0

সম্পাদকীয়

Posted in





















একাধিক চলচ্চিত্রে নির্মাতা এমন এক পৃথিবীর দৃশ্য রচনা করেছেন, যেখানে কোনও এক অজানা ভাইরাসের কারণে কিছু মানুষ রূপান্তরিত হয়েছে 'জম্বি'- তে এবং তারা অন্যদের আক্রমণ করছে, হত্যা করছে এবং ভক্ষণ করছে নরমাংস।

যে সময়ের জটিল আবর্তে আমরা কমবেশি সকলেই যখন পরিত্রাণের পথ খুঁজছি, সংশয় জাগে আমরা কি তবে সত্যিই গড়ে ফেললাম এক 'জম্বি দুনিয়া', যেখানে নর্দমার রাজনীতিই একমাত্র উপজীব্য আর 'মনুষ্যত্ব' নামক শব্দটি অসার এক উচ্চারণ? আত্মধ্বংসী এই প্রক্রিয়ার চরাচরব্যাপী নানান অভিজ্ঞতায় 'সমৃদ্ধ' হচ্ছি আমরা প্রত্যহ। আবার মনুষ্যত্বের নবতর উন্মেষে আলোকিতও হচ্ছি আমরা কখনও কখনও।

ছোট একটি দোকানে দাম নিয়ে বচসা। তারই জেরে প্রাণ হারাতে হল দোকানিকে। অভাবনীয় এই পারিবারিক বিপর্যয় যখন হয়ে উঠল কদর্য এক রাজনীতির কেন্দ্রস্থল, রুখে দাঁড়ালেন মৃত মানুষটির পুত্র। নিদারুণ শোকের আগুনে দগ্ধ হওয়ার সময়েও নির্বাচন করে নিলেন তাঁর সঠিক অবস্থানটি।

বিরল এই ঘটনার সাক্ষী থাকলেন অনেকেই। তবে কি এখনও আশা আছে? নিকষ মেঘছেঁড়া এমন আলোয় যখন 'ঝলমল করে চিত্ত', মনে হয় সকলি ফুরায়নি এখনও। প্রকৃতি এবং পরিপার্শ্বের সঙ্গে লড়াই করে যে জীবন আর সমাজের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন আমাদের পূর্বজনেরা, অবহেলায় আর অনাদরে যাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছি আমরা, স্বপ্নসন্ধানী ভবিষ্যপ্রজন্মের কেউ কেউ যদি তার রক্ষণাবেক্ষণে সচেষ্ট হয়ে ওঠে, ভরসা দানা বাঁধে বৈকি!

সুস্থ থাকুন। দায়বদ্ধ থাকুন।

শুভেচ্ছা নিরন্তর।

0 comments:

0

প্রচ্ছদ নিবন্ধ - রঞ্জন রায়

Posted in

(১.১) মহাপুরুষদের জীবনী

আমাদের ছোটবেলায় একজাতের বই বাড়িতে এবং স্কুলে অবশ্য পাঠ্য ছিল –

মহাপুরুষদের জীবনী। তাতে ক্ষুদিরাম, নেতাজি ও সূর্য সেনের মত স্বাধীনতা

সংগ্রামী, রামমোহন, বিদ্যাসাগর ও আম্বেদকরের মত সমাজসংস্কারক,

রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিমচন্দ্র, শরৎচন্দ্রের মত সাহিত্যিক এবং চৈতন্য, রামকৃষ্ণ

ও বিবেকানন্দের মত ধর্ম সংস্কারক সকলেই একসারিতে জায়গা পেতেন।

এঁদের জীবনীর একটি ছাঁচ আছে। এঁরা কোন বিশেষ ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনে

প্রেরিত। এঁদের জন্মসূত্রেই প্রতিভার স্ফুরণ দেখা যায়। এঁরা কখনও ভুল করেন

না। কাজেই ভুল স্বীকার করার প্রশ্ন ওঠে না।

এঁরা মহাপুরুষ কেন? দুটো কারণে।

এক, এঁদের রাস্তা কখনোই মসৃণ নয়, বরং কাঁটায় ভরা। কিন্তু সব প্রতিকূলতা সব

বাধা দু’হাতে সরিয়ে এঁরা এগিয়ে চলেন।

দুই, এঁরা কখনও ক্ষুদ্র স্বার্থে আদর্শের সঙ্গে আপস করেন না। তাই আর্থিক

কষ্ট এঁদের নিত্যসঙ্গী আর পরিবার, আত্মীয়, বন্ধুবান্ধব সবাই এঁদের ভুল

বোঝে। ফলে অধিকাংশ সময় এঁরা বড় নিঃসঙ্গ।

আমরা এঁদের আদর্শ জীবনী পড়তে পড়তে বড় হই। এবং বড় হতে হতে বুঝে যাই

ওই আদর্শ চরিত্র ঠিক আমাদের মত অকিঞ্চনের মডেল নয়। ওঁরা অনেক উঁচুতে

বসে আছেন। হাত বাড়িয়ে নাগাল পাওয়া দুষ্কর। তাঁদের আমরা পুজো করি, কিন্তু

তাঁদের মত হওয়া? সে বড় কঠিন। আমরা আমাদের ছেলেমেয়েদেরও অমন আদর্শ

মানব বা মহামানব হতে বলি না। জানি, ওঁরা ক্ষণজন্মা, সবাই চাইলেও অমন হতে

পারবে না। আমরা পদে পদে আপস করি। আমাদের জীবন বৈপরীত্যে ভরা। ওঁদের

জীবন সোজা সপাট, কোন ধূসর এলাকা নেই।




আজও অধিকাংশ হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-সুকান্ত জয়ন্তীতে

তাঁদের প্রণাম জানিয়ে ইতিকর্তব্য সারে। তাঁদের কর্মজীবন বা লেখাপত্রকে

অনুধাবন করার বিন্দুমাত্র চেষ্টা করে না। তাই ওঁদের মাথার পাশের

জ্যোতির্মণ্ডল অপরিবর্তিত থাকে। তাঁরা পূজনীয়, তাই তাঁদের যাপিত জীবন বা

তাঁদের উত্তরসূরীদের জন্যে বাতলে দেয়া পথ নিয়ে ঠিক বা ভুল কোন প্রশ্ন

তুললেই ভক্তকুল রে রে করে ওঠেন। কার সম্বন্ধে কথা বলছে, জান? সাহস তো

কম নয়! এ তো মহাপুরুষদের স্ট্যাচুতে কালি লেপে দেয়া!

সে গান্ধীজির নোয়াখালি যাত্রায় যৌনশক্তি নিয়ে অসংবেদনশীল পরীক্ষা-

নিরীক্ষাই হোক, বা নেতাজির প্রেমপত্র। খেয়াল করি না প্রথমটির উৎস

যাত্রাসঙ্গী নির্মল কুমার বসুর দিনলিপি যা তিনি লিখেছিলেন গান্ধীজিকে

জানিয়েই। দ্বিতীয়টির সমর্থন মেলে সুভাষের জার্মান স্ত্রীর কন্যা অনীতা বসুর

থেকে।

এতসব সাতকাহনের একটাই কারণ। সদ্য পড়ে শেষ করেছি একটি বই যা আমাকে

বিচলিত করেছে। বইটির নাম “বিদ্যাসাগর: নির্মাণ-বিনির্মাণ-পুনর্নির্মাণের

আখ্যান”। লেখক দেবোত্তম চক্রবর্তী, এটি সম্ভবত তাঁর প্রথম পূর্ণাঙ্গ

প্রকাশিত বই। চারশ ছত্রিশ পাতার রুচিসম্মত অলংকরণ করা হার্ডকভার

বইটির দাম ৬২০/- টাকা, প্রকাশক - কলাবতী মুদ্রা।

(১.২) আমি কেন বিচলিত?

আমি বড় হয়েছি বিদ্যাসাগরকে প্রায় বীরপুজো করে। উনি বীরসিংহের সিংহশিশু;

মার সঙ্গে দেখা করতে ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ দামোদর সাঁতরে পার হয়েছেন।স্কুলের

পাঠ্যবইয়ে পড়েছি তিনি নারীজাতির প্রতি বিশেষ পক্ষপাতিত্ব করেন। তাই

বহুবিবাহ বন্ধ করানো, বিধবার বিয়ে দেয়ার জন্যে গোঁড়াদের সঙ্গে লড়ে আইন

পাশ করানো -সব করেছেন। এঁর জন্যে তাঁর উপর শারীরিক হামলাও হয়েছে। তারপর

জেনেছি বাংলাভাষাকে দাঁড় করানোর জন্যে উনি প্রাইমার লিখেছেন। তাতে ‘জল

পড়ে, পাতা নড়ে’র সহজ চিত্রময়তা ও সংগীতে রবীন্দ্রনাথও মুগ্ধ। শুধু এটুকুই

নয়, কলেজ স্তরে বাংলা শেখানোর যে পাঠ্যবই লিখেছেন তাতে ইতিহাস,

মহাপুরুষদের লাইফ স্কেচ, সীতার বনবাস বা অভিজ্ঞান শকুন্তলম থেকে অনুবাদ

সবই আছে। এবং তাঁর হাত ধরে বাংলা ভাষাও ক্রমশ ‘এই সেই জনস্থানমধ্যবর্তী




প্রস্রবণ গিরি। ইহার শিখরদেশ সততসঞ্চরমাণ জলধরপটলসংযোগে’ থেকে সরল

এবং প্রসাদগুণ সম্পন্ন হয়েছে, বিশেষ করে ‘প্রভাবতী সম্ভাষণে’।

তারপর জেনেছি উনি ব্যালান্টাইন সায়েবকে চিঠি লিখে সাংখ্য ও বেদান্তকে ভুল

দর্শন বলে তার অ্যান্টিডোট হিসেবে মিলের লজিক পড়াতে রেকমেন্ড করেছেন।

আমার যৌবনের বামপন্থী মন উড়ুনি গায়ে দেয়া তালতলার চটি পরা ব্রাহ্মণ

পণ্ডিতের মধ্যে এক ব্যতিক্রমী প্রায় অজ্ঞেয়বাদী বা সংশয়বাদী আধুনিক

মানসকে দেখতে পেল।

এখানেই শেষ নয়। অবধারিত ভাবে আসবে তাঁর চরিত্রের দার্ঢ্য ও ধারাবাহিকতার

প্রসঙ্গ। সেই ঔপনিবেশিক সমাজে ইংরেজি শিক্ষায় দীক্ষিত মানুষজন যখন

শাসক ইংরেজের সায়েবদের মোসায়েবি করতে ব্যস্ত, তখন এই ইংরেজি জানা

মানুষটি কখনই বুট-হ্যাট-কোটে সায়েব হওয়ার চেষ্টা করেননি। বরং এক সায়েবের

বুটজুতো ট্রেনের জানলা গলিয়ে ফেলে দিয়েছিলেন! দরকার পড়লে সদর্পে দেশের

রাজন্যদের নাকে চটিজুতো পরে টক করে লাথি মারতে পারেন!

ফলে আমার কৈশোরপরবর্তী মানসে উনি একাধারে কলোনিয়াল প্রভু এবং দেশি

সামন্তপ্রভুদের বিরুদ্ধে এক আপসহীন প্রতিবাদী চরিত্র। আর প্রথম বিধবা

বিবাহ দিলেন ছেলে নারায়ণচন্দ্রের সঙ্গে। একেবারে আপনি আচরি ধর্ম!

তারপরে শেষ জীবনে পরিবারের সঙ্গে বিচ্ছেদ। ‘আপনজনে ছাড়বে তোরে তা বলে

ভাবনা করা চলবে না’। কলকাতা ছেড় কার্মাটারে সাঁওতালদের মধ্যে জীবন

কাটানো! একাকী বিচ্ছিন্ন নিঃসঙ্গ ট্র্যাজিক নায়ক। আমার পছন্দের মহাপুরুষ।

যাঁর কথায় কাজে ফাঁক নেই, ফাঁকি নেই। কিন্তু উপরের বইটি আমার সযত্নে

লালিত এতদিনের বিশ্বাসের গোড়া ধরে টান দিয়েছে। বিভিন্ন তথ্য ও বিশ্লেষণ

দিয়ে দেখাতে চাইছে যে উপরের অনেকগুলো আখ্যান ভক্তজনের তৈরি মিথ,

অতিকথন বা প্রেক্ষিত থেকে আলাদা করে টেনে মানে করা, চটজলদি সিদ্ধান্ত

নেয়া। আমার প্রাথমিক মনস্থিতি হোল বিরক্তি। বিদ্যাসাগরকে নিয়ে টানাটানি

কেন? লোক কি কিছু কম পড়িয়াছে?

(১.৩) ‘তুমহারা পলিটিক্স ক্যা হ্যায় পার্টনার’?

কিন্তু ইদানীং ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে খোদ

আমেরিকাতেও যখন অনেক মহাপুরুষের মূর্তি ধরা টানা হচ্ছে তাহলে পরাধীন




ভারতের মহাপুরুষরা কেন বাদ যাবেন? বিদ্যাসাগর, রামমোহন, বঙ্কিমচন্দ্র ও

রবীন্দ্রনাথ? নতুন তথ্যের আলোকে ইতিহাসের পুনর্মূল্যায়ন অবশ্যই কাম্য।

ইতিহাস সব সময়েই ক্ষমতার ইতিহাস, বিজয়ীরা লেখে। অন্য স্বর চাপা পড়ে যায়।

তাহলে সব ইতিহাস লেখনেরই অ্যাজেন্ডা থাকে। ভিন্সেন্ট স্মিথ আর রমেশচন্দ্র

দত্ত, যদুনাথ সরকার বা রমেশচন্দ্র মজুমদারের লেখা একরকম হতে পারেনা।

দু’দলেরই নিজস্ব অ্যাজেন্ডা (কলোনিয়াল বনাম অতীত গৌরবগাথা) অনুযায়ী

নিজস্ব অতিকথনের ঝোঁক থাকে। তাহলে চক্রবর্তী মশায়ের অ্যাজেন্ডাটি কী?

আধুনিক হিন্দি কবিতার সবচেয়ে উঁচু আসনে যাকে অকাদমিক দুনিয়া বসিয়ে

রেখেছে তিনি হলেন ছত্তিশগড়ের গজানন মাধব মুক্তিবোধ। রাজনৈতিক বিশ্বাসে

সাম্যবাদী কিন্তু কবিতার আঙ্গিকে সুকান্ত-সুভাষ নয়, বরং বিষ্ণু দে-অরুণ মিত্র

ঘরানার।

বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে আলাপচারিতায় তাঁর বহু উচ্চারিত একটি বাক্য হল -

‘তুমহারা পলিটিক্স ক্যা হ্যায় পার্টনার’? একই প্রশ্ন ছিল আমারও, তবে গোটা

বইটি বার দুই পড়ার পর আমি সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি যে ইনি বাংলার কলোনিয়াল

হিস্ট্রির অপর স্বরের নির্মাণে ব্যস্ত। এঁদের প্রেমিসগুলো মোটামুটি এইরকম:

১) বৃটিশ কলোনিপ্রভুরা বাণিজ্যিক লুঠের স্বার্থে যেমন ভারত তথা বাংলাদেশের

কৃষি ও হস্তশিল্পের বারোটা বাজিয়েছে, তেমনই পরম্পরাগত শিক্ষা, সমাজনীতি

ইত্যাদিকেও নিজেদের স্বার্থে ঢেলে সাজিয়েছে।

২) আমরা, মানে কলোনিয়াল রুলের বাইপ্রোডাক্ট মধ্যবিত্ত শিক্ষিত বাঙালিরা,

ওদের প্রবর্তিত রেল, ডাক, যাতায়াত, আধুনিক শিক্ষার ফল পেয়েছি ভেবে ধরে

নিই, ওদের হাত না পড়লে আমাদের উন্নতি হত না, আমরা অন্ধকার যুগে পড়ে

থাকতাম। ফলে উন্নতির বিকল্প সম্ভাবনা নিয়ে চিন্তাই করি নি।

৩) তাই আমরা সতীদাহ ও বহুবিবাহ রদ, হিন্দু কোড এসব নিয়ে খুব খুশি। কিন্তু

একবারও ভেবে দেখি না এরা মাথাব্যথা সারাতে মাথাই কেটে ফেলল কিনা।

৪) কলোনিয়াল অ্যাজেন্ডায় যেমন হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক বিভাজন বেড়ে

গেল, তেমনই ওদের ভাষা সংস্কারে বাংলা থেকে আরবি, ফার্সি ও অন্যান্য

প্রাকৃত শব্দ ছেঁটে দিয়ে এক কৃত্রিম উচ্চবর্গীয় সংস্কৃত ঘেঁষা বাংলা ভাষা তৈরি

হল তার ফলে শিক্ষার ক্ষেত্রে নিম্নবর্ণ ও মুসলমানেরা অবহেলিত হয়ে রইল।




আমাদের কবিতা ও গল্পে এরা হয় অনুপস্থিত, নয় প্রান্তিক চরিত্র। এরা

আমাদের ‘অপর’ হয়েই রইল। আর সেই বিষবৃক্ষের ফল আজ পেকেছে।

বেশ, এতে বিদ্যাসাগর, রামমোহন আদি চরিত্রের কী দোষ? সেটা হল এঁরা এই

গ্র্যান্ড ডিজাইনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এঁরা সমাজসংস্কার, শিক্ষাসংস্কারের

নামে যা করেছেন তা কলোনিয়াল প্রভুদের তালে তাল দিতে। সুফল বলতে আমরা যা

পেয়েছি কুফলগুলো পাল্লায় তুললে ওজনে ভারি।

এই হল আমার পূর্বপক্ষ বা লেখকের বক্তব্যের সার - আমি যেমন বুঝেছি।

(২.০) আমার উত্তরপক্ষ

(২.১) লেখকের পদ্ধতি

প্রথমেই বলতে চাই লেখক চিরাচরিত মহাপুরুষের জীবনীর নামে একরৈখিক

মাহাত্ম্য বা কুৎসা রটনার শৈলীটি পরিত্যাগ করে এঁদের একটি নির্দিষ্ট

ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত ও কালখণ্ডের উপজ হিসেবে দেখেছেন। তাই প্রথমে যত্ন

করে কোম্পানির রাজত্বে খাজনা আদায়ের পদ্ধতি , চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ও তার

ফল এবং কীভাবে নব্য জমিদার ও মুৎসুদ্দি বানিয়া শ্রেণির জন্ম ও বিকাশ হল

তা পর্যাপ্ত দস্তাবেজ ও দলিলের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছেন। এই প্রারম্ভিক

পরিচ্ছেদগুলি বইটির সম্পদ।

লেখক এই বইটিতে গোপাল হালদারের সম্পাদিত “বিদ্যাসাগর রচনাসংগ্রহ”কে

প্রামাণ্য ধরে তাঁরই অনুসরণে বইটিকে তিনটি ভাগে ভাগ করেছেন -

শিক্ষাসংস্কার, সমাজসংস্কার ও বাংলা ভাষা সংস্কার।

আমরাও পাঠ-প্রতিক্রিয়ায় ওই ছকটিই অনুসরণ করব।

(২.২) আমার পদ্ধতি

তথ্য -

এই বইয়ে তথ্য এবং তথ্যসূত্র বিস্তারিত ভাবে দেয়া হয়েছে এবং লেখক পরস্পর

বিরোধী তথ্যের মুখোমুখি হলে যা গ্রহণ বা বর্জন করেছেন তার ভিত্তিটুকুও

স্পষ্ট করেছেন। এখানে তথ্যের স্বল্পতা নয় বরং বহু আয়াসে সংগৃহীত তথ্য এত




বেশি রয়েছে যে খেই হারিয়ে যাবার যোগাড়। এর থেকে ছেনে তথ্যের তুল্যমূল্য

বিচার অনেক পরিশ্রম সাপেক্ষ। তাই আমার সীমিত সাধ্যে তথ্য নিয়ে কথা বলা

উচিত হবে না। অতএব, আমি আমার লেখায় উদ্ধৃতি দিলে আলোচ্য লেখকের

বইটিরই পৃষ্ঠা সংখ্যার উল্লেখ করব। এর দুটো দিক। পাঠপ্রতিক্রিয়ায়

বিশ্লেষণ বা যুক্তির ভুল হলে তার দায় নির্দ্বিধায় আমার। কিন্তু তথ্যসূত্রে বা

উদ্ধৃতিতে কোন ভুল থাকলে তার দায়িত্ব লেখক চক্রবর্তী মশায়ের।

আমার কাজ -

আমি দেখব তথ্যের ভিত্তিতে লেখক যে হাইপোথেসিস দাঁড় করাচ্ছেন তার

বিশ্লেষণ, যুক্তিপ্রয়োগ এবং অন্য বিপরীত ব্যাখ্যার সম্ভাবনাগুলো। দেখব

লেখক নিজের অ্যান্টি-কলোনিয়াল অ্যাজেন্ডার জোরে কোথাও কোথাও এমন

সিদ্ধান্ত টানছেন কিনা যাকে স্ট্যাটিসটিক্সের লোকেরা বলেন ‘প্রসিকিউটর’স

বায়াস’।

আমরা দামোদর সাঁতরে পার হওয়ার গল্প নিয়ে মাথা ঘামাব না। বিদ্যাসাগরের

আপন ভাই শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্নের সাক্ষ্যই এসব গালগল্পকে খারিজ করার

জন্যে যথেষ্ট। কিন্তু দেখব নারীশিক্ষার জন্যে বেথুন ও বিদ্যাসাগরের মডেলের

সাফল্য ও বিফলতা নিয়ে তুলনা। দেখব সেই সময়ে ইংরেজ প্রভুদের আনুকূল্যেই

সই, উত্তরভারতে এবং মহারাষ্ট্রে নারীশিক্ষার জন্যে কী কাজ হচ্ছিল এবং

ব্যালান্টাইন-বিদ্যাসাগর বিবাদে সত্যিই বিদ্যাসাগর বেদান্তের বিরুদ্ধে

পাশ্চাত্যের এনলাইটেনমেন্টের প্রতীক মিলের লজিক পড়াতে চাইতেন কিনা।

দেখব শুধু উচ্চবর্ণের ছাত্রদের জন্যে শিক্ষার দ্বার খুলে দেয়া বিদ্যাসাগরের

জাতিঘৃণার লক্ষণ, নাকি নতুন কোন উদ্যোগ শুরু করার জন্যে আবশ্যক

সমঝোতা।

মধুকবিকে বিদ্যাসাগর জেলে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে টাকা ধার দিয়েছেন।

অমিত্রাক্ষর ছন্দ নিয়ে বিদ্রূপ করলেও একটা স্নেহের টান ছিলই। পরেও

অনেকবার টাকা দিয়েছেন - মধুকবির কবিতায় যার স্বীকৃতি রয়েছে। কখনও

কখনও প্রশ্ন জাগত - কত টাকা ছিল বিদ্যাসাগরের? এবং এই অগাধ আয়ের

উৎস কী?

এ নিয়ে অনেক অজানা তথ্য দিয়েছেন লেখক। তাতে এক ব্যবসাবুদ্ধি সম্পন্ন




সুচতুর ব্যক্তির ছবি ফুটে উঠেছে যা আপাত বিভিন্ন সংস্কার আন্দোলন এবং

শিক্ষার মশাল জ্বালিয়ে এগিয়ে চলা বাঙালির ছবির সঙ্গে একেকবারেই খাপ খায়

না। আমরা জানি যে বাঙালি ব্যবসাবিমুখ এবং ব্যবসায়ীদের সততাকে সন্দেহের

চোখে দেখে। অতএব এই নির্মাণটিকেও দেখা দরকার যে বিদ্যাসাগর ব্যবসার

ডুবজলে নেমে নিজের কোন সযত্নলালিত মূল্যবোধ ও নীতির সঙ্গে আপস

করেছেন কিনা।

সমাজসংস্কারের ক্ষেত্রে দেখতে হবে নিজের ছেলেকে দিয়ে বিধবাবিবাহ

আন্দোলনের শুরু করেও কী কারণে পিছিয়ে এলেন? এছাড়া লেখক ইংরেজদের

মনুকে কেটে ছেঁটে হিন্দু কোড বিল বানানোয় নারীদের আগের চেয়ে ক্ষতি হয়েছে

বলে অভিযোগ করেছেন — এটা গুরুত্বপূর্ণ, কাজেই নেড়েচেড়ে দেখতে হবে এতে

বিদ্যাসাগরের দায়িত্ব কতটুকু।

সাহিত্য পর্যায়ে দেখব সমসাময়িক মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালংকার, মদনমোহন

তর্কালংকারের তুলনায় বিদ্যাসাগরের সাহিত্যকর্ম ও ভাষার সৌকর্য

নিম্নমানের ছিল কিনা। রচনায় নারীচরিত্র ও প্রান্তিক মানুষেরা কেন অনুপস্থিত

ইত্যাদি।

তাহলে এবার বিসমিল্লা বলে শুরু করা যাক।

(৩.০) কোম্পানিরাজ, চিরস্থায়ী বন্ডোবস্ত এবং শিক্ষা সংস্কার

(৩.১) চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত

মোঘল আমল থেকে কোম্পানির আমলে, মানে ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে’র আগে,

জমির খাজনার ব্যাপারটা কেমন ছিল?

লেখক সঠিকভাবে বলছেন - কৃষক এবং রাজা বা রাষ্ট্রের মাঝখানে কোন জমিদার

বা মধ্যস্বত্বভোগী ছিল না। সমগ্র গ্রামের উপর রাজস্ব ধার্য হত, এবং

গ্রামসমাজগুলি রাজস্ব আদায়কারী ‘জমিদারে’র মারফত সমবেতভাবে রাজস্ব

প্রদান করত। ‘রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জমিদার নির্দিষ্ট দিনে গ্রামে উপস্থিত

হয়ে রাজস্ব হিসেবে সমগ্র ফসলের এক-তৃতীয়াংশ আদায় করত এবং এই

আদায়ীকৃত ফসলের এক-দশমাংশ নিজের কাছে পারিশ্রমিক হিসেবে রেখে বাকি

ফসল রাষ্ট্রকে দিতে বাধ্য থাকত’। [1] এর মানে তো দাঁড়াল যে আদায়ীকৃত




ফসলের বাকি নয়/দশমাংশ রাষ্ট্রকে দিতে হবে। উনি ব্যাখ্যা করে বলছেন যে

তখন জমিদাররা জমির মালিক ছিল না, তারা ছিল নিছক সরকারের রাজস্ব

আদায়ের প্রতিনিধি। তাদের নবাব ইত্যাদিরা নিযুক্ত করতেন। এ যেন ডাকু গব্বর

সিংহের প্রতিনিধি এসে গোটা গাঁয়ের থেকে নির্ধারিত আনাজ আদায় করছে!

কিন্তু এরপরেই লেখক বলছেন, ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে ঠিক হয় যে,

জমিদারেরা আদায়ীকৃত রাজস্বের নয়-দশমাংশ কোম্পানির কাছে হস্তান্তরিত

করবে। বছরের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এই নির্দিষ্ট রাজস্ব কোম্পানির ঘরে

জমা দিলে, জমিদাররা বংশানুক্রমে জমির স্বত্বাধিকারী থাকবে, ভবিষ্যতে জমির

মূল্য যাই হোক না কেন, তাতে তাদের সঙ্গে কোম্পানির রাজস্ব বন্দোবস্তের

কোনও পরিবর্তন হবে না’। [2]

তাহলে কী দাঁড়াল? আগের ও পরের দুটো নিয়মেই জমিদারেরা ‘আদায়ীকৃত ফসলে’র

এক/দশমাংশ নিজের কাছে রেখে বাকি নয়/দশমাংশ রাষ্ট্রকে দেবেন?

তফাৎ কোথায়? চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে জমিদাররা স্থায়ী ভাবে জমির মালিক

হলেন। আগে গ্রামে উৎপন্ন ফসলের এক-তৃতীয়াংশ খাজনা হিসেবে আদায় করে

তার ভাগাভাগি হত। এখন জমির মূল্য হিসেব করে তার (ফসলের নয়, জমির

মালিকানা স্বত্বের) স্থায়ী খাজনা নির্ধারিত হলে জমিদারেরা প্রতিবছর

নির্দিষ্ট সময়ে তা কোষাগারে জমা দেবেন, নাহলে মালিকানা হাতছাড়া হয়ে যাবে।

অর্থাৎ আগে রাষ্ট্র আদায় করত ফসলের ভাগ, এখন আদায় করছে জমির

মালিকানার খাজনা জমিদারদের থেকে। সেই খাজনা আবার জমিদারেরা আগেই উশুল

করছে চাষিদের থেকে, তাতে যুক্ত করছে নিজের একটা অংশ।

এটা একভাবে দেখলে এশিয়াটিক সোসাইটির গ্রামীণ সমাজের উপর ইউরোপিয়

সামন্ততান্ত্রিক কাঠামো চাপিয়ে দেয়া।

আমরা কী ভাবে দেখছি? কোনটা ভাল, কোনটা মন্দ? কৃষকদের দিক থেকে দেখলে

দুটোই খারাপ। তাহলে মন্দের ভাল কোনটা? লেখকের মতে আগের ব্যবস্থা-তাতে

যে গাঁয়ে থেকে চাষ করে তারই জমির মালিকানা স্বত্ব ছিল। কী চাষ করবে নাকি

করবে না সেটা সেই ঠিক করত। কিন্তু নতুন নিয়মে জমির মালিক জমিদার, সে

উলটে চাষির থেকে খাজনা আদায় করবে।




আমার মতে দুটো খারাপের মধ্যে ১৭৯৩ সালের ২২শে মার্চে প্রবর্তিত চিরস্থায়ী

বন্দোবস্ত কম খারাপ। কেন?

এক, এতে ফসলের হিসেবে প্রতি বছর নতুন নতুন খাজনা ধার্য করার বদলে একটা

ফিক্সড খাজনা। জমিদার ও কৃষক উভয়েই জানে কত দিতে হবে, তাতে অ্যানার্কির

বদলে শৃংখলা আসে, অ্যানার্কির দিনে গরিবের ভোগান্তি বেশি হয়।

দুই, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে জমিদারের খানিকটা দায়িত্ব বা ইনভল্ভমেন্ট থাকে

যাতে চাষটা ভাল ভাবে হয়। ফলে হাল-বলদ-বীজধান ইত্যাদির যোগান এবং

দরকারমত আর্থিক সাহায্য (অবশ্যই চড়া সুদে) দিতে একরকম বাধ্য থাকে।

আগের ব্যবস্থায় এসবই অনিশ্চিত।

লেখক সহমত নন। উনি দেখাচ্ছেন যে ‘কোম্পানি চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে

নতুন জমিদার ও মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণির সৃষ্টি করে, তেমনই তাদের অত্যাচার

ও শোষণ থেকে পরিত্রাণের জন্য অসংখ্য কৃষক সংগ্রামের সৃষ্টি হয়’(নজরটান

আমার)। উদাহরণ হিসেবে লেখক উল্লেখ করেছেন সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহ

(১৭৬৩-৭৮), মেদিনীপুরের বিদ্রোহ (১৭৬৬-৮৩), ত্রিপুরায় সমশের গাজির

বিদ্রোহ ( ১৭৬৭-৬৮), সন্দ্বীপের কৃষক বিদ্রোহ (১৭৬৯), কৃষক-তন্তুবায়দের

লড়াই (১৭৭০-৮০), চাকমা বিদ্রোহ (১৭৭৬-৮৭), এবং রংপুর বিদ্রোহ (১৭৮৩)।

[3]

দেখুন, সবক’টি কৃষক বিদ্রোহ হয়েছে ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত

প্রবর্তনের অনেক আগে। বরং এই নতুন ব্যবস্থা শুরু হওয়ার পরে কোন বড়

কৃষক বিদ্রোহের নজির দেখছি না।তাহলে লেখকের যুক্তি পরম্পরা অনুসরণ

করলে কোন সিস্টেমকে মন্দের ভাল বলব?

(৩.২) নতুন মধ্যস্বত্বভোগী জমিদার ও মুৎসুদ্দিদের উদ্ভব

কেন নতুন করে বড় বিদ্রোহ হল না? এখানে লেখক সঠিক ভাবে আঙুল তুলেছেন

চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে সৃষ্ট নতুন মধ্যস্বত্বভোগী জমিদার ও

মুৎসুদ্দিদের দিকে।

১৭৯৩ সালের ২২শে মার্চ তারিখে লর্ড কর্নওয়ালিশ ‘চিরস্থায়ী বদোবস্তে’র

প্রবর্তন করেন। ঠিক তার আগে ৬ই মার্চ কোম্পানির ডিরেক্টরদের একটি




চিঠিতে লেখেন- ‘ভূমিস্বত্বকে নিরাপদ ঘোষণা করার সঙ্গে সঙ্গেই এদেশীয়দের

হাতে যে বিরাট বিত্ত আছে, তা তারা অন্য কোনও ভাবে নিয়োগ করার উপায় না

পেয়ে ভূসম্পত্তি ক্রয়ের উদ্দেশ্যেই ব্যয় করবে’। [4]

লেখক চমৎকার ভাবে দেখিয়েছেন যে ৪০ বছর পরে লর্ড বেন্টিংক মন্তব্য

করছেন -

‘আমি মানতে বাধ্য যে ব্যাপক গণবিক্ষোভ বা বিপ্লব থেকে নিরাপত্তার প্রশ্নে

চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের একটা বিরাট সুবিধে আছে। অন্ততপক্ষে এর বদান্যতায়

এমন এক বিপুলসংখ্যক ধনী জমিদারশ্রেণী উদ্ভূত হয়েছে যারা বৃটিশ শাসনকে

টিকিয়ে রাখতে প্রচণ্ড আগ্রহী, জনসাধারণের ওপরও তাদের সম্পূর্ণ আধিপত্য

আছে’। [5]

এই সমর্থকদের শ্রেণিবিন্যাসের বিশ্লেষণ করেছেন বিনয় ঘোষ -

‘গ্রাম্যসমাজে নতুন জমিদারশ্রেণী, বৃহৎ একটি জমিদারি-নির্ভর মধ্যসত্বভোগী

ও গ্রাম্য মধ্যশ্রেণী, এবং নাগরিক সমাজে নতুন অর্বাচীন অভিজাত-ধনিকশ্রেণী,

খুদে-ব্যবসায়ী দোকানদার চাকরিজীবী প্রভৃতিদের নিয়ে বড় একটি নাগরিক

মধ্যশ্রেণী এবং তার মধ্যে সোনার চাঁদের মতো একদল ইংরেজিশিক্ষিত ‘elite’।

[6]

(৩.৩) কৃষি, চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত, বঙ্কিম ও বিদ্যাসাগর

মন্বন্তর: ১৭৭০ সালের দুর্ভিক্ষ(বাংলায় ছিয়াত্তরের মন্বন্তর) হয়েছিল

চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত্রের প্রায় আড়াই দশক আগে, যার ভয়াবহ বর্ণনা

বঙ্কিমের দেবী চৌধুরাণী ও আনন্দমঠে রয়েছে। এরপরে বাঙালি পেল সোজা

পঞ্চাশের মন্বন্তর যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে, ১৯৪২-৪৩ সালে ঘটেছিল।

এর মধ্যে কোন বড় দুর্ভিক্ষ উনবিংশ শতাব্দীতে ঘটেনি। কাজেই আমার মনে হয়

কর্নওয়ালিশ স্থায়ী বৃটিশ স্বার্থে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে বংগের

কৃষিতে যে স্ট্রাকচারাল পরিবর্তন আনেন, কিন্তু তার আপাত সুফল বাংলার

কৃষক পেয়েছে। তাই বড় দুর্ভিক্ষ বা বিদ্রোহ কোনটাই হয়নি।

এই আলোচনাটা জরুরি কেন? এইজন্যে যে এখানে লেখক আঙুল তুলেছেন বঙ্কিম

ও বিদ্যাসাগরের দিকে, তাঁদের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের গুণকীর্তন করার দোষে।

তার প্রেক্ষাপটে লেখক বলছেন -




‘উনিশ শতকের প্রথম থেকে এদেশে যে ইংরেজি শিক্ষার প্রচলন শুরু হয়, তার

সুযোগ প্রধানত গ্রহণ করে এই জমিদার ও মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণির

প্রতিনিধিরাই। ভুমিরাজস্ব থেকে প্রাপ্ত বিপুল আর্থিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে

পরবর্তীকালে তারা শিক্ষাদীক্ষা, সরকারি চাকরি এবং ডাক্তার-ওকালতি ইত্যাদি

কাজে নিযুক্ত থেকে এক নতুন বুদ্ধিজীবী শ্রেণির সৃষ্টি করে। চাকরি-নির্ভর এই

শিক্ষিত সম্প্রদায়ও স্বাভাবিকভাবেই ব্রিটিশ অনুরাগী হিসেবে গড়ে ওঠে। তারা

এমন একটি সামাজিক শ্রেণির রূপ গ্রহণ করে, যাদের শ্রেণিস্বার্থ বাঁধা থাকে

ভুমিব্যবস্থার স্রষ্টা, পালক ও রক্ষক ব্রিটিশদের সঙ্গে’। [7]

এইটাই আসল কথা। গোটা গবেষণার ধ্রুবপদ হোল যে বঙ্কিম, বিদ্যাসাগর,

রামমোহন এবং রবীন্দ্রনাথের ঊর্ধ্বতন দুই পুরুষ হয় চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের

উপজ নব্য জমিদার বা নব্য মুৎসুদ্দি ধনিক অথবা ইংরেজের চাকরিনির্ভর নব্য

মধ্যবিত্ত শ্রেণি। ইতিহাসের সাক্ষ্য কী বলে?

অভিযোগ অনেকটাই সত্যি। জোড়াসাঁকো ঠাকুর পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা

রবীন্দ্রনাথের পিতামহ পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত দ্বারকানাথ ইউনিয়ন ব্যাংক

স্থাপন করেছিলেন, রানিগঞ্জের কয়লাখনি, জুটমিল,আসামের চা বাগান

কিনেছিলেন, বিমা কোম্পানি, জাহাজ কোম্পানি খুলেছিলেন। এসব আমরা জানি,

কিন্তু সবই ব্রিটিশদের হাত ধরে, তাদের ছোট তরফ হয়ে। ওড়িশা ও পূর্ব বাংলার

জমিদারি ওঁর পালকপিতা রামলোচন পেয়েছিলেন ওই চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের

আইনের সুবিধেয়। তথ্য ঘাঁটলে পাওয়া যায় খাজনা আদায়ে দ্বারকানাথ ‘রুথলেস’

ছিলেন।

আবার প্রিন্স দ্বারকানাথের তৈরি দেশের প্রথম অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান ম্যানেজিং

এজেন্সির নাম ‘কার, টেগোর অ্যান্ড কোম্পানি’। কিন্তু যেটা বলা হয় না সেটা

হোল এঁদের প্রধান কাজ ছিল আফিমের ব্যবসা। বঙ্গে তৈরি আফিম লুকিয়ে চিনে

জোগান দেওয়া। আর বঙ্কিমচন্দ্র ও বিদ্যাসাগর ছিলেন অবশ্যই ইংরেজ

সরকারের চাকুরিজীবা - একজন ম্যাজিস্ট্রেট, অন্য জন শিক্ষাবিভাগে বিভিন্ন

পদে।

এরপর লেখক বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বঙ্গদেশের কৃষক’ থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে দেখাচ্ছেন

বঙ্কিমচন্দ্র তৎকালীন কৃষিব্যবস্থায় কৃষকদের দুর্দশা সম্বন্ধে সম্যক

অবহিত, লেখনীতে ফুটে উঠেছে হাসিম শেখ-রামা কৈবর্ত-পরাণ মণ্ডলদের দুর্দশা।




কিন্তু লেখকের চোখে এ’সবই কুম্ভীরাশ্রু; কেননা এরপর বঙ্কিম দুটো বক্তব্য

রেখেছেন।

এক, ভাল জমিদার ও মন্দ জমিদারের মধ্যে ফারাক করেছেন, ‘সিস্টেম -অ্যাজ এ

হোল’কে কাঠগড়ায় দাঁড় করান নি।

দুই, চাষির দুঃখকষ্ট দেখেও চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পক্ষে কথা বলেছেন।

“চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ধ্বংসে বঙ্গসমাজে ঘোরতর বিশৃংখলা উপস্থিত হইবার

সম্ভাবনা। আমরা সামাজিক বিপ্লবের অনুমোদক নহি”।

আরও,

“যে দিন ইংরাজের অমঙ্গলাকাঙ্ক্ষী হইব, সেদিন সমাজের অমঙ্গলাকাঙ্ক্ষী

হইব, সেইদিন সে পরামর্শ দিব। --- আমরা কেবল ইহাই চাহি যে সেই

বন্দোবস্তের ফলে যে সকল অনিষ্ট ঘটিতেছে, এখন সুনিয়ম করিলে তাহার যত

দুর প্রতীকার হইতে পারে, তাহাই হউক”। [8]

লেখক এবার দেখাচ্ছেন বিদ্যাসাগর কীভাবে দেখেছিলেন চিরস্থায়ী

বন্দোবস্তকে। “চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত হওয়াতে, বাঙ্গালা দেশের যে সবিশেষ

উপকার দর্শিয়াছে, ইহাতে কোন সন্দেহ নাই। এরূপ না হইয়া যদি পূর্বের ন্যায়,

রাজস্ব বিষয়ে নিত্যনতুন পরিবর্তের প্রথা থাকিত, তাহা হইলে, এদেশের কখনই

মঙ্গল হইত না”। [9]

গ্রন্থটির প্রথম ভাগের এই দ্বিতীয় অধ্যায়টির শীর্ষক ছিল “হেস্টিংস থেকে

কর্নওয়ালিস, সাহেব ও মোসাহেবদের লুঠ কিসসা”। বিদ্যাসাগরের উপরোক্ত

উদ্ধৃতিটি দিয়ে লেখক ধরে নিয়েছেন তাঁর উপপাদ্যটি প্রমাণিত। তাই শেষ করেছেন

এই বলে - ‘বুঝ লোক যে জান সন্ধান’!

অর্থাৎ,

চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ভারতে ইংরাজদের লুঠের ভিত্তি।

বঙ্কিম ও বিদ্যাসাগর চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সমর্থক।

অতএব, ওঁরা দু’জন ইংরেজের মোসাহেব এবং ওদের লুঠের ভাগীদার।

একেবারে অবরোহ তর্কপদ্ধতির হদ্দমুদ্দ।




আমার উত্তরপক্ষ:

চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত মোঘল আমল থেকে চলে আসা কৃষি রাজস্বের পদ্ধতির

চেয়ে মন্দের ভাল। লেখকের বর্ণনা থেকেই দেখা গেছে পুরনো ব্যবস্থায়

কোম্পানির রাজস্ব আদায়কারী প্রতিনিধিরা (পড়ুন জমিদারেরা) একেকবছর

একেক রকম দাবি নিয়ে সোজা মাৎসন্যায় শুরু করেছিল। ফলে ছিয়াত্তরের

মন্বন্তর ও একগাদা কৃষক বিদ্রোহ। নতুন ব্যবস্থায় একবার যা খাজনা ধার্য

হয়েছে তাই প্রতি বছর কোম্পানিকে দিতে হবে। ফলে একধরনের অরাজকতা বন্ধ

হোল। মন্বন্তর ও কৃষক বিদ্রোহ হল না। বিদ্যাসাগর সঠিক বলেছেন - ‘যদি

পূর্বের ন্যায়, রাজস্ব বিষয়ে নিত্যনতুন পরিবর্তের প্রথা থাকিত, তাহা হইলে,

এদেশের কখনই মঙ্গল হইত না”।

কিন্তু যে কোন ব্যবস্থারই অন্ধকার দিক থাকে। দেখাই যাচ্ছে বঙ্কিম সে বিষয়ে

যথেষ্ট ওয়াকিবহাল ছিলেন যা তাঁর ‘বঙ্গদেশের কৃষক’ লেখাটির ছত্রে ছত্রে

আছে। তাই সংস্কারের দাবি রেখেছেন। নইলে ইংরেজ সরকারের ডেপুটি

ম্যাজিস্ট্রেটের কী দায় পড়েছিল ওই অন্ধকার দিকের প্রতি আঙুল তোলার?

‘মোসাহেব’ হলে শুধু গুণ গাইতেন, অন্ধকার দিকের কথা তুলতেন না।

লেখকের আপত্তি যে ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের’ আইন বানিয়েছে বঙ্কিম কেন তার

কাছেই কিছু সংস্কারের আবেদন করছেন?

আমার প্রতিপ্রশ্ন - তা নইলে আর কার কাছে করতেন? অন্য কোন বিকল্প ছিল

কি? থাকলে সেটা কী?

একটা তিনঠেঙে তুলনা টানছি। আজ যে বামপন্থীরা ‘নো ভোট টু বিজেপি’ বলেছেন,

তাঁরাই মমতা সরকারকে বলছেন নিজেদের ক্যাডারদের নিয়ন্ত্রণ করতে, ভোট

পরবর্তী হিংসা বন্ধ করতে। এটাই তো স্বাভাবিক। আর কার কাছে এই দাবি করা

যায়?

আজকে ২১ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে যেসব বিকল্প ভাবনা আমরা ভাবতে পারি দুশো

বছর আগের কলোনিয়াল ভারতে, তখনও হয়ত দিল্লির তখতে মোগল সম্রাট বা

মাত্র ভিক্টোরিয়া হাতে ক্ষমতা নিয়েছেন — কতদূর সম্ভব ছিল?




বিদ্যাসাগরের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সমর্থনের কোন বিষময় প্রভাব তাঁর

শিক্ষা সংস্কারে পড়েছিল কিনা তা আমরা দেখব পরের অধ্যায়ে।

(৩.৪) ইতিহাসের আয়রনি

আমার কথা হল সমাজ বা রাষ্ট্র পরিবর্তন খাপে খাপে আপনার আমার কেতাবি

ফরমুলা মেনে হয় না। বিকাশ ও উত্তরণের সর্পিল গতি অনেক ছোট ছোট

সমঝোতার মধ্যে দিয়ে এগোয়। আমাদের ফর্মূলা তার approximation মাত্র।

তাই আয়রনির ছড়াছড়ি। কয়েকটি উদাহরণ দিচ্ছি।

এক, মজদুরের মুক্তির তত্ত্ব কোন মজদুরের মস্তিষ্কপ্রসূত নয়, বরং এসেছে

মার্ক্স নামের এক প্রুশিয়ান উচ্চবর্গীয় অভিজাত শিক্ষিত পরিবারের ব্যক্তির

থেকে।

দুই, স্বাধীনতা আন্দোলনের ‘বন্দে মাতরম' নামের ব্যাটল ক্রাই এল ইংরেজের

চাকর এক ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের থেকে, যিনি নিজেকে ওপরের প্রবন্ধে বলেছেন

‘ইংরেজের মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী’ বলে।

তিন, যিনি জীবনভর পরিশ্রম করলেন শ্রমিকের শোষণের ‘উদ্বৃত্ত মূল্যের’

তত্ত্বকে দাঁড় করাতে, তাঁকেই ওই ক্যাপিটাল বইটি লেখার সময় খাওয়াপরার

জন্যে বন্ধু এংগেলসের কাপড়ের কলের শেয়ারের ডিভিডেন্ড হিসেবে শ্রমিকের

শ্রমের উদ্বৃত্ত মূল্যের উপর নির্ভর করতে হল।

চার, যে মোহনদাস গান্ধী বিংশ শতাব্দীর গোড়ায় নিজেকে ব্রিটিশ এম্পায়ারের

মোস্ট ওবিডিয়েন্ট সাবজেক্ট বলে লিখছেন তিনিই আর দুটো দশক পরে তাকে

বলছেন ‘দ্য ডেভিল’স এম্পায়ার’ এবং ‘কুইট ইন্ডিয়া’র ডাক দিচ্ছেন।

পাঁচ, রাশিয়ায় পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা লেনিনের ‘ইস্ক্রা’ পত্রিকা

প্রকাশের খরচাটি সম্ভব হত প্রধানত সাশা মরোজভ বলে এক পুঁজিপতির

দাক্ষিণ্যে।

এ নিয়ে আমরা আবার কথা বলব লেখাটির সমাপ্তির সময়। আপাতত লেখকের

সমস্ত মূল্যবান পরিশ্রমী সাক্ষ্যের অকুণ্ঠ প্রশংসা করেও তাঁর সিদ্ধান্তের




সঙ্গে — চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রশংসা করা বঙ্কিম বিদ্যাসাগরেরা ইংরেজের

মোসাহেব - এ নিয়ে একমত হতে পারছি না।

0 comments:

0

প্রবন্ধ - সেবিকা ধর

Posted in

























যজ্ঞবেদীর ওপর যেটুকু আলো আছে, তাতে খানিকটা দেখা যায়, অনেকটাই দেখা যায় না।সেই যজ্ঞস্থলে তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন নিজের কেশপাশ উন্মুক্ত করে। এই কৃষ্ণবর্ণ কেশপাশের দিকে কুরু যোদ্ধাদের লোভী চোখ ছিল।রজঃস্বলা অবস্থায় তারা আমাকে টানতে টানতে নিয়ে এসেছিল কুরুসভাতে।আমি এক কালো মেয়ে।পঞ্চস্বামীর অতি আদরের দ্রৌপদী, পাঞ্চালী, কৃষ্ণা,যাজ্ঞসেনী। এছাড়া আরও কত নাম আমার।আমাকে এই পঞ্চস্বামী-যুধিষ্ঠির, ভীম,অর্জুন, নকুল,সহদেব ছাড়াও কর্ণ নামে এক বীর, তিনিও পছন্দ করতেন আমাকে।আমিও পছন্দ করতাম বীর, শূরবীর কর্ণকে।সূর্যপুত্র কর্ণকে, সূতপুত্র কর্ণকে,সে এক অন্য ইতিহাস।


যজ্ঞবেদীর আলোর চূর্ণমালা পৌঁছে গেছে আমার গালে।আর গালের যেটুকু কালোর আভাস, তা আরও উজ্জ্বলতর হয়ে উঠছে আলোর স্পর্শে। আমি দ্রৌপদী,আমি কালো মেয়ে।


লাইট,ক্যামেরা, অ্যাকশন- না না না আলোটা ঠিক মতো রিফ্লেক্টার দিয়ে ফেলা যাচ্ছে না ওর গালে।আপনি একটু-একটু - স্যরি তুমি একটু সাইড ফেস করতো।হ্যাঁ, হ্যাঁ - এবার ঠিক আছে। সে দাঁড়িয়ে আছে অনেক অনেক আলোর নীচে।বিজ্ঞাপনের মডেল হবে বলে।সে উজ্জ্বল আলোয় ধাঁধিয়ে যাওয়া তার স্বল্পবাসময় শরীর, নিজেই নিজেকে দেখতে দেখতে সে ভাবল- আমি এতো উজ্জ্বল? আমি এতো কালো? তা সত্ত্বেও তো ওরা আমাকে নিয়েছে মডেল হিসেবে।তার চোখের সামনে 'লিরিল' সাবানএর গুঞ্জন ধ্বনি।যা সে চোখে দেখেনি,শুনেছে তার পূর্বজদের কাছে।সেই 'লিরিল' সাবানের ফেনাময় বিজ্ঞাপন আবছা করে ভেসে উঠল।কারণ এই বিজ্ঞাপন সে দেখেছে, এই এড সে দেখেছে ইউটিউবে। চমৎকার শরীরের এক নারী,চারদিকে সাবান, ফেনা,সাবান-ঝরনা,ফেনায় জীবন বহে যাচ্ছে।


না, না, এভাবে হবে না।এটা কিন্তু আন্ডার গার্মেন্টসের বিজ্ঞাপন।তোমাকে বলা হয়েছে কী পজিশন, কী পোজ তোমাকে নিতে হবে। সেইভাবে তুমি তোমার পোজ নাও।ঔদ্ধত্য দেখাও, শরীরী আবেদনের কথা, লাস্যের কথা বলো।


আমি এক কালো মেয়ে।আমি আজ বিজ্ঞাপন- সুন্দরীও। আমাকে ব্যবহার করছে বিজ্ঞাপন কোম্পানি। তারা আমার শরীর যা লক্ষ লক্ষ টাকায় বিক্রি করবে অন্য অন্য পার্টি- বিজ্ঞাপনদাতাদের প্রচার- ক্যামপেনে।
ঠিক আছে, ঠিক আছে, একটু পেছনে, একটু নামাও,বুবস দুটো ভালো করে দেখা যাচ্ছে না। একটু খাঁজ দাও,একটু খাঁজ দাও। হ্যাঁ হ্যাঁ ব্যাক পোর্শান।ঠিক ঠিক।আচ্ছা অন্তর্বাসের বিজ্ঞাপনে এতো এতো ব্যাকপোর্শান, বুবস দেখান!তারপরই ভাবল সেই বিজ্ঞাপনের কালো মেয়ে-এ সব তো করতেই হবে।এই ব্যাক পোর্শান,বোটক্স,বুবস- এতো এই প্রফেশনের অঙ্গ।করতেই হবে।ওরা চাইছেন।


কাট- লাইট,ক্যামেরা, এ্যাকশন - হ্যাঁ, হ্যাঁ এবার শট ঠিক হয়েছে।


কালো মেয়ে, ধরা যাক তার নাম অর্ণবা।কিংবা জুলিয়া অথবা নাসিমা- যে কোনো নাম হতে পারে তার-এক্স, ওয়াই, কিংবা জেড - সেই মেয়েটি এখন বিজ্ঞাপনের মেয়ে। গায়ে তার কালো চামড়ার রঙ উপচে পড়েছে ক্যামেরার লেন্সের ওপর।আর কয়েকদিনের মধ্যে যে প্রোডাক্ট বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে মেয়েদের আন্ডার গার্মেন্টসের পোশাক-বিজ্ঞাপন হিসেবে ছড়িয়ে যাবে টিভিতে। খবরের কাগজে,অন্য অন্য মাধ্যমে।


আমি এক কালো মেয়ে। আমার স্টেপকাট চুলে আশ্চর্য আলো টুকটুক করে এসে বসছে।আবার উড়েও যাচ্ছে।যেমন চড়াই পাখি উড়ে যায়, নীল দিগন্তে অসীম আকাশে।আমি কি ঈগলদের সামনে দাঁড়িয়ে আছি? এতো আলো, এতো কম পোশাক, এতো পা,এতো হাঁটু,এতো বুক, এতো ব্যাক পোর্শন। আমার তো লজ্জা পাওয়া উচিত ছিল।না, না, না - টাকা রোজগার করতে করতে গেলে ওসব ভাবলে হবে না ।বিজ্ঞাপন-মডেল হতে গেলে ওসব ভাবলে চলবে না।আমার কালো রঙ আমাকে আটকাতে পারেনি। তার কারণ আমার আবেদনময়ী শরীর। এই শরীর দিয়ে,শরীরকে প্রদর্শন করে আমি বিজ্ঞাপনের একটা বড় অংশ,একটা বড় জগৎ দখল করতে চাইছি।


কিছু বলল, বলল কিছু, ওদের বাড়ির লোকেরা? শান্তার মুখের দিকে তাকিয়ে প্রবীর মাথা নীচু করে রইল।চৌষট্টি বছরের প্রবীর,ষাট বছরের শান্তা।প্রবীর একজন ব্যাঙ্কের রিটায়ার্ড কেরানি। প্রবীর ও শান্তার দুই মেয়ে।শান্তা কৃষ্ণবর্ণা।কন্যারাও রঙ পেয়েছে মায়ের। প্রবীর এবং শান্তার এই নিয়ে দুশ্চিন্তার শেষ নেই।এই বঙ্গভূমে যতই লেখা হোক, 'কালো মেয়ের পায়ের তলায় দেখে যা আলোর নাচন' কিংবা 'কালো জগতের আলো'- প্রবীর কোনো খেই পাচ্ছে না কৃষ্ণবর্ণা কন্যাদের জন্য।মধুরিমা ও মাধুরী- দুই মেয়ে।দুজনেই গ্র‍্যাজুয়েশন শেষ করে এম এ করে ফেলেছে।বয়স বেড়ে যাচ্ছে ক্রমে, কিন্তু প্রবীর তাদের পাত্রস্থ করতে পারছে না কিছুতেই। কন্যারা যদি কোনো প্রেমঘটিত সম্পর্কে বিষয়ে জড়িয়ে যেত,আর সেই ছেলে যদি ভালো হত।প্রবীর ও শান্তার সেখানে আপত্তি থাকার কথা নয়, থাকতও না।কিন্তু এই দুই কালো মেয়ে প্রেমের বিবাহে বা প্রেম- বিবাহের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়তে পারেনি। খুচরো দু-একটা ঘটনা হয়ত তাদের জীবনে ঘটেছে যা শান্তা খানিকটা জানে,প্রবীর জানে অনেক কম।এবং সেখানেও একটু এগোনর পরই দুই কন্যেই বাতিল হয়ে গেছে তাদের গায়ের রঙের জন্য।


আজকের এই পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে কেউ হয়ত এই সত্য বিশ্বাস করবে না।কিন্তু রবিবার আগরতলা বলুন আর রবিবার কলকাতাই বলুন, সেখানকার বহুল প্রচারিত পত্রিকাতে বা খবরের কাগজে যে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয় সেখানে লেখা হয় 'সুশ্রী গৌর বর্ণা, চাকুরিরতা.... ইত্যাদি ইত্যাদি। অর্থাৎ মেয়েকে সব হতে হবে।সে ভালো রান্না করবে,সে দেখতে খুব সুন্দর হবে, তার গায়ের রঙ হবে ধবধবে ফর্সা, অর্থ উপার্জন করবে,সন্তান মানুষ করবে,সমস্ত দায় সেই মেয়ের।কিন্তু সেখানে কালো মেয়ে হলেই যত আপত্তি-ঘোর এসে যায়।বিশেষ করে যাঁরা পুরনোপন্থী শ্বশুরমশাই এবং শাশুড়িমা, তাঁদের কাছে গায়ের রঙটা খুব বড় ব্যাপার। ফলে প্রবীর এবং শান্তা দুজনেই খুব অকুলেই আছে দুই মেয়েকে নিয়ে।যদিও দুই মেয়ের বিয়ের বিজ্ঞাপনও করেছে তারা,অর্থ ব্যয় করেছেন তাঁরা।মেয়েদের বিবাহের বিজ্ঞাপন দিয়েছে টিভিতে, ম্যাট্রিমনি সাইটে।কিন্তু কোথাও সেই মেয়েদের জন্য উপযুক্ত পাত্র পাওয়া যাচ্ছে না।


এক ঘন অন্ধকারের ভেতর বসে রয়েছে তাঁরা।মেয়েরা ক্রমশ বুড়ি হয়ে যাচ্ছে।মনের ওপর মেঘলা ছায়া ফেলছে তাঁদের।কোন নেলপালিশ লাগাব নখে,কোন ওষ্ঠরঞ্জনী বা লিপস্টিক লাগাবে ঠোঁটে, এই নিয়ে তাদের মধ্যে দোলাচল তৈরি হয়।কালো মেয়েকে কী সব মানায়? কোন শাড়িটা পরবে,কোন কালারের সালোয়ার-কামিজ পরব,কোন পালাজো পরব,এই সব দ্বন্দ্ব- দ্বিধা -এই রঙ কী আমাদের মানাবে? উজ্জ্বল হলুদ রঙের যে আভা, তা কী ফুটে উঠবে আমাদের গায়ে? না কী অসুন্দর দেখাবে? কিংবা কালো শাড়ি নয়তো সাদা সালোয়ার কামিজ? কিংবা টকটকে লাল জিন্স এবং কুর্তি? কোনোটাই সঠিকভাবে মানিয়ে তোলা যাচ্ছে না।ফলে দুই মেয়ে ক্রমশ বিষণ্ণ,বিপর্যস্ত হয়ে যাচ্ছে।চাকরির চেষ্টা করছে তারা।চাকরিও যে খুব ভালো পাওয়া যাচ্ছে, এমন নয়।চাকরির ক্ষেত্রেও অনেক বাছবিচার আছে।অনেক বাঁধাধরা নিয়ম আছে।


সব জায়গা থেকে হতমান হয়ে এই দুই মেয়ে ক্রমশ ভাবছে, তারা আর বিয়ে করবে না।কোনো পুরুষের গলায় তারা আর ঝুলিয়ে দেবে না বরমালা।তারা বাঁচবে নিজেদের মতো করে, নিজেদের রাস্তায়।নিজেদের মতো করে, জীবন তাদের গুছিয়ে নেবে। কিন্তু তারজন্য তো আর্থিক স্বাবলম্বন দরকার।প্রবীর অবসর নিয়েছে, কিছু টাকা সে নিশ্চয়ই পেয়েছে।পাচ্ছে পেনশন। কিন্তু তাতে কী তাদের চারজনের সংসার চলবে?ফলে দুই মেয়ে ঠিক করেছে তারা স্বাধীন ভাবে বাঁচবে।নয়ত স্বাধীনভাবে ব্যবসা করবে তারা।এম এ পাশ করে কম্পিউটার নিয়ে নানারকম চাকরির চেষ্টা করে, তারা ভাবছে এবার একটা ছোটোখাটো ব্যবসা দিয়ে তারা শুরু করবে তাদের নিজেদের জীবন। কালো মেয়ের আলোর জীবন।


অন্ধকারে স্তনবৃন্ত দেখে চমকে উঠল শমীক।এই মেয়ের স্তন এতো কালো! সে জানত না।ফলে কালো স্তন এবং তার নিপল শমীককে শারীরিক ভাবে উত্থানে অসমর্থ করল।শমীক করবীর দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি এতো কালো? আমি তো জানতাম না?জানলে পরে এগিয়ে আসতাম না তোমার দিকে।তোমার বুবস এতো কালো? করবী ভেতরে ভেতরে কষ্ট পাচ্ছিল। সে সবে রাগানুরঞ্জিত হচ্ছিল অভ্যন্তরে।কিন্তু শমীকের এই কথা, শমীকের এই বাক্যবাণ, তাকে অস্থির করে তুলল।করবী ডিভোর্সি।শমীক ডিভোর্স মেনে নিয়েছে।বিবাহবিচ্ছিন্ন অবস্থায় তাদের দুজনের দুটি পরিবারই আলাদা আলাদা।
শমীকের একটি ছেলে, একটি মেয়ে।করবীর একটি মেয়ে।তারা চেষ্টা করছিল নতুন করে একটা যৌথ জীবনের দিকে তারা যাবে।কিন্তু যেতে গেলে কিছু কিছু শারীরিক চাহিদা থেকে যায়।সেই শারীরিক চাহিদার সূত্র ধরে করবীর ফ্ল্যাটে একদিন শমীক এসেছিল।বাইরে তখন ঝমঝমে বৃষ্টি। বৃষ্টিতে ভিজে যাচ্ছে চরাচর।কাঁচের জানলা দিয়ে আচমকা ভেসে আসা বিদ্যুতের আলোয় শমীক আবার করবীর স্তন দেখতে পেল।তার হাতের যে নিবিড় স্পর্শ করবী অনুভব করতে চেয়েছিল তার শরীর ছুঁয়ে, শমীকের এই কথায় তা সম্পূর্ণ ডুবে গেল।বুকের আড়াল সামলে নিয়ে নিজেকে গোছাতে গোছাতে করবী বলল- ঠিক আছে, থাক..


ডিম ডিম ডিম ডিম করে মাদল বাজছে। বাঁধনা পরব- শীত- অন্ধকার,মাটির জালা ভর্তি মহুয়ার আসবের নাচছে মেঝেনরা।সাঁওতাল রমণীরা।এই নারীরা সকলেই, কৃষ্ণবর্ণা,কালো এবং আলো।মেঝেনদের সঙ্গে নাচছে মাঝিরা-মর্দরা।তারা সবাই নিজেদের বাঁশিতে তান তুলছে, যে তান ছড়িয়ে যাচ্ছে দূর থেকে দূরান্তরে।এক আশ্চর্য লোকগাথা তৈরি হচ্ছে ভেতরে ভেতরে। সেই লোকগাথার মধ্যে হয়ত লুকিয়ে আছে সাঁওতাল বিদ্রোহের দীর্ঘ ইতিহাস।চাঁদ,ভৈরব, শালগিরার ডাক, সিধু, কানু -সমস্ত কিছু যেন সামনে দিয়ে দৌড়ে যাচ্ছে তাদের।একদল কৃষ্ণবর্ণ মানুষ তারা দৌড়চ্ছে, হাতে তীর-ধনুক, বল্লম,কাঁড়-বাঁশ নিয়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে, দখলদার দিখুদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য।


কোথায় যেন সেই আলো গিয়ে পড়ল আফ্রিকা মহাদেশে।সেখানকার কৃষ্ণবর্ণ মানুষ, কৃষ্ণাবর্ণা নারীরা সকলেই-নিজেদের বাজনা, গান, উৎসব, নিয়ে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী লড়াইয়ে সামিল করেছেন নিজেদের।তাহলে কী দাঁড়াল? কালো সত্যি সত্যিই জগতের আলো কী? না কী নয়, সত্যি সত্যিই জগতের আলো।তাকে বুঝবার জন্য চোখ, হৃদয়, মন প্রয়োজন।


তিনি বসেছিলেন রাজসভায়।সামনে তাঁর অসংখ্য দাস-দাসী।এবার তাঁরা যাবেন প্রসাধন-কক্ষে।সেখানে নিজের রূপ-চর্চা-রূপটান করবেন রানী ক্লিওপাত্রা। মিশরের নীলনদের হাওয়া ঝিনুকের গভীরে জমে থাকা জল সব- মিলেমিশে এক হয়ে যাচ্ছে ক্লিওপাত্রার রূপ চর্চায়।এন্টনি ক্লিওপাত্রার কালো রূপে মুগ্ধ।তাঁর কৃষ্ণরূপে বিমোহিত।তিনি জানতে চান এই সৌন্দর্যের আকর উৎস কী? কোন জগতের মধ্যে।ক্লিওপাত্রা তার কালো গালের অতি বিখ্যাত টোলে তরঙ্গ তুলে হাসলেন।সেই হাসিতে গাল- টোলের মাধুরী আরও বিস্তৃত হল।আবারও ক্লিওপাত্রা তার কালো গালের টোল- সৌন্দর্য নিয়ে হাসেন।


যজ্ঞবেদীর সামনে দাঁড়িয়ে আছেন যাজ্ঞসেনী। তাঁর পঞ্চস্বামী দাঁড়িয়ে রয়েছেন একটু দূরে। যাজ্ঞসেনীর উন্মুক্ত পিঠ, পিঠের ওপর খোলা দীর্ঘ কেশমালা, অর্জুন এবং ভীম দুজনকে অনুরক্ত করছে যাজ্ঞসেনীর প্রতি।আমি তোমাকে জয় করে এনেছিলাম পাঞ্চালী।উচ্চারণ করলেন অর্জুন।আমি তোমাকে রক্ষা করেছি পাঞ্চালী। আমি তোমাকে রক্ষা করেছি যাজ্ঞসেনী,উচ্চারণ করলেন বৃকোদর- ভীম। আমি তোমাকে রক্ষা করেছি কুরুসভায়।বললেন শ্রীকৃষ্ণ,তোমার লজ্জা নিবারণ করেছি।দূরে দাঁড়িয়েছিলেন শ্রীকৃষ্ণ। তিনি বললেন আসলে এই কালো মেয়েই আমার সখী।একে নিয়ে আমি সারাজীবন চলে যেতে পারি দূর থেকে দূরান্তে কোনো নিবিড় জীবনের আশায়,ভালোবাসায়,প্রেমে-প্রীতিতে।সব কিছুতেই আমার সখী পাঞ্চালী। আমার যাঁরা গোপিনী, আমার বিবাহিত দুই স্ত্রী - রুকমিণী ও সত্যভামা আর সেই সঙ্গে প্রক্ষিপ্ত বা যাই বলা হোক না কেন, শ্রীরাধিকা তো আছেনই।কবি কল্পনায়, কাব্যে,কিন্তু পাঞ্চালী তো একেবারেই স্বতন্ত্র। ঠিক করে বললে পাঞ্চালীও তাদের থেকে স্বতন্ত্র আমার কাছে। আমি তার সখা।আমার সে কৃষ্ণা।কৃষ্ণের কৃষ্ণা।অর্জুন আবারও বললেন আমি জয় করেছি তোমাকে। দ্রৌপদী, তুমি আমার হও।ভীম বললেন, আমি তোমায় রক্ষা করেছি যাজ্ঞসেনী। তুমি আমার হও।যুধিষ্ঠির, নকুল সহদেব- কেউ কোনো কথা বলতে পারছিলেন না।


আরও অনেক দূরে দাঁড়িয়ে আছেন, মহাবীর সূর্যপুত্র, সূতপুত্র কর্ণ।তার মুখেও কোনো কথা নেই।কর্ণ তার দীপ্তমান শরীর দিয়ে আলো ফুটিয়ে তুলতে তুলতে যাজ্ঞসেনীর দিকে তাকিয়েরছিলেন।সেই কালো মেয়ে অর্জুনকে বললেন, আপনি আমায় জয় করেন নি।সেই কালো মেয়ে বৃকোদরকে বললেন, আপনি আমায় রক্ষা করেন নি।আমি নিজেকে নিজে রক্ষা করেছি।আমার স্বভাব ধর্ম, আমার প্রেম, আমার শরীর, আমার মন, আমার সব মিলিয়ে আপনাদের ভালোবাসা।আপনাদের ভালোবেসে থাকা,বাঁচা। ভেবে নেওয়া আপনারাও আমাকে ভালোবাসছেন। এই সূত্র ধরে আমি নিজেকে জয় করেছি, রক্ষা করেছি।


দুই কন্যা দাঁড়িয়ে ছিল রাস্তার ধারে।একটু পরেই তাদের গাড়িটি এসে যাবে।কসমেটিকস- এর ব্যবসা করতে করতে বেশ খানিকটা টাকা ইনভেস্ট করে,ধারে ইনস্টলমেন্টে জিনিসপত্র কিনে, বেচে এখন তারা নিজেরাই নখরঞ্জনী,ওষ্ঠরঞ্জনী,বডিলোশন, সানস্ক্রিনলোশন আরও যা যা লোশন ইত্যাদি সমস্ত কিছু বিক্রি করে যাচ্ছে ক্রমান্বয়ে। এবং তাদের ব্যবসা-কসমেটিকস-এর ব্যবসা ক্রমশ ক্রমশ ফুলে-ফেঁপে উঠছে।তারা বিবাহের কথা বলে না, কিন্তু তারা যৌনতার কথা ভাবে।যৌনতা তাদের জীবনে আছে।সেই যৌনতার গল্প আরও কোনোদিন বলা যাবে।কোনো পছন্দের পুরুষ তাদের সঙ্গে সঙ্গত করলে জীবন মধুময় হয়ে ওঠে।সেই পুরুষ তাদের দেখে বলে না তোমরা বড্ড কালো।কী কালো গো তোমরা! এই কথা উচ্চারণ করেনা পুরুষেরা।ফলে দুই মেয়ে বেশ আছে।প্রবীর এবং শান্তার একটু চিন্তা এই মেয়েদের বিয়ে হল না।বিয়ে হলে ভালো হত।নাতি-নাতনি হত।কিন্তু দুই মেয়ের কোনো চিন্তা নেই। তারা দিব্যি ফুরফুরে আনন্দে, নিজস্ব ভাবনায় ব্যবসা-বাণিজ্য করে, চমৎকার আছে তারা।


সাঁওতাল পল্লীর বাঁধনা পরবের আশ্চর্য মাদল- ধ্বনি ছড়িয়ে যাচ্ছে সমস্ত চরাচরে। কৃষ্ণ বর্ণের মেয়েরা নাচতে নাচতে আসবের উল্লাসে জড়িয়ে ধরছে অন্য অন্য কৃষ্ণ বর্ণের পুরুষদের। সমস্ত আকাশ মথিত হয়ে আছে তারকা সৌন্দর্যে। কালো আকাশের ভেতর অজস্র তারা।মেয়েরা-সাঁওতাল রমণীরা, সাঁওতাল পুরুষেরা নাচতে নাচতে তারা হয়ে যাচ্ছে।


এই সমস্যা মধ্যবিত্তের। প্রবীর একদিন মনে মনে বলেছিল খবরের কাগজ পড়তে পড়তে।এই কালো মেয়ে ফর্সা মেয়ে...শান্তা বলল, না না সবটা তা নয়।আমাদের মধ্যে একটা ঔপনিবেশিক শৃঙ্খল আছে। প্রবীর একদা রাজনীতি করা তার বউয়ের দিকে তাকাল।আমরা আসলে কালোকে নিয়ে চিন্তা করি।বারবার ঘৃণা করি।বিশেষ করে বিয়ের পাত্রী হিসেবে কালো মেয়েদের অজস্র কাঞ্চনমূল্যের বিনিময়ে বিক্রি করতে হয়। ভালোই হয়েছে।দুই মেয়ের বিয়ে হয় নি।


প্রবীর বিড়বিড় করে বলল- তাহলে কালীকে যে আমরা পুজো করি? এখানে অন্য অনেক কথা আছে।কালী কালো,কৃষ্ণ কালো, গোপাল কালো,আরও কোনো কোনো দেবদেবী হয়ত কালো।কিন্তু মানবজীবনের সঙ্গে দেবজীবনের তরঙ্গ একসঙ্গে মেলেনা।ফলে কালো দূরে থাকে। সংসারে কালো মেয়েকে অনেক টাকা পণ নিয়ে মুখ ব্যাজার করে বউ হিসেবে আনতে হয় এবং শ্বশুর-শাশুড়ি ভাবেন যে কালো মেয়ে এল।এবার এদের যে সন্তানাদি হবে নাতি- নাতনি সবাই কালো হবে।পুরো কালোর বংশ হয়ে যাবে আমাদের।এই অন্ধ ভাবনার গভীরতা এখন রয়ে গেছে আমাদের জীবনে।প্রবীর আর শান্তা নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে একসময় চুপ করে গেল।দুই মেয়ে এসি গাড়ির মধ্যে চোখে সানগ্লাস দিয়ে নতুন কোনো বড় ব্যবসার কথা ভাবছিল মনে মনে।

0 comments:

0

প্রবন্ধ - মনোজিৎকুমার দাস

Posted in







আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস ন হন্যতে যাকে বিশেষ খ্যাতি এনে দেয় তিনি হলেন মৈত্রেয়ী দেবী।

মৈত্রেয়ী দেবী( সেপ্টেম্বর, ১৯১৪ - ৪ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯০) ছিলেন একজন বাঙালি কবি, লেখক ও ঔপন্যাসিক। তার বিখ্যাত উপন্যাসের ' ন হন্যতে' জন্য তিনি ১৯৭৬ সালে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন। সাহিত্য ছাড়াও সমাজসেবায় অনন্য অবদান রেখেছেন। ১৯৭৭ সালে তিনি ভারতের সর্বোচ্চ সম্মাননা পদ্মশ্রী পুরস্কারে ভূষিত হন।

মৈত্রেয়ী ১৯১৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর তার বাবার কর্মস্থল তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির (বর্তমান বাংলাদেশ) চট্টগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম সুরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত ও মাতা ভারতের প্রথম ডক্টরেট সুরমা দেবী। তার বাবা ছিলেন একজন দার্শনিক ও প্রাবন্ধিক। তার শৈশব কাটে বাবার বাড়ি বরিশাল জেলার আগৈলঝারার গৈলা গ্রামে। ১৯৩৬ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগমায়া দেবী কলেজ থেকে দর্শনে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন।

মির্চা এলিয়াদ নামক এক বিদেশীর সাথে মৈত্রেয়ী সম্পর্ক তার পরিবারকে বিশেষ ভাবে যখন নাড়া দেয় তখনি তারা তার বিয়ে ঠিক করেন।

১৯৩৪ সালে তিনি ড. মনোমোহন সেনের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। মনোমোহন সেন ছিলেন একজন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী। তিনি মংপুতে সিনকোনা ফ্যাক্টরির ম্যানেজার ছিলেন ও ম্যালেরিয়া প্রতিরোধী ভেষজ সিনকোনা চাষ নিয়ে গবেষণা করেন। মৈত্রেয়ী দেবী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্নেহভাজন হওয়ায় তারা মংপুতে থাকাকালীন রবীন্দ্রনাথ মৈত্রেয়ীর আমন্ত্রণে ১৯৩৮ সাল থেকে ১৯৪০ সালে চারবার সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন।

১৯৩২ সালে ইনি কবি অতুলপ্রসাদ সেনের কথায় ও সুরে "মধুকালে এল হোলি" গানটি এইচ এম ভি থেকে রেকর্ড করেন (রেকর্ড # এইচএমভি এন ৪০১৯).

তার সাহিত্যজীবন শুরু ষোল বছর বয়সে। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ উদিত ১৯৩০ সালে প্রকাশিত হয়। এই বইয়ের ভূমিকা লিখেছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ চিত্তছায়া। ১৯৪২ সালে রবীন্দ্রনাথের মংপুতে কাঠানো দিনগুলোর স্মৃতি ও তার সাথে আলাপচারিতা নিয়ে লিখেন স্মৃতিকথা মংপুতে রবীন্দ্রনাথ। বইটি টেগোর বাই ফায়ারসাইড নামে ইংরেজিতে অনূদিত হয়। রবীন্দ্র বিষয়ক তার অন্যান্য বইগুলো হল স্বর্গের কাছাকাছি, কবি সার্বভৌম, রবীন্দ্রনাথ গৃহে ও বিশ্বে, রবীন্দ্রনাথ : দি ম্যান বিহাইন্ড হিজ পোয়েট্রি। তার আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস ন হন্যতে পাঠক মহলে তাকে খ্যাতির শীর্ষে নিয়ে আসে।১৯৭৫ সালে ভারতীয় লেখিকা সংঘ "ন হন্যতে" ( ইংরেজি, It Does Not Die: A Romance) উপন্যাসের জন্য তাকে সম্মানসূচক পদক দেয়। 'ন হন্যতে' মানে 'যাকে বিনাশ করা যায় না'। এই বইতে তিনি তার দৃষ্টিভঙ্গি, জীবন বোধ, ইংরেজ শাসনামলে ভারতের সমাজ ব্যবস্থা এবং জীবনযাপনের চিত্র তুলে ধরেন। এই বইটির জন্য তিনি ১৯৭৬ সালে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন। বইটি ইংরেজি ভাষায় ইট ডাজ নট ডাই নামে অনূদিত ও প্রকাশিত হয়।

মৈত্রেয়ী দেবীর উপন্যাস ‘ন হন্যতে’ আর "লা নুই বেঙ্গলি" মির্চা ইউক্লিড (ইলিয়াদ)এর পড়েছেন অথচ মনে দাগ কাটেনি এমন বাঙালি প্রায় বিরল।
"ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে" অর্থাৎ "শরীরকে হনন করা গেলেও একে হত্যা করা যায় না" সে ঠিকই রয়ে যায়। পারিপার্শ্বিকতা হয়ত ক্ষণিকের জন্য তার উপর প্রভাব ফেলতে পারে কিন্তু দেহস্থিত সেই সত্য অমর।

১৯২৮/ ২৯ খ্রীস্টাব্দে মির্চা ইউক্লিড(ইলিয়াদ) নামের এক রোমানিয়ান যুবক অতিথি হিসেবে আসেন তাদের পরিবারে ভারতীয় ভাষা-সংস্কৃতি তথা প্রাচ্যের দর্শন সম্বন্ধে জ্ঞানলাভ করার জন্য।
মির্চার শিক্ষক গৃহকর্তা সুরেন্দ্রনাথ কন্যা "রু" যা (মৈত্রেয়ী দেবীর অন্য একটি নাম) দায়িত্ব দেন রোমানিয়ান এই তরুনকে বাংলা শেখানোর জন্য, এবং মির্চাকে ভার দেন রু-কে ফরাসী ভাষা শেখানোর জন্য।

গল্পে মির্চা নামক যুবক, সে তার ইউরোপিয় আভিজাত্য ভূলে গিয়ে বাঙ্গালি-হিন্দু মেয়ে মৈত্রেয়ী এর প্রেমে পড়ে যায়।এমন কি একপর্যায়ে খ্রিষ্টান ধর্ম ত্যাগ করার জন্য ও সংকল্পবদ্ধ হয়।
অপরদিকে মৈত্রেয়ী তার ইউরোপিয়ান কালচারের প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়ে। তারা একে অপরকে গভীরভাবে ভালোবাসে। কিন্তু ক্রীশ্চান মির্চা ও হিন্দু মৈত্রেয়ী দেবীর সেই প্রেম পূর্নতা পায় নি। মির্চাকে আতিথ্যের আসন ত্যাগ করে বাড়ি ছেড়ে নিজের দেশে ফিরে যেতে হয়।
জীবনের প্রথম প্রেম ভুলতে মৈত্রেয়ী ও মির্চা, দুজনকেই প্রচুর বেগ পেতে হয়েছিল। অনেকদিন স্বাভাবিক হতে পারেনি মৈত্রেয়ী।

১৯৩৩ এ ফরাসী ভাষায় তার লেখা "লা নুই বেঙ্গলি"তে মৈত্রেয়ী দেবীর সাথে তার প্রেমকাহিনী লিখে তিনি বিখ্যাত হন।

“লা নুই বেঙ্গলীর” অর্থ হচ্ছে বাঙ্গালীর রাত। লেখক এই বইটিতে আত্মজীবনী পাশাপাশি সত্যের সাথে মিশিয়েছেন ফ্যান্টাসি।

সেই ফ্যান্টাসিতে লেখক তার অপ্রাপ্তি গুলোকে পূর্ণতা দিয়েছেন। সে সময়ের রোমানিয়ান ভাষায় লেখা বেস্ট সেলার বই এটি। মির্চা ও মৈত্রেয়ীর ভালোবাসার গল্প পড়ে কেঁদেছিল সে দেশের মানুষগুলো। ধর্ম, বর্ণ, ভাষা ও জাতীয়তার কিভাবে মানুষের হৃদয়ের পথ আলাদা করে দেয়, তা বইটি পরলে জানা যায়। বই শুধুমাত্র আত্মজীবনী ছিল না তার সাথে ছিলো কল্পনার মিশ্রণ। আর সেই কল্পনার অনেকটা জুড়েই ছিল যৌনতা, শারীরিক ভালোবাসা। পশ্চিমা সংস্কৃতিতে শরীর একটা প্রেমের অংশ হিসেবে দেখা যায় সহজেই কিন্তু ভারতীয় সংস্কৃতিতে এগুলো তখন ‘স্ক্যান্ডাল’ ছাড়া কিছুই নয়।

আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে,মির্চা যে মৈত্রেয়ীকে তার উপন্যাসে স্বপ্নের নায়িকা বানিয়েছে, সেটা স্বয়ং মৈত্রেয়ী জানতেন না। মধ্যবয়েসে এসে মৈত্রেয়ী যখন এই বইয়ের কথা জানতে পারেন, তখন তার ছেলে মেয়েরও বিয়ে হয়ে গিয়েছে।

মৈত্রেয়ী জানতে পারলেন, উপন্যাসে মির্চা লেখেন কিশোরী মৈত্রেয়ী তার ঘরে রোজ রাতে আসতো এবং তাদের মধ্যে শারীরিক প্রেমও হতো। এই সমস্ত ঘটনাকে মৈত্রেয়ী ‘মিথ্যে অভিযোগ’ হিসেবে অবিহিত করেন।

পুরনো প্রেম তাকে নতুন করে কষ্ট দিতে থাকে। এরই মধ্যে মৈত্রেয়ীর দেবীকে শিকাগো থেকে আমন্ত্রণ জানানো হয় রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বক্তৃতা দেওয়ার জন্য। মির্চা এলিয়াদ তখন শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনের অধ্যাপক। লোকলজ্জার ভয় তুচ্ছ করে মৈত্রেয়ী তার স্বামীর অনুমতি নিয়েই দেখা করতে যান তার সাথে। তাদের এই দেখা হয়তো ‘পূনর্মিলন’ ছিল না, কিন্তু এই দেখার ভেতর তারা একে অপরের হৃদয় দেখতে পেয়েছিল। বুঝতে পেরেছিল, এ জীবনে না হলেও অন্য কোনো জীবনে, অন্য কোনো জন্মে তারা এক হবেই।

শিকাগো থেকে ফিরে লা নুই বেঙ্গলির সমস্ত অসত্য ঘটনার উত্তরে ও একইসাথে নিজের মনের গভীরে এত বছর ধরে গোপন করে রাখা এই ব্যথা থেকে মুক্তি পেতে মৈত্রেয়ী লেখেন ন হন্যতে।
১৯৭৪ সালে প্রকাশিত ন হন্যতে, মৈত্রেয়ী দেবীর এতদিনের সাজানো গোছানো জীবনে তীব্র বিতর্ক ও সমালোচনার সঞ্চার করে। এই বইটির জন্য "সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার" পান তিনি। শিকাগোতে মির্চার সাথে দেখা হওয়ার পর মৈত্রেয়ী তার কাছে জানতে চেয়েছিলেন, কেন ওরকম মিথ্যে লিখেছিলেন তার ব্যাপারে। উত্তরে মির্চা বলেছিলেন, ভেতর কষ্টগুলোকে দমন করার জন্য তিনি; কল্পনার আশ্রয় নিয়েছিলেন।

তিনি মৈত্রেয়ী দেবীকে কথাও দিয়েছিলেন, মৈত্রেয়ীর জীবনকালে এই বই কোনোদিন ইংরেজিতে প্রকাশ করা হবে না। ১৯৯০ সালে মৈত্রেয়ী দেবী মারা গেলে তার ৪ বছর পর ১৯৯৪ সালে ন হন্যতে ও লা নুই বেঙ্গলি দুটো বই ই একসাথে শিকাগো প্রেস থেকে ইংরেজিতে প্রকাশ করা হয়।
এই কাহিনী নিয়ে প্রেম ১৯৮৮ সালে" দ্য বেঙ্গলী নাইট "নামের চলচ্চিত্র তৈরি করেন নিকোলাস ক্লতজ।
এছাড়া বলিউডে সঞ্জয় লীলা ভনসালির "হাম দিল দে চুকে সানাম" চলচ্চিত্রের সাথে তাদের কাহিনীর খানিকটা মিল রেখে তৈরি করা হয় চলচ্চিত্রটি।

ইতিহাস আর সাহিত্যে অসমাপ্ত প্রেমের গল্প বরাবরই মানুষের মনে সবচেয়ে বেশি দাগ কেটেছে। এমনকি যেসব প্রেমের পরিণতিতে মধুর মিলন হয়েছে, সেসবের চাইতেও বেশি আবেদন যেন ব্যর্থ প্রেমেই লুকিয়ে থাকে। বিরহে কাতর দুটো মনুষ্য-হৃদয়ের ব্যাকুলতা মানু্ষের অন্তরকে সবসময় ছুঁয়ে যায়।

তাদের প্রেম পূর্ণতা লাভ না করলে তাদের উভয়ের মনজগতে গভীর পূর্ণতায় উন্নীত হয়েছিল,যা চিরদিনের জন্য অমর হয়ে থাকবে।

0 comments:

0

ধারাবাহিক - মনোজ কর

Posted in






















১ম পর্ব - প্রতিকূলতাবিঘ্নিত প্রস্তুতি এবং যাত্রা




প্রস্তুতি

মিনি এখন ইটালির যে ছোট্ট শহরটাতে থাকে তার নাম রেজিও এমিলিয়া। শহরটার

সাইজ ২৩১ বর্গ কিলোমিটার। লোকসংখ্যা ১লক্ষ ৭২হাজার অর্থাৎ জনঘনত্ব

৭৫০জন প্রতি বর্গ কিলোমিটারে। তুলনামূলক ধারণা দেবার জন্য জানাই কলকাতা’র

(মেগাসিটি) আয়তন ২০৬ বর্গ কিমি এবং জনসংখ্যা ৬৫লক্ষ ৭৭হাজার। জনঘনত্বে

কলকাতা রেজিও এমিলিয়ার ৬০গুন!! মিনি যখন ইউনিভার্সিটি অফ মদেনা অ্যান্ড

রেজিও এমিলিয়াতে বৈজ্ঞানিকের কাজ নিয়ে প্রথম রেজিওতে আসে তখন আমরাও

এসেছিলাম ওর সাথে। গত দশবছরে ইউরোপের বিভিন্ন শহরে থেকেছে মিনি।সেই

সুবাদে যে যে শহরে ও থেকেছে সেই সব শহরে আমরাও গেছি প্রতিবছর। যার ফলে

ইউরোপের অনেকগুলো শহর ঘোরা হয়ে গেছে আমাদের। কিন্তু উত্তর ইটালির এই

ছোট্ট শহরটাতে গত বছর প্রথম পা রেখেই ভীষণ ভালো লেগেছিল আমার। শহরটাতে

বহুতল নেই বললেই চলে। সব বাড়িগুলোই পুরনো ধাঁচের। অনেকটা আমাদের উত্তর

কলকাতার পুরনো বড় বাড়িগুলোর মত। উঁচু উঁচু চওড়া পাথরের সিঁড়ি , নক্সাকরা

কাঠের রেলিং, কাঠের সার্সি দেওয়া কাচের জানলা, সিমেন্টের লাল মেঝে, উঁচু সিলিং।

মিনি যে বাড়িটাতে থাকে ওটা সিটি সেন্টারের পাশেই। তিনতলায় দুটো শোবার ঘর,

বসার ঘর, ডাইনিং স্পেস, কিচেন ,টয়লেট। ওর একা থাকার পক্ষে বেশ বড়। বাড়ির

জানলা দিয়ে সামনের রাস্তাটা দেখা যায়। সপ্তাহান্তে রাস্তাটায় লোকের আনাগোনা

বাড়ে। রাস্তার ধারের কফির দোকান, পিজেরিয়া (পিজার দোকান) আর

রেস্টুরেন্টগুলো ভর্তি হয়ে যায়। ইউরোপের অন্যান্য শহরের মতোই রাস্তার ওপরে

চেয়ার টেবিল পাতে কফি আর খাবার দোকানগুলো। আমার ভীষণ ভালো লেগেছিল

বাড়িটা। আগেরবার এই বাড়িটাতে শিফট করে, সব গোছগাছ করে, থাকতে শুরু করতে

না করতেই ফেরার সময় হয়ে গিয়েছিল। মাত্র তিনদিন ছিলাম এই বাড়িটায়। তখন

থেকেই ইচ্ছে ছিল ভিসার ভ্যালিডিটি থাকতে থাকতেই আর একবার এসে অন্তত

মাসখানেক থেকে যাব। বাড়ি ঠিক করে মিনি স্থিতু হতে না হতেই ফিরে এলাম।শুধু

সময় বের করে একদিন সকালে ফ্লোরেন্স গিয়ে রাত্রে ফিরে এসেছিলাম। আর

কোথাও যাওয়া হয়নি। মিনি বলেছিল পরের বার এলে সাত আট দিনের জন্য কোথাও

ঘুরে আসবো। আর সেজন্যই এইবার ইটালি আসা। ভিসার ভ্যালিডিটি শেষ ১৭ই মে।

তাই ঠিক হলো ১৩ই মার্চ রওনা দেব কলকাতা থেকে আর ফিরে যাব ১৮ই এপ্রিল।

মিনি এর মধ্যে স্পেন ভ্রমণের ব্যবস্থা করবে। সেই হিসাবে কলকাতা থেকে দুবাই




হয়ে বোলোনিয়া যাবার টিকিট কাটা হলো ১৩ই মার্চের জন্য। ১৩ই মার্চ রাত্রে

এমিরেটস এয়ারলাইন্সে কলকাতা থেকে দুবাই আর ১৪ই মার্চ সকালে দুবাই থেকে

বোলোনিয়া। সবই ঠিকঠাক চলছিল কিন্তু মার্চের গোড়ার দিকে শুরু হয়ে গেল

আমেরিকা –ইরান যুদ্ধ। যুদ্ধে জড়িয়ে গেল আমেরিকার মিত্রশক্তি সংযুক্ত আমির

আরবশাহি। আক্রান্ত হলো দুবাই। বন্ধ করে দেওয়া হলো দুবাই বিমানবন্দর ।

আমরা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেলাম। কিন্তু মনে ভাবলাম ১৩ তারিখ আসতে

প্রায় দু’সপ্তাহ দেরি। হয়ত এরমধ্যে অবস্থা স্বাভাবিক হয়ে আসবে। শুরু হলো

অস্থির অপেক্ষা। রোজ খবর নিচ্ছি ফ্লাইট ঠিকঠাক চালু হলো কিনা। আশার আলো

দেখিয়ে এমিরেটস জানাল কিছু সীমিত সংখ্যক ফ্লাইট ৮ তারিখ থেকে যাতায়াত শুরু

করবে। তার মধ্যে কলকাতা –দুবাই-বোলোনিয়া আছে। ভাবলাম যাক বাঁচা গেল।

দ্বিগুন উৎসাহে প্যাকিং শুরু করে দিলাম। ১১ তারিখ হঠাৎ এমিরেটস জানালো যে

১৪ তারিখের দুবাই –বোলোনিয়া ফ্লাইট একদিন পরে অর্থাৎ ১৫ তারিখ ছাড়বে।

তার মানে এই দাঁড়ালো যে ১৩ তারিখ রাত্রে কলকাতা থেকে দুবাই। তারপর দুবাইতে

প্রায় দেড় দিন অপেক্ষা । তারপর দুবাই থেকে বোলোনিয়া। এমিরেটস-এ ফোন করে

জানতে চাইলাম কলকাতা-দুবাই ফ্লাইট ১৩ তারিখের বদলে ১৪ তারিখে রি-সিডিউল

করা যাবে কিনা। ওরা রাজি হয়ে গেল। তার মানে আমাদের যাওয়া পিছিয়ে গেল

একদিন। চতুর্দিকে যা চলছে তাতে একদিন পিছিয়ে যাওয়াটা এমন কিছু ব্যাপার নয়।

মনকে সান্তনা দিলাম। ভাবলাম ঠিকই আছে। একদিনেরই তো ব্যাপার।কিন্তু যুদ্ধের

যা পরিস্থিতি তা দেখে খুব একটা নিশ্চিন্ত হতে পারছিলাম না। দুবাইতে পরিচিত

বন্ধুবান্ধবদের ফোন করলাম। এক-দু’জন বাঙালি তো যুদ্ধের ইঙ্গিত পেয়েই

সপরিবারে কলকাতা ফিরে এসেছে।কিছু দক্ষিণ ভারতীয় বন্ধু তখনও দুবাইতে আছে

কিন্তু তারাও খুব একটা আশার কথা শোনালো না। অনতিবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ হবারও

কোনও লক্ষণ নেই। যে কোনও সময়ে দুবাই বিমানবন্দরে ফ্লাইট ওঠানামা কমিয়ে

দেওয়া বা বন্ধ করে দেবার সম্ভাবনাও ওরা একেবারে উড়িয়ে দিল না। অনেক

বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়-পরিজন ইত্যাদি শুভাকাঙ্খীরা পরামর্শ দিল খুব জরুরি না

হলে এখন না যাওয়াই ভাল। কিন্তু কখন যে অবস্থা ভাল হতে পারে তার উত্তর কেউ

দিতে পারলো না। । এইসব অনিশ্চয়তার মধ্যেই ১২ তারিখে এমিরেটস থেকে খবর

এলো যে অনির্দিষ্টকালের জন্য দুবাই –বোলোনিয়া ফ্লাইট বন্ধ করে দেওয়া হলো।

মাথায় হাত! এতদিনের পরিকল্পনা ভেস্তে গেল! অন্য এয়ারলাইন্সে অন্য রুটে

টিকিটের দাম চেক করলাম। দ্বিগুন থেকে তিনগুন দাম। এদিকে হাতেও সময় কম।

ঠিক এইসময়েই এমিরেটস জানালো যে ৩০শে এপ্রিলের মধ্যে যাওয়ার জন্য যে

কোনও ফ্লাইটের দিন এবং রুট একাধিকবার সম্পূর্ণ বিনা অতিরিক্ত খরচায় বদল

করা যেতে পারে। কী মনে হলো এমিরেটস-এর ওয়েবসাইট চেক করে দেখলাম যারা

নতুন করে বোলোনিয়ার টিকিট কাটছে তাদের রোম অবধি প্লেনে এবং রোম থেকে




বোলোনিয়া ট্রেনের ব্যবস্থা করছে এমিরেটস। ভাবলাম আমার পুরনো টিকিট তো কী

আছে, চেষ্টা করে দেখতে দোষ কী? ফোন করলাম। ওরা সব শুনে বলল ট্রেনের

ব্যবস্থা করা যাবে না কিন্তু রোম থেকে একটা কানেক্টিং আই টি এ এয়ারলাইন্সের

ফ্লাইট ব্যবস্থা করে দিতে পারে। তবে ১৪ তারিখের বদলে ১৫ তারিখ রাত্রে ৮-২৫-

এ কলকাতা থেকে রওনা হতে হবে। ১৬ তারিখ রাত্রি ১২টায় (দুবাই সময়) দুবাই

এবং সকাল ৮ টায় (দুবাই সময়) দুবাই –রোম ফ্লাইট যেটা রোমে পৌঁছবে ১৬ তারিখ

১২-৪৫ (রোম সময়) এবং দুপুর ২-২৫ (রোম সময়) মিনিটে রোম-বোলোনিয়া ফ্লাইট।

রোমে লে-ওভার মাত্র ১ ঘন্টা ৪০ মিনিট। ইমিগ্রেশন এবং সিকিউরিটি করে ২৫

মিনিট আগে অর্থাৎ ১ ঘন্টা ১৫ মিনিটের মধ্যে গেটে পৌঁছতে হবে। যথেষ্ট ঝুঁকি

আছে তবুও রাজি হয়ে গেলাম। অন্য কোনও উপায় নেই। আবার অপেক্ষা শুরু ।

প্যাকিং মোটামুটি কমপ্লিট। কিন্তু বিপদ তো একা আসে না। ১৪ তারিখ রাত ১টা

থেকে মুনমুনের ডাইরিয়া শুরু হলো। রাতটুকু ম্যানেজ করার জন্য হাতের কাছে যা

ওষুধ ছিল তাই দিয়ে ভোর প্রায় ৫টার সময় পরিস্থিতি কিছুটা আয়ত্ত্বে এলেও

একেবারে বন্ধ হলো না। সকালে গৃহ চিকিৎসক ডঃ চৌধুরীকে ফোন করলাম।

রক্ষণশীল বয়স্ক ডাক্তার। ইংল্যান্ডে থাকতেন। বললেন,’ কোনও রিস্ক নেওয়া

যাবে না। আবার রি-সিডিউল করান। ওষুধ দিচ্ছি। মিনিমাম চার-পাঁচ দিন লাগবে।‘

আবার ফোন করলাম এমিরেটসে। ওরা সব কিছু দেখে বললো সিডিউল ছ’দিন পিছিয়ে

দেওয়া যেতে পারে। অর্থাৎ ১৫ তারিখের বদলে ২১ তারিখ কলকাতা থেকে রওনা।

বাকি টাইমিং একই রকম থাকবে। আমার অনুরোধে আমাদের ফেরার টিকিটও পিছিয়ে

১৭ই এপ্রিলের বদলে ২৩শে এপ্রিল করে দিতে রাজি হয়ে গেল এমিরেটস

এয়ারলাইন্স। মাঝখানে আর কিছু অঘটন ঘটেনি। অবশেষে ২১ তারিখ কলকাতা থেকে

রাত্রি ৮-২৫ মিনিটের কলকাতা-দুবাই ফ্লাইট ধরলাম। পরের গল্প শুরু ফ্লাইট

ছাড়ার পর।

এই গল্পের শেষে একটা কথা বলে রাখি। আমার এইবারের ইটালি যাত্রার সঙ্গে

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ইটালি ভ্রমণের বেশ কিছু সাদৃশ্য আছে। গুরুদেব তিনবার

ইটালি গেছেন। প্রথমবার ১৮৭৮ সালে ইংল্যান্ড যাবার পথে। দ্বিতীয় ও তৃতীয়বার

যথাক্রমে ১৯২৫ সালে এবং ১৯২৬ সালে। আমারও এটি তৃতীয় ইটালি ভ্রমণ।

প্রথমটি ২০১৬ সালে –রোম ও ভেনিস। আমার প্রথম ইটালি ভ্রমণ আমার কাছে

স্মরণীয় হয়ে আছে। সেবার ভেনিসে গন্ডোলার লাইনে আমার দু’শো ইউরো পকেট

কেটে তুলে নিয়েছিল এক ইটালিয়ান সুন্দরী। তারপর ২০২৫ এবং ২০২৬।

রবীন্দ্রনাথের দ্বিতীয় এবং তৃতীয় ইটালি ভ্রমণের ঠিক একশো বছর পরে।

মুসোলিনি এবং রবীন্দ্রনাথের ঐতিহাসিক সাক্ষাৎকারের শতবর্ষপূর্তি ঘটবে আর

পাঁচ সপ্তাহ পরেই -৩০শে মে। কাকতালীয় !!!




ধান ভাঙতে শিবের গীত এখানেই শেষ। এবার যাত্রা শুরু।

যাত্রা হলো শুরু।

কলকাতা থেকে ২১শে মার্চ রাত্রি ৮-২৫এর দুবাইগামী প্লেনে উঠে বসলাম। প্লেন

ছাড়লো সঠিক সময়। মুনমুনের উইন্ডো সিট, আমার মিডল আর প্যাসেজের পাশে

আইল সিটে এক বাংলাদেশি মাঝবয়সী ভদ্রলোক। প্লেন ছাড়ার খানিকক্ষণের

মধ্যেই চার-পাঁচ ক্যান বিয়র পান করে ঘুমিয়ে পড়লেন ভদ্রলোক। ঘন্টা চারেক পরে

মুনমুন টয়লেট যেতে চাইলে ভদ্রলোককে একটু উঠে দাঁড়াতে বললাম। কিন্তু কে শোনে

কার কথা! নেশাগ্রস্থ ভদ্রলোক তখন ঘুমে কাতর। আমি বারবার ডাকছি , গায়ে হাত

দিয়ে ঠেলা দিচ্ছি তবুও লোকটা নড়ছেনা চড়ছেনা দেখে একজন বিমানসেবিকা এসে

ভদ্রলোককে প্রায় ধাক্কা দিতে শুরু করলেন। অনেক চেষ্টার পর ভদ্রলোক

কোনওক্রমে সোজা হয়ে বসে নিজের পা দু’টো একটু টেনে নিয়ে আবার নিদ্রাদেবীর

কোলে ঢলে পড়লেন। অগত্যা ঐটুকু জায়গা দিয়ে অনেক কসরত করে আমি প্যাসেজে

এসে দাঁড়ালাম। এবার মুনমুনের পালা। অনেক চেষ্টা করে দুপায়ের হাঁটু যতদূর সম্ভব

ভাঁজ করে প্রচুর খেটেখুটে যখন প্যাসেজে এসে দাঁড়ালো তখন বোঝা গেল বাঁ পায়ের

হাঁটুটা আর ভাঁজ করা যাচ্ছেনা। পা সোজা হয়ে আছে কিন্তু হাঁটু মোড়া যাচ্ছে না। চাপ

দিয়ে মুড়তে গেলে প্রচন্ড ব্যাথা। ব্যাকরেস্ট ধরে ধরে কোনওক্রমে টয়লেট থেকে

ফিরে এসে সেই যে সিটে বসলো তারপর থেকে বাঁ পাটা একেবারে নট নড়ন চড়ন। সঙ্গে

রাখা পেন-কিলার খেয়ে ব্যথা একটু কমলেও পায়ের অবস্থার কোনও উন্নতি হলো

না। বিমানসেবিকা এসে বলে গেলেন ল্যান্ড করার পর সিটেই বসে থাকতে। পুরো প্লেন

খালি হয়ে গেলে হুইলচেয়ারে করে নিয়ে যাওয়া হবে। মুনমুনের এই প্রথমবার

হুইলচেয়ার আরোহণ। আইলে বসা ভদ্রলোককে বিশুদ্ধ বাংলায় অভিশাপ দিতে দিতে

হুইলচেয়ারে করে গড়িয়ে চলল মুনমুন আর পিছনে পিছনে আমি চললাম হেঁটে।

দুজনেরই মনেই গভীর উৎকণ্ঠা বাকি পথ কী করে পাড়ি দেব? মিনির বাড়িতো এখন

অনেকটা পথ। দুবাই থেকে রোম, রোম থেকে বোলোনিয়া , বোলোনিয়া থেকে রেজিও

এমিলিয়া-অনেক হাঁটা, ওঠা- নামা, অনেক ঝক্কি। যাইহোক হুইলচেয়ার মুনমুনকে

নামিয়ে দিয়ে গেল এমিরেটস-এর লাউঞ্জে। এখন দুবাই সময় রাত্রি ১২-৩০ , রোমের

ফ্লাইট সকাল ৮টায়। ৭ ঘন্টা ৩০ মিনিটের লে-ওভার। বলে গেল সকাল ৭টায় আবার

হুইলচেয়ার আসবে প্লেনে তুলে দেওয়ার জন্য। এয়ারপোর্ট অ্যাসিস্ট্যান্স

সার্ভিসের এক মহিলাকর্মী জানিয়ে গেলেন তিনি লাউঞ্জেই আছেন। টয়লেট যাবার

বা অন্য কোনও রকম দরকার হলে ওনাকে ডাকতে। এর আগে কোনওদিন

অ্যাসিস্টান্স সার্ভিসের দরকার পড়েনি তাই অভিজ্ঞতাও ছিলনা। ঐ মহিলাকর্মীর

আন্তরিক ব্যবহার এবং প্রতিটি প্রয়োজনে সযত্নে হাত বাড়িয়ে দেওয়া সত্যিই

ভোলবার নয়। কেবলমাত্র প্রশিক্ষণ এবং পেশাগত বাধ্যতার বাইরেও গভীর




আন্তরিকতা এবং পরম মমত্ববোধ ব্যতিরেকে এইধরনের সহায়তা প্রদান সম্ভব

নয়। কাঁটায় কাঁটায় ৭টার সময় হুইলচেয়ার নিয়ে এলেন আরেকজন সহায়তা কর্মী।

সমস্ত লাইন অতিক্রম করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে হুইলচেয়ার আরোহী যাত্রীদের

সকলের আগে প্লেনে ওঠানো হয়। এক্ষেত্রেও তার কোনও ব্যতিক্রম হলোনা।

সঠিক সময়ে আমরা উঠে বসলাম দুবাই থেকে রোম যাবার প্লেনে। দীর্ঘ উড়ান।

প্লেন যদি ঠিক সময়ে ছাড়ে তাহলে রোমে পৌঁছে পরের প্লেন ধরার জন্য সময় পাবো

১ ঘন্টা ১৫ মিনিট। তার মধ্যে সিকিউরিটি এবং ইমিগ্রেশনের গেরো। অনিশ্চয়তার

শুরু আবার। তারই মধ্যে যজ্ঞে ঘৃতাহুতি দিয়ে বিমানচালক জানালেন প্লেন ছাড়তে

৩০ মিনিট দেরি হবে। কারণ দুবাই বিমানবন্দরে রানওয়ের সংখ্যা নিরাপত্তার

কারণে কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমি তখন মনে মনে অঙ্ক করছি। যদি ৩০ মিনিট

দেরিতে ছাড়া মানে ৩০ মিনিট পৌঁছতে দেরি হয় তাহলে পরের প্লেন ধরা অসম্ভব।

সুতরাং হয় আজকের রাত্রি রোমে কাটিয়ে পরেরদিন সকালের বিমানে বোলোনিয়া

অথবা রোম এয়ারপোর্ট থেকে ট্রেন ধরে একটা ট্রেন বদল করে বোলোনিয়া স্টেশন।

কিন্তু এতো লাগেজ এবং প্রায় চলচ্ছক্তিহীন মুনমুনকে নিয়ে মাঝখানে ট্রেন বদল

করে বোলোনিয়া যাওয়া কিছুতেই সম্ভব নয়। প্লেন ছাড়লো ৮-৩০এ। বিমানচালক

ঘোষণা করলেন যে ছাড়তে দেরি করলেও তিনি চেষ্টা করবেন যতটা সম্ভব সময়

বাঁচাতে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পৌঁছে দিতে। আশা হতাশার দোলায় দুলতে

দুলতে চললাম রোমের উদ্দেশ্যে। রোমে যখন পৌঁছলাম তখন আমাদের হাতে আর

মাত্র একঘন্টা সময়। মুনমুনের যেহেতু হুইলচেয়ার লাগবে আমাদের অপেক্ষা করতে

হবে সব যাত্রীর নেমে যাওয়া অবধি। সেখানেই গেল দশ মিনিট। তারপর এলেন এক

মহিলা সহায়তা কর্মী। সঙ্গে হুইলচেয়ার। কিছু রেকর্ড চেক করে মুনমুনকে চেয়ারে

বসালেন। এই হুইলচেয়ারটি হাতে ঠেলা নয়, মোটরচালিত। বললেন,’ আমার নাম

বারবারা। আপনাদের আগেই বলে রাখি আমাদের হাতে যা সময় তাতে সিকিউরিটি,

ইমিগ্রেশন অতিক্রম করে চেক-ইন কাউন্টার থেকে বোর্ডিং পাস সংগ্রহ করে ঠিক

সময়ে গেটে পৌঁছনো প্রায় অসম্ভব।‘ আমাকে বললেন,’ দেখুন আমি হুইলচেয়ার একটু

জোরে ড্রাইভ করবো। আপনাকেও একটু জোরে আমাকে অনুসরণ করতে হবে।

মাঝখানে কোথাও দাঁড়াবেন না। অনেকটা পথ অতিক্রম করতে হবে।‘ হর্ন বাজাতে

বাজতে হুইলচেয়ার দৌড়চ্ছে ।পিছনে দৌড়চ্ছি আমি। ফার্স্ট স্টপ সিকিউরিটি।

বারবারা আমাদের দু’টো কেবিন ব্যাগ হাতে নিয়ে সিকিউরিটির লোকটাকে ওদের

ভাষায় কি একটা বলে বেল্টের ওপর রেখে দিল। সিকিউরিটি অফিসার আমাদের

লাইনের আগে আসতে বললেন। দ্রুতগতিতে সবকিছু চেক করে আমাদের সবার আগে

ছেড়ে দিলেন। শুরু হলো আবার দৌড়। সামনে হুইলচেয়ার, পিছনে আমি। সেকেন্ড স্টপ

–ইমিগ্রেশন। লাইন টপকে আমাদের নিয়ে গিয়ে দাঁড় করালেন ইমিগ্রেশন কাউন্টারে

একেবারে ইমিগ্রেশন অফিসারের সামনে। আমাদের হাত থেকে পাসপোর্টগুলো নিয়ে




ইমিগ্রেশন অফিসারের হাতে প্রায় গুঁজে দিয়ে ইতালিয়ন ভাষায় কি সব বোঝালেন

অফিসারকে। অফিসার মৃদু হেসে হাত চালিয়ে ফর্মালিটি কমপ্লিট করে পাসপোর্ট

দু’টো আমার হাতে দিয়ে হেসে বললেন -অল দি বেস্ট। ইউ আর ইন সেফ হ্যান্ডস।

আবার দৌড় । এবার হুইলচেয়ারের স্পিড আগের থেকে বেশি- লাস্ট ল্যাপ। আমিও

দৌড়চ্ছি প্রাণপণে। গেট নং –এ ৩২। গেটের উল্টোদিকে আই টি এ’র প্রায়রিটি

ট্রান্সফার সার্ভিস। আমাদের দাঁড় করিয়ে হাত থেকে পাসপোর্ট প্রায় ছিনিয়ে নিয়ে

সবাইকে ঠেলে কাউন্টারের সামনে গিয়ে হাত আর মাথা নেড়ে কাউন্টারের মহিলাকে

কি বোঝালেন কিছুই শোনা গেল না। কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখলাম হাতে পাসপোর্ট

আর বোর্ডিং পাস নিয়ে বিজয়ীর হাসি হাসতে হাসতে বারবারা এগিয়ে আসছেন

আমাদের দিকে। বোর্ডিং প্রায় চালু হয়ে গেছে ততক্ষণে। হুইলচেয়ার দেখে

কাউন্টারের মেয়েটি বারবারাকে তাড়াতাড়ি আসার ইঙ্গিত করে অন্যান্য যাত্রীদের

বোর্ডিং কিছুক্ষণের জন্য বন্ধ করে দিল। সকলের আগে হুইলচেয়ারের যাত্রীদের

ছাড়াই নিয়ম। বারবারা সকলের আগে আমাদের নিয়ে গিয়ে প্লেনে ওঠার দরজার কাছে

ছেড়ে দিলেন। বিমানসেবিকা হাত ধরে মুনমুনকে নির্দিষ্ট আসনে বসিয়ে দিলেন।

কিছুক্ষণ পরে বারবারা হুইলচেয়ার রেখে এসে প্লেনের মধ্যে ঢুকে আমাদের সঙ্গে

দেখা করে গেলেন। ওঁকে যে কী বলে ধন্যবাদ জানাবো তার ভাষা খুঁজে পেলাম না।

অনুভব করলাম কেবলমাত্র ধন্যবাদ জানালে বারবারাকে ছোট করা হয়। বললাম

ওঁকে কৃতজ্ঞতা জানানোর ভাষা আমাদের জানা নেই। হাসিমুখে বিদায় নিয়ে বারবারা

চলে গেল । ভেবে দেখলাম মুনমুনের পা যদি ঠিক থাকতো আর বারবারাকে যদি না

পেতাম তাহলে এই প্লেন ধরা আমাদের পক্ষে কোনওভাবেই সম্ভব হতোনা। এই

ঘটনা আমার চিরকাল মনে থাকবে। চরম অনিশ্চয়তা এবং বাধাবিপত্তির মধ্যে

কোথা থেকে হঠাৎ উনি এলেন আর কেনই বা আমাদের হাত ধরে ঝড়ের মতো সমস্ত

বাধাবিপত্তি দূর করে আমাদের লক্ষ্যে পৌঁছে দিলেন আর কী ভাবেই বা সবকিছু

সম্ভব হলো তা এখনও বুঝতে পারিনি।

মিনিকে ভিডিওতে ধরলাম। আমাদের প্লেনের মধ্যে দেখে ও তো একেবারে অবাক। ও

ভাবতেই পারেনি আমরা প্লেনটা ধরতে পারবো। ও নিশ্চিত আমরা কালকের আগে

পৌঁছব না। একমিনিট হাঁ করে তাকিয়ে থেকে বললো – বোলোনিয়াতে নেমে অপেক্ষা

কোরো। আমি লাঞ্চ করে এয়ারপোর্টে আসছি।

রেজিও এমিলিয়াতে মিনির বাড়ি এসে যখন পৌঁছোলাম তখন ইতালির ঘড়িতে সন্ধ্যা

৭টা বেজে ১৫ মিনিট। এখন তিন দিন কোনও কাজ নেই। ২৬শে মার্চ সকালে আমরা

রওনা দেবো উত্তর স্পেনের এক সুন্দর শহর বিলবাও-এর উদ্দেশ্যে।

বাংলাদেশি ভদ্রলোকটিকে বাছা বাছা শব্দে অভিসম্পাতের পর্ব কিন্তু এখনও শেষ

হয়নি। খুব তাড়াতাড়ি শেষ হবে বলেও মনে হচ্ছে না।



                  বোলোনিয়া এয়ারপোর্টে






রেজিও এমিলিয়াতে আমাদের বাড়ি

0 comments: