0

ছোটগল্পঃ মনোজিৎ কুমার দাস

Posted in


ছোটগল্প


গ্রীণরুমে আউট লোক ক্যানে!
মনোজিৎ কুমার দাস 



নদীনালা, খালবিল আর বনবাদাড়ে ঘেরা এক বিশাল এলাকা। সহদেব চক্কবোত্তি বলে,‘‘পাণ্ডব বর্জিত দ্যাশ। দখিনে সুদোরবন, ডাঙ্গায় বাঘ আর জলে কুমির।’’ চক্কবোত্তির কথা শুনে নারাণ মিত্তির বলে ওঠে, ‘‘বুড়োদাদুর মুহি শুনিছি আগে এহানে বাঘ দ্যাহা য্যাতো। সে সুমায়ে পদ্মা গাঙে বান ডাকলি পারে আমাদেগের নদীনালা, খালবিল মাঠঘাট জলে জলাকার হয়ে সুদোরবনের সঙ্গে এক লগে একাকার হতো!’’ 

‘‘ঠিকই শুনিছিলে চক্কবোত্তি। সে সুময় নাকি কলকেতা য্যাতি হলি পারে গড়োই নদীর ঘাট থিকে ব্যাপারীর নাওয়ে চড়ে এ গাঙ সে গাঙ হয়ে কলকেতার নদী ঘাটে নামতি হতো।’’ 

নারাণ ও সহদেবের গলায় গলায় ভাব। তারা তাদের গ্রামের পঞ্চা রাহুতের পাঠশালায় একই ক্লাসে পড়তো। জলজঙ্গলে ঘেরা অঞ্চলে ছেলেদের পড়াশোনার একমাত্র স্থান ছিলো পাঠশালা ও মক্তব। মেয়েদের পড়াশোনার কথা কেউ ভাবতেও পারতো না। নারাণের আরো পড়াশোনার ইচ্ছে ছিলো, কিন্তু স্কুল কোথায়! নারাণ মনে মনে ভাবলো, রাহুত মশাই যে ভাবে প্যারিচাঁদের ইংরেজি ফার্ষ্টবুক পড়াইছেন, তা ভাঙ্গিয়েই চলে যাবে। সহদেব যেটুকু শিখেছে তাতেই পুজোটুজো করতে পারবে।

সহদেব কেন, অন্যেরাও বলে এটা নাকি পাণ্ডববর্জিত দেশ। অজ্ঞাত বাসের সময় পঞ্চপাণ্ডব নাকি বরেন্দ্র অঞ্চলের রাজধানী পৌণ্ড্রবর্ধন, অর্থাৎ এখনকার বগুড়া জেলা পর্যন্ত এসেছিলেন। এ অঞ্চলে তেমন কোনও পুরার্কীর্তির ধ্বংসাবশেষ দেখতে পাওয়া না যাওয়ায় সত্যি সত্যি মনে হয় অনেক অনেক বছর আগে এটা সুন্দরবনের একটা অংশ ছিলো। ইতিহাস বলে, কান্যকুব্জ থেকে প্রথমে কয়েকজন ব্রাহ্মণ ও কায়স্থ পরিবার এখানে আসে। 

ইংরেজরা রেলগাড়ির আবিষ্কার করার পর যোগাযোগ ব্যবস্থায় প্রথমে ইউরোপে নতুন দিগন্তের সূচনা হয়। এক সময় তাদের উপনিবেশগুলোতেও রেল ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। তাদের বিশাল উপনিবেশ ভারতেও রেল লাইন বসে। পূর্ববাংলার সাথে কলকাতার রেল যোগাযোগ স্থাপিত হলে সরাসরি জলপথে কলকাতা যাওয়ার প্রয়োজন পড়তো না আর। 

অভাবিত ভাবে নারাণ মিত্তিরের রেলগাড়িতে চড়ার সুযোগ এসে যায় তার বাবা কান্তি মিত্তির পাবনা শহরের রেলি ব্রাদার্সের জুট কোম্পানীতে চাকুরী করার সুবাদে। কান্তি মিত্তির জানকী গুহের একমাত্র সন্তান সুরবালাকে বিয়ে করায় শ্বশুরের অগাধ বিষয় সম্পত্তির মালিক হয়। নারাণ জানে সে বাবার একমাত্র সন্তান হওয়ায় আজামশাইয়ের সব সম্পত্তির মালিক সেই হবে। 

তখন নারাণের বয়স বছর আঠারো মতন হবে আর কী। সে প্রথম বাইসাইকেল দেখে পাবনা শহরে। সে অবাক হয় দুই চাকার অবাক করা যানটি দেখে। তার বাবা পাবনার শ্রীশ্রী অনুকূল ঠাকুরের শিষ্য। তাদের বাসার কাছেই শ্রীশ্রী অনুকূল ঠাকুরের বিশাল আশ্রম। আশ্রমের পাকা রাস্তায় প্রায় তার বয়সী একটা ছেলেকে সাইকেল চালিয়ে তার দিকে আসতে দেখে। নারাণ তার সাইকেলের প্রতি ঔৎসুক্য দেখানোয় ছেলেটি সাইকেল থেকে নেমে বলে, ‘‘তুমি কান্তি কাকু’র ছেলে না?’’ ‘‘হ্যাঁ, আপনি কেমনে চিনতি পারলেন?’ ‘‘তুমি যেদিন এলে সেদিন আমরা তোমাদের বাসায় সৎসঙ্গের অনুষ্ঠান করছিলাম, মনে আছে?’’ ‘‘হ্যাঁ হ্যাঁ, মনে পড়েছে।’’ ‘‘আমি ঋত্বিক ধৃতিমানের ছেলে অনির্বাণ। আমাকে আপনি বলতে হবে না। আচ্ছা, তুমি কি বাইসাইকেল চালাতে পারো?’’ নারাণ তাকে সত্যি কথাটাই বললো, ‘‘পাবনাতে আসেই তো জীবনে প্রথম বাইসাইকেল দেখতি পালাম।’’ অনির্বাণের বাইসাইকেলটা নেড়েচেড়ে দেখে নারাণের মনে সাধ জাগে, এমন একটা বাইসাইকেল কিনতি পারলি কী মজাই না হতো। সে অনির্বাণকে জিজ্ঞাসা করে, ‘‘এটা তো খুব সুন্দর, কোন থিকে কয় টাকায় কিনিছো এটা তুমি?’’ ‘‘কলকাতা থেকে মামা রেলে পার্সেল করে পাঠিয়েছেন। পার্সেলের খরচ দিয়ে ১১ টাকা বারো আনা লেগেছে।’’ অনির্বাণের কথা শুনে নারাণ তাকে জিজ্ঞেস করে,‘‘বাইসাইকেল কিনতি কলকাতা যাতি হবি। পাবনায়...?’’ ‘‘না না, পাবনায় কোথায় পাবে?’’

অনির্বাণের সঙ্গে নারাণ মিত্তিরের ভাব হতে দেরি হয় না। অনির্বাণ মাত্র দু’দিনের মধ্যে নারাণকে বাইসাইকেল চড়া শিখিয়ে দেয়। সেবারের মতন নারাণ পাবনা থেকে বাড়িতে ফিরে আসে। কিন্তু সে বাইসাইকেলের কথা ভুলতে পারে না। সে ভাবে, বাইসাইকেলের কথা কাউকে বলা যাবে না। কলকাতা থেকে ওটা কিনে এনে সবাইকে তাক লাগায়ে দিতি হবি। নারাণ বাড়ি এসে দাদু ও দিদিমাকে বলে,‘‘সুবোধদা কলকেতা যাচ্ছে, আমি তার সঙ্গে কলকেতা যাব কয়েকটা জিনিস কিনতি।’’

দিদিমা বলে,‘‘কী জিনিস কিনতি হবি যা এহানে পাওয়া যায় না?’’

‘‘কোনও কতা না! আমারে টাহা পয়সা যা লাগে দিতি হবে।’’

আদরের একমাত্র নাতির আবদার কোন দিনই দাদু দিদিমা অগ্রাহ্য করেনি। তারা দাবী মেটাতে রাজি হওয়ায় নারাণের মনটা খুশিতে ভরে ওঠে।

তারপর দেশের নদ নদীতে প্রবল বান ডাকে। কুমোর, হানু, গড়োই গাঙের জল খাল বিল বাওড়, মাঠঘাট পেরিয়ে গ্রামের অলিগলি জলাকার হয়ে বাড়ির উঠোন পর্যন্ত ডুবে যায়। সুবোধদা সেবার কলকাতা গেলেও নারাণের যাওয়া হয় না। সে ভাবে, এ অবস্থায় সে বাইসাইকেল চালাবেই বা কোনখানে? দাদু জানকী গুহ জামাই কান্তিকে চিঠি লিখে জানায়, ‘‘বাবা কান্তি, নারাণ দাদুভাই তোর ডাগর হয়ে উঠিছে, আমাগের বড় সাধ হইছে নাতিবউ’র মুখ দেখার, কিত্তি নগরের প্রেল্লাদ ঘোষের একটা সুন্দরী মেয়ে আছে। ঘটকের লগে আমার কতা হইছে। বাবা কান্তি, তুমি যদি রাজি থাকো আমি আর দাদুভাই যায়ে মেয়েটি দেহে আসতে পারি।’’

জামাইয়ের চিঠি আসার আগেই নারাণের বিয়ের উদ্যোগ বাতিল করে দিতে হয় জানকী গুহকে। নারাণ দাদুকে বলে, ‘‘বিয়ের ভাবনা ভাবতি পারছিনে এহন, কলকেতা যাওয়ার ভাবনায় আমি শ্যাষ হয়ে যাচ্ছি, আর তুমি আমার বিয়ের বায়না ধরিছো এহন!’’ শুকনো মৌসুম এলে দাদুদিদিমার কাছ থেকে টাকা পয়সা ভালো মতন নিয়ে সত্যি সত্যি নারাণ তার পিসতুতো দাদা সুবোধের সঙ্গে কলকাতা যায় খোকসা রেল স্টেশন থেকে রেলগাড়িতে চড়ে। দিন সাতেক পরে কলকাতা থেকে অনেক কিছু জিনিসপত্র নিয়ে গড়াই নদীর লাঙ্গলবাঁধ ঘাটে তাদের নৌকা লাগে। নারাণ বাড়ি পৌঁছে দাদুদিদিমার কাছে মালপত্রের ফিরিস্তি দেয়। একটা বাইসাইকেল, একটা পাঁচ ব্যাটারীর টর্চ্ লাইট, বাইসাইকেল মেরামতের যন্ত্রপাতি, কাপড়চোপড় ইত্যাদি ইত্যাদি। নারাণের পিসতুতো ভাই সুবোধের বড় সখ গান বাজনার, তাই সে বড়সাইজের একটা গ্রমোফোন আর হিজ মাস্টার্স ভয়েস কোম্পানীর এক গাদা রেকর্ড কিনে এনেছে। নারাণ আর সুবোধ কলকাতা থেকে বাড়ি ফিরে আসার খবর রাষ্ট্র হতে বেশি দেরি হয় না। পাড়া প্রতিবেশীরা দল বেঁধে কলকাতা থেকে আনা জিনিসপত্র দেখতে আসে। এর মধ্যেই বৃন্দাবন সর্দ্দারের ঘোড়াগাড়ি মালপত্র নিয়ে নারাণের বাড়িতে হাজির হয়। সুবোধ কাছেই ছিলো। সে তার গ্রমোফোনটা গাড়ি থেকে নামিয়ে এক লহমায় রেকর্ড্ চাপিয়ে দম দিয়ে তা চালু করে দিলে সুরেলা কন্ঠে গান বেজে ওঠে...‘‘কদম তলে বংশী বাজায় কেরে সখী, বংশী বাজায় কে----------।’’ গানের সুরে উপস্থিত লোকজন বাহবা দিয়ে ওঠে। সুবোধ বলে ওঠে, ‘‘এ বাদেও কানা কেষ্ট, কমলা ঝড়িয়া’র কেত্তন------’’

নারাণ রেগে উঠে বলে,‘‘রাখ তোর কেত্তন! তোরে পঁই পঁই করে বললাম বাইসাইকেলটা ফিটিং করে নিয়ে যাই, তুই গোঁ ধরলি বাড়ি যায়ে ফিটিং করা যাবে। হায় হায়! আমি কী আনলাম তা সহলকে দেহাবো কেমনে?’’ ‘‘এত ভাবতিছিস ক্যানে? তোর বাইসাইকেলটাকে ফিটিং করে দিলি পারেই তো হলো।’’

সন্ধ্যের পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত নারাণ কলকাতা থেকে আনা পাঁচ ব্যাটারীর টর্চের কেরামতি দেখাতে শুরু করল। গ্রামের লোকেরা টর্চই দেখেনি, পাঁচ ব্যাটারী টর্চ্ তো দূরের কথা। সকালবেলা একজন বলল, ‘‘রাতির বেলা চারদিক হঠাৎ আলোয় দিপ্পকার হয়ে উঠিছিলো, তা কি দেখিছো খুড়ো!’’ গ্রামের সকলের পঞ্চাখুড়ো বলল,‘‘আজ রাতির তিন পহরের দিকি আমাগের তেঁতুলগাছের উপর দিয়ে দীপ্তকার আলো করে একটা পরী গেছে, দেহিছ নাকি কিরণমামা?’’

দু’দিন যেতেই নারাণকে দেখা গেল বাইসাইকেল চালিয়ে এ গ্রাম থেকে ওগ্রামে যেতে। গ্রামের প্রায় লোকই বাইসাইকেল দেখেনি। গ্রামের বউঝি, বাচ্চা কাচ্চা, এমনকি পুরুষ মানুষও নারাণের বাইসাইকেল দেখার জন্য রাস্তায় উন্মুখ হয়ে থাকতে লাগে। নারাণের গ্রামের দাদু, মামারা বাইসাইকেলের নাম দেয় ‘শয়তানের চাকা’। আলো করে পরী যাওয়ার রহস্যও লোকেরা বুঝতে পারে। 

কয়েক মাস গত হওয়ার পর দাদুদিদিমা নারাণকে বলল, ‘‘এবার চল কিত্তিনগরের পরীকে দেখে আসি।’’ নারায়ণ এবার এক কথায় রাজি হয়ে যায়। তারপর যথারীতি আনুষ্ঠানিকতা শেষেকিত্তিনগরের প্রহ্লাদ ঘোষের সুন্দরী মেয়ে লবঙ্গলতার সঙ্গে নারাণের বিয়ে সুসম্পন্ন হলো। লবঙ্গলতাকে দেখে নারাণের মা ও দিদিমা বেজায় খুশি।

বলে রাখা ভালো, নারাণের প্রাণের বন্ধু সহদেব চক্কোবত্তি কিন্তু মেয়ে দেখা থেকে শুরু করে বিয়ের সব কিছু দেখভাল করে। 

তারপর দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর কেটে যায়। এর মধ্যে কত কিছুই ঘটে যায়। কলেরায় দাদু দিদিমা মারা যাওয়ায় নারাণ যেন দুঃখের সাগরে ভাসতে থাকে।

এক সময় নারাণ শোক কাটিয়ে উঠে সংসারধর্মে মন দেয়। এদিকে তার বাবা কান্তি মিত্তির মাসে মাসে মানিঅর্ডার করে টাকা পাঠানোয় নারাণের অভাব অভিযোগ নেই।

নারাণ মিত্তিরদের বাড়ির পাশ দিয়ে বয় হানু গাঙ। হানু গাঙের উত্তর দিকে মজুমদারদের জমিদারী। নারাণদের গ্রাম অন্য জমিদারীর অধীন। জমিদার ভুবনেশ্বর সেনের নিবাস কলকাতা হওয়ায় এ জমিদারী এক রকম অনাড়ম্বরেই কাটে। দুই জমিদারের মধ্যে হৃদ্যতা থাকলেও উভয় জমিদারীর প্রজাদের মাঝে রেশারেশি কিন্তু মাঝে মাঝে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। রেশারেশি করতে নারাণ ও সহদেবও কম যায় না।

নারাণ বলে, ‘‘আমরা হচ্ছি রাঢ় দ্যাশের কুলীন কায়েত, আর সহদেবরাও হচ্ছে রাঢ় দ্যাশের বায়ন। বড়গ্রামের জমিদার ললিত মজুমদাররা হচ্ছে বঙ্গজ কায়েত, জমিদারী পায়ে তারা কয় তারা নাকি আমাগেরে থিকে দামী কয়েত! তাগেরে কাজ কাম দেহে তো মনে হয় না দামী কায়েত। আমোগের দ্যাশেতো ওগেরে ছাওয়াল ম্যিয়ার বিয়েথ্য হতি দেহিনে। তোরা যদি দামী কায়েতই হবি তোগেরে বাড়িতি দামী জিনিসপাতি ভরা থাকতো না! আমার দেহতো কী কী নেই!’’

নারাণ মিত্তিরের এই সব তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করা কথাবার্তা মজুমদারবাবুর বরকন্দাজ নগা ভূইমালির কানে গেলে সে নারাণ মিত্তিরকে একহাত দেখে নিতে ইচ্ছে করে। বাবু’র অনুমতি ছাড়া সে কোনও কাজ করে না, তাই নিশ্চুপ থকে। তবে নারাণ পালের বলা তুচ্ছ তাচ্ছিল্যের কথায় রঙচঙ মাখিয়ে কর্তামাকে বলে নগা ভূইমালি, যদিও জানে তার কাছে বলে কোন কাজ হবে না, কারণ কর্তামা মাটির মানুষ। 

দুর্গাপূজায় বড়গ্রামের জমিদার বাড়িতে প্রতি বছরেই যাত্রাগান হয়। ছেলেরাই মেয়ে সাজে। নগা ভূইমালি গানের ভাল মাস্টার। মজুমদার জমিদারীর ছোটকর্তা অঘোরবাবু কলকাতা থেকে নগাকে খবর পাঠায় যে এবার যাত্রগানের বদলে থিয়েটার হবে। মিস্ত্রি পাড়ার নকুলদা প্রায় প্রায়ই কলকাতায় আসে, আর সে কলকাতার থিয়েটার পাড়ায় উইংস ফিটিং, সিনসিনারী ঠিকঠাক করে। নকুলদার সঙ্গে যোগাযোগ করে ছোটকর্তা থিয়েটারের সবকিছুর সঙ্গে ‘বঙ্গে বর্গী’ বইখানা পাঠিয়ে দেয়। ছোটকর্তার নির্দেশ অনুযায়ী যথারীতি থিয়েটারের রিহার্সাল শুরু হয় মজুমদার বাড়ির চণ্ডীমণ্ডপে। 

এ খবর যথাসময়ে নারাণ মিত্তিরদের শিবিরেও পৌঁছয়। সহদেব চক্কবোত্তিরা তাদের জমিদারের দিঘির ঘাটে সন্ধ্যের পর রোজই একত্রিত হয়। দিঘির পাড়েই কয়েক ঘর পাটনীর বসবাস। পাটনীদের মধ্যে সুধীর মাতব্বরী করে থাকে। গান বাজনা ভালবাসে। পুজোয় তারাও নিজেরাই যাত্রাগান করে। সরমা বইতে সহদেব রাম সাজে, আর নারাণ সাজে সীতা। আর সুধীর সাজে রাবণ। সুধীর বড়গ্রামের থিয়েটারের কথা পাড়ে। ‘‘কাল রাতি থেটারের রিহার্সল দেখতি যায়ে দেখালাম ও তো যাত্রাগানের নাহালই।’’ এর মধ্যে নারাণ মিত্তির এসে হাজির হয়। সুধীরের শেষ কথাটা তার কানে গেলে সে বলে, ‘‘না গো সুধীর মামা, থেয়েটার আর যাত্রা এক রহম না।’’‘‘তাহলি পারে সুবোধমামার লগে কলকেতা গিয়ে থেয়েটার দেখিছ মনে হয় ভাগনে।’’ ‘‘না, দেহার ইচ্ছে ছ্যাল, কিন্তুক, সুবোধদার জন্যি দেহা হয়নি।’’ সহদেব নারাণের কথা শুনে কয়, ‘‘সহালে ওদের ওহানে গিছিলাম, বড় খোলাটে স্টেজ না কী বলে বানাচ্ছিল। তিনদিকি বন্ধ, আর একদিকি খোলা। অমূল্য মিস্তিরি বললো যে আজ রাতি ফাইনাল রিহার্সেল হবে।’’ অমূল্য মিস্তিরির সঙ্গে সহদেবে ভালই দহরমমহরম আছে, কথা হয়তো ঠিকই, সবাই ভাবলো। সহদেবই কথা পাড়লো, ‘‘আমরা তাহলি পারে সবাই মিলে সন্ধ্যের পর ফাইনাল রিহার্সেল দেখতি যাবানে, কেমন?’’নারাণ সহদেবের কথায় সম্মতি দেওয়ায় সবাই খুশি হয়। 

পরদিন সন্ধ্যের পরে আগের সন্ধ্যের কথা মতন তারা সবাই বড়গ্রামের মজুমদার বাড়িতে ফাইনাল রিহার্সাল দেখতে হাজির হয়। ছোটকর্তাকে সব কিছু তদারকি করতে দেখা যায়। তখনো ফাইনাল রিহার্সাল শুরু হয়নি। সহদেব চারদিকে উঁকিঝুঁকি দিয়ে এসে নারাণকে বললো, ‘‘স্টেজের সাথে লাগোয়া পেছনদিকির ঘরটাতে সাজগোছ করতিছে। নেপলা হয়তো নায়কা সাজবে। নায়কার মতো সাজেগুছে চেয়ারে বসে আছে দিখতি পালাম। অমূল্য এখনো সাজেনি, তবে সাজবে বলে মনে হলো।’’

হঠাৎ করেই অমূল্য বাইরে আসায় সহদেব ও নারাণ তার নজরে আসে। অমূল্য বলে, ‘‘এখানে দাঁড়িয়ে ক্যানে, গ্রীণরুমের ভেতরে এসো।’’ সহদেব ও নারাণের সঙ্গে সঙ্গে সুধীরও ভেতরে ঢুকে পড়ে। নগা ভূইমালি তাদেরকে আদর করেই বসালো। তারা সাজগোছ দেখে মজা পাচ্ছিল। কেথা থেকে ছোটকর্তার পেয়ারের লোক নকুল সেখানে এসে অন্য গ্রামের নারাণ, সহদেব, আর সুধীরকে দেখে রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে বলে ওঠে, ‘‘গ্রীণরুমে আউট লোক ক্যানে!’’ 

নকুলের এ কথা শুনে নারাণের আঁতে ঘা লাগে, সে ওখান থেকে সহদেব ও সুধীরকে সঙ্গে করে বের হয়ে এসে বলে, ‘‘আমার গ্রামের লোকজন যারা আছো আমার লগে চলে এসো, কাল থিকে আমার বাড়িতি থেয়েটারের রিহার্সেল হবে।’’ 

সত্যি সত্যি পরদিন থেকে নারাণ মিত্তিরের বাড়িতে থিয়েটারের রিহার্সেল শুরু হয়। কিন্তু সে আর এক গল্প...


0 comments: