2

অণুগল্প - অনুষ্টুপ শেঠ

Posted in


অণুগল্প


বাঘ
অনুষ্টুপ শেঠ



স্কুল যাতায়াতের পথের ধারে, ভাঙা গাড়িটা পড়ে আছে আজ কত যুগ হলো। রঙ বহুলাংশে চটে গেছে, তাও বোঝা যায় এককালে মেরুন ছিল। তাতানকে স্কুলের গেটে ঢুকিয়ে দিয়ে ফিরতে ফিরতে মনীষা দেখে তোবড়ানো খাঁচাটার ধূলিধূসরিত গায়ে সদ্যকৃত পক্ষীকর্ম। টায়ারগুলো কবেই খুলে নিয়ে গেছে সুযোগসন্ধানীরা। হেডলাইটের ভাঙা কাঁচে রোদ পড়ে, মনীষার মনে হয় মরণাপন্ন এক বাঘ গুটিসুটি মেরে বসে ওর দিকে চেয়ে আছে। গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে, চৈত্রের বেলাতেও চোরা শীত বয়ে যায় শিরদাঁড়া বেয়ে।

মহাবলেশ্বরে প্রবল ঠাণ্ডা নেমে এসেছিল সন্ধ্যার পর। এতটা আশা করেনি দীপম আর মনীষা। সঙ্গে তাই যথেষ্ট গরম জামাকাপড় নিয়ে যায়নি। সুতরাং তড়িঘড়ি ডিনার সেরে ঘিরে ঢুকে জানলা দরজা এঁটে কম্বল-মুড়ি। মনীষার বুক দুরুদুরু করে উঠেছিল অন্য উষ্ণতার আশায়। বিয়ে হয়েছে মাত্র চারদিন, এখনও দুই শরীরের বিশদ পরিচয় হয়নি বললে ভুল হয় না। অনুষ্ঠানের হাঙ্গামা, তারপর বোম্বের ছোট ফ্ল্যাটে আত্মীয়দের ভীড়, কেমন যেন তাড়াহুড়ো হুট করে পেরিয়ে গেছিল প্রথম অভিজ্ঞতা। আজই সেই অর্থে প্রথম, চেনা অচেনা লোকের গণ্ডির বাইরে, শুধু দুজনে। চমৎকার কেটেছে দিনের বেলাটা ঘুরে ঘুরে ছবি তুলে তুলে। সম্বন্ধ করে এমন লোকের সাথে বিয়ে হলো, যে সুপুরুষ সুচাকুরে ছাড়াও ওরই মতো বেড়াতে ভালবাসে দেখে ব্যাপক খুশি হয়েছিল মনীষা।

এখন, মৃদু রাতের আলোয়, ঘন সান্নিধ্যে, অপেক্ষা যখন অধীর হয়ে উঠেছে শরীর জুড়ে তখন হঠাৎই মনে হলো মুগ্ধতা না, এমনকি কৌতূহলও না, অভ্যস্ত অভিজ্ঞ একজোড়া চোখ তাকে মাপছে। মেপে নিচ্ছে তার সব তরঙ্গের সাইজ। ভূগোলের মৌখিক পরীক্ষার সময়ও রীতাদি এমনি সন্দিগ্ধ চোখে তাকাতেন। এ কি পারবে? প্রশ্নের উত্তর দিতে? চাহিদা মেটাতে?

সেই প্রথম এই বাঘটার সাথে মুলাকাত মনীষার। মরণাপন্ন, গুঁড়ি মেরে বসে খালি থাবা চাটে আর হাভাতে চোখে মেপে যায় খাদ্য-জগৎ, খুঁজে যায় দুর্বল শিকার।

তারপর আরও কতবার দেখে ফেলেছে একে। শপিং ম্যলে, রেস্টুরেন্টে, এয়ারপোর্টে, সিনেমা হলে। রাস্তায়। যখনই কোনও ভরভরন্ত মেয়ে শরীর ধারেকাছে আসে। আজকাল ঘাড় না ঘুরিয়েও মনীষা দেখতে পায় দীপমের অদৃশ্য ল্যাজের ডগা নড়ে উঠছে, আলতো করে জিভ বুলিয়ে নিচ্ছে ঠোঁটে আফশোস ঢাকতে।

যখন দীপম ফোন করে বলেছে ফিরতে রাত হবে অফিসে খুব চাপ, যখন দেরি করে আসবে বলে গিয়েও সময়ে চলে এসেছে, এসে কারণ হিসেবে বলেছে মিটিংটা আজ ক্যানসেল হয়ে গেল বস নেই বলে, কিংবা যখন ফোনের ছবিগুলোয় অলস হাত চালাতে চালাতে হঠাৎ ঝট করে ফোন হাত চাপা দিয়ে আড়াল করেছে আর তড়িঘড়ি পাশ থেকে উঠে গেছে - নিশ্চিত বেঘো গন্ধ পেয়েছে মনীষা। প্রতিবার। এক অসুস্থ জন্তুর শরীর ভরা ঘায়ের গন্ধ। নোংরা। পচা।

তারপর গা গুলিয়ে ওঠা সামলে নিয়ে, নির্বিকার প্রশান্ত মুখে যা বলা হয়েছে সব সত্যি বলে মেনে নিয়েছে। যেন ও ফোনের ব্যাকগ্রাউন্ডে মেট্রোর অ্যানাউন্সমেন্ট শুনতে পায়নি, যেন ও ভুলেই গেছে সকালে যাবার সময় দীপম বলেছিল কোনও স্কুলের বন্ধুর বাড়ি নেমন্তন্ন আছে বলে দেরি হবে, অথবা যেন ও অন্য কারও সাথে দীপমের অবাঞ্ছিত ঘনিষ্ঠতার ফোটোটা এক ঝলকেই নির্ভুল দেখে ফেলেনি।

আজ এই ভাঙাচোরা গাড়িটা দেখেও সেই বাঘটার কথা মনে হলো কেন কে জানে! পায়ে পায়ে পেরিয়ে গিয়েও, কি এক দোনামনায় পিছন ফিরে তাকাল মনীষা। তাকাতেই, চোখ ধাঁধিয়ে গেল খণ্ড সাইড মিররে রোদের ঝলকানিতে।

বাঘটা এবার সত্যি গা ঝাড়া দিয়ে উঠে পড়ল, তারপর ছোট্ট লাফ দিয়ে এসে দাঁড়াল ওর সামনে। আর এই দশ বছরের ভাঙাচোরা সংসারের খাঁচাটাকে ঐ গাড়ির জায়গায় দাঁড় করিয়ে রেখে, সমস্ত অভ্যাস, কর্তব্য, টানের ধুলো ঝেড়ে ফেলে অদ্ভুত নির্লিপ্ত একটা হাসিমুখে মনীষা চড়ে বসল তার পিঠে।

2 comments:

  1. যদিও গল্পের সেটআপটা পুরুষ হিসাবে পছন্দ হবার কথা নয়, তবু মুনশিয়ানা অবশ্যই নজর কাড়ে। শেষটুকু অনুগল্পের সঠিক পরিণতির দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। পাঠ করে তৃপ্ত!

    ReplyDelete