6

ধারাবাহিক - সুজিত নারায়ণ চট্টোপাধ্যায়

Posted in


ধারাবাহিক


এক কিশোরীর রোজনামচা - ১৫

সুজিত নারায়ণ চট্টোপাধ্যায়




Diary Entry - 13
14th. August, 1942, FRIDAY


প্রিয় কিটী, 

গত একমাস তোমায় কোনও চিঠিই লিখিনি। সম্ভবত আমার লেখা বা লেখার ইচ্ছা, সব কিছু মরুভূমিতে হারিয়ে গিয়েছিল, বা এখনও যাচ্ছে। কোন ঘটনাই ত’ ঘটছে না, কি লিখব? সত্যিই ভাবলে আবাক হবে, গত একমাসে এত কম ঘটনা ঘটেছে, যে তোমায় কিছু লিখে জানাব, তার মতো কোনও বিষয়বস্তুই খুঁজে পাইনি। আমাদের জীবনটাই নিস্তরঙ্গ প্রবাহের মতো হয়ে গেছে। সকাল বেলায় ওঠা থেকে, রাত্রে শুতে যাওয়ার আগে পর্যন্ত আমাদের কাজ কেবল নিজেদের লুকিয়ে রাখা, আর লুকিয়ে রেখে বাঁচার চেষ্টা করা। এর মধ্যে আমি খুঁজেই পাইনি, আমার লেখার বিষয়বস্তু, অথবা তোমায় কি লিখব, বা কি লিখে জানাব! এর মধ্যে যে ঘটনাটা ঘটেছে, তা’হল, গত ১৩ই জুলাই ভ্যান ড্যান সপরিবারে আমাদের অ্যানেক্সে বা উপগৃহে এসে উঠেছেন। অর্থাৎ আমাদের জায়গা আরও সংকুচিত হয়ে গেছে। অবশ্য এ’সব ভাবনা বর্তমান পরিস্থিতিতে সঠিক নয়। কেমন যেন অসূয়া গ্রস্থের ভাবনার মতো। কারণ আমরা ইহুদিরা শুধু ভীত নই, জীবনের ভয়ে বিব্রত, বিভ্রান্ত। ভ্যান ড্যানের সপরিবারে আসার কথা ছিল, ১৪ই জুলাই। কিন্তু তারা একদিন আগেই পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে। ওদের কাছে শুনলাম, নাৎসি বাহিনীর গেস্টাপো ইউনিট, গত ১৩ থেকে, ১৬ই জুলাই-এর মধ্যে, সকল ইহুদিকে প্রায় ছাকনি দিয়ে ছেঁকে ক্যাম্পে ডেকে হাজির করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে, আর ১৩ তারিখ থেকে সেই কাজ শুরু করে দিয়েছে। স্বাভাবিক করণেই চারিদিক হঠাৎ করে অশান্ত ও চঞ্চল হয়ে উঠেছে। ইহুদিরা প্রায় পাগলের মতো, পালিয়ে যাওয়ার বা লুকানোর জায়গা খুঁজে বেড়াচ্ছে। ভ্যান ড্যান পরিবারও তাদের হাত থেকে বাঁচার জন্যে, নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে, নির্ধারিত দিনের একদিন আগেই এখানে পালিয়ে এসেছে। ওদের কাছে, একদিন অপেক্ষা করার চেয়ে, একদিন আগে চলে আসাটাই একমাত্র বুদ্ধিমানের কাজ বলে মনে হয়েছে। হয়ত সম্ভব হলে আরও আগেই তারা চলে আসত। 

তখন সকাল ন’টা বা সাড়ে ন’টা হবে। আমরা সবাই মিলে জলখাবার খেতে শুরু করেছি। এমন সময়, ভ্যান ড্যানের ছেলে পিটার ভ্যান ড্যান এসে হাজির। 

পিটার ভ্যান পেলস, অ্যানি এ’কে তার ডাইরিতে পিটার ভ্যান ড্যান নামে উল্লেখ করেছে। (২)

পিটার ভ্যান ড্যান, ভ্যান ড্যানের একমাত্র ছেলে। পিটারের বয়স তখন ষোলোরও কম (মানে মারগটের চেয়ে ছোট। কিন্তু অ্যানির চেয়ে প্রায় বছর তিনেকের বড়)। স্বভাবে নরম ও শান্ত প্রকৃতির। লাজুক টাইপের ছেলে, কেমন যেন জবুথবু গোছের। ওর সাথে গল্প করলে তোমার ভাল লাগবে না। এমনকি ওর সঙ্গে মিশতেও তোমার খুব একটা ভাল লাগবে বলে মনে হয় না। আসার সময় বাড়ির বিড়ালটাকেও (মৌসচি- Mouschi) নিয়ে এসেছে। এসে বলল, তার বাবা মা দুজনেই আসছে। পিটার আসার আধ ঘণ্টা পৌনে এক ঘণ্টার মধ্যে পিটারের বাবা ও মা এসে পৌঁছালেন। প্রথমে দেখেই আমরা আনন্দে খাবার ছেড়ে দাঁড়িয়ে উঠলাম। আমাদের একাকীত্বের জীবনে আরও কিছু মানুষ এসেছেন যারা আমাদের একান্ত পরিচিত ও প্রিয়। কিন্তু তারপরই আমাদের সবার অবাক হওয়ার পালা। বিশেষ করে শ্রীমতী ভ্যান ড্যানকে দেখে। শুনলে অবাক হবে, না হতবম্ব হয়ে যাবে জানি না, শ্রীমতী ভ্যান ড্যান তাঁর সঙ্গে করে একটা বড় ব্যাগ নিয়ে এসেছেন, আর তার মধ্যে করে নিয়ে এসেছেন, বড় একটা “পটি বক্স”। এর আগে আমি অন্তত কাউকে কোথাও যাওয়ার সময় “পটি বক্স” নিয়ে যেতে দেখিনি। জানি না তুমি দেখেছকি’না!! ওটার দিকে সবাই অবাক চোখে তাকাতেই, উনি একমুখ হেসে বললেন, “আসলে এইটা ছাড়া আমি কোথাও নিশ্চিন্ত হতে পারি না। অতএব ওনাকে নিশ্চিন্ত করার জন্য, অন্য কিছু কোথায় রাখা হবে, সে বিষয়ে ভাবনাচিন্তা করার আগে, ওই বড় “পটি বক্স”টাকে কোনও একটা জায়গায় যুতসই করে রাখতে হবে। কারণ ওটা ছাড়া শ্রীমতী ভ্যান ড্যানের একটা দিনও ভালভাবে কাটবে না। অতএব, প্রথমেই ওই “পটি বক্স”টাকে পরম যত্নে গুছিয়ে খাটের তলায় রাখা হলো। মিঃ ভ্যান ড্যান অবশ্য তাঁর স্ত্রী-র মতো প্রাতঃকৃত্যের জন্যে “পটি বক্স” নিয়ে আসেননি। তবে তিনিও কিছু কম নন। তিনি তাঁর বগলদাবায় করে “পটি বক্স”এর বদলে একটা ফোল্ডিং চায়ের টেবিল বয়ে নিয়ে এসেছেন। যাক, এ’তে অন্তত সবাই মিলে বসে চা’ খাওয়া যাবে। 

ওঁরা এখানে আসার পর থেকেই ক্রমে ক্রমে আমাদের খাওয়া শোওয়া থাকা সব কিছুর মধ্যে এক বিপুল পরিবর্তন এল। ভ্যান ড্যান পরিবার যেদিন থেকে আত্মগোপন করতে এখনে এল, মোটামুটি সেদিন থেকেই আমাদের খাওয়া- দাওয়া ইত্যাদি সব কিছু দৈনিক কাজ একসাথে করতে আরম্ভ করা হলো। আমরা একক পরিবার হয়ে এখানে ছিলাম, হঠাৎ আমরা একটি যৌথ পরিবারে পরিণত হয়ে গেলাম। আমরা এখানে আসার প্রায় সপ্তাহ খানেক বা দু-সপ্তাহের কাছাকাছি সময় ভ্যান ড্যান পরিবার বাইরের জগতে ছিল। তারা আমাদের চেয়ে বেশী বাইরের জগতটাকে দেখেছে। বাইরের জল- হাওয়াকে আমাদের চেয়ে বেশী দিন উপভোগ করেছে। এটা আমাদের কাছে একটা বিরাট বিষয়। ওরা আসার পর, আমরা সবাই একসাথে বসে, তাদের কাছে ওই সব বাড়তি থাকার দিনগুলোর কথা, বাইরের বিভিন্ন গল্প গ্রোগ্রাসে শুনতাম। বেশী করে শুনতে চাইতাম, আমাদের বাড়িটার কথা। যে বাড়িটাতে আমরা থাকতাম, (এখানে আসার আগে) তার এখন কি অবস্থা, কেউ সেটা দখল করে নিয়েছে কি’না, মিঃ গোল্ডস্মিথ, যিনি আমাদের সাথে থাকতেন, তাঁর খবর – এসবই ছিল আমাদের অগ্রহের বিষয়। আসলে কেউ দখল করে নিলে আমরা কোথায় গিয়ে থাকব, এটাই ছিল আমার মূল চিন্তা। কথায় কথায়, মিঃ ভ্যান ড্যান আমাদের বললেন, 

“সোমবার (হিসাব মতো, সম্ভবত ১০ জুলাই—অনুবাদক।) ঠিক সকাল ন’টার সময় মিঃ গোল্ডস্মিথ আমায় একটা ফোন করেন। এবং ফোনে ব্যস্তসমস্ত গলায় বলেন, আমি তক্ষুনি ওনার কাছে যেতে পারব কি’না? ভীষণ দরকার। আমিও ফোন পাওয়ার সাথে সাথেই প্রায় দৌড়ে গিয়ে মিঃ গোল্ডস্মিথের সাথে দেখা করি। ওখানে পৌঁছে দেখি, সেখানে “শ্রী জী” দাঁড়িয়ে আছেন। শুধু দাঁড়িয়েই আছেন না, গিয়ে বুঝলাম, আমার জন্যেই বেশ উত্তেজিত ভাবে অপেক্ষা করছেন। আমি পৌঁছানো মাত্র, ‘মিঃ জী’ আমায় একটা চিঠি পড়তে দিলেন। তাঁর কাছে শুনলাম, ফ্রাঙ্ক না’কি তাঁকে চিঠিটা দিয়ে গেছেন। চিঠিতে শুধু লেখা ছিল, ‘সে তার বিড়ালটাকে তার প্রতিবেশীদের কাছ থেকে নিয়ে যেতে চায়।‘ চিঠিটা পড়ে বেশ মজা পেলাম। বুঝতে পারলাম না এর আবার কি’ গূঢ রহস্য আছে! তবে ওর সামনে আমি গম্ভীর হয়েই থাকলাম। ‘মিঃ জী’ এরপর আমায় বললেন, দু’এক দিনের মধ্যেই এই বাড়ি আর ঘরগুলো খানাতল্লাশী হতে পারে এবার আমি মনে মনে কিছুটা হলেও ভয় পেয়ে গেলাম। ওকে আর বিশেষ কিছু না বলে, আমি তড়িঘড়ি সব ঘরগুলোকে আবার একবার ঘুরে দেখতে লাগলাম। দেখার সময় যেখানে যা’ কিছু ছিল, সেই সবকিছুকে এক জায়গায় জড় করে ভাল করে বেঁধে ফেললাম। জলখাবারের জায়গাটায় যেসব টুকরোটাকরা জিনিষ পত্র ছিল, সেগুলোকে ভাল করে পরিষ্কার করে ফেললাম। এইসব করতে গিয়ে হঠাৎ নজরে এল, শ্রীমতী ফ্রঙ্কের লেখার টেবিলের দিকে। সেখানে দেখি একটা খোলা চিঠি লেখার প্যাড পড়ে আছে। আর তাতে খোলা পাতাটায় ম্যাসট্রিচট (Maastricht) (১) এর একটা জায়গার ঠিকানা লেখা আছে। আমি ঔই লেখাটা দেখেই তৎক্ষণাৎ অনুমান করে নিই, যে বিশেষ কোন উদ্দেশ্য নিয়েই ঔই জায়গার নামটা লেখা হয়েছে, আর তা’ কোনমতেই এখানে প্রকাশ করা যাবে না। বিশেষ করে ‘মিঃ জে’-র সামনে কিছুই প্রকাশ করা বা তাঁকে কিছু বুঝতে দেওয়া যাবে না। তাই ‘মি জে’-র সামনে আমি অবাক হওয়ার ভান করি। এমন ভান করি, যেন ‘মি জে’ মনে করেন, যে বিষয়টা যে গুরুত্বপূর্ণ সেটাই আমি মনে করি না। বরং আমি ওটাকে একটা বাজে কাগজ ছাড়া আর কিছুই ভাবছি না। তাই আমি তৎক্ষণাৎ ‘মি জে’-কে ওই কাগজটা ছিঁড়ে ফেলতে অনুরোধ করি। ‘মিঃ জে’-ও বিশেষ কিছু না ভেবে কাগজটা ছিঁড়ে ফেলেন। 

“তারপরও আমার মনে হয়, ‘মিঃ জে’ মনে মনে কিছু একটা ভাবছেন। ওই দেখে, আমি ওনার সমনে ভান করি, যে, তোমরা কোথায় গেছ, কেন গেছ, এ’সব আমি কিছুই জানি না। আর তোমরাও কোনদিনই এ’ব্যাপারে আমার সঙ্গে কোন কথাই বলনি। কিন্তু ‘মিঃ জে’ বা মিঃ গোল্ডস্মিথের মনের সন্দেহটা তখনো ঘোরাফেরা করছে দেখে, আমিও প্রথমে ভাবতে শুরু করি ওই লেখাটার মাধ্যমে, কি বোঝানোর চেষ্টা হয়েছে! মনে মনে ভাবি, বিষয়টা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। কিন্তু ওপরে বা মুখের ভাবে, সেটা ওদের কাছে লুকিয়ে রাখি। পরিবর্তে, মিঃ গোল্ডস্মিথকে গদগদ ভাবে বললাম, দেখুন এই কাগজটা দেখে, প্রথমেই আমার মনে হয়েছিল, ঠিকানাটা ঠিক কি বোঝাচ্ছে! কিন্তু একটু চিন্তা করতেই আমার একটা কথা মনে পড়ে গেল। মাস ছয়েক আগে একজন অফিসার গোছের লোক আমাদের অফিসে এসেছিলেন। সম্ভবত কিছুর একটা সরবরাহকারী ছিলেন। স্বাভাবিকভাবে ওটো ফ্রাঙ্কের সঙ্গে ভদ্রলোকের বেশ সুন্দর ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। ভদ্রলোকটিও বেশ ভাল ছিলেন। সেই সময় আমি শুনেছিলাম, তিনি ফ্রাঙ্ককে বলছেন যে, তার কোন রকম অসুবিধা হলে তিনি আন্তরিক ভাবে ফ্রাঙ্ককে যে কোন রকম সাহায্য করতে প্রস্তুত। ফ্রাঙ্ক অবশ্য প্রত্যুত্তরে কোনও কথাই বলেননি। সেই ভদ্রলোক কথায় কথায় বলেছিলেন, যে তিনি ম্যাস্ট্রিচটে থাকেন। তিনি তখন তাঁর ঠিকানাও লিখে দিয়েছিলেন। আমার এখন মনে হচ্ছে, ঐ অফিসার তাঁর কথার দাম রেখেছেন। মনে হয়, তিনি ওটো ফ্রাঙ্ক ও তার পরিবারকে প্রথমে বেলজিয়ামে যেতে পরে সেখান থেকে সুইজারল্যান্ডে পৌঁছতে সাহায্য করেছেন। যাওয়ার আগে আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, আমি কি তাঁর এই যাওয়ার কথা, গোপন করে রাখব? না’কি আমাদের কোনও বিশেষ বন্ধু যদি তোমাদের কথা জিজ্ঞাসা করে, তবে কি তাকে বলব তোমাদের এই যাওয়ার কথা? আমার কথার উত্তরে, ওটো ফ্রাঙ্ক স্পষ্টভাবে আমায় বলেছিলেন, আমি যেন কোনভাবেই তাঁদের কথা কাউকে না বলি।  

এরপর আমি ঐ অফিস থেকে বেরিয়ে যাই। তবে ওখানে যতক্ষণ ছিলাম, ততক্ষণে আমি বুঝতে পারি, তোমার বন্ধুদের মধ্যে অনেকেই জানে, তোমার সাথে ঐ ভদ্রলোকের আলাপ বা কথাবার্তার খবর। কারণ আমি ওখানে অনেকের কাছেই ম্যাস্ট্রিচটের নাম শুনেছি। এবং জায়গাটা কোথায়, সে বিষয়েই অনেকে অনেক কিছু জানে। 

আমরা উপগৃহের আলো আধারে বসে এতক্ষণ ধরে বেশ মন দিয়ে এবং কৌতূহল নিয়ে ভ্যান ড্যানের পুরো গল্পটা শুনছিলাম। ভ্যান ড্যানও বেশ মজা করেই গল্পটা বলছিলেন। ওঁর গল্প শেষ হওয়া মাত্র, আমরা সবাই হো হো হেসে উঠলাম। হাসিটা অবশ্যই বেশ নিশ্চিন্তের হাসি। এখনও বাইরের লোকে আমাদের কথা ভাবে, আমাদের গতিবিধি সম্পর্কে অনুমান করার, বা, কল্পনা করার চেষ্টা করে। আমরা কোথায় আত্মগোপন করে আছি, বা আদৌ আত্মগোপন করে আছি না দেশ ছেড়ে চলেই গেছি, সে ব্যাপারে আলোচনা করে, কল্পনা করে, আর কিছু জানতে না পেরে, আমাদের অনুপস্থিতিকে জানান দিতে, বিভিন্ন গুজব ছড়ায়। যেমন, ভ্যান ড্যানের কাছেই শুনলাম, আমাদের বাড়ির কাছে থাকেন এক ভদ্রমহিলা না’কি পাড়ায় বলেছেন, যে তিনি আমাদের ভোর বেলায় রাস্তায় সাইকেল চালিয়ে যেতে দেখেছেন। সেই শুনে আরেকজন না’কি বলেছেন, যে তিনি নিজের চোখে স্পষ্ট দেখেছেন, মাঝ রাত্রিরে নাৎসি বাহিনীর সৈন্য আমাদের একটা সামরিক বাহিনীর গাড়ীতে, জোর করে টেনে হিঁচড়ে গায়ের জোরে তুলে নিয়ে যাচ্ছে। সব কিছু শুনে আমার মনে হয়, শুধু আমরাই জানি না, আমরা কিভাবে এসেছি, কোথায় আছি !! 



ইতি,
তোমার অ্যানি। 



অনুবাদকের সংযোজন - 

(১) ম্যাসট্রিচট বা Maastricht হল দক্ষিণ নেদারল্যান্ডের বা হল্যান্ডের এক পুরানো শহর। প্রাচীন ইউরোপের এক প্রাচীন নগরী। ইউরোপের রেনেশাঁ পূর্ব প্রাচীন নির্মাণ শিল্পের বহু নিদর্শন এই স্থানে দেখা যায়। এক অর্থে ম্যাসট্রিচট ইউরোপের প্রাচীন নগরী গুলির এক অন্যতম বৈশিষ্ঠ্য হিসাবে আকর্ষণীয় ছিল। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর চল্লিশের দশকে, জার্মানির নাৎসি বাহিনী এই শহরটি আক্রমণ করে। এবং এর সুপ্রাচীন ঐতিহ্যপুর্ন নির্মাণ শিল্পের চিহ্ন সমূহকে ধ্বংস করে। ১৯৪৪ সালে মিত্র শক্তি ম্যাসট্রিচট শহরটিকে নাৎসি বাহিনীর দখল থেকে মুক্ত করলেও, এর পুরানো চিহ্ন সমূহকে পুরোপুরি পুনরুদ্ধার করতে পারেনি। তাছাড়াও ম্যাসট্রিচট শহরকে মিত্র শক্তি নাৎসি কবল থেকে মুক্ত করলেও, নাৎসি বাহিনী তার অবস্থানকালের মধ্যেই ম্যাসট্রিচট শহরে বসবাসকারী অধিকাংশ ইহুদিকে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে ( Concentration Camp ) ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে। 

(২) বর্তমান প্রসঙ্গে পিটার ভ্যান ড্যান ( যে ভাবে অ্যানি ফ্রাঙ্ক তার ডাইরিতে উল্লেখ করেছে) বা পিটার ভ্যান পেলস সম্পর্কে দু-এক কথা বলা প্রয়োজন। বিশেষ করে পাঠকবর্গের সঠিক অনুধাবনের জন্যে। পিটার একদিকে যেমন বেশ নিরীহ গোছের ছেলে ছিল, তেমনি তার মধ্যে এক বিশেষ ধরণের সন্মোহোক ক্ষমতা ছিল। তাকে দেখে সাধারণভাবে মেয়েরা আকৃষ্ট হতো। কিন্তু অ্যানির স্বভাব বা চারিত্রিক বৈশিষ্ট একটু অন্যরকম ছিল। অ্যানি বেশ বুদ্ধিমতী, ও কৌতুকপ্রিয় মেয়ে ছিল। অ্যানি তার ডাইরির প্রথমেই পিটারকে অলস, জবুথুবু মার্কা ছেলে হিসাবে চিহ্নিত করে। বিশেষ করে পিটার এতটাই লাজুক প্রকৃতির ছেলে ছিল, যে অ্যানির নেকনজরে আসা হঠাৎ করে তার পক্ষে প্রায় অসম্ভব ছিল। তাই প্রথমদিকে অ্যানি তাকে বিশেষ পাত্তাই দিত না। বরং কথায় কথায় অগ্রাহ্য করত। তারপর ওখানে থাকতে থাকতে, অ্যানির মধ্যে পিটার সম্পর্কে ক্রমে ক্রমে দুর্বলতা সৃষ্টি হয়। অ্যানি পিটারের চাউনির মধ্যেও এক অন্য রকমের বিহ্বলতা দেখতে পায়। অ্যানি দ্রুত পিটারের প্রতি দুর্বল হয়ে ওঠে, পিটারকে তার সুন্দর, মিষ্টি ও আকর্ষক ছেলে বলে মনে হতে থাকে। 

বছর দুয়েক তারা ওই উপগৃহে একসাথে অন্তরালবর্তী হয়ে ছিল। এই দীর্ঘ সময়, তাদের দুজনের মানসিক পরিবর্তনের পক্ষে যথেষ্ট সময়। অ্যানিরও এই দুবছরের মধ্যে পিটারের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গীর পরিবর্তন হয়, অ্যানি তার ডাইরিতেই স্বীকার করেছে, এক জায়গায় থাকতে থাকতে পিটারের প্রতি তার দুর্বলতা বা ভালবাসার অনুভূতি অল্প অল্প করে বৃদ্ধি পায়। অবশ্য এর মূল কারণ ছিল দীর্ঘ সময় লোকচক্ষুর বাইরে গোপন স্থানে পরিবার দুটির গোপন অবস্থান। তাই এ’মত অবস্থায় পরস্পরের প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার বিকল্প কিছুই তাদের কাছে ছিল না। পরবর্তী সময়ে ১৯৪৪ সালের মার্চ মাসের ডাইরির পাতায় আমরা দেখব, অ্যানি লিখেছে, আমি জানি না, এখানথেকে বেরিয়ে আমি পিটারকে আর পছন্দ করব কি’না। তার সাথে স্থায়ী সম্পর্কে আবদ্ধ হতে চাইব কি’না!! আমার মনে হয় পিটারও এ’কথাটা জানে না। আসলে অ্যানেক্সের অভ্যন্তরে তাদের যে একাকীত্ব আর নির্জনতা তাদের মধ্যে প্রেম ও ভালবাসা জন্ম দিয়েছিল, বাইরের পৃথিবীতে বেরিয়ে সেটা একইরকম থাকবে কি’না, এ’ ব্যাপারে অ্যানি তার ডাইরির বিভিন্ন অংশে সন্দেহ প্রকাশ করেছে।

নাৎসি বাহিনীর হাতে ধরা পাড়ার শেষ মুহূর্তের আগেও অ্যানির আশা ছিল সে আবার স্বাধীন হবে, বাইরের পৃথিবীতে বেরিয়ে আবার আকাশভরা আলো দেখবে। তাই সে ভাবত তার আর পিটারের সম্পর্কটা স্থায়ী হবে কি’না, তা’ এখান থেকে বেরোনোর পর যখন তারা সমাজের আর পৃথিবীর বিশাল ক্যানভাসের সামনে দাঁড়াবে, তখনি তা’ চূড়ান্তভাবে পরীক্ষিত হবে। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে তাদের এই ভালোলাগা বা ভালবাসাকে লাগাম ছাড়া করার চেষ্টা করলে, তা’ হবে সামাজিকভাবে নীতিবিরুদ্ধ এবং ব্যক্তিগতভাবে অসংযমের পরিচায়ক। 

উপগৃহের মধ্যে পিটার অ্যানির কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিল, যে, সে কোনদিন অ্যানির সাথে ঝগড়া করবে না। অবশ্য অ্যানি মনে করত পিটারের এই প্রতিজ্ঞার কারণ এই নয়, যে পিটার খুব শান্তি প্রিয় ছেলে, আসলে অ্যানির মতে পিটার ছিল এক কৌতূহলহীন উদাস অলস ছেলে। 

পিটারের মৃত্যু হয়েছিল ম্যুথাউসেন (Mauthausen) বন্দী শিবিরে। প্রথম অবস্থায় পিটার অটো ফ্রঙ্কের সঙ্গে আউশউইতজ (Auschwitz) বন্দী শিবিরেই ছিল। অটো ফ্রাঙ্ক তাকে বারংবার একসাথে থাকার জন্যে জোর করেছিলেন এবং বন্দীদের কুচকাওয়াজে যেতে নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু পিটার ভেবেছিল বন্দীদের কুচকাওয়াজে গেলে সে আউশউইতজ শিবিরের কষ্টকর জীবন থেকে মুক্তি পাবে এবং ম্যুথাউসেন শিবিরে যাওয়ার সুযোগ পাবে। শেষ পর্যন্ত পিটারকে ম্যুথাউসেন বন্দী শিবিরে ১৯৪৫ সালের ২৫শে জানুয়ারী নিয়ে যাওয়া হয়। পৌঁছানোর চার দিনের মাথায় তাকে শিবিরের বাইরে প্রচণ্ড রোদে কাজ করতে পাঠানো হয়। সেখানে কাজ করতে গিয়ে সে অসুস্থ হয়ে পড়ে। ১৯৪৫ সালের ১১ই এপ্রিল পিটারকে অসুস্থদের ব্যারাকে পাঠানো হয়। সেখানেই তার মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর দিন ও সময় কিছুই জানা যায়নি। রেডক্রস তার নথীতে পিটারের মৃত্যু দিন হিসাবে ৫ই মে ১৯৪৫ সালের দিনটিকে চিহ্নিত করেছে।

6 comments:

  1. Good. No doubt easy reading, enjoyable and interesting piece. I personally wait for this publication

    ReplyDelete
  2. lekhata r transcreation tai sudhu valo ta bola jae na ar er pechoner research work o durdanto... keep it up.waiting for the next..

    ReplyDelete
  3. এটা বোধহয় রোজনামচা সংখ্যা ১৬ হবে।

    ReplyDelete
  4. Congratulation!! Eagerly waiting for the next edition

    ReplyDelete