1

প্রবন্ধ - পিনাকী চক্রবর্তী

Posted in

প্রবন্ধ


চার ফুট সাড়ে আট ইঞ্চি 
পিনাকী চক্রবর্তী 


দাবী পরিত্যাগী কথন (ডিসক্লেইমার) : কোনো রূপ ফলের আশা রাখিয়া পড়িবেন না। এই কাহিনীর আরম্ভ হইতে সমাপ্তি পর্যন্ত কোথাও কোন ভাবের সমন্বয় বা সামঞ্জস্য নাই (গোদা বাংলায়, এ গল্পের কোনও মাথামুণ্ডু নেই)। কাহিনীর একাংশের সহিত অপরাংশের কোথাও কোনও ধারাবাহিকতা পরিলক্ষিত হইলে জানিবেন তাহা লেখকের অজান্তে আসিয়াছে, ইচ্ছাপ্রণোদিত ভাবে নয়। শ্রী এবং ছন্দহীন (ছিরিছাঁদ ছাড়া) এই গল্পে কোনও পাঠক/পাঠিকা যদি কোনও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গী বা জ্ঞানদানের অপচেষ্টা খুঁজিতে প্রচেষ্টা লাভ করেন, তবে তিনি তাহা নিজ দায়িত্বে করিবেন। বিভিন্ন সূত্র হইতে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে রচিত এই কাহিনীর সত্যাসত্য বিচারের ভার কাহাকেও দেওয়া হয় নাই, স্বয়ং লেখককেও নহে। যে কোনও কারণে এই কাহিনী মনোমত না লাগিলে কোম্পানী দায়ী থাকিবেন না। এবং হ্যাঁ, এই রচনার প্রথম চারটি অনুচ্ছেদ (প্যারাগ্রাফ) না পড়িলেও চলিবে!

মনে করুন একটা পেট্রোল চালিত মোটর গাড়ি ঘন্টায় আশি নব্বই কিলোমিটার গতিতে রাস্তা দিয়ে ছুটছে। আপনি কি জানেন যে, সে সময় তার এঞ্জিনের মধ্যে মিনিটে প্রায় পাঁচ হাজার বার একের পর এক বিস্ফোরণ ঘটে চলেছে? মিনিটে পাঁচ হাজার বার, মানে প্রত্যেক সেকেন্ডে প্রায় তিরাশি বার করে এই বিস্ফোরণ হয়ে চলেছে। অর্থাৎ, এক সেকেন্ডের একশো ভাগের প্রতি এক ভাগে একটা করে বিস্ফোরণ ... ভেবে দেখুন! আর, ওই বিস্ফোরণগুলো আপনা আপনি ঘটছে না, তাদের ঘটানো হচ্ছে। এঞ্জিনের ভেতরের সিলিন্ডারগুলোর মধ্যে পেট্রোল এবং হাওয়ার মিশ্রণকে বৈদ্যুতিক স্ফুলিঙ্গের সাহায্যে নিয়ন্ত্রিত ভাবে পূর্ব নির্ধারিত পরম্পরায় জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যাতে এঞ্জিন তথা গাড়ি চলতে পারে। এই নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের ধারাবাহিকতাই এ ধরনের এঞ্জিনের চালিকা শক্তির উৎস। 

এখানে কাজের কথাটা হলো “নিয়ন্ত্রিত ভাবে” ... অর্থাৎ এই তেল জ্বালানো আর এঞ্জিন চালানোর চেইন রিঅ্যাকশনের সমস্তটাই নিয়ন্ত্রনের মধ্যে রাখা হয়, কোনও অংশকেই কখনও তার নির্দিষ্ট মাত্রা ছাড়িয়ে যেতে দেওয়া হয়না। এমন কি, পর পর দুম দাম করে এরকম বিস্ফোরণের ফলে যে প্রচণ্ড উত্তাপের সৃষ্টি হয়, যে তাপশক্তি এই এঞ্জিনকে চালায়, তাকেও সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়। এই পৌনঃপুনিক বিস্ফোরণে এঞ্জিন কতটা গরম হয়ে উঠতে পারে, তারও সীমা বেঁধে দেওয়া থাকে। তার কারণ, এ ধরনের এঞ্জিন সবচেয়ে বেশি দক্ষতার সাথে কাজ করতে পারে মোটামুটি একশো ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রায়, যদিও এর থেকে অনেকটা কম এবং খানিকটা বেশি তাপমাত্রাতেও সাধারণ পেট্রোল এঞ্জিন স্বচ্ছন্দে কাজ করতে সক্ষম। তবে অনেকক্ষণ ধরে, খুব বেশি বা খুব কম তাপমাত্রায় কাজ করতে হ’লে এঞ্জিনের কর্মদক্ষতা এবং জীবনীশক্তি ... দূটোই অল্প অল্প করে কমে যায়। সাথে ফাউ হিসাবে পরিবেশ দূষণও বাড়তে পারে। তাই এটা হতে দেওয়া যায় না।

এতক্ষণ ধরে যা বলা হলো, তার সংক্ষিপ্তসার হলো সেরেফ দুটো কথা। এক) পেট্রোল এঞ্জিন চলতে থাকলেই গরম হবে, আর দুই) তাকে প্রয়োজনের থেকে বেশি গরম হতে দেওয়া চলবে না, কারণ তাহলে এঞ্জিনের আয়ু কমে যাবে। তাই এঞ্জিনের একটা বড় অংশ জুড়ে থাকে এঞ্জিনকে ঠান্ডা করার ব্যবস্থা, পরিভাষায় এঞ্জিনের কুলিং সিস্টেম। ঠান্ডা করার মাধ্যম হিসাবে সাধারণত জল ব্যবহার করা হয়। কিন্তু সাদামাঠা জল এ ধরনের বিরামহীন তাপপ্রবাহে বাষ্প হয়ে বেমালুম উড়ে যেতে পারে। তাই গাড়ির এঞ্জিন ঠান্ডা করার জলকে একটু অসাধারণ করে তোলা হয়। মানে, তাতে বিভিন্ন ধরনের কুল্যান্ট বা ঠান্ডাই মিক্সচার মেশানো হয়ে থাকে। 

এই ঠান্ডাই মিক্সচারের কাজ কিন্তু শুধু জলকে ঠান্ডা রাখাই না, আরো হরেক রকম হ্যাপা তাকে সামলাতে হয়। যেমন ধরুন, জলের থেকে রেডিয়েটর বা এঞ্জিনের যন্ত্রাংশে মরচে না ধরে, তাই তাতে রাস্ট ইনহিবিটর বা মরচে-নিরোধক কিছু পদার্থ মেশানো থাকে। ওয়াটার পাম্পের যন্ত্রাংশ ঠিকঠাক চালু রাখার জন্যে লুব্রিকেটর বা মসৃণতা প্রদায়ী কিছু যৌগও মেশানো হয়। বিদ্যুৎ পরিবাহিতা কম করার জন্যেও কিছুমিছু মেশানো হয়। আর মেশানো হয় অ্যান্টি ফ্রীজ নামক কিছু বস্তুর মিশ্রণ, যেগুলো ঠান্ডা দেশে এঞ্জিন ঠান্ডা রাখার জলকে জমে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচায়। মনে করুন, আপনি সিমলায় থাকেন। শীতের রাত্তিরে ঝুপ ঝুপ করে বরফ পড়ছে, আর আপনি গাড়ি চালিয়ে বাড়ি ফিরে, গাড়িটাকে বাড়ির সামনে পার্ক করে হিহি করে কাঁপতে কাঁপতে বাড়িতে ঢুকে পড়ে রুম হীটারের সামনে বসে গা গরম করছেন। আপনার গাড়ি কিন্তু সারা রাত একা একা রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকলো। তার গরম এঞ্জিন ঠাণ্ডা হলো, কুলিং সিস্টেমের জলও আস্তে আস্তে গরম থেকে ঠান্ডা হলো। তার পর আরো ঠান্ডা হতে হতে জমে একেবারে বরফ হয়ে গেল। রেডিয়েটরের সূক্ষ্ম ঝিল্লিগুলোর মধ্যে জল যদি জমে বরফ হয়ে যায়, তাহলে ব্যাপারটা কেমন হবে? সিমলাতে শীতকালে বাড়ির জলের পাইপের মধ্যে জল জমে বরফ হয়ে গেলে কি হয়? পাইপ ফেটে যায়। কারণ জল জমে বরফ হয়ে গেলে তা আয়তনে বেড়ে যায়। এরকম জল জমানো ঠান্ডা পড়লে, গাড়ির ক্ষেত্রে এঞ্জিনের ভেতরে জল পরিবাহী রাবারের হোসপাইপগুলো ফেটে যেতে পারে, রেডিয়েটরের সাথে যুক্ত ধাতব পাইপগুলোও ফেটে যেতে পারে ... এমনকি আস্ত রেডিয়েটরটাই ফেটে যেতে পারে। এ সমস্যা শুধু সিমলাতেই নয়, নিউ ইয়র্কেও হয়, ক্যানাডার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে হতে পারে, রাশিয়ার তো কথাই নেই...

সুতরাং এই সব জায়গায় দরকার কিছু অ্যান্টি ফ্রীজ পদার্থ, যা জলে মেশানো থাকলে জল চট করে জমে বরফ হয়ে যাবে না। এখন অবশ্য অনেক রকম অ্যান্টি ফ্রীজ আবিষ্কার হয়ে গেছে, কিন্তু আগেকার আমলে এত সুবিধে ছিলো না। আমি বলছি ১৯২৬ সালের কথা। সে সময় যা অ্যান্টি ফ্রীজ পাওয়া যেত, সেগুলো হয় খুব কাজের ছিলো না, অথবা খুব দামী ছিলো, আর নাহলে উদ্বায়ী হওয়ার কারণে সেই জিনিস ঘন ঘন ঢালতে হতো রেডিয়েটরের জলের মধ্যে। সেই আমলেও এটা বেশ বিরক্তিকর ব্যাপার ছিলো। আর সেই জন্যেই এই নিয়ে রিসার্চ চালাচ্ছিলেন দুই মার্কিন রসায়নবিদ, জোসেফ সি. প্যাট্রিক আর ন্যাথান ম্নূকিং। পরের নামটা পড়তে পারলেন কি? আমি তো পারছিলাম না! ওটা আসলে ময়ে নয়ে দীর্ঘ ঊ-কার, ম্নূ! ম্নূকিং! আচ্ছা, ওঁর নামটা যাই হোক, ওঁরা দুজনে মিলে চেষ্টা চালাচ্ছিলেন সস্তায় কিছু টেঁকসই অথচ কার্যক্ষম অ্যান্টি-ফ্রীজ বানিয়ে বাজারে ছাড়ার জন্যে। এই উদ্দেশ্যে বিভিন্ন যৌগ দিয়ে নানা রকম এক্সপেরিমেন্ট চালানোর সময় তাঁরা একবার ইথলীন ডাইক্লোরাইড আর সোডিয়াম পলিসালফাইড মিশিয়ে কিম্ভুত একটা বস্তু বানালেন। সেটা ভালো অ্যান্টি ফ্রীজ হলো কিনা কে জানে, কিন্তু বস্তুটা জন্মিয়েই একটা উৎকট রকম দুর্গন্ধ ছড়াতে লাগলো। তাড়াতাড়ি দুই বন্ধু সেটাকে ল্যাবের সিঙ্কে ঢেলে দিলেন। এবার জল ঢেলে সিঙ্কটা পরিষ্কার করতে যেতেই চিত্তির! তাঁরা দেখলেন সিঙ্কের নিকাশী ব্যবস্থা সম্পূর্ণ জ্যাম হয়ে গেছে।

দেখুন, সিঙ্ক জ্যাম হলে আপনি বা আমি প্লাম্বার ডাকবো! কিন্তু কেমিস্টরা অন্য ধাতু দিয়ে তৈরি। রসায়ানাগারে এরকম ছোটোখাটো দুর্ঘটনা হামেশাই ঘটে থাকে। ওঁরা এসব দেখে দেখে অভ্যস্ত। তার ওপর ওঁদের হাতের কাছে বিস্তর সলভেন্ট থাকে, যেমন ধরুন ইথানল, মিথানল, অ্যাসিটোন, বেঞ্জিন, টল্যুইন, কার্বন টেট্রাক্লোরাইড, তাপ্পর অ্যাকোয়া রিজিয়া... মানে, বুঝতেই পারছেন, আমি তো আর কেমিস্ট নই... রসায়নে আমার বিদ্যের দৌড় হায়ার সেকেন্ডারি পর্যন্ত। তাই ওই লাইনে বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করতে পারলাম না। তবে, ওই দুই বন্ধু ল্যাবে মওজুদ তাবৎ সলভেন্ট দিয়ে জট ছাড়ানোর চেষ্টা করে করে নিজেদের হালত খারাপ করে ফেললেন। কিন্তু সেই বিটকেল বস্তু কিছুতেই ওই সিঙ্ক থেকে সরানো গেলো না। সেটা যেমন সীল হয়ে ছিলো, তেমন সীল হয়েই থাকলো।

দুই বন্ধু এবার হাতে হাত লাগিয়ে সিঙ্কটাকেই খুলে ফেললেন, এবং তার নিকাশি পাইপ ফাটিয়ে ভেতর থেকে সেই পাইপকে সীল করে দেওয়া পদত্থটিকে উদ্ধার করলেন। সেটা দেখতে শুনতে অবিকল প্রাকৃতিক রাবারের এর মতো। অর্থাৎ ঘটনাচক্রে সেদিন ওই ল্যাবে একধরণের কৃত্রিম রাবার তৈরি হয়ে গেছে, সম্ভবত পৃথিবীর প্রথম কৃত্রিম রাবার। এবার দুই বন্ধুর কানে জল ঢুকলো। মানে, এঁরা বুঝলেন যে, নিজেদের অজান্তে তাঁরা একটা খুব কাজের জিনিষ আবিষ্কার করে ফেলেছেন। মানে, অ্যান্টি ফ্রীজের জায়গায় তাঁরা একটা অ্যান্টি-লীক সীল্যান্ট আবিষ্কার করে ফেলেছেন। এমন জিনিস, যা ফাটা পাইপ, ভাঙা সিঙ্ক ইত্যাদিতে জব্বর রকম জোড়া এবং তাপ্পি দিয়ে দেবে! এমন তাপ্পি, যা জীবনে খুলবে না এবং জীবনে লীকও করবে না। অনেকটা আমাদের এখনকার এম-সীলের মতো ব্যাপার, বুঝলেন তো? 

দুই বন্ধু মিলে ঠিক করলেন এর একটা নাম দিতে হবে। অনেক নাম বাছাবুছি করে শেষে একটা নাম পছন্দ হলো, থায়োকল। গ্রীক ভাষায় সালফারের নাম থেইয়ন (বা থেইয়ঁ) এবং আঠাকে বলে কল্লা। এই থেইয়ন আর কল্লাকে জুড়ে দিয়েই তৈরি হলো থায়োকল। এবার এটাকে নিজেদের নামে পেটেন্ট করিয়ে নিয়ে ওঁরা ব্যবসায়িক চিন্তা ভাবনা করতে লাগলেন। কিন্তু বিজ্ঞানীদের দিয়ে বোধহয় এসব হয় না। নিজেরা কিছুই করে উঠতে পারলেন না, তাই চেষ্টা চরিত্র করে নিউ জার্সির স্ট্যান্ডার্ড অয়েল কোম্পানীর বড়কর্তাদের সাথে দেখা করলেন। ওঁদের পেল্লায় পেল্লায় তৈল শোধনাগার, মানে রিফাইনারি টিফাইনারি আছে, ওখানে যদি এই থায়োকল কোনও কাজে লাগে। স্ট্যান্ডার্ড অয়েল এঁদের সাথে বৈষয়িক কথাবার্তা কিছুটা এগিয়ে নিয়ে গেলেও, তাদের চুক্তির কিছু শর্ত দেখে শেষমেশ পিছিয়ে আসতে হলো দুই বন্ধুকে। হতাশ হয়ে, বছর দেড় দুই পরে ওঁরা পেটেন্টের স্বত্ব বিক্রি করে দিলেন এক নুনের কোম্পানীর মালিক-কাম-ম্যানেজারকে। 

সেই নুন কোম্পানীর মালিক, বেভিস লংস্ট্রেথ, কিছু পয়সা কড়ি জমিয়ে থায়োকল কেমিকাল কর্পোরেশন বলে একটা কোম্পানী খুলে বসলেন ১৯২৯ সালে মিসৌরির কানসাস সিটিতে। কোম্পানীটা বানাতো কৃত্রিম রাবার আর পলিমার সীল্যান্ট। কিন্তু তাঁদেরকে সেসব বানাতে দিলে তো! প্রোডাকশন শুরু হতে না হতেই থায়োকল চারপাশে এমন দুর্গন্ধ ছড়াতে লাগলো যে, কানসাস সিটির বাসিন্দারা দলবদ্ধ ভাবে শহরের মেয়রের কাছে গিয়ে থায়োকল কর্পোরেশনের বিরুদ্ধে পরিবেশ দূষণের অভিযোগ আনলেন। মেয়র তো পত্রপাঠ তাঁদের সেই অভিযোগ মেনে নিলেন। এদিকে সেই ঠেলায় কোম্পানী প্রায় লাটে ওঠে আর কি! কিন্তু রাখে কৃষ্ণ মারে কে? মরিয়া হয়ে নিজের পকেটের শেষ সম্বলটুকু খরচা করে লংস্ট্রেথ সাহেব নিউ জার্সির ট্রেন্টনে থায়োকলের ফ্যাক্টরি বানালেন ১৯৩৫ সালে। এ জায়গাটা মনে হয় ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন, কারণ এখানে থায়োকলের দুর্গন্ধ নিয়ে কেউ আপত্তি তুললো না। ঢিকিয়ে ঢিকিয়ে কোম্পানী চলতে লাগলো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় লংস্ট্রেথ ভেবেছিলেন তাঁর কৃত্রিম রাবার হয়তো অনেক কাজে লাগবে। কিন্তু কাজের বেলায় দেখা গেল প্রাকৃতিক রাবার রি-সাইকল করেই মিত্রশক্তি খরচ বাঁচাচ্ছে। তবে, যাই হোক, মিত্রশক্তিকে ওই কৃত্রিম রাবারের তৈরি কিছু বিশেষ হোস পাইপ আর এই তরল পলিমার সীল্যান্ট সাপ্লাই করেই থায়োকল কোম্পানী বাজারে টিঁকে থাকলো। যুদ্ধের শেষের দিকে, ১৯৪৪ সালে, লংস্ট্রেথ সাহেবও দেহ রাখলেন। কোম্পানীও আবার লাটে উঠতে চললো। কেউ আর এগিয়ে এসে এই ডুবন্ত কোম্পানীর দায়িত্ব নিতে চায় না। অবশেষে কোম্পানীর ভাইস-প্রেসিডেন্ট জোসেফ ক্রসবি সাহেবকে ধরে পেড়ে সবাই মিলে কোম্পানীর দায়িত্ব তাঁর হাতে তুলে দিলেন। 

এদিকে, ওই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেরই শেষের দিকে, অক্ষশক্তি এবং মিত্রশক্তি, দু’পক্ষই প্রচুর গবেষণা চালাচ্ছিলো বিভিন্ন ধরনের রকেট নিয়ে। হিটলারের জার্মানি তরল জ্বালানী চালিত ভি-২ মিসাইল দিয়ে ইংল্যান্ডের ওপর সরাসরি আক্রমণ শানাচ্ছিলো ১৯৪৪ সালের শেষ দিক থেকে, যার পাল্টা জবাব দেওয়ার মতো কোনও অস্ত্র সেই সময় মিত্রশক্তির কাছে ছিলো না। মার্কিন মুলুকে সে সময় সলিড ফুয়েল রকেট নিয়ে গবেষণার কাজ চলছিল ক্যালিফোর্নিয়াতে, প্যাসাডেনার জেট প্রপালশন ল্যাব-এ (সংক্ষেপে জেপিএল)। এটা যদিও একটা সরকারী রিসার্চ ল্যাবরেটরি, কিন্তু ১৯৩০ সালে যখন এই জেপিএল তৈরি করা হয়, তখন থেকেই ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি (ক্যালটেক) জেপিএল-এর দেখভাল করতেন। জেপিএল বর্তমানে নাসার রিসার্চ সেন্টার হলেও, এখনও ক্যালটেকের গবেষকরা এখানে মহাকাশযান নির্মাণ এবং রকেট বিজ্ঞান নিয়ে কাজকর্ম করে থাকেন। 

সে যাই হোক, সেই ১৯৪৫ সালে সলিড ফুয়েল রকেট নিয়ে জেপিএল নানা রকম সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিলো। একে তো রকেটের ভেতর সলিড ফুয়েলকে ভালভাবে ধরেবেঁধে রাখা মেলাই ঝামেলা, তার ওপর এই কঠিন জ্বালানীর জ্বলন নিয়ন্ত্রনের উপযুক্ত কোনও স্টেবিলাইজারও পাওয়া যাচ্ছিলো না। 

কালীপুজোর সময় উড়ন তুবড়ি যাঁরা বানিয়েছেন, তাঁরা এই “ধরেবেঁধে রাখার প্রবলেমটা” হয়তো বুঝবেন। পটাশ, সোরা, গন্ধক, অ্যালুমিনিয়াম চূর্ণ, কাঠকয়লার গুঁড়ো ইত্যাদির মিশ্রণটা একটু কম ঠাসা হলে তুবড়িটা ঝট করে ফ্যাঁস দুম ফট হয়ে যায় বলে শুনেছি। (আমাকে মারবেন না প্লীজ, আমি একে এইসব বিপজ্জনক জিনিসের ফিনিশড প্রোডাক্টেই কখনো হাত দিইনি, তায় আবার সে বস্তু বানানোর টেকনোলজি!!! রক্ষে কর প্রভু)! তুবড়ির ব্যাপারটা ভালোভাবে না বুঝলে, ঝুরঝুরে শামী কাবাবের কথাও ভেবে দেখতে পারেন। ওখানে ছোলার ডালের পেস্টটা ঝুরঝুরে কিমাকে বাইন্ড করায় সাহায্য করে। সর্বোপরি ডিমের গোলা আছেই, কাবাবটাকে একসাথে ধরে রাখার জন্যে। এটা উড়ন তুবড়ি টেকনোলজির থেকে অনেক সহজ ব্যাপার, আমার মাথাতেও ঢুকলো…

তা সেই ১৯৪৫ সালে, একদিন জেপিএল-এর একজন গবেষক চার্লস বার্টলে তাঁর সলিড ফুয়েলের জন্যে ওইরকম ভালো বাইন্ডারের খোঁজে এটা সেটা নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করে দেখছিলেন। এদিকে, সেই সময় ল্যাবের এক কোণায় পড়ে ছিলো এক বোতল থায়োকল সীল্যান্ট। সেদিকে সাহেবের চোখ পড়লো। বোধহয় কাজের জন্যে কোন জলের বা কলের মিস্ত্রী ওই পদাত্থটি নিয়ে এসেছিলেন, কাজ হয়ে গেলে বোতলটি ফেলে চলে গেছেন। হঠাৎ কি কারণে কে জানে, বার্টলে সাহেব উঠে গিয়ে বোতলটা তুলে এনে “যা থাকে কপালে” বলে ল্যাবের টেবিলে রাখা রকেটের সলিড জ্বালানীর ওপর অল্প খানিকটা ওই থায়োকল লিক্যুইড সীল্যান্ট ঢেলে দেখলেন ফলটা কিরকম হয়! ফল যা হলো তা দেখে তো ভদ্রলোকের চক্ষু চড়কগাছ! থায়োকল একই সাথে সলিড ফুয়েলকে চমৎকার ভাবে একটা বড়ির মতো ঢ্যালায় বাইন্ড করে ফেললো, আর তারপর তার জ্বলনকেও স্টেবিলাইজ করতে সক্ষম হলো। এবং এই সব কিছুর সাথে সাথে নিজেও এক ধরনের জ্বালানীর মতো সম্পূর্ণ ভাবে জ্বলে গেল!!! এ রকম তিন তিনটে প্রবলেমের একটা সিঙ্গল সল্যুশন সেরেফ আকাশ থেকে পড়া... এ রকম কেলেঙ্কারি কান্ড কেউ কি কোনওদিন চক্ষেও দেখেছে? মানে ভেবে দেখুন, এই নিয়ে এই সালফারযুক্ত পলিমার আঠা তার আবিষ্কর্তাদের দ্বিতীয় বার চমকে দিলো। মনে হলো, জেট প্রপালশন ল্যাব যেন এই থায়োকলেরই খোঁজে ছিল এতদিন। যাকে বলে বগলমে ছোড়া, গাঁও মে ঢিন্ডোরা! হাতের পাশেই ছিলো বোতলটা, বার্টলে সাহেবের নজরেই পড়েনি এতদিন!!!

এর কিছুদিন পরে থায়োকল কর্পোরেশনের মার্কেটিং বিভাগের প্রধান কোম্পানীর ভাইস চেয়ারম্যান ক্রসবি সাহেবের অফিসে জরুরী ভিত্তিতে দেখা করতে এলেন। তিনি ক্রসবিকে চোখ গোল গোল করে জানালেন, প্যাসাডেনার একটি ল্যাবোরেটরি দিন নেই রাত নেই, কেবল বিপুল পরিমাণে থায়োকল সীল্যান্ট কিনে চলেছে বাজার থেকে। অত সীল্যান্ট দিয়ে হয়তো তাবৎ ক্যালিফোর্ণিয়ার যাবতীয় পাইপ সীল করে দেওয়া যায়। অথচ এই ল্যাব যে ওই পরিমাণ সীল্যান্ট দিয়ে কি করছে, তা বোঝা যাচ্ছে না। এদিকে থায়োকলের সাপ্লাই দিতে দিতে স্থানীয় খুচরো ব্যবসায়ীরা হাঁপিয়ে উঠেছেন। তাঁরা সমানে ট্রেন্টনের ফ্যাক্টরিতে এত্তালা পাঠাচ্ছেন, মাল পাঠাও, তুরন্ত, জলদি জলদি, আবভি কে আবভি! ব্যাপারটা রহস্যজনক, বুঝলেন তো ক্রসবি সাহেব, লাগতা হ্যায় ... ডাল মে জরুর কুছ কালা হ্যায়!

ডাল মে কালা কি হে, এ তো দেখছি পুরো ডালটাই কালা! ব্যাপারটাকে তো কাল্টিভেট করতে হচ্ছে! সমস্ত কাজকর্ম ফেলে ক্রসবি সাহেব ছুটলেন জেপিএল ল্যাবের উদ্দেশ্যে। ক্যালটেকের তত্ত্বাবধানে চললেও, এই ল্যাব তখন যুদ্ধের জন্যে ক্ষেপণাস্ত্র বানানোর কাজে লিপ্ত। সুতরাং ল্যাবে প্রবেশ করার ছাড়পত্র পাওয়া বেশ ঝঞ্ঝাটের কাজ! কিন্তু ক্রসবি সাহেব ল্যাবের গেটে মিলিটারি পাহারা দেখেই কিছু একটা আন্দাজ করে নিলেন। পরে ল্যাবের বাইরে দুয়েকজন গবেষকের সাথে কথাবার্তা বলে যা বোঝার তা বুঝে নিলেন অল্প সময়েই। বুঝে নিয়ে আর সময় নষ্ট করলেন না তিনি, সোজা রওনা দিলেন ওয়াশিংটনের দিকে। সেখানে মিলিটারী বড় কর্তাদের দেখা করার অনুমতি চাইলেন তিনি। এবং কিমাশ্চর্যম! অনুমতি সাথে সাথেই পাওয়া গেল। সেইদিনই মিলিটারী অর্ডন্যান্স কোরের জেনেরালদের সাথে খোলাখুলি ভাবে কথা বললেন তিনি। 

এধরণের মামলায় মিলিটারী কর্তারা সাধারণত তুম-তানা-নানা করে কিছু সময় কাটান। তাঁদেরকে পাকড়াও করে কোন চুক্তিপত্রে সই করানো কোনও ছোটখাটো ব্যবসায়ীর পক্ষে খুব একটা সহজ কাজ নয়। আশ্চর্য ব্যাপার হলো, এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের মিলিটারী বড়কর্তারা এক কথায় ক্রসবির সমস্ত শর্তে রাজি হয়ে গেলেন। শুধু তাই-ই নয়, তাঁরা জানালেন, রকেট ফুয়েলের ওপর রিসার্চ চালানোর জন্যে থায়োকল কর্পোরেশনকে তাঁরা সরকারী খরচায় একটা রিসার্চ ল্যাবরেটরি বানিয়ে দিতে চান। এর জন্যে জায়গা, জমি, পরিবেশ সংরক্ষণ সার্টিফিকেট, ল্যাব টেকনিশিয়ান, এমনকি সদ্য পাশ করে বেরোনো এঞ্জিনীয়ারদের একটি আস্ত বাহিনীও তাঁরা জুটিয়ে দিতে পারেন, (আক্ষরিক অর্থেই) যুদ্ধকালীন তৎপরতায়। এ তো মেঘ না চাইতেই জল!!! লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে রাজী হয়ে গেলেন ক্রসবি সাহেব।

তারপর কাজ শুরু হয়ে গেল, ওই যুদ্ধকালীন তৎপরতাতেই। এবং, এতদিনে থায়োকল কর্পোরেশনের কপাল ফিরে গেল। তাঁরা ব্যবসার লাইনটাই চেঞ্জ করে নিজেদের বানিয়ে ফেললেন রকেট এঞ্জিন বানানেওয়ালা কোম্পানী। নিউ জার্সি থেকে চাটিবাটি উঠিয়ে মেরিল্যান্ডের এলক নদীর পাড়ে এলক্টন শহরে নতুন ল্যাবোরেটরি এবং রিসার্চ ফ্যাসিলিটি খুলে ফেললেন। এবং একই সাথে অ্যালাবামার হান্টসভিলে শুরু হয়ে গেল তাঁদের নতুন প্রোডাকশন ফ্যাসিলিটি। ১৯৪৮ সালে এলক্টন ল্যাবরেটরির লাগোয়া প্ল্যান্টে কোম্পানীর তৈরি প্রথম সলিড ফুয়েল মোটর প্রস্তুত হলো, রকেট চালানোর জন্যে। ১৯৪৯ সালে পৃথিবীর প্রথম সলিড ফুয়েল মিসাইল সিস্টেম টিএক্স-১৮ ফ্যালকন তৈরি করে ফেললো থায়োকল কর্পোরেশন। তার কিছুদিন পরেই, অর্থাৎ ১৯৫০ সালে কোরিয়ার যুদ্ধ শুরু হওয়াতে থায়োকল কর্পোরেশন আর চোখে মুখে কিছু দেখার অবস্থায় থাকলো না, এমনই তাদের ব্যস্ততা। সেই ব্যস্ততা চললো ভিয়েতনাম যুদ্ধ জুড়েও। ইতিমধ্যে মিনিটম্যান-৩ মিসাইল তৈরির অর্ডার হাতে পাওয়া যাবে, এই আশায় কোম্পানী ইউটার ব্রিগহ্যাম সিটিতে তাদের একটা ঝকঝকে নতুন প্রোডাকশন প্ল্যান্টও বানিয়ে ফেললো। এরই সাথে তৈরি হলো নিকটবর্তী মরুভূমিতে তাদের রকেট এঞ্জিন টেস্ট ফ্যাসিলিটি।

সে যাই হোক, আমি এখানে থায়োকল কর্পোরেশনের ঠিকুজী কুষ্ঠি খুলে বসিনি। এইভাবে কোম্পানীর গুণগান করার জন্যে আমি তাঁদের থেকে একটা পয়সাও পাবো না। সুতরাং এঁদেরকে ছেড়ে আমি আমার কাজের কথায় চলে আসি। তার মানে, আমি কি এতক্ষণ ভ্যারেন্ডা ভাজছিলাম? হয়তো, কতকটা তাই...! তবে দেখুন, আমার ছোটবেলার থেকেই একটা ধারণা ছিলো, যে রকেট মানেই মহাকাশযান। সেই ধারণার পথ ধরেই এগিয়ে চলতে চলতে দেখতে পেলাম, ১৯৫৯ সালে থায়োকলের হান্টসভিল প্ল্যান্টে তৈরি হয় অ্যাটলাস রকেটের সাথে ব্যবহৃত ক্যাস্টর স্ট্রাপ-অন বুস্টার রকেট। এই অ্যাটলাস রকেটই বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন উপগ্রহদের মহাকাশে উৎক্ষেপণ করেছে, মহাকাশচারীদের নিয়ে মারক্যুরি মহাকাশযানকে মহাশূণ্যে উড়িয়েছে। এবং, এই কাজে হাত পাকিয়ে নেওয়ার পরেই, ১৯৭৪ সালে থায়োকল হাতে পেল একটা বহু কাঙ্ক্ষিত অর্ডার। সেটা হলো নাসার স্পেস শাটল উৎক্ষেপণের জন্য সলিড রকেট বুস্টার, বা সংক্ষেপে এসআরবি বানানোর বরাত।

এই ব্যাপারে নাসার বিজ্ঞানীরা থায়োকলের টেকনিকাল টীমের সাথে একটা প্রাথমিক মিটিং করে ফেললেন। বুস্টার রকেটের সব রকম স্পেসিফিকেশন তাঁরা ধরিয়ে দিলেন থায়োকলের টীমের হাতে। থায়োকলের এঞ্জিনীয়াররা এবার এই কাজের খুঁটিনাটি, সম্ভাব্যতা, ইত্যাদি পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে শুরু করবেন। 

কিন্তু পরের মিটিংয়েই গন্ডগোল বেধে গেল। থায়োকলের দল জানালেন, এই বুস্টার রকেট এঞ্জিনের মাপের কিছু পরিবর্তন করতে হবে। নতুবা, এই অপরিবর্তিত মাপের এঞ্জিন তাঁরা তাঁদের ব্রিগহ্যাম সিটির প্ল্যান্টে ডেলিভারি দিতে পারবেন, কিন্তু ফ্লোরিডার কেপ ক্যানাভেরাল, যেখান থেকে স্পেস শাটল উৎক্ষেপণ হবে, সেখানে পৌঁছে দিতে পারবেন না। শুনে তো নাসার মাথায় হাত। এরকম তো কথা ছিলো না। নাসা তো সব রকম মালপত্রের ডেলিভারি তাঁদের নিজেদের বাড়ির উঠোনেই, মানে ব্যাকইয়ার্ডেই চান। এই মাপের এঞ্জিন হলে থায়োকলের অসুবিধেটা কোথায়, জানতে চাইলেন তাঁরা।

থায়োকল বললেন, অসুবিধেটা হলো, চার ফুট সাড়ে আট ইঞ্চি নিয়ে। অর্থাৎ, রেল লাইনের স্ট্যান্ডার্ড গেজ নিয়ে।

নাসা বললেন, ঝেড়ে কাসুন, মশাই, আমাদের বেশি ধানাই পানাই করার সময় নেই।

থায়োকল টীম জানালেন, আপনারা চান আপনাদের রকেট বুস্টার ষোল ফুট ব্যাসের হোক, কিন্তু অ্যামেরিকান রেলরোড লোডিং গেজের অনুদিত তালিকা অনুযায়ী, চার ফুট সাড়ে আট ইঞ্চি গেজের, অর্থাৎ স্ট্যান্ডার্ড গেজের রেল রোডের যে সর্বাধিক উচ্চতায় মাল বহন করার অনুমতি আছে, তা হলো বারো ফুট সাত ইঞ্চি। অতএব আপনাদের এই রকেট বুস্টার, যার উচ্চতা হবে ষোল ফুট, সেটা আমরা কেমন করে ট্রেনে করে আপনাদের কাছে, অর্থাৎ ফ্লোরিডায় পৌঁছে দেব? উচ্চতা ছাড়া, এ রকেট আড়েও তো আটকে যাবে। চওড়াই-তেও লাইনের পাশে সিগন্যাল ইত্যাদির ক্লীয়ারেন্স থাকবে না। এবং সবচেয়ে বড় কথা, রকি মাউন্টেন পার হবার সময় যে কটা টানেল পার করতে হবে, তার মধ্যে খুব অল্প সংখ্যক টানেলেরই ওই পরিমাণ ক্লীয়ারেন্স থাকবে। এই হলো কথা... এবার সমস্যাটা আপনারা বুঝে নিন।

বোঝার কিছু নেই। অঙ্কটা আবার করে কষতে হবে, এবং বুস্টার রকেটের ব্যাস কমাতে হবে। কিচ্ছুটি করার নেই। নতুন করে রেললাইন পাততে মেলা সময় লাগবে। ততদিনে হয়তো প্রেসিডেন্ট বদলে যাবেন, কংগ্রেস বদলে যাবে, হাতে আসা গ্রান্ট হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে। তার থেকে রকেটের ডিজাইন বদলে দেওয়া অনেক সোজা। উঠে পড়লেন নাসার বিশেষজ্ঞের দল। যাওয়ার আগে শুধু এক ভদ্রলোক থায়োকলের এক এঞ্জিনীয়ারকে এক পাশে টেনে এনে বললেন, আচ্ছা, বলতে পারেন, এই চার ফুট সাড়ে আট ইঞ্চির গেজটা স্ট্যান্ডার্ড গেজ হলো কি করে? মানে, এটা কে ঠিক করে দিয়েছে?

থায়োকলের তরুণ ইঞ্জিনীয়ার পড়ুয়া ছেলে। সহাস্যে বললেন, সে অনেক কথা!

নাসা বললেন, বলুন শুনি। আমি যাবো ক্যালিফোর্নিয়া, আমার ফ্লাইট বিকেলবেলা। সুতরাং, এই মুহূর্তে আমার হাতে কিছুটা নষ্ট করার মতো সময় আছে।

থায়োকল বললেন, এই দেশে রেল লাইন প্রথম বিছিয়েছেন ব্রিটিশ এক্সপ্যাট এঞ্জিনীয়াররা। সুতরাং ধরেই নেওয়া যায়, যে তাঁরা নিজেদের দেশে যে গেজে অভ্যস্ত, সেই গেজই এখানে ব্যবহার করবেন।

নাসা জিগালেন, কিন্তু ব্রিটেনেই বা এই গেজ চালু হলো কেন?

থায়োকল বললেন, দেখুন, এ ব্যাপারে পাক্কা কিছু আমার জানা নেই। তবে একটা কানাঘুষো শুনেছি বটে আমাদের মেকানিকাল এঞ্জিনীয়ারিংয়ের ক্লাসে। 

নাসা বললেন, তাই শুনি!

থায়োকল বললেন, ব্রিটেন এককালে রোমানদের দখলে ছিলো। রোমানরা ব্রিটেনে, বিশেষ করে ইংল্যান্ডের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাওয়ার সময়ে ঘোড়ায় টানা যুদ্ধের রথ ব্যবহার করতো। সেই রথের চাকার দাগ কেটে বসতো মাটিতে। এক নাগাড়ে ইংল্যান্ডের গ্রামে গঞ্জে এই রোমান রথযাত্রা চলতে চলতে এমন অবস্থা হয়েছিলো, যে সব পথের মধ্যে দুটো চাকার ভারে দুটো গভীর দাগের সৃষ্টি হয়ে যেত ...

নাসা বললেন, হ্যাঁ জানি! ওকে বলে রাট ...

থায়োকল বললেন, বাধ্য হয়ে ব্রিটেনে সব ঘোড়ার গাড়ির চাকাও ওই রোমান রথের চাকার মাপে তৈরি করতে হলো। কারণ দুই চাকার মধ্যে দূরত্ব যদি ওই রথের চাকার সাথে খাপে খাপে না মেলে, তাহলে গাড়ির একদিকের চাকা গর্তে পড়ে গেলে এবং অন্যদিকের চাকা ওপরে থাকলে মূহুর্তের মধ্যে দুটো চাকাই মট মট করে ভেঙে যাবে।

নাসা বললেন, বুঝেছি। কিন্তু তার সাথে রেলের চাকার যোগ কোথায়?

থায়োকল বললেন, দেখুন, ওই ঘোড়ার গাড়ির অ্যক্সল বানানোর জন্যে যে জিগ, মানে মাপজোক করার ফ্রেম ব্যবহার করা হতো, প্রথম ঘোড়ায় টানা ট্রাম লাইন পাতার সময়েও সেই জিগ এবং যন্ত্রপাতিগুলোই ব্যবহার করা হয়েছিলো। রেল লাইনের গেজও সেই ট্রাম লাইনের অনুকরণেই তৈরি হয়েছিলো। এই কারণে... শুধু ব্রিটেনেই নয়, পশ্চিম এবং দক্ষিণ ইউরোপের অধিকাংশ দেশেই রেলের গেজ এই রোমানদের রথের চাকার মাপে তৈরি।

নাসা বললেন, বাপরে, কি দাপট! তা, একটা কথা বুঝলাম না, রোমানরাই বা এইরকম একটা অদ্ভুত সংখ্যায় কি করে উপনীত হলো।

খুব গুরুগম্ভীর ভাবে হাসি চেপে থায়োকল বললেন, ওটা হলো দুটো রোমান যুদ্ধাশ্বের সম্মিলিত নিতম্বের মাপ!

নাসা চমকে উঠে বললেন, অ্যাঁ?.

থায়োকল বললেন, আজ্ঞে, সেইরকমই তো শুনেছি। মানে ঘোড়া তো অনেক মাপেরই হয়, হতেই পারে। কিন্তু যুদ্ধের রথ টানার জন্যে যখন ঘোড়া বাছাই করা হতো, তখন তাদের নিতম্বের মাপটাই ছিলো কোয়ালিফাইং ফ্যাক্টর। রোম সাম্রাজ্য ভীষণ নিয়ম মেনে চলতো। প্রত্যেকটা চ্যারিয়ট এক মাপের হবে, তাদের চাকার গেজ এক মাপের হবে, চ্যারিয়ট টানার জন্যে নির্বাচিত ঘোড়ারা প্রত্যেকে এক মাপের হবে ... অবশ্য রথের দুটো ঘোড়া অসমান মাপের হলে সে রথ কন্ট্রোলে রাখাও মুশকিল ...

অনেকক্ষণ ধরে এই তথ্যটা হজম করে নাসা বললেন, পবিত্র হাগু! পৃথিবীর এখন পর্যন্ত সবচেয়ে উন্নত ব্যোমযানের রকেট এঞ্জিনের মাপ ঠিক করে দিলো প্রাচীন রোমান ঘোড়ার ইয়ে (মানে উনি যা বলেছিলেন, তার আক্ষরিক অনুবাদ করলে দাঁড়ায় “ঘোড়ার গাধা”)!

সংক্ষিপ্ত অভিযোজন : কলকাতার ট্রামলাইনের গেজও কিন্তু ওই চার ফুট সাড়ে আট ইঞ্চি। আমি বলছি বলে সেরেফ মুখের কথায় বিশ্বাস করে নিন। টেপ নিয়ে রাস্তার মধ্যে আবার যেন মাপতে বসবেন না! আর, ওই কলকাতায় যখন ঘোড়ায় টানা ট্রাম চলতো, তখন কিছু দিন দুই ঘোড়ায় টানা ট্রাম চলেছিলো (সুরেন বাঁড়ুজ্জে রোডের বোর্ণ অ্যান্ড শেফার্ডের ফোটোগ্রাফির দোকানে তার জলজ্যান্ত প্রমাণ আছে, নেট থেকে কপি করে সেরকম দুটো ছবি এখানে দিলাম)। পরে, চড়নদার লোকজন তেমন না হওয়ায়, এক ঘোড়ার ট্রাম দিয়ে চেষ্টা করে দেখা হয়, এমনকি গেজ ছোট করে মিটার গেজ করেও দেখা হয়েছিলো। কিন্তু তেমন সুবিধে হয়নি। শেষে, ঘোড়ার পাট তুলে দিয়ে ওয়েস্টিংহাউজ ইলেকট্রিক কোম্পানী এই শহরে ট্রামের বৈদ্যুতিকরণ করেছিলেন। তারপর থেকে ট্রাম আজও চলছে কলকাতার বুকে, সেই চারফুট সাড়ে আট ইঞ্চি গেজের লাইন ধরে…

1 comment: