1

ছোটগল্প - সংগীতা দাশগুপ্ত রায়

Posted in


ছোটগল্প


যা কিছু স্বাভাবিক
সংগীতা দাশগুপ্ত রায় 

আহা শরৎ, আহা মেঘের ভেলা, আহা বাসি ঘুড়ি, আহা পুজোর গান, ইত্যাদি ঝুড়ি ভর্তি আহা নিয়ে গাড়ি ভর্তি মেয়ে পুরুষ কিছুটা আন্তাক্ষরী, কিছুটা ইন্সটাগ্র্যাম, কিছুটা স্ন্যাপচ্যাট, কিছুটা হোয়াটস্‌ অ্যাপ আপডেট দিতে দিতে এগোচ্ছিল। 

বলাকার থেকে থেকে চা 'পায়'। সে চুলের থোকায় ঝাপট দিয়ে একদম "তুমি যাকে ভা-আ-লো-বা-আ-সো"র মত সেক্সি গলায় বলে ওঠে "অ্যাইইই, আমার আব্-বার চা পাচ্ছে"। আবীর সঙ্গে সঙ্গে কাছাকাছি কোনও মাটির দেওয়াল, খড়ের বা খোলার চাল, সামনে কাঠের বেঞ্চি দেখে গাড়ি দাঁড় করায়। লেবুচা, দুধচা, আদাদুধচা, ইত্যাদি পছন্দমত বেছে নিয়ে সবাই চুমুক দেয়। বলাকা আদাদুধচা খায়। বাচিক শিল্পী ও। গলা ভাল রাখতে ব্যাগে কাবাবচিনি রাখে আর চান্স পেলেই আদাচা।

#

বিজুর পা চুলকোতে থাকে। মাথা নিচু করে দেখে নেয়। পায়ের আঙ্গুলগুলো থেকে রস পড়ছে। আগুনজ্বলুনি তার সাথে। কানাইকে দেখাতে গেছিল। ডাক্তার না সে। কিন্তু গাঁয়ের হাসপাতালে সেই সব। কানাই ঘা দেখে গুঁড়ো ওষুধ দিয়েছিল বটে। তার আগে সারা গায়ে হাত বুলিয়ে বুলিয়ে জিগেস করেছিল- একেন থেকে রস নামে? ওকেন থেকে নামে? কোমরের নিচে একবার হাতটা ঘুরিয়ে এনে চাপ দিল, "সব সত্যি বল। কোনও গোপন অঙ্গে রস নামলে কিন্তু তার ওষুধ অন্য।" 

বিজুর গা কাঁটা হয়ে উঠেছিল। সারাদিন পচা জলে দাঁড়িয়ে শাপলা গুগলি তুলতে একটুও গা ঘিনঘিন করে না। কিন্তু কানাইয়ের সোনালি ঘড়ি পরা হাতটা দেখে বমি উঠে আসছিল। 

...মাকে বলবে ভেবেও বলতে পারে নি। ভয় পাবে। হয়ত বিজুরই দোষ দিয়ে দুঘা পিটিয়ে দেবে। এমনিতেই সারাদিন ভগবানকে ডেকে ডেকে গাল পাড়ে। বিজুর পেটে ভাত নেই, তবু কি করে এখনও বেড়ালে জান নিয়ে মায়ের গলার কাঁটা হয়ে বেঁচে আছে মেয়েটা - সেই প্রশ্ন ক'রে ক'রে পাড়া জাগিয়ে কাঁদে। এদিকে একবেলার খাবার জুটলেও সেটা বিজুর মুখে গুঁজে দিয়ে নিজে জল খেয়ে শুয়ে পড়ে।

মাথা নিচু করে হাঁটছিল বিজু। গুঁড়ো অসুধে কিছু কাজ হয় নি। হবেও না। রোজ সলিমুদ্দিদের খাটালের গোবর সাফ করতে করতে হাত পায়ে পোকা হয়ে যাচ্ছে। তারওপর বাকি দিন জলে নেমে নেমে সংসারের সুরাহা করা। ওষুধ লাগালেও থাকে না তো তা। আর কানাই ওষুধ দিয়েওছিল তিনদিনের, যাতে আবার ওর কাছে যেতে হয়। যাবে না বিজু। জ্বলুক। জ্বলে পুড়ে যাক সব। যাবেনা শয়তানটার কাছে।

#

গ্রামের চায়ে যাই বল একটা অন্য স্বাদ আছে, তাই না? বলাকা কথা কটা এমন ভাবে বলে যেন বাদামের খোলা আস্তে করে ভেঙ্গে ভেতর থেকে দানা বার করছে। অন্ততঃ আবীরের তাই মনে হয়। এসব ব্যাপারে আবীরের ভিস্যুয়াল দুর্দান্ত। 

দেবা, তুই বুঝি প্রথম গ্রাম বাংলায় এলি, অমন ভ্যাবুর মত মুখ করে কি দেখছিস? আমাদের ছবি তুলে দে না কটা! সরসী গাড়ি থেকে ক্যামেরাটা নামিয়ে এনে হাতে দেয়। মেয়েটা কিছুতেই দেওকী বলবে না। ওর নাকি দেবা বলতেই ভালো লাগে।

কলকাতার জল হাওয়া ফুচকা এগরোলে বড় হওয়া দেওকীনন্দন বলাকার প্রেমে পাগল হয়ে দলে ভিড়েছিল। কিন্তু বলাকা তো প্রেম করা বোঝে না। তার প্রেমও 'পায়'। আর যখন পায় তখন সে সব্বাইকে বলে - অ্যাই তোরা চোখ বন্ধ কর, আমার প্রেম পাচ্ছে, আমি চুমু খাবো। 

দেওকী এই শুনে আরও হাবুডুবু প্রেমে পড়ে। কিন্তু চুমুটা বলাকা সচরাচর আবীরকেই খায়। মাঝেসাঝে সোহমকেও। কিন্তু দেওকীকে আজ অবধি না।

সরসী দেওকীর ব্যথা বোঝে, নাকি দেওকীই সরসীর ব্যাথা - সেটা নিয়ে কেউ মাথাই ঘামায় না। তবে আবদার রেখে ক্যামেরায় ক'টা ছবি তুলে দিয়ে দেওকী বলে তোদের কাশ ফাশ কোথায়? আমি ক্যামেরা আনলাম তো ওইজন্যেই। মাঠ ভরা রবীন্দ্রনাথের দাড়ির মত কাশ দুলছে আর তার পিছনে রেল লাইন ধরে ট্রেন ছুটছে এরকম একটা ছবি তুলব ভাবলাম... 

সোহম জয়েন্ট বানাতে বানাতে সরসীকে অফার করে, টানবি নাকি? 

নাহ, দেবাপক্ষে জয়েন্ট চলবে না...ফিকফিক করে হাসে সরসী... তাছাড়া আবীর এবার রেস্ট নিক, আমি স্টিয়ারিং এ বসছি... হালকা করে খেলে নেয়। সরসী স্টিয়ারিঙে বসলে বলাকা কিছুতেই ওর পাশে বসবে না। ওর আবীর চাই। তার মানে সামনের সিটে না বলাকা না আবীর। সোহম হাফ ধুনকিতেই আছে। অঙ্ক অনুযায়ী দেবাই পাশে বসে ক্যামেরা নিয়ে।

#

বিকেল গড়িয়ে এল। অনেক দূর এসে গেছে বিজু। আকাশটা একটু ছায়া ছায়া দিচ্ছিল বলে বেলাও বোঝা যায় নি। তবে ভাগ্য ভালো আজ। রেলের ঝিলগুলোতে এখন অনেক জল। তার মধ্যেই ছেঁড়া গামছা নামিয়ে দু চারটে চুনো মাছ যদি পাওয়া যায় ভেবেই এসেছিল। তা পেয়েছে দুচারটের বেশিই। বড় একটা কচুপাতায় মাছ কটা মুড়ে সেটাকে গামছায় বেঁধে নেয়। পাটা বড্ড জ্বলছে। কিন্তু রাতে পোড়া মাছের ভর্তা দিয়ে দুটো ভাত খাবে ভাবতেই জ্বলুনি কমে যায়। আকাশটা যেন একটু বেশি ছায়া দিতে লেগেছে। হাওয়াও অল্প ছাড়ছে। 

আরে! বিজু না? কোত্তেকে ফিরচিস! কানাইয়ের গলার আওয়াজ আর সাইকেলটার কাঁকুড়ে রাস্তা মাড়ানোর খরখর শব্দটা একসঙ্গেই কানে আসে। 

ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় তারপর রাস্তার পাশে নেমে যায় একটু।

কি রে? এদিকে কোথায় গেচিলি? হাতে কি! 

ঘাবড়ে যায় বিজু। কিচু না, গামছা... ঘাড় শক্ত করে উত্তর দেয়।

আহা, অ্যাদ্দুরে কিচু না করতে এসেচিলি নাকি... দেকি দেকি পা কেমন আচে...সাইকেল থেকে নেমে আসে কানাই।

বাতাস জোরেই বইতে লেগেছে। বিকেলের আলো কেটে মালগাড়িটা বগিগুলোকে টানতে টানতে ছুটছে লাইন ধরে। হাতের গামছাটা ছিটকে পড়লে বোঝা যায় মাছগুলো তখনও জ্যান্ত। বুক সমান কাশের বনের মধ্যে বিজুর শরীরের রস হায়নার মত শুঁকে শুঁকে চাটে কানাই, কামড়ে কামড়ে খায় যেন কতকালের উপোষী। বিজুর আপ্রাণ বাঁচার চেষ্টায় কাশফুলের ঝাড় দুলে দুলে ওঠে। গোড়ার মাটিতে খানিক রক্তের পুষ্টি যোগ হয় বটে, তবে তাতে ফুলের শুভ্রতায় দাগ লাগে না।

ব্রেকে পা দিয়ে সরসী চেঁচিয়ে ওঠে, লুক অ্যাট আওয়ার রাইট দেবা! তোর সাবজেক্ট এক্কেবারে খাপে খাপ। দূরে ট্রেন, কাশবন, শরতের আকাশ... আর কাশফুলগুলো কেমন জোরে দুলছে দ্যাখ... 

ছবিগুলো সত্যিই দারুণ ওঠে। পাওয়ারফুল লেন্সে কাশের দোলা ট্রেনের গতি আর যা যা কিছু দ্রষ্টব্য সবই যথাযথ।

#

কে জানে কত রাতে বেড়ালের জান নিয়ে জন্মানো বিজু গামছাটা কুড়িয়ে নিয়ে পা বেয়ে নেমে শুকিয়ে যাওয়া রক্তটুকু মুছে বাড়ির পথে এগোনোর চেষ্টা করে। 

ভাগ্যিস সব ধর্ষণ খবর হয় না! তাই সমবয়সী বন্ধুরা বিজুকে পুজোর দিনে ডাকতে আসে বাড়ি বয়ে... 

মা এখনও কাঁদে, তবে পাড়ার কেউ তা জানতে পারে না।

1 comment:

  1. দুর্দান্ত... শুভেচ্ছা

    সার্থক

    ReplyDelete