4

প্রবন্ধঃ অমৃত অধিকারী

Posted in

প্রবন্ধ



ধর্ম ও উৎসব
অমৃত অধিকারী 



ধর্ম শব্দটা যে religion-এর সমার্থক নয়, সে কথা যাঁরা প্রাচীন ভারতীয় দর্শন বিষয়ে সম্যক অবগত নন, তাঁদের বোঝানো দুষ্কর। Religion-এর আভিধানিক অর্থ a particular system of faith and worship, বা পক্ষান্তরে the belief in and worship of a superhuman controlling power, especially a personal god or gods। অর্থাৎ, ঈশ্বরোপাসনার একটি বিশেষ পদ্ধতিতে বিশ্বাসী একদল মানুষের গোষ্ঠীগত পরিচয়। শতাব্দ‌-সহস্রাব্দের পথ অতিক্রম করে আসতে আসতে এই বিশেষ পদ্ধতিগুলির মধ্যে খাদ্যাভ্যাস, পোষাক-পরিচ্ছদ, জাতসংস্কার, বিবাহাদি আরও বহুবিধ লোকাচার ও দেশাচার কিভাবে সন্নিবিষ্ট হয়ে গেছে, তার সামাজিক বিবর্তনের ইতিহাস ধর্মনিরপেক্ষ বা আজকের ধর্মোদাসীন মানুষের আপাতদৃষ্টিতে কিছুটা হাস্যকর হলেও সমাজতাত্ত্বিকের জন্য যথেষ্ট চিত্তগ্রাহী গবেষণার বিষয়। কিন্তু এখানে সে আলোচনার পরিসর নেই। এখানে আমাদের আলোচনা ধর্ম ও তার সংশ্লিষ্ট কিছু উৎসবকে নিয়ে।

ধর্ম বস্তুটা যদি religion না হয়, তাহলে সেটা কি? সারাক্ষণই তো হিন্দুধর্ম, বৌদ্ধধর্ম, খ্রীস্টধর্ম, ইসলামধর্মের কথা শোনা যাচ্ছে চারদিকে। সে তো নিঃসন্দেহে ঈশ্বরোপাসনার ওই বিশেষ পদ্ধতিগুলিরই পরিচায়ক। তাহলে? আসলে সবার আগে যে কথাটা আমাদের বুঝতে হবে, সেটা হলো ‘ধর্ম’ শব্দটার, বা ধারণাটার, যখন উদ্ভব হয়, তখন religion-এর কোনও concept মানুষের ছিলো না। অর্থাৎ, ঈশ্বরবিশ্বাস বা উপাসনার বিশেষ পদ্ধতি যে গোষ্ঠীপরিচয়ের নির্ণায়ক হতে পারে, সেই বোধটাই তখন মানুষের ছিলো না। তাই বৈদিক আর্য সমাজে উদ্ভূত ‘ধর্ম’ ছিলো ‘ঔচিত্যবোধ’ বা sense of correctness-এর সমার্থক। এই ঔচিত্যবোধ আজকের রাজনৈতিক ঔচিত্যবোধ নয়। মানবিক ঔচিত্যবোধ। এবং সেই বোধ নির্দিষ্ট হতো মানুষের সামাজিক অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে। তাই ব্রাহ্মণের ধর্মবোধ ক্ষত্রিয়ের ধর্মবোধের থেকে পৃথক ছিলো, বা চর্মকারের ঔচিত্যবোধ পৃথক ছিলো লৌহবণিকের ঔচিত্যবোধের থেকে।

ভারতবর্ষের সমাজতাত্ত্বিক ইতিহাস বলে, এ দেশের প্রাচীন উৎসবগুলির মধ্যে অধিকাংশেরই ধর্মের সঙ্গে বিশেষ যোগাযোগ ছিলো না প্রাথমিক পর্যায়ে। যেমন ভারতবর্ষের দুই জনপ্রিয়তম উৎসব হোলি ও দীপাবলি, দু’টিই লোকাচার সম্ভূত। হোলি বা বসন্তোৎসব ছিলো শীতের শেষে উষ্ণতার আগমনে আনন্দোৎসব। বসন্তকাল যে যৌবনের প্রতীক, সেই যৌবনের উদযাপন। এছাড়াও বসন্তাগমে যে গুটিকারোগ মহামারী হয়ে দেখা দিতো সেযুগে, তার প্রতিষেধক ছিলো ফুল থেকে প্রস্তুত আবীর ও আরও নানা জাতীয় অঙ্গরাগের অবলেপ। শীতের শুরুতে ফসল তোলার সময় দীপাবলি উৎসব পালন করা হতো আগুন জ্বালিয়ে, পাকা ফসলের গন্ধে আকৃষ্ট পশুপাখি, কীটপতঙ্গকে দূরে রাখার জন্য।

এই রকম বহু উৎসব... নবান্ন, সংক্রান্তি, টুসু, ভাদু এবং এই জাতীয় অসংখ্য ‘পরব’ ছিলো মূলত কৃষিপ্রধান প্রাচীন সমাজের লোকায়ত জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। এছাড়াও ছিলো পূজা জাতীয় উৎসবগুলি, এবং সেগুলি মূলত ধর্মীয়ই। কিন্তু তবু ধর্মীয় উৎসব বলতে যে religious festival-এর কথা মনে হয়, এর সবগুলি সঠিক অর্থে তা ছিলো না। বৈদিক ধর্মে, যাকে আমরা গ্রীকদের কল্যাণে আজ ‘হিন্দুধর্ম’ (‘সিন্ধু’ শব্দের গ্রীক উচ্চারণ বিভ্রাট) বলে জানি, এবং ভারতীয় লোকসংস্কৃতিতে দেবদেবীর সংখ্যা, বৈচিত্র এবং বৈশিষ্ট বিপুল হওয়ায় এদেশের মানুষের কাছে উপাস্য দেবতাটিকে বেছে নেবার বিকল্প ছিলো প্রতুল। তাই যে যার পছন্দমতন এবং জীবিকানুসারে একেকজন দেব বা দেবীকে বরণ করে নিতো গৃহদেবতা বা কুলদেবতা রূপে। প্রতিদিনের পূজার্চনা ছাড়াও নির্দিষ্ট তিথি অনুসারে সেই দেবতার ব্রত পালন বা পূজা ছিলো কুলাচার। এই নিয়মিত কুলাচারের মাধ্যমে গৃহদেবতাটি একসময়ে গিয়ে হয়ে উঠতেন পরিবারের একজন সদস্য। বাকিদের সঙ্গে ঘরের খাবার ভাগ করে খেতে খেতে, পালা-পার্বনে বাড়ির ছেলেমেয়েদের সঙ্গে নতুন পোষাকে সাজতে সাজতে সংসারের মাযাজালে জড়িয়ে পড়তেন দেবতা। এই আবিলতাকে যদি কেউ ধর্মাচরণ বলতে চান, কারও আপত্তি হবার কথা নয়।

এছাড়াও ছিলো পরবের স্নান, তীর্থযাত্রা, ইত্যাদি... এবং সে সবকে ঘিরে মেলা। রথ, চড়ক, গঙ্গাসাগর বা কেন্দুয়ার মেলাগুলি এই জাতীয়, এবং এদের উদ্দেশ্য যতখানি ধার্মিক, তার চাইতে অনেক বেশি অর্থনৈতিক। আসলে, পৃথিবীর যে কোনও প্রান্তে সার্বজনীন উৎসব, পালা, পার্বনের প্রধান উদ্দেশ্য ও উপজীব্য সমাজের একাংশের অর্থনৈতিক পরিপুষ্টি। সেই উৎসব বা পার্বনের সঙ্গে যা যা লোকাচার সংশ্লিষ্ট, তার জন্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের বাজারের পুষ্টি তো বটেই, সেই সঙ্গে আরও অন্যান্য পণ্যবস্তু, যেমন খাদ্য, বস্ত্র, তৈজসপত্র, গৃহসজ্জার সামগ্রী, শিশুদের খেলনা, ইত্যাদি সবকিছুর যে কৃত্রিম চাহিদা তৈরি হয় বাজারে, সেই চাহিদা যে কোনও অর্থনীতির জন্য স্বাস্থ্যকর। এছাড়াও আছে উৎসবের সময়ে কর্মীদের ছুটি এবং বাড়তি বেতন।

এই অর্থনৈতিক পরিপুষ্টির হাত ধরেই ক্রমশ বিস্তার লাভ করেছে আমাদের উৎসবগুলি। আজকের দুর্গাপুজো, নবরাত্রি, দোল‌-হোলি, দীপাবলি-কালিপুজো এবং আরও নানা পুজো-পার্বনে বাজার যে ভরে ওঠে, উপচে পড়ে বহুবিধ পণ্যে, ছোটো-বড় নির্বিশেষে বিক্রেতাদের ঘরে মুনাফা ওঠে, সেখানেই এই সব উৎসবের প্রধান সার্থকতা। ধর্ম তার সঙ্গে সম্পৃক্ত হলেও, এবং ধর্মীয় আচার পালন বহু মানুষের মনে সন্তুষ্টি উৎপাদন করলেও, উৎসবগুলি সর্বার্থে সার্থক হয়ে ওঠে, ভাস্বর হয়ে ওঠে এই আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটেই।






4 comments:

  1. This comment has been removed by the author.

    ReplyDelete
  2. বেশীরভাগ মানুষ ই ধর্মাচার আর লোকাচারের তফাৎ বোঝেনা। ফলে, কালক্রমে লোকাচার ই ধর্মাচার এর রুপ নেয়। ভারতীয় উৎসবগুলি সব ই ছিল মূলতঃ একটা কৃষি নির্ভর সমাজের ঘরে ফসল তোলার উৎসব। এবং অবশ্যই গ্রামীণ উৎসব। নগরায়ণের পরিণতিতে শহরে এসে গ্রামীণ লোকাচারগুলি শহ্রে হয় এবং তার ধারাটিও কিছুটা বদলে যায়। লেখাটি খুব ই সুন্দর এবং উপাদেয়। তবে কিছু বিদেশী শব্দের ব্যবহার লেখাটির রস এবং স্বাদের কিছুটা ব্যাঘাত ঘটিয়েছে বলে আমার ব্যক্তিগত মতামত। মানে, শুক্তোটা খুব ই ভালো হয়েছে, তবে অমৃতা যদি এতে সয়া সস আর আজিনামটো টা না দিত !!

    ReplyDelete
  3. This comment has been removed by the author.

    ReplyDelete
  4. concept’ শব্দটা ব্যবহার করার জন্য ক্ষমা প্রার্থনীয়। আসলে ওই বাক্যেই কয়েকটা শব্দ আগে ‘ধারণা’ শব্দটা ব্যবহৃত হয়েছে, এবং concept-এর ও ছাড়া আর কোনও বাংলা পরিশব্দ নেই। তাই শব্দটার ব্যবহার। আর ‘religion’-এর সংজ্ঞা তো ইংরিজিতেই দিতে হবে, কারণ ওই শব্দটার বাংলা ‘ধর্ম’ হলেও দু’টো যে এক জিনিস নয়, সেটাই এই লেখার প্রাথমিক উপপাদ্য। আর এসব কিছুর উপরে, আজ বোধহয় ‘‘এটা আমার ভাষা আর ওটা তোমার’’ জাতীয় concept-এরই আর বিশেষ প্রাসঙ্গিকতা নেই। এটা এক বিশ্বায়িত সংস্কৃতির যুগ। এযুগে জানা থাকলে কোনও ভাষাই পর নয়। শুধু ব্যবহারটা সে ভাষার ব্যাকরণ সম্মত এবং নির্ভুল হতে হবে, এই যা। মাতৃভাষার ভুল প্রয়োগ কিছুটা হলেও মার্জনীয়। কিন্তু বিদেশী ভাষার ক্ষেত্রে সেটা অনেকটা অতিথির সঙ্গে বিসদৃশ আচরণ করার মতন ব্যাপার। :-)

    ReplyDelete