0

অনুবাদ সাহিত্যঃ মনোজিৎ কুমার দাস

Posted in





অনুবাদ সাহিত্য 




ফুল
মূল কাহিনী- কমলা দাস
অনুবাদ- মনোজিৎ কুমার দাস



মেয়েটি বাড়িতে পৌঁছানর আগেই সন্ধ্যার আঁধার নেমেছে। সে গেটটা খুলে কিছুটা সময় সেখানটাতে অপেক্ষা করলো। জানালার সবুজ পেন্টিং আঁধারে মিলিয়ে গেছে। সে চাবি বের করে সামনে এগোলো। চাবি দিয়ে তালা খুলতেই কালো রঙের প্রকান্ড দরজাটা খুলে গেল। সে এক পা এগিয়ে গেল। সামনে নিকষ কালো আঁধার। সে চোখ বন্ধ করে ফেললো। তারপর এক সময় সে তার চোখ খুললো।

ভেতর থেকে একটা ভ্যাপসা গন্ধ ভেসে এলো।সে তার হাত ব্যাগের ভেতর থেকে দেশলাই বের করলো। সিঁড়ির গোড়ায় পিতলের বড় পিলসুজটা রাখা আছে।দেওয়ালের কাপবোর্ডটা খুলে তেল ভর্তি সবুজ বোতলটা বের করে পিলসুজে তেল ভরলো।সে তার রুমালটা ছিড়ে একটা মোটা শলতে তৈরি করে সেটা জ্বালালো। জায়গাটা আলোয় ভরে উঠলে সে চারদিকে তাকিয়ে দেখলো।

দেশলাইটা মেঝেতেই পড়ে রইলো। সে মেঝের ফাটলটা পেরিয়ে এগিয়ে গেল।দেওয়ালে ঘড়ির আকারের একটা খালি জায়গা তার নজরে পড়লো।ওখানটাতে একসময় একটা জাপানী ঘড়ি ঝুলানো ছিল।

দেওয়ালের এখানে ওখানে মাকড়শার জাল।

সে জানালা খুলে বললো, আমি এসেছি, এখন আমি এখানে আছি।

কোন জবাব নেই। আবার সে স্পষ্ট স্বরে বললো - আমি এসেছি।

তার কন্ঠস্বর করিডোরের দেওয়ালে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে প্রতিধ্বনিত হলো। সে তার পায়ের চপ্পল খুলে করিডোর দিয়ে এগিয়ে গেল। করিডোরে আরো অনেক গুলো পিতলের পিলসুজ রয়েছে। সেগুলোর একটাতে তেল পুরে জ্বালিয়ে হাতে নিয়ে রুমের ভেতরে প্রবেশ করলো।

আাঁধার দূর হওয়ায় সে ভেতরে যাবার পথ খুঁজে পেল। গুদাম ঘরগুলো ধানে ভর্তি। কাপড় চোপড় রাখার একটা বাক্স তার চোখে পড়লো। এ প্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত পর্যন্ত একটা তার ঝুলছে। সে ভাবলো তারটার ওপর কাপড় চোপড় রাখা হয়।

সে রান্নাঘরের ভেতরে গেল। তার হাতের আলো কালো দেওয়ালের ওপর পড়ায় আলোটাকে হলুদ দেখালো। রান্নাঘরের এক কোণে রান্নার জ্বালানী কাঠ গাদা করে রাখা। পাশে রান্নার কড়াই। সে কড়াইটা উনুনের ঝিঁকের ওপর চাপালো।উনুনের মধ্যে শুকনো পাতা আর কাগজ ঠেলে দিয়ে আগুন জ্বালালো।দেওয়ালের ওপর ঝুলানো চারকোণা আকৃতির মোটা একটা কাপড় দেখতে পেয়ে সে ওটা দিয়ে মুখটা মুছে বাইরে যাবার দরজাটা খুলে পানি আনতে কুয়োর কাছে গেল।

কপিকলের দড়ি টেনে পানির বালতি তুলতে গিয়ে একটা শব্দ হলো।প্রায় পনেরো বছর পর সে গ্রীষ্মের ছুটিতে বাড়ি এসেছে।সে নিজে নিজে বললো আগের কোন কিছুরই পরিবর্তন হয়নি।

তার মনে হচ্ছে, আগেকার দিনের মতোই নানা জিনিস থেকে সে শব্দ শুনতে পাবে। ঠাকুরদাদার কাঠের গেটের ক্যাকক্যাক শব্দ, ডাইনিংরুমে চাকরবাকরদের ওপর ঠাকুরদার বকাঝকা সবই সে শুনতে পাবে। মেঝেয় কাঁসার থালা বাসন পড়ার শব্দও সে শুনতে পাবে। ভেতরে কুয়াশা ঢোকার হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য জানালাগুলো বন্ধ।

কোন কিছুরই পরিবর্তন হয়নি। হারানো বছরগুলো সে ফিরে পাবে, তা সে কিভাবে বিশ্বাস করবে?

-ঠাকুমা, আমি আসছি। কথাটা বলেই সে অবাক হলো। কেন? সে একথাটা বলে কী খেলা খেলতে চাচ্ছে।

পানি গরম করতে দিয়ে সে ওপর তলায় গিয়ে ঝাড়ন দিয়ে বিছানাগুলো ঝাড়লো। বিছানাগুলোর একটাতে ঠাকুমা থাকতেন। গাদা করে রাখা তোষকগুলোর একটা ঠাকুমা ব্যবহার করতেন।। বারান্দায় রাখার বাক্সের ভেতর একটা বিছানার চাদর দেখতে পেয়ে সে তা বের করে আনলো।

শুকনো নিমপাতা মেঝেয় ছড়িয়ে আছে, সে দেখতে পেল।

তার মনটা যেন সে সব দিনগুলোতে নিমপাতায় মোড়ানো ছিল। সে তার অতীত জীবনের কথা ভাবলো। কোনকিছুরই পরিবর্তন হয়নি।

তার মনে হলো, অন্য একটা রুমে একটা মাদুরের  ওপর ঠাকুমা বসে মজার মজার ঘটনার স্মৃতিচারণা করছেন। অন্যদিকে, ঠাকুরদা খাটিয়ায় বসে পান সাজছেন।তাদের কথাবার্তা মেয়েটির কানে না যাওয়ায় সে জানালাগুলো খুলে জানালা দিয়ে উত্তরদিকে তাকালো।

দূরে গাছগুলোর নিচে চাঁদের আলো পড়েছে। আগের দিনগুলোতে ওখানটাতে নিম্নবর্ণের লোকগুলো বাঁশের বাঁশি বাজাতো। যেখানটাতে আলো নেই সে দিকের রাস্তাটার দিকে তাকালো।

অল্প সময়ের মধ্য্যেই লোকটার আসার কথা ছিল। চাঁদটা আকাশের আরো উপরে চাঁদের রূপোলী আলো এখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। রাতটা কত হতে পারে!  সে ঘড়িটা আনতে ভুলে গেছে।

সে তার শাড়ি খুলে ফেলে বারান্দায় কাপড় রাখার তারের ওপর তা ছুড়ে দিল। কাঠের বাক্স থেকে সে সরু বর্ডার দেওয়া একটা জামা বের করে এনে সেটা পরে নিল। তারপর দেওয়ালে কাপবোর্ড থেকে চন্দনকাঠ বের করে এনে জলের সাথে ওটা ঘষে ঘষে চন্দনের পেস্ট তৈরি করার  পর হাতও মুখ পরিষ্কার করে তা হাতে ও মুখে মাখলো।

সে একটা আয়না খুঁজে বের করার জন্য পাশের রুমটা খুললো। দেওয়ালে একটা আয়না ঝুলছে। সে বাতিটা সবুজ স্যাতলা পড়া মেঝেতে রাখলো।

কোন কিছুরই পরিবর্তন হয়নি। তার চুলগুলো দুটো বিনুনির পরিবর্তে খোঁপা করা। তা নইলে হয়তো চুলগুলো সামান্য হলেও মুখটাকে ঢেকে রাখতো। সে ভেবে অবাক হলো সেকি তার নিজের চোখে তার মুখে ভাঁজ দেখতে পাচ্ছে। তবে সে এবিষয়ে নিশ্চিত যে কেউই অনুমান করবে না যে তার বয়স তিরিশ। সে বাতিটা দেওয়ালে ঝুলিয়ে রেখে খোঁপাটা খুলে বিনুনি করলো।

সে ধীরে ধীরে নিচের তলায় এলো। সে সামনের দরজা খুলে নিচের দিকে নামলো। গাছগুলোর ওপর চাঁদের আলো পড়েছে। চাঁদের আলোয় সে দেখতে পেল গাছের পাতা রাস্তার ওপর পড়ে আছে। প্রায় ন্যাড়া একটা গাছের ডালের ওপর বড় একটা পাখিকে বসে থাকতে দেখলো। সে ভাবলো ওটা হুতুম পেঁচা হবে হয়তো। মৃত্যুর বার্তাবাহী পাখি! 

-হে ঈশ্বর!  এখন আমাকে চিন্তায় ফেলোনা।

মেয়েটি বুঝতে পারলো যার অপেক্ষায় সে দরজায় দাঁড়িয়ে ছিল তার পর পরই সে এসেছে। তার মুখটা চাঁদের আলোয় আলোকিত হলেও বোঝা গেল তার চুল গুলো কপালের দিক থেকে পেছনের দিকে উল্টিয়ে আঁচড়ানো।

-আমি আগে ভাগেই বসতে পারছি না। বাইরে আমার একটু কাজ আছে।

মেয়েটি উঠে দাঁড়িয়ে তার কাঁধের ওপর হাত রেখে বললো- এখন আর কোন কাজ নয়।

ছেলেটি বুঝতে পারলো না মেয়েটি কী বলতে চাচ্ছিল। সাবান জলের বুদবুদের মতো মেয়েটির বিশ্বাস থেকে থেকে উবে যাচ্ছিল। কোন কিছুর পরিবর্তন হয়নি। মেয়েটি মনে মনে বললো। কেন কয়েকটা তুচ্ছ কথাবার্তা সব কিছুকে এত তাড়াতাড়ি তছনছ করে দিল!  ছেলেটি মেয়েটির মাথাটা তার কাঁধের ওপর টেনে নিলে মেয়েটি তার দিকে একদৃষ্টিতে চেয়ে রইলো। গাছপালার ছায়া আর চাঁদের আলো তাদের ওপর পড়েছে।

-তোমার বাড়ি!

-হ্যাঁ। এসো আমরা ভেতরে যাই।

ভেতরে প্রবেশ করতেই দরজা বন্ধ হয়ে গেল। হুতুমপেঁচা ডেকে উঠতেই মেয়েটির হাত কেঁপে উঠলো।

-কিসের শব্দ, পাখির?

মেয়েটি উত্তর করলোনা। অনেক পাখি পেঁচার মতো ডাকে ভেবে স্বস্তিবোধ করলেও সে পেঁচার ডাক শোনেনি এমন একটা ভান করলো।

ছেলেটি তখনো দেওয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়েছিল।

মেয়েটি বললো- ওখান থেকে নড়োনা। আলোতে তোমাকে দেখতে দাও। মেয়েটি পাশের পিলারের দিকে তাকিয়ে আস্তে করে জিজ্ঞেস করলো- তোমরা সবাই কি তার মতো দেখতে?

ছেলেটি তার হাতদুখানা পকেটের মধ্যে ঢুকিয়ে মেয়েটির দিকে চেয়ে হাসতে লাগলো। বাতির আলো পুরোপুরি ছেলেটির মুখের ওপর না পড়ায় ছেলেটির হাসিটা মেয়েটি দেখতে পেলনা। যদি মেয়েটি ওই মুহূর্তে ছেলেটির মুখের আনন্দের হাসি দেখতে পেত তবে ছেলেটির দাঁতগুলোকে সে মোটেই পছন্দ করতো না।

-কোথায় আমি বসবো, না শোব? ছেলেটি চারদিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো।

মেয়েটি বললো - সব জায়গাই খুব অপরিষ্কার, তাই না?তার কথা শুনে ছেলেটি তার কাঁধ ঝাঁকালো।

তারপর তারা দুজনেই একটা খাটিয়ায় শুয়ে পড়লো। মেয়েটি এবার বললো-একটাই উপায় আছে, তা হচ্ছে তোমাকে বিয়ে করা।

ছেলেটি অপ্রত্যাশিত চোখে মেয়েটির দিকে তাকিয়েও কোন কথা বললো না।

----- সবার সম্মতিতে।

বেচারী বাচ্চা ছেলে।

বাতিটা নিভে গেল। বাতাসে জানালা গুলো ক্যাক ক্যাঁক শব্দ করে উঠলো।

ছেলেটি তার দুহাত দিয়ে মেয়েটিকে জড়িয়ে ধরে বললো- তুমি কি অন্ধকারকে ভয় পাও?

-না।

মেয়েটি তার মুখটা ছেলেটির বুকের সাথে চেপে ধরে তামাক ও ঘামের গন্ধ পেয়ে বললো - তোমার শৈশব কাল থেকে আমি তোমাকে দেখে আসছি। তুমি কেন আগে কখনো আমার সাথে কোন কথা বলো নি?

-বলার মতো কিবা ছিল? আমার বাবা ব্যাংক মিটিংয়ে সভাপতিত্ব করতেন আর রোটারী ক্লাবে বত্তৃতা দিতেন। আমার মা সারা বিকেল তার বন্ধুবান্ধবদের সাথে ব্রিজ খেলতেন আর মাঝেমাঝে চা বিস্কিট খেতেন।

"তারপর?- তারপর আমি বড় হয়ে উঠলাম। দুর্বল এক শিশু, বন্ধুবান্ধবহীন। আমি লিখতে পড়তে শুরু করলাম। আমার বাবা আমার সাথে রূঢ় আচরণ করতে লাগলেন।

-যথেষ্ট হয়েছে!

-তুমি আর কিছু কেন শুনতে চাচ্ছনা?

মেয়েটি আর কোন কথা বললো না।এক সময় ছেলেটি সে সব দিনগুলোর কথা ভাবতে শুরু করে যখন মেয়েটির সাথে তার কোন প্রকার সম্পর্ক ছিল না। ছেলেটি মেয়েটি থেকে দূরে দূরে থাকতো। মেয়েটি ছেলেটির এ ব্যবহার কিভাবে সহ্য করতো?

-আমাদের উভয়ের শৈশব ছিল একই সূত্রে গাঁথা। মেয়েটি বললো।

-তুমি কী স্বার্থপর!

-তুমি কি এখন এটা উপলব্ধি করছো?

-না, গতবছরের একটা মিটিংএ এটা উপলব্ধি করি।

-মিটিংয়ে থাকা কালে?

-না, যখন আমরা ফিরে আসবার পথে আমি তোমাকে তোমার বাড়িতে নামিয়ে দিয়েছিলাম।

মেয়েটি তার চোখ বন্ধ করে ঘুমের ভান করলো।

-তুমি কি ঘুমিয়ে পড়লে?

মেয়েটি কোন জবাব দিলনা।

-এখন দেখ, কে আসলে স্বার্থপর।

কিছু সময়ের মধ্যে ছেলেটি ঘুমিয়ে পড়লো। সে ঘুমিয়ে পড়েছে নিশ্চিত হয়ে মেয়েটি সেখান থেকে আস্তে করে উঠে পড়লো।

ঠাকুমা যে রুমটাতে ঘুমাতেন সেই রুমটাতে গিয়ে মেয়েটি চৌকির উপর বসে দেওয়ালে  হেলান দিয়ে বললো - শোন, ওই রুমে ঘুমাচ্ছে আমার স্বামী। আমি তাকে ভালবাসি, সেও আমাকে ভালবাসে।

মেয়েটির কথাগুলো রুমটির দেওয়ালে গিয়ে প্রতিধ্বনিত হলো।

সে তার মুখটি দু'হাঁটুর মধ্যে গুঁজে ঠায় বসে রইলো। মেয়েটি যদি একটা জবাবও পায় তাহলে  সে স্বস্তি পাবে। অন্ধকার থেকে ভেসে আসা একটা দীর্ঘশ্বাস কিংবা পায়ের শব্দ যেন মেয়েটি শুনতে পেল।  -তোমরা কি সবাই সম্মতি দেবে?

দেওয়ালে টাঙ্গনো শ্রীকৃষ্ণের ছবির পেছন থেকে একটা ম্লান শব্দ ভেসে এলো। মেয়েটি ছবিটির দিকে চেয়ে রইলো। প্রকান্ড একটা মাকড়শা বের হয়ে এসে কাঁচের উপর দিয়ে চলতে সে দেখতে পেল।

সে ঠাকুমার মুখটা ভাববার চেষ্টা করেও মনে করতে পারলো না। তার বাম  গালে কি তার বাম গালের মতোই টোল পড়তো? তার মনে পড়লো না। মেয়েটি ওখান থেকে উঠে ছেলেটির রুমে গেল।

সে ছেলেটির পাশে শুয়ে পড়তেই সে জেগে গেল। ছেলেটি তাকে শুতে দেখে অবাক না হয়ে দেওয়ালের দিকে পাশ ফিরে শুয়ে মেয়েটির শোবার জায়গা করেদিল। চাঁদের আলো পড়ে মেয়েটির চুলগুলো তামাটে দেখাছিল।

-মাটিতে পচা ফল যেন পড়ে আছে।

-কী?

-মৃত!

এখন একজন মৃতলোককে পছন্দ করা তোমার উচিত না।

-আমি কি তার জন্য ভাবনা করা থেকে বিরত থাকবো?

-ঘুমাও,বাছা, তুমি এখন ক্লান্ত।

ছেলেটির শরীর ঠান্ডা বাতাসে শীতল হয়ে গেছে। হঠাৎ করে মেয়েটির মনে পড়লো এখন তো খিরুভাথিন উৎসবের  মৌসুম।

-এসো আমরা জানালা বন্ধ করে দেই, ভেতরে কুয়াশা আর ঠান্ডা ঢুকছে।

মেয়েটি জানালার পাশে গিয়ে দেখতে পেল প্রকান্ড একটা আম গাছ যেন চুল ছেড়ে দিয়ে দৈত্যের মতো দাঁড়িয়ে আছে। সে জানালা বন্ধ না করেই ফিরে এলো।

-আমি আম গাছটার নিচে খেলা করতাম। তুমিও তো করতে? ছেলেটি জিজ্ঞেস করলো।

আমের রঙ হলদেটে।

- আমি দুছর আগে প্রথম আম খেয়েছিলাম। ভারতে ফিরে আসার আগে।

-আচ্ছা বেশ!

-ওহ, আমি ভুলে গিয়েছিলাম। আমার একটা অতীত ছিল। তেমন অতীত তোমার ছিলনা। ছেলেটি হেসে উঠলো।

-কেমন এক ঘেঁয়ে লেখক সব!

অন্ধকারেরমাঝেতারাদুজনহেসেউঠলো।

-আমি ছোটবেলায় ঈশ্বর, দর্শন ও আরো কত কিছু নিয়ে একটা কবিতা লিখেছিলাম।

-হুঁ।

-এখন আমি ইঁদুরদের নিয়ে কবিতা লিখি।

ছেলেটি আবার ঘুমিয়ে পড়লো। মেয়েটি জেগে জেগে ভাবতে লাগলো।পুরনো দিনের স্মৃতি তার মনে ভেসে উঠতেই তার মাথার যেন ঘোর লাগলো। বাতাস উঠলেই আম পড়া, বাড়ির উঠোনের সামনে রাশি রাশি সাদা গোলাপ ফোটা!  বৃষ্টির জলে সেগুলোর গন্ধ ধুয়ে যাওয়া,   কাকগুলো দেখতে যেন কালো শালগ্রামশিলা। আরো কত না দৃশ্য তার মনে ভেসে  উঠছে।

সূর্য উঠার আগেই মেয়েটি জেগে উঠলো।ছেলেটি তার আগেই উঠে জুতো পরে ফেলেছে। সে মেয়েটিকে জাগিয়ে তোলার জন্য বারান্দা দিয়ে হাঁটাহাঁটি করছে।

দেওয়ালে শিব এর একটা ফ্যাকাসে ছবি ঝুলছে। গলায় সাপ জড়ানো। মেয়েটি তার চোখ বন্ধ করে বিড়বিড় করে বললো  - পার্বতী, শিবের পত্নী।

ছেলেটি রুমটিতে এসে বললো- তুমি এখানে? তুমি কী বলছিলে?

ছেলেটি মাথা আঁচড়িয়ে মেয়েটির আঙুল স্পর্শ করলো।

মেয়েটি তাকে জিজ্ঞেস করলো  -তুমি আমাকে ভালবাস না?

-হ্যাঁ, আমি তোমাকে ভালবাসি।

-তুমি কি একথাটা মালয়ালম ভাষায় বলতে পার?

-কেন তা আমাকে বলতে হবে?

মেয়েটি উঠে পড়লো। আলো ফোটবার আগেই এসো আমরা ফিরে যাই।

তারা জানালাগুলো বন্ধ করে দিয়ে আলো নিভিয়ে দিল। মেয়েটি হাত মুখ ধুয়ে একটা শাড়ি পড়লো।

পরিশেষে, সে দরজায় তালা লাগিয়ে চাবিটা হাত ব্যাগে রাখলো। ছেলেটি তার প্যান্টের পকেট থেকে কাঠর পুতুল বের করে তা মেয়েটিকে দেখালো। রোজ উডের একটা মেয়ে পুতুল। মাথার চুলগুলো গিরো করে বাঁধা। হাত দু'খানা বুকের উপর আড়াআড়ি রাখা।

-ওহ, ওটা তো আমার কাঠের পুতুল।

অনেক বছর পরে সে পুতুলটিকে দেখলেও তাকে ঘিরে অনেক কথা মেয়েটির মনে ভেসে উঠলো। পুতুলটি যে কাঠমিস্ত্রি তৈরি করে ছিল তার কথাও মনে পড়লো। লোকটা পান খেয়ে খেয়ে তার দাঁতগুলো লাল করে ফেলেছিল। ঠাকুমা পুতুলটা প্রথম দেখে হেসেছিলেন। আরো কত কথা এ পুতুলটিকে ঘিরে মেয়েটির মনে পড়লো।

-তুমি কেন এটাকে সংগ্রহে রেখেছ?

ছেলেটি তার হাতদুখানা মেয়েটির কাঁধের  ওপর রেখে জবাবে বললো,

-আমাদের ছেলে এটা নিয়ে খেলবে বলে।

মেয়েটি ছেলেটির চোখে কৃতজ্ঞতার আভাস লক্ষ্য করলো।

তারা কয়েক পা হেঁটে আবার ফিরে এলো। বাড়ির সামনের গাছটাতে কোন পাতা নেই। তবে গাছটাতে প্রজাপতির রঙের এক গুচ্ছ ফুল দেখতে পেল।

মেয়েটিজিজ্ঞেসকরলো -তুমিকিজানএগাছটারনামকী?

ছেলেটি মাথা নাড়িয়ে বললো - নিরামা দালাম।

তারা হাঁটতে লাগলো।

ছেলেটি বললো - সুন্দর একটা গাছ।

-ছোট্টবেলায় সকালে ঘুম থেকে উঠে আমি উঠোনটাতে যেতাম। গাছটার নিচে ফুলে ফুলে ভরা থাকতো। ফুলগুলো শিশিরে ভেজা থাকতো। আমি----

-তুমি সেগুলো হাতে তুলে নিয়ে গন্ধ শুকে যখন বুঝতে ওইগুলোতে কোন গন্ধ নেই তখন ফুল গুলোমাটিতে ছুড়ে ফেলে দিতে।

-তাকে মন করে তুমি বুঝতে পেরেছিলে?

ছেলেটি মেয়েটির চোখের দিকে তাকিয়ে হাসলো, কিন্তু কোন কথা বললো না।

মেয়েটির চুলগুলোতে সোনালী সকালের আলো এসে পড়েছে। তার মনে ভেসে উঠলো দুপুরের আলোকোজ্জ্বল ধানের খেত, যা ফসল তোলার অপেক্ষায় আছে।





0 comments: