0

গল্প - প্রদীপ কুমার ভট্টাচার্য

Posted in


গল্প


উপলব্ধি 
প্রদীপ কুমার ভট্টাচার্য 

(১)

পিঁ___পি___পি --- শব্দটা ক্রমাগত বাড়তেই থাকে। একরাশ বিরক্তি নিয়ে হাত বাড়িয়ে মোবাইল-এর টুটি চেপে ধরতে না ধরতেই সদ্য প্রাপ্ত এলিফ্যানটা টেবিল ক্লকটা মিলিটারি ব্যান্ড বাজিয়ে ‘গুড মর্নিং’ বলে কানফাটা আওয়াজ করতে থাকে। সুমন অসহায়, ঘুম জোড়া চোখে সেটার পানে তাকিয়ে। অবশ শরীর অপেক্ষা করে থাকে ঘড়ির ব্যাটারির শুভ বুদ্ধির উপর যাতে এই শব্দ যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পায়। এত কিছু সত্বেও সুমনের অলস মন বুঝে উঠতে পারে না কে বা কারা শত্রুতা করে এলার্ম ফোনের বাহার বইয়ে দিয়েছে রবিবারের সকালে। আওয়াজটাকে কান সহ্য করে পাশবালিশ টেনে আবার শোয়ার তোড়জোড় করছে, ঠিক সেই সময় অলির প্রবেশ চায়ের কাপ হাতে।

‘দাদা তোর না সকালের বাস ধরতে হবে’

ব্যস, এক মুহূর্তে সব বিরক্তি, আলস্য ছেড়ে ধড়মড় করে উঠে বসে সুমন। সকাল ন'টার দুরপাল্লার বাস ধরতে পৌঁছতে হবে সিটি সেন্টার বাস স্ট্যান্ডে। কাল সকালেই জয়েন করতে হবে আবাসিক ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে। শিলিগুরি অফিস এ রিপোর্ট করতে হবে আর তাই এই পর্যায়ক্রমে অ্যালার্ম ধ্বনি তার মতো কুম্ভকর্ণকে জাগাবার জন্যে। 

মালপত্র অবিশ্যি এখন কিছু নিয়ে যাবার নেই। কেননা রিপোর্ট করার পর ফ্যাক্টরি ট্রেনিং এ যেতে হবে প্রায় মাস খানেকের জন্য। ছোট্ট একটা এয়ার ব্যাগ এ নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস ভরার অর্ডার দিয়ে অলিকে সুমন ছূটলো তৈরি হতে। 

যদিও সপ্তাহ তিনেকের মধ্যে দুর্গাপুরে ফিরে আসছে, তবু মাথায় দইয়ের ফোঁটা দেওয়ার সময় মায়ের চোখ ছল ছল করতে থাকে। তেত্রিশ কোটি দেব দেবতার নাম স্মরণ করতে থাকা আশীর্বাদ পর্ব তাই যত প্রলম্বিত হতে থাকে, সুমনের দীর্ঘশ্বাস আর ঘড়ি দেখা ততই ঘন ঘন চলতে থাকে। চোখের ইশারায় অলিকে শুধায় ‘দিয়েছিস তো’? অলি আঁচল চাপা দিয়ে হাসি আটকে ভ্রূ ভঙ্গী করে মায়ের চোখ এড়িয়ে।

ব্যাপারটা অবিশ্যি এমন কিছু আহামরি ঘটনা নয়। উপালি গতকাল এসেছিল সুমনের সঙ্গে দেখা করতে। প্রথম চাকরি হওয়া উপলক্ষে একটা কম্প্যাক্ট ডিভিডি সেট উপহার দিয়েছে সুমনকে। পরবাসে সেটাই উপালির প্রক্সি দেবে, এতটা হয়ত সে ভাবেনি, কিন্তু সুমনের কাছে এই উপহার এমনি মহার্ঘ উঠেছে যে উপালির স্পর্শে ভরা সেটটা দৃষ্টি আড়াল করাই অসম্ভব ব্যাপার হয়ে পড়েছে। অলি কি করে বুঝবে এই নবীন প্রেমের বিরহ মর্ম। এই স্মৃতিটুকু নিয়েই পরবাসে প্রেমিকার মাঝে লীন হয়ে থাকবে সুমন অতএব অতি সাবধানী যে হবে, তা বলাই বাহুল্য। 

(২)

বাস স্ট্যান্ডে এসে সুমনের চক্ষু ছানাবড়া। স্ট্যান্ডে লোকে গিজগিজ করছে। প্রধানত রাজবংশি আর সাঁওতালিতে বাস ভর্তি হয়ে গেছে। ভাগ্যিশ তার সীটটা অগ্রিম সংরক্ষণ করে রেখেছিল, নইলে এই ভীরে পাদানিতে দাঁড়াবার জায়গা পাওয়া যেত কিনা সন্দেহ। খুব সহজে যে তার সিটটা উদ্ধার হয়েছে তা নয়। খানিকটা ভদ্রলোকের গরিমা সম্পন্ন ভাব, খানিকটা অবজ্ঞা সুলভ অবহেলিত দৃষ্টি আর কিছুটা বাসের কন্ডাক্টর এর শ্রেণীগত সমীহর দৌলতে সিট খালি করাতে পেরেছে। কিন্তু তাতেই বা রক্ষে কই? সিট থেকে নেমে পায়ের কাছে বসে পরেছে মুরগীর ঝাঁকা নিয়ে। অসাবধান হলে যে মুরগীর ঠোকর খেতে হবে সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। তার পাশে যে আদিবাসি লোকটা বসে আছে তার ফতুয়া আর ধুতিটা যে কতদিন কাচা হয়নি, তা বোঝবার জন্য কারও শার্লক হোমস হওয়ার দরকার হয় না। সুমন রুমাল বেড় করে নাক বাঁধল। তাও ভাল! অলি রুমালে সেন্ট ঢেলে দিয়েছে ---ভুর ভুর গন্ধ, অন্য গন্ধকে ছাপিয়ে গেছে! শরীরটাকে কুঁকড়ে, তার ভাগ্যকে গাল পাড়তে পাড়তে, কেন আগে খেয়াল করেনি রবিবার বিকেলে দিনাজপুরে হাট, এয়ার ব্যাগটাকে ঝুড়ি চাপা থেকে মুক্ত করে, যতই হোক ভেতরে উপালি আছে! সন্ত্রস্ত সুমনের শিলিগুড়ি যাত্রা শুরু হলো একরাশ বিস্বাদ নিয়ে। 

কোনওক্রমে সোজা হয়ে বসে অলস চোখে বাস এর সহযাত্রীদের জরিপ করতে করতে সুমনের মুখে একটা হাল্কা হাসি হঠাৎ খেলে গেল, এই পরিস্থিতিতে উপালি কি করত বা বলত তা ভেবে। উপালি উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারের একমাত্র সন্তান। চোখ খুলে অবধি গাড়ী ছাড়া কখনও ঘোরাঘুরি করেছে কিনা সন্দেহ। বাবা স্টিল প্ল্যান্টের জেনেরাল ম্যানেজার, তাই জীবন শৈলী আর পরিবেশে রয়ে গেছে না-বলা আভিজাত্যের ছোঁয়া। সেই তুলনায় সুমন এর পশ্চাৎপট নিতান্তই সাদামাটা। দুর্গাপুরের সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা মা এই তিন জনের পরিবারটাকে মধ্যবিত্ত মূল্যবোধ আর পারিপারশকিতায় দাঁড় করিয়েছে, তাদের বাবার অকাল মৃত্যুর পর। শিবপুর থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং অবিশ্যি সুমন তার মেধার দৌলতেই করেছে এবং আজ যে সে বহুজাতিক সংস্থায় যোগদানের জন্য চলেছে, তাও তার ব্যাক্তিগত প্রচেষ্টার মুল্য স্বরূপই! 

প্রেমের মজাই হলো মন ভালবাসার ঢেউয়ে উছল অথচ দৃষ্টি ভঙ্গীতে দুজনের অমিল স্বাস্থকর বিতর্কের সূচনা করে প্রায়শই। আদিবাসী তথা উপজাতির পশ্চাৎপদ মানুষজনদের প্রতি যদিও সুমন সহানুভূতিশীল, তবু উপালির সঙ্গে একটা ব্যাপারে ও দ্বিমত। দিনকে দিন এই সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে ক্রমাগত স্বাধিকার রক্ষার নামে তথাকথিত উচ্চবর্ণের প্রতি রোষ, ক্ষোভ নিরন্তর যে প্রবাহিত তা প্রকারন্তরে জাতি বিভাজনই মাত্র। উপালির মতে এসবই সুমনের মতো কিছু মানুষের নিজ গড়া ধারণা, বাস্তবের সঙ্গে তার মিল নেই। আসলে জাতিগত বৈষম্য এতদিন অবধি লালনের ভার যাঁদের হাতে ছিল, আজ পাশা পাল্টাতেই এরাই গেল গেল রব তুলে বিভাজনের পথ আরও প্রশস্থ করে চলেছে।

উপালি সমাজবিজ্ঞানের মেধাবি ছাত্রী ছিল, অধুনা শিক্ষিকা। তাই যুক্তি তক্কে প্রেমালেপের অবসর খোয়া না যায়, তাই হার মেনে সে ইতি টানত ঠিকই, কিন্তু কোথায় যেন এই সংগঠিত নিম্ন জাতের মানুষের অধিকার বোধকে একরকম নিজের অস্তিত্ব রক্ষার অন্তরায় বলেই মনে হতে থাকতো। তার প্রকাশ তাই মাঝে মাঝেই হয়ে যাচ্ছিলো এই বাস যাত্রার প্রাক্কালে, বোধকরি একটু বেশিরকমই!! 


(৩)

রামপুরহাট পৌঁছতে পৌঁছতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেল। সূর্য অস্তাচলে ঢলতেই গোধূলির আলো কতটা মায়াবী হয়ে ওঠে উন্মুক্ত পশ্চিম দিগন্তে, তার অভিজ্ঞতা সুমনের প্রথম। পরিবেশ ছাপিয়ে পরিস্থিতি সেই আনন্দ উপভোগে বুঝি অন্তরায় হলো। যাত্রা তার সুখপ্রদ হয়নি মোটেই। ভিড় তো কমেইনি, বরং উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে। ঠায় একটু যে আধবোজা হবে, তার যো কই! একবার তো ছাগলের শিঙের গুঁতো খেতে খেতে প্রায় বেঁচেছিল।

রামপুরহাট লেভেল ক্রসিং এ বাস থামতে সে নামলো নিছকই প্রাকৃতিক প্রয়োজনে। দুটো ট্রেন, আপ আর ডাউন লাইন এ যাবে তাই যানবাহনের লম্বা লাইন। আধ খাওয়া সিগারেটটা ফেলে সুমন বাসে ফিরে এল। সীটে বসে চোখ ঘোরাতেই সেই আধো আলোতেও সে খেয়াল করল মাথার ওপরে রাখা দুটো ঝুড়ি আর তার পাশে রাখা সাধের স্টিরিওটার বিপজ্জনক অনুপস্থিতি! মুহূর্তে রক্তচাপ উচ্চচাপে পরিণত হলো। অসহায়তা পুঞ্জিভুত জাত-ক্রোধে বদলে গেল। চিল চীৎকার করে বাসকে রাস্তার ধারে দাঁড় করাল। তারপর শুরু হলো খোঁজার নামে এক এক করে বাসের সহযাত্রীদের প্রতিটি জিনিসপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে অনুসন্ধানের তাণ্ডব। ভদ্রলোক বাবুর এই যে অত্যাচার, বাস-সুদ্ধ লোককে চোর বানিয়ে ফেলা, এ তাদের ভাগ্যগুণে প্রাপ্য মেনে নিয়ে সকলে নিশ্চুপ, নির্বিকার হয়ে... 

কিছু যখন পাওয়া গেল না, সুমন তখন বাস থেকে নেমে এল টর্চ হাতে। হাইওয়েতে অন্ধকার তখন ঘনিয়ে এসেছে, দু'পাশের মাঠ জলাজঙ্গল আঁধারে অদৃশ্য। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে অজানা চোর আর চুরি হওয়া মাল ফিরে পাওয়ার জেদে টর্চ ফেলতে লাগল সে প্রতিটি অপেক্ষামান গাড়ির ভেতরে। তার এই প্রয়াস কতটা ফল্প্রসু হতো বা কতক্ষণ চলত সেই অনিশ্চয়তা বোঝবার আগেই এক জলদ্গম্ভির স্বর ভেসে আসে---

‘কোন হতচ্ছাড়া টর্চ ফেলছে পুলিশ জিপে?’

রামপুরহাট থানার পেট্রোল জিপে সেদিন বড়বাবু মল্লিক মশাই স্বয়ং উপবিষ্ট।

‘ওসব কার গাড়ি ফারি জানিন না, আমি প্রত্যেক গাড়ি সার্চ করছি এটাও করব। টর্চের আলো জিপের অভ্যন্তরে ফেলতে ফেলতে সুমন আলটপকা বলে বসলো। আর বলেই ভেতরে ভেতরে কেঁপে উঠল, কিন্তু গুলি ততক্ষণে ছোঁড়া হয়ে গেছে। বড়বাবু এক লাফে সামনের সিট থেকে নেমে সুমনের কলার ধরে হিড় হিড় করে টেনে জিপের পেছনে তাকে ঠেলে দিয়ে বসে থাকা ছোট বাবুর উদ্দেশ্যে হাক পাড়েন-

‘গাড়ি ঘুরিয়ে সোজা থানায় চলো। এটাকে লক আপে চালান করে কেস দাও পুলিশের গাড়ীতে বোমা ছুঁড়েছে।

মুহূর্তে সুমন অনুভব করল হিমস্রোত বইছে শিরদাঁড়া বেয়ে। এক লহমায় শ্রীমান সুমন, পিটারসন কম্পানির উত্তরবঙ্গের কর্ণধার, মায়ের স্নেহে আদরে পালিত দুলাল, উপালির প্রেমে গর্বিত প্রেমিক, তার স্বপ্ন সৌধ নিজেরই হঠকারিতায় সামান্য এক ডিভিডির জন্য চিরকালের মতো ধূলিসাৎ হতে চলেছে স্বজন নির্বাসিত থানার হাজতে। পড়ে রইলো তার জয়নিং লেটার দূরপাল্লার বাসে আর সুমনের ঠাঁই হলো আট বাই আট ঘরে অভিযুক্ত অপরাধিদের মাঝে। কে করবে এই অজ মফঃস্বলে তাকে নিরপরাধী বলে বিশ্বাস? কেনই বা কেউ তাকে সাহায্য করবে এই অভিযোগের থেকে নিষ্কৃতি পেতে? অপরাধের প্রমাণ নস্যাৎ করতে করতেই হয়ত কেটে যাবে বেশ কয়েকটা স্বর্ণালি স্বপ্নের বছর। পা গুঁটিয়ে, হাঁটুতে মুখ গুঁজে নিজের অজান্তেই কখন যেন বসে পড়ল সে সেই অপরিসর, অপরিস্কার হাজতে। মায়ের মুখটা মনে পড়তেই গলার কাছে কি একটা দলা বেঁধে আটকে গেল। চোখ ঝাপসা হলো লবণাক্ত জলে। দেয়াল ঘড়ি সশব্দে জানান দিল রাত গড়িয়ে মাঝ রাতে। মা হয়ত সন্তানের মঙ্গল কামনায় স্মরণ করছেন দুর্গতি নাশিনী দুর্গাকে। যদি তাঁরা জানত... 

(৪)

সুমনকে পুলিশে ধরে নিয়ে যাওয়ার সংবাদ পাওয়া মাত্র হাইওয়েতে দাঁড়িয়ে থাকা দূরপাল্লার বাসে তখন শুরু হয়েছে এক নতুন নাটক যার একদিকে বাসের চালক, কন্ডাক্টর, হেল্পার আর অপর দিকে সঙ্গবদ্ধ সুমনের বাস শুদ্ধ নিচু জাতের সহযাত্রীরা ।

অভিজ্ঞ পাইলটের বক্তব্য অবশ্য খুবই যুক্তি সঙ্গতঃ একজন যাত্রী যে স্বেচ্ছায় নেমে গেছে বাস থেকে, যাকে পুলিশের জীপ তুলে নিয়ে গেছে থানায়--- তার জন্য রুটের বাস দাড়িয়ে থাকতে পারে না, অন্য যাত্রীদের যাত্রা ভন্দুল করা যায় না। মালিককে কাল সকালেই গন্তব্যস্থলে গিয়ে রিপোর্ট করতে হবে। তবে হ্যাঁ, বাবুর ব্যাগ তারা ডিপোয় হারিয়ে যাওয়া বিভাগে জমা অবশ্যই করে দেবে, ইত্যাদি ইত্যাদি।

দুর্ভাগ্য তাদের, আজ ভদ্রলোক বাবুদের সংখ্যা বিরল! একজোট হয়ে বাস শুদ্ধ মানুষ বাধ্য করল বাস ঘোরাতে । থানা পৌঁছেই সবাই বসে পড়ল সামনের মাঠে। তাদের দাবি সরল সহজ, হয় তাদের বাবুকে ফেরত দাও নয়ত থানা থেকে কাউকে বেড়তে বা ঢুকতে দেওয়া হবে না। বড় বাবু সাঙ্গপাঙ্গসহ আটকা পড়লেন, বলাবাহুল্য। পুলিশের হুমকি, বড়বাবুর আলটিমেটাম, সবই বিফল। থানা প্রকারান্তরে ঘেরাও করে বসে রইল একদল তথাকথিত অশিক্ষিত, পশ্চাৎপট জাতির সাধারণ অরাজনৈতিক মানুষ, যারা অর্থনীতি বোঝে না, রাজনীতির কৌশল জানে না, জাতপাতের বিভেদ মানে না। নিজেদের যারা বিপদে ফেলতে পারে এক সহযাত্রী বাবুর জন্য। দিনাজপুরের হাটে মাল বেচা তুচ্ছ মনে করতে পারে সেই সহযাত্রী বাবুর জন্যে যে কিনা অনায়াসে তাদের চোর ভাবতে দ্বিধা করেনি। 

বড়বাবু মল্লিক সাহেব অনেক ঘেরাও দেখেছেন, রাজনৈতিক আন্দোলন লাঠির ঘায়ে ঠাণ্ডা করেছেন। কিন্তু উদলা গায়ে, আলো আঁধারে এক দঙ্গল কালো কালো মাথার প্রত্যয় তাঁর পুলিশের পাষাণ হৃদয়ে কোথায় যেন চিড় ধরাতে শুরু করল। কেন জানি শত প্ররোচনা সত্বেও এই নেতৃত্ববিহীন মানুষগুলোর ওপর লাঠি বা বেয়নেট চার্জ করার অর্ডার না দিয়ে নিজের চেম্বারে ভোরের অপেক্ষা করা শ্রেয় মনে করলেন। 

(৫) 

ক্লান্তিতে, উদ্বেগে, ভয়ে, ভাবনায় কখন যে দু চোখের পাতা এক হয়েছিল সুমন টেরই পায়নি। লক আপ এর লোহার ফাটক টানার কর্কশ শব্দে তন্দ্রা ভাঙ্গল, ঠাহর করতে সময় লাগলো সে কোথায়! সেই কুঠরি থেকে প্রায় তাকে টেনে বের করলেন ডিউটি বাবু। সুমনের বিস্মিত মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন,

‘যাক এ যাত্রা বড় বাঁচান বেচে গেলেন। হুঃ, পুলিশের সঙ্গে পাঙ্গা নিতে যাবেন না কখনও, এই বলে দিলুম। নেহাত ব্যাপারটা একটা ট্রাইবাল আনরেস্টের দিকে টার্ন করছিল, তাই বড়বাবু ছেড়ে দিতে কইলেন, নইলে...

একরকম হেঁচড়ে নিয়ে এলেন থানার বারান্দায়। ভোরের নরম আলোয় তখন আঁধার কেটেছে।

সুমনকে দেখেই থানার সুমুখে অপেক্ষারত সহযাত্রী মানুষগুলো উল্লাসে ফেটে পড়ল। হাজতে সারা রাত সুমন তার মুক্তির সম্ভব অসম্ভব অনেক উপায় ভেবেছে। কিন্তু ঘুণাক্ষরে কল্পনায় আসেনি যে সেই সব অপমানিত, মুখ বুজে থাকা মানুষেরা তাকে না নিয়ে ফিরে যাবে না বলে সারা রাত মাটি কামড়ে পড়ে রয়েছে থানার প্রাঙ্গনে। আর মধ্যবিত্তের মূল্যবোধের অহঙ্কারে সে কিনা এদেরই অবজ্ঞার চোখে দেখেছে, ধিক্কার দিয়ে কত সহজে চোর বলে সাব্যস্ত করেছে ! 

হতবাক, ব্যাথিত, লজ্জিত সুমন এই মানুষজনের কাছে মানবিক মূল্যবোধের যে পাঠ আজ পেল, তা তার অন্ধ চেতনাকে শুধু জাগরিতই করল না, অনুশোচনায় উদ্বেল করে তুলল। যে অন্ধকূপ থেকে এরা তাকে আজ উদ্ধার করে নিয়ে গেল, সুমন শপথ করে বলতে পারে, তাদের মতো স্বার্থপর মানসিকতায় তা অকল্পনীয়।

মনে মনে ভগবানকে ধন্যবাদ জানাল। ভাগ্যিস মিউজিক সিস্টেমটা খোয়া গেলো, তাই তো এই পরম সত্যটা উপলব্ধি হোল!! 

0 comments: