0

ছোটগল্প - আইভি চট্টোপাধ্যায়

Posted in


ছোটগল্প


মুক্তি
আইভি চট্টোপাধ্যায়



সকাল সকাল খারাপ খবর। শ্রেয়াদির শাশুড়িমা আর নেই। এক বাড়িতেই থাকতেন, পৃথগন্ন যদিও। সহকর্মীদের একটা দায় থাকেই। অফিসের একটা মানবিক মুখ যাতে দৃশ্যমান থাকে, সে নিয়ে কর্তৃপক্ষও সজাগ। সহকর্মিনীরা কেউ কেউ শ্রেয়াদির বাড়িতে যাবেন, দু’জন সহকর্মী অন্তত শ্মশানসঙ্গী হবেন। একে ওকে কাজ বুঝিয়ে দিতে যেটুকু দেরি। হঠাৎ দেখা গেল শ্রেয়াদি চাবি দোলাতে দোলাতে এগিয়ে আসছেন। 

‘‘কি কাণ্ড! চাবি পৌঁছতে আপনি নিজে আসতে গেলেন কেন? আমি তো সমীর কিংবা নিতাইকে পাঠিয়েই দিতাম....!’’ সুজিতদা নিজে চেম্বার ছেড়ে উঠে এসেছেন। 

‘‘তাছাড়া আমরা তো তোমার বাড়িতেই যাচ্ছিলাম...’’ বীণাদি এসে হাত ধরলেন, ‘‘এই অবস্থায় তুমি এতদূর এলে?’’

শ্রেয়াদি বেশ অবাক, ‘‘তোমরা আমার বাড়ি যাচ্ছিলে? এই মাঝ সপ্তাহের দিনে? কেন?’’

তাহলে খবরটা মিথ্যে? কে যেন খবরটা এনেছিল? সুজিতদা কড়া চোখে মুখগুলো নিরীক্ষণ করে নিজের কাচঘরে ঢুকে গেলেন। 

‘‘আমরা আসলে... একটা খবর পেয়ে...’’ বড়বাবু থেমে থেমে বললেন, ‘‘এই যে দেবু... দেবপ্রিয়... ফাজলামির একটা সীমা আছে।’’

দেবু সবসময় বড়বাবুর সঙ্গে মজা করে.... এই টিফিনবাক্স লুকিয়ে ফেলল, একদিন তো বড়বাবু টিফিনবাক্স খুলতেই সেদ্ধ ডিম তুলে কপ করে মুখে তুলে নিল, একদিন ছাতা লুকিয়ে ফেলল তো একদিন চশমা। আর মিথ্যে মিথ্যে ‘‘আপনাকে সুজিতদা ডাকছেন’’ যে দিনে কতবার ! 

‘‘আমি তো নিজেই দেখে এসেছি। রাতে বিজু-চিত্তদার সঙ্গে সঞ্জীবনীতেও গেছিলাম।’’ দেবুও বেশ অবাক। বিজু শ্রেয়াদির দ্যাওর, দেবুর বন্ধু। চিত্তদা শ্রেয়াদির স্বামী। 

‘‘দেবু তো ভুল খবর দেয় নি’’, শ্রেয়াদি ততক্ষণে হাতের ব্যাগ টেবিলে রেখে গুছিয়ে বসেছেন, ‘‘এতদিনে বুড়ি সত্যিই মুক্তি দিয়েছে।’’

‘‘তাহলে? আপনি অফিসে এলেন আজ?’’ 

‘‘অফিসে আসব না কেন? বেঁচে থাকতে কম জ্বালিয়েছে আমায়? এখন আমি কর্তব্য করব?অফিস কামাই করে ফুল-চন্দন দিয়ে সাজাব বুড়িকে?আজ আমার দিন। সবার মুখের সামনে দিয়ে বেরিয়ে এসেছি। আমার ননদ দুটো তো হাঁ করে দেখল।’’ 

‘‘চিত্তদা কিছু বললেন না তোমায়?’’ মালা বলে ফেলেছে। 

‘‘কি বলবে?কি বলবে সে?তার বলার মুখ আছে?এই তো দেবুকেই জিজ্ঞেস করে নে, কি অত্যাচার হয়েছে আমার ওপর। পাড়ার ছেলে, ও সব জানে। তুই নতুন এসেছিস, কিছু জানিস না, বুঝিস না...’’ বেশ রেগেই উঠলেন শ্রেয়াদি। আজ সকাল থেকেই মেঘলা আকাশ, গুমোট। আকাশের মেঘের ভার এসে জমেছে শ্রেয়াদির গলায়। বড্ড গুমোট। একটুও হাওয়া নেই। 

‘‘সে সব ঠিক আছে... আমরা তো জানিই শাশুড়ি-ননদের কত অত্যাচার সহ্য করেছ তুমি। আমরাই কতবার বলেছি তোমায়, ছেলেদের নিয়ে আলাদা হয়ে যাও... কিন্তু...’’ 

বীণাদি আর দীপ্তি এসে বসলেন কাছে, ‘‘আজ এই অবস্থায়... পাঁচজন কি বলবে? চিত্তদার কথাটাও ভাবো।’’

‘‘পাঁচজন কি বলবে?আমার ওপর যখন অত্যাচার হত, পাঁচজন এসে দাঁড়িয়েছিল?আর তোমাদের চিত্তদা?তার সাহস আছে আমার মুখোমুখি হবার?সে আমাকে কর্তব্য দেখাবে? বউকে প্রোটেকশন দেওয়ার কর্তব্য করেছে কোনোদিন? ওই শাশুড়ি যখন আমায় বাড়ি থেকে বার করে দিয়েছিল, তোমাদের চিত্তদা তার প্রতিবাদ করেছিল?একা হাতে দুই ছেলেকে বড় করেছি, অত অত্যাচার সয়ে নিজের চাকরি সামলে সংসার করেছি... আজ আমার পায়ের তলায় শক্ত জমি, দুই ছেলে মানুষ হয়ে গেছে... আমার ছেলেরা আমার অহঙ্কার...’’ 

বলতে বলতে উত্তেজিত শ্রেয়াদি, ‘‘শোনো, আমি হিপোক্রিট নই। মনে এক, মুখে এক করি না। আমার মতো হতে গেলে মনের জোর লাগে।’’

‘‘তাহলে... দেবু যে আজ হাফ-ডে ছুটি নিয়ে তোমার বাড়ি যাচ্ছে?’’ কি বলবেন ভেবে না পেয়েই বোধহয় বলে বসলেন বড়বাবু।

‘‘আমার বাড়ি যাচ্ছে না, দেবু শ্মশানে যাচ্ছে। ও তো পাড়ার ছেলে, ওরা সবার সঙ্গেই যায়।’’

পাড়ার ছেলেদের দায় কেন নিতে হয় কে জানে! কে-ই বা এখন সে কথা জিজ্ঞেস করবে শ্রেয়াদিকে?কে জানে কেমন অন্ধকার পাড়ি দিতে হয়েছে যে একজন মৃত মানুষকেও ক্ষমা করার শক্তি নেই আর। আপাতসুখী স্বচ্ছলতার যাপনেও লুকিয়ে থাকে কতখানি আঁধার ! 

‘‘তোমার ছেলেরা খবর পেয়েছে?’’ বীণাদি। 

‘‘আমি খবর দিতে দিই নি। রনি রাতে ফোন করবে, তখন শুনবে নাহয়। আর রুকু তো শীতের সময় আসবে। তোমরা এত ছটফট করছ কেন?বলছি তো, আমার বাড়ির ব্যাপার, আমি বুঝে নিচ্ছি। আমারই যেখানে দায় নেই, তোমাদের কি করণীয় আছে?’’

তবু বড় অস্বস্তি হচ্ছে সবার। মূল্যবোধের অস্বস্তি। কিন্তু আজকের মানুষ যে ব্যক্তি-স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। আর সম্পর্কের দাবি নিয়ে মূল্যবোধ?সেও তো ব্যক্তি-মানুষের নিজস্ব বিচার। 

একটা ফোন এসে গেল শ্রেয়াদির।

থমথমে মুখে ফোন হাতে নিয়েই একমুখ হাসি, ‘‘রুকু?এইসময়?এখন তো ওখানে অনেক রাত!’’ তারপর একদম চুপ। ফোন ছেড়ে দেবার পরও টেবিলে হাত রেখে বসে। অনেকক্ষণ। তারপর বড়বাবুর টেবিলের কাছে উঠে গেলেন। এসে ব্যাগ হাতে নিলেন, ‘‘আসি। বাড়ি যাচ্ছি।’’

বীণাদি উঠে এলেন, ‘‘সব ঠিক আছে তো?’’

‘‘রুকু আসছে। কাল কিংবা পরশু। যেদিন টিকিট পায়। রনিও আসছে। ফ্লাইটে আছে। আজ বিকেলের মধ্যেই এসে পড়বে।’’

কেমন উদভ্রান্ত এলোমেলো হয়ে আছেন শ্রেয়াদি, ‘‘রুকু কি বলল, জানো?কত কষ্ট পেয়েছ তুমি ঠাম্মার কাছে। কত নিষেধ, শাসন। আচার-বিচার-কুসংস্কার। কত গঞ্জনা। রোজ ঝগড়া, অশান্তি। ঠাম্মা চলে গেল, সব কেমন থেমে গেল। আজ তোমার মুক্তি। কিন্তু তুমি যে বড্ড একলা হয়ে গেলে। বাবাও তো এসময় তোমার পাশে থাকতে পারবে না। তাই আমরা দু’ভাই ঠিক করেছি, এইসময় তোমার কাছে থাকব।’’

হঠাৎ একঝলক জল এল শ্রেয়াদির চোখ ভরে, ‘‘ওই মানুষটাকে দেখতাম, আর ভাবতাম খুব। মনের মধ্যে একটাও জানলা নেই, একটুও আলো নেই, সব অন্ধকার। এ কেমন মানুষ?আজ রুকু আমার মনের জানলাটা খুলে দিল। কি করছিলাম আমি?আমিও যে একজন অন্ধকার মনের মানুষ হয়ে বেঁচে থাকতে চাইছিলাম। তাকে ক্ষমা না-ই করতে পারি, রুকু-রনির বাবাকে তো আর অসম্মান করা যায় না। বলো?’’

আহা রুকু। আহা রনি। ভালোবেসে মাকে আগলে রাখতে চায়। বড্ড কষ্ট পাবে দুই ছেলে, যদি জানতে পারে যে এখনো মুক্তি হয় নি মায়ের। ছেলেরাই যে শ্রেয়াদির অহঙ্কার। সংসারে মস্ত হার হয়েছে। বারবার। কত অশান্তি, নিত্য গঞ্জনা। ছেলেরা মুক্তির আকাশ। ছেলেদের জন্যেই ঘরে বাইরে লড়াই। ছেলেরা শক্তি দিয়েছে, সহায় হয়েছে যাতে সব অপমানের জবাব দিতে পারে মা। সেই ছেলেদের কাছে হেরে যেতে পারবে না শ্রেয়াদি। ঠাম্মার ছায়া মায়ের মধ্যে দেখে তৃপ্তি পাবে না ছেলেরা।

সময় বুঝেই যেন ঝরে পড়ল একপশলা ঝিরঝির বৃষ্টি। মস্ত আকাশটা অন্তর্লীন আলোয় উজ্জ্বল, ঠিক শ্রেয়াদির মুখখানার মতো।



0 comments: