প্রবন্ধ - ইন্দ্রনীল মজুমদার
Posted in প্রবন্ধআগেকার দিনে বিধবাদের দুঃখ ও কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করা খুব দুঃসাধ্যের কাজ। সমাজের কড়া নিয়মের জাঁতাকলে পিষে যেত বিধবাদের জীবন ও ইচ্ছে। আজ থেকে প্রায় দুশো বছর আগে, খুব কমবয়সে মেয়েদের বিয়ে হয়ে যেত। আর বিয়ে হত কোনো বয়স্ক মানুষের সাথে যাঁর মৃত্যু হলে বিধবা মেয়েটির জীবনে নেমে আসত এক ঘোর অন্ধকার। এই বিধবাদের কষ্ট দূর করতে সমাজ সংস্কারক ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় এবং তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের সহায়তায় লর্ড ক্যানিংয়ের আমলে ১৮৫৬ সালের ২৬শে জুলাই হিন্দু বিধবা পুনর্বিবাহ আইন (The Hindu Widows' Remarriage Act, 1856) আইনটি প্রণয়ন করা হয়। উক্ত আইনের অধীনেই ঐ বছরের ৭ই ডিসেম্বর উত্তর কলকাতায় প্রথম বৈধ বিধবা বিবাহ সম্পন্ন হয়। আচ্ছা, এখন যদি জিজ্ঞেস করা হয় যে, প্রথম বিধবা বিবাহ কে করেছিলেন? যিনি করেছিলেন তাঁকে হয়তো আমরা অনেকেই ভুলে গিয়েছি। আজ এই লেখার মধ্যে তাঁকে আমরা আমাদের বিস্মৃতির অতল সাগর থেকে তুলে এনে স্মরণ করব। তিনি হলেন শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন।
শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন ছিলেন ঊনবিংশ শতাব্দীর একজন বাঙালি সমাজ সংস্কারক। তিনি ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সহযোগী। তিনি ছিলেন অবিভক্ত চব্বিশ পরগনা জেলার প্রাচীন কুশদহ পরগনার গোবরডাঙ্গা খাঁটুরার বাসিন্দা। তাঁর পিতা ছিলেন খ্যাতনামা কথক রামধন তর্কবাগীশ এবং দাদা গণেশচন্দ্র। শ্রীশচন্দ্র কলকাতার সংস্কৃত কলেজে অধ্যয়ন করে 'বিদ্যারত্ন' উপাধি পেয়েছিলেন এবং সংস্কৃত কলেজে প্রথমে অ্যাসিস্টেন্ট সেক্রেটারির পদে নিযুক্ত ছিলেন এবং পরে সাহিত্যশাস্ত্রের অধ্যাপনাও করেছিলেন।
আজ থেকে প্রায় ১৭০ বছর আগে ১৮৫৬ সালে যখন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের উদ্যোগে বিধবা বিবাহ আইন সরকারি অনুমোদন লাভ করে তখন কেউ বিধবা বিবাহ করতে তেমন এগিয়ে আসেনি। কিন্তু, প্রচলিত সমস্ত সামাজিক প্রথা ও সংস্কার অগ্রাহ্য করে সর্বপ্রথম বিধবা বিবাহ করতে এগিয়ে আসেন তৎকালীন মুর্শিদাবাদের জজ পণ্ডিত শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন। ৭ই ডিসেম্বর ১৮৫৬ সালে উত্তর কলকাতায় অবস্থিত রাজকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সুকিয়া স্ট্রীটের বাড়িতে বিদ্যাসাগর মহাশয় তো বটেই এমনকি রমাপ্রসাদ রায়, নীলকমল মুখোপাধ্যায়, কালীপ্রসন্ন সিংহ, প্যারীচাঁদ মিত্র, রামগোপাল ঘোষ প্রমুখ সে যুগের উল্লেখযোগ্য বিশিষ্ট পণ্ডিতবর্গ তথা বুদ্ধিজীবীদের উপস্থিতিতে শ্রীশচন্দ্র বিবাহ করেছিলেন বর্ধমানের পলাশডাঙার প্রয়াত ব্রক্ষানন্দ মুখ্যোপাধ্যায়ের দশ বছরের বাল্য-বিধবা মেয়ে কালীমতী দেবীকে। কালীমতী দেবীর প্রথম বিবাহ হয়েছিল মাত্র চার বছর বয়সে। আর তিনি বিধবা হন ছয় বছর বয়সে। সকলের উপস্থিতিতে বিদ্যাসাগর মহাশয় নিজে দাঁড়িয়ে থেকে কনের মা লক্ষ্মীদেবীকে দিয়ে কন্যা সম্প্রদান করিয়েছিলেন।
প্রায় আটশো জনকে কার্ড দিয়ে নিমন্ত্রণ করা হয়েছিল। বোঝাই যাচ্ছে যে, প্রথম বিধবা বিবাহ বাড়িতে নিমন্ত্রিতদের বেশ ভালোই ভিড় ছিল। রক্ষণশীল হিন্দু সমাজ সেদিন এই বিবাহ পণ্ড করার চেষ্টা করলেও, রাস্তায় ব্রিটিশ পুলিশ প্রহরা থাকায় তারা কোনোরকম বিঘ্ন ঘটাতে পারেনি। রাস্তায় এই ব্রিটিশ পুলিশের পাহারার মাঝে রাতের দ্বিতীয় প্রহর পালকি চেপে বিয়ে করতে এসেছিলেন শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন।
বিধবা বিবাহ আইন পাশের পর এই প্রথম বিধবা বিবাহের অধিকাংশ ব্যয়ভার বিদ্যাসাগর মহাশয় স্বয়ং বহন করেছিলেন। যদিও পরবর্তীতে এই বিধবা বিবাহ নিয়ে তুমুল সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল বিদ্যাসাগর মহাশয়কে।
বঙ্গের তথা দেশের এই প্রথম ‘বিধবা বিবাহ’ করে শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের প্রচেষ্টায় প্রবর্তিত ‘বিধবা বিবাহ আইন’-কে সামাজিক ক্ষেত্রে প্রচলন করেন। তবে, বিধবা বিবাহ করার পর শ্রীশচন্দ্রকে অনেক সামাজিক প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছিল। প্রথম বিধবা বিবাহ করার ফলে তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজের চক্ষুশূল হয়ে উঠেছিলেন তিনি। গোবরডাঙার বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ পবিত্র মুখ্যোপাধ্যায়ের মতে, “সমাজ সংস্কারক শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্নকে শুধুমাত্র বিধবা বিবাহ করার জন্য গোবরডাঙায় তাঁর পৈত্রিক ভিটেতে আসতে নিরুতসাহিত করেন তৎকালীন ব্রাক্ষণ সমাজের মাথারা।”
এদেশের তৎকালীন গোঁড়া রক্ষণশীল সমাজ না দিলেও বিধবা বিবাহের মতো কাজ করার জন্য ইংরেজ সরকার এই সমাজ সংস্কারককে বিশেষ মর্যাদা ও সম্মান দিয়েছিল। শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন একসময় বঁনগার ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের পদেও উন্নিত হয়েছিলেন। ১৮৭০ সালে গোবরডাঙা পৌরসভা স্থাপিত হলে তিনিই প্রথম পৌরপিতা হন। স্ত্রী কালীমতী দেবীর মৃত্যুর পর সমাজ ব্যবস্থার চাপে প্রায়শ্চিত্ব করে শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্নকে গোবরডাঙায় তাঁর পৈত্রিক ভিটেতে আসতে হয়। প্রথম পৌরপিতা হিসেবে তিনি গোবরডাঙার বিপুল উন্নয়ন ঘটিয়েছিলেন। গোবরডাঙা পৌরসভা স্থাপন তো বটেই এমনকি তিনি রেললাইন স্থাপন করেছিলেন। তাঁর পৌর এলাকার রাস্তাঘাট সংস্কার করে পাল্টে দিয়েছিলেন গোবরডাঙ্গা শহরকে। জানা যায় যে, শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন প্রতিষ্ঠিত খাঁটুরার বাওড়-তীরের ঘাট ও ১৮৬৮ সালে তাঁর মায়ের নামে গোবরডাঙার কঙ্কনা বাওড়ের ধারে পোড়ামাটির ভাস্কর্যের দুটি শিবমন্দির এখনো বিদ্যমান রয়েছে।
দুঃখের বিষয় এই যে, আজ শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্নের মতো একজন সমাজ সংস্কারক ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদের স্মৃতি সংরক্ষণের ব্যবস্থা সেরকম দেখা যায়নি। তাঁর বসত ভিটে আজ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। তবে, শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন যেহেতু প্রথম নির্বাচিত পৌরপ্রধান তাই সেই স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে পৌরসভার পক্ষ থেকে খাঁটুরায় তাঁর বাড়ির সামনের রাস্তাটির নামকরণ করা হয়েছে ‘শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন সরনী’। তবে তাঁর স্মৃতির উদ্দেশ্যে গোবরডাঙ্গা পৌরসভায় ‘শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন ভবন’ নামটি সংরক্ষিত রয়েছে। গোবরডাঙা তথা বাংলার সমাজসংস্কার আন্দোলনের ইতিহাসে শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন এক উজ্জ্বল নাম। অথচ আজ তিনি অনেকটাই বিস্মৃতপ্রায়। তাঁর স্মৃতিকে সংরক্ষণ এবং আগামী প্রজন্মের কাছে তাঁর অবদান তুলে ধরার ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত উদ্যোগের অভাব লক্ষ করা যায়। তবু সময়ের ধুলো তাঁর কীর্তিকে মুছে দিতে পারেনি; গোবরডাঙা তথা বাংলার শিক্ষিত ও সংস্কৃতিমনস্ক সমাজ আজও গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে এই মহান সমাজসংস্কারক, শিক্ষাবিদ ও জনহিতৈষী মানুষটিকে।
এই ছিল এই বঙ্গের তথা ভারতের মাটিতে ঊনবিংশ শতাব্দীতে প্রথম বিধবা বিবাহের মাধ্যমে ঘটা এক বাঙালির সাহস, দৃঢ়তা ও সমাজ-সংস্কারের প্রতি অঙ্গীকারের ইতিহাস। ৭ই ডিসেম্বর, ১৮৫৬ তারিখটি এদেশে প্রথম বিধবা বিবাহ উপলক্ষ্যে এক উল্লেখযোগ্য ইতিহাস রচনা করেছে যা বাংলা তথা ভারতের ইতিহাসের পাতায় স্বর্নাক্ষরে লেখা থাকবে।
তথ্যসূত্রঃ-
সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান
বাংলা উইকিপিডিয়া




0 comments: