে বসে এক কাপ চা খেয়ে থানার দিকে যাবার জন্য যখন

তৈরি হচ্ছেন পানু রায় এবং সুন্দরী তখন পানু রায়ের ফোনটা বেজে উঠলো। ফোনের

ওপারে মনীষা।

-আপনি কোথায়, মিঃ রায়?

-অফিসে, কী হয়েছে? তোমায় এত উত্তেজিত লাগছে কেন?

-সাঙ্ঘাতিক কান্ড হয়েছে। আমি প্রচন্ড ভয় পেয়ে গেছি। আমি কি আসবো আপনার

কাছে?

-আগে শান্ত হও। কী হয়েছে বলো। তারপর বলছি। এই অবস্থায় এত দৌড়োদৌড়ি করা

ঠিক নয়।

-আমি আজ সকালে অফিসে এসেছি। একটা পুরনো ফাইল খুঁজে বের করার জন্য

একবারে নিচের একটা ড্রয়ার যেখানে অনেক পুরনো ফাইল থাকে সেটা খুলেছিলাম।

খুলে যা দেখলাম তাতে আমার হাত পা কাঁপতে শুরু করেছে।

-শান্ত হও। কী দেখেছ?

-একটা রক্তমাখা তোয়ালে। রক্ত জমে কালো হয়ে গেছে। আমি এটা নিয়ে এখন কী

করবো? আপনার কাছে নিয়ে যাব? নাকি যেখানে ছিল সেখানে রেখে ড্রয়ার বন্ধ করে

দেব? আমার মাথা কাজ করছে না।

-তুমি একটু অপেক্ষা করো। তোমার কোথাও আসার দরকার নেই। দরকার হলে আমি

তোমার কাছে আসছি। শান্ত হয়ে বসো।

পানু রায় ফোন রেখে সুন্দরীকে বললেন,’আমি পেয়ে গেছি। ওরা আমার ছোঁড়া গুলিটা

পায়নি কিন্তু আমি রক্তমাখা তোয়ালে পেয়েছি। ওটাই আমার অস্ত্র।‘

-দাদু, আমি মাথামুন্ডু কিছুই বুঝছিনা।

-বোঝার দরকার নেই। মন দিয়ে শোনো। আমি এটাই বলবো যে ছোটকালী আমরা

যেটাকে ছোট বন্দুক বলছি সেটা নিয়ে রেবার অ্যাপার্টমেন্টে গিয়েছিল। ইতিমধ্যে

রেবা দেখেছে যে বড় বন্দুকটা যেটা বড়কালী তাকে দিয়েছিল সেটাতে একটা গুলি কম

আছে। এটা দেখে রেবা নিশ্চিত হয়েছিল যে বড়কালীই শিবুলালকে খুন করেছে।

সেইজন্য আমরা চলে যাবার পর রেবা ছোট বন্দুকটাকে সরিয়ে বড় বন্দুকটা একই

জায়গায় রেখে দিয়েছিল। পরের দিন পুলিশ এসে বড় বন্দুকটা দেখতে পায় এবং সেটা




পরীক্ষা করে দেখে তাতে একটা গুলি কম এবং মনের আনন্দে চলে যায়। আমি

জিজ্ঞাসা করবো আর একটা বন্দুক তাহলে কোথায় গেল?

-তারপর কী করবে দাদু? তুমি তো পুরো ব্যাপারটা গুলিয়ে দিতে চাইছো মনে হচ্ছে।

-হ্যাঁ, তাই। আমি বলতে চাইছি যে কেলো দারোগা যে তত্ত্ব খাড়া করতে চাইছে তার

মধ্যে অনেক ফাঁক আছে। এর ভিত্তিতে চার্জসিট দাখিল করা যায়না। তারপর আমি

এলিনাকে ডেকে পাঠাবো। অন্য কাউকে ডেকে পাঠালে কেলো দারোগা বলতে পারে

আমি সময় নষ্ট করছি। কিন্তু এলিনার বিরুদ্ধে ভুয়ো বিল পেমেন্ট করার অভিযোগ

আছে। ইতিমধ্যে জগাই এবং তুমি গিয়ে রক্তমাখা তোয়ালে সমেত মনীষাকে থানায়

নিয়ে আসবে। তারপর সবাই দেখবে এই বুড়োহাড়ে ভেল্কি।

-দাদু, অসাধারণ। তোমার গল্প বিশ্বাসযোগ্য বলেই মনে হচ্ছে। আসলে আমারও মনে

হচ্ছে তুমি যা বলছো সেটাই ঘটেছে। রেবা বড়কালীকে ভালোবাসে বলে তাকে বাঁচাতে

চাইছে এবং নিজের ঘাড়ে দোষটা চাপাতে চাইছে।

-তুমি যখন বিশ্বাস করছো, ওরাও করবে। আর একটা বন্দুকের হিসাব যদি ওরা দিতে

না পারে তবে আমার তত্ত্বকে খারিজ করার অস্ত্র ওদের কাছে নেই। ওরা রেবাকে

আবার জেরা করতে শুরু করবে কিন্তু রেবা মুখ খুলবে না আমি নিশ্চিত। রেবা নিশ্চয়ই

চাইবে না তার কোনও কথায় বড়কালীর কোনও ক্ষতি হয়। তোমরা মনীষাকে নিয়ে

এসো। আমি থানায় যাচ্ছি।

পানু রায় থানায় ঢুকে কেলো দারোগাকে জিজ্ঞাসা করলেন,’ আমি এলিনাকে থানায়

নিয়ে আসার জন্য একটু আগে আপনাকে ফোন করেছিলাম সবার সামনে কারণটা না

বলার জন্য। আশা করি আপনি এলিনাকে ডেকে পাঠিয়েছেন।‘ কেলো দারোগা বললো,’

এলিনাকে ফোন করে জানলাম সে আশে পাশেই একটা বিউটি পার্লারে আছে। এক্ষুনি

এসে যাবে। ভাগ্যিস! না হলে চুপচাপ সবাইকে বসে থাকতে হতো। আপনার যা গোঁ!’

-দেখুন দারোগাবাবু আপনার তত্ত্বে এত ফাঁকফোকর যে একটা যুক্তিগ্রাহ্য

চার্জসিট দাখিল করা যাচ্ছে না। দেখাই যাক না কিছু পাওয়া যায় কি না।

পানু রায়ের কথা শেষ হতে না হতেই এলিনা ঘরে ঢুকলো। পানু রায় বললেন,’ আসুন

এলিনা। আপনাকে একটু বিব্রত করলাম। বসুন, দু-একটা প্রশ্ন করেই ছেড়ে দেব

আপনাকে।

-একটু তাড়াতাড়ি করুন। আমার অনেকগুলো কাজ আছে।




-বেশ, আপনি কৃষ্ণকালীর অফিসে সেক্রেটারির কাজ করার আগে অন্য কোথাও

সেক্রেটারির কাজ করেছেন? সেক্রেটারি হিসাবে আপনার একটা কাজ হচ্ছে বিল

পেমেন্ট করা এবং ভাউচার তৈরি করা। ঠিক?

-হ্যাঁ, ঠিক।

-আপনি মাঝে মধ্যেই চেক তৈরি করে কৃষ্ণকালীকে দিয়ে সই করাতেন। কিন্তু চেক

তৈরি করার আগে নিশ্চয়ই বিলগুলো পরীক্ষা করে দেখতেন যে বিলগুলো ঠিক আছে

কি না? কাজগুলো হয়েছে কি না? জিনিসগুলো পাওয়া গেছে কি না? ইত্যাদি।

-হ্যাঁ, অবশ্যই।

-তাহলে বলুন আপনি অ্যাকমে ইলেক্ট্রিকের নামে যে সব চেক তৈরি করেছিলেন সে

সব চেক কোথায় গেল? অ্যাকমে ইলেকট্রিকের ঠিকানা ভুল এবং ভুয়ো। আপনি

সেটাও পরীক্ষা করেন নি কেন?

-না, না বিশ্বাস করুন ওর থেকে আমি একটা পয়সাও পাইনি। শিবুলাল পুরোটাই…

-কে? শিবুলাল? কেন ওকে টাকা পাঠাতেন আপনি? কাঁদবেন না, বলুন। যা সত্যি তাই

বলুন।

-শিবুলাল আমাকে বলেছিল যে ওর নতুন হোটেলে আমাকে কাজ দেবে। ও আমাকে

ঠকিয়েছে। ও আমাকে বলেছিল সিনেমায় চান্স করে দেবে। কিচ্ছু করেনি। আমাকে

লোভ দেখিয়ে আমাকে দিয়ে অন্যায় কাজ করিয়েছে। আমাকে ভাঁওতা দিয়েছে।

এলিনার কথা শেষ হওয়ার আগেই দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকলো জগাই, সুন্দরী এবং

মনীষা। মনীষার চেহারার দিকে তাকিয়ে কেলো দারোগা এবং পানু রায় শশব্যস্ত হয়ে

উঠলো। তাড়াতাড়ি সকলে মিলে ধরাধরি করে মনীষাকে একটা চেয়ারে বসিয়ে দিল।

মনীষার হাত থেকে একটা কাপড়ের প্যাকেট হাতে নিয়ে সেটা খুলতে খুলতে নাটকীয়

ভাবে পানু রায় বললেন,’ এলিনা, শিবুলালকে গুলি করার পর আপনি একটা তোয়ালে

দিয়ে বিভিন্ন জায়গা থেকে রক্ত মুছে তোয়ালেটা আপনার ব্যাগে রেখেছিলেন। তারপর

অফিসে এসে একটা পুরনো ফাইল ক্যাবিনেটে ওটা লুকিয়ে রেখেছিলেন। তারপর

কৃষ্ণকালী যখন কোট খুলে রেখে বাথরুমে গেল তখন আপনি কোটের পকেট থেকে বড়

বন্দুকটা বের করে লকারে রাখলেন আর লকার বন্দুকটা রাখলেন কৃষ্ণকালীর

কোটের পকেটে। আমি কি ঠিক বলছি?’ এলিনা খানিকক্ষণ হাঁ করে পানু রায়ের মুখের

দিকে তাকিয়ে রইলো তারপর হাউহাউ করে কাঁদতে আরম্ভ করলো। পানু রায় বললেন,’

আপনি নিজে বলবেন না আমি বলবো?’




-আমি লকার থেকে বন্দুকটা নিয়ে শিবুলালের কাছে গিয়েছিলাম ওকে ভয় দেখাবো

বলে। কিন্তু কথা কাটাকাটি হতে হতে ও আমার গলা চেপে ধরে। আমার দম বন্ধ হয়ে

আসছিল। নিজেকে ওর হাত থেকে ছাড়াবার আমার আর কোনও উপায় ছিল না। আমি

প্রথমে বুঝতে পারিনি ও মারা গেছে। মেঝেটা রক্তে ভেসে যাচ্ছিল। আমার জুতোয়

রক্তের দাগ দেখে সামনে থেকে একটা তোয়ালে নিয়ে রক্ত মুছে ওটা কোথায় ফেলবো

বুঝতে না পেরে ব্যাগে ঢুকিয়ে নিই। তারপর অফিসে ফিরে তোয়ালেটা একটা পুরনো

ফাইল ক্যাবিনেটে রেখে অপেক্ষা করতে থাকি কৃষ্ণকালীবাবুর। উনি অফিসে এসে

কোটটা খুলে বাথরুমে গেলেন। আমি সেই ফাঁকে লকারের বন্দুকটা ওনার কোটের

পকেটে ঢুকিয়ে ওনার পকেটের বন্দুকটা লকারে রেখে দিই।‘ কথা শেষ করে দু’হাতে

মুখ চাপা দিয়ে বসে রইলো এলিনা। পানু রায় বললেন,’ দারোগাবাবু। বাকিটা আপনার

কাজ।‘ কেলো দারোগা হাত জোড় করে বললো,’ আপনার ধারে কাছে পৌঁছতে আমার

বহুদিন লাগবে। আদৌ পৌঁছতে পারবোনা কোনওদিন মনে হয়।‘ পানু রায় হাসতে হাসতে

বললেন,’ আমার এখন যা বয়স সেখানে পৌঁছতে আপনার আরও চুয়াল্লিশ বছর

লাগবে। ততদিনে আমি এবং আপনি দু’জনেই থাকবো না। আজ চলি ।‘

সুন্দরী কেলো দারোগার দিকে তাকিয়ে বললো,’ একে বলে বুড়োহাড়ে ভেল্কি। ঘুঘু

দেখেছেন,

ফাঁদ তো এখনও দেখেননি।‘

পানু রায়ের অফিসে সেদিন সন্ধ্যাবেলা একে একে জগাই, কৃষ্ণকালী আর রেবা এসে

জড়ো হলো। সুন্দরী অফিসেই ছিল। সকলের জন্য চা-কফি আর স্ন্যাকসের অর্ডার

দিয়ে পানু রায়ের পাশে এসে বসলো। পানু রায় রেবাকে বললেন,’ আপনি আমাকে

সত্যিটা বলতেই পারতেন।‘ রেবা বললো,’ আমি ঠিক করেছিলাম আমি কাউকেই কিছু

বলবো না। আমি সেদিন দেখেছিলাম কৃষ্ণকালী শিবুলালের ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে গেল।

উনি আমাকে দেখেননি। পরে যখন উনি আমাকে ওনার বন্দুকটা দিয়ে গেলেন আমি

দেখলাম ওটাতে একটা গুলি কম আছে। আমি ভাবলাম কৃষ্ণকালীই কাজটা করেছে।

আমার মনে কোনও সন্দেহ রইল না। তারপরে আপনি যখন কালীকৃষ্ণকে সঙ্গে করে

নিয়ে এসে ওর বন্দুকটাও আমাকে দেবার ব্যবস্থা করলেন তখন আমার মনে হলো

যদি পুলিশ এসে কোনও কারণে যদি বড় বন্দুকটা আমার কাছে চায় আমি যাতে তখন

ছোট বন্দুকটা দিয়ে দিই। কিন্তু আমার মনে হলো ছোট বন্দুকটার জায়গায় আমি যদি

বড় বন্দুকটা একই ভাবে রেখে দিই তাহলে পুলিশ জানবে ঐ বন্দুকটা কালীকৃষ্ণ

আমাকে দিয়েছিল। কালীকৃষ্ণ সেটা মেনেও নেবে। আর যেহেতু কালীকৃষ্ণ কোনও

ভাবেই এই হত্যাকান্ডের সঙ্গে যুক্ত নয় পুলিশের কিছুই করার থাকবে না। তাই

আপনারা চলে যাবার সঙ্গে সঙ্গেই আমি বড় বন্দুকটা নিয়ে এসে ঠিক যেমনভাবে

কালীকৃষ্ণ ছোট বন্দুকটা রেখে গিয়েছিল সেইভাবে রেখে দিলাম। ছোট বন্দুকটা নিয়ে




গিয়ে রান্নাঘরে আটার বস্তার মধ্যে ঢুকিয়ে রাখলাম। কিছুক্ষণ পরে বাইরে বেরিয়ে

একটু দূরে একটা জায়গায় যেখানে একটা নতুন বাড়ি তৈরি হচ্ছিল তার সামনে ডাঁই

করে রাখা সিমেন্টের স্তূপের নিচে ঢুকিয়ে রেখে এলাম।‘

কৃষ্ণকালী বললো,’ আমি জানতাম না তুমি আমাকে দেখেছ। আমি তো একটা

হেস্তনেস্ত করার প্ল্যান নিয়ে শিবুলালের ফ্ল্যাটে গেলাম। ও আমাকে দরজা না

খুলেই জানিয়ে দিল যে দশ মিনিটের মধ্যে জরুরি কাজে কেউ আসবে এবং আমার

সঙ্গে দেখা করা সম্ভব নয়। আমার মনে হচ্ছে এলিনা তখন ভিতরে ছিল। আমি বলে

এলাম আমি রাত্রে আবার আসবো। আজ একটা হেস্তনেস্ত হবেই।‘

পানু রায় বললেন,’ তার মানে আমি যখন শিবুলালের সঙ্গে কথা বলছিলাম তখন একটা

ফোন এল। ও আমাকে বললো দু মিনিটের মধ্যে কেউ আসবে এবং আমি যেন তক্ষুনি

বেরিয়ে যাই। আমি সামনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে গিয়ে লক্ষ্য রাখতে শুরু করলাম কে

আসছে। কিন্তু বেশ কিছুক্ষণ পর্যন্ত কাউকে দেখতে না পেয়ে চলে গেলাম। আমার

মাথায় তখন আসেনি যে পিছনের সিঁড়ি দিয়ে কেউ উপরে উঠে পিছনের দরজা দিয়ে

ভেতরে ঢুকতে পারে।‘

কৃষ্ণকালী বললো,’ এখন আমি পুরো ব্যাপারটা চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি। এলিনা

পিছনের দরজা দিয়ে ঢুকেছিল। শিবুলাল ওকে চেকগুলো দেবার জন্য চাপ দিচ্ছিল। সে

এলিনাকে বলেছিল অনেকগুলো শো দেবে। এলিনা ওর অদক্ষতার জন্য নয় শিবুলালকে

টাকা পাইয়ে দেবার জন্য সবকিছু করতে রাজি ছিল। শিবুলাল যে ওকে ঠকাচ্ছে সেটা ও

আগে বোঝেনি।‘

রেবা বললো,’ আমি ওপরে গিয়ে বেল বাজালাম।কেউ খুললো না। হ্যান্ডেলে চাপ দিতেই

দরজাটা খুলে গেল। ভিতরে গিয়ে দেখলাম শিবুলালের মৃতদেহ রক্তে ভাসছে। আমার

মাথা কাজ করছিল না। পায়ের দিকে তাকিয়ে দেখি আমার জুতো রক্তে মাখামখি।

বাথরুমে গিয়ে জুতো ধুলাম। হাতের দিকে তাকিয়ে দেখি হাতে রক্ত। ভালো করে হাত

ধুয়ে পিছনের দরজা দিয়ে নিচে নেমে এলাম। ভয়ে আমার গলা শুকিয়ে কাঠ। কথা বলতে

পারছিলাম না। যেহেতু আমার দৃঢ় ধারণা ছিল যে কৃষ্ণকালীই খুন করেছে আমি চুপ

করে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।‘ কৃষ্ণকালী বললো,’ আর তুমি আমাকে বাঁচানোর

জন্য নিজে আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়াতে রাজি হয়ে গেলে? ‘ রেবা বললো,’ সে তো

বলবেনই। আপনার যেই মনে হলো যে আমি খুন করেছি আপনি পুরো ব্যাপারটা

এমনভাবে সাজালেন যাতে মনে হয় আপনি খুনী।‘ সকলে হো হো করে হেসে উঠলো।

কৃষ্ণকালী বললো,’ ঠিক আছে, এটা নিয়ে পরে কথা বলা যাবে। আপাতত জানাতে চাই

যে আমি মিঃ রায়কে একটা ব্ল্যাঙ্ক চেক দিতে চাই। আমি জানিনা ওনার ফি কত

হওয়া উচিৎ। সেটা ঠিক করার দায়িত্ব ওনাকেই দিলাম আরও অনেক দায়িত্বের




মতো।‘ পানু রায় হেসে বললেন,’ ঠিক আছে। সুবিচারের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত থাকুন।‘ পানু

রায়ের ফোন বেজে উঠলো। কালীকৃষ্ণের ফোন।

-মিঃ রায়। অনেক অনেক অভিনন্দন। কৃতজ্ঞতা জানানোর ভাষা নেই। সেদিন যে

গাড়িটা নিয়ে রেবার বাড়ি গিয়েছিলাম ঐ গাড়িটার যা দাম তার অর্ধেক দামে আপনাকে

বিক্রি করতে চাই।

-ঠিক আছে এক্ষুনি আমার অফিসে আসুন। আমার কাছে একটা ব্ল্যাঙ্ক চেক আছে।

ওটাতে অ্যামাউন্টটা বসিয়ে নেবেন।

সুন্দরী বললো,’ দাদু, তোমার সত্যিই জবাব নেই।‘

0 comments:

0

গল্প - সমরেন্দ্র বিশ্বাস

Posted in




















(১)

খেয়ামতী নদীর কিনারে নতুন তৈরী হয়েছে ঈশ্বরপুর অন্ত্যেষ্টিস্থল। অতি আধুনিক তিন তিনটে ইলেকট্রিক ফার্নেসের লোকার্পণ করা হবে। আজকে এখানে উপচে পড়া মানুষদের ভীড়। এর মূল উদ্যোক্তা আসন্ন নির্বাচণে সরকারী দলের সম্ভাব্য ভোটপ্রার্থী ও মিউনিসিপ্যালিটি নেতা পবন আগরওয়াল।

শহর ও আসপাশের প্রায় হাজার খানেক লোক জড়ো হয়েছে মাঠে। মঞ্চ থেকে বেশ কিছুটা দূরে খেয়ামতী নদী। তার কিনারা ঘেসে নতুন বানানো তিন তিনটে চুল্লী। ফার্ণেসেগুলো অটোমেটিক। ওগুলোর সামনে লেখা No.-1, No.-2, No.-3! ফার্ণেসের সাইড ও পেছনের দেয়ালগুলো ঝকঝকে, স্টেনলেস স্টীলের পাতে মোড়া। বিশাল সাইনবোর্ডগুলোতে বড় বড় হরফে লেখা - “ঈশ্বরপুর আধুনিক অন্ত্যেষ্টিস্থল।” অন্ত্যেষ্টিস্থলের পাশেই বিশাল ওয়েটিং হল, সুন্দর বসবার ব্যবস্থা, স্নান করবার একাধিক বাথরুম, প্রসাধনের জন্যে সুসজ্জিত টয়লেট!

মঞ্চে দাঁড়িয়ে ঘোষক ঘোষণা করছে – ‘আপনারা সবাই সুশৃঙ্খল হয়ে বসুন। এক্ষুণিই মিনিষ্টার মহোদয় এখানে এসে পৌঁছাচ্ছেন। দেশের প্রথম অতি-আধুনিক সৎকারশালাটির উদ্বোধন হতে যাচ্ছে এই ঈশ্বরপুর অঞ্চলে! এজন্যে আমরা গর্বিত।’

– ‘এ বিষয়ে কারিগরী সাহায্য যে বিদেশী কোম্পানীটি করেছে, যার নাম ‘ইউনিটেক ডেডবডি সলিউশন’। তাদের ম্যানেজিং ডাইরেক্টর মিষ্টার রুংতাও আজকের এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে হাজির আছেন। আপনারা সবাই সুশৃঙ্খল ভাবে অপেক্ষা করুন। মাননীয় মন্ত্রী এসে পৌঁছোলেই এই অন্ত্যেষ্টিস্থলের উদ্বোধন করা হবে!’

অল্পবয়েসী ছোকরা নীলমনি টিপ্পুনি কাটে – ‘জিন্দা অবস্থায় মানুষের দ্যাকভালের নাম নাই! মর্লে পরে মরা মানুষেরে দ্যাকভালের জন্যি ফারনিসের উদবোদন! হামাগো এই আজীব দুনিয়া!’


(২)

আজ সেপ্টেম্বরের ২১ তারিখ। মিনিষ্টার ও ভিআইপিরা আসছেন। অন্ত্যেষ্টিস্থলের উদ্বোধনের জন্যে গলাপচা ডেডবডি চলবে না! টাটকা ডেড বডি চাই। কিন্তু তা তো বললেই পাওয়া যায় না। তাই টাটকা তিনটে ডেডবডির জন্যে গতকাল থেকেই এজেন্ট ও লোকজন লাগানো হয়েছে। দালালেরা ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কাছাকাছি গ্রামে - এদিকে ওদিকে, শহরের হাসপাতালে।

ইলেকট্রিক ফার্ণেসে অন্ত্যেষ্টির এই আধুনিক ব্যপারটা এখানকার মানুষজনের কাছে এখনও কিছুটা অপরিচিত। মুস্কিলটা হলো তাদের জন্মগত সংস্কার। যার সামান্যও ক্ষমতা আছে, সে চায় নিজের প্রিয়জনটিকে প্রথাগত ভাবে শ্মশানে দাহ সৎকার করবে, কিংবা মাটির নীচে কবর দেবে। সাধারণ মানুষেরা বিশ্বাস করে, দাহকার্যে খুঁত থাকলে প্রিয়জনের আত্মা মুক্তি পায় না! তারা এই আধুনিক ফার্ণেস টার্নেস বোঝে না!

অথচ এই দেশে ‘ইউনিটেক ডেডবডি সলিউশন’ কোম্পানীর ঈশ্বরপুর অন্ত্যেষ্টিস্থল একটা সম্মানজনক প্রোজেক্ট। আজকের ফার্ণেস-ইনাগুরেশন সাকসেসফুল হলে এ দেশে আরো অনেক বিজনেস পাওয়া যাবে। এ দেশের প্রোজেক্টটার ম্যানেজিং ডিরেক্টর মিস্টার রুংতা। সে জানে, ডেড-বডি ক্রিমেশনের মার্কেট খুব ভালো! তাছাড়া তাদের কোম্পানীর সামনে থার্ড ওয়ার্ল্ডের ডেড-বডি সলিউশন-এর পুরো বাজারটাই রয়েছে!

কোম্পানীর উদ্যোগে তাই ডেডবডি খোঁজার ব্যাপারটা জোর কদমে চলছে। আজকের এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে একটা ডেডবডি সাপ্লাই করতে পারলে একজন এজেন্ট পাবে তিরিশ হাজার টাকা! এটা এদিনের স্পেশাল তোফা! আজকের অনুষ্ঠানের জন্যে ডেডবডির ইউনিটেক কোম্পানীই টাকাটা দিচ্ছে, এটাই তাদের বিজনেস স্ট্রাটেজি। তবে এদিনে পচাগলা মৃতদেহ চলবে না। সেগুলো হওয়া চাই তাজা, টাটকা। মরে যাবার অন্ততঃ আট-দশ ঘণ্টার মধ্যে আত্মীয় পরিজন সহ মৃতদেহ নিয়ে এখানে পৌঁছাতে হবে। লিগাল কারণে এখানে পরিজনদেরও হাজির থাকতে হবে, সই-সাবুদ ইত্যাদির জন্যে।

মঞ্চ থেকে ঘোষণা করা হচ্ছে, ‘বন্ধুগন, মন্ত্রীমহোদয় এয়ারপোর্ট থেকে এক্ষুনি এসে পৌঁছে যাচ্ছেন। আপনারা একটু ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করুন, প্রথম মৃতদেহটি এই জেলার ‘খুদাগ্রাম’ থেকে ইতিমধ্যেই আমাদের অন্তেষ্টিস্থলে পৌঁছে গেছে।’


(৩)

প্রথম মৃতদেহটির কাছে আজকের সকালেই এজেন্টরা সময় মতোই পৌঁছে গেছিল। ডেডবডির ব্যাপারে খবরটা ছিল পাক্কা! যেমনটা চেয়েছিল, তেমনটাই পাওয়াও গেছে!

লোকটার নাম কালোবরণ পাড়ুই, নিবাস- খুদাগ্রাম, পেশা- চাষী, সম্পত্তি- দুই বিঘা জমি ও একটা মাটির বাড়ী। পরিজন বলতে বউ, দুই আবিবাহিতা মেয়ে ও ঘরে কালোবরণের শয্যাশায়ী বাপ। ধার দেনা করে এবছর জমিতে ধান লাগিয়েছে, প্রচন্ড খরা, ক্ষেতে সেচের তেমন সুবিধে নেই। সমস্ত ধানগাছ শুকিয়ে গেছে। কালোবরণ পাড়ুই-এর নিজস্ব জমির কিনারে যেসব ফলনদার পেপে আর কলা গাছগুলো ছিলো, তাতে পঙ্গপালের ঝাঁক! পাতাগুলো সব খেয়ে ফেলে গাছগুলোকে মেরে দিয়েছে। তার উপরে ব্যাঙ্ক থেকে অনেকগুলো টাকা লোন নেয়া হয়েছে!

ক্ষোভে আর হতাশায় ভোর রাতে নিজেদের রান্না ঘরের বাঁশের সিলিং-এ কালোবরণ পাড়ুই নিজে নিজেই ঝুলে পড়েছে।

এ খবরটা বেশী রাষ্ট্র হবার আগেই দালালেরা ওই বাড়ীতে পৌঁছে গেছে। সাথে লোকটার ন্যাচারাল ডেথ সার্টিফিকেট! ওই পরিবারকে বোঝানো হয়েছে আজকে বিশেষ দিনে অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়ার দায় দায়িত্ব সরকারের। ওখানে দাহ করা হলে তাদের টাকা মিলবে! এতে আত্মহত্যা বা অস্বাভাবিক মৃত্যুজনিত কোনো পুলিশ কেসের ভয় নেই, অন্যান্য ঝুট ঝামেলাও নেই।

শেষমেশ মাত্র দশ হাজার টাকার বিনিময়ে মৃতদেহটি বিক্রি হয়ে গেল। কালোবরণ পাড়ুই-এর স্ত্রী ও তার অবিবাহিত ছোট মেয়েটি এজেন্টদের গাড়ীতে ঈশ্বরপুর অন্ত্যেষ্টিস্থলে যেতে রাজী হলো।


(৪)

তক্ষুনি দেখা গেল ইউনিটেক লেখা একটা সাদা গাড়ী প্রধান তোরণের ভেতরে ঢুকছে।

ঘোষকের ঘোষণা - ‘দ্বিতীয় মৃতদেহটি অন্ত্যেষ্টিস্থলে এইমাত্র ঢুকেছে। মৃতদের সম্মানে আপনারা একটু নীরব থাকবেন। আপনাদেরকে একান্ত অনুরোধ, দু মিনিট কেউ কথাবার্তা বলবেন না।’

দ্বিতীয় মৃতদেহ – রোশেনারা খাতুন ওরফে রোশনি। কিশোরী, বয়স- ১৬ বছর। ঠিকানা – ‘ভালোবাসা অনাথ আশ্রম’। ক্লাস সিক্সের ছাত্রী, আশ্রমের আবাসিক পড়ুয়া। এই অনাথ আশ্রমে কেটে গেছে তার বারো-তেরো বছর।

এক বানভাসি বন্যায় রোশেনারা খাতুনদের ঝুপড়ি ভেসে গেছিল নদীর স্রোতে। ভেসে গেছিল আম্মা আর তাদের পরিবারের বাকী সবাই। বাপ সৈয়দ মোহম্মদ তার ছোট্ট মেয়েটাকে জড়িয়ে একটা গাছের ডাল আঁকড়ে কি করে যে বেঁচে ছিল! এরপর তার বাপ- সৈয়দ মোহম্মদ- পাগল ও নিঁখোজ। সেসব কথা রোশেনারার আজ মনে না থাকাটাই স্বাভাবিক। কিছু সমাজসেবী ভলাণ্টিয়ারদের তৎপরতায় মেয়েটার জায়গা হয়েছিল ‘ভালোবাসা অনাথ আশ্রম’এ।

রোশেনারা যখন এসেছিল, তখন তার বয়স তিন। এখন সে ষোলো বছরের কিশোরী।

এই অনাথ আশ্রমের নতুন মহারাজ যিনি এসেছেন তার নজর কিছুদিন ধরে পড়েছিল এই পুরুষ্টু মেয়েটার উপর। সপ্প্রতি মহারাজ মুরারীনন্দ মহাশয় মাঝে মাঝেই এই মেয়েটাকে বিরক্ত করতো। ওর শরীরের দখল নিতে চাইতো। সেপ্টেম্বরের ২০ তারিখ রাত্তিরে খাবার সাথে মাদক দ্রব্য খাইয়ে নির্জন ঘরে নিয়ে গিয়ে মহারাজ মহাশয় রোশেনারাকে উপর্যুপরি রেপ করে। তার পরে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে মেয়েটাকে ঘুম পাড়িয়ে দেয়। কিন্তু ডোজটা বেশী ছিল। অনিচ্ছাকৃতভাবেই এই উচ্ছ্বল মেয়েটা ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় অনন্ত প্রভুর দিকে! মহারাজের ডাক্তারদের সাথে ঢের জানাশোনা, ওঠাবসা। খুব সহজেই স্বাভাবিক হার্টফেলে মৃত্যুর একটা সার্টিফিকেট জোগাড় হয়ে যায়।

ফুলে সাজানো ইউনিটেক লেখা একটা সুসদৃশ্য সাদা গাড়ী, সঙ্গে কোম্পানীর দালাল বা এজেন্টরা। গাড়ীতে রোশেনারা খাতুনের ডেডবডি সসম্মানে ঢুকছে ঈশ্বরপুরের অন্ত্যেষ্টি স্থলে। সেই গাড়ীতেই সাথে সাথে এসেছে আশ্রমের একজন সিস্টার অবলা দেবী। আর মুরারীনন্দ মহারাজ স্বয়ং!

এরই মধ্যে ঈশ্বরপুরের মঞ্চ থেকে ভেসে আসছে ঘোষকের কন্ঠস্বর। ‘আপনাদেরকে জানাচ্ছি, তৃতীয় মৃতদেহটি, অল্প সময়ের মধ্যেই হেলিকপ্টারে করে এখানে এসে পৌঁচ্ছাচ্ছে! আপনারা অনেকেই জানেন, এই মৃতদেহটি চেতন আগরয়ালের। দিল্লীতে একটা দুর্ঘটনায় তার মৃত্যু হয়েছিল।’

ধোপদুরস্ত সাদা পোষাকে মিউনিসিপ্যালেটির চেয়ারম্যান পবন আগরয়াল। এই ভীড়ের মধ্যে তাকে আলাদা করে চেনা যায়! তিনিই এখানে বহু আলোচিত ও সবচাইতে বেশী বিজ্ঞাপিত ‘চেতন আগরয়াল’ নামক মৃতদেহটির পিতা!


(৫)

মিঃ রুংতা এই আধুনিক সৎকারশালাটির নির্মাতা ‘ইউনিটেক ডেডবডি সলিউশন’-র অন্যতম ম্যানেজিং ডাইরেক্টর। তিনিই এই বিদেশী কোম্পানীটির তরফে এদেশে ইনভেস্টমেন্ট ও অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের সর্বময় কর্তা ।

অন্ত্যেষ্টিস্থলের একপাশে দাঁড়িয়ে পবন আগরয়াল ধীরে ধীরে থেমে থেমে কথাগুলো মিষ্টার রুংতাকে বলছিল। - ‘মাননীয় সরকার দেশের সর্বপ্রথম আধুনিক ফার্ণেসগুলো আমাদের পৌরসভাতেই বসিয়েছে। এই এলাকার মিউনিসিপ্যালেটির চেয়ারম্যান হিসেবে আমি অবশ্যই গর্বিত! আপনি তো জানেন, রাজধানীর একটা মর্‌চুয়ারীতে আমার ছেলের দেহটা অনেকদিন ধরে রাখা ছিল! আমার স্ত্রী আর বাড়ীর লোকেরা ছেলেটার অন্ত্যেষ্টি এভাবে এখানে করাতে রাজী ছিল নি। আমিই বুঝিয়ে সুঝিয়ে তাদের রাজী করিয়েছি!’

মিঃ রুংতা – ‘উই অ্যাপ্রিসিয়েট ইয়োর এফিসিয়েন্সি অ্যান্ড ডিসিশন পাওয়ার। আপনি ‘ইউনিটেক ডেডবডি সলিউশন’-এর ওয়েল-উইশার হিসেবে কাজ করছেন। আওয়ার কোম্পানী ওয়েলকাম ইউ, মিঃ আগরয়াল!’ রুংতার মনের ভাবটা এমন, তারা এই দেশে তাদের লাভজনক বিজনেসের জন্যে পবন আগরয়ালের মতো একজন যোগ্য লোক পেয়ে গেছে! ভবিষ্যতে তাকে ‘ইউনিটেক ডেডবডি সলিউশন’ নামক মাল্টি ন্যাশানালের কাজে লাগানো যেতেই পারে।

ঠিক তখনই একটা গাড়ীর কনভয়। কেন্দ্রীয় মিনিষ্টার আর এমএলএ গাড়ী থেকে নামলেন। পবন আগরয়াল আর মিঃ রুংতা এগিয়ে গেলেন তাদের রিসিভ করতে।

ভিআইপিদের বিশিষ্ট ও মাননীয় দলটি এগিয়ে গেলো স্টেজের দিকে। মঞ্চে বসে আছেন দেশের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী মহোদয়, এলাকার বিধায়ক, ইউনিটেক কোম্পানীর ম্যানেজিং ডাইরেক্টর মিস্টার রুংতা, ঈশ্বরপুর মিউনিসিপ্যালেটির চেয়ারম্যান পবন আগরয়াল আর এখানকার জেলা শাসক এবং আরো কয়েক জন ভিআইপি।

মঞ্চ থেকে ঘোষণা করা হলো,- ‘মাননীয় মন্ত্রীকে পুষ্পগুচ্ছ ও উত্তরীয় দিয়ে অভ্যর্থনা করবার জন্যে আমি ঈশ্বরপুর মিউনিসিপ্যালেটির চেয়ারম্যান মাননীয় পবন আগরয়ালকে অনুরোধ করছি। আমরা কৃতজ্ঞ ও গর্বিত। দেশের সর্বপ্রথম আধুনিক অন্ত্যেষ্টিস্থলটির উদ্বোধন এই ঈশ্বরপুরে সম্ভব হয়েছে, আর তা হয়েছে মাননীয় চেয়ারম্যানের অক্লান্ত উদ্যোগ ও মাননীয় সরকারের সহযোগিতাতেই! উপস্থিত বন্ধু ও মা-বোনদের অনুরোধ, আপনারা হাততালি দিন। মাননীয় ও সম্মানিত অতিথিদের স্বাগত জানান।’

উপস্থিত জনতার মধ্যে হাততালি উঠলো।


(৬)

প্রায় মাস দু-তিন আগেকার কথা। তখন দেশের রাজধানীতে চলছে ধুন্ধুমার কান্ড। কে দেশের নাগরিক, কে নয়, তা নিয়ে কিছু কানুন চালু হতে চলেছে। এই কানুনের সমর্থনে যেমন কয়েকটা সংগঠন আছে, তেমনি কানুনের বিরোধিতাতেও প্রচুর সক্রিয়তা চলছে। বিশেষত ইউনিভার্সিটি কলেজের ছেলেপুলেরা কানুনের বিপক্ষে। কিছু পুরুষ-মহিলারা রাস্তা আটকে জমায়েত করছে, ধর্ণায় বসেছে। রাজধানী জুড়ে কলেজের ছেলেপুলেরাও মিছিল নিয়ে রাস্তায় নেমেছে, কানুনের প্রতিবাদে।

খবরের কাগজের পাতায় সেসময় একটাই খবর। মারামারি। দাঙা - মুসলমানের হাতে হিন্দু খুন হতে যাচ্ছে। পাল্টা অভিযোগ, হিন্দুরা মুসলমানদের পাড়ায় গিয়ে পরিকল্পিত হামলা চালিয়েছে। লোকের সম্পত্তি নষ্ট হচ্ছে। টিভি আর কাগজের সংবাদ শুনে বুড়োরা বলছে, এ কেমন ছিয়াল্লিশের রায়ট ফিরে এলো রে!

মেধাবী ছাত্র চেতন আগরয়াল দেশের রাজধানীতে, এই সময়ে একটা নামকরা ইউনিভারসিটিতে পড়াশোনা করছে। অনেক দিন ধরে সে গ্রাজুয়েট, পোষ্ট গ্রাজুয়েট ...! তারপরেও চেতনের পড়াশুনা শেষ হয় নি। একের পর এক ডিগ্রী! একাধিক বিষয় নিয়ে তার পিএইচডি - গবেষণা চলছে। বাড়ির সাথে তেমন সম্পর্ক নেই। কখনো সখনো বছরে এক আধবার নিজের বাড়ি ইশ্বরপুরে ঘুরতে আসে। যখন আসে, মা কান্না কাটি করে। বড়ভাই বোঝায় - ‘পড়াশোনা তো অনেক করলি। ঈশ্বরপুরে ফিরে আয়, আমাদের ফ্যামিলি-বিজনেসে বাবাকে হেল্প কর!’

‘তোদের এই ঘুণ-ধরা সমাজ ব্যবস্থা, এর মধ্যে মাথা গুঁজে থাকতে আমার মোটেই ভালো লাগে না!’ এরকমই চেতন-এর কাছ থেকে জবাব আসে। অগত্যা কি আর উপায়?

সেদিন রাজধানীতে একটা এন-আর-সি বিরোধী মিছিলে ছিল। চেতন আগরয়াল তাতে নেতৃত্ব দিচ্ছিল। শ্লোগান দিতে দিতে মিছিলটা এগোচ্ছিল। অনেকটা দূরে পুলিশ দাঁড়িয়ে। ঠিক তখনই রাস্তার বিপরীত দিক থেকে গোটা পাঁচ-ছয়েক জীপ আর এসইউভি এসে দাঁড়ালো। গাড়ী থেকে নামলো গোটা কুড়ি যুবক, চোখে কালো চশমা, মাথায় হলুদ পাগড়ী, মুখে রুমাল, হাতে ভোজালি, নয়তো রিভালবার।

লোকগুলো প্লান করেই এসেছিল। ওরা নেমেই মিছিলটাকে আটকালো।

‘থাম্‌। এ মিছিল আর আগে যাবে না।’

‘আমরা এন-আর-সি প্রস্তাবের বিরোধিতা করি।’

‘এন-আর-সি আইন পাশ হলে তোদের কি? বাপ তো মাসে মাসে টাকা পাঠাচ্ছে! বাপের আর সরকারের পয়সায় কলেজের হোটেলে আয়েস করছিস। মুখে বড়ো বড়ো শ্লোগান!’

ছাত্ররা মিছিল নিয়ে এগোতে চাইল।

কিছু বুঝে উঠবার আগেই বিপরীত তরফ থেকে ছুটে এলো আঘাত। গুলি চললো, ছোরা চললো। কয়েকটা লাশ পড়লো।

এর মধ্যে চেতন আগরয়াল-এর আঘাত গুরুতর। তার শরীরে মাথায় ছোরা আর গুলি দুটোই চলেছে। কিন্তু মরে নি।

আতাতায়ীরা এসেছিল, কলেজ ইউনিভার্সিটির ছাত্রদের এই মিছিলটাকে উচিত শিক্ষা দিতে। যেমন করে ঝড়ের মতো তারা এসেছিল, তেমনি অত্যন্ত দ্রুততার সাথে হামলাকারীর দল গাড়ী নিয়ে হাওয়া হয়ে গেল।

পুলিশেরা আক্রমণকারীদের গাড়ীর নম্বর লিখেছিল কিনা বোঝা গেল না। কিন্ত গুরুতর আহত অবস্থায় চেতন-কে তারা সরকারী হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দিল। সেই সঙ্গে মিছিলের নেতা চেতন আগরয়ালের বিরুদ্ধে হামলাবাজী আর অপরাধমূলক কাজকর্মের জন্যে কেস দায়ের করা হলো।

খবরটা সংবাদ মাধ্যমে উঠতেই চারদিকে খুব হৈচৈ! প্রচুর বিতর্ক, আলোচনা, সমালোচনার ঝড় উঠলো!

ঈশ্বরপুর থেকে খবর পেয়ে চেতনের বাবা পবন আগরয়াল ছুটে এসেছিল রাজধানীতে। সেই সময় চেতন আই সি ইউতে! বাপের চোখে মুখে বিরিক্তি! এই অপদার্থ সন্তান তাকে আর শান্তিতে থাকতে দিল না!

প্রায় একমাস কোমায় থেকে চেতন আগরয়াল মারা গেল।

তারপরেও হয়রাণির শেষ নেই। চেতনের বডি হিমঘরে ঢুকলো। কিন্ত বডিকে তদন্তের খাতিরে সহজে ছাড়া হলো না। বডির পোষ্টমর্টেম হলো। তারপরেও বাবা পবন আগরওয়লের ইচ্ছেতেই পরিকল্পিত ভাবে চেতনের বডি অন্য আরেকটা হিমঘরে লম্বা সময়ের জন্যে সুরক্ষিত রাখা হলো!

ততদিনে তাদের গ্রাম ঈশ্বরপুরে ‘ইউনিটেক ডেডবডি সলিউশন’এর আধুনিক শ্মশানস্থল তৈরী হয়ে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের জন্যে রেডি!

নিজের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার জন্যে পবন আগরওয়াল দিন কয়েক আগেই ঘোষণা করলেন – নিজের এলাকা ঈশ্বরপুরেই তার নিহত পুত্রের সৎকারকার্য করা হবে। আর সেটা হবে আনুষ্ঠানিকভাবে অন্ত্যেষ্টিস্থলটি উদ্বোধনের দিনেই। মাননীয় কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর উপস্থিতিতে। পবন আগরওয়ালের গোপন ইচ্ছে কি ছিল? নিজের নাম কামাবার? শাসক দলের হয়ে আগামী নির্বাচনে ভোটে লড়বার?

তখনই আকাশে হেলিকপ্টারের শব্দ। চেতন আগরয়ালের লাশ নামছে ঈশ্বরপুর শহরে। রাজধানীর একটা হিমঘর; সেখান থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে, চেতনের বডিটা প্রাইভেট হেলিকপ্টারে তুলে দিয়েছে পবন আগরওয়াল–এর এক আত্মীয়, ওর ইউনিভারসিটির কয়েকজন ছাত্রবন্ধু ও অনুরাগী।

তৃতীয় মৃতদেহটি হেলিকপ্টারে করে এখন ঈশ্বরপুর জনসমাবেশের পাশেই নামছে। একটা যান্ত্রিক শব্দ। তখন সমস্ত সভা ও মঞ্চ জুড়ে একধরণের সাময়িক নিস্তব্ধতা।


(৭)

মঞ্চ থেকে অনেকটা দূরে তিন তিনটে চুল্লী। উপরের জ্বলজ্বলে লেখাগুলো - “ঈশ্বরপুর আধুনিক অন্ত্যেষ্টিস্থল”।

চুল্লীগুলোর ডানধারে বিশাল সাইজের ইলেকট্রিক ট্রান্সফর্মার। খাম্বায় মোটামোটা ইলেকট্রিক কেবল। ট্রান্সফর্মার থেকে ওভারহেড ইলেকট্রিক কেবলগুলো চলে গেছে চুল্লীগুলোর দেয়ালের ভেতরে। পাম্প হাউজ থেকে ফার্নেসের গেট আর ইলেকট্রোডগুলোকে ঠান্ডা রাখার জন্যে সবুজ রঙের জলের পাইপ। পাশেই পাম্প হাউজ। অন্ত্যেষ্ঠিস্থলের ভেতরেই ঝকঝকে বিশাল ওয়েটিং হল, বাথরুম, প্রসাধন কক্ষ!

আধুনিক সৎকারশালার এক নম্বর চুল্লীতে প্রথম-প্রবেশের সৌভাগ্য অর্জন করতে যাচ্ছে যে মৃতদেহটি, সে হলো, কালোবরণ পাড়ুই। ইতিমধ্যে এটাও রাষ্ট্র হয়ে গেছে, দীর্ঘ অসুস্থতার ফলে খুদাগ্রামে তার মৃত্যু হয়েছে গতকাল ভোর রাত পাঁচটায়। তার স্ত্রী, কন্যা ও জনৈক প্রতিবেশী-আত্মীয় এখন এই অন্ত্যেষ্টিস্থলে উপস্থিত।

মঞ্চ থেকে ঘোষক অনুরোধ জানিয়ে বললো,- ‘আমাদের নিকটবর্তী গ্রাম-অঞ্চলের বাসিন্দা কালোবরণ পাড়ুইএর অন্ত্যেষ্টি এক-নম্বর চুল্লীতে করা হবে। মাননীয় মন্ত্রী দেশমুখজীকে অনুরোধ করা হচ্ছে আপনি রিমোট টিপে ১-নম্বর চুল্লীটির উদ্বোধন করুন।’

মাননীয় মন্ত্রী উঠে দাড়ালেন। রিমোটের বাটন টিপলেন। দূর থেকে সবাই দেখলো, ১-নম্বর চুল্লীর বন্ধ দরোজাটা নিজে নিজেই অটোমেটিক খুলে যাচ্ছে। চেম্বারের ভেতর থেকে অটোমেটিক গড়িয়ে গড়িয়ে বাইরে আসছে একটা লোহার ট্রলি। চুল্লীর ভেতরটাতে গনগনে লাল!

‘ইউনিটেক ডেডবডি সলিউশন’ এর ভলান্টিয়ারা কালোবরণ পাড়ুই-এর পুষ্পাচ্ছাদিত দেহটি সুসজ্জিত ট্রলিটায় শুইয়ে দিল। ধীরে ধীরে ট্রলিটা ১-নম্বর চুল্লীর ভেতরে আটোমেটিক ঢুকে গেল। তারপরে নিজে নিজেই বন্ধ হয়ে গেল চুল্লীর দরোজাটা। বাইরে একটা লাল লাইট বিপ বিপ জ্বলতে নিভতে লাগলো। ইলেকট্রিক ফার্ণেসে তার দেহটা তখন পুড়তে শুরু করেছে।

কালোবরণ পাড়ুই এর স্ত্রী ও মেয়েটা তাদের শুখা চাষের জমি, গতকাল রাতে ফান্দে ঝোলা তাদের পরিবারের লোকটার কথা মনে করে হো হো করে কেঁদে উঠলো। ইউনিটেকের একজন এজেন্ট গোছের লোক ওখান থেকে স্ত্রী ও মেয়েটাকে সরিয়ে নিয়ে গেলো।

ঘোষক ঘোষণা করলেন। এরপর মাননীয় এমএলএ-র পালা। তিনি উঠে দাঁড়ালেন। রিমোট–এর বোতাম টিপলেন। আগের মতোই ৩-নম্বর চুল্লীটির গেট আটোমেটিক খুলে গেল। ‘ইউনিটেক ডেডবডি সলিউশন’ এর ভলান্টিয়ারা দ্বিতীয় মৃতদেহটা ট্রলিটায় শুইয়ে দিল। ষোলো বছরের আবাসিক মেয়ে রোশেনারা খাতুন-এর বডিটা চুল্লীর চেম্বারে আটোমেটিক ঢুকে গেল। বাইরে বিপ বিপ করে আলো জ্বলছে। রোশেনারার শরীরটা নতুন টেকনোলজির আধুনিক আগুনে তখন ধীরে ধীরে পুড়ছে!

অনাথ আশ্রমের সিস্টারটি নিজের চোখের জল মুছলো আর হাউ হাউ করে কেঁদে উঠলো। অনাথ আশ্রমের মহারাজ নিজে থেকেই দূরে সরে গেলেন। ইউনিটেক এর দুজন ভলান্টিয়ার সিস্টার অবলা দেবীকে জনতার সামনে থেকে দূরে সরিয়ে নিল।


(৮)

চেতন আগরওয়াল –এর বডিটা হেলিকপ্টারে পৌঁছে গেছে। সেটাকে কাছের খালি মাঠটাতে নামানো হয়ে গেছে। প্যাকেটে মোড়া প্রায় দেড়-দুমাসের পুরানো লাশটা, একটা সুসজ্জিত গাড়ীতে করে ইউনিটেক কোম্পানীর ভলান্টিয়ারদের তৎপরতায় ইতিমধ্যেই পৌঁছে গেছে ২-নম্বর চুল্লীর সামনে।

যেহেতু চেতন আগরওয়াল এই ঈশ্বরপুর শহরের সুযোগ্য সন্তান, যেহেতু তার পিতা এই অঞ্চলের নেতা ও মিউনিসিপ্যালেটির চেয়ারম্যান - তাই উপস্থিত জনতারা সবাই উঠে দাঁড়ালো। শ্রদ্ধাভরে নীরবে চেতনের মৃত আত্মাকে স্মরণ করলো।

চেতনের মা চেয়েছিল, তার ছেলের মুখটা শেষ বারের মতো একবার দেখবে। কিন্তু সবাই বাধা দিল। দুমাসের পুরাণো, মর্গে থাকা, ঠান্ডাঘর থেকে নিয়ে আসা একটা ফ্রীজার ভর্তি লাশ! হয়তো নানা রকম ভাইরাসও থাকতে পারে। এটা এখন ফ্রীজার থেকে বের করে আনা শুধু মাত্র একটা কাপড়ের প্যাকেট – লম্বা মানবাকৃতি, টেপ দিয়ে মোড়ানো। তাই এই লাশটি খোলবার বা মৃত মানুষটির মুখ দেখাবার কোনো সম্ভাবনাই ছিল না।

মঞ্চ থেকে ঘোষণা করা হলো,- ‘এরপর তৃতীয় যে মৃতদেহটা আসছে, তিনি এই ঈশ্বরপুরেরই সুযোগ্য সন্তান - চেতন আগরওয়াল। তার পিতা পবন আগরয়ালের সম্মতি অনুসারে আমরা ২-নম্বর চুল্লীতে তার দাহকার্য সম্পন্ন করতে যাচ্ছি। আমার আনুরোধ, মাননীয় পবন আগরওয়াল স্যার, আপনি নিজেই দ্বিতীয় চুল্লীটির উদ্ঘাটন করবেন। আমরা এযাবৎকাল দেখেছি পুত্রই পিতার মুখাগ্নি করে থাকে! এবারে হতে যাচ্ছে স্মরণীয় ও ব্যতিক্রমী ঘটনাটি! ঈশ্বরপুরের মাননীয় চেয়ারম্যান পবন আগরওয়াল তার প্রিয় সন্তানের সৎকার করবেন রিমোট সুইচ দিয়ে, এই মঞ্চে বসেই।’

মঞ্চ থেকে ঘোষণার সাথে সাথে পবন আগরওয়াল চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। তাকে সহানুভূতি ও শ্রদ্ধা দেখাতে মঞ্চের বাকী সবাই আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। অনুষ্ঠানের প্রোটোকল ও ঘোষকের অনুরোধ মতো পবন আগরওয়াল ফার্ণেসের রিমোট-বাটন টিপলো। আগের মতোই ২-নম্বর চুল্লীর গেট খুলে গেল। ইউনিটেক কোম্পানীর অ্যাপ্রণ-পরা ভলান্টিয়ারেরা কাপড়ে মোড়া একটা প্যাকেটকে ধরাধরি করে শুইয়ে দিল ২-নম্বর ফার্নেসের স্বয়ংক্রিয় ট্রলিতে। সব কিছুই অটোমেটিক। চেতন আগরওয়ালের শরীরটা ফার্নেসের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে। দরোজা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বাইরের লাল লাল আলো বিপ বিপ করে জ্বলছে আর নিভছে!

এবার কিছু সমাপ্তিমূলক ভাষণ শুরু হবে।

মাঠের দক্ষিণ কোনে বিনা মূল্যে বোতলজাত মিষ্টি পানীয়, চা আর জলখাবারের প্যাকেট বিতরণ করা শুরু হয়েছে। অনুষ্ঠানটিকে আকর্ষনীয় করবার জন্যে সরকার আর ইউনিটেক কোম্পানীর তরফে এইসব ব্যবস্থা! কারণ বহুজাতিক কোম্পানীরা বিজনেসকে আকর্ষনীয় ভাবে পরিবেশন করতে জানে। ধীরে ঘীরে কিছু জনতা জলখাবারের লোভে মাঠের দক্ষিণ কোনের দিকেই এগোচ্ছে।


(৯)

ঠিক তক্ষুনিই প্রচন্ড বিস্ফোরণের শব্দ! লোকজনদের মধ্যে হৈহুল্লোড় শুরু হয়ে গেল! মঞ্চ থেকে তড়িঘড়ি করে নামতে গিয়ে মিনিষ্টার মহোদয় হাঁটুতে চোট পেলেন। জনগন সবাই এলোপাথারি দৌড়াচ্ছে! ফার্ণেস তিনটের মাঝখান দিয়ে আগুন গলগল করে বাইরে বেরিয়ে আসছে। বিস্ফোরণটা হয়েছে মাঝখানের ফার্ণেসটাতে। দু নম্বর চুল্লীটার ছাদ ধ্বসে গেছে। সামনের দরোজাটা বেঁকেচুরে গেছে। দরজার হা-করা ফাঁক থেকে দেখা যাচ্ছে হলদেটে আগুন, উত্তপ্ত চেম্বারের দেয়াল। ১-নম্বর ও ৩-নম্বর ফার্নেসের দেয়ালেও ফাটল ধরেছে। সেখানেও লাল গনগনে আগুনের নিশানা! চারদিকটা সাদা ধোয়ায় ধোয়ায় ছেয়ে যাচ্ছে!

উপস্থিত ইউনিটেক কোম্পানীর দুজন ইঞ্জিনীয়ার ছুটে গিয়ে ট্রান্সফর্মারের বিজলি সাপ্লাই কেটে দিল। তখনো সবাই হতভম্ব! জনতারা জমায়েত ছেড়ে দৌড়ে পালাচ্ছে। সবার মুখে প্রশ্ন - হলোটা কি?

ভাগ্যক্রমে ফার্নেসের কিছু ইট, স্টীলের পাত আর লোহালক্কড়গুলো বিস্ফোরণের সময়ে উড়ে গিয়ে, সামনে নয়, পেছনে দিকে নদীটার কিনারে পড়েছিল। তাই তেমন কেউ হতাহত হয় নি।

একদল পুলিশ পুরো জায়গাটাকে কর্ডন করে ঘিরে ফেলেছে।

এত বড়ো একটা আয়োজন। সরকারী আর বিদেশী কোম্পানীর একটা সম্মানজনক প্রোজেক্ট! মন্ত্রী, এমএলএ, মান্যগন্যদের নিয়ে সমস্ত আয়োজন। সবটাই এমন মাটি হলো কেন? কার জন্যে? কার জন্যে?

সেই ভাঙ্গা মেলায় কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে সাংবাদিকদের জটলায় একজন বললো – নিশ্চয়ই কোন উগ্রবাদী দলের কাজ!

আরেক জন কারিগরী জানা দাদা বললো, - না না এটা টেকনিক্যাল ফল্ট। ইউনিটেক কোম্পানীর সাপ্লাই আর ইরেকশনের গলতি। ফার্ণেসের গেট নয়তো হিটিং ইলেকট্রোডের কুলিং কয়েল ফেটে উত্তপ্ত ফার্নেসের গনগনে আগুনের ভেতর ঠান্ডা জল ছড়িয়ে পড়েছিল! তার জন্যেই এই ভয়ংকর বিস্ফোরণ!

- তাহলে মাঝখানের ২নম্বর ফার্নেসেই ব্লাষ্টটা হবে কেন?

আরেকজন এতক্ষণ চুপচাপ ছিল, সেই অভিজ্ঞ মানুষটি হেসে বলে উঠলো – আরে বুঝলেন না? ওই ২-নম্বর ফার্নেসে চেতন আগরওয়ালের ডেডবডিতে নিশ্চয়ই কেউ বিপ্লবীমার্কা কোনো বই অথবা কোনো বিস্ফোরক-ডিটোনেটর লুকিয়ে রেখেছিল! যে ছেলেটার শব দাহ করা হচ্ছিল, সে ছিল ভোটপ্রার্থী ধান্ধাবাজদের এমনতরো লোকদেখানো অনুষ্ঠানের বিরোধী!

0 comments:

0

কবিতা - ঝানকু সেনগুপ্ত

Posted in







রাষ্ট্র আমাকে ছোটবেলায় মিশ্রণের অঙ্ক শিখিয়ে বাজারে নামিয়ে দিয়েছিল
সেই থেকে আমি শুধুমাত্র লাভের জন্য
হরেক রকম পসরা সাজিয়ে রেখেছি
সম্পর্কগুলোকে বেচে দিয়েছি সামান্য কিছু অর্থমূল্যে
কূটনীতির চালগুলো রপ্ত করতে পেরেছি বেশ

আর হয়তো তাই
আমি এখন সেই সব নেতাদের পছন্দ করি
যারা আরও বড় মসিহা হওয়ার নেশায়
অনায়াসে হাসতে হাসতে হীরার খনির জন্য
বনাঞ্চল উজাড় করে দিতে পারে

আমি এখন সেই সব শিল্পপতিদের সমর্থন করি
যারা এই গরীব দেশের উন্নতির জন্য
পরমাণু অস্ত্র তৈরির উদ্যোগে
ইউরিনিয়াম খনির বর্জ ফেলে রাখে
শ্রমিক মহল্লার মাটিতে ;
ধূসর জীবনের সাথে মিশে যায় নিউক্লিয়ার পাওয়ার!

আমি এখন প্রায়শই পুলকিত হই!
ছাপান্ন ইঞ্চির গর্বিত বুকের কথা ভাবতে ভাবতে
দমবন্ধ করা কুম্ভ মিছিলে হেঁটে যেতে যেতে
পুনরাবিস্কার করি নিজেকে;
পিষ্ট হয়ে যাওয়া মৃতদেহের স্তুপে!

অথবা এইতো সেদিন বাজেট ঘোষণার দিন
মন্ত্রীমণ্ডলীর বাম হাতে টেবিল চাপড়ানোর সাথে
সবকিছু না বুঝেই চমৎকার ভাবে
রুদ্ধশ্বাসে দুলে উঠতেও পেরেছিলাম!

আর ঠিক তখনই চুঁইয়ে পড়া অর্থনীতির মডেলে একমুঠো ভাতের গন্ধের জন্য
ঠিকে শ্রমিকেরা নেমে পড়েছিল
বিষাক্ত ম্যানহোলের গর্তে;
আর ঠিক সেই মুহূর্তেই
ওদের মায়েদের দেয়ালচাপা কান্নার আর্তনাদ
বেমালুম ভুলে গিয়ে
গ্রুপ থিয়েটারের সিনোগ্রাফির ব্যঞ্জনা নিয়ে
কী আশ্চর্য তর্ক জুড়ে দিতে পেরেছিলাম!

আসলে রাষ্ট্র আমাকে নানা কিসিমের নেচে ওঠার মন্ত্রে দীক্ষিত করেই বাজারে নামিয়েছিল ;

সুতরাং ...

0 comments:

0

কবিতা - অমিতাভ মুখার্জী

Posted in
নিজের কোনো বাড়ি নেই
নাদুবাবুর—
তাতে নাদুবাবুর—
কিছুই মনে হয়না।
পুরো জীবনটা এগিয়েছে
ভাড়া করা ওই পুরনো বাড়িতে—
পঞ্চাশের দশক থেকে
ভাড়া দেয়, কম টাকায়, রেন্ট কন্ট্রোলে—
পুরোদস্তুর বাড়িটাকে যত্ন করেছে
নিজের মতো করে—
নিজের অঙ্কে, সময়ে সময়ে।
সারা জীবন কথা শুনতে
হয়েছে নাদুবাবুকে—
নিজের কোনো বাড়ি নেই বলে।
অবস্থাহীন বলা যাবে না
নাদুবাবুকে—
মোটের উপরে ভালোই চাকরি
করেছে—
বেশ কয়েকটা গাড়ি আছে।
ইচ্ছে করলে
বাড়ি কিনতেই পারতো—
নাদুবাবু কেন যে বাড়ি করেনি—
তা আমার কাছে ধাঁধার মতো।
আজকের, কালকের
রাজাদের মতো সঙ্কোচে বাঁধে,
নাদুবাবুর বলতে—
চারটে কুকুর রেখেছি
চার কামরার এপার্টমেন্টে—
আর অন্য বাড়িতে থাকি পরিবার নিয়ে।
নাদুবাবুর কিছুই মনে হয় না—
একটা বাড়ি বা এপার্টমেন্ট
নেই বলে নিজের —
বলতে পারেনি ওদেরকে
আজ আমি তোমাদের দলে
ঝাঁকের কই-এর মতো—
পুরো জীবনটা কাটিয়ে দিল ভাড়া বাড়িতে।

নিজের ইচ্ছেতে গিয়ে
বলতে পারেনি—
ঝাঁকের কইয়ের মতো
আমি তোমাদেরই দলে—
নাদুবাবুর কিছুই মনে হয়নি তাতে।
সন্ধেতে সিঙ্গল মল্ট হুইস্কিতে
আপাতত মনে না হওয়াকে—
ওই পুরনো বইগুলোর সঙ্গী করে
সাজিয়ে রেখেছে।
আর সময়কেও
ইস্ত্রি করা শার্টের মতো—
পাট পাট করে, সাজিয়ে রেখেছে
ওয়ারড্রবে—
আর কেউ
কিছু বলতে পারবে না
নাদুবাবুকে।

0 comments:

0

ঋতু ম্যাডামের রান্নাঘর থেকে - মৈত্রেয়ী চক্রবর্তী

Posted in




















পটলের দোলমা

দোলমা বা দোরমা টার্কিশ পদ, যার অর্থ 'something stuffed' বা 'filled'। সূত্রপাত অন‍্য কোথাও হলেও বাঙালী রান্নাঘরে বাঙালী পদ হয়ে উঠেছে সে। পটলের দোলমা অত‍্যন্ত জনপ্রিয় একটি বাঙালী পদ, যেটি আমিষ / নিরামিষ সব রকমেই দারুণ লাগে।

পুর

অনেক ধরনের পুর বানানো যেতে পারে, ডালের পুর দিতে চাইলে, ছোলার ডাল বা মুগ ডাল প্রায় সাত-আট ঘণ্টা ভিজিয়ে রেখে তারপর বেটে নিয়ে সামান‍্য কষিয়ে নিলে ডালের পুর রেডি হবে। ছানার পুর, মাংসের পুর, চিংড়ি মাছের পুর বা মাছের পুর এগুলি দিতে চাইলে ছানা কেটে জল ঝরিয়ে সামান‍্য কষিয়ে নিতে হবে। মাংসের কিমা রান্না করে নিতে হবে। চিংড়ি, নারকোল সহ বেটে নিতে হবে। পোনা মাছ সেদ্ধ করে, কঁটা বেছে, কষিয়ে নিতে হবে।

পটল

একটু বড় সাইজের পটলের দুই মাথা কেটে, গা চেঁছে নিতে হবে। খোসা একদম ফেলা চলবে না। এরপর পেটের ভিতরের বীজ টেনে বের করে নিতে হবে। তবে বীজ ও পাল্প কচি হলে রেখে দিতে হবে। পাকা বা শক্ত বীজ ফেলে দেওয়াই ভালো।

এরপর সময় নিয়ে সাবধানে ভেজে তুলতে হবে। এবার, পছন্দসই পুর নিয়ে ওই ভেজে রাখা পটলের পেটের ভেতর সাবধানে ভরতে হবে। তারপর ঝোলে ফেলে ফুটিয়ে নিলেই দোলমা পরিবেশনের উপযুক্ত হবে।

ঝোল

জিরে গুঁড়ো, ধনে গুঁড়ো, নুন, হলুদ, নারকোলের দুধ, গরম মশলা সহ নিরামিষ ঝোল কিম্বা, এর সাথে, পেঁয়াজ-আদা বাটা মিশিয়ে আমিষ ঝোল, যেকোনো ধরণের ঝোল তৈরী করে নেওয়া যায়। পটল ঝোলে ফুটে সুসিদ্ধ হলে, গরম গরম ভাতের সাথে পরিবেশন।

পরিশেষে জানাই, পুর আগের দিন তৈরী করে রাখতে পারলে পরিশ্রম কম হবে। পুর যে জিনিসেরই হোক, ওই যে পটলের কচি বীজ ইত‍্যাদি রাখা ছিলো, সেটিও বেটে পুরের মধ‍্যে মিশিয়ে দেওয়া যেতে পারে। অথবা, ঝোলের মশলা কষানোর সময়ে, তাতে মিশিয়ে দিলেও হয়। ঝোল যদি আমিষ হয়, সেক্ষেত্রে কাঁচা পেঁয়াজ বাটার পরিবর্তে পেঁয়াজ সাঁতলে নিয়ে বেটে নিলে বদহজম একদম হয় না। (নিয়মিতএই পদ্ধতিতে করে, দেখেই, লিখছি)। ডাল, ছানা, কষানোর সময়ে সামান‍্য করে নুন, হলুদ মেশানো যেতে পারে। মাছ, মাংস কিন্তু ঠিক ভাবে রান্না করে নেওয়াই ভালো, কারণ যেটুকু সময়ে ঝোলে ফুটবে, তাতে সুসিদ্ধ নাও হতে পারে। তবে, চিংড়ি কাঁচা বাটা ভরাই ভালো, নাহলে চিংড়ি শক্ত হয়ে উঠতে পারে। পটল কিন্তু একটু সময় নিয়ে ভাজতে হবে, ভাজার সময়ে প্রায় ৮০% সেদ্ধ হয়ে যাবে, বাকিটুকু ঝোলে সেদ্ধ হবে। ঝোলে পুরোটা সেদ্ধ করতে গেলে, পুর বেরিয়ে আসতে পারে, ঝোল গাঢ় হয়ে নুন-মিষ্টির ব‍্যালান্স নড়ে যেতে পারে। ঝোল নিরামিষ হলে, অবশ‍্যই কিছুটা মিষ্টি দেওয়া উচিত, নিরামিষ ঝোল মিষ্টি-মিষ্টি স্বাদের হলেই মানায়। তবে, আমিষ বা নিরামিষ, কোনো ঝোলেই, ঝাল না দেওয়াই ভালো। দিলেও খুব হাল্কা ঝাল। পুরের মধ‍্যে নুন থাকলে সেই মাপ খেয়াল রেখে, ঝোলে নুন দিতে হবে। নাহলে নুন চড়া হয়ে সব পরিশ্রম বৃথা হয়ে যাবে। মনে রাখতে হবে, নুন কম হলে খেতে বসে মিশিয়ে নেওয়া যায়(যদিও কাঁচা নুন খাওয়া অস্বাস্থ‍্যকর)। কিন্তু নুন চড়া হয়ে গেলে সে রান্না মুখেই তোলা যায় না।






0 comments: