0

ধারাবাহিক - শৌনক দত্ত

Posted in




















২২. আবহমান বাঙালী জীবন তথা বাঙালিত্বের প্রতি





সুপ্রিয়বরেষু

বাসু

তোমার চিঠি যখন পেলাম ঠিক তার চার ঘন্টা পরেই আমার ফ্লাইট ছিল লন্ডন যাবার তাই চিঠিটা পড়া হয়নি, সঙ্গে নিয়ে গেলেও কাজের চাপে সেই চিঠি আবার বারদিন পরে আমার সাথে ফিরে এসেছে। বিস্তর সময় পরে গতকাল অফিস শেষে বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় তোমার চিঠি পড়েছি। তোমার চিঠি পড়তে পড়তে আমার বারবার মনে পড়ছিল পরিমল ভট্টাচার্যর‘সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা’ প্রসঙ্গ। 'সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা' কে শুধু একটি উপন্যাস বললে ভুল বলা হবে, পরিমল ভট্টাচার্যের লেখালেখির সঙ্গে যারা পরিচিত, তারা জানে তাঁর গদ্যের একটি নিজস্ব ভূগোল আছে। তিনি নিছক কাহিনি বলেন না, তিনি ইতিহাসের গায়ে কান পেতে, হারিয়ে যাওয়া জনপদের ধ্বনি শোনেন, নদীর ভাঙন ও মানুষের স্মৃতিকে একই সঙ্গে হৃদয়ে ধারণ করেন। পরিমল ভট্টাচার্যর ‘ফিল্ড নোটস ফ্রম আ ওয়াটারবোর্ন ল্যান্ড’ তো পড়েছো তাঁর সেই নদী চেতনার দেখা এখানেও মেলে এবং তা গুরুত্বপূর্ণ, আমরা তো জানি বাংলার ইতিহাস নদী ছাড়া অসম্পূর্ণ। সাতগাঁর পতনের পিছনেও নদীর ভূমিকা ছিল। লেখক নদীকে ইতিহাসের চরিত্রে পরিণত করেছেন। এই বইটি বড় ক্যানভাসে সময়, স্মৃতি, নদীসভ্যতা, উপনিবেশ, ইতিহাস, লোকবিশ্বাস, মিথ, পরিযান, ভাষা ও মানুষের অন্তর্গত বিষন্নতার এক বিশাল আর্কাইভ। ইতিহাস, মিথ এবং স্মৃতির এক জাদুময় আখ্যান। হুগলি ও সরস্বতী নদীর মধ্যবর্তী প্রাচীন বন্দর নগরী সাতগাঁর পটভূমিতে লেখা এই উপন্যাসটি ৭০০ বছরের পুরোনো এক বিপন্ন জনপদের ও বহুবর্ণ সংস্কৃতির মহাকাব্য। বইটা শেষ করেছি অনেকদিন হলো এখনো উপন্যাসের পটভূমি, চরিত্ররা ঘিরে আছে মনে হয় মাথার প্রতিটি কোষে মিশে গেছে চোখের তারায় ফুটে ওঠে ত্রিবেণীতে গঙ্গা, ভাগীরথী ও সরস্বতীতে বিভক্ত হয়ে যাওয়ায় এই দুই শাখার মধ্যবর্তী অঞ্চলে পলি জমে জমে সৃষ্টি হয় মাছের আকৃতির এক ভূমি, যার নাম মৎস্যভূমি যা প্রাক ইসলামিক পাল ও সেন যুগ থেকে ষোড়শ শতকের শেষভাগ পর্যন্ত ধারণ করে রেখেছে জমজমাট এক বাণিজ্যকেন্দ্র, সপ্তগ্রাম বন্দর। চলতি কথায় সাতগাঁ। সপ্তদশ শতকে সরস্বতী ক্রমশ: ক্ষীণকায়া হতে শুরু করলে সাতগাঁ বন্দর তার কৌলিন্য হারাতে শুরু করে। লেখক কোনো নির্দিষ্ট সন-তারিখ ধরে এগিয়ে যাননি। এখানে ইতিহাস নির্মিত হয়েছে স্মৃতি আর শ্রুতির পথ ধরে, যেখানে অতীত এবং বর্তমান ক্রমাগত একে অপরের পিঠে এসে ভর করে। উপন্যাসটির গভীরতম পরত লুকিয়ে আছে এর সমকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতায়। বাপ্পাদিত্যকে এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র বলা যায়। তার পিতা পূর্ববঙ্গের সন্তান। যাদের বলা হয় বাঙাল। সিলেটি। তারা এখনও সিদলের স্বাদ ভুলতে পারেননি। কিন্তু তার মা শিউলি কেবল ঘটী নয়, সাতগাঁর জয়রামবাটির অন্তত সাতশো বছরের নাড়ির যোগ তাদের। বাঙাল-ঘটী শব্দের পরিচয়সূচক ব্যবহার একশো বছরের অধিক নয়। আবার বাপ্পাদিত্যর মাতামহ বা শিউলির বাপের বাড়ির বংশলতিকার গোড়ায় দেখা যায় কোন সুদূর অতীতে উত্তর ভারতের কনৌজ থেকে এসে গঙ্গা-সরস্বতীর মধ্যকার মৎসভূমিতে বসবাস শুরু করেছিলেন তারা। মাঝে দরপ খান এই অঞ্চল জয় করলে এই বংশের রামাচার্য নতুন শাসককে বলেন --'আমরা পুরোহিত বংশ বটে, তবে মন্দিরে বিগ্রপূজাই আমাদের একমাত্র বৃত্তি নয় ---- আমরা শাস্ত্র পাঠ করি, শিক্ষাশ্রমে অধ্যাপনা করি। এর বাইরে কোনোরূপ জাগতিক বৃত্তি আমাদের বর্ণে নিষিদ্ধ। বারোটি নিষ্কর গ্রাম ও সংলগ্ন কৃষিজমি থেকে আমাদের অন্নসংস্থান হয়। শত শত বছর শাসকেরা এই ব্যবস্থাকে মান্যতা দিয়েছে। আপনি ব্যতিক্রম, আপনি সেই জমিতে কর চাপিয়েছেন। আমাদের সম্মিলিত আবেদন, আপনি সেই জমি আগের ব্যবস্থায় ফিরিয়ে দিন।' দরপ খান তাদের পূর্বব্যবস্থা কেবল বহাল রাখেননি, বরং এই অঞ্চলের প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন। পরবর্তীতে সাতগাঁর জমিনে পা পড়েছে পর্তুগীজদের, পা পড়েছে ইংরেজদের -- সংমিশ্রিত হয়েছে সাংস্কৃতিক রঙ। সেই নতুন রঙে তৈরি হয়েছে একটি জনপদের ক্যানভাস। কেন্দ্রীয় চরিত্র বাপ্পাদিত্য (যার বাবা দেশভাগের ছিন্নমূল প্রত্নতত্ত্ববিদ এবং মা সাতগাঁর স্মার্ত ব্রাহ্মণ পরিবারের মেয়ে) এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি, যেখানে রাষ্ট্র তার কাছে নাগরিকত্বের প্রমাণ বা সাবুদ চাইছে। এর প্রতিটি উপাখ্যান আসলে বাপ্পাদিত্যের সেই আইনি খাঁড়ার বিরুদ্ধে এক সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ। সে প্রমাণ করতে চায়, সাতশো বছর ধরে এই মাটির জল-হাওয়ায় তার পূর্বপুরুষদের অস্তিত্ব মিশে আছে। সেই বাপ্পাদিত্যই আমাদের নিয়ে যায় ক্যানভাসের কেন্দ্রে। আমরা পিছিয়ে যেতে থাকি ক্রমশ। আশপাশটা পাল্টে পাল্টে যেতে থাকে। গলা জড়িয়ে ধরে মিথ, ফ্যান্টাসি, পুরাণ। আমরা সাতশো বছর পিছিয়ে যাই। একটি কনৌজি ব্রাহ্মণ পরিবারের নয়টি প্রজন্ম এবং উনপঞ্চাশটি চরিত্র আমাদের ঘিরে জীবন্ত হয়ে ওঠে। লেখক আমাদের নিয়ে যান হুগলি আর সরস্বতী নদীর সংযোগস্থলে থাকা সেই অদ্ভুতুরে মায়াভূখণ্ডে, যার নাম সাতগাঁ। কত ঘটনাই সেখানে ঘটে! আমরা জানতে পারি আজকের বাপ্পাদিত্য ছেলেবেলা থেকে মায়ের সঙ্গে মার্টিন্স কোম্পানির ছোটো রেলগাড়ি চেপে এসেছে এই জাদুভূমিতে, যেখানে রেলের চাকায় বাজে কেরেস্তান-গোরস্তান ধ্বনি, হাওয়া দিলে গির্জার চালে বেড়ালের কান্নার মতো শব্দ হয়, যেখানে নারীরা নদীতে ডুব দিয়ে দূরবাসিনী আত্মীয়ার সঙ্গে জলে-জলে বার্তা বিনিময় করে, নৈয়ায়িকেরা কুয়োর পেতনির শাপে ব্যাঙ হয়ে যায়, প্যারিস থেকে তরুণ কবি এসে খুঁজে পায় তার ক্লেদজ কুসুম, সার্জেন-পাদরি নদীর খাত ঘুরিয়ে দেয়, দুর্দম তুর্কী যোদ্ধা এসে মায়াবী ভূমিতে বাঁধা পড়ে, সংস্কৃত শিখে গঙ্গাস্তোত্র লেখে, পুরুষেরা পুনর্জন্ম নিয়ে বংশে ফিরে আসে, এমনকি এক ফিরিঙ্গিও ফিরে আসে কাকাতুয়ারূপে... কী অসম্ভব নিপুণ এক নির্মিতি! এতটুকু বিচ্যুতি নেই বয়ানে। উপন্যাসের প্রথমেই দেখা যায় রাষ্ট্রের নতুন নাগরিকত্ব আইনের বেড়াজালে আটকে পড়েছে বাপ্পাদিত্য। বিচারকের কাছে তার জবানবন্দিই হল এই বৃহত্তর উপন্যাস। সাতশো বছরের প্রায় নয় প্রজন্ম ধরে চলে আসা কথকতা। ইতিবৃত্ত। অবিশ্বাস্য রকমভাবে অস্তিত্ব প্রমাণের চেষ্টা করে চলেছে বাপ্পাদিত্য। আইনের চোখে তা কতটা প্রামাণ্য হিসেবে বিবেচিত হবে সেটা বড় কথা নয়, পাঠকের কাছে তা বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠতে বাধ্য করেছেন লেখক। পাঠক অনায়াসে বিশ্বাস করবেন -- শিউলির নদীর জলে ডুব দিয়ে জলমাধ্যমে দূরের প্রিয়জনের সাথে কথোপকথন কতটা বাস্তব। দরপ খাঁ, যিনি দুর্ধর্ষ তুর্কী শাসক এই জনপদের প্রেমে পড়ে এই গঙ্গার সাথে আত্মিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন। সংস্কৃত ভাষায় রচনা করেন গঙ্গাস্তোত্র। তা পাঠ করে হিন্দু ব্রাহ্মণগণ। কিংবা পর্তুগীজ নাবিকের কাকাতুয়া হিসেবে ফিরে আসা -- সবই বাস্তব হয়ে ওঠে পাঠকের চোখে। রয়েছে ইতিহাসের সত্যতা। কিন্তু রাষ্ট্রকে কিভাবে বিশ্বাস করাবে বাপ্পাদিত্য যে এই ভূমির সাথে তার কত প্রজন্মের সম্পর্ক? তার যে জন্ম সার্টিফিকেট নেই! রথীন যখন তাকে জানায় -- 'কিন্তু তুমি তো ইন্ডিয়ায় জন্মেছ বাবা! দ্যাটস আ ফ্যাক্ট'। বাপ্পাদিত্য বলে -- 'সেটা তুই জানিস, আমি জানি রাষ্ট্র তো আর জানে না। রাষ্ট্র প্রমাণ চায়'।

মিথ নির্মাণ বা ইতিহাস প্রাজ্ঞতা দেখানোর মোটিভ নয়, বরং দর্শককে দ্রষ্টব্যের আরও কাছে নিয়ে গিয়ে অস্তিত্বের একেকটা চিহ্ন পুনরুদ্ধারই যেন তাঁর একমাত্র পরিকল্পনা। এ তো কেবল বাপ্পাদিত্যর ইতিহাস নয়, বরং গোটা একটি জাতির উৎসমুখে দাঁড়িয়ে লেখকের এই পরিবেশনা। লাতিন আমেরিকার ইতিহাস যেমন নিমজ্জিত থাকে মার্কেজের তৈরি বুয়েন্দিয়া পরিবারে, ঠিক তেমনি স্মার্ত ব্রাহ্মণ পরিবারটির সাতশো বছরের প্রাককথনে ডুবে আছে বাংলার বহুস্তরীয় সংস্কৃতি ও ইতিহাস। পড়তে পড়তে মনে হতে পারে উপন্যাসটির ম্যাজিক রিয়্যালিজ়ম লাতিন আমেরিকার অনুকরণ। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না ম্যাজিক রিয়্যালিজম লাতিন আমেরিকায় যুবক হলেও বাংলাসাহিত্যে তার শৈশবকাল বহু আগেই রচিত ঠাকুরমার ঝুলি রূপকথার গল্পে আর তাই বাংলার লোকবিশ্বাস, ভূতপ্রেত, নদীপুরাণ, স্বপ্ন, মঙ্গলকাব্য, গ্রামীণ কল্পনা ও স্মৃতির ভিতর থেকে উঠে এসেছে বহুবার। বাংলার গ্রামীণ জীবনে বাস্তব ও অলৌকিকের সীমানা কখনও খুব স্পষ্ট ছিল না। মৃতেরা ফিরে আসে, নদী কথা বলে, গাছের আত্মা থাকে, বাতাসে পূর্বপুরুষের ফিসফিসানি শোনা যায়। ‘হাওয়াতাঁতি’ শব্দটিই এই অলৌকিক বাস্তবতার জাদু।

পরিমল ভট্টাচার্যর ‘নাহুমের গ্রাম’-এ যেমন আমরা পড়েছিলাম ‘হেলেন’ নামের পুতুলটির এক জায়গা থেকে ভাসতে-ভাসতে আর-এক স্থানে পৌঁছে যাওয়ার ইতিবৃত্ত, সাতগাঁর কাহিনিও যেন তেমনই ভেসে বেড়ায় এক প্রজন্ম থেকে আর-এক প্রজন্মের জল-হাওয়ার বুননে। ‘হয়তো সেই কাহিনির বুননের ভেতর কোনো একটি বাঁকে’ আটকে পড়ে তারা। সেখান থেকে বেরোনোর পথ খুঁজে পাওয়া বড় সহজ নয়। তবে মুক্তির এক সহজ উপায় বের করে নেওয়া যেতে পারে। পরিমল ভট্টাচার্যর পাঠবিশ্ব সম্পর্কে অনেকটাই ধারণা করে নেওয়া যায় তাঁর লেখা অন্যান্য বইগুলি থেকে, এ ছাড়াও আমরা জেনেছি গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস, বোর্হেস, সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায় কিংবা সমরেশ বসুর প্রভাবের কথা। সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা পড়তে-পড়তে মনে আসে এমনই অনেক সৃষ্টির কথা। ইনসুলারিটি থেকে মুক্তি পাওয়ার, বাঁকে আটকে পড়া থেকে বেরিয়ে আসার এ-ই এক উপায়। সাতগাঁ–পর্তুগিজ়দের পোর্তো পেক্যেনো (‌ছোট বন্দর)–তার গির্জা, ক্রীতদাস, শাকম্ভরী দেবী, বনলতা, সরোজা, কলার ভেলায় ভেসে আসা মেয়ে মান্দাসী আর সেই জলজ মৎস্যভূমি জুড়ে ঘটে চলা হাজারও অবস্থান নির্মাণ করে চলে ভাষা আর ক্ষমতার সমীকরণের কাহিনি। যেখানে ভাষা ফুরিয়ে যায়, ইতিহাসও যেন থেমে থাকে স্থির, কেবল বুদ্‌বুদের মতো মৃত সময়ের মুখের ভিতর থেকে বেরোতে থাকে জলের ধারা। জে এম কুটসিয়ার লেখা উপন্যাস ফো-র শেষ পৃষ্ঠাটির কথা মনে আসে বারবার, ক্রুসো আর তার ফ্রাইডে যেন আদিরামবাটির কোনও বংশধর! কুটসিয়ার এই উপন্যাসের মূক ফ্রাইডে আর মান্দাসী দাঁড়িয়ে থাকে পাশাপাশি–কিন্তু তাদের ইতিহাস (মাইক্রোহিস্ট্রি, হিস্ট্রি ফ্রম বিলো–যা-ই বলি না কেন) শুনতে পাওয়া যায় কি আদৌ? আজও? ডুবোজাহাজের ভিতর জল স্থির, শান্ত–‘দ্য সেম ওয়াটার অ্যাজ় ইয়েস্টারডে, অ্যাজ় লাস্ট ইয়ার, অ্যাজ় থ্রি হান্ড্রেড ইয়ার্স আগো,’ লিখেছেন কুটসিয়া। এই জলের ছায়াও কি এসে পড়ে সাতগাঁয়ে? মৃত ফ্রাইডের মুখ খোলার চেষ্টা করা হয়। এ বার কি তার মুখ থেকে, নীচের মহল থেকে বেরিয়ে আসবে ভাষা? ‘His mouth opens. From inside him comes a slow stream, without breath, without interruption’। মিস্ট আর মিস্ট্রি বুনে চলে হাওয়াতাঁতিরা, অক্ষরপুঞ্জ দিয়ে গড়া হয় কল্পকাহিনি; বিরতিহীন, বিরামহীন। উপন্যাসটির আর একটি বড় গুরুত্ব তার বিষন্নতায়। কিন্তু এই বিষণ্ণতা নিছক নস্টালজিয়া নয়। এটি সভ্যতার ক্ষয় সম্পর্কে এক গভীর অনুভব। মানুষ প্রযুক্তিগত ভাবে যত উন্নত হচ্ছে, ততই একাকী, বিচ্ছিন্ন ও স্মৃতিহীন হয়ে পড়ছে। ‘সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা’ সেই শূন্যতার অনুভূতিকে ধারণ করে।

পড়তে পড়তে মনে হতে পারে এইভাষা সাম্প্রতিক সময়ের উপন্যাসের ভাষা নয় কিংবা দৃশ্যের পর দৃশ্য, কুয়াশা, নদী, ভাঙা বন্দর, পুরনো বাড়ি, বাতাসের শব্দ— সব মিলিয়ে তাঁর গদ্য অনেক সময় সিনেমাটিক। বিশেষত তারকোভস্কি-র মতো সময়কে তরল করে দেওয়ার প্রবণতা তাঁর লেখায় অনুভব করা যায়। চোখে পড়বে লেখকের বারংবার প্রসঙ্গান্তরে যাওয়া। লেখক হয়ত এভাবেই লিখতে চেয়েছেন। খানিকটা জার্নালের মতো। তাই অনেক পাঠকের কাছে এই ভঙ্গিতে চলা পছন্দসই মনে হয়ত হবেনা। তাই পাঠের তাল কেটে যেতে পারে বারবার। আজকের বাংলা সাহিত্যের একটি বড় অংশ দ্রুতপাঠ্য ও প্লটনির্ভর। সেখানে পরিমল ভট্টাচার্যের গদ্য ধীর, ধ্যানমগ্ন, বহুস্তরীয়। তিনি পাঠককে সহজ উপভোগের জায়গায় রাখেন না। বরং তাকে ইতিহাস, ভূগোল, ভাষা ও স্মৃতির স্তরগুলির মধ্যে প্রবেশ করতে বাধ্য করেন। এই ধীর গতি আজ রাজনৈতিক ভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বর্তমান সময়ের বাজার ও প্রযুক্তি মানুষকে ক্রমাগত দ্রুততার মধ্যে বন্দি করে রেখেছে। মানুষ আর থামতে জানে না, গভীর ভাবে পড়তে জানে না, মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না। ‘সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা’ সেই দ্রুততার বিরুদ্ধে এক সাহিত্যিক প্রতিরোধ। এটি পাঠককে ধীরে পড়তে শেখায়, শুনতে শেখায়, হারিয়ে যাওয়া সময়ের শব্দ শুনতে শেখায়। এই উপন্যাস উপকথায় ভরা। তার অনেকগুলোকেই অপ্রাসঙ্গিক মনে হতে পারে। মনে হতে পারে মূল উপন্যাসকে দুর্বল করেছে এবং গোলকধাঁধায় ফেলে কাহিনির অবয়ব বৃদ্ধি করা হয়েছে মাত্র। প্রথম আলো, সেইসময় পড়া বাঙালির কাছে মনে হতে পারে অজস্র তথ্য, ইতিহাস, চরিত্রের বিচিত্র সমাবেশ ঘটাতে গিয়ে পাতায় পাতায় বেশ জবরজঙ করে ফেলেছেন লেখক আরেকটু পরিমিতবোধ থাকতে পারতো কিংবা প্রশ্ন জাগতেই পারে শুরুতেই বিভিন্ন চরিত্র কাল্পনিক বলে ডিক্লারেশন দিয়ে কি লেখক একটা স্বাধীনতা নিয়েই রেখেছেন, খানিকটা আগাম জামিনের মতো আর তাই যে সব চরিত্রের ছায়া তিনি ব্যবহার করেছেন পাঠকের কাছে তাদের প্রকৃত স্বরূপ চেনানোর জন্য কোনও ফাঁক রাখেননি। যেমন কাঁঠালপাড়ার রাজমোহন চাটুজ্জেকে দিয়ে বন্দেমাতরম লিখিয়েছেন। কলকাতায় রাজেন্দ্রলাল সরকার অকাতরে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা করে গেছেন। প্রসাদ শাস্ত্রী প্রাচীন বাংলা বই-এর অনুসন্ধানে ঘুরেছে সাতগাঁ থেকে নেপাল অবধি। আরও অনেক। এইসব চরিত্রকে প্রকৃত চেহারায় লেখক কেন দেখালেন না তা বোধগম্য হয় না। চেনা চরিত্র নিয়েও কল্পনার সুযোগ তো লেখক নিতেই পারতেন। নাম বদল করে ব্যবহার ব্যাপারটাকে যেন সস্তা করে দিয়েছেন বলে মনে হতে পারে। এক যুগের বেশি সময় ধরে লিখছেন পরিমল ভট্টাচার্য তাঁর প্রিয় কালো জামা গায়ে চাপিয়ে খুঁজতে বেরোন স্মৃতিকে। গদ্যের নতুন ভাষার জন্ম দেন। বারবার প্রথা ভাঙেন। তিনি বলে থাকেন, ‘লেখায় কোন লাইনের প্রয়োজনীয়তা আছে আর কোনটা নেই, সেটা বুঝতে হবে। প্রয়োজনে খুব প্রিয় লাইন বাদ দিতে হবে।’ তাঁর লেখার একটা ধারা আছে। তিনি কোনও কিছুই কোনও বিশেষ খোপে ফেলতে চান না। ভ্রমণ, স্মৃতি, ইতিহাস এইসবের খোপে থাকতে চান না তিনি। তিনি শুধু লিখতে চান। পাঠকের কাঁধে হাত দিয়ে হেঁটে যেতে চান বহুদূর। এই বই পড়তে পড়তে মনে হয়— নদী শুধু জল বয়ে নিয়ে যায় না, সঙ্গে বয়ে নিয়ে যায় মানুষের জীবন, ভালোবাসা, বিচ্ছেদ, স্মৃতি ও বিস্মৃতি। আর সেই হারিয়ে যাওয়া সুরগুলোই যেন হাওয়ার তাঁতে বুনে চলেছে ‘সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা’। এ এক এমন পাঠ-অভিজ্ঞতা, যা শেষ পৃষ্ঠা উল্টে দেওয়ার পরও দীর্ঘদিন ধরে মনের ভেতর নদীর ঢেউয়ের মতো নিজের স্মৃতির সঙ্গে অনুরণিত হতে থাকে। লেখক জানেন তিনি সর্বজ্ঞ নন। ছায়াচ্ছন্ন অন্ধকার হাতড়েই তাঁকে কুড়োতে হয়েছে যাবতীয় মনিমুক্তো। বাপ্পাদিত্যের একক ইতিহাস মনে করিয়ে দেয় ইতালো কালভিনোর দ্য রোড টু সান জিওভান্নি, যেখানে উনি লিখছেন, ‘from the depth of the opaque I write..’ আলোচ্য উপন্যাসের লেখকও বহুমাত্রিক একটি ছায়া-অতীতকেই নির্বাচন করেছেন। ফিকশনের বহুরৈখিক গতি কখনোই পাঠককে বিভ্রান্ত করে না, বরং এই বহুস্বরীয় ইতিহাস স্বীকৃতি পায় পাঠকের ব্যক্তিগত উপলব্ধিতে। ফিকশনকে যদি একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ সমান্তরাল বাস্তব হিসেবে ধরে নেওয়া যায় তাহলে সেই বাস্তবের নির্মাণে প্রকরণগত ভাবে লেখক চূড়ান্ত সফল। ভুলে গেলে চলবে না আজকের বাপ্পাদিত্য, প্রৌঢ় বাপ্পাদিত্যের সামনে দাঁড়িয়ে আছে রাষ্ট্র। নাগরিকত্বের প্রমাণ চাইছে রাষ্ট্র। চাইছে এভিডেন্স। বাপ্পাদিত্যর সমস্ত মুখের কথা, স্মৃতির কথাকে উড়িয়ে দিয়ে রাষ্ট্র বলছে, ‘শো, ডোন্ট টেল’। বাপ্পাদিত্য বলছেন, ‘আমি ডিফেডেন্ট, আমিই ডিপোনেন্ট’। প্রত্যুত্তরে রাষ্ট্র বলছে এভিডেন্সে ইতিহাস থাকতে পারে, ভূগোল থাকতে পারে, কিন্তু সাহিত্য নয়। নো পোয়েট্রি! ঠিক এই বিপন্নতা থেকেই উপন্যাসের অবতারণা। রাষ্ট্রের সমস্ত অযৌক্তিক প্রশ্ন ও আগ্রাসী অবিশ্বাসের সামনে তাই এই আবহমানতার সচেতন প্রতিষ্ঠা। একটি জাতির ক্ষয় -জয়-দীনতা- গোঁড়ামো-বাণিজ্য, সর্বোপরি থেকে যাওয়ার বিস্তৃত ইতিহাসের প্রয়োজন এখানেই। এই বহুস্বরীয় আখ্যান এই প্রতিস্পর্ধীতার বক্তব্যেই প্রাসঙ্গিক। রাষ্ট্রের সমস্ত অযৌক্তিক প্রশ্ন ও আগ্রাসী অবিশ্বাসের সামনে তাই এই আবহমানতার সচেতন প্রতিষ্ঠা। লেখক পরিমল ভট্টাচার্যকে অভিনন্দন, কারণ তিনি রাষ্ট্রশক্তির ছুড়ে দেওয়া বিপন্নতার সামনে এভিডেন্স হাজির করাতে পেরেছেন। কালাকালের দলিল, চিরকালের এই প্রবহমান থেকে যাওয়ার অনিবার্যতাকে প্রকাশ করতেই এই বিপুল নির্মিতির দায়ভার লেখককে নিতে হয়েছে। এই আখ্যান কেবল বাপ্পাদিত্যকে নয়, আমাদেরকেও উৎসমুখে ঠেলে দেয়। সময়ের তাঁত বুনেছেন পরিমল ভট্টাচার্য। তিনিই স্বয়ং হাওয়াতাঁতি, এ নিয়ে আর সন্দেহ থাকে না।

ধান ভাঙ্গতে শিবের গাজন বলে একটা বাগধারা আছে বাংলায় আমি সম্ভবত সেটাই করে ফেললাম আজ তোমাকে লিখতে বসে, আসলে তোমার চিঠি পড়তে পড়তে বাংলার এই পরিক্রমার কথাই মনে পড়েছে বারবার। রাত এখন প্রায় একটা! সারা সোসাইটি ঘুমিয়ে গেছে দূর থেকে ভেসে আসছে জাহাজের ডাক, রাস্তার কুকুরগুলো সে সুরে সুর মিলিয়ে চিৎকার করছে, এমন সময় প্রশ্ন জাগে— সভ্যতা কি শুধুই নির্মাণের ইতিহাস, নাকি বিলুপ্তিরও ইতিহাস?



ভালবাসা সহ-

সুস্মি

২৬ জুন, ২০২৬

0 comments: