ধারাবাহিক - নন্দিনী সেনগুপ্ত
Posted in ধারাবাহিক২১
আগেই বলেছি যে ক্রিস্টিনা সুন্দরী। যদিও তার কিশোরীবেলায় এই সৌন্দর্য, লাবণ্য সেরকম প্রস্ফুটিত ছিল না। ভারিক্কি চওড়া গড়নের চেহারায়, মুখে সেরকম ছিরিছাঁদ না থাকলেও এক অদ্ভুত পবিত্রতা ছিল। এবং তার মুখের বিচিত্র অভিব্যক্তির মধ্যে সবচেয়ে প্রকট ছিল বিরস বিষণ্ণতা। সবার মাঝখানে তাকে সেভাবে কেউ লক্ষ্য করত না। স্কুলে পড়াশুনা ভাল শিখছিল না সে। অবশেষে আঠেরো বছর বয়সে তাকে সুইজারল্যান্ডে এক ফরাসি-মাধ্যম বোর্ডিং স্কুলে পাঠানো হয়। কিন্তু সেখানেও সে তার শিক্ষিকাদের সন্তুষ্ট করবার মত সেরকম কোনও কাজ করতে পারেনি।
তার একজন চিত্রশিল্পীর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছিল। যদিও বোর্ডিং থেকে বেরিয়ে বাইরের লোকজনের সঙ্গে দেখা করবার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ ছিল। কিন্তু সে কোনোদিন এসব নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা করেনি এবং সেসব নিয়ে কোনও লুকোছাপাও করেনি। অদ্ভুত নিরুত্তাপ ভাব দেখাত সে। যখন এসবের জন্য তাকে তিরস্কার করা হত, সে শান্ত হয়ে শুনত; কিন্তু কোনও কিছুই রেখাপাত করত বা তার মাথায় ঢুকেছে বলে মনে হত না। ব্যাপারটা শেষে এমন দাঁড়াত যে, তাকে যেরকম নির্দেশই দেওয়া হোক না কেন, সে কোনওকিছুকে সেরকম পাত্তা দিত না।
ক্রিস্টিনার কাণ্ডকারখানায় তার শিক্ষিকারা মাঝেমধ্যে দিশেহারা বোধ করতেন। প্রথমে তারা ভেবেছিলেন যে ক্রিস্টিনার সেরকম মেধা বা প্রতিভা নেই, তারা ভেবেছিলেন যে সে হয়ত বা ফরাসি ভাষা ঠিকভাবে বুঝতে পারছে না। ফলে তার ক্ষেত্রে শিক্ষিকারা একটু বিশেষ ধৈর্য দেখাতেন। কিন্তু ক্রমেই দেখা গেল যে ক্রিস্টিনার বুঝবার কোনও ইচ্ছেই নেই। তারা অনেকবার নানাভাবে তাকে সামনাসামনি বোঝাবার চেষ্টা করেছেন, সেরকম ফল হয়নি। বরঞ্চ ক্রিস্টিনা অবাক হয়ে উত্তর দিয়েছিল যে সে যথাসম্ভব চেষ্টা করছে যাতে তার কোনও ভুল না হয় এবং সে বুঝতেই পারছে না যে শিক্ষিকারা তার কাছ থেকে ঠিক কী চান। পরদিন বিকেলে বোর্ডিংএর সবাই মিলে একসঙ্গে হাঁটতে যাবার কথা ছিল। এদিকে যথাসময়ে দেখা গেল যে ক্রিস্টিনার কোনও চিহ্ন নেই।
ক্রিস্টিনার রুমমেট জানাল যে দুপুরের খাবার খেয়েই সে কোথায় বেরিয়ে গেছে কেউ জানে না। শিক্ষিকা প্রচণ্ড ক্ষেপে গিয়ে বললেন যে এই কারণে ক্রিস্টিনাকে শাস্তিভোগ করতে হবে। তাছাড়া ভবিষ্যতে এইভাবে যদি সে বেরিয়ে যায়, তাহলে যেন তার সহপাঠীরা অতি অবশ্যই সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষকদের জানায়।
সময়টা ছিল বসন্তকাল, মনোরম আবহাওয়া। সবাই মিলে হাঁটতে শুরু করল লেকের দিকে। জেটির কাছাকাছি গিয়ে সবার সঙ্গে দেখা হল ক্রিস্টিনার। এক যুবকের সঙ্গে সেখানে দাঁড়িয়ে আছে সে। প্রচণ্ড উল্লাসে হাসতে হাসতে চ্যাপ্টা নুড়ি কুড়িয়ে লেকের জলে ছুঁড়ে ছুঁড়ে দেখছে যে সেগুলো কতবার করে জলের তলের উপরে লাফিয়ে উঠছে।
বোর্ডিংএর অন্যান্য সহপাঠীদের দেখে এক মুহূর্তের জন্য অপ্রস্তুত হল সে। কিন্তু পরমুহূর্তে একটু দ্বিধা ও জড়তার সঙ্গে হাসিমুখে সে শিক্ষিকাকে অভিবাদন জানাল। যুবকটিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে শিক্ষিকা প্রচণ্ড ক্ষোভে কাঁপতে কাঁপতে তাকে নির্দেশ দিলেন যে সে যেন এখনি তার বোর্ডিংএর সহপাঠীদের সঙ্গে যোগ দেয় এবং বোর্ডিংএ ফিরে আসে। ক্রিস্টিনাকে দৃশ্যত বেশ বিরক্ত দেখাল। মাথা নেড়ে জানাল যে সে এখন তার বন্ধুর সঙ্গে চা খেতে যেতে চায়। শিক্ষিকা রাগে ফ্যাকাসে হয়ে বললেন যে সে যদি এখনই সবার সঙ্গে যোগ না দেয়, তাহলে তার বাবা মাকে চিঠি লিখে বোর্ডিং স্কুল থেকে বের করে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হবে। একথা শুনে ক্রিস্টিনা একটু কাঁধ ঝাঁকাল উদাসীন ভঙ্গিতে। যুবকের সঙ্গে করমর্দন করল এবং বোর্ডিংএর শিক্ষার্থীদের মিছিলের সারিতে যোগ দিল। ‘তোমাদের দূর থেকে দেখে মনে হচ্ছিল হাঁসের ঝাঁক!’ পাশে হাঁটতে থাকা মেয়েটিকে বলে উঠল ক্রিস্টিনা।
প্রধানা শিক্ষিকা চিন্তায় ছিলেন যে ক্রিস্টিনাকে সত্যিই বাড়িতে পাঠিয়ে দেবেন কিনা। কিন্তু যেহেতু সমস্ত শিক্ষিকা চেয়েছিলেন যে ক্রিস্টিনাকে শৃঙ্খলাভঙ্গের কারণে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া উচিত, সেহেতু প্রধানা শিক্ষিকা সবার বিরুদ্ধে দাঁড়ালেন। এমনকি তিনি ক্রিস্টিনার সমর্থনেই কথা বললেন।
তারপর থেকেই, ক্রিস্টিনাকে প্রধানা শিক্ষিকার প্রিয়পাত্রী হিসেবে গণ্য করা হয় বোর্ডিং স্কুলে। সন্ধেবেলায় প্রায়ই প্রধানা শিক্ষিকার ব্যক্তিগত ঘরে ডাক পড়ত তার এবং এই কারণেই অন্যান্য শিক্ষিকারা বেশ ঈর্ষামিশ্রিত ঘৃণার চোখে তাকে দেখতে শুরু করলেন। মেয়েটির শান্ত এবং উদাসীন হাবভাব তাদের ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দিল এবং ক্লাসে ক্রিস্টিনার পঠনপাঠনও সেভাবে তার মর্যাদা বৃদ্ধিতে সহায়ক হল না।
প্রধানা শিক্ষিকা ছিলেন একজন ভারি উৎসাহী মহিলা। অন্যান্য শিক্ষিকাদের সঙ্গে সময় কাটানোর চেয়েও তার বেশি পছন্দ ছিল ছাত্রীদের সঙ্গ। ছাত্রীদের কী ভাবে শিক্ষাদান করা উচিত, সেই বিষয়ে তার কিছু নিজস্ব মতামত ছিল, যেগুলোকে কোনওভাবেই কঠোর বলা চলে না। আবার বেশি স্নেহ দেখাতে গিয়ে যাতে বাচ্চারা একেবারে বয়ে না যায়, সেই ব্যাপারেও তার যথেষ্ট চিন্তাভাবনা ছিল।
অনেক ছাত্রী তাকে বেশ পছন্দ করত। তিনিও খুব আহ্লাদ দেখাতেন তাদের। সন্ধেবেলায় ছাত্রীরা তার ঘরে যেত। তিনি তাদের চা খাওয়াতেন। তারপর সবার মাথার চুলে বিলি কেটে হালকা আদরে শুভরাত্রি জানাতেন।
ক্রিস্টিনা কখনই প্রধানা শিক্ষিকার ঘনিষ্ঠ ছাত্রীদের বৃত্তের মধ্যে ছিল না। বরঞ্চ সে এমন ভাব করত যে তার মন পাওয়া মোটেই সহজ ব্যাপার নয়। প্রধানা শিক্ষিকা নিজেই উঠেপড়ে লাগলেন ক্রিস্টিনাকে বশ করবার জন্য। সে যদি সন্ধ্যায় কখনো প্রধানা শিক্ষিকার ঘরে যেত, সবার সঙ্গে নয়, একলা ডাকা হত তাকে। সেটা ছিল বিশেষ সম্মান। তিনি ক্রিস্টিনাকে সবই জানিয়েছিলেন যে অন্যান্য শিক্ষিকারা কতখানি ক্ষেপে রয়েছেন তার উপরে। তাদের অভিযোগ, ক্লাসে ক্রিস্টিনার পড়াশুনার অমনোযোগ, খারাপ ফল, সর্বোপরি বিরাট সন্দেহের প্রশ্নচিহ্ন যে হয়তো ক্রিস্টিনা লুকিয়ে সেই যুবকটির সঙ্গে এখনও দেখা করে, যাকে তারা সেদিন লেকের ধারে ক্রিস্টিনার সঙ্গে দেখেছিলেন। অবশ্য তিনি তারপর আশ্বস্ত করলেন… ‘কিন্তু তোমায় সেই কারণে ভীত হবার প্রয়োজন নেই। আমি বিষয়টা দেখছি, যাতে তোমার কোনও ক্ষতি না হয়!’
ক্রিস্টিনা ভাবলেশহীন, স্থাণু বসে রইল। আলগা একটা হাসি ঝুলে রইল ঠোঁটে। প্রধানা শিক্ষিকা এবার দ্বিধায় পড়লেন…
‘ক্রিস্টিনা, তোমার কিন্তু কিছুটা হলেও কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত আমার প্রতি।’ শিক্ষিকা হালকা ভাবে তার হাত স্পর্শ করলেন। ক্রিস্টিনা আদরের কাঙাল, সে মুখে কিছু না বললেও উঠে গিয়ে প্রধানা শিক্ষিকার পাশে ডিভানে বসে। মুখের অভিব্যক্তির অদ্ভুত শীতলতা অবশ্য মুছে যায় না। ফলে শিক্ষিকা বেশ বিভ্রান্ত বোধ করতে থাকেন।
পাঠক, আপনার মনে এই প্রশ্ন আসতে পারে যে তাহলে ক্রিস্টিনা কি আসলে কাউকেই খুব একটা পছন্দ করে না? তার রুমমেট ছিল এক অষ্টাদশী, ছোট্টখাট্ট চেহারার মেয়ে। চালচলন শিশুসুলভ, জাপানিদের মত দেখতে। প্রথম প্রথম সে ক্রিস্টিনাকে বেশ ভয় পেত, এড়িয়ে চলত। বেশির ভাগ সময়ে চুপচাপ থাকত, স্নানে যাবার সময়ে কিম্বা পোশাক বদলানোর সময়ে খুবই অস্বস্তিতে থাকত। ক্রিস্টিনা আবার এসব ব্যাপার একেবারে পাত্তা দিত না। তবে একদিন সে বলে উঠল… ‘জলি, তুমি আমার সামনেই পোশাক বদলাতে পারো, তোমাকে দেখতে আমার খুব ভাল লাগে।’
জলি লাগোয়া চানঘরের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল; সে কোনও উত্তর দিল না। কিন্তু লজ্জায় লাল হয়ে উঠল। ক্রিস্টিনা উল্টোদিকের দেওয়ালে টাঙানো আয়নায় দেখতে পেল জলির অস্বস্তি। এই অস্বস্তি ক্রমে এতটাই বেড়ে চলেছে যে এক ঘরে থাকাটাই একটা সমস্যা হয়ে উঠতে পারে। জলি সর্বত্র ক্রিস্টিনাকে এড়িয়ে চলতে লাগল। ক্লাসরুমে বসে সে নিজের পড়া সারতো, তারপর ঘরে ফিরে সন্ধ্যায় তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ে ঘুমের ভান করত, যাতে কোনওভাবেই ক্রিস্টিনার সঙ্গে তাকে কথা বলতে না হয়। ক্রিস্টিনা আবার রাত জাগত। বিছানার পাশের নাইটল্যাম্পের আলোয় পড়াশুনা করবার জন্য মধ্যরাত অবধি জেগে থাকত সে। জলি শুয়ে শুয়ে দূর থেকে ক্রিস্টিনার প্রতিটি গতিবিধি লক্ষ্য করত। আলো নেভানোর সঙ্গে সঙ্গে ক্রিস্টিনা ঘুমিয়ে পড়ত। জলি তখনো শুনতে পেত তার দীর্ঘ হয়ে যাওয়া নিয়মিত শ্বাসের শব্দ। একদিন ওইভাবেই জলি মটকা মেরে পড়েছিল। আধখোলা চোখে লক্ষ্য করছিল ক্রিস্টিনার গতিবিধি। হঠাৎ সে দেখল যে ক্রিস্টিনা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকে লক্ষ্য করছে। জলি তখন আবার তাড়াতাড়ি তার চোখ বুজে ফেলল এবং একদম নড়াচড়া বন্ধ করে দিল।
- ‘জলি’ ক্রিস্টিনা বলে ওঠে… ‘কেন আমার প্রতি তোমার এত ক্ষোভ? কেন তুমি আমায় সহ্য করতে পারো না?’ জলি চোখ খোলে কিন্তু সরাসরি তার দিকে তাকায় না। মুখ ফিরিয়ে রাখে অন্যদিকে। … ‘আমাকে দেখে তোমার অস্বস্তি হয়?’ ক্রিস্টিনা বলে যায়… ‘তুমি কি জানো যে আমাকে যদি কেউ অপছন্দ করে, তাহলে আমি তার সঙ্গে একত্র থাকতে পারি না?’
জলি তাকে সম্পূর্ণ অবাক করে দিয়ে উঠে দাঁড়ায় এবং বলে যে একথা সত্য নয় যে সে তাকে সহ্য করতে পারে না। তার কণ্ঠস্বর শান্ত, কিন্তু তার অস্বস্তি স্পষ্ট।
ক্রিস্টিনা হালকা সুরে বলে… ‘তাহলে ব্যাপারটা কি এমন যে তুমি আমায় ভালবাস?’ বলে সে অনেকটা সময় চুপ করে বসে থাকে। জলি কোনও উত্তর দেয় না।
‘এসো’… আবার ক্রিস্টিনা তার দিকে তাকায়… ‘আমরা পরস্পর একটু আলোচনা করে দেখি।’
জলি তাড়াতাড়ি এসে বাধ্য মেয়ের মত ক্রিস্টিনার খাটের কিনারায় বসে। ক্রিস্টিনা আবার তাকে প্রশ্ন করে… ‘তুমি কি আমায় ভালবাস?’ এবার জলি ইতিবাচকভাবে মাথা নাড়ে।
ক্রিস্টিনা তাকে হালকা হাতে স্পর্শ করে… ‘সেকথা তো আগেই বলতে পারতে!’
(চলবে)



0 comments: