0

ধারাবাহিক - সুবল দত্ত

Posted in

ধারাবাহিক

প্রতিস্রোত
সুবল দত্ত


৪ 
গোরাচাঁদ 

ঘোর লাগা বেহুশের মতো এইভাবে চলতে চলতে কখন যে অন্ধকার সরু সুড়ঙ্গ পথ শেষ হয়ে একটা বাঁক নিতেই পথ শেষ। আধো অন্ধকারে দেখাগেল উজ্জ্বল হালকা নীলচে সবুজ ডিম্বাকার জলাশয়। চারদিকে কুম্ভের ভিতরের মতো মসৃণ পাথরের দেওয়াল। অনেক উঁচুতে গোলমতো খোলা আকাশ দেখা যায়। সেখান থেকে আলোরশ্মি ছটা জলাশয়ে পড়ে সেটাকে দ্যুতিময় করে তুলেছে। সুড়ঙ্গমুখ থেকে জলস্রোত দুধের মত সাদা ঝর্ণা হয়ে গড়িয়ে পড়ছে নিচে। গোরাচাঁদ দেখলেন সাথের ওই মেয়েটি পাশে একটা ঢালু পাথর বেয়ে ধীরে ধীরে নামছে। পাথরগুলি স্ফটিক পাথরের মত মসৃণ। পাহাড় দেওয়াল সমতল মসৃণ চাট্টান। পাথরের ছাদ থেকে নেমে এসেছে অসংখ্য স্ট্যালেগমাইট স্ট্যালেকাইট এর ঝুরি। মোটা ঝুরিগুলো কোনটা গাছ কোনটা মানুষ কোনটা সাপের আকার নিয়েছে।

জোহা নামের ওই মেয়েটি জলাশয়ের কিনারায় গোরাচাঁদকে ধরে ধরে নিয়ে গিয়ে আঁজলা ভরে খানিকটা জল খাওয়ালো। সেই জল পান করে শরীরে যেন অনেক বল পেলেন তিনি। গোরাচাঁদ দেখলেন জলাশয়ের চারপাশটা পাহাড় পাথরের দেওয়াল দিয়ে ঘেরা। পাথরের চাট্টান দেওয়াল ভেদ করে বেশ কয়েকটি গুহাপথ। অনেকটা জুড়ে পাথরের গায়ে খোদাই করা কিছু লিপি। এই লিপি তাঁর চেনা। এ নিয়ে বিস্তর পড়াশুনো তাঁর।দেখ লেন জোহা হাত বাড়িয়ে কাছে ডাকছে। অক্ষরগুলো অলচিকি ও মুণ্ডারি ভাষার আদি সংমিশ্রণ। প্রতিটি শব্দের পাশে হেয়ারোগ্লিফিক্সের মত ছবি আঁকা রয়েছে সেই শব্দের উচ্চারণ ও তার মানে। বিশাল পাথর দেওয়াল জুড়ে এই চিত্রণ। একজায়গায় আদি অস্ট্রিক মুণ্ডারি ভাষায় লেখা কবিতা। তিনি অলচিকি ও মুণ্ডারি লিপির সাথে ঘনিষ্ট পরিচিত। পেরোর কথা মনে পড়ল। পেরোকে তিনি এই অক্ষরের পাঠ পড়িয়েছেন। উনি বলতেন, পেরো আজকাল এই উত্তর আধুনিক জীবনযাত্রায় অনেক ভাষা অব্যবহৃত হয়ে লোপ পেয়ে যাচ্ছে। তার মধ্যে এই দুটি ভাষা। তার কারণ অস্তিত্ব বজায় রাখতে দলে দলে আদিবাসী ভাইয়েরা ধর্মান্তরিত হয়েছে ও হচ্ছে। অনেকে হীনমন্যতার শিকার হয়ে নিজস্ব জাতি ধর্ম গোপন করছে। সরকারি জনজাতি ও জনউপজাতির কোটাতে পড়াশুনো ও চাকরির লোভে ওরা নিজস্ব ভাষা ত্যাগ করছে। পেরো,এই বিপন্ন সময়ে নিজের মাকে বাঁচা। প্রায় লোপ পেতে বসা এই ভাষাকে তুইই পারবি উদ্ধার করে ভবিষ্যতে এগিয়ে নিয়ে যেতে। ভালোকরে চোখমেলে তাকাতে পারছেন না গোরাচাঁদ। কিন্তু পেরোর কথা খুব মনে পড়ছে এখন। বনবাসীদের অস্তিত্ব বাঁচিয়ে রাখার লড়াই এখন তিনমুখী। এক,শোষণ তন্ত্র এখন খুব শক্তিশালী। তারা মিথ্যে অজুহাত দিয়ে ওদের আমূল উপড়ে ফেলে ওদের বাসস্থানের দখল নিতে চায়। কানুনকে ওরা অস্ত্র বানিয়ে রেখেছে। ওদের হাত থেকে কিভাবে সরিয়ে রাখা যায়। দুই, সভ্য জগতের আদব কায়দা এবং দেশের নাগরিক হিসেবে তাদের কি অধিকার ওরা জানেনা। এইজন্যেই ওদের জংলী বলে সবাই হেয় করে। ওদের কিভাবে শিক্ষিত করে তোলা যায়। তিন, বর্ণবৈষম্য। ওদের রঙ কালো। দেখতে আদিম। ওরা মুণ্ডারী জনজাতি। শহরেও ওরা অনেকেই শিক্ষিত অল্পশিক্ষিত হয়ে বাস করে। কিন্তু সেখানেও ওরা শোষিত। ইন্ট্রোভার্ট। কারণ ওদের চেহারা ও গায়ের রঙ। আচ্ছা! এই জোহা মেয়েটিও তো অস্ট্রীয় জনজাতি। মুণ্ডারী ভাষায় কথা বলে। কিন্তু ওর গায়ের রঙ ফর্সা কেন? ওর আদবকায়দা এতো স্মার্ট কেন? 

এইসব ভাবতে ভাবতে আর প্রস্তরলিপি পড়তে পড়তে কখন আর কোন গুহামুখে প্রবেশ করেছেন গোরাচাঁদের খেয়াল নেই। অবশ্য আগে আগে জোহা প্রস্তরলিপি জোরে জোরে পাঠ করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছে। পিছনে গোরাচাঁদ অনুসরণ করছে। এমনিতেই তাঁর মাথা আচ্ছন্ন হয়ে আছে,সুতরাং এই গোলকধাঁধা পথে কেবল অনুসরণ ছাড়া আর কি করার আছে? কিছুটা এগিয়ে যাওয়ার পর গুহার ভিতরে অন্ধকার ঝাঁপিয়ে এল। ঘুটঘুটে অন্ধকারে কিছুই ঠাহর হয়না। পায়ের নিচে সরসর করে বইছে বরফ ঠান্ডা জল। গোরাচাঁদ জোহার স্পর্শ পেলেন। জোহা তাঁকে জড়িয়ে ধরে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। বেশ কিছুক্ষন পর নাকে একটা মিষ্টি মাদক গন্ধ এলো। এটা কোনো ফুলের গন্ধ। গোরাচাঁদ এতো জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরেছেন। এতো ফুলের গন্ধ চেনেন,কিন্তু এই গন্ধ তাঁর অচেনা। একটুপরেই গন্ধ তীব্র হলো আর একটু আলো দেখা গেল। কিন্তু আলো কোন দিক থেকে আসছে বোঝা যাচ্ছে না। জোহা ফিসফিস করে নিজের মনেই কিছু কথা বলে যাচ্ছে। গোরাচাঁদ মন দিয়ে শুনবার চেষ্টা করলেন। ও বারবার একটা কথাই বলে যাচ্ছে,

‘এযে অন্য পথ দিয়ে চলে এলাম? এই রাস্তা তো আমাদের মেরে ফেলবে। চিরকালের মতো পঙ্গু ও বোবা হয়ে থাকবো। এর চেয়ে মরণ ভালো। এখন কী করি? আমার কিছু হলে ক্ষতি নেই কিন্তু গুরুজির কিছু হলে সর্বনাশ হয়ে যাবে’। এইবলে গোরাচাঁদকে দুহাত দিয়ে আগলে আগে এগোতে বাধা দিল। গোরাচাঁদের খটকা লাগলো। মেয়েটা গুরুজি বলল কেন? একমাত্র পেরো ছাড়া গুরুজি সম্বোধন কেউ করেনা। তবে কি জোহা মেয়েটা পেরোর সাথে কোনোভাবে ?

জোহা নিজস্ব ভাষাতে গোরাচাঁদকে গুহাতে একটা পাথরের উপর বসতে বলল। তার গলায় কঠোর আদেশের ইঙ্গিত। গোরাচাঁদ বসে পড়লেন। জোহা গুহামুখে এগিয়ে বেশকয়েকবার হাওয়াতে নাক ঘুরিয়ে গন্ধ শুকলো। গোরাচাঁদের কাছে এসে বিড়বিড় করে বকতে বকতে বুকের ওড়না ছিঁড়ে একটুকরো গোরাচাঁদের নাক ঢেকে বেঁধে দিলো,আর একটুকরো দিয়ে নিজের নাক ঢাকলো। তারপর গোরাচাঁদকে ওর সাথে চলতে ইঙ্গিত করল। এমনিতেই গোরাচাঁদের মাথা কাজ করছিলো না। কোথা থেকে এসেছেন কী উদ্দেশ্যে কোথায় যাচ্ছেন সব গুলিয়ে গেছে। কিচ্ছু মনে পড়ছে না। তার ওপর ওই মিষ্টি ফুলের গন্ধে মাথা একদম আচ্ছন্ন হয়ে যাচ্ছিল। নাকে কাপড় বাঁধতে মনে হয় একটু কম হয়েছে। জোহার সাথে গুহাপথ দিয়ে এগোতেই আলো দেখা গেল। গুহামুখটা প্রচুর লতাপাতা দিয়ে ঢাকা। এমনভাবে যেন একটা সবুজ পর্দা দিয়ে ঢাকা। জোহা সাবধানে লতাপাতার পর্দা একটু সরিয়েই সঙ্গে সঙ্গে অস্ফুট আর্তনাদ করে গোরাচাঁদের দিকে ঘুরে দাঁড়াল। গোরাচাঁদ দেখলেন একটা লোক গুহামুখের লতা আঁকড়ে ধরে ঝুলছিল। জোহা সেই লতা সরাতেই হুড়মুড় করে নিচে পড়ল। লোকটার হাঁ খোলা মুখ কিন্তু আওয়াজ বেরোচ্ছেনা। বেশ কয়েকবার উঠে বসার চেষ্টা করছে কিন্তু পারছেনা। গোরাচাঁদ লোকটার কাছে গিয়ে ঝুঁকে দেখলেন। লোকটাকে খুব চেনা লাগলো কিন্তু কোথায় দেখেছেন তা মনে পড়ছে না। জোহা গোরাচাঁদকে বলল,ও আপনাদের একটি বস্তির ওঝা। ঝাড়ফুঁক করে ডাইনি ভুত তাড়ায় রোগের জড়িবুটি দেয়।শহরে কখনো যায় কাছারির বাইরে রুজি রোজগারের সন্ধানে। সেনা মহড়াতে সৈনিকদের নেশার ওষুধ বেচে। ও ওষুধগুলো আমাদের অঞ্চলে নিয়ে আসতে চাইছিলো আমি আনতে দিইনি। কিন্তু ও এখানে কি করে এল? মনেহয় ও সবার আড়ালে লুকিয়ে পালাবার ফেরাতে ছিল। জোহা ও গোরাচাঁদ ওকে ধরে দাঁড় করাবার চেষ্টা করল। কিন্তু লোকটার হাত পা যেন অসাড়। গলা দিয়ে আওয়াজও বেরচ্ছেনা। জোহা নিজের মনেই বকে চলেছে,-নিশ্চয় লতাঝাড়ের ওপাশে সম্মোহক ফুলের ঝাড় আছে।ওই ফুলের গন্ধই তো পাচ্ছি। এই লোকটা সেখানে এসে মৌমাছির কামড় খেয়েছে। এতো সর্বনাশ কান্ড! এখন আবার সেই ঝর্ণা সরোবরে গিয়ে ঠিক ঠিক সুড়ঙ্গ খুঁজতে হবে। এছাড়া কোনো উপায় নেই। কিন্তু আমি একা কি করব? দু দুজন ভারী বয়স্ক অসুস্থ মানুষ। একজন তো পুরোপুরি পঙ্গু।

জোহা কেঁদে ফেলল। থপ করে বসে পড়ল মাটিতে। গোরাচাঁদ নিরুপায় হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে রইলেন। কোথায় কেমনভাবে যেতে হবে তাঁর জানা নেই। কি ধরনের বিপদ এসেছে তাও তাঁর বোধে আসছেনা। কিছুক্ষন ওই বিষন্ন বেসাহারা পরিবেশ স্তব্ধ হয়ে রইল। জোহা মুখ ঢেকে বসেছিল হঠাত্‍ সোজা হয়ে উঠে বসল। নাক দিয়ে জোরে জোরে শ্বাস নিয়ে উঠে দাঁড়াল। গোরাচাঁদ জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে রইলেন। জোহা উঠে দাঁড়িয়ে প্রায় চিত্কার করে বলে উঠলো,-ধোঁয়া! মাছি তাড়ানো ধোঁয়া। আপনি গন্ধ পাচ্ছেন গুরুজি? –হ্যাঁ আমি তো গন্ধকের গন্ধ পাচ্ছি। গোরাচাঁদ বললেন। -ঠিক ঠিক,গন্ধকের মতোই গন্ধ। কিন্তু এটা একধরনের ডালপালা জ্বালানো হচ্ছে যেটা মৌমাছিদের মারেনা,মধুরও কোনো ক্ষতি হয় না। আমাদের এখানে প্রাণ হত্যা নিষেধ। আপনি নাকের ঢাকা খুলুন। ধোঁয়ার গন্ধে ফুলের বাস ঢেকে গেছে।এবার কোনো ভয় নেই। 

লতাপাতার পর্দা সরিয়ে গুহামুখ থেকে গোরাচাঁদ বেরোতেই দেখেন কুয়াশার মতো রূপো রঙের ধুয়োর মেঘ রয়েছে চারপাশ। একটু দাঁড়িয়ে থাকার পর তিনি দেখলেন ধোঁয়া ভেদ করে কয়েকজন ওদের দিকে এগিয়ে আসছে। জোহা চিত্কার করে উঠল,-পেরো পেরো আমি এখানে আমি এখানে।

0 comments: