2

প্রবন্ধঃ ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়

Posted in


প্রবন্ধ


বিজ্ঞাপনের সেকাল একাল
ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়



একালে ‘বিজ্ঞাপন’এর কথা অমৃত সমান – শেষ হবার নয়। বিনোদনের জন্য টেলিভিশন খোলার জো নেই, রেডিওতে কান পাতার উপায় নেই, আর খবরের কাগজের প্রথম পৃষ্ঠাটাতেও পাতাজোড়া বিজ্ঞাপন। ‘দুধে জল মেশানো না জলে দুধ মেশানো’ সেটা বোঝা যেমন মুস্কিল হয়, তেমনই বোঝা যায় না ‘খবরের সঙ্গে বিজ্ঞাপন না বিজ্ঞাপনের সঙ্গে কিছু খবরের টুকরো’। একালের কথা থাক , সে কালের কথা বলি।

সুপ্রাচীন কালে মিশরে, যখন কাগজ আবিস্কার হয়নি, তখন গাছের ছালে লিখে পন্য বিক্রির বিজ্ঞাপন দেওয়া হত। প্রাচীন ভারতে শিলালেখ’এ যে রাজনৈতিক বা ধর্মীয় নির্দেশ লেখা হত তাও তো বিজ্ঞাপন। সেই শিলালিপিবার্তা থেকে এই আধুনিক যুগে দেওয়ালে হাঁপানি কিংবা যৌনব্যাধি নিরাময়ের দাওয়াই-এর বিজ্ঞাপন পর্যন্ত দীর্ঘ পরিক্রমা।

লন্ডনের টমাস জে. ব্যারাটকে আধুনিক বিজ্ঞাপনের জনকের মান্যতা দেওয়া হয়। সেটা উনিশ শতকের কথা। ব্যারাট কাজ করতেন লন্ডনের পিয়ার্স সাবান কোম্পানীতে। পিয়ার্স সাবানের ছবি দিয়ে বিজ্ঞাপনের স্লোগান লিখেছিলেন “সুপ্রভাত, তুমি কি পিয়ার্স সাবান ব্যবহার করেছো?” দীর্ঘকাল সেই সাবান নির্মাতারা এই বিজ্ঞাপনটি দিতেন। বস্তুত ব্যারাট পিয়ার্স সাবানকে অভিজাত ও মধ্যবিত্ত শহুরে মানুষের কাছে দারুণ জনপ্রিয় করেছিলেন। আজও পীয়ার্স সাবানের কথা প্রবীণেরা জানেন। শুধু কি বিজ্ঞাপনের স্লোগান রচনা? না, পিয়ার্স সাবানকে জনপ্রিয় করার জন্য বার্ষিক ‘মিস পিয়ার্স’ প্রতিযোগিতা, ব্র্যান্ড অ্যামব্যাসাডর নিয়োগ করা, সেলিব্রিটিদের দিয়ে পণ্যের প্রচার, এ সবই ব্যারাটের মাথা থেকেই বের হয়েছিল। লিটল ল্যাংট্রি নামে এক ব্রিটিশ হোটেল গায়িকাকে দিয়ে তাদের সাবানের বিজ্ঞাপন করিয়েছিলেন ১৮৯১এ। ঐ ব্রিটিশ গায়িকাই প্রথম অর্থের বিনিময়ে পণ্যের বিজ্ঞাপন করা সেলিব্রিটি, যা ছিল ব্যারাটের অবদান ও মস্তিষ্ক প্রসূত।

প্রায় একই সময়ে, ১৮৯৮ নাগাদ ভারতে গ্রামফোন বা কলের গান চলে আসে। দম দেওয়া আর চোং লাগানো গ্রামোফোনে গালার চাকতিতে ধ্বনিবদ্ধ গান শোনা। সে এক বিস্ময় বটে ! সেই সময় গ্রামোফোন কোম্পানীর একটা বিজ্ঞাপন খুব লোকপ্রিয় হয়েছিল এবং এখনও প্রবাদের মত হয়ে আছে – “সুখী গৃহকোণ শোভে গ্রামোফোন”। এমন রুচিসম্মত স্লোগান কে রচনা করেছিলেন, তা জানা যায় না।

১৮৩৬এ ফরাসী সংবাদপত্র ‘লা প্রেসে’ প্রথম সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপনের প্রচলন শুরু করে। সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দেওয়ার পথ খুলে যাওয়ায় কয়েক বছরের মধ্যে মুদ্রিত বিজ্ঞাপনের অভূতপূর্ব বাজার তৈরী হয়ে গেলো এবং একাধিক বিজ্ঞাপন এজেন্সি গঠিত হয়ে গেলো। পণ্য বিক্রয়ের প্রতিযোগিতার ইঁদুর দৌড়ের শুরু অতএব হয়ে গেলো। এদেশে তখন এ’সবের বালাই থাকার কথা নয়, ছিলোও না। দেশের পণ্যই নেই তো বিজ্ঞাপন কে দেবে! 

কিন্তু বিজ্ঞাপন ছিল। ১৮২৫-২৬এর মধ্যে এদেশে সংবাদপত্র এসে যায়। ১৭৬৫তে দেওয়ানী পাওয়ার পর ইংরাজ শাসন জাঁকিয়ে বসতে শুরু করে। নানান পেশায় ভাগ্যান্বেষি ইংরেজ মুচি, ধোপা, নাপিত, ফেরিওয়ালারাও কলকাতায় আস্তানা গাড়ে। লুটেপুটে খাওয়া শুরু হয়েছে যে! সেই সময়ে ইংরাজি সংবাদ পত্রে তাদের বিজ্ঞাপন থাকতো। গৃহভৃত্য চেয়ে, পুরাতন আসবাবপত্র বিক্রি করতে চেয়ে, কিংবা কর্মপ্রার্থী হয়ে সেসব বিজ্ঞাপন দেওয়া হত। এই বিজ্ঞাপনগুলি থেকে সেকালের কলকাতার সমাজজীবনের একটা বিশ্বাসযোগ্য পরিচয় পাওয়া যায়। ১৭৮৪ সালের ক্যালকাটা গেজেটের একটা বিজ্ঞাপন ছিল মেসার্স উইলিয়াম এন্ডলী একটি ঘোড়া বিক্রি করবেন ৩০০ সিক্কা টাকায়। ১৮০১ সালে শ্রীরামপুরের জনৈক আব্রাহাম একটা বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন যে তার স্ত্রী কাউকে না বলে বাড়ি থেকে পালিয়ে গেছেন। তিনি যদি কোথাও কোন ধার দেনা করেন, তার দায় আব্রাহামের নয়। বোঝ কাণ্ড! বৌ পালিয়েছে, তার খোঁজ পাওয়ার বিজ্ঞাপন নয়, সে যদি টাকা ধার করে, তার দায় ঐ ব্যক্তির নয়! ১৭৯১ সালের ২৮শে এপ্রিল এক সাহেব একটা অভিনব বিজ্ঞাপন দিলেন এই মর্মে যে তিনি ‘কলকাতার রাস্তায় যত্রতত্র ঘুরে বেড়ানো ঘোড়াগুলির বংশবৃদ্ধি করাতে চান। ইচ্ছুক ঘোড়া-মালিকরা তার বিজ্ঞাপনের খরচটা মিটিয়ে দিলেই তিনি কাজ শুরু করবেন।’ বোঝা গেল সেই আদি কলকাতার ইংরেজদের শুধু টাকা রোজগারের ধান্দা ছাড়া আর কিছুই মাথায় আসতো না। [সূত্রঃ ‘শহর কলকাতার ইতিবৃত্ত’ / বিনয় ঘোষ ]

পণ্যের বিজ্ঞাপনে সেই পণ্যের টার্গেট ক্রেতাকে প্রলুব্ধ করার মনস্তত্ব পণ্য বিক্রেতার থাকেই, তা দোষের নয়। কিন্তু প্রলুব্ধ করার জন্য রুচিহীন ভাষা ও অনৈতিকতার যে প্রাবল্য এখন দেখা যায় তা সহ্য করা মুস্কিল। পঞ্চাশ, ষাট, সত্তর দশকের বিজ্ঞাপন নির্মাণে এই রুচিশীলতা ও নৈতিকতা বজায় ছিল। নামি লেখকরা পণ্যের বিজ্ঞাপনের ভাষা রচনা করতেন। সত্যজিৎ রায় তাঁর কর্ম জীবন শুরু করেছিলেন বিজ্ঞাপন রচনার কাজ করে। পূর্ব রেলওয়ে তাদের বিজ্ঞাপণে রবীন্দ্রনাথের একটা কবিতা ব্যবহার করত – “এ প্রাণ রাতের রেলগাড়ি, দিল পাড়ি......”। ১৯৪৭এ স্বাধীনতা লাভের পরের দিন ১৬ই অগস্ট ইংরাজি কাগজ স্টেটসম্যানের প্রথম পৃষ্ঠায় একটা হাতঘড়ির বিজ্ঞাপন দেখছি, হাতঘড়ির ছবি দিয়ে তিনটি মাত্র শব্দ খরচ করা বিজ্ঞাপন ‘ইট’স অ্যান ওমেগা’। অতি সংক্ষিপ্ত স্লোগান, কিন্তু অব্যর্থ। একালে এমন বিজ্ঞাপনে নির্ঘাত কোন সুবেশা তন্বির ছবি থাকতো! 

৫৪/৫৫ সালের কথা মনে আছে কাঁচি মার্কা সিগারেটের একটা বিজ্ঞাপন – রেল প্ল্যাটফর্মে সঙ্গের মালপত্রের ওপর বসে একজন সিগারেটে সুখটান দিচ্ছে আর ট্রেন তার সামনে দিয়ে হুশ করে চলে যাচ্ছে। বিজ্ঞাপনে এই রকম বুদ্ধির ছাপ ছিল। বালক বয়সে বিজ্ঞাপনটায় বেশ মজা পেতাম, সিগারেটে সুখটান দেওয়ার জন্য লোকটি ট্রেনটা ধরতে পারলোনা বলে।

বেশি দিনের কথা নয়। পুরাতন পত্রিকা ঘাঁটতে গিয়ে পেলাম ১৯৭১এ ‘হিন্দুস্থান স্টীল’এর একটা বিজ্ঞাপনের ভাষা “ভাষা ও ভঙ্গিমায় জীবনের প্রতিভাস। শিল্পকৃতি মানবিকতার সম্পদ”। বিজ্ঞাপন রচনায় এই ভাষা এখন আর কোথায় ! এখনতো ভাষায় শৈল্পিক স্পর্শ তো দূরের কথা, এখন অদ্ভুত জগাখিচুড়ী ভাষায় পণ্যের বিজ্ঞাপনে ছেয়ে গেছে – ‘ঠান্ডার নতুন ফান্ডা’ জাতীয়।

বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে টার্গেট উপভোক্তাদের মাথা চিবিয়ে খাবার প্রক্রিয়ার আঁতুড় ঘর যে আমেরিকা এখন আর এতে কারো সংশয় নেই। প্রায় একশ’বছর আগে এই প্রক্রিয়ার সূচনা হয়েছিল আমেরিকায়। ‘মানুষের অর্থনৈতিক আচরণ ও তার অবচেতনে থাকা উপভোগ ও ক্রয়ের স্পৃহাকে লক্ষ্যবস্তু করার তত্ত্ব’ প্রয়োগ করা শুরু করলো ওখানকার বিজ্ঞাপন কোম্পানীগুলো। বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে উপভোক্তাকে প্রলুব্ধ করার এই তত্ত্বের উদ্গাতা যে সে লোক নন, মনোবিজ্ঞানি সিগমন্ড ফ্রয়েডের ভাইপো এডওয়ার্ড বেরনাভস, আমেরিকা যাকে বলে আধুনিক বিজ্ঞাপন শিল্পের উদ্ভাবক।

বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে উপভোক্তাকে প্রলুব্ধ করার এই মডেলই সর্ব দেশে অনুসৃত হয়ে আসছে। ১৯৫০এর দশক থেকে আমেরিকায় রেডিও ও টেলিভিশনে বানিজ্যিক বিজ্ঞাপনের চল হওয়ার পর থেকে বড় বড় মনোবিদরা নানান পদ্ধতি উদ্ভাবন করে চলেছেন। আমাদের দেশে রেডিওতে বানিজ্যিক বিজ্ঞাপন চালু হয় বিবিধ ভারতীর অনুষ্ঠানে ১লা নভেম্বর ১৯৬৭ থেকে।

এ কালের বিজ্ঞাপনের কথা বলতে ইচ্ছা হয় না। এ দেশে নব্বইএর দশক থেকে বিশ্বায়নের সর্বগ্রাসী থাবা আমাদের সংস্কৃতি, রুচি, ভাষা আর মূল্যবোধের সবটুকুই লুটে নিয়েছে। ‘রক্তকরবী’ নাটকে অধ্যাপক ও নন্দিনীর কথোপকথনের অংশ মনে পড়ে। অধ্যাপক নন্দিনীকে বলছেন “আমরা যে মরা ধনের শবসাধনা করি। তার প্রেতকে বশ করতে চাই। সোনার তালের তাল-বেতালকে বাঁধতে পারলে পৃথিবীকে পাব মুঠোর মধ্যে।” পণ্যায়ন আর ভোগবাদ পৃথিবীকে হাতের মুঠোয় পাওয়ার রাস্তা বাৎলে দিয়েছে আমাদের।এখন আর ‘সেনকোর অলঙ্কার আমার অহংকার’ নয়, হীরা চাই। তাই হীরা কেনার লোভ দেখানো বিজ্ঞাপন। এখন দেহ ব্যবসার বিজ্ঞাপনও অভিজাত বাংলা সংবাদ পত্রে বাধাহীন প্রকাশ হয়ে চলে।

হাতের মুঠোয় পৃথিবীকে ধরা – মহা পুণ্যবান
একালের বিজ্ঞাপন-কথা অমৃত সমান।


2 comments:

  1. সুন্দর লেখা। ঋদ্ধ হলাম। আমার যৌবনে আর একটি বিজ্ঞাপন খুব মন কেড়েছিল। সেটি গোল্ডফ্লেক সিগারেটের বিজ্ঞাপন। "Smoking is bad, even Goldflake !"

    ReplyDelete
  2. খুব ভাল লাগল। সমৃদ্ধ হলাম।

    ReplyDelete