0

প্রচ্ছদ নিবন্ধ - শিবাংশু দে

Posted in


প্রচ্ছদ নিবন্ধ


মৃত্যুরাখাল ও সদানন্দ
শিবাংশু দে



মৃত্যুরাখালের তো গর্বের শেষ নেই। যে জীবন নিয়ে মানুষের এত অহমিকা, স্বজন-পরিজন সংসারের তৃপ্ত আবহ, অর্থ-কীর্তি-সচ্ছলতার উত্তুঙ্গ মিনার, তা'কে এক ফুঁয়ে সে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে। তার সামনে নত হয়ে থাকে রাজার রাজা, ভিখারির ভিখারি, সম্মান-অসম্মানের ভিতে গড়া অনন্ত নক্ষত্রবীথি, পাবকের পবিত্র অগ্নি থেকে মৃত্যুরাখাল কাউকে রেহাই দেয়না। সে তো ভাবতেই পারেনা একটা রক্তমাংসের মানুষ সদানন্দ হয়ে নিজেকে ঘিরে রেখেছে আনন্দের সমুদ্রে। রাখাল তার নাগাল কখনও পাবেনা। তার কিন্তু চেষ্টার কমতি নেই। সদানন্দের আশি বছরের দীর্ঘ জীবন জুড়ে বারম্বার হননপ্রয়াস চালিয়ে গেছে সে। কিন্তু ঐ সমুদ্রটা কখনও পেরোতে পারেনি। সে হেরে যায় সদানন্দের কাছে। জগৎসংসার জানে সে হলো জীবনের শেষ কথা । সদানন্দ বলে সে হলো অনন্ত সম্ভাবনার দ্বার। 

''....বস্তু জগৎ যদি অটল কঠিন প্রাচীরে আমাদের ঘিরে রেখে দিতো এবং মৃত্যু যদি তার মধ্যে মধ্যে বাতায়ন খুলে না রেখে দিতো, তাহলে আমরা যা আছে তারই দ্বারা সম্পূর্ণ বেষ্টিত হয়ে থাকতুম। এ ছাড়া যে আর কিছু হতে পারে তা আমরা কল্পনাও করতে পারতুম না। মৃত্যু আমাদের কাছে অনন্ত সম্ভাবনার দ্বার খুলে রেখে দিয়েছে।'' 

( ২০শে জুলাই ১৮৯৩ সালে ইন্দিরা দেবী'কে লেখা চিঠি)


এই চিন্তাটি আরও সন্নিবদ্ধ হয়েছিলো পরবর্তীকালে। 

'' জীবন যেমন সত্য, মৃত্যুও তেমনি সত্য। কষ্ট হয় মানি। কিন্তু মৃত্যু না থাকলে জীবনেরও কোনো মূল্য থাকেনা। যেমন বিরহ না থাকলে মিলনের কোনো মানে নেই। তাই শোককে বাড়িয়ে দেখা ঠিক নয়। অনেক সময় আমরা শোকটাকে ঘটা করে জাগিয়ে রাখি পাছে যাকে হারিয়েছি তার প্রতি কর্তব্যের ত্রুটি ঘটে। কিন্তু এটাই অপরাধ, কারণ এটা মিথ্যে। মৃত্যু চেয়ে জীবনের দাবি বড়ো।''

মৃত্যু সম্পর্কে কবি'র এই মানসিকতাটি তৈরি হওয়ার পিছনে কিছু আশৈশব প্রস্তুতি লক্ষ্য করা যায়। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ কোনও মৃত ব্যক্তির স্মৃতিচিণ্হ রক্ষায় অনিচ্ছুক ছিলেন। জোড়াসাঁকোর বাড়িতে তিন তলার যে ঘরে তিনি থাকতেন, মৃত্যুর পরে সেই ঘরে তাঁর কোনও প্রতিকৃতি বা অন্য স্মৃতিফলক রাখতে তিনি মানা করেছিলেন। 

এই নিয়ে কবিকে যখন এক ঘনিষ্টজন প্রশ্ন করেন, তখন কবি বলেন, ''সদর স্ট্রিটের বাড়িতে বাবামশায়ের তখন খুব অসুখ। কেউ ভাবেনি তিনি আবার সেরে উঠবেন। সেইসময় একদিন আমাকে ডেকে পাঠালেন। আমি কাছে যেতেই বললেন- আমি তোমাকে ডেকেছি, আমার একটা বিশেষ কথা তোমাকে বলবার আছে। শান্তিনিকেতনে আমার কোনো মূর্তি বা ছবি বা এইরকম কিছু থাকে আমার তা ইচ্ছা নয়। তুমি নিজে রাখবে না, আর কাউকে রাখতেও দেবেনা। আমি তোমাকে বলে যাচ্ছি এর যেন কোনো অন্যথা না হয়।'' তার পর কবি আরো বলেছিলেন, রামমোহন রায় বিদেশে মারা গিয়ে খুব বুদ্ধির কাজ করেছিলেন। আমাদের দেশকে কোনো বিশ্বাস নেই। হয়তো মৃত্যুর পর তাঁকে নিয়েও একটা কান্ড আরম্ভ হতো। কবির নিজেরও মনে হতো যদি তিনি বিদেশে প্রয়াত হ'ন তবেই ভালো। ভবিষ্যতদ্রষ্টা মানুষ হয়তো মনশ্চক্ষে প্রত্যক্ষ করতে পেরেছিলেন দেশের লোকের হাতে তাঁর শেষ অমর্যাদা।

মীরাদেবী ও রথীন্দ্রনাথ জোড়াসাঁকোয় মহর্ষির ছবি রাখতে বিশেষ আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু কবি কখনও অনুমতি দেননি। তিনি নিজে কোনও পরলোকগত মানুষের ছবি নিজের কাছে রাখতেন না। অবশ্য অন্য কেউ যদি তাঁর ছবি নিজের কাছে রাখতে চাইতো, তিনি বাধাও দিতেন না। ছবিতে সইও করে দিতেন নির্বাধ। তিনি তো বৈরাগী ছিলেন না। কিন্তু চলে যাওয়া প্রিয়জনদের যে ছবি তাঁর মনের মধ্যে আঁকা থাকতো, তাই ছিলো চূড়ান্ত। কাগজকলমের রেখায় তাঁদের খুঁজতে যেতেন না তিনি। 

এই 'ছবি' দেখা নিয়ে একটা ঘটনা আজ ইতিহাসের অংশ। ১৩২১ সালের কার্তিক মাসে কবি বেড়াতে গিয়েছিলেন এলাহাবাদ, ভাগ্নে সত্যপ্রসাদ গাঙ্গুলির বাড়িতে। সেখানে পুরোনো অ্যালবাম দেখতে দেখতে নতুন বৌঠানের একটা পুরোনো ছবি তাঁকে ট্রিগার করে। এভাবেই জন্ম হয় বলাকা কাব্যের সেই অতিখ্যাত কবিতা 'ছবি'। ''.... হায় ছবি, তুমি শুধু ছবি... ।'' এই স্মৃতিঘনঘোর প্রেরণা থেকে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তিনি লেখেন আর একটি বিশ্রুত কবিতা, 'শাজাহান'। 

''ইতিপূর্বে মৃত্যুকে আমি কোনোদিন প্রত্যক্ষ করি নাই। ... কিন্তু আমার চব্বিশ বছর বয়সের সময় মৃত্যুর সঙ্গে যে পরিচয় হইল তাহা স্থায়ী পরিচয়। তাহা তাহার পরবর্তী বিচ্ছেদশোকের সঙ্গে মিলিয়া অশ্রুর মালা দীর্ঘ করিয়া গাঁথিয়া চলিয়াছে। শিশুবয়সের লঘু জীবন বড়ো বড়ো মৃত্যুকেও অনায়াসেই পাশ কাটাইয়া ছুটিয়া যায়- কিন্তু অধিক বয়সে মৃত্যুকে অত সহজে ফাঁকি দিয়া এড়াইয়া চলিবার পথ নাই। তাই সেদিনকার সমস্ত দুঃসহ আঘাত বুক পাতিয়া লইতে হইয়াছিলো।'' ( জীবনস্মৃতি)

দ্বারকানাথের আশ্রিত ঠাকুর পরিবারের 'সন্দেশ পরীক্ষকে'র পৌত্রী যখন মোকাম কলকাতার সম্ভবত সব চেয়ে উপযুক্ত অভিজাত বিবাহসম্ভব পুরুষের পরিণীতা হিসেবে স্বীকৃত হতে চায়, তখন তার জন্য যে চ্যালেঞ্জটি অপেক্ষা করে থাকে তা এককথায় হিমালয়প্রতিম। ভাসুর সত্যেন্দ্রনাথ একেবারে চান'নি এতো অনভিজাত সাধারণ পরিবারের কন্যাকে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের মতো একজন যেকোনো শিক্ষিত, সাধিত, মার্জিত অভিজাত নারীর স্বপ্নপ্রতিম পুরুষের ভার্যা হিসেবে স্বীকার করে নিতে। কিন্তু বিবাহের পর মাতঙ্গিনী রাশনামের এই নারীটি নাম পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে জ্যোতিরিন্দ্রের উপযুক্ত 'সহধর্মিনী' করে তুলতে সফল হয়েছিলেন। 'রবীন্দ্রনাথ' নামের যে বোধিবৃক্ষটি পরবর্তীকালে একটি সভ্যতাকে নিজের ছায়ায় লালনপালন করে বাঁচিয়ে রেখেছিলো, সেই বৃক্ষের অংকুরোদ্গম থেকে নিজস্ব শরীর খুঁজে পাওয়া পর্যন্ত কাদম্বরী জল-মাটি-অক্সিজেন দিয়ে তাকে পোষণ করে গেছেন। কবির জীবনে নতুনবৌঠানের ভূমিকা নিয়ে এতো চর্চা হয়েছে যে তাই নিয়ে পুনরাবৃত্তি নিরর্থক। তবু কবি তাঁর বিকশিত হবার প্রথম স্তরে যা কিছু সৃষ্টি করেছেন, তার সব কিছুই এই নারীটিকে মুগ্ধ করার কৃত্য। উত্তরসূরি কবির ভাষ্য, '' আমার সকল গান, তবুও তোমারে লক্ষ্য করে'' এইভাবে প্রযোজ্য হওয়া খুব কম ক্ষেত্রেই হয়ে থাকে। কাদম্বরীর মৃত্যুর দিন দশেক পরে প্রকাশিত কবির 'প্রকৃতির পরিশোধ' 'নাট্যকাব্য'টির উৎসর্গপত্রে লেখা আছে, 'উৎসর্গ-/ তোমাকে দিলাম।' মাসখানেক পর প্রকাশিত 'শৈশবসঙ্গীত' কাব্যসংকলনের উৎসর্গপত্রে কবি লিখেছিলেন, ''....উপহার/ এ কবিতাগুলিও তোমাকে দিলাম। বহুকাল হইল, তোমার কাছে বসিয়াই লিখিতাম, তোমাকেই শুনাইতাম। সেই সমস্ত স্নেহের স্মৃতি ইহাদের মধ্যে বিরাজ করিতেছে। তাই মনে হইতেছে তুমি যেখানেই থাক না কেন, এ লিখাগুলি তোমার চোখে পড়িবেই।'' তারও মাসখানেক পরে প্রকাশিত 'ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী'র উৎসর্গপত্রে একই আকূতি, ''ভানুসিংহের কবিতাগুলি ছাপাইতে তুমি আমাকে অনেকবার অনুরোধ করিয়াছিলে। তখন সে অনুরোধ পালন করি নাই। আজ ছাপাইয়াছি, আজ তুমি আর দেখিতে পাইলে না।'' সেই অসামান্যা নারীর মাত্র পঁচিশ বছর বয়সে বেদনাতুর অকালমৃত্যুর শোক সম্ভবত কবির মধ্যে বাকি জীবন ধরে ক্রমাগত মৃত্যুআঘাতের তীক্ষ্ণতাকে প্রত্যাখ্যান করে যাওয়ার শক্তি সঞ্চারিত করে দিয়েছিলো। পরবর্তী মৃত্যুর মিছিল হয়তো তাঁকে ভিতর থেকে বিদীর্ণ করেছে, কিন্তু মৃত্যুরাখালের কাছে নত করতে পারেনি। শুধু ইন্দিরা দেবীর লেখা থেকে পাই, ''...নতুনকাকিমার মৃত্যু আমাদের যোড়াসাঁকোর বাল্যজীবনে প্রথম শোকের ছায়া ফেলে বলে মনে হয়। তখন আমরা ত বিশেষ কিছু বুঝতুম না। তবে রবিকাকাকে খুব বিমর্ষ হয়ে বসে থাকতে দেখতুম....''। 

''হে জগতের বিস্মৃত, আমার চিরস্মৃত,...এ সব লেখা যে আমি তোমার জন্য লিখিতেছি। পাছে তুমি আমার কণ্ঠস্বর ভুলিয়া যাও, অনন্তের পথে চলিতে চলিতে যখন দৈবাৎ তোমাতে আমাতে দেখা হইবে তখন পাছে তুমি আমাকে চিনিতে না পার, তাই প্রতিদিন তোমাকে স্মরণ করিয়া আমার এই কথাগুলি তোমাকে বলিতেছি, তুমি কি শুনিতেছ না।'' (পুষ্পাঞ্জলি)

এই লেখাটি কবির চব্বিশ বছর বয়সে লেখা। কিন্তু তার পরেও দীর্ঘ আশি বছরের যাত্রাপথে কবির বোধ হয় এই 'প্রতিদিন তোমাকে স্মরণ করিয়া' কৃত্যে কখনও ছেদ পড়েনি। এই নারীর স্মৃতি কবিকে দিয়ে এত বিপুল পরিমাণ সার্থক সৃষ্টি করিয়ে নিয়েছিলো যে আমাদের মতো ইতর রসগ্রাহিরা কাদম্বরী দেবীর প্রতি চিরকৃতজ্ঞ থাকি। তাঁর স্বল্পকালীন জীবন আর অনন্ত লোকোত্তর অস্তিত্ত্ব কবিকে সারা জীবন সৃজনশীলতার শ্রেয়ত্বে গরিমাময় করে রেখেছিলো।

একেবারে শেষ জীবনে এক স্নেহধন্যাকে কৌতুক করে কবি বলেছিলেন, ''নতুন বৌঠান চলে গিয়েছিলেন বলেই তাঁকে নিয়ে আজও গান বাঁধি। বেঁচে থাকলে হয়তো বিষয় নিয়ে মামলা করতুম''।

''দেখিলাম খান কয় পুরাতন চিঠি
স্নেহমুগ্ধ জীবনের চিণ্হ দু-চারিটি
স্মৃতির খেলেনা-কটি বহু যত্নভরে
গোপনে সঞ্চয় করি রেখেছিলে ঘরে । (স্মরণ)

কবিপত্নী মৃণালিনীর যে ঠিক কী ব্যাধি হয়েছিলো সে বিষয়ে কোনও নিশ্চিত তথ্য নেই। হরিচরণ বন্দোপাধ্যায় লিখেছেন, ''.... বিদ্যালয়ের শিক্ষাপদ্ধতি অক্ষুণ্ণভাবে রক্ষা করার নিমিত্ত মৃণালিনী দেবী কঠোর পরিশ্রম করিয়াছিলেন। ইহার তীব্র আঘাত তাঁহার অনভ্যস্ত শরীর সহ্য করিতে পারিল না। ফলে স্বাস্থ্যভঙ্গ দেখা দিল এবং ক্রমে সাংঘাতিক রোগে পরিণত হইল।'' রথীন্দ্রনাথের লেখায় পাই, ''... শান্তিনিকেতনে কয়েকমাস থাকার পর মায়ের শরীর খারাপ হতে থাকল। ... আমার এখন সন্দেহ হয় তাঁর অ্যাপেন্ডিসাইটিস হয়েছিল। তখন এ বিষয়ে বিশেষ জানা ছিলনা, অপারেশনের প্রণালীও আবিষ্কৃত হয়নি।'' প্রভাতকুমার হেমলতা ঠাকুরের কাছে শুনেছিলেন, ''...মৃণালিনী দেবী বোলপুরের মুন্সেফবাবুর বাড়িতে বর্ষাকালে কোনো নিমন্ত্রণ রক্ষায় গিয়াছিলেন। সেখানে পড়িয়া যান ও আঘাত পান, তখন তিনি অন্তঃস্বত্ত্বা।'' ১৯০২ সালের অক্টোবর মাসের শেষদিকে তাঁর অসুস্থতা খুব বেড়ে যায়। অ্যালোপ্যাথ ডাক্তারেরা অসুখ ধরতে না পারায় কবি বিখ্যাত হোমিওপ্যাথ চিকিৎসক প্রতাপ মজুমদার, ডি এন রায় প্রমুখের শরণ নিলেন, কিন্তু কোনো সুরাহা হলোনা। ইন্দিরা দেবী তো এমনও লিখেছেন, ''...কাকিমার শেষ অসুখে (রবিকা) এক হোমিওপ্যাথি ধরে রইলেন ও কোনো চিকিৎসা বদল করলেন না বলে কোনো কোনো বিশিষ্ট বন্ধুকে আক্ষেপ করতে শুনেছি।''

মীরা দেবীর স্মৃতিচারণে পড়েছি, মৃণালিনী দেবীকে রাখা হয়েছিলো কবির নিজস্ব লালবাড়ির দোতলায়। ''...সেবাড়িতে তখন বৈদ্যুতিক পাখা ছিল না, তাই একমাত্র তালপাতার পাখা দিয়ে বাতাস করা ছাড়া গতি ছিল না। ঐ বাতাসহীন ঘরে অসুস্থ শরীরে মা না জানি কত কষ্ট পেয়েছেন। কিন্তু বড়ো বৌঠান হেমলতা দেবীর কাছে শুনেছি যে বাবা মার পাশে বসে সারা রাত তালপাখা নিয়ে বাতাস করতেন।''

তার পরে অবস্থার ক্রম-অবনতি হতে থাকে। রথীন্দ্রনাথের স্মৃতি কথনে , ''...মৃত্যুর আগের দিন বাবা আমাকে মায়ের ঘরে নিয়ে গিয়ে শয্যাপার্শ্বে তাঁর কাছে বসতে বললেন। তখন তাঁর বাকরোধ হয়েছে। আমাকে দেখে চোখ দিয়ে কেবল নীরবে অশ্রুধারা বইতে লাগল। মায়ের সঙ্গে সেই আমার শেষ দেখা। আমাদের ভাইবোনদের সকলকে সে রাত্রে বাবা পুরোনো বাড়ির তেতলায় শুতে পাঠিয়ে দিলেন। একটি অনির্দিষ্ট আশঙ্কায় আমাদের সারা রাত জেগে কাটল। ভোরবেলা অন্ধকার থাকতে বারান্দায় গিয়ে লালবাড়ির দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলুম। সমস্ত বাড়িটা অন্ধকারে ঢাকা, নিস্তব্ধ, নিঝুম; কোনো সাড়াশব্দ নেই সেখানে। আমরা তখনি বুঝতে পারলুম আমাদের মা আর নেই, তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।'' 

তারপর কবির কাছে সমবেদনা জানাতে দীর্ঘ মানুষের সারি। সকলের সঙ্গে অসম্ভব ধৈর্য নিয়ে কথা বলে গেলেন। শেষে রথীন্দ্রকে ডেকে তাঁর হাতে মৃণালিনী দেবীর নিত্যব্যবহার্য চটিজুতোটি দিয়ে বললেন, '' এটা তোর কাছে রেখে দিস, তোকে দিলুম।'' এই কথা বলে তিনি নিজের ঘরে চলে গেলেন। 

হেমলতা দেবীর স্মৃতিকথায় আমরা পাই ,''রাত্রে আমার স্বামী (দ্বিপেন্দ্রনাথ) এসে বললেন, ''খুড়ির মৃত্যু হয়েছে, কাকামশাই একলা ছাদে চলে গেছেন, বারণ করেছেন কাউকে কাছে যেতে।'' প্রায় সারারাত কবি ছাদে পায়চারি করে কাটিয়েছেন শোনা গেল। কবির পিতা মহর্ষিদেব তখন জীবিত। পুত্রের পত্নীবিয়োগের সংবাদে তিনি বলেন, ''রবির জন্য আমি চিন্তা করিনা, লেখাপড়া নিজের রচনা নিয়ে সে দিন কাটাতে পারবে। ছোট ছেলেমেয়েগুলির জন্যই দুঃখ হয়।'' 

মাত্র ঊনত্রিশ বছর বয়স, উনিশ বছর দাম্পত্য জীবন, পাঁচটি সন্তান, কবির 'ভাই ছুটি' চলে গেলেন। সেই সময় ঘনিষ্ঠ লোকজন বারম্বার কবিকে মহাভারতের শান্তি পর্বের তাঁর এই প্রিয় শ্লোকটি পুনরাবৃত্তি করতে শুনেছে। ''সুখং বা যদি বা দুঃখং প্রিয়ং বা যদি ব্যপ্রিয়ম।/ প্রাপ্তং প্রাপ্তমুপাসীত হৃদয়েনাপরাজিতা''। 

মৃত্যু সম্বন্ধে তাঁর লিপিবদ্ধ ধারণার যে সব কথা উল্লেখিত হয়েছে, তার উৎস ব্যক্তিজীবনে তিনি কীভাবে বারম্বার মৃত্যুর হননঋতুকে সদানন্দ নিরাসক্তিতে গ্রহণ করেছিলেন, তার মধ্যেই ওতোপ্রোত রয়েছে। তার মধ্যে কিছু ইতিকথা তো আজ নব উপনিষদের মর্যাদায় গরীয়ান। 

১৯১৮ সালের গ্রীষ্মকালে তাঁর বড়ো মেয়ে বেলা ছিলেন রোগশয্যায়। থাকতেন তাঁর স্বামীগৃহ জোড়া গির্জার কাছে শরৎচন্দ্র চক্রবর্তীর বাড়িতে। কবি তখন জোড়াসাঁকোয়। মেয়ে'কে দেখতে প্রতিদিন সকালে সেই বাড়ির দোতলায় যা'ন। একদিন বাড়িতে ঢুকেই বেরিয়ে এলেন। সহযাত্রী প্রশ্ন করলেন, কী হলো? তিনি বললেন, ''নাহ, আর দোতলায় উঠলাম না। সে আর নেই, আমি পৌঁছোবার আগেই শেষ হয়ে গিয়েছে।''

জোড়াসাঁকোয় ফিরে কিছুক্ষণ তিনতলার ঘরে চুপ করে বসে রইলেন। তারপর বললেন, ''কিছুই তো করতে পারতুম না। অনেকদিন ধরেই জানি ও চলে যাবে। তবু রোজ সকালে গিয়ে ওর হাতখানি ধরে বসে থাকতুম। ছেলেবেলায় যেমন বলতো বাবা গল্প বলো, অসুখের সময়ও অনেক সময় তাই বলতো। যা মনে আসে কিছু বলে যেতুম। আজ তাও শেষ হয়ে গেলো।'' এতটুকু বলেই আবার শান্ত সমাহিত হয়ে বসে রইলেন।

সেদিন বিকেলে তাঁর নানা সামাজিক কাজ ছিলো। ঘনিষ্টজনেরা চাইলেন সে সব থেকে তাঁকে অব্যাহতি দিতে। কিন্তু কবি নিষেধ করলেন। বললেন, এরকম তো আগেও হয়েছে। তাঁর মেজো মেয়ে রানি'র চলে যাওয়ার গল্পটা জানতো কেউ কেউ। সেই সময়টাতে স্বদেশী আন্দোলন চলছিলো পুরো দমে। রাণী খুব অসুস্থ। আলমোড়া থেকে কবি তাঁকে নিয়ে ফিরে এসেছেন। নিজের হাতে অক্লান্ত শুশ্রূষা করতেন। পিতা নোহসি মন্ত্র শোনাতেন। রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী মশায় রোজ সন্ধেবেলা আসেন জাতীয় শিক্ষা পরিষদের ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করতে। যাবার সময় মেয়ের কুশলসংবাদ নিয়ে যান। সেদিনও যাবার সময় জানতে চাইলেন রাণী কেমন আছেন? কবি শুধু বললেন, ''সে মারা গিয়েছে''। রামেন্দ্রসুন্দর কিছুক্ষণ কবির মুখের দিকে চেয়ে ধীরে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেলেন। 

কবি দুই কন্যাকেই হারিয়েছিলেন যক্ষ্মারোগে। 

'' হে রুদ্র, তোমার দুঃখরূপ, তোমার মৃত্যুরূপ দেখিলে আমরা দুঃখ ও মৃত্যুর মোহ হইতে নিষ্কৃতি পাইয়া তোমাকেই লাভ করি।... তোমার সেই ভীষণ আবির্ভাবের সম্মুখে দাঁড়াইয়া যেন বলিতে পারি , আবিরাবীর্ম এধি, রুদ্র বত্তে দক্ষিণং মুখং তেন মাং পাহি নিত্যম।''

(মাঘ উৎসবের ভাষণ থেকে, ১৩১৪ সাল)

কবির ছোটো ছেলে শমীন্দ্র বেড়াতে গিয়েছিলেন মুঙ্গেরে, কবির এক বন্ধুর বাড়িতে। এগারো বছরের বালক, লোকে বলতো কনিষ্ঠ সন্তানটি কবির প্রিয়তম আত্মজ, সেখানে কলেরায় আক্রান্ত হন। কবির কাছে খবর এল শমীন্দ্র খুব অসুস্থ। তিনি পৌঁছে দেখলেন সে চলে গিয়েছে। তিনি তখন ব্যস্ত হয়ে পড়লেন গৃহকর্তা বন্ধুটির শোকসন্তাপ নিবারণ করতে। লোকে বুঝতেই পারলো না কার সন্তান গত হয়েছে। কবি ফিরে এলেন শান্তিনিকেতনে, একা। রেলস্টেশনে তাঁকে আনতে গিয়েছিলেন জগদানন্দ রায়। গোরুর গাড়ি করে তাঁরা ফেরার সময়ও জানতে পারেননি শমীন্দ্র কেন আসেননি। পরে জানতে পারলেন সে আর নেই। কবির বাহ্যিক ব্যবহারে কোনো বিচলন ছিলোনা। শান্তিনিকেতনে ফিরে কর্মব্যস্ততার মধ্যে তাঁর এক মুহূর্তও কোনও ছেদ পড়েনি। 

শমী গত হবার পর তাঁকে কেউ কখনও প্রকাশ্যে শোক করতে দেখেননি। কিন্তু অনেক বছর পরেও শমীর প্রসঙ্গ উঠলে তাঁর চোখ অশ্রুসজল হয়ে উঠতো। তাঁর তখন ষাট বছর বয়স পেরিয়ে গিয়েছে। একদিন প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ জোড়াসাঁকো বাড়িতে গিয়ে শোনেন কবি রীতিমতো সরবে কবিতা আবৃত্তি করে চলেছেন। তিনি একটু অবাক হলেন তিনি। কবি'কে একথা জানাতে তিনি একটু অপ্রতিভ হলেন। তার পর বললেন, ''একটু জ্বর হয়েছে কিনা, তাই মাথাটা একটু উত্তেজিত হয়েছে। শমীরও এরকম হতো। ওর মা যখন মারা যায় তখন ও খুব ছোটো। তখন থেকে ওকে আমি নিজের হাতে মানুষ করেছিলেম। ওর স্বভাবও ছিলো ঠিক আমার মতো। আমার মতই গান করতে পারতো আর কবিতা ভালোবাসতো। এক এক সময় দেখতুম চঞ্চল হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে কিংবা চেঁচিয়ে কবিতা আবৃত্তি করছে। এই রকম দেখলেই বুঝতুম ওর জ্বর এসেছে। ...শমী বলতো বাবা গল্প বলো। আমি এক একটা কবিতা লিখতুম আর ও মুখস্থ করে ফেলতো। সমস্ত শরীর মাথা ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে আবৃত্তি করত। ঠিক আমার নিজের ছেলেবেলার মতো। ছাতের কোণে কোণে ঘুরে বেড়াত। নিজের মনে কত রকম ছিল ওর খেলা। দেখতেও ছিল ঠিক আমার মতো।'' 

প্রশান্তচন্দ্র লক্ষ্য করলেন শমীর কথা বলতে বলতে কবির চোখ জলে ভরে এসেছে। ঊদ্ধৃত মাঘ উৎসবের ভাষণটি শমীর মৃত্যুর ঠিক দু'মাস পরের লেখা। 

''...ভোরবেলা উঠে এই জানালা দিয়ে তোমার গাছপালা বাগান দেখছি আর নিজেকে ওদের সঙ্গে মেলাবার চেষ্টা করছি। বর্ষায় ওদের চেহারা কেমন খুশি হয়ে উঠেছে। ওদের মনে কোথাও ভয় নেই। ওরা বেঁচে আছে এই ওদের আনন্দ। নিজেকে যখন বিশ্বপ্রকৃতির সঙ্গে মিলিয়ে দেখি তখন সে কী আরাম। আর কোনো ভয়ভাবনা মনকে পীড়া দেয়না। এই গাছপালার মতো-ই মন আনন্দে ভরে ওঠে,''

( রাণী মহলানবীশ'কে কবিঃ ১৯৩২ সালের অগস্ট মাস)

কবির তিন মেয়ের মধ্যে কনিষ্ঠা মীরাদেবীই শেষ পর্যন্ত তাঁর কাছে থাকতেন। পাঁচ সন্তানের মধ্যে তাঁর জীবনকালে তিনজনের দেহাবসান হয়েছিলো। মীরাদেবীর দাম্পত্যজীবন পরিপূর্ণতা পায়নি। কবি তাঁর এই কন্যাটির দুঃখযন্ত্রণার একান্ত শরিক ছিলেন চিরকাল। মীরাদেবীর একমাত্র ছেলে নীতিন্দ্রনাথ বা নীতু। বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য গিয়েছিলেন। কবির পৌত্র বা দৌহিত্র বলতে তিনিই ছিলেন একমাত্র উত্তরপুরুষ। দুঃখী মা'য়ের সন্তান এবং কবির প্রাণপ্রিয় এই মেধাবী, সুদর্শন যুবকটি ছিলেন সবার কাছে প্রেয়, স্নেহিত একটি মানুষ। বিলেতে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন গুরুতরভাবে। এন্ড্রুজ সাহেবের সঙ্গে মীরাদেবী যাত্রা করলেন সেদেশ থেকে ছেলেকে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে। একদিন ভোরবেলা কবি রানী মহলানবিশকে বললেন, যদিও এন্ড্রুজ সাহেব লিখেছেন নীতু ভালো আছেন কিন্তু তবু মন ভারাক্রান্ত রয়েছে। তারপর অনেকক্ষণ ধরে রাণীর সঙ্গে মৃত্যু প্রসঙ্গে তাঁর অনুভূতির কথা বর্ণনা করলেন। 

এইদিন সকালের সংবাদপত্রেই রয়টারের খবর, নীতু মারা গিয়েছেন। কিছুক্ষণ পরে রথীন্দ্রনাথ এলেন বরানগরের বাড়িতে। কবির কাছে গিয়ে বললেন, ''নীতুর খবর এসেছে।'' কবি প্রথমে ঠিক বুঝতে পারেননি। প্রশ্ন করলেন, ''কী, একটু ভালো?'' রথীন্দ্রনাথ বললেন, না, ভালো নয়। রথীকে মৌন থাকতে দেখে কবি বুঝতে পারলেন। স্তব্ধ হয়ে বসে থাকলেন, চোখ থেকে কয়েকফোঁটা জল গড়িয়ে পড়লো। আর কিছু নয়। 

তখন তিনি পুনশ্চের কবিতাগুলি লিখছিলেন। একটু পরে সম্বিত ফিরে পেলে 'পুকুরধারে' নামে কবিতাটি লেখা হলো। পরদিন শান্তিনিকেতন ফিরে গেলেন। তখন সেখানে বর্ষামঙ্গল উৎসবের আয়োজন চলেছে। কবির এই শোকসংবাদে বিচলিত আশ্রমিকেরা উৎসব বন্ধ রাখার প্রস্তাব করলেন। কিন্তু কবি রাজি হলেন না। নিজেও উৎসবে পূর্ণতঃ অংশগ্রহণ করলেন। মীরাদেবীকে লিখলেন, '' ...নীতুকে খুব ভালোবাসতুম, তাছাড়া তোর কথা ভেবে প্রকাণ্ড দুঃখ চেপে বসেছিলো বুকের মধ্যে। কিন্তু সর্বলোকের সামনে নিজের গভীরতম দুঃখকে ক্ষুদ্র করতে লজ্জা করে। ক্ষুদ্র হয় যখন সেই শোক, সহজ জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ...অনেকে বললে এবারে বর্ষামঙ্গল বন্ধ থাক আমার শোকের খাতিরে। আমি বললুম সে হতেই পারেনা। আমার শোকের দায় আমিই নেবো। ...আমার সব কাজকর্মই আমি সহজভাবে করে গেছি।...''

মীরাদেবীকে লেখা এই চিঠিতেই বাংলাভাষার অতিচর্চিত শ্রেষ্ঠ মৃত্যুসাহিত্যের স্তবকটি সংলগ্ন ছিলো। 

''...যে রাত্রে শমী গিয়েছিলো সেরাত্রে সমস্ত মন দিয়ে বলেছিলুম বিরাট বিশ্বসত্তার মধ্যে তার অবাধ গতি হোক, আমার শোক যেন তাকে একটুও পিছনে না টানে। তেমনি নীতুর চলে যাওয়ার কথা যখন শুনলুম তখন অনেকক্ষণ ধরে বারবার ক'রে বলেছি, আর তো আমার কোনো কর্তব্য নেই, কেবল কামনা করতে পারি এর পরে যে বিরাটের মধ্যে তার গতি সেখানে তার কল্যাণ হোক। ....শমী যেরাত্রে গেলো, তার পরের রাত্রে রেলে আসতে আসতে দেখলুম জ্যোৎস্নায় আকাশ ভেসে যাচ্ছে, কোথাও কিছু কম পড়ছে তার লক্ষণ নেই। মন বললে, কম পড়েনি- সমস্তর মধ্যে সবই রয়ে গেছে, আমিও তার মধ্যে। সমস্তের জন্যে আমার কাজও বাকি রইলো। যতদিন আছি সেই কাজের ধারা চলতে থাকবে। সাহস যেন থাকে, অবসাদ যেন না আসে, কোনওখানে কোনওসূত্র যেন ছিন্ন হয়ে না যায়। যা ঘটেছে, তা'কে যেন সহজে স্বীকার করি, যা কিছু রয়ে গেলো তাকেও যেন সম্পূর্ণ সহজ মনে স্বীকার করতে ত্রুটি না ঘটে। ( ২৮শে অগস্ট,১৯৩২) 

''দুঃসহ দুঃখের দিনে
অক্ষত অপরাজিত আত্মারে নিয়েছি আমি চিনে
আসন্ন মৃত্যুর ছায়া যেদিন করেছি অনুভব
সেদিন ভয়ের হাতে হয়নি দুর্বল পরাভব।
...আমি মৃত্যু চেয়ে বড়ো এই শেষ কথা বলে
যাবো আমি চলে।''

উনচল্লিশ সালের শেষ দিকে নাৎসি বাহিনী যখন নরওয়ে আক্রমণ করলো, কবি বললেন, ''অসুররা আবার নরওয়ের ঘাড়ে পড়লো। ওরা কাউকে বাদ দেবেনা। নরওয়ের লোকজনদের কথা মনে পড়ছে আর আমার অসহ্য লাগছে। তাঁদের যে কী হচ্ছে কে জানে।'' 

১৯৪০শের বর্ষার পর তিনি গিয়েছিলেন মংপু, মৈত্রেয়ী দেবীর কাছে। কিন্তু অত্যন্ত অসুস্থ হয়ে পড়ায় সেপ্টেম্বর মাসে তাঁকে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় কালিম্পঙ থেকে কলকাতায় ফিরিয়ে আনা হয়। বেশ কিছুদিন চিকিৎসার পর একটু সামলে ওঠেন, কিন্তু অতীব দুর্বল হয়ে পড়েন। এ রকম একটা সময়ে প্রশান্তচন্দ্র খবর পেলেন কবি তাঁকে বারবার ডেকে পাঠিয়েছেন, জরুরি কথা আছে। নানা কাজে ব্যস্ত থাকায় প্রশান্তচন্দ্রের পৌঁছোতে একটু বিলম্ব হ'লো। তিনি কবির কাছে যাবার পর দেখলেন কবি বিশেষ উত্তেজিত এবং ঐরকম দুর্বল শরীর এতো উত্তেজনার ভার নিতে পারছে না। প্রশান্তচন্দ্রকে দেখেই কবি বললেন, ''অনেকক্ষণ ধরে তোমাকে ডাকছি, চীনদেশের লোকেরা যে যুদ্ধ করছে...'' বলতে বলতে কথা জড়িয়ে এল। একটু থেমে সম্বিত ফিরে পেয়ে আবার বললেন, '' এত দেরি করলে কেন? যা বলতে চাইছি বলতে পারছিনে। একটু আগে কথাটা স্পষ্ট ছিলো, এখন ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে...'' প্রশান্তচন্দ্র নীরবে অপেক্ষা করতে লাগলেন। খানিকটা পরে থেমে থেমে দম নিয়ে তিনি বলতে লাগলেন, ''চীনদেশের লোকেরা চিরকাল যুদ্ধ করাকে বর্বরতা মনে করেছে। কিন্তু আজ বাধ্য হয়েছে লড়াই করতে, দানবরা ওকে আক্রমণ করেছে বলে। এতেই ওদের গৌরব। ওরা যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়েছে এই হলো বড়ো কথা। ওরা যুদ্ধে হেরে গেলেও ওদের লজ্জা নেই। ওরা যে অত্যাচার সহ্য করেনি, তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে, এতেই ওরা অমর হয়ে থাকবে।'' আশি বছর বয়সে, বিছানায় উঠে বসার ক্ষমতা নেই, সেই অবস্থায় অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে তিনি আকুল হয়ে পড়েন। 

রাশিয়া'কে নিয়ে তাঁর মনে ছিলো বিপুল আশ্বাস। তাঁদের দেশ ঘুরে এসে কবির মনে গভীর আস্থা জন্মেছিলো। জার্মানি যখন রাশিয়া আক্রমণ করলো তখন তিনি প্রায় শেষ শয্যায়। প্রতিদিন যুদ্ধের খবর নিতেন। বারবার বলতেন, এই যুদ্ধে যদি রাশিয়া জেতে, তবে তিনি খুব খুশি হবেন। সকালবেলা খবর কাগজ এলে সবার আগে দেখতেন ফ্রন্টের খবর কী। রাশিয়ার জন্য কোনও খারাপ খবর থাকলে বিষণ্ণ হয়ে যেতেন, কাগজ ছুঁড়ে ফেলে দিতেন। 

যেদিন তাঁর অপারেশন হবে সেদিন সকালে বললেন, ''রাশিয়ার খবর বলো''। উত্তর এল, ''একটু ভালো মনে হচ্ছে। হয়তো একটু ঠেকিয়েছে।'' কবির মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো, ''হবেনা? ওদেরই তো হবে। পারবে। ওরাই পারবে।'' রোগকষ্টের ব্যক্তিগত সংলাপের বাইরে সম্ভবত এই ছিলো তাঁর শেষ কথা। 

এর তিন মাস আগেই তিনি লিখেছেন, '' ...আজ পারের দিকে যাত্রা করেছি--পিছনের ঘাটে কী দেখে এলুম, কী রেখে এলুম, ইতিহাসের কী অকিঞ্চিৎকর উচ্ছিষ্ট সভ্যতাভিমানের পরিকীর্ণ ভগ্নস্তূপ। কিন্তু মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ, সে বিশ্বাস শেষ পর্যন্ত রক্ষা করবো। আশা করবো মহাপ্রলয়ের পরে বৈরাগ্যের মেঘমুক্ত আকাশে ইতিহাসের একটি নির্মল আত্মপ্রকাশ হয়তো আরম্ভ হবে এই পূর্বাচলের সূর্যোদয়ের দিগন্ত থেকে। আর একদিন অপরাজিত মানুষ নিজের জয়যাত্রার অভিযানে সকল বাধা অতিক্রম করে অগ্রসর হবে তার মহৎ মর্যাদা ফিরে পাবার পথে।'' 

মৃত্যুরাখাল আবার ফিরে গেলো। সদানন্দের চ্যালেঞ্জ ছিলো সে মৃত্যু চেয়ে বড়ো। আনন্দসমুদ্র পেরিয়ে সদানন্দের মাটির রাজপ্রাসাদ।রাখালের পক্ষে সমুদ্র পেরোনো আর সম্ভব হলোনা। মাঝে মাঝে এই সব পরাভব তার ভালো-ই লাগে। তারও তো কখনও, কোনও দুর্লভ মূহুর্তে ভালোবাসতে ইচ্ছে করে। 

(পূর্বপ্রকাশিত)

0 comments: