1

ছোটগল্প - শ্রীপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়

Posted in


ছোটগল্প


রসিক
শ্রীপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায় 


সাতডিহি গ্রাম থেকে নাইট শো সেরে ফিরছিল কমলা। ট্রেকারে গাদাগাদি যাত্রীর মধ্যে গা ঘেঁষাঘেষি করে কমলার পাশে বসে রসিক ধনঞ্জয় আর পেছনে সঙ্গতের বাজনদাররা। হারমোনিয়াম গলায় কানাই নেমে গেছে পথে। সেখান থেকে আদ্রা যাবে একটা যাত্রা দলের সাথে মহড়ায় বসতে। আদ্রার কাছেই এক গ্রামে তার বাড়ি। কমলার ঘর বল, সংসার বল, সবই রসিক ধনঞ্জেয়ের দান। ঝুমুরের মরশুম ছাড়াও বাজনদাররা খেপ কাজের সুযোগ পায়। কিন্তু প্রধান শিল্পী ‘নাচনী’র নাচের বায়না না থাকলে নাচ নিয়ে পড়ে থাকার উপায় নেই। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ধান ভানা, ধান-চাল সেদ্ধ করা, খড় কুচোনো, গরুর জাবনা তৈরি করা, উঠোন নিকোনো, ঘুঁটে দেওয়া – কাজের অভাব? ধনঞ্জয়ের বৌ কমলাকে ডাকে “ঢেমনি” বলে। খাবার দেয় ছুঁড়ে। তার নিড়ানো বা ভানা চাল অচ্ছুৎ নয়, বাগানের সব্জি অচ্ছুৎ নয়; শুধু কমলা অস্পৃশ্য। হাড় ভাঙা খাটনির পর রাতে দু চোখের পাতা এক হয়ে এলে রসিক ধনার স্পর্শে জেগে উঠতে হয় প্রায় দিন। রক্ষিতা নাচনীর দিনের বেলা ছায়া মাড়ানোও চলে না, কথা বলাও পাপ। কেবল অনুষ্ঠান থাকলে ছাড় থাকে। কিন্তু রাত্রিটা আর পাপের থেকে না। তখন রসিককে খুশি করাই তার এক মাত্র কাজ। শরীর খারাপের ওজরটাও ধোপে টেঁকে না।

কমলার এবছরের মতো নাচের আসর শেষ। এখন ধান সেদ্ধ করার সময়। আরও হাজারটা কাজ। ধনার বৌ অতসী ওকে দেখলে এক ঘটি জলও গড়িয়ে খায় না। ভুল হলো। জল ছোঁয়া তো বারণ। হেঁসেলে ঢোকাও। কমলার কাজ উঠোন থেকে শুরু হয়ে সারা গাঁয়ে ছড়িয়ে আছে। অন্যের বাড়িও খেটে আসতে হয়। মজুরিটা ধনার সংসরের প্রাপ্য। ট্রেকারে চাপাচাপি করে আসতে আসতে নিজের বারমাস্যার কথাই ভাবছিল কমলা। এই যে ওর গায়ে গা লাগিয়ে যাত্রীরা বসে আছে; তারা বাড়ি ফিরেই স্নান করবে নিশ্চই। গাড়িটা হঠাৎ জুরিডির হাটে থেমে গেল। সামনে রাস্তা আটকে অনেক লোক। তা হাটবারে ভিড় তো হবেই। কিন্তু এ তো জটলা বেঁধেছে। কিছু একটা হয়েছে। চড়নদাররা একে একে নামল। কমলাও। ওর ছোঁয়া বাঁচাতে জটলাটা একটু ফাঁক হয়ে গেল। হাটের প্রকাণ্ড অর্জুন গাছটার নীচে বসে আছে এক অশীতিপর বৃদ্ধা। সামনে ভিক্ষাপাত্র। নড়ার ক্ষমতা নেই। শরীর থর্‌থর করে কাঁপছে। “ভিক্ষা দাও মাগো বাবারা” নয়, মুখ থেকে অস্ফুটে বেরিয়ে আসছিল “জল জল..”।

কেউ কাছে যাচ্ছে না। সামনে চায়ের দোকানে জগে জগে পানীয় জল রাখা। কিন্তু কারও গ্রাহ্য নেই। কমলা জনতার জাত চেনে। সে বলল, “দাঁড়াও বিজলি মাসি, আমি জল লিয়ে আইসছি।” ট্রেকারে ফিরে নিজেদের সামগ্রী ঠাসা থলেতে একাধিক বোতল। শালারা কোনটায় জল, আর কোনটায় মাল রেখেছে বোঝা দায়। ভাগ্যিস নিজের ব্যাগে একটা জলের বোতল রাস্তার কল থেকে ভরে ঢুকিয়েছিল। বোতল হাতে ফিরে এসে দেখে ভিড় পাতলা হচ্ছে। নানারকম মন্তব্য –“পাপের জীবন”, “এমনটাই হবার ছিল”। বিজলীবালা গাছের তলায় নেতিয়ে পড়ে আছে। লিকলিকে শরীরটাকে তার নোংরা পুঁটলি থেকে এক নজরে আলাদা করে চেনা যাচ্ছে না।

শেষ সময়টা তৃষ্ণা নিয়ে গেল মানুষটা? কমলার বোতলের জল খরচ হলোনা। চোখ জলে ভরে উঠল। ধনঞ্জয় এসে তাড়া লাগালো, “কী দেখছিস কী? চল। মেলা বেলা হইল”।

“বিজলিমাসি কত সোন্দর দেইখতে ছিল। কত বড় মাইনষে তার নাচ দেইখে শাড়িতে টাকা লাগায়েন দিত। মরার আগে এক ফোঁটা জলও পেইলেক নাই? আমি তো জল জল শুনেই দৌড় লাগায়েনছি। কিন্তুক হাটের লোকে তো আগে থাইকতে শুইনছে। উয়ারা কেউ জলটুকু দিলেক না?”

“খানকির এমনই গতি হয়। ইবার ডোম আইসবেক, খবর করা হঁইছে। আমরা ভালে কী কইরব? চল”।

“খানকি বইলছ কাকে? উ নাচনী ছিলেক। গুণী শিল্পী, আমার পারা। গরমেন্ট চাদর দিলেক, সাট্টিফিকেট দিলেক, পেরাইজে টাকাও দিলেক, দেখো নাই?”
“গুণী শিল্পী-“। ভেংচি কাটল ধনঞ্জয়। “চল”।
“মাসির কাছে কত কিছু শিখছি। শেষ সময়টা টুকদু থাইকতে দাও”।
“গাড়িটো কি তুর বাপের? সবাই কি তুর পারা কামকাজ ফেইলে টাইম কাবার কইরবে? কী কইরবি দেইখে? ঐ দেখ মাতলা ডোম চলে এইসছে”।

মাতলা বিজলীবালার পায়ে আলগোছে দড়ির ফাঁস দিল। তারপর টেনে হিঁচড়ে নিয়ে চলল শ্মশানের কাছে ভাগাড়ে। বিজলীর ছেঁড়া বসন রাস্তায় আটকে আটকে লুটিয়ে চলল। মাথার চুল ধূলো ঝাঁটাল। পুঁটলির চাল ছড়িয়ে পড়ল পথে। আহা! অমন করে খরখরে মোরামের রাস্তায় টানতে আছে? অবশ্য বিজলিমাসি আর ব্যথা পাচ্ছে না। কিন্তু নিজের ভবিতব্য দেখে শিউরে উঠল কমলা। নাঃ, আর কিছু দেখার নেই। এরপর শ্মশান ভাগাড়ের শেয়াল, কুকুর, শকুন..!

বাড়ির দরজায় জোরে জোরে শেকলের বাড়ি মারল ধনঞ্জয়। মেয়ে টুসু এসে দরজা খুলে সরে দাঁড়াল। অতসী উঠোনে কাপড় মেলছিল। স্বামীকে আহ্বানের সঙ্গে সঙ্গে সাবধানও করে দিল, “দেইখো। কাচা কাপড়গুলান ছুয়াৎ না যায়। আগে গোবর ছুঁয়ে ডুব দিয়ে ঘরে ঢুইকবে”।

কমলাকে যেন দেখতেই পেল না। সে নিজের ঘুপচি ঘরে ঢুকে একটা বালতি মগ নিয়ে এসে অপেক্ষা করতে লাগল। সবাই চলে গেলে টিউব কলের জল নিয়ে স্নান করবে। জল নিয়ে কলটা ধুয়ে দিতে হবে। তার স্নানের জায়গাও আলাদা। কানা গরুর ভিনু বাথান। এদিকে পেটটা টিস্‌টিস্‌ করছে। এ বাড়িতে সেপটিক ট্যাঙ্ক আছে। গত বছর খাটা পায়খানার পরিবর্তে বসেছে। কিন্তু সেখানে কমলার ঢোকা মানা। তাকে সেই আগের মতোই এই দিনে দুপুরেও মাঠ থেকে কাজ সেরে ফিরতে হবে। সেসব না চুকিয়ে স্নান করা বৃথা। দু-দুবার কাপড় কাচতে হবে। আচার বিচার সব মেনে স্নান করলেও তার অস্পৃশ্যতা দূর হবে না। অতসীবৌদির কাছে কলাই করা থালা নিয়ে দাঁড়ালে সেই ছুঁড়েই খাবার দেবে। শুধু অতসী নয়, গ্রামের বিয়ে-শাদিতে যখন চেয়ার টেবিল পেতে পংক্তিভোজন হয়, তখনও কমলাদের মাটিতে বসিয়ে ছুঁড়ে ছুঁড়েই খাবার দেওয়া হয়। মেয়ে বিউটি তো নাচনী নয়, তবু তাকেও মায়ের পাশে অচ্ছুৎ হয়ে বসে থাকতে হয়। মানে লাগার জো নেই। নেমন্তন্ন থাকলে বাড়িতে মা মেয়ের নিজেদের ভাত ফুটিয়ে খরচ করা চলবে না। 

ঝুমুর সেরে ‘বাড়ি’ ফিরে যেন চোর হয়ে থাকতে হয়। অতসী এমনিতেই তাকে নিজের ছেলে মেয়ের সামনেও “খানকি, ছেনাল” ইত্যাদি বলতে ছাড়ে না। নাচের আসর থেকে ফিরলে তার মেজাজ যেন আরও চড়ে থাকে। কদিনের জন্য স্বামী এই ঢেমনির সঙ্গে ঢলাঢলি করেছে না? যতক্ষণ আসর ততক্ষণ হৈচৈ। তারপর ‘সোহাগ চাঁদ’ থেকে ঘুঁটে কুড়ুনি।

বাড়ি ফিরে মেয়ের খোঁজ করলেও রাগ রসিক দম্পতির। তার মেয়েকে কি অতসী না খাইয়ে রেখেছে, না বেচে দিয়েছে? বরং নাচনীর আবদার রেখে তাকে গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি করা হয়েছে। দুপুরের মিড ডে মিল ছাড়া শিক্ষা কী পায় বলা মুশকিল, তবে শাসন পায় পর্যাপ্ত। মেয়েটাকে গর্ভে মেরে ফেলার চেষ্টা কম করেনি ধনা। কিন্তু সব বিষ হজম করে কেমন নির্লজ্জের মতো জন্ম নিল। আর যাতে না হয়, সে ব্যবস্থা পাকা করে দিয়েছে রসিক মেয়েটা জন্মানোর পরই। কিন্তু ঐ এক মেয়ের জন্যই ঘুঙুরজোড়া পায়ের বেড়ি হয়ে গেছে। অবশ্য যেসব নাচনীর সন্তান নেই, তাদেরই বা মুক্তি পেতে দেখল কোথায়? পঞ্চমীর কথা কে না জানে?
স্নানের পর থেকেই চোখে ঢুল আসছিল। পেটে ভাত পড়ার পর আর বসে থাকা যাচ্ছে না। মায়ের এঁটো মেঝে গোবরজলে বিউটিই নিকিয়ে দিল। “শুতে চল মা। দুপুরটো টুকদু জিরায়েঁ লাও”।

অতসীর হুংকারে তন্দ্রা ছুটে গেল। “রাতভর ঢলানি কইরে আসছিস। কামকাজ কুছু তো করার নাম নাই। মুড়ির চাল সিজাগে”।

কমলা চাল সেদ্ধ করে শুকিয়ে তৈরি করে রাখলে অতসী ভাজবে। সেই মুড়ি সংসারে উদ্বৃত্ত হলে পাড়ায় বিকোয় না, প্যাকেটবন্দি হয়ে চলে যায় শহরে। আয় মন্দ না। ‘বর্ধমানের মিষ্টি মুড়ি’ শুধু বর্ধমানেই তৈরি হয় না। ঘুম চোখে দুপুরের কড়া রোদ পিঠে নিয়ে গনগনে আঁচের সামনে বসল কমলা। বিউটি মায়ের সঙ্গে থাকলেও এসব কাজ ওকে করতে দিতে চায় না কমলা।

মুকুন্দ ঘোষের ঘর ছাইবার কাজ করতে গিয়ে সরকারি ‘স্বয়ম্ভর’ যোজনা, একশো দিনের কাজ এসব তথ্য কানে এল। ধনাদের লুকিয়ে সেই কাজের এক ফাঁকে ‘স্বয়ম্ভর’ যোজনায় কাজ খুঁজতে গেল। কমলার ভোটার কার্ড, বিপিএল কার্ড সবই আছে। এক মাতব্বর বলল, “তুঁই নাচনী বটিস না? ধনা সর্দারের? ইখানে ক্যানে? যা ঢলানি কইরে রোজগার করগে যা। ইটো গেরামের গরীব বউ বিটিদের জইন্য”। সরকারী নির্দেশের ব্যাখ্যা ও রূপায়ণ সরকারী কর্মীদের জিম্মায়। সুতরাং মুখ চূন করে ফিরে আসতে হলো।

মাঝখান থেকে ধনঞ্জয়ের কানে গেল কথাটা। দরজা ঠেলে স্বামী উঠোনে পা রাখা মাত্র অতসী আবার সাতকাহন শোনাল। কমলার চুলের মুঠি ধরে উঠোনে ফেলে কিল, চড়, লাথি কোনওটাই বাদ রাখল না। বিউটি ভাগ্যিস এখনও স্কুল থেকে ফেরেনি। “খান্‌কির শখ কত। আমি কি তুকে পুষছি নাই?”

কে কাকে পোষে? নাচনীর রোজগারেই রসিকের সংসার, বৌ-বাচ্চার ভাত কাপড় থেকে রসিকের নেশার চোলাই। ঝুমুর নাচের জলসা থেকেই রসিকপত্নীর নাকে সোনার নথ। আর নাচনী গায়ে নকল গয়না ও মুখে সস্তার মেকআপ মেখে ঘুরে ঘুরে নাচে। নাগোরের প্রেম বিরহের আখ্যান শোনায় গানে গানে। কমলার বাঁধা গানগুলিও নিজের নামে চালায় ধনঞ্জয়। কমলা মুখ্যু মেয়েমানুষ। সে কি গান বাঁধতে পারে? সে শুধু নাচবে আর গাইবে। আর রাতে ‘প্রতিপালক’ রসিকের দেহের তলায় পিষ্ট হবে।

“অবেলায় ছুয়াৎ কইরলে? কাপড় ছেইড়ে ঘরে ঢুইকবে”।
অবেলা। তাই তো। এখনও ধনার কমলার ঘরে ঢোকার সময় হয়নি। ধনা টিউব কলের তলায় বসে বলল, “ফের যদি বেচাল দেখি, তো জ্যান্ত কুত্তা দিয়ে খাওয়াব, মরা তক অপেক্ষা কইরব না। আর তুর বিটিটোকে –.”

বিজলিমাসির শক্ত হয়ে যাওয়া মরদেহ শেয়াল, কুকুরে ছিঁড়ে খাচ্ছে কল্পনা করেই এ কদিন রাতে ঘুম হয়নি কমলার। আর তাকে জ্যান্ত...? আর তার মেয়েকে নিয়ে কী করবে ভগবানও জানে না। “ইয়ারা সব পারে”।

মারের ক্ষতিপূরণ হিসাবে সন্ধ্যেবেলায় কোনও কাজ করতে হলো না। তবে রাতের আহারটাও বাজেয়াপ্ত হলো। বিউটিও অতসীমামির ভয়ে মাকে খাবার দিতে পারল না। কমলা একবার কোনওরকমে ছেঁচড়ে ছেঁচড়ে ঘরের বাইরে নালীতে গিয়ে ছোট বাইরে সেরে ফিরল। খাটে ওঠারও ক্ষমতা নেই। মেঝেতেই শুয়ে পড়ল। মুখের কষে রক্ত মোছার জন্য বিউটি মাকে জল দিয়েছে; ঐ জলই সামান্য পান করেছে। হাত পাও ধুয়েছে। মেয়েটা দুপুরে মার কাছে থাকলেও রাতে দালানে শোয়।

এ রাতে তাড়াতাড়ি ঢুকল ধনা। “খুব বেদনা কইরছে?”

উত্তর দিল না কমলা।

“আমার কি তুর গায়ে হাত তুইলতে মন চায় রে? তুই আমার সোহাগী চাঁদ। দিকে দিকে তুর কত নামডাক ছড়াইনছে। ইয়াতে তুঁই খুশি লোস? বিডিও অফিস কিসকে গেঁইছিলি। পালি কুছু? উয়ারা অপমান কইরে তাড়ায়েন দিলেক না? তুকে ভালাবুরা বইললে আমাকেও বাজে ইটো বুঝিস না? তুকে কি আমি খারাপ রেইখেছি? তুর বিটিও পড়ালিখা শিখছে আমার ছিলাগুলার সাথে”। কমলাকে টেনে বিছানায় তোলে ধনা।

“আমার বিটি তুমার বিটি লয়?” বলতে সাহস হলো না। বলল, “সারা শরীল চিড়বিড়াইচ্ছে। আজ রেইতে খেমা দাও। মারার সময় খেয়াল থাকে না। আমি তো অচ্ছুৎ বটি। মইরলে আগুনটুকু পাব না”।

“আয় তুর গায়ে হাত বুলায়েন দিই। বোরোলিন লাগায়েন দুবো? টুসুর মাকে বইলব কাল চূন-হলুদ কইরে দিতে। বেদনা কুথায়?”

“আর সোহাগ কাড়াতে হবেক নাই। সারা দিন তুমার সংসারের লেইগে জিউকে জামিন দিয়ে খাটি। সন্‌ঝায় মার খাই। রেইতে ঘুমাতে তো দিবে”।

“শালি ভালো কথার বিটিছিলা লয়”। ধনা কমলার বুকের কাপড় ব্লাউজ সরিয়ে কামড় বসাল। ভয়ে জোরে কাতরোক্তি করার সাহস হলো না কমলার। ধনা দুহাত দিয়ে শাড়ি-সায়া তুলে কোমরের কাছে গোছ করে দিল। “ইখানটোতে তো বেদনা নাই”।

বিয়ালা বৌ না হয়েও ঘর গেরস্থালির কাজ, ঝুমুর নাচ আর সহবাস মিলে রসিককে ভালোবাসে কিনা কমলা নাচনী ঠিক ঠাওর করতে পারে না। কিন্তু অতসীর কাছে দিবারাত্রি দুর্ব্যবহার পেয়ে এমন এক অলিখিত প্রতিদ্বন্দিতা জন্মেছে, যে ধনা বৌয়ের বদলে কমলার ঘরে রাত্রিবাস করলে এক রকম আনন্দ হয়। শরীরের আনন্দ নয়, হিংসুটেকে জ্বালাতে পারার আনন্দ। যেসব রাতে শরীর সুস্থ থাকলেও রসিক ওর ঘরে আসে না, সেসব রাতগুলো ফাঁকাও লাগে। তাছাড়া বাপ হলেও রসিকের নজরটা ভালো নয়। দালানে মেয়েটা একা শোয়। ধনা কমলার কাছে না এলেই ভয় ভয় করে।

বহুবার মেয়েকে নিয়ে পালানোর কথা ভেবেছে। কিন্তু পঞ্চমীর দশা শুনে সে সাহস হয় না। পঞ্চমী পালিয়ে গিয়ে স্টেশনে এক মহিলার মিষ্টি কথায় ভুলে তার অনুগামী হয়েছিল। মহিলা নিজের বাড়িতে কাজ করাবে বলে কলকাতা নিয়ে যায় তাকে। পঞ্চমী এখন সোনাগাছি, হাড়কাটা গলি থেকে হাত বদল হয়ে শোনা যায় মুম্বাইতে। কেউ বলে দুবাইয়ে চালান হয়ে গেছে। ধনঞ্জয় মারধোর করলেও কমলার দেহে একাই প্রবেশ করে। আদর করে বুকে টেনে নিলে বহুব্যবহৃত শরীরের মাঝেমধ্যে শিহরণ জাগে। পঞ্চমীর মতো নিত্য-নতুন জানোয়ারদের থুতু চাটতে হয় না। নিজের চেয়েও বেশি ভয় মেয়ে বিউটির জন্য। হারামজাদী কেন যে জন্মাতে গেল? নাচনীর ছেলেকেই স্কুলে ভর্তি নিতে চায় না, সেখানে এক দিদিমণির দয়ায় বিউটিকে যে ভর্তি নিয়েছে এই ঢের। শুধু মায়ের পরিচয়েও যে সন্তান শিক্ষার সুযোগ পেতে পারে, তা নিয়ে অনেক তর্ক করতে হয়েছে দিদিমণিকে। অবশ্য এর জন্য ধনা আর অতসীর পায়ে পড়তেও কসুর করেনি কমলা। বিউটিকে কিছুতেই নাচনী হতে দেবে না। এত করেও কি শেষ রক্ষা হবে? চতুর্থ শ্রেণী পাস করলেও কি উচ্চ বিদ্যালয়ে ঢোকার সুযোগ পাবে? টুসু ফেল করে তার ছোট ভাই তপনের সাথে তৃতীয় শ্রেণীতে। বিউটি ক্লাস ফোর। স্কুল যাওয়ার সময় অচ্ছুৎ নাচনীকন্যা মণিবের পুত্র কন্যার ব্যাগ বইতে বইতে তফাতে পিছু পিছু হাঁটে, কারণে অকারণে শাস্তি পায়। তবু টুসুর চেয়ে ভালো ফল করে বলে পরীক্ষার রেজাল্ট বেরোলেই অতসী ঝাঁটা হাতে কথা বলে। ওদিকে ঐ দিদিমণি ছাড়া বেশির ভাগ মাস্টারদের হাতে তো বেত মজুতই থাকে। তবে পরীক্ষার খাতাতে সম্ভবত কারচুপি করে না।

একবার কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরে মায়ের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মেয়েটা। “মা আমি আর হুস্কুলে যাব না। উয়ারা বলে তুর মা নাংটি বটে। নাচনী আর নাংটি কি একঅই কথা মা? পড়া না পাইরলে মাস্টার মারে, সাজা দেয়। বুইঝতে চাইলে বুঝায় না। বলে তুঁই কী কইরবি পড়ালিখা শিখে?” তারপরেও মেয়েটা কী করে পাস দিচ্ছে কে জানে?

“এই মাগী, চার বেলা গিলে উনুনধারে বসে ঘুমাচ্ছিস? ভাগ্যে উনোনটো নিভে গেঁইছে, নইলে সব চাল লষ্ট হইত”। অতসীর ধমকে ধড়মড় করে উঠে বসে কমলা। দুপুরের সূর্য গড়িয়ে পশ্চিমের চালের ওপাশে চলে গেছে। এখন ছায়া ছায়া বিকেল। কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল খেয়াল নেই।

“কুছু হবেক নাই। চালটো ঠিকঠাক সিজাইনছে। দালানে তুলে রাখি?”

“কুছু হবেক নাই –সব জেইনে বইসে আছে। যা আর মড়া আগুলতে হবেক নাই। রেইখে দে? আর শুন, আজ যদি টুসুর বাপ রেইতে তুর ঘরকে গেইছে তো সকালে তুর একদিন কি আমার একদিন। কদিন আগে লাইচতে গিয়ে খুব তো ফুর্তি মেইরে এলি। তারপরেও নাংটা মাগীর রস যায় না”।

“আমি কি তাকে ডাকি? উয়ার যখন ইচ্ছা আমাকে মারে, আর যখন ইচ্ছা ঘুম ভাঙায়। আমার আজ শরীল-গতিক ভাল লয়। তুমার সোয়ামীকে তুমি সামাল দাও”।

“আমি কী কইরব তুর কাছে শিখব নকি?”

চুপচাপ আধসেদ্ধ চাল ভরা প্রকাণ্ড মাটির মালসা দালানে তুলে ঢাকা দিয়ে রাখল। এই লাল চাল ভেজেই মুড়ি হবে। ভাজার আগে নুন সোডা দিয়ে ভেজা চাল মাটির মালসায় নাড়াচাড়া করে নিতে হয়। তারপর রোদে শুকোতে হয়। সেই চাল শুকোলে মাটির খোলায় বালি গরম করে ছেড়ে নারকেল কাঠি দিয়ে নাড়লেই চড়বড়িয়ে মুড়ি। বাড়ির জন্য মুড়িটা অতসী নিজে ভাজে। কিন্তু ব্যবসার মুড়ি ভাজতে হয় কমলাকেই। যারা কিনবে তারা কি জানছে সেটা কে ভেজেছে – সতীলক্ষ্মী না ছেনাল? কমলার ভেতরটা ঢিপ্‌ঢিপ্ করছে। কাল বাচ্চাগুলোর রেজাল্ট।

যা আশা আর আশঙ্কা ছিল, তাই ঘটল। বিউটি উৎরে গেছে, তপন টেনেটুনে পাস, টুসু কেলাস থিরি ফেল। আর কথায় গায়ের জ্বালা মেটার নয়। বিউটিকে বেড়াল ঠেঙানো লাঠি দিয়ে পেটাল টুসুর মা। “বারো ভাতারির বিটি, আমাদের খাবি আমাদের পরবি, আর আমার ব্যাটাবিটিকে গুণতুক কইরে ফেল করাবি? আজই তুকে দিয়ে দিব দাসু সর্দারের হাতে। মায়ের পারা কাপড় তুলে রোজগার কইরবি।”

“কার টাকা কে খায়?” বলতে গিয়েও কথাটা গিলে ফেলল। অতসীর পায়ের কাছে মাটিতে পড়ে বলল, “বৌদিদি গো, তুমার ফাই-ফরমাস খেইটে, তুমার ছিলামিয়ার বইপত্তর বয়ে মিয়াটো আমার পেরাইমারি পাস দিছে। উয়াকে ছাড়ান দাও না কেনে। তুমারই মরদের কইন্যা। তুমারও বিটির পারা। আজ মাইরছ, মেইরে লাও। কিন্তু উয়াকে আর পাঁকে নামাও না। আমি তো তুমাদের সংসার টাইনছি। যতদিন গতর চইলবে ততদিন জিউকে জামিন দিয়ে কইরব। আমি পাপী বটি। আমাকে শাস্তি দাও। আমার বিউটিকে টুকদু লিখাপড়া শিখতে দাও। উয়ার খরচ আমি যোগাব”।

“কী? তুই আমাদের সংসার টাইনছিস? যা না, বিরা আমার বাড়ি থিক্যা। দেইখব কোন ভাতারে তুকে লেয়। আমার সোয়ামী আসরা না দিলে, নাচগান না শিখালে তুকে কে পুঁইছত”।

“আমি ও কথা বলি নাই। আমি তুমাদের দাসী-বাঁদী হঁইয়ে থাইকব। আমার বিটিটোকে হাই হুস্কুলে অ্যাডমিট হইতে দাও”।

“এ যে বইসতে পেইলে শুতে চায়। হাইস কুলে অ্যাডমিট? ধনঞ্জয় সর্দারের বিটি ফেল মাইরবে, আর নাচনীর বিটি উয়াকে টপকায়েঁ বড় হুস্কুলে যাবে?” 

অনেক কান্নাকাটি করে রসিকপত্নীর না হলেও, বাপ রসিকের অনুমতি ও প্রতিশ্রুতি আদায় করা গেছে। হাইস্কুল তিন কিলোমিটার দূরে উরমা হাট ছাড়িয়ে। মেয়েকে উচ্চতর শিক্ষালাভের সুযোগ দেওয়া হবে বলে কমলা উৎসাহে দ্বিগুণ খাটে, অতসীকে চারগুণ তোয়াজ করে। ধনঞ্জয় যে আদৌ রাজি হবে, তা দরবার করার সময় আশা করেনি। ধনাকে মুকুন্দ ঘোষের চেয়েও বড় বাড়ি করিয়ে দেবে কমলা।

রাস্তায় দেখা মঙ্গলার সাথে। সেও নাচনী- তবে বংশপরম্পরায়। তার মায়ের গর্ভ নষ্ট করা হয়নি। তার দুই ভাইও আছে। তবে তাদের ভদ্র পথে রোজগারের সুযোগ নেই। রাণিগঞ্জে গিয়ে কয়লার কারবার করে। কেমন কারবার সেটা স্পষ্ট নয়। মঙ্গলার মা পাঁচকড়ি তার মা গিরিবালার কাছ থেকে সামান্য কত্থকের তালিম পেয়েছিল। কারণ গিরিবালা রীতিমতো ধ্রূপদী শিখতে শুরু করেছিল ছোটবেলায়। তার মা শৈলবালা ছিল রাজা কৃষ্ণ বর্মণের খাস নর্তকী। তিনি নাচলে রাজামশাই নিজে পাখোয়াজ বাজাতেন। রক্ষিতা হলেও রাজবাড়ির প্রাচুর্য ও আদব-কায়দার মধ্যে থেকেছেন। বারবাড়ি আর অন্দরমহল আলাদা বলে স্ত্রী ও রক্ষিতার মধ্যে সংঘাত বাধার অবকাশ ঘটত খুব কম। রানীরা নর্তকীর সঙ্গে কথাই বলতেন না। মাঝে মাঝে নাচ দেখতেন শুধু। শৈলবালাকে বাড়ি বাড়ি দাসীগিরিও করতে হোত না। রাজার দেওয়া বালুচরীর ঔজ্জ্বল্য ম্লান হয়ে গেলেও এখনও মঙ্গলার কাছে সযত্নে রাখা আছে।

“যাস কুথা? বিটি শুনছি পেরাইমারি পাস দিলেক”।

“ঘরামির সাথে ঘর ছাওয়ার কাজে। রবীন গোপের গোয়ালের কাজ। আর আমার মেইয়ে ফোর পাস দিছে না, টুসুর মায়ের কী জ্বলন কী জ্বলন! টুসু ফেল মেইরেছে লয়? তবে উয়ার বাপকে হাতে-পায়ে ধইরে বড় হুস্কুলে ভর্তি করাইতে রাজি করাইনছি। উ বইলেছে বিউটিকে নিজে ভর্তি করাইবেক”।

“করাবেক মানে? অখনও অ্যাডমিট হয় নাই? কেলাস ফাইভের নতুন কেলাস তো কবে শুরু হঁইন গেছে”।

“যাঃ! ধনা সর্দার যে বইললেক অখনও মাসখানেক দেরি আছে অ্যাডমিটে?”

“তবে তাখেই শুধাগে যা। আমি বসন্ত মল্লিকের লেগে ঐ হুস্কুলের পাঁচিলে ঘুঁটে দিয়ে আসি হপ্তায় তিন দিন। যা দেখছি নিজের চোখে, তাই বইলাম। বিশ্বাস না যায় শুধা কেনে দিদিমণিদের”।

কমলার মাথা ঝিম্‌ঝিম করতে লাগল। ক্ষীণভাবে নিজের বিশ্বাসে অটল থাকতে তর্ক করল।

“ধনা তুকে মিছা বইলছে। পেরাইমারিতে ভর্তির সময় নিজের নাম দিঁইছিল উ, যে হাইস্-কুলের বেলা দিবেক? তুর নামে বিউটি হুস্কুলে দাখিল হয় নাই? ইবারও ধনার ভরসা না কইরে নিজে গেলি নাই কেনে?”

রবীন গোপের বাড়ি না গিয়ে সোজা ‘নিজের বাড়ি’ ফিরে এল কমলা। ধনঞ্জয় তখন সদ্য ঘুম থেকে উঠে তেল-মুড়ি আর চা দিয়ে জলখাবার খাচ্ছিল। কমলা ঝাঁপিয়ে পড়ল। “বিউটিকে কবে অ্যাডমিট করাবে?”

“মানে? তার তো দেরি আছে। বইলেছি তো উটো ইবার আমার ভাবনা। তুঁই ইটো জানতে কাজ ফেইলে ঘরকে আলি?”

“কেলাস ফাইভের কেলাস পেরায় এক মাস আগে থাইকতে শুরু হঁইনগেছে। উয়াদের ভর্তি লিবার সময় শেষ। গরীবের বিটি বইলে একটো জলপানির ব্যবস্থা হঁইছিল। সিটো আর পাবেক নাই বিউটি। নিজের বিটির সাথে এমন বেইমানি কইরতে পাইরলে?”

“কে বইলেক ইসব? যা কইরেছি বেশ কইরেছি। জলপানির টাকায় সব হইত? খরচ যুগাবেক কে?”

“রোজগার তো আমি করি। নিজের মিয়ার জইন্য এটুকু করার অধিকার নাই আমার? আমি বলে ডবল খাইটছি, আর তুমি-..”

রোজগার, অধিকার? এত স্পর্ধা! চা শুদ্ধু এঁটো গ্লাস ছুঁড়ে দিল কমলার দিকে। আবার উত্তম-মধ্যম খাওয়ার শখ হয়েছে মাগীর। নাহলে যে থালে খায়, সেই থালে ছ্যাঁদা করে?

ধনার বৌ কুটনো কাটতে কাটতে তারিয়ে তারিয়ে মজা দেখতে লাগল। “মর কসবি”। না, না, মরে গেলে সংসারের আয় কমবে, অতসীর কাজ বাড়বে। স্বামীর হাতে মার সেও যে খায়নি তা নয়। গায়ের জ্বালা একটু জুড়োলে বরের হাত চেপে ধরে বলল, “ওগো, ইবার ছাড়ান দাও। আমি কথা দিছি, আর হুস্কুকের নাম কইরবে না। কমলিকে ছাড়ো। বিউটিকেও নাচ-গানের তালিম দাও”।

অত মার খেয়েও ঝাঁঝিয়ে উঠল কমলা। “উয়ার পড়ার খরচ তো আমি বাড়তি খেইটে যুগায়েনছি, যুগাবও। তুমাদের গায়ে লাগে কেনে?”

“এই হারামজাদি। আমি তুকে বাঁচাতে চাইছি, তুঁই আমার উপর কথা বলিস? টুসুর বাপ তোকে মেইরে ফেইললে বিটিটোর কী হবে ভেইবে দেখছিস?”

“উটো তুমরা ভেইবে রেইখেছ? নাচনী কইরবে। দাসুর হাতে তুলে দিবে”।

যাকে নিয়ে এত অশান্তি সে দাওয়া ঝাঁট দেওয়া বন্ধ রেখে অঝোরে কাঁদছিল। ধনা থামলে মাকে জল দিয়ে পরিস্কার করল। দশ বছরের বালিকার মাকে ঘর পযর্ন্ত নিয়ে যেতে জোর পায় না। অবাক হয়ে দেখল, অতসীমামি মাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে মুখে জল দিচ্ছে। বিউটিকে বলল, “আজ রেতে মায়ের পাশে শুস। সেবা করিস”।

রাতে মায়ের পাশে? বিউটির চোখে জল এল অভাবনীয় সৌভাগ্যে। এ তো স্কুলে যাওয়ার চেয়েও বেশি আনন্দের। নাহলে দালানে শুয়ে মশার কামড় খেতে খেতে সারা রাত শুনতে হয় মায়ের চাপা কাতোরক্তি আর ‘বাপের’ চাপা গর্জন। মাকে দিয়ে কী করায়, আর মাকে কী করে ঐ বয়সেও আবছা আন্দাজ করতে পারে, আর অসহায় আক্রোশে কাঁদে।

দিন দুয়েক উঠতে পারল না কমলা। গায়ে জ্বর। পাকা পায়খানায় বসার অনুমতি পেল মা মেয়ে। ধনা অতসী নিজেদের মধ্যে গুজগুজ করে, ওদের কিছু বলে না। তৃতীয় দিন সকালে কমলা উঠোন ঝাঁটাতে এলে ধনা নরম গলায় বলল, “আজ শরীল ঠিক আছে?” এর দু রকম মানে হয়।

“টুকদু। পুরা লয়”।

“পরাণ গরাইয়ের নাম শুনছিস? উ সরকারি জলসায় ঝুমুর দিবেক। তুঁই যাবি উয়ার সাথে? যা না। দু দিন মনটো ভালো থাইকবেক”।

“পরাণের সাথে? তালে বিঊটিকেও নিয়ে যেইতে মন কইরছে। উ যাবেক আমার সাথে?”

“বিউটি গিয়্যা কী কইরবে? তুঁই তো উয়াকে নাচনী কইরতে চাস না”। 

“ উ তো সবার কাছে শুনে উয়ার মা নাংটি বটে, একবার শিল্পী মাকে দেখুক কেনে”।

“উয়াকে আমি উরমা বালিকা বিদ্যালয়ে দাখিল করাব। তুঁই যা চাস”।

সত্যি বলছে ধনা? হবেও বা। বাপ তো যতই হোক। চোখের জল সামলে ধরা গলায় বলল, “তুমি সাথে যেইতে লাইরবে?”

“আমার অনেক কাজ। বিউটির লেগেও তো থাইকতে হবেক”।

আজ কার মুখ দেখে উঠেছে কমলা? ঐ হতভাগী মেয়েটারই তো! তবু মনটা কেন কু গায়?

দোনোমোনো করে পরাণের দলে ভিড়েই গেল কমলা। দুদিন বই তো নয়।

ভালোই কাটল দুটো দিন। সরকারি অনুষ্ঠান কিনা বোঝা গেল না। ফেরার সময় পরাণ ওকে অন্য গাঁয়ে নামাল। তার বাড়িতে নিয়ে যেতে চায়। পরাণের আন্তরিক ডাকে সাড়া দিতে হলেও মেয়েটার কী হল জানতে এক্ষুণি নিজের বাড়ি ফিরতে ইচ্ছা করছে। সে উস্‌খুস্ করতে থাকে। “পরাণদাদা তুমার বাড়ি তো দেইখলম। ইবার আমাকে জুরিডি পোঁহুছানোর ব্যবস্থা কর”।

“এবার থেইকে ইটোই তুর আস্তানা। ধনার কাছে নগদ সাত হাজার টাকা দিয়্যা কিনছি তুকে”।

“তার মানে? উ আমাকে বেইচে দিঁইছে? আর আমার মিয়া বিউটি?”

পরাণ কুৎসিৎ মুখভঙ্গী করে হাসল। “তুর বিটিকে লিয়ে ধনা রসিক রেইতে ঘরে দোর দিছে, দেইখতে পাইরবি?”

1 comment:

  1. গল্পটা অসম্পূর্ণ কেন? পুরোটা কীভাবে পড়া যাবে?

    ReplyDelete