গল্প - বিশ্বজিৎ দত্ত
Posted in গল্পফ্ল্যাটের অ্যাগ্রিমেন্টে অনেক ছোট ছোট জিনিস লেখা থাকে না। যেমন রাত দুটোর সময় প্রতিবেশী ফ্ল্যাটের বুক-ছাপরানো কাশি, বা বাথরুমের ফ্লাশ প্রতি তিন সপ্তাহে একবার খারাপ হওয়া, অথবা দুপুরের ঘুম ভেঙে যাওয়া কারণ পার্কিং লটে ছোট বাচ্চারা খেলছে। আমার ফ্ল্যাটের অ্যাগ্রিমেন্টেও ছিল না যে একটি সাথি পাব আমি।
আমার প্রথম রাত্রি এই টু-বিএইচকে ফ্ল্যাটে, আমি কার্ডবোর্ডের কার্টন থেকে সব জিনিসপত্র বার করে রাখছি। হঠাৎ করে শুনলাম তার আগমন—মিউ—এবং চোখ তুলে দেখলাম তাঁকে। কালো মার্জার। আমার দিকে কৌতূহলের দৃষ্টি। বাড়ির চারিদিকে দেখে একটু যেন মনখুন্ন হয়েছে।
'আমি এখানে থাকি', বললাম ওকে।
উত্তরে একটা মিউ এল। এর মানে নিশ্চয়ই ওয়েলকাম।
বেড়ালের নাম দিলাম তারু। বেড়াল শ্রীকৃষ্ণের মতো—একশো আটটা নাম না হলেও কুড়ি-ত্রিশটা তো নাম হবেই।
এনারও আছে। তবে আমি তারু বললে ও সাড়া দেয়।
আমাদের মধ্যে ভদ্রলোকের চুক্তি। উনি ঠিক বিকেল ছটায় আসবেন আমার ফ্ল্যাটের ব্যালকনিতে আর মিউ করবেন। আমি ওনাকে একটু দুধ আর একটু মুড়ি দেব বাটিতে। সন্ধে সাড়ে আটটার সময় আবার গায়েব। পরের দিন সন্ধে ছটায় আবার হাজির, মুখে অন্য একটু বাড়ির গন্ধ নিয়ে—যেখানে মাছ একটু বেশি খাওয়া হয়।
আমি ছয় মাস পরে আর থাকতে পারিনি। ভদ্রলোকের চুক্তি ভেঙে দিয়ে তারুর পিছু করি। একটাই কারণ। সর্ষে।
তারুর মুখে সর্ষের গন্ধ আর আমার সন্দেহ — সর্ষে ইলিশ খেয়ে এসেছিল ও। আমি তখন ঠান্ডা ডিম-টোস্ট খাচ্ছিলাম। ভদ্রলোকের চুক্তি ডিম-টোস্ট আর সর্ষে ইলিশের মধ্যে হতে পারে না।
তারু যেন তক্কেতক্কেই ছিল যে ওর পিছু পিছু যাব আমি। ঠিক যেমন দিক হারানো নৌকো কম্পাসের উত্তর দিকের কাঁটার পিছু নেয়, সেরকম আমি ওর পিছু নিলাম—ভাঙা রাস্তা পেরিয়ে, বান্নেরঘাট্টা মার্কেটের খাসির দোকান ক্রস করে, সিল্কবোর্ডের মোড় ডিঙিয়ে তিনতলা হলুদ বাড়ির ফার্স্ট ফ্লোরের সিঁড়িতে। সেখানে উপস্থিত—প্লেটে মাছ ভাজা এবং এক তন্বী নারী।
'কালোসোনা, তুমি লেট', তন্বীর মুখে প্রথম কথা। তারপর তিনি আমার দিকে তাকালেন।
'আপনি?'
'হ্যাঁ, আমি। তারু আমার কাছে থাকে।'
'আচ্ছা, আপনি তাহলে ওকে টোস্ট খাওয়ান।'
আমি চুপ করে রইলাম।
'কালোসোনা বেড়াল হলেও ভাজা মাছটি উল্টে খেতেই ভালোবাসে। আমার নাম সৌমি। আপনার ব্যাপারে কালোসোনার সাথে কথা হয়েছে।'
'তারু।' আমি বললাম।
'সরি?'
'ওর নামটা তারু ।' আবার বললাম।
'একটি বেড়ালের দুটো নাম।'
'হতেই পারে। আমাদের সবার এই তো দুটো নাম আছে—একটা ভালো নাম আর একটা ডাকনাম। শ্রীকৃষ্ণের তো একশো আটটা নাম ছিল।'
'তাও ঠিক। আপনি কি মাছ খাবেন?' সৌমি সিঁড়ির ওপর রাখা প্লেট তুলে ধরল।
……………………………………………………………
তারু - কালোসোনার এই দুই নৌকোয় পা দিয়ে চলা বজায় রইল। এবং তার ফলে ওর পিছু পিছু আমারও যাতায়াত হলুদ বাড়িতে বাড়তে লাগল। প্রতি সোমবার আর বুধবার আমি খাবার নিয়ে যেতাম, কারণ আমি টোস্ট ছাড়াও অন্য কিছু রান্না করতে পারি—এটা দেখানোর প্রয়োজন ছিলো । সিঁড়ির ওপরে আমি এবং সৌমি কাগজের প্লেট খেতাম। তারু - কালোসোনা খাবার খাওয়ার পর লেজ গুটিয়ে শুয়ে পড়ত।
এই রুটিনে কোনো ছেদ পড়েনি। ব্যাঙ্গালোর ঠিক পাঁচটায় বৃষ্টি থেমে যেত সোমবার আর বুধবার, আর আমি গুটিগুটি পায়ে হাজির হতাম হলুদ বাড়িটিতে। সৌমির বাড়ির একতলায় থাকতেন প্রাক্তন আবহবিদ গোলদার বাবু।
উনি বলতেন, এরকম অদ্ভুত ব্যাপার গত চল্লিশ বছরে একবারও হয়নি।
আমরা আমাদের গল্প করতাম। সৌমি ইতিহাসের টিচার। 'সবার ইতিহাস মনে রাখা উচিত। নাহলে ইতিহাস বারবার এসে মনে করিয়ে দেবে।'
আমি বললাম , 'কিছু জিনিস ভুলে যাওয়াই ভালো।'
'যেমন?'
'এই ধরো যেমন বস বলছে তুমি অপদার্থ। সেটা যদি তুমি মনে রাখো তাহলে মন খারাপ হবে। বা ধরো কোনো বন্ধুকে টাকা দিয়েছ, সেগুলো ভুলে যাওয়াই ভালো। নাহলে সম্পর্ক খারাপ হয়ে যায়।'
'আর বান্ধবীরা? প্রাক্তন?'
'চুল তার কবেকার বিদিশার নিশা…'
'থাক, মাছটা খেয়ে নাও।' সৌমি আপনি থেকে তুমিতে নেমে এসেছে — ঠিক যেমন ব্যাঙ্গালোরের বৃষ্টি দুপুরে নেমে আসে পাঁচটার সময়, ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি, যা মন ভেজায় কিন্তু শরীর শুকনোই থাকে।
—————————————————————
ডিসেম্বরে আমাদের বিয়ে হয়ে গেল। বিয়ের সব ফোটোতে তারু - কালোসোনা উপস্থিত। গম্ভীর মুখে পোজ দিয়ে রেখেছে।
আমি এখন হলুদ বাড়িতেই থাকি। আমার পুরোনো ফ্ল্যাটে এখন এক নিঃসন্তান দম্পতি থাকেন। শোনা গেছে, প্রায়ই একটি বেড়াল নাকি ওদের ব্যালকনিতে আসে। কিছুক্ষণ জরিপ করে তারপর চলে যায়, যেন পুরো বাড়ির কর্তা, নজর রাখতে এসেছে বাড়ির ওপর।
প্রতি সোমবার আর বুধবার আমরা মাছ ভাজা খাই। তরু-কালোসোনা আমাদের কোলে বসে থাকে। ঠিক ছটা বাজলেই ও লাফিয়ে যায়। কোথায়? আমি জানি না। আমার আর বেড়ালের পিছনে যাওয়ার দিন শেষ।
আমি ভাবতাম প্রেম আসে জীবনে হঠাৎ করে, কিন্তু বুঝলাম আজকে—প্রেম কখনো ভেজা বেড়ালের মতো ব্যালকনিতে উপস্থিত হয়, অসীম ধৈর্য সমেত তোমাকে দেখে এবং তখন হাওয়াই চটি পরে তার পিছু নিতে হয়।



0 comments: