0

ধারাবাহিক - সুদেব ভট্টাচার্য

Posted in


ধারাবাহিক


সদগুরু 
সুদেব ভট্টাচার্য





সুখব্রত অনেকক্ষণ থেকেই আনচান করছিলেন ঘুমের ঘোরে। প্রীতিলতা খেয়াল করছে আজ কদিন ধরে সুখব্রত অদ্ভুতরকম সব স্বপ্ন দেখেন রাত্রে। আর পরক্ষণেই ঘুম ভেঙ্গে মাঝরাতে ধড়মড় করে জেগে ওঠেন। বিড়বিড় করে অনেক কিছু অস্পষ্ট কথা বলতে থাকেন আপন মনে। অথচ অনেকবার জিজ্ঞেস করা সত্ত্বেও তিনি স্পষ্ট করে বলতে পারেননি তার স্বপ্নের ঘটনা, বৃত্তান্ত, পটভূমি কিছুই। শুধু একটি উজ্জ্বল নক্ষত্রের তীব্র আলোর কথা বারবার তিনি বলেন। এছাড়া নাকি আর কিছুই মনে থাকে না তার। প্রীতিলতা উঠে বসল বিছানার ওপরে। সুখব্রত অবশ্য কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার শান্ত হয়ে পড়লেন ঘুমের ঘোরে। কিন্তু প্রীতিলতার আর ঘুম আসছে না কিছুতেই। সে হাঁটুর মধ্যে মাথা রেখে কোনও এক অজানা ভাবনার জগতে হারিয়ে গেল।

আজকেও বিকেলে পার্টির ছেলেরা এসেছিল সুখব্রতর খোঁজে। প্রীতিলতা ওঁর অনীহা আগে থেকেই আন্দাজ করেছিল। তাই ছেলেগুলোকে বাইরে থেকেই সুখব্রতর শরীর খারাপের কারণ দেখিয়ে বিদেয় করেছিল। সুখব্রত বহুদিন পার্টির ছেলেদের সঙ্গে মেলামেশা একেবারে বন্ধ করে দিয়েছেন। অথচ একসময় এই মানুষটাই নাকি স্বদেশি, পিকেটিং সব করতেন নিয়মিত। এই ঘরেরই দেওয়ালে ঝুলত গান্ধী, পাটেলের ছবি। তখনও সুখব্রত অন্যসব মাঝবয়সী পুরুষদের মতই বেশ সাংসারিক ছিলেন। প্রীতিলতার প্রতি ছিল অগাধ প্রেম আর ছেলেদের পড়াশুনো নিয়েও ছিলেন অত্যন্ত ওয়াকিবহাল। ইদানীং ওই অজিতেশের সঙ্গে উত্তর কলকাতার কোন এক মঠে যাবার পর থেকেই সুখব্রত কেমন বদলে গিয়েছেন। অজিতেশ আর সুখব্রত আগে একসঙ্গেই কংগ্রেস করতেন। স্বাধীনতার আগে বেলেঘাটার বাড়িতে গান্ধীজি এলেই ওঁরা ছুটে যেতেন ওঁর কাছে। গান্ধীজি খুব স্নেহ করতেন সুখব্রতকে। অথচ সেই মানুষটাই এখন গান্ধীর নাম শুনলে বিরক্ত হন। সেই প্রসঙ্গ উঠলেই এখন বলেন, “গান্ধীবাদও সঠিক পথ নয়। স্বাধীনতার পরে কী লাভ হয়েছে মানুষের? পেরেছি আমরা জাগতিক পীড়ার অবসান ঘটাতে? এখনও মানুষ খেতে পায় না। একটা যুদ্ধ থামলে আরেকটা যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। রোগ ব্যাধি, মহামারী, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এসব কি কিছুই আটকাতে পারি আমরা? আসলে পার্থিব মতবাদ দিয়ে কখনও চিরন্তন পীড়া দূর করা যায় না। ঈশ্বরবিমুখ হয়ে মানুষ কোনওদিনও কোনও সুখলাভ করতে পারবে না।“

এসব কথা শুনে প্রীতিলতার কেমন যেন ভয় করে মনে মনে। গত ক’মাসে তার ঘরবাড়ি একটু একটু করে বদলাতে শুরু করেছে। গান্ধী পাটেলের ছবির জায়গায় এখন এক বয়স্ক সন্ন্যাসীর ছবি কোথা থেকে এনে সুখব্রত টানিয়ে রেখেছে। ছবিতে দৃশ্যমান এই মহাপুরুষের নাম এখন প্রীতিলতার কন্ঠস্থ হয়ে গিয়েছে। দিনে সারাক্ষণই প্রায় এই সন্ন্যাসীর নাম করতে থাকে সুখব্রত। সৌরপতি প্রত্যুষ। কলকাতার কোনও এক আধ্যাত্মিক মঠের প্রধান সন্ন্যাসী ইনি। সুখব্রত এখন সৌরপতি প্রত্যুষ অন্ত প্রাণ।

সুখব্রত বদলে যাচ্ছেন ধীরে ধীরে। না, ধীরে ধীরে নয়। খুব দ্রুত। চেনা মানুষটাকে আর চিনতে পারে না প্রীতিলতা। কাজপাগল মানুষটা নিয়মিত এখন আর দোকানেও যান না। সারাদিন ঘরের দরজা বন্ধ করে কি সব ঠাকুর দেবতার বই নিয়ে পড়াশুনো করেন এক মনে। আর দিস্তা দিস্তা কাগজে সেইসব শ্লোক, মন্ত্র লিখে রাখেন। বহির্জগতের সঙ্গে তখন তার সমস্ত সম্পর্ক যেন সম্পূর্ণ লোপ পায়। এভাবে কি কোনও ব্যবসা টিকতে পারে? বড়বাজারে অতবড় একটা ওষুধের দোকান শুধু দুজন কর্মচারীর হাতে ফেলে রাখা যায়? মাঝে মাঝে প্রীতিলতা অনেক বুঝিয়ে, ঝগড়া করে পাঠায় দোকানে। কেমন একটা উদাসীনতা নিয়ে সুখব্রত বেড়িয়ে যান বাড়ি থেকে। ফেরেনও অনেক রাত করে। জিজ্ঞেস করলে বলেন, “সৌরমঠে গিয়েছিলাম ফেরার পথে। সৌরপতির প্রবচন শুনলে একবার আর মাঝপথে কি উঠে আসা যায়?”

প্রীতিলতা আর কোনও কথা বাড়ায় না। কথা বাড়ালেই অশান্তির পরিবেশ তৈরী হয়। এদিকে ছেলে দুটোও বড় হচ্ছে। বড়জন বছর দুই হলো বিয়ে করেছে। আর ছোট ছেলে ম্যাট্রিক দেবে এইবার। এরকম অবস্থায় প্রীতিলতার ইচ্ছে করে না আর নতুন কোনও অশান্তির।

প্রীতিলতা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চাদরটা টেনে নেয় গায়ের ওপরে। একটা ঠাণ্ডা বাতাস জানলা দিয়ে বয়ে এসে তার গায়ে লাগে।

পরের দিন সকালে যখন তার ঘুম ভাঙে তখন এক রাঙা মিঠে ভোরের আলো প্রীতিলতার মুখে এসে পড়ে। ঘুমচোখে নভেম্বরের শীতটা গায়ে মেখে প্রীতিলতা চমকে ওঠেন। তার পাশে সুখব্রত নেই বিছানাতে। শুধু একটা কাগজ পড়ে রয়েছে সেই স্থানে – সুখব্রতর রেখে যাওয়া একটা চিঠি।

******************************************************

সুখব্রত যখন পা রাখলেন মঠের প্রবেশদ্বারে তখন বেলা অনেক হয়েছে। মাথার ওপর সূর্যদেব যেন আজ একটু বেশিই উজ্জ্বল। সুখব্রতর এরকম প্রাণবন্ত দিন খুব প্রিয়। তিনি ধীরে ধীরে মূল মন্দির ছাড়িয়ে মঠপ্রধান সৌরপতির ঘরে প্রবেশ করলেন। এখানে এখন এক অপার্থিব প্রশান্তি বিরাজ করছে। ঘরে ঢুকেই প্রথমেই সুখব্রতর চোখ পড়ল এক দিব্যকান্তি মহাপুরুষের দিকে। ঘরের মাঝে আসনে উপবেশন করে যিনি এখন গভীর ধ্যানে মগ্ন।

সুখব্রত নিশব্দ পায়ে এগিয়ে গিয়ে তাকে প্রণাম নিবেদন করলেন। তারপর তার পাশে বসে রইলেন অনেকক্ষণ।

কতটা সময় এভাবেই গেল তার মনে নেই আর। যখন সৌরপতি প্রত্যুষ চোখ মেলে আগত অতিথির দিকে দৃষ্টিপাত করলেন, তখন তার মুখের চেহারা সম্পূর্ণ বদলে গেল। পূর্ণিমার মত আলোকিত হয়ে উঠল তার চোখদুটি। তিনি নিজের অস্ফুটেই বলে উঠলেন, “সময় হলো অবশেষে।

সুখব্রত বললেন, “প্রভু, আমি আমার সংসার, জাগতিক জীবন সব কিছু ত্যাগ করে আপনার শরণে এসেছি। এর আগে আমাকে আপনি তিনবার ফিরিয়ে দিয়েছন। আর আমি যাব না, আমার মনোস্কামনা পূর্ণ করুন প্রভু। ফিরে যেতে আমি আর আসিনি। আমাকে গ্রহণ করুন গুরুদেব।

সৌরপতি বললেন, “আর ফিরে যেতে হবে না তোমাকে সুখব্রত। আমিও তো নিজেই এতদিন এই দিনের অপেক্ষা করছিলাম। তোমাকে ফিরিয়ে দেবার ক্ষমতা আজ আমারও নেই। যার গভীরে এত ব্যকুলতা তাকে ফেরাবার সাধ্যি আমার কোথায়? তুমি বোসো এখানে। আমি পুজোর আয়োজন করছি। আজ তোমাকে আমি দীক্ষাদান করব।

সুখব্রতের মুখটা ঝলমল করে উঠল আনন্দে। সৌরপতি যতক্ষণ পুজোর আয়োজন করতে লাগলেন ততক্ষণ সুখব্রত এক ঘোরের মধ্যেই ছিলেন। শেষমেশ এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। সুখব্রত আসন পেতে বসলেন। সুগন্ধী ধূপ, পুষ্প এবং প্রদীপের শিখাকে সাক্ষী রেখে সৌরপতি প্রত্যুষ তার কর্ণকুহরে ঢেলে দিলেন বীজমন্ত্রের মধু। এক অদ্ভুত শিহরণ খেলে গেল ওর সারা শরীর জুড়ে। সুখব্রত হারিয়ে গেলেন এক অন্য অতীন্দ্রীয় জগতের অতলে।

সৌরপতি বললেন, “আমি জানি তুমি বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছ সুখব্রত। তাই তোমাকে আমি এখনই সন্ন্যাসদান করব না। কারণ তুমি হয়ত পরবর্তীকালে গৃহীজীবনে আবার ফিরেও যেতে পারো।

সুখব্রত আকুল নয়নে বললেন, “না, গুরুদেব। আমি আর ফিরে যাব না আমার সাংসারিক জীবনে। আমার স্ত্রী ঘোর বস্তুবাদী এক নারী। কিন্তু সে বুদ্ধীমতিও বটে। তাই সে নিজে এই পথে না এলেও আমার এই নতুন আধ্যাত্মিক জীবনে সে কোনও বাঁধা দেবে না। আমি আজ একটি চিঠি রেখে এসেছি তার কাছে। আমি জানি, সে ঘোর অভিমানিনী এবং দৃঢ় চরিত্রের অধিকারী। হয়ত সে আমার খোঁজও করবে না কোনওদিন আর। আমাকে সন্ন্যাসজীবনের মন্ত্র দিন প্রভু। আমার নবজন্ম হোক আপনার আশির্বাদে।“

সৌরপতি বললেন, “তোমাকে সন্ন্যাসী হতেই হবে সুখব্রত। তোমার জন্মই হয়েছে গেরুয়া চীবরকে নিজের একমাত্র ভূষণ করে তোলার জন্যই। সে তোমার ভবিতব্য। তবে আজই তার সময় নয়। তোমার থেকে আমার প্রত্যাশা অনেক অনেক বেশি। তোমার জন্য আরও বড় লক্ষ্য অপেক্ষা করছে।“

সুখব্রত মাথা নীচু করে বললেন, “তাহলে এখন আমার জন্য কী আদেশ প্রভু?”

সৌরপতি বললেন, “ভগবান সূর্যের কৃপাতে তুমি যখন নিজেই এতদূরে এসেছ, তখন এই পুণ্যভূমি ভারতবর্ষকে আরও ভালোভাবে জানো। আমার দুইজন শিষ্য ধর্মকাম ও কিরণজ্যোতির সঙ্গে তুমি পরিব্রজে বেরিয়ে পড়। উত্তর কাশি, বৃন্দাবন, হরিদ্বার, গয়া, ইত্যাদি পুণ্যভূমি ঘুরে এসো এবং সনাতন ধর্ম ও সৌরদের সম্পর্কে আরও জ্ঞান আহরণ করো। তারপর তোমরা ফিরে এলে আমি তোমাকে সন্ন্যাসধর্মে দীক্ষা দেব নিশ্চই। এই কদিনে তোমার সংসারের প্রতি আসক্তি ও মায়ার বাঁধন কিছুটা হলেও স্তিমিত হবে।

সুখব্রত মাথা নত করে গুরুর অনুজ্ঞাতে সম্মতি জানালেন। সেদিন বিকেলেই সুখব্রত বেড়িয়ে পড়লেন অন্য দুই সন্ন্যাসীর সঙ্গে উত্তরের পথে। তখনও তিনি জানতেন না আজ থেকে তিন বছর পরে এই দিনেই তিনি সন্ন্যাস ধর্মে নিজেকে দীক্ষিত করবেন। পিতৃপ্রদত্ত নাম ঘুচে যাবে আজীবনের জন্য। শুঁয়োপোকা থেকে প্রজাপতিতে রূপান্তরের মতই এক নতুন জন্ম হবে তার। 

******************************************************

প্রীতিলতার এখনও স্পষ্ট মনে পড়ে তিনবছর আগের সেই সকালটা। একদিন ঘুম থেকে উঠে সে একটি চিঠি পেয়েছিল বিছানায় – সুখব্রতর লেখা বিদায় পত্র। সুখব্রত তারপর আর ফেরেনি বাড়িতে। সেই সকালের পর থেকেই চিরকালের জন্য বদলে গিয়েছিল প্রীতিলতার সংসারের রোজনামচা। কিন্তু প্রীতিলতা একফোঁটাও চোখের জল ফেলেনি কোনওদিনের জন্য। নিজেকে শুধু মনে মনে আরও শক্ত করেছে প্রতিদিন। যে মানুষটার সঙ্গে ত্রিশবছরের সম্পর্ক সে একদিন এভাবে সবকিছু চুকিয়ে দিয়ে চলে পারে এটা ছিল তার কল্পনাতীত। তার বিশ্বাসের দাম এভাবে পেল সে? এভাবে চলে যাওয়া মানে তো আসলে পালিয়ে যাওয়া! একটা তস্করসুলভ হীন কাজ ছাড়া আর কি? 

তারপর ধীরে ধীরে গঙ্গা দিয়ে অনেক জল বয়ে গেছে অলক্ষ্যেই। কোনওদিনও সে খোঁজ করেনি আর সুখব্রতর। ছেলেদের অনেক পীড়াপীড়ি সত্ত্বেও নিজের বুকে পাষাণ রেখে তার সিদ্ধান্তে অটল থেকেছে প্রীতিলতা। সে ভালো করেই জানে, হারিয়ে যাওয়া মানুষকে খুঁজে পাওয়া যায় কিন্তু যে নিজেই হারাতে চায় তাকে খুঁজে পাওয়া যায় না আর। হয়ত সুখব্রতকে সে জোর করে নিয়েই আসতে পারত, কিন্তু মানুষটাকে কি আর ফেরানো যেত? মনে মনে তো সে অনেকদূরে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছে। তাই জীর্ণ কুসুমের মত পরিত্যাগ করেছে সে সুখব্রতকে। নিজের থেকে, সংসার থেকে চিন্তা থেকে সুখব্রতকে বিসর্জন দিয়েছে প্রীতিলতা। নিজের হাতে দোকান ও সংসার চালিয়েছেন একা। আর সেইসঙ্গেই প্রতিটা বিগত মুহূর্তের সঙ্গে একটু একটু করে ভুলতে চেয়েছে পুরোনো স্মৃতি। এই কয়েক বছর ধরে সে ক্রমাগত নীরবে প্রলেপ লাগিয়ে চলেছে নিজের গোপন ক্ষতগুলিতে। এভাবেই দিন কেটে যাচ্ছিল তার। 

বছর তিনেক ধরে দেশ ও তীর্থ ভ্রমণের পরে ফিরে এসে সুখব্রত যেদিন সন্ন্যাস নিয়েছিলেন সৌরপতি প্রত্যুষের কাছে, সেদিনই নিজের সমস্ত জ্ঞান, শিক্ষা, জাগতিক সম্পদ অর্পণ করে দিয়েছিলেন তার সদগুরুর চরণে। সৌরপতি প্রত্যুষও তার এই নবাগত শিষ্যর চোখে এক স্বতন্ত্র দীপ্তি লক্ষ্য করেছিলেন হয়ত। কারণ সেদিন তার মুখেও এক অদ্ভুত প্রশান্তি দেখা গিয়েছিল। যেন এতদিন সৌরপতি সুখব্রতকেই খুঁজে ফিরছিলেন। এই মন্ত্রদানের জন্যই তো তিনি অপেক্ষা করেছিলেন আজীবন। সুখব্রত ইংরেজীতে ভালো, পদার্থবিদ্যায় স্নাতক। তাই সৌরপতি জানতেন এরকম একজন ব্যক্তিই পারবে তাঁর অবর্তমানে ভগবান সূর্যের এই সংঘ এবং তার নাম পৌঁছে দিতে সমগ্র পৃথিবীর মাঝে। সৌরপতির বয়স হয়েছে, তিনি জানেন তিনি আর বেশিদিন নেই। ভগবান সূর্যের চরণে তিনি আজীবন সেবা করেছেন, নিজের বাড়িতেই সামান্য একটা সঙ্ঘ খুলে তিনি নিত্য পূজাপাঠ করেছেন এবং দীক্ষা দিয়েছেন কয়েকশো মানুষকে। কিন্তু তিনি জানেন তাঁর যোগ্যতা সীমিত। আর এখন তো জরা এসে ধরেছে তাকে। আর কদিন পরেই তিনি চলে যাবেন সূর্যলোকে। কিন্তু অনেক কাজ বাকি রয়ে গেল ভেবে তিনি মাঝেমধ্যেই মুষড়ে পড়তেন। 

তবে এখন আর তিনি হতাশ হন না। তিনি জানেন সুখব্রতই পারবে সূর্যনাম প্রচার করতে এই বিশ্বমাঝে। ভগবান সূর্যই তাকে পাঠিয়েছেন তাঁর কাছে। এদিকে সুখব্রতও একনিষ্ঠ ভক্তের ন্যায় গুরুর সেবা করতে শুরু করলেন। সুখব্রতর বয়স ষাট এখন আর সৌরপতির বিরাশি। মোহ মায়ার জাগতিক বন্ধন যে তাঁকে আর টানে না সেই প্রমাণ ইতিমধ্যে পেয়েছেন সৌরপতি। সুখব্রত সারাজীবন শুধু গুরু সেবা করতে চান ও ইষ্টনাম জপ করতে চান। সৌরপতিও বুঝেছিলেন এটাই যথাযোগ্য সময়। তিনি সন্ন্যাস দান করলেন সুখব্রতকে। অতঃপর তার নতুন নাম হলো দিবাকরম। পিছনে পড়ে রইল তার পুরোনো জীবন, ওষুধের দোকান, ব্যবসা, স্ত্রী প্রীতিলতা ও দুই পুত্র। শুরু হলো এক নতুন জীবন। মুণ্ডিত মস্তক, কপালে সূর্যতিলক, গলায় তেজকন্ঠি এবং বাসন্তী রঙের চীবর এখন তার ভূষণ। সারাদিন তিনি ইষ্টনাম জপ ও সেবার কাজে ব্যাস্ত থাকেন। এভাবেই কেটে যাচ্ছিল দিন, তবে আরও বড় কিছু অপেক্ষা করছিল তাঁর জন্য। দিবাকরম তা জানতেনও না। 

একদিন ভোরের বেলায় সূর্যপ্রণাম সেরে সুখব্রত মঠের টানা বারান্দার এক প্রান্তে বসে মালা গাঁথছিলেন পুজোর জন্য। এমন সময় এক গুরুভাই ধর্মকাম তাকে এসে কানে কানে কিছু বললেন।তার মুখের চেহারা বদলে গেল তৎক্ষণাৎ। তিনি মালা গাঁথা ফেলে ছুটে চললেন গুরুগৃহে। সৌরপতির প্রত্যুষ কিছুক্ষণের মধ্যেই হয়ত দেহ রাখবেন। তাঁর শারীরিক অবস্থা বিশেষ ভালো নয়।


চলবে...

0 comments: