0

গল্প - হিন্দোল ভট্টাচার্য








লিয়াকত কোনওদিন নিজের মুখ আয়নায় দেখেনি। কথাটা শুনতে যত সহজ, ব্যাপারটা তত সহজ নয়,

কারণ মানুষ নিজের মুখ কোনওদিন দেখেনি—এমন কথা বললে প্রথমেই মনে হয়, লোকটি অন্ধ, অথবা

তার বাড়িতে আয়না নেই, অথবা সে এমন কোনও সম্প্রদায়ের মানুষ যারা নিজেদের মুখ দেখতে চায় না,

নিজেদের মুখ দেখতে ভয় পায়, কিংবা হয়তো তাদের বিশ্বাস, নিজের মুখ একবার দেখে ফেললেই মানুষ

আর আগের মানুষ থাকে না। লিয়াকতের এসবের কোনওটাই ছিল না। তার চোখ ছিল, দুটোই, দিব্যি

পরিষ্কার, দূরের মাঠে ঘাসের মধ্যে লুকিয়ে থাকা একটা সাপের মাথাও সে দেখতে পেত, একবার তো

হাট থেকে ফেরার পথে কাদার মধ্যে পড়ে থাকা একটা আধুলি সে কুড়িয়ে পেয়েছিল, আধুলিটা এত ময়লা

ছিল যে প্রথমে পাথর বলে মনে হয়েছিল, পরে জামার খুঁটে ঘষতে ঘষতে তার মনে হয়েছিল, মানুষের

জীবনও বোধহয় এই রকম, যত ঘষবে তত ময়লা উঠবে, ভিতরে কী আছে কে জানে। সেই আধুলিটা সে

মাকে দিয়েছিল। মা তখন উঠোনে বসে চাল বাছছিলেন, তাঁর ডান হাতের আঙুলে একটা পুরোনো কাটা

দাগ, কাটা দাগের ভিতর সাদা মাংস দেখা যেত, লিয়াকত ছোটবেলায় ভাবত, ওটা বুঝি মায়ের শরীরের

মধ্যে ঢোকার কোনও গোপন দরজা, সেখানে আঙুল ঢুকিয়ে দিলে হয়তো অন্য একটা পৃথিবী পাওয়া

যাবে, যেখানে তার বাবা এখনও বেঁচে আছেন, যেখানে বর্ষার রাতে টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ শুনতে

শুনতে মা কাঁদেন না, যেখানে কোনওদিন ভাতের হাঁড়িতে জল বেশি দিতে হয় না।

মা দেখেছেন, ছোটবেলায় মুখে ভাত তুলে দিয়েছেন, কপালে হাত রেখে জ্বর মেপেছেন, চুলের মধ্যে উকুন

খুঁজেছেন, ঈদের সকালে নতুন পাঞ্জাবির কলার ঠিক করে দিয়েছেন। মায়ের চোখে তার মুখ কেমন ছিল?

গোল, না লম্বাটে? চোখ দুটো কি তার বাপের মতো ছিল? নাকটা মায়ের? ঠোঁটের কাছে যে ছোট্ট কালো

তিলটা আছে বলে একবার রহিমা খালা বলেছিলেন, সেটা কি এখনও আছে? রহিমা খালার কথা মনে

পড়লেই লিয়াকতের একটা অদ্ভুত অস্বস্তি হত, কারণ সেই মহিলার গলায় সব সময় পান আর সুপুরির

গন্ধ লেগে থাকত, আর তিনি কথা বলার সময় এমনভাবে তার গাল টিপে দিতেন যেন মুখটা তার নয়,

বাজার থেকে কেনা কোনও ফল, পাকা কি না পরীক্ষা করে দেখতে হবে। ছোটবেলায় সে মুখ সরিয়ে নিত,

খালা হাসতেন, বলতেন, আহা, এত লজ্জা কিসের, নিজের মুখ নিয়েই তো লজ্জা! নিজের মুখ। কথাটা

তখন তার কানে ঢুকেছিল, কিন্তু অর্থটা ঢোকেনি। নিজের আবার মুখ কী? হাত নিজের, পা নিজের,

পেটের মধ্যে ক্ষুধা নিজের, ভয় নিজের, কিন্তু মুখ? মুখ তো অন্যেরা দেখে। অন্যেরা নাম ধরে ডাকে,

অন্যেরা চিনে নেয়, অন্যেরা বলে, এই যে লিয়াকত, এদিকে আয়। সে যদি একদিন কোথাও দাঁড়িয়ে

থাকে, আর কেউ তাকে চিনতে না পারে, তবে কি তার মুখ বদলে গেছে, না কি পৃথিবীর চোখ বদলে গেছে?

ছোটবেলায় এই নিয়ে তার কোনও মাথাব্যথা ছিল না। তখন তার পৃথিবী ছিল উঠোনের এক কোণে রাখা

ভাঙা কলসি, পুকুরঘাটের শ্যাওলা, দুপুরবেলা তালগাছের মাথায় ঘুরতে থাকা চিল, আর স্কুল থেকে

ফেরার পথে যে দোকানে পাঁচ পয়সার বাতাসা পাওয়া যেত। বাতাসা খেতে খেতে সে কতবার যে দোকানের

কাচের বয়ামে নিজের ছায়া দেখেছে, তা মনে নেই। ছায়া কি মুখ? কাচের ভিতরে আলো লেগে কখনও

কখনও একটা অস্পষ্ট অবয়ব ভেসে উঠত, কিন্তু সে অবয়বের চোখ থাকত না, নাক থাকত না, শুধু

একটা নড়াচড়া করা অন্ধকার। লিয়াকত তখন ভাবত, এ নিশ্চয়ই দোকানদারের ছায়া, অথবা তার

পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা অন্য কোনও ছেলের। সে নিজের বলে চিনতে পারত না। নিজেকে চিনতে হলে কি

নিজের দিকে তাকাতে হয়? নাকি অন্যের চোখের মধ্যে নিজের একটা ছবি তৈরি হয়ে যায়, আর সেই

ছবিটাই মানুষ সারাজীবন বয়ে বেড়ায়, নিজের মুখ বলে ভুল করে?




আয়না তাদের বাড়িতে ছিল না, কথাটা ঠিক নয়। ছিল, একটা ছোট্ট আয়না, যার পিছনের রুপোলি

আস্তরণ উঠে গিয়ে জায়গায় জায়গায় কালচে দাগ পড়েছিল। আয়নাটা থাকত মায়ের কাঠের বাক্সের

ভিতর, পুরোনো শাড়ি, সেলাইয়ের সুতো, কয়েকটা বোতাম, একটা ভাঙা চিরুনি আর বাপের রেখে যাওয়া

লাল রুমালের নীচে। সেই বাক্স খুলতে মা কাউকে দিতেন না। কেন দিতেন না, লিয়াকত জানত না।

বাক্সের ভিতর নিশ্চয়ই এমন কিছু ছিল যা অন্যেরা দেখলে হারিয়ে যাবে, অথবা দেখলে আর আগের

মতো থাকবে না। এক দুপুরে মা পাশের বাড়িতে গিয়েছিলেন, লিয়াকত তখন বারো কি তেরো, ঠিক মনে

নেই, বয়সের হিসেব সে কোনওদিন ভালো রাখতে পারেনি, কারণ তাদের বাড়িতে জন্মদিন বলে কিছু ছিল

না, শুধু মনে থাকত কোন বছর বন্যা হয়েছিল, কোন বছর ধান নষ্ট হয়েছিল, কোন বছর বাপ মারা

গিয়েছিলেন।

তারপর কত বছর কেটে গেছে। সেই আয়নাটা আছে কি না, সে জানে না। মায়ের মৃত্যুর পরে বাক্সটা কে

নিয়ে গিয়েছিল, সেটাও মনে নেই। হয়তো পুরোনো জিনিসের সঙ্গে বিক্রি হয়ে গেছে, হয়তো কোনও

আত্মীয়ের ঘরে এখনও পড়ে আছে, তার কালচে দাগের মধ্যে জমে আছে একটা ছোটবেলার দুপুর,

জানলার আলো, আর একটা ছেলে যে নিজের মুখ দেখতে চেয়েও দেখেনি। লিয়াকত মাঝেমধ্যে ভাবে, সে

যদি সেদিন মুখটা দেখে ফেলত, তাহলে কি তার জীবন অন্য রকম হত? মানুষ কি নিজের মুখ দেখে

নিজের ভবিষ্যৎ বুঝতে পারে? চোখের নীচে যে অন্ধকার একদিন জমে উঠবে, ঠোঁটের কোণে যে

ক্লান্তি এসে বসবে, কপালে যে রেখাগুলো তৈরি হবে, সেগুলো কি আগে থেকেই মুখের মধ্যে লেখা

থাকে? আর যদি থাকে, তবে কেন কেউ তা পড়তে পারে না? সে অনেক মুখ দেখেছে, বাসে, ট্রেনে, হাটে,

হাসপাতালে, থানার বারান্দায়, আদালতের সিঁড়িতে, এমনকি একবার একটা মৃত মানুষের মুখও দেখেছিল,

যে মুখের চোখ বন্ধ ছিল অথচ মনে হচ্ছিল লোকটি কিছু একটা বলতে চাইছে। মুখের ভিতর কি কথা

জমে থাকে? মৃত্যুর পরেও? সে দিনটির কথা মনে পড়লে লিয়াকতের মনে হয়, মানুষের মুখ আসলে

একটা বন্ধ ঘর, বাইরে থেকে দরজা দেখা যায়, জানলা দেখা যায়, কিন্তু ভিতরে কে আছে তা বোঝা যায়

না। কখনও দরজা খুলে যায়, কখনও যায় না। তার নিজের ঘরের দরজাটা এতদিন বন্ধই ছিল। সে

অন্যদের মুখ দেখে জীবন কাটিয়েছে, অন্যদের চোখের দিকে তাকিয়ে তাদের মিথ্যে আর সত্যি আলাদা

করার চেষ্টা করেছে, অন্যের ঠোঁটের কাঁপুনিতে ভয় চিনেছে, অন্যের হাসির ভিতর অপমানের গন্ধ

পেয়েছে। অথচ নিজের মুখের কথা ভাবেনি। যেন তার কোনও মুখ নেই, যেন সে শুধু একটা কণ্ঠস্বর,

একটা চলমান স্মৃতি, যে কথা বলে আর বলতে বলতে কোথাও চলে যায়, যেখানে তার কোনও শরীর নেই,

শুধু কিছু দৃশ্য আছে, কিছু গন্ধ, কিছু অসমাপ্ত বাক্য।

আজ সকালে আয়নাটা আবার তার সামনে এসেছে। কোথা থেকে এল, কে রেখে গেল, সে এখনও জানে না।

ঘুম ভাঙার পরে বালিশের পাশে আয়নাটা দেখে প্রথমে ভেবেছিল, নিশ্চয়ই স্বপ্নের কোনও জিনিস,

রাতের মধ্যে স্বপ্ন থেকে গড়িয়ে এসে বাস্তবের মধ্যে পড়ে আছে। তারপর হাত বাড়িয়ে তুলে নিয়েছিল।

আয়নার কাচে ধুলো জমে আছে, এক কোণে চিড়, পিছনের কাঠে কালো ছত্রাকের দাগ। ঠিক সেই রকম।

এত বছর পরেও কি কোনও জিনিস একই রকম থাকতে পারে? বাইরে তখন বৃষ্টি হচ্ছিল, জানলার গরাদ

বেয়ে জল নেমে আসছিল, আর পাশের বাড়ির ছাদ থেকে একটানা টুপটাপ শব্দ হচ্ছিল। লিয়াকত

আয়নাটা হাতে নিয়ে বসে ছিল। তার মনে হচ্ছিল, আয়নাটা তাকে চিনতে পেরেছে। সে আয়নাটাকে নিজের

মুখের সামনে তুলল না, শুধু আঙুলের ডগা দিয়ে কাচের ধুলো সরাল। ধুলোর নীচে একটা অস্পষ্ট আলো

দেখা গেল। তার বুকের ভিতর হঠাৎ সেই পুরোনো দুপুরটা ফিরে এল, মা পাশের বাড়িতে, বাক্সের ভিতর

লাল রুমাল, জানলার কাছে বাঁশপাতার ছায়া। আর সেই সঙ্গে ফিরে এল মায়ের গলা—নিজের মুখ নিয়েই

তো লজ্জা! লিয়াকত চোখ বন্ধ করল। সে জানত, আজ আর মুখ না দেখে থাকা যাবে না। তবু আয়নাটা

মুখের কাছে তোলার আগে তার মনে হল, যদি সেখানে এমন কাউকে দেখতে পায়, যাকে সে কোনওদিন

চিনত না? যদি তার মুখে তার বাপের মুখ থাকে, অথবা মায়ের সেই ক্লান্ত চোখ, অথবা এমন কোনও




মানুষের ছায়া, যার সঙ্গে তার কখনও দেখা হয়নি অথচ যে বহুদিন ধরে তার ভিতরে বাস করছে? বাইরে

বৃষ্টি বাড়ছিল। ঘরের মধ্যে আলো কমে আসছিল। লিয়াকত আয়নাটা দুহাতে ধরে বসে রইল, যেন তার

ভিতরে কোনও মুখ নয়, একটা দরজা আটকে আছে, আর দরজার ওপারে কেউ নিঃশব্দে অপেক্ষা

করছে।

সকালের বৃষ্টিটা থেমে যাওয়ার পরেও লিয়াকত অনেকক্ষণ বুঝতে পারেনি বৃষ্টি সত্যিই থেমেছে, না কি

বৃষ্টির শব্দের সঙ্গে তার কানের এমন একটা সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেছে যে শব্দটা না থাকলেও সে

শুনতে পাচ্ছে, যেমন মা মারা যাওয়ার পরেও কতদিন সে মাঝরাতে শুনতে পেত মা কাশছেন, প্রথমে

একবার, তারপর একটু বিরতি, তারপর পরপর তিনবার, আর তৃতীয়বারের কাশিটা এমনভাবে ভেঙে যেত

যেন বুকের ভিতরে একটা পুরোনো কাপড় ছিঁড়ে যাচ্ছে, সেই কাপড়ের শব্দ সে কখনও ভুলতে পারেনি,

অথচ মায়ের মুখটা এখন আর ঠিক মনে পড়ে না, চোখ দুটো মনে পড়ে, চোখের নীচে কালো দাগ মনে

পড়ে, কিন্তু মুখের সমস্ত অংশ একসঙ্গে জোড়া লাগাতে গেলেই কোথা থেকে একটা অন্ধকার এসে

দাঁড়ায়, যেন স্মৃতিরও নিজস্ব কোনও পুলিশ আছে, যে কিছু কিছু দৃশ্য দেখতে দেয়, কিছু কিছু দৃশ্য

আটকে রাখে, আর মানুষ সারাজীবন সেই নিষিদ্ধ দৃশ্যগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে থাকে, অনুমতির

অপেক্ষায়। লিয়াকতের মনে হল, আগুনও কি আয়নায় নিজেকে দেখতে পায়? যদি পায়, তাহলে নিজের

মুখ দেখে সে কী ভাবে, এতগুলো ঘর পুড়িয়ে দিয়েছি, এতগুলো মানুষের ঘুম কেড়ে নিয়েছি, এতগুলো শিশুর

খেলনা ছাই করে দিয়েছি, তবু আমার ক্ষুধা মেটেনি? আগুনেরও নিশ্চয়ই একটা দেশ আছে, যেখানে সব

কিছু পোড়ানোর পরেও সে নির্বাসিত হয় না।

বাইরে বেরিয়ে লিয়াকত দেখল পাড়াটা আগের মতোই আছে, অথচ আগের মতো নেই। একই চায়ের

দোকান, একই নর্দমা, একই বিদ্যুতের খুঁটি, যার গায়ে পাঁচ বছর আগের নির্বাচনের পোস্টার এখনও

অর্ধেক লেগে আছে, পোস্টারের মুখটা বৃষ্টিতে ধুয়ে গিয়ে এমন হয়েছে যে লোকটাকে এখন আর চেনা

যায় না, শুধু একটা হাত দেখা যায়, সেই হাত আশীর্বাদ করছে না হুমকি দিচ্ছে বোঝা কঠিন। ইদানীং

তার মনে হয়, অনেক কথাই সে আগে ভেবেছে, শুধু মনে নেই, যেমন বহু বছর আগে দেখা কোনও

স্বপ্নের মধ্যে হঠাৎ আবার ঢুকে পড়লে মনে হয় এই রাস্তা, এই বাড়ি, এই সিঁড়ি সব চেনা, অথচ

কোথায় দেখেছে তা মনে করা যায় না। তার হাতে তখন খবরের কাগজে মোড়া আয়না। সে ঠিক করেছিল

আয়নাটা বিক্রি করবে। কেন বিক্রি করবে, সেই প্রশ্নের উত্তর তার কাছে পরিষ্কার ছিল না। টাকার

দরকার ছিল, নিশ্চয়ই ছিল, কারণ গত তিনদিন সে ঠিকমতো খায়নি, কিন্তু শুধু টাকার জন্য নয়।

আয়নাটা ঘরে রাখলে তার ঘুম হবে না, এই বিশ্বাস তার হয়েছিল। একটা জিনিস, যার ভিতরে একটা

দরজা আছে, তাকে ঘরে রেখে মানুষ ঘুমোয় কী করে? দরজাটা যদি রাতে খুলে যায়, যদি কেউ বেরিয়ে

আসে, যদি কেউ ঢুকে পড়ে, যদি ঘুমের মধ্যে সে নিজেই চলে যায় এমন কোথাও যেখান থেকে আর

ফেরার রাস্তা নেই? না, আয়নাটা বিক্রি করতেই হবে। কিন্তু কাকে?

চায়ের দোকানে বসেছিল মতিউর। মতিউর একসময় স্কুলে ইতিহাস পড়াত, এখন আর পড়ায় না। কেন

পড়ায় না, তা নিয়ে পাড়ায় নানা কথা আছে, কেউ বলে সে চাকরি ছেড়েছে, কেউ বলে তাকে ছাড়ানো

হয়েছে, কেউ বলে ইতিহাসের একটা বিশেষ অধ্যায় পড়ানোর সময় সে এমন কিছু বলেছিল যা বলা উচিত

হয়নি, কারণ ইতিহাস এখন আর অতীতের বিষয় নয়, ইতিহাস এখন প্রতিদিন নতুন করে লেখা হয়,

এবং গতকালের সত্যি আজকের মিথ্যে হয়ে যেতে পারে, আবার আজকের মিথ্যে কাল সরকারি

পাঠ্যবইয়ে ঢুকে গেলে তাকে সত্যি বলে মুখস্থ করতে হয়।

— একটা আয়না কিনবেন?

মতিউর মুখ তুলল।

— আয়না?

— হ্যাঁ। খুব ভালো আয়না।




— আমার আয়না দিয়ে কী হবে?

— নিজের মুখ দেখতে পারবেন।

— নিজের মুখ দেখার আর কী বাকি আছে লিয়াকত? ষাট বছর ধরে দেখছি। নতুন কিছু তো দেখলাম না।

লিয়াকত খবরের কাগজটা খুলল না। বলল, এই আয়নায় শুধু মুখ দেখা যায় না।

— আর কী দেখা যায়?

— একটা দরজা।

মতিউর হাসল না। সে বিস্কুটের ভাঙা অংশগুলো চামচ দিয়ে এক জায়গায় জড়ো করতে লাগল।

— দরজা তো অনেক দেখেছি। বেশিরভাগই বন্ধ।

— এই দরজাটা খোলা যায়।

— কোথায় যায়?

— যেখানে যেতে চান।

মতিউর চামচ নামিয়ে রাখল। বাইরে একটা মোটরসাইকেল গেল, মোটরসাইকেলের পিছনে বাঁধা পতাকাটা

ভিজে গুটিয়ে আছে, পতাকার রং বোঝা যাচ্ছে না, অথচ সেই পতাকার জন্যই গত মাসে দুজন মানুষ মারা

গেছে। একজনের নাম ছিল সুশান্ত, অন্যজনের নাম আজিজুল। তাদের দুজনেরই বউ ছিল, ছেলেমেয়ে

ছিল, দুজনেই আলাদা আলাদা ধর্মের মানুষ, অথচ মৃত্যুর পরে তাদের মুখের রং একই হয়েছিল,

এমনটাই বলেছিল যে লোকটা দুজনের মৃতদেহ দেখেছিল। মতিউর সেই ঘটনার পর থেকে আরও কম কথা

বলে।

— যেখানে যেতে চাই, সেখানে?

— হ্যাঁ।

— যে দেশে যেতে চাই, সেই দেশে?

— হ্যাঁ।

— এমন দেশেও, যেটা পৃথিবীর মানচিত্রে নেই?

লিয়াকত একটু ভেবে বলল, মানচিত্রের সঙ্গে আয়নার কোনও সম্পর্ক নেই।

মতিউর এবার প্রথম হাসল, কিন্তু হাসিটা তার মুখে বেশিক্ষণ থাকল না।

— আমি এমন একটা দেশে যেতে চাই, যেখানে ইতিহাস পড়াতে গেলে মিথ্যে বলতে হয় না। যেখানে

ছাত্ররা প্রশ্ন করলে শিক্ষককে ক্ষমা চাইতে হয় না। যেখানে কোনও রাজা নিজের জন্মের আগের

সমস্ত মানুষকে মুছে দিতে পারে না। আছে এমন দেশ?

লিয়াকত বলল, থাকলে যেতে পারবেন।

— না থাকলে?

— তাহলে হয়তো দরজাটা খুলবে না।

মতিউর অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, ভাড়া কত?

এই প্রশ্নটা লিয়াকত আশা করেনি। সে ভেবেছিল মতিউর কিনতে চাইবে, অথবা তাকে পাগল বলবে।

কিন্তু ভাড়া? ভাড়া দেওয়া যায় তো, নিশ্চয়ই যায়, বাড়ি ভাড়া দেওয়া যায়, জমি ভাড়া দেওয়া যায়,

নিজের শ্রম ভাড়া দেওয়া যায়, এমনকি মানুষ নিজের সময়ও ভাড়া দেয়, সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত

অন্যের জন্য কাজ করে, নিজের জীবনের একটা অংশ অন্যের হাতে তুলে দেয়, তাহলে আয়নার ভিতরের

দরজাটা ভাড়া দেওয়া যাবে না কেন? কিন্তু ভাড়া নেবে কীসের হিসাবে? সময়ের? দূরত্বের? একটা দেশ

থেকে আর একটা দেশে যেতে কতক্ষণ লাগে, আর যদি কেউ এমন দেশে যায় যেখানে সময় নেই, তাহলে

তার কাছ থেকে কত টাকা নেওয়া উচিত?

— এক ঘণ্টার জন্য পঞ্চাশ টাকা।

মতিউর বলল, ফিরে আসতে পারব তো?




লিয়াকত উত্তর দিতে পারল না।

মতিউর বলল, তাহলে আজ নয়। এখনও কিছু বই আছে, সেগুলো কাউকে দিয়ে যেতে হবে।

লিয়াকত উঠে পড়ল। দোকানদার কাদের এতক্ষণ কথাগুলো শুনছিল। কাদেরের একটা কান কম শোনে,

কিন্তু যে কানটা ভালো, সেটা দিয়ে সে এমন সব কথা শুনতে পায় যা অন্যেরা শুনতে পায় না। সে

লিয়াকতকে ডেকে বলল, সত্যিই যদি দরজা থাকে, আমার ছেলেটাকে একবার পাঠিয়ে দিস। ছেলেটা তিন

বছর আগে সীমান্ত পেরিয়েছিল, তারপর আর খবর নেই। ও কোথায় আছে জানি না। শুধু একবার দেখতে

চাই।

— আপনি নিজেই যেতে পারেন।

— না রে। আমি গেলে দোকানটা কে দেখবে?

লিয়াকত পৌঁছে গেল পুরোনো মসজিদের সামনে। মসজিদের দেওয়ালে নতুন রং করা হয়েছে, সবুজ রং,

এত উজ্জ্বল যে চোখে লাগে। আগে দেওয়ালটা ছিল ধূসর, বৃষ্টিতে শ্যাওলা ধরত, শীতকালে রোদ এসে

পড়লে দেওয়ালের গায়ে একটা হলদে আলো দেখা যেত। লিয়াকত সেই পুরোনো দেওয়ালটাকে বেশি

ভালোবাসত। এখন দেওয়ালে বড় বড় অক্ষরে কিছু কথা লেখা হয়েছে, সেই কথাগুলো পড়লে মনে হয়

পৃথিবীতে মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার ধর্ম, তার জন্ম, তার রক্ত, আর বাকি সমস্ত পরিচয়

মিথ্যে। মসজিদের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল হাফিজ করিমুদ্দিন। তার গলা খুব সুন্দর, আজান দিলে দূর থেকে

শোনা যায়, কিন্তু ইদানীং সে এমন সব কথা বলে যে লিয়াকতের মনে হয় সুন্দর গলার মধ্যেও ভয়ংকর

কথা বাস করতে পারে। করিমুদ্দিন একদিন বলেছিল, মানুষের সমস্ত বিপদের কারণ সে নিজের ধর্ম

ভুলে যাচ্ছে।

—একটা আয়না কিনবেন?

করিমুদ্দিন ভুরু কুঁচকে তাকাল।

— আয়না?

— এই আয়নায় একটা দরজা আছে। ইচ্ছে করলে অন্য দেশে যাওয়া যায়।

— অন্য দেশ মানে?

— যে দেশ আপনার পছন্দ।

করিমুদ্দিন বলল, আমাদের নিজের দেশ ছেড়ে যাওয়ার দরকার কী? এই দেশকেই ঠিক করতে হবে।

— কী করে?

— যারা ভুল পথে আছে, তাদের সঠিক পথে আনতে হবে।

— তারা না আসতে চাইলে?

— আসতে হবে।

লিয়াকত ভাবল, আশ্চর্য, মানুষ যে দেশে থাকতে চায় না, তাকে সেখান থেকে বেরিয়ে যেতে দেওয়া হয়

না, আবার যে মানুষ সেখানে থাকতে চায়, তাকেও নিজের মতো থাকতে দেওয়া হয় না।

বাজারের কাছে এসে সে দেখল একটা ছোট্ট ভিড়। মাঝখানে দাঁড়িয়ে একজন যুবক চিৎকার করছে।

যুবকটা লিয়াকতকে দেখে বলল, কী আছে হাতে?

— আয়না।

— কী করবি?

— বিক্রি করব।

— কত?

— দুশো টাকা।

— এত দাম কেন?

— এই আয়নায় অন্য দেশে যাওয়া যায়।




যুবকটা হেসে উঠল। তার সঙ্গে ভিড়ের কয়েকজনও হাসল।

— তাহলে তো ভালো। যাদের এই দেশ পছন্দ নয়, তাদের সবাইকে তোর আয়নায় ঢুকিয়ে দে।

— আপনি যাবেন না?

— আমি কেন যাব? এটা আমার দেশ।

— অন্যদের নয়?

যুবকটার মুখ বদলে গেল।

— কী বলতে চাইছিস?

লিয়াকত বুঝতে পারল, কথাটা বলা ঠিক হয়নি। সে আয়নাটা শক্ত করে ধরল। যুবকটা এগিয়ে এসে

বলল, তোর নাম কী?

— লিয়াকত।

নামটা শোনার পর যুবকটার চোখে যে পরিবর্তন হল, তা লিয়াকত স্পষ্ট দেখতে পেল। একটা শব্দ

কীভাবে মানুষের মুখ বদলে দিতে পারে, এটা সে আগে বহুবার দেখেছে। কখনও নাম শুনে মানুষ কাছে

আসে, কখনও দূরে সরে যায়, কখনও হাত বাড়ায়, কখনও পাথর তোলে। সে ভাবল, তার নাম যদি অন্য

কিছু হত, তাহলে কি এই মুহূর্তটা অন্য রকম হত? নাম কি মানুষের জন্মের আগে ঠিক হয়ে যায়, না কি

নামের ভিতরেই তার ভবিষ্যৎ বন্দি থাকে?

— তুই মানুষকে দেশ ছাড়তে বলছিস?

— না। আয়না বিক্রি করছি।

— একই কথা।

যুবকটা তার দিকে আরও এক পা এগোল। লিয়াকত সরে এল। তখনই ভিড়ের পিছন থেকে কেউ বলল,

আরে, লোকটা পাগল। ছেড়ে দাও। পাগল কথাটা শুনে লিয়াকত এক অদ্ভুত স্বস্তি পেল। এই দেশে পাগল

বলে চিহ্নিত হওয়া কখনও কখনও বেঁচে থাকার একটা উপায়, কারণ পাগলের কথাকে কেউ সত্যি বলে

ধরে না, যদিও অনেক সময় পাগলেরাই সবচেয়ে সত্যি কথা বলে ফেলে।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল হওয়ার আগেই খবরটা ছড়িয়ে পড়ল। কীভাবে ছড়াল লিয়াকত বুঝতে পারল না। কেউ

বলল, আয়নাটার ভিতরে একটা সোনার দরজা আছে। কেউ বলল, দরজার ওপারে এমন একটা দেশ

যেখানে কোনও সরকার নেই। কেউ বলল, সেখানে সরকার আছে, কিন্তু পুলিশ নেই। কেউ বলল, সেখানে

কাজ করলে মজুরি পাওয়া যায়, এবং মজুরি চাইতে গেলে কাউকে গুলি করা হয় না। কেউ বলল, সেই দেশে

কোনও সীমান্ত নেই। কেউ বলল, সীমান্ত আছে, কিন্তু তার সামনে কাঁটাতার নেই। কেউ বলল, সেই

দেশে মানুষের নাম জিজ্ঞেস করা হয় না। কেউ বলল, নাম জিজ্ঞেস করা হয়, কিন্তু নাম শুনে কাউকে

সন্দেহ করা হয় না।

লিয়াকত তাদের প্রত্যেককে একই কথা বলল, আয়নায় একটা দরজা আছে, দরজাটা খুললে নিজের

ইচ্ছেমতো দেশে যাওয়া যায়। কিন্তু কেউ আয়নাটা হাতে নিতে চাইলে সে কেমন যেন ভয় পেয়ে যাচ্ছিল।

তার মনে হচ্ছিল, আয়নাটা যদি সত্যিই কাজ করে, যদি এই মানুষগুলো একে একে চলে যায়, তাহলে

পাড়াটা ফাঁকা হয়ে যাবে, চায়ের দোকান বন্ধ হবে, হাসপাতালের বারান্দা খালি হবে, কারখানার সামনে

আর কেউ দাঁড়াবে না, কলেজের দেওয়ালে আর কোনও পোস্টার লাগবে না। তখন এই দেশটা থাকবে কার

জন্য?

সন্ধের দিকে খবরটা আরও বড় হয়ে উঠল। এখন আর শুধু পাড়ায় নয়, পাশের মহল্লায়, বাজারে,

বাসস্ট্যান্ডে, রেলস্টেশনে, হাসপাতালের অপেক্ষাঘরে, আদালতের বারান্দায়, এমনকি থানার সামনে

দাঁড়িয়ে থাকা মানুষদের মধ্যেও কথাটা ছড়িয়ে পড়েছে। একটা আয়না এসেছে। সেই আয়নায় তাকালে

নিজের পছন্দের দেশে চলে যাওয়া যায়। কেউ বলছে আয়নাটা নাকি একজন দরবেশের দেওয়া, কেউ




বলছে বহু শতাব্দী আগে কোনও জাদুকর বানিয়েছিল, কেউ বলছে আয়নাটা আসলে একটা বৈজ্ঞানিক

যন্ত্র, যার ভিতরে অন্য মাত্রার দরজা আছে। একজন বলল, এটা বিদেশি ষড়যন্ত্র।

সেই রাতেই শহরের অন্য প্রান্তে একটা দপ্তরে খবর পৌঁছোল। দপ্তরটার জানলায় মোটা কাচ, ভিতরে

সব সময় আলো জ্বলে, দেওয়ালে দেশের মানচিত্র, মানচিত্রের চারদিকে লাল পিন, নীল পিন, হলুদ

পিন। কোন পিনের অর্থ কী, তা সাধারণ মানুষ জানে না। সেখানে বসে কয়েকজন মানুষ খবরটা পড়ছিল।

একজন বলল, গুজব। অন্যজন বলল, গুজব হলেও বিপজ্জনক। তৃতীয়জন বলল, মানুষ দেশ ছাড়তে

চাইছে, এটা প্রচার হলে সমস্যা হবে। চতুর্থজন বলল, মানুষ দেশ ছাড়তে চাইছে, সেটা সমস্যা নয়,

সমস্যা হচ্ছে তারা ভাবছে দেশ ছাড়ার একটা পথ আছে। প্রথমজন বলল, পথটা বন্ধ করতে হবে।

দ্বিতীয়জন বলল, পথ নেই। তৃতীয়জন বলল, না থাকলেও বন্ধ করতে হবে। কারণ মানুষ যদি বিশ্বাস

করে একটা দরজা আছে, তাহলে একদিন সত্যিই তারা দরজা খুঁজতে শুরু করবে।

বাড়ির কাছাকাছি এসে সে দেখল একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে। কালো গাড়ি। গাড়ির কাচও কালো। চারজন লোক

নেমে এল। তাদের মুখে কোনও বিশেষ অভিব্যক্তি নেই, যেন তারা বাজার থেকে চাল কিনতে এসেছে,

অথবা কোনও অসুস্থ আত্মীয়কে দেখতে এসেছে। একজন বলল, আপনার নাম লিয়াকত?

লিয়াকত বলল, হ্যাঁ।

— আপনার কাছে একটা আয়না আছে?

— আছে।

— সেটা আমাদের দেখতে হবে।

লিয়াকত আয়নাটা এগিয়ে দিল। লোকটা কাগজ খুলে আয়নাটা দেখল। তারপর বলল, এই আয়না দিয়ে

আপনি মানুষকে দেশ ছাড়তে বলছেন?

— না। আমি আয়না বিক্রি করছি।

লোকটা একটু হাসল। বলল, আপনি জানেন এটা রাষ্ট্রবিরোধী প্রচার?

লিয়াকত অবাক হয়ে তাকাল।

— আয়না বিক্রি করা?

— মানুষকে দেশত্যাগে উৎসাহিত করা।

— আমি কাউকে যেতে বলিনি।

— কিন্তু যাওয়ার পথ দেখিয়েছেন।

লোকটা বলল, আমাদের সঙ্গে চলুন।

— কোথায়?

— থানায়।

— কেন?

— জিজ্ঞাসাবাদ হবে।

লিয়াকত বলল, আয়নাটা কি সঙ্গে নিতে পারব?

লোকটা বলল, ওটা বাজেয়াপ্ত করা হচ্ছে।

বাজেয়াপ্ত। শব্দটা লিয়াকতের ভালো লাগল না। তার মনে হল, কোনও জিনিসকে বাজেয়াপ্ত করা মানে

শুধু জিনিসটা কেড়ে নেওয়া নয়, তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সমস্ত স্মৃতিকেও কেড়ে নেওয়া। আয়নাটা তার

মায়ের বাক্সে ছিল, লাল রুমালের নীচে ছিল, তার শৈশবের দুপুর ছিল, বাঁশপাতার ছায়া ছিল, একটা

অদেখা মুখ ছিল।

গাড়িতে তোলার আগে লিয়াকত একবার পিছনে তাকাল। তার বাড়ির দরজা খোলা। ভিতরে অন্ধকার।

জানলার পাশে একটা পুরোনো চেয়ার, চেয়ারের উপর ভেজা গামছা। এত সাধারণ একটা দৃশ্য, অথচ তার

মনে হল আর কোনওদিন হয়তো এই দৃশ্যটা দেখতে পাবে না। মানুষের জীবনে শেষবার বলে একটা




জিনিস আছে, কিন্তু শেষবার যখন আসে, মানুষ সাধারণত বুঝতে পারে না সেটাই শেষবার। শেষবার

মায়ের সঙ্গে কথা বলা, শেষবার কোনও বন্ধুর সঙ্গে দেখা, শেষবার নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করা।

গাড়ির দরজা বন্ধ হল। ভিতরে অন্ধকার। লিয়াকত জানলার বাইরে তাকিয়ে রইল। রাস্তার আলো

একটার পর একটা পিছিয়ে যাচ্ছে, দোকানের সাইনবোর্ড, ভাঙা দেওয়াল, একটা গাছ, একটা বন্ধ

স্কুল, একটা হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা অ্যাম্বুল্যান্স। সব কিছু পিছিয়ে যাচ্ছে, যেন সে

সত্যিই কোথাও চলে যাচ্ছে, এমন একটা দেশে, যার নাম সে জানে না, যার মানচিত্র নেই, যেখানে

যাওয়ার জন্য কোনও পাসপোর্ট লাগে না, শুধু দুজন মানুষের শক্ত হাত আর একটা সরকারি আদেশ

লাগে।

তার পাশে বসে থাকা পুলিশটি আয়নাটা কোলে রেখেছে। আয়নার কাচে গাড়ির ভিতরের অন্ধকার জমে

আছে। লিয়াকত তাকিয়ে দেখল, পুলিশটি একবার খুব সাবধানে কাচের ধুলো মুছে নিজের মুখ দেখার

চেষ্টা করল। তারপর তাড়াতাড়ি আয়নাটা উল্টে রাখল। কেন রাখল? কিছু দেখেছে? ভয় পেয়েছে? নাকি

কিছুই দেখেনি? লিয়াকত জিজ্ঞেস করতে চাইল, কিন্তু তার আগেই গাড়িটা একটা মোড় ঘুরল।

লিয়াকত ভাবল, তার জন্ম হয়েছিল একটা ঘরে, মা তাকে জন্ম দিয়েছিলেন, বাপ তার নাম রেখেছিলেন,

সে এই মাটিতে হেঁটেছে, এই মাটিতে খেয়েছে, এই মাটিতে কেঁদেছে, এই মাটিতে তার মাকে কবর দেওয়া

হয়েছে, এই মাটিতে তার বাপের হাড় মিশে আছে। এসব কি প্রমাণ নয়? কিন্তু সে বুঝল, এসব কথা

বললে অফিসার রেগে যাবে। তাই বলল, কাগজপত্র বাড়িতে আছে।

অফিসার বলল, আপনি জানেন আপনার বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার অভিযোগ আনা হয়েছে?

লিয়াকত মাথা তুলল।

— দেশদ্রোহিতা?

— হ্যাঁ। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, জনমনে অসন্তোষ সৃষ্টি, নাগরিকদের দেশত্যাগে প্ররোচনা।

লিয়াকত কিছুক্ষণ অফিসারের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর খুব আস্তে বলল, আমি তো শুধু একটা

আয়না বিক্রি করতে চেয়েছিলাম।

অফিসার টেবিলে হাত চাপড়াল।

— এই আয়নার গল্পটা কে আপনাকে শিখিয়েছে?

— কেউ না।

— বিদেশি কোনও সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ আছে?

— না।

— তাহলে অন্য দেশে যাওয়ার কথা বলছেন কেন?

লিয়াকতকে একটা ছোট্ট ঘরে ঢোকানো হল। লোহার দরজা, উপরে সরু জানলা, মেঝেতে একটা কম্বল।

দরজাটা বন্ধ হওয়ার শব্দে তার বুক কেঁপে উঠল। সে বসে পড়ল।

মায়ের বাক্সটা মনে পড়ল। লাল রুমাল। ছোট্ট আয়না। জানলার আলো। বাঁশপাতার ছায়া। সেই বারো কি

তেরো বছরের ছেলেটা, যে নিজের মুখ দেখতে চেয়েও দেখেনি। এতদিন পরে লিয়াকতের মনে হল, হয়তো

সেদিন আয়নার ভিতরে সত্যিই একটা দরজা ছিল, কিন্তু সে দরজা খোলেনি। আজ এত বছর পরে সেই

দরজার কথা বলার জন্য তাকে বন্দি হতে হল।

বাইরে তখন রাত গভীর হচ্ছে। শহরের নানা জায়গায় এখনও মানুষ আয়নাটার কথা বলছে। কেউ জানে না

লিয়াকতকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, কেউ জানে, কিন্তু বিশ্বাস করতে চাইছে না। কেউ বলছে, আয়নাটা

এখন পুলিশের কাছে। কেউ বলছে, পুলিশ আয়নাটা ভেঙে ফেলেছে। কেউ বলছে, আয়নাটা ভাঙা যায় না।

কেউ বলছে, আয়নাটার ভিতরের দরজা খুলে গেছে, কয়েকজন পুলিশ নাকি অদৃশ্য হয়ে গেছে। কেউ বলছে,

সব মিথ্যে। কেউ বলছে, মিথ্যে হলেও ক্ষতি কী, অন্তত কিছুক্ষণ বিশ্বাস করা যায় যে এই পৃথিবী

থেকে বেরিয়ে যাওয়ার একটা পথ আছে।




আর সেই দপ্তরে, যেখানে দেশের মানচিত্রের চারদিকে লাল নীল হলুদ পিন লাগানো, একজন অফিসার

আয়নাটা টেবিলের উপর রেখে অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিল। তার সামনে একটা ফাইল, ফাইলে লিয়াকতের

নাম, বয়স, ঠিকানা, অভিযোগের বিবরণ। অফিসার আয়নাটা হাতে তুলে নিল। কাচের ভিতরে নিজের মুখ

দেখতে পেল। ক্লান্ত মুখ, চোখের নীচে কালো দাগ, কপালে কয়েকটা গভীর রেখা। সে অনেকক্ষণ

তাকিয়ে রইল। তারপর খুব আস্তে আয়নাটাকে নিজের মুখের কাছে আনল।

কাচের ভিতরে তার পিছনের দেওয়াল দেখা যাচ্ছিল।

দেওয়ালে দেশের মানচিত্র।

মানচিত্রের এক কোণে একটা ছোট্ট কালো দাগ।

অফিসার প্রথমে ভেবেছিল কাচের ময়লা। আঙুল দিয়ে মুছে দেখল, দাগটা যাচ্ছে না। তারপর বুঝল, ওটা

দাগ নয়। একটা সরু ফাঁক। ফাঁকটার ভিতরে অন্ধকার। অন্ধকারের অনেক গভীরে একটা ক্ষীণ আলো।

অফিসার আয়নাটা নামিয়ে রাখল।

তার হাত কাঁপছিল।

কিছুক্ষণ পরে সে ঘরের দরজা বন্ধ করে দিল। বাইরে পাহারায় থাকা লোকটাকে বলল, কাউকে ভিতরে

আসতে দেবে না।

তারপর আবার আয়নাটা হাতে নিল।

এবার সে স্পষ্ট দেখতে পেল, কাচের ভিতরে একটা দরজা আছে।

অফিসার আয়নাটিকে নিয়ে তালা খুলে লিয়াকতের কাছে এল।

লিয়াকত ঝিমিয়ে পড়েছিল। অফিসারকে আসতে দেখলে ভাবল, এবার মারবে হয়ত।

কিন্তু অফিসার তার সামনে এসে বলল, ওঠ। এ নে আয়না। এবার তাকা।

লিয়াকত তার দিকে তাকিয়ে বলল, আমি তাকাই না। আয়না দেখি না।

অফিসার বলল, তাহলে অন্য লোককে বলিস কেন মিথ্যে মিথ্যে কথা?

লিয়াকত একটু চুপ করে থেকে বলল, স্যার, সত্যিই আয়নার ভিতর দিকে অন্য দেশে যাওয়া যায়।

যাবেন?

অফিসার বলল, তুই আগে যা। তারপর আমি। না গেলে, এখানেই গুলি করে মারব।

লিয়াকতের আর এখানে থাকতে ইচ্ছে করছিল না। আর এ জীবনটাকেই ভাল লাগছিল না। সে হাত বাড়িয়ে

আয়নাটা নিল। সেল-এর আলো জ্বালিয়ে দেওয়া হল। লিয়াকত তাকাল আয়নার দিকে। আয়নায় স্পষ্ট

একটা লোকের মুখ। একমুখ দাড়ি, গোঁফ। কাঁচাপাকা দাড়ি। চোখের কোণে কালি। উস্কোখুস্কো চুল।

অফিসার বলল, মালটা পাগল রে। কাল সকালে ছেড়ে দিস।

বলে, বেরিয়ে গেল। গারদের দরজায় তালাও দিল না।

পরদিন সকালে পুলিশ এসে দেখল সেলের মধ্যে লিয়াকত নেই। মেঝেতে ভাঙা কাচ পড়ে আছে, দেওয়ালে

একটা সরু ফাটল, আর জানলার নীচে খবরের কাগজে মোড়া একটা পুরোনো লাল রুমাল। তদন্ত শুরু হল।

দপ্তরে ফাইল তৈরি হল। সংবাদমাধ্যমে বিবৃতি দেওয়া হল, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার কোনও

ঘটনা ঘটেনি। আয়নার গল্পটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। লিয়াকত নামের কোনও ব্যক্তির নিখোঁজ হওয়ার

খবরও সরকারি নথিতে পাওয়া যায়নি।

কিন্তু সেদিন থেকেই শহরের মানুষ আয়না কেনা বন্ধ করে দিল।

লিয়াকতের অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার বিষয়ে কোনও তদন্ত হল না।

0 comments: