0

প্রচ্ছদ নিবন্ধ - চয়ন সমাদ্দার

Posted in


প্রচ্ছদ নিবন্ধ


বিবেকানন্দ – ফুল প্যাকেজ 
চয়ন সমাদ্দার



‘I could not find the exact orange colour of my coat here, so I have been obliged to satisfy myself with the next best – a cardinal red with more of yellow.’

ওপরের ইংরিজি লাইন দু’টো, একটা চিঠি থেকে নেওয়া। ১লা মে, ১৮৯৪তে নিউ ইয়র্ক থেকে লেখা হয়েছিল চিঠিটা। একত্রিশ বছরের এক ফ্যাশনেবল্‌ বাঙালি যুবক, আমেরিকার ফ্যাশন স্টোরে নিজের পছন্দের রঙের কোট পাচ্ছেন না। কমলা রঙ না পেয়ে লাল রঙের কোট কিনছেন। চিঠিটায় আরও লেখা আছে যে, মীরশ্যাম পাইপ কিনে তিনি ছেলেমানুষের মতো খুশি। মানুষটির নাম স্বামী বিবেকানন্দ। 



নরেন্দ্রনাথ দত্ত যে সময়ের মানুষ, সে সময় বাঙালি মোগলাই পোশাক ছেড়ে ধুতি-ফতুয়া-কামিজ ধরেছে। হালফ্যাশনের বাবুরা পরছেন কোট পাতলুন। অল্প বয়সী ছেলেছোকরাদের চুলের বাহার ছিল খুব। সেই সময়, ব্রাহ্ম সমাজে, অন্যান্য সভাতে, সিমলে পাড়ার একটা ছেলে সবার চোখে পড়ত। পাঁচ ফুট ন’ইঞ্চি মতো লম্বা, চওড়া বুক, ব্যায়ামকরা মজবুত দেহ, কপাল চওড়া, কঠিন চোয়াল। চোখ দুটো দেখলে তাকিয়ে থাকতে হয় কিছুক্ষণ। বড় বড় চোখের পাতা, ঘনকালো, টানা-টানা দুটো চোখ। কোঁকড়া চুলের মাঝখান দিয়ে টানা সিঁথি। তবে, এ ছোকরা কেমন যেন! শুধু ধুতির খুঁট গায়ে জড়িয়ে ঘুরছে। কলেজ থেকে ফিরছে, কোটের বোতাম গুলো খোলা। বড় অন্যমনস্ক। তবে, যা পরে, যা করে সবেতেই মানিয়ে যায় নরেনকে। দক্ষিণেশ্বরের তোতলা বামুন বলে, ‘তোরা সব এক থাকের, নরেন অন্য থাকের।’



রামকৃষ্ণ পরমহংসের এই মন্তব্যই সন্ন্যাসী জীবনে পুরোপুরি কাজে লাগিয়েছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ। যে দিন নিজের উদ্দেশ্য তাঁর কাছে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ হয়ে ওঠে, সেদিন থেকেই একটা সিদ্ধান্ত নেন তিনি। বরাবরই তিনি নজর কাড়েন, সেটাই এবার থেকে সচেতন ভাবে করতে হবে। বেদান্তজ্ঞান মনের মধ্যে ধরে তিনি জানেন যে, বাইরের চেহারাটার মধ্যে আসল তিনি নেই। তাঁর ভেতরের অমলজ্যোতিকে ছোঁওয়ার সাধ্য নেই কোনও কিছুরই। তাই, হিন্দুধর্মকে সবার সেরা প্রমাণ করতে, বাইরের দুনিয়ার সামনে তাকে তুলে ধরতে নিজের দেহটাকেই তার বিজ্ঞাপন করে তুলবেন তিনি। পশ্চিমি বাজারে ডাঁটসে নিয়ে যাবেন নিজের পসরা। ভারতের আধ্যাত্মিকতা। বলবেন, এর বিনিময়ে আমি নেব তোমাদের জড়বিজ্ঞান। আমার দেশের এই সময়ে, ওটা বড় দরকার। এই উদ্দেশ্যের সামনে আর সব কিছু তুচ্ছ। বিদেশীরা সন্ন্যাসী বলতে কী বোঝে, জানা আছে তাঁর। আধল্যাংটো, গায়ে ছাইমাখা, জটাধারী, একদল মানুষ। যাঁদের ওরা শ্রদ্ধা করতে শেখেনি। সেই শ্রদ্ধা তিনি আদায় করে ছাড়বেন । ঠাকুর তো বলেইছেন, ‘নরেন শিক্ষে দিবে।’ সত্যিকারের বিবেকানন্দ হলো, আ ভয়েস উইদাউট আ ফর্ম। ভারতের আত্মার কন্ঠস্বর তিনি। যে বিবেকানন্দকে লোকে দেখছে, এখন থেকে সে একটা প্রতীক। ভারতের ত্যাগ, বীর্য, সৌন্দর্যচেতনা- সব কিছুকে সদর্পে বিদেশের সামনে হাজির করতে, বাইরেটাকে এমন করে সাজাবেন তিনি, যেন ওরা চেয়ে থাকতে বাধ্য হয়। তাঁর ব্যারিটোন কন্ঠে, ওদেরই ভাষায় তাঁর স্বদেশ সম্বন্ধে যা যা বলবেন তা ওদের শুনতে হবে। জন্ম হলো বীর সন্ন্যাসী প্যাকেজের। সন্ন্যাসী ধারণাটারই খোল নলচে বদলে গেল। বিদেশ হাঁ করে চেয়ে দেখল এক দিব্যকান্তি মানুষকে। গেরুয়া আলখাল্লা পরা, মাথায় রাজস্থানী পাগড়ি। এই পাগড়িই বিবেকানন্দের ইউ এস পি। বাংলার মানুষ আগে বা পরে কখনও এমন পাগড়ি পরেনি। রামকৃষ্ণ মিশনের মহারাজরা এখনও পরেন না। তাঁরা পরেন সেই কানঢাকা টুপি, যেটা বিবেকানন্দ হিমাচল থেকে এনেছিলেন। ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘ নিয়েছেন এই পাগড়ির লিগ্যাসি। স্বামীজির ফ্যাশন স্টেটমেন্ট আজও বেঁচে আছে কিন্তু!

এই পর্যন্ত বলে একটু থামতে হবে আমাদের। আবার, একবার পেছনে তাকাতে হবে। কেননা, আমরা এতক্ষণ আবেগে ভেসেছি। এবার একটু তথ্য ভিত্তিক হই। বিবেকানন্দ আমেরিকা গিয়েছিলেন কেন? বেদান্তবাদী হিন্দুধর্মের মহিমা বিদেশিদের কাছে প্রচার করতে। কোথায়? শিকাগো ধর্ম মহাসম্মেলনে। সেটা কী ছিল? ১৮৯৩ এ কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের চারশ’ বছর পূর্তি উপলক্ষে শিকাগোতে অনুষ্ঠিত হয় একটা বিরাট মেলা আর প্রদর্শনী। World’s Columbian Exposition। ১লা মে, এই মেলা জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয়। মেলা চলে ১৮৯৩-এর ৩০শে অক্টোবর পর্যন্ত। এই মেলার একটা অংশ ছিল ধর্মমহাসভা। মেলা শুরু হওয়ার দু’বছর আগে থেকেই সারা পৃথিবীতে তিন হাজারের বেশি নেমন্তন্নর চিঠি পাঠানো হয়। সেই চিঠিতে বোলা হয় যে, এই সম্মেলনের মূল উদ্দেশ্যগুলোর একটা হলো, বিভিন্ন ধর্মের মধ্যেকার সত্যগুলো জনসাধারণের সামনে চিত্তাকর্ষক ভাবে তুলে ধরা। (নজরটান আমার)। কী মনে হচ্ছে? একেবারে ছাপমারা আমেরিকান শো-বিজ্‌, তাই না? না, বিবেকানন্দ এসব জেনে শো দিতে আমেরিকা যাননি। কারণ, তাঁর কাছে কোনও চিঠি যায়নি। তিনি বুঝেছিলেন, তাঁকে বিদেশ গিয়ে নিজের ধর্মের জয়গান গাইতে হবে। কারণ, সেটা করলে দেশে শিক্ষা দেওয়ার সুবিধে। বিদেশী প্রিজমে দেশ দেখা বৃটিশ কলোনীর প্রজাদের তাঁর খুব ভালোভাবে চেনা হয়ে গিয়েছিল। এখান থেকে টাকা রোজগার করে দেশে ফিরে একটা মিশন গড়ার উদ্দেশ্য ছিল তাঁর। দেশবাসীর দেহ আর মনের স্বাস্থ্য ফেরানোর আদর্শ সামনে ছিল। এসব ভেবে ১৮৯৩ সালের ৩০শে জুলাই তিনি আমেরিকা যান। শিকাগোতে এসে তিনি জানতে পারেন, ১) তাঁর নাম নথিভুক্ত নেই, করার দিনও পেরিয়ে গেছে; ২) ধর্ম মহাসভায় অংশগ্রহণের জন্য আবশ্যিক পরিচয়পত্র নেই তাঁর কাছে; ৩) শিকাগো থাকা-খাওয়ার খরচ অসম্ভব বেশি। খরচ টানতে না পেরে, বিবেকানন্দ যান বোস্টন। সেখানে থাকা-খাওয়া শিকাগোর চেয়ে অনেক সস্তা। যাওয়ার পথে রেলে আলাপ হয় কেট স্যানবার্নের সঙ্গে। তাঁর সাহায্যে যোগাযোগ হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জন রাইটের সঙ্গে। তিনি বিবেকানন্দকে নানা ভাবে সাহায্য করেন। পরিচয়পত্র লিখে দেন, ধর্মমহাসভার প্রতিনিধি নির্বাচক কমিটির সেক্রেটারিকে দেওয়ার জন্য একটা চিঠি লেখেন, General Committee of the World’s Congress Auxiliary on Religious Congress এর চেয়ারম্যান রেভারেন্ড জন হেনরি ব্যারোজ-এর ঠিকানা দেন এবং শিকাগো যাবার রেলের টিকিট দেন। বোস্টনে বিবেকানন্দ ছিলেন তিন সপ্তাহের কাছাকাছি। ২৭শে অগাস্ট থেকে ৫ই ও ৬ই সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনি মোট এগারটা বক্তৃতা দেন। সবই ভারত আর হিন্দুধর্ম বিষয়ক। এবং সেগুলো নিয়ে কাগজে লেখাও হতে থাকে। তার মানে, ধর্মমহাসভার আগেই কিছুটা প্রচার পেয়ে যান এই হিন্দু সন্ন্যাসী। আর এগোনোর আগে একটা কথা বলে নিই। শিকাগো ধর্মমহাসভায় ভারত থেকে মোট তের জন প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে বিবেকানন্দ ছাড়া হিন্দু ছিলেন আরও চারজন : লাহোরের লক্ষ্মীনারায়ণ, মাদ্রাজের নরসিংহাচার্য, মজফ্‌ফরগড়ের জিন্দারাম এবং মুলতানের সিধ্‌ধুরাম। সুতরাং, বিবেকানন্দকে যে হিন্দুধর্মের কথা বলতে হয়েছিল তা অবশ্যই বাকীদের থেকে আলাদা। এই আলাদা হিন্দুত্ব নিয়ে তর্কের শেষ নেই। কেউ এর মধ্যে দেখেন প্র্যাকটিকাল বেদান্তবাদ; কেউ আবার ১৮৯৭ সালে The Hindu পত্রিকাকে দেওয়া সাক্ষাৎকার ঊদ্ধৃত করে বলেন যে, তিনি জাতিভেদ প্রথার সমর্থক ছিলেন। বিবেকানন্দের স্ববিরোধিতা আজকাল খুব ইন্‌ থিং! তবে, এ কথাও সত্যি, স্বদেশকে মহিমান্বিত করতে গিয়ে বিবেকানন্দ কিছু অদ্ভুত কথা বলেন এই সময়। যদি, ১৮৯৩ এর ২৮শে অগাস্ট সালেমের ওয়েস্‌লি চ্যাপেলে দেওয়া তাঁর বক্তৃতার খবর তার পরের দিনের ইভনিং নিউজে যে ভাবে বেরিয়েছিল তা সত্যি হয়, তাহলে আমাদের মেনে নিতে হবে, স্কটিশ চার্চ কলেজের উজ্জ্বল ছাত্রটি বিশ্বাস করেন, ভারতের মেয়েরা স্বামীকে এতই ভালবাসেন যে, স্বেচ্ছায় মৃত স্বামীর চিতায় প্রাণ বিসর্জন দেন তাঁরা। যদিও সে প্রথা ভারতে তখন কানুনি –অপরাধ, তবু বিবেকানন্দ ‘explained the old custom of woman being burned on the death of their husbands, on the ground that they loved them so that they could not live without the husband. They were in marriage and must be one in death’। ১৮৯৩ এর ২৯শে অগাস্টের ডেইলি গেজেট এর রিপোর্ট বলছে, স্বামী বিবেকানন্দ ওয়েসলি চার্চের বক্তৃতায় বলেছেন, ‘ভারতের স্বামীরা কখনওই মিথ্যে বলে না এবং তাদের স্ত্রীদের ওপর অত্যাচার করে না।’ অতি উদ্ভট কথা। সন্দেহ নেই। এসব নিয়ে সমালোচনাও হয়েছে বিস্তর। আমাদের কিন্তু অন্যরকম মনে হয়। আমরা মনে করি, এই কথাগুলো জেনে শুনে বলা। ‘ভিক্ষের’ ঝুলি হাতে যে ‘অবুঝ’ জনতার মধ্যে গিয়ে হাজির হয়েছেন, তাদের চমকে দেওয়ার জন্যে বলা। সচেতন ভাবে বিবেকানন্দ আলাদা হতে চাইছেন। নির্মাণ করছেন প্যাকেজ-বিবেকানন্দ। আমরা মনে করি, ধর্ম-বাণিজ্য সভা থেকে যে কোনও মূল্যে অর্থ সংগ্রহ করে দেশে ফিরে তাঁর নিজস্ব ঐশীচেতনার চর্চা ও প্রচারের ক্ষেত্র তৈরী করতে প্রবলভাবে ঔপনিবেশিক, ম্যাসক্যুলিন ক্রিশ্চান যাজকদের সঙ্গে এক দ্বৈরথে নেমেছিলেন তিনি। My God is in no way lesser than your God। ২রা নভেম্বর, ১৮৯৩-তে আলাসিঙ্গাকে লেখা চিঠিটার কথাও মনে করতে পারি আমরা। বিবেকানন্দ সভায় গিয়ে দেখতে পান, সেখানে ধনী ঘরের মহিলার সংখ্যাই বেশি। কেননা, হাতে প্রচুর সময় ও তা নিয়ে যা খুশি করার মতো আর্থিক নিরাপত্তা সবচেয়ে বেশি ছিল তাঁদেরই। তাঁদের করধ্বনি আর উচ্ছ্বাস কতটা বিবেকানন্দের বেদান্তবাদী বক্তৃতা আর কতটা তাঁর রূপ আর পোশাকের জন্য,তা নিয়ে স্বামিজি নিজেই যথেষ্ট সচেতন ছিলেন। তাই তিনি লেখেন, ‘আমার গৈরিক বসনে শ্রোতৃবৃন্দের চিত্ত কিছু আকৃষ্ট হইয়াছিল,…’। সংবাদপত্র থেকে ঊদ্ধৃতি দেন, “এই সুন্দর মুখ বৈদ্যুতিক শক্তিশালী অদ্ভুত বক্তাই মহাসভায় শ্রেষ্ঠ আসন অধিকার করিয়াছেন।”: যদিও ব্যারোজের রিপোর্ট বলছে যে সবচেয়ে বেশি হাততালি ও অভিনন্দন পেয়েছিলেন কনফুসীয় মতের প্রতিনিধি পাং কয়াং যু। বিবেকানন্দ নিশ্চয়ই দেখেছিলেন যে, শিকাগোর এক কাগজ স্বামীজির দেহসৌষ্ঠব আর পোশাকের প্রভাব মহিলাদের কাছে তাঁর জনপ্রিয়তার কারণ বলে লিখেছে। এই সব কিছু মিলিয়েই দ্রুত জনপ্রিয়তা চেয়েছিলেন বিবেকানন্দ। তিনি জানেন, তাঁর অন্তর্জ্যোতি ভাল-মন্দ কিছুর তোয়াক্কা করেন না – না দত্তে কস্যচিৎ পাপং ন চৈব সুকৃতং বিভু। তাঁর দেশের মহাকাব্যই বারবার বলেছে সিচ্যুয়েশনাল এথিক্সের কথা। তাঁর আসল উদ্দেশ্য এতটাই বড় যে তার জন্য নিজেকে নিলামে তুলতে বাধেনি তাঁর। 





বিবেকানন্দের এই আলাদা হয়ে ওঠাটা আরেক শ্রেণীকে মোহিত করেছিল। ইংরিজি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী। কোট পাতলুন পরা দিশি সাহেবদের দল। এদের ইমপ্রেস করাটাও খুব জরুরী ছিল। শিক্ষার পুঁজিটা এদের হাতে। এদেরই ক্যাম্পেইনে দ্রুত প্রচার পাবে সন্ন্যাসের এই নতুন রূপের কথা। সারা ভারত ঘোরার সময়, এই ইংরিজি বলা সন্ন্যাসী যে এই কাজটা খুব ভালোভাবে পেরেছিলেন, তার বিস্তর রেকর্ড আছে। উদাহরণ হিসেবে, বম্বের বেলগাঁওএর ফরেস্ট অফিসার হরিপদ মিত্রের কথা মনে করা যেতে পারে। বিবেকানন্দের চার্লস ডিকেন্সের উপন্যাস পিকউইক পেইপার্স মুখস্ত বলা দেখে, জুল ভের্নের সায়েন্স ফিকশন পড়া দেখে তিনি অবাক হয়েছিলেন। প্রচণ্ড বিস্মিত হয়েছিলেন জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় স্বামীজির অবাধ চলা ফেরা দেখে। তবে, ১৮৯২ এর ১৮ অক্টোবর বিবেকানন্দকে প্রথম দেখে তাঁর যে অনুভূতি হয়েছিল সেটা তিনি কোনওদিন কাটিয়ে উঠতে পারেননি।



‘ফিরিয়া দেখিলাম প্রশান্তমূর্তি, দুই চক্ষু হইতে যেন বিদ্যুতের আলো বাহির হইতেছে। গোঁফদাড়ি কামানো, অঙ্গে গেরুয়া আলখাল্লা, পায়ে মহারাষ্ট্রীয় দেশের বাহানা চটিজুতা, মাথায় গেরুয়া কাপড়েরই পাগড়ি।’ 



পহেলে দর্শনধারী! এই কথাটাই খুব স্পষ্ট করে বুঝেছিলেন বিবেকানন্দ। বুঝেছিলেন, আরও একটা কথা। রামকৃষ্ণেরই কথা। খালি পেটে ধর্ম হয় না। প্রচারের জন্য তিনি যে একধরণের শোবিজ্‌ করেন সেটাও তিনি জানতেন। আর তা নিয়ে কোনও মেকি লজ্জা ছিল না তাঁর –

‘বাবা, তোমরা যেরূপ Utilitarian (উপযোগবাদী), যদি আমি চুপ করিয়া বসিয়া থাকি, তাহা হইলে তোমরা কি আমাকে একমুঠা খাইতে দাও? আমি এইরূপ গল্‌ গল্‌ করিয়া বকি, লোকের শুনিয়া আমোদ হয়, তাই দলে দলে আসে। কিন্তু জেনো, যে সকল লোক সভায় তর্ক বিতর্ক করে, প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করে, তাহারা বাস্তবিক সত্য জানিবার ইচ্ছায় ওরূপ করে না। আমিও বুঝিতে পারি, কে কি ভাবে কি কথা বলে এবং তাহাকে সেইরূপ উত্তর দিই।’

উদ্দেশ্য পরিষ্কার। পরিষ্কার প্রেজেন্টেশন। পোশাক, কথা বলা – সব মিলিয়ে গড়ে তোলা ফ্যাশনের নিপুণ প্রয়োগ। 



এ ব্যাপারে বিবেকানন্দ কতটা সচেতন ছিলেন, তা ছোটবেলার বন্ধু, পাড়ার ছেলে, প্রিয়নাথ সিংহের সঙ্গে তাঁর কথাবার্তা শুনলেই বোঝা যায়। 

স্বামীজি। আমার ইচ্ছে করে, আমার চোখ দিয়ে তোদের সব দেখাই…এই এত বড় বড় সব বাড়ি government এর রয়েছে, বাইরে থেকে দেখলে তার কোন মানে বুঝিস, বলতে পারিস? তারপর তাদের খাড়া প্যান্ট, চোস্ত কোট, আমাদের হিসেবে একপ্রকার ন্যাংটো। না? …আমাদের জন্মভূমিটা ঘুরে দেখ্‌। কোন buildingটার মানে না বুঝতে পারিস, আর তাতে কিবা শিল্প! ওদের জলখাবার গেলাস, আমাদের ঘটি- কোনটায় আর্ট আছে?...পাড়াগাঁয়ে চাষাদের বাড়ি দেখেছিস? 

আমি। হাঁ।

স্বামীজি। কি দেখেছিস? 

আমি। বেশ নিকন-চিকন পরিষ্কার।

স্বামীজি। তাদের ধানের মরাই দেখেছিস? তাতে কত আর্ট! মেটে ঘরগুলোয় কত চিত্তির বিচিত্তির!...কি জানিস? সাহেবদের utility আর আমাদের art- ওদের সমস্ত দ্রব্যেই utility, আমাদের সর্বত্র আর্ট। ঐ সাহেবী শিক্ষায় আমাদের অমন সুন্দর চুমকি ঘটি ফেলে এনামেলের গেলাস এনেছেন ঘরে। ওই রকমে utility এমনভাবে আমাদের ভেতর ঢুকিয়েছে যে বদহজম হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন চাই art এবং utilityর combination;…

প্রশ্ন। কোন্‌ দেশের কাপড় পরা ভাল?

স্বামীজি। আর্যদের ভাল।…কেমন পাটে পাটে সাজানো পোশাক। যত দেশের রাজ-পরিচ্ছদ এক রকম আর্য জাতির নকল, পাটে পাটে রাখবার চেষ্টা, আর তা জাতীয় পোশাকের ধারেও যায় না। দেখ সিঙ্গি ঐ হতভাগা শার্টগুলো পরা ছাড়।

প্রশ্ন। কেন? 

স্বামীজি। আরে ওগুলো সাহেবদের underwear। সাহেবরা ঐগুলো পরা বড় ঘৃণা করে। কি হতভাগা দশা বাঙালীর! যা হোক একটা পরলেই হল? কাপড় পরার যেন মা-বাপ নেই। কারুর ছোঁয়া খেলে জাত যায়, বেচালের কাপড়-চোপড় পরলেও যদি জাত যেত তো বেশ হত। কেন, আমাদের নিজেদের মত কিছু করে নিতে পারিস না? কোট শার্ট গায়ে দিতেই হবে, এর মানে কি? 



বিবেকানন্দের পুরো ভাবনা এর মধ্যে ধরা আছে। কম্বিনেশন। ফিউশন। এথনিসিটি। একটা টোটাল প্যাকেজ। একজন মানুষই হোক বা একটা গোটা জাত, অন্তরে সে অম্লান, অমৃতজ্যোতি। বাইরে তাকে সে ভাবেই সাজতে হবে, যাতে করে পৃথিবীকে ডেকে সে বলতে পারে – দেখ, এই আমি। স্বতন্ত্র। এস। আদানপ্রদান হোক। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলি। 



কিন্তু, এই সব কিছুর মধ্যে, নিজেকে কিছু একটা ‘বানিয়ে তোলা’র ভেতর, ‘বাধ্যতামূলক বক্তব্য’ বলে যাওয়ার নেপথ্যে একটা বিশাল ‘স্ট্রেস ফ্যাকটর’ কাজ করে। তাঁর ‘আরেকটা বিবেকানন্দ থাকলে…’ প্রবন্ধে শিবাংশু দে লিখেছেন,

হয়তো বিবেকের বিরূদ্ধে ক্রমাগত যাত্রা করতে করতেই তিনি অতো কম বয়সে হতোদ্যম ও ভগ্নস্বাস্থ্য হয়ে পড়েছিলেন। গ্রিক ট্র্যাজেডির নায়কের মতো মৃত্যু ছাড়া তাঁকে শুশ্রূষা দেওয়ার আর কেউ ছিল না। 



আমাদেরও তাই মনে হয়। ব্র্যান্ড বিবেকানন্দ ভেতরে ভেতরে ক্ষইয়ে দেয় মানুষ বিবেকানন্দকে। পুঁজি ও উপনিবেশবাদের সঙ্গে নিজের নিয়মে লড়তে গিয়ে শেষ পর্যন্ত পরানের সাথে মরণখেলা খেলতে হয় তাঁকে। 





তথ্যসুত্র : 

Swami Vivekananda On Himself – Advaita Ashrama, 2006

স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা (৯) – উদ্বোধন কার্যালয়,২২ তম পুনর্মুদ্রণ, জৈষ্ঠ ১৪১৯

প্রসঙ্গ :রামকৃষ্ণ বিবেকানন্দ – কণিষ্ক চৌধুরী।

আরেকটা বিবেকানন্দ থাকলে… - শিবাংশু দে। 















0 comments: