0

ধারাবাহিক - শ্যামাপ্রসাদ সরকার

Posted in

১)

 

নীল সমুদ্রটা ক্রমশ এগিয়ে আসছে। একটু পড়েই জোয়ার চলে গেলে ঢেউগুলো সব পিছিয়ে যাবে। ভিজে বালির ওপর ঢেউ এর অজস্র আঁকিবুকি আর ছোটবড় ঝিনুকের কুচি বালিতে আটকে থাকবে তার পর।এইসময়  ভেজা বালির ওপর হাঁটতে বেশ  ভালোই লাগে। তবে সবচেয়ে ভাল লাগে ঝিনুক কুড়োতে। ছাব্বিশ বছর বয়সে এসেও এর আনন্দ একটুও কমে না। ভিজে বালি মাখা ঝিনুকের সাথে ছোট ছোট কড়ি আর শঙ্খের মত সাগর সম্পদে হাত ভরে ওঠে সাগরিকার।

কাঁধ থেকে বাঁধনী প্রিন্টের ওড়নাটা মাটিতে লুটোচ্ছে। দু একটা সাদা পাখি এক্ষুণি উড়ে গেল। সূর্যাস্ত হতে আর বেশী বাকী নেই। মা আর কিছুতেই জলের ধারে আসতে চায়না। একটু দূরে  পলিথিন খাটিয়ে একটা আদিবাসী মেয়ে ডাব বিক্রী করছে। বসবার জন‍্য প্লাস্টিকের চেয়ারও রেখেছে কয়েকটা। ডাব কিনে চাইলে সমুদ‍্র দেখতে দেখতে  বসে বসেই খাওয়া যায়। সাগরিকার মা শ্রীরাধা সেন আপাতত সে রকম একটা চেয়ার জুটিয়ে ওই ডাব বিক্রেতা মেয়েটির সাথে জমিয়ে গল্প করছেন। দূর থেকে সাগরিকা মা কে লক্ষ‍্য করে নিজের মনেই হেসে উঠল।

স‍্যোসিওলজির এক্স - প্রফেসার শ্রীরাধা সেন এখনো ফিল্ড নোটস্ জোগাড় করতে ভালবাসেন তাহলে! এরপর যদি মা যদি ওই মেয়েটির ঘরে গিয়ে লঙ্কাবাটা  ঠাসা কাঁকড়ার ঝোল দিয়ে মোটা চালের একমুঠো ভাতও খেয়ে আসেন, তাতেও অবাক হবার কিছু নেই।

মা মানুষটাই যে অন‍্যরকমের। বাবাও ঠিক এমনি ছিল। সাগরিকার বাবা  সুধন‍্য সেন ছিলেন একজন ভ্রমণপিপাসু ও নামকরা  সাংবাদিক। 'কালাকাল' পত্রিকাটা এখন উঠে গেলেও প্রেসক্লাবে বাবার নামে বছরে একটা স্মারক বক্তৃতা হয় প্রতিবছর। মা আর সাগরিকাই সেটা আয়োজন করে। ওদের বাড়িতে দাদা''সমুদ্র' আর ওর 'সাগরিকা' নামটা তো বাবা-মা'র সমুদ্র নিয়ে অবশেসনেরই ফল। এই সুধন‍্য বাবু এরকম একবার সপরিবারে এখানে বেড়াতে এসে সমুদ্রে স্নান করতে নেমে হঠাৎ সেরিব্রাল স্ট্রোক হয়ে  মারা যান। সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েও বাঁচানো যায়নি। সাগরিকা তখন সবে ইলেভেনে উঠেছে। দাদা তখন সবে জেল থেকে ছাড়া পেয়েও  ওদের সঙ্গে আসেনি। ওরা সেবার দুজনে একলা ফিরে এসেছিল কলকাতায়। বাবার সঙ্গে  না থাকাটা সেই ফেরাটায় সমুদ্রের ধারে বয়ে চলা নোনা হাওয়ার মত ওদের কাছে একলাই ছিল।

বাবা মারা যাওয়ার পর মা খুব একলা হয়ে গেছে। মা-মেয়েতে তাই সুযোগ পেলেই এই সমুদ্রের ধারেই চলে আসে ছুটি কাটাতে। বলা ভাল,স্মৃতির সাথে সহবাস করতে।


আমহার্স্ট স্ট্রীটের  ভিতর দিকে গিয়ে একটা ব্লাইন্ড লেনের শেষে একটা হলদে ছোপধরা  বাড়ি আছে। একতলা জুড়ে মহাকালী বোর্ডিং হাউস আছে আর তার  দোতলায়  'জনতা পাঠাগার' এখনো টিমটিম করে টিকে আছে। মতি শীল দের একটা ট্রাস্টের টাকায় সেই পঞ্চাশ বছর আগের তৈরী লাইব্রেরীটায় যদিও  আজকাল আর বিশেষ কেউ আসে না। বৃদ্ধ তরণী চক্কোত্তি লাইব্রেরী ঘরটা সকাল এগারোটার পর এসে খোলে আর রাত আটটায় বন্ধ করে দেন। বাকী সময়টা তিন বান্ডিল বিড়ি আর চিনি ছাড়া লাল চা' দিয়ে চালিয়ে দেন। সকালে বাড়ি থেকে খেয়ে আসেন বলে আর টিফিন খান না।

সন্ধের দিকে এঘরে জনা দশেক ছেলেদের জমায়েত হয়। সনৎ, সুশান্ত,অরুণ আর সমুদ্র এরা মূলতঃ  সিটি আর স্কটিশে পড়ে আর  তারাই কলেজগুলো থেকে আরো পাঁচ ছ'জন বন্ধুকে জুটিয়ে আনে। তখন আর এক দফা লাল চা আসে মন্টুর দোকান থেকে। দু'তিন ঘন্টা ধরে ওরা স্টাডি সার্কেল চালায়। কলকাতার  দিনকাল বদলাচ্ছে খুব দ্রুত। এই তো কদিন আগে একটা ট্রাম পুড়িয়ে দিয়ে গেছে নকশাল পার্টীর ছেলেরা। এ নিয়ে বেশ হইচই পড়ে গেছে। ওরা আসলে আপাতত এক স্বপ্নসন্ধানী যুবকের দল। উত্তরবাংলার  নকশালবাড়ি আন্দোলনের ওরাও একটা তির্যক অংশ। মধ‍্য কলকাতার  লোকাল কমিটির কমরেড নেতা সমর দত্তের উৎসাহেই মূলতঃ ওদের পাঠচক্রটা বসে। এখনো পার্টী মেম্বারশীপ না পেলেও  ওরা একদিন গ্রাম দিয়ে শহরটাকে ঘিরে এক শ্রেণীমুক্ত, শোষণমুক্ত সমাজ গঠনের স্বপ্নে মশগুল। এর জন‍্য হাতে অস্ত্র তুলে নিতেও ওদের আপত্তি নেই।

আজ আলোচনা চলাকালীন সুশান্ত হঠাৎ বলে বসলো,

' সনৎদা! সমুদ্রের বাবাদের কাগজটা কিন্তু আমাদের মতের বিরোধী সম্পাদকীয় লিখে রোজ  প্রচার করছে..আর সেই বাড়ির ছেলে কিনা  আমাদের দলে রোজ আসছে, বসছে  এটা কি ঠিক হচ্ছে?'

সমুদ্র এমনিতে শান্ত ছেলে হলেও এ কথায় তার গা'য় জ্বালা ধরে। ফস্ করে একটা চারমিনার ধরিয়ে সে উত্তর দেয় -

 ' তুই সি.এমের নোট গুলো ভাল করে পড় আগে।কমিউন গড়ার আগে অবধি সংবাদপত্রের কোন ফিক্সড ইজম্ থাকতেই পারেনা। ওরা আসলে বাজারের চাহিদা মেটাচ্ছে মাত্র। যেটা পাবলিক খায় তাই পাতে দিচ্ছে।  আমরা যেদিন সংখ‍্যাগরিষ্ঠ মানুষকে প্রভাবিত করতে পারব তখন ওরা আমাদের কথাই খালি লিখবে। আর সঙ্গে মনে রাখিস্ কাগজটা আমার  বাবা চালায় না।  ওখানে স্রেফ চাকরী করে। যেমন পোস্তায় তোর বাবা গদীতে বসে খাতা লেখে!'

সনৎ বয়সে একটু বড় ওদের চেয়ে। ব‍্যাপারটাকে  বেশীদূর গড়াতে না দিয়ে তক্ষুণি বাজার অর্থনীতির সাথে দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের প্রভেদের ওপর টুক করে আলোচনাটা ঘুরিয়ে দিল।

কত হঠাৎ-নিষ্প্রদীপ সন্ধ্যায় এইরকম একলা সমুদ্রতটে  সুধন‍্য যখন গলা ছেড়ে গান ধরতেন তখন মা এর সাথে সাথে  আর  স্কুলেশপড়া সাগরিকাও সুর মেলাত। ওদের মধ‍্যবিত্ত আটপৌরে জীবনে বহুদিন তেমন সন্ধ্যা আর আসেনা।

 সমুদ্রটা আস্তে আস্তে অন্ধকার মেখে এবার একলা হয়ে আসছে। বীচ্ টা এমনিতেই নির্জন।

এদিকটায় ট‍্যুরিস্ট বেশী আসেনা। একটু নির্বান্ধব নির্জনতাটার জন‍্যই তো আসা।

সাগরিকা মা'র সামনে এসে  দাঁড়ায়। শ্রীরাধার হাঁটুতে বেশীক্ষণ বসে থাকলে উঠতে একটু কষ্ট হয় আজকাল। আদিবাসী মেয়েটাও  সব গুটিয়ে উঠে পড়ছে। সাগরিকা মা'র হাতটা ধরে আলতো চাপ দেয়। আসলে প্রতিবার উঠে আসার সময় মনে হয় ওরা বাবাকে একলা রেখে ফিরে যাচ্ছে যেন। শ্রীরাধা শাড়ির খুঁটে চশমাটা মুছে স্বাভাবিক গলায় বলে ওঠেন - ' রিমি! গরম গরম চানাওলা দেখতে পেলে দাঁড় করাস তো..আর একবার লেবু চা-ও খেতে হবে।'

0 comments: