0

ধারাবাহিক - নন্দিনী সেনগুপ্ত

Posted in


ধারাবাহিক


জলরেখা 
নন্দিনী সেনগুপ্ত


১৮ 

ওরা আয়নায় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে দেখে নিজেদের। ভারি সুন্দর মানিয়েছে দুজনকে। নিরূপের মাথায় পাগড়ি, গায়ে রেশমের আংরাখা, কোমরবন্ধনীতে কৃপাণ... নিখুঁত সাজ। নিরূপ প্রশ্ন করে, ‘আচ্ছা এই কৃপাণ থাকে কেন? মানে এই যোদ্ধার সাজসজ্জা, কাকে রক্ষা করার জন্য?’ আইয়ম বলে, ‘হ্যাঁ, রক্ষা করার জন্য। বলো তো কাকে?’ আইয়ম মুখোমুখি দাঁড়ায় নিরূপের। নিরূপ লক্ষ্য করে আইয়ম আয়ত চোখে তাকিয়ে আছে ওর চোখের দিকে সোজাসুজি। নিরূপের একটা অস্বস্তি হতে থাকে। আইয়ম কেটে কেটে বলে, ‘হ্যাঁ, রক্ষা করার জন্য। বলতে পারছ না উত্তরটা? জানো না তুমি?’ নিরূপ লক্ষ্য করে ওর চোখের দৃষ্টি কেমন যেন বদলে যাচ্ছে। ওর চোয়ালে একটা কাঠিন্য। ওর চোখের প্রেমময় দৃষ্টি বদলে যাচ্ছে; ঝরে পড়ছে ক্রোধের স্ফুলিঙ্গ। আইয়ম হঠাৎ নিরূপের কোমরবন্ধনীর খাপ থেকে চকিতে মুক্ত করে নেয় কৃপাণ। নিরূপ দেখে ওর সামনে ধাতব ফলক। ও কিছু বুঝতে পারেনা। ও পিছিয়ে যেতে থাকে। একসময় দেখে ওর পিছনে শক্ত দেওয়াল। ওর আর কোথাও যাবার নেই। ও সর্বশক্তি দিয়ে চীৎকার করে উঠতে চায়, বলতে চায়, ‘জানি না-আ-আ-আ! জানি না আমি এসব কিচ্ছু।’ কিন্তু বলতে পারেনা। ওর গলা শুকিয়ে গিয়েছে আইয়মের এই অদ্ভুত রণচণ্ডী মূর্তি দেখে। নিরূপ ওকে কিছু বলবার ব্যর্থ চেষ্টা করে মরীয়া হয়ে হাত তুলে ওর হাত থেকে কৃপাণ কেড়ে নেবার চেষ্টা করে। পারেনা। ওর শরীর যেন পাথরের মতো ভারি হয়ে গেছে। ও যেন জড়পদার্থে পরিণত হয়েছে। আইয়ম এক হাত দিয়ে কৃপাণ ধরে থেকে আরেকটা হাত দিয়ে ওকে ঝাঁকায়। নিরূপের মনে হয় তার সময় ফুরিয়ে আসছে। সমানে ঝাঁকাচ্ছে ওকে, ওর শরীরে প্রচণ্ড শক্তি, ভূমিকম্পের মতো ঝাঁকুনি হচ্ছে, সে যেন কোনও মানবী নয়, ভীষণদর্শনা এক ক্রুদ্ধ দেবীমূর্তি। 

ঝাঁকুনি খেতে খেতেই নিরূপের ঘুম ভাঙ্গে, কে ডাকছে ওকে? ‘গাগা, গাগা’... ‘কি হয়েছে? গোঙাচ্ছিলে কেন? শরীর খারাপ?’ আরে, এ তো নয়নের কণ্ঠস্বর! নিরূপ এতক্ষণে বুঝতে পারে যে ও স্বপ্ন দেখছিল। ও তো কাল সন্ধেবেলা কলকাতায় এসেছে। রাতে তো সে নয়নের ঘরে নয়নের সাথে একই বিছানায় ঘুমিয়েছিল। তার মানে এতক্ষণ যা দেখছে, পুরোটাই স্বপ্ন! নিরূপ নিশ্চিন্তে নিঃশ্বাস ছাড়ে। ওর শরীর প্রচণ্ড ঘামছে। নয়ন আবার বলে, ‘গাগা, জল খাবে?’ নিরূপ মাথা নাড়ে। নয়ন উঠে আলো জ্বালে। জলের জাগ থেকে গ্লাসে জল ঢেলে এগিয়ে দেয়। নিরূপ উঠে বসে। ধীরে ধীরে এক ঢোঁক এক ঢোঁক করে জল খায়। সে কিছু চিন্তা করতে পারছেনা। আপাতত দুঃস্বপ্ন ভেঙ্গে গেছে, এই ভাবনাটা তাকে স্বস্তি দিচ্ছে। কিন্তু এটা পুরোটা তো দুঃস্বপ্ন ছিল না। কিছুটা তো সত্যিই। হুবহু এরকম না হলেও, সত্যিই তো তাদের বিয়ে হয়েছিল। তারা তো ঘরসংসার করছিল। সাঙ্ঘাতিক ভুলবোঝাবুঝি কিছু তো কখনও তার আর আইয়মের মধ্যে হয়নি। তাহলে কেন? কেন নিরূপ পালিয়ে এলে তুমি? নিরূপ নিজেকে এই প্রশ্নটা করে। নয়ন জিজ্ঞাসা করে, ‘কিছু বলছ গাগা?’ নিরূপ উত্তর দেয়, ‘না রে, কিছু না। ঘুমিয়ে পড়। ঘুমিয়ে পড়!’ দ্বিতীয়বারের ঘুমিয়ে পড়ার উপদেশ সে অস্ফুটে বলে। হয়তো বা নিজেকেই বলে। কারণ এখন আবার নয়ন ঘুমিয়ে পড়বে আলো নিভিয়ে, কিন্তু সে কি পারবে আবার ঘুমিয়ে পড়তে? নয়ন আলো নিভিয়ে সত্যিই মুহূর্তের মধ্যে আবার ঘুমিয়ে পড়ে। 

নিরূপ জেগে থাকে। বসেই থাকে। এইসময় হয়ত বা একটা সিগারেট খেলে সে এই অদ্ভুত একটা সময়ের ঘেরাটোপ যা স্বপ্নের মধ্য দিয়ে তাকে গিলে নিচ্ছিল, সেটার মধ্য থেকে বেরিয়ে আসতে পারতো। কিন্তু সে ছেড়ে দিয়েছে সিগারেট বেশ অনেকদিন হলো। যখন ছাড়তে পেরেছে, আর নতুন করে ধরবে না। জীবনে সে অনেককিছুই ছেড়ে এসেছে, হয়ত তার মধ্যে অনেককিছুই ছিল, যা খুব ভালো। সেগুলো তো আর চেষ্টা করেও সে ফেরত পাবেনা কোনওদিন। তাহলে কেন হঠাৎ এই সিগারেটের নেশার কথা এই মধ্যরাতে তার মাথায় উদয় হলো? ভাবতে ভাবতে নিরূপ নিজের মনেই একবার ফিক করে হেসে ফেলে। হেসে সব উড়িয়ে দিতে চায়। যেভাবে এদ্দিন দিয়েছে। আসলে হয়ত কিছু একটা করলে যে অশান্তিটা স্বপ্নের মধ্যে দিয়ে মনের মধ্যে ডালপালা মেলে রেখেছে সেটা কমতো। 

নিরূপ কিছু একটা করতে চাইছিল, তখনই। উঠে একবার টয়লেটে যায়। ফিরে এসে বিছানায় বসে ভাবে আগামীকাল দুপুরে ল্যাবে যেতে হবে স্যাম্পলগুলি নিয়ে। সেগুলো আলাদা ব্যাগেই আছে, তবুও একবার লিস্ট মিলিয়ে গুছিয়ে নিলে হতো। কিন্তু এখন মাঝরাতে আলো জ্বালিয়ে ঘরের মধ্যে খুটখাট করলে নয়নের ঘুম ভেঙ্গে যাবে। বই পড়তে গেলেও আলো জ্বালতে হবে, কাজেই সেটাও সম্ভব নয়। নিরূপ কিছুক্ষণ বিছানায় এপাশ- ওপাশ করে তারপর উঠেই পড়ল। 

ঘর থেকে বেরিয়ে ঘরের দরজা ভেজিয়ে যতটা নিঃশব্দে পারা যায় সেভাবে যাওয়ার চেষ্টা করছিল বাবা- মায়ের ঘরের লাগোয়া একফালি ছাদে। ওই ছাদটা তার খুব পছন্দের জায়গা ছোটবেলা থেকেই। শিশুবেলায় ছোটকার সঙ্গে সে আর অরূপ ওই ছাদে গমের দানা ছড়িয়ে দিত, অনেক পায়রা আসত। খুঁটে খুঁটে খেয়ে যেত সব গম। এমনকি একটা পায়রা সোজাসুজি তার হাত থেকেই গম খেয়ে নিত। অরূপ তার নাম দিয়েছিল ‘বংশীলাল’। নিরূপ বলত, ‘চিনতে পারিস? আমার তো সব্বাইকে একরকম লাগে!’ অরূপ খুব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ঘাড় নেড়ে বলত ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, চেনা যায়।‘ ছোটকাও সমর্থন করত অরূপকে। তারপর বিশ্বকর্মা পূজার দিনে ঘুড়ি ওড়ানো, সেও তো ওই ছাদ থেকেই। অনেক স্মৃতি ভিড় করে আসে তার মনে। বাবা মায়ের ঘর তো বন্ধই পড়ে আছে; কিন্তু মাঝখানের প্যাসেজ দিয়েও ছাদে যাওয়া সম্ভব। নিরূপ পা টিপে টিপে চোরের মতো হাঁটে, যাতে আওয়াজে কারও ঘুম ভেঙ্গে না যায়। আলো জ্বালে না সে। অন্ধকারে চোখ সয়ে গেছে তার। ছাদে ঢুকতে গিয়ে সে লক্ষ্য করে ছাদে যাবার জন্য যে প্যাসেজের দরজা, সেটা আটকানো নয়। ভেজানো। নিরূপের অস্বস্তি হয়। তাহলে কি ছাদে কেউ আছে? এই মাঝরাতে কে থাকতে পারে ছাদে? নাকি চোর এল বাড়িতে? সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে নিরূপ দরজা ঠেলে ছাদে পা রাখে। চারপাশ তাকিয়ে প্রথমে কাউকে দেখতে পায় না। পায়ে পায়ে ছাদের রেলিং এর কাছে যায়। হঠাৎ চোখে পড়ে ছাদে তুলসীগাছের ওপাশে আবছা একটা নারীমূর্তি। নিরূপের বুকটা ছাঁৎ করে ওঠে। স্বপ্নের ঝলক ফিরে আসে এবং একই সঙ্গে মনে পড়ে যায় যে অরূপ বলত সে নাকি তাদের পরলোকগতা ঠাকুমাকে অনেকবার ছাদে দেখেছে। নিরূপ নিজে কোনওদিন এমন কাউকে দেখেনি বলে সে বিশ্বাস করত না। নিজের অজান্তেই সে স্থির হয়ে যায় এবং দেখে সেই নারীমূর্তি তার দিকেই এগিয়ে আসছে। সে বুঝতে পারছে এটা স্বপ্ন নয়। এটা বাস্তব। ছাদের রেলিং এর ধারে দাঁড়িয়ে নিরূপ নিজেকে বলে, ‘এবার কোথায় যাবে?’

0 comments: