0

ছোটগল্প: মমতা দাস (ভট্টাচার্য )

Posted in


ছোটগল্প

বই মেলা 
মমতা দাস (ভট্টাচার্য )



এবারের বই মেলায় যাবে না তন্দ্রা। গতবার যা নাকাল হয়েছে , ওপথে হাঁটার ইচ্ছে আর নেই। গতবারের কথা ভেবে এক সঙ্গে আনন্দ বিষাদে ভরে গেল মন, ওই বই মেলাতেই তো, না আগের কথা আগে- বিপুলের জোরাজুরিতে জ্বর গায়ে-ও বই মেলায় গেল তন্দ্রা গতবার। মা খুব রাগ করছিল শরীর খারাপ নিয়ে মেলায় যাচ্ছে বলে। কিন্তু বিপুল ডাকলে না গিয়ে কি পারে তন্দ্রা ? আর জেদী একরোখা বিপুল তো কারো কথা শোনার পাত্র-ই নয়। তার ভালবাসা নাকি এমন-ই, দুর্দম, দুরন্ত - তাই বিশ্বাস করত তন্দ্রা-ও ! সেই ছোট্টবেলার থেকে খেলার সাথী যখন প্রেমিক হয়, তার একটা বিপুল জোর তো থাকেই ! বিপুলের-ও ছিল। তন্দ্রা একেবারে বশংবদের মত বিপুলের সব কথা শুনত। এতে যে তার মনুষ্যত্ত্বের অপমান, তার নারীত্বের, তার স্বাতন্ত্রের অপমান, বুঝত না সে। প্রেমে অন্ধ ছিল একেবারে। বিপুল ছাড়া এই বিপুল সংসারে আর কাউকে জানত না সে। সেই বিপুল যখন, বই মেলাই তো কাল হলো তার ! মার কথা শুনে না যদি যেত সেদিন, একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ে তার ! এই তো হওয়ার ছিল, গুরুজনদের কথা না শুনলে এমন-ই হয়। মা অবশ্য মানেনা সেটা, বলে, 'বিপুলটা তো প্রথম থেকেই স্বার্থপর, তোকে চাকরের মত খাটায় ! আর তুই-ও বাবা, কি যে দেখলি ! ওর চেয়ে ভালো ছেলে কি নেই সংসারে ? মা তার কথা বলে, কিন্তু বই মেলাই তো দায়ী ...

বেশ মজা করে ঘুরছিল ওরা বই মেলায়। ষ্টল গুলোতে কত সুন্দর সুন্দর বই, যেমন তাদের রূপ, তেমনি তাদের বিষয় বৈচিত্র ! আর নতুন বই-এর গন্ধ ! আহা ! খুউব ভালো লাগছিল তন্দ্রার, নতুন বই-এর জগৎ, সঙ্গে বিপুল, দুটোই তার অতি প্রিয়, কাজেই… কিন্তু বিধি বাম, ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ ....'এই দাঁড়াও দাঁড়াও' বিপুলের উত্তেজিত স্বর। কেনরে বাবা, এখানে তো কোনো স্টল নেই ! উত্তেজিত বিপুল আবার বলে, 'দেখেছ, মোনালিসা রায় এখানে আছে, ওই স্টলে'...ও, এই ব্যাপার, মোনালিসা রায় বিপুলের প্রিয় কবি। অতি আধুনিক তার লেখার স্টাইল, দেখতেও সুন্দরী,.....তরুণ আর যুবকরা নাকি পাগল তার জন্য। বিপুলের কাছেই শোনা। সেই মোনালিসা আজ বই মেলার বিশেষ একটি স্টলের মূল আকর্ষন। বিপুলকে আর পায় কে ? জোর করে তন্দ্রাকে টেনে নিয়ে যায় সেই স্টলে। ঠিক, স্টলের মধ্যিখানে অধিষ্ঠিতা মোনালিসা, আর তাঁকে ঘিরে স্তাবকদের, ভক্তদের ভীড় । বিপুল-ও মুহূর্তে মিশে গেলো সেই দলে। কি হ্যাংলাপনা ছেলেগুলোর, দেখে গা জ্বলে গেল একেবারে। এমন কিছু সুন্দরী নয় মোনালিসা, কিন্তু আলগা চটক আছে, সাজতে জানে, আর আছে লাস্য, অপরিসীম। দাঁড়িয়ে দেখতে থাকে তন্দ্রা ছেলেগুলোর পাগলামি। বিপুল ওই ভীড়ে কোথায় যে হারিয়ে যায় পাত্তা পায় না সে। কি যে একটা বিদঘুটে ব্যাপার হতে থাকে, ঠেলাঠেলি, ধাক্কা-ধাক্কি। অবাক হয়ে দেখতে থাকে তন্দ্রা । হঠাৎ দেখে ধাক্কার ভয়ে সরতে সরতে সে স্টলের বাইরে, বিপুল কোথাও নেই। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে একাই ফিরে আসে তন্দ্রা, জ্বরটাও বেড়েছে ততক্ষণে। কোনরকমে বাড়ি পৌঁছে বেহুঁশের মত শুয়ে পড়ে সে, আর কিছু জানে না। চারদিন পর চোখ খুলেই বিপুলের কথা মনে পড়ে ওর। না, আসে নি বিপুল। সেদিনের পর আর আসে নি। মা বলল ফোন-ও করে নি। 

সেই শেষ, আর কোনদিন আসে নি বিপুল। লোকমুখে শোনা যায় বিপুল এখন মোনালিসার ব্যক্তিগত তল্পিবাহক। সব জায়গায় তার সঙ্গী বিপুল। কাগজে ছবি বেরোয় হাসিমুখে আগে মোনালিসা, পিছনে সঙ্কুচিত বিপুল। হাতে মোনালিসার ব্যাগ,বইপত্র। T V -তেও দেখা যায় আগে-পিছে এদের দুজনকে। আজকাল আর কাগজ পড়ে না তন্দ্রা, টিভি-ও দেখেনা। যে বিপুল হঠাৎ হারিয়ে গেছে তার জীবন থেকে, তার ছবি দেখার কোনো বাসনা তার নেই ! আবার লেখাপড়ায় মন দিয়েছে তন্দ্রা। PhD -তে নাম লিখিয়েছে সে। গল্পের বই পড়ার সময় কই ? আর যে বই মেলায় এক বছর আগে হারিয়ে গেল তার সব, সেই বই মেলায়-ও আর যাবে না, ঠিক করেছে সে। বুঝেছে বই মেলা শুধু আনন্দ দেয় না, আনন্দ কেড়েও নেয় !

0 comments: