0

প্রবন্ধ - সুরঞ্জন রায়

Posted in


ফেলিনির ‘লা দোলচে ভিতা’-য় দান্তের ছায়া


দান্তের ‘কম্মেদিয়া’ পড়তে পড়তে মনে হয়, এ যেন সিনেমার দিকে পা বাড়ানোর এক প্রস্তুতি। রাজনীতির হলাহলে আক্রান্ত কবি ‘ইনফেরনো’-তে প্রবেশ করে দেখলেন, মৃত মানুষেরা জীবিতের মতো ব্যবহার করছে— ছায়াছবির এও এক রীতি। মনে পড়ে যায় অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহের কথাও। চক্রে চক্রে এগিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা বর্ণিত হয় মন্তাজের ঢঙেই। অনুসৃত হয় ফ্ল্যাশব্যাকের রীতিও। কিন্তু কী ভাবে ঘটল এই জটিল ‘টেকনিক’-এর উদ্ভাসন? মনে রাখতে হবে, দান্তের সময়টা ছিল সামন্ত সমাজের ভাঙনের সময়। সনাতন মূল্যবোধ ভেঙে পড়লেও তখনও গড়ে ওঠেনি কোনও নতুন মূল্যবোধ। কৃষিসমাজের প্রাধান্য সরে গিয়ে গড়ে উঠছিল অভিজাত শ্রেণির আধিপত্য। প্রেমের আকাশে জ্বলে উঠল প্রজ্ঞার আলো:

এমনকি এও হয়তো বলা যায় যে এ দুয়ের সংঘর্ষ ও সমন্বয়ের ওপরই নির্ভর করছিল মধ্যবর্তী স্তরটির অস্তিত্ব, যে স্তর প্রায়ই অতিক্রম করে যাই আমরা। দান্তেকে প্রথমেই মীমাংসা করে নিতে হয়েছিল এই সমস্যার। Francis অথবা Dominic. প্রেমের তাপ নাকি প্রজ্ঞার প্রভা— শেষ পর্যন্ত প্রাধান্য কার? মধ্যযুগের এই প্রশ্নের যে উত্তর আছে দান্তের মধ্যে, তা এ দুয়ের সমবায়ে জাত। তাই তাঁর নিবিড়তম প্রতীক হয় সূর্য, যার মধ্যে পরিপূরক ভাবে রয়ে গেছে আলো আর উত্তাপ, সমানভাবে যা প্রকীর্ণ হয়ে যায় সবার উপর।১

এই প্রবন্ধে শঙ্খ ঘোষ আলো ফেলেছেন দান্তে ও জীবনানন্দের আত্মীয়তার নিবিড় দিকটির ওপর।

দান্তের পর কয়েকশো বছর পেরিয়ে আমরা এসে পৌঁছেছি এমন এক পৃথিবীতে যেখানে মারণাস্ত্র হাতে নিয়ে অল্প কিছু মানুষ নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাঁটোয়ারা করে নিতে চাইছে গোটা দুনিয়াটাকে। ঔপনিবেশিক যুদ্ধে যুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত মানুষ আজ দেখতে পাচ্ছে প্রেম ও প্রজ্ঞা হারিয়ে তার ভুবন লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে দুঃস্বপ্নের অতলে— কানে এসে বাজছে শত শত শূকরীর প্রসব বেদনা।

‘হলোনেস’ বা শূন্যতার এই বোধ আজকের যে কোনও সংবেদনশীল মানুষকেই ক্লিষ্ট করে। আধুনিক শিল্পীদের সৃষ্টিতেই ধরা পড়েছে যার জয়োদ্ধত অমঙ্গলের চেহারাটা। আমরা কিন্তু সঙ্গীত-উপন্যাস-নাটক-চিত্রশিল্পকে ছেড়ে আমাদের দৃষ্টিকে নিবদ্ধ রাখতে চাই কবিতা এবং চলচ্চিত্র শিল্পের দিকেই। বোদলেয়ার, মনতালে, অ্যালুয়ার, এলিয়ট বা ইয়েটসদের কবিতার গঠন-বিন্যাসকে বিশ্লেষণ করলেই বেরিয়ে আসে আজকের মানুষের শিথিলমূল চেহারাটা। আজকের অমঙ্গলতাড়িত এই সমাজটার ছবি আঁকতে গিয়ে কোনও কোনও কবি অনেক সময়ই গ্রহণ করেছেন চলচ্চিত্রের গঠনরীতি। উল্টো দিকে সিনেমাও অনেক সময় কবিতার ঘনিষ্ঠ হতে হতেই হয়ে উঠেছে একটা কবিতাই। চলচ্চিত্রের সাঙ্গীতিক কাঠামো ক্রমেই সরে আসতে চেয়েছে কাব্যিক কাঠামোর দিকে। প্রজ্ঞা ও প্রেমের আলো জ্বলে উঠতেই সিনেমা এগিয়েছে কবিতার দিকে।

চলচ্চিত্রকার ফেদেরিকো ফেলিনি সিনেমার সঙ্গে কবিতার সম্পর্ক নিয়ে ভাবতে গিয়ে বললেন, ‘আজকাল চলচ্চিত্র পেরিয়ে এসেছে গদ্যের বাচনভঙ্গি এবং সরতে সরতে সে চলে এসেছে কবিতার খুব কাছাকাছি। আমি আমার কাজকে নানা সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি, সংকীর্ণতা বলে আমি বোঝাতে চাইছি একটি গল্পের শুরু, বিকাশ ও তার পরিসমাপ্তির গণ্ডিটাকেই। এখন ছবিকে এগিয়ে আসতে হবে ছন্দ-অলংকারে ভূষিত হয়েই।’২

ফেলিনির ‘লা দোলচে ভিতা’ বা মধুর জীবন মুক্তি পায় ১৯৫৯ সালে। ‘ইওরোপিয়ান ইকনমিক কমিউনিটি’-র সদস্যপদ গ্রহণ করে ইতালির অর্থনীতিতে তখন ‘মির‌্যাক‌ল’ ঘটতে শুরু করেছে। কিন্তু মানুষের চূড়ান্ত অবক্ষয়ের, তার আত্মিক বিপর্যয়ের চেহারাটা সংবেদনশীল শিল্পীদের কাছে গোপন থাকেনি। এই মর্মান্তিক অমঙ্গলের ছবিটাকেই আমরা প্রত্যক্ষ করলাম ‘মধুর জীবন’-এ। নামের মধ্যে প্রচ্ছন্ন ছিল যে বিদ্রুপ, প্রথম দৃশ্যেই তা হয়ে উঠেছে উচ্চকিত।

আধুনিক রোম নগরী। পরিত্রাতা যিশুর বিশাল মূর্তিকে স্থানান্তরিত করা হচ্ছে। সূর্য তখন মাঝ আকাশে। রোমান ধ্বংসাবশেষের মাথায় ছায়া ফেলে হেলিকপ্টারের সঙ্গে দড়ি দিয়ে ঝুলিয়ে ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে যিশুকে। দরিদ্র বালকরা বিস্মিত, ঊর্ধ্বমুখ, ছুটে চলে পেছন পেছন। সাউন্ডট্র্যাকে কপ্টারের অবিরাম কটকট আওয়াজ। আকাশছোঁয়া অট্টালিকার মাথায় সূর্যস্নাতা অর্ধনগ্না রমণীদের ছুঁয়ে যায় যিশুর ছায়া— কী অসম্ভব অভিঘাত! বিদ্রুপের কশাঘাতে বোধহয় কেঁপে ওঠে আধুনিক নাগরিক সভ্যতারই অন্তরাত্মা!

আধুনিক সমাজ পণ্যশাসিত সমাজ। এখানে নিভে গেছে প্রেম, নিভে গেছে প্রজ্ঞা। ‘ক্যাকোফনি’-তে আক্রান্ত শহর— চারিদিক থেকে ভেসে আসছে শত শত শূকরীর প্রসববেদনা। ফেলিনির ছবির সূচনাদৃশ্য দেখতে দেখতে আমাদের মনে পড়ে যায় এলিয়টের ‘দ্য লাভ সং অব জে আলফ্রেড প্রুফক’-এর কথা:

Let us go then, you and I,
When the evening is spread out against the sky
Like a patient etherised upon a table...

প্রেতলোকের চক্রের পর চক্র পেরিয়ে আসার অভিজ্ঞতাকে মাথায় রেখেই শিল্পী ফেলিনি গড়ে তুলেছেন তাঁর চিত্রনাট্যের শরীর। এক দিন দিগ্‌ভ্রান্ত দান্তে আপন প্রেমের বিভায় খুঁজে পেয়েছিলেন পথপ্রদর্শক ভার্জিলকে। ফেলিনি কিন্তু মহাকবির পথ অনুসরণ করলেও প্রেমহীন নায়ক মার্সেল্লোকে করেছেন নিরালম্ব, নিঃসহায়। মার্সেল্লোর সঙ্গে সঙ্গে আমাদেরও যাত্রা শুরু হয় প্রেতলোকের পথে। দান্তের মতো আমরাও শিউরে উঠি,

এত দীর্ঘ জনস্রোত দেখে মনে হয়
মৃত্যু যে অসংখ্য প্রাণ বিলুপ্ত করেছে
সে কথা বিশ্বাস করা সংগত হয়নি।৩

মনুষ্যত্বের এই মৃত্যু দেখতে দেখতে আমরা পৌঁছে যাই এক চক্র থেকে আর এক চক্রে, পাল্টে যায় দৃশ্যপট। ইট-কাঠ-কংক্রিটে অবরুদ্ধ মানুষের জীবনে যেহেতু নিভে গেছে প্রেম, তাই পুরুষশাসিত সমাজে নারী আজ আর তার কাছে সম্পত্তি নয়, পুরুষের কাছে সে আজ হয়ে উঠেছে পণ্য। আধুনিক নাগরিক মানুষের ধ্বস্ত যাপনের ছবি দেখতে দেখতে ক্রমশ জেগে ওঠে এক বোধ,

পৃথিবী ভঙ্গুর হয়ে নীচে রক্তে নিভে যেতে চায়;
পৃথিবী প্রতিভা হয়ে আকাশের মতো এক শুভ্রতায় নেমে
নিজেকে মেলাতে গিয়ে বেবিলন লন্ডন
দিল্লী কলকাতার নকটার্নে
অভিভূত হয়ে গেলে মানুষের উত্তরণ
জীবনের মাঝপথে থেমে
মহান তৃতীয় অঙ্কে: গর্ভাঙ্কে তবুও লুপ্ত
হয়ে যাবে না কি।

যদিও ‘আবহমান ইতিহাসচেতনা একটি পাখির মতো যেন’, এই কথা ভেবেও কিন্তু—

সূর্যে আরো নব সূর্যে দীপ্ত হয়ে প্রাণ

দাও— প্রাণ দাও পাখি’ বলে শেষ প্রার্থনাটুকু জানাবার মতো শক্তিও আমরা আজ হারিয়ে বসে আছি।

লং শট থেকে কাট করে ক্যামেরা চলে আসে মিড লং শটে। একটি অভিজাত রেস্তোরাঁর অভ্যন্তর। মুখোশ-পরা নৃত্যরত নর্তকদের ওপর থেকে ক্যামেরা ঘুরে চলে আসে মার্সেল্লোর ওপর। ক্যামেরা ছুঁয়ে যেতে থাকে অপচয়ের আয়োজনে ব্যস্ত দামি মানুষদের মুখ। ফেলিনি কি এখানে মার্সেল্লোর মুখোশ খুলে দেখাতে চাইছেন তার মুখকে, না কি আমাদের মতো অপচয়ের স্রোতে ভাসা নাগরিকদের অনাবৃত করে মেলে ধরার জন্যেই এই আয়োজন?

মার্সেল্লোর সঙ্গে দেখা হয়ে যায় বৈভবে লালিত সুন্দরী ম্যাগদালেনার। ধ্বস্ত যাপনের চেহারা ক্রমে স্পষ্ট হয়ে ওঠে বিপ্রলব্ধা নায়িকার আচরণে। যৌন কামনায় অধীর হয়ে দুজনে মোটরে চড়ে কোথাও উধাও হয়ে যায়:

At the violet hour, when the eyes and back
Turn upward from the desk, when the human engine waits
Like a taxi throbbing waiting...

এই ‘ভায়োলেট আওয়ার’-এ এক বারাঙ্গনার ঘরে অতিবাস্তব পরিসর খুঁজে ‘লাভ মেকিং’ সেরে বেরিয়ে আসে চতুর নাগর-নাগরী। মনে পড়ে যায় জীবনানন্দের ‘মহিলা’ কবিতাটির কথা—

না ভেবে মানুষ কাজ করে যায় শুধু
ভয়াবহভাবে অনায়াসে।
কখনো সম্রাট শনি শেয়াল ও ভাঁড়
সে-নারীর রাং দেখে হো-হো করে হাসে।

মন্তাজের ঢঙে ফেলিনি একের পর এক দৃশ্যে ভাসিয়ে নিয়ে চলেন আমাদের। হেলিকপ্টারের বদলে এবার চলে আসে এরোপ্লেন, পরিত্রাতা যিশুর জায়গা দখল করে নেয় ‘সেক্স বুম’ হলিউড স্টার সিলভিয়া। ফেলিনি তাঁর বিশিষ্ট ভঙ্গিতেই চরিত্রদের স্থাপন করেন কত-না বিভিন্ন লোকেশনে— মেলে ধরেন তাদের অন্তর্নিহিত মাত্রাগুলোকে। রোমকে জানতে যাজকের পোশাকে সিলভিয়া দ্রুত এসে পৌঁছয় সেন্ট পিটারের গির্জায়— প্রথম দৃশ্যের বিদ্রুপের ছায়াপাত ঘটে এখানেও। ‘সেক্স গডেস’কে যাজকের পোশাকে এনে আমাদের আত্মিক দীনতাকেই ফুটিয়ে তোলেন শিল্পী।

আধুনিক হৃদয়হীন সমাজ জীবনানন্দকে ক্লান্ত করেছে। হালভাঙা নাবিকের মতোই তিনি অন্বেষণ করেছেন প্রেমের একটু আলো, জ্ঞানের একটু উত্তাপ। স্বপ্ন দেখেছেন সজীব সুগন্ধময় আশ্রয়ের নিবিড় এক আশ্বাস— যান্ত্রিকতাময় বাস্তবে যা খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। কল্পনার রাজ্যে পৌঁছে ইতিহাসচারণা তাই হয়ে ওঠে অনিবার্য। দান্তের লেডি ফিলসফির মতোই কবির কাব্যলক্ষ্মী বনলতা সেন, বতিচেল্লির ভেনাসের মতোই সে কবির চরম চাওয়ার পরম পাওয়া। আর তাই জীবনানন্দের ঘোষণা— সাময়িকতার সংস্কারমুক্ত করে সময়ব্রহ্মের শুদ্ধ স্বরূপের মধ্যে কবি নিয়ে যান তাঁর কবিতা, কিন্তু সে-কবিতার অস্থির ভিতরে থাকবে ইতিহাসচেতনা ও মর্মে থাকবে পরিচ্ছন্ন কালজ্ঞান।

প্রেতলোক পেরিয়ে এসেছেন দান্তে, শুদ্ধিলোকও অতিক্রান্ত প্রায়। ভোরের নরম আলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে এগিয়ে চলেছেন তিনি। নন্দনকাননের সৌরভে ভরে আছে চারিদিক। স্বর্গীয় আশ্বাসের এক স্বপ্ন বুকে নিয়ে গাছগাছালির মধ্যে আনমনে ঘুরতে ঘুরতে দেখতে পেলেন পবিত্র এক জলধারা। হঠাৎ থমকে যায় চোখ, পা চলে না আর— নদীর অপর পারে গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে ফুল তুলছেন অপূর্ব সুন্দরী এক নারী। হতবিহ্বল দান্তের ডাকে সাড়া দিলেন নম্র মাধুর্যে পরিপূর্ণ মাতিল্দা। জানালেন, এটাই নন্দনকানন— গার্ডেন অব ইডেন। পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে লেথে নদী, যার জল পান করলে অন্তর্হিত হয় সব পাপবোধ। বিভিন্ন লোকেশনকে ছবিতে ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও ফেলিনির অন-লোকেশন শুটিংয়ে অনীহা গোটা রোমকেই তুলে আনে স্টুডিয়োর অভ্যন্তরে— শিশুর উত্তেজনায় সৃষ্টি করেন ‘নিজের’ রোম। আর সেখানে প্রমত্ত ঝড়ের মতোই সিলভিয়া মার্সেল্লোকে ছুটিয়ে নিয়ে চলে এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্তে। ‘প্যাট্রিসিয়া’ সুরের তালে তালে শুরু হয় যুগল নৃত্য। সমস্ত নারীর অধরা মাধুরী নিয়ে গড়ে তোলা সিলভিয়াকে মনে হয় প্রকৃতির আদি সৃষ্টি, উর্বশীর বক্ষলগ্ন হয়েও তাই মার্সেল্লো আত্মহারা! আসলে ফেলিনি শিশুর বিস্ময়ে দেখেন জীবনকে, দেখেন নারীকেও— সিলভিয়া তাই দেহের ডাকে যতটা না মেতে ওঠে, তার চেয়েও বেশি মেতে ওঠে বেড়ালছানা নিয়ে খেলতে খেলতে।

ট্রেভি ফাউন্টেনে চলে আসে তারা। সিক্তা সিলভিয়া কামনামদির করে তোলে মার্সেল্লোকে। দেবীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে নিবিড় হতে এগিয়ে গেলে হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে যায় ঝরনা। চকিতে মনে ভেসে আসে জীবনানন্দ দাশের ‘সুদর্শনা’ কবিতাটি,

একদিন ম্লান হেসে আমি
তোমার মতন এক মহিলার কাছে
যুগের সঞ্চিত পণ্যে লীন হতে গিয়ে
অগ্নিপরিধির মাঝে সহসা দাঁড়িয়ে
শুনেছি কিন্নরকণ্ঠ দেবদারু গাছে,
দেখেছি অমৃতসূর্য আছে।

সবচেয়ে আকাশ নক্ষত্র ঘাস চন্দ্রমল্লিকার
রাত্রি ভালো,
তবুও সময় স্থির নয়,
আরেক গভীরতর শেষ রূপ চেয়ে
দেখেছে সে তোমার বলয়।
এই পৃথিবীর ভালো পরিচিত রোদের মতন
তোমার শরীর, তুমি দান কর নি তো,
সুদর্শনা, তুমি আজ মৃত।

মনে পড়ে যায় শুদ্ধিলোকের অষ্টবিংশ সর্গের কথা। ফেলিনি সচেতন ভাবেই মাতিল্দার কথা মাথায় রেখে গড়ে তুলেছেন সিলভিয়া পর্ব। মাতিল্দা-সুদর্শনা-সিলভিয়াদের দেখে যাত্রী দান্তে, কবি জীবনানন্দ বা সাংবাদিক মার্সেল্লোর মনে জ্বলেছে কামনার আগুন। অতি সূক্ষ্মভাবে কবি দান্তে এর বিচার করেছেন— যার আলো ব্যাপ্ত হয়েছে জীবনানন্দ ও ফেলিনির সৃষ্টিতে। পুরাকালে যে পবিত্রতা অটুট ছিল আদমের স্বর্গভ্রষ্ট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তা বিনষ্ট হয়ে যায়, এখন আর তাকে ফিরে পাওয়া বা নষ্ট করা সম্ভব নয়— ‘সুদর্শনা, তুমি আজ মৃত’। অর্থাৎ, মাতিল্দা-সুদর্শনা-সিলভিয়ারা আদিম পবিত্রতার এক-একটি ফিগার মাত্র— একে পাওয়া যেমন সম্ভব নয়, একে নষ্ট করাও তেমনি সম্ভব নয়। তাই তো ছবিতে দেখি সিলভিয়াকে ভোগ করতে চেয়ে মার্সেল্লো যখন ম্যাগদালেনার কাছে একটু পরিসর খোঁজে, তখন তাকে ব্যর্থ হয়েই ফিরে আসতে হয়।

‘কম্মেদিয়া’য় মাতিল্দা দান্তেকে পান করিয়েছে অমল নদীর জল, ছবিতে কিন্তু কামনা-কাতর মার্সেল্লো ট্রেভি ফাউন্টেনে নেমে সিলভিয়াকে জড়িয়ে ধরতেই স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে জল পড়া। মাতিল্দা ক্লাসিক্যাল তাই মঙ্গলময়ী, মাতিল্দার অনাবিল সরল জীবন থেকে সরে এসে অর্বাচীন সিলভিয়া এসে পৌঁছেছে এক জটিল সময়ে, সব রকম স্থূলতাই যার যুগলক্ষণ— গলার স্বরে মাধুর্যের অভাব এনে ফেলিনি জোর দিয়েছেন সেই ভাবনাতেই।

জীবনের মহা অপচয়ের মধ্যে ভাসতে থাকে আধুনিক মানুষ। জে আলফ্রেড প্রুফকের মতোই নিউরোটিক প্রেমের গ্লানি বয়ে ক্যাস্‌ল দৃশ্য পেরিয়ে অন্তিম অঙ্কে পৌঁছে যায় মার্সেল্লো। এবার নাদিরার ঘরে শুরু হয়ে যায় রিরংসার মত্ততা— বীভৎস যাপনার মধ্য দিয়ে ক্রমে ফুটে ওঠে চূড়ান্ত ব্যভিচারের কদর্য চেহারাটা। ভোরের আলো ফুটতেই দেহটাকে একটু গুছিয়ে নেওয়ার জন্য ওরা ছুটে চলে আসে সমুদ্রতটে। সমুদ্রের সাদা ফেনার মতোই মার্সেল্লোর পরনে তখন সাদা ট্রাউজার্স আর সাদা কোট অগোছালো:

I shall wear white flannnel trousers, and walk upon the beach,
I have heard the mermaids singing, each to each.
I do not think that they will sing to me.

I have seen them riding seaward on the waves
Combing the white hair of the waves blown back.
When the wind blows the water white and black.

We have lingered in the chambers of the sea
By sea-girls wreathed with seaweed red and brown
Till human voices wakes us, and we drown.৪

শুভ্র পোশাকেও ঢাকা পড়ে না মার্সেল্লোর অশুভ যাপনা। সমুদ্রতটে তাই পড়ে থাকতে দেখি অমঙ্গলের প্রতীক এক দানবাকৃতি মাছকে। অমঙ্গলকে প্রতিস্থাপিত করতে এগিয়ে আসে পাওলা— কিন্তু ‘মারমেড’-এর সঙ্গীত প্রবেশ করে না মার্সেল্লোর কানে। আমরা বুঝতে পারি, অপচয়ের অতলে তলিয়ে যাওয়ার অনিবার্য ঝোঁকেই আমরা আজ আমাদের জীবন থেকে নির্বাসন দিয়েছি সুন্দরকে, মঙ্গলকে!



তথ্যসূত্র

১. শঙ্খ ঘোষ, ‘ঐতিহ্যের বিস্তার’, ‘চণ্ডিদাস না দান্তে’
২. An interview with G. Bachmann in Cinema 65, No. 99
৩. Inferno III. 52-57
৪. Quoted by Lilian Rossin, The New Yorker, Oct 30, 1965, p 66

0 comments: