0

ছোটগল্পঃ সুপ্রভাত লাহিড়ী

Posted in


ছোটগল্প


অবচেতনিকা
সুপ্রভাত লাহিড়ী


ইদানিং অনিকেত ওর স্ত্রী শাশ্বতীকে নিয়ে বেশ ভাবনায় পড়ে গেছে। যার এত গুণ সে কি করে এমন ধারা ব্যবহার করতে পারে! কোনও কাজের লোককেই তার পছন্দ হয় না! বাড়িতে কাজে ঢোকার প্রথম দিন থেকেই তার কাজে খুঁত খোঁজা শুরু হয়ে যায়। তখন শাশ্বতী বেমালুম ভুলে যায় যে বিগত দশ দিন ধরে কাজের লোক না থাকার কারণে উদয়াস্ত পরিশ্রম করে ওকেই ঘরের সমস্ত কাজ-কর্ম সামলাতে হয়েছে। আর সেই অমানুষিক পরিশ্রম দেখে অনিকেতের খুব ভয় করেছে, পাছে শাশ্বতী অসুস্থ হয়ে পড়ে! কিন্তু নতুন কাজের লোক আসা মাত্রই সেই সব কষ্টস্মৃতি বিস্মৃতির আড়ালে! কোনও স্বস্তি নেই। 

শাশ্বতীর এই আচার-আচরণ অনিকেতকে বেশ অস্বস্তিতে ফেলেছে। আর এই নিয়ে কোনও কথা বললেই তুমুল কাণ্ড বেঁধে যায়। কাজের লোকের পক্ষ নিয়েছে, এই অপরাধে শাশ্বতী অনিকেতকে আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেয়! তখন যে সমস্ত বিশেষণে অনিকেতকে ভূষিত হতে হয়, তা শালীনতার বাইরে এবং তা সর্বজনে ব্যক্ত করবার মতন নয়। ওই সব মুহূর্তে অনিকেত শাশ্বতীর ওপর রাগ করার পরিবর্তে বিষণ্ণ বোধ করে। শাশ্বতীকে কেমন যেন অচেনা বোধ হয়। আবার মাঝে মাঝে বেশ ভীত বোধ করে অনিকেত, সামনের দিনগুলোর কথা ভেবে। জাগতিক নিয়মে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শাশ্বতী শ্লথ হয়ে পড়ছে, এর ওপর বয়সজনিত কিছু ব্যাধি হয়েছে সঙ্গী। অতিরিক্ত পরিশ্রমে ক্লান্ত হয়ে মেজাজ হারিয়ে ফেলে মুখ ছুটিয়ে দেয়। কি বলতে কি যে বলে বসে! আবার এমতাবস্থায় শারীরিক ও মানসিক চাপ কমানোর জন্যে যে ব্যবস্থাটি লাগু আছে, তার মধ্যে মুখ্যটির, অর্থাৎ টিভির ধারাবাহিকতা কোনও কারণে ব্যাহত হলে যে অপ্রীতিকর অবস্থার সৃষ্টি হয়, সে সব কহতব্য নয়। এতে সংসারের বাকি সদস্যরাও ভুক্তভোগী হয়। এ ব্যাপারেও শাশ্বতীকে কিছু বলতে গেলে পরিস্থিতি আরও ঘোরালো হয়ে ওঠে। তাই বেশ কয়েকটা জমজমাট টিভি সিরিয়াল দেখবার পর শাশ্বতীর মানসিক অবহাওয়া বুঝে সেই প্রসঙ্গ উত্থাপন করলে ও হঠ্ করে বলে ওঠে, ‘বেশ, কাল সকালে সন্ধ্যা কাজে এলে ওর কাছে ক্ষমা চেয়ে নেব না হয়। তুমি এবার খুশী তো? সবাই ভালো আর আমিই শুধু খারাপ, তাই না?’ ঠিক তখনই অনিকেত মেজাজ হারিয়ে ফেলে। কেটে কেটে বলে ওঠে,‘বিছানায় পড়ে থাকলে তখন ওদের হাতেই জল খেতে হবে, গু-মুত ওরাই পরিষ্কার করবে। তখন ওই রকম মুখ ঝামটা দেবার মতন শারীরিক শক্তি থাকলে তোমার কপালে শেষ বয়সে অশেষ দুর্গতি নাচছে – আমার কথা মিলিয়ে নিও।’ শাশ্বতীর তখন পরের টিভি সিরিয়াল দেখার সময় উপস্থিত তাই,‘না না, তার আগেই আমি চলে যাব। হুঁ হুঁ বাবা, আমি ওই সবের পরোয়া আমি করি না।’ কী আত্মবিশ্বাস! জন্ম-মৃত্যুও সে নিজেই নিয়ন্ত্রণ করে! হতভম্ব হয়ে অনিকেত বেরিয়ে আসতে আসতে বলে,‘হুঁ! কতলোক মরার সময় মুখে জলটুকুও পায় না।’

রাতের খাবারের পাট চুকে যাবার সঙ্গে সঙ্গে শাশ্বতী বিছানা নেয়। সে ঘরে তখন শুধু জিরো পাওয়ারের বেডল্যাম্প জ্বলে। এমনিতে চোখে আলো পড়লে ঘুমের ব্যাঘাত হলেও রাতে শোবার সময় বেডল্যাম্পের আলোকে বালিশের আড়াল করে ঘুমের কোলে ঢলে পড়ে শাশ্বতী। কিন্তু একটু রাত করে অনিকেত শুতে এসে টিউবলাইট জ্বালাতেই তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠে সে। শুরু হয় গজর গজর, ‘নিজের আর কি! আমাকে তো সেই ভোর থাকতে উঠে(অবশ্যই সাড়ে সাতটার ভোর!) হাঁড়ি চড়াতে হয়, এত রাত অবধি কি করে কে জানে...’ ইত্যাদি ইত্যাদি বিশেষণ। অনিকেত এ সব নিয়ে কোন কথা না বাড়িয়ে সব আলো নিভিয়ে বিছানায় ঢুকে পড়ে। তারপর অন্ধকারেই মশারির প্রান্ত গুঁজতে গুঁজতে বিড়বিড় করে…‘দিনগত পাপক্ষয়.....।’

আজ কিন্তু টিউবলাইট জ্বালাতে কোনরকম বিরক্তিসূচক মন্তব্য কানে এল না। বেশ বিস্মিত হয়ে মশারির ভিতরে নজর মেলে দিতেই অনিকেত দেখে শাশ্বতী অঘোরে ঘুমাচ্ছে। একটু মুচকি হেসে ওর মাথার কাছের মশারির কোণটা গুঁজে দিতে গিয়ে নজরে আসে খাবার জলের বোতলটা শাশ্বতীর মাথার দিকের জানলার সামনের জায়গায় অবস্থান করছে। অথচ অন্যান্য দিনে বোতলটা থাকে ঠিক টিভির পাশের টেবিলের ওপর। আজ চলে এসেছে মাথার কাছে! উত্তর মিলল শাশ্বতীর শান্ত, স্নিগ্ধ ঘুমন্ত মুখে..... ‘আমার আপত্‍কালীন জলের ব্যবস্থা আমি করেই রেখেছি.....’


0 comments: