3

মুক্তগদ্যঃ দময়ন্তী দাশগুপ্ত

Posted in


মুক্তগদ্য



কথোপকথন
দময়ন্তী দাশগুপ্ত



“একদা কলকাতা নামের এই শহরে শুভঙ্কর নামে ৪৫ বছর বয়সী এক সদ্যজাত যুবক ভালোবেসে ফেলেছিলো নন্দিনী নামের এক বিদ্যুৎ-শিখাকে। গেরিলা-যুদ্ধের মতন তাদের গোপন ভালোবাসাবাসির নিত্য সঙ্গী ছিলাম আমি। আর নিজের খাতায় রোজ টুকে রাখতুম তাদের আবীর-মাখানো কথোপকথনগুলো।”

ওপরের অংশটা পড়েছিলাম পূর্ণেন্দু পত্রীর ‘কথোপকথন’-এর ভূমিকায়। সেই আমার নন্দিনী আর শুভঙ্করের সঙ্গে আলাপ। ইদানীং আবার কলকাতার পথেঘাটে মাঝে মধ্যেই নীরার মতো নন্দিনীর সঙ্গেও দেখা হয় আমার। কখনও সে রক্তকরবীর পাতা থেকে নেমে আসে, কখনও বা কথোপকথনের স্কেচ সত্যি করে জেগে ওঠে পথে এলোচুলে। কথায় কথায় আমায় বলল, শুভঙ্করের সঙ্গে আবার দেখা হয়েছে। হঠাৎ করেই কিছুদিন আগে যোগাযোগ হয়েছে ওদের। শুভঙ্করের বয়স এখন সাতাত্তর। নন্দিনীর বয়স? জানিনা। কেউ তো কোথাও লেখেনি যে দুইয়ে দুইয়ে চার করে তার বয়স বুঝব, আর বিদ্যুৎ-শিখার আবার বয়স হয় নাকি? 

নন্দিনী বলল, শুভঙ্কর লেখালেখি করে, ছবিও আঁকে। তবে ইদানীং কানে একটু কম শোনে, তাই মেসেজেই যোগাযোগ করতে হয়। জীবনের নানা ঝড়ঝাপটায় যেন অনেকটাই আত্মকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। নাতি-নাতনী নিয়ে নন্দিনীর ভরভরন্ত সংসারের ওপর ভারী রাগ একা শুভঙ্করের। জিজ্ঞাসা করলাম, আর তোমার? হেসে, ওর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গীতে হাত-পা নেড়ে বলল, আমার ভারী মায়া হয় জানো? এখনও ও ওই সদ্যজাতই রয়ে গেছে। তেমনই ভালোবাসতে ভালোলাগে ওকে আজও। 

শেষ যেদিন দেখা হল, আমার হাতে একটা কাগজ গুঁজে দিয়ে নন্দিনী বিষণ্ণ মুখে বলল, শুভঙ্করের যে কী হয়েছে কে জানে, আমার কোনো মেসেজের উত্তর দেয় না, ফোন করলেও ফোন ধরে না। এটা একটু পৌঁছে দেবে শুভঙ্করের কাছে? আজই? ওকে বোলো, আমি অপেক্ষা করে থাকব। ভালো করে কিছু বোঝার আগেই দেখি আর নেই। কাগজটা উল্টেপাল্টে কোথাও শুভঙ্করের ঠিকানা খুঁজে পেলাম না। রক্তকরবীর একটা পাঁপড়ি খসে পড়ল শুধু। পড়ন্ত বিকেলের শেষ মনখারাপের আলো এসে পড়ল নন্দিনীর হাতের অক্ষরে -



শুভঙ্কর... শুভঙ্কর, 
আজ একবার দেখা করবি আমার সঙ্গে?
উত্তর দিবি না তো?
কফি হাউসে আসবি?
তোকে একটা কবিতার বই দিতাম।
আজকের দিনটা মনে আছে তোর?
চৌঠা জুন।
কেন মনে রাখবি?
তা নিজেই ভেবে দেখ, 
আদৌ মনে রাখবি কিনা?
সে তো গেল অন্য কথা।
আজ একবার আসবি কফি হাউসে?
বইয়ের নাম?
‘কথোপকথন’ – পূর্ণেন্দু পত্রীর।
জানি তোর পড়া।
কী আশ্চর্য, পড়া বই কি 
আবার করে পড়া যায় না!
না, দেওয়া যায়না?
কবিতা তো বারবারই পড়া যায়।
তুই পড়বি না, সে আলাদা কথা।
আসলে তুই আসবি না,
ওইটেই সত্যি।
তা বেশ, তা বলে আমি কি যাব না?
আমি তো কবিতার বই হাতে নিয়ে
দাঁড়িয়ে থাকতেই পারি 
কফি হাউসের দোরগোড়ায়,
অথবা, কফির কাপ হাতে
বসে থাকতে পারি দোতলা বা তিনতলায়।
যেমন, একদিন একা হেঁটেছিলাম পথে পথে,
তোর জন্মদিনেও তুই আসিসনি,
অনন্ত অপেক্ষায় বসেছিলাম আমি।
সেইরকম অনন্ত কোনও কিছু তো 
থাকতেই পারে আমাদের মধ্যে।
যেমন ধর, অনন্ত না পাওয়া।
আবার বাজে বকছি? ওইটাই তো 
আমার স্বভাব, তুই জানিস।
তোর সঙ্গে বাজে কথা 
বলেই সময় কাটাই আমি। 
অথবা, সময় নষ্ট করি। 
নষ্ট কি হয় আদৌ,কিছুই 
কি লাগে না কাজে?
কে জানে! 
তুই তো কথাই বলিস না আজকাল
আমারএকাএকাই কথোপকথন।
তোর সঙ্গে? 
হয়ত বা নিজের সঙ্গেই।
যাক্‌গে, আসল কথাটাই তো বললি না,
আসবি আজকে, মনে আছে তোর,
চৌঠা জুন?
আমি কিন্তু দাঁড়িয়ে থাকব।
অথবা যাওয়ার সময় কবিতার বই
ভুল করে ফেলে রেখে যাব।
ওয়েটারটা হাতে তুলে নিয়ে
পাতা ওলটালে দেখতে পাবে,
লেখা রয়েছে - শুভঙ্করকে নন্দিনী।
নীচেই রয়েছে তারিখ লেখা–
চৌঠা জুন।
জমা দেবে সেটা মালিকের কাছে?
হয়তবা রাখবে তুলেই
কোনোদিন যদি কোনো শুভঙ্কর
চেয়ে নিয়ে যায় পথ ভুলে।

3 comments:

  1. ধন্যবাদ আপনাকে।

    ReplyDelete
  2. আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। আমার জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় আছে কথোপকথন। লেখাটা পরে ভীষণ ভালো লাগলো

    ReplyDelete