0

ধারাবাহিক - রঞ্জন রায়

Posted in




















পর্ব ২৭



সে এক সময় ছিল যখন দার্শনিকের দল পরমাত্মার অস্তিত্ব নিয়ে তর্কবিতর্কে

মেতে উঠতেন। তবে আজকাল তর্ক হচ্ছে গম উৎপাদন নিয়ে। দার্শনিকদের এক দল

বলছেন—দেশে যথেষ্ট গম উৎপন্ন হচ্ছে, শুধু শয়তান দোকানদারদের মজুত করে

গুদামে লুকিয়ে রাখার অভ্যাসের ফলে সমস্যা হচ্ছে।

দ্বিতীয় দলের অভিমত হল—গম বলে কিছুর অস্তিত্ব আছে কি? থাকলেও এদেশে

তো নেই। এই অন্তহীন তর্কবিতর্কের ঢেউ একসময় শিবপালগঞ্জে পৌঁছে গেল।

লোকজন শুধু গম নয়, দুধ -দই- ঘি নিয়েও ওইরকম নাস্তিকতা দেখাতে লাগল।

এইরকম খাদ্যসংকটে কুস্তির আখড়া কি হাওয়া খেয়ে বা খাইয়ে বেঁচে থাকবে? ক’বছর

আগে ছেলেছোকরার দল ব্যায়াম আর কুস্তির দাঁও প্যাঁচের অভ্যাস করে ক্লান্তিতে চুর

চুর হয়ে বাড়ি এলে অন্ততঃ ভিজিয়ে রাখা ছোলা এবং ঘোল খেতে পেত। এখন সেটাও

গেছে। এটা এবং আরও কিছু জিনিস মিলে এমন এক পরিবেশ তৈরি হল যে গ্রামের

নওজোয়ানদের নিষ্কর্মা ও কুঁড়ে হওয়া ছাড়া কোন কাজ রইল না। ওরা ছেঁড়াখোঁড়া

পোষাকের উপর রঙিন পাতলুন-পায়জামা পরে রোগা পাতলা পা ঢাকল এবং বুকে মাংস

লাগুক -না- লাগুক, বুকের মধ্যে সায়রা বানুর সংগে শোয়ার স্বপ্ন ভরে অলিগলিতে

পানের পিক পিচ করে ফেলে উদ্দেশ্যহীন ভাবে ঘুরে বেড়াতে লাগল।

ওদের মধ্যে বেশ ক’জন কখনও কখনও খেতখামার-কলকারখানা এবং জেলখানা ঘুরে

ফেরত এসে যেত। যারা ওদিকপানে যাবার সাহস জোটাতে পারে নি, তারা স্থানীয় কলেজে

মুখ্যু হওয়ার পাঠ নিতে ভর্তি হত। এই ধরণের কলেজ হামেশা কোন স্থানীয় জননায়কের

প্রেরণায় সাধারণ লোকের মধ্যে শিক্ষা প্রসারের নাম নিয়ে খোলা হত। এর আসল

উদ্দেশ্য ওই জননায়ক ভদ্রলোকের জন্যে আগামী বিধানসভা অথবা লোকসভা

নির্বাচন জেতার জমি তৈরি করা এবং আসল কাজ বলতে কয়েকজন মাস্টার ও সরকারি

অনুদানের শোষণ করা। এইসব কলেজ সাময়িক ফ্যাশনের হিসেবে বিনা আগুপাছু ভেবে

চালিয়ে যাওয়া হয়। আর এটাও পাক্কা যে ওখানকার ছাত্রের দল নিজেদের জন্মসূত্রে

প্রাপ্ত আর্থিক ও সামাজিক অবস্থায় সন্তুষ্ট থাকবে এবং কখনোই সেই জায়গা

ছাড়িয়ে উপরে ওঠার চেষ্টা করবে না। সরকারি উচ্চপদ এবং ব্যবসাপাতি যাঁদের হাতে,

তাঁদের মনোপলিতে ওই কলেজগুলোর থেকে কোন বাধা আসবে না।

সে যাই হোক, এইসব শোরগোলে আখড়া সংস্কৃতি খতম হওয়ার উপক্রম, আর গ্রামের

নবযুবকদের শারীরিক বিকাশ এখন ওদের মানসিক বিকাশের সংগে পাল্লা দিচ্ছে।

সেভাবে দেখলে শিবপালগঞ্জে একটা আখড়া থাকা এবং তাতে কিছু ছেলেছোকরার

নিয়মিত যাতায়াত এক মহত্বপূর্ণ তথ্য বটে।




বলার দরকার নেই যে এসব হচ্ছে বদ্রী পালোয়ানের সৌজন্যে। বেশ কয় বছর ধরে ও

নিয়মিত আখড়ায় গিয়ে ব্যায়াম করে, চ্যালাদের মধ্য কুস্তি প্রতিযোগিতা করায়। যখন

ওরা কাউকে তুলে আছাড় দেয়, বা শরীরের কোন অঙ্গে চোট লাগিয়ে দেয়, তখন সবাই

মেনে নেয় যে চ্যালাটি এখন পুরো পালোয়ান হয়ে গেছে।

আর বেশ ক’দিন কসরত করে এবং কুস্তি লড়ে কোন চ্যালা যদি উঃ আঃ করতে করতে

ঘরে ফেরে তো বুঝতে হবে ও আখড়ার কনভোকেশন থেকে ডিগ্রি নিয়ে বাড়ি এসেছে।

আজ আখড়া থেকে দুই পালোয়ান টলতে টলতে বেরোল। একজন বদ্রী, অন্যটি ছোটে।

দুজনেরই ন্যাড়া মাথা। তার উপর ঘাম আর মাটি মিশে যেন পলেস্তারা পড়েছে। ঘাড়ের

পেছনে গণ্ডারের মত বেশ ক’টা চামড়ার ভাঁজ। দুজনেই ল্যাঙগোটের এক প্রান্ত হাতির

শুঁড়ের মতন সামনে ঝুলিয়ে চলছে। ল্যাঙোটের সরু পট্টির পাশ থেকে অণ্ডকোষের

সংক্ষিপ্ত সংস্করণ বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের নজরে স্পষ্ট হচ্ছে। তবে যেমন শিল্পের

দোহাই দিয়ে হেনরি মিলার ও ডি এইচ লরেন্সকে অশ্লীলতার অভিযোগ থেকে ছাড়

দেওয়া হয়, তেমনই ভারতীয় ব্যায়ামের দোহাই দিয়ে ওই দুই পালোয়ানকেও ওসব

দেখানোর ছাড় দেওয়া হয়।

ছোটে পালোয়ানের সমাবর্তনের ডিগ্রি বেশ কয়েক বছর আগে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু

আজ বোধহয় পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ডিগ্রি পেয়েছে। তাই একটু পরে পরেই খুব ধীমে স্বরে

উঃ আঃ করছে। কিন্তু গুরুর সামনে আত্মসম্মান রক্ষা করতে আওয়াজ মুখ থেকে ‘হায়’

না হয়ে একটা দীর্ঘশ্বাসের সংগে মিশে ‘হাব্‌’ গোছের রূপ নিয়ে বেরোচ্ছে। বদ্রী চলছে

চুপচাপ, যেন ছোটের কষ্টের সংগে ওর কোন সম্পর্ক নেই।

আজ বদ্রী পালোয়ান ছোটে ব্যাটাকে ধোবী পাছাড় লাগিয়ে চিত করেছে।

এই প্যাঁচের প্রয়োগ করতে বদ্রী পালোয়ানকে এক অনেক উচ্চস্তরের কবির মত কাজ

করতে হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর “বিজয়িনী” কবিতায় এক নারীর কোন সরোবরের

স্নান করার সময় কামদেব আদি কিছু পাত্রের বিষয়ে অভূতপূর্ব কল্পনা করেছিলেন।

ধোবী পাছাড় প্যাঁচ কষার জন্যে বদ্রীকে তার চেয়ে বেশি অদ্ভূত কল্পনা করতে হয়েছে।

যেমন এটা আখড়া নয়, এক চমৎকার সরোবর--- “সমীরণ প্রলাপ বকিতেছিল

প্রচ্ছায়সঘন পল্লব-শয়নতলে---“।

ওই পরিবেশে ও নিজেকে এক ধোপা হিসেবে কল্পনা করল, আর প্রতিদ্বন্দ্বীকে কোন

নারীর পেটিকোট। ফের ও সেই ব্যাটার হাত টেনে নিজের পিঠের দিক থেকে কাঁধের উপর

উঁচুতে তুলে আখড়ার মাটিতে আছড়ে ফেলল। আছড়ে ফেলার সময় খেয়াল রাখতে হয় যাতে

মাটিতে পড়ার সময় পেটিকোটের সামনের ভাগ উপরের দিকে থাকে। অর্থাৎ

প্রতিদ্বন্দ্বীকে এমন ভাবে পটকাতে হবে যাতে সে মাটিতে চিৎ হয়ে পড়ে।




তারপর?

“বিজয়! বিজয়! মহান বিজয়! শত্রু জানু পাতি বসি , নির্বাক বিস্ময়ভরে নতশিরে---“।

বদ্রী পালোয়ান আজ ছোটেকে আছাড় মারার সময় একটু বেশি কল্পনা করে ফেলল। ওর

কল্পনায় এটা আখড়া নয় পুকুর। আর এটা আখড়ার মাটির আল নয়, পুকুরের ঘাটের

সিঁড়ির পাথর। ফলে ছোটে পালোয়ানের যখন আখড়ায় চিৎ হয়ে আখড়ার উপর বিছিয়ে

থাকা ‘প্রচ্ছায় সঘনপল্লব” দেখার কথা, ও দেখল চোখ থেকে আগুনের ফুলকি

বেরোচ্ছে, কোমরের নিচের অংশ আখড়ার জমির বাইরে , উপরের অংশ আখড়ার ভেতর।

আর ও নেহাত বেহায়া, নইলে কোমর ভেঙে যাওয়ার কথা।

কপালগুণে বদ্রী হল ছোটে পালোয়ানের ওস্তাদ, নইলে এতক্ষণে ওর চোখ থেকে জল

আর মুখ থেকে হাজার গালির ফোয়ারা ছুটত। কিন্তু ওস্তাদের প্রতি সম্ভ্রম দেখিয়ে ও

চুপচাপ হাঁটছে, বেশি কষ্ট হলে মুখ থেকে একটা ‘হাব্‌’ গোছের আওয়াজ বের করছে।

কিন্তু ওর বিপদ এখানেই শেষ হল না। চলতে চলতে বদ্রী পালোয়ান জিজ্ঞেস করল, “কী

হে, সেদিন জোগনাথের হয়ে সাক্ষী দিতে গিয়ে তুমি কীসব বলে এসেছ”?

“কোন শালা জোগনাথের সাক্ষী? আমি তো পুলিসের সাক্ষী ছিলাম”। ছোটে কোমরের

ব্যথা চেপে গিয়ে বেপরোয়া ভাব দেখিয়ে বলল।

বদ্রী বেশ শান্ত স্বরে বলল, “সোজা প্রশ্নের সোজা জবাব চাই। এর মধ্যে শালা-

ভগ্নীপতিকে নিয়ে টানাটানি কেন”?

“কে আবার ত্যাড়া চাল দিচ্ছে”? ছোটে বলল বটে, কিন্তু গলার জোর যেন কমে গেল।

বদ্রী পালোয়ান এসব নিরর্থক কথাবার্তা এড়িয়ে সোজা প্রশ্ন করল, “তুমি সেদিন

সাক্ষী দেবার সময় বেলাকে নিয়ে কী বলেছ”?

“আমার কী বলার ছিল? তখন যা মুখে এল বলে দিলাম”।

বদ্রী পালোয়ান বড় নরম গলায় কথা বলছিল। এবার ছোটের হাথ ধরে বলল, “ওর

জোগনাথের সংগে কোন ইন্টুমিন্টু ছিল”?

ছোটে নিজের হাতটা আস্তে করে ছাড়িয়ে নিল। আঙুল ধরে বাহু ধরা যায়। আবার বাহু

ধরলে ধোবীপাট প্যাঁচ লাগিয়ে কাউকে চিত করা যায়—এটা ও একটু আগেই দেখেছে। কথা

পালটানোর জন্যে বলল, “আমি কি জানি কার সংগে কার ইন্টুমিন্টু চলছে? গাঁয়ের

চারপাশে অড়হরের খেত। তার আড়ালে কে কার সংগে লাগাচ্ছে, আমি কোথায় কোথায়

উঁকি দেব”?




বদ্রী আগের মতই নরম আওয়াজে বলল, “কিন্তু তুমি নাকি বলেছ যে নিজের চোখে

বেলাকে জোগনাথের সংগে সটরপটর অবস্থায় দেখেছ”?

“বললে কী হয়”?

বদ্রী পালোয়ান হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল। কড়া আওয়াজে বলল, “কেন হয় না? তুমি বলেছ কি

বলনি”?

এবার ছোটে পালোয়ানের একটু ভয় ভয় করতে লাগল। ওর গলার স্বরে বেপরোয়া ভাব

গায়েব। শাশ্বত কালজয়ী সাহিত্যের লেখকও যেমন রেডিওর প্রশ্নকর্তার সামনে

হড়বড়িয়ে যায়, তো তো করে, তেমনই ছোটে বদ্রী পালোয়ানের সামনে হড়বড়িয়ে গেল।

মাফ চেয়ে বলল, “ গুরু, বলেছিলাম তো! বলতে গিয়ে অনেক কিছু বলেছিলাম। আদালতে

সাক্ষী দেওয়া বলে কথা! যা মুখে এল, বলতে থাকলাম। কে ওখানে সত্যি বলে”!

বদ্রী পালোয়ান অন্ধকারে খানিকক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। যে কাজটা কোন পালোয়ান

সহজে করতে পারে না, বদ্রী সেটাই করতে লাগল। অর্থাৎ কিছু একটা ভাব ছিল।

ছোটে এতে আরও ঘাবড়ে গেল। একটু তুতলে তুতলে বলল, “গুরু, কী নিয়ে এত চিন্তা-

ভাবনা? ভাবনাচিন্তা ছোটলোকের কাজ। আমাকে বল, হয়েছেটা কী”?

বদ্রী ধীরে ধীরে বলল, “ভাবছি, তোকে লাথি মেরে মেরে শায়েস্তা করি? নাকি জুতোপেটা

করি? শালা, তোর মুখে কুকুরের ছানা পেচ্ছাপ করে! থু ! থু !”

এই বলে ও বেশ ঘেন্নার সঙ্গে মাটিতে একদলা থুতু ফেলল।

ছোটে হক্কাবক্কা! থেমে থেমে অনুনয় করতে লাগল, “এমন কথা বল না গুরু! বলে দাও

কোথায় কী ভুল করেছি”।

“তুমি শালা বললেও বুঝতে পারবে কি? এক ভাল ঘরের মেয়ের সম্মান গোটা দুনিয়ার

সামনে ধূলোয় ছুঁড়ে ফেললে। তোমার চোখে এটা কিছুই নয়”?

ব্যস্‌ এইটুকু ব্যাপার! এবার ছোটে পালোয়ান শান্তিতে দম নিল। ফের বেপরোয়া ভাব

দেখিয়ে বলল, “গুরু, আমি যাই বলে থাকি, সেসব তো ভরা আদালতে ঈশ্বরের দিব্যি গেলে

বলেছি। সবাই জানে যে আদালতে যা বলা হয় তার কোন মাথামুণ্ডু নেই। এতে কার কী

ক্ষতি হোল”?

বদ্রীকে চুপ করতে দেখে ছোটের হিম্মত আরও বেড়ে গেল। অর্থাৎ নিজস্ব ঢঙে বাকি

দুনিয়াকে পোকামাকড় ভেবে ও নিজের কথাটা শেষ করল, “এই জন্যে আমাকে জুতো পেটা

করবে, গুরু? বাহ্‌ গুরু, তুমিও কখনও কখনও এমন সব কায়দা করে কথা বল যে আমিও

অবাক হয়ে ভাবতে থাকি—হয়েছেটা কী”?




বদ্রী পালোয়ান দুই হাতে নিজের গর্দান মালিশ করে তার উপর দু-চারটে তামাচা

লাগালো। এভাবে ও নিজের ঘাড়ে জমে প্লাস্টার হওয়া আখড়ার ধূলোমাটি ঝেড়ে ফেলল

এবং এতক্ষণ ধরে যা যা ভাবছিল সব এক ঝটকায় ছুঁড়ে ফেলল। তারপর আচমকা হেসে

উঠে বলল, “তুই শালা খানদানী খচ্চর। ডাইনে বাঁয়ে দেখে চলতে হয় না? বেলা মেয়েটি

এখন তোর আম্মা হতে যাচ্ছে। তাকে তুই ছেনাল বল বা অন্য কোন নোংরা শব্দ—গালি

তোরই গায়ে লাগবে”।

“এটা কী বললে গুরু”?

“বলার কী আছে? একমাসের ভেতর বেলার বিয়ে হবে। বদ্রী পালোয়ানের সংগে। আর তুই

সানাইয়ে পোঁ ধরবি। মাথায় কিছু ঢুকল”?

সার্কাসের জোকার ফালতু প্রলাপ বকে, বাঁদর-নাচ নাচে। রাস্তায় তামাশা করা ঢোল

বাজাতে বাজাতে হাতের কাঠের টুকরো বগলের তলা দিয়ে কায়দা করে ঘুরিয়ে তাল-ফেরতা

বাজায়। আখড়ায় দু’তিন পালোয়ান খামোখা হাতের উপর ভর করে পা শূন্যে তুলে বিচ্ছুর

মত চলে। গোধূলি বেলায় ঘরে ফেরার সময় বাছুর মাথা ঝুঁকিয়ে খানিক এলোমেলো দৌড়তে

থাকে। তারপর লাফালাফির আনন্দে ওপাশের ডোবায় ঝাঁপিয়ে পড়ে। শনিচর ব্যাটা

অকারণে হঠাৎ চেঁচায়—উর্‌ র্‌ র্‌!

বদ্রী পালোয়ানের কথা শুনে ছোটে পালোয়ানের মনে হল ওইরকম কিছু অর্থহীন

প্রলাপের বোঝা ওর সামনে ফেলে রাখা হয়েছে। আর কেউ ওকে ওই জঞ্জালের গাদায়

চিত করে পটকে দিয়েছে। ওর মুখ থেকে খালি একটা কথা শোনা গেল, “এসব কী বলছ

গুরু”?

“যা বললাম কানে ঢোকে নি”? বদ্রী হালকা ভাবে ঠাট্টা করার ছন্দে বলতে লাগল, “কী

ব্যাপার? কানে খুব ময়লা জমেছে? আবার শোন, আমি বেলাকে বিয়ে করছি। ওকে কথা

দিয়েছি। সেদিন তুমি যখন এজলাসে দাঁড়িয়ে ওর বদনাম করছিলে আমার এক এক রোঁয়া

আগুনে জ্বলছিল। মন চাইছিল --এক চাঁটিতে তোমার মাথা পেটে ঢুকিয়ে দি। কিন্তু তুমি

আমার চ্যালা। তাই পালক-বালক ভেবে মাফ করে দিলাম”।

একটা দীর্ঘশ্বাস! তারপর বদ্রী নিজের কথা শেষ করল এই বলে—“ যাক, যা হবার হয়ে

গেছে। এবার থেকে জিভে লাগাম দাও”।

ছোটের এখনও মনে হচ্ছে যে ও ফালতু কথার জঞ্জালের উপর চিত হয়ে শুয়ে আছে। আর

বদ্রী পালোয়ান যা বলছে সেসব কোন স্বপ্নলোকের কথা। ও বলল, “গুরু, তুমি হলে

বামুন। মেয়েটা বেনে। একটু ভেবে কথা বল। বৈদ্যজী মহারাজ যদি খেরে গিয়ে জিদ ধরেন

তাহলে তোমার পুরো ইস্কিম ভস্কে যাবে”।

বদ্রী বলল—“ হাথী চলে বাজার মেঁ, কুত্তা ভোঁকে হাজার মেঁ”।




ছোটে প্রায় হাতে পায়ে ধরতে লাগল, “গুরু, তুমি দেখছি প্রবাদ আউড়ে যাচ্ছ। এতে

বৈদ্যজী গলে যাবেন”?

মনে হচ্ছে মনের গোপন কথা বলে ফেলে বদ্রী একটু হালকা হয়েছে। ও জবাব না দিয়ে

সিটি বাজাতে লাগল।

আরও খানিকক্ষণ হাঁটার পর পুরো ব্যাপারটা আর তার গুরুত্ব ছোটে পালোয়ানের মগজে

ঢুকল। বেলার সম্বন্ধে উড়ো খবর ছিল যে রূপ্পন বাবু ওকে একটা চিঠি লিখেছেন।

এইভাবে উড়তে উড়তে ওর কানে এটাও পৌঁছেছিল যে কোন ছুঁড়ি রাত্তিরে বৈদ্যজীর ছাতে

এসেছিল। তবে রঙ্গনাথের সংগে ধাক্কা লাগায় পালিয়ে গেছল।

যে বাড়িগুলোর ছাত থেকে অনায়াসে বৈদ্যজীর ছাতে আসা যায় তার মধ্যে গয়াদীনের বাড়ি

একটি। রূপ্পনবাবু একদিন বলেছিলেন যে কোন মেয়ের লেখা চিঠি রঙ্গনাথের হাতে

এসেছে। কিন্তু রঙ্গনাথ সে নিয়ে খুলে বলছে না। ছোটে পালোয়ানের সন্দেহ হচ্ছিল যে

রূপ্পন বাবু কিছুদিন ধরে বেলার পেছনে লেগে আছেন আর প্রায় পটিয়ে ফেলেছেন। এই

পরিস্থিতির মধ্যে হঠাৎ একী! বেলার সাথে বদ্রী পালোয়ানের সম্বন্ধ আর মামলা

অনেকদূর গড়িয়েছে! ছোটে হড়বড়িয়ে গেল।

জিজ্ঞেস করল, “কিন্তু গুরু, শুনেছি রূপ্পনবাবু বেলাকে নিয়ে কিছু চিঠিচাপাটি

করেছিলেন”?

--“হ্যাঁ করেছিল। ছেলেমানুষ। বোকামি করেছে”।

-“শুনেছি, ওদিক থেকেও পালটা চিঠি এসেছিল”।

বদ্রী পালোয়ান কড়া সুরে বললে, “কে বলেছে”?

--“কেউ না, গুরু”।

-“তাহলে তুমি শুনলে কী করে”?

--“মন পড়ছে না গুরু। তবে কেউ না কেউ অমন হাওয়ায় উড়তে থাকা কথার পিঠে বলে

থাকবে”।

বদ্রী পালোয়ান চুপ। যখন কেউ কথাবার্তার সময় আদালতে ঈশ্বরের নামে দিব্যি গেলে

সাক্ষী দেয়ার পেশাদারি কায়দার নকল করে তখন আর কোন প্রশ্ন করা অর্থহীন হয়ে

যায়। বদ্রী খানিকক্ষণ চুপ করে থাকার পর খুলে বলল, “হ্যাঁ, চিঠি এসেছিল। তবে

আমার জন্যে। কিন্তু ওটা ঠিক চিঠি ছিল না। আজকালকার মেয়েদের ন্যাকামি—ফিল্মি

গানটানের কথায় ভর্তি”।




ছোটে এবার তোষামুদে স্বরে বলল, “ তো গুরু, ব্যপারটা কয়েক বছর ধরে চলছে, কী বল?

ছাতের উপরেই---“।

বদ্রী বলল, “ছোটে, এতবড় খবরটা সবার আগে শুধু তোমাকেই বললাম। যতটা শুনলে তাই

অনেক। বেশি খোঁচাখুঁচি করার দরকার নেই। আর দেখ, কাউকে বোল না যেন”।

ছোটে পালোয়ান অন্ধকারে কারও বারান্দার বাড়িয়ে রাখা একটা কোণায় হোঁচট খেল।

এগুলো গ্রামের লোক কোন জমির টুকরো হাতিয়ে নেবার উদ্দেশ্যে বানায়। মুখে এল কাঁচা

খিস্তি। তারপর কোমরের ব্যাথার প্রতি সম্মান দেখিয়ে একবার ‘হাব্‌’ গোছের আওয়াজ

বের করে বদ্রীকে বলল, “কাউকে বলব না গুরু”।

--“কিছুদিন পরে সবাই জানতে পারবে। কিন্তু এখন খবরটা চেপে রাখ”।

-“বললাম তো গুরু! কাউকে বলব না”।

একটু পরে বদ্রী পালোয়ান হেসে উঠল। বলল, “বাহ, রে ছোটে! কেমন যুগলের জোড়

বানিয়েছ! বেলা চক্কর চালাবে জোগনাথের সংগে? শালা ফুটো পয়সার গুড়! বেলা যদি ওর

হাত ধরে তো তোতলাতে থাকবে। তুমি বেলাকে ওর সংগে জোড় বানিয়ে দিলে? তুমি শালা

খড়ুসের খড়ুস! মাথামোটার হদ্দ”!

ছোটে পালোয়ানের কোমর থেকে একটা ব্যথা ঝিলিক দিয়ে উঠল। মনে হোল ধোবীপাছাড়

দিয়ে কেউ ওকে ফের পটকে দিয়েছে।

একজায়গায় এসে ওরা আলাদা হয়ে নিজের নিজের ঘরের পথ ধরল। কিন্তু তার আগে

বদ্রী ফের ছোটেকে মনে করিয়ে দিল—ওর আর বেলার সম্পর্কের কথা যেন পাঁচকান না

হয়। ছোটে বড় নিষ্ঠার সংগে গোপনীয়তার শপথ নিল। কিন্তু এই শপথ ওইসব তথাকথিত

শপথের মতই—যা রাজভবনে নেওয়া হয়। ফলে পরের দিনই বদ্রী পালোয়ানের সংগে

যাদের মোলাকাত হল, তাদের মধ্যে অনেকেই বদ্রীকে বদলে যাওয়া চোখে দেখতে লাগল।

(চলবে)

0 comments: